ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলকে সামনে রেখে নির্ধারিত। পরিবার পরিকল্পনা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ (contraception) বিষয়টিও মুসলিম সমাজে আলোচ্য হয়ে থাকে। অনেকেই এ ব্যাপারে সঠিক দিকনির্দেশনা না জানার কারণে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তাই আপনার প্রশ্ন অনুযায়ী আমরা তিনটি অংশে বিষয়টি ব্যাখ্যা করব।

১. ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম সন্তান জন্মদানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহা নিয়ামত হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ বলেন-

لِلّٰهِ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنْ یَّشَآءُ  اِنَاثًا وَّ یَهَبُ  لِمَنْ  یَّشَآءُ   الذُّکُوْرَ ﴿ۙ۴۹﴾اَوْ یُزَوِّجُهُمْ ذُکْرَانًا وَّ اِنَاثًا ۚ وَ یَجْعَلُ مَنْ  یَّشَآءُ  عَقِیْمًا ؕ اِنَّہٗ  عَلِیْمٌ  قَدِیْرٌ ﴿۵۰﴾

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। সুরা আশ-শূরা : ৪৯-৫০

এ থেকে বোঝা যায়, সন্তান দান বা না দান করা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে।

আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ’আযলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, প্রত্যেক পানিতে সন্তান জন্ম হয় না। আর আল্লাহ তা’আলা যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন কোনো কিছুই তা প্রতিরাধ করার ক্ষমতা রাখে না। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৮, মিশকাত : ৩১৮৭, আহমাদ : ১১৪৬২, সহীহ আল জামি : ৩১০।

সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমি স্ত্রীসহবাসের সময় ’আযল করি। এতে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেন এটা কর? উত্তরে সে বলল, আমি তার সন্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ায় এটা করি। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এতে যদি কোনো প্রকার ক্ষতি হতো তাহলে পারস্যবাসী (ইরান) ও রোমকগণও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। সহিহ মুসলিম : ১৪৪৩, মিশকাত : ৩১৮৮, আহমাদ : ২১৭৭০

উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং অধিক সন্তান দানকারিনী নারীকে বিবাহ করতে উৎসাহিত করেছেন।

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, মিশকাত : ৩০৯৭, সুনানে নাসায়ি : ৫৩৭৯

তবে ইসলামে মানুষকে কিছু বিষয়ে নিজস্ব উদ্যোগ গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন—চিকিৎসা গ্রহণ করা, খাদ্য গ্রহণ করা, নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি। এর ভিত্তিতে আলেমগণ বলেন, সন্তান জন্মদানে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বা বিরতি নেওয়ার অনুমতি শরীয়তে কিছু শর্তসাপেক্ষে বৈধ হতে পারে।

কিন্তু স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নষ্ট করা (যেমন—স্টেরিলাইজেশন, নর-নারীর প্রজনন অঙ্গ কেটে ফেলা বা স্থায়ীভাবে অবরুদ্ধ করা) সাধারণ অবস্থায় হারাম। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন এবং বংশধারা বন্ধ করে দেওয়ার সমান, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।

২. আজল ও জন্মনিয়ন্ত্রণ

“আজল” (العزل) অর্থ হলো সহবাসের সময় বীর্যপাতের আগে পুরুষাঙ্গ বের করে নেওয়া, যাতে বীর্য স্ত্রীর গর্ভে না পড়ে। সাহাবায়ে কেরাম নবিজির ﷺ যুগে এ কাজ করতেন।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা ’আযল করতাম। সে সময় কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল। সহিহ বুখারি : ৫২০৮, সহিহ মুসলিম : ১৪৪০

আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী মুসত্বালিক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম এবং এ যুদ্ধে আমরা অনেক ’আরাবীয় নারী বন্দীনীরূপে করায়ত্ত করি। যেহেতু আমরা দীর্ঘদিন নারীবিহীন থাকায় অস্বস্থিবোধ করছিলাম, ফলে আমরা নারী সঙ্গমের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমরা ’আযল করা পছন্দ করলাম এবং আমরা পরস্পরের মধ্যে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে সমুপস্থিত থাকতে তাঁকে জিজ্ঞেস না করে এরূপ করা কি ঠিক হবে? অতঃপর আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা ’আযল করবে না এমনটি নয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত (সৃষ্টিজীব পৃথিবীতে) যা হওয়ার আছে, তা অবশ্যই সৃষ্টি হবে। সহিহ বুখারী : ৪১৩৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৭২, মিশকাত : ৩১৮৬, আহমাদ : ১১৬৪৭।

এ থেকে প্রমাণিত হয়, আজল মুলত সন্তান জন্মদানে সাময়িক নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি ছিল, যা নবিজি ﷺ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেননি। তবে তিনি এটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বা শতভাগ কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেননি।

আজলের সাথে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির একটি মৌলিক মিল রয়েছে—দুটিই গর্ভধারণ ঠেকানোর প্রচেষ্টা। পার্থক্য হলো, আজল কেবল স্বাভাবিক যৌন মিলনের সময়কার একটি সাময়িক কৌশল, আর আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ নানা রকম হতে পারে—গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট, ইনজেকশন, কন্ডম, কপার-টি, ইত্যাদি।

আযল ও জন্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে পার্থক্য :

বৈশিষ্ট্যআযল (ঐতিহ্যবাহী কৌশল)আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি
পদ্ধতিসহবাসের সময় পুরুষাঙ্গ বাইরে বের করে বীর্যপাত করা।কনডম, পিল, ইনজেকশন, আইইউডি (IUD), স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ ইত্যাদি।
কার্যকারিতাকম কার্যকর, গর্ভসঞ্চারের সম্ভাবনা থাকে।তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর।
শরয়ী বিধানশর্ত সাপেক্ষে জায়েজ (স্বামীর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং স্ত্রীর অনুমতি প্রয়োজন)।সাময়িক ব্যবস্থা শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ; স্থায়ী ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তবে জীবননাশের আশঙ্কা থাকলে বৈধ।
রাসূল (সাঃ)-এর যুগেপ্রচলিত ছিল এবং রাসূল (সাঃ) সরাসরি নিষেধ করেননি।প্রচলিত ছিল না।

অতএব, বলা যায় আজলও এক ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ, তবে এটি প্রাচীন পদ্ধতি। আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ তার বিকল্প ও সম্প্রসারিত রূপ। তবে একটি সহিহ হাদিসে আজল করাকেও হত্যা বলা হয়েছে।

জুযামাহ্ বিনতু ওয়াহ্ব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কিছু সংখ্যক লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলছিলেন যে, আমি ’গীলাহ’ (স্তন্যদায়িনী নারীর সাথে সহবাস করা।) হতে নিষেধ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম; কিন্তু যখন পারস্য (ইরান) এবং রোমবাসীদের ব্যাপারে জানতে পারলাম যে, তারা (সন্তানের আশঙ্কায়) গীলাহ্ করে অথচ এটা তাদের কোনো প্রকার ক্ষতির কারণ নেই। অতঃপর লোকেরা তাঁকে ’আযল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, এটা পরোক্ষভাবে জীবন্ত কন্যা পুঁতে দেয়া (সমাধিস্থ করা), যে সম্পর্কে কুরআন মাজীদের আয়াত আছে- ’’যখন জীবন্ত পুঁতে দেয়া কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’’ সূরা তাকভীর  ৮-৯। সহিহ মুসলিম : ১৪৪২, আবূ দাঊদ : ৩৮৮২, নাসায়ী : ৩৩২৬, তিরমিযী : ২০৭৭, মিশকাত : ৩১৮৯, আহমাদ : ২৭০৩৪, দারিমী : ২৬৬৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪১৯৬, সহীহ আল জামি : ৫১৪৫।

আলেমগণ এ হাদিস ও জাবির (রাঃ) এর হাদিস দুটি সমন্বয় করে বলেন যে, যদিও রাসূল (সাঃ) আযলকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেননি, তবে তিনি এটিকে উৎসাহিতও করেননি; বরং সতর্ক করেছেন। তাঁর এই সতর্কবাণী থেকে বোঝা যায়, আযল মূলত মাকরুহ (অনুত্তম), তবে কিছু বৈধ কারণে স্ত্রী ও স্বামীর পারস্পরিক সম্মতিতে এটি সাময়িকভাবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

৩. ইসলামের দৃষ্টিতে কখন জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েয আর কখন নাজায়েয?

জায়েয হওয়ার শর্ত

ইসলামী ফিকহের আলোকে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে বৈধ বলে গণ্য হয়। নিম্নলিখিত শর্ত ও উদ্দেশ্যে সাময়িক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েয বা বৈধ:

ক. মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে:

যদি মা শারীরিকভাবে দুর্বল হন অথবা অসুস্থতার কারণে গর্ভধারণ করলে তার স্বাস্থ্যের বড় ধরনের ক্ষতি বা জীবননাশের আশঙ্কা থাকে।

দলিল: রাসূল (সাঃ)-এর যুগে দাসীর গর্ভধারণে স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা একটি বৈধ কারণ ছিল (যা আধুনিক যুগে স্ত্রীর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)। এছাড়া ইসলামে ক্ষতিকর বিষয় এড়িয়ে চলার নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ্‌ বলেন,

“আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর তোমাদের দ্বীনে কোনো ক্ষতিকর বিষয় রাখেননি।” (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮)

খ. দুই সন্তানের মাঝে ব্যবধানের জন্য (Spacing):

যদি সদ্য ভূমিষ্ঠ দুগ্ধপোষ্য সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে বা মায়ের যত্নের সুবিধার জন্য এক বা দুই বছর সন্তানদের মধ্যে প্রয়োজনীয় বিরতি (ব্যবধান) রাখার উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে তা জায়েয। তবে এর উদ্দেশ্য হবে পরিকল্পনা, সন্তান সীমিত করা নয়।

দলিল: সাহাবিরা আযল করতেন স্তন্যদানকারী শিশুর (غيلة) ক্ষতি এড়ানোর জন্য। যদিও পরে রাসূল (সাঃ) জানান যে এতে সামান্যই ক্ষতি হয়, তবে সাময়িক বিরতির ধারণাটি এতে প্রতিফলিত হয়।

গ. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিতে:

সাময়িক পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকা আবশ্যক। আযল বা অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করার সময় স্ত্রীর অনুমতি জরুরি। (ইবনু কুদামা, আল-মুগনি)

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি দাসী আছে, আমি তার সাথে ’আযল’ করে থাকি। আমি তার গর্ভবতী হওয়া পছন্দ করি না। আর আমি তাই (সঙ্গম) ইচ্ছা রাখি যা অন্যান্য পুরুষেরা (দাসীর সাথে) ইচ্ছা রাখে। ইয়াহুদীরা বলে থাকে, ’আযল’ নাকি গোপন হত্যা। তার কথা শুনে তিনি বললেনঃ ইয়াহুদীরা মিথ্যা বলেছে। যদি মহান আল্লাহ কোনো প্রাণীকে সৃষ্টি করা নির্ধারিত করেন তবে তা রোধ করার ক্ষমতা তোমার নেই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৭১

অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েয নয়।

ঘ. স্থায়ীভাবে বংশধারা বন্ধ না করা

জন্মনিয়ন্ত্রণ সাময়িক হলে অনুমোদিত, কিন্তু স্থায়ীভাবে বন্ধ করা শরীয়তে নাজায়েয, বিশেষ কোনো চরম চিকিৎসাগত কারণে ছাড়া।

নাজায়েয বা হারাম হওয়ার কারণ

ক. আল্লাহর রিজিক নিয়ে সন্দেহ করা

ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে অধিক সন্তান লাভে উৎসাহিত করা এবং আল্লাহ্‌র দেওয়া রিযিকের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখা। জন্মনিয়ন্ত্রণের ফলে এই মৌলিক নীতির লঙ্ঘন হয় বলে আলেমরা সাধারণত একে নিরুৎসাহিত করেন। রিযিকের মালিক আল্লাহ্‌: ইসলাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, প্রতিটি সন্তানের রিযিক (জীবিকা) আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নির্ধারিত। দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানকে হত্যা করা বা জন্মনিয়ন্ত্রণ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ خَشۡیَۃَ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُہُمۡ وَاِیَّاکُمۡ ؕ اِنَّ قَتۡلَہُمۡ کَانَ خِطۡاً کَبِیۡرًا

অভাব-অনটনের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিয্ক দেই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ। সুরা আল-ইসরা : ৩১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দারিদ্র্যের ভয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা বা সন্তান গ্রহণ থেকে বিরত থাকা হারাম বা মহাপাপের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি আল্লাহ্‌র রিযিকের ওয়াদার উপর অবিশ্বাস প্রকাশ করে।

খ. স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদান বন্ধ করা

আল্লাহ্‌র সৃষ্টিতে পরিবর্তন: স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন- টিউবেকটমি বা ভ্যাসেকটমি) গ্রহণ করাকে কিছু আলেম আল্লাহ্‌র সৃষ্টি কাঠামোতে পরিবর্তন (তাগয়ীরুল খালক) হিসেবে গণ্য করেছেন, যা শয়তানের কাজ বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

وَّلَاُضِلَّنَّہُمۡ وَلَاُمَنِّیَنَّہُمۡ وَلَاٰمُرَنَّہُمۡ فَلَیُبَتِّکُنَّ اٰذَانَ الۡاَنۡعَامِ وَلَاٰمُرَنَّہُمۡ فَلَیُغَیِّرُنَّ خَلۡقَ اللّٰہِ ؕ  وَمَنۡ یَّتَّخِذِ الشَّیۡطٰنَ وَلِیًّا مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ فَقَدۡ خَسِرَ خُسۡرَانًا مُّبِیۡنًا ؕ

‘আর অবশ্যই আমি তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, মিথ্যা আশ্বাস দেব এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ দেব, ফলে তারা পশুর কান ছিদ্র করবে এবং অবশ্যই তাদেরকে আদেশ করব, ফলে অবশ্যই তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবে’। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে, তারা তো স্পষ্টই ক্ষতিগ্রস্ত হল। সূরা নিসা : ১১৯

স্থায়ী বন্ধ্যাকরণকে অনেক আলেম এই পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন, তবে কিছু আলেম বিশেষ স্বাস্থ্যগত কারণে এটিকে বৈধ বলেছেন। যেমন—বন্ধ্যাকরণ (Sterilization), টিউব কেটে ফেলা ইত্যাদি। কারণ এটি আল্লাহর সৃষ্টিতে স্থায়ী পরিবর্তন এবং মানবজাতির বংশধারা কেটে দেওয়া।

গ. স্ত্রীর সম্মতি ছাড়াই জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ

ইসলাম দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মতিকে গুরুত্ব দিয়েছে।

ঘ. কোনো হারাম বা ক্ষতিকর উপায়ে গর্ভনিরোধ

যদি পদ্ধতিটি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয় অথবা শরীয়তবিরোধী হয়, তবে তা হারাম গণ্য হবে।

উপসংহার : ইসলামে সন্তান দান বা জন্মনিয়ন্ত্রণের মূলনীতি হলো ভারসাম্য। সন্তান আল্লাহর নিয়ামত, তাই কেবল দারিদ্র্য বা ভোগবাদী কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তবে বৈধ কারণ,  স্ত্রীর স্বাস্থ্য, সন্তান পালনে সময় প্রয়োজন, কিংবা চিকিৎসাগত ঝুঁকি থাকলে—সাময়িকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের অনুমতি রয়েছে। আজল ছিল সাহাবাদের যুগের জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি, যা নবিজি ﷺ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেননি। তাই আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণও একইভাবে কিছু শর্তসাপেক্ষে জায়েয।  কিন্তু স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ, আল্লাহর রিজিক নিয়ে সন্দেহ, অথবা হারাম উপায়ে গর্ভনিরোধ ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *