মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
জান্নাত (جَنَّة) :
জান্নাত (جَنَّة) একটি আরবি শব্দ যার শাব্দিক অর্থ হলো বাগান, উদ্যান বা আবৃত স্থান। ফারসি ভাষায় একে বেহেশত এবং বাংলায় একে স্বর্গ বলা হয়। কুরআনে জান্নাত (جَنَّة) এর মূল শব্দ দুই শতাধীক স্থানে ব্যবহৃত হলেও জান্নাত (جَنَّة) শব্দটি কুরআনে প্রায় ১৪৭ স্থানে এসেছে। এই সংখ্যায় এর একবচন, দ্বিবচন এবং বহুবচন উভয় রূপই অন্তর্ভুক্ত। তবে, এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ‘বাগান’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন দুনিয়ার বাগান, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পরকালের পুরস্কার হিসেবে ‘জান্নাত’ বা ‘বেহেশত’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইসলামী পরিভাষায়, জান্নাত হলো এমন একটি স্থান যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর অনুগত ও সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য পরকালে পুরস্কার হিসেবে তৈরি করে রেখেছেন। এটি সাধারণ বাগান নয় বরং এক চিরস্থায়ী বাসস্থান যার বর্ণনা কল্পনাতীত সৌন্দর্য, শান্তি ও প্রাচুর্যে ভরপুর। কুরআন হাদিসে জান্নাতকে এমন এক স্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যেখানে কোনো দুঃখ, কষ্ট, ক্লান্তি বা অসুস্থতা থাকবে না। সেখানে সময় চিরন্তন আনন্দ ও স্বস্তিতে কাটবে। জান্নাতের অধিবাসীরা এমন সব নেয়ামত লাভ করবেন যা তারা পৃথিবীতে কখনো কল্পনাও করেননি।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পার-
فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَہُمۡ مِّنۡ قُرَّۃِ اَعۡیُنٍ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ। সুরা সিজদা:১৩। সহিহ বুখারি: ৩২৪৪, ৪৭৭৯, ৪৭৮০, ৭৪৯৮, সহিহ মুসলিম : ২৮২৪, তিরমিযী ৩১৯৭, ইবনু মাজাহ ৪৩২৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ ১৯৭৮, সহীহুল জামি ৪৩০৭, আবূ ইয়া’লা : ৬২৭৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৩৬৯, শু’আবূল ঈমান : ৩৮২, দারিমী : ২৮২৮, আহমাদ : ৯৬৫৫।
হল ইবনু সা‘দ আস্সা‘য়িদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জান্নাতে চাবুক পরিমাণ সামান্য জায়গাও দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা আছে তার থেকে উত্তম। সহিহ : ৩২৫০
জান্নাতের মধ্যে রয়েছে সুন্দর সবুজে ভরা বাগান, দুধ, মধু ও শরাবের ঝরনা, এবং নানা ধরনের সুস্বাদু ফলমূল। সবচেয়ে বড় নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। সুরা কিয়ামা : ২২-২৩
জান্নাতকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি স্তর তার অধিবাসীর আমল বা সৎকর্মের মানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরকে ‘জান্নাতুল ফিরদাউস’ বলা হয়। এটি এমন এক স্থান, যেখানে পৌঁছানো জীবনের পরম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। জান্নাত কোনো অলৌকিক বা অবাস্তব কল্পনা নয়, বরং এটি একটি বাস্তব স্থান যা আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে তৈরি করেছেন। বিশ্বাসীদের জন্য এটি হলো তাদের পার্থিব জীবনের সকল ত্যাগ ও ধৈর্যের চূড়ান্ত প্রতিদান। জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা মুসলিমদের সৎ পথে চলতে এবং ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে। এটি শুধু একটি পুরস্কারই নয়, বরং তা মানব জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রকাশ।
১. জান্নাত সম্পর্কে সাধারণ ধারণা
জান্নাত এক অতুলনীয় শান্তিনিবাস যা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নজিরবিহীন বাস স্থান। জান্নাতের কোনো কিছুকেই দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। সেখানে সবকিছুই অনন্য এবং অতুলনীয়। এর আলো, সৌরভ, অট্টালিকা, খাবার এবং অন্যান্য সব নেয়ামত মানুষের কল্পনার বাইরে। জান্নাতের অট্টালিকাগুলো সোনা ও রুপার ইঁট দিয়ে তৈরি, যার গাঁথুনি হলো মেশকের সুগন্ধি। এর মাটি জাফরান দ্বারা আবৃত। এই বর্ণনাগুলো প্রতীকী অর্থে জান্নাতের ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের বিশালতা প্রকাশ করে। যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে চিরসুখী হবে, কোনো কষ্ট পাবে না এবং কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তার পোশাক পুরোনো হবে না এবং যৌবনও নষ্ট হবে না। এটি জান্নাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী সুখ ও কষ্টের বিপরীতে জান্নাত হলো চিরস্থায়ী আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের স্থান।
وَاِذَا رَاَیۡتَ ثَمَّ رَاَیۡتَ نَعِیۡمًا وَّمُلۡکًا کَبِیۡرًا
তুমি দেখলে সেখানে দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। সূরা ইনসান : ২০
এই আয়াতটি জান্নাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে:
বিশাল রাজ্য (مُلْكًا كَبِيرًا): জান্নাত শুধু একটি আরামদায়ক স্থান নয়, বরং এটি একটি বিশাল সাম্রাজ্য। মুমিনরা সেখানে তাদের ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু লাভ করবে। প্রতিটি মুমিনকে এমন একটি রাজ্য দেওয়া হবে, যার পরিসীমা হবে বিশাল। এই রাজ্য হবে তার নিজস্ব রাজত্ব, যেখানে তার কোনো কিছুর অভাব থাকবে না।
ভোগ-বিলাস (نَعِيمًا): জান্নাতে প্রতিটি আনন্দের উপকরণ থাকবে, যা মানব মনকে তৃপ্ত করবে এবং চোখকে শীতল করবে। সেখানে থাকবে ফল, খাদ্য, পানীয়, এবং সুন্দর সঙ্গিনী। এই নেয়ামতগুলো শুধু ভোগের জন্য নয়, বরং এর মাধ্যমে মুমিনরা তাদের সব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারবে।
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, বদরের যূদ্ধে হারিসা (রাঃ) আদৃশ্য তীরের আঘাতে শাহাদাতবরণ করলে তার মাতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার অন্তরে হারিসার স্নেহ-মমতা যে কত গভীর তা তো আপনি জানেন। অতএব সে যদি জান্নাত লাভ করে তবে আমি তার জন্য কান্নাকাটি করব না। আর যদি ব্যতিক্রম হয় তবে আপনি অচিরেই দেখতে পাবেন আমি কি করি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি তো নির্বোধ। জান্নাত কি একটি, না কি অনেক? আর সে তো সবচেয়ে উন্নতমানের জান্নাত ফিরদাউসে রয়েছে। তিনি আরও বললেনঃ এক সকাল বা এক বিকাল আল্লাহর রাস্তায় চলা দুনিয়া ও তার মধ্যবর্তী সবকিছুর চাইতে উত্তম। তীরের দু’প্রান্তের দূরত্বের সমান বা কদম পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তৎমধ্যবর্তী সবকিছুর চাইতে উত্তম। জান্নাতের কোন নারী যদি দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করে তবে সমস্ত দুনিয়া আলোকিত ও খুশবুতে মোহিত হয়ে যাবে। জান্নাতি নারীর নাসীফ (ওড়না) দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে উত্তম। সহিহ বুখারী : ৬৫৬৮, সহিহ মুসলিম : ১৮৮৩, সুনানে তিরমিযী : ১৬৪৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২৭৫৬, সুনানে নাসায়ী : ৩১১৯, সহীহুল জামি : ৪১৫১, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৯৮
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে একটি চাবুক রাখা পরিমাণ স্থান গোটা দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, তা থেকে উত্তম। সহহি বুখারী : ৩২৫০, মিশকাত : ৫৬১৩, সুনানে তিরমিযী : ৩০১৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩৩০, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১৯৭৮, সহীহুল জামি : ৬৬৩৫, আবূ ইয়ালা : ৭৫১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪১৭, তবারানী : ৫৬২১, হাকিম : ৩১৭০, বায়হাকী : ১৮৯৬১
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পার-
فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَہُمۡ مِّنۡ قُرَّۃِ اَعۡیُنٍ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ। সুরা সিজদা:১৩। সহিহ বুখারি: ৩২৪৪, ৪৭৭৯, ৪৭৮০, ৭৪৯৮, সহিহ মুসলিম : ২৮২৪, আহমাদ : ৯৬৫৫।
২. জান্নাতে সংখ্যা ও নাম
আমাদের সমাজে ব্যাপকভারে আটটি জান্নাতের নাম উল্লেখ করলেও আসলে সে নামগুলি সবই জান্নাতের গুণবাচক নাম। অবশ্য কোন কোন জান্নাতের নাম স্পষ্টতভাবে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ হয়েছে। আাবার অনেক স্থানে জান্নাতের দরজার কথা বলা হয়েছে। অনেকে ঐ দরজার নামকেই জান্নাতের নাম হিসেবে উল্লেখে করেছেন। একটি সহিহ হাদিসে বুঝা যায জান্নাতের আটি দরজা আছে। ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে তিরমিযী ৫৫, সুনানে নাসায়ী ১৪৮, আহমাদ ১৬৯৪২।
বিভিন্ন তাফসীরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে আটি দরজা মানে আটটি জান্নাত। তবে একটি জান্নাতের আটটি দরজা থাকাও অমূল নয়। কোন কোন মুফাস্সির সরাসরি আটটি জান্নাতের নাম উল্লেখ করেছে। আটটি জান্নাতের নাম ও বর্ণনা কুরআন হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হলো। জান্নাতের নামগুলো হলো-
ক. জান্নাতুল ফিরদাউস (جَنَّةُ الْفِرْدَوْسِ): জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর।
খ. জান্নাতুল আদ্ন (جَنَّةُ عَدْنٍ): চিরস্থায়ী আরামের বাগান।
গ. জান্নাতুন নাঈম (جَنَّةُ النَّعِيْمِ): নেয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বাগান।
ঘ. জান্নাতুল মা’ওয়া (جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ): প্রকৃত আশ্রয়স্থল।
ঙ. জান্নাতুল খুলদ (دَارُ الْخُلْدِ): চিরস্থায়ী নিবাস।
চ. দারুস সালাম (دَارُ السَّلَامِ): শান্তির নিবাস।
ছ. দারুল মুক্বামাহ (دَارُ الْمُقَامَةِ): স্থায়ী বসবাসের স্থান।
জ. দারুল কারার (دَارُ الْقَرَارِ): শেষ পরিণতি বা চূড়ান্ত আবাস।
ক. জান্নাতুল ফিরদাউস
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ
নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সুরা কাহফ : ১০৭
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
الَّذِیۡنَ یَرِثُوۡنَ الۡفِرۡدَوۡسَ ؕ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ
অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা (মুমিনগণ) বসবাস করবে চিরকাল।সুরা মুমিনুন : ১১
হারিসা (রাঃ) জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করেছ
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, হারিসাহ (রাঃ) একজন নও জওয়ান লোক ছিলেন। বদর যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করার পর তাঁর আম্মা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! হারিসাহ আমার কত প্রিয় ছিল আপনি তা অবশ্যই জানেন। সে যদি জান্নাতী হয় তাহলে আমি সবর করব এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশা পোষণ করব। আর যদি ব্যাপার অন্য রকম হয় তাহলে আপনি তো দেখতেই পাবেন, আমি যা করব। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কী হল, তুমি কি অজ্ঞান হয়ে গেলে? জান্নাত কি একটি? জান্নাত অনেকগুলি, সে তো জান্নাতুল ফিরদাউসে রয়েছে। সহিহ বুখারি : ৩৯৮২
জান্নাতুল ফিরদাউস সর্বোচ্চ জান্নাত
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি যে ঈমান আনল, সালাত আদায় করল ও রমাযানের সিয়াম পালন করল সে আল্লাহর পথে জিহাদ করুক কিংবা স্বীয় জন্মভূমিতে বসে থাকুক, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি লোকদের এ সুসংবাদ পৌঁছে দিব না? তিনি বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতে একশ’টি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দু’টি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের মত। তোমরা আল্লাহর নিকট চাইলে ফেরদাউস চাইবে। কেননা এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এও বলেছেন, এর উপরে রয়েছে আরশে রহমান। আর সেখান থেকে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। মুহাম্মদ ইবনু ফুলাইহ্ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে (নিঃসন্দেহে) বলেন, এর উপর রয়েছে আরশে রহমান। সহিহ বুখারি : ২৭৯০, ৭৪২৩
খ. জান্নাতুল আদন
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۖ لَهُمْ فِيهَا مَا يَشَاءُونَ ۚ كَذَٰلِكَ يَجْزِي اللَّهُ الْمُتَّقِينَ
তারা প্রবেশ করবে জান্নাতুল আদন (স্থায়ী জান্নাতসমূহ) যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। তারা চাইবে, তাদের জন্য তার মধ্যে তাই থাকবে। এভাবেই আল্লাহ মুত্তাকীদের প্রতিদান দেন। সুরা নাহল : ৩১
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ۖ وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ
তারা প্রবেশ করবে জান্নাতুল আদন-এ (স্থায়ী জান্নাতসমূহ), যেখানে তাদের স্বর্ণ-নির্মিত কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং যেখানে তাদের পোশাকপরিচ্ছদ হবে রেশমের। (ফাত্বিরঃ ৩৩)
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَٰنُ عِبَادَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّهُ كَانَ وَعْدُهُ مَأْتِيًّا
সেই জান্নাতুল আদন (স্থায়ী জান্নাতসমূহ), যার প্রতিশ্রুতি পরম দয়াময় নিজ দাসদেরকে অদৃশ্যভাবে দিয়েছেন; নিশ্চয় তার প্রতিশ্রুত বিষয় অবশ্যম্ভাবী। সুরা মরিয়াম : ৬১
এ ছাড়া আরো বহু আয়াতে (তাওবা-৭২, রাদ-২৩, ইবরাহীম-৩১, কাহফ-৩১, ত্বহা-৭৬, ফাতির-৩৩, সাদ-৫০, গাফির-৮, সফ-১২, বাইয়েনা-৮) এ জান্নাতের কথা উল্লিখিত হয়েছে।
গ. জান্নাতুন নাঈম
নাঈম মানে সম্পদশালী, সুখময়। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُم بِإِيمَانِهِمْ ۖ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ
নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের রব ঈমানের কারণে তাদেরকে পথ দেখাবেন, জান্নাতুন নাঈম-এ (আরামদায়ক জান্নাতসমূহে) যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। সুরা ইউনুস : ৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتُ النَّعِيمِ
নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে জান্নাতুন নাঈম (সুখের উদ্যান)। সুরা লোকমান : ৮
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتِ النَّعِيمِ
আল্লাহভীরুদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই জান্নাতুন নাঈম (ভোগ-বিলাসপূর্ণ জান্নাত) রয়েছে। কালাম : ৩৪
ইব্রাহীম (আঃ) এই জান্নাত চেয়ে দুআ করে বলেছিলেন-
وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ
আমাকে সুখকর (নাঈম) জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর। সুরা শুয়ারা : ৬৫
ঘ. জান্নাতুল মাওয়া
মা’ওয়া মানে ঠিকানা বা বাসস্থান। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ فَلَہُمۡ جَنّٰتُ الۡمَاۡوٰی نُزُلًۢا بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের বাসস্থান হবে জান্নাত, তারা যা করত তার আপ্যায়ন হিসেবে। সুর সিজদা : ১৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ (13) عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ (14) عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ (15)
অর্থাৎ, নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল। সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার কাছে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত। সুনা নাজম : ১৩-১৫
ঙ. জান্নাতুল খুলদ
খুলদ মানে চিরস্থায়ী। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ اَذٰلِکَ خَیۡرٌ اَمۡ جَنَّۃُ الۡخُلۡدِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ کَانَتۡ لَہُمۡ جَزَآءً وَّمَصِیۡرًا
বল, সেটা উত্তম না জান্নাতুল খুলদ (স্থায়ী জান্নাত), মুত্তাকীদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তা হবে তাদের পুরস্কার ও প্রতাবর্তনস্থল। সুরা ফুরকান : ১৫
সাহাবী ইবনে মাসউদ দুআয় বলেছিলেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ إِيمَانًا لا يَرْتَدُّ , وَنَعِيمًا لا يَنْفَدُ , وَمُرَافَقَةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَعْلَى غُرَفِ جَنَّةِ الْخُلْدِ.
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এমন ঈমান চাই, যা কখনও ফিরে যায় না। এমন নেয়ামত চাই, যা কখনও শেষ হয় না এবং জান্নাতুল খুলদের সর্বোচ্চ কক্ষগুলোতে নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সঙ্গ চাই। সহীহাহ : ২৩০
চ. দারুস সালাম
দারুস সালাম’ মানে শান্তিনিকেতন। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لَهُمْ دَارُ السَّلَامِ عِندَ رَبِّهِمْ ۖ وَهُوَ وَلِيُّهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য রয়েছে দারুস সালাম (শান্তির আলয়) এবং তারা যা করত, তার কারণে তিনি হবেন তাদের অভিভাবক। সুরা আনাম : ১২৭
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَىٰ دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ
আল্লাহ (মানুষ)- কে দারুস সালাম-এর (শান্তির আবাসের) দিকে আহবান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথ প্রদর্শন করেন। সুরা ইউনুস : ২৫
ছ. দারুল মুক্বামাহ
দারুল মুক্বামাহ মানে স্থায়ী। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
الَّذِي أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِن فَضْلِهِ لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٌ
যিনি নিজ অনুগ্রহে, আমাদেরকে দারুল মুক্বামাহ (স্থায়ী আবাস) দান করেছেন; যেখানে আমাদেরকে কোন প্রকার ক্লেশ স্পর্শ করে না এবং স্পর্শ করে না। কোন প্রকার ক্লান্তি। সুরা ফাতির : ৩৫
জ. দারুল কারার
দারুল ক্বারার মানে চিরস্থায়ী আবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ
হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আর নিশ্চয় পরকাল হচ্ছে দারুল কারার (চিরস্থায়ী আবাস)। সুরা মুমিন : ৩৯
এই আটটি জান্নাত ছাড়াও কুরআনে আরও একটি জান্নাতের নামের কথা জানা যায়।
আদ-দারুল আখিরাহ
আদ-দারুল আখিরাহ মানে পরকালের আবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ ۖ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বই আর কিছুই নয় এবং যারা সাবধানতা অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের আবাসই (দারুল আখিরাহ) শ্রেয়, তোমরা কি (তা) অনুধাবন কর না? সুরা আনাম : ৩২
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ
এ পরলোকের আবাস (দারুল আখিরাহ), যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। সুরা কাসাস : ৮৩
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ ۚ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ ۚ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ
আর এ দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং নিশ্চয় আখিরাতের নিবাসই (দারুল আখিরাহ) হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। সুরা আনকাবুত : ৬৪
৩. জান্নাতে দরজা বা গেট :
জান্নাতের গেট সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَسِیۡقَ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا رَبَّہُمۡ اِلَی الۡجَنَّۃِ زُمَرًا ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءُوۡہَا وَفُتِحَتۡ اَبۡوَابُہَا وَقَالَ لَہُمۡ خَزَنَتُہَا سَلٰمٌ عَلَیۡکُمۡ طِبۡتُمۡ فَادۡخُلُوۡہَا خٰلِدِیۡنَ
আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌঁছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভাল ছিলে। অতএব স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ কর’। সূরা যুমার : ৭৩
এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হলো যে, জান্নাতে অনেকগুলো গেট আছে।
উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোন মুসলিম ব্যাক্তি উত্তমরূপে অজু করার পর বলে-
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
“আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তাঁর কোন শারীক নাই, তিনি একক এবং আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।
তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। সে যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা তাতে প্রবেশ করবে। ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে তিরমিযী ৫৫, সুনানে নাসায়ী ১৪৮, আহমাদ ১৬৯৪২।
এ হাদিসের আলোকে বলা হয় জান্নাতের আটটি গেট রয়েছে। গেটগুলো এত বিশাল যে, একটি গেটের দুপাটের মধ্যে দুরত্ব হলো মক্কা থেকে হিজর পর্যন্ত (প্রায় ১১৬০ কিলোমিটার) অথবা মক্কা থেকে বসরা পর্যন্ত (প্রায় ১২৫০ কি.মি)।
ক. আবূ বকর (রা.) সকল দরজা হতে ডাকা হবে
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কেউ আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া ব্যয় করবে তাকে জান্নাতের দরজাসমূহ হতে ডাকা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম। অতএব যে সালাত আদায়কারী, তাকে সালাতের দরজা হতে ডাকা হবে। যে মুজাহিদ, তাকে জিহাদের দরজা হতে ডাকা হবে। যে সিয়াম পালনকারী, তাকে রাইয়্যান দরজা হতে ডাকা হবে। যে সাদাকা দানকারী, তাকে সাদাকার দরজা হতে ডাকা হবে। এরপর আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক, সকল দরজা হতে কাউকে ডাকার কোন প্রয়োজন নেই, তবে কি কাউকে সব দরজা হতে ডাকা হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ। আমি আশা করি তুমি তাদের মধ্যে হবে। সহিহ বুখারি : ১৮৯৭, ২৭৪১, ৩২১৬, ৩৬৬৬, মুসলিম : ১০২৭, ১১৫২, আহমাদ : ৭৬৩৭
খ. রাইয়্যান দরজা থেকে সিয়াম পালনকারীকে ডাকা হবে
সাহাল ইবন সাআদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে একটি গেট রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন সিয়াম পালনকারীরাই শুধু সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। যখন তারা প্রবেশ করবে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না”। সহিহ বুখারি : ১৮৯৬, সহিহ মুসলিম : ১১৫২
গ. জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান ওয়াসিলা
আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুয়াযযিনের আযান শুনলে উত্তরে সে শব্দগুলোরই পুনরাবৃত্তি করবে। আযান শেষে আমার ওপর দরূদ পাঠ করবে। কারণ যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে (এর পরিবর্তে) আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। এরপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ’ওয়াসীলা’ প্রার্থনা করবে। ’ওয়াসীলা’ হলো জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজন পাবেন। আর আমার আশা এ বান্দা আমিই হব। তাই যে ব্যক্তি আমার জন্য ’ওয়াসীলা’র দু’আ করবে, কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে পড়বে। সহিহ মুসলিম : ৩৮৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৩, মিশকাত : ৬৫৭, সুনানে নাসায়ী : ৬৭৮, সুনানে তিরমিযী : ৩৬১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ১৬৯০, ইরওয়া : ২৪২, সহীহ আল জামি : ৬১৩।
৪. জান্নাতের মাঝে বিভিন্ন স্তর হবে
আল্লাহ তায়ালব বলেন-
وَمَن يَأۡتِهِۦ مُؤۡمِنٗا قَدۡ عَمِلَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ فَأُوْلَٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلدَّرَجَٰتُ ٱلۡعُلَىٰ ٧٥
আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সূরা ত্বাহা, : ৭৫
আল্লাহ তায়ালব বলেন-
فَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ عَلَى ٱلۡقَٰعِدِينَ دَرَجَةٗۚ وَكُلّٗا وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡحُسۡنَىٰۚ وَفَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ عَلَى ٱلۡقَٰعِدِينَ أَجۡرًا عَظِيمٗا ٩٥ دَرَجَٰتٖ مِّنۡهُ وَمَغۡفِرَةٗ وَرَحۡمَةٗۚ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمًا
“নিজদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বসে থাকাদের ওপর অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ প্রত্যেককেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আল্লাহ জিহাদকারীদেরকে বসে থাকাদের উপর মহা পুরস্কার দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাঁর পক্ষ থেকে রয়েছে অনেক মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। সূরা নিসা : ৯৫-৯৬
এ সকল আয়াতের সবগুলোতে আমরা দেখতে পেলাম, আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে মর্যাদার বিভিন্ন স্তর রেখেছেন।
উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একশতটি স্তর রয়েছে। প্রতি দুই স্তরের মাঝে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বর্তমান। ফিরদাউস হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু স্তরের জান্নাত, সেখান থেকেই জান্নাতের চারটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয় এবং এর উপরেই (আল্লাহ তা’আলার) আরশ স্থাপিত। তোমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করার সময় ফিরদাউসের প্রার্থনা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩১ মিশকাত : ৫৬১৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৯২২,সহীহুল জামি : ৪২৪৫, আহমাদ : ৮৪০০, শু’আবূল ঈমান : ৪২৫৮
আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতের একশত স্তর (ধাপ) রয়েছে। প্রত্যেক দু স্তরের মাঝখানে রয়েছে একশত বছরের ব্যবধান। সুনানে তিরমিজি : ২৫২৯, সহিহাহ : ৯২২
মু’আয ইবনু জাবাল (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক রামাযানের রোযা রেখেছে, নামায আদায় করেছে এবং বাইতুল্লাহর হাজ্জ আদায় করেছে, বর্ণনাকারী বলেন, মু’আয (রাযিঃ) যাকাতের কথা বলেছেন কি-না আমার মনে নেই, তার অপরাধ ক্ষমা করা আল্লাহ তা’আলার দায়িত্ব হয়ে যায়, চাই সে আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় হিজরত করুক কিংবা আপন জন্মস্থানেই অবস্থান করুক। মু’আয (রাযিঃ) বলেন, আমি কি মানুষের নিকট এই খবর পৌছে দিব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ লোকদেরকে ’আমল করতে ছেড়ে দাও। কেননা, জান্নাতে একশ স্তর রয়েছে। প্রত্যেক দু’স্তরের মাঝখানে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বিদ্যমান। আর সর্বোচ্চ ও সর্বোৎকৃষ্ট জান্নাত হচ্ছে ফিরদাউস। এর উপরেই রয়েছে আল্লাহ তা’আলার আরশ এবং এখান থেকেই জান্নাতের ঝর্ণাসমূহ প্রবাহমান। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করার সময় ফিরদাউসের প্রার্থনা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩০, সহীহাহ : ৯২১