মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
স্বামীর প্রতি একজন স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। নিচে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব কর্তব্যসমূহ তুলে ধরা হলো।
মুআয বিন জাবাল (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহিলা যদি স্বামীর হক (যথার্থরূপে) জানতো, তাহলে তার দুপুর অথবা রাতের খাবার খেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে (তার পাশে) দাঁড়িয়ে থাকতো। হাদিস সম্ভার : ২৬১৪, সহীহুল জামে : ৫২৫৯
১. স্বামীর আনুগত্য করা
২. নিজের সতীত্ব সংরক্ষণ করবে
৩. স্বামী ঘর ও ধন সম্পদ সংরক্ষণ করবে
৪. স্ত্রীর স্বামীর নেতৃত্ব মেনে নিবে
৫. স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা
৬. স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করা
৭. স্বামীর আহবানে সাড়া দিতে হবে
৮. স্ত্রী তার স্বামীর ঘরে অবস্থান করবে
৯. স্ত্রী নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখবে
১০. জিদ ও হঠকারিতা পরিহার
১১. স্বামীর সাথে সব সময় হাসি খুসি থাকা
১২. ইবাদত পালনে পারস্পরিক সহযোগিতা
১৩. স্বামীর অপছন্দনীয় কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া
১৪. স্বামীকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না
১৫. স্বামীর অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে
১. স্বামীর আনুগত্য করা
আল্লাহ তা’আলা বলেন-
اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪
এই আয়াতে ‘কাওয়ামুন’ শব্দের অর্থ হলো তত্ত্বাবধায়ক, দায়িত্বশীল বা নেতা। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, পরিবারে পুরুষ বা স্বামী হলো প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এর কারণ হলো, আল্লাহ তা’আলা পুরুষকে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা তাকে পরিবারের প্রধান হিসেবে উপযুক্ত করে তোলে। এই নেতৃত্ব কোনোভাবেই পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব বা নারীর হীনমন্যতা প্রমাণ করে না, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল পরিবার পরিচালনার জন্য ভূমিকা বিভাজন মাত্র।
আয়াতের অপর অংশে আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এই বাক্যটি আগের অংশের কারণ ব্যাখ্যা করে। পুরুষকে যে তত্ত্বাবধায়ক বা প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার একটি কারণ হলো আল্লাহ তাদের কিছু বিশেষ গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, যা সাধারণত পুরুষের মধ্যে বেশি থাকে। এটি আল্লাহর একটি প্রাকৃতিক বিধান, যা উভয় লিঙ্গের জন্যই উপকারী। এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো একতরফা ক্ষমতা নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব, যা পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।
আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৩, সহিহাহ : ১২০৩
স্ত্রী হিসেবে একজন মুসলিম নারীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করা। এটি তার ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ তাআলা ব্যভিচারকে একটি জঘন্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং এই পাপ থেকে দূরে থাকতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো স্ত্রী যদি স্বামীর অনুপস্থিতিতে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তবে এটি একটি ভয়ংকর অন্যায়। ইসলামে এর জন্য দুনিয়াতে কঠিন শাস্তি (রজম) নির্ধারিত আছে এবং আখিরাতেও রয়েছে এর জন্য ভয়াবহ শাস্তি। তবে, যদি কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তবে তার উচিত সর্বাত্মকভাবে নিজেকে রক্ষা করা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজের সম্মান ও সতীত্ব রক্ষার জন্য প্রতিরোধ করা আবশ্যক। যদি এই প্রতিরোধের কারণে কোনো নারী ধর্ষকের হাতে নিহত হন, তবে ইসলামে তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কাছে তিনি শহীদ হিসেবে গণ্য হবেন, যিনি তার সম্মান রক্ষার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাই একজন স্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার নিজের সতীত্ব সংরক্ষণ করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ
সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সূরা নিসা : ৩৪
অর্থাৎ- একজন নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের সতীত্ব রক্ষা করা এবং এই পথে সকল প্রকার অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকা। নিজের ইজ্জত-সম্মান বজায় রাখার জন্য আল্লাহর কাছে সার্বক্ষণিক সাহায্য কামনা করা উচিত। কারণ, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় থাকা সম্ভব নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা—এ দুটি জিনিসই একজন নারীকে যেকোনো পরিস্থিতিতে তার সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
৩. স্বামী ঘর ও ধন সম্পদ সংরক্ষণ করবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ
সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সূরা নিসা : ২৪
পুণ্যবতী নারীরা তাদের স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেদের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করে। একই সাথে, তারা স্বামীর ধন-সম্পদ, গৃহ ও গোপনীয়তার যথাযথ হেফাজত করে। স্বামীদের অনুপস্থিতিতেও নিজেদের ও স্বামীর সবকিছু রক্ষা করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।
সূরা আহযাব : ৩৩
আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮
আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি বিদায় হজ্জের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার বক্তৃতায় বলতে শুনেছি, স্বামীর ঘর হতে তার পূর্বানুমতি ছাড়া কোন স্ত্রীলোক যেন কিছু দান না করে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! খাবারও কি নয়? তিনি বললেন, খাবার তো আমাদের উত্তম সম্পদ। সুনানে তিরমিজি : ৬৭০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২২৯৫
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকে চারটি নি’আমাত দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করা হয়েছে। (১) শুকরগুজার অন্তর, (২) জিকির-আযকারে রত জিহবা, (৩) বিপদাপদে ধৈর্যশীল শরীর, (৪) নিজের (ইজ্জত-আবরু) ও স্বামীর ধন-সম্পদে আমানতদারিতায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্ত্রী। মিশকাত : ৩২৭৩, শু‘আবুল ঈমান : ৪১১৫
৪. স্ত্রীর স্বামীর নেতৃত্ব মেনে নিবে
পরিবারে শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখার জন্য একজন পুরুষের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া প্রয়োজন। তবে এই নেতৃত্ব যেন জুলুমের রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় সূরা নিসা : ৩৪
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোন স্ত্রী স্বামীর উপস্থিতিতে তাঁর অনুমতি ব্যতীত নফল সওম রাখবে না। সহিহ বুখারি : ৫১৯২,
আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোন নারী তার বাবা, ছেলে, ভাই, স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া তিন দিন বা তার বেশি দিন সফর করবে না। সহিহ মুসলিম : ১৩৪০, সুনানে আবূ দাঊদ : ১৭২৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৮৯৮, সুনানে তিরমিযী : ১১৬৯, সহিহ ইবনে হিব্বান : ২৭০৮
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করলেন। তার একটি এই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া স্ত্রী যেন (নাফল) রোযা না রাখে। তার উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া সে যেন তার ঘরে প্রবেশ করার জন্য অন্য কাউকে অনুমতি না দেয়। তার (স্বামীর) নির্দেশ ছাড়া সে তার উপার্জিত সম্পদ থেকে যা কিছু দান করবে তাতেও সে (স্বামী) অর্ধেক সাওয়াব পাবে। সহিহ মুসলিম : ১০২৬, আহমাদ : ৮১৯৫
উপরের আয়াত ও হাদিসগুলো প্রমান করে, ইসলামে পারিবারিক জীবন সুশৃঙ্খল এবং দায়িত্বশীলতার উপর প্রতিষ্ঠিত। স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই নির্দিষ্ট ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে। স্বামী পরিবারের অভিভাবক হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন, আর স্ত্রী সেই নেতৃত্বকে সম্মান ও সহযোগিতা করবেন। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা একটি সুস্থ ও সুখী পারিবারিক জীবনের জন্য অপরিহার্য।
৫. স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা
স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একজন স্ত্রীর নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। অনেক নারী স্বামীর অবদানকে ছোট করে দেখে, যা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
«مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَ»
মানুষের প্রতি যে লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, আল্লাহ্ তা’আলার প্রতিও সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সুনানে তিরমিযী : ১৯৫৫, মিশকাত : ৩০২৫, সহীহাহ : ৪১৬, আহমাদ : ১১২৮০
ইবনু আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেন, ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষনো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ সহিহ বুখারি : ২৯, ৪৩১,৭৪৮,১০৫২,৩২০২,৫১৯৭, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, আহমাদ : ৩০৬৪
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ৭৯, ৮০, আহমাদ : ৫৪৪৩
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা সেই মহিলার প্রতি চেয়েও দেখবেন না, যে তার স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না; অথচ সে তার মুখাপেক্ষিণী। হা্দিস সম্ভার : ২৬০৬সুনানে নাসায়ি কুবরা : ৯১৩৫, ত্বাবারানী, বাযযার : ২৩৪৯, হাকেম : ২৭৭১, বাইহাকী : ১৪৪৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৮৯
৬. স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করা
ইসলামে একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করাকে জান্নাতে প্রবেশের একটি উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“ أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ دَخَلَتِ الْجَنَّةَ
যে কোন নারী তার স্বামীকে খুশী রেখে মারা যায় সে জান্নাতে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ১১৬১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৪, মিশকাত : ৩২৫৬
আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, কোন মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহ্ভীতির পর উত্তম যা লাভ করে তা হলো পুণ্যময়ী স্ত্রী। স্বামী তাকে কোন নির্দেশ দিলে সে তা পালন করে; সে তার দিকে তাকালে (তার হাস্যাজ্জ্বল চেহারা ও প্রফুল্লতা) তাকে আনন্দিত করে এবং সে তাকে শপথ করে কিছু বললে সে তা পূর্ণ করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার সম্ভ্রম ও সম্পদের হেফাযত করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৭, মিশকাত : ৩০৯৫, সুনানে নাসায়ি : ৩২৩১, মুসনাদে আহমাদ : ৯৩৫২
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-
إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَصَّنَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا، قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ
“যদি কোনো নারী তার পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তবে তাকে বলা হবে—তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ কর।” সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪১৬৩, মুসনাদ আহমাদ : ১৬৬১, আল-মুজামুল আওসাত : ১৫৯১
করো।’ মুসনাদ আহমদ : ১৬৬১, সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪১৬৩,
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, কোন্ রমণী সর্বোত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে স্বামী স্ত্রীর প্রতি তাকালে তাকে সন্তুষ্ট করে দেয়, স্বামী কোনো নির্দেশ করলে তা (যথাযথভাবে) পালন করে এবং নিজের প্রয়োজনে ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করে না। মিশকাত : ৩২৭২, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩১, আহমাদ : ৭৪২১, ইরওয়া : ১৭৮৬, সহীহাহ্ : ১৮৩৮, সহীহ আল জামি : ৩২৯৮
৭. স্বামীর আহবানে সাড়া দিতে হবে
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক চাহিদা পূরণ করা উভয় পক্ষেরই অধিকার ও দায়িত্ব। এর মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় এবং পরিবারে শান্তি বজায় থাকে। ইসলাম স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর এই অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। যদি স্ত্রীর কোনো শরীয়তসম্মত ওজর থাকে (যেমন- অসুস্থতা, মাসিক ঋতুস্রাব বা অন্য কোনো শারীরিক দুর্বলতা) তাহলে ভিন্ন কথা। অন্যথায় ফিরেশতাগণ ঐ স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে।
এ হাদিসটি একটি সুখী ও সুশৃঙ্খল দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে। এটি স্ত্রীর প্রতি স্বামীকে তার বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত না করার জন্য একটি শক্তিশালী নির্দেশনা।
আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণনা আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তির নামায তাদের কান ডিঙ্গায় না (কবুল হয় না)। পলায়নকারী দাস যে পর্যন্ত তার মালিকের নিকটে ফিরে না আসে; যে মহিলা তার স্বামীর বিরাগ নিয়ে রাত কাটায় এবং যে ইমামকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা পছন্দ করে না। সুনানে তিরমিজি : ৩৬০, মিশকাত : ১১২২, ত্বাবারানী ৮০১৬, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৮৮, ৬৫০
আবূ আলী ত্বালক ইবনে আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার প্রয়োজনে আহবান করবে, তখন সে যেন (তৎক্ষণাৎ) তার নিকট যায়। যদিও সে উনানের কাছে (রুটি ইত্যাদি পাকানোর কাজে ব্যস্ত) থাকে। সুনানে তিরমিজি : ১১৬০, সহীহুল জামে : ৫৩৪, হাদিস সম্ভার : ২৬০৩
৮. স্ত্রী তার স্বামীর ঘরে অবস্থান করবে
ইসলামে স্ত্রীর প্রধান কর্মক্ষেত্র হলো তার স্বামীর ঘর। তবে এর মানে এই নয় যে, সে কোনো প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারবে না। বরং প্রয়োজনে স্বামীর অনুমতি নিয়ে বা তার সম্মতি নিয়ে বাইরে যাওয়া জায়েজ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সূরা আহযাব : ৩৩
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুসলিম নারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। এটি মূলত ইসলামের প্রথম দিকের মুসলিম নারীদের সম্বোধন করে নাজিল হয়েছিল, কিন্তু এর শিক্ষা সব যুগের মুসলিম নারীদের জন্য প্রযোজ্য।
নারীদেরকে প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি থাকলেও, বিনা প্রয়োজনে ঘরে থাকার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, নারীদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা। ইসলাম নারীদেরকে সম্মানের আসনে বসিয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। ঘরে থাকা মানে এই নয় যে নারীদের কোনো স্বাধীনতা নেই, বরং এটি তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়। ঘরের বাইরে যখন প্রয়োজন হবে, যেমন – জ্ঞান অর্জন, জীবিকা নির্বাহ, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা, তখন তারা পর্দার সাথে বের হতে পারবেন।
নারীরা নিজেদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করবে, প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবে না, এবং যদি বের হতেই হয়, তবে পর্দার বিধান মেনে চলবে। নিজেদের সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয় রূপ জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করবে না, যা ইসলামের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী।
৯. স্ত্রী নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখবে
স্ত্রীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজের ঘর ও সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা, যাতে পরিবার ইসলামী পরিবেশে থাকে। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا وَّقُوۡدُہَا النَّاسُ وَالۡحِجَارَۃُ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। সূরা তাহরীম : ৬
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীও স্বামীর সহচরী হিসেবে সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও হিফাযতের দায়িত্বে অংশীদার।
আবদুল্লাহ [ইবনু ‘উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪, সহিহ মুসলিম : ১৮২৯
১০. জিদ ও হঠকারিতা পরিহার
দাম্পত্য জীবনে শান্তি বজায় রাখার জন্য স্ত্রীর জন্য জিদ ও হঠকারিতা পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সূরা নিসা : ১৯
এই আয়াত পারস্পরিক ভালো আচরণের কথা বলে, যেখানে জিদ ও হঠকারিতার কোনো স্থান নেই।
আবূ উমামাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন সম্প্রদায় হিদায়াতের রাস্তা পেয়ে আবার পথভোলা হয়ে থাকলে তা শুধু তাদের বিবাদ ও বাক-বিতণ্ডায় জড়িত হওয়ার কারণেই হয়েছে। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন-
مَا ضَرَبُوۡہُ لَکَ اِلَّا جَدَلًا ؕ بَلۡ ہُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُوۡنَ
তারা কেবল কূটতর্কের খাতিরেই তাকে তোমার সামনে পেশ করে। বরং এরাই এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়।
সূরা যুখরুফ : ৫৮। সুনানে তিরমিজি : ৩২৫৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৮
আবূ উমামা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের যিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের যিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের যিম্মাদার। সুনানে আবু দাউদ : ৪৮০০
এটি ঝগড়া পরিহারের সাধারণ নীতি, যা দাম্পত্য জীবনেও প্রযোজ্য।
১১. স্বামীর সাথে সব সময় হাসি খুসি থাকা
ইসলামে সত্যিই স্বামীর সাথে স্ত্রীর স্নেহময়, হাসিখুশি ও সুন্দর ব্যবহার অনেক বড় গুণ হিসেবে গণ্য। এ বিষয়ে একাধিক সহিহ হাদিস পাওয়া যায়।
আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, কোন মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহ্ভীতির পর উত্তম যা লাভ করে তা হলো পুণ্যময়ী স্ত্রী। স্বামী তাকে কোন নির্দেশ দিলে সে তা পালন করে; সে তার দিকে তাকালে (তার হাস্যাজ্জ্বল চেহারা ও প্রফুল্লতা) তাকে আনন্দিত করে এবং সে তাকে শপথ করে কিছু বললে সে তা পূর্ণ করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার সম্ভ্রম ও সম্পদের হেফাযত করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫৭, মিশকাত : ৩০৯৫,
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
خَيْرُ النِّسَاءِ امْرَأَةٌ إِذَا نَظَرْتَ إِلَيْهَا سَرَّتْكَ، وَإِذَا أَمَرْتَهَا أَطَاعَتْكَ، وَإِذَا غِبْتَ عَنْهَا حَفِظَتْكَ فِي نَفْسِهَا وَمَالِكَ
“সর্বোত্তম নারী সে-ই, যাকে দেখে তুমি আনন্দিত হও, যাকে তুমি আদেশ করলে সে মান্য করে, আর তুমি অনুপস্থিত থাকলে সে তোমার মান-ইজ্জত ও সম্পদ রক্ষা করে।” মুসনাদে আহমাদ : ৭৩৯৬, ৭৪১২, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩১, সহিহ আল-হাকিম : ২/১৬১
আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সাথে উত্তম ব্যবহার করে। আর আমি আমার পরিবারের সাথে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যবহারকারী।” সুনানে তিরমিযি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫
আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমার হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তোমার ভাইয়ের সামনে উপস্থিত হওয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। তোমার সৎকাজের আদেশ এবং তোমার অসৎকাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশ তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। পথহারা লোককে পথের সন্ধান দেয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ, স্বল্প দৃষ্টি সম্পন্ন লোককে সঠিক দৃষ্টি দেয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। পথ হতে পাথর, কাটা ও হাড় সরানো তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। তোমার বালতি দিয়ে পানি তুলে তোমার ভাইয়ের বালতিতে ঢেলে দেয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫৬, সহীহাহ : ৫৭২
১২. ইবাদত পালনে পারস্পরিক সহযোগিতা
আল্লাহ তায়াল বলেন-
لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّہُنَّ ؕ
তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। সুরা বাকারা : ১৮৭
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু পার্থিব নয়, আধ্যাত্মিকও। একে অপরের ইবাদতে সহযোগিতা করা, যেমন সালাতের জন্য ডাকা বা রোজা রাখতে উৎসাহিত করা, সম্পর্ককে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে তোলে।
আবূ সাঈদ ও আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজ স্ত্রীকেও ঘুম থেকে জাগ্রত করে উভয়ে দু রাকআত (নফল) সালাত পড়ে, তাদের উভয়কে আল্লাহ্র পর্যাপ্ত যিকরকারী পুরুষ ও পর্যাপ্ত যিকিরকারী স্ত্রীলোকদের তালিকাভুক্ত করা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩০৯, ১৪৫১, মিশকাত : ১২৩৮
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“আল্লাহ সেই পুরুষের ওপর রহম করুন যে রাতের বেলা উঠে সালাত আদায় করে এবং তার স্ত্রীকে জাগায়, আর যদি সে অস্বীকার করে, তবে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। এবং আল্লাহ সেই নারীর ওপর রহম করুন যে রাতের বেলা উঠে সালাত আদায় করে এবং তার স্বামীকে জাগায়, আর যদি সে অস্বীকার করে, তবে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়।” সুনানে আবু দাউদ : ১৩০৮
১৩. স্বামীর অপছন্দনীয় কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া
স্বামী যাকে অপছন্দ করে, সেই ব্যক্তিকে তার ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া একজন স্ত্রীর জন্য জরুরি। এতে দাম্পত্য জীবনে ফিতনা সৃষ্টি হয় না।
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো বিবাহিতা নারীর নিকটে স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া কেউ যেন রাত্রি যাপন না করে। সহিহ মুসলিম : ২১৭১, সহীহাহ্ : ৩০৮৬, মিশকাত : ৩১০১
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন স্বামী উপস্থিত থাকবে, তখন স্বামীর অনুমতি ব্যতীত মহিলার জন্য সওম পালন বৈধ নয় এবং স্বামীর অনুমতি ব্যতীত অন্য কাউকে তার গৃহে প্রবেশ করতে দেবে না। যদি কোন স্ত্রী স্বামীর নির্দেশ ব্যতীত তার সম্পদ থেকে খরচ করে, তাহলে স্বামী তার অর্ধেক সওয়াব পাবে। সহিহ বুখারি : ২০৬৬, ৫১৯৫, মুসলিম ২৪১৭,
আমর বিন আহওয়াস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বিদায়ী হজ্জের ভাষণে) বলেছেন, তোমাদের স্ত্রীর উপর তোমাদের অধিকার এই যে, (তোমাদের অবর্তমানে) তোমরা যাকে অপছন্দ ও ঘৃণা কর, তাকে তোমাদের শয্যা দলন করতে যেন সুযোগ না দেয় এবং যাকে অপছন্দ কর তাকে তোমাদের গৃহে (প্রবেশের জন্য) যেন অনুমতি না দেয়। সুনানে তিরমিজি : ১১৬৩, ৩০৮৭, হাদসি সম্ভার হাদিসের মান সহিহ
১৪. স্বামীকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায় আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে ফেরেশ্তাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। শুবা, আবূ হামযাহ, ইবনু দাউদ ও আবূ মু‘আবিয়াহ (রহ.) আ‘মাশ (রহ.) হতে হাদীস বর্ণনায় আবূ আওয়ানাহ (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। সহিহ বুখারি : ৩২৩৭, ৫১৯৩, ৫১৯৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৬, আহমাদ : ৯৬৭৭
মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কোন স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, তখন জান্নাতে তার আয়তালোচনা হুর স্ত্রীগণ বলতে থাকেঃ ওহে! আল্লাহ্ তোমার সর্বনাশ করুন। তুমি তাকে কষ্ট দিও না। সে তো তোমার নিকট অল্প দিনের মেহমান। অচিরেই সে তোমাকে ত্যাগ করে আমাদের নিকট চলে আসবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৪, সুাননে তিরমিজি : ১১৭৪, সহীহা : ১৭৩