তালাকের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তালাক (اَلْطَّلَاقُ) এর বিধান

তালাক (اَلْطَّلَاقُ) একটি আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ছেড়ে দেওয়া’ বা ‘বিচ্ছিন্ন করা’। ইসলাম ধর্মানুসারে, এটি হলো স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ছিন্ন করার একটি পদ্ধতি।

ইসলামে তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর ও অপছন্দনীয় কাজ। যদিও এটি শরীয়তসম্মত, তবে আল্লাহ তায়ালার কাছে এটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ হিসেবে বিবেচিত। ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র ও শক্তিশালী বন্ধন, যা যথাসম্ভব টিকিয়ে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে তালাকের সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও সতর্কবাণী রয়েছে। কারণ, তালাক শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন করে না, বরং এটি পরিবার ও সমাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই, চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে তালাককে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে দাম্পত্য জীবন বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللهِ الطَّلَاقُ

আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণ্য বৈধ কাজ হচ্ছে তালাক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৮, ইরওয়া : ২০৪০

দাম্পত্য সুখের জন্য তালাকের বিধান : ইসলামের প্রজ্ঞা ও দর্শন

ইসলামে তালাক (বিবাহবিচ্ছেদ) কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি গভীর প্রজ্ঞা ও দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা’আলা দাম্পত্য জীবনকে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান এবং বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু যখন সেই সম্পর্ক অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং আর কোনোভাবেই এর সংস্কার সম্ভব হয় না, তখন তালাকের বিধান কার্যকর হয়। এর উদ্দেশ্য কোনো সম্পর্ককে ভেঙে দেওয়া নয়, বরং একটি অস্থিতিশীল ও যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা থেকে দম্পতিকে মুক্তি দেওয়া এবং তাদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ করে দেওয়া। তালাকের এই বিধানের পেছনে ইসলামে যে প্রজ্ঞা ও দর্শন কাজ করে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

ক. অসহনীয় সম্পর্ক থেকে মুক্তি:

তালাকের মূল উদ্দেশ্য হলো দম্পতিকে এমন একটি সম্পর্ক থেকে মুক্তি দেওয়া, যা তাদের জন্য মানসিক ও শারীরিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়, তখন সেই সম্পর্ক কেবল একটি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে জোর করে সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা উভয়কে দীর্ঘমেয়াদি হতাশা, দুঃখ এবং মানসিক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম মানুষের ওপর কোনো অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেয় না। তাই, তালাকের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা এই ধরনের বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের উভয়কে নতুন করে, শান্তিপূর্ণ জীবন শুরু করার সুযোগ দিয়েছেন।

২. সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ:

 যখন কোনো দম্পতির মধ্যে লাগাতার ঝগড়া, বিবাদ ও ঘৃণা চলতে থাকে, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব কেবল তাদের দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা তাদের সন্তান-সন্ততি, পরিবার এবং পুরো সমাজকে প্রভাবিত করে। সন্তানের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশে বড় হয়। তালাকের বিধান এই ধরনের বিশৃঙ্খলাকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রেখে উভয়কে নিজ নিজ পথে ভালো থাকার সুযোগ করে দেয়। এর ফলে সমাজে নতুন করে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।

৩. নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার রক্ষা:

 ইসলামে তালাকের বিধান কেবল পুরুষের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নারীর অধিকারও নিশ্চিত করে। একজন পুরুষ যেমন নির্দিষ্ট কিছু কারণে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে, তেমনি একজন নারীও যদি তার স্বামীর সঙ্গে থাকা অসম্ভব মনে করে, তাহলে তার অধিকার আছে তালাক চাওয়ার। এই অধিকারকে ‘খোলা’ বলা হয়। যদি কোনো নারী তালাক না পায়, তাহলে সে কাজি বা অভিভাবকের মাধ্যমে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে। ইসলাম নারীর সম্মান ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই, নারীরা যাতে কোনোভাবেই তাদের স্বামীর অধীনে নিপীড়িত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্যই এই অধিকার দেওয়া হয়েছে।

তালাক যাতে না হয় তার জন্য করণীয় কাজ :

তালাক ইসলামে একটি অপছন্দনীয় হালাল কাজ হলেও, এটি যাতে সংঘটিত না হয়, সেজন্য কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কৌশল রয়েছে। সূরা নিসায় কিছু সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক কোনো সহজ বা দ্রুত সমাধান নয়, বরং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করার পরেই কেবল এটি সর্বশেষ উপায় হিসেবে বিবেচিত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوْنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰهُ بَعْضَهُمْ عَلٰی بَعْضٍ وَّ بِمَاۤ اَنْفَقُوْا مِنْ اَمْوَالِهِمْ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلْغَیْبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰهُ ؕ وَ الّٰتِیْ تَخَافُوْنَ نُشُوْزَهُنَّ فَعِظُوْهُنَّ وَ اهْجُرُوْهُنَّ فِی الْمَضَاجِعِ وَ اضْرِبُوْهُنَّ ۚ فَاِنْ اَطَعْنَکُمْ فَلَا تَبْغُوْا عَلَیْهِنَّ سَبِیْلًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیًّا كَبِیْرًا ﴿۳۴﴾  وَ اِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَیْنِهِمَا فَابْعَثُوْا حَكَمًا مِّنْ اَهْلِہٖ وَ حَكَمًا مِّنْ اَهْلِهَا ۚ اِنْ یُّرِیْدَاۤ  اِصْلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰهُ بَیْنَهُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلِیْمًا خَبِیْرًا ﴿۳۵﴾

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত। সুরা নিসা : ৩৪-৩৫

সূরা নিসার এই দুটি আয়াত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি, স্বামীর দায়িত্ব এবং তালাকের আগে পারস্পরিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। এখানে আল্লাহ তাআলা পুরুষদেরকে নারীর তত্ত্বাবধায়ক বা অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর কারণ হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে:

১. আল্লাহ তাআলা পুরুষকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে কিছু ক্ষেত্রে নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, যাতে তারা পরিবারের নেতৃত্ব দিতে পারে।

২. পুরুষ তার সম্পদ দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ বহন করে।

এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, সৎ ও নেককার স্ত্রীরা স্বামীর অনুগত হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা করে।

তালাকের আগে করণীয় পদক্ষেপ:

আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যখন মতবিরোধ বা অবাধ্যতা দেখা দেয়, তখন ইসলাম তালাকের মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কয়েকটি ধাপে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেয়।

ক. প্রথম ধাপ: সদুপদেশ দেওয়া:

স্বামী যদি স্ত্রীর অবাধ্যতা বা খারাপ আচরণ লক্ষ্য করে, তাহলে প্রথমে তাকে কোমল ভাষায়, ভালোবাসা ও ধৈর্যের সাথে বোঝানো উচিত।

খ. দ্বিতীয় ধাপ: বিছানা আলাদা করা:

যদি প্রথম ধাপে সমস্যার সমাধান না হয়, তবে দ্বিতীয় ধাপে স্বামী স্ত্রীর সাথে একই বিছানায় শয়ন ত্যাগ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে মানসিকভাবে সতর্ক করা এবং তার ভুল উপলব্ধি করতে সাহায্য করা।

গ. তৃতীয় ধাপ: মৃদু প্রহার:

যদি উপরের দুটি পদ্ধতি ব্যর্থ হয়, তবে আয়াতে মৃদু প্রহারের কথা বলা হয়েছে। এই প্রহারের ব্যাপারে আলেমগণ কঠোর শর্তারোপ করেছেন, যেমন- মুখে আঘাত না করা, কোনো চিহ্ন না রাখা, আঘাত যেন কষ্টদায়ক না হয় এবং এর উদ্দেশ্য যেন শুধুই সতর্ক করা হয়। এটি কোনোভাবেই নির্যাতন বা শারীরিক আঘাতের উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটি একটি প্রতীকী বা মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ। যদি এই প্রহার নির্যাতন বা কষ্টদায়ক হয়, তবে তা হারাম।

এই তিনটি ধাপের কোনো একটিতে যদি স্ত্রী তার ভুল বুঝতে পেরে স্বামীর আনুগত্য করে, তবে স্বামীর উচিত তার বিরুদ্ধে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া।

ঘ. চতুর্থ ধাপ : তালাকের পরিবর্তে মীমাংসার চেষ্টা:

যদি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা দেখা দেয়, অর্থাৎ উপরের সব ধাপ ব্যর্থ হয়, তখন আয়াতটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়। এই ধাপে স্বামী-স্ত্রীর উভয় পক্ষ থেকে একজন করে বিচারক বা সালিস নিযুক্ত করতে বলা হয়েছে। এই বিচারকদের দায়িত্ব হলো, নিরপেক্ষভাবে তাদের সমস্যা পর্যালোচনা করা এবং উভয়কে পুনরায় একত্র করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। যদি এই বিচারকগণ আন্তরিকভাবে মীমাংসা চান, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে সমঝোতা করে দেবেন।

এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক কোনো সহজ বা হালকা বিষয় নয়। এটি এমন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ যা গ্রহণ করার আগে অনেকগুলো স্তর পার করতে হয় এবং সর্বাত্মকভাবে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করতে হয়। এই নিয়মগুলো অনুসরণ করা হলে অনেক ক্ষেত্রে তালাক এড়ানো সম্ভব হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক টিকে থাকে।

বিশেষ পরিস্থিতিতে তালাত প্রদানে হুকুম

যখন কো অবস্থায় দুজনে মাঝে মিলেমিসে থাকা সম্ভব হয় না। তখন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত তালাকের মত অপছন্দণীয় কাজটি বেছে নিতে হয়। তালাকের বিধান মূলত একটি চূড়ান্ত সমাধান, যা কেবল তখনই প্রয়োগ করা হয় যখন আপস-মীমাংসার আর কোনো উপায় থাকে না। আল্লাহ তা’আলা তালাকের অনুমতি দিয়েছেন যাতে দম্পতিরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ এবং ঘৃণা নিয়ে জীবন ধারণ না করে বরং শান্তি ও স্বস্তির সাথে তাদের জীবন পরিচালনা করতে পারে। এ কারনে মানুষের ভালোর জন্য আল্লাহ এ বিধান রেখেছেন। নিচে সরাসরি কুরআনের আলোকে তালাকের কিছু বিধান উল্লখ কররাম।

১. স্বামী তালাক দিতে পার আর স্ত্রী নিজেকে মুক্ত করতে পারে

আল্লাহ তা’আলা কু্রআনে তালাকের বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে সর্বোচ্চ দুইবার তালাক দিতে পারে। এই দুই তালাকের পর স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) ফিরিয়ে নিতে পারে, অথবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর সুন্দরভাবে (যেকোনো ধরনের ক্ষতি বা হয়রানি ছাড়া) ছেড়ে দিতে পারে। তালাকের বিনিময়ে স্ত্রীকে দেওয়া মোহর বা অন্য কোনো উপহার ফিরিয়ে নেওয়া স্বামীর জন্য বৈধ নয়। তবে যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ই আশঙ্কা করে যে তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা বা বিধান মেনে চলতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী স্বামীকে কিছু সম্পদ দিয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটাতে পারবে, যাকে ‘খোলা’ বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

২. একবার তালাক দিলে আর ফিরে আসা যায় না

অত:পর আল্লাহ আরও বিধান বর্ণনা করেন। কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে তিনবার তালাক দেয়, তবে সে স্ত্রী তার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করে এবং সেই স্বামীর সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক হয়। এরপর সেই দ্বিতীয় স্বামী যদি কোনো কারণে তাকে তালাক দেয় বা মারা যায়, তবেই প্রথম স্বামীর জন্য তাকে আবার বিবাহ করা বৈধ হবে। যদি তারা উভয়ে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলতে পারবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে, তবে তাদের পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে কোনো পাপ হবে না। এই বিধানটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি সীমারেখা। আল্লাহ এই বিধানটি তাদের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যারা জ্ঞান রাখে এবং তাঁর নির্দেশনা বুঝতে চায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

৩. ইদ্দত গণনা করে তালাক দেওয়া

আল্লাহ তা’আলা তালাকের সঠিক পদ্ধতি ও এর সাথে সম্পর্কিত বিধানাবলী বর্ণনা করেছেন। যখন কোনো মুসলমান তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়, তখন তাকে অবশ্যই ‘ইদ্দত’-এর প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিতে হবে। ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়কাল, যা তালাকের পর স্ত্রীকে অতিবাহিত করতে হয়। তালাক দেওয়ার সর্বোত্তম সময় হলো যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র থাকে এবং তার সাথে সহবাস করা হয়নি। এই সময় তালাক দিলে ইদ্দতের হিসাব রাখা সহজ হয়। আল্লাহকে ভয় করে এই বিধান মেনে চলতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

হে নাবী! তোমরা যদি তোমাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর তাহলে তাদেরকে তালাক দিও ইদ্দাতের প্রতি লক্ষ্য রেখে, ইদ্দাতের হিসাব রেখ এবং তোমাদের রাব্ব আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ হতে বহিস্কার করনা এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়; এগুলি আল্লাহর বিধান। যে আল্লাহর বিধান লংঘন করে সে নিজেরই উপর অত্যাচার করে। তুমি জাননা, হয়তো আল্লাহ এরপর কোন উপায় করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১

৪. ইদ্দত ও তালাকের কিছু বিধান

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ فَارِقُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ  ذٰلِکُمۡ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۬ؕ  وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا ۙ

অতঃপর যখন তারা তাদের ইদ্দতের শেষ সীমায় পৌঁছবে, তখন তোমরা তাদের ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় রেখে দেবে অথবা ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় তাদের পরিত্যাগ করবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনে এটি দ্বারা তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। সুরা তালাক : ০২

আল্লাহ তাআলা তালাক পরবর্তী সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। যখন একজন স্ত্রী ইদ্দত (তালাকের পর নির্দিষ্ট সময়) শেষ করার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন স্বামীকে দুটি বিকল্পের মধ্যে থেকে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছে:

১. ন্যায়ানুগ পন্থায় রেখে দেওয়া:

স্বামী যদি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই ন্যায় ও সদ্ব্যবহারের সাথে ফিরিয়ে নিতে হবে। এটি কোনো প্রকার ক্ষতি বা হয়রানির উদ্দেশ্যে করা যাবে না।

২. ন্যায়ানুগ পন্থায় ছেড়ে দেওয়া:

যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই সুন্দর ও যথাযথভাবে ছেড়ে দিতে হবে। এর মানে হলো, স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকার (যেমন: মোহর বা ভরণপোষণ) থেকে বঞ্চিত করা যাবে না এবং তার সাথে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ করা যাবে না।

এই দুটি কাজের যেকোনো একটি করার সময়, আল্লাহ তাআলা দুইজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিমকে সাক্ষী রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই সাক্ষ্য কেবল আইনগত বৈধতার জন্য নয়, বরং আল্লাহর জন্য সঠিক ও সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে, এই বিধানগুলো তাদের জন্য উপদেশ, যারা আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে।

আয়াতের শেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে: “যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন।” এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি তালাকের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধান মেনে চলে, আল্লাহ তাকে তার সমস্যার সমাধান ও উত্তরণের পথ সহজ করে দেন। এটি একদিকে যেমন আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুলের (ভরসার) শিক্ষা দেয়, তেমনি এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

তালাক প্রদানের ক্ষমতা কার?

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদ একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তালাকের অধিকার এবং নিয়মকানুন কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তালাকের চূড়ান্ত ক্ষমতা মূলত স্বামীর হাতেই থাকে। সে ইচ্ছে করলে যে কোনো সময় তালাক দিতে পারে, তবে নারীদেরও নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে তাকাল প্রদানে অধিকার দেওয়া হয়েছে।  

১. তালাক প্রদানের ক্ষমতা পুরুষ

পুরুষের তালাক প্রদানের অধিকারের বিষয়টি কুরআনে একাধিক স্থানে উল্লিখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ

তালাক (ফেরতযোগ্য) দু’বার। তারপর (ইচ্ছা করলে) সুন্দরভাবে স্ত্রীকে রেখে দেওয়া অথবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে। সূরা বাকারা : ২২৯

কুরআনের এ আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, “তালাক দুইবার। অতঃপর হয় স্ত্রীকে বিধি মোতাবেক রেখে দেবে অথবা সদ্ব্যবহারসহ তাকে বিদায় দেবে।” এই আয়াতটি সরাসরি পুরুষকে সম্বোধন করছে, কারণ তালাক প্রদানের ক্ষমতা তার হাতেই ন্যস্ত। তালাকের পর স্ত্রীকে ইদ্দতকালীন সময়ে ফিরিয়ে নেওয়ার বা চূড়ান্তভাবে ছেড়ে দেওয়ার উভয় সিদ্ধান্তই পুরুষ গ্রহণ করে, যা প্রমাণ করে যে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা পুরুষেরই। এই বিধান ইসলামে পুরুষের দায়িত্ব ও অধিকারের ভারসাম্যকে তুলে ধরে।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ سَرِّحُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ ۪  وَلَا تُمۡسِکُوۡہُنَّ ضِرَارًا لِّتَعۡتَدُوۡا ۚ  وَمَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ

আর যখন তোমরা (স্বামীরা) স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতে পৌঁছে যাবে তখন হয়তো বিধি মোতাবেক তাদেরকে রেখে দেবে অথবা বিধি মোতাবেক তাদেরকে ছেড়ে দেবে। তবে তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সীমালঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে তাদেরকে আটকে রেখো না। সূরা বাকারা : ২৩১

এ আয়াতে সরাসরি পুরুষদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে তালাক প্রদানের ক্ষমতা তাদেরই। আয়াতের পরের অংশে তালাকের পর স্বামীর দুটি বিকল্পের কথা বলা হয়েছে। “বিধি মোতাবেক তাদেরকে রেখে দেবে”: স্বামী চাইলে ইদ্দত (তালাকের পর নির্দিষ্ট সময়কাল) শেষ হওয়ার আগেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এটি দ্বারা বোঝা যায়, তালাকের পর স্ত্রীকে পুনর্বার গ্রহণ করার সিদ্ধান্তটি স্বামীর ওপর নির্ভরশীল। “বিধি মোতাবেক তাদেরকে ছেড়ে দেবে”: যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নিতে চান, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তাদের বিবাহ সম্পূর্ণভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্তও স্বামীরই।

কুরআন পুরুষের তালাক প্রদানে ক্ষমতা দিয়ে আরও বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَاِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ

আর যদি তারা (স্বামীরা) তালাকের দৃঢ় ইচ্ছা করে নেয় তবে নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সূরা বাকারা : ২২৭

২. নারীর তালাক প্রদানের অধিকার

যদিও তালাকের প্রধান ক্ষমতা পুরুষের, ইসলামে নারীর জন্যও সম্মানজনকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ লাভ করার পথ খোলা আছে। নারীর তালাকের অধিকার মূলত তিন ধরনের:

ক. স্ত্রী অর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে তালাক নিবে

যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীর সাথে থাকতে না চায় এবং তাদের মধ্যে বনিবনা না হয়, তবে সে স্বামীকে অর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে তালাক চাইতে পারে যে তালাকে খুলা তালাক বলা হয়। খুলা হলো স্বামীর কাছ থেকে কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে স্ত্রী কর্তৃক বিবাহবিচ্ছেদ লাভ করা। এই ক্ষতিপূরণ মোহরানার অংশ হতে পারে বা অন্য কোনো সম্পত্তি হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৬. ২০৫৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬৩, ইরওয়াহ : ২০৩৬

আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাহল কন্যা হাবীবা (রাঃ) সাবিত বিন কায়স বিন সামমাস (রাঃ) এর স্ত্রী ছিলেন। সাবিত (রাঃ) ছিলেন কুৎসিত চেহারাবিশিষ্ট। হাবিবা (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহ্‌র রসুল! আল্লাহ্‌র শপথ! আল্লাহর ভয় না থাকলে সাবিত যখন আমার নিকট আসে তখন অবশ্যই আমি তার মুখে থুথু নিক্ষেপ করতাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তুমি কি তার বাগানটি ফেরত দিতে রাজি আছো? তিনি বলেন, হাঁ। রাবী বলেন, তিনি তার বাগানটি তাকে ফেরত দিলেন। অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দু’জনকে পৃথক করে দিলেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৭, সহিহ আবু দাউদ : ১৯২৯, ইরওয়াহ : ২০৩৭।

খ. তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করা।

তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করাকে তাফভীজে তালাক । বিয়ের সময় বা বিয়ের পরে স্বামী যদি স্ত্রীকে এই অধিকার দেয় যে, সে যখন ইচ্ছা নিজেকে তালাক দিতে পারবে, তবে স্ত্রী এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। এই অধিকারকে ‘তালাকে তাফভীয’ বলা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ  قُلْ  لِّاَزْوَاجِكَ اِنْ  کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ  الْحَیٰوۃَ  الدُّنْیَا وَ زِیْنَتَهَا فَتَعَالَیْنَ اُمَتِّعْکُنَّ وَ اُسَرِّحْکُنَّ سَرَاحًا جَمِیْلًا ﴿۲۸﴾ وَ اِنْ کُنْـتُنَّ تُرِدْنَ اللّٰهَ  وَ رَسُوْلَہٗ وَ الدَّارَ الْاٰخِرَۃَ  فَاِنَّ اللّٰهَ  اَعَدَّ لِلْمُحْسِنٰتِ مِنْکُنَّ  اَجْرًا عَظِیْمًا ﴿۲۹﴾

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’।  আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন’। সুরা আহযাব : ২৮-২৯

এই আয়াতে রাসূল (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁর স্ত্রীদেরকে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী বিচ্ছেদের সুযোগ দেওয়ার জন্য। এটি প্রমাণ করে যে, স্ত্রী যদি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্বামী তাতে সম্মত হয়, তবে তা শরীয়তসম্মত। ফিকহবিদগণ এই আয়াতকে তাফউইয-এর একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দুনিয়ার সুখ শান্তি বা পরকালীন সুখ শান্তি বেছে নেয়ার) ইখতিয়ার দিলে আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেই গ্রহণ করলাম। আর এতে আমাদের প্রতি কিছুই অর্থাৎ ত্বলাক (তালাক)) সাব্যস্ত হয়নি। সহিহ বুখারি : ৫২৬২, ৫২৬৩, সহহি মুসলিম : ১৪৭৭

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন এ আয়াতটি নাযিল হলো, যদি তোমার আল্লাহ্‌ ও তার রসূলের সন্তুষ্টি চাও। সূরা আহযাব : ২৯। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট প্রবেশ করে বলেন, হে আয়িশা! আমি তোমাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করবো। তুমি তোমার পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ না করে সে সম্পর্কে তাড়াহুড়া করে কিছু বলবে না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্‌র শপথ! তিনি জানতেন যে, নিশ্চয় আমার পিতা-মাতা কখনো তাঁর থেকে আমার বিচ্ছেদের পক্ষে মত দিবেন না। আয়িশা (রাঃ) বলেন, এরপর তিনি আমাকে এ আয়াতটি পড়ে শুনান-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ اِنۡ کُنۡـتُنَّ تُرِدۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا وَزِیۡنَتَہَا فَتَعَالَیۡنَ اُمَتِّعۡکُنَّ وَاُسَرِّحۡکُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই’। সূরা আহযাব : ২৮

তখন আমি বললাম, এ সম্পর্কে আমার পিতা-মাতার সাথে আমি আর কী পরামর্শ করবো! আমি আল্লাহ্‌ ও তার রসূলকেই গ্রহণ করলাম। সহিহ বুখারি :  ৪৭৮৬,৫২৬২, ৫২৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৭৫, ১৪৭৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫২,  সুনানে তিরমিযী : ১১৭৯, ৩২০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩২০১, ৩২০২, ৩২০৩, ৩৪৩৯, ৩৪৪১, ৩৪৪২, ৩৪৪৩, ৩৪৪৪, ৩৪৪৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২২০৩

ফিকহ কিতাবের দলিল

ইসলামী ফিকহের প্রায় সব মাযহাবের (হানাফি, শাফেঈ, মালিকি, হাম্বলি) কিতাবেই তাফউইযের বিধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে এবং এর বৈধতা সম্পর্কে সবাই একমত।

বাদাইউস সানাই : হানাফি ফিকহের এই প্রসিদ্ধ গ্রন্থে বলা হয়েছে, স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয় এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। আলাউদ্দিন আল-কাসানী, বাদাইউস সানাই তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১২৩

আল-মুগনি : হাম্বলি ফিকহের এই গ্রন্থেও উল্লেখ আছে যে, স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেকে তালাক দিতে পারে। ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, দশম খণ্ড, পৃ.-৩২০

এই সকল দলিল প্রমাণ করে যে, ‘তালাক-ই-তাফউইয’ শরীয়তসম্মত এবং এটি একটি বৈধ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে নারী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তালাকের অধিকার পায়।

গ. পারস্পরিক সম্মতিতে তালাক

স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে সংঘটিত যে তালাক সংঘটিত হয় তাকে তালাকে মোবারত বলা হয়। এখানে উভয় পক্ষই বিবাহ সম্পর্ক থেকে মুক্তি চায়।

এই ধরনের তালাক সংঘটিত হয় যখন স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ই একে অপরের প্রতি অসন্তুষ্ট হন এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করেন। উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মতিতে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। এই ক্ষেত্রে স্ত্রী কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেন না, বরং উভয়ের সম্মতিতে তালাক হয়।

এটি মূলত খোলা তালাকের মতোই, তবে খোলা তালাকের মতো এখানে স্ত্রী একাই ক্ষতিপূরণ দেন না, বরং উভয়ের মধ্যে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। এর ভিত্তিও হলো খোলা তালাকের দলিল। যেমন সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ২২৯, যেখানে বলা হয়েছে, “…যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তবে তাদের উভয়ের জন্য তাতে কোনো দোষ নেই যে, স্ত্রী কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামীকে মুক্ত করে নেবে।” এই আয়াতটি পারস্পরিক সম্মতিতে বিচ্ছেদের একটি পথ উন্মুক্ত করে, যা মোবারতকেও সমর্থন করে।

৩. বিচারকের মাধ্যমে তালাক:

বিচারকের মাধ্যমে তালাক বা ফাসখ (فسخ) এর বিধান ইসলামে স্বীকৃত। যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে একত্রে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, এবং স্বামী তালাক দিতে বা খোলা করতে রাজি না হয়, তখন স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারে। ইসলামী শরিয়াহ আদালত বা বিচারক উভয় পক্ষের অবস্থা বিবেচনা করে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এই ধরনের বিচ্ছেদকে ফিকহের পরিভাষায় ‘ফাসখ’ বলা হয়।

পবিত্র কুরআনের এই ধরনের পরিস্থিতিতে বিচারকের হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

وَاِنۡ خِفۡتُمۡ شِقَاقَ بَیۡنِہِمَا فَابۡعَثُوۡا حَکَمًا مِّنۡ اَہۡلِہٖ وَحَکَمًا مِّنۡ اَہۡلِہَا ۚ اِنۡ یُّرِیۡدَاۤ اِصۡلَاحًا یُّوَفِّقِ اللّٰہُ بَیۡنَہُمَا ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا خَبِیۡرًا

আর যদি তোমরা তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক পাঠাও। যদি তারা মীমাংসা চায় তাহলে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে মিল করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞানী, সম্যক অবগত। সুরা নিসা : ৩৫

এই আয়াতে যদিও সরাসরি ফাসখের কথা বলা হয়নি, তবে এটি পারিবারিক বিরোধ নিরসনের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব প্রমাণ করে। যদি সালিস বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেও সমস্যার সমাধান না হয়, তবে বিচারকের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটানোই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা (অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭

এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যদি স্ত্রী স্বামীর প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এবং একত্রে থাকা সম্ভব না হয়, তবে বিচারক (এক্ষেত্রে রাসূল সা.) এর হস্তক্ষেপে বিবাহ বিচ্ছেদ বৈধ।

প্রায় সব মাযহাবের ফিকহবিদগণ বিচারকের মাধ্যমে তালাক বা ফাসখের বৈধতা সম্পর্কে একমত।

বাদাই’উস সানাই : হানাফি ফিকহের এই গ্রন্থেও বলা হয়েছে যে, স্বামী যদি দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকে এবং স্ত্রীর কোনো ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা না করে, তাহলে বিচারকের নির্দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর করা যায়। আলাউদ্দিন আল-কাসানী, বাদাই’উস সানাই, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৩৮

আল-মুগনি : হাম্বলি ফিকহের এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, যদি স্বামীর কোনো গুরুতর ত্রুটি থাকে (যেমন: দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকা, ভরণ-পোষণ দিতে ব্যর্থ হওয়া, গুরুতর শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি), যার ফলে স্ত্রীর জন্য জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে বিচারক তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, দশম খণ্ড, পৃ.-৬৪৫

এই দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, যদি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন তিক্ত হয়ে যায় যে একত্রে থাকা অসম্ভব, তবে বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ একটি বৈধ এবং ইসলামসম্মত সমাধান।

তালাকের প্রকারভেদ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র ও দৃঢ় বন্ধন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তবে মানব জীবনে সব সম্পর্ক সবসময় একইভাবে স্থায়ী হয় না। কখনো কখনো দাম্পত্য জীবনে এমন জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যে, একসাথে বসবাস করা দুঃসহ হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় ইসলাম সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে তালাকের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু তালাক এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় হলেও প্রয়োজনে বৈধ। তাই ইসলাম তালাককে সীমাহীন স্বাধীনতা হিসেবে দেয়নি; বরং এর প্রকৃতি, কার্যকারিতা ও পদ্ধতির ভিত্তিতে স্পষ্ট বিধান নির্ধারণ করেছে।

প্রকৃতি ও কার্যকারিতার দিক থেকে তালাককে মূলত তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে—তালাক-এ-রজয়ি, তালাক-এ-বায়িন এবং তালাক-এ-খুলা। এসব শ্রেণীবিভাগ নির্ধারণ করে দেয় তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কীভাবে থাকবে এবং পুনরায় সংসার করার সুযোগ আছে কি না। অন্যদিকে, তালাক প্রদানের পদ্ধতিগত দিক থেকেও ইসলামে নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে। কারণ, তালাক যেন তাৎক্ষণিক রাগ বা আবেগের বশে না হয়, বরং ভেবে-চিন্তে সঠিক নিয়মে সম্পন্ন হয়, সেটিই শরীয়তের উদ্দেশ্য। এ কারণে তালাকের চারটি প্রধান পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে—আহসান, হাসান, বিদআত এবং অশুদ্ধ পদ্ধতিতে তালাক।

এই শ্রেণীবিভাগ ও পদ্ধতিগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলাম তালাককে সহজ-সরলভাবে উৎসাহিত করেনি; বরং দাম্পত্য জীবনের মর্যাদা ও স্থিতি রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। কেবল যখন সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখনই সঠিক নিয়মে তালাক দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই তালাকের বিভিন্ন প্রকার ও পদ্ধতি বোঝা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিচে তালারে ভিবিন্ন প্রকারে শ্রেণীতে ভাগ করে প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো:

প্রকৃতি এবং কার্যকারিতার ভিত্তিতে তালাকের শ্রেণীবিভাগ

ইসলামে তালাকের প্রকৃতি ও কার্যকারিতার ভিত্তিতে একে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই শ্রেণীবিভাগ মূলত তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কতটুকু স্থায়ী হয় এবং সেই সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করার সুযোগ আছে কিনা, তার ওপর নির্ভর করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, তালাক প্রধানত তিন প্রকার। এই শ্রেণীবিভাগগুলো ইসলামের মূলনীতি এবং বিবাহিত জীবনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে এই তিন প্রকার তালাক সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১. তালাক-এ-রজয়ি

২. তালাক-এ-বায়িন

৩. তালাক-এ-খুলা

১. তালাক-এ-রজয়ি

‘রজয়ি’ (رجعي) শব্দের অর্থ হলো ‘প্রত্যাবর্তনযোগ্য’ বা ‘ফিরিয়ে নেওয়ার যোগ্য’। এটি আরবি ‘রুজু’ (رجوع) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ফিরে আসা’ বা ‘প্রত্যাবর্তন করা’।

তালাক-এ-রজয়ি হলো ইসলামের সবচেয়ে উদার ও মানবিক তালাক পদ্ধতি। যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীকে এক বা দুই তালাক দেন, তখন সেই তালাকটি সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় না, বরং ইদ্দতকাল (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) পর্যন্ত স্থগিত থাকে। এই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয় না। তারা একই বাড়িতে থাকতে পারে এবং স্বামী স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকেন। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী যেকোনো মুহূর্তে স্ত্রীকে মৌখিকভাবে বা শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। যদি স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে তালাকটি বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ বহাল থাকে। এই সুযোগ দেওয়ার কারণ হলো, স্বামী-স্ত্রীকে তাদের ভুল সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার এবং সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একটি সুযোগ দেওয়া।

এটি সুন্নাহসম্মত তালাকের প্রথম ধাপ। ইদ্দতকালে স্বামী স্ত্রীকে মৌখিক ঘোষণার মাধ্যমে বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। ফিরিয়ে নিলে তালাক বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ বহাল থাকে। ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে যদি স্বামী ফিরিয়ে না নেন, তাহলে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাকে বাইনে সগির-এ পরিণত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

২. তালাকে বায়িন (তালাক-এ-বায়িন)

‘বায়িন’ (بائن) শব্দের অর্থ হলো ‘চূড়ান্ত’, ‘স্পষ্ট’ বা ‘সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন’। এটি আরবি ‘বানা’ (بان) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বিচ্ছিন্ন হওয়া’ বা ‘আলাদা হওয়া’।

তালাক-এ-বায়িন এমন এক ধরনের তালাক যা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়ে যায়। এই তালাক স্বামীর ‘রুজু’ বা স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেয়। তালাকে বায়িন-এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তারা ইদ্দতকালীন সময়েও একসাথে থাকতে পারে না। যদি তারা ভবিষ্যতে আবার একসাথে জীবনযাপন করতে চায়, তবে তা শুধুমাত্র নতুন করে কাবিন ও মোহরানা নির্ধারণ করে পুনরায় বিবাহের মাধ্যমেই সম্ভব। এই তালাক সাধারণত তখন ঘটে যখন স্বামী একবারে তিন তালাক দেন (তালাক-এ-বায়েন কুবরা) অথবা যখন ইদ্দতের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন না (তালাক-এ-বায়েন সুগরা), বা খোলা তালাকের মতো পরিস্থিতিতে।

তালাকে বায়িন সাধারণত দুটি কারণে হয়ে থাকে:

১. যখন স্বামী ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেয় এবং ইদ্দত শেষ হয়ে যায়।

২. যখন এক বা একাধিক তালাক প্রদান করা হয়, যা সরাসরি বায়িন তালাক হিসেবে গণ্য হয় (যেমন: খোলা তালাক, লি’আনের কারণে বিচ্ছেদ)।

তালাকে বায়িনের বিধান :

তালাকে বায়িনের বিধানকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. তালাকে বায়িন-এ সগির (ছোট তালাক)

এটি এমন তালাক, যা এক বা দুটি তালাকের পর সংঘটিত হয় এবং ইদ্দত শেষ হয়ে যায়। অথবা, এমন তালাক যা সরাসরি বায়িন হিসেবে গণ্য হয় (খোলা বা মুবারাতের তালাক)। এই ধরনের তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় সংসার করতে চায়, তবে তাদেরকে নতুন করে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন মোহর নির্ধারণ এবং দুজন সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

এই ধরনের তালাক সংঘটিত হলে তা বাইনে সগীর হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী চাইলে আবার বিবাহ করতে পারবে।

২. তালাকে বায়িন-এ কবীর (বড় তালাক)

এটি তখনই ঘটে যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়, অথবা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিন তালাক সম্পন্ন করে। এই ধরনের তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। তাদের পুনরায় বিবাহ কেবল তখনই সম্ভব, যখন স্ত্রী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করবে এবং সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করার পর সে মারা যাবে অথবা তাকে তালাক দেবে। এরপর ইদ্দত শেষে প্রথম স্বামী তাকে আবার বিবাহ করতে পারবে। এই প্রক্রিয়াকে হালালা বলা হয়, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও বিতর্কিত একটি প্রথা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

এই আয়াতটি বাইনে কবীরের বিধানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। যেখানে একবার তিন তালাক হলে আর সরাসরি ফিরিয়ে আনা যাবে না।

৩. খোলা তালাক (তালাক-এ-খুলা)

খোলা তালাক বা خلع হলো এমন এক ধরনের বিবাহবিচ্ছেদ, যা স্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত হয় এবং স্বামী তা গ্রহণ করে। এই ক্ষেত্রে স্ত্রী স্বামীকে কিছু আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা (যেমন: মোহরানা ফিরিয়ে দেওয়া) প্রদান করে তার থেকে তালাক গ্রহণ করে। এই তালাক মূলত স্বামীর স্বেচ্ছাচারীতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য স্ত্রীর একটি অধিকার। খোলা তালাক কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন-এর অন্তর্ভুক্ত।

সংজ্ঞা: যে তালাক স্ত্রী তার স্বামীর কাছে মোহরানা বা অন্য কোনো প্রতিদানের বিনিময়ে চেয়ে নেয়, তাকে খোলা তালাক বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সাবিত ইবনু কায়স এর স্ত্রী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! চরিত্রগত বা দ্বীনী বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের উপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভিতরে থেকে কুফরী করা অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল) পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বললঃ হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি বাগানটি গ্রহণ কর এবং মহিলাকে এক তালাক দিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ৫২৭৩, ৫২৭৪, ৫২৭৫, ৫২৭৬, ৫২৭৭, মিশকাত : ৩২৭৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬৩, ইরওয়া : ২০৩৬

নাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’সফিয়াহ বিনতু আবূ ’উবায়দ’-এর ক্রীতদাসী হতে বর্ণনা করেন, সফিয়া (রাঃ) তাঁর স্বামী (আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রা.) হতে নিজের সমস্ত সহায়-সম্পত্তির বিনিময়ে খুলা’ (তালাক) চান। অথচ আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) এতে কোনো দ্বিমত পোষণ করেননি। মিশকাত : ৩২৯১, মুয়াত্তা মালিক : ১২২

বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চাওয়া হারাম

সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণী বিনা কারণে স্বামীর নিকট তালাক চায়, সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না। মিশকাত : ৩২৭৯, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২২৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৫৫, দারিমী : ১৩১৬, আহমাদ : ২২৪৪০, ইরওয়া : ২০৩৫, সহীহ আল জামি : ২৭০৬, সহীহ আত্ তারগীব : ২০১৮

সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ খোলা তালাক দাবিকারিণী নারীরা মুনাফিক। সুনানে তিরমিজি : ১১৮৬, সহীহাহ : ৬৩৩, মিশকাত : ৩২৯০

মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকে তালাক চার প্রকারঃ-

মর্যাদা ও অবস্থানের দিক থেকে তালাক চার প্রকার হতে পারে। নিচে প্রত্যেক প্রকারের বিস্তারিত আলোচনা ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত দলিল দেওয়া হলো।

১. হারাম তালাক

ইসলামে তালাক মূলত একটি অপছন্দনীয় কাজ। কিছু বিশেষ অবস্থায় তালাক দেওয়াকে হারাম হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এই ধরনের তালাক ইসলামের নীতির বিরোধী।

১. ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া।

২. যে পবিত্র অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, সেই অবস্থায় তালাক দেওয়া।

৩. একবারে তিন তালাক দেওয়া। এই পদ্ধতিগুলো শরিয়তের স্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘন এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

কুরআনের দলিল: সূরা তালাক, আয়াত ১-এ আল্লাহ বলেন, “তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও।” এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঋতুকালীন অবস্থায় বা সহবাসের পর তালাক দেওয়া এই নির্দেশনার পরিপন্থী।

হাদিসের দলিল: আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর হাদিসটি এর প্রধান দলিল। তিনি তার স্ত্রীকে ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। নবী (সা.) এই কথা শুনে অসন্তুষ্ট হন এবং তাকে তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া হারাম।

২. মাকরুহ তালাক

মাকরুহ তালাক হলো সেই তালাক, যা শরীয়তসম্মত হলেও কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া বা তুচ্ছ কারণে দেওয়া হয়। এই ধরনের তালাক দেওয়া উচিত নয়, যদিও এটি কার্যকর হয়। এটি হারাম নয়, তবে অপছন্দনীয়।

ক. কোনো গুরুতর কারণ ছাড়া, যেমন: তুচ্ছ বিষয়ে মতবিরোধ বা সামান্য মনোমালিন্যের কারণে তালাক দেওয়া।

খ. যখন স্ত্রীর মধ্যে কোনো অনৈতিক বা ধর্মীয় দুর্বলতা নেই, তবুও স্বামী তাকে তালাক দিতে চায়।

হাদিসের দলিল: নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহর কাছে হালাল কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ হলো তালাক।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)। এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, কোনো কারণ ছাড়া তালাক দেওয়া আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়, তাই এটি মাকরুহ হিসেবে বিবেচিত হয়।

৩. মুস্তাহাব তালাক

মুস্তাহাব তালাক হলো সেই তালাক, যা কোনো বিশেষ কারণে দেওয়া হলে স্বামী একটি ভালো কাজের সওয়াব পেতে পারেন।

গ. যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলতে পারে না এবং একত্রে থাকলে গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

খ. স্ত্রী যদি কোনো অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয় এবং এই বিষয়ে স্বামী তাকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হন।

কুরআনের দলিল: সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত ২২৯-এ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “…যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তবে তাদের উভয়ের জন্য তাতে কোনো দোষ নেই যে, স্ত্রী কিছু বিনিময় দিয়ে তার স্বামীকে মুক্ত করে নেবে।” এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, সম্পর্ক ভেঙে গেলে এবং আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করার আশঙ্কা থাকলে তালাক দেওয়া মুস্তাহাব হতে পারে।

৪. ওয়াজিব তালাক

ওয়াজিব তালাক হলো সেই তালাক, যা দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক বা অবশ্যকরণীয় হয়ে যায়।

যদি স্বামী তার স্ত্রীকে ‘ঈলা’ করে অর্থাৎ চার মাসের জন্য তার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার শপথ করে। যদি চার মাসের মধ্যে সে এই শপথ থেকে ফিরে না আসে, তবে আদালতের নির্দেশে তালাক দেওয়া ওয়াজিব হয়ে যায়। যদি আদালতের নির্দেশে কোনো কারণে তালাক দেওয়ার আদেশ হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করবে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা বাক্বারাহ  :  ২২৬

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, যদি স্বামী চার মাসের মধ্যে ফিরে না আসে, তবে আদালতের নির্দেশে তালাক দেওয়া হয়, যা ওয়াজিব।

পদ্ধতিগত দিক থেকে তালাকের প্রকারভেদ

ইসলামে বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন হলেও, কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে, চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবে তালাকের অনুমতি রয়েছে। তবে, এই তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে ইসলামে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। এই পদ্ধতিগুলো তালাকের সিদ্ধান্তকে তাড়াহুড়ো থেকে রক্ষা করে, সম্পর্কের তিক্ততা কমিয়ে আনে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়কে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ দেয়। এই নিয়মগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে তালাক একটি অপছন্দনীয় কাজ, যা কেবল তখনই প্রয়োগ করা উচিত যখন সব ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পদ্ধতিগত দিক থেকে তালাক চার প্রকার। যথা-

১. তালাকে আহসান (আহসান বা সর্বোত্তম তালাক)

২. তালাকে হাসান (হাসান বা উত্তম তালাক)

৩. তালাকে বিদআত (বিদআতি বা নব আবিস্কৃত তালাক)

৪. অশুদ্ধ পদ্ধতিতে তালাক

তালাকে আহসান (সর্বোত্তম তালাক)

তালাকে আহসান হলো তালাকের সবচেয়ে উত্তম ও সুন্নাতসম্মত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে তালাক দিলে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সর্বোচ্চ সুযোগ থাকে।

তালাকে আহসানের পদ্ধতি :

সুন্নাতী তালাক হলো তালাক প্রদানের এমন একটি পদ্ধতি যা ইসলামের বিধান অনুযায়ী উত্তম এবং অনুমোদিত। এই পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে এসেছে। প্রথমে কুরআনের তিনটি আয়াত লক্ষ করি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে। তুমি জান না, হয়তো এর পর আল্লাহ, (ফিরে আসার) কোন পথ তৈরী করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

আল্লাহ তা’আলার উপরোক্ত তিনটি আয়াতের আলোকে তালাকের সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। ইসলামে তালাক একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অপছন্দনীয় বিষয়, যা শুধুমাত্র চরম প্রয়োজনের মুহূর্তে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হয়। কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী তালাকের সুন্নাতসম্মত পদ্ধতি মূলত তিনটি ধাপে বিভক্ত। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে তালাকের পর সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুযোগ থাকে এবং উভয় পক্ষের অধিকার নিশ্চিত হয়।

প্রথম ধাপ : এক তালাক প্রদান (তালাক-এ-আহসান)

প্রথমত, তালাক দিতে হবে ইদ্দতের সময়কাল বিবেচনায় রেখে। সূরা তালাকের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে।” এর অর্থ হলো, স্বামী তার স্ত্রীকে এমন অবস্থায় তালাক দেবেন যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়েছেন এবং ঐ পবিত্র অবস্থায় তাদের মধ্যে কোনো ধরনের শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। এই অবস্থাকে ‘তুহর’ বলা হয়। এই সময়ে স্বামী তার স্ত্রীকে শুধুমাত্র একটি তালাক (যেমন- “আমি তোমাকে তালাক দিলাম”) প্রদান করবেন।  এই তালাকের পর স্ত্রী তার ইদ্দতকাল (সাধারণত তিন মাসিক চক্র) পালন করবেন। এই সময়ে তারা একই বাড়িতে বসবাস করতে পারেন, তবে স্বামী-স্ত্রীর মতো আচরণ করবেন না। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী যেকোনো মুহূর্তে চাইলে তার স্ত্রীকে মৌখিকভাবে অথবা দৈহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ফিরিয়ে নিতে পারেন। যদি ইদ্দত শেষে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: ইদ্দতকালে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন

প্রথম তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতকালীন সময়ের মধ্যে স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান। যদি স্বামী মনে করেন যে, তারা পুনরায় আল্লাহর সীমারেখা মেনে চলতে পারবেন, তাহলে তিনি মৌখিক বা শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এই সম্পর্ক পুনঃস্থাপনকে বলা হয় ‘রুজু’। যদি ইদ্দতের মধ্যে রুজু করা হয়, তাহলে তালাক বাতিল হয়ে যায় এবং বিবাহ পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। যদি ইদ্দত শেষেও স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেন, তবে তালাকটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে এবং এটি তালাকে বায়িন সগির হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ ঐ স্বামী তালাক দেওয়া স্ত্রীকে পুণরায় বিবাহের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে পারবে।

আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

فِي طَلَاقِ السُّنَّةِ يُطَلِّقُهَا عِنْدَ كُلِّ طُهْرٍ تَطْلِيقَةً فَإِذَا طَهُرَتْ الثَّالِثَةَ طَلَّقَهَا وَعَلَيْهَا بَعْدَ ذَلِكَ حَيْضَةٌ.

তালাক-ই-সুন্নাহতে হলো- সে (স্বামী) তাকে (স্ত্রীকে) প্রতিটি পবিত্রতার সময় (ঋতুস্রাব শেষে) একটি করে তালাক দেবে। যখন সে তৃতীয়বার পবিত্র হবে, তখন তাকে তালাক দেবে এবং এরপর সে এক হায়েজ কাল ইদ্দাত পালন করবে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০২১, ২০২০, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৯৪, ৩৩৯৫

রুকানাহ্ ইবনু ’আব্দ ইয়াযীদ হতে বর্ণিত। তিনি স্বীয় স্ত্রী সুহায়মাহ্-কে নিশ্চিত তালাক দিলেন। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি অবহিত করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এক তালাকের নিয়্যাত করেছি, অন্য কিছু নয়। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! তুমি কি এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করনি? আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এক তালাক ব্যতীত অন্য কিছু নিয়্যাত করিনি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়ার নির্দেশ করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, রুকানাহ্ তার স্ত্রীকে উমার (রাঃ)-এর যুগে দ্বিতীয় এবং উসমান (রাঃ)-এর যুগে তৃতীয় তালাক দেন। মিশকাত : ৩২৮৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২০৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৫১, দারিমী : ২২৭৭

সুন্নানি তালাকের বৈশিষ্ট্য :

১. মাসিক ঋতুস্রাব শেষ হওয়ার পর পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া।

২. পবিত্র অবস্থায় শুধুমাত্র একটি তালাক উচ্চারণ করা।

৩. এক সাথে তিন তালাক না দেওয়া।

৪. শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকবে।

৫. ইদ্দতকাল গণনা করে এক বা দুই তালাক দেয়া, তৃতীয় তালাক না দেওয়া।

৬. পুনর্বিবেচনা ও সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে।

তালাকে হাসান (উত্তম তালাক)

তালাকে হাসান হলো তালাকের এমন একটি পদ্ধতি, যা তালাকে আহসানের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, তবে এটিও শরীয়তসম্মত। তালাকের উত্তম পদ্ধতি হিসেবে তালাকে হাসান-এর মূল উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রীকে ধীরে ধীরে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং প্রতিটি ধাপে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ রাখা। এটি কোনো তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়া।

তালাক-এ-হাসান পদ্ধতিটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিটি ধাপেই পবিত্রতা ও ধৈর্যের শর্ত রয়েছে।

প্রথম তালাক: এই পদ্ধতির শুরু হয় যখন স্বামী তার স্ত্রীকে প্রথমবার তালাক দেন। এই তালাক অবশ্যই এমন সময় দিতে হবে, যখন স্ত্রী মাসিক ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র অবস্থায় রয়েছেন এবং ওই পবিত্র অবস্থায় তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। এই প্রথম তালাকের পর স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবেন না, বরং তারা ইদ্দতকাল (প্রথম মাসিক চক্র শেষ হওয়া) পর্যন্ত আলাদা থাকবেন।

দ্বিতীয় তালাক: প্রথম ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ স্ত্রীর দ্বিতীয়বারের মতো পবিত্র অবস্থায় আসার পর, স্বামী তাকে দ্বিতীয়বার তালাক দেবেন। এই সময়েও তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না। এই দ্বিতীয় তালাকের পরও তারা ইদ্দতকাল (দ্বিতীয় মাসিক চক্র শেষ হওয়া) পর্যন্ত আলাদা থাকবেন।

তৃতীয় তালাক : একইভাবে, তৃতীয়বারের পবিত্র অবস্থায় স্বামী তার স্ত্রীকে তৃতীয় ও চূড়ান্ত তালাক দেবেন।

এই তিনটি তালাক পৃথক পৃথক পবিত্র অবস্থায় দেওয়া হয়। যদি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের পর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেন, তাহলে তালাক বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু যদি স্বামী তিনবার তালাক দেন, তাহলে বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন কুবরা হিসেবে গণ্য হয়। এই ক্ষেত্রে, স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করতে হলে হিলা নামক জটিল প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করতে হয়।

এই পদ্ধতিটি কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলে, যা ধীরে ধীরে তালাক দেওয়ার কথা বলে এবং সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি ধাপে সুযোগ দেয়। সূরা বাক্বারাহর ২:২২৯-২৩০ আয়াতে পর্যায়ক্রমে দুই তালাক এবং এরপর তৃতীয় তালাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই পদ্ধতির মূল ভিত্তি।

সারকথা : স্বামী পবিত্র অবস্থায় এবং কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করে একবার তালাক দেবেন। ইদ্দতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকবেন এবং স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেবেন না। এরপর পরবর্তী পবিত্র অবস্থায় এবং কোনো শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করে স্বামী দ্বিতীয়বার তালাক দেবেন। একইভাবে তৃতীয়বারের পবিত্র অবস্থায়ও স্বামী তৃতীয়বার তালাক দেবেন। এভাবে তিনবার তালাক দেওয়া হলে বিবাহ সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে যায় এবং এটি তালাকে বায়িন কুবরা হিসেবে গণ্য হয়। এ পদ্ধতির দলিল উপরে বর্ণনা করা হয়ছে। সুরা বাকারা : ২২৯-২৩০, সুরা তালাক : ০১।

এক সাথে তিন তালাকের বিধান : বিদআতি তালাক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিদআতি তালাক

বিদআত শব্দটি আরবী (البدع) শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। বিদআত (البدع) এর আবিধানিক অর্থ হল, নব আবিস্কৃত ও নব উদ্ভাবন। বিদআত এর অর্থ এমন করেও বলা যায়, পূর্বের কোন দৃষ্টান্ত ও নমুনা ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি ও উদ্ভাবন করা। পারিভাষিক অর্থে দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন কিছু সংযোজন করার নাম বিদআত। আর শরীয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুন করে যার প্রচলন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে শরীয়তের কোন ব্যাপক ও সাধারণ কিংবা খাস ও সুনির্দিষ্ট দলীল নেই। কাওয়ায়েদ মা’রিফাতিল বিদআহ, পৃ-২৪

তালাকের ক্ষেত্রে, বিদআতি তালাক বলতে এমন পদ্ধতিকে বোঝানো হয়, যা শরিয়ত অনুমোদন করে না। এর মধ্যে প্রধানত তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত:

১. ঋতুকালীন অবস্থায় তালাক দেওয়া।

২. পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পর তালাক দেওয়া

৩. একসাথে তিন তালাক দেওয়া।

১. মাসিক চলাকালীন সময়ে তালাক :

কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে মাসিক চলাকালীন সময়ে তালাক দেয়, তবে সেটিও বিদ‘আতী তালাক। এই তালাকও কার্যকর হয়, তবে এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। বিদ‘আতী তালাক কার্যকর হলেও এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ।

নাফি’ (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু ’উমার (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে ঋতুমতী অবস্থায় এক তালাক দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন এবং মহিলা পবিত্র হয়ে আবার ঋতুমতী হয়ে পরবর্তী পবিত্রা অবস্থা আসা পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখেন। পবিত্র অবস্থায় যদি তাকে তালাক দিতে চায় তবে সঙ্গমের পূর্বে তালাক দিতে হবে। এটাই ইদ্দাত, যে সময় স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়ার জন্য আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। ’আবদুল্লাহকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাদের বলেনঃ তুমি যদি তাকে তিন তালাক দিয়ে দাও, তবে স্ত্রীলোকটি অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত তোমার জন্য হারাম হয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় ইবন ’উমার (রাঃ) বলতেন, ’তুমি যদি এক বা দু’ তালাক দিতে’, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকমই নির্দেশ দিয়েছেন।

সহিহ বুখারি : ৫৩৩২, ৬০৩৩, ৭১৬০, সহহি মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২, ২১৮৪, ২১৮৫

২. পবিত্র অবস্থায় সহবাসের পর তালাক দেওয়া:

যখন কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তখন সেই পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়া বিদ‘আতী তালাক হিসেবে গণ্য হয়। এর কারণ হলো, শারীরিক সম্পর্কের ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে। যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে থাকেন, তাহলে ইদ্দতকাল গণনা করা জটিল হয়ে পড়ে। এছাড়া, সহবাসের পর তালাক দিলে তা পারিবারিক সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই, এই ধরনের তালাক দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়।

ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি তার স্ত্রীকে তার হায়য অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। ’উমার (রাঃ) বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উত্থাপন করলে তিনি বলেনঃ তাকে বলো, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, এরপর সে চাইলে তাকে তুহর অথবা গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৩, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে নাসায়ী ৩৩৮৯, ৩৩৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২,

এই হাদিসটি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, ঋতুকালীন অবস্থায় এবং শারীরিক সম্পর্কের পর তালাক দেওয়া ইসলামে অনুমোদিত নয়। এটি তালাকের সুন্নাতসম্মত পদ্ধতির পরিপন্থী।

৩. একসাথে তিন তালাক দেওয়া

একসাথে তিন তালাক দেওয়া একটি বিদআতী ও হারাম কাজ। এই বিষয়ে উম্মাহর আলেমদের মধ্যে ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে যে, এটি ইসলামের বিধানসম্মত পদ্ধতি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি কোনো ব্যক্তি এই হারাম কাজটি করেই ফেলে, তাহলে তার হুকুম কী হবে? এই বিষয়ে আমাদের উপমহাদেশের আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইসলামী শরীয়তে মতভেদের প্রধান কারণগুলো হলো: কোনো বিষয়ে সরাসরি দলিল না থাকা, একাধিক সঠিক দলিল বিদ্যমান থাকা, অথবা একই দলিলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা। দলিল বুঝার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও মতভেদের একটি কারণ হতে পারে। এই কারণে মতভেদ করা ইসলামে জায়েজ। রাসূল (সা.)-এর যুগেও সাহাবিদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ ছিল, কিন্তু তিনি তা দূর করে দিতেন। শুধু সাহাবিরা নন, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীদের মাঝেও ফিকহি মাসআলা-মাসায়েলে মতভেদ ছিল। তবে, তাদের সবার মূল লক্ষ্য ছিল কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি মাথা নত করা। যখন তারা প্রকৃত দলিল জানতে পারতেন, তখন তাদের মধ্যকার মতভেদ বিলীন হয়ে যেত। ইমামদের মাঝেও ফিকহি বিষয়ে হাজার হাজার মতভেদ থাকলেও তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল না। কারণ, যার কাছে যে দলিল ছিল, তার আলোকে তিনি বিশুদ্ধ অভিমত প্রদান করেছেন এবং অন্যদের মতামতের প্রতিও সম্মান দেখিয়েছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে তারা ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও হাদিসের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন।

কুরআনে তালাকের বিধান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, যার প্রমাণস্বরূপ একটি সম্পূর্ণ সূরার নামকরণই করা হয়েছে ‘সূরা তালাক’। সহিহ হাদিসেও এ বিষয়ে অসংখ্য প্র্যাকটিক্যাল বর্ণনা পাওয়া যায়। এত স্পষ্টতা সত্ত্বেও, একসাথে তিন তালাকের বিষয়ে সামান্য অস্পষ্টতার কারণে মুজতাহিদ আলেমদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়ে মোট চারটি প্রসিদ্ধ মতামত রয়েছে।

একদল মুজতাহিদ বলেন, একসাথে তিন তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না। দ্বিতীয় দলের মতে, একসাথে তিন তালাক দিলে নারীদের ওপর তিন তালাক বর্তাবে, তবে সহবাসহীন নারীদের ওপর এক তালাক। তৃতীয় দলের মতে, একসাথে তিন তালাক দিলে তা তালাকে বাইন কবীর হিসেবে গণ্য হবে, যদিও তালাকদাতা গুনাহগার হবেন। চতুর্থ দল বলেন, এটি এক তালাক-এ-রজয়ি হবে।

একথা বললে অন্যায় হবে না যে আমাদর উপমহাদেশের অধিকংশ লোকই হানাফি মাজহাবের অনুসারী। অর্থাৎ তারা ফিকহি মাসায়েলে একদল হানাফি আলেমদের অনুসরণ করে থাকে। দ্বিতীয় বড় হলো আহলে হাদিস বা সালাফি। উপরে বর্ণনি চারটি মতামতের মাঝে হানাফি মাজহাবের আলেমদের মতে, এক সাথে তিন তালাক দিলে, তালাকে বায়িন কবির হয়ে যাবে, তবে তালাক দাতা গুনাহগার হবেন। অপর পক্ষে আহলে হাদিস বা সালাফি আলেমদের মতে, এক সাথে তিন তালাক দিলে, এক তালাক রাজয়ি হবে।  দেখা যায় তালাকের মাসায়ের উপমহাদের দুটি বৃহত দল, হানাফি ও সালাফিদের (আহলে হাদিস) মাঝে বিরাট মতভেদ। কাজেই আমি এ চারটি মতমত থেকে দুটি মতামত তুলে ধরছি। আশা করি আল্লাহ রহমতে বইটিতে নিরপেক্ষভাবে দুই দলের দলিল উপস্থাপন কবর যাতে জ্ঞানীগণ  সঠিক মতামত বুঝে আমল করেত পারে।

এক সাথে তিন তালাক দিলে, তালাকে বায়িন কবির হয়ে যাবে।

আমাদের উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারী হানাফি আলেমদের মতে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া বিদআত বা হারাম হলেও তা কার্যকর হয়। তাদের মতে, এমন তালাক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হিসেবে গণ্য হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ইদ্দতকালীন সময়েও কোনো ধরনের পুনর্মিলনের সুযোগ থাকে না, যা এক বা দুই তালাকের ক্ষেত্রে সম্ভব। এই মতটি তালাকের বিধানকে কঠিন করে তোলে যাতে মানুষ এর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। এই মতের স্বপক্ষে যে প্রধান দলিলগুলো তারা পেশ করে, তা নিচে দেওয়া হল-

১. এ কথার সমর্থনে কুরআনের দলিল :

হানাফি মাজহাবের ফকিহগণ তালাকের বিধান সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলোর সমন্বিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ

তালাক দু’বার। অতঃপর বিধি মোতাবেক রেখে দেবে কিংবা সুন্দরভাবে ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ, তা থেকে কিছু নিয়ে নেবে। তবে উভয়ে যদি আশঙ্কা করে যে, আল্লাহর সীমারেখায় তারা অবস্থান করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালিম। সুরা বাকারা : ২২৯

এইতো গেল দুই তালাকের বিধান। এরপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তিন তালাক প্রদানের বিধান ঘোষণা করে ইরশাদ করেন-

فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا تَحِلُّ لَہٗ مِنۡۢ بَعۡدُ حَتّٰی تَنۡکِحَ زَوۡجًا غَیۡرَہٗ ؕ فَاِنۡ طَلَّقَہَا فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَاۤ اَنۡ یَّتَرَاجَعَاۤ اِنۡ ظَنَّاۤ اَنۡ یُّقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ یُبَیِّنُہَا لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ

অতএব যদি সে তাকে তালাক দেয় তাহলে সে পুরুষের জন্য হালাল হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত ভিন্ন একজন স্বামী সে গ্রহণ না করে। অতঃপর সে (স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যে, তারা একে অপরের নিকট ফিরে আসবে, যদি দৃঢ় ধারণা রাখে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে। আর এটা আল্লাহর সীমারেখা, তিনি তা এমন সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যারা জানে। সুরা বাকারা : ২৩০

পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াতের দ্বারা পরিস্কার প্রমণিত হয় যে, তিন তালাক প্রদান করলে তিন তালাকই পতিত হবে। প্রথম দুই তালাকের পর স্বামী ফিরিয়ে নিতে পারেন, কিন্তু তৃতীয়বার তালাক দিলে (তা যেই পদ্ধতিতেই হোক না কেন) তালাকে বাইন কবীর কার্যকর হয়। একবারে তিন তালাক দেওয়া যদিও শরিয়তসম্মত পদ্ধতি নয়, কিন্তু তা উচ্চারিত হলে কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী তা কার্যকর হবে। কারণ, আল্লাহ তালাকের সংখ্যাকে দুইবারে সীমাবদ্ধ করেছেন, কিন্তু তিন তালাকের ফলাফলকে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।

২. সাহাবিদের (রা.) ইজমা

ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كَانَ الطَّلاَقُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَسَنَتَيْنِ مِنْ خِلاَفَةِ عُمَرَ طَلاَقُ الثَّلاَثِ وَاحِدَةً فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ إِنَّ النَّاسَ قَدِ اسْتَعْجَلُوا فِي أَمْرٍ قَدْ كَانَتْ لَهُمْ فِيهِ أَنَاةٌ فَلَوْ أَمْضَيْنَاهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏ فَأَمْضَاهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এবং আবূ বকর (রাঃ)-এর যুগে ও উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত তিন তালাক এক তালাক হিসেবে গণ্য হতো। অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বললেন, ‘লোকেরা এমন এক বিষয়ে তাড়াতাড়ি করছে, যাতে তাদের জন্য ধৈর্যের অবকাশ ছিল। যদি আমরা এটি তাদের উপর কার্যকর করে দেই (তাহলে কেমন হয়)?’ এরপর তিনি তা তাদের উপর (একসাথে তিন তালাককে তিন তালাক)  কার্যকর করে দিলেন। সহি মুসলিম : ১৪৭২

উমার (রাঃ) যখন এক সাথে তিন তালাককে কার্যকর বা তিন তালাক হিসেবেই গণ্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তা সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা সমর্থিত হয়। এই ইজমা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান হিসেবে বিবেচিত। যদিও রাসূল (সাঃ)-এর যুগে এবং আবু বকর (রাঃ)-এর খিলাফতে এক সঙ্গে তিন তালাককে এক তালাক ধরা হতো, উমার (রাঃ)-এর এই সিদ্ধান্তের পেছনে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ (মাসলাহা) ছিল।

হানাফি আলেমদের দাবি- এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, সাহাবীদের ইজমা শরীয়তের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। যদিও মূল নীতি এক ছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী বিধানের প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে। উমার (রাঃ)-এর এই সিদ্ধান্তকে তাকয়ীদে হুকুম (বিধানকে সীমাবদ্ধ করা) হিসেবে দেখা হয়, যা একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং যা মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তাই, হানাফি ফিকহ মোতাবেক, একসঙ্গে তিন তালাক উচ্চারণ করলে তা তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর হবে এবং স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যাবে।

৩. একত্র তিন তালাক শুনে ইবনু আব্বাস (রা.) চুপ হয়ে যান

মুজাহিদ (রহ.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রা.)-এর কাছে অবস্থান করছিলাম এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বললো যে, সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি এ কথা শুনে চুপ রইলেন। তখন আমার মনে হলো, সম্ভবতঃ তিনি মহিলাটিকে পুনরায় গ্রহণের নির্দেশ দিবেন। অতঃপর তিনি বললেন, তোমাদের কেউ আহম্মকের মতো কাজ করে এবং এসে বলে, হে ইবনু ’আব্বাস! হে ইবনু ’আব্বাস! অথচ আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটা সমাধানের পথ দেখিয়ে দিবেন’’। সূরা তালাক : ২। আর তুমি তো (তালাকের বিষয়ে) আল্লাহকে ভয় করোনি। সুতরাং আমি তোমার জন্য কোনো পথ দেখছি না। তুমি তোমার প্রতিপালকের নাফরমানী করেছো এবং স্ত্রীকেও হারিয়েছো। মহান আল্লাহ তো বলেছেনঃ ’’হে নবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দাতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে।’’ সুরা তালাক : ০১

ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, এ হাদীসটি হুমাইদ, আ’রাজ ও অন্যরা মুজাহিদ থেকে ইবনু ’আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও শু’বাহ, আইয়ূব, ইবনু জুরাইজ আ’মাশ প্রমুখ বর্ণনাকারীগণ সকলেই ইবনু ’আব্বাস সূত্রে হাদীস বর্ণনা করে বলেছেন যে, ইবনু  আব্বাস (রাযি.) একে একসাথে তিন তালাক হিসেবে গণ্য করেছেন। তাই তিনি বলেছেন, ’তুমি তোমার স্ত্রীকে হারালে।

ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, হাম্মাদ ইবনু যায়িদ আইয়ূব থেকে ইকরিমার মাধ্যমে ইবনু ’’আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন, ’’যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একত্রে তিন তালাক দেয়, তা এক তালাক গণ্য হবে।’’ ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম (রহ.) আইউব থেকে ইকরিমাহ (রহ.) সূত্রে বর্ণনা করেন, উক্ত কথাটি ইবনু আব্বাসের নয়, বরং ইকরিমাহর কথা। তিনি ইবনু ’আব্বাস (রাযি.)-এর উল্লেখ করেননি এবং একে ইকরিমাহ (রহ.)-এর অভিমত গণ্য করেছেন। সহীহ। সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৭, সুনানে বায়হাকী কুবরা ; -১৪৭২০, সুনানে দারা কুতনী : ১৪৩

নোট : এ হাদিসে এ সাথে তিন তালাত গন্য হয়েছে বিধায় ইবনু আব্বাস (রা.) চুপ হয়ে গেলেন এবং বললেন তুমি স্ত্রীকে হারালে।

৪. রিফায়া (রা.) তার স্ত্রী তিন তালাক ছিয়েছিল

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রিফায়া আল কুরাযী নামে এক সাহাবীর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি রিফায়ার বিবাহিতা স্ত্রী ছিলাম, সে আমাকে তিন তালাক দিয়ে সম্পূর্ণ সম্পর্ক নিঃশেষ করে দিয়েছে। অতঃপর আব্দুর রহমান ইবনে যাবীর -এর সাথে আমার বিবাহ হয়, কিন্তু তাঁর কাছে এই কাপড়ের আঁচলের মতো ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি রিফায়ার নিকট ফিরে যেতে চাও? সে বলল, জি, হ্যাঁ। তিনি বললেন, না, যে পর্যন্ত না তুমি তার স্বাদ আস্বাদন (সহবাস) কর এবং সে তোমার স্বাদ আস্বাদন করে। সহিহ বুখারী : ২৬৩৯,  সহিহ মুসলিম : ১৪৩৩, সুনানে নাসায়ী : ৩২৮৩, সুনানে তিরমিযী : ১১১৮, সুনানে ইবনু মাজাহ “ ১৯৩২, আহমাদ : ২৪০৯৮, ইরওয়া : ১৮৮৭,  মিশকাত : ৩২৯৫, হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

সালাফিদের দাবি : এ হাদিসে এক মজলিসে তিন তালাকের কথা নেই। বরং সে তাকে স্বাভাবিক নিয়মে তিন তুহরে তিন তালাক দিয়েছিল বলেই বুঝতে হবে। কেননা রাসূলের যামানায় ‘বায়েন তালাক’ বলতে তিন তুহরে তালাকই বুঝাতো।

৫. একই মজলিসে তিন তালাক

 আমের আশশাবী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বললাম, আপনার তালাকের ঘটনাটি আমাকে বলুন। তিনি বলেন-

طَلَّقَنِي زَوْجِي ثَلَاثًا وَهُوَ خَارِجٌ إِلَى الْيَمَنِ فَأَجَازَ ذَلِكَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم

আমার স্বামী ইয়ামনে থাকা অবস্থায় আমাকে তিন তালাক দেয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে জায়েয গণ্য করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৪, আহমাদ : ২৭৩২৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪০৪৯, মিশকাত : ৩৩২৪

ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ আমর ইবনু হাফস্ (রা.) (তার স্বামী) অনুপস্থিতিতে তাকে বায়িন তালাক দেন। এরপর সামান্য পরিমাণ যবসহ উকীলকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। এতে তিনি ফাতিমা (রা.) তার উপর ভীষণভাবে অসন্তুষ্ট হন। সে  বলল, আল্লাহর কসম! তোমাকে (খোরপোষরূপে) কোন কিছু দেয়া আমাদের দায়িত্ব নয়। তখন তিনি ফাতিমা বিনত কায়স (রা.) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে উপস্থিত হয়ে তার নিকট সব খুলে বললেন। তিনি বললেন, তোমার জন্য তার তোমার স্বামী আবূ আমর ইবনু হাফস্ (রা.) এর দায়িত্বে কোন খোরপোষ নেই। এরপর তিনি তাকে উম্মু শারীক এর ঘরে গিয়ে ইদ্দাত পালনের নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি এও বললেন, সে মহিলা (উম্মু শারীক) এমন একজন স্ত্রীলোক যার কাছে আমার সাহাবীগণ ভীড় করে থাকেন। তুমি বরং ইবনু উম্মু মাকতুম (রা.) এর বাড়িতে গিয়ে ইদ্দাত পালন করতে থাক। কেননা সে একজন অন্ধ মানুষ। সেখানে প্রয়োজনবোধে তুমি তোমার পরিধানের বস্তু খুলে রাখতে পারবে। ইদ্দাত পূর্ণ হলে তুমি আমাকে জানাবে। তিনি বলেন, যখন আমার ইদ্দাত পূর্ণ হল তখন আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানালাম যে, মু’আবিয়াহ ইবনু আবূ সুফইয়ান (রা.) ও আবূ জাহম (রা.) আমাকে বিবাহের পায়গাম পাঠিয়েছেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আবূ জাহম এমন লোক যে, তার কাঁধ থেকে লাঠি নামিয়ে রাখে না। আর মু’আবিয়াহ তো কপৰ্দকহীন গরীব মানুষ। তুমি উসামাহ ইবনু যায়দের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও। কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করলাম না। পরে তিনি আবার বললেন, তুমি উসামাকে বিয়ে কর। তখন আমি তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। আল্লাহ এতে (তার ঘরে) আমাকে বিরাট কল্যাণ দান করলেন। আর আমি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হলাম। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০, সুনানে  আবূ দাঊদ : ২২৮৪, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৫ হাদিসটি আবু দাউদ থেকে সংকরন করা হয়েছে।  

হানাফি আলেমদের দাবি এ হাদিস দ্বারা বুঝা যায় ফাতিমা বিনতু কায়স (রা.) এক সঙ্গে তিন তালাকের কথা জানতে পারেন। আগে তিনি এক বা দুই তালাকের কথা জানতেন না। তাই তিনি ভরণ পোষনের জন্য এর নিকট অভিযোগ করেছেন। এক বা দু্‌ই তালাত দিলে স্বামী নিশ্চয়ই ভরন পোষন দিতে বাধ্য থাকত। ইবন মাজাহ এ হাদিসের শিরোনাম দিয়েছেন : যে ব্যক্তি একই মজলিসে তিন তালাক দেয়।

৬. স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে হারাম হয়ে যায়

 লায়স (রহ.) নাফি থেকে বর্ণনা করেছেন-

كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا سُئِلَ عَمَّنْ طَلَّقَ ثَلاَثًا قَالَ لَوْ طَلَّقْتَ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ فَإِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَمَرَنِي بِهٰذَا فَإِنْ طَلَّقْتَهَا ثَلاَثًا حَرُمَتْ حَتّٰى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَكَ.

ইবনু উমার (রাঃ)-কে তিন তালাক প্রদানকারী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, যদি তুমি একবার বা দু’বার দিতে! কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে সে হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না সে স্ত্রী তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। সহিহ বুখারি : ৫২৬৪

নোট : এ হাদিসটি অনেক হানাফি আলেরম একসাথে তিন তালাকের দলিল হিসেবে উল্লেখ করে। তখন তারা হদিসের অনুবাদে সামান্য বিকৃতি কবে। তাদের একটি ভুল বা বুকৃত অনুবাদ হলো-

নাফে (রহ.) বলেন, যখন ইবনে উমর রাঃ এর কাছে এক সাথে তিন তালাক দিলে ‎তিন তালাক পতিত হওয়া না হওয়া’ (রুজু‘করা যাবে কিনা) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো,‎ তখন তিনি বলেন-“যদি তুমি এক বা দুই তালাক দিয়ে থাকো তাহলে ‘রুজু’ [তথা স্ত্রীকে বিবাহ করা ছাড়াই ফিরিয়ে আনা] করতে পার। ‎কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকম অবস্থায় ‘রুজু’ করার আদেশ দিয়েছিলেন। ‎যদি তিন তালাক দিয়ে দাও তাহলে স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে, সে তোমাকে ছাড়া অন্য স্বামী গ্রহণ করা পর্যন্ত।

নোট : এ বিষয়টি সাধারণ তিন তালাত বায়িনের মাসায়েল। শুধু একসাত তিন তালাক কথাটি অতিরিক্ত যোগ করে দলিল নিজের পক্ষে নিয়েছে। মুফতি রাশেদুল ইসলাম, মুসলিম বাংলা ওয়বসাইড, প্রশ্ন নম্বর-২৬২৫৪ এর উত্তরে।

৭. জেনার কারনে এক সাথে তিন তালাক প্রদান

সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে (ব্যভিচারে) দেখতে পায় এবং সে যদি (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? (আর এরূপ যদি না করে) তবে সে (স্বামী) কি করবে (অর্থাৎ- এই ব্যভিচারের কারণে তার করণীয় কি)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম। অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। সহিহ বুখারি : ৪৭৪৫, ৪৭৪৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৯২, সুনানে নাসায়ী :  ৩৪০২, দারিমী :  ২২৭৫, মিশকাত : ৩৩০৪। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

নোট :  এ হাদিসের আলোকে তারা দাবি করের থাকেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) একসাথে তিন তালাক দেওয়াটা স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু এখানে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর বিরুদ্ধে যেনার অভিযোগ ছিল এবং লিআনের ঘটনা ছিল। লিআনের কারণে উভয়পক্ষের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। তাই পৃথকভাবে তালাক দেওয়ায় কোন প্রয়োজন হয় না। কাজেই এ হাদিস দ্বারা একসাথে তিন তালাকের হুকুর জারি করা যাবে না।

৮. একসাথে একশত তালাক প্রদান করা

 মালিক (রহ.) হতে বর্ণিত। তাঁর নিকট খবর এসেছে যে, জনৈক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করল, আমি স্বীয় স্ত্রীকে একশ’ তালাক দিয়েছি, এ সম্পর্কে আমার প্রতি আপনার অভিমত কি? উত্তরে তিনি বললেন, তিনটির মাধ্যমেই তোমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে, বাকি সাতানব্বইটি দ্বারা তুমি আল্লাহর আয়াত (শারীআতের বিধান)-এর সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছ। মিশকাত : ৩২৯৩, মুয়াত্তা মালিক : ১১৯৫, হাদিসের মান হাসান।

উবাদাহ বিন ছামিত (রাঃ) বলেন, আমার দাদা তার স্ত্রীকে একসঙ্গে ১০০০ তালাক দেন। তখন আমার আববা রাসূল (ছাঃ)-এর দরবারে গেলেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তোমার দাদা তালাক দেওয়ার সময় আল্লাহকে ভয় করেনি। তার অধিকারে মাত্র তিনটি। বাকী ৯৯৭টি বাড়াবাড়ি ও যুলম হয়েছে। আল্লাহ চাইলে তাকে আযাব দিবেন, চাইলে ক্ষমা করবেন’। সুনানে দারা কুতনী : ৪৬১০, মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ : ১৭৮৮৯, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ১১৭৫৩, কানজুল উম্মাল : ২৮৪২৩, হাদিসটি মান কেউ জঈফ আবার কেউ জাল বলেছেন।

নোট : এ দুটি হাদিসের প্রথমটি সহিহ হাদিস। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তিনটি তালাকের মাধ্যমেই তোমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে। এখানে কিন্তু তিন তালাক একসাথে দেওয়া হয়েছে বলে আনুমেয়। ,

০৯. হানাফি মাজহাবের ফিকহি দলিল

হানাফি ফকিহগণ বলেন, ইসলামে তালাক দেওয়ার সুন্নতি পদ্ধতি হলো এক তালাক দেওয়া। কিন্তু যদি কোনো স্বামী এই পদ্ধতি না মেনে একসাথে তিন তালাক দেন, তাহলে এর জন্য তাকে গুনাহগার হতে হবে, কিন্তু তার তালাক কার্যকর হবে। কারণ, যদি একসাথে দেওয়া তিন তালাককে অকার্যকর ধরা হয়, তবে মানুষ শরিয়তের বিধানকে অবহেলা করবে এবং দায়িত্বহীনভাবে তালাক দেবে। তাই, শাস্তি হিসেবে হলেও এই তালাককে কার্যকর করা উচিত, যাতে মানুষ সতর্ক হয়। এই মতের পক্ষে তাদের ফিকহি গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন দলিল উল্লেখ করেছেন। নিচে কয়েকটি প্রসিদ্ধ ফিকহি গ্রন্থ থেকে এর কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. ফতোয়ায়ে আলমগীরি (ফাতাওয়া-ই-হিন্দিয়া) গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দেয়, তবে তিন তালাকই কার্যকর হবে, যদিও এটি বিদ’আতী (শরিয়ত-বিরুদ্ধ) পদ্ধতি। তারা এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, রাসূল (সা.)-এর সময়কাল থেকে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি ছিল যে, একসাথে তিন তালাক দিলে তা তিন তালাক হিসেবেই গণ্য হবে। ফতোয়ায়ে আলমগীরি (ফাতাওয়া-ই-হিন্দিয়া), প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩৭৩-৩৭৪

২. বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একসাথে তিন তালাক দেয়, তবে তার স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যাবে, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করে। এই বিধানটি একবারে তিন তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গ্রন্থটিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে যে, তিন তালাক মুখে উচ্চারণ করা হলে তা কার্যকর হবে, কারণ তালাকের বিষয়টি নির্ভর করে উচ্চারণের ওপর, নিয়তের ওপর নয়। আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২২৭

৩. ইমাম আলাউদ্দীন আবু বকর ইবনে মাসউদ কাসানী হানাফী (রহ.) বলেছেন, এক সাথে তিন তালাক কার্যকর হওয়ার কারণ হিসেবে উমর (রা.)-এর আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফিকাহবিদগণ বলেন যে, উমর (রা.) যখন দেখলেন যে মানুষ এ বিষয়ে খেলাধুলা করছে, তখন তিনি সাহাবিদের উপস্থিতিতে এটিকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সাহাবিদের ঐকমত্যের (ইজমা’) ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল। তাই, এটি শরিয়তের একটি প্রতিষ্ঠিত বিধান হিসেবে গণ্য। বাদাই’উস সানাই, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৯৬

৪. মুহাম্মদ আমীন ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেছেন, যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে, “আমি তোমাকে তিন তালাক দিলাম,” তবে তা কার্যকর হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রন্থটিতে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, এই ধরনের তালাক যদিও হারাম, কারণ এটি শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতির পরিপন্থী, তবুও এটি কার্যকর হবে। ফতোয়ায়ে শামী (রদ্দুল মুহতার), তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৫৩

এক সাথে তিন তালাক দিলে, এক তালাক রজয়ি হবে

একসাথে তিন তালাক দিলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হবে—এই মতটি সালাফি ও আহলে হাদিস আলেমগণ দিয়ে থাকেন। তারা তাদের মতের সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ এবং সাহাবিদের আমল থেকে বেশ কিছু শক্তিশালী দলিল পেশ করেন।

ক. কুরআন থেকে দলিল

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا

হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ী-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোন স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর যুলম করে। তুমি জান না, হয়তো এর পর আল্লাহ, (ফিরে আসার) কোন পথ তৈরী করে দিবেন। সুরা তালাক : ০১

এই আয়াতটি তালাকের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়, যা হলো ইদ্দতকাল অনুযায়ী ধাপে ধাপে তালাক দেওয়া। একসাথে তিন তালাক দিলে এই বিধান লঙ্ঘিত হয়। সালাফি আলেমদের মতে, যেহেতু এই পদ্ধতি কুরআনের নির্দেশের বিরোধী, তাই তা শরিয়তসম্মত নয় এবং তা এক তালাক হিসেবেই কার্যকর হবে।

সহিহ হাদিস থেকে দলিল

১. একসাথে তিন তালাকের পর স্ত্রীকে পুনঃগ্রহণ করা যায়

ইবনু আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রুকানার পিতা আবদু ইয়াযীদ ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠী উম্মু রুকানাকে তালাক দেন এবং মুযাইনাহ গোত্রের এক মহিলাকে বিয়ে করেন। একদা ঐ মহিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললো, তার স্বামী সহবাসে অক্ষম। যেমন আমার মাথার চুল অন্য কোনো চুলের কোনো উপকারে আসে না। সুতরাং আপনি আমার ও তার মাঝে বিচ্ছেদ করিয়ে দিন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে অসন্তুষ্ট হন এবং রুকানা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে ডেকে আনেন। এরপর তিনি সেখানে উপস্থিত সকল লোকজনকে বলেন, তোমরা কি লক্ষ করেছো যে, এদের মধ্যে অমুক অমুকের অঙ্গের মিল রয়েছে? তারা বললো, হ্যাঁ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আবদু ইয়াযীদকে বলেন, তুমি তাকে তালাক দাও। সুতরাং তিনি তাকে তালাক দিলেন। তিনি বলেন, তুমি রুকানার মা ও তার ভ্রাতৃগোষ্ঠীকে পুনরায় গ্রহণ করো। তিনি বলেন, আমি তো তাকে তিন তালাক দিয়েছি, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেন, আমি তা জানি, তুমি তাকে গ্রহণ করো। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, ’’হে নবী! যখন তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের তালাক দিবে তখন তাদের ইদ্দাতকালের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দিবে’’। সূরা তালাক : ০১

ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, নাফি ইবনু উজাইর ও আব্দুল্লাহ ইবনু ’আলী ইবনু ইয়াযীদ ইবনু রুকানা থেকে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, রুকানা তার স্ত্রীকে তালাক দিলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পুনরায় ঐ স্ত্রীকে গ্রহণ করতে আদেশ দেন। এটা অধিকতর সঠিক।

সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৬

নোট : এ হাদিস থেকে জানা যায় যে, রুকানা (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এটিকে এক তালাক হিসেবে গণ্য করে তাঁকে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেন। সাধারণত, তিন তালাক দিলে তালাকটি বাইন (সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ) হয়ে যায় এবং স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, কেবল দ্বিতীয় বিয়ের পরই তা সম্ভব। কিন্তু এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী একসঙ্গে দেওয়া তিন তালাক এক তালাক হিসেবেই কার্যকর হয়েছিল, যা রাজ’ঈ (ফেরতযোগ্য) তালাক। এটি প্রমাণ করে যে, একসঙ্গে তিন তালাক দিলে তা এক তালাকেই পরিণত হয়।

২. এক সাথে তিন তালাক দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষন রাগ করেছিল

মাহমুদ ইবনু লাবীদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কোন লোক সম্বন্ধে সংবাদ দেয়া হলো যে, লোকটি তার স্ত্রীকে একই সাথে তিন তালাক দিয়ে ফেলেছে। (এরূপ শুনে) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগাম্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, অতঃপর বললেন-

«أَيُلْعَبُ بِكِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى, وَأَنَا بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ». حَتَّى قَامَ رَجُلٌ, فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ! أَلَا أَقْتُلُهُ رَوَاهُ النَّسَائِيُّ وَرُوَاتُهُ مُوَثَّقُونَ

তোমাদের মধ্যে আমি বিদ্যমান থাকা অবস্থাতেই কুরআন নিয়ে কি খেলা করা হচ্ছে? এমনকি এক ব্যক্তি (সাহাবী) দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি তাকে হত্যা করব না?  বুলূগুল মারাম : ১০৭২,  সুনানে নাসাই : ৩৪০১, গায়াতুল মারাম : ২৬১

নোট : রাসূল (সা.)-এর এই তীব্র প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই কাজটি এতটাই গুরুতর যে নবী (সা.) এটিকে আল্লাহর কিতাবের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ হিসেবে তুলনা করেছেন।

৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং আবু বকর (রাঃ)-এর যুগে তিন তালাককে এক তালাক গন্য করা হতো

তাওস (রহ.) থেকে বর্ণিতখ। আবু সহবা ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে বললেন-

هَاتِ مِنْ هَنَاتِكَ أَلَمْ يَكُنِ الطَّلاَقُ الثَّلاَثُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَاحِدَةً فَقَالَ قَدْ كَانَ ذَلِكَ فَلَمَّا كَانَ فِي عَهْدِ عُمَرَ تَتَايَعَ النَّاسُ فِي الطَّلاَقِ فَأَجَازَهُ عَلَيْهِمْ ‏.‏

“তোমার কিছু বক্তব্য আমাদের শুনাও। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে এবং আবু বকর (রাঃ)-এর যুগে কি তিন তালাক (একসাথে দিলে) এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো না?” তিনি (ইবনে আব্বাস রাঃ) বললেন,

“হ্যাঁ, তা-ই ছিল। কিন্তু যখন উমর (রাঃ)-এর খেলাফতের যুগ এলো, মানুষ তালাকের ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে (অতিরিক্তভাবে) লিপ্ত হতে লাগল, তখন তিনি (উমর রাঃ) তা তাদের ওপর কার্যকর করে দিলেন (অর্থাৎ তিনকে তিন হিসেবেই গণ্য করলেন)।” সহিহ মুসলিম : ১৪৭২

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর যুগে, আবূ বকর (রাঃ)-এর খিলাফতে এবং উমার (রাঃ)-এর খিলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া হলে তা এক তালাক হিসেবেই গণ্য করা হতো। এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবীগণ একসাথে তিন তালাককে এক তালাকই গন্য করতেন, যা ছিল শরীয়তের মূল বিধান।

পরবর্তীতে, উমার (রাঃ) যখন দেখলেন যে মানুষেরা তালাকের ব্যাপারে হেলাফেলা করছে এবং ঘন ঘন একসাথে তিন তালাক দিয়ে দিচ্ছে, তখন তিনি একটি কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি একসঙ্গে তিন তালাককে তিন তালাক হিসেবেই কার্যকর করার নির্দেশ দেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তালাকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা এবং তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে খেল-তামাশায় পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা। এটি কোনো শরয়ী বিধানের পরিবর্তন ছিল না, বরং একটি শিক্ষামূলক পদক্ষেপ ছিল, যা মানুষের অসাবধানতা ও বাড়াবাড়ি বন্ধ করার জন্য নেওয়া হয়েছিল।

এই হাদিসটি এ মতের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় যে, একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া হলে তা মূলত এক তালাক হিসেবেই গণ্য হওয়া উচিত। উমার (রাঃ)-এর সিদ্ধান্তটি ছিল একটি বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপ। যদি বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে একসাথে তিন তালাক দেওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে তার পেছনে সামাজিক, মানসিক এবং শিক্ষাগত কারণগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। কোরআন ও হাদিসের মূল শিক্ষা অনুযায়ী, তালাক একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ এবং এটি ধীরে ধীরে, সুন্নাহর নিয়ম মেনে হওয়া উচিত। একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়ার যে প্রবণতা, তা কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশে একসাথে তিন তালাক দেওয়ার কারণ

একসাথে তিন তালাক দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়, বরং বিদ’আত ও হারাম। এতদসত্ত্বেও আমাদের সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এর মূল কারণগুলো হলো:

ক. পূর্বপুরুষের অনুসরণ :

আমাদের সমাজে বহু যুগ ধরে এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, তালাক মানেই একবারে তিন তালাক। এর চেয়ে কম তালাক দিলে তা কার্যকর হয় না। এই বিশ্বাস এতটাই গভীর যে মানুষ সঠিক ধর্মীয় বিধান জানার পরও তা মানতে চায় না। বাপ-দাদার এই ভুল প্রথা অনুসরণ করে মানুষ সহজে একসাথে তিন তালাক দিয়ে বসে।

খ. ধর্মিয় জ্ঞানের অভাব :

প্রতিটি মুসলিমের ধর্মিয় প্রয়োজনীয় পরিমান জ্ঞান অর্জন ফরজ। কাজেই যিনি তালাক দিবেন তার তালাক সম্পর্কি সকল জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কিন্তু তালাকের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ অজ্ঞ। তারা জানে না যে, ইসলামে তালাকের একটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি রয়েছে, যা অনুসরণ করলে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও তা ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে। অজ্ঞতার কারণে তারা একসাথে তিন তালাক দিয়ে পারিবারিক জীবনকে আরও জটিল করে তোলে।

গ. হঠাৎ রাগ ও আবেগ :

তালাকের ঘটনা সাধারণত স্বামী-স্ত্রীর তীব্র ঝগড়া, রাগ এবং মানসিক চাপের কারণে ঘটে। চরম রাগের মুহূর্তে স্বামী তার রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে একবারে তিন তালাক উচ্চারণ করে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়। এই মুহূর্তে কী বলা হচ্ছে এবং তার পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে তার কোনো হুঁশ থাকে না।

ঘ. পারিবারিক চাপ :

অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে ছেলে বা মেয়ের ওপর বিয়ের সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়, বিশেষ করে যদি তারা নিজেরা বিবাহ করে থাকে বা পরিবার সম্পর্কটি মেনে নিতে না পারে। এই চাপের মুখে অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী একসাথে তিন তালাক দিয়ে সম্পর্ককে চূড়ান্তভাবে শেষ করে দেয়। অনেক সময় বউ শাশুরি এক অপরকে মেন নিতে পারেনা বিধায় পারিবারিক তিব্র কলহের কারনে কোন কোন স্বামী এক সাথে তালাক দিতে বাধ্য হয়।

ঙ.  সামাজিক চাপ ও মর্যাদা :

অজ্ঞতার কারণে অনেক সময় পরিবার বা সমাজ মনে করে যে, তালাক একটি দুর্বল সিদ্ধান্ত। যদি স্বামী শুধুমাত্র এক তালাক দেন, তবে তার সম্মান কমে যাবে বলে মনে করা হয়। তাই, তারা সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার জন্য একবারে তিন তালাক দিয়ে থাকে। তাদের কাছে এটি যেন একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা তাদের সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা প্রকাশ করে।

চ.  প্রক্রিয়াগত অজ্ঞতা :

অধিকাংশ মানুষ তালাকের আইনি ও শরীয়তসম্মত পদ্ধতি সম্পর্কে জানে না। তারা মনে করে, একবার মুখে তিনটি তালাক উচ্চারণ করলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। তারা জানে না যে, তালাকের নির্দিষ্ট সময় এবং পদ্ধতি রয়েছে। এই অজ্ঞতার কারণে তারা তালাকের সঠিক নিয়ম-কানুন মেনে চলে না এবং একবারে তিন তালাক দেয়।

ছ.  দ্রুত সমাধান :

অনেকে মনে করে, সম্পর্ক যখন খারাপ হয়ে যায়, তখন দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে তা শেষ করাই ভালো। তারা ভাবে, ধীরে ধীরে এক বা দুই তালাক দিলে ঝামেলা বাড়তে পারে বা সম্পর্ক ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। তাই, সব সমস্যা একবারে শেষ করতে তারা একবারে তিন তালাক দেয়।

জ. যৌতুক :

যৌতুক একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। যদি বিয়ের পর শর্তকৃত যৌতুক না দেওয়া হয়, তখন স্বামী এবং তার পরিবার স্ত্রীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এই নির্যাতনের চরম পর্যায়ে একবারে তিন তালাকের ঘটনা ঘটে।

আপনার এই আলোচনাটি থেকে বোঝা যায় যে, একসাথে তিন তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের পরিপন্থী হলেও সামাজিক ও মানসিক কারণে এর প্রচলন রয়েছে। এই বিষয়ে আরও কিছু জানতে চাইলে আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি।

বাতিল তালাক বা অশুদ্ধ তালাক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে, বাতিল তালাক হলো এমন ধরনের বিচ্ছেদ, যা কোনোভাবেই কার্যকর হয় না। এই তালাক সেসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, যারা শরীয়তের বিধিবিধান পালনের জন্য উপযুক্ত নয়। এদের মধ্যে রয়েছে নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক), পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি, যার জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে লোপ পেয়েছে। এছাড়াও, যে ব্যক্তি ঘুমের ঘোরে থাকে অথবা কোনো কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, তাদের দেওয়া তালাকও বাতিল বলে গণ্য হয়। এর কারণ হলো, শরীয়ত এমন ব্যক্তির ওপর কোনো বিধান কার্যকর করে না, যার পূর্ণ জ্ঞান বা বিচার-বুদ্ধি নেই। এ ধরনের ব্যক্তিদের কাজকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কাজ হিসেবে ধরা হয় না, তাই তাদের তালাকও বাতিল হয়ে যায় এবং দাম্পত্য সম্পর্ক অক্ষুণ্ন থাকে। এটি ইসলামে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা অক্ষম ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষিত করে।

১. পাগল, মাতাল বা অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় তালাক

২. জবরদস্তি তালাক (ভয়-ভীতি বা বল প্রয়োগ)

৩. ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক

১. পাগল, মাতাল বা অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় তালাক

ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির ওপর কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। যেহেতু তালাক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও ধর্মীয় চুক্তি, তাই এর জন্য সুস্থ মস্তিষ্কের প্রয়োজন।

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে। ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষন না সে জাগ্রত হয়, নাবালেগ যতক্ষন না সে বালেগ হয় এবং পাগল, যতক্ষন না সে জ্ঞান ফিরে পায় বা সুস্থ হয়। অধস্তন রাবী আবূ বাকর (রহঃ) এর বর্ণনায় আছে, বেহুঁশ ব্যক্তি যতক্ষণ না সে হুঁশ ফিরে পায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪১, সুনানে নাসায়ী ৩৪৩২, আবূ দাউদ ৪৩৯৮, আহমাদ ২৪১৭৩, ২৪১৮২, ২৪৫৯০, দারেমী ২২৯৬, ইরওয়াহ ২৯৭, মিশকাত ৩২৮৭-৩২৮৮।

আলী বিন আবূ তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নাবালেগ, পাগল ও ঘুমন্ত ব্যক্তি থেকে কলম তুলে নেয়া হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪২, সুনানে তিরমিযী ১৪২৩, মিশকাত : ৩২৮৭, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৪০৩, ইরওয়া ; ২৯৭,

এই হাদিসের আলোকে, একজন পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির তালাক কার্যকর হবে না। মাতাল ব্যক্তির তালাকের বিষয়ে কিছুটা মতভেদ আছে।

হানাফী মাজহাবের ভিন্নমত :

হানাফি আলেমদের মতে, পাগল ব্যক্তির তালাক কার্যকর না হলেও মাতাল ব্যক্তির তালাক কার্যকর হবে।

তদের এ মতের প্রধান ভিত্তি হলো, ইসলামে যেকোনো কাজ, যা পাপের মাধ্যমে সংঘটিত হয়, তা তার ফল বহন করে। মাতাল হওয়া ইসলামে হারাম এবং একটি গুরুতর পাপ। যখন কোনো ব্যক্তি জেনে-বুঝে এই হারাম কাজটি করে, তখন তার পরবর্তী কর্মকাণ্ডের দায়ভার তাকেই বহন করতে হয়। এই মতের সমর্থনে সরাসরি কোরআন বা হাদিসের কোনো নির্দিষ্ট আয়াত বা হাদিস নেই। তবে, ফিকাহবিদরা কিছু সাধারণ মূলনীতি (উসুল) থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তাদের দুক্তি হলো-

ক. মাতাল অবস্থায় একজন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার জ্ঞান ও চেতনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। যেহেতু এই অবস্থাটি সে নিজেই তৈরি করেছে, তাই এর ফলস্বরূপ তার দ্বারা উচ্চারিত তালাকের দায়িত্বও তারই। যদি এই তালাককে বাতিল বলে ধরা হয়, তাহলে একজন ব্যক্তি তালাক থেকে বাঁচার জন্য ইচ্ছে করে মাতাল হওয়ার অজুহাত দিতে পারে, যা শরিয়তের বিধানকে দুর্বল করে দেবে।

খ. হানাফি মাজহাবের ফিকাহবিদগণ আরও মনে করেন যে, যদি মাতাল অবস্থায় তালাক কার্যকর না হয়, তবে এটি অপরাধীদের জন্য একটি সুবিধা হয়ে দাঁড়াবে, যা শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এই কারণে, তারা মাতাল ব্যক্তির তালাককে কার্যকর বলে রায় দেন।

২. জবরদস্তি তালাক (ভয়-ভীতি বা বল প্রয়োগ)

জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ করে নেওয়া তালাক অধিকাংশ আলেমের মতে বাতিল, কারণ ইসলামে কোনো কাজ জোর করে করার অনুমতি নেই। বিবাহের মতো তালাকের জন্যও স্বামীর স্বাধীন ইচ্ছা থাকতে হবে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ۟ۙ قَدۡ تَّبَیَّنَ الرُّشۡدُ مِنَ الۡغَیِّ ۚ

দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। সূরাবাক্বারা : ২৫৬

এই আয়াতটি থেকে বোঝা যায়, কোনো ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لَا طَلَاقَ وَلَا عَتَاقَ فِي إِغْلَاقٍ

জোরপূর্বক আদায়কৃত তালাক ও দাসমুক্তি কার্যকর হবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৬

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ্ আমার উম্মাতকে ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বক কৃত কাজের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৫

এই দুটি সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে জমহুর আলেমগণ মনে করেন যে, জবরদস্তিমূলকভাবে দেওয়া তালাক কার্যকর হবে না।

আবূ যার আল-গিফারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ আমার উম্মাতের ভুল , বিস্মৃতি ও বলপূর্বক যা করিয়ে নেয়া হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৩, মিশকাত : ৬২৮৪, ইরওয়া : ৮২

হানাফি মাজহাবে ভিন্নমত :

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, জবরদস্তি বা বল প্রয়োগ করে নেওয়া তালাক কার্যকর হবে। এই মতবাদের মূল ভিত্তি হলো কয়েকটি হাদিস ও ফিকাহ শাস্ত্রের ব্যাখ্যা, যা তালাকের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে ঠাট্টা বা অনিচ্ছাকৃত বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না।

হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের প্রধান দলিল হলো একটি হাদিস। হাদিসটি হলো-

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلاَقُ وَالرَّجْعَةُ

তিনটি বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে বললেও এবং ঠাট্টাচ্ছলে বললেও যথার্থ বলে বিবেচিত হবেঃ বিয়ে, তালাক ও রাজআত (তালাক প্রত্যাহার)। সুননে তিরমিজি : ১১৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ :২০৩৯, বায়হাকী : ৩১৮, ইরওয়াহ : ১৮২৬, মিশকাত : ৩২৮৪

এই হাদিসটি থেকে হানাফি ফকিহগণ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুধুমাত্র মৌখিক উচ্চারণই যথেষ্ট। এখানে ব্যক্তির উদ্দেশ্য বা ভেতরের ইচ্ছার চেয়ে তার বাহ্যিক উচ্চারণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাই, যদি একজন ব্যক্তি রাগের বশে বা জোরপূর্বকও তালাক উচ্চারণ করে, তবে তা কার্যকর বলে গণ্য হবে।

হানাফি মাজহাবের এই মতের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুটি যুক্তি রয়েছে। যেমন-

ক. ভ্রান্তি নিরসন :

যদি জোরপূর্বক তালাক দেওয়াকে বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়, তাহলে অনেক স্বামী-ই পরবর্তীতে দাবি করতে পারেন যে, তিনি চাপে পড়ে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তালাক দিয়েছেন। এতে তালাকের বিধানটি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং নারীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

খ. তালাকের মর্যাদা :

হানাফি ফকিহগণ মনে করেন যে, তালাক একটি খেলা বা ঠাট্টার বিষয় নয়। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ঠাট্টা বা জোর করেও উচ্চারণ করলে তা বাস্তব রূপ ধারণ করে।

হানাফি মাজহাব জবরদস্তি তালাককে কার্যকর বলে গণ্য করে কারণ, তারা বাহ্যিক উচ্চারণের ওপর গুরুত্ব দেয় এবং মনে করে যে, তালাকের মতো বিষয়কে তুচ্ছ বা ঠাট্টার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়

২. ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক

ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তের দুটি ভিন্ন মত রয়েছে। একদল আলেম মনে করেন, যখন কোনো ব্যক্তি চরম রাগের কারণে তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং কী বলছে তা বুঝতে পারে না, তখন তার তালাক কার্যকর হবে না। এর কারণ হলো, তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সুস্থ মস্তিষ্কের থাকা আবশ্যক।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا طَلَاقَ، وَلَا عَتَاقَ فِي غِلَاقٍ، قَالَ أَبُو دَاوُدَ: الْغِلَاقُ: أَظُنُّهُ فِي الْغَضَبِ

রাগের অবস্থায় কোনো তালাক হয় না এবং দাসত্বমুক্ত করা যায় না। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, আমার মতে ’আল-গিলাক’ অর্থ রাগ। সুনানে আবু দাউদ : ২১৯৩, আহমাদ : ২৫৮২৮, ইরওয়াহ : ২০৪৭,

এই হাদিসটি অনুযায়ী, যখন একজন ব্যক্তি তার স্বাভাবিক বোধশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন তার দ্বারা উচ্চারিত কোনো তালাক কার্যকর হয় না। তবে, যদি রাগ স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকে এবং ব্যক্তি তার কথার অর্থ বুঝতে পারে, তবে তালাক কার্যকর হবে।

হানাফি মাজহাবে ফতোয়া :

হানাফি মাজহাবের আলেমদের মতে ক্রোধান্ধ অবস্থায় তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে। এই মতের মূল ভিত্তি হলো ইজতিহাদ ও কিছু হাদিসের ভিন্ন ব্যাখ্যা।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلاَقُ وَالرَّجْعَةُ

তিনটি কাজ এমন যা বাস্তবে বা ঠাট্টাচ্ছলে করলেও তা বাস্তবিকই ধর্তব্য। তা হলো- বিবাহ, তালাক ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনা। সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৯৪, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৩৯, মিশকাত : ৩২৮৪, ইরওয়া : ১৮২৬, সহীহ আল জামি : ৩০২৭

এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে হানাফি ফকিহগণ যুক্তি দেন যে, তালাকের মতো একটি গুরুতর বিষয়ে ব্যক্তির ভেতরের উদ্দেশ্য বা অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না, বরং তার বাহ্যিক উচ্চারণই যথেষ্ট। যদি ঠাট্টা করে বলা তালাক কার্যকর হয়, তবে রাগের মাথায় দেওয়া তালাকও কার্যকর হবে।

ক্রোধান্ধ অবস্থার প্রকারভেদ : হানাফি মাজহাবে ক্রোধান্ধ অবস্থাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দেখা হয়। যেমন-

১.  ক্রোধের প্রথম পর্যায়:

যখন ক্রোধ স্বাভাবিক থাকে এবং ব্যক্তি কী বলছে তা বুঝতে পারে। এই অবস্থায় তালাক দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে কার্যকর হবে।

২.  ক্রোধের মধ্যম পর্যায়:

যখন ক্রোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ব্যক্তি তার কথার অর্থ বুঝতে পারে, কিন্তু তার মানসিক নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে যায়। এই অবস্থায়ও তালাক কার্যকর হয়।

৩.  ক্রোধের চরম পর্যায়:

যখন রাগ এতটাই প্রবল হয় যে, ব্যক্তি তার জ্ঞান ও চেতনা হারিয়ে ফেলে এবং কী বলছে বা করছে তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসতর্ক থাকে। এই ধরনের তালাক কার্যকর হবে না। তবে, হানাফি মাজহাবের অধিকাংশ ফকিহ মনে করেন, এই চরম পর্যায়টি খুব কমই ঘটে। সাধারণত মানুষ রাগের সময়েও তার কথার অর্থ বুঝতে পারে। 

এ সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন : আমি একটি ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন করতে চাই। সেটা হচ্ছে– এক মুসলিম ভাই তার স্ত্রীকে বলেছেন যে, তিনি তাকে তিন তালাক দিয়েছেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরে তিনি মত পরিবর্তন করে বলেন যে, তিনি সেটা রাগের মাথায় বলেছেন। ইয়া শাইখ, আমার প্রশ্ন হচ্ছে– এই ভাই কি তার স্ত্রীকে ফেরত নেয়ার অধিকার আছে? আমি শরিয়তের দলিল সমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত চাই। উল্লেখ্য, আমরা এ মাসয়ালায় একাধিক দৃষ্টিভঙ্গির মতামত শুনেছি; কিন্তু কোন দলিল-প্রমাণ ছাড়া।

উত্তর : সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূলের প্রতি। পর সমাচার:

রাগের তিনটি অবস্থা হতে পারে:

প্রথম অবস্থা:

এত তীব্র রাগ উঠা যে, ব্যক্তি তার অনুভুতি হারিয়ে ফেলা। পাগল বা উন্মাদের মত হয়ে যাওয়া। সকল আলেমের মতে, এ লোকের তালাক কার্যকর হবে না। কেননা সে বিবেকহীন পাগল বা উন্মাদের পর্যায়ভুক্ত।

দ্বিতীয় অবস্থা:

রাগ তীব্র আকার ধারণ করা। কিন্তু সে যা বলছে সেটা সে বুঝতেছে এবং বিবেক দিয়ে করতেছে। তবে তার তীব্র রাগ উঠেছে এবং দীর্ঘক্ষণ ঝগড়া, গালি-গালাজ বা মারামারির কারণে সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেনি। এগুলোর কারণেই তার রাগ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ লোকের তালাকের ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অগ্রগণ্য মতানুযায়ী, এ লোকের তালাকও কার্যকর হবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “ইগলাক এর অবস্থায় তালাক কিংবা দাস আযাদ নেই”। সুনানে ইবনে মাজাহ ; ২০৪৬, শাইখ আলবানী ‘ইরওয়াউল গালিল’ কিতাবে হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন] ইগলাক শব্দের অর্থে আলেমগণ বলেছেন: জবরদস্থি কিংবা কঠিন রাগ।

তৃতীয় অবস্থা:

হালকা রাগ। স্ত্রীর কোন কাজ অপছন্দ করা কিংবা মনোমালিন্য থেকে স্বামীর এই রাগের উদ্রেক হয়। কিন্তু এত তীব্র আকার ধারণ করে না যে, এতে বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে কিংবা নিজের ভাল-মন্দের বিবেচনা করতে পারে না। বরং এটি হালকা রাগ। আলেমগণের সর্বসম্মতিক্রমে এ রাগের অবস্থায় তালাক কার্যকর হবে।

রাগাম্বিত ব্যক্তির তালাকের মাসয়ালায় বিস্তারিত ব্যাখ্যামূলক এটাই সঠিক অভিমত। ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়্যেম এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ। আমাদের নবী মুহাম্মদ এর উপর আল্লাহ্‌র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। শাইখ বিন বায এর ‘ফাতাওয়াত তালাক’ পৃষ্ঠা: ১৫-২। ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাবের প্রশ্ন নম্বর : ২২০৩৪

সহবাসে পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক প্রদান

সহবাস বা নির্জনবাসের পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি মাসআলা। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামের বিধান অনুযায়ী, সহবাসের আগে তালাক দিলে সেই তালাকের কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে।

০১. সহবাসে পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিলে মহর অর্ধেক হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ طَلَّقۡتُمُوۡہُنَّ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَمَسُّوۡہُنَّ وَقَدۡ فَرَضۡتُمۡ لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً فَنِصۡفُ مَا فَرَضۡتُمۡ اِلَّاۤ اَنۡ یَّعۡفُوۡنَ اَوۡ یَعۡفُوَا الَّذِیۡ بِیَدِہٖ عُقۡدَۃُ النِّکَاحِ ؕ وَاَنۡ تَعۡفُوۡۤا اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی ؕ وَلَا تَنۡسَوُا الۡفَضۡلَ بَیۡنَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

আর যদি তোমরা তাদেরকে তালাক দাও, তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে এবং তাদের জন্য কিছু মোহর নির্ধারণ করে থাক, তাহলে যা নির্ধারণ করেছ, তার অর্ধেক (দিয়ে দাও)। তবে স্ত্রীরা যদি মাফ করে দেয়, কিংবা যার হাতে বিবাহের বন্ধন সে যদি মাফ করে দেয়। আর তোমাদের মাফ করে দেয়া তাকওয়ার অধিক নিকটতর। আর তোমরা পরস্পরের মধ্যে অনুগ্রহ ভুলে যেয়ো না। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা। সুরা বাকারা : ২৩৭

অর্থাৎ, সহবাস বা বৈধ নির্জনবাসের আগে তালাক দিলে অর্ধেক মহর দিতে হবে।

২. মহর নির্ধারণই না করে সহবাসের আগে তালাক

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡہُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ۚۖ وَّمَتِّعُوۡہُنَّ ۚ عَلَی الۡمُوۡسِعِ قَدَرُہٗ وَعَلَی الۡمُقۡتِرِ قَدَرُہٗ ۚ مَتَاعًۢا بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ

তোমাদের কোন অপরাধ নেই যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এমন অবস্থায় যে, তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করনি কিংবা তাদের জন্য কোন মোহর নির্ধারণ করনি। আর উত্তমভাবে তাদেরকে ভোগ-উপকরণ দিয়ে দাও, ধনীর উপর তার সাধ্যানুসারে এবং সংকটাপন্নের উপর তার সাধ্যানুসারে। সুকর্মশীলদের উপর এটি আবশ্যক। সুরা বাকারাহ : ২৩৬

এ ক্ষেত্রে কোনো মহর দিতে হবে না। তবে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু উপহার/মাল দিতে হবে যাকে কুরআনে মাতাআন বিল-মা‘রূফ বা উত্তম পন্থায় উপকরণ, ভোগ্য বস্তু, উপহার প্রদান করা।

৩. সহবাসে পূর্বেই স্ত্রীকে তালাক দিলে কোন ইদ্দত নাই

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا نَکَحۡتُمُ الۡمُؤۡمِنٰتِ ثُمَّ طَلَّقۡتُمُوۡہُنَّ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ تَمَسُّوۡہُنَّ فَمَا لَکُمۡ عَلَیۡہِنَّ مِنۡ عِدَّۃٍ تَعۡتَدُّوۡنَہَا ۚ فَمَتِّعُوۡہُنَّ وَسَرِّحُوۡہُنَّ سَرَاحًا جَمِیۡلًا

হে মুমিনগণ, যখন তোমরা মুমিন নারীদেরকে বিবাহ করবে অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই* তালাক দিয়ে দেবে তবে তোমাদের জন্য তাদের কোন ইদ্দত নেই যা তোমরা গণনা করবে। সুতরাং তাদেরকে কিছু উপহার সামগ্রী প্রদান কর এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে বিদায় দাও। সুরা আহযাব : ৪৯

অর্থাৎ, সহবাস বা বৈধ নির্জনবাস হওয়ার আগে তালাক দিলে স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে না।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে তালাক দিল এবং সহবাস করার আগেই তাকে পৃথক করে দিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘তাদের মধ্যে কোন ইদ্দত নেই, কেবল তাকে কিছু দিয়ে বিদায় করে দাও।’ সুনানে আবূ দাউদ : ২২১৮

এ তালাকের কিছু বিধান :

উল্লিখিত কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে ইসলামিক ফিকহবিদগণ একমত হয়েছেন যে, সহবাস বা নির্জনবাসের আগে স্ত্রীকে তালাক দিলে তা এক তালাক-এ-বায়িন হিসেবে গণ্য হবে। তালাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে যায়। যেহেতু এটি এক তালাক-এ-বাইন, তাই স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে না।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রুকানা ইবনু ইয়াযিদ (রাঃ) তার স্ত্রীকে এক তালাক দেন, যখন তিনি তার সঙ্গে সহবাস করেননি। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বলেন, ‘তুমি তাকে ফিরিয়ে নাও, যদি তুমি চাও।’ সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৬২

যদি তারা আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়, তাহলে নতুন করে মোহর ও শর্ত সাপেক্ষে বিবাহ করতে হবে। এর জন্য স্ত্রীর অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করা এবং তার সাথে সহবাস করার কোনো প্রয়োজন নেই।

নোট : সহবাস না হলেও, বৈধ নির্জনবাস অবস্থান করে তালে স্ত্রী পূর্ণ মহরের অধিকারী হবে। তালাক দিলে ইদ্দত পালন করতে হবে। কারণ নির্জনবাসের মাধ্যমে সহবাসের সম্ভাবনা নিশ্চিত হয়ে যায়।

মাসিক হয়নি কিংবা মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে এমন স্ত্রীকে তালাক প্রদান

মাসিক হয়নি বা মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে এমন স্ত্রীকে তালাক দেওয়া সংক্রান্ত ইসলামি বিধান কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দ্বারা নির্ধারিত। এই বিধানটি মূলত তালাকের সময় নির্ধারণ এবং ইদ্দত গণনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

وَالّٰٓیِٴۡ یَئِسۡنَ مِنَ الۡمَحِیۡضِ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ اِنِ ارۡتَبۡتُمۡ فَعِدَّتُہُنَّ ثَلٰثَۃُ اَشۡہُرٍ ۙ وَّالّٰٓیِٴۡ لَمۡ یَحِضۡنَ

তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস।

এই আয়াত থেকে দুটি প্রধান বিধান পাওয়া যায়:

১. মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে: যেসব নারীর বয়স বেশি হওয়ার কারণে মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, তাদের ইদ্দতকাল হলো তিন মাস। এই তিন মাস চন্দ্র মাস হিসাবে গণনা করা হবে।

২. মাসিক হয়নি: যেসব নারীর বয়স কম হওয়ার কারণে এখনো মাসিক শুরু হয়নি, তাদেরও ইদ্দতকাল হলো তিন মাস।

এ তালাকের শরীয়তি বিধান

একজন স্বামী যদি তার এমন স্ত্রীকে তালাক দেয়, যার মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে, তবে তার ইদ্দত হবে তিন চন্দ্র মাস। এই তিন মাস পর তালাক কার্যকর হবে এবং স্ত্রী পুনর্বিবাহের জন্য যোগ্য হবে। যেসব কিশোরীর এখনও মাসিক শুরু হয়নি, তাদেরও তালাকের ইদ্দতকাল তিন মাস।

তালাক দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি:

মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা মাসিক শুরু না হওয়া স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। যেহেতু তাদের ক্ষেত্রে মাসিকের চক্র নেই, তাই যে কোনো সময় তালাক দেওয়া যেতে পারে। তবে, উত্তম হলো একবারে একটি তালাক দেওয়া এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। এই এক তালাক রজ’ঈ তালাক (ফেরতযোগ্য তালাক) হিসেবে গণ্য হবে। যদি স্বামী ইদ্দতের মধ্যে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তাদের সম্পর্ক বহাল থাকবে। ইদ্দত শেষ হলে যদি ফিরিয়ে না নেয়, তাহলে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে, তবে নতুন করে বিবাহের মাধ্যমে আবার একসাথে থাকার সুযোগ থাকবে।

এই বিধানগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো, তালাকের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বিধানের মাধ্যমে মানব জীবনের সব দিক বিবেচনা করেছেন, যাতে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত থাকে।

গর্ভবতী স্ত্রীর তালাক:

ইসলামে তালাক একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও শর্ত রয়েছে, যা কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

১. গর্ভবতী স্ত্রীর তালাকের বিধান:

ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, একজন পুরুষ তার গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে। এটি বৈধ এবং শরীয়তসম্মত। তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সময়ের কোনো বাধা নেই।

যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) থেকে বর্ণিত। উম্মু কুলসুম বিনতে উকবা (রাঃ) ছিলেন তার স্ত্রী। তিনি তার গর্ভাবস্থায় যুবাইর (রাঃ)-কে বলেন, আমাকে এক তালাক দিয়ে সন্তুষ্ট করুন। তিনি তাকে এক তালাক দিলেন, অতঃপর সালাত পড়তে চলে গেলেন। তিনি ফিরে এসে দেখেন যে, তার স্ত্রী একটি সন্তান প্রসব করেছে। যুবাইর (রাঃ) বললেন, সে কেন আমাকে প্রতারিত করলো! আল্লাহ্ যেন তাকেও প্রতারিত করেন। এরপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেন : আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত তার ইদ্দাত পূর্ণ হয়ে গেছে। তাকে বিবাহের প্রস্তাব দাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৬,  ইরওয়াহ : ২১১৭

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিতঅ তিনি তার স্ত্রীকে হায়য অবস্থায় তালাক দিয়েছিলেন। উমার (রাঃ) বিষয়টি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট উত্থাপন করলে তিনি বলেনঃ তাকে বলো, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়, এরপর সে চাইলে তাকে তুহর অথবা গর্ভবতী অবস্থায় তালাক দেয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৩, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৮৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১,

এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়:

ক. ইদ্দত (অপেক্ষাকাল) গণনা :

একজন গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর তার ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। অর্থাৎ, যখনই সে সন্তান প্রসব করবে, তখনই তার ইদ্দতকাল শেষ হয়ে যাবে। এটি আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

 ؕ وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

 আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সূরা তালাক : ৪

এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, গর্ভবতী মহিলার তালাকের পর ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। সন্তান প্রসবের পরই সে ইদ্দত থেকে মুক্ত হবে এবং চাইলে অন্য কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।

আবূস সানাবিল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আসলাম গোত্রের হারিসের কন্যা সুবাইআ তার স্বামীর মৃত্যুর বিশাধিক দিন পর একটি সন্তান প্রসব করেন। তিনি নিফাস (সন্তান প্রসবজনিত ঋতু) হওয়ার পর নতুন পরিচ্ছদ পরতে লাগলেন (অর্থাৎ সাজগোজ করতে লাগলেন)। এতে তার প্রতি দোষারোপ হতে থাকলে বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে অবহিত হয়। তিনি বলেনঃ সে তা করতে পারে, কারণ তার ইদ্দাতকাল পূর্ণ হয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৭, ২০২৮, ২০২৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৩, আহমাদ : ১৮২৩৮, ১৮২৩৯, দারেমী : ২২৮১

খ. গর্ভবতী স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ :

তালাকের পর ওই সন্তানের ভরণপোষণ এবং লালন-পালনের দায়িত্ব পিতাকেই নিতে হবে। যদি স্ত্রী অন্য কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয় এবং শিশুটির পরিচর্যা করে, তাহলে ভরণপোষণের দায়িত্বও পিতার উপরই থাকবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ  وَاِنۡ کُنَّ اُولَاتِ حَمۡلٍ فَاَنۡفِقُوۡا عَلَیۡہِنَّ حَتّٰی یَضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ۚ  فَاِنۡ اَرۡضَعۡنَ لَکُمۡ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ ۚ  وَاۡتَمِرُوۡا بَیۡنَکُمۡ بِمَعۡرُوۡفٍ ۚ  وَاِنۡ تَعَاسَرۡتُمۡ فَسَتُرۡضِعُ لَہٗۤ اُخۡرٰی ؕ

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর; আর তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করালে তাদের পাওনা তাদেরকে দিয়ে দাও এবং (সন্তানের কল্যাণের জন্য) সংগতভাবে তোমাদের মাঝে পরস্পর পরামর্শ কর। আর যদি তোমরা পরস্পর কঠোর হও তবে পিতার পক্ষে অন্য কোন নারী দুধপান করাবে। সুরা তালাক : ০৬

৩. ইসলামে তালাকের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম:

ইসলামে তালাক একটি ঘৃণিত কাজ হলেও প্রয়োজনের সময় এর অনুমতি রয়েছে। তবে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়:

স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে তালাকের প্রক্রিয়া শুরু করা। এক তালাক দেওয়ার পর যদি স্বামী-স্ত্রী আবার একত্রে থাকতে চান, তাহলে ইদ্দতকালীন সময়ে তারা আবার একত্রে থাকতে পারবেন। এক্ষেত্রে নতুন করে বিবাহ করার প্রয়োজন নেই। তালাক দেওয়ার পর ইদ্দতকাল হলো তিন মাসিকের সমপরিমাণ সময় (যদি স্ত্রী গর্ভবতী না হয়)। গর্ভবতীর ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত। ইদ্দতকালীন সময়ে স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া উচিত নয়, বরং তাকে স্বামীর ঘরেই থাকতে দেওয়া উচিত।

গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয। তবে, একজন মুসলিমের জন্য তালাক একটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ।

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ মহান আল্লাহর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল হচ্ছে তালাক। সুনানে আবু দাউদ : ২১৭৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০১৮, ইরওয়া : ২০৪০, মিশকাত : ৩২৮০

স্ত্রী গর্ভবতী হ’লেও তাকে তালাক দেয়া বৈধ। তাকেও সুন্নাত মোতাবেক এক তালাক দিতে হবে। গর্ভবতী মহিলার ইদ্দত সন্তান প্রসবকাল পর্যন্ত। প্রসবের সাথে সাথেই তার ইদ্দত শেষ হয়ে যাবে। এবার সে নতুন করে অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে। আর নিয়ম মাফিক এক কিংবা দুই তালাক দেওয়া থাকলে প্রথম স্বামীকেও বিয়ে করতে পারবে।

ঋতুবতী স্ত্রীর তালাক :

ইসলামে ঋতুবতী স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হারাম এবং শরীয়তসম্মত নয়। এ ধরনের তালাক শরীয়তের বিধান অনুসারে ‘তালাক-ই-বিদআত’ হিসেবে গণ্য হয়। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো, তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নারীকে তার স্বাভাবিক ও পবিত্র অবস্থায় থাকা নিশ্চিত করা, যাতে আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়।

আল্লাত তায়াল বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ

হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ‘ইদ্দত হিসাব করে রাখবে এবং তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় কর। সুরা তালাক : ০১

এই আয়াত অনুসারে, তালাক এমন সময়ে দিতে হবে যখন ইদ্দত গণনা সম্ভব হয়। মাসিকের সময় যেহেতু ইদ্দত গণনা শুরু করা যায় না, তাই এ সময় তালাক দেওয়া অনুচিত।

নাফি (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু ’উমার (রাঃ) তাঁর স্ত্রীকে ঋতুমতী অবস্থায় এক তালাক দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন, তিনি যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন এবং মহিলা পবিত্র হয়ে আবার ঋতুমতী হয়ে পরবর্তী পবিত্রা অবস্থা আসা পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখেন। পবিত্র অবস্থায় যদি তাকে তালাক দিতে চায় তবে সঙ্গমের পূর্বে তালাক দিতে হবে। এটাই ইদ্দাত, যে সময় স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়ার জন্য আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন। ’আবদুল্লাহকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তাদের বলেনঃ তুমি যদি তাকে তিন তালাক দিয়ে দাও, তবে স্ত্রীলোকটি অন্য স্বামী গ্রহণ না করা পর্যন্ত তোমার জন্য হারাম হয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় ইবন ’উমার (রাঃ) বলতেন, ’তুমি যদি এক বা দু’ তালাক দিতে’, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এরকমই নির্দেশ দিয়েছেন।

সহিহ বুখারি : ৫৩৩২, ৬০৩৩, ৭১৬০, সহহি মুসলিম : ১৪৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৭৫, ১১৭৬, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৭৯, ২১৮১, ২১৮২, ২১৮৪, ২১৮৫

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, ঋতু অবস্থায় তালাক দেওয়া ইসলামের বিধানের পরিপন্থী। নবী (সা.) এর নির্দেশে ইবনে ওমর (রা.) তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন এবং পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন।

ঋতু অবস্থায় তালাকের বিধান:

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ঋতু অবস্থায় বা নেফাস অবস্থায় তালাক দেওয়াকে বিদআতি তালাক বলা হয।  যদিও বেশিরভাগ ইমামের মতে এ ধরনের তালাক কার্যকর হয়ে যায়, তবে এটি একটি গুনাহের কাজ এবং সুন্নাহর পরিপন্থী। যদি কেউ ভুল করে ঋতু অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দিয়ে ফেলে, তাহলে তার জন্য সুন্নাহ হলো স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া এবং পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। স্ত্রী পবিত্র হলে, যদি তালাক দেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে সহবাসের পূর্বে তাকে তালাক দেওয়া যাবে।

সঠিক পদ্ধতিতে তালাক দেওয়ার নিয়ম:

ঋতু অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেওয়া হারাম এবং গুনাহের কাজ। এটি শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং আবেগের বশে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত। ইসলামে তালাকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়কে সঠিক নিয়ম মেনে সম্পন্ন করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মুসলমানদের উচিত, এই বিধানগুলো অনুসরণ করা এবং যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমেই তালাকের মতো চূড়ান্ত পদক্ষেপ না নিয়ে বরং ধৈর্য, সমঝোতা এবং পারস্পরিক সম্মানের সাথে সমাধানের চেষ্টা করা।

তালাক প্রদানের সময় সাক্ষী বাখার বিধান

ইসলামি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য সাক্ষী রাখা আবশ্যক নয়। অর্থাৎ, সাক্ষী না থাকলেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়। তবে, কিছু পরিস্থিতিতে সাক্ষী রাখা সুন্নাহ। যদি ভবিষ্যতে তালাক কার্যকর হয়েছে কিনা, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে সাক্ষী থাকলে তা প্রমাণ করা সহজ হয়।

সাক্ষী উপস্থিত থাকলে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে তালাকের শর্তাবলী বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে সুবিধা হয়। সাক্ষী থাকলে তালাকের পর স্বামী বা স্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো মিথ্যা অভিযোগ আসার সম্ভাবনা কমে যায়।

আল্লাত তায়ালা বলেন-

فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ فَارِقُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ 

অতঃপর যখন তারা তাদের ইদ্দতের শেষ সীমায় পৌঁছবে, তখন তোমরা তাদের ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় রেখে দেবে অথবা ন্যায়ানুগ প‎ন্থায় তাদের পরিত্যাগ করবে এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সুরা তালাক : ২

এ আয়াতে তালাকের ক্ষেত্রে সাক্ষী রাখার কথা বলা হয়েছে। অধিকাংশ ইসলামিক স্কলার এই আয়াতকে বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে না দেখে বরং একটি উত্তম পরামর্শ হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছেন। তালাকের ইসলামী শরীয়তে তালাকের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার একটি বৈধ পন্থা। এই সম্পর্কটি মূলত পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, যেখানে সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক নয়।

ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তাকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো যে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর তার সাথে সহবাস করেছে, কিন্তু তাকে তালাক দেয়া এবং ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে কোন সাক্ষী রাখেনি। ইমরান (রাঃ) বলেন, তুমি সুন্নাত নিয়মের বহির্ভূত তালাক দিয়েছো এবং সুন্নাত নিয়ম বহির্ভূতভাবে ফিরিয়ে নিয়েছো। তুমি তাকে তালাক দেয়া ও ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে সাক্ষী রাখো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০২৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৮৬, ইরওয়াহ : ২০৭৮

ফকীহ বা ইসলামী আইনবিদগণের মধ্যে এই বিষয়ে প্রায় ঐক্যমত্য (ইজমা) রয়েছে যে, স্বামী যদি নির্জনে বা সাক্ষী ছাড়াই তালাক দেন, তাহলেও তা কার্যকর হবে। স্ত্রীকে তালাকের কথা জানানো বা তার উপস্থিত থাকাটাও তালাকের জন্য শর্ত নয় বরং বড় জোল সুন্নাহ। অনেকে ঐচ্ছিক বা মুস্তাহাব বলেছেন।

সাক্ষী রাখা উত্তম :

তালাকের পর যদি কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যেমন ইদ্দত পালন, মোহরানা, অথবা পুনরায় বিয়ে করার ক্ষেত্রে, তখন সাক্ষী থাকলে তা প্রমাণ করা সহজ হয়। এজন্য সাক্ষী রাখা মুস্তাহাব (উত্তম) বা পরামর্শ হিসেবে গণ্য হয়, যা উভয় পক্ষকে অহেতুক অভিযোগ এবং জটিলতা থেকে রক্ষা করে।

আয়াতে শুধু সাক্ষী রাখার কথা বলা হয়নি, বরং ‘আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে’—এই বাক্যটিও যুক্ত করা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যায়, সাক্ষ্য মূলত কোনো বিবাদ বা প্রয়োজনে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাখা হয়। সুতরাং, তালাকের জন্য সাক্ষী রাখা আবশ্যকীয় শর্ত না হলেও, ইসলামের সৌন্দর্য ও নৈতিকতার দিক থেকে এটি একটি পরামর্শ এবং উত্তম পদ্ধতি।

মুখে কিছু না বলে শুধু মনে মনে তালাক দিলে তালাক কার্যকর হবে না

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ اللهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا وَسْوَسَتْ بِهِ صُدُورُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَكَلَّمْ

নিশ্চয় আল্লাহ্ আমার উম্মাতের মনের মন্দ কল্পনা, যতক্ষণ না সে তা কার্যকর করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে এবং তার উপর বলপ্রয়োগে কৃত কর্ম উপেক্ষা করেছেন। সহিহ বুখারি : ২৫২৮, ৬৬৬৪, ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম :  ১২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৪,

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ আমার উম্মাতের মনে মনে বলা কথা উপেক্ষা (ক্ষমা) করেছেন, যাবত না সে তদনুযায়ী কাজ করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে। সুনান ইবনে মাজাহ : ২০৪০, সুনানে তিরমিযী : ১১৮৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৩৩, ৩৪৩৪, ৩৪৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২২০৯, আহমাদ : ৮৮৬৪, ৯২১৪, ৯৭৮৬, ৯৮৭৮, ৯৯৯০,

এই হাদীসের আলোকে, মনের মধ্যে কোনো কিছু চিন্তা করা, এমনকি তা যদি তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মুখে উচ্চারণ করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তা কার্যকর হয় না। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি হলো, কোনো কাজ বা সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হওয়ার জন্য তার বাহ্যিক প্রকাশ (যেমন মুখে বলা বা কাজ করা) জরুরি।

তালাক ও এর শর্ত

ইসলামী আইন অনুযায়ী, তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে:

১. স্পষ্ট ঘোষণা বা মুখে বলা :

তালাক অবশ্যই স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করতে হবে। শুধু মনে মনে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

২. কাজের মাধ্যমে ইঙ্গিত :

অনেক ক্ষেত্রে, যদি কোনো ব্যক্তি স্পষ্ট করে মুখে তালাক না দেন, কিন্তু এমন কোনো কাজ করেন যা তালাকের ইঙ্গিত দেয় (যেমন তালাকনামা লেখা), তাহলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে, শুধু মনে মনে চিন্তা করলে তা এই শর্তের আওতায় আসে না।

৩. সাক্ষীর উপস্থিতি :

যদিও সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক নয়, তবে যদি কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়, সেক্ষেত্রে সাক্ষী থাকলে তা প্রমাণ করা সহজ হয়।

উপরোক্ত হাদীস এবং ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুসারে, শুধু মনে মনে তালাকের চিন্তা করলে বা ইচ্ছা পোষণ করলে তালাক হবে না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তা মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক।

বিবাহের পূর্বে কোন তালাক নেই

আমর ইবনু শু’আইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তালাক দেয়ার অধিকার জন্মানোর আগে প্রদত্ত তালাক কার্যকর হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৭, সুনানে তিরমিযী : ১১৮১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৯০, ইরওয়াহ : ১৭৫১, ২০৬৯

মিসওয়ার বিন মাখ্‌মারাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিন বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, বিবাহের আগে তালাক নাই এবং মালিকানা লাভের আগে দাসমুক্তি নাই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৮, বায়হাকী : ৭/৩১৪, সহীহ ইরওয়াহ : ৭/১৫২

আলী বিন আবূ তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, বিবাহের পূর্বে তালাক নাই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৪৯,

ইসলামে তালাক হলো একটি আনুষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়া, যা শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই হাদীসটি এই ধারণাকেই দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এর অর্থ হলো, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারীকে বিবাহের আগে তালাক দেওয়ার কথা বলেন, অথবা কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে তালাক দেন, তাহলে সেই তালাক কার্যকর হবে না। কারণ, তালাক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার জন্য দেওয়া হয়, এবং সম্পর্ক না থাকলে তা বিচ্ছিন্ন করার প্রশ্নই ওঠে না।

এই হাদীসের একটি ব্যবহারিক উদাহরণ হলো, যদি কেউ কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার সময় বলেন, “যদি তুমি আমাকে বিয়ে করো, তাহলে তোমাকে তালাক দিলাম,” তবে এই ধরনের কথা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

ইমাম তিরমিযী (রহ.) এর মন্তব্য: সুনানে তিরমিযীতে ইমাম তিরমিযী (রহ.) এই হাদীসের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে, অধিকাংশ আলেম এই হাদীসের উপর আমল করেন। তারা মনে করেন, “তালাক তখনই কার্যকর হবে, যখন তা বিয়ের পর দেওয়া হবে।”

ইমাম শাফেঈ (রহ.) এর মত: ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন, “তালাকের মালিকানা বিবাহের মাধ্যমে অর্জিত হয়, তাই বিবাহের আগে তালাক কার্যকর হয় না।”

এই সমস্ত দলীল এই বিষয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের ঐক্যমত্যকে প্রমাণ করে। এটি একটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত নীতি। কারণ, তালাক হলো বিবাহিত জীবনের একটি অংশ, যা শুধুমাত্র বিবাহ বন্ধন বিদ্যমান থাকলেই প্রাসঙ্গিক হয়।

যিহারের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আরবি ‘যিহার’ (ظِهار) শব্দটি এসেছে ‘যাহর’ (ظَهْر) থেকে, যার অর্থ ‘পিঠ’। ইসলামী শরীয়াহতে এর অর্থ হলো, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে এমনভাবে তুলনা করে যা তাকে তার জন্য হারাম করে দেয়। যেমন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে বলে, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো”। এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মতো সম্মানের আসনে বসাতে চায়, কিন্তু একই সাথে তাদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ককে হারাম করে দেয়।

যিহারকারী ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত কাফফারা আদায় না করবে, ততক্ষণ তার জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস করা সম্পূর্ণ হারাম। যদি সে কাফফারা আদায়ের আগে সহবাস করে, তাহলে তাকে পুনরায় কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন (যেমন একসাথে থাকা, কথা বলা, ইত্যাদি) নিষিদ্ধ নয়, শুধু শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিষিদ্ধ।

ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার

ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার (ظِهار) প্রথাটি প্রচলিত ছিল। এটি ছিল তালাকের একটি রূপ, যা দিয়ে স্বামী তার স্ত্রীকে চিরতরে হারাম করে দিত। ওই সময়ে কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলত, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো,” তবে এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মর্যাদায় উন্নীত করত এবং এর ফলে স্ত্রী তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যেত। এর পরিণতি ছিল খুবই ভয়াবহ। স্ত্রীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে তালাকও পেত না, আবার স্ত্রী হিসেবেও বিবেচিত হতো না। ফলে তাদের জীবন এক কঠিন অনিশ্চয়তায় ডুবে যেত। তারা না পারত অন্য কোথাও বিয়ে করতে, না পারত স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করতে।

ইসলামের আগমনের পর এই প্রথাটি রহিত করা হয়। মহানবী (সা.)-এর সময়ে এক সাহাবি, আওস ইবনে সামিত তার স্ত্রী খাওলা বিনতে সালাবা-কে যিহার করেন। হাদিসে এসেছে-

’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেন, বরকতময় সেই সত্তা যাঁর শরবণশক্তি সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। আমি সালাবার কন্যা খাওলা (রাঃ)-এর কিছু কথা শুনলাম এবং কিছু কথা আমার অজ্ঞাত থেকে যায়। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে আমার যৌবন উপভোগ করেছে এবং আমি আমার পেট থেকে তাকে অনেক সন্তান উপহার দিয়েছি। অবশেষে আমি যখন বার্ধক্যে উপনীত হলাম এবং সন্তানদানে অক্ষম হলাম, তখন সে আমার সাথে যিহার করেছে। হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকটে আমার অভিযোগ পেশ করছি। অতঃপর বেশি সময়ে অতিবাহিত না হতেই জিবরীল (আঃ) এ আয়াতগুলো নিয়ে অবতরণ করলেন-

قَدْ سَمِعَ  اللّٰهُ  قَوْلَ  الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ  اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ  تَحَاوُرَکُمَا………..

’আল্লাহ্ অবশ্যই শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে নিজের স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকটও ফরিয়াদ করছে……’’। সূরা মুজাদালা : ১-৪। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬০ হাদিসের মান সহিহ

এ হাদিসে দেখা যায়, আওস ইবনে সামিত (রা.) যিকার করার কারনে খাওলা বিনতে খাওলা এতে হতাশ হয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এর প্রতিকার চেয়ে বিচার দেন। তার এই করুণ আর্তি আল্লাহ তা’আলা শোনেন। ফলস্বরূপ, আল্লাহ তায়ালা যিহার প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে পবিত্র কুরআনের সূরা মুজাদালাহ-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল করেন। কুরআনে নাজিল হলো-

قَدْ سَمِعَ  اللّٰهُ  قَوْلَ  الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ  اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ  تَحَاوُرَکُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ  سَمِیْعٌۢ بَصِیْرٌ ﴿۱﴾  اَلَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْکُمْ مِّنْ  نِّسَآئِهِمْ مَّا هُنَّ  اُمَّهٰتِهِمْ ؕ اِنْ  اُمَّهٰتُهُمْ  اِلَّا الِّٰٓیْٔ وَلَدْنَهُمْ ؕ وَ اِنَّهُمْ  لَیَقُوْلُوْنَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَ زُوْرًا ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَعَفُوٌّ غَفُوْرٌ ﴿۲﴾ وَ الَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْ نِّسَآئِهِمْ ثُمَّ یَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا فَتَحْرِیْرُ  رَقَبَۃٍ  مِّنْ قَبْلِ  اَنْ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمْ تُوْعَظُوْنَ بِہٖ ؕ وَ اللّٰهُ  بِمَا تَعْمَلُوْنَ  خَبِیْرٌ ﴿۳﴾  فَمَنْ  لَّمْ یَجِدْ فَصِیَامُ شَہْرَیْنِ مُتَتَابِعَیْنِ مِنْ قَبْلِ اَنْ یَّتَمَآسَّا ۚ فَمَنْ لَّمْ  یَسْتَطِعْ  فَاِطْعَامُ سِتِّیْنَ مِسْكِیْنًا ؕ ذٰلِكَ لِتُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِہٖ ؕ  وَ تِلْكَ حُدُوْدُ اللّٰهِ ؕ وَ لِلْکٰفِرِیْنَ  عَذَابٌ  اَلِیْمٌ ﴿۴﴾

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার* করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা মুজাদালা : ১-৪

এই আয়াতগুলোতে যিহারকে একটি গর্হিত কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে, আল্লাহ ইসলামপূর্ব যুগের এই কঠোর ও অন্যায় প্রথাকে সংশোধন করে স্ত্রীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করেন।

যিহারের বিধান করা একটি গর্হিত কাজ

প্রাচীন আরব সমাজে স্ত্রী সাথে যিহারের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হত। ইসলাম এসে এ বিধান বাতিল করে। তাই যিহারের মাধ্যামে সরাসরি বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তবে অসঙ্গত কথা বলার কারণে কাফ্ফারা দিতে হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি গর্হিত ও মিথ্যা কথা। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

اَلَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِہِمۡ مَّا ہُنَّ اُمَّہٰتِہِمۡ ؕ اِنۡ اُمَّہٰتُہُمۡ اِلَّا الّٰٓیِٴۡ وَلَدۡنَہُمۡ ؕ وَاِنَّہُمۡ لَیَقُوۡلُوۡنَ مُنۡکَرًا مِّنَ الۡقَوۡلِ وَزُوۡرًا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ لَعَفُوٌّ غَفُوۡرٌ

তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। সূরা মুজাদালা : ২

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, যিহার একটি মিথ্যা ও অন্যায় কাজ, যা আল্লাহ ঘৃণা করেন।

যিহারের কাফফারা বা  প্রায়শ্চিত্ত :

যদি কোনো ব্যক্তি যিহার করে ফেলে, তাহলে তার জন্য তার স্ত্রীর সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম হয়ে যায় যতক্ষণ না সে নির্দিষ্ট কাফফারা আদায় করে। আল্লাহ তা’আলা এই কাফফারাকে পর্যায়ক্রমে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। ইসলামি শরীয়তের আলোকে যিহারের কারনে যে কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয় তান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক. একজন দাস মুক্ত করা:

যিহারের কাফফারার প্রথম ধাপ হলো একজন দাস মুক্ত করা। এটি সবচেয়ে সহজ ও উত্তম পদ্ধতি। যদি কোনো ব্যক্তি একজন দাস মুক্ত করার সামর্থ্য রাখে, তবে তাকে এটাই করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ ثُمَّ یَعُوۡدُوۡنَ لِمَا قَالُوۡا فَتَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمۡ تُوۡعَظُوۡنَ بِہٖ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ

আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা মুজাদালা : ৩

এই আয়াত অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর পুনরায় মিলিত হওয়ার আগেই দাস মুক্ত করতে হবে। বর্তমানে দাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় যিহারের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) আদায়ের ক্ষেত্রে দাস মুক্ত করার বিধানটি এখন আর প্রযোজ্য নয়। এর কারণ, এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দাসদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করা এবং সামাজিক কুপ্রথা দূর করা। ইসলামের এ প্রসস্ত বিধানে কারনেই পৃথিবীতে বর্তমানে দাস প্রথা ও তার বিধান অকার্যকর হয়েছে।

ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুসারে, যদি কোনো বিধানের প্রথম ধাপটি পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, যা মানুষের জন্য বিধানকে সহজ ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।

খ. ষাট দিন একটানা রোজা রাখা:

যদি কোনো ব্যক্তি দাস মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে তাকে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে হবে। এই রোজা রাখতে কোনো প্রকার বিরতি দেওয়া যাবে না। যদি কোনো কারণে একটি রোজাও ছুটে যায়, তাহলে আবার প্রথম থেকে ষাট দিন রোজা শুরু করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ شَہۡرَیۡنِ مُتَتَابِعَیۡنِ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ۚ

কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। সূরা মুজাদালা, : ৪

এই বিধান অত্যন্ত কঠোর, কারণ এর মাধ্যমে ব্যক্তিকে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার এবং কষ্ট স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গ. ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানো:

যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতা, দুর্বলতা বা অন্য কোনো কারণে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য দান করতে হবে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

فَمَنۡ لَّمۡ یَسۡتَطِعۡ فَاِطۡعَامُ سِتِّیۡنَ مِسۡکِیۡنًا ؕ ذٰلِکَ لِتُؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ

 আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। সূরা মুজাদালা, : ৪

এই তিনটি ধাপের কাফফারা একটির পর আরেকটি অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ, যদি প্রথমটি সম্ভব না হয়, তবে দ্বিতীয়টি এবং দ্বিতীয়টি সম্ভব না হলে তৃতীয়টি। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানুষের সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখেছেন এবং বিধানকে সহজ করেছেন।

হাদিসে যিহারের কাফফারা

হাদিসে যিহারের কাফফারার ধারাবাহিকতা ও এর প্রয়োগকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। যেমন-

সালামা ইবনু সাখর আল-বায়াদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নারীদের প্রতি অধিক আসক্ত ছিলাম। অন্য পুরুষের তুলনায় আমি তাদের সাথে বেশি সহবাসে লিপ্ত হতাম। রমযান মাস শুরু হলে আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করলাম। রমযান মাস প্রায় শেষ হতে যাচ্ছে। একদা রাতের বেলা সে আমার সাথে কথাবার্তা বলছিল। তখন তার দেহের একটি অংশ আমার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেলো। আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং তার সাথে সহবাস করলাম। ভোর হলে আমি সকাল সকাল আমার সম্প্রদায়ের লোকেদের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদেরকে আমার ঘটনাটি জানালাম।

আমি তাদের বললাম, তোমরা আমার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করো। তারা বললো, আমরা তা করতে পারবো না। হয়ত বা আল্লাহ্ আমাদের সম্পর্কে কিতাব (কুরআনের আয়াত) নাযিল করবেন অথবা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এমন কিছু বলবেন, যা আমাদের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে থাকবে। বরং আমরা তোমার অপরাধসহ তোমাকে সোপর্দ করবো। তুমি নিজেই গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তোমার ঘটনাটি বলো।

রাবী বলেন, আমি রওয়ানা হয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আমার বিষয়টি তাঁকে জানালাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি এটা করেছো? আমি বললাম, আমিই এটা করেছি। আমি এখানে আছি হে আল্লাহর রসূল! আমার প্রতি আল্লাহর যে হুকুম হয় তাতে আমি ধৈর্য ধারণ করবো তিনি বলেন, একটি গোলামকে দাসত্বমুক্ত করো। আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি আমার দেহটি ছাড়া আর কিছুর মালিক নই। তিনি বলেন, তাহলে একাধারে দু’ মাস রোযা রাখো।

আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমার উপর যে বিপদ এসেছে, তা তো এই রোযার কারণেই। তিনি বলেন, তাহলে দান-খয়রাত করো অথবা ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও। রাবী বলেন, আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমরা এ রাতটি নিরন্ন অবস্থায় অতিবাহিত করেছি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি বনু যুরাইক-এর যাকাত বণ্টনকারীর নিকট যাও এবং তাকে বলো, সে যেন তোমাকে যাকাতের কিছু মাল দান করে। তা দিয়ে তুমি ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও এবং অবশিষ্ট যা থাকে তা নিজের উপকারে লাগাও। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৬২, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৮, ১২০০, ৩২৯৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২১৩, মিশকাত : ৩২৯৯, আহমাদ : ৩১৮৮, দারেমী : ২২৭৩, ইরওয়াহ : ২০৯১

উপসংহার

যিহার একটি গুরুতর বিষয়, যা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। ইসলাম এর জন্য কঠিন কাফফারা নির্ধারণ করে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করেছে। একইসাথে, কাফফারার তিনটি ধাপ নির্ধারণ করে আল্লাহ তা’আলা এই বিধানকে মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের ভুল থেকে ফিরে আসতে পারে এবং তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে পারে।

লিআন এর বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

লিআন (لعان) শব্দটি আরবি ‘লা’ন’ (لعن) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘আল্লাহর অভিশাপ’। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, লি’আন হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি বিশেষ শপথ ও অভিশাপের প্রক্রিয়া, যা কোনো স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনলে কিংবা স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করলে অনুষ্ঠিত হয়।

ইসলামের প্রথম যুগে, যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনত এবং তা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারত, তাহলে তাকে ‘ক্বযফ’ (মিথ্যা অপবাদ) এর শাস্তি হিসেবে আশিটি বেত্রাঘাত করা হতো। কিন্তু এতে একটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল: স্বামী যদি সত্যিই তার স্ত্রীর ব্যভিচার দেখেও প্রমাণ করতে না পারত, তাহলে তাকে হয় মিথ্যা অপবাদের শাস্তি ভোগ করতে হতো, নয়তো চুপ করে থাকতে হতো, যা তার জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। এই সমস্যার সমাধানেই আল্লাহ তাআলা নতুন বিধান নাজিল করেন।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হিলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট শরীক বিন সাহমার সাথে যেনায় লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ দায়ের করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, প্রমাণ পেশ করো অন্যথায় তোমার পিঠে হদ্দ কার্যকর হবে। হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) বলেন, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দীনসহ পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্যই সত্যবাদী এবং আল্লাহ্‌ আমার অভিযোগের ব্যাপারে এমন বিধান নাযিল করবেন, যা আমার পিঠকে হদ্দ থেকে রক্ষা করবে। তখন এই আয়াত নাযিল হলো-

﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। সূরা নূর : ৬-৭।

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুখ ফিরিয়ে তাদের দু’জনকে ডেকে পাঠান। তারা উপস্থিত হলে প্রথমে হেলাল বিন উমাইয়্যা (রাঃ) দাড়িয়ে শপথ করেন এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ অবশ্যই জানেন যে, তোমাদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী। অতএব কেও তওবা করবে কি? অতঃপর স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলো। পঞ্চমবারে সে যখন বলতে যাচ্ছিল যে, সে (স্বামী) সত্যবাদী হলে তার নিজের উপর আল্লাহ্‌র গযব পতিত হোক, তখন লোকেরা তাকে বলল, এটি কিন্তু অবধারিতকারী বাক্য। বিন আব্বাস (রাঃ) বলেন, সেই নারী তখন আর কিছু না বলে থেমে গিয়ে পিছনে হটে গেলো। শেষে আমরা মনে করলাম সে হয়তো ফিরে যাবে (বিরত থাকবে)। কিন্তু সে বললো, আল্লাহ্‌র শপথ! আমি আমার সম্প্রদায়কে চিরদিনের জন্য কালিমালিপ্ত করতে পারি না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা তার প্রতি লক্ষ্য রেখো। সে যদি সুরমাদীপ্ত চোখ, মাংসল নিতম্ব ও মাংসল পদযুগলবিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে তবে এটি শরীক বিন সাহমার। অতঃপর সে এই ধরণের সন্তানই প্রসব করলো। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্‌র কিতাবে আগেই যদি (লিআনকারীর) বিধান না দেয়া থাকতো, তাহলে তার ও আমার মধ্যে কিছু একটা ঘটে যেতো (তাকে শাস্তি দিতাম)। সহিহ বুখারী ২৬৭১, ৪৭৪৭, ৫৩০৭,সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৭, সুনানে তিরমিযী : ৩১৭৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৪, ২২৫৫, ২২৫৬, আহমাদ : ২৪৬৪, ইরওয়াহ : ২০৯৮, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

লিআনের বিধান সম্পর্ক সুরা নুরের আয়াতগুলো হলো-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ الْمُحْصَنٰتِ ثُمَّ لَمْ یَاْتُوْا بِاَرْبَعَۃِ  شُهَدَآءَ فَاجْلِدُوْهُمْ ثَمٰنِیْنَ جَلْدَۃً  وَّ لَا تَقْبَلُوْا لَهُمْ شَهَادَۃً  اَبَدًا ۚ وَ اُولٰٓئِكَ هُمُ  الْفٰسِقُوْنَ ۙ﴿۴﴾ اِلَّا الَّذِیْنَ تَابُوْا مِنْۢ بَعْدِ ذٰلِكَ وَ اَصْلَحُوْا ۚ فَاِنَّ  اللّٰهَ  غَفُوْرٌ  رَّحِیْمٌ ﴿۵﴾  وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾  وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾  وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর যারা সচ্চরিত্র নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসে না, তবে তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত কর এবং তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না। আর এরাই হলো ফাসিক। তবে যারা এরপরে তাওবা করে এবং নিজদের সংশোধন করে, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর লা‘নত। আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৪-৯

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার এই ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য লি’আন (لعان)-এর বিধান প্রবর্তন করেন। লি’আনের মাধ্যমে স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে তার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করবে এবং পঞ্চমবারে মিথ্যা হলে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করবে। একইভাবে, স্ত্রীও যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চায়, তাহলে তাকেও চারবার শপথ করে স্বামীর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে এবং পঞ্চমবারে সত্য হলে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ কামনা করবে। এভাবে, আল্লাহ তাআলা এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে এমন একটি সমস্যার সমাধান দিয়েছেন, যা সমাজ ও পরিবারের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করত। একই সাথে, এটি মিথ্যা অপবাদ থেকে নারীকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।

কুরআন সুন্নাহর আলোকে লিআন (لعان) এর বিধান

লি’আন একটি গুরুতর বিষয়, যা সরাসরি দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে মুজতাহীদ আলেমগণ নিআনের বিস্তরিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাদের মতে নিআন সাধারণত দুটি কারণে সংঘটিত হয়:

১. স্বামী যদি স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আনে।

২. স্বামী যদি স্ত্রীর গর্ভের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে, যদি স্বামীর কাছে তার অভিযোগ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী না থাকে, তবে স্বামী-স্ত্রী দু’জনকেই বিচারকের সামনে লি’আন করতে হয়। লি’আনের প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

ক. স্বামীর শপথ :

স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী স্বামী চারবার আল্লাহর নামে শপথ মাধ্যমে দাবি করবে যে তিনি যে অভিযোন এনেছেন তা সত্য। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ الَّذِیْنَ یَرْمُوْنَ اَزْوَاجَهُمْ وَ لَمْ  یَکُنْ لَّهُمْ شُهَدَآءُ  اِلَّاۤ  اَنْفُسُهُمْ فَشَهَادَۃُ اَحَدِهِمْ  اَرْبَعُ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ  لَمِنَ الصّٰدِقِیْنَ ﴿۶﴾  وَ الْخَامِسَۃُ اَنَّ لَعْنَتَ اللّٰهِ عَلَیْهِ  اِنْ كَانَ مِنَ  الْکٰذِبِیْنَ ﴿۷﴾

আর যারা নিজদের স্ত্রীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অথচ নিজেরা ছাড়া তাদের আর কোন সাক্ষী নেই, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হবে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেবে যে, সে নিশ্চয়ই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চম বারে বলবে যে, সে যদি মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তার উপর নেমে আসবে আল্লাহর লা’নত। সুরা নুর : ৬-৭

খ. স্ত্রীর শপথ:

স্বামীর শপথ শেষ হওয়ার পর স্ত্রী চারবার আল্লাহর নামে শপথ করে বলবে যে স্বামী তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেসে তা মিথ্যা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَ یَدْرَؤُا  عَنْهَا الْعَذَابَ اَنْ تَشْهَدَ اَرْبَعَ شَهٰدٰتٍۭ بِاللّٰهِ ۙ اِنَّہٗ لَمِنَ الْکٰذِبِیْنَ ۙ﴿۸﴾ وَ الْخَامِسَۃَ  اَنَّ غَضَبَ اللّٰهِ عَلَیْهَاۤ  اِنْ  كَانَ مِنَ  الصّٰدِقِیْنَ ﴿۹﴾

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবারে সাক্ষ্য দেবে যে, যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে নিশ্চয় তার উপর আল্লাহর গযব। সুরা নুর : ৮-৯

এই আয়াতে আল্লাহর গজবের কথা উল্লেখ করার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এখানে শুধু একটি অভিযোগের সমাধান করা হচ্ছে না, বরং এটি একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের পবিত্রতা ও বিশ্বাসকে চিরতরে ভেঙে দেয়। এই শপথের পর, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

লি’আনের ফলাফল

লি’আনের পর নিম্নলিখিত ফলাফলগুলো কার্যকর হয়:

১. চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ :

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তারা আর কোনো দিন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এটি সাধারণ তালাকের মতো নয়, যেখানে পুনরায় বিবাহ সম্ভব।

ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি বলেন-

লি’আনের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে, এ বিষয়ে প্রায় সব ফিকহ কিতাবই একমত। এই বিচ্ছেদ এমন যে, তারা আর কোনো দিন পুনরায় বিবাহ করতে পারবে না, এমনকি যদি তারা তওবাও করে। এটি ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালিক এবং অন্যান্য অধিকাংশ ফিকহবিদের মত। কিতাব: আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৯৮

২. ব্যভিচারের অভিযোগ বাতিল:

স্বামীর করা ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম) কার্যকর হয় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَدۡرَؤُا عَنۡہَا الۡعَذَابَ اَنۡ تَشۡہَدَ اَرۡبَعَ شَہٰدٰتٍۭ بِاللّٰہِ ۙ  اِنَّہٗ لَمِنَ الۡکٰذِبِیۡنَ ۙ

আর তারা স্ত্রীলোকটি থেকে শাস্তি রহিত করবে, যদি সে আল্লাহর নামে চারবার সাক্ষ্য দেয় যে, নিশ্চয় তার স্বামী মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। সুরা নুর : ৮

আলাউদ্দিন আল-কাসানী বলেন-

লি’আনের পর স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর ব্যভিচারের অভিযোগটি বাতিল হয়ে যায় এবং স্ত্রীর ওপর কোনো শরঈ শাস্তি (যেমন রজম বা বেত্রাঘাত) কার্যকর হয় না। এটি তার শপথের ফলেই ঘটে। কিতাব: বাদাই’উস সানাই, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-৩০৯

৩. সন্তানের বংশ বাতিল :

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তবে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের দিকটিই প্রাধান্য পায়।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে লিআন করায় এবং তার গর্ভের সন্তানকে অস্বীকার করে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের দু’জনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন এবং সন্তানটি উক্ত নারীর সাথে যুক্ত করেন। সহিহ বুখারী ৪৭৪৮, ৫৩০৬, ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩১৩, ৫৩১৪, ৫৩১৫, ৫৩৪৯, ৬৭৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪৯৩, ১৪৯৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৯ সুনানে তিরমিযী : ১২০৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৭৩, ৩৪৭৪, ৩৪৭৫, ৩৪৭৬, ৩৪৭৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২২৫৮, ২২৫৯, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

সাহল ইবনু সা’দ আস্ সা’ইদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উওয়াইমির আল আজলানী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! কোনো ব্যক্তি যদি স্বীয় স্ত্রীর সাথে অপর পুরুষকে দেখতে পায় এবং সে যদি তাকে হত্যা করে বসে, তবে কি নিহতের আত্মীয়স্বজন তাকে হত্যা করবে? তবে সে (স্বামী) কি করবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ওয়াহী নাযিল হয়েছে, ’যাও তোমার স্ত্রীকে নিয়ে আসো’। বর্ণনাকারী সাহল বলেন, অতঃপর তারা উভয়ে মসজিদে এসে লি’আন করল, আমিও অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে উপস্থিত থেকে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম।

অতঃপর উভয়ে যখন লি’আন শেষ করল, তখন ’উওয়াইমির বলল, আমি যদি তাকে আমার বিবাহের বন্ধনে রাখি, তাহলে আমি তার ওপর মিথ্যারোপ করেছি, এটা বলে সে তাকে তিন তালাক প্রদান করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি স্ত্রী লোকটি কালো রংয়ের এবং কালো চক্ষুবিশিষ্ট, বড় বড় নিতম্ব, মোটা মোটা পা-বিশিষ্ট সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করতে হবে ’উওয়াইমির তার সম্পর্কে সত্য বলেছেন। আর যদি রক্তিম বর্ণের ক্ষুদ্রাকৃতির কীটের ন্যায় সন্তান প্রসব করে, তবে মনে করব ’উওয়ামির মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর স্ত্রীলোক এমন বর্ণের সন্তান প্রসব করল যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা দিয়েছিলেন- সে সেরূপ সন্তানই প্রসব করল।’ এর দ্বারা ’উয়াইমির-এর দাবির সত্যতার ধারণা জন্মে, অতঃপর সন্তানটিকে (পিতার পরিবর্তে) মায়ের পরিচয়ে ডাকা হতো। সহিহ বুখারি : ৪২৩, ৪৭৪৫, সহিহ মুসলিম : ১৪৯২, সুনানে নাসায়ী : ৩৪০২, দারিমী : ২২৭৫।

আবু ইসহাক আশ-শিরাজি বলেছেন-

যদি লি’আন সন্তানের বংশ নিয়ে হয়, তাহলে সেই সন্তানকে আর স্বামীর বংশের বলে গণ্য করা হয় না। এর ফলে সন্তানের বংশপরিচয় তার মায়ের দিক থেকেই নির্ধারিত হয়। আল-মুহাজ্জাব, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-১৫৫

৪. লি‘আনকারিণীর মোহর ফেরত দিতে হবে না

সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমারকে জিজ্ঞেস করলাম, এক লোক তার স্ত্রীকে অপবাদ দিল (বিধান কী?), তিনি বললেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ ’আজলানের স্বামী-স্ত্রীর দু’জনকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তা’আলা জানেন তোমাদের একজন অবশ্যই মিথ্যাচারী। কাজেই তোমাদের কেউ তওবা করতে রাযী আছ কি? তারা দু’জনেই অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী, সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল। তিনি পুনরায় বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা অবহিত আছেন তোমাদের একজন মিথ্যাচারী সুতরাং কেউ তওবা করতে প্রস্তুত আছ কি? তারা আবারও অস্বীকার করল।

এরপর তিনি তাদেরকে পৃথক করে দেন। আইয়ুব বলেন, আমাকে আমর ইবনু দ্বীনার (রহ.) বললেন, এ হাদীসে আরও কিছু কথা আছে, তোমাকে তা বর্ণনা করতে দেখছি না কেন? তিনি বলেন, লোকটি বলল, আমার (দেয়া) মালের কী হবে? তাকে বলা হল, তোমার মাল ফিরে পাবে না। যদি তুমি সত্যবাদী হও, (তবুও পাবে না)। (কেননা) তুমি তার সঙ্গে সহবাস করেছ। আর যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে তা পাওয়া তো বহু দূরের ব্যাপার। সহিহ বুখারি : ৫৩১১, ৫৩১২, ৫৩৪৯, ৫৩৫০, সহহি মুসলিম : ১৪৯৩, মিশকাত : ৩৩০৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৫৭, সুনানে  নাসায়ী : ৩৪৭৬, আহমাদ : ৪৫৮৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪২৮৭।

৫. স্ত্রীক অন্য পুরুষের সাথে দেখলে হত্যা করা যাবে না

মুগীরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ (রাঃ) বললেন, আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য কোন পুরুষকে যদি দেখি, তাকে সরাসরি তরবারি দিয়ে হত্যা করব। এ কথা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, তোমরা কি সাদের আত্মমর্যাদাবোধ দেখে বিস্মিত হচ্ছ? আল্লাহর শপথ! আমি তার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আর আল্লাহ্ আমার চেয়েও অধিক আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। আল্লাহ্ আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হবার কারণে প্রকাশ্য ও গোপনীয় (যাবতীয়) অশ্লীলতাকে হারাম করে দিয়েছেন। অক্ষমতা প্রকাশকে আল্লাহর চেয়ে অধিক পছন্দ করেন এমন কেউই নেই। আর এজন্য তিনি ভীতি প্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতাদেরকে পাঠিয়েছেন। আত্মপ্রশংসা আল্লাহর চেয়ে অধিক কারো কাছে প্রিয় নয়। তাই তিনি জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৬৮৪৬, ৭৪১৬, সহিহ  মুসলিম : ১৪৯৯, মিশকাত : ৩৩০৯, আহমাদ : ১৮১৬৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৭৭৩

৬. সন্দেহের কারনে সন্তানের পিতৃপরিচয় অস্বীকরা করা যাবে না

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান জন্ম দিয়েছে। আর আমি তাকে (আমার সন্তান হিসাবে) অস্বীকার করছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কি উট আছে? সে বলল, হ্যাঁ আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,সেগুলোর কী রঙ? সে বলল, লাল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলোর মাঝে সাদা কালো মিশ্রিত রঙের কোন উট আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ, সাদা কালো মোশানো রঙের অনেকগুলো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এ রং কিভাবে এল বলে তুমি মনে কর? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বংশ সূত্রের প্রভাবে এমন হয়েছে। তিনি বললেনঃ সম্ভবত তোমার সন্তানও বংশ সূত্রের প্রভাবে (পূর্বপুরুষের কেউ কালো ছিল বলে) এমন হয়েছে। এবং তিনি এ সন্তানটিকে অস্বীকার করার অনুমতি লোকটিকে দিলেন না। সহিহ বুখারি : ৫৩০৫, ৭৩১৪, মুসলিম ১৫০০, আবূ দাঊদ ২২৬২, নাসায়ী ৩৪৭৮, তিরমিযী ২১২৮, ইবনু মাজাহ ২০০২, আহমাদ ৭২৬৪

লি’আনের বিধানটি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মিথ্যা অভিযোগের হাত থেকে স্ত্রীকে সুরক্ষা দেয় এবং একই সাথে সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করে। এটি একটি গুরুতর পদক্ষেপ, যা কেবল চরম পরিস্থিতিতেই শরঈ বিচারকের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।

ঈলার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামী শরীয়তে ঈলা (الإيلاء) একটি বিশেষ পরিভাষা, যা আরবি আল্‌ই (أَلْي) শব্দ থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ শপথ করা। মহাগ্রন্থ কুরআনে (یُؤۡلُوۡنَ) ইউলুনা হিসেবে এসেছে। যার অর্থ শপথ (সম্পর্ক না রাখার) করে।

শরীয়তের পরিভাষায়, ঈলা হলো এমন একটি শপথ, যেখানে কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে চার মাস বা তার বেশি সময় ধরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করার প্রতিজ্ঞা করে। এই ধরনের শপথের ক্ষেত্রে, স্বামী যদি চার মাসের মধ্যে তার স্ত্রীর কাছে ফিরে আসে এবং শপথ ভঙ্গ করে, তাহলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকবে। তবে শপথ ভঙ্গের জন্য তাকে কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) দিতে হবে। যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তাহলে স্বামী স্ত্রীর মাঝে তালাক হয়ে যাবে। অবশ্য কোন কোন মুজতাহিদ আলেম তালাক না হওয়ার পক্ষেও মতামত দিয়েছেন।

উম্মু সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কতক স্ত্রীর সংস্পর্শে না আসার জন্য এক মাসের ঈলা করেছিলেন। উনতিরিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর বিকালে অথবা সকালে তিনি (স্ত্রীদের নিকট) আসেন। বলা হলো, হে আল্লাহ্‌র রসূল! ঊনতিরিশ দিন তো অতিবাহিত হয়েছে? তিনি বললেন, মাস ঊনতিরিশ দিনেও হয়। সহীহুল বুখারী ১৯১০, সহিহ মুসলিম : ১০৮৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬১, আহমাদ : ২৬১৪৩

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মর্মে শপথ করেন, একমাস যাবত তার স্ত্রীদের সংস্পর্শে যাবেন না। তিনি একাধারে উনত্রিশ দিন এভাবে কাটিয়ে দিলেন। অবশেষে তিরিশ দিনের সন্ধ্যা হলে তিনি আমার নিকট আসেন। আমি বললাম, আপনি তো শপথ করেছিলেন যে, আপনি একমাস আমাদের সংস্পর্শে আসবেন না। তিনি বলেন, মাস এভাবেও হয়। তিনি তাঁর দু’হাতের আঙ্গুলসমূহ তিনবার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রেখে ইশারায় বলেন, মাস এভাবেও হয়, তিনি পুনরায় (দু’বার পূর্বোক্ত নিয়মে দেখান) কিন্তু তিনি তৃতীয় বারে তিনি একটি আঙ্গুল মুষ্টিবদ্ধ রাখেন (অর্থাৎ মাস উনতিরিশ দিনেও হয়)। সহিহ বুখারি : ৫২৬৯, ৫২৯৯, ১৯১১, সহিহ মুসলিম : ১৪৫৬ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৫৯,  আহমাদ : ২৩৫৩০, হাদিসটি ইবনে মাজাহ থেকে নেওয়া হয়েছে।

ঈলার বিধান

স্বামী যদি তার স্ত্রীর সাথে ঈলা (অর্থাৎ, সহবাস না করার শপথ) করে, তবে স্ত্রীকে চার মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়কালে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার বা শপথ ভাঙার জন্য অপেক্ষা করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করবে তারা চার মাস অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারা যদি ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২২৬

এই আয়াতে মূলত ‘ঈলা’র বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। ‘ঈলা’ হলো এমন একটি শপথ, যেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে না বলে কসম খায়। জাহিলিয়াতের যুগে এমন শপথ অনির্দিষ্টকালের জন্য করা হতো, যার ফলে স্ত্রীরা এক প্রকার অনিশ্চিত ও কষ্টকর অবস্থায় জীবনযাপন করত। ইসলাম এই প্রথার অবসান ঘটিয়ে এর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।

১. ঈলার সময়সীমা:

আল্লাহ তা’আলা এমন শপথের জন্য চার মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, যদি কোনো স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত না হওয়ার শপথ করে, তবে এই শপথ সর্বোচ্চ চার মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে স্ত্রীর অধিকার খর্ব করা হয় না, বরং তাকে এই সময়ের মধ্যে ফিরে আসার বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

২. চার মাসের মধ্যে ফিরে আসা

চার মাসের সময়সীমার মধ্যে যদি স্বামী তার শপথ থেকে ফিরে আসে, অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কারণ এই ধরনের শপথ একটি অন্যায় কাজ এবং এর থেকে ফিরে আসাই সঠিক কাজ। যদি কোনো স্বামী চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তার শপথ ভঙ্গ

জকরে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, তবে শপথ ভাঙার জন্য তাকে কাফফারা দিতে হবে। কসমের কাফফারা সম্পর্কে ইসলামি শরীয়তেন স্পষ্ট বিধান আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَا یُؤَاخِذُکُمُ اللّٰہُ بِاللَّغۡوِ فِیۡۤ اَیۡمَانِکُمۡ وَلٰکِنۡ یُّؤَاخِذُکُمۡ بِمَا عَقَّدۡتُّمُ الۡاَیۡمَانَ ۚ فَکَفَّارَتُہٗۤ اِطۡعَامُ عَشَرَۃِ مَسٰکِیۡنَ مِنۡ اَوۡسَطِ مَا تُطۡعِمُوۡنَ اَہۡلِیۡکُمۡ اَوۡ کِسۡوَتُہُمۡ اَوۡ تَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ ؕ فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ ثَلٰثَۃِ اَیَّامٍ ؕ ذٰلِکَ کَفَّارَۃُ اَیۡمَانِکُمۡ اِذَا حَلَفۡتُمۡ ؕ وَاحۡفَظُوۡۤا اَیۡمَانَکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ

আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফফারা হল দশ জন মিসকীনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অতঃপর যে সামর্থ্য রাখে না তবে তিন দিন সিয়াম পালন করা। এটা তোমাদের কসমের কাফ্ফারা, যদি তোমরা কসম কর, আর তোমরা তোমাদের কসম হেফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।

সুরা মায়েদা : ৮৯

৩. শপথের সীমা চার মাস অতিক্রম করলে

যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী তার শপথ না ভাঙে, তবে স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারেন। হাদিসে বর্ণিত সাহাবিদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিচারক তখন স্বামীকে দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলবেন:

ক. শপথ ভেঙে স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন পুনরায় শুরু করা।

খ. স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

৪. ঈলা চার মাস পূর্ণ হলে কি স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে?

যদি চার মাস পার হয়ে যায় এবং স্বামী ফিরে না আসে বা শপথ ভঙ্গ না করে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যাবে কি না, এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ক. হানাফি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব:

এই তিনটি মাযহাব অনুযায়ী, চার মাস পূর্ণ হওয়ার পর যদি স্বামী স্ত্রীর কাছে ফিরে না আসে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি তালাকে বায়েন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক) পতিত হয়। এই তালাকের জন্য আদালতের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।

হানাফি মাযহাব :

আল-জাসসাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ আহকামুল কুরআন-এ বলেছেন, “যদি চার মাস অতিবাহিত হয় এবং সে ফিরে না আসে, তবে তালাক হয়ে যাবে।” আহকামুল কুরআন, প্রথম খণ্ড,পৃ. ৩৫৫-৩৫৬

মালিকি মাযহাব :

ইমাম মালিক তার আল-মুয়াত্তা-এ বলেছেন, “যদি চার মাস পূর্ণ হয় এবং স্বামী ফিরে না আসে, তবে তা তালাক।” ইমাম মালিক ইবনে আনাস, আল-মুয়াত্তা, তালাক অধ্যায় হাদিস : ১১৭২

হাম্বলি মাযহাব :

ইবনে কুদামা তার আল-মুগনি-তে উল্লেখ করেছেন, “ঈলাকারী যদি চার মাস পার হওয়ার পরও ফিরে না আসে, তাহলে তালাক পতিত হবে।” ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি, আল-মুগনি, খণ্ড ৯, পৃ.-১৮৮-১৯১

খ. শাফেয়ি মাযহাব:

শাফেয়ি মাযহাবের মতে, চার মাস পার হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয় না। বরং স্ত্রী চাইলে বিচারকের কাছে অভিযোগ করবে এবং বিচারক তাকে ফিরে আসার নির্দেশ দেবেন। যদি সে ফিরে না আসে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।

ইমাম শাফেয়ি তার কিতাবুল উম্ম-এ এই মত তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি বলেন, “চার মাস পূর্ণ হলে বিচারক তাকে (স্বামী) ডেকে বলবেন, হয় ফিরে আসো, অথবা তালাক দাও। যদি সে কোনোটিই না করে, তবে বিচারকই তালাক কার্যকর করবেন।” ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.- ১৫২-১৫৪

এই মতভেদের মূল কারণ হলো সূরা বাকারার ২২৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, যেখানে বলা হয়েছে, “আর যদি তারা তালাকের সংকল্প করে, তবে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”

 শাফেয়ি মাযহাবের আলেমরা মনে করেন, ‘সংকল্প’ কথাটি তালাকের জন্য ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়, যা আদালতের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কার্যকর হয়।

ইদ্দতের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইদ্দত’ (عدة) হলো ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময়, যা কোনো নারী তার স্বামী থেকে তালাক বা মৃত্যু পর পালন করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো নারীর গর্ভাশয়ের পবিত্রতা নিশ্চিত করা, যাতে তার বংশপরিচয় নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে।

ইদ্দত হলো এমন একটি সময়সীমা, যা তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পালন করতে হয়। ইদ্দতের মাধ্যমে ইসলাম নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে, পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে এবং বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ইদ্দতেত প্রধান প্রধান উপকারি দিক হলো—

১. ইদ্দত নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করে

মানসিক প্রশান্তি : তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর নারীদের জন্য ইদ্দত একটি মানসিক প্রশান্তির সুযোগ দেয়। এই সময়টুকুতে তারা শোক কাটাতে পারে এবং জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে। জোর করে দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়ানো থেকে এটি নারীকে রক্ষা করে।

ভরণপোষণ : তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার স্বামীর ঘরেই থাকবে এবং তার ভরণপোষণ স্বামীকেই বহন করতে হবে। এটি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কারণ এই সময়ে সে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং জীবিকা অর্জনের জন্য প্রস্তুত নয়।

শোভনতা ও সম্মান : বিধবা নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা তার স্বামীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপায়। এটি সমাজে তাকে একটি সম্মানজনক অবস্থান দেয় এবং তার দুঃখের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে।

২. পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে

সমঝোতার সুযোগ : তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দতকাল সাধারণত তিন মাসিক। এই সময় স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার সুযোগ পায়। যদি তারা ইদ্দতের মধ্যে আবার সম্পর্ক ফিরিয়ে নিতে চায়, তাহলে তা সহজেই করতে পারে। এটি অনেক সময় ভেঙে যাওয়া সংসারকে নতুন করে জোড়া লাগাতে সাহায্য করে।

নতুন সম্পর্কের প্রস্তুতি : ইদ্দত শেষ হওয়ার পর নারী নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। এটি সমাজে এক ধরনের শৃঙ্খলা নিয়ে আসে। নতুন সম্পর্কের আগে একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা নারী ও তার সম্ভাব্য নতুন পরিবারের জন্য একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

৩. বংশের পবিত্রতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে

গর্ভধারণ নিশ্চিত করা: ইদ্দতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নিশ্চিত করে যে তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী গর্ভবতী কি না। যদি কোনো নারীর গর্ভে তার প্রাক্তন স্বামীর সন্তান থাকে, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে সে অন্য কোথাও বিবাহ করতে পারে না।

ইদ্দতের কারণে বংশের পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। যদি নারীটি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই নতুন বিবাহ করে এবং গর্ভবতী হয়, তাহলে কার সন্তান তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ইদ্দত এই ধরনের জটিলতা দূর করে এবং সন্তানের পিতৃত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করতে সাহায্য করে। এটি সন্তানের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে।

সুতরাং, ইদ্দতকে শুধু একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে না দেখে, এটি নারী, পরিবার এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এটি ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।

ইদ্দত পালনের বিধান

ইদ্দত পালন করা প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব, যদি তার মাসিক হয়। যাদের মাসিক হয় না, তাদের জন্য এই সময়কাল তিন মাস। গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। অন্যদিকে, স্বামীর মৃত্যুর পর কোনো নারীর জন্য ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। তবে, যদি তিনি গর্ভবতী হন, তবে তার ইদ্দতকালও সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইদ্দতের এই সময়কালে নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না। ইদ্দতের সময়কাল বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়। নিচে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো–

১. তালাকের ইদ্দত

তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল নির্ভর করে নারীর শারীরিক অবস্থার উপর।

ক. মাসিক হয় এমন নারীর জন্য :

তালাকপ্রাপ্তা নারীর জন্য ইদ্দত হলো তিনটি পূর্ণ মাসিক ঋতুস্রাব। এই সময়ের মধ্যে যদি তার তিনবার মাসিক হয়, তাহলে তার ইদ্দত পূর্ণ হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡمُطَلَّقٰتُ یَتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ ثَلٰثَۃَ قُرُوۡٓءٍ ؕ 

এবং তালাক প্রাপ্তাগণ তিন ঋতু পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। সুরা বাকারা : ২২৮

খ. মাসিক হয় না এমন নারীর জন্য :

যে সকল নারীর মাসিক হয় না (বয়সের কারণে বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে), তাদের জন্য ইদ্দত হলো তিন মাস। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

  وَالّٰٓیِٴۡ یَئِسۡنَ مِنَ الۡمَحِیۡضِ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ اِنِ ارۡتَبۡتُمۡ فَعِدَّتُہُنَّ ثَلٰثَۃُ اَشۡہُرٍ ۙ وَّالّٰٓیِٴۡ لَمۡ یَحِضۡنَ ؕ

তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা ঋতুবর্তী হওয়ার কাল অতিক্রম করে গেছে, তাদের ইদ্দত সম্পর্কে তোমরা যদি সংশয়ে থাক এবং যারা এখনও ঋতুর বয়সে পৌঁছেনি তাদের ইদ্দতকালও হবে তিন মাস। সুরা তালাক : ৪

গ. গর্ভবতী নারীর জন্য :

গর্ভবতী নারীর জন্য ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সন্তান প্রসবের পর পরই তার ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, এমনকি যদি তা তালাকের এক মুহূর্ত পরেই হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

 আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪

২. স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত

যদি কোনো নারীর স্বামী মারা যায়, তবে তার ইদ্দতকাল হলো:

ক. সাধারণ নারীর জন্য :

স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দত হলো চার মাস দশ দিন। এই সময়কালে তাকে শোক পালন করতে হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَیَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّعَشۡرًا ۚ فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا فَعَلۡنَ فِیۡۤ اَنۡفُسِہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ

আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যাবে এবং স্ত্রীদেরকে রেখে যাবে, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় থাকবে। অতঃপর যখন তারা ইদ্দতকাল পূর্ণ করবে, তখন তারা নিজদের ব্যাপারে বিধি মোতাবেক যা করবে, সে ব্যাপারে তোমাদের কোন পাপ নেই। আর তোমরা যা কর, সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক অবগত। সূরা বাকারা : ২৩৪

যায়নাব বিনতু আবূ সালামা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী হাবীবাহ (রাযিঃ) এর কাছে তার পিতা আবূ সুফইয়ানের ইনতিকালের খবর পৌঁছল তখন তৃতীয় দিনে তিনি হলুদ বর্ণের সুগন্ধি চেয়ে পাঠালেন এবং তার দু’হাতে গায়ে ভাল করে তা মেখে নিলেন। আর বললেন, আমার এর কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, যে মহিলা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তার পক্ষে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা হালাল নয়। তবে স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারটি স্বতন্ত্র। কেননা সে তার স্বামীর মৃত্যুতে চারমাস দশদিন শোক পালন করবে। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৬, সুনানে আবু দাউদ : ২৩১৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৭, আহমাদ : ২৬৭৫৪, সহীহ আত্ তারগীব : ৩৫৩৭।

খ. গর্ভবতী নারীর জন্য:

যদি কোনো নারী তার স্বামীর মৃত্যুর সময় গর্ভবতী থাকে, তাহলে তার ইদ্দত হলো সন্তান প্রসব পর্যন্ত, ঠিক তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীর মতোই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا

আর গর্ভধারিনীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন। সুরা তালাক : ৪

মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, সুবায়’আ আসলামীয়া তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে।সহিহ বুখারি : ৫৩২০, মিশকাত : ৩৩২৮, সুনানে নাসায়ী : ৩৫০৬

আবূ সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি ইবনু ’আব্বাস (রাঃ)-এর কাছে এলেন এবং বললেন, এক মহিলা তাঁর স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর বাচ্চা প্রসব করেছে। সে এখন কীভাবে ইদ্দত পালন করবে, এ বিষয়ে আমাকে ফতোয়া দিন। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বললেন, ইদ্দত সম্পর্কিত হুকুম্ দু’টির যেটি দীর্ঘ, তাকে সেটি পালন করতে হবে। আবূ সালামাহ (রহ.) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর হুকুম তো হলঃ গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমি আমার ভ্রাতুষ্পুত্র অর্থাৎ আবূ সালামাহর সঙ্গে আছি। তখন ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) তাঁর ক্রীতদাস কুরায়বকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করার জন্য উম্মু সালামাহ (রাঃ)-এর কাছে পাঠালেন। তিনি বললেন, সুবায়’আ আসলামিয়া (রাঃ)-এর স্বামীকে হত্যা করা হল, তিনি তখন গর্ভবতী ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর তিনি সন্তান প্রসব করলেন। এরপরই তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। যারা তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন আবুস্ সানাবিল তাদের মধ্যে একজন। সহিহ বুখারি : ৪৯০৯, ৫৩১৮, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৪

নোট : ইদ্দত পালন করা আল্লাহর স্পষ্ট হুকুম, তাই এটি প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীর জন্য ফরজ। এক কথায় বলেতে গেলে -তালাকের ক্ষেত্রে ইদ্দত ৩ হায়েজ/৩ মাস। স্বামী মারা গেলে ইদ্দত ৪ মাস ১০ দিন কিন্তু গর্ভবতী হলে ইদ্দত সন্তান জন্ম দেওয়া পর্যন্ত।

ইদ্দত পালনের সময় করণীয়

ইদ্দত পালনকারী নারীকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়:

১. বাড়িতে অবস্থান:

ইদ্দতকালীন সময়ে নারীকে তার স্বামীর বাড়ি বা যেখানে বিচ্ছেদ হয়েছে, সেখানেই অবস্থান করতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

২০৩১। ফুরাইআ বিনতে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার স্বামী তার (পলাতক) গোলামের খোঁজে রওয়ানা হয়ে কাদূম নামক স্থানে তাদের ধরে ফেলেন। তারা আমার স্বামীকে হত্যা করে। যখন আমার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ আসে, তখন আমি আমার পরিবার-পরিজন থেকে অনেক দূরে আনসারদের বসতিতে অবস্থান করছিলাম। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! যখন আমার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এলো তখন আমি আমার পরিজন ও ভাইদের বাড়ি থেকে দূরে বসবাস করছিলাম। তিনি আমার ভরণপোষণের জন্য কোন মাল রেখে যাননি এবং তার এমন কোন মালও নেই, আমি যার ওয়ারিস হতে পারি, এমনকি তার মালিকানাভুক্ত কোন ঘরও নাই। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি আমার পরিবার ও ভাইদের বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি। আর এটা আমার জন্য অধিক প্রিয় এবং বিভিন্ন দিক দিয়ে সুবিধাজনকও। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি চাইলে তা করতে পারো। মহিলাটি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখে আমার জন্য আল্লাহর এই ফায়সালা শুনে খুশি মনে ফিরে যেতে লাগলাম।আমি মসজিদে অথবা তাঁর কোন এক হুজরার নিকটে পৌঁছতেই, তিনি আমাকে ডেকে বলেন, তুমি জানি কী বলেছিলে? মহিলাটি বললো, আমি পুনরায় তাকে আমার বিবরণ শুনালাম। তিনি বলেনঃ তুমি ঐ ঘরেই অবস্থান করো, যেখানে তোমার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়েছো, যতক্ষণ না তোমার ইদ্দাত পূর্ণ হয়। ফুরাইআ (রাঃ) বলেন, এরপর আমি সেখানেই চার মাস দশ দিন ইদ্দাত পালন করলাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৩১, সুনানে তিরমিযী : ১২০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫২৮, ৩৫২৯, ৩৫৩০, ৩৫৩২, সুনানে আবূ দাউদ : ২৩০০, আহমাদ : ২৬৫৪৭, ২৬৮১৭, মুয়াত্তা মালেক : ১২৫৪, দারেমী : ২২৮৭, ইরওয়াহ : ২১৩১।

তবে জরুরি প্রয়োজনে ইদ্দাত পালনকালে দিনের বেলায় ঘরের বাইরে যাওয়া জায়িয। যেমন সহিহ হাদিস এসেছে-

উরওয়া (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মারওয়ানের নিকট প্রবেশ করে তাকে বললাম, আপনার পরিবারের এক মহিলাকে তালাক দেয়া হয়েছে। আমি তার ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম যে, সে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। সে বললো, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) আমাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে (ইদ্দত পালনকালে) স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছেন। মারওয়ান বলেন, ফাতেমাহ বিনতে কায়েস (রাঃ) তাদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। উরওয়া (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! ’আয়িশাহ্ (রাঃ) তা আপত্তিকর বলেছেন। ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, ফাতেমাহ হিংস্র পশুর উৎপাতের এলাকায় বাস করতেন বলে তার জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। আর এ কারণেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বেলায় এরূপ অনুমতি দিয়েছিলেন। সুনানে [MIH1] ২০৩২

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার খালা ত্বলাক (তালাক) প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি তার (খেজুর বাগানের) খেজুর পাড়ার ইচ্ছা করলেন। এক ব্যক্তি তাকে বাইরে যেতে বাধা দিলেন। তখন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ তুমি তোমার বাগানের খেজুর পাড়ার জন্য বাইরে যেতে পার। কারণ সম্ভবত তা থেকে অন্যদের সাদাকা করবে অথবা অন্য কোন ভাল কাজ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৮৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৫০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৩৪, দারিমী : ২৩৩৪, ইরওয়া : ২১৩৪।

২. সাজসজ্জা ত্যাগ করা :

স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দতের সময় নারীকে কোনো ধরনের সাজসজ্জা, সুগন্ধি, রঙিন পোশাক এবং অলঙ্কার পরিধান থেকে বিরত থাকতে হয়। এটি শোক প্রকাশের অংশ।

যাইনাব (রাঃ) বলেনঃ আমি উম্মু সালামাহকে বলতে শুনেছি: এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মেয়ের স্বামী মারা গেছে। তার চোখে অসুখ। তার চোখে কি সুরমা লাগাতে পারবে? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ অথবা তিন বার বললেন, না। তিনি আরও বললেনঃ এতো মাত্র চার মাস দশ দিনের ব্যাপার। অথচ জাহিলী যুগে এক মহিলা এক বছরের মাথায় বিষ্ঠা নিক্ষেপ করত। সহিহ বুখারি : ৫৩৩৬, ৫৩৩৮, ৫৭০৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২২৯৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৭, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৩

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে রমণীর স্বামী মারা গেছে, সে (’ইদ্দতকালে লাল বা) হলুদ রংয়ের কাপড় এবং গেরুয়া রঙের কাপড় পরবে না, অলঙ্কার পরবে না, চুলে বা হাতে মেহেদী লাগাবে না এবং চোখে সুরমা লাগাবে না। মিশকাত : ৩৩৩৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৩০৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৫, আহমাদ : ২৬৫৮১, সহীহ আল জামি : ৬৬৭৭।

উম্মু আতিয়্যাহ ( হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোন মহিলার জন্য স্বামী ব্যতীত অন্য কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশী শোক পালন করা হালাল হবে না।। সুরমা ও রঙিন কাপড়ও ব্যবহার করতে পারবে না। তবে সূতাগুলো একত্রে বেঁধে হালকা রং লাগিয়ে তা দিয়ে কাপড় বুনলে তা ব্যবহার করা যাবে। সহিহ বুখারি : ১৩১৩, ৫৩৪২, সহিহ মুসলিম ৯৩৮, সুনানে আবূ দাঊদ ২৩০২, সুনানে নাসায়ী : ৩৫৩৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৮৭, ইরওয়া : ২০১৪, সহীহ আল জামি : ৭৬৪৯

৩. অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ:

ইদ্দত চলাকালীন সময়ে কোনো নারী অন্য কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না।

ইদ্দতের এই বিধানগুলো পবিত্র কুরআন এবং হাদিসের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে, যার মাধ্যমে নারীর মর্যাদা ও বংশের পবিত্রতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান

তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী বিধান। ইসলামে তালাকের পর নারীর ভরণ-পোষণ এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এই বিধানগুলো নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

১. ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ:

ইদ্দত হলো সেই নির্দিষ্ট সময়, যা একজন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে দ্বিতীয় বিবাহ করার আগে অবশ্যই পালন করতে হয়। এই ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামীর দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে স্বাভাবিক ভরণ-পোষণ প্রদান করা।

১. তালাকে রজঈ (প্রত্যাবর্তনীয় তালাক)

যদি কোনো নারীকে তালাকে রজঈ (অর্থাৎ এক বা দুই তালাক) দেওয়া হয় এবং সে ইদ্দত পালন করে, তবে ইদ্দত চলাকালীন সময়ে তার স্বামী তার ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য। ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না, বরং স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে। তাই, এই সময়ে নারীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং চিকিৎসা খরচ স্বামীর ওপরই থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ 

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। সুরা তালাক : ০৬

আয়াতে গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণের বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে।

২. তালাকে বায়িন (অপ্রত্যাবর্তনীয় তালাক)

যদি তালাকপ্রাপ্তা নারী গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তার স্বামী তার ভরণ-পোষণের খরচ বহন করতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 وَاِنۡ کُنَّ اُولَاتِ حَمۡلٍ فَاَنۡفِقُوۡا عَلَیۡہِنَّ حَتّٰی یَضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ۚ  فَاِنۡ اَرۡضَعۡنَ لَکُمۡ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ ۚ

আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। আর তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করালে তাদের পাওনা তাদেরকে দিয়ে দাও। সুরা তালাক : ০৬

আর যদি যদি নারী গর্ভবতী না হয় তবে বায়িন তালাক এর ক্ষেত্রে এই বিধানটি কিছুটা জটিল। বেশিরভাগ ফিকাহবিদ ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণের সাধারণ বিধানের পক্ষে রায় দিয়েছেন। কিছু ফিকহবিদদের মতে, তালাকে বায়িনের পর নারীকে কেবল বাসস্থান দেওয়া হবে, তবে তার খাদ্য, বস্ত্র বা অন্যান্য খরচ স্বামীর ওপর বর্তায় না। কারণ এই তালাকের মাধ্যমে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের পক্ষের দলিল হলো-

আবূ বকর বিন আবী জাহম বিন সুখাইর আদাবী (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ফাতেমাহ্ বিনতে কায়েস (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোষের নির্দেশ দেননি। সুনানে ইবনে মাজাহ :২০৩৫, ২০৩৬, সহিহ মুসলিম ১৪৮০, আবী দাউদ : ১৯৭৬-১৯৮০

ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল এমন যে, তার স্বামী তাকে তিন তালাক দিয়েছিলেন। তিন তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার কারণে তিনি তার স্বামীর ঘরে ইদ্দত পালন করবেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে তার স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার অধিকার দেননি।

বিষয়টি ব্যতিক্রমের কারণ- তালাকে বাইন। যদি স্বামী স্ত্রীকে তিন তালাক দেন, তাহলে সম্পর্কটি তাৎক্ষণিকভাবে ও সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর কোনো সম্পর্ক থাকে না। তাই, ইসলামী আইন অনুযায়ী, এই ধরনের তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রীর আর স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করার বা খোরপোষ পাওয়ার অধিকার থাকে না।

ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) এর ঘটনাটি ছিল তিন তালাকের। যেহেতু এটি একটি তালাকে বাইন ছিল, তাই রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাকে স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করতে এবং খোরপোষ পাওয়ার নির্দেশ দেননি। এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার স্বামীর থেকে কোনো খোরপোষ বা বাসস্থান পাবেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত : এই হাদীসটি নিয়ে কিছু সাহাবা এবং ফকীহদের মধ্যে ভিন্নমত ছিল। যেমন, উমর (রাঃ) এবং উসমান (রাঃ) এর মতো কিছু সাহাবা মনে করতেন যে, স্ত্রী রাজঈ তালাকপ্রাপ্তা হোক বা বাইন তালাকপ্রাপ্তা হোক, উভয় ক্ষেত্রেই তার খোরপোষের অধিকার রয়েছে। তবে, অনেক সাহাবা এবং ফকীহ এই হাদীসটিকে সমর্থন করেছেন এবং তালাকে বাইনের ক্ষেত্রে স্ত্রীর খোরপোষ ও বাসস্থানের অধিকার না থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন।

২. ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ

ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ দেওয়া স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এই ভরণ-পোষণকে ‘মুতা’আ’ বলা হয়। মুতা’আ হলো এমন একটি উপহার বা আর্থিক সহায়তা, যা স্বামী তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে দেবে, যা তার আর্থিক সামর্থ্য এবং স্ত্রীর সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এটি তালাকের কারণে সৃষ্ট মানসিক ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের একটি রূপ। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَلِلۡمُطَلَّقٰتِ مَتَاعٌۢ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ حَقًّا عَلَی الۡمُتَّقِیۡنَ

আর তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্য থাকবে বিধি মোতাবেক ভরণ-পোষণ। মুত্তাকীদের উপর আবশ্যক। সূরা বাকারা : ২৪১

/২০৩৭। ’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। জাওন-কন্যা ’আমরাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট পেশ করা হলে সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে (আল্লাহর) আশরয় প্রার্থনা করে। তিনি বলেনঃ তুমি এক মহান সত্তার নিকটই আশ্রয় প্রার্থনা করেছো। অতঃপর তিনি তাকে তালাক দিলেন এবং উসামাহ অথবা আনাস (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলে তদনুযায়ী তিনি তাকে (উপঢৌকনস্বরূপ) তিনখানা সাদা লম্বা কাপড় দেন।

সহীহুল বুখারী ৫২৫৪, নাসায়ী ৩৪১৭, বায়হাকী ৭/৩১৮, ইরওয়াহ ৭/১৪৬।

মুতা’আর মূল উদ্দেশ্য হলো তালাকের পর নারীর প্রতি সহানুভূতি ও মানবিকতা প্রদর্শন করা। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে একটি সদয় কাজ, যা তালাকের তিক্ততা কমিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে তালাকপ্রাপ্তা নারীর ভরণ-পোষণ

বাংলাদেশের আইনও এই ইসলামী বিধানকে সমর্থন করে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, তালাকের পর একজন নারী ইদ্দতকালীন সময়ে তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকারী। এই আইন অনুসারে, ইদ্দতকাল হলো তিন মাস।

২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দেয়, যেখানে বলা হয় যে একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী তার প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে ইদ্দতকালের পরেও ভরণ-পোষণ দাবি করতে পারে, যদি সে জীবিকা নির্বাহে অক্ষম হয়। এই রায়টি ইসলামী বিধানের ‘মুতা’আ’র নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং নারীর অধিকার রক্ষায় একটি বড় পদক্ষেপ।

ইদ্দতকালীন ভরণ-পোষণ প্রদান করা স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক। ইদ্দত-পরবর্তী ভরণ-পোষণ যা ‘মুতা’আ’ নামে পরিচিত। এটি বাধ্যতামূলক না হলেও একটি উত্তম ও মানবিক কাজ। এটি স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী একটি আর্থিক সহায়তা বা উপহার হিসেবে গণ্য হবে।


 [MIH1]

শিয়া ফির্কার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

“শিয়া” (الشيعة) শব্দটি আরবি “شايَعَ – يُشايِعُ” ধাতু থেকে এসেছে। এর মৌলিক অর্থ হলো- অনুসরণ করা, সমর্থন করা, কোনো দলের পক্ষে হওয়া, ‘শিয়াতু ফুলান’ মানে: “অমুক ব্যক্তির দল বা অনুসারীরা”।

 ইবন মানজুর বলেন-

الشِّيعةُ: الأَتْباعُ والأَنصارُ

“শিয়া মানে অনুসারী ও সাহায্যকারী।

কুরআনে ‘শিয়া’ শব্দের ব্যবহার: কুরআনে “শিয়া” শব্দটি একাধিকবার এসেছে, তবে সবক্ষেত্রে ‘দল’, ‘উপদল’ বা ‘অনুসারী’ অর্থে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ফিরকা বোঝাতে নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ

“নিশ্চয়ই যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ডবিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।” সূরা আনআম :১৫৯

 এখানে “شِيَعًا” শব্দটি এসেছে “দল বা উপদল” অর্থে। এটা ফির্কাবাজির নিন্দা হিসাবে এসেছে।

فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَذَا مِن شِيعَتِهِ وَهَذَا مِنْ عَدُوِّهِ

তিনি (মূসা (আ.)) সেখানে দুই ব্যক্তিকে যুদ্ধরত দেখতে পেলেন। এক জন ছিল তাঁর শিয়া (অনুসারী), আর অন্যজন ছিল তাঁর শত্রুদের অন্তর্ভুক্ত।” সূরা কাসাস :১৫

এখানে শিয়া মানে: “নিজ দলের লোক” বা “সহযোগী”।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন-

وَإِنَّ مِن شِيعَتِهِ لَإِبْرَاهِيمَ

নিশ্চয়ই ইব্রাহীম ((আ.)) ছিলেন তাঁর (নূহ (আ.)) শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত।” সূরা সাফফাত : ৮৩

এখানে “শিয়া” মানে: নূহ (আ.)-এর অনুসারী বা তাঁর পথের লোক।

“শিয়া” শব্দটি কুরআনে এসেছে মূলত নিরপেক্ষ অর্থে “দল বা অনুসারী”। তবে পরবর্তীতে এটি ‘আলি (রা.) এর অনুসারী একটি ধর্মীয় মতবাদ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে যার সাথে কুরআনে এ শিয়া শব্দের কোন সম্পর্ক নাই।

শিয়াদের উৎত্তির সময় ও প্রাক্ষাপট :

উমার (রা.) এর আমলে মুসলিমরা পারস্য (ইরান) জয় করে । তখন পারস্য বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন হরমুজান। হরমুজানকে বন্দী করে মদিনা নিয়ে আসা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড প্রদানের হুকুম দান করা হয়। মৃত্যুদণ্ড প্রদানের আগে তার শেষ ইচ্ছ্ জানতে চাওয়া হয়। সে তার মৃত্যুদণ্ড এড়াতে একটি ছলনার আশ্রয় নেয়। পানি চেয়ে বলে এটাই তাঁর শেষ ইচ্ছা যে, এ পানি পান না করা পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা হবে না। খলিফার তরফ থেকে প্রতিশ্রুতি পেয়ে সে পানি পান না করে ফেলে দেয়। এ কারণে উমার (রা) তাকে আর হত্যা করেন নাই। হরমুজান, উমর (রা.) প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ও তার মহানুভবতার জন্য ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় এটা ছিল তার লোক দেখানো সে অন্তরে ছিল চরম প্রতিশোধ নেয়ার নিয়ত করে। 

মুক্তি পেয়ে হরমুজান মদিনাতেই বসবাস করতে থাকে এবং উমার (রা.) কে হত্যা করার পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। এ কাজে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয় জাফিনা আল খালিল (খ্রিষ্টান) এবং সাবা ইবনে শামুন (ইহুদি)। তারা একসাথে মিলে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা সাজাতে থাকে। কারণ, হরমুজাখানের পারস্য বাহিনী এবং  জাফিনার রোমান বাহিনীকে মুসলিমরা পরাজিত করে সমূলে উৎখাত করেছে। অপর পক্ষে সাবার ইহুদি গোষ্ঠীকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছে মুসলিমরা। সকলের একটাই লক্ষ মুসলমানদের বিরুদ্ধ প্রতিশোধ।

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য অভূতপূর্ব বিস্তার লাভ করে। পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্য এবং বাইজান্টাইনদের বিশাল অংশ মুসলিমদের আয়ত্তে চলে আসে। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, বিচারের কঠোরতা ও ইনসাফের জন্য তিনি মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের নিকটেই প্রিয় ছিলেন। তবে এই সাফল্যে কিছু পরাজিত মানুষের মাঝে বিদ্বেষের জন্ম নেয়। তার শাসনের অধীনে বিপুল সংখ্যক বিজিত অমুসলিমদের প্রবেশ এবং তাদের একাংশের অন্তর্নিহিত বিদ্বেষ। এই সকল অঞ্চলের বন্দী ও দাসেরা আরব ভূমিতে এনে রাখা হতো। এদের অনেকেই ছিল যুদ্ধবন্দি, পরাজিত জাতির সদস্য, যারা ইসলামের প্রতি হিংসা লালন করত। তাদের মধ্যে একজন ছিল আবু লুলু ফিরোজ নামে একজন পারস্যবাসী, যিনি একজন অগ্নিপূজক মাজুসি ছিলেন। সে ছিল একজন দক্ষ কারিগর এবং কাঠ ও ধাতব কাজ জানত। আবু লুলু ফিরোজ মদিনায় অবস্থান করছিল এক সাহাবি, মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা.)-এর অধীন দাস হিসেবে। সে পারস্যের পতনের জন্য সে উমর (রা.) কে দায়ী করত। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বৃহত্তর বিদ্বেষপ্রসূত পরিকল্পনার অংশ, যার পেছনে কিছু ফারসি (ইরানি) জাতীয়তাবাদী মনোভাব কাজ করছিল। মুসলিম খেলাফতের শক্তি ও উমর (রা.) এর নেতৃত্ব দুর্বল করার উদ্দেশ্যও এতে জড়িত ছিল। 

অনেক ঐতিহাসিকের মতে হরমুজান, জাফিনা আল খালিল (খ্রিষ্টান) এবং সাবা ইবনে শামুন (ইহুদি) এ তিন জনের ষড়যন্ত্রের কারণে ২৩ হিজরি (৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) সালের মুহাররম মাসে, ফজরের সালাতের সময় মসজিদে নববীতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। উমর (রা.) ইমাম হিসেবে দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করেন। ঠিক সেই সময়, আবু লুলু ফিরোজ একটি দ্বি-ধারী বিষাক্ত ছুরি নিয়ে পেছন থেকে তাঁর উপর আক্রমণ করে। সে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করে এবং আশেপাশে থাকা আরও কয়েকজন মুসল্লিকেও আহত করে। আবু লুলু ফিরোজ হামলার পর পালাতে গেলে মুসল্লিরা তাকে ধাওয়া করে। ধরা পড়ার আগেই সে নিজেই আত্মহত্যা করে ফেলে। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে উমর (রা.) অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরে তাঁকে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিন দিন তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন। এ হত্যাকাণ্ড শুধু উমর (রা.) এর জীবনাবসানই নয়, বরং একটি স্থিতিশীল ইসলামি রাষ্ট্রকে গভীর রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখোমুখি করে তোলে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর খলিফার দায়িত্ব বিষয়ে পরামর্শ করেন এবং উসমান (রা.), আলি (রা.), তালহা (রা.), যুবায়র (রা.), সাদ (রা.) এবং আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রা.) এই ছয়জনকে পরামর্শ দিয়ে পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের দায়িত্ব অর্পণ করেন। সবার পরামর্শে উসমান উসমান (রা.) কে খলিফা নির্বাচিত করা হয়।

উমর (রা.) এর হত্যা কাণ্ডের বিচার :

এই হত্যা কাণ্ডের পর পরই উমার (রা) এর ছেলে উবাইদুল্লাহ হরমুজান ও জাফিনাকে হত্যা করেন। কিন্তু প্রতারণ ইহুদি সাবা বেঁচে যায়। সাবা আড়ালে থেকে প্রতারণা মাধ্য তার কাজ চালিয়ে জেতে থাকে। এত পর্যায় উমর পুত্র উবাইদুল্লাহকে হরমুজ খান ও জাফিনাকে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। তাঁর বিচারের দাবিতে নবনিযুক্ত খলিফা উসমান (রা) এর সামনে উপস্থিত করা হয়। আলি (রা) বললেন, উবাইদুল্লাহ বিনা প্রমাণে তৎক্ষণাৎ হত্যা করেছে, যেটা ইসলাম মানে না। কারণ হরমুজান, জাফিনা আল খালিল যে উমর (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত তার প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে কেউ দিতে পারে নাই। তাই আলি (রা) বলেন, এটা তাঁর করা উচিত হয়নি। আলি (রা) এর পক্ষে মদিনার অনেকেই সমর্থন দেন। আবার উবাইদুল্লার প্রতিও অনেকে সমর্থন দেন। তখন তারা দুই ভাগ হয়ে যান। অপঃপর, উসমান (রা) উবাইদুল্লাহ এর পক্ষ হতে কিসাস আদায় করেন।

উসমান (রা.) বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার ষড়যন্ত্র :

উমর (রা.) কে হত্যার করার মাধ্যমে ইহুদি পরিকল্পনা সফল হতে শুরু করেছে। ইহুদি সাবা পরিকল্পনা করে তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে বললেন, মুসলিমদের দেখিয়ে ইসলাম গ্রহণ করান। তার উদ্দেশ্য ছিল যেন এরপর থেকে সহজেই মুসলিমদের গোপন খবর পেতে পারে। ভিতর থেকে মুনাফিকি করে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে এমন একজনের খুবই দরকার।

ঐতিহাসিকের মতে, ইসলাম ধর্মে বিভক্তি আর ধ্বংসের প্রত্যয় মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় খলিফার উসমান (রা.) খেলাফতকালে ইয়েমেনের অধিবাসী ইয়াহুদি সাবা, তার সন্তান আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের ভান করে সে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। প্রথমে সে মদিনায় কিছু দিন ষড়যন্ত্র করে সফল না হয়ে বসরা যান। এক সময় সিরিয়াও গিয়ে ছিল। এই সব জায়গা পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করতে না পেরে অবশেষে মিশর গমন করেন। এখানে সে তার দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের জন্য কিছু সাহায্য কারি পেয়ে যায়।  এরই সুযোগে সে প্রচার করে যে, মুসলানদের প্রতি আমার আশ্চর্য লাগে, যারা পৃথিবীতে ঈসা ((আ.)) এর পুনরায় আগমনের কথা বিশ্বাস করে বিন্তু  মুহম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পুনরায় আগমনের কথা বিশ্বাস করে না। অথচ মুহম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ  ঈসা ((আ.))  এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তার এই কথা অনেক অজ্ঞলোক মেনে নেয়। অতঃপর সে খলিফা উসমান ইবন আফফান (রা.) বিরুদ্ধে মানুষদের মিথ্যা প্রচারণ মাধ্যমে ক্ষেপিয়ে তুলে। উসমান ইবনে আফফান (রা.) এর বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের উত্থাপিত মিথ্যা অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা প্রচার করে, আলি (রা.) খলিফা হওয়ার অধিক হকদার কারণ তিনি ছিলেন রাসূল ﷺ এর প্রকৃত উত্তরাধিকারী। উসমান রা. খিলাফতের উপযুক্ত নন। তিনি নবি ﷺ এর পরিবারের লোকদের (আহলুল বাইত) খিলাফতের অধিকারের প্রতি অবিচার হয়েছে।

২. উসমান (রা.) সরকারি কোশাগার থেকে নিজের পরিবার ও বন্ধু-স্বজনদের অত্যধিক সম্পদ বিতরণ করেছেন। প্রকৃত সত্য হলো খিলাফতের পূর্বেও উসমান (রা.) একজন দাতা ছিলেন।  সরকারি কোশাগার থেকে সম্পদ প্রদান করা একটি মিথ্যা অভিযোগ মাত্র।

৩। আত্মীয় প্রীতির অভিযোগ এনে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা প্রচার করে উসমান (রা) তার আত্মীয়দের, বিশেষত বনু উমাইয়ার সদস্যকে প্রাদেশিক গভর্নর নিযুক্ত করেন।

৪। উসমান (রা.) শাসনে কুরআন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। বাস্তবতা ছিল কোন কোন অঞ্চলে কুরআনের কিছু নকল করা অংশ ভুল পেলে তিনি তা পুড়িয়ে ফেলে। মূল কুরআন যা আবু বক্করের শাসনামলে একত্র করা হয়ে ছিল, তা সম্পাদনা করে সাতটি কপি করে, সাতটি প্রদেশে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সাবা এ ঘটনা বিকৃতি বলে অপপ্রচার চালায়।

৫। উসমান (রা.) বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তিনি সাহাবিদের (রা.) প্রতি অবিচার করছে। বাস্তবতা ছিল উমর (রা.) শাসনামলে সময় মসজিদে নববী সম্প্রসারণের জন্য কিছু জমি অধিগ্রনের সিদ্ধান্ত হয়। উমর (রা.) এর কঠোরতার কারনে কেউ কিছু বলার সাহস পায় নি। কিন্তু উসমান (রা.) সময় জমি অধিগ্রনের বাধা প্রদান করে। উসমান (রা.) বাধা উপেক্ষা করে উমর (রা.) এর নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। ইবনে সারাহ এ ঘটনাকে সাহাবিদের উপর জুলুম বলে মিথ্যা প্রচারণা চালায়।

৬। উসমান (রা.) বিরুদ্ধে কিছু ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘন অভিযোগ এনে ইবনে সাবা প্রচারণ চালায় যে, তিনি নবির সুন্নাহ পরিবর্তন করেছেন যেমন- জুমার নামাজে দ্বিতীয় আজান প্রচলন করেছেন, তিনি তামাত্তু হজ্জ আদায় করেছেন, তিনি হজে মিনায় সালাত কসর করেন নাই ইত্যাদি।

৭। মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ (রা.) এবং কিছু প্রাদেশিক গভর্নরদের উপর জনগণের অভিযোগ সত্ত্বেও উসমান (রা.) তাদের অপসারণ করেননি বলে মিথ্যা প্রচার করা হয়। বাস্তবতা ছিল,  উসমান (রা.) গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন যে ঐ সকল প্রাদেশিক গভর্নরদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক।

এই অভিযোগগুলো ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত। উসমান (রা.) ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ খলিফা। তাঁর শাসনামলে ইসলামি রাষ্ট্র ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়, এবং তিনি কুরআনের সংকলনের মতো মহান কাজ সম্পন্ন করেন। বিদ্রোহীদের অপপ্রচার ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি শহিদ হন। ইতিহাসবিদরা (যেমন—তাবারী, ইবনে কাসির) লিখেছেন যে, ইবনে সাবা একটি বিভ্রান্তিকর গোষ্ঠী তৈরি করে উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর শাহাদাতের কারণ হয়।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মিথ্যা প্রচারণায় ইসলামি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ :

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মিথ্যা প্রচারণার প্রভাবে অজ্ঞ ও সদ্য ইসলামগ্রহণকারী কিছু লোক অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে এবং তাদের মধ্যে  মূলত তিনটি প্রধান গোষ্ঠী উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অংশ নেয় এবং শেষে মদিনায় তাঁর বাড়ি অবরোধ করে। এ তিনটি গোষ্ঠী হলো-

ক. মিসরীয় বিদ্রোহী দল :

মিশর থেকে প্রায় ১,০০০ জনের একটি দল মদিনায় আসে। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আল-গাফিকি ইবনে হারব আল-কিন্দি ও কিনানা ইবনে বিশর। তারা দাবি করেছিল যে উসমান (রা.) মিসরের গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে সা‘দকে অপসারণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।

খ. কুফার বিদ্রোহী দল :

কুফা থেকে একটি দল আমর ইবনে আল-আস (পরবর্তীতে তাঁর ভূমিকা পরিবর্তন হয়) ও অন্যান্যদের প্ররোচনায় এসেছিল।

গ. বসরার বিদ্রোহী দল :

বসরা থেকেও কিছু লোক যোগ দেয়, যদিও তাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।

এই দলগুলো ইবনে সাবার প্রভাবিত কিছু চরমপন্থি দ্বারা নেতৃত্ব পেয়েছিল, যারা উসমান (রা.) কে সরিয়ে আলি (রা.) কে খলিফা বানানোর লক্ষ্যে কাজ করছিল।

অবরোধের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ইসলামি ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে:

বিদ্রোহীরা মদিনায় পৌঁছে উসমান (রা.) এর কাছে তাদের অভিযোগ পেশ করে। তিনি তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং মিসরীয় দলকে উসমান (রা.) বুঝিয়ে শান্ত করেন। এ তারা বিদ্রোহ ত্যাগ করে ফিরে জেতে সম্মত হন।

মিসরীয়রা ফেরার পথে একটি ঘোড় সওয়ার দেখে তাকে আটকায়। তার কাছ থেকে তারা একটি সীলমোহরযুক্ত চিঠি পায়, যা উসমান (রা.) এর পক্ষ থেকে মিসরের গভর্নরের কাছে লেখা বলে দাবি করা হয়। চিঠিতে নির্দেশ দেওয়া ছিল যে, মিসরীয় বিদ্রোহীদের ফিরে আসার পর যেন তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। তারা বুঝতে পারে এ পত্রের মাধ্যমে তাদের শান্তি প্রদানের কথা উল্লেখ আছে। তাই তারা মিসরে ফিরে না গিয়ে মদিনায় ফিরে আসে।  তারা মদিনায় ফিরে চিঠিটি উসমান (রা.)-কে দেখায়। তিনি আশ্চর্য হয়ে যান এবং শপথ করে বলেন যে এটি তিনি লেখেননি বা সীলমোহর ব্যবহার করেননি।

কোন কোন ঐতিহাসিকের মনে, উসমান (রা.) এর সচিব মারওয়ান ইবনে আল-হাকাম এর সাথে জড়িত ছিল কিন্তু উসমান (রা.) এতে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন। আবার কিছু বর্ণনায় বলা হয়, এটি ইবনে সাবার ষড়যন্ত্র ছিল, যাতে বিদ্রোহীরা উসমান (রা.) এর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়। (এই ঘটনাটি তাবারী, ইবনে কাসির, ও আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া তে উল্লিখিত হয়েছে। তবে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে যে চিঠিটি কে লিখেছিল—মারওয়ান নাকি ইবনে সাবার অনুসারীরা)

উসমান (রা.) এর ধৈর্য ও রক্তপাত এড়ানোর নীতি:

খলিফা উসমান ইবন আফফান (রা.) বিদ্রোহের সময় পরিস্থিতি খুব সহজেই সামরিক শক্তি ব্যবহার করে দমন করতে পারতেন। মদিনার চারপাশে ও অন্যান্য প্রদেশে তার আনুগত্যশীল অনেক সাহাবি, যোদ্ধা ও সেনাপতি ছিলেন। তবে তিনি কয়েকটি কারণে সশস্ত্র প্রতিরোধ না করে ধৈর্য ধারণ করেন এবং রক্তপাত এড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঐতিহাসিক দলিল ও বর্ণনা থেকে প্রমাণ:

ক. রক্তপাত এড়ানোর আকাঙ্ক্ষা :

উসমান (রা.) বলেন, ❝আমি চাই না আমার হাতে মুসলিমদের মধ্যে প্রথম রক্তপাত ঘটুক।❞ ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ৭

খ. সাহাবাদের প্রতিরোধের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান :

মদিনার যুবক সাহাবিগণ (যেমন আলি রা.-এর পুত্র হাসান ও হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর প্রমুখ) বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রস্তাব দেন। কিন্তু উসমান রা. বলেন, ❝যে ব্যক্তি আমার জন্য যুদ্ধ করবে, তার জন্য আমি আল্লাহর কাছে কোনো সাওয়াব আশা করি না।❞ [ইবন সাদ, আল-তাবাকাত আল-কুবরা

গ. আলি (রা.)-এর মাধ্যমে সাহায্য আসা সত্ত্বেও সাড়া না দেওয়া :

আলি (রা.) তার পুত্র হাসান (রা.)-কে উসমান (রা.)-এর রক্ষার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু উসমান (রা.) হাসান রাঃ-সহ অন্য সাহাবাদের বলেন, “আমি আপনাদের জান-মালের জন্য দায়ী নই; আপনারা চলে যান। আমি চাই না আমার কারণে কারও রক্তপাত হোক।”

উসমান (রা.) হত্যার ঘটনা :

বিদ্রোহীরা উসমান (রা.)-এর বাড়ি ঘেরাও করে তার ঘরের পানি বন্ধ করে দেয়। উসমান (রা.) ও তাঁর পরিবার তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েন। সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) ও অন্যান্যরা গোপনে পানির মশক পৌঁছে দিতে চাইলে বিদ্রোহীরা বাধা দেয়। তাঁকে মসজিদে যেতে দেওয়া হয়নি, ফলে তিনি বাড়িতেই জামাত আদায় করেন।

আলি (রা.), তালহা (রা.) ও যুবাইর (রা.) বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা করেও ব্যর্থ হন। এ সকল সাহাবি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করলেও উসমান (রা.) অনুমিত প্রদান করে নাই। এতে তালহা (রা.) ও যুবাইর (রা.) খুবই মনোখুন্ন হন।

যুল-হুজ্জা ১৮, ৩৫ হিজরি ভোরে বিদ্রোহীরা বাড়িতে ঢোকার সুযোগ খুঁজতে থাকে। প্রথমে কিছু বিদ্রোহী দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে, কিন্তু উসমান (রা.)-এর স্ত্রী নায়লা (রা.) ও অন্যান্য পরিবার সদস্যরা বাধা দেন। পরবর্তীতে কিনানা ইবনে বিশর আল-মিসরি ও আমর ইবনে হামিক নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র লোক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। উসমান (রা.) তখন কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। হত্যারাকারীরা তাঁর হাতের কুরআনটি ছিনিয়ে নিয়ে তরবারি দিয়ে আঘাত করে। প্রথমে কিনানা ইবনে বিশর উসমান (রা.)-এর মাথায় আঘাত করে। সুদান ইবনে হামরান নামক এক ব্যক্তি লোহার রড বা তরবারি দিয়ে তাঁর বুকে আঘাত করে। রক্তে ভেসে যায় কুরআনের পাতাগুলো এবং মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)  ৮২ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন।

উসমান (রা.) এর লাশ ৩ দিন অবহেলিত থাকে, কারণ বিদ্রোহীরা দাফনে বাধা দেয়। শেষে জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) ও কয়েকজন সাহাবি গোপনে রাতে জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করেন। এই হত্যাকাণ্ড ইসলামি উম্মাহর প্রথম ফিতনা (গৃহযুদ্ধ)-এর সূচনা করে, যা জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে রূপ নেয়।

ঐতিহাসিক সূত্র এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়: ইবনে সাদের “আত-তাবাকাত আল-কুবরা”, অষ্টম খণ্ড. পৃ.-২৩-৩১, তাবারির “তারিখ আল-উমাম ওয়াল মুলুক” চতুর্থ খণ্ড, পৃ.-৩৯০-৪০৫, ইবনে কাসিরের “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৮০-১৯০

আলি (রা.) কে খলিফা নির্বাচিত করা :

উসমান (রা.) এর শাহাদাতের পর মদীনার সাহাবিগণ ব্যাপকভাবে আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেন। আলি (রা.) প্রথমে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন এবং সাহাবিদের এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। যার কারণে লোকজন সাদ (রা.), তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.) প্রমুখের নিকট গিয়ে খলিফা হবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তারাও রাজি হলেন না। অতঃপর আলি (রা.) বললেন, সবাই তাঁকে মানলেই তিনি খলিফা হবেন। মানুষের চাপ ও পরিস্থিতির বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। খলিফা নির্বাচিত সভায় সাহাবিগণ তাদের সাথে বিশিষ্ট সাহাবি তালহা (রা.) ও জুবায়ের (রা.) কে হাজির করেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনারা আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে মানবেন কিনা? তারা নীরব রইলেন এবং পরবর্তীতে তারা দুজন শর্তসাপেক্ষে বাইয়াতে গ্রহণ করেন। ফলে মদীনাবাসী অনেক বদরী সাহাবি, আনসার সাহাবি ও সাধারণ মুসলিমদের একটি বড় অংশ আলি (রা.) কে খলিফা হিসেবে সমর্থন করেছিলেন। ইবনে আব্বাস (রা.), আবু আইয়ুব আনসারি (রা.), আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.), আবু জার আল-গিফারী (রা.), সালমান আল-ফারিসী (রা.), মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা.) প্রমুখ নামকরা সাহাবিরা তাঁর পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করেন।

আয়িশা (রা.) ও আলি (রা.) মাঝে যুদ্ধ ছিল মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এর ষড়যন্ত্রের ফল :

উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ চরম অস্থিরতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। উনার হত্যাকারীরা সংগঠিতভাবে মদিনায় অবস্থান করে এবং নতুন খলিফা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে। অবশেষে আলি (রা.) খলিফা নিযুক্ত হন, তবে উনার শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই, আয়িশা (রা.), তালহা (রা.) ও যুবায়ের (রা.) উসমান (রা.) এর হত্যার ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধ দাবি করে আন্দোলনে নামেন। এই সময় আয়িশা হজ পালনের জন্য মক্বা অবস্থান করছিলেন। হজ পালন শেষে আয়িশা (রা.) মক্কায় ফেরার পথে উসমান (রা.)-এর হত্যার খবর শুনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। তালহা ও যুবায়ের (রা.) তাঁর সঙ্গে একত্র হয়ে বসরার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, খুনিদের বিচারের জন্য জনগণকে সংগঠিত করা এবং খলিফা আলি (রা.)-এর উপর চাপ সৃষ্টি করা যেন তিনি দ্রুত বিচার কার্য সম্পন্ন করেন। আলি (রা.) নিজেও বিচারের পক্ষে ছিলেন, তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, খুনি দলগুলোর ছদ্মবেশ এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা বিচারে বিলম্ব ঘটায়।

এমতাবস্থায়, ৩৬ হিজরিতে বসরা শহরে আলি (রা.) ও আয়িশা, তালহা ও যুবায়ের (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন পক্ষের মধ্যে প্রথমে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলেও, উভয় পক্ষ মুসলিম রক্তপাত এড়াতে সমঝোতার সিদ্ধান্তে উপনীত হন এবং একটি চুক্তি পৌছাতের সম্মত হন। চুক্তির বিষয়বস্তু ছিল:

ক. উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের ব্যবস্থা করা হবে।

খ. উভয় পক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে বসরা শহর ছেড়ে চলে যাবে। কোন প্রকার রক্তপাত বা যুদ্ধ হবে না।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা (সাবাঈয়্যা) তারা আলির বাহিনীতে ও প্রতিপক্ষের বাহিনীতেও নিজেদের লোক ঢুকিয়ে রেখেছিল। তারা জানত, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ফিরে আসবে এবং তারা মুখোশহীন হয়ে যাবে এবং খলিফা উসমান হত্যায় তারা অভিযুক্ত হয়ে বিচারের সম্মুখীন হবে। তাই তারা রাতে দুই পক্ষের উপর গোপনে হামলা করে, যেন উভয় পক্ষ একে অপরকে বিশ্বাসঘাতক ভাবে। ফলে, পরদিন সকালে দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। উভয়েই ধারণা করে প্রতিপক্ষ রাতের আক্রমণের জন্য দায়ী। এ থেকেই শুরু হয় জামালের যুদ্ধ, যা ছিল এক মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ। এ কথার দলিল ও ঐতিহাসিক সূত্র উল্লেখ করছি :

ক. ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, “আলি (রা.) ও আয়িশা (রা.) সহ সাহাবারা শান্তিচুক্তিতে উপনীত হন। কিন্তু যাদের হাতে উসমান (রা.)-এর রক্ত লেগে আছে, তারা দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করে, এবং যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়।” ইবন কাসীর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ২৩৫–২৪০

খ. ইবন আবী শাইবা (রহ.) বলেন, “আলি ও তালহা-যুবায়ের (রা.) উভয়েই সন্ধির বিষয়ে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু রাতের আঁধারে অজ্ঞাতনামা একদল সেনা দুই শিবিরে হামলা চালায়।”  মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা, খণ্ড ৭

গ. তাবারী (আল-তাবারী) লিখেন, “সাবাঈয়্যাহ গোপনে উভয় বাহিনীতে প্রবেশ করে। তারা জানত, যদি মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে। তাই তারা যুদ্ধ বাধানোর জন্য পরিকল্পিত হামলা করে।” তারীখ আল-তাবারী, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৪৩৬

সারকথা হলো : আলি (রা.) ও আয়িশা (রা.)-এর মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, উভয়েই রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার দল ইসলামি সমাজে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে উম্মাহকে দুর্বল করতে সচেষ্ট ছিল। তাদের গোপন ষড়যন্ত্রে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয় এবং জামালের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যুদ্ধ হল এবং যুদ্ধ চলার এক পর্যায়ে আলি (রা) জুবায়ের (রা) এর কাছে গিয়ে বললেন, “মনে আছে? একদিন রাসুল বলেছিলেন তুমি ভবিষ্যতে অন্যায়ভাবে আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে?” জুবায়ের বললেন, “ও! হ্যাঁ! তাই তো!” সাথে সাথে জুবায়ের (রা) যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে চলে গেলেন। ইবনে সাবার এক লোক জুবায়েরের পিছু নেয়। পরে জুবায়ের (রা) জোহোর এর নামাজ শুরু করতেই তাঁকে খুন করল। আনন্দের সাথে আলি (রা) এর কাছে এল খুনি, এরপর জুবায়েরের (রা) তরবারি, বর্ম পেশ করল। আলি (রা) তাঁকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিলেন। সাথে সাথে, সেই লোক পেটে তরবারি ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করল। অন্যদিকে তালহা (রা) যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করার সময় একটি তীরের আঘাতে মারা যান। আলি (রা) এ উভয়ের মৃত্যুর কথা শুনে মনবেদনায় কাতর হয়ে পড়লেন।

আলি (রা) বুঝতে পারলেন, যুদ্ধ সহজে শেষ হবে না। যতক্ষণ আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিবেন, ততক্ষণ চলবে যুদ্ধ। দশ হাজার মুসলিম মারা যাবার পর আলির (রা) বাহিনীর একজন উট পর্যন্ত পৌঁছে পা কেটে ফেলেন। ফলে উট বসে পড়ল। আর আয়িশার (রা) বাহিনীর মন ভেঙ্গে গেল। পরে, আলি (রা) আয়িশার (রা) হাওদাটি অদূরে নিয়ে গিয়ে পর্দা দিয়ে ঘিরে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরপর সেখানে ঢুকে কুশল জিজ্ঞেস করলেন। তারা পরস্পরের কাছে ক্ষমা চাইলেন। যুদ্ধ বন্ধ হল। এ যুদ্ধ জামাল (উট) যুদ্ধ নামে পরিচিত। কারণ, আয়িশা (রা) উটের উপর থেকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। মুসলিমদের যতই ক্ষতি হোক, লাভ হল ইসলামের শত্রুদের। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৩৬ হিজরী সনের জুমাদাল উখরা মাসে। এই ঘটনা বিস্তারি জানান জন্য ইসলামি ফাইন্ডেসনের প্রকাশিত, ইবনে কাসির রহ. লিখিত “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ৭ম খণ্ড” দেখার অনুরোধ রইল

সিফফিন যুদ্ধের পটভূমি ও ষড়যন্ত্রকারীদের ভূমিকা :

উসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহ ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ে। আলি (রা.) খলিফা নিযুক্ত হলে, মুসলিম বিশ্বের বড় একটি অংশ তাঁর নেতৃত্ব মেনে নেয়, কিন্তু সিরিয়ার গভর্নর আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) যিনি উসমান (রা.)-এর আত্মীয়ও ছিলেন, তিনি খিলাফতের বিরোধিতা করেন না, তবে উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি করেন। ইবনে কাসির বলেন-

মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফতের দাবিদার ছিলেন না, বরং উসমান (রা.)-এর হত্যার বদলা ও বিচার দাবি করছিলেন। তিনি আলি (রা.)-কে চিঠিতে লিখেন, ‘তুমি খলিফা হও বা না হও, আগে খুনিদের বিচার হওয়া চাই।’ ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-২৪৮-২৫০

আলি (রা.) পরিস্থিতির বাস্তবতা বিবেচনায় সময় নিয়ে ন্যায়বিচার করতে চাইলেও, মুয়াবিয়া (রা.) মনে করতেন অপরাধীদের দেরিতে বিচার হলে তা জুলুমের সমান। এই ভিন্নমত থেকেই ৩৭ হিজরিতে সিরিয়ার সীমানায় ‘সিফফিন’ নামক স্থানে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়। আলি (রা.) এই সংঘাত এড়াতে প্রথমে সংলাপের চেষ্টা করেন, কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা (বিশেষত উসমান (রা.)-এর খুনিরা) দুই পক্ষের সংঘর্ষ বাধিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে।

আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়ালিদ আল-মাকদিসী বলেন, সাবাঈয়্যাহ দল আলির (রা.) বাহিনীতে গোপনে প্রবেশ করে এবং যুদ্ধ বাধিয়ে উম্মাহকে বিভক্ত করার চক্রান্ত করে। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সপ্তম খণ্ড

এই ষড়যন্ত্রে অন্যতম ভূমিকা রাখে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার অনুসারীরা, যারা একদিকে আলির বাহিনীতে ঢুকে পড়ে, অন্যদিকে সিরিয়ার পক্ষেও বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মুসলিম নেতৃত্বে স্থায়ী ফাটল সৃষ্টি করা, যাতে ইসলামি রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, মারওয়ান ইবনে হাকাম, যিনি উসমান (রা.)-এর আত্মীয় ছিলেন, তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-কে প্রতিশোধে আরও উৎসাহী করেন। মারওয়ান যুদ্ধ চেয়েছিলেন, কারণ এতে উসমান (রা.)-এর খুনিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করতেন। ফলে, ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিরোধ সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।

সিফফিন যুদ্ধ ছিল মূলত দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যের দ্বন্দ্ব, কিন্তু তা ষড়যন্ত্রকারীদের কারণে রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। পরে এই যুদ্ধ তাহকীম বা সালিসির মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টায় রূপান্তরিত হয়, কিন্তু তা-ও নতুনভাবে ফিতনার জন্ম দেয়, যার ফলে খারিজি মতবাদের উৎপত্তি ঘটে।

৩৭ হিজরিতে সিফফিন যুদ্ধে আলি (রা.) ও  মুয়াবিয়া (রা.) এর বাহিনী মুখোমুখি হলে দীর্ঘ যুদ্ধের পর মুসলিম রক্তপাত বন্ধ করতে তাহকীম বা সালিসির প্রস্তাব আসে মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে। যুদ্ধ চলাকালে, হঠাৎ মুয়াবিয়ার সেনারা কুরআনের পৃষ্ঠা বর্শার মাথায় তুলে সালিসির আবেদন জানায়  “আসুন কুরআনের নির্দেশে সিদ্ধান্ত নিই।”আলি (রা.) প্রথমে বলেন-

الْكِتَابُ أَنَا نَاطِقُهُ

“আমি তো কুরআনের ভাষ্যকার (অর্থাৎ আমি নিজেই কুরআনের নির্দেশ মেনে চলছি)।

তাঁর সেনাবাহিনীর একটি অংশ চাপ দিলে তিনি তাহকীম মেনে নিতে সম্মত হন, তখন তাঁর সেনাবাহিনীর একটি উগ্রপন্থী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা বলে-

لا حُكْمَ إِلَّا لِلَّهِ

“হুকুম কেবলমাত্র আল্লাহরই, কোনো মানুষের নয়।”

এ থেকেই খারিজি দল গঠিত হয়, অর্থাৎ যারা মূল শরিয়া ভিত্তিক জামাআত থেকে ‘বেরিয়ে যায়’। খারিজিদের দাবি ছিল, আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) উভয়েই ‘তাহকীম’ মেনে ভুল করেছেন, তাই তারা কাফির! যে কেউ বড় গোনাহ (সালিসি) করে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়।

ইবন কাসীর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলেন-

“তাহকীমের বিরোধিতা থেকে একদল লোক আলির (রা.) বাহিনী ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তারা এতটাই চরম ছিল যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরে।  আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া,সপ্তম, পৃ.-২৮৫

এ সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে একটি হাদিস এসেছে-

সুওয়াইদ ইবনু গাফালাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলি (রা.) বলেছেন, আমি কোন কথা রসুলুল্লাহ ﷺ এর পক্ষ থেকে বানিয়ে বলার চেয়ে- আমার আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করি। আর যখন আমি আমার ও তোমাদের মধ্যকার ব্যাপার নিয়ে কথা বলি তখন মনে রাখবে যে, যুদ্ধে কৌশল ও চাতুরতার আশ্রয় নেয়া বৈধ। আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনিঃ সে যুগে (অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে) এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা অল্প বয়স্ক ও স্বল্প বুদ্ধি-সম্পন্ন হবে। তারা সৃষ্টি জগতের চেয়ে ভাল ভাল কথা বলবে, তারা কুরআন মাজীদ পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের গলার নীচে যাবে না। তীর যেভাবে শিকার থেকে বেরিয়ে যায় তারাও অনুরূপভাবে বেরিয়ে যাবে। অতএব, তোমরা তাদের সাথে মুখোমুখি হলে তাদের হত্যা করে ফেলবে। কেননা তাদেরকে যারা হত্যা করবে তারা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সাওয়াব পাবে। সহিহ মুসলিম : ১০৬৬

তাহকীমের (সালিসির) পর আলি (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.) এর মধ্যকার সম্পর্ক আরও জটিল হয়, যা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য চরম সংকট ডেকে আনে। উভয় পক্ষের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে যায়

আলি (রা.) তাহকীমে সম্মতি দেয়ায় খারিজিরা তাঁকে ‘কাফির’ বলে ঘোষণা করে এবং বিদ্রোহ করে।

ইতিমধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) নিজেকে “আমীরুল মুমিনীন” বলে ঘোষণা করেন এবং শাম অঞ্চলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।  মুয়াবিয়া (রা.)-এর রাজনৈতিক শক্তি বাড়ার কারনে শাম, মিশর, ও অন্যান্য প্রদেশ ধীরে ধীরে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে। মিসরের গভর্নর মুহাম্মদ ইবনু আবি বকর (আলি রা. এর নিয়োজিত) নিহত হন এবং মিসর মুয়াবিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

আলি (রা.) এর সেনাবাহিনী খারিজি বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তার অবস্থান কিছুটি দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, অন্যদিকে মুয়াবিয়ার প্রভাব, দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ে। ৪০ হিজরিতে (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে) এক খারিজি বিদ্রোহী আবদুর রহমান ইবনু মুলজিম আলি (রা.)-কে ফজরের নামাজে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। আলি (রা.) শাহাদাত বরণ করলে তাঁর ছেলে হাসান (রা.) খলিফা নিযুক্ত হন। পরের বছর ৪১ হিজরিতে হাসান (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর সন্ধি হয়। যার কারণে এ বছরকে বলা হয়,  আামুল জামায়া (ঐক্যের বছর)। মুসলিম রক্তপাত বন্ধের জন্য হাসান (রা.) নিজে স্বেচ্ছায় খিলাফত থেকে সরে গিয়ে মুয়াবিয়া (রা.) কে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ফলে উম্মাহর মধ্যে আবার একতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া লিখেন-

“তাহকীমের পর উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থাহীনতা চরমে পৌঁছে। আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পর হাসান (রা.) মুয়াবিয়াকে ক্ষমতা হস্তান্তর করে উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করেন।  আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, অষ্টম খণ্ড, পৃ.-১৩১–১৪৫

উসমান (রা.) কে হত্যার পর শিয়াদের আনুষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র :

উসমান (রা.) কে হত্যার পর। যখন মদিনার অধিকাংশ সাবাবি ও মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে আলি রা, খলীফা নির্বাচিত হয়ে তখন মদিনার সাহাবিদের পাশাপাশি উসমান (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত ক্ষুদ্র একটি মুনাফিক দল শিয়া জামাতের প্রতিষ্ঠিত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার নেতৃত্বেও আলি (রা.) কে সমর্থন দেয়। তারা মুনাফিকির নিয়তে আলি (রা.) পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই ক্ষুদ্র দলটি পরবর্তীতে আলি ও আহলে বাইয়াত নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করে। যেহেতু তারা আলি (রা.) এর পক্ষে বাড়াবাড়ি করে এবং তার অনুসারী দাবি করে। তাই তাদেরকে ‘শিয়ায়ে আলি’ বা আলির অনুসারী বলা হত। তখন থেকে ‘শিয়া’ বলতে আলি (রা.) এর অনুসারীদের বুঝান হত। বর্তমানে শিয়া বলা হয় এমন ব্যক্তিদের যারা ইমামতে বিশ্বাসী, আলি (রা.) ও আহলে বাইয়াত সম্পর্কে বিশেষ আকিদা বিশ্বাসীউসমান (রা.) কে হত্যার পর শিয়াদের আনুষ্ঠানিক ষড়যন্ত্র :

উসমান (রা.) কে হত্যার পর। যখন মদিনার অধিকাংশ সাবাবি ও মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে আলি রা, খলীফা নির্বাচিত হয়ে তখন মদিনার সাহাবিদের পাশাপাশি উসমান (রা.) এর হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত ক্ষুদ্র একটি মুনাফিক দল শিয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার নেতৃত্বেও আলি (রা.) কে সমর্থন দেয়। তারা মুনাফিকির নিয়তে আলি (রা.) পক্ষে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। এই ক্ষুদ্র দলটি পরবর্তীতে আলি ও আহলে বাইয়াত নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি করে। যেহেতু তারা আলি (রা.) এর পক্ষে বাড়াবাড়ি করে এবং তার অনুসারী দাবি করে। তাই তাদেরকে ‘শিয়ায়ে আলি’ বা আলির অনুসারী বলা হত। তখন থেকে ‘শিয়া’ বলতে আলি (রা.) এর অনুসারীদের বুঝান হত। বর্তমানে শিয়া বলা হয় এমন ব্যক্তিদের যারা ইমামতে বিশ্বাসী, আলি (রা.) ও আহলে বাইয়াত সম্পর্কে বিশেষ আকিদা পোষণ করে। তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাহাবিদের গালি দেয়া এবং আলি (রা.) কে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.) চেয়ে অধিকতর মর্যাদা অধিকারী মনে করে। তারা বিশ্বাস করে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর আগে “গাদির খুম” নামক স্থানে আলি (রা.) কে নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিনিধি এবং খলিফা নির্ধারণ করে যান। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পর সাহাবিগণ আবুবকর (রা.) এর নিকট সর্বসম্মতিতে বাইয়াত গ্রহণ করেন, আলি (রা.) কিংবা কেউ তাতে বিরোধিতা করেন নি।

আলি (রা.) এর যুগে শিয়াদের ফির্কা

ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি বলেন- আলি (রা.) এর যুগে যখন শিয়াদের উন্মেষ ঘটে তখন তারা তিন ভাগে বিভক্ত ছিল।

১। মুফাদ্দালাহ (প্রাধান্য দানকারী): তারা আলি (রা.) কে আবু বকর ও ওমর (রা.)মের উপর প্রাধান্য দিত।

২. সাব্বাবাহ (গালমন্দকারী): তারা আলি (রা.) কে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে, এমন কি আবুবকর ও ওমরকে পর্যন্ত গালমন্দ করে।

৩। গুলাত (সীমালঙ্ঘনকারী): তারা আলি (রা.) কে ইলাহ (উপাস্য) জানে, অর্থাৎ তারা বিশ্বাস করে তিনি ইলাহ, অথবা তার মাঝে ইলাহের কোনো অংশ প্রবেশ করেছে, যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বিশ্বাস করে। তারা যিন্দিক। তাদেরকে যিন্দিক বলার কারণ তারা প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়, কিন্তু অন্তরে কুফর গোপন করে। উত্স : ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি”  প্রকাশক ইসলাম হাউজ, সৌদিআরব।

এই তিন প্রকার শিয়াদের ব্যাপারে আলি (রা.) এর ফয়সালা :

১। মুফাদদালাহ : মুফাদদালাহদেন আলি (রা.) তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করতেন এবং ঘোষণা দিতেন যে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পর সর্বোত্তম উম্মত আবুবকর ও উমর (রা.)। যেমন- সহিহ বুখারিতে তার সূত্রে বর্ণিত আছে। সহিহ সূত্রে তার থেকে আরো প্রমাণিত, আলি (রা.) বলেছেন, “আবুবকর ও ওমরের উপর আমাকে প্রাধান্য দানকারী ব্যক্তিকে যদি আমার নিকট উপস্থিত করা হয় আমি অবশ্যই তাকে মিথ্যা অপবাদের শাস্তি আশিটি বেত্রাঘাত করবো”।

২। সাব্বাবাহ : সাব্বাবাহ সম্পর্কে আলি (রা.) এর ফয়সালা ছিল যে, তাদেরকে হত্যা করতে হবে। তার দলের কতক লোক আবুবকর ও ওমরকে গালমন্দ করে, এরূপ কথা তার নিকট পৌঁছলে তিনি তাদেরকে হত্যার জন্য তলব করেন, কিন্তু তারা পলায়ন করে।

৩. গুলাত (যিন্দিক) : গুলাতদের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত ছিল আগুনে পোড়ানো, তিনি পুড়িয়েছেনও। যা সহিহ বুখারি দ্বারা প্রমাণিত।

ইবনে আব্বাস (রা.) তাদেরকে পোড়ানো নিয়ে আপত্তি করেন, কারণ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ক্ষেত্রে নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই তাদেরকে তিনি তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে বলেন।

উত্স : ড. সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি”  প্রকাশক ইসলাম হাউজ, সৌদিআরব।

আলি (রা.) খিলাফতের সময় আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ইসলাম ধর্মে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সে ও তার অনুসারিগণ আলি (রা.) এর ব্যাপারে চরম সীমালঙ্ঘন করে, যার কিছু নমুনা তুলে ধরা হল :

১। আলি (রা.) এর উলুহিয়াত মতবাদ প্রকাশ করে :

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তার অনুসারীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় যে আলি (রা.) এর মাঝে উলুহিয়াত ক্ষমতা আছে।  ইবনে সাবার একদল অনুসারী আলি (রা.) এর দরজায় এসে বলে, “আপনিই সে?” তিনি বলেন, “সে মানে? তারা বলল, “আপনি আল্লাহ”। তিনি তাদেরকে তিন দিন সময় দেন, অতঃপর তাদেরকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারেন।

ইবন হাজর আল‑আসকলানি ফাথহুল বারি-তে বর্ণনাকারী ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত। “আলি (রা.) কিছু ‘জানার্দি’ (যেকোনও ব্যক্তি যিনি আলিকে ইলাহ বলছিল) বংশকে আগুনে পুড়িয়ে দেন। আল-ইবন আব্বাস (রা.) এই হত্যাকে অস্বীকার করেন না, তবে তিনি বলেন, ‘যদি আমি হইতাম, তবে আমি তাদের পোড়াতাম না, কারণ নবি (সা.) বলেছেন,’’ لَا تُعَذِّبُوا بِعَذَابِ اللَّهِ”  (‘আল্লাহর শাস্তি দিয়ে অন্যকে শাস্তি দিও না’)  বরং আমি তাদের হত্যা করতাম ঠিক যার মতো নবি নির্দেশ দিয়েছেন, “যে ধর্ম পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা করতে হবে। ইবন হাজর আল‑আসকলানি ফাথ্‌হুল বারি

২। আলি (রা.) ছাড়া কেউ কুরআন জমা করতে পারেনি :

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা দাবি করে বর্তমান কুরআন প্রকৃত কুরআনের এক নবমাংশ, আলি ব্যতীত কেউ পূর্ণ কুরআন জমা করতে সক্ষম হয়নি। আলি ও তার পরিবারকে নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ বাতেনি ইলম দ্বারা ভূষিত করেছেন। আলি (রা.) আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এ মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নবি ﷺ আমাকে কোনো ইলম দ্বারা খাস করেন নি।

তিনি ইবনে সাবাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, “আল্লাহর কসম তিনি অর্থাৎ নবি রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে একান্তে কিছু প্রদান করেন নি যা অন্যান্য মানুষ থেকে গোপন করেছেন। আমি তাকে বলতে শুনেছি। কিয়ামতের পূর্বে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী হবে, তুমি অবশ্যই তাদের একজন”।

৩। শিয়াগণ আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) কে গালমন্দ করত

ইবনে সাবা আবু বকর ও উমর (রা.) কে গালমন্দ করার উক্তি প্রকাশ করে, সে ধারণা করে আলি (রা.) তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করেন। যখন আলি (রা.) পর্যন্ত এ কথা পৌঁছে, তিনি বলেন, “আমার সাথে ও এ কালো খবিসের সম্পর্ক কি? আল্লাহর নিকট পানাহ চাই, তাদের ব্যাপারে ভালো ব্যতীত খারাপ কিছু গোপন করা থেকে”।

অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে মাদায়েন নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং বলেন: “আমার সাথে এক শহরে সে কখনো থাকতে পারে না”। অতঃপর তিনি মিম্বারে দাঁড়ান, যখন মানুষেরা জড়ো হল, তিনি আবু বকর ও উমরের অনেক প্রশংসা করেন, এবং জনগণকে শাসিয়ে তিনি এ বলে ভাষণ সমাপ্ত করেন। “জেনে রেখো, যার এ সম্পর্কে পৌঁছবে যে, সে আমাকে তাদের (আবু বক্কর ও উমর রা.) উপর প্রাধান্য দেয় আমি অবশ্যই তাকে অপবাদের দোররা মারব”।

সৌদি আলেম ডঃ সফর ই়বনে আব্দুর রহমান আল-হাওয়ালি, “বিভিন্ন ফের্কা, ধর্ম ও মতবাদের মূলনীতি” নামক গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। অন লাইলে প্রকাশ করেছে ইসলামহাইজ.কম

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ পারস্যে নির্বাসন

এই সব কার্যকলাপের দরুন আলি (রা.) ইবনে সাবাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু তিনি ফিতনা ও বিদ্রোহের আশঙ্কায় সরাসরি পদক্ষেপ নেননি। কারণ, ইবন সাবার অনুসারীরা সংখ্যায় কম ছিল না এবং তারা নিজেদেরকে ‘আলির সমর্থক’ বলে দাবি করত। এদেরকে প্রকাশ্যে দমন করলে, তারা “আলি নিজেই নবির পরিবার ও আহলুল বাইতের বিরুদ্ধাচরণ করছেন” এমন অপবাদ ছড়াতে পারত। এই আশঙ্কায় তিনি কৌশলগত ধৈর্য অবলম্বন করেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে নির্বাসনে পারস্যরা নিক্ষেপ করেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে পারস্যে নির্বাসনে পাঠাল আলি (রা.) সাময়িক স্বস্ত্বি পেলেও, ইবনে সাবাহ পেয়ে যান তার মতলব হাসিলের সূবর্ণ সুযোগ। চতুর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ সুযোগের সৎব্যবহারের কোন কমতি করেনি। ইবনে সাবার ভ্রান্ত আকিদা প্রচারের সূযোগসমুহ হল :

ক. নতুন ইসলাম দেশ :

পারস্যে ছিল ইসলামে প্রবেশকারী নতুন অনারব দেশ। তাদের ইসলাম গ্রহণের বয়স দশ/বার বছর। উমর সময়ে পারস্য বিজয় হয়। তাতে বসবাসকারী সাধারণ লোকদের অন্তর সাবেক আকিদার ভ্রান্তি থেকে তখনো পুরোপুরি মুক্ত হয়নি, তারা যে কোনো দাওয়াত গ্রহণ করার জন্য উৎসুক ছিল। তারা ইবনে সাবার দাওয়াত কে আসল ইসলাম মনে করে অকপটে গ্রহণ করে। ইবনে সাবার তার ভ্রান্ত বিশ্বাস ছড়ানোর জন্য সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায়।

খ. ক্ষমতাধরদের ইসলাম অপছন্দ :

পারস্যের ক্ষমতাধর লোকেরা ইসলাম ও তার অনুসারীদের অপছন্দ করত। কারণ ইসলাম তাদের রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়েছে, তাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে ও তাদের অগ্নিপূজার ধর্ম নিশ্চিহ্ন করেছে। 

গ. অগ্নিপূজারী ধর্মগুরুরা নাখোশ :

 অগ্নিপূজারী ধর্মগুরুরা ইসলামের প্রতি নাখোশ ছিল। তারাও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যে কোন কাজের সহযোগী ছিল। ইবনে সাবা ধর্মগুরুরা সাথে তাল মিলিয়ে ইসলাম বিকৃতিতে অংশ গ্রহণ কনে।

ঘ. পারস্যের জনগণের পুরান বিশ্বাস :

পারস্যের জনগণের স্বভাব ছিল শাসক পরিবারকে নিষ্পাপ জানা, প্রভুর স্তরে তাদের আনুগত্য প্রদান করা, শাসক পরিবার থেকে পরম্পরায় রাজত্বের মালিক বানানো, এমন কি তাতে পুরুষ সদস্য না থাকলে নারীই রাজত্বের মালিক হত। এই বিশ্বাসের পালে হাওয়া দিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহ  প্রচার করে আলি (রা.) নিষ্পাপ, ইলাহ ও রাজত্বের একক মালিক।

ঙ. ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা :

 ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অগ্নিপূজকদের পুরান বিশ্বাসের সূত্র ধরে। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ‘হুলুল’ আকিদা আলি (রা.) সম্পর্কে রচনা করে তার ব্যাপক প্রচার করে। এমন কি যখন তার নিকট আলি (রা.) এর হত্যার সংবাদ পৌঁছে, সে বলল, “যদি তোমরা একটি থলিতে তার মগজ নিয়ে আস আমি তার মৃত্যু বিশ্বাস করব না”। সে আরো বলে: “হত্যাকৃত ব্যক্তি আলি নয় বরং শয়তান তার আকৃতি ধারণ করেছে, আলি আসমানে উঠে গেছে, সে মেঘে হাঁটে, বিদ্যুৎ চমক তার দোররা, মেঘের গর্জন তার আওয়াজ। অতিসত্বর সে জমিনে ফিরে আসবে, অতঃপর তা ইনসাফ দ্বারা ভরে দিবে, যেমন তা ফ্যাসাদ দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেছে”।

চ. অগ্নিপূজকদের হিংসা :

অগ্নিপূজকদের হিংসাকে পুঁজি করে ইবনে সাবা তার অনুসারী পারস্যদের মাঝে সাহাবিদের বিদ্বেষ ও গালমন্দ করার বীজ বপন করতে সক্ষম হয়, বিশেষ করে আমিরুল মুমেনিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সম্পর্কে, যার মুজাহিদ বাহিনী তাদের দেশ জয় ও তাদের রাজত্ব ধ্বংস করেছে। তাদের এক অগ্নিপূজক আবু লুলু ফিরোজ উমর (রা.) কে অতর্কিত হামলা করে শহীদ করে, যা সবার জানা। যেমনি ভাবে ইবনে সাবা  উসমান (রা.), তালহা (রা.), যুবায়ের (রা.) ও অনেক সাহাবিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে ছিল, ঠিক তেমনি ভারে প্রকাশ্যভাবে তাদের উপর লানত করত। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, অগ্নিপূজক আবু লুলু ফিরোজের কর্মে গর্ব করে ও সম্মান দেখায় এবং তাকে বীর-বাহাদুর উপাধি দেয়।

এভাবে মূল ইসলামকে পাশ কাটিয়ে আলি (রা.) জামানায় তার সম্পর্কে যে ভ্রান্ত আকিদা সৃষ্টি হয় যা স্বয়ং আলি (রা.) ও অপছন্দ করতেন, পরবর্তীতে আরও অনেক রঙ লাগিয়ে ভ্রান্ত আকিদার পাহাড় রচনা করা হয়, আর এই ভ্রান্ত আকিদার পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে যে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয় তার নাম হল “শিয়া” মতবাদ।

উমাইয়া খিলাফতের সময় ইবনে সাবা ও তার অনুসারীদের অবস্থা ও অবস্থান :

উমাইয়া খিলাফত শুরু হয় ৪১ হিজরিতে আলি (রা.)-এর শাহাদাতের পরে, যার প্রথম খলিফা ছিলেন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, তিনি আলি (রা.) এর যুগেই দগ্ধ হয়ে মারা যান, ফলে উমাইয়া যুগে সরাসরি তাঁর অস্তিত্ব ছিল না। তবে তার অনুসারীরা বেঁচে ছিল এবং ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মূল অনুসারীরা সক্রিয় ছিল কুফা, বসরা, ও ইয়ামানের এলাকাগুলোতে। উমাইয়া শাসকরা বিশেষ করে মুয়াবিয়া (রা.) ও পরে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ কড়া হস্তে চরমপন্থি গোষ্ঠী দমন করেন। কুফা ছিল শিয়া মতবাদের মূল ঘাঁটি, তাই সেখানে গুপ্তচর নিয়োগ, বক্তৃতা নিষেধাজ্ঞা এবং কখনো কখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ (মৃত্যু: ৯৫ হি.) এর সময় বহু চরমপন্থি (গুলাত ও সাব্বাহ) কে হত্যা করা হয়। তাবারী, বালাধুরি, ইবনে আসাকির

আব্বাসি খিলাফতের শিয়াদের অবস্থা :

ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী আব্বাসি খিলাফতের সূচনা ঘটে ১৩২ হিজরিতে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বিপ্লবের সূচনালগ্নে শিয়ারা কিছুটা রাজনৈতিক প্রভাব ও আশা নিয়ে এই আন্দোলনের অংশ হয় কিন্তু আব্বাসিরা খিলাফত গ্রহণের পর নিজেদের আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (নবির চাচা)-এর বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা আলি (রা.) এর বংশধর না করে দেয় এবং শিয়াদের প্রত্যাশা ভেঙে যায়। আব্বাসি শাসকেরা শিয়ারা বিপদের আশঙ্কা করত বিধায় তারা শাসনের শুরুর দিক থেকেই তাদের উপর নজরদারি শুরু করে এবং কারণে অনকারনে তাদের নির্যাতন করে। এই নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রান্তিকতার সময় শিয়ারা আধ্যাত্মিক নেতৃত্বে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ইমামতবাদী শিয়ারা ইমামদেরকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতা নয় বরং আধ্যাত্মিক ও গোপন জ্ঞানের অধিকারী মনে করতে থাকে। শিয়াদের মধ্যে ইসমাইলিয়া, জাফরিয়া (ইমামিয়া), ও অন্যান্য উপদল গঠিত হয়। শিয়াদের মধ্যে গায়ব (ইমামের আত্মগোপন) বিশ্বাসও এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। যদিও শিয়াদের দমন করা হতো, তবুও কেউ কেউ আব্বাসি দরবারে উচ্চপদে ছিলেন,  বিশেষ করে তারা যারা প্রকাশ্যে শিয়া মতাদর্শ প্রকাশ করতেন না। এ সময় শিয়া মতবাদের ভিত আরও সুদৃঢ় হলেও রাজনৈতিকভাবে তারা কোণঠাসা ছিল।

আব্বাসি খিলাফতের (১৩২-৬৫৬ হিজরি/৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ ) প্রায় ৫০০ বছরের দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম উম্মাহ শাসন করে।  এ সময় শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে সরাসরি “বড় যুদ্ধ” খুব বেশি হয়নি, কারণ শিয়ারা দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ও রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ছিল। তবে কুফা, মদিনা, বাহরাইন, সিরিয়া, ইরান, ইয়েমেন কুফা, বাগদাদ, তাবারিস্তান ইত্যাদি অঞ্চলে সাতটির বড় বিদ্রোহ ও অসংখ্য ছোট সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনাই পরবর্তীতে শিয়া-সুন্নি মতবিরোধকে আরও গভীর ও রাজনৈতিক রূপ দেয়।

শিয়াদের প্রথম রাষ্ট্র গঠন :

শিয়া তথা ফাতিমি খেলাফতের উত্থান (সাল: ২৯৭ হিজরি / ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা ইসলামি বিশ্বে শিয়া নেতৃত্বাধীন প্রথম ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক ক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত। এটি ইসমাইলি শিয়াদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রায় ২৭০ বছর ধরে উত্তর আফ্রিকা, মিশর, সিরিয়ায়, ও হিজাজের একটি বিশাল অংশে শাসন বিস্তার করে। ‘ফাতিমি’ শব্দটি এসেছে ফাতিমা আয-যাহরা (রা.), নবি মুহাম্মদ ﷺ এর কন্যার নাম থেকে। ফাতিমিদের দাবি ছিল, তারা নবি পরিবারের বংশধর এবং আলি ও ফাতিমা (রা.)-এর মাধ্যমে ইমাম হাসান ও হুসাইন (রা.) এর বংশে সম্পর্কিত। তাদের প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইলি শিয়া মতবাদের অনুসারী, যারা ৭ম ইমাম ইসমাইল ইবনে জাফরের পর বংশধরদেরই ইমাম মানে।

আব্বাসি খেলাফত সুন্নি মতবাদে শাসন করছিল এবং আহলে বাইতের কিছু বংশধরদের দমন করত। ইসমাইলি শিয়ারা গোপনে দাওয়াহ চালিয়ে যাচ্ছিল নানা অঞ্চলে, খোরাসান, ইয়েমেন, উত্তর আফ্রিকা, মিশর ও সিরিয়ায়। উত্তর আফ্রিকার কায়রাওয়ান, ইফরীকিয়া (আজকের তিউনিশিয়া ও আলজেরিয়া) অঞ্চলে। তাদের ও দাওয়াতে কারণেই ফাতিমি খিলাফত প্রথিষ্ঠা হয়। প্রতিষ্ঠা ও প্রথম খলিফা ছিল উবাইদুল্লাহ আল-মাহদি বিল্লাহ তিনি নিজেকে আহলে বাইতের একজন বলে দাবি করেন এবং ইমাম মাহদি হিসেবে পরিচিতি দেন।

ফাতিমি খেলাফত ৩৫৮ হিজরিতে (৯৬৯ খ্রি.) মিশর বিজয় করেন। নতুন রাজধানী কায়রো প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটিকে খেলাফতের কেন্দ্র বানান। বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় (৩৬১ হি.) প্রতিষ্ঠা হয় মূলত শিয়া দাওয়াহর কেন্দ্র হিসেবে।

ইমামদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়, গোপন ইমামত ও রাজনৈতিক ইমামতের ফারাক নিয়ে মতভেদ, ক্রুসেডারদের আগমন, তুর্কি সালজুকদের উত্থান ফলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মিসরের সেনাপতি সালাহউদ্দিন আইউবি ৫৬৭ হিজরিতে (১১৭১ খ্রি.) ফাতিমিদের শাসনের অবসান ঘটান। সালাহউদ্দিন ফাতিমি খেলাফতের অবসান ঘটিয়ে মিশরে সুন্নি শাফেয়ি মাজহাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং আয়ুবি সালতানাত শুরু করেন।

ফাতিমি খেলাফতের উত্থান ছিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি বিপ্লবাত্মক ধারা। এটি সুন্নি-প্রধান ইসলামি ভূখণ্ডে শিয়া চিন্তার প্রথম সফল রাষ্ট্রীয় রূপ, যা প্রায় তিন শতাব্দী ধরে টিকে ছিল এবং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও মতাদর্শের উপর গভীর প্রভাব রেখেছে।

উত্স : আহমাদ ইবনে আলি আল মাকরিযী (মৃত্যু: ৮৪৫ হি./১৪৪২ খ্রি:), আল-মাকরিযী, আল-খিত্ত।

আলি ইবনে আবিল করীম ইবনুল আসীর (মৃত্যু: ৬৩০ হি./১২৩৩ খ্রি:, আল-কামিল ফিত্তারীখ।

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারী (মৃত্যু: ৩১০ হি./৯২৩ খ্রি:), তারীখুল উমাম ওয়াল মুলূক।

আব্বাসি খেলাফতের পতনে শিয়াদের ভূমিকা :

আব্বাসি খেলাফতের পতনের সময় (৬৫৬ হিজরি / ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে) তাতার বা মঙ্গোল বাহিনীর হাতে বাগদাদের ধ্বংস একটি ভয়াবহ ঐতিহাসিক বিপর্যয় ছিল। তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় নেতৃত্বের কেন্দ্র ছিল এই শহর। হালাকু খান, চেঙ্গিস খানের বংশধর, বিশাল বাহিনী নিয়ে আব্বাসি খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করেন এবং প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা অভিযানে শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন। এ আক্রমণে প্রায় দশ লক্ষেরও বেশি মুসলমান নিহত হন। আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাসিম বিল্লাহকে অপমানজনকভাবে পদদলিত করে হত্যা করা হয়। এছাড়া মুসলিম সভ্যতার অমূল্য সম্পদ – হাজারো কুরআন, হাদিস ও অন্যান্য জ্ঞানের গ্রন্থ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয় কিংবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা জ্ঞানের অন্ধকার যুগের সূচনা করে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিয়াদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ চলমান রয়েছে। অনেক সুন্নি ঐতিহাসিকের মতে, আব্বাসি খলিফার প্রধান মন্ত্রী ইবনে আল-আলকামী, যিনি শিয়া মাজহাবের অনুসারী ছিলেন, এই পতনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেন। বলা হয়, তিনি গোপনে হালাকু খানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং খেলাফতের সৈন্য সংখ্যা ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেখিয়ে প্রতিরোধ পরিকল্পনা ব্যাহত করেন। এমনকি হালাকুর আগমনের সময় তিনি আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়ে খেলাফতকে কার্যত রক্ষাহীন করে দেন। ইবন কাসীর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া-তে, আর ইবনে তাইমিয়া মিনহাজুস সুন্নাহ-তে এই অভিযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। তাদের মতে, ইবনে আল-আলকামী শুধু বিশ্বাসঘাতকতাই করেননি, বরং মুসলিম বিশ্বের ধ্বংসে পরোক্ষ হাতও বাড়িয়ে দেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে শিয়া ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাদের মতে, ইবনে আল-আলকামী হয়তো আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে মঙ্গোলদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, কারণ শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নে বহু বছর ধরে শিয়ারা নিগৃহীত ছিলেন। তাই অনেকে একে আত্মরক্ষামূলক রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখেন। বিশেষ করে তৎকালীন ইসমাইলি, বতাইনিয়া ও অন্যান্য শিয়া উপদলসমূহ তাতারদের সুন্নি শাসকদের বিরুদ্ধে একটি সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেখেছিল এবং তাদের কেউ কেউ পরোক্ষ সমর্থনও দিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে হালাকুর বংশধররা ইসলাম গ্রহণ করে। যদিও তাদের কেউ সুন্নি ধারায় প্রবেশ করে, কেউবা শিয়া ঘরানার ইমামিয়াদের প্রতি সহনশীলতা দেখায়। এ থেকে বোঝা যায়, তাতারদের সঙ্গে কিছু শিয়া গোষ্ঠীর পূর্ব থেকেই কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তবে সব শিয়াকে একযোগে এই পতনের জন্য দায়ী করা ঐতিহাসিক নিরপেক্ষতার পরিপন্থি। এটি ছিল একাধারে রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল, যার মাঝে মাজহাবীয় মতভেদ একটি মাত্র উপাদান হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল।