মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
প্রত্যেক প্রাণীর জন্য মৃত্যু অবধারিত। এই মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টিই অমর নয়। জন্ম হয়েছে যার, মৃত্যু তাকে স্পর্শ করবেই। এটি এমন এক অমোঘ বিধান, যা থেকে কেউ পালাতে পারবে না, তা সে যত শক্তিশালী, ধনী বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন। এই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি অতি আসক্ত না হতে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করেন। সকলকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে: মৃত্যুর পর জীবন শেষ হয়ে যায় না, বরং তা নতুন এক জীবনের দিকে যাত্রা। মৃত্যুর পর সকলকেই মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। সেখানে প্রতিটি কর্মের হিসাব নেওয়া হবে। এটি পুনরুত্থান এবং বিচার দিবসের প্রতি ইঙ্গিত। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, দুনিয়ার জীবনে যা কিছু করা হয়, তার সবকিছুর জন্য একদিন জবাবদিহি করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
کُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَۃُ الْمَوْتِ ۟ ثُمَّ اِلَیْنَا تُرْجَعُوْنَ
অর্থ : প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে, তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। সুনা আনকাবুত : ৫৭
মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর উর্দ্ধে নন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّکَ مَیِّتٌ وَّاِنَّہُمْ مَّیِّتُوْنَ ۫
অর্থ : নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল। সুরা জুমার : ৩০
কাফেররা মুহম্মদসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবিদ্রূপ করতো যে তিনি যদি সত্য নবী হন তবে মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করবে না। এরই প্রেক্ষিতে উক্ত আয়াত নাজেল হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبْلِكَ ٱلْخُلْدَۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلْخَـٰلِدُونَ–. كُلُّ نَفْسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلْمَوْتِۗ وَنَبْلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلْخَيْرِ فِتْنَةً۬ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
অর্থ : আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে? প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫
জম্মিলে মৃত্যু আছে, একথাটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য সে মানব শিশু হোক বা অন্য কিছু। যে দিন সে পৃথিবীতে জন্ম লাভ করে, তার পরের দিন থেকেই শুরু হয় তার মৃত্যুর দিকে পথযাত্রা। প্রতিটি জীবন মানেই মৃত্যু। নবী রসুলেরাও এর ব্যতিক্রম নয়। এর উর্দ্ধে নয় কোন অলী আওলিয়া বা কোন পূণ্যাত্মা মানুষ। পাপী ও পূণ্যাত্মা সকলেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে। জীবনের তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রত্যেক মানুষ এ তিনটি স্তর অতিক্রম করতে হবে।
ক. ইহকালীন জীবন
খ. বারযাখী জীবন
গ. পরকালীন জীবন বা চিরস্থায়ী জীবন, যার কোনো শেষ নেই।
ক. ইহকালীন জীবন (দুনিয়ার জীবন)
এটি আমাদের বর্তমান জীবন, যা আমরা এখন যাপন করছি। কুরআন ও সুন্নাহতে এই জীবনকে অস্থায়ী এবং পরীক্ষার স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
الَّذِیْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَیٰوۃَ لِیَبْلُوَکُمْ اَیُّکُمْ اَحْسَنُ عَمَلًا ؕ وَہُوَ الْعَزِیْزُ الْغَفُوْرُ ۙ
যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল। সুরা মুলক : ২
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন—কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম।” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:২)।
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ার জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষা। আয়াতে প্রথমেই “মৃত্যু” শব্দটি এসেছে, এরপর “জীবন” এতে আল্লাহর কুদরত ও পরিকল্পনার এক বিশেষ দিক রয়েছে। অনেক মুফাসসির বলেন, এখানে মৃত্যু আগে আনা হয়েছে, কারণ মানুষ দুনিয়াতে আসার আগেও একপ্রকার মৃত্যু বা অপ্রকাশিত অবস্থা ছিল। তারপর সে জন্মগ্রহণ করে। আবার মৃত্যুর পর আবার এক অনন্ত জীবন শুরু হবে। আল্লাহ মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন “পরীক্ষা করার জন্য”, এই দুনিয়া আসলে একটি ইমতিহানের ঘর। আমাদের কর্ম, চিন্তা, নিয়ত ও আচরণ এসবের মাধ্যমেই যাচাই হবে আমরা কতটুকু উত্তম বান্দা।
আল্লাহ দুনিয়ার জীবনকে ক্ষণস্থায়ী উপমা দিয়ে বলেছেন-
اِعْلَمُوْۤا اَنَّمَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَا لَعِبٌ وَّلَہْوٌ وَّزِیْنَۃٌ وَّتَفَاخُرٌۢ بَیْنَکُمْ وَتَکَاثُرٌ فِی الْاَمْوَالِ وَالْاَوْلَادِ ؕ کَمَثَلِ غَیْثٍ اَعْجَبَ الْکُفَّارَ نَبَاتُہٗ ثُمَّ یَہِیْجُ فَتَرٰىہُ مُصْفَرًّا ثُمَّ یَکُوْنُ حُطَامًا ؕ وَفِی الْاٰخِرَۃِ عَذَابٌ شَدِیْدٌ ۙ وَّمَغْفِرَۃٌ مِّنَ اللّٰہِ وَرِضْوَانٌ ؕ وَمَا الْحَیٰوۃُ الدُّنْیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الْغُرُوْرِ
তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। সুরা হাদিদ : ২০
আমাদের পরকালের প্রস্তুতি নিতে হবে। এই জীবনে আমরা যে আমল করি, তাই আমাদের পরকালের পাথেয়। আবূ ইয়ালা শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ও অকর্মন্য সেই ব্যক্তি যে তার নফসের দাবির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর নিকট বৃথা আশা করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৬০, সুনানে তিরমিযী : ২৪৫৯, মিশকাত : ৫২৮৯
খ. বারযাখী জীবন বা কবরের জীবন
মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সময়ের জীবনকে বারযাখী জীবন বলা হয়। এটি ইহকাল ও পরকালের মধ্যবর্তী একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لَعَلِّیْۤ اَعْمَلُ صَالِحًا فِیْمَا تَرَکْتُ کَلَّا ؕ اِنَّہَا کَلِمَۃٌ ہُوَ قَآئِلُہَا ؕ وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ
যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সুরা মুমিনুন : ১০০
গ. পরকালীন জীবন :
এটি জীবনের শেষ ও চূড়ান্ত পর্যায়, যার কোনো শেষ নেই। কিয়ামত বা পুনরুত্থানের পর এই জীবনের শুরু হবে। এই জীবনের শুরু হয় ইসরাফিলের শিঙ্গায় ফুৎকারের মাধ্যমে। তখন সকল মৃত মানুষ জীবিত হয়ে আল্লাহর সামনে একত্রিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ
যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও এবং মানুষ উপস্থিত হবে আল্লাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী। সূরা ইব্রাহিম : ৪৮
কিয়ামতের দিন সকলে একত্র হয়ে আল্লাহ সামনে সবাই যার যার হিসাব-নিকাশ দিবে। এ দিনকে বিচার দিবসও বলা হয়। এ দিন সকল মানুষকে তাদের ইহকালীন জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় কাজের হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلْیَوْمَ تُجْزٰی کُلُّ نَفْسٍۭ بِمَا کَسَبَتْ ؕ لَا ظُلْمَ الْیَوْمَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَرِیْعُ الْحِسَابِ
আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জন অনুসারে প্রতিদান দেয়া হবে। আজ কোন যুল্ম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী। সূরা গাফির :১৭
চূড়ান্ত বিচারের পর মুমিনদের ঠিকানা হবে জান্নাত এবং কাফির ও পাপীদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এই জীবন চিরস্থায়ী। জান্নাতের সুখ-শান্তি এবং জাহান্নামের কষ্ট কখনোই শেষ হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اِنَّ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَہُمْ جَنّٰتٌ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِہَا الْاَنْہٰرُ ۬ؕؑ ذٰلِکَ الْفَوْزُ الْکَبِیْرُ ؕ
যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের বাগানসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। এটাই মহা সফলতা।” সূরা আল-বুরুজ : ১১
আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম সম্পর্কে বলেছেন-
وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا لَہُمْ نَارُ جَہَنَّمَ ۚ لَا یُقْضٰی عَلَیْہِمْ فَیَمُوْتُوْا وَلَا یُخَفَّفُ عَنْہُمْ مِّنْ عَذَابِہَا ؕ کَذٰلِکَ نَجْزِیْ کُلَّ کَفُوْرٍ ۚ
আর যারা কুফরী করে, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তাদের প্রতি এমন কোন ফয়সালা দেয়া হবে না যে, তারা মারা যাবে, এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও লাঘব করা হবে না। এভাবেই আমি প্রত্যেক অকৃতজ্ঞকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। সূরা ফাতির : ৩৬
এই তিনটি পর্যায় একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। ইহকালীন জীবন হলো বারযাখী ও পরকালীন জীবনের সেতু। যে ব্যক্তি ইহকালে ভালোভাবে জীবন যাপন করবে, সে বারযাখ ও পরকালে সফলতা লাভ করবে।
মানুষ জীবনের ও তিনটি পর্যায় আমাদের আলোচ্য বিষয় শেষ দুটি অর্থাৎ বারজখ ও পরকালের জীবন।
বারযাখী জীবন
বারযাখী জীবন (الحياةُ البَرزَخِيَّةُ ) :
মানুষের জীবনচক্র তিনটি মূল স্তরে বিভক্ত- দুনিয়ার জীবন, বারযাখী জীবন, এবং আখিরাতের জীবন। এর মধ্যে “বারযাখী জীবন” সবচেয়ে রহস্যময় ও অদৃশ্য জগৎ। দুনিয়ার জীবন ও কিয়ামতের পরের স্থায়ী জীবনের মাঝে একটি অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা হলো বারযাখ—যেখানে প্রতিটি মানুষের আত্মা তার মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত অবস্থান করবে। এটি কুরআন ও সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
বারযাখ (بَرْزَخٌ) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো- “আড়াল”, “প্রাচীর” বা “দ্ব্যর্থবোধক সীমারেখা”, যা দুটি ভিন্ন বাস্তবতার মাঝখানে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ
যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সুরা মুমিনুন : ১০০
এই আয়াতের আলোকে স্পষ্ট হয়, মৃত্যুর পর মানব আত্মা একটি অন্তরালের মধ্যে প্রবেশ করে, যেটি বারযাখ নামে পরিচিত। বারযাখী জীবন সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অবগত নই, কারণ এটি গায়েব বা অদৃশ্য জগতের অন্তর্ভুক্ত। তবে হাদীসের আলোকে কিছু বিষয় জানা যায় যার মাধ্যমে বুঝা যায় কবরের জীবনই বারযাখী জীবনের এক অংশ। বারযাখী জীবন হলো দুনিয়া ও আখিরাতের মাঝে এক গায়েবি জগত, যা দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পরই শুরু হয়। এটি যেমন মুমিনদের জন্য আরামদায়ক ও প্রশান্তিময় একটি আবাস, তেমনি গাফেল ও কুফরকারীদের জন্য ভয়াবহ এক শাস্তির জায়গা। মৃত্যুর পর কবরের আজাব বা শান্তি, প্রশ্ন-উত্তর, ফেরেশতা মুনকার-নাকীর আগমন—এসবই বারযাখী জীবনের অঙ্গ।
১. বারযখী জীবনের শুরুতে সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর আর তাওবা কবুল কবে না
মূলত মৃত্যুর পরই বারযাখী জীবন শুরু হয়। তাই আমরা এ পর্যায়ে মৃত্যু থেকে পুণরুত্থন পর্যন্ত দীর্ঘ বারযাখী জীবন (الحياةُ البَرزَخِيَّةُ) এর একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরব। কুরআন ও সহিহ হাদিসে বরজখি জীবনের কিছু সুখ ও তার শাস্তির বর্ণিত হয়েছে। এ জীবনের শুধুতে যখন মৃত্যু উপস্থিত হবে, তখন মানুষের চোখ খুলে যাবে। সে তখন ভালো কাজ সম্পাদন করার জন্য আরো সময় কামনা করবে। কিন্তু তাকে আর সময় দেওয়া হবে না। মৃত্যুর সময় এ ধরনের প্রার্থনা অনর্থক। এতে কোনো ফল বয়ে আনে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
حَتّٰۤی اِذَا جَآءَ اَحَدَہُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُوْنِ ۙ لَعَلِّیْۤ اَعْمَلُ صَالِحًا فِیْمَا تَرَکْتُ کَلَّا ؕ اِنَّہَا کَلِمَۃٌ ہُوَ قَآئِلُہَا ؕ وَمِنْ وَّرَآئِہِمْ بَرْزَخٌ اِلٰی یَوْمِ یُبْعَثُوْنَ
অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, সে বলে, ‘হে আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান, যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ। সূরা মুমিনূন : ৯৯-১০০
পবিত্র কুরআনের ফেরাউনের ঈমান আনার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। যখন ফেরাউন ও তার সৈন্য বাহিনীকে ডুবিয়ে মারার জন্য আল্লাহ তাআলা তাদের ওপর আজাব নাজিল করেন, তখন ফেরাউন বুঝতে পারে যে, তার সামনে সত্য উন্মোচিত হয়েছে। সেই মুহূর্তে সে বলেছিল, তার সামনে যখন সত্য উন্মোচিত হয় তখন সে আল্লাহ উপর ঈমান এনেছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার ঈমান গ্রহন করেন নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَجٰوَزْنَا بِبَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ الْبَحْرَ فَاَتْبَعَہُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُوْدُہٗ بَغْیًا وَّعَدْوًا ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَدْرَکَہُ الْغَرَقُ ۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا الَّذِیْۤ اٰمَنَتْ بِہٖ بَنُوْۤا اِسْرَآءِیْلَ وَاَنَا مِنَ الْمُسْلِمِیْن آٰلْـٰٔنَ وَقَدْ عَصَیْتَ قَبْلُ وَکُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِیْنَ
আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির‘আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’। এখন ঈমান আনছ? অথচ পূর্ব (মুহুর্ত) পর্যন্ত তুমি নাফরমানী করছিলে এবং বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। সুরা ইউনুস : ৯০-৯০
২. মৃত্যুর যন্ত্রনার মাধ্যমে বারযখী জীবন শুরু হয়
বারযখী জীবন শুরুতে বান্দার রূহ কবজ করে তার মৃত ঘটান হয়। এ রূহ কবজের সময় বান্দা যন্ত্রনা অনুভব করে যাকে মৃত্যু যন্ত্রনা বলা হয়। এ মৃত্যুর যন্ত্রনা সকল বন্দাকেই ভোগ করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَجَآءَتْ سَکْرَۃُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ؕ ذٰلِکَ مَا کُنْتَ مِنْہُ تَحِیْدُ
মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই আসবে। যা থেকে তুমি পলায়ন করতে চাইতে। সুরা কাফ : ১৯
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-
وَلَوْ تَرٰۤی اِذِ الظّٰلِمُوْنَ فِیْ غَمَرٰتِ الْمَوْتِ وَالْمَلٰٓئِکَۃُ بَاسِطُوْۤا اَیْدِیْہِمْ ۚ اَخْرِجُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ اَلْیَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْہُوْنِ بِمَا کُنْتُمْ تَقُوْلُوْنَ عَلَی اللّٰہِ غَیْرَ الْحَقِّ وَکُنْتُمْ عَنْ اٰیٰتِہٖ تَسْتَکْبِرُوْنَ
আর যদি তুমি দেখতে, যখন যালিমরা মৃত্যু কষ্টে থাকে, এমতাবস্থায় ফেরেশতারা তাদের হাত প্রসারিত করে আছে (তারা বলে), ‘তোমাদের জান বের কর। আজ তোমাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে লাঞ্ছনার আযাব, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তোমরা তার আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহঙ্কার করতে। সুরা আনাম : ৯৩
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
مَاتَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَإِنَّهُ لَبَيْنَ حَاقِنَتِي وَذَاقِنَتِي فَلاَ أَكْرَهُ شِدَّةَ الْمَوْتِ لأَحَدٍ أَبَدًا بَعْدَ مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم .
আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুকালীন সময়ে তার মাথা আমার থুতনি এবং গলদেশের মাঝখানে ছিল। তার মৃত্যু যন্ত্রণা দর্শনের পর আমি অন্য কারো মৃত্যু যন্ত্রণা খারাপ মনে করি না। সুনানে নাসায়ি : ১৮৩৩ ইফ:
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ প্রকটরূপ ধারণ করে তখন তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ফাতেমাহ (রাঃ) বললেন, উহ্! আমার পিতার উপর কত কষ্ট! তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, আজকের পরে তোমার পিতার উপর আর কোন কষ্ট নেই। যখন তিনি ইন্তিকাল করলেন তখন ফাতেমাহ (রাঃ) বললেন, হায়! আমার পিতা! রবের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। হায় আমার পিতা! জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁর বাসস্থান। হায় পিতা! জিবরীল (আঃ)-কে তাঁর ইনতিকালের খবর শুনাই। যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সমাহিত করা হল, তখন ফাতিমাহ (রাঃ) বললেন, হে আনাস! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মাটি চাপা দিয়ে আসা তোমরা কীভাবে বরদাশত করলে! সহিহ বুখারি : ৪৪৬২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬২৯, আহমাদ : ১৬০২৬, সহীহাহ : ১৬৩৮,
প্রতিটি মুসলামের বিশ্বাস মৃতবরণ করার পর তার সামনে কবর, মিজান, হাশর, ফুলসিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম। কিন্তু দুনিয়ার কাজে আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে এসব নিয়ে চিন্তা করার ও সময় কোথায়। মহান আল্লাহ বলেন,
كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَما الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلاَّ مَتَاعُ الْغُرُورِ
প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যু। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। তারপর যাকে দোযখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, তার কার্যসিদ্ধি ঘটবে। আর পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া অন্য কোন সম্পদ নয়। সুরা ইমরান :১৮৫
কাজেই কেউ মারা গেলই তার পরকালের যাত্রা শুরু। তখন মানুষ নিজের জন্য না হলে মৃত্যু ব্যক্তির জন্য আমল শুরু করে যাতে তার পরকালের যাত্রা শান্তিময় হয়ে জান্নাতে যেতে পারে।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ও মৃত্যু
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলতেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে চামড়ার অথবা (বর্ণনাকারী উমরের সন্দেহ) কাঠের একপাত্রে কিছু পানি রাখা ছিল। তিনি তাঁর হাত ঐ পানির মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন। এরপর নিজ চেহারা দু’ হাত দ্বারা মাসহ(মাসেহ) করতেন আর বলতেন ’লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ঃ নিশ্চয়ই মৃত্যুর অনেক যন্ত্রণা। এরপর দু’হাত তুলে বলতে লাগলেনঃ হে আল্লাহ্! উচ্চ মর্যাদা সম্পন্নদের সঙ্গে করে দেন। এ অবস্থাতেই তার (জান) কবয করা হলো। আর তাঁর হাত দু’টো এলিয়ে পড়ল। সহিহ বুখারি : ৬৫১০
মৃত্যুর পরে মাইয়াত কিবলা মুখি করা হবে
মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করা একটি মুস্তাহাব আমল বিধায় না করলেও সমস্যা নেই। কিন্তু সময় ও সুযোগ থাকলে মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করে দেয়া ভাল। তবে বাড়াবাড়ি অপছন্দনীয় কাজ।
উমাইর (রা.) সূত্রে বর্ণিত। যিনি সাহাবী ছিলেন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! কোনগুলি কবীরাহ গুনাহ? তিনি বললেন, এর সংখ্যা নয়টি। অতঃপর উপরোক্ত হাদীসের অনুরূপ বর্ণিত। এতে আরো রয়েছে, মুসলিম পিতা-মাতাকে কষ্ট দেয়া এবং তোমাদের জীবন-মরণের কিবলাহ কা’বা ঘরের চত্বরে নিষিদ্ধ কাজকে হালাল গণ্য করা। সুনানে আবু দাউদ : ২৮৭৫
এই হাদিসে আমাদের জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় কিবল হিসাবে বাইতুল্লাহকে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই অনেক আলেম মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কেবলামুখী করাকে মুস্তাহাব বলেছেন। তবে মাইয়াতকে কেবলা মুখি করা সুন্নাহ। মাইয়াতকে ডান কাতে শোয়ানোর কোন স্পষ্ট কোন দলীল নাই তবে জীবিত মানুষের ডানকাতে ঘুমানোর সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও সহহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমানিত। সম্ভবত, এই সহিহ হাদিসের উপর ভিত্তি করেই বিদ্বানগণ মাইয়েতকে ডান কাতে শোয়ানোকে উত্তম বলেছেন। আল-মুহাল্লা, তৃতীয় খণ্ড, পৃ-৪০৪, মাসআলা : ৬১৫
৩. মাইয়াতের গোসল, কাফন, জানাযা ও দাফনের ব্যবস্থা করা
কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে চারটি কাজ দ্রুততার সাথে সম্পাদন জরুরি। মাইয়াতকে সামনে নিয়ে বেশী সময় অপেক্ষা করা সুন্নাহ বিরোধী। খুবই দ্রুততার সাথে নিম্নের চারটি কাজ সমাধা করতে হবে।
(১) মাইয়াতকে গোসল করান
(২) কাফনের কাপড় পরিধান করান
(৩) জানাযা সালাতের ব্যবস্থা করা
(৪) দাফনের ব্যবস্থা করা
(১) মাইয়াতকে গোসল করান-
সহিহ হাদিসের আলোকে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা যায়নাব (রা.) এর গোসলের বিবরণ-
উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা (যায়নাবকে) গোসল করাচ্ছিলাম। এ সময় তিনি আমাদের কাছে এলেন। তিনি বললেন, তোমরা তিনবার, পাঁচবার, প্রয়োজন বোধ করলে এর চেয়ে বেশী বার। পানি ও বরই পাতা দিয়ে তাকে গোসল দাও। আর শেষ বার দিকে ’কাফুর’। অথবা বলেছেন, কাফূরের কিছু অংশ পানিতে ঢেলে দিবে, গোসল করাবার পর আমাকে খবর দিবে। তাঁকে গোসল করাবার পর আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে খবর দিলাম। তিনি এসে তহবন্দ বাড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, এ তহবন্দটি তাঁর শরীরের সাথে লাগিয়ে দাও। আর এক বর্ণনার ভাষা হলো, তাকে বেজোড় তিন অথবা পাঁচ অথবা সাতবার (পানি ঢেলে) গোসল দাও। আর গোসল ডানদিক থেকে আজুর জায়গাগুলো দিয়ে শুরু করবে। তিনি (উম্মু আতিয়াহ) বলেন, আমরা তার চুলকে তিনটি বেনী বানিয়ে পেছনের দিকে ছেড়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ১২৫৩, ১২৫৪, ১২৫৮, ১২৬৩, সহিহ মুসলিম : ৯৩৯, মিশকাত : ১৬৩৪, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩১৪২, সুনানে তিরমিযী : ৯৯০, সুনানে নাসায়ী : ১৮৮১, ১৮৮৬, ইবনু মাজাহ : ১৪৫৮
এছাড়াও মাইয়াতের গোসল করানোর সময় নিম্নের বিধানগুলি অনুসরণ করতে হবে-
ক। মাইয়াতের গোসল ডান দিক ও অজুর অঙ্গ হতে আরম্ভ করা
উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ তাঁর মেয়ে (জয়নাব (রা.) কে গোসল করানোর সময় তাঁদের বলেছিলেন, তোমরা তার ডান দিক হতে এবং অজুর অঙ্গ হতে আরম্ভ কর। সহিহ বুখারি : ১৬৭
খ। মহিলার চুল তিনটি বেনী করে তার পিছন দিকে রাখা :
উম্মু আতিয়াহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি ﷺ এর কন্যাগণের একজনের ইন্তিকাল হলে তিনি ﷺ আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা তাকে বরই পাতার পানি দিয়ে বিজোড় সংখ্যক তিনবার, পাঁচবার অথবা প্রয়োজনবোধ করলে আরও অধিকবার গোসল দাও। শেষবারে কর্পূর অথবা তিনি বলেছিলেন কিছু কর্পূর ব্যবহার করবে। তোমরা গোসল শেষ করে আমাকে জানাবে। আমরা শেষ করে তাঁকে জানালাম। তখন তিনি তাঁর ﷺ চাদর আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন, আমরা তাঁর মাথার চুলগুলো তিনটি বেনী করে পিছনের দিকে ছেড়ে দিলাম। সহিহ বুখারি : ১২৬৩
গ। মাইয়াতের কোন গোপনীয় বিষয় গোচরীভূত হলে তা প্রকার করা যাবে না
আলি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
مَنْ غَسَّلَ مَيِّتًا وَكَفَّنَهُ وَحَنَّطَهُ وَحَمَلَهُ وَصَلَّى عَلَيْهِ وَلَمْ يُفْشِ عَلَيْهِ مَا رَأَى خَرَجَ مِنْ خَطِيئَتِهِ مِثْلَ يَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
অর্থ : যে ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলো, কাফন পরালো, সুগন্ধি মাখল, বহন করে নিয়ে গেলো, তার জানাজার সালাত পড়লো এবং তার গোচরীভূত হওয়া তার গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করলো না, তার থেকে তার গুনাহসমূহ তার জন্মদিনের মত বের হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬২ মান জঈফ।
ঘ। স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে বিনা দ্বিধায় গোসল দিতে পারবে
আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন
رَجَعَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ الْبَقِيعِ فَوَجَدَنِي وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِي رَأْسِي وَأَنَا أَقُولُ وَا رَأْسَاهُ فَقَالَ بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَا رَأْسَاهُ ثُمَّ قَالَ مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِي فَقُمْتُ عَلَيْكِ فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ وَدَفَنْتُكِ
অর্থ : রাসুলুল্লাহ ﷺ বাকি থেকে ফিরে এসে আমাকে মাথা ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পেলেন। তখন আমি বলছিলাম, হে আমার মাথা! তিনি বলেন, হে আয়িশা! আমিও মাথা ব্যথায় ভুগছি। হে আমার মাথা! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যেতে, তাহলে তোমার কোন ক্ষতি হতো না। কেননা আমি তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন পরাতাম, তোমার জানাজার সালাত পড়তাম এবং তোমাকে দাফন করতাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, দারাকুৎনী : ১৮৩৩
ঙ। মৃতব্যক্তিকে পৃথকভাবে কুলুখ করানোর প্রয়োজন নাই, বরং পানি দ্বারাই সবকিছু করতে হবে।
আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি (মহিলাদের) বললেন, তোমরা তোমাদের স্বামীদের পানি দ্বারা ইস্তিঞ্জা করার নির্দেশ দাও। আমি (স্ত্রীলোক হিসাবে) তাদের (এ নির্দেশ দিতে) লজ্জাবোধ করছি। কেননা রাসুলুল্লাহ ﷺ ও পানি দিয়ে ইস্তিনজা করতেন। সুনানে তিরমিজি : ১৯
আলি (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
مَنْ غَسَّلَ مَيِّتًا وَكَفَّنَهُ وَحَنَّطَهُ وَحَمَلَهُ وَصَلَّى عَلَيْهِ وَلَمْ يُفْشِ عَلَيْهِ مَا رَأَى خَرَجَ مِنْ خَطِيئَتِهِ مِثْلَ يَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
অর্থ : যে ব্যক্তি মৃতকে গোসল দিলো, কাফন পরালো, সুগন্ধি মাখান, বহন করে নিয়ে গেলো, তার জানাজার সালাত পড়লো এবং তার গোচরীভূত হওয়া তার গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করলো না, তার থেকে তার গুনাহসমূহ তার জন্মদিনের মত বের হয়ে যায়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪৬২ মান জঈফ।
(২) কাফরে কাপড় পরিধান করান
ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে তিনটি কাপড়ে কবর দেওয়া হয়। এগুলো ছিল নাজরানের তৈরি। যার একটি ছিল চাদর, একটি লুঙ্গি এবং অপরটি ছিল মৃত্যুশয্যায় তাঁর পরিহিত পোশাক। উসমান ইবনে আবু শাইবার বর্ণনায় রয়েছে। তাকে তিনটি কাপড়ে কাফন দেয়া হয়েছিল- যার দু’টি চাদর লাল বর্ণের এবং যে জামা পরিহিত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩১৫৩ মান যঈফ।
গাকীফ গোত্রের কাফিনের কন্যা লায়লা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা উম্মু কুলসুম (রা.) মারা গেলে যে মহিলা তাকে গোসল দেয় তার সাথে ’আমিও ছিলাম। রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে (কাফনের জন্য) প্রথমে তহবন্দ, তারপর কামিজ, তারপর ওড়না, তারপর চাদর এবং অন্য একটি কাপড় দিলেন। যা দিয়ে লাশ পেঁচিয়ে দেয়া হলো। লায়লা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কাফনের কাপড়সহ দরজার পাশেই বসা ছিলেন। তিনি সেখান থেকে একটি একটি করে কাপড়গুলো আমাদেরকে প্রদান করেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩১৫৭ মান যঈফ
(৩) জানাযা সালাতের ব্যবস্থা করা
জানাযার সালাতের পদ্ধতি
ক। মাইয়াতকে সামনে রেখে কাতারে সোজা করে জানাযা সালাতের নিয়ত করবে।
খ। ইমাম আল্লাহু আকবার বলে প্রথম তাকবীর দিলে সবাই দু’হাত কাঁধের সমান উঠাবেন। তারপর হাত দুটি বুকের উপর রেখে পড়বেন ‘সুরা ফাতেহা’ পাঠ করা। অবশ্য হানাফি মাজহাবের আলেমগণ ফাতিহার পরিবর্তে সানা পাঠ করে থাকেন। (বিস্তারিত আলোচনা পরে আছে)
গ। ইমাম সাহেব দ্বিতীয় তাকবীর দিলে নবি ﷺ এর উপর দরুদ পড়বেন। দুরুদে ইব্রাহিম পড়াই উত্তম। সহিহ বুখারি : ৩৩৭০, সহিহ মুসলিম, : ৪০৬।
দুরুদটি হলো
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
ঘ। অতঃপর ইমাম সাহের তৃতীয় তাকবীর দিবেন। অতঃপর মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ করবেন ঐকান্তিকতা ও ইখলাসের সাথে মাইয়াতের জন্য দুআ করবে।
প্রথম দুআ
আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ জানাযার সালাতে এ দুআ করতেনÑ
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا، وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا، وَصَغِيرِنَا وَكَبيرِنَا، وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا. اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلاَمِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ، اللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ، وَلاَ تُضِلَّنَا بَعْدَهُ
হে আল্লাহ! আমাদের জীবিতÑমৃত, ছোটÑবড়, পুরুষÑনারী এবং উপস্থিতÑঅনুপস্থিত সকলকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে আপনি যাকে জীবিত রাখবেন তাকে ইসলামের উপর জীবিত রাখেন এবং আমাদের মধ্যে যাকে মৃত্যু দিবেন তাকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দিন। হে আল্লাহ! এর সাওয়াব থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করবেন না এবং এর পর আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করবেন না।’ আবু দাঊদ : ৩২০১; তিরমিযী : ১০২৪; নাসায়ি : ১৯৮৫; ইবন মাজাহ : ১৪৯৮
দ্বিতীয় দুআ
জুবায়ের ইবনে নুফায়র (রহ.) থেকে বর্ণিত। (তিনি বলেন) আমি আওফ ইবনে মালিক (রা.) কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ ﷺ এক জানাযায় যে দুআ পড়লেন, আমি তার সে দুআ মনে রেখেছি। দুয়ায় তিনি এ কথাগুলো বলেছিলেন
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَاراً خَيْراً مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلاً خَيْراً مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجَاً خَيْراً مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ [وَعَذَابِ النَّارِ]
হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করে দাও ও তার প্রতি দয়া কর। তাকে নিরাপদে রাখ ও তার ক্রটি মার্জনা কর। তাকে উত্তম সামগ্ৰী দান কর ও তার প্রবেশ পথকে প্রশস্ত করে দাও। তাকে পানি, বরফ ও বৃষ্টি দ্বারা মুছে দাও এবং পাপ থেকে এরূপভাবে পরিষ্কারÑপরিচ্ছন্ন করে দাও যেÑরূপ সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়। তাকে তার ঘরকে উত্তম ঘরে পরিণত কর, তার পরিবার থেকে উত্তম পরিবার দান কর, তার স্ত্রীর তুলনায় উত্তম স্ত্রী দান কর। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং কবরের আজাব ও জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচাও।
বর্ণনাকারী আওফ ইবনে মালিক বলেন, তার মূল্যবান দুআ শুনে আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জাগল, আমি যদি সে মৃত ব্যক্তি হতাম। সহিহ মুসলিম : ৯৬৩
তৃতীয় দুআ
ওয়াসিলা ইবনেল আসকা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ মুসলিমদের এক ব্যক্তির জানাযার সালাত পড়লেন। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি
হে আল্লাহ! অমুকের পুত্র অমুক তোমার জিম্মায় এবং তোমার নিরাপত্তার বন্ধনে। তুমি তাকে কবরের বিপর্যয় ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করো এবং তাকে দয়া করো। কেননা তুমিই কেবল ক্ষমাকারী পরম দয়ালু’’। ইবনে মাজাহ ১৪৯৯, সুনানে আবু দাউদ : ৩২০২, আহমাদ : ১৫৫৮৮ মিশকাত : ১৬৭৭।
আর যদি মৃতব্যক্তি শিশু হয়, তবে বলুন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرَطاً، وَسَلَفاً، وَأَجْراً
হে আল্লাহ, আমাদের জন্য তাকে অগ্রগামী প্রতিনিধি, অগ্রিম পুণ্য এবং সওয়াব হিসেবে নির্ধারণ করে দিন। আব্দুর রায্যাক তার মুসান্নাফে : ৬৫ ৮৮।
ঙ। সর্বশেষ ইমাম সাহেব চতুর্থ তাকবীর দিয়ে ডানে বামে সালাম দিয়ে জানাযার সালাত শেষ করবে।
একটি পর্যালোচনা : জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা না ছানা পড়ত হবে।
জানাযার নামাযে সুরা ফাতিহা পড়ার ব্যাপারটি যদিও মতবিরোধ পূর্ণ। তবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত হল, জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়তে হবে। সহিহ বুখারিতে এসেছে-
ত্বলহাহ্ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আউফ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ
আমি ইবনে আব্বাস (রা.) এর পিছনে জানাযার সালাত আদায় করলাম। তাতে তিনি সুরা ফাতিহা পাঠ করলেন এবং (সালাত শেষে) বললেন, (আমি সুরা ফাতিহা পাঠ করলাম) যাতে লোকেরা জানতে পারে যে, এটা সুন্নাত। সহিহ বুখারি : ১৩৩৫
প্রখ্যাত সাহাবী উবাদা বিন সামেত (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-
لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ.
যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ করবে না তার সালাত হবে না। সহিহ বুখারি ৭৫৬, সহিহ মুসলিম : ৩৯৪, আহমাদ : ২২৮০৭
আর জানাযার সালাত একটি সালাত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا وَلاَ تَقُمْ عَلَىَ قَبْرِهِ
আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হলে তার উপর কখনও সালাত পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। সুরা তাওবা : ৮৪
আল্লাহ তায়ালা এখানে জানাযার সালাতকেও সালাত বলে উল্লেখ করেছেন। তাই ইমাম হোক আর মুসল্লী হোক। আস্ত হোক আর জোরে হোক ফাতিহা তো পড়তেই হবে।
যারা বলেন ফাতিহা পড়তে হবে না তাদের দলিল–
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কোনো মাইয়াতের জানাযার নামাজ পড়তেন তখন প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করতেন তারপর নবি কারীম ﷺ এর উপর দরুদ পড়তেন অতঃপর দুআ করতেন। মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৪৯৪
নাফে রাহ. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. জানাযার নামাযে (কুরআন) পড়তেন না। মুয়াত্তা মালিক – : ৫২৩, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৫২২, এই আছরটি বিশুদ্ধতম সনদে বর্ণিত।
আবু সাঈদ মাকবুরী থেকে বর্ণিত। তিনি আবু হুরায়রা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কিভাবে জানাযার সালাত পড়েন? আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম অবশ্যই আমি তোমাকে বলব। আমি মাইয়াতের (ঘর থেকে) পরিবারের সাথে রয়েছি। অতঃপর যখন মাইয়াতকে রাখা হয় আমি তাকবীর পড়ি এবং আল্লাহর প্রশংসা করি। তারপর নবির উপর দরুদ পড়ি। অতঃপর দুআ করি। মুয়াত্তা মালেক ৫২১; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৬৪২৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৪৯৫,
এই সকল হাদিসের আলোক তারা দাবি করেন জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া জরুরি নয়। তাদের অনেক বিশ্লেষন ধর্মী লেখা পড়েছি, তারা কোথাও কোন হাদিসের রেফারেন্স দিতে পাবেনী যে, জানাযার সালাতে ছানা পড়তে হবে। কিন্তু তাদের প্রতিটি হাদিস জানাযা সালাতে প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করার কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ জানাযার সালাতে ছানা দিয়া শুরু করতে হবে। ফিকহি ক্ষেত্র সাহাবিদের যুগ থেকেই মতভেদ চলে আসছে। কিন্তু তারা এই নিয়ে মতবিরোধ করে নাই বা ঝগড়া বিবাদও করে নাই। আমাদের অবস্থান তাদের বিপরীত, আমরা আজ ফিকহি মাসায়েল নিয়ে মতবিরোধ করেছি বা ঝগড়া বিবাদ করছি। নিরপেক্ষ ভাবে বলতে গেলে সুরা ফাতিহায় মহান আল্লাহর প্রশংসা আছে। যদি জানাযার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় তবে মহান আল্লাহর প্রশংসা হবে আবার বুখারিতে বর্ণিত সহিহ হাদিসের উপরও আমল হবে। তাই জানাযার সালাতের শুরুতে সুরা ফাতিহা পড়া উত্তম। তবে একটি কথা পরিধান যোগ্য, যারা ফাতিহা না পড়ে সানা পাঠ করে, তাদের আমলকে অযোগ্য বলে, বিদআত বলে প্রচার করা ঠিক হবে না। কেননা মতভেদপূর্ণ মাসায়েল নিয়ে বিরোধে জড়ান বা ঝগড়া বিবাদ করা অবশ্যই বিদআতি কাজ।