মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
বিবাহের বিধান
ইসলামে বিবাহের হুকুম (আহকাম) ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার কারণে পরিবর্তিত হয়। আলেমগণ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিচে সংক্ষেপে প্রতিটি হুকুম, তার প্রমাণ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরছি—
১. বিবাহ করা ওয়াজিব
যখন কোনো ব্যক্তি জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম হয় এবং সে আশঙ্কা করে যে ব্যভিচার (যিনা) করে ফেলবে, তখন তার জন্য বিবাহ ওয়াজিব।
আল্লাহ বলেন—
وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ
আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সূরা আন-নূর ২৪:৩২
আয়াতে আল্লাহ অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎ দাস-দাসীদের বিবাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে বিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বিবাহ শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা মুসলিম সমাজে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে। কাজেউ যারা জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম তাদের বিবাহ কার ওয়াজিব বলা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন-
وَلۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِکَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ
আর যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। সুরা নূর : ৩৩
আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।” এখানে সংযম বলতে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই বোঝানো হয়নি, বরং এর দ্বারা দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং মনকে খারাপ চিন্তা থেকে দূরে রাখাও বোঝানো হয়েছে। এটি একটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ, ইসলামে কেবল বাহ্যিক আমলই নয়, বরং মনের পবিত্রতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য এই সংযম অবলম্বন করা ফরজ, যাতে তারা কোনোভাবেই যিনা বা ব্যভিচারের মতো গুরুতর পাপে জড়িয়ে না পড়ে।
আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।
ব্যাখ্যা : এখানে নবী ﷺ স্পষ্ট করেছেন, যদি দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা না যায় তবে বিয়ে করা অপরিহার্য।
২. বিবাহ করা সুন্নাহ
যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, কিন্তু ব্যভিচারের আশঙ্কা নেই—তাহলে তার জন্য বিবাহ করা সুন্নাহ বা মু’আক্কাদাহ সুন্নাহ।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, আহমাদ : ১৩৫৩৪
নবী ﷺ বিবাহকে নিজের সুন্নাহ বলেছেন, তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যভিচারের ভয় না থাকে তবে এটি সুন্নাহ।
৩. বিবাহ মুস্তাহাব
যখন কেউ ব্যভিচারের ভয় পায় না, আবার বিবাহ না করলে কোনো ক্ষতির শঙ্কাও নেই, তবে বিবাহ করলে দ্বীন পালন, আত্মীয়তার বন্ধন ও সন্তান উৎপাদনের সুযোগ হয়। এ ক্ষেত্রে বিবাহ মুস্তাহাব।
মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, সহিহ ইবন হিব্বান : ৪০৩১
এখানে সন্তান উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই কেউ যদি ব্যভিচারের আশঙ্কা না রেখেও বিবাহ করে, তবে এটি মুস্তাহাব। যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, তার জন্য বিবাহ করা মুস্তাহাব। তবে একাকী জীবন-যাপনের চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কেননা ইসলামে সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্য নেই।
৪. বিবাহ করা হারাম
যখন কোনো ব্যক্তি জানে যে, সে স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না বা স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ক্ষতি করবে, অথবা বিবাহের উদ্দেশ্য হারাম কাজে ব্যবহার করা (তালাক দিয়ে কষ্ট দেয়া, ধোঁকা দেয়া) তাহলে তার জন্য বিবাহ হারাম।
যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। ফিক্বহুস সুন্নাহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩১
অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। তদ্রূপ কোন ব্যক্তির স্ত্রী থাকলে এবং অন্য স্ত্রীর মাঝে ইনছাফ করতে না পারার আশংকা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ
আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা উভয়ে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা বিনিময় দেবে তার মাধ্যমে তারা উভয়ে মুক্ত হয়ে গেলে তাতে কোনো পাপ নেই। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। সূরা বাকারা : ২২৯
খায়সামাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার কোষাধ্যক্ষ আসলেন। তিনি বললেন, তুমি কি গোলামদের খাবারের ব্যবস্থা করেছো? তিনি বললেন, না! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি গিয়ে তাদের খাবার দিয়ে আসো। বর্ণনাকার বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাদের ভরণ-পোষণ করা, ব্যয়ভার বহন করা কর্তব্য তা না করে আটকে রাখাই কোন ব্যক্তির গুনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সহিহ মুসলিম : ৯৯৬
যে ব্যক্তি স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না, তার বিয়ে করা হারাম, কারণ এটি জুলুম ও গুনাহর কারণ।
৫. মাকরূহ বা অপছন্দনীয়
মাকরূহ হলো এমন কাজ যা শরিয়ত অপছন্দ করেছে, তবে তা করলে গুনাহ হয় না, কিন্তু না করলে সওয়াব পাওয়া যায়।
কখন
অনেক আলেমের মতে কিছু কারনে বিবাহ করা মাকরূহ হয়। এমন ব্যক্তির জন্য যার বিবাহের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততির প্রতি তার কোনো চাহিদা বা আগ্রহ নেই, বা সে নিশ্চিত যে বিবাহ তার ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাবে।
অর্থাৎ, যাদের মধ্যে দাম্পত্য জীবনের প্রাকৃতিক আকাঙ্ক্ষা নেই, কিংবা বিবাহ তাদের জন্য দীন চর্চার প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে, তাদের জন্য বিবাহকে আলেমরা মাকরূহ বলেছেন।
ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, “যার কামনা-বাসনা নেই এবং সে ইবাদতে ব্যস্ত থাকে, তার জন্য অবিবাহিত থাকা উত্তম, কেননা তার জন্য বিবাহে কোনো প্রয়োজন নেই।” আল-মাজমূ‘, ইমাম নববী
ইবনে কুদামাহ (রহ.) লিখেছেন, “যার কামনা নেই, অথবা বিবাহ তার ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাবে, তার জন্য বিবাহ মাকরূহ।” আল-মুগনী, ইবনে কুদামাহ
এই বিধানগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামে বিবাহকে ব্যক্তির নৈতিক সুরক্ষা, সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত করে দেখা হয়।
দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য
১. দাম্পত্য জীবন যাপন করা আল্লাহর বিধান
২. দাম্পত্য জীবন যাপন করা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত
৩. দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি দেয়
৪. দাম্পত্য জীবন শারীরিক চাহিদা পূরণ ও সুরক্ষা দেয়
৫. দাম্পত্য জীবন ঈমানের পূর্ণতা দেয়
৬. দাম্পত্য জীবন দ্বীনি দায়িত্ব পালন ও সৎকাজে সহযোগিতা করে
৭. দাম্পত্য জীবন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ করে
৮. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা
৯. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে পারস্পরিক অধিকার ও সমতা
১০. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে বংশের ধারা অব্যাহত থাকে
১১. দাম্পত্য জীবনকে দুনিয়াবি ও আখিরাতি নেয়ামত
১২. দাম্পত্য জীবনে পরস্পর সৎকর্মে সহযোগিতা করা যায়
১৩. দাম্পতির দুআ কবুল করা হয়
দাম্পত্য জীবন আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ নেয়ামত। এটি মানবজীবনের পূর্ণতা দান করে, পরিবার গঠন করে এবং একটি সুশৃঙ্খল সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে। দাম্পত্য জীবনের মূল উদ্দেশ্য কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণ নয়, বরং এর রয়েছে আরও গভীর আধ্যাত্মিক, মানসিক এবং সামাজিক লক্ষ্য।
দাম্পত্য জীবনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি লাভ। আল্লাহ তা’আলা কোরআনে বলেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও।” এই প্রশান্তি একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য অপরিহার্য। এটি শুধু শারীরিক নয়, বরং মানসিক ও আত্মিকও। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী হয়, যা তাদের জীবনে স্থিতিশীলতা এনে দেয়।
বিবাহ ঈমানের পূর্ণতা লাভের একটি মাধ্যম। বিবাহ একজন মুসলিমকে ব্যভিচার ও অন্যান্য অনৈতিক কাজ থেকে রক্ষা করে এবং তাকে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি, এটি রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত অনুসরণ এবং আল্লাহর বিধান পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দাম্পত্য জীবন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটায়। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়, যা তাদের আত্মিক ও নৈতিক জীবনে উন্নতি ঘটায়। যেমন, স্বামী পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয় এবং স্ত্রী ঘরের ও সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে। এই পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন তৈরি হয়। এর ফলে তারা দোয়ার কবুল হওয়ার একটি মাধ্যম লাভ করে।
বিবাহের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন ও বংশবিস্তার হয়, যা মুসলিম উম্মাহর ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। এই সন্তানরা যখন দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা সমাজ ও দেশের জন্য সম্পদ হিসেবে কাজ করে। এভাবে বিবাহ পরিবার ও সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে। এটি লজ্জাশীলতা ও দৃষ্টি সংরক্ষণের একটি উপায়, যা মানুষকে পাপ কাজ থেকে দূরে রাখে।
সর্বোপরি, বিবাহ একটি সওয়াব অর্জনের মাধ্যম। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সেবা করে এবং একে অপরের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করে, যার জন্য তারা পরকালে জান্নাতি পুরস্কার লাভ করবে। দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি সৎ কাজ, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এভাবেই দাম্পত্য জীবন দুনিয়াবি ও আখিরাতি নেয়ামত হিসেবে পরিগণিত হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ বা দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য হলো শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধন। এটি মানব জীবনের পূর্ণতা দান করে, পরিবার গঠন করে এবং সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে। নিচে দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্দেশ্য তুলে ধরা হলো:
১. দাম্পত্য জীবন যাপন করা আল্লাহর বিধান
আল্লাত তায়ালা বলেন-
وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ
তোমাদের মধ্যে যারা ‘‘আইয়িম’’ (বিপত্নীক পুরুষ বা বিধবা মহিলা) তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন; আল্লাহতো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। সুরা নুর : ৩২
আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।
আলক্বামাহ ইবনু কায়েস (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’উদ (রাঃ)-এর সাথে মিনায় উপস্থিত ছিলাম। ’উসমান (রাঃ) এসে তাঁর সাথে একান্তে কথা বলেন। আমিও তার নিকটেই বসলাম। ’উসমান (রাঃ) তাঁকে বলেন, আমি কি তোমার সাথে এক কুমারী মেয়ের বিবাহ দিবো, যে তোমার অতীত যৌবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে? ’আবদুল্লাহ (রাঃ) যখন দেখলেন যে, তার উদ্দেশ্য কেবল বিবাহ করার উৎসাহ প্রদান করা, তখন তিনি আমাকে হাতের ইশারায় ডাকলেন। আমি তার নিকটে গেলাম এবং তিনি তখন বলছিলেন, তুমি যদি এ কথায় রাযী হয়ে যেতে। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহ করার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা দৃষ্টিশক্তিকে সংযতকারী এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী। আর যার এ সামর্থ্য নেই, সে যেন রোযা রাখে। কেননা এটি তার জন্য জৈবিক উত্তেজনা প্রশমনকারী। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৪৫, সুনানে তিরমিযী ১০৮১, নাসায়ী : ২২৩৯-৪৩, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৪৬, আহমাদ : ৩৫৮১, ৪১০১, দারেমী : ২১৬৫, ২১৬৬,
২. দাম্পত্য জীবন যাপন করা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত
নবী-রাসূলগণ তাদের জীবনে বিবাহ করেছেন এবং এর মাধ্যমে সুস্থ পরিবার গঠন করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন যে, বিবাহ একটি নৈতিক ও পবিত্র সম্পর্ক, যা মানুষকে অশ্লীলতা ও অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে রক্ষা করে। এটি মানবজাতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং একটি প্রজন্মকে দ্বীনের পথে পরিচালনা করতে সহায়তা করে। এই সুন্নাতের অনুসরণ একজন মুসলিমকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সাহায্য করে, কারণ এর মাধ্যমে তার ঈমান পূর্ণতা পায় এবং সে পরকালীন জীবনেও সফলতা লাভ করতে পারে। অপর পক্ষে যারা বিবাহ করে না, তিনি তাদের কে উম্মতে বলে স্বীকার করেন না।
’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي وَتَزَوَّجُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ الْأُمَمَ وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلٍ فَلْيَنْكِحْ وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وِجَاءٌ
বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত মোতাবেক কাজ করলো না সে আমার নয়। তোমরা বিবাহ করো, কেননা আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মাতের সামনে গর্ব করবো। অতএব যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে এবং যার সামর্থ্য নেই সে যেন রোযা রাখে। কারণ রোযা তার জন্য জৈবিক উত্তেজনা প্রশমনকারী। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৪৬, সহিহাহ : ২৩৮৩
সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’উসমান ইবনু মাজ’উনকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যদি অনুমতি দিতেন, তাহলে আমরাও খাসি হয়ে যেতাম। সহিহ বুখারি : ৫০৭৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০২, সুনানে নাসায়ী : ৩২১২, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৪৩, আহমাদ :ঢ় ১৫১৪, দারিমী : ২২১৩।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না।
অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, আহমাদ : ১৩৫৩৪
৩. দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি দেয়
বিবাহ মানুষের মন ও আত্মাকে প্রশান্তি দেয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুনা রূম : ২১
আয়াতটি বিবাহের তাৎপর্য, উদ্দেশ্য এবং এর গভীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করে। এটি কেবল একটি বৈবাহিক বন্ধন নয়, বরং আল্লাহর অসামান্য কুদরত ও মহিমার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিচে এই আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
ক. সৃষ্টিতত্ত্বের নিদর্শন
আয়াতের প্রথম অংশ, “তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন,” এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, নারী কোনো ভিন্ন সত্তা নয়, বরং পুরুষেরই অংশ। হাওয়া (আ.)-কে আদম (আ.)-এর পাঁজর থেকে সৃষ্টি করার ঘটনা এই ধারণাকে সমর্থন করে। এই সৃষ্টি রহস্য ইঙ্গিত করে যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক এবং তাদের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তি স্থাপন করে।
খ. প্রশান্তি লাভের মাধ্যম
আয়াতের দ্বিতীয় অংশ, “যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও,” বিবাহের মূল উদ্দেশ্যকে তুলে ধরে। আরবিতে ‘তাসকুনু’ (প্রশান্তি) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা শুধু শারীরিক বিশ্রাম নয়, বরং মানসিক, আত্মিক ও আবেগিক প্রশান্তিকে বোঝায়। বৈবাহিক সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে, যেখানে তারা জীবনের সকল ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে একে অপরের সান্নিধ্যে শান্তি অনুভব করে। এই প্রশান্তি তখনই অর্জিত হয় যখন উভয়ই পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস এবং সম্মানের সাথে জীবন যাপন করে।
গ. ভালোবাসা ও করুণার সৃষ্টি
আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, “আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” এখানে আল্লাহ তা’আলা দুটি স্বতন্ত্র শব্দ ব্যবহার করেছেন: ‘মাওয়াদ্দাহ’ (مَوَدَّةٌ) এবং ‘রাহমাহ’ (رَحْمَةٌ)।
মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা)- এটি সাধারণত যৌবনের আবেগপ্রবণ ও গভীর ভালোবাসাকে বোঝায়, যা দাম্পত্য জীবনের শুরুতে দেখা যায়। এটি এমন একটি আকর্ষণ যা স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রাখে।
আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দম্পতির পরস্পরের প্রতি যে আন্তরিক প্রেম-ভালোবাসা, তা অন্য (কোথাও) দু’জনের মাঝে তুমি দেখতে পাবে না। মিশকাত : ৩০৯৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৪৭, সহীহাহ্ : ৬২৪, সহীহ আল জামি : ৫২০০
রাহমাহ (করুণা)- এটি হলো এমন দয়া, সহানুভূতি ও করুণা, যা সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয়। এই করুণা সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করে, বিশেষ করে যখন জীবনে কঠিন সময় আসে, যেমন রোগ-শোক, বার্ধক্য বা আর্থিক সংকট। ‘রাহমাহ’ হলো এমন এক বন্ধন, যা ভালোবাসার আবেগ কমে গেলেও সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। এই দুটি গুণের সমন্বয় একটি সম্পর্ককে পরিপূর্ণতা দান করে।
ঘ. চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন
আয়াতের শেষ অংশ, “নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে,” এটি ইঙ্গিত করে যে, এই বৈবাহিক বন্ধন, যার মধ্যে ভালোবাসা ও করুণার মতো গুণ রয়েছে, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং আল্লাহর অসামান্য কুদরত ও ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যারা গভীর চিন্তাভাবনা করে, কেবল তারাই এই নিদর্শনগুলো উপলব্ধি করতে পারে। যারা বিবাহকে কেবল একটি জৈবিক বা সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখে, তারা এর গভীর আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। এই আয়াতটি মানুষকে বিবাহের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে।
এ আয়াতটি বিবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট মানব সম্পর্কের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে, যা কেবল দুটি ব্যক্তির মিলন নয়, বরং আল্লাহ তা’আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও নিদর্শন।
৪. দাম্পত্য জীবন শারীরিক চাহিদা পূরণ ও সুরক্ষা দেয়
বিবাহের মাধ্যমে মানবজাতির জৈবিক চাহিদা বৈধ ও পবিত্র পন্থায় পূরণ হয়। এর মাধ্যমে অশ্লীলতা ও অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেন-
যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫
এই হাদিসটিতে বিয়ের দুটি প্রধান উপকারের কথা বলা হয়েছে, যা মানব জীবনের নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক. চোখকে অবনত রাখা (দৃষ্টির পবিত্রতা)
হাদিসে উল্লিখিত প্রথম উপকারটি হলো চোখকে অবনত রাখা। যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে তার জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য একটি হালাল পথ পায়। এর ফলে তার মন এবং চোখ অন্য নারীদের দিকে আকৃষ্ট হয় না। আজকের সমাজে যেখানে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা ব্যাপক, সেখানে চোখকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। বিবাহ একজন মুসলিমকে এই ধরনের প্রলোভন থেকে রক্ষা করে এবং তার দৃষ্টিকে পবিত্র রাখে। এটি তার ঈমানকে মজবুত করে এবং তাকে পরকালের শাস্তির ভয় থেকে বাঁচায়।
খ. লজ্জাস্থানকে সংযত করা (যৌন পবিত্রতা)
হাদিসের দ্বিতীয় উপকারটি হলো লজ্জাস্থানকে সংযত করা। এটি ব্যভিচার, অশ্লীলতা এবং অন্যান্য অবৈধ সম্পর্ক থেকে আত্মরক্ষার একটি উপায়। বিবাহ মানুষের সহজাত শারীরিক চাহিদাকে একটি বৈধ এবং পবিত্র সম্পর্কের মাধ্যমে পূর্ণতা দেয়। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার আত্মাকে গুনাহের কাজ থেকে দূরে রাখতে পারে। এটি কেবল ব্যক্তিগত পবিত্রতাই নিশ্চিত করে না, বরং পরিবার ও সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করে।
এই হাদিসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে, বিবাহ শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি একটি দ্বীনি প্রয়োজন। এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি পথ। যে ব্যক্তি বিবাহের মাধ্যমে এই দুটি উপকার লাভ করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আদেশ মেনে চলে এবং তার দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পূর্ণ করে।
,
৫. দাম্পত্য জীবন ঈমানের পূর্ণতা দেয়
আনাস ইবন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي
মানুষ যখন বিয়ে করে তখন সে তার ঈমানের অর্ধেক পূর্ণ করে, অবশিষ্টাংশ লাভের জন্য সে যেন আল্লাহভীতি অর্জন করে। মিশকাত : ৩০৯৬, শু‘আবুল ঈমান : ৫১০০, সহীহাহ্ : ৬২৫, সহীহ আল জামি‘ : ৬১৪৮, তাবরানি, আল-মু‘জামুল আওসাত : ৯৯২
এই হাদিসের মূল বিষয়বস্তু হলো বিবাহকে দ্বীনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা এবং এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তির জীবনকে পরিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল করা। এই হাদিসটির মূল বক্তব্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে:
ক. দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করা
রাসূল (সাঃ)-এর এই উক্তিটি দ্বারা বোঝা যায় যে, বিবাহ শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি ইবাদতের একটি অংশ। মানবজীবনের একটি বড় অংশ জৈবিক ও মানসিক চাহিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিবাহ এই চাহিদাগুলোকে বৈধ ও পবিত্র পথে পূরণ করার সুযোগ দেয়। যখন একজন ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে ব্যভিচার, অশ্লীলতা এবং অন্যান্য অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করে। এর মাধ্যমে তার চরিত্র ও নৈতিকতা মজবুত হয়। যেহেতু মানবজীবনে এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই এর সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে দ্বীনের অর্ধেক অংশ পূর্ণতা লাভ করে।
খ. অবশিষ্ট অর্ধেক বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করা
বিবাহের পর একজন ব্যক্তি তার দ্বীনের অর্ধাংশ পূর্ণ করলেও, বাকি অর্ধেকের জন্য তাকে সতর্ক থাকতে হবে। এই বাকি অর্ধেক হলো আল্লাহর প্রতি ভয় এবং তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। এর মধ্যে রয়েছে:
সালাত, সিয়াম, যাকাত, ও হজ- এই মৌলিক ইবাদতগুলো সঠিকভাবে পালন করা।
আর্থিক লেনদেন- হালাল উপার্জন করা এবং হারাম থেকে বিরত থাকা।
পারিবারিক দায়িত্ব- স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালনা করা।
সামাজিক সম্পর্ক- আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং অন্যান্য মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।
এই হাদিসটি মূলত একজন ব্যক্তিকে বিবাহের মাধ্যমে পরিপূর্ণ জীবনধারণের জন্য উৎসাহিত করে। এটি বিবাহকে একটি পবিত্র বন্ধন হিসেবে তুলে ধরে, যা কেবল আত্মিক প্রশান্তিই দেয় না, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথেও সহায়তা করে। এর মাধ্যমে একজন মুসলিম তার জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়।
৬. দাম্পত্য জীবন দ্বীনি দায়িত্ব পালন ও সৎকাজে সহযোগিতা করে
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সহায়ক এবং সহযোগী হিসেবে কাজ করে। তারা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیۡعُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُہُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ
আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা তাওবা : : ৭১
এই আয়াতটি দাপ মুমিন নারী ও পুরুষের দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে। এটি শুধু দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মুমিনদের একে অপরের প্রতি দায়িত্বকেও বোঝায়। তবে দাম্পত্য জীবনের প্রসঙ্গে এর ব্যাখ্যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ক. পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা
আয়াতের প্রথম অংশ “আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু” দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের শুধু জীবনসঙ্গীই নয়, বরং সর্বোত্তম বন্ধু। এই বন্ধুত্ব এমন একটি বন্ধন যেখানে তারা একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত, যত্নশীল এবং সহায়ক। একজন মুমিন স্বামী ও একজন মুমিন স্ত্রী একে অপরের ভালো চায় এবং তাদের সম্পর্ক হয় সততা ও ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে। এই সম্পর্ক তাদের একাত্ম করে, যা জীবনের কঠিন মুহূর্তে তাদের একে অপরের পাশে থাকতে সাহায্য করে।
খ. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ
আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, “তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে।” দাম্পত্য জীবনে এই নীতিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে আল্লাহর পথে চলতে উৎসাহিত করবে। একজন অপরকে ফজরের সালাতের জন্য জাগিয়ে দিতে পারে, কোরআন তেলাওয়াত করতে উৎসাহিত করতে পারে, বা দান-সাদকা করার পরামর্শ দিতে পারে। একইভাবে, তারা একে অপরের ভুল বা অন্যায় কাজ দেখলে বিনয়ের সাথে তা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করবে। উদাহরণস্বরূপ, স্বামী যদি কোনো হারাম আয়ে লিপ্ত হয়, তবে স্ত্রী তাকে সে বিষয়ে সতর্ক করতে পারে। আর স্ত্রী যদি কোনো অনৈসলামিক কাজ করে, তবে স্বামী তাকে তা থেকে বিরত রাখতে পারে। এই পারস্পরিক জবাবদিহিতা তাদের উভয়কে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।
গ. ইবাদতে অবিচল থাকা
আয়াতের পরবর্তী অংশ “আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে” এই নীতির বাস্তবায়ন তুলে ধরে। এটি বোঝায় যে, দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী শুধু একে অপরকে সৎকাজের উপদেশই দেবে না, বরং নিজেরাও নিয়মিত ইবাদত করবে। সালাত, যাকাত এবং আল্লাহর আনুগত্যের মতো বিষয়গুলো পারিবারিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই এই ইবাদতগুলো মেনে চলে, তখন তাদের পরিবারে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় এবং তাদের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।
সুতরাং, এই আয়াতের আলোকে বলা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীকে তাদের দাম্পত্য জীবনকে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রায় পরিণত করতে হবে। এই যাত্রায় তারা একে অপরের বন্ধু, সহযোগী এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে, যা তাদের উভয়কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের পথে পরিচালিত করবে।
৭. দাম্পত্য জীবন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ করে
বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটে। স্বামী পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয় এবং স্ত্রী ঘরের ও সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে। এই পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই একটি পরিবার সফল হয়।
৮৯৩. ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল। লায়স ইবনু সা‘দ (রাযি.) আরো অতিরিক্ত বলেন, (পরবর্তী রাবী) আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাঁকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবার বর্গের অভিভাবক, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী তার স্বামী-গৃহের কর্ত্রী, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। খাদিম তার মনিবের ধন-সম্পদের রক্ষক, তাকেও তার মনিবের ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমার মনে হয়, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদের রক্ষক এবং এগুলো সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তাদের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। সহিহ বুখারি : ৮৯৩, ২৪০৯, ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮
৮. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা
বিবাহ এবং দাম্পত্য জীবনের সকল কাজ, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।
আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বললেন, আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্ল-হু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্।
এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে।” সহীহ মুসলিম : ১০০৬
সা‘আদ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও।’ সহহি বুখরি : ৫৬, সহিহ মুসলিম : ১৬২৮, আহমাদ : ১৫৪৬
৯. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে পারস্পরিক অধিকার ও সমতা
ইসলামে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই নির্দিষ্ট অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে। বিবাহ এই অধিকার ও কর্তব্যগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-
الَّذِیۡ عَلَیۡہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۪ وَلِلرِّجَالِ عَلَیۡہِنَّ دَرَجَۃٌ ؕ وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ
আর নারীদের উপর তাদের স্বামীদের যেরূপ স্বত্ব আছে, স্ত্রীদেরও তাদের পুরুষদের (স্বামীর) উপর তদনুরূপ ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে; এবং তাদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে; আল্লাহ হচ্ছেন মহা পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। সূরা বাকারা : ২২৮
আয়াতের প্রথম অংশ “আর নারীদের উপর তাদের স্বামীদের যেরূপ স্বত্ব আছে, স্ত্রীদেরও তাদের পুরুষদের (স্বামীর) উপর তদনুরূপ ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে” দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, দাম্পত্য জীবনে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের প্রতি সমান অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে। ইসলাম স্বামী ও স্ত্রীকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখে, যেখানে তাদের নিজ নিজ ভূমিকা রয়েছে। যেমন, স্ত্রীর ওপর স্বামীর সেবা ও আনুগত্যের অধিকার রয়েছে, তেমনি স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, উত্তম আচরণ ও সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। এই অধিকারগুলো ন্যায়সঙ্গত এবং ভারসাম্যপূর্ণ, যা একটি সুস্থ পারিবারিক জীবনের ভিত্তি।
আয়াতের দ্বিতীয় অংশ “এবং তাদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে” দ্বারা পুরুষের এক বিশেষ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। আরবিতে এই মর্যাদা বোঝাতে ‘দারাজাহ’ (دَرَجَةٌ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ‘এক ধাপ শ্রেষ্ঠত্ব’। এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো শোষণ বা নির্যাতনের অধিকার নয়, বরং এটি দায়িত্ব ও নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব। কোরআনের অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। সূরা নিসা : ৩৪
এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে, যেখানে পুরুষকে ‘কাওয়াম’ বা পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বশীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে:
ক. আর্থিক ভরণ-পোষণ : পরিবারের সকল সদস্যের আর্থিক চাহিদা পূরণ করা।
খ. নিরাপত্তা ও সুরক্ষা : পরিবারের সদস্যদের বাহ্যিক বিপদ থেকে রক্ষা করা।
গ. নেতৃত্ব : পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া।
এই শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষের জন্য একটি বাড়তি বোঝা, যা তাকে পরিবারের কল্যাণের জন্য আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে। এটি কোনোভাবেই নারীকে ছোট করা বা তার অধিকার খর্ব করাকে বোঝায় না।
১০. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে বংশের ধারা অব্যাহত থাকে
মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো।সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০
এ হাদিসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে প্রেমময়ী ও অধিক সন্তান প্রসবকারী নারীকে বিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছেন, দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। এই হাদিসটি অনুযায়ী, বিবাহ শুধু দুটি ব্যক্তির সম্পর্ক নয়, বরং এটি মানব বংশের ধারা অব্যাহত রাখার একটি পবিত্র মাধ্যম।
ক. বংশবৃদ্ধির গুরুত্ব
হাদিসের মূল বার্তা হলো, বংশবৃদ্ধি মানবজাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (সা.) বন্ধ্যা নারীকে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী নারীকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এর কারণ হলো, তিনি কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের কাছে মুসলিম উম্মাহর সংখ্যাধিক্যের জন্য গর্ব করবেন। এটি স্পষ্ট করে যে, সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং বংশের ধারা অব্যাহত রাখা ইসলামের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য।
খ. পারিবারিক ও সামাজিক কল্যাণ
বংশধারা অব্যাহত থাকার মাধ্যমে একটি পরিবার শুধু বৃদ্ধিই পায় না, বরং তা সমাজকেও স্থিতিশীল করে। সন্তানরা বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া করে, তাদের নেক আমল অব্যাহত থাকে। এটি একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখে। যে সমাজে অধিক সন্তান থাকে, সেই সমাজ আর্থিকভাবেও শক্তিশালী হয় এবং মানবসম্পদ বৃদ্ধি পায়।
গ. প্রেম ও করুণার সম্পর্ক
রাসূল (সা.) শুধু অধিক সন্তান প্রসবকারী নারীকেই বিয়ে করতে বলেননি, বরং ‘প্রেমময়ী’ নারীকেও বেছে নিতে বলেছেন। এর কারণ হলো, একটি সফল দাম্পত্য জীবনের জন্য ভালোবাসা ও আবেগ অপরিহার্য। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি থাকে, তখন তাদের পরিবার সুখী হয় এবং সন্তানরা একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠে। এই পরিবেশ বংশধারাকে শুধু শারীরিক দিক থেকে নয়, বরং নৈতিক ও আত্মিকভাবেও সমৃদ্ধ করে।
সুতরাং, এই হাদিসটি বিবাহকে কেবল একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং এটি একটি ব্যাপক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বংশের ধারা অব্যাহত থাকে এবং মুসলিম উম্মাহ শক্তিশালী হয়।
১১. দাম্পত্য জীবনকে দুনিয়াবি ও আখিরাতি নেয়ামত
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا ہَبۡ لَنَا مِنۡ اَزۡوَاجِنَا وَذُرِّیّٰتِنَا قُرَّۃَ اَعۡیُنٍ وَّاجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِیۡنَ اِمَامًا
আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন’। সুরা ফুরকান : ৭৪
এই আয়াতটি দাম্পত্য জীবনের এক গভীর উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরে। এটি শুধু একটি সাধারণ দোয়া নয়, বরং এটি একটি আদর্শ পরিবার এবং নেককার জীবনের আকাঙ্ক্ষা, যা দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ নিয়ে আসে।
ক. চক্ষু শীতলকারী জীবনসঙ্গী ও সন্তান
আয়াতের প্রথম অংশ “হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে” দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, একজন মুমিন আল্লাহর কাছে এমন জীবনসঙ্গী এবং সন্তান কামনা করে, যাদের দেখলে তার মন প্রশান্ত হয় এবং অন্তর শীতল হয়। এই প্রশান্তি তখনই আসে যখন স্ত্রী ও সন্তানরা দ্বীনের পথে চলে, আল্লাহর আনুগত্য করে এবং সৎ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়।
খ. দুনিয়াবি নেয়ামত :
যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীকে দেখে, যে আল্লাহর বিধান মেনে চলে, তার সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং তার আনুগত্য করে, তখন সে এক ধরনের মানসিক শান্তি অনুভব করে। একইভাবে, যখন কোনো পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের দেখে, যারা তাদের কথা শোনে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সমাজের জন্য ভালো কিছু করছে, তখন তাদের অন্তর এক বিশেষ আনন্দে ভরে যায়। এই আনন্দই হলো দুনিয়ার অন্যতম সেরা নেয়ামত।
গ. আখিরাতি নেয়ামত :
এই চক্ষু শীতলকারী জীবনসঙ্গী ও সন্তানরা আখিরাতেও তাদের পিতামাতার জন্য কল্যাণের কারণ হয়। যখন তারা নেক আমল করে এবং আল্লাহর কাছে তাদের পিতামাতার জন্য ক্ষমা চায়, তখন তাদের পিতামাতার আমলনামাতেও সওয়াব যুক্ত হয়। একটি সৎ ও নেককার পরিবার আখিরাতে একত্রে জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ পায়, যা আল্লাহ তা’আলা সূরা রা’দ-এর ২৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন।
ঘ. মুত্তাকীদের নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
আয়াতের দ্বিতীয় অংশ “আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন” এই দোয়ার গভীরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। এর মাধ্যমে একজন মুমিন কেবল নিজের ও তার পরিবারের জন্য কল্যাণ চায় না, বরং সে অন্যদের জন্য একটি আদর্শ হতে চায়। এর অর্থ এই নয় যে সে ক্ষমতার জন্য নেতা হতে চায়, বরং সে আল্লাহর ভয়ে ভীত এবং সৎকর্মশীলদের মধ্যে একজন আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হতে চায়, যাতে অন্যরা তাকে অনুসরণ করে।
সুতরাং, এই আয়াতের আলোকে দাম্পত্য জীবনকে এক দ্বিমুখী নেয়ামত হিসেবে দেখা যায়। যা কেবল দুনিয়াতে মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি দেয় না, বরং আখিরাতেও মুক্তি ও জান্নাতের পথ খুলে দেয়।
১২. দাম্পত্য জীবনে পরস্পর সৎকর্মে সহযোগিতা করা যায়
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ۘ وَتَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَالتَّقۡوٰی ۪ وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ
সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর। সূরা মায়েদাহ : ২
এই আয়াতটি সাধারণভাবে সকল মুমিনদের জন্য একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বর্ণিত হলেও, দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী তাদের সম্পর্কের মধ্যে এই নীতিএ এ আয়াতের আলোকে বাস্তবায়ন হতে পারে।
ক. দাম্পত্য জীবনে সৎকর্মে সহযোগিতা
দাম্পত্য জীবন হলো এমন একটি বন্ধন যেখানে দুটি মানুষ শুধুমাত্র নিজেদের জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য একত্রিত হয় না, বরং তারা একে অপরের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যও কাজ করে। এই আয়াতটি তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
খ. ইবাদতে সহযোগিতা :
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ও সহায়ক হতে পারে। তারা একে অপরকে সালাতের জন্য উৎসাহিত করতে পারে, ফজরের সময় একে অপরকে ডেকে তুলতে পারে এবং একসাথে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে। স্ত্রী স্বামীকে রোজা রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং স্বামী স্ত্রীকে দান-সাদকা করতে উৎসাহিত করতে পারে। এই পারস্পরিক সহযোগিতা তাদের ইবাদতকে আরও সহজ ও সুন্দর করে তোলে।
গ. নেক কাজে উৎসাহ :
দাম্পত্য জীবনে শুধু ইবাদত নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে সৎকাজে সহযোগিতা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি স্বামী কোনো ভালো কাজে যুক্ত হতে চায়, যেমন কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বা কোনো গরীবকে সাহায্য করা, তবে স্ত্রী তাকে সমর্থন করতে পারে। একইভাবে, স্ত্রী যদি কোনো দ্বীনি ইলম অর্জন করতে চায়, তবে স্বামী তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে পারে। এই ধরনের পারস্পরিক সমর্থন একটি পরিবারকে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে।
ঘ. মন্দকর্মে সহযোগিতা না করা
আয়াতের দ্বিতীয় অংশ “মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না” দাম্পত্য জীবনের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি বোঝায় যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের কোনো ভুল বা অনৈতিক কাজে সমর্থন করবে না। যদি স্বামী কোনো হারাম আয়ের সাথে জড়িত হয়, তবে স্ত্রীর উচিত তাকে সতর্ক করা। একইভাবে, যদি স্ত্রী কোনো অনৈসলামিক কাজ করে, তবে স্বামীর উচিত তাকে তা থেকে বিরত রাখা। এই পারস্পরিক জবাবদিহিতা তাদের উভয়কে গুনাহ থেকে রক্ষা করে।
সুতরাং, এই আয়াতের আলোকে দাম্পত্য জীবন এমন একটি বন্ধন হওয়া উচিত, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সৎকর্মে উৎসাহ দেবে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করবে। এটি তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করবে এবং তাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।
১৩. দাম্পতির দুআ কবুল করা হয়
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
ثَلاَثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللَّهِ عَوْنُهُمُ الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُكَاتَبُ الَّذِي يُرِيدُ الأَدَاءَ وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافَ
আল্লাহ্ তা’আলা তিন প্রকারের মানুষকে সাহায্য করা নিজের কর্তব্য হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলার পথে জিহাদকারী, মুকাতাব গোলাম- যে চুক্তির অর্থ পরিশোধের ইচ্ছা করে এবং বিবাহে আগ্রহী লোক- যে বিয়ের মাধ্যমে পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়। সুনানে তিরমিজি : ১৬৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫১৮
১৩. চারিত্র রক্ষার জন্য বিবাহিতদের আল্লাহ সাহায্য করেন
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই সাহায্য করেন। (প্রথমত) ক্রীতদাস- যে তার মুক্তিপণ পরিশোধ করে স্বাধীন হতে চায়। (দ্বিতীয়ত) বিবাহ উদ্যমী ব্যক্তি- যে স্বীয় চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে হয়। (তৃতীয়ত) মুজাহিদণ্ড যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। মিশকাত : ৩০৮৯, সুনানে তিরমিযী ১৬৫৫, সুনানে ইবনু মাজাহ ২৫১৮, সুনানে নাসায়ী ৩২১৮।