যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০১ : লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান বা শবে বরাত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিদআত সম্পর্কে একটু ধারণ

১। বিদআত কি?

বিদআত শব্দটি আরবী (البدع) শব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। বিদআত (البدع) এর আবিধানিক অর্থ হল, নব আবিস্কৃত ও নব উদ্ভাবন। এর অর্থ এমন করেও বলা যায়, পূর্বের কোন দৃষ্টান্ত ও নমুনা ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি ও উদ্ভাবন করা। পারিভাষিক অর্থে দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন কিছু সংযোজন করার নাম বিদআত।

শরীয়তের পরিভাষায়-

مَا أُحْدِثَ فِى دِيْنِ اللهِ وَلَيْسَ لَهُ أَصْلٌ عَامٌ وَلاَخَاصٌّ يَدُلُّ عَلَيْهِ.

আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে নতুন করে যার প্রচলন করা হয়েছে এবং এর পক্ষে শরীয়তের কোন ব্যাপক ও সাধারণ কিংবা খাস ও সুনির্দিষ্ট দলীল নেই। কাওয়ায়েদ মারিফাতিল বিদআহ, পৃ-২৪

এক কথায় বলতে গেলে, বিদআত হলো ঐ সকল কাজ যা সওয়াব বা নেকির নিয়তে করা হয় কিন্তু শরীয়তে তার কোন ভিত্তি বা প্রমাণ পাওয়া যায়না।  অর্থাৎ যে আমল রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে করেনি এবং কাউকে তা করার অনুমতি ও প্রদান করেননি।

২। বিদআতের ভয়াবহতাঃ

বিদআতের সবচেয়ে ভয়াবহতা হলো  বিদআতিগণ বিদআতকে ভাল আমল হিসাবে পালন করে থাকে, তারা বিদআতকে খারাপ মনে করে না বিধায় বিদআত থেকে তওবা করে না এবং উক্ত গর্হিত পাপ থেকে বিরত থাকে না। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন-

اَلْبِدْعَةُ أَحَبُّ إِلَى إِبْلِيْسِ مِنَ الْمَعْصِيَةِ لِأَنَّ الْبِدْعَةَ لاَ يُتَابُ مِنْهَا وَالْمَعْصِيَةَ يُتَابُ مِنْهَا

ইবলীসের নিকট পাপের চেয়ে বিদ‘আত অধিক প্রিয়। কেননা পাপ থেকে মানুষ তওবা করে কিন্তু বিদ‘আত থেকে তওবা করে না। (কেননা সে বিদ‘আতকে ভাল কাজ বলে বিশ্বাস করে)’। বায়হাক্বী, শুয়াবুল ঈমান : ৯০০৯; ইবনুল কাইয়িম, মাদারিজুস সালেহীন প্রথম খণ্ড, পৃ-৩২২

সুন্নাহ সম্মত আমল না করে মনগড়া বিদআতি আমল আবিস্কার করার প্রতি কুরআন কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। বিদআত না করে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসরনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং বিদআতের ভয়বহ পরিনতি সম্পর্কে কুনআন হাদিসে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। সুরা হাশর : ৭

(১) বিদআত মানুষকে পথভ্রষ্ট করে

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা উম্মতের জন্য নিয়ে এসেছেন তা হল হক। এ ছাড়া যা কিছু ধর্মীয় আচার হিসাবে পালিত হবে তা পথভ্রষ্টতা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ

* فَمَاذَا بَعۡدَ ٱلۡحَقِّ إِلَّا ٱلضَّلَٰلُۖ * 

সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী আছে? সূরা ইউনুস : ৩২

তিনি আরো বলেন,

مَّا فَرَّطۡنَا فِي ٱلۡكِتَٰبِ مِن شَيۡء

আমি কিতাবে কোন কিছু লিপিবদ্ধ করতে ত্রুটি করিনি। সূরা আনআম : ৩৮

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নাসীহাত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু বর্ষণ করলো। তাঁকে বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন (একটি সুনির্দিষ্ট আদেশ দিন)। তিনি বলেনঃ তোমরা আল্লাহ্ভীতি অবলম্বন করো, শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো (নেতৃ-আদেশ), যদিও সে কাফরী গোলাম হয়। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্নক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। ইবনে মাজাহ : ৪২,  সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, আবূ দাঊদ ৪৬০৭, আহমাদ ১৬৬৯২, দারিমী ৯৫

(২) বিদআত সহিহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করে তার স্থলাভিষিক্ত হয়

হাসসান ইবনু আতিয়্যাহ্) (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَا ابْتَدَعَ قَوْمٌ بِدْعَةً فِي دِينِهِمْ إِلَّا نَزَعَ اللَّهُ مِنْ سُنَّتِهِمْ مِثْلَهَا ثُمَّ لَا يُعِيدُهَا إِلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة.

কোন জাতি যখন দীনের মধ্যে কোন বিদ্’আত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তা’আলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় না।

মিশকাত : ১৮৮, সুনানুদ দারেমী : ৯৮

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন-

إِنَّهُ سَيَلِيْ أَمْرَكُمْ مِنْ بَعْدِيْ رِجَالٌ يُطْفِئُوْنَ السُّنَّةَ وَيُحْدِثُوْنَ بِدْعَةً وَيُؤَخِّرُوْنَ الصَّلاَةَ عَنْ مَوَاقِيْتِهَا. قَالَ ابْنُ مَسْعُوْدٍ يَا رَسُوْلَ اللهِ كَيْفَ بِيْ إِذَا أَدْرَكْتُهُمْ قَالَ لَيْسَ طَاعَةٌ لِمَنْ عَصَى اللهَ قَالَهَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ-

নিশ্চয়ই তোমরা আমার (মৃত্যুর) পরে তোমাদের শরী‘আতকে এমন অবস্থায় পাবে- যখন মানুষ সুন্নাতকে বিলুপ্ত করবে, বিদ‘আত সৃষ্টি করবে এবং ছালাতের সময় ছালাত আদায় না করে দেরী করে আদায় করবে। তখন ইবনু মাসউদ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমি যদি তাদেরকে পাই তাহ’লে আমি কি করব? তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, আল্লাহর অবাধ্যদের কোন আনুগত্য নেই। এ কথা তিনি তিনবার বললেন। মুসনাদে আহমাদ : ৩৭৯০; সিলসিলা ছহীহা হ: ২৮৬৪।

(৩) বিদআত সবচেয়ে নিকৃষ্ট আমল

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত-

إِنَّ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَ (إِنَّ مَا تُوعَدُونَ لاَتٍ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ)

সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ -এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ও’য়াদা দেয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না’’- (সূরাহ আনাম-১৩৪)। সহিহ বুখারি : ৭২৭৭,

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন ভাষণ দিতেন তখন তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে যেতো, কন্ঠস্বর জোরালো হতো, তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি পেতো, যেন তিনি কোন সেনাবাহিনীকে সতর্ক করছেন। তিনি বলতেনঃ তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হতে পারো (অথবা তোমাদের সকাল-সন্ধ্যা কল্যাণময় হোক)। তিনি আরো বলতেনঃ আমার প্রেরণ ও ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) এ দুটি আঙ্গুলের অবস্থানের মত পরস্পর নিকটবর্তী। তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল মিলিয়ে দেখান। অতঃপর তিনি বলেনঃ সবচেয়ে উত্তম নির্দেশ হল আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হল মুহাম্মাদ প্রদর্শিত পথ। দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট কাজ। প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। তিনি আরো বলেনঃ কোন ব্যাক্তি ধন-সম্পদ রেখে (মারা) গেলে তা তার পরিবারবর্গের এবং কোন ব্যাক্তি দেনা অথবা অসহায় সন্তান রেখে (মারা) গেলে তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার এবং তার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বভারও আমার যিম্মায়। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫, সুনানে নাসায়ী : ১৫৭৮, ১৯৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪, আহমাদ : ১৩৭৪৪, ১৩৯২৪, ১৪০২২, ১৪২১৯, ১৪৫৬৬; সুনানে দারিমী : ২০৬

(৪) বিদআতির আম কবুল হয়নাঃ

আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

الْمَدِينَةُ حَرَمٌ مَا بَيْنَ عَيْرٍ إِلَى ثَوْرٍ فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثًا أَوْ آوَى مُحْدِثًا فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ لاَ يَقْبَلُ اللهُ مِنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَرْفًا وَلاَ عَدْلاً

আইর থেকে সওর পর্যন্ত মদীনার হারাম-সীমা। এখানে যে ব্যক্তি অভিনব কিছু (বিদআত) রচনা করবে বা বিদআতীকে আশ্রয় দেবে, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাদল এবং সকল মানুষের অভিশাপ। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল করবেন না। হাদিস সম্ভার : ২৯১৩, সহিহ মুসলিম : ৩৩৯৩

ইবরাহীম ইবনু তাইমী (রহঃ) এর পিতা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী (রা.) আমাদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, আমাদের কাছে আল্লাহর কিতাব ও এই সাহীফায় যা আছে, তা ছাড়া অন্য কোন কিতাব নেই, যা আমরা পাঠ করে থাকি। তিনি বলেন, এ সাহীফায় রয়েছে, যখমসমূহের দন্ড বিধান, উটের বয়সের বিবরণ, এবং আইর পর্বত থেকে সত্তার পর্যন্ত মদিনা হারাম হওয়ার বিধান। যে ব্যাক্তি এর মধ্যে বিদআত উদ্ভাবন করে কিংবা বিদআতীকে আশ্রয় দেয়, তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সকল মানুষের লানত। আল্লাহ তাঁর কোন নফল ও ফরয ইবাদত কবূল করেন না। আর যে নিজ মাওলা (প্রভু) ব্যতীত অন্যকে (প্রভু) মাওলা রূপে গ্রহণ করে, তার উপর অনুরূপ লানত। আর নিরাপত্তা দানে সর্বস্তরের মুসলিমগণ একই স্তরের এবং যে ব্যাক্তি কোন মুসলিমের চুক্তি ভঙ্গ করে তার উপরও অনুরূপ লা’নত। সহিহ বুখারি : ৩১৭২, ৬৭৫৫

(৫)। বিদআতির তওবা কবুল হয়না

বিদআতকে বর্জন না করা পর্যন্ত তার তওবা কবুল হবে না।

আনাস (রা.) হতেই বর্ণিত, আল্লাহর রসূল বলে-

إِنَّ اللَّهَ حَجَبَ التَّوْبَةَ عَن كُلِّ صَاحِبِ بِدْعَةٍ حَتَّى يَدَع َبِدْعَتَهُ

আল্লাহ প্রত্যেক বিদআতীর তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত রাখেন (গ্রহণ করেন না), যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার বিদআত বর্জন না করেছে। হাদিস সম্ভার : ১৪৬, ত্বাবারানীর আওসাত : ৪২০২, বাইহাক্বীর শুআবুল ঈমান : ৯৪৫৭, সহিহ আত তারগিব : ৫৪

(৬) বিদআত সৃষ্টিকারীর প্রতি ফেরেশতা এবং সব লোকের অভিশাপ হয়ে থাকে-

ইবরাহীম আত-তাইমী (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আলী (রা.) আমাদের সামনে খুতবাহ দেন এবং বলেন, যে ব্যক্তি ধারণা করে যে, আমাদের নিকট আল্লাহ্ তা’আলার গ্রন্থ এবং এই পুস্তিকা যার মধ্যে উটের বয়সের বিবরণী ও জখমের ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে তা ব্যতীত আরো কোন গ্রন্থ আছে সে মিথ্যাবাদী।

তিনি তার খুৎবায় আরো বলেন, এই গ্রন্থে আরো আছেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মদীনার হেরেমের সীমানা হচ্ছে আইর পাহাড় হতে সাওর পর্বত পর্যন্ত। যদি কেউ এতে কোন প্রকার বিদ”আতের প্রচলন ঘটায় অথবা কোন বিদ’আতীকে আশ্রয় দেয় তাহলে তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাগণ ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। কিয়ামত দিবসে তার কোন ফরয বা নাফল ইবাদাতই আল্লাহ তা’আলা কুবুল করবেন না।

যে লোক তার বাবাকে পরিত্যাগ করে অন্য কাউকে বাবা বলে দাবি করে (নিজের বংশপরিচয় গোপন করে অন্য বংশের পরিচয় দেয়) অথবা তার মনিবকে ছেড়ে দিয়ে অন্য মনিবের নিকট পালিয়ে যায় তার উপর আল্লাহ, ফিরিশতাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ। তার ফরয বা নাফল কোন ইবাদাতই গ্রহণ করা হবে না। সুনানে তিরিমিজ : ২১২৭, বায়হাক্বী : ৯৯৫১, সহিহ আল জামি : ৬৬৮৩, সহিহ আত তারগীব : ১৯৮৬।

(৭)  কিয়ামতের দিন হাউজে কাওসার পানি থেকে বঞ্চিত হবে-

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, নাবী ﷺ বলেছেন-

لَيَرِدَنَّ عَلَىَّ الْحَوْضَ رِجَالٌ مِمَّنْ صَاحَبَنِي حَتَّى إِذَا رَأَيْتُهُمْ وَرُفِعُوا إِلَىَّ اخْتُلِجُوا دُونِي فَلأَقُولَنَّ أَىْ رَبِّ أُصَيْحَابِي أُصَيْحَابِي ‏.‏ فَلَيُقَالَنَّ لِي إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ ‏”

অবশ্যই হাউযের পাড়ে এমন কিছু লোক আসবে যারা দুনিয়াতে আমার সাহচর্য লাভ করেছিল। এমন কি যখন আমি তাদের দেখতে পাব এবং তাদেরকে আমার সম্মুখে নিয়ে আনা হবে, তখন আমার নিকট আসতে তাদের বাধা দেওয়া হবে। তারপর আমি বলব, আয় রব্ব! এরা আমার সাথী, এরা আমার সাথী। তখন আমাকে বলা হবে, অবশ্য আপনি জানেন না, আপনার পর এরা কি উদ্ভাবন (কিরূপ বিদ’আত)

(৮) বিদআতি সালাম না দেওয়া-

নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত-

أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، جَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ إِنَّ فُلاَنًا يَقْرَأُ عَلَيْكَ السَّلاَمَ ‏.‏ فَقَالَ لَهُ إِنَّهُ بَلَغَنِي أَنَّهُ قَدْ أَحْدَثَ فَإِنْ كَانَ قَدْ أَحْدَثَ فَلاَ تُقْرِئْهُ مِنِّي السَّلاَمَ فَإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ يَكُونُ فِي هَذِهِ الأُمَّةِ أَوْ فِي أُمَّتِي الشَّكُّ مِنْهُ خَسْفٌ أَوْ مَسْخٌ أَوْ قَذْفٌ فِي أَهْلِ الْقَدَرِ

ইবন উমার (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললঃ অমুক ব্যক্তি আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন তিনি বললেনঃ আমি খবর পেয়েছি যে, সে ব্যক্তি বেদআতী। সে যদি বেদআতী হয়ে থাকে তবে আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম দিবে না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি, আমার এ উম্মাতের কাদরিয়্যা আকীদা পোষণকারীদের মধ্যে ঘটবে ভূমি ধ্বস বা চেহারা বিকৃতি বা প্রস্তর নিক্ষেপ। সুনানে তিরমিজী : ২১৫২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪০৬১

এতসব ভয়াবহতার পরও মানুষ বিদআত করে কারন এই সম্পর্কে তার জ্ঞান নাই। সে বিদআতকে ভাল মনে করে মহান আল্লাহকে রাজি খুশি করার নিমিত্তে এই জঘন্য পাপে লিপ্ত হয়। অজ্ঞ মুসলিমগণ জান্নাত লাভের আশায় ও জাহান্নামের ভয়ে মরনপন ইবাদাত করার জন্য যে যাবে বলে, যার কাছে যা শুনে তাই আমল করার চেষ্টা করে। দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারনে মুলত বিদআত করে। অনেক সময় সমাজ, পরিবেশে ও  বাপ দাদার অন্ধ অনুসরণের কারনেও বিদআত হয়ে থাকে। পূর্বের আলোচনায় আমরা কিছু মহান দিন সম্পর্ক জেনেছি। এই পর্যায় আমরা এমন কতগুলো দিবস সম্পর্ক জ্ঞান  অর্জন করবে যে দিবস কে আমরা দ্বীন মনে করে আমল করি অথচ দ্বীন নয়। ইসলামি শরীয়তে এই দিন সম্পর্কে কোন আমল করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেনি। আমাদের সমাজ ও আমাদের বাপ দাদারা মহান আল্লাহ কে রাজি খুশি করার জন্য এই নতুন নতুন দিবস আবিস্কার করেছেন। যদি তারা তা আল্লাহকে রাজি খুশির জন্য করেছেন কিন্তু তার কোন শরীয়তের ভিত্তি নাই বিধানয় বিদআত ও পরিত্যাজ্য। খৃষ্টানগণও মহান আল্লাহকে খুসি করা জন্য এমন বিদআত আবিস্কার করেছিল। মহান আল্লাহ বলেছেন-

الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُ رَاۡفَۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ وَرَہۡبَانِیَّۃَۨ ابۡتَدَعُوۡہَا مَا کَتَبۡنٰہَا عَلَیۡہِمۡ

আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারাই বৈরাগ্যবাদের উদ্ভাবন করেছিল। এটা আমি তাদের ওপর লিপিবদ্ধ করে দেইনি। সুরা হাদিস : ২৭

১। শবে বরাতের সুচনা

শবে বরাত নামটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। এই দিন সরকরি ছুটির দিন বলে সকল নাগরিকই জানে এটি একটি ইসলমি দিবস। আমরাও দেখে থাকি এই রাতে প্রতিটি মসজিদে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে রাতটি অতিবাহিত করে। আবার কিছু লোককে দেখা যায় তারা এ রাতের বিশেষ ইবাদতকে বিদআত হবে। আলোচনা সমালোচায় এক পর্যায় শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর এই আমলকে মুরুব্বিদের দোহাই ও সমাজে প্রচলিত বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলোঃ শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর আমল, বিশেষ নামায পড়া, সিয়াম রাখা, মিলাদ পড়া, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা, আলোক সজ্জা করা ইত্যাদি ইসলামি শরীআতে একটা নব আবিস্কার বিষয়। এই ধরনের কোন আমল বা অনুষ্ঠান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে কিংবা সাহাবাগণের যুগে ছিল না। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খেলাফতের একজন শিয়া মতাদর্শী মন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন আলী বিন খলফ এ দিনকে বিশেষ ঈদ বা অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা শুরু করেন এবং ৪৪৮ হিজরীতে এক ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দস মসজিদে বিশেষ নামাযের আয়োজন করেন। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

হাফেয ইবনে রজব (রহঃ) তার কিতাব লাতায়িফুল মায়ারিফে লিখেছেন- “তাবেয়ীদের যুগে সিরিয়ায় খালিদ ইবনে মা’দান, মকহুল, লুকমান ইবনে আমের প্রমুখ আলিম এ রাতকে মর্যাদা দিতে শুরু করেন এবং এ রাতে বেশী পরিমাণে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন। তখন লোকেরা তাদের থেকে এটা অনুসরণ করতে আরম্ভ করল। এরপর লোকদের মধ্যে মতানৈক্য শুরু হল। বসরা অঞ্চলের অনেক আবেদগণ এ রাতকে গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু মক্কা ও মদীনার আলিমগণ এটাকে বিদ‘আত বলে প্রত্যাখ্যান করলেন। অতঃপর সিরিয়াবাসী আলিমগণ দুই ভাগ হয়ে গেলেন। একদল এ রাতে মাসজিদে একত্র হয়ে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন। এদের মধ্যে ছিলেন খালেদ ইবনে মা’দান, লোকমান ইবনে আমের। ইসহাক ইবনে রাহভিয়াহও তাদের অনুরূপ মত পোষণ করতেন।

শবে বরাত দুটি ফারসী শব্দের সমন্নয় গঠিত হয়ছে। একটি হল শব অপরটি বরাত। ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ শব্দের অর্থ সৌভাগ্য বা ভাগ্য। এই অর্থ অনুসারে শবে বরাত শব্দটির অর্থ হল, সৌভাগ্য রজনী বা ভাগ্য রজনী। অনেক বলে থাকে শব ফারসী শব্দ হলেও বরাত শব্দটি আবরি যার অর্থ হল, সম্পর্কচ্ছেদ, পরোক্ষ অর্থে মুক্তি। সে অর্থে শবে বলাতের অর্থ হয় মুক্তির রজনী। কেউ কেউ আবার শবে বরাত কে লাইলাতুল বরাত বলে থাকে। এই ক্ষেত্রে দুটি শব্দই আবরি যার অর্থ হল, মুক্তির রজনী। যেমন কুরআন মাজীদে সূরা বারাত রয়েছে যা সূরা তাওবা নামেও পরিচিত। ইরশাদ হয়েছেঃ

بَرَآءَةٌ۬ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۤ إِلَى ٱلَّذِينَ عَـٰهَدتُّم مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ  

সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে। সূরা তাওবা : ০১

এখানে বারাতের অর্থ হল সম্পর্ক ছিন্ন করা।

আরার বারাত’ মুক্তি অর্থেও আল-কুরআনে এসেছে। যেমনঃ সুরা কামারে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

 أَكُفَّارُكُمۡ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أُوْلَـٰٓٮِٕكُمۡ أَمۡ لَكُم بَرَآءَةٌ۬ فِى ٱلزُّبُرِ

তোমাদের মধ্যকার কাফিররা কি তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ? না কি তোমাদের মুক্তির সনদ রয়েছে কিতাব সমূহে? সূরা কামার : ৪৩

অতএব শবে বরাত শব্দটার অর্থ দাড়ায় মুক্তির রজনী, সম্পর্ক ছিন্ন করার রজনী। অথবা সৌভাগ্যের রাত, যদি ‘বরাত’ শব্দটিকে ফার্সী শব্দ ধরা হয়। শবে বরাত শব্দটাকে যদি আরবীতে তর্জমা করতে চান তাহলে বলতে হবে ‘লাইলাতুল বারায়াত’। বরায়াত শব্দটি এর রূপ বা উচ্চারণ আরবী ও ফারসী ভাষায় একই রকম কিন্তু এর অর্থ ভিন্ন। সার কথা হল ‘বারায়াত’ শব্দটিকে আরবী শব্দ ধরা হলে উহার অর্থ সম্পর্কচ্ছেদ বা মুক্তি। আর ফারসী শব্দ ধরা হলে উহার অর্থ সৌভাগ্য। যেহেতু কুরআন সুন্নাহতে এই শব্দের বা এই রাতের কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। আর অনাবর ভাষাভাষীদের এই রাতের আমলে প্রতি ঝোক বেশি, তাই শবে বারাত দুটি ফারসী শব্দ ধরে নেয়াই যুক্তি যুক্ত। তা হলে একে ‘সৌভাগ্য রজনী’ বলাই অধিক শ্রেয়।

কখন এই রাত আসেঃ

প্রতি বছর হিজরি সালের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে মুসলিম উম্মাহ কিছু বিদআতী এই রাতকে সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পালন করে বহু মনগড়া আমল করে থাকে। তারা এর সমর্থনে একটি হাদিস পেশ করে থাকে। হাদিসটি হল-

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ

এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯

তিরমীজির টিকাঃ ইমাম ঈসা (রহঃ) বলেন, হাজ্জাতের বরাতে এই সূত্রটি ছাড়া আয়িশা (রা.) এর হাদীসটি সম্পর্কে কোন কিছু আমাদের জানা নাই। এই হাদীসটিকে দুর্বল বলতে আমি মুহাম্মদ আল-বুখারীকে শুনেছি। তিনি বলেন, রাবী ইয়াহইয়া ইবনু আবূ কাসীর উরওয়া (রহঃ) থেকে কোন রিওয়ায়াত শোনেননি। মুহাম্মদ আল-বুখারী বলেন, এমনিভাবে হাজ্জাজ ইয়াহইয়া ইবনু আবূ কাসীরের নিকট থেকে কিছুই শোনেননি। এই হাদিসটি মানঃ যঈফ।

শবে বরাতে আমলকারীদের দলিল ও পর্যালোচনাঃ

কোন সত্যপন্থী আলেম পবিত্র কুরআনের কোন আয়াত শবে বরাতের আমল সম্পর্কে দলীল হিসাবে পেশ করেন না কারন শবে বরাত কিংবা লাইলাতুল বারায়াতের নামে কোন শব্দ কুরআন মাজীদে খুজে পাবেন না, আয়াততো অনেক দুরের কথা। সত্য কথাটাকে সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় পবিত্র কুরআন মাজীদে শবে বরাতের কোন আলোচনা নেই। সরাসরি তো দূরের কথা আকার ইংগিতেও নেই। শবে বরাত নামটি হাদীসের কোথাও উল্লেখ হয়নি। তবে হাদিসের গ্রন্থ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রাত সম্পর্কে বেশ কয়েকটি যঈফ হাদিস উল্লেখ আছে। এই সকল যঈফ হাদিসগুলিতে ফজিলত বর্ণিত হলেও কোন প্রকার আমল করার কথা বলা হয়নি। ফিকহের কিতাবেও এ রাত সম্পর্কে কিছু বলা হয় নাই। কিন্তু কিছু কিছু অখ্যাত বইয়ে এ সম্পর্কি আলোচনা পাওয়া যায়। শবে বরাতের পক্ষে যারা কথা বলেন যারা কুরআন সুন্নাহ থেকে দলীল পেশ করা চেষ্টা করেন। তাদের দেয়া কিছু দলীল পর্যালোচনা করব, ইনশাল্লাহ।

৪। কুরআন আলোকে লাইলাতুল নিসফে মিন সাবান বা সাবানের মধ্য রজনী।

যারা শবে বরাতে পক্ষে কথা বলেন তাদের দেখা যায় শবে বরাতের গুরুত্ব আলোচনা করতে যেয়ে সূরা দুখানের প্রথম চারটি আয়াত পাঠ করেন। আয়াতসমূহ হলঃ 

حمٓ (١) وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلۡمُبِينِ (٢) إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةٍ۬ مُّبَـٰرَكَةٍ‌ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ (٣) فِيہَا يُفۡرَقُ كُلُّ أَمۡرٍ حَكِيمٍ (٤)

অর্থঃ হা-মীম। শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমিতো এটা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। আমি তো সতর্ককারী। এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। সূরা দুখান : ১-৪

শবে বরাতের পক্ষের ব্যাখ্যা

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় শবে বরতা পন্থী আলেমগন অনেক মিথ্যা, ভুয়া ও মনগড়া তথ্য দিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে থাকে। তাদের প্রথম দাবি সুরা দখানে উল্লেখিত এই বরকতময় রজনী হচ্ছে অর্ধ শাবানের রাত বা শবে বরাতের রাত। তাদের দাবী, মধ্য শাবানের রাত্রিতে বছরের সকল ব্যাপার চূড়ান্ত করা হয়, জীবিত ও মৃতদের তালিকা লেখা হয় এবং হাজিদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ তালিকা থেকে পরবর্তীতে একজনও কমবেশি হয় না মহান আল্লাহ শবে বরাতের রাতে সকল বিষয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা করার পর সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববান ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করে থাকেন। তাদের এই কথা স্পষ্টভাবেই কুরআনের অপব্যাখ্যা তাদের এ ব্যাখ্যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয় বরং এখানে বরকতপূর্ণ রাত বলতে লাইলাতুল ক্বদর উদ্দেশ্য। 

তাদের ব্যাখ্যার জবাবঃ

আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ.) বলেন, অত্র বরকতপূর্ণ রাতই হল লাইলাতুল ক্বদর বা ক্বদরের রাত। যেমন অন্যত্র সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে। কুরআনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য কথা হল, কুরআনের কোন অস্পষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা যদি অন্য কোন আয়াতে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, তাহলে কুরআনের ব্যাখ্যাই গ্রহণ করতে হবে। আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ সূরা কদরের শুরুতে বলেন, মহান আল্লাহ এই আয়াত দ্বারা বরকতময় রাতের অর্থ পনের শাবানের রাতকে বুঝান নাই তিনি এই আয়াত দ্বারা যে বরকতময় রাতের কথা বলছেন তা হল, লাইলাতুল কদর যদি কেউ এই আয়াত দ্বারা শাবানের পনের তারিখ বুঝিয়ে থাকেন তবে তা হবে মারাত্বক অন্যায় এবং মহান আল্লাহর কালাম বিকৃত করার মত অপরাধ  কুরআনের এই আয়াতগুল লক্ষ করুন। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ (١) وَمَآ أَدۡرَٮٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ (٢) لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أَلۡفِ شَہۡرٍ۬ (٣) تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيہَا بِإِذۡنِ رَبِّہِم مِّن كُلِّ أَمۡرٍ۬ (٤) سَلَـٰمٌ هِىَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ (٥)

অর্থঃ আমি এই কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আপনি জানেন লাইলাতুল কদর কি? লাইলাতুল কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য মালাইকা ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশে। এই শান্তি ও নিরাপত্তা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা কাদর ৯৭:১-৫)।

পূর্বে উল্লেখিত সুরা দুখানের আয়াত থেকে স্পষ্ট দুটি ধারনা পাওয়া যায়

প্রথমটি হলোঃ মহান আল্লাহ বরকতময় একটি রজনীতে কুরআন নাজিল করেছেন।

দ্বিতীয়টি হলোঃ এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত করা হয়।

বিদআতীগন বলে থাকেন, এই বরকতময় রজণী হল শবে বরাত বা লাইলাতুর বরাত। আর আমরা বলছি এই বরকতময় রজণী হল লাইলাতুল করদ বা করদের রাত্রী। তাহলে কে সঠিক? একটু লক্ষ করুন, সুরা দুখানের ঐ আয়াতে বলা হয়ে, এই বরকতময় রজনীতে কুরআন নাজিল হয়েছে। তাহলে একটা বিষয় শতভাগ নিশ্চত যে, কুরআন যে রাত্রে নাজিল হয়েছে সেই রাতই হল এই বরকতময় রজণী। এবার দেখুন, সুরা কাদরে মহান আল্লাহ বলেন, আমি এই কুরআন নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে। দুটি আয়াতের সমন্নয় করলে দাড়ায়, কুরআন নাজিল হয়েছে এক বরকতময় রাতে আর সে রাতের নাম হল লাইলাতুল কদর কাজেই মহান আল্লাহর কুরআনের বাণীর পর আর কারও ব্যাখ্যা বিশ্লষন গ্রহন করা হারাম। একটি স্পষ্ট দলীলের বিপরীত কোন প্রকার ব্যাখ্যা বিশ্লষন করা যাবে না। তবে বলতে পারেন লাইতাতুল কদর কখন হয়। এ প্রশ্নের জবাব ও মহান  আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরঅনে দিয়ে এরশাদ করছেন,

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ

অর্থঃ রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন। সুরা বাকারা : ১৮৫

এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলে দিলেন, কুরআন নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। কাজেই এই বরকতময় রজণী হল লাইলাতুল কদর অবশ্যই রমজান মাসে। কুনআনে এই স্পষ্ট দলীল বলে দিচ্ছে লাইলাতুল কদর হল রমজান মাসে। তাই যারা সুরা দুখানের ঐ আয়াত দ্বারা শবে বরাতের দলীল দেন তারা কুনআনেরই অবমাননা করছেন।

এক কথায় বলা যায় সূরা দুখানের প্রথম চার আয়াতের ব্যাখ্যা হল সূরা কদর। আল কুরআনের এক আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য আয়াত দ্বারা করা হল সর্বোত্তম ব্যাখ্যা। কিন্তু সূরা দুখানের লাইলাতুল মুবারাকার অর্থ যদি শবে বরাত হয় তাহলে এ আয়াতের অর্থ দাড়ায় আল কুরআন শাবান মাসের শবে বরাতে নাযিল হয়েছে। অথচ উপরের আলোচনায় থেকে কুরআনের দলীল দ্বারা সহজে অনুমেয় কুরআন নাযিল হয়েছে রামাযান মাসের লাইলাতুল কদরে। 

আপনি যদি তাফসীর থেকে এর ব্যাখ্যার আলোচনা দেখেন তবে দেখবেন, অধিকাংশ মুফাচ্ছিরে কিরামের মত হল উক্ত আয়াতে বরকতময় রাত বলতে লাইলাতুল কদরকেই বুঝানো হয়েছে। শুধু মাত্র তাবেয়ী ইকরামা (রহঃ) এর একটা মত উল্লেখ করে বলা হয় যে, তিনি বলেছেন বরকতময় রাত বলতে শাবান মাসের পনের তারিখের রাতকেও বুঝানো যেতে পারে।  তিনি বরকতময় রজনীর যে ব্যাখ্যা শাবানের ১৫ তারিখ দ্বারা করেছেন, তা ভুল হওয়া সত্ত্বেও প্রচার করতে হবে এমন কোন নিয়ম-কানুন নেই। বরং তা প্রত্যাখ্যান করাই হল হকের দাবী। তিনি যেমন ভুলের উর্ধ্বে নন, তেমনি যারা তার থেকে বর্ণনা করেছেন তারা ভুল শুনে থাকতে পারেন অথবা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বানোয়াট বর্ণনা দেয়াও অসম্ভব নয়। এমন কথা বলার অধিকার কুরআন দিয়েছেন তার স্পষ্ট বর্ণনা দ্বারা। তিনি যদি এটা বলে থাকেন তাহলে এটা তার ব্যক্তিগত অভিমত। যা কুরআন ও হাদীসের বিরোধী হওয়ার কারণে পরিত্যাজ্য। এ বরকতময় রাতের দ্বারা উদ্দেশ্য যদি শবে বরাত হয় তাহলে শবে কদর অর্থ নেয়া চলবেনা।

আর একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, সুরা দুখানে চার নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয় (৪৪:৪)। কাজেই ভাগ্য রজনী বলতে যা বুঝায় তাও হবে লাইলাতুল কদরে, শবে কদরে নয়। কিন্তু বিআদতীদের বাদী হল, শবে বরাতে সৃষ্টিকূলের হায়াত-মাউত, রিয্‌ক-দৌলত সম্পর্কে সিদ্ধান- নেয়া হয় ও লিপিবদ্ধ করা হয়। তাদের এই বাদী সরাসরি কুরআন বিরোধী। তাদের প্রচারনার ফলে অনেক অজ্ঞ মুসলিম শবে বরাতের গুরুত্ব বর্ণনায় সূরা দুখানের উক্ত আয়াত উল্লেখ করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এ আকীদাহ বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, শবে বরাতে সৃষ্টিকূলের হায়াত-মাউত, রিয্‌ক-দৌলত সম্পর্কে সিদ্ধান নেয়া হয় ও লিপিবদ্ধ করা হয়। আর শবে বরাত উদযাপনকারীদের শতকরা নিরানব্বই জনের বেশী এ ধারণাই পোষণ করেন। তারা এর উপর ভিত্তি করে লাইলাতুল কদরের চেয়ে ১৫ শাবানের রাতকে বেশী গুরুত্ব দেয়। অথচ কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ বিষয়গুলি লাইলাতুল কদরের সাথে সম্পর্কিত। তাই যারা শবে বরাতের গুরুত্ব বুঝাতে উক্ত আয়াত যারা উল্লেখ করেন তারা মানুষকে সঠিক ইসলামী আকীদাহ থেকে দূরে সরানোর কাজে লিপ্ত, যদিও মনে-প্রাণে তারা তা ইচ্ছা করেন না।

ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর তাফসীরে বলেছেন, কোন কোন আলেমের মতে ‘লাইলাতুম মুবারাকাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল মধ্য শাবানের রাত (শবে বরাত)। কিন্তু এটা একটা বাতিল ধারণা।

হাদিসের আলোকে লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান বা শবে বরাত পর্যালোচনাঃ

আলোচনায় দেখা যাবে শবে বরাত বা লাইলাতুল  বরাত নামে কোন বর্ণনা নাই । এই সম্পর্কিত সকল হাদিসেও মধ্য শাবানের রাতে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আলোচনার শুরুতে এই সম্পর্কে কয়েকটি  সহিহ ও যঈফ হাদিস উল্লখ করছি। দ্বিতীয় পর্যায় কয়েকটি জাল হাদিস উল্লেখ করছি। এর মাধ্যমে আপনারা এই রাত সম্পর্কে স্পষ্ট একটি ধারণ পাবেন বলে আশা করছি।

মুয়াজ বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত,  তিনি বলেন

إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

‘মহান আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক ও  হিংসুক ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন। সহিহ ইবনু হিববান, খণ্ড-১২, পৃ-৪৮১, তাবারানী, আল-মুজাম আল-কাবীর, ২০/১০৮, ২২/২২৩, বায়হাক্বী, শু’আবুল ঈমান, ৩/৩৮১; কিতাবুত তাওহীদ, পৃ-৩২৫-৩২৬। হাদিসের মান সহিহ।  

আবূ মূসা আল-আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেন-

إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلاَّ لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে আত্নপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৯০, জামি সগীর : ১৮১৯ হাসান, সহীহা : ১৫৬৩, মিশকাত : ১৩০৬, ১৬০৭ হাদিসের মান হাসান

উপরের দুটি হাদিসের অর্থ একই। এ অর্থের হাদীস কাছাকাছি শব্দে ৮ জন সাহাবী: আবূ মূসা আশআরী, আউফ ইবনু মালিক, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, মুয়ায ইবনু জাবাল, আবু সা’লাবা আল-খুশানী, আবূ হুরাইরা, আয়েশা ও আবূ বাকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ সকল হাদীসের সনদ সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষনা করে দেখা যায় এগুলোর মধ্যে কিছু সনদ দুর্বল ও কিছু সনদ ‘হাসান’ পর্যায়ের। সামগ্রিক বিচারে হাদীসটি সহীহ। শাইখ আলবানী বলেন, ‘‘হাদীসটি সহীহ। তা অনেক সাহাবী থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে, যা একটি অন্যটিকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করে বিধান মুহাদ্দিসগন হাদিসটি সহিহ বলেছেন। শায়খ নাসিরউদ্দিন আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহাহ ৩/১৩৫

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ‏”‏ يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ‏”‏ ‏.‏ قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ

এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯ হাদিসের মান যঈফ। ইমাম আলবানীর তাহকিক মিশকাত : ১২৯৯ ও যঈফ বলেছেন।

উসমান ইবনে আবিল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেয়। আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কেহ কিছু চাইবার আমি তাকে তা দিয়ে দিব। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ মুশরিক ও ব্যভিচারী বাদে সকল প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করা হয়। বাইহাকী, শুয়াবুল ঈমান

হদিসের মান যইফ। বিখ্যাত মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দীন আল-বানী (রহঃ) হাদীসটিকে তার সংকলন ‘যয়ীফ আল-জামে’ নামক কিতাবের ৬৫২ ক্রমিকে দুর্বল প্রমাণ করেছেন। 

হাদিসগুলোর বিশ্লষণঃ

উপরের হাদিসগুলি পর্যালোচনা করে দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন সনদে এই রাত সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস ও কয়েকটি জঈফ হাদিস বর্নিত হয়েছে। যদি সকল হাদিসগুলো সহিহ বলে ধরে নেয়া হয়, তাহলেও কি কোন প্রকার আমল প্রমাণিত? না, এ হাদিস দ্বারা কোন আমল প্রমানিত হয় না। এই হাদিসগুলো দ্বারা চারটি বিষয় সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা পাওয়া যায়।

(১) এই রাতে আল্লাহ তায়ালা মুশরিক ও  হিংসুক ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।

(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক কবর জিয়ারত করা।

(৩) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।

(৪) কালব গোত্রের পালিত বকরীর পশমের পরিমানের চেয়েও অধিক পরিমান লোকদের ক্ষমা করেন।

(১) আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে মহান আল্লাহ তার সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি প্রদান করেন ও সকলকে ক্ষমা করে কেবল মুশরিক ও হিংসুকদের ক্ষমা করেনা। এই হাদিসটি সহিহ হলেও এর দ্বারা কোন আমল প্রনানিত হয় না। সারা বছর যারা আমল দ্বারা মহান আল্লাহকে সন্ত্বষ্ট করেছেন তারাই শুধু এই রাতে ক্ষমা পেয়ে থাকেন। তবে এই ক্ষমা থেকে আল্লাহর সাথে শিরককারী মুশরিক ও হিংসুক বঞ্চিত থাকেন। 

(২) একটি জঈফ হাদিস বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই রাতে কবর জিয়ারত করেছেন। যদি কেউ এই জঈফ হাদিসের আলোকে এই রাতে কবর জিয়ারত করতে চায় তবে তাকে একাকি কবর জিয়ারত করেত হবে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন। তিনি সময় সুযোগ থাকা সত্বেও নিজের স্ত্রী বা সাহাবী কাউকে এ আমলে শরীক করান নাই। এ হাদীসে দেখা গেল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিছানা ছেড়ে চলে গেলেন, আর পাশে শায়িত আয়িশা (রা.) কে ডাকলেন না। ডাকলেন না অন্য কাউকে। তাকে জাগালেন না বা সালাত আদায় করতে বললেন না। অথচ আমরা দেখতে পাই যে, রামাযানের শেষ দশকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে রাত জেগে ইবাদাত-বন্দেগী করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। বেশী পরিমাণে ইবাদাত-বন্দেগী করতে বলতেন। যদি ১৫ শাবানের রাতে কোন ইবাদাত করার ফাযীলাত থাকত তাহলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন আয়িশাকে (রা.) বললেন না? কেন রামাযানের শেষ দশকের মত সকলকে জাগিয়ে দিলেন না, তিনি তো নেক কাজের প্রতি মানুষকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে আমাদের সকলের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। কাজেই সম্মিলিতভাবে করব জিয়ারত এই রাতের আমল নয় বিদআত। কিন্তু যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে মাসজিদে একত্র হয়ে নানান প্রকারের ইবাদতের মাধ্যমে এই যেভাবে উদযাপন করে, তারা কিভাবে এই হাদিস দিয়ে আমলের পক্ষে দলীল দেয়। এভাবে দলবেধে এই রাতে কবর জিয়ারত নিঃসন্দেহে বিদআত।

(৩) এই জঈফ হাদিস বাদি করে মহান আল্লাহ শুধু মধ্য শাবানের রাত্রিতে বান্দাদের নিকটবর্তী আকাশে আবির্ভূত নয়। কিন্তি সহিহ হাদিস দাবি করে তিনি প্রতি রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল বলেছেন-

‏ يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ

মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। সহিহ বুখারি : ১১৪৫, ৬৩২১, ৭৪৯৪, সহিহ মুসলিম : ৭৫১-৫, সুনানে তিরমিযী : ৪৪৬, ৩৪৯৮; সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩১৫, ৪৭৩৩; আহমাদ : ৭৪৫৭, ৭৫৩৮, ৭৫৬৭, ৭৭৩৩, মুওয়াত্ত্বা মালিক : ৪৯৬,

উল্লিখিত হাদীসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাতে নিকটতম আকাশে আসেন ও বান্দাদের দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। কিন্তু এই বিখ্যাত সহিহ হাদিসটির বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষের দিকে নিকটতম আকাশে অবতরণ করে দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। আর এ হাদীসটি সর্বমোট ৩০ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন এবং বুখারী এবং মুসলিম ও সুনানের প্রায় সকল কিতাবে এসেছে। হাদীসটি প্রসিদ্ধ এবং অনেক আলেম মনে করেন মশহুর হাদীসের বিরোধী বক্তের অংশটুকু সঠিক নয়। কারণ এ হাদীসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন মধ্য শাবানের রাতের শুরু থেকে এবং অন্য হাদিসের বক্তব্য হল প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। প্রতি রাতের মধ্যে শাবান মাসের পনের তারিখের রাতও অনর্ভুক্ত। কাজেই আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ শুধু শাবান মাসের জন্য খাস করা ঠিক হবে না।

৬। এই রাতে ফজিলত আছে, তা হলে আমল করলে ক্ষতি কি?

ফজিলত থাকলেই আমল করার প্রমান বহন করে না। কোন কাজ করলে ইবাদত হবে আর কোন কাজ করলে ইবাদত হবে এর মান দন্ড দিয়েছেন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কাজেই কোন আমল দ্বারা মহান আল্লাহকে রাজি খুসি করতে হলে সে আমল অবশ্য রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত হতে হবে। নিজের খেয়াল খুসিমত ইবাদতের পদ্ধতি, সময় সংখ্যা দ্বারা নির্দিষ্ট করা যাবে না। কোন ইবাদাতের ক্ষেত্রে কোন আলেমের মন্তব্য দলীল নয়, বরং দলীল হল আল্লাহর কিতাব (কুরআন) ও রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বানী ও কাজ (সহিহ হাদিস), যদি এই দু’ইয়ের মধ্যে দলীল থাকে তাহলেই আমল অথবা ইবাদাত করা যাবে আর না থাকলে করা যাবে না।

সুতরাং প্রকৃত পক্ষেই লাইলাতুর নিসফে মিন শাবার বা মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ পাক মুশরিক ও সুন্নত বিরোধী অথবা বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যাক্তি ব্যাতিত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। এই রাতের ফযিলত স্বীকার করেছেন।

১। ইমাম শাফেঈ (রহ.), কিতাবুল উম্ম, ১মখণ্ড, পৃঃ ২৩১

২। ইমাম আহমাদ (রহ.), ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইকতিদায়ে ছিরাতেমুস্তাকীমে, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ-৬২৬

৩। ইমাম আওযায়ী (রহ.), ইমাম ইবনে রাজাব, লাতায়েফুল মা‘আরিফ, পৃ-১৪৪

৪। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.), ইকতিদায়ে ছিরাতেমুস্তাকীমে, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ-৬২৬ ।

৫। ইমাম ইবনে রাজাব, লাতায়েফুল মা‘আরিফ, পৃ-১৪৪

৬। আল্লামা নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী (রহ.), লছিলাতুল আহাদীস আস সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯

সুতরাং লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান বা শবে বরাতের ফযিলত প্রমানিত। যারা এই রাতে ইবাদাতের পক্ষে কথা বলেন তারা এই বলে যুক্তি দেন যে, ফযিলতপূর্ণ রাত কি ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিব? এটা তো অযৌক্তিক। এছাড়া তাদের আর কোন দলীল ও যুক্তি নেই। এই রাতে ব্যাক্তিগত ইবাদাত করার পক্ষে মত দিয়েছেন-

১. ইমাম আওযা‘য়ী (রহ.)

২. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)

৩. আল্লামা ইবনে রজব (রহ.)

এই রাত উপলক্ষে যে কোন ইবাদাত করা কে বিদআত বলেছেন-

১। প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ‘আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.)

২। ইবনে আবি মুলাইকা (রহ.)

৩। মদীনার ফুকাহাগণ

৪। আব্দুর রাহমান ইবনু যায়েদ ইবনু আসলাম (রহ.)

৫। ইমাম মালেকের ছাত্রগণ

৬। শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রহ.)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *