মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
কুরআন ও সুন্নাহের অনুসরণের মাঝেই মানুষের কল্যাণ। কুরআনের বহু আয়াতে কুরআন ও রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ পালন করার আদেশ পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরা, আল্লাহর কিতাবের আদেশ নিষেধ পালন করা ফরয, ঠিক তেমনিভারে আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করা ও তিনি যা নিয়ে দুনিয়াতে আগমন করেছেন তার আনুগত্য করাও ফরয। কুরআন ও হাদিস একটি অপরটির সম্পূরক ও অবিচ্ছেদ্য মূল উৎস। দুটির কোনোটিকেই অস্বীকার করা যাবে না। কুরআন এবং হাদিস (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা, কাজ ও সমর্থ) একই সাথে পাশপাশি রেখে সমান তালে মেনে চলতে হবে। মুসলিমদের জীবনে কুরআনে হুকুম পালনের নিমিত্তে সুন্নাতের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম মানে কুরআন আর সুন্নাহ একটি বাদ দিয়ে অপরটি মানা যাবে না। কুনআনের বিভিন্ন আয়াতে মাহান আল্লাহ যেভাবে তার আদেশ পালন করতে বলেছেন ঠিক তেমনিভাবে রাসূল ﷺ এর আদেশ নিষেধ পালন করতে বলেছেন। কুরআন ও সুন্নাহ একটি অপরটির সম্পূরক ও অবিচ্ছেদ্য মূল উৎস। দুটির কোনোটিকেই অস্বীকার করা যাবে না। যদি কোনো ব্যক্তি একটিকে স্বীকার করে এবং অপরটিকেও অস্বীকার করল, তবে সে ইসলাম ধর্মের প্রতি মিথ্যারোপ করল।
ক কুরআন সুন্নাহর অনুসারণ-
(১) কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করলে কেহ পথভ্রষ্ট হবে না-
এই মর্মে মালিক (রহঃ) বলেন তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলিয়াছেন,
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ
আমি তোমাদের নিকট দুইটি বস্তু ছাড়িয়া যাইতেছি। তোমরা যতক্ষণ উহাকে ধরিয়া থাকিবে পথভ্রষ্ট হইবে না। উহা হইল আল্লাহর কিতাব ও নবির সুন্নাত। মুয়াত্তা মালিক : ১৬৬১ ইফাঃ
আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
تَرَكْتُ فيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُما كِتابَ الله وسُنَّتي وَلَنْ يَتَفَرَّقا حَتَّى يَرِدا عَلَيَّ الحَوْضَ
আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা অবলম্বন করলে তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। ’হওয’ (কাওসারে) আমার নিকট অবতরণ না করা পর্যন্ত তা বিচ্ছিন্ন হবে না। হাদিস সম্ভার : ১৫০০, হাকেম : ৩১৯
(২) মহান আল্লাহর ভালবাসা ও ক্ষমা পেতে সুন্নাহ অনুসরণ-
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ
قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সুরা আল ইমরান : ৩১
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমরা ইয়াহূদীদের নিকট তাদের অনেক ধর্মীয় কথাবার্তা শুনে থাকি। এসব আমাদের কাছে অনেক ভালো মনে হয়। এসব কথার কিছু কি লিখে রাখার জন্য আমাদেরকে অনুমতি দিবেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ইয়াহুদী ও নাসারাগণ যেভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তোমরাও কি (তোমাদের দীনের ব্যাপারে) এভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছ? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কাছে একটি অতি উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ দীন নিয়ে এসেছি। মূসা (আঃ)-ও যদি আজ দুনিয়ায় বেঁচে থাকতেন, আমার অনুসরণ ব্যতীত তাঁর পক্ষেও অন্য কোন উপায় ছিল না। মিশকাত : ১৭৭, আহমাদ : ১৪৭৩৬, বায়হাক্বী : ১৭৭।
(৩) আল্লাহর রসূল ﷺ এর সুন্নাহ বিরোধী কাজ কর গোমরাহী-
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ
وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا
যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সূরা আহযাব : ৩৬
(৪) আল্লাহর রসূল ﷺ এর সুন্নাহ বিমুখ কাফির হয়ে যাবে
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ
قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡكَـٰفِرِينَ
অর্থঃ বলুন, আল্লাহ আনুগত্য প্রকাশ কর এবং তাঁর রসূলদের আনুগত্য প্রকাশ কর। বস্তত, তারা যদি বিমুখতা অবলম্ভন করে, তা হলে আল্লাহ কাফিরদের ভালোবাসবেন না। সূরা আল ইমরান : ৩২
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও এরশাদ করেনঃ
وَيَقُولُونَ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلرَّسُولِ وَأَطَعۡنَا ثُمَّ يَتَوَلَّىٰ فَرِيقٌ۬ مِّنۡہُم مِّنۢ بَعۡدِ ذَٲلِكَۚ وَمَآ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ
অর্থঃ তারা বলে, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করেছি কিন্তু এরপর তাদের মধ্য থেকে একটি দল মুখ ফিরিয়ে নেয়৷ এ ধরনের লোকেরা কখনোই মুমিন নয়। সূরা নুর : ৪৭
(৫) সুন্নাহর অনুসরণই একমাত্র মুক্তির পথ-
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ
আল্লাহর ও রাসূলের হুকুম মান্য কর, যাতে তোমরা কৃপা প্রাপ্ত হতে পার”। আলে ইমরান : ১৩২
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّتِي”
আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি এগুলো আঁকড়ে ধরো, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। মুসনাদ আহমদ: ৮৮৪৫, সুনান দারিমি
(৬) রসূল ﷺ এর সুন্নাহ বিরোধীতাকারি জাহান্নামি-
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ
وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا
আর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ। সুরা নূর : ৫২
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে। সহিহ বুখারি : ৭২০৮
(৭) রাসূল ﷺ তথা সুন্নাহই হলো মুমিন জীবনের একমাত্র আদর্শ।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗ
অর্থঃ তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে”। সূরা আনফাল : ২৪
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ যখন ভাষণ দিতেন তখন তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করত, কণ্ঠস্বর জোরালো হ’ত এবং তার রাগ বেড়ে যেত, এমনকি মনে হ’ত, তিনি যেন শত্রুবাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করছেন আর বলছেনঃ তোমরা ভোরেই আক্রান্ত হবে, তোমরা সন্ধ্যায়ই আক্রান্ত হবে। তিনি ﷺ আরো বলতেন, আমি ও কিয়ামত এ দুটির ন্যায় (স্বল্প ব্যবধান) প্রেরিত হয়েছি, তিনি মধ্যম ও তর্জনী আঙ্গুল মিলিয়ে দেখাতেন।
তিনি ﷺ আরো বলতেন, অতঃপর উত্তম বাণী হ’ল- আল্লাহর কিতাব এবং উত্তম পথ হ’ল মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রদর্শিত পথ। অতীব নিকৃষ্ট বিষয় হ’ল নতুন উদ্ভাবন। প্রতিটি বিদ’আদ ভ্রষ্ট। তিনি আরো বলতেন, আমি প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তির জন্য তার নিজের থেকে অধিক উত্তম (কল্যাণকামী)। কোন ব্যক্তি সম্পদ রেখে গেলে তা তার পরিবার-পরিজনের প্রাপ্য। আর কোন ব্যক্তি ঋণ অথবা অসহায় সন্তান রেখে গেলে সেগুলোর দায়িত্ব আমার। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে নাসায়ী : ১৫৭৮, ১৯৬২; সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪০
(৮) রাসূল ﷺ এর আনিত দ্বীন তথা সুন্নাহর আনুগত্য করা ফরজঃ
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ
وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ
তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক তবে তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর”। সূরা আনফাল : ১
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ
يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ وَلَا تَوَلَّوۡاْ عَنۡهُ وَأَنتُمۡ تَسۡمَعُونَ
অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং হুকুম শোনার পর তা অমান্য করো না৷ সুরা আনফাল : ২০
(৯) রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ ছাড়া কোন আমলই কবুল হবে না-
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
وَمَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ
আর কেউ ইসলাম (রাসূল ﷺ আনিত দ্বীন) ছাড়া অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে, তা কখনো কবূল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ
কেউ আমাদের এ শরীয়াতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮)
ইবরাহীম ইবনু তাইমী (রহঃ) এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রা.) আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব ও এই সাহীফায় যা আছে, তা ছাড়া অন্য কোন কিতাব নেই, যা আমরা পাঠ করে থাকি। তিনি বলেন, এ সাহীফায় রয়েছে, যখমসমূহের দন্ড বিধান, উটের বয়সের বিবরণ এবং আইর পর্বত থেকে সত্তার পর্যন্ত মদিনা হারাম হওয়ার বিধান। যে ব্যাক্তি এর মধ্যে (সুন্নাত বিরোধী) বিদআত উদ্ভাবন করে কিংবা বিদআতীকে আশ্রয় দেয়, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সকল মানুষের লানত। আল্লাহ তাঁর কোন নফল ও ফরয ইবাদত কবূল করেন না। আর যে নিজ প্রভু ব্যতীত অন্যকে প্রভু রূপে গ্রহণ করে, তার উপর অনুরূপ লানত। আর নিরাপত্তা দানে সর্বস্তরের মুসলিমগণ একই স্তরের এবং যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের চুক্তি ভঙ্গ করে তার উপরও অনুরূপ লা’নত। সহিহ বুখারি : ৩১৭২
খ) সাহাবীদের সম্মান ও অনুসরণ-
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
ؕ رَضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡہُ ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য। সুরা মায়েদা : ১১৯
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنَ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং যুদ্ধ করেছে তারা সমান নয়। তারা মর্যাদায় তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যারা পরে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ প্রত্যেকের জন্যই কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবগত। সুরা হাদিদ : ১০
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
وَالسّٰبِقُوۡنَ الۡاَوَّلُوۡنَ مِنَ الۡمُہٰجِرِیۡنَ وَالۡاَنۡصَارِ وَالَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُمۡ بِاِحۡسَانٍ ۙ رَّضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَرَضُوۡا عَنۡہُ وَاَعَدَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ تَحۡتَہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ
আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা তাদেরকে অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য। সুরা তওবা : ১০০
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
وَلٰکِنَّ اللّٰہَ حَبَّبَ اِلَیۡکُمُ الۡاِیۡمَانَ وَزَیَّنَہٗ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ وَکَرَّہَ اِلَیۡکُمُ الۡکُفۡرَ وَالۡفُسُوۡقَ وَالۡعِصۡیَانَ ؕ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الرّٰشِدُوۡنَ ۙ
কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের অন্তরে সুশোভিত করেছেন। আর তোমাদের কাছে কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। তারাই তো সত্য পথপ্রাপ্ত। সুরা হুজুরাত : ৭
আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَا تَسُبُّوْا أَصْحَابِيْ فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيْفَهُ تَابَعَهُ جَرِيْرٌ وَعَبْدُ اللهِ بْنُ دَاوُدَ وَأَبُوْ مُعَاوِيَةَ وَمُحَاضِرٌ عَنْ الأَعْمَشِ
তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ কর না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ-এর সমপরিমাণ সওয়াব হবে না। জারীর ‘আবদুল্লাহ ইবনু দাউদ, আবূ মু‘আবিয়াহ ও মুহাযির (রহ.) আ‘মাশ (রহ.) হতে হাদীস বর্ণনায় শুবা (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৭৩, সহিহ মুসলিম : ২৫৪০, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৬১
আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
آيَةُ الإِيْمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الأَنْصَارِ.
ঈমানের আলামত হল আনসারকে ভালবাসা এবং মুনাফিকীর চিহ্ন হল আনসারের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা। সহিহ বুখারি : ১৭, ৩৭৮৪, সহিহ মুসলিম : ৭৪
গ) তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িদের অনুসরণ-
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِيْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ يَجِيءُ قَوْمٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِيْنَهُ وَيَمِيْنُهُ شَهَادَتَهُ
আমার উম্মাতের সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ (সাহাবীগণ)। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর এমন লোকদের আগমন হবে যাদের কেউ সাক্ষ্য দানের পূর্বে কসম এবং কসমের পূর্বে সাক্ষ্য দান করবে। সহিহ বুখারি : ২৬৫২, ৩৬৫১, সহিহ মুসলিম : ২৫৩৩
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী ﷺ বলেছেন-
خَيْرُ الشُّهَدَاءِ الَّذِي يَأْتِي بِشَهَادَتِهِ قَبْلَ أَنْ يُسْأَلَهَا . هُوَ عِنْدَنَا إِذَا أُشْهِدَ الرَّجُلُ عَلَى الشَّىْءِ أَنْ يُؤَدِّيَ شَهَادَتَهُ
আমার যুগ হচ্ছে সর্বোত্তম যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ। তারপর এরূপভাবে মিথ্যার প্রসার ঘটবে যে, কারো নিকট সাক্ষ্য তলব না করা হলেও সে সাক্ষ্য দিবে, শপথ করতে বলা না হলেও শপথ করবে”। সুনানে তিরমিজি : ২৩০৩
ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম যুগ হল আমার সাহাবিদের যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী (তাবেয়িদের) যুগ। ইমরান বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর যুগের পর উত্তম যুগ হিসাবে দুই যুগ উল্লেখ করেছেন, না তিন যুগ তা আমার জানা (স্মরণ) নেই।’ অতঃপর তোমাদের পর এমন এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে, যারা সাক্ষ্য দেবে অথচ তাদেরকে সাক্ষী মানা হবে না। তারা খেয়ানত করবে এবং তাদের নিকট আমানত রাখা যাবে না। তারা আল্লাহর নামে মানত করবে কিন্তু তা পুরা করবে না। আর তাদের দেহে স্থূলত্ব প্রকাশ পাবে। সহিহ বুখারি : ২৬৫১, ৩৬৫০, ৬৪২৮, ৬৬৯৫, মুসলিম : ২৫৩৫, সুনানে তিরমিজি : ২২২১, ২২২২, সুনানে নাসায়ি : ৩৮০৯, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৫৭
এই সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকেএকটি আসার-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: “مَنْ كَانَ مُسْتَنًّا فَلْيَسْتَنَّ بِمَنْ قَدْ مَاتَ، فَإِنَّ الْحَيَّ لَا تُؤْمَنُ عَلَيْهِ الْفِتْنَةُ، أُوْلَئِكَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ.”
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কারো অনুসরণ করতে চায়, সে যেন তাদের অনুসরণ করে, যারা মৃত্যুবরণ করেছে। কারণ জীবিত ব্যক্তি ফিতনার আশঙ্কা থেকে মুক্ত নয়। তারা হলেন সাহাবি, তারপর তাদের পরবর্তী প্রজন্ম (তাবেয়ি)। মুসনাদ আহমদ : ৩৭৯, মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ৩৮৫৪৬
এই সম্পর্কে একটি আসার-
قَالَ ابْنُ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ: “نَحْنُ نُحِبُّ مَنْ يَلِيْنَا.”
ইবনে উমর (রাঃ) বলেন: “আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে (তাবেয়ি) ভালোবাসি। মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক : ২০৭৭
এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে তাবেয়িরা ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ফজিলতপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। তারা সাহাবিদের অনুসরণ করে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে তাদের পথ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সাহাবি তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী এই তিন যুগ কম-বেশী ২২০ হিজরি পর্যন্ত ধরা হয়। অর্থাৎ তাবে-তাবেয়ীগন যত দিন বেচে ছিলেন ঠিক তত দিনই তাদের যুগ ছিল। এ হিসাবে তাদের যুগ কম বেশী ২২০ হিজরী পর্যান্ত স্থায়ী ছিল। এই তিন যুগের মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও কর্ম পদ্ধতি সঠিক ছিল। তাই এই তিন যুগে যে সকল আমলের দলীল প্রমান পাওয়া যায়, সেগুলোকে বিদআত বলা যাবে না। আর গবেষণা করে এর কথার সত্যতা পাওয়া গিয়েছে যে এই তিন প্রজম্মের আলেমগন সঠিক দিনের উপর ছিলেন।
কাজেই যখন দেখবেন যে, আমলটি ২২০ হিজরীর পর মুসলিমদের মাঝে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে তা নিঃসন্দেহে বিদআত। উদারণ হিসাবে বলা যায়, আমাদের সমাজে প্রচলিত মিলাদ কিয়ামের প্রথা হিজরী ৬০৪ সনে আরবিলার সুলতান মুজাফফরউদ্দীন মওসিল শহরে (ইরাকের পার্শ্ববর্তী একটি শহর) এই মিলাদ নামক ইবাদতে প্রথম প্রচলন করেন। যে সময় ক্রুসেডের মহাসমরে লক্ষ লক্ষ খৃষ্টান সৈন্য সিরিয়া ও জেরুজালেম শহরে আগমণ করে। যিশু খৃষ্টের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আকর্ষণীয় মেলা দেখে সুলতান মুজাফফরের হৃদয়ে রাসূলে কারীম (সাঃ) এর জন্মদিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের প্রেরণা জাগ্রত হয়, অনুগত একজন মৌলভীকে দিয়ে এই মিলাদের আনুষ্ঠানিকতা চালু করা হয়। এমনিভাবে কোন ইবাদাত যদি খাইরুর রুকন বা ২২০ হিজরির পরে প্রচলন হয় তবে আমরা তা বিদআত হিসাবে ধরে নিতে পারি।
ঘ। একটি সতর্কতা: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতিত একক কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না-
আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্যতম বৈশিষ্ট হবে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতিত একক কোন ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না। ইসলাম অহী নির্ভর ধর্ম। অহী আসে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষ থেকে যা মানুষ জাতির নিকট উপস্থাপণ করেছেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনিই একমাত্র অনুকরনী এবং অনুসরণীয়। ইবাদাত কোন পদ্দতিতে হবে তার একমাত্র অনুকরনী মাপকাঠি হল আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। শুধু ইবাদত নয় দুনিয়াবী বিধি বিধানেও তিনি অনুকরনীয়। মুসলীম মানে আত্মসমর্থণকারী। অর্থাৎ আমরা আল্লাহ ও তার রাসূল ও তার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফায়সালার সামনে আত্মসমর্থণকারী। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফায়সালার সামনে মু’মিনের আর কোন স্বাধীনতা থাকে না।
মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন এরশাদ করেনঃ
﴿ وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا
অর্থঃ যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ (সূরা আহযাব : ৩৬
আল্লাহ তায়ালা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে উসওয়াতুন হাসানা বা দ্বীনের মাপকাঠি বানিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে অনেক অনেক সম্মান দান করে বলেন::
لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ۬ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأَخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا (٢١)
অর্থঃ আসলে তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলের মধ্যে ছিল একটি উত্তম আদর্শ এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ ও শেষ দিনের আকাঙ্ক্ষী এবং বেশী করে আল্লাহকে স্মরণ করে৷ (আহজাব ৩৩:২১)।
ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে একক কোন মানুষের তাকলীদ করতে হলে শুধু নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তাকলীদ করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে কেহই ভূলেন উর্ধে নয়। কিন্তু আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন নির্দোষ (গোনাহ থেকে পবিত্র), মনগড়া কোনো কথা বলেননি। তিনি ছাড়া অন্যান্য মানুষ যতই বড় হোন না কেন ভুল করতে পারেন। কেউই ভুল-ত্রুটির উর্দ্ধে নন। এ প্রসঙ্গে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
كُلُّ بَنِى آدمَ خَطَّاءٌ وَ خَيرُ الْخَطًّائِيْنَ التَّوَّابُوْنَ
মানুষ মাত্রই গুনাহগার (অপরাধী)। আর গুনাহগারদের মধ্যে তওবাকারীরাই উত্তম। সুনানে তিরমিজি : ২৪৯৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৫১
ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া কেহই শতভাগ সঠিক নয়। কাজেই কারো তাকলীদে বা অন্ধ অনুসরণ জায়েয নয়।
ইমাম মালেক র. বলেছেন, রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত এমন কোনো ব্যক্তি নেই যার সমস্ত কথা গ্রহণ করা যায়, অথবা পরিত্যাগ করা যায়। উপমহাদেশের অনেক খ্যাতমানা আলেম সাহাবিদের কেও সত্যের মাপকাঠি নির্ধারন করেছেন। তারাদের এই দাবিও সত্য কারন কুরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
*وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ ءَامِنُواْ كَمَآ ءَامَنَ ٱلنَّاسُ*
অর্থঃ আর যখন তাদের বলা হয়েছে , অন্য লোকেরা যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ঈমান আনো। সুরা বাকারা : ১৩
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
فَاِنۡ اٰمَنُوۡا بِمِثۡلِ مَاۤ اٰمَنۡتُمۡ بِہٖ فَقَدِ اہۡتَدَوۡا ۚ
অতএব যদি তারা ঈমান আনে, তোমরা যেরূপে তার প্রতি ঈমান এনেছ, তবে অবশ্যই তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। সুরা বাকারা : ১৩৭
এ দুটি আয়াতে ঈমানের মাপকাঠি সাহেবায়ে কেরামের ঈমানের মাপকাটি হওয়ার কথা বিবৃত হয়েছে।
মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءتْ مَصِيرًا
অর্থঃ যে কেউ রসূলের বিরুদ্ধাচারণ করে, তার কাছে সরল পথ প্রকাশিত হওয়ার পর এবং সব মুসলমানের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, আমি তাকে ঐ দিকেই ফেরাব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। আর তা নিকৃষ্টতর গন্তব্যস্থান। সুরা নিসা : ১১৫
এই সকল আয়াতে সাহেবায়ে কেরামেরদের সত্যের মাপকাঠি হওয়ার কথা বিবৃত হয়েছে। এখানে সকল সাহাবিদের বুঝান হয়েছে। একক কোন সাহাবীকে বলা হয়নি। সাহাবিগণ সজ্ঞানে রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলের বিপরীত আমল করছেন এমন কথা কেউ ভাবতে ও পারেনা। কারন তারা ইমান আমলের দিক দিয়ে উম্মতের মাঝে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল। কিন্তু তাদের না জানার কারনে বা অজ্ঞতার কারনে কোন ভুল করলে বা ভূল সিদ্ধান্ত দিলে এবং সেই সিদ্ধান্ত যদি রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা, কাজ বা আমলের বিপরীন হয় তবে তার পরিত্যজ্য। সাহাবিদের জীবন দসায় এমন অনেক উদাহরণ দেখা যায়। যেমনঃ
(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-
(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-
(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ
(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা
(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।
(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-
প্রথম উদাহরনণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-
عَنْ عِكْرِمَةَ أَنَّ أَهْلَ الْمَدِينَةِ سَأَلُوا ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ امْرَأَةٍ طَافَتْ ثُمَّ حَاضَتْ قَالَ لَهُمْ تَنْفِرُ قَالُوا لاَ نَأْخُذُ بِقَوْلِكَ وَنَدَعُ قَوْلَ زَيْدٍ قَالَ إِذَا قَدِمْتُمْ الْمَدِينَةَ فَسَلُوا فَقَدِمُوا الْمَدِينَةَ فَسَأَلُوا فَكَانَ فِيمَنْ سَأَلُوا أُمُّ سُلَيْمٍ فَذَكَرَتْ حَدِيثَ صَفِيَّةَ رَوَاهُ خَالِدٌ وَقَتَادَةُ عَنْ عِكْرِمَةَ
ইকরিমা (রহ.) হতে বর্ণিত যে, তাওয়াফে যিয়ারাহর পর ঋতু এসেছে এমন মহিলা সম্পর্কে মদিনা্বাসী ইবনু ‘আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তাদের বললেন, সে রওয়ানা হয়ে যাবে। তারা বললেন, আমরা আপনার কথা গ্রহণ করব না এবং জায়েদের কথাও বর্জন করব না। তিনি বললেন, তোমরা মদিনায় ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবে। তাঁরা মদিনায় এসে জিজ্ঞেস করলেন যাঁদের কাছে তাঁরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে সুলাইম (রা.) ও ছিলেন। তিনি তাঁদের উম্মুল মুমিনিন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সহিহ বুখারি : ১৭৫৮
তাঊস (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর সঙ্গে ছিলাম। জায়েদ ইবনু সাবিত (রাঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বললেন, আপনি কি এই ফাতওয়া দিয়েছেন যে, হায়যগ্রস্ত মহিলারা বিদায়ী তাওয়াফ না করেই প্রস্থান করতে পারবে? ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাকে বললেন, যদি আপনি আশ্বস্ত না হতে পারেন, তবে অমুক আনসারী মহিলাকে জিজ্ঞাসা করুন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন? তাঊস বলেন, যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হাসতে হাসতে ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি মনে করি আপনি সত্য কথাই বলেছেন। সহিহ মুসলিম : ১৩২৮
মদিনার অধিবাসীরা ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে জানতে চান, একজন মহিলা তাওয়াফে যিয়ারাহ সম্পন্ন করার পর ঋতুমতী হলে, তার করণীয় কি? তিনি তাদের বলেন, ঐ মহিলা (মক্কা থেকে) রওয়ানা হয়ে যেতে পারবে। এই মতামতের বিপরীত মত জায়দ (রা.) থেকে এসেছিল বিধায় তারা ইবনে আব্বাস (রা.) এর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিধায় পড়ে যান এবং বলেন, আমরা যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর মতামতও বিবেচনায় রাখব। এরপর ঘটনাটি আরো স্পষ্ট করতে, তারা মদিনায় ফিরে উম্মে সুলাইম (রা.) এর কাছ থেকে উম্মুল মুমিনীন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি শুনে নিশ্চিত হন যে তাওয়াফে যিয়ারাহ শেষ করার পর ঋতুমতী হন, তাহলে তার মক্কা ত্যাগে বাধা নেই। কারণ, তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে এবং হজের মূল শর্ত পূরণ হয়েছে। এখানে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কিরামদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলে, দলিল প্রমাণের আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হতো। সাহাবায়ে কিরাম ইজতিহাদ এবং দলিলের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদান করতেন। মতভেদ দেখা দিলে, তারা প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাউস (রহ.) এর বর্ণনায় ও এমনটি দেখা যায় যে, জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বিষয়টি অনুসন্ধান করে ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে এসে হাসতে হাসতে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছিলেন।
নোট : সাহাবিদের (রা.) শিক্ষা হলো দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে যার মতামত অধিক সঠিক তার মতামত গ্রহণ করা। আমরা দলিল প্রমাণের চেয়ে আমাদের আকাবিরদের বেশী গুরুত্ব প্রদান করে থাকি। মনে রাখতে হবে কোন মুজতাহিদ সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞাত নন। যখন হাদিসের সঠিক দলিল প্রমাণ পাওয়া যাবে, তখন আর কারো মতমতা প্রদান করা অধিকার থাকে না।
দ্বিতীয় উদাহরণ-
আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ’উমার ইবনু খাত্তাব সিরিয়ার দিকে রওনা করেছিলেন। শেষে তিনি যখন সারগ এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সৈন্য বাহিনীর প্রধানগণ তথা আবূ ’উবাইদাহ ইবনু জার্রাহ ও তাঁর সঙ্গীগণ সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানালেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের বিস্তার ঘটেছে। ইবনু ’আব্বাস বলেন, তখন ’উমার বলল, আমার নিকট প্রবীণ মুহাজিরদের ডেকে আন। তখন তিনি তাঁদের ডেকে আনলেন। ’উমার তাঁদের সিরিয়ার প্লেগের বিস্তার ঘটার কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন; কাজেই তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেন, বাকী লোক আপনার সঙ্গে রয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিগণ। কাজেই আমরা সঠিক মনে করি না যে, আপনি তাদের এই প্লেগের মধ্যে ঠেলে দিবেন।
উমার (রা.) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে চলে যাও। এরপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম। তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলে তাঁরাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতই মতপার্থক্য করলেন।
উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা উঠে যাও। এরপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশী আছেন, যাঁরা মক্কা জয়ের বছর হিজরত করেছিলেন, তাদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম, তখন তাঁরা পরস্পরে মতভেদ করলেন না। তাঁরা বললেন, আপনার লোকজনকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা এবং তাদের প্লেগের মধ্যে ঠেলে না দেয়াই আমরা ভাল মনে করি। তখন ’উমার লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সাওয়ারীর পিঠে আরোহণ করব (ফিরার জন্য)। অতএব তোমরাও সকালে সওয়ারির পিঠে আরোহণ করবে।
আবূ ’উবাইদাহ (রাঃ) বললেন, আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদির থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন? ’উমার(রাঃ) বললেন, হে আবূ ’উবাইদাহ! যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলত! হাঁ, আমরা আল্লাহর, এক তকদির থেকে আল্লাহর আরেকটি তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত, তোমার কিছু উটকে যদি তুমি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও যেখানে আছে দু’টি মাঠ। তন্মধ্যে একটি হল সবুজ শ্যামল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তাহলে তাও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ(রাঃ) আসলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোন প্রয়োজনের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।
তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা যখন কোন এলাকায় প্লেগের) বিস্তারের কথা শোন, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাক, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ’উমার (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করলেন। সহিহ বুখারি : ৫৭২৯, ৫৭৩০, ৬৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২১৯
মন্তব্যঃ কিয়াস করা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করা, উভয়টাই শরীয়ত সম্মত হলেও মতভেদের সময় দলিল পাওয়া গেলে দলিলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক।
এই দুটি উদাহরণ প্রমাণ করে সকল সাহাবি (রা.) সকল ফিকহি বিষয়ের জ্ঞান সম্পর্কে সমানভাবে জ্ঞাত ছিলেন না। এটা কোন অপরাধ নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। তবে ইমল আসার পর আর ইজতিহাদ করে মতামত প্রদান করা জায়েয নাই। দলিল প্রমাণের পরও মুরুব্বি বা বড়দের দোহাই দিয়ে মতবিরোধ করা যাবে না।
(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-
প্রথম উদাহরণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-
جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ يَقُولُ كُنَّا لاَ نَأْكُلُ مِنْ لُحُومِ بُدْنِنَا فَوْقَ ثَلاَثِ مِنًى فَرَخَّصَ لَنَا النَّبِيُّ فَقَالَ كُلُوا وَتَزَوَّدُوا فَأَكَلْنَا وَتَزَوَّدْنَا قُلْتُ لِعَطَاءٍ أَقَالَ حَتَّى جِئْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لاَ
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আমাদের কুরবানির গোশত মিনায় তিন দিনের বেশি খেতাম না। এরপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অনুমতি দিলেন এবং বললেন, খাও এবং সঞ্চয় করে রাখ। তাই আমরা খেলাম এবং সঞ্চয়ও করলাম। রাবী বলেন, আমি আত্বা (রহ.) কে বললাম, জাবির (রাঃ) কি বলেছেন আমরা মদিনায় আসা পর্যন্ত? তিনি বললেন, না। সহিহ বুখারি : ১৭১৯, ২৯৮০, ৫৪২৪, ৫৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৯৭২, সুনানে নাসায়ী ৪৪২৬, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৫৯২৫, মিশকাত : ২৬৩৯
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে: “জমহূরের মতে, তিন দিনের পরে খাওয়া এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখা বৈধ। আর এ বিষয়ে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞাটি জাবির, বুরায়দাহ্, ইবনু মাসউদ, কাতাদা, নুমানসহ বহু সাহাবি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে মানসুখ হয়ে গেছে। এই মানসুখের বিষয়টি আলী এবং ইবনু উমার (রা.) এর বিষয়টি জানা ছিল না।
হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তার গ্রন্থ ফাতহুল বারী-তে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, সম্ভবত আলী (রাঃ)-এর নিকট মানসূখের বিষয়টি পৌঁছেনি।
ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে সহিহ সনদে বর্ণিত অনেক হাদীস রয়েছে। আর ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এর বিষয়টি হলো তাদের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাড়ের বিষয়টি পৌঁছেনি। তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিষেধ করতে শুনেছিলেন ফলে তারা যা শ্রবণ করেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। লক্ষ করুন, একটি জরুরি দুই জন বিশিষ্ট সাহাবির গোচরি ভূক্তই হয় নাই।
(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ
উদাহরণ-
আল্লাহ রব্বুল আলামি বলেন-
أَسۡكِنُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ سَكَنتُم مِّن وُجۡدِكُمۡ وَلَا تُضَآرُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُواْ عَلَيۡہِنَّۚ وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّۚ
অর্থঃ তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। সূরা তালাক : ৬
আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও জ্ঞানের কথা বলার অবকাশ নেই। অথচ তাঁর মত বিজ্ঞ মানুষের একটি হাদিছটি অজানা ছিল বিধান তিনি এই আয়াতে ব্যাখ্যায় ভুল করে বসেন। তিনি মতামত প্রদান করেন যে, তালাকে বাইন বা একসাথে তিন তালাক প্রাপ্ত মহিলা স্বামীর পক্ষ থেকে খোরপোশ ও আবাসনের পাবে। সহিহ হাদিসে এসেছে-
عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ، أَنَّهُ طَلَّقَهَا زَوْجُهَا فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ أَنْفَقَ عَلَيْهَا نَفَقَةَ دُونٍ فَلَمَّا رَأَتْ ذَلِكَ قَالَتْ وَاللَّهِ لأُعْلِمَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ لِي نَفَقَةٌ أَخَذْتُ الَّذِي يُصْلِحُنِي وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لِي نَفَقَةٌ لَمْ آخُذْ مِنْهُ شَيْئًا قَالَتْ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ “ لاَ نَفَقَةَ لَكِ وَلاَ سُكْنَى
ফাতমিা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তার স্বামী তাকে তালাক (তালাক) দেন। এরপর তার স্বামী তার জন্য (ইদ্দাতকালীন সময়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য) সামান্য পরিমাণ খোরপোশ দিয়েছিলেন। তিনি তা দেখে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই এ বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোচরে আনব। যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য হয় তবে তা আমি এ পরিমাণ উসুল করব যাতে সুচারুভাবে আমার প্রয়োজন পূরণ হয়। আর যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য না-ই হয় তাহলে আমি তার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করব না। তিনি বলেন, এবার আমি বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উত্থাপন করলাম। তিনি আমাকে বললেন, তোমার জন্য কোন খোরপোশ নেই, বাসস্থানও নেই। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০
এই হাদিস উল্লেখ করার পরও আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ফাতিমা বিনতু কায়স হয়ত (রা.) ভুলে গেছেন। এই সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তাঁর হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মহিলার কথার উপর ভিত্তি করে আমরা কি আমাদের প্রতিপালকের কথা পরিত্যাগ করব, অথচ আমরা জানি না যে, তার মনে আছে নাকি ভুলে গেছে? অর্থাৎ আমীরুল মুমিনিন উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এই দলিলের প্রতি আস্থাশীল হতে পারেননি।
এরূপ ঘটনা শুধু উমর (রা.) নয়, অন্যান্য সাহাবিগণ এবং তাবেয়িন-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তাই তো দেখা যায় বিদ্বানগণের এক জন এক হাদিসকে সহিহ মনে করে দলিল দিচ্ছেন অপর জন যঈফ মনে করে তা পরিত্যাগ করছেন। ফলে উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু দৃষ্টিতে যেটি শক্তিশালী মনে হয়েছে সেটিকেই তিনি গ্রহণ করেছেন। এমনকি তাদের পরেও হাদিস সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মাঝেও এমন মতভেদ দেখা যায়। সনদ বিচারে একজন সহিহ বলেছেন তো আরেক জন যঈফ বলেছেন। কাজেই এক্ষেত্রে আমরা মহান সহাবিগণ (রা.) এর অনুসরণ করব। যে মতটি অধিক সঠিক বা সত্যের কাছাকাছি সে মতটিই গ্রহণ করতে হবে।
(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা
ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধ হতে ফিরে পথে আমাদেরকে বললেন, বনূ কুরাইযাহ এলাকায় পৌঁছার পূর্বে কেউ যেন ‘আসর সালাত আদায় না করে। কিন্তু অনেকের রাস্তাতেই আসরের সময় হয়ে গেল, তখন তাদের কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে না পৌঁছে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা সালাত আদায় করে নেব, আমাদের নিষেধ করার এ উদ্দেশ্য ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল তাড়াতাড়ি যাওয়া। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এ কথা উল্লেখ করা হলে, তিনি তাঁদের কারোর ব্যাপারে কড়াকড়ি করেননি। সহিহ বুখারি : ৯৪৬, ৪১১৯
এই হাদিসের মূল কথা হলো- খন্দকের যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরে এলেন এবং যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম রাখলেন। তখন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন আমরা এখন অস্ত্র রাখিনি। অতএব আপনি চুক্তি ভঙ্গকারি বিশ্বাসঘাতক ইয়াহুদি সম্প্রদায় “বনি কুরায়জা’র উদ্দেশ্যে বের হন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের একটি দলকে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা “বনি কুরায়জা’র মহল্লায় না পৌঁছে কেউ আসর পড়বেনা”। পথে আসরের ওয়াক্ত হলে একদল হাদিসের শাব্দিক নির্দেশ অনুযায়ী বললো, আমরা সেখানে পৌঁছার পূর্বে সালাত আদায় করবো না। অন্যদল বললো, তাঁর (সা) ইচ্ছা এটা নয় অর্থাৎ উক্ত আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাড়াতাড়ি ঐ গোত্রে পৌঁছা, নামাজ না পড়া নয়, অতএব পথে সালাত পড়ে নাও। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে উভয় দলের ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি দুটোকেই অনুমোদন করেন। সাহাবিগন নিজ কানে সরাসরি শুনে ও মর্ম বুঝতে ভুল করলেন। এক এক দল এক এক ধরনের বুঝলেন এবং আমল ও করলেন ভিন্ন ভিন্ন অথচ উভয় দলই সঠিক ছিল। এটাই মতভেদ মতবিরোধ নয়। আজ কাল আমরা যা করছি তা মতবিরোধ, মতভেদ নয়।
(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।
আবদুর রহমান ইবনু আবযা (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’উমার (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, আমরা কোন (পানিবিহীন) জায়গায় এক-দুই মাস অবস্থান করে থাকি (সেখানে অপবিত্র হলে করণীয় কি?)। ’উমার (রাঃ) বললেন, আমি তো পানি না পাওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করব না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ’আম্মার (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আপনার কি ঐ ঘটনার কথা মনে নেই, যখন আমি ও আপনি উটের পালে ছিলাম। আমরা জুনুবি হয়ে গেলাম এবং আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিলাম।
আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন তোমাদের জন্য শুধু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল- এই বলে তিনি মাটিতে উভয় হাত মেরে হাতে ফুঁ দিলেন। তারপর হাত দিয়ে মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের অর্ধেক পর্যন্ত মুছলেন। ’উমার (রাঃ) বললেন, হে ’আম্মার! আল্লাহকে ভয় কর। তিনি বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আল্লাহর শপথ! আপনি চাইলে আমি আর কখনো তা বর্ণনা করব না। ’উমার (রা.) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার উদ্দেশ্য এরূপ নয়, বরং তুমি চাইলে অবশ্যই তোমার বক্তব্যের স্বাধীনতা তোমাকে দিব। সুনানে আবু দাউদ : ৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৬৯, সুনানে নাসায়ি : ৩১৮
মুনাফিক সাহাবী ব্যতিত সকল সাহাবীই হকের উপর ছিল। মহান আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের কোন প্রকার সমালোচনা করা হারাম। তাদের ইজমা বা ঐক্যমত আমাদের জন্য দলীল। সকল সাহাবি এককভাবেও আমাদের দলীল কিন্তু তাদের কোন আমল সুন্নাহর বিপরীত হলে (না জানার কারনে বা ভুলের কারনে) আমাদের নিকট দলীল নয়। তাই একক কোন সাহাবীর আমলকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা ঠিক নয় কারন উপরের কিছু হাদিসে দেখেছি তারা কোন কোন হাদিস জানতেন না বা জানার পরে আমল পরিবর্তন হয়েছিল, যা তিনি জানতেন না। তবে তাদের বড় বৈশিষ্ট্য হল তারা হাদিসের প্রমান পেলে নিজ মতামত ত্যাগ করছেন। তাই আমাদেরও উচিত এককভাবে শুধুই রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ আর দলগত ভাবে সাহাবীদের ইজমা বা ঐক্যমতের অনুসরণ করা। তাই কোন একজন মুজতাহীদ আলেমকে অন্ধভাবে অনুসরণ করলে হক বা সত্য খুজে পাওয়া যাবে না। তাই সত্য বা হক পন্থীদলের অন্যতম বৈশিষ্ট তারা একক কোর ব্যক্তি বা মুজতাহীদ আলেমের তাকলীদ বা আন্ধ অনুসরণ করেণা।
ঙ) শর্তসাপেক্ষে আমির বা উলুল আমরদের অনুসরণ-
কুনআন সুন্নাহ মানদণ্ডে পরীক্ষতি আমিরের আনুগত্য ফরজ। কুনআন সুন্নাহ অনুসারী নতা বা আমিরকে আনুগত্য না করে, নতুন আমিরে তৈরি করে ইসলামকে টুকরা টুকরা করে দলে উপদলে ভাগ করা ইসলামি শরীয়ত হারাম। কুরআন সুন্নার বহু স্থানে আমিরের আনুগত্য বা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً
অর্থ : হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের (আমির, বিচারক, শাসক)। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-
مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شِبْرًا فَمَاتَ عَلَيْهِ إِلاَّ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً
যে ব্যক্তি তার আমীরের কোন কার্যকলাপ অপছন্দ করে, তার উচিত ধৈর্যধারণ করা। কেননা যে কোন ব্যক্তিই শাসকের থেকে (আনুগত্য থেকে) বেরিয়ে গিয়ে বিঘত পরিমাণ সরে যাবে এবং তারপর এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৪৯
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
وَبِهَذَا الْإِسْنَادِ مَنْ أَطَاعَنِيْ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ عَصَى اللهَ وَمَنْ يُطِعْ الأَمِيْرَ فَقَدْ أَطَاعَنِيْ وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيْرَ فَقَدْ عَصَانِيْ وَإِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللهِ وَعَدَلَ فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا وَإِنْ قَالَ بِغَيْرِهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ مِنْهُ
যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানি করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই নাফরমানি করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আমারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানি করল সে ব্যক্তি আমারই নাফরমানি করল। ইমাম তো ঢাল স্বরূপ। তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধ এবং তাঁরই মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জন করা হয়। অতঃপর যদি সে আল্লাহর তাকওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে, তবে তার জন্য এর পুরস্কার রয়েছে আর যদি সে এর বিপরীত করে তবে এর মন্দ পরিণাম তার উপরই বর্তাবে। সহিহ বুখারি : ২৯৫৭, ৭১৩৭, সহিহ মুসলিম : ১৮৩৫, মিশকাত : ৩৬৬১, সহিহ আল জামি : ৬০৪৪
নাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) আবদুল্লাহ ইবনু মুতী (রা.) এর নিকট এলেন তখন হাররা (হৃদয় বিদারক) এর ঘটনা ঘটেছে এবং যুগটা ছিল ইয়াযীদ ইবনু মুয়াবিয়ার যুগ। তখন তিনি (ইবনু মুতী’) বললেন, আবূ আবদুর রহমানের জন্য বিছানা পেতে দাও। তখন তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে বসতে আসিনি, এসেছি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যে হাদীস শুনেছি তা তোমাকে শুনাতে। আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি (আমীরের) আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে তার কোন দলিল থাকবে না। আর যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলো আর তার ঘাড়ে আনুগত্যের কোন চুক্তি নেই তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৫১
উপরের কুরআন ও হাদিসের আলোকে দেখতে পেলাম মতবিরোধ থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমিরের আনুগত্য করতে হবে। আমিরের আনুগত্য মেনে চললে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে শান্তির পথে আগানো সম্ভব। ইসলাম নেতৃত্ব মানার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম আমিরের অনুসরণ বা আনুগত্যের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে। কিন্তু একটি কথা সব সময় লক্ষ রাখতে হবে আমিরের আনুগত্য শর্ত সাপেক্ষ। তাকে অনুসরণের মাপকাঠিও কুরআন সুন্নায় বিস্তারিত বলেছেন। কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থানকারী নেতার আনুগত্য প্রকাশ অপরিহার্য ঘোষণা করেছে। সে সকল আমির আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে তাদের কোন আনুগত্য নাই। যে আয়াতে মহান আল্লাহ আমিরের আনুগত্য করার কথা বলেছেন, সে আয়াতেই সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً
অর্থঃ অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯
এ আয়াতে উলুল আমর বা আমিরের আনুগত্য শর্ত হলো তাদের মাঝে কোন বিষয় মতবিরোধ হলে কুরআন সুন্নাহর আলোকে সমাধা করতে হবে। কোনো অবস্থায়ই তারা কুরআ সুন্নাহর বাহিরে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বস্তুকে হারাম করার ক্ষেত্রে আনুগত্য করা যাবে না। কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তাদের আনুগত্য করল তারা মূলত আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ দাড় করার মত হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
অর্থ: তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছেন৷ এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও৷ অথচ তাদের মাবুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগি কারার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মাবুদ যিনি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন আর কেউ নেই৷ তারা যে-সব মুশরিক কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র৷ সুরা তওবা : ৩১
বোঝা গেল, শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমাণ ছাড়াই আমিরের হালাল বা হারাম সিদ্ধান্তকে অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত। উপরের আয়াত সম্পর্কে একটি হাদিস-
আদী ইবনু হাতিম (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এলাম। তিনি বললেন, হে ’আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাকে সূরা তওবার নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম-
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
অনুবাদ) “তারা আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসারবিরাগীগণকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। সূরা তওবা-৩১
তারপর তিনি বললেন, তারা অবশ্য তাদের পূজা করত না। তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলত তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলত তখন নিজেদের জন্য উহাকে হারাম বলে মেনে নিত। সুনানে তিরমিজ : ৩০৯৫
তাফসিরে ইবনে কাসির লিখেন-
আদী ইবনে হাতেম নবি (সা) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিল খ্রিষ্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি নবি (সা) কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের এ আয়াতটিতে (সুরা তওবা- ৯:৩১) আমাদের বিরুদ্ধে উলামা ও দরবেশদেরকে খোদা বানিয়ে নেবার যে দোষারোপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কি৷ জবাবে তিনি বলেন, তারা যেগুলোকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়৷ জবাবে আদী বলেন, হ্যাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্য এমনটি করতাম। রসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ব্যাস, এটিই তো হচ্ছে তোমাদের প্রভু বানিয়ে নেয়া। সুরা তাওবার ৩১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, ইবনে কাসির
আমিরের আনুগত্য শুধু মাত্র হকের উপর-
আলী (ইবনু আবূ তালিব) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং আনসারদের এক ব্যক্তিকে তার সেনাপতি নিযুক্ত করে তিনি তাদেরকে তাঁর (সেনাপতির) আনুগত্য করার নির্দেশ দেন। (কোন কারণে) আমির রাগান্বিত হয়ে যান। তিনি বললেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করতে নির্দেশ দেননি? তাঁরা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা কিছু কাঠ সংগ্রহ করে আনো। তাঁরা কাঠ সংগ্রহ করলেন। তিনি বললেন, এগুলোতে আগুন লাগিয়ে দাও। তাঁরা ওতে আগুন লাগালেন। তখন তিনি বললেন, এবার তোমরা সকলে এ আগুনে প্রবেশ কর। তারা আগুনে প্রবেশ করতে সংকল্প করে ফেললেন। কিন্তু তাদের কয়েকজন অন্যদের বাধা দিয়ে বলতে লাগলেন, আগুন থেকেই তো আমরা পালিয়ে গিয়ে নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এভাবে ইতস্তত করতে করতে আগুন নিভে গেল এবং তার ক্রোধও ঠান্ডা হল। এরপর এ সংবাদ নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, যদি তারা আগুনে ঝাঁপ দিত তা হলে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আর এ আগুন থেকে বের হতে পারত না। আনুগত্য (করতে হবে) কেবল সৎ কাজের। সহিহ বুখারি ৪৩৪০, ৭১৪৫, ৭২৫৭
পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই-
পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি নেতা বা কারো আনুগত্য করতে পারবে না। যাদের আনুগত্য করা ইসলামে জরুরি পাপের কাজে তাদেরও আনুগত্য করতে কেউ বাধ্য নয়। যেমনভাবে মহান আল্লাহ বলেন,
وَتَعَاوَنُواْ عَلَى الْبرِّ وَالتَّقْوَى وَلاَ تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
অর্থ : সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। সুরা মায়েদা : ২
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِالْمَعْصِيَةِ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ
পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না। সহিহ বুখারি : ২৯৫৫, ৭১৪৪)
আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوف
নাফরমানির ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু সৎকর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সহিহ মুসলিম : ১৮৪০, আবূ দাঊদ : ২৬২৫, নাসায়ী : ৪২০৫, মিশকাত : ৩৬৬৫, আহমাদ : ৭২৪।
এই আলোচনা দ্বারা দুটি বিষয় বোঝ যায়-
(১) কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক শরীয়ত সম্মত আমিরের আদেশ মান্য করা ফরজ। এ সকল বিষয় মতবিরোধ করা হারাম। এ মতবিরোধ থেকেই নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
(২) অপর পক্ষে শর্থহীভাবে আমিরের অনুসরণ করে, তার সীমা লঙ্ঘনকে সহায়তা করে দলে দলে বিভক্ত হচ্ছি। আমিরের ভ্রান্ত নীতির ফলে সত্যপন্থীরা তার থেকে দূরে চলে যায় এবং নতুন করে ফির্কার সৃষ্ট হয়।