Category Archives: বিভাগহীন

বিবাহের সুন্নাহ সম্মত কাজ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ফরজ কাজের বাইরে বিবাহকে বরকতময় ও ফলপ্রসূ করার জন্য ইসলামে কিছু সুন্নাহ বা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) আমল ও অনুষ্ঠান রয়েছে। এই সুন্নাহ ও মুস্তাহাব কাজগুলো বিবাহের আনন্দকে পূর্ণ করে এবং দাম্পত্য জীবনে আল্লাহর বরকত (রহমত) নিয়ে আসে, তবে আকদ সম্পন্ন হওয়ার জন্য এগুলো ফরজ বা বাধ্যতামূলক নয়। নিচে এমন কতগুলো বিষয় উল্লেখ করা হলো-

১. বিবাহের খুতবা

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কল্যাণসমূহের উৎস, তাঁর সমষ্টি এবং তার সমাপ্তি দান করা হয়েছে। তিনি আমাদের সালাতের খুতবা এবং প্রয়োজনের (বিবাহের) খুতবা শিক্ষা দিয়েছেন। সালাতের খুত্বা (তাশাহ্হুদ) হলোঃ সমস্ত সম্মান, ’ইবাদাত ও পবিত্রতা আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক, আল্লাহর রহমত ও বারাকাতও। আমাদের উপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাহ্দের উপরও শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দাহ্ ও তাঁর রসূল। আর বিবাহের খুতবা হলো-

’’সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্ট ও আমাদের কাজের নিকৃষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশরয় চাই। আল্লাহ্ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোন পথপ্রদর্শক নাই। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, তিনি এক এবং তাঁর কোন শরীক নাই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল’’।

এরপর তোমরা তোমাদের খুত্বার সাথে কুরআনের এ তিনটি আয়াত যোগ করবে-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوْتُنَّ  اِلَّا وَ اَنْتُمْ  مُّسْلِمُوْنَ ﴿۱۰۲﴾

হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মারা যেও না। সূরা আল ইমরান :  ১০২

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّکُمُ الَّذِیْ خَلَقَکُمْ مِّنْ نَّفْسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ خَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَ بَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِیْرًا وَّ نِسَآءً ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ الَّذِیْ تَسَآءَلُوْنَ بِہٖ وَ الْاَرْحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ عَلَیْکُمْ  رَقِیْبًا ﴿۱﴾

হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক। সূরা নিসা : ১

یُّصْلِحْ  لَکُمْ  اَعْمَالَکُمْ وَ یَغْفِرْ لَکُمْ ذُنُوْبَکُمْ ؕ وَ مَنْ یُّطِعِ اللّٰهَ  وَ رَسُوْلَہٗ  فَقَدْ  فَازَ  فَوْزًا عَظِیْمًا ﴿۷۱﴾  اِنَّا عَرَضْنَا الْاَمَانَۃَ عَلَی السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ الْجِبَالِ فَاَبَیْنَ اَنْ یَّحْمِلْنَهَا وَ اَشْفَقْنَ مِنْهَا وَ حَمَلَهَا الْاِنْسَانُ ؕ اِنَّہٗ كَانَ ظَلُوْمًا جَهُوْلًا ﴿ۙ۷۲﴾

’হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের কার্যাবলি সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে। সূরা আহযাব : ৭০-৭১। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯২, সুননে তিরমিযী : ১১০৫, ১৪০৪, সুননে আবূ দাউদ : ২১১৮, আহমাদ : ৪১০৪, দারেমী : ২২০২, মিশকাত : ৩১৪৯, সহিহাহ : ১৪৮৩

২. বিবাহে ওয়ালীমা

মুসলিমদের বিবাহে ওয়ালীমা হলো একটি বিশেষ ভোজ বা বিবাহোত্তর ভোজের আয়োজন, যা বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানাতে এবং তাদের সুখের জন্য দোয়া করতে অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে এর প্রচলন ও গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

ক. ওয়ালিমার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব

রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাত: ওয়ালীমা রাসূল (ﷺ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। তিনি নিজে তাঁর বিবাহের সময় ওয়ালীমার আয়োজন করেছেন এবং সাহাবীদেরকেও এর জন্য উৎসাহিত করেছেন। ওয়ালীমার মাধ্যমে বিবাহকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়, যা সামাজিক সম্পর্ককে মজবুত করে এবং বিবাহকে ব্যভিচার থেকে আলাদা করে।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও এবং তাতে দফ বাজাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫

মুহাম্মাদ ইবনু হাতিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হালাল ও হারাম বিবাহের মধ্যে পার্থক্য হলো- দফ বাজানো এবং শব্দ করা বা ঘোষণা প্রচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৮, ইরওয়াহ : ১৯৯৪, মিশকাত : ৩১৫৩

এটি পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। ওয়ালীমার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা নবদম্পতির জন্য দোয়া করেন, যা তাদের দাম্পত্য জীবনে বরকত নিয়ে আসে।

খ. ওয়ালিমা করার জন্য হাদিসে উত্সাহ প্রদান করা হয়েছে

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন বিয়ে করেন, তখন ওয়ালীমা করেন, কিন্তু যাইনাব (রাঃ)-এর বিয়ের সময় যে পরিমাণ ওয়ালীমার ব্যবস্থা করেছিলেন, তা অন্য কারো বেলায় করেননি। সেই ওয়ালীমা ছিল একটি ছাগল দিয়ে। সহিহ বুখারি : ৫১৬৮ ৪৭৯১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়্যাহ (রাঃ)-কে আযাদ করে বিয়ে করেন এবং এই আযাদ করাকেই তাঁর মাহর নির্দিষ্ট করেন এবং তার ’হায়স’(এক প্রকার সুস্বাদু হালুয়া) দ্বারা ওয়ালীমাহ’র ব্যবস্থা করেন। সহিহ বুখারি : ৫১৬৯, ৩৭১

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ) মদ্বীনায় আগমন করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও সা‘দ ইবনু রাবী‘ আনসারীর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। সা‘দ (রাঃ) ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ‘আবদুর রহমান (রাঃ)-কে বললেন, আমি তোমার উদ্দেশে আমার সম্পত্তি অর্ধেক অর্ধেক ভাগ করে নিতে চাই এবং তোমাকে বিবাহ করিয়ে দিতে চাই। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। আমাকে বাজার দেখিয়ে দাও। তিনি বাজার হতে মুনাফা করে নিয়ে আসলেন পনীর ও ঘি। এভাবে কিছুকাল কাটালেন। একদিন তিনি এভাবে আসলেন যে, তাঁর গায়ে বিয়ের হলুদ রংয়ের চিহ্ন লেগে আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জনৈকা আনসারী মহিলাকে বিবাহ করেছি। তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাকে কী দিয়েছ? তিনি বললেন, খেজুরের এক আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ। তিনি [নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ] বললেন, একটি বকরী দিয়ে হলেও ওয়ালীমা কর। সহিহ বুখারি : ২০৪৯, ৫১৫৩, সহহি মুসলিম : ১৪২৭, সুনানে ইবনু মাজাহ ১৯০৭, সুনানে তিরমিজি : ১০৯৪, আহমাদ : ১৩৩৬৯

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ওয়ালীমা আয়োজন করার নির্দেশ স্বয়ং রাসূল (ﷺ) দিয়েছেন এবং এর জন্য খুব বেশি সম্পদশালী হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু দিয়ে হলেও এর আয়োজন করা উচিত।

গ. বিত্তবান ও দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য করা নিকৃষ্ট কাজ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ওয়ালীমায় কেবল ধনীদেরকে দাওয়াত করা হয় এবং গরীবদেরকে দাওয়াত করা হয় না সেই ওয়ালীমা সবচেয়ে নিকৃষ্ট। যে ব্যক্তি দাওয়াত কবুল করে না, সে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে অবাধ্যতা করে। সহিহ বুখারি : ৫১৭৭, সহিহ মুসলিম : ১৪৩২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৭৪২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯১৩, আহমাদ : ৭২৭৯, দারিমী : ২১১০, ইরওয়া : ১৯৪৭, সহীহ আত্ তারগীব : ২১৫১

এই হাদিসটি ওয়ালীমার আয়োজনে সামাজিক সমতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে। ওয়ালীমা শুধু ধনী বা সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের জন্য নয়, বরং সবার জন্য হওয়া উচিত।

ঘ. দাওয়াত গ্রহণ করা জরুরি :

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কাউকে ওয়ালীমার দাওয়াত করা হলে তা অবশ্যই গ্রহণ করবে। সহিহ বুখারী : ৫১৭৩, ৫১৭৯, সহিহ মুসলিম : ১৪২৯, আহমাদ : ৪৯৪৯

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বন্দীদেরকে মুক্তি দাও, দাওয়াত কবূল কর এবং রোগীদের সেবা কর। সহহি বুখারি : ৩০৪৬, ৫১৭৪

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কাউকেও খাবার আয়োজনে দা’ওয়াত দিলে, সে যেন গ্রহণ করে। তবে ইচ্ছা থাকলে খাবে, অন্যথায় খাবে না। সহিহ মুসলিম : ১৪৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৭৪০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৫১,  মিশকাত : ৩২১৭, আহমাদ : ১৫২১৯, সহীহ আত্ তারগীব : ২১৫৫।

এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ওয়ালীমার দাওয়াত গ্রহণ করাও একটি সুন্নাত। ওয়ালীমা একটি আনন্দময় ও বরকতময় অনুষ্ঠান যা বিবাহের ঘোষণাকে পূর্ণতা দেয় এবং সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে।

ঙ. বীনা দাওয়াতে খাওয়া ঠিক নয়, খাইতে চাইলে অনুমতি নিতে হবে

আবূ মাস্’ঊদ আল আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসারগণের মধ্যে আবূ শু’আয়ব নামক এক ব্যক্তির মাংস বিক্রেতা একজন ক্রীতদাস ছিল। সে ক্রীতদাসকে বলল, তুমি আমার জন্য পাঁচজনের অনুপাতে খাদ্য প্রস্তুত কর। আমি পাঁচজনের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কেও দা’ওয়াত করতে ইচ্ছুক। সুতরাং সে হিসাবে তাঁর জন্য খাবার তৈরি করা হলো। অতঃপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দা’ওয়াত করলেন। অতঃপর পথিমধ্যে তাঁদের (পাঁচজনের) সাথে একজন শামিল হলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ শু’আয়বকে ডেকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে তাকে (অতিরিক্ত লোকটিকে) অনুমতি দিতে পার, ইচ্ছা করলে না করতে পার। সে বলল, না, বরং আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সহিহ বুখারী : ৫৪৬১, সহিহ মুসলিম : ২০৩৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৯, মিশকাত : ৩২১৯, সহীহাহ : ৩৫৭৯।

চ. ওয়ালিমান অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে নব দম্পত্তির জন্য দোয় করা

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ উপলক্ষে কাউকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলতেন-

«بَارَكَ اللهُ لَكُمْ وَبَارَكَ عَلَيْكُمْ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ»

’’আল্লাহ্ তোমাদের বরকত দান করুন, তোমাদের উপর বরকত নাযিল করুন এবং কল্যাণের সাথে তোমাদের একত্র করুন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৯১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩০, আহমাদ ৮৭৩৩, দারেমী : ২১৭৪,

৩. বিবাহ আনন্দ প্রকাশ করা বা দফ বাজান

সাহাবীগণ (রা.) বিবাহে কবিতা আবৃত্তি ঔ  দফ বাজানোর মাধ্যমে আমোদ-প্রমোদ করতেন বলে হাদিসে প্রমান পাওয়া যায়। ইসলামে বিবাহ একটি উৎসব এবং আনন্দের বিষয়। যা প্রকাশ করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট পন্থা অনুসরণ করেত হয়।

গান ও কবিতা আবৃত্তি: বিবাহের দিন বা তার পরে নারীদের জন্য হালকা বাদ্যযন্ত্র (যেমন— দফ) ব্যবহার করে কবিতা বা হামদ-নাত আবৃত্তি করা জায়েয। হাদিসে আনসারদের আমোদ-প্রমোদ প্রিয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই ধরনের কার্যকলাপের প্রতি ইঙ্গিত করে। তবে, পুরুষদের জন্য ঢোল বা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা অনুমোদিত নয়।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনসার গোত্রের জনৈক পুরুষের সাথে জনৈকা নারীর বিয়ের পরে যখন তাকে স্বামীর নিকট ঘরে পাঠানো হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের নিকট কি কোনো (আনন্দোল্লাস উপকরণ স্বরূপ) ক্রীড়াকৌতুক ছিল না? আনসারগণ তো আমোদ-প্রমোদপ্রিয়। সহিহ :বুখারী ৫১৬২, মিশকাত : ৩১৪১, সহীহ আল জামি : ৭৯১

রুবায়ই বিনতু মু‘আওয়িয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমার বাসর রাতের পরদিন সকালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন এবং তুমি (খালিদ ইবনু যাকওয়ান) যেমন আমার কাছে বসে আছ ঠিক সেভাবে আমার পাশে আমার বিছানায় এসে বসলেন। তখন কয়েকজন ছোট বালিকা দুফ বাজিয়ে বদরে নিহত শহীদ পিতাদের প্রশংসা গীতি আবৃত্তি করছিল। শেষে একটি বালিকা বলে উঠল, আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি জানেন, আগামীকল্য কী হবে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন কথা বলবে না, বরং আগে যা বলেছিলে তাই বল। সহিহ বুখারি : ৪০০১, ৫১৪৭, সুনানে তিরমিযী : ১০৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯২২, আহমাদ : ২৬৪৮১, ২৬৪৮৭

 আর ‘ঈদের দিন সুদানীরা বর্শা ও ঢালের খেলা করত। আমি নিজে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম অথবা তিনি নিজেই বলেছিলেন, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ, অতঃপর তিনি আমাকে তাঁর পিছনে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন যে, আমার গাল ছিল তাঁর গালের সাথে লাগান। তিনি তাদের বললেন, তোমরা যা করছিলে তা করতে থাক, হে বনূ আরফিদা। পরিশেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার দেখা কি যথেষ্ট হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তিনি বললেন, তা হলে চলে যাও। সহিহ বুখারি : ৯৫০, ৯৫২, ৯৮৮, ২৯০৮, ৩৫৩০, ৩৯৩১, ৫১৯০, সহিহ মুসলিম : ৮৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৮, সুনানে নাসায়ী : ১৫৯৭

৪. শাউয়াল মাসে এবং জুমুয়ার দিনে বিবাহ করা

শাউয়াল মাসে এবং জুমুয়ার দিনে মসজিদে বিবাহ সম্পাদন করা। উল্লেখ্য, সকল মাসের যে কোন দিন বিবাহ করা যায়িজ আছে।

আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শাও্ওয়াল মাসে বিবাহ করেছেন এবং ঐ মাসেই আমার বাসর রজনী হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণীগণের মধ্যে আমার চেয়ে কে অধিক (তার ভালোবাসা প্রাপ্তিতে) সৌভাগ্যবতী ছিলেন? সহিহ মুসলিম :  ১৪২৩, মিশকাত : ৩১৪২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৩,  সুনানে ইবনু মাজাহ ১৯৯০, আহমাদ ২৫৭১৬।

৫. বিবাহের খবর ব্যাপকভাবে প্রচার কর

মুহাম্মাদ ইবনু হাতিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

فَصْلُ مَا بَيْنَ الْحَلَالِ وَالْحَرَامِ الدُّفُّ وَالصَّوْتُ فِي النِّكَاحِ

হালাল ও হারাম বিবাহের মধ্যে পার্থক্য হলো- দফ বাজানো এবং শব্দ করা বা ঘোষণা প্রচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৬, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৮, ইরওয়াহ : ১৯৯৪, মিশকাত : ৩১৫৩

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও এবং তাতে দফ বাজাও। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯৫

৬. নব দম্পতিকে মুবারকবাদ জানানো।

আকীল ইবনু আবূ ত্বলিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বনু জুশম গোত্রের এক মহিলাকে বিবাহ করলে লোকেরা (মুবারকবাদ দিয়ে) বললো, সুখী হও এবং অধিক সন্তান হোক। তিনি বলেন, তোমরা এরূপ বলো না, বরং যেরূপ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন তদ্রূপ বলো-

 اللّٰهُمَّ بَارِكْ لَهُمْ وَبَارِكْ عَلَيْهِمْ

’’হে আল্লাহ্! তাদেরকে বরকত দান করুন এবং তাদের উপর বরকত নাযিল করুন।’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৬, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৭১, আহমাদ : ১৭৪০, ১৫৩১৩, দারেমী : ২১৭৩

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ উপলক্ষে কাউকে মুবারকবাদ জানিয়ে বলতেনঃ

«بَارَكَ اللهُ لَكُمْ وَبَارَكَ عَلَيْكُمْ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ»

’’আল্লাহ্ তোমাদের বরকত দান করুন, তোমাদের উপর বরকত নাযিল করুন এবং কল্যাণের সাথে তোমাদের একত্র করুন।’’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯০৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৯১, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩০, আহমাদ : ৮৭৩৩, দারেমী : ২১৭৪,

বাসর রাতের সুন্নাহ সম্মত আমল

১. বাসর রাতে স্ত্রীর কপালের উপরের চুল দুআ পাঠ করা

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমাদের কেউ স্ত্রী, খাদেম অথবা আরোহণের পশু লাভ করে তখন সে যেন তার কপালে হাত রেখে বলে-

اللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهَا وَخَيْرِ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ

হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকট এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ প্রার্থনা করি এবং যে কল্যাণ এর মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। আমি তোমার নিকট এর অনিষ্ট হতে এবং যে অনিষ্টসহ একে সৃষ্টি করা হয়েছে তা হতে আশরয় চাই’’। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯১৮, বাইহাকী, সুনান কুবরা : ১৪২১১

আমর ইবনু শুআইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিয়ে করে অথবা কোনো দাসী ক্রয় করে তখন সে যেন বলে-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَمِنْ شَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ،

হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এর মধ্যকার কল্যাণ এবং এর মাধ্যমে কল্যাণ চাই এবং তার মধ্যে নিহিত অকল্যাণ ও তার মাধ্যমে অকল্যাণ থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।’’

আর যখন কোনো উট কিনবে তখন যেন সেটির কুঁজের উপরিভাগ ধরে অনুরূপ দু’আ করে। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, আবূ সাঈদের বর্ণনায় রয়েছেঃ অতঃপর তার কপালের চুল ধরে বলবে। স্ত্রী এবং দাসীর ব্যাপারেও বরকতের দু’আ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ২১৬০

২. স্বামী-স্ত্রী  উভয়ে একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করা :

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, স্ত্রী যখন স্বামীর কাছে যাবে, স্বামী তখন দাঁড়িয়ে যাবে। আর স্ত্রীও দাঁড়িয়ে যাবে তার পেছনে। অতপর তারা একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করবে এবং বলবে-

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِي أَهْلِي، وَبَارِكْ لَهُمْ فِيَّ، اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي مِنْهُمْ وَارْزُقْهُمْ مِنِّي، اللَّهُمَّ اجْمَعَ بَيْنَنَا مَا جَمَعْتَ إِلَى خَيْرٍ، وَفَرِّقْ بَيْنَنَا إِذَا فَرَّقْتَ إِلَى خَيْرٍ.

‘হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আমার পরিবারে বরকত দিন আর আমার ভেতরেও বরকত দিন পরিবারের জন্য। আয় আল্লাহ, আপনি তাদের থেকে আমাকে রিযক দিন আর আমার থেকে তাদেরও রিযক দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যতদিন একত্রে রাখেন কল্যাণেই একত্র রাখুন আর আমাদের মাঝে যখন বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবেন তখন কল্যাণের পথেই বিচ্ছেদ ঘটাবেন। . তাবরানী, মুজামুল কাবীর : : ৮৯০০, মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ১৭৪৩৩

৩. বাসর রাতে সহবাস করার ইচ্ছা করলে দুআ দুআ পাঠ করা

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে যদি বলে-

بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏

“আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখো এবং আমাদের যে সন্তান দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।”

 অতঃপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের কিসমতে কোন সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহিহ বুখারি : ১৪১, ৩২৭১, ৩২৮৩, ৫১৬৫, ৬৩৮৮, ৭৩৯৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৪, সুনানে তিরমিযী ১০৯২, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৬১, আহমাদ : ১৮৭০, ১৯১১, ২১৭৯, ২৫৫১, ২৫৯২, দারেমী : ২২১২, ইরওয়াহ : ২০১২

৪. সহবাসের সময় পর্দা করা।

উতবা ইবনু আব্দ আস-সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর নিকট এসে যেন (নির্জনে মিলনে) পর্দা (গোপনীয়তা) রক্ষা করে এবং গর্দভের ন্যায় বিবস্ত্র না হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, ইরওয়া : ২০০৯

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাইনি বা তা দেখিনি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, আহমাদ ২৩৮২৩, ইরওয়া : ১৮১২, মিশকাত : ৩১২৩

৫. নিষিদ্ধ সময় ও জায়গা থেকে বিরত থাকা :

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم

যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে অথবা গণক ঠাকুরের নিকটে যায়।  সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করে। সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬৩৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওয়াহী নাযিল হয়- ’’তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’’। সূরা বাকারা : ২২৩। তাই সামনের দিক হতে বা পিছন দিক হতে সহবাস কর; কিন্তু মলদ্বার ও ঋতুবতী হতে বিরত থাক। মিশকাত : ৩১৯১, সুনানে তিরমিযী : ২৯৮০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯২৫, আহমাদ : ২৭০৩, সহীহ আল জামি :  ১১৪১।

৬- ঘুমানোর আগে অযূ বা গোসল করা :

স্ত্রী সহবাসের পর সুন্নত হলো অযূ বা গোসল করে তবেই ঘুমানো। অবশ্য গোসল করাই উত্তম।

আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

ثَلَاثَةٌ لَا تَقْرَبُهُمُ الْمَلَائِكَةُ: جِيفَةُ الْكَافِرِ، وَالْمُتَضَمِّخُ بِالْخَلُوقِ، وَالْجُنُبُ، إِلَّا أَنْ يَتَوَضَّأَ

তিন প্রকার ব্যক্তির নিকট ফিরিশতারা আসেন না। (১) কাফিরের লাশের নিকট (জানাযায়). (২) জাফরান রঙ ব্যবহারকারী এবং (৩) নাপাক ব্যক্তির নিকট, তবে সে উযু করলে ভিন্ন কথা। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৮০

৭. বাসর রাতে স্ত্রী ঋতুবতীর হলেও যা যা অনুমতি রয়েছে

স্বামীর জন্য ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে যোনি ব্যবহার ছাড়া অন্য সব আচরণের অনুমতি রয়েছে। স্ত্রী পবিত্র হবার পর গোসল করলে তার সঙ্গে সবকিছুই বৈধ।

আনাস (রা. থেকে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীগণ তাদের মহিলাদের হায়িয হলে তার সাথে এক সঙ্গে খাবার খেত না এবং এক ঘরে বাস করত না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন-

আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।  সূরা বাকারা : ২২২

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা (সে সময় তাদের সাথে) শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ কর। এ খবর ইয়াহুদীদের কাছে পৌছলে তারা বলল, এ লোকটি সব কাজেই কেবল আমাদের বিরোধিতা করতে চায়।

অতঃপর উসায়দ ইবনু হুযায়র (রা.) ও আব্বাদ ইবনু বিশ্বর (রা.) এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা এমন এমন বলছে। আমরা কি তাদের সাথে (হায়িয অবস্থায়) সহবাস করব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। এতে আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি তাদের উপর ভীষণ রাগাম্বিত হয়েছেন। তারা (উভয়ে) বেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দুধ হাদিয়া এলো। তিনি তাদেরকে ডেকে আনার জন্যে লোক পাঠালেন। (তারা এলে) তিনি তাদেরকে দুধ পান করালেন। তখন তারা বুঝল যে, তিনি তাদের উপর রাগ করেননি। সহিহ মুসলিম : ৩০২

৮. বাসর রাতের স্ত্রী সান্বিধ্যের গোপন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না

বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

৯. বাসর রাতে বিশুদ্ধ নিয়তে স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে

নারী-পুরুষের উভয়ের উচিত বিয়ের মাধ্যমে নিজকে হারামে লিপ্ত হওয়া থেকে বাঁচানোর নিয়ত করা। তাহলে উভয়ে এর দ্বারা ছাদাকার ছাওয়াব লাভ করবে।

আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্ল-হু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে। সহিহ মুসলিম : ১০০৬

পড়াশুনার পাশাপাশি ইসলামি অনুশাসন শিক্ষা : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আধুনিক সমাজে একজন মুসলিম সন্তানের জন্য শুধু সাধারণ শিক্ষায় পারদর্শী হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তার অন্তরে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও দ্বীনের চেতনা সঞ্চার হওয়া অপরিহার্য। কারণ স্কুলের শিক্ষার মাধ্যমে সে হয়তো দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করবে, কিন্তু দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে তার অন্তর আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা, আর আখিরাতের প্রস্তুতি সম্পর্কে সচেতন হবে। তাই অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানকে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক অনুশাসন শেখানো।

শিশু বয়সে অর্জিত শিক্ষা দীর্ঘজীবন পর্যন্ত মনে গেঁথে থাকে। তাই এই বয়সেই যদি তাকে সঠিক আকিদা, সালাত, শিষ্টাচার ও পর্দার ধারণা শেখানো যায়, তবে সে বড় হয়ে একজন আদর্শ মুসলিম এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। আজকের শিশুই আগামী দিনের পরিবারপ্রধান, সমাজের নেতা কিংবা রাষ্ট্রের কর্ণধার। যদি তার ভেতরে দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি মজবুত হয়, তবে দুনিয়ার শিক্ষা তাকে পথভ্রষ্ট না করে বরং দ্বীনকে সঠিকভাবে ধারণ করার শক্তি দেবে।

একজন স্কুলগামী মুসলিম বালকের জন্য দ্বীনের যে বিষয়গুলো অপরিহার্য জ্ঞান হিসেবে শিখতে হবে, তা আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করছি।  

এর মধ্যে প্রথমেই আসছে— আকিদার মৌলিক বিষয়, যাতে সে আল্লাহর একত্ব, নবুওয়াত, আখিরাত ও ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে। দ্বিতীয়ত— সালাতের সাধারণ নিয়ম, কারণ সালাত দ্বীনের স্তম্ভ এবং প্রতিদিনকার অপরিহার্য ইবাদত। তৃতীয়ত— পর্দার প্রাথমিক ধারণা, যাতে সে ছোটবেলা থেকেই শালীনতা ও দৃষ্টি সংযমে অভ্যস্ত হয়।

এর পাশাপাশি আরও কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে, যা প্রত্যেক মুসলিম শিশুর জানা জরুরি। যেমন:

১. আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন

২. পবিত্রতার মৌলিক জ্ঞান অর্জন

৩. কুরআন শিক্ষা করা

৪. সালাতের সাধারণ নিয়ম শিক্ষা করা

৫. পর্দার প্রাথমিক ধারণা নেওয়া

৬. সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা (অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধু ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব)

৭. দু’আ ও যিকিরের মৌলিক দিকগুলো শেখা

৮. হালাল-হারামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা

১. আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন

শিশুদের আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ আকিদা দ্বীনের মূলভিত্তি। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশু বুঝতে পারে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, সবকিছুর মালিক, আর নবী ﷺ হচ্ছেন সর্বশেষ রাসূল, তবে তার ঈমান দৃঢ় হবে। আখিরাত, ফেরেশতা, বারজাখ ও কিয়ামতের বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকলে সে জীবনের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বুঝতে পারবে। আকিদার জ্ঞান শিশুকে কুসংস্কার, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও গোমরাহি থেকে রক্ষা করে। এতে তার হৃদয়ে তাকওয়া জন্মায় এবং আমলগুলো সঠিক পথে পরিচালিত হয়। তাই দুনিয়াবি শিক্ষার পাশাপাশি আকিদার মৌলিক শিক্ষা দেওয়া প্রতিটি অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব। নিচে আকিদার কিছু মৌলিক বিষয় প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-

১. তোমার রব (رَبٌّ) কে?

আমার ও সমগ্র বিশ্বের রব আল্লাহ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-

ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বের রব। সুরা ফাতিহা : ১

২: রব (رَبٌّ)  অর্থ কি?

“রব” (رَبّ) শব্দটি আরবি। এর মূল অর্থ হলো—

সৃষ্টি করা, পরিপূর্ণ করা, পরিপালন করা, পরিচর্যা করা ও লালন পালন করা। যিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, মালিক, নিয়ন্ত্রক, পরিচর্যাকারী ও হিদায়াত দানকারী।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ

বলুন, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে রব বানাবো? অথচ তিনিই সব কিছুর রব।” সুরা আনআম : ১৬৪

৩: আল্লাহ (اللّٰه) অর্থ কি?

আল্লাহ (اللّٰه) শব্দটি ইসলামের সবচেয়ে মহিমান্বিত নাম। আল্লাহ মানে হল— যাবতীয় ইবাদত, আনুগত্য ও উপাসনার যোগ্য একমাত্র সত্য সত্তা। কুরআনের ভাষায়-

وَإِلَـٰهُكُمْ إِلَـٰهٌۭ وَٰحِدٌۭ ۖ لَّآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلرَّحْمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ

তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু।” সুরা বাকারা : ১৬৩

৪: আল্লাহ কোথায় আছন?

আমার প্রভু আল্লাহ উর্ধ্বে, আরশের উপরে আছেন। মহান আল্লাহ নিজের সম্পর্কে বলেন,

اَلرَّحۡمٰنُ عَلَی الۡعَرۡشِ اسۡتَوٰی

পরম করুণাময় আরশের ওপর সমুন্নত। সুরা ত্বহা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-

الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

যিনি আসমান জমিন ও এতদুভয়ের অন্তবর্র্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। সুরা ফুরকান : ৫৯

কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা আরশে সমুন্নত। তিনি স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন, বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান। এমনকি গভির সমুদ্রের ক্ষুত্র প্রানি, জমিনের গভিরের ছোট পোকা তার দৃষ্টি ও জ্ঞানের বাহিরে নয়।

৫. আল্লাহর আকার আছে কি?

আল্লাহ রব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা জায়েয নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নন। কাজেই আল্লাহ তায়ালার আকার আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা তা বিশ্বাস করি কিন্তু তার ধরন জানিনা। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। তাই নিরাকার বলাটা তো একেবারেই অযৌক্তিক।  সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারনা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোন সৃষ্টির আকারে সাব্যস্থ করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি।

৬. আল্লাহ আমদেরকে কেন সৃষ্টি করেছেন?

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ

আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। সুরা জারিয়াত : ৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-

৭. আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় পাপ কোন্‌টি?

উত্তর : আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় পাপ হলে- শিরক। অর্থাত তার প্রভুত্তে, ইবাদতে ও গুনে কাউকে তার সমকক্ষ দাড় করার।

৮. ইবাদত অর্থ কি?

যে সকল কাজের কারণে আল্লাহ আমাদের ভালোবাসে বা সন্ত্বষ্ট হন তাই ইবাদত। যেমন- সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত, দান সদগা, জিকির, পর্দা করা, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা, উপকার করা ইত্যাদি।

৯. আমরা কার ইবাদত করব?

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ

আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। সুরা নিসা : ৩৬

১০. বান্দার প্রথম ফরজ কাজ কোনটি?

বান্দার প্রথম ফরজ কাজ হলো- আল্লাহ, তার ফিরিশতা, তার নাজিল করা কিতাব, তার রাসুল, শেষ দিবস ও তাকদিরের ভালো-মন্দের ওপর ঈমান আনা।

১১ তোমান দ্বীন কি?

আমার দ্বীন হচ্ছে, ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥

“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা তার পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫

১২. সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি কে?

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি হলো- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

১৩. ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন হক বা সত্য ধর্ম আছে কি?

না, ইসলাম ছাড়া অন্য কোন সত্য দ্বীন নাই। ইসলাম আল্লাহ মতোনিত একমাত্র পরিপূর্ণ দ্বীন। মহান আল্লাহ বলেন,

ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নে’মতসমূহ সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পছন্দ করলাম। সুরা মায়েদাহ : ৩

১৪. ঈমানের পুরস্কার কি?

ঈমানের পুরস্কার জান্নাত। মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫

১৫. কাফিরের আলম ওজন করা হবে না

আল্লাহ তায়ালা-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ رَبِّہِمۡ وَلِقَآئِہٖ فَحَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ فَلَا نُقِیۡمُ لَہُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَزۡنًا

তারাই সেসব লোক, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন ওজনের ব্যবস্থা রাখব না’। সুরা কাহাব : ১০৫

১৬. ইহসান কাকে বলে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইহসান হলো-

«أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ

এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে সক্ষম না হও, তাহলে মনে করবে, তিনি তোমাকে দেখছেন। সহিহ মুসলিম : ৮

১৭. নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব কিছুর পরিচালক কে?

আল্লাহ তায়ালাই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব বস্তুর পরিচালক।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সিজদা : ৫

১৮. নবি, রাসূল, অলি-আওলিয়ারা কি গায়েবের খবর জানেন?

মহান আল্লাহ বলেন-

﴿وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَكۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِيَ ٱلسُّوٓءُۚ

“আর আমি যদি গায়বের কথা জানতাম, তাহলে বহু কল্যাণ অর্জন করে নিতে পারতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। সুরা আরআফ : ১৮৮

আমাদের প্রিয় রাসুল ﷺ যেখানে গায়েব জানেন সেখানে অন্য নবি, রাসূল, অলি-আওলিয়ারাদের বিষয়টি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৯. আল্লাহর অলি হতে কি কি গুন থাকা প্রয়োজন?

অলি আওলিয়া সম্পর্কে আমাদের সমাজে ভ্রান্ত ধারনা প্রচলিত আছে যে যিনি আল্লাহ অলি ব বন্ধু হবে তিনি অলৌকিক ক্ষমতার দেখান বা তার মাধ্যমে শত শথ অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পায়। তদের ও ধারনা মিথ্যা ও কুফরির সামিল। কেননা অলৌকিক ক্ষমতার মালিক শুধি আল্লাহ। মহান আল্লাহর মতে দুটি গুনা কোন মানুষের মাঝে থাকলে তিনিই আল্লাহ অলি বা বন্ধু। আল্লাহ তায়ারা বলেন-

اَلَاۤ اِنَّ اَوْلِیَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَیْهِمْ وَ لَا  هُمْ  یَحْزَنُوْنَ ﴿ۚۖ۶۲﴾   الَّذِیْنَ  اٰمَنُوْا  وَ كَانُوْا  یَتَّقُوْنَ ﴿ؕ۶۳﴾

জেনে রাখ, আল্লাহর বন্ধুদের (অলিয়াদের) কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা হলো, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। সুরা ইউনুস : : ৬২-৬৩

২০. পৃথিবীতে কি আল্লাহকে দেখা সম্ভব?

না, পৃথিবীতে বসে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

لَا تُدۡرِکُہُ الۡاَبۡصَارُ ۫ وَہُوَ یُدۡرِکُ الۡاَبۡصَارَ ۚ وَہُوَ اللَّطِیۡفُ الۡخَبِیۡرُ

কোন মানব-দৃষ্টি তাঁকে দেখতে পারেনা, অথচ তিনি সকল কিছুই দেখতে পান এবং তিনি অতীব সূক্ষ্মদর্শী এবং সর্ব বিষয়ে ওয়াকিফহাল। সুরা আনআম : ১০৩

২১. মুমিনগণ পরকালে কি আল্লাহকে দেখতে পারবে?

হ্যাঁ, মুমিনগণ জান্নাতে তাঁদের প্রতিপালককে দেখতে পাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

وَ  لٰكِنْ  كَذَّبَ وَ تَوَلّٰی ﴿ۙ۳۲﴾  ثُمَّ  ذَهَبَ  اِلٰۤی  اَهْلِہٖ یَتَمَطّٰی ﴿ؕ۳۳﴾

সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। সুর কিয়ামাহ : ২২-২৩

২২. ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ কতটি?

ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ ছয়টি। যথা-

কুরআনুল কারীমের আয়াত ও সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলিমগণ হাদিসে জিবরাঈলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন। যথা-

(১) আল্লাহর প্রতি ঈমান,

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান,  

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান,  

(৪) রাসূলগণের প্রতি ঈমান,

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং

(৬) তাকদীর বা পূর্বনিয়তির প্রতি ঈমান।

২৩. তাওহীদ কয় প্রকার ও কি কি?

তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ তিন প্রকার। যথা

১. ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ :  এর অর্থ হচ্ছে, আমাদেরকে এমর্মে অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, একমাত্র আল্লাহই এককভাবে ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, এতে তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ

“তাদেরকে কেবলমাত্র এই নির্দেশ করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি বিশ্বাসের সহিত এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে। সুরা বাইয়েনাহ : ৫

২. রুবুবিয়াত তথা প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ:  অর্থাৎ আমাদেরকে এই অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, একমাত্র আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রিযিক্বদাতা এবং পরিচালক; এক্ষেত্রে তার কোনো অংশীদার নেই এবং নেই কোনো সহযোগীও। মহান আল্লাহ বলেন,

هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ فَأَنَّىٰ تُؤۡفَكُونَ

আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন স্রষ্টা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযিক্ব দান করে? তিনি ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা কিভাবে (তাঁর তাওহীদ থেকে) ফিরে যাচ্ছ?” সুরা ফাতির : ৩

৩. আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ এবং গুণাবলীর ক্ষেত্রে একত্ববাদ : অর্থাৎ এই বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ এবং পরিপূর্ণ গুণাবলী রয়েছে, যেগুলি কুরআনুল কারীম ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন-

وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ

আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। অতএব, সেগুলির মাধ্যমেই তাঁকে ডাকো সুরা  আরাফ : ১৮০ এই নামসমূহ এবং গুণাবলীতে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যাবে না এবং এগুলির কল্পিত কোনো আকৃতি যেমন স্থির করা যাবে না, তেমনি কোনো সৃষ্টির সাথে সেগুলির কোনোরূপ সাদৃশ্য বিধানও করা চলবে না। আমাদেরকে আরো বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহর মত আর কেউ নেই। আল্লাহ বলেন,

لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ

কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা” (শূরা ১১)।

২৪. শির্ক কত প্রকার ও কি কি?

শির্ক দুই প্রকার। যথা-

১. বড় শিরক।

২. ছোট শিরক।

১. শিরকে আকবার বা বড় শিরক

বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا فَاُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ 

আর যারা কুফরী করে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তাদের জন্যেই রয়েছে অপমানজনক আযাব। সুরা হজ : ৫৭

২. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক

আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য করাতে যে শিরক হয় তাকে ছোট শিরক বা রিয়া বলা হয়।  শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّهٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّ لَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّهٖۤ اَحَدًا

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সূরা আল কাহফ : ১১০

২৫. কুফরী কত প্রকার ও কি কি?

কুফরী দুই প্রকার। যথা-

১. বড় কুফরী :

২. ছোট কুফরী :

১. বড় কুফরী : যে কুফরি মানুষকে দ্বীন থেকে বের করে দেয়। যেমন-

আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে গালি দেওয়া বা অস্বীকার করা। ইসলামের রুকনসমূহ বা আল্লাহ কর্তৃক ফজরকৃত বিধানকে অস্বীকার করলে বড় কুফরি হবে। মহান আল্লাহ বলেন-

وَ لَئِنْ سَاَلْتَهُمْ لَیَقُوْلُنَّ اِنَّمَا کُنَّا نَخُوْضُ وَ نَلْعَبُ ؕ قُلْ اَ بِاللّٰهِ وَ اٰیٰتِہٖ وَ رَسُوْلِہٖ  کُنْتُمْ  تَسْتَہْزِءُوْنَ ﴿۶۵﴾ لَا تَعْتَذِرُوْا قَدْ كَفَرْتُمْ  بَعْدَ  اِیْمَانِکُمْ ؕ اِنْ نَّعْفُ عَنْ طَآئِفَۃٍ مِّنْکُمْ نُعَذِّبْ طَآئِفَۃًۢ  بِاَنَّهُمْ  كَانُوْا  مُجْرِمِیْنَ ﴿۶۶﴾

আর যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর, অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বল, ‘আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের সাথে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে’? তোমরা ওযর পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরী করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আযাব দেব। কারণ, তারা হচ্ছে অপরাধী। সুরা তাওবা : ৬৫-৬৬

২. ছোট কুফরী : আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করা অথবা কোনো মুসলিম ব্যক্তির সাথে অন্যায়ভাবে কলহ-বিবাদ ও মারামারি করা বা হত্যা করা।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ

 মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তাকে হত্যা করা কুফুরী। সহিহ বুখারি : ৬০৪৪

২৬. আখেরাতে সুপারিশ প্রাপ্তির শর্ত কি?

আখেরাতে সুপারিশ প্রাপ্তির দুটি শর্ত। যথা-

১. ঈমারদান :

২. আল্লাহ অনুমতি :

১. ঈমারদান : সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দুনিয়াতে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরীর গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন, কিয়ামত দিবসে তারা সুপরিশ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের জন্য কোন প্রকারের সুপারিসের অনুমতি প্রদান করা হবে না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ

আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সূরা বায়্যিনাহ : ৬

এ থেকে বুঝা গেল, কাফির এবং মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশকারী নাই।

২. আল্লাহর অনুমতি : আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূর্ণরূপে তার ইচ্ছাধীন। শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬ا‌ۖ لَّهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ (٤٤) 

বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সূরা যুমার : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ

অর্থ: পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷  কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সূরা বাক্বারা : ২৫৫

২৭. কারা আল্লাহ অনুমতি প্রদান সাপেক্ষে সুপারিশ করতে পারবে

ঈমান ও আল্লাহর অনুমতি প্রদানে পর আল্লাহ কিছু বান্দা অন্য বান্দাদের সুপারিশ করতে পারবে।  সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম  সুপারিশের অনুমতি পাবেন। 

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ

আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০

রসূলুল্লাহ এর পর অন্যান্য নবী রাসুলগণ, শহিদগণ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, কুরআন ও সিয়াম মুমিনদের জন্য সুপারিশের অনুমতি পাবেন 

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২

২৮. ইবাদত কবূল হওয়ার শর্ত কয়টি ও কি কি?

ইবাদত কবূল হওয়ার শর্ত দু’টি। যথা-

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা

২. সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি করতে হবে

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা : ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ

তাদেরকে কেবলমাত্র এই নির্দেশ করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি বিশ্বাসের সাথে এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে” (বাইয়্যেনাহ ৫)।

২. সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি করতে হবে : রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত পদ্ধতিত বা সুন্নাহ সম্মতভাবে করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন-

مَنۡ یُّطِعِ الرَّسُوۡلَ فَقَدۡ اَطَاعَ اللّٰہَ ۚ  وَمَنۡ تَوَلّٰی فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ حَفِیۡظًا ؕ

যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি। সুনা নিসা : ৮০

রাসূল ﷺ প্রতি খুতবায় বলতেন-

«فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ»

অর্থ: “নিশ্চয় সর্বোত্তম কথা আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ মুহাম্মদ ﷺ-এর পথনির্দেশ। আর নিকৃষ্টতম কাজ হলো দ্বীনে নতুন উদ্ভাবন, আর প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনই বিদআত। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে দাউদ : ৪৬০৭, সুনানে আন-নাসায়ি : ১৫৭৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫

২৯গণক বা জ্যোতিষীগণ কি অদৃশ্যের খবর রাখেন?

না, গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন না। অদৃশ্যে জ্ঞানের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

*عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِۦٓ أَحَدًا *

তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। সুরা জিন : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ لَّا یَعۡلَمُ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ الۡغَیۡبَ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ اَیَّانَ یُبۡعَثُوۡنَ

বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’। সুরা নামল : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَمَّا قَضَیۡنَا عَلَیۡہِ الۡمَوۡتَ مَا دَلَّہُمۡ عَلٰی مَوۡتِہٖۤ اِلَّا دَآبَّۃُ الۡاَرۡضِ تَاۡکُلُ مِنۡسَاَتَہٗ ۚ  فَلَمَّا خَرَّ تَبَیَّنَتِ الۡجِنُّ اَنۡ لَّوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ الۡغَیۡبَ مَا لَبِثُوۡا فِی الۡعَذَابِ الۡمُہِیۡنِ ؕ

তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না। সুরা সাবা : ১৪

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সঙ্গম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৯০৪,

কুরআন সুন্নাহর আলোকে বলা যায়- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কারো কাছে গায়ের প্রকাশ করেন না, কোন নবী রাসূলও গায়েব জানে না, এমনকি কোন জিনও গায়েব জানে না। তাহলে গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের খবর রাখেন এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া নিসন্দেহে শির্ক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।

৩০. ঈসা আলাইহিস সালাম কি মৃত্যুবরণ করেছেন?

না, ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেন নাই। তাকে উপরে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-

وَّ قَوْلِهِمْ اِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِیْحَ عِیْسَی ابْنَ مَرْیَمَ رَسُوْلَ اللّٰهِ ۚ وَ مَا قَتَلُوْهُ وَ مَا صَلَبُوْهُ وَ لٰكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ ؕ وَ  اِنَّ الَّذِیْنَ اخْتَلَفُوْا فِیْهِ لَفِیْ شَکٍّ مِّنْهُ ؕ مَا لَهُمْ بِہٖ مِنْ عِلْمٍ  اِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ ۚ وَ مَا قَتَلُوْهُ  یَقِیْنًۢا ﴿۱۵۷﴾ۙ  بَلْ رَّفَعَهُ اللّٰهُ اِلَیْهِ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ عَزِیْزًا حَكِیْمًا ﴿۱۵۸﴾

এবং তাদের এ কথার কারণে যে, ‘আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম পুত্র ঈসা মাসীহকে হত্যা করেছি’। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে শূলেও চড়ায়নি। বরং তাদেরকে ধাঁধায় ফেলা হয়েছিল। আর নিশ্চয় যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল, অবশ্যই তারা তার ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে ছিল। ধারণার অনুসরণ ছাড়া এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাঁর কাছে তাকে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ১৫৭-১৫৮

মহান আল্লাহ আরওভ বলেন-

اِذۡ قَالَ اللّٰہُ یٰعِیۡسٰۤی اِنِّیۡ مُتَوَفِّیۡکَ وَرَافِعُکَ اِلَیَّ وَمُطَہِّرُکَ مِنَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا

স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ঈসা, নিশ্চয় আমি তোমাকে পরিগ্রহণ করব, তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নেব এবং কাফিরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করব। সুরা আল ইমরান : ৩৩

এ আয়াতগুলোই প্রমাণ করে যে ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেন নাই; বরং আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন।

৩১. খিযির কি এখনো জীবিত?

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে প্রেরিত হওয়ার আগেই খিযির মারা গেছেন। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٖ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَٰلِدُونَ

আপনার পূর্বে কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে? সুরা আম্বিয়া : ৩৪

আকিদা বা বিশ্বাসগত শিরকে আকবর : দ্বিতীয় পর্ব (১৫-১৯)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৫। মানুষ বা সৃষ্টিকে আল্লাহর মত ভয় করা

মহান আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষার জন্য দুয়িয়াতে প্রেরণ করেছেন। দুনিয়াত তার আদেশে নিষেধ মেনে চলতে পারলে জান্নাতে তিনি স্থায়ী নিবাস করে দিবেন। তার হুকুমের বাহিরে চললে তিনি স্থায়ী আজাবে নিপতিত করবেন। যার হাতে আমার জীবন, মরণ, জান্নাত, জাহান্নাম, সুখ, শান্তি ইত্যাদি। তাকে কেমন সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে ভয় করা উচিত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তার সেই ভয়ের স্থান যদি সৃষ্টিকে স্থান দেওয়া হয় অর্থাত আল্লাহ মত তার সৃষ্টিকে ভয় করা। তাহলে আল্লাহ তার সমতুল্য ভয় করার জন্য তার বান্দাকে শিরকের গুনাহে অধিযুক্ত করবেন।

আল্লাহকে ভয় কার ফরজ আর গাইরুল্লাহকে ভয় করা শিরক-

অপরাধের জন্য আল্লাহর শাস্তি অবধারিত এ জন্য তাকে ভয় করা ফরজ। কুরআন বিভিন্ন আয়াতে এই বিষয়টি বার বার আল্লাহ তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর মত অন্য কাউকে ভয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। কোন মুসলিমকে যুদ্ধের জন্য আহবান করা হলে, সে জীবনের মায়ায় কাফিরকে আল্লাহ থেকে বেশী ভয় করে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। এই ধরনের ভয়কে আল্লাহ তিরস্কার করেছেন। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ قِيلَ لَهُمۡ كُفُّوٓاْ أَيۡدِيَكُمۡ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيۡہِمُ ٱلۡقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ۬ مِّنۡہُمۡ يَخۡشَوۡنَ ٱلنَّاسَ كَخَشۡيَةِ ٱللَّهِ أَوۡ أَشَدَّ خَشۡيَةً۬‌ۚ وَقَالُواْ رَبَّنَا لِمَ كَتَبۡتَ عَلَيۡنَا ٱلۡقِتَالَ لَوۡلَآ أَخَّرۡتَنَآ إِلَىٰٓ أَجَلٍ۬ قَرِيبٍ۬‌ۗ قُلۡ مَتَـٰعُ ٱلدُّنۡيَا قَلِيلٌ۬ وَٱلۡأَخِرَةُ خَيۡرٌ۬ لِّمَنِ ٱتَّقَىٰ وَلَا تُظۡلَمُونَ فَتِيلاً

তোমরা কি তাদেরকেও দেখেছো, যাদেরকে বলা হয়েছিল, তোমাদের হাত গুটিয়ে রাখো এবং নামায কায়েম করো ও যাকাত দাও? এখন তাদেরকে যুদ্ধের হুকুম দেয়ায় তাদের একটি দলের অবস্থা এই দাঁড়িয়েছে যে, তারা মানুষকে এমন ভয় করেছে যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিত অথবা তার চেয়েও বেশী ৷ তারা বলছে, হে আমাদের রব ! আমাদের জন্য এই যুদ্ধের হুকুমনামা কেন লিখে দিলে? আমাদের আরো কিছু সময় অবকাশ দিলে না কেন ? তাদেরকে বলো, দুনিয়ার জীবন ও সম্পদ অতি সামান্য এবং একজন আল্লাহর ভয়ে ভীত মানুষের জন্য আখেরাতই উত্তম ৷ আর তোমাদের ওপর এক চুল পরিমাণও জুলুম করা হবে না৷  সুরা নিসা : ৭৭

ইয়াহুদিগণ লোক লজ্জার ভয়ে ইসলামকে সত্য জেনেও হক গ্রহন করেত পারে নাই। আল্লাহ থেকে মানুষের ভয়কে বা দুনিয়ার স্বার্থকে বেশী গুরুত্ব দিসে। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَا تَخۡشَوُاْ ٱلنَّاسَ وَٱخۡشَوۡنِ وَلَا تَشۡتَرُواْ بِـَٔايَـٰتِى ثَمَنً۬ا قَلِيلاً۬‌ۚ وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَـٰٓٮِٕكَ هُمُ ٱلۡكَـٰفِرُونَ  

কাজেই, তোমরা মানুষকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো৷ আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফায়সালা করে না তারাই কাফের৷ সুরা মায়িদা : ৪৪

রসূলুল্লাহ ﷺ কে মহান আল্লাহ তার আদেশ মানেতে লোকদের ভয় করেত নিষেধ করেছেন। তিনি আদেশ দিয়েছেন আমাকেই ভয় কর। মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 وَمِنۡ حَيۡثُ خَرَجۡتَ فَوَلِّ وَجۡهَكَ شَطۡرَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ‌ۚ وَحَيۡثُ مَا كُنتُمۡ فَوَلُّواْ وُجُوهَڪُمۡ شَطۡرَهُ ۥ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَيۡكُمۡ حُجَّةٌ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ مِنۡہُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَٱخۡشَوۡنِى وَلِأُتِمَّ نِعۡمَتِى عَلَيۡكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَہۡتَدُونَ (١٥٠) 

 আর যেখান থেকেই তুমি চল না কেন তোমার মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও এবং যেখানেই তোমরা থাকো না কেন সে দিকেই মুখ করে সালাত আদায় কর, যাতে লোকেরা তোমাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ খাড়া করতে না পারে।  তবে যারা যালেম, তাদের মুখ কোন অবস্থায়ই বন্ধ হবে না৷ কাজেই তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো, আর এ জন্য যে, আমি তোমাদের ওপর নিজের অনুগ্রহ পূর্ণ করে দেবো এবং এই আশায় যে, আমার এই নির্দেশের আনুগত্যের ফলে তোমরা ঠিক তেমনিভাবে সাফল্যের পথ লাভ করবে। সুরা বাকারা : ১৫০

কখনো নিন্দুকের নিন্দার ভয়ে আমল ছেড়ে দিলে শির্ক হবে। কারন আল্লাহর আদেশের উপর গাইরুল্লার ভয়কে স্থান দিয়েছে। আল্লাহর ও গাইরুল্লার কে সমান করা শির্ক নয় কি? মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِى ٱللَّهُ بِقَوۡمٍ۬ يُحِبُّہُمۡ وَيُحِبُّونَهُ ۥۤ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَـٰفِرِينَ يُجَـٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآٮِٕمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ (٥٤)

 হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি দীন থেকে ফিরে যায়, আল্লাহ এমনিতর আরো বহু লোক সৃষ্টি করে দেবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালবাসবে, যারা মুমিনদের ব্যাপারে কোমল ও কাফেরদের ব্যাপারে কঠোর হবে, যারা আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করে যাবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবেনা৷ এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে চান তাকে দান করেন৷ আল্লাহ ব্যাপক উপায় উপকরণের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন৷ সুরা মায়িদা : ৫৪

আল্লাহ ব্যতীত মূর্তি প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য তাগুত, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত, মৃত কিংবা অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর দ্বারা ক্ষতি বা অনিষ্ট হওয়ার ভয়, আশংকা করা। ইহাদের এমন ভাবে ভয় করে যেমন আল্লাহকে ভয় করা উচিৎ। ঐ সবের প্রতি ধারনা ধারনা করা যে ইহারা ক্ষতি করতে পারে অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটাতে পারে। এরূপ ভয় ও ভীতি দ্বীনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা শুধু মাত্র আল্লাহ তা’আলার সাথে নির্দিষ্ট। এখন যদি কেউ এটিকে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো দিকে সম্পর্কিত করে তাহলে সে আল্লাহর সাথে বড় শির্ক করল বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّمَا ذَٲلِكُمُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ يُخَوِّفُ أَوۡلِيَآءَهُ ۥ فَلَا تَخَافُوهُمۡ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ

এখন তোমরা জেনে ফেলেছো, সে আসলে শয়তান ছিল, তার বন্ধুদের অনর্থক ভয় দেখাচ্ছিলে৷ কাজেই আগামীতে তোমরা মানুষকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো, যদি তোমরা যথার্থ ঈমানদার হয়ে থাকো৷ আল ইমরান : ১৭৫

মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

أَلَيۡسَ ٱللَّهُ بِكَافٍ عَبۡدَهُ ۥ‌ۖ وَيُخَوِّفُونَكَ بِٱلَّذِينَ مِن دُونِهِۦ‌ۚ وَمَن يُضۡلِلِ ٱللَّهُ فَمَا لَهُ ۥ مِنۡ هَادٍ۬

 আল্লাহ নিজে কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? এসব লোক তাকে বাদ দিয়ে তোমাদেরকে অন্যদের ভয় দেখায়৷ অথচ আল্লাহ যাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেন তাকে কেউ পথপ্রদর্শন করতে পারে না। সুরা জুমার : ৩৬

আল্লাহ ব্যতীত যে সকল তাগুত, অদৃশ্য জ্বিন, ভুত থেকে অনিষ্ট হওয়ার ভয় করা হয় তারা নিজেরাই আল্লাহর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত৷ আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷  সুরা বনি ইসরাঈল : ৫৭

ইলাহ, মাবুদ হিসেবে এবং তার নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে ভয় করা। আর এটাই হলো ঈমানের ওয়াজিব সমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ ওয়াজিব। মুমিন কোথাও পরম দয়ালু আল্লাহকে দেখে নাই। নিজের ইন্দ্রিসমূহ দ্বারাও তাকে অনুভব করতে পারে নাই। তা সত্ত্বেও তাঁর নাফরমানী করতে সে ভয় পেয়েছে কারন তাকে সে বিশ্বাস করেছে। প্রকাশ্যে দেখা যায় না এমন সব শক্তি ও সত্তার তুলনায় তার মনে অদেখা শক্তির ভয় অধিক প্রবল ছিল বলেই সে পাপ কাজে লিপ্ত হয় নাই। বরং সব সময়ই তাঁর অসন্তুষ্টিকে ভয় পেয়েছে । মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 مَّنۡ خَشِىَ ٱلرَّحۡمَـٰنَ بِٱلۡغَيۡبِ وَجَآءَ بِقَلۡبٍ۬ مُّنِيبٍ (٣٣) ٱدۡخُلُوهَا بِسَلَـٰمٍ۬‌ۖ ذَٲلِكَ يَوۡمُ ٱلۡخُلُودِ  

যে অদেখা দয়াময়কে ভয় করতো, যে অনুরক্ত হৃদয় নিয়ে এসেছে৷ বেহেশতে ঢুকে পড় শান্তির সাথে৷ সেদিন অনন্ত জীবনের দিন হবে৷ সুরা ক্বাফ : ৩৩-৩৪

মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

يَـٰبَنِىٓ إِسۡرَٲٓءِيلَ ٱذۡكُرُواْ نِعۡمَتِىَ ٱلَّتِىٓ أَنۡعَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ وَأَوۡفُواْ بِعَہۡدِىٓ أُوفِ بِعَهۡدِكُمۡ وَإِيَّـٰىَ فَٱرۡهَبُونِ

হে বনী ইসরাঈল ৷ আমার সেই নিয়ামতের কথা মনে করো, যা আমি তোমাদের দান করেছিলাম, আমার সাথে তোমাদের যে অংগীকার ছিল, তা পূর্ণ করো, তা হলে তোমাদের সাথে আমার যে অংগীকার ছিল ,তা আমি পূর্ণ করবো এবং তোমরা একমাত্র আমাকেই ভয় করো। সুরা বাকারা : ৪০

মহান আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 أَفَأَمِنُواْ مَڪۡرَ ٱللَّهِ‌ۚ فَلَا يَأۡمَنُ مَڪۡرَ ٱللَّهِ إِلَّا ٱلۡقَوۡمُ ٱلۡخَـٰسِرُونَ

এরা কি আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে নির্ভীক হয়ে গেছে?   অথচ যে সব সম্প্রায়ের ধ্বংস অবধারিত তারা ছাড়া আল্লাহর কৌশলের ব্যাপারে আর কেউ নির্ভীক হয় না৷ সুরা আরাফ : ৯৯

হাদিসে এসেছে আল্লাহকে ভয় করার কারনে পূর্বে যুগের এক বান্দাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী ﷺ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, পূর্বযুগে এক লোক তার নিজের উপর অনেক জুলুম করেছিল। যখন তার মৃত্যুকাল ঘনিয়ে এলো, সে তার পুত্রদেরকে বলল, মৃত্যুর পর আমার দেহ হাড় গোশতসহ পুড়িয়ে ছাই করে নিও এবং প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দিও। আল্লাহর কসম! যদি আল্লাহ্ আমাকে ধরে ফেলেন, তবে তিনি আমাকে এমন কঠিনতম শাস্তি দিবেন যা অন্য কাউকেও দেননি। যখন তার মওত হল, তার সঙ্গে সে ভাবেই করা হল। অতঃপর আল্লাহ্ যমীনকে আদেশ করলেন, তোমার মাঝে ঐ ব্যক্তির যা আছে জমা করে দাও। যমীন তা করে দিল। এ ব্যক্তি তখনই দাঁড়িয়ে গেল। আল্লাহ্ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসে তোমাকে এ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করল? সে বলল, হে, প্রতিপালক তোমার ভয়। অতঃপর তাকে ক্ষমা করা হলো। সহিহ বুখারি : ৩৪৮১, ৭৫০৬, সহিহ মুসলিম : ২৭৫৬)

২. মুমিনদের ভীতিপূর্ণ জীবন যাপন:

মুমিন দুনিয়ায় আল্লাহর ব্যাপারে ভীতি শূণ্য ও চিন্তামুক্ত জীবন যাপন করে না। যা মনে আসে তাই করে না এবং ওপরে একজন আল্লাহ আছেন তিনি জুলুম ও বাড়াবাড়ি করলে পাকড়াও করেন একথা কখনো ভুলে যায় না। বরং তাদের মন সব সময়  তাঁর ভয়ে ভীত থাকে এবং তিনিই তাদেরকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে থাকেন। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ هُم مِّنۡ خَشۡيَةِ رَبِّہِم مُّشۡفِقُونَ ٥٧

 আসলে কল্যাণের দিকে দৌড়ে যাওয়া ও অগ্রসর হয়ে তা অর্জনকারী লোক তো তারাই যারা নিজেদের রবের ভয়ে ভীত। সরা মুমিনুন : ৫৭

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 فَٱسۡتَجَبۡنَا لَهُ ۥ وَوَهَبۡنَا لَهُ ۥ يَحۡيَىٰ وَأَصۡلَحۡنَا لَهُ ۥ زَوۡجَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّهُمۡ ڪَانُواْ يُسَـٰرِعُونَ فِى ٱلۡخَيۡرَٲتِ وَيَدۡعُونَنَا رَغَبً۬ا وَرَهَبً۬ا‌ۖ وَڪَانُواْ لَنَا خَـٰشِعِينَ

অর্থ: কাজেই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ইয়াহ্‌ইয়া দান করেছিলাম, আর তার স্ত্রীকে তার জন্য যোগ্য করে দিয়েছিলাম৷ তারা সৎকাজে আপ্রাণ চেষ্টা করতো, আমাকে ডাকতো আশা ও ভীতি সহকারে এবং আমার সামনে ছিল অবনত হয়ে৷ সুরা আম্বিয়া  : ৯০

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

قَالُوٓاْ إِنَّا ڪُنَّا قَبۡلُ فِىٓ أَهۡلِنَا مُشۡفِقِينَ

তারা বলবে আমরা প্রথমে নিজের পরিবারের লোকদের মধ্যে ভয়ে ভয়ে জীবন যাপন করতাম৷ সুরা তুর : ২৬

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَنُسۡڪِنَنَّكُمُ ٱلۡأَرۡضَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡ‌ۚ ذَٲلِكَ لِمَنۡ خَافَ مَقَامِى وَخَافَ وَعِيدِ

এবং এদের পর পৃথিবীতে তোমাদের প্রতিষ্ঠিত করবো৷ এটা হচ্ছে তার পুরস্কার, যে আমার সামনে জবাবদিহি করার ভয় করে এবং আমার শাস্তির ভয়ে ভীত৷ সুরা ইব্রাহীম : ১৪

প্রকৃতিগত সাভাবিক ভয়:

দুশমন, শত্রু, হিংস্র জীব জনোয়ার ইত্যাদির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বিপদ বা ক্ষতির আশংকা থাকলে ভয় করা বৈধ। যে এ প্রকারের ভয় করবে তাকে তিরস্কার করা যাবে না। আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

قَالَ رَبِّ إِنِّىٓ أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ (١٢) وَيَضِيقُ صَدۡرِى وَلَا يَنطَلِقُ لِسَانِى فَأَرۡسِلۡ إِلَىٰ هَـٰرُونَ

 সে (মুছা) বললো, “হে আমার রব! আমার ভয় হয় তারা আমাকে মিথ্যা বলবে। আমার বক্ষ সংকুচিত হচ্ছে এবং আমার জিহ্বা সঞ্চালিত হচ্ছে না৷ আপনি হারুনের প্রতি রিসালাত পাঠান। সুরা শুয়ারা : ১২-১৩

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 فَخَرَجَ مِنۡہَا خَآٮِٕفً۬ا يَتَرَقَّبُ‌ۖ قَالَ رَبِّ نَجِّنِى مِنَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلظَّـٰلِمِينَ

এ খবর শুনতেই মূসা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লো এবং সে দোয়া করলো, “হে আমার রব! আমাকে জালেমদের হাত থেকে বাঁচাও৷ সুরা কাসাস : ২১

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 قَالَ إِنِّى لَيَحۡزُنُنِىٓ أَن تَذۡهَبُواْ بِهِۦ وَأَخَافُ أَن يَأۡڪُلَهُ ٱلذِّئۡبُ وَأَنتُمۡ عَنۡهُ غَـٰفِلُونَ

বাপ বললো, “তোমরা তাকে নিয়ে যাবে, এটা আমাকে কষ্ট দেবে এবং আমরা আশংকা হয়, তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে এবং নেকড়ে থাকে খেয়ে ফেলবে৷ সুরা ইউসুফ : ১৩

১৬। আল্লাহ ছাড়া গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা

আল্লাহ উপর তাওয়াক্কুল করা ফরজঃ

সকল কাজে সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহ তায়ার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা মুমিন বান্দার উপর ফরজ। আল্লাহ তায়ালার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা ঈমানের দাবি ও শীর্ষ পর্যায়ের ইবাদত।

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَلَى ٱللَّهِ فَتَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ

এবং একমাত্র আল্লাহ তা’আলার উপরই তাওয়াক্কুল কর যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। সুরা মায়েদা : ২৩

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

فَإِذَا عَزَمۡتَ فَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ‌ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُتَوَكِّلِينَ

তারপর যখন কোন মতের ভিত্তিতে তোমরা স্থির সংকল্প হবে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো৷ আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন যারা তাঁর ওপর ভরসা করে কাজ করে৷ সুরা ইমরান : ১৫৯

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَعَلَى ٱللَّهِ فَلۡيَتَوَكَّلِ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ

 কাজেই সাচ্চা মুমিনদের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত। সুরা আল ইমরান : ১৬০

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 وَقَالَ مُوسَىٰ يَـٰقَوۡمِ إِن كُنتُمۡ ءَامَنتُم بِٱللَّهِ فَعَلَيۡهِ تَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّسۡلِمِينَ  

অর্থ: মুসা তার কওমকে বললো, হে লোকেরা! যদি তোমরা সত্যিই আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে থাকো তাহলে তার ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম ও পূর্ণ আত্মসমর্পনকারী হও। সুরা ইউনুস : ৮৪

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

وَلِلَّهِ غَيۡبُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَإِلَيۡهِ يُرۡجَعُ ٱلۡأَمۡرُ كُلُّهُ ۥ فَٱعۡبُدۡهُ وَتَوَڪَّلۡ عَلَيۡهِ‌ۚ وَمَا رَبُّكَ بِغَـٰفِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُونَ

অর্থ: আকাশে ও পৃথিবীতে যাকিছু লুকিয়ে আছে সবই আল্লাহর কুদরাতের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং সমস্ত বিষয়ে তাঁরই দিকে রুজু করা হয়৷ কাজেই হে নবী! তুমি তাঁর বন্দেহী করো এবং তাঁরই ওপর ভরসা রাখো৷ যাকিছু তোমরা করছো তা থেকে তোমার রব গাফেল নন৷ সুরা হুদ : ১২৩

আল্লাহ রআব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُہُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡہِمۡ ءَايَـٰتُهُ ۥ زَادَتۡہُمۡ إِيمَـٰنً۬ا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ

সাচ্চা ঈমানদার তো তারাই আল্লাহকে স্মরণ করা হলে যাদের হৃদয় কেঁপে ওঠে৷ আর আল্লাহর আয়াত যখন তাদের সামনে পড়া হয়, তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে৷ সুরা আনফাল : ২

উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলূল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, যদি তোমারা যথার্থই আল্লাহর উপর ভরসা করতে, তাহলে তিনি অবশ্যই তোমাদেরকে পাখির মত রিযিক দান করতেন। ভোরবেলা পাখিরা খালিপেটে বের হয়ে যায় এবং সন্ধ্যাবেলা উদর পূর্তি করে ফিরে আসে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৪৬, সুনানে তিরমিজি : ২৩৪৪

তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা করার অর্থ হলো,  দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় বিষয়ের কল্যাণ, লাভ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সঠিকভাবে অন্তর থেকে আল্লাহর উপর নির্ভর করা। বান্দা তার প্রতিটি বিষয় আল্লাহর উপর সোপর্দ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন। অন্তরে এই বিশ্বাস থাকবে যে, আমার উপকার বা অপকার করার একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারো অধিকারে নেই। ইসলামে তাওয়াক্কুল হল, মানুষ কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করবে আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করবে এবং তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যের উপর তাওয়াক্কুল করা শিরক হিসেবে গণ্য হয়।

রসূলুল্লাহ ﷺ এর তাওয়াক্কুল সম্পর্ক একটি হাদিস-

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে নাজদ এর দিকে একটি জিহাদে গেলাম। রসূলুল্লাহ ﷺ একটি কাটাবন যুক্ত উপত্যকায় আমাদের পেলেন। রসূলুল্লাহ ﷺ একটি গাছের তলায় অবতরণ করলেন এবং তার তলোয়ারটি সে বৃক্ষের একটি শাখায় লটকিয়ে রাখলেন। বর্ণনাকারী জাবির (রা.) বলেন, আর লোকেরা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেয়ার জন্য প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ল। পরে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, জনৈক লোক আমার নিকট আসলো তখন আমি ঘুমন্ত। সে তলোয়ারটি হাতে নিল। আমি জেগে উঠলাম, আর সে আমার মাথার কাছে দণ্ডায়মান। আমি কিছু বুঝে না উঠতেই উন্মুক্ত তলোয়ারটি তার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। অতঃপর সে আমাকে বলল, কে তোমাকে আমা হতে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ! সে দ্বিতীয় বার বলল, তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ! রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সে তখন তলোয়ারটি ভিতরে ঢুকিয়ে রাখল। আর ওই যে সে বসে আছে। এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ তাকে কিছুই বললেন না। সহিহ মুসলিম : ৮৪৩

শির্কি তাওয়াক্কুলঃ

যদি কোন ব্যক্তি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করল যে বিষয়ের উপর আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না, তাহলে সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল। পীরবাবা, খাজাবাবা, মৃত ওলী বা অদৃশ্য ব্যক্তিবর্গের উপর তাওয়াক্কুল করলে শির্কে আকবরের অন্তর্ভূক্ত হবে। কাজ শুরু করে ভাবল, ভয় কিছু নেই অমুক ওলী, আউলিয়া, দরবেশ তো আছেই।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلِلّٰہِ غَیۡبُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَاِلَیۡہِ یُرۡجَعُ الۡاَمۡرُ کُلُّہٗ فَاعۡبُدۡہُ وَتَوَکَّلۡ عَلَیۡہِ ؕ  وَمَا رَبُّکَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ 

আসমানও জমীনের গায়েব আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে। সুতরাং তুমি তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর উপর তাওয়াক্কুল কর। আর তোমরা যা কিছু কর সে ব্যাপারে তোমার রব গাফেল নন। সুরা হুদ : ১২৩

যদি কোন ব্যক্তি এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে গাইরুল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করল যে বিষয়ের উপর আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না, তাহলে সে আল্লাহর সাথে শির্ক করল। অনেক নারীর সন্তান হয় না, তারা সন্তানের জন্য মাজারে মানত করে বা কোন পীরের উপর ভরসা করে দান করে। মূলত সন্তান দানের একমাত্র মালিক আল্লাহ, মায়ের চিকিত্সা পাশাপাশি আল্লাহ উপর তাওয়াক্কুল করেত হবে।

যে সকল বিষয় আল্লাহ ছাড়া কেহই দান করতে পারে না, সে সকল বিষয় পীর, ওলী, আওলিয়া, খাজাবাবা, মৃত ওলি বা অদৃশ্য ব্যক্তিবর্গের উপর তাওয়াক্কুল করলে শির্কে আকবরের অন্তর্ভূক্ত হবে। কোনো কাজ শুরু করে ভাবল, ভয়ের কিছুই নেই, অমুক ওলি, আওলিয়া, দরবেশ তো আছেই। দোকালে বা বাসায় তাবিজ ঝুলিয়ে রেখে তার উপর তাওয়াক্কুল করা শির্ক বলে গন্য হবে। হাতে বা গাছে লাল সুতা বেধে তার উপর তাওয়াক্কুল করা ও শির্ক কাজ। অপর পক্ষে  আমীর, উমরা, রাষ্ট্র নায়ক, সমাজপতি, ধন সম্পদের উপকরন ইত্যাদির উপর তাওয়াক্কুল করা ছোট শির্কর অন্তরভুক্ত হবে।

ছোট শির্কি তাওয়াক্কুল:

আমীর, উমরা, রাষ্ট্র নায়ক, সমাজপতি, চাকুরির বেতন, ধন সম্পদের উপকরন ইত্যাদির উপর তাওয়াক্কুল করা ছোট শির্কর অন্তরভুক্ত হবে।

জায়েয তাওয়াক্কুল:

দায়িত্ব দিয়ে প্রতিনিধির বা উকিলের উপর ভরসা করা জায়েয। তবে বলা যাবে না আমি তার উপর তাওয়াক্কুল করলাম। বলতে হবে আমি তাকে প্রতিনিধির বানালাম। দুনিয়ার কোন কার্য হাসিলের জন্য বৈধ সব পন্থা অবলম্ভন করার পরই কেবল আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল যাবে। কেননা আল্লাহ বলেন। এটা আল্লাহর বিধান যা পূর্ব থেকেই চলে আসছে৷  তুমি আল্লাহর বিধানে কোন পরিবর্তন পাবে না৷ (সুরা ফাতহা ৪৮:২৩)। আগুনে হাত দিলে পুড়বেই, বিষ খেলে তার প্রতিক্রিয়া হবেই, পানি পানে পিপাষা নিবারন হবেই। এটাই আল্লাহর বিধান। তবে চুড়ান্ত ফলাফল আল্লাহর হাতে আর এটাই তাওয়াক্কুল। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 فَإِذَا قُضِيَتِ ٱلصَّلَوٰةُ فَٱنتَشِرُواْ فِى ٱلۡأَرۡضِ وَٱبۡتَغُواْ مِن فَضۡلِ ٱللَّهِ وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَثِيرً۬ا لَّعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ  

অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার। সুরা্ জুমাহ : ১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ خُذُواْ حِذۡرَڪُمۡ فَٱنفِرُواْ ثُبَاتٍ أَوِ ٱنفِرُواْ جَمِيعً۬ا

 হে ঈমানদারগণ ! মোকাবিলা করার জন্য সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকো৷ তারপর সুযোগ পেলে পৃথক পৃথক বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বের হয়ে পড়ো অথবা এক সাথে৷  সুরা নিসা : ৭১

আল্লাহ তা’আলা বলেন :

وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن قُوَّةٍ۬ وَمِن رِّبَاطِ ٱلۡخَيۡلِ تُرۡهِبُونَ بِهِۦ عَدُوَّ ٱللَّهِ وَعَدُوَّڪُمۡ وَءَاخَرِينَ مِن دُونِهِمۡ لَا تَعۡلَمُونَهُمُ ٱللَّهُ يَعۡلَمُهُمۡ‌ۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِن شَىۡءٍ۬ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ يُوَفَّ إِلَيۡكُمۡ وَأَنتُمۡ لَا تُظۡلَمُونَ

অর্থ: আর তোমরা নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী সর্বাধিক পরিমাণ শক্তি ও সদাপ্রস্তুত ঘোড়া তাদের মোকাবিলার জন্য যোগাড় করে রাখো৷  এর মাধ্যমে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, নিজের শত্রুকে এবং অন্য এমন সব শত্রুকে যাদেরকে তোমরা চিন না৷ কিন্তু আল্লাহ চেনেন৷ আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু খরচ করবে তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, এবং তোমাদের প্রতি কখনো জুলুম করা হবে না৷ সুরা আনফাল : ৬০

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ قَالَ ‏ “‏ اعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ

কোন একজন লোক বললো, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি সেটা (উট) বেঁধে রেখে আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করবো, না বাধন খুলে রেখে আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করবো? তিনি বললেনঃ তুমি সেটা বেঁধে রেখে (আল্লাহ্ তা’আলা উপর) ভরসা করবে। সুনানে তিরমিজি : ২৫১৭

১৭। গাইরুল্লাহর একনিষ্ট অনুগত্য করাঃ

আল্লাহ ও তার দ্বীনের আনুগত্য করা প্রত্যেক মুমিনের উপর ফরজ। আনুগত্য করতে হবে আল্লাহর, তার রসূলের এবং দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী উলামা, শাসনকর্তা, উমারাদের। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উলামা, শাসনকর্তা, ওলী, আউলিয়া, দরবেশ, পীরদের আনুগত্যে ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে আল্লাহর অনুগত্যের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া থেকেই আনুগত্যের শির্কের উৎপত্তি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِى ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡ‌ۖ

হে ঈমানগারগণ ! আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রসূলের আর সেই সব লোকের যারা তোমাদের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতার অধিকারী৷ সুরা নিসা : ৫৯

আনুগত্য পাঁচ প্রকার হয়ে থাকে:

আল্লাহর আনুগত্য করা ফরজঃ

আল্লাহ যখন যে কাজ যে সময় যে স্থানে করার হুকুম দিয়েছেন ঠিক সে ভাবেই তার আনুগত্য করতে হবে। অন্যভাবে বলতে হয় পুরাপুরি বিনাশর্তে তার নাজিল কৃত ওহীর আনুগত্য মেনে নেওয়া। আল্লাহর আনুগত্যে শর্থ আরপ করলে শির্ক হবে। আল্লার দ্বীনের আনুগত্যই আল্লাহর আনগত্য। আল্লাহর দ্বীন পেয়েছি রাসর সা: মাধ্যমে কাজেই যে, রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَ‌ۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَـٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظً۬ا

যে ব্যক্তি রসূলের আনুগত্য করলো সে আসলে আল্লাহরই আনুগত্য করলো৷ আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিলো, যাই হোক, তাদের ওপর তো আমি তোমাকে পাহারাদার বানিয়ে পাঠাইনি৷ সুরা নিসা : ৮০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ‌ۖ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَإِنَّمَا عَلَيۡهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيۡڪُم مَّا حُمِّلۡتُمۡ‌ۖ وَإِن تُطِيعُوهُ تَهۡتَدُواْ‌ۚ وَمَا عَلَى ٱلرَّسُولِ إِلَّا ٱلۡبَلَـٰغُ ٱلۡمُبِينُ

 বলো, ‘‘ আল্লাহর অনুগত হও এবং রসূলের হুকুম মেনে চলো ৷ কিন্তু যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও৷ তাহলো ভালোভাবে জেনে রাখো, রসূলের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সে জন্য রাসূল দায়ী এবং তোমাদের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে সে জন্য তোমরাই দায়ী ৷ তাঁর আনুগত্য করলে তোমরা নিজেরাই সৎ পথ পেয়ে যাবে, অন্যথায় পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন হুকুম শুনিয়ে দেয়া ছাড়া রসূলের আর কোন দায়িত্ব নেই ৷ সুরা নূর : ৫৪

রাসূলুল্লাহ এর অনুগত্য করা ফরজঃ

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করাও ফরজ। আল্লাহর নাজিল কৃত ওহী তিনি যেভাবে বুঝেছেন ও পালন করছেন ঠিক সেভবেই মান্য করা ফরজ। এর ব্যতিক্রম হরাম। আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন আদেশ প্রমাণিত হলে, সে বিষয়ে কোন মুসলিম ব্যক্তি, জাতি, প্রতিষ্ঠান, আদালত, পার্লামেন্ট বা রাষ্ট্রের নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। মুসলমান হবার অর্থই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সামনে নিজের স্বাধীন ইখতিয়ার বিসর্জন দেয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٍ۬ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُ ۥۤ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَـٰلاً۬ مُّبِينً۬ا

অর্থ: যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখ কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর  সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের নাফরমানী করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সুরা আহজাব : ৩৬

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট যে দ্বীন আল্লাহর নাজিল করেছেন। তার বিত্তিতে তিনি উম্মতকে পথপ্রদর্শন করছেন। তাই তার প্রচারিত ইসলাম চিরস্থায়ীভাবে মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত ফায়সালাকারী সনদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সুতারং তার ফায়সালা মেনে আনুগত্য করলে মুমিন থাকবে, তা না হলে মুমিনের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِىٓ أَنفُسِہِمۡ حَرَجً۬ا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمً۬ا

না, হে মুহাম্মদ! তোমার রবের কসম, এরা কখনো মুনিন হতে পারে না যতক্ষণ এদের পারস্পারিক মতবিরোধের ক্ষেত্রে এরা তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নেবে, তারপর তুমি যা ফায়সালা করবে তার ব্যাপারে নিজেদের মনের মধ্য যে কোন প্রকার কুণ্ঠা ও দ্বিধার স্থান দেবে না, বরং সর্বান্তকরণে মেনে নেবে৷ সুরা নিসা : ৬৫

তাগুদের আনুগত্য করা শিরকঃ

তাগুত এমন এক বান্দাকে বলা হয়, যে বন্দেগী ও দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে নিজেই প্রভু ও খোদা হবার দাবীদার সাজে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের বন্দেগী ও দাসত্বে নিযুক্ত করে। তাই তাগুত কখনো শয়তান নিজে, কখনো ভন্ডপীরের ভেসে, কখনো রাষ্ট্র নায়কের ভেসে আসে। তাগুদের আনুগত্য করা শিরক। এই কথার দলীল হচ্ছে কুরআনের এই আয়াত,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

“আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক। সুরা নাহল : ৩৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 لَآ إِكۡرَاهَ فِى ٱلدِّينِ‌ۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَىِّ‌ۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّـٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَا‌ۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর জবরদস্তি নেই।  ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেয়া হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ছিন্ন হয় না। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।  সুরা বাকারা : ২৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 أَلَمۡ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ يَزۡعُمُونَ أَنَّهُمۡ ءَامَنُواْ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡكَ وَمَآ أُنزِلَ مِن قَبۡلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوٓاْ إِلَى ٱلطَّـٰغُوتِ وَقَدۡ أُمِرُوٓاْ أَن يَكۡفُرُواْ بِهِۦ وَيُرِيدُ ٱلشَّيۡطَـٰنُ أَن يُضِلَّهُمۡ ضَلَـٰلاَۢ بَعِيدً۬ا

হে নবী ! তুমি কি তাদেরকে দেখোনি, যারা এই মর্মে দাবী করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাযিল করা হয়েছে এবং সেই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমরা পূর্বে নাযিল করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়সমূহ ফায়সালা করার জন্য “তাগুতে”র দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুতকে অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল?  শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়৷ সুরা  নিসা : ৬০

কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করা হারাম, আবার কখনও শিরক

মুশরিক কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করা হারাম কখনো কখনো শির্ক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلنَّبِىُّ ٱتَّقِ ٱللَّهَ وَلَا تُطِعِ ٱلۡكَـٰفِرِينَ وَٱلۡمُنَـٰفِقِينَ‌ۗ إِنَّ ٱللَّهَ ڪَانَ عَلِيمًا حَكِيمً۬ا

হে নবী! আল্লাহকে ভয় করো এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করো না৷ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও মহাজ্ঞানী। সুরা আহজাব : ০১

কাফির বা মুশরিকগণ যখন তাদের শিরক কাজ করার আহবান করে তখন তাদের কাজে প্রতি অনুগত্য প্রকাশ করা বা সম্মতি প্রদান করা শিরক। তাদের সাধারণ কাজের অনুগত্য হারাম হলেও শিরকি কাজের অনুগত্য শিরক।

শর্ত সাপেক্ষে উলুল আমরদের আনুগত্য করা যাবেঃ

উলুল আমর বা কর্তৃত্বশীল ব্যাক্তি বা আমিরের অনুগত্য করা যাবে তবে তাদের অনুগত্য হবে শর্ত সাপেক্ষে। তাদের একনিষ্ঠ বা অন্ধ আনুগত্য হারাম। যদি তারা আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বস্তুকে হারাম করে তখন তাদের আনুগত্য করা করা হারাম। সুতরাং যেসব লোক এসব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করল তারা মুলত আল্লাহ তা’আলার সমকক্ষ শির্কে ডুবে গেল। উলুল আমর বা কর্তৃত্বশীল ব্যাক্তি বা আমিরের অনগত্য ততক্ষণ পর্যন্ত জায়েয যতক্ষন পর্যন্ত তারা কুরআন সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তাদের করা হারাম ও হালালকে বিনা দলিলে মেনে নেওয়াই হলো, তাদের ইলাহ হিসাবে মর্যাদা প্রদান করা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

 তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছে৷ এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও৷ অথচ তাদের মা’বুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগী কারার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মাবুদ যিনি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন আর কেউ নেই৷ তারা যেসব মুশরিকী কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র৷ সুরা তওবা : ৩১

আনুগত্যের শির্ক হল, বিনা ভাবনায় শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমান ছাড়াই হালাল হারাম জায়েয নাজায়েজের ব্যপারে আলেম বুজুর্গ বা উপরস্থ কারো সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া।

সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে আদী ইবনে হাতেম নবী (সা) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন খৃস্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি নবী (সা) কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন।এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের এ আয়াতটিতে (সুরা তওবা- ৯:৩১) আমাদের বিরুদ্ধে উলামা ও দরবেশদেরকে খোদা বানিয়ে নেবার যে দোষারূপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কি৷ জবাবে তিনি বলেন, তারা যেগুলোকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়৷ জবাবে হযরত আদী বলেন , হাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্যি এমনটি করতাম। রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ব্যাস, এটিই তো হচ্ছে তোমাদে প্রভু বানিয়ে নেয়া। আহম্মদ, তিরমিজ, তাফসিরে ইবনে কাসির

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِالْمَعْصِيَةِ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ

পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না।’ সহিহ বুখারি :: ২৯৫৫, ৭১৪৪

আমাদের সমাজের অনেক পীর মাসায়েক এই শির্কে জড়িত। মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক সাহেব পীর সাহেব চরমোনাই এর লেখা বই “ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা’  এ আছে ’কামেল পীরের আদেশ পাইলে,নাপাক শারাব (মদ) দ্বারাও জায়নামাজ রঙ্গিন করিয়া তাহাতে নামাজ পড়’’। মানিক গঞ্জের মো: আজহারু ইসলাম সিদ্দিকির লেখাবই “মারেফতের ভেদতত্ত্ব” এর ৩৭ পৃষ্ঠায় বলেন: “যুক্তি ছাড়া মোর্শেদের বাক্য বিনা দ্বিধায় মানতে হবে। নিজের বিবেক বুদ্ধি বিদ্যা, যুক্তি, কিতাবি ইলম সবই বিসর্জন দিতে হবে। মোর্শেদের কথায় অন্ধভাবে কাজ করে জেতে হবে। তা সামনে একটা মরা মানুষ সাজতে হবে”।

আল্লাহর কিতাবের সনদ ছাড়াই যারা মানব জীবনের জন্য জায়েয ও নাজায়েযের সীমানা নির্ধারণ করে তারা আসলে নিজেদের ধারণা মতে নিজেরাই আল্লাহর বিধান দানের মর্যাদায় সমাসীন হয়। আর যারা শরীয়াতের বিধি রচনার এ অধিকার তাদের জন্য স্বীকার করে নেয়া পরিস্কার শির্ক। “তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছে” মনে হচ্ছে এ আয়াতের ই প্রতিধ্বনি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 ٱتَّبِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَيۡكُم مِّن رَّبِّكُمۡ وَلَا تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِۦۤ أَوۡلِيَآءَ‌ۗ قَلِيلاً۬ مَّا تَذَكَّرُونَ (٣) 

হে মানব সমাজ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের ওপর যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ করো এবং নিজেদের রবকে বাদ দিয়ে আওলিয়াদের অনুসরণ করো না৷  কিন্তু তোমরা খুব কমই উপদেশ মেনে থাকো৷ সুরা আরাফ : ৩

                                                                              
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

 وَلَا تَأۡڪُلُواْ مِمَّا لَمۡ يُذۡكَرِ ٱسۡمُ ٱللَّهِ عَلَيۡهِ وَإِنَّهُ ۥ لَفِسۡقٌ۬‌ۗ وَإِنَّ ٱلشَّيَـٰطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰٓ أَوۡلِيَآٮِٕهِمۡ لِيُجَـٰدِلُوكُمۡ‌ۖ وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ (١٢١

আর যে পশুকে আল্লাহর নামে যবেই করা হয়নি তার গোশত খেয়ো না৷ এটা অবশ্যি মহাপাপ৷ শয়তানরা তাদের ঝগড়া করতে পারে৷ কিন্তু যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো তাহলে অবশ্যি তোমরা মুশরিক হবে৷ সুরা আনআম : ১২১

দুনিয়াতে তাদের নিষেধ করলেও আনুগত্য ছাড়বেনা। আখেরাতে ঠিকই সম্পর্ক ছিন্ন করবে। কিন্তু কোন কাজে আসবেনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِذۡ تَبَرَّأَ ٱلَّذِينَ ٱتُّبِعُواْ مِنَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ وَرَأَوُاْ ٱلۡعَذَابَ وَتَقَطَّعَتۡ بِهِمُ ٱلۡأَسۡبَابُ (١٦٦) 

যখন তিনি শাস্তি দেবেন তখন এই সমস্ত নেতা ও প্রধান ব্যক্তিরা, দুনিয়ায় যাদের অনুসরণ করা হতো, তাদের অনুগামীদের সাথে সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করতে থাকবে৷ কিন্তু শাস্তি তারা পাবেই এবং তাদের সমস্ত উপায় উপকরণের ধারা ছিন্ন হয়ে যাবে৷ সুরা  বাকারা : ১৬৬

১৮। আল্লাহর অনুগ্রহ বা নেয়ামতকে গাইরুল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত কার

পৃথিবীত ও আকাশ মন্ডলিতে যত প্রকারের নেয়ামত দেখা যায় তার সব কিছুর একছন্ন মালিক মহান রাব্বিল আলামীন। তার অনুগ্রহ বা নেয়ামত না থাকলে পৃতিবীর কোন প্রানীরই অস্তিত্ত্ব থাকতনা। এই জন্য আল্লাহ তাদেরকে ভৎর্সনা করছেন, যারা তাঁর একছন্ন নিয়ামতকে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত করে থাকে। আল্লাহর প্রদানকৃত নিয়ামতের সাথে গাইরুল্লাহকে সম্পৃক্ত করাই মুলত শিরক। কেউ যদি বলে অমুক না থাকলে আজ মারাই জেতার। যদি অমুক ডাক্তারে নিকট চিকত্সা না নিতাম মারা যেতাম। তাকে বাচার আল্লাহ আর নেয়ামতের শুকরিয় করল অন্যের যা পরিস্কার শির্ক। মহান আল্লাহ যখন নিজ করুনায় দুরাবস্থা থেকে মুক্ত করে তার বান্দাকে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করে সে তখন সে তার বাপ দাদাদের উদাহরণ দেয়। সর্বশ্রেষ্ঠ মহত্বপূর্ণ আল্লাহ বলেন-

ثُمَّ بَدَّلۡنَا مَکَانَ السَّیِّئَۃِ الۡحَسَنَۃَ حَتّٰی عَفَوۡا وَّقَالُوۡا قَدۡ مَسَّ اٰبَآءَنَا الضَّرَّآءُ وَالسَّرَّآءُ فَاَخَذۡنٰہُمۡ بَغۡتَۃً وَّہُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ

তারপর আমি মন্দ অবস্থাকে ভাল অবস্থা দ্বারা বদলে দিয়েছি। অবশেষে তারা প্রাচুর্য লাভ করেছে এবং বলেছে, ‘আমাদের বাপ-দাদাদেরকেও দুর্দশা ও আনন্দ স্পর্শ করেছে।’ অতঃপর আমি তাদেরকে হঠাৎ পাকড়াও করেছি এমনভাবে যে, তারা উপলব্ধিও করতে পারেনি। সুরা আরাফ : ৯৫

বিপদে বান্দা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে কিন্তু যখন তার বিপদ কেটে যায় তখন সে আল্লাহ আল্লাহর বিরুদ্ধে কুফরি করে থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَاِذَا غَشِیَہُمۡ مَّوۡجٌ کَالظُّلَلِ دَعَوُا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ۬ۚ فَلَمَّا نَجّٰہُمۡ اِلَی الۡبَرِّ فَمِنۡہُمۡ مُّقۡتَصِدٌ ؕ وَمَا یَجۡحَدُ بِاٰیٰتِنَاۤ اِلَّا کُلُّ خَتَّارٍ کَفُوۡرٍ

আর যখন ঢেউ তাদেরকে ছায়ার মত আচ্ছন্ন করে নেয়, তখন তারা একনিষ্ঠ অবস্থায় আনুগত্যভরে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন, তখন তাদের কেউ কেউ (ঈমান ও কুফরীর) মধ্যপথে থাকে। আর বিশ্বাসঘাতক ও কাফির ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমার নিদর্শনাবলী অস্বীকার করে না। সুরা লোকমান : ৩২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

يَعۡرِفُونَ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ ثُمَّ يُنكِرُونَهَا وَأَكۡثَرُهُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ

এরা আল্লাহর অনুগ্রহ নেয়ামত জানে, কিন্তু সেগুলো অস্বীকার করে,  আর এদের মধ্যে বেশীর ভাগ লোক এমন যারা সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়৷ সুরা নাহল : ৮৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

فَاِنۡ اَعۡرَضُوۡا فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ حَفِیۡظًا ؕ اِنۡ عَلَیۡکَ اِلَّا الۡبَلٰغُ ؕ وَاِنَّاۤ اِذَاۤ اَذَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنَّا رَحۡمَۃً فَرِحَ بِہَا ۚ وَاِنۡ تُصِبۡہُمۡ سَیِّئَۃٌۢ بِمَا قَدَّمَتۡ اَیۡدِیۡہِمۡ فَاِنَّ الۡاِنۡسَانَ کَفُوۡرٌ

আর যদি তারা বিমুখ হয়, তবে আমি তো তোমাকে তাদের রক্ষক হিসেবে পাঠাইনি। বাণী পৌঁছে দেয়াই তোমার দায়িত্ব। আর আমি যখন মানুষকে আমার রহমত আস্বাদন করাই তখন সে খুশি হয়। আর যখন তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের উপর কোন বিপদ আসে তখন মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ হয়। সুরা শুরা : ৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুর আর রহমানে তার নেয়ামতকে স্মরন করিয়ে দিয় ৩১ বার ইরশাদ করেন-

فَبِاَیِّ اٰلَآءِ رَبِّکُمَا تُکَذِّبٰنِ

সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের রবের কোন নেয়মতকে অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিয়ামত অস্বীকারকারী বানী ইসরাঈলের তিনজন লোকের কাহিনি-

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, বানী ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন্ জিনিস অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হল। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’উট’ অথবা সে বলল, ’গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে শ্বেতরোগী না টাকওয়ালা দু’জনের একজন বলেছিল ’উট’ আর অপরজন বলেছিল ’গরু’। অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হল। তখন ফিরশতা বললেন, ’’এতে তোমার জন্য বরকত হোক।’’

বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা টাকওয়ালার নিকট গেলেন এবং বললেন, তোমার নিকট কী জিনিস পছন্দনীয়? সে বলল, সুন্দর চুল এবং আমার হতে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হল। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’গরু’। অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দু’আ করলেন, এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক। অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে বলল, আল্লাহ্ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত ফিরিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল ’ছাগল’। তখন তিনি তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন। উপরে উল্লেখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল।

অতঃপর ঐ ফেরেশতা তাঁর পূর্ববর্তী আকৃতি প্রকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর নিকট এসে বললেন, আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্য স্থানে পৌঁছার আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপায় নেই। আমি তোমার নিকট ঐ সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং, কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর উপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছাব। তখন লোকটি তাকে বলল, আমার উপর বহু দায়িত্ব রয়েছে। তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি এক সময় শ্বেতরোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত। তুমি কি ফকীর ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা তোমাকে দান করেছেন। তখন সে বলল, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ হতে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, তুমি যদি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে সেরূপ করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। অতঃপর ফেরেশতা মাথায় টাকওয়ালার নিকট তাঁর সেই বেশভূষা ও আকৃতিতে গেলেন এবং তাকে ঠিক তেমনই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেত রোগীকে বলেছিলেন। এও তাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল যেমন জবাব দিয়েছিল শ্বেতরোগী।

তখন ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে তেমন অবস্থায় করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট তাঁর আকৃতিতে আসলেন এবং বললেন, আমি একজন নিঃস্ব লোক, মুসাফির মানুষ; আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ বাড়ি পৌঁছার ব্যাপারে আল্লাহ্ ব্যতীত কোন গতি নেই। তাই আমি তোমার নিকট সেই সত্তার নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব। সে বলল, প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ্ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকীর ছিলাম। আল্লাহ্ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম। আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না। তখন ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিন জনের পরীক্ষা নেয়া হল মাত্র। আল্লাহ্ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার সাথীদ্বয়ের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সহিহ বুখারি : ৩৪৬৪, ৬৬৫৩, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৪

১৯। ‌আল্লাহ অপেক্ষা কাউকে উত্তম বিচারক বা  ফয়সালাকারী হিসেবে মান্য করা

জাহিলিয়াতের ফয়সালা কাসনা করা আর আল্লাহ ফয়সালাকে অস্বীকার করা কুফরি কাজ। আর আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী বা তার সমকক্ষ ভাবা তো একেবারে বড় শিরক। কেননা আল্লাহর ফয়সালাই কল্যান কর ও চুড়ান্ত। আল্লাহর শরীয়তে স্বীকৃত হয়নি এমন সব ফয়সালাকে বর্জন করতে হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

اَفَغَیۡرَ اللّٰہِ اَبۡتَغِیۡ حَکَمًا وَّہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ اِلَیۡکُمُ الۡکِتٰبَ مُفَصَّلًا ؕ وَالَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہٗ مُنَزَّلٌ مِّنۡ رَّبِّکَ بِالۡحَقِّ فَلَا تَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡمُمۡتَرِیۡنَ

আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে তালাশ করব? অথচ তিনিই তোমাদের নিকট বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন। আর যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছিলাম তারা জানত যে, তা তোমার রবের পক্ষ থেকে যথাযথভাবে নাযিলকৃত। সুতরাং তুমি কখনো সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। সুর আনাম : ১১৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ

তারা কি তবে জাহিলিয়াতের বিধান চায়? আর দৃঢ় বিশ্বাসী কওমের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে কে অধিক উত্তম?  সুরা মায়েদা : ৫০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ اِنِّیۡ عَلٰی بَیِّنَۃٍ مِّنۡ رَّبِّیۡ وَکَذَّبۡتُمۡ بِہٖ ؕ مَا عِنۡدِیۡ مَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنَ بِہٖ ؕ اِنِ الۡحُکۡمُ اِلَّا لِلّٰہِ ؕ یَقُصُّ الۡحَقَّ وَہُوَ خَیۡرُ الۡفٰصِلِیۡنَ

বল, ‘নিশ্চয় আমি আমার রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণের উপর রয়েছি আর তোমরা তা অস্বীকার করছ। তোমরা যা নিয়ে তাড়াহুড়া করছ তা আমার কাছে নেই। হুকুম কেবল আল্লাহর কাছে। তিনি সত্য বর্ণনা করেন এবং তিনি সর্বোত্তম ফয়সালাকারী’। সুরা আনাম : ৫৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ یَجۡمَعُ بَیۡنَنَا رَبُّنَا ثُمَّ یَفۡتَحُ بَیۡنَنَا بِالۡحَقِّ ؕ وَہُوَ الۡفَتَّاحُ الۡعَلِیۡمُ

বল, ‘আমাদের রব আমাদেরকে একত্র করবেন। তারপর তিনি আমাদের মধ্যে সঠিকভাবে ফয়সালা করবেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী ও সম্যক পরিজ্ঞাত’। সুরা সাবা : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই কাফির। সুরা মায়িদাহ : ৪৪

আল্লাহ হচ্ছেন ফায়সালা করার যাবতীয় ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী। অন্য কাউকে চুড়ান্ত ফায়সালা অধিকরী মনে করা শির্ক। সাধারনত মানুষকে কোন ফায়সালা করার ক্ষমতা দিলে আল্লাহ বিধান মতো ফায়সালা করতে হবে তখন এটাই আল্লাহর ফায়সালা বলে গন্য হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

ثُمَّ رُدُّوۡۤا اِلَی اللّٰہِ مَوۡلٰىہُمُ الۡحَقِّ ؕ اَلَا لَہُ الۡحُکۡمُ ۟ وَہُوَ اَسۡرَعُ الۡحٰسِبِیۡنَ

তারপর তাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হয় তাদের সত্য অভিভাবক আল্লাহর কাছে। সাবধান! বিধান প্রদানের ক্ষমতা তাঁরই। আর তিনি হচ্ছেন খুব দ্রুত হিসাবকারী। সুরা আনআম : ৬২

শিয়াদের ভ্রান্ত আকিদাসমূহ-২ : বর্তমান কুরআন ও ইমাম মাহদি (আ.) সম্পর্কে শিয়াদের ভ্রান্ত বিশ্বাস।


মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. শিয়াদের আকিদা কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন করা হয়েছে :
শিয়াদের মধ্যে বিভিন্ন কিতাবে এমন বিশ্বাস প্রকাশ পাওয়া যায় যে, কুরআনে তাহরীফ (تحريف) বা পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন ঘটেছে, বিশেষ করে আহলে বাইতের ফজিলত সংক্রান্ত আয়াতগুলো মুছে ফেলা হয়েছে, এমন আকিদা তারা পোষণ করে থাকে।

ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী শিয়াদের অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস, যিনি “আল-কাফি” গ্রন্থ সংকলন করেন। এই কিতাব শিয়াদের কাছে “সহিহ বুখারি” এর সমতুল্য। এই গ্রন্থে অনেক রেওয়ায়েত রয়েছে, যেগুলো কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন ঘটেছে এমন বিশ্বাসকে সমর্থন করে। যেমন-
عن أبي عبد الله قال: «إِنَّ القُرْآنَ الَّذِي جَاءَ بِهِ جِبْرَائِيلُ إِلَى مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ»
আবু ইবনে আব্দুল্লাহ (ইমাম জাফর আস-সাদিক) বলেন, “নিশ্চয়ই কুরআন, যা জিবরাইল মুহাম্মদ ﷺ এর কাছে নিয়ে এসেছিলেন, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১

খ। নিমাতুল্লাহ আল-জাযায়েরি (মৃত্যু: ১১১২ হিজরি), তিনি স্পষ্টভাবে বলেন-
إِنَّ الأَحَادِيثَ الدَّالَّةَ عَلَى وُقُوعِ التَّحْرِيفِ فِي القُرْآنِ، قَدْ تَجَاوَزَتْ حَدَّ التَّوَاتُرِ۔
“কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে এ মর্মে প্রমাণদাতা হাদিসসমূহ তাওতারের (মিথ্যা হওয়ার) সীমা অতিক্রম করেছে। আল-আনওয়ার আন-নুমানিযয়াহ, দ্বিতীয় খণ্ড,পৃ.-৪৭৫

গ। আল-নূরী আত-তাবরসী (মৃত্যু: ১৩২০ হিজরি) তার লিখিত বই “ফাসলুল খিতাব ফি ইসবাত তাহরিফে কিতাবে রাব্বিল আরবাব” অর্থাৎ “প্রভুর কিতাবে তাহরীফ প্রমাণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্তমূলক কথা”। এই বইতে লেখক দাবি করেন যে, কুরআনে সাহাবাগণ পরিবর্তন এনেছে এবং আহলে বাইতের প্রশংসাসমূহ বাদ দিয়েছে।

২. শিয়াদের আকিদা আউসিয়া (أوصياء)” বা অসীয়তকৃতগণ ছাড়া কারো নিকট সম্পূর্ণ কুরআন নাই :
শিয়া সম্প্রদায়ের চরমপন্থি দলিল ও বিশ্বাস অনুযায়ী, “আউসিয়া (أوصياء)” অর্থাৎ ইমামগণ ব্যতীত অন্য কারো নিকট সম্পূর্ণ ও যথাযথ কুরআন নেই। এই বিশ্বাস মূলত শিয়া ইসেনে আশারী বা ইমামিয়া দ্বাদশী ফির্কার একটি মূল আকিদার অংশ, যেখানে তারা মনে করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকালের আগে আলি (রা.) কে অসী বা আউলিয়া আমর হিসেবে মনোনীত করে গেছেন, এবং পরে তাঁর বংশের ১২ জন ইমাম যারা ‘আহলে বাইতের’ অন্তর্ভুক্ত তারা একে একে কুরআনের আসল ও গভীর জ্ঞান ও তাফসিরের উত্তরাধিকারী হয়েছেন। এমন বক্তব্য তাদের প্রাথমিক হাদিস গ্রন্থে পাওয়া যায়।
মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বলেন-
: أنّهُ لَم يَجمَعِ القُرآنَ كُلَّهُ إِلّا الأئِمَّةُ
নিশ্চয়ই কুরআনের পূর্ণসংকলন কেউ করেনি/পারে না, শুধুমাত্র ইমামগণ ব্যতীত।” আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১
❝ٱلْقُرْآنُ ٱلَّذِي أُنْزِلَ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ، مَا جَمَعَهُ إِلَّا ٱلْأَوْصِيَاءُ❞
“যে কুরআন মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর নাজিল করা হয়েছে, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত; একমাত্র ওসীয়্যতপ্রাপ্তগণ (অর্থাৎ ইমামগণ) ব্যতীত কেউ তা সংকলন করেনি। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ৩

৩. কুরআনে আহলে বাইত বা ইমামদের নাম ছিল তা বাদ দেওয়া হয়েছে:
শিয়াদের বিশ্বাস কুরআনের কিছু আয়াতে আলি (রা.) ও ইমামদের নাম ছিল, সাহাবারা তা মুছে দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি বলেন-
“وَلَوْلَا أَنَّهُ زِيدَ فِي كِتَابِ اللّٰهِ وَنُقِصَ مِنْهُ، مَا خُفِيَ حَقُّنَا عَلَى ذِي حِجَى.”
অর্থ : তিনি বললেন, “যদি আল্লাহর কিতাবের (কুরআনের) মধ্যে কিছু যোগ না করা হতো এবং কিছু বাদ না দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের (আহলুল বয়াতের) অধিকার ধামাচাপা পড়ত না।” মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি, গায়বা, পৃ.- ১০০

৪. আসল কুরআন ইমাম মাহদির সাথে আছে :
শিয়াদের আকিদা অনুসারে, সাহাবারা কুরআন থেকে কিছু আয়াত বাদ দিয়েছে বা পরিবর্তন করেছে, আর কুরআনের আসল ও পূর্ণ রূপ কেবলমাত্র ইমাম মাহদী (আল-মাহদী) ও তাঁর পূর্ববর্তী ইমামগণের কাছে সংরক্ষিত আছে। তিনি বিশ্ব শেষ সময় ফিরে এসে পুরো কুরআন পুনরুদ্ধার করবেন। তিনি ফিরে এসে তা প্রকাশ করবেন এবং প্রকৃত ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবেন।
মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী বলেন-
“كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَيْهِ بَيْنَ الرُّكْنِ وَالْمَقَامِ، يُبَايِعُ النَّاسَ عَلَى كِتَابٍ جَدِيدٍ، عَلَى الْعَرَبِ شَدِيدٍ.”
“আমি যেন তাকে (ইমাম মাহদিকে) দেখছি কুফা ও মাকামের মাঝে দাঁড়িয়ে, মানুষের সঙ্গে নতুন একটি কিতাবের ওপর বায়াত নিচ্ছে, যা আরবদের প্রতি কঠোর।” মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী, আল-গায়বা, পৃ.- ১৫৭
তারা একটি ইমাম মাহদির মাধ্যমে একটি “নতুন কুরআনের” আগমনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার কিতাব লিখেন, আবু আবদুল্লাহ (আ) বলেছেন-
“مَا ادَّعَى أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ أَنَّهُ جَمَعَ الْقُرْآنَ كُلَّهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا كَذَّابٌ، وَمَا جَمَعَهُ وَحَفِظَهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا عَلِيٌّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَالْأَئِمَّةُ مِنْ بَعْدِهِ.”
যে ব্যক্তি দাবি করে যে মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি পূর্ণ কুরআন যেভাবে নাজিল করেছেন, অনুরূপ সে তা একত্র করেছেন, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ পাক তিনি যেভাবে কুরআন নাজিল করেছেন, আলি (রা.) এবং উনার পরবর্তী ইমামগণ ছাড়া কেউই তা হুবহু একত্র ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হননি।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২২৭
সঠিক আকিদা :
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সময়, ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফিজ সাহাবির শাহাদতের কারণে কুরআন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন উমর (রা.)-এর পরামর্শে আবু বকর (রা.) কুরআন সংকলনের নির্দেশ দেন। এই মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর উপর, যিনি ওহি লিখতেন এবং নির্ভরযোগ্য হাফিজ ছিলেন। তিনি সতর্কতা ও ঈমানদারির সাথে কুরআনের আয়াতসমূহ সাহাবিদের নিকট থেকে দুজন সাক্ষীর ভিত্তিতে গ্রহণ করেন। তিনি তা খাতা আকারে সংকলন করেন, যা পরে উমর (রা.) এবং উমরের মৃত্যুর পর হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে। এই সংকলনই পরবর্তীতে উসমান (রা.)-এর সময় একটি মানক মুসহাফ আকারে ছাপিয়ে সর্বত্র প্রেরণ করা হয়। এই উদ্যোগ ইসলামের ইতিহাসে কুরআন সংরক্ষণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত বিশ্বাস হলো, কুরআনে কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি। কুরআন আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, যেমনটি রাসূল ﷺ-এর যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাছাড়া কুরআন হিফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ারা নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“আমরাই এই জিকির (কুরআন) নাজিল করেছি, এবং আমরাই এর সংরক্ষণকারী।” সূরা হিজর : ৯

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন ও তিনি উলঙ্গ হয়ে আত্মপ্রকাশ করবেন :
ইমাম মাহদির আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম বাই‘আত গ্রহণকারী হবেন মুহাম্মাদ ﷺ ও তারপর আলি (রা.)
এটি শিয়াদের একটি রহস্যময় ও তাত্ত্বিক বিশ্বাসের অংশ। তারা মনে করে, নবি মুহাম্মাদ ﷺ ও ইমাম আলি (আ.) রূহানিয়ভাবে বা অন্যভাবে ইমাম মাহদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন। মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
الرِّوَايَةُ: “فَأَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ.”
অর্থ : সর্বপ্রথম যিনি তাঁর (ইমাম মাহদির) প্রতি বাই‘আত করবেন, তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ।”
শায়খ আল-নুমানী, আল-গায়বা, কিয়ামাতের আলামত অধ্যায়, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩২৬
শায়খ তুসী, মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন-
تَذْكُرُ فِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ (ص) وَعَلِيًّا (ع) هُمَا أَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُ الْقَائِمَ عِنْدَ ظُهُورِهِ۔
অর্থ : এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবি (সা.) এবং আলি (আ.)—তাঁরা উভয়ে কায়েম (ইমাম মাহদী)-এর আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম তাঁর কাছে বা্ইয়াত করবেন। শায়খ তুসী, আল-গায়বা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪–৪৭৫

৩. ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন
সূর্যের গোলকের সামনে ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। এটি শিয়াদের একটি জঘন্য ও মিথ্যা আকিদা। শায়খ তুসী ও নুমানি ইমাম রেজা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
يَخْرُجُ الْقَائِمُ عُرْيَانًا أَمَامَ الشَّمْسِ…
অর্থ : কায়েম (ইমাম মাহদি) সূর্যের সামনে বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, ভলিউম ৫২, পৃ. ২৮৬-২৮৮
সঠিক আকিদা :
এই সকল মতবাদ ও বর্ণনা সুন্নি আকিদা এবং সহিহ হাদিসসমূহের পরিপন্থী। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের বিশ্বাস অনুযায়ী, রাসূল ﷺ তো সকল নবিদের শেষ এবং সবার নেতা, তার পক্ষ থেকে কোনো “বাই‘আত” গ্রহণের কথা একেবারে অকল্পনীয় ও বাতিল। তেমনি, ইমাম মাহদির বিবস্ত্র হয়ে আত্মপ্রকাশের মত ধারণা শরিয়ত, লজ্জাশীলতা ও নবি পরিচিত আদর্শবিরোধী।