মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান বা শবে বরাত সম্পর্কে বহু মিথ্যা ও জলা কথা সমাজে প্রচলিত। এই জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করেই শবে বরাতের দিনে সিয়াম ও রাতে কিয়ামের আমল যুগ যুগ ধরে মুসলীম সমাজে চালু আছে। এই ব্যাপারের আলেমগন ঐক্যমত প্রষণ করেছেন যে, সকল প্রকারের সহিহ হাদিসের উপর আমল করা যাবে এবং কোন জাল হাদিসের উপর আমল করা যাবে না। কিন্ত যঈফ হাদিসের উপর আমলের ক্ষেত্র দুটি মত পাওয়া যায়। আলমদের একদল বলছেন, যঈফ হাদিস থেকে কোন প্রকার আমল করা যাবে না। অন্যদল বলছেন, যঈফ হাদিসের উপর আমল করা যাবে। কিন্তু লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রাত্রি ফজিলত বর্ণিত হাদিস দ্বারা আমলের রেওয়াজ চালু করার কোন যুক্ত নেই। যদি কোন আমল করা খাস হত তবে আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও ছাড়তেন না। কমছে কম কোন সাহাবি দ্বারা এর প্রমান পাওয়া যেত। অথচ কোন সহিহ বা যঈফ হাদিসে আমলের কোন প্রমান পাওয়া যায় না। যে সকল হাদিসে আমলের ঘ্রান পেলাম তা জাল। আর উম্মতের মাঝে ইজমা বা ঐক্যমত হল জাল হাদিসের উপর আমল করা জায়েয নয়। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে হাদিসের মধ্যে পাঁচটি (আদালত, যাবত, ইত্তিসাল, শুযূয মুক্তি, ইল্লাত মুক্তি) শর্ত পূরণ হয়েছে তাকে সহিহ হাদিস বলা হয়। উপরোক্ত ৫টি শর্তের বিদ্যমানতা অপরিহার্য। তবে দ্বিতীয় শর্তের (যাবত) মধ্যে যদি সামান্যতম দূর্বলতা দেখা যায় তবে হাদীসটিকে ‘হাসান’ (সুন্দর বা গ্রহণযোগ্য হাদীস) বলা হয়। যে ‘হাদীসের’ মধ্যে হাসান হাদীসের শর্তগুলির মধ্যে কোনো একটি অবিদ্যমান থাকে, মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় তাকে ‘যয়ীফ’ হাদীস বলা হয়। যদি প্রমাণিত হয় যে, এরূপ দুর্বল হাদীস বর্ণনাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলুল্লাহ (স) এর নামে সমাজে প্রচার করতেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে হাদীসের সূত্র (সনদ) বা মূল বাক্যের মধ্যে কম বেশি করতেন, তবে তার বর্ণিত হাদীসকে ‘মাউযূ’ বা বানোয়াট হাদীস বলে গণ্য করা হয়। এমন কি এরা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন নাম ব্যবহার করে হাদিস বানিয়েছেন। অনেক সময় কিছু পীর, দরবেশ, আলেমগন নিজেরাই হাদিস বানিয়ে প্রচার করেছেন কোন বিশেষ স্বার্থে। মাউযূ বা জাল হাদীস হাদিস গ্রহনের ফলে যুগে যুগে মুসলীমদের আকিদা ও আমলের ক্ষেত্রে বহু বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই বুঝতে পারছেন জাল হাদিস দ্বারা কোন প্রকার আমল করা যাবে না। এই রাতের বিদআতি আমলের মুলভিত্তি হলো এই সকল জাল হাদিস। যা বানিয়ে বানিয় এর নামে প্রচার করা হয়েছে। সরল প্রান অজ্ঞ মুসলিম মিথ্যাবাদীদের প্রতারণা শিকার হলে বিদআতকে সঠিক আমল মনে করে পালন করে যাচ্ছে। এই সম্পর্কিত কয়েকটি জাল হাদিস নিম্ম উল্লেখ করা হলো-
জাল হাদীস-০১ : শাবান মাসের ১৫ জিকিরের ফজিলত।
১. হাদিসে আছে, শাবানের চাঁদের চৌদ্দই তারিখের সূর্য অস্ত যাইবার সময় নিম্নলিখিত দোওয়া ৪০ বার পাঠ করিলে ৪০ বৎসরের ছগীরা গুনাহ মাফ হইয়া যাইবে।
لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ
বর্ণনাগুলি পাবেনঃ মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃ. ২৩৬-২৪১।
এই হাদীসটি জার কারনঃ
১. এই হাদীসটি মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এর কোন সনদ নাই। সহিহ, যয়ীফ বা জাল কোন সনদেই কথাগুলী বর্ণিত হয় নাই।
২. এই হাদীসটি বানোয়াট ও মিথ্যা। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৫০)
এই কালিমাতে জিকির করার কথা বহু সহিহ হাদীসে বিদ্যমানঃ
আবূ মুসা আশআরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, “তোমাকে জান্নাতের অন্যতম ধনভাণ্ডারের কথা বলে দেব না কি?” আমি বললাম, ’অবশ্যই বলে দিন, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন-
لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ
উচ্চরণঃ লা হাওলা অলা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
সহিহ বুখারি ২৯৯২, ৪২০৫, ৬৩৮৪, ৬৪০৯, সহহি মুসলিম ২৭০৪, তিরমিযী ৩৩৭৪, ৩৪৬১, আবূ দাউদ ১৫২৬, ইবনু মাজাহ ৩৮২৪
২. আবূ মূসা আশআরী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম। আমরা যখনই কোন উঁচুস্থানে আরোহণ করতাম, কোন উঁচুতে থাকতাম এবং কোন উপত্যকা অতিক্রম করতাম তখনই উচ্চস্বরে তাকবীর বলতাম। রাবী বলেন অতঃপর নবী ﷺ আমাদের নিকটবর্তী হলেন এবং বললেনঃ ওহে লোকেরা! তোমরা নিজেদের উপর রহম কর। তোমরা কোন বধির বা কোন অনুপস্থিত সত্ত্বাকে ডাকছ না বরং তোমরা ডাকছ শ্রবণকারী ও দর্শনকারী সত্ত্বাকে। এরপর তিনি বললেনঃ হে ’আবদুল্লাহ্ ইবনু কায়স! তোমাকে আমি কি এমন একটি কথা শিখিয়ে দিব না, যা হল জান্নাতের ভান্ডারসমূহের অন্যতম? তা হলঃ
لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ
উচ্চরণঃ লা হাওলা অলা ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। সহিহ বুখারি ৬৬১০
জাল হাদীস-০২ : মধ্য শাবানের রাতে একশত রাকআত সালাত আদায়ের ফজিলত।
ইবনু উমার (রা)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে বলেছে: ‘‘যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে এক শত রাকআত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ তা‘য়ালা তার কাছে ১০০ জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন, তন্মধ্যে ত্রিশজন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে জাহান্নমের আগুন থেকে নিরাপত্তার সুসংবাদ প্রদান করবে, ত্রিশজন তাকে ভুলের মধ্যে নিপতিত হওয়া থেকে রক্ষা করবে এবং দশজন তার শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জবাব দেবে।’’
হাদীসটি জাল বলেছেনঃ
১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫০-৫১।
২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৯।
৩. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, পঞ্চম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৭১।
৪. মুহাম্মদ বিন ইসহাক্ব, আখবারু মাক্কাহ, ফাকিহানী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৮৬-৮৭।
৫. এ হাদীসটিও বানোয়াট। সনদের অধিকাংশ রাবী অজ্ঞাতপরিচয়। বাকীরা মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩৯
জাল হাদীস-০৩ : মধ্য শাবানের রাত্রিতে রহমতের দরজাগুলো খোলা হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথা হলোঃ
উবাই ইবনু কাব (রা.) এর সূত্রে কথিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মধ্য শাবানের রাতে জিবরাঈল (আ.) আমার কাছে আগমন করে বলেন, আপনি দাঁড়িয়ে সালাত পড়ুন এবং আপনার মাথা ও হস্তদ্বয় উপরে উঠান। আমি বললাম, হে জিবরাঈল, এটি কোন্ রাত? তিনি বলেন, হে মুহাম্মাদ, এ রাতে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং রহমতের ৩০০ দরজা খুলে দেওয়া হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বাকী গোরস্তানে গমন করেন। তিনি যখন সেখানে সাজদারত অবস্থায় দোয়া করছিলেন, তখন জিবরাঈল সেখানে অবতরণ করে বলেন, হে মুহাম্মাদ, আপনি আকাশের দিকে মাথা তুলুন। তিনি তখন তাঁর মস্তক উত্তোলন করে দেখেন যে, রহমতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেক দরজায় একজন ফিরিশতা ডেকে বলছেন, এ রাত্রিতে যে সাজদা করে তার জন্য মহা সুসংবাদ।
হাদীসটি জাল বলেছনঃ
১. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৬।
২. হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৬
জাল হাদীস-০৪ : পনের শাবানের দিনে সিয়াম পালন।
আমাদের সমাজে প্রচলিতঃ
১. আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন যে ব্যক্তি শাবান মাসের ১৫ তারিখে সিয়াম পালন করবে, জাহান্নামের আগুন কখনোই তাকে স্পর্শ করবে না।
জাল বর্ণনাটি পাবেনঃ
মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মোমেনীন, পৃ.২৩৫; মুফতী ছামদানী, বার চান্দ.. পৃ. ২৫।
যারা বলেছনঃ
১. এই হাদীসট সহিহ, যয়ীফ বা জাল সনদেও বর্ণিত নাই। এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
২. শা’বান মাসের মধ্যম রজনীর ফযীলত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। ইবনু মাজাহ সংকলিত আলী (রা)-এর নামে বর্ণিত হাদীসটিতে সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। তবে হাদীসটির সনদ নির্ভরযোগ্য নয়। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৯।
জাল হাদীস-০৫ : শবে বরাতে রাত্রিতে গোসল করার ফজিলত।
এই সম্পর্কিত জাল হাদীস হলোঃ
নবি ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি উক্ত রাত্রিতে এবাদতের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যায় গোসল করিবে, সে ব্যক্তির গোসলের প্রত্যেকটি বিন্দু পানির পরিবর্তে তাহার আমল নামায় ৭০০ (সাতশত) রাকাত নফল নামাযের ছওয়াব লিখা যাইবে। গোসল করিয়া দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল অজুর নামায পড়িবে।
জাল বর্ণনাটি পাবেনঃ
মাও. গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-২৪০। আরো দেখুন: মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃষ্ঠা-. ২৬; অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃষ্ঠা-৩০৯।
হাদিসটি জাল কারনঃ
১. এই হাদীসট সহিহ, যয়ীফ বা জাল সনদেও বর্ণিত নাই। এটি এমন একটি ভিত্তিহীন কথা যার জাল হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
২. শবে বরাত বিষয়ক প্রচলিত মিথ্যা কথাগুলোর অন্যতম হলো এ রাতে গোসল করার ফযীলত। বিষয়টি যদিও সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও জঘন্য বানোয়াট কথা, তবুও আমাদের সমাজে তা অত্যন্ত প্রচলিত। এ মিথ্যা কথা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কঠিন শীতের দিনেও অনেকে গোসল করেন। উপরন্তু ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার আশায় শরীর ও মাথা ভাল করে মোছেন না। এর ফলে অনেকে, বিশেষত, মহিলারা বড় চুলের কারণে ঠান্ডা-সর্দিতে আক্রান্ত হন। আর এ কষ্ট শরীয়াতের দৃষ্টিতে পন্ডশ্রম ছাড়া কিছুই নয়। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৮)
৮। এই রাত সম্পর্কে আমাদের সারাফদের আমলঃ
এ সম্পর্কে সাহাবীদের কোন বক্তব্য বা আসার পাওয়া যায় না। তাবেয়ী যুগ থেকেই কোন কোন তাবেয়ী গুরুত্ব না দিয়ে লাইলাতুল নিসফে মিন শাবান বা শাবানের মধ্য রাতে কিছু ইবাদত করতে থাকে এবং তখনই আবার অনেক তাবেয়ী এর প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু তারা লাইলাতুল কদর বা ভাগ্য রজনী বলে কিছু বলেন নাই বা তারা জানতেনও না। এর প্রমান তাদের পরবর্তীতে লিখিত কোন হাদিস গ্রন্থ বা ফিক্হের নির্ভরযোগ্য কিতাবে এই রাতের ইবাদত সম্পর্কে কিছু পাওয়া যায় না। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলো ফিকহের সিলেবাস হিসাবে মালাবুদ্দা মিনহু, নুরুল ইজাহ, মুখতাসাতুল কুদুরী, কানযুদ দাকায়েক, শরহে বিকায়া, হিদায়াহ ইত্যাদি কিতাবগুলি পড়ে থাকে। এই সকল কিতাবেগুল খুলে দেখুন না, কোথাও শবে বরাত নামের কিছু পাওয়া যায় কিনা। অথচ আমাদের পূর্বসূরী ফিকাহবিদগণ ইসলামের অতি সামান্য বিষয়গুলো আলোচনা করতেও কোন ধরনের কার্পণ্যতা দেখাননি। তারা সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণের সালাত সম্পর্কেও অধ্যায় রচনা করেছেন। অনুচ্ছেদ তৈরী করেছেন কবর যিয়ারতের মত বিষয়েরও। শবে বরাতের ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহর সামান্যতম ইশারা থাকলেও ফিকাহবিদগণ এর আলোচনা মাসয়ালা-মাসায়েল অবশ্যই বর্ণনা করতেন।
৯। শবে বরাতের নামে ভ্রান্ত আকিদা ও বিদআতঃ
শবে রবাতের রাতে নানা আয়োজনে নানান ইবাদাত করা হয়। এর মাঝে অনেকগুল সুন্নাহ সম্মত নফল ইবাদাত শুধু এই রাতের সাথে সম্পৃক্ত করা জন্য নফল ইবাদাতটি বিদআদ হিসাবে পরিগনিত হয়। আমাদের উপমহাদেশ ইবাদাত বহির্ভূত বিদআত ও করা হয় এবং বিদআতের পাশাপাশি এই রাত সম্পর্কে অনেকে ভ্রান্ত আকিদা রাখে। শবে বরাতে বহির্ভূত বিদআত ও ভ্রান্ত আকিদা এই দুটি বিষয় সামান্য আলোকপাত করব।
১০। শবে বরাত সম্পর্কে ভ্রান্ত আকিদাঃ
ইসলাম ধর্ম পৃথিবীতে আসার অনেক দিন পরে শবে বরাত পালন শুরু হলেও এর বয়স কম নয়। সময়ের সাথে সাথে শবে বরাত সম্পর্কে মানুষের মাঝে বিভিন্ন আকিদা বিশ্বাসের জম্ম দিয়েছে। এই সকল আকিদা বিশ্বাস কুনআন ও সহিহ হাদিসের সাথ সাংঘর্ষিক।
(১) শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন।
(২) শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন।
(৩) সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করা
(৪) মৃতদের আত্মার দুনিয়াতের পূণরাগমনের বিশ্বাস
(১) শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেনঃ
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
فَقَدْتُ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعٌ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ ” يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ ” . قَالَتْ قَدْ قُلْتُ وَمَا بِي ذَلِكَ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ . فَقَالَ ” إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمِ كَلْبٍ
এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে না পেয়ে ঘর থেকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। হঠাৎ তাকে বাকী গোরস্তানে যেয়ে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি আশংকা করো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অন্যায় করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রী কাছে চলে গিয়েছেন বলে আমার ধারণা হয়েছিল। তিনি বলেন, শোন, আল্লাহ তা‘আলার মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে নেমে আসেন। অনন্তর বানূ কালব গোত্রের বকরী পালের লোমের সংখ্যার চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন। সুনানে তিরমীজি : ৭৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৮৯ হাদিসের মান যঈফ। ইমাম আলবানীর তাহকিক মিশকাত : ১২৯৯ ও যঈফ বলেছেন।
এই জঈফ হাদিস বাদি করে মহান আল্লাহ শুধু মধ্য শাবানের রাত্রিতে বান্দাদের নিকটবর্তী আকাশে আবির্ভূত নয়। কিন্তি সহিহ হাদিস দাবি করে তিনি প্রতি রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকী থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন-
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
মহামহিম আল্লাহ্ তা‘আলা প্রতি রাতে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেনঃ কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। সহিহ বুখারি : ১১৪৫, ৬৩২১, ৭৪৯৪, সহিহ মুসলিম : ৭৫১-৫, সুনানে তিরমিযী : ৪৪৬, ৩৪৯৮; সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩১৫, ৪৭৩৩; আহমাদ : ৭৪৫৭, ৭৫৩৮, ৭৫৬৭, ৭৭৩৩, মুওয়াত্ত্বা মালিক : ৪৯৬,
উল্লিখিত হাদীসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাতে নিকটতম আকাশে আসেন ও বান্দাদের দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। কিন্তু এই বিখ্যাত সহিহ হাদিসটির বক্তব্য হল আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষের দিকে নিকটতম আকাশে অবতরণ করে দু‘আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন।
(২) শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ্ মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেনঃ
শবে-বরাতের রাতে আল্লাহ মানুষের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন, এই সকল আকিদা সরাসরি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ বিরোধি। এই কথা বিশ্বাসে জন্য দায়ী একটি জঈফ হাদিস। যে জাল হদিসটি আল-মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবে রমাজান মাসে কিয়াম (রমাজান মাসের রাতের সালাত) অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। হাদিসটি হলো-
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
هَل تدرين مَا هَذِه اللَّيْل؟» يَعْنِي لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ قَالَتْ: مَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ: «فِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كلُّ مَوْلُودٍ مِنْ بَنِي آدَمَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ وَفِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كُلُّ هَالِكٍ مِنْ بَنِي آدَمَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ وَفِيهَا تُرْفَعُ أَعْمَالُهُمْ وَفِيهَا تَنْزِلُ أَرْزَاقُهُمْ
তুমি কি জানো এটা (মধ্য শাবানের রাত) কোন রাত? তিনি বললেন করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ রাতে কি রয়েছে? তিনি বললেনঃ এ রাতে এই বছরে যে সকল মানব সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে তাদের ব্যাপারে লিপিবদ্ধ করা হয়, যারা মৃত্যু বরণ করবে তাদের তালিকা তৈরী হয়, এ রাতে ‘আমলসমূহ পেশ করা হয়, এ রাতে রিযক নাযিল করা হয়। মিশকাত : ১৩০৫ আংশিক
হাদিসের মানঃ হাদিসের মান মুনকার। এ হাদীসটি আল-মিশকাত আল-মাসাবীহর সংকলক উল্লেখ করার পর বলেছেন, তিনি হাদীসটি ইমাম বাইহাকীর ‘আদ-দাওআত আল-কাবীর’ কিতাব থেকে নিয়েছেন। ইমাম বাইহাকী তার ‘আদ-দাওআত আল-কাবীর’ গ্রন্থে শবে বরাত সম্পর্কে মাত্র দুটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। তার একটি হল এই হাদীস। তিনি তার ‘শুআ’বুল ঈমান’ গ্রন্থে শবে বরাত সম্পর্কিত হাদীস উল্লেখ করার পর লিখেছেন, “এ বিষয়ে বহু মুনকার হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যার বর্ণনাকারীরা অপরিচিত। আমি তা থেকে দু’টি হাদীস ‘আদ-দাওআত আল-কাবীর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছি। আলোচ্য হাদীসটি হাদীসে মুনকার। মুনকার হাদীস ‘আমলের জন্য গ্রহণ করা যায় না। যিনি হাদীসটি আমাদের কাছে পৌছিয়েছেন তিনি নিজেই যখন হাদীসটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে মতামত দিয়েছেন। কাজেই বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোন অবস্থায়ই এই মুনকার হাদিস গ্রহণীয় নয়।
এই হাদিসের বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, হাদীসে ভাগ্য লেখার বিষয়টি লাইলাতুল কদরের সাথে সম্পর্কিত। কেননা জন্ম, মৃত্যু, ‘আমল পেশ, রিয্ক ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী রামাযান মাসে লাইলাতুল কদরে সাথে সম্পৃক্ত। কুরআনের একাধিক আয়াত দ্বারা প্রমাণিত তেমনি বহু সংখ্যক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন,
وَٱلۡڪِتَـٰبِ ٱلۡمُبِينِ (٢) إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةٍ۬ مُّبَـٰرَكَةٍۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ (٣) فِيہَا يُفۡرَقُ كُلُّ أَمۡرٍ حَكِيمٍ (٤)
শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমিতো এটা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। আমি তো সতর্ককারী। এই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। সূরা দুখান : ১-৪
কুরআন নাজিলের রাতে বা লাইলাতুল কদরের রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয় বা ভাগ্য লিপি বদ্ধ হয়। এ ছাড়া মিশকাত আল-মাসাবীহর সংকলক বিষয়টি ভালভাবে বুঝেছেন বলে তিনি হাদীসটিকে রামাযান মাসের সালাত (কিয়ামে শাহরি রামাযান) অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। বুঝা গেল যে, তার মত হল হাদীসটি রামাযান মাসের লাইলাতুল কদর সম্পর্কিত। হাদীসটিতে বর্ণিত “মধ্য শাবানের রাত” কথাটি আয়িশার (রা.) বক্তব্য নয়। কারণ তার বক্তব্য শুরু রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বক্তব্য শেষ হওয়ার পর। কিন্তু এখানে প্রশ্নের ভিতরেই আয়শা (রা.) এর বক্তব্য শুরু হয়েছে। যা আদবের খেলাপ। তাহলে এ বক্তব্যটি কার? এ বক্তব্যটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আয়িশা (রা.) ব্যতীত অন্য কোন বর্ণনাকারীর নিজস্ব মন্তব্য, যা মেনে নেয়া আমাদের জন্য যরুরী নয়।
(৩) সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করাঃ
একটি সহিহ হাদিসে লাইলাতুল নিসফে মিন শারান বা শাবানের মধ্য রজণীর ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনও বলেন নাই যে এই রাতটি সৌভাগ্য রাত। আমাদের বিশ্বাস মহান আল্লাহ আমাদের প্রতিটি আমলেন প্রতিদান দিবেন, তার আমলের প্রতিদান প্রদানের জন্য কোন রাতকে সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করার কোন কারন নেই কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এমনটি করে নাই আর সাহাবীদের ও এমনটি করতে বলেন নাই। তবে একটি জাল হাদিসে এই রাতকে সোভাগ্য রজনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথা হলো-
আলী (রা)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামে প্রচারিত: যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে ১০০ রাকআত সালাত আদায় করবে, প্রত্যেক রাকআতে সুরা ফাতিহা ও ১০ বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে সে উক্ত রাতে যত প্রয়োজনের কথা বলবে আল্লাহ তায়ালা তার সকল প্রয়োজন পূরণ করবেন। লাওহে মাহফুযে তাকে দুর্ভাগা লিপিবদ্ধ করা হলেও তা পরির্বতন করে সৌভাগ্যবান হিসেবে তার নিয়তি নির্ধারণ করা হবে, আল্লাহ তায়ালা তার কাছে ৭০ হাজার ফিরিশতা প্রেরণ করবেন যারা তার পাপরাশি মুছে দেবে, বছরের শেষ পর্যন্ত তাকে সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন রাখবে, এছাড়াও আল্লাহ তায়ালা ‘আদন’ জান্নাতে ৭০ হাজার বা ৭ লাখ ফিরিশতা প্রেরণ করবেন যারা জান্নাতের মধ্যে তার জন্য শহর ও প্রাসাদ নির্মাণ করবে এবং তার জন্য বৃক্ষরাজি রোপন করবে…। যে ব্যক্তি এ নামায আদায় করবে এবং পরকালের শান্তি কামনা করবে মহান আল্লাহ তার জন্য তার অংশ প্রদান করবেন।
হা্দীসটি জাল বলেছেনঃ
১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৪৯-৫০।
২. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৭-৫৮।
৩. মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হি.), আল-আসরার, পৃষ্ঠা-৩৩০-৩৩১ এবং আল মাসনু’, পৃষ্ঠা-২০৮-২০৯।
৪. ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৭৫-৭৬।
৫. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৯২-৯৩।
৬. হাদীসটি সর্বসম্মতভাবে বানোয়াট ও জাল। এর বর্ণনাকারীগণ কেউ অজ্ঞাত পরিচয় এবং কেউ মিথ্যাবাদী জালিয়াত হিসেবে পরিচিত। (হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩৮)
নিজেদের সৌভাগ্য রচনার জন্য কোন অনুষ্ঠান বা ইবাদাত-বন্দেগী ইসলামে অনুমোদিত নয়। শবে বরাতকে সৌভাগ্য রজনী বলে বিশ্বাস করা একটি বিদ‘আত তথা ধর্মে বিকৃতি ঘটানোর শামিল। এ সৌভাগ্য অর্জন করতে হলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ বাদ দিয়ে এবং সারা জীবন সালাত-সিয়াম-যাকাত ত্যাগ করে শুধুমাত্র একটি রাতে মাসজিদে রাত জেগে ভাগ্য বদল করে সৌভাগ্য হাসিল করে নিবেন এমন ধারণা ইসলামে একটি হাস্যকর ব্যাপার। অনেক ঐতিহাসিক জ্ঞানী আলেমদের ধারনা, “শবে বরাত মত বিদআত প্রচলনের কৃতিত্ব সম্পূর্ণভাবে শীয়াদের। ধর্ম বিকৃতি করার জন্য শিয়াগণ এক নম্বর। তাদের ফারসী ভাষার “শবে বরাত” নামটা থেকে এ বিষয়টা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তারা এ দিনটাকে ইমাম মাহদীর জন্ম দিন হিসাবে পালন করে থাকে। তারা বিশ্বাস করে যে, এ রাতে ইমাম মাহদীর জন্ম হয়েছে। এ রাতে তারা এক বিশেষ ধরনের সালাত আদায় করে। যার নাম দিয়েছে “সালাতে জাফর”।
আরা জানি ফিকহী মাসয়ালা মাসায়েলে কুনআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস কে উৎস হিসাবে গ্রহন করা হয়। কিন্তু আকিদা বিশ্বাস হল গায়েবী বিষয় যা সরাসরি কুনআন ও সহিহ দ্বারা প্রমানিত হতে হবে। আকিদার ক্ষেত্র ইজমা, কিয়াস, যঈফ জাল হাদিস গ্রহন করা যাবে না। তাই শবে বরাতের যে সকল হাদিস যঈফ বা জাল তা দিয়ে ‘সৌভাগ্য রজনী হিসাবে বিশ্বাস করার কথা বলা হয়েছে তা কি করে বিশ্বাস করি। তাই যেহেতু বিষয়টি আকিদার সাথে সম্পর্কিত আমলের সাথে নয়।
শবে বরাত সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস পরিস্কার থাকতে হবে। যদি মিথ্যা বা জাল হাদিস দ্বারা আকিদা প্রমাণ করে বিশ্বাস করি তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি মিথ্যা আরোপ করার মত অন্যায় হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেনঃ
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ
তার চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে? সূরা সাফ : ৭
(৪) এই রাতে মৃতদের আত্মার পুণরায় দুনিয়াতের ফিরে আসে বিশ্বাস করা
আমাদের উপমহাদেশের হিন্দুদের বিশ্বাস মৃতর পর তাদের আত্মার দুনিয়াতের পূণরায় ফিরে আসে। হিন্দুদের সাথে অবস্থানের কারনে অজ্ঞ মুসলিমেদের মাঝে তাদের মত বিশ্বাস করতে উদ্ভুদ্য করেছেন। কিছু অজ্ঞ মুসলীমদের বিশ্বাস, এই রাতে মৃতদের আত্মার পুণরায় দুনিয়াতের ফিরে আসে। মৃত্যুর আগমনের কারনে তারা ঘর-বাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে আতর সুগন্ধি লাগিয়ে পরিপাটি করে রাখে। এ রাতে অনেক মহিলা এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারনে মাটির বাসনের খাবার রেখে দেয়। তাদের ধারনা, এই খাাবার মৃতব্যাক্তি বাড়িতে এসে যেন না খেয়ে চলে না যা। এমনকি তারা কিছু খাবার একটুকরো কাপড়ে পুরে ঘরে ঝুলিয়ে রাখে। কারণ, তাদের বিশ্বাস হল, তাদের মৃত স্বামী-স্বজনদের আত্মা এ রাতে ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ পরিবারের সাথে দেখা করতে আসে। এটা যে কতবড় মূর্খতা তা একমাত্র আল্লাহ জানেন। সঠিক কথা হলো- মানুষ মারা গেলে তাদের আত্মা বছরের কোন একটি সময় আবার দুনিয়াতে ফিরে আসা মুসলমানদের আকীদাহ নয়। বরং অনেকটা তা হিন্দুয়ানী আকীদার সাথে সাঞ্জস্যপূর্ণ।