কুরআনে কক্ষপথ ও মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিশাল এই মহাবিশ্ব এক পরম বিস্ময়। আদি দিগন্তহীন মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি গ্রহ, নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সিগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা মানবমনকে যুগে যুগে ভাবিয়ে তুলেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষের এই যুগে আমরা জানতে পেরেছি যে, মহাকাশের প্রতিটি বস্তু এক একটি নির্দিষ্ট পথে বা কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে যখন বিজ্ঞানের কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ছিল না, তখন পবিত্র কুরআনে এই ‘কক্ষপথ’ বা ‘অরবিট’ সম্পর্কে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রদান করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানব রচিত গ্রন্থ নয়, বরং মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এক অলৌকিক কিতাব। কুরআনের বর্ণনায় কক্ষপথ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সূর্য, চন্দ্র এবং মহাকাশীয় বস্তুসমূহের গতিবিধি সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ الَّیۡلَ وَالنَّہَارَ وَالشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ فِیۡ فَلَکٍ یَّسۡبَحُوۡنَ

আর তিনিই রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টি করেছেন; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে। সূরা আল-আম্বিয়ার ৩৩

এখানে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘ইয়াসবাহুন’ (yasbahūn) এর আভিধানিক অর্থ হলো ‘সাঁতার কাটা’ বা ‘সন্তরণ করা’। মহাকাশ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহাকাশীয় বস্তুগুলো যখন তাদের কক্ষপথে ঘোরে, তখন তারা কোনো স্থির অবলম্বনের ওপর দিয়ে যায় না, বরং শূন্যে ভেসে চলে—যা অনেকটা পানির মধ্যে কোনো বস্তুর ভেসে চলার মতো।

অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে-

وَالشَّمۡسُ تَجۡرِیۡ لِمُسۡتَقَرٍّ لَّہَا ؕ  ذٰلِکَ تَقۡدِیۡرُ الۡعَزِیۡزِ الۡعَلِیۡمِ ؕ

আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলছে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের স্থিরীকৃত বিধান। সূরা ইয়াসিন : ৩৮

এই আয়াতগুলো থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ কক্ষপথে সচল এবং তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্য রয়েছে।

মহাবিশ্বের দিকে তাকালে মানুষ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়। অসংখ্য তারা, গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু ও ছায়াপ, সবকিছু যেন এক অদৃশ্য নিয়মে আবদ্ধ। এই নিয়মের অন্যতম প্রধান দিক হলো কক্ষপথ। প্রতিটি মহাজাগতিক বস্তু একটি নির্দিষ্ট পথ বা কক্ষপথে নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান যে সত্যগুলো আজ আবিষ্কার করেছে, পবিত্র কোরআন সেগুলো বহু শতাব্দী আগেই স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে।

একসময় মানুষ মনে করত সূর্য স্থির, আর গ্রহগুলো শুধু তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে—সূর্য নিজেও স্থির নয়। এটি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট পথে অগ্রসর হচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গণনা অনুযায়ী, সূর্য প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৭,২০,০০০ কিলোমিটার গতিতে “সোলার অ্যাপেক্স” নামক একটি দিকের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যার অভিমুখ ভেগা (Vega) তারার দিকে। এর ফলে সূর্য প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭২ লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। শুধু সূর্যই নয়—তার মহাকর্ষীয় প্রভাবে আবদ্ধ সমস্ত গ্রহ ও উপগ্রহও একই সঙ্গে এই মহাজাগতিক যাত্রায় অংশ নিচ্ছে।

কুরআন শুধু সূর্য ও চন্দ্রের কথাই বলেনি; বরং সমগ্র আকাশমণ্ডলীর গতিপথের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে—

وَالسَّمَآءِ ذَاتِ الۡحُبُکِ ۙ

“পথ ও কক্ষপথ বিশিষ্ট আকাশমণ্ডলীর শপথ। সূরা যারিয়াত : ৭

এই আয়াতে ব্যবহৃত “حُبُك” শব্দটি বহুবিধ অর্থবহ—এর মধ্যে রয়েছে সুসংগঠিত পথ, বুনন, শৃঙ্খলা ও নিখুঁত নকশা। আধুনিক বিজ্ঞান আজ বলছে, মহাবিশ্বে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ছায়াপথ রয়েছে, এবং প্রতিটি ছায়াপথে গড়ে প্রায় ২০০ বিলিয়ন তারা। এই তারাগুলোর অধিকাংশের চারপাশে গ্রহ রয়েছে, আর সেই গ্রহগুলোরও উপগ্রহ রয়েছে। প্রত্যেকটি বস্তুই তার নিজস্ব কক্ষপথে এমন নিখুঁতভাবে চলাচল করছে যে লক্ষ লক্ষ বছরেও সামান্য বিচ্যুতি দেখা যায় না।

এই শৃঙ্খলা কেবল গ্রহ বা তারাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ধূমকেতুরাও নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, হ্যালির ধূমকেতু প্রতি প্রায় ৭৬ বছর পরপর পৃথিবীর কাছ দিয়ে অতিক্রম করে। এর কক্ষপথ এতটাই নির্ভুল যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা এর আগমন ও প্রস্থান সময় নির্ভুলভাবে হিসাব করতে পারছেন। যদি এই কক্ষপথে সামান্য বিশৃঙ্খলাও থাকত, তাহলে এমন পূর্বাভাস সম্ভব হতো না।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—ছায়াপথগুলিও একে অপরের তুলনায় নির্দিষ্ট গতিপথে অগ্রসর হচ্ছে। মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হলেও এই সম্প্রসারণ কোনো বিশৃঙ্খল বিস্ফোরণ নয়; বরং এটি সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। এই বিপুল গতিবিধির মাঝেও মহাজাগতিক বস্তুগুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না—এটি এক অতুলনীয় শৃঙ্খলার প্রমাণ।

যখন কোরআন নাজিল হয়েছিল, তখন মানুষের কাছে দূরবীন, টেলিস্কোপ, মহাকাশযান বা আধুনিক পদার্থবিদ্যার জ্ঞান ছিল না। তখন আকাশ পর্যবেক্ষণ মানেই ছিল খালি চোখে তারা দেখা। তবুও সেই সময়েই কোরআন ঘোষণা করেছিল—আকাশ পথ ও কক্ষপথ দ্বারা পরিপূর্ণ। আজকের বিজ্ঞান সেই ঘোষণার সত্যতা একে একে প্রমাণ করছে।

অতএব, মহাবিশ্বের এই নিখুঁত কক্ষপথ ও শৃঙ্খলা কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়; এটি ঈমানেরও এক গভীর নিদর্শন। এত বিশাল, জটিল ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা কোনো অন্ধ দুর্ঘটনার ফল হতে পারে না। যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এর প্রতিটি কণাকে নির্দিষ্ট পথ ও নিয়মে পরিচালিত করছেন। সেই সত্তাই হলেন আল্লাহ—পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ এবং মহাপ্রজ্ঞাময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *