মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আরবি ‘যিহার’ (ظِهار) শব্দটি এসেছে ‘যাহর’ (ظَهْر) থেকে, যার অর্থ ‘পিঠ’। ইসলামী শরীয়াহতে এর অর্থ হলো, কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে এমনভাবে তুলনা করে যা তাকে তার জন্য হারাম করে দেয়। যেমন, কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে বলে, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো”। এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মতো সম্মানের আসনে বসাতে চায়, কিন্তু একই সাথে তাদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ককে হারাম করে দেয়।
যিহারকারী ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত কাফফারা আদায় না করবে, ততক্ষণ তার জন্য স্ত্রীর সাথে সহবাস করা সম্পূর্ণ হারাম। যদি সে কাফফারা আদায়ের আগে সহবাস করে, তাহলে তাকে পুনরায় কাফফারা আদায় করতে হবে। তবে, স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন (যেমন একসাথে থাকা, কথা বলা, ইত্যাদি) নিষিদ্ধ নয়, শুধু শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা নিষিদ্ধ।
ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার
ইসলামপূর্ব যুগে আরবে যিহার (ظِهار) প্রথাটি প্রচলিত ছিল। এটি ছিল তালাকের একটি রূপ, যা দিয়ে স্বামী তার স্ত্রীকে চিরতরে হারাম করে দিত। ওই সময়ে কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে বলত, “তুমি আমার কাছে আমার মায়ের পিঠের মতো,” তবে এর মাধ্যমে সে স্ত্রীকে তার মায়ের মর্যাদায় উন্নীত করত এবং এর ফলে স্ত্রী তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যেত। এর পরিণতি ছিল খুবই ভয়াবহ। স্ত্রীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে তালাকও পেত না, আবার স্ত্রী হিসেবেও বিবেচিত হতো না। ফলে তাদের জীবন এক কঠিন অনিশ্চয়তায় ডুবে যেত। তারা না পারত অন্য কোথাও বিয়ে করতে, না পারত স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করতে।
ইসলামের আগমনের পর এই প্রথাটি রহিত করা হয়। মহানবী (সা.)-এর সময়ে এক সাহাবি, আওস ইবনে সামিত তার স্ত্রী খাওলা বিনতে সালাবা-কে যিহার করেন। হাদিসে এসেছে-
’আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেছেন, বরকতময় সেই সত্তা যাঁর শরবণশক্তি সব কিছুতে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে। আমি সালাবার কন্যা খাওলা (রাঃ)-এর কিছু কথা শুনলাম এবং কিছু কথা আমার অজ্ঞাত থেকে যায়। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করেন। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সে আমার যৌবন উপভোগ করেছে এবং আমি আমার পেট থেকে তাকে অনেক সন্তান উপহার দিয়েছি। অবশেষে আমি যখন বার্ধক্যে উপনীত হলাম এবং সন্তানদানে অক্ষম হলাম, তখন সে আমার সাথে যিহার করেছে। হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকটে আমার অভিযোগ পেশ করছি। অতঃপর বেশি সময়ে অতিবাহিত না হতেই জিবরীল (আঃ) এ আয়াতগুলো নিয়ে অবতরণ করলেন-
قَدْ سَمِعَ اللّٰهُ قَوْلَ الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ تَحَاوُرَکُمَا………..
’আল্লাহ্ অবশ্যই শুনেছেন সেই নারীর কথা, যে নিজের স্বামীর বিষয়ে তোমার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং আল্লাহর নিকটও ফরিয়াদ করছে……’’। সূরা মুজাদালা : ১-৪। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৬৩, সুনানে নাসায়ী : ৩৪৬০ হাদিসের মান সহিহ
এ হাদিসে দেখা যায়, আওস ইবনে সামিত (রা.) যিকার করার কারনে খাওলা বিনতে খাওলা এতে হতাশ হয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এর প্রতিকার চেয়ে বিচার দেন। তার এই করুণ আর্তি আল্লাহ তা’আলা শোনেন। ফলস্বরূপ, আল্লাহ তায়ালা যিহার প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে পবিত্র কুরআনের সূরা মুজাদালাহ-এর প্রথম কয়েকটি আয়াত নাযিল করেন। কুরআনে নাজিল হলো-
قَدْ سَمِعَ اللّٰهُ قَوْلَ الَّتِیْ تُجَادِلُكَ فِیْ زَوْجِهَا وَ تَشْتَكِیْۤ اِلَی اللّٰهِ ٭ۖ وَ اللّٰهُ یَسْمَعُ تَحَاوُرَکُمَا ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَمِیْعٌۢ بَصِیْرٌ ﴿۱﴾ اَلَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْکُمْ مِّنْ نِّسَآئِهِمْ مَّا هُنَّ اُمَّهٰتِهِمْ ؕ اِنْ اُمَّهٰتُهُمْ اِلَّا الِّٰٓیْٔ وَلَدْنَهُمْ ؕ وَ اِنَّهُمْ لَیَقُوْلُوْنَ مُنْكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَ زُوْرًا ؕ وَ اِنَّ اللّٰهَ لَعَفُوٌّ غَفُوْرٌ ﴿۲﴾ وَ الَّذِیْنَ یُظٰهِرُوْنَ مِنْ نِّسَآئِهِمْ ثُمَّ یَعُوْدُوْنَ لِمَا قَالُوْا فَتَحْرِیْرُ رَقَبَۃٍ مِّنْ قَبْلِ اَنْ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمْ تُوْعَظُوْنَ بِہٖ ؕ وَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِیْرٌ ﴿۳﴾ فَمَنْ لَّمْ یَجِدْ فَصِیَامُ شَہْرَیْنِ مُتَتَابِعَیْنِ مِنْ قَبْلِ اَنْ یَّتَمَآسَّا ۚ فَمَنْ لَّمْ یَسْتَطِعْ فَاِطْعَامُ سِتِّیْنَ مِسْكِیْنًا ؕ ذٰلِكَ لِتُؤْمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِہٖ ؕ وَ تِلْكَ حُدُوْدُ اللّٰهِ ؕ وَ لِلْکٰفِرِیْنَ عَذَابٌ اَلِیْمٌ ﴿۴﴾
তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার* করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমা এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সুরা মুজাদালা : ১-৪
এই আয়াতগুলোতে যিহারকে একটি গর্হিত কাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এর কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে, আল্লাহ ইসলামপূর্ব যুগের এই কঠোর ও অন্যায় প্রথাকে সংশোধন করে স্ত্রীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করেন।
যিহারের বিধান করা একটি গর্হিত কাজ
প্রাচীন আরব সমাজে স্ত্রী সাথে যিহারের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হত। ইসলাম এসে এ বিধান বাতিল করে। তাই যিহারের মাধ্যামে সরাসরি বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তবে অসঙ্গত কথা বলার কারণে কাফ্ফারা দিতে হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি গর্হিত ও মিথ্যা কথা। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
اَلَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِہِمۡ مَّا ہُنَّ اُمَّہٰتِہِمۡ ؕ اِنۡ اُمَّہٰتُہُمۡ اِلَّا الّٰٓیِٴۡ وَلَدۡنَہُمۡ ؕ وَاِنَّہُمۡ لَیَقُوۡلُوۡنَ مُنۡکَرًا مِّنَ الۡقَوۡلِ وَزُوۡرًا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ لَعَفُوٌّ غَفُوۡرٌ
তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে, তাদের স্ত্রীগণ তাদের মাতা নয়। তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। আর তারা অবশ্যই অসঙ্গত ও অসত্য কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অধিক পাপ মোচনকারী, বড়ই ক্ষমাশীল। সূরা মুজাদালা : ২
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, যিহার একটি মিথ্যা ও অন্যায় কাজ, যা আল্লাহ ঘৃণা করেন।
যিহারের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত :
যদি কোনো ব্যক্তি যিহার করে ফেলে, তাহলে তার জন্য তার স্ত্রীর সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করা হারাম হয়ে যায় যতক্ষণ না সে নির্দিষ্ট কাফফারা আদায় করে। আল্লাহ তা’আলা এই কাফফারাকে পর্যায়ক্রমে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। ইসলামি শরীয়তের আলোকে যিহারের কারনে যে কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয় তান নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ক. একজন দাস মুক্ত করা:
যিহারের কাফফারার প্রথম ধাপ হলো একজন দাস মুক্ত করা। এটি সবচেয়ে সহজ ও উত্তম পদ্ধতি। যদি কোনো ব্যক্তি একজন দাস মুক্ত করার সামর্থ্য রাখে, তবে তাকে এটাই করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
وَالَّذِیۡنَ یُظٰہِرُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ ثُمَّ یَعُوۡدُوۡنَ لِمَا قَالُوۡا فَتَحۡرِیۡرُ رَقَبَۃٍ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ؕ ذٰلِکُمۡ تُوۡعَظُوۡنَ بِہٖ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ
আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা মুজাদালা : ৩
এই আয়াত অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর পুনরায় মিলিত হওয়ার আগেই দাস মুক্ত করতে হবে। বর্তমানে দাস প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় যিহারের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) আদায়ের ক্ষেত্রে দাস মুক্ত করার বিধানটি এখন আর প্রযোজ্য নয়। এর কারণ, এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য ছিল দাসদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করা এবং সামাজিক কুপ্রথা দূর করা। ইসলামের এ প্রসস্ত বিধানে কারনেই পৃথিবীতে বর্তমানে দাস প্রথা ও তার বিধান অকার্যকর হয়েছে।
ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুসারে, যদি কোনো বিধানের প্রথম ধাপটি পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, যা মানুষের জন্য বিধানকে সহজ ও বাস্তবসম্মত করে তোলে।
খ. ষাট দিন একটানা রোজা রাখা:
যদি কোনো ব্যক্তি দাস মুক্ত করার সামর্থ্য না রাখে, তাহলে তাকে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে হবে। এই রোজা রাখতে কোনো প্রকার বিরতি দেওয়া যাবে না। যদি কোনো কারণে একটি রোজাও ছুটে যায়, তাহলে আবার প্রথম থেকে ষাট দিন রোজা শুরু করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
فَمَنۡ لَّمۡ یَجِدۡ فَصِیَامُ شَہۡرَیۡنِ مُتَتَابِعَیۡنِ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّتَمَآسَّا ۚ
কিন্তু যে তা পাবে না, সে লাগাতার দু’মাস সিয়াম পালন করবে, একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে। সূরা মুজাদালা, : ৪
এই বিধান অত্যন্ত কঠোর, কারণ এর মাধ্যমে ব্যক্তিকে তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার এবং কষ্ট স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
গ. ষাটজন মিসকিনকে খাওয়ানো:
যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতা, দুর্বলতা বা অন্য কোনো কারণে একটানা ষাট দিন রোজা রাখতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে ষাটজন মিসকিনকে খাদ্য দান করতে হবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন-
فَمَنۡ لَّمۡ یَسۡتَطِعۡ فَاِطۡعَامُ سِتِّیۡنَ مِسۡکِیۡنًا ؕ ذٰلِکَ لِتُؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ
আর যে (এরূপ করার) সামর্থ্য রাখে না সে ষাটজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। এ বিধান এ জন্য যে, তোমরা যাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন। আর এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। সূরা মুজাদালা, : ৪
এই তিনটি ধাপের কাফফারা একটির পর আরেকটি অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ, যদি প্রথমটি সম্ভব না হয়, তবে দ্বিতীয়টি এবং দ্বিতীয়টি সম্ভব না হলে তৃতীয়টি। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মানুষের সামর্থ্যের দিকে লক্ষ্য রেখেছেন এবং বিধানকে সহজ করেছেন।
হাদিসে যিহারের কাফফারা
হাদিসে যিহারের কাফফারার ধারাবাহিকতা ও এর প্রয়োগকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। যেমন-
সালামা ইবনু সাখর আল-বায়াদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নারীদের প্রতি অধিক আসক্ত ছিলাম। অন্য পুরুষের তুলনায় আমি তাদের সাথে বেশি সহবাসে লিপ্ত হতাম। রমযান মাস শুরু হলে আমি আমার স্ত্রীর সাথে যিহার করলাম। রমযান মাস প্রায় শেষ হতে যাচ্ছে। একদা রাতের বেলা সে আমার সাথে কথাবার্তা বলছিল। তখন তার দেহের একটি অংশ আমার সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেলো। আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং তার সাথে সহবাস করলাম। ভোর হলে আমি সকাল সকাল আমার সম্প্রদায়ের লোকেদের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদেরকে আমার ঘটনাটি জানালাম।
আমি তাদের বললাম, তোমরা আমার ব্যাপারে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করো। তারা বললো, আমরা তা করতে পারবো না। হয়ত বা আল্লাহ্ আমাদের সম্পর্কে কিতাব (কুরআনের আয়াত) নাযিল করবেন অথবা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের এমন কিছু বলবেন, যা আমাদের জন্য লজ্জার কারণ হয়ে থাকবে। বরং আমরা তোমার অপরাধসহ তোমাকে সোপর্দ করবো। তুমি নিজেই গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তোমার ঘটনাটি বলো।
রাবী বলেন, আমি রওয়ানা হয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আমার বিষয়টি তাঁকে জানালাম। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি এটা করেছো? আমি বললাম, আমিই এটা করেছি। আমি এখানে আছি হে আল্লাহর রসূল! আমার প্রতি আল্লাহর যে হুকুম হয় তাতে আমি ধৈর্য ধারণ করবো তিনি বলেন, একটি গোলামকে দাসত্বমুক্ত করো। আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি আমার দেহটি ছাড়া আর কিছুর মালিক নই। তিনি বলেন, তাহলে একাধারে দু’ মাস রোযা রাখো।
আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আমার উপর যে বিপদ এসেছে, তা তো এই রোযার কারণেই। তিনি বলেন, তাহলে দান-খয়রাত করো অথবা ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও। রাবী বলেন, আমি বললাম, সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমরা এ রাতটি নিরন্ন অবস্থায় অতিবাহিত করেছি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি বনু যুরাইক-এর যাকাত বণ্টনকারীর নিকট যাও এবং তাকে বলো, সে যেন তোমাকে যাকাতের কিছু মাল দান করে। তা দিয়ে তুমি ষাটজন মিসকীনকে আহার করাও এবং অবশিষ্ট যা থাকে তা নিজের উপকারে লাগাও। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২০৬২, সুনানে তিরমিযী : ১১৯৮, ১২০০, ৩২৯৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২২১৩, মিশকাত : ৩২৯৯, আহমাদ : ৩১৮৮, দারেমী : ২২৭৩, ইরওয়াহ : ২০৯১
উপসংহার
যিহার একটি গুরুতর বিষয়, যা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে নষ্ট করে দেয়। ইসলাম এর জন্য কঠিন কাফফারা নির্ধারণ করে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করেছে। একইসাথে, কাফফারার তিনটি ধাপ নির্ধারণ করে আল্লাহ তা’আলা এই বিধানকে মানুষের জন্য সহজ করে দিয়েছেন, যাতে তারা তাদের ভুল থেকে ফিরে আসতে পারে এবং তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে পারে।