মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১৬. স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা
স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দাম্পত্য শুধু দু’জন মানুষের সম্পর্ক নয়; বরং দুটি পরিবার ও বংশের সংযোগও বটে। যখন স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের পরিবারকে ছোট করে দেখে বা অপমান করে, তখন এর প্রভাব সরাসরি সংসারের ভেতরে পড়ে।
ক. ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়ে যায়
স্বামী বা স্ত্রী তার নিজের পরিবারকে নিজের মর্যাদার অংশ মনে করে। যখন কেউ তার পরিবারকে অপমান করে, তখন সে মনে করে, আসলে আমাকেই হেয় করা হলো। এতে ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়।
খ. স্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়
পরিবারকে অপমান করার কথা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। এতে অন্তরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
গ. পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ে
একে অপরের পরিবারকে খাটো করলে স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি দুই পরিবারের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এতে দাম্পত্য জীবনে চাপ আরও বেড়ে যায়।
ঘ. ছোট বিষয়কে বড় করে তোলে
যখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের পরিবার নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে, তখন ক্ষুদ্র সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করে। এতে সমাধান না হয়ে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়।
ঙ. সন্তানদের মানসিক ক্ষতি
সন্তানরা যদি দেখে বাবা-মা সবসময় একে অপরের পরিবারকে অপমান করছে, তবে তাদের ভেতরে দ্বন্দ্বপূর্ণ ও নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। তারা সম্মান ও সৌজন্য শেখার পরিবর্তে ঝগড়া-মুখী হয়ে ওঠে।
চ. বিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়ে
একে অপরের পরিবারকে অপমান করা অনেক সময় এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করে যে, তা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিকারের উপায় :
স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে সম্মান জানানো অত্যন্ত জরুরি। পরিবারকে অপমান করা আসলে ভালোবাসার মানুষটিকে অপমান করারই সমান। তাই দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। ইসলামে অন্যের পরিবারকে গালি বা অপমান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো নিজের পিতা-মাতাকে লা’নত করা। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপন পিতা-মাতাকে কোন লোক কীভাবে লা’নত করতে পারে? তিনি বললেনঃ সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তখন সে তার মাকে গালি দেয়। সহিহ বুখারি : ৫৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ৯০, আহমাদ : ৬৫৪০
১৭. ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলা ও উপেক্ষা না করা
দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। যদি স্বামী-স্ত্রী ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলে এবং তা উপেক্ষা করতে না পারে, তবে সংসার অশান্ত হয়ে যায়। এর ক্ষতিকর দিকগুলো হলো—
ক. প্রতিনিয়ত ঝগড়া সৃষ্টি হয়
প্রতিটি ত্রুটি নিয়ে আলোচনা বা অভিযোগ করলে সংসারে শান্তি হারিয়ে যায়। তুচ্ছ বিষয় নিয়েই বারবার ঝগড়া হতে থাকে।
খ. ভালোবাসা ও মমতা কমে যায়
যখন এক পক্ষের ভুল অন্য পক্ষ বারবার বড় করে তোলে, তখন তার মনে অপমান ও অভিমান জমে যায়। এতে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়।
গ. আস্থার সম্পর্ক ভেঙে যায়
সবসময় সমালোচনা শুনতে শুনতে মানুষ মনে করে, “সে আমাকে বুঝতে বা মানতে চায় না।” এতে পারস্পরিক আস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।
ঘ. নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়
ছোটখাটো ভুল বড় করে দেখার অভ্যাস একসময় স্বামী বা স্ত্রীকে অপরজনের শুধু খারাপ দিকগুলোই দেখতে বাধ্য করে। তখন আর কোনো ভালো দিক চোখে পড়ে না।
ঙ. সন্তানদের উপর খারাপ প্রভাব
যদি বাবা-মা সবসময় ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করে, সন্তানরা তা দেখে নেতিবাচক চরিত্র গড়ে তোলে এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে যায়।
চ. সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি
অবিরাম খুঁটিনাটি ভুল নিয়ে সমালোচনা দাম্পত্য জীবনে এক পর্যায়ে ক্লান্তি এনে দেয়। তখন বিচ্ছেদ বা দূরত্ব তৈরি হওয়া খুব সহজ হয়ে যায়।
ছ. তিক্ততা এবং রাগ বৃদ্ধি
ক্ষমা করার অভ্যাস না থাকলে এবং ছোট ভুলের জন্য অভিযোগ করতে থাকলে দুজনের মনেই তিক্ততা এবং রাগ জমা হয়। এই চাপা রাগ একসময় বড় ঝগড়া বা বিস্ফোরণের রূপ নেয়। সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা এই তিক্ততা বিষের মতো কাজ করে এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে শেষ করে দেয়।
প্রতিকারের উপায় :
দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। একে অপরকে ক্ষমা করে দিলে এবং ছোটখাটো বিষয়গুলো সহজে মেনে নিলে সম্পর্ক অনেক বেশি মজবুত হয়। মনে রাখবেন, ভালোবাসার সম্পর্ক নিখুঁত হয় না, এটি ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়েই সুন্দর হয়ে ওঠে। ইসলাম আমাদেরকে ক্ষমাশীল হতে এবং ছোটখাটো ভুল এড়িয়ে চলতে শিখিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন-
خُذِ الۡعَفۡوَ وَاۡمُرۡ بِالۡعُرۡفِ وَاَعۡرِضۡ عَنِ الۡجٰہِلِیۡنَ
তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক। সুরা আরাফ : ১৯৯
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “একজন মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। কারণ, যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে তার অন্য কোনো স্বভাবের প্রতি সে সন্তুষ্ট হবে।” সহীহ মুসলিম : ১৪৬৯
১৮. পরকিয়া বা নিজ স্বামী-স্ত্রীর থেকে অন্য কাউকে প্রধান্য দেওয়া
পরকীয়া বা স্বামী/স্ত্রীর বদলে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। কারণ দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস, আনুগত্য ও একনিষ্ঠতা। যখন এই ভিত্তি নষ্ট হয়, তখন সংসার ভেঙে পড়তে শুরু করে। নিচে কয়েকটি দিক তুলে ধরছি—
ক. বিশ্বাসের চূড়ান্ত লঙ্ঘন
দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং পারস্পরিক আনুগত্য। যখন একজন সঙ্গী পরকীয়া করে বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়, তখন এই বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কের মূল স্তম্ভকে আঘাত করে এবং এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি ফাটল তৈরি হয় যা সহজে মেরামত করা যায় না। যে ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হন, তিনি আর কখনোই তার সঙ্গীকে বিশ্বাস করতে পারেন না, যা সম্পর্ককে অকার্যকর করে তোলে।
খ. ভালোবাসার মৃত্যু
পরকীয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও মমতা দ্রুত নষ্ট হয়। যিনি অবহেলিত হন, তার মনে প্রবল কষ্ট, ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্ম নেয়।
গ. পারিবারিক ভাঙন
পরকীয়া সংসার ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ। এতে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, বরং দুই পরিবার ও সন্তানের জীবনও নষ্ট হয়ে যায়।
ঘ. সন্তানদের উপর ভয়াবহ প্রভাব
যখন সন্তানরা দেখে বাবা-মার একজন অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, তখন তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং অনেক সময় বেপথু হয়ে পড়ে।
ঙ. পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি
পরকীয়া শুধু দম্পতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পরিবার এবং সমাজে তাদের সম্মানও নষ্ট করে। যখন এই ধরনের সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তখন তা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাস এবং ঘৃণা তৈরি করে। এর ফলে সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৬. আল্লাহর গজব ও আখিরাতের শাস্তি
পরকীয়া (ব্যভিচার) কুরআন-হাদিসে মহাপাপ হিসেবে বর্ণিত।
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। সূরা ইসরা : ৩২
২৪৭৫. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, ৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০, সহিহ মুসলিম : ৫৭
প্রতিকারের উপায় :
পরকীয়া বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেওয়া একটি সম্পর্ককে কেবল ভেঙে দেয় না, বরং এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। এটি ভালোবাসার সম্পর্ককে ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং ব্যথার সম্পর্কে পরিণত করে। তাই দাম্পত্য জীবন রক্ষা করতে হলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, আনুগত্য করা এবং পরকীয়া বা অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে বাঁচা অপরিহার্য। সাথে সাথে দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তির কথা মনে করলে পরকিয়া করা অসম্ভব হবে।
আবদুল্লাহ (ইবনু মাস’ঊদ) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২, সহিহ মুসলিম : ৮৬০
১৯. ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করার ফলে
ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হয়। কারণ দাম্পত্যের প্রকৃত ভিত্তি হলো আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, এবং দ্বীনের অনুসরণ। যখন স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্বকে উপেক্ষা করে, তখন সংসার থেকে বরকত সরে যায় এবং নানা বিপদ ঘনিয়ে আসে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে দাম্পত্য জীবনের ক্ষতি তা হলো-
ক. আল্লাহর ভয় না থাকায় সম্পর্ক দুর্বল হয়
যদি স্বামী-স্ত্রী আল্লাহকে ভয় না করে, তবে তারা সহজেই একে অপরের প্রতি জুলুম, প্রতারণা বা অবহেলা করতে পারে। ফলে দাম্পত্যের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।
খ. নামাজ-সিয়াম অবহেলা করলে বরকত চলে যায়
নামাজ, সিয়াম, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত অবহেলা করলে সংসার থেকে বরকত সরে যায়। ফলে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও শান্তি থাকে না।
গ. হালাল-হারামের সীমা অমান্য করা
ধর্মীয় অবহেলার কারণে কেউ হারাম উপার্জনে লিপ্ত হয়, কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে, কেউ অপচয় ও বিলাসিতায় মত্ত হয়। এসব সরাসরি সংসার ধ্বংস করে।
ঘ. সন্তানদের ঈমান নষ্ট হয়
স্বামী-স্ত্রীর দ্বীনহীনতা সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভবিষ্যত প্রজন্ম নষ্ট হয় এবং পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।
ঙ. পারস্পরিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা
ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর দায়িত্ব, আর স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে এগুলো অমান্য হয়, যা সংসার ভাঙনের পথ তৈরি করে।
চ. বিবেক ও নৈতিকতার অবক্ষয়
ধর্ম ছাড়া দাম্পত্য জীবন শুধুই জাগতিক স্বার্থে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে নৈতিকতা হারায়, সম্মান ও ভালোবাসা ক্ষয়ে যায়।
ছ. আখিরাতের ক্ষতি
সংসারে সুখ পেলেও যদি স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করে, তবে আখিরাতে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا
যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, আমি তার জন্য সংকীর্ণ জীবন নির্ধারণ করব।” সুরা ত্বাহা : ১২৪
প্রতিকারের উপায় :
দ্বীনহীন স্বামী বা স্ত্রী সংসারে শান্তি আনতে পারে না। তাই দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর, স্থায়ী ও বরকতময় করতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দ্বীনের প্রতি যত্নবান হওয়া, একে অপরকে ইবাদতে সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর ভয় হৃদয়ে জাগ্রত রাখা অপরিহার্য। প্রথমত দ্বীনদার ছেলে/মেয়ে বিবাহ করা।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সিহহ মুসলিম : ১৪৬৬, আহমাদ : ৯৫২৬
পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে একটি পরিবার আদর্শ মুসলিম পরিবার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং সদস্যরা একে অপরের জন্য সহায়ক হতে পারে। নিচে কিছু সহজ ও কার্যকরী উপায় দেওয়া হলো, যার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা সম্ভব। তাই নিয়মিত ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা। যেমন- জামাতে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দুআ, দান সদগা ইত্যাদি। নিয়মিত ঘরে দ্বীনি আলোচনার ব্যবস্থা করা। পরিবারের সবাইকে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করা। পরিবারের নারীদের মাহরাম রক্ষা করে চলাফেরা করা এবং পর্দার বিষয় কোন ছাড় না দেওয়া। এভাবের পরিবারে দ্বীন চলে আসলে আপনি অবশ্যি দাম্পত্য জীবনে সুখি হবেন।
২০. অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা
অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা দাম্পত্য জীবনে একটি ধ্বংসাত্মক আচরণ, যা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। এই ধরনের আচরণ দাম্পত্য জীবনে যে ক্ষতি করে তা হলো-
ক. পারস্পরিক সম্মান নষ্ট হওয়া
একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। যখন একজন সঙ্গী অন্যজনকে গালি দেয় বা অশ্লীল কথা বলে, তখন সেই সম্মানবোধ সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়। এই আচরণ এমন একটি বার্তা দেয় যে, আপনি আপনার সঙ্গীকে সম্মান করেন না বা তার অনুভূতি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর ফলে সঙ্গী নিজেকে অপমানিত এবং মূল্যহীন মনে করে, যা সম্পর্কের মূল ভিত্তি ভেঙে দেয়।
খ. মানসিক আঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা
অশ্লীল কথা এবং গালাগালি শারীরিক আঘাতের মতো দৃশ্যমান না হলেও এটি মানসিক আঘাত তৈরি করে। এই ধরনের আচরণ একজন ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং তাকে নিরাপত্তাহীন করে তোলে। যে ব্যক্তি এই ধরনের আচরণের শিকার হন, তিনি সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকেন যে কখন আবার তাকে অপমান করা হবে। এতে করে সম্পর্কের মধ্যে কোনো শান্তি থাকে না।
গ. ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা বৃদ্ধি
ভালোবাসা এবং গালাগালি একসঙ্গে চলতে পারে না। যখন একজন মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ক্রমাগত অসম্মান করে, তখন ভালোবাসার অনুভূতি ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। যে ব্যক্তি গালমন্দ করে, তার প্রতি অন্যজনের মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ জমা হয়, যা একসময় সম্পর্কের ইতি টেনে দেয়।
ঘ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব
যদি দম্পতির সন্তান থাকে, তবে তাদের বাবা-মায়ের অশ্লীল কথা এবং গালাগালি তাদের মানসিক বিকাশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুরা এই ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে এবং নিজের জীবনেও এটি প্রয়োগ করতে শেখে। এর ফলে তাদের মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।
ঙ. ঘনিষ্ঠতা ও আস্থা ভেঙে যায়
যখন স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে খারাপ ভাষায় সম্বোধন করে, তখন তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়, আস্থা হারিয়ে যায়।
প্রতিকারের উপায় :
অশ্লীল কথা এবং গালাগালি একটি সম্পর্কের উষ্ণতা, সম্মান এবং ভালোবাসা কেড়ে নেয়। এটি সম্পর্ককে একটি বিষাক্ত এবং অসহনীয় জায়গায় পরিণত করে, যেখানে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য এই ধরনের আচরণ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَّاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ
আর মানুষকে উত্তম কথা বল, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তোমরা সকলে উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিলে। সূরা বাকারা : ৮৩
আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। সুনানে তিরমিজ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ৩২০
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করে। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা চুপ থাকে। সহিহ বুখারি : ৬০১৮, ৫১৮৫, সহিহ মুসলিম : ৪৭, আহমাদ : ৭৬৩০
তাই দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত অশ্লীলতা ও গালাগালি থেকে বিরত থাকা, সবসময় কোমল ও ভালোবাসাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা।
২১. স্ত্রী পক্ষের আত্মীয়দের বেশী গুরুত্ব দেওয়া
দাম্পত্য জীবন হলো দুজন মানুষের এক হওয়া এবং তাদের দুটি পরিবারকে একটি পরিবার হিসেবে গ্রহণ করা। যখন একজন স্ত্রী তার নিজের পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেন এবং স্বামীর পরিবারের প্রতি অবহেলা করেন, তখন স্বামীর মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে তার পরিবারকে সম্মান করা হচ্ছে না। এই অসম্মান থেকে পারস্পরিক আস্থার অভাব সৃষ্টি হয়। স্বামী ভাবতে শুরু করেন যে, তার স্ত্রী তার এবং তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক নন, যা সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। ইহার ফলে দাম্পত্য জীবনে যে সকল সমস্যা সৃষ্টি করে তা আলোচনা করা হলো-
ক. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি
স্ত্রীর অতিরিক্ত আত্মীয়প্রিয়তা স্বামীর পিতামাতা বা পরিবারের প্রতি অমনোযোগ বা অসম্মান হিসেবে ধরা দিতে পারে। এটি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি এবং দূরত্ব বৃদ্ধি করে।
খ. অর্থ ও দায়িত্বের অসামঞ্জস্য
যদি পরিবারিক অর্থনৈতিক বা দৈনন্দিন দায়িত্ব (যেমন রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবা) প্রধানত নারীর হাতে থাকে, আত্মীয়দের বেশি সাহায্য ও সহযোগিতা দেওয়া স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। স্বামীকে তার অধিকার ও দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হতে পারে।
গ. ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব
স্ত্রী যখন আত্মীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন এবং তাদের কথার বেশি গুরুত্ব দেন, তখন স্বামীর প্রতি তাঁর প্রাধান্য বা নেতৃত্বের ধারণা হ্রাস পেতে পারে। এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব বা কলহের কারণ হতে পারে।
ঘ. সংঘাত ও কলহের উদ্ভব
যদি স্বামী এই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন, তবে স্ত্রী-স্বামী মধ্যে তর্ক বা কলহ জন্মায়। আবার যদি স্বামী চুপচাপ থাকে, তাহলে ভিতরে ভিতরে ক্ষোভ জমে যায়। এই ধরনের ক্ষোভ দীর্ঘমেয়াদি হলে সম্পর্কের মানসিক দিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঙ. সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা
দাম্পত্য জীবনে সবকিছুতে সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ—সময়, অর্থ, আবেগ, দায়িত্ব। আত্মীয়দের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা ও সম্পর্কের সৌহার্দ্য কমে যায়।
প্রতিকারের উপায় :
দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর উভয়েরই উচিত একে অপরের পরিবারকে সমান চোখে দেখা এবং উভয় পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই সকল পক্ষের আত্মীয়দের সদ্ব্যবহার ও ভালোবাসা দিতে হবে। স্বামী স্ত্রী উভয় পক্ষের আত্মীয়দের সাথে ভালো আচরন করা কুরআন সুন্নাহ নির্দেশ।
আল্লাহ তায়ারা বলেন-
فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ
“তোমরা কি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে দুনিয়ায় ফিতনা সৃষ্টি করবে না?” সূরা মুহাম্মদ : ২২
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ
যে লোক তার জীবিকা প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৫
যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৪, মুসলিম ২৫৫৬, তিরমিযী ১৯০৯, আবূ দাউদ ১৬৯৬, আহমাদ ১৬২৯১, ১৬৩২২, ১৬৩৩১
২২. একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে
দাম্পত্য জীবনে একে অপরকে ছোট করা এবং অসম্মান করা সম্পর্কের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে কীভাবে একটি সুস্থ সম্পর্ক ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। , তা নিচে আলোচনা করা হলো। একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো-
ক. বিশ্বাসের অভাব ও দূরত্ব তৈরি হওয়া
যখন একজন সঙ্গী বারবার অন্যজনকে ছোট করে কথা বলেন বা অপমান করেন, তখন তাদের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়। যার ফলে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি, দুর্বলতা বা মনের কথা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতে পারেন না। এতে দুজনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।
খ. আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া
বারবার অপমানিত হলে একজন মানুষের আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এর ফলে তিনি নিজেকে অযোগ্য বা মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। এই ধরনের মানসিক চাপ সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গ. রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম
অপমানিত হতে হতে মনের মধ্যে রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম হয়। এই নেতিবাচক অনুভূতিগুলো সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। একপর্যায়ে এই চাপা রাগ বা হতাশা বড় ধরনের ঝগড়া বা বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে।
ঘ. একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা হারানো
সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা। যখন একজন আরেকজনকে ছোট করে, তখন সেই শ্রদ্ধা ভেঙে যায়। শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে না।
ঙ. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
নিয়মিত অপমান ও অসম্মান একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। এর ফলে তিনি বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগতে পারেন।
চ. শিশু ও পরিবারিক পরিবেশে প্রভাব:
অবমাননার পরিবেশে বড় হওয়া সন্তান মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়। তারা পরিবারকে ঘরের নিরাপদ স্থান মনে করতে পারে না, যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।
প্রতিকারে উপায় :
একে অপরকে ছোট করা বা অসম্মান করা হলো একটি সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায়। একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার জন্য একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং শ্রদ্ধা থাকা অপরিহার্য। তাই এক অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। অপরের আত্ম মর্যাদারে প্রতি দৃষ্টি রেখে কথা বলেত হবে। কাউকে কোন প্রকারের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা চলবেনা। তাহলেউ দাম্পত্য জীবনে সুখ আসবে।
আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, (ক্রয় করার ভান করে) মূল্য বৃদ্ধি করে ধোঁকা দিও না। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না। একে অপরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন (অবজ্ঞা প্রকাশ) করবে না। তোমাদের একজনের সাওদা করা শেষ না হলে ঐ বস্তুর সাওদা বা কেনা-বেচার প্রস্তাব করবে না। হে আল্লাহ্র বান্দাগণ! তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, অসম্মান করবে না, তুচ্ছ ভাববে না। ‘ধর্ম ভীরুতা এখানে’-এটা বলার সময় তিনি স্বীয় বক্ষস্থলের প্রতি তিনবার ইঙ্গিত করেছিলেন। কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করাটা মন্দ ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট (অর্থাৎ এরূপ তুচ্ছ জ্ঞান প্রদর্শন দ্বারা পাপ কার্য হওয়া সুনিশ্চিত।) এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে খুন করা, তাঁর মাল গ্রাস করা ও সম্মানে আঘাত দেয়া হারাম। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩, ২৫৬৪, সুনানে তিরমিযী : ১১৩৪, ১৯৮৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৯, ৪৪৯৬, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৪৩৮, ৩৪৪৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৭, ২১৭২,২১৭৪, আহমাদ : ৭৬৭০, ৭৮১৫, মালেক ১৩৯১, ১৬৮৪ ।