Category Archives: তাওহীদ

তাওহীদের ফজিলত

তাওহীদের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. তাওহীদের স্বীকৃতি দিলেই জান্নাত হবে :

উসমান (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»

যে ব্যক্তি (খাঁটি মনে) এ বিশ্বাস নিয়ে মারা যাবে যে, ’’আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই’’ সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে। সহিহ মুসলিম : ২৬, মিশকাত : ৩৬. শুয়াবুল ঈমান : ৯৪

আনাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবি ﷺ বলেছেন-

‏”‏ يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ ‏”‏‏.‏

অর্থ : যে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে এবং যে ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী (ঈমান) থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। সহিহ বুখারি : ৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৯৩, আহমাদ : ১২১৫৪

জাবির (রা.) বলেন, যে এক ব্যক্তি নবি ﷺ এর সামনে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল- ইয়া রাসুলুল্লাহ! ওয়াজিবকারী (অবশ্যম্ভাবী) দুটি বিষয় কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক না করে যে ব্যক্তি মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছু শারীক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে যাবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩, মিশকাত : ৩৭, আহমাদ : ২৫২০০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ১৩২৯৬।

উবাদাহ (রা.) সূত্রে নবি ﷺ বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই আর মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর বান্দা ও রাসুল আর নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল এবং তাঁর সেই কালিমা যা তিনি মারইয়ামকে পৌঁছিয়েছেন এবং তাঁর নিকট হতে একটি রূহ মাত্র, আর জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, তার আমল যাই হোক না কেন। জুনাদাহ (রহ.) হতে বর্ণিত হাদিসে জুনাদাহ অতিরিক্ত বলেছেন যে, জান্নাতে আট দরজার যেখান দিয়েই সে চাইবে। সহিহ বুখারি : ৩৪৩৫, সহিহ মুসলিম :  ২৮, আহমাদ : ২২৭৩৮, সহিহ ইবনে হিব্বান ২০৭, সহিহ আল জাম : ৬৩২০, সহিহ আত তারগিব : ১৫২১

আবু যার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবি ﷺ এর নিকট আসলাম। তাঁর পরনে তখন সাদা পোশাক ছিল। তখন তিনি ছিল নিদ্রিত। কিছুক্ষণ পর আবার এলাম, তখন তিনি জেগে গেছেন। তিনি বললেন, যে কোন বান্দা ’লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং এ অবস্থার উপরে মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে যদি জিনা করে, সে যদি চুরি করে? তিনি বললেন, যদি সে জিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে যদি জিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, সে যদি জিনা করে, সে যদি চুরি করে তবুও। আমি বললাম, যদি সে জিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও? তিনি বললেন যদি সে জিনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও। আবু যারের নাক ধূলি ধুসরিত হলেও। আবু যার যখনই এ হাদিস বর্ণনা করতেন তখন আবু যারের নাসিকা ধুলাচ্ছন্ন হলেও বাক্যটি বলতেন। আবু ’আবদুল্লাহ ইমাম বুখারি) বলেন, এ কথা প্রযোজ্য হয় মৃত্যুর সময় বা তার পূর্বে যখন সে তওবা করে ও লজ্জিত হয় এবং বলে ’লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’, তখন তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। সহিহ বুখারি : ৫৮২৭, মুসলিম ৯৪, মিশকাত : ২৫, আহমাদ ২১৪৬৬, সহিহ আল জামি ৫৭৩৩।

আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ وَقُلْتُ أَنَا مَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ

যে আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা অবস্থায় মারা যায়, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, যে আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুর শির্ক না করা অবস্থায় মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ বুখারি : ১২৩৮, ৪৪৯৭, ৬৬৮৩

আবু যার গিফারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন-

أَتَانِي آتٍ مِنْ رَبِّي فَأَخْبَرَنِي أَوْ قَالَ بَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِي لاَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ قَالَ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ

অর্থ : একজন আগন্তুক [জিবরীল (আ.)] আমার প্রতিপালকের নিকট হতে এসে আমাকে খবর দিলেন অথবা তিনি বলেছেন, আমাকে সুসংবাদ দিলেন, আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর  সঙ্গে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, যদিও সে জিনা করে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে? তিনি বললেন : যদিও সে জিনা করে থাকে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে। সহিহ বুখারি : ১২৩৭, ১৪০৮, ২৩৮৮, ৩২২২, ৫৮২৭, ৬২৬৮, ৬৪৪৩ ৬৪৪৪, ৭৪৮৭, সহিহ মুসলিম : ৯৪, আহমাদ : ২১৪৭১

আবু হুরায়রাহ (রা.) বলেন, একদা আমরা (সাহাবাগণ) রাসুলুল্লাহ ﷺ কে ঘিরে বসেছিলাম। আমাদের জামা’আতে আবু বকর এবং উমর (রা.) ও ছিল। এ সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝ থেকে উঠে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ অতিক্রান্তের পর আমরা শঙ্কিত হলাম যে, তিনি কোথাও কোন বিপদের সম্মুখীন কিনা। তাই আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আর আমি সর্বপ্রথম বিচলিত হলাম। তাই আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর খোঁজে বের হয়ে পড়লাম। আমি বানু নাজ্জারের জনৈক আনসারীর বাগানের নিকট এসে উপনীত হলাম। আর বাগানের অভ্যন্তরে প্রবেশের কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায় কিনা সেজন্য চারদিকে ঘুরলাম। কিন্তু পেলাম না। হঠাৎ দেখতে পেলাম বাইরের একটি কুয়া থেকে একটি নালা বাগানের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। সংকীর্ণ নালাকে জাদওয়াল’ বলা হয়। অতঃপর আমি নিজেকে শেয়ালের ন্যায় সংকুচিত করে নর্দমার মধ্য দিয়ে গিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট উপনীত হলাম।

তিনি বললেন, আবু হুরায়রা নাকি? আমি বললাম, জী-হ্যাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার? আমি বললাম, আপনি আমাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ উঠে চলে আসলেন, আর দীর্ঘক্ষণ পরও ফিরে না যাওয়ায় আমরা বিচলিত হয়ে পড়েছি। আমাদের অনুপস্থিতিতে কোথাও বিপদের সম্মুখীন হলেন কিনা আমাদের এ আশঙ্কা হল। আর আমি সর্বপ্রথম বিচলিত হয়ে পড়ি। আমি এ দেয়ালের কাছে এসে শেয়ালের ন্যায় সংকুচিত হয়ে নালার ভিতর দিয়ে এখানে উপস্থিত হলাম। অন্যান্যরা আমার পেছনে আছেন। তিনি তার জুতা জোড়া আমাকে দিয়ে বললেন, হে আবু হুরায়রা! আমার জুতা জোড়া সাথে নিয়ে যাও। এ বাগানের বাইরে যার সাথেই তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে বলো, “যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”

বর্ণনাকারী আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, সর্বপ্রথম উমর (রা.) এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে বললেন, হে আবু হুরায়রা! জুতা জোড়া কার? আমি বললাম, আল্লাহর রাসুলের। তিনি আমাকে এ জুতা জোড়াসহ এই বলে পাঠিয়েছেন যে, “যে ব্যক্তি প্রশান্ত মনে এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, তাকে তুমি জান্নাতের সুসংবাদ দিবে” তিনি আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমার এ কথা শুনে উমর (রা.) আমার বুকের উপর এমন জোরে চপেটাঘাত করলেন যে, আমি পেছন দিকে পড়ে গেলাম। আর তিনি বললেন, হে আবু হুরায়রা! তুমি (রাসুলুল্লাহ ﷺ এর) নিকট ফিরে চলো। তাই আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট কাঁদো কাঁদো অবস্থায় ফিরে আসলাম। আমার পেছনে পেছনে উমর (রা.) সেখানে উপস্থিত হলেন।

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু হুরায়রা! তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম, আমার সাথে উমারের সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং আপনি আমাকে যে সুসংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তাকে এটা জানালে তিনি আমার বুকে এমন জোরে ঘুসি মারলেন যে, আমি পিছন দিকে পড়ে যাই। তিনি এটাও বলেছেন যে, আমি যেন (আপনার নিকট) ফিরে আসি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে উমর! কোন বস্তু তোমাকে এমন কাজ করতে উদ্যত করলো? তিনি বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোক। আপনি কি আপনার জুতা জোড়াসহ আবু হুরায়রাকে এ বলে পাঠিয়েছেন যে, যার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হয় তাকে বলো, যে ব্যক্তি সর্বান্তঃকরণে এ সাক্ষ্য দিবে যে, “আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই” তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও? তিনি বললেন, হ্যাঁ।

উমর (রা.) বললেন, এরূপ করবেন না, কেননা আমার আশঙ্কা হচ্ছে এতে লোকেরা (আমল বর্জন করে) এর উপর ভরসা করে বসে থাকবে, কাজেই লোকদেরকে আমল করার সুযোগ দিন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আচ্ছা তাদেরকে ছেড়ে দাও। সহিহ মুসলিম : ৩১, ২৪০৮, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৫১, সহিহাহ : ১৩১৪, ২৩৫৫, আহমাদ : ১৮৭৮০, ১৮৮৪৬, দারেমী : ৩৩১৬

২. তাওহীদের স্বীকৃতি দিয়ে মৃত্যু বরণ করলে সুপারিশের আশা করা যায় :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ قَالَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏ “‏ لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لاَ يَسْأَلَنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ، لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ، أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ ‏

অর্থ : আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসুল ﷺ -কে প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসুল ﷺ বললেন, আবু হুরায়রা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদিসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠ চিত্তে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ  (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে। সহিহ বুখারি : ৯৯, ৬৫৭০

ইবনে মুসাইয়্যাব তার পিতা মুসাইয়্যাব (রহ.) হতে বর্ণনা করেন, যখন আবু তালিবের মুমূর্ষু অবস্থা তখন নবি ﷺ তার নিকট গেলেন। আবু জাহেলও তার নিকট উপবিষ্ট ছিল। নবি ﷺ তাকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচাজান, لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ কলেমাটি একবার পড়ুন, তাহলে আমি আপনার জন্য আল্লাহর নিকট কথা বলতে পারব। তখন আবু জাহেল ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু উমাইয়া বলল, হে আবু তালিব! তুমি কি ‘আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে ফিরে যাবে? এরা দু’জন তার সাথে একথাটি বারবার বলতে থাকল। সর্বশেষ আবু তালিব তাদের সাথে যে কথাটি বলল, তাহল, আমি ‘আবদুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপরেই আছি। এ কথার পর নবি ﷺ বললেন, আমি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতে থাকব যে পর্যন্ত আপনার ব্যাপারে আমাকে নিষেধ করা না হয়। এ প্রসঙ্গে এ আয়াতটি নাজিল হল,

مَا کَانَ لِلنَّبِیِّ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡ یَّسۡتَغۡفِرُوۡا لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ وَلَوۡ کَانُوۡۤا اُولِیۡ قُرۡبٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمۡ اَنَّہُمۡ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

নবি ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। তাওবা : ১১৩। আরো নাজিল হলো-

اِنَّکَ لَا تَہۡدِیۡ مَنۡ اَحۡبَبۡتَ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَہُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُہۡتَدِیۡنَ

নিশ্চয় তুমি যাকে ভালোবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না; বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন। সুরা কাসাস-৫৬। সহিহ বুখারি : ৩৮৮৪, ৪৬৭৫, ৪৭৭২, ৬৬৮১

৩. আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার না করলে তিনি বান্দার সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।

আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি-

“‏ قَالَ اللَّهُ يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلاَ أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلاَ أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لاَ تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لأَتَيْتُكَ  بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً ‏”‏

অর্থ : আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮

৪. তাওহীদের স্বীকৃতি জাহান্নাম হারাম করে দেয় :

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ  : “إِنِّي لَأَعْلَمُ كَلِمَةً لَا يَقُولُهَا عَبْدٌ حَقًّا مِنْ قَلْبِهِ فَيَمُوتُ عَلَى ذَلِكَ إِلَّا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ لَا إِلَهَ إِلَّا الله

উমর বিন খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন: ’আমি এমন একটি বাক্য জানি, যা কোন যদি অন্তর থেকে সত্যনিষ্ঠভাবে বলে অতঃপর তার উপর মৃত্যুবরণ করে, তবে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামকে হারাম করে দিবেন। বাক্যটি হলো ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই। সহিহ ইবনে হিব্বান : ২০৪, মুসনাদ আহমাদ: ৬৩, ৬৫, সহিহ মুসলিম : ২৬, সুনানে নাসায়ি : ১১১৫। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি ইবনে হিব্বান থেকে সংকলন করা হয়েছে।

উবাদা  ইবনে সামিত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি-

«مَنْ شَهِدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ حَرَّمَ الله عَلَيْهِ النَّار»

যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ (তাঁর অনুগ্রহে) তার ওপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। সহিহ মুসলিম : ২৯, মিশকাত : ৩৫, তিরমিজি ২৬৩৮, আহমাদ ২২৭১১, সহিহ ইবনে হিব্বান ২০২, সহিহ আল জামি ৬৩১৯।

একদা মুআয (রা.) নবি ﷺ -এর পিছনে সওয়ারীতে ছিলেন, তখন তিনি তাকে ডাকলেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল আমি আপনার সার্বিক সহযোগিতা ও খিদমাতে হাজির আছি। তিনি ডাকলেন, মু‘আয! মু‘আয (রা.) উত্তর দিলেন, আমি হাজির হে আল্লাহর রাসুল এবং প্রস্তুত।’ তিনি আবার ডাকলেন, মু‘আয। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি হাজির এবং প্রস্তুত’। এরূপ তিনবার করলেন। অতঃপর বললেন, যে কোন বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল’-তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন। মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি মানুষকে এ খবর দেব না, যাতে তারা সুসংবাদ পেতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তারা এর উপরই ভরসা করবে।’ মু‘আয (রা.) (জীবন ভর এ হাদিসটি বর্ণনা করেননি) মৃত্যুর সময় এ হাদিসটি বর্ণনা করে গেছেন যাতে (‘ইল্ম গোপন রাখার) গুনাহ না হয়। সহিহ বুখারি : ১২৮, ১২৯,  সহিহ মুসলিম : ৩২

সুনাবিহী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি উবাদাহ ইবনে সামিত (রা.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন। সুনাবিহী বলেন, উবাদাহ ইবনে সীমিত (রা.) যখন মৃত্যু শয্যায় তখন আমি তার নিকট গেলাম, (তাকে দেখে) আমি কেঁদে ফেললাম। এ সময় তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, থামো, কাঁদছ কেন? আল্লাহর কসম! আমাকে যদি সাক্ষী বানানো হয়, আমি তোমার স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিবো, আর যদি সুপারিশ করার অধিকারী হই তবে তোমার জন্য সুপারিশ করবো। আর যদি তোমার কোনো উপকার করতে পারি, নিশ্চয় সেটাও করবো। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! এ যাবৎ আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যে কোন হাদিস শুনেছি, যার মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে, তা আমি অবশ্যই তোমাদের কাছে বর্ণনা করেছি। কিন্তু একটি মাত্র হাদিস (যা এতদিন আমি তোমাদেরকে বলিনি) আজ এখনই তা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করবো। কেননা বর্তমানে আমি মৃত্যুর বেষ্টনীতে আবদ্ধ। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল, আল্লাহ তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিবেন। সহিহ মুসলিম : ২৯

৫. তাওহীদের উপর থাকলে মহান আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবেন না :

মুআয ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন_

كُنْتُ رِدْفَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   عَلَى حِمَارٍ يُقَالُ لَهُ عُفَيْرٌ قَالَ فَقَالَ ‏”‏ يَا مُعَاذُ تَدْرِي مَا حَقُّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ وَمَا حَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ قُلْتُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَإِنَّ حَقَّ اللَّهِ عَلَى الْعِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوا اللَّهَ وَلاَ يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَحَقُّ الْعِبَادِ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لاَ يُعَذِّبَ مَنْ لاَ يُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا ‏”‏ ‏.‏ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلاَ أُبَشِّرُ النَّاسَ قَالَ ‏”‏ لاَ تُبَشِّرْهُمْ فَيَتَّكِلُوا

আমি এক সফরে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর গাধা উফায়র এর পিঠে তার পিছনে বসা ছিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে মুআয! তুমি কি জানো, বান্দার উপর আল্লাহর হক কী এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো তারা আল্লাহর ইবাদাত করবে এবং তার সঙ্গে কোন কিছু শারীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, যে তার সঙ্গে শারীক করবে না, তাকে তিনি শাস্তি দিবেন না। মু’আয বললেন, ’আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি লোকদের এ সংবাদ জানিয়ে দেব না? তিনি বললেন, না; লোকেদের এ সংবাদ দিও না, তাহলে তারা এর উপর ভরসা করে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৩০, সহিহ বুখারি : ২৮৫৬ ও ৫৯৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৯৬, সহিহ আল জামি : ৭৯৬৮।

মুআয ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এক সময় নবি ﷺ এর বাহনের পিছনে বসা ছিলাম। আমার ও নবি ﷺ এর মাঝে হাওদার কাঠের টুকরা ব্যতীত কোন ব্যবধান ছিল না। নবি ﷺ বললেন, “হে মুআয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! উপস্থিত আছি আপনার আনুগত্য শিরোধার্য। অতঃপর তিনি কিছু দূর অগ্রসর হয়ে পুনরায় বললেন, ’হে মুআয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! উপস্থিত আছি, আপনার আনুগত্য শিরোধার্য। তিনি বললেন, তুমি কি জানো, বান্দার উপর আল্লাহর কী হক রয়েছে? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তার রাসূলই তা উত্তম জানেন। নবি ﷺ বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো তারা তার ইবাদাত করবে এবং তার সঙ্গে কোন কিছুকে শারীক করবে না। অতঃপর কিছু দূর চললেন, নবি ﷺ আবার বললেন, হে মু’আয ইবনে জাবাল! আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! উপস্থিত আছি, আপনার আনুগত্য শিরোধার্য। নবি ﷺ বললেন, তুমি কি জানো, এগুলো করলে আল্লাহর কাছে বান্দার কী হক আছে? আমি বললাম, আল্লাহ তার রাসূলই ভালো জানেন। নবি বললেন, “আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তি দিবেন না। সহিহ মুসলিম : ৪৯

আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত যে, একদা মু‘আয (রা.) নবি ﷺ -এর পিছনে সওয়ারীতে ছিলেন, তখন তিনি তাকে ডাকলেন, হে মু‘আয ইবনে জাবাল! মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল আমি আপনার সার্বিক সহযোগিতা ও খিদমাতে হাজির আছি। তিনি ডাকলেন, মু‘আয! মু‘আয (রা.) উত্তর দিলেন, আমি হাজির হে আল্লাহর রাসুল এবং প্রস্তুত।’ তিনি আবার ডাকলেন, মু‘আয। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি হাজির এবং প্রস্তুত’। এরূপ তিনবার করলেন। অতঃপর বললেন, যে কোন বান্দা আন্তরিকতার সাথে এ সাক্ষ্য দেবে যে, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল’-তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন। মু‘আয (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি মানুষকে এ খবর দেব না, যাতে তারা সুসংবাদ পেতে পারে?’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তারা এর উপরই ভরসা করবে।’ মু‘আয (রা.) (জীবন ভর এ হাদিসটি বর্ণনা করেননি) মৃত্যুর সময় এ হাদিসটি বর্ণনা করে গেছেন যাতে (‘ইল্‌ম গোপন রাখার) গুনাহ না হয়। সহিহ বুখারি : ১২৮, ১২৯, সহিহ মুসলিম : ৩২, সহিহ আত্ তারগিব : ১৫২২, শুয়াবুল ঈমান : ১২৫

৬. তাওহীদের স্বীকৃতি জান ও মালের নিরাপত্তা দেয় :

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ـ ‏ “‏ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُولُوا لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فَإِذَا قَالُوهَا عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّهَا وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ‏”‏

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন, আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত লোকদের সঙ্গে যুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে আর যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলবে সে তার জান ও মাল আমার হাত থেকে বাঁচিয়ে নিল। অবশ্য ইসলামের কর্তব্যাদি আলাদা, আর তার হিসেব আল্লাহর উপর ন্যস্ত।

 সহিহ বুখারি : ২৯৪৬, ৬৯২৪, ৭২৮৫, সহিহ মুসলিম : ২১, সুনানে তিরমিজি ২৬০৬-৭, সুনানে নাসায়ি ২৪৪৩, ৩০৯০-৯৩, ৩০৯৫, ৩৯৭০-৭৮; সুনানে আবু দাঊদ ২৬৪০, সহিহাহ ৪০৭

ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেন-

“‏ أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَيُقِيمُوا الصَّلاَةَ، وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّ الإِسْلاَمِ، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ

আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল, আর সালাত প্রতিষ্ঠা করে ও জাকাত আদায় করে। তারা যদি এগুলো করে, তবে আমার পক্ষ হতে তাদের জান ও মালের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলো; অবশ্য ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি কোন কারণ থাকে, তাহলে স্বতন্ত্র কথা। আর তাদের হিসেবের ভার আল্লাহর উপর অর্পিত। সহিহ বুখারি : ২৫, সহিহ মুসলিম : ২২, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৭৫, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ৫১৪১।

৭. তাওহীদের বাণীই সবচেয়ে ভারী আমল নামা :

’আবদুল্লাহ ইবনে ’আমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ سيخلِّصُ رجلا من أُمّتي على رُؤُوس الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَنْشُرُ عَلَيْهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ سِجِلًّا كُلُّ سِجِلٍّ مِثْلَ مَدِّ الْبَصَرِ ثُمَّ يَقُولُ: أَتُنْكِرُ مِنْ هَذَا شَيْئًا؟ أَظَلَمَكَ كَتَبَتِي الحافظون؟ فَيَقُول: لَا يارب فَيَقُول: أَفَلَك عذر؟ قَالَ لَا يارب فَيَقُولُ بَلَى. إِنَّ لَكَ عِنْدَنَا حَسَنَةً وَإِنَّهُ لَا ظُلْمَ عَلَيْكَ الْيَوْمَ فَتُخْرَجُ بِطَاقَةٌ فِيهَا أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ فَيَقُولُ احْضُرْ وَزْنَكَ. فَيَقُولُ: يَا رَبِّ مَا هَذِهِ الْبِطَاقَةُ مَعَ هَذِهِ السِّجِلَّاتِ؟ فَيَقُولُ: إِنَّكَ لَا تُظْلَمُ قَالَ: فَتُوضَعُ السِّجِلَّاتُ فِي كِفَّةٍ وَالْبِطَاقَةُ فِي كِفَّةٍ فَطَاشَتِ السِّجِلَّاتُ وَثَقُلَتِ الْبِطَاقَةُ فَلَا يَثْقُلُ مَعَ اسْمِ الله شَيْء .

অর্থ : কিয়ামতের দিন এমন এক লোককে (মুক্তি দেয়া হবে এভাবে যে, তাকে) জনসম্মুখে উপস্থিত করা হবে যার ’আমলনামা খোলা হবে নিরানব্বই ভলিউমে এবং প্রতিটি ভলিউম বিস্তীর্ণ হবে দৃষ্টির সীমা অবধি। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে প্রশ্ন করবেন, আচ্ছা বল দেখি, তুমি এর কোন একটিকে অস্বীকার করতে পারবে? অথবা আমার লেখক মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) কি তোমার প্রতি অবিচার করেছে? সে বলবে না; হে আমার প্রভু!

আল্লাহ তায়ালা প্রশ্ন করবেন, তবে কি তোমার পক্ষ হতে কোন ওযর পেশ করার আছে? সে বলবে, না; হে আমার রব! তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হ্যাঁ, তোমার একটি পুণ্য আমার নিকট আছে। তুমি নিশ্চিত জেনে রাখ, আজ তোমার প্রতি কোন জুলুম বা অবিচার করা হবে না। এরপর এক টুকরা কাগজ বের করা হবে, যাতে রয়েছে- (أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ) “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইবাদত পাওয়ার যোগ্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল”।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাকে বলবেন, তোমার ’আমালের ওজন দেখার জন্য উপস্থিত হও। তখন সে বলবে, হে প্রভু! ঐ সমস্ত বিরাট বিরাট রেজিস্ট্রারের মোকাবিলায় এই এক টুকরা কাগজের মূল্যই বা কি আছে?

তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তোমার ওপর কোনো অবিচার করা হবে না। তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর ঐ সকল রেজিস্ট্রারগুলো পাল্লার এক পালিতে এবং এ কাগজের টুকরাখানি আরেক পালিতে রাখা হবে। তখন দফতরগুলোর পালি হালকা হয়ে উপরে উঠে যাবে এবং কাগজের টুকরার পালি ভারী হয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে থাকবে। মোটকথা, আল্লাহর নামের সাথে অন্য কোন জিনিস ওজন হতে পারবে না।

মিশকাত : ৫৫৫৯, সুনানে তিরমিজি ২৬৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ ৪৩০০, সহিহ জামি : ১৭৭৬, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ১৩৫, সহিহ ইবনে হিব্বান : ২২৫, শুয়াবুল ঈমান : ২৮৩

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ “‏ مَا قَالَ عَبْدٌ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ قَطُّ مُخْلِصًا إِلاَّ فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ حَتَّى تُفْضِيَ إِلَى الْعَرْشِ مَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ ‏”‏

অর্থ : কোন বান্দা সততার সাথে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” বললে তার জন্য আকাশের দ্বারগুলো খোলা হয়। ফলে উক্ত কালিমা আরশে আজীম পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যতক্ষণ সে কবীরাহ গুনাহ ত্যাগ করে”। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৯০, সহিহ জামেউস সাগির : ৫৬৪৮

৮. মৃত্যুর সময়ও তাওহীদের স্বীকৃতি দিলে জান্নাতে যাবে :

উসমান (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ “‏ مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏”‏ ‏.‏

অর্থ : যে ব্যক্তি এই অবস্থায় মারা যাবে যে, সে জানে—‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ২৬

মুআয ইবনে জাবাল (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

  : مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ

অর্থ : যার সর্বশেষ বাক্য হবে ’’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩১১৬, রিয়াদুস সালেহীন : ৯২২, মাসনদে আহমাদ : ২১৫২৯, ২১৬২২

আবু সাঈদ ও আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তারা বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَقِّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ

অর্থ : যে ব্যক্তি মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যায় তাকে কালিমায়ে ’লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ তালকিন দিও।  মুসলিম ৯১৬, ৯১৭, আত্ তিরমিজি ৯৭৬, নাসায়ি ১৮২৬, ইবনে মাজাহ্ ১৪৪৪, ১৪৪৫, মিশকাত : ১৬১৬

সুদা আল মুররিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকালের পর উমর (রা.) তালহা (রা.) এর নিকট দিয়ে যেতে তাকে বলেন, তোমার কী হয়েছে, তুমি বিষণ্ন কেন? তোমার চাচাতো ভাইয়ের খেলাফত কি তোমার অপছন্দ হয়েছে? তালহা (রা.) বলেন, না। বরং আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, আমার এমন একটি বাক্য জানা আছে, যা কোন ব্যক্তি তার মৃত্যুর সময় বললে সেটা তার আমলনামার জন্য নূর হবে এবং নিশ্চয় তার দেহ ও আত্মা মৃত্যুর সময় তাকে শান্তি ও স্বস্তি দিবে। সেটি আমি তাকে জিজ্ঞেস করিনি, এরই মধ্যে তিনি ইনতিকাল করেন। উমর (রা.) বলেন, আমি সেটি জানি। তা হলো সেই কলেমা যা তিনি তাঁর চাচার নিকট পেশ করেছিলেন। যদি তিনি জানতেন যে, সেই কলেমার চেয়েও অধিক নাজাত দানকারী কিছু আছে, তবে অবশ্যই তিনি সেটি তাঁর চাচার নিকট পেশ করতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৯৫, আহমাদ : ১৩৮৭। তাহকীক আলবানি হাদিসের মান সহিহ।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, এক বেদুইন নবি ﷺ -এর নিকট এসে বলল, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন যদি আমি তা সম্পাদন করি তবে জান্নাতে প্রবেশ করবো। রাসুল ﷺ বললেন, আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে আর তার সাথে অপর কোন কিছু শরীক করবে না। ফরজ সালাত আদায় করবে, ফরজ জাকাত প্রদান করবে, রমাজান মাসে সিয়াম পালন করবে। সে বলল, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তার শপথ করে বলছি, আমি এর চেয়ে বেশী করবো না। যখন সে ফিরে গেল, নবি ﷺ বললেন, যে ব্যক্তি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে পছন্দ করে সে যেন এই ব্যক্তিকে দেখে নেয়। সহিহ বুখারি : ১৩৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৪, আহমাদ : ৮৫, সহিহ আত তারগিব : ৭৪৮।

আবু জামরাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনে ‘আব্বাস (রা.)-এর সাথে বসতাম। তিনি আমাকে তাঁর আসনে বসাতেন। একবার তিনি বললেন, তুমি আমার কাছে থেকে যাও, আমি তোমাকে আমার ধন-সম্পদ হতে কিয়দংশ প্রদান করব। আমি তাঁর সাথে দু’মাস থাকলাম। অতঃপর একদা তিনি বললেন, আবদুল কায়েস-এর একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসুল ﷺ -এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন, তোমরা কোন গোত্রের? কিংবা বললেন, কোন,, প্রতিনিধিদলের? তারা বলল, ‘রাবী‘আ গোত্রের।’ তিনি বললেন, স্বাগতম সে গোত্র বা সে প্রতিনিধি দলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল! শাহরুল হারাম ব্যতীত অন্য কোন সময় আমরা আপনার নিকট আগমন করতে পারি না। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রীয় কাফিরদের বসবাস। তাই আমাদের কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিন, যাতে করে আমরা যাদের পিছনে ছেড়ে এসেছি তাদের অবগত করতে পারি এবং যাতে করে আমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারি। তারা পানীয় সম্বন্ধেও জিজ্ঞেস করল।

তখন তিনি তাদেরকে চারটি বিষয়ের আদেশ এবং চারটি বিষয় হতে নিষেধ করলেন। তাদেরকে এক আল্লাহ্তে বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে বললেন, এক আল্লাহর প্রতি কীভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা হয় তা কি তোমরা অবগত আছ?’ তাঁরা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই অধিক জ্ঞাত।’ তিনি বললেন, ‘তা হচ্ছে এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসুল এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করা, জাকাত আদায় করা, রমজানের সিয়াম পালন করা; আর তোমরা গনিমতের সম্পদ হতে এক-পঞ্চমাংশ আদায় করবে। তিনি তাদেরকে চারটি বিষয় হতে বিরত থাকতে বললেন। আর তা হচ্ছে- সবুজ কলস, শুকনো কদুর খোল, খেজুর বৃক্ষের গুড়ি হতে তৈরি বাসন এবং আলকাতরা দ্বারা রাঙানো পাত্র।  সহিহ বুখারি : ৫৩, ৮৭, ৫২৩, ১৩৯৮, ৩০৯৫, ৩৫১০, ৪৩৬৮, ৪২৬৯, ৬১৭৬, ৭২৬৬, ৭৫৫৬; মুসলিম : ১৭, মিশকাত : ১৬, সহিহ ইবনে হিব্বান : ১৭২, আহমাদ : ২০২০, সহিহ আল জামি : ১০

৯. তাওহীদের স্বীকৃতি বান্দাকে দুনিয়া এবং আখিরাতের জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন :

বারা ইবনে ’আজিব (রা.) হতে বর্ণিত। নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহﷺ বলেছেন-

الْمُسْلِمُ إِذَا سُئِلَ فِي الْقَبْرِ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ فَذَلِكَ قَوْلُهُ (يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْاٰخِرَةِ

অর্থ : কবরে মুসলিমকে যখন প্রশ্ন করা হবে, তখন সে সাক্ষ্য দিবে ’’লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্’’ আল্লাহর বাণীতে এর প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। বাণীটি হলো এই ’’যারা শাশ্বত বাণীতে বিশ্বাসী তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন’। সুরা ইবরাহীম-২৭।

সহিহ বুখারি : ৪৬৯৯, সুনানে আবু দাঊদ ৪৭৫০, সহিহ আল জামি : ৬৭০৮, সহিহাহ ; ৩৯৬৩, সুনানে নাসায়ি ২০৫৭, সুনানে তিরমিজি ৩১২০

বারা ইবনে আযিব (রা.) এর সূত্রে নবি ﷺ থেকে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর বাণী- “যারা শাশ্বত বাণীতে ঈমান রাখে তাদেরকে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন” সম্পর্কে বলেন, এ আয়াত কবরের আজাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কবরে তাকে প্রশ্ন করা হয়, তোমার রব কে? সে বলে, আমার রব আল্লাহ এবং আমার নবি মুহাম্মাদ। এটাই আল্লাহর নিম্নবর্ণিত বাণীর মর্ম, “যারা শাশ্বত বাণীতে ঈমান রাখে তাদেরকে আল্লাহ দুনিয়া ও পরকালে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন”। সহিহ মুসলিম : ২৮৭১, সুনানে ইবনে মাজাহ্ ৪২৬৯।

তাওহীদ ও শিরক

তাওহীদ ও শিরক

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

তাওহীদ (توحيد) শব্দটি আরবি। যার অর্থ একত্ববাদ। কোনো কিছুকে এক মনে করা, এক ঘোষণা করা বা “একত্ব স্বীকার করা”। ইসলামি পরিভাষায় “আল্লাহ তায়ালা যে সত্তা, তাঁর গুণাবলি, কাজ, অধিকার ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তিনি এক ও অনন্য। এ বিশ্বাস করা ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি।

তাওহীদের তিনটি শাখা বা প্রকারভেদ :

তাওহীদকে সহজভাবে বুঝানোর জন্য আলেমগণ এটিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। যথা-

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম

১. তাওহীদুর রুববিয়াহ বা প্রতিপালক এককত্ত্ব :

আল্লাহকে তার কর্ম সমূহে একক হিসেবে মেনে নেওয়া। আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, পরিচালনাকারী ও জীবিকা প্রদানকারী। কেউই তার এই গুণে শরিক নয়। তিনিই আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনিই বৃষ্টি দেন, মৃত্যু ও জীবন দেন।

বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে, এককভাবে আল্লাহ তায়ালাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনিই একে পরিচালনা করতে কারো মুখাপেক্ষী নন। তার সমতুল্য কেউ নেই। তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী। যিনি পরম দয়ালু ও মেহেরবান।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اَللّٰہُ خَالِقُ کُلِّ شَیۡءٍ ۫ وَّہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ وَّکِیۡلٌ

অর্থ : আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। সুরব যুমার : ৬২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قُلۡ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (١) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (٢) لَمۡ يَلِدۡ وَلَمۡ يُولَدۡ (٣) وَلَمۡ يَكُن لَّهُ ۥ ڪُفُوًا أَحَدٌ (٤)

অর্থ : বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। সুরা ইখলাস : ১-৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

ٱللَّهُ لَآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَىُّ ٱلۡقَيُّومُ‌ۚ لَا تَأۡخُذُهُ ۥ سِنَةٌ۬ وَلَا نَوۡمٌ۬‌ۚ لَّهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ‌ۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَىۡءٍ۬ مِّنۡ عِلۡمِهِۦۤ إِلَّا بِمَا شَآءَ‌ۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ‌ۖ وَلَا يَـُٔودُهُ ۥ حِفۡظُهُمَا‌ۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِىُّ ٱلۡعَظِيم

অর্থ :  “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান। সুরা বাকারা : ২৫৫

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, ’’বানী আদম আমার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে; অথচ এরূপ করা তার জন্য সঠিক হয়নি। বানী আদম আমাকে গালি দিয়েছে; অথচ এমন করা তার জন্য উচিত হয়নি। আমার প্রতি মিথ্যারোপ করার অর্থ হচ্ছে এই যে, সে বলে, আল্লাহ্ আমাকে যে রকম প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন না। অথচ তাকে আবার জীবিত করা অপেক্ষা প্রথমবার সৃষ্টি করা আমার জন্য সহজ ছিল না। আমাকে তার গালি দেয়ার অর্থ হল, সে বলে, আল্লাহ্ তায়ালা সন্তান গ্রহণ করেছেন; অথচ আমি একক, কারো মুখাপেক্ষী নই। আমি কাউকে জন্ম দেইনি, আমাকেও জন্ম দেয়া হয়নি এবং কেউ আমার সমকক্ষ নয়। সহিহ বুখারি : ৪৯৭৪, সুনানে নাসায়ি : ২০৭৮, সহিহ ইবনে হিব্বান ২৬৭।

২. তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক :

ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন: সালাত, সাওম, হজ, জাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান সদকা, দুআ, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা কারণ এই উদ্দেশেই সকল নবি (আ:) প্রেরণ করা হইয়াছে এবং কিতাব নাজিল করা হইয়াছে।

সকল মুসলিম তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। এমনকি মুশরিকগণও তাওহীদুর রুববিয়াহ স্বীকার করে। কিন্তু তাওহীদুল উলুহিয়াহ কে অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করে তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষ জাতির নিকট বহু নবি রাসুল প্রেরণ করছেন। তারা এসে তাওহীদুর উলুহিয়াহ বা শুধু আল্লাহর ইবাদত শিক্ষা দিয়েছেন। অন্যদের উপসনা ত্যাগ করতে বলেছেন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

অর্থ : আপনার পূর্বে আমি যে রাসুল পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর। সুরা আম্বিয়া : ২৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

অর্থ : আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসুল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সুরা নাহল : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ

অর্থ : আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসেব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না। সুরব মুমিনুন : ১১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا

অর্থ : এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো। সুরা ইসরা : ৫৭

অতএব তাওহীদ আল ইবাদাত এর ব্যাপারে এক আল্লাহর অধিকার সংরক্ষণ করা তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি একাই ইবাদত পাওয়ার অধিকারী এবং তিনিই মানুষকে ইবাদাতের কল্যাণকর প্রতিদান দেওয়ার অধিকারী।

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসুলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুণগুলি আচরণগত হোক বা সত্ত্বাগত হোক। সূত্র: তাফসীরুল উসরিল আখির মিনাল কুরআনুল কারীম

তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত  আল্লাহর মূলসত্বা ও গুণাবলিতে বিশ্বাস করা। আল্লাহকে সেই নামেই ডাকতে হবে যে নাম তিনি নিজের জন্য নির্ধারণ করেছেন। কোন নব উদ্ভাবিত নামে তাঁকে ডাকা যাবে না। আল্লাহর কোন গুণকে মানুষের কোন গুণের সাথে তুলনা করা যাবে না। আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে-

لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِي

অর্থ : কোন বস্তুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সব শোনেন, সব দেখেন, সুরা শুরা-১১)

যদিও দেখা ও শোনা মানুষের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু মানুষের দেখার জন্য চোখ, শোনার জন্য কানের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আল্লাহর সত্তার জন্য এসব চোখ, কান নাক ইত্যাদির প্রয়োজন হয় না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِہَا‌ۖ وَذَرُواْ ٱلَّذِينَ يُلۡحِدُونَ فِىٓ أَسۡمَـٰٓٮِٕهِۦ‌ۚ سَيُجۡزَوۡنَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ

অর্থ : সবচেয়ে সুন্দর নাম সমূহ আল্লাহর অধিকারভুক্ত। সুতরাং সেই নামেই তাঁকে ডাক। যারা তাঁর নামকে অবজ্ঞা করে সে সব লোককে বর্জন কর। তারা যা করে শীঘ্রই তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সুরা আরাফ : ১৮০

আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের কিছু উদাহরণ হল: আর রহমান (দয়াবান), আর রহিম (দয়ালু), আস সামী (সর্বদ্রষ্টা), আল বাসির (সর্বশ্রোতা),আল আযিয(পরাক্রমশালী), আল হাকিম (প্রজ্ঞাময়), আল হালিম (সহনশীল), আর আলিম (সর্বজ্ঞ) আল আলীউল কাবির (সর্বোচ্চ), আল হাইউল (চিরঞ্জীব) আল কাইউম

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসুল ﷺ বলেন-

«إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ اسْمًا مِائَةً إِلَّا وَاحِدًا، مَنْ أَحْصَاهَا دَخَلَ الجَنَّةَ»

অর্থ : আল্লাহর নিরানব্বই নামটি নাম রয়েছে যে ব্যক্তি সেগুলোর যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’’। সহিহ বুখারি : ২৭৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৬৭৭

শিরক (شِرۡکَ)

তাওহীদ সম্পর্কে সামান্য ধারনা পেলাম। তাওহীদের বিপরীত কর্ম হলে শিরক। তাওহীদকে পুরোপুরি বুঝতে হলে শিরকতে বুঝতে হবে। তাই খুবই সংক্ষেপে শিরক ও তার কুফল সম্পর্কে আলোচন করা হবে।

একটি আরবি শব্দ যার অর্থ অংশীদার সাব্যস্ত করা, দুই বা ততোধিক শরিকের সংমিশ্রণ। কাউকে অপরের অংশীদার বানানো। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোন কিছুকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

اَمۡ لَہُمۡ شِرۡکٌ فِی السَّمٰوٰتِ 

অর্থ : অথবা আসমানসমূহে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে কি? সুরা আহকাব : ৪।

এই আয়াতে মহান আল্লাহর সৃষ্টির কর্তৃত্বে অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আর কখনও দু’জনের মাঝে কোনো বস্তু বণ্টন করা হলে, এক জনকে অন্য জনের শরীক বলা হয়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَاَشۡرِکۡہُ فِیۡۤ اَمۡرِیۡ ۙ

অর্থ : এবং তাকে আমার কাজের অংশী করুন। সুরা ত্বহা : ৩২

এই আয়াতে মুসা (আ.) তার ভাই হারুন আ.) তার নবুয়তের অংশীদার বুঝাতে শিরক শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

প্রকৃত পক্ষে, শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে নির্ধারিত করা বা তার উপাসনা করা। ইসলামের পরিভাষায় রব ও ইলাহ হিসেবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক সাব্যস্ত করার নামই শিরক। যেমন- 

মূর্তি বা দেবতার পূজা করা, তার সামনে মাথানত করা। আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিকট রোগ মুক্তির জন্য, বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য, সন্তান কামনায় জন্য নিবেদন পেশ করা।

শরীয়তের পরিভাষায় শির্ক :

আল্লাহর রুববিয়াহ (প্রতিপালকে) অথবা তার উলুহিয়াহ (ইবাদতে) অথবা আসমা ওয়াস সিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নামে) অংশীদার বা সমকক্ষ নির্ধারণ করাকে শিরক বলে। প্রতিপালন, আইন, বিধান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একচ্ছত্র অধিকারে কাউকে শরীক করা বা অংশীদার বানানোই হচ্ছে শিরক।

এই সংজ্ঞা এভাবে ও দেয়া যায় যে, ‘‘এমন সব বিশ্বাস, কাজ, কথা ও অভ্যাসকে শির্ক বলা হয় যার দ্বারা বাহ্যত মহান আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, উলুহিয়্যাত ও গুণাবলিতে অপর কারো অংশীদারিত্ব বা সমকক্ষতা প্রতীয়মান হয়।“ এক কথায় গাইরুল্লাহকে আল্লাহ তয়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যে গায়রুল্লাহকে সমকক্ষ করাকে শির্ক বলা হয়।’ যেমন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

قَالُواْ وَهُمۡ فِيهَا يَخۡتَصِمُونَ ٩٦ تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذۡ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٨

অর্থ : সেখানে (জাহান্নামে) পরস্পর ঝগড়া করতে গিয়ে তারা বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম। যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম’। সুরা শুরা : ৯৬-৯৮

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা তাদের পাথর ও কাঠ ইত্যাদির মূর্তিসমূহকে আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নেয়ার কারণেই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়ে মুশরিক হয়েছিল। শির্ক যখন আল্লাহ তায়ালার রুবূবিয়্যাত, উলূহিয়্যাত ও গুণাবলীর বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্পর্কিত।

শিরকের প্রকারভেদ :

উপরে শিরক সম্পর্কে একটা ধারনা পেয়েছি। শিরক এমন গুনাহ যা মুসলিমকে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। কিন্তু কিছু শিরক এমন আছে যা করা কবিরা গুনাহ হলেও মুসলিমকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। যেমন- গাইরুল্লাহর জন্য দান করা, লোক দেখান ইবাদাত করা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর উদ্দেশ্যে মান্নত করা, ব্যক্তি বা বস্তুরকে কল্যান অকল্যান ভাবা ইত্যাদি। এ থেকে ষ্পষ্ট যে শিরকেরও প্রকারভেদ আছে। সাধারণ শিরক দুই প্রকার। যথা-

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরক।

খ. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক।

ক। শিরকে আকবার বা বড় শিরক

বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।

আল্লাহকে তার মখলুকের সঙ্গে তুলনা করা, অথবা আল্লাহর সাথে দ্বিতীয় কাউকে সৃষ্টিকর্তা, অথবা রিজিকদাতা, অথবা পরিকল্পনাকারী জ্ঞান করা। শিরকে আকবার যা একজন ঈমানদার মুসলিম কে মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে দেয়। বান্দার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেয়। এ ধরনের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি তওবা ছাড়া শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে। যেমন-

আল্লাহ ব্যতীত কারো নিকট দুআ করা, ফরিয়াদ করা, সাহায্য তলব করা, আশ্রয় প্রার্থনা করা, হোক সে নবি, অথবা অলি, অথবা ফেরেশতা অথবা জিন, অথবা অন্য কোনো মখলুক। দেবদেবী বা মূর্তি পূজা করা, কবর-মাজারে সিজদা করা, গায়রুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোন ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত আদায় করা, গায়রুল্লাহর উদ্দেশে কুরবানি করা, মৃত ব্যক্তি কিংবা জ্বিন অথবা শয়তান  বা ফিরিশতাগণ কারো ক্ষতি বা উপকার করতে বলে বিশ্বাস করে তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ ছাড়া কেউ প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করতে পারে, সুস্থ বা অসুস্থ করতে পারে, বিপদ আপদ দূর করতে পারে বলে বিশ্বাস করা তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া। বিশ্বাস করা যে, আল্লাহর সাথে কোনো সত্তা আছে যে সৃষ্টি করে, অথবা জীবিত করে, অথবা মৃত্যু দেয়, অথবা মালিকানার হকদার, অথবা এ জগতে কর্তৃত্বের অধিকারী। অথবা এরূপ বিশ্বাস করা যে, অমুক সত্তা আল্লাহর ন্যায় নিঃশর্ত আনুগত্যের হকদার, ফলে সে কোনো বস্তু হালাল ও হারাম করার ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার আনুগত্য করে, যদিও তা রাসুলদের আনিত দীনের বিপরীত হয়। আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য জবেহ করা। আল্লাহর বিধানের ন্যায় বিধান রচনা করে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এবং তা মেনে নিতে বাধ্য করা। কাফেরদের পক্ষ নেওয়া ও মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদেরকে সাহায্য করা।

ক. শিরকে আকবার বা বড় শিরকের সাধারণত তিনটি মাধ্যমে সংঘটিত হয়। যথা-

১। আকিদা বা বিশ্বাসের মাধ্যমে শিরক

২। ইবাদাতের মাধ্যমে শিরক

৩। সমাজে প্রচলিত ইসলামি বিরোধী কাজের মাধ্যমে শিরক

খ। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক

যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে তাকে শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচনা করব। আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য সুন্দর করার নাম শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। কেননা উক্ত রিয়াকারী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে। কখনও এমন কাজ বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلاً صَالِحًا وَلاَ يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

অর্থ : সুতরাং যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহফ : ১১০

লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। লোকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য সুন্দর ভাবে সালাত আদায় করা, সদকা করা। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সশব্দে যিকির করা, সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা। নিরাপত্তার জন্য পুঁতি, তাবিজ, তাগা ও কড়ি ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা। গাইরুল্লাহর নামে কসম খাওয়া। কোনো মহান বস্তু বা ব্যক্তিকে অতিরিক্ত সম্মান দেওয়া যা আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমান নয়। ব্যক্তি শুধু দুনিয়া অর্জনের জন্যে আজান দেয়, ইমামতি করে, শিক্ষকতা, কুরআন শিখে, শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে, জিহাদ,  হজ করে। আবার অনেক সময় ফাহেসা কথায় দ্বারাও ছোট শিরক হয়। কিন্তু এই শিরক ইসলাম থেকে বের করে দেয় না।

হুযাইফাহ ইবনে ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত। এক মুসলিম ব্যক্তি স্বপ্ন দেখে যে, আহলে কিতাবের এক ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাৎ হলে সে বলল, তোমরা কতই না উত্তম জাতি, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বলে থাকো, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন এবং মুহাম্মাদ যা ইচ্ছা করেন’’। অতঃপর সে স্বপ্নের কথাটি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিকট বর্ণনা করলো। তিনি বলেন-

أَمَا وَاللَّهِ إِنْ كُنْتُ لأَعْرِفُهَا لَكُمْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ مُحَمَّدٌ

অর্থ : আল্লাহর শপথ! শোনো, আমি তো তোমাদের এরূপ কিছু বলতে শিখানি। তোমরা বলবে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ যা চান’’। ইবনে মাজাহ : ২১১৮

এ হাদিসটি প্রমাণ করছে যে, ইসলামের প্রারম্ভিক আমলে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবিদের মাঝে ‘আল্লাহ ও মুহাম্মদ ﷺ যা চান’, এ-জাতীয় কথাবার্তা বলার প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদেরকে এমন কথা বলা থেকে বারণ করেন এবং এ ধরনের কথার বদলে নিম্নোক্ত কথা বলতে শিক্ষা দেন। তোমরা বল, আল্লাহ তায়ালা এককভাবে যা চান। যেমন-

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِذَا حَلَفَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ وَشِئْتَ ‏.‏ وَلَكِنْ لِيَقُلْ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شِئْتَ ‏ ‏

অর্থ : তোমাদের কেউ যেন শপথ করা কালে এভাবে না বলে, ’’আল্লাহ যা চান এবং তুমি যা ইচ্ছা করো’’। বরং সে যেন বলে, ’’আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন, এরপর তুমি যা ইচ্ছা করছো। ইবনে মাজাহ : ২১১৭

 শিরকে আসগার’ এর কতিপয় উদাহরণ হলো- কোনো ব্যক্তির বলল, আমার চাকরিটি  না থাকিলে সংসারের কি যে হত। আজ বিপদে আপনিই আমাকে বাঁচিয়েছেন। পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়িতে চুরি হয়ে যেতো, ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাওহীদ ও শিরকের মাঝে পার্থক্য :

বিষয়তাওহীদশিরক
সংজ্ঞাআল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলা ও মানাআল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করা
ইবাদতের অধিকারকেবল আল্লাহরআল্লাহ ছাড়া অন্যকেও দেওয়া
উদ্দেশ্যআল্লাহর সন্তুষ্টিআল্লাহর সাথে অন্যের সন্তুষ্টি অর্জন
ইবাদতের দৃষ্টিভঙ্গিশুধুই আল্লাহর উদ্দেশ্যে ইবাদতকাউকে ইবাদতের অংশীদার করা
ক্ষমতার বিশ্বাসআল্লাহর সব কিছুর ক্ষমতা আছেঅন্যেরও অলৌকিক ক্ষমতা আছে মনে করা
প্রভাবজান্নাতের পথে নিয়ে যায়জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়
নবিদের দাওয়াতসব নবি তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেননবিরা শিরকের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছেন
তাওবা না করলে পরিণতিক্ষমারযোগ্য, যদি ভুল হয়ক্ষমাহীন গুনাহ, যদি তাওবা ছাড়া মৃত্যু হয়
অন্তর ও আমলের প্রভাবএকনিষ্ঠতা, শান্তি, একাগ্রতাবিভ্রান্তি, ভয়ের মিশ্রতা
ফলাফলজান্নাতের সফলতাজাহান্নামের শাস্তি ও চিরস্থায়ী ব্যর্থতা