মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
দাম্পত্য জীবন হলো মানব সম্পর্কের সবচেয়ে পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্ধন। এটি কেবল দুজন মানুষের মিলন নয়, বরং দুটি পরিবারের বন্ধন এবং একটি নতুন প্রজন্মের ভিত্তি। তবে, নানা কারণে এই পবিত্র সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে বা এর সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কারণগুলো মূলত ঈমান ও নৈতিকতার দুর্বলতা, যা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ধৈর্য ও ভালোবাসাকে ক্ষুণ্ণ করে।
কুরআন ও হাদিসে সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যখন স্বামী-স্ত্রী আল্লাহর দেওয়া এই বিধানগুলো থেকে দূরে সরে যায়, তখন তাদের জীবনে অশান্তি নেমে আসে। এর মধ্যে রয়েছে অহংকার, অবিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব, এবং ছোটখাটো বিষয়ে ধৈর্যহীনতা। এই কারণগুলো একটি পরিবারকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাই, দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর ও মজবুত রাখতে হলে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধান করা অপরিহার্য। প্রতিটি মুসলিম দম্পতির উচিত তাদের জীবনকে আল্লাহর দেখানো পথে পরিচালিত করা, যাতে সম্পর্কটি শুধু দুনিয়াতে নয়, আখেরাতেও কল্যাণ বয়ে আনে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার প্রধান কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরছি—
১. ঈমানের দুর্বলতা ও আল্লাহর ওপর ভরসার অভাব হলে
যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বা যেকোনো একজনের ঈমান দুর্বল হয়, তখন তারা ধৈর্য, ক্ষমা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মতো গুণগুলো হারিয়ে ফেলে। আল্লাহর ওপর ভরসা না থাকলে সামান্য সমস্যাতেই তারা হতাশ হয়ে পড়ে এবং সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ধৈর্য ধারণ করার এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, জীবনের সব সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জের সমাধান আল্লাহর হাতেই নিহিত। তিনি ইরশাদ করেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَالصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
হে মুমিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। সূরা বাকারা : ১৫৩
এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন যে, যখন আমরা কোনো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, তখন ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। দাম্পত্য জীবনে যখন কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তখন ঈমানদার দম্পতি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর কাছে সমাধান চান। কিন্তু ঈমান দুর্বল হলে ধৈর্য থাকে না, ফলে সামান্য সমস্যাতেই তারা হতাশ হয়ে পড়ে এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।
وَ مَنْ یَّتَّقِ اللّٰهَ یَجْعَلْ لَّہٗ مَخْرَجًا ۙ﴿۲﴾ وَّ یَرْزُقْهُ مِنْ حَیْثُ لَا یَحْتَسِبُ ؕ وَ مَنْ یَّتَوَكَلْ عَلَی اللّٰهِ فَهُوَ حَسْبُہٗ ؕ… .﴿۳﴾
আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (উত্তরণের) পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাক, ৬৫:২-৩)
এই আয়াতটি বিশেষভাবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে নাযিল হয়েছে। এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, যারা তাকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে), তিনি তাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেন। দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে যারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তাদের জন্য অকল্পনীয় উপায়ে সমাধানের পথ খুলে দেন।
হাদিসেও ঈমানের দুর্বলতার কারণে দাম্পত্য জীবনের সমস্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবাতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর। সহীহ মুসলিম : ২৯৯৯
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, একজন প্রকৃত মুমিন তার দাম্পত্য জীবনের সুখ বা দুঃখ—উভয় পরিস্থিতিতেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে এবং ধৈর্য ধারণ করে। ঈমান দুর্বল হলে এই গুণটি হারিয়ে যায়, তখন দুঃখ-কষ্টে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং সম্পর্কের ইতি টানার কথা ভাবে। এছাড়াও, আরও একটি হাদিসে বলা হয়েছে:
২৩৯৮। মুসআব ইবনু সা’দ (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি (সাদ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। মানুষের মাঝে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়? তিনি বললেনঃ নবীদের বিপদের পরীক্ষা, তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা। মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। তুলনামূলকভাবে যে লোক বেশি ধাৰ্মিক তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি কেউ তার দ্বীনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে সে মোতাবিক পরীক্ষা করা হয়। অতএব, বান্দার উপর বিপদাপদ লেগেই থাকে, অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে যমীনে চলাফেরা করে অথচ তার কোন গুনাহই থাকে না। সুনানে তিরমিজি : ২৩৯৮,সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০২৩
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, জীবনে পরীক্ষা আসবেই। আর দাম্পত্য জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়।
প্রতকারের উপায় : ঈমানদার ব্যক্তিরা এসব পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, যা তাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। কিন্তু যারা ঈমানের দুর্বলতায় ভোগে, তারা এসব পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়। আল্লাহ তায়ালার উপর যথাযত ঈমানের ও তার ওপর সকল কাজের ভরসাই দাম্পত্য জীবনে সুখ আনতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ وَعَلَی اللّٰہِ فَلۡیَتَوَکَّلِ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ
আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই; সুতরাং মু’মিনরা যেন আল্লাহ উপরই নির্ভর করে। সুরা তাগাবুন : ১৩
২. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহ সৃষ্টি হলে
অকারণে সন্দেহ একটি সুখী সংসার ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ। এটি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে বিশ্বাস, সম্মান এবং ভালোবাসার মূল ভিত্তিগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ইসলামে এই ধরনের সন্দেহ পোষণ করাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অহেতুক সন্দেহ একটি বড় ধরনের পাপ এবং এটি সমাজের মধ্যে ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ।
সূরা হুজুরাত : ১২
এই আয়াতে আল্লাহ সরাসরি অনুমান বা সন্দেহ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। দাম্পত্য জীবনে এই সন্দেহ যখন প্রবেশ করে, তখন তা স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের প্রতি খারাপ ধারণা করতে বাধ্য করে, যা সম্পর্কের ভিত্তি নষ্ট করে দেয়।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। একে অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজিও না, একে অন্যের ব্যাপারে মন্দ কথায় কান দিও না এবং একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না; বরং ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখরি : ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩
এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, অহেতুক সন্দেহ একটি মিথ্যাচার, যা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে নয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যখন এই মিথ্যা প্রবেশ করে, তখন তা সত্যকে আড়াল করে দেয় এবং উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়।
সন্দেহ কীভাবে সংসার ভাঙে?
ক. বিশ্বাস নষ্ট হয় : দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন সঙ্গী অন্যজনকে অকারণে সন্দেহ করে, তখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা আবার ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।
খ. মানসিক যন্ত্রণা : সন্দেহপ্রবণ সঙ্গী অপরজনকে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসাবাদ করে, নজরদারি করে এবং তার স্বাধীনতা খর্ব করে। এটি যার ওপর সন্দেহ করা হচ্ছে, তার জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশার কারণ হয়।
গ. অসহযোগিতা ও দূরত্ব : সন্দেহ সম্পর্কের মধ্যে একটি দেয়াল তৈরি করে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মন খুলে কথা বলতে পারে না, ফলে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
ঘ. অশান্তি ও ঝগড়া : সন্দেহ থেকে প্রতিনিয়ত ঝগড়া, বিবাদ এবং অশান্তি সৃষ্টি হয়। এর ফলে পারিবারিক শান্তি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিকারের উপায় : ইসলাম দাম্পত্য জীবনে আস্থা ও নিরাপত্তার উপর জোর দিয়েছে। যখন স্বামী-স্ত্রী আল্লাহর বিধান মেনে চলে এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান বজায় রাখে, তখন তাদের সম্পর্ক শক্তিশালী ও স্থায়ী হয়। অকারণে সন্দেহকে তাই পারিবারিক জীবনের জন্য একটি বিষাক্ত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত অবিশ্বাস ও সন্দেহ পরিহার করে, বিশ্বাস, সম্মান এবং ভালোবাসার মাধ্যমে পাম্পত্য জীবন গড় তোলা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ।
সূরা হুজুরাত : ১২
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। একে অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজিও না, একে অন্যের ব্যাপারে মন্দ কথায় কান দিও না এবং একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না; বরং ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখরি : ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩
৩. স্বামীর সাথে স্ত্রীর অবাধ্য আচরণের ফলে
স্ত্রীর অবাধ্যতা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি পারিবারিক শৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য। যখন স্ত্রী স্বামীর বৈধ ও শরিয়তসম্মত আদেশ-নিষেধ অমান্য করে, তখন সম্পর্কটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়।
অবাধ্যতা যেভাবে দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে
ক. পারিবারিক শৃঙ্খলার অভাব:
ইসলামে পরিবারকে একটি সুশৃঙ্খল একক হিসেবে দেখা হয়, যার নেতৃত্ব দেন স্বামী। স্ত্রীর অবাধ্যতা এই শৃঙ্খলা নষ্ট করে দেয়। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বা কোনো কাজ করতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায় এবং স্ত্রী স্বামীর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সংসারে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি হয়।
খ. বিশ্বাস ও সম্মানের অভাব:
অবাধ্যতা মূলত স্বামীর প্রতি অসম্মানেরই বহিঃপ্রকাশ। একজন স্বামী যখন দেখতে পান যে তার স্ত্রী তার কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না বা তার বৈধ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করছেন, তখন তিনি নিজেকে অসম্মানিত ও মূল্যহীন মনে করতে পারেন। এর ফলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা কমে যায়।
গ. মানসিক চাপ ও হতাশা:
অবাধ্য স্ত্রী একজন স্বামীর জন্য মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। তিনি হতাশ হয়ে পড়েন কারণ তিনি তার পরিবারকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন না। এই হতাশা তাদের দুজনের মধ্যে আরও দূরত্ব তৈরি করে।
ঘ. কুরআন ও হাদিসের লঙ্ঘন:
ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪
আল্লাহ পুরুষদের নারীদের থেকে শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি প্রদান করেছেন। এটি আল্লাহর একটি প্রাকৃতিক বিধান, যা উভয় লিঙ্গের জন্যই উপকারী। এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো একতরফা ক্ষমতা নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব, যা পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু যখন কোন নারী আল্লাহ প্রদত্ত পুরুষে এ দায়িত্ব অস্বীকার করে তার অনুগত্য ত্যাগ করে তাহলে তার দাম্পত্য জীবনের সুখ চলে যাবে।
ঙ. সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব:
অবাধ্য স্ত্রী যখন সন্তানদের সামনে স্বামীর অবাধ্যতা করে, তখন শিশুরা তাদের মায়ের এই আচরণ দেখে শেখে যে বাবাদের অসম্মান করা যায়। এটি তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
প্রতিকারের উপায় :
স্ত্রীর অবাধ্যতা কেবল তাদের দুজনের সম্পর্কই নষ্ট করে না, বরং পুরো পরিবারের শৃঙ্খলা ও শান্তিকে ভেঙে দেয়। কোন প্রশ্ন ছাড়া ন্যায় সংগত সকল প্রকারের কাজে স্ত্রীকে স্বামীর অনুগত্য করতে হবে। স্বামী শরীয়ত বিরোধী কোন হুকুম প্রদান না করলে, স্ত্রী মান্য করতে বাধ্য। প্রতিকারে প্রদান উপাদান হলো স্বামীর অনুগত্য।
আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যদি কাউকে অন্য কোন লোকের প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। সুনানে তিরমিজি : ১১৫৯
৪. স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে কৃতজ্ঞাবোধ না থাকার কারনে
স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা না থাকা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে এটি একটি গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত। এর কারণ হলো:
ক. ভালোবাসা ও সম্মানের অভাব :
কৃতজ্ঞতা হলো ভালোবাসার একটি প্রকাশ। যখন একজন স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন না, তখন স্বামী নিজেকে মূল্যহীন ও অসম্মানিত মনে করতে পারেন। এর ফলে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে এবং ভালোবাসা কমে যায়।
খ. হাদিসের সতর্কতা :
ইবনু আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেন, ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষনো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ সহিহ বুখারি : ২৯, ৪৩১,৭৪৮,১০৫২,৩২০২,৫১৯৭, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, আহমাদ : ৩০৬৪
এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা জাহান্নামে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে। এটি শুধু একটি মানসিক অবস্থা নয়, বরং এটি একটি গুরুতর পাপ।
গ. পারিবারিক শান্তি নষ্ট হওয়া :
কৃতজ্ঞতা না থাকলে স্ত্রী তার স্বামীর ভালো কাজগুলোকে তুচ্ছ মনে করতে পারে। এতে স্বামী হতাশ হয়ে পড়ে এবং সাংসারিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে সংসারে অশান্তি ও কলহ বৃদ্ধি পায়।
ঘ. নেতিবাচকতা ও অভিযোগ :
অকৃতজ্ঞ স্ত্রী সবসময় স্বামীর খারাপ দিকগুলো নিয়ে অভিযোগ করে। এই ধরনের নেতিবাচক মনোভাব সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করে এবং উভয়কে মানসিকভাবে পীড়িত করে।
প্রতিকারের উপায় :
স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি সুখী ও সফল দাম্পত্য জীবনের জন্য অপরিহার্য। এটি শুধু সম্পর্ককে মজবুত করে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করে।
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা সেই মহিলার প্রতি চেয়েও দেখবেন না, যে তার স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। অথচ সে তার মুখাপেক্ষিণী। হা্দিস সম্ভার : ২৬০৬সুনানে নাসায়ি কুবরা : ৯১৩৫, ত্বাবারানী, বাযযার : ২৩৪৯, হাকেম : ২৭৭১, বাইহাকী : ১৪৪৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৮৯
৫. স্ত্রীর ওপর স্বামীর অন্যায় ও নির্যাতনের ফলে
স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর প্রতি অন্যায় ও নির্যাতন একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে গুরুতর কারণগুলোর মধ্যে একটি। এটি শুধু সম্পর্কের বিশ্বাস ও ভালোবাসা নষ্ট করে না, বরং এটি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামে এই ধরনের আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্যাতন কেন সম্পর্ক নষ্ট করে?
ক. কুরআনের নির্দেশনা লঙ্ঘন:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন-
فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯
এই আয়াতে আল্লাহ পুরুষদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের স্ত্রীর সাথে সুন্দর ও ভদ্র আচরণ করে। নির্যাতন এই নির্দেশের সরাসরি লঙ্ঘন।
খ. রাসূল ﷺ-এর আদর্শের পরিপন্থী:
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের প্রতি সর্বদা অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহপরায়ণ ছিলেন। তিনি কখনোই তাদের ওপর কঠোরতা বা নির্যাতন করেননি।
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ ২৮৫।
এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, একজন ভালো মুসলিম পুরুষ তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোচ্চ দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করবে। নির্যাতন এই আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।
গ. বিশ্বাস ও ভালোবাসার অভাব : একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা। যখন স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি শারীরিক, মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতন চালায়, তখন সেই বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়। স্ত্রী তার স্বামীকে আর নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে না, বরং ভয় ও আতঙ্কের উৎস হিসেবে দেখে।
ঘ. মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি : নির্যাতন শুধু শারীরিক আঘাতই নয়, এটি স্ত্রীর মানসিক স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি করে। এটি হতাশা, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব সৃষ্টি করে। একটি পরিবারে শান্তি ও সুখ তখনই আসতে পারে যখন উভয় সঙ্গী মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে। নির্যাতন সেই সুস্থতাকে নষ্ট করে দেয়।
ঙ. পারিবারিক অবক্ষয় : একটি নির্যাতিত পরিবারে সন্তানরা নেতিবাচক পরিবেশের শিকার হয়। তারা সহিংসতা ও অসম্মান দেখে বড় হয়, যা তাদের মানসিক বিকাশে বাধা দেয় এবং ভবিষ্যতে তারাও একই ধরনের আচরণ করতে শিখতে পারে।
প্রতিকারের উপায় :
স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর প্রতি অন্যায় ও নির্যাতন কেবল একটি ব্যক্তিগত ভুল নয়, বরং এটি একটি গুরুতর পাপ এবং একটি সুস্থ পরিবার গঠনের পথে একটি বড় বাধা। এটি সম্পর্কের ভিত্তি, অর্থাৎ ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয় এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়।
আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিলেন, অতঃপর মহিলাদের উল্লেখ করে তাদের ব্যাপারে লোকজনকে উপদেশ দিলেন। তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ কেন তার স্ত্রীকে দাসীর মত বেত্রাঘাত করে? অথচ দিনের শেষেই সে আবার তার শয্যাসঙ্গী হয়! সহিহ বুখারি : ৫২০৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৩, সুনানে তিরমিযী : ৩৩৪৩, আহমাদ : ১৫৭৮৮, দারেমী : ২২২০, ইরওয়াহ : ২০৩১
৫. স্বামী বা স্ত্রীর অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা ফলে
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা দাম্পত্য জীবন ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এটি কুরআন-হাদিসে নিন্দিত হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা দাম্পত্য জীবনে কি কি প্রভাব পড়ে তান নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-
ক. পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব তৈরি হয়
যখন স্বামী বা স্ত্রী নিজেদের মতামতকেই সঠিক ধরে নেয় এবং মানতে জিদ ধরে, তখন পারস্পরিক আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ
আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। সুরা রুম : ২০
অতিরিক্ত জিদ থাকলে এই ভালোবাসা ও রহমত ভেঙে যায়।
খ. ছোট সমস্যা বড় সংঘাতে রূপ নেয়
দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু জিদ-হঠকারিতা এগুলোকে বড় ঝগড়ায় পরিণত করে।
’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে সর্বাধিক ঘৃণ্য ঐ ব্যক্তি, যে সব সময় ঝগড়ায় লিপ্ত থাকে। সহহি বুখঅই : ২৪৫৭, ৭১৮৮, সহিহ মুসলিম : ৩৬৬৮
গ. ক্ষমা ও দয়া হারিয়ে যায়
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হলো দয়া, ক্ষমা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা। কিন্তু জিদী স্বভাব থাকলে কেউই ছাড় দিতে চায় না।
আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮
কিন্তু জিদ মানুষকে ক্ষমা করতে বাধা দেয়। ফলে সম্পর্ক শীতল হয়ে যায়।
ঘ. শান্তি ও সুখ হারিয়ে যায়
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। সুরা রূম : ২১
কিন্তু জিদী মনোভাব থাকলে সম্পর্ক টানটান হয়ে থাকে, শান্তি চলে যায়। অনেক সময় এ ধরনের হঠকারিতা তালাক পর্যন্ত গড়ায়।
ঙ. শয়তানের সুযোগ সৃষ্টি হয়
জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইবলীস পানির উপর তার আরশ স্থাপন করতঃ তার বাহিনী প্রেরণ করে। তন্মধ্যে তার সর্বাধিক নৈকট্য অর্জনকারী সে-ই যে সবচেয়ে বেশী ফিতনাহ সৃষ্টিকারী। তাদের একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। সে বলে, তুমি কিছুই করনি। অতঃপর অন্যজন এসে বলে, অমুকের সাথে আমি সকল প্রকার ধোকার আচরণই করেছি। এমনকি তার থেকে তার স্ত্রীকে আলাদা করে দিয়েছি। তারপর শাইতান (শয়তান) তাকে তার নিকটবর্তী করে নেয় এবং বলে হ্যাঁ, তুমি খুব ভাল। রাবী আ’মাশ বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেছেনঃ অতঃপর শাইতান (শয়তান) তার সাথে আলিঙ্গন করে।সহিহ মুসলিম : ২৮১৩
প্রতিকারের উপায় :
অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা দাম্পত্য জীবনের বোঝাপড়া নষ্ট করে। স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা ও দয়া কমিয়ে দেয়। ছোট সমস্যাকে বড় করে তোলা হয়। যে সুযোগ নিয়ে শয়তান দাম্পত্য জীবন ধ্বংস করে দেয়। জেদ থেকেই মানুষের ক্রোদ্ধ বা রাগের সৃষ্টি হয়ে। তাই রাগ পরিহার করার চেষ্টা করি।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, তুমি রাগ করবে না। লোকটি কয়েকবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও প্রত্যেক বারই বললেন, তুমি রাগ করো না। সহিহ বুখারী : ৬১১৬, মিশকাত : ৫১০৪, সুনানে তিরমিযী : ২০২০, সহীহ আত্ তারগীব : ২৭৪৫, আহমাদ : ২০৩৫৭, আবূ ইয়া‘লা : ৬৮৩৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৬৮৯, শু‘আবুল ঈমান : ৮২৭৭,
৭. স্বামী সামর্থ অনুসারে আর্থিক দায়িত্ব পালন না করার ফলে
ইসলামে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক। এটি স্বামীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বরেন-
لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰىہُ اللّٰہُ ؕ لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىہَا ؕ سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا
সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিজক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন। সূরা তালাক : ৭
মুয়াবিযা বিন হাইদাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলো, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেনঃ সে আহার করলে তাকেও (একই মানের) আহার করাবে, সে পরিধান করলে তাকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে কখনও তার মুখমণ্ডল আঘাত করবে না, অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকী ত্যাগ করবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪২, ইরওয়াহ : ২০৩, মিশকাত : ৩২২৯, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫৮-১৮৬১।
আবূ মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাবী বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে? তিনি বললেন, (হাঁ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ সওয়াবের আশায় কোন মুসলিম যখন তার পরিবার-পরিজনের প্রতি ব্যয় করে, তা তার সাদাকা হিসাবে গণ্য হয়। সহিহ বুখারি : ৫৩৫১, সহিহ মুসলিম : ১০০২, আহমাদ : ১৭০৮১
প্রতিকারের উপায় :
উপরের কুরআন ও হাদিস প্রমান কর- স্বামীর প্রধান দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা) নিশ্চিত করা, তা সে স্ত্রী যতই ধনী হোক না কেন। স্ত্রীর উপার্জন থাকুক বা না থাকুক, এই দায়িত্ব স্বামীর কাঁধে। অন্যদিকে, স্ত্রী তার উপার্জিত অর্থ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ বা মোহরানার সম্পূর্ণ মালিক। এই সম্পদ থেকে তিনি কাকে দেবেন বা কীভাবে খরচ করবেন, তা নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার আছে। স্বামী যদি তার সামর্থ অনুসারে স্ত্রীকে ভরণ পোষণ প্রদান করে, তবে দাম্পত্য জীবনে শান্তি এসে যাবে।