বিবাহে যে কাজগুলো বর্জনীয়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. মেয়ের পক্ষ থেকে ওয়ালীমার করার হুকুম

বিয়ের পর ওয়ালীমার মূল দায়িত্ব বর বা ছেলের পক্ষের। এটি অসংখ্য সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যা বিবাহের ঘোষণা ও আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের একটি সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি বরপক্ষের জন্য একটি নেকীর কাজ।

যখন কনে বা তার পরিবার ওয়ালীমার নামে কোনো ভোজের আয়োজন করে, তখন তা শরীয়তের ওয়ালীমা হিসেবে গণ্য হয় না, বরং এটি একটি সামাজিক প্রথা বা রেওয়াজ মাত্র। এটি নিঃসন্দেহে সুন্নাহর স্পষ্ট বিপরীত। কারণ, এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে এবং সমাজের প্রচলিত প্রথাকে দ্বীনের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ইসলামের আনিত নিয়ম বাদ দিয়ে সমাজের বা বাপ দাদাদের প্রথাকে অনুসরণ করেত আল্লাহ  নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَکَذٰلِکَ مَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ قَبۡلِکَ فِیۡ قَرۡیَۃٍ مِّنۡ نَّذِیۡرٍ اِلَّا قَالَ مُتۡرَفُوۡہَاۤ ۙ اِنَّا وَجَدۡنَاۤ اٰبَآءَنَا عَلٰۤی اُمَّۃٍ وَّاِنَّا عَلٰۤی اٰثٰرِہِمۡ مُّقۡتَدُوۡنَ

এভাবে তোমার পূর্বে কোন জনপদে যখনই কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি তখন ওর সমৃদ্ধশালী ব্যক্তিরা বলত, আমরাতো আমাদের পূর্ব-পুরুষদেরকে পেয়েছি এক মতাদর্শের অনুসারী এবং আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। সুরা যুখরুফ : ৪৩

মুসলিমদের উচিত বিয়ের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় সামাজিক প্রথা পরিহার করা।

যদি কনে পক্ষ কেবল সাধারণ আপ্যায়ন বা অতিথি সংবর্ধনার উদ্দেশ্যে কোনো ভোজের আয়োজন করে এবং তাকে ওয়ালীমা না বলে, তবে তা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে সমাজে এই ধরনের ভোজকেই “ওয়ালীমা” বলা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বরপক্ষের সুন্নাহসম্মত ওয়ালীমাকে বাদ দিয়ে শুধু কনেপক্ষের আয়োজনকেই প্রধান্য দেওয়া হয়।

২. ওয়ালীমার পুরস্কার নেওয়া

ইসলামে উপহার (হাদিয়া) আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্পর্ক বৃদ্ধি করা। মহানবী (সা.) নিজেও হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং উপহার দিতে উৎসাহিত করতেন।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। লোকেরা তাদের হাদিয়া পাঠাবার ব্যাপারে ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর জন্য নির্ধারিত দিনের অপেক্ষা করত। এতে তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করত। সহিহ বুখারি : ২৫৭৪, ২৫৮০, ২৫৮১, ৩৭৭৫, সহিহ মুসলিম : ২৪৪১, ২৪৪২

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা পরস্পরকে হাদিয়া দাও, তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বাড়বে।” আল-আদাব আল-মুফরদ : ৫৯৪

ওয়ালীমা হলো নবদম্পতির জন্য দোয়া ও শুভকামনা জানানোর একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত গ্রহীতা যদি নবদম্পতিকে কোনো উপহার দেন, তবে তা হাদিয়া হিসেবেই গণ্য হবে। এটি একটি প্রশংসনীয় কাজ, কারণ এর মাধ্যমে নতুন দম্পতির প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ পায়। বাংলাদেশ–ভারতের অনেক সমাজে দেখা যায়, ওয়ালীমার দাওয়াতে যারা যায়, তারা খাবারের সাথে খুশি হয়ে টাকা বা উপহার দিয়ে যায়। ওয়ালীমার এ ধরনের উপহারের পিছনে নিচে ইসলমা বিরোধী কাজগুলো লুকিয়ে থাকে।

ক. ওয়ালীমা ইবাদত ছাড়া কোন ব্যবসা নয় :

ওয়ালীমা মূলত একতরফা খাওয়ানো। অতিথির কাছ থেকে কিছু নেওয়া ইসলামের উদ্দেশ্যের বিরোধী।

এতে ইবাদত সামাজিক লেনদেনে পরিণত হয়।

খ. উপহার প্রদান রেওয়াজে আবদ্ধ হয় :

অনেকে ভাবে, “অমুক আমাদের ওয়ালীমায় এত টাকা দিয়েছে, আমরাও তার দাওয়াতে দিতে বাধ্য।” এটি চাপ সৃষ্টি করে, অথচ ইসলাম অতিথিকে চাপ দেয়নি, বরং খেতে আসাটাই সুন্নাহ। যদি এটি একটি চক্রে পরিণত হয় (আমি তাকে দিয়েছি, তাই সে আমাকে দেবে), তবে এর পবিত্রতা নষ্ট হয়।

গ. সাদাসিধে ওয়ালীমা হারিয়ে যাওয়া :

পুরস্কার-প্রত্যাশী মনোভাব ওয়ালীমাকে আড়ম্বরপূর্ণ করে ফেলে। অথচ নবিজি ﷺ বলেছেন, সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটিই, যেখানে খরচ কম হয়। মুসনাদ আহমাদ : ২৪৫৯৫, সহিহ

ঘ. বিদআতের রূপান্তিরিত হয় :

নবিজি ﷺ এবং সাহাবাদের যুগে ওয়ালীমায় কারো থেকে টাকা-পয়সা নেওয়া হয়নি। অথচ এখন সমাজে এটি প্রচলিত। সুতরাং এটি বিদআতী রেওয়াজ।

ঙ. লোক দেখানোর প্রবণতা থাকে :

যখন উপহার দেওয়া-নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ভালোবাসা বা সহযোগিতা না হয়ে লোক দেখানো বা সামাজিক চাপ হয়, তখন তা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়।

চ. বাধ্যবাধকতা : অনেক সমাজে এটি এমনভাবে প্রচলিত হয়েছে যে, উপহার না দিলে তা অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়। ইসলামে কোনো উপহার দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। ওয়ালীমা হলো খাওয়ানোর ইবাদত, “খেয়ে উপহার নেওয়ার রেওয়াজ” নয়। ইসলামে দাওয়াতের বিনিময়ে কিছু গ্রহণ করা ইবাদতের সাথে খেলা করা, তাই একে ইসলামের পরিভাষায় বলা যায়— বিদআত ও সুন্নাহ-বিরোধী রেওয়াজ।

৩. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে বেপর্দা গমন গুনাহের কাজ

ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে নারীদের বেপর্দা এবং ফ্যাশন শো-এর মতো আচরণ নিঃসন্দেহে ইসলামে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ইসলামে পর্দার বিধান শুধু একটি পোশাক নয়, বরং এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা নৈতিকতা, শালীনতা এবং পারস্পরিক সম্মান রক্ষা করে।

ইসলামে পর্দার গুরুত্ব

ইসলামে পর্দার বিধান কোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।  সুরা আহযাব : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সুরা নুর : ৩০

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

ক. বিয়ের অনুষ্ঠানে বেপর্দা ও ফ্যাশন শো-এর কুফল

বিয়ের অনুষ্ঠানে বেপর্দা হওয়া এবং ফ্যাশন শো-এর মতো আচরণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে কয়েকটি কারণে গর্হিত কাজ:

খ. আল্লাহর বিধানের লঙ্ঘন :

এটি সরাসরি কোরআন ও সুন্নাহর বিধানের লঙ্ঘন। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করা একটি বড় পাপ।

গ. দৃষ্টির ফিতনা :

বিয়ের অনুষ্ঠানে যখন নারীরা আকর্ষণীয় পোশাক ও সাজে নিজেদের প্রকাশ করে, তখন তা পুরুষদের দৃষ্টির ফিতনার কারণ হয়। তাছাড়া, বেপর্দা মেলামেশা থেকে প্রেম, ব্যভিচার ও অনৈতিক সম্পর্কের পথ উন্মুক্ত হয়।  ফরে নারী পুরুষ উভয়ই গুনাহগার হয়।

ঘ. আড়ম্বর ও অপচয় :

ইসলামে বিয়েকে সহজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু বেপর্দার সঙ্গে ফ্যাশন শো-এর মতো আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন করা অপচয়ের (ইসরাফ) অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে অপছন্দনীয়। আল্লাহ অহংকারী ও অপব্যয়ীদের ভালোবাসেন না।

إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

“নিশ্চয়ই তিনি অপব্যয়ীদের ভালোবাসেন না। সূরা আনআম : ১৪১

ঙ. অহংকার ও রিয়া :

এই ধরনের অনুষ্ঠানে অনেক সময় লোক দেখানো বা অহংকার প্রদর্শনের প্রবণতা থাকে, যা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত) এবং এটি মুসলিমদের জন্য একটি মারাত্মক নৈতিক দুর্বলতা।

এটি সরাসরি একটি হারাম কাজ। কারণ, কোরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে বেপর্দার বিধান দেওয়া হয়েছে এবং তা লঙ্ঘন করা সুস্পষ্টভাবে হারাম।

সুতরাং, আমাদের দেশের অনেক বিয়ের অনুষ্ঠানে যে বেপর্দার প্রচলন আছে, তা ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি একটি মারাত্মক নৈতিক ও ধর্মীয় অবক্ষয়। মুসলিমদের উচিত বিয়ের মতো একটি পবিত্র অনুষ্ঠানে আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা।

৪. ওয়ালীমাতে অপচয় করা এবং আভিজাত্য জাহির করা :

ওয়ালীমা একটি সুন্নত অনুষ্ঠান, এটি আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। কিন্তু ইসলাম এর মধ্যে আভিজাত্য জাহির ও অপচয়কে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কুরআন-হাদিসে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যেন আমরা ভোগ-বিলাস ও অপচয়ের পথে না যাই। যেমন-

ক. বিয়ের জন্য দামি দাওয়াত কার্ড ছাপা

বিয়ের দাওয়াত কার্ড মূলত খবর পৌঁছানোর একটি মাধ্যম। কিন্তু অনেকেই এই মাধ্যমকে আভিজাত্য প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করেন। দামি, জাঁকজমকপূর্ণ, এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে বড় কার্ড ছাপিয়ে অর্থ নষ্ট করা হয়, যা কোনোভাবেই ইসলামে অনুমোদিত নয়। ইসলাম সবক্ষেত্রে সরলতা এবং মিতব্যয়িতার ওপর জোর দেয়। বিয়েতে দাওয়াত কার্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে জানানো, সেটা যেকোনো সহজ উপায়েও হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। সূরা বনী ইসরাঈল ; :২৭

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, যেকোনো ধরনের অপচয়ই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

খ. হোটেল ও কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা

বিয়েতে বিলাসবহুল হোটেল বা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করা আজকাল একটি সাধারণ প্রবণতা। এতে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়, যা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য ঋণের বোঝা তৈরি করে। ইসলামে বিয়ে একটি সহজ ও বরকতময় ইবাদত। এটি এমন কোনো অনুষ্ঠান নয় যেখানে আভিজাত্য দেখাতে গিয়ে অন্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বিয়ে তার আসল উদ্দেশ্য (স্বামী-স্ত্রীর মিলন) থেকে দূরে সরে গিয়ে লোক দেখানো একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন-

“أَعْظَمُ النِّكَاحِ بَرَكَةً أَيْسَرُهُ مَئُونَةً”

সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে হলো সেটি, যাতে খরচ সবচেয়ে কম হয়। সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪১৭৩, সুনানে বাইহাকি : ১৩৫৮৮

আমর ইবনে শো’আইব (রাঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা পানাহার করো, দান-খয়রাত করো এবং পরিধান করো যাবত না তার সাথে অপচয় বা অহংকার যুক্ত হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬০৫, আহমাদ : ৬৬৫৬, ৬৬৬৯, মিশকাত : ৪৩৮১।

এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, বিয়ের বরকত খরচের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর সহজতা ও সরলতার ওপর নির্ভর করে।

গ. শুধু বিয়ের জন্য বাহারি পোশাক কেনা

অনেকেই শুধু বিয়ের দিনের জন্য এক বা একাধিক ব্যয়বহুল পোশাক কেনেন, যা পরে আর কোনো কাজে লাগে না। এটি এক ধরনের অপচয়। ইসলামে পোশাকের ব্যাপারে মার্জিত ও শালীনতার কথা বলা হয়েছে, তবে তা অবশ্যই সামর্থ্যের মধ্যে হতে হবে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অর্থ খরচ করা এবং পরে তা ফেলে রাখা বা ব্যবহার না করা ইসলামে নিন্দনীয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন_

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ : ৩১

এই আয়াতটি খাওয়া-পরাসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে অপচয় বর্জন করার নির্দেশ দেয়।

আবূ উমামাহ সালাবাহ আল-আনসারী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ তাঁর সামনে দুনিয়াদারী সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা কি শুনতে পাও না, তোমরা কি শুনতে পাও না যে, পোশাক-পরিচ্ছদের নম্রতা প্রকাশ ঈমানের অঙ্গ, পোশাক-পরিচ্ছদে নম্রতা প্রকাশ ঈমানের অঙ্গ অর্থাৎ পোশাক-পরিচ্ছদে বাবুগিরী প্রদর্শন না করা। সুনানে আবু  দাউদ : ৪১৬১

ঘ. খাবারে অপচয় করা

বিয়েতে সবচেয়ে বেশি অপচয় হয় খাবারে। আয়োজনকারীরা অতিথিদের সংখ্যা এবং খাবারের পরিমাণ সঠিকভাবে অনুমান করতে না পারায় প্রচুর খাবার নষ্ট হয়। এই অপচয় করা খাবারগুলো সমাজের অনেক দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্যের উৎস হতে পারত। ইসলামে খাবার নষ্ট করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন_

وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ : ৩১

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কারো লোকমা পড়ে গেলে সে যেন তা তুলে নেয়। তারপর তাতে যে আবর্জনা স্পর্শ করেছে তা যেন দূরীভূত করে এবং খাদ্যটুকু খেয়ে ফেলে। শাইতানের জন্য সেটি যেন ফেলে না রাখে। আর তার আঙ্গুল চেটে না খাওয়া পর্যন্ত সে যেন তার হাত রুমাল দিয়ে মুছে না ফেলে। কেননা সে জানে না খাদ্যের কোন অংশে বারাকাত রয়েছে। সহিহ মুসলিম : ২০৩৩

এই হাদিসটি খাবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং অপচয় থেকে বিরত থাকার কথা বলে।

ঙ. বিয়ের অনুষ্ঠানে লাইটিং করা

বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বা লাইটিং করা হয়, যা মূলত আভিজাত্য ও জৌলুস দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়। এই অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জায় প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হয় এবং খরচও বৃদ্ধি পায়। ইসলামে বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো সহজ ও সাবলীলভাবে একটি নতুন পরিবার গঠন, যেখানে এসব বাহ্যিক প্রদর্শনীর কোনো স্থান নেই।

শা‘বী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, মুগীরা ইবনু শু‘বাহ্ (রহ.)-এর কাতিব (একান্ত সচিব) বলেছেন, মু‘আবিয়া (রাঃ) মুগীরা ইবনু শু‘বাহ্ (রাঃ)-এর কাছে লিখে পাঠালেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছ হতে আপনি যা শুনেছেন তার কিছু আমাকে লিখে জানান। তিনি তাঁর কাছে লিখলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন- (১) অনর্থক কথাবার্তা, (২) সম্পদ নষ্ট করা এবং (৩) অত্যধিক সওয়াল করা। সহিহ বুখারি : ১৪৭৭

চ. মেয়েরা পোশাক-আশাকের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে

বিয়েতে কনের জন্য পোশাক-আশাক, গহনা এবং অন্যান্য সাজসজ্জার পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। এই ব্যয় অনেক সময় পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়। সমাজে এটি একটি অলিখিত রীতিতে পরিণত হয়েছে যে, কনেকে যত বেশি জাঁকজমকপূর্ণ সাজানো হবে, তত তার সম্মান বাড়বে। অথচ ইসলামে নারী-পুরুষ সবার জন্যই সরলতা এবং মিতব্যয়িতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।

বিয়েতে অপচয় ও আভিজাত্য জাহির করা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী। এর ফলে শুধু অর্থ ও সম্পদের অপচয়ই হয় না, বরং সমাজের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপরও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত, এসব অহেতুক রীতিনীতি পরিহার করে ইসলাম নির্দেশিত পথে সহজ ও বরকতময় বিয়ের আয়োজন করা।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-

مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شُهْرَةٍ أَلْبَسَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَوْبًا مِثْلَهُ زَادَ عَنْ أَبِي عَوَانَةَ ثُمَّ تُلَهَّبُ فِيهِ النَّارُ

যে ব্যক্তি খ্যাতি লাভের জন্য পোশাক পরে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সেরূপ পোশাক পরাবেন, অতঃপর তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে। সুনানে  আবু দাউদ : ৪০২৯

ছ. অশ্লীল কিংবা প্রসিদ্ধি ও অহংকারের পোশাক পরা :

অতি টাইট, পাতলা ও গোপন সৌন্দর্যকে প্রস্ফূটিত করে এমন পোশাক পরা। বক্ষ, বাহু ও কটি দৃশ্যমান হয় এমন অপ্রচলিত ও দৃষ্টিকটু পোশাক পরে অহংকার দেখানো এবং পর পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

জ. নারীদের সুগন্ধি ব্যবহার করা :

বিবাহ অনুষ্ঠানে ইদানীং মেয়েরা বিশেষত তরুণীরা মহা উৎসাহে সেন্ট ব্যবহার করে অংশগ্রহণ করে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

أَيُّمَا امْرَأَةٍ اسْتَعْطَرَتْ ، فَمَرَّتْ عَلَى قَوْمٍ لِيَجِدُوا رِيحَهَا فَهِيَ زَانِيَةٌ

‘যে নারী সুগন্ধি ব্যবহার করে অতপর মানুষের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাতে তার সুগন্ধি পায়, সে ব্যভিচারিণী। সুনানে  নাসায়ি : নাসায়ী : ৯৩৬১; আহমদ : ১৯৭২৬।

৫. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে গান বাজনা করা

পুর্বের আলোচনাতে দেখেছি বিবাহর অনুষ্ঠানে দফ জানান জায়েয। কিন্তু আমাদের সমাজে দফ নয়, সরাসরি নাজ গানের আয়োজন করা হয় তা নিশ্চয়ই হারাম। তাই দফ বাজানো জায়েয হলে আলেমগণ শর্ত সাপেক্ষে জায়েয করেছেন।

বিয়ের ওয়ালীমায় দফ (এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র, যার শুধু একদিক খোলা) ব্যবহার করা জায়েয। তবে এর সাথে অশ্লীল বা অনর্থক কথা, অশ্লীল গান, এবং নারীদের বাদ্যযন্ত্র বাজানো জায়েয নয়। নিচের শর্তাবলী অনুসরণ করে দফ বাজানো জায়েয়। ওয়ালীমা অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হলো খাবার পরিবেশন করা, গান-বাজনা নয়।

অবশ্য কিছু আলোম গান-বাজনাকে সম্পূর্ণ হারাম বলেছেন। তারা বলেন- ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে গান-বাজনা সম্পূর্ণ হারাম। তারা এই মতের পক্ষে বিভিন্ন হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) গান-বাজনা, বিশেষ করে অশ্লীল গান-বাজনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। শুধুমাত্র ওয়ালীমা অনুষ্ঠানে নয়, বরং কোনো অনুষ্ঠানেই গান-বাজনা করা জায়েয নয়। আলেমগণ একমত যে অশ্লীল গান-বাজনা, অশ্লীল বা অনর্থক কথা, এবং অশ্লীল বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হারাম।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ

অর্থ : আর মানুষদেরই মধ্যে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষ কে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা (গান) খরিদ করে।  এবং তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসাবে গ্রহন করে। এ ধরনের লোকদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব৷ সুরা লুকমান : ৬

এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি (لَهْوَ الْحَدِيثِ) ‘লাহওয়াল হাদীছ’ অবলম্বন করে, সে দোজখের কঠিন শাস্তি প্রাপ্ত হবে, কাজেই তা হারাম। উক্ত আয়াত-এ বর্ণিত (لَهْوَ الْحَدِيثِ) ‘লাহওয়াল হাদীছ’-এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে ইবনে কাসির বলেন- ‘লাহওয়াল হাদীছ’-এর অর্থ- সঙ্গীত বা গান-বাজনা। বেশীর ভাগ তাফসির কারকগণ  ‍লাহওয়াল হাদিস বলতে গানকে বুঝিয়েছেন।

প্রখ্যাত সাহাবী আ’ব্দুল্লাহ ইবনু মাসউ’দ (রা.) বলেন, “আল্লাহর কসম! যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, (এই আয়াতে উল্লেখিত) ‘লাহুয়াল হাদীস’ (অবান্তর-কথাবার্তা) কথার অর্থ হচ্ছে গান।” ‘ইবলীসের আওয়াজ’।

তাফসিরে তাফহিমুল কুরআনে মাওলানা মউদুদী বলেন-

“লাহওয়াল হাদীস” অর্থাৎ এমন কথা যা মানুষকে আত্ম-সমাহিত করে অন্য প্রত্যেকটি জিনিস থেকে গাফিল করে দেয়। শাব্দিক অর্থের দিক দিয়ে এ শব্দগুলোর মধ্যে নিন্দার কোন বিষয় নেই। কিন্তু খারাপ, বাজে ও অর্থহীন কথা অর্থে শব্দটির ব্যবহার হয়। যেমন গালগল্প, পুরাকাহিনী, হাসি-ঠাট্টা, কথা-কাহিনী, গল্প, উপন্যাস, গান বাজনা এবং এ জাতীয় আরো অন্যান্য জিনিস।

আবূ মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০২০, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৬৮৮, আহমাদ : ২২৩৯৩, মিশকাত : ৪২৯২, সহীহাহ : ১৩৮-১৩৯।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে  দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

৬. বিয়েতে হারাম কাজ হলেও তাতে অংশ নেয়া :

বিয়ের অনুষ্ঠানে যদি নিষিদ্ধ কিছুর আয়োজন থাকে তবে তাতে অংশ নেয়ার অনুমতি নেই।  আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জিবরীল আমার নিকট এসে বলেন, গত রাতে আমি আপনার কাছে এসেছিলাম, কিন্তু আমি প্রবেশ করিনি। কারণ ঘরের দরজায় ছবি ছিলো। ঘরের মধ্যে ছিলো ছবিযুক্ত পর্দা এবং ঘরের ভিতরে ছিলো কুকুর। সুতরাং আপনি ঘরে ঝুলানো ছবির মাথা কেটে দেয়ার আদেশ করুন, তাহলে তা গাছের আকৃতিতে পরিণত হবে। আর পর্দাটি কেটে দু’টি বালিশের ভিতরের কাপড় বানাতে আদেশ করুন এবং কুকুরটিকে বের করে দেয়ার হুকুম দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপদেশ মতো কাজ করলেন। কুকুরটি ছিলো হাসান বা হুসাইনের এবং তা তাদের খাটের নীচে শুয়ে ছিলো। তিনি সেটাকেও বের করে দেয়ার আদেশ দেন এবং তা বের করে দেয়া হলো। ইমাম আবূ দাঊদ (রহঃ) বলেন, আন-নাযাদ হচ্ছে কাপড় রাখার বস্তু, গদি সদৃশ। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৫৮, সুনানে তিরমিজি : ২৫০৬, সুনানে নাসায়ী : ৫৩৫১

ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুসারে, কোনো মুসলমানের এমন কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া উচিত নয় যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা হয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে-

ক. হারাম কাজ থেকে দূরে থাকা একটি ইবাদত। কোনো অনুষ্ঠানে এমন কিছু থাকলে সেখানে উপস্থিত থাকা মানে হলো সেই হারাম কাজকে সমর্থন করা। এতে পুণ্য অর্জনের সুযোগ নষ্ট হয়।

খ. রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাদিস অনুযায়ী, যে ঘরে ছবি বা মূর্তি থাকে, সেখানে রহমতের ফিরিশতা প্রবেশ করেন না। একইভাবে, গান-বাজনা, অশ্লীলতা বা অন্যান্য হারাম কাজ যেখানে হয়, সেখানেও আল্লাহর রহমত থাকে না।

গ. কোনো অনুষ্ঠানে হারাম কাজ থাকলে তা থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ, সেখানে উপস্থিত থাকা মানে হলো সেই হারাম কাজকে সমর্থন করা। এটি সমাজে সেই হারাম কাজকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।

ঘ. একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ঈমানকে রক্ষা করা। হারাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে ঈমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ইমাম আওযায়ী (রহ.)-এর বক্তব্যটি এই নীতিরই প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছেন, যে দাওয়াতে তবলা বা বাদ্যযন্ত্র থাকে, সেখানে যাওয়া যাবে না। এর অর্থ হলো, ওয়ালীমার মূল উদ্দেশ্য বরকতময় করা এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। তাই কোনো অনুষ্ঠানে যদি এমন কিছু থাকে যা আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিপন্থী, তবে সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

৭. ওয়ালীমার অনুষ্ঠানর ভিডিও ও ছবি তোলা :

ওয়ালীমার অনুষ্ঠান ভিডিও ও ছবি তোলা বিষয়টি আধুনিক যুগের একটি মাসআলা। কুরআন-হাদিসে সরাসরি ভিডিও বা ফটোগ্রাফির উল্লেখ নেই, তবে এ বিষয়ে ইসলামি উলামারা কুরআন-সুন্নাহর মূল নীতিমালা থেকে হুকুম নির্ধারণ করেছেন।

১. কুরআনের দিক থেকে নির্দেশনা আছে মানুষ যেন অশ্লীলতা ও বেপর্দা এড়িয়ে চলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সুরা নুর : ৩০

অপ্রয়োজনীয় চিত্র বা মূর্তি ব্যবহার থেকে বারণ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অবশ্যই কিয়ামতের দিবসে মানুষের মধ্যে (কঠিন শাস্তি ভোগকারী হবে ছবি তৈরিকারীরা। সহিহ মুসলিম : ২১০৯

আবূ তালহাহ্ (রাযিঃ)-এর সানাদে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ফেরেশতাগণ সে গৃহে প্রবেশ করেন না, যে গৃহে কোন কুকুর অথবা কোন (প্রাণীর) ছবি থাকে। সহিহ মুসলিম : ২১০৬

৫৯৫০. মুসলিম (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) মাসরূকের সাথে ইয়াসার ইবনু নুমাইরের ঘরে ছিলাম। মাসরূক ইয়াসারের ঘরের আঙিনায় কতগুলো মূর্তি দেখতে পেয়ে বললেনঃ আমি ’আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে শুনেছি এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, (কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সব থেকে শক্ত শাস্তি হবে তাদের, যারা ছবি তৈরি করে। সহিহ বুখারি : ৫৯৫০, সহিহ মুসলিম : ২১০৯, আহমাদ : ৩৫৫৮

 এ সম্পর্কে আলেমদের মতামত

পুরনো যুগে “ছবি” বলতে মূলত আঁকা ছবি বা ভাস্কর্য বোঝানো হতো। সেগুলো শিরকের মাধ্যম হওয়ায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আধুনিক যুগে ক্যামেরার ছবি/ভিডিও নিয়ে উলামাদের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেক আলেম বলেন, এটি “আসল ছবি আঁকার মতো” নয়, বরং প্রতিফলন (reflection), তাই প্রমাণস্বরূপ, পরিচয়ের প্রয়োজনে, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে জায়েজ। তবে যদি তা অশ্লীলতা, বেপর্দা, পুরুষ-নারীর মিশ্রণ, গায়িকা/বাদ্যযন্ত্র, অপচয় প্রভৃতির সাথে হয়, তাহলে তা স্পষ্টতই হারাম।ইসলামি শরিয়তে ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে ভিডিও ও ছবি তোলার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদের মূল কারণ হলো, ছবি ও ভিডিওর বৈধতা সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।

ক. শর্ত সাপেক্ষে ওয়ালীমায় ভিডিও ও ছবি তোলার জায়েয :

অধিকাংশ আধুনিক আলেম ছবি ও ভিডিওকে জায়েজ মনে করেন, তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে। হাদিসের নিষেধাজ্ঞা ছিল প্রাণীর মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরির জন্য, যা পূজা বা শিরকের উদ্দেশ্যে করা হতো। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা বা ভিডিও করা সেই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। ভিডিও ও ছবি হলো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি, যা হাতে আঁকা ছবি বা মূর্তির মতো নয়। অনেক ইসলামিক কাজ, যেমন শিক্ষার জন্য, দাওয়াতের জন্য, এবং পারিবারিক স্মৃতি রক্ষার জন্য ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি এতে কোনো হারাম কাজ না থাকে, যেমন গান-বাজনা, অশ্লীল দৃশ্য ইত্যাদি, তবে তা বৈধ হতে পারে। অনেক আলোম নিচের শর্তে ছবি করার আনুমতি দিয়েছেণ অনুমোদনযোগ্য শর্তে:

১. কেবল স্মৃতিচারণ বা হালাল উদ্দেশ্যে,

২. যেখানে নারী-পুরুষের মিশ্রণ নেই,

৩. বেপর্দা, অশ্লীলতা বা অপচয়ের দৃশ্য ধারণ করা হয় না।

৪. ভিডিও পরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া যারে না

৫. অনুষ্ঠানে গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র ও অশ্লীল পোশাক থাকা যাবে না।

খ. যারা ছবি ও ভিডিওকে হারাম মনে করেন:

কিছু আলেম, যারা প্রাণীর ছবি আঁকা বা মূর্তি বানানো হারাম মনে করেন, তারা ভিডিও এবং ছবি তোলাকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলেন। তাদের যুক্তি হলো- হাদিসে বর্ণিত ছবি ও মূর্তির নিষেধাজ্ঞা ভিডিও এবং ছবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভিডিওতে অনেক সময় নারীদের অনিয়ন্ত্রিতভাবে দেখানো হয়, যা পর্দার বিধানের পরিপন্থী। এগুলো সাধারণত অহংকার ও অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহৃত হয়।

বর্তমানে ওয়ালীমার অনুষ্ঠানের ভিডিওতে করা হয় তাতে হারাম গান-বাজনা, নারী অশ্লীল দৃশ্য বা কর্মকাণ্ড থাকা খুবই সাভাবিক বিষয়। এ অনুষ্ঠানে নারী ও পুরুষদের আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়না। তাই তাদের ছবি ও ভিডিও তোলার ফলে নারীদের পর্দা লঙ্ঘিত হয়। কোন অপ্রয়োজনীয় ছাড়াই  ছবি ও ভিডিও তোলা হয়,  এর ফলে আর্থিক অপচয় হয়।  ইসলামে অপচয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিবাহ হলো ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মুসলিম নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের একটি পবিত্র চুক্তি। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও বিধি রয়েছে। এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে পালন করা অপরিহার্য। তবে, দুঃখজনকভাবে মুসলিম সমাজে বিবাহের সময় কিছু প্রচলিত প্রথা দেখা যায়, যা ইসলামের বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৯. মুসলিম বিবাহে প্রচলিত কিছু কুপ্রথা

ক. পাত্রী দেখা

পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে ইসলামী নিয়ম হলো, যিনি বিবাহ করবেন, শুধু তিনিই পাত্রীকে দেখতে পারবেন। এর উদ্দেশ্য হলো, পাত্রীকে ভালোভাবে দেখে তার সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। পাত্রীর চেহারা, শারীরিক গঠন এবং অন্যান্য বিষয় দেখা অনুমোদিত। তবে, যারা পাত্রীর মাহরাম নন, তাদের সামনে পাত্রীর যাওয়া জায়েজ নয়। অর্থাৎ, যিনি বিবাহ করবেন, তার সঙ্গে তার বাবা, চাচা বা অন্য পুরুষ আত্মীয়রা থাকলে পাত্রীকে তাদের সামনে পর্দা করতে হবে। অথচ আমাদের সমজে নামাহরাম পুরুষ পাত্রী দেখে থাকে যা হারাম।

উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো পুরুষ অপর (মাহরাম নয়) নারীর সাথে নিঃসঙ্গে দেখা হলেই শয়তান সেখানে তৃতীয় জন হিসেবে উপস্থিত হয়। সুনানে তিরমিজি : ১১৭১, ২১৬৫, মিশকাত : ৩১১৮

২. গায়ে হলুদের রীতি

ইসলামে গায়ে হলুদের কোনো বিধান নেই। এটি মূলত হিন্দুধর্মের একটি প্রথা, যা বর ও কনের পরিবারে আনন্দ এবং উৎসবের জন্য প্রচলিত হয়েছে। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, এই ধরনের প্রথা অনুসরণ করা উচিত নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী পালন করবে, অন্য ধর্মের প্রথা অনুসরণ করে নয়।

(১) গায়ে হলুদের উৎপত্তি ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানটি হিন্দু ধর্মের একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি, যা বৈদিক যুগ থেকে চলে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বর-কনেকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করা এবং তাদের দাম্পত্য জীবনের শুভ কামনা করা। এই ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার-আচরণ ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ ইসলামে সকল প্রকার কুসংস্কার এবং অন্য ধর্মের রীতিনীতি অনুসরণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মুসলিমদের জন্য তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী পালন করা বাধ্যতামূলক।

(২) ইসলামে অন্য ধর্মের প্রথা অনুসরণ

ইসলামে অন্য ধর্মের প্রথা ও আচার-আচরণ অনুসরণ করাকে ‘তাশাব্বুহ’ (সাদৃশ্য গ্রহণ) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এটি নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে-

 ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

গায়ে হলুদ যেহেতু অমুসলিমদের একটি ধর্মীয় প্রথা, তাই এটি পালন করা মুসলিমদের জন্য জায়েজ নয়।

(৩) সৌন্দর্যবর্ধনে হলুদের ব্যবহার

ব্যক্তিগতভাবে সৌন্দর্যের জন্য হলুদ ব্যবহার করা ইসলামী শরিয়তে জায়েজ। অর্থাৎ, যদি বর বা কনে নিজেরা নিজেদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য হলুদ ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। এটি গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের মতো আনুষ্ঠানিক বা দলগতভাবে করার প্রয়োজন নেই। তবে, এটি যেন অন্য ধর্মের রীতিনীতিকে অনুসরণ করে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে হলুদ মাখা এবং অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মের প্রথা অনুসরণ করা এক জিনিস নয়।

(৪) অশ্লীল পোশাক পরিধান করা

এ অনুষ্ঠানে নারীদের পর্দা না করে অশ্লীল পোশাক পরিধান করে অংশ গ্রহণ করে, যা সম্পূর্ণ হারাম।  বিবাহ একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান হলেও ইসলামে এর পবিত্রতা বজায় রাখা উচিত। নারীদের জন্য পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক।

গ. উকিল পিতা বানানো

ইসলামে বিবাহের জন্য অবশ্যই একজন অভিভাবকের (ওয়ালি) অনুমতি প্রয়োজন। যিনি মেয়ের আইনগত অভিভাবক, তিনিই এই দায়িত্ব পালন করবেন। এই দায়িত্ব সাধারণত বাবা পালন করেন। পুর্বে বিস্তারিত আ্লোচন করা হয়েছে যে, বাবার অবর্তমানে দাদা, ভাই, চাচা, বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যিনি মাহরাম, তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে উকিল বানানো শরিয়ত সম্মত নয়, কারণ এটি বিবাহের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বাংলাদেশে অনেক অঞ্চলে বৈধ অভিভাবকে বাদ দিয়ে পরপুরুষকে উকিল পিতা বানোন হয়। যা একটি হারাম কাজ। এ বানানো উকিল পিতা পর্বরতীত ঔ নারীর সাথে পিতার মত আচরন করে। পিতার সাথে কন্যার যেমন মাহরান ঐ বানানো উকিল পিতাও তার সাথে মাহরামের মত মেলামেসা করা, যা পরিস্কার হারাম।

৭৬৬. সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে অন্যকে নিজের পিতা বলে দাবি করে অথচ সে জানে যে সে তার পিতা নয়, জান্নাত তার জন্য হারাম। সহিহ বুখারি : ৪৩২৬, ৬৭৬৬, সহিহ মুসলিম : ৬৩, আহমাদ : ১৫৫

 ঘ. বিয়ে উপলক্ষে রব বা কনের গোসল

ইসলামে পবিত্রতা একটি মৌলিক বিষয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধেক বলেছেন। তাই প্রতিটি মুসলিমকে তার ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতার বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। গোসল হলো শরীরকে পবিত্র করার একটি অন্যতম মাধ্যম। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী গোসল করার কিছু নিয়ম রয়েছে, যা মানা বাধ্যতামূলক। এই নিয়মগুলোর মধ্যে রয়েছে, গোসল করার সময় সতর (শরীরের লজ্জাস্থান) ঢেকে রাখা এবং নামাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ জায়েজ) ব্যক্তির সামনে সতর খোলা না রাখা।

ইসলামে বিয়ের আগে বা পরে বিশেষ কোনো আনুষ্ঠানিক গোসলের প্রথা নেই। এটি সম্পূর্ণই একটি সামাজিক কুপ্রথা, যা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী, একজন পুরুষকে তার মাহরাম (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন মা, বোন, খালা ইত্যাদি) নারী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সামনে সতর খোলা জায়েজ নয়। একইভাবে, একজন নারীকেও তার মাহরাম পুরুষ ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সামনে সতর খোলা জায়েজ নয়।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক গোসল, যা সাধারণত পরিবার বা সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের দ্বারা পরিচালিত হয়, এর পেছনে কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই। এটি মূলত লোকালোকি ও কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে চলে আসছে। ইসলামে এমন কোনো কুপ্রথাকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি, যা শরীয়তের মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করে। মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত, সকল কুসংস্কার ও অনৈসলামিক রীতি-নীতি থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা এবং শুধুমাত্র আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর দেখানো পথে চলা।

বিয়ের আনুষ্ঠানিক গোসল, যেখানে নামাহরাম ব্যক্তিরা বর-কনের গোসলে অংশ নেয়, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বর্জনীয়।

ঙ. নির্দিষ্ট দিন-তারিখ দেখে বিয়ে করা

চন্দ্র বর্ষের কোন মাসে বা কোন দিনে অথবা বর/কনের জন্ম তারিখে বা তাদের পূর্ব পুরুষের মৃত্যুর তারিখে বিবাহ শাদী হওয়া অথবা যে কোন শুভ সৎ কাজ করার জন্য ইসলামী শারী’য়াতে বা ইসলামী দিন তারিখের কোন বিধি নিষেধ নেয়। ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিনকে শুভ বা অশুভ মনে করা হয় না। আল্লাহ তা’আলা সব দিনকেই সমানভাবে সৃষ্টি করেছেন। তাই, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট দিন-তারিখ দেখে বিবাহ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। যেকোনো ভালো দিনে বিবাহ করা যেতে পারে, যখন উভয় পক্ষ রাজি থাকে এবং ইসলামী বিধান অনুসারে সবকিছু প্রস্তুত থাকে।

চ. হিন্দুয়ানী প্রথা

ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে সকল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মুসলিম বিবাহও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলাম চায় তার অনুসারীরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখুক এবং অন্য কোনো ধর্মের রীতিনীতি বা কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকুক।

ইসলামে অন্য ধর্মের আচার-আচরণ বা প্রথা অনুসরণ করাকে ‘তাশাব্বুহ’ বলা হয় এবং এটি নিষিদ্ধ।

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

বাঁশের কুলায় চন্দন, মেহদি, হলুদ, কিছু ধান-দূর্বা ঘাস কিছু কলা, সিঁদুর ও মাটির চাটি নেওয়া, বরকে পিড়িতে বসিয়ে বা সিল-পাটাই দাড় করিয়ে দই-ভাত খাওয়ান ইত্যাদি হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা। এগুলো ব্যবহার করা সরাসরি সেই ধর্মের রীতিনীতিকে অনুসরণ করা। এই ধরনের কাজ মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ইসলামে যেকোনো ধরনের কুসংস্কারের স্থান নেই। বাঁশের কুলা বা সিঁদুরের মতো জিনিসগুলো প্রায়শই কোনো ধরনের অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, যা ইসলামে শিরকের (আল্লাহর সাথে অন্য কিছুকে অংশীদার করা) অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইসলামে সকল প্রকার ক্ষমতা ও কল্যাণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। তাই, কোনো বস্তুকে শুভ বা অশুভ মনে করা এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রথা অনুসরণ করা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের পরিপন্থী।

ছ. ওয়ালীমাতে পটকা-আতশবাজি ফুটান

বিবাহ উৎসবে অথবা অন্য যে কোন উৎসবে পটকা-আতশবাজি ফুটান হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ সকল কাজ অবৈধ ও অপচয়।

আল্লাহু-তা’য়ালা বলেনঃ

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

“নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ।” (সুরা বানী ইসরাঈল : ২৭

জ. নামাহরাম ব্যক্তি কনেকে কোলে তুলে বহন করা।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিবাহের পর কনেকে নামাহরাম ব্যক্তির কোলে তুলে বহন করা একটি অনৈসলামিক ও অত্যন্ত আপত্তিকর কাজ। এই ধরনের প্রথা বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা এবং ইসলামী শরীয়তের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।

নামাহরাম সম্পর্ক ও ইসলামী পর্দা

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাহরাম ব্যক্তি (যাদের সাথে বিবাহ হারাম, যেমন বাবা, ভাই, চাচা) ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে নামাহরাম বলা হয়। বরের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যারা কনের মাহরাম নন, তাদের সামনে কনের নিজেকে উন্মুক্ত রাখা বা তাদের সাথে শারীরিক স্পর্শে আসা ইসলামী পর্দার লঙ্ঘন। কনেকে কোলে তুলে বহন করা এই বিধানকে সরাসরি লঙ্ঘন করে।

বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন, যা আল্লাহর নির্দেশিত পথে সম্পন্ন করা হয়। এর মধ্যে পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক। জনসমক্ষে বা মুরুব্বীদের সামনে একজন নামাহরাম ব্যক্তির দ্বারা কনেকে কোলে তুলে বহন করা চরম বেহায়াপনা ও নির্লজ্জতার পরিচায়ক। ইসলামে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো স্থান নেই। ইসলামী শরীয়ত অনুসারে, স্বামী এবং স্ত্রী একে অপরের জন্য হালাল। কিন্তু অন্যদের সামনে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করা অনুমোদিত নয়। বরের কোলে স্ত্রীর যাতায়াত বা অন্য কোনো নামাহরাম পুরুষের দ্বারা তাকে বহন করা— এই ধরনের প্রথাগুলো ইসলামী বিধানের সীমালঙ্ঘন করে। এগুলি মুসলিম সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিপন্থী।

সুতরাং, এই ধরনের প্রথাগুলো থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা উচিত। বিবাহকে আনন্দপূর্ণ করার জন্য অনেক হালাল উপায় আছে, তবে সেগুলো যেন কখনও ইসলামী বিধানের বাইরে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

ঝ. বিবাহ অনুষ্ঠানে খেজুর ছিটানো, কুড়ানো বা কাড়াকাড়ি করা

এ বিষয়ে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কোনো সহীহ হাদীস নেই। হাদীসগুলোর সনদ অত্যন্ত যয়ীফ এবং সনদে মিথ্যাবাদী রাবী রয়েছে। এজন্য মুহাদ্দিসগণ সেগুলোকে জাল বলে গণ্য করেছেন। তাবারানী, আল-আউসাত ১/৪৪; ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূ‘আত ২/১৭০-১৭২; যাহাবী, মীযানুল ই’তিদাল ২/২৩; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ২/১৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৯০; সুয়ূতী, আল-লাআলী ২/১৬৫-১৬৬; তাহির পাটনী, পৃ. ১২৬।

বিবাহের বিধান সম্পর্কিত কিছু হাদিস :

১. নাবালিকা বিবাহ দেওয়া জায়েয :

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে বিয়ে করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬ বছর এবং নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে বাসর ঘর করেন এবং তিনি তাঁর সান্নিধ্যে নয় বছরকাল ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৩৮৯৪, ৫১৩৩

২.  শিগার বিবাহ নিষিদ্ধ।

ইবনু ’উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিগার বিবাহ নিষিদ্ধ করেছেন। রাবী বলেন, শিগার বিবাহ এই যে, এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে প্রস্তাব দিলো, তুমি আমার সাথে তোমার মেয়েকে অথবা বোনকে বিবাহ দাও এবং তার পরিবর্তে আমি আমার মেয়েকে অথবা বোনকে তোমার সাথে বিবাহ দিবো, আর এতে কোন মাহর থাকে না। সহিহ বুখারী : ৫১১২, ৬৯২০, সহিহ মুসলিম : ১৪১৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৩, সুনানে তিরমিযী ১১২৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৩৪, ৩৩৩৭, ৩৩৩৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৭৪, আহমাদ : ৪৫১২, ৪৬৭৮, ৫২৬৭, মুয়াত্তা মালেক : ১১৩৪, দারেমী : ২১৮০, ইরওয়াহ : ১৮৯৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *