মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
৪. মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বের করার জন্য নবী ﷺ আবার সুপারিশ করবেন
উপরের হাদিসে দেখেছি, কিয়ামতের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি শাফা‘আত হবে সকলের জন্য। আর সেটা বিচার-ফয়সালা শুরু করার আবেদন সম্পর্কে। সকল নবী ও রাসূল এ ব্যাপারে শাফা‘আত করতে অস্বীকার করবে, নিজেদের অপরাগতা প্রকাশ করবে।
শেষে নবী মুহাম্মাদ ﷺ মুমিদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার জন্য দ্বিতীয় বার আবার সুপারিশ করবেন। এটা হলো সাধারণ সুপারিশ। সকল মানুষ এ শাফা‘আত দ্বারা উপকৃত হবে।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরাশাদ করেন-
لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ دَعَا بِهَا فِي أُمَّتِهِ فَاسْتُجِيبَ لَهُ وَإِنِّي أُرِيدُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ أَنْ أُؤَخِّرَ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
প্রত্যেক নবীকে তার উন্মাতের ব্যাপারে একটি এমন দু’আর অনুমতি দেয়া হয়েছে যা অবশ্যই কবুল করা হবে। তা তারা নিজের উন্মাতের জন্য করে ফেলেছেন। আমি ইনশাআল্লাহ সংকল্প করেছি, আমার দু’আটি পরে কিয়ামতের দিবসে আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য করবো। সহিহ মুসলিম : ১৯৯।
আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রাসূল ﷺ -কে প্রশ্ন করা হলঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, আবূ হুরাইরা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে। সহিহ বুখারি : ৯৯, ৬৫৭০
এ দুটো হাদীস পাঠে আমরা জানতে পারলাম কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত দ্বারা কারা ধন্য হবে। যারা অন্তর দিয়ে শির্ক মুক্ত থেকে আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে বিশ্বাস করেছে তারাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত পাবে। তারা যতই পাপী হোক না কেন।
সুপারিশ সম্পর্কে আমাদের সমাজের একটি ভুল ধারণা
আমাদের সমাজের বিরাট একটা অংশ সুফিবাদের সাথে সম্পৃক্ত। তাদের ধারন, তাদের পীর, অলি আওলিয়াগণ তাদের সুপারিশ করে জাহান্নাহ থেকে বাচিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অথচ আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মূহূর্ত মহান আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কেউ শাফাআত করতে পারবে না। অপর পক্ষ কোন মুশরিক ও কাফিরকে সুপারিশ করার কোন অনুমিত প্রদান করা হবে না। সুপারিক পেতে হলে ঈমানদার হতে হবে আর সুপারিশ করেত হলে আল্লাহ অনুমিত লাগবে। ঈমান ও অনুমিত একত্র হলেই সুপারিশ পাওয়ার যোগত্য অর্যন করবে। এ কারনে সুপারিশের শর্ত দুটি। যথা-
ক. ঈমানদার হতে হবে
খ. আল্লাহ তায়ালার অনুমতি।
ক.ঈমানদার হতে হবে
কিয়ামত দিবসে অনুষ্ঠিত শাফাআত থেকে বঞ্চিত হবে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরীর গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এরই উপর মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
مَا کَانَ لِلنَّبِیِّ وَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَنْ یَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِکِیْنَ وَلَوْ کَانُوْۤا اُولِیْ قُرْبٰی مِنْۢ بَعْدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمْ اَنَّہُمْ اَصْحٰبُ الْجَحِیْمِ
নাবী ও অন্যান্য মু’মিনদের জন্য জায়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, এ কথা প্রকাশ হবার পর যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী। সুরা তাওবা : ১১৩
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنْ أَهْلِ ٱلْكِتَـٰبِ وَٱلْمُشْرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ
অর্থঃ আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং যারা মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সূরা বায়্যিনাহ : ৬
এতে বুঝা যায় কাফির ও মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না। কারণ, তারা ঈমানশূন্য। অনেক পীরকে বলতে শুনা যায়, আখেরাতে পীর সাহেব নাকি মুরিদদের ফেলে জান্নাতে যাবে না। কেমন হাস্যকর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং নিজের কলিজা ফাতিমার (রাদি.) টুকরার জিম্মাদারী নিতে পারলেন না। অথচ পীর সাহেব মুরিদদের জিম্মাদারী নিচ্ছেন।
তবে মনে রাখতে হবে আল্লাহর বন্ধু বা অলিদের শাফায়াত বা সুপারিশ সত্য কিন্তু নিশ্চিত নয় বা ইচ্ছাধীন নয়। কারন ইহাতে আল্লাহকে বাধ্য করা হয় যা চুড়ান্তভাবে অন্যায়। আর যদি কেউ গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সুপারিশের জন্য দুআ বা প্রার্থনা করে তবে দাও শির্ক হবে, যদি সে আমাদের প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হয়। কারণ, দুআ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুআ-ই ইবাদত”। সুনানে তিরমিজি : ৩৩৭১
আর ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। ইবাদতে তাঁর আর কোন শরীক নেই। আর শির্ক হচ্ছে, গাইরুল্লাহকে ইবাদতে অংশীদার করার নাম।
খ. আল্লাহ তায়ালার অনুমতি।
শাফাআতের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার অনুমতি প্রয়োজন। এ সম্পর্কে বহু আয়াত কুরআনে মজুদ আছে। নিচে কয়েকটি তুলে ধরছি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬اۖ لَّهُ ۥ مُلْكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلْأَرْضِۖ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ
বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সূরা যুমার : ৪৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
مَا لَكُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَلِىٍّ۬ وَلَا شَفِيعٍۚ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ
তিনি ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই এবং নেই তার সামনে সুপারিশকারী, তারপরও কি তোমরা সচেতন হবে না। সূরা সাজদাহ : ৪
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلْأَرْضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشْفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذْنِهِۦۚ
অর্থ: পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷ কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সূরা বাক্বারা : ২৫৫
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
وَاَنْذِرْہُمْ یَوْمَ الْاٰزِفَۃِ اِذِ الْقُلُوْبُ لَدَی الْحَنَاجِرِ کٰظِمِیْنَ ۬ؕ مَا لِلظّٰلِمِیْنَ مِنْ حَمِیْمٍ وَّلَا شَفِیْعٍ یُّطَاعُ ؕ
আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। তখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। সুরা গাফির : ১৮
আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূর্ণরূপে তার ইচ্ছাধীন। এক শ্রেণীর মুশরিকগণ চিন্তা করে থাকেন যে, আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিবর্গ, নবিগণ, রাসুলগণ, ফেরেতাগণ বা অন্যান্য সত্তা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাদের জান্নাত দিবেন বা আল্লাহর ওখানে তাদের বিরাট প্রতিপত্তি আছে। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে তারা যে কোন কার্যোদ্ধার করতে সক্ষম। তারা যে কথার ওপর অটল থাকে, তা তারা আদায় করেই ছাড়ে। অথচ শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না। তবে আল্লাহ অনুমতি নিয়ে সুপারিশ করেত পারবেন। সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দ্বিতীয় যোগ্যতা হলো- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুমতি।
কারা সুপারিশ করার অনুমতি পাবেন?
ক. রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রথম সুপারিশ করা অনুমিত পাবেন
সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম আল্লাহর অনুমতিক্রমে ইমানদারদের জন্য সুপারিশ অনুমতি পাবেন।
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ
আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীগণ বিশেষভাবে আমার শাফা’আত লাভ করবে। সুনানে তিরমিযী : ২৪৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩৯, মিশকাত : ৫৫৯৮, সহীহুল জামি : ৩৭১৪, মুসনাদে আহমাদ : ১৩২৪৫, আবূ ইয়া’লা : ৩২৮৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৬৪৬৭, শু’আবূল ঈমান : ৩১০
আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, জান্নাতে লোকদের প্রবেশ সম্পর্কে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ইমান এনেছে যা অন্য কোন নাবির বেলায় হবে না। নাবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যাঁর প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ইমান এনেছে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৩
আওফ ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার প্রভুর কাছে থেকে একজন আগমনকারী (ফেরেশতা) আসলেন এবং তিনি (আল্লাহর পক্ষ হতে) আমাকে এ দুয়ের মধ্যে একটির ইচ্ছা স্বাধীনতা প্রদান করলেন, হয়তো আমার উম্মতের অর্ধেক সংখ্যা জান্নাতের সুযোগ গ্রহণ করুক অথবা আমি শাফা’আতের অধিকার গ্রহণ করি? অতঃপর আমি শাফা’আত গ্রহণ করলাম। অতএব তা ঐ সকল লোকের জন্য, যারা আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপন না করে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের জন্য আমার শাফা’আত কার্যকারী হবে। মিশকাত : ৫৬০০, সুনানে তিরমিযী : ২৪৪১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩১৭, সহীহুল জামি : ৫৬, আহমাদ : ২৪০৪৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৬৪৭০, ত্ববারানী : ১৫৭৭,
খ. শহিদগণ সুপারিশ করার অনুমিত পাবেন
নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২
গ. কুরআন সুপারিশ করবে
আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪
ঘ. সিয়াম সুপারিশ করবে
আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَقُولُ الصِّيَامُ: أَيْ رَبِّ إِنِّي مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ: مَنَعْتُهُ النُّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ فيشفعان . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان
সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য শাফা’আত করবে। সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা দিয়েছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার শাফা’আত কবূল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে। মিশকাত : ১৯৬৩, সহহি আত তারগিব : ৯৭৩, মুসতাদারাক লিল হাকিম : ২০৩৬, শুসিহহ আল জামি :৩৮৮২
নোট : আলেমদের সরাসরি “সুপারিশকারী” হিসেবে কোনো সহীহ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিছু দুর্বল বা মাওকূফ সূত্রে আছে, আলেমগণও সুপারিশ করবেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
যখন জাহান্নামীরা মুক্তি পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য সুপারিশের অনুমতি দেবেন, যারা সুপারিশ করতে পারবে। তারপর সুপারিশ করবেন নবীগণ, অতঃপর আলেমগণ, অতঃপর শহীদগণ।” মুসনাদে বাযযার : ৩৪০৬। কেউ কেউ এটিকে “দুর্বল” আবার কেউ কেউ “অতিশয় দুর্বল” বলেছেন।
ঙ. উম্মাতের একজন লোকের সুপারিশে বহু লোক নাজাত পাবেন
আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি একটি দলের সাথে ইলিয়া (বাইতুল মাকদিসের একটি নগর) নামক জায়গায় অবস্থান করছিলাম। দলের একজন লোক বলল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আমার উম্মাতের একজন লোকের সুপারিশে তামীম বংশের সকল ব্যক্তির চেয়ে বেশি সংখ্যক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি ব্যতীত অন্য কারো সুপারিশে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমি ছাড়াই। সুনানে তিরমিজি : ২৪৩৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩১৬, সহীহুল জামি : ৫৩৬৪, মুসনাদে আহমাদ : ১৫৮৯৫, আবূ ইয়ালা : ৬৮৬৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৭৬, দারিমী : ২৮০৮, হাকিম : ২৩৬।
উম্মতে মুহাম্মাদীর হিসাব হবে সর্বপ্রথম
ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন-
نَحْنُ آخِرُ الأُمَمِ وَأَوَّلُ مَنْ يُحَاسَبُ يُقَالُ أَيْنَ الأُمَّةُ الأُمِّيَّةُ وَنَبِيُّهَا فَنَحْنُ الآخِرُونَ الأَوَّلُونَ
আমরা হলাম সর্বশেষ উম্মাত এবং সর্বপ্রথম আমাদের হিসাব গ্রহণ করা হবে। বলা হবে, উম্মী (নিরক্ষর) নবীর উম্মাত এবং তাদের নবী কোথায়? সুতরাং আমরা হলাম সর্বশেষ উম্মাত (দুনিয়াতে আগমনের দিক থেকে) এবং সর্ব প্রথম উম্মাত (মর্যাদার দিক থেকে)। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৯০, সহিহাহ : ১২৭৪, শায়খ আলবানি সহিহ বলেছেন।
আবু হুরায়রা ও হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে: নবী ﷺ বলেছেন-
«نَحْنُ الْآخِرُونَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا، وَالْأَوَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الْمَقْضِيُّ لَهُمْ قَبْلَ الْخَلَائِقِ».
পৃথিবীতে বসবাসকারী জাতিগুলোর মধ্যে আমাদের আগমন সর্বশেষে আর কিয়ামতের দিনে আমাদের ফয়সালা করা হবে সকল সৃষ্টি জীবের পূর্বে”। সহিহ মুসলিম : ৮৫৬
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
আমরা সবশেষে আগত উম্মাত, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা হব সর্বগ্রবর্তী, আমরাই প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করব। অথচ তাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে আমাদের পূর্বে এবং আমাদেরকে তা দেয়া হয়েছে তাদের পরে। তারা বিরোধে লিপ্ত হয়ে পড়ল কিন্তু তারা যে সত্য দীনের ব্যাপারে বিরোধে লিপ্ত হয়েছিল, আল্লাহ আমাদেরকে সে দিন সম্পর্কে হিদায়াত দান করেছেন। তিনি বলেনঃ আমাদের জন্য আজকে জুমুআর দিন আর ইয়াহুদীদের জন্য পরের দিন এবং খৃষ্টানদের জন্য তারও পরের দিন। সহিহ বুখারি : ৮৭৬, সহিহ মুসলিম : ৮৫৫।
৫. কিয়ামতের দিন সর্বোচ্চ ন্যায় বিচার করা হবে
কিয়ামতের দিন সর্বোচ্চ ন্যায় বিচার করা হবে, কারো ওপর বিন্দুমাত্র অন্যায় করা হবে না। এ সম্পর্কিত কিছু আয়াত তুলে ধরা হলো-
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَوُضِعَ الْکِتٰبُ فَتَرَی الْمُجْرِمِیْنَ مُشْفِقِیْنَ مِمَّا فِیْہِ وَیَقُوْلُوْنَ یٰوَیْلَتَنَا مَالِ ہٰذَا الْکِتٰبِ لَا یُغَادِرُ صَغِیْرَۃً وَّلَا کَبِیْرَۃً اِلَّاۤ اَحْصٰہَا ۚ وَوَجَدُوْا مَا عَمِلُوْا حَاضِرًا ؕ وَلَا یَظْلِمُ رَبُّکَ اَحَدًا
আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, ‘হায় ধ্বংস আমাদের! কী হল এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে’ এবং তারা যা করেছে, তা হাযির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। সূরা কাহফ, : ৪৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰہَ لَا یَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّۃٍ ۚ وَاِنْ تَکُ حَسَنَۃً یُّضٰعِفْہَا وَیُؤْتِ مِنْ لَّدُنْہُ اَجْرًا عَظِیْمًا
নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলম করেন না। আর যদি সেটি ভাল কাজ হয়, তিনি তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে মহা প্রতিদান প্রদান করেন। সূরা নিসা : ৪০
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰہَ لَا یَظْلِمُ النَّاسَ شَیْئًا وَّلٰکِنَّ النَّاسَ اَنْفُسَہُمْ یَظْلِمُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কিছুমাত্র যুলম করেন না; বরং মানুষই নিজদের উপর যুলম করে। সূরা ইউনুস : ৪৪
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاتَّقُوْا یَوْمًا تُرْجَعُوْنَ فِیْہِ اِلَی اللّٰہِ ٭۟ ثُمَّ تُوَفّٰی کُلُّ نَفْسٍ مَّا کَسَبَتْ وَہُمْ لَا یُظْلَمُوْنَ
আর তোমরা সে দিনের ভয় কর, যে দিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে সে যা উপার্জন করেছে, তা পুরোপুরি দেয়া হবে। আর তাদের যুলম করা হবে না। সূরা বাকারা : ২৮১
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
মু’মিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর একটি পুলের ওপর তাদের দাঁড় করানো হবে, যা জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে অবস্থিত। দুনিয়ায় তারা একে অপরের উপর যে যুলুম করেছিল তার প্রতিশোধ গ্রহণ করানো হবে। তারা যখন পাক-সাফ হয়ে যাবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাণ, প্রত্যেক ব্যক্তি তার দুনিয়ার বাসস্থানের তুলনায় জান্নাতের বাসস্থানকে উত্তমরূপে চিনতে পারবে। সহিহ বুখারি : ৬৫৩৫
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক লোক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এসে বসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কতিপয় গোলাম আছে। আমার কাছে মিথ্যা কথা বলে, আমার ধন-সম্পদ খিয়ানত করে এবং আমার নির্দেশের অবাধ্য হয়, তাই আমি তাদেরকে গালমন্দ করি এবং মারধরও করে থাকি। (কিয়ামতে) তাদের ব্যাপারে আমার অবস্থা কী হবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন গোলামদের খিয়ানত, অবাধ্য, মিথ্যা বলা এবং তোমার শাস্তি দেয়া সবকিছুর হিসাব নেয়া হবে। যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের সমান হয়, তখন ব্যাপার সমান সমান থাকবে। তুমি পুণ্যও পাবে না এবং তোমাকে কোন শাস্তিও দেয়া হবে না। আর যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের তুলনায় কম হয়, তখন তাদের অতিরিক্ত অপরাধের শাস্তি না দেয়ার জন্য তুমি সাওয়াব পাবে। কিন্তু যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের তুলনায় বেশি হয়, তখন গোলামদের জন্য তোমার নিকট থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে। এ সকল কথা শুনে লোকটি অন্যত্র সরে দাঁড়াল এবং চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি আল্লাহর এ বাণীটি পড়নি?
وَنَضَعُ الْمَوَازِیْنَ الْقِسْطَ لِیَوْمِ الْقِیٰمَۃِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَیْئًا ؕ وَاِنْ کَانَ مِثْقَالَ حَبَّۃٍ مِّنْ خَرْدَلٍ اَتَیْنَا بِہَا ؕ وَکَفٰی بِنَا حٰسِبِیْنَ
আর কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কারো কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা হাযির করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। সূর আম্বিয়া : ৪৭
তখন লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার নিজের এবং ঐ সমস্ত গোলামদের ব্যাপারে তাদেরকে আমার কাছ থেকে পৃথক করে দেয়া অপেক্ষা উত্তম আর কিছু পচ্ছি না। আমি আপনাকে সাক্ষী করে বলছি যে, তারা সকলেই মুক্ত। মিশকাত : ৫৫৬১, সুনানে তিরমিযী : ৩১৬৫, মুসনাদে আহমাদ : ২৬৪৪৪, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ২২৯০, শু’আবূল ঈমান : ৮৫৮৬
৬. কিয়ামতের দিন প্রতিটি ছোট-বড় কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব হবে
কিয়ামতের দিন কম-বেশি, ছোট-বড় সকল কাজ-কর্ম, কথা ও বিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَکُلُّ شَیْءٍ فَعَلُوْہُ فِی الزُّبُرِ وَکُلُّ صَغِیْرٍ وَّکَبِیْرٍ مُّسْتَطَرٌ
আর তারা যা করেছে, সব কিছুই ‘আমলনামায়’ রয়েছে। আর ছোট বড় সব কিছুই লিখিত আছে। সুরা কামার : ৫২-৫৩
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَمَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّۃٍ خَیْرًا یَّرَہٗ ؕ وَمَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّۃٍ شَرًّا یَّرَہٗ ٪
কেহ অণু পরিমাণ সৎ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও সে দেখবে। সূরা যিলযাল : ৭-৮
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَقَالَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَا تَاْتِیْنَا السَّاعَۃُ ؕ قُلْ بَلٰی وَرَبِّیْ لَتَاْتِیَنَّکُمْ ۙ عٰلِمِ الْغَیْبِ ۚ لَا یَعْزُبُ عَنْہُ مِثْقَالُ ذَرَّۃٍ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الْاَرْضِ وَلَاۤ اَصْغَرُ مِنْ ذٰلِکَ وَلَاۤ اَکْبَرُ اِلَّا فِیْ کِتٰبٍ مُّبِیْنٍ ٭ۙ
আর কাফিররা বলে, ‘কিয়ামত আমাদের কাছে আসবে না।’ বল, ‘অবশ্যই, আমার রবের কসম! যিনি গায়েব সম্পর্কে অবগত, তা তোমাদের কাছে আসবেই। আসমানসমূহ ও যমীনে অনু পরিমাণ কিংবা তদপেক্ষা ছোট অথবা বড় কিছুই তাঁর অগোচরে নেই, বরং সবই সুস্পষ্ট কিতাবে রয়েছে। সুরা সাবা : ৩
আয়িশা (রাদি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ হে আয়েশা! ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৪৩, আহমাদ : ২৩৮৯৪, ২৪৬৫১, দারেমী : ২৭২৬, সহীহাহ : ৫১৩।
৭. কিয়ামতের দিন প্রথমে সালাতের হিসেব নেওয়া হবে
আনাস ইবনু হাকীম আদ-দাববী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ আমাকে বললেন, তুমি তোমার শহরে পৌঁছে তার বাসিন্দাদের অবহিত করবে যে, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন-
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ الْمُسْلِمُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الصَّلاَةُ الْمَكْتُوبَةُ فَإِنْ أَتَمَّهَا وَإِلاَّ قِيلَ انْظُرُوا هَلْ لَهُ مِنْ تَطَوُّعٍ فَإِنْ كَانَ لَهُ تَطَوُّعٌ أُكْمِلَتِ الْفَرِيضَةُ مِنْ تَطَوُّعِهِ ثُمَّ يُفْعَلُ بِسَائِرِ الأَعْمَالِ الْمَفْرُوضَةِ مِثْلُ ذَلِكَ
কিয়ামতের দিন মুসলিম বান্দার নিকট থেকে সর্বপ্রথম ফরয সালাতের হিসাব নেয়া হবে। যদি সে তা পূর্ণরূপে আদায় করে থাকে (তবে তো ভালো), অন্যথায় বলা হবেঃ দেখো তো তার কোন নফল সালাত আছে কি না? যদি তার নফল সালাত থেকে থাকে, তবে তা দিয়ে তার ফরয সালাত পূর্ণ করা হবে। অতঃপর অন্যান্য সব ফরজ আমলের ব্যাপারেও অনুরূপ ব্যবস্থা করা হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪২৫, ১৪২৬, সুনানে তিরমিযী : ৪১৩, সুনানে নাসায়ী : ৪৬৫-৬৭
আনাস ইবনু হাকীম আদ্-দাব্বী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি যিয়াদ অথবা ইবনু যিয়াদের ভয়ে মদীনায় চলে আসেন এবং আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) আমাকে তাঁর বংশ পরিচয় দিলেন এবং আমিও আমার বংশ পরিচয় দিলাম। তিনি আমাকে বলেনঃ হে যুবক! আমি কি তোমার কাছে হাদীস বর্ণনা করব না? জবাবে আমি বলিঃ হ্যাঁ, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! বর্ণনাকারী ইউনুস বলেন, আমার মনে হয়, তিনি এ হাদীস সরাসরি নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেছেন। নবী ﷺ বলেনঃ কিয়ামতের দিন মানুষের ’আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম তাদের সালাত সম্পর্কে হিসাব নেয়া হবে।
তিনি বলেনঃ আমাদের মহান রব্ব ফিরিশতাদের বান্দার সালাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করবেন, দেখো তো সে তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করেছে নাকি তাতে কোন ত্রুটি রয়েছে? অতঃপর বান্দার সালাত পূণার্ঙ্গ হলে পূণার্ঙ্গই লিখা হবে। আর যদি তাতে ত্রুটি থাকে তাহলে মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের বলবেন, দেখো তো আমার বান্দার কোন নফল সালাত আছে কিনা? যদি থাকে তাহলে তিনি বলবেনঃ আমার বান্দার ফারয সালাতের ঘাটতি তার নফল সালাত দ্বারা পরিপূর্ণ করো। অতঃপর সকল আমলই এভাবে গ্রহণ করা হবে (অর্থাৎ নফল দ্বারা ফারযের ত্রুটি দূর করা হবে)। সুনানে আবু দাউদ : ৮৬৪, আহমাদ ৭৮৪২, ৯২১০, ১৬৫০১;, হাদিসের মান সহিহ।
তবে একটি সহিহ হাদিসে এসেছে-
আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ بِالدِّمَاءِ
(কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম হত্যার বিচার করা হবে। সহিহ বুখারি : ৬৫৩৩, ৬৮৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৬৭৮, আহমাদ : ৩৬৭৪
মন্তব্য : প্রকৃত পক্ষে এ দুটি হাদিসের মাঝে কোন বিরোধ নাই। কেননা, সালাতে হিসেব আল্লাহর তায়ালার ইবাদতের (আল্লাহর হকের) সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং আল্লাহ হক সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব হবে। আর এ হাদীসটি সৃষ্ট জীবের (বান্দার হক্বের) সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিদ বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম খুনের হিসাব হবে। হাদীসটি থেকে বুঝা যয়, খুনের ব্যাপার অত্যন্ত মারাত্মক।
৮. কিয়ামতের দিন সৎকর্ম দ্বারা গুনাহের প্রতিদান দিতে হবে
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
«مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُونَ دِينَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ»
যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোন দ্বীনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট হতে নেয়া হবে আর তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ২৪৪৯, ৬৫৩৪
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা কি জান দরিদ্র অসহায় ব্যক্তি কে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের মধ্যে দরিদ্র অসহায় ব্যক্তিতো সে যার কোনো টাকা পয়সা বা সম্পদ নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: আমার উম্মতের মধ্যে সত্যিকার দরিদ্র অসহায় হলো সেই ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাতসহ অনেক ভালো কাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, অথচ দুনিয়াতে বসে সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো প্রতি অপবাদ দিয়েছিল, করো সম্পদ আত্নসাত করেছিল, কারো রক্তপাত ঘটিয়েছিল, কাউকে মারধোর করেছিল ফলে তার নেক আমলগুলো থেকে নিয়ে তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাওনা আদায় করা হবে। এভাবে যখন তার নেক আমলগুলো শেষ হয়ে যাবে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার জন্য আর কিছু থাকবে না তখন তাদের পাপগুলো তাকে দেওয়া হবে ফলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে”। সহীহ মুসলিম : ২৫৮১।
৯. উম্মতে মুহাম্মদী কিয়ামতের দিন অন্য জাতির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন
মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বিশেষ মর্যাদার বিষয়। কিয়ামতের দিন উম্মতে মুহাম্মদী (সা.) অন্যান্য সকল জাতির বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে, এই সত্যটি কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এই সাক্ষ্য দেওয়ার কারণ হলো, আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে মধ্যপন্থী ও ন্যায়পরায়ণ উম্মত হিসেবে মনোনীত করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَکَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَہِیْدًا ؕ
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। সূরা বাকারার : ১৪৩
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন যে, “মধ্যপন্থী জাতি” (উম্মাতান ওয়াসাত্বান) হওয়ার কারণে উম্মতে মুহাম্মদীকে (সা.) এই বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন যখন পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতরা নিজেদের নবীদের দাওয়াত পৌঁছানোর বিষয়টি অস্বীকার করবে, তখন এই উম্মত নবীদের পক্ষে সাক্ষী দেবে।
আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কিয়ামতের দিন নূহ (আঃ) কে হাযির করে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি (দ্বীন) পৌঁছে দিয়েছ? তখন তিনি বলবেন, হ্যাঁ। হে আমার রব। এরপর তাঁর উম্মাতকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের কাছে নূহ পৌঁছিয়েছে কি? তারা সকলে বলে উঠবে, আমাদের কাছে কোন ভয় প্রদর্শনকারী আসেনি। তখন নূহ্ (আঃ) কে বলা হবে, তোমার কোন সাক্ষী আছে কি? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মাতরাই (আমার সাক্ষী)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদেরকে তখন নিয়ে আসা হবে এবং তোমরা সাক্ষ্য দেবে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী পাঠ করলেন-
وَکَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَہِیْدًا ؕ
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর, সূরা বাকারার : ১৪৩। সহিহ বুখারি : ৩৩৩৮, ৩৭৪৯, ৭৩৪৯, সুনানে তিরমিযী ২৯৬১, বায়হাকী : ৫৩৬১, শুআবূল ঈমান ২৬৪
আর আবু সায়ীদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন নবীদের ডাকা হবে। কারো সাথে একজন অনুসারী থাকবে কারো সাথে থাকবে দুজন আবার কারো সাথে থাকবে তিন জন বা এর বেশি। তাদের জাতিকে ডাকা হবে। তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে, এ ব্যক্তি কি তোমাদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছিল? তারা উত্তর দিবে, না, আমাদের কাছে আপনার বাণী পৌঁছে দেয়নি। তখন নবীকে প্রশ্ন করা হবে তুমি কি আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছো? সে বলবে, হ্যা, দিয়েছি। তখন তাকে বলা হবে তোমার পক্ষে কে আছে স্বাক্ষী? তখন নবী বলবেন, আমার পক্ষে স্বাক্ষী আছে মুহাম্মাদ ও তাঁর উম্মত। তখন মুহাম্মাদ ও তার অনুসারীদের ডাকা হবে। তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে এ ব্যক্তি কি তার জাতির কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছে? তখন তারা বলবে, হ্যাঁ, সে তার জাতির কাছে আপনার বাণী পৌঁছে দিয়েছে। তখন তাদের প্রশ্ন করা হবে তোমরা এটা কীভাবে জানলে? তারা উত্তর দিবে, আমাদের কাছে আমাদের নবী এসেছিলেন, তিনি আমাদের বলেছেন, এ নবী তার জাতির কাছে আপনার বাণী পৌঁছে দিয়েছে। এটা হলো আল্লাহ তায়ালার সেই বাণীর প্রতিফলন-
وَکَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَہِیْدًا ؕ
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। সূরা বাকারার : ১৪৩। মুসনাদে আহমাদ : ১১৫৫৮, মিশকাত : ৫৫৫৩ শাইখ আলবানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।