কবর বা বারযখী জীবন : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

প্রত্যেক প্রাণীর জন্য মৃত্যু অবধারিত। এই মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টিই অমর নয়। জন্ম হয়েছে যার, মৃত্যু তাকে স্পর্শ করবেই। এটি এমন এক অমোঘ বিধান, যা থেকে কেউ পালাতে পারবে না, তা সে যত শক্তিশালী, ধনী বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন। এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি অতি আসক্ত না হতে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেন। সকলকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে: মৃত্যুর পর জীবন শেষ হয়ে যায় না, বরং তা নতুন এক জীবনের দিকে যাত্রা। মৃত্যুর পর সকলকেই মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে প্রতিটি কর্মের হিসাব নেওয়া হবে। এটি পুনরুত্থান এবং বিচার দিবসের প্রতি ইঙ্গিত। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার জীবনে যা কিছু করা হয়, তার সবকিছুর জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

کُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَۃُ الْمَوْتِ ۟ ثُمَّ اِلَیْنَا تُرْجَعُوْنَ

অর্থ : প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। সুনা আনকাবুত : ৫৭

মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর উর্দ্ধে নন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّکَ مَیِّتٌ وَّاِنَّہُمْ مَّیِّتُوْنَ ۫

অর্থ : নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল। সুরা জুমার : ৩০

কাফেররা মুহম্মদসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবিদ্রূপ করতো যে তিনি যদি সত্য নবী হন তবে মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করবে না। এরই প্রেক্ষিতে উক্ত আয়াত নাজেল হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبْلِكَ ٱلْخُلْدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلْخَـٰلِدُونَ–. كُلُّ نَفْسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلْمَوْتِ‌ۗ وَنَبْلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلْخَيْرِ فِتْنَةً۬‌ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ

অর্থ : আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে? প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫

জম্মিলে মৃত্যু আছে, একথাটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য সে মানব শিশু হোক বা অন্য কিছু। যে দিন সে পৃথিবীতে জন্ম লাভ করে, তার পরের দিন থেকেই শুরু হয় তার মৃত্যুর দিকে পথযাত্রা। প্রতিটি জীবন মানেই মৃত্যু। নবী রসুলেরাও এর ব্যতিক্রম নয়। এর উর্দ্ধে নয় কোন অলী আওলিয়া বা কোন পূণ্যাত্মা মানুষ। পাপী ও পূণ্যাত্মা সকলেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে। জীবনের তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রত্যেক মানুষ এ তিনটি স্তর অতিক্রম করতে হবে।

ক. ইহকালীন জীবন

খ. বারযাখী জীবন

গ. পরকালীন জীবন বা চিরস্থায়ী জীবন, যার কোনো শেষ নেই।

ক. ইহকালীন জীবন (দুনিয়ার জীবন)

এটি আমাদের বর্তমান জীবন, যা আমরা এখন যাপন করছি। কুরআন ও সুন্নাহতে এই জীবনকে অস্থায়ী এবং পরীক্ষার স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِیْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَیٰوۃَ لِیَبْلُوَکُمْ اَیُّکُمْ اَحْسَنُ عَمَلًا ؕ  وَہُوَ الْعَزِیْزُ الْغَفُوْرُ ۙ

যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল। সুরা মুলক : ২

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন—কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম।” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:২)।

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ার জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষা। আয়াতে প্রথমেই “মৃত্যু” শব্দটি এসেছে, এরপর “জীবন” এতে আল্লাহর কুদরত ও পরিকল্পনার এক বিশেষ দিক রয়েছে। অনেক মুফাসসির বলেন, এখানে মৃত্যু আগে আনা হয়েছে, কারণ মানুষ দুনিয়াতে আসার আগেও একপ্রকার মৃত্যু বা অপ্রকাশিত অবস্থা ছিল। তারপর সে জন্মগ্রহণ করে। আবার মৃত্যুর পর আবার এক অনন্ত জীবন শুরু হবে। আল্লাহ মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন “পরীক্ষা করার জন্য”, এই দুনিয়া আসলে একটি ইমতিহানের ঘর। আমাদের কর্ম, চিন্তা, নিয়ত ও আচরণ এসবের মাধ্যমেই যাচাই হবে আমরা কতটুকু উত্তম বান্দা।

আল্লাহ দুনিয়ার জীবনকে ক্ষণস্থায়ী উপমা দিয়ে বলেছেন-

اِعْلَمُوْۤا اَنَّمَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَا لَعِبٌ وَّلَہْوٌ وَّزِیْنَۃٌ وَّتَفَاخُرٌۢ بَیْنَکُمْ وَتَکَاثُرٌ فِی الْاَمْوَالِ وَالْاَوْلَادِ ؕ کَمَثَلِ غَیْثٍ اَعْجَبَ الْکُفَّارَ نَبَاتُہٗ ثُمَّ یَہِیْجُ فَتَرٰىہُ مُصْفَرًّا ثُمَّ یَکُوْنُ حُطَامًا ؕ وَفِی الْاٰخِرَۃِ عَذَابٌ شَدِیْدٌ ۙ وَّمَغْفِرَۃٌ مِّنَ اللّٰہِ وَرِضْوَانٌ ؕ وَمَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ

তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। সুরা হাদিদ : ২০

আমাদের পরকালের প্রস্তুতি নিতে হবে। এই জীবনে আমরা যে আমল করি, তাই আমাদের পরকালের পাথেয়। আবূ ইয়ালা শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অকর্মন্য সেই ব্যক্তি যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৬০, সুনানে তিরমিযী : ২৪৫৯, মিশকাত : ৫২৮৯

খ. বারযাখী জীবন বা কবরের জীবন

মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সময়ের জীবনকে বারযাখী জীবন বলা হয়। এটি ইহকাল ও পরকালের মধ্যবর্তী একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَعَلِّیْۤ اَعْمَلُ صَالِحًا فِیْمَا تَرَکْتُ کَلَّا ؕ اِنَّہَا کَلِمَۃٌ ہُوَ قَآئِلُہَا ؕ وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ

যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সুরা মুমিনুন : ১০০

গ. পরকালীন জীবন :

এটি জীবনের শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়, যার কোনো শেষ নেই। কিয়ামত বা পুনরুত্থানের পর এই জীবনের শুরু হবে। এই জীবনের শুরু হয় ইসরাফিলের শিঙ্গায় ফুৎকারের মাধ্যমে। তখন সকল মৃত মানুষ জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে একত্রিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ

যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও এবং মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী। সূরা ইব্রাহিম : ৪৮

কিয়ামতের দিন সকলে একত্র হয়ে আল্লাহ সামনে সবাই যার যার হিসাব-নিকাশ দিবে। এ দিনকে বিচার দিবসও বলা হয়। এ দিন সকল মানুষকে তাদের ইহকালীন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلْیَوْمَ تُجْزٰی کُلُّ نَفْسٍۭ بِمَا کَسَبَتْ ؕ لَا ظُلْمَ الْیَوْمَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَرِیْعُ الْحِسَابِ

আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জন অনুসারে প্রতিদান দেয়া হবে। আজ কোন যুল্ম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী। সূরা গাফির  :১৭

চূড়ান্ত বিচারের পর মুমিনদের ঠিকানা হবে জান্নাত এবং কাফির ও পাপীদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এই জীবন চিরস্থায়ী। জান্নাতের সুখ-শান্তি এবং জাহান্নামের কষ্ট কখনোই শেষ হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَہُمْ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِہَا الْاَنْہٰرُ ۬ؕؑ  ذٰلِکَ الْفَوْزُ الْکَبِیْرُ ؕ

যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের বাগানসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। এটাই মহা সফলতা।” সূরা আল-বুরুজ : ১১

আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম সম্পর্কে বলেছেন-

وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَہُمْ نَارُ جَہَنَّمَ ۚ  لَا یُقْضٰی عَلَیْہِمْ فَیَمُوْتُوْا وَلَا یُخَفَّفُ عَنْہُمْ مِّنْ عَذَابِہَا ؕ  کَذٰلِکَ نَجْزِیْ کُلَّ کَفُوْرٍ ۚ

আর যারা কুফরী করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের প্রতি এমন কোন ফয়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মারা যাবে, এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। সূরা ফাতির : ৩৬

এই তিনটি পর্যায় একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। ইহকালীন জীবন হলো বারযাখী ও পরকালীন জীবনের সেতু। যে ব্যক্তি ইহকালে ভালোভাবে জীবন যাপন করবে, সে বারযাখ ও পরকালে সফলতা লাভ করবে।

মানুষ জীবনের ও তিনটি পর্যায় আমাদের আলোচ্য বিষয় শেষ দুটি অর্থাৎ বারজখ ও পরকালের জীবন।

বারযাখী জীবন

বারযাখী জীবন (الحياةُ البَرزَخِيَّةُ ) :

মানুষের জীবনচক্র তিনটি মূল স্তরে বিভক্ত- দুনিয়ার জীবন, বারযাখী জীবন, এবং আখিরাতের জীবন। এর মধ্যে “বারযাখী জীবন” সবচেয়ে রহস্যময় ও অদৃশ্য জগৎ। দুনিয়ার জীবন ও কিয়ামতের পরের স্থায়ী জীবনের মাঝে একটি অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা হলো বারযাখ—যেখানে প্রতিটি মানুষের আত্মা তার মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করবে। এটি কুরআন ও সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

বারযাখ (بَرْزَخٌ)  একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো- “আড়াল”, “প্রাচীর” বা “দ্ব্যর্থবোধক সীমারেখা”, যা দুটি ভিন্ন বাস্তবতার মাঝখানে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ

যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সুরা মুমিনুন : ১০০

এই আয়াতের আলোকে স্পষ্ট হয়, মৃত্যুর পর মানব আত্মা একটি অন্তরালের মধ্যে প্রবেশ করে, যেটি বারযাখ নামে পরিচিত। বারযাখী জীবন সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অবগত নই, কারণ এটি গায়েব বা অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত। তবে হাদীসের আলোকে কিছু বিষয় জানা যায় যার মাধ্যমে বুঝা যায় কবরের জীবনই বারযাখী জীবনের এক অংশ। বারযাখী জীবন হলো দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে এক গায়েবি জগত, যা দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পরই শুরু হয়। এটি যেমন মুমিনদের জন্য আরামদায়ক ও প্রশান্তিময় একটি আবাস, তেমনি গাফেল ও কুফরকারীদের জন্য ভয়াবহ এক শাস্তির জায়গা। মৃত্যুর পর কবরের আজাব বা শান্তি, প্রশ্ন-উত্তর, ফেরেশতা মুনকার-নাকীর আগমন—এসবই বারযাখী জীবনের অঙ্গ।

১. বারযখী জীবনের শুরুতে সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর আর তাওবা কবুল কবে না

মূলত মৃত্যুর পরই বারযাখী জীবন শুরু হয়। তাই আমরা এ পর্যায়ে মৃত্যু থেকে পুণরুত্থন পর্যন্ত দীর্ঘ বারযাখী জীবন (الحياةُ البَرزَخِيَّةُ) এর একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরব।  কুরআন ও সহিহ হাদিসে বরজখি জীবনের কিছু সুখ ও তার শাস্তির বর্ণিত হয়েছে। এ জীবনের শুধুতে যখন মৃত্যু উপস্থিত হবে, তখন মানুষের চোখ খুলে যাবে। সে তখন ভালো কাজ সম্পাদন করার জন্য আরো সময় কামনা করবে। কিন্তু তাকে আর সময় দেওয়া হবে না। মৃত্যুর সময় এ ধরনের প্রার্থনা অনর্থক। এতে কোনো ফল বয়ে আনে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حَتّٰۤی اِذَا جَآءَ اَحَدَہُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ ۙ لَعَلِّیْۤ اَعْمَلُ صَالِحًا فِیْمَا تَرَکْتُ کَلَّا ؕ اِنَّہَا کَلِمَۃٌ ہُوَ قَآئِلُہَا ؕ وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ

অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, সে বলে, ‘হে আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান, যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সূরা মুমিনূন : ৯৯-১০০

পবিত্র কুরআনের ফেরাউনের ঈমান আনার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। যখন ফেরাউন ও তার সৈন্য বাহিনীকে ডুবিয়ে মারার জন্য আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর আজাব নাজিল করেন, তখন ফেরাউন বুঝতে পারে যে, তার সামনে সত্য উন্মোচিত হয়েছে। সেই মুহূর্তে সে বলেছিল, তার সামনে যখন সত্য উন্মোচিত হয় তখন সে আল্লাহ উপর ঈমান এনেছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার ঈমান গ্রহন করেন নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَجٰوَزْنَا بِبَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ الْبَحْرَ فَاَتْبَعَہُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُوْدُہٗ بَغْیًا وَّعَدْوًا ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَدْرَکَہُ الْغَرَقُ ۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا الَّذِیْۤ اٰمَنَتْ بِہٖ بَنُوْۤا اِسْرَآءِیْلَ وَاَنَا مِنَ الْمُسْلِمِیْن آٰلْـٰٔنَ وَقَدْ عَصَیْتَ قَبْلُ وَکُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِیْنَ

আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির‘আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’। এখন ঈমান আনছ? অথচ পূর্ব (মুহুর্ত) পর্যন্ত তুমি নাফরমানী করছিলে এবং বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। সুরা ইউনুস : ৯০-৯০

২. মৃত্যুর যন্ত্রনার মাধ্যমে বারযখী জীবন শুরু হয়

বারযখী জীবন শুরুতে বান্দার রূহ কবজ করে তার মৃত ঘটান হয়। এ রূহ কবজের সময় বান্দা যন্ত্রনা অনুভব করে যাকে মৃত্যু যন্ত্রনা বলা হয়। এ মৃত্যুর যন্ত্রনা সকল বন্দাকেই ভোগ করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَجَآءَتْ سَکْرَۃُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ؕ ذٰلِکَ مَا کُنْتَ مِنْہُ تَحِیْدُ

মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই আসবে। যা থেকে তুমি পলায়ন করতে চাইতে। সুরা কাফ : ১৯

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

 وَلَوْ تَرٰۤی اِذِ الظّٰلِمُوْنَ فِیْ غَمَرٰتِ الْمَوْتِ وَالْمَلٰٓئِکَۃُ بَاسِطُوْۤا اَیْدِیْہِمْ ۚ اَخْرِجُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ اَلْیَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْہُوْنِ بِمَا کُنْتُمْ تَقُوْلُوْنَ عَلَی اللّٰہِ غَیْرَ الْحَقِّ وَکُنْتُمْ عَنْ اٰیٰتِہٖ تَسْتَکْبِرُوْنَ

আর যদি তুমি দেখতে, যখন যালিমরা মৃত্যু কষ্টে থাকে, এমতাবস্থায় ফেরেশতারা তাদের হাত প্রসারিত করে আছে (তারা বলে), ‘তোমাদের জান বের কর। আজ তোমাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে লাঞ্ছনার আযাব, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তোমরা তার আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহঙ্কার করতে। সুরা আনাম : ৯৩

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَإِنَّهُ لَبَيْنَ حَاقِنَتِي وَذَاقِنَتِي فَلاَ أَكْرَهُ شِدَّةَ الْمَوْتِ لأَحَدٍ أَبَدًا بَعْدَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏.‏

আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুকালীন সময়ে তার মাথা আমার থুতনি এবং গলদেশের মাঝখানে ছিল। তার মৃত্যু যন্ত্রণা দর্শনের পর আমি অন্য কারো মৃত্যু যন্ত্রণা খারাপ মনে করি না। সুনানে নাসায়ি : ১৮৩৩ ইফ:

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ফাতেমাহ (রাঃ) বললেন, উহ্! আমার পিতার উপর কত কষ্ট! তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আজকের পরে তোমার পিতার উপর আর কোন কষ্ট নেই। যখন তিনি ইন্তিকাল করলেন তখন ফাতেমাহ (রাঃ) বললেন, হায়! আমার পিতা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর বাসস্থান। হায় পিতা! জিবরীল (আঃ)-কে তাঁর ইনতিকালের খবর শুনাই। যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সমাহিত করা হল, তখন ফাতিমাহ (রাঃ) বললেন, হে আনাস! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাটি চাপা দিয়ে আসা তোমরা কীভাবে বরদাশত করলে! সহিহ বুখারি : ৪৪৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬২৯, আহমাদ : ১৬০২৬, সহীহাহ : ১৬৩৮,

প্রতিটি মুসলামের বিশ্বাস মৃতবরণ করার পর তার সামনে কবর, মিজান, হাশর, ফুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম। কিন্তু দুনিয়ার কাজে আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে এসব নিয়ে চিন্তা করার ও সময় কোথায়। মহান আল্লাহ বলেন,

كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَما الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ

প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ নয়। সুরা ইমরান :১৮৫

কাজেই কেউ মারা গেলই তার পরকালের যাত্রা শুরু। তখন মানুষ নিজের জন্য না হলে মৃত্যু ব্যক্তির জন্য আমল শুরু করে যাতে তার পরকালের যাত্রা শান্তিময় হয়ে জান্নাতে যেতে পারে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ও মৃত্যু

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে চামড়ার অথবা (বর্ণনাকারী উমরের সন্দেহ) কাঠের একপাত্রে কিছু পানি রাখা ছিল। তিনি তাঁর হাত ঐ পানির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন। এরপর নিজ চেহারা দু’ হাত দ্বারা মাসহ(মাসেহ) করতেন আর বলতেন ’লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ঃ নিশ্চয়ই মৃত্যুর অনেক যন্ত্রণা। এরপর দু’হাত তুলে বলতে লাগলেনঃ হে আল্লাহ্! উচ্চ মর্যাদা সম্পন্নদের সঙ্গে করে দেন। এ অবস্থাতেই তার (জান) কবয করা হলো। আর তাঁর হাত দু’টো এলিয়ে পড়ল। সহিহ বুখারি : ৬৫১০

মৃত্যুর পরে মাইয়াত কিবলা মুখি করা হবে

মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করা একটি মুস্তাহাব আমল বিধায় না করলেও সমস্যা নেই। কিন্তু সময় ও সুযোগ থাকলে মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করে দেয়া ভাল। তবে বাড়াবাড়ি অপছন্দনীয় কাজ।

উমাইর (রা.) সূত্রে বর্ণিত। যিনি সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! কোনগুলি কবীরাহ গুনাহ? তিনি বললেন, এর সংখ্যা নয়টি। অতঃপর উপরোক্ত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত। এতে আরো রয়েছে, মুসলিম পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়া এবং তোমাদের জীবন-মরণের কিবলাহ কা’বা ঘরের চত্বরে নিষিদ্ধ কাজকে হালাল গণ্য করা। সুনানে আবু দাউদ : ২৮৭৫

এই হাদিসে আমাদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কিবল হিসাবে বাইতুল্লাহকে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই অনেক আলেম মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। তবে মাইয়াতকে কেবলা মুখি করা সুন্নাহ। মাইয়াতকে ডান কাতে শোয়ানোর কোন স্পষ্ট কোন দলীল নাই তবে জীবিত মানুষের ডানকাতে ঘুমানোর সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও সহহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সম্ভবত, এই সহিহ হাদিসের উপর ভিত্তি করেই বিদ্বানগণ মাইয়েতকে ডান কাতে শোয়ানোকে উত্তম বলেছেন। আল-মুহাল্লা, তৃতীয় খণ্ড, পৃ-৪০৪, মাসআলা : ৬১৫

৩. মাইয়াতের গোসল, কাফন, জানাযা ও দাফনের ব্যবস্থা করা

কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে চারটি কাজ দ্রুততার সাথে সম্পাদন জরুরি। মাইয়াতকে সামনে নিয়ে বেশী সময় অপেক্ষা করা সুন্নাহ বিরোধী। খুবই দ্রুততার সাথে নিম্নের চারটি কাজ সমাধা করতে হবে।

(১) মাইয়াতকে গোসল করান

(২) কাফনের কাপড় পরিধান করান

(৩) জানাযা সালাতের ব্যবস্থা করা

(৪) দাফনের ব্যবস্থা করা

(১) মাইয়াতকে গোসল করান-

সহিহ হাদিসের আলোকে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা যায়নাব (রা.) এর গোসলের বিবরণ-

উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা (যায়নাবকে) গোসল করাচ্ছিলাম। এ সময় তিনি আমাদের কাছে এলেন। তিনি বললেন, তোমরা তিনবার, পাঁচবার, প্রয়োজন বোধ করলে এর চেয়ে বেশী বার। পানি ও বরই পাতা দিয়ে তাকে গোসল দাও। আর শেষ বার দিকে ’কাফুর’। অথবা বলেছেন, কাফূরের কিছু অংশ পানিতে ঢেলে দিবে, গোসল করাবার পর আমাকে খবর দিবে। তাঁকে গোসল করাবার পর আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে খবর দিলাম। তিনি এসে তহবন্দ বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, এ তহবন্দটি তাঁর শরীরের সাথে লাগিয়ে দাও। আর এক বর্ণনার ভাষা হলো, তাকে বেজোড় তিন অথবা পাঁচ অথবা সাতবার (পানি ঢেলে) গোসল দাও। আর গোসল ডানদিক থেকে আজুর জায়গাগুলো দিয়ে শুরু করবে। তিনি (উম্মু আতিয়াহ) বলেন, আমরা তার চুলকে তিনটি বেনী বানিয়ে পেছনের দিকে ছেড়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ১২৫৩, ১২৫৪, ১২৫৮, ১২৬৩, সহিহ মুসলিম : ৯৩৯, মিশকাত : ১৬৩৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩১৪২, সুনানে তিরমিযী : ৯৯০, সুনানে নাসায়ী : ১৮৮১, ১৮৮৬, ইবনু মাজাহ : ১৪৫৮

এছাড়াও মাইয়াতের গোসল করানোর সময় নিম্নের বিধানগুলি অনুসরণ করতে হবে-

ক। মাইয়াতের গোসল ডান দিক ও অজুর অঙ্গ হতে আরম্ভ করা

উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ তাঁর মেয়ে (জয়নাব (রা.)  কে গোসল করানোর সময় তাঁদের বলেছিলেন, তোমরা তার ডান দিক হতে এবং অজুর অঙ্গ হতে আরম্ভ কর। সহিহ বুখারি : ১৬৭

খ। মহিলার চুল তিনটি বেনী করে তার পিছন দিকে রাখা :

উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ এর কন্যাগণের একজনের ইন্তিকাল হলে তিনি ﷺ আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা তাকে বরই পাতার পানি দিয়ে বিজোড় সংখ্যক তিনবার, পাঁচবার অথবা প্রয়োজনবোধ করলে আরও অধিকবার গোসল দাও। শেষবারে কর্পূর অথবা তিনি বলেছিলেন কিছু কর্পূর ব্যবহার করবে। তোমরা গোসল শেষ করে আমাকে জানাবে। আমরা শেষ করে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর ﷺ চাদর আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন, আমরা তাঁর মাথার চুলগুলো তিনটি বেনী করে পিছনের দিকে ছেড়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ১২৬৩

গ। মাইয়াতের কোন গোপনীয় বিষয় গোচরীভূত হলে তা প্রকার করা যাবে না

আলি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ غَسَّلَ مَيِّتًا وَكَفَّنَهُ وَحَنَّطَهُ وَحَمَلَهُ وَصَلَّى عَلَيْهِ وَلَمْ يُفْشِ عَلَيْهِ مَا رَأَى خَرَجَ مِنْ خَطِيئَتِهِ مِثْلَ يَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ

অর্থ : যে ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলো, কাফন পরালো, সুগন্ধি মাখল, বহন করে নিয়ে গেলো, তার জানাজার সালাত পড়লো এবং তার গোচরীভূত হওয়া তার গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করলো না, তার থেকে তার গুনাহসমূহ তার জন্মদিনের মত বের হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬২ মান জঈফ।

ঘ। স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে বিনা দ্বিধায় গোসল দিতে পারবে

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন

رَجَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ الْبَقِيعِ فَوَجَدَنِي وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِي رَأْسِي وَأَنَا أَقُولُ وَا رَأْسَاهُ فَقَالَ بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَا رَأْسَاهُ ثُمَّ قَالَ مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِي فَقُمْتُ عَلَيْكِ فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ وَدَفَنْتُكِ

অর্থ : রাসুলুল্লাহ ﷺ বাকি থেকে ফিরে এসে আমাকে মাথা ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পেলেন। তখন আমি বলছিলাম, হে আমার মাথা! তিনি বলেন, হে আয়িশা! আমিও মাথা ব্যথায় ভুগছি। হে আমার মাথা! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যেতে, তাহলে তোমার কোন ক্ষতি হতো না। কেননা আমি তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন পরাতাম, তোমার জানাজার সালাত পড়তাম এবং তোমাকে দাফন করতাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, দারাকুৎনী : ১৮৩৩

ঙ। মৃতব্যক্তিকে পৃথকভাবে কুলুখ করানোর প্রয়োজন নাই, বরং পানি দ্বারাই সবকিছু করতে হবে।

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি (মহিলাদের) বললেন, তোমরা তোমাদের স্বামীদের পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করার নির্দেশ দাও। আমি (স্ত্রীলোক হিসাবে) তাদের (এ নির্দেশ দিতে) লজ্জাবোধ করছি। কেননা রাসুলুল্লাহ ﷺ ও পানি দিয়ে ইস্তিনজা করতেন। সুনানে তিরমিজি : ১৯

আলি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ غَسَّلَ مَيِّتًا وَكَفَّنَهُ وَحَنَّطَهُ وَحَمَلَهُ وَصَلَّى عَلَيْهِ وَلَمْ يُفْشِ عَلَيْهِ مَا رَأَى خَرَجَ مِنْ خَطِيئَتِهِ مِثْلَ يَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ

অর্থ : যে ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলো, কাফন পরালো, সুগন্ধি মাখান, বহন করে নিয়ে গেলো, তার জানাজার সালাত পড়লো এবং তার গোচরীভূত হওয়া তার গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করলো না, তার থেকে তার গুনাহসমূহ তার জন্মদিনের মত বের হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬২ মান জঈফ।

(২) কাফরে কাপড় পরিধান করান

ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে তিনটি কাপড়ে কবর দেওয়া হয়। এগুলো ছিল নাজরানের তৈরি। যার একটি ছিল চাদর, একটি লুঙ্গি এবং অপরটি ছিল মৃত্যুশয্যায় তাঁর পরিহিত পোশাক। উসমান ইবনে আবু শাইবার বর্ণনায় রয়েছে। তাকে তিনটি কাপড়ে কাফন দেয়া হয়েছিল- যার দু’টি চাদর লাল বর্ণের এবং যে জামা পরিহিত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩১৫৩ মান যঈফ।

গাকীফ গোত্রের কাফিনের কন্যা লায়লা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা উম্মু কুলসুম (রা.) মারা গেলে যে মহিলা তাকে গোসল দেয় তার সাথে ’আমিও ছিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে (কাফনের জন্য) প্রথমে তহবন্দ, তারপর কামিজ, তারপর ওড়না, তারপর চাদর এবং অন্য একটি কাপড় দিলেন। যা দিয়ে লাশ পেঁচিয়ে দেয়া হলো। লায়লা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কাফনের কাপড়সহ দরজার পাশেই বসা ছিলেন। তিনি সেখান থেকে একটি একটি করে কাপড়গুলো আমাদেরকে প্রদান করেন।  সুনানে আবু দাউদ : ৩১৫৭ মান যঈফ

(৩) জানাযা সালাতের ব্যবস্থা করা

জানাযার সালাতের পদ্ধতি

ক। মাইয়াতকে সামনে রেখে কাতারে সোজা করে জানাযা সালাতের নিয়ত করবে।

খ। ইমাম আল্লাহু আকবার বলে প্রথম তাকবীর দিলে সবাই দু’হাত কাঁধের সমান উঠাবেন। তারপর হাত দুটি বুকের উপর রেখে পড়বেন ‘সুরা ফাতেহা’ পাঠ করা।  অবশ্য হানাফি মাজহাবের আলেমগণ ফাতিহার পরিবর্তে সানা পাঠ করে থাকেন। (বিস্তারিত আলোচনা পরে আছে)

গ। ইমাম সাহেব দ্বিতীয় তাকবীর দিলে নবি ﷺ এর উপর দরুদ পড়বেন। দুরুদে ইব্রাহিম পড়াই উত্তম। সহিহ বুখারি : ৩৩৭০, সহিহ মুসলিম, : ৪০৬। 

দুরুদটি হলো

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

ঘ। অতঃপর ইমাম সাহের তৃতীয় তাকবীর দিবেন। অতঃপর মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ করবেন ঐকান্তিকতা ও ইখলাসের সাথে মাইয়াতের জন্য দুআ করবে।

প্রথম দুআ

আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ জানাযার সালাতে এ দুআ করতেনÑ

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا، وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا، وَصَغِيرِنَا وَكَبيرِنَا، وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا. اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلاَمِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ، اللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ، وَلاَ تُضِلَّنَا بَعْدَهُ

হে আল্লাহ! আমাদের জীবিতÑমৃত, ছোটÑবড়, পুরুষÑনারী এবং উপস্থিতÑঅনুপস্থিত সকলকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে আপনি যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের উপর জীবিত রাখেন এবং আমাদের মধ্যে যাকে মৃত্যু দিবেন তাকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দিন। হে আল্লাহ! এর সাওয়াব থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না এবং এর পর আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করবেন না।’ আবু দাঊদ : ৩২০১; তিরমিযী : ১০২৪; নাসায়ি :  ১৯৮৫; ইবন মাজাহ :  ১৪৯৮

দ্বিতীয় দুআ

জুবায়ের ইবনে নুফায়র (রহ.) থেকে বর্ণিত। (তিনি বলেন) আমি আওফ ইবনে মালিক (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ এক জানাযায় যে দুআ পড়লেন, আমি তার সে দুআ মনে রেখেছি। দুয়ায় তিনি এ কথাগুলো বলেছিলেন

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَاراً خَيْراً مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلاً خَيْراً مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجَاً خَيْراً مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ [وَعَذَابِ النَّارِ]

হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করে দাও ও তার প্রতি দয়া কর। তাকে নিরাপদে রাখ ও তার ক্রটি মার্জনা কর। তাকে উত্তম সামগ্ৰী দান কর ও তার প্রবেশ পথকে প্রশস্ত করে দাও। তাকে পানি, বরফ ও বৃষ্টি দ্বারা মুছে দাও এবং পাপ থেকে এরূপভাবে পরিষ্কারÑপরিচ্ছন্ন করে দাও যেÑরূপ সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। তাকে তার ঘরকে উত্তম ঘরে পরিণত কর, তার পরিবার থেকে উত্তম পরিবার দান কর, তার স্ত্রীর তুলনায় উত্তম স্ত্রী দান কর। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং কবরের আজাব ও জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচাও।

বর্ণনাকারী আওফ ইবনে মালিক বলেন, তার মূল্যবান দুআ শুনে আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জাগল, আমি যদি সে মৃত ব্যক্তি হতাম। সহিহ মুসলিম : ৯৬৩

তৃতীয় দুআ

ওয়াসিলা ইবনেল আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলিমদের এক ব্যক্তির জানাযার সালাত পড়লেন। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি

হে আল্লাহ! অমুকের পুত্র অমুক তোমার জিম্মায় এবং তোমার নিরাপত্তার বন্ধনে। তুমি তাকে কবরের বিপর্যয় ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো এবং তাকে দয়া করো। কেননা তুমিই কেবল ক্ষমাকারী পরম দয়ালু’’। ইবনে মাজাহ ১৪৯৯, সুনানে আবু দাউদ : ৩২০২, আহমাদ : ১৫৫৮৮ মিশকাত : ১৬৭৭।

আর যদি মৃতব্যক্তি শিশু হয়, তবে বলুন,

 اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرَطاً، وَسَلَفاً، وَأَجْراً

হে আল্লাহ, আমাদের জন্য তাকে অগ্রগামী প্রতিনিধি, অগ্রিম পুণ্য এবং সওয়াব হিসেবে নির্ধারণ করে দিন।  আব্দুর রায্যাক তার মুসান্নাফে : ৬৫ ৮৮।

ঙ। সর্বশেষ ইমাম সাহেব চতুর্থ তাকবীর দিয়ে ডানে বামে সালাম দিয়ে জানাযার সালাত শেষ করবে।

একটি পর্যালোচনা : জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা না ছানা পড়ত হবে।

জানাযার নামাযে সুরা ফাতিহা পড়ার ব্যাপারটি যদিও মতবিরোধ পূর্ণ। তবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত হল, জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়তে হবে। সহিহ বুখারিতে এসেছে-

ত্বলহাহ্ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আউফ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ

আমি ইবনে আব্বাস (রা.) এর পিছনে জানাযার সালাত আদায় করলাম। তাতে তিনি সুরা ফাতিহা পাঠ করলেন এবং (সালাত শেষে) বললেন, (আমি সুরা ফাতিহা পাঠ করলাম) যাতে লোকেরা জানতে পারে যে, এটা সুন্নাত। সহিহ বুখারি : ১৩৩৫

প্রখ্যাত সাহাবী উবাদা বিন সামেত (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-

لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ.

যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ করবে না তার সালাত হবে না। সহিহ বুখারি ৭৫৬, সহিহ মুসলিম : ৩৯৪, আহমাদ : ২২৮০৭

আর জানাযার সালাত একটি সালাত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلاَ تَقُمْ عَلَىَ قَبْرِهِ

আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনও সালাত পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। সুরা তাওবা : ৮৪

আল্লাহ তায়ালা এখানে জানাযার সালাতকেও সালাত বলে উল্লেখ করেছেন। তাই ইমাম হোক আর মুসল্লী হোক। আস্ত হোক আর জোরে হোক ফাতিহা তো পড়তেই হবে।

যারা বলেন ফাতিহা পড়তে হবে না তাদের দলিল

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কোনো মাইয়াতের জানাযার নামাজ পড়তেন তখন প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করতেন তারপর নবি কারীম ﷺ এর উপর দরুদ পড়তেন অতঃপর দুআ করতেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৪৯৪

নাফে রাহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. জানাযার নামাযে (কুরআন) পড়তেন না। মুয়াত্তা মালিক – : ৫২৩, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৫২২, এই আছরটি বিশুদ্ধতম সনদে বর্ণিত।

আবু সাঈদ মাকবুরী থেকে বর্ণিত। তিনি আবু হুরায়রা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কিভাবে জানাযার সালাত পড়েন?  আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম অবশ্যই আমি তোমাকে বলব। আমি মাইয়াতের (ঘর থেকে) পরিবারের সাথে রয়েছি। অতঃপর যখন মাইয়াতকে রাখা হয় আমি তাকবীর পড়ি এবং আল্লাহর প্রশংসা করি। তারপর নবির উপর দরুদ পড়ি। অতঃপর দুআ করি। মুয়াত্তা মালেক ৫২১; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৬৪২৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৪৯৫,

এই সকল হাদিসের আলোক তারা দাবি করেন জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া জরুরি নয়। তাদের অনেক বিশ্লেষন ধর্মী লেখা পড়েছি, তারা কোথাও কোন হাদিসের রেফারেন্স দিতে পাবেনী যে, জানাযার সালাতে ছানা পড়তে হবে। কিন্তু তাদের প্রতিটি হাদিস জানাযা সালাতে প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ জানাযার সালাতে ছানা দিয়া শুরু করতে হবে। ফিকহি ক্ষেত্র সাহাবিদের যুগ থেকেই মতভেদ চলে আসছে। কিন্তু তারা এই নিয়ে মতবিরোধ করে নাই বা ঝগড়া বিবাদও করে নাই। আমাদের অবস্থান তাদের বিপরীত, আমরা আজ ফিকহি মাসায়েল নিয়ে মতবিরোধ করেছি বা ঝগড়া বিবাদ করছি। নিরপেক্ষ ভাবে বলতে গেলে সুরা ফাতিহায় মহান আল্লাহর প্রশংসা আছে। যদি জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় তবে মহান আল্লাহর প্রশংসা হবে আবার বুখারিতে বর্ণিত সহিহ হাদিসের উপরও আমল হবে। তাই জানাযার সালাতের শুরুতে সুরা ফাতিহা পড়া উত্তম। তবে একটি কথা পরিধান যোগ্য, যারা ফাতিহা না পড়ে সানা পাঠ করে, তাদের আমলকে অযোগ্য বলে, বিদআত বলে প্রচার করা ঠিক হবে না। কেননা মতভেদপূর্ণ মাসায়েল নিয়ে বিরোধে জড়ান বা ঝগড়া বিবাদ করা অবশ্যই বিদআতি কাজ।

কবর বা বারযখী জীবন : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৪. মৃতদেহ বহন করে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া :

মৃতদেহকে দাফন করার জন্য মৃতদের রাখার খাটে করে কাধে বহন করে গোরস্থানের নিয়ে যেতে হবে। মাইয়াতের মাথা সামনে দিকে রেখে কাধে বহন করা সুন্নাত। পরিবার ও নিকট অত্মীয় পুরুষ লাশ বহন করা ভাল তবে অন্য কেউ বহন করলে নাজায়েয নয়। জানাযার পিছে পিছে মেয়েদের যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে এটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ নয়। এই সময় সরবে কান্নাকাটি করা যাবে না। আগেই উল্লেখ করেছি সরবে যিকর, তাকবীর ও তেলাওয়াত বা অনর্থক কথাবার্তা বলা যাবে না। বরং মৃত্যুর চিন্তা করতে করতে চুপচাপ ভাবগম্ভীরভাবে মধ্যম গতিতে মাইয়েতের পিছে পিছে কবরের দিকে এগিয়ে যাবে। চলা অবস্থায় রাস্তায় (বিনা প্রয়োজনে) বসা যাবে না। অনেক স্থানে দেখা যায় জানাযা বহন কালে তিন বার মাইয়াতকে মাটিতে রাখা। কবর স্থানে নিকটে হওয়া সত্বেও তিন বার বিশ্রাম কে সুন্নাহ মনে করে বসা হয়। এইভাবে জরুরী মনে করে বসাই হল বিদআত। তবে হ্যা, কোন কারনে যদি জানাযার জন্য বা কবরে রাখান জন্য বেশ দুরে লাশ বহন করে নিতে হয় এবং বহনকারীদের বিশ্রামের জন্য লাশ বহনকারী খাট মাটিতে রেখে বিশ্রাম নিলে কোন অসুবিধা নেই। আমাদের সমাজে প্রচলিত, লাশ বহন কালে তিন বার বিশ্রাম নিতেই হবে। যদি কেউ এই কাজ জরুরী বা সুন্নাহ ভেবে করে থাকে তবে বিদআত হবে।

জানাযার পিছে পিছে উচ্চৈঃস্বরে যিকর করা কোন সুন্নাহ সম্মত কাজ নয়। এটি একটি বাদআতী কাজ। জানাযা বহনের সময় পরিপূর্ণ নীরবতাই সুন্নাত। মনের গভীরে শোক ও মৃত্যু চিন্তা নিয়ে নীরবে পথ চলতে হবে। পরস্পরে কথাবার্তা বলাও সুন্নাত বিরোধী। ইমাম নাবাবী বলেন, লাশ বহনের সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকাই হলো সুন্নাত সম্মত সঠিক কর্ম যা সাহাবীগণ ও পরবর্তী যুগের মানুষদের রীতি ছিল। প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ আল্লামা কাসানী বলেন, ‘‘লাশের অনুগমনকারী তার নীরবতাকে প্রলম্বিত করবে। এ সময় সশব্দে যিকর করা মাকরূহ। কাইস ইবনু উবাদাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাহাবীগণ তিন সময়ে শব্দ করতে অপছন্দ করতেন: যুদ্ধ, জানাযা এবং জিকির। এছাড়া লাশ বহনের সময় সশব্দে জিকির করা ইহূদী-নাসারাগণের অনুকরণ; এজন্য তা মাকরূহ। কাসানী, বাদাইউস সানাই ১/৩১০, হাদিসের নামে জালিয়াত

অনেক সময় দেখা যায় লাশ বহন করার সময় এত উচ্চ স্বরে জিকির করছে মনে হবে কোন রাজনৈতিক দলের মিছিল যাচ্ছে। সম্প্রতি কালে ইউটিউবে দেখলাম একটি মুসলিম ভাইয়ের লাশ ঢাকঢোল পিটিয়ৈ কবরে নেয়া হচ্ছে। এই সকল জাহের মুসলিমদের জন্য কষ্ট পাওয়া ছাড়া কিছু করার নাই।

৫. মাইয়াতকে অতিক্রম না করে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্নাত

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন

مَرَّتْ جَنَازَةٌ فَقَامَ لَهَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَقُمْنَا مَعَهُ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهَا يَهُودِيَّةٌ ‏.‏ فَقَالَ ‏ “‏ إِنَّ الْمَوْتَ فَزَعٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُ الْجَنَازَةَ فَقُومُوا ‏

একটি জানাযা নিয়ে যাওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ তার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন, আমরাও তার সঙ্গে দাঁড়ালাম এবং বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ জানাযা একজন ইয়াহুদী মহিলার। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, মৃত্যু হল ভীতিকর ব্যাপার। অতএব কোন জানাযা দেখলে দাঁড়িয়ে যেও। সহিহ মুসলিম : ২০৯৩ ইফা:

নাফি (রহ.) হতে উক্ত সনদে লায়স ইবনে সাদ (রহ.) এর হাদিসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে ইবনে জুরায়জের হাদিসে আছে যে, নাবি ﷺ বলেছেন, তোমরা যখন কোন জানাযা দেখ, তখন তোমরা জানাযার সঙ্গে না গেলে জানাযা এগিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকো। সহিহ মুসলিম : ২০৯০ ইফা:

কাজেই মাইয়াতকে দেখে দাঁড়িয়ে থাকাই সুন্নাহ। যখন শবদেহ অতিক্রম করবে তখন স্থান ত্যাগ করা উচিত। কিন্তু জানাযার সাথে থাকলে বা অনুগামী হলে ভিন্ন কথা। জানাযার অনুগামী  মাইয়েতের পিছনে কাছাকাছি চলাই উত্তম। তবে প্রয়োজনে সম্মুখে ও ডানে-বামে চলা যাবে। কেউ গাড়িতে গেলে তাকে পিছে পিছেই যেতে হবে। শবদেহ দেখার পর আর তার আগে চলা উচিত হবে না। কিন্তু শবদেহে দেখে বসা থেকে দাঁড়ান সুন্নতটি রহিত হয়ে গেছে। শেষে দিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ আর শবদেহ দেখে বসা থেকে দাঁড়াতেন না।

ওয়াকিদ ইবনে আমর সাদ ইবনে মুয়াজ (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একটি জানাযা উপলক্ষ্যে দাঁড়িয়েছিলাম। এমতাবস্থায় নাফি ইবনে জুবায়র (রহ 🙂 আমাকে দাঁড়ানো দেখতে পেলেন। জানাযা মাটিতে রাখার অপেক্ষায় তিনি বসে ছিলেন। আমাকে বললেন, দাঁড়িয়ে থাকছ কেন? আমি বললাম, আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণিত হাদিসটির কারণে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। তখন নাফি (রহ .) বললেন, মাসুদ ইবনেল হাকাম আমার কাছে আলী ইবন আবু তালিব (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রথমে দাঁড়াতেন। পরে তিনি বসেছেন। সহিহ মুসলিম : ২০৯৮ ইফা:

৬. মাইয়াতকে তাড়াতাড়ি দাফন করা।

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

أَسْرِعُوا بِالْجِنَازَةِ فَإِنْ تَكُ صَالِحَةً فَخَيْرٌ تُقَدِّمُونَهَا وَإِنْ يَكُ سِوَى ذَلِكَ فَشَرٌّ تَضَعُونَهُ عَنْ رِقَابِكُمْ

জানাযার কার্যক্রম সালাত তাড়াতাড়ি আদায় কর। কারণ মৃত ব্যক্তি যদি নেক মানুষ হয় তাহলে তার জন্য কল্যাণ। কাজেই তাকে কল্যাণের দিকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবে। সে এরূপ না হলে খারাপ হবে। তাই তাকে তাড়াতাড়ি নিজেদের ঘাড় থেকে নামিয়ে দাও। সহিহ বুখারি : ১৩১৫, সহিহ মুসলিম :৯৪৪, আবু দাঊদ ৩১৮১, আত্ তিরমিযী ১০১৫, নাসায়ি ১৯১০, ১৯১১, ইবনে মাজাহ্ ১৪৭৭

আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে বলেন-

يَا عَلِيُّ ثَلاَثٌ لاَ تُؤَخِّرْهَا الصَّلاَةُ إِذَا آنَتْ وَالْجَنَازَةُ إِذَا حَضَرَتْ وَالأَيِّمُ إِذَا وَجَدْتَ لَهَا كُفْؤًا

হে আলী। তিনটি কাজে দেরি করবে না। সালাত যখন ওয়াক্ত হয়ে যায়; জানাযা যখন উপস্থিত হয় এবং বিধবাÑযখন তার যোগ্য পাত্র পাওয়া যায়। সুনানে তিরমিজি : ১০৭৫, মিশকাত : ১৪৮৬

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন কালো অথবা একজন যুবক মসজিদ ঝাড়ু দিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে কয়েক দিন না পেয়ে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকেরা তাকে জানালেন, সে মারা গিয়াছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, তোমরা আমাকে জানাওনি কেন? রাবী বলেন, তারা যেন তাঁর ব্যাপারটি তুচ্ছ মনে করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা আমাকে তার কবর দেখিয়ে দাও। তারা (কবরটি) দেখিয়ে দিলেন। তিনি ঐ কবর সামনে রেখে জানাযার সালাত আদায় করলেন। তারপর বললেন, এ কবরগুলো তাদের জন্য অত্যন্ত অন্ধকার। আল্লাহ তায়ালা আমার সালাতের কারণে তাদের জন্য কবরকে আলোকোজ্জ্বল করে দেবেন। সহিহ মুসলিম : ২০৮৬ ইফা:

মৃত ব্যক্তি ভালো হোক আর মন্দ হোক জানাযা দ্রুত আদায় করা জরুরি। আমাদের দেশে দেখা যায় মৃত ব্যক্তির কোন নিকট আত্মীয়ের জন্য জানাযা ও দাফন কাজ এক দু দিন রেখে দেয়। শুধু আবেগের বশীভূত হয়ে বিদেশ থেকেও মৃত ব্যক্তির দেহ আনার জন্য কয়েক সপ্তাহ পরে দাফন করা হয়। কারণ অনেক সময় মৃত ব্যক্তির দেহ বিদেশে থেকে দেশে আনতে দুই তিন সপ্তাহ লেগে যায়। এ সব কাজ ইসলামি শরীয়া সমর্থ করে না।

৭. দাফনের ব্যবস্থা করা

মাইয়াতকে নিজ বাসস্থানের নিকটবর্তী মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা উচিত। তবে সঙ্গত কারণে অন্যত্র নেওয়া যাবে। মাইয়াতকে ডান কাতে কিবলামুখী করে শোয়াবে। এই সময় কাফনের কাপড়ের গিরাগুলি খুলে দেবে। কবরে রাখার সময় বলবে

بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ

‘আল্লাহর নামে ও আল্লাহর রাসুলের দ্বীনের উপরে।

‘মিল্লাতে’এর স্থলে ‘সুন্নাতে’ বলা যাবে। এই সময় কোনো সুগন্ধি বা গোলাপ পানি ছিটানো বিদআত।  ছালাতুর রাসূল (সা.),  ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল গালিব

৮. লাশ কবরে রাখার সময়ের দোয়া প্রসংঙ্গে

একট যঈফ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূল ﷺ তাঁর মেয়ে উম্মে কুলসুম (রা.) কে কবরে রাখার সময় একটি দোয়া পড়েছিলেন।

আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূল ﷺ এর মেয়ে উম্মে কুলসুম (রা.) কে কবরে রাখা হয়,  তখন রাসূল ﷺ পড়েন-

مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى

উচ্চারণ : মিনহা খালকনাকুম ওয়াফীহা নুয়ীদুকুম ওয়ামিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা

অর্থ : এ মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃজন করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিব এবং পুনরায় এ থেকেই আমি তোমাদেরকে উত্থিত করব। । মুসনাদে আহমাদ : ২২১৮৭

অনেকগুলি হাদিসের গ্রন্থে এই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে। সকল মুহাদ্দিসীগণ উক্ত হাদীসকে যঈফ বলে মন্তব্য করছে। তাই এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে রাসূল ﷺ থেকে সুনিশ্চিত প্রমাণিত সুন্নত মনে করে আমল করা যাবে না। কিছু আলেম এই আমলটি জায়েয বলেছেন আবার অনেক আলেম আমলটি বিদআত বলেছেন। আমলের ক্ষেত্র শর্তকতা অবলম্ভন করি এবং বিদআত পরিহার করে চলি।

আমল ছাড়া সবই পৃথিবীতে থেকে যায়

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিনটি বস্ত্ত মৃত ব্যক্তির অনুসরণ করে। দু’টি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তার পরিবারবর্গ, তার মাল ও তার ’আমল তার অনুসরণ করে। তার পরিবারবর্গ ও তার মাল ফিরে আসে, এবং তার ’আমল তার সঙ্গে থেকে যায়। সহিহ বুখারি : ৬৫১৪, সহিহ মুসলিম : ২৯৬০, আহমাদ : ১২০৮১

 ৯. মৃত থেকে শুরু করে বরজখি জীবনের একটি চিত্রঃ

বারা ইবন আযেব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

এক আনসারী ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে বের হলাম। আমরা কবরের কাছে পৌঁছে গেলাম তখনও কবর খোঁড়া শেষ হয় নি। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেখানে বসলেন। আমরা তাঁর চার পাশে এমনভাবে বসে গেলাম যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসেছে। আর তাঁর হাতে ছিল চন্দন কাঠ যা দিয়ে তিনি মাটির উপর মৃদু পিটাচ্ছিলেন। তিনি তখন মাথা জাগালেন আর বললেন, তোমরা কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কথাটি তিনি দু’বার কিংবা তিন বার বললেন।

এরপর তিনি আরো বললেন, যখন কোনো ঈমানদার বান্দা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে আখিরাতের দিকে যাত্রা করে তখন আকাশ থেকে তার কাছে ফিরিশতা আসে। তাদের চেহারা থাকবে সূর্যের মত উজ্জল। তাদের সাথে থাকবে জান্নাতের কাফন ও সুগন্ধি। তারা তার চোখ বন্ধ করা পর্যন্ত তার কাছে বসে থাকবে। মৃত্যুর ফিরিশতা এসে তার মাথার কাছে বসবে। সে বলবে, হে সুন্দর আত্মা! তুমি আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা ও তার সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো। আত্মা বেরিয়ে আসবে যেমন বেড়িয়ে আসে পান-পাত্র থেকে পানির ফোটা। সে আত্মাকে গ্রহণ করে এক মুহুর্তের জন্যেও ছাড়বে না। তাকে সেই জান্নাতের কাফন পরাবে ও সুগন্ধি লাগাবে। পৃথিবিতে যে মিশক আছে সে তার চেয়ে বেশি সুগন্ধি ছড়াবে। তাকে নিয়ে তারা আসমানের দিকে যেতে থাকবে। আর ফিরিশতাদের প্রতিটি দল বলবে, কে এই পবিত্র আত্মা? তাদের প্রশ্নের উত্তরে তারা তার সুন্দর নাম নিয়ে বলবে যে, অমুক অমুকের ছেলে। এমনিভাবে প্রথম আসমানে চলে যাবে। তার জন্য প্রথম আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে। এমনি করে প্রতিটি আসমান অতিক্রম করে যখন সপ্তম আসমানে যাবে তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলবেন, আমার বান্দা আমলনামাটা ইল্লিয়ীনে লিখে দাও। আর আত্মাটা দুনিয়াতে তার দেহের কাছে পাঠিয়ে দাও। এরপর কবরে প্রশ্নোত্তরের জন্য দুজন ফিরিশতা আসবে। তারা প্রশ্ন করবে, তোমার প্রভূ কে? সে বলবে আমার প্রভূ আল্লাহ। তারা প্রশ্ন করবে, তোমার দীন কি? সে উত্তর দিবে, আমার দীন ইসলাম। তারা প্রশ্ন করবে এই ব্যক্তিকে চেন, যাকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে? সে উত্তরে বলবে, সে আল্লাহর রাসূল। তারা বলবে, তুমি কীভাবে জানলে? সে উত্তরে বলবে, আমি আল্লাহর কিতাব পাঠ করেছি। তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি। তাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি। তখন আসমান থেকে একজন আহবানকারী বলবে, আমার বান্দা অবশ্যই সত্য বলেছে। তাকে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। তার কবর থেকে জান্নাতের একটি দরজা খুলে দাও। জান্নাতের সুঘ্রাণ ও বাতাস আসতে থাকবে। যতদূর চোখ যায় ততদূর কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে। তার কাছে সুন্দর চেহারার সুন্দর পোশাক পরিহিত সুগন্ধি ছড়িয়ে এক ব্যক্তি আসবে। সে তাকে বলবে, তুমি সুসংবাদ নাও। সূখে থাকো। দুনিয়াতে এ দিনের ওয়াদা দেওয়া হচ্ছিল তোমাকে। মৃত ব্যক্তি সুসংবাদ দাতা এ ব্যক্তিকে সে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে উত্তরে বলবে, আমি তোমার নেক আমল (সৎকর্ম)। তখন সে বলবে, হে আমার রব! কিয়ামত সংঘটিত করুন! হে আমার রব! কিয়ামত সংঘটিত করুন!! যেন আমি আমার সম্পদ ও পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারি।

আর যখন কোনো কাফির দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে আখিরাত পানে যাত্রা করে তখন তার কাছে কালো চেহারার ফিরিশতা আগমন করে। তার সাথে থাকে চুল দ্বারা তৈরি কষ্ট দায়ক কাপর। তারা চোখ বুজে যাওয়া পর্যন্ত তার কাছে বসে থাকে। এরপর আসে মৃত্যুর ফিরিশতা। তার মাথার কাছে বসে বলে, হে দুর্বিত্ত পাপিষ্ট আত্মা বের হয়ে আল্লাহর ক্রোধ ও গজবের দিকে চলো। তখন তার দেহে প্রচন্ড কম্পন শুরু হয়। তার আত্মা টেনে বের করা হয়, যেমন আদ্র রেশমের ভিতর থেকে লোহার ব্রাশ বের করা হয়। যখন আত্মা বের করা হয় তখন এক মুহুর্তের জন্যও ফিরিশতা তাকে ছেড়ে দেয় না। সেই কষ্টদায়ক কাপড় দিয়ে তাকে পেচিয়ে ধরে। তার লাশটি পৃথিবীতে পড়ে থাকে। আত্মাটি নিয়ে যখন উপরে উঠে তখন ফিরিশতারা বলতে থাকে কে এই পাপিষ্ট আত্মা? তাদের উত্তরে তার নাম উল্লেখ করে বলা হয় অমুক, অমুকের ছেলে। প্রথম আসমানে গেলে তার জন্য দরজা খোলার অনুরোধ করা হলে দরজা খোলা হয় না। এ সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ এ আয়াতটি পাঠ করলেন-

لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَٰبُ ٱلسَّمَآءِ وَلَا يَدْخُلُونَ ٱلْجَنَّةَ حَتَّىٰ يَلِجَ ٱلْجَمَلُ فِي سَمِّ ٱلْخِيَاطِۚ٤٠

তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে”। সূরা আরাফ : ৪০

অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তার আমলনামা সিজ্জীনে লিখে দাও যা সর্ব নিম্ন স্তর। এরপর তার আত্মাকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হবে। এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এ আয়াতটি পাঠ করেন-

وَمَن يُشْرِكْ بِٱللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ ٱلسَّمَآءِ فَتَخْطَفُهُ ٱلطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ ٱلرِّيحُ فِي مَكَانٖ سَحِيق

“আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে দূরের কোনো জায়গায় নিক্ষেপ করল”। সূরা হজ্জ : ৩১

এরপর তার দেহে তার আত্মা চলে আসবে। দু’ফিরিশতা আসবে। তাকে বসাবে। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করবে, তোমার প্রভূ কে? সে বলবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তারা তাকে আবার জিজ্ঞেস করবে, তোমার ধর্ম কি? সে বলবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তারপর জিজ্ঞেস করবে, এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মধ্যে পাঠানো হয়েছিল? সে উত্তর দিবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তখন আসমান থেকে এক আহবানকারী বলবে, সে মিথ্যা বলেছে। তাকে জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। জাহান্নামের একটি দরজা তার জন্য খুলে দাও। জাহান্নামের তাপ ও বিষাক্ততা তার কাছে আসতে থাকবে। তার জন্য কবরকে এমন সঙ্কুচিত করে দেওয়া হবে যাতে তার হাড্ডিগুলো আলাদা হয়ে যাবে। তার কাছে এক ব্যক্তি আসবে যার চেহার বিদঘুটে, পোশাক নিকৃষ্ট ও দুর্গন্ধময়। সে তাকে বলবে, যে দিনের খারাপ পরিণতি সম্পর্কে তোমাকে বলা হয়েছিলো তা আজ উপভোগ করো। সে এই বিদঘুটে চেহারার লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে বলবে, আমি তোমার অসৎকর্ম। এরপর সে বলবে, হে প্রভূ! আপনি যেন কিয়ামত সংঘটিত না করেন”। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৫৩, মুসনাদে আহমদ : ১৮৫৩৪, মুসতাদরাক হাকেম : ১০৭, শাইখ নাসির উদ্দিন আলবানী (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

একটি সংশোধন : মৃত্যুর ফিরিশতার নাম আজরাইল

আমাদের সমাজে মালাকুল মউত (মৃত্যুর ফিরিশতা), আজরাইল নামে পরিচিত। কুরআন ও সহিহ হাদিসে জান কবচকারী ফিরিশতাকে মালাকুল মউত (মৃত্যুর ফিরিশতা) বলা হয়েছে। কুরআনে ও সহিহ হাদিসে এই মৃত্যুর ফিরিশতার নাম কি, তা বলা হয় নি।  

মহান আল্লাহ বলেন-

قُلْ یَتَوَفّٰىکُمْ مَّلَکُ الْمَوْتِ الَّذِیْ وُکِّلَ بِکُمْ ثُمَّ اِلٰی رَبِّکُمْ تُرْجَعُوْنَ

বল, তোমাদের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফিরিশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অবশেষে তোমরা তোমাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তীত হবে। সুরা সিজদাহ : ১১

সম্ভব এটা ইহুদীদের থেকে এসেছে। তাই এ নামটি ব্যবহার না করাই ভালো।  উপরের হাদিসটিতেও মৃত্যুর ফিরিস্তাকে মালাকুল মাউত বলা হয়েছে।

১০. দাফনের পর মুনকার ও নাকীর নামে দুজন ফিরিশতার প্রশ্ন উত্তর পর্ব :

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তাকে পিছনে রেখে তার সাথীরা চলে যায় (এতটুকু দূরে যে,) তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়, এমন সময় তার নিকট দু’জন ফেরেশ্তা এসে তাকে বসিয়ে দেন। অতঃপর তাঁরা প্রশ্ন করেন, এই যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তাঁর সম্পর্কে তুমি কী বলতে? তখন সে বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহ্‌র বান্দা এবং তাঁর রাসূল। তখন তাঁকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানের জায়গাটি দেখে নাও, যার পরিবর্তে আল্লাহ্ তা‘আলা তোমার জন্য জান্নাতে একটি স্থান নির্ধারিত করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তখন সে দু’টি স্থান একই সময় দেখতে পাবে। আর যারা কাফির বা মুনাফিক, তারা বলবে, আমি জানি না। অন্য লোকেরা যা বলত আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, না তুমি নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। অতঃপর তার দু’ কানের মাঝখানে লোহার মুগুর দিয়ে এমন জোরে মারা হবে, যাতে সে চিৎকার করে উঠবে, তার আশেপাশের সবাই তা শুনতে পাবে মানুষ ও জ্বীন ছাড়া। সহিহ বুখারি : ১৩৩৮, ১৩৭৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৭০, আহমাদ : ১২২৭৩

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কোনো মৃত ব্যক্তিকে কবর দেওয়া হয় তখন কালো ও নীল বর্ণের দু’জন ফিরিশতা আগমন করে। একজনের নাম মুনকার অন্যজনের নাম হলো নাকীর। তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, এই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমরা কী বলতে? সে বলবে, সে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তখন ফিরিশতাদ্বয় বলবে, আমরা আগেই জানতাম তুমি এ উত্তরই দিবে। এরপর তার কবরকে সত্তর হাত প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। সেখানে আলোর ব্যবস্থা করা হয়। এরপর তাকে বলা হয়, এখন তুমি নিদ্রা যাও। সে বলবে, আমি আমার পরিবারের কাছে ফিরে যাবো, তাদেরকে (আমার অবস্থা সম্পর্কে) এ সংবাদ দেব। তখন ফিরিশতাদ্বয় তাকে বলে, তুমি ঘুমাও সেই নব বধুর মত যাকে তার প্রিয়জন ব্যতীত কেউ জাগ্রত করে না। এমনিভাবে একদিন আল্লাহ তাকে জাগ্রত করবেন। আর যদি সে ব্যক্তি মুনাফেক হয়, সে উত্তর দিবে আমি তাঁর (রাসূলুল্লাহ) সম্পর্কে মানুষকে যা বলতে শুনেছি তাই বলতাম। বাস্তব অবস্থা আমি জানি না। তাকে ফেরেশ্‌তাদ্বয় বলবে, আমরা জানতাম, তুমি এই উত্তরই দিবে। তখন মাটিকে বলা হবে তার উপর চাপ সৃষ্টি করো। মাটি এমন চাপ সৃষ্টি করবে যে, তার হাড্ডিগুলো আলাদা হয়ে যাবে। কিয়ামত সংঘটনের সময় তার উত্থান পর্যন্ত এ শাস্তি অব্যাহত থাকবে”। সুনানে তিরমিজি : ১০৭১,

১১. বরজখি জীবনে সুখ-নিদ্রায় বিভোর থাকবে :

কুরআনও এই কথার সাক্ষ্য বহন করে। ঈমানদার ব্যক্তি বরযখের জীবনে সুখ-নিদ্রায় বিভোর থাকবে। যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন তার নিদ্রা ভেঙ্গে যাবে ফলে সে অনেকটা বিরক্তির স্বরে বলবে-

قَالُواْ يَٰوَيْلَنَا مَنۢ بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَاۜ ۗ هَٰذَا مَا وَعَدَ ٱلرَّحْمَٰنُ وَصَدَقَ ٱلْمُرْسَلُونَ

হায়! কে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো? এটা তো তা যার ওয়াদা পরম করুণাময় করেছিলেন এবং রাসূলগণ সত্য বলেছিলেন। সূরা ইয়াসীন : ৫২

করবে প্রান ফিরলে সালাত পড়তে চাইবে

আবূ সুফিয়ান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

‏ إِذَا أُدْخِلَ الْمَيِّتُ الْقَبْرَ مُثِّلَتِ الشَّمْسُ لَهُ عِنْدَ غُرُوبِهَا فَيَجْلِسُ يَمْسَحُ عَيْنَيْهِ وَيَقُولُ ‏:‏ دَعُونِي أُصَلِّي ‏

মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখা হলে সে সূর্যকে অস্তমিত দেখতে পায়। তখন সে উঠে বসে এবং তার চক্ষুদ্বয় মলতে মলতে বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি নামায পড়বো। এবং তার চক্ষুদ্বয় মলতে মলতে বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি নামায পড়বো। সুনানে ইবনু মাজাহ ৪২৭২, তাহকীক আলবানি মান হাসান।

১২. বারজখি জীবনের আজাব বা কবরের আজাব হবে :

উসমান (রাঃ) এর মুক্তদাস হানী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উষমান ইবনে আফফান (রাঃ) যখন কোন কবরের পাশে দাঁড়াতেন তখন এতো কাঁদতেন যে, তার দাড়ি ভিজে যেতো। তাকে বলা হলো, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা স্মরণ করেন তখন তো এভাবে কান্নাকাটি করেন না, অথচ কবর দেখলেই কাঁদেন! তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয় কবর হলো আখেরাতের মনযিলসমূহের মধ্যকার সর্বপ্রথম মনযিল। কেউ যদি এখান থেকে রেহাই পায়, তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলো কবরের চেয়েও সহজতর হবে। আর সে যদি এখান থেকে রেহাই না পায়, তবে তার জন্য পরবর্তী মনযিলগুলো আরো ভয়াবহ হবে। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কখনও এমন কোন দৃশ্য অবলোকন করিনি যার তুলনায় কবর অধিক ভয়ংকর নয়। সুনানে তিরমিজি : ২৩০৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৬৭, মিশকাত : ১৩২

১৩. কবরে সকাল সন্ধ্যা জাহান্নামের আগুন সামনে পেশ করা হবে :

কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোক কবর আজাব প্রমানিত। আল্লাহ রাব্বিল আলামীন বলেন-

فَوَقَىٰهُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِ مَا مَكَرُواْۖ وَحَاقَ بِ‍َٔالِ فِرْعَوْنَ سُوٓءُ ٱلْعَذَابِ ٤٥ ٱلنَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوّٗا وَعَشِيّٗاۚ وَيَوْمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ أَدْخِلُوٓاْ ءَالَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ ٱلْعَذَابِ

অতঃপর তাদের ষড়যন্ত্রের অশুভ পরিণাম থেকে আল্লাহ তাকে রক্ষা করলেন আর ফিরআউনের অনুসারীদেরকে ঘিরে ফেলল কঠিন আজাব। আগুন, তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়, আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, ফিরআউনের অনুসারীদেরকে কঠোরতম আজাবে প্রবেশ করাও। সূরা গাফির : ৪৫-৪৬

হাফেজ ইবন হাজার রহ. এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, ফিরআউন এবং তার অনুসারীদের রূহসমূহ কিয়ামত পর্যন্ত সকাল-সন্ধায় আগুনের সম্মুখীন করা হবে, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন তাদের রূহ এবং শরীর গুলো আগুনে একত্রিত করা হবে।

১৪. মৃত ব্যক্তির সম্মুখে সকাল ও সন্ধ্যায় জান্নাত ও জাহান্নামে পেশ করা হয়

আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

তোমাদের কেউ মারা গেলে অবশ্যই তার সামনে সকাল ও সন্ধ্যায় তার অবস্থান স্থল উপস্থাপন করা হয়। যদি সে জান্নাতী হয়, তবে (অবস্থান স্থল) জান্নাতীদের মধ্যে দেখানো হয়। আর সে জাহান্নামী হলে, তাকে জাহান্নামীদের (অবস্থান স্থল দেখানো হয়) আর তাকে বলা হয়, এ হচ্ছে তোমার অবস্থান স্থল, ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) দিবসে আল্লাহ্ তোমাকে পুনরুত্থিত করা অবধি। সহিহ বুখারি : ১৩৭৯, ৩২৪০, ৬৫১৫, সহিহ মুসলিম : ২৬৮৮, আহমাদ : ৫১১৯

১৫. কাফির, মুশরিক, ইহুদী, খৃষ্টানসহ সকলেরই কবর আজাব হয়ঃ

আবূ আইয়ুব আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ وَجَبَتْ الشَّمْسُ فَسَمِعَ صَوْتًا فَقَالَ يَهُودُ تُعَذَّبُ فِي قُبُورِهَا

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন। তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে বলেন, ইয়াহূদীদের কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে। সহিহ মুসলিম : ১৩৭৫, সহিহ মুসলিম : ২৮৬৯

১৬. গীবত এবং পেশাবে অসাবধানতার কারণে কবরের আজাব হয়

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَرَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى قَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ مِنْ كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ بَلَى أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ يَسْعَى بِالنَّمِيمَةِ وَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ قَالَ ثُمَّ أَخَذَ عُودًا رَطْبًا فَكَسَرَهُ بِاثْنَتَيْنِ ثُمَّ غَرَزَ كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا عَلَى قَبْرٍ ثُمَّ قَالَ لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন ঐ দু’জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে আর কোন কঠিন কাজের কারণে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ (আযাব দেয়া হচ্ছে) তবে তাদের একজন পরনিন্দা করে বেড়াত, অন্যজন তার পেশাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করত না। (রাবী বলেন) অতঃপর তিনি একটি তাজা ডাল নিয়ে তা দু’খন্ডে ভেঙ্গে ফেললেন। অতঃপর সে দু’ খন্ডের প্রতিটি এক এক কবরে পুঁতে দিলেন। অতঃপর বললেনঃ আশা করা যায় যে এ দু’টি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের উভয়ের ‘আযাব হালকা করা হবে। সহিহ বুখারি : ২১৬, ১৩৭৮

১৭.  কবরের আজাব সম্পর্কিত বিখ্যাত একটি হাদিসঃ

সামুরাহ ইবনু জুনদাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই তাঁর সাহাবীদেরকে বলতেন, তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ কি? রাবী বলেন, যাদের ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছা, তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে স্বপ্ন বর্ণনা করত। তিনি একদিন সকালে আমাদেরকে বললেনঃ গত রাতে আমার কাছে দু’জন আগন্তুক আসল। তারা আমাকে উঠাল। আর আমাকে বলল, চলুন। আমি তাদের সঙ্গে চললাম। আমরা কাত হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের কাছে আসলাম। দেখলাম, অন্য এক লোক তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথর নিচে গিয়ে পড়ছে। এরপর আবার সে পাথরটি অনুসরণ করে তা আবার নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মত আবার ভাল হয়ে যায়। ফিরে এসে আবার তেমনি আচরণ করে, যা পূর্বে প্রথমবার করেছিল। তিনি বলেন, আমি তাদের (সাথীদ্বয়কে) বললাম, সুবহান্নাল্লাহ্! এরা কারা? তিনি বললেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন।

তিনি বলেন, আমরা চললাম, এরপর আমরা চিৎ হয়ে শোয়া এক লোকের কাছে আসলাম। এখানেও দেখলাম, তার নিকট এক লোক লোহার আঁকড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর সে তার চেহারার একদিকে এসে এটা দ্বারা মুখমণ্ডল ের একদিক মাথার পিছনের দিক পর্যন্ত এবং অনুরূপভাবে নাসারন্ধ্র,চোখ ও মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলছে। আওফ (রহ.) বলেন, আবূ রাজা (রহ.) কোন কোন সময় ’ইয়ুশারশিরু’ শব্দের পরিবর্তে ’ইয়াশুক্কু’ শব্দ বলতেন। এরপর ঐ লোকটি শায়িত লোকটির অপরদিকে যায় এবং প্রথম দিকের সঙ্গে যেমন আচরণ করেছে তেমনি আচরণই অপরদিকের সঙ্গেও করে। ঐ দিক হতে অবসর হতে না হতেই প্রথম দিকটি আগের মত ভাল হয়ে যায়। তারপর আবার প্রথমবারের মত আচরণ করে। তিনি বলেনঃ আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ্! এরা কারা? তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং চুলার মত একটি গর্তের কাছে পৌঁছলাম।

রাবী বলেন, আমার মনে হয় যেন তিনি বলেছিলেন, আর তথায় শোরগোলের শব্দ ছিল। তিনি বলেন, আমরা তাতে উঁকি মারলাম, দেখলাম তাতে বেশ কিছু উলঙ্গ নারী ও পুরুষ রয়েছে। আর নিচ থেকে বের হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করছে। যখনই লেলিহান শিখা তাদেরকে স্পর্শ করে, তখনই তারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। তিনি বলেন, আমরা চললাম এবং একটা নদীর (তীরে) গিয়ে পৌঁছলাম। রাবী বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে তিনি বলেছিলেন, নদীটি ছিল রক্তের মত লাল। আর দেখলাম, এই নদীতে এক ব্যক্তি সাঁতার কাটছে। আর নদীর তীরে অন্য এক লোক আছে এবং সে তার কাছে অনেকগুলো পাথর একত্রিত করে রেখেছে। আর ঐ সাঁতারকারী লোকটি বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর সে লোক কাছে এসে পৌঁছে যে নিজের নিকট পাথর একত্রিত করে রেখেছে। সেখানে এসে সে তার মুখ খুলে দেয় আর ঐ লোক তার মুখে একটি পাথর ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সে চলে যায়, সাঁতার কাটতে থাকে; আবার তার কাছে ফিরে আসে, যখনইসে তার কাছে ফিরে আসে তখনই সে তার মুখ খুলে দেয়, আর ঐ ব্যক্তি তার মুখে একটা পাথর ঢুকিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা বলল, চলুন, চলুন। তিনি বরৈন, আমরা চললাম এবং এমন একজন কুশ্রী লোকের কাছে এসে পৌঁছলাম, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী বলে মনে হয়। আর দেখলাম, তার নিকট রয়েছে আগুন, যা সে জ্বালাচ্ছে ও তার চতুর্দিকে দৌড়াচ্ছে। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, ঐ লোকটি কে? তারা বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা সজীব শ্যামল বাগানে হাজির হলাম, যেখানে বসন্তের হরেক রকম ফুলের কলি রয়েছে। আর বাগানের মাঝে আসমানের থেকে অধিক উঁচু দীর্ঘকায় একজন পুরুষ রয়েছে যার মাথা যেন আমি দেখতেই পাচ্ছি না। এমনিভাবে তার চারপাশে এত বিপুল সংখ্যক বালক-বালিকা দেখলাম যে, এত অধিক আর কখনো আমি দেখিনি। আমি তাদেরকে বললাম, উনি কে? এরা কারা? তারা আমাকে বলল, চলুন, চলুন। আমরা চললাম এবং একটা বিরাট বাগানে গিয়ে পৌঁছলাম। এমন বড় এবং সুন্দর বাগান আমি আর কখনো দেখিনি। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এর ওপরে চড়ুন। আমরা ওপরে চড়লাম। শেষ পর্যন্ত সোনা-রূপার ইটের তৈরি একটি শহরে গিয়ে আমরা হাজির হলাম।

আমরা শহরের দরজায় পৌঁছলাম এবং দরজা খুলতে বললাম। আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল, আমরা তাতে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে আমাদের সঙ্গে এমন কিছু লোক সাক্ষাৎ করল যাদের শরীরের অর্ধেক খুবই সুন্দর, যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়। আর শরীরের অর্ধেক এমনই কুশ্রী ছিল যা তোমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে কুশ্রী মনে হয়। তিনি বলেন, সাথীদ্বয় ওদেরকে বলল, যাও ঐ নদীতে গিয়ে নেমে পড়। আর সেটা ছিল প্রশস্ত প্রবাহিত নদী, যার পানি ছিল দুধের মত সাদা। ওরা তাতে গিয়ে নেমে পড়ল। অতঃপর এরা আমাদের কাছে ফিরে এল, দেখা গেল তাদের এ শ্রীহীনতা দূর হয়ে গেছে এবং তারা খুবই সুন্দর আকৃতির হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এটা জান্নাতে আদন এবং এটা আপনার বাসস্থান। তিনি বলেন, আমি বেশ উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম ধবধবে সাদা মেঘের মত একটি প্রাসাদ আছে। তিনি বলেন, তারা আমাকে বলল, এটা আপনার বাসগৃহ। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, আল্লাহ্ তোমাদের মাঝে বরকত দিন! আমাকে ছেড়ে দাও। আমি এতে প্রবেশ করি।

তারা বলল, আপনি অবশ্য এতে প্রবেশ করবেন। তবে এখন নয়। তিনি বলেন, আমি এ রাতে অনেক বিস্ময়কর বিষয় দেখতে পেলাম, এগুলোর তাৎপর্য কী? তারা আমাকে বলল, আচ্ছা! আমরা আপনাকে বলে দিচ্ছি। ঐ যে প্রথম ব্যক্তিকে যার কাছে আপনি পৌঁছেছিলেন, যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে হল ঐ ব্যক্তি যে কুরআন গ্রহণ করে তা ছেড়ে দিয়েছে। আর ফরজ সালাত ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকে। আর ঐ ব্যক্তি যার কাছে গিয়ে দেখেছেন যে, তার মুখের এক ভাগ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত, এমনিভাবে নাসারন্ধ্র ও চোখ মাথার পিছন দিক পর্যন্ত চিরে ফেলা হচ্ছিল সে হল ঐ ব্যক্তি, যে সকালে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে এমন কোন মিথ্যা বলে যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ সকল উলঙ্গ নারী-পুরুষ যারা চুলা সদৃশ গর্তের ভিতর আছে তারা হল ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীর দল।

আর ঐ ব্যক্তি, যার কাছে পৌঁছে দেখেছিলেন যে, সে নদীতে সাঁতার কাটছে ও তার মুখে পাথর ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে সে হল সুদখোর। আর ঐ কুশ্রী ব্যক্তি, যে আগুনের কাছে ছিল এবং আগুন জ্বালাচ্ছিল আর সে এর চারপাশে দৌড়াচ্ছিল, সে হল জাহান্নামের দারোগা, মালিক ফেরেশ্তা। আর এ দীর্ঘকায় ব্যক্তি যিনি বাগানে ছিলেন, তিনি হলেন, ইবরাহীম (আঃ)। আর তাঁর আশেপাশের বালক-বালিকারা হলো ঐসব শিশু, যারা ফিত্রাতের (স্বভাবধর্মের) ওপর মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি বলেন, তখন কিছু সংখ্যক মুসলিম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও কি? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ঃ মুশরিকদের শিশু সন্তানরাও। আর ঐসব লোক যাদের অর্ধাংশ অতি সুন্দর ও অর্ধাংশ অতি কুশ্রী তারা হল ঐ সম্প্রদায় যারা সৎ-অসৎ উভয় কাজ মিশ্রিতভাবে করেছে। আল্লাহ্ তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সহিহ বুখারি ৭০৪৭, সহিহ মুসলিম : ২২৭৫, আহমাদ : ২০১১৫

১৮। করব আজাব থেকে পরিত্রানের উপায়

ক. বিশুদ্ধভাবে ঈমানদার আনতে হবে

আল্লাহ রাব্বিল আলামীন বলেন-

وَحَاقَ بِ‍َٔالِ فِرْعَوْنَ سُوٓءُ ٱلْعَذَابِ ٤٥ ٱلنَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوّٗا وَعَشِيّٗاۚ وَيَوْمَ تَقُومُ ٱلسَّاعَةُ أَدْخِلُوٓاْ ءَالَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ

ফির‘আউন গোত্রকে শোচনীয় আজাব গ্রাস করল, সকাল সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সম্মুখে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সে দিন আদেশ করা হবে, ফিরআউন গোত্রকে কঠিনতম ‘‘আযাবে পেশ করাও। সূরা গাফির  : ৪৫-৪৬

আবূ আইয়ুব আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَقَدْ وَجَبَتْ الشَّمْسُ فَسَمِعَ صَوْتًا فَقَالَ يَهُودُ تُعَذَّبُ فِي قُبُورِهَا

সূর্য ডুবে যাওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন। তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে বলেন, ইয়াহূদীদের কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে। সহিহ মুসলিম : ১৩৭৫, সহিহ মুসলিম : ২৮৬৯

কুরআন ও সহিহ হাদিসের দেখা যায় ফিরাউন ও এক জন ইহুদীর কবর আজাব হচ্ছে। অর্থাত কাফির, মুশরিক, ইহুদী, খৃষ্টানসহ সকলেরই কবর আজাব হবে। কাজেই বিশুদ্ধ ঈমান ছাড়া কবর আজাব থেকে পরিত্রানের উপায় নাই।

খ. আল্লাহর পথে শহীদ  হতে হবে

মিকদাম ইবনু মা’দীকারিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শহীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট ছয়টি পুরস্কার বা সুযোগ আছে। তার প্রথম রক্তবিন্দু পড়ার সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করা হয়, তাকে তার জান্নাতের বাসস্থান দেখানো হয়, কবরের আযাব হতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়, সে কঠিন ভীতি হতে নিরাপদ থাকবে, তার মাথায় মর্মর পাথর খচিত মর্যাদার টুপি পরিয়ে দেওয়া হবে। এর এক একটি পাথর দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছু হতে উত্তম। তার সাথে টানা টানা আয়তলোচনা বাহাত্তরজন জান্নাতী হুরকে বিয়ে দেওয়া হবে এবং তার সত্তরজন নিকটাত্মীয়ের জন্য তার সুপারিশ কুবুল করা হবে। সুনানে তিরমিযী ১৬৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৭৯৯, আহমাদ : ১৬৭৩০, মিশকাত : ৩৮৩৪, সহিহাহ : ৩২১৩

শহীদ কারা-

জাবির ইবনে আতীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসেন। জাবির (রাঃ) এর পরিবারের কেউ বললো, আমরা আশা করতাম যে, সে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাহলে আমার উম্মাতের শহীদের সংখ্যা তো খুব কম হয়ে যাবে। (১) আল্লাহর পথে নিহত হলে শহীদ, (২) মহামারীতে নিহত হলে শহীদ, (৩) যে মহিলা গর্ভাবস্থায় মারা যায় সে শহীদ, (৪) পানিতে ডুবে, (৫) আগুনে পুড়ে ও (৬) ক্ষয়রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৮০৩, সুনানে নাসায়ি : ১৮৪৬, ৩১৯৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩১১১, আহমাদ : ২৩২৪১, মুয়াত্তা মালেক : ৫৫২।

গ. গীবত এবং পেশাবে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَرَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى قَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ وَمَا يُعَذَّبَانِ مِنْ كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ بَلَى أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ يَسْعَى بِالنَّمِيمَةِ وَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ قَالَ ثُمَّ أَخَذَ عُودًا رَطْبًا فَكَسَرَهُ بِاثْنَتَيْنِ ثُمَّ غَرَزَ كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا عَلَى قَبْرٍ ثُمَّ قَالَ لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন ঐ দু’জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে আর কোন কঠিন কাজের কারণে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। অতঃপর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ (আযাব দেয়া হচ্ছে) তবে তাদের একজন পরনিন্দা করে বেড়াত, অন্যজন তার পেশাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করত না। (রাবী বলেন) অতঃপর তিনি একটি তাজা ডাল নিয়ে তা দু’খন্ডে ভেঙ্গে ফেললেন। অতঃপর সে দু’ খন্ডের প্রতিটি এক এক কবরে পুঁতে দিলেন। অতঃপর বললেনঃ আশা করা যায় যে এ দু’টি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের উভয়ের ‘আযাব হালকা করা হবে। সহিহ বুখারি : ২১৬, ১৩৭৮

ঘ. করব আজাব থেকে বাচতে সব সময় দোয়া করতে হবেঃ

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘আ করতেন-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ

হে আল্লাহ্! আমি আপনার সমীপে পানাহ চাচ্ছি কবরের শাস্তি হতে, জাহান্নামের শাস্তি হতে, জীবন ও মরণের ফিতনা হতে এবং মাসীহ্ দাজ্জাল এর ফিতনা হতে। সহিহ বুখারি : ১৩৭৭, সহিহ মুসলিম : ৫৮৮, আহমাদ : ৯৪৭০

কিয়ামত দিবস ও শিংগা ফুত্কার

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের জীবন কেবল দুনিয়ার কয়েকদিনের ক্ষণস্থায়ী সফরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর রয়েছে চিরস্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ এক পরবর্তী ধাপ, যা “পরকালীন জীবন” নামে পরিচিত। মৃত্যুর পর একজন মানুষের ভৌত অস্তিত্ব মাটির নিচে চলে গেলেও তার আত্মা প্রবেশ করে এক অন্তর্বর্তী জগতে, যাকে ‘বারযাখ’ বলা হয়। এটি আখেরাতের সূচনা পর্ব, যেখানে মানুষ কিয়ামতের আগপর্যন্ত অবস্থান করবে। অত:পর, ইসরাফিল (আ.) আল্লাহর আদেশে শিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। এর ফলে আকাশ-বাতাস, গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষ পুনরায় মৃত অবস্থায় কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে—যাকে বলা হয় ‘নশর’ বা পুনরুত্থান। তখন এক বিশাল ও ভয়াবহ দিন শুরু হবে, যার নাম ‘ইয়াওমুল কিয়ামাহ’ বা কিয়ামতের দিন। কুরআনে একে “৫০ হাজার বছরের সমান দীর্ঘ” দিন বলা হয়েছে।

বান্দাকে এ দিনে হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে। সেখানে শুরু হবে মহান হিসাব-নিকাশের পর্ব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রত্যেককে তাঁর দুনিয়াবি কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন করবেন। কারো আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, আর কারো বাম হাতে। বিচার হবে পূর্ণ ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, যেখানে কণামাত্র অন্যায় করা হবে না। এমনকি কারো পায়ে ছোট কাঁটা ফুটানোর মতো সামান্য যন্ত্রণাও হিসাবের খাতায় লেখা থাকবে।

হিসাব-নিকাশের পরে মানুষের সামনে উপস্থিত হবে একটি সংকীর্ণ ও ভয়ানক সেতু যার নাম ‘পুল সিরাত’। এই সেতুটি জাহান্নামের উপর স্থাপিত থাকবে এবং সকলকে এটি অতিক্রম করতে হবে। কেউ এটি বিজলি গতিতে পার হবে, কেউ হাঁটতে হাঁটতে, আবার কেউ পিছলে পড়ে জাহান্নামে নিপতিত হবে। কেবল ঈমানদার, সৎকর্মশীল ও তাকওয়াবানরাই সফলতার সঙ্গে পার হতে পারবে।

সবশেষে প্রত্যেক মানুষকে তার চিরস্থায়ী আবাসস্থলে প্রেরণ করা হবে—জান্নাত অথবা জাহান্নাম। জান্নাত হবে পরম শান্তি ও পুরস্কারের স্থান, আর জাহান্নাম হবে শাস্তি ও নিদারুণ কষ্টের জায়গা। জান্নাত লাভ হবে আল্লাহর রহমত ও বান্দার ঈমান ও আমলের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে জাহান্নাম হবে সেইসব কাফির, মুনাফিক ও পাপাচারীদের গন্তব্য, যারা আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অমান্য করেছে।

সারকথা, পরকালীন জীবন একটি চরম বাস্তবতা, যা আমাদের বর্তমান জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিতার একটি চূড়ান্ত পরিণতি বহন করে। এই বিশ্বাস একজন মুসলিমকে দুনিয়াবি জীবনে সচেতন, আত্মনিয়ন্ত্রণকারী ও সৎকর্মপরায়ণ করে তোলে।

পাঠকদের নিকটি বারযক বা কবরের জীবনের পরবর্তি পরকালীন জীবনের ধাপগুলো ফুটিয়ে তুলতে ৬ ভাগে ভাগ করে উপস্থাপন করা চেষ্টা করব। বান্দাকে পরকালে নিচের ৬ টি ধাপের সম্মূখিত হবে তবে।

১. কিয়ামত দিবস ও শিংগা ফুত্কারের

২. হাশরের ময়দান

৩. হাশরের ময়দানের হিসেব নিকাশ

৪. পুল সিরাত পার হওয়া

৪. জান্নাত ও

৬. জাহান্নাম

শিংগা ফুত্কার

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্ধারিত এক সময় পৃথিবীর শেষ দিন নির্ধারণ করেছেন, যাকে বলা হয় কিয়ামত। যখন সেই সময় উপস্থিত হবে, তখন তিনি কিয়ামত সংঘটনের জন্য নিয়োজিত বিশেষ ফেরেশতা ইসরাফিল (আ.) কে শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার আদেশ দিবেন। একমাত্র আল্লাহই জানেন সেই মুহূর্ত কখন আসবে। ফেরেশতা শিঙ্গায় প্রথমবার ফুঁ দেবার সঙ্গে সঙ্গে আসমান ও যমীন কাঁপতে থাকবে। পাহাড়গুলো গুড়িয়ে বালুর পাহাড়ের মতো উড়ে যাবে, ভূমি উল্টে যাবে। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে পড়বে, গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ বিছিন্ন হয়ে তা খসে পড়বে। সূর্য ও চাঁদের আলো নিভে যাবে, সমুদ্র অগ্নিসদৃশ উত্তাল হয়ে উঠবে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দে প্রাণীকুল হতবিহবল হয়ে পড়বে। এই সময় দুনিয়াতে শুধু সেই সব মানুষই জীবিত থাকবে, যারা হবে সবচেয়ে মন্দ, পাপাচারী ও অবাধ্য। কিয়ামত তাদেরই ওপর সংঘটিত হবে। এই দৃশ্য হবে এতটাই ভয়াবহ যে, কেউ রক্ষা পাবে না যতক্ষণ না আল্লাহ চান। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্যার কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে তুল ধরা হয়েছে। নিচে কুরআন এ সহিহ হাদিসের আলোকে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

১. কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই সংরক্ষিত

কিয়ামত কখন হবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানেন না—এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনে একাধিক আয়াত রয়েছে। এই আয়াতগুলোতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই সংরক্ষিত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ۚ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً ۗ

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তা কখন ঘটবে? বলো, এর জ্ঞান কেবল আমার প্রতিপালকের কাছেই আছে। তিনিই তার নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। আসমান ও যমীনে তা এক কঠিন বিষয়। তোমাদের কাছে তা হঠাৎ করেই আসবে। সূরা আরাফ : ১৮৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন যা কিছু জরায়ুতে আছে। আর কোনো ব্যক্তি জানে না যে, সে আগামী কাল কী উপার্জন করবে। কোনো ব্যক্তি জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব বিষয়ে খবর রাখেন।” সূরা লুকমান : ৩৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَسْأَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ اللَّهِ ۚ وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُونُ قَرِيبًا

“লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, ‘তার জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে।তুমি কি জানো, সম্ভবত কিয়ামত অতি নিকটবর্তী।” সূরা আহযাব : ৬৩

ক. আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا . فِيمَ أَنتَ مِن ذِكْرَاهَا . إِلَىٰ رَبِّكَ مُنتَهَاهَا

তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তা কখন ঘটবে? এর আলোচনায় তোমার কী বলার আছে? এর চূড়ান্ত জ্ঞান তোমার প্রতিপালকের কাছেই।” সূরা নাযিয়াত : ৪২-৪৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِلَيْهِ يُرَدُّ عِلْمُ السَّاعَةِ ۚ وَمَا تَخْرُجُ مِن ثَمَرَاتٍ مِّنْ أَكْمَامِهَا وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَىٰ وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ ۚ وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ أَيْنَ شُرَكَائِي قَالُوا آذَنَّاكَ مَا مِنَّا مِن شَهِيدٍ

কিয়ামতের জ্ঞান তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়। তাঁর অজ্ঞাতসারে আবরণ হতে ফলসমূহ বের হয় না, কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসবও করে না এবং সেদিন যখন তিনি তাদেরকে আহবান করে বলবেন, ‘আমার শরীকরা কোথায়?’ তারা বলবে, ‘আমরা আপনাকে জানাচ্ছি যে, এ ব্যাপারে আমাদের থেকে কোন সাক্ষী নেই।’ সূরা ফুসসিলাত : ৪৭

ইস্রাফিল (আ.) সর্বক্ষন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন

আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কিভাবে নিশ্চিন্তে আরাম করতে পারি, অথচ শিঙ্গাওয়ালা (ফিরিশতা ইসরাফীল আঃ) মুখে শিঙ্গা নিয়ে অধীর আগ্রহে কান পেতে শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার নির্দেশ শোনার অপেক্ষায় আছেন, কখন ফুঁ দেয়ার নির্দেশ প্রদান করা হবে, আর অমনি তিনি ফুঁ দিবেন। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের নিকট অত্যন্ত ভীতিকর মনে হলো। তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ তোমরা বল যে, আমাদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলাই যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধানকারী। আমরা আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করলাম। সুনানে তিরমিজ : ২৪৩১, মিশকাত : ৫৫২৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ২০৭৯, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ : ২৯৫৮৭, মুসনাদে আহমাদ : ৩০১০, আবূ ইয়া’লা : ১০৮৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৮২৩, ত্ববারানী : ৪৯৩২, তারহীব : ৪৫।

শিঙ্গাটি দেখতে একটি শিং এর মত

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শিঙ্গা একটি শিং এর ন্যায়, তাতে ফুঁ দেয়া হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪২, মিশকাত : ৫৫২৮, সুনানে তিরমিজি : ৩৪৭২, সহীহুল জামি : ৩৮৬৩, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১০৮০।

২. শিংগা ফুত্কারের মাধ্যমে কিয়ামত শুরু হবে

ক. আল্লাহ হুকুমে কিয়ামতের দিন শিংগার ফুঁক দেওয়া হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ ؕ ذٰلِکَ یَوْمُ الْوَعِیْدِ

আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। এটাই হল প্রতিশ্রুত দিন। সুরা কাফ : ২০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا نُفِخَ فِی الصُّوْرِ نَفْخَۃٌ وَّاحِدَۃٌ ۙ

অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে- একটি মাত্র ফুঁক। সুরা হাক্কাহ : ১৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَوْمَ یَقُوْلُ کُنْ فَیَکُوْنُ ۬ؕ قَوْلُہُ الْحَقُّ ؕ وَلَہُ الْمُلْکُ یَوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ ؕ عٰلِمُ الْغَیْبِ وَالشَّہَادَۃِ ؕ وَہُوَ الْحَکِیْمُ الْخَبِیْرُ

যেদিন তিনি বলবেন. ‘হাশর হও‘ সেদিন হাশর হয়ে যাবে। তাঁর কথা খুবই যথার্থ বাস্তবানুগ। যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন একমাত্র তাঁরই হবে বাদশাহী ও রাজত্ব। গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তাঁর জ্ঞানায়ত্বে। তিনি হচ্ছেন প্রজ্ঞাময়, সর্ববিদিত। সুরা আনাম : ৭৩

খ. শিংগায় ফুঁক দেয়া হলে অপরাধীরা দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَّوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِیْنَ یَوْمَئِذٍ زُرْقًا ۚۖ

যেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, আর সেদিন আমি অপরাধীদেরকে দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব। সুরা ত্বহা : ১০২

গ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ হাশরের ময়দানে তরঙ্গমালার মত আছড়ে পড়বে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَتَرَکْنَا بَعْضَہُمْ یَوْمَئِذٍ یَّمُوْجُ فِیْ بَعْضٍ وَّنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَجَمَعْنٰہُمْ جَمْعًا ۙ

আর সেদিন আমি তাদেরকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেব যে, তারা একদল আরেক দলের উপর তরঙ্গমালার মত আছড়ে পড়বে এবং শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদের সকলকে একত্র করব। সুরা কাহফ : ৯৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَاِذَا ہُمْ مِّنَ الْاَجْدَاثِ اِلٰی رَبِّہِمْ یَنْسِلُوْنَ

আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা কবর থেকে তাদের রবের দিকে ছুটে আসবে। সুরা ইয়াসিন : ৫১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَّوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ فَتَاْتُوْنَ اَفْوَاجًا ۙ

সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। সুরা নাবাহ : ১৮

ঘ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ আত্ম কেন্দ্রিক হয়ে পড়বে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا نُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَلَاۤ اَنْسَابَ بَیْنَہُمْ یَوْمَئِذٍ وَّلَا یَتَسَآءَلُوْنَ

অতঃপর যে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবেনা, এবং একে অপরের খোঁজ খবর নিবেনা। সুরা মুমিনুন : ১০১

ঙ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ فَفَزِعَ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَمَنْ فِی الْاَرْضِ اِلَّا مَنْ شَآءَ اللّٰہُ ؕ وَکُلٌّ اَتَوْہُ دٰخِرِیْنَ

আর যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন আল্লাহ যাদেরকে চান তারা ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সবাই ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে এবং সবাই তাঁর নিকট আসবে বিনীত অবস্থায়। সুরা নামল : ৮৭

চ. শিংগায় প্রথম ফুৎকারে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে এবং দ্বিতীয় ফুত্কারে দাঁড়িয়ে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَصَعِقَ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَمَنْ فِی الْاَرْضِ اِلَّا مَنْ شَآءَ اللّٰہُؕ ثُمَّ نُفِخَ فِیْہِ اُخْرٰی فَاِذَا ہُمْ قِیَامٌ یَّنْظُرُوْنَ

আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। ফলে আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া আসমানসমূহে যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তারপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। সুরা যুমান : ৬৮

ছ. শিঙ্গায় ফুৎকারের পর আকাশ পাতাল চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَإِذَا نُفِخَ فِى ٱلصُّورِ نَفْخَةٌ۬ وَٲحِدَةٌ۬ (١٣) وَحُمِلَتِ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً۬ وَٲحِدَةً۬ (١٤) فَيَوْمَٮِٕذٍ۬ وَقَعَتِ ٱلْوَاقِعَةُ (١٥) وَٱنشَقَّتِ ٱلسَّمَآءُ فَهِىَ يَوْمَٮِٕذٍ۬ وَاهِيَةٌ۬ (١٦) وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآٮِٕهَا‌ۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَٮِٕذٍ۬ ثَمَـٰنِيَةٌ۬ (١٧)

তারপর যখন একবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা তোলা হবে এবং এক আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে,  তখন সেই দিন সংঘটিত হবে সেই মহাদিবস। এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, কেননা সেদিন তা দুর্বল হয়ে পড়বে। এবং ফিরিশতাগণ থাকবে তার প্রান্তসীমায় এবং তোমার রবের আরশকে সে দিন আটজন ফিরিশতা বহন করবে তাদের ওপর। সুরা হাক্কাহ : ১৩-১৭

৩. দ্বিতীয় ফুৎকারের মাধ্যামে সকল মানুষ পূনরুত্থিত হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু’বার ফুঁৎকারের মাঝে ব্যবধান চল্লিশ। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবূ হুরাইরাহ! চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। তারপর তারা জিজ্ঞেস করল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। এরপর তাঁরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি চল্লিশ মাস। তিনি বললেন, আমার জানা নেই এবং বললেন, শিরদাঁড়ার হাড় বাদে মানুষের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দ্বারাই সৃষ্টি জগত আবার সৃষ্টি করা হবে। সহিহ বুখারি : ৪৮১৪, ৪৯৩৫, সহিহ মুসলিম : ৯৫৫, মিশকাত : ৫৫১, সহীহুল জামি : ৫৫৮৫, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৫৭৪ আহমাদ : ৯৫৩৩

৪. মেরুদন্ডের হাড় থেকে পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হবে  

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

قَالَ: كُلَّ ابْنِ آدَمَ تَأْكُلُ الْأَرْضُ، إِلَّا عَجْبَ الذَّنَبِ مِنْهُ خُلِقَ وَفِيهِ يُرَكَّبُ

প্রতিটি আদম সন্তানকে মাটি খেয়ে ফেলবে, শুধু মেরুদন্ডের নীচের হাড়টুকু বাকী থাকবে। এ থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ থেকেই তাকে পুনর্গঠন করা হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪৩

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কতিপয় হাদীস উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হাদীস হচ্ছে এই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের শরীরে এমন একটি হাড় আছে, যা জমিন কখনো ভক্ষণ করবে না। কিয়ামতের দিন এর দ্বারাই পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হবে। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এ আবার কোন হাড্ডি? তিনি বললেন, এ হলো, মেরুদণ্ডের হাড্ডি। সহিহ মুসলিম : ২৯৫৫

৫. কিয়ামতের ফুৎকারের মাঝে ব্যবধান হবে চল্লিশ বছর বা দিন

ইয়াকুব ইবনু আসিম ইবনু উরওয়াহ ইবনু মাসউদ আস্ সাকাফী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) কে আমি এ কথা বলতে শুনেছি যে, একদা জনৈক লোক তার কাছে এসে বললেন, এ কেমন হাদীস আপনি বর্ণনা করছেন যে, এতো এতো দিনের মধ্যে কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ কথা শুনে তিনি বললেন, “সুবহানাল্লাহ অথবা ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ অথবা অবিকল কোন শব্দ। তারপর তিনি বললেন, আমি তো শুধু এ কথাই বলেছিলাম যে, অচিরেই তোমরা এমন ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে যা ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দিবে। এ ঘটনা কায়িম হবেই হবে।

এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যেই দাজ্জালের আবির্ভাব হবে এবং সে চল্লিশ পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমি জানি না চল্লিশ দিন, না চল্লিশ মাস, না চল্লিশ বছর। এ সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মারইয়াম তনয় ঈসা (আঃ) কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি উরওয়াহ ইবনু মাসউদ এর অবিকল হবে। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করে তাকে ধ্বংস করে দিবেন। তারপর সাতটি বছর লোকেরা এমনভাবে অতিবাহিত করবে যে, দু’ ব্যক্তির মধ্যে কোন শত্রুতা থাকবে না। তখন আল্লাহ তা’আলা সিরিয়ার দিক হতে শীতল বাতাস প্রবাহিত করবেন। ফলে যার হৃদয়ে কল্যাণ বা ঈমান থাকবে, এ ধরনের কোন লোকই এ দুনিয়াতে আর বেঁচে থাকবে না। বরং এ ধরনের প্রত্যেকের জান আল্লাহ তা’আলা কবয করে নিবেন। এমনকি তোমাদের কোন লোক যদি পর্বতের গভীরে গিয়ে আত্মগোপন করে তবে সেখানেও বাতাস তার কাছে পৌছে তার জান কবয করে নিবে।

আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তখন খারাপ লোকগুলো পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে। দ্রুতগামী পাখী এবং জ্ঞানশূন্য হিংস্রপ্রাণীর ন্যায় তাদের স্বভাব হবে। তারা কল্যাণকে অকল্যাণ বলে জানবে না এবং অকল্যাণকে অকল্যাণ বলে মনে করবে না। এ সময় শয়তান এক আকৃতিতে তাদের কাছে এসে বলবে, তোমরা কি আহবানে সাড়া দিবে না? তারা বলবে, আপনি আমাদেরকে কোন বিষয়ের আদেশ করছেন? তখন সে তাদেরকে মূর্তি পূজার নির্দেশ দিবে। এমতাবস্থায়ও তাদের জীবনোপকরণে প্রশস্ততা থাকবে এবং তারা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন-যাপন করবে। তখনই শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। যে এ আওয়াজ শুনবে সে তার ঘাড় একদিকে অবনমিত করবে এবং অন্যদিকে উত্তোলন করবে। এ আওয়াজ সর্বপ্রথম ঐ লোকই শুনতে পাবে, যে তার উটের জন্য হাওয সংস্করণের কাজে নিযুক্ত থাকবে।

আওয়াজ শুনামাত্রই সে অজ্ঞান হয়ে লুটে পড়বে। সাথে সাথে অন্যান্য লোকেরাও অজ্ঞান হয়ে যাবে। অতঃপর মহান আল্লাহ শুক্র ফোটার অথবা ছায়ার ন্যায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। বর্ণনাকারী নুমান (রহ.) সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এতে মানুষের শরীর পরিবর্ধিত হবে। আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। অকস্মাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। অতঃপর আহবান করা হবে যে, হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আসো। অতঃপর (ফেরেশতাদের বলা হবে) তাদেরকে থামাও, কারণ তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। তারপর আবারো বলা হবে, জাহান্নামী দল বের করো। জিজ্ঞেস করা হবে, কত জন? উত্তরে বলা হবে, প্রত্যেক হাজার থেকে নয়শ’ নিরানব্বই জন। অতঃপর তিনি বললেন, এ-ই তো ঐদিন, যেদিন কিশোরকে পরিণত করবে বৃদ্ধে এবং এ-ই চরম সঙ্কটাপন্ন অবস্থার দিন। সহিহ মুসলিম : ২৯৪০

কিয়ামত বিদস

কিয়ামত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দাঁড়িয়ে যাওয়া, পুনরুত্থান বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। ইসলামি পরিভাষায়কিয়ামত বলতে এমন এক মহাদিবসকে বোঝানো হয়, যেদিন পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাআলা সকল মৃত মানুষকে পুনরায় জীবিত করে বিচারের জন্য দাঁড় করাবেন। কিয়ামতের এই দিনটিই হলো আখেরাত বা পরকালের প্রথম ধাপ, যেখানে মানুষের দুনিয়ার জীবনের সকল কাজের চূড়ান্ত হিসাব নেওয়া হবে।

কিয়ামত দিবস হলো এক ভয়ংকর ও অবশ্যম্ভাবী ঘটনা, যা মানবজাতির ইতিহাসকে চূড়ান্ত পরিণতি দেবে। সেদিন পৃথিবী তার সমস্ত ভার নির্গত করবে এবং পাহাড়-পর্বত তুলাধুনার মতো উড়ে যাবে। মানুষ ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, কারণ সেদিন কোনো আশ্রয় থাকবে না এবং প্রত্যেকে নিজের কর্মফল নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। সেদিন আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে পুনরায় জীবিত করে এক বিশাল ময়দানে সমবেত করবেন, যেখানে প্রতিটি ছোট-বড় কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে। এটি হলো চূড়ান্ত বিচার ও কর্মফল প্রাপ্তির দিন, যখন মানুষের পার্থিব জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন হবে এবং প্রত্যেকের ভাগ্য নির্ধারিত হবে জান্নাত অথবা জাহান্নামে।

কুরআনে বহু স্থানে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলা হলেও সুরা হাক্কাহ, সুরা তাকভীর, সুরা কিয়ামাহ, সুরা ইনফিতার, সুরা ইনশিকাক, সুরা যিলজাল, সুরা গাশিয়াহ এই সূরাগুলোতে কিয়ামতের ভয়াবহতা ও দৃশ্যমান বর্ণনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব সূরা পাঠ করলে একজন মানুষের হৃদয়ে ভয়, অনুশোচনা ও আত্মশুদ্ধির অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়। নিচে কুরআন হাদিসের আলোকে এ দিবস সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:

১. মা নিজের শিশুকে ভুলে যাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى ٱلنَّاسَ سُكَٰرَىٰ وَمَا هُم بِسُكَٰرَىٰ وَلَٰكِنَّ عَذَابَ ٱللَّهِ شَدِيد

অর্থ : যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নারী তার স্তন্যপানরত শিশুকে ভুলে যাবে, এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারী গর্ভপাত করবে, আর তুমি মানুষকে মনে করবে মাতাল, অথচ তারা মাতাল নয়, বরং আল্লাহর শাস্তিই অত্যন্ত কঠিন। সূরা হজ্জ : ২

২. মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَبْصِرُونَهُمْ ۚ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍۢ بِبَنِيهِ

অর্থ: তারা একে অপরকে দেখতে পাবে। সে দিন অপরাধী চায় যে, যদি সে ঐ দিনের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারত, তাহলে সে নিজের সন্তানদের কোরবানি দিত। সূরা মায়ারিজ : ১১

৩. আপন জন থেকে মানুষ পালিয়ে বেড়াবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوْمَ يَفِرُّ ٱلْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (٣٤) وَأُمِّهِۦ وَأَبِيهِ (٣٥) وَصَٰحِبَتِهِۦ وَبَنِيهِ (٣٦) لِكُلِّ ٱمْرِئٖ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٖ شَأْنٌ يُغْنِيهِ (٣٧)

অর্থ: সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই থেকে, তার মা ও পিতা থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই এমন এক অবস্থা থাকবে যা তাকে ব্যস্ত রাখবে। সূরা আবাসা : ৩৪–৩৭

৪. কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসিদের চেহারা কালো হবে। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَّوْمَ تَبْیَضُّ وُجُوْہٌ وَّتَسْوَدُّ وُجُوْہٌ ۚ فَاَمَّا الَّذِیْنَ اسْوَدَّتْ وُجُوْہُہُمْ ۟ اَکَفَرْتُمْ بَعْدَ اِیْمَانِکُمْ فَذُوْقُوا الْعَذَابَ بِمَا کُنْتُمْ تَکْفُرُوْنَ

সে দিন কতক চেহারা সাদা হবে এবং কতক চেহারা হবে কালো। আর যাদের চেহারা কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে) ‘তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা আযাব আস্বাদন। সুরা আল ইমরান : ১০৬

৫. কিয়ামতের দিন সবার আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَئِذٍ یَّتَّبِعُوْنَ الدَّاعِیَ لَا عِوَجَ لَہٗ ۚ وَخَشَعَتِ الْاَصْوَاتُ لِلرَّحْمٰنِ فَلَا تَسْمَعُ اِلَّا ہَمْسًا

সেদিন তারা আহবানকারীর (ফেরেশতার) অনুসরণ করবে। এর কোন এদিক সেদিক হবে না এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না। সুরা ত্বহা : ১০৮

৬. পাপীরা তাদের দুর্ভোগের জন্য হাত কামড়াবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ يَعَضُّ ٱلظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيْهِ يَقُولُ يَٰلَيْتَنِي ٱتَّخَذْتُ مَعَ ٱلرَّسُولِ سَبِيلٗا . يَٰوَيْلَتَىٰ لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلٗا . لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ ٱلذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَآءَنِيۗ وَكَانَ ٱلشَّيْطَٰنُ لِلْإِنسَٰنِ خَذُولٗا

অর্থ : আর সেদিন যালিম নিজের হাত দু’টো কামড়িয়ে বলবে, ‘হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম’! হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম’। আমাকেতো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌঁছার পর; শাইতানতো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক। সূরা ফুরকান: ২৭–২৯

৭. সেদিন মুখগুলো হবে আতঙ্কিত

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وُجُوهٞ يَوْمَئِذٖ نَّاضِرَةٌ  . إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٞ . وَوُجُوهٞ يَوْمَئِذِۭ بَاسِرَةٞ . تَظُنُّ أَن يُفْعَلَ بِهَا فَاقِرَةٞ

অর্থ: সেদিন কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আর কিছু মুখ হবে বিমর্ষ, তারা ধারণা করবে তাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসবে। সূরা কিয়ামাহ : ২২–২৫

৮. আল্লাহ সামনে সকলেই অবনত হয়ে থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَنَتِ ٱلْوُجُوهُ لِلْحَيِّ ٱلْقَيُّومِۖ وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمٗا ١١١ وَمَن يَعْمَلْ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَهُوَ مُؤْمِنٞ فَلَا يَخَافُ ظُلْمٗا وَلَا هَضْمٗا ١١٢

আর চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত সত্তার সামনে সকলেই অবনত হবে। আর সে অবশ্যই ব্যর্থ হবে যে যুলুম বহন করবে। এবং যে মুমিন অবস্থায় ভালো কাজ করবে সে কোনো যুলুম বা ক্ষতির আশংকা করবে না”। সূরা ত্বাহা : ১১১-১১২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

خَاشِعَۃً اَبْصَارُہُمْ تَرْہَقُہُمْ ذِلَّۃٌ ؕ  ذٰلِکَ الْیَوْمُ الَّذِیْ کَانُوْا یُوْعَدُوْنَ 

অবনত চোখে। লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে! এটিই সেদিন যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। সুরা মায়ারিজ : ৪৪

৯. কিয়ামতর দিন সূর্য ও চন্দ্র গুটিয়ে নেয়া হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

إِذَا ٱلشَّمْسُ كُوِّرَتْ (١) وَإِذَا ٱلنُّجُومُ ٱنكَدَرَتْ (٢) وَإِذَا ٱلْجِبَالُ سُيِّرَتْ (٣) وَإِذَا ٱلْعِشَارُ عُطِّلَتْ (٤) وَإِذَا ٱلْوُحُوشُ حُشِرَتْ (٥) وَإِذَا ٱلْبِحَارُ سُجِّرَتْ (٦)

যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, আর যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে এবং যখন পর্বতসমূহকে সঞ্চালিত করা হবে, আর যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলো পরিত্যক্ত হবে, এবং যখন বন্য পশুদের একত্রিত করা হবে,  আর যখন সমুদ্রসমূহকে অগ্নিতে উত্তপ্ত করা হবে। সূরা তাকভীর : ১-৬

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি কিয়ামতের দৃশ্যটি এমনভাবে দেখতে পছন্দ করে যে, তা তার চোখের সামনে উপস্থিত সে যেন (إِذا الشَّمسُ كُوِّرَتْ) “যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে”। সূরাতাকভীর: ১ এবং (إِذا السَّماءُ انفطرَتْ)“যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে”। সূরা ইনফিত্বার : ১, ও (إِذا السَّماءُ انشقَّتْ) “যখন আকাশ ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে। সূরা ইনশিক্বাক : ১, এ সূরা কয়েকটি (মর্ম বুঝে) পাঠ করে। সুনানে তিরমিযী : ৩৩৩৩, মিশকাত : ৫৫৪৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ ১০৮১, মুসনাদে আহমাদ ৪৮০৬, সহীহুল জামি ৬২৯৩, আল মুসতাদরাকলিল হাকিম ৮৭১৯।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্র দু’টিকেই গুটিয়ে নেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ৩২০০, মিশকাত : ৫৫৩৬,  সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ১২৪।

১০. কিয়ামদের দিন আকাশ পৃথিবী উলট পালট হয়ে যাবে

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

فَإِذَا نُفِخَ فِي ٱلصُّورِ نَفْخَةٞ وَٰحِدَةٞ ١٣ وَحُمِلَتِ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةٗ وَٰحِدَةٗ ١٤ فَيَوْمَئِذٖ وَقَعَتِ ٱلْوَاقِعَةُ ١٥ وَٱنشَقَّتِ ٱلسَّمَآءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٖ وَاهِيَةٞ ١٦ وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآئِهَاۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٖ ثَمَٰنِيَةٞ ١٧ يَوْمَئِذٖ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَىٰ مِنكُمْ خَافِيَةٞ

অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে- একটি মাত্র ফুঁক। আর যমীন ও পর্বতমালাকে সরিয়ে নেওয়া হবে এবং মাত্র একটি আঘাতে এগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সে দিন মহাঘটনা সংঘটিত হবে। আর আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সেদিন তা হয়ে যাবে দুর্বল বিক্ষিপ্ত। ফিরিশতাগণ আসমানের বিভিন্ন প্রান্তে থাকবে। সেদিন তোমার রবের আরশকে আটজন ফিরিশতা তাদের উর্ধ্বে বহন করবে। সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো গোপনীয়তাই গোপন থাকবে না”। সূরা হাক্কাহ : ১৩-১৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

إِذَا ٱلسَّمَآءُ ٱنفَطَرَتْ ١ وَإِذَا ٱلْكَوَاكِبُ ٱنتَثَرَتْ ٢ وَإِذَا ٱلْبِحَارُ فُجِّرَتْ ٣ وَإِذَا ٱلْقُبُورُ بُعْثِرَتْ ٤ عَلِمَتْ نَفْسٞ مَّا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ

যখন আসমান বিদীর্ণ হবে। আর যখন নক্ষত্রগুলো ঝরে পড়বে। আর যখন সমুদ্রগুলোকে একাকার করা হবে। আর যখন কবরগুলো উন্মোচিত হবে। তখন প্রত্যেকে জানতে পারবে, সে যা আগে পাঠিয়েছে এবং যা পিছনে রেখে গেছে”। সূরা ইনফিতার : ১-৫

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

 إِنَّمَا تُوعَدُونَ لَوَٰقِعٞ ٧ فَإِذَا ٱلنُّجُومُ طُمِسَتْ ٨ وَإِذَا ٱلسَّمَآءُ فُرِجَتْ ٩ وَإِذَا ٱلْجِبَالُ نُسِفَتْ ١٠ وَإِذَا ٱلرُّسُلُ أُقِّتَتْ ١١ لِأَيِّ يَوْمٍ أُجِّلَتْ ١٢ لِيَوْمِ ٱلْفَصْلِ ١٣ وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا يَوْمُ ٱلْفَصْلِ ١٤ وَيْلٞ يَوْمَئِذٖ لِّلْمُكَذِّبِينَ ١٥

তোমাদেরকে যা কিছুর ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তা অবশ্যই ঘটবে। যখন তারকারাজি আলোহীন হবে, আর আকাশ বিদীর্ণ হবে, আর যখন পাহাড়গুলি চূর্ণবিচূর্ণ হবে, আর যখন রাসূলদেরকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত করা হবে; কান দিনের জন্য এসব স্থগিত করা হয়েছিল? বিচার দিনের জন্য। আর কিসে তোমাকে জানাবে বিচার দিবস কি? মিথ্যারোপকারীদের জন্য সেদিনের দুর্ভোগ! সূর মুরসালাত: ৭-১৫

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

وَيَسْ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلْجِبَالِ فَقُلْ يَنسِفُهَا رَبِّي نَسْفٗا ١٠٥ فَيَذَرُهَا قَاعٗا صَفْصَفٗا ١٠٦ لَّا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجٗا وَلَآ أَمْتٗا ١٠٧ يَوْمَئِذٖ يَتَّبِعُونَ ٱلدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُۥۖ وَخَشَعَتِ ٱلْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَٰنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسٗا

“আর তারা তোমাকে পাহাড় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, আমার রব এগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দিবেন, তারপর তিনি তাকে মসৃণ সমতলভূমি করে দিবেন তাতে তুমি কোনো বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না। সদিন তারা আহ্বানকারীর (ফেরেশতার) অনুসরণ করবে। এর কোনো এদিক সেদিক হবে না এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না”। সূরা ত্বাহা : ১০৫-১০৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

﴿ يَوْمَ تَرْجُفُ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ وَكَانَتِ ٱلْجِبَالُ كَثِيبٗا مَّهِيلًا ١٤

দিন যমীন ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পাহাড়গুলো চলমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে”। [সূরা আল-মুযযাম্মমিল : ১৪

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–

وَيَوْمَ نُسَيِّرُ ٱلْجِبَالَ وَتَرَى ٱلْأَرْضَ بَارِزَةٗ وَحَشَرْنَٰهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَدٗا ٤٧ وَعُرِضُواْ عَلَىٰ رَبِّكَ صَفّٗا لَّقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْنَٰكُمْ أَوَّلَ مَرَّةِۢۚ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّن نَّجْعَلَ لَكُم مَّوْعِدٗا ٤٨ وَوُضِعَ ٱلْكِتَٰبُ فَتَرَى ٱلْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَٰوَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا  لْكِتَٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةٗ وَلَا كَبِيرَةً إِلَّآ أَحْصَىٰهَاۚ وَوَجَدُواْ مَا عَمِلُواْ حَاضِرٗاۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدٗا

আর যেদিন আমি পাহাড়কে চলমান করব এবং তুমি যমীনকে দেখতে পাবে দৃশ্যমান, আর আমি তাদেরকে একত্র করব। অতঃপর তাদের কাউকেই ছাড়ব না। আর তাদেরকে তোমার রবের সামনে উপস্থিত করা হবে কাতারবদ্ধ করে। (আল্লাহ তায়ালা বলবেন) তোমরা আমার কাছে এসেছ তেমনভাবে, যেমন আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম; বরং তোমরা তো ভেবেছিলে আমি তোমাদের জন্য কোনো প্রতিশ্রুত মুহূর্ত রাখি নি। আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, হায় ধ্বংস আমাদের! কী হলো এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে এবং তারা যা করেছে, তা হাজির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। সূরা কাহাফ : ৪৭-৪৯

১১. কিয়ামতের দিন আল্লাহ দুনিয়াকে তার মুষ্ঠিতে ধারণ করবেন

কিয়ামতের দিনে আল্লাহর মহত্ব, সর্বময় কর্তৃত্ব ও সৃষ্টিজগতের ক্ষুদ্রতা ফুটে উঠেছে। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর কব্জায় থাকবে, আর যারা দুনিয়াতে অহংকার করেছে, তাদের অপমান ও বিচার হবে চরমভাবে।

وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدْرِہٖ ٭ۖ وَالْاَرْضُ جَمِیْعًا قَبْضَتُہٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَالسَّمٰوٰتُ مَطْوِیّٰتٌۢ بِیَمِیْنِہٖ ؕ سُبْحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشْرِکُوْنَ

আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে। সুরা যুমার : ৬৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন

یَوْمَ نَطْوِی السَّمَآءَ کَطَیِّ السِّجِلِّ لِلْکُتُبِ ؕ کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ

সে দিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। সুরা আম্বিয়া : ১০৪

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলা যমীনকে নিজ মুষ্ঠিতে নিবেন এবং আকাশমন্ডলীকে ভাঁজ করে তাঁর ডান হাতে নিবেন, তারপর বলবেন, আমিই মালিক, দুনিয়ার বাদশারা কোথায়? সহিহ বুখারি : ৪৮১২, ৬৫১৯, ৭৩৮২, ৭৪১৩, সহিহ মুসলিম : ২৭৮৭, মিশকাত : ৫৫২২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৮, সহীহুল জামি : ৮০০৯, মুসনাদে বাযযার : ৬১০৫, মুসনাদে আহমাদ : ৮৮৫০, ৮৮৭২, আবূ ইয়ালা : ৫৫৫৮, দারিমী : ২৭৯৯, তবারানী : ১৩১৪৬

আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ইয়াহূদী পাদ্রি নবী (সা.) -এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা (তাওরাতে) পেয়েছি যে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন আকাশমণ্ডলীকে এক আঙ্গুলের উপর স্থাপন করবেন। জমিনকে এক আঙ্গুলের উপর, পর্বতমালা ও গাছসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর, পানি এবং কাদা-মাটিকে এক আঙ্গুলের উপর, আর অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টিজগতকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন। অতঃপর এ সমস্ত কিছুকে নাড়া দিয়ে বলবেন, আমিই বাদশাহ, আমিই আল্লাহ! ইয়াহুদী পাদ্রির কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিস্ময়ে হয়ে হেসে ফেললেন, তিনি যেন তার কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। অতঃপর তিনি (সা.) কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন- وَ مَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِهٖ ٭ۖ وَ الْاَرْضُ جَمِیْعًا قَبْضَتُهٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَ السَّمٰوٰتُ مَطْوِیّٰتٌۢ بِیَمِیْنِهٖ ؕ سُبْحٰنَهٗ وَ تَعٰلٰی عَمَّا یُشْرِکُوْنَ

আল্লাহ তা’আলার যতটুকু সম্মান করা দরকার ছিল তারা ততটুকু সম্মান করেনি, অথচ কিয়ামতের দিন সম্পূর্ণ পৃথিবী তাঁর মুষ্টিতে থাকবে এবং আকাশমণ্ডলী ডান হাতে গুটানো থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তিনি তার উর্ধ্বে”। সূরা আয যুমার : ৬৭

সহিহ বুখারি : ৪৮১১, ৭৪১৪, ৭৪৫১, ৭৫১৩, সহিহ মুসলিম : ২৭৮৬, সুনানে তিরমিযী : ৩২৩৮, আহমাদ : ৪০৮৭, আবূ ইয়ালা : ৫৩৮৭, তবারানী : ১০১৮১

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা আকাশমণ্ডলী পেচিয়ে নিবেন। তারপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে ডান হস্তে ধরে বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় শক্তিশালী লোকেরা! কোথায় অহংকারীরা? এরপর তিনি বাম হস্তে গোটা পৃথিবী গুটিয়ে নিবেন এবং বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় অত্যাচারী লোকেরা, কোথায় বড়ত্ব প্রদর্শনকারীরা? সহিহ মুসলিম : ২৭৮৮, মিশকাত : ৫৫২৩, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩২, ইবনু মাজাহ : ১৯৮, সহীহুল জামি : ৮০০৯, আবূ ইয়ালা : ৫৫৫৮, তবারানী : ৩৭

১২.  কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুস হয়ে প্রথম মুসা (আ.) দেখতে পাবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’ ব্যক্তি একে অপরকে গালি দিয়েছিল। তাদের একজন ছিল মুসলিম, অন্যজন ইয়াহূদী। মুসলিম লোকটি বলল, তাঁর কসম, যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত প্রদান করেছেন। আর ইয়াহূদী লোকটি বলল, সে সত্তার কসম, যিনি মূসা (আঃ)-কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত দান করেছেন। এ সময় মুসলিম ব্যক্তি নিজের হাত উঠিয়ে ইয়াহূদীর মুখে চড় মারল। এতে ইয়াহূদী ব্যক্তিটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গিয়ে তার এবং মুসলিম ব্যক্তিটির মধ্যে যা ঘটেছিল, তা তাঁকে অবহিত করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমাকে মূসা (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তাদের সাথে আমিও বেহুঁশ হয়ে পড়ব। তারপর সকলের আগে আমার হুঁশ আসবে, তখন (দেখতে পাব) মূসা (আঃ) আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তিনি বেহুঁশ হয়ে আমার আগে হুঁশে এসেছেন অথবা আল্লাহ তা‘আলা যাঁদেরকে বেহুঁশ হওয়া হতে রেহাই দিয়েছেন, তিনি তাঁদের মধ্যে ছিলেন। সহিহ বুখারি : ২৪১১, ৩৪০৮, ৩৪১৪, ৪৮১৩, ৬৫১৭, ৬৫১৮, ৭৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৭৩, আহমাদ : ৭৫৮৯

হাশরের ময়দা : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দান হবে এক মহাবিস্ময়কর ও ভয়ংকর স্থান। পৃথিবী তখন তার বর্তমান রূপ হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক সমতল ভূমি হয়ে যাবে, যেখানে কোনো পাহাড়, পর্বত বা অসমতা থাকবে না। সেদিন সকল মানুষ, প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত, সেই ময়দানে একত্রিত হবে। এটি হবে এমন এক সমাবেশ, যার কোনো তুলনা নেই।

সূর্য সেদিন মানুষের খুব কাছে চলে আসবে, ফলে প্রচণ্ড গরমে সবাই অস্থির হয়ে পড়বে। পাপের পরিমাণ অনুযায়ী মানুষের শরীর থেকে ঘাম ঝরতে থাকবে। কেউ কেউ হাঁটুর সমান ঘামে, আবার কেউ কেউ বুক পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মানুষ কেবলই নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। সেদিন কোনো আপনজন কাউকে সাহায্য করতে পারবে না।

অপেক্ষা করতে করতে মানুষের ধৈর্য যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন তারা নবীদের কাছে শাফায়াতের জন্য যাবে। অবশেষে শাফায়াতের দায়িত্ব দেওয়া হবে শেষ নবীকে, যিনি আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। এরপরই শুরু হবে চূড়ান্ত বিচার। এটি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আদালত, যেখানে প্রতিটি কাজের নিখুঁত হিসাব নেওয়া হবে এবং কোনো জুলুম করা হবে না। সেই দিনটি হবে বিশ্বাসীদের জন্য সুসংবাদ এবং অবিশ্বাসীদের জন্য চরম হতাশার দিন।

১. কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দানের অবস্থা

ক. হাশরের ময়দানের হবে সমতল ও মসৃণ ভূমি মত

কুরআনে আরও বলা হয়েছে যে, বিচার দিবসে পৃথিবী একটি সমতল, মসৃণ ও ধূসর ময়দানে পরিণত হবে। এতে কোনো বক্রতা বা উঁচু-নিচু জায়গা থাকবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَیَذَرُہَا قَاعًا صَفْصَفًا ۙ لَّا تَرٰی فِیْہَا عِوَجًا وَّلَاۤ اَمْتًا ؕ

‘তারপর তিনি তাকে মসৃণ সমতলভূমি করে দিবেন’। ‘তাতে তুমি কোন বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না’। সূরা ত্বাহা : ১০৬-১০৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ

যেদিন এ যমীন ভিন্ন যমীনে রূপান্তরিত হবে এবং আসমানসমূহও। আর তারা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে হাযির হবে। সূরা ইবরাহিম : ৪৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَیَوْمَ نُسَیِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَی الْاَرْضَ بَارِزَۃً ۙ  وَّحَشَرْنٰہُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْہُمْ اَحَدًا ۚ

স্মরণ কর সেদিনের কথা যেদিন আমি পর্বতকে করব সঞ্চালিত এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর; সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করব এবং তাদের কেহকেও অব্যাহতি দিব না। সূরা কাহফ : ৪৭

সাহল ইবন সাআদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أَرْضٍ بَيْضَاءَ عَفْرَاءَ، كَقُرْصَةِ النَّقِيِّ، لَيْسَ فِيهَا عَلَمٌ لِأَحَدٍ»

কিয়ামতের দিবসে মানুষকে সাদা পোড়ামাটি রংয়ের উদ্ভিদহীন একটি জমিনে একত্র করা হবে। যেখানে কারো জন্য কোনো আলামত থাকবে না”। সহিহ বুখারী : ৬৫২১, সহিহ মুসলিম : ২৭৯০, মিশকাত : ৫৫৩২,  সহীহুল জামি : ৮০৪৪, আবূ ইয়া’লা : ৭৫৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩২০, শুআবূল ঈমান : ৩৫৭।

২. হাশরের ময়দানে সবাইকে একত্র করার দৃশ্য

ক. কিয়ামতের দিন মানুষকে তাড়িয়ে হাশরের ময়দানে হাজির করা হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্রিত করা হবে তিন প্রকারে। একদল হবে আল্লাহর প্রতি আসক্ত ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত। দ্বিতীয় দল হবে দু’জন, তিনজন, চারজন বা দশজন এক উটের ওপর আরোহণকারী। আর অবশিষ্ট যারা থাকবে অগ্নি তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। যেখানে তারা থামবে আগুনও তাদের সঙ্গে সেখানে থামবে। তারা যেখানে রাত্রি কাটাবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে রাত্রি কাটাবে। তারা যেখানে সকাল করবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে সকাল করবে। যেখানে তাদের সন্ধ্যা হবে আগুন সেখানেও তাদের সাথে অবস্থান করবে। সহিহ বুখারি : ৬৫২২, সহিহ মুসলিম : ২৮৬১, মিশকাত : ৫৫৩৪, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৪৩৯৮, সুননে নাসায়ী : ২২১২, তবারানী : ১২৯০

খ. কিয়ামতে দিন কিছু মানুষ মুখে ভর দিয়ে হাশরের ময়দানে হাজির হবে

কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা এসেছে, যা থেকে বোঝা যায়, জালেম ও কাফেরদের কী অবমাননাকরভাবে জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়া হবে। এটি তাদের শাস্তির এক রূপ, দুনিয়ার গর্ব ও অহংকারের জবাব, যে দিন তারা লাঞ্ছিত হবে মুখ থুবড়ে। তারা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلَّذِیْنَ یُحْشَرُوْنَ عَلٰی وُجُوْہِہِمْ اِلٰی جَہَنَّمَ ۙ  اُولٰٓئِکَ شَرٌّ مَّکَانًا وَّاَضَلُّ سَبِیْلًا 

যাদেরকে মুখে ভর দিয়ে দিয়ে চলা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে একত্র করা হবে, তাদেরই স্থান হবে অতি নিকৃষ্ট এবং তারাই পথভ্রষ্ট। সুরা ফুরকান : ৩৪

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর নবী! কিয়ামতের দিন কাফেরদের মুখে ভর করে চলা অবস্থায় একত্রিত করা হবে? তিনি বললেন, যিনি এ দুনিয়ায় তাকে দু’পায়ের উপর চালাতে পারছেন, তিনি কি কিয়ামতের দিন মুখে ভর করে তাকে চালাতে পারবেন না? ক্বাতাদাহ (রহ.) বলেন, নিশ্চয়ই, আমার রবের ইজ্জতের কসম! সহিহ বুখারি : ৪৭৬০, ৬৫২৩, সহিহ মুসলিম : ২৮০৬, মিশকাত : ৫৫৩৭, আহমাদ : ১৩৪১৬, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৫০৭, আবূ ইয়া’লা:  ৩০৪৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩২৩,

বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে তার বাবা, অতঃপর তার দাদার সুত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ (কিয়ামত দিবসে) তোমাদের পায়ে হাটিয়ে, সাওয়ারী হিসাবে এবং কিছু সংখ্যককে মুখের উপর উপুড় করে টেনে হাযির করা হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৪২৪ হাদিসের মান সহিহ

গ. কাফিরের অন্ধ হয়ে উপস্থিত হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

﴿ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةٗ ضَنكٗا وَنَحْشُرُهُۥ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ أَعْمَىٰ ١٢٤ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِيٓ أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرٗا ١٢٥ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلْيَوْمَ تُنسَىٰ ١٢٦

আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? তিনি বলবেন, এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো”। সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৬

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ عَلَىٰ وُجُوهِهِمْ عُمْيٗا وَبُكْمٗا وَصُمّٗاۖ مَّأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُۖ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَٰهُمْ سَعِيرٗ

“আর আমরা কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম, যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব। সূরা ইসরা : ৯৭

ঘ. হাশরের ময়দানে ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

كَلَّآۖ إِذَا دُكَّتِ ٱلْأَرْضُ دَكّٗا دَكّٗا ٢١ وَجَآءَ رَبُّكَ وَٱلْمَلَكُ صَفّٗا صَفّٗا ٢٢ وَجِاْيٓءَ يَوْمَئِذِۢ بِجَهَنَّمَۚ يَوْمَئِذٖ يَتَذَكَّرُ ٱلْإِنسَٰنُ وَأَنَّىٰ لَهُ ٱلذِّكْرَىٰ ٢٣ يَقُولُ يَٰلَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي ٢٤

কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে পরিপূর্ণভাবে। আর তোমার রব ও ফিরিশতাগণ উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। আর সেদিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু সেই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে? সে বলবে, হায়! যদি আমি কিছু আগে পাঠাতাম আমার এ জীবনের জন্য! সূরা ফাজর : ২১-২৪

ঙ. হাশরের মাঠে সকলে নগ্ন পদে নগ্ন দেহে পায়ে হেঁটে ও খাতনা বিহীন অবস্থায় হাজির হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ

যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। সুরা আম্বিয়া : ১০৪

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন-

إِنَّكُمْ مُلاَقُو اللهِ حُفَاةً عُرَاةً مُشَاةً غُرْلاً قَالَ سُفْيَانُ هَذَا مِمَّا نَعُدُّ أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ سَمِعَهُ مِنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم

নিশ্চয়ই তোমরা নগ্ন পদে নগ্ন দেহে পায়ে হেঁটে ও খাতনা বিহীন অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে। সুফ্ইয়ান বলেন, এ হাদীসকে ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) এর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে স্বয়ং শুনা হাদীসসমূহের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। সহিহ বুখারি : ৬৫২৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৬০, আহমাদ : ১৯১৩

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষকে হাশরের মাঠে উঠানো হবে নগ্ন পদ, নগ্ন দেহ ও খাতনাবিহীন অবস্থায়। ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তাহলে পুরুষ ও নারীগণ একে অপরের দিকে তাকাবে। তিনি বললেন: এরকম ইচ্ছে করার চেয়ে তখনকার অবস্থা হবে অতীব সংকটময়। সহিহ বুখারি : ৩৪৪৭, ৬৫২৭, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৯, সুনানে তিরমিযী : ২৪২৩, সুনানে নাসায়ী : ২০৮৩, সহীহুল জামি : ৫২৩৫,  সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৪৬৯, মুসনাদে বাযযার : ২০২৩, মুসনাদে আহমাদ : ২৪৩১০, আবূ ইয়া’লা : ২৫৭৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩১৬, শুআবূল ঈমান : ৩৫৯, , দারিমী : ২৮০০, ত্ববারানী : ১২১৪৩, হাকিম : ৮৭১৫।

চ. সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আ.) কে কাপড় পরানো হবে

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে হাশর ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-

کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ

যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। আম্বিয়াঃ ১০৪

আর কিয়ামতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পরানো হবে তিনি হবেন ইবরাহীম (আ.)। আর আমার অনুসারীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে পাকড়াও করে বাম দিকে অর্থাৎ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার অনুসারী, এরা তো আমার অনুসারী। এ সময় আল্লাহ বললেন, যখন আপনি এদের নিকট হতে বিদায় নেন, তখন তারা পূর্ব ধর্মে ফিরে যায়। কাজেই তারা আপনার সাহাবী নয়। তখন আল্লাহর নেক বান্দা [ঈসা (আঃ)] যেমন বলেছিলেন, তেমন আমি বলব, হে আল্লাহ! আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক। আপনি ক্ষমতাধর হিকমত ওয়ালা। সুরা মায়িদা : ১১৭। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৯, ৪৩৩৭, ৪৬২৫, ৪৬২৬, ৪৬৪০, ৬৫২৬, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৯, সুনানে তিরমিযী : ২৪২৩, সুনানে নাসায়ী : ২০৮১, মিশকাত : ৫৫৩৫, সহীহুল জামি : ৭৮৭০ সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৪৬৯, মুসনাদে বাযযার : ২০২৩, মুসনাদে আহমাদ : ১৯৫০।

ছ. কিয়ামতের দিন সমস্ত জমিন একটি রুটি হয়ে যাবে

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন একটি রুটি হয়ে যাবে। আর আল্লাহ তা’আলা বেহেশতীদের মেহমানদারীর জন্য তাকে বেহেশতে তুলে নেবেন। যেমন তোমাদের মাঝে কেউ সফরের সময় তার রুটি হাতে তুলে নেয়। এমন সময় একজন ইহুদী এলো এবং বলল, হে আবূল কাসিম! দয়াময় আপনাকে বরকত প্রদান করুন। কিয়ামতের দিন বেহেশতিদের আতিথেয়তা সম্পর্কে আপনাকে কি জানাব না? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। লোকটি বলল, (সেই দিন) সমস্ত ভূ-মণ্ডল একটি রুটি হয়ে যাবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন (লোকটিও সেইরূপই বলল)। এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে তাকালেন এবং হাসলেন। এমনকি তার চোয়ালের দাঁতসমূহ প্রকাশ পেল। এরপর তিনি বললেনঃ তবে কি আমি তোমাদেরকে (সেই রুটির) তরকারী সম্পর্কে বলব না? তিনি বললেনঃ তাদের তরকারী হবে বালাম এবং নূন। সাহাবাগন বললেনঃ সে আবার কি? তিনি বললেনঃ ষাড় এবং মাছ। এদের কলিজার গুরদা থেকে সত্তর হাজার লোক খেতে পারবে। সহিহ বুখারি : ৬৫২০, সহিহ মুসলিম : ২৭৯২, মিশকাত : ৫৫৩৩ সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ১৪৩৮, সহীহুল জামি : ২৯৮৮।

জ. হাশরের ময়দানের মানুষ ঘামে হাবুডুবু খাবে।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«يَعْرَقُ النَّاسُ يَوْمَ القِيَامَةِ حَتَّى يَذْهَبَ عَرَقُهُمْ فِي الأَرْضِ سَبْعِينَ ذِرَاعًا، وَيُلْجِمُهُمْ حَتَّى يَبْلُغَ آذَانَهُمْ»

কিয়ামতের দিন মানুষ ঘর্মাক্ত হবে। এমনকি যমীনের সত্তর হাত ঘামে ডুবে যাবে। তাদের ঘামে তারা কান পর্যন্ত ডুবে যাবে”। সহিহ বুখারী : ৬৫৩২, সহিহ মুসলিম : ২৮৬৩, মিশকাত : ৫৫৩৯, মুসনাদে আহমাদ : ৯৪১৬, সহীহুল জামি : ১৬৭৯।

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। আল্লাহ বলেন-

یَّوْمَ یَقُوْمُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ؕ

যেদিন মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের জন্য দাঁড়াবে। সূরা মুতাফ্ফিফীন : ৬ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তির কানের লতা পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯৩৮, ৬৫৩১, সহিহ মুসলিম : ২৮৬২, আহমাদ : ৬০৭২

মিকদাদ ইবন আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামত দিবসে সূর্য মানুষের খুব নিকটবর্তী হবে। এমনকি এর দুরত্ব এক মাইল পরিমাণ হবে। এ সম্পর্কে সুলাইম ইবন আমের বলেন, আল্লাহর শপথ! মাইল বলতে এখানে কোনো মাইল তিনি বুঝিয়েছেন আমি তা জানি না। জমির দূরত্ব পরিমাপের মাইল বুঝিয়েছেন, না সুরমা দানির মাইল (শলাকা) বুঝিয়েছেন? মানুষ তার আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে থাকবে। কারো ঘাম হবে পায়ের গিরা বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে হাটু বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে কোমর বরাবর। আবার কারো ঘামের পরিমাণ হবে তার মুখ বরাবর” সহিহ মুসলিম : ২৮৬৪।

ঝ. মুত্তাকীরা আল্লাহর মেহমানরূপে হাজির হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا، وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَىٰ جَهَنَّمَ وِرْدًا

সেদিন আমরা মুত্তাকীদেরকে দয়াময় আল্লাহর কাছে সম্মানিত মেহমানরূপে একত্র করব। আর অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব।” (সূরা মারয়াম: ৮৫-৮৬)

ঞ. কেউ উজ্জ্বল আবার কেউ কালো মুখমণ্ডল নিয়ে হাজির হবে

ঈমানদার ও নেককারদের মুখ সেদিন হবে উজ্জ্বল ও হাস্যোজ্জ্বল, আর অবিশ্বাসীদের মুখ হবে মলিন ও কালো। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ، ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ، وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ، تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ، أُوْلَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ

সেদিন কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল, হাস্যোজ্জ্বল, আনন্দিত। আর কিছু মুখ হবে ধুলোমলিন, সেগুলোকে আচ্ছন্ন করে থাকবে কালিমা। এরাই হলো কাফির ও পাপিষ্ঠরা।”সূরা আবাসা: ৩৮-৪২

ট. কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টিকুলের অতি কাছাকাছি করে দেয়া হবে।

মিকদাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টিকুলের অতি কাছাকাছি করে দেয়া হবে। এমনকি তা প্রায় এক মাইলের ব্যবধানে হয়ে যাবে। অতএব তখন তার তাপে মানব সম্প্রদায় আপন আপন ’আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। কারো ঘাম টাখনু পর্যন্ত হবে। কারো হাঁটু অবধি। কারো কোমর অবধি আর কারো জন্য এ ঘাম লাগাম পর্যন্ত হয়ে যাবে (অর্থাৎ তার মুখের ভিতরে লাগামের ন্যায় ঢুকে যাবে) এ কথাটি বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের মুখের দিকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করলেন। সহিহ মুসলিম : ২৮৬৪, মিশকত : ৫৫৪০, সহীহুল জামি : ২৯৩৩, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব:  ৩৫৮৭, শু’আবূল ঈমান : ২৫৮, তবারানী : ১৬৯৯০

রিয়াকারী ও সালাত ত্যাগ হাশরে আল্লাহ দেখে সিজদা দিতে পারবেনা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یَوْمَ یُکْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَّیُدْعَوْنَ اِلَی السُّجُوْدِ فَلَا یَسْتَطِیْعُوْنَ ۙ

সে দিন পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, (কিয়ামতের দিন) যখন আমাদের প্রভু পায়ের নলা বা গোছা উন্মোচিত করবেন, তখন ঈমানদার নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই তাঁকে সিজদাহ্ করবে। আর বিরত থাকবে ঐ সকল লোক যারা দুনিয়াতে রিয়া (লোক দেখানো) ও শুনানোর জন্য সিজদাহ্ করত, তারা সিজদাহ করতে চাইবে কিন্তু তাদের পৃষ্ঠদেশ ও কোমর একটি কাষ্ঠফলকের মতো শক্ত হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯১৯, মিশকাত : ৫৫৪২, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৫৮৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৭৭।

৩. মানুষ তাদের নির্বাচিত গাইরুল্লাহ প্রত্যাখ্যান করবে

দুনিয়াতে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত বা অনুসরণ করে, কিয়ামতের দিন সেই অনুসারী এবং তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিরা একে অপরের থেকে দায়মুক্ত হতে চাইবে। কিয়ামতের দিন যখন সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে, তখন মানুষেরা তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করবে।

ক. ইবাদতের অংশীদাররা প্রত্যাখ্যান করবে:

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, দুনিয়াতে যাদেরকে আল্লাহর অংশীদার হিসেবে ইবাদত করা হয়েছে, কিয়ামতের দিন তারাই এই ইবাদতকারীদের থেকে নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعٗا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُواْ مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَآؤُكُمْۚ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْۖ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ ٢٨

আর যেদিন আমরা তাদের সকলকে একত্র করব, অতঃপর যারা শির্‌ক করেছে, তাদেরকে বলব, থাম, তোমরা ও তোমাদের শরীকরা। অতঃপর আমি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাব। আর তাদের শরীকরা বলবে, তোমরা তো আমাদের ইবাদাত করতে না”। সূরা ইউনূস : ২৮

এই আয়াতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন শিরককারীরা তাদের উপাস্যদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাবে না, বরং তারাই তাদের অস্বীকার করবে।

খ. শয়তান তার অনুসারীদের প্রত্যাখ্যান করবে:

শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সব সময় চেষ্টা করে। কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন ফলাফল প্রকাশ পাবে, তখন শয়তান নিজেই তার অনুসারীদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالَ الشَّیْطٰنُ لَمَّا قُضِیَ الْاَمْرُ اِنَّ اللّٰہَ وَعَدَکُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُّکُمْ فَاَخْلَفْتُکُمْ ؕ وَمَا کَانَ لِیَ عَلَیْکُمْ مِّنْ سُلْطٰنٍ اِلَّاۤ اَنْ دَعَوْتُکُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِیْ ۚ فَلَا تَلُوْمُوْنِیْ وَلُوْمُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ مَاۤ اَنَا بِمُصْرِخِکُمْ وَمَاۤ اَنْتُمْ بِمُصْرِخِیَّ ؕ اِنِّیْ کَفَرْتُ بِمَاۤ اَشْرَکْتُمُوْنِ مِنْ قَبْلُ ؕ اِنَّ الظّٰلِمِیْنَ لَہُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ

আর যখন যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন সত্য ওয়াদা, তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্য ছিল না, তবে আমিও তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, এখন আমি তা ভঙ্গ করলাম। তোমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, আর তোমরা আমার দাওয়াতে সাড়া দিয়েছ। সুতরাং তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করো না, বরং নিজদেরকেই ভৎর্সনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, আর তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা আমাকে যার সাথে শরীক করেছ, নিশ্চয় আমি তা অস্বীকার করছি। নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। সূরা ইবরাহিম : ২২

গ. নেতারা অনুসারীদের থেকে দায়মুক্ত হবে

ইসলামে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে কোনো নেতা বা গোষ্ঠীর মনগড়া নিয়ম অনুসরণ করে, কিয়ামতের দিন তারাও চরম হতাশার মধ্যে পড়বে। সেই নেতারা তাদের অনুসারীদের অস্বীকার করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَٱتَّخَذُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ ءَالِهَةٗ لِّيَكُونُواْ لَهُمْ عِزّٗا ٨١ كَلَّاۚ سَيَكْفُرُونَ بِعِبَادَتِهِمْ وَيَكُونُونَ عَلَيْهِمْ ضِدًّا ٨

আর তারা আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ গ্রহণ করেছে, যাতে ওরা তাদের সাহায্যকারী হতে পারে। কখনো নয়, এরা তাদের ইবাদাতের কথা অস্বীকার করবে এবং তাদের বিপক্ষ হয়ে যাবে। সূরা মারইয়াম : ৮১-৮২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّاۤ اَطَعْنَا سَادَتَنَا وَکُبَرَآءَنَا فَاَضَلُّوْنَا السَّبِیْلَا رَبَّنَاۤ اٰتِہِمْ ضِعْفَیْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْہُمْ لَعْنًا کَبِیْرًا

তারা আরো বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, তখন তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল’। হে আমাদের রব, আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দিন এবং তাদেরকে বেশী করে লা‘নত করুন’। সূরা আহযাব: ৬৭-৬৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِذْ تَبَرَّأَ ٱلَّذِينَ ٱتُّبِعُواْ مِنَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ وَرَأَوُاْ ٱلْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ ٱلْأَسْبَابُ ١٦٦ وَقَالَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةٗ فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُواْ مِنَّاۗ كَذَٰلِكَ يُرِيهِمُ ٱللَّهُ أَعْمَٰلَهُمْ حَسَرَٰتٍ عَلَيْهِمْۖ وَمَا هُم بِخَٰرِجِينَ مِنَ ٱلنَّارِ ١٦٧

“যখন অনুসরনীয় ব্যক্তিরা অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং তারা আযাব দেখতে পাবে। আর তাদের সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যারা অনুসরণ করেছে, তারা বলবে, যদি আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হত, তাহলে আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতাম, যেভাবে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন তাদের আক্ষেপের জন্য, আর তারা আগুন থেকে বের হতে পারবে না”। সূরা বাকারা : ১৬৬-১৬৭

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার নিজের আমলের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সেদিন দুনিয়ার সব সম্পর্ক, প্রভাব এবং আনুগত্য ভেঙে যাবে। যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ইবাদত বা অনুসরণ করেছে, তারা চরম হতাশ হবে। তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি বা শক্তি, তা সে শয়তান হোক, কোনো নেতা হোক, বা কোনো মূর্তি হোক—কেউই তাদের পাশে দাঁড়াবে না, বরং সবাই নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করবে। এই কারণে ইসলামে শিরক থেকে দূরে থাকার ওপর এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৪. হাশরের মাঠে পরকাল অস্বীকারকারীদের ধ্বংশ

পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে শাস্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই শাস্তিগুলো কেবল পরকালের জন্যই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে কবরের জীবন থেকেও শুরু হয়। কুরআনের আলোকে পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য কিছু প্রধান শাস্তি নিচে তুলে ধরা হলো:

ক. অন্ধ ও হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় হাশর

হাশরের ময়দানে পরকাল অস্বীকারকারীদের অন্ধ অবস্থায় উঠানো হবে। তারা কোনো কিছু দেখতে পাবে না এবং তাদের মধ্যে থাকবে গভীর হতাশা ও অনুশোচনা।

وَمَنْ اَعْرَضَ عَنْ ذِکْرِیْ فَاِنَّ لَہٗ مَعِیْشَۃً ضَنْکًا وَّنَحْشُرُہٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ اَعْمٰی

‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সূরা ত্ব-হা : ১২৪

খ. আমলনামা বাম হাতে দেওয়া

কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির আমলনামা (জীবনের হিসাব) দেওয়া হবে। যারা পরকাল অস্বীকারকারী, তাদের আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে। এতে তারা অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হবে।

وَاَمَّا مَنْ اُوْتِیَ کِتٰبَہٗ بِشِمَالِہٖ ۬ۙ  فَیَقُوْلُ یٰلَیْتَنِیْ لَمْ اُوْتَ کِتٰبِیَہْ ۚ

কিন্তু যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে, ‘হায়, আমাকে যদি আমার আমলনামা দেয়া না হত’! সূরা আল-হাক্কাহ : ২৫

গ. চেহারার মলিনতা এবং কালিমা

কেয়ামতের দিন পরকাল অস্বীকারকারীদের চেহারা কালো ও মলিন হয়ে যাবে, যা তাদের অপমান ও পাপের পরিচায়ক হবে।

وَیَوْمَ الْقِیٰمَۃِ تَرَی الَّذِیْنَ کَذَبُوْا عَلَی اللّٰہِ وُجُوْہُہُمْ مُّسْوَدَّۃٌ ؕ اَلَیْسَ فِیْ جَہَنَّمَ مَثْوًی لِّلْمُتَکَبِّرِیْنَ

আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারাগুলো কালো দেখতে পাবে। অহঙ্কারীদের বাসস্থান জাহান্নামের মধ্যে নয় কি? সূরা আয-যুমার: ৬০

ঘ. কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি

কুরআন স্পষ্টভাবে বলে যে, পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য এক কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এই শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না এবং এর তীব্রতা হবে কল্পনাতীত।

بَلْ کَذَّبُوْا بِالسَّاعَۃِ ۟  وَاَعْتَدْنَا لِمَنْ کَذَّبَ بِالسَّاعَۃِ سَعِیْرًا ۚ

বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে আর কিয়ামতকে যে অস্বীকার করে তার জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুন। সূরা ফুরকান : ১১

ঙ. যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে

পরকাল অস্বীকারকারীদের প্রধান পরিণতি হলো জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান। এই জাহান্নাম থেকে তাদের কোনোদিন মুক্তি দেওয়া হবে না এবং তাদের কষ্ট কখনো শেষ হবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ وَلِقَآئِہٖۤ اُولٰٓئِکَ یَئِسُوْا مِنْ رَّحْمَتِیْ وَاُولٰٓئِکَ لَہُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ

আর যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর সাক্ষাত অস্বীকার করে তারা আমার রহমত থেকে হতাশ হবে এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা আনকাবুত : ২৩

এই শাস্তিগুলো পরকাল অস্বীকারের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে এবং বিশ্বাসীদেরকে সঠিক পথে চলার জন্য উৎসাহিত করে। এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, পরকালকে অস্বীকার করা কেবল একটি চিন্তাভাবনা নয়, বরং এর জন্য কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

চ. কিয়ামতের দিন কাফিরদের জন্য কোন ওযনই স্থাপন করব না

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন খুব মোটাতাজা একজন বড় লোক আসবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা একটি মশার পাখার সমানও হবে না। অতঃপর তিনি এর প্রমাণস্বরূপ বললেন, তোমরা এই আয়াতটি পাঠ কর-

 فَلَا نُقِیْمُ لَهُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَزْنًا

“আমি কিয়ামতের দিন কাফিরদের (নেক ’আমলের) জন্য কোন ওযনই স্থাপন করব না। সূরা কাহফ : ১০৫। সহিহ বুখারি : ৪৭২৯, সহহি মুসলিম : ২৭৮৫), মিশকাত : ৫৫৪৩, সহীহুল জামি : ২৪০৭, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩২০১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ৩৫৮১

হাশরের ময়দা : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৫. ইবরাহীম আ. এর পিতাকে ক্ষমা করা হবে না

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তার পিতা আযর-এর সাক্ষাৎ পাবেন। তখন আযর-এর চেহারা হবে কালো ধুলাবালি মিশ্রিত। তখন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তাকে বলবেন, আমি কি আপনাকে (দুনিয়াতে) বলেছিলাম না যে, আপনি আমার কথা অমান্য করবেন না? তখন তার পিতা তাকে বলবেন, আজ আমি তোমার অবাধ্যতা করব না। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম বলবেন, হে প্রতিপালক! আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, হাশরের দিন আমাকে অপমানিত করবেন না। অথচ আজ আমার পিতা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত, অতএব এর চেয়ে অধিক লাঞ্ছনা ও অপমান আর কি হতে পারে? তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত অবৈধ করে রেখেছি। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে বলা হবে, তুমি তোমার পায়ের তলার দিকে দেখ। তিনি সে দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই হঠাৎ দেখবেন যে, তার সামনে কাদা গোবরে লণ্ডভণ্ড শিয়াল আকৃতি একটি নিকৃষ্ট পশু দাঁড়িয়ে আছে। তখনি তাকে চার পা ধরে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ৩৩৫০, মিশকাত : ৫৫৩৮, সহীহুল জামি : ৮১৫৮, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম : ২৯৩৬।

৬. কিয়ামতের দিন কিছু মানুষকে আরশের ছায়ায় স্থান দেওয়া হবে

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: «أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي، الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي»

আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, যারা আমারই জন্য পরস্পরকে ভালোবেসেছে তারা আজ কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় ছায়া দান করবো। আজ এমন দিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই”। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৬।

আবু ইয়াসার কা‘আব ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا أَوْ وَضَعَ عَنْهُ، أَظَلَّهُ اللهُ فِي ظِلِّهِ»

“যে কোনো ঋণগ্রস্ত বা অভাবী ব্যক্তিকে সুযোগ দিবে অথবা তাকে ঋণ আদায় থেকে অব্যাহতি দিবে আল্লাহ তায়ালা তাকে নিজ ছায়ায় আশ্রয় দিবেন”। সহিহ মুসলিম : ২৩০২

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

কিয়ামত দিবসে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ‘আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোনো ছায়া থাকবে না- ন্যায়পরায়ন বাদশাহ, এমন যুবক যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর ইবাদতে, ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় সর্বদা সংশি­ষ্ট থাকে মসজিদের সাথে, এমন দু ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে তারই জন্য, এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সুন্দরী নেতৃস্থানীয়া এক রমণী আহ্বান করল অশ্লীল কর্মের প্রতি, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করে সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি, এমন ব্যক্তি, যে এরূপ গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত ডান হাতের দান সম্পর্কে অবগত হয় না। আর এমন ব্যক্তি, নির্জনে যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দু-চোখ বেয়ে বয়ে যায় অশ্রুধারা” সহিহ বুখারি ৬৬০, সহিহ  মুসলিম : ১০৩১।

৭. কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠি মুমিনগণ আল্লাহকে দেখতে পাবে

আবূ রযীন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমরা কি কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখতে পাবো এবং তাঁর সৃষ্টির মাঝে এর নিদর্শন কী? তিনি বলেনঃ হে আবূ রযীন! তোমাদের প্রত্যেকে কি চাঁদকে পৃথকভাবে দেখতে পায় না? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেনঃ আল্লাহ অতীব মহান এবং এটাই হল তাঁর সৃষ্টির মাঝে (তাঁর) নিদর্শন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮০, মিশকাত : ৫৬৫৮, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩১, ইবনু মাজাহ : ১৮০, মুসনাদে আহমাদ : ১৬২৩১, ত্ববারানী : ১৫৭৯৬।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি কিয়ামত দিবসে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “আচ্ছা দুপুর বেলা যখন মেঘ না থাকে তখন সূর্যকে দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন, না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করলেন: পূর্ণিমার রাতে যখন আকাশে মেঘ না থাকে তখন চাঁদ দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন: না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! তোমাদের প্রতিপালককে দেখার জন্য সেদিন তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হবে না। যেমন সূর্য ও চন্দ্র দেখার জন্য তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হয় না। আল্লাহ এক বান্দার সাথে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাইনি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাইনি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর দ্বিতীয় এ ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাই নি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাই নি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর তৃতীয় এক ব্যক্তিকে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে অপর দুজনের মত করেই প্রশ্ন করবেন। সে বলবে, আমি আপনার প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। আপনার কিতাব, আপনার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। সালাত পড়েছি, রোযা রেখেছি, দান-সদকা করেছি। সাধ্যমত আপনার প্রশংসা করেছি। তার উত্তর শুনে আল্লাহ বলবেন, তাই নাকি? তাহলে এখনই তোমার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী উপস্থিত করি। তারপর (তোমার উত্তর সম্পর্কে) তুমি ভেবে দেখবে। বলা হবে, কে আছে তার সম্পর্কে স্বাক্ষ্য দিবে? এরপর তার মুখ সীল করে দেওয়া হবে। তার রান, তার মাংস, তার হাড্ডিকে বলা হবে, তোমরা কথা বলো। এরা তাদের জানা মতে তথ্য দিতে শুরু করবে। এভাবে আল্লাহ নিজে স্বাক্ষ্য দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। আসলে এ ব্যক্তিটি ছিল দুনিয়ার জীবনে মুনাফিক। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন”। সহীহ বুখারী : ৭৪৩৭, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৭৯১৪, আবূ ইয়া’লা : ৬৬৮৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪৬৪২. হাকিম : ৮৭৩৬।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন যে, কয়েকজন সাহাবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত দিবসে আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের মাঝে কষ্ট হয়? সাহাবাগণ বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের কষ্টবোধ হয়? তারা বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তদ্রুপ তোমরা তাকেও দেখবে। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ সকল মানুষকে জমায়েত করে বলবেন, পৃথিবীতে তোমাদের যে যার ইবাদাত করেছিলে আজ তাকেই অনুসরণ কর।

তখন যারা সূর্যের উপাসনা করতো, তারা সূর্যের সাথে থাকবে। যারা চন্দ্রের উপাসনা করতো, তারা চন্দ্রের সাথে থাকবে। আর যারা আল্লাহদ্রোহীদের (তাগুতের) উপাসনা করতো, তারা আল্লাহদ্রোহীদের সাথে জমায়েত হয়ে যাবে। কেবল এ উম্মত অবশিষ্ট থাকবে। তন্মধ্যে মুনাফিকরাও থাকবে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট এমন আকৃতিতে উপস্থিত হবেন যা তারা চিনে না। তারপর (আল্লাহ তা’আলা) বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক (সুতরাং তোমরা আমার পিছনে চল)। তারা বলবে, নাউযুবিল্লাহ। আমাদের প্রভু না আসা পর্যন্ত আমরা এখানেই দাড়িয়ে থাকবো। আর তিনি যখন আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারবো।

এরপর আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট তাদের পরিচিত আকৃতিতে আসবেন, বলবেনঃ আমি তোমাদের প্রভু। তারা বলবে, হ্যাঁ, আপনি আমাদের প্রতু। এ বলে তারা তাকে অনুসরণ করবে। এমন সময়ে জাহান্নামের উপর দিয়ে সিরাত (সাকো) বসানো হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আর আমি ও আমার উম্মতই হব প্রথম এ পথ অতিক্রমকারী। সেদিন রাসূলগণ ব্যতীত অন্য কেউ মুখ খোলারও সাহস করবে না। আর রাসূলগণও কেবল এ দু’আ করবেন। হে আল্লাহ! নিরাপত্তা দাও, নিরাপত্তা দাও। আর জাহান্নামে থাকবে সা’দান বৃক্ষের কাটার মত অনেক কাটাযুক্ত লৌহদণ্ড। তোমরা সাদান বৃক্ষটি দেখেছ কি? সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তা সাদান বৃক্ষের কাটার মতই, তবে সেটা যে কত বিরাট তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। পাপ কাজের জন্য কাটার আংটাগুলো ছোবল দিতে থাকবে। তাদের কেউ কেউ মু’মিন (যারা সাময়িক জাহান্নামী) তারা রক্ষা পাবে, আর কেউ তো শাস্তি ভোগ করে নাযাত পাবে।

এরপর আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা হতে অবসর হলে স্বীয় রহমতে কিছু সংখ্যক জাহান্নামীদের (জাহান্নাম হতে) বের করতে দেয়ার ইচ্ছা করবেন তখন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন যারা কালিমায় বিশ্বাসী ও শিরক করেনি যাদের উপর আল্লাহ তা’আলা রহম করতে চাইবেন যে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসো। আর যাদের উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করতে চেয়েছেন তারা ঐ সকল লোক যারা ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলত। অতঃপর ফেরেশতাগণ তাদের সনাক্ত করবেন। তারা সিজদা চিহ্নের সাহায্যে তাদের চিনবেন। কারণ, অগ্নি মানুষের দেহের সবকিছু জ্বালিয়ে ফেললেও সাজদার স্থান অক্ষত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা সাজদার চিহ্ন নষ্ট করা হারাম (নিষিদ্ধ) করে দিয়েছেন। মোটকথা, ফেরেশতাগণ এদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে এমন অবস্থায় যে, তাদের দেহ আগুনে দগ্ধ। তাদের উপর ’মাউল-হায়াত’ (সঞ্জীবনী পানি) ঢেলে দেয়া হবে। তখন তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে যেমনভাবে শস্য অঙ্কুর পানিসিক্ত উর্বর জমিতে সতেজ হয়ে উঠে।

তারপর আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের বিচার সমাপ্ত করবেন। শেষে এক ব্যক্তি থেকে যাবে। তার মুখমণ্ডল হবে জাহান্নামের দিকে। এই হবে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী। সে বলবে, হে আমার প্রভু! (অনুগ্রহ করে) আমার মুখটি জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দিন। কারণ জাহান্নামের দুর্গন্ধ আমাকে অসহনীয় কষ্ট দিচ্ছে; এর লেলিহান অগ্নিশিখা আমাকে দগ্ধ করে দিচ্ছে। আল্লাহ যতদিন চান ততদিন পর্যন্ত সে তার নিকট দু’আ করতে থাকবে। পরে আল্লাহ বলবেন, তোমার এ দু’আ কবুল করলে তুমি কি আরো কিছু কামনা করবে? সে বিভিন্ন ধরনের ওয়াদা ও অঙ্গীকার করে বলবে যে, জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দিবেন।

তার চেহারা যখন জান্নাতের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, আর সে জান্নাত দেখবে, তখন আল্লাহ যতদিন চান সে নীরব থাকবে। পরে আবার বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেবল জান্নাতের দরজা পর্যন্ত আমাকে পৌছে দিন। আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি না অঙ্গীকার দিয়েছিলে যে, আমি তোমাকে যা দিয়েছি তা ছাড়া আর কিছু চাইবে না। হে আদম সন্তান! তুমি হতভাগা ও তুমি সাংঘাতিক ওয়াদাভঙ্গকারী। তখন সে বলবে, হে আমার রব! এই বলে আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকবে। আল্লাহ বলবেন, তুমি যা চাও তা যদি দিয়ে দেই তবে আর কিছু চাইবে না তো? সে বলবে, আপনার ইজ্জতের কসম! আর কিছু চাইব না। এভাবে সে তার অক্ষমতা (আল্লাহর কাছে) পেশ করতে থাকবে যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা হয়।

তারপর তাকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া হবে। এবার যখন সে জান্নাতের দরজায় দাঁড়াবে, তখন জান্নাত তার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সে জান্নাতের সমৃদ্ধি ও সুখ দেখতে থাকবে। সেখানে আল্লাহ যতক্ষণ চান সে ততক্ষণ চুপ করে থাকবে। পরে বলবে, হে আমার রব! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, তুমি না সকল ধরনের ওয়াদা ও অঙ্গীকার করে বলেছিলে, আমি যা দান করেছি এর চাইতে বেশি আর কিছু চাইবে না? হে হতভাগা আদম সন্তান! তুমি তো ভীষণ ওয়াদাভঙ্গকারী। সে বলবে, হে আমার রব। আমি যেন আপনার সৃষ্টির সবচেয়ে দুর্ভাগা না হই। সে বার বার দু’আ করতে থাকবে। পরিশেষে তার অবস্থা দেখে আল্লাহ তা’আলা হেসে ফেলবেন। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। (জান্নাতে প্রবেশের পর) আল্লাহ তাকে বলবেন, (যা চাওয়ার) চাও। তখন সে তার সকল কামনা চেয়ে শেষ করবে। এরপর আল্লাহ নিজেই স্মরণ করায়ে বলবেন, অমুক অমুকটা চাও। এভাবে তার কামনা শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ বলবেন, তোমাকে এ সব এবং এর সমপরিমাণ আরো দেয়া হল। সহিহ মুসলিম : ১৮২

৮. ফিরিশতাগণ মুশরিকদের থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা দিবে

আরবের মুশরিকরা ফিরিশতাদেরকে আল্লাহ তায়ালার কন্যা বলে জ্ঞান করতো। তাই তারা ফিরিশতাদের পূজা করতো। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, অবিশ্বাসীরা কি তাদের পূজা করত? ফিরিশতারা সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিজেদের পবিত্র ঘোষণা করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعٗا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَٰٓئِكَةِ أَهَٰٓؤُلَآءِ إِيَّاكُمْ كَانُواْ يَعْبُدُونَ ٤٠ قَالُواْ سُبْحَٰنَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِمۖ بَلْ كَانُواْ يَعْبُدُونَ ٱلْجِنَّۖ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ ٤١

আর স্মরণ কর, যেদিন তিনি তাদের সকলকে সমবেত করবেন তারপর ফেরেশতাদেরকে বলবেন, ‘এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?’ তারা (ফেরেশতারা) বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, আপনিই আমাদের অভিভাবক, তারা নয়। বরং তারা জিনদের পূজা করত। এদের অধিকাংশই তাদের প্রতি ঈমান রাখত’। সূরা সাবা : ৪০-৪১

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সকল প্রকার শিরক বা আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্বের মিথ্যাকে প্রকাশ করে দেবেন। যারা ফিরিশতা, নবী-রাসূল বা জিনদের পূজা করত, তাদের উপাসনার এই দাবি সেদিন বাতিল প্রমাণিত হবে। তারা কেউ কারো কোন উপকার করেত পারবে না।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

فَٱلْيَوْمَ لَا يَمْلِكُ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٖ نَّفْعٗا وَلَا ضَرّٗا وَنَقُولُ لِلَّذِينَ ظَلَمُواْ ذُوقُواْ عَذَابَ ٱلنَّارِ ٱلَّتِي كُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ

ফলে আজ তোমাদের একে অপরের কোনো উপকার কিংবা অপকার করার ক্ষমতা কেউ রাখবে না। আর আমি যালিমদের উদ্দেশ্যে বলব, তোমরা আগুনের আযাব আস্বাদন কর যা তোমরা অস্বীকার করতে”। সূরা সাবা : ৪২

৯. মুশরিকদের মূর্তিগুলো পুজারীদের সাহায্য করতে অক্ষমতা প্রকাশ করবে

দুনিয়াতে যারা মূর্তি বা অন্য কোনো বস্তুর পূজা করেছে, কিয়ামতের দিন সেই পূজিত বস্তুগুলো তাদের পূজারীদের কোনো রকম সাহায্য করতে পারবে না। বরং তারা হয় পূজারীদের বিপক্ষে সাক্ষী দেবে অথবা তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে। কুরআনে বেশ কয়েকটি আয়াতে এই সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِذَا حُشِرَ النَّاسُ کَانُوْا لَہُمْ اَعْدَآءً وَّکَانُوْا بِعِبَادَتِہِمْ کٰفِرِیْنَ

আর যখন মানুষকে একত্র করা হবে, তখন এ উপাস্যগুলো তাদের (পূজারীদের) শত্রু হবে এবং তারা তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে। সূরা আহকাফ: ৬

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন পূজিত উপাস্যগুলো তাদের পূজারীদের ইবাদত অস্বীকার করবে। অর্থাৎ, তারা বলবে যে, “আমরা তোমাদের ইবাদত সম্পর্কে অবগত নই এবং আমাদের ইবাদত করার জন্য আমরা তোমাদেরকে নির্দেশও দেইনি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُوا مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَاؤُكُمْ ۚ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ ۖ وَقَالَ شُرَكَاؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ

আর যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব, তারপর যারা শির্ক করেছিল, তাদের বলব, তোমরা এবং তোমাদের অংশীদাররা নিজ নিজ স্থানে থাকো। অতঃপর আমি তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেব এবং তাদের অংশীদাররা বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের ইবাদত করতে না’। সূরা ইউনুস: ২৮

এই আয়াতটিতে আরও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, পূজিত উপাস্যগুলো কেবল অসহায়ত্বই প্রকাশ করবে না, বরং তাদের পূজারীদের ইবাদত অস্বীকার করে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أَتَدْعُونَ مَن لَّا يَسْمَعُ دُعَاءَكُمْ وَلَا يَضُرُّكُمْ وَلَا يَنفَعُكُمْ

তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছুকে ডাকো, যা তোমাদের কোনো ডাকে সাড়া দিতে পারে না, তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না এবং তোমাদের কোনো উপকারও করতে পারে না?” সূরা আরাফ: ১৯২

এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মূর্তিপূজার ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করেছেন। এই মূর্তিগুলো এতটাই ক্ষমতাহীন যে, তারা তাদের পূজারীদের প্রার্থনা শুনতে বা কোনো সাহায্য করতে পারে না।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, ‘যে যার পূজা করত, সে তার অনুসরণ করুক।’ তখন যারা সূর্যের পূজা করত, তারা সূর্যের সঙ্গে, যারা চন্দ্রের পূজা করত, তারা চন্দ্রের সঙ্গে এবং যারা প্রতিমার পূজা করত, তারা তাদের প্রতিমার সঙ্গে চলে যাবে। সহিহ বুখারী, হাদিস: ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ৪৫১

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন এই উপাস্যগুলো তাদের পূজারীদের কোনো উপকারে আসবে না, বরং তাদের সঙ্গে জাহান্নামের দিকে চলে যাবে।

সুতরাং, কুরআন ও হাদিসের আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে, দুনিয়াতে যারা মূর্তি বা অন্য কোনো বস্তুর পূজা করেছে, কিয়ামতের দিন সেই মূর্তিগুলো তাদের কোনো কাজে আসবে না। বরং তারা তাদের পূজারীদের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দেবে এবং তাদের অসহায়ত্বের চরম প্রমাণ হবে।

১০. কিয়ামতের দিনে ঈসা (আ.) খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (Trinity) এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন

খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (Trinity) হলো একটি ধর্মীয় বিশ্বাস যা বলে যে ঈশ্বর এক, কিন্তু তিনি তিনটি সত্তায় বিদ্যমান- পিতা (God the Father), পুত্র (God the Son বা যিশু খ্রিস্ট) এবং পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)। এই তিনটি সত্তা সমানভাবে ঐশ্বরিক এবং তারা তিনজন মিলে এক ঈশ্বর।

এই বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রিত্বের প্রতিটি সত্তা সম্পূর্ণ ঈশ্বর। যেমন-

পিতা: তিনি হলেন স্রষ্টা, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

পুত্র: তিনি হলেন যিশু খ্রিস্ট, যিনি মানব রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছেন, মানুষকে পাপ থেকে মুক্ত করার জন্য।

পবিত্র আত্মা: তিনি হলেন ঈশ্বরের সেই শক্তি বা প্রভাব, যা বিশ্বাসীদের হৃদয়ে কাজ করে এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে।

ত্রিত্ববাদকে বোঝার জন্য প্রায়শই একটি উপমা ব্যবহার করা হয়, যেমন একটি ডিমের তিনটি অংশ (শেল, সাদা অংশ, কুসুম) বা পানির তিনটি রূপ (তরল, বরফ, বাষ্প)। যদিও এই উপমাগুলো ত্রিত্বের ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না, তবে এটি বোঝাতে সাহায্য করে যে কীভাবে একজন ঈশ্বর তিনটি ভিন্ন সত্তায় প্রকাশিত হতে পারেন।

ত্রিত্ববাদ হলো খ্রিস্টধর্মের অন্যতম মৌলিক একটি মতবাদ। এটি প্রধানত ক্যাথলিক, অর্থোডক্স এবং প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের বেশিরভাগ শাখা দ্বারা গৃহীত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে ত্রিত্ববাদ (Trinity) হারাম ও শিরক কারণ এটি ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহীদ-এর পরিপন্থী। তাওহীদ মানে হলো আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং তিনি কোনো কিছু বা কারো ওপর নির্ভরশীল নন। আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা অপরিহার্য। ত্রিত্ববাদের ধারণা, যেখানে ঈশ্বরকে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা এই তিনটি সত্তায় বিভক্ত করা হয়, তা এই মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসিদের সাথে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَإِذْ قَالَ ٱللَّهُ يَٰعِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ ءَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ ٱتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَٰهَيْنِ مِن دُونِ ٱللَّهِۖ قَالَ سُبْحَٰنَكَ مَا يَكُونُ لِيٓ أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّۚ إِن كُنتُ قُلْتُهُۥ فَقَدْ عَلِمْتَهُۥۚ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَآ أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلْغُيُوبِ ١١٦ مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَآ أَمَرْتَنِي بِهِۦٓ أَنِ ٱعْبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْۚ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدٗا مَّا دُمْتُ فِيهِمْۖ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ ٱلرَّقِيبَ عَلَيْهِمْۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٖ شَهِيدٌ

আর আল্লাহ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?’ সে বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, যার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য সম্ভব নয়। যদি আমি তা বলতাম তাহলে অবশ্যই আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরে যা আছে তা আপনি জানেন, আর আপনার অন্তরে যা আছে তা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি গায়েবী বিষয়সমূহে সর্বজ্ঞাত’। আমি তাদেরকে কেবল তাই বলেছি, যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আললাহর ইবাদাত কর। আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনি ছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণকারী। আর আপনি সব কিছুর উপর সাক্ষী। সূরা মায়েদা : ১১৬-১১৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَہْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الْحَقَّ ؕ  اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللّٰہِ وَکَلِمَتُہٗ ۚ  اَلْقٰہَاۤ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْہُ ۫  فَاٰمِنُوْا بِاللّٰہِ وَرُسُلِہٖ ۚ۟  وَلَا تَقُوْلُوْا ثَلٰثَۃٌ ؕ  اِنْتَہُوْا خَیْرًا لَّکُمْ ؕ  اِنَّمَا اللّٰہُ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ  سُبْحٰنَہٗۤ اَنْ یَّکُوْنَ لَہٗ وَلَدٌ ۘ  لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الْاَرْضِ ؕ  وَکَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیْلًا 

হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল ও তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বলো না, ‘তিন’। তোমরা বিরত হও, তা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহই কেবল এক ইলাহ, তিনি পবিত্র মহান এ থেকে যে, তাঁর কোন সন্তান হবে। আসমানসূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে যমীনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ১৭১

এই দুটি আয়াতের মূল সারকথা হলো, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক বা সন্তান নেই। নবী ঈসা (আ.) একজন সম্মানিত রাসূল ছিলেন, কোনোভাবেই আল্লাহর পুত্র বা ইলাহ নন। ত্রিত্ববাদ এবং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করার এই ধারণা ইসলামের তাওহীদের মূলনীতির পরিপন্থী। কিয়ামতের দিনেও নবী ঈসা (আ.) নিজে এই সত্যের সাক্ষী হবেন।

১১. হাশরের মাঠের অন্যতম আকর্ষন ‘হাউজে কাউসার

ক. কিয়ামতের দিন বিদআতিদের হাউজে কাউসারের পানি পান করতে দেওয়া হবে না

আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি হাউজে কাউসারে থাকব আর দেখব তোমাদের কে কে আসছে। কিন্তু কিছু মানুষকে আমার অনুমতি ব্যতীত নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, হে রব! এরা আমার অনুসারী, আমার উম্মতের অংশ। আমাকে বলা হবে, আপনি কি জানেন, আপনার পরে এরা কি কাজ করেছে? আল্লাহর শপথ! তারা পিছনে ফিরে যাবে”। সহিহ বুখারী : ৬৫৯৩,  সহিহ মুসলিম : ২৭।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হাউজে কাউসারে আমার উম্মত সমবেত হবে। আমি অনেক মানুষকে এমনভাবে তাড়িয়ে দেব যেমন একজনের উট অন্য জনের উটের পাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাদের তখন চিনবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যা, তোমাদের এমন কিছু আলামত আছে যা অন্যদের নেই। তোমরা আমার কাছে উপস্থিত হবে আর তোমাদের অজুর স্থানগুলো চকমক করতে থাকবে। তোমাদের একটি দলকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে, তারা হাউজের কাছে পৌছতে পারবে না। সে সময় আমি বলব, হে আমার প্রভূ এরা আমার অনুসারী। তখন এক ফিরিশতা উত্তর দিবে, আপনি কি জানেন আপনার পরে তারা কি প্রচলন করেছে? সহিহ মুসলিম : ২৪৭

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ তার উপর অচৈতন্য ভাব চেপে বসল। অতঃপর তিনি মুচকি হেসে মাথা তুললেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাসির কারণ কি? তিনি বললেনঃ এ মাত্র আমার উপর একটি সূরাহ অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি পাঠ করলেন-

بِسْمِ ٱللهِ ٱلرَّحْمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ

إِنَّآ أَعْطَيْنَـٰكَ ٱلْكَوْثَرَ (١) فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنْحَرْ (٢) إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلْأَبْتَرُ (٣)

পরম করুনাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ নামে শুরু করছি।  নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় কর এবং কুরবানী দাও। তোমার কুৎসা রটনাকারীরাই মূলত শিকড়কাটা, নির্মূল।

অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জান কাওসার কি? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা একটা ঝর্ণা। আমার মহান প্রতিপালক আমাকে তা দেয়ার জন্য ওয়া’দা করেছেন। এর মধ্যে অশেষ কল্যাণ রয়েছে, আমার উম্মতের লোকেরা কিয়ামতের দিন এ হাওযের পানি পান করতে আসবে। এ হাওযে রয়েছে তারকার মত অসংখ্য পানপাত্র।

এক ব্যক্তিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। আমি তখন বলব, প্রভু! সে আমার উম্মতেরই লোক। আমাকে তখন বলা হবে, তুমি জান না, তোমার মৃত্যুর পর এরা কী অভিনব কাজ (বিদ’আত) করেছে। ইবনু হুজরের বর্ণনায় আরো আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে আমাদের কাছে এসেছেন এবং আল্লাহ বলবেন, এ ব্যক্তি আপনার পরে বিদ’আত চালু করেছে। সহিহ মুসলিম : ৪০০

১২. হাশররের ময়দানে হাউজে কাউসারের পাশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে নেককারের সাক্ষাত হবে

ইবন যায়েদ ইবন আসেম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আমার পরে তোমরা অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে শাসকদের অগ্রাধিকার দেখতে পাবে। তোমরা তখন ধৈর্য ধারণ করবে হাউজে কাউসারে আমার কাছে সাক্ষাত লাভ পর্যন্ত”। সহিহ বুখারী : ৪৩৩০,  সহিহ মুসলিম : ১৮৪৫।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সা.) -এর নিকটে আবেদন করলাম, কিয়ামতের দিন আপনি অনুগ্রহপূর্বক আমার জন্য বিশেষভাবে শাফা’আত করবেন। তিনি (সা.) বললেন, আচ্ছা আমি তা করব। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে কোথায় অনুসন্ধান করব? তিনি (সা.) বললেন, সর্বপ্রথম তুমি আমাকে পুলসিরাতের উপর অনুসন্ধান করবে। বললাম, যদি আমি আপনাকে পুলসিরাতের সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে মীযানের কাছে খোঁজ করে বললাম, যদি আমি আপনাকে মীযানের কাছেও সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে হাওযে কাওসারের কাছে অনুসন্ধান করব। স্মরণ রাখ, আমি এ তিন জায়গা থেকে অনুপস্থিত থাকব না। সুনানে তিরমিযী : ২৪৩৩, মিশকাত : ৫৫৯৫, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ : ২৬৩০।

১২. হাশরে কেউ একবার এ পানি পান করবে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না

সাহল ইবনু সাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের কাছে পৌছব। যে ব্যক্তি আমার কাছে পৌছবে, সে তার পানি পান করবে। আর যে একবার পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। আমার কাছে এমন কিছু লোক আসবে যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। অতঃপর আমার ও তাদের মাঝে আড়াল করে দেয়া হবে। তখন আমি বলব, তারা তো আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে তারা যে কি সকল নতুন নতুন মত পথ তৈরি করেছে। তা শুনে আমি বলব, যারা আমার অবর্তমানে আমার দীনকে পরিবর্তন করেছে, তারা দূর হোক (অর্থাৎ এ ধরনের লোক আমার শাফা’আত ও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। সহীহ বুখারী : ৬৫৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২৯৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৯৪৪, মিশকাত : ৫৫৭১,  সহীহুল জামি : ২৪৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৩৮১২, আবূ ইয়া’লা : ৭৪৭৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৯৮৫, শু’আবূল ঈমান : ৩৬০, তবারানী : ১৬৭৩

১৩. হাউজে কাউসার পরিচিত :

ক. হাউজে কাউসারের পানি হবে দুধের চেয়েও সাদা

আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার হাউজের প্রশস্ততা হবে এক মাসের সমান দূরত্ব। তার পানি দুধের চেয়েও সাদা, সুঘ্রান মেশকের চেয়ে উত্তম। আর তার পাত্রগুলো আকাশের নক্ষত্রের মতো। যে তা থেকে পান করবে কখনো পিপাসিত হবে না”। সহিহ বুখারী : ৬৫৭৯, সহিহ মুসলিম : ২২৯২

খ. পানি মিশকের মতো সুগন্ধময়।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (মি’রাজের রাত্রে) জান্নাত ভ্রমণকালে অকস্মাৎ আমি একটি নহরের কাছে উপস্থিত হলাম, যার উভয় পার্শ্বে শূন্যগর্ভ মুক্তার গুম্বুজ সাজানো রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! এটা কী? তিনি বললেন, এটাই সেই কাওসার যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন। তার পানি মিশকের মতো সুগন্ধময়। মিশকাত : ৫৫৬৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৬৪৭৪, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৭২০, আবূ ইয়ালা : ২৮৭৬

গ. পানপাত্রের (গ্লাসের) সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো অগণিত

সাওবান (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আমার হাওয ’আদান থেকে বালকা’র ’উম্মানের মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাণ হবে। তার পানি দুগ্ধ অপেক্ষা সাদা ও মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং তার পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো অগণিত। যে তা থেকে এক ঢোক পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। উক্ত হাওযের কাছে সর্বপ্রথম ঐ সকল গরীব মুহাজিরীনগণ আসবে, যাদের মাথার চুল অগোছালো, পরনের কাপড়-চোপড় ময়লা, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলাগণকে যাদের সাথে বিবাহ দেয়া হয় না এবং তাদের জন্য (গৃহের) দরজা খোলা হয় না। মিশকাত : ৫৫৯২, সুনানে তিরমিযী : ২৪৪৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩০৩, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ১০৮২, আহমাদ : ২২৪২১, সহীহুল জামি : ২০৬০, শুআবূল ঈমান : ১০৪৮৫

হাশরের ময়দানের বিচার : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাশরের ময়দান হলো পরকালের এমন এক বিশাল স্থান, যেখানে মানবজাতির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলকে একত্রিত করা হবে। এই স্থানটি এক মহাবিচারের মঞ্চ, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার পার্থিব জীবনের প্রতিটি কাজের হিসাব দেবে। সেদিন কোনো মানুষই এই বিচার থেকে রেহাই পাবে না—রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সবাই সেখানে উপস্থিত থাকবে।

পার্থিব জীবনকে যেভাবে কর্মের ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, হাশরের ময়দান হলো তার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের স্থান। সেদিন মানুষের সকল কর্ম—প্রকাশ্য কিংবা গোপন, ছোট কিংবা বড়—একেবারে নিখুঁতভাবে সামনে আনা হবে। কোনো কিছু গোপন থাকবে না, কোনো কিছু হারিয়ে যাবে না। এমনকি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তার কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে। সেদিন সব মানুষের জন্য দু’টি পাল্লা স্থাপন করা হবে, যেখানে তাদের ভালো এবং মন্দ আমল ওজন করা হবে। যাদের ভালো কাজের পাল্লা ভারী হবে, তারা পাবে এক অনাবিল শান্তি ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি। আর যাদের মন্দ কাজের পাল্লা ভারী হবে, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন পরিণতি।

এই বিচারের দিনটি হবে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং কঠিন। মানুষ সেদিন যার যার নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। তবে যারা নিজেদের জীবনে সৎ কাজ করেছে, মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে এবং স্রষ্টার প্রতি অনুগত ছিল, তাদের জন্য সেদিন থাকবে এক বিশেষ প্রশান্তি ও নিরাপত্তা। তাদের আমলনামা তাদের হাতে দেওয়া হবে, যা দেখে তারা বুঝতে পারবে তাদের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে। এটি কেবল কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়, বরং এটি মানবজীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যের এক অনিবার্য বাস্তবতার চিত্র।

১. হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত বিচার

কিয়ামতের দিন মানুষ পুনরুত্থিত হবে, সকল আমলের হিসাব নেওয়া হবে এবং চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হবে। এই বিচার এমন একটি কঠিন মুহূর্ত, যার ভয়াবহতা কুরআন ও হাদীসে গভীরভাবে বর্ণিত হয়েছে। মানুষ সেখানে নগ্ন, অচল, আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় অবস্থান করবে এবং এক এক করে সকলকে আল্লাহর আদালতে উপস্থিত করা হবে। সেই মহামহিম আদালতের বিচার দুইটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হবে-

ক. হক্কুল্লাহ সম্পর্কিত বিচার

খ. হক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত বিচার

ক. হক্কুল্লাহ সম্পর্কিত বিচার

হক্কুল্লাহ অর্থ হলো- আল্লাহর অধিকার বা বান্দার উপর আল্লাহর যে সমস্ত হক (অধিকার) রয়েছে। এটি ইসলামী বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক দিক, যা কিয়ামতের দিন বিচারকার্যের প্রথম ভাগে অন্তর্ভুক্ত হবে। একজন বান্দার জীবনের প্রধান দায়িত্ব হলো— আল্লাহর হক আদায় করা। আর আল্লাহর হক হচ্ছে— তিনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন, ঠিক সেইভাবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা।

এককথায় হক্কুল্লাহ বলতে সেই সকল দায়িত্ব ও কর্তব্যকে বোঝায়, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার উপর ফরজ করেছেন, তাঁর প্রতি বান্দার আনুগত্য, ইবাদত, বিশ্বাস ও আচরণের ক্ষেত্রে।

তাওহিদ হলো সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক। আল্লাহ চান, বান্দা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। আল্লাহ বলেন:

وَمَا خَلَقْتُ ٱلْجِنَّ وَٱلْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমারই ইবাদতের জন্য। সূরা যারিয়াত : ৫৬

আল্লাহর সবচেয়ে বড় হক সম্পর্কে সহিহ হাদিসে এসেছে-

মু‘আয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উফাইর নামক একটি গাধার পিঠে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পেছনে আরোহী ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে মু‘আয, তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর হক কী? এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, বান্দা তাঁর ‘ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, তাঁর ‘ইবাদাতে কাউকে শরীক না করলে আল্লাহ্ তাকে শাস্তি দিবেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি কি লোকদের এ সুসংবাদ দিব না? তিনি বললেন, তুমি তাদের সুসংবাদটি দিও না, তাহলে লোকেরা এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। সহিহ বুখারি : ২৮৫৬, ৫৯৬৭, ৬২৬৭, ৬৫০০, ৭৩৭৩, সহিহ মুসলিম : ৩০, আহমাদ : ২২০৫২

তাওহীদ ও শিরকের বিচার

কিয়ামতের দিনের বিচারপদ্ধতির ভিত্তি হলো তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ। তাওহীদ ইসলামের মূল স্তম্ভ। যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে ইবাদত করেছে, তাদের কোনো আমলই গৃহীত হবে না। অর্থাৎ তাওহিদের বিশ্বাসের কারনে মানুষ হিসেব প্রদানে জন্য উপযুক্ত হবে। যারা মুশরিক তাদের তাদের হিসেব থেকে বাদ দেওয়া হবে। শিরককারির গুনাহ ক্ষমা করা হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغْفِرُ اَنْ یُّشْرَکَ بِہٖ وَیَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِکَ لِمَنْ یَّشَآءُ ۚ وَمَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰہِ فَقَدِ افْتَرٰۤی اِثْمًا عَظِیْمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অন্য বর্ণনায় রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ ‏”‏ ‏.‏ وَقُلْتُ أَنَا وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏.

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শারীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বলি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শারীক না করা অবস্থায় মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯২

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, বারাকাতময় আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাযির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ হাদিসের মান হাসান

আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ যাকারিয়া বর্ণনা করেছেন, আমি উম্মু দারদাকে বলতে শুনেছি, আমি আবূ দারদা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ সব গুনাহই ক্ষমা করবেন; কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে অথবা কোনো ঈমানদার ব্যক্তি অপর কোনো ঈমানদারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে। সুনানে কখআবু দাউদ : ৪২৭০

যারা তাওহীদ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে বিচারের দ্বিতীয় ধাপে গমন সম্ভব। আর যারা শিরকে লিপ্ত ছিল, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন-

وَلَقَدْ اُوْحِیَ اِلَیْکَ وَاِلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکَ ۚ لَئِنْ اَشْرَکْتَ لَیَحْبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہْدِیْ بِہٖ مَنْ یَّشَآءُ مِنْ عِبَادِہٖ ؕ وَلَوْ اَشْرَکُوْا لَحَبِطَ عَنْہُمْ مَّا کَانُوْا یَعْمَلُوْنَ

এ হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত, এ দ্বারা তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্‌ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত। সুরা আনাম : ৮৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَدِمْنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰہُ ہَبَآءً مَّنْثُوْرًا

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

মুআবিয়া বিন হায়দা বিন মুআবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ ‏

কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯

যারা শিরক করেছে, তারা কোনো প্রশ্নোত্তর ছাড়াই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

নেক বা বদ আমলের হিসাব

যারা তাওহিদের পরিক্ষায় পাশ করবে তাদের নেক আমল বা বদ আমলের হিসেবের মুখোমিখি করা হবে। কিন্তু যারা শিরকে লিপ্ত ছিল, কুফরি করেছিল, পরকার অস্বীকার করছিল তারা তাওহিদের পরীক্ষায় ফেল করে দ্বিতীয় পর্যায়ে (হিসেব নিকেশ) উত্তির্ণ হতে পারবেনা। অর্থাৎ তাওহীদের ভিত্তিতে যারা ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ে আল্লাহ হক সম্পর্কে বিচার করা হবে। এ পর্যায়ে প্রধান্য পারে ঈমান আনার পর আল্লাহ প্রদত্ত ইবাদত, আদেশ নিষেধ, হালাল হারামের সীমা সম্পর্কিত বিষয়। এক কথায় বলা যায়, ইসলামে সকল হুকুম আহকাম সম্পর্কিত বিষয় যা সরাসরি আল্লাহ হকের সাথে জড়িত। যেমন-

১. প্রতি দিন পাঁচবার সালাত আদায় করা ফরজ। সুরা বাকারা : ৪৩, ৮৩, ২৭৭, সুরা নিসা : ১০৩, সুরা মায়েদা : ৫৫, সুরা আনআম : ৭২, সুরা আরাফ : ১৭০, সুরা আনফাল : ৩, সুরা তাওবা : ১৮, ৭১, সুরা রাদ : ২২, সুরা ইব্রাহিম : ৩১, সুরা নুর : ৫৬ ইত্যাদি

২. রমাজান মাসে সিয়াম আদায় করা ফরজ। সূরা বাকারা : ১৮৩-১৮৫, সহিহ বুখারি : ০৮, ৪৫১৪, সহিহ মুসলিম : ১৬, মিশকাত : ১৯৬২, সুনানে নাসায়ি : ২১০৬, সহিহ আত্ তারগীব : ৯৯৯, সহিহ আল জামি : ৫৫

৩. সামর্থ্যবাদ উপর আল্লাহর জন্য হজ ফরজ করেছেন। সুরা ইমরান : ৯৭, সুরা হাজ :২৭, সহিহ বুখারি ৮, সহিহ মুসলিম ১৬,

৫. নিসাব পরিমান মালের উপর জাকাত ফরজ করেছেন।  সুরা বাকারা : ৪৩, সুরা বাইয়িনা : ৫, সহিহ বুখারি : ৫৭, ৫২৪, ১৪০১, ২১৫৭, ২৭১৪, ২৭১৫, ৭২০৪, সহিহ মুসলিম : ৫৬, আহমাদ : ৩২৮১

৬. অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করা না করা। সুরা নিসা : ২৯, সুরা বাকারা : ১৮৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৩৩

৭. প্রকাশ্য ও গোপন সকল অশ্লীলতার থেকে দুরে থাকা ফরজ। সূরা আনআম : ১৫১

৮. হারাম কাজ পরিহার করা, সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করা । সূরা হাশর : ৭

৯.  সূদ পরিহার করে চলা অ সুরা বাকারা : ২৭৫. ২৭৬, ২৭৮, সুরা ইমরান : ১৩০, সুনানে নাসাঈ : ৫১০২, ইরনে মাজাহ ২২৭৪, মিসকাত ২৮২৬, শুয়াবুল ঈমান ৫১৩৩

১০. হারাম মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত ভক্ষন না করা। সুরা মায়েদা : ৩, সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৮৫

আল্লাহর শত শত আদেশ নিষেদ থেকে মাত্র ১০ টি উদাহরণ তুলে ধরলাম। এগুলো সম্পর্কে কিয়ামতে দিন জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ তালায়া এ সকল আমলের জন্য শাস্তির ঘোষণা করেছেন। যেমন-

১. সালাত আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে।

 সুরা মারিয়াম : ৫৯, সুরা রূম : ৩১, সহিহ মুসলিম : ৮২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬৭৮, সুনানে নাসায়ী : ৪৬৪, সুনানে তিরমিযী ২৬২০, সুনানে ইবনু মাজাহ্ ১০৭৮, মিশকাত : ৫৬৯

২. জাকাত আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে।

সুরা তাওবা : ৩৪-৩৫, সহিহ বুখারি : ১৪০৩, ১৪৬০, ৪৫৬৫, ৬৬৩৮, ৪৬৫৯, ৬৯৫৭, সহিহ মুসলিম : ৯৯০, আহমাদ : ২১৪০৯

৩. সিয়াম আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে। সহিহ বুখারি : ২৮৪০, সহিহ মুসলিম : ১১৫৩, তিরমিযী ১৬২৩, নাসায়ী : ২২৫১-২২৫৩, ইবনু মাজাহ : ১৭১৭

একটিভাবে প্রতিটি ফরজ, ওয়াজিব, হারাম, অন্যায় অসত্য কাজের শাস্তির ঘোষণা আছে। এ শাস্তি প্রদান আল্লাহ তায়ালা শতভাগ সক্ষম। কিন্তু বড় আশার কথা হলো তিনি ইচ্ছা করলে তার সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

আল্লাহ হক্কুল্লাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন :

হক্কুল্লাহ সম্পর্কে আল্লাহ ক্ষমাশীল। এটি একটি আশার কথা, যে হক্কুল্লাহ যদি কেউ লঙ্ঘন করে, তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি শিরক ব্যতিত সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আশা করা যায় বান্দা তার যে সকল হক (শিরক করা ব্যতিত) আদায় করতে পাবে নাই, তা ক্ষমা করা হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغْفِرُ اَنْ یُّشْرَکَ بِہٖ وَیَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِکَ لِمَنْ یَّشَآءُ ۚ وَمَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰہِ فَقَدِ افْتَرٰۤی اِثْمًا عَظِیْمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সূরা নিসা: ৪৮

খ. হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক

হক্কুল ইবাদ” (حَقُّ الْعِبَاد) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো বান্দার হক বা মানুষের হক। অর্থাৎ, এক মানুষের প্রতি অন্য মানুষের যে অধিকার ও দায়িত্ব, যেমন – মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব, প্রতিবেশীর অধিকার, আমানতের হেফাজত, সম্মান রক্ষা করা, ইত্যাদি।

ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো “হক্কুল ইবাদ” বা বান্দার হক। এটি এমন এক নীতি যা একজন মুসলিমকে কেবল আল্লাহর ইবাদতকারী হিসেবেই নয়, বরং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।

হক্কুল ইবাদের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সহানুভূতি এবং ন্যায়পরায়ণতা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। এর মধ্যে রয়েছে অন্যের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও স্বাধীনতাকে সম্মান করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হয়। এটাই মহা সাফল্য।” এখানে সৎকর্মের মধ্যে হক্কুল ইবাদ একটি অপরিহার্য অংশ। হক্কুল ইবাদ একটি বিস্তৃত ধারণা এবং এর মধ্যে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত। কিছু প্রধান দিক নিচে তুলে ধরা হলো-

১. পিতা মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা লোকমান : ১৪, সুরা বনিইসরাইল : ২৩, সুরা আনাম : ১৫১, সুরা আহকাফ : ১৫, সুরা বাকারা : ২১৫

২. পুরুষ ও স্ত্রী একে অপরের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।মুসলিম ১৪৬৯, রিয়াদুস সালেহীন : ২৭৫, আহমাদ ৮১৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫১, সুনানে তিরমিযী ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ ১৯৯৭-২০২০, রিয়াদুস সালেহীন : ২৭৬

৩. আত্মীয় স্বজনের সাথে সদাচরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সুরা বাকারা : ৮৩, ১৭৭, ১৮০, সুরা মুহাম্মদ : ২২-২৩, সহিহ বুখারি : ৫৯৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৫৬, সুনানে তিরমিজি ১৯০৯, আবু দাউদ ১৬৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩২৫১, সুনানে তিরমিযি : ২৪৮৫, দারিমী ১৪৬০।

৪. প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার নির্দেশ দেওয়া হয়েছ।

সুরা নিসা : ৩৬, সহিহ বুখারি : ১২৪০, ২৫৬৬, ৬০৪৭, সহিহ মুসলিম : ১০৩০, ২১৬০, সুনানে তিরমিজি ২১৩০, ২৭৩৭, সুনানে নাসায়ি ১৯৩৮, সুনানে আবু দাউদ ৫০৩০, ইবনে মাজাহ ১৪৩৫, রিয়াদুস সালেহীন : ৩০৬,

৫. সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, তাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা।

সুরা মায়েদা : ২, সুরা হুজুরাত : ১০, সুরা ফুসসিলাত : ৩৪, সহিহ বুখারি : ৬০১১, ৬০১৩, ৭৩৭৬, সহিহ মুসলিম ২৩১৯, ২৫৮৬, সুনানে তিরমিযী : ১৯২২, , রিয়াদুস সালেহীন : ২২৪,  আহমাদ ১৮৭০৭, ১৮৭২১, ১৮৭৫৬, ১৮৭৭৭

৬. শ্রমিকের শ্রমের মর্যাদা দেওয়া, তাদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের জুলুম না করা ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা। সূরা আল-মায়েদা : ১, সহিহ বুখারি : ২০৭২,  ২২২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৪৩

৭. এতিম, মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। সূরা বাকারা : ১৭৭, সূরা আন-নিসা : ৩৬, সূরা আল-ইনসান : ৮, সূরা ফজর : ১৭-১৮, সহিহ বুখারি :  ৫০০২, সহিহ মুসলিম: ৯৯৬ ১০৫৮, সুনানে তিরমিজি: ১৯১৮

হক্কুল ইবাদ এর গুনাহ ক্ষমা করা হবে না

হক্কুল্লাহর ক্ষেত্রে, আল্লাহ চাইলে তার বান্দার কোনো গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন, শিরক (আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা) ছাড়া। তবে হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক নষ্ট করার গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত যার হক নষ্ট করা হয়েছে, সে নিজে ক্ষমা না করে। এর মূল কারণ হলো, আল্লাহ অত্যন্ত ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবেন।

হক্কুল ইবাদ সংক্রান্ত গুনাহের মধ্যে রয়েছে অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, গালিগালাজ করা, কারও সম্মানহানি করা, ঋণ পরিশোধ না করা, ইত্যাদি। এ ধরনের গুনাহের বিচার এতটাই কঠোর হবে যে, হাদিসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি সবচেয়ে নিঃস্ব হবে, যে দুনিয়াতে অনেক নেক আমল নিয়ে আসবে, কিন্তু একই সাথে মানুষের হক নষ্ট করেছে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হাক তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সহিহ মুসলিম : ২৫৮১

হাদিস অনুযায়ী, বিচার দিবসে যখন পাওনাদাররা তাদের পাওনা দাবি করবে, তখন তাদের পাওনাদারকে পরিশোধ করার জন্য সেই হক নষ্টকারী ব্যক্তির নেক আমলগুলো থেকে নিয়ে দেওয়া হবে। যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তখন পাওনাদারের গুনাহ তার কাঁধে চাপানো হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সুতরাং, বান্দার হক সম্পর্কিত গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে জীবিত থাকতেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে এবং তার পাওনা পরিশোধ করে দিতে হবে। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করার পাশাপাশি যার হক নষ্ট করেছেন তা পরিশোধের পর তার জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। এটি বিচারকার্যের সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন পর্যায়। বান্দার সাথে বান্দার যে সম্পর্ক, অন্যায়-অবিচার, গীবত, ধোঁকা, হক্ব নষ্ট করা, অপমান এসবের বিচার এই পর্যায়ে হবে। এই বিষয়ে ক্ষমার সুযোগ নেই। আল্লাহ তাঁর নিজের হক মাফ করতে পারেন। কিন্তু বান্দার হক তখনই মাফ হবে, যদি হকদার নিজে তা ক্ষমা করে দেয়।

২. কিয়ামতের দিন প্রথম আদম আলাইহিস সালাম কে ডাকা হবে

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

«أَوَّلُ مَنْ يُدْعَى يَوْمَ القِيَامَةِ آدَمُ، فَتَرَاءَى ذُرِّيَّتُهُ، فَيُقَالُ: هَذَا أَبُوكُمْ آدَمُ، فَيَقُولُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ، فَيَقُولُ: أَخْرِجْ بَعْثَ جَهَنَّمَ مِنْ ذُرِّيَّتِكَ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ كَمْ أُخْرِجُ، فَيَقُولُ: أَخْرِجْ مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ ” فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِذَا أُخِذَ مِنَّا مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ، فَمَاذَا يَبْقَى مِنَّا؟ قَالَ: «إِنَّ أُمَّتِي فِي الأُمَمِ كَالشَّعَرَةِ البَيْضَاءِ فِي الثَّوْرِ الأَسْوَدِ»

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-কে ডাকা হবে। তিনি তাঁর সন্তানদেরকে দেখতে পাবেন। তখন তাদেরকে বলা হবে, ইনি তোমাদের পিতা আদম (আঃ)। তখন তারা বলবে لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ আমরা তোমার খিদমাতে হাযির! এরপর তাঁকে আল্লাহ্ বলবেন, তোমার জাহান্নামী বংশধরকে বের কর। তখন আদম (আঃ) বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! কী পরিমাণ বের করব? আল্লাহ্ বলবেনঃ প্রতি একশ’ তে নিরানব্বই জনকে বের কর। তখন সাহাবাগণ বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রতি একশ’ থেকে যখন নিরানব্বই জনকে বের করা হবে তখন আর আমাদের কে বাকী থাকবে? তিনি ﷺ বললেন,  নিশ্চয়ই অন্যান্য সকল উম্মাতের তুলনায় আমার উম্মাত হল কাল ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা চুলের মত। সহিহ বুখারি : ৬৫২৯

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাযির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হাজ্জঃ ২)। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে। অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। [আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) বলেন] আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। সহিহ বুখাই : ৩৩৪৮, ৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২২, মিশকাত : ৫৫৪১, সহীহুল জামি : ১৪১০২, হাকিম : ৮০।

৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর সুপারিশে হিসাব গ্রহণের শুরু হবে

কিয়ামতের পর জান্নাতকে ঈমানদারদের নিকটে নিয়ে আসা হবে। তারা তাতে প্রবেশ করার জন্য অস্থির হয়ে যাবে। অপরদিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিচার, হিসাব নিকাশে দেরী করবেন। তখন মানুষেরা নবী ও রাসূলদের কাছে যাবে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার জন্য। তখন প্রত্যেক নবীই বলবে, আমি আমার জন্য চিন্তিত তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী ﷺ-এর সঙ্গে এক খানার দা’ওয়াতে উপস্থিত ছিলাম। তাঁর সামনে (রান্না করা) ছাগলের বাহু আনা হল, এটা তাঁর নিকট পছন্দনীয় ছিল। তিনি সেখান হতে এক খন্ড খেলেন এবং বললেন, আমি কিয়ামতের দিন সমগ্র মানব জাতির সরদার হব। তোমরা কি জান? আল্লাহ কিভাবে (কিয়ামতের দিন) একই সমতলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্র করবেন? যেন একজন দর্শক তাদের সবাইকে দেখতে পায় এবং একজন আহবানকারীর আহবান সবার নিকট পৌঁছায়। সূর্য তাদের অতি নিকটে এসে যাবে। তখন কোন কোন মানুষ বলবে, তোমরা কি লক্ষ্য করনি, তোমরা কী অবস্থায় আছ এবং কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ। তোমরা কি এমন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের জন্য তোমাদের রবের নিকট সুপারিশ করবেন? তখন কিছু লোক বলবে, তোমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) আছেন। তখন সকলে তাঁর নিকট যাবে এবং বলবে, হে আদম! আপনি সমস্ত মানব জাতির পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার পক্ষ হতে রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকেছেন। তিনি ফেরেশতাদেরকে (আপনার সম্মানের) নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী সকলে আপনাকে সিজদাও করেছেন এবং তিনি আপনাকে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছেন। আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? আপনি দেখেন না, আমরা কী অবস্থায় আছি এবং কী কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি। তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন এর পূর্বে এমন রাগান্বিত হননি আর পরেও এমন রাগান্বিত হবেন না। আর তিনি আমাকে বৃক্ষটি হতে নিষেধ করেছিলেন। তখন আমি ভুল করেছি। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা আমাকে ছাড়া অন্যের নিকট যাও। তোমরা নূহের নিকট চলে যাও। তখন তারা নূহ (আঃ)-এর নিকট আসবে এবং বলবে, হে নূহ! পৃথিবীবাসীদের নিকট আপনিই প্রথম রাসূল এবং আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞ বান্দা। আপনি কি লক্ষ্য করছেন না, আমরা কী ভয়াবহ অবস্থায় পড়ে আছি? আপনি দেখছেন না আমরা কতই না দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে আছি? আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়ে আছেন, যা ইতোপূর্বে হন নাই এবং এমন রাগান্বিত পরেও হবেন না। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা নবী [মুহাম্মাদ ﷺ]-এর নিকট চলে যাও। তখন তারা আমার নিকট আসবে আর আমি আরশের নীচে সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার মাথা উঠান এবং সুপারিশ করুন। আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে আর আপনি যা চান, আপনাকে তাই দেয়া হবে। মুহাম্মাদ ইবনু ‘উবাইদ (রহ.) বলেন, হাদীসের সকল অংশ মুখস্থ করতে পারিনি। সহিহ বুখারি : ৩৩৪০, ৩৩৬১, সহিহ মুসলিম : ১৯৪, আহমাদ : ৯২২৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গোশ্ত আনা হল এবং তাঁকে সামনের রান পরিবেশন করা হল। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি তার থেকে কামড়ে খেলেন। এরপর বললেন, আমি হব কিয়ামতের দিন মানবকুলের নেতা। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? কিয়ামতের দিন আগের ও পরের সকল মানুষ এমন এক ময়দানে জমায়েত হবে, যেখানে একজন আহবানকারীর আহবান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই এক সঙ্গে দৃষ্টিগোচর করবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছ না? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদমের কাছে চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাঁকে বলবে, আপনি আবুল বাশার

আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে নিজ হস্ত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছেন এবং মালায়িকাহ্কে হুকুম দিলে তাঁরা আপনাকে সিজদা করেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কী অবস্থায় পৌঁছেছি। তখন আদম (আঃ) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে একটি গাছের নিকট যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি, নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী, (আমি নিজেই সুপারিশ প্রার্থী) তোমরা অন্যের কাছে যাও, তোমরা নূহ (আঃ)-এর কাছে যাও। তখন সকলে নূহ্ (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে নূহ্ (আঃ)! নিশ্চয়ই আপনি পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রথম রাসূল।

আর আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আমার রব আজ এত ভীষণ রাগান্বিত যে, আগেও এমন রাগান্বিত হননি আর পরে কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমার একটি গ্রহণযোগ্য দু’আ ছিল, যা আমি আমার কওমের ব্যাপারে করে ফেলেছি, (এখন) নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও তোমরা ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে। তখন তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে ইব্রাহীম (আঃ)! আপনি আল্লাহর নবী এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আপনি আল্লাহর বন্ধু[3]। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি তাদের বলবেন, আমার রব আজ ভীষণ রাগান্বিত, যার আগেও কোন দিন এরূপ রাগান্বিত হননি, আর পরেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো তিনটি মিথ্যা বলে ফেলেছিলাম। রাবী আবূ হাইয়ান তাঁর বর্ণনায় এগুলোর উল্লেখ করেছেন- (এখন) নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও মূসার কাছে।

তারা মূসার কাছে এসে বলবে, হে মূসা (আঃ)! আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ্ আপনাকে রিসালাতের সম্মান দিয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে কথা বলে সমস্ত মানবকূলের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বললেন, আজ আমার রব ভীষণ রাগান্বিত আছেন, এরূপ রাগান্বিত আগেও হননি এবং পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম, যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এখন নফ্সী, নফসী, নফসী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও ঈসা (আঃ)-এর কাছে।

তখন তারা ঈসা (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে ঈসা (আঃ)! আপনি আল্লাহররাসূল এবং কালিমাহ, যা তিনি মারইয়াম (আঃ)-এর উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি ’রূহ’। আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন ঈসা (আঃ) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত যে, এর আগে এরূপ রাগান্বিত হননি এবং এর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি নিজের কোন গুনাহর কথা বলবেন না। নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্য কারও কাছে যাও- যাও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে।

তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ্ তা’আলা আপনার আগের, পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সিজদা দিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর নিয়ম আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে অন্য কারও জন্য খোলেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তোমার মাথা উঠাও। তুমি যা চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবূল করা হবে।

এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার উম্মাতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ব্যতীত অন্যদের সঙ্গে অন্য দরজায় ও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে। তারপর তিনি বলবেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার শপথ! জান্নাতের এক দরজার দুই পার্শ্বের মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা যেমন মক্কা ও হামীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বস্রার মাঝে দূরত্বের সমতুল্য। সহিহ বুখারি : ৪৭১২; সহিহ মুসলিম : ১৯৪

হাশরের ময়দানের বিচার : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৪. মুমিনদের জাহান্নাম থেকে বের করার জন্য নবী আবার সুপারিশ করবেন

উপরের হাদিসে দেখেছি, কিয়ামতের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি শাফা‘আত হবে সকলের জন্য। আর সেটা বিচার-ফয়সালা শুরু করার আবেদন সম্পর্কে। সকল নবী ও রাসূল এ ব্যাপারে শাফা‘আত করতে অস্বীকার করবে, নিজেদের অপরাগতা প্রকাশ করবে।

শেষে নবী মুহাম্মাদ ﷺ মুমিদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার জন্য দ্বিতীয় বার আবার সুপারিশ করবেন। এটা হলো সাধারণ সুপারিশ। সকল মানুষ এ শাফা‘আত দ্বারা উপকৃত হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরাশাদ করেন-

لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ دَعَا بِهَا فِي أُمَّتِهِ فَاسْتُجِيبَ لَهُ وَإِنِّي أُرِيدُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ أَنْ أُؤَخِّرَ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ

প্রত্যেক নবীকে তার উন্মাতের ব্যাপারে একটি এমন দু’আর অনুমতি দেয়া হয়েছে যা অবশ্যই কবুল করা হবে। তা তারা নিজের উন্মাতের জন্য করে ফেলেছেন। আমি ইনশাআল্লাহ সংকল্প করেছি, আমার দু’আটি পরে কিয়ামতের দিবসে আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য করবো। সহিহ মুসলিম : ১৯৯।

আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রাসূল ﷺ -কে প্রশ্ন করা হলঃ হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, আবূ হুরাইরা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ  (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে। সহিহ বুখারি : ৯৯, ৬৫৭০

এ দুটো হাদীস পাঠে আমরা জানতে পারলাম কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত দ্বারা কারা ধন্য হবে। যারা অন্তর দিয়ে শির্ক মুক্ত থেকে আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে বিশ্বাস করেছে তারাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফা‘আত পাবে। তারা যতই পাপী হোক না কেন।

সুপারিশ সম্পর্কে আমাদের সমাজের একটি ভুল ধারণা

আমাদের সমাজের বিরাট একটা অংশ সুফিবাদের সাথে সম্পৃক্ত। তাদের ধারন, তাদের পীর, অলি আওলিয়াগণ তাদের সুপারিশ করে জাহান্নাহ থেকে বাচিয়ে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। অথচ আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মূহূর্ত মহান আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কেউ শাফাআত করতে পারবে না। অপর পক্ষ কোন মুশরিক ও কাফিরকে সুপারিশ করার কোন অনুমিত প্রদান করা হবে না। সুপারিক পেতে হলে ঈমানদার হতে হবে আর সুপারিশ করেত হলে আল্লাহ অনুমিত লাগবে। ঈমান ও অনুমিত একত্র হলেই সুপারিশ পাওয়ার যোগত্য অর্যন করবে। এ কারনে সুপারিশের শর্ত দুটি। যথা-

ক. ঈমানদার হতে হবে

খ. আল্লাহ তায়ালার অনুমতি।

ক.ঈমানদার হতে হবে

কিয়ামত দিবসে অনুষ্ঠিত শাফাআত থেকে বঞ্চিত হবে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরীর গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এরই উপর মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

مَا کَانَ لِلنَّبِیِّ وَالَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَنْ یَّسْتَغْفِرُوْا لِلْمُشْرِکِیْنَ وَلَوْ کَانُوْۤا اُولِیْ قُرْبٰی مِنْۢ بَعْدِ مَا تَبَیَّنَ لَہُمْ اَنَّہُمْ اَصْحٰبُ الْجَحِیْمِ

নাবী ও অন্যান্য মু’মিনদের জন্য জায়েয নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, যদিও তারা আত্মীয়ই হোক না কেন, এ কথা প্রকাশ হবার পর যে, তারা জাহান্নামের অধিবাসী। সুরা তাওবা : ১১৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنْ أَهْلِ ٱلْكِتَـٰبِ وَٱلْمُشْرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ

অর্থঃ আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং যারা মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সূরা বায়্যিনাহ : ৬

এতে বুঝা যায় কাফির ও মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না। কারণ, তারা ঈমানশূন্য। অনেক পীরকে বলতে শুনা যায়, আখেরাতে পীর সাহেব নাকি মুরিদদের ফেলে জান্নাতে যাবে না। কেমন হাস্যকর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং নিজের কলিজা ফাতিমার (রাদি.) টুকরার জিম্মাদারী নিতে পারলেন না। অথচ পীর সাহেব মুরিদদের জিম্মাদারী নিচ্ছেন।

তবে মনে রাখতে হবে আল্লাহর বন্ধু বা অলিদের শাফায়াত বা সুপারিশ সত্য কিন্তু নিশ্চিত নয় বা ইচ্ছাধীন নয়। কারন ইহাতে আল্লাহকে বাধ্য করা হয় যা চুড়ান্তভাবে অন্যায়। আর যদি কেউ গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সুপারিশের জন্য দুআ বা প্রার্থনা করে তবে দাও শির্ক হবে, যদি সে আমাদের প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হয়।  কারণ, দুআ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুআ-ই ইবাদত”। সুনানে তিরমিজি : ৩৩৭১

আর ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। ইবাদতে তাঁর আর কোন শরীক নেই। আর শির্ক হচ্ছে, গাইরুল্লাহকে ইবাদতে অংশীদার করার নাম।

খ. আল্লাহ তায়ালার অনুমতি।

শাফাআতের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার অনুমতি প্রয়োজন। এ সম্পর্কে বহু আয়াত কুরআনে মজুদ আছে। নিচে কয়েকটি তুলে ধরছি।  

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬ا‌ۖ لَّهُ ۥ مُلْكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلْأَرْضِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন।  আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সূরা যুমার : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

مَا لَكُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَلِىٍّ۬ وَلَا شَفِيعٍ‌ۚ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ

তিনি ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই এবং নেই তার সামনে সুপারিশকারী, তারপরও কি তোমরা সচেতন হবে না। সূরা সাজদাহ : ৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلْأَرْضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشْفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذْنِهِۦ‌ۚ

অর্থ: পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷  কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সূরা বাক্বারা : ২৫৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

وَاَنْذِرْہُمْ یَوْمَ الْاٰزِفَۃِ اِذِ الْقُلُوْبُ لَدَی الْحَنَاجِرِ کٰظِمِیْنَ ۬ؕ  مَا لِلظّٰلِمِیْنَ مِنْ حَمِیْمٍ وَّلَا شَفِیْعٍ یُّطَاعُ ؕ

আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। তখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ, কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে। সুরা গাফির : ১৮

আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূর্ণরূপে তার ইচ্ছাধীন। এক শ্রেণীর মুশরিকগণ চিন্তা করে থাকেন যে, আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিবর্গ, নবিগণ, রাসুলগণ, ফেরেতাগণ বা অন্যান্য সত্তা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে তাদের জান্নাত দিবেন বা আল্লাহর ওখানে তাদের বিরাট প্রতিপত্তি আছে। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে তারা যে কোন কার্যোদ্ধার করতে সক্ষম। তারা যে কথার ওপর অটল থাকে, তা তারা আদায় করেই ছাড়ে। অথচ শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না। তবে আল্লাহ অনুমতি নিয়ে সুপারিশ করেত পারবেন। সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দ্বিতীয় যোগ্যতা হলো- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অনুমতি।

কারা সুপারিশ করার অনুমতি পাবেন?

ক. রাসুলুল্লাহ প্রথম সুপারিশ করা অনুমিত পাবেন

সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম  আল্লাহর অনুমতিক্রমে ইমানদারদের জন্য সুপারিশ অনুমতি পাবেন। 

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ

আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী (সা.) বলেছেন: আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীগণ বিশেষভাবে আমার শাফা’আত লাভ করবে। সুনানে তিরমিযী : ২৪৩৫, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩৯, মিশকাত : ৫৫৯৮, সহীহুল জামি : ৩৭১৪, মুসনাদে আহমাদ : ১৩২৪৫, আবূ ইয়া’লা : ৩২৮৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৬৪৬৭, শু’আবূল ঈমান : ৩১০

আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, জান্নাতে লোকদের প্রবেশ সম্পর্কে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ইমান এনেছে যা অন্য কোন নাবির বেলায় হবে না। নাবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যাঁর প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ইমান এনেছে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৩

আওফ ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমার প্রভুর কাছে থেকে একজন আগমনকারী (ফেরেশতা) আসলেন এবং তিনি (আল্লাহর পক্ষ হতে) আমাকে এ দুয়ের মধ্যে একটির ইচ্ছা স্বাধীনতা প্রদান করলেন, হয়তো আমার উম্মতের অর্ধেক সংখ্যা জান্নাতের সুযোগ গ্রহণ করুক অথবা আমি শাফা’আতের অধিকার গ্রহণ করি? অতঃপর আমি শাফা’আত গ্রহণ করলাম। অতএব তা ঐ সকল লোকের জন্য, যারা আল্লাহর সাথে অংশীস্থাপন না করে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের জন্য আমার শাফা’আত কার্যকারী হবে। মিশকাত : ৫৬০০, সুনানে তিরমিযী : ২৪৪১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩১৭, সহীহুল জামি : ৫৬, আহমাদ : ২৪০৪৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৬৪৭০, ত্ববারানী : ১৫৭৭,

খ. শহিদগণ সুপারিশ করার অনুমিত পাবেন

নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২

গ. কুরআন সুপারিশ করবে

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

ঘ. সিয়াম সুপারিশ করবে

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার হতে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَقُولُ الصِّيَامُ: أَيْ رَبِّ إِنِّي مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ: مَنَعْتُهُ النُّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ فيشفعان . رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ فِي شعب الْإِيمَان

সিয়াম এবং কুরআন বান্দার জন্য শাফা’আত করবে। সিয়াম বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার গ্রহণ করতে ও প্রবৃত্তির তাড়না মিটাতে বাধা দিয়েছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার শাফা’আত কবূল করো। কুরআন বলবে, হে রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে এখন আমার সুপারিশ গ্রহণ করো। অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে। মিশকাত : ১৯৬৩, সহহি আত তারগিব : ৯৭৩, মুসতাদারাক লিল হাকিম : ২০৩৬, শুসিহহ আল জামি :৩৮৮২

নোট : আলেমদের সরাসরি “সুপারিশকারী” হিসেবে কোনো সহীহ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিছু দুর্বল বা মাওকূফ সূত্রে আছে, আলেমগণও সুপারিশ করবেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

যখন জাহান্নামীরা মুক্তি পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য সুপারিশের অনুমতি দেবেন, যারা সুপারিশ করতে পারবে। তারপর সুপারিশ করবেন নবীগণ, অতঃপর আলেমগণ, অতঃপর শহীদগণ।” মুসনাদে বাযযার : ৩৪০৬। কেউ কেউ এটিকে “দুর্বল” আবার কেউ কেউ “অতিশয় দুর্বল” বলেছেন।

ঙ. উম্মাতের একজন লোকের সুপারিশে বহু লোক নাজাত পাবেন

আবদুল্লাহ ইবনু শাকীক (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি একটি দলের সাথে ইলিয়া (বাইতুল মাকদিসের একটি নগর) নামক জায়গায় অবস্থান করছিলাম। দলের একজন লোক বলল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আমার উম্মাতের একজন লোকের সুপারিশে তামীম বংশের সকল ব্যক্তির চেয়ে বেশি সংখ্যক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রশ্ন করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি ব্যতীত অন্য কারো সুপারিশে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমি ছাড়াই। সুনানে তিরমিজি : ২৪৩৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩১৬, সহীহুল জামি : ৫৩৬৪, মুসনাদে আহমাদ : ১৫৮৯৫, আবূ ইয়ালা : ৬৮৬৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৭৬, দারিমী : ২৮০৮, হাকিম : ২৩৬।

উম্মতে মুহাম্মাদীর হিসাব হবে সর্বপ্রথম

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন-

نَحْنُ آخِرُ الأُمَمِ وَأَوَّلُ مَنْ يُحَاسَبُ يُقَالُ أَيْنَ الأُمَّةُ الأُمِّيَّةُ وَنَبِيُّهَا فَنَحْنُ الآخِرُونَ الأَوَّلُونَ

আমরা হলাম সর্বশেষ উম্মাত এবং সর্বপ্রথম আমাদের হিসাব গ্রহণ করা হবে। বলা হবে, উম্মী (নিরক্ষর) নবীর উম্মাত এবং তাদের নবী কোথায়? সুতরাং আমরা হলাম সর্বশেষ উম্মাত (দুনিয়াতে আগমনের দিক থেকে) এবং সর্ব প্রথম উম্মাত (মর্যাদার দিক থেকে)। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৯০, সহিহাহ : ১২৭৪, শায়খ আলবানি সহিহ বলেছেন।

আবু হুরায়রা ও হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে: নবী ﷺ বলেছেন-

«نَحْنُ الْآخِرُونَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا، وَالْأَوَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الْمَقْضِيُّ لَهُمْ قَبْلَ الْخَلَائِقِ».

পৃথিবীতে বসবাসকারী জাতিগুলোর মধ্যে আমাদের আগমন সর্বশেষে আর কিয়ামতের দিনে আমাদের ফয়সালা করা হবে সকল সৃষ্টি জীবের পূর্বে”। সহিহ মুসলিম : ৮৫৬

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

আমরা সবশেষে আগত উম্মাত, কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা হব সর্বগ্রবর্তী, আমরাই প্রথম জান্নাতে প্রবেশ করব। অথচ তাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে আমাদের পূর্বে এবং আমাদেরকে তা দেয়া হয়েছে তাদের পরে। তারা বিরোধে লিপ্ত হয়ে পড়ল কিন্তু তারা যে সত্য দীনের ব্যাপারে বিরোধে লিপ্ত হয়েছিল, আল্লাহ আমাদেরকে সে দিন সম্পর্কে হিদায়াত দান করেছেন। তিনি বলেনঃ আমাদের জন্য আজকে জুমুআর দিন আর ইয়াহুদীদের জন্য পরের দিন এবং খৃষ্টানদের জন্য তারও পরের দিন। সহিহ বুখারি : ৮৭৬, সহিহ মুসলিম : ৮৫৫।

৫. কিয়ামতের দিন সর্বোচ্চ ন্যায়  বিচার করা হবে

কিয়ামতের দিন সর্বোচ্চ ন্যায়  বিচার করা হবে, কারো ওপর বিন্দুমাত্র অন্যায় করা হবে না। এ সম্পর্কিত কিছু আয়াত তুলে ধরা হলো-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَوُضِعَ الْکِتٰبُ فَتَرَی الْمُجْرِمِیْنَ مُشْفِقِیْنَ مِمَّا فِیْہِ وَیَقُوْلُوْنَ یٰوَیْلَتَنَا مَالِ ہٰذَا الْکِتٰبِ لَا یُغَادِرُ صَغِیْرَۃً وَّلَا کَبِیْرَۃً اِلَّاۤ اَحْصٰہَا ۚ  وَوَجَدُوْا مَا عَمِلُوْا حَاضِرًا ؕ  وَلَا یَظْلِمُ رَبُّکَ اَحَدًا

আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, ‘হায় ধ্বংস আমাদের! কী হল এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে’ এবং তারা যা করেছে, তা হাযির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। সূরা কাহফ, : ৪৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّۃٍ ۚ وَاِنْ تَکُ حَسَنَۃً یُّضٰعِفْہَا وَیُؤْتِ مِنْ لَّدُنْہُ اَجْرًا عَظِیْمًا

নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলম করেন না। আর যদি সেটি ভাল কাজ হয়, তিনি তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে মহা প্রতিদান প্রদান করেন। সূরা নিসা : ৪০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَظْلِمُ النَّاسَ شَیْئًا وَّلٰکِنَّ النَّاسَ اَنْفُسَہُمْ یَظْلِمُوْنَ

নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি কিছুমাত্র যুলম করেন না; বরং মানুষই নিজদের উপর যুলম করে। সূরা ইউনুস : ৪৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاتَّقُوْا یَوْمًا تُرْجَعُوْنَ فِیْہِ اِلَی اللّٰہِ ٭۟  ثُمَّ تُوَفّٰی کُلُّ نَفْسٍ مَّا کَسَبَتْ وَہُمْ لَا یُظْلَمُوْنَ 

আর তোমরা সে দিনের ভয় কর, যে দিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে সে যা উপার্জন করেছে, তা পুরোপুরি দেয়া হবে। আর তাদের যুলম করা হবে না। সূরা বাকারা : ২৮১

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

মু’মিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর একটি পুলের ওপর তাদের দাঁড় করানো হবে, যা জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে অবস্থিত। দুনিয়ায় তারা একে অপরের উপর যে যুলুম করেছিল তার প্রতিশোধ গ্রহণ করানো হবে। তারা যখন পাক-সাফ হয়ে যাবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রাণ, প্রত্যেক ব্যক্তি তার দুনিয়ার বাসস্থানের তুলনায় জান্নাতের বাসস্থানকে উত্তমরূপে চিনতে পারবে। সহিহ বুখারি : ৬৫৩৫

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন এক লোক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এসে বসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কতিপয় গোলাম আছে। আমার কাছে মিথ্যা কথা বলে, আমার ধন-সম্পদ খিয়ানত করে এবং আমার নির্দেশের অবাধ্য হয়, তাই আমি তাদেরকে গালমন্দ করি এবং মারধরও করে থাকি। (কিয়ামতে) তাদের ব্যাপারে আমার অবস্থা কী হবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন গোলামদের খিয়ানত, অবাধ্য, মিথ্যা বলা এবং তোমার শাস্তি দেয়া সবকিছুর হিসাব নেয়া হবে। যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের সমান হয়, তখন ব্যাপার সমান সমান থাকবে। তুমি পুণ্যও পাবে না এবং তোমাকে কোন শাস্তিও দেয়া হবে না। আর যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের তুলনায় কম হয়, তখন তাদের অতিরিক্ত অপরাধের শাস্তি না দেয়ার জন্য তুমি সাওয়াব পাবে। কিন্তু যদি তোমার শাস্তি প্রদান তাদের অন্যায়ের তুলনায় বেশি হয়, তখন গোলামদের জন্য তোমার নিকট থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে। এ সকল কথা শুনে লোকটি অন্যত্র সরে দাঁড়াল এবং চিৎকার দিয়ে কাঁদতে লাগল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি কি আল্লাহর এ বাণীটি পড়নি?

وَنَضَعُ الْمَوَازِیْنَ الْقِسْطَ لِیَوْمِ الْقِیٰمَۃِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَیْئًا ؕ وَاِنْ کَانَ مِثْقَالَ حَبَّۃٍ مِّنْ خَرْدَلٍ اَتَیْنَا بِہَا ؕ وَکَفٰی بِنَا حٰسِبِیْنَ

আর কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব। সুতরাং কারো প্রতি কোন অবিচার করা হবে না। কারো কর্ম যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয়, আমি তা হাযির করব। আর হিসাব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট। সূর আম্বিয়া : ৪৭

তখন লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার নিজের এবং ঐ সমস্ত গোলামদের ব্যাপারে তাদেরকে আমার কাছ থেকে পৃথক করে দেয়া অপেক্ষা উত্তম আর কিছু পচ্ছি না। আমি আপনাকে সাক্ষী করে বলছি যে, তারা সকলেই মুক্ত। মিশকাত : ৫৫৬১, সুনানে তিরমিযী : ৩১৬৫, মুসনাদে আহমাদ : ২৬৪৪৪, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ২২৯০, শু’আবূল ঈমান : ৮৫৮৬

৬. কিয়ামতের দিন প্রতিটি ছোট-বড় কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব হবে

কিয়ামতের দিন  কম-বেশি, ছোট-বড় সকল কাজ-কর্ম, কথা ও বিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَکُلُّ شَیْءٍ فَعَلُوْہُ فِی الزُّبُرِ وَکُلُّ صَغِیْرٍ وَّکَبِیْرٍ مُّسْتَطَرٌ

আর তারা যা করেছে, সব কিছুই ‘আমলনামায়’ রয়েছে। আর ছোট বড় সব কিছুই লিখিত আছে। সুরা কামার : ৫২-৫৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَمَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّۃٍ خَیْرًا یَّرَہٗ ؕ وَمَنْ یَّعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّۃٍ شَرًّا یَّرَہٗ ٪

কেহ অণু পরিমাণ সৎ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করলে তাও সে দেখবে। সূরা যিলযাল : ৭-৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَالَ الَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَا تَاْتِیْنَا السَّاعَۃُ ؕ  قُلْ بَلٰی وَرَبِّیْ لَتَاْتِیَنَّکُمْ ۙ  عٰلِمِ الْغَیْبِ ۚ  لَا یَعْزُبُ عَنْہُ مِثْقَالُ ذَرَّۃٍ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الْاَرْضِ وَلَاۤ اَصْغَرُ مِنْ ذٰلِکَ وَلَاۤ اَکْبَرُ اِلَّا فِیْ کِتٰبٍ مُّبِیْنٍ ٭ۙ

আর কাফিররা বলে, ‘কিয়ামত আমাদের কাছে আসবে না।’ বল, ‘অবশ্যই, আমার রবের কসম! যিনি গায়েব সম্পর্কে অবগত, তা তোমাদের কাছে আসবেই। আসমানসমূহ ও যমীনে অনু পরিমাণ কিংবা তদপেক্ষা ছোট অথবা বড় কিছুই তাঁর অগোচরে নেই, বরং সবই সুস্পষ্ট কিতাবে রয়েছে। সুরা সাবা : ৩

আয়িশা (রাদি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ হে আয়েশা! ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৪৩, আহমাদ : ২৩৮৯৪, ২৪৬৫১, দারেমী : ২৭২৬, সহীহাহ : ৫১৩।

৭. কিয়ামতের দিন প্রথমে সালাতের হিসেব নেওয়া হবে

আনাস ইবনু হাকীম আদ-দাববী (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ হুরাইরাহ আমাকে বললেন, তুমি তোমার শহরে পৌঁছে তার বাসিন্দাদের অবহিত করবে যে, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন-

إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ الْمُسْلِمُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الصَّلاَةُ الْمَكْتُوبَةُ فَإِنْ أَتَمَّهَا وَإِلاَّ قِيلَ انْظُرُوا هَلْ لَهُ مِنْ تَطَوُّعٍ فَإِنْ كَانَ لَهُ تَطَوُّعٌ أُكْمِلَتِ الْفَرِيضَةُ مِنْ تَطَوُّعِهِ ثُمَّ يُفْعَلُ بِسَائِرِ الأَعْمَالِ الْمَفْرُوضَةِ مِثْلُ ذَلِكَ

কিয়ামতের দিন মুসলিম বান্দার নিকট থেকে সর্বপ্রথম ফরয সালাতের হিসাব নেয়া হবে। যদি সে তা পূর্ণরূপে আদায় করে থাকে (তবে তো ভালো), অন্যথায় বলা হবেঃ দেখো তো তার কোন নফল সালাত আছে কি না? যদি তার নফল সালাত থেকে থাকে, তবে তা দিয়ে তার ফরয সালাত পূর্ণ করা হবে। অতঃপর অন্যান্য সব ফরজ আমলের ব্যাপারেও অনুরূপ ব্যবস্থা করা হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪২৫, ১৪২৬, সুনানে তিরমিযী : ৪১৩, সুনানে নাসায়ী : ৪৬৫-৬৭

আনাস ইবনু হাকীম আদ্-দাব্বী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিনি যিয়াদ অথবা ইবনু যিয়াদের ভয়ে মদীনায় চলে আসেন এবং আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) আমাকে তাঁর বংশ পরিচয় দিলেন এবং আমিও আমার বংশ পরিচয় দিলাম। তিনি আমাকে বলেনঃ হে যুবক! আমি কি তোমার কাছে হাদীস বর্ণনা করব না? জবাবে আমি বলিঃ হ্যাঁ, আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! বর্ণনাকারী ইউনুস বলেন, আমার মনে হয়, তিনি এ হাদীস সরাসরি নবী ﷺ হতে বর্ণনা করেছেন। নবী ﷺ বলেনঃ কিয়ামতের দিন মানুষের ’আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম তাদের সালাত সম্পর্কে হিসাব নেয়া হবে।

তিনি বলেনঃ আমাদের মহান রব্ব ফিরিশতাদের বান্দার সালাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করবেন, দেখো তো সে তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করেছে নাকি তাতে কোন ত্রুটি রয়েছে? অতঃপর বান্দার সালাত পূণার্ঙ্গ হলে পূণার্ঙ্গই লিখা হবে। আর যদি তাতে ত্রুটি থাকে তাহলে মহান আল্লাহ ফিরিশতাদের বলবেন, দেখো তো আমার বান্দার কোন নফল সালাত আছে কিনা? যদি থাকে তাহলে তিনি বলবেনঃ আমার বান্দার ফারয সালাতের ঘাটতি তার নফল সালাত দ্বারা পরিপূর্ণ করো। অতঃপর সকল আমলই এভাবে গ্রহণ করা হবে (অর্থাৎ নফল দ্বারা ফারযের ত্রুটি দূর করা হবে)। সুনানে আবু দাউদ : ৮৬৪, আহমাদ ৭৮৪২, ৯২১০, ১৬৫০১;, হাদিসের মান সহিহ।

তবে একটি সহিহ হাদিসে এসেছে-

আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ أَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ بِالدِّمَاءِ ‏

(কিয়ামতের দিন) মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম হত্যার বিচার করা হবে। সহিহ বুখারি : ৬৫৩৩, ৬৮৬৪, সহিহ মুসলিম : ১৬৭৮, আহমাদ : ৩৬৭৪

মন্তব্য : প্রকৃত পক্ষে এ দুটি হাদিসের মাঝে কোন বিরোধ নাই। কেননা, সালাতে হিসেব আল্লাহর তায়ালার ইবাদতের (আল্লাহর হকের) সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং আল্লাহ হক সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম সালাতের হিসাব হবে। আর এ হাদীসটি সৃষ্ট জীবের (বান্দার হক্বের) সাথে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিদ বিষয়গুলোর মধ্যে  সর্বপ্রথম খুনের হিসাব হবে। হাদীসটি থেকে বুঝা যয়, খুনের ব্যাপার অত্যন্ত মারাত্মক।

৮. কিয়ামতের দিন সৎকর্ম দ্বারা গুনাহের প্রতিদান দিতে হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ، فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ اليَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُونَ دِينَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ»

যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোন দ্বীনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট হতে নেয়া হবে আর তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ২৪৪৯, ৬৫৩৪

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা কি জান দরিদ্র অসহায় ব্যক্তি কে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের মধ্যে দরিদ্র অসহায় ব্যক্তিতো সে যার কোনো টাকা পয়সা বা সম্পদ নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: আমার উম্মতের মধ্যে সত্যিকার দরিদ্র অসহায় হলো সেই ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাতসহ অনেক ভালো কাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, অথচ দুনিয়াতে বসে সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারো প্রতি অপবাদ দিয়েছিল, করো সম্পদ আত্নসাত করেছিল, কারো রক্তপাত ঘটিয়েছিল, কাউকে মারধোর করেছিল ফলে তার নেক আমলগুলো থেকে নিয়ে তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাওনা আদায় করা হবে। এভাবে যখন তার নেক আমলগুলো শেষ হয়ে যাবে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার জন্য আর কিছু থাকবে না তখন তাদের পাপগুলো তাকে দেওয়া হবে ফলে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে”। সহীহ মুসলিম : ২৫৮১।

৯. উম্মতে মুহাম্মদী কিয়ামতের দিন অন্য জাতির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন

মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বিশেষ মর্যাদার বিষয়। কিয়ামতের দিন উম্মতে মুহাম্মদী (সা.) অন্যান্য সকল জাতির বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে, এই সত্যটি কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এই সাক্ষ্য দেওয়ার কারণ হলো, আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে মধ্যপন্থী ও ন্যায়পরায়ণ উম্মত হিসেবে মনোনীত করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَکَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَہِیْدًا ؕ

আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর।  সূরা বাকারার : ১৪৩

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন যে, “মধ্যপন্থী জাতি” (উম্মাতান ওয়াসাত্বান) হওয়ার কারণে উম্মতে মুহাম্মদীকে (সা.) এই বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন যখন পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতরা নিজেদের নবীদের দাওয়াত পৌঁছানোর বিষয়টি অস্বীকার করবে, তখন এই উম্মত নবীদের পক্ষে সাক্ষী দেবে।

আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কিয়ামতের দিন নূহ (আঃ) কে হাযির করে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি কি (দ্বীন) পৌঁছে দিয়েছ? তখন তিনি বলবেন, হ্যাঁ। হে আমার রব। এরপর তাঁর উম্মাতকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাদের কাছে নূহ পৌঁছিয়েছে কি? তারা সকলে বলে উঠবে, আমাদের কাছে কোন ভয় প্রদর্শনকারী আসেনি। তখন নূহ্ (আঃ) কে বলা হবে, তোমার কোন সাক্ষী আছে কি? তিনি বলবেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মাতরাই (আমার সাক্ষী)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদেরকে তখন নিয়ে আসা হবে এবং তোমরা সাক্ষ্য দেবে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী পাঠ করলেন-

وَکَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَہِیْدًا ؕ

আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর, সূরা বাকারার : ১৪৩। সহিহ বুখারি : ৩৩৩৮, ৩৭৪৯, ৭৩৪৯, সুনানে তিরমিযী ২৯৬১, বায়হাকী : ৫৩৬১, শুআবূল ঈমান ২৬৪

আর আবু সায়ীদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন নবীদের ডাকা হবে। কারো সাথে একজন অনুসারী থাকবে কারো সাথে থাকবে দুজন আবার কারো সাথে থাকবে তিন জন বা এর বেশি। তাদের জাতিকে ডাকা হবে। তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে, এ ব্যক্তি কি তোমাদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছিল? তারা উত্তর দিবে, না, আমাদের কাছে আপনার বাণী পৌঁছে দেয়নি। তখন নবীকে প্রশ্ন করা হবে তুমি কি আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছো? সে বলবে, হ্যা, দিয়েছি। তখন তাকে বলা হবে তোমার পক্ষে কে আছে স্বাক্ষী? তখন নবী বলবেন, আমার পক্ষে স্বাক্ষী আছে মুহাম্মাদ ও তাঁর উম্মত। তখন মুহাম্মাদ ও তার অনুসারীদের ডাকা হবে। তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে এ ব্যক্তি কি তার জাতির কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিয়েছে? তখন তারা বলবে, হ্যাঁ, সে তার জাতির কাছে আপনার বাণী পৌঁছে দিয়েছে। তখন তাদের প্রশ্ন করা হবে তোমরা এটা কীভাবে জানলে? তারা উত্তর দিবে, আমাদের কাছে আমাদের নবী এসেছিলেন, তিনি আমাদের বলেছেন, এ নবী তার জাতির কাছে আপনার বাণী পৌঁছে দিয়েছে। এটা হলো আল্লাহ তায়ালার সেই বাণীর প্রতিফলন-

وَکَذٰلِکَ جَعَلْنٰکُمْ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوْنُوْا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْکُمْ شَہِیْدًا ؕ

আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর।  সূরা বাকারার : ১৪৩।  মুসনাদে আহমাদ : ১১৫৫৮, মিশকাত : ৫৫৫৩ শাইখ আলবানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।

হাশরের ময়দানের বিচার : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১০. দুনিয়াতে যারা আল্লাহর সাক্ষাতে বিশ্বাস করত না, পরকালে তাদের ভূলে যাওয়া হবে

হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

“সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি কিয়ামত দিবসে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “আচ্ছা দুপুর বেলা যখন মেঘ না থাকে তখন সূর্যকে দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন, না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করলেন: পূর্ণিমার রাতে যখন আকাশে মেঘ না থাকে তখন চাঁদ দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন: না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! তোমাদের প্রতিপালককে দেখার জন্য সেদিন তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হবে না। যেমন সূর্য ও চন্দ্র দেখার জন্য তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হয় না। আল্লাহ এক বান্দার সাথে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাইনি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাইনি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর দ্বিতীয় এ ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাই নি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাই নি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর তৃতীয় এক ব্যক্তিকে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে অপর দুজনের মত করেই প্রশ্ন করবেন। সে বলবে, আমি আপনার প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। আপনার কিতাব, আপনার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। সালাত পড়েছি, রোযা রেখেছি, দান-সদকা করেছি। সাধ্যমত আপনার প্রশংসা করেছি। তার উত্তর শুনে আল্লাহ বলবেন, তাই নাকি? তাহলে এখনই তোমার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী উপস্থিত করি। তারপর (তোমার উত্তর সম্পর্কে) তুমি ভেবে দেখবে। বলা হবে, কে আছে তার সম্পর্কে স্বাক্ষ্য দিবে? এরপর তার মুখ সীল করে দেওয়া হবে। তার রান, তার মাংস, তার হাড্ডিকে বলা হবে, তোমরা কথা বলো। এরা তাদের জানা মতে তথ্য দিতে শুরু করবে। এভাবে আল্লাহ নিজে স্বাক্ষ্য দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। আসলে এ ব্যক্তিটি ছিল দুনিয়ার জীবনে মুনাফিক। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন”। সহিহ মুসলিম : ২৯৬৮।

১১. কিয়ামতের দিন যার হিসাব নেওয়া হবে সে জাহান্নামে যাবে

ইবনু আবূ মুলাইকাহ (রাযি.) বলেন, নবী ﷺ এর স্ত্রী আয়িশা (রাদি.) কোন কথা শুনে না বুঝলে বার বার প্রশ্ন করতেন। একদা নবী ﷺ বললেন, ‘‘কিয়ামতের দিন যার কাছ থেকে হিসেব নেয়া হবে তাকে শাস্তি দেয়া হবে।’’ ‘আয়িশা (রাদি.) বলেন-

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ্ তা‘আলা কি ইরশাদ করেননি, فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। সূরা ইনশিক্বাক : ৮। তখন তিনি বললেন, তা কেবল হিসেব প্রকাশ করা। কিন্তু যার হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে নেয়া হবে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। সহহি বুখারি : ১০৩

এ হাদিসটিই অন্য স্থানে একটু পরির্তনে এসেছে-

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তিরই হিসাব নেয়া হবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, তখন আমি বললাম, আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন। আল্লাহ্ কি বলেননি,

فَأَمَّا مَنْ أُوْتِيَ كِتٰبَه” بِيَمِيْنِهٰلا – فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَّسِيْرًا

’’যার ’আমলনামা তার ডান হস্তে দেয়া হবে, তার হিসাব নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। সূরা ইনশিক্বাক : ৮

এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ আয়াতে আমলনামা কীভাবে দেয়া হবে সে ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুবা যার খুঁটিনাটি হিসাব নেয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯৩৯, ৬৫৩৬, ৬৫৩৭, সহিহ মুসলিম: ২৮৭৬, মিশকাত : ৫৫৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৬৯, সহীহুল জামি : ৬২২০, আবূ ইয়া’লা : ৪৪৫৩, আহমাদ : ২৪২৫৫

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে এসে বললেন, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ যেদিন সম্পর্কে বলেছেন, সেদিন সকল মানুষ উভয় জাহানের প্রভুর সম্মুখে দণ্ডায়মান হবে। আমাকে বলুন! কোন লোকের সেই কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়ানোর সাধ্য হবে। তখন তিনি (সা.) বললেন, সেদিন ঈমানদারের জন্য খুবই হালকা করা হবে। এমনকি ঐ দিন তার জন্য একটি ফরয সালাত (আদায়ের সময়ের) ন্যায় হবে। মিশকাত : ৫৫৬৩

১২. সেদিন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে কোনো দোভাষী থাকবে না

আদী ইবন হাতেম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

«مَا مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا سَيُكَلِّمُهُ رَبُّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ تُرْجُمَانٌ، فَيَنْظُرُ أَيْمَنَ مِنْهُ فَلاَ يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ مِنْ عَمَلِهِ، وَيَنْظُرُ أَشْأَمَ مِنْهُ فَلاَ يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ، وَيَنْظُرُ بَيْنَ يَدَيْهِ فَلاَ يَرَى إِلَّا النَّارَ تِلْقَاءَ وَجْهِهِ، فَاتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ “

তোমাদের মধ্যে প্রতিটি ব্যক্তি সেদিন আল্লাহ তায়ালার সাথে সরাসরি কথা বলবে। কোনো দোভাষী বা মধ্যস্থ থাকবে না। মানুষ তখন তার ডান দিকে তাকাবে দেখতে পাবে শুধু তাদের প্রেরিত কর্ম। আর বাম দিকে তাকাবে দেখবে শুধু নিজ কৃত কর্ম। সামনের দিকে তাকাবে দেখবে শুধু জাহান্নামের আগুন। কাজেই তোমরা আগুন থেকে সাবধান হও নিজেদের বাঁচাও যদি একটি খেজুরের টুকরা দান করার বিনিময়েও হয়”। সহিহ বুখারি : ৭৫১২,

এ হাদিসটিই অন্য স্থানে বিস্তারিত বিবরণসহ এসেছে-

আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে ছিলাম, এমন সময় দু’জন সাহাবী আসলেন, তাদের একজন দারিদ্রের অভিযোগ করছিলেন আর অপরজন রাহাজানির অভিযোগ করছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাহাজানির অবস্থা এই যে, কিছু দিন পর এমন সময় আসবে যখন কাফিলা মক্কা পর্যন্ত বিনা পাহারায় পৌঁছে যাবে। আর দারিদ্রের অবস্থা এই যে, তোমাদের কেউ সাদাকা নিয়ে ঘোরাফিরা করবে, কিন্তু তা গ্রহণ করার মত কাউকে পাবে না। এমন সময় না আসা পর্যন্ত ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) কায়িম হবে না। অতঃপর (বিচার দিবসে) আল্লাহর নিকট তোমাদের কেউ এমনভাবে খাড়া হবে যে, তার ও আল্লাহর মাঝে কোন আড়াল থাকবে না বা কোন ব্যাখ্যাকারী দোভাষীও থাকবে না। অতঃপর তিনি বলবেনঃ আমি কি তোমাকে সম্পদ দান করিনি? সে অবশ্যই বলবে, হ্যাঁ। এরপর তিনি বলবেন, আমি কি তোমার নিকট রাসূল প্রেরণ করিনি? সে অবশ্যই বলবে হাঁ, তখন সে ব্যক্তি ডান দিকে তাকিয়ে শুধু আগুন দেখতে পাবে, তেমনি ভাবে বাম দিকে তাকিয়েও আগুন দেখতে পাবে। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত এক টুকরা খেজুর (সাদাকা) দিয়ে হলেও যেন আগুন হতে আত্মরক্ষা করে। যদি কেউ তা না পায় তবে যেন উত্তম কথা দিয়ে হলেও। সহিহ বুখারি : ১৪১৩ ১৪১৭, ৩৫৯৫, ৬০২৩, ৬৫৩৯, ৬৫৪০, ৬৫৬৩, ৭৪৪৩, সহিহ মুসলিম : ১০১৬, মিশকাত : ৫৫৫০, সুনানেতিরমিযী : ২৪১৫, সুননে ইবনু মাজাহ : ১৮৫, আহমাদ : ১৮২৭২, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৭৩, বায়হাকী : ১০৪২৫।

১৩. নিজের পাপাচার গোপনকারীকে পরকালে ক্ষমা করে দেয়া হবে

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা একজন মু’মিন বান্দাকে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সম্মানের সঙ্গে নিজের কাছে ডেকে নেবেন। এরপর তার কৃত পাপগুলো একটি একটি করে তাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। মু’মিন ব্যক্তি যখন তার পাপগুলো স্বীকার করবে, তখন সে ভয় পাবে যে তার কোনো ক্ষমা নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা তার গোপনীয় গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিবেন। অন্যদিকে, কাফির ও মুনাফিকদেরকে সবার সামনে আনা হবে যারা পরকাল কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

সাফওয়ান ইবনু মুহরিব আল-মাযিনী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর সাথে তাঁর হাত ধরে চলছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর মু’মিন বান্দার একান্তে কথাবার্তা সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কী বলতে শুনেছেন? তখন তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন ব্যক্তিকে নিজের কাছে নিয়ে আসবেন এবং তার উপর স্বীয় আবরণ দ্বারা তাকে ঢেকে নিবেন। তারপর বলবেন, অমুক পাপের কথা কি তুমি জান? তখন সে বলবে, হ্যাঁ, হে আমার প্রতিপালক! এভাবে তিনি তার কাছ হতে তার পাপগুলো স্বীকার করিয়ে নিবেন। আর সে মনে করবে যে, তার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, আমি পৃথিবীতে তোমার পাপ গোপন করে রেখেছিলাম। আর আজ আমি তা মাফ করে দিব’’। তারপর তার নেকের আমলনামা তাকে দেয়া হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে সাক্ষীরা বলবে, এরাই তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিল। সাবধান, যালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। সহিহ বুখারি : ২৪৪১, ৪৬৮৫, ৬০৭০, ৭৫১৪, সহিহ মুসলিম : ২৭৬৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৩, আহমাদ : ৫৪৩৬, সহীহুল জামি : ১৮৯৪, আবূ ইয়া’লা : ৫৭৫১, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৫৫

১৪. হাশরের ময়দানে সবার আমলনামা দেখান হবে

হাশরের দিন সকল মানুষের আমলনামা প্রকাশ করা হবে এবং প্রত্যেককে তার নিজ নিজ আমলনামা দেওয়া হবে। এই বিষয়টি কুরআন ও হাদিসের একাধিক স্থানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস।

আল্লাহ তায়ালা বলন-

اِقْرَاْ کِتٰبَکَ ؕ  کَفٰی بِنَفْسِکَ الْیَوْمَ عَلَیْکَ حَسِیْبًا ؕ

পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশকারী হিসেবে যথেষ্ট। সুরা ইসরা : ১৪

আল্লাহ তায়ালা বলন-

وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا ۚ وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا

আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, ‘হায় ধ্বংস আমাদের! কী হল এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে’ এবং তারা যা করেছে, তা হাযির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। সূরা কাহফ : ৪৯

আল্লাহ তায়ালা বলন-

فَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ بِيَمِينِهِۦ .فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابً۬ا يَسِيرً۬ا . وَيَنقَلِبُ إِلَىٰٓ أَهْلِهِۦ مَسْرُورً۬ا    وَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ وَرَآءَ ظَهْرِهِۦ . فَسَوْفَ يَدْعُواْ ثُبُورً۬ا

অতঃপর যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে। অত্যন্ত সহজভাবেই তার হিসাব-নিকাশ করা হবে। আর সে তার পরিবার-পরিজনের কাছে আনন্দিত হয়ে ফিরে যাবে। আর যাকে তার আমলনামা পিঠের পেছনে দেয়া হবে। অতঃপর সে ধ্বংস আহবান করতে থাকবে। সূরা ইনশিকাক : ৭-১১

এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন সকল মানুষের আমলনামা সামনে আনা হবে। মুমিনদেরকে তাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, আর কাফির ও পাপীদেরকে তাদের বাম হাতে অথবা পিঠের পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে।

সহিহ বুখারীর একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা মুমিন ব্যক্তির আমলনামা নিয়ে তার সঙ্গে একান্তে কথা বলবেন এবং তার পাপগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন। যখন মুমিন ব্যক্তি পাপের কথা স্বীকার করবে, আল্লাহ তখন বলবেন, “আমি দুনিয়াতে তোমার পাপ গোপন করে রেখেছিলাম, আর আজ আমি তা ক্ষমা করে দিলাম।” এরপর তাকে তার নেকের আমলনামা দেওয়া হবে। সহিহ বুখারি : ২৪৪১, ৪৬৮৫, ৬০৭০, ৭৫১৪

ইমাম আহমদের মুসনাদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কেয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের আমলনামা তাদের সামনে পেশ করা হবে, এবং তাদেরকে বলা হবে, ‘পড়ো তোমার আমলনামা, আজ তোমার নিজের হিসাব নেওয়ার জন্য তুমিই যথেষ্ট’। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬৬৫৩

কুরআন ও হাদিসের প্রমাণগুলো থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে, হাশরের ময়দানে প্রত্যেক মানুষকে তার জীবনের সব আমল বা কাজের হিসাব দিতে হবে। প্রতিটি ভালো-মন্দ কাজ আমলনামায় লিপিবদ্ধ থাকবে এবং তা সবার সামনে প্রকাশ করা হবে।

১৫. মানুষের আমল নামা ওজর করা হবে

কিয়ামতের দিন মানুষের আমলনামা ওজন করা হবে, এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা বা বিশ্বাস।

কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে এই আমল ওজন করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এই ওজন করার জন্য একটি পাল্লা থাকবে, যাকে মিজান বলা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলন-

وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ ۚ فَمَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ . وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُم بِمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَظْلِمُونَ

আর সেদিন পরিমাপ হবে যথাযথ। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারি হবে তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই হবে সেই সব লোক, যারা নিজদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি (অস্বীকার করার মাধ্যমে) যুলম করত। সূরা আরাফ : ৮-৯

আল্লাহ তায়ালা বলন-

فَاَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِیْنُہٗ ۙ فَہُوَ فِیْ عِیْشَۃٍ رَّاضِیَۃٍ ؕ وَاَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِیْنُہٗ ۙ فَاُمُّہٗ ہَاوِیَۃٌ ؕ وَمَاۤ اَدْرٰىکَ مَا ہِیَہْ ؕ  نَارٌ حَامِیَۃٌ 

অতঃপর যার পাল্লা ভারী হবে, সে থাকবে সন্তোষজনক জীবনে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার আবাস হবে হাবিয়া।আর তোমাকে কিসে জানাবে হাবিয়া কী? প্রজ্জ্বলিত অগ্নি। সূরা আল-কারিয়াহ: ৬-১১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আমল ওজন করার পর যাদের নেকির পাল্লা ভারী হবে, তারা সফলকাম হবে এবং যাদের পাপের পাল্লা ভারী হবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلٰى اللِّسَانِ ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ حَبِيبَتَانِ إِلٰى الرَّحْمٰنِسُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه

দু’টি বাক্য এমন যা মুখে উচ্চারণ করা অতি সহজ, পাল্লায় অতি ভারী, আর আল্লাহর নিকট অতি প্রিয়। তা হলোঃ সুবহানাল্লাহিল আযীম, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহ।স হিহ বুখারি : ৬৪০৬, ৬৬৮২, ৭৫৬৩, সহিহ  মুসলিম : ২৬৯৪, আহমাদ : ৭১৭০

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন কেবল বড় আমলই নয়, বরং ছোট ছোট আমলও ওজন করা হবে এবং আল্লাহর কাছে প্রিয় এমন কিছু বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমেও নেকির পাল্লা ভারী করা সম্ভব।

আবূদ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে মুমিনের দাড়িপাল্লায় সচ্চরিত্র ও সদাচারের চেয়ে বেশি ওজনের আর কোন জিনিস হবে না। কেননা, আল্লাহ তা’আলা অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন। সুনানে তিরমিজি : ২০০২, সহীহাহ :  ৮৭৬, আহমাদ : ২৭৫৪১

এই হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট যে, কিয়ামতের দিন মানুষের আমল, এমনকি তাদের চরিত্রও ওজন করা হবে। তাই প্রতিটি মুসলিমের জন্য ভালো কাজ করা এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া অপরিহার্য।

১৬. তাদের আমলনামা কর্ম অনুসারে ডান বা বাম হাতে দেওয়া হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآٮِٕهَا‌ۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَٮِٕذٍ۬ ثَمَـٰنِيَةٌ۬ (١٧) يَوْمَٮِٕذٍ۬ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَىٰ مِنكُمْ خَافِيَةٌ۬ (١٨) فَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ بِيَمِينِهِۦ فَيَقُولُ هَآؤُمُ ٱقْرَءُواْ كِتَـٰبِيَهْ (١٩) إِنِّى ظَنَنتُ أَنِّى مُلَـٰقٍ حِسَابِيَهْ (٢٠) فَهُوَ فِى عِيشَةٍ۬ رَّاضِيَةٍ۬ (٢١) فِى جَنَّةٍ عَالِيَةٍ۬ (٢٢) قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ۬ (٢٣) كُلُواْ وَٱشْرَبُواْ هَنِيٓـَٔۢا بِمَآ أَسْلَفْتُمْ فِى ٱلْأَيَّامِ ٱلْخَالِيَةِ (٢٤) وَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ بِشِمَالِهِۦ فَيَقُولُ يَـٰلَيْتَنِى لَمْ أُوتَ كِتَـٰبِيَهْ (٢٥) وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ (٢٦) يَـٰلَيْتَہَا كَانَتِ ٱلْقَاضِيَةَ (٢٧) مَآ أَغْنَىٰ عَنِّى مَالِيَهْۜ (٢٨) هَلَكَ عَنِّى سُلْطَـٰنِيَهْ (٢٩) خُذُوهُ فَغُلُّوهُ (٣٠) ثُمَّ ٱلْجَحِيمَ صَلُّوهُ (٣١) ثُمَّ فِى سِلْسِلَةٍ۬ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعً۬ا فَٱسْلُكُوهُ (٣٢)

সেই দিন তোমরা হিসাবের জন্য উপস্থিত হবে, তোমাদের কোনো গোপন বিষয় লুকানো থাকবে না। যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘আসো, আমার আমলনামা পড়ো!’ ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আমি আমার হিসাবের মুখোমুখি হব।’ সে সুখের জীবনে থাকবে, এক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতে, যার ফলমূল থাকবে হাতের নাগালে। তোমরা আহার করো ও পান করো আনন্দের সঙ্গে, তোমাদের পূর্ববর্তী কাজের বিনিময়ে।’  আর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘হায়! যদি আমার আমলনামা আমাকে না দেওয়া হতো!  এবং আমি না জানতাম আমার হিসাব কী!’ হায়! যদি সেটাই চূড়ান্ত মৃত্যু হতো! আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসেনি। আমার ক্ষমতাও আমার থেকে চলে গেছে।’ ‘তোমরা তাকে ধরে নাও এবং শৃঙ্খলে আবদ্ধ করো।’ তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। অতঃপর তাকে সত্তর হাত দীর্ঘ এক শৃঙ্খলে প্রবেশ করাও। সুরা হাক্কাহ : ১৮-৩২

১৭. কিয়ামতে দিন রিয়া বা লোক দেখানো আমলের বিচার হবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ یُخٰدِعُوْنَ اللّٰہَ وَہُوَ خَادِعُہُمْ ۚ  وَاِذَا قَامُوْۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوْا کُسَالٰی ۙ  یُرَآءُوْنَ النَّاسَ وَلَا یَذْکُرُوْنَ اللّٰہَ اِلَّا قَلِیْلًا ۫ۙ

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। সুরা নিসা : ১৪২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

  فَمَنْ کَانَ یَرْجُوْا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلْیَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشْرِکْ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহাফ : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقٰتِکُمْ بِالْمَنِّ وَالْاَذٰی ۙ کَالَّذِیْ یُنْفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤْمِنُ بِاللّٰہِ وَالْیَوْمِ الْاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَیْہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلْدًا ؕ لَا یَقْدِرُوْنَ عَلٰی شَیْءٍ مِّمَّا کَسَبُوْا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہْدِی الْقَوْمَ الْکٰفِرِیْنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

সুলাইমান ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা লোকজন যখন আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) এর নিকট থেকে বিদায় নিচ্ছিল, তখন সিরিয়াবাসী নাতিল (রহঃ) বললেন, হে শায়খ! আপনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে শুনেছেন এমন একখানা হাদীস আমাদেরকে শুনান। তিনি বলেন, হ্যাঁ! (শুনাবো)। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন যে শহীদ হয়েছিল। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং আল্লাহ তার নিয়ামাতরাশির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এর বিনিময়ে কী আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি তোমারই পথে যুদ্ধ করেছি এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি বরং এ জন্যেই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে, তুমি বীর। তা বলা হয়েছে, এরপর নির্দেশ দেয়া হবে। সে মতে তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে যে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করেছে। তখন তাকে হাযির করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তার প্রদত্ত নি’আমাতের কথা তাকে বলবেন এবং সে তা চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে) তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এত বড় নি’আমাত পেয়ে বিনিময়ে তুমি কী করলে? জবাবে সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে এজন্যে যাতে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলে। কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে এ জন্যে যাতে লোকে বলে, তুমি একজন কারী। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে, সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে যাকে আল্লাহ তা’আলা সচ্ছলতা এবং সর্ববিধ বিত্ত-বৈভব দান করেছেন। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে প্রদত্ত নিআমাতসমূহের কথা তাকে বলবেন। সে তা চিনতে পারবে (এবং স্বীকারোক্তিও করবে)। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এসব নি’আমাতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছো? জবাবে সে বলবে, সম্পদ ব্যয়ের এমন কোন খাত নেই যাতে সম্পদ ব্যয় করা তুমি পছন্দ কর, আমি সে খাতে তোমার সন্তুষ্টির জন্যে ব্যয় করেছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছে। তুমি বরং এ জন্যে তা করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে ’দানবীর’ বলে অভিহিত করে। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে। সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সহিহ মুসলিম : ১৯০৫।

মাহমূদ ইবনু লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ: الرِّيَاءُ

তোমাদের ব্যাপারে আমার সর্বাপেক্ষা ভয়ের বস্তু যা আমি ভয় পাচ্ছি তা হচ্ছে ছোট শির্ক বা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত)। বুলুগুল মারাম : ১৪৮৪, আহমাদ : ২৩১১৯, ২৭৭৪২

১৮. অসহায়কে সাহায্য না করলে জবাবদিহি করত হবে

অসহায়কে সাহায্য না করা এবং তাদের প্রতি উদাসীন থাকা সম্পর্কে ইসলামে কঠোর সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। কুরআনে অসহায় ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করার ব্যাপারে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যারা তাদের হক আদায় করে না, তাদের জন্য শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَرَءَیْتَ الَّذِیْ یُکَذِّبُ بِالدِّیْنِ ؕ فَذٰلِکَ الَّذِیْ یَدُعُّ الْیَتِیْمَ ۙ وَلَا یَحُضُّ عَلٰی طَعَامِ الْمِسْکِیْنِ ؕ

তুমি কি তাকে দেখেছ, যে হিসাব-প্রতিদানকে অস্বীকার করে? সে-ই ইয়াতীমকে কঠোরভাবে তাড়িয়ে দেয়,

আর মিসকীনকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না। সূরা মাউন : ১-৩

এই সূরায় আল্লাহ তাআলা তাদের কথা বলেছেন যারা দ্বীনকে অস্বীকার করে। এর একটি লক্ষণ হলো তারা অসহায়দের প্রতি উদাসীন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

کَلَّا بَلْ لَّا تُکْرِمُوْنَ الْیَتِیْمَ ۙ وَلَا تَحٰٓضُّوْنَ عَلٰی طَعَامِ الْمِسْکِیْنِ ۙ

কখনো নয়, বরং তোমরা ইয়াতীমদের দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন কর না। আর তোমরা মিসকীনদের খাদ্যদানে পরষ্পরকে উৎসাহিত কর না। সূরা ফাজর : ১৭-১৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ  وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ

 তোমাদেরকে কিসে সাকার (জাহান্নাম) নামক স্থানে নিয়ে গেল?  তারা বলবে, আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না এবং আমরা মিসকিনদের খাদ্য দিতাম না। আর আমরা অনর্থক আলোচনাকারীদের সাথে আলোচনায় মগ্ন থাকতাম।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিনে বলবেন, হে আদম সন্তান আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা-শুশ্রুষা করনি। সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমার সেবা শুশ্রুষা করব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, আর তুমি তার সেবা করনি, তুমি কি জানতে না যে, তুমি তার সেবা-শুশ্রুষা করলে আমাকে তার কাছেই পেতে। হে আদম সন্তান আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে খেতে দাওনি। সে (বান্দা) বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে আহার করাতে পারি? তুমি তো সারা জাহানের প্রতিপালক।

তিনি (আল্লাহ) বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে আহার চেয়েছিল? তুমি তাকে খেতে দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, যদি তুমি তাকে আহার করাতে তাহলে তা অবশ্যই আমার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান আমি তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। সে (বান্দা) বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে পান করাব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক। তিনি (আল্লাহ) বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিল, তুমি তাকে পান করাওনি। যদি তুমি তাকে পান করাতে, তবে তা আমার কাছে পেয়ে যেতে। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৯

এ বিচারের সময় ভালোফল পেতে নিচের হাদিসটির্ উপর আমল করা জরুরি।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক কোন ঈমানদারের দুনিয়া থেকে কোন মুসীবাত দূর করে দিবে, আল্লাহ তা’আলা বিচার দিবসে তার থেকে মুসীবাত সরিয়ে দিবেন। যে লোক কোন দুঃস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাই এর সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোন একটি গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে তখন তাদের উপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তা’আলা তার নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে আমলে পিছনে সরিয়ে দিবে তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করে দিবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৪৮, সুনানে তিরমিজি : ১৪২৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪

১৯. তাওহিদে সাক্ষ্য প্রদানে জন্য ক্ষমা করা হবে

তাওহীদ বা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদে অবিচল বিশ্বাস দীন ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার তাওহীদী আকীদা-বিশ্বাসে সমস্যা আছে তার কোনো নেক আমল কাজে আসবে না। দুনিয়া পরিমাণ সম্পদ ছদকা বা আল্লাহর পথে নিজের প্রাণ ও সম্পদ সবকিছু কুরবানী দিলেও নয়। অপরপক্ষে যারা তাওহীদী-আকীদা বিশ্বাস নির্ভেজাল হবে ও এর ওপর অবিচল থাকবে তার অন্য কোনো নেক আমল না থাকলেও তাওহীদের কারণে সে একদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। কিয়ামত পরবর্তী বিচারেও তাওহীদের মূল্যায়ন করা হবে গুরুত্বের সাথে।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত দিবসে আমার উম্মতের একজনকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে আলাদা করে এনে উপস্থিত করবেন। তিনি তার সামনে নিরানব্বইটি আমলনামার খাতা খুলে ধরবেন। প্রতিটি খাতা দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তারপর তিনি প্রশ্ন করবেন, তুমি কি এগুলো হতে কোন একটি (গুনাহ) অস্বীকার করতে পার? আমার লেখক ফেরেশতারা কি তোমার উপর যুলুম করেছে? সে বলবে, না, হে প্ৰভু!

তিনি আবার প্রশ্ন করবেনঃ তোমার কোন অভিযোগ আছে কি? সে বলবে, না, হে আমার প্রভু! তিনি বলবেনঃ আমার নিকট তোমার একটি সাওয়াব আছে। আজ তোমার উপর এতটুকু যুলুমও করা হবে না। তখন ছোট একটি কাগজের টুকরা বের করা হবে। তাতে লিখা থাকবে-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

অর্থ : আমি সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্রভু নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল”।

তিনি তাকে বলবেনঃ দাড়িপাল্লার সামনে যাও। সে বলবে, হে প্ৰভু! এতগুলো খাতার বিপরীতে এই সামান্য কাগজটুকুর কি আর ওজন হবে? তিনি বলবেনঃ তোমার উপর কোন রকম যুলুম করা হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর খাতাগুলো এক পাল্লায় রাখা হবে এবং উক্ত টুকরাটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। ওজনে খাতাগুলোর পাল্লা হালকা হবে এবং কাগজের টুকরার পাল্লা ভারী হবে। আর আল্লাহ তা’আলার নামের বিপরীতে কোন কিছুই ভারী হতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ২৬৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০০, সহিহাহ : ১৩৫, সহীহুল জামি : ১৭৭৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ২২৫, শুআবূল ঈমান : ২৮৩, তবারানী : ১৪৯০

২০. কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেউ অগ্রসর হতে পারবে না

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ لاَ تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاَهُ وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ ‏”

কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে। সুনানে তিরিমিজি : ২৪১৬, সহিহাহ : ৯৪৬

২১. মুসলিমদের মুক্তিপণ হিসেবে ইহুদী বা নাসারকে প্রদান করা হবে

আবু মূসা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ دَفَعَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى كُلِّ مُسْلِمٍ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا فَيَقُولُ هَذَا فَكَاكُكَ مِنَ النَّارِ ‏

কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মুসলিমের নিকট একজন খ্রীস্টান বা ইয়াহুদী দিয়ে বলবেন, এ হচ্ছে তোমার জন্যে জাহান্নামের অগ্নি হতে মুক্তিপণ। সহীহ মুসলিম : ২৭৬৭, মিশকাত : ৫৫৫২ শুআবূল ঈমান : ৩৭৮, আল মুজামুল আওসাত : ৯৭৪।

২২. হাশরের ময়দানে মানুষের অঙ্গ প্রতঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষি দিবে

اَلْیَوْمَ نَخْتِمُ عَلٰۤی اَفْوَاہِہِمْ وَتُکَلِّمُنَاۤ اَیْدِیْہِمْ وَتَشْہَدُ اَرْجُلُہُمْ بِمَا کَانُوْا یَکْسِبُوْنَ

আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে ছিলাম, হঠাৎ তিনি হাসলেন। অতঃপর প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জান আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি (সা.) বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দা যে তার প্রভুর সাথে কথা বলবে, সে কথাটি স্মরণ করে হাসছি। বান্দা বলবে, হে প্রভু! তুমি কি আমাকে অবিচার থেকে নিরাপত্তা দান করনি? আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হ্যাঁ। তখন বান্দা বলবে, আজ আমি আমার সম্পর্কে আপনজন ছাড়া আমার বিরুদ্ধে অন্য কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করব না। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি আজ নিজেই তোমার সাক্ষী হিসেবে এবং কিরামান কাতিবীনের সাক্ষ্যই তোমার জন্য যথেষ্ট। অতঃপর তার মুখের উপর আল্লাহ তা’আলা মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা হবে, তোমরা (কে কখন কি কি কাজ করেছ) বল? তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ তাদের কৃতকর্মসমূহ প্রকাশ করে দেবে। এরপর তার মুখকে স্বাভাবিক অবস্থায় খুলে দেয়া হবে। তখন সে স্বীয় অঙ্গসমূহকে লক্ষ্য করে আক্ষেপের সাথে বলবে, হে হতভাগা অঙ্গসমূহ! তোরা দূর হ! তোদের ধ্বংস হোক। তোদের জন্যই তো আমি আমার প্রভুর সাথে তর্ক করছিলাম। সহীহ: মুসলিম : ২৯৬৯, মিশকাত : ৫৫৫৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৫৮, সহীহুল জামি : ৮১৩৪,  আবু ইয়া’লা : ৩৯৭৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৫৮, শুআবূল ঈমান : ২৬৫।

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছন, ………মোটকথা সে সাধ্য পরিমাণ নিজের নেক কার্যসমূহের একটি তালিকা আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আচ্ছা! তুমি তো তোমার কথা বললে, এখন এখানেই দাঁড়াও, এক্ষুণি তোমার সাক্ষী উপস্থিত করছি। এ কথা শুনে বান্দা মনে মনে চিন্তা করবে, কে আছে এমন যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে? অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার উরুকে বলা হবে, তুমি বল, তখন তার উরু, হাড় মাংস প্রভৃতি এক একটি করে বলে ফেলবে, তারা যা যা করেছিল। তার মুখে মোহর লাগিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে এজন্য সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে যেন সে বান্দা কোন ওযর-আপত্তি পেশ করতে না পারে। মূলত যে বান্দার কথা আলোচনা করা হয়েছে, সে হলো মুনাফিক এবং এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা তার প্রতি অত্যন্ত রাগান্বিত হবেন। অংশিক সহীহ বুখারী : ৭৪৩৭, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৭৯১৪, আবূ ইয়া’লা : ৬৬৮৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪৬৪২. হাকিম : ৮৭৩৬।

২৩. সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন

আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আমার প্রভু আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্য থেকে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তাদের ওপর ’আযাবও হবে না। আবার উক্ত প্রত্যেক হাজারের সাথে সত্তর হাজার এবং আমার প্রভুর তিন অঞ্জলি ভর্তি লোকও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।

মিশকত : ৫৫৫৬, সুনানে তিরমিযী : ২৪৬৭, সুনানে ইবনু মাজাহ :ধ ৪২৮৬, সহীহুল জামি : ৭০৬২ : আহমাদ : ২২৩৫৭,  সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১৯০৯, ত্ববারানী : ৪৪২৭

২৪. আল্লাহ ক্ষমার আচ্ছাসে বান্দা তার কবিরা গুনাহ প্রকাশ করে দিবেন

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি এমন এক লোক সম্পর্কে অবহিত আছি, যে জান্নাতীদের মধ্যে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি এবং সর্বশেষ জাহান্নামী, যে তা থেকে বের হয়ে আসবে। কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহ তা’আলার সামনে উপস্থিত করা হবে। তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের)-কে বলা হবে, তার ছোট ছোট গুনাহসমূহ তার সামনে উপস্থিত কর এবং বড় বড় গুনাহগুলো সরিয়ে রাখ। তখন তার ছোট ছোট গুনাহগুলোই তার সামনে উপস্থিত করা হবে। তখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, আচ্ছা বল তো অমুক অমুক দিন অমুক অমুক কাজটি তুমি করেছিলে? সে বলবে, হ্যা করেছি। মূলত তা সে অস্বীকার করতে পারবে না। তবে বড় বড় গুনাহসমূহ উপস্থিত করা সম্পর্কে সে অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে। তখন তাকে বলা হবে, যাও! তোমার প্রতিটি গুনাহের স্থলে তোমাকে এক একটি পুণ্য দেয়া হলো। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমি তো এমন কিছু (বড় বড়) গুনাহও করেছিলাম, যেগুলাকে আমি এখানে দেখতে পাচ্ছি না। বর্ণনাকারী আবূ যার (রাঃ) বলেন, এ সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) – কে এমনভাবে হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সহীহ মুসলিম : ১৯০, মিশকাত : ৫৫৮৭, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ৩০৫২, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ২১২৯১।

পুলসিরাত ও আরাফ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পুলসিরাত:

পুলসিরাত এর শাব্দিক অর্থ হলো পথ বা সেতু। ইসলামী পরিভাষায়, এটি হলো এমন একটি সেতু যা কিয়ামতের দিন জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে। মু’মিনগণ এই সেতু পার হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন, আর পাপীরা সেখান থেকে জাহান্নামে পতিত হবে। পুলসিরাত সম্পর্কে সরাসরি কোনো আয়াতে নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে, যা দিয়ে পুলসিরাতের ধারণাকে ব্যাখ্যা করা যায়। ইসলামি পণ্ডিতগণ ও মুফাসসিরগণ এই আয়াতগুলোকে পুল সিরাতের বর্ণনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। যেমন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنْ مِّنْکُمْ اِلَّا وَارِدُہَا ۚ  کَانَ عَلٰی رَبِّکَ حَتْمًا مَّقْضِیًّا ۚ

এবং তোমাদের প্রত্যেকেই ওটা অতিক্রম করবে; ওটা তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। সূরা মারইয়াম : ৭১

এই আয়াতে ‘ওয়ারিদুহা’ (অতিক্রমশ করবে) শব্দটি নিয়ে মুফাসসিরদের দুটি মত আছে:

১. এর অর্থ হলো সবাই জাহান্নামের পাশ দিয়ে অতিক্রমশ করবে।

২. এর অর্থ হলো সবাই পুল সিরাতের উপর দিয়ে অতিক্রমশ করবে, যা জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে।

এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই অধিকাংশ পণ্ডিত গ্রহণ করেছেন। কারণ, এই আয়াতে বলা হয়েছে, সবাইকেই জাহান্নামের উপর দিয়ে যেতে হবে, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদেরকে (সৎকর্মশীলদের) রক্ষা করবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ثُمَّ نُنَجِّی الَّذِیْنَ اتَّقَوْا وَّنَذَرُ الظّٰلِمِیْنَ فِیْہَا جِثِیًّا

পরে আমি মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব। সূরা মারইয়াম: ৭২

এই আয়াতে বলা হয়েছে, যারা পরহেজগার, আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন। এই রক্ষা করার বিষয়টি পুল সিরাতের সাথে সম্পর্কিত। যারা পুল সিরাত পার হতে পারবে, তারা হবে মুত্তাকি এবং যারা তা পারবে না, তারা জাহান্নামে পড়ে যাবে।

আয়িশা (রাদি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। আল্লাহ বলেন-

یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ

যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও এবং মানুষ উপস্থিত হবে আললাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী। সূরাহ ইবরাহীম ১৪: ৪৮।

সে দিন সকল মানুষ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, ’পুলসিরাতের উপর। সহিহ মুসলিম : ২৭৯১, মিশকাত : ৫৫২৫, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৩৩১।

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

فَجُعِلَ عَلَى الصِّرَاطِ كَلاَلِيبُ، وَشَوْكٌ مِثْلَ شَوْكِ السَّعْدَانِ، ثُمَّ يَمُرُّ الْمُؤْمِنُونَ عَلَى الصِّرَاطِ، فَمِنْهُمْ مَنْ يَمُرُّ بِسُرْعَةٍ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُخْتَطَفُ، فَيَقَعُ فِي النَّارِ، فَيُقَالُ لَهُ: مَا تَعْبُدُ؟ فَيَقُولُ: كُنْتُ أَعْبُدُ اللَّهَ

এরপর পুলসিরাতের উপর কাঁটা ও হুক স্থাপন করা হবে, যা সাদানের কাঁটার মতো হবে। এরপর মুমিনগণ পুলসিরাতের উপর দিয়ে পার হবে। তাদের মধ্যে কেউ দ্রুত পার হবে, আবার কাউকে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। সহিহ বুখারী : ৭৪৩৯ -এর একটি অংশ। সম্পূর্ণ হাদিসটি পর দেওয়া আছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত।  রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

‏”‏يُضْرَبُ الصِّرَاطُ بَيْنَ ظَهْرَانَىْ جَهَنَّمَ، فَأَكُونُ أَنَا وَأُمَّتِي أَوَّلَ مَنْ يُجِيزُهَا‏”‏‏.‏

জাহান্নামের মাঝখানে পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। তখন আমি এবং আমার উম্মত সর্বপ্রথম তা পার হব। সহিহ বুখারী : ৭৪৩৭-এর একটি অংশ। সম্পূর্ণ হাদিসটি পর দেওয়া আছে।

আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

“‏يُعْطَى كُلُّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ نُورُهُ، فَيُسْطِعُ كُلُّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ نُورُهُ فَيَسِيرُونَ عَلَى الصِّرَاطِ‏”‏‏.‏

“প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে তার নূর (আলো) দেওয়া হবে। সেই আলো তাদের সামনে থাকবে এবং তারা পুলসিরাতের উপর দিয়ে চলতে থাকবে। মুস্তাদরাকে হাকিম : ৪৬২৯

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

“مَنْ كَانَتْ لَهُ حَاجَةٌ إِلَى ذِي سُلْطَانٍ فِي تَفْرِيجِ كُرْبَةٍ أَوْ قَضَاءِ حَاجَةٍ لِأَخِيهِ الْمُسْلِمِ، فَقَامَ لَهَا، فَاللَّهُ جَلَّ وَعَلَا يُجِيزُهُ عَلَى الصِّرَاطِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حِينَ تَزِلُّ الْأَقْدَامُ”

যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ সাধন অথবা কষ্ট দূর করার জন্য কোনো শাসকের কাছে যাওয়ার মাধ্যম হবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যখন (পুলসিরাতে) মানুষের পা পিছলে যাবে, তখন তাকে পুলসিরাত পার করাবেন। সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৩১

হুযায়ফাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) এ থেকে শাফা’আতের হাদীস বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি (সা.) বলেছেন-

আমানত ও আত্মীয়তাকে পাঠানো হবে, তখন উভয়টি পুলসিরাতের ডানে ও বামে উভয় পার্শ্বে দাঁড়াবে। সহিহ মুসলিম : ১৯৫, মিশকাত : ৫৫৭৬, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৬৪২।

১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন পুলসিরাতের কাছে থাকবেন।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিবেদন করলাম যে, তিনি যেন কিয়ামত দিবসে আমার জন্য সুপারিশ করেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে আমি সুপারিশ করব। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমি আপনাকে কোথায় খোঁজ করব? তিনি বললেন, তুমি সর্বপ্রথম আমাকে পুলসিরাতের সামনে খোঁজ করবে। আমি বললাম, পুলসিরাতে যদি আপনাকে না পাই? তিনি বললেন, তাহলে মীযানের ঐখানে খুঁজবে। আমি আবার বললাম, মীযানের ঐখানেও যদি আপনাকে না পাই? তিনি বললেন, তাহলে হাওযে কাওসারের সামনে খুঁজবে। আমি এ তিনটি জায়গার যে কোন একটিতে অবশ্যই উপস্থিত থাকব। সুনানে তিরমিজি : ২৪৩৩, মিশকাত : ৫৫৯৫

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত-

(কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে)…….রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আর নিমিত্ত দাঁড়াবেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করা হবে। আমানাত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, পুল-সিরাতের ডানে-বামে এসে দাঁড়াবে। আর তোমাদের প্রথম দলটি এ সিরাতে, বিদ্যুৎ গতিতে পার হয়ে যাবে। সাহাবা বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক। আমাকে বলে দিন “বিদ্যুৎ গতির ন্যায়” কথাটির অর্থ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আকাশের বিদ্যুৎ চমক কি কখনো দেখনি? চোখের পলকে এখান থেকে সেখানে চলে যায় আবার ফিরে আসে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বায়ুর বেগে, পাখির গতিতে, তারপর লম্বা দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে তা অতিক্রম করবে। আর তোমাদের নবী সে অবস্থায় পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দু’আ করতে থাকবে, আল্লাহ এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন, এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন।

এরূপে মানুষের আমল মানুষকে চলতে অক্ষম করে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা এ সিরাত অতিক্রম করতে থাকবে। শেষে এক ব্যক্তিকে দেখা যাবে সে নিতম্বের উপর ভর করে পথ অতিক্রম করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, সিরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। এরা আল্লাহর নির্দেশত্রুমে চিহ্নিত পাপীদেরকে পাকড়াও করবে। তন্মধ্যে কাউকে তো ক্ষত-বিক্ষত করেই ছেড়ে দিবে; অতঃপর সে নাজাত পাবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, শপথ সে সত্তার যার হাতে আবূ হুরাইরাহর প্রাণ! জেনে রেখ, জাহান্নামের গভীরতা সত্তর খারীফ (অর্থাৎ- সত্তর হাজার বছরের পথের ন্যায়। আংশিক সহিহ মুসলিম : ১৯৫

২. জাহান্নামের উপর দুর্গম পিচ্ছিল পুল স্থান করা হবে

আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের রবের দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেনঃ মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেনঃ সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ’ইবাদত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রুশপূজারী ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রুশের কাছে। মূর্তিপূজারীরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়র (আঃ)-এর ’ইবাদত করতাম।

তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসীহের ’ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীগণ। তাদের নেক্কার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন্ জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল।

আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ’ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর মহাক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রবব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবীগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে।

এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সিজদা্য় পড়ে যাবে। বাকি থাকবে তারা, যারা লোক-দেখানো এবং লোক-শোনানো সিজদা্ করেছিল। তবে তারা সিজদার মনোভাব নিয়ে সিজদা্ করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের মেরুদন্ড একটি তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে। এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবীগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো।

তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। এ কবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে। এখন তোমরা হকের বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক কঠোর নও, যতটুকু সেদিন ঈমানদারগণ আল্লাহর সম্মুখে হয়ে থাকবে, যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে, তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত? তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আল্লাহ্ তাদের মুখমণ্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু’পা ও দু’পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।

তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ আবার তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে। তারপর আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। বর্ণনাকারী আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহলে আল্লাহর এ বাণীটি পড়ঃ ’’আল্লাহ অণু পরিমাণও যুল্ম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন’’- (সূরাহ আন্-নিসা ৪/৪০)। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ফেরেশ্তা ও মু’মিনগণ সুপারিশ করবে। তখন মহা পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলবেন, এখন শুধু আমার শাফাআতই বাকী রয়েছে।

তিনি জাহান্নাম থেকে একমুষ্টি ভরে এমন কতগুলো কওমকে বের করবেন, যারা জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গিয়েছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখে অবস্থিত ’হায়াত’ নামের নহরে ঢালা হবে। তারা সে নহরের দু’পার্শ্বে এমনভাবে উদগত হবে, যেমন পাথর এবং গাছের কিনারে বয়ে আনা আবর্জনায় বীজ থেকে তৃণ উদগত হয়। দেখতে পাও তার মধ্যে সূর্যের আলোর অংশের গাছগুলো সাধারণত সবুজ হয়, ছায়ার অংশেরগুলো সাদা হয়। তারা সেখান থেকে মুক্তার দানার মত বের হবে। তাদের গর্দানে মোহর লাগানো হবে। জান্নাতে তারা যখন প্রবেশ করবে, তখন অন্যান্য জান্নাতবাসীরা বলবেন, এরা হলেন রাহমান কর্তৃক আযাদকৃত যাদেরকে আল্লাহ্ কোন নেক ’আমল কিংবা কল্যাণকর কাজ ব্যতীতই জান্নাতে দাখিল করেছেন। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা যা দেখেছ, সবই তো তোমাদের, এর সঙ্গে আরো সমপরিমাণ তোমাদেরকে দেয়া হলো। সহিহ বুখারি : ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ১৮৩, আহমাদ : ১১১২৭

৩. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম পুল অতিক্রম করবেন

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার কয়েকজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? উত্তরে তিনি বললেনঃ সূর্যের নিচে যখন কোন মেঘ না থাকে তখন তা দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়? তারা বলল, না, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ পূর্ণিমার চাঁদ যদি মেঘের আড়ালে না থাকে তবে তা দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়? তারা বলল, না হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ তোমরা অবশ্যই কিয়ামতের দিন আল্লাহকে ঐরূপ দেখতে পাবে। আল্লাহ্ মানুষকে একত্রিত করে বলবেন, (দুনিয়াতে) তোমরা যে যে জিনিসের ’ইবাদাত করেছিলে সে তার সঙ্গে চলে যাও।

অতএব সূর্যের পূজারী সূর্যের সঙ্গে, চন্দ্রের পূজারী চন্দ্রের সঙ্গে এবং মূর্তি পূজারী মূর্তির সঙ্গে চলে যাবে। অবশিষ্ট থাকবে এ উম্মাতের লোকেরা, যাদের মাঝে মুনাফিক সম্প্রদায়ের লোকও থাকবে। তারা আল্লাহকে যে আকৃতিতে জানত, তার আলাদা আকৃতিতে আল্লাহ্ তাদের কাছে হাযির হবেন এবং বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক। তখন তারা বলবে, আমরা তোমার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমাদের প্রতিপালক না আসা পর্যন্ত আমরা এ স্থানেই থেকে যাব। আমাদের প্রতিপালক যখন আমাদের কাছে আসবেন, আমরা তাকে চিনে নেব। এরপর যে আকৃতিতে তারা আল্লাহকে জানত সে আকৃতিতে তিনি তাদের কাছে হাযির হবেন এবং বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক। তখন তারা বলবে (হাঁ) আপনি আমাদের প্রতিপালক। তখন তারা আল্লাহর অনুসরণ করবে। অতঃপর জাহান্নামের পুল স্থাপন করা হবে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, সর্বপ্রথম আমি সেই পুল অতিক্রম করব। আর সেই দিন সমস্ত রাসূলের দু’আ হবে اللهُمَّ سَلِّمْ سَلِّمْ অর্থাৎ হে আল্লাহ্! রক্ষা কর, রক্ষা কর। সেই পুলের মাঝে সা’দান নামক (এক রকম কাঁটাওয়ালা) গাছের কাঁটার মত কাঁটা থাকবে। তোমরা কি সা’দানের কাঁটা দেখেছ? তারা বলল, হ্যাঁ, ইয়া রাসূরাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ কাঁটাগুলি সা’দানের কাঁটার মতই হবে, তবে তা যে কত বড় হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানে না। সে কাঁটাগুলি মানুষকে তাদের ’আমল অনুসারে ছিনিয়ে নেবে। তাদের মাঝে কতক লোক এমন হবে যে তাদের ’আমলের কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর কতক লোক এমন হবে যে তাদের ’আমল হবে সরিষার মত নগণ্য। তবুও তারা নাজাত পাবে। এমন কি আল্লাহ্ বান্দাদের বিচার সমাপ্ত করবেন এবং لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ এর সাক্ষ্যদাতাদের থেকে যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার ইচ্ছা করবেন আল্লাহ্ তাদেরকে বের করার জন্য ফেরেশতাদেরকে আদেশ করবেন। সিজদার চিহ্ন দেখে ফেরেশতারা তাদেরকে চিনতে পারবে।

আর আল্লাহ্ বানী আদমের ঐ সিজদার স্থানগুলোকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। কাজেই ফেরেশ্তারা তাদেরকে এমন অবস্থায় বের করবে যে, তখন তাদের দেহ থাকবে কয়লার মত। তারপর তাদের দেহে পানি ঢেলে দেয়া হবে। যাকে বলা হয় ’মাউল হায়াত’ জীবন-বারি। সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসা আবর্জনায় যেমন গাছ জন্মায়, পরে এগুলো যেমন সজীব হয় তারাও সেরকম সজীব হয়ে যাবে। এ সময় জাহান্নামের দিকে মুখ করে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকবে আর বলবে, হে প্রভু! জাহান্নামের লু হাওয়া আমাকে ঝলসে দিয়েছে, এর তেজ আমাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সুতরাং তুমি আমার চেহারাটা জাহান্নামের দিক থেকে ঘুরিয়ে দাও। এভাবে সে আল্লাহকে ডাকতে থাকবে। তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ আমি যদি তোমাকে এটা দিয়ে দেই তবে তুমি আর অন্যটি চাইবে? লোকটি বলবে, না। আল্লাহ্, তোমার ইয্যতের কসম! আর অন্যটি চাইব না। তখন তার চেহারাটা জাহান্নামের দিক থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হবে। এরপর সে বলবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে জান্নাতের দরজার কাছে পৌঁছে দাও। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বলনি যে, তুমি আমার কাছে আর অন্য কিছু চাইবে না? আফসোস তোমার জন্য আদম সন্তান! তুমি বড়ই বিশ্বাসঘাতক! সে এরূপই প্রার্থনা করতে থাকবে।

তখন আল্লাহ বলবেনঃ সম্ভবত আমি যদি তোমাকে এটা দিয়ে দেই তবে তুমি অন্য আরেকটি আমার কাছে চাইবে। লোকটি বলবে, না, তোমার ইয্যাতের কসম! অন্যটি আর চাইব না। তখন সে আল্লাহর সাথে ওয়াদা করবে যে, সে আর কিছুই চাইবে না। তখন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতের দরজার নিকটে নিয়ে দিবেন। সে যখন জান্নাতের ভিতরের নিয়ামতগুলো দেখতে পাবে, তখন আল্লাহ্ যতক্ষণ চাইবেন ততক্ষণ সে চুপ থাকবে। এরপরই সে বলতে থাকবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তখন আল্লাহ্ বলবেন, তুমি কি বল নাই যে তুমি আর কিছু চাইবে না? আফসোস তোমার জন্য হে আদম সন্তান! তুমি কতইনা বিশ্বাসঘাতক।

লোকটি বলবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে তোমার সৃষ্ট জীবের মাঝে সবচেয়ে হতভাগ্য কর না। এভাবে সে চাইতেই থাকবে। শেষে আল্লাহ্ হেসে দিবেন। আর আল্লাহ্ যখন হেসে দিবেন, তখন তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে দেবেন। এরপর সে যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাকে বলা হবে, তোমার যা ইচ্ছে হয় আমার কাছে চাও। সে চাইবে, এমনকি তার সব চাহিদা ফুরিয়ে যাবে। তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ এগুলো তোমার এবং আরো এতটা তোমার। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, ঐ লোকটি হচ্ছে সবশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী। রাবী বলেন যে, এ সময় আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৮০৬, ৬৫৭৩, ৭৩৩৭, সহিহ মুসলিম : ১৮২, আহমাদ  : ৭৭২১

৪. পুলসিরাতের উপর কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা থাকবে

জাবির ইবনু আবদুল্লাহকে কুরআনে উল্লেখিত الْوُرُودِ অর্থাৎ (পুলসিরাতের উপর দিয়ে) অতিক্রম করতে হবে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, কিয়ামতের দিন আমরা এরূপে আসব। তিনি মাথা উচু করে দেখালেন। এরপর একে একে প্রত্যেক জাতিকে তাদের নিজ নিজ দেব-দেবী ও উপাস্যের নামসহ ডাকা হবে। তারপর আল্লাহ আমাদের (মু’মিনদের) নিকট এসে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কার অপেক্ষায় রয়েছ? মুমিনগণ বলবে, আমাদের প্রতিপালকের অপেক্ষায় আছি। তিনি বলবেন, আমিই তে তোমাদের প্রতিপালক। তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে না দেখব (আমরা তা মানছি না)। এরপর আল্লাহ তখন এমনভাবে উদ্ভাসিত হবেন যে, তিনি হাসছেন। অনন্তর তিনি তাদের নিয়ে চলবেন এবং মুমিনগণ তার অনুসরণ করবে। মুনাফিক কি মুমিন প্রত্যেক মানুষকেই নূর প্রদান করা হবে। তারপর তারা এর অনুসরণ করবে।

জাহান্নামের পুলের উপর থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে সেগুলো পাকড়াও করবে। মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। আর মুমিনগণ নাযাত পাবেন। প্রথম দল হবে সত্তর হাজার লোকের, তাদের কোন হিসাবই নেয়া হবে না। তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমা রাতের চাদের ন্যায় উজ্জ্বল। তারপর আরেক দল আসবে তাদের মুখমণ্ডল হবে আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের ন্যায় দীপ্ত। এভাবে পর্যায়ক্রমে সকলে পার হয়ে যাবে। তারপর শাফাআতের অনুমতি প্রদান করা হবে। ফলে সকলেই শাফা’আত করবে। এমনকি যে ব্যক্তি “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ” স্বীকার করেছে এবং যার অন্তরে সামান্য যব পরিমাণ ঈমান অবশিষ্ট আছে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে। পরে এদেরকে জান্নাতের আঙিনায় জমায়েত করা হবে, আর জান্নাতীগণ তাদের গায়ে পানি সিঞ্চন করবেন, ফলে তারা এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে যেমনভাবে কোন উদ্ভিদ স্রোতবাহিত পানির ধারে সতেজ হয়ে উঠে। আগুনে পোড়া দাগসমূহ মুছে যাবে। এরপর তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা জানাবে। আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করবেন। তাদের প্রত্যেককে পৃথিবীর ন্যায় এবং তৎসহ আরো দশগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। সহিহ মুসলিম : ১৯১

৫. মুমিনগন তাদের আমল অনুসারে পুলসিরাত পার হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা’আলা সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। মু’মিনগণ দাঁড়িয়ে থাকবে। জান্নাত তাদের নিকটবর্তী করা হবে। অবশেষে সবাই আদমের নিকট এসে বলবে, আমাদের জন্য জান্নাত খুলে দেয়ার প্রার্থনা করুন। আদম (আঃ) বলবেন, তোমাদের পিতা আদমের পদস্খলনের কারণেই তো তোমাদেরকে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়েছিল। সুতরাং আমি এর যোগ্য নই। আমার পুত্র ইবরাহীমের নিকট যাও। তিনি আল্লাহর বন্ধু। এরপর সবাই ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, না, আমিও এর যোগ্য নই, আমি আল্লাহর বন্ধু ছিলাম বটে, তবে তা ছিল দূরে দূরে থেকে। তোমরা মূসার নিকট যাও। কারণ তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি বাক্যালাপ করেছেন। সবাই মূসার নিকট আসবে। তিনি বলবেনঃ আমিও এর যোগ্য নই বরং তোমরা ঈসার নিকট যাও। তিনি আল্লাহর কালিমাহ ও রূহ। (সবাই তার নিকট আসলে) তিনি বলবেনঃ আমি তার উপযুক্ত নই। তখন সকলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসবে।

তিনি দু’আর নিমিত্ত দাঁড়াবেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করা হবে। আমানাত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, পুল-সিরাতের ডানে-বামে এসে দাঁড়াবে। আর তোমাদের প্রথম দলটি এ সিরাতে, বিদ্যুৎ গতিতে পার হয়ে যাবে। সাহাবা বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক। আমাকে বলে দিন “বিদ্যুৎ গতির ন্যায়” কথাটির অর্থ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আকাশের বিদ্যুৎ চমক কি কখনো দেখনি? চোখের পলকে এখান থেকে সেখানে চলে যায় আবার ফিরে আসে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বায়ুর বেগে, পাখির গতিতে, তারপর লম্বা দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে তা অতিক্রম করবে। আর তোমাদের নবী সে অবস্থায় পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দু’আ করতে থাকবে, আল্লাহ এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন, এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন।

এরূপে মানুষের আমল মানুষকে চলতে অক্ষম করে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা এ সিরাত অতিক্রম করতে থাকবে। শেষে এক ব্যক্তিকে দেখা যাবে সে নিতম্বের উপর ভর করে পথ অতিক্রম করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, সিরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। এরা আল্লাহর নির্দেশত্রুমে চিহ্নিত পাপীদেরকে পাকড়াও করবে। তন্মধ্যে কাউকে তো ক্ষত-বিক্ষত করেই ছেড়ে দিবে; অতঃপর সে নাজাত পাবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, শপথ সে সত্তার যার হাতে আবূ হুরাইরাহর প্রাণ! জেনে রেখ, জাহান্নামের গভীরতা সত্তর খারীফ (অর্থাৎ- সত্তর হাজার বছরের পথের ন্যায়। সহিহ মুসলিম : ১৯৫

৬. জাহান্নাম ও জান্নাতের মধ্যে একটি সেতু থাকবে।

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِذَا خَلَصَ الْمُؤْمِنُونَ مِنْ النَّارِ حُبِسُوا بِقَنْطَرَةٍ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ فَيَتَقَاصُّونَ مَظَالِمَ كَانَتْ بَيْنَهُمْ فِي الدُّنْيَا حَتَّى إِذَا نُقُّوا وَهُذِّبُوا أُذِنَ لَهُمْ بِدُخُولِ الْجَنَّةِ فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لأحَدُهُمْ بِمَسْكَنِهِ فِي الْجَنَّةِ أَدَلُّ بِمَنْزِلِهِ كَانَ فِي الدُّنْيَا وَقَالَ يُونُسُ بْنُ مُحَمَّدٍ حَدَّثَنَا شَيْبَانُ عَنْ قَتَادَةَ حَدَّثَنَا أَبُو الْمُتَوَكِّلِ

যখন মু’মিনগণ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে, তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি সেতুতে (ক্বানত্বরাহ) আটকে রাখা হবে। সেখানে দুনিয়াতে তাদের পরস্পরের মধ্যে যে সব জুলুম ও অন্যায় ছিল, তার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা সম্পূর্ণ পরিশুদ্ধ ও পবিত্র হবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! তাদের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তি তার দুনিয়ার বাসস্থানের চেয়ে জান্নাতের বাসস্থানকে অধিক সহজে চিনবে। সহিহ বুখারি : ২৪৪০, ৬৫৩৫

আল আরাফ :

আরাফ (الأعراف) হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে অবস্থিত একটি উঁচু স্থান বা প্রাচীর। এর নামেই কুরআনের একটি সূরার নামকরণ করা হয়েছে, সূরা আল-আরাফ। যারা এখানে অবস্থান করবে, তাদের বলা হয় ‘আহলুল আ’রাফ’ (আরাফবাসী)। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আ’রাফের ৪৬ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াতে আরাফের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলো থেকে আরাফ সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হলো

১. আরাফের অবস্থান :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَبَیْنَہُمَا حِجَابٌ ۚ وَعَلَی الْاَعْرَافِ رِجَالٌ یَّعْرِفُوْنَ کُلًّۢا بِسِیْمٰہُمْ ۚ وَنَادَوْا اَصْحٰبَ الْجَنَّۃِ اَنْ سَلٰمٌ عَلَیْکُمْ ۟ لَمْ یَدْخُلُوْہَا وَہُمْ یَطْمَعُوْنَ

আর তাদের মধ্যে থাকবে পর্দা এবং আরাফের উপর থাকবে কিছু লোক, যারা প্রত্যেককে তাদের চি‎‎হ্ন দ্বারা চিনবে। আর তারা জান্নাতের অধিবাসীদেরকে ডাকবে যে,‘তোমাদের উপর সালাম’। তারা (এখনো) তাতে প্রবেশ করেনি তবে তারা আশা করবে। সূরা আরাফ : ৪৬

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আরাফ হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে একটি উঁচু স্থান, যা থেকে উভয় স্থানই দেখা যাবে।

২. আরাফবাসীদের অবস্থা

আরাফবাসীরা জান্নাত ও জাহান্নাম উভয় দিকেই তাকিয়ে থাকবে। তারা জান্নাতবাসীদের দিকে তাকিয়ে শান্তি ও স্বস্তির অনুভূতি প্রকাশ করবে এবং জাহান্নামবাসীদের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাইবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَادٰۤی اَصْحٰبُ الْاَعْرَافِ رِجَالًا یَّعْرِفُوْنَہُمْ بِسِیْمٰہُمْ قَالُوْا مَاۤ اَغْنٰی عَنْکُمْ جَمْعُکُمْ وَمَا کُنْتُمْ تَسْتَکْبِرُوْنَ

আর আ‘রাফের অধিবাসীরা এমন লোকদেরকে ডাকবে, যাদেরকে তারা চিনবে তাদের চি‎‎হ্নর মাধ্যমে, তারা বলবে, ‘তোমাদের দল এবং যে বড়াই তোমরা করতে তা তোমাদের উপকারে আসেনি’। সূরা আরাফ : ৪৮

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, আরাফবাসীরা সেইসব লোকদের চিনতে পারবে যারা দুনিয়াতে অহংকার করত।

আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ঈমানদারদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি একটি পুলের উপর আটক রাখা হবে এবং দুনিয়াতে পরস্পর পরস্পরে যা অন্যায়-অবিচার হয়েছিল তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সবশেষে যখন তারা পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমি মুহাম্মাদের প্রাণ! মু’মিনদের প্রত্যেকে পৃথিবীতে তার নিজ বাড়িকে যেমনিভাবে চিনত, তার তুলনায় সে জান্নাতে তার স্থান ভালোরূপে চিনতে পারবে। সহীহঃ বুখারী ৬৫৩৫, মিশকাত : ৫৫৮৯, মুসনাদে আহমাদ : ১১১১৩,

৩. আরাফবাসী কারা হবেন?

ইসলামী পণ্ডিত ও মুফাসসিরগণের মতে, আরাফবাসীরা হবেন এমন কিছু মানুষ, যাদের নেকি ও বদির পাল্লা সমান সমান হবে। অর্থাৎ, তাদের ভালো কাজ ও মন্দ কাজের পরিমাণ এতটাই সমান হবে যে, তাদের সরাসরি জান্নাতে বা জাহান্নামে পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এই ব্যক্তিদের আমলনামা ওজন করার পর দেখা যাবে যে, তাদের নেকি ও বদির পাল্লা সমান হয়ে গেছে। ফলে তারা সরাসরি জান্নাতে যাওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারবে না, আবার জাহান্নামেও যাবে না। আরাফবাসীরা দীর্ঘদিন সেই স্থানে অবস্থান করবে এবং আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় থাকবে। অবশেষে আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে।

আরাফ সম্পর্কে সরাসরি হাদিসের সংখ্যা কম, তবে কিছু হাদিস ও সাহাবিদের ব্যাখ্যায় এর ধারণা পাওয়া যায়। এই হাদিসগুলো মূলত সূরা আল-আ’রাফের আয়াতের ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে।

ইবনে মাসউদ (রা.)-কে আরাফবাসী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “তারা এমন কিছু লোক যাদের নেকি ও বদির পাল্লা সমান হয়ে গেছে। তাদের নেকিগুলো তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেনি, আবার তাদের বদিগুলো তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাতে পারেনি। তাই তারা আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় আরাফে অবস্থান করবে।”  তাফসীরে ইবনে কাসীর-এ এই বর্ণনাটি উল্লেখ করা হয়েছে, যা সাহাবিদের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে। এটি সরাসরি মারফু হাদিস নয়, বরং মুফাসসিরদের তাফসীরের অংশ।

আরাফবাসীদের পরিচয় সম্পর্কে হাদীসে এসেছে: হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-

আরাফবাসী হলো এমন এক দল, যাদের সৎকর্ম এত পরিমাণ যে তা তাদের জাহান্নামে যেতে দেয় না আবার পাপাচার এত পরিমাণ যে তা জান্নাতে প্রবেশ করতে দেয় না। (অর্থাৎ পাপ ও পুণ্য সমানে সমান) যখন তাদের মুখ জাহান্নামবাসীদের দিকে ফেরানো হবে তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে যালিম কওমের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। তারা এমনি অবস্থায় থাকবে। তখন তোমার প্রতিপালক বলবেন, যাও, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো। তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম”। মুস্তাদরাকে হাকিম : ৩২৪৭, ৪৪২৯।

সহিহ ইবনে খুযাইমা : ২৪৬৩

কিয়ামতের দিনে যখন মুমিনরা তাদের ঈমান ও আমলের কারণে নূর বা আলো পাবে, তখন মুনাফিক পুরুষ ও নারীরাও তাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু মুনাফিকদের কোনো আলো থাকবে না। মুমিনদের নূর দেখে তারা তাদের কাছে মিনতি করবে, যেন মুমিনরা একটু থামে এবং তাদের নূর থেকে কিছু আলো নিতে দেয়। কিন্তু মুমিনদেরকে বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং নূরের সন্ধান কর।’ এর অর্থ হলো, দুনিয়াতে তারা ঈমানের আলো গ্রহণ করেনি, তাই সেদিনও তারা তা পাবে না। তাদের বলা হবে, তারা যেন দুনিয়াতে ফিরে গিয়ে নূরের সন্ধান করে, যা তাদের জন্য অসম্ভব। এটি হবে তাদের প্রতি এক ধরনের উপহাস এবং হতাশার চূড়ান্ত প্রকাশ। এর পর তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর স্থাপন করা হবে। এই প্রাচীরের বৈশিষ্ট্য হলো:

১. অভ্যন্তরীণ অংশে এই দিকে থাকবে রহমত। এই অংশটি মুমিনদের দিকে থাকবে, যেখানে জান্নাতের শান্তি, আনন্দ ও আল্লাহর দয়া থাকবে।

২. বাহ্যিক অংশে থাকবে আযাব। এটি মুনাফিকদের দিকে থাকবে, যেখানে জাহান্নামের যন্ত্রণা ও কষ্ট থাকবে।

এই প্রাচীরটি মুমিন ও মুনাফিকদের চিরতরে আলাদা করে দেবে। মুনাফিকরা আর কখনো মুমিনদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না এবং তারা আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের সুখ থেকেও বঞ্চিত হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

یَوْمَ یَقُوْلُ الْمُنٰفِقُوْنَ وَالْمُنٰفِقٰتُ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِکُمْ ۚ  قِیْلَ ارْجِعُوْا وَرَآءَکُمْ فَالْتَمِسُوْا نُوْرًا ؕ  فَضُرِبَ بَیْنَہُمْ بِسُوْرٍ لَّہٗ بَابٌ ؕ  بَاطِنُہٗ فِیْہِ الرَّحْمَۃُ وَظَاہِرُہٗ مِنْ قِبَلِہِ الْعَذَابُ ؕ

সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীগণ ঈমানদারদের বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য অপেক্ষা কর, তোমাদের নূর থেকে আমরা একটু নিয়ে নেই’, বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং নূরের সন্ধান কর,’ তারপর তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর স্থাপন করে দেয়া হবে, যাতে একটি দরজা থাকবে। তার ভিতরভাগে থাকবে রহমত এবং তার বহির্ভাগে থাকবে আযাব। সূরা হাদীদ : ১৩

জান্নাতের বিবরণ : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

জান্নাত (جَنَّة) :

জান্নাত (جَنَّة) একটি আরবি শব্দ যার শাব্দিক অর্থ হলো বাগান, উদ্যান বা আবৃত স্থান। ফারসি ভাষায় একে বেহেশত এবং বাংলায় একে স্বর্গ বলা হয়। কুরআনে জান্নাত (جَنَّة) এর মূল শব্দ দুই শতাধীক স্থানে ব্যবহৃত হলেও জান্নাত (جَنَّة) শব্দটি কুরআনে প্রায় ১৪৭ স্থানে এসেছে। এই সংখ্যায় এর একবচন, দ্বিবচন এবং বহুবচন উভয় রূপই অন্তর্ভুক্ত। তবে, এর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ‘বাগান’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন দুনিয়ার বাগান, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি পরকালের পুরস্কার হিসেবে ‘জান্নাত’ বা ‘বেহেশত’ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ইসলামী পরিভাষায়, জান্নাত হলো এমন একটি স্থান যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর অনুগত ও সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য পরকালে পুরস্কার হিসেবে তৈরি করে রেখেছেন। এটি সাধারণ বাগান নয় বরং এক চিরস্থায়ী বাসস্থান যার বর্ণনা কল্পনাতীত সৌন্দর্য, শান্তি ও প্রাচুর্যে ভরপুর। কুরআন হাদিসে জান্নাতকে এমন এক স্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যেখানে কোনো দুঃখ, কষ্ট, ক্লান্তি বা অসুস্থতা থাকবে না। সেখানে সময় চিরন্তন আনন্দ ও স্বস্তিতে কাটবে। জান্নাতের অধিবাসীরা এমন সব নেয়ামত লাভ করবেন যা তারা পৃথিবীতে কখনো কল্পনাও করেননি।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পার-

فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَہُمۡ مِّنۡ قُرَّۃِ اَعۡیُنٍ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ। সুরা সিজদা:১৩। সহিহ বুখারি: ৩২৪৪, ৪৭৭৯, ৪৭৮০, ৭৪৯৮, সহিহ মুসলিম : ২৮২৪, তিরমিযী ৩১৯৭, ইবনু মাজাহ ৪৩২৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ ১৯৭৮, সহীহুল জামি ৪৩০৭, আবূ ইয়া’লা : ৬২৭৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৩৬৯, শু’আবূল ঈমান : ৩৮২, দারিমী : ২৮২৮, আহমাদ : ৯৬৫৫।

হল ইবনু সা‘দ আস্সা‘য়িদী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জান্নাতে চাবুক পরিমাণ সামান্য জায়গাও দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা আছে তার থেকে উত্তম। সহিহ : ৩২৫০

জান্নাতের মধ্যে রয়েছে সুন্দর সবুজে ভরা বাগান, দুধ, মধু ও শরাবের ঝরনা, এবং নানা ধরনের সুস্বাদু ফলমূল। সবচেয়ে বড় নেয়ামত হিসেবে উল্লেখ করা হয় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

জান্নাতকে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি স্তর তার অধিবাসীর আমল বা সৎকর্মের মানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরকে ‘জান্নাতুল ফিরদাউস’ বলা হয়। এটি এমন এক স্থান, যেখানে পৌঁছানো জীবনের পরম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। জান্নাত কোনো অলৌকিক বা অবাস্তব কল্পনা নয়, বরং এটি একটি বাস্তব স্থান যা আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে তৈরি করেছেন। বিশ্বাসীদের জন্য এটি হলো তাদের পার্থিব জীবনের সকল ত্যাগ ও ধৈর্যের চূড়ান্ত প্রতিদান। জান্নাতের আকাঙ্ক্ষা মুসলিমদের সৎ পথে চলতে এবং ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করে। এটি শুধু একটি পুরস্কারই নয়, বরং তা মানব জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রকাশ।

১. জান্নাত সম্পর্কে সাধারণ ধারণা

জান্নাত এক অতুলনীয় শান্তিনিবাস যা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নজিরবিহীন বাস স্থান। জান্নাতের কোনো কিছুকেই দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। সেখানে সবকিছুই অনন্য এবং অতুলনীয়। এর আলো, সৌরভ, অট্টালিকা, খাবার এবং অন্যান্য সব নেয়ামত মানুষের কল্পনার বাইরে। জান্নাতের অট্টালিকাগুলো সোনা ও রুপার ইঁট দিয়ে তৈরি, যার গাঁথুনি হলো মেশকের সুগন্ধি। এর মাটি জাফরান দ্বারা আবৃত। এই বর্ণনাগুলো প্রতীকী অর্থে জান্নাতের ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের বিশালতা প্রকাশ করে। যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে চিরসুখী হবে, কোনো কষ্ট পাবে না এবং কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। তার পোশাক পুরোনো হবে না এবং যৌবনও নষ্ট হবে না। এটি জান্নাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী সুখ ও কষ্টের বিপরীতে জান্নাত হলো চিরস্থায়ী আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের স্থান।

وَاِذَا رَاَیۡتَ ثَمَّ رَاَیۡتَ نَعِیۡمًا وَّمُلۡکًا کَبِیۡرًا

তুমি দেখলে সেখানে দেখতে পাবে ভোগ-বিলাসের উপকরণ এবং বিশাল রাজ্য। সূরা ইনসান : ২০

এই আয়াতটি জান্নাতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে:

বিশাল রাজ্য (مُلْكًا كَبِيرًا): জান্নাত শুধু একটি আরামদায়ক স্থান নয়, বরং এটি একটি বিশাল সাম্রাজ্য। মুমিনরা সেখানে তাদের ইচ্ছানুযায়ী সবকিছু লাভ করবে। প্রতিটি মুমিনকে এমন একটি রাজ্য দেওয়া হবে, যার পরিসীমা হবে বিশাল। এই রাজ্য হবে তার নিজস্ব রাজত্ব, যেখানে তার কোনো কিছুর অভাব থাকবে না।

ভোগ-বিলাস (نَعِيمًا): জান্নাতে প্রতিটি আনন্দের উপকরণ থাকবে, যা মানব মনকে তৃপ্ত করবে এবং চোখকে শীতল করবে। সেখানে থাকবে ফল, খাদ্য, পানীয়, এবং সুন্দর সঙ্গিনী। এই নেয়ামতগুলো শুধু ভোগের জন্য নয়, বরং এর মাধ্যমে মুমিনরা তাদের সব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারবে।

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, বদরের যূদ্ধে হারিসা (রাঃ) আদৃশ্য তীরের আঘাতে শাহাদাতবরণ করলে তার মাতা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আগমন করে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার অন্তরে হারিসার স্নেহ-মমতা যে কত গভীর তা তো আপনি জানেন। অতএব সে যদি জান্নাত লাভ করে তবে আমি তার জন্য কান্নাকাটি করব না। আর যদি ব্যতিক্রম হয় তবে আপনি অচিরেই দেখতে পাবেন আমি কি করি। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তুমি তো নির্বোধ। জান্নাত কি একটি, না কি অনেক? আর সে তো সবচেয়ে উন্নতমানের জান্নাত ফিরদাউসে রয়েছে। তিনি আরও বললেনঃ এক সকাল বা এক বিকাল আল্লাহর রাস্তায় চলা দুনিয়া ও তার মধ্যবর্তী সবকিছুর চাইতে উত্তম। তীরের দু’প্রান্তের দূরত্বের সমান বা কদম পরিমাণ জান্নাতের জায়গা দুনিয়া ও তৎমধ্যবর্তী সবকিছুর চাইতে উত্তম। জান্নাতের কোন নারী যদি দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিপাত করে তবে সমস্ত দুনিয়া আলোকিত ও খুশবুতে মোহিত হয়ে যাবে। জান্নাতি নারীর নাসীফ (ওড়না) দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে উত্তম। সহিহ বুখারী : ৬৫৬৮, সহিহ মুসলিম : ১৮৮৩, সুনানে তিরমিযী : ১৬৪৮, সুনানে আবূ দাউদ : ২৭৫৬, সুনানে নাসায়ী : ৩১১৯, সহীহুল জামি : ৪১৫১, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৯৮

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: জান্নাতে একটি চাবুক রাখা পরিমাণ স্থান গোটা দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, তা থেকে উত্তম। সহহি বুখারী : ৩২৫০, মিশকাত : ৫৬১৩, সুনানে তিরমিযী : ৩০১৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩৩০, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১৯৭৮, সহীহুল জামি : ৬৬৩৫, আবূ ইয়ালা : ৭৫১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৪১৭, তবারানী : ৫৬২১, হাকিম : ৩১৭০, বায়হাকী : ১৮৯৬১

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যার সম্পর্কে কোন মানুষের মনে ধারণাও জন্মেনি। তোমরা চাইলে এ আয়াতটি পাঠ করতে পার-

فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٌ مَّاۤ اُخۡفِیَ لَہُمۡ مِّنۡ قُرَّۃِ اَعۡیُنٍ ۚ جَزَآءًۢ بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার বিনিময়স্বরূপ। সুরা সিজদা:১৩। সহিহ বুখারি: ৩২৪৪, ৪৭৭৯, ৪৭৮০, ৭৪৯৮, সহিহ মুসলিম : ২৮২৪, আহমাদ : ৯৬৫৫।

২. জান্নাতে সংখ্যা ও নাম

আমাদের সমাজে ব্যাপকভারে আটটি জান্নাতের নাম উল্লেখ করলেও আসলে সে নামগুলি সবই জান্নাতের গুণবাচক নাম। অবশ্য কোন কোন জান্নাতের নাম স্পষ্টতভাবে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ হয়েছে। আাবার অনেক স্থানে জান্নাতের দরজার কথা বলা হয়েছে। অনেকে ঐ দরজার নামকেই জান্নাতের নাম হিসেবে উল্লেখে করেছেন। একটি সহিহ হাদিসে বুঝা যায জান্নাতের আটি দরজা আছে। ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে তিরমিযী ৫৫, সুনানে নাসায়ী ১৪৮, আহমাদ ১৬৯৪২।

বিভিন্ন তাফসীরের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে আটি দরজা মানে আটটি জান্নাত। তবে একটি জান্নাতের আটটি দরজা থাকাও অমূল নয়। কোন কোন মুফাস্সির সরাসরি আটটি জান্নাতের নাম উল্লেখ করেছে। আটটি জান্নাতের নাম ও বর্ণনা কুরআন হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হলো। জান্নাতের নামগুলো হলো-

ক. জান্নাতুল ফিরদাউস (جَنَّةُ الْفِرْدَوْسِ): জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর।

খ. জান্নাতুল আদ্‌ন (جَنَّةُ عَدْنٍ): চিরস্থায়ী আরামের বাগান।

গ. জান্নাতুন নাঈম (جَنَّةُ النَّعِيْمِ): নেয়ামত ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বাগান।

ঘ. জান্নাতুল মা’ওয়া (جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ): প্রকৃত আশ্রয়স্থল।

ঙ. জান্নাতুল খুলদ (دَارُ الْخُلْدِ): চিরস্থায়ী নিবাস।

চ. দারুস সালাম (دَارُ السَّلَامِ): শান্তির নিবাস।

ছ. দারুল মুক্বামাহ (دَارُ الْمُقَامَةِ): স্থায়ী বসবাসের স্থান।

জ. দারুল কারার (دَارُ الْقَرَارِ): শেষ পরিণতি বা চূড়ান্ত আবাস।

ক. জান্নাতুল ফিরদাউস

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَانَتۡ لَہُمۡ جَنّٰتُ الۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ۙ

নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সুরা কাহফ : ১০৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِیۡنَ یَرِثُوۡنَ الۡفِرۡدَوۡسَ ؕ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

অধিকারী হবে ফিরদাউসের, যাতে তারা (মুমিনগণ) বসবাস করবে চিরকাল।সুরা মুমিনুন : ১১

হারিসা (রাঃ) জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করেছ

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলতেন, হারিসাহ (রাঃ) একজন নও জওয়ান লোক ছিলেন। বদর যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করার পর তাঁর আম্মা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! হারিসাহ আমার কত প্রিয় ছিল আপনি তা অবশ্যই জানেন। সে যদি জান্নাতী হয় তাহলে আমি সবর করব এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াবের আশা পোষণ করব। আর যদি ব্যাপার অন্য রকম হয় তাহলে আপনি তো দেখতেই পাবেন, আমি যা করব। তখন তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার কী হল, তুমি কি অজ্ঞান হয়ে গেলে? জান্নাত কি একটি? জান্নাত অনেকগুলি, সে তো জান্নাতুল ফিরদাউসে রয়েছে। সহিহ বুখারি : ৩৯৮২

জান্নাতুল ফিরদাউস সর্বোচ্চ জান্নাত

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি যে ঈমান আনল, সালাত আদায় করল ও রমাযানের সিয়াম পালন করল সে আল্লাহর পথে জিহাদ করুক কিংবা স্বীয় জন্মভূমিতে বসে থাকুক, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব হয়ে যায়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি লোকদের এ সুসংবাদ পৌঁছে দিব না? তিনি বলেন, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতে একশ’টি মর্যাদার স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। দু’টি স্তরের ব্যবধান আসমান ও যমীনের দূরত্বের মত। তোমরা আল্লাহর নিকট চাইলে ফেরদাউস চাইবে। কেননা এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। আমার মনে হয়, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এও বলেছেন, এর উপরে রয়েছে আরশে রহমান। আর সেখান থেকে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে। মুহাম্মদ ইবনু ফুলাইহ্ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে (নিঃসন্দেহে) বলেন, এর উপর রয়েছে আরশে রহমান। সহিহ বুখারি : ২৭৯০, ৭৪২৩

খ. জান্নাতুল আদন

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ ۖ لَهُمْ فِيهَا مَا يَشَاءُونَ ۚ كَذَٰلِكَ يَجْزِي اللَّهُ الْمُتَّقِينَ

তারা প্রবেশ করবে জান্নাতুল আদন (স্থায়ী জান্নাতসমূহ) যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। তারা চাইবে, তাদের জন্য তার মধ্যে তাই থাকবে। এভাবেই আল্লাহ মুত্তাকীদের প্রতিদান দেন। সুরা নাহল : ৩১

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ۖ وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ

তারা প্রবেশ করবে জান্নাতুল আদন-এ (স্থায়ী জান্নাতসমূহ), যেখানে তাদের স্বর্ণ-নির্মিত কঙ্কণ ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং যেখানে তাদের পোশাকপরিচ্ছদ হবে রেশমের। (ফাত্বিরঃ ৩৩)

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَٰنُ عِبَادَهُ بِالْغَيْبِ ۚ إِنَّهُ كَانَ وَعْدُهُ مَأْتِيًّا

সেই জান্নাতুল আদন (স্থায়ী জান্নাতসমূহ), যার প্রতিশ্রুতি পরম দয়াময় নিজ দাসদেরকে অদৃশ্যভাবে দিয়েছেন; নিশ্চয় তার প্রতিশ্রুত বিষয় অবশ্যম্ভাবী। সুরা মরিয়াম : ৬১

এ ছাড়া আরো বহু আয়াতে (তাওবা-৭২, রাদ-২৩, ইবরাহীম-৩১, কাহফ-৩১, ত্বহা-৭৬, ফাতির-৩৩, সাদ-৫০, গাফির-৮, সফ-১২, বাইয়েনা-৮) এ জান্নাতের কথা উল্লিখিত হয়েছে।

গ. জান্নাতুন নাঈম

নাঈম মানে সম্পদশালী, সুখময়। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ يَهْدِيهِمْ رَبُّهُم بِإِيمَانِهِمْ ۖ تَجْرِي مِن تَحْتِهِمُ الْأَنْهَارُ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ

নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের রব ঈমানের কারণে তাদেরকে পথ দেখাবেন, জান্নাতুন নাঈম-এ (আরামদায়ক জান্নাতসমূহে) যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত। সুরা ইউনুস : ৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ جَنَّاتُ النَّعِيمِ

নিশ্চয় যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, তাদের জন্য আছে জান্নাতুন নাঈম (সুখের উদ্যান)। সুরা লোকমান : ৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتِ النَّعِيمِ

আল্লাহভীরুদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই জান্নাতুন নাঈম (ভোগ-বিলাসপূর্ণ জান্নাত) রয়েছে। কালাম : ৩৪

ইব্রাহীম (আঃ) এই জান্নাত চেয়ে দুআ করে বলেছিলেন-

وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ

আমাকে সুখকর (নাঈম) জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর। সুরা শুয়ারা : ৬৫

ঘ. জান্নাতুল মাওয়া

মা’ওয়া মানে ঠিকানা বা বাসস্থান। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ فَلَہُمۡ جَنّٰتُ الۡمَاۡوٰی  نُزُلًۢا بِمَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ

যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের বাসস্থান হবে জান্নাত, তারা যা করত তার আপ্যায়ন হিসেবে। সুর সিজদা : ১৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ (13) عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ (14) عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ (15)

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল। সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার কাছে জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত। সুনা নাজম : ১৩-১৫

ঙ. জান্নাতুল খুলদ

খুলদ  মানে চিরস্থায়ী। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ اَذٰلِکَ خَیۡرٌ اَمۡ جَنَّۃُ الۡخُلۡدِ الَّتِیۡ وُعِدَ الۡمُتَّقُوۡنَ ؕ کَانَتۡ لَہُمۡ جَزَآءً وَّمَصِیۡرًا

বল, সেটা উত্তম না  জান্নাতুল খুলদ (স্থায়ী জান্নাত), মুত্তাকীদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তা হবে তাদের পুরস্কার ও প্রতাবর্তনস্থল। সুরা ফুরকান : ১৫

সাহাবী ইবনে মাসউদ দুআয় বলেছিলেন,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ إِيمَانًا لا يَرْتَدُّ , وَنَعِيمًا لا يَنْفَدُ , وَمُرَافَقَةَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَعْلَى غُرَفِ جَنَّةِ الْخُلْدِ.

হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এমন ঈমান চাই, যা কখনও ফিরে যায় না। এমন নেয়ামত চাই, যা কখনও শেষ হয় না এবং জান্নাতুল খুলদের সর্বোচ্চ কক্ষগুলোতে নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সঙ্গ চাই। সহীহাহ : ২৩০

চ. দারুস সালাম

দারুস সালাম’ মানে শান্তিনিকেতন। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

لَهُمْ دَارُ السَّلَامِ عِندَ رَبِّهِمْ ۖ وَهُوَ وَلِيُّهُم بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদের জন্য রয়েছে দারুস সালাম (শান্তির আলয়) এবং তারা যা করত, তার কারণে তিনি হবেন তাদের অভিভাবক। সুরা আনাম : ১২৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَىٰ دَارِ السَّلَامِ وَيَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

আল্লাহ (মানুষ)- কে দারুস সালাম-এর (শান্তির আবাসের) দিকে আহবান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সরল পথ প্রদর্শন করেন। সুরা ইউনুস : ২৫

ছ. দারুল মুক্বামাহ

দারুল মুক্বামাহ মানে স্থায়ী। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِي أَحَلَّنَا دَارَ الْمُقَامَةِ مِن فَضْلِهِ لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٌ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٌ

যিনি নিজ অনুগ্রহে, আমাদেরকে দারুল মুক্বামাহ (স্থায়ী আবাস) দান করেছেন; যেখানে আমাদেরকে কোন প্রকার ক্লেশ স্পর্শ করে না এবং স্পর্শ করে না। কোন প্রকার ক্লান্তি। সুরা ফাতির : ৩৫

জ. দারুল কারার

দারুল ক্বারার মানে চিরস্থায়ী আবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَا قَوْمِ إِنَّمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا مَتَاعٌ وَإِنَّ الْآخِرَةَ هِيَ دَارُ الْقَرَارِ

হে আমার সম্প্রদায়! এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আর নিশ্চয় পরকাল হচ্ছে দারুল কারার (চিরস্থায়ী আবাস)। সুরা মুমিন : ৩৯

এই আটটি জান্নাত ছাড়াও কুরআনে আরও একটি জান্নাতের নামের কথা জানা যায়।

আদ-দারুল আখিরাহ

আদ-দারুল আখিরাহ মানে পরকালের আবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ ۖ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

 আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বই আর কিছুই নয় এবং যারা সাবধানতা অবলম্বন করে, তাদের জন্য পরকালের আবাসই (দারুল আখিরাহ) শ্রেয়, তোমরা কি (তা) অনুধাবন কর না? সুরা আনাম : ৩২

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

এ পরলোকের আবাস (দারুল আখিরাহ), যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। সুরা কাসাস : ৮৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا هَٰذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَهْوٌ وَلَعِبٌ ۚ وَإِنَّ الدَّارَ الْآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ ۚ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ

আর এ দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং নিশ্চয় আখিরাতের নিবাসই (দারুল আখিরাহ) হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। সুরা আনকাবুত : ৬৪

৩. জান্নাতে দরজা বা গেট :

জান্নাতের গেট সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَسِیۡقَ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا رَبَّہُمۡ اِلَی الۡجَنَّۃِ زُمَرًا ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَآءُوۡہَا وَفُتِحَتۡ اَبۡوَابُہَا وَقَالَ لَہُمۡ خَزَنَتُہَا سَلٰمٌ عَلَیۡکُمۡ طِبۡتُمۡ فَادۡخُلُوۡہَا خٰلِدِیۡنَ

আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌঁছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভাল ছিলে। অতএব স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ কর’। সূরা যুমার : ৭৩

এ আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হলো যে, জান্নাতে অনেকগুলো গেট আছে।

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোন মুসলিম ব্যাক্তি উত্তমরূপে অজু করার পর বলে-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

“আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তাঁর কোন শারীক নাই, তিনি একক এবং আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।

তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। সে যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা তাতে প্রবেশ করবে। ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে তিরমিযী ৫৫, সুনানে নাসায়ী ১৪৮, আহমাদ ১৬৯৪২।

এ হাদিসের আলোকে বলা হয় জান্নাতের আটটি গেট রয়েছে। গেটগুলো এত বিশাল যে, একটি গেটের দুপাটের মধ্যে দুরত্ব হলো মক্কা থেকে হিজর পর্যন্ত (প্রায় ১১৬০ কিলোমিটার) অথবা মক্কা থেকে বসরা পর্যন্ত (প্রায় ১২৫০ কি.মি)।

ক. আবূ বকর (রা.) সকল দরজা হতে ডাকা হবে

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কেউ আল্লাহর পথে জোড়া জোড়া ব্যয় করবে তাকে জান্নাতের দরজাসমূহ হতে ডাকা হবে, হে আল্লাহর বান্দা! এটাই উত্তম। অতএব যে সালাত আদায়কারী, তাকে সালাতের দরজা হতে ডাকা হবে। যে মুজাহিদ, তাকে জিহাদের দরজা হতে ডাকা হবে। যে সিয়াম পালনকারী, তাকে রাইয়্যান দরজা হতে ডাকা হবে। যে সাদাকা দানকারী, তাকে সাদাকার দরজা হতে ডাকা হবে। এরপর আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক, সকল দরজা হতে কাউকে ডাকার কোন প্রয়োজন নেই, তবে কি কাউকে সব দরজা হতে ডাকা হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হাঁ। আমি আশা করি তুমি তাদের মধ্যে হবে। সহিহ বুখারি : ১৮৯৭, ২৭৪১, ৩২১৬, ৩৬৬৬, মুসলিম : ১০২৭, ১১৫২, আহমাদ : ৭৬৩৭

খ. রাইয়্যান দরজা থেকে সিয়াম পালনকারীকে ডাকা হবে

সাহাল ইবন সাআদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতে একটি গেট রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন সিয়াম পালনকারীরাই শুধু সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। যখন তারা প্রবেশ করবে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না”। সহিহ বুখারি : ১৮৯৬, সহিহ মুসলিম : ১১৫২

গ. জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান ওয়াসিলা

আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর ইবনুল ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মুয়াযযিনের আযান শুনলে উত্তরে সে শব্দগুলোরই পুনরাবৃত্তি করবে। আযান শেষে আমার ওপর দরূদ পাঠ করবে। কারণ যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে (এর পরিবর্তে) আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। এরপর আমার জন্য আল্লাহর কাছে ’ওয়াসীলা’ প্রার্থনা করবে। ’ওয়াসীলা’ হলো জান্নাতের সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান, যা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু একজন পাবেন। আর আমার আশা এ বান্দা আমিই হব। তাই যে ব্যক্তি আমার জন্য ’ওয়াসীলা’র দু’আ করবে, কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে পড়বে। সহিহ মুসলিম : ৩৮৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ৫২৩, মিশকাত : ৬৫৭, সুনানে নাসায়ী : ৬৭৮, সুনানে তিরমিযী : ৩৬১৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ১৬৯০, ইরওয়া : ২৪২, সহীহ আল জামি : ৬১৩।

৪. জান্নাতের মাঝে বিভিন্ন স্তর হবে

আল্লাহ তায়ালব বলেন-

وَمَن يَأۡتِهِۦ مُؤۡمِنٗا قَدۡ عَمِلَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ فَأُوْلَٰٓئِكَ لَهُمُ ٱلدَّرَجَٰتُ ٱلۡعُلَىٰ ٧٥

আর যারা তাঁর নিকট আসবে মুমিন অবস্থায়, সৎকর্ম করে তাদের জন্যই রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদা। সূরা ত্বাহা, : ৭৫

আল্লাহ তায়ালব বলেন-

فَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ بِأَمۡوَٰلِهِمۡ وَأَنفُسِهِمۡ عَلَى ٱلۡقَٰعِدِينَ دَرَجَةٗۚ وَكُلّٗا وَعَدَ ٱللَّهُ ٱلۡحُسۡنَىٰۚ وَفَضَّلَ ٱللَّهُ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ عَلَى ٱلۡقَٰعِدِينَ أَجۡرًا عَظِيمٗا ٩٥ دَرَجَٰتٖ مِّنۡهُ وَمَغۡفِرَةٗ وَرَحۡمَةٗۚ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمًا

“নিজদের জান ও মাল দ্বারা জিহাদকারীদের মর্যাদা আল্লাহ বসে থাকাদের ওপর অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ প্রত্যেককেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং আল্লাহ জিহাদকারীদেরকে বসে থাকাদের উপর মহা পুরস্কার দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। তাঁর পক্ষ থেকে রয়েছে অনেক মর্যাদা, ক্ষমা ও রহমত। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”। সূরা নিসা : ৯৫-৯৬

এ সকল আয়াতের সবগুলোতে আমরা দেখতে পেলাম, আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে মর্যাদার বিভিন্ন স্তর রেখেছেন।

উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জান্নাতে একশতটি স্তর রয়েছে। প্রতি দুই স্তরের মাঝে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বর্তমান। ফিরদাউস হচ্ছে সবচেয়ে উঁচু স্তরের জান্নাত, সেখান থেকেই জান্নাতের চারটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয় এবং এর উপরেই (আল্লাহ তা’আলার) আরশ স্থাপিত। তোমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করার সময় ফিরদাউসের প্রার্থনা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩১ মিশকাত : ৫৬১৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৯২২,সহীহুল জামি : ৪২৪৫, আহমাদ : ৮৪০০, শু’আবূল ঈমান : ৪২৫৮

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-জান্নাতের একশত স্তর (ধাপ) রয়েছে। প্রত্যেক দু স্তরের মাঝখানে রয়েছে একশত বছরের ব্যবধান। সুনানে তিরমিজি : ২৫২৯, সহিহাহ : ৯২২

মু’আয ইবনু জাবাল (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক রামাযানের রোযা রেখেছে, নামায আদায় করেছে এবং বাইতুল্লাহর হাজ্জ আদায় করেছে, বর্ণনাকারী বলেন, মু’আয (রাযিঃ) যাকাতের কথা বলেছেন কি-না আমার মনে নেই, তার অপরাধ ক্ষমা করা আল্লাহ তা’আলার দায়িত্ব হয়ে যায়, চাই সে আল্লাহ তা’আলার রাস্তায় হিজরত করুক কিংবা আপন জন্মস্থানেই অবস্থান করুক। মু’আয (রাযিঃ) বলেন, আমি কি মানুষের নিকট এই খবর পৌছে দিব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ লোকদেরকে ’আমল করতে ছেড়ে দাও। কেননা, জান্নাতে একশ স্তর রয়েছে। প্রত্যেক দু’স্তরের মাঝখানে আসমান-যমীনের সমান ব্যবধান বিদ্যমান। আর সর্বোচ্চ ও সর্বোৎকৃষ্ট জান্নাত হচ্ছে ফিরদাউস। এর উপরেই রয়েছে আল্লাহ তা’আলার আরশ এবং এখান থেকেই জান্নাতের ঝর্ণাসমূহ প্রবাহমান। সুতরাং তোমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করার সময় ফিরদাউসের প্রার্থনা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫৩০, সহীহাহ : ৯২১