মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১. শিয়াদের আকিদা কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন করা হয়েছে :
শিয়াদের মধ্যে বিভিন্ন কিতাবে এমন বিশ্বাস প্রকাশ পাওয়া যায় যে, কুরআনে তাহরীফ (تحريف) বা পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন ঘটেছে, বিশেষ করে আহলে বাইতের ফজিলত সংক্রান্ত আয়াতগুলো মুছে ফেলা হয়েছে, এমন আকিদা তারা পোষণ করে থাকে।
ক। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী শিয়াদের অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস, যিনি “আল-কাফি” গ্রন্থ সংকলন করেন। এই কিতাব শিয়াদের কাছে “সহিহ বুখারি” এর সমতুল্য। এই গ্রন্থে অনেক রেওয়ায়েত রয়েছে, যেগুলো কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন ঘটেছে এমন বিশ্বাসকে সমর্থন করে। যেমন-
عن أبي عبد الله قال: «إِنَّ القُرْآنَ الَّذِي جَاءَ بِهِ جِبْرَائِيلُ إِلَى مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ»
আবু ইবনে আব্দুল্লাহ (ইমাম জাফর আস-সাদিক) বলেন, “নিশ্চয়ই কুরআন, যা জিবরাইল মুহাম্মদ ﷺ এর কাছে নিয়ে এসেছিলেন, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১
খ। নিমাতুল্লাহ আল-জাযায়েরি (মৃত্যু: ১১১২ হিজরি), তিনি স্পষ্টভাবে বলেন-
إِنَّ الأَحَادِيثَ الدَّالَّةَ عَلَى وُقُوعِ التَّحْرِيفِ فِي القُرْآنِ، قَدْ تَجَاوَزَتْ حَدَّ التَّوَاتُرِ۔
“কুরআনে তাহরীফ বা পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে এ মর্মে প্রমাণদাতা হাদিসসমূহ তাওতারের (মিথ্যা হওয়ার) সীমা অতিক্রম করেছে। আল-আনওয়ার আন-নুমানিযয়াহ, দ্বিতীয় খণ্ড,পৃ.-৪৭৫
গ। আল-নূরী আত-তাবরসী (মৃত্যু: ১৩২০ হিজরি) তার লিখিত বই “ফাসলুল খিতাব ফি ইসবাত তাহরিফে কিতাবে রাব্বিল আরবাব” অর্থাৎ “প্রভুর কিতাবে তাহরীফ প্রমাণ করার বিষয়ে সিদ্ধান্তমূলক কথা”। এই বইতে লেখক দাবি করেন যে, কুরআনে সাহাবাগণ পরিবর্তন এনেছে এবং আহলে বাইতের প্রশংসাসমূহ বাদ দিয়েছে।
২. শিয়াদের আকিদা আউসিয়া (أوصياء)” বা অসীয়তকৃতগণ ছাড়া কারো নিকট সম্পূর্ণ কুরআন নাই :
শিয়া সম্প্রদায়ের চরমপন্থি দলিল ও বিশ্বাস অনুযায়ী, “আউসিয়া (أوصياء)” অর্থাৎ ইমামগণ ব্যতীত অন্য কারো নিকট সম্পূর্ণ ও যথাযথ কুরআন নেই। এই বিশ্বাস মূলত শিয়া ইসেনে আশারী বা ইমামিয়া দ্বাদশী ফির্কার একটি মূল আকিদার অংশ, যেখানে তারা মনে করে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকালের আগে আলি (রা.) কে অসী বা আউলিয়া আমর হিসেবে মনোনীত করে গেছেন, এবং পরে তাঁর বংশের ১২ জন ইমাম যারা ‘আহলে বাইতের’ অন্তর্ভুক্ত তারা একে একে কুরআনের আসল ও গভীর জ্ঞান ও তাফসিরের উত্তরাধিকারী হয়েছেন। এমন বক্তব্য তাদের প্রাথমিক হাদিস গ্রন্থে পাওয়া যায়।
মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী বলেন-
: أنّهُ لَم يَجمَعِ القُرآنَ كُلَّهُ إِلّا الأئِمَّةُ
নিশ্চয়ই কুরআনের পূর্ণসংকলন কেউ করেনি/পারে না, শুধুমাত্র ইমামগণ ব্যতীত।” আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ০১
❝ٱلْقُرْآنُ ٱلَّذِي أُنْزِلَ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ ﷺ سَبْعَةَ عَشَرَ أَلْفَ آيَةٍ، مَا جَمَعَهُ إِلَّا ٱلْأَوْصِيَاءُ❞
“যে কুরআন মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর নাজিল করা হয়েছে, তাতে ছিল সতেরো হাজার আয়াত; একমাত্র ওসীয়্যতপ্রাপ্তগণ (অর্থাৎ ইমামগণ) ব্যতীত কেউ তা সংকলন করেনি। আল-কুলায়নীর “আল-কাফী”, কিতাব ফাদ্লুল কুরআন, অধ্যায় হাদিস : ৩
৩. কুরআনে আহলে বাইত বা ইমামদের নাম ছিল তা বাদ দেওয়া হয়েছে:
শিয়াদের বিশ্বাস কুরআনের কিছু আয়াতে আলি (রা.) ও ইমামদের নাম ছিল, সাহাবারা তা মুছে দিয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি বলেন-
“وَلَوْلَا أَنَّهُ زِيدَ فِي كِتَابِ اللّٰهِ وَنُقِصَ مِنْهُ، مَا خُفِيَ حَقُّنَا عَلَى ذِي حِجَى.”
অর্থ : তিনি বললেন, “যদি আল্লাহর কিতাবের (কুরআনের) মধ্যে কিছু যোগ না করা হতো এবং কিছু বাদ না দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের (আহলুল বয়াতের) অধিকার ধামাচাপা পড়ত না।” মুহাম্মাদ ইবনে নুমান আল নুবাখতি, গায়বা, পৃ.- ১০০
৪. আসল কুরআন ইমাম মাহদির সাথে আছে :
শিয়াদের আকিদা অনুসারে, সাহাবারা কুরআন থেকে কিছু আয়াত বাদ দিয়েছে বা পরিবর্তন করেছে, আর কুরআনের আসল ও পূর্ণ রূপ কেবলমাত্র ইমাম মাহদী (আল-মাহদী) ও তাঁর পূর্ববর্তী ইমামগণের কাছে সংরক্ষিত আছে। তিনি বিশ্ব শেষ সময় ফিরে এসে পুরো কুরআন পুনরুদ্ধার করবেন। তিনি ফিরে এসে তা প্রকাশ করবেন এবং প্রকৃত ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবেন।
মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী বলেন-
“كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَيْهِ بَيْنَ الرُّكْنِ وَالْمَقَامِ، يُبَايِعُ النَّاسَ عَلَى كِتَابٍ جَدِيدٍ، عَلَى الْعَرَبِ شَدِيدٍ.”
“আমি যেন তাকে (ইমাম মাহদিকে) দেখছি কুফা ও মাকামের মাঝে দাঁড়িয়ে, মানুষের সঙ্গে নতুন একটি কিতাবের ওপর বায়াত নিচ্ছে, যা আরবদের প্রতি কঠোর।” মুহাম্মদ ইবনে নূমান আল-নূমানী, আল-গায়বা, পৃ.- ১৫৭
তারা একটি ইমাম মাহদির মাধ্যমে একটি “নতুন কুরআনের” আগমনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী।
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী তার কিতাব লিখেন, আবু আবদুল্লাহ (আ) বলেছেন-
“مَا ادَّعَى أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ أَنَّهُ جَمَعَ الْقُرْآنَ كُلَّهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا كَذَّابٌ، وَمَا جَمَعَهُ وَحَفِظَهُ كَمَا أُنْزِلَ إِلَّا عَلِيٌّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ وَالْأَئِمَّةُ مِنْ بَعْدِهِ.”
যে ব্যক্তি দাবি করে যে মহান আল্লাহ তায়ালা তিনি পূর্ণ কুরআন যেভাবে নাজিল করেছেন, অনুরূপ সে তা একত্র করেছেন, তাহলে সে মিথ্যাবাদী। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ পাক তিনি যেভাবে কুরআন নাজিল করেছেন, আলি (রা.) এবং উনার পরবর্তী ইমামগণ ছাড়া কেউই তা হুবহু একত্র ও সংরক্ষণ করতে সক্ষম হননি।” ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব আল-কুলায়নী, উসুলুল কাফী, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২২৭
সঠিক আকিদা :
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকিদ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সময়, ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফিজ সাহাবির শাহাদতের কারণে কুরআন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন উমর (রা.)-এর পরামর্শে আবু বকর (রা.) কুরআন সংকলনের নির্দেশ দেন। এই মহান দায়িত্ব অর্পিত হয় সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর উপর, যিনি ওহি লিখতেন এবং নির্ভরযোগ্য হাফিজ ছিলেন। তিনি সতর্কতা ও ঈমানদারির সাথে কুরআনের আয়াতসমূহ সাহাবিদের নিকট থেকে দুজন সাক্ষীর ভিত্তিতে গ্রহণ করেন। তিনি তা খাতা আকারে সংকলন করেন, যা পরে উমর (রা.) এবং উমরের মৃত্যুর পর হাফসা (রা.)-এর কাছে সংরক্ষিত থাকে। এই সংকলনই পরবর্তীতে উসমান (রা.)-এর সময় একটি মানক মুসহাফ আকারে ছাপিয়ে সর্বত্র প্রেরণ করা হয়। এই উদ্যোগ ইসলামের ইতিহাসে কুরআন সংরক্ষণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। আহলুস সুন্নাহর সর্বসম্মত বিশ্বাস হলো, কুরআনে কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি। কুরআন আজও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, যেমনটি রাসূল ﷺ-এর যুগে অবতীর্ণ হয়েছিল। তাছাড়া কুরআন হিফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ারা নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
“আমরাই এই জিকির (কুরআন) নাজিল করেছি, এবং আমরাই এর সংরক্ষণকারী।” সূরা হিজর : ৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ ইমাম মাহদির নিকট বাইয়াত নিবেন ও তিনি উলঙ্গ হয়ে আত্মপ্রকাশ করবেন :
ইমাম মাহদির আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম বাই‘আত গ্রহণকারী হবেন মুহাম্মাদ ﷺ ও তারপর আলি (রা.)
এটি শিয়াদের একটি রহস্যময় ও তাত্ত্বিক বিশ্বাসের অংশ। তারা মনে করে, নবি মুহাম্মাদ ﷺ ও ইমাম আলি (আ.) রূহানিয়ভাবে বা অন্যভাবে ইমাম মাহদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন। মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
الرِّوَايَةُ: “فَأَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ.”
অর্থ : সর্বপ্রথম যিনি তাঁর (ইমাম মাহদির) প্রতি বাই‘আত করবেন, তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ।”
শায়খ আল-নুমানী, আল-গায়বা, কিয়ামাতের আলামত অধ্যায়, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৩২৬
শায়খ তুসী, মুহাম্মদ বাকের (আ.) থেকে বর্ণনা করেন-
تَذْكُرُ فِيهِ أَنَّ النَّبِيَّ (ص) وَعَلِيًّا (ع) هُمَا أَوَّلُ مَنْ يُبَايِعُ الْقَائِمَ عِنْدَ ظُهُورِهِ۔
অর্থ : এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবি (সা.) এবং আলি (আ.)—তাঁরা উভয়ে কায়েম (ইমাম মাহদী)-এর আত্মপ্রকাশের সময় প্রথম তাঁর কাছে বা্ইয়াত করবেন। শায়খ তুসী, আল-গায়বা, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৪৭৪–৪৭৫
৩. ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন
সূর্যের গোলকের সামনে ইমাম মাহদির বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। এটি শিয়াদের একটি জঘন্য ও মিথ্যা আকিদা। শায়খ তুসী ও নুমানি ইমাম রেজা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-
يَخْرُجُ الْقَائِمُ عُرْيَانًا أَمَامَ الشَّمْسِ…
অর্থ : কায়েম (ইমাম মাহদি) সূর্যের সামনে বিবস্ত্র অবস্থায় আত্মপ্রকাশ করবেন। আল্লামা মুহাম্মদ বাকের আল-মজলিসী, ভলিউম ৫২, পৃ. ২৮৬-২৮৮
সঠিক আকিদা :
এই সকল মতবাদ ও বর্ণনা সুন্নি আকিদা এবং সহিহ হাদিসসমূহের পরিপন্থী। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের বিশ্বাস অনুযায়ী, রাসূল ﷺ তো সকল নবিদের শেষ এবং সবার নেতা, তার পক্ষ থেকে কোনো “বাই‘আত” গ্রহণের কথা একেবারে অকল্পনীয় ও বাতিল। তেমনি, ইমাম মাহদির বিবস্ত্র হয়ে আত্মপ্রকাশের মত ধারণা শরিয়ত, লজ্জাশীলতা ও নবি পরিচিত আদর্শবিরোধী।