মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
বিয়ে প্রতিটি মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, তাই এতে নামাজ, রোজা, এবং অন্যান্য ইবাদতের মতো বিয়ে-শাদীরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দুঃখজনকভাবে, আজকাল আমরা মসজিদ বা ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম মানলেও, বিয়ে-শাদীর অনুষ্ঠানে প্রায়ই ইসলাম-বিরোধী কাজ করি। বিয়ের প্রথম ধাপ হলো কনে দেখা বা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া।
ইসলাম বিয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটির জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। কনে দেখার ক্ষেত্রে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং দ্বীনদারী বা ধার্মিকতাকেও প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব বা কনে দেখার সময় ছেলে ও মেয়ের পক্ষ থেকে কিছু মৌলিক নীতি মেনে চলা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে পর্দা রক্ষা করে দেখা-সাক্ষাৎ করা, কনে সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অনৈসলামিক রীতি পরিহার করা।
বিয়েকে সহজ করতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই শরিয়তসম্মত নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করা অপরিহার্য। কারণ, বিয়ের শুরুটা যদি সঠিক পথে হয়, তাহলে পুরো দাম্পত্য জীবনটাই বরকতময় হয়ে ওঠে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনা মেনে চলার তৌফিক দিন।
শরীয়তে বিবাহ বলতে কী বুঝায় :
শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ হলো একটি সামাজিক চুক্তি, যা নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইসলাম কর্তৃক অনুমোদিত। এটি শুধু একটি জৈবিক প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়, বরং একটি ইবাদত এবং সুন্নাহ। এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। ইসলামে বিবাহকে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এবং সমাজে নৈতিকতা ও পবিত্রতা রক্ষার একটি উপায় হিসেবে দেখা হয়। এটি মানবজাতির বংশবৃদ্ধির একটি বৈধ ও সম্মানজনক পদ্ধতি। পাত্র পাত্রি নির্বচনের পর বিবাহে মূল কার্যক্রম শুরু হয়। ইসলামী শরিয়তে বিয়ের মূল কার্যাক্রমের ৫ টি পর্যায়ে সংঘটিত হয়।
১. ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া
২. কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি
৩. কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকবে
৪. আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোহর নির্ধারণ করা
৫. রবের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা
উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সকল শর্তের চেয়ে বিয়ের শর্ত পালন করা তোমাদের অধিক কর্তব্য এজন্য যে, এর মাধ্যমেই তোমাদেরকে স্ত্রী অঙ্গ ভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। সহিহ বুখারী : ৫১৫১, সহিহ মুসলিম : ১৪১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৯, সুনানে নাসায়ী : ৩২৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১২৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৫৪, আহমাদ : ১৭৩০২, ইরওয়া : ১৮৯২, সহীহ আল জামি : ১৫৪৭
ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া
কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী হয় তার জন্য সমীচীন হলো ওই মেয়ের অভিভাবকের মাধ্যমে তাকে পেতে চেষ্টা করা। এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিয়ে করতে চাওয়া যার কাছ থেকে এমন প্রস্তাব গ্রহণ হতে পারে। এটি বিবাহ পর্ব সূচনাকারীদের প্রাথমিক চুক্তি। এটি বিবাহের ওয়াদা এবং বিবাহের প্রথম পদক্ষেপ। এ পদক্ষেপ গ্রহনের আগে নিচের আমলগুলো করা জরুরি।
১. ইস্তিখারা[MIH1] করা :
মুসলিম নর-নারীর জীবনে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই যখন তারা বিবাহের সিদ্ধান্ত নেবেন তাদের জন্য কর্তব্য হলো ইস্তিখারা তথা আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা।
হাসান (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ইস্তিখারা করে সে কখনো ব্যর্থ হয় না, আর যে পরামর্শ নেয় সে কখনো অনুতপ্ত হয় না।” মুসনাদ আহমদ : ১৭২৪৫; সিলসিলা সহিহাহ : ৬১১
জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সব কাজে ইস্তিখারাহ্* শিক্ষা দিতেন। যেমন পবিত্র কুরআনের সূরাহ্ আমাদের শিখাতেন। তিনি বলেছেন, তোমাদের কেউ কোন কাজের ইচ্ছা করলে সে যেন ফরজ নয় এমন দু’রাক‘আত সালাত আদায় করার পর এ দু’আ পড়ে-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلاَ أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلاَ أَعْلَمُ وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي أَوْ قَالَ فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي قَالَ وَيُسَمِّي حَاجَتَهُ.
প্রভু হে! আমি তোমার জ্ঞানের ওয়াসিলাতে তোমার অনুমতি কামনা করছি। তোমার কুদরতের ওয়াসিলায় শক্তি চাচ্ছি আর তোমার অপার করুণা ভিক্ষা করছি। কারণ তুমিই সর্বশক্তিমান আর আমি দুর্বল। তুমিই জ্ঞানী আর আমি অজ্ঞ এবং তুমিই সর্বজ্ঞ। প্রভু হে! তুমি যদি মনে কর যে, এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায়, ইহকালে ও পরকালে সত্বর কিংবা বিলম্বে আমার পক্ষে মঙ্গলজনক হবে তা হলে আমার জন্য তা নির্ধারিত করে দাও এবং তার প্রাপ্তি আমার জন্য সহজতর করে দাও। অতঃপর তুমি তাতে বারাকাত দাও। আর যদি তুমি মনে কর এই জিনিসটি আমার দ্বীন ও দুনিয়ায় ইহকালে ও পরকালে আমার জন্য ক্ষতিকর হবে শীঘ্র কিংবা বিলম্বে তাহলে তুমি তাকে আমা হতে দূর করে দাও এবং আমাকে তা হতে দূরে রাখো; অতঃপর তুমি আমার জন্য যা মঙ্গলজনক তা ব্যবস্থা কর- সেটা যেখান থেকেই হোক না কেন এবং আমাকে তার প্রতি সন্তুষ্টচিত্ত করে তোল। সহিহ বুখারি : ১১৬২, ৬৩৮২, ৭৩৯০
২. আত্মীয় স্বজনদের সাথে পরামর্শ করা :
বিবাহ করতে চাইলে আরেকটি করণীয় হলো বিয়ে ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ, পাত্রী ও তার পরিবার সম্পর্কে ভালো জানাশুনা রয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاعۡفُ عَنۡہُمۡ وَاسۡتَغۡفِرۡ لَہُمۡ وَشَاوِرۡہُمۡ فِی الۡاَمۡرِ ۚ فَاِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَوَکِّلِیۡنَ
সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরার্মশ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন। সুরা আল ইমরান : ১৫৯
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَالَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪ وَاَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ ۪ وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۚ
আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। সুরা শুরা : ৩৮
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে অধিক পরিমাণে পরামর্শ করতেন।
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে তাঁর সাহাবাদের সাথে পরামর্শের ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অধিক কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি : ১৭১৪, বাইহাকী : ১৯২৮০।
এদিকে পরামর্শদাতার কর্তব্য বিশ্বস্ততা রক্ষা করা। তিনি যেমন তার জানা কোনো দোষ লুকাবেন না, তেমনি অসদুদ্দেশে আদতে নেই এমন কোনো দোষের কথা বানিয়েও বলবেন না। আর অবশ্যই এ পরামর্শের কথা কাউকে বলবেন না।
৩. প্রস্তাব দেওয়ার আগে একে অপরকে দেখে নেয়া উচিত
ইসলামে বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক ভালোবাসা, শান্তি এবং স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন করা। এই সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং এটি মানবিক আকর্ষণ ও বোঝাপড়ার ওপরও প্রতিষ্ঠিত। বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীকে দেখে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় যাতে তাদের মধ্যে প্রাথমিক বোঝাপড়া তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। জীবনসঙ্গীর চেহারা বা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে একজন ব্যক্তি মানসিকভাবে স্বস্তি লাভ করে। এর ফলে বিবাহের প্রতি তার আগ্রহ ও সন্তুষ্টি বাড়ে, যা একটি সফল বৈবাহিক জীবনের জন্য খুবই জরুরি। অনেক সময় বাহ্যিক চেহারা বা শারীরিক গঠন নিয়ে মানুষের মনে কিছু ধারণা বা প্রত্যাশা থাকে। পাত্র-পাত্রী দেখে নেওয়ার মাধ্যমে এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা হতাশা এড়ানো সম্ভব হয়।
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে তাকে বলল যে, সে আনসার সম্প্রদায়ের এক মেয়েকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে একবার দেখেছে? সে বলল, না। তিনি বললেন, যাও! তুমি তাকে এক নযর দেখে নাও। কারণ আনসারদের চোখে কিছুটা ক্রটি আছে। সহিহ মুসলিম : ১৫২৪, মিশকাত : ৩০৯৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৬, আহমাদ : ৭৮৪২, সহীহাহ্ : ৯৫
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, আর যদি তার পক্ষে এমন কোনো অঙ্গ দেখা সম্ভব হয় যা বিবাহের পক্ষে যথেষ্ট, তখন তা যেন দেখে নেয়। সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৮২, মিশকাত :৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি : ৫০৬।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেনঃ তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, সহীহাহ : ১৫১-১৫২
মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে এক মহিলাকে বিবাহ করার ব্যাপারে তাঁর সাথে আলাপ করলাম। তিনি বলেনঃ তুমি যাও এবং তাকে দেখে নাও। হয়তো তাতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে ভালোবাসার সৃষ্টি হবে। অতএব আমি এক আনসার মহিলার নিকটে এসে তার পিতা-মাতার নিকট তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলাম এবং সাথে সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীসও তাদের অবহিত করলাম। কিন্তু মনে হলো তার পিতা-মাতা এটা অপছন্দ করলো। রাবী বলেন, মেয়েটি পর্দার আড়াল থেকে উক্ত হাদীস শুনে বললো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে পাত্রী দেখার আদেশ দিয়ে থাকলে আপনি দেখে নিন। অন্যথায় আমি আপনাকে শপথ দিচ্ছি (না দেখার জন্য)। সে যেন ব্যাপারটিকে অভিনব মনে করলো। রাবী বলেন, আমি তাকে দেখে নিলাম এবং তাকে বিবাহ করলাম। পরে মুগীরাহ (রাঃ) তার সাথে সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।
৪. ছবি বিনিময়ের শরয়ী বিধান
ইসলামে সাধারণত অপ্রয়োজনে বা এমনভাবে ছবি ব্যবহার করা নিরুৎসাহিত করা হয়, যা ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করতে পারে। বিয়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বিয়ের প্রস্তাবের জন্য নারী-পুরুষের ছবি আদান-প্রদান করাকে অনেক আলেম মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে:
ক. পর্দার লঙ্ঘন : ইসলামে নারী ও পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছবি বিনিময় করলে তা বহু লোকের হাতে চলে যেতে পারে, যাদের কাছে ওই ছবি দেখা বৈধ নয়। এতে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয়।
খ. বাস্তবের সঙ্গে অমিল : ছবি অনেক সময় বাস্তবের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। ছবি এডিট করে বা নির্দিষ্ট কোণ থেকে তুলে কাউকে আকর্ষণীয় দেখানো হতে পারে, যা পরে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে।
গ. সম্মানের হানি : যদি কোনো কারণে বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যায়, তবে ছবিগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তখন সেগুলো অপব্যবহার হওয়ার বা অসম্মানের শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৫. সরাসরি দেখা ও কথা বলার গুরুত্ব-
শরিয়তের নির্দেশনা হলো, বিয়ের প্রস্তাবের সময় পাত্র-পাত্রীকে সরাসরি দেখা। এটি হলো কনে দেখা পর্ব। এর মূল উদ্দেশ্য হলো একে অপরের চেহারা, চলাফেরা, এবং ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা। এই দেখার সময় পাত্র ও পাত্রীর মধ্যে কেবল বৈধ সম্পর্কের ভিত্তিতে পর্দার বিধান বজায় রেখে দেখা ও কথা বলার অনুমতি রয়েছে।
জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দিবে তখন সম্ভব হলে তার এমন কিছু যেন দেখে নেয় যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে। বর্ণনাকারী বলেন, আমি একটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেবার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে গোপন রেখেছিলাম। অতঃপর আমি তার মাঝে এমন কিছু দেখি যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আকৃষ্ট করলো। অতঃপর আমি তাকে বিয়ে করি সুনানে আবু দাউদ : ২০৮২, মিশকাত : ৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি : ৫০৬।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে সরাসরি দেখাই হচ্ছে বিয়ের জন্য সঠিক পদক্ষেপ। সুতরাং, ছবি আদান-প্রদান করে বিয়ের সম্পর্ক স্থাপন করা শরিয়তসম্মত নয়। এর পরিবর্তে পাত্র-পাত্রীর পরিবারের সম্মতিতে এবং ইসলামিক বিধান মেনে একে অপরকে সরাসরি দেখে নেওয়া উত্তম ও নিরাপদ। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সম্পর্ক মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
৬. প্রস্তাবদানকারীর সঙ্গে বাইরে নির্জনে অবস্থান করা যাবে না
ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মানেই মেয়েটি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে যায়নি। বিয়ের চুক্তি বা ‘আকদ’ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা সম্পূর্ণভাবে শরিয়তসম্মত স্বামী-স্ত্রী নয়। তাই এই সময়ে তাদের মধ্যে পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক। বিয়ের আগে নির্জন স্থান বা একা একা ঘোরাঘুরি ফিতনার (পরীক্ষা বা ফিতনা) কারণ হতে পারে এবং এটি ইসলামের পর্দার নীতির পরিপন্থী।
আজকাল অনেক অভিভাবকই এই বিষয়ে উদাসীন। তারা মনে করেন, যেহেতু বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তাই পাত্র-পাত্রীর মেলামেশা বা বাইরে যাওয়া-আসা স্বাভাবিক। কিন্তু এই ধরনের মনোভাব শরিয়ত সম্মত নয়। ইসলামে অভিভাবকদের দায়িত্ব হলো, তাদের সন্তানদের নৈতিক ও ইসলামিক মূল্যবোধের মধ্যে বড় করা। বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের এমন অবাধ মেলামেশা নৈতিকতা ও পর্দার বিধান উভয়কেই লঙ্ঘন করে, যা পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে।
বিয়ের আগের এই সময়টুকুতে বর-কনের মধ্যে শুধু প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা ও শরিয়তসম্মত উপায়ে একে অপরকে জানার সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোনোভাবেই নির্জনতা বা ব্যক্তিগত মেলামেশার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। বিবাহ পূর্ববর্তী এই ধরনের সম্পর্ক ইসলামে নিষিদ্ধ। বিয়ের আকদ সম্পন্ন হলেই কেবল তারা একে অপরের জন্য বৈধ হবেন এবং তাদের জন্য মেলামেশার পথ উন্মুক্ত হবে।
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ’জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমর (রাঃ) আমাদের সামনে খুতবাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাড়িয়ে বলেনঃ হে উপস্থিত জনতা! যেভাবে আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়াতেন, সেভাবে তোমাদের মাঝে আমিও দাড়িয়েছি। তারপর তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ আমার সাহাবীদের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (তাদের যমানা শ্রেষ্ঠ যমানা), তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর মিথ্যাচারের বিস্তার ঘটবে। এমনকি কাউকে শপথ করতে না বলা হলেও সে শপথ করবে, আর সাক্ষ্য প্রদান করতে না বলা হলেও সাক্ষ্য প্রদান করবে।
সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৩৬৩
৭. বিবাহের আগে যোগাযোগের সীমারেখা মানতে হবে
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এমন নারী-পুরুষ এখনও একে অপরের জন্য ‘বেগানা’ বা অপরিচিতই রয়েছেন। যতক্ষণ না তারা শরিয়তসম্মত উপায়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন, ততক্ষণ তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তাই এই সময় তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়।
মূলত, এই যোগাযোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিয়ের শর্ত, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। অর্থাৎ, তাদের কথাবার্তা শুধু বিয়ের চুক্তি ও শর্তাবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এই যোগাযোগে আবেগ বা ভালোবাসা প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। আবেগপ্রবণ বা রোমান্টিক ভাষায় কথা বলা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কারণ, এই ধরনের কথাবার্তা সম্পর্কের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং ফিতনার কারণ হতে পারে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, বেগানা নারী-পুরুষের মধ্যে এমন কথাবার্তা বৈধ নয়। বিয়ের আলোচনা যেহেতু একটি পারিবারিক বিষয়, তাই এই যোগাযোগের ক্ষেত্রে উভয় পরিবারের, বিশেষ করে পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের সম্মতি থাকা উত্তম। এটি সম্পর্কের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সাহায্য করে। অভিভাবকদের সামনে বা তাদের জ্ঞাতসারে যোগাযোগ হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কমে যায় এবং সম্পর্কটি একটি সম্মানজনক গণ্ডির মধ্যে থাকে।
৮. একজনের প্রস্তাবের ওপর অন্যজনের প্রস্তাব না দেয়া :
যে নারীর কোথাও বিয়ের কথাবার্তা চলছে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়া বৈধ নয়।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রামবাসীর পক্ষে শহরবাসী কর্তৃক বিক্রয় করা হতে নিষেধ করেছেন এবং তোমরা প্রতারণামূলক দালালী করবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। কোন মহিলা যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের দাবী না করে, যাতে সে তার পাত্রে যা কিছু আছে, তা নিজেই নিয়ে নেয়। সহিহ বুখারি : ২১৪০, ৫১৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৫১৫, আহমাদ : ৯৫২৩. সুনানে নাসায়ী : ৩২৪১
হ্যা, দ্বিতীয় প্রস্তাবদাতা যদি প্রথম প্রস্তাবদাতার কথা না জানেন তবে তা বৈধ। এ ক্ষেত্রে ওই নারী যদি প্রথমজনকে কথা না দিয়ে থাকেন তবে দু’জনের মধ্যে যে কাউকে গ্রহণ করতে পারবেন।
৯. ইদ্দতে থাকা নারীকে প্রস্তাব দেয়া :
বায়ান তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত পালনকারী নারীকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া হারাম। ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়া বৈধ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِہٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَکۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ سَتَذۡکُرُوۡنَہُنَّ وَلٰکِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡہُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ وَلَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّکَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡکِتٰبُ اَجَلَہٗ ؕ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُ ۚ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ
আর এতে তোমাদের কোন পাপ নেই যে, তোমরা নারীদেরকে ইশারায় যে প্রস্তাব করবে কিংবা মনে গোপন করে রাখবে। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে স্মরণ করবে। কিন্তু বিধি মোতাবেক কোন কথা বলা ছাড়া গোপনে তাদেরকে (কোন) প্রতিশ্রুতি দিয়ো না। আর আল্লাহর নির্দেশ (ইদ্দত) তার সময় পূর্ণ করার পূর্বে বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা জানেন। সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। সূরা বাকারা : ২৩৫।
তবে ‘রজঈ’ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে সুস্পষ্টভাবে তো দূরের কথা আকার-ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়াও হারাম। তেমনি এ নারীর পক্ষে তালাকদাতা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রস্তাবে সাড়া দেয়াও হারাম। কেননা এখনো সে তার স্ত্রী হিসেবেই রয়েছে।
১০. এ্যাংগেজমেন্ট করা :
ইসলামে ‘এ্যাংগেজমেন্ট’ বা বাগদান অনুষ্ঠান, যেটিতে আংটি পরানোর রেওয়াজ আছে, এর কোনো ভিত্তি নেই। এটি মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আমাদের সমাজে এসেছে। ইসলামে বিয়ে পূর্ববর্তী সম্পর্ককে সহজ ও পবিত্র রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর থেকে বিবাহের আকদ (চুক্তি) সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত, পাত্র-পাত্রী একে অপরের কাছে বেগানা বা অপরিচিতই থাকেন। তাই এই সময়ে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা শরিয়তসম্মত নয়।
এ্যাংগেজমেন্টের মাধ্যমে অনেকেই মনে করেন যে বিয়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গেল। এর ফলে বর-কনে এমনভাবে মেলামেশা শুরু করে, যেন তারা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু ইসলামে শুধুমাত্র বিবাহের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পরই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বৈধ হয়। এ্যাংগেজমেন্টের আংটি কোনোভাবেই এই আকদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না।
সবচেয়ে আপত্তিকর বিষয় হলো, প্রস্তাবদানকারী পুরুষ নিজের হাতে কনেকে আংটি পরিয়ে দেয়। ইসলামে বেগানা নারী-পুরুষের জন্য একে অপরের শরীর স্পর্শ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেহেতু বিয়ের চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বামী-স্ত্রী নন, তাই এই ধরনের শারীরিক স্পর্শ শরিয়ত লঙ্ঘন করে।
ইসলামের বিধান হলো-
কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বা আংটি পরানোর প্রথা ছাড়াই যত দ্রুত সম্ভব বিবাহের আকদ সম্পন্ন করা উচিত। এতে শরিয়তসম্মতভাবে পাত্র-পাত্রী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন এবং এরপর তাদের পারস্পরিক মেলামেশা ও সম্পর্ক স্থাপন বৈধ হবে।
১১. উপযুক্ত পাত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখান না করা :
উপযুক্ত পাত্র পেলে তার প্রস্তাব নাকচ করা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ.
‘যদি এমন কেউ তোমাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয় যার ধার্মিকতা ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট তবে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। যদি তা না করো তবে পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজতা সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি : ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯
কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি
ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে কনের জন্য একজন ওয়ালি বা অভিভাবক থাকা ফরজ বা আবশ্যক। ওয়ালি হলেন এমন ব্যক্তি যিনি কনের সম্মতিতে তার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ওয়ালি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।
আবূ মূসা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়েই হতে পারে না। সুনানে আবু দাউদ : ২০৮৫
তাই যে কোন নারীর বিবাহের জন্য ওয়ালী বা অভিভাবক আবশ্যক। অভিভাবক উপযুক্ত হওয়ার জন্য ৬টি শর্ত আছে। যখা-
(১) আকল বা বিবেক সম্পন্ন হওয়া (পাগল হলে হবে না)
(২) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া
(৩) স্বাধীন হওয়া
(৪) পুরুষ হওয়া (বিবাহের ক্ষেত্রে নারী নারীর অভিভাবক হতে পারবে না)
(৫) অভিভাবক ও যার অভিভাবক হচ্ছে উভয়ে একই দ্বীনের অনুসারী হওয়া। (কোন কাফির মুসলিম নারীর অভিভাবক হবে না
(৬) অভিভাবক হওয়ার উপযুক্ত হওয়া। (অর্থাৎ বিবাহের জন্য কুফূ বা তার কন্যার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন বা সমকক্ষ পাত্র নির্বাচন করার জ্ঞান থাকা ও বিবাহের কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয় সমূহ অনুধাবন জ্ঞান থাকা)
১. ইসলামে কনের ওয়ালি ছাড়া নিকাহ বৈধ নয়
বিবাহে কনের অভিভাবক বা ওয়ালীর সম্মতি আবশ্যক। এই বিষয়ে ইসলামে একাধিক হাদিস রয়েছে। এই সম্মতি ব্যতীত কোনো বিবাহ বৈধ হয় না। এ প্রশ্নের সবচেয়ে সরাসরি উত্তর দিতে পারে এমন একটি হাদিস হলো:
আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,
আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১০১, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৫, আহমাদ : ১৯০২৪, ১৯২১১, ১৯২৪৭, দারেমী : ২১৮২, ২১৮৩, ইরওয়াহ : ১৮৩৯, মিশকাত : ১৩৩০,
২. কোন নারী কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবক হতে পারবে না
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا
কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকে বিবাহ দিবে না এবং কোন মহিলা নিজেকেও বিবাহ দিবে না। কেননা যে নারী স্বউদ্যোগে বিবাহ করে সে যেনাকারিণী।সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮২, ইরওয়াহ : ১৮৪১
৩. কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকত্বের পরিচয়
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ওয়ালি বা অভিভাবক হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি নিজের অধীনস্থ ব্যক্তির আর্থিক বা ব্যক্তিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বিবাহের ক্ষেত্রে ওয়ালি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি কনের পক্ষ থেকে বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামী আইনে সাবালিকা নারীর বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য ওয়ালির উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামি ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার অধিকার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে বন্টিত হয়। এই ক্রমটি সাধারণত আত্মীয়তার নৈকট্য ও মিরাসে (উত্তরাধিকার) প্রাপ্তির ক্রমের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
ক. পিতা:
বিবাহের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার প্রথম ও প্রধান হকদার হলেন তার পিতা। কারণ, তিনি কনের নিকটতম রক্ত সম্পর্কীয় অভিভাবক এবং তার উপর সবচেয়ে বেশি স্নেহ ও অধিকার রয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ প্রায় সব ফকিহ এ বিষয়ে একমত। ইমাম শাফেঈ উল্লেখ করেছেন, “বিয়ের ক্ষেত্রে পিতার অধিকার সবচেয়ে বেশি, এমনকি তিনি যদি নাবালিকাও হন।” আল-উম্ম, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৫৫
খ. দাদা:
পিতার অনুপস্থিতিতে (যদি তিনি মৃত বা অযোগ্য হন) কনের ওয়ালি হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন তার দাদা (পিতার পিতা)। দাদার স্থান পিতার পরেই কারণ তিনি মূল সম্পর্কীয় দিক থেকে দ্বিতীয় নিকটতম পুরুষ।
আল-মুগনি, ইবনে কুদামা, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯, আল-উম্ম, ইমাম শাফেঈ, ৫ম খণ্ড, পৃ.-১৫৭
গ. ভাই:
পিতা ও দাদা উভয়ের অনুপস্থিতিতে আপন ভাই ওয়ালি হবেন। এরপর যদি আপন ভাই না থাকে, তাহলে বৈমাত্রেয় ভাই (পিতা ভিন্ন, কিন্তু মাতা এক) ওয়ালি হবেন।
ইমাম ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯, আল-উম্ম, ইমাম শাফেঈ, ৫ম খণ্ড, পৃ.-১৫৭
ঘ. চাচা:
ভাইদের অনুপস্থিতিতে চাচা (পিতার আপন ভাই) ওয়ালি হবেন। চাচার অধিকার ভাইয়ের পরের স্থানে কারণ তিনি পিতার সমান্তরাল অবস্থানে থাকেন এবং সম্পর্কীয় নৈকট্যের দিক থেকে ভাইয়ের পরেই তার স্থান। : এই বিষয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম শাফেঈ (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ প্রায় সব ফকিহ একমত পোষণ করেছেন। হেদায়াম প্রথম খণ্ড, পৃ-২১৫, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯
ঙ. অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়:
উপরোক্ত ওয়ালিদের অনুপস্থিতিতে, নিকটবর্তী রক্ত সম্পর্কীয় পুরুষ আত্মীয়গণ ক্রমানুসারে ওয়ালি হবেন। যেমন—চাচাতো ভাই, মামা, ইত্যাদি। এই ক্ষেত্রে ফিকহবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে, মিরাসে (উত্তরাধিকার) যারা অগ্রাধিকার পান, তারাই ওয়ালি হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। হেদায়াম প্রথম খণ্ড, পৃ-২১৫, আল-মুগনি, নবম খণ্ড, পৃ.-৩৮৯
চ. ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক:
যদি কনের কোনো ওয়ালি না থাকে, অথবা ওয়ালি থাকা সত্ত্বেও তিনি দূরে থাকেন, বা বিবাহে বাধা দেন কিন্তু শরিয়তসম্মত কোনো কারণ না দেখাতে পারেন, তাহলে ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক কনের ওয়ালি হবেন।
আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,
উম্মু হাবীবাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি (’উবাইদুল্লাহ) ইবনু জাহশের স্ত্রী ছিলেন। স্বামী মারা গেলে তিনি হিজরতকারীদের সাথে হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর হাবশার বাদশা নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাকে বিয়ে দেন। তিনি (অভিভাবক ছাড়া) তাদের কাছেই অবস্থান করেন। সুনানে আব দাউদ : ২০৮৬
৪. বিবাহ কন্যার সম্মতি নেওয়া জরুরি :
কোনো নারী নিজে নিজে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন না। তার জন্য অবশ্যই একজন ওয়ালি থাকতে হবে। ওয়ালি কেবল বিবাহ সম্পন্নকারী হিসেবে কাজ করেন। ওয়ালি হতে হলে কনের মতামত নেওয়া আবশ্যিক। কনের সম্মতি ছাড়া ওয়ালি তাকে বিবাহ দিতে পারেন না।
আবূ সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বললেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, ৬৯৭০, সহহি মুসলিম : ১৪১৯, আহমাদ : ৯৬১
খানসা বিনতে খিযাম আল আনসারিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, যখন তিনি অকুমারী ছিলেন তখন তার পিতা তাকে বিয়ে দেন। এ বিয়ে তিনি অপছন্দ করলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৮, ৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯
আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ও মুজাম্মে ইবনু ইয়াযীদ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। খিযাম নামক এক ব্যক্তি তার মেয়েকে বিবাহ দেন। সে তার পিতার এই বিবাহ অপছন্দ করে। মেয়েটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তাঁকে অবহিত করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পিতার দেয়া তার এই বিবাহ রদ করে দেন। পরে সেই মেয়ে আবূ লুবাবা ইবনু ’আবদুল মুনযির (রাঃ)-কে বিবাহ করে। মিশকাত : ১৮৭৩, সুনানে নাসায়ী ৩২৬৮, সুনানে আবূ দাউদ ২১০১, আহমাদ : ২৬২৪৬, ২৬২৫১, মুয়াত্তা মালেক : ১১৩৫, দারেমী : ২১৯১ ২১৯২, , ইরওয়াহ : ১৩৮০
৫. বিবাহে ওয়ালী বা অভিভাবকের বাধা
একজন উপযুক্ত যুবক যদি কোন মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় (অর্থাৎ সেই যুবক দ্বীনদারী ও চরিত্রের দিক থেকে পছন্দনীয় হয়), আর মেয়েও ঐ যুবককে পছন্দ করে, আর শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত মেয়ের অভিভাবক ঐ বিবাহে বাধা প্রদান করে তবে শরীয়তের পরিভাষায় এটাকে বলা হয়, العضل বা বিবাহে বাধা। ইবনে কুদামা, মুগনী, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-৩৬৮
এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে-
وَاِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَبَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَلَا تَعۡضُلُوۡہُنَّ اَنۡ یَّنۡکِحۡنَ اَزۡوَاجَہُنَّ اِذَا تَرَاضَوۡا بَیۡنَہُمۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ ذٰلِکَ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ مِنۡکُمۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِکُمۡ اَزۡکٰی لَکُمۡ وَاَطۡہَرُ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ
আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে অতঃপর তারা তাদের ইদ্দতে পৌঁছবে তখন তোমরা তাদেরকে বাধা দিয়ো না যে, তারা তাদের স্বামীদেরকে বিয়ে করবে যদি তারা পরস্পরে তাদের মধ্যে বিধি মোতাবেক সম্মত হয়। এটা উপদেশ তাকে দেয়া হচ্ছে, যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে। এটি তোমাদের জন্য অধিক শুদ্ধ ও অধিক পবিত্র। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সুরা বাকারা : ২৩২
আল হাসান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ’’তোমরা তাদেরকে আটকে রেখো না’’-এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাঃ) বলেছেন যে, উক্ত আয়াত তার সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন, আমি আমার বোনকে এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেই, সে তাকে তালাক দিয়ে দেয়। যখন তার ইদ্দাতকাল অতিক্রান্ত হয় তখন সেই ব্যক্তি আমার কাছে আসে এবং তাকে পুনরায় বিয়ের পয়গাম দেয়। কিন্তু আমি তাকে বলে দিই, আমি তাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলাম এবং তোমরা মেলামেশা করেছ এবং আমি তোমাকে মর্যাদা দিয়েছি। তারপরেও তুমি তাকে তালাক দিলে? পুনরায় তুমি তাকে চাওয়ার জন্য এসেছ? আল্লাহর কসম, সে আবারও কখনও তোমার কাছে ফিরে যাবে না। মা’কিল বলেন, সে লোকটি অবশ্য খারাপ ছিল না এবং তার স্ত্রীও তার কাছে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিল। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ’’তাদেরকে বাধা দিও না,’ (২:২৩২) এরপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার বোনকে তার কাছে বিয়ে দেব। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি তাকে তার সঙ্গে পুনরায় বিয়ে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩০
ইমাম বুখারী বলেন, যদিও এখানে বিবাহিতা নারীকে কেন্দ্র করে আয়াতটি নাযিল হয়েছে, কিন্তু এখানে কুমারী নারীও শামিল। অর্থাৎ কুমারীর জন্যও একই হুকুম।
কি করলে অভিভাবক বা বাধাপ্রদাকারী হিসেবে গণ্য হবে?
(১) অভিভাবকের অধিনস্থ মেয়ে যদি নির্দিষ্টভাবে কোন যুবককে পছন্দ করে এবং পাত্রও উপযুক্ত হয়, তখন যদি অভিভাবক তার সাথে বিবাহ দিতে (শরীয়ত সম্মত) কোন কারণ ছাড়াই বা দুর্বল যুক্তিতে (যেমন, লেখাপড়া শেষ করা ইত্যাদি) অস্বীকার করে, তাহলে সে বাধাপ্রদানকারী হবে। আল মাওসুয়া আল ফেকহিয়্যা ৩৪/২৬৫
(২) অভিভাবক যদি বিবাহের প্রস্তাবকারীদের উপর অহেতুক কঠিন শর্ত আরোপ করে, যা শুনলেই তারা পলায়ন করবে এবং তা পূর্ণ করা অনেক সময় অসাধ্য হয়ে যায়, তখন সে বাধাপ্রদানকারী গণ্য হবে। ইবনে তাইমিয়া- কিতাবুল ইনসাফ ৮/৭৫
শাইখ ইবনে জাবরীন (রহঃ) বলেন, প্রস্তাবকারীর উপর কঠরোতা আরোপ করা, অথবা অপ্রয়োজনীয় অত্যধিক শর্তারোপ করা, অথবা উপযুক্ত পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করা, অথবা অতিরিক্ত মোহর চাওয়া। অভিভাবক যদি এরূপ করে তবে সে বাধাপ্রদানকারী গণ্য হবে এবং সে হবে ফাসেক। তখন তার অভিভাবকত্ব বাতিল হয়ে যাবে।
বিবাহের শর্ত হলো দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকা
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে, বিবাহের অন্যতম শর্ত হলো দুইজন সাক্ষী উপস্থিত থাকা। এই শর্তটি বিবাহকে প্রকাশ্য ও বৈধতা প্রদান করে। সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ সংঘটিত হলে তা ইসলামী আইন অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হয়। বিবাহে সাক্ষী থাকার কারণ হলো, এর মাধ্যমে বিবাহটি গোপনীয়তা থেকে বেরিয়ে আসে এবং সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি লাভ করে। এটি শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি চুক্তি নয়, বরং একটি সামাজিক চুক্তি। সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে কোনো ধরনের সন্দেহ বা বিরোধ দেখা দিলে তা সহজেই মীমাংসা করা যায়।
১. সাক্ষীর সংখ্যা ও যোগ্যতা:
ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের জন্য কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী পাওয়া না যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে পারে।
ক. প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) : সাক্ষী অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।
খ. মুসলিম: সাক্ষী অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। একজন অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম বিবাহের সাক্ষী হতে পারবে না।
গ. ন্যায়পরায়ণ (আদিল): সাক্ষী ফাসিক (পাপী) না হয়ে আদিল (ন্যায়পরায়ণ) হওয়া উত্তম। যদিও অনেক ফিকহবিদ ফাসিকের সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য বলেছেন, তবে ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী থাকা অধিক পছন্দনীয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ
এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সূরা তালাক : ২
যদিও এই আয়াতটি মূলত তালাকের ক্ষেত্রে এসেছে, তবে ফিকহবিদগণ এর সাধারণ বিধানের ভিত্তিতে বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন।
বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন। কোরআনের অন্য একটি আয়াত থেকে নারী-পুরুষের সাক্ষীর সংখ্যার বিষয়ে ফকিহগণ দলীল গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاسۡتَشۡہِدُوۡا شَہِیۡدَیۡنِ مِنۡ رِّجَالِکُمۡ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَکُوۡنَا رَجُلَیۡنِ فَرَجُلٌ وَّامۡرَاَتٰنِ مِمَّنۡ تَرۡضَوۡنَ مِنَ الشُّہَدَآءِ اَنۡ تَضِلَّ اِحۡدٰىہُمَا فَتُذَکِّرَ اِحۡدٰىہُمَا الۡاُخۡرٰی ؕ وَلَا یَاۡبَ الشُّہَدَآءُ اِذَا مَا دُعُوۡا ؕ
আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী- যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়। সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। সূরা বাকারা : : ২৮২
এই আয়াতটি মূলত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে হলেও, ফিকহবিদগণ এই সাধারণ নীতিকে বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও প্রয়োগ করেছেন।
ইমরান ইবন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَي عَدْلٍ»
“অভিভাবক (ওলি) এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” ইমাম বাইহাকি, সুনান আল-কুবরা : ১৪১৪৬, ইমাম দারাকুতনি : ৩৭৩৮
সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।
২. ফতোয়া ও ফিকহি কিতাবের দলিল:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, বিবাহে কমপক্ষে দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে, অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে হবে। আল-হেদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২১৮
ইমাম শাফেঈ (রহ.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ অধিকাংশ ফিকহবিদ এই বিষয়ে একমত যে, সাক্ষীর উপস্থিতি বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তাদের মতে, সাক্ষী ছাড়া বিবাহ বাতিল। আল-মুগনি, নবম খণ্ড ৯, পৃ.-৪৬২; আল-উম্ম, পঞ্চম খণ্ড, পৃ.-১৬১
সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি শুধু একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।
মহর বা দেনমোহর নির্ধারণ ও আদায়
ইসলামে, মহর বা মোহর হলো বিবাহের সময় বর কর্তৃক কনেকে প্রদত্ত একটি অপরিহার্য আর্থিক দায় বা সম্পদ। এটি কেবল একটি উপহার নয়, বরং বিয়ের চুক্তির একটি বাধ্যতামূলক অংশ, যা স্ত্রীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রতীক। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে সম্মান ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ প্রদান করা হয়। মহর নির্ধারণ ছাড়া কোনো বিবাহ পূর্ণাঙ্গ ও শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ হয় না। তবে মহর বাকি থাকলে বিবাহ বৈধ হবে। মহর নির্ধাণ বিবাহের একটি অপরিহার্য শর্ত আর মহর আদায় করা, ঋন আদায়ের মত ফরজ কাজ।
প্রাচীন আরবে কন্যাকে বিবাহ দেওয়ার সময় যৌতুক বা পণ প্রথার প্রচলন ছিল, যেখানে কনের পরিবারকে অর্থ বা সম্পদ দেওয়া হতো। রাসূলুল্লাহ ﷺ নবুয়ত প্রাপ্তির পর আল্লাহ তাআলার নির্দেশে এই অন্যায় ও অসম্মানজনক যৌতুক প্রথাকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেন। এর পরিবর্তে তিনি আবশ্যক দেনমোহর প্রথা চালু করেন, যা নারীদের সম্মান ও অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ব্যবস্থাটি কেবল একটি সামাজিক পরিবর্তনই ছিল না, বরং নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি বিপ্লবী পদক্ষেপও ছিল।
১. মহরের তাৎপর্য ও গুরুত্ব :
ক. স্ত্রীর অধিকার : মহর সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এর উপর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য কারো কোনো অধিকার নেই। স্ত্রী এটি নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারেন।
খসম্মানের প্রতীক : মহর নারীকে একটি সম্মান ও মর্যাদা দিতে এবং তাকে স্বামীর কাছে একটি মূল্যবান সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে দেওয়া হয়।
গ. মহর ধার্য্য ও আদায় করা ফরজ বা ওয়জিব :
মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا
আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪
এ সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
স্ত্রী স্বেচ্ছায় মাফ করতে পারেন: স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় এবং খুশি মনে তার প্রাপ্য মহরের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ মহর মাফ করে দেন, তবে তা জায়েয। তবে, কোনো ধরনের চাপ বা লজ্জার কারণে মাফ করালে তা শরীয়ত সম্মত নয়।
মৃত্যু বা তালাক : যদি মহর পরিশোধের আগেই স্বামী মারা যান, তাহলে মহর তার ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার সম্পদ থেকে স্ত্রীর মহর পরিশোধ করা হবে। একইভাবে, যদি তালাক হয়, তবে স্বামী তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ মহর পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। যদি সহবাসের আগেই তালাক হয় এবং মহর নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে অর্ধেক মহর পরিশোধ করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ؕ فَمَا اسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِہٖ مِنۡہُنَّ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ؕ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا تَرٰضَیۡتُمۡ بِہٖ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡفَرِیۡضَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا
সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪
উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন, জাহিলী যুগে চার প্রকারের বিয়ে প্রচলিত ছিল। এক প্রকার হচ্ছে, বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কোন মহিলার অভিভাবকের নিকট তার অধীনস্থ মহিলা অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং তার মাহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। সহিহ বুখারি ৫১২৭ হাদিসের প্রথম অংশ
এ সকল কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বুঝা যায় মহর আলায় করা ওয়াজিব। তাছাড়া যে সকল বিবাহে মহর নির্ধারন ছাড়া ইজার কবুল হয়। তাদের মহরও অটোমেটিকভাবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী) ধার্য হয়ে যায়। সুনানে তিরমিজি : ১১৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯১, নাসায়ী ৩৩৫৪, ৩৩৫৫, ৩৩৫৬, ৩৩৫৮, ৩৫২৪, আবূ দাউদ ২১১৪, দারেমী ২২৪৬, ইরওয়াহ ১৯৩৯, সহীহ, আবী দাউদ ১৮৩৯।
ঘ. ইচ্ছা করে মহর আদায় না করা গুরুতর পাপ : মহর পরিশোধ করার নিয়ত ছাড়া বিবাহ করলে বা পরিশোধ না করার ইচ্ছা থাকলে তা ব্যভিচারের সমতুল্য। হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে।
মাইমূন আল-কুরদী, তার পিতার সূত্রে বলেন। আমি নবী ﷺ-কে একবার, দুইবার, তিনবার নয়—বরং দশবার পর্যন্ত বলতে শুনেছি-
أَيُّمَا رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً بِمَا قَلَّ مِنَ الْمَهْرِ أَوْ كَثُرَ، لَيْسَ فِي نَفْسِهِ أَنْ يُؤَدِّيَ إِلَيْهَا حَقَّهَا، خَدَعَهَا، فَمَاتَ وَلَمْ يُؤَدِّ إِلَيْهَا حَقَّهَا، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَهُوَ زَانٍ
যে ব্যক্তি কোনো নারীকে সামান্য বা অধিক মোহরের বিনিময়ে বিবাহ করে, অথচ তার মনে থাকে না যে সে তার হক আদায় করবে—তাহলে সে নারীকে প্রতারণা করল। যদি সে মারা যায় অথচ তার হক (মোহর) আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষাৎ করবে ব্যভিচারী (যানী) হিসেবে।’ মুসনাদে আহমাদ : ১১০৬২, আল-মুজামুল আওসাত : ৬০৮৭, আল-মুজামুস সাগীর : ৯৫৩
ঙ. মহর নির্ধারণ না করে বিবাহ করা
আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়, এমনকি যদি মহর নির্দিষ্ট নাও করা হয়। তবে পরবর্তীতে স্ত্রী মহরের দাবিদার হবেন, আর সেটি হবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী)। অর্থাত্ এ গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবটি বাদ দিলেও বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে কিন্তু মহর অটোমেটিকভাবে ধার্য হয়ে যাবে। মহর নির্দিষ্ট না থাকলেও বিবাহ বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন-
لَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡہُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ۚۖ وَّمَتِّعُوۡہُنَّ ۚ عَلَی الۡمُوۡسِعِ قَدَرُہٗ وَعَلَی الۡمُقۡتِرِ قَدَرُہٗ ۚ مَتَاعًۢا بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ
তোমাদের কোন অপরাধ নেই যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এমন অবস্থায় যে, তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করনি কিংবা তাদের জন্য কোন মোহর নির্ধারণ করনি। আর উত্তমভাবে তাদেরকে ভোগ-উপকরণ দিয়ে দাও, ধনীর উপর তার সাধ্যানুসারে এবং সংকটাপন্নের উপর তার সাধ্যানুসারে। সুকর্মশীলদের উপর এটি আবশ্যক। সূরা বাকারাহ : ২৩৬
এখানে স্পষ্ট বলা হলো, মহর নির্ধারণ না করেই বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে।আর যদি মহর একেবারেই নির্ধারণ না করা হয়ে থাকে, তাহলে সহবাস ঘটলে স্ত্রী মোহরে মিসল পাবেন।
ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তাকে প্রশ্ন করা হলঃ এক লোক এক মহিলাকে বিয়ের পর তার মোহর না ঠিক করে এবং তার সাথে সহবাস না করেই মৃত্যুবরণ করল, তার জন্য কি হুকুম আছে? ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, মহিলাটি তার পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের সম-পরিমাণ মোহর পাবে, তার কমও পাবে না বেশিও পাবে না। তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য সে মহিলাটি ইদ্দাত পালন করবে এবং সে (তার) ওয়ারিসের অধিকারীও হবে। তখন মাকিল ইবনু সিনান আল-আশজাঈ (রাঃ) দাড়িয়ে বললেন, আপনি যে ধরণের ফায়সালা করেছেন, আমাদের বংশের মেয়ে ওয়াশিকের কন্যা বিরওয়াআ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একই ফায়সালা করেছেন। ইবনু মাসউদ (রাঃ) এটা শুনে খুবই আনন্দিত হন। সুনানে তিরমিজি : ১১৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯১, নাসায়ী ৩৩৫৪, ৩৩৫৫, ৩৩৫৬, ৩৩৫৮, ৩৫২৪, আবূ দাউদ ২১১৪, দারেমী ২২৪৬, ইরওয়াহ ১৯৩৯, সহীহ, আবী দাউদ ১৮৩৯।
এখানে মহর নির্ধারণকে উৎসাহিত করা হয়েছে, তবে শর্ত করা হয়নি যে, মহর ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হবে না।
ফকিহদের বক্তব্য হলো-
ইবনুল হুমাম (হানাফি ফকিহ) বলেন, “মহর নির্ধারণ ছাড়াও বিবাহ সম্পন্ন হবে, তবে সহবাস বা স্বামীর মৃত্যু হলে ‘মোহরে মিসল’ ওয়াজিব হবে।” ফাতহুল কাদির, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২০০”
ইবন কুদামাহ (হাম্বলি ফকিহ) বলেন, “যদি মহর নির্ধারণ ছাড়াই বিবাহ হয়, তবুও তা বৈধ হবে এবং স্ত্রী ‘মোহরে মিসল’ এর অধিকারী হবেন।” “আল-মুগনি লি ইবনে কুদামাহ, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-৭৮
আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়, এমনকি যদি মহর নির্দিষ্ট না-ও করা হয়। তবে পরবর্তীতে স্ত্রী মহরের দাবিদার হবেন, আর সেটি হবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী)।
২. মহরের প্রকারভেদ
আসলে ইসলামে মহরের কোনো নির্দিষ্ট প্রকারভেদ নেই। তবে বাস্তবে মহর আদায় ও প্রদান ব্যবস্থার ভিত্তিতে মহরকে প্রধানত দুই প্রকারে ভাগ করা যেতে পারে।
ক. তাৎক্ষণিক মহর
খ. বিলম্বিত মহর
ক. তাৎক্ষণিক মহর :
তাৎক্ষণিক মহর হলো সেই মোহর, যা বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীকে নগদে বা তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীকে মোহরের ওপর অবিলম্বে অধিকার দেওয়া। এটি সাধারণত বিয়ের মজলিসেই আদায় করা হয়, অথবা এমন কোনো নির্ধারিত সময়ে, যা খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়।.মহর আদায়ের নির্দেশ আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ
আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও। সূরা নিসা : ৪
উদাহরণস্বরূপ, যদি বিয়ের চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে যে, “পুরো মোহর নগদ ২ লাখ টাকা এবং এটি বিয়ের দিনই পরিশোধ করা হবে,” তাহলে এটি তাৎক্ষণিক মহর। সাধারণত বিয়ের সময় বা বাসর রাতের আগেই এটি পরিশোধ করা উত্তম।
খ.বিলম্বিত মহর :
বিলম্বিত মহর হলো সেই মোহর, যার কিছু অংশ অথবা পুরোটা পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা বিশেষ কোনো ঘটনার পর পরিশোধ করার শর্ত থাকে। এই শর্তটি সাধারণত বিয়ের সময় নির্ধারণ করা হয় এবং বিবাহের চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاِنۡ اَرَدۡتُّمُ اسۡتِبۡدَالَ زَوۡجٍ مَّکَانَ زَوۡجٍ ۙ وَّاٰتَیۡتُمۡ اِحۡدٰہُنَّ قِنۡطَارًا فَلَا تَاۡخُذُوۡا مِنۡہُ شَیۡئًا ؕ اَتَاۡخُذُوۡنَہٗ بُہۡتَانًا وَّاِثۡمًا مُّبِیۡنًا
আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রীকে বদলাতে চাও আর তাদের কাউকে তোমরা প্রদান করেছ প্রচুর সম্পদ, তবে তোমরা তা থেকে কোন কিছু নিও না। তোমরা কি তা নেবে অপবাদ এবং প্রকাশ্য গুনাহের মাধ্যমে? সূরা আন-নিসা ৪:২০
এখানে বলা হয়েছে, বিপুল মহর দেওয়া যায়, যা অনেক সময় একসাথে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তখন প্রথাগতভাবে মহরের একটি অংশ বিলম্বিত থাকে। যদি চুক্তিতে নির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ না থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়, হোক তা তালাকের মাধ্যমে বা স্বামীর মৃত্যুর কারণে, তখন বিলম্বিত মহর সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীর পাওনা হয়ে যায় এবং তা পরিশোধ করা স্বামীর (বা তার উত্তরাধিকারীদের) ওপর ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক।
মহরের পরিমাণ
ইসলামে মহরের পরিমাণের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়নি। এর পরিমাণ সম্পূর্ণভাবে বরের আর্থিক সামর্থ্য এবং কনের সামাজিক অবস্থান ও সম্মানের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। এটি এমন একটি বিধান যা উভয় পক্ষের জন্য সহজ করে দেয়, যাতে কোনো পক্ষই অতিরিক্ত আর্থিক চাপে না পড়ে। মহর এমন হতে পারে যা বরের পক্ষে পরিশোধ করা সহজ, আবার তা এত বেশিও হতে পারে যা তার সামর্থ্যের বাইরে নয়। এর মাধ্যমে ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
আবূ সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের মাহর কতো ছিলো? তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীদের মাহরের পরিমাণ ছিলো বার উকিয়া ও এক নাশ। তুমি কি জানো, নাশ কী? তাহলো অর্ধ উকিয়া। আর তাহলো পাঁচ শত দিরহামের সমান। সহিহ মুসলিম ১৪২৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৬, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৫, দারেমী : ২১৯৯, সহিহাহ : ১৮৩৩
উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা যদি উক্ত মোহর নির্ধারণ দুনিয়াতে সম্মান এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বিষয় হতো, তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তোমাদের চেয়ে তা নির্ধারণে অধিক অগ্রগামী হতেন। কিন্তু ১২ উকিয়্যার বেশি পরিমাণ মোহর নির্ধারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো সহধর্মিণীকে বিয়ে করেছেন কিংবা কোনো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। মিশকাত : ৩২০৪, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৫১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৮৭, দারিমী : ২২৪৬, আহমাদ : ৩৪০, ইরওয়া : ১৯২৭।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) কোন এক মহিলাকে বিয়ে করলেন এবং তাকে মাহর হিসাবে খেজুর দানার পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখে বিয়ের খুশির ছাপ দেখলেন তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন; তখন সে বললঃ আমি এক নারীকে খেজুর আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বিয়ে করেছি। সহিহ বুখারি : ৫১৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪২৭, সুনানে নাসায়ী ৩৩৭২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯০৭, আহমাদ : ১৩৩৭০, দারিমী : ২২৫০।
সাহল (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একজন মহিলা এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিজেকে পেশ করলেন। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাকে আমার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দিন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কাছে কী আছে? সে উত্তর দিল, আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যাও, তালাশ কর, কোন কিছু পাও কিনা? দেখ যদি একটি লোহার আংটিও পাও। লোকটি চলে গেল এবং ফিরে এসে বলল, কিছুই পেলাম না এমনকি একটি লোহার আংটিও না; কিন্তু আমার এ তহবন্দখানা আছে। এর অর্ধেকাংশ তার জন্য। সাহল (রাঃ) বলেন, তার দেহে কোন চাদর ছিল না। অতএব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার তহবন্দ দিয়ে সে কী করবে? যদি তুমি এটা পর, মহিলার শরীরে কিছুই থাকবে না, আর যদি এটা সে পরে তবে তোমার শরীরে কিছুই থাকবে না। এরপর লোকটি অনেকক্ষণ বসে রইল। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে চলে যেতে দেখে ডাকলেন বা তাকে ডাকানো হল এবং বললেন, তুমি কুরআন কতটুকু জান? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে সূরাগুলোর উল্লেখ করল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে পরিমাণ কুরআন জান, তার বিনিময়ে তোমাকে এর সঙ্গে বিয়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ২৩১০, ২৩১১, ৫০২৯, ৫০৩০, ৫০৮৭, ৫১২১, ৫১২৬, ৫১৩২, ৫১৩৫, ৫১৪১, ৫১৪৯, ৫৮৭১, মুসলিম ১৪১৫, নাসায়ী ৩২০০, ৩২৮০, ৩৩৫৯, আবূ দাউদ ২১১১, আহমাদ ২২২৯২, ২২৩২০, ২২৩৪৩
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহাহ্ উম্মু সুলায়ম (রাঃ)-কে বিয়ে করেন, তাদের মোহর ছিল ইসলাম গ্রহণ। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ)-এর পূর্বে ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; যদি তুমি ইসলাম কবুল কর তবে তোমার সাথে বিয়ে হতে পারে। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ ইসলাম গ্রহণ তাঁদের বিয়ের মোহর বলে গণ্য হয়। মিশকাত : ৩২০৯, সুনানে নাসায়ী ধ ৩৩৪০
মোহরে ফাতেমি :
মোহরে ফাতেমি হলো ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহের সময় যে পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করেছিলেন, সেই পরিমাণকে বোঝানো হয়।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ফাতিমা (রা.)-এর মোহর ছিল ৫০০ দিরহাম রৌপ্য মুদ্রা। আধুনিক হিসাবে এই ৫০০ দিরহামের মূল্য কত, তা নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও এর একটি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হিসাব দেওয়া যায়।
১ দিরহাম = ২.৯৭৫ গ্রাম রূপা।
৫০০ দিরহাম = ৫০০ × ২.৯৭৫ গ্রাম = ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপা।
বর্তমান বাজারে রূপার দামের ওপর ভিত্তি করে এই ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপার মূল্য হিসাব করা হয়। এই মূল্য প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রূপার দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
আধুনিক সমাজে সরাসরি মোহরে ফাতেমির পরিমাণে মোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে এর মূল স্পিরিট বা চেতনা অনুসরণ করাকে উৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ, সামর্থ্য অনুযায়ী এমন পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করা উচিত, যা কনের জন্য সম্মানজনক এবং বরের জন্য বোঝা নয়।
সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪
সামর্থে বাইরে মহল নির্ধারণ ঠিক না
ইসলামে মহর ধার্য করার ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা লোকলজ্জার ভয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ নির্ধারণ করাকে উৎসাহিত করা হয় না। ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো সহজ ও বরকতময় একটি সম্পর্ক স্থাপন করা, যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত হয়।
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
«إِنَّ مِنْ يُمْنِ الْمَرْأَةِ تَيْسِيرَ خِطْبَتِهَا، وَتَيْسِيرَ صَدَاقِهَا، وَتَيْسِيرَ رَحِمِهَا»
“নিশ্চয়ই নারীর বরকতের লক্ষণ হলো, তার প্রস্তাব সহজ হওয়া, তার মোহর সহজ হওয়া এবং তার গর্ভধারণ সহজ হওয়া।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ : ২৪৫৯৫, ইমাম হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : ২৭০৯, ইমাম বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৮২৮৫, সহিহাহ : ২২৩৬`
উমার ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণিত, তিনি (রাঃ) বলেছেন, মহিলাদের মাহরের ব্যাপারে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। কেননা তা যদি পার্থিব জীবনে সম্মান অথবা আল্লাহর কাছে তাক্ওয়ার প্রতীক হতো, তাহলে তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে অধিক যোগ্য ও অগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের মাহর বারো উকিয়ার বেশি ধার্য করেননি। কখনও অধিক মাহর স্বামীর উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মনে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, এমনকি সে বলতে থাকে, আমি তোমার জন্য পানির মশক বহনে বাধ্য হয়েছি অথবা তোমার জন্য ঘর্মাক্ত হয়ে পড়েছি। (রাবী বলেন), আমি একজন বেদুইন। অতএব আমি ’’আলাকাল কিরবা’’ বা ’’আলাকাল কিরবা’’-এর অর্থ কি তা জানি না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৭, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৬, ২৮৭, দারেমী : ২২০০, মিশকাত : ৩২০৪
অধিক মহর ধার্য করার মাধ্যমে বিবাহকে কঠিন করে তোলা হয়, যা এই হাদিসের শিক্ষার পরিপন্থী। যখন মহর অতিরিক্ত হয়, তখন তা অনেক যুবকের জন্য বিবাহকে অসম্ভব করে তোলে, যা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে।
আমের ইবনু রবীআ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ফাযারা গোত্রের এক ব্যক্তি এক জোড়া পাদুকার বিনিময়ে বিবাহ করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিবাহ অনুমোদন করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৮, সুনানে তিরমিযী : ১১১৩, আহমাদ : ১৫২৪৯, ১৫২৬৪, ইরওয়াহ : ১৯২৬।
সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি বলেনঃ কে তাকে বিবাহ করবে? এক ব্যক্তি বললো, আমি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তাকে একটি লোহার আংটি হলেও তা (মারহস্বরূপ) দাও। সে বললো, আমার কাছে কিছুই নাই। তিনি বলেনঃ তোমার কাছে কুরআনের যে অংশ আছে, তার বিনিময়ে আমি তাকে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম। সন সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৯.
এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে মহর কম হওয়া উত্তম। কারণ, মহর যত কম হবে, বিয়ে করা তত সহজ হবে এবং সমাজে বিবাহর প্রচলন বাড়বে। রাসূল (ﷺ) নিজে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিয়েতে কম মহর নির্ধারণ করে উম্মতকে এই শিক্ষাই দিয়েছেন।
সমাজের কিছু মানুষ লোকলজ্জার ভয়ে বা সামাজিক মর্যাদার কারণে এমন পরিমাণ মহর ধার্য করে যা বরের সাধ্যের বাইরে। এর ফলে হয় বরকে মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হয়, নয়তো তাকে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে হয়। ইসলামে এমন অনর্থক বোঝা চাপানোকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
মহরের মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে নিরাপত্তা দেওয়া এবং বিবাহের বন্ধনকে মজবুত করা। কিন্তু যখন এটি লোক দেখানো প্রথায় পরিণত হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং তা পারিবারিক জীবনে অশান্তির কারণ হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, অতিরিক্ত মহরের কারণে স্বামী তা পরিশোধ করতে না পেরে দাম্পত্য জীবনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, প্রতিটি মুসলমানের উচিত বিবাহের ক্ষেত্রে সরলতা অবলম্বন করা। মহর এমন পরিমাণ ধার্য করা উচিত যা বরের জন্য সহজ এবং যা সে সন্তুষ্টচিত্তে পরিশোধ করতে পারে। সামাজিক রীতিনীতি বা লোকলজ্জার পরিবর্তে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। অধিক মহর ধার্য করে বিবাহের পথ কঠিন করার চেয়ে বরং অল্প মহরে বরকতময় একটি বিবাহ করা উত্তম। এটি একটি সুস্থ ও সহজ সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বরের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা
ইসলামে নিকাহ্ (বিবাহ) একটি ইবাদত ও চুক্তি। এ ক্ষেত্রে ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (স্বীকৃতি) শর্ত। ইজাব ও কবুল হলো ইসলামি আইন (শরিয়ত) অনুযায়ী একটি বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য অপরিহার্য দুটি শব্দ। এই দুটি শব্দ দ্বারা গঠিত মৌখিক বা লিখিত চুক্তির মাধ্যমেই একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধতা লাভ করে। এই চুক্তিটি একটি আইনি চুক্তি, যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য কিছু অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে।
ইজাব (প্রস্তাব) :
ইজাব হলো বিবাহের জন্য এক পক্ষ কর্তৃক প্রস্তাব পেশ করা। সাধারণত, পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি আসে। প্রস্তাবটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। যেমন-
পাত্রের পক্ষ থেকে : “আমি অমুকের মেয়ে অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলাম।”
পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বামী হিসেবে কবুল করলাম।”
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই কুমারী মেয়েরা লজ্জা করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার সম্মতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৭, ৬৯৪৬, ৬৯৭১
এখানে উল্লেখ্য, প্রস্তাবটি যে কোনো এক পক্ষ থেকে আসতে পারে, তবে তা স্পষ্ট হতে হবে। প্রস্তাবের ভাষা এমন হতে হবে, যেন তাতে কোনো অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা না থাকে।
কবুল (গ্রহণ) :
কবুল হলো অপর পক্ষ কর্তৃক সেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করা। ইজাবের পর সঙ্গে সঙ্গেই কবুল করা আবশ্যক। কবুল করার সময়ও ভাষা স্পষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:
পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি কবুল করলাম।”
যদি ইজাব এবং কবুলের মাঝে দীর্ঘ সময় ব্যবধান থাকে বা প্রস্তাবের মধ্যে কোনো শর্ত যুক্ত করা হয়, তাহলে বিবাহ চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। তাই এই দুটি বিষয় একই মজলিসে (একই স্থানে, একই বৈঠকে) সম্পন্ন করা জরুরি।
ইজাব ও কবুলের শর্ত
একটি সঠিক ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়:
ক. একই মজলিস : ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে (মজলিসে) সম্পন্ন হতে হবে। আল-ইনায়াহ শরহুল হিদায়াহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৮৭
খ. সাক্ষী : ইজাব ও কবুলের সময় কমপক্ষে দুইজন মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকা আবশ্যক। অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী হলেও চলবে। এটি বিয়ের বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সূরা তালাক : ২
গ. স্পষ্ট ভাষা: প্রস্তাব ও গ্রহণ উভয়ই স্পষ্ট ভাষায় হতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৬৭
ইজাব ও কবুলের ধারণা সরাসরি কোরআন বা হাদিসে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা না থাকলেও, এর ভিত্তি ইসলামি ফিকাহ (আইনশাস্ত্র) এবং ইজমা (ইসলামি পণ্ডিতদের ঐক্যমত্য) থেকে এসেছে। এই নিয়মগুলো মূলত সাহাবিদের আমল এবং পরবর্তী ফকিহদের ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব থেকে ইজাব ও কবুল যে নিকাহর রুকন ও শর্ত—এ ব্যাপারে স্পষ্ট দলিল তুলে ধরছি।
ক. ইমাম ইবনু কুদামাহ (হাম্বলি) বলেন-
وَالنِّكَاحُ لَا يَنْعَقِدُ إِلَّا بِلَفْظِ الْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ
“নিকাহ বৈধ হয় না, যতক্ষণ না ইজাব ও কবুলের উচ্চারণ হয়।” আল-কাফি, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৮)-
খ. ইমাম মারগিনানি (হানাফি) বলেন-
لَا يَنْعَقِدُ النِّكَاحُ إِلَّا بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ
“নিকাহ ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।” আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৮৮
গ. ইমাম নববী (শাফেয়ি) বলেন-
رُكْنُ النِّكَاحِ الْإِيجَابُ وَالْقَبُولُ، وَلَا يَنْعَقِدُ بِدُونِهِمَا
“নিকাহর রুকন হলো ইজাব ও কবুল। এ দু’টির ছাড়া নিকাহ বৈধ হয় না।” রাওদাতুত ত্বলিবীন, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৮)
ঘ. ইমাম মালিক (মালিকি) বলেন-
لَا يَكُونُ النِّكَاحُ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَإِيجَابٍ وَقَبُولٍ
ওয়ালি, ইজাব এবং কবুল ছাড়া নিকাহ হয় না। আল-মুদাওয়ানাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫৫৫
ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিস-
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, যখন ’উমার (রাঃ)-এর কন্যা হাফসাহ (রাঃ) খুনায়স ইবনু হুযাইফাহ সাহমীর মৃত্যুতে বিধবা হলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী ছিলেন এবং মদিনায় ইন্তিকাল করেন। ’উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি ’উসমান ইবনু ’আফফান (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং হাফসাহকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিলাম; তখন তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। এরপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম, তারপর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, আমার কাছে এটা প্রকাশ পেয়েছে যে, যেন এখন আমি তাকে বিয়ে না করি। ’উমার (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, যদি আপনি চান তাহলে আপনার সঙ্গে ’উমারের কন্যা হাফসাহকে বিয়ে দেই। আবূ বকর (রাঃ) নীরব থাকলেন এবং প্রতি-উত্তরে আমাকে কিছুই বললেন না। এতে আমি ’উসমান (রাঃ)-এর চেয়ে অধিক অসন্তুষ্ট হলাম, তারপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন এবং হাফসাহ্কে আমি তার সঙ্গে বিয়ে দিলাম। এরপর আবূ বকর (রাঃ) আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, সম্ভবত আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আপনি যখন হাফসাহকে আমার জন্য পেশ করেন তখন আমি কোন উত্তর দেইনি। ’উমার (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হাঁ। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে কোন কিছুই আমাকে বিরত করেনি; এ ছাড়া যে, আমি জানি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহর বিষয় উল্লেখ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপন ভেদ প্রকাশ আমার পক্ষে কখনও সম্ভব নয়। যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করতেন তাহলে আমি হাফসাহকে গ্রহণ করতাম। সহিহ বুখারি : ৪০০৫, ৫১২২
[MIH1]