Category Archives: বিভিন্ন দিবস

যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০৭ ::  আশুরা সম্পর্কি জাল বর্ণনাসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় জালিয়াতগন এ সম্পর্কেও বহু জাল হাদিস রচনা করেছে। আশুরা সম্পর্কে কয়েকটি জাল হাদিস তুল ধরছি।

জাল হাদীস-০১ : মুহাররম বা আশুরার সিয়ামের ফজিলত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে এই সম্পর্কে জাল হাদিসগুলি হলোঃ

১. যে ব্যক্তি আশুরার দিন রোজা রাখে, তা তার চল্লিশ বছরের গোনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।

২. মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।

৩. আশুরার তারিখে রোজা আদায়কারীর আমলনামার সাত আসমান-জমিনের অধিবাসীদের সওয়াব লিখে দেওয়া হয়।

৪. হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি মহররমের মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তা‘আলা তাহাকে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ৩০ দিন রোযা রাখার সমান ছওয়াব দিবেন।

৫. মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে।

৬. আরও হাদীছে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার দিন একটি রোযা রাখিবে সে দশ হাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের ও দশ হাজার হাজীর ছওয়াব পাইবে। 

৭. আরও হাদীছে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে স্নেহ-পরবশ হইয়া কোন এতীমের মাথায় হাত ঘুরাইবে, আল্লাহতাআলা ঐ এতীমের মাথার প্রত্যেক চুলের পরিবর্তে তাহাকে বেহেশতের এক একটি ‘দরজা’ প্রদান করিবেন। আর যে ব্যক্তি উক্ত তারিখের সন্ধ্যায় রোযাদারকে খানা খাওয়াইবে বা ইফতার করাইবে, সে ব্যক্তি সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে খানা খাওয়াইবার ও ইফতার করাইবার ন্যায় ছওয়াব পাইবে।

৮. নবি (সা.) বলিলেন, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখিবে, সে ৬০ বৎসর রোযা সালাত করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে। যে ব্যক্তি ঐ তারিখে বিমার পোরছী করিবে, সে সমস্ত আওলাদে আদমের বিমার-পোরছী করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে।… তাহার পরিবারের ফারাগতি অবস্থা হইবে। ৪০ বৎসরের গুনাহর কাফ্ফারা হইয়া যাইবে।

৯. হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখিবে, সে ব্যক্তি যেন ১০ হাজার বৎসর যাবত দিনের বেলা রোজা রাখিল এবং রাত্রিবেলা ইবাদতে জাগরিত থাকিল। … মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।… তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পছন্দনীয় মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিও। যেই ব্যক্তি মহররম মাসের সম্মান করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাকে জান্নাতের মধ্যে সম্মানিত করিবেন এবং জাহান্নামের আযাব হইতে বাঁচাইয়া রাখিবেন… মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে।

এই জাল কথাগুলি পাবেনঃ

১. মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-৪৩০-৪৩১। 

২. মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃষ্ঠা-১৩,

৩. অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃষ্ঠা-২৯৮-৩০০।

হাদীস জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৩

২. শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিঃ), মিজানুল ইতিদাল, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-৪৫১-৪৫২।

৩. ইমাম হাসান আস-সাগানী (৬৫০ হিঃ), আল-মাউদুআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৬৮-৫৭২।

৪. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৪৬-৫৪৮।

৫. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯ ।

৬. ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৯-১৩০।

৭. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহুশ শরীআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯-১৫১

৮. আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৫।

৯. মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬।

১০. হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৯।

১১. এসব হাদিস নয়, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১৯।

জাল হাদীস-০২ : আশুরার সম্পর্কে মিথ্যা ঘটনাবলি।

আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে এই জাল কাথাগুলি বলা হয়ঃ

দশই মহাররম বা আশুরার দিন আল্লাহ আসমান ও যমিন, পাহাড়, পর্বত, নদনদী, কলম, লাওহে মাহফূয, আরশ, কুরসী, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিরিশতাগণ, আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, ইদরীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, নূহ (আ.) কে নৌকা থেকে বের করেন,  দাউদ (আ.) তাওবা কবুল করেছেন, সুলাইমান (আ.) কে রাজত্ব প্রদান করেছেন, আইঊব (আ.)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন, তাওরাত নাযিল করেন, ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, তিনি খলীল উপাধি লাভ করেন, ইবরাহীম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান, ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানী করা হয়েছিল, ইউনূস (আ.) মাছের পেট থেকে বাহির হয়, ইউসূফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করেন, এ দিনে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান, ইয়াকূব (আ.) ইউসূফের (আ.) সাথে সম্মিলিত হন, মুহাম্মাদ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছেন।

আদম (আ.) এর তাওবা কবুল, নূহ (আ.) এর নৌকা জূদী পর্বতের উপর থামা ও ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবী-তাবিয়ী থেকে বর্ণিত।

কথাগুলিকে জাল হাদিস বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৭

২. শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিঃ), মিজানুল ইতিদাল, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৯০।

৩. মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়িদ দরবেশ হূত (১২৭৬ হি), ‘আসনাল মাতালিব, পৃষ্ঠা-২৭৭-২৭৮।

৪. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৬৯।

৫. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯ ।

৬. ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২।

৭. আল-আজলূনী (১১৬২ হি.), কাশফুল খাফা, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৭।

৮. আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৭।

৯. মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬।

১০. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯।

ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২।

১১. হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫১০।

১২. এসব হাদিস নয়, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১২০।

এই সম্পর্কে সহিহ হাদিস হলোঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা আশূরার দিন সওম রাখে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে  ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। (মিশকাত-২০৬৭, বুখারী ১৮৭৮ ইফাঃ সহিহ মুসলিম ১১৩০)

এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরআউন ও তার কওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এই বর্ণনাটি সত্য হলেও বাকি সব জাল।

জাল হাদীস-০৩ : আশূরার দিনে সুরমা ব্যবহার।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথাটি হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَنِ اكْتَحَلَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ بِالإِثْمِدِ، لَمْ تَرْمُدْ عَيْنُهُ أَبَداً

যে ব্যক্তি আশূরার দিনে চোখে ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে কখনোই তার চোখ উঠবে না।

হাদিসটি জাল বলেছনঃ

* ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১৬।

* আব্দুর রহমান আল-সাখাভী (৯০২ হিঃ), আল-মাকাসীদুল হাসানাহ, পৃষ্ঠা-৪০১।

* ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-২১১।

* মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরার পৃষ্ঠা-২২২, মাসনূ, পৃষ্ঠা- ১৪১।

* ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৫৭।

* ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৩১-১৩২।

* আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১০০-১০২।

* হাদিসের নামে জালিয়াতী বইয়ের অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৮।

ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করার ফলে চোখের উপকার হয় এই মর্মে সহহি হাদীস বিদ্যমানঃ

১. আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা অবশ্যই ইসমিদ সুরমা ব্যবহার করবে। কেননা তা চোখের ময়লা দূর করে, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতায় লোম গজায়। (ইবনে মাজাহ ৩৪৯৫)

২. ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো এবং তা দিয়ে তোমাদের মৃতদের কাফন পরাও। কেননা তা তোমাদের উত্তম পোশাক। আর তোমাদের জন্য উত্তম সুরমা হলো ‘ইসমিদ’ সুরমা, কারণ তা দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতার চুল গজায়।  (আবু দাউদ ৩৮৭৮, ৪১৬১)

৩. জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা শোয়ার সময় অবশ্যই ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে। কারণ, তা চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে এবং এর ফলে অধিক ভ্রূ জন্মায়। (শামায়েলে তিরমিজি ৪১, ইবনে মাজাহ ৩৪৯৬)

৪. ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, তোমরা ইসমিদ সুরমা লাগাও। এটা চোখের জ্যোতি বাড়ায় এবং চোখের পাতার লোম গজায়। তিনি মনে করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটি সুরমাদানি ছিল। তা হতে তিনি প্রতি রাতে তিনবার ডান চোখে এবং তিনবার বাঁ চোখে সুরমা লাগাতেন। (তিরমিজি ১৭৫৭)

জাল হাদীস-০৪ : দশই মুহাররম আশুরার দিন কিয়মত হবে।

এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে প্রচলিত জাল হাদিসটি হলোঃ

১. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশই মুহাররম ব আশুরার দিন কিয়মত হবে।

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

১. আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী (রহ.) মন্তব্য করেন এটা নিঃসন্দেহে মাওযূ বা বানোয়াট।

২. শায়খ আলবানী জাল বলেছেন। কিতাবুল মওযূয়াত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-২০২।

৩. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল লায়ালিল মাসনূআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৯।

৪. মুহাম্মদ ইব্‌ন আলী আল-কিনানী, তানযীহুশ শরীআতিল মারফুআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯।

৫. মাউযূ হাদীস বা প্রচলিত জাল হাদীস, হাদীস নং-১০৬।

বিভিন্ন প্রকারের দিবস কেন্দ্রিক কার্যক্রম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

দেশ বিদেশে বিভিন্ন দিবস খুব ঘটা করে উদ্‌যাপন করা হয়। জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবেও বিভিন্ন দিবস উদ্‌যাপন করা হয়। ইসলামি শরীয়তেও বিভিন্ন দিবস বা মাসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ইবাদাত করা হয়।  রমজান এবং জিলহজ্জ মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ ইবাদাত করা হয়। লাইলাতুল কদর, আরাফাতের দিন, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার দিন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায় অনেক মুসলিম কম বেশী ইসলামি শরিয়তের বাহিরের দিবসগুলো খুব গুরুত্ব দিয়া উদ্‌যাপন করে থাকে। ইসলামি শরীয়তে নেই, এমন দিবস উদ্‌যাপন করা ইসলাম কতটুকু সমর্থন করে?

কুরআন সুন্নাহর বাহিরে কোনো দিবস উদ্‌যাপন ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ বিধান প্রযোজ্য। কোন কোন দিবস উদ্‌যাপন করা হারাম, আবার কোনটি জায়েয। দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে দিবসটির সামগ্রিক কার্যকলাপের উপর নির্ভর করবে। এই হিসাবে দিবসটি পালনের কারণে শির্ক, কুফরি, বিদআত, হারাম এবং জায়েয হতে পারে। শুধু দুনিয়ায় সাথে সংশ্লিষ্ট এমন নতুন দিবস উদ্‌যাপন করা হয় হারাম, না হয় জায়েয। কিন্তু যখন দিবসটি ইবাদত মনে করে উদ্‌যাপন করা হবে তখন তা বিদআতি কাজ হিসেবে পরিগনিত হবে।  দিবস উদ্‌যাপন করা শরিয়ত সম্মত কি না, তা নির্ধারণের জন্য কিছু শর্ত আছে। ঐ শর্তের বাহিরে গেলেই উদ্‌যাপন করা করা হয় হারাম, না হয় বিদআত হবে। কাজেই দিবস উদ্‌যাপন করার আগে এই শর্ত সম্পর্কে জেনে নেই। সাধারণত দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত শর্তগুলি খেয়াল রাখতে হবে।

১। কুরআন সুন্নাহে নাই, এমন দিবস উদ্‌যাপন করাকে ইবাদাত মনে করা যাবে না।

২। দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে কুফরি আকিদা ধারণ করা করা যাবে না।

৩। দিবস উদ্‌যাপন করার সময় ইসলাম বহির্ভূত হারাম কাজ লিপ্ত হওয়া যাবে না।

৪। দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় করা যাবে না।

৫। বিধর্মীদের অনুসরণে কোনো দিবস উদ্‌যাপন করা যাবে না।

৬। ইবাদত প্রমাণের জন্য জাল জইফ হাদিসের আশ্রয় নেয়া যাবে না।

৭। যে দিবস ইসলামের প্রাথমিক যুগে উদ্‌যাপন করা হয় নাই।

উপরের শর্তগুলির আলোকেই দিবস উদ্‌যাপন করা জায়েয হতে পারে। বিষয়টি একটু খুলে বলা যাক।

১। দিবস উদ্‌যাপন করাকে দ্বীন মনে করা :

কুরআন সুন্নাহে নাই, এমন দিবসকে ইবাদাত মনে করে উদ্‌যাপন করা একটি বিদআত। আমাদের সমাজে বহু দিবসকে দ্বীন মনে করে উদ্‌যাপন করা হয় যার কোন ভিত্তি ইসলামে নেই। ইসলামের নামে এমন দিবস উদ্ভাবন করে উদ্‌যাপন করাই বিদআত যা মুমিন মুসলিমকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।

আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি ২৬৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নাসীহাত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু প্রবাহিত হলো। বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন। তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ ভিতি অবলম্বন করো, শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো, যদিও সে কাফরী গোলাম হয়। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্নক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২, সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬০৭, আহমাদ : ১৬৬৯২, দারিমী : ৯৫।

দ্বীন নাই অথচ দ্বীন মনে করে বহু আমল আবিষ্কার করেছে জান্নাত পাগল মুমিন। নবি ﷺ এর জন্মদিবস উদ্‌যাপন করা হয় “ঈদে মিলাদুন্নবি” নাম ধারণ  করে। নবি ﷺ এর মিরাজকে কেন্দ্র করে “শবে মিরাজ” বা “লাইলাতুল মিরাজ” উদ্‌যাপন করা হয়। বিভিন্ন অলি আউলিয়াদের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাদের মাজারে উরশ উদ্‌যাপন করা হয়। সাধারণ মুসলীম নর-নারীদের মৃত্যু বার্ষিকী এবং চল্লিশার নামে দিন ক্ষণ ঠিক করে পালিত হয় মৃত্যু বার্ষিকী এবং চল্লিশা উদ্‌যাপন করা হয়। এমনিভাবে আশুরা এবং শাবানের ১৫ তারিখের রজনীও মুসলিম সমাজে ইবাদাত মনে করে উদ্‌যাপন করা হয়। এই সকল দিবস উদ্‌যাপন করার কোন ভিত্তি ইসলামি শরীয়তে নাই কিন্তু বিদআতিগণ ইহাকে দ্বীন মনে করে নেকীর আশায় উদ্‌যাপন করে। মন রাখতে হবে, কুরআন সুন্নাহে নাই, এমন দিবস উদ্‌যাপন করাকে ইবাদাত মনে করা যাবে না।

২। দিবসের উৎযাপনের সাথে কুফরী আকিদা রাখাঃ

এমন অনেক দিবস আছে যেগুলির সাথে ইসলামী শরীয়তের কোন প্রকার সংশ্লিষ্টতা নাই এবং কেউ ইবাদাত মনে করেও এই সকল দিবস উদ্‌যাপন করে না। কিন্তু ঐ দিবসটি উদযাপনের সাথে সাথে কুফরী আকিদা প্রষোণ করে থাকে। আমাদের দেশে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন করা হয়। অনেক এই কুফরী আকিদা রাখে যে বছরের প্রথম দিন যেমন যাবে, সারা বছর ঠিক তেমন যাবে। তাই তারা বছরের প্রথম দিন ভাল ভাল পোশাক করে, ভালো ভালো খাবার খায়। প্রতি বছর নববর্ষের একটি করে কুফরী আকিদা নিয়ে উৎযাপিত হয়। এই সম্পর্কে বলা হয়- এ বছর  মা দূর্গা হাতিতে চড়ে এসেছেন, তাই এবার ফসল ভাল হবে।

আমাদের সমাজে আশুরার সিয়াম উদ্‌যাপন করে অনেক সুন্নাহ সম্মত আমল করার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু লোক অজ্ঞতা বসত মনে করে থাক। আশুরার সম্পর্কে মিথ্যা ঘটনাবলি। দশই মহাররম বা আশুরার দিন আল্লাহ আসমান ও যমিন, পাহাড়, পর্বত, নদনদী, কলম, লাওহে মাহফূয, আরশ, কুরসী, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিরিশতাগণ, আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, ইদরীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, নূহ (আ.) কে নৌকা থেকে বের করেন,  দাউদ (আ.) তাওবা কবুল করেছেন, সুলাইমান (আ.) কে রাজত্ব প্রদান করেছেন, আইঊব (আ.)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন, তাওরাত নাযিল করেন, ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, তিনি খলীল উপাধি লাভ করেন, ইবরাহীম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান, ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানী করা হয়েছিল, ইউনূস (আ.) মাছের পেট থেকে বাহির হয়, ইউসূফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করেন, এ দিনে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান, ইয়াকূব (আ.) ইউসূফের (আ.) সাথে সম্মিলিত হন, মুহাম্মাদ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছেন।

এই সম্পর্কে সহিহ হাদিস হলোঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা আশূরার দিন সওম রাখে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আঃ) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে  ডুবিয়েছেন। মূসা (আঃ) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। (মিশকাত-২০৬৭, বুখারী ১৮৭৮ ইফাঃ সহিহ মুসলিম ১১৩০)

নোটঃ – এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরআউন ও তার কওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন এই বর্ণনাটি সত্য । আদম (আ.) এর তাওবা কবুল, নূহ (আ.) এর নৌকা জূদী পর্বতের উপর থামা ও ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবী-তাবিয়ীদের কথা।  বাকিই সব বর্ণনা জাল বলেছেন-

ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৭, শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিঃ), মিজানুল ইতিদাল, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৯০, ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৬৯,  ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯,  আল-আজলূনী (১১৬২ হি.), কাশফুল খাফা, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৭, আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৭, মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশই মুহাররম ব আশুরার দিন কিয়মত হবে। এই হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী (রহ.) মন্তব্য করেন এটা নিঃসন্দেহে মাওযূ বা বানোয়াট, জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল লায়ালিল মাসনূআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৯। শায়খ আলবানী জাল বলেছেন। কিতাবুল মওযূয়াত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-২০২।

৩। দিবসের উৎযাপনের সময় ইসলাম বহির্ভুত হারাম কাজে লিপ্ত হয়ঃ

এমন অনেক দিবস আছে যার সাথে ইসলামে ইবাদাতে কোন সম্পর্ক নাই। দিবসটি উদ্‌যাপন করাকে ইবাদাত মনে করে না। ইহার দ্বারা কোন খারাপ আকিদাও প্রষোণ করে না। কিন্তু এই দিবস উৎযাপনের সাথে সাথে বহু হারাম কাজ লিপ্ত হতে হয়। অর্থাৎ দিবসটির সাথে হারাম হালালের সম্পর্ক আছে। আন্তরজাতীক নারী দিবস উদ্‌যাপন করার জন্য হাজার হাজার মহিলা পর্দাকে উপেক্ষা করে ঘরের বাহিরে আসে। নারীর পর্দার ফরজকে উপেক্ষা করে ইহাতে অংশ গ্রহন হারাম। অথচ মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। সুরা আহযাব : ৫৯

‘আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস’ এর কথাই ধরুন, নারীর নৃত্য মানে কি সবার জানা। কোন দেশের বা অঞ্চলের সংস্কৃতি হলেও ইসলামি শরীয়তে ইহা যে হারাম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠিক তেমনভাবে “বিশ্বভালবাসা দিবস” উদ্‌যাপন করা মানে নারী অবাধ মেলামেসাকে সমর্থন প্রদান করা। এই দিবস উদ্‌যাপন করা করার অর্থ হবে নিজেকে হারাম কাজে সম্পৃক্ত করা। আপনাকে কোন আলেম হতে হবে না, একটু চোখ কান খোলা রাখলেই ইসলামি শরীয়ত বিরোধী দিবস যা হারাম কাজের জম্মদেয় তা অনায়াসে চিনতে পারবেন। আমলের যেমন নির্দষ্ট নিয়ম কারন আছে ঠিক তেমনি প্রতিটি কাজের মাঝে ইসলামি শরীয়তের নির্দিষ্ট বীধি বিধান আছে। এই বীধি বিধানের বাহিরে কোন কাজ করলে কাজটি হারাম হয়। কাজেই কোন দিবস উদ্‌যাপন করতে গিয়ে যদি ইসলামি শরীয়তের এই বীধি বিধানকে উপেক্ষা করে হারামে লিপ্ত হতে হয়, তবে দিবসটি উদ্‌যাপন করা যে হারাম হবে।

৪। দিবস উদযাপনে শুধু অর্থের অপচয় করা

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُواْ إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় উদ্‌যাপনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। ( সুরা বনী-ইসরাঈল : ২৭

এমন অনেক দিবস আছে যার কোন উপকারীতা নাই শুধু্ই অর্থের অপচয়। যেমনঃ জম্ম দিন, জাতীয় শিক্ষক দিবস, সুন্দরবন দিবস, কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী, মহান শিক্ষা দিবস, কন্যা শিশু দিবস, জাতীয় যুব দিবস, এই রকম বহু দিবস আছে যার কারনে সমাজের কোন উপকার হয় না, দিবসটি উৎযাপনে শুধু অর্থের অপচয় হয়। এই সকল দিবস পালনে ইসলামের সাথে সম্পর্ক না থাকলেও অপচয় করার জন্য হারামে পরিনত্ হয়।

ইংরেজী নববর্ষে শুধু আতশবাজীর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার আগুন-পটকা ফোটানোর মাধ্যমে খরচ করে থাকে। এই অপচয় এখন আর ধনী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পৃথিবীর বহু দেশ এখন এই অপচয়ের সাথে যু্ক্ত।  আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশর মানুষও নানা অপকর্মের আর অপচয়ের মাধ্যমে দিনটি উদ্‌যাপন করে।

৫। বিধর্মীদের অনুসকরণে দিবস উদ্‌যাপন করাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

*وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ وَدَعْ أَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا*

আপনি কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের উৎপীড়ন উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর উপর ভরসা করুন। আল্লাহ কার্যনিবার্হীরূপে যথেষ্ট। সুরা আহযাব ৩৩:৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ ٱلْيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْۗ قُلْ إِنَّ هُدَى ٱللَّهِ هُوَ ٱلْهُدَىٰۗ وَلَئِنِ ٱتَّبَعْتَ أَهْوَآءَهُم بَعْدَ ٱلَّذِى جَآءَكَ مِنَ ٱلْعِلْمِۙ مَا لَكَ مِنَ ٱللَّهِ مِن وَلِىٍّ وَلَا نَصِيرٍ

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহর হিদায়াতই হিদায়াত’ আর যদি তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর তোমার কাছে যে জ্ঞান এসেছে তার পর, তাহলে আল্লাহর বিপরীতে তোমার কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না। সুরা বাকারা : ১২০

ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

আমর ইবনু শু‘আইব রহ. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لاَ تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلاَ بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بِالأَصَابِعِ وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفِّ ‏

বিজাতির অনুকরণকারী ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী-নাসারাদের অনুকরণ করো না। কেননা ইয়াহূদীগণ আঙ্গুলের ইশারায় এবং নাসারাগণ হাতের ইশারায় সালাম দেয়। সুনানে তিরমিজ : ২৬৯৫

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ ﷺ আমার পরনে কমলা বা কুসম্ব রংয়ের দু’খানা কাপড় দেখতে পেলেন, তখন তিনি ﷺ বললেন, মূলতঃ এটা কাফিরদের পোশাক। কাজেই তা পরো না। অপর এক রিওয়ায়াতে আছে, আমি বললাম, আমি কি তাকে ধৌত করে ফেলব? তিনি বললেন, বরং এ দু’টিকে পুড়িয়ে ফেলো।  মিশকাত : ৪৩২৭,  সিলসিলাতুস সহিহাহ : ২৩৯৫

কুরআন ও সহিহ হাদিসসমূহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠলো যে কাফির মুশরিক, ইহুদী, নাছারা, বৌদ্ধ, হিন্দুসহ কোন অমুসলিমদের অনুসরণ করা জায়িয নেই। কিন্তু এমন অনেক দিবস আছে যে দিবসগুলি উদ্‌যাপন করে থাকি অমুসলিমদের অনুসরণের মাধ্যমে। যে দিবস কখনও মুসলিমদের দ্বার সৃষ্ট হয় নাই। যার প্রতিটি ছত্রই আবিস্কার করছে অমুসলিম জাতী। প্রতি বছর জানুয়ারীর প্রথম দিন ইংরেজী নববর্ষ হিসাবে পশ্চিমা জাতী খুব ঘটা করে উদ্‌যাপন করে থাকে। তাদের দেখা দেখি অনেক মুসলমানে সন্তানেরাও আজ ঘটা করে ইংরেজী নববর্ষ উদ্‌যাপন করা করে থাকে।

অনুরূপভাবে খৃষ্টানগণ প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর ঈসা আলাইহিস সালামের জম্ম দিন ধরে বড় দিন হিসবে উদ্‌যাপন করে। হিন্দুরা শ্রী শ্রী কৃষ্ণের জন্ম দিন হিসাব করে জম্মাষ্টি উদ্‌যাপন করে। এদের দেখা দেখি আজ বিদআতি মুসলিমগন নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জম্ম দিবস হিসাব করে “ঈদে মীলাদুন্নবী” উদ্‌যাপন করে।

৬। ইবাদত প্রমানের জন্য জাল জইফ হাদিসের আশ্রয় নেয়া যাবে না

দিবস পালনের জন্য জাল হাদিস দ্বারা মিথ্যা নেকির বর্ণনা করে থাকে। এর যুগে দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয় নাই। সাহবী রা. ও জানতেন না। তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িগণ ও আমল করেন  নাই। এমন দিবস সম্পর্ক কিছু জাল  ও বানোয়াট বর্ণনা করে দিবসটি পালনের বৈধতা প্রদান করার চেষ্টা করা হয়। লাইলা তুল মিরাজের কথা বলতে পারি। এই সম্পর্কে কোন হাদিসতো দুরের কতা সঠিক তারিখটিও জানা যায় নে কত তারিখে মিরাজ হয়েছিল। অথচ আমদের পূর্বসুরিদের আমল প্রমানিত হলে আর যা হোক তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকতো না। অথচ লাইলাতুল মিরাজ সম্পর্কে একটি জাল হাদিস দেখুন-

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

بُعِثْتُ نَبِيًّا فِيْ السَّابِعِ وَالْعِشْرِيْنَ مِنْ رَجَبٍ فَمَنْ صَامَ ذَلِكَ الْيَوْمَ كَانَ كَفَّارَةَ سِتِّيْنَ شَهْراً

রজব মাসের ২৭ তারিখে আমি নবুয়ত পেয়েছি। কাজেই যে ব্যক্তি এই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করবে তার ৬০ মাসের গোনাহের কাফফারা হবে।

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

 ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৬১,  ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), তাবয়ীনুল আজাব, পৃষ্ঠা-৬৪, ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), আল-ইলালুল মুতানাহিয়া, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৬, ইবনে কাসির (৭৭৪ হিঃ), আলবিদায়া ওয়ান-নিহায়া, সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা-৬৮০-৬৮১ ও একাদশ খন্ড, পৃষ্ঠা-৭৪, ইমাম আল-বায়হাকী (৪৫৮ হিঃ), শু‘আবুল ঈমান, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠ-৩৭৩, হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩২, এসব হাদিস, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৫-১২৬।

ঠিত তেমনি ভাবে ঈদে মিলাদুন্ননবী সম্পর্কে কোন অনেক জাল বর্ননা আছে যার  দ্বারা বিদআতিগণ  তার ফজিলত বর্ণনা করে দিবসটি পালনের চেষ্টা করে তাকে। কাজেই কোন দিবস পারনের জন্য সহিহ বর্ণনা না পেলে কোন অবস্থায়ই দিবসটি ইসলাম মনের করে উদ্‌যাপন করা যাবে না এবং এ লক্ষে কোন প্রকার জাল জইফ হাদিসের আশ্রয় নেয়া যাবে না।

৭। যে দিবস ইসলামের প্রথমিক যুগে উদ্‌যাপন করা হয় নাই

আবূ নাজীহ আল-ইরবাদ ইবনু সারিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনালেন যে, তাতে অন্তর ভীত হল এবং চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে গেল। সুতরাং আমরা বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! এ যেন বিদায়ী ভাষণ মনে হচ্ছে। তাই আপনি আমাদেরকে অন্তিম উপদেশ দিন।’ তিনি বললেন, ’’আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতি এবং (রাষ্ট্রনেতার) কথা শোনার ও তার আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি; যদিও তোমাদের উপর কোন নিগ্রো (আফ্রিকার কৃষ্ণকায় অধিবাসী) রাষ্ট্রনেতা হয়। (স্মরণ রাখ) তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদ্বীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবূত করে ধরে থাকবে। আর তোমরা দ্বীনে নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদ’আত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদ’আতই ভ্রষ্টতা। সুনানে আবূ দাউদ : ৪৬০৭, সুনানে দারেমী : ৯৫, রিযাদুস সালেহিন : ১৫৭

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেনঃ আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১, সহীহাহ : ১৩৪৮

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পর ১০ হিজরী থেকে ২২০ হিজরী সাল পর্যান্ত সাহাবি, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের যুগ ছিল। ২২০ হিজরি সময় কাল পর্যান্ত যে সকল তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগন তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা হাদিস মুখম্ত করেছেন, সংরক্ষণ করেছেন এবং উম্মতে ফিকহি সমাধান প্রদান করছেন তাদের মধ্য মাযহাবে ইমাম চার জনের ভূমিকা অত্যান্ত উজ্জ্বল। তারা হাদিস মুখন্ত, সংকল, সংরক্ষন, প্রচার এবং ফিকহি ব্যাখ্যা বিশ্লেষন অন্যতম ভুমিকা রাখেন। এই সময়টাকে ইসলামের প্রথমিক যুগ বলা। এই সময় দ্বীনের মাঝে কোন বিকৃতি ঘটে নাই বিধায় এই সময় কোন আমলকে সুন্নাহ সম্মত হিসাবে ধরা হয়। কাজেই কোন আমল এর পর আবিস্কৃত হলে তা বাতিল বিদআত।  রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর প্রায় চারশত বছর পরি মিলাদ নামক বিদআত চালু হলেয়ে। আমাদের পূর্ববর্তী সালাফদের মাছে এই মিলাদের কোন নমুনা খুজে পাওয়া যায় না।

বিভিন্ন দিবসের নাম

উপরে আলোচিত সাতটি শর্তে মেনে কোন দিবস উদ্‌যাপন করা হারাম হবে না, বরং জায়েয। জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস, জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস, নিরাপদ সড়ক দিবস,  বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস, মাদক বিরোধী দিবস ইত্যাদি। এই সকল দিবসে যদি অপচয় রোধ করে বা কোন প্রকার শরীয়ত বিরোধী কাজ না করে যদি জন সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষে কাজ করা হয় তবে শুধু জায়েয হবে না বরং বড় সওয়াবের কাজ হবে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতীকভাবে এত দিবস উদ্‌যাপন করা হয় যে হিসাব রাখা খুবই কঠিন। এই বিশাল তালিকা সম্পর্কে আলোচনা করাও সম্ভব নয়। এ সকল দিবস সম্পর্কে জ্ঞান রাখাও জরুরী নয়। তারপরও একটা সাধারণ ধারনা প্রদানের জন্য পাঠকদের নিকট এই দিবসগুলোর একটি তালিকা উল্লেখ করছি। যার ফলে পাঠকবৃন্দ এ সম্পর্কে কিছু ধারনা নিতে পারে। আমাদের আলোচনার বিষয় হলো বিভিন্ন দিবস তাই এই দিবসগুলির মাঝে যেগুলো আমাদের শরীয়ত বিরোধী কাজ করাতে উৎসাহ দেন তা থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটা আলোচন করব ইনশাল্লাহ।   

দিবসগুলোর তালিকা তিনটিভাগে উল্লেখ করছি, প্রথমভাগে বাংলাদেশের দিবসগুলো, দ্বিতীয় ভাগে বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক দিবসগুলো এবং শেষের দিকে আন্তর্জাতিক দিবস যা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত সেগুলো উল্লেখ করব। আমাদের দেশে অধিকাংশই দিবসগুলো প্রায় নিয়মিত পালিত হয়। কিন্তু কিছু কিছু দিবস, বিভিন্ন রাজনৈতিক কারনে পালিত হয়, আবার কখনও রাজনৈতিক কারনে পালিত হয় না। আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক দিবসগুলোর জন্য সরকারি ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার প্রেক্ষিতে তা পালিত হয়। দিবস পালনের ব্যাপ্তিও অর্থ প্রাপ্তীর উপর নির্ভর করে থাকে। অর্থ বেশী পেলে জাকযমক বেশী হয়, আবার অর্থ কম পেলে জাকযমক কম হয়।

বাংলাদেশের দিবস :

এই দিবসগুলো শ্রেফ বাংলাদেশেই পালিত হয়। অবশ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসি বাঙালিরাও এই দিবসগুলো সীমিতাকারে উদ্‌যাপন করে থাকেন।

তারিখদিবসের নামতারিখদিবসের নাম
১০ জানুয়ারিবঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ২৩ জুনপলাশী দিবস 
১৯ জানুয়ারিজাতীয় শিক্ষক দিবস ১ জুলাইঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস 
২০ জানুয়ারিশহীদ আসাদ দিবস ৩ জুলাইজন্ম নিবন্ধন দিবস :
২৪ জানুয়ারিগণঅভ্যুত্থান দিবস ১৫ আগষ্টশোক দিবস 
২৫ জানুয়ারিকম্পিউটারে বাংলা প্রচলন দিবস ২৭ আগস্টদিঘলিয়ার দেয়াড়া গণহত্যা দিবস 
৫ ফেব্রুয়ারিবাংলাদেশের জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস১৭ সেপ্টেম্বরমহান শিক্ষা দিবস :
১১ ফেব্রুয়ারিসড়ক হত্যা দিবস১৮ সেপ্টেম্বরকৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস 
১৪ ফেব্রুয়ারিসুন্দরবন দিবস ২৩ সেপ্টেম্বরপ্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবস
২১ ফেব্রুয়ারিশহীদ দিবস২৯ সেপ্টেম্বরমাহমুদপুর গণহত্যা দিবস 
২৮ ফেব্রুয়ারিজাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস৩০ সেপ্টেম্বরকন্যা শিশু দিবস
১ মার্চজাতীয় ভোটার দিবস  ২ অক্টোবরপথশিশু দিবস বা সুবিধাবঞ্চিত শিশু দিবস  
২ মার্চজাতীয় পতাকা দিবস ৫ অক্টোবরশিক্ষক দিবস 
৬ মার্চজাতীয় পাট দিবস২২ অক্টোবরনিরাপদ সড়ক দিবস 
৮ মার্চজাতীয় নারী দিবস১ নভেম্বরজাতীয় যুব দিবস
১৭ মার্চশিশু দিবসপ্রথম শনিবারজাতীয় সমবায় দিবস 
২৩ মার্চপতাকা উত্তোলন দিবস*৩ নভেম্বরজেলহত্যা দিবস
২৬ মার্চস্বাধীনতা দিবস  ৪ নভেম্বরসংবিধান দিবস
৩১ মার্চজাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস৭ নভেম্বরজাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস*
২ এপ্রিলজাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস ১০ নভেম্বরনূর হোসেন দিবস বা স্বৈরাচার বিরোধী দিবস 
১৪ এপ্রিলপহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ ২১ নভেম্বরসশস্ত্রবাহিনী দিবস 
১৭ এপ্রিলমুজিবনগর দিবস৩০ নভেম্ববরজাতীয় আয়কর দিবস
২৮ এপ্রিলজাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা দিবস
১ মেমহান মে দিবস : ৬ ডিসেম্বরস্বৈরাচার পতন দিবস
১৬ মেফারাক্কা লংমার্চ দিবস বা ফারাক্কা দিবস ৮ ডিসেম্বরজাতীয় যুব দিবস 
২৩ মেজাতীয় নৌ নিরাপত্তা দিবস৯ ডিসেম্বররোকেয়া দিবস
২৫ মেকবি কাজী নজরুল ইসলামের  জন্মবার্ষিকী  ১২ ডিসেম্বরডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস
২৮ মেনিরাপদ মাতৃত্ব দিবস  ১৪ ডিসেম্বরশহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
৭ জুনছয় দফা দিবস১৬ ডিসেম্বরবিজয় দিবস
১৩ জুননারী উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধ দিবস বা ইভ টীজিং প্রতিরোধ দিবস ১৯ ডিসেম্বরবাংলা ব্লগ দিবস

বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক দিবসঃ

বিশ্বের প্রায় সকল দেশে একই দিনে একই সাথে এই দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয়। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এই দিবসগুলি পালনের রীতি চালু আছে।  বিশ্ব দিবসাকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

তারিখদিবসের নামতারিখদিবসের নাম
জানুয়ারির শেষ রবিবারবিশ্ব কুষ্ঠ দিবস৩১ মেবিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস
২ জানুয়ারিবিশ্ব জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দিবসতৃতীয় রবিবার।বিশ্ব বাবা দিবস
২৬ জানুয়ারিআন্তর্জাতিক কাস্টম্‌স দিবস৫ জুনবিশ্ব পরিবেশ দিবস
২ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব জলাভূমি দিবস৮ জুনবিশ্ব ব্রেইন টিউমার দিবস
১২ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব ডারউইন দিবস,১২ জুনবিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস
১৪ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব ভালোবাসা দিবস১৪ জুনবিশ্ব রক্তদাতা দিবস
১৫ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস১৭ জুনবিশ্ব মরুময়তা দিবস 
২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস২১ জুনবিশ্ব সঙ্গীত দিবস
২২ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব স্কাউট দিবস২ জুলাইবিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিকতা দিবস
২৪ ফেব্রুয়ারি: আল কুদ্‌স দিবস২৯ জুলাইবিশ্ব বাঘ দিবস
দ্বিতীয় সোমবারকমনওয়েলথ দিবসপ্রথম রবিবারবিশ্ব বন্ধু দিবস
৩ মার্চবিশ্ব বই দিবস১ আগস্টবিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস
৮ মার্চবিশ্ব নারী দিবস৬ আগস্টহিরোশিমা দিবস
১০ মার্চবিশ্ব কিডনি দিবস৯ আগস্টনাগাসাকি দিবস
১৪ মার্চআন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস ৮ই সেপ্টেম্বরবিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস
১৪ মার্চবিশ্ব পাই দিবস১৮ সেপ্টেম্বরবিশ্ব নৌ দিবস
১৫ মার্চপঙ্গু দিবস২২ সেপ্টেম্বরবিশ্ব কারামুক্ত দিবস
 ১৫ মার্চবিশ্ব ক্রেতা অধিকার দিবস২৪ সেপ্টেম্বরমীনা দিবস
২০ মার্চবিশ্ব শিশুনাট্য দিবস২৬ সেপ্টেম্বরবিশ্ব হার্ট দিবস
২১ মার্চবিশ্ব বন দিবস২৭ সেপ্টেম্বরবিশ্ব পর্যটন দিবস
২১ মার্চবিশ্ব বর্ণবৈষম্য দিবস২৮ সেপ্টেম্বরবিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস
২২ মার্চবিশ্ব পানি দিবস৩০ সেপ্টেম্বরবিশ্ব কন্যা শিশু দিবস
২৩ মার্চবিশ্ব আবহাওয়া দিবস১ অক্টোবরআন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস
২৪ মার্চবিশ্ব যক্ষ্মা দিবস১ অক্টোবরবিশ্ব নিরামিষ দিবস
২৬ মার্চআর্থ আওয়ার৪ অক্টোবরবিশ্ব প্রাণী দিবস
২৭ মার্চবিশ্ব নাট্য দিবস৫ অক্টোবরবিশ্ব শিক্ষক দিবস
২ এপ্রিলবিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস৯ অক্টোবরবিশ্ব ডাক দিবস
২ এপ্রিলবিশ্ব শিশু বই দিবস১০ অক্টোবরবিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস
৪ এপ্রিলবিশ্ব মাইন বিরোধী দিবস১৪ অক্টোবরবিশ্ব মান দিবস
৭ এপ্রিলবিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস১৪ অক্টোবরবিশ্ব দৃষ্টি দিবস
১৬ এপ্রিলবিশ্ব কণ্ঠ দিবস১৫ অক্টোবরবিশ্ব সাদাছড়ি দিবস
১৭ এপ্রিলবিশ্ব হিমোফেলিয়া দিবস১৬ অক্টোবরবিশ্ব খাদ্য দিবস
২২ এপ্রিলবিশ্ব ধরিত্রী দিবস২৪ অক্টোবরবিশ্ব তথ্য উন্নতকরণ দিবস
২৩ এপ্রিলবিশ্ব পুস্তক দিবস৩১ অক্টোবরবিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস
২৪ এপ্রিলবিশ্ব ভেটেরিনারি দিবসঅক্টোবরের প্রথম সপ্তাহআন্তর্জাতিক পোস্টকার্ড সপ্তাহ
২৫ এপ্রিলবিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবসঅক্টোবরের প্রথম সোমবারবিশ্ব স্থাপত্য দিবস
২৬ এপ্রিলবিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসঅক্টোবরের প্রথম শুক্রবারবিশ্ব হাসি দিবস
২৬ এপ্রিলআন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস১৪ নভেম্বরবিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস
২৭ এপ্রিলবিশ্ব নকশা দিবস১২ নভেম্বরবিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস
২৮ এপ্রিলবিশ্ব পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস২০ নভেম্বরআফ্রিকার শিল্পায়ন দিবস
৩ মেবিশ্ব সাংবাদিকতা দিবস২৯ নভেম্বরফিলিস্তিন সংহতি দিবস
৮ মেবিশ্ব রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট দিবস১ ডিসেম্বরবিশ্ব এইড্‌স দিবস
১৭ মেবিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস১১ ডিসেম্বরবিশ্ব পর্বত দিবস
১৮ মে:আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস২৫ ডিসেম্বরবড় দিন বা যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন

আন্তর্জাতিক দিবস যা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতঃ

 সাধারণত জাতিসংঘ কর্তৃক চালু করা ও উদযাপিত দিবসগুলোই “আন্তর্জাতিক দিবস” হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ, জাতিসংঘের অন্যতম সদস্য হিসেবে এই দিবসগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্‌যাপন করে থাকে।

তারিখদিবসের নামতারিখদিবসের নাম
২৫ জানুয়ারিআন্তর্জাতিক শুল্ক দিবস:১ অক্টোবরবিশ্ব শিশু দিবস
৪ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব ক্যান্সার দিবস:১ অক্টোবরআন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস
২১ ফেব্রুয়ারিআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস৫ অক্টোবরবিশ্ব শিক্ষক দিবস
২২ মার্চবিশ্ব পানি দিবসঅক্টোবর প্রথম সোমবারবিশ্ব আবাসন দিবস বা বিশ্ব বসতি দিবস
২৯ এপ্রিলআন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসঅক্টোবর দ্বিতীয় বুধবারআন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসকরণ দিবস
১ মেমে দিবস১৫ অক্টোবরআন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস
১৫ মেআন্তর্জাতিক পরিবার দিবস১৭ অক্টোবরআন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস
২৯ মেশান্তিরক্ষী দিবস২৪ অক্টোবরজাতিসংঘ দিবস
২০ জুনবিশ্ব শরণার্থী দিবস৩ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
২৬ জুনআন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস :৫ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস
জুন প্রথম শনিবারআন্তর্জাতিক সমবায় দিবস৭ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল দিবস
১১ জুলাইবিশ্ব জনসংখ্যা দিবস :৯ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক দূর্নীতিবিরোধী দিবস
৯ আগস্টআন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস :১০ ডিসেম্বরমানবাধিকার দিবস
৮ সেপ্টেম্বরবিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবস ১৮ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস
১৬ সেপ্টেম্বরআন্তর্জাতিক ওজনস্তর রক্ষা দিবস ২৯ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস
২১ সেপ্টেম্বরবিশ্ব শান্তি দিবস  

উৎসঃ এই লেখাটির https://bn.wikipedia.org/wiki/ থেকে নেয়া।

বিভিন্ন দিবসের হুকুমঃ

দিবস উদ্‌যাপন সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারনা পেয়েছি। দিবস উদ্‌যাপন করা কখনও ইবাদত আবার কখনও হারাম। ইসলামি শরীয়তে আমাদের সকল কাজই ইবাতদের মধ্য গন্য। আর কাজটি তখনই ইবাদতের মধ্য গন্য হবে যখন কাজেটি আল্লাহ হুকুম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দেখানো পথে সম্পাদন করব। যদি আল্লাহর আদেশ অমান্য করে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দেখান পথে করি তার হলে আর ইবাদত হবে না। অনুরূপভাবে আল্লাহ হুকুম আছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দেখান পন্থায় আমল করলাম না তবেও ইবাদত হবেনা।  উদরাহরণ সরূপ বলা যায। গরু বা ভেড়ার মাংশ খাওয়া জায়েয অর্থাত আল্লাহ হুকুম আছে। কিন্তু যদি আল্লাহ নাম না নিয়ে সুন্নাহ বহির্ভূতভাবে জবেহ করি তবে ঐ মাংশ খাওয়া জায়েয নয়। আবার শুকরের মাংশ খাওয়া হারাম অর্থাত আল্লাহর হুকুম নাই। যদি কেউ সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতিতে জবেহ করি তবে তাও খাওয়া জায়েয নয়। ইসলামি শরীয়তে ইবাদত হতে হলে আমাদের এই দুটি শর্ত মেনে আমল করতে হবে। দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রেও আমাদের দেখতে হবে আল্লাহ হুকুম আছে কিনা? রাসূলুল্লাহ ﷺ এর তরিকা আছে কিনা? এর বাহিকে যে কোন দিবস উদ্‌যাপন করা কখনও হারাম, কখনও বিদআত আবার কখনও জায়েয। কাজেই আমরা দিবস আলোচনার ক্ষেত্র চারটি ভাবে বিভক্ত করে আলোচনা করব।

১। যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত

২। যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা বিদআত

৩। যে সকর দিবস উদ্‌যাপন করা হারাম।

৩। যে সকর দিবস উদ্‌যাপন করা জায়েয।

যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত-০১ ::  লাইলতুল কদর

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহান আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মান্য করাই ইবাদত। তিনি আমাদের ইবাদতের জন্য কিছু সময় ও কিছু তিন খাস করে দিয়েছেন। ঐ সময় বা দিনে তার ইবাদতে অধিক নেকী হাসিল কা যায়। তিনি লাইলাতুল কদর দিয়েছেন, তিনি রামাজান মাস দিয়েছেন, তিনি আরাফার দিন দিয়েছেন, দুটি ঈদের দিন  দিয়েছেন যাতে করে বান্দা তার সন্ত্বষ্টি অর্জন করতে পারে। আল্লাহ প্রদত্ত সময় ও দিনের বাহিরে নিজে সময় বা দিন নির্ধারণ করে নেওয়া গুনাহের কাজ। তিনি আমাদের দিন দিয়েছেন আর দিনের ইবাদতের পদ্ধতিও বলেদিয়েছেন। রামাজানের দিনে পারাহার করতে নিষেধ করেছেন। ইফতারিতে খাওয়াতে পুরস্কার ঘোষনা করেছেন। ঈদের দিনে সিয়াম পালন হারাম করেছেন। অর্থাত আল্লাহ প্রদত্ত সময় বা দিনে তার প্রদত্ত বিধান মোতাবেক আমল করাই আবশ্যক। কিন্তু ইহার বাহিরে মনগড়া দিবস পালন করা বিদআত বা হারাম হবে পারে। এ পর্যায়ে এ পরিচ্ছেদে ঐ সকল দিবস নিয়ে আলোচনা করব যা আল্লাহ প্রদত্ত এবং তার কথামত উদযাপন করতে পারলে তাকে সন্ত্বষ্ট করতে পারব। মনে রাখতে হবে শুধু আল্লাহ প্রদত্ত দিবস হলেই হবে না, ঐ দিবসে তার প্রদত্ত সীমাও অতিক্রম করা যাবেনা। ঈদের দিন আল্লাহ প্রদত্ত সীমার মধ্য থেকে ঈদ পালন করলে তিনি খুসি হবে এবং পরিনামে তার বান্দাকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু যদি ঈদের দিন তার প্রদত্ত সীমা অতিক্রম করে নাজ, গাল, অশ্লীল কাজ, মদ, জুয়া, নারী ইত্যাদির উপভোদের মাধ্যমে উদযাপন করে তবে কি তিনি খুসি হবেন? নিশ্চয় তিনি খুসি হবে না। কাজেই আল্লাহ প্রদত্ত বিধান তার প্রদত্ত সীমার মাঝে তার নির্দেশিত পন্থায় পালন করাই ইবাদত হবে।

লাইলতুল কদর

১। দিবসটির নামকরণ-

লাইলাতুল কদর-এর নামকরণ নিয়ে উলামাগণের মাঝে দুটি মত প্রদিদ্ধ। আরবি শব্দ একটি হল (لیل) ‘লাইলাতুন’ অর্থ যার অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী আর অপরটি হল (القدر‎‎) ‘কদর’ যার অর্থ হল সম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান। এ হিসাবে লাইলাতুল কদর এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। এ রাতের বিরাট মাহাত্ম্য ও অপরিসীম মর্যাদার কারণে এ রাতকে ‘লায়লাতুল কদর’ তথা মহিমান্বিত রাত বলা হয়। গবেষক আবু বকর ওররাক (রহঃ) বলেন, এ রাতকে ‘লায়লাতুল কদর’ বলার কারণ হচ্ছে, এ রাতের পূর্বে আমল না করার কারণে যাদের কোনো সম্মান মর্যাদা, মূল্যায়ন ছিল না তারাও তাওবা-ইস্তেগফার ও ইবাদতের মাধ্যমে এ রাতে সম্মানিত ও মহিমান্বিত হয়ে যান। (তাফসির মারিফুল কোরআন)

আরবি ভাষায় এ ছাড়া কদর অন্য আর একটি অর্থ হলোঃ ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা। ভাগ্য অর্থে লাইলাতুল কদর এর অর্থ হবে ভাগ্য রজনী। সংক্ষেপে বলতে গেলে লাইলাতুল কদর এর অর্থ হলোঃ ভাগ্য রজনী। এই অর্থে এ রাতে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত বিধিলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাগণের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের বয়স, মৃত্যু, রিজিক, বৃষ্টি ইত্যাদির ফরমান নির্দিষ্ট ফেরেশতাগণকে লিখে দেওয়া হয়। এমনকি এ বছর কে হজ্জ করবে তাও লিখে দেওয়া হয়। হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বক্তব্য মতে, চার ফেরেশতাকে এসব কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তারা হলেন— ইসরাফিল, মিকাইল, আজরাইল ও জিবরাইল (আঃ)। (তাফসিরে কুরতুরি)

একটি ভুল সংশোধনঃ অনেক মুসলিককে বলতে শুনা যায়, সাবান মাসের পনের তারিখ হল ভাগ্য রজনী। তাদের কথার কোন দলীল নেই। কিন্ত লাইলাতুল কদর বা মহিমান্বিত রাতটি যে ভাগ্য রজনী এ সম্পর্ক কুরআনের ষ্পষ্ট দলীল বিদ্যামান। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-

 إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةٍ۬ مُّبَـٰرَكَةٍ‌ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ (٣) فِيہَا يُفۡرَقُ كُلُّ أَمۡرٍ حَكِيمٍ (٤)

নিশ্চয় আমি এটি নাযিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। সুরা দুখান : ৩-৪

এই আয়াতের আলোকে দেখা যায়, কুরআন যে বরকত ও কল্যাণময় রাতে নাযিল হয়েছে এবং সেই রাত্রেই ভাগ্য নির্ধারণ হয়। এক কথায় বলা যায়, যে রাতে কুরআন নাজিল হয়েছিল, সে রাতেই ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। আর কুরআন নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। সুরা বাকারা : ১৮৫

উপরের আয়াতের ঘোষনা হলো- রমজান মাসেই কুরআন নাজিল হয়। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত লাইলাতুল কদর বা ভাগ্য রজনী রমজানের শেষ দশকেই তাকে। ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, মুজাহিদ, কাতাদা, হাসান বাসারী, সাঈদ ইবনে জুবাইর, ইবনে যায়েদ, আবু সালেক, দাহ্‌হাক এবং আরো অনেক মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত যে, এটা রমযানের সেই রাত যাকে “লাইলাতুল কদর” বলা হয়েছে। কারণ, কুরআন মজীদ নিজেই সুস্পষ্ট করে তা বলছে। ইবনের কাসীর বলেনঃ এক শা’বান থেকে অন্য শা’বান পর্যন্ত ভাগ্যের ফায়সালা হওয়া সম্পর্কে উসমান ইবনে মুহাম্মাদ বর্ণিত যে হাদীস ইমাম যুহরী উদ্ধৃত করেছেন তা একটি ‘মুরসাল’’ হাদীস। কুরআনের সুস্পষ্ট উক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের হাদীস পেশ করা যায় না। কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী বলেন, শা’বানের পনের তারিখের রাত সম্পর্কে কোন হাদীসই নির্ভরযোগ্য নয়, না তার ফযীলত সম্পর্কে, না ঐ রাতে ভাগ্যের ফয়সালা হওয়া সম্পর্কে। তাই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা উচিত। (আহকামুল কুরআন, তাফহীমূল কুরআন)

তাই বলা যায় এই মহিমান্বিত রাত্রিতে মুসলিমদের সম্মান বৃদ্ধি করা হয় এবং মানবজাতির ভাগ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তাই মুসলমানদের কাছে এই রাত অত্যন্ত পুণ্যময় ও মহাসম্মানিত হিসেবে পরিগণিত। কুরানের ঘোষণা অনুসারে, আল্লাহ এই রাত্রিকে অনন্য সকল রাত্রির উপর মর্যাদা দিয়েছেন। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল হওয়ার কারণে অন্যসব মাস ও দিনের চেয়ে রমজান মাসের ফজিলত বেশী। আর রমজানের রাতগুলোর মধ্যে কোরআন নাজিলের রাত, লাইলাতুল কদর সবচেয়ে তাত্পর্যমণ্ডিত একটি রাত। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন,

إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ (١) وَمَآ أَدۡرَٮٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ (٢) لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أَلۡفِ شَہۡرٍ۬ (٣)

অর্থঃ আমি একে নাজিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জান কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সূরা কদর : ১-৩

এই একটি মাত্র রজনীর উপাসনা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর মাহে রমজানে এই মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর মুসলিমদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে বলে তারা বিশ্বাস করে। এই রজনী অনুসন্ধানের জন্য তারা রমজানের শেষ দশকে মসজিদে মসজিদে ইতিকাফ করে।

২। লাইলাতুল কদর এর সময় নির্ধারণ

লাইলাতুল কদর এর নির্দিষ্ট কোন রাত কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত নয়। নির্দিষ্ট না করার মাধ্যমে কল্যান নিহীত আছে বলে মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট করেন নি। আবার রাতটি জন্য সারা বছর বা পুর রমজান মাসও নির্দিষ্ট করেন নি। হাদিসসমূহের ভাষ্য মতে বুঝা যায়, রমজানের শেষ দশকেই লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট আছে। মাত্র এই দশটি দিন অনুসন্ধান করলেই নিশ্চিতভাবে এই ফজিলতপূর্ন কল্যায়কর রজণী পাওয়া যাবে। এই রমজানের শেষ দশকে মাঝে আবার কোন কোন দিনকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। নিম্ম এমনই কিছু হাদিস তুলে ধরলাম।

ক। লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ সাত দিনেঃ

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী ﷺ এর কতিপয় সাহাবীকে স্বপ্নযোগে রমযানের শেষের সাত রাতে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيَهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ ‏

আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব যে ব্যাক্তি এর সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে। সহিহ বুখারী : ২০১৫, মুয়াত্তা মালিক : ১১৪৪, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৩৬৭৫, সহিহ আল জামি : ৮৬৭)।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী ﷺ এর কতিপয় সাহাবীকে স্বপ্নে দেখান হল যে, শেষ সাত দিনের মধ্যে কদরের রাত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমি মনে করি যে, শেষের সাতদিন সম্পর্কে তোমাদের সকলের স্বপ্ন পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব যে ব্যাক্তি তা অন্বেষণ করবে, সে যেন রমযানের শেষ সাতদিনের রাতগুলোতে তা অন্বেষণ করে। সহিহ মুসলিম : ১১৬৫

খ। লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশকে

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُجَاوِرُ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ، وَيَقُولُ ‏ “‏ تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‏

রাসূলুল্লাহ ﷺ রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ কর। সহিহ বুখারী : ২০২০

উকবাহ ইবনু হুরায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমর (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা (রমাযানের) শেষ দশ দিনে কদরের রাত অনুসন্ধান কর। তোমাদের কেউ যদি দুর্বল অথবা অপারগ হয়ে পড়ে, তবে সে যেন শেষের সাত রাতে অলসতা না করে। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৫

গ। । লাইলাতুল কদর রমজানের ২১ তারিখেঃ

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ রমযান মাসের প্রথম দশকে ইতিকাফ করলেন। এরপর তিনি মাঝের দশকেও একটি তাঁবুর মধ্যে ইতিকাফ করলেন এবং তাবুর দরজায় একটি চাটাই ঝূলান ছিল। রাবী বলেন, তিনি নিজ হাতে চাটাই ধরে তা তাঁবুর কোণে রাখলেন এরপর নিজের মাথা বাইরে এনে লোকদের সাথে কথা বললেন এবং তারাও তাঁর নিকট এগিয়ে এল। তিনি বললেন, এই রাতের অনুসন্ধানকল্পে আমি (রমযানের) প্রথম দশকে ইতিকাফ করলাম। অতঃপর মাঝের দশকে ইতিকাফ করলাম। এরপর আমার নিকট একজন আগন্তুক (ফিরিশতা) এসে আমাকে বলল, লায়লাতুল কদর শেষ দশকে নিহিত আছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন ইতিকাফ করে।

লোকেরা তাঁর সঙ্গে (শেষ দশকে) ইতিকাফ করল। রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বললেন, স্বপ্নে আমাকে তা কোন এক বেজোড় রাতে দেখনো হয়েছে এবং আমি যেন সেই রাতে কাদা ও পানির মধ্যে ফজরের সিজদা করছি। (রাবী বলেন) তিনি ২১তম রাতের ভোরে উপনীত হয়ে ফজরের সালাতে দাঁড়ালেন এবং আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হল। ফলে ছাদ থেকে মসজিদে পানি বর্ষিত হল এবং আমি কাদা ও পানি দেখতে পেলাম। তিনি ফজরের সালাত শেষে যখন বের হয়ে এলেন তখন তাঁর কপাল ও নাকের ডগা সিক্ত ও কর্দমাক্ত ছিল। আর তা ছিল রমযানের শেষ দশকের প্রথম (বা ২১তম) রাত। সহিহ বুখারি  : ২০১৮, সহিহ মুসলিম : ২৬৪২ ইফা

ঘ। লাইলাতুল কদর রমজানের ২৩ তারিখেঃ

আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমাকে কদরের রাত দেখান হয়েছিল। অতঃপর তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে ঐ রাতের ভোর সম্পর্কে স্বপ্নে আরও দেখান হয়েছে যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি। রাবী বলেন, অতএব ২৩তম রাতে বৃষ্টি হল এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সাথে (ফজরের) সালাত আদায় করে যখন ফিরলেন, তখন আমরা তাঁর কপাল ও নাকের ডগায় কাদা ও পানির চিহ্ন দেখতে পেলাম। রাবী বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স (রাঃ) বলতেন, তা ছিল ২৩তম। সহিহ মুসলিম : ২৬৪৬ ইফাঃ

ঙ। লাইলাতুল কদর রমজানের ২৭ তারিখেঃ

যির ইবনু হুবায়শ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) কে বললাম, আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, যে ব্যক্তি গোটা বছর রাত জাগরণ করে- সে কদরের রাতের সন্ধান পাবে। তিনি (উবাই) বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন, এর দ্বারা তিনি এ কথা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, লোকেরা যেন কেবল একটি রাতের উপর ভরসা করে বসে না থাকে। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, তা রমযান মাসে শেষের দশ দিনের মধ্যে এবং ২৭তম রজনী। অতঃপর তিনি দৃঢ় শপথ করে বললেন, তা ২৭তম রজনী। আমি (যির) বললাম, হে আবূল মুনযির! আপনি কিসের ভিত্তিতে তা বলছেন? তিনি বললেন, বিভিন্ন আলামাত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে- যে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উদয় হবে কিন্তু তাতে আলোকরশ্মি থাকবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৬৭

চ। লাইলাতুল কদর রমজানের বিজোড় তারিখেঃ

সালিম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন, এক ব্যক্তি (রমাযানের) ২৭ তম রাতে লায়লাতুল কদর দেখতে পেল। নবী ﷺ বললেন-

‏ أَرَى رُؤْيَاكُمْ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ فَاطْلُبُوهَا فِي الْوِتْرِ مِنْهَا

আমাকেও তোমাদের মতো স্বপ্ন দেখানো হয়েছে যে, তা রমাযানের শেষ দশকে নিহিত আছে। অতএব এর বেজোড় রাতগুলোতে তা অনুসন্ধান কর। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৩

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী ﷺ বলেছেনঃ তোমরা তা (লাইলাতুল কদর) রমযানের শেষ দশকে তালাশ কর। লাইলাতুল কদর (শেষ দিক হতে গনণায়) নবম, সপ্তম বা পঞ্চম রাত অবশিষ্ট থাকে। (সহিহ বুখারী হাদিস : ২০২১

উপরের হাদিসগুলোর আলোক বুঝা যায় লাইলাতুল কদর নির্ধারিত নয়। তবে এ কথা ষ্পষ্ট জোর দিয়ে বলা যায় যে, রমজানের শেষ দশকেই লাইলাতুল কদর নির্ধারিত। একদল মুজতাহীদ আলেম জোর দিয়ে বলেছেন, নিশ্চয়ই লাইলাতুল কদর রমাজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে হতে পারে। তরে নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে প্রতি বছর একই তারিখেই হবে। কোন বছর তা ২১তম রাতে হতে পারে, আবার কখনো ২৫শে কখনো ২৭শে এবং কখনো ২৯শে রাতে হতে পারে।

৩। লাইলাতুল কদর গোপন করার হিকমাতঃ

উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নাবী ﷺ আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের (নির্দিষ্ট তারিখের) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলমান ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিবার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবতঃ এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যান নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর। সহিহ বুখারী ২০২৩

লাইলাতুল কদরের রাতকে গোপন করার হিকমাত প্রসঙ্গে ‘উলামাগণ বলেন, এটি গোপন রাখা হয়েছে এ কারণে যে, যাতে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধানের জন্য সকলে প্রচেষ্টা করা যায়। এর বিপরীতে যদি তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হত তাহলে মানুষ শুধু ওই নির্ধারিত রাতটির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। (আল্লাহ ভালো জানেন)

৪। লাইলাতুল কদর ফজিলতঃ

সূরা কদরের শানে নুজুল সম্পর্কে ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আলী ইবনে উরওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বনি ইসরাইলের চারজন আবেদ সম্পর্কে বলছিলেন, তারা আশি বছর ধরে অনবরত আল্লাহর ইবাদত করছিল। এর মধ্যে মুহূর্ত সময়ের জন্যও ইবাদত থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হননি। বিখ্যাত এ চারজন আবেদ হলো আল্লাহর নবী জাকারিয়া আলাইহিস সালাম, আইউব আলাইহিস সালাম, হাজকিল ইবনে আজূজ আলাইহিস সালাম, এবং ইউশা ইবনে নূহ আলাইহিস সালাম। এমনটি শুনে সাহাবিরা (রা.) রীতিমতো অবাক হলেন। এ সময় জিবরাইল আলাইহিস সালাম, এসে বললেন, ‘হে মোহাম্মদ (সাঃ)! আপনার উম্মতরা এ কথা শুনে অবাক হচ্ছে? তাদের জন্য আল্লাহতায়ালা এর চেয়ে উত্তম কিছু রেখেছেন। এরপর সূরা কদর পাঠ করা হয়। তাফসিরে ইবনে কাসরি, খন্ড-১৮, পৃ-২২৩।

সুরা ক্বদরে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ

إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ (١) وَمَآ أَدۡرَٮٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ (٢) لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أَلۡفِ شَہۡرٍ۬ (٣) تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيہَا بِإِذۡنِ رَبِّہِم مِّن كُلِّ أَمۡرٍ۬ (٤) سَلَـٰمٌ هِىَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ (٥)

আমি একে নাযিল করেছি শবে-কদরে। শবে-কদর সমন্ধে আপনি কি জানেন? শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের উদ্‌যাপনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সুরা ক্বদর : ১-৫

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ تَابَعَهُ

যে ব্যক্তি রমাযানে ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় সওম উদ্‌যাপন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। সহিহ বুখারি : ২০১৪

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলেছেন যে, তোমাদের নিকট রমযান উপস্থিত হয়েছে, যা একটি বরকতময় মাস। তোমাদের উপরে আল্লাহ তা’আলা অত্র মাসের সওম ফরয করেছেন। এ মাসের আগমনে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়, আর আল্লাহর অবাধ্য শয়তানদের গলায় লোহার বেড়ী পরানো হয়। এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল সে প্রকৃত বঞ্চিত রয়ে গেল। সুনানে নাসায়ী : ২১০৬

আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রমজান মাস শুরু হলে রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমাদের নিকট এ মাস সমুপস্থিত। এতে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হলো সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। কেবল বঞ্চিত ব্যক্তিরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৪৪, মিশকাত -১৯৬৪, সহিহ আত তারগীব : ১৪২৯, সহিহ আল জামি : ৩৮৮২

৫। লাইলাতুল কদরের আমলঃ

লাইলাতুল কদর এই উম্মতের জন্য বড় নেয়ামত। মহান আল্লাহর অশেষ নেয়ামত মধ্যে এটি একটি বড় নেয়ামত। এই নেয়ামতের হক হল, আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেগ তার ইবাদাত তার সন্ত্বষ্টি অর্জন করা। আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই এই রাতের সন্দানে রমজানের শেষ দশকে ইবাদতের জন্য কোমর বেধে আমল করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাযানে শেষ দশকে যত বেশি পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ‏.

যখন রমযানের শেষ দশক আসত তখন নবী ﷺ তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশী বেশী ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত্রে জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।

সহিহ বুখারি : ২০২৪, সহিহ মুসলিম : ১১৭৪, সহিহ আল জামি : ৪৭১৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩৭৬, সুনানে নাসায়ী : ১৬৩৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৬৮

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখান পথ ধরে আমরাও রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের নিমিত্তে প্রতি রাতে নিম্মের ইবাদতগুলোর মাধ্যমে রাত কাটাতে পারি, যাতে লাইলাতুল কদর কোনভাবেই মিস না হয়। ইবাতদগুলি হল-

ক। শেষ দশকে ইতিকাফ করা

নবী ﷺ সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ

নাবী ﷺ রমযানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন। তার ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তার সহধর্মিণীগণও তিকাফ করতেন। সহিহ বুখারি ২০২৬, সহিহ মুসলিম ১১৭২, সুনানে তিরমিয়ী : ৭৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ২৪৬২,

লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে রাসুলুল্লাহ ﷺ মসজিদে ইতকাফ করছেন। কাজেই সময় ও সুযোগ হলে আমাদের প্রথম কাজই হবে রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে মসজিদে ইতিকাফ করা।

খ। তারাবিহ সালাত আদায় করাঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ  ﷺ কে রমযান সম্পর্কে বলতে শুনেছি-

مَنْ قَامَهُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏

যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় কিয়ামে রমযান অর্থাৎ তারাবীহর সালাত আদায় করবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহিহ বুখারি :

কাজেই লাইলাতুল কদর এর প্রধান আমল হল তারাবিহ সালাত আদায় করা। কোন অবস্থায় এই সালাত যেন বাদ না পড়ে। ইফতারি করার পর পর সামান্য বিশ্রাম নিয়েই এই সালাত আদায়ের উদ্দেশ্য মসজিদে গমন করতে হবে।

গ। তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করাঃ

তারাবীহ সালাতের রাকাতের সংখ্যা নিয়ে যেমন মতভেদ আছে ঠিক তেমনি তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ সালাত নিয়েও মহভেদ আছে। কেউ বলে দুটি সালাত একই আবার কেউ বরে দুটি সালাত ভিন্ন। মহান আল্লাহ নফলের (তাহাজ্জুদ) কোন সীমা নির্ধারণ করে নাই। ঠিক তেমনি তারাবীহ এর সীমা নির্ধারণ করে দিলে বা ফরজ করে দিলে উম্মত আদায় করতে পারত না। রাসুলুল্লাহ ﷺ আশঙ্কা করে ছিল যে, উম্মতের মাঝে এই সালাতের সীমা নির্ধারণ দিলে কষ্ট হবে। কাজেই উম্মার ঐক্যের স্বার্থ যে সমাজে বিশ রাকাত চালু আছে সেখানে বিশ পড়ে, আর সে সমাজে আট রাকাত চালু আছে সেখানে আট পড়ে একটু বিশ্রম নিয়ে তাহাজ্জুদ সালাত দাড়াই যেন আমার কদর রাত আমল বিহীন অতিবাহিত না হয়। 

ঘ। নফল সালাত আদায় করাঃ

সময় সুযোগ হলে মাগরিবের পর কিছু নফল সালাত আদয় করা যায়। কারন সূর্য অন্ত যাওয়ার সাথে সাথেই কদরের রাত্রি শুরু হয়। এই রাতের প্রতিটি মুহুর্তই খুব দামি। কাজেই এই রাতে হয় বিশ্রাসের জন্য ঘুমে থাকবে, না হয় ইবাদতের মাধ্যে থাকবে।

ঙ। কুরআন বুঝে তিলওয়াত করাঃ

আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَتۡلُونَ كِتَـٰبَ ٱللَّهِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ سِرًّ۬ا وَعَلَانِيَةً۬ يَرۡجُونَ تِجَـٰرَةً۬ لَّن تَبُورَ (٢٩) لِيُوَفِّيَهُمۡ أُجُورَهُمۡ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۚۦۤ إِنَّهُ ۥ غَفُورٌ۬ شَڪُورٌ۬ (٣٠)

অর্থঃ যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। সুরা ফাতির : ২৯-৩০

লাইলাতুল কদরের রাতে প্রতিটি মুহুর্তে ইবাদাতের মাধ্যমে অতিবাহিত করাই হল আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। যতগুলো নফল ইবাদাত আছে তার মধ্য কুরআন তিলওয়াত হল সর্বত্তোম। মহান আল্লাহ নিজে কুরআনে বলছেন, আল্লাহর কিতাব পাঠকারী কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং নিজ অনুগ্রহে তিনি কুরআন পাঠকারীকে অধিক দান করবেন। কাজেই এই রাত্রে যেন কুরআন হাত ছাড়া না হয়।

চ। তাজবিহ তাহলীল পড়া

একাধারে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা কার পক্ষ সম্বব নয়। তাই প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নিতে হয়। এই বিশ্রামের মুহূর্তে অন্তর ও ঠোট মহান আল্লাহর স্মরনে কাটাতে হবে। এই তজবিহ তাহলীলের শব্দ ও বাক্য সমূহকে যিকর বলে, যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করা হয়। যেমন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল-হামদুল্লিল্লাহ” “সুবহানাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” “আস্তাগ ফিরুল্লাহ”, “লা হাওলা ওয়ালা কুউআতা ইল্লাবিল্লাহ”। ইত্যাদি।

ছ। ইতিকাফ করা সম্ভব না হলেও মসজিদে রাত কাটানঃ

রমজানে মসজিদে ইতিকাফ করা খুবই ফজিলতের কাজ। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে অনেকে এই ফজিলত পূর্ণ ইবাদাত করতে পারে না। যারা শেষ দশকে ইতকাফ করতে পারে না, তারা ইচ্ছা করলে  এই রাতের সন্ধানে মসজিদে রাত কাটাতে পারে। দিনে বেলায় আয় রোজগারের জন্য সময় ব্যয় করে অথবা চাকুরীজীবিগন অফিসের কাজ শেষ করে, বিকালে ইফতারী নিয়ে মসজিদে গিয়ে অবস্থান করা। ফজরের পর সূর্য উঠার পর ইশরাক আদায় করে ঘরে ফিরে আসা। এভাবে শেষ দশকে আমল করলে লাইলাতুল কদর মিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা কারন এই মহিমান্বিত সময় রাতেই হয়ে থাকে। তাই শিরোনামের সাথে তাল মিলিয়ে বলা যায়, ইতিকাফ করা সম্ভব না হলেও মসজিদে রাত কাটান।

জ।  ফজর ও ঈশার সালাতের জামাত যেন মিস না হয়ঃ

সারা জীবনের নফল সালাত এক ওয়াক্ত ফরজের সমান হতে পারে না। কাজেই এই রাতের নফলের প্রস্তিতে যেন কোন অবস্তায় আমার ফজর ও ঈশার সালাতের জামাত যেন মিস না হয়।

ঝ। সাধ্যমত আল্লাহর রাস্তায় কিছু দান-সাদকা করাঃ

এই রাতের সব প্রকারের আমলই করা যায়। যে কোন আমলই এই রাতে উত্তম। দান সদকা করা যেহেতু অন্যতম একটা নেক আমল, তাই এই রাতে গুনাহ মাপের নিয়তে কিছু দান সদকা করা যায়। নিজের পক্ষ থেকে মৃত মাতা পিতার পক্ষ থেকেও দান করা যায়।  যেমনঃ  মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَنفِقُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَلاَ تُلْقُواْ بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوَاْ إِنَّ اللّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

আর ব্যয় কর আল্লাহর পথে, তবে নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। আর মানুষের প্রতি অনুগ্রহ কর। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদেরকে ভালবাসেন। সুরা বাকারা : ১৯৫

ঞ। পরিবার ও প্রতিবেশীদের এ রাত সম্পর্কে সচেতন করাঃ

এই তারটি যেহেতু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ তাই এই সৌভাগ্যবান রাতে যেমন নিজে সৌভাগ্য অর্জণ করতে হতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে অন্যদেরও এ সম্পর্কে সচেতন করে সৌভাগ্য লাভের চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَاراً وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও স্বীয় পরিবারবর্গকে আগুন (জাহান্নাম) হ’তে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।  (তাহরীম ৬৬:৬)।

কাজেই গুনাহ মাপের রজনীতে নিজের পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের এ রাত সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, যাতে তারাও গুনাহ মাপ করে নিতে পার।

ট। এই সকল আমলের মাঝে মাঝে দুয়া করাঃ

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহ আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি জানতে পারি যে, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তাহলে তখন কোন দুয়াটি পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি বল-

 اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى

হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অতঃএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। সুনানে তিরমিজি : ৩৫১৩, সুনানে ইবনু মাজাহ ৩৮৫০, হাকিম : ১৯৪২, সহীহাহ : ৩৩৩৭, সহিহ আল জামি : ৩৩৯১

এছাড়া বান্দা পছন্দ মত দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর যাবতীয় দুআ করবে। সে গুলো প্রমাণিত আরবী ভাষায় দুয়া হোক কিংবা নিজ ভাষায় হোক। এ ক্ষেত্রে ইবাদতকারী একটি সুন্দর সহীহ দুআ সংকলিত দুয়ার বইয়ের সাহায্য নিতে পারে। সালাফে সালেহীনদের অনেকে এই রাতে অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে দুয়া করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ এতে বান্দার মুক্ষাপেক্ষীতা, প্রয়োজনীয়তা ও বিনম্রতা প্রকাশ পায়, যা আল্লাহ পছন্দ করেন।

যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত-০২ ::  ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈদ আরবি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে এমন সাধারণ সম্মেলন যা বারবার ফিরে আসে। চাই তা সপ্তাহ ঘুরে ফিরে আসুক, মাস ঘুরে আসুক কিংবা বৎসর ঘুরে আসুক। অর্থাৎ যে দিনটি বার বার ফিরে আসে তাকে ঈদের দিন বলে। আমরা ঈদ বলতে বুঝি খুসি আর আনন্দেভরা দিন। প্রতি বছর রমযান মাসে দীর্ঘ এক মাস সিয়াম পালনের পর আবার স্বাভাবিক জীবন যাপন লাভের আনন্দ লাভ করা সত্যিকার অর্থেই ঈদ (যে আনন্দ বার বার ফিরে আসে)। ঈদুল ফিতরের দিনটি আল্লাহ তাআলা অনেক বড় অনুগ্রহ কারন মাস ব্যাপি সিয়াম পালনের পর পানাহারের অনুমতি প্রদান। এমনি ভাবে ত্যাগের মহিমা নিয়ে বার বার ফিরে আসে ঈদুল আজহা বা কুরবানীর ঈদ। আল্লাহ তা’আলা প্রতি বছর তার বান্দাকে নিয়ামাত, ইহসান ও অনুগ্রহ দ্বারা বার বার ধন্য করে থাকেন। এতে মানুষের প্রাণে আনন্দের সঞ্চার হয়। এসব কারণে এ দিবসের নামকরণ হয়েছে ঈদ। মহান আল্লাহ বলেন,

 وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ

আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। সুরা জারিযাত : ৫৬

কাজেই মুসলিমদের ঈদও ইবাদাত। অর্থাৎ আল্লাহর মর্জিমত আনন্দ করলেও ইবাদত হবে। এই জন্যই মুসলিমদের ঈদের আনন্দ অত্যন্ত নির্মল, পবিত্র এবং মধুময়। এই আনন্দ প্রকাশের সীমা ও ইসলাম নির্ধারণ করেছে। ঈদের আনন্দ শুরু হয় ঈদের সালাতের সমাবেশের মাধ্যমে যেখানে দেখা হয় নতুন পুরাতন হাজার বন্ধু বান্ধবদের সাথে, শুভেচ্ছা বিনিময় চলতে থাকে পাড়া প্রতিবেশীসহ সকল স্তরের মানুষের সাথে। মহান মিলন মেলার কথা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। এ উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব একে অপরকে দাওয়াত দেয়। সমাজের সবার জন্য সবার দার উম্মুক্ত থাকে। তবে থাকে না ধনি গরিবের ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ ও ক্রোধ। 

১। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সুচনা

আনাস ইব্‌ন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত,

كَانَ لَكُمْ يَوْمَانِ تَلْعَبُونَ فِيهِمَا وَقَدْ أَبْدَلَكُمُ اللَّهُ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْفِطْرِ، وَيَوْمَ الْأَضْحَى

তিনি বলেন, জাহিলিয়াত যুগের অধিবাসীদের জন্য প্রত্যেক বৎসরে দু’টি দিন ছিল, যাতে তারা খেল-তামাশা করত। যখন নবী (ﷺ) মদীনায় আগমন করলেন তখন তিনি বললেন, তোমাদের জন্য দু’টি দিন ছিল, যাতে তোমরা খেল-তামাশা করতে। এখন আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের জন্য উক্ত দু’দিনের পরিবর্তে তার চেয়েও অধিকতর উত্তম দু’টি দিন নিদির্ষ্ট করে দিয়েছেন, ঈদুল ফিত্‌রের দিন এবং কুরবানীর দিন। সুনানে নাসায়ী : ১৫৫৬

এই হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামী শরীয়তে মুসলিমদের পালনীয় ঈদ হল দুটি, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। এই দুটি ঈদ ব্যতিরেকে মুসলিমদের তৃতীয় কোন ঈদ নেই বা ঈদের নাম দিয়ে কোন উৎসব উদ্‌যাপন করার সুযোগ নেই। অথচ আমাদের মুসলিম সমাজে বর্তমানে ঈদে মিলাদুন নবী বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম উৎসব নামে তৃতীয় একটি ঈদের প্রচল হয়েছে, যাকে সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ বলে জোরেশোরে প্রচার চালান হচ্ছে। যা এক দিকে যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসের সুস্পষ্ট বিরোধী অপর পক্ষে সলফে সালেহিদের যামানায় ইহার অস্থিত্ব খুজে পাওয়া যায় না। আমাদের সমাজে ঘটা করে ঈদের মত সমান গুরুত্ব দিয়ে উদ্‌যাপন করা হয় তথাকথিত পহেলা বৈশাখ, ইংরেজি নববর্ষ, বিশ্ব ভালবাসা দিবস, এপ্রিল ফুল, বড় দিনসহ অগণিত উৎসব। হিন্দু ও খৃষ্টানদের মত বিধর্মীদের থেকে আমদানিকৃত সংষ্কৃতিতে ইসলাম ও মুসলমানের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না।

 ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। আবু দাউদ : ৪০৩১

ইসলাম স্বীকৃত দুটি ঈদ ছাড়া অন্য কোন ঈদ বা উৎসব উদ্‌যাপন করা, তাতে অংশগ্রহণ করা বা সে উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় করা মুসলমানদের জন্য বৈধ নয়। অপর পক্ষে আমরা যারা এই দুটি কে ঈদ হিসাবে স্বীকার করি ও উদ্‌যাপন করি তারাও এই উৎসব উদ্‌যাপন করতে গিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের সীমা লংঘন করছি। এমন অনেক আছেন সাওম বা সালাতের ধারেও নেই কিন্তু ইফতারিতে হরেক রকম সুস্বাদু খাবার খান আর ঈদে দামি দামি পোশাক পরেন। ঈদের দিন ব্যয় করে নাটক, সিনেমা, বিদেশী সিরিয়াল দেখে। আবার অনেকে ঈদের দিন প্রতিবেশীদের সাথে সৌহদ্যপূর্ণ ব্যবহারের পরিবর্তে পরিবারসহ পার্কে বা বিনোদন কেন্দ্রে সমায় কাটানোর নতুন ফ্যাসন বাহির করছেন। এভাবে ইসলামের সৌন্দর্যময় ঈদের উদ্দেশ্য থেকে তারা যোজর বিয়োজন দুরে থাকছেন।

২। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার কিছু বিধান

(১) ঈদের দিন গোসল করা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ভাল পোশাক পরিধান করা

মহান আল্লাহ বলেন-

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ يَغْتَسِلُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَيَوْمَ الأَضْحَى

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন গোসল করতেন। ইবনে মাজাহ : ১৩১৫ মান যঈফ।

(২) ঈদের দিনে বৈধ আনন্দ করা যায়।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আবূ বকর (রাঃ) ঈদুল তিফত্র অথবা ঈদুল আযহার দিনে তাঁকে দেখতে এলেন। তখন নবী ﷺ ‘ ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর বাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় দু’জন অল্প বয়স্কা বালিকা এ কবিতাটি উচ্চস্বরে আবৃত্তি করছিল যা আনসারগণ বু‘আস যুদ্ধে আবৃত্তি করেছিল। তখন আবূ বকর (রাঃ) দু‘বার বললেন, এ হল শয়তানের ঢাল। নবী ﷺ বললেন-

دَعْهُمَا يَا أَبَا بَكْرٍ إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيْدًا وَإِنَّ عِيْدَنَا هَذَا الْيَوْمُ

হে আবূ বকর, ওদেরকে ছাড়। প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই ঈদ আছে আর আজ হল আমাদের ঈদের দিন। সহিহ বুখারি : ৩৯৩১, সহিহ মুসলিম : ৮৯২, মিসকাত : ১৪৩২, সুনানে নাসায়ী : ১৫৯৩

(৩) দুই ঈদের দিন সিয়াম রাখা নিষেধ

বনূ আযহারের আযাদকৃত গোলাম আবূ ’উবায়দ (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একবার ঈদে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে ছিলাম, তখন তিনি বললেন-

هَذَانِ يَوْمَانِ نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ صِيَامِهِمَا يَوْمُ فِطْرِكُمْ مِنْ صِيَامِكُمْ، وَالْيَوْمُ الآخَرُ تَأْكُلُونَ فِيهِ مِنْ نُسُكِكُمْ‏.‏

রাসূলুল্লাহ ﷺ এই দুই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করতে নিষেধ করেছেন। (ঈদুল ফিতরের দিন) যে দিন তোমরা তোমাদের সিয়াম ছেড়ে দাও। আরেক দিন, যেদিন তোমরা তোমাদের কুরবানীর মাংস খাও। সহিহ বুখারি : ১৯৯০

যিয়াদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যাক্তি এসে ইবনু উমর (রাঃ) কে বলল যে, এক ব্যাক্তি কোন এক দিনের সিয়াম উদ্‌যাপন করার মানত করেছে, আমার মনে হয় সে সোমবারের কথা বলেছিল। ঘটনাক্রমে ঐ দিন ঈদের দিন পড়ে যায়। ইবনু উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তাআলা মানত পুরা করার নির্দেশ দিয়েছেন আর নবী ﷺ এই (ঈদের) দিনে সাওম উদ্‌যাপন করতে নিষেধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ১৯৯৪

(৪) ঈদের সময় তাকবির বলার বিধান।

দু’ ঈদের রাত আরম্ভ হওয়ার পর থেকে ঈদের নামাজ পর্যন্ত উচ্চ স্বরে তাকবির বলা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে পৌঁছে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবীর বলতেন। যখন নামাজ আদায় করতেন, তার পর আর তাকবীর বলতেন না। (আবী শাইরাহ, আলবানী একে সহিহ বলেছেন)।

ঈদের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তাকবীর পড়তে পড়তে যেতেন সেটি তাকবীরটি হলঃ

**اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَللهِ الْحَمْدُ*** اَللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ**

উচ্চারণঃ আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

অর্থঃ আল্লাহ মহান, আল্লাহ অতিমহান, তিনি ছাড়া সত্যিকার আর কোন মা’বুদ নেই। আল্লাহ মহান আল্লাহ মহান আর সমস্ত প্রশংসা শুধুমাত্র তাঁরই জন্য।

মাসায়েলঃ  তাকবীর প্রকাশ্যে ও উচ্চস্বরে পড়া সুন্নাত।  ঈদগাহের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে তাকবীর পাঠ শুরু করবে এবং ইমাম সাহেব সালাত শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতে থাকবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ঈদুল ফিত্‌রের তাকবীর শুরু করবে ঈদের চাঁদ উদিত হওয়ার পর থেকেই। ঈদের সলাত শেষ হওয়া পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবীর পাঠ করতেন।

(৫) ঈদের দিন ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া

সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

أَنَّ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ كَانَ يَخْرُجُ إِلَى الْعِيدِ مَاشِيًا وَيَرْجِعُ مَاشِيًا ‏.‏

নবী ﷺ পদব্রজে ঈদগাহে যেতেন এবং পদব্রজেই ঈদগাহ থেকে ফিরে আসতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১২৯৪

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ঈদের মাঠে পায়ে হেটে যাওয়া এবং যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। সুনানে তিরমিজি : ৫৩০

(৬) ঈদের দিন ঈদগাহে গমনের আগে কিছু খেয়ে নেওয়া।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

لاَ يَغْدُو يَوْمَ الْفِطْرِ حَتَّى يَأْكُلَ تَمَرَاتٍ‏.‏ حَدَّثَنِي أَنَسٌ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَيَأْكُلُهُنَّ وِتْرًا‏.‏

রাসুলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অপর এক রিওয়াতে আনাস (রাঃ) নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তা বেজোড় সংখ্যক খেতেন। সহিহ বুখারি : ৯৫৩

৩। ঈদের দিন ঈদের সালাত আদায় করা

আল্লাহ তাআলা বলেন,

 فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ (٢)

অর্থঃ আপনি আপনার প্রভুর জন্য নামাজ পড়েন এবং কুরবানি করুন। (সূরা কাউসার)

বারাআ (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ ﷺকে খুতবা ‍দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন-

إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ مِنْ يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، فَمَنْ فَعَلَ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا ‏‏

আমাদের আজকের এ দিনে আমরা যে কাজ প্রথম শুরু করব, তা হল সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করা। এরপর ফিরে আসব এবং কুরবানী করব। তাই যে এরূপ করে সে আমাদের রীতিনীতি সঠিকভাবে উদ্‌যাপন করল। সহিহ বুখারি : ৯৫১

ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) বলেছেন ঈদের সলাত প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ওয়াজিব। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ একই মত পোষণ করেন।

(১) ঈদের সালাত দু রাকআত।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم صَلَّى يَوْمَ الْفِطْرِ رَكْعَتَيْنِ، لَمْ يُصَلِّ قَبْلَهَا وَلاَ بَعْدَهَا، ثُمَّ أَتَى النِّسَاءَ وَمَعَهُ بِلاَلٌ، فَأَمَرَهُنَّ بِالصَّدَقَةِ، فَجَعَلْنَ يُلْقِينَ، تُلْقِي الْمَرْأَةُ خُرْصَهَا وَسِخَابَهَا‏.‏

নবী ﷺ ঈদুল ফিতরে দু’ রাকা’আত সালাত আদায় করেন। এর আগে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি। তারপর বিলাল (রাঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে মহিলাগনের কাছে এলেন এবং সাদাকা প্রদানের জন্য তাদের নির্দেশ দিলেন। তখন তারা দিতে লাগলেন। কেউ দিলেন আংটি, আবার কেউ দিলেন গলার হার। সহিহ বুখারী : ৯৬৪, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ১১৫৯

(২) ঈদের সালাত আদায় করার পরে খুতবা দিতেন

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي فِي الْأَضْحَى وَالْفِطْرِ ثُمَّ يَخْطُبُ بَعْدَ الصَّلاَةِ.

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন সালাত আদায় করতেন। আর সালাত শেষে খুতবা দিতেন। সহিহ বুখারি  : ৯৫৭

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

شَهِدْتُ الْعِيدَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ وَعُثْمَانَ ـ رضى الله عنهم ـ فَكُلُّهُمْ كَانُوا يُصَلُّونَ قَبْلَ الْخُطْبَةِ‏.‏

আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ, আবূ বকর, উমর, এবং উসমান (রাঃ) এর সঙ্গে সালাতে হাযির ছিলাম। তারা সবাই খুতবার আগে সালাত আদায় করতেন। সহিহ বুখারি : ৯৬২

(৩) ঈদের সালাত আযান ও ইকামত নেই।

জাবির ইবনু সামুরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত-

صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْعِيدَيْنِ غَيْرَ مَرَّةٍ وَلاَ مَرَّتَيْنِ بِغَيْرِ أَذَانٍ وَلاَ إِقَامَةٍ

আমি রসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে একবার দু’বার নয়, অনেক বার দু’ঈদের সালাত আযান ও ইকামাত ব্যতীত আদায় করেছি। সহিহ মুসলিম : ৮৮৭, আবূ দাঊদ : ১১৪৮, সুনানে তিরমিজি ৫৩২, মিশকাত : ১৪২৭

(৪) দুই ঈদের সালাতের মাঝের তাকবীরসমূহের বিধান।

ঈদের সলাতে তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর “আল্লাহু আকবার বলে অতিরিক্ত কিছু তাকবীর দেয়া হয়, সে তাকবীরের সংখ্যা সম্পর্কে বেশ কিছু মতভেদ আছে। তাদের মধ্যে দুটি মত প্রসিদ্ধ-

প্রতম মত হল-

হানাফী মাযহাবের ইমাম আবূ হানিফার (রহ.) মত হল ঈদের সলাতে তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর “আল্লাহু আকবার বলে ১ম রাকআতে অতিরিক্ত ০৩ তাকবীর ও ২য় রাক’আতে অতিরিক্ত ০৩ তাকবীর, মোট অতিরিক্ত ০৬ তাকবীর দিতে হবে।

তাদের দলীল-

ইমাম আবদুর রায্যাক রাহ. (সুফিয়ান) ছাওরী থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি আলকামা ও আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ থেকে, তাঁরা ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি (ইবনে মাসউদ রা.) দুই ঈদের নামাযে ৯টি করে তাকবীর দিতেন। কুরআন পাঠের আগে ৪টি। তারপর তাকবীর দিয়ে রুকু করতেন। দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়তেন। কুরআন পড়া শেষ হলে ৪ তাকবীর দিতেন। তারপর রুকু করতেন। মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক : ৫৬৮৬

ইমাম আবদুর রায্যাক রাহ. মা‘মার থেকে, তিনি আবু ইসহাক থেকে, তিনি আলকামা ও আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁরা বলেছেন, একবার ইবনে মাসউদ রা. বসে ছিলেন। তাঁর কাছে হুযায়ফা রা. ও আবু মূসা আশআরী রা. ও ছিলেন। সায়ীদ ইবনুল আস উভয়কে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাযের তাকবীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা তাকে (ইবনে মাসুদ) জিজ্ঞাসা করতে বলেন। শেষে হুযায়ফা রা. ইবনে মাসউদ রা. এর দিকে ইশারা করে বললেন, তাঁকে জিজ্ঞাসা কর। জিজ্ঞাসা করলে ইবনে মাসউদ রা. বললেন, ৪ তাকবীর দিয়ে কুরআন পড়বে। তারপর তাকবীর দিয়ে রুকু করবে। দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়বে। তারপর ৪ তাকবীর দিবে। মুসান্নাফে আবদুর রায্যাক : ৫৬৮৭

ইবনে মাসউদ (রা.) এই রেওয়ায়েতে ৪ তাকবীরে ঈদের সালাত বলা সম্পর্কে একদল ফকীহ বলেন, ৪ তাকবীরকে প্রথম রাকাতে তাকবীরে উলার সাথে ৩ তাকবীর এবং দ্বিতীয় রাকাতে রুকুর তাকবীর সহ ৩ তাকবীর। অর্থাত অতিরিক্ত ৬ টি তাকবীর দিতে হবে।  উল্লেখ্য, মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) এটাকে দুর্বল হাদীস বলেছেন।

দ্বিতীয় মত হল-

তাকবীরে তাহরীমা বাধার পর “আল্লাহু আকবার বলে প্রথম রাক’আতে অতিরিক্ত ০৭ তাকবীর ও দ্বিতীয় রাক’আতে অতিরিক্ত ০৫ তাকবীর, মোট অতিরিক্ত ১২ তাকবীর দিতে হবে।

তাদের দলীল-

 আমর ইবনু আওফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ كَبَّرَ فِي الْعِيدَيْنِ سَبْعًا فِي الأُولَى وَخَمْسًا فِي الآخِرَةِ

রাসূলুল্লাহ ﷺ দু ঈদের সালাতে প্রথম রাকআতে সাত তাকবীর এবং শেষের রাকআতে পাঁচ তাকবীর দিতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১২৭৯, সুনানে তিরমিজি : ৫৩৬, মিশকাত : ১০৪১, তালীক ইবনু খুযাইমাহ : ১৪৩৮, ১৪৩৯ হাদিসের মান সহিহ

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন-

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُكَبِّرُ فِي الْفِطْرِ وَالأَضْحَى فِي الأُولَى سَبْعَ تَكْبِيرَاتٍ وَفِي الثَّانِيَةِ خَمْسًا

রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার নামাযের প্রথম রাকাতে সাতবার এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচবার তাকবীর বলতেন। আবূ দাউদ : ১১৪৯, ইবনে মাজাহ : ১২৮০

ইসলামি জিজ্ঞাসা ও জবাব ওয়েব সাইডে এক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়- এটি একটি ইজতাহিদী মাসয়ালা। এ নিয়ে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী ও পরবর্তী ইমামদের মধ্যে মতানৈক্য আছে এবং এ মাসয়ালায় ১০টিরও অধিক মতামত রয়েছে।

মালেকী ও হাম্বলি মাযহাবের আলেমগণ বলেন: ঈদের নামাযের প্রথম রাকাতে তাকবীর সংখ্যা ৬টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে ৫টি। এটি মদিনার সাত ফকীহ, উমর ইবনে আব্দুল আযিয, যুহরী ও মুযানি থেকে বর্ণিত আছে। আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা’ ১৩/২০৯

বুঝা যাচ্ছে- প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরীমাকে তারা সপ্তম তাকবীর হিসেবে গণ্য করেন এবং দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর তাকবীরকে তারা বর্ণিত পাঁচটি তাকবীরের অতিরিক্ত তাকবীর হিসেবে গণ্য করেন। আর হানাফী মাযহাবের অভিমত ও এক বর্ণনা মতে ইমাম আহমাদের মত হচ্ছে: দুই ঈদের নামাযে অতিরিক্ত ৬ তাকবীর দিতে হবে। প্রথম রাকাতে ৩ তাকবীর, দ্বিতীয় রাকাতে ৩ তাকবীর। এটি ইবনে মাসউদ (রাঃ), আবু মুসা আশআরী (রাঃ), হুযাইফাতুল ইয়ামান (রাঃ), উকবা বিন আমের (রাঃ), ইবনে যুবায়ের (রাঃ), আবু মাসউদ আল-বদরী (রাঃ), হাসান বসরী (রহঃ), মুহাম্মদ বিন সিরিন (রহঃ), ছাওরী (রহঃ), কুফার আলেমগণ ও এক বর্ণনা মতে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর অভিমত।

শাফেয়ি মাযহাবের আলেমগণ বলেন, প্রথম রাকাতে অতিরিক্ত তাকবীর ৭টি এবং দ্বিতীয় রাকাতে ৫টি।

আইনী (রহঃ) অতিরিক্ত তাকবীরের সংখ্যার ব্যাপারে ১৯ টি উক্তি উল্লেখ করেছেন। ইসলামি জিজ্ঞাসা ও জবাব, প্রশ্ন নম্বর : ২২৪০৩২, শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ।

মাসায়েলঃ হানাফী ও মালেকী মাযহাবে বাড়তি তাকবীর বলা ওয়াজিব। এটা ছুটে গেলে সাহু সিজদা দিতে হবে। পক্ষান্তরে অন্যান্য মাযহাবে বাড়তি তাকবীর বলা সুন্নাত। এবং এই বাড়তি তাকবীর বলার সময় প্রত্যেক তাকবীরেই কি হাত উঠাতে হবে।

৪। ঈদের সলাত আদায়ের পদ্ধতি-

প্রথম পদ্ধতিঃ

প্রথমে নিয়ত করে আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরীমা বলে হাত বাঁধবে। এরপর ছানা পড়তে হবে। সুরা ফাতিহা পড়ার পূর্বেই একের পর এক মোট ৭ বার তাকবীর দিতে হবে। প্রতি দুই তাকবীরের মাঝখানে একটুখানি চুপ থাকতে হবে। অতপর সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা মিলিয়ে পড়ে সাভাবি রুকুও সিজদা করতেন। এভাবে প্রথম রাক’আত শেষ করার পর সাজদাহ থেকে উঠে সূরা ফাতিহা শুরুর পূর্বেই দ্বিতীয় রাকাতে পর পর ৫টি তাকবীর দিতেন। তারপর সূরা ফাতিহা পড়ে আরেকটি সূরা পড়তেন। এরপর তিনি রুকু ও সাজদাহ করে দু’ রাক’আত ঈদের সলাত শেষ করতেন। সালাম ফিরানোর পর তিনি একটি তীরের উপর ভর দিয়ে যমীনে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিতেন। তখন ঈদগাহে কোন মিম্বর নেয়া হত না। তারপর দু’আ করে শেষ করে দিতেন।

দ্বিতীয় পদ্ধতিঃ

দ্বিতীয় নিয়মটি প্রথমটির মতই। শুধু পার্থক্য হল প্রথম রাক’আতে তাকবীরে তাহরীমার পর অতিরিক্ত ৩ তাকবীর বলবে এবং প্রথম দুই তাকবীরে হাত ছেড়ে দেবে এবং শেষ তাকবীরে হাত বেঁধে ফেলবে। দ্বিতীয় রাকআতে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সুরা শেষে রুকুর পূর্বে অতিরিক্ত ৩ তাকবীর দেবে এবং প্রত্যেক তাকবীরেই হাত ছেড়ে দেয়। চতুর্থ তাকবীরে রুকুতে যাবে। অপতর সাধারন নিয়মে সালাত শেষ করবে।

মাসায়েলঃ  ঈদের নামাযের কোন কাজা নেই। এটাই হানাফী মাযহাবের মত। ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে উসাইমিন (রহঃ)। এ মতটি গ্রহন করছেন। তবে মালেকী, শাফে‘ঈ ও হাম্বলী মাযহাবের হুবহু দুই রাকাত উল্লেখিত তাকবীরসমূহসহ কাজা করা যাবে।

৫। ঈদের পূর্বে বা পরে কোন সালাত নেই।

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم صَلَّى يَوْمَ الْفِطْرِ رَكْعَتَيْنِ لَمْ يُصَلِّ قَبْلَهَا وَلاَ بَعْدَهَا ثُمَّ أَتَى النِّسَاءَ وَمَعَهُ بِلاَلٌ فَأَمَرَهُنَّ بِالصَّدَقَةِ فَجَعَلْنَ يُلْقِينَ تُلْقِي الْمَرْأَةُ خُرْصَهَا وَسِخَابَهَا

নবী ﷺ ‘ঈদুল ফিত্রে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করেন। এর পূর্বে ও পরে কোন সালাত আদায় করেননি। অতঃপর বিলাল (রাযি.)-কে সঙ্গে নিয়ে নারীদের নিকট এলেন এবং সাদাকা প্রদানের জন্য তাদের নির্দেশ দিলেন। তখন তাঁরা দিতে লাগলেন। নারীদের কেউ দিলেন আংটি, আবার কেউ দিলেন গলার হার। সহিহ বুখারি : ৯৬৪, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ১১৫৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১২৯১, সুনানে তিরমিজি : ৫৩৭, মিশকাত : ১৪৩০

৬। ঈদের সলাতের স্থানঃ

ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَغْدُو إِلَى الْمُصَلَّى، وَالْعَنَزَةُ بَيْنَ يَدَيْهِ، تُحْمَلُ وَتُنْصَبُ بِالْمُصَلَّى بَيْنَ يَدَيْهِ فَيُصَلِّي إِلَيْهَا‏.‏

নবী ﷺ যখন সকাল বেলায় ঈদগাহে যেতেন, তথন তার সামনে বর্শা বহন করা হতো এবং তার সামনে ঈদগাহে তা স্থাপন করা হতো এবং একে সামনে রেখে তিনি সালাত আদায় করতেন। সহিহ বুখারি : ৯৭৩

আবূ সাঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন (ঘর থেকে) বের হয়ে ঈদগাহের ময়দানে গমন করতেন। প্রথমে তিনি (ﷺ) সেখানে গিয়ে সালাত আদায় করাতেন। এরপর তিনি (ﷺ) মানুষের দিকে মুখ ফিরে দাঁড়াতেন। মানুষরা সে সময় নিজ নিজ সারিতে বসে থাকতেন। তিনি (ﷺ) তাঁদেরকে ভাষণ শুনাতেন, উপদেশ দিতেন। আর যদি কোন দিকে কোন সেনাবাহিনী পাঠাবার ইচ্ছা করতেন, তাদেরকে নির্বাচন করতেন। অথবা কাউকে কোন নির্দেশ দেয়ার থাকলে তা দিতেন। তারপর তিনি (ﷺ) [ঈদগাহ] হতে ফিরে প্রত্যাবর্তন করতেন। সহিহ বুখারি : ৯৫৬, সহিহ মুসলিম : ৮৮৯, মিশকাত : ১৪২৬

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত-

أَنَّهُ أَصَابَهُمْ مَطَرٌ فِي يَوْمِ عِيدٍ فَصَلَّى بِهِمُ النَّبِيُّ صلي الله عليه وسلم صَلَاةَ الْعِيدِ فِي الْمَسْجِدِ ‏.‏

একদা ঈদের দিন বৃষ্টি হলে নবী ﷺ সাহাবীদেরকে নিয়ে ঈদের সালাত মসজিদে আদায় করেন। সুনানে আবু দাঊদ : ১১৬০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৩১৩,  মিশকাত : ১৪৪৮ হাদিসের মান দুর্বল।

৭। ঈদের সালাতে মহিলাদের অংশ গ্রহন সম্পর্কেঃ

উম্মে আতিয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كُنَّا نُؤْمَرُ أَنْ نَخْرُجَ يَوْمَ الْعِيدِ، حَتَّى نُخْرِجَ الْبِكْرَ مِنْ خِدْرِهَا، حَتَّى نُخْرِجَ الْحُيَّضَ فَيَكُنَّ خَلْفَ النَّاسِ، فَيُكَبِّرْنَ بِتَكْبِيرِهِمْ، وَيَدْعُونَ بِدُعَائِهِمْ يَرْجُونَ بَرَكَةَ ذَلِكَ الْيَوْمِ وَطُهْرَتَهُ‏.‏

ঈদের দিন আমাদের বের হওয়ার আদেশ দেওয়া হত। এমন কি আমরা কুমারী মেয়েদেরকেও অন্দর মহল থেকে বের করতাম এবং ঋতুমতী মেয়েদেরকেও। তারা পুরুষদের পিছনে থাকতো এবং তাদের তাকবীরের সাথে তাকবীর বলতো এবং তাদের দু’আর সাথে দু’আ করত-তারা আশা করত সে দিনের বরকত এবং পবিত্রতা। সহিহ বুখারি : ৯৭১

উম্মু ’আতিয়্যাহ (রাযি.) হতে রিওয়ায়াত হয়েছে , তিনি বলেনঃ নবী ﷺ ঈদের দিবসে ঋতুমতী এবং পর্দানশীন নারীদের বের করে আনার আদেশ দিলেন, যাতে তারা মুসলিমদের জামা’আত ও দু’আয় অংশ গ্রহণ করতে পারে। অবশ্য ঋতুমতী নারীগণ সালাতের জায়গা হতে দূরে অবস্থান করবে। এক মহিলা বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কারো কারো ওড়না নেই। তিনি বললেনঃ তার সাথীর উচিত তাকে নিজের ওড়না পরিয়ে দেয়া। সহিহ বুখারি ; ৩৫১, ৯৭১, ৯৭৪, ৯৮০-৮১, ১৬৫২, সহহি মুসলিম : ৮৯০, সুনানে তিরমিজি : ৫৩৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৯০, ১৫৫৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ১১৩৬, ১১৩৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৩০৭, ১৩০৮।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কি নবী ﷺ এর সঙ্গে কখনো ঈদে উপস্থিত হয়েছেন? তিনি বললেন হ্যাঁ। যদি তার কাছে আমার মর্যাদা না থাকত তা হলে কম বয়সী হওয়ার কারণে আমি ঈদে উপস্থিত হতে পারতাম না। তিনি বের হয়ে কাসীর ইবনু সালাতের গৃহের কাছে স্থাপিত নিশানার কাছে এলেন এবং সালাত আদায় করলেন। এরপর খুতবা দিলেন। তারপর তিনি মহিলাগনের নিকট উপস্থিত হলেন। তখন তার সঙ্গে বিলাল (রাঃ) ছিলেন। তিনি তখন মহিলাগনের উপদেশ দিলেন, নসীহত করলেন এবং দান সাদাকা করার জন্য নির্দেশ দিলেন। আমি তখন মহিলাগণের নিজ নিজ হাত বাড়িয়ে বিলাল (রাঃ) এর কাপড়ে দান সামগ্রী ফেলতে দেখলাম। এরপর তিনি এবং বিলাল (রাঃ) নিজ বাড়ীর দিকে চলে গেলেন। সহিহ বুখারি : ৯৭৭

৮। ঈদুর আজহার দিন সালাতের পর কুরবানি করা

আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

 فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ

তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং কুরবানি কর। সূরা কাউছার : ২

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন-

مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ وَلَمْ يُضَحِّ فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا ‏

যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩১২৩

বারা ইবনু আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী ﷺ এক কুরবানীর ঈদের দিন আমাদের সামনে এক ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, এ ঈদের দিন প্রথমে আমাদেরকে সলাত আদায় করতে হবে। এরপর আমরা বাড়ী গিয়ে কুরবানী করব। যে ব্যক্তি এভাবে কাজ করল সে আমাদের পথে চলল। আর যে ব্যক্তি আমাদের সলাত আদায় করার পূর্বে কুরবানী করল সে তার পরিবারের জন্য তাড়াতাড়ি যাবাহ করে নিশ্চয়ই তা গোশত ভক্ষণের ব্যবস্থা করল তা কুরবানীর কিছুই নয়। সহিহ বুখারি : ৯৬৮, সহিহ মুসলিম ১৯৬১, সহিহ আল জামি : ২০১৯, মিসকাত : ১৪৩৫

৯। সালাতের পর ঈদুল আজহার মূল আমল কুরবানির কিছু জরুরি বিধানঃ

(১) একমাত্র মহান আল্লাহ জন্য কুরবানি করতে হবেঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

*لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ*

অর্থঃ এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সুরা হাজ্জ্ব : ৩৭

(২) পশু হিসাবে গৃহপালিত হতে হবেঃ

কুরবাণীর পশু হলো, উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ। এর দলিল মহান আল্লাহর বলেন,

(وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ)

অর্থঃ আমি প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি। তাদেরকে গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক্ দেয়া হয়েছে সেগুলোর উপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। কারণ, তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য, কাজেই তাঁর কাছেই আত্মসমর্পণ কর আর সুসংবাদ দাও বিনীতদেরকে। সুরা হজ্জ : ৩৪

মহান আল্লাহ পশুর ধরণ বলেছেন, গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু। আমাদের সমাজে প্রচলিত গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হলোঃ- উঁট, গরু, ছাগল, দুম্বা বা মেষ। সহিহ মুসলিম : ৩০৮২, সুনানে নাসায়ি : ৪৩৮৮, ৪৩৯০

(৩) কুরবানির পশুর নির্দিষ্ট বয়স হতে হবেঃ

ইসলামি শরীয়ত পশুর নির্ধারিত বয়স ঠিক করে দিয়ছে। আর তা হচ্ছে, উঁটের বয়স পাঁচ বছর সম্পূর্ণ হওয়া, গরুর বয়স দুই বছর সম্পূর্ণ হওয়া, ছাগলের বয়স এক বছর সম্পূর্ণ হওয়া, মেষ বা দুম্বার বয়স ছয় মাস পূর্ণ হওয়া। এর কম বয়সের হলে তা কুরবানীতে যথেষ্ট হবে না। সহিহ মুসলিম : ৪৯৭৬, সুনানে নাসাঈ : ৪৩৮১, ৪৩৮৩, সুনানে আবু দাউদ : ২৭৯৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩১৩৪,

(৪) পশুটি অবশ্যই রোগমুক্ত ও সুস্বাস্থের অধিকারী হতে হবে

রাসূলুল্লাহ ﷺ চারটি দোষ হতে কুরবানীর পশুর মুক্ত হওয়া জন্য বলেছেন। কুরবানীর পশুর যে চারটি দোষমুক্ত হবে তা হলো-

  • অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট।
  • রুগ্ন পশু যার রোগ সুস্পষ্ট।
  • খোঁড়া পশু যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট। এবং
  • কৃশকায় দুর্বল পশু যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে।

সহিহ মুসলিম : ৩০৭৬, সুনানে তিরমিজি : ১৪৯৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩১৪৪, ৩১২২, সুনানে নাসায়ী : ৪৩৭, সুনানে আবু দাউদ : ২৭৯৬

(৫) ঈদের সালাতে পূর্বে জবেহ করা যাবে নাঃ

জুনদুব ইবন সুফয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে ঈদগাহে উপস্থিত ছিলাম। তিনি লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন, সালাত শেষে দেখলেন একটি বকরী যবেহ করা হয়েছে। তখন তিনি বললেন, সালাতের পূর্বে কে যবেহ করলো? সে যেন এর পরিবর্তে অন্য একটি বকরী যবেহ করে। আর যে এখনও যবেহ করেনি, সে যেন আল্লাহর নামে যবেহ করে। সুনানে নাসায়ী : ৪৩৬৯

(৬) আল্লাহর নামে জবেহ করতে হবেঃ

দাড়ান বা কাত করে শোয়ানোর পর ‘বিস্‌মিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহ আকবার’ বলে ছুরি দ্বারা রক্ত প্রবাহিত করতে হবে। জবেহ করার সময় কমপক্ষে (بسْمُ اللَّهِ)  ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ফরজ কাজ। কারণ, কোন পশুর জবেহ করার পূর্বে আল্লাহর নাম না পাঠ করলে সেই পশুর গোশত খাওয়া হারাম।

মহান আল্লাহ বলেন,

*فَكُلُواْ مِمَّا ذُكِرَ اسْمُ اللّهِ عَلَيْهِ إِن كُنتُمْ بِآيَاتِهِ مُؤْمِنِينَ*

অতঃপর যে জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তা থেকে ভক্ষণ কর যদি তোমরা তাঁর বিধানসমূহে বিশ্বাসী হও। সুরা আন’য়াম : ১১৮

মন্তব্যঃ এই কারনে মৃ্ত পড়ে থাকা জন্তু খাওয়া হলাল নয়। কেননা, কেউ জানেনা এই জন্তু আল্লাহর নাম নিয়ে শিকার বা জবেহ করা হয়েছিল কি না!

(৭) জবেহ হবে পরিবারের পক্ষ থেকেঃ

আতা ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহু থেকে বর্ণিত, আবূ আইয়ূব (রা.) কে আমি প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যামানায় কুরবানীর বিধান কেমন ছিল। তিনি বললেন, কোন লোক তার ও তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে একটি ছাগল দ্বারা কুরবানী আদায় করত এবং তা নিজেরাও খেত, অন্যান্য লোকদেরকেও খাওয়াত। অবশেষে মানুষেরা গর্ব ও আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। ফলে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তা তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছ। সুনানে তিরমিজি : ১৫০৫, ইবনু মাজাহ : ৩১৪৭

(৮) কাসাইকে পারিশ্রমিক হিসাবে কুরবানীর কোন অংশ দেয়া যাবে নাঃ

আলী (রা.) হতে বর্ণিত যে, তাঁকে নাবী ﷺতাঁর নিজের কুরবানীর জানোয়ারের পাশে দাঁড়াতে আর এগুলোর সমুদয় গোশ্ত, চামড়া এবং পিঠের আবরণসমূহ বিতরণ করতে নির্দেশ দেন এবং তা হতে যেন কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কিছুই না দেয়া হয়।  সহিহ বুখারি : ১৭১৭

(৯) কুরবানী নিয়তকরী নিজের চুল ও নখ কাটবে নাঃ

উম্মু সালামা (রা্ং) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন (যিলহাজ্জ মাসের) প্রথম দশদিন উপস্থিত হয় আর কারো নিকট কুরবানীর পশু উপস্থিত থাকে, যা সে যাবাহ করার নিয়্যাত রাখে, তবে সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে। সহিহ মুসলিম : ৫০১২, সহিহ মুসলিম : ৫০১৫, সুনানে আবু দাউদ : ২৭৯১)

১০। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ঃ

জুবাইর ইবনু নুফাইর (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, নরি (স.)-এর সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন-

تقبل الله منا ومنكم

উচ্চারণ: তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।

অর্থ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের পক্ষ থেকে (আমল) কবুল করুন। ফাতহুল কাদির, খণ্ড-২, পৃ-৫১৭

ওয়াসিলা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (স.) এর সঙ্গে ঈদের দিন সাক্ষাৎ করলাম। আমি বললাম, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’। মহানবী (স.) বললেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা। বায়হাকি খন্ড-৩, পৃ-৪৪৬

১১। ঈদের সালাতের পর মুআনাকা বা কোলাকুলি করার বিধান

আমাদের সমাজে ঈদ মানে, ঈদের সালাতে পর কোলাকুলি। ঈদুল ফিতর মানে ছবিতে বা ক্যাপসনে কোলাকুলির দৃশ্য। কিন্তু আমরা কেউ একবারর জন্যও ভেবে দেখেনি কাজটি কি ইসলাম সম্মত। এখানে দুটি প্রশ্ন একটি হলো কোলাকুলি আর একটি হল ঈদের সালাতের পর কোলাকুলি। কোলাকুলি মুলত একটি শরীযত সম্মত সুন্নাহ কাজ। যেমন

আইশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, যাইদ ইবনু হারিসা (রাঃ) যখন (সফর হতে) মদীনায় ফিরে এলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমার ঘরে ছিলেন। তিনি এসে দরজা খটখট করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালি গায়ে কাপড় টানতে টানতে তার নিকটে গেলেন। আল্লাহর শপথ! আমি তাকে আগে বা পরে কখনো খালি গায়ে দেখিনি। তারপর তিনি যাইদের সাথে কোলাকুলি করলেন এবং তাকে চুমু খেলেন। সুনানে তিরমিজী : ২৭৩২, মিশকাত : ৪৬৮২, শরহুস সুন্নাহ : ৩৩২৭ মান জইফ।

এখন আসুন ঈদের সালাতের পর বিশেষ কুলাকুলি। মূলত কুলাকুলির হুকুম হল, দীর্ঘদিন পর কোন কাছের মানুষের সাথে দেখা হলে কুলাকুলি করবে। এখন ঈদের জামাতের পর যদি কোন কাছের মানুষের সাথে দেখা হয়, তাহলে সালাম বিনিময়ের পর কুলাকুলি করতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু এটিকে ঈদের সালাতের পরের সুন্নত মনে করা বিদআত। কিংবা আমভাবে সবার সাথেই ঈদের নামায শেষ হতেই কুলাকুলি শুরু করে দেয়া একটি রুসুম। সুন্নাত, মুস্তাহাব কিছুই নয়। এটিকে সুন্নাত, মুস্তাহাব ইত্যাদি মনে করা বিদআত হবে। এই কুলাকুলি আরেকটি সুন্নাহ বিরোধী কাজ হল তিন বার কুলাকুলি করা। হাদিসে মূলত একবার করার কথা পাওয়া যায়। তিনবারের কোন বিধান নেই। কিন্তু আমাদের সমাজের প্রচলন হিসেবে এমনটি করা হয়ে থাকে। এটি সুন্নত নয়।

কোলাকুলি সম্পর্কে অধিক জানার জন্য আধুনিক যুগ শ্রেষ্ঠ তিন জন ‘আলিমের ফাতওয়া পেশ করা হলোঃ

১। সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ ও মুহাদ্দিস শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ (মৃত-১৯৯৯) বলেছেন,

“লোকদের মধ্যে প্রচলিত প্রথা ছাড়া কোলাকুলির কোনো ভিত্তি আছে বলে আমরা জানি না। এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি হলো, (ইবাদত) কবুল হওয়ার দু‘আ করা। যখন সে তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করবে, তখন তার জন্য (ইবাদত) কবুলের দু‘আ করবে। এটা সালাফদের কর্ম। পক্ষান্তরে এ উপলক্ষে কোলাকুলি করার ভিত্তি আমি জানি না। এটি লোকদের আচার বা প্রথা মাত্র। সবচেয়ে উত্তম হলো, সাক্ষাতে শুধু করমর্দন করা এবং এটাতেই ক্ষান্ত হওয়া। সে তার ভাইয়ের সাথে করমর্দন করবে এবং তাকে বলবে, ‘হান্নাআকাল্লাহু বি হাযাল ঈদ (আল্লাহ তোমাকে এই ঈদের মাধ্যমে খুশি করুন)’, ‘বারাকাল্লাহু লাকা ফী হাযাল ঈদ (আল্লাহ তোমাকে এই ঈদে বরকত দিন)’ অথবা ‘তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা (আল্লাহ তোমার ও আমার পক্ষ থেকে এই ঈদ কবুল করুন)’; কিংবা অনুরূপ কিছু বলবে। এতে কোনো অসুবিধা নাই। (binbaz.org.sa/fatwas/1533/حكم-المعانقة-في-الاعياد.]

·
২। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সাবেক সদস্য, বিগত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল ‘উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ (মৃত-২০০১) প্রদত্ত ফাতওয়া-

প্রশ্ন: “ঈদের নামাজের পর করমর্দন, কোলাকুলি এবং মুবারকবাদ জানানোর বিধান কী?”

উত্তর: “এগুলো করায় কোনো সমস্যা নেই। কেননা লোকেরা এগুলো ইবাদত বা আল্লাহ’র নৈকট্য অর্জনের জন্য করে না। বরং তারা এগুলো দেশাচারমূলক প্রথা হিসেবে করে এবং একে অপরকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের জন্য করে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো আচার বা প্রথার ব্যাপারে শরিয়তের নিষেধাজ্ঞা সাব্যস্ত হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মৌলিক মান হলো বৈধতা। যেমন বলা হয়—‘সকল (প্রথাগত) বিষয়ের মৌলিক মান হলো বৈধতা, আর শরিয়তপ্রণেতার অনুমতি ছাড়া সকল ইবাদতের মৌলিক মান হলো নিষিদ্ধতা’।” (ইমাম ইবনু ‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ), মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৬ পৃষ্ঠা)

৩। মাদীনাহ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক আচার্য, বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুল মুহসিন আল-‘আব্বাদ আল-বাদর হাফিযাহুল্লাহ প্রদত্ত ফাতওয়া-

প্রশ্ন: “বর্তমানে আমাদের এখানে বিভিন্ন উপলক্ষে এবং ঈদের দিনগুলোতে লোকেরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে।”

উত্তর: “আল্লাহ’র কসম, আমার কাছে এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, এটা সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার সাথে লোকেরা কোলাকুলি করে থাকে। আর তারা তা খুশি ও আনন্দের উপস্থিতির কারণে করে। সুতরাং এ কাজে কোনো ক্ষতি নেই। উদাহরণস্বরূপ কোনো ব্যক্তির যদি বিবাহ উপস্থিত হয়, আর সে তার বিয়েতে আনন্দিত হয়, ফলে সে অপরকে শুভেচ্ছা জানায় এবং কোলাকুলি করে। এগুলোর (উল্লিখিত প্রকারগুলোর) প্রত্যেকটিতেই খুশি ও আনন্দ রয়েছে। যেমন: সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তিকে নিয়ে খুশি হওয়া, বিয়েতে খুশি হওয়া এবং ঈদে খুশি হওয়া।”

কোলাকুলি করা একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। অনেক দিন পর দেখা হলে করা যায় এমনকি ঈদের দিনও করা যায়। আবার কেউ ঈদের ইবাদাত মনে না করে আদায় করলেও বিদআত হবে না। কিন্তু যদি কেউ মনে করে এই সুন্নাহটি ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এটি একটি ইবাদাত তবে তা বিদআতে পরিনত হবে।   

·

১২। ঈদের রাতে সালাত  আদায় করাঃ

আমাদের দেশে অনেক ঈদের রাত মসজিদে কাঠান। কারন তারা একটা জাল হাদিসের উপর আমর করে থাকে। রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা পর, শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে ইতিকাফ শেষ করে বাড়িতে যেতে হয়। কিন্তু কিছু ভাই এই যঈফ/জাল হাদিসের কারনে ঈদের রাত মসজিদে থেকে ঈদের দিন সকালে বাড়িতে যান। তাদের এই কাজটি ইবাদতে বাড়াবাড়ি। তারা যে হাদিসের আলোকে এই রাতে ইবাদাত করেন সেই বিখ্যাত জাল হাদিসটি হলো-

ঈদের রাতে কিয়ামুল লাইল পালনের ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসটি হলোঃ

১. আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদাত করবে তার অন্তর ঐ দিন মরবে না, যে দিন অন্তরসমূহ মরে যাবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭৮২

হাদিসটি জাল বলেছেনঃ

১. এটির সনদে রাবী উমার ইবনু হারুণ রয়েছেন। তার সম্পর্কে ইবনু মাঈন এবং সালেহ জাযারাহ বলেছেন, তিনি মিথ্যুক। ইবনুল জাওয়ী, আল-মাওযু’আত, দ্বিতীয় খন্ডে (পৃষ্ঠা-১৪২) অনুরূপ কথাই বলেছেন। অতঃপর তার একটি হাদীছ উল্লেখ করে তাকে জাল করার দোষে দোষী করেছেন।

২. আর ইবনু হিব্বান দ্বিতীয় খন্ডে (পৃষ্ঠা-৯১) বলেছেন, তিনি নির্ভরযোগ্যদের উদ্ধৃতিতে মুযাল হাদীছ বর্ণনা করতেন এবং সে যাদেরকে নিজের শাইখ হিসাবে দাবী করতেন অথচ তিনি তাদেরকে দেখেননি। এ ব্যক্তি মিথ্যার দোষে দোষী।

৩. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, ঈদের রাতের (ইবাদত) সম্পর্কে যত হাদিস উল্লেখ করা হয় সবগুলো নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যাচার।

৪. শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি জাল বলেছেন। (যঈফ ও জাল হাদিস, হাদিস-৫২০)

৫. সমাগ্রীকভাবে হাদিসটি খুবই দুর্বল। ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব। শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ উত্তরগুলো তত্ত্বাবধান করেন।

যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত-০৩ ::  জুমার দিন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। জুমআর ইতিকথা

প্রথম হিজরীতে হিজরতের পরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মদীনা আগমনের সাথে সাথে জুমআ ফরয হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বপ্রথম জুমআ পড়েছিলেন মদীনার কুবা মসজিদে ও মসজিদে নববীর মধ্যবর্তী ‘বনু সালেম ইবনে আউস’ গোত্রে। বর্তমানে এ জায়গায় নির্মিত মসজিদটির নাম ‘মসজিদে জুমআ’। এরপর তিনি (ﷺ) মসজিদে নববীতে জুমআ আদায় শুরু করেন।

ইবনু আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

إِنَّ أَوَّلَ جُمُعَةٍ جُمِّعَتْ بَعْدَ جُمُعَةٍ فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي مَسْجِدِ عَبْدِ الْقَيْسِ بِجُوَاثَى مِنَ الْبَحْرَيْنِ‏.‏

আল্লাহর রাসূল ﷺ এর মসজিদে জুমুআহর ছালাত অনুষ্ঠিত হবার পর প্রথম জুমুআহর ছালাত অনুষ্ঠিত হয় বাহরাইনে জুওয়াসা নামক স্থানে অবস্থিত আবদুল কায়স গোত্রের মসজিদে। সহিহ বুখারি : ৮৯২

অতঃপর মসজিদে নববীতে জুমআ পড়া শুরু হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, এই বাহরাইন হলো মদিনার মহল্লা, বর্তমান রাষ্ট্র বাহরাইন নয়।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছেন যে, আমরা দুনিয়ায় (আগমনের দিক দিয়ে) সর্বশেষ, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা মর্যাদার ব্যাপারে সবার পূর্বে। ব্যতিক্রম এই যে, আমাদের পূর্বে তাদের কিতাব প্রদান করা হয়েছে। অতঃপর তাদের সে দিন যে দিন তাদের জন্য ইবাদত ফরজ করা হয়েছিল তারা এ বিষয়ে মতভেদ করেছে। কিন্তু সে বিষয়ে আল্লাহ্ আমাদের হিদায়াত করেছেন। কাজেই এ ব্যাপারে লোকেরা আমাদের পশ্চাদ্বর্তী। ইয়াহূদীদের (সম্মানীয় দিন হচ্ছে) আগামী কাল (শনিবার) এবং নাসারাদের আগামী পরশু (রোববার)। সহিহ বুখারি : ৮৭৬, সহিহ মুসলিম : ৮৫৫

আবদুর রহমান বিন কাব বিন মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতা (কাব বিন মালিক) (রাঃ) অন্ধ হয়ে গেলে আমি ছিলাম তার পরিচালক। আমি তাকে নিয়ে যখন জুমুআহ্‌র সালাত আদায় করতে বের হতাম, তিনি আযান শুনলেই আবূ উমামাহ আসআদ বিন যুরারাহ্ (রাঃ) এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং দুআ করতেন। আমি তাকে ক্ষমা প্রার্থনা ও দুআ করতে শুনে কিছুক্ষণ থামলাম, অতঃপর মনে মনে বললাম, আল্লাহর শপথ! কি বোকামী! তিনি জুমুআহর আযান শুনলেই আমি তাকে আবূ উমামাহ (রাঃ) -এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও দুআ করতে শুনি, অথচ আমি তাকে তার কারণ জিজ্ঞেস করিনি? আমি তাকে নিয়ে যেমন বের হতাম, তদ্রুপ একদিন তাঁকে নিয়ে জুমুআহ্‌র উদ্দেশে বের হলাম। তিনি যখন আযান শুনলেন তখন তা অভ্যাস মাফিক ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে পিতা! জুমুআহ্‌র আযান শুনলেই আমি কি আপনাকে দেখি না যে, আপনি আসআদ বিন যুরারাহ্ (রাঃ)  এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তা কেন? তিনি বলেন, প্রিয় বৎস! রসূলুল্লাহ ﷺ এর মাক্কাহ থেকে (মাদীনাহয়) আসার পূর্বে তিনিই সর্বপ্রথম বনূ বাইয়াদার প্রস্তরম সমতল ভূমিতে অবস্থিত নাকীউল খাযামাত-এ আমাদের নিয়ে জুমুআহ্‌র সালাত পড়েন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা তখন কতজন ছিলেন? তিনি বলেন, চল্লিশজন পুরুষ। ইবনে মাজাহ : ১০৮২, আবূ দাঊদ : ১০৬৯

২। জুমআর নামকরণঃ

আরবি শব্দ জুমুআ এর অর্থ হলো একত্রিত হওয়া, সমাবেশ করা বা সম্মেলন করা। ইয়াওমুল জুমআ বা শুক্রবার। আল্লাহর দুনিয়ায় সপ্তাহের সেরা দিন ইয়াওমুল জুমআ। মুসুল্লীদের জমায়েত হওয়ার কারণে এ দিনের নাম জুমআর দিন অর্থাৎ জমা হওয়ার দিন নাম করণ হয়ে আসছে।

এই দিনে মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর নির্দেশ পালনে ইবাদত উপলক্ষে মসজিদে একত্রিত হয় বলে দিনটিকে ইয়াওমুল জুমাআ বা জুমার দিন বলা হয়। কুরআনেও সে কথাটি ওঠে এসেছেঃ

يٰأَيُّهَا الَّذينَ ءامَنوا إِذا نودِىَ لِلصَّلوٰةِ مِن يَومِ الجُمُعَةِ فَاسعَوا إِلىٰ ذِكرِ اللَّهِ وَذَرُوا البَيعَ ۚ ذٰلِكُم خَيرٌ لَكُم إِن كُنتُم تَعلَمونَ

হে মুমিনগণ! জুমআর দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হবে তখন তোমরা আল্লাহর স্মরনে ধাবিত হও এবং ক্রয় বিক্রয় ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। সূরা জুমআ : ৯

আওস ইবনু আওস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, তোমাদের সর্বোত্তম দিনগুলোর মধ্যে জুমু’আহর দিনটি উৎকৃষ্ট। কাজেই এ দিনে তোমরা আমার প্রতি বেশী পরিমাণে দরূদ পাঠ করবে। কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়। বর্ণনাকারী বলেন, তারা বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের দরূদ আপনার কাছে কিভাবে উপস্থিত করা হবে অথচ আপনি তো মাটির সাথে মিশে যাবেন? বর্ণনাকারী বলেন, লোকেরা বললো, আপনি তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। তিনি (ﷺ) বললেনঃ নিশ্চয় আল্লাহ নবীদের দেহকে মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।সুনানে আবু দাউদ : ১৫৩১, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৪, রিয়াদুস সলেহিন : ১১৬৫

আওস ইবনু আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমুআহর দিন সর্বোত্তম। এদিনই আদম আলাইহিস সালাম কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এদিনই শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং এদিনই কিয়ামত সংঘটিত হবে। অতএব তোমরা এদিন আমার প্রতি অধিক সংখ্যায় দুরূদ ও সালাম পেশ করো। কেননা তোমাদের দুরূদ আমার সামনে পেশ করা হয়। এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের দুরূদ আপনার নিকট কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনি তো মাটির সাথে মিশে যাবেন? তিনি বলেনঃ আল্লাহ্ তাআলা নবী ﷺগণের দেহ ভক্ষণ যমীনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। ইবনু মাজাহ : ১৬৩৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ১০৪৭ আহমাদ : ১৫৭২৯

৩। জুমআ ও জোহরের মধ্যে পার্থক্যঃ

জুমআ ও যোহরের মধ্যে পাঁচটি পার্থক্য লক্ষ করা যায়ঃ

১. জোহর সকল বিবেক সম্পন্ন মুমিন নর-নারীর উপর ফরজ, আর জুমআ সকলের উপর ফরজ নয়।

২. জোহর হল মূল ছালাত, আর জুমআ হল জোহরের পরিবর্তে।

৩. জুমআর ছালাতে কিরআত স্বশব্দে পাঠ হয়, জোহরে কিরআত চুপে চুপে পাঠ করা হয়।

৪. জুমআর ফরজ দুই রাকাআত, আর জোহরের ফরজ চার রাকাআত।

৫. জুমআয় খুৎবা আছে কিন্তু জোহরে কোন খুৎবা নেই।

৪। জুমআর ছালাতের হুকুম

জুমআর ছালাত ফরজ তবে ঐ সব পুরুষদের জন্য, যাদের উপর জামাআতে ছালাত আদায় করা ওয়াজিব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يٰأَيُّهَا الَّذينَ ءامَنوا إِذا نودِىَ لِلصَّلوٰةِ مِن يَومِ الجُمُعَةِ فَاسعَوا إِلىٰ ذِكرِ اللَّهِ وَذَرُوا البَيعَ ۚ ذٰلِكُم خَيرٌ لَكُم إِن كُنتُم تَعلَمونَ

হে মুমিনগণ! জুমআর দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হবে তখন তোমরা আল্লাহর স্মরনে ধাবিত হও এবং ক্রয় বিক্রয় ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। (সূরা জুমআ : ৯

আযান হওয়া মাত্র সকল কাজ বাদ দিয়ে ছালাত আদায়কে সবকিছুর উপর গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিতে হবে। এখানে এই অর্থই বোঝানো হয়েছে। ছালাতে দৌড়ে আসতে হবে- এটা বুঝান হয়নি। কারণ দৌড়ে এসে ছালাতে শরীক হওয়ার ব্যপারে হাদীসে নিষেধাজ্ঞা আছে। ছালাতে আসতে হয় খুশু-খুযু, ভয়-ভীতি ও বিনয়ের সঙ্গে।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী ﷺ বলেন-

الْجُمُعَةُ عَلَى كُلِّ مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ ‏

যে ব্যক্তি জুমুআর আযান শুনতে পাবে, তার ওপর জুমুআর ছালাত ফরয হয়ে যায়। আবূ দাঊদ : ১০৫৬, মিশকাত ১৩৭৫, ইরওয়া ৫৯৩, দারাকুত্বনী ১৫৯০

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী ﷺ এমন লোক সম্পর্কে বলেছেন, যারা জুমুআর সলাতে উপস্থিত হয় না, তাদের সম্পর্কে আমি চিন্তা করে দেখেছি যে, আমি কাউকে আদেশ করব, সে আমার স্থানে লোকদের ইমামত করবে। আর আমি গিয়ে তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবো। সহিহ মুসলিম : ৬৫২, মিশকাতু : ১৩৭৮

৫। জুমআর ছালাত ফরজ হওয়ার শর্তঃ

নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূর্ণরূপে পাওয়া গেলে জুমা ফরজ হবেঃ

১. পূরুষ হওয়া, মহিলার উপর জুমা ফরজ নয়

২. স্বাধীন হওয়া দাসের উপর জুমা ফরজ নয়

৩. হাটা চলার শক্তি থাকা, চলা-ফিরায় অক্ষম ব্যাক্তির উপর জুমা ফরজ নয়

৪. সুস্থ্য হওয়া, রুগ্ন ব্যাক্তির উপর জুমা ফরজ নয়

৫. নিরাপদ হওয়া, জুলুম অত্যাচারের ভয় থাকলে তার উপর জুমা ফরজ নয়

৬. দৃষ্টি শক্তি থাকা, অন্ধের উপর জুমা ফরজ নয়

৭. শহরের বা শহরের হুকুমে পড়ে এমন স্থানের মুকিম হওয়া

যাদের উপর জুমআ ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তারা আদায় করলেও শুদ্ধ হবে, জোহরের নামাজ আদায় করতে হবে না। বরং তাদের জন্য জুমা মোস্তাহাব। কমপক্ষে কতজন মুসুল্লী হলে জুমআর ছালাত আদায় করা যায়। এই সম্পর্ক মতভেদ আছে। যেমন হানাফি মাজহাবের আলেমগণ জুমআ ফরজ হওয়ার শহরে অবস্থানকে শর্ত হিসাবে উল্লেখ করে থাকে। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখপূর্বক কোন হাদীস পাওয়া যায় না। তাই ইমাম ইবনে তাইমিয়াসহ (রহ.) বহু বিজ্ঞ আলেমদের মতে, ইমাম ব্যতীত কমপক্ষে ৩ জন হলেই যথেষ্ট। একজন খুৎবা দেবে, বাকী তিনজন শুনবে। যত ছোট গ্রামই হোক সেখানে জুমআ পড়া জায়েয আছে। সহিহ বুখারি : ৮৯৩

৬। জুমাআন দিনের গুরুত্ব, মহত্ব ও ফজিলতঃ

(১) জুমার দিনে পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়ঃ

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন-

مَنِ اغْتَسَلَ ثُمَّ أَتَى الْجُمُعَةَ فَصَلَّى مَا قُدِّرَ لَهُ ثُمَّ أَنْصَتَ حَتَّى يَفْرُغَ مِنْ خُطْبَتِهِ ثُمَّ يُصَلِّيَ مَعَهُ غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ الأُخْرَى وَفَضْلَ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ

যে ব্যক্তি গোসল করে জুমুআর সালাতে আসল, অতঃপর সাধ্যমত (সুন্নাত) সালাত আদায় করল, অতঃপর ইমামের খুতবাহ শেষ হওয়া পর্যন্ত নীরব থাকল, অতঃপর ইমামের সাথে সালাত আদায় করল, এতে তার দু’ জুমুআর মধ্যকার দিনসমূহের এবং আরো তিন দিনের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়। সহিহ মুসলিম : ৮৫৭, সুনানে তিরমিজি : ৪৯৮, সুনানে আবূ দাউদ : ১০৫০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১০৯০

আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে আরও বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

الصَّلاَةُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ مَا لَمْ تُغْشَ الْكَبَائِرُ ‏”

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমআ হতে পরের জুমআ পর্যন্ত, এক রমজান হতে অন্য রমযান পর্যন্ত, সেগুলির মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত (সগিরা) গুনাহর ক্ষমা করা হবে, যখন কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা যাবে। সহিহ মুসলিম : ২৩৩, সুনানে তিরমিজি : ২৪১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১০৭৬

সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে কোন ব্যক্তি জুমার দিন গোসল ও সাধ্যমত পবিত্রতা অর্জন করে, নিজসব তেল গায়ে লাগায় অথবা নিজ ঘরের সুগন্ধি (আতর) ব্যবহার করে, অতঃপর (মসজিদে) গিয়ে দুই জনের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি না করেই (যেখানে স্থান পায়, বসে যায়) এবং তার ভাগ্যে যত রাকআত নামায জোটে, আদায় করে। তারপর ইমাম খুতবা আরম্ভ করলে নীরব থাকে, সে ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট জুমআ থেকে পরবর্তী জুমআ পর্যন্ত কৃত সমুদয় (সগিরা) গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়। সহিহ বুখারি : ৮৮৩, ৯১০, সুনানে নাসায়ী : ১৪০৩

(২) সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হল জুমার দিনঃ

আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ فِيهِ الشَّمْسُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ فِيهِ خُلِقَ آدَمُ وَفِيهِ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ وَفِيهِ أُخْرِجَ مِنْهَا وَلاَ تَقُومُ السَّاعَةُ إِلاَّ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ

যে সব দিনে সূর্য উদয় হয় তার মধ্যে জুমুআর দিনই উত্তম। এ দিনেই আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিনেই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এ দিনই তাকে জান্নাত হতে বের করা হয়েছে। আর জুমুআর দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সহিহ মুসলিম : ৮৫৪, সুনানে তিরমিজি : ৪৮৮, ৪৯১, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৩, ১৪৩০, সহিহাহ : ১৫০২

আওস ইবনে আওস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমাদের দিনগুলির মধ্যে সর্বোত্তম একটি দিন হচ্ছে জুমার দিন। সুতরাং ঐ দিনে তোমরা আমার উপর বেশী বেশী দরূদ পাঠ কর। কেননা, তোমাদের পাঠ করা দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়। সুনানে আবূ দাউদ : ১০৪৭, ১৫৩১, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৬৩৬

(৩) জুমআর ছালাতের জন্য পুরস্কারঃ

 আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন নাপাকির গোসলের ন্যায় গোসল করল এবং  প্রথম অক্তে মসজিদে এল, সে যেন একটি উঁট দান করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় সময়ে এলো, সে যেন একটি গাভী দান করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় সময়ে এলো, সে যেন একটি শিংবিশিষ্ট দুম্বা দান করল। যে ব্যক্তি চতুর্থ সময়ে এলো, সে যেন একটি মুরগী দান করল। আর যে ব্যক্তি পঞ্চম সময়ে এলো, সে যেন একটি ডিম দান করল। তারপর ইমাম যখন খুতবা প্রদানের জন্য বের হন, তখন (লেখক) ফেরেশতাগণ যিকির শোনার জন্য হাজির হয়ে যান। সহিহ বুখারি : ৮৮১, ৯২৯, ৩২১১, সহিহ মুসলিম : ৮৫০, ১৮৬০, সুনানে তিরমিজি : ৪৯৯, সুনানে নাসায়ী : ৮৬৪, ১৩৭৫-১৩৮৮, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৫১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১০৯২ 

(৪) জুমআর দিনে বিশেষ মুহুর্তে দোয়া কবুল হয়ঃ

সালমান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতেই বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ذَكَرَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ فِيهِ سَاعَةٌ لاَ يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي يَسْأَلُ اللهَ تَعَالَى شَيْئًا إِلاَّ أَعْطَاهُ إِيَّاهُ وَأَشَارَ بِيَدِهِ يُقَلِّلُهَا.

রাসূলুল্লাহ ﷺ একদা জুমার দিন সম্বন্ধে আলোচনা করে বললেন, এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যে কোন মুসলিম বান্দা যদি এ সময় সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করে, তবে তিনি তাকে অবশ্যই তা দিয়ে থাকেন এবং তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত। সহিহ বুখারি : ৯৩৫, ৫২৯৪, ৬৪০০, সহিহ মুসলিম : ৮৫২, সুনানে তিরমিজি : ৪৯১, সুনানে নাসায়ী : ১৪৩০-১৪৩২, সুনানে আবূ দাউদ : ১০৪৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১১৩৭

আবূ বুরায়দাহ ইবনে আবূ মুসা আশআরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আপনি কি জুমার দিনের বিশেষ মুহূর্ত সম্পর্কে আপনার পিতাকে, রাসূলুল্লাহ ﷺ হতে বর্ণনা করতে শুনেছেন?’ তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আমি আল্লাহর রসূল ﷺকে এ কথা বলতে শুনেছি যে, “সেই মুহূর্তটুকু ইমামের মেম্বারে বসা থেকে নিয়ে নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়ের ভিতরে। সহিহ মুসলিম : ৮৫৩, সুনানে আবূ দাউদ : ১০৪৯

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, জুমুআর দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, সে মুহূর্তটি যদি কোন মুমিন বান্দা পায় আর আল্লাহর নিকট কোন কল্যাণ কামনা করে, আল্লাহ তা’আলা তাকে তা দান করেন। মুসলিম; অন্য এক বর্ণনায় ইমাম মুসলিম এ শব্দগুলোও নকল করেছেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, সে সময়টা খুবই ক্ষণিক হয়। বুখারী ও মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় এ শব্দগুলো বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: নিঃসন্দেহে জুমুআর দিনে এমন একটি ক্ষণ আসে যে ক্ষণে যদি কোন মুমিন বান্দা সলাতের জন্য দাঁড়াতে পারে এবং আল্লাহর নিকট কল্যাণের জন্য দুআ করে, তাহলে আল্লাহ তাকে অবশ্যই সে কল্যাণ দান করেন। সহিহ বুখারী : ৫২৯৪, সহহি মুসলিম : ৮৫২, সুনানে তিরমিজি ৪৯১, সুনানে নাসায়ী : ১৪৩১০, মিশকাত : ১৩৫৭

(৫) জুমাআর দিনে আদম (আঃ) কে সৃষ্টি করেন, জান্নাত থেকে বের করে দেন, দোয়া কবুল করেন এবং  কিয়ামাত সংঘটিত হবেঃ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমুআহর দিনই হচ্ছে সর্বোত্তম। আদম (আ) কে এদিনেই সৃষ্টি করা হয়েছিলো। এদিনই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিলো। এদিনই তাঁর তওবা কবুল হয়েছিলো। এদিনই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন এবং এদিনই ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) সংঘটিত হবে। জিন ও মানুষ ছাড়া প্রতিটি প্রাণী শুক্রবার দিন ভোর হতে সূর্যোদয় পর্যন্ত কিয়ামতের ভয়ে ভীত থাকে। এদিন এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, ছালাতরত অবস্থায় কোন মুসলিম বান্দা মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে কোন অভাব পূরণের জন্য দুআ করলে মহান আল্লাহ তাকে তা দান করেন। কাব বললেন, এ সময়টি প্রতি এক বছরে একটি জুমুআহর দিনে থাকে। আমি (আবূ হুরাইরাহ) বললাম, না, বরং প্রতি জামুআহর দিনেই থাকে। অতঃপর কাব (এর প্রমাণে) তাওরাত পাঠ করে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ সত্যই বলেছেন। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, অতঃপর আমি আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি অবহিত করি। সেখানে কাব (রাঃ) ও উপস্থিত ছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) বললেন, আমি দুআ কবুলের বিশেষ সময়টি সম্পর্ক জানি। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, আমাকে তা অবহিত করুন। তিনি বলেন, সেটি হলো জুমুআহর দিনের সর্বশেষ সময়। আমি (আবূ হুরাইরাহ) বললাম, জুমুআহর দিনের সর্বশেষ সময় কেমন করে হবে? অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ ’’যে কোন মুসলিম বান্দা ছালাতরত অবস্থায় ঐ সময়টি পাবে…। কিন্তু আপনার বর্ণনাকৃত সময়ে তো ছালাত আদায় করা যায় না। ’আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কি বলেননি, যে ব্যক্তি ছালাতের জন্য বসে অপেক্ষা করবে সে ছালাত আদায় না করা পর্যন্ত ছালাতরত বলে গণ্য হবে। আবূ হুরাইরাহ বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ। ’আবদুল্লাহ ইবনু সালাম (রাঃ) বললেন, তা এরূপই। সুনানে আবু দাউদ : ১০৪৬, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭২, সুনানে তিরমিজি : ৪৯১

(৬) জুমআর দিন হল সাপ্তাহিক ঈদের দিনঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ هَذَا يَوْمُ عِيدٍ جَعَلَهُ اللَّهُ لِلْمُسْلِمِينَ فَمَنْ جَاءَ إِلَى الْجُمُعَةِ فَلْيَغْتَسِلْ وَإِنْ كَانَ طِيبٌ فَلْيَمَسَّ مِنْهُ وَعَلَيْكُمْ بِالسِّوَاكِ ‏

নিশ্চয় আল্লাহ এই দিনকে মুসলিমদের ঈদের দিনরূপে নির্ধারণ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি জুমুআহর আদায় করতে আসবে সে যেন গোসল করে এবং সুগন্ধি থাকলে তা শরীরে লাগায়। আর মিসওয়াক করাও তোমাদের কর্তব্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১০৯৮, মুযাত্তা মালিক : ১৪৬, মিশকাত : ১৩৯৮, ১৩৯৯

(৭) জুমআর দিনটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার চেয়েও শ্রেষ্ঠঃ

আবূ লুবাবা ইবনু আবদুল মুনযির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, জুমুআহর দিন হলো সপ্তাহের দিনসমূহের নেতা এবং তা আল্লাহ্‌র নিকট অধিক সম্মানিত। এ দিনটি আল্লাহ্‌র নিকট কুরবানীর দিন ও ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়ে অধিক সম্মানিত। এ দিনে রয়েছে পাঁচটি বৈশিষ্ট্যঃ এই দিন আল্লাহ আদম (আলাইহিস সালাম) কে সৃষ্টি করেন, এ দিনই আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীতে পাঠান এবং এ দিনই আল্লাহ তাঁর মৃত্যু দান করেন। এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোন বান্দা তখন আল্লাহ্‌র নিকট কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তাকে তা দান করেন, যদি না সে হারাম জিনিসের প্রার্থনা করে এবং এ দিনই ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) সংঘটিত হবে। নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতাগণ, আসমান-যমীন, বায়ু, পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্র সবই জুমুআহর দিন শংকিত হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১০৮৪, আহমাদ : ১৫১২০, মিশকাত : ১৩৬৩

(৮) জুমআর রাতে বা দিনে কেউ মারা গেলে তাকে কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করা হবেঃ

আদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلاَّ وَقَاهُ اللَّهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ

জুমুআর দিনে অথবা জুমুআর রাতে কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করে তাহলে কবরের ফিতনা হতে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন। সুনানে তিরমিজি : ১০৭৪, মিশকাত : ১৩৬৭

(৯) জান্নাতে প্রতি জুমআর দিনে জান্নাতীদের হাট বসবেঃ

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ জান্নাতে একটি বাজার থাকবে। প্রত্যেক জুমুআয় জান্নাতী লোকেরা এতে একত্রিত হবে। তারপর উত্তরদিকের বায়ু প্রবাহিত হয়ে সেখানকার ধূলা-বালি তাদের মুখমণ্ডল ও পোশাক-পরিচ্ছদে গিয়ে লাগবে। এতে তাদের সৌন্দর্য এবং শরীরের রং আরো বেড়ে যাবে। তারপর তারা স্ব স্ব পরিবারের কাছে ফিরে আসবে। এসে দেখবে, তাদের শরীরের রং এবং সৌন্দর্যও বহু বৃদ্ধি পেয়েছে। এরপর তাদের পরিবারের লোকেরা বলবে, আল্লাহর শপথ আমাদের নিকট হতে যাবার পর তোমাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরে তারাও বলবে, আল্লাহর শপথ! তোমাদের শরীরের সৌন্দর্য তোমাদের নিকট থেকে যাবার পর বহুগুণে বেড়ে গেছে। ণে বেড়ে যাবে এবং তাদের স্ত্রীরা তা দেখে অভিভূত হবে। অনুরূপ সৌন্দর্য বৃদ্ধি স্ত্রীদের বেলায়ও হবে। সহিহ মুসলিম : ২৮৩৩

(১০) জুমার সালাত ত্যাগ করলে অন্তরে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবেঃ

আবদুল্লাহ ইবনু উমার ও আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তারা উভয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তার মিম্বারের সিড়িতে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন-

لَيَنْتَهِيَنَّ أَقْوَامٌ عَنْ وَدْعِهِمُ الْجُمُعَاتِ أَوْ لَيَخْتِمَنَّ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ ثُمَّ لَيَكُونُنَّ مِنَ الْغَافِلِينَ ‏

যারা জুমুআর সালাত ত্যাগ করে তাদেরকে এ অভ্যাস বর্জন করতে হবে। নতুবা আল্লাহ তাদের অন্তরে সীল মেরে দিবেন, অতঃপর তারা গাফিলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। সহিহ মুসলিম : ৮৬৫, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৭৯৪, ১১২৭

৭। জুমআর দিনের কিছু সুন্নাহ সম্মত আমলঃ

(১) জুমআর দিন মিসওয়াক করাঃ

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন,

لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلاَةٍ.

আমার উম্মাতের জন্য বা তিনি বলেছেন, লোকদের জন্য যদি কঠিন মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেক সালাতের সাথে তাদের মিসওয়াক করার হুকুম করতাম। সহিহ বুখারি : ৮৮৭, ৭২৪০, সহিহ মুসলিম : ২৫

(২) জুমআর দিন গোসল করাঃ

আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল বলেছেন,

إِذَا جَاءَ أَحَدُكُمْ الْجُمُعَةَ فَلْيَغْتَسِلْ.

তোমাদের মধ্যে কেউ জুমু‘আহর সালাতে আসলে সে যেন গোসল করে। সহিহ বুখারি : ৮৭৭, ৮৯৪, ৯১৯, সহিহ মুসলিম : ৮৪৪, ৪৫৫৩

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, ‘‘যে ব্যক্তি জুমুআর সালাতে আসবে সে যেন গোসল করে। সহিহ বুখারি : ৮৯৪

(৩) জুমআর দিন উত্তম পোশাক পরিধান করাঃ

আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেনঃ যে ব্যক্তি জুমুআহর দিন উত্তমরূপে গোসল করে, উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে, তার উৎকৃষ্ট পোশাক পরিধান করে এবং আল্লাহ তার পরিবারের জন্য যে সুগন্ধির ব্যবস্থা করেছেন, তা শরীরে লাগায়, এরপর জুমুআহর সালাতে এসে অনর্থক আচরণ না করে এবং দুজনের মাঝে ফাঁক করে অগ্রসর না হয়, তার এক জুমুআহ থেকে পরবর্তী জুমুআহর মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হয়। সুনানে  ইবনে মাজাহ : ১০৯৭

(৪). জুমআর দিন সুগন্ধি ব্যবহার করাঃ

আমর ইবনু সুলাইম আনসারী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, আমি এ মর্মে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন,

الْغُسْلُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ، وَأَنْ يَسْتَنَّ وَأَنْ يَمَسَّ طِيبًا إِنْ وَجَدَ ‏”‏‏.‏ قَالَ عَمْرٌو أَمَّا الْغُسْلُ فَأَشْهَدُ أَنَّهُ وَاجِبٌ، وَأَمَّا الاِسْتِنَانُ وَالطِّيبُ فَاللَّهُ أَعْلَمُ أَوَاجِبٌ هُوَ أَمْ لاَ، وَلَكِنْ هَكَذَا فِي الْحَدِيثِ

জুমআর দিন প্রত্যেক বালিগের জন্য গোসল করা কর্তব্য। আর মিসওয়াক করবে এবং সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে। আমর ইবনু সুলায়ম রহ. বলেন, গোসল সম্পর্কে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তা ওয়াজিব। কিন্তু মিসওয়াক ও সুগন্ধি ওয়াজিব কিনা তা আল্লাহই ভাল জানেন। তবে হাদীসে এ রকমই আছে। সহিহ বুখারি ৮৮০, সহিহ মুসলিম ৮৪৬

(৫) জুমআর দিন চুলে তেল ব্যবহার করাঃ

(৬) লোকের মাঝে ফাঁক না রেখে বসাঃ

(৭) ইমামের খুৎবার সময় চুপ থাকাঃ

সালমান ফারিসী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন,

‏ لاَ يَغْتَسِلُ رَجُلٌ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، وَيَتَطَهَّرُ مَا اسْتَطَاعَ مِنْ طُهْرٍ، وَيَدَّهِنُ مِنْ دُهْنِهِ، أَوْ يَمَسُّ مِنْ طِيبِ بَيْتِهِ ثُمَّ يَخْرُجُ، فَلاَ يُفَرِّقُ بَيْنَ اثْنَيْنِ، ثُمَّ يُصَلِّي مَا كُتِبَ لَهُ، ثُمَّ يُنْصِتُ إِذَا تَكَلَّمَ الإِمَامُ، إِلاَّ غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ الأُخْرَى

যে ব্যক্তি জুমু‘আহর দিন গোসল করে এবং যথাসাধ্য ভালরূপে পবিত্রতা অর্জন করে ও নিজের তেল হতে ব্যবহার করে বা নিজ ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে, অতঃপর বের হয় এবং দু’জন লোকের মাঝে ফাঁক না করে, অতঃপর তার নির্ধারিত সালাত আদায় করে এবং ইমামের খুৎবা দেয়ার সময় চুপ থাকে, তা হলে তার সে জুমু‘আহ হতে আরেক জুমু‘আহ পর্যন্ত সময়ের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। সহিহ বুখারি : ৮৮৩, ৮৮৪, ৮৮৫, ৯১০

(৮) কারো বসার স্থান হতে উঠিয়ে নিজে সে স্থানে বসা যাবে নাঃ

ইবনু উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

نَهَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُقِيمَ الرَّجُلُ أَخَاهُ مِنْ مَقْعَدِهِ وَيَجْلِسَ فِيهِ‏.‏ قُلْتُ لِنَافِعٍ الْجُمُعَةَ قَالَ الْجُمُعَةَ وَغَيْرَهَ

নবী ﷺ নিষেধ করেছেন, যেন কেউ তার ভাইকে স্বীয় বসার স্থান হতে উঠিয়ে দিয়ে নিজে সে জায়গায় না বসে। ইবনু জুরাইজ (রহ.) বলেন, আমি নাফি রহ. কে জিজ্ঞেস করলাম, এ কি শুধু জুমু‘আহর ব্যাপারে? তিনি বললেন, জুমআহ ও অন্যান্য (সালাতের) ব্যাপারেও। সহিহ বুখারি : ৯১১, ৬২৬৯, ৬২৭০

(৯) মিম্বারের উপর দাড়িয়ে খুৎবাহ দেয়া এবং দুই খুৎবার মাঝে বসাঃ

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ عَلَى الْمِنْبَرِ فَقَالَ ‏ “‏ مَنْ جَاءَ إِلَى الْجُمُعَةِ فَلْيَغْتَسِلْ ‏”‏‏.‏

আমি নবী ﷺ কে মিম্বারের উপর হতে খুৎবাহ দিতে শুনেছি। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমআর সালাতে আসে সে যেন গোসল করে নেয়।  সহিহ বুখারি : ৯১৯

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ দাঁড়িয়ে খুৎবাহ দিতেন। অতঃপর বসতেন এবং পুনরায় দাঁড়াতেন। যেমন তোমরা এখন করে থাক। সহিহ বুখারি : ৯২০, সহিহ মুসলিম : ৮৬১

আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ দু’খুৎবাহ দিতেন আর দু’ খুৎবাহর মধ্যখানে বসতেন। সহিহ বুখারি : ৯২৮

(১০) জুমার খুতবার সময় হাটির উপর কাপড় জড়িয়ে বসা যাবে নাঃ

সাহল ইবনু মু’আয ইবনু আনাস (রাঃ) হতে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত।

أَنَّ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنِ الْحُبْوَةِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالإِمَامُ يَخْطُبُ

রাসূলুল্লাহ ﷺ জুমু’আহর দিন ইমামের খুত্ববাহ চলাকালে কাউকে হাঁটু উপরে উঠিয়ে কাপড় জড়িয়ে বসতে নিষেধ করেছেন। সনানে আবু দাউদ : ১১১০, সুনানে তিরমিজি : ৫১৪,  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১১৩৪

(১১) জুমার খুতবার সময় মসজিদে প্রবেশ করলেও দুই রাকাত সালাত করে বাসঃ

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

جَاءَ رَجُلٌ وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ النَّاسَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ ‏”‏ أَصَلَّيْتَ يَا فُلاَنُ ‏”‏‏.‏ قَالَ لاَ‏.‏ قَالَ ‏”‏ قُمْ فَارْكَعْ ‏

কোন এক) জুমার দিন নবী ﷺ লোকদের সামনে খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি আসলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে অমুক! তুমি কি সালাত আদায় করেছ? সে বলল, না; তিনি বললেন, উঠ, সালাত আদায় করে নাও। (সহিহ বুখারি : ৯৩০, ৯৩১, ১১৬৬, সহিহ মুসলিম ৮৭৫)

(১২)  খুতবা চলা কালে কাউকে চুপ থাকতেও বলা যাবে নাঃ

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‏ إِذَا قُلْتَ أَنْصِتْ وَالإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ ‏

 ইমামের খুতবা দেয়ার সময় যদি তুমি কাউকে চুপ থাকতেও বল, তবে তুমি বেহুদা কাজ করলে। সুনানে আবু দাউদ : ১১১২

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ইমামের খুতবাহ দানরত অবস্থায় তুমি যদি তোমার সাথীকে বল, ‘চুপ কর’ তবে তুমি অনৰ্থক কাজ করল। সহিহ মুসলিম : ১৮৫০

(১৩) জুমআর দিন আগে ভাগে মসজিদে যাওয়াঃ

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমু‘আহর দিন জানাবাত গোসলের ন্যায় গোসল করে এবং সালাতের জন্য আগমন করে সে যেন একটি উট কুরবানী করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করে সে যেন একটি গাভী কুরবানী করল। তৃতীয় পর্যায়ে যে আগমন করে সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানী করল। চতুর্থ পর্যায়ে আগমন করল সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। পঞ্চম পর্যায়ে যে আগমন করল সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল। পরে ইমাম যখন খুৎবা দেয়ার জন্য বের হন তখন মালাইকাহ যিকর শ্রবণের জন্য উপস্থিত হয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ৮৮১, সহিহ মুসলিম : ৮৫০

(১৪) জুমআর দিনে পায়ে হেঁটে মসজিদে গমন

আওস ইবনু আওস আস সাকাফী (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি জুমুআর দিন গোসল করবে এবং (স্ত্রীকেও) গোসল করাবে, প্রত্যুষে ঘুম থেকে জাগবে এবং জাগাবে, জুমুআর জন্য বাহনে চড়ে নয় বরং পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে এবং কোনরূপ অনর্থক কথা না বলে ইমামের নিকটে বসে খুতবা শুনবে, তার (মসজিদে যাওয়ার) প্রতিটি পদক্ষেপ সুন্নাত হিসেবে গণ্য হবে এবং প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে সে এক বছর যাবত সিয়াম উদ্‌যাপন ও রাতভর সালাত আদায়ের (সমান) সাওয়াব পাবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৫, সুনানে তিরমিজি : ৪৯৬, সুনানে নাসায়ী : ১৩৮০, ইবনে মাজাহ ১০৮৭)

(১৫) জুমার দিন ও জুমার রাতে বেশি বেশি দুরুদ পাঠ

শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের সর্বোত্তম দিন হলো জুমুআহর দিন। এ দিন আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে এবং তাতে বিকট শব্দ হবে। অতএব তোমরা এ দিন আমার উপর প্রচুর পরিমাণে দুরূদ পাঠ করো। তোমাদের দুরূদ অবশ্যই আমার নিকট পেশ করা হয়। এক ব্যক্তি বলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! কিভাবে আমাদের দুরূদ আপনার নিকট পেশ করা হবে, অথচ আপনি তো অচিরেই মাটির সাথে একাকার হয়ে যাবেন? তিনি বলেন, আল্লাহ নবীগণের দেহ ভক্ষণ মাটির জন্য হারাম করেছেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১০৮৫, সুনানে আবু দাউদ : ১০৪৭, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৩

(১৬) জুমআর দিনে বিশেষ মুহূর্তের জন্ড বেশি বেশি দোয়া করা

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ذَكَرَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ فِيهِ سَاعَةٌ لاَ يُوَافِقُهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي يَسْأَلُ اللهَ تَعَالَى شَيْئًا إِلاَّ أَعْطَاهُ إِيَّاهُ وَأَشَارَ بِيَدِهِ يُقَلِّلُهَا

রাসূলুল্লাহ ﷺ জুমআর দিন সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং বলেন, এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যে কোন মুসলিম বান্দা যদি এ সময় সালাতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করে, তবে তিনি তাকে অবশ্যই তা দিয়ে থাকেন এবং তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত। সহিহ বুখারি : ৯৩৫, ৫২৯৪, ৬৪০০, সহিহ মুসলিম : ৮৫২

(১৭) খুতবার সময় ইমামের কাছাকাছি বসা

সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন,

احْضُرُوا الذِّكْرَ وَادْنُوا مِنَ الإِمَامِ فَإِنَّ الرَّجُلَ لَا يَزَالُ يَتَبَاعَدُ حَتَّى يُؤَخَّرَ فِي الْجَنَّةِ وَإِنْ دَخَلَهَا

 তোমরা নসীহতের সময় উপস্থিত থাকবে এবং ইমামের নিকটবর্তী হবে। কারণ যে ব্যক্তি সর্বদা (উপদেশ হতে) দূরে থাকে সে জান্নাতবাসী হলে জান্নাতেও বিলম্বে যাবে। সুনানে আবু দাউদ : ১১০৮

(১৮) জুমার দিন সূরা কাহফ তিলওয়াত করাঃ

আবূ সাঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন,

من قَرَأَ سُورَة الْكَهْف فِي يَوْم الْجُمُعَة أَضَاء لَهُ النُّور مَا بَيْنَ الْجُمْعَتَيْنِ

যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা আল কাহাফ পড়বে, তার (ঈমানের) নূর এ জুমাহ্ হতে আগামী জুমাহ পর্যন্ত চমকাতে থাকবে। মিশকাত : ২১৭৫, বাইহাকি, সুনানে কুবরা : ৫৯৯৬, ইরওয়া ৬২৬, সহিহ আল জামি : ৬৪৭০

(১৯) জুমআর সালাতের পর চার রাকাত সুন্নাত সালাতঃ

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مُصَلِّيًا بَعْدَ الْجُمُعَةِ فَلْيُصَلِّ أَرْبَعًا ‏.‏ وَلَيْسَ فِي حَدِيثِ جَرِيرٍ”‏ مِنْكُمْ

তোমাদের কেউ যখন জুমুআর সালাত আদায় করে, তখন সে যেন তার পরে চার রাকাআত (সুন্নাত) সালাত আদায় করে। সহিহ মুসলিম : ৮৮১, সুনানে আবু দাউদ ১১৩০

যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত-০৪ ::  আরাফার ও অন্যান্য কিছু দিবস

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

জিলহজ মাসের নয় তারিখকে আরাফার দিন বলা হয়। এই দিনে আরাফারের ময়দানে হাজিদের অবস্থান করা সর্বসম্মতিতে ফরজ। যতি কেউ জিলহজ মাসের নয় তারিখ আরাফায় অবস্থান না করে হজের সকল কাজ সমাধা করে তবেও তার হজ্জ হবে না। কোন প্রকার দম দিয়াও এর ক্ষতি পূরণ হবে না। আর যারা হজ করার জন্য আরাফাতের ময়দানে হাদির হবে না তাদের এই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করা সুন্নাহ। যারা হজের নিয়তে মিনায় সমবেত হয়েছে তারা এই দিন সকালে মিনায় ফরজের সালাত আদায় করে। সূর্য় উদয়ের পর আস্তে আস্তে আরাফার দিকে রওয়ানা দিবে। এই সময় হেঁটেই আরাফায় যাওয়া সুন্নাহ তবে বাহন ব্যবহার করায় কোন ক্ষতি নাই। অনেক সময় দেখা যায় মহিলা ও মাজুর হাজিগণ আট তারিখ দিবাগত রাত্রিতে গাড়িতে করে আরাফার ময়দানে যায়। উজর বসত যাওয়া সঠিক হলেও অনেকেই সময় সুযোগ থাকা সত্বেও মাজুরদের সাথে রাত্রিতে আরাফাতের ময়দানে যায়, যা সু্ন্নাহ সম্মত নয়। অথচ আরাফাত দিনের আগে রাতে রসুলুল্লাহ (সা.) ছিল মিনায় রাত্রি জাপন করেছেন। এই আমলটি করা মুস্তহাব।

১। আরাফার দিনে মর্যাদা ও ফযীলত

(১) মহান আল্লাহ এই দিনে জাহান্নাম থেকে অধিক সংখ্যা বান্দাকে মুক্তি দেন।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللَّهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِي بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُولُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ ‏আরাফাহ দিবসের তুলনায় এমন কোন দিন নেই। যে দিন আল্লাহ তা’আলা সর্বাধিক সংখ্যক লোককে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন। আল্লাহ তা’আলা নিকটবতী হন, অতঃপর বান্দাদের সম্পর্কে মালায়িকার সামনে গৌরব প্রকাশ করেন এবং বলেন, তারা কী উদ্দেশে সমবেত হয়েছে? সহিহ মুসলিম ১৩৪৮, ইবনু মাজাহ : ৩০১৪, সুনানে নাসায়ী ৩০০৩

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ “জ্বিলহজ মাসের দশ দিন থেকে উত্তম আল্লাহর নিকট কোন দিন নেই”। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল, এ দিনগুলোই উত্তম, না এ দিনগুলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদসহ উত্তম? তিনি বললে,  “জিহাদ ছাড়াই এগুলো উত্তম। আল্লাহর নিকট আরাফার দিন থেকে উত্তম কোন দিন নেই, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন অতঃপর জমিনে বাসকারীদের নিয়ে আসমানে বাসকারীদের সাথে গর্ব করেন। তিনি বলেন, আমার বান্দাদের দেখ, তারা হজ্জের জন্য এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় দূর-দিগন্ত থেকে এসেছে। তারা আমার রহমত আশা করে, অথচ তারা আমার আযাব দেখে নাই। সুতরাং এমন কোনো দিন দেখা যায় না যাতে আরাফার দিনের তুলনায় জাহান্নাম থেকে অধিক মুক্তি পায়”। (সহিহ হাদিসে কুদসি ১০১)

(২) ফেরেশতাদের কাছে বান্দার ব্যাপারে গর্ব করে এবং প্রশ্ন করেন, তারা কি চায়?

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ يُبَاهِي بِأَهْل عَرَفَاتْ مَلَائِكَة السْمَاءِ فَيَقُولُ: انْظُرُوا إِلَى عِبَادِي جَاَءُونِي شُعْثًا غُبْرًا

আল্লাহর তাআলা আরাফার লোকদের নিয়ে আসমানের ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন, তিনি বলেন, আমার বান্দাদের দেখ তারা এলোমেলো চুল ও ধূলিময় অবস্থায় আমার কাছে এসেছে”। সহিহ হাদিসে কুদসি : ১০২, সহিহ ইবনে হিব্বান

(৩) আরাফার দিনে মৃত ব্যক্তিকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠান হবে

ইব্‌নু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আরাফাতের মাঠে নবী (সা.) এর সাথে অবস্থান করছিলেন, আকস্মাৎ তিনি তাঁর সওয়ারী হতে পড়ে গেলে তাঁর ঘাড় ভেঙ্গে যায় অথবা সওয়ারীটি তার ঘাড় ভেঙ্গে দেয়। (ফলে তিনি মারা যান)। এরপর নবী ﷺ বললেন, তোমরা তাকে কুলগাছের পাতা দিয়ে সিদ্ধ পানি দ্বারা গোসল করাও এবং দুই কাপড়ে কাফন দাও। তবে তার শরীরে সুগন্ধি মাখাবে না আর তার মাথা ঢাকবে না এবং হানূতও লাগাবে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামাতের দিনে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠাবেন। সহিহ বুখারি : ১৮৫০, সহহি মুসলিম : ২৭৮২)

২। আরাফার ময়দানে হাজীদের করণীয়ঃ

এক নজরে এই দিনে হাজীদের করণীয় আমল।

(১) মসজিদে নামিরার নিকটে অবস্থান করাঃ

ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আরাফার দিন ভোরে ফাজ্‌রের সলাত আদায় করেই রওয়ানা করে আরাফাতে এসে পৌঁছে ‘নামিরাহ’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। এটা আরাফার সেই স্থান যেখানে ইমাম অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর যুহর সলাতের ওয়াক্ত হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাড়াতাড়ি সলাতের জন্য রওয়ানা হলেন এবং যুহর ও ‘আসরের সলাত একত্রে আদায় করে লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন, তারপর সেখান থেকে প্রস্থান করে আরাফার ময়দানের অবস্থান স্থলে অবস্থান গ্রহণ করেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৯১৩

রাসুলূল্লাহ ﷺ আরাফার ময়দানের নামিরা নামক স্থানে তাঁর জন্য তাবু তৈরি করা অবস্থায় পেলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করলেন। এই কারনে আরাফায় পৌঁছে মসজিদে ‘নামিরা’র কাছে অবস্থান করা মুস্তাহাব বা উত্তম। সেখানে জায়গা না পেলে আরাফার সীমানার ভিতরে যে কোন স্থানে অবস্থান করতে পারেন। এতে কোন অসুবিধা নেই।

(২) আরাফার ময়দানের বাহিরে অবস্থান না করাঃ

আবদুর রহমান ইবন ইয়ামুর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তাঁর কাছে কয়েকজন লোক এসে তাকে হজ্জ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন-

الْحَجُّ عَرَفَةُ، فَمَنْ أَدْرَكَ لَيْلَةَ عَرَفَةَ قَبْلَ طُلُوعِ الْفَجْرِ مِنْ لَيْلَةِ جَمْعٍ، فَقَدْ تَمَّ حَجُّهُ»

হজ্জ হলো আরাফায় অবস্থান। অতএব যে ব্যক্তি আরাফার রাত পেয়েছে মুযদালাফার রাতের পূর্বে, তার হজ্জ পূর্ণ হয়েছে। সুনানে নাসাঈ : ৩০১৯

আরাফাতের একটি সীমা দেয়া আছে, এর বাহিরে কোন হাজি অবস্থান করলে তার হজ্জ শুদ্ধ হবে না।

(৩) আরাফাতে সালাত জমা করাঃ

আবূ আইয়ুব আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم جَمَعَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ بِالْمُزْدَلِفَةِ

আল্লাহর রাসূল ﷺ বিদায় হাজ্জের সময় মুযদালিফায় মাগরিব এবং ইশা একত্রে আদায় করেছেন। সহিহ বুখারি : ১৬৭৪

ইবনু উমর (রা.) ইমামের সাথে সালাত আদায় করতে না পারলে উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। যে বছর হাজ্জাজ ইব্‌নু ইউসুফ ইব্‌নু যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সে বছর তিনি আবদুল্লাহ (রা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, আরাফার দিনে উকূফের সময় আমরা কিরূপে কাজ করব? সালিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসরণ করতে চান তাহলে আরাফার দিনে দুপুরে সালাত আদায় করবেন। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বলেন, সালিম ঠিক বলেছে। সুন্নাত মুতাবিক সাহাবীগণ যুহর ও আসর এক সাথেই আদায় করতেন। আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল ﷺ ও কি এরূপ করেছেন? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তোমরা কি আল্লাহর রাসূল ﷺ এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কারো অনুসরণ করবে? সহিহ বুখারি : ১৬৬২

(৪)। আরাফার ময়দানে বেশী বেশী দোয়া এবং জিকির করাঃ

আরাফার ময়দানে অবস্থান কালে হাজ্জিদের প্রধান কাজই হলো দোয়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহ অনুগ্রহ তালাস করা। এই দিনে মহান আল্লাহর ক্ষমা প্রদানে ঘোষনা আছে। তাই, ক্ষমা প্রাপ্তির জন্য এই দিনে দোয়ার পাশাপাশি আল্লাহ প্রশংসাসহ জিকির এবং কুনআন তিলওয়াত মাধ্যমে অতিবাহিত করা উত্তম।

উসামা ইবন যায়দ (রা.) বলেন-

كُنْتُ رَدِيفَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَفَاتٍ، فَرَفَعَ يَدَيْهِ يَدْعُو، فَمَالَتْ بِهِ نَاقَتُهُ، فَسَقَطَ خِطَامُهَا فَتَنَاوَلَ الْخِطَامَ بِإِحْدَى يَدَيْهِ، وَهُوَ رَافِعٌ يَدَهُ الْأُخْرَى

আমি আরাফায় রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর সঙ্গে একই বাহনে সাওয়ার ছিলাম। তিনি দুয়ায় উভয় হাত উত্তোলন করলেন। এমন সময় তার উট তাঁকে নিয়ে একদিকে হেলে গেল, ফলে তার নাকের রশি পড়ে যেতে লাগলো, তিনি তাঁর এক হাতে তা ধরে ফেললেন, এ সময় তাঁর অন্য হাত উঠানোই ছিল। সুনানে নাসাঈ ৩০১১

হাদীসে বর্ণিত রাসূল ﷺ এর বাক্যে দোয়া করা উত্তম কারন, এই দোয়াগুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং অধিক উপকারী। তবে বান্দা ইচ্ছা মনের আবেগ দিয়ে তার নিজ নিজ মাতৃভাষায় দোয়া করতে পারে। এতে করে তার চাহিদামত দোয়া করা সম্বব হবে। আরাফাতের ময়দানে প্রধাণ আমলই হলো, দোয়া ও জিকির।  আরাফার ময়দানে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ হাত তুলে দোয়া করেছেন। এই স্থান অনেক কে দেখা যায় দোয়া না করে নফল সালাত আদায় করে থাকে। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বা  সাহাবিদের থেকে এই আমলের প্রমান পাওয়া যায়। বরং এই স্থানে জোহর ও আসর সালাত কে জমা করে আদায় করার বিধান দেয়া হয়েছে। তাই নফল সালাত আদায় করা ঠিন নয়। আরাফা হল দোয়া কবুলের স্থান। তাই এখানে হাত তুলে একাকী দোয়া করতে হবে। এখানে তাবলীগের বিশ্ব ইজতিমার মত সম্মিলিত দোয়া কোন ব্যবস্থা করা হয় না কারন এখান একাকী দোয়া করাই সুন্নাহ সম্মত আমল। কিন্তু দোয়ার সময় একটি বিষয় খুব লক্ষ করবেন। যেন কোন অবস্থায়ই কিবলাকে পিছনে রেখে জাবালে আরাফার দিকে মুখ করে দুআ করা যাবে না।

৩। যারা আরাফাতে অবস্থান করবেন তাদের আমলঃ

আরাফার দিনের সিয়াম উদ্‌যাপন একটি সুন্নাহ সম্মত ও ফজিলত পূর্ণ আমল কিন্তু এই দিনের সিয়ামের অনেক ফজিলত হলেও হাজিগণ যারা এই দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করবেন তারা রাখতে পারবেন না। কেননা এই দিনে প্রকাশ্যে সিয়াম ভঙ্গ করে উম্মতে দেখিয়েন। আর যারা হজে গমন করেন নাই, তারা নিজ নিজ স্থান থেকে এই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করবে।

আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالَّتِي بَعْدَهُ

আমি আল্লাহর নিকট আরাফাত দিবসের রোযার এই সওয়াব আশা করি যে, তিনি তাঁর বিনিময়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৭৩০, সুনানে তিরমিজি : ৭৪৯, সুনানে আবু দাউদ : ২০৯৬, আহমাদ : ২২০২৪

উম্মু ফাযল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

شَكَّ النَّاسُ يَوْمَ عَرَفَةَ فِي صَوْمِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَبَعَثْتُ إِلَى النَّبِيِّ بِشَرَابٍ فَشَرِبَهُ

আরাফার দিনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিয়াম এর ব্যাপারে লোকজন সন্দেহ করতে লাগলেন। তাই আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট শরবত পাঠিয়ে দিলাম। তিনি তা পান করলেন। সহিহ বুখারি : ১৬৫৮

মায়মূনাহ (রা.) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ النَّاسَ شَكُّوا فِي صِيَامِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَرَفَةَ فَأَرْسَلَتْ إِلَيْهِ بِحِلاَبٍ وَهُوَ وَاقِفٌ فِي الْمَوْقِفِ فَشَرِبَ مِنْهُ وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ

কিছু সংখ্যক লোক ‘আরাফাতের দিনে আল্লাহ্‌র রসূল ﷺ এর সিয়াম উদ্‌যাপন সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি স্বল্প পরিমাণ দুধ আল্লাহর রসূল ﷺ এর নিকট পাঠিয়ে দিলে তিনি তা পান করলেন ও লোকেরা তা প্রত্যক্ষ করছিল। তখন তিনি (‘আরাফাতে) অবস্থান স্থলে ওকূফ করছিলেন। সহিহ বুখারি ১৯৮৯, সহিহ মুসলিম : ১১২৪

নোট- আমাদের উপমহাদেশে আরাফাতের সিয়ামের তারিখ নিয়ে মতভেদ দেখা যায়। আমাদের দেশে সাধারণ চন্দ্র মাসের তারিক সৌদি আরব থেকে একদিন পিছিয়ে থাকে। এই কারনে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা সৌদি আরবের একদিন পর উদযাপিত হয়ে থাকে। এই কারনে আমাদের দেশের অনেক আলেম মতামত দিয়েছেন। সৌদি আরবে যে দিন আরাফার ময়দানে হাজিগণ অবস্থান করবে তার একদিন পর অর্থাৎ সৌদির দশ আর আমাদের দেশে নয় জিলহজ তারিখে আরাফার সিয়াম উদ্‌যাপন করতে হবে। আরেক দল আলেম বলছেন যে যেহেতু আমরা জানতে পারছি যে সৌদির নয় জিলহজ ও আমাদের দেশে আট জিলহজ হাজিরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছি তাই এই দিনেই আরাফার সিয়াম উদ্‌যাপন করতে হবে।

প্রথম পক্ষের একটি দাবি- যেহতু আমরা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা সৌদি আরবের একদিন পর উদ্‌যাপন করি তাই আরাফার সিয়ামও একদিন পর আদায় কবর।

দ্বিতীয় পক্ষের মতে- আমাদের দেশে আরাফার ময়দান নাই, আর সিয়াম যেহেতু আরাফার দিনের কথা বলেছেন। আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে শতভাগ সঠিকভাবেই জানতে পারছি যে হাজিরা কখন আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন। এখানে তারিখ কোন বিষয় নয়, বিষয় হলো হাজিদের আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিন। তাই আমরা যদি শতভাগ নিশ্চিত হয় যে হাজিগণ অমুক দিন আরাফাতে অবস্থান করবে, তখন সেই দিনই সিয়াম উদ্‌যাপন করব এবং এটাই সুন্নাহ। পরের দিন নয়।

যেহেতু বিষয়টি মতভেদপূর্ণ তাই অনেক আলেম বলেছেন, জিলহজের প্রথম দশ দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করা সুন্নাহ সম্মত ইবাদত। কাজেই আমরা এই দশদিন সিয়াম উদ্‌যাপন করলে, আমি আর বিতর্কের মাঝে থাকলাম না। আর যাদের দশ দিন সিয়াম উদ্‌যাপন করা সম্ভব নয় তারা অন্তত জিলহজের নয় ও দশ তারিখ দুটি সিয়াম রাখলে এই বিতর্কের উর্ধে চলে যাবেন। আর যারা একটি সিয়াম উদ্‌যাপন করবে তারা সুধারণার ভিত্তিতে যে কোন দিন উদ্‌যাপন করেত পারে কিন্তু যারা তার মতের বাহিরে আমল করবে তাদের আমল  হবে বলে মত প্রকাশ করা যাবে। আল্লাহু আলাম।

সাপ্তাহিক সোম ও বৃহস্পতিবারের সিয়ামঃ

প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার- এ দু’দিন সিয়াম উদ্‌যাপন করা সুন্নাত। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দু’দিন রোযা রাখতে পছন্দ করতেন।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلاَّ رَجُلاً كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا

প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। এরপর এমন সব বান্দাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়, যারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে না। তবে সে ব্যক্তিকে নয়, যার ভাই ও তার মধ্যে শত্রুতা বিদ্যমান। এরপর বলা হবে, এ দু’জনকে আপোষ মীমাংসা করার জন্য অবকাশ দাও, এ দু’জনকে আপোষ মীমাংসা করার জন্য সুযোগ দাও, এ দু’জনকে আপোষ মীমাংসা করার জন্য সুযোগ দাও। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৫, সুনানে তিরমিজি : ৭৪৭, ২০২৩, আবূ দাউদ :ধ ৪৯২৬, ইবনু মাজাহ : ১৭৪০

রবীআ ইবনুল গায (রহ.) থেকে বর্ণিত-

أَنَّهُ سَأَلَ عَائِشَةَ عَنْ صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ كَانَ يَتَحَرَّى صِيَامَ الِاثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ

তিনি আয়িশা (রাঃ) এর নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোযার প্রতি খুবই খেয়াল রাখতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ :১৭৩৯, সুনানে তিরমিজি : ৭৪৫, সুনানে নাসায়ী : ২১৮৬, ২৩৬০, ২৩৬১, মিশকাত : ২০৫৫

আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত-

أَنَّرَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سُئِلَ عَنْ صَوْمِ الاِثْنَيْنِ فَقَالَ ‏ “‏ فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ ‏”‏ ‏.‏

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সোমবার দিনে রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “এই দিনটি এমন যে দিন আমার জন্ম হয়েছে, যেদিন আমি প্রেরিত হয়েছি অথবা ঐ দিনে আমার প্রতি অহী’ অবতীর্ণ করা হয়েছে। সহিহ মুসলিম : ১১৬২, আবূ দাঊদ : ২৪২৬, মিশকাত : ২০৪৫,, আহমাদ : ২২৫৫০

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার ও বৃহস্পতিবার সওম রাখতেন। তাঁর কাছে আরয করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! আপনি অধিকাংশ সময়ই সোম ও বৃহস্পতিবার সওম রাখেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সোম ও বৃহস্পতিবার হলো ঐ দিন, যেদিন আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মুসলিমকে মাফ করে দেন। কিন্তু ওদেরকে মাফ করে দেন না যারা সম্পর্কচ্ছেদ করে রাখে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা মালায়িকাহ্ (ফেরেশতা)-কে (ফেরেশতাগণকে) বলেন, ওদেরকে ছেড়ে দাও যে পর্যন্ত তারা পরস্পর সম্পর্ক ঠিক করে নেয় (এরপর তাদেরকে মাফ করে দেয়া হবে)। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৪০, মিশকাত : ২০৬৮,  সহিহ আল জামি : ২২৭৮, সহিহ আত তারগীব : ১০৪২

,

প্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ বা আইয়ামে বিদের সিয়াম

প্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে মোট ৩ দিনের সিয়াম পালনে করা সুন্নাত যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এ ৩ দিনকে শরীয়াতের পরিভাষায় “আইয়ামুল বীদ” বলা হয়। বীদ অর্থ সাদা বা আলোকিত। কারণ এ ৩ দিনের রজনীগুলো ফুটফুটে চাঁদের আলোতে উদ্ভাসিত থাকে।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

أَوْصَانِي خَلِيلِي بِثَلاَثٍ لاَ أَدَعُهُنَّ حَتَّى أَمُوتَ صَوْمِ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَصَلاَةِ الضُّحَى وَنَوْمٍ عَلَى وِتْرٍ.

আমার খলীল ও বন্ধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তিনটি কাজের ওসিয়্যাত করেছেন, মৃত্যু পর্যন্ত তা আমি পরিত্যাগ করব না। প্রতি মাসে তিন দিন সিয়াম, সালাতুয্-যুহা এবং বিতর আদায় করে শয়ন করা। সহিহ বুখারি ১১৭৮, ১৯৮১, সহিহ মুসলিম : ৭২১, তিরমিজি ৭৬০, নাসায়ী ১৬৭৭, ১৬৭৮, ২৪০৬, আবূ দাউদ ১৪৩২,

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا صُمْتَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ فَصُمْ ثَلاَثَ عَشْرَةَ وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ وَخَمْسَ عَشْرَةَ ‏”‏

হে আবূ যার! তুমি যখন কোন মাসে তিনদিন সওম উদ্‌যাপন করতে চাও, তাহলে তেরো, চৌদ্দ ও পনের তারিখে করবে। সুনানে তিরমিজি ৭৬১, নাসায়ী ২৪২৪, সহীহ আল জামি‘ ৬৭৩, আহমাদ ২১৪৩৭)।

ইবনু মিলহান আল-কায়সী (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنَا أَنْ نَصُومَ الْبِيضَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ، وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَخَمْسَ عَشْرَةَ، قَالَ: وَقَالَ هُنَّ كَهَيْئَةِ الدَّهْرِ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আইয়ামে বীয অর্থাৎ চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সওম পালনে আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এগুলো সারা বছর সওম রাখার সমতুল্য। সুনানে আবু দাউদ : ২৪৪৯, সুনানে নাসায়ি : ২৪৩২

আবূ দরদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এমন তিনটি কাজের অসিয়ত করেছেন, যা আমি যতদিন বেঁচে থাকব, কখনোই ত্যাগ করব না। প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা উদ্‌যাপন করা, চাশতের নামায পড়া এবং বিতির না পড়ে নিদ্রা না যাওয়া। সহিহ মুসলিম : ৭২২, সুনানে আবূ দাউদ : ১৪৩৩, আহমাদ : ২৬৯৩৫, ২৭০০৩

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা রাখা, সারা বছর ধরে রোযা রাখার সমান।  সহিহ বুখারী : ১১৫৯, ১৯৭৫)।

যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০১ : লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান বা শবে বরাত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিদআত সম্পর্কে একটু ধারণ

১। বিদআত কি?

বিদআত শব্দটি আরবী (البدع) শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। বিদআত (البدع) এর আবিধানিক অর্থ হল, নব আবিস্কৃত ও নব উদ্ভাবন। এর অর্থ এমন করেও বলা যায়, পূর্বের কোন দৃষ্টান্ত ও নমুনা ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি ও উদ্ভাবন করা। পারিভাষিক অর্থে দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন কিছু সংযোজন করার নাম বিদআত।

শরীয়তের পরিভাষায়-

مَا أُحْدِثَ فِى دِيْنِ اللهِ وَلَيْسَ لَهُ أَصْلٌ عَامٌ وَلاَخَاصٌّ يَدُلُّ عَلَيْهِ.

আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুন করে যার প্রচলন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে শরীয়তের কোন ব্যাপক ও সাধারণ কিংবা খাস ও সুনির্দিষ্ট দলীল নেই। কাওয়ায়েদ মারিফাতিল বিদআহ, পৃ-২৪

এক কথায় বলতে গেলে, বিদআত হলো ঐ সকল কাজ যা সওয়াব বা নেকির নিয়তে করা হয় কিন্তু শরীয়তে তার কোন ভিত্তি বা প্রমাণ পাওয়া যায়না।  অর্থাৎ যে আমল রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে করেনি এবং কাউকে তা করার অনুমতি ও প্রদান করেননি।

২। বিদআতের ভয়াবহতাঃ

বিদআতের সবচেয়ে ভয়াবহতা হলো  বিদআতিগণ বিদআতকে ভাল আমল হিসাবে পালন করে থাকে, তারা বিদআতকে খারাপ মনে করে না বিধায় বিদআত থেকে তওবা করে না এবং উক্ত গর্হিত পাপ থেকে বিরত থাকে না। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন-

اَلْبِدْعَةُ أَحَبُّ إِلَى إِبْلِيْسِ مِنَ الْمَعْصِيَةِ لِأَنَّ الْبِدْعَةَ لاَ يُتَابُ مِنْهَا وَالْمَعْصِيَةَ يُتَابُ مِنْهَا

ইবলীসের নিকট পাপের চেয়ে বিদ‘আত অধিক প্রিয়। কেননা পাপ থেকে মানুষ তওবা করে কিন্তু বিদ‘আত থেকে তওবা করে না। (কেননা সে বিদ‘আতকে ভাল কাজ বলে বিশ্বাস করে)’। বায়হাক্বী, শুয়াবুল ঈমান : ৯০০৯; ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালেহীন প্রথম খণ্ড, পৃ-৩২২

সুন্নাহ সম্মত আমল না করে মনগড়া বিদআতি আমল আবিস্কার করার প্রতি কুরআন কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। বিদআত না করে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসরনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং বিদআতের ভয়বহ পরিনতি সম্পর্কে কুনআন হাদিসে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। সুরা হাশর : ৭

(১) বিদআত মানুষকে পথভ্রষ্ট করে

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা উম্মতের জন্য নিয়ে এসেছেন তা হল হক। এ ছাড়া যা কিছু ধর্মীয় আচার হিসাবে পালিত হবে তা পথভ্রষ্টতা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ

* فَمَاذَا بَعۡدَ ٱلۡحَقِّ إِلَّا ٱلضَّلَٰلُۖ * 

সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী আছে? সূরা ইউনুস : ৩২

তিনি আরো বলেন,

مَّا فَرَّطۡنَا فِي ٱلۡكِتَٰبِ مِن شَيۡء

আমি কিতাবে কোন কিছু লিপিবদ্ধ করতে ত্রুটি করিনি। সূরা আনআম : ৩৮

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নাসীহাত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু বর্ষণ করলো। তাঁকে বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন (একটি সুনির্দিষ্ট আদেশ দিন)। তিনি বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ভীতি অবলম্বন করো, শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো (নেতৃ-আদেশ), যদিও সে কাফরী গোলাম হয়। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্নক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। ইবনে মাজাহ : ৪২,  সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, আবূ দাঊদ ৪৬০৭, আহমাদ ১৬৬৯২, দারিমী ৯৫

(২) বিদআত সহিহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করে তার স্থলাভিষিক্ত হয়

হাসসান ইবনু আতিয়্যাহ্) (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَا ابْتَدَعَ قَوْمٌ بِدْعَةً فِي دِينِهِمْ إِلَّا نَزَعَ اللَّهُ مِنْ سُنَّتِهِمْ مِثْلَهَا ثُمَّ لَا يُعِيدُهَا إِلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة.

কোন জাতি যখন দীনের মধ্যে কোন বিদ্’আত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তা’আলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না।

মিশকাত : ১৮৮, সুনানুদ দারেমী : ৯৮

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন-

إِنَّهُ سَيَلِيْ أَمْرَكُمْ مِنْ بَعْدِيْ رِجَالٌ يُطْفِئُوْنَ السُّنَّةَ وَيُحْدِثُوْنَ بِدْعَةً وَيُؤَخِّرُوْنَ الصَّلاَةَ عَنْ مَوَاقِيْتِهَا. قَالَ ابْنُ مَسْعُوْدٍ يَا رَسُوْلَ اللهِ كَيْفَ بِيْ إِذَا أَدْرَكْتُهُمْ قَالَ لَيْسَ طَاعَةٌ لِمَنْ عَصَى اللهَ قَالَهَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ-

নিশ্চয়ই তোমরা আমার (মৃত্যুর) পরে তোমাদের শরী‘আতকে এমন অবস্থায় পাবে- যখন মানুষ সুন্নাতকে বিলুপ্ত করবে, বিদ‘আত সৃষ্টি করবে এবং ছালাতের সময় ছালাত আদায় না করে দেরী করে আদায় করবে। তখন ইবনু মাসউদ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি যদি তাদেরকে পাই তাহ’লে আমি কি করব? তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহর অবাধ্যদের কোন আনুগত্য নেই। এ কথা তিনি তিনবার বললেন। মুসনাদে আহমাদ : ৩৭৯০; সিলসিলা ছহীহা হ: ২৮৬৪।

(৩) বিদআত সবচেয়ে নিকৃষ্ট আমল

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত-

إِنَّ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَ (إِنَّ مَا تُوعَدُونَ لاَتٍ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ)

সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ -এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ও’য়াদা দেয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না’’- (সূরাহ আনাম-১৩৪)। সহিহ বুখারি : ৭২৭৭,

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন ভাষণ দিতেন তখন তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে যেতো, কন্ঠস্বর জোরালো হতো, তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি পেতো, যেন তিনি কোন সেনাবাহিনীকে সতর্ক করছেন। তিনি বলতেনঃ তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হতে পারো (অথবা তোমাদের সকাল-সন্ধ্যা কল্যাণময় হোক)। তিনি আরো বলতেনঃ আমার প্রেরণ ও ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) এ দুটি আঙ্গুলের অবস্থানের মত পরস্পর নিকটবর্তী। তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল মিলিয়ে দেখান। অতঃপর তিনি বলেনঃ সবচেয়ে উত্তম নির্দেশ হল আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হল মুহাম্মাদ প্রদর্শিত পথ। দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট কাজ। প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। তিনি আরো বলেনঃ কোন ব্যাক্তি ধন-সম্পদ রেখে (মারা) গেলে তা তার পরিবারবর্গের এবং কোন ব্যাক্তি দেনা অথবা অসহায় সন্তান রেখে (মারা) গেলে তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার এবং তার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বভারও আমার যিম্মায়। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫, সুনানে নাসায়ী : ১৫৭৮, ১৯৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪, আহমাদ : ১৩৭৪৪, ১৩৯২৪, ১৪০২২, ১৪২১৯, ১৪৫৬৬; সুনানে দারিমী : ২০৬

(৪) বিদআতির আম কবুল হয়নাঃ

আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

الْمَدِينَةُ حَرَمٌ مَا بَيْنَ عَيْرٍ إِلَى ثَوْرٍ فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثًا أَوْ آوَى مُحْدِثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لاَ يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَرْفًا وَلاَ عَدْلاً

আইর থেকে সওর পর্যন্ত মদীনার হারাম-সীমা। এখানে যে ব্যক্তি অভিনব কিছু (বিদআত) রচনা করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাদল এবং সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। হাদিস সম্ভার : ২৯১৩, সহিহ মুসলিম : ৩৩৯৩

ইবরাহীম ইবনু তাইমী (রহঃ) এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রা.) আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব ও এই সাহীফায় যা আছে, তা ছাড়া অন্য কোন কিতাব নেই, যা আমরা পাঠ করে থাকি। তিনি বলেন, এ সাহীফায় রয়েছে, যখমসমূহের দন্ড বিধান, উটের বয়সের বিবরণ, এবং আইর পর্বত থেকে সত্তার পর্যন্ত মদিনা হারাম হওয়ার বিধান। যে ব্যাক্তি এর মধ্যে বিদআত উদ্ভাবন করে কিংবা বিদআতীকে আশ্রয় দেয়, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সকল মানুষের লানত। আল্লাহ তাঁর কোন নফল ও ফরয ইবাদত কবূল করেন না। আর যে নিজ মাওলা (প্রভু) ব্যতীত অন্যকে (প্রভু) মাওলা রূপে গ্রহণ করে, তার উপর অনুরূপ লানত। আর নিরাপত্তা দানে সর্বস্তরের মুসলিমগণ একই স্তরের এবং যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের চুক্তি ভঙ্গ করে তার উপরও অনুরূপ লা’নত। সহিহ বুখারি : ৩১৭২, ৬৭৫৫

(৫)। বিদআতির তওবা কবুল হয়না

বিদআতকে বর্জন না করা পর্যন্ত তার তওবা কবুল হবে না।

আনাস (রা.) হতেই বর্ণিত, আল্লাহর রসূল বলে-

إِنَّ اللَّهَ حَجَبَ التَّوْبَةَ عَن كُلِّ صَاحِبِ بِدْعَةٍ حَتَّى يَدَع َبِدْعَتَهُ

আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত রাখেন (গ্রহণ করেন না), যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার বিদআত বর্জন না করেছে। হাদিস সম্ভার : ১৪৬, ত্বাবারানীর আওসাত : ৪২০২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান : ৯৪৫৭, সহিহ আত তারগিব : ৫৪

(৬) বিদআত সৃষ্টিকারীর প্রতি ফেরেশতা এবং সব লোকের অভিশাপ হয়ে থাকে-

ইবরাহীম আত-তাইমী (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আলী (রা.) আমাদের সামনে খুতবাহ দেন এবং বলেন, যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, আমাদের নিকট আল্লাহ্ তা’আলার গ্রন্থ এবং এই পুস্তিকা যার মধ্যে উটের বয়সের বিবরণী ও জখমের ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে তা ব্যতীত আরো কোন গ্রন্থ আছে সে মিথ্যাবাদী।

তিনি তার খুৎবায় আরো বলেন, এই গ্রন্থে আরো আছেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার হেরেমের সীমানা হচ্ছে আইর পাহাড় হতে সাওর পর্বত পর্যন্ত। যদি কেউ এতে কোন প্রকার বিদ”আতের প্রচলন ঘটায় অথবা কোন বিদ’আতীকে আশ্রয় দেয় তাহলে তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাগণ ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। কিয়ামত দিবসে তার কোন ফরয বা নাফল ইবাদাতই আল্লাহ তা’আলা কুবুল করবেন না।

যে লোক তার বাবাকে পরিত্যাগ করে অন্য কাউকে বাবা বলে দাবি করে (নিজের বংশপরিচয় গোপন করে অন্য বংশের পরিচয় দেয়) অথবা তার মনিবকে ছেড়ে দিয়ে অন্য মনিবের নিকট পালিয়ে যায় তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ। তার ফরয বা নাফল কোন ইবাদাতই গ্রহণ করা হবে না। সুনানে তিরিমিজ : ২১২৭, বায়হাক্বী : ৯৯৫১, সহিহ আল জামি : ৬৬৮৩, সহিহ আত তারগীব : ১৯৮৬।

(৭)  কিয়ামতের দিন হাউজে কাওসার পানি থেকে বঞ্চিত হবে-

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নাবী ﷺ বলেছেন-

لَيَرِدَنَّ عَلَىَّ الْحَوْضَ رِجَالٌ مِمَّنْ صَاحَبَنِي حَتَّى إِذَا رَأَيْتُهُمْ وَرُفِعُوا إِلَىَّ اخْتُلِجُوا دُونِي فَلأَقُولَنَّ أَىْ رَبِّ أُصَيْحَابِي أُصَيْحَابِي ‏.‏ فَلَيُقَالَنَّ لِي إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ ‏”

অবশ্যই হাউযের পাড়ে এমন কিছু লোক আসবে যারা দুনিয়াতে আমার সাহচর্য লাভ করেছিল। এমন কি যখন আমি তাদের দেখতে পাব এবং তাদেরকে আমার সম্মুখে নিয়ে আনা হবে, তখন আমার নিকট আসতে তাদের বাধা দেওয়া হবে। তারপর আমি বলব, আয় রব্ব! এরা আমার সাথী, এরা আমার সাথী। তখন আমাকে বলা হবে, অবশ্য আপনি জানেন না, আপনার পর এরা কি উদ্ভাবন (কিরূপ বিদ’আত)

(৮) বিদআতি সালাম না দেওয়া-

নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ إِنَّ فُلاَنًا يَقْرَأُ عَلَيْكَ السَّلاَمَ ‏.‏ فَقَالَ لَهُ إِنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّهُ قَدْ أَحْدَثَ فَإِنْ كَانَ قَدْ أَحْدَثَ فَلاَ تُقْرِئْهُ مِنِّي السَّلاَمَ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ يَكُونُ فِي هَذِهِ الأُمَّةِ أَوْ فِي أُمَّتِي الشَّكُّ مِنْهُ خَسْفٌ أَوْ مَسْخٌ أَوْ قَذْفٌ فِي أَهْلِ الْقَدَرِ

ইবন উমার (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললঃ অমুক ব্যক্তি আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন তিনি বললেনঃ আমি খবর পেয়েছি যে, সে ব্যক্তি বেদআতী। সে যদি বেদআতী হয়ে থাকে তবে আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম দিবে না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, আমার এ উম্মাতের কাদরিয়্যা আকীদা পোষণকারীদের মধ্যে ঘটবে ভূমি ধ্বস বা চেহারা বিকৃতি বা প্রস্তর নিক্ষেপ। সুনানে তিরমিজী : ২১৫২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪০৬১

এতসব ভয়াবহতার পরও মানুষ বিদআত করে কারন এই সম্পর্কে তার জ্ঞান নাই। সে বিদআতকে ভাল মনে করে মহান আল্লাহকে রাজি খুশি করার নিমিত্তে এই জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়। অজ্ঞ মুসলিমগণ জান্নাত লাভের আশায় ও জাহান্নামের ভয়ে মরনপন ইবাদাত করার জন্য যে যাবে বলে, যার কাছে যা শুনে তাই আমল করার চেষ্টা করে। দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারনে মুলত বিদআত করে। অনেক সময় সমাজ, পরিবেশে ও  বাপ দাদার অন্ধ অনুসরণের কারনেও বিদআত হয়ে থাকে। পূর্বের আলোচনায় আমরা কিছু মহান দিন সম্পর্ক জেনেছি। এই পর্যায় আমরা এমন কতগুলো দিবস সম্পর্ক জ্ঞান  অর্জন করবে যে দিবস কে আমরা দ্বীন মনে করে আমল করি অথচ দ্বীন নয়। ইসলামি শরীয়তে এই দিন সম্পর্কে কোন আমল করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেনি। আমাদের সমাজ ও আমাদের বাপ দাদারা মহান আল্লাহ কে রাজি খুশি করার জন্য এই নতুন নতুন দিবস আবিস্কার করেছেন। যদি তারা তা আল্লাহকে রাজি খুশির জন্য করেছেন কিন্তু তার কোন শরীয়তের ভিত্তি নাই বিধানয় বিদআত ও পরিত্যাজ্য। খৃষ্টানগণও মহান আল্লাহকে খুসি করা জন্য এমন বিদআত আবিস্কার করেছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন-

الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُ رَاۡفَۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ وَرَہۡبَانِیَّۃَۨ ابۡتَدَعُوۡہَا مَا کَتَبۡنٰہَا عَلَیۡہِمۡ

আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারাই বৈরাগ্যবাদের উদ্ভাবন করেছিল। এটা আমি তাদের ওপর লিপিবদ্ধ করে দেইনি। সুরা হাদিস : ২৭

১। শবে বরাতের সুচনা

শবে বরাত নামটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। এই দিন সরকরি ছুটির দিন বলে সকল নাগরিকই জানে এটি একটি ইসলমি দিবস। আমরাও দেখে থাকি এই রাতে প্রতিটি মসজিদে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে রাতটি অতিবাহিত করে। আবার কিছু লোককে দেখা যায় তারা এ রাতের বিশেষ ইবাদতকে বিদআত হবে। আলোচনা সমালোচায় এক পর্যায় শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর এই আমলকে মুরুব্বিদের দোহাই ও সমাজে প্রচলিত বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলোঃ শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর আমল, বিশেষ নামায পড়া, সিয়াম রাখা, মিলাদ পড়া, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা, আলোক সজ্জা করা ইত্যাদি ইসলামি শরীআতে একটা নব আবিস্কার বিষয়। এই ধরনের কোন আমল বা অনুষ্ঠান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে কিংবা সাহাবাগণের যুগে ছিল না। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খেলাফতের একজন শিয়া মতাদর্শী মন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন আলী বিন খলফ এ দিনকে বিশেষ ঈদ বা অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা শুরু করেন এবং ৪৪৮ হিজরীতে এক ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দস মসজিদে বিশেষ নামাযের আয়োজন করেন। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

হাফেয ইবনে রজব (রহঃ) তার কিতাব লাতায়িফুল মায়ারিফে লিখেছেন- “তাবেয়ীদের যুগে সিরিয়ায় খালিদ ইবনে মা’দান, মকহুল, লুকমান ইবনে আমের প্রমুখ আলিম এ রাতকে মর্যাদা দিতে শুরু করেন এবং এ রাতে বেশী পরিমাণে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন। তখন লোকেরা তাদের থেকে এটা অনুসরণ করতে আরম্ভ করল। এরপর লোকদের মধ্যে মতানৈক্য শুরু হল। বসরা অঞ্চলের অনেক আবেদগণ এ রাতকে গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু মক্কা ও মদীনার আলিমগণ এটাকে বিদ‘আত বলে প্রত্যাখ্যান করলেন। অতঃপর সিরিয়াবাসী আলিমগণ দুই ভাগ হয়ে গেলেন। একদল এ রাতে মাসজিদে একত্র হয়ে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন। এদের মধ্যে ছিলেন খালেদ ইবনে মা’দান, লোকমান ইবনে আমের। ইসহাক ইবনে রাহভিয়াহও তাদের অনুরূপ মত পোষণ করতেন।

শবে বরাত দুটি ফারসী শব্দের সমন্নয় গঠিত হয়ছে। একটি হল শব অপরটি বরাত। ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ শব্দের অর্থ সৌভাগ্য বা ভাগ্য। এই অর্থ অনুসারে শবে বরাত শব্দটির অর্থ হল, সৌভাগ্য রজনী বা ভাগ্য রজনী। অনেক বলে থাকে শব ফারসী শব্দ হলেও বরাত শব্দটি আবরি যার অর্থ হল, সম্পর্কচ্ছেদ, পরোক্ষ অর্থে মুক্তি। সে অর্থে শবে বলাতের অর্থ হয় মুক্তির রজনী। কেউ কেউ আবার শবে বরাত কে লাইলাতুল বরাত বলে থাকে। এই ক্ষেত্রে দুটি শব্দই আবরি যার অর্থ হল, মুক্তির রজনী। যেমন কুরআন মাজীদে সূরা বারাত রয়েছে যা সূরা তাওবা নামেও পরিচিত। ইরশাদ হয়েছেঃ

بَرَآءَةٌ۬ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۤ إِلَى ٱلَّذِينَ عَـٰهَدتُّم مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ  

সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে। সূরা তাওবা : ০১

এখানে বারাতের অর্থ হল সম্পর্ক ছিন্ন করা।

আরার বারাত’ মুক্তি অর্থেও আল-কুরআনে এসেছে। যেমনঃ সুরা কামারে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

 أَكُفَّارُكُمۡ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أُوْلَـٰٓٮِٕكُمۡ أَمۡ لَكُم بَرَآءَةٌ۬ فِى ٱلزُّبُرِ

তোমাদের মধ্যকার কাফিররা কি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ? না কি তোমাদের মুক্তির সনদ রয়েছে কিতাব সমূহে? সূরা কামার : ৪৩

অতএব শবে বরাত শব্দটার অর্থ দাড়ায় মুক্তির রজনী, সম্পর্ক ছিন্ন করার রজনী। অথবা সৌভাগ্যের রাত, যদি ‘বরাত’ শব্দটিকে ফার্সী শব্দ ধরা হয়। শবে বরাত শব্দটাকে যদি আরবীতে তর্জমা করতে চান তাহলে বলতে হবে ‘লাইলাতুল বারায়াত’। বরায়াত শব্দটি এর রূপ বা উচ্চারণ আরবী ও ফারসী ভাষায় একই রকম কিন্তু এর অর্থ ভিন্ন। সার কথা হল ‘বারায়াত’ শব্দটিকে আরবী শব্দ ধরা হলে উহার অর্থ সম্পর্কচ্ছেদ বা মুক্তি। আর ফারসী শব্দ ধরা হলে উহার অর্থ সৌভাগ্য। যেহেতু কুরআন সুন্নাহতে এই শব্দের বা এই রাতের কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। আর অনাবর ভাষাভাষীদের এই রাতের আমলে প্রতি ঝোক বেশি, তাই শবে বারাত দুটি ফারসী শব্দ ধরে নেয়াই যুক্তি যুক্ত। তা হলে একে ‘সৌভাগ্য রজনী’ বলাই অধিক শ্রেয়।

কখন এই রাত আসেঃ

প্রতি বছর হিজরি সালের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে মুসলিম উম্মাহ কিছু বিদআতী এই রাতকে সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পালন করে বহু মনগড়া আমল করে থাকে। তারা এর সমর্থনে একটি হাদিস পেশ করে থাকে। হাদিসটি হল-

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ

এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯

তিরমীজির টিকাঃ ইমাম ঈসা (রহঃ) বলেন, হাজ্জাতের বরাতে এই সূত্রটি ছাড়া আয়িশা (রা.) এর হাদীসটি সম্পর্কে কোন কিছু আমাদের জানা নাই। এই হাদীসটিকে দুর্বল বলতে আমি মুহাম্মদ আল-বুখারীকে শুনেছি। তিনি বলেন, রাবী ইয়াহইয়া ইবনু আবূ কাসীর উরওয়া (রহঃ) থেকে কোন রিওয়ায়াত শোনেননি। মুহাম্মদ আল-বুখারী বলেন, এমনিভাবে হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনু আবূ কাসীরের নিকট থেকে কিছুই শোনেননি। এই হাদিসটি মানঃ যঈফ।

শবে বরাতে আমলকারীদের দলিল ও পর্যালোচনাঃ

কোন সত্যপন্থী আলেম পবিত্র কুরআনের কোন আয়াত শবে বরাতের আমল সম্পর্কে দলীল হিসাবে পেশ করেন না কারন শবে বরাত কিংবা লাইলাতুল বারায়াতের নামে কোন শব্দ কুরআন মাজীদে খুজে পাবেন না, আয়াততো অনেক দুরের কথা। সত্য কথাটাকে সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় পবিত্র কুরআন মাজীদে শবে বরাতের কোন আলোচনা নেই। সরাসরি তো দূরের কথা আকার ইংগিতেও নেই। শবে বরাত নামটি হাদীসের কোথাও উল্লেখ হয়নি। তবে হাদিসের গ্রন্থ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রাত সম্পর্কে বেশ কয়েকটি যঈফ হাদিস উল্লেখ আছে। এই সকল যঈফ হাদিসগুলিতে ফজিলত বর্ণিত হলেও কোন প্রকার আমল করার কথা বলা হয়নি। ফিকহের কিতাবেও এ রাত সম্পর্কে কিছু বলা হয় নাই। কিন্তু কিছু কিছু অখ্যাত বইয়ে এ সম্পর্কি আলোচনা পাওয়া যায়। শবে বরাতের পক্ষে যারা কথা বলেন যারা কুরআন সুন্নাহ থেকে দলীল পেশ করা চেষ্টা করেন। তাদের দেয়া কিছু দলীল পর্যালোচনা করব, ইনশাল্লাহ।

৪। কুরআন আলোকে লাইলাতুল নিসফে মিন সাবান বা সাবানের মধ্য রজনী।

যারা শবে বরাতে পক্ষে কথা বলেন তাদের দেখা যায় শবে বরাতের গুরুত্ব আলোচনা করতে যেয়ে সূরা দুখানের প্রথম চারটি আয়াত পাঠ করেন। আয়াতসমূহ হলঃ 

حمٓ (١) وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلۡمُبِينِ (٢) إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةٍ۬ مُّبَـٰرَكَةٍ‌ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ (٣) فِيہَا يُفۡرَقُ كُلُّ أَمۡرٍ حَكِيمٍ (٤)

অর্থঃ হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমিতো এটা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। আমি তো সতর্ককারী। এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। সূরা দুখান : ১-৪

শবে বরাতের পক্ষের ব্যাখ্যা

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় শবে বরতা পন্থী আলেমগন অনেক মিথ্যা, ভুয়া ও মনগড়া তথ্য দিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে থাকে। তাদের প্রথম দাবি সুরা দখানে উল্লেখিত এই বরকতময় রজনী হচ্ছে অর্ধ শাবানের রাত বা শবে বরাতের রাত। তাদের দাবী, মধ্য শাবানের রাত্রিতে বছরের সকল ব্যাপার চূড়ান্ত করা হয়, জীবিত ও মৃতদের তালিকা লেখা হয় এবং হাজিদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা থেকে পরবর্তীতে একজনও কমবেশি হয় না মহান আল্লাহ শবে বরাতের রাতে সকল বিষয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা করার পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববান ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করে থাকেন। তাদের এই কথা স্পষ্টভাবেই কুরআনের অপব্যাখ্যা তাদের এ ব্যাখ্যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় বরং এখানে বরকতপূর্ণ রাত বলতে লাইলাতুল ক্বদর উদ্দেশ্য। 

তাদের ব্যাখ্যার জবাবঃ

আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ.) বলেন, অত্র বরকতপূর্ণ রাতই হল লাইলাতুল ক্বদর বা ক্বদরের রাত। যেমন অন্যত্র সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে। কুরআনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য কথা হল, কুরআনের কোন অস্পষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা যদি অন্য কোন আয়াতে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, তাহলে কুরআনের ব্যাখ্যাই গ্রহণ করতে হবে। আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ সূরা কদরের শুরুতে বলেন, মহান আল্লাহ এই আয়াত দ্বারা বরকতময় রাতের অর্থ পনের শাবানের রাতকে বুঝান নাই তিনি এই আয়াত দ্বারা যে বরকতময় রাতের কথা বলছেন তা হল, লাইলাতুল কদর যদি কেউ এই আয়াত দ্বারা শাবানের পনের তারিখ বুঝিয়ে থাকেন তবে তা হবে মারাত্বক অন্যায় এবং মহান আল্লাহর কালাম বিকৃত করার মত অপরাধ  কুরআনের এই আয়াতগুল লক্ষ করুন। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ (١) وَمَآ أَدۡرَٮٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ (٢) لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أَلۡفِ شَہۡرٍ۬ (٣) تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيہَا بِإِذۡنِ رَبِّہِم مِّن كُلِّ أَمۡرٍ۬ (٤) سَلَـٰمٌ هِىَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ (٥)

অর্থঃ আমি এই কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আপনি জানেন লাইলাতুল কদর কি? লাইলাতুল কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য মালাইকা ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশে। এই শান্তি ও নিরাপত্তা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা কাদর ৯৭:১-৫)।

পূর্বে উল্লেখিত সুরা দুখানের আয়াত থেকে স্পষ্ট দুটি ধারনা পাওয়া যায়

প্রথমটি হলোঃ মহান আল্লাহ বরকতময় একটি রজনীতে কুরআন নাজিল করেছেন।

দ্বিতীয়টি হলোঃ এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত করা হয়।

বিদআতীগন বলে থাকেন, এই বরকতময় রজণী হল শবে বরাত বা লাইলাতুর বরাত। আর আমরা বলছি এই বরকতময় রজণী হল লাইলাতুল করদ বা করদের রাত্রী। তাহলে কে সঠিক? একটু লক্ষ করুন, সুরা দুখানের ঐ আয়াতে বলা হয়ে, এই বরকতময় রজনীতে কুরআন নাজিল হয়েছে। তাহলে একটা বিষয় শতভাগ নিশ্চত যে, কুরআন যে রাত্রে নাজিল হয়েছে সেই রাতই হল এই বরকতময় রজণী। এবার দেখুন, সুরা কাদরে মহান আল্লাহ বলেন, আমি এই কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। দুটি আয়াতের সমন্নয় করলে দাড়ায়, কুরআন নাজিল হয়েছে এক বরকতময় রাতে আর সে রাতের নাম হল লাইলাতুল কদর কাজেই মহান আল্লাহর কুরআনের বাণীর পর আর কারও ব্যাখ্যা বিশ্লষন গ্রহন করা হারাম। একটি স্পষ্ট দলীলের বিপরীত কোন প্রকার ব্যাখ্যা বিশ্লষন করা যাবে না। তবে বলতে পারেন লাইতাতুল কদর কখন হয়। এ প্রশ্নের জবাব ও মহান  আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরঅনে দিয়ে এরশাদ করছেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ

অর্থঃ রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন। সুরা বাকারা : ১৮৫

এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলে দিলেন, কুরআন নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। কাজেই এই বরকতময় রজণী হল লাইলাতুল কদর অবশ্যই রমজান মাসে। কুনআনে এই স্পষ্ট দলীল বলে দিচ্ছে লাইলাতুল কদর হল রমজান মাসে। তাই যারা সুরা দুখানের ঐ আয়াত দ্বারা শবে বরাতের দলীল দেন তারা কুনআনেরই অবমাননা করছেন।

এক কথায় বলা যায় সূরা দুখানের প্রথম চার আয়াতের ব্যাখ্যা হল সূরা কদর। আল কুরআনের এক আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য আয়াত দ্বারা করা হল সর্বোত্তম ব্যাখ্যা। কিন্তু সূরা দুখানের লাইলাতুল মুবারাকার অর্থ যদি শবে বরাত হয় তাহলে এ আয়াতের অর্থ দাড়ায় আল কুরআন শাবান মাসের শবে বরাতে নাযিল হয়েছে। অথচ উপরের আলোচনায় থেকে কুরআনের দলীল দ্বারা সহজে অনুমেয় কুরআন নাযিল হয়েছে রামাযান মাসের লাইলাতুল কদরে। 

আপনি যদি তাফসীর থেকে এর ব্যাখ্যার আলোচনা দেখেন তবে দেখবেন, অধিকাংশ মুফাচ্ছিরে কিরামের মত হল উক্ত আয়াতে বরকতময় রাত বলতে লাইলাতুল কদরকেই বুঝানো হয়েছে। শুধু মাত্র তাবেয়ী ইকরামা (রহঃ) এর একটা মত উল্লেখ করে বলা হয় যে, তিনি বলেছেন বরকতময় রাত বলতে শাবান মাসের পনের তারিখের রাতকেও বুঝানো যেতে পারে।  তিনি বরকতময় রজনীর যে ব্যাখ্যা শাবানের ১৫ তারিখ দ্বারা করেছেন, তা ভুল হওয়া সত্ত্বেও প্রচার করতে হবে এমন কোন নিয়ম-কানুন নেই। বরং তা প্রত্যাখ্যান করাই হল হকের দাবী। তিনি যেমন ভুলের উর্ধ্বে নন, তেমনি যারা তার থেকে বর্ণনা করেছেন তারা ভুল শুনে থাকতে পারেন অথবা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বানোয়াট বর্ণনা দেয়াও অসম্ভব নয়। এমন কথা বলার অধিকার কুরআন দিয়েছেন তার স্পষ্ট বর্ণনা দ্বারা। তিনি যদি এটা বলে থাকেন তাহলে এটা তার ব্যক্তিগত অভিমত। যা কুরআন ও হাদীসের বিরোধী হওয়ার কারণে পরিত্যাজ্য। এ বরকতময় রাতের দ্বারা উদ্দেশ্য যদি শবে বরাত হয় তাহলে শবে কদর অর্থ নেয়া চলবেনা।

আর একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, সুরা দুখানে চার নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয় (৪৪:৪)। কাজেই ভাগ্য রজনী বলতে যা বুঝায় তাও হবে লাইলাতুল কদরে, শবে কদরে নয়। কিন্তু বিআদতীদের বাদী হল, শবে বরাতে সৃষ্টিকূলের হায়াত-মাউত, রিয্‌ক-দৌলত সম্পর্কে সিদ্ধান- নেয়া হয় ও লিপিবদ্ধ করা হয়। তাদের এই বাদী সরাসরি কুরআন বিরোধী। তাদের প্রচারনার ফলে অনেক অজ্ঞ মুসলিম শবে বরাতের গুরুত্ব বর্ণনায় সূরা দুখানের উক্ত আয়াত উল্লেখ করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এ আকীদাহ বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, শবে বরাতে সৃষ্টিকূলের হায়াত-মাউত, রিয্‌ক-দৌলত সম্পর্কে সিদ্ধান নেয়া হয় ও লিপিবদ্ধ করা হয়। আর শবে বরাত উদযাপনকারীদের শতকরা নিরানব্বই জনের বেশী এ ধারণাই পোষণ করেন। তারা এর উপর ভিত্তি করে লাইলাতুল কদরের চেয়ে ১৫ শাবানের রাতকে বেশী গুরুত্ব দেয়। অথচ কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ বিষয়গুলি লাইলাতুল কদরের সাথে সম্পর্কিত। তাই যারা শবে বরাতের গুরুত্ব বুঝাতে উক্ত আয়াত যারা উল্লেখ করেন তারা মানুষকে সঠিক ইসলামী আকীদাহ থেকে দূরে সরানোর কাজে লিপ্ত, যদিও মনে-প্রাণে তারা তা ইচ্ছা করেন না।

ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর তাফসীরে বলেছেন, কোন কোন আলেমের মতে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত)। কিন্তু এটা একটা বাতিল ধারণা।

হাদিসের আলোকে লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান বা শবে বরাত পর্যালোচনাঃ

আলোচনায় দেখা যাবে শবে বরাত বা লাইলাতুল  বরাত নামে কোন বর্ণনা নাই । এই সম্পর্কিত সকল হাদিসেও মধ্য শাবানের রাতে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচনার শুরুতে এই সম্পর্কে কয়েকটি  সহিহ ও যঈফ হাদিস উল্লখ করছি। দ্বিতীয় পর্যায় কয়েকটি জাল হাদিস উল্লেখ করছি। এর মাধ্যমে আপনারা এই রাত সম্পর্কে স্পষ্ট একটি ধারণ পাবেন বলে আশা করছি।

মুয়াজ বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত,  তিনি বলেন

إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

‘মহান আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও  হিংসুক ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন। সহিহ ইবনু হিববান, খণ্ড-১২, পৃ-৪৮১, তাবারানী, আল-মুজাম আল-কাবীর, ২০/১০৮, ২২/২২৩, বায়হাক্বী, শু’আবুল ঈমান, ৩/৩৮১; কিতাবুত তাওহীদ, পৃ-৩২৫-৩২৬। হাদিসের মান সহিহ।  

আবূ মূসা আল-আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন-

إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلاَّ لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে আত্নপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৯০, জামি সগীর : ১৮১৯ হাসান, সহীহা : ১৫৬৩, মিশকাত : ১৩০৬, ১৬০৭ হাদিসের মান হাসান

উপরের দুটি হাদিসের অর্থ একই। এ অর্থের হাদীস কাছাকাছি শব্দে ৮ জন সাহাবী: আবূ মূসা আশআরী, আউফ ইবনু মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, মুয়ায ইবনু জাবাল, আবু সা’লাবা আল-খুশানী, আবূ হুরাইরা, আয়েশা ও আবূ বাকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ সকল হাদীসের সনদ সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষনা করে দেখা যায় এগুলোর মধ্যে কিছু সনদ দুর্বল ও কিছু সনদ ‘হাসান’ পর্যায়ের। সামগ্রিক বিচারে হাদীসটি সহীহ। শাইখ আলবানী বলেন, ‘‘হাদীসটি সহীহ। তা অনেক সাহাবী থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা একটি অন্যটিকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করে বিধান মুহাদ্দিসগন হাদিসটি সহিহ বলেছেন। শায়খ নাসিরউদ্দিন আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ ৩/১৩৫

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ

এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯ হাদিসের মান যঈফ। ইমাম আলবানীর তাহকিক মিশকাত : ১২৯৯ ও যঈফ বলেছেন।

উসমান ইবনে আবিল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেয়। আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কেহ কিছু চাইবার আমি তাকে তা দিয়ে দিব। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ মুশরিক ও ব্যভিচারী বাদে সকল প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করা হয়। বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান

হদিসের মান যইফ। বিখ্যাত মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আল-বানী (রহঃ) হাদীসটিকে তার সংকলন ‘যয়ীফ আল-জামে’ নামক কিতাবের ৬৫২ ক্রমিকে দুর্বল প্রমাণ করেছেন। 

হাদিসগুলোর বিশ্লষণঃ

উপরের হাদিসগুলি পর্যালোচনা করে দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন সনদে এই রাত সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস ও কয়েকটি জঈফ হাদিস বর্নিত হয়েছে। যদি সকল হাদিসগুলো সহিহ বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলেও কি কোন প্রকার আমল প্রমাণিত? না, এ হাদিস দ্বারা কোন আমল প্রমানিত হয় না। এই হাদিসগুলো দ্বারা চারটি বিষয় সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা পাওয়া যায়।

(১) এই রাতে আল্লাহ তায়ালা মুশরিক ও  হিংসুক ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।

(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক কবর জিয়ারত করা।

(৩) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।

(৪) কালব গোত্রের পালিত বকরীর পশমের পরিমানের চেয়েও অধিক পরিমান লোকদের ক্ষমা করেন।

(১) আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে মহান আল্লাহ তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি প্রদান করেন ও সকলকে ক্ষমা করে কেবল মুশরিক ও হিংসুকদের ক্ষমা করেনা। এই হাদিসটি সহিহ হলেও এর দ্বারা কোন আমল প্রনানিত হয় না। সারা বছর যারা আমল দ্বারা মহান আল্লাহকে সন্ত্বষ্ট করেছেন তারাই শুধু এই রাতে ক্ষমা পেয়ে থাকেন। তবে এই ক্ষমা থেকে আল্লাহর সাথে শিরককারী মুশরিক ও হিংসুক বঞ্চিত থাকেন। 

(২) একটি জঈফ হাদিস বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই রাতে কবর জিয়ারত করেছেন। যদি কেউ এই জঈফ হাদিসের আলোকে এই রাতে কবর জিয়ারত করতে চায় তবে তাকে একাকি কবর জিয়ারত করেত হবে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন। তিনি সময় সুযোগ থাকা সত্বেও নিজের স্ত্রী বা সাহাবী কাউকে এ আমলে শরীক করান নাই। এ হাদীসে দেখা গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিছানা ছেড়ে চলে গেলেন, আর পাশে শায়িত আয়িশা (রা.) কে ডাকলেন না। ডাকলেন না অন্য কাউকে। তাকে জাগালেন না বা সালাত আদায় করতে বললেন না। অথচ আমরা দেখতে পাই যে, রামাযানের শেষ দশকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে রাত জেগে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। বেশী পরিমাণে ইবাদাত-বন্দেগী করতে বলতেন। যদি ১৫ শাবানের রাতে কোন ইবাদাত করার ফাযীলাত থাকত তাহলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন আয়িশাকে (রা.) বললেন না? কেন রামাযানের শেষ দশকের মত সকলকে জাগিয়ে দিলেন না, তিনি তো নেক কাজের প্রতি মানুষকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে আমাদের সকলের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। কাজেই সম্মিলিতভাবে করব জিয়ারত এই রাতের আমল নয় বিদআত। কিন্তু যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে মাসজিদে একত্র হয়ে নানান প্রকারের ইবাদতের মাধ্যমে এই যেভাবে উদযাপন করে, তারা কিভাবে এই হাদিস দিয়ে আমলের পক্ষে দলীল দেয়। এভাবে দলবেধে এই রাতে কবর জিয়ারত নিঃসন্দেহে বিদআত।

(৩) এই জঈফ হাদিস বাদি করে মহান আল্লাহ শুধু মধ্য শাবানের রাত্রিতে বান্দাদের নিকটবর্তী আকাশে আবির্ভূত নয়। কিন্তি সহিহ হাদিস দাবি করে তিনি প্রতি রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল বলেছেন-

‏ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ

মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। সহিহ বুখারি : ১১৪৫, ৬৩২১, ৭৪৯৪, সহিহ মুসলিম : ৭৫১-৫, সুনানে তিরমিযী : ৪৪৬, ৩৪৯৮; সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩১৫, ৪৭৩৩; আহমাদ : ৭৪৫৭, ৭৫৩৮, ৭৫৬৭, ৭৭৩৩, মুওয়াত্ত্বা মালিক : ৪৯৬,

উল্লিখিত হাদীসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাতে নিকটতম আকাশে আসেন ও বান্দাদের দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। কিন্তু এই বিখ্যাত সহিহ হাদিসটির বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষের দিকে নিকটতম আকাশে অবতরণ করে দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। আর এ হাদীসটি সর্বমোট ৩০ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন এবং বুখারী এবং মুসলিম ও সুনানের প্রায় সকল কিতাবে এসেছে। হাদীসটি প্রসিদ্ধ এবং অনেক আলেম মনে করেন মশহুর হাদীসের বিরোধী বক্তের অংশটুকু সঠিক নয়। কারণ এ হাদীসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন মধ্য শাবানের রাতের শুরু থেকে এবং অন্য হাদিসের বক্তব্য হল প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। প্রতি রাতের মধ্যে শাবান মাসের পনের তারিখের রাতও অনর্ভুক্ত। কাজেই আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ শুধু শাবান মাসের জন্য খাস করা ঠিক হবে না।

৬। এই রাতে ফজিলত আছে, তা হলে আমল করলে ক্ষতি কি?

ফজিলত থাকলেই আমল করার প্রমান বহন করে না। কোন কাজ করলে ইবাদত হবে আর কোন কাজ করলে ইবাদত হবে এর মান দন্ড দিয়েছেন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কাজেই কোন আমল দ্বারা মহান আল্লাহকে রাজি খুসি করতে হলে সে আমল অবশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত হতে হবে। নিজের খেয়াল খুসিমত ইবাদতের পদ্ধতি, সময় সংখ্যা দ্বারা নির্দিষ্ট করা যাবে না। কোন ইবাদাতের ক্ষেত্রে কোন আলেমের মন্তব্য দলীল নয়, বরং দলীল হল আল্লাহর কিতাব (কুরআন) ও রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বানী ও কাজ (সহিহ হাদিস), যদি এই দু’ইয়ের মধ্যে দলীল থাকে তাহলেই আমল অথবা ইবাদাত করা যাবে আর না থাকলে করা যাবে না।

সুতরাং প্রকৃত পক্ষেই লাইলাতুর নিসফে মিন শাবার বা মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ পাক মুশরিক ও সুন্নত বিরোধী অথবা বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যাক্তি ব্যাতিত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। এই রাতের ফযিলত স্বীকার করেছেন।

১। ইমাম শাফেঈ (রহ.), কিতাবুল উম্ম, ১মখণ্ড, পৃঃ ২৩১

২। ইমাম আহমাদ (রহ.), ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইকতিদায়ে ছিরাতেমুস্তাকীমে, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ-৬২৬

৩। ইমাম আওযায়ী (রহ.), ইমাম ইবনে রাজাব, লাতায়েফুল মা‘আরিফ, পৃ-১৪৪

৪। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.), ইকতিদায়ে ছিরাতেমুস্তাকীমে, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ-৬২৬ ।

৫। ইমাম ইবনে রাজাব, লাতায়েফুল মা‘আরিফ, পৃ-১৪৪

৬। আল্লামা নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী (রহ.), লছিলাতুল আহাদীস আস সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯

সুতরাং লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান বা শবে বরাতের ফযিলত প্রমানিত। যারা এই রাতে ইবাদাতের পক্ষে কথা বলেন তারা এই বলে যুক্তি দেন যে, ফযিলতপূর্ণ রাত কি ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিব? এটা তো অযৌক্তিক। এছাড়া তাদের আর কোন দলীল ও যুক্তি নেই। এই রাতে ব্যাক্তিগত ইবাদাত করার পক্ষে মত দিয়েছেন-

১. ইমাম আওযা‘য়ী (রহ.)

২. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)

৩. আল্লামা ইবনে রজব (রহ.)

এই রাত উপলক্ষে যে কোন ইবাদাত করা কে বিদআত বলেছেন-

১। প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ‘আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.)

২। ইবনে আবি মুলাইকা (রহ.)

৩। মদীনার ফুকাহাগণ

৪। আব্দুর রাহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রহ.)

৫। ইমাম মালেকের ছাত্রগণ

৬। শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.)

যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০২ :: লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান সম্পর্কিত জাল হাদিস।

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান বা শবে বরাত সম্পর্কে বহু মিথ্যা ও জলা কথা সমাজে প্রচলিত। এই জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করেই শবে বরাতের দিনে সিয়াম ও রাতে কিয়ামের আমল যুগ যুগ ধরে মুসলীম সমাজে চালু আছে। এই ব্যাপারের আলেমগন ঐক্যমত প্রষণ করেছেন যে, সকল প্রকারের সহিহ হাদিসের উপর আমল করা যাবে এবং কোন জাল হাদিসের উপর আমল করা যাবে না। কিন্ত যঈফ হাদিসের উপর আমলের ক্ষেত্র দুটি মত পাওয়া যায়। আলমদের একদল বলছেন, যঈফ হাদিস থেকে কোন প্রকার আমল করা যাবে না। অন্যদল বলছেন, যঈফ হাদিসের উপর আমল করা যাবে। কিন্তু লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত্রি ফজিলত বর্ণিত হাদিস দ্বারা আমলের রেওয়াজ চালু করার কোন যুক্ত নেই। যদি কোন আমল করা খাস হত তবে আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও ছাড়তেন না। কমছে কম কোন সাহাবি দ্বারা এর প্রমান পাওয়া যেত। অথচ কোন সহিহ বা যঈফ হাদিসে আমলের কোন প্রমান পাওয়া যায় না। যে সকল হাদিসে আমলের ঘ্রান পেলাম তা জাল। আর উম্মতের মাঝে ইজমা বা ঐক্যমত হল জাল হাদিসের উপর আমল করা জায়েয নয়। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে হাদিসের মধ্যে পাঁচটি (আদালত, যাবত, ইত্তিসাল, শুযূয মুক্তি, ইল্লাত মুক্তি) শর্ত পূরণ হয়েছে তাকে সহিহ হাদিস বলা হয়। উপরোক্ত ৫টি শর্তের বিদ্যমানতা অপরিহার্য। তবে দ্বিতীয় শর্তের (যাবত) মধ্যে যদি সামান্যতম দূর্বলতা দেখা যায় তবে হাদীসটিকে ‘হাসান’ (সুন্দর বা গ্রহণযোগ্য হাদীস) বলা হয়। যে ‘হাদীসের’ মধ্যে হাসান হাদীসের শর্তগুলির মধ্যে কোনো একটি অবিদ্যমান থাকে, মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় তাকে ‘যয়ীফ’ হাদীস বলা হয়। যদি প্রমাণিত হয় যে, এরূপ দুর্বল হাদীস বর্ণনাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলুল্লাহ (স) এর নামে সমাজে প্রচার করতেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীসের সূত্র (সনদ) বা মূল বাক্যের মধ্যে কম বেশি করতেন, তবে তার বর্ণিত হাদীসকে ‘মাউযূ’ বা বানোয়াট হাদীস বলে গণ্য করা হয়। এমন কি এরা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন নাম ব্যবহার করে হাদিস বানিয়েছেন।  অনেক সময় কিছু পীর, দরবেশ, আলেমগন নিজেরাই হাদিস বানিয়ে প্রচার করেছেন কোন বিশেষ স্বার্থে। মাউযূ বা জাল হাদীস হাদিস গ্রহনের ফলে যুগে যুগে মুসলীমদের আকিদা ও আমলের ক্ষেত্রে বহু বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই বুঝতে পারছেন জাল হাদিস দ্বারা কোন প্রকার আমল করা যাবে না। এই রাতের বিদআতি আমলের মুলভিত্তি হলো এই সকল জাল হাদিস। যা বানিয়ে বানিয় এর নামে প্রচার করা হয়েছে। সরল প্রান অজ্ঞ মুসলিম মিথ্যাবাদীদের প্রতারণা শিকার হলে বিদআতকে সঠিক আমল মনে করে পালন করে যাচ্ছে। এই সম্পর্কিত কয়েকটি জাল হাদিস নিম্ম উল্লেখ করা হলো-

জাল হাদীস-০১ : শাবান মাসের ১৫ জিকিরের ফজিলত।

১. হাদিসে আছে, শাবানের চাঁদের চৌদ্দই তারিখের সূর্য অস্ত যাইবার সময় নিম্নলিখিত দোওয়া ৪০ বার পাঠ করিলে ৪০ বৎসরের ছগীরা গুনাহ মাফ হইয়া যাইবে।

لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ

বর্ণনাগুলি পাবেনঃ মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃ. ২৩৬-২৪১।

এই হাদীসটি জার কারনঃ

১. এই হাদীসটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এর কোন সনদ নাই। সহিহ, যয়ীফ বা জাল কোন সনদেই কথাগুলী বর্ণিত হয় নাই।

২. এই হাদীসটি বানোয়াট ও মিথ্যা। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৫০)

এই কালিমাতে জিকির করার কথা বহু সহিহ হাদীসে বিদ্যমানঃ

আবূ মুসা আশআরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, “তোমাকে জান্নাতের অন্যতম ধনভাণ্ডারের কথা বলে দেব না কি?” আমি বললাম, ’অবশ্যই বলে দিন, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন-

لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ

উচ্চরণঃ লা হাওলা অলা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

সহিহ বুখারি ২৯৯২, ৪২০৫, ৬৩৮৪, ৬৪০৯, সহহি মুসলিম ২৭০৪, তিরমিযী ৩৩৭৪, ৩৪৬১, আবূ দাউদ ১৫২৬, ইবনু মাজাহ ৩৮২৪

২. আবূ মূসা আশআরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ্ এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখনই কোন উঁচুস্থানে আরোহণ করতাম, কোন উঁচুতে থাকতাম এবং কোন উপত্যকা অতিক্রম করতাম তখনই উচ্চস্বরে তাকবীর বলতাম। রাবী বলেন অতঃপর নবী আমাদের নিকটবর্তী হলেন এবং বললেনঃ ওহে লোকেরা! তোমরা নিজেদের উপর রহম কর। তোমরা কোন বধির বা কোন অনুপস্থিত সত্ত্বাকে ডাকছ না বরং তোমরা ডাকছ শ্রবণকারী ও দর্শনকারী সত্ত্বাকে। এরপর তিনি বললেনঃ হে ’আবদুল্লাহ্ ইবনু কায়স! তোমাকে আমি কি এমন একটি কথা শিখিয়ে দিব না, যা হল জান্নাতের ভান্ডারসমূহের অন্যতম? তা হলঃ

لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ

উচ্চরণঃ লা হাওলা অলা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। সহিহ বুখারি ৬৬১০

জাল হাদীস-০২ : মধ্য শাবানের রাতে একশত রাকআত সালাত আদায়ের ফজিলত।

ইবনু উমার (রা)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে বলেছে: ‘‘যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে এক শত রাকআত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ তা‘য়ালা তার কাছে ১০০ জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন, তন্মধ্যে ত্রিশজন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে জাহান্নমের আগুন থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ প্রদান করবে, ত্রিশজন তাকে ভুলের মধ্যে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং দশজন তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জবাব দেবে।’’

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫০-৫১।

২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৯।

৩. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, পঞ্চম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৭১।

৪. মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব, আখবারু মাক্কাহ, ফাকিহানী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৮৬-৮৭।

৫. এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের অধিকাংশ রাবী অজ্ঞাতপরিচয়। বাকীরা মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩৯

জাল হাদীস-০৩ : মধ্য শাবানের রাত্রিতে রহমতের দরজাগুলো খোলা হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথা হলোঃ

উবাই ইবনু কাব (রা.) এর সূত্রে কথিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মধ্য শাবানের রাতে জিবরাঈল (আ.) আমার কাছে আগমন করে বলেন, আপনি দাঁড়িয়ে সালাত পড়ুন এবং আপনার মাথা ও হস্তদ্বয় উপরে উঠান। আমি বললাম, হে জিবরাঈল, এটি কোন্ রাত? তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ, এ রাতে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং রহমতের ৩০০ দরজা খুলে দেওয়া হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বাকী গোরস্তানে গমন করেন। তিনি যখন সেখানে সাজদারত অবস্থায় দোয়া করছিলেন, তখন জিবরাঈল সেখানে অবতরণ করে বলেন, হে মুহাম্মাদ, আপনি আকাশের দিকে মাথা তুলুন। তিনি তখন তাঁর মস্তক উত্তোলন করে দেখেন যে, রহমতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক দরজায় একজন ফিরিশতা ডেকে বলছেন, এ রাত্রিতে যে সাজদা করে তার জন্য মহা সুসংবাদ।

হাদীসটি জাল বলেছনঃ

১. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৬।

২. হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৬

জাল হাদীস-০৪ : পনের শাবানের দিনে সিয়াম পালন।

আমাদের সমাজে প্রচলিতঃ

১. আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করবে, জাহান্নামের আগুন কখনোই তাকে স্পর্শ করবে না।

জাল বর্ণনাটি পাবেনঃ

মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মোমেনীন, পৃ.২৩৫; মুফতী ছামদানী, বার চান্দ.. পৃ. ২৫।

যারা বলেছনঃ

১. এই হাদীসট সহিহ, যয়ীফ বা জাল সনদেও বর্ণিত নাই। এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

২. শা’বান মাসের মধ্যম রজনীর ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। ইবনু মাজাহ সংকলিত আলী (রা)-এর নামে বর্ণিত হাদীসটিতে সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। তবে হাদীসটির সনদ নির্ভরযোগ্য নয়। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৯।

জাল হাদীস-০৫ : শবে বরাতে রাত্রিতে গোসল করার ফজিলত।

এই সম্পর্কিত জাল হাদীস হলোঃ

নবি বলেন, যে ব্যক্তি উক্ত রাত্রিতে এবাদতের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যায় গোসল করিবে, সে ব্যক্তির গোসলের প্রত্যেকটি বিন্দু পানির পরিবর্তে তাহার আমল নামায় ৭০০ (সাতশত) রাকাত নফল নামাযের ছওয়াব লিখা যাইবে। গোসল করিয়া দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল অজুর নামায পড়িবে।

জাল বর্ণনাটি পাবেনঃ

মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-২৪০। আরো দেখুন: মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃষ্ঠা-. ২৬; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃষ্ঠা-৩০৯।

হাদিসটি জাল কারনঃ

১. এই হাদীসট সহিহ, যয়ীফ বা জাল সনদেও বর্ণিত নাই। এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

২. শবে বরাত বিষয়ক প্রচলিত মিথ্যা কথাগুলোর অন্যতম হলো এ রাতে গোসল করার ফযীলত। বিষয়টি যদিও সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও জঘন্য বানোয়াট কথা, তবুও আমাদের সমাজে তা অত্যন্ত প্রচলিত। এ মিথ্যা কথা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কঠিন শীতের দিনেও অনেকে গোসল করেন। উপরন্তু ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার আশায় শরীর ও মাথা ভাল করে মোছেন না। এর ফলে অনেকে, বিশেষত, মহিলারা বড় চুলের কারণে ঠান্ডা-সর্দিতে আক্রান্ত হন। আর এ কষ্ট শরীয়াতের দৃষ্টিতে পন্ডশ্রম ছাড়া কিছুই নয়। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৮)

৮। এই রাত সম্পর্কে আমাদের সারাফদের আমলঃ

এ সম্পর্কে সাহাবীদের কোন বক্তব্য বা আসার পাওয়া যায় না। তাবেয়ী যুগ থেকেই কোন কোন তাবেয়ী গুরুত্ব না দিয়ে লাইলাতুল নিসফে মিন শাবান বা শাবানের মধ্য রাতে কিছু ইবাদত করতে থাকে এবং তখনই আবার অনেক তাবেয়ী এর প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু তারা লাইলাতুল কদর বা ভাগ্য রজনী বলে কিছু বলেন নাই বা তারা জানতেনও না। এর প্রমান তাদের পরবর্তীতে লিখিত কোন হাদিস গ্রন্থ বা ফিক্‌হের নির্ভরযোগ্য কিতাবে এই রাতের ইবাদত সম্পর্কে কিছু পাওয়া যায় না। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলো ফিকহের সিলেবাস হিসাবে মালাবুদ্দা মিনহু, নুরুল ইজাহ, মুখতাসাতুল কুদুরী, কানযুদ দাকায়েক, শরহে বিকায়া, হিদায়াহ ইত্যাদি কিতাবগুলি পড়ে থাকে। এই সকল কিতাবেগুল খুলে দেখুন না, কোথাও শবে বরাত নামের কিছু পাওয়া যায় কিনা। অথচ আমাদের পূর্বসূরী ফিকাহবিদগণ ইসলামের অতি সামান্য বিষয়গুলো আলোচনা করতেও কোন ধরনের কার্পণ্যতা দেখাননি। তারা সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণের সালাত সম্পর্কেও অধ্যায় রচনা করেছেন। অনুচ্ছেদ তৈরী করেছেন কবর যিয়ারতের মত বিষয়েরও। শবে বরাতের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর সামান্যতম ইশারা থাকলেও ফিকাহবিদগণ এর আলোচনা মাসয়ালা-মাসায়েল অবশ্যই বর্ণনা করতেন। 

৯। শবে বরাতের নামে ভ্রান্ত আকিদা ও বিদআতঃ

শবে রবাতের রাতে নানা আয়োজনে নানান ইবাদাত করা হয়। এর মাঝে অনেকগুল সুন্নাহ সম্মত নফল ইবাদাত শুধু এই রাতের সাথে সম্পৃক্ত করা জন্য নফল ইবাদাতটি বিদআদ হিসাবে পরিগনিত হয়। আমাদের উপমহাদেশ ইবাদাত বহির্ভূত বিদআত ও করা হয় এবং বিদআতের পাশাপাশি এই রাত সম্পর্কে অনেকে ভ্রান্ত আকিদা রাখে। শবে বরাতে বহির্ভূত বিদআত ও ভ্রান্ত আকিদা এই দুটি বিষয় সামান্য আলোকপাত করব।

১০। শবে বরাত সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদাঃ

ইসলাম ধর্ম পৃথিবীতে আসার অনেক দিন পরে শবে বরাত পালন শুরু হলেও এর বয়স কম নয়। সময়ের সাথে সাথে শবে বরাত সম্পর্কে মানুষের মাঝে বিভিন্ন আকিদা বিশ্বাসের জম্ম দিয়েছে। এই সকল আকিদা বিশ্বাস কুনআন ও সহিহ হাদিসের সাথ সাংঘর্ষিক।

(১) শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন।

(২) শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন।

(৩) সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করা

(৪) মৃতদের আত্মার দুনিয়াতের পূণরাগমনের বিশ্বাস

(১) শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেনঃ

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ

এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯ হাদিসের মান যঈফ। ইমাম আলবানীর তাহকিক মিশকাত : ১২৯৯ ও যঈফ বলেছেন।

এই জঈফ হাদিস বাদি করে মহান আল্লাহ শুধু মধ্য শাবানের রাত্রিতে বান্দাদের নিকটবর্তী আকাশে আবির্ভূত নয়। কিন্তি সহিহ হাদিস দাবি করে তিনি প্রতি রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল বলেছেন-

‏ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ

মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। সহিহ বুখারি : ১১৪৫, ৬৩২১, ৭৪৯৪, সহিহ মুসলিম : ৭৫১-৫, সুনানে তিরমিযী : ৪৪৬, ৩৪৯৮; সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩১৫, ৪৭৩৩; আহমাদ : ৭৪৫৭, ৭৫৩৮, ৭৫৬৭, ৭৭৩৩, মুওয়াত্ত্বা মালিক : ৪৯৬,

উল্লিখিত হাদীসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাতে নিকটতম আকাশে আসেন ও বান্দাদের দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। কিন্তু এই বিখ্যাত সহিহ হাদিসটির বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষের দিকে নিকটতম আকাশে অবতরণ করে দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন।

(২)  শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেনঃ

শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন, এই সকল আকিদা সরাসরি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ বিরোধি। এই কথা বিশ্বাসে জন্য দায়ী একটি জঈফ হাদিস। যে জাল হদিসটি আল-মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবে রমাজান মাসে কিয়াম (রমাজান মাসের রাতের সালাত) অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসটি হলো-

আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

هَل تدرين مَا هَذِه اللَّيْل؟» يَعْنِي لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ قَالَتْ: مَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ: «فِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كلُّ مَوْلُودٍ مِنْ بَنِي آدَمَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ وَفِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كُلُّ هَالِكٍ مِنْ بَنِي آدَمَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ وَفِيهَا تُرْفَعُ أَعْمَالُهُمْ وَفِيهَا تَنْزِلُ أَرْزَاقُهُمْ

তুমি কি জানো এটা (মধ্য শাবানের রাত) কোন রাত? তিনি বললেন করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ রাতে কি রয়েছে? তিনি বললেনঃ এ রাতে এই বছরে যে সকল মানব সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে তাদের ব্যাপারে লিপিবদ্ধ করা হয়, যারা মৃত্যু বরণ করবে তাদের তালিকা তৈরী হয়, এ রাতে ‘আমলসমূহ পেশ করা হয়, এ রাতে রিযক নাযিল করা হয়। মিশকাত : ১৩০৫ আংশিক

হাদিসের মানঃ হাদিসের মান মুনকার। এ হাদীসটি আল-মিশকাত আল-মাসাবীহর সংকলক উল্লেখ করার পর বলেছেন, তিনি হাদীসটি ইমাম বাইহাকীর ‘আদ-দাওআত আল-কাবীর’ কিতাব থেকে নিয়েছেন।  ইমাম বাইহাকী তার ‘আদ-দাওআত আল-কাবীর’ গ্রন্থে শবে বরাত সম্পর্কে মাত্র দুটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। তার একটি হল এই হাদীস। তিনি তার ‘শুআ’বুল ঈমান’ গ্রন্থে শবে বরাত সম্পর্কিত হাদীস উল্লেখ করার পর লিখেছেন, “এ বিষয়ে বহু মুনকার হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যার বর্ণনাকারীরা অপরিচিত। আমি তা থেকে দু’টি হাদীস ‘আদ-দাওআত আল-কাবীর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছি। আলোচ্য হাদীসটি হাদীসে মুনকার। মুনকার হাদীস ‘আমলের জন্য গ্রহণ করা যায় না। যিনি হাদীসটি আমাদের কাছে পৌছিয়েছেন তিনি নিজেই যখন হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মতামত দিয়েছেন। কাজেই বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোন অবস্থায়ই এই মুনকার হাদিস গ্রহণীয় নয়।

এই হাদিসের বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, হাদীসে ভাগ্য লেখার বিষয়টি লাইলাতুল কদরের সাথে সম্পর্কিত। কেননা জন্ম, মৃত্যু, ‘আমল পেশ, রিয্‌ক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী রামাযান মাসে লাইলাতুল কদরে সাথে সম্পৃক্ত। কুরআনের একাধিক আয়াত দ্বারা প্রমাণিত তেমনি বহু সংখ্যক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন,

وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلۡمُبِينِ (٢) إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةٍ۬ مُّبَـٰرَكَةٍ‌ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ (٣) فِيہَا يُفۡرَقُ كُلُّ أَمۡرٍ حَكِيمٍ (٤)

শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমিতো এটা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। আমি তো সতর্ককারী। এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। সূরা দুখান : ১-৪

কুরআন নাজিলের রাতে বা লাইলাতুল কদরের রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয় বা ভাগ্য লিপি বদ্ধ হয়। এ ছাড়া মিশকাত আল-মাসাবীহর সংকলক বিষয়টি ভালভাবে বুঝেছেন বলে তিনি হাদীসটিকে রামাযান মাসের সালাত (কিয়ামে শাহরি রামাযান) অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। বুঝা গেল যে, তার মত হল হাদীসটি রামাযান মাসের লাইলাতুল কদর সম্পর্কিত। হাদীসটিতে বর্ণিত “মধ্য শাবানের রাত” কথাটি আয়িশার (রা.) বক্তব্য নয়। কারণ তার বক্তব্য শুরু রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বক্তব্য শেষ হওয়ার পর। কিন্তু এখানে প্রশ্নের ভিতরেই আয়শা (রা.) এর বক্তব্য শুরু হয়েছে। যা আদবের খেলাপ। তাহলে এ বক্তব্যটি কার? এ বক্তব্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আয়িশা (রা.) ব্যতীত অন্য কোন বর্ণনাকারীর নিজস্ব মন্তব্য, যা মেনে নেয়া আমাদের জন্য যরুরী নয়।

                  
(৩) সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করাঃ

একটি সহিহ হাদিসে লাইলাতুল নিসফে মিন শারান বা শাবানের মধ্য রজণীর ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও বলেন নাই যে এই রাতটি সৌভাগ্য রাত। আমাদের বিশ্বাস মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিটি আমলেন প্রতিদান দিবেন, তার আমলের প্রতিদান প্রদানের জন্য কোন রাতকে সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করার কোন কারন নেই কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এমনটি করে নাই আর সাহাবীদের ও এমনটি করতে বলেন নাই। তবে একটি জাল হাদিসে এই রাতকে সোভাগ্য রজনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথা হলো-

আলী (রা)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামে প্রচারিত: যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ১০০ রাকআত সালাত আদায় করবে, প্রত্যেক রাকআতে সুরা ফাতিহা ও ১০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে সে উক্ত রাতে যত প্রয়োজনের কথা বলবে আল্লাহ তায়ালা তার সকল প্রয়োজন পূরণ করবেন। লাওহে মাহফুযে তাকে দুর্ভাগা লিপিবদ্ধ করা হলেও তা পরির্বতন করে সৌভাগ্যবান হিসেবে তার নিয়তি নির্ধারণ করা হবে, আল্লাহ তায়ালা তার কাছে ৭০ হাজার ফিরিশতা প্রেরণ করবেন যারা তার পাপরাশি মুছে দেবে, বছরের শেষ পর্যন্ত তাকে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন রাখবে, এছাড়াও আল্লাহ তায়ালা ‘আদন’ জান্নাতে ৭০ হাজার বা ৭ লাখ ফিরিশতা প্রেরণ করবেন যারা জান্নাতের মধ্যে তার জন্য শহর ও প্রাসাদ নির্মাণ করবে এবং তার জন্য বৃক্ষরাজি রোপন করবে…। যে ব্যক্তি এ নামায আদায় করবে এবং পরকালের শান্তি কামনা করবে মহান আল্লাহ তার জন্য তার অংশ প্রদান করবেন।

হা্দীসটি জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৪৯-৫০।

২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৭-৫৮।

৩. মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হি.), আল-আসরার, পৃষ্ঠা-৩৩০-৩৩১ এবং আল মাসনু’, পৃষ্ঠা-২০৮-২০৯।

৪. ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৭৫-৭৬।

৫. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৯২-৯৩।

৬. হাদীসটি সর্বসম্মতভাবে বানোয়াট ও জাল। এর বর্ণনাকারীগণ কেউ অজ্ঞাত পরিচয় এবং কেউ মিথ্যাবাদী জালিয়াত হিসেবে পরিচিত। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩৮)

নিজেদের সৌভাগ্য রচনার জন্য কোন অনুষ্ঠান বা ইবাদাত-বন্দেগী ইসলামে অনুমোদিত নয়। শবে বরাতকে সৌভাগ্য রজনী বলে বিশ্বাস করা একটি বিদ‘আত তথা ধর্মে বিকৃতি ঘটানোর শামিল। এ সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ বাদ দিয়ে এবং সারা জীবন সালাত-সিয়াম-যাকাত ত্যাগ করে শুধুমাত্র একটি রাতে মাসজিদে রাত জেগে ভাগ্য বদল করে সৌভাগ্য হাসিল করে নিবেন এমন ধারণা ইসলামে একটি হাস্যকর ব্যাপার। অনেক ঐতিহাসিক জ্ঞানী আলেমদের ধারনা, “শবে বরাত মত বিদআত প্রচলনের কৃতিত্ব সম্পূর্ণভাবে শীয়াদের। ধর্ম বিকৃতি করার জন্য শিয়াগণ এক নম্বর। তাদের ফারসী ভাষার “শবে বরাত” নামটা থেকে এ বিষয়টা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তারা এ দিনটাকে ইমাম মাহদীর জন্ম দিন হিসাবে পালন করে থাকে। তারা বিশ্বাস করে যে, এ রাতে ইমাম মাহদীর জন্ম হয়েছে। এ রাতে তারা এক বিশেষ ধরনের সালাত আদায় করে। যার নাম দিয়েছে “সালাতে জাফর”।

আরা জানি ফিকহী মাসয়ালা মাসায়েলে কুনআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস কে উৎস হিসাবে গ্রহন করা হয়। কিন্তু আকিদা বিশ্বাস হল গায়েবী বিষয় যা সরাসরি কুনআন ও সহিহ দ্বারা প্রমানিত হতে হবে। আকিদার ক্ষেত্র ইজমা, কিয়াস, যঈফ জাল হাদিস গ্রহন করা যাবে না। তাই শবে বরাতের যে সকল হাদিস যঈফ বা জাল তা দিয়ে ‘সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করার কথা বলা হয়েছে তা কি করে বিশ্বাস করি। তাই যেহেতু বিষয়টি আকিদার সাথে সম্পর্কিত আমলের সাথে নয়।

শবে বরাত সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস পরিস্কার থাকতে হবে যদি মিথ্যা বা জাল হাদিস দ্বারা আকিদা প্রমাণ করে বিশ্বাস করি তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি মিথ্যা আরোপ করার মত অন্যায় হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেনঃ 

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ

তার চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে? সূরা সাফ : ৭


(৪) এই রাতে মৃতদের আত্মার পুণরায় দুনিয়াতের ফিরে আসে বিশ্বাস করা

আমাদের উপমহাদেশের হিন্দুদের বিশ্বাস মৃতর পর তাদের আত্মার দুনিয়াতের পূণরায় ফিরে আসে। হিন্দুদের সাথে অবস্থানের কারনে অজ্ঞ মুসলিমেদের মাঝে তাদের মত বিশ্বাস করতে উদ্ভুদ্য করেছেন। কিছু অজ্ঞ মুসলীমদের বিশ্বাস, এই রাতে মৃতদের আত্মার পুণরায় দুনিয়াতের ফিরে আসে। মৃত্যুর আগমনের কারনে তারা ঘর-বাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে আতর সুগন্ধি লাগিয়ে পরিপাটি করে রাখে। এ রাতে অনেক মহিলা এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারনে মাটির বাসনের খাবার রেখে দেয়। তাদের ধারনা, এই খাাবার মৃতব্যাক্তি বাড়িতে এসে যেন না খেয়ে চলে না যা। এমনকি তারা কিছু খাবার একটুকরো কাপড়ে পুরে ঘরে ঝুলিয়ে রাখে। কারণ, তাদের বিশ্বাস হল, তাদের মৃত স্বামী-স্বজনদের আত্মা এ রাতে ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ পরিবারের সাথে দেখা করতে আসে। এটা যে কতবড় মূর্খতা তা একমাত্র আল্লাহ জানেন। সঠিক কথা হলো‌- মানুষ মারা গেলে তাদের আত্মা বছরের কোন একটি সময় আবার দুনিয়াতে ফিরে আসা মুসলমানদের আকীদাহ নয়। বরং অনেকটা তা হিন্দুয়ানী আকীদার সাথে সাঞ্জস্যপূর্ণ।

যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০৩ :: শবে বরাত রাতে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু বিদআত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পুর্বের আলোচনা দ্বারা বুঝতে  পেরেছি। এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে সকলে একমত। এই রাতের আলস সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহে কোন দিক নির্দেশনা নাই। তারপরও কিছু আলেমদের মাঝে এই রাতে আমল করা না করা নিয়ে সামান্য মতপার্থক্য লক্ষ করা যায়।  এই রাতের আমলের বাহিরে সমজে এমন কতগুলী কাজ চালু চয়েছে যাকে সকলেই একবাক্যে বিদআত বলে অবিহিত করছেন। এমনই কিছু বিদআত সম্পর্কে নিচে ধারনা দেওয়া হলো-

(১) শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের দিনে সিয়াম পালন

আমদের উপমহাদেশে শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের রাতে সালাত আদায় ও দিনে সিয়াম পালন করাকে ইসলামি বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এখনও এই আমলটি গুরুত্বসহকারে করা হয়। বিশেষ করে দেওবন্দী অনুসরাণী ও সুন্নী নাম ধারি বিদআতিগণ এই আলম চালু রেখেছেন। অবশ্য দুই একজন ব্যতিক্রমও আছে। তারা একটি জাল হাদিসের উপর আমল করে। হাদিসটি হলো-

আলী ইবনু আবূ তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-

“‏ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا يَوْمَهَا ‏.‏ فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ أَلاَ مِنْ مُسْتَغْفِرٍ فَأَغْفِرَ لَهُ أَلاَ مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلاَ مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلاَ كَذَا أَلاَ كَذَا حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ

যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা এ রাতে দাঁড়িয়ে সালাত পড়ো এবং এর দিনে সওম রাখো। কেননা এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেনঃ কে আছো আমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছো রিযিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিযিক দান করবো। কে আছো রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবো। কে আছো এই প্রার্থনাকারী। ফজরের সময় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৮, মিশকাত : ১৩০৮ যঈফ আত তারগীব : ৬৩২। হাদিসের মান জাল শায়খ নাসিরউদ্দিন আলবানী জাল বলেছেন, যাঈফা : ২১৩২

হাদিসটি জাল বলেছেনঃ

১. শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) হাদীসটি জাল বলেছেন। সিলসিলাহ যায়ীফাহ, হাদীস নম্বর : ২১৩২

২.. উক্ত হাদিসের রাবী আবু বকর বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আবু সাবরাহ সম্পর্কে ইমামগণ বলেন, তিনি দুর্বল।

৩. ইবরাহীম বিন মুহাম্মাদ সম্পর্কে ইবনু হিব্বান সিকাহ বললেও অন্যত্রে তিনি বলেন যে সে হাদিস বর্ণনায় ভুল করেন। ইমাম যাহাবী তাকে সত্যবাদী বলেছেন।

সঠিক কথা হলো- এই হাদিসটি জাল বিধান এর কোন প্রকার হুকুম মানা যাবে না। উম্মতের মাঝে ঐক্যমত আছে কোন প্রকারের জাল হাদিসের উপর আমল করা যাবে না। এই হাদিসে বলা  হয়েছে, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে সালাত আদায় করবে আর দিবসে সিয়াম পালন করবে। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত আত্ম ভোলা নয় যে তিনি সালাত ও সিয়ামের কথা বলবেন বলতে ভুলে গেলের। এই হাদিসটি জাল তাই ও দ্বারাও কোন আমল সৃষ্ট করা যাবে না এবং লাইলাতুল নিসফে মিন শাবান বা শাবানের মধ্য রাতে কেন্দ্র করে সিয়াম পালন করা যাবে না। কিন্তু শাবান মান খুবই বরকতময় মাসে এই মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ অন্য মাসের চেয়ে অনেক বেশী  সিয়াম পালন করতেন।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ لاَ يُفْطِرُ، وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ لاَ يَصُومُ‏.‏ فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلاَّ رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ‏.‏

রাসূলুল্লাহ ﷺ একাধারে সিয়াম পালন করতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর সিয়াম পরিত্যাগ করবেন না। সিয়াম পালন না করা অবস্থায় একাধারে কাটাতেন যে, আমরা বলাবলি করতাম, তিনি আর (নফল) সিয়াম পালন করবেন না। আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে রমজান ব্যতীত কোন পুরা মাসের সিয়াম পালন করতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে কোন মাসে বেশী (নফল) সিয়াম পালন করতে দেখিনি। সহিহ বুখারী : ১৯৬৯

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী ﷺ শা‘বান মাসের চেয়ে বেশী (নাফল) সিয়াম কোন মাসে পালন করতেন না। তিনি (প্রায়) পুরা শাবান মাসই সিয়াম পালন করতেন এবং বলতেন, তোমাদের সাধ্যে যতটুকু কুলোয় ততটুকু আমল কর, কারণ তোমরা ক্লান্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা (সওয়াব দান) বন্ধ করেন না। নাবী ﷺ এর কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় সালাতই ছিল তাই যা যথাযথ নিয়মে সর্বদা আদায় করা হত। যদিও তা পরিমানে কম হত এবং তিনি যখন কোন (নফল) সালাত আদায় করতেন পরবর্তীতে তা অব্যাহত রাখতেন। সহিহ বুখারী : ১৯৭০

শাবান মাসে বেশী থেকে বেশী সিয়াম পালন করা সুন্নাহ। তা হলে প্রশ্ন হল বেশী বেশী সিয়াম পালনের সময় এর মাঝে যদি লাইলাতুল নিসফে মিন শাবান বা শাবানের মধ্য রাত হয়, তবে কি সিয়াম আদায় করলে বিদআত হবে না? প্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে মোট ৩ দিনের সিয়াম পালনে করা সুন্নাত যা হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এই তিন দিনকে শরীয়াতের পরিভাষায় “আইয়ামুল বীদ” বলা হয়। এই সিয়াম পালন সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

আবূ যার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا صُمْتَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ فَصُمْ ثَلاَثَ عَشْرَةَ وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ وَخَمْسَ عَشْرَةَ ‏”‏

হে আবূ যার! তুমি যখন কোন মাসে তিনদিন সওম পালন করতে চাও, তাহলে তেরো, চৌদ্দ ও পনের তারিখে করবে। সুনানে তিরমিজি ৭৬১, নাসায়ী ২৪২৪, সহীহ আল জামি‘ ৬৭৩, আহমাদ ২১৪৩৭)।

ইবনু মিলহান আল-কায়সী (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُرُنَا أَنْ نَصُومَ الْبِيضَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ، وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ، وَخَمْسَ عَشْرَةَ، قَالَ: وَقَالَ هُنَّ كَهَيْئَةِ الدَّهْرِ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ আইয়ামে বীয অর্থাৎ চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সওম পালনে আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ বলেছেনঃ এগুলো সারা বছর সওম রাখার সমতুল্য। সুনানে আবু দাউদ : ২৪৪৯, সুনানে নাসায়ি : ২৪৩২

যদি কারপ্রতি চন্দ্রমাসে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করে থাকে। তবে সেও শাবান মাসের এই তিন দিন সিয়াম পালন করতে বিদআত হবে না। এমন কি যারা সাপ্তাহিক সোমবার ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করে তারা ঐ দিন সাপ্তাহিক সিয়াম রাখলে বিদআতা হবে না। যদি কেউ সাধারণত নফল সিয়াম রাখে কিন্তু এই দিনকে ভীষন গুরুত্ব দিয়ে সিয়াম পালন করে তবে  তা  বিদআত হবে।  

(২) এই রাত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায় করাঃ

বিদআতিগণ রাতে ইবাদত উপলক্ষে  বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়ের পদ্ধতি আবিস্কার করেছে। তাদের এই আবিস্কারের পিছনে কাজ করছে কয়েকটি জাল হাদিস। জাল হাদিসগুলো হলো-

 ইবনু উমার (রা)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে বলেছে: ‘‘যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে এক শত রাকআত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ তা‘য়ালা তার কাছে ১০০ জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন, তন্মধ্যে ত্রিশজন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে জাহান্নমের আগুন থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ প্রদান করবে, ত্রিশজন তাকে ভুলের মধ্যে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং দশজন তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জবাব দেবে।

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫০-৫১।

২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৯।

৩. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, পঞ্চম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৭১।

৪. মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব, আখবারু মাক্কাহ, ফাকিহানী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৮৬-৮৭।

৫. এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের অধিকাংশ রাবী অজ্ঞাতপরিচয়। বাকীরা মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩৯

২. বিশিষ্ট তাবিয়ী ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ আল বাকির (১১৫ হি) থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বরাতে বর্ণনা করেছে: ‘‘যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ১০০ রাকআত সালাতে ১০০০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বেই মহান আল্লাহ তার কাছে ১০০ ফিরিশতা প্রেরণ করবেন। ৩০ জন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ৩০ জন তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবে, ৩০ জন তার ভুল সংশোধন করবে এবং ১০ জন তার শত্রুদের নাম লিপিবদ্ধ করবে।’

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫১।

২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৯।

৩. আব্দুল হাই লাখনবী (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১১৩-১১৪।

৪. এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের কিছু রাবী অজ্ঞাতপরিচয় এবং কিছু রাবী মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৩৯)

৩. দুই দুই রাকাত করিয়া চারি রাকাত সালাত পড়িবে। সূরা ফাতেহার পর প্রত্যেক রাকাতেই সূরা এখলাছ দশবার করিয়া পাঠ করিবে ও এই নিয়মেই সালাত শেষ করিবে।

১. হাদীসে শরীফে আছেঃ  যাহারা এই সালাত পড়িবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাহাদের চারিটি হাজত পুরা করিয়া দিবেন ও তাহাদের সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দিবেন।

২. হাদীস শরীফে আছেঃ মাতৃগর্ভ হইতে লোক যেরূপ নিষ্পাপ হইয়া ভুমিষ্ট হয়, উল্লিখিত ৪ রাকাত সালাত পড়িলেও সেইরূপ নিষ্পাপ হইয়া যাইবে। (মেশকাত)

৩. হাদীস শরীফে আছেঃ  যাহারা এই সালাত পাঠ করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাদের পঞ্চাশ বৎসরের গুনাহ মার্জনা করিয়ো দিবেন। (তিরমিজী)

৪. আরও হাদীসে আছেঃ যাহারা উক্ত রাত্রে বা দিনে ১০০ হইতে ৩০০ মরতবা দরূদ শরীফ হযরত (ﷺ) এর উপর পাঠ করিবে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাহাদের উপর দোজখ হারাম করিবেন। হযরত (দঃ) ও সুপারিশ করিয়া তাহাদিগকে বেহেশতে লইবেন। (সহিহ বোখারী)

বর্ণনাগুলি পাবেনঃ মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-২৩৬-২৪১।

যারা জাল বলেছেনঃ

১. এই আমলটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এর কোন সনদ নাই। সহিহ, যয়ীফ বা জাল কোন সনদেই কথাগুলী বর্ণিত হয় নাই।

২. উপরের কথাগুলো সবই বানোয়াট। সবচেয়ে দুঃখজনক কথা যে, গ্রন্থকার এখানে মিশকাত, তিরমিযী ও বুখারীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন ভিত্তিহীন কিছু কথার জন্য, যে কথাগুলো এ গ্রন্থগুলো তো দূরের কথা কোনো হাদীসের গ্রন্থেই নেই। এভাবে প্রতারিত হচ্ছেন সরলপ্রাণ বাঙালি পাঠক।  হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৫০

এই সালাত বিদআত কেননা, ইসলামে এ ধরণের নামায পড়ার নিয়ম সম্পূর্ণ নতুন আবিস্কৃত বিদআত। এ ব্যাপারে সর্ব যুগের সমস্ত আলেমগণ একমত। কারণ, তা রাসূল ﷺ এবং খোলাফায়ে রাশেদীন কখনো তা পড়েন নি। তাছাড়া ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, আহমদ বিন হাম্বল, সুফিয়ান সাওরী, আওযাঈ, লাইস প্রমূখ যুগ শ্রেষ্ঠ ইমামগণ কেউ এ ধরণের বিশেষ নামায পড়ার কথা বলেন নি। এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসটি হাদীস বিশেষজ্ঞদের মতে বানোয়াট এবং জাল। যেমন, ইব্‌নুল জাওযী উক্ত হাদীসটি মাওযু’আত (জাল হাদীস সংগ্রহ) কিতাবে তিনটি সনদে উল্লেখ করে বলেছেন, এটি যে বানোয়াট তাতে কোন সন্দেহ নেই। তিনটি সনদেই এমন সব বর্ণনাকারী রয়েছে যাদের অধিাকংশরই পরিচয় অজ্ঞাত। আরো কতিপয় বর্ণনাকারী খুব দূর্বল। সুতরাং হাদীসটি নিশ্চিতভাবে জাল। আল মাউযূআত ২য় খন্ড, পৃ- ১২৭-১৩০

এই বিদআতি সালাতের ইতিহাস-

ইমাম ত্বরতূশী (রাহ:) বলেন, শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে একশত রাকআত নামায পড়ার পদ্ধতি সর্ব প্রথম যে ব্যক্তি চালু করে তার নাম হল ইব্‌ন আবুল হামরা। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের অধিবাসী। তিনি ৪৪৮ হিজরী সনে বাইতুল মাকদিসে আসেন। তার তেলাওয়াত ছিল খুব সুন্দর। তিনি শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে মসজিদুল আকসায় এসে নামায শুরু করে। আর এক লোক তার পেছনে এক্তেদা করে। অতঃপর আর একজন আসে। কিছুক্ষণপর আরে আরও একজন। এভাবে নামায শেষে দেখা গেল বিরাট জামাআতে পরিণত হয়েছে। পরিবর্তী বছর শবে বরাতে সে ব্যক্তির সাথে প্রচুর পরিমাণ মানুষ নামাযে শরীক হয়। এভাবে এ নামাযটি মসজিদে আক্বসা সহ বিভিন্ন মসজিদে পড়া আরম্ভ হয়ে গেল। কিছু মানুষ নিজেদের বাড়িতে এ নামায পড়া শুরু করে দিল। পরিশেষে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যেন এটি একটি সুন্নাত। (আত্‌ ত্বারতুশী রচিত আত্‌তাহযীর মিনাল বিদা। পৃষ্টা: ১২১ ও ১২২)।

রাতে নফল ইবাদাত করলে বিদআত হবে কেন?

 যে কোন রাতে বা দিনে যে কেউ ইচ্ছামত জিকির-আসগান, কুরআন তেলাওয়াত, নফল সালাত, দুয়া -মুনাজাত, ইস্তিগফার, কান্নাকাটি, কবর যিয়ারাত, দান-সাদকাহ, ওয়াজ-নাসীহাত প্রভৃতি নেক আমল আদায় করতে পার। এই সকল আমাদের সাথে সময় বা সংখ্যা নির্দিষ্ট করা যাবে না যা বিদআতের আলোচনা থেকে শিখেছি। কারন সংখ্যা ও সময় নির্দষ্ট করার একমাত্র ক্ষমতা হলো মহান আল্লাহর  আর তিনি তার রাসূল সাঃ মাধ্যমে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন। তিনি সামান্য কিছুই গোপন করেন নাই।  নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘আলার সন্ত্বষ্টি অর্জনের জন্য  দুয়া-মুনাজাত, সালাত, সিয়াম, দান-ছাদাকাহ, কুরআন তিলাওয়াত, রাত্রি জাগরণ খুবই ভাল কাজ। এ বিষয়ে কেউ দ্বিমত করবে না এবং বিদআত ও বলবেনা। কিন্তু যখন কেউ কুনআন সুন্নাহর দলীল ব্যতিত একটি মাত্র রাতকে নির্দিষ্ট করে ইবাদাত করবে তখন তা বিদআত হয়ে যাবে। দলীলহীনভাবে একটি রাতের নাম শবে বরাত বা সৌভাগ্য রজনী অথবা মুক্তি রজনী রেখে তার উপর ভ্রান্ত বিশ্বাস রেখে আমল করলে ঐ সকল সুন্নাহ সম্মত ইবাদাতও বিদআতে পরিনত হবে। যদি কেউ নিয়মিত প্রতি রাতেই এই সকল নফল ইবাদাত করে থাকে তবে ঐ রাতেও সে নফল ইবাদাত করতে পারে বিদআত হবে না। যার সিয়াম পালনের অভ্যাস তিনি এ দিন সিয়াম পালন করতে পারেন। যেমন হাদিসে এসেছেঃ আবু কাতাদাহ ইবনে মিলহান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে শুক্লপক্ষের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে সিয়াম রাখার জন্য আদেশ করতেন।’ (হাদিসটি নেয়া হয়েছে রিয়াযুস স্বা-লিহীন-১২৭১; আবূ দাউদ ২৪৪৯; নাসায়ী ২৪৩২)।

তাই যদি কারও প্রত্যেক চদ্র মাসে শুক্ল পক্ষের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের সিয়াম পালন করার অভ্যাস থাকে আর সে এই দিন সিয়াম পালন করে তবে বিদআত হবে না। কিন্তু কোন ব্যাক্তি যদি বছরের কখনও সিয়ম পালন করেনা শুধু মিথ্যা বিশ্বাসের উপর শাবান মাসের ১৫ তারিখের সিয়াম পালন করে তবে তা নিঃসন্দেহে বিদআত হবে।

ঠিক তেমনিভাবে বছরের কোন সময় দুয়া-মুনাজাত, সালাত, দান-ছাদাকাহ, কুরআন তিলাওয়াত, রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে কাটালাম না শুধু মিথ্যা বিশ্বাসের উপর শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে কাটালাম তবে বিদআদ হবে। আমাদের একমাত্র আদর্শ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর নবুওয়াতের তেইশ বছরের জীবনে কখনো তার সাহাবীগণকে সাথে নিয়ে মক্কায় মাসজিদুল হারামে অথবা মদীনায় মাসজিদে নবুবীতে কিংবা অন্য কোন মাসজিদে একত্র হয়ে উল্লিখিত ইবাদাত-বন্দেগীসমূহ করেছেন এমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাঁর ইন্তেকালের পরে তাঁর সাহাবায়ে কিরাম (রা.) তথা খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে কেহ জানতো না শবে বরাত কি এবং এতে কি করতে হয়। তারা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের ‘আমল প্রত্যক্ষ করেছেন। আমাদের চেয়ে উত্তম রূপে কুরআন অধ্যয়ন করেছেন। তারা তাতে শবে বরাত সম্পর্কে কোন দিক-নির্দেশনা পেলেন না। তারা তাদের জীবন কাটালেন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে, অথচ জীবনের একটি বারও তাঁর কাছ থেকে শবে বরাত বা মুক্তির রজনীর ছবক পেলেন না? যা পালন করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে যাননি, যা কুরআনে নেই, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের তা’লীমে নেই, সাহাবীগণের ‘আমলে নেই, তাদের সোনালী যুগের বহু বছর পরে প্রচলন করা শবে বরাতকে নিঃসন্দেহে বিদআদ। হয়তো মনে প্রশ্ন হতে পারে এতদিন ধরে চলছে। মাদ্রাসার বড় হুজুরও আদায় করছে তা হলে বিদআত হয় কি করে? তারা কি কুনআন হাদিস কম বুঝে?

মনে রাখবেন ইসলাম ধর্মে যতগুলো বিদ‘আত চালু হয়েছে তার শতভাগই এক শ্রেনী আলেম দ্বারা। তারা মানুষের বেশী ভাল করতে গিয়ে, ইবাদাত পালনের প্রতি ঝোক সৃষ্ট করতে গিয়ে এই সকল বিদআতের প্রচলণ করেছেন। কোন কালেই কোন সাধারণ মানুষ বা কাফির মুশরিকদের মাধ্যমে বিদআত চালু হয়নি বা প্রসারও ঘটেনি। বিদআত সম্পর্কে ষ্পষ্ট ধারনা রাখতে হবে। কোন আলেমের অন্ধ অনুসরণ বা অনুকরণ করা যাবে না। সন্দেহ হলে ভাল মুহাক্কিক আলেমের পরামর্শ গ্রহন করতে হবে। কারন কোন কারনে যদি আমি বিআদতি আমল করি বা আমার কারনে বিদআতের প্রসার ঘটে এ জন্য তাদেরকে আল্লাহর সম্মুখে জবাবদিহি করতে হবে। যে দিন বলা হবেঃ

*وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ*

অর্থঃ আর সে দিন আল্লাহ তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা রাসূলদের আহ্বানে কিভাবে সাড়া দিয়েছিলে? (সূরা কাসাস ৬৫)

সে দিন তো এ প্রশ্ন করা হবে না যে, তোমরা অমুক বড় হুজুরের মত অনুযায়ী বা অমুক ইমামের মত অনুযায়ী ‘আমল করেছিলে কিনা। যারা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ মত ‘আমল করবে তারাই সে দিন সফল কাম হবে। কাজেই বিআদত সম্পর্কে শতর্ক হই। আমার আমলকে কেউ বিদআত বললে, সম্ভব হলে নিজের আমলের পক্ষের দলীল জেনে নেই। দলীল জানা থাকলে আমলেন প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় হয় এবং কিয়ামতের দিন (উপরের আয়াতে বর্ণিত) প্রশ্নের উত্তরে বলা যাবে। হ্যা, তোমার রাসূলের আহবানে সাড়া দিয়ে সুন্নাহ সম্মত আমল করেছি।


(৩) হালুয়া-রুটি খাওয়াঃ

শবে বরাত উপলক্ষ্যে আমাদের সমাজে হালুয়া রুটি তৈরি বেশ প্রচলন আছে। এই বিদআতি কর্মকান্ডের জন্য দায়ী জাল হাদিস।  এই কথাগুলিকে জাল হাদিস বলতেও ঘৃনা হয়। অথচ যুগ যুগ ধরে অন্ধ ও অজ্ঞ মুসলীমদের মাঝে হাদিস হিসাবে প্রচলিত। এমনই একটি জাল হাদিস হলো-

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে।

হাদীসট জাল কারনঃ

১. রাসূলুল্লাহ (সা.) এর হাদীসের সাথে এর দূরতম সম্পর্কও নেই। এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি জাল হাদীসের উপর লেখা কিতাবাদিতেও এর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। মাসিক আল কাউসার, প্রকাশ কাল, আগস্ট ২০১৪

২. এ রত্রিতে হালুয়া-রুটি তৈরি করা, খাওয়া, বিতরণ করা, মিষ্টান্ন বিতরণ করা ইত্যাদি সবই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কর্ম। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৯

সমাজে প্রচলিত এমনই আরেকটি জাল হাদিস হলো-

কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়, ওহুদ যুদ্ধে যখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানদান মোবরক শহীদ হয়েছিল, তখন কিছুদিন কোনো প্রকার শক্ত খাবার খেতে পারতেন না সেই ঘটনার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই দিনে ঘটা করে হালুয়া রুটি খাওয়া হয়

সকল মুসলিম জানেন যে, ওহুদ যুদ্ধ হয়েছিল তৃতীয় হিজরী শাওয়াল মাসের সাত তারিখে। এই রক্তক্ষয়ী ও অসম যুদ্ধে কাফেরদের আঘাতে নবী ﷺ দাঁত ভেঙ্গে দিয়ে ছিল যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এরই সুযোগ নিয়ে অনেক বিদআতি জাহেল প্রচার করে কিছুদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ কোনো প্রকার শক্ত খাবার খেতে পারতেন না। তিনি এই সময়টা নরম বা হালুয়া রুটি খেতেন। তার সাথে সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য ঐ দিন হালূয়া রুটি খেতে হবে। দেখুন অপরাধী কিভাবে তার অপরাধের সাক্ষী রেখে যায়। ওহুদ যুদ্ধ হয়েছিল শাওয়াল মাসে ও এরা হালূয়া রুটি খায় শাবান মাসে। তিনি নরম খাবার কি শুধু একদিন খেয়ে ছিলেন? কুরআন সুন্নাহ সম্মত আমলেতো নয়ই বরং তাদের কথাগুলী সম্পূর্ণ অযৌক্তিও বটে। বিদআতীদের অবস্থা হল, আল্লাহর নবীর রেখে যাওয়া সাধারণ সুন্নতগুলোও পালন করে না সুবিধামত আমলের নামে বিদআতী কাজ করা। বিদআতী আমলের ভীরে তারা ফরজ সালাত, সিয়াম, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদির কথা ভূলে যায়। তারপর সমাজের অনেক অজ্ঞ বিদআতি আলেম দাবি করে থাকে যে, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি অথবা অন্য কোনো বিশেষ খাবার তৈরি করা শরীয়তে নাজায়িয তো নয়ই বরং জায়িয এবং খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। যারা এটাকে বিদয়াত বা নাজায়িয বলে থাকে তাদের কথা মোটেও শরীয়তসম্মত ও গ্রহণযোগ্য তো নয়ই বরং তা সম্পূর্ণরূপে কুফরী ও গুমরাহীতে পরিপূর্ণ। এই হলো একজন বিদআতি আলেমের কথা।

মুহাক্কিক আলেমদের মনে ঐ নির্দষ্ট দিনে জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে, মিথ্যা নেকীর উদ্দেশ্য হালুয়া রুটি বানান সম্পূর্ণ বিদআতি কাজ।

(৪) এই রাতে বিশেষ মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা 

উপমহাদেশে যারা বিদআতে ধারক বাহক তাদের অনুষ্ঠান হবে অথচ মিলাদ হবে না ভাবা যায় না। শবে বরাতের রাত আর মসজিদে এশার সালাত পর মিলাদ একটি রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। আর ৩০/৩৫ বছর ঢাকা আছি অনেক মসজিদে সালাত আদায় করা সৌভাগ্য হয়েছে। মাজার পুজারী বিদআতী ইমাম নয়, ঢাকার অনেক নামিদামি মসজিদের ইমামকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শবে বরাতের মিলাদে জিলাপি কেনার জন্য চাঁদা আদায় করতে দেখেছি। এই রাতকে সামনে রেখে ঘরে ঘরে গিয়ে মিলাদের জিলপি কেনার টাকা তোলা হয়। বলূত তো এটা কার সুন্নাহ? রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগন কি এইভাবে মিলাদের আয়োজন করেছেন। আমাদের চার মাযহাবের কোন ইমান কি এমন আমল করতে বলেছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে মসজিদ ছাড়াও বিদআতিদের খানকাহ ও দরগায়সমূহে বিশাল আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মিলাদ শেষে চলে মিষ্টি খওয়ার ধুম। চলতে থাকে বিদআতী পন্থায় গরম জিকিরের মজলিশ। এ সব কাজ দ্বীনের মধ্যে বিদআত ছাড়া কিছু নয়।

(৫) মসজিদে সম্মিলিতভাবে খাওয়ার আয়োজন করাঃ

চাকুরির সুবাধে চট্রগ্রামের বিভিন্ন মসজিদে বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখান সৌভাগ্য হয়েছে। এ সব মসজিদে, এ রাতে বিদআতীগণ মিলাদ উপলক্ষে রান্না করা খাবার (পায়েশ, ভাত-গোশতের তরকারী, হালূয়া-রুটি) জমা করে। এশার সালাতের পর সম্মিলিতভাবে মিলাদের আয়োজন করে এবং মীলাদ শেষে সকলে মিলে ঐ জমা করা খাদ্য খায়। মনে হবে, কোন একটি অনুষ্ঠানের খাওয়া দাওয়া চলছে। এই কাজকে তারা ইসলামি কাজ মনে করে নেকীর জন্য করছে অথচ এর কোন দলীল প্রমান কুরআন সুন্নাহতে নেই। এই ভাবে খেতে অসুবিধা নেই কিন্তু নির্দষ্ট দিনে নেকী আশায় আমল করলে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমানিত হতে হবে নতুবা বিদআত হবে।

(৬) এই রাতে ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করাঃ

ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করার জন্য কোন সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। আমাদের মাঝে অনেকেই এই রাতে কিয়ামে ব্যস্ত থেকেছেন কিন্তু সহিহ বুঝ আসার পর এই আমল ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু কিছু মুসলীম ভাইকে দেখা যায় এই রাতের মায়া ছাড়তে পারে না। তারা এই রাতের নির্দিষ্ট সালাত ছেড়ে দিলেও এশা সালাতের পর ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকিরের মাহফিল কায়েম করে থাকেন। প্রশ্ন হল এই আলোচনা ও জিকিরের এই রাতে কেন? যদি তারা বছরের বিভিন্ন সময় এই ধরনের মাহফিল করে থাকে তবে কোন সমস্যা নেই কিন্তু যদি তারা সমগ্র বছরের শুধু এই রাতটিক খাস মনে করে এমন আমল করারে জরুরী মনে করে তবে তা আমল নয় বিদআতে পরিনত হবে। কারন যখন কোন আমল সময়ে সাথে করা কে জরুরী মনে করা হবে তবে তার দলীল প্রয়োজন হবে। আমলটি রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীদের থেকে প্রমানিত হতে হবে।

অনেক মসজিদে আলোচনা করার পর আবার নির্দিষ্ট সংখ্যক (১২/২০ রাকাত) সালাত আদায় করার সময় প্রদান করেন। এরপর লম্বা একটি সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। কোন কোন মসজিদে আরার আলোচনা শেষ করে ব্যক্তিগত আমল জিকির, সালাত, তিলওয়াত করার সময় প্রদান করে। ফজর সালাতের পর সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। ইসলামি আলোচনা, সালাত, তিলওয়াত, জিকির এবং সম্মিলিত মুনাজান কোনটিই বিদআত নয়। কিন্তু শুধু এই রাতটিক খাস মনে করে সময়ে সাথে নির্দষ্ট করার জন্য বিদআত পরিনত হবে।

(৭) এই রাতে সম্মিলিতভাবে কবর জিয়ারত করা

সুনানে তিরমিজে এই জঈফ হাদিসের কারনে অনেক এই দিন কবর জিয়ারতকে জরুরী মনে করে থাকে। বিখ্যাত সেই জঈফ হাদিসটি হলো-

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ

এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯ হাদিসের মান যঈফ। ইমাম আলবানীর তাহকিক মিশকাত : ১২৯৯ ও যঈফ বলেছেন।

পূর্বের আলোচনায় থেকে জানতে পেরেছি হাদিসটির মান জঈফ। তারপরও যদি হাদীসটিকে সহিহ বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলেও কি কোন প্রকার আমল প্রমাণিত। না এ হাদিস দ্বারা কোন আমল প্রমানিত হয় না। যদি কেউ হাদিসটির উপর আমল করতে চায় তবে সে একাকি করব জিয়ারত করতে পারে ঠিক যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন। মনে রাখতে হবে সম্মিলিত কবর জিয়ারত এই বিদআতি আমল। আল্লাহু আলাম

(৮) এই রাতে আলোক সজ্জা করা এবং আতশবাজী করা :

আমাদের সমাজে সাধারণ বিহাহের আয়োজনে, আনন্দ উত্সবে বা কোন খুসির কারনে আলোক সজ্জা করা হয়। আতশবাজী ফুটান হয়। এই দুটি কাজই সময় ও অর্থের অপব্যয় করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে এ দুটি কাজই হারাম। মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّہٖ کَفُوۡرًا

নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ। সুরা ইসরা : ২৭

ইবাদাত মনে করে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি ও আলোকসজ্জা করা বিদআত। সুতারং এই কাজটি হারাম হওয়া পাশাপাশি বিদআতও বটে। তাই এ রাত উপলক্ষ্যে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা যাবে না। এ কাজ শরীয়তসম্মত নয়। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোক সজ্জা হচ্ছে গ্রীক ধর্মের একটি প্রথা। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে হিন্দু ধর্মের প্রথা হিসেবে রূপ লাভ করে যা শেষ পর্যন্ত দেয়ালীপূজা নামে মশহুর হয়। আলোক সজ্জা সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে মুসলমানগণের মধ্যে প্রবেশ করে। যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে আতশবাজিও হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে লক্ষ লক্ষ টাকা শুধু অপচয় করা হয় না বরং এগুলো অগ্নি পুজকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০৪ :: শবে মিরাজ বা লাইলাতুল মিরাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১। শবে মিরাজ বা লাইলাতুল মিরাজ

শব একটি ফারসী শব্দ যার অর্থ রাত। শব শব্দের আরবী লাইল। তাই বলা যায় শবে মিরাজ বা লাইলাতুল মিরাজ দুটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আমারা ইসলামের অনেক পরিভাষাই আরবীর পরিবর্তে ফারসী ব্যবহার করি। যেমনঃ সালাত কে নামাজ বলি, সিয়াম কে রোজা বলি, এ সব বলাল এক মাত্র কারন উপমহাদেশে মোগলদের মাতৃভাষা ফারসীর প্রভাব। সে যা হোক আমাদের আলোচ্য বিষয় হল শবে মিরাজ বা লাইলাতুল মিরাজ। এই  লাইলাতুল মিরাজ আমাদের উপমহাদেশসহ বিভিন্ন দেশে খুব গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। এই রাত কে কেদ্রো করে পরের দিন সরকারি ছুটি থাকে সিয়াম পালনের জন্য। ইসলামের একটি গুরুত্ব পূর্ণ ইবাদত মনে করে কোন মুসলীম শ্বাষক হয়ত এই দিনটি ছুটির দিন ঘোষনা করেছেন। আমার এই লেখায় আমি মিজারে ঘটনা সম্পর্কে সঠিক একটা ধারনা দিব। অতপর, এই দিনে করণীয় ও বর্জণীয় আমল সম্পর্কে আলোচনা কবর। ইনশাল্লাহ।  

মিরাজ শব্দের অর্থ উপরে আরোহন। আল্লাহ তাঁর হাবীব মুহাম্মদ ﷺকে ভূমি থেকে আকাশে আরোহণ করিয়ে প্রথম আকাশ থেকে শুরু করে সপ্তাকাশ ভেদ করে সিদরাতুল মুন্তাহা পেরিয়ে তাঁর নিজের কাছে ডেকে নিয়েছিলেন। সেটাকেই মি‘রাজ বলা হয়। অপর পক্ষে মহানবী ﷺকে রাতের একাংশে মক্কার হারাম থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস এর এলাকায় যে সফর করানো হয়েছে সেটাকে ইসরা বলা হয়। ইসরা শব্দের অর্থ হল রাতের সফর বা রাতের ভ্রমন।

মুহাম্মদ ﷺ এই ইসরা ও মিরাজ একই রাতে হয়েছিল বিধায় বিষয়টি খুবই গুরুত্ব বহন করে। ইসরার দলীল পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইসরা বা বনী ইসরাঈল এর প্রথম আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে,

سُبۡحَـٰنَ ٱلَّذِىٓ أَسۡرَىٰ بِعَبۡدِهِۦ لَيۡلاً۬ مِّنَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ إِلَى ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡأَقۡصَا ٱلَّذِى بَـٰرَكۡنَا حَوۡلَهُ ۥ لِنُرِيَهُ ۥ مِنۡ ءَايَـٰتِنَآ‌ۚ إِنَّهُ ۥ هُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ (١) 

রম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যান্ত-যা র চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল। সুরা বনী-ইসরাঈল : ১

আর মিরাজের দলীল হচ্ছে, অন্য আয়াত যেখানে বলা হয়েছে,

 وَلَقَدۡ رَءَاهُ نَزۡلَةً أُخۡرَىٰ (١٣) عِندَ سِدۡرَةِ ٱلۡمُنتَهَىٰ (١٤) عِندَهَا جَنَّةُ ٱلۡمَأۡوَىٰٓ (١٥) إِذۡ يَغۡشَى ٱلسِّدۡرَةَ مَا يَغۡشَىٰ (١٦) مَا زَاغَ ٱلۡبَصَرُ وَمَا طَغَىٰ (١٧) لَقَدۡ رَأَىٰ مِنۡ ءَايَـٰتِ رَبِّهِ ٱلۡكُبۡرَىٰٓ (١٨) 

নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুলমুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত।

যখন বৃক্ষটি দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি।

নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলী অবলোকন করেছে। সুরা নাজম :১৩-১৮

২। মিজারের পটভূমিঃ

মিরাজ ছিল মহান আল্লাহ প্রদত্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবুয়তের নিদর্শন। এমন এক সময় মহান আল্লাহ এই নিদর্শণ প্রদান করেন যখন রাসূলুল্লাহ  ﷺকে চার দিক থেকে বিপদে ঘিরে ধরেছিল। এতিম রাসূলুল্লাহ ﷺকে তারা দাদা প্রতিপালন করেন। তিনি মারা যাওয়ার পর যিনি তাকে পিতার শ্নেহে পালন পালন করেন তিনি হলেন আবু তালেব। যিনি কাফের হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ ﷺকে সার্বক্ষনিক নিজের তত্ত্বাবধানে রাখতেন। তার জীবদ্দশায় কেউ তার কোন ক্ষতি করতে চাইলেও সক্ষম হত না। নবুওয়তের দশম বৎসরে এই মহান ব্যক্তির মারা যান। তার মৃত্যুর পর কাফেররা অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠে। এর কিছুদিন পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহাও মারা যান। যিনি শুধু রাসূলের স্ত্রীই ছিলেন না বরং তার দাওয়াতের প্রধান সহযোগীও ছিলেন। তার সমস্ত সম্পত্তি রাসূলের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। যিনি প্রতি দিন হেরা গুহায় খাবার পৌছে দিতেন। অহীর সংবাদ পেয়ে প্রথম ঈমান এনেছিলেন। হিজরতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যত কষ্ট প্রতিটির সাথে ভাগ ছিল উম্মুল মুমিনীন খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহার। আবু তালেব ও খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহার মৃত্যুর পর রাসূল ﷺ অসহায় বোধ করলেন। তিনি ইসলামের দাওয়াত পৌছে দেয়ার জন্য বিভিন্ন গোত্র পতিদের সহায়তা চাইলেন। কিন্তু কেউ তাকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়নি। এমতাবস্থায় তিনি ইসলামে বাণী পৌছাতে মক্কা থেকে তায়েফ বাসির নিকট গেলেন। তায়েফের বাসির গোত্রপতিদের নিকট তিনি ইসলাম গ্রহনর আহবান জানান যাতে তার হাত শক্তিশালী হয় কিন্তু তাদের কেউ তার কথায় কর্ণপাতই করল না। উপরন্তু তারা দুষ্ট শিশুদের তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল। এমতাবস্থায় যা ঘটার তা-ই ঘটল। তারা তাকে পাথর মেরে রক্তাক্ত করে দিল। তিনি মক্কায় ফিরে আসলেন। মহান আল্লাহ্ তাকে সম্মানিত করতে চাইলেন। তিনি তাকে ইসরা ও মি‘রাজের মত বিরল সম্মানে সম্মানিত করলেন।

৩। সহিহ কয়েকটি হাদিসের মাধ্যমে মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা বর্ণনা করছিঃ

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,

أُتِيتُ بِالْبُرَاقِ – وَهُوَ دَابَّةٌ أَبْيَضُ طَوِيلٌ فَوْقَ الْحِمَارِ وَدُونَ الْبَغْلِ يَضَعُ حَافِرَهُ عِنْدَ مُنْتَهَى طَرْفِهِ – قَالَ فَرَكِبْتُهُ حَتَّى أَتَيْتُ بَيْتَ الْمَقْدِسِ – قَالَ – فَرَبَطْتُهُ بِالْحَلْقَةِ الَّتِي يَرْبِطُ بِهِ الأَنْبِيَاءُ – قَالَ – ثُمَّ دَخَلْتُ الْمَسْجِدَ فَصَلَّيْتُ فِيهِ رَكْعَتَيْنِ

আমার কাছে বুরাক আনা হল। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদুর দৃষ্টি যায়, এক এক পদক্ষেপে সে ততাদূর চলে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমি এতে আরোহন করলাম এবং বায়তুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌছলাম। তারপর অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কিরাম তাদের বাহনগুলো যে রজ্জুতে বাধতেন, আমি সে রজ্জুতে আমার বাহনটিও বাধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু-রাকাত সালাত আদায় করে বের হলাম। সহিহ মুসলিম : ১৬২  নম্বর হাদিসের প্রথম অংশ কারন পরের হাদিসে বাকী অংশ আছে।

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসুল (ﷺ) ইরশাদ করেনঃ আমি মক্কাতে ছিলাম। আমার ঘরের ছাদ ফাঁক করা হলো। তখন জিবরীল (আ.) অবতরণ করলেন। তিনি আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। এরপর তা যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন। তারপর হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি পাত্র আনা হলো এবং তা আমার বুকে ঢেলে বক্ষ বন্ধ করে দিলেনা এরপর আমার হাত ধরলেন এবং ঊর্ধ্বাকাশে যাত্রা করলেন। আমরা যখন প্রথম আসমানে গিয়ে পৌছলাম, তখন জিবরীল (আ.) এ আসমানের দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন! তিনি বললেন, কে? বললেন, জিবরীল। দ্বাররক্ষী বললেন, আপনার সাথে কি অন্য কেউ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমার সাথে মুহাম্মদ আছেন। দাররক্ষী বললেন, তাঁর কাছে আপনাকে পাঠান হয়েছিল কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর দরজা খুলে দেওয়া হলো।

আমরা প্রবেশ করে দেখি, এক ব্যাক্তি, তাঁর ডানে একদল মানুষ এবং বায়ে একদল মানুষ। যখন তিনি ডান দিকে তাকান তখন হাসেন, আর যখন বাঁ দিকে তাকান তখন কাঁদেন। তিনি আমাকে বললেন মারহাবা হে সুযোগ্য সন্তান। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আমি জিবরীলকে বললাম, ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি  আদম (আ.) আর ডানে ও বায়ের এ লোকগুলো তার বংশধর। ডান পার্শ্বস্থরা হচ্ছে জান্নাতবাসী আর বাম পার্শ্বস্থরা হচ্ছে জাহান্নামবাসী। আর এ কারণেই তিনি ডান দিকে তাকালে হাসেন এবং বাঁ দিকে তাকালে কাদেন।

তারপর জিবরীল (আ.) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বারোহণ করলেন এবং দ্বিতীয় আসমানে পৌছলেন এবং এর দ্বাররক্ষীকে বললেন, দরজা খুলুন। তিনি প্রথম আসমানের দ্বাররক্ষীর মত প্রশ্নোত্তর করে দরজা খূলে দিলেন। আনাস (রা.) বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন যে, তিনি আসমানসমূহে . আদম, ইদূরীস, মূসা ও ইবরাহীম (আলাইহিমুস সালাম) এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। আদম (আ.) প্রথম আসমানে এবং ইবরাহীম (আ.) ষষ্ঠ আসমানে। এছাড়া অন্যান্য নাবীর অবস্থান সম্পর্কে এ রেওয়ায়েতে কিছু উল্লেখ নেই।

আনাস (রা.) বলেন, যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ ও  জিবরীল (আ.) ইদরীস (আ.) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য নাবী! সুযোগ্য ভ্রাতা। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? জিবরীল (আ.) উত্তর দিলেন; ইনি ইদরীস (আ.) তারপর আমরা মূসা (আ.)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনিও বললেন, মারহাবা হে সুযোগ্য নাবী, সুযোগ্য ভ্রাতা। জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি জবাব দিলেন, ইনি মূসা (আ.)।

তারপর আমরা ঈসা (আ.) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনিও বললেন, মারহাবা হে সুযোগ্য নাবী, সুযোগ্য ভ্রাতা! জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি ঈসা (আ.)। তারপর আমরা ইবরাহীম (আ.)-এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম, তিনিও বললেন, মারহাবা হে সুযোগ্য নাবী, সুযোগ্য সন্তান! জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি . ইবরাহিম (আ.)।

ইবনু শিহাব, ইবনু হাযম, ইবনু আব্বাস ও আবূ হাব্বা আনসারী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তারপর জিবরীল (আ.) আমাকে নিয়ে আরো ঊর্ধ্বে চললেন। আমরা এমন এক স্তরে পৌঁছলাম যে, তথায় আমি কলম-এর খশমশ (লেখার) শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ইবনু হাযম ও আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেনঃ রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেনঃ তখন আল্লাহ তা’আলা আমার ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করেন। আমি এ নিয়ে প্রত্যাবর্তন করার পথে মূসা (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উম্মতের ওপর কি ফরয করেছেন? আমি উত্তরে বললাম, তাদের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হয়েছে। 

মূসা (আ.) আমাকে বললেন, আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মাত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না। তাই আমি আল্লাহর নিকটে ফিরে গেলাম। তখন আল্লাহ এর অর্ধেক কমিয়ে দিলেন। আমি আবার ফিরে এসে মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জানালে তিনি বললেন, না, আপনি পুনরায় ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মাত এতেও সক্ষম হবে না। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ তারপর আমি আল্লাহর নিকটে ফিরে গেলে তিনি বললেন, এ নির্দেশ পাঁচ, আর পাঁচই পঞ্চাশের সমান করে দিলাম, আমার কথার কোন রদবদল নেই।

এরপর আমি মূসা (আ.) এর কাছে ফিরে আসি। তিনি তখনো বললেন, আপনি ফিরে যান আল্লাহর নিকটে। আমি বললাম আমার লজ্জা অনুভূত হচ্ছে। তারপর জিবরীল (আ.) আমাকে নিয়ে চললেন, আমরা সিদরাতুল মুনতাহায় পৌছলাম। তা এত বিচিত্র রঙে আবৃত যে, আমি বুঝতে পারছি না যে, আসলে তা কী। তারপর আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান হল। সেখানে ছিল মুক্তার গম্বুজ আর তার মাটি ছিল মিশকের। সহিহ মুসলিম : ১৬৩

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাবী বলেন, আনাস (রা.) সম্ভবত তার সম্প্রদায়ের জনৈক মালিক ইবনু সা’সাআ (রা.) হতে বর্ণনা করেন যে, নাবী ﷺ ইরশাদ করেনঃ একদা আমি কাবা শরীফের কাছে নিদ্রা ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। তখন তিন ব্যাক্তির মধ্যবতী একজনকে কথা বলতে শুনতে পেলাম। যাহোক তিনি আমার কাছে এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। তারপর আমার কাছে একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হল, তাতে যমযমের পানি ছিল। এরপর তিনি আমার বক্ষ এখান থেকে ওখান পর্যন্ত বিদীর্ন করলেন। বর্ণনাকারী কাতাদা (রা.) বলেন, আমি আমার পার্শ্বস্থ একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এখান থেকে ওখান পর্যন্ত- বলে কি বোঝাতে চেয়েছেন?

তিনি জবাব দিলেন, “বক্ষ থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত”। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ এরপর আমার হৃদপিণ্ডটি বের করা হল এবং যমযমের পানি দিয়ে তা ধৌত করে পূনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হল। ঈমান ও হিকমতে আমার হৃদয় পূর্ন করে দেয়া হয়েছে। এরপর আমার কাছে ‘বুরাক’- নামের একটি সাদা জন্তু উপস্থিত করা হয়। এটি গাধা থেকে কিছু বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট। যতদুর দৃষ্টি যায় একেক পদক্ষেপে সে ততদুর চলে। এর উপর আমাকে আরোহণ করান হল। আমরা চললাম এবং দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত পৌছলাম। জিবরীল (আ.) দরজা খুলতে বললেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, আমার সাথে মুহাম্মাদ আছেন। দাররক্ষী বললেন, তাঁর কাছে আপনাকে পাঠান হয়েছিল কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর দরজা খুলে দিলেন এবং বললেন, মারহাবা! কত সম্মানিত আগন্তুকের আগমন হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ তারপর আমরা আদম (আ.)-এর কাছে আসলাম … এভাবে বর্ণনাকারী পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করেন। তবে এ রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ দ্বিতীয় আসমানে ঈসা ও ইয়াহইয়া, তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতূর্থ আসমানে ইদরীস, পঞ্চম আসমানে হারুন (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রাসুলাল্লাহ ﷺ বলেনঃ তারপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে গিয়ে পৌছি এবং মূসা (আ.) এর কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম দেই। তিনি বললেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য নাবী, সুযোগ্য ভ্রাতা! এরপর আমরা ডাঁকে অতিক্রম করে চলে গেলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। আওয়াজ এল, আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি জবাব দিলেন, প্রভু, এ বালককে আপনি আমার পরে পাঠিয়েছেন; অথচ আমার উম্মাত অপেক্ষা তাঁর উম্মাত অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ আমরা আবার চললাম এবং সপ্তম আসমানে গিয়ে পৌছলাম ও ইবরাহীম (আ.) এর কাছে আসলাম। সাহাবী তাঁর এ হাদীসে আরো উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেনঃ সেখানে তিনি চারটি নহর দেখেছেন। তন্মধ্যে দুটি প্রকাশ্য ও দুটি অপ্রকাশ্য। সবগুলোই সিদূরাতূল মুনতাহার গোড়া হতে প্রবাহিত। নাবী ﷺ বলেনঃ আমি বললাম, হে জিবরীল! এ নহর গুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহরদ্বয় তো জান্নাতের নহর আর প্রকাশ্যগুলো নীল ও ফূরাত। অর্থাৎ এ দুটি নহরের সা’দূশ্য রয়েছে জান্নাতের ঐ দুটি নহরের সাথে।

এরপর আমাকে বায়তুল মামুরে উঠান হল। বললামঃ হে জিবরীল! একি? তিনি বললেন, এ হচ্ছে ‘বায়তুল মামুর’। প্রত্যহ এতে সত্তর হাজার ফেরেশতা (তাওয়াফের জন্য) প্রবেশ করে। তারা একবার তাওয়াফ সেরে বের হলে কখনও আর ফের তাওয়াফের সুযোগ হয় না তাদের। তারপর আমার সম্মুখে দূটি পাত্র পেশ করা হলো, একটি শরাবের, অপরটি দুধের। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনি ঠিক করেছেন। আল্লাহ আপনার উম্মাতকেও আপনার ওসীলায় ফিতরাত এর উপর কায়েম রাখুন। তারপর আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত (নামায/নামাজ) ফরয করা হয়… এভাবে বর্ণনাকায়ী হাদীসের শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেন।(সহিহ মুসলিম ৩১৩ নম্বর হাদিস ইফাঃ)।

৪। আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ইসরা মিরাজের রাতে ঈলিয়া নামক স্থানে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সামনে শরাব ও দুধের দু’ টি পেয়ালা পেশ করা হয়েছিল। তিনি উভয়টির দিকে নযর করলেন। এরপর দুধের পেয়ালাটি গ্রহন করেন। তখন জিবরীল (আ.) বললেনঃ সকল প্রসংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আপনাকে স্বভাবজাত জিনিসের দিকে পথ দেখিয়েছেন। অথচ যদি আপনি শরাব গ্রহণ করতেন তাহলে আপনার উম্মত গুমরাহ হয়ে যেত। যুহরী (রহঃ) থেকে মা’মার, ইবনু হাদী, উসমান, ইবনু উমর যুবায়দী অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৭৬

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যখন কুরাইশরা মিরাজের ঘটনায় আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে লাগলো, তখন আমি হিজরে (কাবার একটা অংশের নাম) দাঁড়ালাম। আল্লাহ তা’আলা বায়তুল মুকাদ্দাস কে আমার সামনে উম্মুক্ত করে দিলেন। আমি তা দেখে দেখে তার সকল চিহ্ন তাদের বলে দিতে লাগলাম। ইয়াকুব ইবনু ইব্রাহিম ইবনু শিহাব সূত্রে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন। যখন কুরাইশরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে লাগল, সেই ঘটনার ব্যাপারে যখন আমাকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর করানো হয়েছিল। পরবর্তী অনুরূপ। এমন যা সবকিছু চুরমার করে দেয়। আমাকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত সফর করানোর ঘটনাটি যখন কুরাইশরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে লাগল। সহিহ বুখারী : ৪৭১০

রাসুলুল্লাহ কি মিরাজে আল্লাহ কে দেখেছেন?

মাসরুক (রহ.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে হেলান দিয়া বসেছিলাম। তখন তিনি বললেন, “হে আবু আয়েশা! তিনটি কথা এমন, যে এর কোন একটি বলল, সে মহান আল্লাহ সম্পর্কে ভীষণ অপবাদ দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সেগুলো কী? তিনি বললেন, যে এ কথা বলে যে,  মুহাম্মাদ  ﷺ তার রবকে দেখেছেন, সে আল্লাহর উপর ভীষণ অপবাদ দেয়। আমি তো হেলান অবস্থায় ছিলাম, এবার সোজা হয়ে বসলাম। বললাম, হে উম্মুল মু’মিনীন! থামুন। আমাকে সময় দিন, ব্যস্ত হবেন না। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কি বলেন নি? তিনি তো আল্লাহকে ষ্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন। (তাকবির ৮১:২৩)। অন্যত্রে “নিশ্চয়ই তিনি তাকে আরেক বার দেখে ছিলেন। (নাজম ৫৩:১৩)।  আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বললেন, আমিই এ উম্মতের প্রথম ব্যক্তি, যে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, তিনি তো ছিলেন জিবরীল (আ.)। কেবল এ দু’বার-ই আমি তাকে তার আসল আকৃতিতে দেখেছি। আমি তাকে আসমান থেকে অবতরণ করতে দেখেছি। তাঁর বিরাট দেহ ঢেকে ফেলেছিল আসমান ও জমিনের মধ্যবতী সবটুকু স্থান। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা আরও বলেন, তুমি কি শোন নি?  আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “তিনি (আল্লাহ) দৃষ্টির অধিগম্য  নন, তবে দৃষ্টিশক্তি তাঁর অধিগত এবং তিনিই সূক্ষ্মদর্শী ও সম্যক পরিজ্ঞাত। (আনয়াম ৬:১০৩)। এরূপ তুমি কি শোন নি?  আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “মানুষের এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ব্যতিরেকে অথবা পর্দার অন্তরাল ব্যতিরেকে অথবা এমন দূত প্রেরণ ব্যতিরেকে যে তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করেন, তিনি সর্বোচ্চ ও প্রজ্ঞাময়। (শূরা ৪২:৫)।  আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, আর ঐ ব্যক্তিও আল্লাহর উপর ভীষণ অপবাদ দেয়, যে এমন কথা বলে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু্ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কিতাবের কোনো কথা গোপন রেখেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে রাসূল!আপনার রবের কাছ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা প্রচার করুন, যদি তা না করেন তবে আপনি তাঁর বার্তা প্রচারই করলেন না। (মায়েদা ৫:৬৭)। তিনি (আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) আরো বলেন, যে ব্যক্তি এ কথা বলে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু্ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর ওহী ব্যতীত কাল কী হবে তা অবহিত করতে পারেন, সেও আল্লাহর উপর ভীষন অপবাদ দেয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, বল, আসমান ও জমিনে আল্লাহ ব্যতীত গায়েব সম্পর্কে কেউ জানে না।” (সূরা আন-নামল ২৭:৬৫, সহিহ মুসলিম : ১৭৭

এই একটি মাত্র সহিহ হাদিস দ্বারা বুঝে নিবেন। মিরাজের সফরে কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু্ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখেছেন, নাকি দেখেন নাই।

৫। মিরাজ কখনহয়েছিল?

আমাদের দেশে রজব মাসের চাঁদ উঠলেই পত্র-পত্রিকাতে নিউজ ছাপা হয়। রজব মাসের চাঁদ উঠেছে এই মাসের অমুক তারিখে শবে মিরাজ। দেশের সকল মুসলিম ধরেই নিয়েছি যে রজব মাস মানেই মিরাজের মাস। এই মাসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো মিরাজ। শবে মিজার উপলক্ষে প্রতিটি দৈনিকে বিশেষ ক্রোড় পত্র বের করে। মিরাজের উপর বিস্তার লেখালেখি হয়, যার মধ্যে গুরুত্ব পায় শবে মিজারের গুরুত্ব, ঘটে যাওয়া সত্য কাহিণী, মিথ্যা ফজিলত ও বিদআতী আমল। এই সব প্রবদ্ধ লেখা হয় আমাদের সমাজে আমরা যারা আলেম মনে করি তাদের দ্বারা। তবে হ্যা, ইদানিং অনেক ভাল মানের আলেন ও এ সম্পর্কে সত্য তুলে ধরছেন। আমাদের দেশে যারা আলেম নামে পরিচিতি তারাও এ সম্পর্কে নিজেদের অজ্ঞতার কারনে এই মাসের নির্দিষ্ট দিনে মিরাজ সম্পর্কিত আলোচনা করে। সাধারন মুসলিমকে ধোকা দিয়ে এই দিনের গুরুত্ব তুলে ধরে রাতে সালাত আদায় করতে ও দিনে সিয়াম পালন করতে উৎসাহ প্রদান করেন। সাধারন মুসলিমদেরও দোষ আছে। এই রাতে এশার সালাতের পর হুজুরের ওয়াজ না শুনে এবং মিলাদ না পড়ে কেউই মসজিদ থেকে বাহির হয় না। যেহেতু দিন হল সরকারি ছুটির দিন। নিশ্চয় কিছু একটাতো আছেই, তা না হলে সরকার বাহাদুর ছুটি দিন কেন? যা হোক আবার অনেক আলেম বাধ্য হন কিছু একটা বলার বা করার জন্য।

মিজারের রাতে যখন কোন আলেম কিছু বলতে যায়, তখন মিরাজ সম্পর্কিত সত্য ঘটনা কুরআন সুন্নাহ মোতাবেগই বলেন কিন্তু এই রাতের ফজিলত এ আমল সম্পর্কিত যত কথা বলেন সবই মিথ্যা বানোয়াট। কিন্তু হুজুরদে মিথ্যা ফজিলত ও আমলের কথা বলার কারনে অনেকেই মনে করে থাকেন এই রাতের অনেক গুরুত্ব আছে।

আমাদের সমাজে মিরাজ মানেই রজব মাসের ২৭ তারিখ। এই তারিখটা এতই প্রসিদ্ধ লাভ করেছে যে, এ রিপরীত কোন তারিখ থাকতে পারে তা কেউ কল্পণাও করতে পারেনা। যুগ যুগ ধরে চলে আসা রীতির প্রতি আমাদের একনিষ্ট অনুসরণই এর জন্য দায়ী। পৃথীবির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জণকারী সিরাত গ্রন্থ আর-রাহিকুল মাখতুম-এ মিরাজ সম্পর্কে একটা অধ্যায় আছে। সেখানে মিরাজের তারিখ সম্পর্ক অনেকগুলি মতামত তুলে ধরেছেন আলোচনা শুরুতে ঐ তারিখগুলো হুরহু তুলে ধরলাম।

মিরাজের এ বিশ্ববিশ্রুত অলৌকিক ঘটানাটি কোন সময় সংগটিত হয়েছিল সে ব্যাপারে জীবন চরিতগনের মধ্যে যে মতভেদ দেখআ যায় তা নিম্ম লিপিদ্ধ করা হল,

১। রাসূলুল্লাহ ﷺ  কে যে নবুয়াত প্রদান করা হয়েছিল, সে বছর মিরাজ সংগটিত হয়েছিল। (এটা তাবারীর কথা)

২। নবুয়াতের পাঁচ বছর পর মিরাজ সংগটিত হয়েছিল (ইমাম নাবাবী এবং ইমাম কুরতুবি এ মত অধিক গ্রহন যোগ্য বলে স্থির করেছেন।

৩। দশম নবুয়াত বর্ষের ২৭ শে রজব তারিখে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। (আল্লামা মানসুরপুরী এ মত গ্রহন করেছেন।

৪। হিজরতের ১৬ মাস পূর্বে, আর্থাৎ নবুয়াতের দ্বাদশ বর্ষের রমাজান মাসে মিরাজ সংগটিত হয়েছিল।

৫। হিজরতের ১ বছর ২ মাস পূর্বে আর্থাৎ নবুয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষের মুহারম মাসে মিরাজ সংগটিত হয়েছিল।

৬। হিজরতের ১ বছর পূর্বে আর্থাৎ নবুয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসে মিরাজ সংগটিত হয়েছিল।

এর মধ্য প্রথম তিনটি মত গ্রহন যোগ্য নয় কারন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার মৃত্য হয়েছিল পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হওয়ার পূর্বে। আর এ ব্যাপারে সকলে এক মত যে, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ হয় মিরাজের রাত্রিতে। এ কথাটি পরিস্কার যে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার মৃত্য হয়েছিল মিরাজের পূর্বে। তাছাড়া, এ কথা সর্বজন বিদিত যে, তার মৃত্যু হয়েছিল দশম নবুওয়াত বর্ষের রমাযান মাসে। কাজেই আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি দশম নবুওয়াত বর্ষের রমাযান আগে মিরাজ হতে পারে না। বাকি তিনটি মতের একটির উপর অন্যটির প্রধান্য দেয়ার প্রমান পাওয়া যায় না।

বিশ্ব নন্দীত সিরাত গ্রন্থ আর-রাহিকুল মাখতুম এর ভাষ্যগুলি ভাল করে খেয়াল করলে দেখা যায় মিরাজ সংগটিত হওয়ার সময় হিজরতের এক বা দেড় বছর পূর্বে নবুয়াতের দ্বাদশ বর্ষের রমাজান মাসে অথবা ত্রয়োদশ বর্ষের মুহারম বা রবিউল আউয়াল মাসে। একটু খেয়াল করুন এই গ্রন্থ ২৭ শে রজব তারিখে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল বলে যে কথা বলা হয়েছে তার একেবারেই বাতিন। অথচ আমরা কি বোকা ঐ বাতিল তারিখে আসল ধরে শবে মিরাজ পালন করছি।

মুসলিম সমাজে প্রসিদ্ধ সকল হাদিস গ্রন্থেই মিরাজ সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় রচনা করে আলোচনা করা হয়েছে। সীরাত গ্রন্থ মিরাজের ঘটনা ছাড়া কল্পনা করা যায় না। হাদিস ও সীরাত বিষয়ক গ্রন্থে প্রায় ৪০ জন সাহাবী সহিহ জঈফ সনদে মিরাজের ঘটনার বিভিন্ন দিক ছোট বা বড় আকারে তুলে ধরেছেন। এ সকল হাদীসে মিরাজের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হলেও মিরাজ সংঘটনের কোন নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করে নাই। এমন কি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকেও মিরাজের তারিখ সম্পর্কে একটি কথা বর্ণিত হয় নি। যার ফরে মিজারের তারিখ নিয়ে পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। মিরাজ কোন্ বৎসর হয়েছে, কোন্ মাসে হয়েছে, কোন্ তারিখে হয়েছে ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় ২০টি মত রয়েছে। কারো মতে যুলকাদ মাসে, কারো মতে রবিউস সানী মাসে, কারো মতে রজব মাসের এক তারিখে, কারো মতে রজব মাসের প্রথম শুক্রবারে বা রজব মাসের ২৭ তারিখে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। ইমাম নববী, ইবনুল আসীর, ইবন হাজার আসকালানী ও অন্যান্য অনেকেই বলেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসে মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে আবার তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন এ মাসের ১২ তারিখে এবং কেউ বলেছেন এ মাসের ২৭ তারিখে মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, হাদীসের নামে জালিয়াতি,. পৃ-৩৫০-৩৫৫ম ও  ৫৩০-৫৩১।

আলোচনার সার কথা হল, লাইলাতুল মিরাজের সঠিক তারিখ কেউ জানেন। কোন বছর তা নিয়েই বিতর্ক আছে, কোন মাস তা নিয়ে বিতর্ক আছে আর তারিখ নিয়েতো মহা বিতর্ক আছে। আলোচনার শুরুতে মিরাজ সম্পর্ক অনেকগুলী সহিহ হাদিস উল্লেখ করেছি। এ সকল হাদিস সমূহে দেখা যায় যে, তাকে আসমানের দিকে ঊর্ধ্বে মিরাজ করানো হয়েছে। তাঁর জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। এমনকি তিনি সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়েছেন। এরপর আল্লাহ রব্বুল আলামিম তার সাথে যা ইচ্ছা কথা বলেছেন এবং তাঁর উপর নামায ফরয করেছেন। যে রাত্রিতে মিরাজ সংগঠিত হয়েছে সে রাত্রিকে তারিখ বা কত সালে মিরাজ হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে কোন হাদিস বর্ণিত হয়নি। না রজব মাসের ব্যাপারে আর না অন্য কোন মাসের ব্যাপারে। কিন্তু এই রাত্রিকে নির্দিষ্ট করে যে সব আমলের বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে সে বর্ণনাগুলোর কোনটি হাদিস বিশারদদের নিকট নবী ﷺ থেকে সাব্যস্ত নয়। এমন কি আমল সংক্রান্ত হাদিসগুল যঈফ সনদেও নাই, সহিহ অনেক দুরের কথা। এই রাতে যদি ইবাদতের কোন কল্যান নিহীত থকেত তবে মহান আল্লাহ আমদেরকে অবশ্যই নবী ﷺ এর মাধ্যমে অবহিত করতেন। মিরাজ যে রজব মাসের ২৭ তারিখেই হয়েছে এর কোন গ্রহন যোগ্য ভিত্তি কোরআন ও সহিহ সুন্নাতে কোথাও পাওয়া যায় না। কারন রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নিদিষ্ট কোন তারিখ বলে যাননি। এই রাতটি বা এই তারিখটি যদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতো তাহলে রাসুলুল্লাহ ﷺ নির্দিষ্ট করে রেখে যেতেন। আর সাহাবারা ঠিকই আদায় করতেন। এমন একটা বরকতময় রাত চলে যাবে আর সাহাবা আজমাইনরা আমল করবেন না তাতো হতে পারে না।

লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন করা ইসলামী কাজ নয়ঃ

সহজেই বুঝতে পারছি মিরাজের ঘটনা প্রবাহ শতভাগ সঠিক হলেও রাসূলুল্লাহ  এর থেকে এ রাতটি কোন অবস্থায়ই প্রমানিত হয় নাই। যদি এই রাত্রিটি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমানিত হত, তহলেও এই রাত্রিতে বিশেষ কোন ইবাদত পালন করা বা বিশষভাবে পালন করা কোন ঈমানদারের জন্য জায়েয হবে না। কেননা নবী ﷺ ও তাঁর সাহাবীবর্গ এ দিবসটি বিশেষভাবে পালণ করেননি এবং এ দিবসে বিশেষ কোন ইবাদত আদায় করেননি। যদি সে দিবসটি পালন করা শরিয়তের বিধান হত তাহলে নবী ﷺ উম্মতের জন্য সেটা বর্ণনা করতেন। হয়তো কথার মাধ্যমে কিংবা তাঁর আমলের মাধ্যমে। আর সে রকম কিছু ঘটলে সে কথা সবাই জানতে পারত এবং সাহাবায়ে কেরাম আমাদের কাছে সেটা বর্ণনা করতেন। কেননা, উম্মতের যা কিছু প্রয়োজন এর সবকিছু তারা নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেছেন। দ্বীনি কোন বিষয় বর্ণনা করার ক্ষেত্রে তাঁরা অবহেলা করেননি। বরং তাঁরা যে কোন ভাল কাজে অগ্রণী ছিলেন। যদি এ দিবসটি উদযাপন করা শরিয়তসম্মত হত তাহলে তাঁরা সবার আগে সেটা উদযাপনে এগিয়ে যেতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন মানুষের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকামী। তিনি রাসূলের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করেছেন, আমানত যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। সুতরাং এ রাতকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া ও পালন করা যদি দ্বীনি বিষয় হত তাহলে এক্ষেত্রে তিনি গাফেল থাকতেন না এবং এটি গোপন করতেন না। যেহেতু নবী ﷺ থেকে এমন কিছু আসেনি অতএব বুঝতে হবে এ রাতকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া ও এ রাতটি উদযাপন করা ইসলামী কাজ নয়। আল্লাহ্‌ তাআলা এ উম্মতের জন্য দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন এবং তাদের জন্য নেয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র অনুমোদন ছাড়া এ দ্বীনের মধ্যে নব কিছু চালু করবে তার নিন্দা করেছেন।

আল্লাহ্‌ তাআলা সূরা মায়িদাতে বলেন-

 ؕ اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَاَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَرَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا ؕ

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসাবে মনোনীত করলাম। সুরা মায়েদা : ৩

সহিহ হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি্ ওয়া সাল্লাম কর্তৃক বিদআত যে কঠিন হুশিয়ার দিয়েছেন তাতো আমরা জানিই। কাজেই সতর্ক হই সময় আছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর মিরাজ হয়েছে এটা ঠিক এবং তা কোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমানিত। এবং এই বিষয় অস্বিকার করলে তার ঈমানই থাকবেনা। শবে মিরাজের আমলের গুরুত্ব যদি থাকতো তাহলে সহিহ বর্ণনায় অবশ্যই পাওয়া যেত। আমার মুসলিম ভাই ও বোনেরা আমরা সেই আমলটিই করবো যেই আমল কুরআন ও রাসুলুল্লাহ ﷺ এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এর বাইরে যদি আমরা কোন কিছু করি তাহলে বিদআত হবে। বিধায় রজব মাসকে কেন্দ্র করে মিরাজ উৎযাপন করা বা পালন করা এটা বিদয়াত হবে। আমাদের আমল পরিত্যায্য হতে পাবে। এই বিষয় গুলো আল্লাহ আমাদের বোঝার তাওফিক তান করুন।

৭। লাইলাতুল মিরাজের আমলঃ

লাইলাতুল মিরাজে কোন প্রকার আমল সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত নয়।  যারা আমল করে তারাও জানেন যে, লাইলাতুল মিরাজ উপলক্ষে বিশেষ কোনো আমলের কথা শরীয়তে উল্লেখ করা হয়নি। তারপরও এ রাতে আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ কিছু মিথ্যা, প্রতারণপূর্ণ জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে বিশেষ ইবাদত বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতে পছন্দ করে থাকেন। এই রাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মসজিদ কমিটি কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করার প্রথা বহুদিন যাবত চলে আসছে। সারা রাত জিকির, কুরআন তিলওয়াত, নফল সালাত, দুরুত, দুয়া, ইস্তেগফার ইত্যাদিরম মাধ্যে কাটিয়ে দেয়। অনেকে রাতে কবর স্থানে যায় এবং মৃত ব্যক্তিদের জন্যে দোয়া করা ও দরুদ-ইস্তেগফার পাঠ করে। লাইলাতুল মিরাজের পরদিন অর্থাৎ ২৭ রজব নফল রোজা রাখে। এই কর্মগুলো সম্পাদনের জন্য তারা যে জাল হাদিসগুলোর দলিল হিসার প্রদান করে তার কিছু নমুনা নিম্মে আলোচা করা হবে।