Category Archives: কুরআন ও বিজ্ঞান

মহাবিশ্বের আদি উৎস সম্পর্কে কুরআন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও কুরআন

অনন্ত নক্ষত্ররাজি, অগণিত গ্যালাক্সি এবং সীমাহীন শূন্যতায় ঘেরা এই মহাবিশ্ব মানবজাতির জন্য সবসময়ই এক পরম বিস্ময়ের নাম। মানুষ অনাদিকাল থেকে মহাবিশ্বের জন্ম, এর গঠন এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে আসছে। বিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তার অনেকগুলোই পবিত্র কুরআনুল কারীমে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই ইঙ্গিত করা হয়েছিল। ‘মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ও কুরআন’ বিষয়টি মূলত স্রষ্টার অস্তিত্ব ও তাঁর অসীম ক্ষমতার এক জলজ্যান্ত প্রমাণ।

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে স্বীকৃত তত্ত্ব ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাবিস্ফোরণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাবিশ্ব এক সময় একটি বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল, যা পরে এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআন এই সত্যটিই তুলে ধরেছে—আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একসাথে মিশে ছিল, অতঃপর আল্লাহ তাদের পৃথক করে দিলেন। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানী এডুইন হাবল ১৯২৯ সালে প্রমাণ করেন যে মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ কুরআন সূরা যারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে বহু আগেই ঘোষণা করেছে, *“আমি আকাশ নির্মাণ করিয়াছি আমার ক্ষমতা বলে এবং আমিই ইহাকে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করিতেছি।”*

মহাবিশ্বের স্তম্ভহীন ভারসাম্য রক্ষায় ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির ভূমিকা আজ বিজ্ঞানীদের প্রধান আলোচনার বিষয়। কুরআন বলছে, আকাশমণ্ডলকে আল্লাহ কোনো দৃশ্যমান স্তম্ভ ছাড়াই উচ্চে স্থাপন করেছেন। আবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল যে আমাদের জন্য এক সুরক্ষিত ছাদ হিসেবে কাজ করে এবং মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করে, সেই বৈজ্ঞানিক ধ্রুব সত্যটি সূরা আম্বিয়ায় ‘সুরক্ষিত ছাদ’ (Roof Protected) হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা বাড়লে যে অক্সিজেনের চাপ কমে যায় এবং মানুষের বুক সংকুচিত হয়ে আসে, সেই মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক পরিবর্তনের কথা কুরআনে চমৎকারভাবে রূপক অর্থে বর্ণিত হয়েছে।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বিংশ শতাব্দীতে ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’র মাধ্যমে সময়ের আপেক্ষিকতা বুঝিয়েছিলেন। অথচ কুরআনে আল্লাহর একদিন মানুষের হাজার বছরের সমান কিংবা ফেরেশতাদের চলাচলের গতিতে সময়ের ভিন্নতার কথা বলে এই আপেক্ষিকতার ধারণা আগেই দিয়ে রেখেছে। মহাবিশ্বের প্রতিটি নক্ষত্র ও গ্রহ যে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে (সূরা ইয়াসিন), এই কক্ষপথের ধারণা তৎকালীন আরব সমাজের মানুষের কাছে ছিল অকল্পনীয়। পৃথিবীর গোলাকৃতি এবং দিন-রাত্রির পর্যায়ক্রমিক আবর্তনকে ‘প্যাঁচানো’ বা ‘গুটিয়ে নেওয়া’র (কুরআনের ভাষায় ‘ইউকাওবিরু’) মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে, যা কেবল একটি গোল বস্তুর ক্ষেত্রেই সম্ভব।

মহাবিশ্বের অস্তিত্ব নিয়ে কুরআনের এই উপস্থাপনাগুলো কোনো সাধারণ তথ্য নয়, বরং এটি মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিকে নাড়া দেওয়ার একটি ঐশ্বরিক পদ্ধতি। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যত বেগবান হচ্ছে, কুরআনের আয়াতগুলোর গভীরতা তত বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে। কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর সামঞ্জস্য এটাই প্রমাণ করে যে, এই মহাবিশ্বের একজন মহান পরিকল্পনাকারী আছেন এবং কুরআন তাঁরই অভ্রান্ত বাণী। এই বৈজ্ঞানিক নিদর্শনগুলো মানুষকে অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করে যুক্তিনির্ভর ঈমানের পথে পরিচালিত করে।

মহাবিশ্বের আদি উৎস সম্পর্কে কুরআন

মহাবিশ্বের উৎস ও তার আদিম অবস্থা সম্পর্কে আল-কুরআনে যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের সাথে এক বিস্ময়কর সাদৃশ্য বহন করে। আধুনিক কসমোলজির প্রমিত মডেল (Standard Cosmological Model) দৃঢ়ভাবে নির্দেশ করে যে, আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্ব একসময় একটি অত্যন্ত ঘন, উত্তপ্ত, এবং অস্বচ্ছ গ্যাসীয় সংমিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আল-কুরআন এই আদিম অবস্থাকেই আরবি শব্দ “দুখান” (دُخَانٌ) বা ধূম্রপুঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

১. দুখান (Dukhan): কুরআনে বর্ণিত আদিম অবস্থা

সূরা ফুসসিলাতের আল্লাহ তাআলা মহাবিশ্বের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্ কুরআনে বলেছেন:

ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ وَہِیَ دُخَانٌ فَقَالَ لَہَا وَلِلۡاَرۡضِ ائۡتِیَا طَوۡعًا اَوۡ کَرۡہًا ؕ قَالَتَاۤ اَتَیۡنَا طَآئِعِیۡنَ

অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধূম্রপুঞ্জ বিশেষ। অতঃপর তিনি ওটাকে এবং পৃথিবীকে বললেনঃ তোমরা উভয়ে এসো স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বললঃ আমরা এলাম অনুগত হয়ে। সুরা ফুসসিলাত : ১১

আয়াতে ব্যবহৃত “দুখান” (دُخَانٌ) শব্দটি ধূম্র, ধোঁয়া, বা বাষ্পকে বোঝায়। এই বর্ণনাটি মহাবিশ্বের সেই প্রাথমিক অবস্থা বা প্রাইমরডিয়াল কসমিক সোপ (Primordial Cosmic Soup)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে, যা বিগ ব্যাং-এর পরে এবং নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি গঠিত হওয়ার আগে বিদ্যমান ছিল।

 এটি কোনো সাধারণ ঘরের ধোঁয়া নয়, বরং হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, প্লাজমা এবং আদিম কণাগুলির একটি অত্যন্ত উত্তপ্ত, অস্বচ্ছ এবং গ্যাসীয় মিশ্রণকে নির্দেশ করে। এই আদিম গ্যাসীয় অবস্থা মহাবিশ্বের সৃষ্টির এক অনস্বীকার্য ধাপ।

মহাবিশ্ব আদিতে ধূম্রপুঞ্জ বা গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল। আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণমূলক এবং তাত্ত্বিক উভয়ই, স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, একসময় সমগ্র মহাবিশ্ব ‘ধোঁয়া’ (অর্থাৎ একটি অস্বচ্ছ, অত্যন্ত ঘন এবং উত্তপ্ত গ্যাসীয় সংমিশ্রণ) ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এটি আধুনিক প্রমিত বিশ্বতত্ত্বের একটি অনস্বীকার্য নীতি। বিজ্ঞানীরা এখন সেই ‘ধোঁয়া’র অবশিষ্ট অংশ থেকে নতুন তারা গঠিত হতে দেখতে পান।

রাতে আমরা যে উজ্জ্বল তারাগুলি দেখি, সেগুলি ঠিক যেমন সমগ্র মহাবিশ্ব ছিল, সেই ‘ধোঁয়া’ উপাদানের মধ্যে ছিল।

২. আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের অনস্বীকার্য নীতি

আধুনিক বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ (যেমন কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা CMB) এবং তাত্ত্বিক মডেল উভয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত করেছে যে, একসময় সমগ্র মহাবিশ্ব একটি আদিম গ্যাসীয় অবস্থায় ছিল।

আদিম প্লাজমা:

বিগ ব্যাং-এর প্রাথমিক সম্প্রসারণের পর মহাবিশ্ব যখন শীতল হচ্ছিল, তখন এটি ছিল একটি উত্তপ্ত প্লাজমা (Plasma)-এর সমুদ্র যেখানে নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনগুলি মুক্ত অবস্থায় ছিল। এই অবস্থাটি ছিল অস্বচ্ছ, ঠিক যেন ঘন ধোঁয়া। প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পরে এই প্লাজমা শীতল হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করে, এবং মহাবিশ্ব স্বচ্ছ হয়। এই আদিম প্লাজমা অবস্থাটিই কুরআনে বর্ণিত ‘ধূম্রপুঞ্জ’ বা দুখ Nunn-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

নক্ষত্র গঠনের উৎস :

বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেন যে, রাতের আকাশে আমরা যে উজ্জ্বল নক্ষত্র, গ্রহ এবং গ্যালাক্সি দেখি, সেগুলি সবই এই আদিম ধূম্রপুঞ্জের অবশিষ্ট অংশ থেকেই গঠিত হয়েছে। মহাকর্ষীয় আকর্ষণের প্রভাবে এই আদিম গ্যাসীয় মেঘ বা নেবুলা (Nebulae) ঘনীভূত হতে শুরু করে, ফলে নক্ষত্রের জন্ম হয়। নতুন তারা বা স্টার সিস্টেম গঠনের প্রক্রিয়া আজও মহাজাগতিক গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘের মধ্যে ঘটছে।

পৃথিবী ও আকাশের অভিন্ন উৎস :

মহান আল্লাত তায়ালা বলেন-

اَوَلَمۡ یَرَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَنَّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ کَانَتَا رَتۡقًا فَفَتَقۡنٰہُمَا ؕ وَجَعَلۡنَا مِنَ الۡمَآءِ کُلَّ شَیۡءٍ حَیٍّ ؕ اَفَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ

যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? সুরা আম্বিয়া : ৩০

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে আদিতে আকাশ, সূর্য, নক্ষত্র ও পৃথিবী ইত্যাদি পৃথক সত্তায় ছিল না; বরং সবকিছুই ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল। তখন মহাবিশ্ব ছিল অসংখ্য গ্যাসীয় কণার সমষ্টি। পরবর্তীকালে মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে নক্ষত্র, সূর্য, পৃথিবী ও গ্রহসমূহ সৃষ্টি হয়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানও স্বীকার করে যে, পৃথিবীসহ সৌরজগতের সকল উপাদান মহাজাগতিক ধূলিকণা ও গ্যাসের একটি আদিম মেঘ (Solar Nebula) থেকে ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। এই অভিন্ন উৎসই প্রমাণ করে যে, পৃথিবী এবং আকাশের উপাদানগুলি মূলত একই আদিম পদার্থ থেকে এসেছে।

এই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান যে মহাবিশ্ব আদিতে একটি গ্যাসীয় বা ধূম্রপুঞ্জ অবস্থা থেকে শুরু হয়েছিল— তা মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। এটি কেবল বিংশ শতাব্দীর উন্নত প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং জটিল গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। এমন একটি সময়ে কুরআনের এই নির্ভুল ঘোষণা মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে কুরআনের গভীর এবং ঐশ্বরিক জ্ঞানের এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, বিগ ব্যাং এবং কুরআন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্বের উৎস, গঠন এবং পরিণতি নিয়ে মানুষের কৌতূহল চিরন্তন। আধুনিক বিজ্ঞান বর্তমানে যে তত্ত্বগুলির মাধ্যমে এই রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে, তার মধ্যে বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্ব এবং মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ধারণা সবচেয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত। আশ্চর্যজনকভাবে, প্রায় ১৪৫০ বছর পূর্বে অবতীর্ণ আল-কুরআনের বেশ কিছু আয়াতে এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা তৎকালীন মানুষের জ্ঞানসীমার বাইরে ছিল।

এই প্রবন্ধে, আমরা আল-কুরআনের আয়াত এবং বিশেষত সূরা আয-যারিয়াতের একটি আয়াতের আলোকে মহাবিশ্বের চলমান সম্প্রসারণ, বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূল ধারণা এবং মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ পরিণতি (যেমন: বিগ ক্রাঞ্চ) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। এছাড়াও, মহাবিশ্বের আদি অবস্থা এবং ‘ধোঁয়া’ (Dukhan) ও ‘সংযুক্ত সত্তা’ (Ratq) থেকে সৃষ্টি হওয়ার কুরআনিক বর্ণনাগুলি কীভাবে আধুনিক কসমোলজির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, তা বিশদভাবে তুলে ধরা হবে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা

আধুনিক কসমোলজির এক অপরিহার্য ভিত্তি হলো মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং গতিশীল এবং প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা পায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, কিন্তু কুরআন এটিকে বহু পূর্বেই ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالسَّمَآءَ بَنَیۡنٰہَا بِاَیۡىدٍ وَّاِنَّا لَمُوۡسِعُوۡنَ

আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতা বলে এবং আমি অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী। সুরা জারিয়াত : ৪৭

এই আয়াতে ব্যবহৃত আরবি শব্দ “لَمُوۡسِعُوۡنَ” (লামুসিঊন) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ বলা হয়, শব্দটি (ل) জোর প্রদানকারী (Laam al-Tawkeed) এবং (مُوسِعُونَ – মুসিঊন) সম্প্রসারণকারী শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হলো, আল্লাহ শুধু ‘সম্প্রসারণকারী’ নন, বরং ‘নিশ্চয়ই, আমরা হলাম মহাসম্প্রসারণকারী’ বা ‘বিস্তৃতকারী’। এটি একটি চলমান এবং সক্রিয় প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।

ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যা: প্রথাগতভাবে, মধ্যযুগের মুফাসসিরগণ এই শব্দটির অর্থ করতেন আল্লাহর ক্ষমতা, প্রাচুর্য বা সৃষ্টির বিশালতা বোঝাতে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির পরিসরকে সব সময় প্রশস্ত করছেন।

আধুনিক ব্যাখ্যা : আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান লাভের পর বহু মুফাসসির এবং গবেষক এই আয়াতকে সরাসরি মহাবিশ্বের স্থানিক (Spatial) সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই ব্যাখ্যাটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সাথে সরাসরি মিলে যায়। আল্লাহ মহাবিশ্বকে শুধুমাত্র সৃষ্টিই করেননি, বরং তিনি নিজেই এর সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন প্রভাবশালী গ্রিক দর্শনের প্রভাবে মহাবিশ্বকে স্থির (Static) এবং চিরস্থায়ী মনে করা হতো। এমন একটি সময়ে কুরআনের এই ঘোষণা ছিল সম্পূর্ণ বৈপ্লবিক। এটি কুরআনের ঐশ্বরিক উৎসের প্রতি একটি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ও এডউইন হাবলের বৈপ্লবিক পর্যবেক্ষণ

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেও বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে আমাদের এই মহাবিশ্ব স্থির এবং অপরিবর্তনীয়। কিন্তু ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল (Edwin Hubble) তার শক্তিশালী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই চিরন্তন ধারণাকে বদলে দেন। তিনি প্রমাণ করেন যে মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং এটি প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বতত্ত্ব বা কসমোলজির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল হাবলের তিনটি প্রধান বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে।

১. লাল সরণ (Redshift) মহাকাশের সংকেত

হাবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল দূরবর্তী ছায়াপথগুলোর আলোতে লাল সরণ (Redshift) পর্যবেক্ষণ করা। তিনি যখন মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরির শক্তিশালী টেলিস্কোপ ব্যবহার করে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর বর্ণালী (Spectrum) বিশ্লেষণ করেন, তখন একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেন।

গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর নির্দিষ্ট রেখাগুলো তাদের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে বর্ণালীর লাল প্রান্তের দিকে সরে গিয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, যখন কোনো আলোক উৎস পর্যবেক্ষক থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায় এবং বর্ণালীতে তাকে লাল দেখায়। হাবলের এই পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করে যে, মহাকাশের প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সি আমাদের মিল্কিওয়ে থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটিই ছিল মহাবিশ্ব যে গতিশীল, তার প্রথম অকাট্য প্রমাণ।

২. ডপলার প্রভাব (Doppler Effect) গতির বিজ্ঞান

হাবল তার পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করার জন্য পদার্থবিজ্ঞানের সুপরিচিত ডপলার প্রভাব (Doppler Effect) ব্যবহার করেন। আমরা যেমন দেখি যে, একটি দ্রুতগতির অ্যাম্বুলেন্স আমাদের দিকে এগিয়ে এলে তার শব্দের তীক্ষ্ণতা বেড়ে যায় এবং দূরে চলে গেলে শব্দের তীক্ষ্ণতা কমে যায়, আলোর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটে।

যদি কোনো গ্যালাক্সি আমাদের দিকে আসত, তবে তার আলোতে ‘নীল সরণ’ (Blueshift) দেখা যেত। কিন্তু হাবল দেখলেন প্রায় সব গ্যালাক্সিতেই ‘লাল সরণ’ ঘটছে। যেহেতু মহাকাশের সব দিক থেকেই এই লাল সরণ দেখা যাচ্ছিল, এর অর্থ দাঁড়ায় মহাবিশ্বের স্থান (Space) নিজেই প্রসারিত হচ্ছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রের দিকে নয়, বরং সব বস্তু একে অপরের থেকে দূরে সরে যাওয়ার এক নিরন্তর প্রক্রিয়া।

৩. হাবলের সূত্র (Hubble’s Law): সম্প্রসারণের গাণিতিক রূপ

হাবলের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তার গাণিতিক সূত্র, যা হাবলের সূত্র (Hubble’s Law) নামে পরিচিত। তিনি লক্ষ্য করেন যে, কোনো ছায়াপথ আমাদের থেকে যত বেশি দূরে অবস্থিত, তার দূরে সরে যাওয়ার গতিও তত বেশি। গাণিতিক সমীকরণটি হলো:

u = H0 X d

এখানে u হলো গ্যালাক্সির পিছু হটার গতি, d হলো দূরত্ব এবং H0 হলো হাবল ধ্রুবক।

এই সূত্রটি প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের প্রসারণ অভিন্ন এবং সুশৃঙ্খল। হাবল একটি বেলুনের উদাহরণ দিয়ে এটি বোঝাতেন—একটি ফোলা বেলুনের গায়ে কিছু বিন্দু এঁকে দিলে এবং বেলুনটি আরও ফোলালে যেমন প্রতিটি বিন্দু প্রতিটি বিন্দু থেকে দূরে সরে যায়, মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলোও সেভাবেই স্থান-কালের প্রসারণের কারণে দূরে সরে যাচ্ছে।

এডউইন হাবলের এই পর্যবেক্ষণগুলো বিজ্ঞান জগতে এক মহাবিপ্লব নিয়ে আসে। তার এই কাজের মাধ্যমেই বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়। কারণ, মহাবিশ্ব যদি আজ প্রসারিত হতে থাকে, তবে অতীতে নিশ্চয়ই এটি একটি বিন্দুতে ছিল। হাবলের সূত্রই আধুনিক বিশ্বতত্ত্বে বিগ ব্যাং তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করে এবং স্থির মহাবিশ্বের ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেয়। এই সূত্রের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ একটি পরিমাপযোগ্য ও পরীক্ষণযোগ্য বৈজ্ঞানিক সত্যে পরিণত হয়। হাবল (১৯২৯ খৃ:), প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস, খণ্ড ১৫, সংখ্যা ৩, পৃষ্ঠা ১৬৮–১৭৩।

নোট : কুরআনের “আমরা অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী” ঘোষণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের এই পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূলনীতি :

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ধারণাটি বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূল ভিত্তি। এটি কেবল মহাবিশ্বের চলমান অবস্থাই নয়, বরং এর উৎসের বর্ণনা দেয়। বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্ব আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে গৃহীত বিশ্বতাত্ত্বিক মডেল। বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূলনীতি তিনটি। যথা-

১. একক বিন্দু (Singularity) থেকে শুরু :

বিগ ব্যাং তত্ত্বের যাত্রা শুরু হয় আনুমানিক ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, যখন মহাবিশ্বের সকল বস্তু, শক্তি এবং স্থান-কাল (spacetime) একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র, অসীম ঘন এবং উত্তপ্ত অবস্থায় ঘনীভূত ছিল, যাকে একক বিন্দু (Singularity) বলা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের পরিচিত সূত্রগুলি ভেঙে পড়ে। কল্পনা করুন, আজকের বিশাল মহাবিশ্ব তার সমস্ত উপাদান নিয়ে একটি পিনহেডের চেয়েও ছোট স্থানে আবদ্ধ ছিল। এই একক বিন্দুর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট সূচনা ছিল।

২. মহাবিস্ফোরণ ও প্রসারণ (Expansion) :

একক বিন্দু থেকে মহাবিশ্ব হঠাৎ করেই এক অতি-দ্রুত প্রসারণ বা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। তবে এটি প্রচলিত অর্থে কোনো শূন্যস্থানের মধ্যে বিস্ফোরণ নয়, বরং স্থান (Space) নিজেই প্রসারিত হতে শুরু করে। বিস্ফোরণের প্রথম সেকেন্ডের ভগ্নাংশেই এই প্রসারণ অবিশ্বাস্য গতিতে ঘটে (যাকে মহাজাগতিক স্ফীতি বা Inflation বলা হয়)। প্রসারণের সাথে সাথে মহাবিশ্ব শীতল হতে থাকে এবং এর শক্তি পদার্থে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোয়ার্ক ও ইলেকট্রন থেকে হাইড্রোজেন (H) এবং হিলিয়ামের (He) মতো মৌলিক উপাদানগুলির নিউক্লিয়াস তৈরি হয়, যা ছিল মহাবিশ্বের আদিম উপাদান।

৩. কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) প্রমাণ :

বিগ ব্যাং তত্ত্বের সবচেয়ে জোরালো এবং পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ হলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) বিকিরণ। মহাবিস্ফোরণের প্রায় ৩,৮০,০০০ বছর পর মহাবিশ্ব যখন যথেষ্ট শীতল হয়ে 3000 K-এর নিচে নেমে আসে, তখন ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করে। এই ঘটনাটিকে ডিকাপলিং (Decoupling) বলা হয়, যার ফলে মহাবিশ্ব প্রথমবারের মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে এবং ফোটন বা আলো মুক্তভাবে ভ্রমণ করতে শুরু করে। এই মুক্ত হওয়া আলোই হলো CMB, যা আজ আমরা মহাবিশ্বের সবদিকে একটি অত্যন্ত শীতল (বর্তমানে প্রায় 2.725 K) মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ হিসেবে দেখতে পাই। এটি বিগ ব্যাং-এর অবশিষ্ট তাপের ‘ফসিল প্রমাণ’ হিসেবে কাজ করে।

এই তিনটি নীতি একত্রে বিগ ব্যাং তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে, যা মহাবিশ্বের সৃষ্টির একটি যৌক্তিক ও পর্যবেক্ষণ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।

মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে কুরআনের আলোকপাত :

কুরআন মাজীদের মহাবিশ্বের সৃষ্টির একটি মৌলিক ধাপের প্রতি ইঙ্গিত করে, যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং (Big Bang) তত্ত্বের প্রথম ধারণার সাথে মিলে যায়। এই আয়াতটি সেই সময়ের কথা বলছে যখন আকাশমণ্ডল (আসমানসমূহ) এবং পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে একটি একক সত্তা হিসেবে ছিল, এবং এরপর আল্লাহ সেগুলোকে পৃথক করে দেন। এই দুটি ধারণা, অর্থাৎ ‘একত্রিত থাকা’ এবং ‘বিদীর্ণ করা’, কসমোলজির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে আলোকপাত করে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যের ইঙ্গিত এমন এক সময়ে দেওয়া হয়েছিল, যখন মানুষের কাছে এই জ্ঞান লাভের কোনো উপায় ছিল না, যা কুরআনের ঐশী উৎসের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত। কুরআনের অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَوَلَمۡ یَرَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَنَّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ کَانَتَا رَتۡقًا فَفَتَقۡنٰہُمَا ؕ وَجَعَلۡنَا مِنَ الۡمَآءِ کُلَّ شَیۡءٍ حَیٍّ ؕ اَفَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ

যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম, আর আমি সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না? সুরা আম্বিয়া : ৩০

রতক (رَتْقًا) : একত্রে মিশে থাকা আদি সত্তা

কুরআনের আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ “রতক্বান” (رَتْقًا)-এর অর্থ হলো একত্রিত, সেলাই করা, সংমিশ্রিত, বা ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা (Merged)। এই শব্দটির ব্যবহার মহাবিশ্বের উৎপত্তির প্রথম মুহূর্তের এক গভীর চিত্র তুলে ধরে:

মহাজাগতিক একক বিন্দু : আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে, বিগ ব্যাং-এর পূর্বে সমগ্র মহাবিশ্বের সকল পদার্থ, শক্তি এবং স্থান-কাল একটি অসীম ঘন ও উত্তপ্ত একক বিন্দুতে (Singularity) ঘনীভূত ছিল। এই একক বিন্দুতে কোনো পৃথকীকৃত বস্তু বা কাঠামো ছিল না; সবকিছু ছিল একটি সমজাতীয় এবং সংযুক্ত সংমিশ্রণ। কুরআন এই অবস্থাকেই “আসমানসমূহ ও যমীন ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল” (‘কানাতা রতক্বান’) বাক্যাংশের মাধ্যমে বর্ণনা করে। ২. সমজাতীয় আদি অবস্থা: এই আয়াতটি ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবী (এবং এর উপাদান) এবং আকাশ (গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ) সৃষ্টির আগে একটি একক, অ-পৃথকীকৃত উপাদান বা সত্তা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। এটি আধুনিক বিজ্ঞানের সেই ধারণাকে সমর্থন করে যে, সকল মহাজাগতিক বস্তুর উৎপত্তিস্থল একটিই – আদিম ঘন সংমিশ্রণ। এই জ্ঞান চৌদ্দশো বছর আগে কোনো মানুষের পক্ষে নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করা অসম্ভব ছিল, যা ড. আলফ্রেড ক্রনারের মতো শীর্ষ বিজ্ঞানীর মন্তব্যকে সমর্থন করে। ৩. বিগ ব্যাং-এর পূর্বের অবস্থা: এই ধারণাটি বিগ ব্যাং মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, অর্থাৎ মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট শুরু ছিল। সমস্ত পদার্থ ও শক্তি যখন “রতক্বান” অবস্থায় ছিল, তখন মহাবিশ্ব তার বর্তমান পরিচিত রূপে আসতে পারেনি। এই অবস্থাটি সেই সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যখন স্থান-কাল ধারণাটিও তার জন্মলগ্নে ছিল।

ফাতক (فَتَقْنَا) : বিদীর্ণকরণ ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি

আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি হলো “ফা-ফাতাক্বনা-হুমা” (فَفَتَقْنٰهُمَا), যেখানে “ফাতক্ব” (فَتَقْنَا) শব্দের অর্থ হলো বিদীর্ণ করা, পৃথক করা বা বিচ্ছিন্ন করা (Separated, Split)। এই শব্দটি মহাজাগতিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গতিশীল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে:

বিগ ব্যাং-এর সূচনা: “বিদীর্ণ করে দেওয়া” শব্দটি সরাসরি বিগ ব্যাং নামক মহাবিস্ফোরণের প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে। এটি একটি মুহূর্তের প্রক্রিয়া যেখানে সেই ‘একত্রিত সত্তা’ (রতক্বান) হঠাৎ করে প্রচণ্ড প্রসারণের মাধ্যমে পৃথকীকৃত হতে শুরু করে। এটি কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না, বরং স্থান (Space) নিজেই প্রসারিত হওয়া শুরু করেছিল, যার ফলে আদিম উপাদানগুলি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আকাশ ও পৃথিবীর পৃথকীকরণ: এই ‘ফাতক’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মহাবিশ্বের উপাদানগুলি পৃথক হতে শুরু করে। আদিম গ্যাস ও প্লাজমা শীতল ও ঘনীভূত হয়ে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি এবং অবশেষে পৃথিবী গঠিত হয়। অর্থাৎ, যে একক উপাদান থেকে সবকিছুর উৎপত্তি, সেটি বিদীর্ণ হওয়ার ফলেই আকাশমণ্ডল (আসমানসমূহ) এবং পৃথিবী তার বর্তমান রূপে আলাদা আলাদা কাঠামো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি কুরআনের এই আয়াতের সাথে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মহাবিশ্বের বিবর্তন: এই ‘বিদীর্ণকরণ’ প্রক্রিয়াটি কেবল সৃষ্টির সূচনা নয়, বরং এটি সেই প্রক্রিয়া যা মহাবিশ্বকে তার বর্তমান বিবর্তিত অবস্থায় আসতে সাহায্য করেছে। এই বিদীর্ণকরণই আদিম উপাদানগুলিকে একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যার ফলে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং অন্যান্য ভারী উপাদান সৃষ্টি হয়ে তারা ও গ্রহের জন্ম হয়। কুরআনের এই বর্ণনাটি মহাবিশ্বের উৎস সম্পর্কে এমন একটি সত্য তুলে ধরে, যা পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞান বহু শতক পরে আবিষ্কার করেছে।

ড. আলফ্রেড ক্রনারের মতো শীর্ষ ভূতত্ত্ববিদদের মন্তব্য, যেখানে তিনি বলেন: “চৌদ্দশো বছর আগে যিনি পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে কিছু জানতেন না, তিনি আমার মনে হয়, নিজের মন থেকে এটা বের করতে পারার মতো অবস্থানে ছিলেন না, উদাহরণস্বরূপ, যে পৃথিবী এবং আকাশের উৎপত্তি একই ছিল,” এই আয়াতে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতাকেই তুলে ধরে।

ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) মহাবিশ্বের স্তম্ভহীন ভারসাম্যে

ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) হলো মহাবিশ্বের রহস্যময় উপাদান যা এর প্রায় ৯৫% গঠন করে, তবুও এগুলো অদৃশ্য এবং এখনো খুব সামান্যই বোঝা সম্ভব হয়েছে; ডার্ক ম্যাটার গ্যালাক্সিগুলোর জন্য মহাকর্ষীয় কাঠামো প্রদান করে (তাদের একত্রে ধরে রাখে), অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি একটি বিকর্ষণমূলক শক্তি প্রয়োগ করে যা মহাবিশ্বের প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে। এরা মহাজাগতিক বিপরীত শক্তি হিসেবে কাজ করে মহাবিশ্বের পরিণতি নির্ধারণ করছে। দৃশ্যমান পদার্থ, যেমন নক্ষত্র এবং গ্রহ, মহাবিশ্বের মাত্র ৫% গঠন করে।

ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter)

ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) একটি অদৃশ্য বস্তু যা মহাকর্ষীয়ভাবে মিথস্ক্রিয়া করে কিন্তু আলো নির্গত, শোষণ বা প্রতিফলন করে না।  ডার্ক ম্যাটার একটি “অদৃশ্য আঠা” হিসেবে কাজ করে, যা গ্যালাক্সি এবং গ্যালাক্সি গুচ্ছগুলোকে একত্রে ধরে রাখার জন্য অতিরিক্ত মহাকর্ষ বল প্রদান করে; এটি ব্যাখ্যা করে যে কেন গ্যালাক্সিগুলো কেবল দৃশ্যমান পদার্থের অনুমিত গতির চেয়েও দ্রুত ঘোরে। এটি মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির প্রায় ২৭%।

ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)

ডার্ক এনার্জি (Dark Energy) একটি রহস্যময় শক্তি বা শক্তি ক্ষেত্র যা মহাকাশের সর্বত্র ব্যাপ্ত। এটি মহাবিশ্বের ত্বরান্বিত প্রসারণকে চালিত করে, গ্যালাক্সিগুলোকে একে অপরের থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এটি মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির প্রায় ৬৮%।

ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে কুরআন :

বিশাল এই মহাবিশ্ব কীভাবে কোনো দৃশ্যমান খুঁটি বা স্তম্ভ ছাড়াই টিকে আছে, তা মানবজাতির জন্য চিরকালই এক বিস্ময়ের বিষয়। আধুনিক বিজ্ঞান যখন মহাবিশ্বের গঠন উপাদান নিয়ে গবেষণা শুরু করে, তখন তারা এমন এক রহস্যময় শক্তির সন্ধান পায় যা খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সমগ্র মহাজাগতিক কাঠামোকে ধরে রেখেছে। এই অদৃশ্য শক্তি এবং এর ভারসাম্য রক্ষাকারী ভূমিকা নিয়ে পবিত্র কুরআনে চৌদ্দশ বছর আগেই অত্যন্ত সুনিপুণ ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

দৃশ্যমান স্তম্ভহীন আসমান ও মহাজাগতিক ভারসাম্য

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَللّٰہُ الَّذِیۡ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیۡرِ عَمَدٍ تَرَوۡنَہَا ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ وَسَخَّرَ الشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ یَّجۡرِیۡ لِاَجَلٍ مُّسَمًّی ؕ یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّکُمۡ بِلِقَآءِ رَبِّکُمۡ تُوۡقِنُوۡنَ

আল্লাহ, যিনি খুঁটি ছাড়া আসমানসমূহ উঁচু করেছেন যা তোমরা দেখছ। অতঃপর তিনি আরশে উঠেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়োজিত করেছেন। এর প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে। তিনি সবকিছু পরিচালনা করেন। আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন, যাতে তোমাদের রবের সাক্ষাতের ব্যাপারে তোমরা দৃঢ়বিশ্বাসী হতে পার। সুরা রাদ : ১৩

সাধারণত কোনো বিশাল ছাদ বা কাঠামোকে ধরে রাখতে হলে মজবুত স্তম্ভ বা খুঁটির প্রয়োজন হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের কোটি কোটি গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রপুঞ্জ কোনো দৃশ্যমান খুঁটি ছাড়াই মহাশূন্যে ভাসমান অবস্থায় আছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এই “অদৃশ্য খুঁটি” হলো মহাজাগতিক বল বা শক্তির ভারসাম্য। মহাকর্ষ বল (Gravity) মহাবিশ্বের বস্তুগুলোকে একে অপরের দিকে টেনে আনে। যদি কেবল এই আকর্ষণ বলই কাজ করত, তবে মহাবিশ্বের সবকিছু সংকুচিত হয়ে এক জায়গায় দলা পাকিয়ে যেত। কিন্তু তা হচ্ছে না, কারণ এর বিপরীতে কাজ করছে এক বিশাল অদৃশ্য বিকর্ষণ শক্তি।

২. আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআনে সমস্বয়

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বের মাত্র ৫% সাধারণ পদার্থ যা আমরা দেখতে পাই। বাকি ৯৫% হলো ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)। ডার্ক ম্যাটার অদৃশ্য হলেও এর মহাকর্ষীয় প্রভাব রয়েছে যা গ্যালাক্সিগুলোকে তাদের কক্ষপথে ধরে রাখে। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি বা অদৃশ্য শক্তি মহাবিশ্বকে বাইরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা মহাকর্ষ বলের বিপরীত কাজ করে।

এখানেই কুরআনের সেই “খুঁটি ছাড়া আসমান” ধারণার চমৎকার প্রতিফলন ঘটে। স্তম্ভ যেমন ছাদকে নিচের দিকে পড়তে দেয় না, তেমনি এই অদৃশ্য শক্তিগুলো মহাবিশ্বের উপাদানগুলোকে একে অপরের ওপর আছড়ে পড়তে দেয় না কিংবা ভারসাম্যহীনভাবে হারিয়ে যেতে দেয় না। মহাকর্ষ বল কাছে টানে, আর এই অদৃশ্য শক্তি দূরত্ব বজায় রাখে—এই টানাপোড়েনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে এক নিখুঁত ভারসাম্য।

আসমান ও জমিনের স্থানচ্যুতি রোধ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ اللّٰہَ یُمۡسِکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ اَنۡ تَزُوۡلَا ۬ۚ وَلَئِنۡ زَالَتَاۤ اِنۡ اَمۡسَکَہُمَا مِنۡ اَحَدٍ مِّنۡۢ بَعۡدِہٖ ؕ اِنَّہٗ کَانَ حَلِیۡمًا غَفُوۡرًا

নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনকে ধরে রাখেন যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। আর যদি এগুলো স্থানচ্যুত হয়, তাহলে তিনি ছাড়া আর কে আছে, যে এগুলোকে ধরে রাখবে? নিশ্চয় তিনি পরম সহনশীল, অতিশয় ক্ষমাপরায়ণ। সূরা ফাতির : ৪১

এই ‘ধরে রাখা’ বা ‘স্থানচ্যুত না হওয়া’ বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহাবিশ্বের প্রতিটি গ্যালাক্সি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু এই সরে যাওয়ার হার যদি সুশৃঙ্খল না হতো, তবে মহাবিশ্ব ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। ডার্ক ম্যাটার এখানে একটি আঠার মতো কাজ করে যা গ্যালাক্সিগুলোকে তাদের সীমানার মধ্যে ধরে রাখে, আবার ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বকে স্থবির হতে দেয় না। আল্লাহ তাআলার এই অদৃশ্য ব্যবস্থাপনাই মূলত মহাবিশ্বকে তার নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং অদৃশ্য বিকর্ষণ শক্তির এই বিপরীতমুখী অবস্থানই মহাবিশ্বের স্থায়িত্বের মূল রহস্য। ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জি যদি না থাকত, তবে মহাবিশ্বের বর্তমান ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হতো না। ঠিক যেভাবে একটি অট্টালিকা তার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, মহাবিশ্বও তেমনি এই অদৃশ্য শক্তিগুলোর ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। কুরআনে “বিগাইরি আমাদিন” (খুঁটি ছাড়া) শব্দটির ব্যবহারের মাধ্যমে এই অদৃশ্য পারমাণবিক ও মহাজাগতিক শক্তিগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা মানুষের চর্মচক্ষে ধরা পড়ে না কিন্তু যার অস্তিত্ব আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।

মহাবিশ্বের বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch) বা প্রত্যাবর্তন ও সংকোচন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্বের সৃষ্টি এবং চলমান সম্প্রসারণ যেমন আধুনিক বিজ্ঞানের মূল আলোচ্য বিষয়, তেমনি এর চূড়ান্ত পরিণতি নিয়েও বিশ্বতত্ত্ববিদরা নানা তাত্ত্বিক মডেল তৈরি করেছেন। মজার বিষয় হলো, কুরআন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের (সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭) পাশাপাশি এর সমাপ্তি বা ‘গুটিয়ে ফেলার’ একটি চিত্রও প্রদান করে, যা বিজ্ঞানের সম্ভাব্য সমাপ্তির মডেলগুলির মধ্যে অন্যতম একটির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই ধারণাগুলির মধ্যে একটি হলো বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch), যা একটি চক্রাকার মহাবিশ্বের ইঙ্গিত দেয়।

বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch) বা প্রত্যাবর্তন ও সংকোচনের বৈজ্ঞানিক মডেল

বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch) হলো মহাবিশ্বের সমাপ্তি সম্পর্কে একটি তাত্ত্বিক ধারণা, যা বিগ ব্যাং-এর ঠিক বিপরীত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে বলে ধারণা করা হয়। যদি মহাবিশ্বের গড় ঘনত্ব (Average Density), যা মূলত সকল দৃশ্যমান পদার্থ (নক্ষত্র, গ্যালাক্সি) এবং অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার দ্বারা গঠিত, একটি নির্দিষ্ট সংকট ঘনত্ব (Critical Density)-এর চেয়ে বেশি হয়, তবে মহাকর্ষ বল চূড়ান্তভাবে জয়ী হবে। মহাকর্ষের এই শক্তিশালী আকর্ষণ বল একসময় ডার্ক এনার্জি-জনিত সম্প্রসারণকে থামিয়ে দেবে এবং মহাবিশ্ব উল্টো দিকে চলতে শুরু করবে। এই তত্ত্বটি একটি চক্রাকার মহাবিশ্বের (Cyclic Universe) মডেলকে নির্দেশ করে, যেখানে সৃষ্টি ও বিনাশ একটি চক্রের মতো চলতে পারে। এই মডেল অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতি ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, শূন্যে নেমে আসবে, এবং তারপর মহাকর্ষের প্রভাবে সংকোচন শুরু হবে।

একটি বিগ ক্রাঞ্চের প্রত্যাশিত আচরণের একটি ছবি

এই সংকোচনকালে, আমাদের গ্যালাক্সিগুলি দ্রুত একে অপরের দিকে ধাবিত হবে, দূরত্ব কমতে থাকবে এবং মহাজাগতিক বস্তুর তাপমাত্রা ও ঘনত্ব চরমভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এটি বিগ ব্যাং-এর বিপরীত একটি প্রক্রিয়া। সম্প্রসারণের পরিবর্তে সংকোচন, শীতল হওয়ার পরিবর্তে উত্তপ্ত হওয়া। চূড়ান্ত পরিণতিতে, মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ, শক্তি এবং স্থান-কাল আবার একটি অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত একক বিন্দুতে (Singularity) ফিরে যাবে, যা বিগ ব্যাং-এর ঠিক পূর্বের অবস্থার মতো। যদিও বর্তমানে ডার্ক এনার্জির প্রভাবে ত্বরণশীল সম্প্রসারণের কারণে বিগ ক্রাঞ্চের সম্ভাবনা কম, তবুও এটি মহাবিশ্বের সম্ভাব্য সমাপ্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক মডেল।

বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch) বা প্রত্যাবর্তন ও সংকোচন সম্পর্কে কুরআনের ইঙ্গিত :

বিগ ক্রাঞ্চের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে আল-কুরআনের অন্য আয়াতে মহাবিশ্বের গুটিয়ে ফেলার একটি শক্তিশালী উপমা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوۡمَ نَطۡوِی السَّمَآءَ کَطَیِّ السِّجِلِّ لِلۡکُتُبِ ؕ کَمَا بَدَاۡنَاۤ اَوَّلَ خَلۡقٍ نُّعِیۡدُہٗ ؕ وَعۡدًا عَلَیۡنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیۡنَ

সে দিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। সূরা আম্বিয়া : ১০৪

এই আয়াতটি মহাবিশ্বের শেষ পরিণতির এক সুস্পষ্ট চিত্র প্রদান “লিখিত কাগজপত্র গুটিয়ে ফেলার” উপমাটি নিছক ধ্বংস নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট, পদ্ধতিগত এবং সম্পূর্ণ সংকোচন বা গুটিয়ে ফেলার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। যখন একটি নথি বা লিখিত পত্র গুটিয়ে ফেলা হয়, তখন তার স্থানিক (Spatial) অস্তিত্ব সংকুচিত হয়ে আসে এবং এটি তার আদিম অবস্থায় ফিরে যায়। ঠিক একইভাবে, মুফাসসিরগণ এই আয়াতটিকে মহাবিশ্বের এক মহা-সংকোচন (Great Contraction) বা আদি অবস্থায় প্রত্যাবর্তন-এর দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। এই সংকোচনটি বিগ ক্রাঞ্চের প্রক্রিয়ার সাথে দারুণভাবে মিলে যায়, যেখানে মহাবিশ্বের সমস্ত স্থান ও পদার্থ পুনরায় একটি ঘন বিন্দুতে সংকুচিত হবে।

১৪৫০ বছর আগে, যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান সীমিত ছিল এবং মহাবিশ্বকে সাধারণত স্থির বলে মনে করা হতো, তখন কুরআনের এই ঘোষণা যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের পরে সংকুচিত হতে পারে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে সৃষ্টিকর্তার জ্ঞানে মহাবিশ্বের কেবল সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ নয়, বরং এর চূড়ান্ত পরিণতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই আয়াতটি কেবল কেয়ামতের দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি স্থানের (Space) প্রকৃতি এবং এর গুটিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। কুরআনের এই বর্ণনাটি বিজ্ঞানকে একটি সম্ভাব্য সমাপ্তির ধারণার দিকে পরিচালিত করে, যা মানবজাতির জ্ঞান অর্জনের অনুপ্রেরণা জোগায়।

অনেক মুফাসসির এই আয়াতটিকে মহাবিশ্বের এক মহা-সংকোচন বা গুটিয়ে ফেলার দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। ‘লিখিত কাগজপত্র গুটিয়ে ফেলার’ উপমাটি একটি ব্যাপক সংকোচন এবং আদি অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের চিত্র তুলে ধরে, যা বিগ ক্রাঞ্চ-এর প্রক্রিয়ার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ السَّاعَۃِ اَیَّانَ مُرۡسٰہَا ؕ قُلۡ اِنَّمَا عِلۡمُہَا عِنۡدَ رَبِّیۡ ۚ لَا یُجَلِّیۡہَا لِوَقۡتِہَاۤ اِلَّا ہُوَ ؕۘؔ ثَقُلَتۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ لَا تَاۡتِیۡکُمۡ اِلَّا بَغۡتَۃً ؕ یَسۡـَٔلُوۡنَکَ کَاَنَّکَ حَفِیٌّ عَنۡہَا ؕ قُلۡ اِنَّمَا عِلۡمُہَا عِنۡدَ اللّٰہِ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে, ‘তা কখন ঘটবে’? তুমি বল, ‘এর জ্ঞান তো রয়েছে আমার রবের নিকট। তিনিই এর নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। আসমানসমূহ ও যমীনের উপর তা (কিয়ামত) কঠিন হবে। তা তোমাদের নিকট হঠাৎ এসে পড়বে। তারা তোমাকে প্রশ্ন করছে যেন তুমি এ সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত। বল, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকট আছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’। সুরা আরাফ : ১৮৭

মহাকাশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মহাবিশ্বের এই সংকোচন প্রক্রিয়া যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন নক্ষত্র ও গ্রহগুলোর সংঘর্ষ এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে এক চরম বিশৃঙ্খলা বা ‘কঠিন’ অবস্থার সৃষ্টি হবে। কুরআন বলছে, এই ধ্বংসযজ্ঞের সঠিক সময় আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কিন্তু এটি হবে অত্যন্ত আকস্মিক। এটি কেবল পৃথিবীর বিনাশ নয়, বরং সমগ্র ‘আসমান ও যমীনের’ (মহাকাশ ও পৃথিবী) এক বৈশ্বিক পরিবর্তন।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

یَوۡمَ تُبَدَّلُ الۡاَرۡضُ غَیۡرَ الۡاَرۡضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوۡا لِلّٰہِ الۡوَاحِدِ الۡقَہَّارِ

যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও এবং মানুষ উপস্থিত হবে আললাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী। সুরা ইবরাহিম : ৪৮

এই আয়াতটি নির্দেশ করে যে, বর্তমান মহাবিশ্ব সংকুচিত বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর একটি নতুন জগত বা ‘নতুন পৃথিবী ও আকাশ’ সৃষ্টি করা হবে। আধুনিক বিজ্ঞানের ‘বিগ বাউন্স’ (Big Bounce) তত্ত্বের সাথে এর সাদৃশ্য পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয় যে একটি মহাবিশ্ব সংকুচিত হওয়ার পর পুনরায় নতুনভাবে প্রসারিত হতে পারে। তবে কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নতুন সৃষ্টি হবে বিচার দিবস এবং পরবর্তী জীবনের জন্য।

বর্তমান বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি: বিগ ফ্রিজ ও বিগ রিপ

মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় বিগ ক্রাঞ্চ একটি প্রধান তাত্ত্বিক মডেল হলেও, ১৯৯৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পর বর্তমানে ভিন্ন দুটি মডেল, বিগ ফ্রিজ এবং বিগ রিপ, অধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এই মডেলগুলি মহাবিশ্বের ভাগ্যে ডার্ক এনার্জি নামক এক রহস্যময় উপাদানের ভূমিকা তুলে ধরে।

১. ডার্ক এনার্জির প্রভাব ও সম্প্রসারণের ত্বরণ

১৯৯৮ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী সুপারনোভা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন: মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ কেবল চলমান নয়, বরং এর গতি ত্বরান্বিত (accelerating) হচ্ছে। এই ত্বরণের কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা এক রহস্যময় বল বা শক্তিকে দায়ী করেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)।

ডার্ক এনার্জি মহাকর্ষীয় আকর্ষণের বিপরীতমুখী একটি চাপ সৃষ্টি করে, যা মহাবিশ্বের স্থানকে বাইরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই শক্তি মহাবিশ্বের মোট শক্তি ও ভরের প্রায় ৬৯% গঠন করে বলে ধারণা করা হয়। ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব এবং এর প্রভাব প্রমাণ করে যে, মহাকর্ষীয় আকর্ষণ (যা বিগ ক্রাঞ্চ ঘটাতে পারে) যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ডার্ক এনার্জির অবিরাম ত্বরণশীল প্রভাবে মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হতে থাকবে এবং এই কারণেই বিগ ক্রাঞ্চের ধারণা বর্তমানে বৈজ্ঞানিক মহলে কম গ্রহণযোগ্য।

২. বিগ ফ্রিজ (Big Freeze) বা তাপীয় মৃত্যু

বর্তমানে মহাবিশ্বের সমাপ্তির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল হলো বিগ ফ্রিজ (Big Freeze), যা ইউনিভার্সের তাপীয় মৃত্যু (Heat Death of the Universe) নামেও পরিচিত। এই মডেলটি ডার্ক এনার্জির অবিচ্ছিন্ন, তবে স্থিতিশীল, ত্বরণশীল সম্প্রসারণের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। এই তত্ত্ব অনুসারে:

ক. মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হতে থাকলে, গ্যালাক্সিগুলি একে অপরের থেকে এত দূরে সরে যাবে যে একসময় তারা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং রাতের আকাশ অন্ধকার হয়ে যাবে।

খ. মহাবিশ্বের তাপমাত্রা কমতে থাকবে। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পরে, সকল নক্ষত্রের জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে এবং নতুন নক্ষত্র গঠন বন্ধ হয়ে যাবে।

গ. শেষ পর্যন্ত, সকল কৃষ্ণ গহ্বর (Black Holes) ও অন্যান্য অবশিষ্ট বস্তুও বিলীন হয়ে যাবে। মহাবিশ্ব একটি অত্যন্ত শীতল, অন্ধকার, এবং ফাঁকা স্থানে পরিণত হবে, যেখানে কোনো তাপীয় পার্থক্য বা কার্যকর শক্তি থাকবে না।

এই পরিণতিতে মহাবিশ্ব জমে যাবে এবং কার্যক্ষম শক্তি হারিয়ে ফেলবে, যার ফলে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হবে না।

“মহাবিশ্বের সমাপ্তি সম্পর্কে বেশ কিছু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যার মধ্যে ‘তাপীয় মৃত্যু’ (heat death) অন্যতম জনপ্রিয়।”

৩. বিগ রিপ (Big Rip): চরম বিদীর্ণতা

যদি ডার্ক এনার্জি কেবল স্থিতিশীল না হয়ে আরও অতিমাত্রায় শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান হয়, তবে মহাবিশ্বের সমাপ্তি হতে পারে বিগ রিপ (Big Rip)-এর মাধ্যমে। এটি হলো মহাবিশ্বের চরম বিদীর্ণতার এক নাটকীয় ধারণা। এই মডেলে ডার্ক এনার্জির ঘনত্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ডার্ক এনার্জির এই ক্রমবর্ধমান শক্তি একসময় মহাকর্ষের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। প্রথমে এই শক্তি গ্যালাক্সিগুলিকে ছিন্নভিন্ন করবে। তারপর নক্ষত্র এবং গ্রহগুলিকে তাদের কক্ষপথ থেকে ছিঁড়ে ফেলবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে, ডার্ক এনার্জি এতটাই শক্তিশালী হবে যে এটি অণু, পরমাণু এবং এমনকি মৌলিক কণাগুলিকেও ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দেবে। স্থান-কাল নিজেই তখন ভেঙে পড়বে।

এই ধারণাটি বিগ ফ্রিজের চেয়ে কম সম্ভাব্য হলেও, ডার্ক এনার্জির চরম ক্ষমতাকে তুলে ধরে। যদিও বিজ্ঞান বর্তমানে এই দুটি মডেলকে বেশি সমর্থন করে, কুরআনের আয়াতে ‘গুটিয়ে ফেলার’ ইঙ্গিত থাকা এই সত্যকেই প্রমাণ করে যে সৃষ্টিকর্তার জ্ঞানে মহাবিশ্বের সকল সম্ভাব্য পরিণতিই অন্তর্ভুক্ত।

আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআন–হাদিসের আলোকে মহাবিশ্বের বয়স

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্ব (Universe) মানব বুদ্ধির জন্য এক চিরন্তন বিস্ময়। আদিকাল থেকেই মানুষ আকাশ, নক্ষত্র, গ্রহরাজি ও সময়ের সূচনা সম্পর্কে প্রশ্ন করে এসেছে। “এই বিশ্ব কখন সৃষ্টি হলো?”, “এর বয়স কত?”, “এর সূচনার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা আছে কি?”—এই প্রশ্নগুলো একদিকে যেমন আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু, অন্যদিকে তেমনি ওহীভিত্তিক ধর্মগ্রন্থসমূহের মৌলিক আলোচ্য বিষয়।

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বতত্ত্ব (Cosmology) আজ মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণে অনেকটাই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কুরআন মাজিদ—যা নিজেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চূড়ান্ত গ্রন্থ বলে ঘোষণা করে—মহাবিশ্বের সৃষ্টি, সময়, পর্যায়ক্রম ও পরিমিতির বিষয়ে গভীর ইঙ্গিত প্রদান করেছে। যদিও কুরআন কোনো বিজ্ঞানবই নয়, তথাপি এর বক্তব্যসমূহ আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে বিস্ময়কর সামঞ্জস্য প্রদর্শন করে। এখানে আমরা তিনটি মূল বিষয় আলোচনা করব—

১) আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে মহাবিশ্বের বয়স,

২) কুরআনে মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও সময় সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইঙ্গিত,

৩) হাদিসে সময়, সৃষ্টি ও মহাজাগতিক বাস্তবতার ধারণা।

১. আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে মহাবিশ্বের বয়স

ক. বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও মহাবিশ্বের সূচনা

আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছে একটি অতি ঘন ও অতি উত্তপ্ত অবস্থা থেকে, যাকে বলা হয় বিগ ব্যাং (Big Bang)। এটি কোনো বিস্ফোরণ নয়; বরং সময়, স্থান, পদার্থ ও শক্তির একযোগে সূচনা।

১৯২৯ সালে এডউইন হাবল পর্যবেক্ষণ করেন যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্প্রসারণকে উল্টো পথে অনুসরণ করলে দেখা যায়—একসময় সমস্ত কিছু একটি সূচনাবিন্দুতে কেন্দ্রীভূত ছিল।

আধুনিক বিজ্ঞানের সর্বজনস্বীকৃত তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল বিগ ব্যাং (Big Bang) বা এক মহা-বিস্ফোরণের মাধ্যমে। আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর (১৩৮০ কোটি বছর) আগে এক অতিক্ষুদ্র ও অসীম ঘনত্বের বিন্দু (Singularity) থেকে সময়ের গণনা শুরু হয়।

খ. মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণের পদ্ধতি

বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন—

হাবল ধ্রুবক (Hubble Constant):

গ্যালাক্সির দূরত্ব ও তাদের সরে যাওয়ার গতির ভিত্তিতে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ হার নির্ণয় করা হয়।

কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB):

বিগ ব্যাং-এর প্রায় ৩৮০,০০০ বছর পর নির্গত প্রাচীনতম আলো, যা আজও পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে।

প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইট ও WMAP ডাটা:

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার প্ল্যাঙ্ক মিশনের তথ্য অনুযায়ী মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে।

গ. বয়স নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি

বিজ্ঞানীরা মূলত দুটি প্রধান পদ্ধতির মাধ্যমে মহাবিশ্বের বয়স নির্ধারণ করেছেন:

মহাজাগতিক ক্ষুদ্রতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ (CMB):

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘প্লাঙ্ক’ (Planck) মিশনের মাধ্যমে মহাবিশ্বের আদিম আলো বা বিকিরণ বিশ্লেষণ করে এই বয়স নিশ্চিত করা হয়েছে।

মহাবিশ্বের প্রসারণের হার (Hubble Constant):

এডুইন হাবল প্রমাণ করেছিলেন যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। এই প্রসারণের গতিকে উল্টো দিকে হিসাব করলে (Reverse calculation) আমরা সেই প্রারম্ভবিন্দুতে পৌঁছাতে পারি, যা ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের হিসাব দেয়।

এই হিসাবের মধ্যে সামান্য তারতম্য থাকলেও বৈজ্ঞানিক সমাজে এটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য।

২. কুরআনে মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও সময়: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইঙ্গিত

ক. কুরআনে মহাবিশ্বের সূচনা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا

“কাফিররা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একত্রে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিয়েছি?” সূরা আল-আম্বিয়া: ৩০

এই আয়াতে “রত্‌ক” (সংযুক্ত অবস্থা) ও “ফাত্‌ক” (বিচ্ছিন্নকরণ) শব্দদ্বয় আধুনিক বিগ ব্যাং তত্ত্বের সঙ্গে গভীর সাম profum মিল প্রদর্শন করে।

খ. কুরআনে সময়ের আপেক্ষিকতা

মহাবিশ্বের বয়স বোঝার ক্ষেত্রে কুরআনের সময়-ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

وَإِنَّ يَوْمًا عِندَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ

“নিশ্চয়ই তোমার রবের নিকট একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।” সূরা হাজ্জ: ৪৭

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে—

تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ

“ফেরেশতাগণ ও রূহ তাঁর দিকে আরোহণ করে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।” সূরা আল-মা‘আরিজ: ৪

এখানে স্পষ্ট যে, কুরআনে সময়কে আপেক্ষিক (Relative) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের সঙ্গে বিস্ময়কর সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গ. ‘ছয় দিন’ সৃষ্টি ও সময়ের প্রকৃতি

কুরআনে বহু স্থানে বিশ্বকে ছয় দিন সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছ। যেমন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ وَمَا بَیۡنَہُمَا فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ٭ۖ وَّمَا مَسَّنَا مِنۡ لُّغُوۡبٍ

আর অবশ্যই আমি আসমানসমূহ ও যমীন এবং এতদোভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি। আর আমাকে কোনরূপ ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। সুরা ক্বফ : ৩৮

এখানে ‘ইয়াওম’ (দিন) শব্দটি আরবি ভাষায় নির্দিষ্ট ২৪ ঘণ্টা বোঝাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘ সময়কাল বা পর্যায় বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়। অতএব, কুরআনের “ছয় দিন” বলতে ছয়টি সৃষ্টিপর্ব বা ধাপ বোঝানো হয়েছে—যা আধুনিক বিজ্ঞানের বহু-ধাপের মহাজাগতিক বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কুরআনের সূরা ফুসসিলাত (৯-১২ নং আয়াত) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে:

প্রথম ২ দিন: পৃথিবীর প্রাথমিক সৃষ্টি।

পরবর্তী ৪ দিন: পৃথিবীর পর্বতমালা ও জীবনধারণের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।

মোট ৬ দিন: সমগ্র মহাজাগতিক কাঠামো সমাপ্তিকরণ।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পৃথিবীর বয়স ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর এবং মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর। যদি আমরা মহাবিশ্বের পুরো সময়কালকে কুরআনের ছয়টি পর্যায় বা ‘ইয়াওম’-এ ভাগ করি, তবে গাণিতিকভাবে দেখা যায় যে পৃথিবীর গঠনের সময়কাল এবং মহাবিশ্বের মোট বয়সের অনুপাত কুরআনের দেওয়া সৃষ্টিতাত্ত্বিক ধাপগুলোর সাথে অদ্ভুতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইসলামী পণ্ডিতদের একাংশ “ছয় দিন” এর ব্যাখ্যায় নিম্নোক্ত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন:

১. প্রতীকী ব্যাখ্যা: “দিন” বলতে দীর্ঘ সময়কাল বোঝানো হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক মহাযুগ (Eras) এর সাথে তুলনীয়।

২. সৃষ্টির পর্যায়: কুরআনে বর্ণিত ছয়টি দিনকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির ছয়টি প্রধান পর্যায় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়:

প্রথম দিন: বিগ ব্যাং ও মৌলিক শক্তির সৃষ্টি

দ্বিতীয় দিন: ছায়াপথ গঠন

তৃতীয় দিন: সৌরজগৎ ও পৃথিবী গঠন

চতুর্থ দিন: সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি দৃশ্যমান হওয়া

পঞ্চম দিন: প্রাণের সৃষ্টি

ষষ্ঠ দিন: মানুষ সৃষ্টি

৩. হাদিসে সৃষ্টি, সময় ও মহাজাগতিক বাস্তবতা

ক. সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে হাদিস

 ‘ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার উটনীটি দরজার সঙ্গে বেঁধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তাঁর নিকট তামীম সম্প্রদায়ের কিছু লোক এল। তিনি বললেন, হে তামীম সম্প্রদায়! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। উত্তরে তারা বলল, আপনি তো আমাদের সুসংবাদ দিয়েছেন, এবার আমাদেরকে কিছু দান করুন। একথা দু’বার বলল। অতঃপর তাঁর নিকট ইয়ামানের কিছু লোক আসল। তিনি তাদের বললেন, হে ইয়ামানবাসী! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কারণ বানূ তামীম তা গ্রহণ করেনি। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তা গ্রহণ করলাম। তারা আরো বলল, আমরা দ্বীন সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য আপনার খেদমতে এসেছিলাম। তখন তিনি বললেন, একমাত্র আল্লাহই ছিলেন, আর তিনি ছাড়া আর কোন কিছুই ছিল না। তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে। অতঃপর তিনি লাওহে মাহফুজে সব কিছু লিপিবদ্ধ করলেন এবং আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। এ সময় একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করল, হে ইবনু হুসাইন! আপনার উটনী পালিয়ে গেছে। তখন আমি এর খোঁজে চলে গেলাম। দেখলাম তা এত দূরে চলে গেছে যে, তার এবং আমার মধ্যে মরীচিকাময় ময়দান দূরত্ব হয়ে পড়েছে। আল্লাহর কসম! আমি তখন উটনীটিকে একেবারে ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা করলাম। সহিহ বুখারি : ৩১৯১

এই হাদিসে স্পষ্টভাবে সময় ও স্থান সৃষ্টির আগের বাস্তবতা নির্দেশ করা হয়েছে—যা আধুনিক কসমোলজিতে বিগ ব্যাং-এর পূর্ববর্তী অবস্থা সম্পর্কে আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

খ. তাকদীর ও সৃষ্টির কালক্রম

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে সমস্ত সৃষ্টির তাকদীর লিখে রেখেছেন। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৩

এতে বোঝা যায়, সৃষ্টিজগত একটি সুপরিকল্পিত ও নির্ধারিত নিয়মের অধীন—যা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম ধ্রুবক (Fine-tuning of universe) ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

গ. সময়ের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সাথে সাদৃশ্য

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, সময় পরম নয়; এটি মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র ও বেগের উপর নির্ভরশীল। কুরআনে উল্লিখিত “আল্লাহর দিন” ও মানুষের দিনের পার্থক্য আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার “আ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মহাবিশ্বের প্রাথমিক মুহূর্তগুলোতে সময়ের ধারণা বর্তমান সময়ের ধারণা থেকে ভিন্ন ছিল।

ইসলামী পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীদের কিছু প্রচেষ্টা:

ড. মরিস বুকাইলি: তার “দ্য বাইবেল, দ্য কুরআন অ্যান্ড সায়েন্স” গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন যে কুরআনের সৃষ্টি বর্ণনা আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

ড. জাকির নায়েক: তিনি উল্লেখ করেন যে কুরআনে সৃষ্টির “ছয় দিন” বলতে ছয়টি পর্যায় বোঝায়, যা বৈজ্ঞানিক সৃষ্টি তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শাইখ ইউসুফ আল-কারযাভি: তিনি বলেছেন, “কুরআন বিজ্ঞানের বই নয়, কিন্তু এর বর্ণনা বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না”।

ঘ. বিজ্ঞান ও ওহীর মধ্যে সমন্বয়: সংঘাত নয়, পরিপূরকতা

এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআন বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করতে আসেনি; বরং মানুষকে চিন্তা, গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উৎসাহিত করেছে—

أَفَلَا يَتَفَكَّرُونَ

“তবে কি তারা চিন্তা করে না?”

আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে মহাবিশ্বের বয়সকে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর হিসেবে নির্ধারণ করে, সেখানে কুরআন সময়কে আপেক্ষিক, পর্যায়ভিত্তিক ও আল্লাহর জ্ঞানের অধীন বলে ঘোষণা করে—যার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের কোনো মৌলিক সংঘাত নেই।

মহাবিশ্বের বয়স সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআন–হাদিসের আলোচনাকে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, উভয় উৎস পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। বিজ্ঞান আমাদের বলে কিভাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং তার বয়স কত, আর কুরআন আমাদের জানায় কেন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এবং এর পেছনে কে আছেন।

১৩.৮ বিলিয়ন বছরের এই বিশাল সময়কাল আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও জ্ঞানের এক ক্ষুদ্র নিদর্শন মাত্র। কুরআনের দৃষ্টিতে সময় কোনো চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়; বরং এটি সৃষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং, মহাবিশ্বের বয়স নিয়ে গবেষণা কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়—বরং এটি মানুষকে তার স্রষ্টার দিকে আরও গভীরভাবে মনোনিবেশ করার এক শক্তিশালী মাধ্যম।

সার কথা হলো :

১. মহাবিশ্বের শুরু একটি সুনির্দিষ্ট বিন্দু থেকে (কুরআন ও বিজ্ঞানে সমর্থিত)।

২. সময়ের প্রবাহ স্থান ও কালভেদে ভিন্ন হতে পারে।

৩. সৃষ্টিজগত স্থির নয় বরং প্রসারণশীল, যা এর নির্দিষ্ট বয়স থাকার প্রমাণ দেয়।

 ৪. কুরআনের ‘ছয় দিন’ মূলত মহাজাগতিক

কুরআনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি ও ছয় দিনের রহস্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআন মহান আল্লাহর সৃষ্টিজগত সম্পর্কে এমন ভাষায় আলোচনা করেছে, যা একদিকে ঈমানকে দৃঢ় করে, অন্যদিকে চিন্তা ও গবেষণার দরজা খুলে দেয়। সৃষ্টিজগত ছয় দিনে সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি কুরআনের একাধিক আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ۣالَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ وَمَا بَیۡنَہُمَا فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ ۚۛ اَلرَّحۡمٰنُ فَسۡـَٔلۡ بِہٖ خَبِیۡرًا

যিনি আসমান, যমীন ও উভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আরশে উঠেছেন। পরম করুণাময়। সুতরাং তাঁর সম্পর্কে যিনি সম্যক অবহিত, তুমি তাকেই জিজ্ঞাসা কর। সুরা ফুরকান : ৫৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ وَمَا بَیۡنَہُمَا فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ٭ۖ وَّمَا مَسَّنَا مِنۡ لُّغُوۡبٍ

আর অবশ্যই আমি আসমানসমূহ ও যমীন এবং এতদোভয়ের মধ্যস্থিত সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছি। আর আমাকে কোনরূপ ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। সুরা ক্বফ : ৩৮

وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ وَّکَانَ عَرۡشُہٗ عَلَی الۡمَآءِ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَلَئِنۡ قُلۡتَ اِنَّکُمۡ مَّبۡعُوۡثُوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡمَوۡتِ لَیَقُوۡلَنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ ہٰذَاۤ اِلَّا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ

আর তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর, যাতে তিনি পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে আমলে সর্বোত্তম। আর তুমি যদি বল, ‘মৃত্যুর পর নিশ্চয় তোমাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে’, তবে কাফিররা অবশ্যই বলবে, ‘এতো শুধুই স্পষ্ট যাদু’। সুরা রাদ : ৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ ؕ یَعۡلَمُ مَا یَلِجُ فِی الۡاَرۡضِ وَمَا یَخۡرُجُ مِنۡہَا وَمَا یَنۡزِلُ مِنَ السَّمَآءِ وَمَا یَعۡرُجُ فِیۡہَا ؕ وَہُوَ مَعَکُمۡ اَیۡنَ مَا کُنۡتُمۡ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ

তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশে উঠেছেন। তিনি জানেন যমীনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। সুরা হাদিদ : ৪

এ সব আয়াতে “দিন” (আরবি: يوم / ইয়াওম) শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য কী—এ প্রশ্নটি যুগে যুগে মুফাসসির ও চিন্তাবিদদের ভাবিয়েছে। মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং এর বিবর্তন মানব সভ্যতার চিরন্তন কৌতূহলের বিষয়। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আসমান, যমীন এবং এর মধ্যবর্তী সবকিছু ‘ছয় দিনে’ সৃষ্টি করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান যখন মহাবিশ্বের বয়স বিলিয়ন বিলিয়ন বছর বলে নির্ধারণ করে, তখন সাধারণ মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—এই ‘ছয় দিন’ আসলে কী?

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে এই সময়ের ব্যাপ্তি এবং সৃষ্টির পর্যায়ক্রমিক ধারা এক অনন্য বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে।

১. দিনবা ইয়াওমশব্দের অর্থ ও আপেক্ষিকতা

কুরআনে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘ইয়াওম’ (یوم) মানে কেবল আমাদের পরিচিত ২৪ ঘণ্টার দিন নয়। এর একাধিক অর্থ হতে পারে: একটি সময়কাল, একটি পর্যায় বা একটি দীর্ঘ যুগ (A period of time/epoch)।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সময়ের ধারণা আপেক্ষিক। আলবার্ট আইনস্টাইনের ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ অনুযায়ী, মহাকর্ষ বল এবং গতির পার্থক্যের কারণে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সময়ের গতি ভিন্ন হয়। যেমনটি আমরা জানি,

আধুনিক বিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, দিন ও সময় আপেক্ষিক। পৃথিবীতেই গ্রীষ্ম ও শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য সমান নয়। বাংলাদেশের দিন ও ইংল্যান্ডের দিন এক নয়। উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিনের পার্থক্য আরও স্পষ্ট।গ্রহসমূহের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর—

  • বুধ (Mercury) : ১ দিন ≈ পৃথিবীর ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা
  • শুক্র (Venus) : ১ দিন ≈ পৃথিবীর ১২১ দিন
  • মঙ্গল (Mars) : ১ দিন ≈ পৃথিবীর প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট

এ থেকে বোঝা যায়, মহাবিশ্বে ‘দিন’ কোনো নির্দিষ্ট একক নয়। কাজী জাহান মিয়া যথার্থই বলেছেন—

“কুরআনে ‘ইয়াওম’ বলতে অতি সূক্ষ্ম সময়, মধ্যম সময় ও বিশাল সময়—সবই অন্তর্ভুক্ত।”

এমনকি কুরআনের অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর নিকট একদিন তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَسۡتَعۡجِلُوۡنَکَ بِالۡعَذَابِ وَلَنۡ یُّخۡلِفَ اللّٰہُ وَعۡدَہٗ ؕ وَاِنَّ یَوۡمًا عِنۡدَ رَبِّکَ کَاَلۡفِ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

আর তারা তোমাকে আযাব তরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় এক দিন তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান। সুরা হজ্জ : ৪৭

একইভাবে কুরআনের অন্য স্থানে আল্লাহ তায়াল বলেন-

یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সাজদাহ : ৫

অতএব, মহাবিশ্ব সৃষ্টির ‘ছয় দিন’ বলতে আল্লাহ তাআলা ছয়টি বিশেষ ‘দীর্ঘ সময়কাল’ বা পর্যায়কে বুঝিয়েছেন, যা আমাদের সৌরদিন (Solar Day) থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২. ছয় দিনের বিভাজন : সূরা ফুসসিলাতের গাণিতিক সমন্বয়

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلْ  اَئِنَّکُمْ  لَتَکْفُرُوْنَ بِالَّذِیْ خَلَقَ الْاَرْضَ فِیْ یَوْمَیْنِ وَ تَجْعَلُوْنَ لَہٗۤ  اَنْدَادًا ؕ  ذٰلِكَ رَبُّ  الْعٰلَمِیْنَ ۚ﴿۹﴾ وَ جَعَلَ  فِیْهَا رَوَاسِیَ مِنْ فَوْقِهَا وَ بٰرَكَ فِیْهَا وَ قَدَّرَ فِیْهَاۤ  اَقْوَاتَهَا فِیْۤ  اَرْبَعَۃِ  اَیَّامٍ ؕ سَوَآءً   لِّلسَّآئِلِیْنَ ﴿۱۰﴾ ثُمَّ  اسْتَوٰۤی  اِلَی السَّمَآءِ وَ هِیَ دُخَانٌ فَقَالَ  لَهَا وَ لِلْاَرْضِ ائْتِیَا طَوْعًا  اَوْ كَرْہًا ؕ قَالَتَاۤ   اَتَیْنَا  طَآئِعِیْنَ ﴿۱۱﴾ فَقَضٰهُنَّ سَبْعَ سَمٰوَاتٍ فِیْ یَوْمَیْنِ وَ اَوْحٰی فِیْ کُلِّ سَمَآءٍ  اَمْرَهَا ؕ وَ زَیَّنَّا السَّمَآءَ  الدُّنْیَا بِمَصَابِیْحَ ٭ۖ وَ حِفْظًا ؕ ذٰلِكَ تَقْدِیْرُ  الْعَزِیْزِ  الْعَلِیْمِ ﴿۱۲﴾

বল, ‘তোমরা কি তাঁকে অস্বীকার করবে যিনি দু’দিনে যমীন সৃষ্টি করেছেন? আর তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ বানাতে চাচ্ছ? তিনিই সৃষ্টিকুলের রব’। আর তার উপরিভাগে তিনি দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে বরকত দিয়েছেন, আর তাতে চারদিনে প্রার্থীদের জন্য সমভাবে খাদ্য নিরূপণ করে দিয়েছেন। তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন। তা ছিল ধোঁয়া। তারপর তিনি আসমান ও যমীনকে বললেন, ‘তোমরা উভয়ে স্বেচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় আস’। তারা উভয়ে বলল, ‘আমরা অনুগত হয়ে আসলাম’। তারপর তিনি দু’দিনে আসমানসমূহকে সাত আসমানে পরিণত করলেন। আর প্রত্যেক আসমানে তার কার্যাবলী ওহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন। আর আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপমালার দ্বারা সুসজ্জিত করেছি আর সুরক্ষিত করেছি। এ হল মহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নির্ধারণ। সুরা ফুসসিলাত : ৯-১২

সূরা ফুসসিলাতের এ আয়াতে সৃষ্টির দিনগুলোর একটি বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় :

  • পৃথিবী সৃষ্টি: ২ দিন।
  • পৃথিবীর উপরিভাগ, পর্বতমালা ও খাদ্যের সংস্থান: ৪ দিন।
  • আকাশমণ্ডলী বা সাত আসমান গঠন: ২ দিন।

এখানে অনেকের মনে হতে পারে ২+৪+২=৮ দিন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাফসিরবিদ এবং আধুনিক গবেষকদের মতে, এটি গাণিতিক যোগফল নয়, বরং পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা। যেমন: একজন নির্মাণ শ্রমিক যদি বলেন, “আমি দালানের ভিত্তি গড়তে ২ দিন নিয়েছি এবং পূর্ণ দালানটি গড়তে ৪ দিন নিয়েছি,” তার অর্থ এই নয় যে মোট ৬ দিন লেগেছে। বরং ৪ দিনের মধ্যেই প্রথম ২ দিন অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং, পৃথিবী ও তার রসদ তৈরি করতে মোট সময় লেগেছে ৪ দিন, আর মহাবিশ্বের সামগ্রিক কাঠামো বা আসমানসমূহ পূর্ণ করতে লেগেছে ২ দিন—এই মিলে সর্বমোট ৬ দিন বা ছয়টি যুগ।

৩. আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পর্যায়ক্রমিক মিল

পবিত্র কুরআনের সূরা ফুসসিলাতে বর্ণিত মহাবিশ্ব এবং পৃথিবী সৃষ্টির পর্যায়গুলো আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূতত্ত্বের (Geology) সাথে আশ্চর্যজনকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনটি বিষয়ের সম্পর্কে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো:

ক. প্রাথমিক পর্যায় ও মহাজাগতিক ধোঁয়া (Primordial Smoke)

সূরা ফুসসিলাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: “তারপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন, যখন তা ছিল ধোঁয়া (Dukhan)…”।

আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে ‘ধোঁয়া’ শব্দটি ব্যবহার করা ছিল এক পরম বিস্ময়। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Modern Astronomy) নিশ্চিত করেছে যে, নক্ষত্র ও গ্যালাক্সিগুলো সৃষ্টির আগে সমগ্র মহাবিশ্ব একটি বিশাল উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড এবং ধূলিকণার মেঘ দ্বারা আবৃত ছিল। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘Nebula’ বা ‘Primordial Gas’ বলা হয়।

বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী সময়ে মহাবিশ্ব যখন অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল, তখন হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস একটি ঘন মেঘের মতো ছড়িয়ে ছিল। এই মেঘলা অবস্থাকে বর্ণনা করার জন্য ‘ধোঁয়া’ (Smoke) শব্দটি বিজ্ঞানের ভাষায় অত্যন্ত সঠিক, কারণ এটি গ্যাসীয় এবং কঠিন কণার (Particulate matter) একটি মিশ্রণকে নির্দেশ করে। এই মহাজাগতিক ধোঁয়া থেকেই পরবর্তী কোটি কোটি বছরে নক্ষত্র, গ্রহ এবং ছায়াপথসমূহ ঘনীভূত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। কুরআনের এই ‘ধোঁয়া’ শব্দটি মূলত সৃষ্টির আদিম বা আদি অবস্থা তথা ‘Gaseous stage’-এর একটি নিখুঁত বৈজ্ঞানিক রূপক।

খ. পৃথিবীর শীতলীকরণ ও ভূ-ত্বকের স্থিতিশীলতা

পৃথিবী যখন প্রথম সৃষ্টি হয়, তখন এটি ছিল সূর্যের মতো একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। কোটি কোটি বছর ধরে তাপ বিকিরণ করার পর পৃথিবীর উপরের স্তরটি শীতল হতে শুরু করে। এই শীতলীকরণের ফলে তরল ম্যাগমা কঠিন শিলা বা ভূ-ত্বকে (Crust) পরিণত হয়।

কুরআনে এই পর্যায়কে ‘দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আধুনিক ভূ-তত্ত্ব বা Plate Tectonics তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর উপরিভাগ বা লিথোস্ফিয়ার (Lithosphere) কতগুলো বড় বড় পাতে বিভক্ত। এই পাতগুলোর নড়াচড়া পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারত। কিন্তু পাহাড়গুলোর মূল (Root) মাটির গভীরে ‘পেরেক’-এর মতো প্রোথিত থাকে, যা টেকটোনিক প্লেটগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। কুরআন এই প্রক্রিয়াকে ‘পৃথিবীর উপরিভাগে দৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন’ বলে উল্লেখ করেছে, যা উত্তপ্ত পিণ্ড থেকে একটি বসবাসযোগ্য শক্ত আবরণে পরিণত হওয়ার পর্যায়টিকে নির্দেশ করে। এই শক্ত আবরণ ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব হতো না।

গ. জীবন ও খাদ্যের অনুকূল পরিবেশ (The Provisioning)

সূরা ফুসসিলাতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ চার দিনে (অর্থাৎ চারটি দীর্ঘ পর্যায়ে) পৃথিবীতে খাদ্য নিরূপণ বা নির্ধারণ করেছেন। এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বা Geological Time Scale-এর সাথে চমৎকারভাবে মিলে যায়।

পৃথিবীর ভূ-ত্বক সৃষ্টির পর বায়ুমণ্ডল (Atmosphere) এবং জলমণ্ডল (Hydrosphere) গঠিত হয়। এই সময়ে আগ্নেয়গিরির উদগিরণ এবং মহাজাগতিক প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও পানি জমা হয়। এরপর শুরু হয় সালোকসংশ্লেষণকারী ক্ষুদ্র জীবের উদ্ভব, যা বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন সরবরাহ করে। এই পর্যায়টি ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ, যেখানে উদ্ভিদ জগত থেকে শুরু করে প্রাণীর খাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ ও পরিবেশগত ভারসাম্য তৈরি করা হয়।

বিজ্ঞানের ভাষায়, একে ‘Biogeochemical cycles’ বলা যায়। অর্থাৎ, পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন শুরু হওয়ার আগে কার্বন চক্র, নাইট্রোজেন চক্র এবং জলচক্রের মতো জটিল ব্যবস্থাগুলো আল্লাহ তায়ালা সুনিপুণভাবে সেট করেছিলেন। কুরআনের ‘খাদ্য নিরূপণ’ করার বিষয়টি মূলত পৃথিবীর এই দীর্ঘ প্রস্তুতিকালকেই নির্দেশ করে, যা আধুনিক জীবাশ্ম বিজ্ঞান (Paleontology) এবং জীববিজ্ঞানের আলোকে প্রমাণের দাবি রাখে।

কুরআনের এই বর্ণনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং মহাবিশ্ব ও পৃথিবী গঠনের এক ধারাবাহিক ইতিহাস। ধোঁয়া থেকে শুরু করে পৃথিবীর পিঠ শীতল হওয়া এবং পরিশেষে খাদ্যের সংস্থান—এই পর্যায়ক্রমিক ধারাটি প্রমাণ করে যে কুরআন সেই সত্তার বাণী যিনি এই বিশাল মহাবিশ্বের নকশা করেছেন।

মহাপ্রজ্ঞাবানের নির্ধারণ : কুরআনে বর্ণিত ছয় দিন বা ছয়টি সময়কাল আসলে মহাবিশ্ব বিবর্তনের ছয়টি মহাযুগ। আধুনিক কসমোলজি মহাবিশ্বের সৃষ্টিকে বিগ ব্যাং থেকে আজ পর্যন্ত প্রধান কয়েকটি যুগে (যেমন: Radiation Era, Matter Era ইত্যাদি) ভাগ করে, যা কুরআনের ‘ছয়টি ইয়াওম’-এর ধারণাকে সমর্থন করে। কাজী জাহান মিয়া যেমনটি বলেছেন-

 কুরআন ‘ইয়াওম’ বলতে অতি সূক্ষ্ম সময় থেকে বিশাল সময়—সবই অন্তর্ভুক্ত করে। মহাবিশ্বের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। বরং এটি যে একজন “মহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নির্ধারণ,” তা আজ বিজ্ঞান ও ধর্ম উভয়ের নিকট দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই মহাবিশ্ব আমাদের জন্য এক খোলা কিতাব, যা পাঠ করলে স্রষ্টার মাহাত্ম্য আর তাঁর অসীম জ্ঞানের কাছে মাথা নত হয়ে আসে।

সময়ের আপেক্ষিকতা সম্পের্কে কুরআনের  বিস্ময়কর উপস্থাপনা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সময়ের ধারণা নিয়ে মানুষের আদিম কৌতূহল চিরন্তন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ বিশ্বাস করে আসছিল যে সময় একটি ধ্রুব বা স্থির বিষয়, যা মহাবিশ্বের সব জায়গায় একইভাবে প্রবাহিত হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন প্রমাণ করেন যে, সময় স্থির নয় বরং আপেক্ষিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধুনিক বিজ্ঞানের এই জটিল তত্ত্বটি আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

১. আধুনিক বিজ্ঞানে সময়ের আপেক্ষিকতা

১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তার ‘স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি’ (Special Theory of Relativity) এবং পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে ‘জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি’র মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে সময় একটি চতুর্থ মাত্রা। তাঁর মতে, সময় নির্ভর করে পর্যবেক্ষকের গতি বা বেগ এবং মহাকর্ষীয় বলের ওপর।

সহজ কথায়, কোনো বস্তু যদি আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ভ্রমণ করে, তবে তার জন্য সময় ধীর হয়ে যায় (Time Dilation)। একইভাবে, প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রেও সময় ধীরগতিতে চলে।

উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর সমতলে যে গতিতে সময় চলে, কোনো কৃষ্ণগহ্বরের (Black Hole) কাছে বা মহাকাশের উচ্চতায় সেই গতি এক থাকে না। আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এবং জিপিএস সিস্টেম থেকে শুরু করে আধুনিক মহাকাশ গবেষণায় এর প্রয়োগ অপরিহার্য।

আল-কোরআনে সময়ের আপেক্ষিকতার প্রতিফলন

যে সময় আইনস্টাইন এই তত্ত্ব দেন, তখন উন্নত গবেষণাগার বা টেলিস্কোপ ছিল। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীতে আরবের মরুভূমিতে নাজিল হওয়া কোরআনে যখন সময়ের এই পার্থক্যের কথা বলা হয়, তখন সেটি ছিল মানব চিন্তার অতীত। কোরআনের বেশ কিছু আয়াতে সময় যে স্থান ও প্রেক্ষাপট ভেদে আলাদা হতে পারে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে।

১. এক দিন সমান ১০০০ বছর

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَسۡتَعۡجِلُوۡنَکَ بِالۡعَذَابِ وَلَنۡ یُّخۡلِفَ اللّٰہُ وَعۡدَہٗ ؕ وَاِنَّ یَوۡمًا عِنۡدَ رَبِّکَ کَاَلۡفِ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

আর তারা তোমাকে আযাব তরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা খেলাফ করেন না। আর তোমার রবের নিকট নিশ্চয় এক দিন তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান। সুরা হজ্জ : ৪৭

একইভাবে কুরআনের অন্য স্থানে আল্লাহ তায়াল বলেন-

یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সাজদাহ : ৫

২. এক দিন সমান ৫০,০০০ বছর

সময়ের এই প্রসারণ বা পার্থক্য আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে সুরা আল-মা’আরিজে। সেখানে ফেরেশতা এবং রূহের ভ্রমণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে-

تَعۡرُجُ الۡمَلٰٓئِکَۃُ وَالرُّوۡحُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗ خَمۡسِیۡنَ اَلۡفَ سَنَۃٍ ۚ

ফেরেশতাগণ ও রূহ এমন এক দিনে আল্লাহর পানে ঊর্ধ্বগামী হয়, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। সুরা মায়ারিজ : ৪

পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে, ফেরেশতারা যদি অত্যন্ত উচ্চ গতিতে (আলোর গতির কাছাকাছি) ভ্রমণ করেন, তবে তাদের একদিন পৃথিবীর ৫০,০০০ বছরের সমান হওয়া তত্ত্বীয়ভাবে সম্ভব। এটি সময়ের আপেক্ষিকতার এক অনন্য উদাহরণ।

মানুষের উপলব্ধিতে সময়ের আপেক্ষিকতা

কোরআন কেবল মহাজাগতিক হিসেবেই নয়, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধিতেও সময়ের আপেক্ষিকতার কথা বলেছে। পরকালে বিচারের দিন মানুষকে যখন জিজ্ঞাসা করা হবে তারা পৃথিবীতে কতদিন ছিল, তখন তাদের উত্তর হবে বিস্ময়কর। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قٰلَ  كَمْ  لَبِثْتُمْ  فِی الْاَرْضِ عَدَدَ  سِنِیْنَ ﴿۱۱۲﴾ قَالُوْا لَبِثْنَا یَوْمًا اَوْ بَعْضَ یَوْمٍ فَسْـَٔلِ  الْعَآدِّیْنَ ﴿۱۱۳﴾

আল্লাহ বলবেন, ‘বছরের হিসাবে তোমরা যমীনে কত সময় অবস্থান করেছিলে?’ তারা বলবে, ‘আমরা একদিন বা দিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি; সুতরাং আপনি গণনাকারীদেরকে জিজ্ঞাসা করুন।’ সুরা মুমিনুন : ১১২-১১৩

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছালে মানুষের কাছে পৃথিবীর দীর্ঘ জীবনকেও অতি সামান্য মনে হবে। বর্তমানের ‘সাইকোলজিক্যাল টাইম’ গবেষণাতেও দেখা গেছে যে, আনন্দ বা কষ্টের তীব্রতায় মানুষের সময়ের উপলব্ধি বদলে যায়।

বিজ্ঞান ও ঐশী বাণীর মিলনসূত্র

আইনস্টাইনের সূত্র মতে কোন বস্তুর গতি বাড়লে সময় সংকুচিত হয়। অথচ কোরআনে কোনো গাণিতিক সমীকরণ ছাড়াই এই সত্যটি প্রকাশ করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর আগে কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না যে, পৃথিবীর একদিন অন্য কোনো মাত্রায় হাজার বছর বা পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান হতে পারে।

উপসংহার : সময়ের আপেক্ষিকতা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার এবং কোরআনের বর্ণনার মধ্যে যে অভূতপূর্ব মিল পাওয়া যায়, তা কোনো কাকতালীয় বিষয় হতে পারে না। এটি প্রমাণ করে যে, কোরআন কোনো সাধারণ মানুষের লেখা গ্রন্থ নয়, বরং এটি সেই সত্তার বাণী যিনি সময় এবং স্থানের ঊর্ধ্বে। আজ বিজ্ঞান যা প্রমাণ করছে, কোরআন তা ১৪০০ বছর আগেই মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়ে তার ঐশী সত্যতার স্বাক্ষর রেখেছে।

কুরআনে কক্ষপথ ও মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিশাল এই মহাবিশ্ব এক পরম বিস্ময়। আদি দিগন্তহীন মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি গ্রহ, নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা মানবমনকে যুগে যুগে ভাবিয়ে তুলেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষের এই যুগে আমরা জানতে পেরেছি যে, মহাকাশের প্রতিটি বস্তু এক একটি নির্দিষ্ট পথে বা কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে যখন বিজ্ঞানের কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ছিল না, তখন পবিত্র কুরআনে এই ‘কক্ষপথ’ বা ‘অরবিট’ সম্পর্কে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানব রচিত গ্রন্থ নয়, বরং মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক অলৌকিক কিতাব। কুরআনের বর্ণনায় কক্ষপথ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সূর্য, চন্দ্র এবং মহাকাশীয় বস্তুসমূহের গতিবিধি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ الَّیۡلَ وَالنَّہَارَ وَالشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ فِیۡ فَلَکٍ یَّسۡبَحُوۡنَ

আর তিনিই রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে। সূরা আল-আম্বিয়ার ৩৩

এখানে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘ইয়াসবাহুন’ (yasbahūn) এর আভিধানিক অর্থ হলো ‘সাঁতার কাটা’ বা ‘সন্তরণ করা’। মহাকাশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহাকাশীয় বস্তুগুলো যখন তাদের কক্ষপথে ঘোরে, তখন তারা কোনো স্থির অবলম্বনের ওপর দিয়ে যায় না, বরং শূন্যে ভেসে চলে—যা অনেকটা পানির মধ্যে কোনো বস্তুর ভেসে চলার মতো।

অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে-

وَالشَّمۡسُ تَجۡرِیۡ لِمُسۡتَقَرٍّ لَّہَا ؕ  ذٰلِکَ تَقۡدِیۡرُ الۡعَزِیۡزِ الۡعَلِیۡمِ ؕ

আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলছে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের স্থিরীকৃত বিধান। সূরা ইয়াসিন : ৩৮

এই আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ কক্ষপথে সচল এবং তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্য রয়েছে।

মহাবিশ্বের দিকে তাকালে মানুষ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়। অসংখ্য তারা, গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু ও ছায়াপ, সবকিছু যেন এক অদৃশ্য নিয়মে আবদ্ধ। এই নিয়মের অন্যতম প্রধান দিক হলো কক্ষপথ। প্রতিটি মহাজাগতিক বস্তু একটি নির্দিষ্ট পথ বা কক্ষপথে নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান যে সত্যগুলো আজ আবিষ্কার করেছে, পবিত্র কোরআন সেগুলো বহু শতাব্দী আগেই স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে।

একসময় মানুষ মনে করত সূর্য স্থির, আর গ্রহগুলো শুধু তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে—সূর্য নিজেও স্থির নয়। এটি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট পথে অগ্রসর হচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গণনা অনুযায়ী, সূর্য প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৭,২০,০০০ কিলোমিটার গতিতে “সোলার অ্যাপেক্স” নামক একটি দিকের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যার অভিমুখ ভেগা (Vega) তারার দিকে। এর ফলে সূর্য প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭২ লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। শুধু সূর্যই নয়—তার মহাকর্ষীয় প্রভাবে আবদ্ধ সমস্ত গ্রহ ও উপগ্রহও একই সঙ্গে এই মহাজাগতিক যাত্রায় অংশ নিচ্ছে।

কুরআন শুধু সূর্য ও চন্দ্রের কথাই বলেনি; বরং সমগ্র আকাশমণ্ডলীর গতিপথের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—

وَالسَّمَآءِ ذَاتِ الۡحُبُکِ ۙ

“পথ ও কক্ষপথ বিশিষ্ট আকাশমণ্ডলীর শপথ। সূরা যারিয়াত : ৭

এই আয়াতে ব্যবহৃত “حُبُك” শব্দটি বহুবিধ অর্থবহ—এর মধ্যে রয়েছে সুসংগঠিত পথ, বুনন, শৃঙ্খলা ও নিখুঁত নকশা। আধুনিক বিজ্ঞান আজ বলছে, মহাবিশ্বে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ছায়াপথ রয়েছে, এবং প্রতিটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ২০০ বিলিয়ন তারা। এই তারাগুলোর অধিকাংশের চারপাশে গ্রহ রয়েছে, আর সেই গ্রহগুলোরও উপগ্রহ রয়েছে। প্রত্যেকটি বস্তুই তার নিজস্ব কক্ষপথে এমন নিখুঁতভাবে চলাচল করছে যে লক্ষ লক্ষ বছরেও সামান্য বিচ্যুতি দেখা যায় না।

এই শৃঙ্খলা কেবল গ্রহ বা তারাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ধূমকেতুরাও নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, হ্যালির ধূমকেতু প্রতি প্রায় ৭৬ বছর পরপর পৃথিবীর কাছ দিয়ে অতিক্রম করে। এর কক্ষপথ এতটাই নির্ভুল যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা এর আগমন ও প্রস্থান সময় নির্ভুলভাবে হিসাব করতে পারছেন। যদি এই কক্ষপথে সামান্য বিশৃঙ্খলাও থাকত, তাহলে এমন পূর্বাভাস সম্ভব হতো না।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—ছায়াপথগুলিও একে অপরের তুলনায় নির্দিষ্ট গতিপথে অগ্রসর হচ্ছে। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হলেও এই সম্প্রসারণ কোনো বিশৃঙ্খল বিস্ফোরণ নয়; বরং এটি সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। এই বিপুল গতিবিধির মাঝেও মহাজাগতিক বস্তুগুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না—এটি এক অতুলনীয় শৃঙ্খলার প্রমাণ।

যখন কোরআন নাজিল হয়েছিল, তখন মানুষের কাছে দূরবীন, টেলিস্কোপ, মহাকাশযান বা আধুনিক পদার্থবিদ্যার জ্ঞান ছিল না। তখন আকাশ পর্যবেক্ষণ মানেই ছিল খালি চোখে তারা দেখা। তবুও সেই সময়েই কোরআন ঘোষণা করেছিল—আকাশ পথ ও কক্ষপথ দ্বারা পরিপূর্ণ। আজকের বিজ্ঞান সেই ঘোষণার সত্যতা একে একে প্রমাণ করছে।

অতএব, মহাবিশ্বের এই নিখুঁত কক্ষপথ ও শৃঙ্খলা কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়; এটি ঈমানেরও এক গভীর নিদর্শন। এত বিশাল, জটিল ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা কোনো অন্ধ দুর্ঘটনার ফল হতে পারে না। যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এর প্রতিটি কণাকে নির্দিষ্ট পথ ও নিয়মে পরিচালিত করছেন। সেই সত্তাই হলেন আল্লাহ—পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ এবং মহাপ্রজ্ঞাময়।

পৃথিবীর গোলাকৃতি ও  কুরআন বিস্ময়কর সামঞ্জস্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মানব সভ্যতার ইতিহাসে পৃথিবীর আকার নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে নানা বিতর্ক ও ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করত যে পৃথিবী সমতল এবং এর একটি শেষ প্রান্ত রয়েছে। এমনকি সপ্তম শতাব্দীতেও, যখন পবিত্র কুরআন নাজিল হচ্ছিল, তখন তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারণা ছিল পৃথিবী একটি স্থির সমতল ভূমি। কিন্তু এই অন্ধকার যুগেও পবিত্র কুরআন এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের ‘পৃথিবীর গোলাকৃতি’র ধারণাকে নিখুঁতভাবে সমর্থন করে।

১. ‘তাকভীরশব্দের অলৌকিকত্ব

কুরআনের রাত ও দিনের পরিক্রমা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন-

خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ بِالۡحَقِّ ۚ یُکَوِّرُ الَّیۡلَ عَلَی النَّہَارِ وَیُکَوِّرُ النَّہَارَ عَلَی الَّیۡلِ وَسَخَّرَ الشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ یَّجۡرِیۡ لِاَجَلٍ مُّسَمًّی ؕ اَلَا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفَّارُ

তিনি যথাযথভাবে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাতকে দিনের উপর এবং দিনকে রাতের উপর জড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন সূর্য ও চাঁদকে। প্রত্যেকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চলছে। জেনে রাখ, তিনি মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। সুরা যুমাহ : ৫

এই আয়াতে ‘আবর্তন করানো’ বা ‘পেঁচিয়ে দেওয়া’ অর্থে আরবি ‘তাকভীর’ (Takwir) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি ভাষায় এই শব্দটি মূলত তখনই ব্যবহৃত হয়, যখন কোনো জিনিসকে অন্য একটি গোলাকার বস্তুর ওপর পেঁচিয়ে রাখা হয়। যেমন—মাথার ওপর পাগড়ি পেঁচিয়ে পরা। পাগড়ি যখন মাথার ওপর প্যাঁচানো হয়, তখন সেটি মাথার গোল আকৃতি অনুসরণ করেই আবর্তিত হয়।

পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর ঘূর্ণায়মান বলেই একদিকে আলো পড়ে দিন হয়, আর অপরদিকে অন্ধকার পড়ে রাত হয়। এই আলো ও অন্ধকারের সীমারেখা (terminator line) কখনোই স্থির নয়; বরং ধীরে ধীরে পৃথিবীর গায়ে পেঁচিয়ে যাওয়ার মতো করে সরে যায়। ঠিক এই বাস্তব চিত্রটিই “তাকভীর” শব্দ দ্বারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অতএব, কোরআনের এই বর্ণনা পৃথিবীর গোলাকৃতির সাথেই সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কোনো কাব্যিক রূপক নয়; বরং ভাষাগতভাবে নির্ভুল ও বাস্তবতার সঙ্গে সুসংগত একটি বিবৃতি।

কুরআনের এই শব্দ চয়নটি অত্যন্ত বিস্ময়কর। যদি পৃথিবী সমতল হতো, তবে রাত ও দিনের পরিবর্তনকে কোনো কিছুর ওপর ‘পেঁচিয়ে দেওয়া’ বা ‘গুটিয়ে রাখা’র মতো শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা সম্ভব হতো না। রাত ও দিন যখন একে অপরের ওপর দিয়ে ক্রমাগত আবর্তিত হয়, তখন তা তখনই সম্ভব যখন পৃথিবী গোলাকার হয়। মহাকাশ থেকে দেখলে দেখা যায়, পৃথিবীর গোল আকৃতির কারণে একপাশে যখন দিন থাকে, তখন অন্য পাশে রাত থাকে এবং পৃথিবী ঘোরার সাথে সাথে রাত ও দিন যেন একে অপরকে পেঁচিয়ে বা গুটিয়ে নিয়ে অগ্রসর হয়।

২. কোরআনের ভাষার নির্ভুলতা

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—কোরআন কোথাও সরাসরি “পৃথিবী গোল” বলে ঘোষণা দেয়নি। বরং এমন শব্দ ব্যবহার করেছে, যা সর্বকালের মানুষের জন্য অর্থবহ। প্রাথমিক যুগের মানুষ এর সাধারণ অর্থ বুঝেছে, আর আধুনিক যুগের মানুষ এতে গভীর বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে। এটি কোরআনের ভাষার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। যেহেতু কোরআন আল্লাহর বাণী—যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সর্বজ্ঞ—তাই এতে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই সর্বোচ্চ নির্ভুলতা ও প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে।

পবিত্র কুরআনে রাত ও দিনের এই পেঁচিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে যে, এই প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্ন। সমতল ভূমিতে দিন ও রাতের পরিবর্তন হঠাৎ হতে পারত, কিন্তু গোলাকার পৃথিবীতে এটি একটি বৃত্তাকার পথে ক্রমাগত ঘটে চলেছে। পৃথিবীর আবর্তনের ফলেই দিনের আলোকচ্ছটা ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারের ওপর ছেয়ে যায় এবং রাতের অন্ধকার দিনের আলোর ওপর গুটিয়ে আসে। এই নিখুঁত বর্ণনা কেবল তিনিই দিতে পারেন, যিনি এই মহাবিশ্ব ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।

৩. তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও আধুনিক বিজ্ঞান

আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে মানুষের কাছে আজকের মতো স্যাটেলাইট ইমেজ বা মহাকাশযান ছিল না। সে সময় মানুষের সাধারণ দৃষ্টিতে পৃথিবী সমতলই মনে হতো। তখনকার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও তাদের সমস্ত গণনা পৃথিবীর সমতল আকৃতি চিন্তা করেই করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কুরআনে এমন একটি সূক্ষ্ম শব্দ (তাকভীর) ব্যবহার করেছেন, যা আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

বিজ্ঞান আজ আমাদের বলছে যে, পৃথিবী পুরোপুরি ফুটবলার মতো গোল না হলেও এটি একটি ‘অবলেট স্ফেরয়েড’ (Oblate Spheroid) বা কমলালেবুর মতো মেরু অঞ্চলে সামান্য চাপা গোলাকার বস্তু। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡاَرۡضَ بَعۡدَ ذٰلِکَ دَحٰىہَا ؕ

এরপর তিনি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছেন। সুরা নাজিয়াত : ৩০

এই আয়াতে আল্লাহ পৃথিবীকে ‘বিছিয়ে দেওয়া’র কথা বলতে গিয়ে ‘দাহাহা’ (Dahaha) শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার একটি মূলগত অর্থ হলো ‘উটপাখির ডিমের মতো আকৃতি দেওয়া’। এটি পৃথিবীর প্রকৃত জ্যামিতিক আকারের সাথে হুবহু মিলে যায়।

৪. সপ্তম শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে এই সত্যের গুরুত্ব

এখানে একটি ঐতিহাসিক বিষয় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। কোরআন যখন নাজিল হয়—অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে তখন বিশ্বের প্রচলিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল ভিন্ন। বহু সভ্যতা ও দার্শনিকের মধ্যে পৃথিবীকে সমতল ভূমি হিসেবে কল্পনা করা হতো। এমনকি অনেক বৈজ্ঞানিক গণনা ও দার্শনিক ব্যাখ্যাও এই ধারণার ওপরই দাঁড়িয়েছিল। সেই যুগে মানুষের কাছে না ছিল আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা, না ছিল উপগ্রহ, না ছিল মহাকাশযান, না ছিল পৃথিবীর বাইরে গিয়ে তাকে দেখার সুযোগ। তবুও কোরআনের ভাষা এমনভাবে দিন–রাতের আবর্তন বর্ণনা করেছে, যা সরাসরি পৃথিবীর গোলাকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

উপসংহার : পবিত্র কুরআনের এই বর্ণনাগুলো কেবল রূপক কোনো কথা নয়, বরং এগুলো গভীর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বহন করে। যখন সারা বিশ্ব পৃথিবীকে সমতল মনে করত, তখন কুরআন পৃথিবীর গোলাকৃতির দিকে যে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানব রচিত গ্রন্থ নয়। বরং এটি সেই মহান স্রষ্টা আল্লাহর বাণী, যিনি মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা থেকে শুরু করে বিশাল গ্রহ-নক্ষত্রের আকার ও গতিপথ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।

মহাকাশে সুনির্দিষ্ট কোন দিন নাই

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَللّٰہُ نُوۡرُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ  مَثَلُ نُوۡرِہٖ کَمِشۡکٰوۃٍ فِیۡہَا مِصۡبَاحٌ ؕ  اَلۡمِصۡبَاحُ فِیۡ زُجَاجَۃٍ ؕ  اَلزُّجَاجَۃُ کَاَنَّہَا کَوۡکَبٌ دُرِّیٌّ یُّوۡقَدُ مِنۡ شَجَرَۃٍ مُّبٰرَکَۃٍ زَیۡتُوۡنَۃٍ لَّا شَرۡقِیَّۃٍ وَّلَا غَرۡبِیَّۃٍ ۙ  یَّکَادُ زَیۡتُہَا یُضِیۡٓءُ وَلَوۡ لَمۡ تَمۡسَسۡہُ نَارٌ ؕ  نُوۡرٌ عَلٰی نُوۡرٍ ؕ  یَہۡدِی اللّٰہُ لِنُوۡرِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ  وَیَضۡرِبُ اللّٰہُ الۡاَمۡثَالَ لِلنَّاسِ ؕ  وَاللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ۙ

আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনের নূর। তাঁর নূরের উপমা একটি তাকের মতই। তাতে রয়েছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি রয়েছে একটি চিমনির মধ্যে। চিমনিটি উজ্জ্বল তারকার মতই। প্রদীপটি বরকতময় যাইতূন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্ব দিকেরও নয় এবং পশ্চিম দিকেরও নয়। এর তেল যেন আলো বিকিরণ করে, যদিও তাতে আগুন স্পর্শ না করে। নূরের উপর নূর। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন তাঁর নূরের দিকে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমাসমূহ উপস্থাপন করেন। আর আল্লাহ প্রতিটি বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। সুরা নুর : ৩৫

পৃথিবীতে আমরা দিন এবং রাত বলতে যা বুঝি, তা মূলত সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফল। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে মহাকাশে গেলে এই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যায়। মহাকাশ মূলত একটি অন্ধকার বিস্তৃতি, যেখানে কোনো বায়ুমণ্ডল নেই যা আলোকে বিচ্ছুরিত করতে পারে। সেখানে সূর্য আছে, নক্ষত্র আছে, কিন্তু আমাদের পরিচিত ২৪ ঘণ্টার ‘দিন’ নেই। মহাকাশচারীরা যখন কক্ষপথে থাকেন, তখন তারা প্রতি ৯০ মিনিটে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে পারেন। অর্থাৎ, মহাকাশে সময় ও আলো অত্যন্ত আপেক্ষিক। সেখানে পৃথিবীর মতো সুনির্দিষ্ট কোনো সীমানা নেই যা আলো ও অন্ধকারকে বিভাজিত করে।

সুরা নূরের এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নিজেকে আসমান ও জমিনের ‘নূর’ বা জ্যোতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। আয়াতের একটি বিশেষ অংশ হলো— “যা পূর্ব দিকেরও নয় এবং পশ্চিম দিকেরও নয়।”

এই বাক্যটি মহাকাশের বাস্তবতার সাথে গভীরভাবে মিলে যায়। পৃথিবীর যেকোনো স্থানকে আমরা পূর্ব বা পশ্চিম দিয়ে চিহ্নিত করি সূর্যের উদয়-অস্তের ভিত্তিতে। কিন্তু মহাকাশে কোনো নির্দিষ্ট পূর্ব বা পশ্চিম নেই। আল্লাহ যে নূরের কথা বলছেন, তা কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নয়। এটি এমন এক চিরন্তন আলো যা কোনো নির্দিষ্ট গোলার্ধ বা দিক থেকে উৎপন্ন হয় না, বরং সমগ্র অস্তিত্বকে আলোকিত করে রাখে।

আয়াতে আল্লাহ একটি উপমা দিয়েছেন—একটি তাক, তার ভেতর প্রদীপ, এবং প্রদীপটি একটি কাঁচের চিমনির ভেতরে। এই চিমনিটিকে তুলনা করা হয়েছে ‘কোকাবুন দুরিইয়ুন’ বা উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাথে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে, মহাকাশে নক্ষত্ররাই আলোর উৎস। কিন্তু আল্লাহর নূর সেই বাহ্যিক আলোর চেয়েও সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী।

আয়াতে বর্ণিত ‘যাইতূন তেল’ যা আগুন ছাড়াই প্রজ্বলিত হতে চায়, তা মূলত আল্লাহর হিদায়াত ও কুদরতের অসীম শক্তির ইঙ্গিত দেয়। মহাকাশের বিশালতায় যেখানে মানুষের তৈরি সব আলো ম্লান হয়ে যায়, সেখানে আল্লাহর নূরই সমস্ত সৃষ্টিজগতকে দৃশ্যমান এবং সুশৃঙ্খল রাখে।

“নূরুন আলা নূর” বা নূরের ওপর নূর কথাটি দ্বারা জ্ঞানের ও হিদায়াতের স্তরের কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আলো যেমন তরঙ্গ এবং কণা (Photon) উভয় রূপেই বিদ্যমান, তেমনি আল্লাহর নূর একদিকে সৃষ্টিজগতকে দৃশ্যমান করে (ভৌত আলো), অন্যদিকে মানুষের অন্তরকে সত্যের পথ দেখায় (আধ্যাত্মিক আলো)। মহাকাশে যেমন পার্থিব দিনের আলো নেই, তেমনি সত্যের পথ প্রদর্শন ছাড়া মানুষের জীবনও অন্ধকার।

পরিশেষে বলা যায়, মহাকাশে আমাদের পরিচিত ‘দিন’ না থাকা প্রমাণ করে যে মহাজাগতিক নিয়মগুলো পৃথিবীর সীমাবদ্ধ নিয়মের ঊর্ধ্বে। সুরা নূরের এই আয়াতটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু সেই মহান আল্লাহর নূরে উদ্ভাসিত। তিনি কোনো দিক বা সময়ের ফ্রেমে বন্দী নন। মহাকাশের অসীম অন্ধকার যেমন নক্ষত্রের আলোতে দূর হয়, তেমনি মানুষের জীবনের অন্ধকার দূর হয় আল্লাহর হিদায়াতের নূরের মাধ্যমে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার নূরের দিকে পথ দেখান, আর তিনিই সর্ববিষয়ে সম্যক পরিজ্ঞাত।

কুরআনে পৃথিবী সুরক্ষিত রাখার ছাদ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহাবিশ্বের অন্তহীন শূন্যতায় আমাদের এই পৃথিবী এক অতি ক্ষুদ্র নীল গ্রহ। এই গ্রহের চারপাশ ঘিরে রয়েছে এমন এক মহাজাগতিক প্রতিকূলতা, যা যেকোনো মুহূর্তেই জীবনকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো দানবীয় উল্কাপিণ্ড, সূর্য থেকে আসা প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয় রশ্মি এবং মহাজাগতিক হিমাঙ্ক—এই সবকিছুই পৃথিবীর জন্য এক একটি মরণফাঁদ। অথচ আমরা পৃথিবীতে অত্যন্ত নিরাপদে বসবাস করছি। এই নিরাপত্তার রহস্য লুকিয়ে আছে আমাদের মাথার উপরে থাকা এক অদৃশ্য ও শক্তিশালী ঢালের মধ্যে। আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে বলেছেন-

وَجَعَلۡنَا السَّمَآءَ سَقۡفًا مَّحۡفُوۡظًا ۚۖ وَّہُمۡ عَنۡ اٰیٰتِہَا مُعۡرِضُوۡنَ

আর আমি আসমানকে করেছি সুরক্ষিত ছাদ; কিন্তু তারা তার নিদর্শনাবলী হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সুরা আম্বিয়া : ৩২

১. বায়ুমণ্ডল: পৃথিবীর প্রথম প্রতিরক্ষা বলয়

পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল কেবল আমাদের শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেনই সরবরাহ করে না, বরং এটি একটি শক্তিশালী ফিল্টার এবং ঢাল হিসেবে কাজ করে।

উল্কাপিণ্ড থেকে সুরক্ষা:

প্রতিদিন মহাকাশ থেকে কয়েক মিলিয়ন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে। বায়ুমণ্ডল না থাকলে এগুলো সরাসরি পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ত, যার ফলে পৃথিবীতে প্রাণ ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ত। আমেরিকার অ্যারিজোনায় পড়া একটি উল্কাপিণ্ডের গর্ত দেখে আমরা বুঝতে পারি এর ভয়াবহতা কতটুকু। কিন্তু আমাদের ‘সুরক্ষিত ছাদ’ বা বায়ুমণ্ডলের স্তরে প্রবেশের সাথে সাথে ঘর্ষণের ফলে এই উল্কাপিণ্ডগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আল্লাহ তাঁর অসীম দয়ায় পৃথিবীকে এই বোমাবর্ষণ থেকে রক্ষা করছেন।

মহাকাশের হিমাঙ্ক থেকে সুরক্ষা:

মহাকাশের গড় তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ২৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ($-270^\circ\text{C}$)। বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস প্রভাব এবং এর সুরক্ষামূলক স্তরগুলো ছাড়া পৃথিবীর তাপমাত্রা এতটাই কমে যেত যে সমস্ত পানি জমে বরফ হয়ে যেত এবং কোনো প্রাণ টিকে থাকত না। বায়ুমণ্ডল সূর্যের তাপকে ধরে রাখে এবং মহাকাশের সেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে আমাদের রক্ষা করে ঠিক যেমন একটি বাড়ির ছাদ আমাদের রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে।

২. ওজোন স্তর এবং আলোক বিকিরণ পরিস্রাবণ

সূর্য আমাদের শক্তির প্রধান উৎস হলেও এটি প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক বিকিরণ নির্গত করে। সূর্য থেকে আসা আলোক রশ্মির মধ্যে সবটুকুই জীবনের জন্য কল্যাণকর নয়।

অতিবেগুনি রশ্মি (UV Rays): সূর্য থেকে আসা অত্যন্ত তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি যদি সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছাত, তবে প্রাণিকুলের ডিএনএ (DNA) ধ্বংস হয়ে যেত এবং ক্যান্সারসহ নানা মরণব্যাধি ছড়িয়ে পড়ত।

ওজোন স্তরের ভূমিকা: বায়ুমণ্ডলের স্ট্রাটোস্ফিয়ারে অবস্থিত ওজোন স্তর এই ক্ষতিকারক রশ্মির বেশিরভাগই শোষণ করে নেয়। এটি কেবল সেই পরিমাণ অতিবেগুনি রশ্মিকে আসতে দেয়, যা উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ এবং প্রাণীর শরীরে ভিটামিন-ডি তৈরির জন্য অপরিহার্য।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ‘সিলেক্টিভ ফিল্টারিং’ বা বেছে বেছে দরকারী রশ্মিকে প্রবেশ করতে দেওয়ার ক্ষমতা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। এটি একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম নকশার ফসল।

৩. ম্যাগনেটোস্ফিয়ার এবং ভ্যান অ্যালেন বেল্ট (Van Allen Belts)

আকাশের সুরক্ষার বিষয়টি কেবল বায়ুমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর আরও গভীরে এবং অনেক উঁচুতে আর একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে যা বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি হলো ভ্যান অ্যালেন বেল্ট।

চৌম্বক ক্ষেত্রের ঢাল:

পৃথিবীর কেন্দ্রে রয়েছে বিশাল এক নিকেল-লোহার পিণ্ড। এর ঘূর্ণনের ফলে পৃথিবীর চারপাশে এক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ম্যাগনেটোস্ফিয়ার। এই চৌম্বক ক্ষেত্রটি মহাকাশ থেকে আসা অত্যন্ত চার্জিত কণা এবং কসমিক রশ্মিকে প্রতিহত করে।

ভ্যান অ্যালেন বেল্টের গুরুত্ব:

১৯৫৮ সালে জেমস ভ্যান অ্যালেন এই স্তরটি আবিষ্কার করেন। সূর্য থেকে মাঝে মাঝে ‘সোলার ফ্লেয়ার’ বা সৌর শিখা নির্গত হয়। একটি মাত্র বড় সৌর বিস্ফোরণে যে পরিমাণ শক্তি থাকে, তা হিরোশিমায় ফেলা ১০০ বিলিয়ন পারমাণবিক বোমার সমান ধ্বংসাত্মক। এই বিপুল শক্তি সরাসরি পৃথিবীতে আঘাত হানলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পুড়ে যেত এবং সমস্ত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ও জীবন ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু ভ্যান অ্যালেন বেল্ট এই প্রাণঘাতী কণাগুলোকে আটকে দেয় এবং পৃথিবীর পাশ কাটিয়ে মহাকাশে পাঠিয়ে দেয়।

বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডঃ হিউ রস (Dr. Hugh Ross) এর মতে:

“পৃথিবীর ঘনত্ব অন্য যেকোনো পাথুরে গ্রহের চেয়ে বেশি এবং এর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র একটি অনন্য সুরক্ষা ঢাল তৈরি করে। এই ঢাল না থাকলে পৃথিবীতে জীবন সম্ভব হতো না।”

উদাহরণস্বরূপ, মঙ্গল বা শুক্র গ্রহের এমন শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র নেই বলেই সেখানে বায়ুমণ্ডল বা জীবন টিকে থাকতে পারেনি।

৪. আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ও বিস্ময়কর তথ্য

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, সৌর বিস্ফোরণের ১৮ ঘণ্টা পর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ২৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় হঠাৎ করে 2,500^C পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের এই ‘সুরক্ষিত ছাদ’ সেই তাপ নিচে নামতে দেয় না।

৫. কুরআনের অলৌকিকতা: চৌদ্দশ বছর আগের বার্তা

আজকের বিজ্ঞানীরা আধুনিক স্যাটেলাইট, স্পেকট্রোস্কোপি এবং গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে জানতে পেরেছেন যে আকাশ বা আসমান একটি সুরক্ষিত ছাদের মতো কাজ করে। কিন্তু সপ্তম শতাব্দীর আরবের মরুভূমিতে, যেখানে বিজ্ঞানের কোনো ছোঁয়া ছিল না, সেখানে একজন মানুষের পক্ষে এই জটিল মহাজাগতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা কীভাবে সম্ভব?

তৎকালীন যুগে মানুষ আকাশকে কেবল একটি শূন্য স্থান বা দেব-দেবীর আবাসস্থল মনে করত। কিন্তু কুরআন অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে ‘সাকফাম মাহফুজা’ (সুরক্ষিত ছাদ) শব্দটি ব্যবহার করেছে। ‘সাকফ’ মানে ছাদ—যা ওপরের বিপদ থেকে নিচের বাসিন্দাদের রক্ষা করে। এটি কোনো সাধারণ বর্ণনা নয়, বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা যা বর্তমানে ধাপে ধাপে প্রমাণিত হচ্ছে।

৬. চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন

আকাশের দিকে তাকালে আমরা শুধু নীল রঙ বা মেঘ দেখতে পাই। আমরা অনুভব করতে পারি না যে প্রতি মুহূর্তে আমাদের মাথার ওপর কয়েক স্তরের এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে। একদিকে মহাবিশ্বের ধ্বংসাত্মক শক্তি, অন্যদিকে আল্লাহর তৈরি এই সুনিপুণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাটি যদি সামান্যতম দুর্বল হতো, তবে আমাদের অস্তিত্ব থাকত না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-

اِنَّ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَاخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَالنَّہَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ ۚۙ

নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং রাত ও দিনের বিবর্তনের মধ্যে রয়েছে বিবেকসম্পন্নদের জন্য বহু নির্দশন। সূরা আল ইমরান : ১৯০

এই সুরক্ষিত ছাদ কেবল একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়, বরং এটি মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক বিশেষ করুণা ও নিরাপত্তা। যারা চিন্তা করে, তাদের জন্য এই একটি আয়াতেই (২১:৩২) স্রষ্টার অস্তিত্বের বিশাল প্রমাণ লুকিয়ে আছে।

উপসংহার : পবিত্র কুরআন এবং আধুনিক বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক হিসেবে মহাবিশ্বের সত্যকে উন্মোচন করে। আকাশ যে একটি সুরক্ষিত ছাদ, তা আজ আর কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়, এটি একটি প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। মহাকাশের ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা, প্রচণ্ড ঠান্ডা এবং উল্কাপাত থেকে আমাদের এই সুরক্ষিত রাখা প্রমাণ করে যে, এই মহাবিশ্ব কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি একজন মহান প্রকৌশলী, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার এক নিখুঁত পরিকল্পনা। কুরআনের এই অলৌকিক তথ্যগুলো আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করে এবং বিজ্ঞানের গবেষণাকে সঠিক পথের দিশা দেয়।