মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মানব সভ্যতার ইতিহাসে পৃথিবীর আকার নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে নানা বিতর্ক ও ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করত যে পৃথিবী সমতল এবং এর একটি শেষ প্রান্ত রয়েছে। এমনকি সপ্তম শতাব্দীতেও, যখন পবিত্র কুরআন নাজিল হচ্ছিল, তখন তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারণা ছিল পৃথিবী একটি স্থির সমতল ভূমি। কিন্তু এই অন্ধকার যুগেও পবিত্র কুরআন এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের ‘পৃথিবীর গোলাকৃতি’র ধারণাকে নিখুঁতভাবে সমর্থন করে।
১. ‘তাকভীর‘ শব্দের অলৌকিকত্ব
কুরআনের রাত ও দিনের পরিক্রমা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন-
خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ بِالۡحَقِّ ۚ یُکَوِّرُ الَّیۡلَ عَلَی النَّہَارِ وَیُکَوِّرُ النَّہَارَ عَلَی الَّیۡلِ وَسَخَّرَ الشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ یَّجۡرِیۡ لِاَجَلٍ مُّسَمًّی ؕ اَلَا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفَّارُ
তিনি যথাযথভাবে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাতকে দিনের উপর এবং দিনকে রাতের উপর জড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন সূর্য ও চাঁদকে। প্রত্যেকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চলছে। জেনে রাখ, তিনি মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। সুরা যুমাহ : ৫
এই আয়াতে ‘আবর্তন করানো’ বা ‘পেঁচিয়ে দেওয়া’ অর্থে আরবি ‘তাকভীর’ (Takwir) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি ভাষায় এই শব্দটি মূলত তখনই ব্যবহৃত হয়, যখন কোনো জিনিসকে অন্য একটি গোলাকার বস্তুর ওপর পেঁচিয়ে রাখা হয়। যেমন—মাথার ওপর পাগড়ি পেঁচিয়ে পরা। পাগড়ি যখন মাথার ওপর প্যাঁচানো হয়, তখন সেটি মাথার গোল আকৃতি অনুসরণ করেই আবর্তিত হয়।

পৃথিবী নিজ অক্ষের ওপর ঘূর্ণায়মান বলেই একদিকে আলো পড়ে দিন হয়, আর অপরদিকে অন্ধকার পড়ে রাত হয়। এই আলো ও অন্ধকারের সীমারেখা (terminator line) কখনোই স্থির নয়; বরং ধীরে ধীরে পৃথিবীর গায়ে পেঁচিয়ে যাওয়ার মতো করে সরে যায়। ঠিক এই বাস্তব চিত্রটিই “তাকভীর” শব্দ দ্বারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। অতএব, কোরআনের এই বর্ণনা পৃথিবীর গোলাকৃতির সাথেই সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কোনো কাব্যিক রূপক নয়; বরং ভাষাগতভাবে নির্ভুল ও বাস্তবতার সঙ্গে সুসংগত একটি বিবৃতি।
কুরআনের এই শব্দ চয়নটি অত্যন্ত বিস্ময়কর। যদি পৃথিবী সমতল হতো, তবে রাত ও দিনের পরিবর্তনকে কোনো কিছুর ওপর ‘পেঁচিয়ে দেওয়া’ বা ‘গুটিয়ে রাখা’র মতো শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা সম্ভব হতো না। রাত ও দিন যখন একে অপরের ওপর দিয়ে ক্রমাগত আবর্তিত হয়, তখন তা তখনই সম্ভব যখন পৃথিবী গোলাকার হয়। মহাকাশ থেকে দেখলে দেখা যায়, পৃথিবীর গোল আকৃতির কারণে একপাশে যখন দিন থাকে, তখন অন্য পাশে রাত থাকে এবং পৃথিবী ঘোরার সাথে সাথে রাত ও দিন যেন একে অপরকে পেঁচিয়ে বা গুটিয়ে নিয়ে অগ্রসর হয়।
২. কোরআনের ভাষার নির্ভুলতা
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—কোরআন কোথাও সরাসরি “পৃথিবী গোল” বলে ঘোষণা দেয়নি। বরং এমন শব্দ ব্যবহার করেছে, যা সর্বকালের মানুষের জন্য অর্থবহ। প্রাথমিক যুগের মানুষ এর সাধারণ অর্থ বুঝেছে, আর আধুনিক যুগের মানুষ এতে গভীর বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছে। এটি কোরআনের ভাষার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। যেহেতু কোরআন আল্লাহর বাণী—যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সর্বজ্ঞ—তাই এতে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই সর্বোচ্চ নির্ভুলতা ও প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে।
পবিত্র কুরআনে রাত ও দিনের এই পেঁচিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে যে, এই প্রক্রিয়াটি নিরবচ্ছিন্ন। সমতল ভূমিতে দিন ও রাতের পরিবর্তন হঠাৎ হতে পারত, কিন্তু গোলাকার পৃথিবীতে এটি একটি বৃত্তাকার পথে ক্রমাগত ঘটে চলেছে। পৃথিবীর আবর্তনের ফলেই দিনের আলোকচ্ছটা ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারের ওপর ছেয়ে যায় এবং রাতের অন্ধকার দিনের আলোর ওপর গুটিয়ে আসে। এই নিখুঁত বর্ণনা কেবল তিনিই দিতে পারেন, যিনি এই মহাবিশ্ব ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।
৩. তৎকালীন প্রেক্ষাপট ও আধুনিক বিজ্ঞান
আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে মানুষের কাছে আজকের মতো স্যাটেলাইট ইমেজ বা মহাকাশযান ছিল না। সে সময় মানুষের সাধারণ দৃষ্টিতে পৃথিবী সমতলই মনে হতো। তখনকার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও তাদের সমস্ত গণনা পৃথিবীর সমতল আকৃতি চিন্তা করেই করতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা কুরআনে এমন একটি সূক্ষ্ম শব্দ (তাকভীর) ব্যবহার করেছেন, যা আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
বিজ্ঞান আজ আমাদের বলছে যে, পৃথিবী পুরোপুরি ফুটবলার মতো গোল না হলেও এটি একটি ‘অবলেট স্ফেরয়েড’ (Oblate Spheroid) বা কমলালেবুর মতো মেরু অঞ্চলে সামান্য চাপা গোলাকার বস্তু। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالۡاَرۡضَ بَعۡدَ ذٰلِکَ دَحٰىہَا ؕ
এরপর তিনি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছেন। সুরা নাজিয়াত : ৩০
এই আয়াতে আল্লাহ পৃথিবীকে ‘বিছিয়ে দেওয়া’র কথা বলতে গিয়ে ‘দাহাহা’ (Dahaha) শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার একটি মূলগত অর্থ হলো ‘উটপাখির ডিমের মতো আকৃতি দেওয়া’। এটি পৃথিবীর প্রকৃত জ্যামিতিক আকারের সাথে হুবহু মিলে যায়।
৪. সপ্তম শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে এই সত্যের গুরুত্ব
এখানে একটি ঐতিহাসিক বিষয় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। কোরআন যখন নাজিল হয়—অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীতে তখন বিশ্বের প্রচলিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল ভিন্ন। বহু সভ্যতা ও দার্শনিকের মধ্যে পৃথিবীকে সমতল ভূমি হিসেবে কল্পনা করা হতো। এমনকি অনেক বৈজ্ঞানিক গণনা ও দার্শনিক ব্যাখ্যাও এই ধারণার ওপরই দাঁড়িয়েছিল। সেই যুগে মানুষের কাছে না ছিল আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা, না ছিল উপগ্রহ, না ছিল মহাকাশযান, না ছিল পৃথিবীর বাইরে গিয়ে তাকে দেখার সুযোগ। তবুও কোরআনের ভাষা এমনভাবে দিন–রাতের আবর্তন বর্ণনা করেছে, যা সরাসরি পৃথিবীর গোলাকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
উপসংহার : পবিত্র কুরআনের এই বর্ণনাগুলো কেবল রূপক কোনো কথা নয়, বরং এগুলো গভীর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বহন করে। যখন সারা বিশ্ব পৃথিবীকে সমতল মনে করত, তখন কুরআন পৃথিবীর গোলাকৃতির দিকে যে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা কোনো মানুষের পক্ষে কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানব রচিত গ্রন্থ নয়। বরং এটি সেই মহান স্রষ্টা আল্লাহর বাণী, যিনি মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা থেকে শুরু করে বিশাল গ্রহ-নক্ষত্রের আকার ও গতিপথ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন।