নাজাত প্রাপ্ত দলের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বর্তমান মুসলিম বিশ্বের প্রধান সমস্যা মতবিরোধ বা ফির্কাবাজি। সমাজের দিকে তাকালে দেখতে পার ইসলামের মুল অনুসারী মুসলিমগণ আজ বিচ্ছিন্ন হয়ে কেন শত শত দল বা ফির্কার বিভক্ত হয়ে আছে। এদের মাঝে সঠিক ও সত্যপন্থী দল খুজে বের করে তাদের অনুসরণ করা ফরজ। কিন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার হলো যদ দল বা ফির্কা সমাজে প্রচলিত আছে তারা সকলেই নিজেদের সঠিক ও সত্যপন্থী দল বলে দাবি করে। কিন্তু সকল দলই সঠিক ও সত্যপন্থী হবে, এমন বিশ্বাস কেউই রাখে না। কাজেই সত্যপন্থী দল আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এই লক্ষে নিন্মের হাদিসগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন। সহিহ হাদিসে এসেছে-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ‏ “‏ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي مَا أَتَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلاَنِيَةً لَكَانَ فِي أُمَّتِي مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ وَإِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلاَّ مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ مُفَسَّرٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ مِثْلَ هَذَا إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ ‏.‏

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেন, আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১, মিশকাত : ১৭১, সহীহাহ : ১৩৪৮

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِيْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ يَجِيءُ قَوْمٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِيْنَهُ وَيَمِيْنُهُ شَهَادَتَهُ

আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ সাক্ষ্য দানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য দান করবে। সহিহ বুখারি : ২৬৫২, ৩৬৫১, ৬৪২৯, ৬৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ২৫৩৩

মুগীরাহ ইবনু শুবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত-

عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ لَا يَزَالُ نَاسٌ مِنْ أُمَّتِيْ ظَاهِرِيْنَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللهِ وَهُمْ ظَاهِرُوْنَ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মাতের একটি দল সর্বদা বিজয়ী থাকবে। এমনকি যখন ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) আসবে তখনও তারা বিজয়ী থাকবে। সহিহ বুখারি : ৩৬৪০, ৭৩১১, ৭৪৫৯, সহুহ মুসলিম : ১৯২১

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ফজরের নামযের পর আমাদেরকে মর্মস্পশী ওয়াজ শুনালেন, যাতে (আমাদের) সকলের চোখে পানি এলো এবং অন্তর কেঁপে উঠলো। কোন একজন বলল, এ তো বিদায়ী ব্যক্তির নাসীহাতের মতো। হে আল্লাহর রাসূল! এখন আপনি আমাদেরকে কি উপদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করার এবং (নেতৃআদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (নেতা) হাবশী ক্রীতদাস হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু বিভেদ-বিসম্বাদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গুমরাহী। তোমাদের মধ্যে কেউ সে যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নাতে ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাতে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে। তোমরা এসব সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। সুনানে তিরমিজি ২৬৭৬, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২

এ হাদিসগুলো মূল বক্তব্য একত্রে কলে দাড়ায়-

১. একটি মাত্র দল নাজাত প্রাপ্ত এবং সেই দল হবে নবি (সা.) ও সাহাবীদের অনুসারি।

২. সাহাবীগণ ও তাদের পরে দুই যুগ (তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়ি) হকের উপর তাকবে।

৩. বিভ্রান্তির যুগে খোলাফায়ে রাসেদিনদের কর্মকে মানদণ্ড হিসেবে ধরতে হবে।

৪. উপরের বর্ণিত বৈশিষ্ট্য সম্বলিত দলটি কিয়ামত পর্যন্ত বিজয় থাকবে এবং এটিই সেই নাজাত প্রপ্ত দল।

নাজাতপ্রাপ্ত দলের নাম :

উপরের বর্ণিত হাদিসে একটি দলকে নাজাতপ্রাপ্ত দল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। উম্মতের সকলেই সেই দলটির অন্তর্ভুক্ত হতে চাই। সমার মনে প্রশ্ন সেই দলের নাম কি? তাদের বৈশিষ্ট কেমন? কিভাবে আমারা সেই দল চিহিৃত  করে তার অন্তর্ভুক্ত হব। এই সকল প্রশ্নের উত্তর খুজব। উম্মার মাঝে ব্যপকভাবে প্রচলিত আছে সেই দলটি হলো- আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) এ কারণে সবাই নিজেকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) এর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিচয় প্রদান করতে সাচ্ছন্দ বোধ করে। “আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত” বলতে বোঝায় সেই মুসলিম গোষ্ঠী, যারা কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করে ইসলামের মূল শিক্ষাগুলি অনুসরণ করে এবং সাহাবাদের পথ ও চেতনার অনুসারী। তারা বিভিন্ন বিভাজন ও গোমরাহি থেকে দূরে থেকে উম্মাহর ঐক্য ও সত্যের ধারক।

শব্দের ব্যাখ্যা:

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত বাক্যটি চারটি শব্দের নিয়ে গঠিত-

أَهْلُ (আহলু) – “পরিবার” বা “গোষ্ঠী” অর্থে।

السُّنَّةِ (আস্‌-সুন্নাহি) – রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পথ বা শিক্ষা।

وَ (ওয়া) – “এবং” (সংযোগের জন্য ব্যবহৃত)।

الْجَمَاعَةِ (আল-জামাআতি) – “সম্মিলিত দল” বা “সমাজ”। পারিভাষিক অর্থে অনেকে এই জামআত বলেত সাহাবীদের জামাআতকে বুঝিয়েছেন।

এই চারটি শব্দ একত্রে করলে দাড়ায়-

أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ

অর্থ : সুন্নাহ বা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পথে পরিচালিত সেই দল বা গোষ্ঠী, যারা ঐক্যবদ্ধ এবং মূলধারার ইসলামী শিক্ষার অনুসারী। অর্থাৎ, যারা মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে এবং বিভক্তি বা দলবাজি থেকে বিরত থাকে।

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত হলো সেই দল, যারা:

(১) কুরআন ও হাদীসের অনুসরণে অটল।

(২) সাহাবা (রাযি.) এবং তাবেয়ীনদের পথকে সঠিক পথ হিসেবে গ্রহণ করে।

(৩) বিভিন্ন বিদআত (ধর্মে নতুন সংযোজন) ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে মুক্ত থাকে।

(৪) মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং সত্য ধর্মের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।

আরবি সংজ্ঞা:

“هُمْ ٱلَّذِينَ يَتَمَسَّكُونَ بِٱلْقُرْآنِ وَٱلسُّنَّةِ بِفَهْمِ ٱلسَّلَفِ ٱلصَّالِحِ، وَيَتَجَنَّبُونَ ٱلْبِدَعَ وَٱلْخِلَافَ، وَيَدْعُونَ إِلَىٰ وَحْدَةِ ٱلْمُسْلِمِينَ تَحْتَ رَايَةِ ٱلْحَقِّ.”

অনুবাদ: তারা হলো সেই গোষ্ঠী, যারা কুরআন ও সুন্নাহকে সালাফে সালেহীন (সাহাবা ও তাদের অনুসারীরা) এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী অনুসরণ করে, বিদআত ও বিভক্তি থেকে দূরে থাকে, এবং সত্যের পতাকাতলে মুসলিমদের ঐক্যের দিকে আহ্বান জানায়।”

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত মানে সেই মুসলিম সম্প্রদায় যারা ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতি অটল থেকে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুন্নাহ ও সাহাবাদের ঐতিহ্য ধরে রাখে এবং উম্মাহর ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই মূলধারার মুসলিমদের মধ্যে নাজাতপ্রাপ্ত দলটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ)  নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই পরিচিতি ব্যবহারের পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে-

১.  আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত-কে “নাজাত প্রাপ্ত দল” বলা হয় কারণ এই দলটি কুরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ অনুযায়ী তাদের আকিদা ও আমল পরিচালনা করে। এ বিষয়ে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

: إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى اثْنَتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهَا فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً، قَالُوا: وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي.

বনি ইসরাইল ৭২টি দলে বিভক্ত হয়েছিল, আর আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে সবগুলো দল জাহান্নামে যাবে, শুধুমাত্র একটি দল ব্যতীত। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহর রাসুল! সেই দলটি কারা?’ নি বললেন: ‘যারা আমার এবং আমার সাহাবাদের পথ অনুসরণ করবে।  সুনান তিরমিজি : ২৬৪১

এই হাদিসটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নসিহত। এতে বলা হয়েছে, আখিরাতে নাজাত পেতে হলে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবাদের পথ অনুসরণ করেত হবে। বাস্তবেও দেখি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআল এর অনুসারিগন সাহাদের পথকেই নিজেদের পথ হিসেবে গ্রহন করেছেন। বাতিল ফির্কা শিয়া, রাফেজি, খারেজিদের মত সাহাবিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে না। এটি একটি প্রামাণ্য ও বিশুদ্ধ পথ হিসেবে স্বীকৃত, যা বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে দূরে।

২. ইসলামের প্রথম যুগ থেকে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত নামে পরিচিত দলটি মূলধারার প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। এটি মুসলিম সমাজে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং ঐক্যের প্রতীক।

৩. বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর মতবাদ ও ফির্কা ইসলামে রয়েছে, যেমন খারিজি, শিয়া, মুতাজিলা ইত্যাদি। নিজেদের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষ বোঝাতে চায় যে তারা ভ্রান্ত পথের অনুসারী নয়।

৪. “আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত” শব্দটি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার একটি মাধ্যম। এটি বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে এবং ইসলামের মূল শিক্ষা ও আকিদার প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।

৫. অনেকেই এই পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের ধর্মীয় অবস্থানকে সুদৃঢ় এবং মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে চান। এটি তাঁদের কাছে একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিচয়।

৬. তবে, এই পরিচয় ব্যবহার কখনো কখনো ফির্কা সৃষ্টির কাজে লাগান হয়েছে। অনেক সময় মূলধারার মুসলিমগণও বাতিল নতুন ফির্কা সৃষ্টি করে তার নাম দিয়েছে, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত। কখনো কখনো এই নামটি রাজনৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়েছে যা ইসলামের প্রকৃত চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এই পরিচয়ের প্রকৃত অর্থ এবং তা প্রয়োগের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِবা নাজাতপ্রাপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-

মুসলিম বিশ্বে ব্যপকভাবে প্রচলিত নাজাত প্রাপ্ত দলের নাম ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ)। এ কারণে সকল দল ও মতের মানুষ যখন ফির্কা বা দলের সৃষ্টি করে তখন তারা নিজেদের দলের বা ফির্কার নাম ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দিয়ে নিজেদের সঠিক বা সত্যপন্থী দল হিসাবে দাবি করে। কোনো কোনো ফির্কা অন্য নাম দিয়ে ফির্কা বা দলের সৃষ্টি করলেও নিজেদের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ অন্তর্ভুক্ত দাবি করে। কেননা, নাজাতপ্রাপ্ত দলে মানেও ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’।

হকপন্থী বা বাতিলপন্থী সকলে হাদিসগুলোর আলোকে নিজেদের ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দাবি করে। কিন্তু হাদিসের ভবিষ্যৎ বানী বলে দেয় সকলে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ অন্তভূক্ত থাকবে না। ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ এর যারা অনুসারি হবে তাদের সংখ্যা অন্যদের থেকে কম হবে। কিয়ামতের কঠিন বিপদের সময় মুক্তি পেতে হলে এই নাজাতপ্রাপ্ত সত্যপন্থী দলের মধ্য অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। তাই সঠিক দল নির্বাচন করা খুবই কঠিন। ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ নাম দিলেই সঠিক বা সত্যপন্থীদল হিসবে পরিগনিত হবে না। নাজাতপ্রান্ত বা সত্যপন্থী দল হতে হলে সত্যি কারের ইসলামের অনুসরী হতে হবে। এমন কি ভিন্ন নামের একাধীক দল ও ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দলের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যদি কিনা তারা কুরআন সুন্নাহর সঠিক অনুসারী হয়। নাম নয় তাদের আমল আখলাক বা বৈশিষ্ট্যের জন্যই তারা ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’  বা নাজাতপ্রাপ্ত দল হয়ে থাকে।

এই নাজাতপ্রাপ্ত সত্যপন্থী ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ এ অন্তর্ভুক্ত  হতে হলে প্রথমেই তাদের পরিচয় বা তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে হবে। তারপর তাদের অনুসারী হবে হবে। সকলে যদি তাদের বৈশিষ্ট্য দেখে অনুসরণ করে, তবে সত্যিকার ইসলামের অনুসারি মুসলীমদের মাঝে একতা সৃষ্টি হবে এবং ফির্কা বা বিভক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অত্র অধ্যায় ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ দলের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব, যাতে সহজে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ বা নাজাত প্রাপ্ত সঠিক দল নির্বাচন করতে সহজ হয়। এখান কুরআন সুন্নাহর আলোকে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ এর কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করব, ইহাই তাদের সকল বৈশিষ্ট বলা যাবে না। ইহার বাহিরে আরও বৈশিষ্ট আছে। পরবর্তী অলোচনায় ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ বা নাজাত প্রপ্ত দলের কিছু বৈশিষ্ট তুলে ধরা হল। এক নজরে তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-

১। বিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারী হবে

২। তাওহিদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা থাকবে-

৩। কুরআন ও সহিহ হাদিস সম্মত আকিদা ধারণ করবে

৪। চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : কুরআন ও সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী হবে

ক) কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ

খ) সাহাবীদের সম্মান ও অনুসরণ

গ) তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িদের অনুসরণ

ঘ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতিত একক কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না-

ঙ) শর্তসাপেক্ষে আমিরের অনুসরণ

৫। ইবাদতের গুরুত্ব প্রদান ও ভারসাম্য রক্ষা করে

৬। গাইরুল্লাহ ইবাদত থেকে নিজেকে দূরে রাখবে

৭। বিদআত মুক্ত আমল করবে

৮।  দ্বীন প্রচার প্রসারের জন্য দাওয়াত ও জিহাদে সতেষ্ট হবে

৯। মাবন রচিত শরীয়ত পরিপন্থী আইন ও বিচারের বিরোধিতা করে

১০। দ্বীন পালনে মধ্যপন্থা অবলম্বন

১১।  জামায়াতবদ্ধ থাকা/ মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া।

১১। নিজেদের মুসলিম পরিচয় দিবে

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০১ ::  এই দলের অনুসারীগণ বিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারী হবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈমান (إِيمَانٌ) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অর্থ বিশ্বাস।  ইসলামি পরিভাষায়, ঈমান বলতে এমন এক শক্তিশালী বিশ্বাস বোঝায় যা মৌখিক স্বীকৃতি, অন্তরের বিশ্বাস এবং তদনুযায়ী আমল করা।

ঈমানের তিনটি স্তর-

ক। অন্তরের বিশ্বাস-

মহান আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক আনিত দ্বীনকে অন্তর থেকে সঠিক হিসেবে বিশ্বাস করা।

খ। মুখে স্বীকারোক্তি

মুখে সাক্ষ্য প্রদান করা-

أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ (উপাস্য) নেই এবং আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।  সহিহ বুখারি : ৮৩১, ৫৩, ১২০২, ৬২৩০, সহিহহ মুসলিম : ৪০২

কেননা প্রায় শতভাগ নও মুসলিমকে এই কালিমা পাঠ করিয়ে মুসলিম করা হয়ে ছিল।

গ। কর্মে প্রকাশ-

ঈমানের চুড়ান্ত প্রকাশ হল আল্লাহর আদেশ মেনে চলা এবং নিষেধ থেকে বিরত থাকা।

১। ঈমানের রুকন ছয়টি-

কুরআন, সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলেমগণ হাদিসে জিবরাঈলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন । ঈমানের এই ছয়টি মূল  ভিত্তি হলো–

(১) আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস

(২) ফিরিশতাগণের প্রতি বিশ্বাস

(৩) কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস

(৪) রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস

(৫) শেষ দিবস ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস

(৬) তাক্বদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস।

নোটঃ অনেক গবেষক আলেম শেষ দিবস ও পরকাল আলাদা আলাদা উল্লেখ করে, ঈমানের রুকন সাতটি বলে উল্লেখ করেছেন।

২। উপরের এই বিষয় সম্পর্কিত কুরআন ও সহহি হাদিসের বর্ণনাসমূহ-

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَٱلۡكِتَـٰبِ ٱلَّذِى نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلَّذِىٓ أَنزَلَ مِن قَبۡلُ‌ۚ وَمَن يَكۡفُرۡ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدًا

হে ঈমানদারগণ! ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রসূলের প্রতি, আল্লাহ তাঁর রসূলের ওপর যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি এবং পূর্বে তিনি যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ ও পরকালের প্রতি কুফরী করলোসে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূর চলে গেলো, (সুরা নিসা :১৩৬)।

আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা আরও বলেন:

ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَ‌ۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓٮِٕكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٍ۬ مِّن رُّسُلِهِۦ‌ۚ

রাসূল তাঁর প্রভুর নিকট থেকে তাঁর প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তাতে ঈমান এনেছে এবং মুমিনগণও ! এরা প্রত্যেকে আল্লাহতে, তাঁর ফিরিশতাগণে, তাঁর কিতাবে, তাঁর রাসূলগণে বিশ্বাস স্থাপন করে, (সুরা বাকারা ২:২৮৫)

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آَمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ.

অর্থঃ বরং ভালো কাজ হল যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি। সূরা আল-বাক্বারা : ১৭৭

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَعِنۡدَہٗ مَفَاتِحُ الۡغَیۡبِ لَا یَعۡلَمُہَاۤ اِلَّا ہُوَ ؕ وَیَعۡلَمُ مَا فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ ؕ وَمَا تَسۡقُطُ مِنۡ وَّرَقَۃٍ اِلَّا یَعۡلَمُہَا وَلَا حَبَّۃٍ فِیۡ ظُلُمٰتِ الۡاَرۡضِ وَلَا رَطۡبٍ وَّلَا یَابِسٍ اِلَّا فِیۡ کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ

আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে। আর কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন এবং যমীনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভেজা এবং না কোন শুষ্ক কিছু; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে। সুরা আনআম : ৫৯

হাদিসে জিবরাইল-

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: بَيْنَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ شَدِيدُ بَيَاضِ الثِّيَابِ شَدِيدُ سَوَادِ الشَّعْرِ لَا يُرَى عَلَيْهِ أَثَرُ السَّفَرِ وَلَا يَعْرِفُهُ مِنَّا أَحَدٌ حَتَّى جَلَسَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسلم فأسند رُكْبَتَيْهِ إِلَى رُكْبَتَيْهِ وَوَضَعَ كَفَّيْهِ عَلَى فَخْذَيْهِ وَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ أَخْبِرْنِي عَنِ الْإِسْلَامِ قَالَ: الْإِسْلَامُ: أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ وَتَصُومَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا . قَالَ: صَدَقْتَ. فَعَجِبْنَا لَهُ يَسْأَلُهُ وَيُصَدِّقُهُ. قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِيمَانِ. قَالَ: «أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ» . قَالَ صَدَقْتَ. قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِحْسَانِ. قَالَ: «أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ» . قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ السَّاعَةِ. قَالَ: «مَا المسؤول عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ» . قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنْ أَمَارَاتِهَا. قَالَ: «أَنْ تَلِدَ الْأَمَةُ رَبَّتَهَا وَأَنْ تَرَى الْحُفَاةَ الْعُرَاةَ الْعَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ يَتَطَاوَلُونَ فِي الْبُنْيَانِ» . قَالَ: ثُمَّ انْطَلَقَ فَلَبِثْتُ مَلِيًّا ثُمَّ قَالَ لِي: «يَا عُمَرُ أَتَدْرِي مَنِ السَّائِلُ» ؟ قُلْتُ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «فَإِنَّهُ جِبْرِيل أَتَاكُم يعلمكم دينكُمْ»

উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি আমাদের নিকট আত্মপ্রকাশ করলেন। ধবধবে সাদা তাঁর পোশাক। চুল তাঁর কুচকুচে কালো। না ছিল তাঁর মধ্যে সফর করে আসার কোন চিহ্ন, আর না আমাদের কেউ তাকে চিনতে পেরেছেন। তিনি এসেই নবী ﷺ এর নিকট বসে পড়লেন। নবী ﷺ এর হাঁটুর সাথে তাঁর হাঁটু মিলিয়ে দিলেন।

তাঁর দু’হাত তাঁর দুই উরুর উপর রেখে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলুন, অর্থাৎ ইসলাম কি?

উত্তরে তিনি (ﷺ) বললেন, ’’ইসলাম হচ্ছে- তুমি সাক্ষ্য দিবে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত আর কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রসূল, সালাত কায়িম করবে, জাকাত আদায় করবে, রমাযান মাসের সিয়াম পালন করবে এবং বায়তুল্লাহর হজ করবে যদি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে।’’ আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন।’’ আমরা আশ্চর্যান্বিত হলাম একদিকে তিনি রসূল ﷺ কে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করলেন, আবার অপরদিকে রসূলের বক্তব্যকে (বিজ্ঞের ন্যায়) সঠিক বলে সমর্থনও করলেন।

এরপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ’’আমাকে ঈমান সম্পর্কে কিছু বলুন। তিনি () উত্তর দিলেন, ঈমান হচ্ছে- আল্লাহ তা’আলা, তাঁর ফিরিশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রসূলগণ এবং পরকালকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এছাড়া তাক্বদীরের উপর, অর্থাৎ- জীবন ও জগতে কল্যাণ-অকল্যাণ যা কিছু ঘটছে, সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হচ্ছে এ কথার উপর বিশ্বাস করা। উত্তর শুনে আগন্তুক বললেন, ’’আপনি ঠিকই বলেছেন’’।

অতঃপর তিনি আবার বললেন, ’’আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।’’ তিনি (ﷺ) বললেন, ইহসান হচ্ছে, ’’তুমি এমনভাবে আল্লাহর ’ইবাদাত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছো। আর তুমি যদি তাকে না-ও দেখো, তিনি তোমাকে অবশ্যই দেখছেন’’।

আগন্তুক এবার বললেন, ’’আমাকে ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) সম্পর্কে বলুন।’’ উত্তরে তিনি ﷺ বললেন, ’’এ বিষয়ে যাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে তিনি প্রশ্নকারীর চাইতে অধিক কিছু জানেন না।’’ আগন্তুক বললেন, ’’তবে কিয়ামতের (কিয়ামতের) নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে বলুন।’’ তিনি ﷺ বললেন, কিয়ামতের নিদর্শন হলো, দাসী তাঁর আপন মুনীবকে প্রসব করবে, তুমি আরো দেখতে পাবে- নগ্নপায়ী বিবস্ত্র হতদরিদ্র মেষ চালকেরা বড় বড় দালান-কোঠা নিয়ে গর্ব ও অহংকার করবে।’’ উমার (রাঃ) বললেন, অতঃপর আগন্তুক চলে গেলে আমি কিছুক্ষণ সেখানেই অবস্থান করলাম। পরে তিনি ﷺ আমাকে বললেন, হে ’উমার! প্রশ্নকারী আগন্তুককে চিনতে পেরেছো?’’ আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, ’’ইনি হচ্ছেন জিবরাইল (আ,)। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের দীন শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে এসেছিলেন’’। সহিহ মুসলিম মুসলিম : ৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬৯৫, সুনানে নাসায়ি : ৪৯৯০, সিহহ আত তারগীব : ৩৫১, আহমাদ : ৩৬৭।

৩। কুরআনের আলোকো বিশুদ্ধ ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা

(১) ঈমান আনলে আল্লাহ হেদায়েত দিবেন।

 আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهَادِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬ (٥٤) 

আর যারা ঈমান এনেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করে থাকেন। সুরা হজ : ৫৪

 (২) ঈমান আনলে আল্লাহ নিরাপত্তা ও হিদায়েত দিবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَـٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ

যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনিম তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। সূরা আনআম : ৮২

(৩) আল্লাহ তায়ালা সাহায্য করবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَٱنتَقَمۡنَا مِنَ ٱلَّذِينَ أَجۡرَمُواْ‌ۖ وَكَانَ حَقًّا عَلَيۡنَا نَصۡرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ

তারপর যারা অপরাধ করে, তাদের থেকে আমি প্রতিশোধ নিই আর মুমিনদেরকে সাহায্য করা ছিল আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। সূরা আর-রূম : ৪৭

(৪) আল্লাহ তায়ালা সফলতা দিবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ (١)

নিশ্চতভাবে সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ। সূরা মুমিনুন : ১

(৫) আল্লাহ তায়ালা মুমিনকে সম্মান ও মর্যাদা দিবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

‌ۚ وَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِۦ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ

অথচ সম্মান ও মর্যাদা তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রসূল ও মু’মিনদের জন্য। সূরা মুনাফিকুন : ৮

(৬) পৃথিবীতে খিলাফত বা শ্বাসনভার দান করবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ ڪَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِينَہُمُ ٱلَّذِى ٱرۡتَضَىٰ لَهُمۡ وَلَيُبَدِّلَنَّہُم مِّنۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ أَمۡنً۬ا‌ۚ يَعۡبُدُونَنِى لَا يُشۡرِكُونَ بِى شَيۡـًٔ۬ا‌ۚ وَمَن ڪَفَرَ بَعۡدَ ذَٲلِكَ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡفَـٰسِقُونَ (٥٥) 

আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দীনকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যাকে আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন ৷ তারা শুধু আমার বন্দেগী করুক এবং আমার সাথে কাউকে যেন শরীক না করে৷ আর যারা এরপর কুফরী করবেতারাই ফাসেক ৷ সুরা নুর : ৫৫

(৭) আল্লাহ মুমিনদের রক্ষা করেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ

নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। সূরা আল হজ্ব :৩৮

(৮) ঈমান আনলে আল্লাহ উত্তম জীবন দান করবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَنۡ عَمِلَ صَـٰلِحً۬ا مِّن ذَڪَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٌ۬ فَلَنُحۡيِيَنَّهُ ۥ حَيَوٰةً۬ طَيِّبَةً۬‌ۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا ڪَانُواْ يَعۡمَلُونَ

পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবে এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে।

সূরা নাহল: ৯৭

(৯) ঈমান আনলে আল্লাহ  আকাশ ও পৃথিবীর রবকত সমূহের দুয়ার খুলে দিবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

  وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡقُرَىٰٓ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَفَتَحۡنَا عَلَيۡہِم بَرَكَـٰتٍ۬ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلَـٰكِن كَذَّبُواْ فَأَخَذۡنَـٰهُم بِمَا ڪَانُواْ يَكۡسِبُونَ (٩٦) 

যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর রবকত সমূহের দুয়ার খুলে দিতাম৷ কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে৷ কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷ লাভ। সূরা আরাফ : ৯৬

(১০ আল্লাহ মুমিনদের জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَـٰتِ جَنَّـٰتٍ۬ تَجۡرِى مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَـٰرُ خَـٰلِدِينَ فِيہَا وَمَسَـٰكِنَ طَيِّبَةً۬ فِى جَنَّـٰتِ عَدۡنٍ۬‌ۚ وَرِضۡوَٲنٌ۬ مِّنَ ٱللَّهِ أَڪۡبَرُ‌ۚ ذَٲلِكَ هُوَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ (٧٢)

এ ঈমানদার পুরুষ ও নারীকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদেরকে তিনি এমন বাগান দান করবেন যার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহমান হবে এবং তারা তার মধ্যে চিরকাল বাস করবে৷ এসব চির সবুজ বাগানে তাদের জন্য থাকবে বাসগৃহ এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে৷ এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।  সুরা তাওবা : ৭২

ইহা ছাড়াও বহু আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার বান্দার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। চৃড়ান্তভাবে ঈমারের বদৌলতে তিনি তার বান্দাকে নাজাত দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

৩। সহিহ হাদিসের আলোকো বিশুদ্ধ ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা-

(১) উসমান (রাযিঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

‏ مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏‏ ‏

যে ব্যক্তি অন্তরে এ বিশ্বাস রেখে মৃত্যুবরণ করলো যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ২৬, মিশকাত : ৩৭, শুআবুল ঈমান : ৯৪

(২) আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لِيْ جِبْرِيْلُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ أَوْ لَمْ يَدْخُلْ النَّارَ قَالَ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ وَإِنْ

একবার জিবরীল (আ.) আমাকে বললেন, আপনার উম্মাত থেকে যদি এমন ব্যাক্তি মারা যায়, যে আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে নাই, তবে সে ব্যাক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে কিংবা তিনি বলেছেন, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদিও সে যিনা করে এবং চুরি করে। জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন, যদিও (সে যিনা করে ও চুরি করে)। সহিহ বুখারি : ৩২২২

(৩) আনাস (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ

যে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।

আবূ আবদুল্লাহ বলেন, আবান (রহ.) বর্ণনা করেছেন, আনাস (রা.) হতে এবং তিনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে নেকী এর স্থলে ’ঈমান’ শব্দটি রিওয়ায়াত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৪৪

(৪) সুহায়ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

‏ عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لأَحَدٍ إِلاَّ لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ

মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবাতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর। সহিহ মুসলিম : ২৯৯৯

(৫) আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ), ‘নূহ (আঃ)-এর মৃত্যুর সময় তাঁর দুই ছেলেকে অছিয়ত করে বলেন-

إِنِّي قَاصِرٌ عَلَيْكُمَا الْوَصِيَّةَ آمُرُكُمَا بِاثْنَتَيْنِ وَأَنْهَاكُمَا عَن اثْنَتَيْنِ أَنْهَاكُمَا عَن الشِّرْكِ وَالْكِبْرِ وَآمُرُكُمَا بِلَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ فَإِنَّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا فِيهِمَا لَوْ وُضِعَتْ فِي كِفَّةِ الْمِيزَانِ وَوُضِعَتْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ فِي الْكِفَّةِ الْأُخْرَى كَانَتْ أَرْجَحَ وَلَوْ أَنَّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا حَلْقَةً فَوُضِعَتْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ عَلَيْهَا لَفَصَمَتْهَا أَوْ لَقَصَمَتْهَا

আমি তোমাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (বলার) আদেশ করছি। কেননা সাত আসমান এবং সাত যমীনকে যদি মীযানের এক পাল্লায় রাখা হয় আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’কে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তাহ’লে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র পাল্লা বেশী ভারী হবে। যদি সাত আসমান এবং সাত যমীন নিরেট গোলাকার বস্ত্ত হয়, তাহলেও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেবে’। সিলসিলা আহাদিস আস সহিহহা :  ১৩৪, আহমাদ : ৭১০১

(৬) আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে প্রশ্ন করা হলঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবূ হুরাইরা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ  (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে। সহিহ বুখারি : ৯৯, ৬৫৭০

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০২ ::  তাওহিদের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা থাকবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদাদের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। বান্দা তার নাম, সিফাত এবং কর্মাবলীর ক্ষেত্রে তাঁকে এক ও অদ্বিতীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করা। ভাল মন্দ, লাভ লোকসান সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পৃথিবীতে সঙ্ঘটিত ও সঙ্ঘটিতব্য সকল ঘটনা অনুঘটনা এক মাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এবং তাঁর ইশারাতেই হয়ে থাকে। এখানে অন্য কোন মাধ্যম ও কার্যকারণের ন্যূনতম ভূমিকা নেই। প্রত্যেক মানুষ সকল বিষয়কে উপরোক্ত বিশ্বাসের আলোকে বিচার করবে। এটিই হচ্ছে মূলত তাওহীদের সার কথা। আর প্রভূত্ব, ইবাদাত, নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের অস্তিত্বকে প্রমাণ করা হল তাওহীদ। সুতরাং এক মাত্র তারই ইবাদাত করবে। যে ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তাঁর সাথে অন্য কারো ইবাদত করবে না। আর যে ব্যক্তি তাওহীদের শিক্ষা ও তাৎপর্য বাস্তবায়ন করলো সে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাকে কোনোই শাস্তি পেতে হবে না। শিরক ও বিদআত হচ্ছে এই মূল ভিত্তির বিধ্বংসীকারী মারঅস্ত্র। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তার তাওহীদ বা একত্ববাদের  কথা মহা গ্রন্থ আল কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে তুলে ধরছেন। আল্লাহর মারোফাত বা পরিচয়ের সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ কয়েকটি আয়াতগুলো দেওয়া হলো-

আল্লাহ রব্বুল আমালিম বলেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ:  বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

আল্লাহ রব্বুল আমালিম বলেন-

ٱللَّهُ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَىُّ ٱلۡقَيُّومُ‌ۚ لَا تَأۡخُذُهُ ۥ سِنَةٌ۬ وَلَا نَوۡمٌ۬‌ۚ لَّهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ‌ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَىۡءٍ۬ مِّنۡ عِلۡمِهِۦۤ إِلَّا بِمَا شَآءَ‌ۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ‌ۖ وَلَا يَـُٔودُهُ ۥ حِفۡظُهُمَا‌ۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِىُّ ٱلۡعَظِيمُ (٢٥٥)

 অর্থ:  “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” সূরা বাকারার ২৫৫ নং আয়াত (এ আয়াতটি কে আয়াতুল কুরসী বলা হয়)।

আল্লাহ রব্বুল আমালিম বলেন-

هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِى لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ‌ۖ عَـٰلِمُ ٱلۡغَيۡبِ وَٱلشَّهَـٰدَةِ‌ۖ هُوَ ٱلرَّحۡمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ (٢٢)

 هُوَ ٱللَّهُ ٱلَّذِى لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡمَلِكُ ٱلۡقُدُّوسُ ٱلسَّلَـٰمُ ٱلۡمُؤۡمِنُ ٱلۡمُهَيۡمِنُ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡجَبَّارُ ٱلۡمُتَڪَبِّرُ‌ۚ سُبۡحَـٰنَ ٱللَّهِ عَمَّا يُشۡرِڪُونَ (٢٣)

هُوَ ٱللَّهُ ٱلۡخَـٰلِقُ ٱلۡبَارِئُ ٱلۡمُصَوِّرُ‌ۖ لَهُ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ‌ۚ يُسَبِّحُ لَهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۖ وَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (٢٤)

অর্থ:  তিনিই আল্লাহ্‌, তিনি ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নাই। যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সব জানেন। তিনি মহান এবং পরম করুণাময়।  তিনিই আল্লাহ্‌, তিনি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই। তিনিই সার্বভৌম, পবিত্র, শান্তি উৎস, ঈমানের বিধায়ক, নিরাপত্তার রক্ষক, পরাক্রমশালী, অপ্রতিরোধ্য, সর্বশ্রেষ্ঠ। মহিমা আল্লাহ্‌র। তারা আল্লাহ্‌র সম্বন্ধে যে শরীক আরোপ করে তিনি তার উর্দ্ধে। তিনিই আল্লাহ্‌ সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক, আকৃতির রূপকার, সকল উত্তম নাম তারই। আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা হাশর : ২২-২৪

তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে বান্দা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়, এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা,  তিনিই সকল ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য, তিনি সর্বোতভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলী ও বৈশিষ্টে বৈশিষ্টমন্ডিত। তাওহীদের সার কথা এই যে, বান্দা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের রুবুবিয়াতে (প্রভুত্বে), উলুহিয়াতে (উপাস্যত্বে) এবং আসমা ওয়াসসিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) একক বলে স্বীকার করবে, কোন শরীক স্থাপন করবে না। নিম্মে বর্ণিত তিনটি বিষয়ের সমষ্টিই হল তাওহীদ।

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম

বুঝার জন্য বিষয় তিনটিকে আলাদা ভাবে ব্যাখ্যা করা হল:

(১) তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালক এককত্ত্ব:

আল্লাহকে তার কর্ম সমুহে একক হিসাবে মেনে নেওয়া। বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে, এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক, রিজিক দাতা, জীবন- মৃত্যু দাতা এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনিই একে পরিচালনা করতে কারো মুখাপেক্ষি নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান। সৃষ্টব করা, রিজিক দেওয়া, জীবন-মৃত্যু দান করা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে কাফেরগন এই ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছিল। যেমন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

هُوَ ٱلَّذِى خَلَقَ لَكُم مَّا فِى ٱلۡأَرۡضِ جَمِيعً۬ا ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰٓ إِلَى ٱلسَّمَآءِ فَسَوَّٮٰهُنَّ سَبۡعَ سَمَـٰوَٲتٍ۬‌ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمٌ۬ (٢٩)

অর্থ : তিনিই পৃথিবীর সকল বস্তু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। উপরন্তু তার পরিকল্পনা আকাশকেও অন্তর্ভূক্ত করে, তিনি সপ্ত আসমান তৈরির কাজকে সুষম করেন। সকল বিষয় সম্বন্ধে তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। সুরা বাকারা  : ২৯

আল্লাহ তায়ালা একক সৃষ্টিকর্তা হিসাবে নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল:

আল আনাম : ১৭৩-১০১;  আর রাদ : ১৬; আল আম্বিয়া : ৩৩; মুমিনুন : ১২-১৪; আন নুর : ৪৫; আল ফুরকান : ২; লোকমান :১০; আর রহমান : ১৪-১৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلِ ٱللَّهُمَّ مَـٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِى ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُ‌ۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُ‌ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَىۡءٍ۬ قَدِيرٌ۬ (٢٦)

অর্থ :  বল, “হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্‌ ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান কর, এবং যার নিকট থেকে ইচ্ছে কর ক্ষমতা কেড়ে নাও। যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত কর, এবং যাকে ইচ্ছা তুমি অসম্মানিত কর। সকল কল্যাণ তোমার হাতেই। নিশ্চয়ই তুমি সবার উপরে সর্বশক্তিমান। সুরা ইমরান : ২৬

আল্লাহ তায়ালা একমাত্র মালিক হিসাবে নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা হল: আন আন নিসা- ৫৩; আল মায়িদা- ১৭৬; আন নাহল-৭৩; বনী ইসরাইল-১১১; সাবা-২২;  ফাতির-১৩; জুমার-৪৩; যোখরুফ-৮৬; আল ফাতহ- ১১-১৪। মুমিনুন ২৩: ৮৮-৮৯)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ هَـٰذَا لَهُوَ ٱلۡقَصَصُ ٱلۡحَقُّ‌ۚ وَمَا مِنۡ إِلَـٰهٍ إِلَّا ٱللَّهُ‌ۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ (٦٢)

অর্থ:   নিসন্দেহ এটা নির্ভুল সত্য বৃত্তান্ত ৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই৷ আর আল্লাহর সত্তা প্রবল পরাক্রান্ত এবং তার জ্ঞান ও কর্মকৌশল সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থায় সক্রিয়। সুরা আল ইমরান : ৬২

নিম্মে আর ও কিছু আয়াতের রেফারেন্স উল্লেখ করা:  সূরা আল বাকারা-১৬৩ & ২৫৫; আন নিসা-১৭১; আল মায়িদা-৭৩; আল আনআম-৪৬; আল আ’রাফ-৬৫; ইব্রাহিম-৫২; আন নাহল-২২ &৫১; বনী ইসরাইল-২২; আল ক্বাহফ-১১০;  আল আম্বিয়া ১০৮; আল হাজ্জ-৩৪; আল মোমেনুন-৯১; আন নামল-৬০; আল কাছাছ-৭১; সাদ-৬৫; মীম সিজদাহ-৬ যোখরুখ৮৪; আত তূর-৪৩।

০২. তাওহীদে উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা-

ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে তাওহীদুল উলুহিয়াহ বলা হয়। বান্দার যাবতীয় ইবাদাত  সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলোয়াত, জিকির, দান সদকা, দোয়া, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদির এক মাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সন্তষ্টির জন্য করা। সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিরংকুশ করা।

এই তাওহীদুল উলুহিয়াহ কে অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করে তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির নিকট বহু নবী রাসুল প্রেরন করছেন। তারা এসে আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যদের উপসনা ত্যাগ করতে বলেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর। সূরা আম্বিয়া : ২৫

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সূরা নাহল- : ৩৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ

অর্থ: ‘আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসাব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। সুরা মুমিনুন : ১৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

অর্থ: এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো। সুরা বনী ইসরাইল : ৫৭

মজার বিষয় হলো- মক্কার মুশরিকগণ তাওহীদে রুববিয়াহতে বিশ্বাসী হলেও কাফির-

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কার মুশরিকরা আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে রুববিয়াহ বা প্রতিপালক হিসাবে তার কোন অংশীদার নেই এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছিল। যার বহু প্রমাণ কুরআনুল করিমে মজুদ আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُل لِّمَنِ ٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهَآ إِن ڪُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٤) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (٨٥) قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ ٱلسَّبۡعِ وَرَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡعَظِيمِ (٨٦) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ (٨٧) قُلۡ مَنۢ بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ ڪُلِّ شَىۡءٍ۬ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيۡهِ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٨) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ فَأَنَّىٰ تُسۡحَرُونَ (٨٩)

অর্থঃ তাদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা জানো তাহলে বলো এ পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা বাস করে তারা কার (অধীনে)? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহর৷ বলো, তাহলে তোমরা সচেতন হচ্ছো না কেন?

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, সাত আসমান ও মহান আরশের অধিপতি কে? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ।  বলো, তাহলে তোমরা ভয় করো না কেন?  তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, বলো যদি তোমরা জেনে থাকো, কার কর্তৃত্ব চলছে প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তাঁর মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয়ই বলবে, এ বিষয়টি তো আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত ৷ বলো,তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথায় থেকে? সুরা মুমিনুন : ৮৪-৮৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ والأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيَّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللّهُ فَقُلْ أَفَلاَ تَتَّقُونَ

তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেউবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ!খন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?  সুরা ইউনুস ১০:৩১

এই আয়াতগুলি দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ প্রতি পালক হিসেবে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত না। কিন্তু  ইবাদতে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত।

আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না বুঝে যে ইবাদাত করছি। সালাত আদায় করছি, সাওম পালন করী, হজ্জ আদায় করছি, যাকাত আদায় করছি, মান্নত পুরা করছি, দ্বারে দ্বারে দাওয়াত দিচ্ছি, কুরআন তি্লওয়াত মুখে ফেনা তুলছি, জিকির করতে করতে বেহুঁশ হচ্ছি, মাজারে দান করছি, জুমা ঘরে ছিন্নি দিচ্ছি, মাজারে পশু মান্নত করছি, মাজারে পশু জবেহ করছি, সুপারিশ লাভের আশায় মাজারে বা পীরকে তাজিমি সিজদাহ দিচ্ছি, মিলাদ মাহফিল করছি, বিভিন্ন প্রকার খতমের আয়োজন করছি, মাজারে উরশ করছি এর কি হবে। আসলে আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না জানার জন্য আল্লাহর ইবাদাতের সাথে গাইরুল্লাহর ও ইবাদাত করছি। অর্থাৎ না বুঝে হলেও গাইরুল্লাহর ইবাদাত করছি যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَمَا يُؤۡمِنُ أَڪۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ

অর্থঃ অধিকাংশ লোক আল্লাহর প্রতি ইমান আনা স্বত্বেও মুশরিক। সুরা ইউসুফ : ১০৬

এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ প্রতি পালক হিসেবে মহান আল্লাহর সাথে শিরক করত না। কিন্তু  ইবাদতে ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যাবে।

সুরা ফিলের সানে নুযুল থেকে পাই, বাদশা আবরাহা যখন কাবা ধ্বংস করার জন্য আসে তখন তার অগ্রবাহিনী তিহামার অধিবাসী ও কুরাইশদের উট , ছাগল , ভেড়া ইত্যাদি বহু পালিত পশু লুট করে নিয়ে যায়। এর মধ্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা আবদুল মুত্তালিবেরও দু’ শো উট ছিল। এরপর সে মক্কাবাসীদের কাছে নিজের একজন দূতকে পাঠায়। তার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের কাছে এই মর্মে বাণী পাঠায় : আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি এসেছি শুধুমাত্র এই ঘরটি ( কাবা ) ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে । যদি তোমরা যুদ্ধ না করো তাহলে তোমাদের প্রাণ ও ধন – সম্পত্তির কোন ক্ষতি আমি করবো না। তাছাড়া তার এক দুতকেও মক্কাবাসীদের কাছে পাঠায়। মক্কাবাসীরা যদি তার সাথে কথা বলতে চায় তাহলে তাদের সরদারকে তার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দেয়। আবদুল মুত্তালিব তখন ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বড় সরদার। দূত তাঁর সাথে সাক্ষাত করে আবরাহার পয়গাম তাঁর কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। তিনি বলেন , আবরাহার সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এটা আল্লাহর ঘর তিনি চাইলে তাঁর ঘর রক্ষা করবেন। দূত বলে , আপনি আমার সাথে আবরাহার কাছে চলুন। তিনি সম্মত হন এবং দূতের সাথে আবরাহার কাছে যান। তিনি এতই সুশ্রী , আকর্ষণীয় ও প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে , আবরাহা তাকে দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সে সিংহাসন থেকে নেমে এসে নিজে তাঁর কাছে বসে পড়ে। সে তাঁকে জিজ্ঞেস করে , আপনি কি চান ? তিনি বলেন , আমার যে উটগুলো ধরে নেয়া হয়েছে সেগুলো আমাকে ফেরত দেয়া হোক। আবরাহা বলল , আপনাকে দেখে তো আমি বড়ই প্রভাবিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজের উটের দাবী জানাচ্ছেন , অথচ এই যে ঘরটা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষদের ধর্মের কেন্দ্র সে সম্পর্কে কিছুই বলছেন না , আপনার এ বক্তব্য আপনাকে আমার দৃষ্টিতে মর্যাদাহীন করে দিয়েছে। তিনি বলেন , আমি তো কেবল আমার উটের মালিক এবং সেগুলোর জন্য আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি । আর এই ঘর। এর একজন রব , মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হেফাজত করবেন। আবরাহা জবাব দেয় , তিনি একে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আবদুল মুত্তালিব বলেন , এ ব্যাপারে আপনি জানেন ও তিনি জানেন । একথা বলে তিনি সেখান থেকে উঠে পড়েন । আবরাহা তাঁকে তাঁর উটগুলো ফিরিয়ে দেয়।  আবরাহার সেনাদলের কাছ থেকে ফিরে এসে আবদুল মুত্তালিব কুরাইশদেরকে বলেন , নিজেদের পরিবার পরিজনদের নিয়ে পাহাড়ের ওপর চলে যাও , এভাবে তারা ব্যাপক গণহত্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে। তারপর তিনি ও কুরাইশদের কয়েকজন সরদার হারম শরীফে হাযির হয়ে যান। তারা কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করতে থাকেন যে , তিনি যেন তাঁর ঘর ও তাঁর কাদেমদের হেফাজত করেন। সে সময় কাবা ঘরে ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। কিন্তু এই সংকটকালে তারা সবাই এই মূর্তিগুলোর কথা ভুলে যায়। তারা একমাত্র আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য হাত ওঠায় । ইতিহাসের বইগুলোতে তাদের প্রার্থনা বাণী উদ্ধৃত হয়েছে তার মধ্যে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নাম পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ইবনে হিশাম তাঁর সীরাত গ্রন্থে আবদুল মুত্তালিবের নিম্নোক্ত কবিতাসমূহ উদ্ধৃত করেছেন  

 “ হে আল্লাহ ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো। আগামীকাল তাদের ক্রুশ ও তাদের কৌশল যেন তোমার কৌশলের ওপর বিজয় লাভ না করে । যদি তুমি ছেড়ে দিতে চাও তাদেরকে ও আমাদের কিবলাহকে তাহলে তাই করো যা তুমি চাও।  সুহাইলী ‘ রওযুল উনুফ’ গ্রন্থে এ প্রসংগে নিম্নোক্ত কবিতাও উদ্ধৃত করেছেন : ক্রুশের পরিজন ও তার পূজারীদের মোকাবিলায় আজ নিজের পরিজনদেরকে সাহায্য করো। ”

আবদুল মুত্তালিব দোয়া করতে করতে যে , কবিতাটি পড়েছিলেন ইবনে জারীর সেটিও উদ্ধৃত করেছেন। সেটি হচ্ছে :

“হে আমার রব ! তাদের মোকাবিলায়
তুমি ছাড়া কারো প্রতি আমার আশা নেই,
হে আমার রব ! তাদের হাত থেকে
তোমার হারমের হেফাজত করো ।
এই ঘরের শত্রু তোমার শত্রু ,
তোমার জনপদ ধবংস করা থেকে
তাদের বিরত রাখো। ”

এ দোয়া করার পর আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীরাও পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে দিন আবরাহা মক্কায় প্রবশে করার জন্য এগিয়ে যায়। এ সময় ঝাঁকে ঝাকে পাখিরা ঠোঁটে ও পাঞ্জার পাথর কণা নিয়ে উড়ে আসে । তারা এ সেনাদলের ওপর পাথর বর্ষণ করতে থাকে। যার ওপর পাথর কণা পড়তো তার দেহ সংগে সংগে গলে যেতে থাকতো। (তাফসীরে ইবনে কাসির, মারেফুল কুরআন, তাফহীমুল কুরআনের সুরা ফিলের তাফসির।

ঘটনা বলার উদ্যেষ্য হল মক্কার মুসরিকদের রুবুবিয়াতের (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর প্রতি ইমান কত পাকা ছিল শুধু একথাটা বুঝানোর জন্য। আবদুল মুত্তালিবের বক্তব্য দেখুন “আর এই ঘর, এর একজন রব , মালিক ও প্রভু আছেন । তিনি নিজেই এর হিফাজত করবেন।“ “ হে আল্লাহ ! বান্দা নিজের ঘর রক্ষা করে তুমিও তোমার ঘর রক্ষা করো।“ আল্লার রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) প্রতি বিশ্বাস কত মজবুত ছিল।

যদি কোন ব্যক্তি রুবুবিয়াতের (প্রভুত্ব) ক্ষেত্রে এ কথা শত ভাগ বিশ্বাস ও স্বীকার করে যে, আল্লাহ তাআলা এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সকল কিছুর তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন কিন্তু তিনি ইবদতের ক্ষেত্রে আংশিক বা পূর্ন ভাবে অংশিদারত্ব স্থাপন করেন তবে সে মুশরিক।

কলেমা তাইয়েবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর অর্থ হলো আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অর্থাত আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহের ইবাদাত করা যাবে না। মক্কার মুশরিকরা এ কথা ভালো করেই জানত। তাই তারা এই কলেমা স্বীকার করেনি। কিন্তু বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলিম কালিমায়ে তাইয়্যবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর সঠিক অর্থ না জেনে, কালিমাকে স্বীকার করে এবং সাথে গাইরুল্লাহর ইবাদত করে। মক্কার মুশরিকগণ আল্লাহকে প্রতিপালক হিসেবে স্বীকার করে হজ করত, বাইতুল্লাহ তাওয়াব করত কিন্তু যখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) দাওয়াত দেওয়া হল তারা বুঝতে পারল। আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহের ইবাদাত করা যাবে না। তারা আল্লাহ স্বীকার করার পরও লাত, মানাত, উজ্জসহ বহু মুর্তির পুজা করত, আল্লাহ সাথে শিরক করত। কিন্তু লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) তাদের ঐ সকর মুর্তির ইবাদত অস্বীকার করে বিধায় তারা এই কলেমা গ্রহণ করে নাই।

তৎকালিন মুশরিক আবু জাহেল, ওতবা, সায়বা, আবু লাহাব, রাবিয়া, উবাইয়া বিন খলফসহ সকলে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এই কলেমাকে অস্বীকার করে গাইরুল্লাহর দাসত্ব করেছিল। আর আমরা এই কলেমা স্বীকার করে গাইরুল্লাহর দাসত্ব করছি।

বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমানদের অবস্থা জাহিলিয়াতের যুগের মুসলিমদের অবস্থার তুলনায় অনেক খারাপ। বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলিম এ কালিমার বিশুদ্ধ অর্থ সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখে না। পক্ষান্তরে তৎকালীন যুগের আরবরা কালিমার অর্থ কি তা জানত ও বুঝত, কিন্তু তারা তাতে বিশ্বাস করত না। আনেক দাওয়াত দান কারিকে দেখবেন কলেমা তাইয়েবা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর অর্থ করে আল্লাহ ছাড়া কোন প্রতিপালক নেই। অর্থাৎ আমার হায়াতের মালিক, মৌয়তের মালিক, রিজিকের মালিক, সব কিছুর মালিক এক মাত্র আল্লাহ। কিছু থেকে কিছু হয়না সব কিছু আল্লাহ থেকে হয়। তারা কেন অধিকাংশ মুসলিমই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ ) এর এই অর্থ ও ব্যাখ্যাই করে, তারা প্রকৃত পক্ষে এ কথার সত্যিকার অর্থ কি, তা জানে না। ভুলটা কোথায় একবার দেখুন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র অর্থ হবে: ‘আল্লাহ ছাড়া কোন (সত্যিকার) উপাস্য নাই’। আর আমরা অর্থ করছি: ‘আল্লাহ ছাড়া কোন রব (প্রতিপালক) নাই’।  তা হলে কথা দাড়াল আমরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র অর্থ সম্পূর্ণ উল্টা ও বিপরীত জানি। আমরা ইলাহ এর অর্থ করছি রব (প্রতিপালক) কিন্তু ইলাহ এর অর্থ উপাস্য (ইবাদতের মালিক)। মক্কার কুফরেরা  বিশ্বাস করত যে, এ জগতের একজন স্রষ্টা আছে, যার কোন শরিক নাই, কিন্তু তারা আল্লাহর সাথে ইবাদাতে অসংখ্যা শরিক সাব্যস্ত করত কেননা তাদের শরিকগণ মহান আল্লাহর নিকট তাদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে। আল্লাহকে স্বীকার করার পর তার নিকট সুপারিশ পেতে গাইরুল্লাহ ইবাদত করার করা শিরকেরই নামান্ত। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের এ বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে গাইরুল্লাহর ইবাদাত বলে আখ্যায়িত । তারা বিশ্বাস করত রব এক কিন্তু তারা এ ও বিশ্বাস করত যে উপাস্য অসংখ্য।

মক্কার মুশরিকগন ইবাদাতের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শিরক করত এই আশায় যে তাদের উপাস্যরা তাদের কে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেবে অর্থাৎ সুপারিশ করবে৷  যখনই জিজ্ঞাসা করা হত তোমরা কেন এক বাদ দিয়ে অসংখ্য উপাস্যের ইবাদাত করছ। তারা জবাব দিত, এই সকল উপাস্যই আমাদের আল্লাহ নিকটবর্তি করে দিবে।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

اَلَا لِلّٰہِ الدِّیۡنُ الۡخَالِصُ ؕ وَالَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اَوۡلِیَآءَ ۘ مَا نَعۡبُدُہُمۡ اِلَّا لِیُقَرِّبُوۡنَاۤ اِلَی اللّٰہِ زُلۡفٰی ؕ اِنَّ اللّٰہَ یَحۡکُمُ بَیۡنَہُمۡ فِیۡ مَا ہُمۡ فِیۡہِ یَخۡتَلِفُوۡنَ ۬ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِیۡ مَنۡ ہُوَ کٰذِبٌ کَفَّارٌ

জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। সুরা জুমার : : ০৩

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

(١٧) وَيَعۡبُدُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمۡ وَلَا يَنفَعُهُمۡ وَيَقُولُونَ هَـٰٓؤُلَآءِ شُفَعَـٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِ‌ۚ قُلۡ أَتُنَبِّـُٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَلَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۚ سُبۡحَـٰنَهُ ۥ وَتَعَـٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ (١٨)

অর্থ: এ লোকেরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের ইবাদত করছে তারা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না৷ আর তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী ৷ হে মুহাম্মাদ ! ওদেরকে বলে দাও, “তোমরা কি আল্লাহকে এমন বিষয়ের খবর দিচ্ছো যার অস্তিত্বের কথা তিনি আকাশেও জানেন না এবং যমিনেও না!”  তারা যে শিরক করে তা থেকে তিনি পাক -পবিত্র এবং তার উর্ধে৷  সুরা ইউনুস : ১৮

লক্ষ করুন, আরবের মুশরীকেরা আল্লাহর তাওহীদের সঠিত অর্থ বুঝেছির কিন্তু স্বীকার না করে হজ্জের মওসুমে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধত, তালবিয়া পড়ত, কাবা ঘরের প্রভুর ইবাদাত করত, কাবা ঘর তাওয়াব করত, হাজিদের পানি পান করাত, আল্লাহ কাছ চাইত (সুরা ফিলের শানে নুযুল), সাফা মারওয়া সাই করত, দান সদকা করত। এসবগুলি রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর প্রতি কঠিন বিশ্বাসের পরিচয় বহন করে। আল্লাহর প্রতি কঠিন বিশ্বাসের পর ও কি তাহাদের ঠিকানা জাহন্নাম? জী, হ্যা। কারন তারা প্রভুর ইবাদাতে শরীক বা অংশীদার স্থাপন করছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের একটি মাত্র উপায় আ তা হল মানুষকে এ কালিমার দাওয়াত দিতে হবে এবং এ কালিমার মর্মার্থ সঠিক ভাবে তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে তৌফিক দিন। আমিন।

(৩) তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম:

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতির হল :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুনগুলি আচরনগত হোক বা সত্ত্বাগত হোক। সুত্র: তাফসীরুল উসরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম

তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত বলতে বোঝায়, আল্লাহর নামসমূহ (আসমা) এবং গুণাবলির (সিফাত) প্রতি একত্ববাদের ভিত্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ, আল্লাহর নাম ও গুণাবলিকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিকভাবে গ্রহণ করা, কোনো পরিবর্তন, বিকৃতি, অস্বীকার বা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তুলনা না করা।

তাওহীদে আসমা (নামসমুহ):

আসমা বা আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ, যা কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এগুলো আল্লাহর সত্তার বিশেষ দিক নির্দেশ করে। এগুলো আল্লাহর সত্তাকে নির্দেশ করে এবং কুরআন ও হাদিসে উল্লেখিত নামগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِہَا‌ۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِىٓ أَسۡمَـٰٓٮِٕهِۦ‌ۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ (١٨٠)

সবচেয়ে সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহ্‌র অধিকারভুক্ত। সুতরাং সেই নামেই তাঁকে ডাক। যারা তাঁর নামকে অবজ্ঞা করে সে সব লোককে বর্জন কর। তারা যা করে শীঘ্রই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

إِنَّ لِلهِ تِسْعَةً وَتِسْعِيْنَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ

আল্লাহর নিরানব্বই অর্থাৎ এক কম একশ’টি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি তা মনে রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, ৬৪১০, ৭৩৯২, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৫০৮

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে নিরাপত্তা চায়, তাকে নিরাপত্তা দাও। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে ভিক্ষা চায়, তাকে দাও। যে ব্যক্তি তোমাদেরকে দাওয়াত করে তার ডাকে সাড়া দাও। যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে তোমরা তার উত্তম প্রতিদান দাও। প্রতিদান দেয়ার মতো কিছু না পেলে তার জন্য দু’আ করতে থাকো, যতক্ষণ না তোমরা অনুধাবন করতে পারো যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছো।

সুনানে আবূ দাঊদ : ১৬৭২, ৫১০৯, সুনানে নাসায়ী : ২৫৬৭, আহমাদ : ৫৩৪২

ইহা ছাড়া অসংখ্যা সহিহ হাদিসে আল্লাহর নামে নিয়ে সকল কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছে। অজুর শুরুতে, খাওয়ার শুরুতে, জবেহ করার শুরুতে, শিকার করার শুধুতে আল্লাহ নাম নিতে বলা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে সবসময় (بِاللَّهِ) বিসমিল্লাহ ব্যবহার করা হয়।

আসমা বা আল্লাহ নাম সম্পর্কে আমাদের আকিদা হবে-

১. আল্লাহর নামের অর্থে বিকৃতি না করা (تَحْرِيف)

আল্লাহর নামগুলোর প্রকৃত অর্থ পরিবর্তন করা বা বিকৃত করা সম্পূর্ণ হারাম।

উদাহরণ: “আর-রহমান” (পরম দয়ালু) নামকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা।

২. আল্লাহর নামকে সৃষ্টির সঙ্গে তুলনা না করা (تَشْبِيه)

আল্লাহর নাম বা গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।

“لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ”

অর্থ: “তাঁর মতো কিছুই নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।”

(সূরা আশ-শুরা: ১১)

৩. আল্লাহর নাম অস্বীকার না করা (تَعْطِيل)

আল্লাহর নাম সম্পূর্ণ অস্বীকার করা বা তা মানতে অস্বীকৃতি জানানো নিষিদ্ধ।

৪. আল্লাহর নামের প্রকৃত অর্থে সন্দেহ না করা (تَكْيِيف)

আল্লাহর নাম বা গুণাবলির বাস্তব রূপ বা কেমন তা জানতে চেষ্টা করা উচিত নয়। আমরা কেবল কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট অর্থে তা গ্রহণ করব। যেমন- আল্লাহ “শোনেন” (সামীউন), কিন্তু তাঁর শ্রবণ সৃষ্টির মতো নয়।

আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ (আসমা-উল-হুসনা):

নাম (আরবি)বাংলা উচ্চারণবাংলা অর্থ
اللَّهُআল্লাহএকমাত্র উপাস্য
الرَّحْمَٰنُআর-রহমানপরম দয়ালু
الرَّحِيمُআর-রহিমপরম করুণাময়
الْمَلِكُআল-মালিকসর্বশক্তিমান শাসক
الْقُدُّوسُআল-কুদ্দুসএকেবারে পবিত্র
السَّلَامُআস-সালামশান্তি দানকারী
الْمُؤْمِنُআল-মু’মিননিরাপত্তা দানকারী
الْعَزِيزُআল-আজিজপরাক্রমশালী
الْغَفَّارُআল-গফফারঅতিশয় ক্ষমাশীল
الْوَدُودُআল-ওয়াদুদঅগাধ ভালোবাসার অধিকারী
الرَّزَّاقُআর-রায্জাকরিজিক দানকারী
الْعَلِيمُআল-আলীমসর্বজ্ঞ
السَّمِيعُআস-সামীসর্বশ্রোতা
الْبَصِيرُআল-বাসীরসর্বদ্রষ্টা
الْحَكِيمُআল-হাকীমপ্রজ্ঞাময়
التَّوَّابُআত-তাওয়াবঅনুতপ্তদের ক্ষমাকারী
الشَّكُورُআশ-শাকুরকৃতজ্ঞতা গ্রহণকারী
الْكَرِيمُআল-করিমমহা উদার
الرَّؤُوفُআর-রউফঅত্যন্ত দয়ালু
الْجَبَّارُআল-জাব্বারমহা ক্ষমতাবান
الْخَالِقُআল-খালিকস্রষ্টা
الْبَارِئُআল-বারিসৃষ্টির আদর্শ রূপদানকারী
الْمُصَوِّرُআল-মুসাওয়াররূপকার

তাওহীদে সিফাত (গুণাবলি):

তাওহীদে সিফাত বলতে বোঝায়, আল্লাহর গুণাবলির প্রতি সঠিক বিশ্বাস স্থাপন করা, যা কুরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত। আল্লাহর গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণাবলির সঙ্গে তুলনা না করা এবং তা বিকৃত বা অস্বীকার না করা। এগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে, যা আল্লাহ নিজে কুরআনে বলেছেন বা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহর সিফাতের সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস থেকে উদাহরণ তুলে ধরা হলো :

১. আল্লাহ সর্বশ্রোতা (সামি‘)

কুরআনের দলিল:

“إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ”

অর্থ: “নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। সূরা আশ-শোআরা : ২২

২. আল্লাহ সর্বদ্রষ্টা (বাসীর)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا”

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। সূরা আন-নিসা : ৫৮

৩. আল্লাহ ক্ষমাশীল (গাফুর)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا”

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। সূরা আন-নিসা: ৪৩

৪. আল্লাহ দয়ালু (রহিম)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“وَرَبُّكَ الْغَفُورُ ذُو الرَّحْمَةِ”

অর্থ: “আর তোমার রব ক্ষমাশীল, দয়ালু। সূরা কাহফ : ৫৮

৫. আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা (খালিক)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ”

অর্থ: “আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর ওপর অভিভাবক। সূরা যুমার : ৬২

৬. আল্লাহ রিজিক দানকারী (রায্জাক)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ”

অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহই রিজিক দাতা, শক্তিশালী, সুদৃঢ়। সূরা যারিয়াত : ৫৮

৭. আল্লাহ সবকিছু জানেন (আলিম)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

“وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ”

অর্থ: “আর তাঁর কাছেই রয়েছে অদৃশ্যের চাবি, যা তিনি ছাড়া কেউ জানে না। সূরা আনআম : ৫৯

সিফাত সম্পর্কিত হাদিস-

১. আল্লাহর করুণা ও দয়া-

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَمَّا قَضَى اللهُ الْخَلْقَ كَتَبَ فِيْ كِتَابِهِ فَهُوَ عِنْدَهُ فَوْقَ الْعَرْشِ إِنَّ رَحْمَتِيْ غَلَبَتْ غَضَبِي

আল্লাহ যখন সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাব লাওহে মাহ্ফুজে লিখেন, যা আরশের উপর তাঁর নিকট আছে। নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রবল। সহিহ বুখারি : ৩১৯৪, ৭৪০৪, ৭৪১২, ৭৪৫৩, ৭৫৫৩, ৭৫৫৪, সহিহ মুসলিম : ২৭৫১, আহমাদ ৯৬০৩

৫. আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছিঃ বারাকাতময় আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাযির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ তাহকীক সানী (হাঃ ২৩৩৬)

সিফাত সম্পর্ক আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো-

১. তাতিল (অস্বীকার না করা):

আল্লাহর কোনো গুণ অস্বীকার করা যাবে না।

২. তাহরিফ (বিকৃতি না করা):

আল্লাহর গুণাবলির অর্থ বিকৃত করা নিষিদ্ধ।

৩. তাকইফ (কিভাবে তা হয়, তা নির্ধারণ না করা):

আমরা জানি না আল্লাহর গুণাবলি কীভাবে কাজ করে।

যদি তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না পায় তবে সে শিরকই কাজে লিপ্ত হবে। আমাদের উপমাদেশের প্রায় সকল মুসলিমদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল এবং এখনও তাদের পাশাপাশি বাস করছি। জন্মের সাথে সাথে তাদের আচার আচরণ আমাদের সামাজিক জীবনে একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে আমরা তাদের পূজা পার্বন্যে অংশ গ্রহণ করি এমনকি তাদের এ সকল অনুষ্ঠান সুন্দর করে উদ্‌যাপন করা জন্য চাঁদা প্রদান করি।

অপর পক্ষে যারা তাওহীদের সঠিক জ্ঞান রাখে। তারা সমাজের এ সকল শির্ক কাজ থেকে শতভাগ দুরে থাকার চেষ্টা করে। অনেক সময় এই শির্ককারী অজ্ঞ মুসলিমকে শির্ক থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তখন উভয় পক্ষের মাঝে তাওহীদের জ্ঞানগত অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য থেকেই শুরু হয় শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি। কাজেই বলতে পারি সকল মুসলিম ভাইদের তাওহীদের জ্ঞান থাকলে ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হত না। যদি জম্ম থেকেই সকলে তাওহীদের সঠিক দিক নির্দেশনা পেত তবে অন্তত এ কারণে তাদের মাঝে ফির্কাবাজী মনোভাব তৈরি হত না।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য – ৩ (১-৫) :: কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিস সম্মত আকিদা ধারণ করবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত কুরআন ও সহিহ হাদিসের ওপর ভিত্তি করে তাদের আকিদা (বিশ্বাস) এবং আমল প্রতিষ্ঠা করে। তাদের আকিদা নিম্নোক্ত মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তারা তাওহিদ (একত্ববাদ) বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়। তিনি স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং একমাত্র উপাস্য। আল্লাহর কোনো সাদৃশ্য নেই এবং তাঁর গুণাবলি (সিফাত) তাঁর সত্তার সাথে সংগতিপূর্ণ। রিসালাত সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস আল্লাহর রাসূলগণ তাঁর নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রেরিত। সকল রাসুলগণই হক ও সত্যের উপর থেকে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশেষ নবি এবং তাঁর পরে আর কোনো নবি আসবে না (খাতামুন নাবিয়্যিন)। তারা আখিরাত তথা মৃত্যুর পরে জীবনের, কিয়ামতের দিন, জান্নাত, জাহান্নাম, হাশর এবং বিচার দিবসের প্রতি ঈমান রাখে। তাদের বিশ্বাস কিয়ামতের দিন আমল ও বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ হবে। তাদের বিশ্বাস কুরআন আল্লাহর কালাম এবং এটি বিকৃত বা পরিবর্তিত হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা এবং জীবনের জন্য দিকনির্দেশনা। তারা সাহাবাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কনে ও তাদের অনুসরণ করা। তাদের মধ্যকার বিভেদ নিয়ে অতিরিক্ত সমালোচনা না করা। তাদের শুধু প্রশংসা করে, সমালোচনা এড়িয়ে চলে। তারা তাকদির বা আল্লাহর পূর্ব নির্ধারণের প্রতি বিশ্বাস। ভালো ও মন্দ সবই আল্লাহর জ্ঞানের আওতাভুক্ত এবং তাঁর ইচ্ছাতেই ঘটে। ইবাদতে ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করে এবং ধর্মে কোনো নতুন সংযোজন বা পরিবর্তনকে বিদআত (নবপ্রবর্তিত কর্ম) হিসেবে পরিহার করা। এই জামাত উম্মাহর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা এবং অযথা বিভেদ সৃষ্টি না করা থেকে বিরত থাকাকে ফরজ মনে করে।

এই হলো আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদার মূল ভিত্তি। কিন্তু কালের আবর্তনের ফলে তাদের মাঝেও অনেক ভ্রান্ত আকিদা প্রবেশ করেছেন। যার ফলে মূল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে ভ্রান্ত আকিদার অনুসারিগণ দূরে সরে গিয়েছেন। ভ্রান্ত আকিদা ধারণকারী নতুন ফির্কা সৃষ্টি করে নতুন নামকরণ করলেও তারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারী দাব করে থাকে।

মজার বিষয় হলো, তাদের এই ভ্রান্ত আকিদা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত এর থেকে আলাদা হলেও তারা নিজের আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত পরিচয় ধারণ করে আছে। এই জামাতের সহিহ আদিকা সম্পর্কে বহু কিতাব রচিত হয়েছে। আকিদা জানতে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সে সকল কিতাব পাঠ করতে পারেন। আমি এখানে যারা ভ্রান্ত আকিদা ধারণ করে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত পরিচয় দেয় তাদের কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরছি যাতে এই ভ্রান্ত আকিদা দেখলেই বুঝতে পারবেন এরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।

যদি কেউ নিম্নের ভ্রান্ত আকিদাগুলি ধারণ করে, প্রচার করে ও বিশ্বাস করে তবে বুঝবেন তারা এই সঠিক, সত্যপন্থি, মুক্তি প্রাপ্ত দল আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা একটি ভ্রান্ত ধারণার অনুসারী। যদিও তারা দাবি করে আমরা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী কিন্তু ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাস করার কারণ তারা বাতিল ফির্কা। নিম্নে সতর্ক করার জন্য বাতিল ফির্কার কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুল ধরছি। যাতে সহজে বুঝতে পারেন, এই সব বাতিল ফির্কা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নাম ব্যবহার করে তাদের ভ্রান্ত আকিদা প্রচার ও প্রসার করেছে। নিম্নে তাদের কিছু ভ্রান্ত আকিদা বর্ণনা হরা হলো-

১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা হয়।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার ধারণা থেকে উর্ধে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدۡرِہٖ ٭ۖ وَالۡاَرۡضُ جَمِیۡعًا قَبۡضَتُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَالسَّمٰوٰتُ مَطۡوِیّٰتٌۢ بِیَمِیۡنِہٖ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ

তারা আল্লাহর যথাযথ সম্মান করেন না। কিয়ামাত দিবসে সমস্ত পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুষ্টিতে এবং আকাশমণ্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাকে শরিক করে তিনি তার ঊর্ধ্বে। সুরা জুমার : ৬৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ یٰۤاِبۡلِیۡسُ مَا مَنَعَکَ اَنۡ تَسۡجُدَ لِمَا خَلَقۡتُ بِیَدَیَّ ؕ اَسۡتَکۡبَرۡتَ اَمۡ کُنۡتَ مِنَ الۡعَالِیۡنَ

তিনি বললেন, হে ইবলিস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহংকার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন?  সুরা সোয়াদ : ৭৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وُجُوهٌ۬ يَوۡمَٮِٕذٍ۬ نَّاضِرَةٌ إِلَىٰ رَبِّہَا نَاظِرَةٌ۬

সেদিন কোন কোন মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।  সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বলেন-

 يَوۡمَ يُكۡشَفُ عَن سَاقٍ۬ وَيُدۡعَوۡنَ إِلَى ٱلسُّجُودِ فَلَا يَسۡتَطِيعُونَ

সে দিন (আল্লাহর) পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহ্বান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়েই স্বীয় রবের নিকট অভিযোগ করল। জান্নাত বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ব্যাপারটি কী যে তাতে শুধু নিঃস্ব ও নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই প্রবেশ করবে। এদিকে জাহান্নামও অভিযোগ করল অর্থাৎ আপনি শুধু অহংকারীদেরকেই আমাকে প্রাধান্য দিলেন। আল্লাহ্ জান্নাতকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি আমার রহমত। জাহান্নামকে বললেন, তুমি আমার আজাব। আমি যাকে চাইব, তোমাকে দিয়ে শাস্তি পৌঁছাব। তোমাদের উভয়কেই পূর্ণ করা হবে। তবে আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির কারো উপর জুলুম করবেন না। তিনি জাহান্নামের জন্য নিজ ইচ্ছানুযায়ী নতুন সৃষ্টি করবেন। তাদেরকে যখন জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন জাহান্নাম বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? জাহান্নামে আরো নিক্ষেপ করা হবে, তখনো বলবে, আরো অতিরিক্ত আছে কি? এভাবে তিনবার বলবে। অবশেষে আল্লাহ তাঁর পা জাহান্নামে প্রবেশ করিয়ে দিলে তা পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। তখন জাহান্নামের একটি অংশ অন্য অংশকে এ উত্তর করবে- আর নয়, আর নয়, আর নয়। সহিহ বুখারি : ৭৪৪৯

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারণা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোনো সৃষ্টির আকারে সৃষ্টি করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি। কেননা মহান আল্লাহর ঘোষণা, মহা বিশ্বের কোনো কিছুই আমার সদৃশ নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَاطِرُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ جَعَلَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا وَّمِنَ الۡاَنۡعَامِ اَزۡوَاجًا ۚ یَذۡرَؤُکُمۡ فِیۡہِ ؕ لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের গ্রষ্টা। তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া বানিয়েছেন এবং চতুষ্পদ জন্তু থেকেও জোড়া বানিয়েছেন, তিনি তোমাদেরকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সবদ্র্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নয়। কাজেই আল্লাহ তায়ালার কাছে আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। তাই নিরাকার বলাটা তো একেবারেই অযৌক্তিক।  সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

এ সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর উক্তিটি যথার্থ। তিনি বলেন-

আল্লাহর ইয়াদ (হাত) আছে, ওয়াজহ (মুখমন্ডল) আছে, নফস (সত্তা) আছে, কারণ আল্লাহ কুরআনে এগুলো উল্লেখ করেছেন। কুরআনে আল্লাহ যা কিছু উল্লেখ করেছেন, যেমন- মুখমন্ডল, হাত, নফস ইত্যাদি সবই তাঁর বিশেষণ, কোনো ‘স্বরূপ’ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। এ কথা বলা যাবে না যে, তাঁর হাত অর্থ তাঁর ক্ষমতা অথবা তাঁর নিয়ামত। কারণ এরূপ ব্যাখ্যা করার অর্থ আল্লাহর বিশেষণ বাতিল করা। এরূপ ব্যাখ্যা করা কাদারিয়া ও মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের রীতি। বরং তাঁর হাত তাঁর বিশেষণ, কোনো স্বরূপ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। তাঁর ক্রোধ এবং তাঁর সন্তুষ্টি তাঁর দুটি বিশেষণ, আল্লাহর অন্যান্য বিশেষণের মতই, কোনো ‘কাইফ’ বা ‘কীভাবে’ প্রশ্ন করা ছাড়াই।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রাহিমাহুল্লাহ এর লেখা, আল ফিকহুল আকবারের বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃ-২২৫

কাজেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর কোন নির্দিষ্ট আকার দেয়া বা তাকে নিরাকার সাব্যস্ত করা, দু’টিই কবিরা গুনাহ অন্তর্ভুক্ত।

২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

 কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মারেফাত বা পরিচয় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাকে নিজস্ব জ্ঞান, বুদ্ধি আর কল্পনা দ্বারা মানব সত্তার অবস্থানের মত অবস্থান কল্পনা করা যাবে না। তিনি কোথায় সে বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন আমাদের জন্য ওয়াজিব। এই সম্পর্কে কিছু বলার আগে কুরআনের কিছু আয়াত দেখেনি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى

দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত  হয়েছেন।  সুরা ত্বহা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-

الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا

যিনি আসমান জমিন ও এতদুভয়ের অন্তবর্র্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর। সুরা ফুরকান : ৫৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশের উপর সমুন্নত আছেন এ সম্পর্কিত আয়াত: সুরা সাজদা : ৪, সুরা ইউনুস : ৩, সুরা রাদ : ২, সুরা আরাফ : ৫৪, সুরা মুলক : ১৭,  সুর হাদিদ : ৪।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

 أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۖ مَا يَڪُونُ مِن نَّجۡوَىٰ ثَلَـٰثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمۡ وَلَا خَمۡسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُہُمۡ وَلَآ أَدۡنَىٰ مِن ذَٲلِكَ وَلَآ أَڪۡثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمۡ أَيۡنَ مَا كَانُواْ‌ۖ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُواْ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَىۡءٍ عَلِيمٌ (٧)

আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস সম্পর্কে অবগত, সে ব্যাপারে তুমি কি সচেতন নও? যখনই তিন ব্যক্তির মধ্যে কোন গোপন কানাঘুষা হয়, তখন সেখানে আল্লাহ অবশ্যই চতুর্থজন হিসেবে উপস্থিত থাকেন৷ যখনই পাঁচজনের মধ্যে গোপন সলাপরামর্শ হয় তখন সেখানে ষষ্ঠ জন হিসেবে আল্লাহ অবশ্যই বিদ্যমান থাকেন৷  গোপন সলাপরামর্শকারীরা সংখ্যায় এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক, এবং তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সাথে থাকেন৷ তারপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দেবেন তারা কি কি করেছে৷ আল্লাহ সর্বজ্ঞ৷  সুরা মুজাদালা : ৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-

 وَلِلَّهِ ٱلۡمَشۡرِقُ وَٱلۡمَغۡرِبُ‌ۚ فَأَيۡنَمَا تُوَلُّواْ فَثَمَّ وَجۡهُ ٱللَّهِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ۬ (١١٥)

পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত। সুরা বাকারা : ১১৫

ইহা ছাড়াও বহু আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আমি আমাদের সাথে আছি,  সবরকারীদের সাথে আছি, মুত্তাকিদের সাথে আছি, মুমিনদের সাথে আছি।

প্রথম দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশের উপর সমুন্নত আছেন। পরের দুই আয়াতসহ অনেক আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সাথে আছেন। তাহলে এই আয়াতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা কী?

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি বলেন-

هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ

তিনি নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন। সুরা হাদীদ : ৪

ভাল করে লক্ষ করুন হাদীদের এই আয়াতের প্রথমে আল্লাহ তায়ালা বললেন, তিনি আরশের উপর সমুন্নত আছেন এবং এই আয়াতই তিনি বললেন, আমাদের সাথে আছেন। তাহলে আল্লাহ কি আত্মভোলা (নাউজুবিল্লাহ)। এ আয়াতের তাফসির আয়াতেরই শেষাংশ আর তা হল, আল্লাহ সব কিছু দেখেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে সকল সৃষ্টির সাথে আছেন। অর্থাৎ তিনি সপ্ত আসমানের উপর অবস্থিত আরশের উপর থেকেই সব কিছু দেখছেন, সব কিছু শুনছেন, সকল বিষয়ে জ্ঞাত আছেন।

সাথে থাকার অর্থ, গায়ে গায়ে লেগে থাকা নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মূসা ও হারূন আ. কে ফেরাউনের নিকট যেতে বললেন, তারা ফেরাউনের অত্যাচারের আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন। আল্লাহ তাদের সম্বোধন করে বললেন, ‘‘তোমরা ভয় পেয়ো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। শুনছি এবং দেখছি। সুরা ত্বহা : ৪৬ এখানে সাথে থাকার অর্থ এটা নয় যে, মূসা আ. এর সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরাউনের দরবারে গিয়েছিলেন। বরং সাথে থাকার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই করছেন এই বলে যে, ‘‘শুনছি এবং দেখছি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরশে আছেন বলেই, কুরআন পৃথিবীতে নাজিল করা হয়েছে এবং মিরাজে রাসূল ﷺ কে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করান। তিনি সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজ মান হলে জিবরাইল আ. এর মাধ্যমে কুরআন নাজিল করার প্রয়োজন ছিন না। মিরাজেও ঊর্ধ্বাকাশের গমনেন প্রয়োজন ছিল না। অতএব আল্লাহর সাথে থাকার অর্থ হলো জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতার মাধ্যমে, আর স্ব-সত্তায় তিনি আরশের উপর রয়েছেন।

তা হলে প্রশ্ন হল ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান’ কথাটা কি সঠিক?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান” বাক্যটির অর্থ যদি হয় ‘‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্ব-সত্তায় সর্বত্র বিরাজমান” তা হলে কথাটি সরাসরি বাতিল। আর যদি বলা হয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ও ক্ষমতা দ্বারা সর্বত্র বিরাজমান তাহলে সঠিক হবে। আমরা শত শত কিলোমিটার দুর থেকে লাইভ টেলিকাস্ট দেখি আর ভাবি এত আমার চোখের সামনেই ঘটছে। কারণ আমার জ্ঞান, শ্রবণ, দর্শন ঐ ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত।

সুরা বাকারার ১১৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরবীদ হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনু কাসীর রহ. বলেন- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হতে কোন জায়গা শূন্য নেই, এর ভাবার্থ যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ‘ইলম’ বা অবগতি হয় তাহলে অর্থ সঠিক হবে, যে কোন স্থানেই আল্লাহ পাকের ইলম হতে শূন্য নেই। আর যদি এর ভাবার্থ হয় ‘আল্লাহ তা আল্লাহ সত্তা’ তবে এটা সঠিক হবে না। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে, তার সৃষ্টি জীবের মধ্য হতে কোন জিনিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন তা থেকে তার পবিত্র সত্তা বহু ঊর্ধ্বে। তাফসিরে ইবনে কাসির প্রথম খণ্ড পৃ-৩৭২

আবু মুতি আল হাকাম ইবনে আব্দুল্লাহ আল বালাখি রহ. বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফা রহ. কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেউ যদি বলে, আমি জানি না আল্লাহ্ কোথায় পৃথিবীতে না আসমানে,তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন সে কাফির। কেননা আল্লাহ বলেছেন, “পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। (সুরা ত্বহা ২০:৫)। আবু মুতি বলেছেন, অতঃপর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করে ছিলাম যে কেউ যদি বলে, আল্লাহ উপরে অধিষ্ঠিত কিন্তু আমি জানিনা আরশ কোথায় অবস্থিত, আকাশে না পৃথিবীতে। তাহলে তার সম্পর্কে আপনার অভিমত কি? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছেন, সে ব্যক্তি কাফির কেননা সে এ কথা অস্বীকার করে যে, ‘পরম করুণাময় আরশের উপর সমাসীন। আল ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃষ্ঠা -২৬১; ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গির রহ.

কুরআন, সহিহ হাদিস ও সালাফদের উক্ত থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান। কিন্তু তিনি স্বভাবগত ভাবে, সাত আসমানের উপর আরশে আযীমে সমুন্নত। আর এটাই হল বিশুদ্ধ আকীদা। আল্লাহ সম্পর্কে এর বিকল্প চিন্তা করা শিরকের  মত কবিরা গুনাহ।

৩।  রাসুলুল্লাহ আমাদের মত মানব ছিলেন না

ভ্রান্ত আকিদব হলো : রাসুলুল্লাহ আমাদের মত মানব ছিলেন না

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন কিন্তু তিনি মহান আল্লাহ মনোনিত রাসুল ছিলেন, তার উপর ওহি নাজিল হত।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلاً۬ صَـٰلِحً۬ا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦۤ أَحَدَۢا

বলুন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহি করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করে। সুরা আল কাহাব : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তায়ালা আরাও বলেন-

قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬ فَٱسۡتَقِيمُوٓاْ إِلَيۡهِ وَٱسۡتَغۡفِرُوهُ‌ۗ وَوَيۡلٌ۬ لِّلۡمُشۡرِكِينَ

(হে নবি) বলুন, আমি কেবল তোমাদের মত একজন মানুষ। আমার কাছে ওহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল এক ইলাহ। অতএব তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাক এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। আর মুশরিকদের জন্য ধ্বংস। সুরা হা-মিম-সিজদা : ৬

কুরআনের আয়াতগুলিতে স্পষ্ট ঘোষণা রাসুল ﷺ আমাদের মতই একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ ﷺ কে নবি ও রাসুল বানিয়ে সর্বোউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা আসনে বসিয়েছেন। সুতরাং রাসুলুল্লাহ ﷺ মহা মানব না বলে, অতি মানব বা মানুষ ছিলেন বলা কবিরা গুনাহে অন্তর্ভুক্ত।

৪। রাসুলুল্লাহ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তায়ালা মানুকে যে উপাদান দ¦ারা সৃষ্টি করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কেও সেই একই উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।

কুরআনের বহু আয়াত আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- রাসুলুল্লাহ ﷺ একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই জানেন মানুষ কে তিনি কোন উপাদানে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

وَمِنۡ ءَايَـٰتِهِۦۤ أَنۡ خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ۬ ثُمَّ إِذَآ أَنتُم بَشَرٌ۬ تَنتَشِرُونَ

তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন। এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছ। সুরা রুম : ২০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَـٰنَ مِن سُلَـٰلَةٍ۬ مِّن طِينٍ۬

আমি মানুষকে তৈরি করেছি মাটির উপাদান থেকে। সুরা মুমিনুন : ১২

মানুষ মাটির তৈরি এ সম্পর্কিত আরও আয়াত: সুরা আল ইমরান : ৫৯, সুরা আনাম : ২, সুরা  আরাফ : ১২, সুরা সাফফাত : ১১, সুরা সোয়াদ : ৭১, ৭৫, ৭৬।

আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সৃষ্টি করছেন নুর দিয়ে, জিনদের সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা থেকে (সুরা আর রহমান : ১৫)। আর মানুষকে সৃষ্টি করছেন মাটির উপাদান থেকে। প্রত্যেক সৃষ্টির উপাদান আলাদা, তাই সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য ও আলাদা। মানুষ হিসেবে তাদের কিছু মানবিয় বৈশিষ্ট্য ও আছে। যেমন- খাবার গ্রহণ করা, পিপাসার জন্য পানি পান করা, বিবাহ করা, সন্তানের জন্মে দেওয়া, বাজারে গমন করা, দুনিয়াবি বিভিন্ন কাজে অংশ গ্রহণ করা ইত্যাদি। এই মানবিয় বৈশিষ্ট্যগুলি ও তাদের মধ্যে ছিল।

রাসুলুল্লাহ ﷺ  নুরের তৈরি এই সম্পর্কে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসনাদ আবী হানীফা, মুআত্তা মালিক, মুসনাদ আহমাদ, মিশকাত প্রভৃতি  গ্রন্থ কোন হাদিস নাই। চার ইমামসহ ইসলামের প্রথম ৫০০ বৎসরের মধ্যে কেউ কোন হাদিস গ্রন্থ নুর সম্পর্কে কোন হাদিন লিপিবদ্ধ করে নাই। হাদিস সংকলনের ৫০০ বছরের পর রাসুলুল্লাহ ﷺ কথা লিখবেন অথচ পূর্বের কোন কিতাবের রেফারেন্স দিবেন না, তা কি করে হয়? মনে রাখবেন হাদিস সংকলনের ৫০০ বছর পর কেউ কোন কথা লিখলে বা বললে তাকে অবশ্যই কিতাবের রেফারেন্স দিতে হবে। তা না হলে সে যে কথাটি লিখল বা বলল তা অবশ্যই তার নিজস্ব মতামত বা জাল কথা।

রাসুলুল্লাহ ﷺ  কে আল্লাহর নূরে তৈরি হয়েছে এ কথাটা খুবই বিপদ জনক, ইসলামে থাকা না থাকার প্রশ্ন। রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নূর। যদি এ অর্থে বলা হয় যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর স্বভাবগত নূর, তাহলে তা কুরআন বিরোধী, কারণ কুরআনে তাকে মানুষ বলা হয়েছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসে কোথাও বলা হয়নি আল্লাহর সত্তা নূর। তাহলে রাসুল ﷺ আল্লাহর স্বভাবগত নূর হওয়ার তো কোন প্রশ্ন আসে না।

যদি কেউ বলে রাসুল ﷺ কে আল্লাহর স্বভাবগত নূর থেকে সৃষ্টি করা হইয়াছে। তাহলে তো বলা হল রাসুল ﷺ স্বয়ং আল্লাহর সত্তা। তাহলে তার সুস্পষ্ট মর্ম দাঁড়ায় আল্লাহই রাসূল এবং রাসূলই আল্লাহ। আর এটা যে প্রকাশ্য কুফর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যদি বলা হয়, রাসূল আল্লাহর জাতি নূর মানে হুবহু আল্লাহর সত্তা নন, বরং তাঁর সত্তার অংশ বিশেষ, তাহলে এর পরিষ্কার মর্ম দাঁড়ায় আল্লাহর সত্তায় রাসূল অংশীদার। অথচ এটা যে প্রকাশ্য শিরক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।

৫।  আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

প্রতিটি সৃষ্টি জীবের মতই আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু বরণ করতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ۬ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُ‌ۚ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوۡ قُتِلَ ٱنقَلَبۡتُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَـٰبِكُمۡ‌ۚ وَمَن يَنقَلِبۡ عَلَىٰ عَقِبَيۡهِ فَلَن يَضُرَّ ٱللَّهَ شَيۡـًٔ۬ا‌ۗ وَسَيَجۡزِى ٱللَّهُ ٱلشَّـٰڪِرِينَ

মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া কিছুই নয়। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথাযথ পুরস্কার দেবেন। আলে ইমরান : ১৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ

নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। সুরা জুমার : ৩০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَـٰلِدُونَ (٣٤) كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةً۬‌ۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٣٥)

আর তোমার পূর্বে কোনো মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে? প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে৷  আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকে ফিরে আসতে হবে৷  সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫

আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর মারা গেছেন কিনা এ সম্পর্কে আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি?

সুতরাং যদি বিশ্বাস করি কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করা হয়েছে তবে তা হবে কুরআন বিরোধী শিরকি বিশ্বাস। মৃত্যুর পরে এবং পুনূরূত্থানের পূবের্র জীবনকে বলা হয় ‘বারযাখি জীবন’। ‘বারযাখি হায়াত’’ সময়টাকে আমরা সকলে কবরে অবস্থানের সময়কে বুঝিয়ে থাকি। এই জীবনের কবি, শহিদ, মুসলিম, অমুসলিম সকলে জীবিত। কেননা, কবর আজাব সত্য। অপর পক্ষে নবি ও শহিদের ব্যাপারে স্পষ্ট ঘোষণা আছে। কিন্তু তাদের হায়াতকে ‘বারযাখী হায়াত’ না বলে, পৃথিবীর মত স্বাভাবিক জীবন আছে মনে করা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী। কাজেই ‘বারযাখি হায়াত’ এর রেফারেন্স দিয়ে যদি বলা হয়, আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি. আওলিয়াগর মৃত্যু নাই। তাহলে নিশ্চয়ই শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ হবে।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য – ৩ (৬-১০) :: কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিস সম্মত আকিদা ধারণ করবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৬। নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُل لَّآ أَمۡلِكُ لِنَفۡسِى نَفۡعً۬ا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَآءَ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَڪۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِىَ ٱلسُّوٓءُ‌ۚ إِنۡ أَنَا۟ إِلَّا نَذِيرٌ۬ وَبَشِيرٌ۬ لِّقَوۡمٍ۬ يُؤۡمِنُونَ

আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু যা আল্লাহ চান। আর আমি যদি গায়বের কথা জেনে নিতে পারতাম, তাহলে বহু মঙ্গল অর্জন করে নিতে পারতাম, ফলে আমার কোন অমঙ্গল কখনও হতে পারত না। আমি তো শুধু একজন ভীতি প্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা ইমানদারদের জন্য। সুরা আরাফ : ১৮৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمۡ عِندِى خَزَآٮِٕنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمۡ إِنِّى مَلَكٌ‌ۖ إِنۡ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّ‌ۚ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِى ٱلۡأَعۡمَىٰ وَٱلۡبَصِيرُ‌ۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ (٥٠)

অর্থ: বল, “আমি তোমাদের বলি নাই যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভাণ্ডার রয়েছে। আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জানি না। আমি তোমাদের এ কথা বলি না যে, আমি একজন ফেরেশতা। আমার নিকট যে প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে, আমি শুধু তার অনুসরণ করি। বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক হতে পারে? তোমরা কি বিবেচনা করবে না? সুরা আনাম : ৫০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী। তার সৃষ্টিজগতের কাউকে তিনি এই বিষয়ে ভাগ প্রদান করেন নাই। এই সম্পর্কিত কিছু রেফারেন্স উল্লেখ করা হল-

সুরা মায়েদা : ১১৬, ১০৯, সুরা আনাম : ৫৯ ৭৩, সুরা তওবা : ১০, ৯৫,৭৮,৪৩, সুরা নাহল- : ৭৭, সুরা ত্বহা : ১১০, সুরা জুরাক : ৮৫, সুরা তাহরিম : ১, সুরা জিন : ২৫, সুরা সাবা : ৩, সুরা আরাফ : ১৮, সুরা আহজাব : ৬৩, সুরা আনাম : ৫৯. সুরা নামল : ৬৫, সুরা হুজুরাত : ১৮, সুরা ফাতির : ৩৮, সুরা লুকমান : ৩৪, সুরা রাদ ; ৮,৯, সুরা হুদ : ১২৩, সুরা বাকারা : ১৩৩, সুরা কাহব : ২৬।

এই সকল আয়াতেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার রাসুলুল্লাহ ﷺ কে পরিস্কারভাবে ঘোষণা দিতে বললেন যে, তুমি বল আমি অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখি না। আমাদের রাসুলুল্লাহ ﷺ যেখানে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখে না, সেখানে সাধারণ একজন অলি, আওলিয়া বা পিরের পক্ষে কীভাবে অদৃশ্য সম্বন্ধে জ্ঞান রাখবেন। অদৃশ্যের জ্ঞান রাখা আল্লাহ একক গুণের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহর এই আদেশ কাউকে দেওয়া হয়নি, এমন কি আমাদের প্রাণ প্রিয় সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুর মুহাম্মদ ﷺ  কেও না। অন্যান্য নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগরতো অনেক দূরের কথা। কাজেই কুরআনের বিরোধী আকিদা প্রষোণ করা নিশ্চয়ই শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।

৭। গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِۦٓ أَحَدًا

তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। সুরা জিন : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ لَّا یَعۡلَمُ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ الۡغَیۡبَ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ اَیَّانَ یُبۡعَثُوۡنَ

বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও জমিনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’। সুরা নামল : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَمَّا قَضَیۡنَا عَلَیۡہِ الۡمَوۡتَ مَا دَلَّہُمۡ عَلٰی مَوۡتِہٖۤ اِلَّا دَآبَّۃُ الۡاَرۡضِ تَاۡکُلُ مِنۡسَاَتَہٗ ۚ  فَلَمَّا خَرَّ تَبَیَّنَتِ الۡجِنُّ اَنۡ لَّوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ الۡغَیۡبَ مَا لَبِثُوۡا فِی الۡعَذَابِ الۡمُہِیۡنِ ؕ

তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না। সুরা সাবা : ১৪

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি ঋতুমতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সংগম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৯০৪,

কুরআন সুন্নাহর আলোকে বলা যায়- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কারো কাছে গায়ের প্রকাশ করেন না, কোন নবি রাসুলও গায়েব জানে না, এমনকি কোন জিনও গায়েব জানে না। তাহলে গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের খবর রাখেন এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া নিঃসন্দেহে শিরক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।

৮। রাসুলুল্লাহ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

 আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির নয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ذٰلِکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الۡغَیۡبِ نُوۡحِیۡہِ اِلَیۡکَ ۚ وَمَا کُنۡتَ لَدَیۡہِمۡ اِذۡ اَجۡمَعُوۡۤا اَمۡرَہُمۡ وَہُمۡ یَمۡکُرُوۡنَ

এটা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যা তোমাকে আমি ওহি দ্বারা অবহিত করছি, ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌঁছেছিল তখন তুমি তাদের সাথে ছিলেনা। সুরা ইউসুফ : ১০২

ইউসুফ আ. এর ভাইদের ষড়যন্ত্র রাসুলুল্লাহ ﷺ  জানতেন না কেননা তিনি সেখানে ছিলেন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

تِلۡکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الۡغَیۡبِ نُوۡحِیۡہَاۤ اِلَیۡکَ ۚ  مَا کُنۡتَ تَعۡلَمُہَاۤ اَنۡتَ وَلَا قَوۡمُکَ مِنۡ قَبۡلِ ہٰذَا ؕۛ  فَاصۡبِرۡؕۛ  اِنَّ الۡعَاقِبَۃَ لِلۡمُتَّقِیۡنَ 

এগুলো গায়েবের সংবাদ, আমি তোমাকে ওহির মাধ্যমে তা জানাচ্ছি। ইতিপূর্বে তা না তুমি জানতে এবং না তোমার কওম। সুতরাং তুমি সবর কর। নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকিদের জন্য। সুরা হুদ : ৪৯

মুহাম্মদ ﷺ কে গায়েবের বিষয় ওহির মাধ্যমে জানতে হত। তিনি সর্বত্র সবদ্রা হাজির নাজির থাকলে ওহির জ্ঞানের প্রয়োজন ছিল না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمِمَّنۡ حَوۡلَکُمۡ مِّنَ الۡاَعۡرَابِ مُنٰفِقُوۡنَ ؕۛ  وَمِنۡ اَہۡلِ الۡمَدِیۡنَۃِ ۟ۛؔ  مَرَدُوۡا عَلَی النِّفَاقِ ۟  لَا تَعۡلَمُہُمۡ ؕ  نَحۡنُ نَعۡلَمُہُمۡ ؕ  سَنُعَذِّبُہُمۡ مَّرَّتَیۡنِ ثُمَّ یُرَدُّوۡنَ اِلٰی عَذَابٍ عَظِیۡمٍ ۚ

আর তোমাদের আশপাশের মরূবাসীদের মধ্যে কিছু লোক মুনাফিক এবং মদ্বীনাবাসীদের মধ্যেও কিছু লোক অতিমাত্রায় মুনাফিকীতে লিপ্ত আছে। তুমি তাদেরকে জান না। আমি তাদেরকে জানি। অচিরে আমি তাদেরকে দু’বার আজাব দেব তারপর তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে মহা আজাবের দিকে। সুরা তওবা : ১০১

মুহাম্মদ ﷺ এর চার পাশে অনেক মুনাফিক লোক ছিল। তিনি তাদের চিনতেন না। আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিয়েছেন কে কে মুনাফিক ছিল। যদি তিনি সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির থাকতেন তবে মুনাফিকের কার্যকলাপ দেখতে পেতেন এবং আল্লাহ কর্তৃক তাকে আর অবহিত করার প্রয়োজন ছিন না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি দ্বারা সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির। কুরআনের আয়াতগুলো প্রমাণ করে মুহাম্মদ ﷺ কে আল্লাহ এই গুণটি দান করেন নাই। বরং তিনি তার প্রয়োজন মাফিক অহি করে জানিয়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর এই গুণের সাথে অন্য কোন নবি, রাসুল, ওলি, আওলিয়াকে যুক্ত করলে বড় শির্কে পতিত হবে যা কবিরা গুনাহ থেকেও ভয়াবহ।

৯। দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখার দাবি করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর বান্দা দুনিয়াতে বসে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পারে।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব।

দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব। আল্লাহকে কোন দৃষ্টিশক্তি আয়ত্ত করতে পারবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لَّا تُدۡرِكُهُ ٱلۡأَبۡصَٰرُ وَهُوَ يُدۡرِكُ ٱلۡأَبۡصَٰرَۖ وَهُوَ ٱللَّطِيفُ ٱلۡخَبِيرُ

দৃষ্টিশক্তি তাঁকে দেখতে অক্ষম কিন্তু তিনি দৃষ্টিকে আয়ত্ত করে নেন৷ তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞ। সুরা আনআম : ১০৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-

  وَلَمَّا جَآءَ مُوسَىٰ لِمِيقَـٰتِنَا وَكَلَّمَهُ ۥ رَبُّهُ ۥ قَالَ رَبِّ أَرِنِىٓ أَنظُرۡ إِلَيۡكَ‌ۚ قَالَ لَن تَرَٮٰنِى وَلَـٰكِنِ ٱنظُرۡ إِلَى ٱلۡجَبَلِ فَإِنِ ٱسۡتَقَرَّ مَڪَانَهُ ۥ فَسَو

ۡفَ تَرَٮٰنِى‌ۚ فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُ ۥ لِلۡجَبَلِ جَعَلَهُ ۥ دَڪًّ۬ا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقً۬ا‌ۚ فَلَمَّآ أَفَاقَ قَالَ سُبۡحَـٰنَكَ تُبۡتُ إِلَيۡكَ وَأَنَا۟ أَوَّلُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ

অতঃপর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলো এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন তখন সে আকুল আবেদন জানালো, হে প্রভু! আমাকে দর্শনের শক্তি দাও, আমি তোমাকে দেখবো৷ তিনি বললেন, তুমি আমাকে দেখতে পারো না৷ হাঁ সামনের পাহাড়ের দিকে তাকাও। সেটি যদি নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তাহলে অবশ্য তুমি আমাকে দেখতে পাবে৷ কাজেই তার রব যখন পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে গেলো৷ সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মূসা বললো, পাক-পবিত্র তোমার সত্তা৷ আমি তোমার কাছে তওবা করছি এবং আমিই সর্বপ্রথম মুমিন৷ সুরা আরাফ : ১৪৩

সুস্পষ্ট আয়াতের নির্দেশনার আলোকে মুসলিম উম্মাহ একমত যে, পৃথিবীতে কেউ আল্লাহকে দেখতে পারে না। রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে একটি সহিহ হাদিসও বর্ণিত হয় নি, যাতে তিনি বলেছেন ‘আমি জাগ্রত অবস্থায় পৃথিবীতে বা মিরাজে চর্ম চক্ষে আল্লাহকে দেখেছি। নবি, রাসুল, অলি. আওলিয়া, পীর, বুজুর্গ, আধ্যাত্মিক গুরু যে কেউই দাবি করতে পারে যে, সে দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখেছেন। দাবি করা আর বাস্তবতা ভিন্ন কথা। আল্লাহ তায়ালা কে নবি মুসা আ. দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় দেখতে চেয়ে ছিলেন কিন্তু পারেন নাই। তার পরও যদি কেউ দাবি করে বা বিশ্বাস করে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ দেখা সম্ভব তবে তার শিরকি পর্যায়ের কবিরা গুনাহ হবে। 

১০। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কিয়ামতের দিন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬ا‌ۖ لَّهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ

বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণ রূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন।  আসমান ও যমীনের বাদশাহি মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সুরা যুমার : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

مَا لَكُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَلِىٍّ۬ وَلَا شَفِيعٍ‌ۚ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ

তিনি ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই এবং নেই তার সামনে সুপারিশকারী, তারপরও কি তোমরা সচেতন হবে না। সুরা সাজদাহ : ৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ

অর্থ: পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷  কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সুরা বাক্বারা : ২৫৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَاَنۡذِرۡہُمۡ یَوۡمَ الۡاٰزِفَۃِ اِذِ الۡقُلُوۡبُ لَدَی الۡحَنَاجِرِ کٰظِمِیۡنَ ۬ؕ  مَا لِلظّٰلِمِیۡنَ مِنۡ حَمِیۡمٍ وَّلَا شَفِیۡعٍ یُّطَاعُ ؕ

আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। তখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। সুরা গাফির : ১৮

আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূণর্রূপে তার ইচ্ছাধীন। এক শ্রেণীর মুশরিকগণ চিন্তা করে থাকেন যে, আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিবর্গ, নবিগণ, রাসুলগণ, ফেরেতাগণ বা অন্যান্য সত্তা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাদের জান্নাত দিবেন বা আল্লাহর ওখানে তাদের বিরাট প্রতিপত্তি আছে। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে তারা যে কোন কার্যোদ্ধার করতে সক্ষম। তারা যে কথার ওপর অটল থাকে, তা তারা আদায় করেই ছাড়ে। অথচ শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না। তবে আল্লাহ অনুমতি নিয়ে সুপারিশ করতে পারবেন। সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দ্বিতীয় যোগ্যতা হলো- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুমতি।

দুনিয়াতে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরির গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন, কিয়ামত দিবসে তারা সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের জন্য কোনো প্রকারের সুপারিশের অনুমতি প্রদান করা হবে না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ

আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাযয়্যিনাহ : ৬

এ থেকে বুঝা গেল, কাফির এবং মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশকারী নাই। আল্লাহর অনুমতিক্রমে ইমানদারদের জন্য সুপারিশ করা হবে। সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম  সুপারিশের অনুমতি পাবেন। 

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ

আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের নেতা হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, জান্নাতে লোকদের প্রবেশ সম্পর্কে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ইমান এনেছে যা অন্য কোন নাবির বেলায় হবে না। নাবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যাঁর প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ইমান এনেছে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৩

রসুলুল্লাহ এর পর অন্যান্য নবি রাসুলগণ, শহিদগণ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, কুরআন ও সিয়াম মুমিনদের জন্য সুপারিশের অনুমতি পাবেন 

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সুরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়স্তÍ পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সুরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সুরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য – ৩ (১১-১৫) :: কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিস সম্মত আকিদা ধারণ করবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।

হেদায়েতের এক মাত্র মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। কুরআন ও সহিহ হাদিসে এই সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। নিচের সহিহ হাদিসটি দিকে লক্ষ করুন-

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রহ 🙂 তাঁর পিতা (রা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আবূ তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে নবি ﷺ তার কাছে গেলেন। এসময় আবূ জাহল এবং আবদুল্লাহ ইবনু আবূ উমাইয়াও সেখানে বসা ছিল। নবি ﷺ বললেন, হে চাচা! আপনি পড়ুন ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আপনার মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট এটা দলিল হিসেবে পেশ করব। এ কথা শুনে আবূ জাহল ও আবদুল্লাহ ইবনু উমাইয়াহ বলল, হে আবূ তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করে দিবে? নবি ﷺ বললেন, হে চাচা! আমি আপনার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে যতক্ষণ আমাকে নিষেধ না করা হবে ততক্ষণ ক্ষমা চাইতে থাকব। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়-

 إِنَّكَ لَا تَہۡدِى مَنۡ أَحۡبَبۡتَ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ يَہۡدِى مَن يَشَآءُ‌ۚ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ (٥٦)

নবি ও মুমিনদের পক্ষে উচিত নয় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে মুশরিকদের জন্য যদি তারা নিকটাত্মীয়ও হয় যখন তাদের কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামি, সুরা তওবা-১১৩। সহিহ বুখারি : ৪৬৭৫

উক্ত ঘটনা দ্বারা বুঝতে পারি, ব্যক্তিগত ভালবাসা ও আত্মীয়তার সম্পর্কের  ভিত্তিতে যদি কোন ব্যক্তির হেদায়াত লাভ করত তাতে তিনি ছিলেন আবু তালেব। কিন্তু তাকে হেদায়াত দান করার শক্তি যখন নবি ﷺ কে দিলেন না, তা হলে একথা একেবারে সুস্পষ্ট হয়ে গেলো যে, কাউকে হেদায়াত দান করা বা কাউকে হেদায়াত বঞ্চিত করা নবি ﷺ ক্ষমতার বাইরে। এবং বিষয়টি সম্পূণর্রূপে আল্লাহর হাতে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاء وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তা’আলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন। সুরা কাসাস : ৫৬

যদি কেহ মনে করে তার পীর, শাইখ বা মুরুব্বি তাকে হিদায়েত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তবে হিদায়েততো দূরের কথা তার ইমানই চলে যাবে। কেননা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।

১২। কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো– কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা শিরক।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ

আর কিছু লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর রহমতে ইমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। সুরা বাকারা : ১৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلۡ إِن كَانَ ءَابَآؤُكُمۡ وَأَبۡنَآؤُڪُمۡ وَإِخۡوَٲنُكُمۡ وَأَزۡوَٲجُكُمۡ وَعَشِيرَتُكُمۡ وَأَمۡوَٲلٌ ٱقۡتَرَفۡتُمُوهَا وَتِجَـٰرَةٌ۬ تَخۡشَوۡنَ كَسَادَهَا وَمَسَـٰكِنُ تَرۡضَوۡنَهَآ أَحَبَّ إِلَيۡڪُم مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَجِهَادٍ۬ فِى سَبِيلِهِۦ فَتَرَبَّصُواْ حَتَّىٰ يَأۡتِىَ ٱللَّهُ بِأَمۡرِهِۦ‌ۗ وَٱللَّهُ لَا يَہۡدِى ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَـٰسِقِينَ

বল, ‘তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত’। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। সুরা তওবা : ২৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ভালবাসা, এমনই এক ভালবাসা যার আবেদন অনেক ব্যাপক, যা পরিপূর্ণ বিনয় এবং সর্বাত্মক আনুগত্যকে অনিবার্য করে। আল্লাহ প্রতি ভালবাসা হলো, তাকে সর্বশক্তিমান জেনে তার প্রতিটি হুকুম আহকামে সর্বাত্মক আনুগত্য প্রদর্শন করা। এই ভালবাসা প্রকাশ পায় তার ইবাদতের মাধ্যমে। যদি তার সর্বাত্মক আনুগত্য ও ইবাদতে অন্যকে শরিক করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে তিনি যে ভালবাসা পাওয়ার কথা তা দিতে বান্দা ব্যর্থ। বান্দার এই ব্যর্থ ভালোবাসাই কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

একজন ইমানদারের কাছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্য সবার সন্তুষ্টির ওপর অগ্রাধিকার লাভ করবে। কোনো কিছুকে এমন মর্যাদার আসনে সমাসীন করবেনা যেন আল্লাহ প্রতি ভালোবাসার কমতি দেখা যায়। আর এটাই হচ্ছে আকিদা বিশ্বাসের মৌলিক উপাদান ও মেরূদণ্ড। আল্লাহ প্রতি ভালবাসা প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হলো, তার রসুল ﷺ এর তার উপর নাজিলকৃত দ্বিনের পরিপূর্ণ অনুসরণ। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِى يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡ‌ۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌ۬ رَّحِيمٌ۬

হে নবি! লোকদের বলে দাও, ‘যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন ৷ তিনি বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ সুরা আল ইমরান- : ৩১

এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছের তার প্রতি ভালোবাসার মান দণ্ড। যদি কেউ দাবি করে আমি আল্লাহকে ভালোবাসি তাহলে তাকে প্রমাণ হিসাবে রসুল ﷺ এর তার উপর নাজিলকৃত দ্বিনের পরিপূর্ণ অনুসরণ দেখাবে হবে। যদি কেউ রসুল ﷺ কে অনুসরণ না হবে আল্লাহ ভালোবাসার দাবি করে তবে সে মিথ্যাবাদী।

১৩। দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে একক মালিক মহান আল্লাহ, এ জন্য তার কোন সাহায্যকারী প্রয়োজন নাই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ثُمَّ يَعۡرُجُ إِلَيۡهِ فِى يَوۡمٍ۬ كَانَ مِقۡدَارُهُ ۥۤ أَلۡفَ سَنَةٍ۬ مِّمَّا تَعُدُّونَ

তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যে দিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সাজদা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَـٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَىَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَىِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ‌ۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُ‌ۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ

বল, ‘আসমান ও যমীন থেকে কে তোমাদের রিজিক দেন? অথবা কে শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিক? আর কে মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন আর জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন? কে সব বিষয় পরিচালনা করেন’? তখন তারা আবার বলবে, ‘আল্লাহ’। সুতরাং, তুমি বল, ‘তারপরও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না’? সুরা ইউনুস : ৩১

খুবই পরিতাপের বিষয় আমাদের সমাজের কিছু নামধারী মুসলিমের বিশ্বাস আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেহেতু একা সেহেতু তার একার পক্ষে পুরো বিশ্বজগৎ পরিচালনা করা সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)। ফলে তিনি তাঁর বিশ্ব পরিচালনা কাজের সুবিধার্থে আরশে মুয়াল্লায় একটি পার্লামেন্ট কায়েম করেছেন। সেই পার্লামেন্টের সদস্য সংখ্যা মোট ৪৪১ জন। আল্লাহ তাদের স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। তন্মধ্যে নাজির ৩১৯ জন, নাকীব ৭০ জন, আওতাদ ৭ জন, কুতুব ৫ জন, আবদাল ৪০ জন এবং একজন হলেন গাওছুল আযম যিনি মক্কায় থাকেন। উম্মতের মধ্যে প্রায় ৪০ জন আল্লাহ তায়ালার মধ্যস্থতায় পৃথিবীবাসীর বিপদাপদ দূরীভূত করে থাকেন। আর আওলিয়া দ্বারা সৃষ্ট জীবের হায়াত, রুজি, বৃষ্টি, বৃক্ষ জন্মানো ও মুছিবত বিদূরণের কার্য সম্পাদন করেন। মৃতগণ কবরে শ্রবণ, দর্শন ও উপলব্ধি করে থাকেন। তাদের শ্রবণ ও দর্শন যদিও সব সময় থাকে, কিন্তু জুমুয়ার দিনে তা বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং সাধারণ মৃত ব্যক্তিরাও কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়া যিয়ারাতকারীদের সাথে কথা বলে। এই সবই শিরকি কথা ইহার সাথে কুরআন সুন্নাহর কোন সম্পর্ক নাই। যা কিছু বল হয়েছে সবই ভণ্ড সুফিদের বানান কথা মাত্র। এ সব কুফরি কথা কে শুধু কবিরা গুনাহ বললে ভুল হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَسَخَّرَ ٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ‌ۖ كُلٌّ۬ يَجۡرِى لِأَجَلٍ۬ مُّسَمًّ۬ى‌ۚ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ يُفَصِّلُ ٱلۡأَيَـٰتِ لَعَلَّكُم بِلِقَآءِ رَبِّكُمۡ تُوقِنُونَ

এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় মোতাবেক আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও। সুরা রাদ : ২

১৪। গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلْ أَطِيعُوا۟ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَۖ فَإِن تَوَلَّوْا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلْكَٰفِرِينَ

বল, তোমরা আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য কর। যদি তারা অস্বীকার করে তাহলে আল্লাহ কাফেরদের ভালোবাসেন না। সুরা আল ইমরান : ৩২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَفَغَيْرَ دِينِ ٱللَّهِ يَبْغُونَ وَلَهُۥٓ أَسْلَمَ مَن فِى ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ

তারা কি আল্লাহর দীনের পরিবর্তে অন্য কিছু তালাশ করছে? অথচ আসমানসমূহ ও যমিনে যা আছে তা তাঁরই আনুগত্য করে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় এবং তাদেরকে তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তন করা হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِن تُطِيعُوا۟ فَرِيقًا مِّنَ ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ ٱلْكِتَٰبَ يَرُدُّوكُم بَعْدَ إِيمَٰنِكُمْ كَٰفِرِينَ

হে ইমানদারগণ! তোমরা যদি কিতাবধারীদের কোন একটি দলের আনুগত্য করো তাহলে ইমান আনার পর তারা তোমাদেরকে আবার কাফের বানিয়ে দেবে। সুরা আল ইমরান : ১০০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

تِلْكَ حُدُودُ ٱللَّهِۚ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدْخِلْهُ جَنَّٰتٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلْفَوْزُ ٱلْعَظِيمُ

এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা। সুরা নিসা : ১৩

১৫। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পাওে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَأَنَّهُۥ هُوَ أَغْنَىٰ وَأَقْنَىٰ

তিনিই অভাবমুক্ত ও সম্পদশালী করেন। সুরা নাজম : ৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱللَّهُ يُضَٰعِفُ لِمَن يَشَآءُۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ

আল্লাহ যাকে চান তার সম্পদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ বড় দানশীল, মহাজ্ঞানী।  (সুরা বাকারা ২:২৬১)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَوَجَدَكَ عَآئِلًا فَأَغْنَىٰ

তিনি তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব। অতঃপর তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। সুরা দোহা : ৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلْ إِنَّ ٱلْفَضْلَ بِيَدِ ٱللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَآءُۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ

বল, ‘নিশ্চয় অনুগ্রহ আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে চান, তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’। সুরা আল ইমরান : ৭৩

সমস্ত প্রাচুযের্র ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হাতে। যদি কেউ সমান্যও বিশ্বাস রাখে যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ কাউকে ধনী বা গরিব বানাতে পারে তবে শির্কে আকবর হবে

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য – ৩ (১৬-২০) :: কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিস সম্মত আকিদা ধারণ করবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৬। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখতে পাওে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أُو۟لَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ يَعْلَمُ ٱللَّهُ مَا فِى قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِىٓ أَنفُسِهِمْ قَوْلًۢا بَلِيغًا

ওরা তো তারাই যাদের অন্তরের কথা আল্লাহ জানেন। তাই তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করো, আর কিছু উপদেশ দাও এবং তাদের মনে প্রভাব ফেলতে পারে এমন কিছু কথা বল। সুরা নিসা : ৬৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَعْلَمُ خَآئِنَةَ ٱلْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِى ٱلصُّدُورُ

চক্ষুসমূহের খেয়ানত এবং অন্তরসমূহ যা গোপন রাখে তিনি তা জানেন। সুরা গাফির : ১৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

أَوَلَيْسَ ٱللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِى صُدُورِ ٱلْعَٰلَمِينَ

আল্লাহ কি বিশ্ববাসীর অন্তরের কথা সম্পর্কে অবগত নন?  সুরা আনকাবুত : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌۢ بِذَاتِ ٱلصُّدُورِ

আল্লাহ অন্তরের খবর ভাল করেই জানেন।  সুরা লোকমান : ২৩

একমাত্র মহান আল্লাহই মানুষের অন্তরের খবর জানেন। কিছু ভণ্ড পীর বা আল্লাহর অলি দাবিদার কিছু প্রতারক দাবি করে যে সেও মানুষের অন্তরের খবর রাখেন। অনেক অজ্ঞ মানুষ ভণ্ডদের কথা বিশ্বাস করে। এই দুই শ্রেণীর লোকই কাফির। কেননা তারা উভয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমকক্ষ দাড় করিয়েছে।

১৭। আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পাওে না।

শাহর ইবন হাওশাব রহ. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি উম্মু সালামা রা. কে বললাম, হে উম্মুল মুমিনিন! রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন আপনার কাছে অবস্থান করতেন তখন অধিকাংশ সময় তিনি কি দুয়া করতেন? তিনি বললেন, তাঁর অধিকাংশ দু’আ ছিল-

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

উচ্চারণ: ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা

অর্থ: হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তর তুমি তোমার দীনে সুদৃঢ় রাখ।

তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি অধিকাংশ সময় এই দু’আ কেন করেন যে, ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা? তিনি বললেন, হে উম্মু সালামা! এমন কোন মানুষ নেই যার অন্তর আল্লহ ত’আলার অঙ্গুল সমূহের দুই আঙ্গুলের মাঝে নেই। যাকে তিনি ইচ্ছা তাকে তিনি দিনের উপর কায়েম রাখেন, যাকে ইচ্ছা তিনি সরিয়ে দেন। বর্ণনাকারী মুয়াজ রহ. এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-

ربَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا

হে আমাদের রব! হেদায়েতের পর তুমি আমাদের অন্তর বক্র করে দিও না, সুরা আল ইমরান-৮।

সুনানে তিরমিজি : ৩৫২২

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এই দু‘আ অধিক পাঠ করতেন-

يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

উচ্চারণ: ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব ছাব্বিত কালবী আলা দীনিকা

হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বিনের উপর প্রতিষ্ঠিত  রাখো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা ইমান এনেছি আপনার উপর এবং আপনি যা নিয়ে এসেছেন তার উপর। আপনি আমাদের ব্যাপারে কি কোনো রকম আশঙ্কা করেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কেননা, আল্লাহ্ তা‘আলার আঙ্গুলসমূহের মধ্যকার দুটি আঙ্গুলের মাঝে সমস্ত অন্তরই অবস্থিত। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করেন। সুনানে তিরমিজি : ২১৪০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৮৩৪)

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ অধিকাংশ সময় কসম করতেন এই বলে, না। তাঁর কসম, যিনি অন্তরসমূহ পরিবর্তন করে দেন। সহিহ বুখারি : ৭৩৯১

ইবনু উমার বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ এর অধিকাংশ শপথ ছিল, না, অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারীর শপথ। সহিহ বুখারি : ৬৬১৭, ৬৬২৮, ১৫৪০ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০৯২, সুনানে নাসায়ী : ৩৭৬১, ৩৭৬২, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৬৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের অন্তর পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন। যার ইচ্ছা তার অন্তর পরিবর্তন করে থাকেন। কাজেই কেউ যদি বিশ্বাস করে কোনো পীর, ফরিক মানুষের অন্তর পরিবর্তন করে দিতে পারেন তবে সে কুফরি করবে।

১৮। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পাওে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لِّلَّهِ مُلْكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِۚ يَخْلُقُ مَا يَشَآءُۚ يَهَبُ لِمَن يَشَآءُ إِنَٰثًا وَيَهَبُ لِمَن يَشَآءُ ٱلذُّكُورَ

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। সুরা শুরা : ৪৯

 আল্লাহ তায়ালা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে। অনেক অজ্ঞ মুসলিমকে দেখা যায় সন্তান লাভের আশায় মাজারে মাজারে ঘুরে। এমন কি অনেক ভণ্ড প্রতারক ফকিরের খপ্পরে পড়েনি:শ্ব হয়েছেন। অথচ তার উচিত ছিল শরিয়ত সম্মত চিকিৎসার পাশাপাশি মহান আল্লাহ উপর তাওয়াক্কুল করে তার নিকটই সাহায্য চাওয়া।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

رَبِّ هَبْ لِى مِنَ ٱلصَّٰلِحِينَ

হে প্রভু! আমাকে সৎ সন্তান দান কর। সুরা সাফফাত : ১০০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَٱجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন। সুরা ফুরকান : ৭৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَأَرَدْنَآ أَن يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا خَيْرًا مِّنْهُ زَكَوٰةً وَأَقْرَبَ رُحْمًا

 তাই আমরা চাইলাম, তাদের প্রভু তাদেরকে ঐ ছেলের পরিবর্তে পবিত্রতায় শ্রেয়তর ও মায়া-মমতায় নিকটতর একটি ছেলে দান করুক।  সুরা কাহাব : ৮১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبْ لِى مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ

সেখানে যাকারিয়া তার প্রভুর কাছে দোয়া করে। সে বলে, “হে আমার প্রভু! আমাকে তোমার পক্ষ থেকে (তোমার বিশেষ কৃপায়) ভাল সন্তান দান কর। অবশ্যই তুমি দোয়া শ্রবণকারী। সুরা আল ইমরান : ৩৮

১৯। কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তায়ালাই এতমাত্র উত্তম ফয়সালাকারী।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রশ্ন করেন-

 أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ

তারা কি তবে জাহিলিয়াতের বিধান চায়? আর দৃঢ় বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?  সুরা মায়েদা : ৫০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই কাফির। সুরা মায়িদাহ : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ثُمَّ رُدُّوۡۤا اِلَی اللّٰہِ مَوۡلٰىہُمُ الۡحَقِّ ؕ اَلَا لَہُ الۡحُکۡمُ ۟ وَہُوَ اَسۡرَعُ الۡحٰسِبِیۡنَ

তারপর তাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হয় তাদের সত্য অভিভাবক আল্লাহর কাছে। সাবধান! বিধান প্রদানের ক্ষমতা তাঁরই। আর তিনি হচ্ছেন খুব দ্রুত হিসাবকারী। সুরা আনআম : ৬২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّآ أَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلۡكِتَـٰبَ بِٱلۡحَقِّ لِتَحۡكُمَ بَيۡنَ ٱلنَّاسِ بِمَآ أَرَٮٰكَ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَا تَكُن لِّلۡخَآٮِٕنِينَ خَصِيمً۬ا

আমি সত্য সহকারে এই কিতাব তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে আল্লাহ তোমাকে যে সঠিক পথ দেখিয়েছেন সেই অনুযায়ী তুমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতে পারো৷ তুমি খেয়ানতকারী ও বিশ্বাস ভংগকারীদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হয়ো না৷ সুরা নিসা : ১০৫

জাহিলিয়াতের ফয়সালা কাসনা করা আর আল্লাহ ফয়সালাকে অস্বীকার করা কুফরি কাজ। আর আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী সমকক্ষ ভাবা শিরক মত কবিরা গুনাহ। কেননা আল্লাহর ফয়সালাই কল্যাণ কর ও চূড়ান্ত। আল্লাহর শরীয়তে স্বীকৃত হয়নি এমন সব ফয়সালাকে বর্জন করতে হবে। আল্লাহ হচ্ছেন ফায়সালা করার যাবতীয় ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী। অন্য কাউকে চূড়ান্ত ফায়সালা অধিকারী মনে করা শিরক। সাধারণত মানুষকে কোন ফায়সালা করার ক্ষমতা দিলে আল্লাহ বিধান মতো ফায়সালা করতে হবে তখন এটাই আল্লাহর ফায়সালা বলে গণ্য হবে।

২০। আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহই একমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতার উত্তম উৎস।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱللَّهُ يُؤۡتِى مُلۡڪَهُ ۥ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ۬

আর আল্লাহ যাকে চান, তাকে তার রাজত্ব দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।  সুরা বাকারা : ২৪৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 قُلِ ٱللَّهُمَّ مَـٰلِكَ ٱلۡمُلۡكِ تُؤۡتِى ٱلۡمُلۡكَ مَن تَشَآءُ وَتَنزِعُ ٱلۡمُلۡكَ مِمَّن تَشَآءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَآءُ‌ۖ بِيَدِكَ ٱلۡخَيۡرُ‌ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَىۡءٍ۬ قَدِيرٌ۬

বল, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’। সুরা আল ইমরান : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাআলা ওয়াদা করছেন তিনি অবশ্য দুনিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দান করবেন। কিন্তু তিনি দুটি অর্থ আরোপ করছেন।

১। ইমান আনতে হবে

২। আমলে সালেহা করতে হবে

নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। কাজেই বান্দাকে উক্ত দুটি কাজ করে আল্লাহর শর্ত পূরণ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। যেমন নবি ﷺ এবং তার একনিষ্ঠ সাহাবিগণ যখন উক্ত শর্ত পূরণ করলেন তখনই আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিলেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ ڪَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِم

আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ইমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন। সুরা নুর : ৫৫

উপরের আয়াতে দ্বারা বুঝা  যায়, নিশ্চয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একছন্ন মালিক। তার তার দেয়া শর্ত সঠিক ইমান ও কবুল যোগ্য আমল করতে পারলেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রদান করবেন। অনেক সময় জনগণ, টাকা পয়সা, সুনাম সুখ্যাতি, আত্মীয়তার সম্পর্ক অনেক সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ করার উপায় উপকরণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এগুলোই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ করার উপায় উপকরণ মনে না করে, রাষ্ট্র ক্ষমতার উত্স মনে করা শিরকের মত কবিরা গুনাহ। যেমন অনেকে বলে থাকেন, “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস”।

আল্লাহকে একমাত্র সকল ক্ষমতার উত্স মেনে নিয়ে উক্ত কথাটি বললে ছোট শিরক হবে কিন্তু উক্ত কথাটি মনে প্রাণে বিশ্বাস করলে বড় শিরক এতে কোন সন্দেহ নেই।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য – ৩ (২১-২৫) :: কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিস সম্মত আকিদা ধারণ করবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

২১। আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

 আল্লাহ তায়ালাই শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের একক মালিক।

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার চলার নিয়ম- নীতি, পদ্ধতি, নির্দেশনা ও বিধান প্রণয়নের অধিকার সবই একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর জন্যই সংরক্ষিত। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে অন্য কারো সামান্য অধিকার নেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَمۡ لَهُمۡ شُرَڪَـٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُ‌ۚ وَلَوۡلَا ڪَلِمَةُ ٱلۡفَصۡلِ لَقُضِىَ بَيۡنَہُمۡ‌ۗ وَإِنَّ ٱلظَّـٰلِمِينَ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٌ۬

তাদের জন্য কি এমন কিছু শরিক আছে, যারা তাদের জন্য দীনের বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? আর ফয়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েই যেত। আর নিশ্চয় জালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। সুরা শুয়া : ২১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُ‌ۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

জেনে রাখো, সৃষ্টি তারই এবং নির্দেশও তাঁরই৷ আল্লাহ বড়ই বরকতের অধিকারী। তিনি সমগ্র বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক। সুরা আরাফ : ৫৪

আমাদের প্রিয় নবি যার মাধ্যমে আমাদের দ্বীন দান করা হইয়াছে তাকেও হালাল হারাম করার নিজস্ব কোন ক্ষমতা দান করা হয় রাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلنَّبِىُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَآ أَحَلَّ ٱللَّهُ لَكَ‌ۖ تَبۡتَغِى مَرۡضَاتَ أَزۡوَٲجِكَ‌ۚ وَٱللَّهُ غَفُورٌ۬ رَّحِيمٌ۬ 

হে নবি, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ? আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা তাহরিম : ০১

তবে মনে রাখতে হবে, দিনে হুকুম আহকাম ইবাদাত বন্দেগির ক্ষেতে আর কোন সংযোজন বিয়োজনের অধিকার কারে নেই। কেননা আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে আল কুরআনে উল্লেখ করেছেন-

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِيناً

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দিনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। আমার নিয়ামত পূণর্রূপে তোমাদেরকে প্রদান করলাম। ইসলামকে দ্বীন হিসাবে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম। সুর মায়েদা : ০৩

দুনিয়া সংশ্লিষ্ট কিছু নতুন নতুন বিষয়ে যে গুলি এড়িয়ে দ্বীন পালন করা সম্ভব নয়। আবার সরাসরি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সে বিধান গুলি স্পষ্ট বলে দেন নি। তখন কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে শরিয়ত সম্মত কোনো বিধান প্রণয়ন করাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু মানুষ আল্লাহর বিধানকে সম্পূর্ণ রূপে পরিত্যাগ করে শরিয়তবিরোধী মানুষের তৈরি বিধানকে নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে, যা নিঃসন্দেহে শিরক ও কুফরি। আর এইরূপ ফায়সালা করিকে আল্লাহ কাফির, জালিম ও ফাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ

আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ (বিধান) অনুযায়ী বিচার করেন, তারাই কাফির।  সুরা মায়েদা : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

‌ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡڪُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ

আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ (বিধান) অনুযায়ী বিচার করেন, তারাই জালেম। সুরা মায়েদা : ৪৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 ۚ إِلَى ٱللَّهِ مَرۡجِعُڪُمۡ جَمِيعً۬ا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ فِيهِ تَخۡتَلِفُونَ

আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ (বিধান) অনুযায়ী বিচার করেন, তারাই ফাসিক। সুরা মায়েদা : ৪৭

২২।  অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَءِلَـٰهٌ۬ مَّعَ ٱللَّهِ‌ۚ بَلۡ أَڪۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ (٦١)

আল্লাহর সাথে আর অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না। সুরা নমল : ৬১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمَا ظَنُّ ٱلَّذِينَ يَفۡتَرُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلۡڪَذِبَ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَذُو فَضۡلٍ عَلَى ٱلنَّاسِ وَلَـٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ لَا يَشۡكُرُونَ

আর যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটাচ্ছে, তাদের কী ধারণা, কিয়ামতের দিন সম্পর্কে? নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের উপর অনুগ্রহশীল। কিন্তু তাদের অধিকাংশ শোকর করে না। সুরা ইউনুস ১০:৬০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ فِى ذَٲلِكَ لَأَيَةً۬‌ۖ وَمَا كَانَ أَكۡثَرُهُم مُّؤۡمِنِينَ

নিশ্চয়ই তার মধ্যে একটি নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়৷  সুরা শুআরা : ১০৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ ٱلۡحَقَّ‌ۖ فَهُم مُّعۡرِضُونَ

কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই প্রকৃত সত্য থেকে বেখবর, কাজেই মুখ ফিরিয়ে নেয়৷ সুরা আম্বিয়া : ২৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

بَلۡ جَآءَهُم بِٱلۡحَقِّ وَأَڪۡثَرُهُمۡ لِلۡحَقِّ كَـٰرِهُونَ

অথবা তারা কি একথা বলে যে, সে উন্মাদ?  না, বরং সে সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যই তাদের অধিকাংশের কাছে অপছন্দনীয়৷  সুরা মুমিনুন ২৩:৭০

আরো দেখুন-

সুরা আরাফ : ১৩১, সুরা যুমার : ২৯, সুরা কাসাস : ১৩, সুরা আনাম : ৭৩, সুরা ফুরকান : ৫০, সুরা ইউসুফ : ৩৮, সুরা শুআরা : ৬৭, ১২১, ১৩৯, ১৫৮, ১৭৪ ও ১৯০

দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অধিকাংশ লোক নির্ভুল জ্ঞানের পরিবর্তে কেবল আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে তাদের আকীদা, বিশ্বাস, দর্শন, চিন্তাধারা, জীবন যাপনের মূলনীতি ও কর্ম বিধান সবকিছুই ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে গড়ে। কাজেই দুনিয়ার বেশির ভাগ লোক কোন পথে যাচ্ছে, কি বিশ্বাস করছে, কি আমল করছে, কোন তরিকা অনুসরণ করছে, কোন সত্য সন্ধানীর এটা দেখা উচিত নয়। বরং আল্লাহ যে পথটি তৈরি করে দিয়েছেন তার ওপরই তার দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলা উচিত। এ পথে চলতে গিয়ে দুনিয়ায় যদি সে অধিকাংশের মতামত ত্যাগ করে একাকী চলতে হয়, তবে তাই করতে হবে। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হওয়া যাবে। এর ব্যতিক্রম করলে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে৷

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

 وَإِن تُطِعۡ أَڪۡثَرَ مَن فِى ٱلۡأَرۡضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ‌ۚ إِن يَتَّبِعُونَ إِلَّا ٱلظَّنَّ وَإِنۡ هُمۡ إِلَّا يَخۡرُصُونَ (١١٦) إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعۡلَمُ مَن يَضِلُّ عَن سَبِيلِهِۦ‌ۖ وَهُوَ أَعۡلَمُ بِٱلۡمُهۡتَدِينَ (١١٧)

অর্থ: আর হে মুহাম্মাদ! যদি তুমি দুনিয়ায় বসবাসকারী অধিকাংশ লোকের কথায় চলো তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে ফেলবে৷ তারা তো চলে নিছক আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে এবং তারা কেবল আন্দাজ-অনুমানই করে থাকে। সুরা আনআম : ১১৬-১১৭

সহজ কথা হলো দ্বিনের কাজগুলো কে লোকদের উপস্থিতি দেখে পরিমাপ করা যাবে না বরং কুরআন ও সহজি হাদিস দ্বারা পরিমাপ করতে হবে। আমার অনেকেরই ধারণা করে থাকি অধিকাংশ লোক সাধারণত যা করে তাই সঠিক। তাইতো দেখা যায় কোন দ্বিনের বিষয়ে কোন  ভুল আমল সংশোধনের কথা বললে, পালটা প্রশ্ন করেন, অধিকাংশ মানুষ কি ভুল করছে? আবার অনেকেই এও বলে থাকে এতগুলো লোক কি একসাথে ভুল করতে পারে? তাদের বিশ্বাস অধিকাংশ মানুষ অনুসরণই সঠিক। অধিকাংশ মানুষের ভুল কম হয়। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় অধিকাংশ লোকের মতামত সঠিক হতেও পারে।

এমন আলেমবৃন্দ যাদের দ্বিনের সঠিক জ্ঞান আছে, তাদের মধ্যে অধিকাংশের মতামত, যা কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিতে দিয়ে থাকেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা অধিকাংশ লোক কখন সত্যের মাপকাঠি হতে পারে না। এক মাত্র কুরআন সুন্নাহ সত্যের (ইসলামের) মাপকাঠি। কুরআন সুন্নাহ (আল্লাহর আদেশের) বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বা অধিকাংশের মতামতকে সত্যের মাপকাঠি মানা নিঃসন্দেহ কবিরা গুনাহ। অপর পক্ষে অধিকাংশ লোক সত্যের মাপকাঠি বা অনুসরণীয় নয় তার কেননা উপরের আয়াতগুলিতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, সমাজের অধিকাংশ লোক হবে অজ্ঞ, ইমানহীন, জালিম, অকৃতজ্ঞ, পাপী, পথভ্রষ্ট, মিথ্যুক, সত্য বিমুখ।

২৩। অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡشَاَ لَکُمُ السَّمۡعَ وَالۡاَبۡصَارَ وَالۡاَفۡـِٕدَۃَ ؕ قَلِیۡلًا مَّا تَشۡکُرُوۡنَ

আর তিনিই তোমাদের জন্য কান, চোখসমূহ ও অন্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন; তোমরা কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। সুরা মুমিনুন : ৭৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَا یَسۡتَوِی الۡاَعۡمٰی وَالۡبَصِیۡرُ ۬ۙ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَلَا الۡمُسِیۡٓءُ ؕ قَلِیۡلًا مَّا تَتَذَکَّرُوۡنَ

সমান নয় অন্ধ ও চক্ষুষ্মান এবং যারা ইমান আনে ও সৎ কাজ করে আর যারা দুষ্কৃতি পরায়ণ। তোমরা অল্পই উপদেশ গ্রহণ করে থাক। সুরা গাফির : ৫৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَـٰكِن لَّعَنَہُمُ ٱللَّهُ بِكُفۡرِهِمۡ فَلَا يُؤۡمِنُونَ إِلَّا قَلِيلاً۬

কিন্তু তাদের কুফরির কারণে আল্লাহ তাদেরকে লানত করেছেন। তাই তাদের কমসংখ্যক লোকই ইমান আনে। সুরা নিসা : ৪৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَآ ءَامَنَ مَعَهُ ۥۤ إِلَّا قَلِيلٌ۬

আর তার (নুহ আ.) সাথে অল্পসংখ্যকই ইমান এনেছিল। সুরা হুদ : ৪০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 ؕ اِعۡمَلُوۡۤا اٰلَ دَاوٗدَ شُکۡرًا ؕ وَقَلِیۡلٌ مِّنۡ عِبَادِیَ الشَّکُوۡرُ

হে দাঊদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। সুরা সাবা : ১৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَمَّا کُتِبَ عَلَیۡہِمُ الۡقِتَالُ تَوَلَّوۡا اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِالظّٰلِمِیۡنَ

অতঃপর যখন তাদের উপর লড়াই ফরজ করা হল, তখন তাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তারা বিমুখ হল। আর আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে সম্যক অবগত। সুরা বাকারা : ২৪৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَقَدۡ مَکَّنّٰکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ وَجَعَلۡنَا لَکُمۡ فِیۡہَا مَعَایِشَ ؕ  قَلِیۡلًا مَّا تَشۡکُرُوۡنَ 

আর অবশ্যই আমি তো তোমাদেরকে যমিনে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তোমাদের জন্য তাতে রেখেছি জীবনোপকরণ। তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞ হও। সুরা আরাফ : ১০

সমাজ জীবনে দেখা যায় জ্ঞানী লোকের সংখ্যা খুবই কম। আপনি ভাল লোক খুঁজবেন পাওয়া খুবই দুষ্কর। নামাজি লোক খুঁজবেন, পাওয়া যাবে কিন্তু সংখ্যায় খুবই নগণ্য। এমনিভাবে জাগতিক বিষয় ও যদি খোঁজ করেন দেখবেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী লোকের সংখ্যা অনেক কম। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় ভালো মানুষ অল্পই হয়। কুরআনে অধিকাংশে লোক যেমন খারাপ বলে উল্লেখ করেছেন ঠিক তেমনি ভাবে অল্প সংখ্যক লোক কে হক বা উত্তম আলে উল্লেখ করেছেন। কুরআন ও সহিহ হাদিসে বিরোধী বিশ্বাস করা কুফরির নামান্তর। কাজেই অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় এমন ধারণা কুরআন বিরোধী। বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসে আলোকে অল্পসংখ্যক মানুষই হকের উপর থাকবে বলে বারবার ঘোষণা প্রদান করা হইয়াছে

২৪। হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’  বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা তার সৃষ্টির মাঝে হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’ করে বলে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।

ইবনে আরাবীর একটি আকিদা ছিল হুললিয়্যাহ। আরবিতে বলা হয়, হুলুলিয়্যাহ, যার বাংলা অর্থ হচ্ছে, ‘অনুপ্রবেশবাদ’। হুলুল কথাটির সাধারণ ব্যাখ্যা হচ্ছে- আল্লাহ কোনো কিছুর মধ্যে ‘হুলুল’ করে অর্থাৎ প্রবেশ করেন। এই মতবাদ প্রাচীনকাল থেকে মানুষের মাঝে বিদ্যমান, তবে বিশেষ করে খ্রিষ্টানদের মাঝে এই আকিদা লক্ষ্য করা যায়। খ্রীস্টানরা মনে করে আল্লাহ ঈসা (আ.) এর মধ্যে প্রবেশ করে এক হয়ে গেছেন। এই কারণে হুসাইন বিন মানসুর হাল্লাজ নামে একজন পথভ্রষ্ট সুফি যখন বলেছিল, আনাল হক্ব (আমিই আল্লাহ)। তখন এই কথাটিকে খৃষ্টানরাই বেশী পছন্দ করেছিল, কারণ এই কথার সাথে তাদের আকিদার মিল ছিল। জালালুদ্দিন রূমিও হুলুল আকিদায় বিশ্বাসী ছিলেন। এই জন্য তিনি তার ছবি শরিফে হুসাইন বিন মানসুর হাল্লাজ প্রশংসাসহ উল্লেখ করেছেন। তিনি হুলুল বা মানুষে ঐশিরূপ দেখেছেন। এবং বিশ্বাস করেছেন যে, ইলাহীয়তে বা ঐশী সত্তার বিকাশ স্ফুরণ হয় মানবত্বে। তিনি আদম (আ.) কে সর্বপ্রথম আল্লাহর শারীরিক বিকাশ হিসেবে ধরেছেন। আরও বলেন, মানবিয় দৈহিক সত্তায় ঐশী সত্তার পূর্ণতম প্রকাশই আল্লাহর এক চিরন্তন রহস্য। এই ধরনের কথা উচ্চারণের কারণে তিনি লম্বা বিচারের সম্মুখীন হন এবং দীর্ঘ ১১ বছর বাগদাদ নগরে কারাবাস করেন। অবশেষে উনাকে ৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে মার্চ জনসমক্ষে তৎকালীন সরকারি বিচারকদের নির্দেশে হত্যা করা হয়।

কিছু পথভ্রষ্ট অজ্ঞ বাতিল পন্থি সুফি ব্যতীত কোন সাধারণ মুসলিম হুলুলিয়্যায় বিশ্বাস করা না। এই জন্যই সুফিরা ফানাফিল্লায় বিশ্বাস করে। আল্লাহর ধ্যান আর আরাধনার মাধ্যমে আল্লাহই বিলীন হয়ে যাওয়া। আল্লাহই বিলীন হতে পারলে তার আর ইবাদাত প্রয়োজন হয় না। অথচ মুহম্মাদ ﷺ ধ্যান আর আরাধনার মাধ্যমে আল্লাহই বিলীন হতে পারেন না। তিনি মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত সালাত আদায় করছেন। এই আকিদা একটি শিরকি আকিদা। বিশ্বাসকারী মুশরিক এতে কোন সন্দেহ নেই।   

২৫। অহেদাতুল অজুদ বা সর্বেশ্বরবাদ আকিদায় বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা ও সৃষ্টির অজুদ বা অস্তিত¦ একই বলে বিশ্বাস করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।

ওয়াহদাতুল ওজুদ দুটি আরবি শব্দের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে। আরবি শব্দ ওহেদ (এক) থেকে ওহেদা/ ওয়াহদাতুল, যার অর্থ এক হয়ে যাওয়া। আরবি শব্দ অজুদ অর্থ অস্তিত্ব। ওয়াহদাতুল ওজুদ এর শাব্দিক অর্থ হল- সব কিছুর (সৃষ্টি ও স্রষ্টার) অস্তিত্ব এক হয়ে যাওয়া।

গ্রিস ও হিন্দুদের বিশ্বাস থেকে জানা যায়, এই পৃথিবীতে যা কিছুর অস্তিত্ব আছে, সব দেখতে ভিন্ন ভিন্ন রকন হলেও প্রকৃতপক্ষে সবকিছু অস্তিত্ব এক। তাই স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য নেই, যিনি ‘খালিক্ব’ তিনিই ‘মাখলুক’ অর্থাৎ যা সৃষ্টি তাই স্রষ্টা। এই আকিদা বা বিশ্বাস স্রিকদের হলেও, এই আকিদার উপরে সবচেয়ে বেশি আমলকারী হচ্ছে হিন্দুরা। তাদের মতে পৃথিবীতে যা রয়েছে সবই মাবুদ। অর্থাৎ সবই সৃষ্টি এবং সবই মাবুদ। এ অর্থে কুকুর, শূকর, বানর এবং অন্যান্য নাপাক সৃষ্টিও মাবুদ হতে কোনো বাঁধা নেই। সুতরাং তাদের মতে যারা মূর্তি পূজা করে তারা ঈশ্বরেরই (আল্লাহরই) ইবাদত করে (নাউযুবিল্লাহ)।  তাই তারা পৃথিবীর প্রায় সবকিছুরই পূজা করে থাকে, যেমন- গাছ, পাথর, মাটি, সাপ-বিচ্ছু, হনুমান, হাতী, পশু, পাখি, নদ-নদী, সমুদ্র, নারী, এমনকি পুরুষের লিঙ্গেরও পূজা করে। কারণ তাদের বিশ্বাস সৃষ্টির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

ওয়াহদাতুল ওজুদ এর বাংলা হচ্ছে  ‘সর্বেশ্বরবাদ’।  অর্থাৎ সব কিছুর মাঝেই ঈশ্বর আছেন। মুসলিমগণ ঈশ্বর শব্দকে মহান আল্লাহ সমান্তরাল ব্যবহার করেন। তাই সম্ভবত ‘সর্বেশ্বরবাদ’ শব্দটি হিন্দু ধর্ম থেকে আগত, কারণ অনেক হিন্দু আছে যারা অদ্বৈতবাদে বিশ্বাসী। ওয়াহদাতুল ওজুদ এর ইংরেজি পারিভাষিক শব্দ হল: চধহঃযবরংস. চধহঃযবরংস দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত একটি হল- চধহ, অন্যটি হল- ঞযবড়. চধহ শব্দের অর্থ হল অষষ বা সব আর ঞযবড় শব্দের অর্থ হল- এড়ফ বা ঈশ্বর। চধহঃযবরংস এর সংজ্ঞায় বলা হয়: ঞযব ফড়পঃৎরহব ঃযধঃ ঃযব যিড়ষব ঁহরাবৎংব রং এড়ফ (যে মতবাদে বিশ্বের সবকিছুতেই ঈশ্বর)। ইসলাম আগমনের আগেই এই চধহঃযবরংস মতবাদটি এথেন্সের দার্শনিকদের মধ্যে লক্ষ করা যায়।  এথেন্সের দার্শনিক জেনো কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্টোয়িক দর্শনে সর্বেশ্বরবাদ তথা চধহঃযবরংস মতবাদটি ছিল বলে জানা যায়। সূত্র: “গ্রিস দর্শন প্রজ্ঞা ও প্রসার” বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত

প্রাচীন কাল থেকে মানবিয় যুক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান বা দর্শন দ্বারা স্রষ্টা, সৃষ্টি, স্রষ্টার প্রকৃতি, সৃষ্টির প্রকৃতি ও কর্ম ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করছে। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিতর্ক অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও কোন চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছতে পারেনি। এই ধরনের যুক্তিভিত্তিক জ্ঞান চর্চাকে ইলমুল কালাম বা যুক্তিবিদ্যা বলে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই ইলমুল কালাম বা যুক্তিবিদ্যা ছিল না। দ্বিতীয় হিজরি শতকে মুসলিম উম্মার মধ্যে স্রিস, ভারতীয় ও পারসিকদের দর্শন প্রচার লাভ করে। মূলধারার তাবেয়িগণ ও তাদের অনুসারীগণ গাইবি বিষয়ে, দর্শন বিতর্ক কঠিনভাবে অপছন্দ করতেন। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, গায়েবি বিষয় সব সময় অহির উপর নির্ভর করে, যুক্তির উপর নয়। অহির আদেশ মেনে নেয়াই মুমিনের কাজ। ইমাম আবু হানিফা ও তার অনুসারীগণ ইলমুল কালাম শিক্ষা করতে ঘোর আপত্তি করতেন। কারণ গায়েবের প্রতি বিশ্বাসে কোনো যুক্তি খাটে না। এ জন্যই চার মাযহাবের ইমামদের মধ্যে ফিকহি মাসলা মাসায়েলে মতপার্থক্য থাকলেও আকিদার ব্যাপারে তেমন কোন পার্থক্য পাওয়া যায় না। খুলাফায়ে রাশিদার পর মুসলিম উম্মার মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রভাবে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাববিয়া, কাদরিয়া, মুরজিয়া, জাহমিয়া, মুতাজিলা ইত্যাদি দল সৃষ্টি হয়েছিল। এই সকল দল মানবিয় যুক্তি, বুদ্ধি, জ্ঞান বা দর্শন দ্বারা স্রষ্টা, সৃষ্টি, স্রষ্টার প্রকৃতি, সৃষ্টির প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করে। স্রিস, ভারতীয় ও পারসিকদের দর্শন লুফে নেয়। চতুর্থ হিজরি শতাব্দীতে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মূলধারা আলেমগন ইলমুল কালাম বা যুক্তিবিদ্যা চর্চা শুরু করে। এই সময়কার প্রখ্যাত ইলমুল কালামবীদ আবুল হাসান আল আশআরী ও আবু মানসুর মাতুরীদীর আবির্ভাব ঘটে। আবুল হাসান আল আশআরী প্রাথমিক জীবনে মুতাজিলা মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিল। পরবর্তীতে মুতাজিলা মতাদর্শন ত্যাগ করেন এবং মূলধারার ইলমুল কালামে অনেক অবদান রাখেন। চতুর্থ হিজরি শতাব্দীর পর ইসলাম আস্ত আস্তে সুফিবাদের দিকে ঝুঁকতে থাকে, সাথে সাথে যুক্তি ভিত্তিক, বুদ্ধি ভিত্তিক দর্শন প্রসার ঘটে। ষষ্ঠ হিজরি শতাব্দীতে ভারতীয়‘সর্বেশ্বরবাদ’ বা গ্রীসের ‘চধহঃযবরংস’ মুসলিমগণ “ওয়াহদাতুল অজুদ” নামে স্রহণ করে। তার অর্থ দাঁড়ায় ইসলামের প্রথম পাঁচ শতাব্দীতে “ওয়াহদাতুল ওজুদ” নামে কোন আকিদা ছিল না। আবু হানিফা রহ. রচিত ফিকহুল আকবর বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা’, ও “ইসলামি আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ”

প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দিনের লেখা “ইসলামি আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” যা কওমি মাদ্রাসার লেসাব ভুক্ত। উক্ত বই-এ তিনি একটা অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন ‘সর্বেশ্বরবাদ/সর্বখোদাবাদ’। ঐ অধ্যায়ের তিনি ওয়াহদাতুল ওজুদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “মুসলিম মনীষীদের মধ্যে সর্ব প্রথম শায়েখে আকবর ইবনুল আরাবী এই মতবাদটি উদ্ভাবন করেন এবং তার অনুসারীগণ এটির প্রচার ও প্রসার ঘটান। ইবনে আরাবী এই মতবাদটি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্ব হুবহু আল্লাহ অস্তিত্ব”।

এখানে তিনি ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ তথা  স্রষ্টা ও সৃষ্টির অস্তিত্বের ঐক্য ও অভেদ তত্বকেই বুঝিয়েছেন। ফারসি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তার, সাদরুদ্দি, নাব লুসি প্রমুখ তাদের লেখায় ইবনুল আরাবীর এই ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ মতবাদটি তুলে ধরেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন। নাবলুসি  ব্যাখ্যা করে বলেন, “আল্লাহই একমাত্র  অস্তিত্ববান সত্তা, এই দৃষ্টি কোন থেকে যে, তিনি সার্বিক সমগ্র। অন্যের দ্বারা তিনি অস্তিত্তবান নন বরং তিনি স্বকীয় সত্তায় অস্তিত্ববান। নাবলুসি এই ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ আলোকে প্রদত্ত কালিমার ব্যাখ্যাকেই বিশুদ্ধ ব্যাখ্যা বলে অভিহিত করছেন। তবে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের উলামাগণ তার এ অভিমত মেনে নেয়নি। “ইসলামি আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” প্রকাশনায় : মাকতাবাতুল আবরার; পৃষ্ঠা -৫৪৭

এতক্ষণে জানতে পারলাম, যে মতবাদটি ইসলামেই নেই। কোন ইমানদার এই আকিদা পূর্ণ করতে পারেনা। তবে উপমহাদেশের কিছু আলেম সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে পার্থক্য করে এই মতবাদ সঠিক বলার চেষ্টা করছেন। তাদের ব্যাখ্যা বিশে¬ষণ সাধারণ মুসলিমদের  বোধ গণ্য হবে না। যেহেতু ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না ছিল এবং যে অর্থে এই আকিদা ব্যবহার হয় তা কুফরি। এই আকিদাতো দূরের কথা এই ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করাও হারাম।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০৪ ::  কুরআন ও সুন্নাহর একনিষ্ট অনুসারী হবে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন ও সুন্নাহের অনুসরণের মাঝেই মানুষের কল্যাণ। কুরআনের বহু আয়াতে কুরআন ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ পালন করার আদেশ পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরা, আল্লাহর কিতাবের আদেশ নিষেধ পালন করা ফরয, ঠিক তেমনিভারে আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা ও তিনি যা নিয়ে দুনিয়াতে আগমন করেছেন তার আনুগত্য করাও ফরয। কুরআন ও হাদিস একটি অপরটির সম্পূরক ও অবিচ্ছেদ্য মূল উৎস। দুটির কোনোটিকেই অস্বীকার করা যাবে না। কুরআন এবং হাদিস (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা, কাজ ও সমর্থ) একই সাথে পাশপাশি রেখে সমান তালে মেনে চলতে হবে। মুসলিমদের জীবনে কুরআনে হুকুম পালনের নিমিত্তে সুন্নাতের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম মানে কুরআন আর সুন্নাহ একটি বাদ দিয়ে অপরটি মানা যাবে না। কুনআনের বিভিন্ন আয়াতে মাহান আল্লাহ যেভাবে তার আদেশ পালন করতে বলেছেন ঠিক তেমনিভাবে রাসূল ﷺ এর আদেশ নিষেধ পালন করতে বলেছেন। কুরআন ও সুন্নাহ একটি অপরটির সম্পূরক ও অবিচ্ছেদ্য মূল উৎস। দুটির কোনোটিকেই অস্বীকার করা যাবে না। যদি কোনো ব্যক্তি একটিকে স্বীকার করে এবং অপরটিকেও অস্বীকার করল, তবে সে ইসলাম ধর্মের প্রতি মিথ্যারোপ করল।

ক কুরআন সুন্নাহর অনুসারণ-

(১) কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করলে কেহ পথভ্রষ্ট হবে না-

এই মর্মে মালিক (রহঃ) বলেন তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলিয়াছেন,

تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ

আমি তোমাদের নিকট দুইটি বস্তু ছাড়িয়া যাইতেছি। তোমরা যতক্ষণ উহাকে ধরিয়া থাকিবে পথভ্রষ্ট হইবে না। উহা হইল আল্লাহর কিতাব ও নবির সুন্নাত। মুয়াত্তা মালিক : ১৬৬১ ইফাঃ

আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تَرَكْتُ فيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُما كِتابَ الله وسُنَّتي وَلَنْ يَتَفَرَّقا حَتَّى يَرِدا عَلَيَّ الحَوْضَ

আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা অবলম্বন করলে তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। ’হওয’ (কাওসারে) আমার নিকট অবতরণ না করা পর্যন্ত তা বিচ্ছিন্ন হবে না। হাদিস সম্ভার : ১৫০০, হাকেম : ৩১৯

(২) মহান আল্লাহর ভালবাসা ও ক্ষমা পেতে সুন্নাহ অনুসরণ-

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সুরা আল ইমরান : ৩১

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমরা ইয়াহূদীদের নিকট তাদের অনেক ধর্মীয় কথাবার্তা শুনে থাকি। এসব আমাদের কাছে অনেক ভালো মনে হয়। এসব কথার কিছু কি লিখে রাখার জন্য আমাদেরকে অনুমতি দিবেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ইয়াহুদী ও নাসারাগণ যেভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তোমরাও কি (তোমাদের দীনের ব্যাপারে) এভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছ? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কাছে একটি অতি উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ দীন নিয়ে এসেছি। মূসা (আঃ)-ও যদি আজ দুনিয়ায় বেঁচে থাকতেন, আমার অনুসরণ ব্যতীত তাঁর পক্ষেও অন্য কোন উপায় ছিল না। মিশকাত : ১৭৭, আহমাদ : ১৪৭৩৬, বায়হাক্বী : ১৭৭।

(৩) আল্লাহর রসূল এর সুন্নাহ বিরোধী কাজ কর গোমরাহী-

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا

যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷  সূরা আহযাব : ৩৬

(৪) আল্লাহর রসূল এর সুন্নাহ বিমুখ কাফির হয়ে যাবে

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ‌ۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡكَـٰفِرِينَ

অর্থঃ বলুন, আল্লাহ আনুগত্য প্রকাশ কর এবং তাঁর রসূলদের আনুগত্য প্রকাশ কর। বস্তত, তারা যদি বিমুখতা অবলম্ভন করে, তা হলে আল্লাহ কাফিরদের ভালোবাসবেন না। সূরা আল ইমরান : ৩২

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও এরশাদ করেনঃ

وَيَقُولُونَ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلرَّسُولِ وَأَطَعۡنَا ثُمَّ يَتَوَلَّىٰ فَرِيقٌ۬ مِّنۡہُم مِّنۢ بَعۡدِ ذَٲلِكَ‌ۚ وَمَآ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থঃ তারা বলে, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করেছি কিন্তু এরপর তাদের মধ্য থেকে একটি দল মুখ ফিরিয়ে নেয়৷ এ ধরনের লোকেরা কখনোই মুমিন নয়।  সূরা নুর : ৪৭

(৫) সুন্নাহর অনুসরণই একমাত্র মুক্তির পথ-

আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ

আল্লাহর ও রাসূলের হুকুম মান্য কর, যাতে তোমরা কৃপা প্রাপ্ত হতে পার”। আলে ইমরান : ১৩২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّتِي”

আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি এগুলো আঁকড়ে ধরো, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। মুসনাদ আহমদ: ৮৮৪৫,  সুনান দারিমি

(৬) রসূল এর সুন্নাহ বিরোধীতাকারি জাহান্নামি-

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَ‌ۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا

আর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ। সুরা নূর : ৫২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে। সহিহ বুখারি : ৭২০৮

(৭) রাসূল তথা সুন্নাহই হলো মুমিন জীবনের একমাত্র আদর্শ।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

 لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗ

অর্থঃ তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে”। সূরা আনফাল : ২৪

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ যখন ভাষণ দিতেন তখন তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করত, কণ্ঠস্বর জোরালো হ’ত এবং তার রাগ বেড়ে যেত, এমনকি মনে হ’ত, তিনি যেন শত্রুবাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করছেন আর বলছেনঃ তোমরা ভোরেই আক্রান্ত হবে, তোমরা সন্ধ্যায়ই আক্রান্ত হবে। তিনি আরো বলতেন, আমি ও কিয়ামত এ দুটির ন্যায় (স্বল্প ব্যবধান) প্রেরিত হয়েছি, তিনি মধ্যম ও তর্জনী আঙ্গুল মিলিয়ে দেখাতেন।

তিনি আরো বলতেন, অতঃপর উত্তম বাণী হ’ল- আল্লাহর কিতাব এবং উত্তম পথ হ’ল মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ এর প্রদর্শিত পথ। অতীব নিকৃষ্ট বিষয় হ’ল নতুন উদ্ভাবন। প্রতিটি বিদ’আদ ভ্রষ্ট। তিনি আরো বলতেন, আমি প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তির জন্য তার নিজের থেকে অধিক উত্তম (কল্যাণকামী)। কোন ব্যক্তি সম্পদ রেখে গেলে তা তার পরিবার-পরিজনের প্রাপ্য। আর কোন ব্যক্তি ঋণ অথবা অসহায় সন্তান রেখে গেলে সেগুলোর দায়িত্ব আমার। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে নাসায়ী : ১৫৭৮, ১৯৬২; সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪০

(৮) রাসূল এর আনিত দ্বীন তথা সুন্নাহর আনুগত্য করা ফরজঃ

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ

তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তবে তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর”। সূরা আনফাল : ১

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ وَلَا تَوَلَّوۡاْ عَنۡهُ وَأَنتُمۡ تَسۡمَعُونَ

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং হুকুম শোনার পর তা অমান্য করো না৷ সুরা আনফাল : ২০

(৯) রাসূল এর সুন্নাহ ছাড়া কোন আমলই কবুল হবে না-

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَمَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর কেউ ইসলাম (রাসূল ﷺ আনিত দ্বীন) ছাড়া অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে, তা কখনো কবূল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন,

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

কেউ আমাদের এ শরীয়াতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮)

ইবরাহীম ইবনু তাইমী (রহঃ) এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রা.) আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব ও এই সাহীফায় যা আছে, তা ছাড়া অন্য কোন কিতাব নেই, যা আমরা পাঠ করে থাকি। তিনি বলেন, এ সাহীফায় রয়েছে, যখমসমূহের দন্ড বিধান, উটের বয়সের বিবরণ এবং আইর পর্বত থেকে সত্তার পর্যন্ত মদিনা হারাম হওয়ার বিধান। যে ব্যাক্তি এর মধ্যে (সুন্নাত বিরোধী) বিদআত উদ্ভাবন করে কিংবা বিদআতীকে আশ্রয় দেয়, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সকল মানুষের লানত। আল্লাহ তাঁর কোন নফল ও ফরয ইবাদত কবূল করেন না। আর যে নিজ প্রভু ব্যতীত অন্যকে প্রভু রূপে গ্রহণ করে, তার উপর অনুরূপ লানত। আর নিরাপত্তা দানে সর্বস্তরের মুসলিমগণ একই স্তরের এবং যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের চুক্তি ভঙ্গ করে তার উপরও অনুরূপ লা’নত। সহিহ বুখারি : ৩১৭২

খ) সাহাবীদের সম্মান ও অনুসরণ-

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

ؕ رَضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡہُ ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য। সুরা মায়েদা : ১১৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

 لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنَ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত। সুরা হাদিদ : ১০

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَالسّٰبِقُوۡنَ الۡاَوَّلُوۡنَ مِنَ الۡمُہٰجِرِیۡنَ وَالۡاَنۡصَارِ وَالَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُمۡ بِاِحۡسَانٍ ۙ رَّضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡہُ وَاَعَدَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ تَحۡتَہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ

আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য। সুরা তওবা : ১০০

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَلٰکِنَّ اللّٰہَ حَبَّبَ اِلَیۡکُمُ الۡاِیۡمَانَ وَزَیَّنَہٗ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ وَکَرَّہَ اِلَیۡکُمُ الۡکُفۡرَ وَالۡفُسُوۡقَ وَالۡعِصۡیَانَ ؕ  اُولٰٓئِکَ ہُمُ الرّٰشِدُوۡنَ ۙ

কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন। আর তোমাদের কাছে কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত। সুরা হুজুরাত : ৭

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا تَسُبُّوْا أَصْحَابِيْ فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيْفَهُ تَابَعَهُ جَرِيْرٌ وَعَبْدُ اللهِ بْنُ دَاوُدَ وَأَبُوْ مُعَاوِيَةَ وَمُحَاضِرٌ عَنْ الأَعْمَشِ

 তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ কর না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ-এর সমপরিমাণ সওয়াব হবে না। জারীর ‘আবদুল্লাহ ইবনু দাউদ, আবূ মু‘আবিয়াহ ও মুহাযির (রহ.) আ‘মাশ (রহ.) হতে হাদীস বর্ণনায় শুবা (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৭৩, সহিহ মুসলিম : ২৫৪০, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৬১

আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

آيَةُ الإِيْمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الأَنْصَارِ.

ঈমানের আলামত হল আনসারকে ভালবাসা এবং মুনাফিকীর চিহ্ন হল আনসারের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা। সহিহ বুখারি : ১৭, ৩৭৮৪, সহিহ মুসলিম : ৭৪

গ) তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িদের অনুসরণ-

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِيْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ يَجِيءُ قَوْمٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِيْنَهُ وَيَمِيْنُهُ شَهَادَتَهُ

আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী  যুগ। অতঃপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ সাক্ষ্য দানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য দান করবে। সহিহ বুখারি : ২৬৫২, ৩৬৫১, সহিহ মুসলিম : ২৫৩৩

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী ﷺ বলেছেন-

خَيْرُ الشُّهَدَاءِ الَّذِي يَأْتِي بِشَهَادَتِهِ قَبْلَ أَنْ يُسْأَلَهَا ‏.‏ هُوَ عِنْدَنَا إِذَا أُشْهِدَ الرَّجُلُ عَلَى الشَّىْءِ أَنْ يُؤَدِّيَ شَهَادَتَهُ

আমার যুগ হচ্ছে সর্বোত্তম যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ। তারপর এরূপভাবে মিথ্যার প্রসার ঘটবে যে, কারো নিকট সাক্ষ্য তলব না করা হলেও সে সাক্ষ্য দিবে, শপথ করতে বলা না হলেও শপথ করবে”। সুনানে তিরমিজি : ২৩০৩

ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হল আমার সাহাবিদের যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়িদের) যুগ। ইমরান বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর যুগের পর উত্তম যুগ হিসাবে দুই যুগ উল্লেখ করেছেন, না তিন যুগ তা আমার জানা (স্মরণ) নেই।’ অতঃপর তোমাদের পর এমন এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদেরকে সাক্ষী মানা হবে না। তারা খেয়ানত করবে এবং তাদের নিকট আমানত রাখা যাবে না। তারা আল্লাহর নামে মানত করবে কিন্তু তা পুরা করবে না। আর তাদের দেহে স্থূলত্ব প্রকাশ পাবে। সহিহ বুখারি : ২৬৫১, ৩৬৫০, ৬৪২৮, ৬৬৯৫, মুসলিম : ২৫৩৫, সুনানে তিরমিজি : ২২২১, ২২২২, সুনানে নাসায়ি : ৩৮০৯, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৫৭

এই সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকেএকটি আসার-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: “مَنْ كَانَ مُسْتَنًّا فَلْيَسْتَنَّ بِمَنْ قَدْ مَاتَ، فَإِنَّ الْحَيَّ لَا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ، أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ.”

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কারো অনুসরণ করতে চায়, সে যেন তাদের অনুসরণ করে, যারা মৃত্যুবরণ করেছে। কারণ জীবিত ব্যক্তি ফিতনার আশঙ্কা থেকে মুক্ত নয়। তারা হলেন সাহাবি, তারপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম (তাবেয়ি)। মুসনাদ আহমদ : ৩৭৯, মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ৩৮৫৪৬

এই সম্পর্কে একটি আসার-

قَالَ ابْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: “نَحْنُ نُحِبُّ مَنْ يَلِيْنَا.”

ইবনে উমর (রাঃ) বলেন: “আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে (তাবেয়ি) ভালোবাসি। মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক : ২০৭৭

এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে তাবেয়িরা ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। তারা সাহাবিদের অনুসরণ করে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের পথ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সাহাবি তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী এই তিন যুগ কম-বেশী ২২০ হিজরি পর্যন্ত ধরা হয়। অর্থাৎ তাবে-তাবেয়ীগন যত দিন বেচে ছিলেন ঠিক তত দিনই তাদের যুগ ছিল। এ হিসাবে তাদের যুগ কম বেশী ২২০ হিজরী পর্যান্ত স্থায়ী ছিল। এই তিন যুগের মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও কর্ম পদ্ধতি সঠিক ছিল। তাই এই তিন যুগে যে সকল আমলের দলীল প্রমান পাওয়া যায়, সেগুলোকে বিদআত বলা যাবে না। আর গবেষণা করে এর কথার সত্যতা পাওয়া গিয়েছে যে এই  তিন প্রজম্মের আলেমগন সঠিক দিনের উপর ছিলেন।

কাজেই যখন দেখবেন যে, আমলটি ২২০ হিজরীর পর মুসলিমদের মাঝে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে তা নিঃসন্দেহে বিদআত। উদারণ হিসাবে বলা যায়, আমাদের সমাজে প্রচলিত মিলাদ কিয়ামের প্রথা হিজরী ৬০৪ সনে আরবিলার সুলতান মুজাফফরউদ্দীন মওসিল শহরে (ইরাকের পার্শ্ববর্তী একটি শহর) এই মিলাদ নামক ইবাদতে প্রথম প্রচলন করেন।  যে সময় ক্রুসেডের মহাসমরে লক্ষ লক্ষ খৃষ্টান সৈন্য সিরিয়া ও জেরুজালেম শহরে আগমণ করে। যিশু খৃষ্টের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আকর্ষণীয় মেলা দেখে সুলতান মুজাফফরের হৃদয়ে রাসূলে কারীম (সাঃ) এর জন্মদিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের প্রেরণা জাগ্রত হয়, অনুগত একজন মৌলভীকে দিয়ে এই মিলাদের আনুষ্ঠানিকতা চালু করা হয়। এমনিভাবে কোন ইবাদাত যদি খাইরুর রুকন বা ২২০ হিজরির পরে প্রচলন হয় তবে আমরা তা বিদআত হিসাবে ধরে নিতে পারি।

ঘ। একটি সতর্কতা: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতিত একক কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না-

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্যতম বৈশিষ্ট হবে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতিত একক কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না। ইসলাম অহী নির্ভর ধর্ম। অহী আসে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে যা মানুষ জাতির নিকট উপস্থাপণ করেছেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনিই একমাত্র অনুকরনী এবং অনুসরণীয়। ইবাদাত কোন পদ্দতিতে হবে তার একমাত্র অনুকরনী মাপকাঠি হল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। শুধু ইবাদত নয় দুনিয়াবী বিধি বিধানেও তিনি অনুকরনীয়। মুসলীম মানে আত্মসমর্থণকারী। অর্থাৎ আমরা আল্লাহ ও তার রাসূল ও তার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফায়সালার সামনে আত্মসমর্থণকারী। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফায়সালার সামনে মু’মিনের আর কোন স্বাধীনতা থাকে না।

মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ

﴿ وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا

অর্থঃ যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ (সূরা আহযাব : ৩৬

আল্লাহ তায়ালা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে উসওয়াতুন হাসানা বা দ্বীনের মাপকাঠি বানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে অনেক অনেক সম্মান দান করে বলেন::

لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ۬ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأَخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا (٢١)

অর্থঃ আসলে তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে ছিল একটি উত্তম আদর্শ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাঙ্ক্ষী এবং বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ করে৷ (আহজাব ৩৩:২১)।

ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে একক কোন মানুষের তাকলীদ করতে হলে শুধু নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তাকলীদ করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে কেহই ভূলেন উর্ধে নয়। কিন্তু আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন নির্দোষ (গোনাহ থেকে পবিত্র), মনগড়া কোনো কথা বলেননি। তিনি ছাড়া অন্যান্য মানুষ যতই বড় হোন না কেন ভুল করতে পারেন। কেউই ভুল-ত্রুটির উর্দ্ধে নন। এ প্রসঙ্গে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

كُلُّ بَنِى آدمَ خَطَّاءٌ وَ خَيرُ الْخَطًّائِيْنَ التَّوَّابُوْنَ

মানুষ মাত্রই গুনাহগার (অপরাধী)। আর গুনাহগারদের মধ্যে তওবাকারীরাই উত্তম। সুনানে তিরমিজি : ২৪৯৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৫১

ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া কেহই শতভাগ সঠিক নয়। কাজেই কারো তাকলীদে বা অন্ধ অনুসরণ জায়েয নয়।

ইমাম মালেক র. বলেছেন, রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত এমন কোনো ব্যক্তি নেই যার সমস্ত কথা গ্রহণ করা যায়, অথবা পরিত্যাগ করা যায়। উপমহাদেশের অনেক খ্যাতমানা আলেম সাহাবিদের কেও সত্যের মাপকাঠি নির্ধারন করেছেন। তারাদের এই দাবিও সত্য কারন কুরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

*وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ ءَامِنُواْ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ*

অর্থঃ আর যখন তাদের বলা হয়েছে , অন্য লোকেরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো। সুরা বাকারা : ১৩

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

فَاِنۡ اٰمَنُوۡا بِمِثۡلِ مَاۤ اٰمَنۡتُمۡ بِہٖ فَقَدِ اہۡتَدَوۡا ۚ 

অতএব যদি তারা ঈমান আনে, তোমরা যেরূপে তার প্রতি ঈমান এনেছ, তবে অবশ্যই তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। সুরা বাকারা : ১৩৭

এ দুটি আয়াতে ঈমানের মাপকাঠি সাহেবায়ে কেরামের ঈমানের মাপকাটি হওয়ার কথা বিবৃত হয়েছে।

মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءتْ مَصِيرًا

অর্থঃ যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। সুরা নিসা : ১১৫

এই সকল আয়াতে সাহেবায়ে কেরামেরদের সত্যের মাপকাঠি হওয়ার কথা বিবৃত হয়েছে। এখানে সকল সাহাবিদের বুঝান হয়েছে। একক কোন সাহাবীকে বলা হয়নি। সাহাবিগণ সজ্ঞানে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলের বিপরীত আমল করছেন এমন কথা কেউ ভাবতে ও পারেনা। কারন তারা ইমান আমলের দিক দিয়ে উম্মতের মাঝে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল। কিন্তু তাদের না জানার কারনে বা অজ্ঞতার কারনে কোন ভুল করলে বা ভূল সিদ্ধান্ত দিলে এবং সেই সিদ্ধান্ত যদি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা, কাজ বা আমলের বিপরীন হয় তবে তার পরিত্যজ্য। সাহাবিদের জীবন দসায় এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়। যেমনঃ

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

প্রথম উদাহরনণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

عَنْ عِكْرِمَةَ أَنَّ أَهْلَ الْمَدِينَةِ سَأَلُوا ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ امْرَأَةٍ طَافَتْ ثُمَّ حَاضَتْ قَالَ لَهُمْ تَنْفِرُ قَالُوا لاَ نَأْخُذُ بِقَوْلِكَ وَنَدَعُ قَوْلَ زَيْدٍ قَالَ إِذَا قَدِمْتُمْ الْمَدِينَةَ فَسَلُوا فَقَدِمُوا الْمَدِينَةَ فَسَأَلُوا فَكَانَ فِيمَنْ سَأَلُوا أُمُّ سُلَيْمٍ فَذَكَرَتْ حَدِيثَ صَفِيَّةَ رَوَاهُ خَالِدٌ وَقَتَادَةُ عَنْ عِكْرِمَةَ

ইকরিমা (রহ.) হতে বর্ণিত যে, তাওয়াফে যিয়ারাহর পর ঋতু এসেছে এমন মহিলা সম্পর্কে মদিনা্বাসী ইবনু ‘আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তাদের বললেন, সে রওয়ানা হয়ে যাবে। তারা বললেন, আমরা আপনার কথা গ্রহণ করব না এবং জায়েদের কথাও বর্জন করব না। তিনি বললেন, তোমরা মদিনায় ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবে। তাঁরা মদিনায় এসে জিজ্ঞেস করলেন যাঁদের কাছে তাঁরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে সুলাইম (রা.) ও ছিলেন। তিনি তাঁদের উম্মুল মুমিনিন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সহিহ বুখারি : ১৭৫৮

তাঊস (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর সঙ্গে ছিলাম। জায়েদ ইবনু সাবিত (রাঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বললেন, আপনি কি এই ফাতওয়া দিয়েছেন যে, হায়যগ্রস্ত মহিলারা বিদায়ী তাওয়াফ না করেই প্রস্থান করতে পারবে? ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাকে বললেন, যদি আপনি আশ্বস্ত না হতে পারেন, তবে অমুক আনসারী মহিলাকে জিজ্ঞাসা করুন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন? তাঊস বলেন, যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হাসতে হাসতে ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি মনে করি আপনি সত্য কথাই বলেছেন। সহিহ মুসলিম : ১৩২৮

       মদিনার অধিবাসীরা ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে জানতে চান, একজন মহিলা তাওয়াফে যিয়ারাহ সম্পন্ন করার পর ঋতুমতী হলে, তার করণীয় কি? তিনি তাদের বলেন, ঐ মহিলা (মক্কা থেকে)  রওয়ানা হয়ে যেতে পারবে। এই মতামতের বিপরীত মত জায়দ (রা.) থেকে এসেছিল বিধায় তারা ইবনে আব্বাস (রা.) এর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিধায় পড়ে যান এবং বলেন, আমরা যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর মতামতও বিবেচনায় রাখব। এরপর ঘটনাটি আরো স্পষ্ট করতে, তারা মদিনায় ফিরে উম্মে সুলাইম (রা.) এর কাছ থেকে উম্মুল মুমিনীন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি শুনে নিশ্চিত হন যে তাওয়াফে যিয়ারাহ শেষ করার পর ঋতুমতী হন, তাহলে তার মক্কা ত্যাগে বাধা নেই। কারণ, তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে এবং হজের মূল শর্ত পূরণ হয়েছে। এখানে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কিরামদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলে, দলিল প্রমাণের আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হতো। সাহাবায়ে কিরাম ইজতিহাদ এবং দলিলের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদান করতেন। মতভেদ দেখা দিলে, তারা প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাউস (রহ.) এর বর্ণনায় ও এমনটি দেখা যায় যে, জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বিষয়টি অনুসন্ধান করে ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে এসে হাসতে হাসতে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছিলেন।

নোট : সাহাবিদের (রা.) শিক্ষা হলো দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে যার মতামত অধিক সঠিক তার মতামত গ্রহণ করা। আমরা দলিল প্রমাণের চেয়ে আমাদের আকাবিরদের বেশী গুরুত্ব প্রদান করে থাকি। মনে রাখতে হবে কোন মুজতাহিদ সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞাত নন। যখন হাদিসের সঠিক দলিল প্রমাণ পাওয়া যাবে, তখন আর কারো মতমতা প্রদান করা অধিকার থাকে না।

দ্বিতীয় উদাহরণ-

আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ’উমার ইবনু খাত্তাব সিরিয়ার দিকে রওনা করেছিলেন। শেষে তিনি যখন সারগ এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সৈন্য বাহিনীর প্রধানগণ তথা আবূ ’উবাইদাহ ইবনু জার্রাহ ও তাঁর সঙ্গীগণ সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানালেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের বিস্তার ঘটেছে। ইবনু ’আব্বাস বলেন, তখন ’উমার বলল, আমার নিকট প্রবীণ মুহাজিরদের ডেকে আন। তখন তিনি তাঁদের ডেকে আনলেন। ’উমার তাঁদের সিরিয়ার প্লেগের বিস্তার ঘটার কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন; কাজেই তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেন, বাকী লোক আপনার সঙ্গে রয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিগণ। কাজেই আমরা সঠিক মনে করি না যে, আপনি তাদের এই প্লেগের মধ্যে ঠেলে দিবেন।

উমার (রা.) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে চলে যাও। এরপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম। তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলে তাঁরাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতই মতপার্থক্য করলেন।

উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা উঠে যাও। এরপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশী আছেন, যাঁরা মক্কা জয়ের বছর হিজরত করেছিলেন, তাদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম, তখন তাঁরা পরস্পরে মতভেদ করলেন না। তাঁরা বললেন, আপনার লোকজনকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা এবং তাদের প্লেগের মধ্যে ঠেলে না দেয়াই আমরা ভাল মনে করি। তখন ’উমার লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সাওয়ারীর পিঠে আরোহণ করব (ফিরার জন্য)। অতএব তোমরাও সকালে সওয়ারির পিঠে আরোহণ করবে।

আবূ ’উবাইদাহ (রাঃ) বললেন, আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদির থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন? ’উমার(রাঃ) বললেন, হে আবূ ’উবাইদাহ! যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলত! হাঁ, আমরা আল্লাহর, এক তকদির থেকে আল্লাহর আরেকটি তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত, তোমার কিছু উটকে যদি তুমি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও যেখানে আছে দু’টি মাঠ। তন্মধ্যে একটি হল সবুজ শ্যামল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তাহলে তাও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ(রাঃ) আসলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোন প্রয়োজনের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।

তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা যখন কোন এলাকায় প্লেগের) বিস্তারের কথা শোন, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাক, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ’উমার (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করলেন। সহিহ বুখারি : ৫৭২৯, ৫৭৩০, ৬৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২১৯

মন্তব্যঃ কিয়াস করা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করা, উভয়টাই শরীয়ত সম্মত হলেও মতভেদের সময় দলিল পাওয়া গেলে দলিলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক।

এই দুটি উদাহরণ প্রমাণ করে সকল সাহাবি (রা.) সকল ফিকহি বিষয়ের জ্ঞান সম্পর্কে সমানভাবে জ্ঞাত ছিলেন না। এটা কোন অপরাধ নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। তবে ইমল আসার পর আর ইজতিহাদ করে মতামত প্রদান করা জায়েয নাই। দলিল প্রমাণের পরও মুরুব্বি বা বড়দের দোহাই দিয়ে মতবিরোধ করা যাবে না।

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

প্রথম উদাহরণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ يَقُولُ كُنَّا لاَ نَأْكُلُ مِنْ لُحُومِ بُدْنِنَا فَوْقَ ثَلاَثِ مِنًى فَرَخَّصَ لَنَا النَّبِيُّ فَقَالَ كُلُوا وَتَزَوَّدُوا فَأَكَلْنَا وَتَزَوَّدْنَا قُلْتُ لِعَطَاءٍ أَقَالَ حَتَّى جِئْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لاَ

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আমাদের কুরবানির গোশত মিনায় তিন দিনের বেশি খেতাম না। এরপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অনুমতি দিলেন এবং বললেন, খাও এবং সঞ্চয় করে রাখ। তাই আমরা খেলাম এবং সঞ্চয়ও করলাম। রাবী বলেন, আমি আত্বা (রহ.) কে বললাম, জাবির (রাঃ) কি বলেছেন আমরা মদিনায় আসা পর্যন্ত? তিনি বললেন, না। সহিহ বুখারি : ১৭১৯, ২৯৮০, ৫৪২৪, ৫৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৯৭২, সুনানে নাসায়ী ৪৪২৬, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৫৯২৫, মিশকাত : ২৬৩৯

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে: “জমহূরের মতে, তিন দিনের পরে খাওয়া এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখা বৈধ। আর এ বিষয়ে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞাটি জাবির, বুরায়দাহ্, ইবনু মাসউদ, কাতাদা, নুমানসহ বহু সাহাবি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে মানসুখ হয়ে গেছে। এই মানসুখের বিষয়টি আলী এবং ইবনু উমার (রা.) এর বিষয়টি জানা ছিল না।

হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তার গ্রন্থ ফাতহুল বারী-তে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, সম্ভবত আলী (রাঃ)-এর নিকট মানসূখের বিষয়টি পৌঁছেনি।

ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে সহিহ সনদে বর্ণিত অনেক হাদীস রয়েছে। আর ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এর বিষয়টি হলো তাদের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাড়ের বিষয়টি পৌঁছেনি। তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিষেধ করতে শুনেছিলেন ফলে তারা যা শ্রবণ করেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। লক্ষ করুন, একটি জরুরি দুই জন বিশিষ্ট সাহাবির গোচরি ভূক্তই হয় নাই।

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

উদাহরণ- 

আল্লাহ রব্বুল আলামি বলেন-

أَسۡكِنُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ سَكَنتُم مِّن وُجۡدِكُمۡ وَلَا تُضَآرُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُواْ عَلَيۡہِنَّ‌ۚ وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّ‌ۚ

অর্থঃ তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। সূরা তালাক : ৬

আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও জ্ঞানের কথা বলার অবকাশ নেই। অথচ তাঁর মত বিজ্ঞ মানুষের একটি হাদিছটি অজানা ছিল বিধান তিনি এই আয়াতে ব্যাখ্যায় ভুল করে বসেন। তিনি মতামত প্রদান করেন যে, তালাকে বাইন বা একসাথে তিন তালাক প্রাপ্ত মহিলা স্বামীর পক্ষ থেকে খোরপোশ ও আবাসনের পাবে। সহিহ হাদিসে এসেছে-

عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ، أَنَّهُ طَلَّقَهَا زَوْجُهَا فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ أَنْفَقَ عَلَيْهَا نَفَقَةَ دُونٍ فَلَمَّا رَأَتْ ذَلِكَ قَالَتْ وَاللَّهِ لأُعْلِمَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ لِي نَفَقَةٌ أَخَذْتُ الَّذِي يُصْلِحُنِي وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لِي نَفَقَةٌ لَمْ آخُذْ مِنْهُ شَيْئًا قَالَتْ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏ “‏ لاَ نَفَقَةَ لَكِ وَلاَ سُكْنَى

ফাতমিা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তার স্বামী তাকে তালাক (তালাক) দেন। এরপর তার স্বামী তার জন্য (ইদ্দাতকালীন সময়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য) সামান্য পরিমাণ খোরপোশ দিয়েছিলেন। তিনি তা দেখে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই এ বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোচরে আনব। যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য হয় তবে তা আমি এ পরিমাণ উসুল করব যাতে সুচারুভাবে আমার প্রয়োজন পূরণ হয়। আর যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য না-ই হয় তাহলে আমি তার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করব না। তিনি বলেন, এবার আমি বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উত্থাপন করলাম। তিনি আমাকে বললেন, তোমার জন্য কোন খোরপোশ নেই, বাসস্থানও নেই। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০

এই হাদিস উল্লেখ করার পরও আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ফাতিমা বিনতু কায়স হয়ত (রা.) ভুলে গেছেন। এই সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তাঁর হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মহিলার কথার উপর ভিত্তি করে আমরা কি আমাদের প্রতিপালকের কথা পরিত্যাগ করব, অথচ আমরা জানি না যে, তার মনে আছে নাকি ভুলে গেছে? অর্থাৎ আমীরুল মুমিনিন উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এই দলিলের প্রতি আস্থাশীল হতে পারেননি।

এরূপ ঘটনা শুধু উমর (রা.) নয়, অন্যান্য সাহাবিগণ এবং তাবেয়িন-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তাই তো দেখা যায় বিদ্বানগণের এক জন এক হাদিসকে সহিহ মনে করে দলিল দিচ্ছেন অপর জন যঈফ মনে করে তা পরিত্যাগ করছেন। ফলে উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু দৃষ্টিতে যেটি শক্তিশালী মনে হয়েছে সেটিকেই তিনি গ্রহণ করেছেন। এমনকি তাদের পরেও হাদিস সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মাঝেও এমন মতভেদ দেখা যায়। সনদ বিচারে একজন সহিহ বলেছেন তো আরেক জন যঈফ বলেছেন। কাজেই এক্ষেত্রে আমরা মহান সহাবিগণ (রা.) এর অনুসরণ করব। যে মতটি অধিক সঠিক বা সত্যের কাছাকাছি সে মতটিই গ্রহণ করতে হবে।

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধ হতে ফিরে পথে আমাদেরকে বললেন, বনূ কুরাইযাহ এলাকায় পৌঁছার পূর্বে কেউ যেন ‘আসর সালাত আদায় না করে। কিন্তু অনেকের রাস্তাতেই আসরের সময় হয়ে গেল, তখন তাদের কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে না পৌঁছে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা সালাত আদায় করে নেব, আমাদের নিষেধ করার এ উদ্দেশ্য ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল তাড়াতাড়ি যাওয়া।  নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এ কথা উল্লেখ করা হলে, তিনি তাঁদের কারোর ব্যাপারে কড়াকড়ি করেননি। সহিহ বুখারি : ৯৪৬, ৪১১৯

এই হাদিসের মূল কথা হলো- খন্দকের যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরে এলেন এবং যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম রাখলেন। তখন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন আমরা এখন অস্ত্র রাখিনি। অতএব আপনি চুক্তি ভঙ্গকারি বিশ্বাসঘাতক ইয়াহুদি সম্প্রদায় “বনি কুরায়জা’র উদ্দেশ্যে বের হন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের একটি দলকে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা “বনি কুরায়জা’র মহল্লায় না পৌঁছে কেউ আসর পড়বেনা”। পথে আসরের ওয়াক্ত হলে একদল হাদিসের শাব্দিক নির্দেশ অনুযায়ী বললো, আমরা সেখানে পৌঁছার পূর্বে সালাত আদায় করবো না। অন্যদল বললো, তাঁর (সা) ইচ্ছা এটা নয় অর্থাৎ উক্ত আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাড়াতাড়ি ঐ গোত্রে পৌঁছা, নামাজ না পড়া নয়, অতএব পথে সালাত পড়ে নাও। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে উভয় দলের ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি দুটোকেই অনুমোদন করেন। সাহাবিগন নিজ কানে সরাসরি শুনে ও মর্ম বুঝতে ভুল করলেন। এক এক দল এক এক ধরনের বুঝলেন এবং আমল ও করলেন ভিন্ন ভিন্ন অথচ উভয় দলই সঠিক ছিল। এটাই মতভেদ মতবিরোধ নয়। আজ কাল আমরা যা করছি তা মতবিরোধ, মতভেদ নয়।

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

আবদুর রহমান ইবনু আবযা (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’উমার (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, আমরা কোন (পানিবিহীন) জায়গায় এক-দুই মাস অবস্থান করে থাকি (সেখানে অপবিত্র হলে করণীয় কি?)। ’উমার (রাঃ) বললেন, আমি তো পানি না পাওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করব না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ’আম্মার (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আপনার কি ঐ ঘটনার কথা মনে নেই, যখন আমি ও আপনি উটের পালে ছিলাম। আমরা জুনুবি হয়ে গেলাম এবং আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিলাম।

আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন তোমাদের জন্য শুধু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল- এই বলে তিনি মাটিতে উভয় হাত মেরে হাতে ফুঁ দিলেন। তারপর হাত দিয়ে মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের অর্ধেক পর্যন্ত মুছলেন। ’উমার (রাঃ) বললেন, হে ’আম্মার! আল্লাহকে ভয় কর। তিনি বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আল্লাহর শপথ! আপনি চাইলে আমি আর কখনো তা বর্ণনা করব না। ’উমার (রা.) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার উদ্দেশ্য এরূপ নয়, বরং তুমি চাইলে অবশ্যই তোমার বক্তব্যের স্বাধীনতা তোমাকে দিব। সুনানে আবু দাউদ : ৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৬৯, সুনানে নাসায়ি : ৩১৮

মুনাফিক সাহাবী ব্যতিত সকল সাহাবীই হকের উপর ছিল। মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের কোন প্রকার সমালোচনা করা হারাম। তাদের ইজমা বা ঐক্যমত আমাদের জন্য দলীল। সকল সাহাবি এককভাবেও আমাদের দলীল কিন্তু তাদের কোন আমল সুন্নাহর বিপরীত হলে (না জানার কারনে বা ভুলের কারনে) আমাদের নিকট দলীল নয়। তাই একক কোন সাহাবীর আমলকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা ঠিক নয় কারন উপরের কিছু হাদিসে দেখেছি তারা কোন কোন হাদিস জানতেন না বা জানার পরে আমল পরিবর্তন হয়েছিল, যা তিনি জানতেন না। তবে তাদের বড় বৈশিষ্ট্য হল তারা হাদিসের প্রমান পেলে নিজ মতামত ত্যাগ করছেন। তাই আমাদেরও উচিত এককভাবে শুধুই রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ আর দলগত ভাবে সাহাবীদের ইজমা বা ঐক্যমতের অনুসরণ করা। তাই কোন একজন মুজতাহীদ আলেমকে অন্ধভাবে অনুসরণ করলে হক বা সত্য খুজে পাওয়া যাবে না। তাই সত্য বা হক পন্থীদলের অন্যতম বৈশিষ্ট তারা একক কোর ব্যক্তি বা মুজতাহীদ আলেমের তাকলীদ বা আন্ধ অনুসরণ করেণা।

ঙ) শর্তসাপেক্ষে আমির বা উলুল আমরদের অনুসরণ-

কুনআন সুন্নাহ মানদণ্ডে পরীক্ষতি আমিরের আনুগত্য ফরজ। কুনআন সুন্নাহ অনুসারী নতা বা আমিরকে আনুগত্য না করে, নতুন আমিরে তৈরি করে ইসলামকে টুকরা টুকরা করে দলে উপদলে ভাগ করা ইসলামি শরীয়ত হারাম।  কুরআন সুন্নার বহু স্থানে আমিরের আনুগত্য বা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً

অর্থ : হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের (আমির, বিচারক, শাসক)। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شِبْرًا فَمَاتَ عَلَيْهِ إِلاَّ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً

যে ব্যক্তি তার আমীরের কোন কার্যকলাপ অপছন্দ করে, তার উচিত ধৈর্যধারণ করা। কেননা যে কোন ব্যক্তিই শাসকের থেকে (আনুগত্য থেকে) বেরিয়ে গিয়ে বিঘত পরিমাণ সরে যাবে এবং তারপর এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৪৯

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

وَبِهَذَا الْإِسْنَادِ مَنْ أَطَاعَنِيْ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ عَصَى اللهَ وَمَنْ يُطِعْ الأَمِيْرَ فَقَدْ أَطَاعَنِيْ وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيْرَ فَقَدْ عَصَانِيْ وَإِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللهِ وَعَدَلَ فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا وَإِنْ قَالَ بِغَيْرِهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ مِنْهُ

যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানি করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই নাফরমানি করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আমারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানি করল সে ব্যক্তি আমারই নাফরমানি করল। ইমাম তো ঢাল স্বরূপ। তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধ এবং তাঁরই মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জন করা হয়। অতঃপর যদি সে আল্লাহর তাকওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে, তবে তার জন্য এর পুরস্কার রয়েছে আর যদি সে এর বিপরীত করে তবে এর মন্দ পরিণাম তার উপরই বর্তাবে। সহিহ বুখারি : ২৯৫৭, ৭১৩৭, সহিহ মুসলিম : ১৮৩৫, মিশকাত : ৩৬৬১, সহিহ আল জামি : ৬০৪৪

নাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) আবদুল্লাহ ইবনু মুতী (রা.) এর নিকট এলেন তখন হাররা (হৃদয় বিদারক) এর ঘটনা ঘটেছে এবং যুগটা ছিল ইয়াযীদ ইবনু মুয়াবিয়ার যুগ। তখন তিনি (ইবনু মুতী’) বললেন, আবূ আবদুর রহমানের জন্য বিছানা পেতে দাও। তখন তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে বসতে আসিনি, এসেছি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যে হাদীস শুনেছি তা তোমাকে শুনাতে। আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি (আমীরের) আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে তার কোন দলিল থাকবে না। আর যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলো আর তার ঘাড়ে আনুগত্যের কোন চুক্তি নেই তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৫১

উপরের কুরআন ও হাদিসের আলোকে দেখতে পেলাম মতবিরোধ থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমিরের আনুগত্য করতে হবে। আমিরের আনুগত্য মেনে চললে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে শান্তির পথে আগানো সম্ভব। ইসলাম নেতৃত্ব মানার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম আমিরের অনুসরণ বা আনুগত্যের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে। কিন্তু একটি কথা সব সময় লক্ষ রাখতে হবে আমিরের আনুগত্য শর্ত সাপেক্ষ। তাকে অনুসরণের মাপকাঠিও কুরআন সুন্নায় বিস্তারিত বলেছেন। কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থানকারী নেতার আনুগত্য প্রকাশ অপরিহার্য ঘোষণা করেছে। সে সকল আমির আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে তাদের কোন আনুগত্য নাই। যে আয়াতে মহান আল্লাহ আমিরের আনুগত্য করার কথা বলেছেন, সে আয়াতেই সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً

অর্থঃ অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

এ আয়াতে উলুল আমর বা আমিরের আনুগত্য শর্ত হলো তাদের মাঝে কোন বিষয় মতবিরোধ হলে কুরআন সুন্নাহর আলোকে সমাধা করতে হবে। কোনো অবস্থায়ই তারা কুরআ সুন্নাহর বাহিরে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বস্তুকে হারাম করার ক্ষেত্রে  আনুগত্য করা যাবে না। কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তাদের আনুগত্য করল তারা মূলত আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ দাড় করার মত হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

অর্থ: তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছেন৷ এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও৷ অথচ তাদের মাবুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগি কারার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মাবুদ যিনি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন আর কেউ নেই৷ তারা যে-সব মুশরিক কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র৷ সুরা তওবা : ৩১

বোঝা গেল, শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমাণ ছাড়াই আমিরের হালাল বা হারাম সিদ্ধান্তকে অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত। উপরের আয়াত সম্পর্কে একটি হাদিস-

আদী ইবনু হাতিম (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এলাম। তিনি বললেন, হে ’আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাকে সূরা তওবার  নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

অনুবাদ) “তারা আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসারবিরাগীগণকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। সূরা তওবা-৩১

তারপর তিনি বললেন, তারা অবশ্য তাদের পূজা করত না। তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলত তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলত তখন নিজেদের জন্য উহাকে হারাম বলে মেনে নিত। সুনানে তিরমিজ : ৩০৯৫

তাফসিরে ইবনে কাসির লিখেন-

আদী ইবনে হাতেম নবি (সা) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিল খ্রিষ্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি নবি (সা) কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের এ আয়াতটিতে (সুরা তওবা- ৯:৩১) আমাদের বিরুদ্ধে উলামা ও দরবেশদেরকে খোদা বানিয়ে নেবার যে দোষারোপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কি৷ জবাবে তিনি বলেন, তারা যেগুলোকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়৷ জবাবে আদী বলেন, হ্যাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্য এমনটি করতাম। রসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ব্যাস, এটিই তো হচ্ছে তোমাদের প্রভু বানিয়ে নেয়া। সুরা তাওবার ৩১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, ইবনে কাসির

আমিরের আনুগত্য শুধু মাত্র হকের উপর-

আলী (ইবনু আবূ তালিব) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং আনসারদের এক ব্যক্তিকে তার সেনাপতি নিযুক্ত করে তিনি তাদেরকে তাঁর (সেনাপতির) আনুগত্য করার নির্দেশ দেন। (কোন কারণে) আমির রাগান্বিত হয়ে যান। তিনি বললেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করতে নির্দেশ দেননি? তাঁরা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা কিছু কাঠ সংগ্রহ করে আনো। তাঁরা কাঠ সংগ্রহ করলেন। তিনি বললেন, এগুলোতে আগুন লাগিয়ে দাও। তাঁরা ওতে আগুন লাগালেন। তখন তিনি বললেন, এবার তোমরা সকলে এ আগুনে প্রবেশ কর। তারা আগুনে প্রবেশ করতে সংকল্প করে ফেললেন। কিন্তু তাদের কয়েকজন অন্যদের বাধা দিয়ে বলতে লাগলেন, আগুন থেকেই তো আমরা পালিয়ে গিয়ে নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এভাবে ইতস্তত করতে করতে আগুন নিভে গেল এবং তার ক্রোধও ঠান্ডা হল। এরপর এ সংবাদ নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, যদি তারা আগুনে ঝাঁপ দিত তা হলে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আর এ আগুন থেকে বের হতে পারত না। আনুগত্য (করতে হবে) কেবল সৎ কাজের। সহিহ বুখারি ৪৩৪০, ৭১৪৫, ৭২৫৭

পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই-

পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি নেতা বা কারো আনুগত্য করতে পারবে না। যাদের আনুগত্য করা ইসলামে জরুরি পাপের কাজে তাদেরও আনুগত্য করতে কেউ বাধ্য নয়। যেমনভাবে মহান আল্লাহ বলেন,

وَتَعَاوَنُواْ عَلَى الْبرِّ وَالتَّقْوَى وَلاَ تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

অর্থ : সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। সুরা মায়েদা : ২ 

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِالْمَعْصِيَةِ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ

পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না। সহিহ বুখারি : ২৯৫৫, ৭১৪৪)

আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوف

নাফরমানির ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু সৎকর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সহিহ মুসলিম : ১৮৪০, আবূ দাঊদ : ২৬২৫, নাসায়ী : ৪২০৫, মিশকাত : ৩৬৬৫, আহমাদ : ৭২৪।

এই আলোচনা দ্বারা দুটি বিষয় বোঝ যায়-

(১) কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক শরীয়ত সম্মত আমিরের আদেশ মান্য করা ফরজ। এ সকল বিষয় মতবিরোধ করা হারাম। এ মতবিরোধ থেকেই নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

(২) অপর পক্ষে শর্থহীভাবে আমিরের অনুসরণ করে, তার সীমা লঙ্ঘনকে সহায়তা করে দলে দলে বিভক্ত হচ্ছি। আমিরের ভ্রান্ত নীতির ফলে সত্যপন্থীরা তার থেকে দূরে চলে যায় এবং নতুন করে ফির্কার সৃষ্ট হয়।

নাজাত প্রপ্ত দলের বৈশিষ্ট্য-০৫ ::  ইবাদতের গুরুত্ব প্রদান ও ভারসাম্য রক্ষা করে

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইবাদত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ইসলামের মূল ভিত্তির অন্যতম। এটি মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর বান্দার আনুগত্য, ভক্তি, এবং ভালোবাসার প্রকাশ। ইবাদত শুধু আল্লাহর আদেশ নয়, এটি মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। ইবাদতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে উপলব্ধি করি। তাই আমাদের উচিত ইবাদতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা। ইবাদতের গুরুত্ব বোঝাতে কুরআন ও হাদিসে বিভিন্ন স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।

(১) ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য

আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

অর্থ: “আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদতের জন্য। সূরা যারিয়াত : ৫৬

(২) ইবাদত হৃদয়ের প্রশান্তি আনে

আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

অর্থ: “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের অন্তর শান্ত হয় আল্লাহর স্মরণে। শুনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর শান্তি পায়। সূরা রাদ : ২৮

৩. ইবাদত পরকালের সাফল্যের পথ

আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ

অর্থ: সে সফলকাম হয়েছে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করেছে ও সালাত আদায় করেছে। সূরা আলা : ১৪-১৫

৪. ইবাদত মানুষকে পাপ থেকে রক্ষা করে

আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ تَنْهَىٰ عَنِ ٱلْفَحْشَآءِ وَٱلْمُنكَرِ ۗ وَلَذِكْرُ ٱللَّهِ أَكْبَرُ ۗ وَٱللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ

অর্থ: “নিশ্চয় সালাত অশ্লীলতা ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে। এবং আল্লাহর স্মরণ অবশ্যই সবচেয়ে বড় জিনিস। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা জানেন। সূরা আনকাবুত : ৪৫

৫. আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী

মুয়াজ ইবনু জাবাল (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি কোন এক ভ্রমণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। একদিন যেতে যেতে আমি তার নিকটবর্তী হলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি কাজ সম্পর্কে আমাকে জানিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম হতে দূরে রাখবে। তিনি বললেন, তুমি তো আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন করেছো। তবে সেই ব্যক্তির জন্য এ ব্যাপারটা অতি সহজ যে ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তা’আলা তা সহজ করে দেন।

তুমি আল্লাহ তা’আলার ইবাদাত করবে, কোন কিছুকে তার সাথে শরীক করবে না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত দিবে, রামাযানের সিয়াম রাখবে এবং বাইতুল্লাহর হাজ্জ করবে। তিনি আরো বললেন, আমি কি তোমাকে কল্যাণের দরজাসমূহ সম্পর্কে বলে দিব না? রোযা হলো ঢালস্বরূপ, দান-খাইরাত গুনাহসমূহ বিলীন করে দেয়, যেমনিভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয় এবং কোন ব্যক্তির মধ্যরাতের সালাত আদায় করা। তারপর তিনি এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন-

تَتَجَافٰی جُنُوۡبُہُمۡ عَنِ الۡمَضَاجِعِ یَدۡعُوۡنَ رَبَّہُمۡ خَوۡفًا وَّطَمَعًا ۫ وَّمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡن.َ فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَہُمۡ مِّنۡ قُرَّۃِ اَعۡیُنٍ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

তাদের দেহপাশ বিছানা থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং তারা তাদের প্রভুকে ডাকে আশায় ও ভয়ে এবং আমি তাদেরকে যে রিযক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। কেউই জানে না তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ। (সূরা সিজদা:১৬-১৭)

তিনি আবার বলেন, আমি কি সমস্ত কাজের মূল, স্তম্ভ ও সর্বোচ্চ শিখর সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করবো না? আমি বললাম, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, সকল কাজের মূল হলো ইসলাম, স্তম্ভ হলো সালাত এবং সর্বোচ্চ শিখর হলো জিহাদ। তিনি আরো বললেন? আমি কি এসব কিছুর সার সম্পর্কে তোমাকে বলব না? আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি তার জিহ্বা ধরে বললেন, এটা সংযত রাখ। আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর নবী! আমরা যে কথাবার্তা বলি এগুলো সম্পর্কেও কি পাকড়াও করা (জবাবদিহি) হবে? তিনি বললেনঃ হে মুয়াজ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! মানুষকে শুধুমাত্র জিহবার উপার্জনের কারণেই অধঃমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৬১৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৩

(৬) ইবাদতের প্রতিদান জান্নাত

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ سَنُدۡخِلُہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ وَعۡدَ اللّٰہِ حَقًّا ؕ وَمَنۡ اَصۡدَقُ مِنَ اللّٰہِ قِیۡلًا

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, অচিরেই তাদেরকে আমি প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। সেখানে তারা হবে স্থায়ী। আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। আর কথায় আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী কে? সুরা নিসা : ১২২

ইবাদত আল্লাহর নির্দেশিত একটি মৌলিক দায়িত্ব, যা শুধু ব্যক্তিগত পরিত্রাণের মাধ্যম নয়, বরং এটি সামাজিক শৃঙ্খলা ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির উপায়। আমাদের উচিত যথাযথভাবে ইবাদত করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকা। তাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতে অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হবে তারা আল্লাহ প্রদত্ত সীমার মাঝে থেকে যাথাযত তার হুকুম আহকাম মান্য করে তাকে খুসি করবে।

২। ইবাদত আদায় ও ভারসাম্য রক্ষা করা

ইবাদত আদায় ও ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরী। ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসুল (সা.) আমাদের এই ভারসাম্যের প্রতি দৃষ্টি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই সম্পর্কি কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে উপস্থাপন করা হলো-

১. ইবাদতে মধ্যপন্থা অবলম্বন

মহান আল্লাহ বলেন-

وَابۡتَغِ فِیۡمَاۤ اٰتٰىکَ اللّٰہُ الدَّارَ الۡاٰخِرَۃَ وَلَا تَنۡسَ نَصِیۡبَکَ مِنَ الدُّنۡیَا وَاَحۡسِنۡ کَمَاۤ اَحۡسَنَ اللّٰہُ اِلَیۡکَ وَلَا تَبۡغِ الۡفَسَادَ فِی الۡاَرۡضِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ الۡمُفۡسِدِیۡنَ

আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’। সূরা কাসাস : ৭৭

২. ইবাদতে কষ্ট না করে সহজ পথ অবলম্বন করা

আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ الدِّينَ يُسْرٌ، وَلَنْ يُشَادَّ الدِّينَ أَحَدٌ إِلاَّ غَلَبَهُ، فَسَدِّدُوا وَقَارِبُوا وَأَبْشِرُوا، وَاسْتَعِينُوا بِالْغَدْوَةِ وَالرَّوْحَةِ وَشَىْءٍ مِنَ الدُّلْجَةِ

নিশ্চয়ই দ্বীন সহজ। দ্বীন নিয়ে যে বাড়াবাড়ি করে দ্বীন তার উপর জয়ী হয়। কাজেই তোমরা মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং (মধ্যপন্থার) নিকটে থাক, আশান্বিত থাক এবং সকাল-সন্ধ্যায় ও রাতের কিছু অংশে (ইবাদাত সহযোগে) সাহায্য চাও। সহিহ বুখারি : ৩৯, ৫৬৭৩, ৬৪৬৩, ৭২৩৫

৩. ইবাদতে সীমা লঙ্ঘন না করা

মহান আল্লাহ বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ

অর্থ : হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হালাল করেছেন, তা নিজেরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। সূরা মায়িদা : ৮৭

৪. পরিবার ও নিজের প্রতি দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছে যে, আমি একটানা সওম পালন করি এবং রাতভর সালাত আদায় করি। এরপর হয়ত তিনি আমার কাছে লোক পাঠালেন অথবা আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করলাম। তিনি বললেন, আমি কি এ কথা ঠিক শুনিনি যে, তুমি সওম পালন করতে থাক আর ছাড় না এবং তুমি (রাতভর) সালাত আদায় করতে থাক আর ঘুমাও না? (আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন) তুমি সওম পালন কর এবং মাঝে মাঝে তা ছেড়েও দাও। রাতে সালাত আদায় কর এবং নিদ্রাও যাও। কেননা তোমার উপর তোমার চোখের হক রয়েছে এবং তোমার নিজের শরীরের ও তোমার পরিবারের হক তোমার উপর আছে। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, আমি এর চেয়ে বেশি শক্তি রাখি। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি দাঊদ (আঃ)-এর সিয়াম পালন কর। রাবী বলেন, ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, তা কিভাবে? তিনি বললেনঃ দাঊদ (আঃ) একদিন সওম পালন করতেন, একদিন ছেড়ে দিতেন এবং তিনি (শত্রুর) সম্মুখীন হলে পলায়ন করতেন না। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমাকে এ শক্তি কে যোগাবে? বর্ণনাকারী ‘আত্বা (রহ.) বলেন, (এ হাদীসে) কিভাবে সব সময়ের সিয়ামের প্রসঙ্গ আসে সে কথাটুকু আমার মনে নেই (অবশ্য) এতটুকু মনে আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’বার এ কথাটি বলেছেন, সব সময়ের সওম কোন সওম নয়। সহিহ বুখারি : ১৯৭৭

৫ইবাদতে ভারসাম্য শেখানো তিন সাহাবির বিখ্যাত ঘটনা-

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না।

অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি।  সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১

ইসলাম আমাদের ইবাদত ও জীবনের অন্যান্য দিকের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে উৎসাহিত করে। ইবাদত যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের, পরিবারের ও সমাজের অধিকারও পূরণ করতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনই প্রকৃত মুমিনের লক্ষণ। এমনি ভাবে ইবাদতে যাদের এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন পাবেন তারাই হলো আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী।