Category Archives: আমলের ফজিলত

মদিনার হারামের সীমা ও বিভিন্ন স্থানের ফজিলত

মদিনার হারামের সীমা ও বিভিন্ন স্থানের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মসজিদে নববীর রয়েছে ব্যাপক মর্যাদা ও অসাধারণ শ্রেষ্ঠত্ব। কুরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে একাধিক ঘোষণা এসেছে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَّمَسۡجِدٌ أُسِّسَ عَلَى ٱلتَّقۡوَىٰ مِنۡ أَوَّلِ يَوۡمٍ أَحَقُّ أَن تَقُومَ فِيهِۚ فِيهِ رِجَالٞ يُحِبُّونَ أَن يَتَطَهَّرُواْۚ وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلۡمُطَّهِّرِينَ ١٠٨ ﴾

অর্থঃ অবশ্যই যে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকে তা বেশী হকদার যে, তুমি সেখানে সালাত কায়েম করতে দাঁড়াবে। সেখানে এমন লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন। (সুরা তওবা ৯:১০৮।

মন্তব্যঃ আল্লামা সামহুদী বলেন, ‘কুবা ও মদীনা- উভয় স্থানের মসজিদ প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত। উক্ত আয়াতে তাই উভয় মসজিদের কথা বলা হয়েছে।’(শায়খ সফিউর রহমান মুবারকপুরী, তারীখুল মাদীনাতিল মুনাওয়ারা ৭৫ পৃষ্ঠা)

বহু সহিহ হাদিসে মদিনা ফজিরত বর্ণনা করা হয়েছে। উদহরণ সরূপ কয়েকটি তুলে ধরা হলোঃ

১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আমার এ মসজিদে নামায আদায় করা অন্য মসজিদে নামায আদায় করার চেয়ে এক হাজার গুণ বেশি সওয়াব; তবে মসজিদে হারাম ছাড়া। (সহিহ বুখারী ১১৯০ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৪)

২. আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান আর আমার মিম্বর অবস্থিত আমার হাউয (কাউসার) এর উপরে। (সহিহ বুখারি ১১৯৬, ১৮৮৮, ৬৫৮৮, ৭৩৩৫)

৩. ইয়াজিদ ইবনে আবু উবাইদ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি সালামা বিন আকওয়া এর সাথে আসতাম এবং মুসহাফের নিকটবর্তী পিলারের কাছে নামায পড়তাম। অর্থাৎ রিয়াদুল জান্নাতে। আমি বললাম: হে আবু মুসলিম, আপনাকে দেখি এ পিলারের কাছে নামায পড়তে বেশি আগ্রহী? তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ পিলারের কাছে নামায পড়তে আগ্রহী দেখেছি। (সহিহ বুখারী ৫০২)

৪. আবদুল্লাহ্ ইবনু যায়দ মাযিনী (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার ঘর ও মিম্বার-এর মধ্যবর্তী স্থানটুকু জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান। (সহিহ বুখারি ১১৯৫, সহিহ মুসলিম ১৩৯০)

৫. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন গন্তব্যে সফর করা যাবে না। মসজিদে হারাম, আমার এই মসজিদ ও মসজিদে আকসা।”(সহিহ বুখারী ১১৮৯ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৭, আবু দাইদ ২০৩৩)

৬. জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “সফর করার সবচেয়ে উত্তম গন্তব্য হচ্ছে- আমার এ মসজিদ ও বাইতুল আতিক (কাবা)”। (মুসনাদে আহমাদ ৩/৩৫০, আলবানী তাঁর ‘আল-সিলসিলাতুস সহিহা’ গ্রন্থে ১৬৪৮) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)

৭. আবূ হুরাইয়া রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে আমার এই মসজিদে কেবল কোনো কল্যাণ শেখার জন্য কিংবা শেখানোর জন্য আসবে, তার মর্যাদা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য। পক্ষান্তরে যে অন্য কোন উদ্দেশ্যে তা দেখতে আসবে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে অন্যের মাল-সামগ্রীর প্রতি তাকায়। (ইবন মাজাহ্‌ : ২৭৭)

৮. আবূ উমামা আল-বাহেলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি একমাত্র কোন কল্যাণ শেখা বা শেখানোর উদ্দেশ্যে মসজিদে (নববীতে) আসবে, তার জন্য পূর্ণ একটি হজের সওয়াব লেখা হবে। (মাজমাউয যাওয়াইদ : ১/১২৩)

মন্তব্যঃ রওযা শরীফ ও এর আশেপাশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পূর্ব দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর হুজরা শরীফ। তার পশ্চিম দিকের দেয়ালের মধ্যখানে তাঁর মিহরাব এবং পশ্চিমে মিম্বর। এখানে বেশ কিছু পাথরের খুঁটি রয়েছে। যেসবের সাথে জড়িয়ে আছে হাদীস ও ইতিহাসের কিতাবে বর্ণিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও স্মৃতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর যুগে এসব খুঁটি ছিল খেজুর গাছের। এগুলো ছিল নিম্মরূপঃ

১. উসতুওয়ানা আয়েশা বা আয়েশা রা.-এর খুঁটি।

২. উসতুওয়ানাতুল-উফূদ বা প্রতিনিধি দলের খুঁটি।

৩. উসতুওয়ানাতুত্তাওবা বা তওবার খুঁটি।

৪. উসতুওয়ানা মুখাল্লাকাহ বা সুগন্ধি জালানোর খুঁটি।

৫. উসতুওয়ানাতুস-সারীর বা খাটের সাথে লাগোয়া খুঁটি এবং উসতুওয়ানাতুল-হারছ বা মিহরাছ তথা পাহাদারদের খুঁটি।

মুসলিম শাসকগণের কাছে এই রওযা ছিল বরাবর খুব গুরুত্ব ও যত্নের বিষয়। উসমানী সুলতান সলীম রওযা শরীফের খুঁটিগুলোর অর্ধেক পর্যন্ত লাল-সাদা মারবেল পাথর দিয়ে মুড়িয়ে দেন। অতপর আরেক উসমানী সুলতান আবদুল মাজীদ এর খুঁটিগুলোর সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করেন। ১৯৯৪ সালে সৌদি সরকার পূর্ববর্তী সকল বাদশাহর তুলনায় উৎকৃষ্ট পাথর দিয়ে এই রওযার খুঁটিগুলো ঢেকে দেন এবং রওযার মেঝেতে দামী কার্পেট বিছিয়ে দেন।

মসজিতে কুবায় সালাত আদায় করা

মদীনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত প্রথম মসজিদ এটি। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে কুবা পল্লীতে আমর ইবন আউফ গোত্রের কুলছুম ইবন হিদমের গৃহে অবতরণ করেন। এখানে তাঁর উট বাঁধেন। তারপর এখানেই তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এর নির্মাণকাজে তিনি সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। এ মসজিদে তিনি নামাজ পড়তেন। এটিই প্রথম মসজিদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে তাঁর সাহাবীদের নিয়ে প্রকাশ্যে একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। এ মসজিদের কিবলা প্রথমে বাইতুল মাকদিসের দিকে ছিল। পরে কিবলা পরিবর্তন হলে কা‘বার দিকে এর কিবলা নির্ধারিত হয়। মদীনা মসজিতে নব্বী বাদে এই মসজিদের ফজিলত সহিহ হাদিসর দ্বারা প্রমানি। কাজেই যখন মদীন যাওয়ার সৌভাগ্য হবে তখন মসজিদে কুবায় যেতে ভুলে যাবেন না। এই মসজিদে সালাত আদায় করলে উরমার সওয়াব পাওয়া যাবে।

দলিলঃ

১.  সাহল বিন হুনাইফ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি (স্বগৃহ হতে ওযূ করে) বের হয়ে এই মসজিদে (কুবায়) উপস্থিত হয়ে নামায আদায় করে, সে ব্যক্তির একটি উমরাহ আদায় করা সমান সওয়াব লাভ হয়। (হাদিস সম্ভার ১১৯৭, ইবনে মাজাহ ১৪১২)

২. উসাইদ বিন যুহাইর আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কুবার মসজিদে নামায পড়ার সওয়াব একটি উমরাহ করার সমতুল্য। (হাদিস সম্ভার ১১৯৮, ইবনে মাজাহ ১৪১১)

৩. নাফি (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু ‘উমার (রাযি.) দু’ দিন ছাড়া অন্য সময়ে চাশ্তের সালাত আদায় করতেন না, যে দিন তিনি মক্কা্য় আগমন করতেন। তাঁর অভ্যাস ছিল যে, তিনি চাশ্তের সময় মক্কা্য় আগমন করতেন। তিনি বাইতুল্লাহ্ ত্বওয়াফ করার পর মাকামে ইব্রাহীম-এর পিছনে দাঁড়িয়ে দু’রাক‘আত সালাত আদায় করতেন। আর যে দিন তিনি কুবা মসজিদে গমন করতেন। তিনি প্রতি শনিবার সেখানে গমন করতেন এবং সেখানে সালাত আদায় না করে বেরিয়ে আসা অপছন্দ করতেন। নাফি‘ (রহ.) বলেন, তিনি (ইবনু ‘উমার (রাযি.) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুবা মাসজিদ যিয়ারাত করতেন- কখনো সওয়ারীতে, কখনো পদব্রজে। (সহিহ বুখারি ১১৯১, সহিহ মুসলিম ৩২৬৬)

৪. নাফি (রহ.) বলেন, তিনি (ইবনু ‘উমার (রাযি.) তাঁকে আরো বলতেন, আমি আমার সাথীদেরকে যেমন করতে দেখেছি তেমন করব। আর কাউকে আমি দিন রাতের কোন সময়ই সালাত আদায় করতে বাধা দিইনা, তবে তাঁরা যেন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় (সালাতের) ইচ্ছা না করে। (সহিহ বুখারি ১১৯২)

৫. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি শনিবার কুবা মসজিদে আসতেন, কখনো পদব্রজে, কখনো সওয়ারীতে। ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.)-ও ঐরূপ করতেন। (সহিহ বুখারি ১১৯৩)

৬. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহণ করে কিংবা পায়ে হেঁটে কুবা মসজিদে আসতেন। ইবনু নুমায়র (রহ.) নাফি‘ (রহ.) হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করতেন। (সহিহ বুখারি ১১৯৪, সহিহ মুসলিম ৩২৬০ ইফাঃ)

মদিনার নগরীর ফজিলাত

১.  আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, সাহাবাগণ (তাদের বাগানে) সর্বপ্রথম পাকা ফল দেখলে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে (হাদীয়াহ স্বরূপ) নিয়ে আসত। ফলটি নিজ হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ “হে আল্লাহ! আমাদের ফলমূলে আমাদেরকে বারাকাত দাও, আমাদের শহরে আমাদেরকে বারাকাত দাও এবং আমাদের দাঁড়িপাল্লায় আমাদের বারাকাত দাও। “হে আল্লাহ! ইবরাহীম নিশ্চয়ই তোমার বান্দা, তোমার বন্ধু ও তোমার নাবী এবং আমিও তোমার বান্দা ও তোমার নাবী। তোমার নিকট তিনি মক্কা ভূমির জন্য দু’আ করেছিলেন। তোমার নিকট আমিও মাদীনার জন্য দু’আ করছি, যেভাবে তিনি মক্কার জন্য তোমার নিকট দু’আ করেছিলেন এবং আরও সম-পর্যায়ের”। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর তিনি কোন বালককে উপস্থিত দেখতে পেলে ফলটি তাকে দিয়ে দিতেন।( সুনানে তিরমিজি ৩৪৫৪, শামায়েলে তিরমিজি ১৪৯, সহিহ মুসলিম ৩৪০০)

২. আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মদীনার অধিবাসীদের ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা করবে, তাকে আল্লাহ তাআলা এমনভাবে গলিয়ে দিবে, যেভাব লবণ পানিতে গলে যায়। (ইবনে মাজাহ ৩১১৪, সনদ সহিহ আলবানী)

৩ .ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যদি মদীনায় মৃত্যুবরণ করতে পারে, সে যেন তাই করে। কারণ যে ব্যক্তি এখানে মারা যাবে, আমি তার পক্ষে সাক্ষী হবো। (ইবনে মাজাহ ৩১১২, সনদ সহিহ আলবানী)

৪. আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ঈমান মদিনাতে ফিরে আসবে যেমন সাপ তার গর্তে ফিরে আসে। (সহিহ বুখারি ১৮৭৬)

৫. যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উহূদের উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলে যারা তাঁর সঙ্গে বের হয়েছিল, তাদের কিছু সংখ্যক লোক ফিরে এলো। নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ তাদের ব্যাপারে দু’দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এরপর বললেন, আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। অপর দল বললেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। এ সময় অবতীর্ণ হয় আয়াতটিঃ

*فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللّهُ أَرْكَسَهُم بِمَا كَسَبُواْ*

‘তোমাদের কী হল যে, তোমরা মুনাফিকদের সম্বন্ধে দু’দল হয়ে গেলে? অথচ আল্লাহ্ তাদেরকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদের কৃতকর্মের দরুন’।(সূরা নিসা ৪:৮৮)। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এটা পবিত্র স্থান। আগুন যেমন রুপার ময়লা দূরে করে, তেমনি মদিনা্ও গুনাহকে দূর করে দেয়। (সহিহ বুখারি ৪০৫০)

৬. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি এমন এক জনপদে হিজরত করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, যে জনপদ অন্য সকল জনপদের উপর জয়ী হবে। লোকেরা তাকে ইয়াসরিব বলে থাকে। এ হল মদীনা। তা অবাঞ্ছিত লোকদেরকে এমনভাবে বহিষ্কার করে দেয়, যেমনভাবে কামারের অগ্নিচুলা লোহার মরিচা দূর করে দেয়। (সহিহ বুখারি ১৮৭১)

৭. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর হতে ফিরে আসার পথে যখন মদিনার প্রাচীরগুলোর দিকে তাকাতেন, তখন তিনি মদিনার প্রতি ভালবাসার কারণে তাঁর উটকে দ্রুত চালাতেন আর তিনি অন্য কোন জন্তুর উপর থাকলে তাকেও দ্রুত চালিত করতেন। (সহিহ বুখারি ১৮৮৬)

৮. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদিনার প্রবেশ পথসমূহে ফেরেশ্তা পাহারায় নিয়োজিত আছে। তাই প্লেগ রোগ এবং দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। (সহিহ বুখারি ১৮৮০)

৯. আবূ বাকরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ) বলেছেন, মদীনাতে দাজ্জালের ত্রাস ও ভীতি প্রবেশ করতে পারবে না। ঐ সময় মদীনার সাতটি প্রবেশ পথ থাকবে। প্রত্যেক পথে দু’জন করে ফেরেশতা (মোতায়েন) থাকবে। (সহিহ বুখারি ১৮৭৯)

মদীনা হারাম বা সম্মানিত স্থান

মুসলিমদের পবিত্র ভুমি মক্কার যেমন হারাম বা সম্মানিত নগরী ঠিক তেমনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় ভুমি মনিদাও মুসলিমদের নিকট হারাম বা সম্মানিত নগরী। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহ ইচ্ছায় যেমন মক্কাকে হারাম ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মহান আল্লাহ ইচ্ছায় মদিনাকে হারাম সম্মানিত ঘোষণা করেছেন। তাই শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার ক্ষেত্রে পৃথিবীর মধ্যে মক্কা নগরীর পরেই  মদিনার স্থান। সুতরাং মদীনাও নিরাপদ শহর। এখানে রক্তপাত বৈধ নয়। বৈধ নয় শিকার করা বা গাছ কাটা।

দলিলঃ

১. আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ মদীনা এখান হতে ওখান পর্যন্ত হারাম (রূপে গণ্য)। সুতরাং তার গাছ কাটা যাবে না এবং এখানে কোন ধরনের অঘটন (বিদ‘আত, অত্যাচার ইত্যাদি) ঘটানো যাবে না। যদি এখানে কোন অঘটন ঘটায় তাহলে তার প্রতি আল্লাহ্‌র এবং ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের লা’নত (অভিশাপ)।(সহিহ বুখারি ১৮৬৭)

২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উহুদ পর্বত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দৃষ্টিগোচর হলো। তিনি বললেন, এ পর্বত আমাদের ভালবাসে আর আমরাও তাকে ভালবাসি। হে আল্লাহ! ইবরাহীম (‘আঃ) মক্কাকে হারাম ঘোষণা করেছেন আর আমি হারাম ঘোষণা করছি এর দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানকে (মদীনাকে)। এ হাদীসটি ‘আব্দুল্লাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) ও নবী‎ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেছেন। (সহিহ বুখারি ৩৩৬৭)

৩. ‘আলী (রাযি.) থেকে পূর্বোক্ত হাদীসের ঘটনা প্রসংগে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (মদীনার) সবুজ ঘাস কাটা যাবে না, শিকার তাড়ানো যাবে না এবং পড়ে থাকা বস্তু উঠানো যাবে না। তবে ঘোষক ঘোষণার উদ্দেশ্যে তা তুলতে পারবে। কেউ সেখানে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে কোনো হাতিয়ার নিয়ে যেতে পারবে না এবং সেখানকার কোনো বৃক্ষও কাটা যাবে না, তবে কেউ তার উটের খাদ্য সংগ্রহ করলে তা ভিন্ন কথা।(আবু দাউদ ২০৩৫)

৪. সা‘দ (রাযি.) এর মুক্তদাস সূত্রে বর্ণিত। সা‘দ (রাযি.) মদীনার কতিপয় গোলামকে মদীনার গাছপালা কাটতে দেকে তাদের মালপত্র কেড়ে নিলেন এবং তাদের মনিবদের বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মদীনার গাছপালা কাটতে নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, কেউ এখানকার কিছু কাটলে তার মালপত্র সেই পাবে যে তা কেড়ে নিবে।কথা। (আবু দাউদ ২০৩৮)

৫. জাবির ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সংরক্ষিত এলাকায় গাছের পাতা না পাড়ে এবং কর্তন না করে, তবে কোমলভাবে পাতায় আঘাত করা যাবে। (আবু দাইদ ২০৩৯)

৬. ‘আবদুল্লাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইবরাহীম (আ.) মক্কা্কে হারাম ঘোষণা করেছেন ও তার জন্য দু‘আ করেছেন। আমি মদিনা্কে হারাম ঘোষণা করেছি, যেমন ইবরাহীম (আ.) মক্কা্কে হারাম ঘোষণা করেছেন এবং আমি মদিনার মুদ ও সা‘ এর জন্য দু‘আ করেছি। যেমন ইবরাহীম (আ.) মক্কার জন্য দু‘আ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি ২১৩৯)

হারামের সীমারেখা হলো

উত্তরে লম্বায় উহুদ পাহাড়ের পেছনে সাওর পাহাড় থেকে দক্ষিণে আইর পাহাড় পর্যন্ত। পূর্বে হার্রা ওয়াকিম অর্থাৎ কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকা থেকে পশ্চিমে হার্রা আল-ওয়াবরা অর্থাৎ কালো পাথর বিশিষ্ট এলাকা পর্যন্ত।

১. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার দু’ পাথুরে ভূমির মধ্যবর্তী স্থান আমার ঘোষণা মোতাবেক হারাম হিসাবে নির্ধারিত করা হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনূ হারিসের নিকট তাশরীফ আনেন এবং বলেন, হে বনূ হারিসা! আমার ধারণা ছিল যে, তোমরা হারামের বাইরে অবস্থান করছ, অতঃপর তিনি সেদিকে দৃষ্টিপাত করে বললেনঃ (না তোমরা হারামের বাইরে নও) বরং তোমরা হারামের ভিতরেই আছ। (সহিহ বুখারি ১৮৬৯)

২. আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলতেন, আমি যদি মদীনাতে কোন হরিণকে বেড়াতে দেখি তাহলে তাকে আমি তাড়াব না। (কেননা) আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার প্রস্তরময় পাহাড়ের দুই এলাকার মধ্যবর্তী এলাকা হল হারম বা সম্মানিত স্থান। (সহিহ বুখারি ১৮৭৩)

৩. আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ হে আল্লাহ! ইবরাহীম (আ.) তোমার বন্ধু ও নবী। তুমি মক্কাকে ইবরাহীম (আ.)-এর যবানীতে হারাম (সম্মানিত) ঘোষণা করেছো। হে আল্লাহ! আমিও তোমার বান্দা ও নবী। অতএব আমি মদীনাকে, তার দুপ্রস্তরময় জমীনের মধ্যস্থল হারাম ঘোষণা করছি। আবূ মারওয়ান (রাঃ) বলেন, ‘লাবাতাইহা’ শব্দের অর্থ মদীনার দু’প্রান্তের প্রস্তরময় ভূমি। (ইবনে মাজাহ ৩১১৩, তাহকীক আলবানীঃ সহীহ)।

৪. আলী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আল্লাহর কুরআন এবং তাঁর এ সহীফার মধ্যে যা লিখিত আছে তা ব্যতীত অন্য কিছু লিপিবদ্ধ করিনি। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনা ‘আয়ের’ থেকে ‘সাওর’ পর্যন্ত হারাম এলাকা। এখানে যদি কেউ বিদ‘আত করে কিংবা বিদ‘আতীকে আশ্রয় দেয়, তবে তার উপর আল্লাহ, সকল ফিরিশতা ও মানবকুলের অভিশাপ। তার কোনো ফরয বা নফল ইবাদাত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। তিনি আরো বলেছেনঃ সকল মুসলিমের নিরাপত্তা বিধান সমান গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি একজন সাধারণ ব্যক্তির নিরাপত্তাও। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের প্রদত্ত নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটাবে তার উপর আল্লাহ, সকল ফিরিশতা ও মানবকুলের অভিশাপ। তার কোনো ফরয বা নফল ‘ইবাদাত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আর যে ব্যক্তি কোনো কাওমের লোকদের অনুমতি ছাড়াই তাদের নেতা হয় তার উপর আল্লাহ, সকল ফিরিশতা ও মানবকুলের অভিশাপ। তার কোনো ফরয বা নফল ‘ইবাদাত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। (সহিহ বুখারি ১৮৭০ এবং সুনানে আবু দউদ ২০৩৪)

মসজিদে নববীতে প্রবেশের আদব

ক। পবিত্র হয়ে দোয়া পড়ে প্রবেশ করাঃ

আবাসস্থল থেকে উযূ-গোসল সেরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ধীরে-সুস্থে মসজিদে নববীর উদ্দেশ্যে গমন করবেন। আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ করবেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ করবেন। নিচের দো‘আ পড়তে পড়তে ডান পা দিয়ে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করবেন এবং বলবে,

«أَعُوذُ بِاللَّهِ العَظِيمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ، وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» [بِسْمِ اللَّهِ، وَالصَّلَاةُ] [وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ] «اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ».

অর্থঃ আমি মহান আল্লাহ্‌র কাছে তাঁর সম্মানিত চেহারা ও প্রাচীন ক্ষমতার ওসীলায় বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ্‌র নামে (প্রবেশ করছি), সালাত ও সালাম আল্লাহ্‌র রাসূলের উপর। “হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।

দলিলঃ

১. হাইওয়াহ ইবনু শুরায়িহ (রহঃ) বলেন, আমি ‘উক্ববাহ্ ইবনু মুসলিমের সাথে সাক্ষাত করে বলি, আমি জানতে পারলাম যে, আপনার নিকট ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) এর মাধ্যমে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এ হাদীস বর্ণনা করা হয়েছেঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশের সময় বলতেনঃ ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অতীব মর্যাদা ও চিরন্তন পরাক্রমশালীর অধিকারী মহান আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান হতে। ‘উক্ববাহ্ (রাঃ) বললেন, এতটুকুই? আমি বললাম, হ্যাঁ। ‘উক্ববাহ্ (রাঃ) বললেন, কেউ এ দু‘আ পাঠ করলে শয়তান বলে, এ লোকটি আমার (অনিষ্ট ও কুমন্ত্রণা) থেকে সারা দিনের জন্য বেঁচে গেল। (আবু দাউদ ৪৬৬)

২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশকালে বলতেনঃ আল্লাহ্‌র নামে (প্রবেশ) এবং আল্লাহ্‌র রাসূলকে সালাম। হে আল্লাহ্! আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য আপনার দয়ার দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিন। তিনি (মাসজিদ থেকে) বের হওয়ার সময় বলতেনঃ আল্লাহ্‌র নামে (প্রস্থান) এবং সালাম আল্লাহ্‌র রাসূলকে। হে আল্লাহ্! আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য আপনার অনুগ্রহের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দিন। (ইবনে মাজাহ ৭৭১)

খ। প্রবেশের পরই সালাত আদায় করাঃ

মসজিদে প্রবেশ করে যদি কোন দেখেন ফরয সালাতের জামাত চলছে তবে সরাসরি জামাতে অংশ নিন। আর যদি অন্য সময় প্রবেশ করেন তবে বসার আগেই দু’রাক‘আত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়বেন।

দলিলঃ 

১. আবূ কাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ তোমাদের কেউ মাসজিদে প্রবেশ করলে দু’ রাক’আত সলাত (তাহিয়্যাতুল-মাসজিদ) আদায় করার পূর্বে যেন না বসে। (সহিহ বুখারী ৪৪৪, ১১৬৭, তিরমিযী ৩১৬, নাসায়ী ৭৩০, আবূ দাঊদ ৪৬৭, ইবনু মাজাহ ১০১৩)

২. জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমা’আর দিন মিম্বারে উপবিষ্ট থাকা অবস্থায় সুলায়ক আল গাত্বাফানী মাসজিদে এসে (তাহিয়্যাতুল মাসজিদ) সলাত আদায় করার আগেই বসে পড়ল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেন, তুমি কি দু’ রাক‘আত সলাত আদায় করেছো? সে বলল, না। তিনি বলেন, তুমি উঠে দু’ রাক‘আত সলাত আদায় কর। (সহিহ মুসলিম ১৯০৮)

গ। সম্ভব হলে রাওযার সীমানার সালাত আদায় করবেনঃ

সম্ভব হলে রওযাতুন মিন রিয়াদিল জান্নাত সালাত আদায় করবেন কেননা সহিহ হাদিসে এই স্থানটি জান্নাতের অংশ বলা হয়েছে। তাই ফজিলত অর্জনের উদ্দেশ্যে রাওযার সীমানার মধ্যে এই নামায পড়বেন।

দলিলঃ

১. আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝখানের অংশটুকু রওযাতুন মিন রিয়াদিল জান্নাত (জান্নাতের উদ্যানসমুহের একটি উদ্যান)। (সহিহ বুখারী ১৮৮৮, ৬৫৮৮)

২. আবদুল্লাহ ইবন্‌ যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মধ্যস্থিত স্থান বেহেশতের বাগানসমূহের একটি বাগান। (সুনানে নাসাঈ ৬৯৫)

মন্তব্যঃ তবে এখানে প্রচুর ভীড় থাকে তাই সম্ভব না হলে মসজিদে নববীর যেখানে সম্ভব সেভাবেই পড়বেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মসজিদের এ অংশকে অন্যান্য অংশ থেকে পৃথক গুণে গুণান্বিত করা দ্বারা এ অংশের আলাদা ফযীলত ও বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করছে। আর সে শ্রেষ্ঠত্ব ও ফযীলত অর্জিত হবে কাউকে কষ্ট না দিয়ে সেখানে নফল নামায আদায় করা, আল্লাহর জিকির করা, কুরআন পাঠ করার দ্বারা।

ঘ। সব সময় সমানের কাতারে আদায়ের চেষ্টা করাঃ

যে কয়দিন মদিনা অবস্থান করবে, প্রতিদিন চেষ্টা থাকবে ফরজ সালাতের প্রথম কাতারগুলোতে সালাত আদায় করার চেষ্টা করা। কেননা সামনের কাতারে সালাত আদায়ের ফজিলত সহিহ হাদিসে প্রমানিত বিষয়।   

দলিলঃ

১. বারা’ বিন আযেব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ প্রথম কাতারের(নামাযীদের) উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। মুআয্‌যিনকে তার আযানের আওয়াযের উচ্চতা অনুযায়ী ক্ষমা করা হয়। তার আযান শ্রবণকারী প্রত্যেক সরস বা নীরস বস্তু তার কথার সত্যায়ন করে থাকে। তার সাথে যারা নামায পড়ে তাদের সকলের নেকীর সমপরিমাণ তার নেকী লাভ হয়।” (সুনানে নাসাঈ ৬৪৬)

২.  আবদুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ প্রথম কাতারের লোকদের উপর রহমত নাযিল করেন। (ইবনে মাজাহ ৯৯৯)

৩. উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদিন আমাদেরকে নিয়ে ফাজ্‌রের সলাত আদায় করলেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সালাম ফিরানোর পর বললেন, অমুক লোক কি হাযির আছে? সহাবীগণ বললেন, না। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পুণরায় বললেন, অমুক লোক কি হাযির আছে? সহাবীগণ বললেন, না। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সব সলাতের মাঝে এ দু’টি সলাত (ফাজ্‌র ও ‘ইশা) মুনাফিক্বদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য। তোমরা যদি জানতে এ দু’টি সলাতের মাঝে কত পুণ্য, তাহলে তোমরা হাঁটুর উপর ভর করে হলেও সলাতে আসতে। সলাতের প্রথম কাতার মালায়িকাহ্‌’র (ফেরেশ্‌তাদের) কাতারের মতো (মর্যাদাপূর্ণ)। তোমরা যদি প্রথম কাতারেরফাযীলাত জানতে তবে এতে অংশগ্রহণ করার জন্য তাড়াতাড়ি পৌছার চেষ্টা করতে। আর একা একা সলাত আদায় করার চেয়ে অন্য একজন লোকের সঙ্গে মিলে সলাত আদায় করা অনেক সাওয়াব। আর দু’জনের সাথে মিলে সলাত আদায় করলে একজনের সাথে সলাত আদায় করার চেয়ে অধিক সাওয়াব পাওয়া যায়। আর যত বেশী মানুষের সঙ্গে মিলে সলাত আদায় করা হয়, তা আল্লাহর নিকট তত বেশী প্রিয়। (মিসকাত ১০৬৬, আবূ দাঊদ ৫৫৫, নাসায়ী ৮৪৩)

সুন্নাহ অনুসরণে ফজিলত

সুন্নাহ অনুসরণে ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সুন্নাতের পরিচিতি

সুন্নাহ বা সুন্নাত (سُنَّة) একটি আবরি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হলো- ছবি, প্রতিচ্ছবি, প্রকৃতি, জীবন পদ্ধতি, কর্মধারা, রীতি, আদর্শ ইত্যাদি। ইসলামি শরিয়তে সুন্নাত বলতে বুঝায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দ্বারা নির্দেশিত জীবনব্যবস্থা যা অনুসরণের মাধ্যমে পার্থিব সফলতার সাথে সাথে মহান আল্লাহকে সন্তুষ্টি অর্জণ করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধান পূর্ণাঙ্গরূপে মুমিনের জীবনে বাস্তবায়নের সঠিক এবং একমাত্র নীতিমালার নামই হলো সুন্নাহ।

পরিভাষিক অর্থেঃ ইসলামি শরিয়তের যে সমস্ত বিধান রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে নির্ধারিত হয়েছে সেগুলোকে বলা হয় সুন্নাত৷ অর্থাৎ যে সকল আমল রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে করছেন বা যা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা অনুমোদন করছেন তাকে সুন্নাত বলা হয়৷ এই সুন্নাহ অনুসরণের গুরুত্ব অপরিসীম।

কুরআনে সুন্নাত শব্দটির ব্যবহৃত :

কুরআনে সুন্নাত (سُنَّة) শব্দটি বিভিন্ন অর্থে সরাসরি মোট ১৬ বার এসেছে। সুন্নাত (سُنَّة) শব্দটি আদর্শ, নিয়ম, রীতি, নীতি, বিধান, স্থায়ী নীতি, অনুসৃত রীতি ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

১. মহান আল্লাহ প্রদত্ত পদ্ধতি, রীতি-নীত ও বিধানকে বুঝাতে সুন্নাত ষব্দটি ব্যবহারঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

سُنَّۃَ اللّٰہِ الَّتِیۡ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلُ ۚۖ وَلَنۡ تَجِدَ لِسُنَّۃِ اللّٰہِ تَبۡدِیۡلًا

ইহাই আল্লাহর সুন্নাত (বিধান বা নিয়ম), প্রাচীনকাল হতে চলে আসছে। তুমি আল্লাহর এই সুন্নাতে (বিধান বা নিয়ম) কোন পরিবর্তন পাবেনা। (সুরা ফাতির ৪৮:২৩)

মহান আল্লাহ বলেন,

فَلَمۡ یَکُ یَنۡفَعُہُمۡ اِیۡمَانُہُمۡ لَمَّا رَاَوۡا بَاۡسَنَا ؕ  سُنَّتَ اللّٰہِ الَّتِیۡ قَدۡ خَلَتۡ فِیۡ عِبَادِہٖ ۚ  وَخَسِرَ ہُنَالِکَ الۡکٰفِرُوۡنَ 

তারা যখন আমার শাস্তি প্রত্যক্ষ করল তখন তাদের ঈমান তাদের কোন উপকারে এলোনা। এটা আল্লাহর সুন্নাহ (বিধান বা নিয়ম) যা পূর্ব হতেই তার বান্দাদের মধ্যে চলে আসছে এবং সেই ক্ষেত্রে কাফিরেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (সুর গাফির ৪০:৮৫)

মহান আল্লাহ বলেন,

 ؕ فَہَلۡ یَنۡظُرُوۡنَ اِلَّا سُنَّتَ الۡاَوَّلِیۡنَ ۚ فَلَنۡ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللّٰہِ تَبۡدِیۡلًا ۬ۚ وَلَنۡ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللّٰہِ تَحۡوِیۡلًا

তবে কি তারা পূর্ববর্তীদের বিধানের অপেক্ষা করছে? কিন্তু তুমি আল্লাহর সুন্নাতের (পদ্ধতি, রীতি, বিধান) কখনই কোন পরিবর্তন পাবে না এবং তুমি আল্লাহর সুন্নাতের (পদ্ধতি, রীতি, বিধান) কখনই কোন ব্যতিক্রমও দেখতে পাবে না। (সুরা ফাতির ৩৫:৪৩)

উপরের তিনটি আয়াতে সুন্নাতুল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সুন্নাতুল্লাহ বা আল্লাহর সুন্নাহ বলতে আল্লাহর বিধান বা আল্লাহর প্রকৃতির নিয়মকে বুঝান হয়। এই অর্থে আরও আছে সুরা সুরা বনীইসরাইল ১৭:৭৭, সুরা আহজাব ৩৩:৩৮, ৩৩:৬২।

২. পূর্ববর্তী জামানার মানুষদের রীতি-নীতি, আদর্শ, নিয়ম, পদ্ধতি বুঝাতে সুন্নাহ শব্দটি ব্যবহার

মহান আল্লাহ বলেন,

یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیُبَیِّنَ لَکُمۡ وَیَہۡدِیَکُمۡ سُنَنَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ وَیَتُوۡبَ عَلَیۡکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ

আল্লাহ চান তোমাদের জন্য বিস্তারিত বর্ণনা করতে, তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ববর্তীদের সুন্নাহ (আদর্শ) প্রদর্শন করতে এবং তোমাদের তাওবা কবূল করতে। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। (সুরা নিসা ৪:২৬)

মহান আল্লাহ বলেন,

قُلۡ لِّلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ یَّنۡتَہُوۡا یُغۡفَرۡ لَہُمۡ مَّا قَدۡ سَلَفَ ۚ وَاِنۡ یَّعُوۡدُوۡا فَقَدۡ مَضَتۡ سُنَّتُ الۡاَوَّلِیۡنَ

তুমি কাফিরদেরকে বল, তারা যদি অনাচার থেকে বিরত থাকে তাহলে তাদের পূর্বের অপরাধ যা হয়েছে তা আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কিন্তু তারা যদি অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি করে তাহলে পূর্ববর্তীদের সুন্নাততো (দৃষ্টান্ত বা অনুসৃত রীতি) রয়েছেই। (সুরা আনফাল ৮:৩৮)

মহান আল্লাহ বলেন,

قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ سُنَنٌ ۙ فَسِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَانۡظُرُوۡا کَیۡفَ کَانَ عَاقِبَۃُ الۡمُکَذِّبِیۡنَ

অবশ্যই তোমাদের পূর্বে অনেক সুন্নাহ (রীতি-নীতি) অতিবাহিত হয়েছে, অতএব তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর, দেখ অস্বীকারকারীদের পরিণতি কিরূপ হয়েছিল। (সুর আল ইমরান ৩:১৩৭)

 উপরের তিনটি আয়াতে পূর্ববর্তী জামানার মানুষদের রীতি-নীতি, আদর্শ, নিয়ম, পদ্ধতি বুঝাতে মহান আল্লাহ সুন্নাহ (سُنَّة)  শব্দটি ব্যবহার করছেন।  এই অর্থ আরও পাবেন, সুরা হিজর ১৫:১৩, সুরা কাহাব ১৮:৫৫।

হাদিসে সুন্নাত শব্দটির ব্যবহার :

১. হাদিসে ভালো মন্দ রীতি বা পদ্ধতি অর্থে সুন্নাহ শব্দটি ব্যবহার :

শাক্বীক্ব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রা.) বলেন-

كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا لَبِسَتْكُمْ فِتْنَةٌ يَهْرَمُ فِيهَا الْكَبِيرُ، وَيَرْبُو فِيهَا الصَّغِيرُ، وَيَتَّخِذُهَا النَّاسُ سُنَّةً، فَإِذَا غُيِّرَتْ قَالُوا: غُيِّرَتِ السُّنَّةُ “. قَالُوا: وَمَتَى ذَلِكَ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ؟ قَالَ: إِذَا كَثُرَتْ قُرَّاؤُكُمْ، وَقَلَّتْ فُقَهَاؤُكُمْ، وَكَثُرَتْ أُمَرَاؤُكُمْ، وَقَلَّتْ أُمَنَاؤُكُمْ، وَالْتُمِسَتِ الدُّنْيَا بِعَمَلِ الْآخِرَةِ

তোমাদের অবস্থা তখন কেমন হবে যখন ফিতনা তোমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলবে। ফিতনার মধ্যেই বড়রা বৃদ্ধ হবে এবং ছোটরা বেড়ে উঠবে। আর সেটিকেই লোকেরা সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করবে। যখন তা (ফিতনা) পরিবর্তন করা হবে, তখন লোকেরা বলবে, সুন্নাতকে পরিবর্তন করে ফেলা হল! তারা জিজ্ঞেস করল, হে আবু আব্দুর রহমান! এটা কখন ঘটবে? তিনি বললেন, যখন তোমাদের মধ্যে কুররা দরবেশের সংখ্যা বেশি হবে এবং ফকীহদের সংখ্যা কমে যাবে, নেতার সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং আমানতদারের সংখ্যা কমে যাবে এবং আখিরাতের আমলের দ্বারা দুনিয়া অন্বেষণ করা হবে।  সুনানে দামেরী : ১৯১

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَبْغَضُ النَّاسِ إِلَى اللهِ ثَلاَثَةٌ مُلْحِدٌ فِي الْحَرَمِ وَمُبْتَغٍ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَمُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٍّ لِيُهَرِيقَ دَمَهُ.

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত লোক হচ্ছে তিনজন। যে লোক হারাম শরীফে অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হয়। যে লোক ইসলামী যুগে জাহিলী যুগের সুন্নাত (নিয়ম পদ্ধতি) অন্বেষণ করে। যে লোক ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া কারো রক্তপাত দাবি করে। সহিহ বুখারি : ৬৮৮২

এই সকল হাদিসে বলতে সমাজে প্রচলিত ভালো মন্দ রীতি-নীতিকে বুঝান হয়েছে।

ইসলামি শরিয়তে সুন্নাত চারটি অর্থে ব্যবহৃত হয় থাকে :

১. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সামগ্রিক জীবনাদর্শকে সুন্নাত অর্থে ব্যবহার।

২. কুরআনের বাহিরে এর সকল শিক্ষাই সুন্নাত অর্থে ব্যবহার।

৩. সকল প্রকার ফরজ ওয়াজিব, নফল, মুবাহ আমলকে সুন্নাত অর্থে ব্যবহার।

৪. ইসলামী শরিয়তে অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন ঐচ্ছিক নেক আমলকে সুন্নাত অর্থে ব্যবহার।

১. রাসূলুল্লাহ এর সামগ্রিক জীবনাদর্শই সুন্নাতঃ

 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সকল আদেশ, নিষেধ, কথা, কর্ম, অনুমোদন, সম্মতি, মৌন সমর্থন যা সম্মানিত কিতাব কুরআনে বলা হয় নি তাই সুন্নাহ হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-

সাদ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন উসমান ইবনু মাযউন (রা.) এর স্ত্রী সংসর্গ পরিত্যাগের বিষয়টি (জানতে পারার পর) রাসূলুল্লাহ ﷺ তার নিকট লোক পাঠিয়ে ডেকে আনলেন। তখন তিনি বললেন:

يَا عُثْمَانُ إِنِّي لَمْ أُومَرْ بِالرَّهْبَانِيَّةِ أَرَغِبْتَ عَنْ سُنَّتِي قَالَ لَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ إِنَّ مِنْ سُنَّتِي أَنْ أُصَلِّيَ وَأَنَامَ وَأَصُومَ وَأَطْعَمَ وَأَنْكِحَ وَأُطَلِّقَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي يَا عُثْمَانُ إِنَّ لِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا وَلِعَيْنِكَ عَلَيْكَ حَقًّا قَالَ سَعْدٌ فَوَاللَّهِ لَقَدْ كَانَ أَجْمَعَ رِجَالٌ مِنْ الْمُسْلِمِينَ عَلَى أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنْ هُوَ أَقَرَّ عُثْمَانَ عَلَى مَا هُوَ عَلَيْهِ أَنْ نَخْتَصِيَ فَنَتَبَتَّلَ

“হে উসমান! আমাকে ’রাহবানিয়্যাত’ বা বৈরাগ্যের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তুমি কি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করছো?” তিনি বললেন, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি বললেন, “আমি (রাতে) সালাত আদায় করি, আবার ঘুমায়। আমি সিয়াম পালন করি, আবার আহার করি। আমি বিবাহ করি, আবার তালাক দিই। (এ সবই) আমার সুন্নাত। অতএব, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করবে, সে আমার দলভূক্ত নয়। হে উসমান! তোমার উপর তোমার পরিবারের হক্ব (অধিকার) রয়েছে, অনুরূপ তোমার উপর তোমার নিজের নফসের ও হক্ব (অধিকার) রয়েছে।”সা’দ বলেন, আল্লাহর কসম! মুসলিমদের বেশকিছু লোক এ ব্যাপারে একজোট হয়েছিলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি উসমান (রা.) এর বিষয়টি সমর্থন দেন, তবে আমরা খাসী হয়ে যাবো এবং বিয়ে বা নারী সংসর্গ পরিত্যাগ করবো। সুনানে দামেরী : ২২০৮

আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী ﷺ এর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী ﷺ এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবী ﷺ এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ ﷺ তাদের নিকট এলেন এবং বললেন,

آخَرُ أَنَا أَصُوْمُ الدَّهْرَ وَلاَ أُفْطِرُ وَقَالَ آخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلاَ أَتَزَوَّجُ أَبَدًا فَجَاءَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِلَيْهِمْ فَقَالَ أَنْتُمْ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا أَمَا وَاللهِ إِنِّي لأخْشَاكُمْ للهِ÷ وَأَتْقَاكُمْ لَه“ لَكِنِّي أَصُوْمُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي.

’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, আহমাদ : ১৩৫৩৪

২. কুরআনের বাহিরে এর সকল শিক্ষাই সুন্নাত :

মুআয (রা.)-এর সঙ্গীগণ হতে বর্ণিত আছে-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ مُعَاذًا إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ ‏”‏ كَيْفَ تَقْضِي ‏”‏ ‏.‏ فَقَالَ أَقْضِي بِمَا فِي كِتَابِ اللَّهِ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي كِتَابِ اللَّهِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَجْتَهِدُ رَأْيِي ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَفَّقَ رَسُولَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

রাসূলুল্লাহ ﷺ মুআয (রা.) কে ইয়ামানে পাঠান। তিনি প্রশ্ন করেন, তুমি কিভাবে বিচার করবে? তিনি বললেন, আমি আল্লাহ তাআলার কিতাব অনুসারে বিচার করব। তিনি বললেন, যদি আল্লাহ তা’আলার কিতাবে পাওয়া না যায়? তিনি বললেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাত অনুসারে বিচার করব। তিনি বললেন, যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাতেও না পাও? তিনি বললেন, আমার জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ করব। তিনি বললেন? সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ্ তা’আলার জন্য যিনি আল্লাহর রাসূলের প্রতিনিধিকে এইরূপ যোগ্যতা দান করেছেন। সুনানে তিরমিজি : ১৩২৭ হাদসির মান জঈফ

৩. সকল প্রকার ফরজ ওয়াজিব, নফল, মুবাহ আমলই সুন্নাত :

(১) ফরজ আমলকে সুন্নাহ বলা :

ব্যভিচারের শাস্তি প্রদান করা ইসলমি শরিয়তে ফরজ আমল কিন্তু আলী (রা.) এই শাস্তিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করেছেন।

أَنَّ عَلِيًّا حِينَ رَجَمَ الْمَرْأَةَ مِنْ أَهْلِ الْكُوفَةِ، ضَرَبَهَا يَوْمَ الْخَمِيسِ، وَرَجَمَهَا يَوْمَ الْجُمُعَةِ، وَقَالَ: أَجْلِدُهَا بِكِتَابِ اللهِ، وَأَرْجُمُهَا بِسُنَّةِ نَبِيِّ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

কুফাবাসী এক মহিলাকে আলী (রা.) (ব্যভিচারের দায়ে) যখন পাথর মেরে হত্যা করলেন, তখন বৃহস্পতিবারে তাকে বেত্ৰাঘাত করলেন এবং শুক্রবারে পাথর মেরে হত্যা করলেন। তিনি বললেন, তাকে বেত্ৰাঘাত করছি আল্লাহর কিতাবের আদেশে আর পাথর মারছি আল্লাহর নবীর সুন্নাত অনুসারে। মুসনাদে আহমাদ : ৭১৬, ৮৩৯, ৯৪১, ১৯৪২, ৯৭৮, ১১৮৫, ১১৯০, ১২১০, ১৩১৭

সফরে সালাত কসর করা ফরজ হলেও ইবনু আব্বাসকে (রা.) কসর সালাতকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাত নামে আখ্যায়িত করছেন।

মুসা ইবনু সালামাহ আল হুযালী (রহ.) থেকে বর্ণিত-

سَأَلْتُ ابْنَ عَبَّاسٍ كَيْفَ أُصَلِّي إِذَا كُنْتُ بِمَكَّةَ إِذَا لَمْ أُصَلِّ مَعَ الإِمَامِ ‏.‏ فَقَالَ رَكْعَتَيْنِ سُنَّةَ أَبِي الْقَاسِمِ ﷺ

তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) কে জিজ্ঞেস করলাম, আমি মক্কায় অবস্থানকালে যদি ইমামের পিছনে সালাত আদায় না করি তাহলে কীভাবে সালাত আদায় করব। জবাবে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বললেন, দুই রাকাআত সালাত আদায় করবে। এটি আবূল কাসিম ﷺ এর সুন্নাত। সহিহ মুসলিম : ৬৮৮

(২) ওয়াজিব আমলকে সুন্নাহ বলা :

মানত করা মাকরুহ হলেও নেক কাজের মানত আদায় করা ওয়াজিব। এই ওয়াজিব আমল বুঝাতে  হাদিসে সুন্নাত শব্দটি উল্লেখ করছেন। ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। উবাইদুল্লাহ্ ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) কে ইবনু আব্বাস (রা.) জানিয়েছেন যে-

أَنَّ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ الأَنْصَارِيَّ اسْتَفْتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فِي نَذْرٍ كَانَ عَلَى أُمِّهِ فَتُوُفِّيَتْ قَبْلَ أَنْ تَقْضِيَهُ فَأَفْتَاهُ أَنْ يَقْضِيَهُ عَنْهَا فَكَانَتْ سُنَّةً بَعْدُ

সাদ ইবনু উবাদাহ আনসারী (রা.) নবী ﷺ এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন তাঁর মায়ের কোন এক মানতের ব্যাপারে, যা আদায় করার আগেই তিনি ইনতিকাল করেন। তখন নবী ﷺ তাকে তার মায়ের পক্ষ থেকে মানত পূর্ণ করার আদেশ দিলেন। পরবর্তীতে এটাই সুন্নাত হয়ে গেল। সহিহ বুখারি : ৬৬৯৮

এক হাদিসে তাকবীরে তাহরীমাসহ সকল তাকবীরকেই ইবনু আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাত নামে আখ্যায়িত করছেন।

(৩) সালাতের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত সকল আমলকেই সুন্নাহ বলা :

আবূ মুসা আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم خَطَبَنَا فَعَلَّمَنَا سُنَّتَنَا وَبَيَّنَ لَنَا صَلاَتَنَا فَقَالَ ‏”‏ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاَةِ فَأَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ ثُمَّ لْيَؤُمَّكُمْ أَحَدُكُمْ فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا وَإِذَا قَالَ ‏(‏ وَلاَ الضَّالِّينَ ‏)‏ فَقُولُوا آمِينَ يُجِبْكُمُ اللَّهُ ثُمَّ إِذَا كَبَّرَ وَرَكَعَ فَكَبِّرُوا وَارْكَعُوا فَإِنَّ الإِمَامَ يَرْكَعُ قَبْلَكُمْ وَيَرْفَعُ قَبْلَكُمْ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ نَبِيُّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ فَتِلْكَ بِتِلْكَ

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সামনে (একদিন) খুতবায় আমাদের সুন্নাত শিক্ষা দিলেন, আমাদের সালাত সম্পর্কে বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, তোমরা যখন সালাতে দাঁড়াবে তখন তোমাদের কাতার সোজা করে নেবে। তারপর তোমাদের একজন তোমাদের ইমামতি করবে। যখন সে তাকবীর বলবে, তোমরাও তাকবীর বলবে আর যখন সে ’ওয়ালাদদ্বাল্লীন’ বলবে, তোমরা তখন ’আমীন’ বলবে, আল্লাহ তোমাদের দোয়া কবুল করবেন। তারপর যখন সে তাকবীর বলে রুকুতে যাবে তখন তোমরাও তাকবীর বলে রুকুতে যাবে। কেননা, ইমাম তোমাদের পুর্বে রুকুতে যাবে এবং তোমাদের পুর্বে-রুকু থেকে উঠবে। নবী ﷺ বললেন, তার (ইমামের রুকুতে তোমাদের আগে যাওয়া ও তোমাদের আগে উঠার) সমান হয়ে যাবে।  সুনানে নাসায়ী : ১২৮৩ ইফাঃ আংশিক

(৪) মুবাহ কাজকেও সুন্নাহ বলা :

সালাত আদায়ের জন্য সাধারণত তিন টুকরা কারড় পরিধান করা হয়। শরীরের নিম্নাঙ্গের জন্য একটি, উর্ধ্বাঙ্গের জন্য একটি ও মাথা আবৃত করার জন্য একটি। সকলেই একমত যে, এইরূপ পোশাকই উত্তম। শুধু সতর ঢাকা পরিমান পোশাক (নাভি থেকে হাটু) পোশাকেও সালাত আদায় হয়ে যাবে। তবে এই কাজটি মুবাহ। তাসত্ত্বেও কোনো কোনো সাহাবী শুধু সতর ঢাকা পরিমান পোশাক (নাভি থেকে হাটু) পোশাক পরিধান করে সালাত আদায়কে সুন্নাত বলেছেন।

উবাই ইবনু কা’ব (রা.) বলেন-

الصَّلاةَ فِي التَّوْبِ الْوَاحِدِ سُنَّةٌ كُنَّا نَفْعَلُهُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَلَا يُعَابُ فِي الثَّيَابِ قِلَّةٌ فَأَمَّا إِذْ وَسَّعَ اللَّهُ إِذْ كَانَ عَلَيْنَا. فَقَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ إِنَّمَا كَانَ ذَاكَ فَالصَّلَاةُ فِي التَّوْبَيْنِ أَزْكَى.

শুধু এক কাপড়ে সালাত আদায় করা সুন্নাত, আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে এভাবে এক কাপড়ে সালাত

আদায় করতাম, এজন্য আমাদেরকে কোনো দোষ দেওয়া হতো না। তখন ইবনু মাসউদ (রা.) বলেন, সে সময়ে কাপড় চোপড়ের কমতির কারণে এভাবে সালাত আদায় করা হতো। এখন যেহেতু আল্লাহ প্রাচুর্য প্রদান করেছেন সেহেতু দুটি কাপড়ে সালাত আদায় করা উত্তম।  মুসনাদে আহমদ : ২০৭৬৯

৪. ইসলামী শরিয়তে অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন ঐচ্ছিক নেক আমলই সুন্নাতঃ

ইবাদতের ক্ষেত্রে ফরজ ও ওয়াজিব আমলের পরবর্তী ধাপের আমল হলো সুন্নাত। যে আমল আবশ্যকীয় নয় কিন্তু করা উত্তম ও প্রয়োজন। আমাদের সমাজে সুন্নাত বলতে আমলকেই বুঝে থাকে। গুরুত্ব বিবেচনা করে ফরজ ও ওয়াজির আমলের পর যে আমল নির্ধারণ করা হয় তাই সুন্নাত। সাহাবিগণ কখনো কখনো ফরজ বা আবশ্যকীয় বিষয়ের অনিরিক নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় আমল যা রাসুলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন তাকে সুন্নাত বলেছেন। পরবর্তীতে এই সকল আমলকে মুহাদ্দিসগণ ওয়াজিবা বা সুন্নাহ বলেছেন। যেমন-

আলী (রাঃ) বলেছেন-

إِنَّ الْوَتْرَ لَيْسَ بِحَتْمٍ، وَلَكِنَّهُ سُنَّةٌ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَإِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ، وِتْرٌ يُحِبُّ الْوَتْرَ

বিতর বাধ্যতামূলক নয়। ওটা রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি সুন্নাত। আল্লাহ বেজোড় তাই বেজোড় অর্থাৎ বিতর ভালোবাসেন। মুসনাদে আহমাদ : ৭৮৬

এই হাদিসে ফরজ কাজের অতিরিক্ত কর্মকে সুন্নাহ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

আসেম ইবনু দমরা আস-সালূলী (রহ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বলেছেন,

إِنَّ الْوِتْرَ لَيْسَ بِحَتْمٍ وَلاَ كَصَلاَتِكُمُ الْمَكْتُوبَةِ وَلَكِنْ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ أَوْتَرَ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ ‏ “‏ يَا أَهْلَ الْقُرْآنِ أَوْتِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ وِتْرٌ يُحِبُّ الْوِتْرَ

নিশ্চয় বিতর বাধ্যতামূলক সালাত নয় এবং তোমাদের ফরজ সালাতের সম-পর্যায়ভুক্তও নয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ বিতরের সালাত আদায় করেছেন, অতঃপর বলেছেন, হে আহলে কুরআন! তোমরা বিতরের সালাত পড়ো। নিশ্চয় আল্লাহ বিতর (বেজোড়), তিনি বিতরকে ভালবাসেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১১৬৯, সুনানে তিরমিযী : ৪৫৩-৫৪, সুনানে নাসায়ী : ১৬৭৫-৭৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ১৪১৬

কুরআনের আলোকে রাসূল এর সুন্নাহ অনুসরণের গুরুত্ব :

মুসলিমদের জীবনে সুন্নাহর গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম মানে কুরআন আর সুন্নাহ একটি বাদ দিয়ে অপরটি মানা যাবে না। কুনআনের বিভিন্ন আয়াতে মাহান আল্লাহ যেভাবে তার আদেশ পালন করতে বলেছেন ঠিক তেমনিভাবে রাসূল ﷺ এর আদেশ নিষেধ পালন করতে বলেছেন। কুরআন ও সুন্নাহ একটি অপরটির সম্পূরক ও অবিচ্ছেদ্য মূল উৎস। দুটির কোনোটিকেই অস্বীকার করা যাবে না। যদি কোনো ব্যক্তি একটিকে স্বীকার করে এবং অপরটিকেও অস্বীকার করল, তবে সে ইসলাম ধর্মের প্রতি মিথ্যারোপ করল। কুরআনে বহু আয়াতে আল্লাহ রাসূল এর অনুগত্য ও অনুসরণ ফরজ করেছেন। তার অনুগত্য ত্যাগ করাকে কুফরি বলে উল্লেথ করেছেন। অপর পক্ষে তার অনুসরণের পুরস্কার হিসেবে জান্নাত প্রদানের ঘোষন করেছেন। নিচে এমনই কিছু আয়াত তুলে ধরছি।

১. রাসূল এর আনুগত্য করা ফরজ :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَ‌ۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَـٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظً۬ا

অর্থ : যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিলো, যাই হোক, তাদের ওপর তো আমি তোমাকে পাহারাদার বানিয়ে পাঠাইনি৷ সূরা নিসা : ৮০

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ

তোমরা যদি মু’মিন হয়ে থাক তবে তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য কর”। সূরা আনফাল : ১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ وَلَا تَوَلَّوۡاْ عَنۡهُ وَأَنتُمۡ تَسۡمَعُونَ

অর্থ : হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো এবং হুকুম শোনার পর তা অমান্য করো না৷ সুরা আনফাল : ২০

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

২. রসূল কে অস্বীকার করা কুফরি :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَكۡفُرُونَ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُواْ بَيۡنَ ٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَيَقُولُونَ نُؤۡمِنُ بِبَعۡضٍ۬ وَنَڪۡفُرُ بِبَعۡضٍ۬ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُواْ بَيۡنَ ذَٲلِكَ سَبِيلاً

অর্থ : যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের সাথে কুফরী করে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলদের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় এবং বলে আমরা কাউকে মানবো ও কাউকে মানবো না আর কুফর ও ঈমানের মাঝখানে একটি পথ বের করতে চায়।  সূরা নিসা : ১৫০

৩. রসূল এর বিরোধীতা কারিদের অপদস্থ করা হবে :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحَآدُّونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ كُبِتُواْ كَمَا كُبِتَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ‌ۚ وَقَدۡ أَنزَلۡنَآ ءَايَـٰتِۭ بَيِّنَـٰتٍ۬‌ۚ وَلِلۡكَـٰفِرِينَ عَذَابٌ۬ مُّهِينٌ۬

অর্থ : যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে তাদেরকে অপদস্থ করা হবে যেভাবে অপদস্থ করা হয়েছিল তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। আর আমি নাযিল করেছি সুস্পষ্ট প্রমাণাদি। আর কাফিরদের জন্য রয়েছে অপমানজনক আযাব। সূরা মুজাদিলা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُ ۥ يُدۡخِلۡهُ نَارًا خَـٰلِدً۬ا فِيهَا وَلَهُ ۥ عَذَابٌ۬ مُّهِينٌ۬

অর্থ :আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানি করবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে যাবে, তাকে আল্লাহ আগুনে ফেলে দেবেন৷ সেখানে সে থাকবে চিরকাল, আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা ও অপমানজনক শাস্তি৷ সূরা নিসা : ১৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

ذَٲلِكَ بِأَنَّهُمۡ شَآقُّواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ‌ۚ وَمَن يُشَاقِقِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ فَإِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ

অর্থ : এটি এ কারণে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করেছে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। সূরা আনফাল : ১৩

৪. সুন্নাহ বিরোধীগণ কিয়ামতের দিন আফসস করবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَيَوۡمَ يَعَضُّ ٱلظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيۡهِ يَقُولُ يَـٰلَيۡتَنِى ٱتَّخَذۡتُ مَعَ ٱلرَّسُولِ سَبِيلاً۬

অর্থ : জালেমরা সেদিন নিজেদের হাত কামড়াতে থাকবে এবং বলতে থাকবে, “হায় ! যদি আমি রসুলের সহযোগী হতাম৷ সুরা ফুরকান : ২৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

يَوۡمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمۡ فِى ٱلنَّارِ يَقُولُونَ يَـٰلَيۡتَنَآ أَطَعۡنَا ٱللَّهَ وَأَطَعۡنَا ٱلرَّسُولَا۟

অর্থ : যেদিন তাদের চেহারা আগুনে ওলট পালট করা হবে তখন তারা বলবে “হায়! যদি আমরা আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করতাম”৷ সুরা আহজাব : ৬৬

৫।  সুন্নাহ বিহীন আমল ধ্বংস হয়ে যাবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَلَا تُبۡطِلُوٓاْ أَعۡمَـٰلَكُمۡ

অর্থ : হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের আমল ধ্বংস করো না৷ সুরা মুহম্মাদ : ৩৩

৬. রসূল এর ফায়সালার সামনে মুমিনের কোন স্বাধীনতা নাই :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا

 অর্থ : যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সূরা আহযাব : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَإِذَا دُعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَہُمۡ إِذَا فَرِيقٌ۬ مِّنۡہُم مُّعۡرِضُونَ (٤٨) وَإِن يَكُن لَّهُمُ ٱلۡحَقُّ يَأۡتُوٓاْ إِلَيۡهِ مُذۡعِنِينَ () أَفِى قُلُوبِہِم مَّرَضٌ أَمِ ٱرۡتَابُوٓاْ أَمۡ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ ٱللَّهُ عَلَيۡہِمۡ وَرَسُولُهُ ۥ‌ۚ بَلۡ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ

অর্থ : যখন তাদেরকে ডাকা হয় আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দিকে, যাতে রসূল তাদের পরস্পররে মোকদ্দমার ফায়সালা করে দেন তখন তাদের মধ্যকার একটি দল পাশ কাটিয়ে যায়। তবে যদি সত্য তাদের অনুকূল থাকে, তাহলে বড়ই বিনীত হয়ে রসূলের কাছে আসে। তাদের মনে কি (মুনাফিকীর ) রোগ আছে? না তারা সন্দেহের শিকার হয়েছে? না তারা ভয় করছে আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাদের প্রতি যুলুম করবেন? আসলে তারা নিজেরাই যালেম। সূরা নুর : ৪৮-৫০

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا

কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ তারা মুমিন হবে না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদের বিষয় মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর, তোমার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কিছু মাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, আর তারা তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে। সূরা নিসা : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

إِنَّمَا كَانَ قَوۡلَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذَا دُعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ لِيَحۡكُمَ بَيۡنَهُمۡ أَن يَقُولُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ

মু’মিনদেরকে যখন তাদের মাঝে ফায়সালা করার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে ডাকা হয়, তখন মু’মিনদের জওয়াব তো এই হয় যে, তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম, আর তারাই সফলকাম”। সূরা নূর : ৫১

৭. আল্লাহর রসূল এর আনুগত্যের করবেনা তারা কাফির

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ‌ۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ ٱلۡكَـٰفِرِينَ

অর্থ : বলুন, আল্লাহ আনুগত্য প্রকাশ কর এবং তাঁর রসূলদের আনুগত্য প্রকাশ কর। বস্তত, তারা যদি বিমুখতা অবলম্ভন করে, তা হলে আল্লাহ কাফিরদের ভালোবাসবেন না। সূরা আল ইমরান : ৩২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَيَقُولُونَ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلرَّسُولِ وَأَطَعۡنَا ثُمَّ يَتَوَلَّىٰ فَرِيقٌ۬ مِّنۡہُم مِّنۢ بَعۡدِ ذَٲلِكَ‌ۚ وَمَآ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থ : তারা বলে, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহ ও রসূলের প্রতি এবং আমরা আনুগত্য স্বীকার করেছি কিন্তু এরপর তাদের মধ্য থেকে একটি দল (আনুগত্য থেকে ) মুখ ফিরিয়ে নেয় ৷ এ ধরনের লোকেরা কখনোই মু’মিন নয়। সূরা নুর : ৪৭

৮. সুন্নাহর অনুসরণই একমাত্র হিদায়াত প্রাপ্তির পথ

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَإِن تُطِيعُوهُ تَهۡتَدُواْۚ وَمَا عَلَى ٱلرَّسُولِ إِلَّا ٱلۡبَلَٰغُ ٱلۡمُبِينُ ٥٤

অর্থঃ আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তবে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। সূরা নূর : ৫৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

 وَأَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ ١٣٢

“আল্লাহর ও রাসূলের হুকুম মান্য কর, যাতে তোমরা কৃপা প্রাপ্ত হতে পার”। ( আলে ইমরান, ৩:১৩২)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

 وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَخۡشَ ٱللَّهَ وَيَتَّقۡهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَآئِزُونَ ٥٢ 

অর্থ : আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই কৃতকার্য। (সুরা নূর ২৪:৫২)।

৯. সুন্নাহর বিরোধীতাকারি জাহান্নামি

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَمَن يُشَاقِقِ ٱلرَّسُولَ مِنۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ ٱلۡهُدَىٰ وَيَتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيلِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ نُوَلِّهِۦ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصۡلِهِۦ جَهَنَّمَ‌ۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا

অর্থ : আর যে রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার জন্য হিদায়াত প্রকাশ পাওয়ার পর এবং মুমিনদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে ফেরাব যেদিকে সে ফিরে এবং তাকে প্রবেশ করাব জাহান্নামে। আর আবাস হিসেবে তা খুবই মন্দ।  সূরা নিসা : ১১৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَمَآ ءَاتَٮٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَہَٮٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْ‌ۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ‌ۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ

অর্থ : রসূল যা কিছু তোমাদের দেন তা গ্রহণ করো এবং যে জিনিস থেকে তিনি তোমাদের বিরত রাখেন তা থেকে বিরত থাকো৷ আল্লাহকে ভয় করো৷ আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা৷  সুরা হাসর : ৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

ذَٲلِكَ بِأَنَّہُمۡ شَآقُّواْ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ‌ۖ وَمَن يُشَآقِّ ٱللَّهَ فَإِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ

অর্থ : এ হওয়ার কারণ হলো, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের চরম বিরোধিত করেছে৷ যে ব্যক্তিই আল্লাহর বিরোধিতা করে, তাকে শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর৷  সুরা হাসর :৪

১০. রসূল এর আনুগত্য করলে সঠিক পথ পাওয়া যাবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ‌ۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا عَلَيۡهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيۡڪُم مَّا حُمِّلۡتُمۡ‌ۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهۡتَدُواْ‌ۚ وَمَا عَلَى ٱلرَّسُولِ إِلَّا ٱلۡبَلَـٰغُ ٱلۡمُبِينُ

অর্থ : বলঃ তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর; অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী; এবং তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎ পথ পাবে, রাসূলের দায়িত্বতো শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। সূরা নুর : ৫৪

১। মতভেদ দেখা দিলে সুন্নাহর দিকে ফিরে আসতে হবে :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِى ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡ‌ۖ فَإِن تَنَـٰزَعۡتُمۡ فِى شَىۡءٍ۬ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأَخِرِ‌ۚ ذَٲلِكَ خَيۡرٌ۬ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلاً

অর্থ : হে ঈমানগারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী৷ এরপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন ব্যাপারে বিরোধ দেখা দেয় তাহলে তাকে আল্লাহ ও রসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও৷ যদি তোমরা যথার্থই আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান এনে থাকো ৷ এটিই একটি সঠিক কর্মপদ্ধতি এবং পরিণতির দিক দিয়েও এটিই উৎকৃষ্ট৷ সূরা নিসা : ৫৯

 ২. সুন্নাহ-ই মু’মিন জীবনের একমাত্র আদর্শ :

আল্লাহর রাসূল ﷺ  মুমিনের একমাত্র অনুকরনীয় আদর্শ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

 لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِي رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٞ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرٗ

অর্থ : তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের আশা রাখে আর আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে”। সূরা আনফাল : ২৪

﴿ وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤

অর্থ : তুমি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। সূরা কলম : ৪

৩. আল্লাহর ভালবাসা পেকে সুন্নাহর অনুসরণ ফরজ :

আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে, রাসূল ﷺ এর অনুসরণেন কোন বিকল্প নাই। রাসূল ﷺ এর ইত্তেবার মাধ্যমেই আল্লাহর ভালোবাসা লাভ হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সূরা আল ইমরান : ৩১

১৪. রসূল এর প্রতি ঈমান আনা ফরজ

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَاٰمِنُوۡا بِرَسُوۡلِہٖ یُؤۡتِکُمۡ کِفۡلَیۡنِ مِنۡ رَّحۡمَتِہٖ وَیَجۡعَلۡ لَّکُمۡ نُوۡرًا تَمۡشُوۡنَ بِہٖ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ؕ  وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ۚۙ

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি স্বীয় রহমতে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন, আর তোমাদেরকে নূর দেবেন যার সাহায্যে তোমরা চলতে পারবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা হাদিদ : ২৮

১৫. রসূল এর প্রতি ঈমান আনলে পরকালে বিরাট পুরস্কার পাবে :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَرُسُلِہٖۤ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الصِّدِّیۡقُوۡنَ ٭ۖ  وَالشُّہَدَآءُ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ؕ  لَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ وَنُوۡرُہُمۡ ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ 

আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান আনে, তারাই তাদের রবের নিকট সিদ্দীক ও শহীদ। তাদের জন্য রয়েছে তাদের প্রতিফল এবং তাদের নূর। আর যারা কুফরী করে এবং আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী। সুরা হাদিদ : ১৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

ءَامِنُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَأَنفِقُواْ مِمَّا جَعَلَكُم مُّسۡتَخۡلَفِينَ فِيهِ‌ۖ فَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَأَنفَقُواْ لَهُمۡ أَجۡرٌ۬ كَبِيرٌ۬

অর্থ : আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং ব্যয় কর সে জিনিস যার প্রতিনিধিত্বমূলক মালিকানা তিনি তোমাদের দিয়েছেন৷  তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও অর্থ -সম্পদ খরচ করবে তাদের জন্য বড় প্রতিদান রয়েছে৷  সুরা হাদিদ : ৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتُجَـٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ بِأَمۡوَٲلِكُمۡ وَأَنفُسِكُمۡ‌ۚ ذَٲلِكُمۡ خَيۡرٌ۬ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ

অর্থ : তোমরা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ও জান-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করো এটাই তোমাদের জন্য অতিব কল্যাণকর যদি তোমরা তা জান৷ সুরা সফ : ১১

১৬. রসূল   আহবানে সাড়া দিলে বা তার হুকুম মানলে মহাপুরস্কার :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

ٱلَّذِينَ ٱسۡتَجَابُواْ لِلَّهِ وَٱلرَّسُولِ مِنۢ بَعۡدِ مَآ أَصَابَہُمُ ٱلۡقَرۡحُ‌ۚ لِلَّذِينَ أَحۡسَنُواْ مِنۡہُمۡ وَٱتَّقَوۡاْ أَجۡرٌ عَظِيمٌ

অর্থ : আহত হবার পরও যারা আল্লাহ ও রসূলের আহবানে সাড়া দিয়েছে, তাদের মধ্যে যারা সৎ-নেককার ও মুত্তাকী তাদের জন্য রয়েছে বিরাট প্রতিদান৷ আর যাদেরকে।  সূরা আল ইমরান : ১৭২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ وَيَخۡشَ ٱللَّهَ وَيَتَّقۡهِ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡفَآٮِٕزُونَ

অর্থ : আর সফলকাম তারাই যারা আল্লাহ ও রসূলের হুকুম মেনে চলে এবং আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী করা থেকে দূরে থাকে। সূরা নুর : ৫২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱللَّهِ وَرُسُلِهِۦ وَلَمۡ يُفَرِّقُواْ بَيۡنَ أَحَدٍ۬ مِّنۡہُمۡ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ سَوۡفَ يُؤۡتِيهِمۡ أُجُورَهُمۡ‌ۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورً۬ا رَّحِيمً۬ا

অর্থ : বিপরীত পক্ষে যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলদেরকে মেনে নেয় এবং তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করে না, তাদেরকে আমি অবশ্যি তা পুরস্কার দান করবো৷  আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও করুণাময়৷ সূরা নিসা : ১৫২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

 تِلۡكَ حُدُودُ ٱللَّهِۚ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَذَٰلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ

অর্থ : এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তার  রাসূলের হুকুম অনুযায়ী চলবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত, তারা তাতে চিরকাল থাকবে এবং এটা বিরাট সাফল্য”। নিসা, আয়াত : ১৩

১৭. সুন্নাহর অনুগত্যে বিরাট পুরস্কার :

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ فَأُوْلَٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّ‍ۧنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّٰلِحِينَۚ وَحَسُنَ أُوْلَٰٓئِكَ رَفِيقٗا ٦٩

অর্থঃ  যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা নবী, সিদ্দিক, শহীদ এবং নেককার লোকদের সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন, তারা কতই না উত্তম সঙ্গী! নিসা : ৬৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

لَّيۡسَ عَلَى ٱلۡأَعۡمَىٰ حَرَجٌ۬ وَلَا عَلَى ٱلۡأَعۡرَجِ حَرَجٌ۬ وَلَا عَلَى ٱلۡمَرِيضِ حَرَجٌ۬‌ۗ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّـٰتٍ۬ تَجۡرِى مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡہَـٰرُ‌ۖ وَمَن يَتَوَلَّ يُعَذِّبۡهُ عَذَابًا أَلِيمً۬ا

অর্থ : যদি অন্ধ, পংগু ও রোগাক্রান্ত লোক জিহাদে না আসে তাহলে কোন দোষ নেই৷  যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে সেসব জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেসবের নিম্নদেশে ঝর্ণাধারাসমূহ প্রবাহমান থাকবে৷ আর যে মুখ ফিরিয়ে থাকবে আল্লাহ তাকে মর্মান্তিক আযাব দেবেন৷ সুরা ফাতহা : ১৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

تِلۡكَ حُدُودُ ٱللَّهِ‌ۚ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ يُدۡخِلۡهُ جَنَّـٰتٍ۬ تَجۡرِى مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَـٰرُ خَـٰلِدِينَ فِيهَا‌ۚ وَذَٲلِكَ ٱلۡفَوۡزُ ٱلۡعَظِيمُ

অর্থ : এগুলো আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা ৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের অনুগত্য করবে, তাকে আল্লাহ এমন বাগীচায় প্রবেশ করাবেন, যার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত হবে, সেখানে তারা থাকবে চিরকাল৷ এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য ৷   সূরা নিসা : ১৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ لَعَلَّڪُمۡ تُرۡحَمُونَ (٥٦) لَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مُعۡجِزِينَ فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۚ وَمَأۡوَٮٰهُمُ ٱلنَّارُ‌ۖ وَلَبِئۡسَ ٱلۡمَصِيرُ (٥٧)

অর্থঃ নামায কায়েম করো, যাকাত দাও এবং রসূলের আনুগত্য করো, আশা করা যায়, তোমাদের প্রতি করুণা করা হবে ৷ (সূরা নুর ২৪:৫৬)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

يُصۡلِحۡ لَكُمۡ أَعۡمَـٰلَكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۗ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِيمًا

অর্থ : আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ ঠিকঠাক করে দেবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ মাফ করে দেবেন৷ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে সে বড় সাফল্য অর্জন করে৷ সুরা আহজাব : ৭১

উল্লেখিত আয়াতগুলো দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, হিদায়াত ও রহমত একমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ করার মধ্যেই নিহিত। কুরআন ষ্পষ্ট ঘোষণা হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য বা তার সুন্নাহর অনুসরণ করার মাধ্যমেউ হিদায়েত।

সহিহ হাদিসের আলোকে সুন্নাহ অনুসরণের ফজিলত :

১. সুন্নাহ তথা এর আদেশ ও নিষেধ-ই চুড়ান্ত :

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

আমি তোমাদেরকে যা আদেশ দেই, তোমরা তা গ্রহণ করো এবং যে বিষয়ে তোমাদেরকে নিষেধ করি তা থেকে বিরত থাকো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ০১, সুনানে তিরমিযী : ২৬৭৯, আহমাদ ৭৩২০, ৭৪৪৯, ৮৪৫০, ৯২২৯,

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যে সম্পর্কে তোমাদের বলিনি, সে সম্পর্কে তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করো না। কারণ তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতগণ তাদের নবীগণের নিকট অধিক প্রশ্নের কারণে এবং তাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ধ্বংস হয়েছে। অতএব আমি তোমাদেরকে কোন বিষয়ের নির্দেশ দিলে তোমরা তা যথাসাধ্য পালন করো এবং কোন বিষয়ে আমি তোমাদের নিষেধ করলে তা থেকে তোমরা বিরত থাকো। সহিহ বুখারি : ৭২৮৮, সহিহ মুসলিম ১৩৩৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ০২

২. সুন্নাহ অনুসরণ ছাড়া জান্নাতে যাওয়া যাবে না :

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلاَّ مَنْ أَبَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى.

অর্থ : আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে। সহিহ বুখারি : ৭২৮০, মিশকাত : ১৪৩, সহীহ আল জামি : ৪৫১৩, আহমাদ ৮৭২৮, সহীহাহ : ৩১৪১

৩. সর্বোত্তম পথ হল রসূলুল্লাহ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত পথ :

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ وَخَيْرَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ

অতঃপর নিশ্চয়ই সর্বোত্তম বাণী হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দীনে নতুন জিনিস সৃষ্টি করা এবং সব নতুন সৃষ্টিই গুমরাহী। মিশকাত : ১৪১, ইবনু মাজাহ : ৪৫, নাসায়ী : ১৫৭৮, সহীহ ইবনু খুযাইমাহ : ১৭৮৫।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুতবাহ দিতেন তখন তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করত, কণ্ঠস্বর জোরালো হ’ত এবং তার রাগ বেড়ে যেত, এমনকি মনে হ’ত, তিনি যেন শত্রুবাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করছেন আর বলছেনঃ তোমরা ভোরেই আক্রান্ত হবে, তোমরা সন্ধ্যায়ই আক্রান্ত হবে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলতেন, আমি ও কিয়ামত এ দুটির ন্যায় (স্বল্প ব্যবধান) প্রেরিত হয়েছি, তিনি মধ্যম ও তর্জনী আঙ্গুল মিলিয়ে দেখাতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলতেন, অতঃপর উত্তম বাণী হল- আল্লাহর কিতাব এবং উত্তম পথ হল মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত পথ। অতীব নিকৃষ্ট বিষয় হল (ধর্মের মধ্যে) নতুন উদ্ভাবন (বিদআত)। প্রতিটি বিদ’আদ ভ্রষ্ট। তিনি আরো বলতেনঃ আমি প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তির জন্য তার নিজের থেকে অধিক উত্তম। কোন ব্যক্তি সম্পদ রেখে গেলে তা তার পরিবার-পরিজনের প্রাপ্য। আর কোন ব্যক্তি ঋণ অথবা অসহায় সন্তান রেখে গেলে সেগুলোর দায়িত্ব আমার। সহিহ মুসলিম ৮৬৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ১০, সহীহ আত তারগীব : ৫০, বুলূগুল মারাম : ৪৪৮, দারেমী : ২০৬

৪. সুন্নাহ আকড়ে ধরলে কেউ পথভ্রষ্ট হবে না :

মালিক ইবনু আনাস (রাঃ) (রহঃ) হতে মুরসালরূপে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ رَسُولِهِ «.

আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস। [ইমাম মালিক মুয়াত্ত্বায় বর্ণনা করেছেন। মিশকাত : ১৮৬, মুয়াত্ত্বা মালিক : ১৫৯৪

৫. সুন্নাহ পরিত্যাগকারী ঘৃনিত লোক :

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أَبْغَضُ النَّاسِ إِلَى اللهِ ثَلاَثَةٌ مُلْحِدٌ فِي الْحَرَمِ وَمُبْتَغٍ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ وَمُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٍّ لِيُهَرِيقَ دَمَهُ.

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত লোক হচ্ছে তিনজন। যে লোক হারাম শরীফে অন্যায় ও অপকর্মে লিপ্ত হয়। যে লোক ইসলামী যুগে জাহিলী যুগের রেওয়াজ অন্বেষণ (পছন্দ) করে। যে লোক ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া কারো রক্তপাত দাবি করে। সহিহ বুখারি : ৬৮৮২, মিশকাত : ১৪২, বায়হাক্বী : ১৫৯০২, সহীহাহ : ৭৭৮, সহীহ আল জামি : ৪০।

৬. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতা, সন্তান-সন্ততি থেকে অধিক প্রিয় হবে :

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

তোমাদের মধ্যে কেউ (প্রকৃত) মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা, তার সন্তান-সন্ততি এবং অন্যান্য সকল মানুষ হতে প্রিয়তম হই। সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ৪৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬৭, দারিম : ২২৭৮৩, আহমাদ : ১২৮১৪

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোকের মধ্যে তিনটি গুণের সমাবেশ ঘটে, সে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে। (১) তার মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের ভালোবাসা দুনিয়ার সকল কিছু হতে অধিক প্রিয়। (২) যে লোক কোন মানুষকে কেবলমাত্র আল্লাহর উদ্দেশেই ভালোবাসে। (৩) যে লোক কুফরী হতে নাজাতপ্রাপ্ত হয়ে ঈমান ও ইসলামের আলো গ্রহণ করার পর পুনরায় কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে এত অপছন্দ করে যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ২১, সহিহ মুসলিম ৪৩, নাসায়ী ৪৯৮৮, তিরমিযী ২৬২৪, ইবনু মাজাহ ৪০৩৩, আহমাদ ১২৭৬৫।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ যখন ভাষণ দিতেন তখন তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করত, কণ্ঠস্বর জোরালো হ’ত এবং তার রাগ বেড়ে যেত, এমনকি মনে হ’ত, তিনি যেন শত্রুবাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করছেন আর বলছেনঃ তোমরা ভোরেই আক্রান্ত হবে, তোমরা সন্ধ্যায়ই আক্রান্ত হবে। তিনি আরো বলতেন, আমি ও কিয়ামত এ দুটির ন্যায় (স্বল্প ব্যবধান) প্রেরিত হয়েছি, তিনি মধ্যম ও তর্জনী আঙ্গুল মিলিয়ে দেখাতেন। তিনি আরো বলতেন, অতঃপর উত্তম বাণী হ’ল- আল্লাহর কিতাব এবং উত্তম পথ হ’ল মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ এর প্রদর্শিত পথ। অতীব নিকৃষ্ট বিষয় হ’ল নতুন উদ্ভাবন। প্রতিটি বিদ’আদ ভ্রষ্ট। তিনি আরো বলতেন, আমি প্রত্যেক মু’মিন ব্যক্তির জন্য তার নিজের থেকে অধিক উত্তম (কল্যাণকামী)। কোন ব্যক্তি সম্পদ রেখে গেলে তা তার পরিবার-পরিজনের প্রাপ্য। আর কোন ব্যক্তি ঋণ অথবা অসহায় সন্তান রেখে গেলে সেগুলোর দায়িত্ব আমার। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে নাসায়ী : ১৫৭৮, ১৯৬২; সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪০

৭. যে ব্যক্তি সুন্নাহকে অপছন্দ করে, সে রসূলুল্লাহ এর উম্মত নয় :

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না।

অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি।  সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, মিশকাত : ১৪৫,  সহীহ ইবনু হিব্বান ৩১৭, ইরওয়া ১৭৮২, সহীহ আল জামি‘ ১৩৩৬, সহীহ আত্ তারগীব ১৯১৮, বুলুগুল মারাম ৯৭৫, আহমাদ ১৩৭২৭।

৮. সুন্নাহ-ই ইবাদতের চুড়ান্ত মানদন্ড :

হুযাইফাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

يَا مَعْشَرَ الْقُرَّاءِ اسْتَقِيمُوا فَقَدْ سَبَقْتُمْ سَبْقًا بَعِيدًا فَإِنْ أَخَذْتُمْ يَمِينًا وَشِمَالاً لَقَدْ ضَلَلْتُمْ ضَلاَلاً بَعِيدًا

হে কুরআন পাঠকারী সমাজ! তোমরা (কুরআন ও সুন্নাহর উপর) সুদৃঢ় থাক। নিশ্চয়ই তোমরা অনেক পশ্চাতে পড়ে আছ। আর যদি তোমরা ডানদিকের কিংবা বামদিকের পথ অনুসরণ কর তাহলে তোমরা সঠিকপথ থেকে বহু দূরে সরে পড়বে। সহিহ বুখারি : ৭২৮২

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

صَنَعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ شَيْئًا فَرَخَّصَ فِيهِ فَتَنَزَّهَ عَنْهُ قَوْمٌ فَبَلَغَ ذَلِكَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَخَطَبَ فَحَمِدَ اللَّهَ ثُمَّ قَالَ: «مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَتَنَزَّهُونَ عَنِ الشَّيْءِ أَصْنَعُهُ فَوَاللَّهِ إِنِّي لأعلمهم بِاللَّه وأشدهم لَهُ خشيَة»

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কাজ করলেন (সফরে সিয়াম ভঙ্গ করলেন),অন্যদেরকেও তা করার জন্য অনুমতি দিলেন। কিন্তু কতক লোক তা থেকে বিরত থাকল (অর্থাৎ- সিয়াম ভাঙ্গল না)। এ সংবাদ শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুত্বাহ্ (খুতবা) দিলেন, হাম্দ-সানা পড়ার পর বললেন, লোকদের কী হল? তারা এমন কাজ হতে বিরত থাকছে যা আমি করছি। আল্লাহর কসম! আমি তাঁকে (আল্লাহকে) তাদের চেয়ে অধিক জানি ও তাদের চেয়ে বেশী ভয় করি।  সহিহ বুখারি : ৬১০১, মুসলিম ২৩৫৬, মিশকাত : ১৪৬, সহীহাহ্ ৩২৮, সহীহ আল জামি‘ ৫৫৭৩, আহমাদ ২৫৪৮২, সহীহ ইবনু খুযাইমাহ্ ২০১৫।

৯. সুন্নাহ বাদ দিয়ে শুধু কুরআন অনুসরণ গুমরাহি :

আবূ রাফি’ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«لَا أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ أَمر مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لَا أَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ

আমি তোমাদের কাউকেও যেন এরূপ অবস্থায় না দেখি যে, সে তার গদিতে হেলান দিয়ে বসে থাকবে। আর তার নিকট আমার নির্দেশাবলীর কোন একটি পৌঁছবে, যাতে আমি কোন বিষয় আদেশ করেছি অথবা কোন বিষয় নিষেধ করেছি। তখন সে বলবে, আমি এসব কিছু জানি না, যা কিছু আমি আল্লাহর কিতাবে পাবো তার অনুসরণ করবো।  মিশকাত : ১৬২, আহমাদ ২৩৩৪৯, আবূ দাঊদ ৪৬০৫, তিরমিযী ২৬৬৩, ইবনু মাজাহ্ ১২, সহীহুল জামি‘ ৭১৭২

আল-মিকদাম ইবনু মা’দীকারিব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখো! এমন এক সময় আসবে যখন কোনো প্রাচুর্যবান লোক তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই গ্রহণ করো, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল এবং যা হারাম পাবে তা হারাম মেনে নিবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জেনে রাখো! গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয় এবং ছেদন দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র পশুও নয়।

অনুরূপ সন্ধিবদ্ধ অমুসলিম গোত্রের হারানো বস্তু তোমাদের জন্য হালাল নয়, অবশ্য যদি সে এর মুখাপেক্ষী না হয়। আর যখন কোনো লোক কোনো সম্প্রদায়ের নিকট আগন্তুক হিসেবে পৌঁছে তখন তাদের উচিত তার মেহমানদারী করা। যদি তারা তা না করে, তাহলে তাদেরকে কষ্ট দিয়ে হলেও তার মেহমানদারীর পরিমাণ জিনিস আদায় করার অধিকার তার আছে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৪, সহীহুল জামি‘ ২৬৪৩, সুনানে ইবনু মাজাহ ১২।

১০. মতবিরোধের সময় খুলাফাদের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরতে হবে :

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ফজরের নামযের পর আমাদেরকে মর্মস্পশী ওয়াজ শুনালেন, যাতে (আমাদের) সকলের চোখে পানি এলো এবং অন্তর কেঁপে উঠলো। কোন একজন বলল, এ তো বিদায়ী ব্যক্তির নাসীহাতের মতো। হে আল্লাহর রাসূল! এখন আপনি আমাদেরকে কি উপদেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করার এবং (নেতৃআদেশ) শ্রবণ ও মান্য করার উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (নেতা) হাবশী ক্রীতদাস হয়ে থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা বহু বিভেদ-বিসম্বাদ প্রত্যক্ষ করবে। তোমরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করা হতে দূরে থাকবে। কেননা তা গুমরাহী। তোমাদের মধ্যে কেউ সে যুগ পেলে সে যেন আমার সুন্নাতে ও সৎপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাতে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে। তোমরা এসব সুন্নাতকে চোয়ালের দাঁতের সাহায্যে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর। সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬০৭, আহমাদ ১৬৬৯৪

১১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীয়ত ই চুড়ন্ত :

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, আমরা ইয়াহূদীদের নিকট তাদের অনেক ধর্মীয় কথাবার্তা শুনে থাকি। এসব আমাদের কাছে অনেক ভালো মনে হয়। এসব কথার কিছু কি লিখে রাখার জন্য আমাদেরকে অনুমতি দিবেন? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ইয়াহুদী ও নাসারাগণ যেভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তোমরাও কি (তোমাদের দীনের ব্যাপারে) এভাবে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছ? আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের কাছে একটি অতি উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ দীন নিয়ে এসেছি। মূসা (আঃ)-ও যদি আজ দুনিয়ায় বেঁচে থাকতেন, আমার অনুসরণ ব্যতীত তাঁর পক্ষেও অন্য কোন উপায় ছিল না। মিশকাত : ১৭৭, আহমাদ ১৪৭৩৬, বায়হাক্বী ১৭৭।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তাওরাত কিতাবের একটি পান্ডুলিপি এনে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এটা হলো তাওরাতের একটি পান্ডুলিপি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ থাকলেন। এরপর ’উমার (রাঃ) তাওরাত পড়তে আরম্ভ করলেন। (এদিকে রাগে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হতে লাগল। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ’উমার! তোমার সর্বনাশ হোক। তুমি কি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবর্ণ চেহারা মুবারক দেখছো না? ’উমার (রাঃ) রসূলের চেহারার দিকে তাকালেন এবং (চেহারায় ক্রোধান্বিত ভাব লক্ষ্য করে) বললেন, আমি আল্লাহর গযব ও তাঁর রসূলের ক্রোধ হতে পানাহ চাচ্ছি। আমি ’রব’ হিসেবে আল্লাহ তা’আলার ওপর, দীন হিসেবে ইসলামের ওপর এবং নবী হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর সন্তুষ্ট আছি। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ’’আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! যদি (তাওরাতের নবী স্বয়ং) মূসা (আঃ) তোমাদের মধ্যে থাকতেন আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করতে আর আমাকে ত্যাগ করতে, তাহলে তোমরা সঠিক সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে। মূসা (আঃ) যদি এখন জীবিত থাকতেন এবং আমার নুবূওয়্যাতের যুগ পেতেন, তাহলে তিনিও নিশ্চয়ই আমার অনুসরণ করতেন। মিশকাত : ১৯৪, দারীমি : ৪৩৫, আহমাদ : ১৫১৫৬, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান :  ১৭৬

১২. সুন্নাহর বিপরীত আলম সাহাবিদের চিন্তারও বাহিরে ছিল :

আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ্ লা’নাত করেছেন ঐ সমস্ত নারীর প্রতি যারা অন্যের শরীরে উল্কি অংকণ করে, নিজ শরীরে উল্কি অংকণ করায়, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভূরু-চুল উপড়িয়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। সে সব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনয়ন করে। এরপর বানী আসাদ গোত্রের উম্মু ইয়াকূব নামের এক মহিলার কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে সে এসে বলল, আমি জানতে পারলাম, আপনি এ ধরনের মহিলাদের প্রতি লা’নত করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার প্রতি লা’নাত করেছেন, আল্লাহর কিতাবে যার প্রতি লা’নাত করা হয়েছে, আমি তার প্রতি লা’নাত করব না কেন? তখন মহিলা বলল, আমি দুই ফলকের মাঝে যা আছে তা (পূর্ণ কুরআন) পড়েছি। কিন্তু আপনি যা বলেছেন, তা তো এতে পাইনি।

’আবদুল্লাহ্ বললেন, যদি তুমি কুরআন পড়তে তাহলে অবশ্যই তা পেতে, তুমি কি পড়নি রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক। মহিলাটি বলল, হাঁ নিশ্চয়ই পড়েছি। ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ) বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তখন মহিলা বলল, আমার মনে হয় আপনার পরিবারও এ কাজ করে তিনি বললেন, তুমি যাও এবং ভালমত দেখে এসো। এরপর মহিলা গেল এবং ভালভাবে দেখে এলো। কিন্তু তার দেখার কিছুই দেখতে পেলো না। তখন ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ) বললেন, যদি আমার স্ত্রী এমন করত, তবে সে আমার সঙ্গে একত্র থাকতে পারত না। সহিহ বুখারি : ৪৮৮৬, ৪৮৮৭, ৫৯৩১, ৫৯৩৯, ৫৯৪৩, ৫৯৪৮; মুসলিম : ২১২৫, আহমাদ : ৪৩৪৩

১৩. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেখান সরল ও সঠিক পথ হলো সুন্নাহ :

আবদুল্লাহ ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাদেরকে বুঝাবার উদ্দেশে) একটি (সরল) রেখা টানলেন এবং বললেন, এটা আল্লাহর পথ। এরপর তিনি এ রেখার ডানে ও বামে আরো কয়েকটি রেখা টানলেন এবং বললেন, এগুলোও পথ। এসব প্রত্যেক পথের উপর শায়ত্বন (শয়তান) দাঁড়িয়ে থাকে। এরা (মানুষকে) তাদের পথের দিকে আহবান করে। অতঃপর তিনি তাঁর কথার প্রমাণ স্বরূপ কুরআনের এ আয়াত পাঠ করলেন-

وَاَنَّ ہٰذَا صِرَاطِیۡ مُسۡتَقِیۡمًا فَاتَّبِعُوۡہُ ۚ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِکُمۡ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ ؕ ذٰلِکُمۡ وَصّٰکُمۡ بِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ

বলুন, এটাই আমার পথ। আমি জ্ঞান ও প্রজ্ঞাসহকারে আল্লাহর দিকে আহ্বান করি, আমি এবং যেসব লোক আমার অনুসরণ করে। আল্লাহ পবিত্র এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। সুরা আন‘আম : ১৫৩। মিশকাত : ১৬৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১১, আহমাদ ৪১৩১, দারিমী ২০২।

ইবনু মাস্’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা একটি উদাহরণ পেশ করেছেন। তা হলো একটি সরল সঠিক পথ আছে, এর দু’দিকে দু’টি দেয়াল। এসব দেয়ালে খোলা দরজা রয়েছে এবং সে সব দরজায় পর্দা ঝুলানো রয়েছে। আর রাস্তার মাথায় একজন আহবায়ক, যে আহবান করছে, এসো সোজা রাস্তা দিয়ে চলে যাও। ভুল ও বাঁকা পথে যাবে না। আর এ আহবানকারীর একটু আগে আছেন আর একজন আহবানকারী। যখনই কোন বান্দা সে দরজাগুলোর কোন একটি দরজা খুলতে চায়, তখনই সে তাকে ডেকে বলেন, সর্বনাশ! এ দরজা খুলো না। যদি তুমি এটা খুলো তাহলে ভিতরে ঢুকে যাবে (প্রবেশ করলেই পথভ্রষ্ট হবে)। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ব্যাখ্যা করলেনঃ সঠিক সরল পথের অর্থ হচ্ছে ’ইসলাম’ (সে পথ জান্নাতে চলে যায়)। আর খোলা দরজার অর্থ হলো ওই সব জিনিস আল্লাহ তা’আলা যা হারাম করেছেন এবং দরজার মধ্যে ঝুলানো পর্দার অর্থ হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমাসমূহ। রাস্তার মাথায় আহবায়ক হচ্ছে কুরআন। আর তার সামনের আহবায়ক হচ্ছে নাসীহাতকারী মালাক, যা প্রত্যেক মু’মিনের অন্তরে আল্লাহর তরফ থেকে বিদ্যমান। মিশকাত : ১৯১, আহমাদ : ১৭১৮২, সহীহুল জামি : ৩৮৮৭

১৪. সাহাবিদের (রা.) অনুসারী দলটি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে :

মুআবিয়া ইবন আবূ সুফিয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বললেন-

 أَلَا إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَامَ فِينَا فَقَالَ: أَلَا إِنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ افْتَرَقُوا عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَإِنَّ هَذِهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ: ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ، وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ، وَهِيَ الْجَمَاعَةُ

“সতর্ক হও! নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,

‘জেনে রাখো! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলুল কিতাব (ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা) ৭২টি দল বা মতভেদে বিভক্ত হয়েছিল।আর এই উম্মত (ইসলামি জাতি) ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে ৭২টি দল জাহান্নামে যাবে,আর একটি দল জান্নাতে যাবে। এটাই হলো ‘আল-জামা‘আহ। সুনানে আবু দাউদ : ৪৫৯৭, আহমাদ ১৬৪৯০, সহীহুত্ তারগীব ৫১।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেনঃ আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজ : ২৬৪১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৯২ মিশকাত : ১৭১, সহীহাহ : ১৩৪৮

আহমাদ ও আবূ দাঊদে মুআবিয়াহ্ (রাঃ) হতে (কিছু পার্থক্যের সাথে) বর্ণনা করেন-

«ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ وَهِيَ الْجَمَاعَةُ وَإِنَّهُ سَيَخْرُجُ فِي أُمَّتِي أَقْوَامٌ تَتَجَارَى بِهِمْ تِلْكَ الْأَهْوَاءُ كَمَا يَتَجَارَى الْكَلْبُ بِصَاحِبِهِ لَا يَبْقَى مِنْهُ عِرْقٌ وَلَا مَفْصِلٌ إِلَّا دخله»

যে, ৭২ দল জাহান্নামে যাবে। আর একটি দল জান্নাতে যাবে। আর সে দলটি হচ্ছে জামা’আত। আর আমার উম্মাতের মধ্যে কয়েকটি দলের উদ্ভব হবে যাদের শরীরে এমন কুপ্রবৃত্তি (বিদ্’আত) ছড়াবে যেমনভাবে জলাতংক রোগ রোগীর সমগ্র শরীরে সঞ্চারণ করে। তার কোন শিরা-উপশিরা বাকি থাকে না, যাতে তা সঞ্চার করে না। মিশকাত : ১৭২

১৫. সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরালে জাহান্নামে যেতে হবে :

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে হাশর ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ যেভাবে আমি প্রথমে সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। এটি আমার প্রতিশ্রুতি। এর বাস্তবায়ন আমি করবই- (আম্বিয়াঃ ১০৪)। আর কিয়ামতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পরানো হবে তিনি হবেন ইবরাহীম (আঃ)। আর আমার অনুসারীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে পাকড়াও করে বাম দিকে অর্থাৎ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার অনুসারী, এরা তো আমার অনুসারী। এ সময় আল্লাহ বললেন, যখন আপনি এদের নিকট হতে বিদায় নেন, তখন তারা পূর্ব ধর্মে ফিরে যায়। কাজেই তারা আপনার সাহাবী নয়। তখন আল্লাহর নেক বান্দা [ঈসা (আঃ)] যেমন বলেছিলেন; তেমন আমি বলব, হে আল্লাহ! আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক। আপনি ক্ষমতাধর হিকমতওয়ালা-(আল-মায়িদাহ ১১৭-১১৮)। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৯, ৪৩৩৭, ৪৬২৫, ৪৬২৬, ৪৬৪০, ৬৫২৪, ৬৫২৬

১৬. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহই চুড়ান্ত সতর্ক বাণী :

আবূ মূসা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার ও আমাকে আল্লাহ্ যা কিছু দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হল এমন যে, এক লোক কোন এক কাওমের নিকট এসে বলল, হে কাওম! আমি নিজের চোখে সেনাবাহিনীকে দেখে এসেছি। আমি সুস্পষ্ট সতর্ককারী। কাজেই তোমরা আত্মরক্ষার চেষ্টা কর। কাওমের কিছু লোক তার কথা মেনে নিল, সুতরাং রাতের প্রথম প্রহরে তারা সে জায়গা ছেড়ে রওনা হল এবং একটি নিরাপদ জায়গায় গিয়ে পৌঁছল। ফলে তারা রক্ষা পেল। তাদের মধ্যেকার আর একদল লোক তার কথা মিথ্যা জানল, ফলে তারা নিজেদের জায়গাতেই রয়ে গেল। সকাল বেলায় শত্রুবাহিনী তাদের উপর আক্রমণ চালাল, তাদেরকে ধ্বংস করে দিল এবং তাদেরকে উৎপাটিত করে দিল। এই হল তাদের উদাহরণ যারা আমার আনুগত্য করে এবং আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুসরণ করে। আর যারা আমার কথা অমান্য করে তাদের দৃষ্টান্ত হল আমি যে সত্য নিয়ে এসেছি তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। সহিহ বুখারি : ৭২৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২৮৩, সহীহ আল জামি‘ ৫৮৬০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, আমার ও লোকদের উদাহরণ এমন লোকের মত, যে আগুন জ্বালালো আর যখন তার চারদিক আলোকিত হয়ে গেল, তখন পতঙ্গ ও ঐ সমস্ত প্রাণী যেগুলো আগুনে পুড়ে, তারা তাতে পুড়তে লাগলো। তখন সে সেগুলোকে আগুন থেকে ফিরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সেগুলো আগুনে তাকে পরাজয় করল এবং আগুনে পতিত হল। (তদ্রূপ) আমিও তোমাদের কোমর ধরে আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি। কিন্তু তোমরা তাতেই পতিত হচ্ছ। সহিহ বুখারি : ৬৪৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২৮৪, মিশকাত : ১৪৯ তিরমিযী ২৮৭৪, আহমাদ ৭৩২১, ইবনু হিব্বান ৬৪০৮, সহীহ আল জামি‘ ৫৮৫৮, সহীহ আত্ তারগীব ৩৬৬০।

আবূ মূসা আল আশ্’আরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে হিদায়াত ও ’ইলম দিয়ে পাঠিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত হলো জমিনে মুষলধারে বৃষ্টি, যা কোন ভূখণ্ডে পড়েছে। সে ভূখণ্ডের একাংশ উৎকৃষ্ট, যা বৃষ্টিকে চুষে নিয়েছে এবং প্রচুর উদ্ভিদ, গাছ-গাছালি ও ঘাস জন্ম দিয়েছে। আর অপর অংশ ছিল কঠিন ও গভীর, যা পানি (শোষণ না করে) আটকিয়ে রেখেছে। যার দ্বারা মানুষের উপকার সাধন করেছে। লোকেরা তা পান করেছে, অন্যকে পান করিয়েছে এবং তার দ্বারা ক্ষেত-খামারে কৃষি কাজ করেছে। আর কিছু বৃষ্টি ভূমির সমতল ও কঠিন জায়গায় পড়েছে, যা পানি আটকিয়ে রাখেনি বা শোষণ করেনি অথবা গাছপালা জন্মায়নি। এটা হলো সে ব্যক্তির উদাহরণ যে আল্লাহর দীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছে এবং যা দিয়ে আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন এটা তার কল্যাণ সাধন করেছে- সে তা শিক্ষা করেছে ও (মানুষকে) শিক্ষা দিয়েছে। আর সে ব্যক্তির উদাহরণ, যে এর দিকে মাথা তুলেও তাকায়নি এবং আল্লাহর যে হিদায়াত দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে তা কবূলও করেনি। সহিহ বুখারি : ৭৯, মুসলিম ২২৮২, মিশকাত : ১৫০, সহীহ আল জামি‘ ৫৮৫৫, আহমাদ ১৯৫৭৩, সহীহ ইবনু হিব্বান ৪, সহীহ আত্ তারগীব ৭৬।

১৭. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ফয়সালাই চুড়ান্ত :

আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক আনসারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সামনে যুবাইর (রাঃ)-এর সঙ্গে হাররার নালার পানির ব্যাপারে ঝগড়া করল যে পানি দ্বারা খেজুর বাগান সিঞ্চন করত। আনসারী বলল, নালার পানি ছেড়ে দিন, যাতে তা (প্রবাহিত থাকে) কিন্তু যুবাইর (রাঃ) তা দিতে অস্বীকার করেন। তারা দু’জনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকটে এ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর (রাঃ)-কে বললেন, হে যুবাইর! তোমার যমীনে (প্রথমে) সিঞ্চন করে নাও। এরপর তোমার প্রতিবেশীর দিকে পানি ছেড়ে দাও। এতে আনসারী অসন্তুষ্ট হয়ে বলল, সে তো আপনার ফুফাতো ভাই। এতে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেহারায় অসন্তুষ্টির লক্ষণ প্রকাশ পেল। এরপর তিনি বললেন, হে যুবাইর! তুমি নিজের জমি সিঞ্চন কর। এরপর পানি আটকিয়ে রাখ, যাতে তা বাঁধ পর্যন্ত পৌঁছে। যুবাইর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমার মনে হয়, এ আয়াতটি এ সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ ‘‘তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা মু’মিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর পত্যার্পণ না করে’’- (আন-নিসাঃ ৬৫)। সহিহ বুখারি, ২৩৬০, ২৩৬১, ২৩৬২, ২৭০৮, ৪৫৮৫, মুসলিম ২৩৫৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৫, সুনানে তিরমিযী ১৩৬৩, ৩০২৭; সুনানে নাসায়ী ৫৪০৭, ৫৪১৬; সুনানে আবূ দাঊদ ৩৬৩৭, আহমাদ ১৪২২।

১৮. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার সামনে সব মতাবাদ মুল্যহীন :

ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

‏ “‏ لاَ تَمْنَعُوا إِمَاءَ اللَّهِ أَنْ يُصَلِّينَ فِي الْمَسْجِدِ ‏”‏ ‏.‏ فَقَالَ ابْنٌ لَهُ إِنَّا لَنَمْنَعُهُنَّ ‏.‏ فَقَالَ فَغَضِبَ غَضَبًا شَدِيدًا وَقَالَ إِنِّي أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ وَإِنَّكَ تَقُولُ إِنَّا لَنَمْنَعُهُنَّ ‏.‏

তোমরা আল্লাহ্র বাঁদীদেরকে আল্লাহ্র মসজিদে সালাত আদায় করতে (যেতে) বাধা দিও না। ইবনু উমার (রাঃ)-এর এক পুত্র বললো, আমরা অবশ্যই তাদেরকে বাধা দিবো। রাবী বলেন, এতে তিনি ভীষণ অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন, আমি তোমার নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীস বর্ণনা করছি, আর তুমি বলছো, আমরা অবশ্যই তাদের বাধা দিবো! সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬, সুনানে তিরমিযী ৫৭০, সুনানে নাসায়ী ৭০৬, সুনানে আবূ দাঊদ ৫৬৬-৬৮

ক্বাবীসাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবী ও তাঁর মুখপাত্র উবাদাহ ইবনুুস সামিত মুআবিয়াহ -এর সাথে রোম (বায়যান্টাইন) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি লোকেদের লক্ষ্য করলেন যে, তারা সোনার টুকরা স্বর্ণ মুদ্রার সাথে এবং রূপার টুকরা রৌপ্য মুদ্রার সাথে ক্রয়-বিক্রয় (বিনিময়) করছে। তিনি বলেন, হে লোক সকল! তোমরা তো (এরূপ বিনিময়ে) সুদ খাচ্ছো। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা সোনার বিনিময়ে সোনা বিক্রয় করো না, তবে পরিমাণে সমান সমান হলে, বাড়তি না হলে এবং লেনদেন বাকীতে না হলে করতে পারো। তখন মুআবিয়াহ তাকে বলেন, হে আবূল ওয়ালীদ! আমি তো এরূপ লেনদেনে সুদের কিছু দেখছি না, যদি না লেনদেন বাকীতে হয়। উবাদাহ (রাঃ) বলেন, আমি তোমার নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস বর্ণনা করছি। আর তুমি আমার নিকট তোমার অভিমত ব্যক্ত করছো। আল্লাহ যদি আমাকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ দেন তাহলে আমি এমন এলাকায় বসবাস করবো না, যেখানে আমার উপর তোমার কর্তৃত্ব চলে। অতএব তিনি (যুদ্ধ থেকে) প্রত্যাবর্তন করে মদিনা্য় পৌঁছলে উমার ইবনুল খাত্তাব তাকে বলেন, হে আবূল ওয়ালীদ! আপনি কেন ফিরে এসেছেন? তখন তিনি তার নিকট সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণনা করেন এবং সেখানে তার বসবাস না করার কথাও ব্যক্ত করেন। উমার (রাঃ) বলেন, হে আবূল ওয়ালীদ! আপনি আপনার এলাকায় ফিরে যান। কেননা যে এলাকায় আপনি ও আপনার মত মানুষ থাকবে না সেখানে আল্লাহ গযব নাযিল করবেন। তিনি মুআবিয়াহ (রাঃ)-কে লিখে পাঠান, উবাদাহ (রাঃ)-এর উপর তোমার কোন কর্তৃত্ব চলবে না এবং তিনি যা বলেন জনসাধারণকে তদনুযায়ী পরিচালনা করো। কারণ এটাই আদেশ। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮, সুনানে তিরমিযী ১২৪০, সুনানে নাসায়ী ৪৫৬০-৬৪, ৪৫৬৬, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৩৪৯, আহমাদ ২২১৭৫, ২২২১৭, ২২২২০; দারিমী ২৫৭৯।

আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তার পাশে তার এক ভ্রাতুষ্পুত্র বসা ছিল। সে কংকর নিক্ষেপ করলে তিনি তাকে নিষেধ করেন এবং বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আরো বলেনঃ এতে না শিকার ধরা যায়, না শত্রুকে আহত করা যায়, বরং তা দাঁত ভেঙ্গে দেয় এবং চোখ ফুঁড়ে দেয়। রাবী বলেন, তার ভাইপো পুনরায় কংকর নিক্ষেপ করলে আবদুল্লাহ ইবনু মুগাফফাল বলেন, আমি তোমাকে হাদীস শুনাচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন, তারপরও তুমি কংকর নিক্ষেপ করলে! আমি তোমার সাথে কখনও কথা বলবো না।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭, নাসায়ী ৪৮১৫, আবূ দাঊদ ৫২৭০, দারিমী ৪৩৯, ৪৪০।

১৯. আবু বক্কর (রা.) ও উমর (রা.) সুন্নাহ পালনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলন :

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করলেন আর তাঁর পরে আবূ বকর (রাঃ)-কে খালীফা করা হলো এবং আরবের যারা কাফির হবার তারা কাফির হয়ে গিয়েছিল, তখন ’উমার (রাঃ) আবূ বকর (রাঃ)-কে বললেন, আপনি কী করে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন, অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি মানুষের সঙ্গে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য নির্দেশপ্রাপ্ত। অতএব যে ব্যক্তি ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলল, সে তার জান ও মালকে আমার থেকে নিরাপদ করে নিল।

তবে ইসলামী বিধানের আওতায় পড়লে আলাদা। তাদের প্রকৃত হিসাব আল্লাহর কাছে হবে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করে, আমি অবশ্য অবশ্যই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। কেননা, যাকাত হল মালের হক। আল্লাহর শপথ! যদি তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যা আদায় করত, এখন তা (সেভাবে) দিতে অস্বীকার করে, তাহলেও আমি অবশ্যই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। ’উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি দেখছিলাম যে, যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ্ তা’আলা আবূ বকরের সিনা খুলে দিয়েছেন। সুতরাং আমি বুঝতে পারলাম এ সিদ্ধান্ত সঠিক। সহিহ বুখারি : ৭২৮৫

আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’উয়াইনাহ ইবনু হিস্ন ইবনু হুযাইফাহ ইবনু বাদ্র (রহ.) তাঁর ভাতিজা হুর ইবনু কায়স ইবনু হিস্ন-এর কাছে আসলেন। ’উমার (রাঃ) যাদের নিজে সন্নিকটে রাখতেন, হুর ইবনু কায়স (রহ.) ছিলেন তাদেরই একজন। যুবক হোক কিংবা বৃদ্ধ কারী (আলিম) ব্যক্তিরাই ’উমার (রাঃ)-এর মজলিসের সদস্য ও পরামর্শদাতা ছিলেন। উয়ায়না তার ভাতিজাকে বললেন, হে ভাতিজা! তোমার কি আমীরের নিকট এতটুকু প্রভাব আছে যে আমার জন্য সাক্ষাতের অনুমতি গ্রহণ করতে পারবে? সে বলল, আমি আপনার ব্যাপারে তাঁর কাছে অনুমতি চাইব। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, তিনি (হুর) ’উয়াইনাহর জন্য অনুমতি চাইলেন।

তারপর যখন ’উয়াইনাহ (রাঃ) ’উমার (রাঃ)-এর নিকট গেলেন, তখন সে বলল, হে ইবনু খাত্তাব! আল্লাহর কসম! আপনি আমাদের মাল দিচ্ছেন না, আবার ইনসাফের ভিত্তিতে আমাদের মাঝে ফায়সালাও করছেন না। তখন ’উমার (রাঃ) রেগে গেলেন, এমন কি তিনি তাকে মারতে উদ্যত হলেন। তখন হুর বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন। আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেছেন-

خُذِ الۡعَفۡوَ وَاۡمُرۡ بِالۡعُرۡفِ وَاَعۡرِضۡ عَنِ الۡجٰہِلِیۡنَ

তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক। সুরা আ’রাফ : ১৯৯। এ লোকটি একজন মূর্খ।  আল্লাহর শপথ! উমার (রাঃ) এর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হলে তিনি তা এতটুকু লঙ্ঘন করলেন না। তিনি আল্লাহর কিতাবের খুবই অনুগত ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৭২৮৬

কুরআন তিলওয়াত শ্রবন মুখস্ত করার ফজিলত

কুরআন তিলওয়াত শ্রবন মুখস্ত করার ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন শুনা একটি ইবাদাত। নামাজ ও খুতবা চলাকালে কোরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা ওয়াজিব। তবে এই দুই জায়গার বাইরেও কোরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা ওয়াজিব কি না এ ব্যাপারে ফকিহগণের মতামত হলো, যেখানে কোরআন শোনানোর জন্যই তিলাওয়াত করা হয়ে থাকে, সেখানে মনোযোগ দিয়ে কোরআন তিলাওয়াত শোনা ওয়াজিব। আর যেখানে কেউ নিজেই তিলাওয়াত করছে বা অনেকেই নিজ নিজ তিলাওয়াত করছে, সেখানে চুপ থেকে মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব নয়। তবে এরূপ ক্ষেত্রে কুরআন শোনাও ভাল কাজ। কেননা মহান আল্লাহ কুরআন তিলওয়াত মনযোগ সহকারে কুরআন তেলওয়াত শ্রবন করতে বলেছেন। তাই যিনি উচ্চ স্বরে কুরআন তিলওয়াত করবেন তাকে স্থান ও সময় বিবেচনা করে তিলওয়াত করা উচিত। কুরআন তিলওয়াত শুনতে পেলে, বিনা কারনে না শুনলে গুনাহ হবে।  মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُواْ لَهُ وَأَنصِتُواْ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

আর যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তাতে কান লাগিয়ে রাখ এবং নিশ্চুপ থাক যাতে তোমাদের উপর রহমত হয়। সুরা আরাফ : ২০৪

এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পটভুমি নিয়ে তাফসির কারকদের থেকে একাধীক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কোন কোন তাফসির কারকের মতে এই বিধান নামাজে কোরআন তিলাওয়াত শ্রবণের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তাই এই বিধান নামাজের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। কারো কারো বর্ণনা মতে, এই বিধান খুতবা চলাকালে কুরআন তিলাওয়াতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। তবে অধিকাংশ তাফসির বিশারদের মতে, আয়াতটি কিছু বিশেষ অবস্থা ব্যতীত সর্বাবস্থার জন্যই প্রযোজ্য, চাই নামাজে তিলাওয়াত শ্রবণের ব্যাপারে হোক বা খুতবা চলাকালীন হোক বা এর বাইরেই হোক সর্বাস্থায় জন্যই এই বিধান প্রযোজ্য।

মনোযোগসহ কোরআন শোনার ফজিলতঃ

১. মহান আল্লাহ নিজেই নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তিলওয়াত শুনতেন-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَا أَذِنَ اللهُ لِشَيْءٍ مَا أَذِنَ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنْ يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ قَالَ سُفْيَانُ تَفْسِيْرُهُ يَسْتَغْنِيْ بِهِ

আল্লাহ্ তা’আলা কোন বিষয়ের প্রতি এরূপ কান লাগিয়ে শুনেন না যেরূপ তিনি নবীর সুমধুর তিলাওয়াত শুনেন। সুফ্ইয়ান (রহ.) বলেন, কুরআনই তার জন্য যথেষ্ট। সহিহ বুখারি : ৫০২৪, ৫০২৩

২. কুরআন তিলাওয়াত শয়তান কে দূরে তাড়িয়ে দেয়

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

“إِذَا قُرِئَتِ الْقُرْآنُ فَاعْتَزَلَ الشَّيْطَانُ، وَأَمَّا إِذَا سَمِعَتِ الْقُرْآنَ فَتَرَكَهُ”

“যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন শয়তান দূরে সরে যায়। কুরআনের শব্দ শোনার ধৈর্য শয়তানের নেই।” মুসনাদে আহমদ :১৬৬৯৯

৩. রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলওয়াত শুনতেন

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনু কাবকে লক্ষ্য করে বললেন-

، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لأُبَىٍّ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِي أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ آللَّهُ سَمَّانِي لَكَ قَالَ ‏”‏ اللَّهُ سَمَّاكَ لِي ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَجَعَلَ أُبَىٌّ يَبْكِي ‏.‏

মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে তোমার সামনে কুরআন পড়ে শুনাতে আদেশ করেছেন। (এ কথা শুনে) উবাই ইবনু কাব বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন আল্লাহ তা’আলা কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হ্যাঁ, আল্লাহ তাআলা আমার কাছে তোমার নাম উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাকারী আনাস ইবনু মালিক বলেন, এ কথা শুনে উবাই ইবনু কাব কাঁদতে শুরু করলেন। সহিহ মুসলিম : ৭৯৯

আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন-

اقْرَأْ عَلَيَّ الْقُرْآنَ قُلْتُ آقْرَأُ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ قَالَ إِنِّيْ أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي.

’আমার কাছে কুরআন পাঠ কর।’’ ’আবদুল্লাহ্ বললেন, আমি আপনার কাছে কুরআন পাঠ করব; অথচ আপনার ওপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, আমি অন্যের নিকট থেকে তা শুনতে ভালবাসি। সহিহ বুখারি : ৫০৪৯

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আবূ মূসা! তোমাকে দাঊদ (আঃ)-এর সুমধুর কন্ঠ দান করা হয়েছে। সহিহ বুখারি : ৫০৪৮, সহিহ মুসলিম : ৭৯৩, আহমাদ ২৩০৩

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি কুরআন পাঠ কর। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার কাছে কুরআন পাঠ করব? অথচ তা তো আপনার ওপরই অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর আমি ’সূরাহ নিসা’ পাঠ করলাম। যখন আমি এই আয়াত পর্যন্ত আসলাম ’চিন্তা করো আমি যখন প্রত্যেক উম্মাতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী উপস্থিত করব এবং সকলের ওপরে তোমাকে সাক্ষী হিসাবে হাযির করব তখন তারা কী করবে।’ নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপাততঃ যথেষ্ট হয়েছে। আমি তাঁর চেহারার দিকে তাকালাম, দেখলাম, তাঁর চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। সহিহ বুখারি ৫০৫০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রতি বছর জিব্‌রীল (আঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর সঙ্গে একবার কুরআন মাজীদ শোনাতেন ও শুনতেন। কিন্তু যে বছর তাঁর ওফাত হয় সে বছর তিনি রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে দু’বার শুনিয়েছেন। প্রতি বছর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমাযানে দশ দিন ই’তিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তাঁর ওফাত হয় সে বছর তিনি বিশ দিন ই’তিকাফ করেন। সহিহ বুখারি : ৪৯৯৮

কুরআনে কারিমের আদব ও শিষ্টাচারসমূহ থেকে একটি আদব হলো, কুরআন পাঠ চলাকালীন চুপ থেকে তা মনোযোগ দিয়ে শোনা। এর বিপরীত এ কথা স্পষ্ট যে যারা এর পরিপন্থী কাজ করবে, তারা সে রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। এ জন্যই যেসব জায়গায় লোকজন ঘুমাচ্ছে বা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, সেখানে উচ্চ স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত নয়। কেননা এতে লোকজন তিলাওয়াত না শোনার কারণে প্রকারান্তরে কোরআন অবমাননা হয়ে থাকে। এই জন্য নিচের বিষয় দুটির প্রতি লক্ষ রাখি।

(১) বর্তমানে যারা বাজারে-ঘাটে, যেখানে-সেখানে কোরআন তিলাওয়াত চালু করে দেয়, যেখানে কোনো শ্রবণকারী থাকে না, তারা অনুচিত কাজ করছে। অনুরূপ যারা রাতে মানুষের ঘুমের সময় মসজিদে লাউড স্পিকারে কোরআন তিলাওয়াত করে, যা শ্রবণ করার মতো কেউই থাকে না এবং তাতে ঘুমন্ত ব্যক্তিদের ঘুমের ব্যাঘাত হয়, এগুলো পরিহার করা অপরিহার্য। কেননা এরূপ ক্ষেত্রে অন্যরা মনোযোগ দিয়ে কোরআন তিলাওয়াত না শোনায় তার গুনাহ তিলাওয়াতকারীর ওপরই বর্তাবে।

(২) অনেক মানুষকে দেখা যায় ক্যাসেট বা কম্পিউটারে কুরআন তিলাওয়াত চালু করে অন্য কাজ করতে থাকে। তিলাওয়াত একেবারেই শুনছে না বা কাজের কারণে তিলাওয়াতের প্রতি মনোযোগ দিতে পারছে না। একটা কিছু শুনতে শুনতে কাজ করার অভ্যাস তাই তিলাওয়াত ছেড়ে রেখেছে। শোনা উদ্দেশ্য নয়। এ কাজটি ঠিক নয়। কুরআন তিলাওয়াত শোনা একটি স্বতন্ত্র আমল। আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত হচ্ছে আর আমি অন্যদিকে মনোযোগ দিব তা হয় না। সুতরাং তিলাওয়াত যখন শুনব তো মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত শুনব।

কুরআন মুখস্থ বা হিফয করা

কুরআন হিফয বা মুখস্থ করা মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং বরকতপূর্ণ কাজ। কুরআনের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অন্যতম পথ হলো এটি মনে রাখার মাধ্যমে। কুরআন হিফযের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন এবং কিয়ামতের দিন তার মুখে কুরআন থাকবে, যা তাকে সুপারিশ করবে। আশা করা যায় কুরআন হিফযকারীকে জান্নাতের সর্বোচ্চ দেওয়া হবে। কুরআন মুখস্থ করা ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অন্তরকে পবিত্র করে। কুরআন হিফয একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পূণ্যময় কার্য। মহান আল্লাহ যত মহান তার কালাম তথা কুরআনও তত মহান। এই মহান গ্রন্থ কুরআন সংরক্ষনের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ নিজে নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ

অর্থঃ নিশ্চয় আমি এই কোরআনকে অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষক। সুরা হিজর : ৯

মহান আল্লাহ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর এ ওয়াদা পূর্ণ করেছেন। তাই কুরআন আজ সমহিমায় অবিকৃতভাবে আমাদের সামনে দৃ্শ্যমান। কুরআনের প্রতিটি শব্দ আজ লিখিত আছে। যখন ব্যাপক হারে কুরআন লিখে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না, তখন কুরআনের জন্য নিবেদীত এক দল মানুষ কুরআন হিফাজনের জন্য মুখস্ত করা শুরু করেছিলেন যা আজও মুসলিম সমাজে বৃদ্যমান।

সমগ্র কুরআন মুখস্থ করা ফরজ হয়। প্রয়োজন পরিমান কুরআন মুখন্ত করা ফরজ। ইবাদত বন্দেগির মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হচ্ছে নামাজ। নামাজের জন্য কুরআন তিলাওয়াত ফরজ এবং ওয়াজিব। সুতরাং নামাজ আদায় করা যায়, এই পরিমাণ কুরআন মুখস্ত করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। পাশাপাশি গোটা কুরআন মাজিদ মুখস্ত করা ফরজে কেফায়া। কেননা যদি কেউই কুরআন হিফজ না করে বা কোন হাফিজ না থাকে বা কুরআন হেফাজতের নিয়তে কাজ না করে তবে সমস্ত মুসলমানকেই সমভাবে গুনাহগার হতে হবে। কুরআনের হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ তাআলা নিয়েছেন। এর মানে এই নয় যে, আমাদের আর কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব নেই। মহান আল্লাহই হিফাজত করবেন, এই কাজে তিনি আমাদের ব্যবহার করবেন। কুরআন যেমন দামি, আর কুরআন হিফাজনের জন্য মহান আল্লাহ যাকে ব্যবহার করবে সেও দামি হয়ে যাবে।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا ‏”

(কিয়ামতের দিন) কুরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাক ও উপরে আরোহণ করতে থাক এবং দুনিয়াতে যেভাবে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে ঠিক সেরূপে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে থাক। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে সেখানেই তোমার স্থান। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৪, মিশকাত : ২১৩৪, সুনানে আবু দাউদ : ১৪৬৪

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরআন কিয়ামত দিবসে হাযির হয়ে বলবে, হে আমার প্রভু! একে (কুরআনের বাহককে) অলংকার পরিয়ে দিন। তারপর তাকে সম্মান ও মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। সে আবার বলবে, হে আমার প্রভু! তাকে আরো পোশাক দিন। সুতরাং তাকে মর্যাদার পোশাক পরানো হবে। সে আবার বলবে, হে আমার প্রভু! তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। কাজেই তিনি তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। তারপর তাকে বলা হবে, তুমি এক এক আয়াত পাঠ করতে থাক এবং উপরের দিকে উঠতে থাক। এমনিভাবে প্রতি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে সাওয়াব (মর্যাদা) বাড়ানো হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৫

হাফিজদের সম্পর্কে মিথ্যা ও দুর্বল হাদিস :

আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন-

“‏ مَنْ قَرَأَ الْقُرْآنَ وَاسْتَظْهَرَهُ فَأَحَلَّ حَلاَلَهُ وَحَرَّمَ حَرَامَهُ أَدْخَلَهُ اللَّهُ بِهِ الْجَنَّةَ وَشَفَّعَهُ فِي عَشَرَةٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ كُلُّهُمْ وَجَبَتْ لَهُ النَّارُ ‏যে ব্যক্তি কোরআন তেলওয়াত ও মুখস্থ রেখেছে এর হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম মেনেছে। তাকে আল্লাহ জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তার পরিবারের এমন দশজন লোক সম্পর্কে তার সুপারিশ কবুল করবেন যাদের প্রত্যেকের জন্য জাহান্নাম আবশ্যক ছিলো। সুনানে তিরমিযী : ২৯০৫, আহমাদ ১২৭১, মিশকাত ২১৪১। হাদিসের মান জঈফ।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যার হৃদয়ে কুরআনের কিছুই নেই সে বর্জিত ঘরের মত। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৩, মিশকাত : ২১৩৫। হাদিসের  মান জঈফ।

কুরআনের সুরা ও আয়াত কেন্দ্রিক ফজিলত

কুরআনের সুরা ও আয়াত কেন্দ্রিক ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ কুরআনুল কারিম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত যার প্রতিটি শব্দ এবং আয়াতের মধ্যে রয়েছে অসীম ফজিলত ও বরকত। সম্পুর্ন কুরআনই ফজিলতপূর্ণ তারপরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষ বিশেষ কিছু সুরা বা আয়াতে বিশেষভাবে ফজিলতের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সুরাগুলো শুধু তিলাওয়াত করে হাদিসে বর্ণিত ফজিলত লাভ করা যায় বিধায় সম্পূর্ণ কুরআন পাশাপাশি ঐ আয়াত বা সুরাকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। যেমন সূরা ফাতিহাকে কুরআনের ‘উম্মুল কিতাব’ বলা হয়েছে, সূরা বাকারা ও আয়াতুল কুরসি আমাদের রক্ষাকবচ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এসব সুরা ও আয়াত শুধু ফজিলতপূর্ণ আমল নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। নিম্মের লেখায় আমরা সেসব বিশেষ সুরা ও আয়াতের ফজিলত সম্পর্কে আলোকপাত করব,

সেগুলো ভালোভাবে শিক্ষা করে নিয়মিত বেশি বেশি তিলাওয়াত করা। এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ রেখে, সহিহ হাসিসে বর্ণিত কয়েকটি সুরা ও আয়াতের ফজিলত আলোচনা করা হল।

০১। সূরা ফাতিহার ফজিলত ও মহাত্ব

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أُمُّ الْقُرْآنِ هِيَ السَّبْعُ الْمَثَانِيْ وَالْقُرْآنُ الْعَظِيْمُ

উম্মুল কুরআন (সূরাহ ফাতিহা) হচ্ছে বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহা কুরআন। সহিহ বুখারি : ৪৭০৪

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার উবাই ইবনু কাবকে জিজ্ঞেস করলেন-

«كَيْفَ تَقْرَأُ فِي الصَّلَاةِ؟» فَقَرَأَ أُمَّ الْقُرْآنِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أنزلت فِي التَّوْرَاة وَلَا فِي الْإِنْجِيل وَلَا فِي الزبُور وَلَا فِي الْفرْقَان مِثْلُهَا وَإِنَّهَا سَبْعٌ مِنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ الَّذِي أُعْطِيتُهُ» . رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَرَوَى الدَّارِمِيُّ مِنْ قَوْلِهِ: «مَا أُنْزِلَتْ» وَلَمْ يَذْكُرْ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ. وَقَالَ التِّرْمِذِيُّ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ

তুমি সালাতে কিভাবে কুরআন পড়ো? উত্তরে উবাই ইবনু কাব রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সূরা আল ফাতিহা পড়ে শুনালেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন! এর মতো কোন সূরা তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবূর বা ফুরকান-এ নাযিল হয়নি। এ সূরা হলো সাবউল মাসানী (পুনরাবৃত্ত সাতটি আয়াত) ও মহান কুরআন। এটি আমাকেই দেয়া হয়েছে। সুনানে তিরমিজি : ২৮৭৫, মিশকাত : ২১৪২, সুনানে দারিমী : ৩৪১৬।

আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত আছে, কোন এক সফরে সুরা ফাতিহা দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করার ফলে একজন সাপে কাটা রোগীকে সুস্থ হয়ে যায়। সহিহ বুখারি : ৫০০৭ হাদিসটি দীর্ঘ বিধায় উল্লেখ করলাম না।

আবূ সা’ঈদ ইবনু মু’আল্লা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একদা মসজিদে নাববীতে সালাত আদায় করছিলাম, এমন সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকেন। কিন্তু ডাকে আমি সাড়া দেইনি। পরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সালাত আদায় করছিলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ কি বলেননি যে, ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা সাড়া দেবে আল্লাহ্ ও রাসূলের ডাকে, যখন তিনি তোমাদেরকে ডাক দেন। সূরাহ আনফাল-২৪। তারপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই তোমাকে আমি কুরআনের এক অতি মহান সূরাহ্ শিক্ষা দিব। তারপর তিনি আমার হাত ধরেন। এরপর যখন তিনি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করেন তখন আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি বলেননি যে আমাকে কুরআনের অতি মহান সূরাহ্ শিক্ষা দিবেন? তিনি বললেন, الْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ -সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক, এটা বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহান কুরআন যা কেবল আমাকেই দেয়া হয়েছে। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৪, ৪৬৪৭, ৪৭০৩, ৫০০৬,  সুনানে নাসায়ী ৯১৩, সুনানে আবূ দাউদ ১৪৫৮, আহমাদ ১৫৩০৩, ১৭৩৯৫, দারেমী ১৪৯২, ৩৩৭১,

সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ সাথে কথোপকথোন-

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি সালাত আদায় করল অথচ তাতে উন্মুল কুরআন (সূরাহ ফা-তিহাহ্) পাঠ করেনি তার সালাত ত্রুটিপূর্ণ থেকে গেল, পূর্ণাঙ্গ হল না। এ কথাটা তিনবার বলেছেন। আবূ হুরাইরাহ (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হল, আমরা যখন ইমামের পিছনে সালাত আদায় করব তখন কী করব? তিনি বললেন, তোমরা চুপে চুপে তা পড়ে নাও। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ বলেছেন, আমার এবং আমার বান্দার মাঝে আমি সালাতকে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিয়েছি এবং আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চায়।

বান্দা যখন বলে-  الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য),

আল্লাহ তা’আলা তখন বলেন- আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।

সে যখন বলে- الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ‏ (তিনি অতিশয় দয়ালু এবং করুণাময়)।

আল্লাহ তা’আলা বলেন- বান্দা আমার প্রশংসা করেছে, গুণগান করেছে।

সে যখন বলে- مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (তিনি বিচার দিনের মালিক)।

তখন আল্লাহ বলেন- আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে আল্লাহ আরো বলেন, বান্দা তার সমস্ত কাজ আমার উপর সমর্পণ করেছে।

সে যখন বলে, إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি)।

তখন আল্লাহ বলেন- এটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যকার ব্যাপার। (এখন) আমার বান্দার জন্য রয়েছে সে যা চায়।

যখন সে বলে-اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ (আমাদের সরল-সঠিক পথে পরিচালনা করুন। যেসব লোকদের আপনি নি’আমাত দান করেছেন, তাদের পথে নয় যাদের প্রতি আপনার গযব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।

তখন আল্লাহ বলেন-এসবই আমার বান্দার জন্যে এবং আমার বান্দার জন্যে রয়েছে সে যা চায়।

সহিহ মুসলিম : ৩৯৫, সুনানে তিরমিযী ২৯৫৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮৪, সুনানে নাসায়ী ৯০৯, আহমাদ ৭২৪৯, ৭৭৭৭, ৯৬১৬, মুয়াত্তা মালেক : ১৮৯,

২। সূরা বাকারার ফজিলকত –

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

“لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَفِرُّ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ”

“তোমরা তোমাদের ঘর-বাড়িগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা বাকারা পাঠ করা হয়, সেই ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়। সহিহ মুসলিম ৭৮০, সুনানে তিরমিজ : ২৮৭৭

ইবনে মাসঊদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ سِنَامًا وَسِنَامُ الْقُرْآنِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ

অবশ্যই প্রত্যেক বস্তুরই চূড়া আছে; আর কুরআনের চূড়া হল সূরা বাক্বারাহ। হাদিস সম্ভার : ১৪৫৯, হাকেম : ২০৬০, সিলসিলাহ সহীহাহ : ৫৮৮

৩। আয়াতুল কুরসী পড়ার ফযীলত

আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيّ دُبُرَ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنْ دُخُوْلِ الْجنَّة إِلَّا أَنْ يَمُوتَ

যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয নামাযের পশ্চাতে ’আয়াতুল কুরসী’ পাঠ করবে, সে ব্যক্তির জন্য তার মৃত্যু ছাড়া আর অন্য কিছু জান্নাত প্রবেশের পথে বাধা হবে না। হাদিস সম্ভার : ১৪৬৩, নাসাঈ কুবরা : ৯৯২৮, ত্বাবারানী : ৭৫৩২, সহীহুল জামে : ৬৪৬৪

উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আবূল মুনযিরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ হে আবূল মুনযির আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি তোমার কাছে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ? আবূল মুনযির বলেন, জবাবে আমি বললামঃ এ বিষয়ে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলই সর্বাধিক অবগত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবার বললেনঃ হে আবূল মুনযির! আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি তোমার কাছে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ? তখন আমি বললাম, اللَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ (এ আয়াতটি আমার কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ)। এ কথা শুনে তিনি আমার বুকের উপর হাত মেরে বললেন, হে আবূল মুনযির! তোমার জ্ঞানকে স্বাগতম। সহিহ মুসলিম : ৮১০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমাযানের যাকাত হিফাযত করার দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন। এক ব্যক্তি এসে আঞ্জলা ভর্তি করে খাদ্য সামগ্রী নিতে লাগল। আমি তাকে পাকড়াও করলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে উপস্থিত করব। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খুব অভাবগ্রস্ত, আমার যিম্মায় পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে এবং আমার প্রয়োজন তীব্র। তিনি বললেন, আমি ছেড়ে দিলাম।

যখন সকাল হলো, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ হুরাইরা, তোমার রাতের বন্দী কি করলে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার তীব্র অভাব ও পরিবার, পরিজনের কথা বলায় তার প্রতি আমার দয়া হয়, তাই তাকে আমি ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, সাবধান! সে তোমার কাছে মিথ্যা বলেছে এবং সে আবার আসবে। ‘সে আবার আসবে’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ উক্তির কারণে আমি বুঝতে পারলাম যে, সে পুনরায় আসবে।

কাজেই আমি তার অপেক্ষায় থাকলাম। সে এল এবং অঞ্জলি ভরে খাদ্র সামগ্রী নিতে লাগল। আমি ধরে ফেললাম এবং বললাম, আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে নিয়ে যাব। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দিন। কেননা, আমি খুবই দরিদ্র এবং আমার উপর পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব ন্যস্ত, আমি আর আসব না। তার প্রতি আমার দয়া হল এবং আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। সকাল হলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবূ হুরাইরাহ! তোমার বন্দী কী করল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার তীব্র প্রয়োজন এবং পরিবার-পরিজনের কথা বলায় তার প্রতি আমার দয়া হয়। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বললেন, খবরদার সে তোমার কাছে মিথ্যা বলেছে এবং সে আবার আসবে। তাই আমি তৃতীয়বার তার অপেক্ষায় রইলাম।

সে আবার আসল এবং অঞ্জলি ভর্তি করে খাদ্য সামগ্রী নিতে লাগল। আমি তাকে পাকড়াও করলাম এবং বললাম, আমি তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে অবশ্যই নিয়ে যাব। এ হলো তিনবারের শেষবার। তুমি প্রত্যেকবার বল যে, আর আসবে না, কিন্তু আবার আস। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দেব। যা দিয়ে আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন। আমি বললাম, সেটা কী?

সে বলল, যখন তুমি রাতে শয্যায় যাবে তখন আয়াতুল কুরসী (اللهُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ)  আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়বে। তখন আল্লাহর তরফ হতে তোমার জন্যে একজন রক্ষক নিযুক্ত হবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। কাজেই তাকে আমি ছেড়ে দিলাম। ভোর হলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, গত রাতের তোমার বন্দী কী করল? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমাকে বলল যে, সে আমাকে কয়েকটি বাক্য শিক্ষা দেবে যা দিয়ে আল্লাহ আমাকে লাভবান করবেন। তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি।

তিনি আমাকে বললেন, এই বাক্যগুলো কী? আমি বললাম, সে আমাকে বলল, যখন তুমি তোমার বিছানায় শুতে যাবে তখন আয়াতুল কুরসী ( اللهُ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ )  প্রথম হতে আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়বে এবং সে আমাকে বলল, এতে আল্লাহর তরফ হতে তোমার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবেন এবং ভোর পর্যন্ত তোমার নিকট কোন শয়তান আসতে পারবে না। সাহাবায়ে কিরাম কল্যাণের জন্য বিশেষ লালায়িত ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, এ কথাটি তো সে তোমাকে সত্য বলেছে। কিন্তু হুশিয়ার, সে মিথ্যুক। হে আবূ হুরাইরাহ! তুমি কি জান, তিন রাত ধরে তুমি কার সাথে কথাবার্তা বলেছিলে। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বললেন, না। তিনি বললেন, সে ছিল শয়তান। সহিহ বুখারি ২৩১১, ৩২৭৫, ৫০১০

৪। সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াতের ফজিলত-

আবূ মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ “‏ مَنْ قَرَأَ بِالآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ‏”‏‏

কেউ যদি রাতে সূরাহ বাকারার শেষ দু’টি আয়াত পাঠ করে, সেটাই তার জন্য যথেষ্ট। সহিহ বুখারি ৫০০৯

আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জিবরীল (আঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসেছিলেন। সে সময় তিনি উপর দিক থেকে দরজা খোলার একটা প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পেয়ে মাথা উঠিয়ে বললেনঃ এটি আসমানের একটি দরজা। আজকেই এটি খোলা হ’ল- ইতোপূর্বে আর কখনো খোলা হয়নি। আর এ দরজা দিয়ে একজন মালায়িকাহ পৃথিবীতে নেমে আসলেন। আজকের এ দিনের আগে আর কখনো তিনি পৃথিবীতে আসেননি। তারপর তিনি সালাম দিয়ে বললেনঃ আপনি আপনাকে দেয়া দু’টি নূর বা আলোর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনার পূর্বে আর কোন নবীকে তা দেয়া হয়নি। আর ঐ দু’টি নূর হ’ল ফা-তিহাতুল কিতাব বা সূরাহ আল ফাতিহাহ এবং সূরাহ আল বাকারাহ-এর শেষাংশ। এর যে কোন হারফ আপনি পড়বেন তার মধ্যকার প্রার্থিত বিষয় আপনাকে দেয়া হবে। সহিহ মুসলিম : ৮০৬

৫. সুরা আলে ইমরানের ফজিলত

নাওওয়াস ইবনু সামান (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

“‏ يُؤْتَى بِالْقُرْآنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَهْلِهِ الَّذِينَ كَانُوا يَعْمَلُونَ بِهِ تَقْدُمُهُ سُورَةُ الْبَقَرَةِ وَآلُ عِمْرَانَ ‏”‏ ‏.‏ وَضَرَبَ لَهُمَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ثَلاَثَةَ أَمْثَالٍ مَا نَسِيتُهُنَّ بَعْدُ قَالَ ‏”‏ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ أَوْ ظُلَّتَانِ سَوْدَاوَانِ بَيْنَهُمَا شَرْقٌ أَوْ كَأَنَّهُمَا حِزْقَانِ مِنْ طَيْرٍ صَوَافَّ تُحَاجَّانِ عَنْ صَاحِبِهِمَا

কিয়ামতের দিন কুরআন ও কুরআন অনুযায়ী যারা আমল করত তাদেরকে আনা হবে। সূরাহ আল বাকারাহ ও সূরাহ আল ইমরান অগ্রভাগে থাকবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাহ দু’টি সম্পর্কে তিনটি উদাহরণ দিয়েছিলেন যা আমি কখনো ভুলিনি। তিনি বলেছিলেনঃ এ সূরাহ দুটি দু’খণ্ড ছায়াদানকারী মেঘের আকারে অথবা দু’টি কালো চাদরের মতো ছায়াদানকারী হিসেবে আসবে যার মধ্যখানে আলোর ঝলকানি অথবা সারিবদ্ধ দু’ ঝাক পাখীর আকারে আসবে এবং পাঠকারীদের পক্ষ নিয়ে যুক্তি দিতে থাকবে। সহিহ মুসলিম : ৮০৫

৬। সুরা কাহাফের ফজিলত –

আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-

“‏ مَنْ حَفِظَ عَشْرَ آيَاتٍ مِنْ أَوَّلِ سُورَةِ الْكَهْفِ عُصِمَ مِنَ الدَّجَّالِ ‏

‘যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম দিক থেকে দশটি আয়াত মুখস্ত করবে,সে দাজ্জালের (ফিৎনা) থেকে পরিএাণ পাবে।’’ অন্য বর্ণনায় ‘কাহফ সূরার শেষ দিক থেকে’ উল্লেখ হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ৮০৯, , আলবানি, সহিহা : ৫৮২

আবু সাইদ আল-খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ.

“যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে নূর (আলোক) চমকাবে। সুনান আন-নাসাঈ আল-কুবরা: ৫২৮৯, মুস্তাদরাক আল-হাকিম : ৩৩৯২, সুনান আদ-দারিমি : ৩৪০০

বারা ইবনু আযিব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি সূরাহ আল কাহফ পড়ছিল। সে সময় তার কাছে মজবুত লম্বা দু’টি রশি দিয়ে একটি ঘোড়া বাঁধা ছিল। এ সময়ে একখণ্ড মেঘ তার মাথার উপরে এসে হাজির হ’ল। মেঘ খণ্ডটি ঘুরছিল এবং নিকটবর্তী হচ্ছিল। এ দেখে তার ঘোড়াটি ছুটে পালাচ্ছিল। সকাল বেলা সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে ঐ বিষয়টি বর্ণনা করল। এসব কথা শুনে তিনি বললেনঃ এটি ছিল (আল্লাহর তরফ থেকে) রহমত বা প্রশান্তি যা কুরআন পাঠের কারণে অবতীর্ণ হয়েছিল  সহিহ মুসলিম : ৭৯৫

৭। সুরা মুলকের ফজিলত –

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

سُورَةٌ مِنَ الْقُرْآنِ ثَلَاثُونَ آيَةً تَشْفَعُ لِصَاحِبِهَا حَتَّى يُغْفَرَ لَهُ ‏(تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ

কুরআনে তিরিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরাহ রয়েছে। সূরাহটি তার পাঠকের জন্য সুপারিশ করবে, শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। সূরাহটি হচ্ছে ’তাবারকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক।’ সুনানে ইমাম আবু দাউদ : ১৪০০, সুনানে তিরমিজি : ২৮৯১, সহিহ আত-তারগিব ওয়াত তারহিব: ১৪৭৫

ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ কোন এক সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক সাহাবী একটি কবরের উপর তার তাবু খাটান। তিনি জানতেন না যে, তা একটি কবর। তিনি হঠাৎ বুঝতে পারেন যে, কবরে একটি লোক সূরা আল-মুলক পাঠ করছে। সে তা পাঠ করে সমাপ্ত করলো। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে এসে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি একটি কবরের উপর তাঁবু খাটাই। আমি জানতাম না যে, তা কবর। হঠাৎ বুঝতে পারি যে, একটি লোক সূরা আল-মুলক পাঠ করছে এবং তা সমাপ্ত করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ সূরাটি প্রতিরোধকারী নাজাত দানকারী। এটা কবরের আযাব হতে তিলাওয়াতকারীকে নাজাত দান করে। সুনানে তিরমিজি : ২৮৯০

৮। সুরা ওয়াকিয়ার ফজিলত-

বাইহাকি শুয়াবুল ইমান গ্রন্থে এই সুরার ফজিলতে একটি হদিস আছে-

“مَن قَرَأَ سُورَةَ الْوَاقِعَةِ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَقْرَةٌ أَبَدًا.” عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি প্রতিদিন রাতে সুরা ওয়াকিয়া তেলাওয়াত করবে, তাকে কখনো দরিদ্রতা স্পর্শ করবে না। বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ২৪৯৮

৭. সুরা হাশরের ফজিলত-

হাসান (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

مَنْ قَرَأَ ثَلَاثَ آيَاتٍ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْحَشْرِ إِذَا أَصْبَحَ فَمَاتَ مِنْ يَوْمِهِ ذَلِكَ طُبِعَ بِطَابَعِ الشُّهَدَاءِ وَإِنْ قَرَأَ إِذَا أَمْسَى فَمَاتَ مِنْ لَيْلَتِهِ طُبِعَ بِطَابَعِ الشُّهَدَاءِ

যে ব্যক্তি সকালে সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করে, সে যদি সেই দিন মৃত্যুবরণ করে, তবে তাকে শাহাদাতের সীল (টিকিট) প্রদান করা হবে এবং সন্ধ্যায় তা পাঠ করলে সে যদি সেই রাতে মৃত্যুবরণ করে, তবে তাকে শাহাদাতের সীল লাভ প্রদান করা হবে। সুনান আদ-দারেমী : ৩৪৬২ হাদিসের মান সহিহ (হাদিসবিডি)

মাকিল ইবন ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সকালে তিনবার পাঠ করবে-

أَعُوذُ بِاللهِ السَّمِيعِ العَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

এরপর সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করবে আল্লাহ্ তা’আলা তার জন্য সত্তর হাজার ফিরিশতা নিযুক্ত করে দেন। যাঁরা বিকাল পর্যন্ত তার জন্য রহমতের দু’আ করতে থাকেন। এই দিন যদি সে মারা যায় তবে তার শহীদী মৃত্যু হয়। আর যদি বিকালে পাঠ করে তবুও ঐ ফজিলতই হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৯২২, বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান : ২৫০২। সুনান আদ-দারেমী : ৩৪৬২ হাদিসের মান জঈফ

৯. সুরা কাফিরুনের ফজিলত

আনাস বিন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ قُلْ يَا أَيُّهَا الْكافِرُونَ عَدَلَتْ لَهُ بِرُبْعِ الْقُرْآنِ وَمَنْ قَرَأَ قُلْ هُوَ الله أَحَدٌ عَدَلَتْ لَهُ بِثُلُثِ الْقُرْآنِ

যে ব্যক্তি ’ক্বুল ইয়া-আইয়্যুহাল কা-ফিরূন’ পাঠ করবে, তার এক চতুর্থাংশ কুরআন পাঠের সমান সওয়াব লাভ হবে। আর যে, ব্যক্তি ’ক্বুল হুওয়াল্লা-হু আহাদ’ পাঠ করবে তার এক তৃতীয়াংশ কুরআন পাঠের সমান সওয়াব লাভ হবে। হাদিস সম্ভার : ১৪৪৭, সুনানে তিরমিযী : ২৮৯৩, সহীহুল জামে : ৬৪৬৬

১০। সূরা ইখলাসের ফজিলত

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ‏ تَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ ‏

’কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’’ সূরাটি কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮৭, সুনানে তিরমিযী ২৮৯৯, ২৯০০, আহমাদ ৯২৫১, দারেমী ৩৪৩২

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَقْبَلْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَسَمِعَ رَجُلاً يَقْرَأُْ ‏(‏قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ * اللَّهُ الصَّمَدُ ‏)‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ وَجَبَتْ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ وَمَا وَجَبَتْ قَالَ ‏”‏ الْجَنَّةُ ‏”‏

একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আসছিলাম। তখন তিনি এক ব্যক্তিকে “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস সামাদ” পাঠ করতে শুনলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ওয়াজিব (অবধারিত) হয়ে গেছে। আমি প্রশ্ন করলাম, কি ওয়াজিব হয়ে গেছে? তিনি বললেনঃ জান্নাত। সুনানে তিরমিজি : ২৮৯৭,

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে ’কুল হুআল্লাহু আহাদ’ পড়তে শুনলেন। সে বার বার তা মুখে উচ্চারণ করছিল। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে এ ব্যাপারে বললেন। যেন ঐ ব্যক্তি তাকে কম মনে করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

وَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ إِنَّهَا لَتَعْدِلُ ثُلُثَ الْقُرْآنِ

সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার জীবন। এ সূরাহ হচ্ছে সমগ্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান। সহিহ বুখারি : ৫০১৩, ৬৬৪৩

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে বলেছেন-

أَيَعْجِزُ أَحَدُكُمْ أَنْ يَقْرَأَ ثُلُثَ الْقُرْآنِ فِيْ لَيْلَةٍ فَشَقَّ ذَلِكَ عَلَيْهِمْ وَقَالُوْا أَيُّنَا يُطِيْقُ ذَلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ فَقَالَ اللهُ الْوَاحِدُ الصَّمَدُ ثُلُثُ الْقُرْآنِ

তোমাদের কেউ কি এক রাতে কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করা সাধ্যাতীত মনে কর? এ প্রশ্ন তাদের জন্য কঠিন ছিল। এরপর তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের মধ্যে কার সাধ্য আছে যে, এটা পারবে? তখন তিনি বললেন, ’’কুল হুআল্লাহ আহাদ’’ অর্থাৎ সূরাহ ইখ্লাস কুরআনের তিন ভাগের এক ভাগ। সহিহ বুখারি : ৫০১৫, ৫০১৪, ৫৫৪৩, ৭৩৭৫, নাসায়ী ৯৯৫, আবূ দাউদ ১৪৬১, আহমাদ ১০৬৬৯, ১০৭৩১, মুওয়াত্তা মালিক ৪৭৭, ৪৮৩

মুআয বিন আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ’ক্বুল হুঅল্লা-হু আহাদ’ শেষ পর্যন্ত ১০ বার পাঠ করবে, আল্লাহ সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতে এক মহল নির্মাণ করবেন। এ কথা শুনে উমার বিন খাত্ত্বাব (রাঃ) বললেন, তাহলে আমরা বেশি বেশি করে পড়ব হে আল্লাহর রসূল! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহও বেশি দানশীল ও বেশি পবিত্র। হাদিস সম্ভার : ১৪৪৮, আহমাদ ১৫৬১০, সহীহাহ : ৫৮৯

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাহাবীকে একটি মুজাহিদ দলের প্রধান করে অভিযানে পাঠালেন। সালাতে তিনি যখন তাঁর সাথীদের নিয়ে ইমামত করতেন, তখন ইখ্লাস সূরাটি দিয়ে সালাত শেষ করতেন। তারা যখন অভিযান থেকে ফিরে আসল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে ব্যাপারটি আলোচনা করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাঁকেই জিজ্ঞেস করে কেন সে এ কাজটি করেছে? এরপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দিলেন, এ সূরাটির আল্লাহ্ তা’আলার গুণাবলী রয়েছে। এ জন্য সূরাটিতে পড়তে আমি ভালোবাসি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাকে জানিয়ে দাও, আল্লাহ্ তাঁকে ভালবাসেন। সহিহ বুখারি : ৭৩৭৫, সহিহ মুসলিম : ৮১৩

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একদিন) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা এক জায়গায় জমায়েত হও। কারণ আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাদেরকে কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশ পড়ে শুনাব। সুতরাং যাদের জমায়েত হওয়ার তারা জমায়েত হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে আসলেন এবং “কুল হওয়াল্ল-হু আহাদ” সূরাটি পড়লেন। তারপর তিনি গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। তখন আমরা একে অপরকে বলতে থাকলাম, আমার মনে হয় আসমান থেকে কোন খবর এসেছে আর সে জন্যই তিনি ভিতরে প্রবেশ করেছেন। পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে এসে বললেনঃ আমি তোমাদের বলেছিলাম যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তোমাদেরকে কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশ পাঠ করে শোনাব। জেনে রাখ এটি (সূরাহ ইখলাস) কুরআন মাজীদের এক তৃতীয়াংশের সমান। সহিহ মুসলিম : ৮১২

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কুবা মসজিদে আনসার সম্প্রদায়ের এক লোক তাদের ইমামতি করতেন। তিনি নামাযে সূরা আল-ফাতিহার পর কোন সূরা পাঠ করার ইচ্ছা করলে প্রথমে সূরা কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ পাঠ করতেন এবং এ সূরা শেষ করার পর এর সাথে অন্য সূরা পাঠ করতেন। তিনি প্রতি রাকাআতেই এরূপ করতেন।

তার সাথীরা তার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করে বললেন, আপনি এ সূরাটি পাঠ করার পর মনে করেন যে, এটা বুঝি যথেষ্ট হয়নি, তাই এর সাথে অন্য আরেকটি সূরাও পাঠ করেন। আপনি হয় এ সূরাটিই পাঠ করবেন, না হয় এটা বাদ দিয়ে অন্য কোন সূরা পাঠ করবেন। তিনি বললেন, আমি এ সূরা বাদ দিতে পারব না। যদি তোমাদের পছন্দ হয় তবে আমি এ সূরাসহ ইমামতি করি, আর পছন্দ না হলে ইমামতি ছেড়ে দেই। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সবচাইতে উত্তম ব্যক্তি। তাই তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ইমাম বানাতে তারা সম্মত হলেন না। পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলে তারা বিষয়টি তাকে জানালেন। তিনি বললেনঃ হে অমুক! তোমার সাথীরা তোমাকে যে নির্দেশ দিচ্ছে তা পালন করতে তোমাকে কিসে বাধা দিচ্ছে? আর তোমাকে প্রতি রাকআতে এ সূরা পাঠ করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করছে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এটি খুব ভালোবাসি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এর প্রতি তোমার ভালোবাসাই তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২৯০১

১১। সূরা ফালাক ও সূরা নাসের ফজিলত-

আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَتَعَوَّذُ مِنَ الْجَانِّ وَعَيْنِ الإِنْسَانِ حَتَّى نَزَلَتِ الْمُعَوِّذَتَانِ فَلَمَّا نَزَلَتَا أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَاهُمَا ‏.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিন এবং মানুষের কু-দৃষ্টি হতে আশ্রয় চাইতেন। তারপর সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল হলে তিনি এ সূরা দুটি গ্রহণ করেন এবং বাকীগুলো পরিত্যাগ করেন। সুনানে তিরমিজি : ২০৫৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৫১১

‘আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত-

كَانَ إِذَا أَوَى إِلَى فِرَاشِهِ كُلَّ لَيْلَةٍ جَمَعَ كَفَّيْهِ ثُمَّ نَفَثَ فِيْهِمَا فَقَرَأَ فِيْهِمَا{قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ}وَ {قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ} وَ {قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ} ثُمَّ يَمْسَحُ بِهِمَا مَا اسْتَطَاعَ مِنْ جَسَدِهِ يَبْدَأُ بِهِمَا عَلَى رَأْسِهِ وَوَجْهِهِ وَمَا أَقْبَلَ مِنْ جَسَدِهِ يَفْعَلُ ذَلِكَ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ

প্রতি রাতে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিছানায় যাওয়ার প্রাক্কালে সূরা ইখ্‌লাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে দু’হাত একত্র করে হাতে ফুঁক দিয়ে যতদূর সম্ভব সমস্ত শরীরে হাত বুলাতেন। মাথা ও মুখ থেকে আরম্ভ করে তাঁর দেহের সম্মুখ ভাগের উপর হাত বুলাতেন এবং তিনবার এরূপ করতেন। সহিহ বুখারি : ৫০১৭

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ إِذَا اشْتَكَى يَقْرَأُ عَلَى نَفْسِهِ بِالْمُعَوِّذَاتِ وَيَنْفُثُ فَلَمَّا اشْتَدَّ وَجَعُهُ كُنْتُ أَقْرَأُ عَلَيْهِ وَأَمْسَحُ بِيَدِهِ رَجَاءَ بَرَكَتِهَا

যখনই নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ হতেন তখনই তিনি ‘সূরায়ে মু’আব্বিযাত’ পড়ে নিজের উপর ফুঁক দিতেন। যখন রোগ কঠিন হয়ে গেল, তখন বাকাত অর্জনের জন্য আমি এই সূরা পাঠ করে তাঁর হাত দিয়ে শরীর মাসহ্ করিয়ে দিতাম। সহিহ বুখারি : ৫৭৪৫, ৫৭৪৬, সহিহ মুসলিম : ২১৯৪, আহমাদ : ২৪৬৭১

একদা ইবনে আবেস জুহানী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-

يَا ابْنَ عَابِسٍ أَلَا أُخْبِرُكَ بِأَفْضَلِ مَا تَعَوَّذَ بِهِ الْمُتَعَوِّذُونَ؟ قُلْتُ: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ وَقُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ

হে ইবনে আবেস! আমি তোমাকে উত্তম ঝাড়-ফুঁকের কথা বলে দেব না কি, যার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনাকারীরা আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে? তিনি বললেন, অবশ্যই বলে দিন, হে রাসূলাল্লাহ! তিনি ফালাক ও নাস সূরা দুটিকে উল্লেখ করে বললেন, এ সূরা দুটি হল মুআব্বিযাতান (ঝাড়-ফুঁকের মন্ত্র)। হাদিস সম্ভার : ১৪৫৩, আহমাদ ১৫৪৪৮, ১৭২৯৭, নাসাঈ কুবরা ৭৮৪৭

আবূ সাঈদ খুদরী ( রাঃ) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সূরা ফালাক্ক ও নাস অবতীর্ণ হবার পূর্ব পর্যন্ত নিজ ভাষাতে) জিন ও বদ নজর থেকে (আল্লাহর) আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। পরিশেষে যখন উক্ত সূরা দু’ টি অবতীর্ণ হল, তখন ঐ সূরা দু’টি দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করতে লাগলেন এবং অন্যান্য সব পরিহার করলেন’। সুনানে তিরমিজী : ২০৫৮, হাদিস সম্ভার : ১৪৫৩

১২।  সূরা ফাতহ এর ফজিলত –

আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু মুগাফফাল (রাঃ) হতে বর্ণিত-

 رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ وَهُوَ يَقْرَأُ عَلَى رَاحِلَتِهِ سُوْرَةَ الْفَتْحِ

মাক্কাহ বিজয়ের দিন আমি রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে (উটের পিঠে) আরোহন অবস্থায় ‘সুরাহ আল্‌ ফাত্‌হ’ তিলাওয়াত করতে দেখেছি। সহিহ বুখারি : ৫০৩৪

১৩। সূরা বনী ইসরাঈল ও সূরা আয-যুমার ফজিলত

এই সম্পর্কে একটি হাদিস-

قَالَتْ عَائِشَةُ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لاَ يَنَامُ عَلَى فِرَاشِهِ حَتَّى يَقْرَأَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَالزُّمَرَ ‏

আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, সূরা বনী ইসরাঈল ও সূরা আয-যুমার তিলাওয়াত না করা পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমাতেন না। সুনানে তিরমিজি : ২৯২০

কুরআনের আয়াত ও সুরার ফজিলত অর্জনের পাশাপাশি পুরো কুরআন তাজবীদ ও তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করা উচিত। যারা কুরআন বোঝেন, তাদের এটি আরও যত্নসহকারে করা উচিত। যারা বোঝেন না, তাদের সহীহ তিলাওয়াত শেখার পর বোঝার চেষ্টা করতে হবে, যাতে কুরআনের হেদায়েত লাভ করা যায়। সবার উচিত গভীর চিন্তা ও সত্যিকারের উপলব্ধি মাধ্যমে কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করা। মহান আল্লাহ বলেন-

کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَلِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ

আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সুরা সাদ : ২৯

১৪. কুরআন বিশেষ একটি আয়াতে ফজিলত

ইরবায বিন সারিয়াহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقْرَأُ الْمُسَبِّحَاتِ قَبْلَ أَنْ يَرْقُدَ، وَقَالَ: إِنَّ فِيهِنَّ آيَةً أَفْضَلُ مِنْ أَلْفِ آيَةٍ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শয়ন করার আগে শুরুতে তসবীহ (’সাব্বাহা’ বা ইউসাব্বিহু) বিশিষ্ট (বনী ইসরাঈল, হাদীদ, হাশর, সাফ্, জুমুআহ, তাগাবুন, ও আ’লা এই সাতটি) সূরা পাঠ করতেন। তিনি বলেন, ঐ সূরাগুলির মধ্যে এমন একটি আয়াত নিহিত আছে যা এক হাজার আয়াত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সুনানে আবু দাউদ : ৫১৫৭, হাদিস সম্ভার : ১৪৫৮, আহমাদ ১৭২৯২

কয়েকটি জঈফ ও জাল ফজিলত

১. মাকিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা তোমাদের মৃতদের কাছে সূরা ইয়াসিন পড়ো। ইবনে মাজাহ : ১৪৪৮, সুনানে আবু দাউদ : ৩১২১, আহমাদ ১৯৭৮৯, ১৯৮০৩, মিশকাত : ১৬২২, যঈফাহ ৫৮৬১। হাদিসটির মান জঈফ কোন মতভেদ নাই।

২. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ قَلْبًا وَقَلْبُ الْقُرْآنِ يس وَمَنْ قَرَأَ يس كَتَبَ اللَّهُ لَهُ بِقِرَاءَتِهَا قِرَاءَةَ الْقُرْآنِ عَشْرَ مَرَّاتٍ ‏”‏

প্রত্যেকটা বস্তুর কলব (হৃদয়) আছে। কুরআনের কলব হচ্ছে সূরা ইয়াসীন। যে ব্যক্তি এ সূরা একবার পাঠ করবে আল্লাহ তা’আলা এর পরিবর্তে তার জন্য দশবার কুরআন পাঠের সমান সাওয়াব নিরূপণ করবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৮৮৭, অনেকই হাদিসটি জঈপ বললেও প্রকৃত পক্ষে হাদিসের মান জাল।

হাদিসটি সুনানে তিরমিজি ও সুনানে দামেরীতে থাকা স্বত্ত্বেও শাইখ নাসিরউদ্দন অনেক গবেষনা করে বলেছেন হাদিসটি জাল। বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানতে তার লিখিত জঈফা কিতাবের ১৬৯ নম্বর হাদিস দেখে নিতে পারেন।

৩.  যে ব্যাক্তি তার পিতা-মাতা উভয়ের কবর প্রত্যেক জুম’আর দিবসে যিয়ারত করবে। অতঃপর তাদের উভয়ের নিকট অথবা পিতার কবরের নিকট সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে, প্রত্যেক আয়াত অথবা অক্ষরের সংখ্যার বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। এই হাদিসটি জাল শাইখ নাসিরউদ্দিন আলবানি জঈফা : ৫০

কুরআন তিলওয়াতের ফজিলত

কুরআন তিলওয়াতের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন তিলওয়াত মহান আল্লাহর আদেশ আল কুরআন মাজীদে ইরশাদ করা হয়েছে এভাবে-

اُتۡلُ مَاۤ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ مِنَ الۡکِتٰبِ وَاَقِمِ الصَّلٰوۃَ ؕ اِنَّ الصَّلٰوۃَ تَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ

তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত কর এবং সালাত কায়েম কর। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে। সূরা আনকাবুত : ৪৫

আল্লাহ রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আদেশ দিচ্ছেন কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য। আল্লাহ এই আদেশ তার সকল উম্মতের জন্যই প্রযোজ্য। কুরআন তিলওয়াতের মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। এটি ঈমান দৃঢ় করে এবং আখিরাতে সুপারিশকারী হয়। কুরআন তিলাওয়াত ঈমান শক্তিশালী করে, জ্ঞান বাড়ায় এবং আল্লাহর হেদায়েত অনুসরণে সহায়তা করে। কুরআন তিলাওয়াত মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে প্রেরণা জোগায়। কুরআন তিলাওয়াত করা কুরআনের অন্যতম হক।

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঐশিগ্রন্থ আল কুরআন। কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ বুঝে কিংবা না বুঝে যেভাবেই পড়ুক না কেন পাঠকের জন্য নেকি আছে। এমন কি এই  ঐশি গ্রন্থের সাথে ভালবাসা রাখাও নেকির কাজ। কুরআন যথাযথ তেলওয়ার শিক্ষা গ্রহন করার পর নিয়মিত কুরআন তিলওয়ার করতে হবে। কুরআন তেলাওয়াত করা মহান আল্লাহর হুকুম, তা সত্বেও নিয়মিত কুরআন তেলওয়াত করা মুস্তাহাব পর্যায়ের আমল। এটি জরুরী বা ফরজ পর্যায়ের আমল নয়। এই আমল না করলে কোন মুসলমান গুনাহগার হবেন না। কিন্তু মনে রাখতে হবে কুরআন তেলওয়াত একটি গুরুত্বপূর্ন ইবাদাত। প্রয়োজন পরিমান কুরআন শিক্ষা করা ও মুখন্ত করা অবশ্যই ফরজ।

কুরআন তিলাওয়াত এইটি ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি ও সওয়াব অর্জনের হয।। প্রতিটি অক্ষরের তিলাওয়াতে বহু গুণ সওয়াবের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এটি হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, পাপ মোচন করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করে। নিম্মে কুরআন তিলাওয়াতের অপরিসীম ফজিলতের বর্ণনা প্রদান করা হলো-

কুরআনের আলোকে কুরআন তিলাওয়াত ফজিলত

১. কুরআন তিলওয়াত একটি ব্যবসা যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে :

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَتۡلُوۡنَ کِتٰبَ اللّٰہِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاَنۡفَقُوۡا مِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ سِرًّا وَّعَلَانِیَۃً یَّرۡجُوۡنَ تِجَارَۃً لَّنۡ تَبُوۡرَ ۙ

নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ যে রিয্ক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না। সুরা ফাতির : ২৯-৩০

কুরআন তিলওয়াত এমন একটি ব্যবসা যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কাজেই এই ব্যবসার প্রতি গুরুত্ব আরফ করে নিয়মিত কুরআন তিলওয়াত করি।

২. কুরআন তিলাওয়াত ঈমান বৃদ্ধি করেঃ

কুরআন তিলাওয়াত করা বান্দার জন্য এমন উপকারী। এবং কুরআন তিলাওয়াত করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُهُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُهُۥ زَادَتۡهُمۡ إِيمَٰنٗا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ ٢ 

অর্থ: ‘মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে’। সুরা  আনফাল : ২

৩. মুমিনের অত্যতম গুন কুরআন তিলওয়াত করা

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلاَوَتِهِ أُوْلَـئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمن يَكْفُرْ بِهِ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

অর্থঃ আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। সুরা বাকারা : ১২১

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

لَيْسُواْ سَوَاء مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَآئِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللّهِ آنَاء اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ

অর্থঃ তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। সুরা ইমরান : ১১৩

৪. কুরআন তিলওয়াত কাফিরদের অসন্তোষ কর তোলে :

মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ تَعْرِفُ فِي وُجُوهِ الَّذِينَ كَفَرُوا الْمُنكَرَ يَكَادُونَ يَسْطُونَ بِالَّذِينَ يَتْلُونَ عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا قُلْ أَفَأُنَبِّئُكُم بِشَرٍّ مِّن ذَلِكُمُ النَّارُ وَعَدَهَا اللَّهُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَبِئْسَ الْمَصِيرُ

অর্থঃ যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ আবৃত্তি করা হয়, তখন তুমি কাফেরদের চোখে মুখে অসন্তোষের লক্ষণ প্রত্যক্ষ করতে পারবে। যারা তাদের কাছে আমার আয়াত সমূহ পাঠ করে, তারা তাদের প্রতি মার মুখো হয়ে উঠে। বলুন, আমি কি তোমাদেরকে তদপেক্ষা মন্দ কিছুর সংবাদ দেব? তা আগুন আল্লাহ কাফেরদেরকে এর ওয়াদা দিয়েছেন। এটা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল। সুরা হাজ্জ্ব : ৭২

সহিহ হাদিসের আলোকে কুরআন তিলাওয়াত ফজিলত

১. সে ব্যক্তি উত্তম, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়

উসমান (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়। সহিহ বুখারি :৫০২৭, ৫০২৮

২.  কুরআন তিলওয়াতে প্রতি হরফের জন্য সওয়াব প্রদান করা হয় :

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ

আল্লাহ তা’আলার কিতাবের একটি হরফ যে ব্যক্তি পাঠ করবে তার জন্য এর সাওয়াব আছে। আর সাওয়াব হয় তার দশ গুণ হিসেবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ। সুনানে তিরমিজি : ২৯১০, মিশকাত : ২১৩৭

৩. কুরআনের তিলওয়াতে সালাতের মত সওয়াব

তামীম দারী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ مِائَةَ آيَةٍ فِي لَيْلَةٍ كُتِبَ لَهُ قُنُوتُ لَيْلَةٍ

যে ব্যক্তি এক রাতে একশ’টি আয়াত পাঠ করবে, সে ব্যক্তির আমলনামায় ঐ রাত্রির কিয়াম (নামাযের) সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে। হাদিস সম্ভার : ১৪২৩, আহমাদ ১৬৯৫৮, নাসাঈর কুবরা ১০৫৫৩, ত্বাবারানী ১২৩৮, দারেমী ৩৪৫০, সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৪৪

ফাযালাহ বিন উবাইদ (রাঃ) ও তামীম দারী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ عَشْرَ آيَاتٍ فِي لَيْلَةٍ كُتِبَ لَهُ قِنْطَارٌ وَالْقِنْطَارُ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا

যে ব্যক্তি রাত্রে দশটি আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য ’ক্বিন্তার’ পরিমাণ সওয়াব লেখা হবে। ’ক্বিন্তার’ পৃথিবী ও তন্মধ্যস্থিত সকল বস্তু হতে শ্রেষ্ঠ। হাদিস সম্ভার : ১৪২৪, ত্বাবারানীর কাবীর ১২৩৯, আওসাত্ব ৮৪৫১, সহিহ আত তারগীব ৬৩৮

৪. কুরআন তিলওয়াত গাভিন উষ্ট্রী প্রাপ্তি থেকেও উত্তম

অবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

‏”‏ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ إِذَا رَجَعَ إِلَى أَهْلِهِ أَنْ يَجِدَ فِيهِ ثَلاَثَ خَلِفَاتٍ عِظَامٍ سِمَانٍ ‏”‏ ‏.‏ قُلْنَا نَعَمْ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ فَثَلاَثُ آيَاتٍ يَقْرَؤُهُنَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلاَتِهِ خَيْرٌ لَهُ مِنْ ثَلاَثِ خَلِفَاتٍ سِمَانٍ عِظَامٍ ‏”.‏>

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কেউ কি তার ঘরে ফিরে এসে সেখানে তিনটি হৃষ্টপুষ্ট গর্ভবতী উষ্ট্রী পেতে পছন্দ করে? আমরা বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ তার নামাযে তিনটি আয়াত পড়লে তার জন্য হৃষ্টপুষ্ট তিনটি গর্ভবতী উষ্ট্রীর চেয়ে উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮২, আহমাদ ৯৬৮৭, ১০০৬৯, দারেমী ৩৩১৪

উক্বাহ ইবনু আমির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলেন। তখন আমরা সুফফাহ বা মসজিদের চত্বরে অবস্থান করছিলাম। তিনি বললেনঃ তোমরা কেউ চাও যে, প্রতিদিন “বুত্বহান” বা আকীকের বাজারে যাবে এবং সেখানে থেকে কোন পাপ বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা ছাড়াই বড় কুঁজ বা চুঁটবিশিষ্ট দু’টি উটনী নিয়ে আসবে? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা এরূপ চাই। তিনি বললেনঃ তাহলে কি তোমরা কেউ মসজিদে গিয়ে আল্লাহর কিতাবের দু’টি আয়াত শিক্ষা দিবে না কিংবা পাঠ করবে না? এটা তার জন্য ঐরুপ দু’টি উটনীর চেয়েও উত্তম। এরূপ তিনটি আয়াত তিনটি উটনীর চেয়ে উত্তম এবং চারটি আয়াত চারটি উটনীর চেয়ে উত্তম। আর অনুরূপ সমসংখ্যক উটনীর চেয়ে তত সংখ্যক আয়াত উত্তম। সহিহ মুসলিম : ৮০৩

৫. কুরআন কিয়ামতের দিন তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশ করবে :

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

“اقْرَؤُوا الْقُرْآنَ، فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ

তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কেননা কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

জাবের (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন-

الْقُرْآنُ شَافِعٌ مُشَفَّعٌ وَمَاحِلٌ مُصَدَّقٌ، مَنْ جَعَلَهُ أَمَامَهُ قادَهُ إِلَى الْجَنَّةِ وَمَنْ جَعَلَهُ خَلْفَهُ سَاقَهُ إِلَى النَّارِ

এই কুরআন (কিয়ামতে) সুপারিশকারী; তার সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হবে। (কুরআন) সত্যায়িত প্রতিবাদী। যে ব্যক্তি তাকে নিজ সামনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জান্নাতের প্রতি পথপ্রদর্শন করে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি তাকে পিছনে রাখবে, সে ব্যক্তিকে সে জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করবে। হাদিস সম্ভার : ১৪১১, সহিহ ইবনে হিব্বান ১২৪, সহীহ তারগীব : ১৪২৩

আবু উমামাহ বাহেলী (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে শুনেছি, তিনি বলেছেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে। তোমরা দুই জ্যোতির্ময় সূরা; বাক্বারাহ ও আ-লে ইমরান পাঠ কর। কারণ উভয়েই মেঘ অথবা উড়ন্ত পাখীর ঝাঁকের ন্যায় কিয়ামতের দিন উপস্থিত হয়ে তাদের পাঠকারীদের হয়ে (আল্লাহর নিকট) হুজ্জত করবে। তোমরা সূরা বাক্বারাহ পাঠ কর। কারণ তা গ্রহণ করায় বরকত এবং বর্জন করায় পরিতাপ আছে। আর বাতেলপন্থীরা এর মোকাবেলা করতে পারে না। মুআবিয়াহ বিন সাল্লাম বলেন, আমি শুনেছি যে, বাতেলপন্থীরা অর্থাৎ যাদুকর দল। সহিহ মুসলিম : ১৯১০, হাদিস সম্ভার : ১৪১২

৬. কুরআন তিলওয়কর আল্লাহ ও তাঁর রসূল কে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালোবাসার নিদর্সন

ইবনে মাসঊদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُحِبَّ الله وَرَسُولَهُ فَلْيَقْرَأْ في المُصْحَفِ

যে ব্যক্তি চায় যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে (অধিক) ভালবাসুক (অথবা আল্লাহ ও তাঁর রসূল তাকে ভালবাসুন), সে যেন কুরআন দেখে পাঠ করে। হাদিস সম্ভার : ১৪১৩, ইহাক্বীর শুআবুল ঈমান ২২১৯, সিলসিলাহ সহীহাহ ২৩৪২

৭. কুরআন তিলওয়াতকারি আল্লাহর খাস লোক :

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ لِلهِ أَهْلِينَ مِنْ النَّاسِ فَقِيلَ مَنْ أَهْلُ اللهِ مِنْهُمْ قَالَ أَهْلُ الْقُرْآنِ هُمْ أَهْلُ اللهِ

মানবমণ্ডলীর মধ্য হতে আল্লাহর কিছু বিশিষ্ট লোক আছে; আহলে কুরআন (কুরআন বুঝে পাঠকারী ও তদনুযায়ী আমলকারী ব্যক্তিরাই) হল আল্লাহর বিশেষ ও খাস লোক। হাদিস সম্ভার : ১৪১৬, আহমাদ ১২২৭৯, সহীহুল জামে : ২১৬৫

৮. কিয়ামতের দিন কুরআনের বাহককে অলংকার পড়ান হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُولُ يَا رَبِّ حَلِّهِ فَيُلْبَسُ تَاجَ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُولُ يَا رَبِّ زِدْهُ فَيُلْبَسُ حُلَّةَ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُولُ يَا رَبِّ ارْضَ عَنْهُ فَيَرْضَى عَنْهُ فَيُقَالُ لَهُ اقْرَأْ وَارْقَ وَتُزَادُ بِكُلِّ آيَةٍ حَسَنَةً ‏”

কুরআন কিয়ামত দিবসে হাযির হয়ে বলবে, হে আমার প্রভু! একে (কুরআনের বাহককে) অলংকার পরিয়ে দিন। তারপর তাকে সম্মান ও মর্যাদার মুকুট পরানো হবে। সে আবার বলবে, হে আমার প্রভু! তাকে আরো পোশাক দিন। সুতরাং তাকে মর্যাদার পোশাক পরানো হবে। সে আবার বলবে, হে আমার প্রভু! তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। কাজেই তিনি তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। তারপর তাকে বলা হবে, তুমি এক এক আয়াত পাঠ করতে থাক এবং উপরের দিকে উঠতে থাক। এমনিভাবে প্রতি আয়াতের বিনিময়ে তার একটি করে সাওয়াব (মর্যাদা) বাড়ানো হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৫, হাদিস সম্ভার : ১৪২৬, হাকেম ২০২৯, দারেমী ৩৩১১, সহীহুল জামে ৮০৩০

৯. কুরআনের বাহককে জান্নাতে প্রবেশ কালে পাঠ করবে আর আরহন করতে থাকবে

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ “‏ يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ إِذَا دَخَلَ الْجَنَّةَ اقْرَأْ وَاصْعَدْ ‏.‏ فَيَقْرَأُ وَيَصْعَدُ بِكُلِّ آيَةٍ دَرَجَةً حَتَّى يَقْرَأَ آخِرَ شَىْءٍ مَعَهُ

কুরআনের বাহককে জান্নাতে প্রবেশকালে বলা হবে, তুমি পাঠ করতে থাকো এবং উপরে আরোহণ করতে থাকো। অতঃপর সে পড়তে থাকবে এবং প্রতিটি আয়াত পড়ার সাথে সাথে একটি স্তর অতিক্রম করবে। এভাবে সে তার জ্ঞাত শেষ আয়াতটি পর্যন্ত পড়বে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৮০, হাদিস সম্ভার : ১৪২৮, আহমাদ ১০৯৬৮,  সহীহাহ ২২৪০, সহীহুল জামে : ৮১২১

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا ‏”‏

(কিয়ামতের দিন) কুরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাক ও উপরে আরোহণ করতে থাক এবং দুনিয়াতে যেভাবে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে ঠিক সেরূপে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে থাক। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে সেখানেই তোমার স্থান। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৪, সুনানে আব দাউদ : ১৪৬৬, মিশকাত : ২১৩৪, সহীহাহ : ২২৪০

১০. কুরআন তিলওয়াতকারীদের আল্লাহ প্রশংসা করেন-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ تَعَالَى يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ ‏”‏

যখন কোনো সম্প্রদায় আল্লাহর কোন ঘরে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পরে তা নিয়ে আলোচনা করে, তখন তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয়, তাদেরকে রহমত ঢেকে নেয়, ফিরিশতাগণ তাদেরকে ঘিরে রাখে, এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফিরিশতাদের কাছে তাদের প্রশংসা করেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৪৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৫, সুনানে তিরমিজি : ২৯৪৫, সুনানে দামিরি : ৩৪৪

১১. কুরআন তিলাওয়াত একটি ঈর্শানীয় আমল

ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন—

سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ لَا حَسَدَ إِلَّا عَلَى اثْنَتَيْنِ رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ الْكِتَابَ وَقَامَ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَرَجُلٌ أَعْطَاهُ اللهُ مَالًا فَهُوَ يَتَصَدَّقُ بِهِ آنَاءَ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ.

আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, দু’টি বিষয় ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় না। প্রথমত, যাকে আল্লাহ্ তা’আলা কিতাবের জ্ঞান দান করেছেন এবং তিনি তা থেকে গভীর রাতে তিলাওয়াত করেন। দ্বিতীয়ত, যাকে আল্লাহ্ তা’আলা সম্পদ দান করেছেন এবং তিনি সেই সম্পদ দিন-রাত দান করতে থাকেন। সহিহ বুখারি : ৫০২৫, ৭৫২৯, সহিহ মুসলি : ১৯৩০

১২. কুরআন তিলওয়াত বান্দাকে জান্নাতে উচ্চাশনে নিয়ে যাবে

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

يُقَالُ لِصَاحِبِ الْقُرْآنِ اقْرَأْ وَارْتَقِ وَرَتِّلْ كَمَا كُنْتَ تُرَتِّلُ فِي الدُّنْيَا فَإِنَّ مَنْزِلَتَكَ عِنْدَ آخِرِ آيَةٍ تَقْرَأُ بِهَا ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏

(কিয়ামতের দিন) কুরআনের বাহককে বলা হবে, পাঠ করতে থাক ও উপরে আরোহণ করতে থাক এবং দুনিয়াতে যেভাবে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে ঠিক সেরূপে ধীরে সুস্থে পাঠ করতে থাক। যে আয়াতে তোমার পাঠ সমাপ্ত হবে সেখানেই তোমার স্থান। সুনানে তিরমিজি : ২৯১৪, মিশকাত : ২১৩৪, সহীহাহ :২২৪০

১৩. কিয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে-

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে শাফা’আতকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সূরাহ অর্থাৎ সূরাহ আল বাকারাহ এবং সূরাহ্ আ-লি ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরাহ এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরাহ আল বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। হাদীসটির বর্ণনাকারী আবূ মু’আবিয়াহ বলেছেন- আমি জানতে পেরেছি যে, বাতিলের অনুসারী বলে যাদুকরদের কথা বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

১৪. কুরআন অভিজ্ঞ ব্যক্তি মালাকগণের সাথে থাকবে

আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ ‏‏ ‏.‏>

কুরআন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ঐসব মালাকগণের সাথে থাকবে যারা আল্লাহর অনুগত, মর্যাদাবান এবং লেখক। আর যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং তার জন্য কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও বারবার পড়ে সে ব্যক্তির জন্য দু’টি পুরস্কার নির্দিষ্ট আছে। সহিহ মুসলিম : ৭৯৮

১৫. কুরআন তিলওয়াতকারীকে সুঘ্রাণ ও উত্তম সাদের লেবুর সাথে তুলনা-

আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কুরআন পাঠকারী মুমিনের হচ্ছে ঠিক কমলা লেবুর মত; যার ঘ্রাণ উওম এবং স্বাদও উওম। আর যে মুমিন কুরআন পড়ে না তার উদাহরণ হচ্ছে ঠিক খেজুরের মত; যার (উওম) ঘ্রাণ তো নেই, তবে স্বাদ মিষ্ট। (অন্যদিকে) কুরআন পাঠকারী মুনাফিকের দৃষ্টান্ত হচ্ছে সুগন্ধিময় (তুলসি) গাছের মত; যার ঘ্রাণ উওম কিন্ত স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন পড়ে না তার উদাহরণ হচ্ছে ঠিক মাকাল ফলের মত; যার (উওম) ঘ্রাণ নেই, স্বাদও তিক্ত। সহিহ বুখারী : ৫০২০, সহিহ মুসলিম : ৭৯৭

১৬. কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও বারবার তিলওয়াতের জন্য দু’টি পুরস্কার-

আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ الْمَاهِرُ بِالْقُرْآنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ وَيَتَتَعْتَعُ فِيهِ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَهُ أَجْرَانِ ‏

“কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি সম্মানিত এবং পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে এবং তাতে আটকে যায় বা কষ্ট অনুভব করে, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।” সহিহ বুখারি: ৪৯৩৭, সহিহ মুসলিম: ৭৯৮

১৭. কুরআন অবহেলাকারীকে কিয়ামতের দিন অন্ধ করে উঠান হবে-

কুরআন শিখা থেকে থেকে বিমুখ হয়ে থাকল, সে কতইনা দুর্ভাগা! মহান আল্লাহ বলেন-

 وَمَنۡ أَعۡرَضَ عَن ذِڪۡرِى فَإِنَّ لَهُ ۥ مَعِيشَةً۬ ضَنكً۬ا وَنَحۡشُرُهُ ۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَـٰمَةِ أَعۡمَىٰ (١٢٤) قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرۡتَنِىٓ أَعۡمَىٰ وَقَدۡ كُنتُ بَصِيرً۬ا (١٢٥) قَالَ كَذَٲلِكَ أَتَتۡكَ ءَايَـٰتُنَا فَنَسِيتَہَا‌ۖ وَكَذَٲلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ (١٢٦

অর্থঃ আর যে আমার যিকর (কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, নিশচয় তার জীবন যাপন হবে  সংকুচিত এবং আমি কিয়ামতের দিন তাকে অন্ধ অবস্থয় উঠাবো। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমিতো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্নণ?  তিনি বলবেন, অনুরুপভাবে তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অত:পর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৬

১৮. কুরআন খতম করার ফজিলত :

আওযাঈ হতে বর্ণিত, আব্দাহ বলেন-

إِذَا خَتَمَ الرَّجُلُ الْقُرْآنَ بِنَهَارٍ صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ حَتَّى يُمْسِيَ وَإِنْ فَرَغَ مِنْهُ لَيْلًا صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلَائِكَةُ حَتَّى يُصْبِحَ

কোন লোক দিনের বেলায় কুরআন খতম করলে সন্ধ্যা পর্যন্ত মালাইকাগণ তার জন্য রহমতের দু’আ করতে থাকে। আর রাতের বেলায় কুরআন খতম (শেষ) করলে সকাল পর্যন্ত মালাইকাগণ তার জন্য রহমতের দু’আ করতে থাকে। সুনান আদ-দারেমী : ৩৫১৪ হাদিসবিডি. হাদিসের মান সহিহ

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কত দিনে কুরআন খতম করতে পারি? তিনি বললেন, “তুমি এক মাসে কুরআন খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, তাহলে পঁচিশ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, “তাহলে বিশ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, “তাহলে পনেরো দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, তাহলে দশ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, তাহলে পাঁচ দিনে খতম করো।” আমি (আরো অধিক) কষ্ট করতে সক্ষম। তিনি বললেন, “না” (এর কমে করো না)। সুনান আদ-দারেমী : ৩৫২৫ হাদিসবিডি. সহিহ ইবনু হিব্বান নং ৮৫৬, ৮৫৭ তে। নাসাঈ, ৯১; ইবনু কাছীর , ফাযাইলুল কুরআন পৃ. নং ২৪৭ হাদিসের মান সহিহ

১৯. কুরআন নিয়মিত তিলাওয়াত করে স্মরণ রাখা

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَالَ تَعَاهَدُوا الْقُرْآنَ فَوَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَصِّيًا مِنَ

তোমরা কুরআনের প্রতি লক্ষ্য রাখবে (অর্থাৎ নিয়মিত তিলাওয়াত ও চর্চা করবে)। আল্লাহর কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, কুরআন বাঁধনহীন উটের চেয়েও দ্রুত পালিয়ে যায়। সহিহ বুখারি : ৫০৩৩, সহিহ মুসলিম : ৭৯১, আহমাদ ১৯৫৬৩

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّمَا مَثَلُ صَاحِبِ الْقُرْآنِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الإِبِلِ الْمُعَقَّلَةِ إِنْ عَاهَدَ عَلَيْهَا أَمْسَكَهَا وَإِنْ أَطْلَقَهَا ذَهَبَتْ.

যে ব্যক্তি অন্তরে কুরআন গেঁথে (মুখস্থ) রাখে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মালিকের ন্যায়, যে উট বেঁধে রাখে। যদি সে উট বেঁধে রাখে, তবে সে উট তার নিয়ন্ত্রণে থাকে, কিন্তু যদি সে বাঁধন খুলে দেয়, তবে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সহিহ বুখারি : ৫০৩১, সহিহ মুসলিম : ৭৮৯, ৫০৩১, নাসায়ী ৯৪২, আহমাদ ৪৬৫১, ৪৭৪৫, ৪৮৩০, ৫২৯৩, ৫৮৮৭, মুয়াত্তা মালেক ৪৭৩,

উকবাহ বিন আমের (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تَعَلَّمُوا كِتَابَ اللهِ وَتَعَاهَدُوهُ وَتَغَنُّوا بِهِ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَلُّتًا مِنْ الْمَخَاضِ فِي الْعُقُلِ

তোমরা আল্লাহর কিতাব শিক্ষা কর, (পাঠ করার মাধ্যমে) তার যত্ন কর, তা ঘরে রাখ এবং সুরেলা কণ্ঠে তা তেলাঅত কর। কারণ, উট যেমন রশির বন্ধন থেকে অতর্কিতে বের হয়ে যায়, তার চেয়ে অধিক অতর্কিতে কুরআন (স্মৃতি থেকে) বের হয়ে (বিস্মৃত হয়ে) যায়। হাদিস সম্ভার : ১৪৩১, আহমাদ : ১৭৩১৭, দারেমী : ৩৩৪৯, সিলসিলাহ সহীহাহ : ৩২৮৫

আল কুরআনের গুরুত্ব ফজিলত  

আল কুরআনের গুরুত্ব ফজিলত  

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য প্রেরিত সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি শুধু পড়ার জন্য নয়, বরং বুঝে, শিখে, এবং তা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য নাজিল হয়েছে। কুরআনের প্রথম এবং মূল হক হলো এর প্রতি ঈমান আনা। অর্থাৎ, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত একমাত্র সত্য কিতাব, যা মানবজাতির জন্য হিদায়াত ও দিকনির্দেশনা। ঈমান আনার অর্থ হলো -কুরআনের প্রতিটি আয়াতই সত্য এবং নির্ভুল। ঈমান আনার সাথে সাথে কুরআন শিক্ষা গ্রহন করে নিয়মিত তিলাওয়াত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَرَتِّلِ الۡقُرۡاٰنَ تَرۡتِیۡلًا ؕ

আর কুরআন যথাযথভাবে তিলাওয়াত করো। সূরা মুজাম্মিল : ৪

উসমান (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়। সহিহ বুখারি : ৫০২৭

নিয়মিত তিলওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের অর্থ বুঝে পড়তে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে আয়াতের গভীরতা বুঝার জন্য কেবল অর্থ পড়া যথেষ্ট নয়, বরং বিশুদ্ধ তাফসির অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। কারণ, কুরআনের কিছু আয়াতের অর্থ সুস্পষ্ট হলেও কিছু আয়াতের ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয়। কুরআনের তাফসির বুঝতে হলে নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থ থেকে কুরআন অধ্যয়ন করা। যেমন- তাফসির ইবনে কাসির, তাফসির আত-তাবারি, তাফসির সাঈদি ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন-

کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَلِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ

আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে। সুরা সাদ : ২৯

কুরআনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনকে আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করা। কেবল তিলাওয়াত বা মুখস্থ করা যথেষ্ট নয়; বরং কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে জীবন পরিচালনা করাই আসল উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন-

وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ

আমি মানুষ ও জিনকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি। সুরা জারিয়াত : ৫৬

সততা, ধৈর্য, বিনয়, দয়া ও ইনসাফ কুরআনের শিক্ষা। হারাম ও অন্যায় কাজ পরিহার করা: সুদ, মিথ্যা, জুলুম, পরনিন্দা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কুরআনের বিধান মেনে চলা: বিবাহ, ব্যবসা, উত্তরাধিকারসহ সব বিষয়ে কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন “চলমান কুরআন”, অর্থাৎ তিনি তাঁর জীবনে কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। তাই আমাদেরও কুরআনের আলোকে জীবন গঠন করতে হবে।

কুরআনের প্রতি আমাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন মাধ্যমে আমারা আমাদের জীবনকে কুরআনের আলোতে আলোকিত করতে পারি। যারফলে আমরা পরকালে সফলতা লাভ করতে পারব।

কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফজিলত :

কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। এটি আল্লাহর নাজিলকৃত সর্বশেষ আসমানী কিতাব এবং হিদায়াতের চূড়ান্ত উৎস। কুরআন আল্লাহর নির্দেশ এবং মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক। এতে জীবন পরিচালনার জন্য সব বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করে। এটি না মানলে একজন মানুষ পথভ্রষ্ট হতে পারে এবং আখিরাতে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন,

ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ  فِیۡہِ ۚۛ  ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ

এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত। সূরা বাকারা : ২

কুরআনের প্রতি ঈমান না আনা আল্লাহর প্রতি কুফরি করার সমান। এটি ঈমানের মূল ভিত্তি এবং একজন মুমিনের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। যারা কুরআন মেনে চলে, তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কুরআনের প্রতি ঈমান আনা দুনিয়ায় শান্তি, আখিরাতে সফলতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের প্রধান মাধ্যম। সুতরাং, কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ এবং তা না মানলে চরম ক্ষতির কারণ হবে। নিম্মে কুরআনের উপর ঈমান আনার কিছু ফজিলত তুলে ধরছি।

২। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার পুরস্কার :

কুরআনের প্রতি ঈমানের মাধ্যমেই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হয়। কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফলে, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে এবং আখিরাতে সফলতার পথ সুগম করে। কুরআনে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে তার প্রতি ঈমান আনা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللّهِ وَمَلآئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ

অর্থ : রসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। সুরা বাকারা : ২৮৫

কুরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি এরশাদ করেন-

فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالنُّورِ الَّذِي أَنزَلْنَا وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ

অর্থঃ অতএব তোমরা আল্লাহ, তাঁর রসূল এবং অবতীর্ন নূরের (কুরআনের) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত। সুরা তাগাবুন : ৮

কুরআনের প্রতি ঈমান আনার আল্লাহ নির্দেশ হওয়ার কারণে অসংখ্য পুরস্কার বা লাভ রয়েছে। দুনিয়া ও আখিরাতে এই ঈমান মানুষের জন্য হিদায়াত, শান্তি, সফলতা এবং চিরস্থায়ী কল্যাণের পথ উন্মোচন করে। নিচে কুরআনের প্রতি ঈমান আনার প্রধান পুরস্কারগুলো কুরআনের আয়াতের আলোকে উল্লেখ করা হলো :

(১) জান্নাতের অধিকারী হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ

এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের জন্য এমন জান্নাত রয়েছে যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। সূরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সূরা কাহফ : ১০৭

(২) আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করবে

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَاعۡتَصَمُوۡا بِہٖ فَسَیُدۡخِلُہُمۡ فِیۡ رَحۡمَۃٍ مِّنۡہُ وَفَضۡلٍ ۙ  وَّیَہۡدِیۡہِمۡ اِلَیۡہِ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ؕ

অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর দিকে সরল পথ দেখাবেন। সুরা নিসা : ১৭৫

(৩) দুনিয়ায় এবং আখিরাতে শান্তি ও প্রশান্তি পাবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। সূরা রা’দ: ২৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ ٪

যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। সূরা আনআম: ৮২

(৪) পাপের ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার

মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّاَجۡرٌ عَظِیۡمٌ

যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। সূরা মায়েদাহ : ৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ

আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিয্ক। সুরা আনফাল : ৭৪

(৫) দুনিয়ায় মর্যাদা ও সাফল্য লাভ

মহান আল্লাহ বলেন-

الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। সূরা মুজাদালাহ : ১

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاَنَّ ہٰذَا صِرَاطِیۡ مُسۡتَقِیۡمًا فَاتَّبِعُوۡہُ ۚ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِکُمۡ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ

আর এটি তো আমার (কুরআনের) সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। সূরা আনআম : ১৫৩

(৬) আখিরাতে কোনো ভয় বা চিন্তিত হবে না

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَادُوۡا وَالنَّصٰرٰی وَالصّٰبِئِیۡنَ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۪ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

নিশ্চয়ই মুসলিম, ইয়াহুদী, খৃষ্টান এবং সাবেঈন সম্প্রদায়, (মাঝে) যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ভাল কাজ করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোন প্রকার ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা। সুরা বাকারা : ৬২

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا نُرۡسِلُ الۡمُرۡسَلِیۡنَ اِلَّا مُبَشِّرِیۡنَ وَمُنۡذِرِیۡنَ ۚ فَمَنۡ اٰمَنَ وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

আর আমি রাসূলদেরকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করি। অতএব যারা ঈমান এনেছে ও শুধরে নিয়েছে, তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং তারা চি‎‎ন্তিত হবে না। সুরা আনাম : ৪৮

(৭) হিদায়াত ও আল্লাহর রহমত লাভ

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২১৮

মহান আল্লাহ বলেন-

 ؕ  وَنَزَّلۡنَا عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ تِبۡیَانًا لِّکُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً وَّبُشۡرٰی لِلۡمُسۡلِمِیۡنَ 

আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।

(৮) মহান আল্লাহ নিকট সুউচ্চ মর্যাদা

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَنۡ یَّاۡتِہٖ مُؤۡمِنًا قَدۡ عَمِلَ الصّٰلِحٰتِ فَاُولٰٓئِکَ لَہُمُ الدَّرَجٰتُ الۡعُلٰی ۙ

আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সূরা ত্বাহা : ৭৫

মহান আল্লাহ বলেন-

اُولٰٓئِکَ عَلٰی ہُدًی مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ٭ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ

এরাই তাদের রবের পক্ষ হতে প্রাপ্ত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে এবং এরাই পূর্ণ সফলকাম।  সুরা বাকারা : ৫

(৯) আল্লাহর  শিফা এবং রহমত লাভ

মহান আল্লাহ বলেন-

وَنُنَزِّلُ مِنَ الۡقُرۡاٰنِ مَا ہُوَ شِفَآءٌ وَّرَحۡمَۃٌ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ ۙ وَلَا یَزِیۡدُ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا خَسَارًا

আর আমি কুরআন নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত, কিন্তু তা যালিমদের ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়। সূরা আল-ইসরা: ৮২

(১০) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে

মহান আল্লাহ বলেন

الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (63) لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবী জীবনে এবং আখিরাতে। আল্লাহর বাণীসমূহের কোন পরিবর্তন নেই। এটিই মহাসফলতা। সূরা ইউনুস : ৬৩-৬৪

(১১) মহান আল্লাহই তাদের অভিভাবক হবেন

মহান আল্লাহ বলেন-

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ 

যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। সুরা বাকারা : ২৫৭

(১২) সম্মানজনক রিযিকের ব্যবস্থা করে দিবেন। 

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ-

وَمَن يَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتَعۡمَلۡ صَـٰلِحً۬ا نُّؤۡتِهَآ أَجۡرَهَا مَرَّتَيۡنِ وَأَعۡتَدۡنَا لَهَا رِزۡقً۬ا ڪَرِيمً۬ا

অর্থঃ আর তোমাদের মধ্য থেকে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে এবং সৎকাজ করবে তাকে আমি দুবার প্রতিদান দেবো এবং আমি তার জন্য সম্মানজনক রিযিকের ব্যবস্থা করে রেখেছি৷  (সুরা আহজাব ৩৩:৩১)।

কুরআনের প্রতি ঈমান আনার ফলে দুনিয়ায় এবং আখিরাতে অজস্র পুরস্কার পাওয়া যাবে। এটি মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে, দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তি ও সফলতা নিশ্চিত করে এবং আল্লাহর চিরস্থায়ী নৈকট্য লাভের পথ উন্মোচন করে। তাই কুরআনের প্রতি ঈমান আনা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

৩। কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার শাস্তি

কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার ফলে পৃথিবীতে এবং আখিরাতে মারাত্মক শাস্তি ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনবে না বা তার বিধান মেনে চলবে না, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। এর ফলে সৃষ্ট যে ফলাফলগুলো কুরআনে উল্লেখ আছে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

(১) আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত হওয়া

وَلَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَکَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ

আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লানত। সূরা বাকারা: ৮৯

(২) অস্বীকারীগণ ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ

নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করছে তাদের জন্য উভয়ই সমান; তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবেনা। সুরা বাকারা : ৬

(৩) অন্তর অন্ধ হয়ে যাওয়া

মহান আল্লাহ বলেন-

قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا () قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمَ تُنسَىٰ ()

সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন’? তিনি বলবেন, ‘এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী (কিতাব) এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল’। সুরা ত্বহা : ১২৫-১২৬

(৪) জাহান্নামে আজাব শুধু বৃদ্ধি করা হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ زِدۡنٰہُمۡ عَذَابًا فَوۡقَ الۡعَذَابِ بِمَا کَانُوۡا یُفۡسِدُوۡنَ

যারা কুফরী করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করব। সুরা হিজর : ৮৮

(৫) আখিরাতে শাস্তির দিন অস্বস্তি ও লাঞ্ছনাকর আজাব

মহান আল্লাহ বলেন-

تَلۡفَحُ وُجُوهَهُمُ ٱلنَّارُ وَهُمۡ فِيهَا كَٰلِحُونَ ١٠٤ أَلَمۡ تَكُنۡ ءَايَٰتِي تُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ ١٠٥

“আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে, আর সেখানে তারা হবে বীভৎস চেহারাবিশিষ্ট। ‘আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না? তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে?’ মুমিনুন, : ১০৪-১০৫

মহান আল্লাহ বলেন-

ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَہُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّعَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ

আর যারা কুফরী করেছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং বেদনাদায়ক আযাব। এ কারণে যে তারা কুফরী করত। সুরা ইউনুস : ৪

মহান আল্লাহ বলেন-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

এরাই তারা, যারা তাদের রবের সাথে কুফরী করেছে, আর ওদের গলায় থাকবে শিকল এবং ওরা অগ্নিবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা রাদ : ৫

(৬) আল্লাহর হিদায়াত বঞ্চিত বা চুড়ান্ত পথভ্রষ্ট

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ ازۡدَادُوۡا کُفۡرًا لَّمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ سَبِیۡلًا ؕ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে তারপর কুফরী করেছে, আবার ঈমান এনেছে তারপর কুফরী করেছে, এরপর কুফরীকে বাড়িয়ে দিয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করার নন এবং তাদেরকে পথ প্রদর্শন করার নন। সুরা নিসা : ১৩৭

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(৭)  দুনিয়াতে সাহায্যকারী থেকে বঞ্চিত থাকবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অতঃপর যারা কুফরী করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আযাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৫৬

(৮) জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ بِہٖ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ صَدَّ عَنۡہُ ؕ وَکَفٰی بِجَہَنَّمَ سَعِیۡرًا

অতঃপর তাদের অনেকে এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং অনেকে এ থেকে বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ৫৫

(৯) জাহান্নামে স্থায়ী হবেন

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। বাকারা : ৩৯

(১০) পরকালে আজাব দেওয়া হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَلِقَآیِٔ الۡاٰخِرَۃِ فَاُولٰٓئِکَ فِی الۡعَذَابِ مُحۡضَرُوۡنَ

আর যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াত ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে। সুরা রুম : ১৬

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের কারো কাছ থেকে যমীন ভরা স্বর্ণ বিনিময়স্বরূপ প্রদান করলেও গ্রহণ করা হবে না, তাদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব, আর তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

কুরআন মানব জাতির জন্য আল্লাহর পাঠানো সর্বশেষ পথপ্রদর্শক। কুরআনের প্রতি ঈমান না আনার ফলে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই কুরআনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এর নির্দেশনা অনুসারে জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব।

ঈমানের ফজিলত

ঈমানের ফজিলত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুরআনের আলোক ঈমানদারের কিছু ফজিলত :

ঈমান ইসলামের মৌল ভিত্তি। এটি ছাড়া কোনো আমল, কোনো ইবাদত, কোনো নেক কাজই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কুরআনুল কারিমে বারবার ঈমান আনার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ঈমানকে সফলতার প্রথম ও প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজেই ঈমান আনা প্রতিটি মানুষের মুক্তির জন্য ফরজ। মহান আল্লাহ কুরআনে অসংখ্য আয়াতে ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা করেছেন। নিম্নে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো-

(১) জান্নাতের অধিকারী হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ

অর্থ : এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করে থাকে তাদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের জন্য এমন জান্নাত রয়েছে যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। সুরা বাকারা : ২৫

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী। সুরা বাকারা : ৮২

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সুরা কাহফ : ১০৭

(২) আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করবে

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا بِاللّٰہِ وَاعۡتَصَمُوۡا بِہٖ فَسَیُدۡخِلُہُمۡ فِیۡ رَحۡمَۃٍ مِّنۡہُ وَفَضۡلٍ ۙ  وَّیَہۡدِیۡہِمۡ اِلَیۡہِ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ؕ

অর্থ : অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাকে আঁকড়ে ধরেছে তিনি অবশ্যই তাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে দয়া ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর দিকে সরল পথ দেখাবেন। সুরা নিসা : ১৭৫

(৩) দুনিয়ায় এবং আখিরাতে শান্তি ও প্রশান্তি পাবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রেখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। সুরা রা’দ: ২৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ 

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত। সুরা আনাম: ৮২

(৪) পাপের ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার পাবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ۙ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّاَجۡرٌ عَظِیۡمٌ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার। সুরা মায়েদাহ : ৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَالَّذِیۡنَ اٰوَوۡا وَّنَصَرُوۡۤا اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজিক। সুরা আনফাল : ৭৪

(৫) দুনিয়ায় ও আখেরত মর্যাদাবান করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ

অর্থ : তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। সুরা মুজাদালাহ : ১

(৬) আখিরাতে কোনো ভয় বা চিন্তিত হবে না

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَادُوۡا وَالنَّصٰرٰی وَالصّٰبِئِیۡنَ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۪ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয়ই মুসলিম, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান এবং সাবেঈন সম্প্রদায়, (মাঝে) যারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং ভাল কাজ করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোন প্রকার ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবেনা। সুরা বাকারা : ৬২

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَا نُرۡسِلُ الۡمُرۡسَلِیۡنَ اِلَّا مُبَشِّرِیۡنَ وَمُنۡذِرِیۡنَ ۚ فَمَنۡ اٰمَنَ وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : আর আমি রাসুলদেরকে কেবল সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করি। অতএব যারা ঈমান এনেছে ও শুধরে নিয়েছে, তাদের উপর কোন ভয় নেই এবং তারা চি‎‎ন্তিত হবে না। সুরা আনাম : ৪৮

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ لَہُمۡ اَجۡرُہُمۡ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ۚ وَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে এবং সালাত কায়েম করে, আর জাকাত প্রদান করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট প্রতিদান। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। সুরা বাকারা  : ২৭৭

(৭) আল্লাহর রহমত লাভ করবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَالَّذِیۡنَ ہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَرۡجُوۡنَ رَحۡمَتَ اللّٰہِ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও যারা হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তারা আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা বাকারা : ২১৮

(৮) মহান আল্লাহ নিকট সুউচ্চ মর্যাদা

মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَنۡ یَّاۡتِہٖ مُؤۡمِنًا قَدۡ عَمِلَ الصّٰلِحٰتِ فَاُولٰٓئِکَ لَہُمُ الدَّرَجٰتُ الۡعُلٰی ۙ

অর্থ : আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সুরা ত্বাহা : ৭৫

(৯) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ প্রাপ্ত হবে

মহান আল্লাহ বলেন

الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (63) لَهُمُ الْبُشْرَىٰ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ ۚ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবী জীবনে এবং আখিরাতে। আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তন নেই। এটিই মহা সফলতা। সুরা ইউনুস : ৬৩-৬৪

(১০) মহান আল্লাহই তাদের অভিভাবক হবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ  یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ 

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। সুরা বাকারা : ২৫৭

(১১)  ঈমান আনলে আল্লাহ নিরাপত্তা ও হেদায়েত দিবেন :

 আল্লাহ তায়ালা বলেন,

 ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَلَمۡ يَلۡبِسُوٓاْ إِيمَـٰنَهُم بِظُلۡمٍ أُوْلَـٰٓٮِٕكَ لَهُمُ ٱلۡأَمۡنُ وَهُم مُّهۡتَدُونَ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াত প্রাপ্ত।  সুরা আনাম : ৮২

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَإِنَّ ٱللَّهَ لَهَادِ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬

অর্থ : আর যারা ঈমান এনেছে, নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শনকারী। সুরা হজ : ৫৪

(১২) ঈমানদারকে সাহায্য ও রক্ষা করা আল্লাহর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

فَٱنتَقَمۡنَا مِنَ ٱلَّذِينَ أَجۡرَمُواْ‌ۖ وَكَانَ حَقًّا عَلَيۡنَا نَصۡرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থ : অতঃপর যারা অপরাধ করেছিল আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম। আর মুমিনদেরকে সাহায্য করা তো আমার কর্তব্য। সুরা রূম : ৪৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يُدَافِعُ عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ خَوَّانٍ كَفُورٍ

অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদেরকে রক্ষা করেন এবং কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না, সুরা হজ : ৩৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন,

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ‌ۚ كَذَٲلِكَ حَقًّا عَلَيۡنَا نُنجِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ (١٠٣)

অর্থ : এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে রক্ষা করি৷ এটিই আমার রীতি৷ মুমিনদের রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। সুরা ইউনুস : ১০৩

(১৩)  দুনিয়া আখেরাতে সফলকাম হবে :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَہَاجَرُوۡا وَجٰہَدُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِاَمۡوَالِہِمۡ وَاَنۡفُسِہِمۡ ۙ اَعۡظَمُ دَرَجَۃً عِنۡدَ اللّٰہِ ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে ও হিজরাত করেছে, আর নিজেদের ধন ও প্রাণ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তারা মর্যাদায় আল্লাহর কাছে অতি বড়, আর তারাই হচ্ছে পূর্ণ সফলকাম । সুর তাওবা : ২০

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قَدۡ أَفۡلَحَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ (١)

অর্থ : নিশ্চিতভাবে সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, সুরা মুমিনুন :১

(১৪) ঈমানদার মুমিন জন্য সম্মান ও মর্যাদা :

 :: আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‌ۚ وَلِلَّهِ ٱلۡعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِۦ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ

অর্থ : অথচ সম্মান ও মর্যাদা তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও মুমিনদের জন্য। সুরা মুনাফিকুন : ৮

(১৫) পৃথিবীতে খিলাফত বা শাসনভার প্রদান করবেন :

আল্লাহ তায়ালা বলেন_

وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنكُمۡ وَعَمِلُواْ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ لَيَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ ڪَمَا ٱسۡتَخۡلَفَ ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِينَہُمُ ٱلَّذِى ٱرۡتَضَىٰ لَهُمۡ وَلَيُبَدِّلَنَّہُم مِّنۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ أَمۡنً۬ا‌ۚ يَعۡبُدُونَنِى لَا يُشۡرِكُونَ بِى شَيۡـًٔ۬ا‌ۚ وَمَن ڪَفَرَ بَعۡدَ ذَٲلِكَ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡفَـٰسِقُونَ

অর্থ : আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তাদেরকে তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যাকে আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন ৷ তারা শুধু আমার বন্দেগি করুক এবং আমার সাথে কাউকে যেন শরীক না করে৷ আর যারা এমন কুফরি করবে তারাই ফাসেক ৷ সুরা নুর : ৫৫

(১৬) ঈমান আনলে আল্লাহ উত্তম জীবন দান করবেন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

مَنۡ عَمِلَ صَـٰلِحً۬ا مِّن ذَڪَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٌ۬ فَلَنُحۡيِيَنَّهُ ۥ حَيَوٰةً۬ طَيِّبَةً۬‌ۖ وَلَنَجۡزِيَنَّهُمۡ أَجۡرَهُم بِأَحۡسَنِ مَا ڪَانُواْ يَعۡمَلُونَ

অর্থ : পুরুষ বা নারী যে-ই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবে এবং (আখেরাতে) তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে। সুরা নাহল

 : ৯৭

(১৭) আকাশ ও পৃথিবীর বরকত সমূহের দুআর খুলে দিবেন :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

  وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡقُرَىٰٓ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَفَتَحۡنَا عَلَيۡہِم بَرَكَـٰتٍ۬ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ وَلَـٰكِن كَذَّبُواْ فَأَخَذۡنَـٰهُم بِمَا ڪَانُواْ يَكۡسِبُونَ

অর্থ : যদি জনপদের লোকেরা ঈমান আনতো এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করতো, তাহলে আমি তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীর বরকত সমূহের দুআর খুলে দিতাম৷ কিন্তু তারা তো প্রত্যাখ্যান করেছে৷ কাজেই তারা যে অসৎকাজ করে যাচ্ছিলো তার জন্যে আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি৷ লাভ। সুরা আরাফ : ৯৬

(১৮) ঈমান বান্দার পূর্বেকৃত অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেয় :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ وَإِنْ يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ 

অর্থ : হে নবি আপনি অমুসলিমদের বলে দিন যে, তারা যদি বিরত হয়ে যায়, তাহলে পূর্বে সংঘটিত সব ক্ষমা করে দেয়া হবে। পক্ষান্তরে আবারও যদি তাই করে তাহলে পূর্ববর্তীদের পথ নির্ধারিত হয়ে গেছে।  আনফাল : ৩৮

কুরআনের আলোকে ঈমান না আনার শাস্তি :

ঈমান না আনার ফলে পৃথিবীতে এবং আখিরাতে মারাত্মক শাস্তি ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যারা ঈমান আনবে না বা তার বিধান মেনে চলবে না, তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ পরিণতি। এর ফলে সৃষ্ট যে ফলাফলগুলো কুরআনে উল্লেখ আছে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

(১) কুফরির কারণ জাহান্নামে বাসিন্দা হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ  ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ 

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে। বাকারা : ৩৯

মহান আল্লাহ বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَحِیۡمِ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। সুরা মায়েদা : ১০

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ لِیَصُدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  فَسَیُنۡفِقُوۡنَہَا ثُمَّ تَکُوۡنُ عَلَیۡہِمۡ حَسۡرَۃً ثُمَّ یُغۡلَبُوۡنَ ۬ؕ  وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِلٰی جَہَنَّمَ یُحۡشَرُوۡنَ ۙ

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে, তারা নিজেদের সম্পদসমূহ ব্যয় করে, আল্লাহর রাস্তা হতে বাধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে। তারা তো তা ব্যয় করবে। অতঃপর এটি তাদের উপর আক্ষেপের কারণ হবে এরপর তারা পরাজিত হবে। আর যারা কুফরি করেছে তাদেরকে জাহান্নামে সমবেত করা হবে। সুরা আনফাল : ৩৬

(২) কুফরির কারণে পরকালে আজাব দেওয়া হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا وَلِقَآیِٔ الۡاٰخِرَۃِ فَاُولٰٓئِکَ فِی الۡعَذَابِ مُحۡضَرُوۡنَ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে এবং আমার আয়াত ও আখিরাতের সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে আযাবের মধ্যে উপস্থিত করা হবে। সুরা রুম : ১৬

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের কারো কাছ থেকে জমিন ভরা স্বর্ণ বিনিময়স্বরূপ প্রদান করলেও গ্রহণ করা হবে না, তাদের জন্যই রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব, আর তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

(৩) অস্বীকারী  ঈমান থেকে বঞ্চিত হবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করছে তাদের জন্য উভয়ই সমান; তুমি তাদেরকে ভয় প্রদর্শন কর বা না কর, তারা ঈমান আনবেনা। সুরা বাকারা : ৬

(৪) জাহান্নামে আজাব শুধু বৃদ্ধি করা হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ زِدۡنٰہُمۡ عَذَابًا فَوۡقَ الۡعَذَابِ بِمَا کَانُوۡا یُفۡسِدُوۡنَ

অর্থ : যারা কুফরি করেছে ও আল্লাহর পথ হতে বাধা দিয়েছে, আমি তাদের শাস্তির উপর শাস্তি বৃদ্ধি করব। সুরা হিজর : ৮৮

(৫) আখিরাতে অস্বস্তি ও লাঞ্ছনাকর আজাব হবে :

মহান আল্লাহ বলেন-

تَلۡفَحُ وُجُوهَهُمُ ٱلنَّارُ وَهُمۡ فِيهَا كَٰلِحُونَ ١٠٤ أَلَمۡ تَكُنۡ ءَايَٰتِي تُتۡلَىٰ عَلَيۡكُمۡ فَكُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ ١٠٥

অর্থ : আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে, আর সেখানে তারা হবে বীভৎস চেহারাবিশিষ্ট। ‘আমার আয়াতসমূহ কি তোমাদের কাছে পাঠ করা হত না? তারপর তোমরা তা অস্বীকার করতে?’ মুমিনুন, : ১০৪-১০৫

মহান আল্লাহ বলেন-

ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَہُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّعَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ

অর্থ : আর যারা কুফরি করেছে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানীয় এবং বেদনাদায়ক আজাব। এ কারণে যে তারা কুফরি করত। সুরা ইউনুস : ৪

মহান আল্লাহ বলেন-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

অর্থ : এরাই তারা, যারা তাদের রবের সাথে কুফরি করেছে, আর ওদের গলায় থাকবে শিকল এবং ওরা অগ্নিবাসী, তারা সেখানে স্থায়ী হবে। সুরা রাদ : ৫

(৬) আল্লাহর হিদায়াত বঞ্চিত বা চূড়ান্ত পথভ্রষ্ট

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ اٰمَنُوۡا ثُمَّ کَفَرُوۡا ثُمَّ ازۡدَادُوۡا کُفۡرًا لَّمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ سَبِیۡلًا ؕ

অর্থ : নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে তারপর কুফরি করেছে, আবার ঈমান এনেছে তারপর কুফরি করেছে, এরপর কুফরিকে বাড়িয়ে দিয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করার নন এবং তাদেরকে পথ প্রদর্শন করার নন। সুরা নিসা : ১৩৭

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(৭)  দুনিয়াতে সাহায্যকারী থেকে বঞ্চিত থাকবে-

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অর্থ : অতঃপর যারা কুফরি করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আজাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৫৬

(৮) জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ করবেন :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ بِہٖ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ صَدَّ عَنۡہُ ؕ وَکَفٰی بِجَہَنَّمَ سَعِیۡرًا

অর্থ : অতঃপর তাদের অনেকে এর প্রতি ঈমান এনেছে এবং অনেকে এ থেকে বিরত থেকেছে। আর দগ্ধকারী হিসেবে জাহান্নামই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ৫৫

(১০) আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত হওয়া

মহান আল্লাহ বলেন-

وَلَمَّا جَآءَہُمۡ کِتٰبٌ مِّنۡ عِنۡدِ اللّٰہِ مُصَدِّقٌ لِّمَا مَعَہُمۡ ۙ وَکَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ یَسۡتَفۡتِحُوۡنَ عَلَی الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚۖ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ مَّا عَرَفُوۡا کَفَرُوۡا بِہٖ ۫ فَلَعۡنَۃُ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ

অর্থ : আর যখন তাদের কাছে, তাদের সাথে যা আছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সত্যায়নকারী কিতাব এল, অথচ তারা পূর্বে কাফিরদের উপর বিজয় কামনা করত। সুতরাং যখন তাদের নিকট এল যা তারা চিনত, তখন তারা তা অস্বীকার করল। অতএব কাফিরদের উপর আল্লাহর লানত। সুরা বাকারা: ৮৯

(১১) ইহকাল ও পরকালে কঠিন শাস্তি কালে কোন সাহায্যকারী পাবে না :

মহান আল্লাহ বলেন-

فَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَاُعَذِّبُہُمۡ عَذَابًا شَدِیۡدًا فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ

অর্থ : অতঃপর যারা কুফরি করেছে, আমি তাদেরকে কঠিন আজাব দেব দুনিয়া ও আখিরাতে, আর তাদের কোন সাহায্যকারী নেই। সুর আল ইমরান : ৫৬

(১২) পরকালে কোন কিছুর বিনিময়ে মুক্তি প্রদান করা হবে না:

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَمَاتُوۡا وَہُمۡ کُفَّارٌ فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡ اَحَدِہِمۡ مِّلۡءُ الۡاَرۡضِ ذَہَبًا وَّلَوِ افۡتَدٰی بِہٖ ؕ  اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ وَّمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ 

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করেছে ও অবিশ্বাসী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মুক্তির বিনিময়ে যদি পৃথিবী পূর্ণ স্বর্ণ দেয়া হয় তবুও কক্ষনো তা গ্রহণ করা হবেনা। ওদেরই জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে এবং ওদের জন্য কোনোই সাহায্যকারী নেই। সুরা আল ইমরান : ৯১

(১৩) কাফির চুড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ قَدۡ ضَلُّوۡا ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا

অর্থ : নিশ্চয় যারা কুফরি করেছে এবং আল্লাহর পথ থেকে বাধা দিয়েছে,তারা অবশ্যই চূড়ান্তভাবে পথভ্রষ্ট হয়েছে। সুরা নিসা : ১৬৭

(১৪) কাফিরকে ক্ষমা করবেন না এবং হিদায়েতও দিবেন না :

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَظَلَمُوۡا لَمۡ یَکُنِ اللّٰہُ لِیَغۡفِرَ لَہُمۡ وَلَا لِیَہۡدِیَہُمۡ طَرِیۡقًا

অর্থ : নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাসী হয়েছে ও অত্যাচার করেছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে সুপথ প্রদর্শন করবেন না ।সুরা নিসা : ১৬৮

সহিহ হাদিসের আলোকে ঈমানের পুরস্কার ও প্রতিশ্রুতির বর্ণনা :

১. অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না :

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

 ‏ “‏ لاَ يَدْخُلُ النَّارَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ وَلاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ أَحَدٌ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ كِبْرِيَاءَ ‏

অর্থ : যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আর যে ব্যক্তির অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে না। মুসলিম ৯১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৯, সুনানে তিরমিজি : ১৯৯৮-৯৯, সুনানে আবু দাঊদ ৪০৯১, আহমাদ : ৩৭৭৯, ৩৯০৩, ৩৯৩৭, ৪২৯৮।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেছেন-

 ‏”‏ يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ‏.‏ فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا قَدِ اسْوَدُّوا فَيُلْقَوْنَ فِي نَهَرِ الْحَيَا ـ أَوِ الْحَيَاةِ، شَكَّ مَالِكٌ ـ فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي جَانِبِ السَّيْلِ، أَلَمْ تَرَ أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً ‏”‏‏.‏ قَالَ وُهَيْبٌ حَدَّثَنَا عَمْرٌو ‏”‏ الْحَيَاةِ ‏”‏‏.‏ وَقَالَ ‏”‏ خَرْدَلٍ مِنْ خَيْرٍ

অর্থ : বেহেশতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালা ফিরিশতাদের বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আনো। তারপর তাদের জাহান্নাম হতে এমন অবস্থায় বের করা হবে যে, তারা (পুড়ে) কালো হয়ে গেছে। অতঃপর তাদের বৃষ্টিতে বা হায়াতের [বর্ণনাকারী মালিক (রহ.) শব্দ দু’টির কোনটি এ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন] নদীতে নিক্ষেপ করা হবে। ফলে তারা সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন নদীর তীরে ঘাসের বীজ গজিয়ে উঠে। তুমি কি দেখতে পাও না সেগুলো কেমন হলুদ বর্ণের হয় ও ঘন হয়ে গজায়? সহিহ বুখারি : ২২, ৬৫৬০, সহিহ মুসলিম : ৮৪।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের রবের দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেন, মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন, সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ’ইবাদত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রুশ পূজারি ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রুশের কাছে। মূর্তি পূজারিরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইহুদিদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কীসের ’ইবাদত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উজা্ইর  (আ.) এর ’ইবাদত করতাম।

তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসিহের ’ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীগণ। তাদের নেককার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল।

আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ’ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নবি ﷺ বলেন, এরপর মহা ক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবিগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে।

এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সিজদায় পড়ে যাবে। বাকি থাকবে তারা, যারা লোক-দেখানো এবং লোক-শোনানো সিজদা করেছিল। তবে তারা সিজদার মনোভাব নিয়ে সিজদা করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের মেরুদন্ড একটি তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে। এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবিগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসুল? তিনি বললেন, দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো।

তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। একেবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে। এখন তোমরা হকের বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক কঠোর নও, যতটুকু সেদিন ঈমানদারগণ আল্লাহর সম্মুখে হয়ে থাকবে, যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে, তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত? তখন আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আল্লাহ্ তাদের মুখমণ্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু’পা ও দু’পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।

তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ আবার তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে। তারপর আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। বর্ণনাকারী আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহলে আল্লাহর এ বাণীটি পড়- ’’আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন’’। সুরা নিসা : ৪০। তারপর নবি ﷺ, ফিরিশতা ও মুমিনগণ সুপারিশ করবে। তখন মহাপরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলবেন, এখন শুধু আমার শাফায়াত বাকী রয়েছে।

তিনি জাহান্নাম থেকে একমুষ্টি ভরে এমন কতগুলো কওমকে বের করবেন, যারা জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গেছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখে অবস্থিত ’হায়াত’ নামের নহরে ঢালা হবে। তারা সে নহরের দু’পার্শ্বে এমনভাবে উদ্‌গত হবে, যেমন পাথর এবং গাছের কিনারে বয়ে আনা আবর্জনায় বীজ থেকে তৃণ নির্গত হয়। দেখতে পাও তার মধ্যে সূর্যের আলোর অংশের গাছগুলো সাধারণত সবুজ হয়, ছায়ার অংশেরগুলো সাদা হয়। তারা সেখান থেকে মুক্তার দানার মত বের হবে। তাদের গর্দানে মোহর লাগানো হবে। জান্নাতে তারা যখন প্রবেশ করবে, তখন অন্যান্য জান্নাতবাসীরা বলবেন, এরা হলেন রাহমান কর্তৃক আজাদকৃত যাদেরকে আল্লাহ্ কোন নেক ’আমল কিংবা কল্যাণকর কাজ ব্যতীতই জান্নাতে দাখিল করেছেন। তখন তাদেরকে বলা হবে। তোমরা যা দেখেছ, সবই তো তোমাদের, এর সঙ্গে আরো সমপরিমাণ তোমাদেরকে দেয়া হলো। সহিহ বুখারি : ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ১৮৩, সুননে ইবনে মাজাহ : ৬০, সহিহাহ : ৩০৫৪, আহমাদ : ১১১২৭

২. ইমান আনয়ন করা সবচেয়ে উত্তম আমল :

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   سُئِلَ أَىُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ فَقَالَ ‏”‏ إِيمَانٌ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ‏”‏‏.‏ قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ ‏”‏ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ‏”‏‏.‏ قِيلَ ثُمَّ مَاذَا قَالَ ‏”‏ حَجٌّ مَبْرُورٌ ‏

অর্থ : আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসুল ﷺ কে জিজ্ঞেস করা হল, কোন আমলটি উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। জিজ্ঞেস করা হলো, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’ প্রশ্ন করা হল, ‘অতঃপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘মাকবুল হাজ্জ সম্পাদন করা। সহিহ বুখারি : ২৬, ১৫১৯, সহিহ মুসলিম : ৮৩

৩. ঈমান গ্রহণ অতীতের গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায় :

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ نَاسًا، مِنْ أَهْلِ الشِّرْكِ قَتَلُوا فَأَكْثَرُوا وَزَنَوْا فَأَكْثَرُوا ثُمَّ أَتَوْا مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَقَالُوا إِنَّ الَّذِي تَقُولُ وَتَدْعُو لَحَسَنٌ وَلَوْ تُخْبِرُنَا أَنَّ لِمَا عَمِلْنَا كَفَّارَةً فَنَزَلَ ‏(‏ وَالَّذِينَ لاَ يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلاَ يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ وَلاَ يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا‏)‏ وَنَزَلَ ‏(‏ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لاَ تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ‏)‏

অর্থ : ইবনে আব্বাস হতে বর্ণনা করেন যে, মুশরিকদের কিছু লোক যারা ব্যাপকভাবে হত্যা ও ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল, তারা মুহাম্মাদ ﷺ এর দরবারে এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি যে দীনের প্রতি মানুষদের আহ্বান জানাচ্ছেন, এতো অনেক উত্তম বিষয়। তবে আমাদের পূর্বকৃত গুনাহসমূহের প্রায়শ্চিত্ত সম্পর্কে আপনি যদি আমাদের নিশ্চিতভাবে কিছু অবহিত করতেন। তখন এ আয়াত নাজিল হয়ঃ “এবং যারা আল্লাহর সঙ্গে কোন ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না; যে এগুলো করে সে শাস্তি ভোগ করবে”- (সুরাহ্ আল ফুরকান ২৫ঃ ৬৮)। আরো নাজিল করেনঃ “হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ো না”। সুরা জুমার : ৫৩। সহিহ মুসলিম : ১২২

ইবনে শামাসাহ আল মহরি (রহ.) বলেন, আমরা ’আমর ইবনে আস (রা.) কে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দেখতে উপস্থিত হলাম। তখন তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করে অনেকক্ষণ কাঁদছিলেন। তার পুত্র তাকে তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রদত্ত বিভিন্ন সুসংবাদের উল্লেখপূর্বক সান্ত্বনা দিচ্ছে যে, আব্বা রাসুলুল্লাহ ﷺ কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাসুলুল্লাহ ﷺ কি আপনাকে অমুক সুসংবাদ দেননি? রাবী বলেন, তখন তিনি পুত্রের দিকে মুখ ফিরালেন এবং বললেন, আমার সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয় হচ্ছে “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এ কালিমার সাক্ষ্য দেয়া।

আর আমি অতিক্রম করেছি আমার জীবনের তিনটি পর্যায়। এক সময় তো আমি এমন ছিলাম যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধাচরণে আমার চেয়ে কঠোরতর আর কেউই ছিল না। সে সময়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ কে কবজায় পেয়ে হত্যা করা ছিল আমার সবচাইতে প্রিয় ভাবনা। যদি সে অবস্থায় আমার মৃত্যু হত তবে নিশ্চিত আমাকে জাহান্নামে যেতে হত।

এরপর আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামের অনুরাগ সৃষ্টি করে দিলেন, তখন আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর দরবারে উপস্থিত হয়ে অনুরোধ জানালাম যে, আপনার ডান হাত বাড়িয়ে দিন, আমি বাই’আত করতে চাই। রাসুলুল্লাহ ﷺ তার ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন, তখন আমি আমার হাত টেনে নিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমর, কি ব্যাপার? বললাম, পূর্বে আমি শর্ত করে নিতে চাই। রাসুলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, কি শর্ত করবে? আমি উত্তর করলাম, আল্লাহ যেন আমার সব গুনাহ মাফ করে দেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, ’আমর! তুমি কি জানো না যে, ইসলাম পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়। আর হিজরত পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়? আর হজ পূর্ববর্তী সকল অন্যায় মিটিয়ে দেয়? আমর বলেন, এ পর্যায়ে আমার অন্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ অপেক্ষা বেশি প্রিয় আর কেউ ছিল না। আমার চোখে তিনি অপেক্ষা মহান আর কেউ নেই। অপরিসীম শ্রদ্ধার কারণে আমি তার প্রতি চোখভরে তাকাতেও পারতাম না। আজ যদি আমাকে তার দৈহিক আকৃতির বর্ণনা করতে বলা হয় তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ চোখ ভরে আমি কখনোই তার প্রতি তাকাতে পারিনি। ঐ অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হত তবে অবশ্যই আমি জান্নাতী হওয়ার আশাবাদী থাকতাম।

পরবর্তীকালে আমরা নানা বিষয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছি, তাই জানি না, এতে আমার অবস্থান কোথায়? সুতরাং আমি যখন মারা যাব, তখন যেন কোন বিলাপকারিণী অথবা আগুন সে জানাযার সাথে না থাকে। আমাকে যখন দাফন করবে তখন আমার উপর আস্তে আস্তে মাটি ফেলবে এবং দাফন সেরে একটি উট জবেহ করে তার মাংস বণ্টন করতে যে সময় লাগে ততক্ষণ আমার কবরের পাশে অবস্থান করবে। যেন তোমাদের উপস্থিতির কারণে আমি আতঙ্ক মুক্ত অবস্থায় থাকি ও চিন্তা করতে পারি যে, আমার প্রতিপালকের দূতের কি জবাব দিব। সহিহ মুসলিম : ১২১, সহিহ ইবনে খুযায়মাহ :২৫১৫, সহিহ আল জামি : ১৩২৯, সহিহ আত্ তারগিব : ১০৯৭, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ১৮৯৯০

৪. ঈমান গ্রহণ অতীতের নেক আমল জমা থাকে :

عَنْ حَكِيمِ بْنِ حِزَامٍ، قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَشْيَاءَ كُنْتُ أَفْعَلُهَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ – قَالَ هِشَامٌ يَعْنِي أَتَبَرَّرُ بِهَا – فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏ “‏ أَسْلَمْتَ عَلَى مَا أَسْلَفْتَ لَكَ مِنَ الْخَيْرِ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ فَوَاللَّهِ لاَ أَدَعُ شَيْئًا صَنَعْتُهُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ إِلاَّ فَعَلْتُ فِي الإِسْلاَمِ مِثْلَهُ

হাকিম ইবনে হিযাম (রা.) বলেন,  আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! জাহিলী যুগে যে সকল নেক কাজ করতাম আমি কি তার কোন প্রতিদান পাবো? রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, তোমার সে সব নেক কাজের বিনিময়ে তুমি ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! জাহিলী যুগে যে সব নেক কাজ আমি করেছি ইসলামি জিন্দেগীতেও আমি তা করে যাব। সহিহ মুসলিম : ১২৩

৫. ঈমানদার ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না :

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“‏ لاَ تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلاَ تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا ‏.‏ أَوَلاَ أَدُلُّكُمْ عَلَى شَىْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ أَفْشُوا السَّلاَمَ بَيْنَكُمْ

অর্থ : ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দিব না, কি করলে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো, তোমরা পরস্পর বেশি সালাম বিনিময় করবে। সহিহ মুসলিম : ৫৪

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন-

قَالَ لَمَّا كَانَ يَوْمُ خَيْبَرَ أَقْبَلَ نَفَرٌ مِنْ صَحَابَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَقَالُوا فُلاَنٌ شَهِيدٌ فُلاَنٌ شَهِيدٌ حَتَّى مَرُّوا عَلَى رَجُلٍ فَقَالُوا فُلاَنٌ شَهِيدٌ ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏”‏ كَلاَّ إِنِّي رَأَيْتُهُ فِي النَّارِ فِي بُرْدَةٍ غَلَّهَا أَوْ عَبَاءَةٍ ‏”‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   ‏”‏ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ اذْهَبْ فَنَادِ فِي النَّاسِ إِنَّهُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلاَّ الْمُؤْمِنُونَ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَخَرَجْتُ فَنَادَيْتُ ‏”‏ أَلاَ إِنَّهُ لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلاَّ الْمُؤْمِنُونَ ‏

অর্থ : খাইবারে অমুক অমুক শহীদ হয়েছেন। অবশেষে এক ব্যক্তি প্রসঙ্গে তারা বললেন যে, সেও শহীদ হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, কখনই না। গনিমতের মাল থেকে চাঁদর আত্মসাৎ করার কারণে আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। তারপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! যাও লোকেদের মাঝে ঘোষণা করে দাও যে, জান্নাতে কেবলমাত্র প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, তারপর আমি বের হলাম এবং ঘোষণা করে দিলাম, “সাবধান! শুধুমাত্র প্রকৃত মুমিনরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ১১৪

৬. আহলে কিতাব থেকে যারা ঈমান আনবে, তাদের দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে :

আবু মূসা আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেন-

‏ “‏ ثَلاَثَةٌ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُمْ مَرَّتَيْنِ الرَّجُلُ تَكُونُ لَهُ الأَمَةُ فَيُعَلِّمُهَا فَيُحْسِنُ تَعْلِيمَهَا، وَيُؤَدِّبُهَا فَيُحْسِنُ أَدَبَهَا، ثُمَّ يُعْتِقُهَا فَيَتَزَوَّجُهَا، فَلَهُ أَجْرَانِ، وَمُؤْمِنُ أَهْلِ الْكِتَابِ الَّذِي كَانَ مُؤْمِنًا، ثُمَّ آمَنَ بِالنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ   فَلَهُ أَجْرَانِ، وَالْعَبْدُ الَّذِي يُؤَدِّي حَقَّ اللَّهِ وَيَنْصَحُ لِسَيِّدِهِ ‏”‏‏.‏ ثُمَّ قَالَ الشَّعْبِيُّ وَأَعْطَيْتُكَهَا بِغَيْرِ شَىْءٍ وَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يَرْحَلُ فِي أَهْوَنَ مِنْهَا إِلَى الْمَدِينَةِ‏.‏

অর্থ : তিন প্রকারের ব্যক্তিকে দ্বিগুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। যে ব্যক্তির একটি বাদী আছে সে তাকে শিক্ষা দান করে, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয় এবং তাকে উত্তমরূপে শিষ্টাচার দান করে। তারপর তাকে মুক্ত করে দিয়ে তাকে বিয়ে করে। সে ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। আর আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে মুমিন ব্যক্তি যে তার নবির উপর ঈমান এনেছিল। তারপর নবি ﷺ এর প্রতি ঈমান এনেছে। তাঁর জন্য দ্বিগুণ সওয়াব রয়েছে। যে গোলাম আল্লাহর হক যথাযথভাবে আদায় করে এবং স্বীয় মনিবের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে। সহিহ বুখারি : ৩০১১, সহিহ মুসলিম : ১৫৪, সুনানে নাসায়ি ৩৩৪৪, সুনানে তিরমিজি : ১১১৬, দারিমী ২২৯০, সহিহ আল জামি : ৩০৭৩, সহিহ আত তারগিব :১৮৮২।

৭. দুনিয়াতে কোন মুসলিমের দোষ গোপন রাখলে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন :

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

যে লোক কোন ঈমানদারের দুনিয়া থেকে কোন বিপদ দূর করে দিবে, আল্লাহ তায়ালা বিচার দিবসে তার থেকে বিপদ সরিয়ে দিবেন। যে লোক কোন দুস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাই এর সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোন একটি গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে তখন তাদের উপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তায়ালা তার নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে আমলে পিছনে সরিয়ে দিবে তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করে দিবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯

৮। ঈমানদারের নেক আমল বৃদ্ধি করা হলেও পাপ বৃদ্ধি করা হয় না :

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন-

إِذَا أَحْسَنَ أَحَدُكُمْ إِسْلاَمَهُ، فَكُلُّ حَسَنَةٍ يَعْمَلُهَا تُكْتَبُ لَهُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ، وَكُلُّ سَيِّئَةٍ يَعْمَلُهَا تُكْتَبُ لَهُ بِمِثْلِهَا

অর্থ : তোমাদের মধ্যে কেউ যখন উত্তমরূপে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তখন সে যে আমলে সালেহ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে সাতশ গুণ পর্যন্ত (পুণ্য) লেখা হয়। আর সে যে পাপ কাজ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার জন্য ঠিক ততটুকুই পাপ লেখা হয়। সহিহ বুখারি : ৪২, সহিহ মুসলিম : ১২৯, আহমাদ : ৮২১৭, সহিহ ইবনে হিব্বান : ২২৮, শুয়াবুল ঈমান : ৭০৪৬, সহিহ জামি : ২৮৭