Category Archives: পরিবার ও দাম্পত্য জীবন

দাম্পত্য জীবনের বিধান ও উদ্দেশ্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিবাহের বিধান

ইসলামে বিবাহের হুকুম (আহকাম) ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার কারণে পরিবর্তিত হয়। আলেমগণ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। নিচে সংক্ষেপে প্রতিটি হুকুম, তার প্রমাণ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরছি—

১. বিবাহ করা ওয়াজিব

যখন কোনো ব্যক্তি জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম হয় এবং সে আশঙ্কা করে যে ব্যভিচার (যিনা) করে ফেলবে, তখন তার জন্য বিবাহ ওয়াজিব।

আল্লাহ বলেন—

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সূরা আন-নূর ২৪:৩২

আয়াতে আল্লাহ অবিবাহিত নারী-পুরুষ এবং সৎ দাস-দাসীদের বিবাহ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে বিবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। বিবাহ শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা মুসলিম সমাজে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে। কাজেউ যারা জৈবিক চাহিদা দমন করতে অক্ষম তাদের বিবাহ কার ওয়াজিব বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন-

وَلۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِکَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ

আর যাদের বিবাহের সামর্থ্য নেই আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে। সুরা নূর : ৩৩

আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, “তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।” এখানে সংযম বলতে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক থেকে বিরত থাকাই বোঝানো হয়নি, বরং এর দ্বারা দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং মনকে খারাপ চিন্তা থেকে দূরে রাখাও বোঝানো হয়েছে। এটি একটি মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ, ইসলামে কেবল বাহ্যিক আমলই নয়, বরং মনের পবিত্রতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য এই সংযম অবলম্বন করা ফরজ, যাতে তারা কোনোভাবেই যিনা বা ব্যভিচারের মতো গুরুতর পাপে জড়িয়ে না পড়ে।

আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬,  সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

ব্যাখ্যা : এখানে নবী ﷺ স্পষ্ট করেছেন, যদি দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করা না যায় তবে বিয়ে করা অপরিহার্য।

২. বিবাহ করা সুন্নাহ

যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে, কিন্তু ব্যভিচারের আশঙ্কা নেই—তাহলে তার জন্য বিবাহ করা সুন্নাহ বা মু’আক্কাদাহ সুন্নাহ।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না। অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১, আহমাদ : ১৩৫৩৪

নবী ﷺ বিবাহকে নিজের সুন্নাহ বলেছেন, তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যভিচারের ভয় না থাকে তবে এটি সুন্নাহ।

৩. বিবাহ মুস্তাহাব

যখন কেউ ব্যভিচারের ভয় পায় না, আবার বিবাহ না করলে কোনো ক্ষতির শঙ্কাও নেই, তবে বিবাহ করলে দ্বীন পালন, আত্মীয়তার বন্ধন ও সন্তান উৎপাদনের সুযোগ হয়। এ ক্ষেত্রে বিবাহ মুস্তাহাব।

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০, সহিহ ইবন হিব্বান : ৪০৩১

এখানে সন্তান উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই কেউ যদি ব্যভিচারের আশঙ্কা না রেখেও বিবাহ করে, তবে এটি মুস্তাহাব। যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, তার জন্য বিবাহ করা মুস্তাহাব। তবে একাকী জীবন-যাপনের চেয়ে বিবাহ করা উত্তম। কেননা ইসলামে সন্ন্যাসব্রত বা বৈরাগ্য নেই।

৪. বিবাহ করা হারাম

যখন কোনো ব্যক্তি জানে যে, সে স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না বা স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ক্ষতি করবে, অথবা বিবাহের উদ্দেশ্য হারাম কাজে ব্যবহার করা (তালাক দিয়ে কষ্ট দেয়া, ধোঁকা দেয়া) তাহলে তার জন্য বিবাহ হারাম।

যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। ফিক্বহুস সুন্নাহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-১৩১

অনুরূপভাবে যিনি যুদ্ধের ময়দানে বা কাফির-মুশরিক দেশে যুদ্ধরত থাকেন তার জন্য বিবাহ হারাম। কেননা সেখানে তার পরিবারের নিরাপত্তা থাকে না। তদ্রূপ কোন ব্যক্তির স্ত্রী থাকলে এবং অন্য স্ত্রীর মাঝে ইনছাফ করতে না পারার আশংকা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করা যাবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ

আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তারা উভয়ে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী যা বিনিময় দেবে তার মাধ্যমে তারা উভয়ে মুক্ত হয়ে গেলে তাতে কোনো পাপ নেই। এগুলো আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। সূরা বাকারা : ২২৯

খায়সামাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার কোষাধ্যক্ষ আসলেন। তিনি বললেন, তুমি কি গোলামদের খাবারের ব্যবস্থা করেছো? তিনি বললেন, না! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি গিয়ে তাদের খাবার দিয়ে আসো। বর্ণনাকার বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যাদের ভরণ-পোষণ করা, ব্যয়ভার বহন করা কর্তব্য তা না করে আটকে রাখাই কোন ব্যক্তির গুনাহগার হওয়ার জন্য যথেষ্ট। সহিহ মুসলিম : ৯৯৬

 যে ব্যক্তি স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না, তার বিয়ে করা হারাম, কারণ এটি জুলুম ও গুনাহর কারণ।

৫. মাকরূহ বা অপছন্দনীয়

মাকরূহ হলো এমন কাজ যা শরিয়ত অপছন্দ করেছে, তবে তা করলে গুনাহ হয় না, কিন্তু না করলে সওয়াব পাওয়া যায়।

কখন

অনেক আলেমের মতে কিছু কারনে বিবাহ করা মাকরূহ হয়। এমন ব্যক্তির জন্য যার বিবাহের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও স্ত্রী বা সন্তান-সন্ততির প্রতি তার কোনো চাহিদা বা আগ্রহ নেই, বা সে নিশ্চিত যে বিবাহ তার ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাবে।

অর্থাৎ, যাদের মধ্যে দাম্পত্য জীবনের প্রাকৃতিক আকাঙ্ক্ষা নেই, কিংবা বিবাহ তাদের জন্য দীন চর্চার প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে, তাদের জন্য বিবাহকে আলেমরা মাকরূহ বলেছেন।

ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, “যার কামনা-বাসনা নেই এবং সে ইবাদতে ব্যস্ত থাকে, তার জন্য অবিবাহিত থাকা উত্তম, কেননা তার জন্য বিবাহে কোনো প্রয়োজন নেই।” আল-মাজমূ‘, ইমাম নববী

ইবনে কুদামাহ (রহ.) লিখেছেন, “যার কামনা নেই, অথবা বিবাহ তার ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটাবে, তার জন্য বিবাহ মাকরূহ।” আল-মুগনী, ইবনে কুদামাহ

এই বিধানগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামে বিবাহকে ব্যক্তির নৈতিক সুরক্ষা, সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত করে দেখা হয়।

দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য

১. দাম্পত্য জীবন যাপন করা আল্লাহর বিধান

২. দাম্পত্য জীবন যাপন করা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত

৩. দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি দেয়

৪. দাম্পত্য জীবন শারীরিক চাহিদা পূরণ ও সুরক্ষা দেয়

৫. দাম্পত্য জীবন ঈমানের পূর্ণতা দেয়

৬. দাম্পত্য জীবন দ্বীনি দায়িত্ব পালন ও সৎকাজে সহযোগিতা করে

৭. দাম্পত্য জীবন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ করে

৮. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা

৯. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে পারস্পরিক অধিকার ও সমতা

১০. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে বংশের ধারা অব্যাহত থাকে

১১. দাম্পত্য জীবনকে দুনিয়াবি ও আখিরাতি নেয়ামত

১২. দাম্পত্য জীবনে পরস্পর সৎকর্মে সহযোগিতা করা যায়

১৩. দাম্পতির দুআ কবুল করা হয়

দাম্পত্য জীবন আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ নেয়ামত। এটি মানবজীবনের পূর্ণতা দান করে, পরিবার গঠন করে এবং একটি সুশৃঙ্খল সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে। দাম্পত্য জীবনের মূল উদ্দেশ্য কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণ নয়, বরং এর রয়েছে আরও গভীর আধ্যাত্মিক, মানসিক এবং সামাজিক লক্ষ্য।

দাম্পত্য জীবনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি লাভ। আল্লাহ তা’আলা কোরআনে বলেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও।” এই প্রশান্তি একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য অপরিহার্য। এটি শুধু শারীরিক নয়, বরং মানসিক ও আত্মিকও। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী হয়, যা তাদের জীবনে স্থিতিশীলতা এনে দেয়।

বিবাহ ঈমানের পূর্ণতা লাভের একটি মাধ্যম। বিবাহ একজন মুসলিমকে ব্যভিচার ও অন্যান্য অনৈতিক কাজ থেকে রক্ষা করে এবং তাকে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি, এটি রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত অনুসরণ এবং আল্লাহর বিধান পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দাম্পত্য জীবন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটায়। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়, যা তাদের আত্মিক ও নৈতিক জীবনে উন্নতি ঘটায়। যেমন, স্বামী পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয় এবং স্ত্রী ঘরের ও সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে। এই পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন তৈরি হয়। এর ফলে তারা দোয়ার কবুল হওয়ার একটি মাধ্যম লাভ করে।

বিবাহের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদন ও বংশবিস্তার হয়, যা মুসলিম উম্মাহর ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। এই সন্তানরা যখন দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়, তখন তারা সমাজ ও দেশের জন্য সম্পদ হিসেবে কাজ করে। এভাবে বিবাহ পরিবার ও সমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে। এটি লজ্জাশীলতা ও দৃষ্টি সংরক্ষণের একটি উপায়, যা মানুষকে পাপ কাজ থেকে দূরে রাখে।

সর্বোপরি, বিবাহ একটি সওয়াব অর্জনের মাধ্যম। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সেবা করে এবং একে অপরের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করে, যার জন্য তারা পরকালে জান্নাতি পুরস্কার লাভ করবে। দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি সৎ কাজ, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এভাবেই দাম্পত্য জীবন দুনিয়াবি ও আখিরাতি নেয়ামত হিসেবে পরিগণিত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ বা দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য হলো শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ইবাদত এবং সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বন্ধন। এটি মানব জীবনের পূর্ণতা দান করে, পরিবার গঠন করে এবং সমাজের ভিত্তি স্থাপন করে। নিচে দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্দেশ্য তুলে ধরা হলো:

১. দাম্পত্য জীবন যাপন করা আল্লাহর বিধান

আল্লাত তায়ালা বলেন-

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

তোমাদের মধ্যে যারা ‘‘আইয়িম’’ (বিপত্নীক পুরুষ বা বিধবা মহিলা) তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও। তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন; আল্লাহতো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। সুরা নুর : ৩২

আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। সওম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫, ৫০৬৫, ৫০৬৬,  সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

আলক্বামাহ ইবনু কায়েস (রহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’উদ (রাঃ)-এর সাথে মিনায় উপস্থিত ছিলাম। ’উসমান (রাঃ) এসে তাঁর সাথে একান্তে কথা বলেন। আমিও তার নিকটেই বসলাম। ’উসমান (রাঃ) তাঁকে বলেন, আমি কি তোমার সাথে এক কুমারী মেয়ের বিবাহ দিবো, যে তোমার অতীত যৌবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিবে? ’আবদুল্লাহ (রাঃ) যখন দেখলেন যে, তার উদ্দেশ্য কেবল বিবাহ করার উৎসাহ প্রদান করা, তখন তিনি আমাকে হাতের ইশারায় ডাকলেন। আমি তার নিকটে গেলাম এবং তিনি তখন বলছিলেন, তুমি যদি এ কথায় রাযী হয়ে যেতে। কেননা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যার বিবাহ করার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা দৃষ্টিশক্তিকে সংযতকারী এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী। আর যার এ সামর্থ্য নেই, সে যেন রোযা রাখে। কেননা এটি তার জন্য জৈবিক উত্তেজনা প্রশমনকারী। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৪৫, সুনানে তিরমিযী ১০৮১, নাসায়ী : ২২৩৯-৪৩, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৪৬, আহমাদ : ৩৫৮১, ৪১০১, দারেমী : ২১৬৫, ২১৬৬,

২. দাম্পত্য জীবন যাপন করা রাসূল (সা.)-এর সুন্নাত

নবী-রাসূলগণ তাদের জীবনে বিবাহ করেছেন এবং এর মাধ্যমে সুস্থ পরিবার গঠন করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন যে, বিবাহ একটি নৈতিক ও পবিত্র সম্পর্ক, যা মানুষকে অশ্লীলতা ও অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে রক্ষা করে। এটি মানবজাতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং একটি প্রজন্মকে দ্বীনের পথে পরিচালনা করতে সহায়তা করে। এই সুন্নাতের অনুসরণ একজন মুসলিমকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সাহায্য করে, কারণ এর মাধ্যমে তার ঈমান পূর্ণতা পায় এবং সে পরকালীন জীবনেও সফলতা লাভ করতে পারে। অপর পক্ষে যারা বিবাহ করে না, তিনি তাদের কে উম্মতে বলে স্বীকার করেন না।

’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي وَتَزَوَّجُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ الْأُمَمَ وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلٍ فَلْيَنْكِحْ وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وِجَاءٌ

বিবাহ করা আমার সুন্নাত। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত মোতাবেক কাজ করলো না সে আমার নয়। তোমরা বিবাহ করো, কেননা আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মাতের সামনে গর্ব করবো। অতএব যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে এবং যার সামর্থ্য নেই সে যেন রোযা রাখে। কারণ রোযা তার জন্য জৈবিক উত্তেজনা প্রশমনকারী। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৪৬, সহিহাহ : ২৩৮৩

সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’উসমান ইবনু মাজ’উনকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যদি অনুমতি দিতেন, তাহলে আমরাও খাসি হয়ে যেতাম। সহিহ বুখারি : ৫০৭৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০২, সুনানে নাসায়ী : ৩২১২, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৪৩, আহমাদ :ঢ় ১৫১৪, দারিমী : ২২১৩।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ’ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসল। যখন তাঁদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হলো, তখন তারা ’ইবাদাতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল, নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না। কারণ, তাঁর আগের ও পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা ক’রে দেয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর সালাত আদায় করতে থাকব। অপর একজন বলল, আমি সব সময় সওম পালন করব এবং কক্ষনো বাদ দিব না।

অপরজন বলল, আমি নারী সংসর্গ ত্যাগ করব, কখনও বিয়ে করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, ’’তোমরা কি ঐ সব লোক যারা এমন এমন কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশিঅনুগত; অথচ আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। সহিহ বুখারি : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম : ১৪০১,  আহমাদ : ১৩৫৩৪

৩. দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, মানসিক ও শারীরিক প্রশান্তি দেয়

বিবাহ মানুষের মন ও আত্মাকে প্রশান্তি দেয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুনা রূম : ২১

আয়াতটি বিবাহের তাৎপর্য, উদ্দেশ্য এবং এর গভীর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করে। এটি কেবল একটি বৈবাহিক বন্ধন নয়, বরং আল্লাহর অসামান্য কুদরত ও মহিমার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিচে এই আয়াতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।

ক. সৃষ্টিতত্ত্বের নিদর্শন

আয়াতের প্রথম অংশ, “তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন,” এটি এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, নারী কোনো ভিন্ন সত্তা নয়, বরং পুরুষেরই অংশ। হাওয়া (আ.)-কে আদম (আ.)-এর পাঁজর থেকে সৃষ্টি করার ঘটনা এই ধারণাকে সমর্থন করে। এই সৃষ্টি রহস্য ইঙ্গিত করে যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক এবং তাদের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তি স্থাপন করে।

খ. প্রশান্তি লাভের মাধ্যম

আয়াতের দ্বিতীয় অংশ, “যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও,” বিবাহের মূল উদ্দেশ্যকে তুলে ধরে। আরবিতে ‘তাসকুনু’ (প্রশান্তি) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা শুধু শারীরিক বিশ্রাম নয়, বরং মানসিক, আত্মিক ও আবেগিক প্রশান্তিকে বোঝায়। বৈবাহিক সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে, যেখানে তারা জীবনের সকল ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে একে অপরের সান্নিধ্যে শান্তি অনুভব করে। এই প্রশান্তি তখনই অর্জিত হয় যখন উভয়ই পারস্পরিক বোঝাপড়া, বিশ্বাস এবং সম্মানের সাথে জীবন যাপন করে।

গ. ভালোবাসা ও করুণার সৃষ্টি

আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, “আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” এখানে আল্লাহ তা’আলা দুটি স্বতন্ত্র শব্দ ব্যবহার করেছেন: ‘মাওয়াদ্দাহ’ (مَوَدَّةٌ) এবং ‘রাহমাহ’ (رَحْمَةٌ)।

মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা)- এটি সাধারণত যৌবনের আবেগপ্রবণ ও গভীর ভালোবাসাকে বোঝায়, যা দাম্পত্য জীবনের শুরুতে দেখা যায়। এটি এমন একটি আকর্ষণ যা স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট করে এবং সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রাখে।

আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দম্পতির পরস্পরের প্রতি যে আন্তরিক প্রেম-ভালোবাসা, তা অন্য (কোথাও) দু’জনের মাঝে তুমি দেখতে পাবে না। মিশকাত : ৩০৯৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৪৭, সহীহাহ্ : ৬২৪, সহীহ আল জামি : ৫২০০

রাহমাহ (করুণা)- এটি হলো এমন দয়া, সহানুভূতি ও করুণা, যা সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয়। এই করুণা সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করে, বিশেষ করে যখন জীবনে কঠিন সময় আসে, যেমন রোগ-শোক, বার্ধক্য বা আর্থিক সংকট। ‘রাহমাহ’ হলো এমন এক বন্ধন, যা ভালোবাসার আবেগ কমে গেলেও সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। এই দুটি গুণের সমন্বয় একটি সম্পর্ককে পরিপূর্ণতা দান করে।

ঘ. চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন

আয়াতের শেষ অংশ, “নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে,” এটি ইঙ্গিত করে যে, এই বৈবাহিক বন্ধন, যার মধ্যে ভালোবাসা ও করুণার মতো গুণ রয়েছে, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং আল্লাহর অসামান্য কুদরত ও ক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যারা গভীর চিন্তাভাবনা করে, কেবল তারাই এই নিদর্শনগুলো উপলব্ধি করতে পারে। যারা বিবাহকে কেবল একটি জৈবিক বা সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখে, তারা এর গভীর আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। এই আয়াতটি মানুষকে বিবাহের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে।

এ আয়াতটি বিবাহের মাধ্যমে সৃষ্ট মানব সম্পর্কের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে, যা কেবল দুটি ব্যক্তির মিলন নয়, বরং আল্লাহ তা’আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও নিদর্শন।

৪. দাম্পত্য জীবন শারীরিক চাহিদা পূরণ ও সুরক্ষা দেয়

বিবাহের মাধ্যমে মানবজাতির জৈবিক চাহিদা বৈধ ও পবিত্র পন্থায় পূরণ হয়। এর মাধ্যমে অশ্লীলতা ও অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

আলকামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে চলতে ছিলাম, তখন তিনি বললেন, আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে ছিলাম, তিনি বললেন-

যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। সহিহ বুখারি : ১৯০৫

এই হাদিসটিতে বিয়ের দুটি প্রধান উপকারের কথা বলা হয়েছে, যা মানব জীবনের নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক. চোখকে অবনত রাখা (দৃষ্টির পবিত্রতা)

হাদিসে উল্লিখিত প্রথম উপকারটি হলো চোখকে অবনত রাখা। যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে তার জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য একটি হালাল পথ পায়। এর ফলে তার মন এবং চোখ অন্য নারীদের দিকে আকৃষ্ট হয় না। আজকের সমাজে যেখানে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা ব্যাপক, সেখানে চোখকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। বিবাহ একজন মুসলিমকে এই ধরনের প্রলোভন থেকে রক্ষা করে এবং তার দৃষ্টিকে পবিত্র রাখে। এটি তার ঈমানকে মজবুত করে এবং তাকে পরকালের শাস্তির ভয় থেকে বাঁচায়।

খ. লজ্জাস্থানকে সংযত করা (যৌন পবিত্রতা)

হাদিসের দ্বিতীয় উপকারটি হলো লজ্জাস্থানকে সংযত করা। এটি ব্যভিচার, অশ্লীলতা এবং অন্যান্য অবৈধ সম্পর্ক থেকে আত্মরক্ষার একটি উপায়। বিবাহ মানুষের সহজাত শারীরিক চাহিদাকে একটি বৈধ এবং পবিত্র সম্পর্কের মাধ্যমে পূর্ণতা দেয়। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার আত্মাকে গুনাহের কাজ থেকে দূরে রাখতে পারে। এটি কেবল ব্যক্তিগত পবিত্রতাই নিশ্চিত করে না, বরং পরিবার ও সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করে।

এই হাদিসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে, বিবাহ শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি একটি দ্বীনি প্রয়োজন। এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি পথ। যে ব্যক্তি বিবাহের মাধ্যমে এই দুটি উপকার লাভ করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আদেশ মেনে চলে এবং তার দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পূর্ণ করে।

,

৫. দাম্পত্য জীবন ঈমানের পূর্ণতা দেয়

আনাস ইবন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي

মানুষ যখন বিয়ে করে তখন সে তার ঈমানের অর্ধেক পূর্ণ করে, অবশিষ্টাংশ লাভের জন্য সে যেন আল্লাহভীতি অর্জন করে। মিশকাত : ৩০৯৬,  শু‘আবুল ঈমান : ৫১০০, সহীহাহ্ : ৬২৫, সহীহ আল জামি‘ : ৬১৪৮, তাবরানি, আল-মু‘জামুল আওসাত : ৯৯২

এই হাদিসের মূল বিষয়বস্তু হলো বিবাহকে দ্বীনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা এবং এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তির জীবনকে পরিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল করা। এই হাদিসটির মূল বক্তব্যকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে:

ক. দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করা

রাসূল (সাঃ)-এর এই উক্তিটি দ্বারা বোঝা যায় যে, বিবাহ শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং এটি ইবাদতের একটি অংশ। মানবজীবনের একটি বড় অংশ জৈবিক ও মানসিক চাহিদা দ্বারা প্রভাবিত হয়। বিবাহ এই চাহিদাগুলোকে বৈধ ও পবিত্র পথে পূরণ করার সুযোগ দেয়। যখন একজন ব্যক্তি বিবাহ করে, তখন সে ব্যভিচার, অশ্লীলতা এবং অন্যান্য অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করে। এর মাধ্যমে তার চরিত্র ও নৈতিকতা মজবুত হয়। যেহেতু মানবজীবনে এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই এর সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে দ্বীনের অর্ধেক অংশ পূর্ণতা লাভ করে।

খ. অবশিষ্ট অর্ধেক বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করা

বিবাহের পর একজন ব্যক্তি তার দ্বীনের অর্ধাংশ পূর্ণ করলেও, বাকি অর্ধেকের জন্য তাকে সতর্ক থাকতে হবে। এই বাকি অর্ধেক হলো আল্লাহর প্রতি ভয় এবং তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। এর মধ্যে রয়েছে:

সালাত, সিয়াম, যাকাত, ও হজ- এই মৌলিক ইবাদতগুলো সঠিকভাবে পালন করা।

আর্থিক লেনদেন- হালাল উপার্জন করা এবং হারাম থেকে বিরত থাকা।

পারিবারিক দায়িত্ব- স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালনা করা।

সামাজিক সম্পর্ক- আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং অন্যান্য মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করা।

এই হাদিসটি মূলত একজন ব্যক্তিকে বিবাহের মাধ্যমে পরিপূর্ণ জীবনধারণের জন্য উৎসাহিত করে। এটি বিবাহকে একটি পবিত্র বন্ধন হিসেবে তুলে ধরে, যা কেবল আত্মিক প্রশান্তিই দেয় না, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথেও সহায়তা করে। এর মাধ্যমে একজন মুসলিম তার জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়।

৬. দাম্পত্য জীবন দ্বীনি দায়িত্ব পালন ও সৎকাজে সহযোগিতা করে

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সহায়ক এবং সহযোগী হিসেবে কাজ করে। তারা একে অপরকে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیۡعُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُہُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ

আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা তাওবা : : ৭১

এই আয়াতটি দাপ মুমিন নারী ও পুরুষের দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যের এক পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে। এটি শুধু দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মুমিনদের একে অপরের প্রতি দায়িত্বকেও বোঝায়। তবে দাম্পত্য জীবনের প্রসঙ্গে এর ব্যাখ্যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ক. পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা

আয়াতের প্রথম অংশ “আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু” দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের শুধু জীবনসঙ্গীই নয়, বরং সর্বোত্তম বন্ধু। এই বন্ধুত্ব এমন একটি বন্ধন যেখানে তারা একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত, যত্নশীল এবং সহায়ক। একজন মুমিন স্বামী ও একজন মুমিন স্ত্রী একে অপরের ভালো চায় এবং তাদের সম্পর্ক হয় সততা ও ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে। এই সম্পর্ক তাদের একাত্ম করে, যা জীবনের কঠিন মুহূর্তে তাদের একে অপরের পাশে থাকতে সাহায্য করে।

খ. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ

আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, “তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে।” দাম্পত্য জীবনে এই নীতিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে আল্লাহর পথে চলতে উৎসাহিত করবে। একজন অপরকে ফজরের সালাতের জন্য জাগিয়ে দিতে পারে, কোরআন তেলাওয়াত করতে উৎসাহিত করতে পারে, বা দান-সাদকা করার পরামর্শ দিতে পারে। একইভাবে, তারা একে অপরের ভুল বা অন্যায় কাজ দেখলে বিনয়ের সাথে তা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করবে। উদাহরণস্বরূপ, স্বামী যদি কোনো হারাম আয়ে লিপ্ত হয়, তবে স্ত্রী তাকে সে বিষয়ে সতর্ক করতে পারে। আর স্ত্রী যদি কোনো অনৈসলামিক কাজ করে, তবে স্বামী তাকে তা থেকে বিরত রাখতে পারে। এই পারস্পরিক জবাবদিহিতা তাদের উভয়কে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে সাহায্য করে।

গ. ইবাদতে অবিচল থাকা

আয়াতের পরবর্তী অংশ “আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে” এই নীতির বাস্তবায়ন তুলে ধরে। এটি বোঝায় যে, দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী শুধু একে অপরকে সৎকাজের উপদেশই দেবে না, বরং নিজেরাও নিয়মিত ইবাদত করবে। সালাত, যাকাত এবং আল্লাহর আনুগত্যের মতো বিষয়গুলো পারিবারিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই এই ইবাদতগুলো মেনে চলে, তখন তাদের পরিবারে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় এবং তাদের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।

সুতরাং, এই আয়াতের আলোকে বলা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীকে তাদের দাম্পত্য জীবনকে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রায় পরিণত করতে হবে। এই যাত্রায় তারা একে অপরের বন্ধু, সহযোগী এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে, যা তাদের উভয়কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের পথে পরিচালিত করবে।

৭. দাম্পত্য জীবন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ করে

বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার বিকাশ ঘটে। স্বামী পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয় এবং স্ত্রী ঘরের ও সন্তানদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে। এই পারস্পরিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই একটি পরিবার সফল হয়।

৮৯৩. ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল। লায়স ইবনু সা‘দ (রাযি.) আরো অতিরিক্ত বলেন, (পরবর্তী রাবী) আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, তোমরা সকলেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের (দায়িত্ব) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হবে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, তাঁকে তাঁর অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবার বর্গের অভিভাবক, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী তার স্বামী-গৃহের কর্ত্রী, তাকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। খাদিম তার মনিবের ধন-সম্পদের রক্ষক, তাকেও তার মনিবের ধন-সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ইবনু ‘উমার (রাযি.) বলেন, আমার মনে হয়, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ পুত্র তার পিতার ধন-সম্পদের রক্ষক এবং এগুলো সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তাদের অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। সহিহ বুখারি : ৮৯৩, ২৪০৯, ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮

৮. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা

বিবাহ এবং দাম্পত্য জীবনের সকল কাজ, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বললেন, আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্ল-হু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্।

এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে।” সহীহ মুসলিম : ১০০৬

সা‘আদ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও।’ সহহি বুখরি : ৫৬, সহিহ মুসলিম : ১৬২৮, আহমাদ : ১৫৪৬

৯. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে পারস্পরিক অধিকার ও সমতা

ইসলামে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই নির্দিষ্ট অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে। বিবাহ এই অধিকার ও কর্তব্যগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-

الَّذِیۡ عَلَیۡہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۪  وَلِلرِّجَالِ عَلَیۡہِنَّ دَرَجَۃٌ ؕ  وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ 

আর নারীদের উপর তাদের স্বামীদের যেরূপ স্বত্ব আছে, স্ত্রীদেরও তাদের পুরুষদের (স্বামীর) উপর তদনুরূপ ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে; এবং তাদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে; আল্লাহ হচ্ছেন মহা পরাক্রান্ত, বিজ্ঞানময়। সূরা বাকারা : ২২৮

আয়াতের প্রথম অংশ “আর নারীদের উপর তাদের স্বামীদের যেরূপ স্বত্ব আছে, স্ত্রীদেরও তাদের পুরুষদের (স্বামীর) উপর তদনুরূপ ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে” দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, দাম্পত্য জীবনে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের প্রতি সমান অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে। ইসলাম স্বামী ও স্ত্রীকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখে, যেখানে তাদের নিজ নিজ ভূমিকা রয়েছে। যেমন, স্ত্রীর ওপর স্বামীর সেবা ও আনুগত্যের অধিকার রয়েছে, তেমনি স্বামীর ওপর স্ত্রীর ভরণ-পোষণ, উত্তম আচরণ ও সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। এই অধিকারগুলো ন্যায়সঙ্গত এবং ভারসাম্যপূর্ণ, যা একটি সুস্থ পারিবারিক জীবনের ভিত্তি।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশ “এবং তাদের উপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে” দ্বারা পুরুষের এক বিশেষ মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। আরবিতে এই মর্যাদা বোঝাতে ‘দারাজাহ’ (دَرَجَةٌ) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ‘এক ধাপ শ্রেষ্ঠত্ব’। এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো শোষণ বা নির্যাতনের অধিকার নয়, বরং এটি দায়িত্ব ও নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব। কোরআনের অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদেরকে সদুপদেশ দাও, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর এবং তাদেরকে (মৃদু) প্রহার কর। এরপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুন্নত মহান। সূরা নিসা : ৩৪

এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করা হয়েছে, যেখানে পুরুষকে ‘কাওয়াম’ বা পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বশীল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে:

ক. আর্থিক ভরণ-পোষণ : পরিবারের সকল সদস্যের আর্থিক চাহিদা পূরণ করা।

খ. নিরাপত্তা ও সুরক্ষা : পরিবারের সদস্যদের বাহ্যিক বিপদ থেকে রক্ষা করা।

গ. নেতৃত্ব : পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়া।

এই শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষের জন্য একটি বাড়তি বোঝা, যা তাকে পরিবারের কল্যাণের জন্য আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে। এটি কোনোভাবেই নারীকে ছোট করা বা তার অধিকার খর্ব করাকে বোঝায় না।

১০. দাম্পত্য জীবনের মাধ্যমে বংশের ধারা অব্যাহত থাকে

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেনঃ না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেনঃ এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো।সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০

এ হাদিসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে প্রেমময়ী ও অধিক সন্তান প্রসবকারী নারীকে বিয়ে করার পরামর্শ দিয়েছেন, দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। এই হাদিসটি অনুযায়ী, বিবাহ শুধু দুটি ব্যক্তির সম্পর্ক নয়, বরং এটি মানব বংশের ধারা অব্যাহত রাখার একটি পবিত্র মাধ্যম।

ক. বংশবৃদ্ধির গুরুত্ব

হাদিসের মূল বার্তা হলো, বংশবৃদ্ধি মানবজাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (সা.) বন্ধ্যা নারীকে বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী নারীকে বিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এর কারণ হলো, তিনি কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের কাছে মুসলিম উম্মাহর সংখ্যাধিক্যের জন্য গর্ব করবেন। এটি স্পষ্ট করে যে, সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং বংশের ধারা অব্যাহত রাখা ইসলামের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য।

খ. পারিবারিক ও সামাজিক কল্যাণ

বংশধারা অব্যাহত থাকার মাধ্যমে একটি পরিবার শুধু বৃদ্ধিই পায় না, বরং তা সমাজকেও স্থিতিশীল করে। সন্তানরা বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া করে, তাদের নেক আমল অব্যাহত থাকে। এটি একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখে। যে সমাজে অধিক সন্তান থাকে, সেই সমাজ আর্থিকভাবেও শক্তিশালী হয় এবং মানবসম্পদ বৃদ্ধি পায়।

গ. প্রেম ও করুণার সম্পর্ক

রাসূল (সা.) শুধু অধিক সন্তান প্রসবকারী নারীকেই বিয়ে করতে বলেননি, বরং ‘প্রেমময়ী’ নারীকেও বেছে নিতে বলেছেন। এর কারণ হলো, একটি সফল দাম্পত্য জীবনের জন্য ভালোবাসা ও আবেগ অপরিহার্য। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও সহানুভূতি থাকে, তখন তাদের পরিবার সুখী হয় এবং সন্তানরা একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠে। এই পরিবেশ বংশধারাকে শুধু শারীরিক দিক থেকে নয়, বরং নৈতিক ও আত্মিকভাবেও সমৃদ্ধ করে।

সুতরাং, এই হাদিসটি বিবাহকে কেবল একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং এটি একটি ব্যাপক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে বংশের ধারা অব্যাহত থাকে এবং মুসলিম উম্মাহ শক্তিশালী হয়।

১১. দাম্পত্য জীবনকে দুনিয়াবি ও আখিরাতি নেয়ামত

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا ہَبۡ لَنَا مِنۡ اَزۡوَاجِنَا وَذُرِّیّٰتِنَا قُرَّۃَ اَعۡیُنٍ وَّاجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِیۡنَ اِمَامًا

আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন’। সুরা ফুরকান : ৭৪

এই আয়াতটি দাম্পত্য জীবনের এক গভীর উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরে। এটি শুধু একটি সাধারণ দোয়া নয়, বরং এটি একটি আদর্শ পরিবার এবং নেককার জীবনের আকাঙ্ক্ষা, যা দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ নিয়ে আসে।

ক. চক্ষু শীতলকারী জীবনসঙ্গী ও সন্তান

আয়াতের প্রথম অংশ “হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে” দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, একজন মুমিন আল্লাহর কাছে এমন জীবনসঙ্গী এবং সন্তান কামনা করে, যাদের দেখলে তার মন প্রশান্ত হয় এবং অন্তর শীতল হয়। এই প্রশান্তি তখনই আসে যখন স্ত্রী ও সন্তানরা দ্বীনের পথে চলে, আল্লাহর আনুগত্য করে এবং সৎ ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়।

খ. দুনিয়াবি নেয়ামত :

যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীকে দেখে, যে আল্লাহর বিধান মেনে চলে, তার সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং তার আনুগত্য করে, তখন সে এক ধরনের মানসিক শান্তি অনুভব করে। একইভাবে, যখন কোনো পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের দেখে, যারা তাদের কথা শোনে, তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সমাজের জন্য ভালো কিছু করছে, তখন তাদের অন্তর এক বিশেষ আনন্দে ভরে যায়। এই আনন্দই হলো দুনিয়ার অন্যতম সেরা নেয়ামত।

গ. আখিরাতি নেয়ামত :

এই চক্ষু শীতলকারী জীবনসঙ্গী ও সন্তানরা আখিরাতেও তাদের পিতামাতার জন্য কল্যাণের কারণ হয়। যখন তারা নেক আমল করে এবং আল্লাহর কাছে তাদের পিতামাতার জন্য ক্ষমা চায়, তখন তাদের পিতামাতার আমলনামাতেও সওয়াব যুক্ত হয়। একটি সৎ ও নেককার পরিবার আখিরাতে একত্রে জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ পায়, যা আল্লাহ তা’আলা সূরা রা’দ-এর ২৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন।

ঘ. মুত্তাকীদের নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা

আয়াতের দ্বিতীয় অংশ “আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন” এই দোয়ার গভীরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। এর মাধ্যমে একজন মুমিন কেবল নিজের ও তার পরিবারের জন্য কল্যাণ চায় না, বরং সে অন্যদের জন্য একটি আদর্শ হতে চায়। এর অর্থ এই নয় যে সে ক্ষমতার জন্য নেতা হতে চায়, বরং সে আল্লাহর ভয়ে ভীত এবং সৎকর্মশীলদের মধ্যে একজন আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হতে চায়, যাতে অন্যরা তাকে অনুসরণ করে।

সুতরাং, এই আয়াতের আলোকে দাম্পত্য জীবনকে এক দ্বিমুখী নেয়ামত হিসেবে দেখা যায়। যা কেবল দুনিয়াতে মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি দেয় না, বরং আখিরাতেও মুক্তি ও জান্নাতের পথ খুলে দেয়।

১২.  দাম্পত্য জীবনে পরস্পর সৎকর্মে সহযোগিতা করা যায়

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ۘ وَتَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَالتَّقۡوٰی ۪ وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ

সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর। সূরা মায়েদাহ : ২

এই আয়াতটি সাধারণভাবে সকল মুমিনদের জন্য একটি মৌলিক নীতি হিসেবে বর্ণিত হলেও, দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী তাদের সম্পর্কের মধ্যে এই নীতিএ এ আয়াতের আলোকে বাস্তবায়ন হতে পারে।

ক. দাম্পত্য জীবনে সৎকর্মে সহযোগিতা

দাম্পত্য জীবন হলো এমন একটি বন্ধন যেখানে দুটি মানুষ শুধুমাত্র নিজেদের জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য একত্রিত হয় না, বরং তারা একে অপরের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যও কাজ করে। এই আয়াতটি তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

খ. ইবাদতে সহযোগিতা :

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ও সহায়ক হতে পারে। তারা একে অপরকে সালাতের জন্য উৎসাহিত করতে পারে, ফজরের সময় একে অপরকে ডেকে তুলতে পারে এবং একসাথে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারে। স্ত্রী স্বামীকে রোজা রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং স্বামী স্ত্রীকে দান-সাদকা করতে উৎসাহিত করতে পারে। এই পারস্পরিক সহযোগিতা তাদের ইবাদতকে আরও সহজ ও সুন্দর করে তোলে।

গ. নেক কাজে উৎসাহ :

দাম্পত্য জীবনে শুধু ইবাদত নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে সৎকাজে সহযোগিতা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি স্বামী কোনো ভালো কাজে যুক্ত হতে চায়, যেমন কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করা বা কোনো গরীবকে সাহায্য করা, তবে স্ত্রী তাকে সমর্থন করতে পারে। একইভাবে, স্ত্রী যদি কোনো দ্বীনি ইলম অর্জন করতে চায়, তবে স্বামী তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে পারে। এই ধরনের পারস্পরিক সমর্থন একটি পরিবারকে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করে।

ঘ. মন্দকর্মে সহযোগিতা না করা

আয়াতের দ্বিতীয় অংশ “মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না” দাম্পত্য জীবনের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি বোঝায় যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের কোনো ভুল বা অনৈতিক কাজে সমর্থন করবে না। যদি স্বামী কোনো হারাম আয়ের সাথে জড়িত হয়, তবে স্ত্রীর উচিত তাকে সতর্ক করা। একইভাবে, যদি স্ত্রী কোনো অনৈসলামিক কাজ করে, তবে স্বামীর উচিত তাকে তা থেকে বিরত রাখা। এই পারস্পরিক জবাবদিহিতা তাদের উভয়কে গুনাহ থেকে রক্ষা করে।

সুতরাং, এই আয়াতের আলোকে দাম্পত্য জীবন এমন একটি বন্ধন হওয়া উচিত, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সৎকর্মে উৎসাহ দেবে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করবে। এটি তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করবে এবং তাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।

১৩. দাম্পতির দুআ কবুল করা হয়

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

ثَلاَثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللَّهِ عَوْنُهُمُ الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُكَاتَبُ الَّذِي يُرِيدُ الأَدَاءَ وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافَ ‏

আল্লাহ্ তা’আলা তিন প্রকারের মানুষকে সাহায্য করা নিজের কর্তব্য হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলার পথে জিহাদকারী, মুকাতাব গোলাম- যে চুক্তির অর্থ পরিশোধের ইচ্ছা করে এবং বিবাহে আগ্রহী লোক- যে বিয়ের মাধ্যমে পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়। সুনানে তিরমিজি : ১৬৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৫১৮

১৩. চারিত্র রক্ষার জন্য বিবাহিতদের আল্লাহ সাহায্য করেন

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তিকে আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই সাহায্য করেন। (প্রথমত) ক্রীতদাস- যে তার মুক্তিপণ পরিশোধ করে স্বাধীন হতে চায়। (দ্বিতীয়ত) বিবাহ উদ্যমী ব্যক্তি- যে স্বীয় চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে হয়। (তৃতীয়ত) মুজাহিদণ্ড যে আল্লাহর পথে জিহাদ করে। মিশকাত : ৩০৮৯, সুনানে তিরমিযী ১৬৫৫, সুনানে ইবনু মাজাহ ২৫১৮, সুনানে নাসায়ী ৩২১৮।


 [MIH1]

পাত্র ও পাত্রী নির্বাচন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামি শরীয়তে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল বিষয়, যা কেবল দুটি মানুষের চুক্তি নয়, বরং একটি পবিত্র বন্ধন এবং নতুন পরিবারের ভিত্তি। এই নির্বাচনের উপর ভিত্তি করেই একটি পরিবারের সুখ, শান্তি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তি নির্ভর করে। ইসলাম এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে, যা মেনে চললে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পারিবারিক সমৃদ্ধি লাভ করা সম্ভব।

ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে ধর্মীয় গুণাবলী (দ্বীনদারী)-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা হলো প্রধান শর্ত, যা ছাড়া দাম্পত্য জীবনের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। তবে দ্বীনদারীর পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা উচিত।  যেমন- সচ্চরিত্র বা আখলাক, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, আর্থিক সক্ষমতা ইত্যাদি। তবে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের আগে একবার দেখে নেয়া সুন্নাহ।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন-

اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا فَفَعَلَ فَتَزَوَّجَهَا فَذَكَرَ مِنْ مُوَافَقَتِهَا

তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে তাকে বলল যে, সে আনসার সম্প্রদায়ের এক মেয়েকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে একবার দেখেছে? সে বলল, না। তিনি বললেন, যাও! তুমি তাকে এক নযর দেখে নাও। কারণ আনসারদের চোখে কিছুটা ক্রটি আছে। সহিহ মুসলিম : ১৫২৪, মিশকাত : ৩০৯৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৬, আহমাদ : ৭৮৪২, সহীহাহ্ : ৯৫

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, আর যদি তার পক্ষে এমন কোনো অঙ্গ দেখা সম্ভব হয় যা বিবাহের পক্ষে যথেষ্ট, তখন তা যেন দেখে নেয়। সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৮২, মিশকাত :৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি :  ৫০৬।

 নিচে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে পাত্রী নির্বাচনে কিছু দিক উল্লেখ করা হলো:

১. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে দ্বীনদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া

এটি পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান শর্ত। একজন ধার্মিক জীবনসঙ্গী তার ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং পরিবারকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে সাহায্য করবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সহিহ মুসলিম : ১৪৬৬, সুনানে নাসায়ী ৩২৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৫৮, মিশকাত : ৩০৭৪,  আহমাদ : ৯৫২১, ৯৫২৬,  ইরওয়া : ১৭৮৩, সহীহ আল জামি : ৩০০৩

হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের নিকট কেউ বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়, তখন দীনদারী ও সচ্চরিত্রের মূল্যায়ন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কর। যদি তোমার তা না কর, তাহলে দুনিয়াতে বড় রকমের ফিতনা-বিশৃঙ্খলা জন্ম দেবে। মিশকাত : ৩০৯০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৬৭, ইরওয়া ১৮৬৮

বিয়ে শুধু পার্থিব জীবনের হিসাব-নিকাশ নয়, বরং এটি একটি পবিত্র বন্ধন যা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। সম্পদ, বংশ বা সৌন্দর্য আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু একটি সুখী, সমৃদ্ধ এবং নেককার পরিবারের ভিত্তি হলো দ্বীনদারী বা ধার্মিকতা। তাই, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সময় এই গুণটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

২. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সচ্চরিত্র ও নৈতিকতা দেখতে হবে

দ্বীনদারীর পাশাপাশি উত্তম চরিত্র থাকা অপরিহার্য। একজন উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি তার জীবনসঙ্গীর সাথে দয়া ও সম্মানের সাথে আচরণ করবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ

সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যে ব্যক্তির দীনদারী ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সাথে বিয়ে দাও। তা যদি না কর তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি : ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

৩. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করতে হবে

’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ করো এবং সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৮, সহীহাহ : ১০৬৭

৪. পাত্রী নির্বাচনে অধিক সন্তান প্রসবকারী বিবেচনায় নিতে হবে

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা বিবাহ করো আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গৌরব করবো। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৩,

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেন, না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেন, এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০

৫. পাত্র নির্বাচনে ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা থাকা দরকার

সাভাবিক ভরন পোষণের ব্যবস্থা থাকলে আল্লাহ উপর ভরষা করে বিবাহ করলে তিনি প্রাচুর্যে ভবে দিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَنۡکِحُوا الۡاَیَامٰی مِنۡکُمۡ وَالصّٰلِحِیۡنَ مِنۡ عِبَادِکُمۡ وَاِمَآئِکُمۡ ؕ اِنۡ یَّکُوۡنُوۡا فُقَرَآءَ یُغۡنِہِمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ وَاللّٰہُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। সুরা নুর : ৩২

আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০, সুনানে নাসায়ী ৩২১০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮১, আহমাদ : ৪০২৩, ইরওয়া : ১৭৮১, সহীহ আল জামি : ৭৯৭৫।

৬. কুমারীত্ব নারীকে বিবাহ করা উত্তম

আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু ’উতবাহ্ ইবনু ’উওয়াইম ইবনু সা’ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ

তোমাদের কুমারী মেয়ে বিবাহ করা উচিত। কেননা তারা মিষ্টিমুখী, নির্মল জরায়ুধারী এবং অল্পতেই তুষ্ট হয়। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬১, মিশকাত : ৩০৯২, সহীহাহ : ৬২৩, সহীহ আল জামি : ৪০৫৩।

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক যুদ্ধে শরীক ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে ফেরার সময়) যখন আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলাম, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন সদ্যবিবাহিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বিবাহ করেছ! উত্তরে বললাম, জী হ্যাঁ। (পুনরায়) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বিধবা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী বিবাহ করলে না কেন? তাহলে তুমিও তার সাথে আমোদ-প্রমোদ করতে এবং সেও তোমার সাথে মন খুলে আমোদ-প্রমোদ করত। জাবির(রাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা যখন মদীনায় পৌঁছলাম, তখন আমরা নিজ ঘরে প্রবেশে উদ্যত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ থাম! রাত (সন্ধ্যা) পর্যন্ত অপেক্ষা কর (এখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো না), আমরা রাতে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করব। কেননা স্ত্রী তার অবিন্যস্ত চুল আঁচড়ে (পরিপাটি হতে) নিতে পারে এবং স্বামী বিচ্ছিন্না (প্রবাসী স্বামীর) নারী ক্ষুর ব্যবহার করে অবসর হয় (অর্থাৎ- নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করে নিতে পারে)। সহিহ বুখারী : ৫২৪৭, ২০৯৭, ২৩০৯, ২৯৬৭, ৪০৫২, ৫০৭৯, ৫০৮০, ৫২৪৫, ৫২৪৭, ৫৩৬৭, ৬৩৮৭ সহিহ মুসলিম : ৭১৫,  মিশকাত : ৩০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০০, দারিমী : ২২৬২, ইরওয়া : ১৭৮৫, সহীহ আল জামি : ৪২৩৩।

৭. যাদের সাথে বিবাহ হারাম

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট সম্পর্কের মানুষের সাথে বিবাহ করা হারাম বা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এই সম্পর্কের ভিত্তি হল রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কগুলো আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَیۡکُمۡ اُمَّہٰتُکُمۡ وَبَنٰتُکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ وَعَمّٰتُکُمۡ وَخٰلٰتُکُمۡ وَبَنٰتُ الۡاَخِ وَبَنٰتُ الۡاُخۡتِ وَاُمَّہٰتُکُمُ الّٰتِیۡۤ اَرۡضَعۡنَکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ مِّنَ الرَّضَاعَۃِ وَاُمَّہٰتُ نِسَآئِکُمۡ وَرَبَآئِبُکُمُ الّٰتِیۡ فِیۡ حُجُوۡرِکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِکُمُ الّٰتِیۡ دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ ۫  فَاِنۡ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ ۫  وَحَلَآئِلُ اَبۡنَآئِکُمُ الَّذِیۡنَ مِنۡ اَصۡلَابِکُمۡ ۙ  وَاَنۡ تَجۡمَعُوۡا بَیۡنَ الۡاُخۡتَیۡنِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ۙ

তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদেরকে, তোমাদের মেয়েদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুদেরকে, তোমাদের খালাদেরকে, ভাতিজীদেরকে, ভাগ্নীদেরকে, তোমাদের সে সব মাতাকে যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে, তোমাদের শ্বাশুড়ীদেরকে, তোমরা যেসব স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছ সেসব স্ত্রীর অপর স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদেরকে, আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলিত না হয়ে থাক তবে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে এবং দুই বোনকে একত্র করা (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে)। তবে অতীতে যা হয়ে গেছে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা নিসা : ২৩

এই আয়াতে আল্লাহ তিন ধরনের ১৪ প্রকারে সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবাহকে হারাম করেছেন। রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত কারণে হারাম (৭ জন):

১.  মা (জননী)

২.  মেয়ে (নিজ ঔরসের কন্যা)

৩.  বোন (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা সৎ বোন)

৪.  ফুফু (পিতার বোন)

৫.  খালা (মাতার বোন)

৬.  ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজী)

৭.  বোনের মেয়ে (ভাগ্নী)

দুধের সম্পর্কের কারণে হারাম (২ জন):

৮.  দুধ-মা (যিনি দুধ পান করিয়েছেন)

৯.  দুধ-বোন (দুধ-মায়ের কন্যা)

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম (৫ জন):

১০. শাশুড়ি (স্ত্রীর মা)

১১. স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যা (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়)

১২. ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ)

১৩. স্ত্রীর বোন (দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা হারাম)

১৪. বিবাহিত নারী (কোনো নারীর বিবাহ থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করা হারাম)

বিবাহের আহকামসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিয়ে মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে অন্যান্য ইবাদতের (নামাজ, রোজা) মতোই এর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দুঃখজনকভাবে, ইবাদতের ক্ষেত্রে ইসলামের নিয়ম মানলেও বর্তমানে বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায়ই ইসলাম-বিরোধী কাজ দেখা যায়। বিয়ের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো কনে দেখা বা বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। ইসলাম এই প্রক্রিয়ার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। কনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যকে নয়, বরং দ্বীনদারী বা ধার্মিকতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। এই নীতি অনুসরণ করা অপরিহার্য, কারণ ধার্মিকতা একটি সুখী ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি। বিয়ের প্রক্রিয়াকে সহজ করতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই শরিয়তসম্মত নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করা অপরিহার্য। কারণ, বিয়ের শুরুটা যদি সঠিক পথে হয়, তবে পুরো দাম্পত্য জীবনটাই বরকতময় হয়ে ওঠে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনা মেনে চলার তৌফিক দিন।

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ হলো একটি সামাজিক চুক্তি এবং একটি পবিত্র বন্ধন যা একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইসলাম কর্তৃক অনুমোদিত। এটি কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি ইবাদত এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ তৈরি হয়, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় এবং সমাজে নৈতিকতা ও পবিত্রতা রক্ষা পায়। এটি মানবজাতির বংশবৃদ্ধির একটি বৈধ ও সম্মানজনক পদ্ধতি।

উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সকল শর্তের চেয়ে বিয়ের শর্ত পালন করা তোমাদের অধিক কর্তব্য এজন্য যে, এর মাধ্যমেই তোমাদেরকে স্ত্রী অঙ্গ ভোগ করার অধিকার দেয়া হয়েছে। সহিহ বুখারী : ৫১৫১, সহিহ মুসলিম : ১৪১৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৯, সুনানে নাসায়ী : ৩২৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১২৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৫৪, আহমাদ : ১৭৩০২, ইরওয়া : ১৮৯২, সহীহ আল জামি : ১৫৪৭

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের পর বিবাহ বা আকদ (চুক্তি) সম্পন্ন করতে ইসলামী শরীয়তে পাঁচটি মৌলিক পর্যায় বা শর্ত রয়েছে। নিচে সেগুলো ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া

২. কনের পক্ষ থেকে ওয়ালী বা অভিভাবকের সম্মতি

৩. কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী

৪. আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোহর নির্ধারণ করা

৫. বরের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া

বিবাহ প্রতিটি মানুষের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ইসলামী শরীয়তে এই পবিত্র বন্ধন স্থাপনের প্রথম ধাপ হলো ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া।

যখন কোনো পুরুষ কোনো নারীকে বিবাহ করতে আগ্রহী হন, তখন তার জন্য সমীচীন হলো ওই মেয়ের অভিভাবকের (ওয়ালী) মাধ্যমে তাকে বিবাহ করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া। সরাসরি নারীর কাছে না গিয়ে তার অভিভাবকের কাছে প্রস্তাব পাঠানো ইসলামের শিষ্টাচার ও সামাজিক রীতিনীতির অংশ। এই প্রস্তাব এমন একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকে হওয়া উচিত যার কাছ থেকে এমন মহৎ প্রস্তাব গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে— অর্থাৎ যিনি সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে সম্মানীয়।

প্রকৃতপক্ষে, এই ইজাব হলো বিবাহ পর্ব সূচনাকারীদের প্রাথমিক অঙ্গীকার, যা বিবাহের ওয়াদা (Promise) এবং বিবাহের প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ। এই পদক্ষেপ থেকেই বৈধভাবে দুটি পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে আগ্রহীদের জন্য কিছু শরীয়তসম্মত আমল বা কাজ করা জরুরি, যা পুরো প্রক্রিয়াকে বরকতময় ও ফলপ্রসূ করে তোলে:

১. ইস্তেখারা বার পরামর্শ প্রার্থনা করা :

প্রথমে আল্লাহর কাছে ইস্তেখারার সালাতের মাধ্যমে আন্তরিকভাবে কল্যাণ প্রার্থনা করা উচিত। এটি হলো এই সম্পর্কের পরিণতি শুভ হবে কিনা, সে বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য ও নির্দেশনা চাওয়া।

হাসান (রহ.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ইস্তিখারা করে সে কখনো ব্যর্থ হয় না, আর যে পরামর্শ নেয় সে কখনো অনুতপ্ত হয় না।” মুসনাদ আহমদ : ১৭২৪৫; সিলসিলা সহিহাহ : ৬১১

২. বিবাহের পূর্বে খোঁজ-খবর নেওয়া

 প্রস্তাব পাঠানোর আগে মেয়ে এবং তার পরিবার সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে মেয়ের দ্বীনদারী (ধার্মিকতা), সচ্চরিত্র এবং পারিবারিক পরিবেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে তাকে বলল যে, সে আনসার সম্প্রদায়ের এক মেয়েকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, তুমি কি তাকে একবার দেখেছে? সে বলল, না। তিনি বললেন, যাও! তুমি তাকে এক নযর দেখে নাও। কারণ আনসারদের চোখে কিছুটা ক্রটি আছে। সহিহ মুসলিম : ১৫২৪, মিশকাত : ৩০৯৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৪৬, আহমাদ : ৭৮৪২, সহীহাহ্ : ৯৫

৩. ধর্মভীরু ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা

বিশ্বস্ত, জ্ঞানী ও ধর্মভীরু ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা উচিত, যারা নিরপেক্ষভাবে উপদেশ ও পরামর্শ দিতে পারেন।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اسۡتَجَابُوۡا لِرَبِّہِمۡ وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ ۪  وَاَمۡرُہُمۡ شُوۡرٰی بَیۡنَہُمۡ ۪  وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۚ

আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। সুরা শুরা : ৩৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে অধিক পরিমাণে পরামর্শ করতেন।

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ -কে তাঁর সাহাবাদের সাথে পরামর্শের ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে অধিক কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি :  ১৭১৪, বাইহাকী : ১৯২৮০।

এদিকে পরামর্শদাতার কর্তব্য বিশ্বস্ততা রক্ষা করা। তিনি যেমন তার জানা কোনো দোষ লুকাবেন না, তেমনি অসদুদ্দেশে আদতে নেই এমন কোনো দোষের কথা বানিয়েও বলবেন না। আর অবশ্যই এ পরামর্শের কথা কাউকে বলবেন না।

৪. একজনের প্রস্তাবের ওপর অন্যজনের প্রস্তাব না দেয়া :

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রামবাসীর পক্ষে শহরবাসী কর্তৃক বিক্রয় করা হতে নিষেধ করেছেন এবং তোমরা প্রতারণামূলক দালালী করবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। কোন মহিলা যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের দাবী না করে, যাতে সে তার পাত্রে যা কিছু আছে, তা নিজেই নিয়ে নেয়। সহিহ বুখারি : ২১৪০, ৫১৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৫১৫, আহমাদ : ৯৫২৩. সুনানে নাসায়ী : ৩২৪১

হ্যা, দ্বিতীয় প্রস্তাবদাতা যদি প্রথম প্রস্তাবদাতার কথা না জানেন তবে তা বৈধ। এ ক্ষেত্রে ওই নারী যদি প্রথমজনকে কথা না দিয়ে থাকেন তবে দু’জনের মধ্যে যে কাউকে গ্রহণ করতে পারবেন।

৫. ইদ্দতে থাকা নারীকে প্রস্তাব দেয়া :

বায়ান তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত পালনকারী নারীকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া হারাম। ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়া বৈধ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِہٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَکۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ  عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ سَتَذۡکُرُوۡنَہُنَّ وَلٰکِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡہُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ  وَلَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّکَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡکِتٰبُ اَجَلَہٗ ؕ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُ ۚ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ 

আর এতে তোমাদের কোন পাপ নেই যে, তোমরা নারীদেরকে ইশারায় যে প্রস্তাব করবে কিংবা মনে গোপন করে রাখবে। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে স্মরণ করবে। কিন্তু বিধি মোতাবেক কোন কথা বলা ছাড়া গোপনে তাদেরকে (কোন) প্রতিশ্রুতি দিয়ো না। আর আল্লাহর নির্দেশ (ইদ্দত) তার সময় পূর্ণ করার পূর্বে বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা জানেন। সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। সূরা বাকারা : ২৩৫।

তবে ‘রজঈ’ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে সুস্পষ্টভাবে তো দূরের কথা আকার-ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়াও হারাম। তেমনি এ নারীর পক্ষে তালাকদাতা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রস্তাবে সাড়া দেয়াও হারাম। কেননা এখনো সে তার স্ত্রী হিসেবেই রয়েছে।

৬. উপযুক্ত পাত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখান না করা :

উপযুক্ত পাত্র পেলে তার প্রস্তাব নাকচ করা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ.

‘যদি এমন কেউ তোমাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয় যার ধার্মিকতা ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট তবে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। যদি তা না করো তবে পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজতা সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি :  ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

৭. বিবাহ কন্যার সম্মতি নেওয়া জরুরি :

কোনো নারী নিজে নিজে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন না। তার জন্য অবশ্যই একজন ওয়ালি থাকতে হবে। ওয়ালি কেবল বিবাহ সম্পন্নকারী হিসেবে কাজ করেন। ওয়ালি হতে হলে কনের মতামত নেওয়া আবশ্যিক। কনের সম্মতি ছাড়া ওয়ালি তাকে বিবাহ দিতে পারেন না।

আবূ সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বললেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, ৬৯৭০, সহহি  মুসলিম : ১৪১৯, আহমাদ : ৯৬১

খানসা বিনতে খিযাম আল আনসারিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, যখন তিনি অকুমারী ছিলেন তখন তার পিতা তাকে বিয়ে দেন। এ বিয়ে তিনি অপছন্দ করলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৮, ৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯

আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ ও মুজাম্মে ইবনু ইয়াযীদ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। খিযাম নামক এক ব্যক্তি তার মেয়েকে বিবাহ দেন। সে তার পিতার এই বিবাহ অপছন্দ করে। মেয়েটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তাঁকে অবহিত করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পিতার দেয়া তার এই বিবাহ রদ করে দেন। পরে সেই মেয়ে আবূ লুবাবা ইবনু ’আবদুল মুনযির (রাঃ)-কে বিবাহ করে। মিশকাত : ১৮৭৩, সুনানে নাসায়ী ৩২৬৮, সুনানে আবূ দাউদ ২১০১, আহমাদ : ২৬২৪৬, ২৬২৫১, মুয়াত্তা মালেক : ১১৩৫, দারেমী : ২১৯১ ২১৯২, , ইরওয়াহ : ১৩৮০

৮. আল্লাহর সাহায্য কামনা:

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দিয়েছে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষত বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, আল্লাহর কাছে দু’আ করা, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং বরকত কামনা করা জরুরি। সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া:

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ

“আর তোমাদের রব বলেছেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” সুরা গাফির : ৬০

এ আয়াত প্রমাণ করে, জীবনের যেকোনো প্রয়োজনে আল্লাহর কাছে দুআ করতে হবে। বিবাহও এর অন্তর্ভুক্ত।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, যখন কোন লোক বিয়ে করত, তখন তার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু’আ পাঠ করতেন-

بَارَكَ اللَّهُ لَكَ، وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ

উচ্চারণ : “বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া বারাকা আলাইকা ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফিল খাইরি”।

অর্থ : আল্লাহ তা’আলা তোমার জীবন বারকাতময় করুন আর তোমাদেরকে কল্যাণের মধ্যে একত্রিত করুন। সুনে তিরমিজি : ১০৯০ সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৯০৫

বিবাহে সফলতা ও বরকত কামনা করা কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআনে আল্লাহ দুআর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আর নবী ﷺ সরাসরি বিবাহ উপলক্ষে বরকতের দুআ শিক্ষা দিয়েছেন।

কনের পক্ষ থেকে ওয়ালী বা অভিভাবকের সম্মতি

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে কনের জন্য একজন ওয়ালি বা অভিভাবক থাকা ফরজ বা আবশ্যক। ওয়ালি হলেন এমন ব্যক্তি যিনি কনের সম্মতিতে তার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ওয়ালি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।

আবূ মূসা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়েই হতে পারে না। সুনানে আবু দাউদ : ২০৮৫

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১০১, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৫, আহমাদ : ১৯০২৪, ১৯২১১, ১৯২৪৭, দারেমী : ২১৮২, ২১৮৩, ইরওয়াহ : ১৮৩৯, মিশকাত : ১৩৩০,

১. কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকত্বের পরিচয়

ইসলামি ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার অধিকার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে বন্টিত হয়। এই ক্রমটি সাধারণত আত্মীয়তার নৈকট্য ও মিরাসে (উত্তরাধিকার) প্রাপ্তির ক্রমের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। ফকিহগণের মনে কনের ওয়ালির ক্রমধার হলো- পিতা , দাদা, ভাই, চাচা, অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়, ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক।

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১,

উম্মু হাবীবাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি (’উবাইদুল্লাহ) ইবনু জাহশের স্ত্রী ছিলেন। স্বামী মারা গেলে তিনি হিজরতকারীদের সাথে হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর হাবশার বাদশা নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাকে বিয়ে দেন। তিনি (অভিভাবক ছাড়া) তাদের কাছেই অবস্থান করেন। সুনানে আব দাউদ : ২০৮৬

২. ওয়ালী হওয়ার যোগ্যতা :

তাই যে কোন নারীর বিবাহের জন্য ওয়ালী বা অভিভাবক আবশ্যক। অভিভাবক উপযুক্ত হওয়ার জন্য ৬টি শর্ত আছে। যখা-

(১) আকল বা বিবেক সম্পন্ন হওয়া (পাগল হলে হবে না)

(২) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া

(৩) স্বাধীন হওয়া

(৪) পুরুষ হওয়া (বিবাহের ক্ষেত্রে নারী নারীর অভিভাবক হতে পারবে না)

(৫) অভিভাবক ও যার অভিভাবক হচ্ছে উভয়ে একই দ্বীনের অনুসারী হওয়া। (কোন কাফির মুসলিম নারীর অভিভাবক হবে না

(৬) অভিভাবক হওয়ার উপযুক্ত হওয়া। (অর্থাৎ বিবাহের জন্য কুফূ বা তার কন্যার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন বা সমকক্ষ পাত্র নির্বাচন করার জ্ঞান থাকা ও বিবাহের কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয় সমূহ অনুধাবন জ্ঞান থাকা)

(৭) কোন নারী কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবক হতে পারবে না

 আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ الْمَرْأَةَ وَلَا تُزَوِّجُ الْمَرْأَةُ نَفْسَهَا فَإِنَّ الزَّانِيَةَ هِيَ الَّتِي تُزَوِّجُ نَفْسَهَا

কোন মহিলা অপর কোন মহিলাকে বিবাহ দিবে না এবং কোন মহিলা নিজেকেও বিবাহ দিবে না। কেননা যে নারী স্বউদ্যোগে বিবাহ করে সে যেনাকারিণী।সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮২, ইরওয়াহ : ১৮৪১

কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী

ইসলামী শরীয়তে বিবাহের অন্যতম শর্ত হলো কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম সাক্ষী উপস্থিত থাকা। এই শর্ত বিবাহের চুক্তিকে বৈধতা ও প্রকাশ্য স্বীকৃতি দেয়। সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ ইসলামী আইন অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হয়। বিবাহের সময় সাক্ষী থাকার কারণ হলো, এর মাধ্যমে বিবাহটি গোপনীয়তা থেকে বেরিয়ে এসে সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি লাভ করে। সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে কোনো ধরনের সন্দেহ বা বিরোধ দেখা দিলে তা সহজে মীমাংসা করা যায়। এটি দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।

১. সাক্ষীর সংখ্যা ও যোগ্যতা:

ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের জন্য কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী পাওয়া না যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে পারে।

ক. প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) : সাক্ষী অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।

খ. মুসলিম: সাক্ষী অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। একজন অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম বিবাহের সাক্ষী হতে পারবে না।

গ. ন্যায়পরায়ণ (আদিল): সাক্ষী ফাসিক (পাপী) না হয়ে আদিল (ন্যায়পরায়ণ) হওয়া উত্তম। যদিও অনেক ফিকহবিদ ফাসিকের সাক্ষ্যও গ্রহণযোগ্য বলেছেন, তবে ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী থাকা অধিক পছন্দনীয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ 

এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সূরা তালাক : ২

যদিও এই আয়াতটি মূলত তালাকের ক্ষেত্রে এসেছে, তবে ফিকহবিদগণ এর সাধারণ বিধানের ভিত্তিতে বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন।

বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন। কোরআনের অন্য একটি আয়াত থেকে নারী-পুরুষের সাক্ষীর সংখ্যার বিষয়ে ফকিহগণ দলীল গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاسۡتَشۡہِدُوۡا شَہِیۡدَیۡنِ مِنۡ رِّجَالِکُمۡ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَکُوۡنَا رَجُلَیۡنِ فَرَجُلٌ وَّامۡرَاَتٰنِ مِمَّنۡ تَرۡضَوۡنَ مِنَ الشُّہَدَآءِ اَنۡ تَضِلَّ اِحۡدٰىہُمَا فَتُذَکِّرَ اِحۡدٰىہُمَا الۡاُخۡرٰی ؕ وَلَا یَاۡبَ الشُّہَدَآءُ اِذَا مَا دُعُوۡا ؕ

আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ। অতঃপর যদি তারা উভয়ে পুরুষ না হয়, তাহলে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী- যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর। যাতে তাদের (নারীদের) একজন ভুল করলে অপরজন স্মরণ করিয়ে দেয়। সাক্ষীরা যেন অস্বীকার না করে, যখন তাদেরকে ডাকা হয়। সূরা বাকারা : : ২৮২

এই আয়াতটি মূলত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে হলেও, ফিকহবিদগণ এই সাধারণ নীতিকে বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও প্রয়োগ করেছেন।

ইমরান ইবন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَي عَدْلٍ»

“অভিভাবক (ওলি) এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” ইমাম বাইহাকি, সুনান আল-কুবরা : ১৪১৪৬, ইমাম দারাকুতনি : ৩৭৩৮

সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।

আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোহর নির্ধারণ করা

ইসলামে মোহর (দেনমোহর) হলো বিবাহের সময় বর কর্তৃক কনেকে প্রদত্ত একটি অপরিহার্য আর্থিক দায় বা সম্পদ। এটি কেবল একটি উপহার নয়, বরং বিয়ের চুক্তির একটি বাধ্যতামূলক অংশ, যা স্ত্রীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রতীক। এটি স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে সম্মান ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ প্রদান করা হয়।

মোহর নির্ধারণ ছাড়া কোনো বিবাহ পূর্ণাঙ্গ ও শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ হয় না। তবে মোহর নির্ধারণ বিবাহের একটি অপরিহার্য শর্ত হলেও, তা সঙ্গে সঙ্গে আদায় না করে বাকি রাখা হলে বিবাহ বৈধ হবে। মোহর আদায় করা হলো স্বামীর জন্য ঋণ আদায়ের মতো ফরজ কাজ।

১. মহর ধার্য্য ও আদায় করা ফরজ বা ওয়জিব :

মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪

স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় এবং খুশি মনে তার প্রাপ্য মহরের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ মহর মাফ করে দেন, তবে তা জায়েয। তবে, কোনো ধরনের চাপ বা লজ্জার কারণে মাফ করালে তা শরীয়ত সম্মত নয়।

যদি মহর পরিশোধের আগেই স্বামী মারা যান, তাহলে মহর তার ঋণ হিসেবে গণ্য হবে এবং তার সম্পদ থেকে স্ত্রীর মহর পরিশোধ করা হবে। একইভাবে, যদি তালাক হয়, তবে স্বামী তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ মহর পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবেন। যদি সহবাসের আগেই তালাক হয় এবং মহর নির্দিষ্ট থাকে, তাহলে অর্ধেক মহর পরিশোধ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَمَا اسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِہٖ مِنۡہُنَّ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ؕ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا تَرٰضَیۡتُمۡ بِہٖ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡفَرِیۡضَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪ 

উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিণী ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন, জাহিলী যুগে চার প্রকারের বিয়ে প্রচলিত ছিল। এক প্রকার হচ্ছে, বর্তমান যে ব্যবস্থা চলছে অর্থাৎ কোন ব্যক্তি কোন মহিলার অভিভাবকের নিকট তার অধীনস্থ মহিলা অথবা তার কন্যার জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিবে এবং তার মাহর নির্ধারণের পর বিবাহ করবে। সহিহ বুখারি ৫১২৭ হাদিসের প্রথম অংশ

২. ইচ্ছা করে মহর আদায় না করা গুরুতর পাপ : মহর পরিশোধ করার নিয়ত ছাড়া বিবাহ করলে বা পরিশোধ না করার ইচ্ছা থাকলে তা ব্যভিচারের সমতুল্য। হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে।

মাইমূন আল-কুরদী, তার পিতার সূত্রে বলেন। আমি নবী ﷺ-কে একবার, দুইবার, তিনবার নয়—বরং দশবার পর্যন্ত বলতে শুনেছি-

أَيُّمَا رَجُلٍ تَزَوَّجَ امْرَأَةً بِمَا قَلَّ مِنَ الْمَهْرِ أَوْ كَثُرَ، لَيْسَ فِي نَفْسِهِ أَنْ يُؤَدِّيَ إِلَيْهَا حَقَّهَا، خَدَعَهَا، فَمَاتَ وَلَمْ يُؤَدِّ إِلَيْهَا حَقَّهَا، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَهُوَ زَانٍ

যে ব্যক্তি কোনো নারীকে সামান্য বা অধিক মোহরের বিনিময়ে বিবাহ করে, অথচ তার মনে থাকে না যে সে তার হক আদায় করবে—তাহলে সে নারীকে প্রতারণা করল। যদি সে মারা যায় অথচ তার হক (মোহর) আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষাৎ করবে ব্যভিচারী (যানী) হিসেবে।’ মুসনাদে আহমাদ : ১১০৬২, আল-মুজামুল আওসাত : ৬০৮৭, আল-মুজামুস সাগীর : ৯৫৩

৩. মহর নির্ধারণ না করে বিবাহ করলে মহরে মিসল কার্যকর হবে

আকদ (ইজাব-কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হয়ে যায়, এমনকি যদি মহর নির্দিষ্ট নাও করা হয়। তবে পরবর্তীতে স্ত্রী মহরের দাবিদার হবেন, আর সেটি হবে মোহরে মিসল (সমমানের নারীদের মহর অনুযায়ী)। অর্থাত্ এ গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবটি বাদ দিলেও বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যাবে কিন্তু মহর অটোমেটিকভাবে ধার্য হয়ে যাবে। মহর নির্দিষ্ট না থাকলেও বিবাহ বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন-

لَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ مَا لَمۡ تَمَسُّوۡہُنَّ اَوۡ تَفۡرِضُوۡا لَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ۚۖ وَّمَتِّعُوۡہُنَّ ۚ عَلَی الۡمُوۡسِعِ قَدَرُہٗ وَعَلَی الۡمُقۡتِرِ قَدَرُہٗ ۚ مَتَاعًۢا بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ حَقًّا عَلَی الۡمُحۡسِنِیۡنَ

তোমাদের কোন অপরাধ নেই যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দাও এমন অবস্থায় যে, তোমরা তাদেরকে স্পর্শ করনি কিংবা তাদের জন্য কোন মোহর নির্ধারণ করনি। আর উত্তমভাবে তাদেরকে ভোগ-উপকরণ দিয়ে দাও, ধনীর উপর তার সাধ্যানুসারে এবং সংকটাপন্নের উপর তার সাধ্যানুসারে। সুকর্মশীলদের উপর এটি আবশ্যক। সূরা বাকারাহ : ২৩৬

এখানে স্পষ্ট বলা হলো, মহর নির্ধারণ না করেই বিবাহ সম্পন্ন হতে পারে। আর যদি মহর একেবারেই নির্ধারণ না করা হয়ে থাকে, তাহলে সহবাস ঘটলে স্ত্রী মোহরে মিসল পাবেন।

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তাকে প্রশ্ন করা হলঃ এক লোক এক মহিলাকে বিয়ের পর তার মোহর না ঠিক করে এবং তার সাথে সহবাস না করেই মৃত্যুবরণ করল, তার জন্য কি হুকুম আছে? ইবনু মাসউদ (রাঃ) বললেন, মহিলাটি তার পরিবারের অন্যান্য মেয়েদের সম-পরিমাণ মোহর পাবে, তার কমও পাবে না বেশিও পাবে না। তার স্বামীর মৃত্যুর জন্য সে মহিলাটি ইদ্দাত পালন করবে এবং সে (তার) ওয়ারিসের অধিকারীও হবে। তখন মাকিল ইবনু সিনান আল-আশজাঈ (রাঃ) দাড়িয়ে বললেন, আপনি যে ধরণের ফায়সালা করেছেন, আমাদের বংশের মেয়ে ওয়াশিকের কন্যা বিরওয়াআ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একই ফায়সালা করেছেন। ইবনু মাসউদ (রাঃ) এটা শুনে খুবই আনন্দিত হন। সুনানে তিরমিজি : ১১৪৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৯১, নাসায়ী ৩৩৫৪, ৩৩৫৫, ৩৩৫৬, ৩৩৫৮, ৩৫২৪, আবূ দাউদ ২১১৪, দারেমী ২২৪৬, ইরওয়াহ ১৯৩৯, সহীহ, আবী দাউদ ১৮৩৯।

এখানে মহর নির্ধারণকে উৎসাহিত করা হয়েছে, তবে শর্ত করা হয়নি যে, মহর ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হবে না।

৪. মহর বিলম্বেও আদায় করা যায়

মহরের কিছু অংশ অথবা পুরোটা পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা বিশেষ কোনো ঘটনার পর পরিশোধ করার যায়। এই শর্তটি সাধারণত বিয়ের সময় নির্ধারণ করা হয় এবং বিবাহের চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ اَرَدۡتُّمُ اسۡتِبۡدَالَ زَوۡجٍ مَّکَانَ زَوۡجٍ ۙ وَّاٰتَیۡتُمۡ اِحۡدٰہُنَّ قِنۡطَارًا فَلَا تَاۡخُذُوۡا مِنۡہُ شَیۡئًا ؕ اَتَاۡخُذُوۡنَہٗ بُہۡتَانًا وَّاِثۡمًا مُّبِیۡنًا

আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রীকে বদলাতে চাও আর তাদের কাউকে তোমরা প্রদান করেছ প্রচুর সম্পদ, তবে তোমরা তা থেকে কোন কিছু নিও না। তোমরা কি তা নেবে অপবাদ এবং প্রকাশ্য গুনাহের মাধ্যমে? সূরা আন-নিসা ৪:২০

এখানে বলা হয়েছে, বিপুল মহর দেওয়া যায়, যা অনেক সময় একসাথে তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তখন প্রথাগতভাবে মহরের একটি অংশ বিলম্বিত থাকে। যদি চুক্তিতে নির্দিষ্ট কোনো সময় উল্লেখ না থাকে, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়, হোক তা তালাকের মাধ্যমে বা স্বামীর মৃত্যুর কারণে, তখন বিলম্বিত মহর সম্পূর্ণরূপে স্ত্রীর পাওনা হয়ে যায় এবং তা পরিশোধ করা স্বামীর (বা তার উত্তরাধিকারীদের) ওপর ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক।

৫. মহরের পরিমাণ

ইসলামে মহরের পরিমাণের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়নি। এর পরিমাণ সম্পূর্ণভাবে বরের আর্থিক সামর্থ্য এবং কনের সামাজিক অবস্থান ও সম্মানের উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। এটি এমন একটি বিধান যা উভয় পক্ষের জন্য সহজ করে দেয়, যাতে কোনো পক্ষই অতিরিক্ত আর্থিক চাপে না পড়ে। মহর এমন হতে পারে যা বরের পক্ষে পরিশোধ করা সহজ, আবার তা এত বেশিও হতে পারে যা তার সামর্থ্যের বাইরে নয়। এর মাধ্যমে ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছে।

আবূ সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের মাহর কতো ছিলো? তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীদের মাহরের পরিমাণ ছিলো বার উকিয়া ও এক নাশ। তুমি কি জানো, নাশ কী? তাহলো অর্ধ উকিয়া। আর তাহলো পাঁচ শত দিরহামের সমান। সহিহ মুসলিম ১৪২৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৬,  সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৫, দারেমী : ২১৯৯, সহিহাহ : ১৮৩৩

উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা যদি উক্ত মোহর নির্ধারণ দুনিয়াতে সম্মান এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বিষয় হতো, তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তোমাদের চেয়ে তা নির্ধারণে অধিক অগ্রগামী হতেন। কিন্তু ১২ উকিয়্যার বেশি পরিমাণ মোহর নির্ধারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো সহধর্মিণীকে বিয়ে করেছেন কিংবা কোনো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। মিশকাত : ৩২০৪, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৫১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৮৭, দারিমী : ২২৪৬, আহমাদ : ৩৪০, ইরওয়া : ১৯২৭।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) কোন এক মহিলাকে বিয়ে করলেন এবং তাকে মাহর হিসাবে খেজুর দানার পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখে বিয়ের খুশির ছাপ দেখলেন তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন; তখন সে বললঃ আমি এক নারীকে খেজুর আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বিয়ে করেছি। সহিহ বুখারি : ৫১৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪২৭, সুনানে নাসায়ী ৩৩৭২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯০৭, আহমাদ : ১৩৩৭০, দারিমী : ২২৫০।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ ত্বলহাহ্ উম্মু সুলায়ম (রাঃ)-কে বিয়ে করেন, তাদের মোহর ছিল ইসলাম গ্রহণ। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) আবূ ত্বলহাহ্ (রাঃ)-এর পূর্বে ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। উম্মু সুলায়ম (রাঃ) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; যদি তুমি ইসলাম কবুল কর তবে তোমার সাথে বিয়ে হতে পারে। অতঃপর আবূ ত্বলহাহ্ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ ইসলাম গ্রহণ তাঁদের বিয়ের মোহর বলে গণ্য হয়। মিশকাত : ৩২০৯, সুনানে নাসায়ী ধ ৩৩৪০

৬. মোহরে ফাতেমি :

মোহরে ফাতেমি হলো ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর বিবাহের সময় যে পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করেছিলেন, সেই পরিমাণকে বোঝানো হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হযরত ফাতিমা (রা.)-এর মোহর ছিল ৫০০ দিরহাম রৌপ্য মুদ্রা। আধুনিক হিসাবে এই ৫০০ দিরহামের মূল্য কত, তা নিয়ে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও এর একটি মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হিসাব দেওয়া যায়।

১ দিরহাম = ২.৯৭৫ গ্রাম রূপা।

৫০০ দিরহাম = ৫০০ × ২.৯৭৫ গ্রাম = ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপা।

বর্তমান বাজারে রূপার দামের ওপর ভিত্তি করে এই ১৪৮৭.৫ গ্রাম রূপার মূল্য হিসাব করা হয়। এই মূল্য প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রূপার দামের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।

আধুনিক সমাজে সরাসরি মোহরে ফাতেমির পরিমাণে মোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে এর মূল স্পিরিট বা চেতনা অনুসরণ করাকে উৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ, সামর্থ্য অনুযায়ী এমন পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করা উচিত, যা কনের জন্য সম্মানজনক এবং বরের জন্য বোঝা নয়।

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪

৭. সামর্থে বাইরে মহল নির্ধারণ ঠিক না

ইসলামে মহর ধার্য করার ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা লোকলজ্জার ভয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ নির্ধারণ করাকে উৎসাহিত করা হয় না। ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য হলো সহজ ও বরকতময় একটি সম্পর্ক স্থাপন করা, যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনার আলোকে পরিচালিত হয়।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«إِنَّ مِنْ يُمْنِ الْمَرْأَةِ تَيْسِيرَ خِطْبَتِهَا، وَتَيْسِيرَ صَدَاقِهَا، وَتَيْسِيرَ رَحِمِهَا»

“নিশ্চয়ই নারীর বরকতের লক্ষণ হলো, তার প্রস্তাব সহজ হওয়া, তার মোহর সহজ হওয়া এবং তার গর্ভধারণ সহজ হওয়া।” ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-মুসনাদ : ২৪৫৯৫, ইমাম হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : ২৭০৯, ইমাম বায়হাকি, শু‘আবুল ঈমান : ৮২৮৫, সহিহাহ : ২২৩৬`

উমার ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণিত, তিনি (রাঃ) বলেছেন, মহিলাদের মাহরের ব্যাপারে তোমরা বাড়াবাড়ি করো না। কেননা তা যদি পার্থিব জীবনে সম্মান অথবা আল্লাহর কাছে তাক্ওয়ার প্রতীক হতো, তাহলে তোমাদের মধ্যে মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে অধিক যোগ্য ও অগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রী ও কন্যাদের মাহর বারো উকিয়ার বেশি ধার্য করেননি। কখনও অধিক মাহর স্বামীর উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মনে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, এমনকি সে বলতে থাকে, আমি তোমার জন্য পানির মশক বহনে বাধ্য হয়েছি অথবা তোমার জন্য ঘর্মাক্ত হয়ে পড়েছি। (রাবী বলেন), আমি একজন বেদুইন। অতএব আমি ’’আলাকাল কিরবা’’ বা ’’আলাকাল কিরবা’’-এর অর্থ কি তা জানি না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৭, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৬, ২৮৭, দারেমী :  ২২০০, মিশকাত : ৩২০৪

অধিক মহর ধার্য করার মাধ্যমে বিবাহকে কঠিন করে তোলা হয়, যা এই হাদিসের শিক্ষার পরিপন্থী। যখন মহর অতিরিক্ত হয়, তখন তা অনেক যুবকের জন্য বিবাহকে অসম্ভব করে তোলে, যা সমাজে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে।

আমের ইবনু রবীআ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। ফাযারা গোত্রের এক ব্যক্তি এক জোড়া পাদুকার বিনিময়ে বিবাহ করে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বিবাহ অনুমোদন করেন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৮, সুনানে তিরমিযী : ১১১৩, আহমাদ : ১৫২৪৯, ১৫২৬৪, ইরওয়াহ : ১৯২৬।

বর্তমানে সমাজের কিছু মানুষ লোক দেখানোর জন্য বা সামাজিক মর্যাদার কারণে এমন বিপুল পরিমাণ মোহর ধার্য করে যা বরের সাধ্যের বাইরে। এর ফলস্বরূপ বরকে হয় মিথ্যা অঙ্গীকার করতে হয়, নয়তো ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে হয়। ইসলামে এমন অনর্থক বোঝা চাপানোকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

মোহরের মূল উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা, তাকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দেওয়া এবং দাম্পত্য বন্ধনকে মজবুত করা। কিন্তু যখন মোহর লোক দেখানো প্রথায় পরিণত হয়, তখন এর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং তা পারিবারিক জীবনে অশান্তির কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত মোহরের কারণে স্বামী তা পরিশোধ করতে না পেরে দাম্পত্য জীবনে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়।

ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, প্রতিটি মুসলমানের উচিত বিবাহের ক্ষেত্রে সরলতা অবলম্বন করা। মোহর এমন পরিমাণ ধার্য করা উচিত যা বরের জন্য সহজ এবং যা সে সন্তুষ্টচিত্তে পরিশোধ করতে পারে। সামাজিক রীতিনীতি বা লোকলজ্জার পরিবর্তে আমাদের উচিত আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (ﷺ) নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বেশি মোহর ধার্য করে বিবাহের পথ কঠিন করার চেয়ে বরং অল্প মোহরে বরকতময় একটি বিবাহ সম্পন্ন করা উত্তম। এটি একটি সুস্থ ও সহজ সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

বরের পক্ষ থেকে কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

ইজাব হলো বিবাহের জন্য এক পক্ষ কর্তৃক প্রস্তাব পেশ করা। সাধারণত, পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি আসে। প্রস্তাবটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। যেমন-

পাত্রের পক্ষ থেকে : “আমি অমুকের মেয়ে অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলাম।”

পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি অমুককে মোহরানা বাবদ এত টাকা বা এত পরিমাণ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বামী হিসেবে কবুল করলাম।”

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই কুমারী মেয়েরা লজ্জা করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার সম্মতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৭, ৬৯৪৬, ৬৯৭১

এখানে উল্লেখ্য, প্রস্তাবটি যে কোনো এক পক্ষ থেকে আসতে পারে, তবে তা স্পষ্ট হতে হবে। প্রস্তাবের ভাষা এমন হতে হবে, যেন তাতে কোনো অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা না থাকে।

কবুল বা গ্রহণ :

কবুল হলো অপর পক্ষ কর্তৃক সেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করা। ইজাবের পর সঙ্গে সঙ্গেই কবুল করা আবশ্যক। কবুল করার সময়ও ভাষা স্পষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:

পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি কবুল করলাম।”

যদি ইজাব এবং কবুলের মাঝে দীর্ঘ সময় ব্যবধান থাকে বা প্রস্তাবের মধ্যে কোনো শর্ত যুক্ত করা হয়, তাহলে বিবাহ চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। তাই এই দুটি বিষয় একই মজলিসে (একই স্থানে, একই বৈঠকে) সম্পন্ন করা জরুরি।

ইজাব ও কবুলের শর্ত

ইজাব ও কবুলের ধারণা সরাসরি কোরআন বা হাদিসে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা না থাকলেও, এর ভিত্তি ইসলামি ফিকাহ (আইনশাস্ত্র) এবং ইজমা (ইসলামি পণ্ডিতদের ঐক্যমত্য) থেকে এসেছে। এই নিয়মগুলো মূলত সাহাবিদের আমল এবং পরবর্তী ফকিহদের ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব থেকে ইজাব ও কবুল যে নিকাহর রুকন ও শর্ত—এ ব্যাপারে স্পষ্ট দলিল তুলে ধরছি।

ক. ইমাম ইবনু কুদামাহ (হাম্বলি) বলেন-

وَالنِّكَاحُ لَا يَنْعَقِدُ إِلَّا بِلَفْظِ الْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ

“নিকাহ বৈধ হয় না, যতক্ষণ না ইজাব ও কবুলের উচ্চারণ হয়।” আল-কাফি, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৮)-

খ. ইমাম মারগিনানি (হানাফি) বলেন-

لَا يَنْعَقِدُ النِّكَاحُ إِلَّا بِالْإِيجَابِ وَالْقَبُولِ

“নিকাহ ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।” আল-হিদায়া, প্রথম খণ্ড, পৃ.-১৮৮

গ. ইমাম নববী (শাফেয়ি) বলেন-

رُكْنُ النِّكَاحِ الْإِيجَابُ وَالْقَبُولُ، وَلَا يَنْعَقِدُ بِدُونِهِمَا

“নিকাহর রুকন হলো ইজাব ও কবুল। এ দু’টির ছাড়া নিকাহ বৈধ হয় না।” রাওদাতুত ত্বলিবীন, সপ্তম খণ্ড, পৃ.-১৮)

ঘ. ইমাম মালিক (মালিকি) বলেন-

لَا يَكُونُ النِّكَاحُ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَإِيجَابٍ وَقَبُولٍ

ওয়ালি, ইজাব এবং কবুল ছাড়া নিকাহ হয় না। আল-মুদাওয়ানাহ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ.-৫৫৫

ইজাব (প্রস্তাব)  ও কবুল (গ্রহণ) সম্পর্কিত একটি হাদিস-

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, যখন ’উমার (রাঃ)-এর কন্যা হাফসাহ (রাঃ) খুনায়স ইবনু হুযাইফাহ সাহমীর মৃত্যুতে বিধবা হলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন সাহাবী ছিলেন এবং মদিনায় ইন্তিকাল করেন। ’উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি ’উসমান ইবনু ’আফফান (রাঃ)-এর কাছে গেলাম এবং হাফসাহকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিলাম; তখন তিনি বললেন, আমি এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। এরপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম, তারপর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, আমার কাছে এটা প্রকাশ পেয়েছে যে, যেন এখন আমি তাকে বিয়ে না করি। ’উমার (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, যদি আপনি চান তাহলে আপনার সঙ্গে ’উমারের কন্যা হাফসাহকে বিয়ে দেই। আবূ বকর (রাঃ) নীরব থাকলেন এবং প্রতি-উত্তরে আমাকে কিছুই বললেন না। এতে আমি ’উসমান (রাঃ)-এর চেয়ে অধিক অসন্তুষ্ট হলাম, তারপর আমি কয়েক রাত অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালেন এবং হাফসাহ্কে আমি তার সঙ্গে বিয়ে দিলাম। এরপর আবূ বকর (রাঃ) আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, সম্ভবত আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। আপনি যখন হাফসাহকে আমার জন্য পেশ করেন তখন আমি কোন উত্তর দেইনি। ’উমার (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হাঁ। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে কোন কিছুই আমাকে বিরত করেনি; এ ছাড়া যে, আমি জানি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাফসাহর বিষয় উল্লেখ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপন ভেদ প্রকাশ আমার পক্ষে কখনও সম্ভব নয়। যদি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা ত্যাগ করতেন তাহলে আমি হাফসাহকে গ্রহণ করতাম। সহিহ বুখারি : ৪০০৫, ৫১২২

স্ত্রীর অধিকারসমূহ : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বা উত্তমভাবে জীবন-যাপন করা

কুরআনের দলিল:

وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا

আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা আন-নিসা : ১৯

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

ক. স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা

স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন করতে হলে, স্বামীকে তার সাথে  দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হবে।

নুমান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়। সহহি বুখারি : ৬০১১, সহহি মুসলিম : ২৫৮৬, আহমাদ : ১৮৪০১

খ. স্ত্রীর প্রতি অজথা রাগ পরিত্যাগ করা

সাহল ইবনু মু’আয (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার নিজের রাগকে সংযত করে রাখে এমন অবস্থায় যে, সে নিজের রাগ দ্বারা নিজের মনোবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে পারে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে সৃষ্টিকুলের সম্মুখে ডাকবেন এবং যে হূরকে সে পছন্দ করে, তাকে সে হূরকেই বেছে নেয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হবে। মিশকাত : ৫০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ ৪৭৭৭, সুনানে তিরমিযী : ২০২১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪১৮৬, আহমাদ : ১৫৬৩৭, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা : ১৪৯৭, শু‘আবুল ঈমান : ৮৩০৩

অনেক সময় সামান্য রাগের কারনে স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবাসে না, সম্মান করে না, তার জীবনকে বিষিয়ে তোলে। রাগের কারনে সে শুধু একটি সম্পর্ককেই নষ্ট করে না, বরং একটি পরিবারের শান্তি ও ভবিষ্যতকেও ধ্বংস করে দেয়। শুধু এ কারণে একজন পুরুষ অন্যায়েই নারীর শরীর রক্তাক্ত করে দেয়। সমাজে এমন বহু বিপন্ন নারী রয়েছে, যারা তাদের স্বামীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। দাম্পত্য জীবন সুন্দর ও সুফলদায়ক করতে হলে রাগ দমন করে স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বা উত্তমভাবে জীবন-যাপন করতে হবে। স্বামীর নিকট প্রতিটি নারীর প্রাপ্য হলো সম্মান, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা। স্ত্রী তার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত আমানত। এই আমানতের সঠিক পরিচর্যা করতে পারাটাই একজন প্রকৃত পুরুষের কর্তব্য।

গ. স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ’আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা’ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা’ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেন, যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, সহিহ মুসলিম : ২৩১৮, আহমাদ : ৭২৯৩

২. স্বামী স্ত্রীর খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা

ইসলামে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক। এটি স্বামীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বরেন-

لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ  وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰىہُ اللّٰہُ ؕ  لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىہَا ؕ  سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا 

সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিজক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন। সূরা তালাক : ৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ لَا تُکَلَّفُ نَفۡسٌ اِلَّا وُسۡعَہَا ۚ

আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না।  সুরা আল-বাকারা : ২৩৩

মুয়াবিযা বিন হাইদাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলো, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেনঃ সে আহার করলে তাকেও (একই মানের) আহার করাবে, সে পরিধান করলে তাকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে কখনও তার মুখমণ্ডল আঘাত করবে না, অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকী ত্যাগ করবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪২, ইরওয়াহ : ২০৩, মিশকাত : ৩২২৯, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫৮-১৮৬১।

বাহয ইবনু হাকীম তার পিতা থেকে তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের স্ত্রীদের কোন্ স্থানে সঙ্গম করবো, আর কোন্ স্থান বর্জন করবো? তিনি বললেনঃ তুমি যেভাবে ইচ্ছে করো তোমার ফসল উৎপাদন স্থানে (সম্মুখের লজ্জাস্থানে) সঙ্গম করো। আর তুমি যখন খাবে তাকেও খাওয়াবে এবং তুমি পরিধার করলে তাকেও পরিধান করাবে। তাকে গালমন্দ করবে না এবং মারবে না। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, শু’বাহ বর্ণনা করেছেন, যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে। আর যখন তুমি পরিধান করবে তখন তাকেও পরাবে। সুনানে আবু দাউদ : ২১৪৩

আমর ইবনুল আহ্ওয়াস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বিদায় হাজ্জে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করেন এবং ওয়াজ-নসীহত করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তোমরা নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহারের উপদেশ শুনে নাও। কেননা তারা তোমাদের নিকট আবদ্ধ আছে। এর অধিক তাদের উপর তোমাদের কর্তৃত্ব নাই যে, তারা যদি প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, সত্যিই যদি তারা তাই করে, তবে তোমরা তাদেরকে পৃথক বিছানায় রাখবে এবং আহত হয় না এরূপ হালকা মারধর করবে। অতঃপর তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের উপর আর বাড়াবাড়ি করো না। স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের উপরও তাদের অধিকার আছে। তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের শয্যা তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদের দ্বারা মাড়াবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদেরকে তোমাদের ঘরে প্রবেশানুমতি দিবে না। সাবধান! তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তাদের ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সজ্জার ব্যাপারে তোমরা তাদের প্রতি শোভনীয় আচরণ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে তিরমিযী : ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ : ১৯৯৭-২০২০

আবূ মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাবী বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে? তিনি বললেন, (হাঁ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ সওয়াবের আশায় কোন মুসলিম যখন তার পরিবার-পরিজনের প্রতি ব্যয় করে, তা তার সাদাকা হিসাবে গণ্য হয়। সহিহ বুখারি : ৫৩৫১, সহিহ মুসলিম : ১০০২, আহমাদ : ১৭০৮১

৩. স্ত্রীর জন্য উত্তম বাসস্থানের ব্যবস্থা

ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর জন্য একটি পৃথক ও স্বাধীন আবাসনের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে স্ত্রী তার ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে পারে। যদি স্ত্রী শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকতে না চায়, তবে তাকে আলাদা করে রাখা স্বামীর কর্তব্য। শরীয়ত অনুযায়ী, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা স্ত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, যদিও সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেবা করলে তা অনেক সওয়াবের কাজ। তাদের সেবা করার মূল দায়িত্ব স্বামীর, সে নিজে করবে অথবা লোক দিয়ে করাবে।

অনেক পরিবারে স্বামীকে জোর করে তার স্ত্রীকে মাতা-পিতার অধীনে রাখা হয়, যা স্ত্রীর প্রতি জুলুম। শাশুড়িদের উচিত তাদের পুত্র ও পুত্রবধূকে স্বাধীনভাবে থাকতে দেওয়া এবং তাদের স্বেচ্ছাকৃত সেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। পুত্রবধূকে কাজের বোঝা না চাপিয়ে তাদের নিজেদের পুত্রবধূ জীবনের কথা মনে করা উচিত, যেখানে তারাও একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন বাস্তাবায়নে স্ত্রীর জন্য একটি উত্তম বাসস্থানের ব্যবস্থা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, স্ত্রীর জন্য একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থান নিশ্চিত করাও স্বামীর দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বরেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না।  সূরা তালাক : ৬

এই আয়াতের প্রধান বার্তা হলো, স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে বাসস্থান সরবরাহ করা আবশ্যক। এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, স্বামী যেখানে ও যেভাবে বসবাস করে, স্ত্রীকে ঠিক সেভাবেই থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এর মানে হলো, স্বামী যেমন একটি নিরাপদ, শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশে থাকে, স্ত্রীরও তেমন পরিবেশে থাকার অধিকার রয়েছে।

আয়াতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া বা তার জীবনকে সংকটে ফেলার জন্য বাসস্থানকে কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, স্ত্রীকে এমন কোনো অস্বস্তিকর বা অনুপযোগী পরিবেশে রাখা যাবে না যা তার জন্য কষ্টকর হয়। যেমন, অতিরিক্ত ছোট, নোংরা বা অনিরাপদ স্থানে তাকে থাকতে বাধ্য করা যাবে না, কারণ এর উদ্দেশ্য হলো তাকে কষ্ট দেওয়া।

৪. স্ত্রীকে নিয়মিত সদুপদের দেওয়া

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَذَکِّرۡ اِنۡ نَّفَعَتِ الذِّکۡرٰی ؕ

অতঃপর উপদেশ দাও যদি উপদেশ ফলপ্রসু হয়। সুরা আলা : ৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّلٰکِنۡ ذِکۡرٰی لَعَلَّہُمۡ یَتَّقُوۡنَ

কিন্তু (তাদের কর্তব্য হচ্ছে) উপদেশ দেয়া, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে। সুরা আনাম : ৬৯

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। কারণ তাদেরকে পাঁজরের বাঁকা হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, পাঁজরের হাড়ের মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা (হাড়) হলো উপরেরটি। অতঃপর তুমি যদি ঐ হাড়কে সোজা করতে চেষ্টা কর, তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি রেখে দাও, তবে সর্বদা বাঁকাই থাকবে। সুতরাং (আমার নাসীহাত) তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। সহিহ বুখারী ৫১৮৬, মুসলিম ১৪৬৮, মিশকাত : ৩২৩৮,  ইরওয়া ১৯৯৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৯২৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদেরকে সম্বোধন যে উপদেশ প্রদান করেছেন-

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৯৮৮, ৩০৪৮, ৪৭৯০, সহিহ মুসলিম : ৯৮২, আহমাদ : ৭২৯৯

৫. স্ত্রীর গোপনীয়তার তথ্য ফাঁস না করা

বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

স্ত্রীর গোপনীয়তার তথ্য ফাঁস করা একটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও অনৈতিক কাজ। ইসলামে এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই কাজটি শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো বিশ্বাস ও নির্ভরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। একজন স্ত্রী তার স্বামীকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে, তার কাছে নিজের জীবনের সব গোপন কথা ও দুর্বলতা প্রকাশ করে। যখন স্বামী সেই গোপনীয়তা ফাঁস করে, তখন তা সেই বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে। এটি শুধু বিশ্বাসভঙ্গ নয়, বরং সম্পর্কের পবিত্রতাও নষ্ট করে। স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করাকে একটি বড় পাপ হিসেবে দেখা হয়। স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করলে তার সম্মান ও মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। এটি সমাজে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে এবং তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। একজন স্ত্রীর জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কিছু হতে পারে না।

আবূ বকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লজ্জাশীলতা ঈমানের অংগ। আর ঈমানের অবস্থান হলো জান্নাতে। আর অশ্লীলতা হলো অত্যাচার (জুলুম), আর অত্যাচার থাকবে জাহান্নামে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৮৪, সহীহাহ : ৪৯৫

৬. স্ত্রীর জন্য দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা করা

ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। স্ত্রী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, যা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। স্বামী তার স্ত্রীকে এই জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করবে। এ শিক্ষা শুধু তার জন্যই উপকারি নয়, বরং পরিবারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। স্ত্রীর শরীয়তের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তার সন্তানদেরকে শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে সন্তান লালন-পালন করতে পারবেন। এমনকি তিনি কুরআন সুন্নাহ অনুসারে নিজ সন্তাদের প্রথমিক শিক্ষা দিতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ ہَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ  اِنَّمَا یَتَذَکَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ 

বল, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে। সুরা যুমার : ৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 قُلۡ ہَلۡ یَسۡتَوِی الۡاَعۡمٰی وَالۡبَصِیۡرُ ۬ۙ اَمۡ ہَلۡ تَسۡتَوِی الظُّلُمٰتُ وَالنُّوۡرُ ۬ۚ

বল, ‘অন্ধ ও দৃষ্টিমান ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে? সুরা রাদ : ১৬

ইসলাম ধর্মে পুরুষদের জন্য শিক্ষা-দীক্ষাকে যেরূপ জরুরী মনে করা হয়েছে, মহিলাদের জন্যও তেমনি আবশ্যক মনে করা হয়েছে। পুরুষরা যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তা‘লীম গ্রহণ করতেন, তেমনি করতেন নারীরাও। শুধু সম্ভ্রান্ত মহিলাদেরকেই নয়, বরং দাসীদেরকেও শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আবূ বুরদাহ, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ধরনের লোকের জন্য দুটি পুণ্য রয়েছেঃ (১) আহলে কিতাব- যে ব্যক্তি তার নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপরও ঈমান এনেছে। (২) যে ক্রীতদাস আল্লাহর হাক আদায় করে এবং তার মালিকের হাকও (আদায় করে)। (৩) যার বাঁদী ছিল, যার সাথে সে মিলিত হত। তারপর তাকে সে সুন্দরভাবে আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েছে এবং ভালভাবে দ্বীনি ইল্ম শিক্ষা দিয়েছে, অতঃপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে; তার জন্য দু’টি পুণ্য রয়েছে। অতঃপর বর্ণনাকারী ‘আমির (রহ.) (তাঁর ছাত্রকে) বলেন, তোমাকে কোন কিছুর বিনিময় ব্যতীতই হাদীসটি শিক্ষা দিলাম, অথচ পূর্বে এর চেয়ে ছোট হাদীসের জন্যও লোকেরা (দূর-দূরান্ত থেকে) সওয়ার হয়ে মদিনা্য় আসত। সহিহ বুখারি : ২৯, ২৫৪৪, ২৫৪৭, ২৫৫১, ৩০১১, ৩৪৪৬, ৫০৮৩, সহিহ মুসলিম : ১৫৪, আহমাদ : ১৯৭৩২

ইসলাম যেভাবে পুরুষের উপর শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন ফরয করে দিয়েছে, ঠিক তেমনি এটা ফরয করে দিয়েছে নারীদের উপর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলিমদের তাঁর উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেছেন। এ ঘোষণায় তিনি পুরুষ বা মহিলা কাউকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেননি।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪

৭. মোহরানা আদায় সঠিকভাবে আদায় করা

মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪

মাইমূন আল-কুরদী, তার পিতার সূত্রে বলেন। আমি নবী ﷺ-কে একবার, দুইবার, তিনবার নয়—বরং দশবার পর্যন্ত বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো নারীকে সামান্য বা অধিক মোহরের বিনিময়ে বিবাহ করে, অথচ তার মনে থাকে না যে সে তার হক আদায় করবে—তাহলে সে নারীকে প্রতারণা করল। যদি সে মারা যায় অথচ তার হক (মোহর) আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষাৎ করবে ব্যভিচারী (যানী) হিসেবে।’ মুসনাদে আহমাদ : ১১০৬২, আল-মুজামুল আওসাত : ৬০৮৭, আল-মুজামুস সাগীর : ৯৫৩

উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা যদি উক্ত মোহর নির্ধারণ দুনিয়াতে সম্মান এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বিষয় হতো, তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তোমাদের চেয়ে তা নির্ধারণে অধিক অগ্রগামী হতেন। কিন্তু ১২ উকিয়্যার বেশি পরিমাণ মোহর নির্ধারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো সহধর্মিণীকে বিয়ে করেছেন কিংবা কোনো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। মিশকাত : ৩২০৪, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৫১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৮৭, দারিমী : ২২৪৬, আহমাদ : ৩৪০, ইরওয়া : ১৯২৭।

৮. স্ত্রীর সম্পদের প্রতি লোভ না করা

স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ বা উপার্জন থাকলে তার উপর স্বামীর কোনো অধিকার নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَتَمَنَّوۡا مَا فَضَّلَ اللّٰہُ بِہٖ بَعۡضَکُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ لِلرِّجَالِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا اکۡتَسَبُوۡا ؕ وَلِلنِّسَآءِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا اکۡتَسَبۡنَ ؕ وَسۡئَلُوا اللّٰہَ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا

আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না সে সবের, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের এক জনকে অন্য জনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরুষদের জন্য রয়েছে অংশ, তারা যা উপার্জন করে তা থেকে এবং নারীদের জন্য রয়েছে অংশ, যা তারা উপার্জন করে তা থেকে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। সুরা নিসা : ৩২

এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের নিজ নিজ উপার্জনের মালিক। নারীর উপার্জিত অর্থ তার একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি এবং এর উপর অন্য কারো কোনো অধিকার নেই, এমনকি তার স্বামীরও নয়।

হাদিসের আলোকে এই নীতি আরও পরিষ্কার হয়। একজন মুসলিম নারী তার নিজস্ব সম্পদ থেকে খরচ করার বা কাউকে দান করার পূর্ণ স্বাধীনতা রাখেন। ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে স্ত্রী তার স্বামীকে বা অন্য কাউকে নিজের সম্পদ থেকে দান করেছেন।

আবদুল্লাহর স্ত্রী যায়নাব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, হে নারী সমাজ! তোমরা (দান) সাদাকা কর যদিও তা তোমাদের গহনাপত্রের মাধ্যমে হয়। যায়নাব (রাযিঃ) বলেন, এ কথা শুনে আমি গিয়ে আমার স্বামী আবদুল্লাহকে বললাম, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সাদাকা করতে বলেছেন। আর তুমি তো গরীব অভাবী মানুষ, তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, তোমাকে দান করলে তা দান হিসেবে গণ্য হবে কিনা? তা না হলে অপর কাউকে দান করব। রাবী বলেন, আমার স্বামী আবদুল্লাহ আমাকে বললেন, বরং তুমিই যাও। অতঃপর আমিই গেলাম এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরজায় আনসার সম্প্রদায়ের অপর এক মহিলাকে একই উদ্দেশে দাঁড়ানো দেখলাম। কারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও প্রভাবশালী লোক। অতঃপর বিলাল (রাযিঃ) বের হয়ে আসলে আমরা তাকে বললাম, আপনি গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলুন, দু’জন মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা আপনার কাছে জানতে চাচ্ছে- যদি তারা তাদের নিজ স্বামীকে দান করে এবং তাদের ঘরেই প্রতিপালিত ইয়াতীমকেই দান করে তাহলে কি তা আদায় হবে? আর অনুরোধ হলো আমাদের পরিচয় তাকে জানাবেন না। রাবী বলেন, অতঃপর বিলাল (রাযিঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মহিলাদ্বয় কে কে? তিনি বললেন, জনৈক আনসার গোত্রের এবং অপরজন যায়নাব? তিনি বললেন, ’আবদুল্লাহর স্ত্রী যায়নাব। অতঃপর তাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা উভয়েই তাদের দানের জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব পাবে। এক- নিকটাত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের জন্য। দুই- সাদাকা করার জন্য। সহিহ বুখারি : ১৪৬৬, সহিহ মুসলিম : ১০০০, আহমাদ : ১৬০৮৩

এ হাদিসে আমরা দেখতে পাচ্ছি- স্ত্রী তার নিজ স্বামীকে দান করছে। যদি নারীদের সম্পত্তির নিজেস্ব মালাকানা না থাকত তবে স্বামীকে দান করার প্রশ্নই উঠত না।

ইসলামী শরিয়তে স্বামী এবং স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায়িত্ব সম্পূর্ণ আলাদা।

স্বামীর দায়িত্ব : স্বামীর প্রধান দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা) নিশ্চিত করা, তা সে স্ত্রী যতই ধনী হোক না কেন। স্ত্রীর উপার্জন থাকুক বা না থাকুক, এই দায়িত্ব স্বামীর কাঁধে।

স্ত্রীর অধিকার : অন্যদিকে, স্ত্রী তার উপার্জিত অর্থ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ বা মোহরানার সম্পূর্ণ মালিক। এই সম্পদ থেকে তিনি কাকে দেবেন বা কীভাবে খরচ করবেন, তা নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার আছে।

ইসলামে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। স্ত্রীর উপার্জনে স্বামীর কোনো অধিকার নেই। তবে, যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় এবং সন্তুষ্টচিত্তে তার স্বামীকে কোনো আর্থিক সহযোগিতা করতে চান, তাহলে তা জায়েজ এবং এর জন্য তিনি সওয়াবও পাবেন।

৯. স্ত্রীর ত্রুটি বিচ্ছুতি রাগ সংবরণ করে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা

দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হতেই পারে। ক্ষমা ও সহনশীলতার মানসিকতা সম্পর্ককে মজবুত করে। ক্ষমা করা বা ক্ষমার মানসিকতা রাখা ইসলামের একটি মহান গুণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ فِی السَّرَّآءِ وَالضَّرَّآءِ وَالۡکٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَالۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ  وَاللّٰہُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ۚ

যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং রাগ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন। সূরা আল ইমরান : ১৩৪

সাহল ইবনু মু’আয (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার নিজের রাগকে সংযত করে রাখে এমন অবস্থায় যে, সে নিজের রাগ দ্বারা নিজের মনোবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে পারে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে সৃষ্টিকুলের সম্মুখে ডাকবেন এবং যে হূরকে সে পছন্দ করে, তাকে সে হূরকেই বেছে নেয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হবে। মিশকাত : ৫০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ ৪৭৭৭, সুনানে তিরমিযী : ২০২১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪১৮৬, আহমাদ : ১৫৬৩৭, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা : ১৪৯৭, শু‘আবুল ঈমান : ৮৩০৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَجَزٰٓؤُا سَیِّئَۃٍ سَیِّئَۃٌ مِّثۡلُہَا ۚ فَمَنۡ عَفَا وَاَصۡلَحَ فَاَجۡرُہٗ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیۡنَ

মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ দ্বারা এবং যে ক্ষমা করে ও আপোষ-নিস্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ যালিমদের পছন্দ করেন না। সূরা শূরা : ৪০

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ۪ۖ وَلۡیَعۡفُوۡا وَلۡیَصۡفَحُوۡا ؕ اَلَا تُحِبُّوۡنَ اَنۡ یَّغۡفِرَ اللّٰہُ لَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা নূর : ২২

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮

১০. স্ত্রীল নারী প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রাখা

নারীদের প্রকৃতি, তাদের মানসিকতা ও শারীরিক অবস্থার প্রতি স্বামীর যত্নশীল হওয়া উচিত।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নারীদেরকে উত্তম নাসীহাত প্রদান করবে। কেননা নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে উপরের হাড়টি বেশী বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থাকবে। কাজেই নারীদেরকে নাসীহাত করতে থাক। সহিহ বুখারি : ৩৩৩১, ৫১৮৪, ৫১৮৬

এই হাদিসের মূলভাব হলো, নারীদের প্রকৃতি কিছুটা সংবেদনশীল, কোমল এবং পুরুষ থেকে ভিন্ন। এই ভিন্নতাকে সম্মান করা এবং তাদের সাথে সেভাবেই আচরণ করা উচিত। নারী ও পুরুষের শারীরিক ও মানসিক প্রকৃতি ভিন্ন, এবং এই ভিন্নতা একটি বাস্তবতা। এটিকে স্বীকার করে নিতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে অপরের ছোটখাটো ভুলত্রুটি এবং ভিন্নতাকে ধৈর্যের সাথে মেনে নেওয়া জরুরি। নারীদের প্রতি কঠোর না হয়ে বরং দয়া ও ভালোবাসার সাথে আচরণ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ নারীর কোমল ও সংবেদনশীল প্রকৃতি ভালোবাসা ও কোমলতা চায়।

জারীর ইবনে আবদুল্লাহ আল-বাজালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নম্র স্বভাব বঞ্চিত, সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। সহিহ মুসলিম : ২৫৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৮৭, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮০৯, আহমাদ : ২৭৮২৯, ১৮৭৬৭

নারিদের এ বাঁকা স্বভাব সোজা করা যাবে না। তাই কোন কারনে তাদের প্রতি বাগ হলে, তাদের গায়ে হাত তোলা ঠিক নয়।

আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম’আহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্রহার করো না। কেননা, দিনের শেষে তার সঙ্গে তো মিলিত হবে। সহিহ বুখারি : ৫২০৪

ইয়াস ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ যুবাব (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর দাসীদেরকে মারবে না। অতঃপর উমার (রাযি.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, মহিলারা তাদের স্বামীদের অবাধ্য হচ্ছে। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে মৃদু আঘাত করার অনুমতি দিলেন। অতঃপর অনেক মহিলা এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে স্বামীদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করলো। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মুহাম্মাদের পরিবারে কাছে অনেক মহিলা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে। সুতরাং যারা স্ত্রীদেরকে প্রহার করে তারা তোমাদের মধ্যে উত্তম নয়। সুনানে আবু দাউদ : ২১৪৬৯

স্ত্রীর অধিকারসমূহ : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১১. স্ত্রীর সাথে নিয়মিত রাত্রিযাপন

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু শারীরিক প্রয়োজন নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক বন্ধনের জন্যও অপরিহার্য। স্বামী তার স্ত্রীর মানসিক ও শারীরিক চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকবেন।

আল্লাত তায়ালা বলেন-

وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا

আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯

এই আয়াতে ‘ভালোভাবে জীবনযাপন’ বলতে সকল প্রকার পারস্পরিক অধিকার আদায়কে বোঝানো হয়েছে, যার মধ্যে রাত্রিযাপনও অন্তর্ভুক্ত।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার দু’জন স্ত্রী আছে, আর সে তাদের একজনের চেয়ে অপরজনের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে, সে কিয়ামতের দিন তার (দেহের) এক পার্শ্ব পতিত অবস্থায় উপস্থিত হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৪১, সুনানে নাসায়ী : ৩৯৪২, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩৩, আহমাদ : ৮৩৬৩, ৯৭৪০, দারেমী : ২২০৬, ইরওয়াহ : ২০১৭, মিশকাত : ৩২৩৬, সহীহাহ : ২০৭৭

আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এলেন। এরপর তিনি ‘‘তোমার উপর মেহমানের হাক্ব আছে, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হাক্ব আছে। সহিহ বুখারি : ১৯৭৪

আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ হে ‘আবদুল্লাহ! আমি জানতে পেরেছি, তুমি দিনে সওম রাখো ও রাত জেগে সলাত আদায় করো। আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! তিনি ﷺ বললেন, না, (এরূপ) করো না। সওম রাখবে, আবার ছেড়ে দেবে। সলাত আদায় করবে, আবার ঘুমাবে। অবশ্য অবশ্যই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার চোখের ওপর হক আছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক আছে। তোমার মেহমানদেরও তোমার ওপর হক আছে। যে সব সময় সওম রাখে সে যেন সওমই রাখল না। অবশ্য প্রতি মাসে তিনটি সওম সবসময়ে সওম রাখার সমান। অতএব প্রতি মাসে সওম রাখো। এভাবে প্রতি মাসে কুরআন পড়বে। আমি নিবেদন করলাম, আমি তো এর চেয়ে বেশী করার সামর্থ্য রাখি। তিনি ﷺ বললেন, তাহলে উত্তম দাঊদ (আ.) এর সওম রাখো। একদিন রাখবে, আর একদিন ছেড়ে দেবে। আর সাত রাতে একবার কুরআন খতম করবে। এতে আর মাত্রা বাড়াবে না। সহিহ বুখারী ১৯৭৫, ১৯৭৬, ৫০৫৪, সহিহ মুসলিম ১১৫৯, মিশকাত-২০৫৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩২০, সহীহ আত্ তারগীব ২৫৮৭, সহীহ আল জামি‘ ৭৯৪২

আবূ জুহায়ফাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান (রাঃ) ও আবুদ দারদা (রাঃ)-এর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। (একদা) সালমান (রাঃ) আবূদ দারদা (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে উম্মুদ দারদা (রাযি.)-কে মলিন কাপড় পরিহিত দেখতে পান। তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে উম্মুদ দারদা (রাযি.) বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদার পার্থিব কোন কিছুরই প্রতি মোহ নেই। কিছুক্ষণ পরে আবূদ দারদা (রাঃ) এলেন। অতঃপর তিনি সালমান (রাঃ)-এর জন্য খাদ্য প্রস্তুত করান এবং বলেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি সাওম পালন করছি। সালমান (রাঃ) বললেন, আপনি না খেলে আমি খাবো না। এরপর আবূদ দারদা (রাঃ) সালমান (রাঃ)-এর সঙ্গে খেলেন। রাত হলে আবূদ দারদা (রাঃ) (সালাত আদায়ে) দাঁড়াতে গেলেন। সালমান (রাঃ) বললেন, এখন ঘুমিয়ে পড়েন। আবূদ দারদা (রাঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবূদ দারদা (রাঃ) আবার সালাতে দাঁড়াতে উদ্যত হলেন, সালমান (রাঃ) বললেন, ঘুমিয়ে পড়েন। যখন রাতের শেষ ভাগ হলো, সালমান (রাঃ) আবূদ দারদা (রাঃ)-কে বললেন, এখন উঠুন। এরপর তাঁরা দু’জনে সালাত আদায় করলেন। পরে সালমান (রাঃ) তাঁকে বললেন, আপনার প্রতিপালকের হাক্ব আপনার উপর আছে। আপনার নিজেরও হাক্ব আপনার উপর রয়েছে। আবার আপনার পরিবারেরও হাক্ব রয়েছে। প্রত্যেক হাক্বদারকে তার হাক্ব প্রদান করুন। এরপর আবূদ দারদা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট হাজির হয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সালমান ঠিকই বলেছে।  সহিহ বুখারি : ১৯৬৮, ৬১৩৯

১২. স্ত্রীর চারিত্রিক বিষয়ে সন্দেহ পোষণ না করা

দাম্পত্য জীবনে আস্থা ও বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অযথা সন্দেহ করা সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। একজন বিশ্বাসী স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি সর্বদা ভালো ধারণা রাখবেন। কেননা, ইসলাম শুধু স্ত্রীর নয়, বরং সমাজের অন্যের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এটি পরিবারে বা সমাজে অবিশ্বাস, বিভেদ ও শত্রুতা তৈরি করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ

হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ।

সূরা হুজুরাত : ১২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। একে অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজিও না, একে অন্যের ব্যাপারে মন্দ কথায় কান দিও না এবং একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না; বরং ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখরি : ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের উপর উঠলেন এবং উচ্চস্বরে ডেকে বললেনঃ ’’হে মুসলিমগণ! যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং অন্তরে ইসলামের প্রভাব রাখোনি, তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লজ্জা দিয়ো না এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করো না। কেননা যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ অন্বেষণ করে, আল্লাহ তা’আলা তার দোষ অন্বেষণ করেন। আল্লাহ তা’আলা যার দোষ খুঁজবেন, তাকে অপমান করবেন, যদি সে নিজের ঘরের মধ্যেও থাকে। মিশকাত : ৫০৪৪, সুনান তিরমিযী : ২০৩২, সহীহ আত্ তারগীব : ২৩৩৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৭৬৩, আহমাদ : ১৯৭৭৬, শু‘আবুল ঈমান : ৬৭০৪

সত্যি সত্যি যদি কোন স্ত্রীর অন্যায় ধরা পড়ে তবে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। যদি সংশোধন না হয় তবে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান তালাক দেওয়া যাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সন্ধেহের কারনে কোন অপবাদ প্রদান হারাম।

১৩. একাধিক বিবাহ করলে স্ত্রীদের মাঝে সমতা বজায় রাখা

ইসলামে একাধিক বিবাহের অনুমতি থাকলেও, প্রতিটি স্ত্রীর প্রতি সমান আচরণ করা বাধ্যতামূলক। এই সমতা শুধু আর্থিক ভরণ-পোষণেই নয়, বরং রাত্রিযাপন ও ভালোবাসার ক্ষেত্রেও।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَانۡکِحُوۡا مَا طَابَ لَکُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ مَثۡنٰی وَثُلٰثَ وَرُبٰعَ ۚ  فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تَعۡدِلُوۡا فَوَاحِدَۃً اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ

তাহলে তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দু’টি, তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি অথবা তোমাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে। সুরা নিসা : ৩

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কোনো পুরুষের দু’জন সহধর্মিণী থাকে আর সে তাদের মধ্যে যদি ন্যায়বিচার না করে, তবে সে কিয়ামতের দিন একপাশ ভঙ্গ (অঙ্গহীন) অবস্থায় উঠবে। মিশকাত : ৩২৩৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৪১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৬৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৯৪২, আহমাদ : ৭৯৩৬, সহীহ আল জামি : ৭৬১, সহিহ আত তারগীব : ১৯৪৯

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরের ইচ্ছা পোষণ করলে তাঁর স্ত্রীদের মাঝে কুর‘আ নিক্ষেপ করতেন। যার নাম বের হত তাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি সফরে বের হতেন। আর তিনি স্ত্রীদের প্রত্যেকের জন্যই দিন রাত বণ্টন করতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম‘আহ (রাঃ) তাঁর অংশের দিন রাত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে দান করে দিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তা করেছিলেন। সহিহ বুখারি : ২৬৮৮, সহিহ মুসলিম : ২৭৭০, মিশকাত : ৩২৩২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৭০, আহমাদ : ২৪৮৫৯, দারিমী : ২২৫৪।

১৪. স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার বা উত্তম আচরণ করা

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলে আমি তাঁকে অতিক্রম করে যাই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২৫৭৮, আহমাদ : ২৩৫৯৮, ২৪৪৬০, ২৫৭২০, ২৫৭৪৫. ২৫৮৬৬, ইরওয়াহ : ১৫০২, সহীহাহ : ১৩১

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে পুতুল নিয়ে খেলা করতাম। তিনি আমার বান্ধবীদেরকে আমার সাথে খেলা করার জন্য আমার নিকট পাঠিয়ে দিতেন। সহিহ বুখারী : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম : ২৪৪০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮২, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯৬১, আহমাদ : ২৩৭৭৭, ২৪৮০৬, ২৫৪৩০, ২৫৪৩৭

‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬, সহিহ মুসলিম : ৮৯২, সুনানে নাসয়ী : ১৫৯৫, আহমাদ : ১৬১০১, ইরওয়া : ১৮০৫।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ ২৮৫।

আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে উত্তম লোক তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৮, সহিহাহ : ২৮৫, আদাবুয যিফাফ : ১৬২।

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুমিন পুরুষ কোন মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ-ঘৃণা পোষণ করবে না; (কেননা) তার কোন চরিত্র অভ্যাসকে অপছন্দ করলে তার অন্য কোন (চরিত্র-অভ্যাস) টি সে পছন্দ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৬৯, মিশকাত : ৩২৪০, আহমাদ : ৮৩৬৩, সহীহ আত্ তারগীব : ১৯২৮, সহীহ আল জামি : ৭৭৪১।

১৫. স্ত্রীর সম্মানের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল হওয়া

একজন মুসলিম স্বামীর উচিত তার স্ত্রীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা। অন্যদের সামনে স্ত্রীর ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরা বা তাকে অপমান করা একজন দায়িত্বশীল স্বামীর কাজ নয়।

মুগীরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ (রাঃ) বলেছেন, যদি আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোন পরপুরুষকে দেখি তবে আমি তাকে তরবারীর ধারালো দিক দিয়ে আঘাত করব। তার এ উক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন, তোমরা কি সা’দ এর আত্মমর্যাদাবোধে আশ্চর্য হচ্ছ? আমি ওর থেকে অধিক আত্মসম্মানী। আর আল্লাহ্ আমার থেকেও অধিক আত্মসম্মানের অধিকারী। সহিহ বুখারি : ৬৮৪৬, ৭৪১৬

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষ বড় আমনাত খিয়ানাতকারী যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭

১৬. ইবাদতে স্ত্রীকে উত্সাহ প্রদান করা

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে দয়া করুন, যে রাতে উঠে নিজেও সালাত আদায় করে এবং তার স্ত্রীকেও জাগায় এবং সেও সালাত আদায় করে। সে উঠতে না চাইলে তার মুখমণ্ডল পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ এমন নারীর প্রতিও অনুগ্রহ করুন, যে রাতে উঠে নিজে সালাত আদায় করে এবং তার স্বামীকেও জাগায়। সে উঠতে না চাইলে তার মুখন্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়। সুনানে আবু দাউদ : ১৩০৮, ১৪৫০, সুনানে নাসায়ী : ১৬০৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৩৩৬, আহমাদ : ৭৪০৪

১৭. স্ত্রীদের প্রহার করা অন্যায় কাজ

আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বহস্তে কোন দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোন নারীকেও না, খাদিমকেও না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত। আর যে তার অনিষ্ট করেছে তার থেকে প্রতিশোধও নেননি। তবে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি তার প্রতিশোধ নিয়েছেন। সহিহ মুসলিম : ২৩২৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৪, সুনানে আবূ দাউদ ৪৭৮৫, ৪৭৮৬, আহমাদ : ২৩৫১৪, ২৪৩০৯, ২৪৪৬৪, ২৫৪২৫, ২৭৬৫৮, মুয়াত্তা মালেক : ১৬৭১, দারেমী : ২২১৮, গয়াতুল মারাম : ২৫২, মুখতাসার শামাইল : ২৯৯

আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিলেন, অতঃপর মহিলাদের উল্লেখ করে তাদের ব্যাপারে লোকজনকে উপদেশ দিলেন। তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ কেন তার স্ত্রীকে দাসীর মত বেত্রাঘাত করে? অথচ দিনের শেষেই সে আবার তার শয্যাসঙ্গী হয়! সহিহ বুখারি : ৫২০৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৩, সুনানে তিরমিযী : ৩৩৪৩, আহমাদ : ১৫৭৮৮, দারেমী : ২২২০, ইরওয়াহ : ২০৩১

ইয়াস ইবনু ’আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ যুবাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর দাসীদের প্রহার করো না। অতঃপর ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! নারীরা তো তাদের স্বামীদের অবাধ্যাচরণ করছে। তিনি তাদেরকে মারার অনুমতি দিলেন এবং তারা প্রহৃত হলো। পরে অনেক নারী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাড়িতে সমবেত হলো। সকাল বেলা তিনি বলেনঃ ’’আজ রাতে মুহাম্মাদের পরিবারে সত্তরজন মহিলা এসে তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। তোমরা মারপিটকারীদেরকে তোমাদের মধ্যে উত্তম হিসাবে পাবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪৬, দারেমী : ২২১৯, গায়াতুল মারাম : ২৫১

১৮. স্ত্রীর মান-অভিমানের প্রতি লক্ষ রাখা

নারীদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো মান-অভিমান করা। ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে একটি পবিত্র সম্পর্ক হিসেবে দেখে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সহানুভূতিশীল এবং ধৈর্যশীল হবেন। এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একে অপরের মানসিক প্রকৃতিকে বোঝা এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করা। নারীদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো মান-অভিমান করা, যা অনেক সময় তাদের সংবেদনশীল প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত হয়। একজন বিচক্ষণ ও আদর্শ মুসলিম স্বামী এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখবেন এবং ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে তার স্ত্রীর মান ভাঙানোর চেষ্টা করবেন।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই মান-অভিমান কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য, যা সম্পর্কের গভীরতা ও ভালোবাসার পরিচায়ক। নবী কারীম (ﷺ)-এর জীবনীতে আমরা এর সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। স্বয়ং তাঁর স্ত্রীদেরও মান-অভিমান করার ঘটনা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই প্রবণতা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এটি মানব প্রকৃতির একটি অংশ। নারীদের মান অভিমানের প্রধান কারণ-

ক. নারীদের সোজা করা কঠিন

উপরন্তু নারীদের বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরার হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরার ওপরের হাড়। যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙ্গে যাবে। আর যদি তা যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদেরকে ওসীয়ত করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার জন্য। সহিহ বুখারি : ৫১৮৬

খ.নারীদের জ্ঞান-বুদ্ধি কম

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ৭৯, ৮০ আহমাদ : ৫৪৪৩

গ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর স্ত্রীদের মান-অভিমানের

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একজন স্ত্রীর কাছে ছিলেন। ঐ সময় উম্মুহাতুল মু’মিনীনের আর একজন একটি পাত্রে কিছু খাদ্য পাঠালেন। যে স্ত্রীর ঘরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান করছিলেন সে স্ত্রী খাদিমের হাতে আঘাত করলেন। ফলে খাদ্যের পাত্রটি পড়ে ভেঙ্গে গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রের ভাঙ্গা টুকরোগুলো কুড়িয়ে একত্রিত করলেন, তারপর খাদ্যগুলো কুড়িয়ে তাতে রাখলেন এবং বললেন, তোমাদের আম্মাজীর আত্মর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছে। তারপর তিনি খাদিমকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং যে স্ত্রীর কাছে ছিলেন তাঁর নিকট হতে একটি পাত্র নিয়ে যার পাত্র ভেঙ্গেছিল, তার কাছে পাঠালেন এবং ভাঙ্গা পাত্রটি যে ভেঙ্গেছিল তার ঘরেই রাখলেন। সহিহ বুখারি : ২৪৮১, ৫২২৫,

১৯. স্ত্রী অভদ্র, বদমেজাজী হলেও ভালো ব্যবহার করা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا

আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯

স্ত্রী অভদ্র ও বদমেযাজী হলেও ইসলাম স্বামীকে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছে এবং প্রতিদান হিসেবে পরকালে স্বামীর জন্য মহাপুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। স্ত্রীর ভালো দিকগুলো নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করতে বলেছে। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে বলেছে। কারণ অভদ্র হওয়া সত্ত্বেও সে তো স্বামীর খিদমত, রান্না-বান্না, সংসার পরিচালনা ও সন্তানাদি লালন-পালনসহ প্রতিনিয়ত অসংখ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অতএব কদাচিৎ তার পক্ষ থেকে কিছুটা কষ্ট পেলে তা সয়ে যাওয়াই স্বামীর কর্তব্য। এক্ষেত্রে লোকমান হাকীমের একটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন-

‏”‏ لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ ‏‏

কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ করে, তবে তার অন্য একটি স্বভাবের প্রতি সে সন্তুষ্ট থাকবে। সহীহ মুসলিমের : ১৪৬৯

এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো একজন যদি অন্যজনের কোনো স্বভাব অপছন্দ করে, তবে সেই একটি দুর্বলতার কারণে তাকে পুরোপুরি ঘৃণা করা উচিত নয়। বরং, তার মধ্যে যে ভালো গুণগুলো রয়েছে, সেগুলো স্মরণ করে ভালোবাসা ও ধৈর্য বজায় রাখা দরকার। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুস্থ দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

২০. স্ত্রী অপছন্দনীয় হলেও ভালো ব্যবহার করা

ইসলামে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক উপহার। কোনো কারণে স্ত্রীকে অপছন্দ হলেও তাকে ত্যাগ করা বা তার প্রতি দুর্ব্যবহার করা উচিত নয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا

আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯

এই আয়াতটি স্বীকার করে যে, দাম্পত্য জীবনে স্বামী তার স্ত্রীর কোনো আচরণ, স্বভাব বা বাহ্যিক দিক অপছন্দ করতে পারে। এটি মানব প্রকৃতির একটি অংশ। তবে, আল্লাহ এখানে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, এই অপছন্দের কারণে যেন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, যেমন তালাক। বরং, ধৈর্য ধারণ করা এবং পরিস্থিতিকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করা উচিত।

আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো,”…আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন।” এর অর্থ হলো, আমরা যা অপছন্দ করি, তার মধ্যে আল্লাহ এমন কল্যাণ লুকিয়ে রাখতে পারেন, যা আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে আমরা বুঝতে পারি না। এই কল্যাণ বিভিন্নভাবে আসতে পারে:

ক. সন্তান-সন্ততি :  হয়তো সেই স্ত্রীর গর্ভে এমন সন্তান জন্ম নেবে, যে ভবিষ্যতে মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক বড় কল্যাণ বয়ে আনবে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একজন সাধারণ মায়ের গর্ভে মহান আলেম, নেতা বা শহীদ জন্মগ্রহণ করেছেন।

খ. আত্মিক উন্নতি : স্ত্রীর কোনো অপছন্দনীয় স্বভাব বা ত্রুটি একজন স্বামীকে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং ক্ষমা করার মতো মহৎ গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করতে পারে। এটি তার ঈমান এবং চারিত্রিক উন্নতিতে সহায়ক হয়।

গ. অদৃশ্য কল্যাণ : আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই সম্পর্কে এমন বারাকাহ বা কল্যাণ আসতে পারে, যা দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় ক্ষেত্রেই লাভজনক হবে।

এই আয়াতটি মুসলিম পুরুষদেরকে তাদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করতে শেখায়। এটি শেখায় যে, কোনো মানুষকে তার এক বা একাধিক খারাপ গুণের কারণে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া উচিত নয়। বরং, তার ভালো গুণগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং সামগ্রিকভাবে তাকে বিচার করা প্রয়োজন।

২১. স্ত্রী নিঃসন্তান সন্তান হলে ভালো ব্যবহার করা

সন্তান আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে একটি উপহার। নিঃসন্তান হওয়া বা শুধু কন্যা সন্তান হওয়া কোনোভাবেই স্ত্রীর দোষ নয়। এই নিয়ে স্ত্রীকে দোষারোপ করা বা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। আল্লাহ তা’আলা বলেন-

لِلّٰهِ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنْ یَّشَآءُ  اِنَاثًا وَّ یَهَبُ  لِمَنْ  یَّشَآءُ   الذُّکُوْرَ ﴿ۙ۴۹﴾ اَوْ یُزَوِّجُهُمْ ذُکْرَانًا وَّ اِنَاثًا ۚ وَ یَجْعَلُ مَنْ  یَّشَآءُ  عَقِیْمًا ؕ اِنَّہٗ  عَلِیْمٌ  قَدِیْرٌ ﴿۵۰﴾

আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। সূরা শুরা : ৪৯-৫০

আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, সন্তান দান করার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই। এরপরেও সমাজে সন্তান না হওয়ার জন্য নারীকে দোষারোপ করা হয়, যা ইসলামের শিক্ষা ও আল্লাহর কালামের সম্পূর্ণ বিরোধী।

ক. আল্লাহর ইচ্ছাকে অস্বীকার করা

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নিঃসন্তান হওয়ার কারণ হিসেবে নিজেকেই উল্লেখ করেছেন। তিনি সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান; তাঁর প্রতিটি ফয়সালার পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা। যখন কোনো পুরুষ বা তার পরিবার সন্তান না হওয়ার জন্য স্ত্রীকে দোষারোপ করে, তখন প্রকারান্তরে তারা আল্লাহর এই সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করে। এটি ঈমানের দুর্বলতারই একটি লক্ষণ। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, আল্লাহর প্রতিটি বিধানের ওপর সন্তুষ্ট থাকা, তা তার মনমতো হোক বা না হোক।

খ. জাহেলি যুগের কুসংস্কার

সন্তান না হওয়ার জন্য নারীকে দায়ী করা মূলত ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগের কুসংস্কার। সে সময় সমাজে নারীদেরকে হেয় করা হতো এবং তাদের কোনো সম্মান ছিল না। ইসলাম এসে এই সব জাহেলি প্রথার মূলোচ্ছেদ করে দিয়েছে। ইসলাম নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে যে, সন্তান আল্লাহর দান। তাই এই ধরনের কুসংস্কার আঁকড়ে ধরা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।

ইসলামে স্বামীর একটি প্রধান দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল ও যত্নশীল হওয়া। স্ত্রীর নিঃসন্তান হওয়া কোনোভাবেই তার দোষ নয়। এই পরিস্থিতিতে তাকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া এবং তার পাশে থাকা স্বামীর নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। স্ত্রীকে দোষারোপ করা বা তার সাথে দুর্ব্যবহার করা তার মানসিক কষ্ট বাড়িয়ে দেয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। বরং এই ধরনের পরিস্থিতিতে উভয়কেই ধৈর্যের সাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।

ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, জীবনের প্রতিটি বিষয় তাকদীর দ্বারা নির্ধারিত হয়। সন্তান হওয়া বা না হওয়াও তাকদীরের অংশ। একজন মুমিন হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো আল্লাহর এই সিদ্ধান্তে ধৈর্য ধারণ করা এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখা। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মুমিনের প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর।” যদি আল্লাহ কাউকে নিঃসন্তান রাখেন, তবে এর মধ্যেও হয়তো কোনো কল্যাণ রয়েছে, যা আমরা বুঝতে পারি না।

২৫. স্ত্রী কন্যা সন্তান প্রসবিনী হলে ভালো ব্যবহার করা

সন্তান জন্ম গ্রহণের পূর্বমুহূর্ত অনাগত সন্তানের মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচিসহ পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন থাকে সন্তানটি কি ছেলে হবে, না মেয়ে হবে। শুধু বর্তমান যুগে নয়, যুগ যুগ ধরে সমাজের প্রতিটি পরিবারই চেয়েছে তাদের যেন একটি ছেলে সন্তায় হয়। পুরো পরিবার পুত্র সন্তান জন্য দুআ করে। সবার দুয়া কবুল করলে কি হত, একবার ভেবে দেখেছেন! সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিরতে সমতা বিধানের জন্যই হয়ত সবার চওয়া পূরণ করেন না। সন্তান ছেলে হবে, না মেয়ে হবে, এর উপর পিতা মাতার কোন হাত নাই।  এটা সম্পূর্ণ মহান আল্লাহ হাতে। জাহেলি যুগে কন্যা সন্তানের জম্মকে নিজেদের অপমান মনে করা হত, তাই তারা কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে জীবন্ত কবর দিয়ে দিত।

সাদ ইবনু হাফস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন, মা-বাপের নাফরমানি করা, প্রাপকের প্রাপ্য আটক রাখা, যে জিনিস গ্রহণ করা তোমাদের জন্য ঠিক নয় তা তলব করা এবং কন্যা সন্তানকে জীবিত ক্ববর দেয়া। আর তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন গল্প-গুজব করা, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা ও সম্পদ অপচয় করা। সহিহ বুখারী : ৫৯৭৫

এখন অবশ্য জাহেলি যুগের মত কবর দেয়া হয় না, তবে ইসলামি জ্ঞান যাদের কম তারা মন খারাপ করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُۥ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ

আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। সুরা নহল : ৫৮

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ  یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ  یَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّیَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّکُوۡرَ ۙ

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তা’ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। সুরা শুরা : ৪৯

পুত্র বা কন্যা সন্তান জম্ম দানের ব্যাপারে স্বামী বা স্ত্রীর কোন হাত নাই। মহান আল্লাহ তার এই সৃষ্টির পরিকল্পনাতে কাউকে শরীক করেন না। কাজেই কাউকে দোষ না দিয়ে মহান আল্লাহ পরীক্ষার উপদান মনে করতে হবে। আর ভাবতে হবে মহান আল্লাহ হয়ত ইহার মধ্যে কল্যান রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ  বহু হাদিসে কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের পুরস্কার ঘোষনা করেছেন। পৃথিবীতে কেউ স্থায়ীভাবে থাকতে আসে নাই। মহান আল্লাহকে সন্ত্বষ্ট রেখে পৃথিবী থেকে চলে যেতে পারলেই কৃতকার্য হওয়া যাবে। সেই কাঙ্থিত কৃতকারর্য যদি কন্যা সম্তানের কারনে হয়, তবে কন্যা সস্তানই ভালো। নিম্মের হাদিসগুলো লক্ষ করি।

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কন্যা সন্তানদের জন্য কোনরকম পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরলে, তা তার জন্য জাহান্নাম ঢাল হবে।  সুনানে তিরমিজি : ১৯১৩

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে লোক দুটি মেয়ে সন্তানকে লালন-পালন করবে, আমি এবং সে এভাবে একসাথে পাশাপাশি জান্নাতে যাব। এই বলে তিনি নিজের হাতের দুটি আঙ্গুল একত্র করে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন। সহিহ মুসলিম : ২৬৩১, সুনানে তিরমিজি : ১৯১৪

উকবা ইবনে ’আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কারো তিনটি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করলে, যথাসাধ্য তাদের পানাহার করালে ও পোশাক-আশাক দিলে, তারা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে অন্তরায় হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৬৯, আহমাদ : ১৬৯৫০, সহীহাহ : ৩৯৪)

এই সকল হাদিসের আলোকে বুঝা যায় সঠিকভাবে কন্যা সন্তান লালন পালন করে, দ্বীনের উপর রাখতে পারলে আখেরাত নাজাতের অসিলা হয়ে যাবে।

মেয়ে সন্তান জন্মের জন্য নারীর ভূমিকা বেশি না পুরুষের? – এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে জেনেটিক্স, এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিয়েছে।

আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে মেয়ে সন্তান জম্মগ্রহণে কার ভুমিকা বেশি

আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি শিশু ছেলে হবে না মেয়ে হবে, তা সম্পূর্ণভাবে পুরুষের ক্রোমোজোমের ওপর নির্ভরশীল। নারীর এই বিষয়ে কোনো ভূমিকা নেই। কারণ-

মানুষের ক্রোমোজোম : প্রতিটি মানুষের শরীরে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে, যা ২৩ জোড়ায় বিভক্ত। এর মধ্যে ২২ জোড়া ক্রোমোজোম ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই একই রকম। ২৩তম জোড়া হলো সেক্স ক্রোমোজোম, যা নির্ধারণ করে একটি শিশু ছেলে হবে না মেয়ে হবে।

নারীর ক্রোমোজোম : নারীর সেক্স ক্রোমোজোম হলো দুটি X ক্রোমোজোম (XX)। ডিম্বাণু (ovum) উৎপাদনের সময় নারী কেবল একটি X ক্রোমোজোমই দিতে পারে।

পুরুষের ক্রোমোজোম : পুরুষের সেক্স ক্রোমোজোম হলো একটি X এবং একটি Y ক্রোমোজোম (XY)। শুক্রাণু (sperm) উৎপাদনের সময় পুরুষ দুটি ভিন্ন ধরনের শুক্রাণু তৈরি করে—একটি যাতে X ক্রোমোজোম থাকে এবং অন্যটি যাতে Y ক্রোমোজোম থাকে।

কীভাবে লিঙ্গ নির্ধারিত হয়?

যখন নিষেক (fertilization) ঘটে, তখন নারীর ডিম্বাণুর (যা কেবল X ক্রোমোজোম বহন করে) সাথে পুরুষের যেকোনো একটি শুক্রাণু মিলিত হয়।

যদি X ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণু ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়, তাহলে শিশুটি হবে XX, অর্থাৎ মেয়ে সন্তান।

যদি Y ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণু ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়, তাহলে শিশুটি হবে XY, অর্থাৎ ছেলে সন্তান।

সুতরাং, বিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি শিশু ছেলে না মেয়ে হবে তা নির্ভর করে পুরুষ কোন ধরনের শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করছে তার উপর। নারীর ডিম্বাণুতে সব সময় একই ধরনের (X) ক্রোমোজোম থাকে বলে তার কোনো ভূমিকা থাকে না।

অতীতে, যখন মানুষ এই বৈজ্ঞানিক সত্য জানত না, তখন কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নারীকে দোষারোপ করা হতো। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান সেই ধারণা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণ করেছে।

স্বামীর অধিকারসমূহ : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

স্বামীর প্রতি একজন স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। নিচে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব কর্তব্যসমূহ তুলে ধরা হলো।

মুআয বিন জাবাল (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহিলা যদি স্বামীর হক (যথার্থরূপে) জানতো, তাহলে তার দুপুর অথবা রাতের খাবার খেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত সে (তার পাশে) দাঁড়িয়ে থাকতো। হাদিস সম্ভার : ২৬১৪, সহীহুল জামে : ৫২৫৯

১. স্বামীর আনুগত্য করা

২. নিজের সতীত্ব সংরক্ষণ করবে

৩. স্বামী ঘর ও ধন সম্পদ সংরক্ষণ করবে

৪. স্ত্রীর স্বামীর নেতৃত্ব মেনে নিবে

৫. স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা

৬. স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করা

৭.  স্বামীর আহবানে সাড়া দিতে হবে

৮. স্ত্রী তার স্বামীর ঘরে অবস্থান করবে

৯. স্ত্রী নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখবে

১০. জিদ ও হঠকারিতা পরিহার

১১. স্বামীর সাথে সব সময় হাসি খুসি থাকা

১২. ইবাদত পালনে পারস্পরিক সহযোগিতা

১৩. স্বামীর অপছন্দনীয় কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া

১৪. স্বামীকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না

১৫. স্বামীর অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে

১. স্বামীর আনুগত্য করা

ইসলামে একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্য করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই আনুগত্য অবশ্যই আল্লাহর আনুগত্যের সীমারেখার মধ্যে হতে হবে। অর্থাৎ, স্বামী যদি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের (সা.) নির্দেশের পরিপন্থী কোনো কাজের আদেশ দেন, তবে সেই আদেশ মানা যাবে না।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪

এই আয়াতে ‘কাওয়ামুন’ শব্দের অর্থ হলো তত্ত্বাবধায়ক, দায়িত্বশীল বা নেতা। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, পরিবারে পুরুষ বা স্বামী হলো প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এর কারণ হলো, আল্লাহ তা’আলা পুরুষকে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা তাকে পরিবারের প্রধান হিসেবে উপযুক্ত করে তোলে। এই নেতৃত্ব কোনোভাবেই পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব বা নারীর হীনমন্যতা প্রমাণ করে না, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল পরিবার পরিচালনার জন্য ভূমিকা বিভাজন মাত্র।

আয়াতের অপর অংশে আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এই বাক্যটি আগের অংশের কারণ ব্যাখ্যা করে। পুরুষকে যে তত্ত্বাবধায়ক বা প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার একটি কারণ হলো আল্লাহ তাদের কিছু বিশেষ গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, যা সাধারণত পুরুষের মধ্যে বেশি থাকে। এটি আল্লাহর একটি প্রাকৃতিক বিধান, যা উভয় লিঙ্গের জন্যই উপকারী। এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো একতরফা ক্ষমতা নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব, যা পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।

আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৩, সহিহাহ : ১২০৩

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যদি কাউকে অন্য কোন লোকের প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। সুনানে তিরমিজি : ১১৫৯

২. নিজের সতীত্ব সংরক্ষণ করবে

স্ত্রী হিসেবে একজন মুসলিম নারীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করা। এটি তার ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ তাআলা ব্যভিচারকে একটি জঘন্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং এই পাপ থেকে দূরে থাকতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো স্ত্রী যদি স্বামীর অনুপস্থিতিতে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তবে এটি একটি ভয়ংকর অন্যায়। ইসলামে এর জন্য দুনিয়াতে কঠিন শাস্তি (রজম) নির্ধারিত আছে এবং আখিরাতেও রয়েছে এর জন্য ভয়াবহ শাস্তি। তবে, যদি কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তবে তার উচিত সর্বাত্মকভাবে নিজেকে রক্ষা করা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজের সম্মান ও সতীত্ব রক্ষার জন্য প্রতিরোধ করা আবশ্যক। যদি এই প্রতিরোধের কারণে কোনো নারী ধর্ষকের হাতে নিহত হন, তবে ইসলামে তাকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কাছে তিনি শহীদ হিসেবে গণ্য হবেন, যিনি তার সম্মান রক্ষার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাই একজন স্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার নিজের সতীত্ব সংরক্ষণ করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ

সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সূরা নিসা : ৩৪

অর্থাৎ- একজন নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের সতীত্ব রক্ষা করা এবং এই পথে সকল প্রকার অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকা। নিজের ইজ্জত-সম্মান বজায় রাখার জন্য আল্লাহর কাছে সার্বক্ষণিক সাহায্য কামনা করা উচিত। কারণ, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় থাকা সম্ভব নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাঁর কাছে প্রার্থনা—এ দুটি জিনিসই একজন নারীকে যেকোনো পরিস্থিতিতে তার সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

৩. স্বামী ঘর ও ধন সম্পদ সংরক্ষণ করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ

সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সূরা নিসা : ২৪

পুণ্যবতী নারীরা তাদের স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেদের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করে। একই সাথে, তারা স্বামীর ধন-সম্পদ, গৃহ ও গোপনীয়তার যথাযথ হেফাজত করে। স্বামীদের অনুপস্থিতিতেও নিজেদের ও স্বামীর সবকিছু রক্ষা করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।

সূরা আহযাব : ৩৩

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮

আবু উমামা আল-বাহিলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি বিদায় হজ্জের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার বক্তৃতায় বলতে শুনেছি, স্বামীর ঘর হতে তার পূর্বানুমতি ছাড়া কোন স্ত্রীলোক যেন কিছু দান না করে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! খাবারও কি নয়? তিনি বললেন,  খাবার তো আমাদের উত্তম সম্পদ। সুনানে তিরমিজি : ৬৭০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২২৯৫

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকে চারটি নি’আমাত দান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করা হয়েছে। (১) শুকরগুজার অন্তর, (২) জিকির-আযকারে রত জিহবা, (৩) বিপদাপদে ধৈর্যশীল শরীর, (৪) নিজের (ইজ্জত-আবরু) ও স্বামীর ধন-সম্পদে আমানতদারিতায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ স্ত্রী। মিশকাত : ৩২৭৩, শু‘আবুল ঈমান : ৪১১৫

৪. স্ত্রীর স্বামীর নেতৃত্ব মেনে নিবে

পরিবারে শৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখার জন্য একজন পুরুষের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া প্রয়োজন। তবে এই নেতৃত্ব যেন জুলুমের রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয়  সূরা নিসা : ৩৪

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোন স্ত্রী স্বামীর উপস্থিতিতে তাঁর অনুমতি ব্যতীত নফল সওম রাখবে না। সহিহ বুখারি : ৫১৯২,

আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোন নারী তার বাবা, ছেলে, ভাই, স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া তিন দিন বা তার বেশি দিন সফর করবে না। সহিহ মুসলিম : ১৩৪০, সুনানে আবূ দাঊদ : ১৭২৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৮৯৮, সুনানে তিরমিযী : ১১৬৯, সহিহ ইবনে হিব্বান : ২৭০৮

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কয়েকটি হাদীস বর্ণনা করলেন। তার একটি এই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া স্ত্রী যেন (নাফল) রোযা না রাখে। তার উপস্থিতিতে তার অনুমতি ছাড়া সে যেন তার ঘরে প্রবেশ করার জন্য অন্য কাউকে অনুমতি না দেয়। তার (স্বামীর) নির্দেশ ছাড়া সে তার উপার্জিত সম্পদ থেকে যা কিছু দান করবে তাতেও সে (স্বামী) অর্ধেক সাওয়াব পাবে। সহিহ মুসলিম : ১০২৬, আহমাদ : ৮১৯৫

উপরের আয়াত ও হাদিসগুলো প্রমান করে, ইসলামে পারিবারিক জীবন সুশৃঙ্খল এবং দায়িত্বশীলতার উপর প্রতিষ্ঠিত। স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই নির্দিষ্ট ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে। স্বামী পরিবারের অভিভাবক হিসেবে নেতৃত্ব দেবেন, আর স্ত্রী সেই নেতৃত্বকে সম্মান ও সহযোগিতা করবেন। এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা একটি সুস্থ ও সুখী পারিবারিক জীবনের জন্য অপরিহার্য।

৫. স্বামীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করা

স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একজন স্ত্রীর নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। অনেক নারী স্বামীর অবদানকে ছোট করে দেখে, যা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

«مَنْ لَمْ يَشْكُرِ النَّاسَ لَمْ يَشْكُرِ اللَّهَ»

মানুষের প্রতি যে লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, আল্লাহ্ তা’আলার প্রতিও সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। সুনানে তিরমিযী : ১৯৫৫, মিশকাত : ৩০২৫, সহীহাহ : ৪১৬, আহমাদ : ১১২৮০

ইবনু আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেন, ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষনো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ সহিহ বুখারি : ২৯, ৪৩১,৭৪৮,১০৫২,৩২০২,৫১৯৭, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, আহমাদ : ৩০৬৪

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্‌র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ৭৯, ৮০, আহমাদ : ৫৪৪৩

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা সেই মহিলার প্রতি চেয়েও দেখবেন না, যে তার স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না; অথচ সে তার মুখাপেক্ষিণী। হা্দিস সম্ভার : ২৬০৬সুনানে নাসায়ি কুবরা : ৯১৩৫, ত্বাবারানী, বাযযার : ২৩৪৯, হাকেম : ২৭৭১, বাইহাকী : ১৪৪৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৮৯

৬. স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করা

ইসলামে একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জন করাকে জান্নাতে প্রবেশের একটি উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

উম্মু সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ أَيُّمَا امْرَأَةٍ مَاتَتْ وَزَوْجُهَا عَنْهَا رَاضٍ دَخَلَتِ الْجَنَّةَ

যে কোন নারী তার স্বামীকে খুশী রেখে মারা যায় সে জান্নাতে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ১১৬১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৪, মিশকাত : ৩২৫৬

আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, কোন মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহ্ভীতির পর উত্তম যা লাভ করে তা হলো পুণ্যময়ী স্ত্রী। স্বামী তাকে কোন নির্দেশ দিলে সে তা পালন করে; সে তার দিকে তাকালে (তার হাস্যাজ্জ্বল চেহারা ও প্রফুল্লতা) তাকে আনন্দিত করে এবং সে তাকে শপথ করে কিছু বললে সে তা পূর্ণ করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার সম্ভ্রম ও সম্পদের হেফাযত করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৭, মিশকাত : ৩০৯৫, সুনানে নাসায়ি : ৩২৩১, মুসনাদে আহমাদ : ৯৩৫২

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন-

إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَهَا، وَصَامَتْ شَهْرَهَا، وَحَصَّنَتْ فَرْجَهَا، وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا، قِيلَ لَهَا: ادْخُلِي الْجَنَّةَ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شِئْتِ

“যদি কোনো নারী তার পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমজানের রোজা রাখে, সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তবে তাকে বলা হবে—তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ কর।” সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪১৬৩, মুসনাদ আহমাদ : ১৬৬১, আল-মুজামুল আওসাত : ১৫৯১

করো।’ মুসনাদ আহমদ : ১৬৬১, সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪১৬৩,

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, কোন্ রমণী সর্বোত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, যে স্বামী স্ত্রীর প্রতি তাকালে তাকে সন্তুষ্ট করে দেয়, স্বামী কোনো নির্দেশ করলে তা (যথাযথভাবে) পালন করে এবং নিজের প্রয়োজনে ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ করে না। মিশকাত : ৩২৭২, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩১, আহমাদ : ৭৪২১, ইরওয়া : ১৭৮৬, সহীহাহ্ : ১৮৩৮, সহীহ আল জামি : ৩২৯৮

৭.  স্বামীর আহবানে সাড়া দিতে হবে

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক চাহিদা পূরণ করা উভয় পক্ষেরই অধিকার ও দায়িত্ব। এর মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় এবং পরিবারে শান্তি বজায় থাকে। ইসলাম স্ত্রীর জন্য তার স্বামীর এই অধিকারকে গুরুত্ব দেয়। যদি স্ত্রীর কোনো শরীয়তসম্মত ওজর থাকে (যেমন- অসুস্থতা, মাসিক ঋতুস্রাব বা অন্য কোনো শারীরিক দুর্বলতা) তাহলে ভিন্ন কথা। অন্যথায় ফিরেশতাগণ ঐ স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায় আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে ফেরেশ্তাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। সহিহ বুখারি : ৩২৩৭, ৫১৯৩, ৫১৯৪, সহিহ মুসলিম ; ১৪৩৬, আহমাদ : ৯৬৭৭

এ হাদিসটি একটি সুখী ও সুশৃঙ্খল দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরে। এটি স্ত্রীর প্রতি স্বামীকে তার বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত না করার জন্য একটি শক্তিশালী নির্দেশনা।

আবু উমামা (রাঃ) হতে বর্ণনা আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ব্যক্তির নামায তাদের কান ডিঙ্গায় না (কবুল হয় না)। পলায়নকারী দাস যে পর্যন্ত তার মালিকের নিকটে ফিরে না আসে; যে মহিলা তার স্বামীর বিরাগ নিয়ে রাত কাটায় এবং যে ইমামকে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা পছন্দ করে না। সুনানে তিরমিজি : ৩৬০, মিশকাত : ১১২২, ত্বাবারানী ৮০১৬, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৮৮, ৬৫০

আবূ আলী ত্বালক ইবনে আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তার প্রয়োজনে আহবান করবে, তখন সে যেন (তৎক্ষণাৎ) তার নিকট যায়। যদিও সে উনানের কাছে (রুটি ইত্যাদি পাকানোর কাজে ব্যস্ত) থাকে। সুনানে তিরমিজি : ১১৬০, সহীহুল জামে : ৫৩৪, হাদিস সম্ভার : ২৬০৩

৮. স্ত্রী তার স্বামীর ঘরে অবস্থান করবে

ইসলামে স্ত্রীর প্রধান কর্মক্ষেত্র হলো তার স্বামীর ঘর। তবে এর মানে এই নয় যে, সে কোনো প্রয়োজনে বাইরে যেতে পারবে না। বরং প্রয়োজনে স্বামীর অনুমতি নিয়ে বা তার সম্মতি নিয়ে বাইরে যাওয়া জায়েজ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সূরা আহযাব : ৩৩

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুসলিম নারীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। এটি মূলত ইসলামের প্রথম দিকের মুসলিম নারীদের সম্বোধন করে নাজিল হয়েছিল, কিন্তু এর শিক্ষা সব যুগের মুসলিম নারীদের জন্য প্রযোজ্য।

নারীদেরকে প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি থাকলেও, বিনা প্রয়োজনে ঘরে থাকার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, নারীদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা। ইসলাম নারীদেরকে সম্মানের আসনে বসিয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। ঘরে থাকা মানে এই নয় যে নারীদের কোনো স্বাধীনতা নেই, বরং এটি তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়। ঘরের বাইরে যখন প্রয়োজন হবে, যেমন – জ্ঞান অর্জন, জীবিকা নির্বাহ, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা, তখন তারা পর্দার সাথে বের হতে পারবেন।

নারীরা নিজেদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করবে, প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবে না, এবং যদি বের হতেই হয়, তবে পর্দার বিধান মেনে চলবে। নিজেদের সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয় রূপ জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করবে না, যা ইসলামের নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী।

৯. স্ত্রী নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখবে

স্ত্রীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজের ঘর ও সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা, যাতে পরিবার ইসলামী পরিবেশে থাকে। কুরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا وَّقُوۡدُہَا النَّاسُ وَالۡحِجَارَۃُ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। সূরা তাহরীম : ৬

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, স্ত্রীও স্বামীর সহচরী হিসেবে সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা, চরিত্র গঠন ও হিফাযতের দায়িত্বে অংশীদার।

আবদুল্লাহ [ইবনু ‘উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪,  সহিহ মুসলিম : ১৮২৯

১০. জিদ ও হঠকারিতা পরিহার

দাম্পত্য জীবনে শান্তি বজায় রাখার জন্য স্ত্রীর জন্য জিদ ও হঠকারিতা পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا

আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সূরা নিসা : ১৯

এই আয়াত পারস্পরিক ভালো আচরণের কথা বলে, যেখানে জিদ ও হঠকারিতার কোনো স্থান নেই।

আবূ উমামাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন সম্প্রদায় হিদায়াতের রাস্তা পেয়ে আবার পথভোলা হয়ে থাকলে তা শুধু তাদের বিবাদ ও বাক-বিতণ্ডায় জড়িত হওয়ার কারণেই হয়েছে। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন-

 مَا ضَرَبُوۡہُ لَکَ اِلَّا جَدَلًا ؕ بَلۡ ہُمۡ قَوۡمٌ خَصِمُوۡنَ

তারা কেবল কূটতর্কের খাতিরেই তাকে তোমার সামনে পেশ করে। বরং এরাই এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়।

সূরা যুখরুফ : ৫৮। সুনানে তিরমিজি : ৩২৫৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৮

আবূ উমামা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের যিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের যিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের যিম্মাদার। সুনানে আবু দাউদ : ৪৮০০

এটি ঝগড়া পরিহারের সাধারণ নীতি, যা দাম্পত্য জীবনেও প্রযোজ্য।

১১. স্বামীর সাথে সব সময় হাসি খুসি থাকা

ইসলামে সত্যিই স্বামীর সাথে স্ত্রীর স্নেহময়, হাসিখুশি ও সুন্দর ব্যবহার অনেক বড় গুণ হিসেবে গণ্য। এ বিষয়ে একাধিক সহিহ হাদিস পাওয়া যায়।

আবূ উমামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, কোন মু’মিন ব্যক্তি আল্লাহ্ভীতির পর উত্তম যা লাভ করে তা হলো পুণ্যময়ী স্ত্রী। স্বামী তাকে কোন নির্দেশ দিলে সে তা পালন করে; সে তার দিকে তাকালে (তার হাস্যাজ্জ্বল চেহারা ও প্রফুল্লতা) তাকে আনন্দিত করে এবং সে তাকে শপথ করে কিছু বললে সে তা পূর্ণ করে। আর স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে তার সম্ভ্রম ও সম্পদের হেফাযত করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫৭, মিশকাত : ৩০৯৫,

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

 خَيْرُ النِّسَاءِ امْرَأَةٌ إِذَا نَظَرْتَ إِلَيْهَا سَرَّتْكَ، وَإِذَا أَمَرْتَهَا أَطَاعَتْكَ، وَإِذَا غِبْتَ عَنْهَا حَفِظَتْكَ فِي نَفْسِهَا وَمَالِكَ

“সর্বোত্তম নারী সে-ই, যাকে দেখে তুমি আনন্দিত হও, যাকে তুমি আদেশ করলে সে মান্য করে, আর তুমি অনুপস্থিত থাকলে সে তোমার মান-ইজ্জত ও সম্পদ রক্ষা করে।” মুসনাদে আহমাদ : ৭৩৯৬, ৭৪১২, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩১, সহিহ আল-হাকিম : ২/১৬১

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের সাথে উত্তম ব্যবহার করে। আর আমি আমার পরিবারের সাথে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম ব্যবহারকারী।” সুনানে তিরমিযি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমার হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তোমার ভাইয়ের সামনে উপস্থিত হওয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। তোমার সৎকাজের আদেশ এবং তোমার অসৎকাজ হতে বিরত থাকার নির্দেশ তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। পথহারা লোককে পথের সন্ধান দেয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ, স্বল্প দৃষ্টি সম্পন্ন লোককে সঠিক দৃষ্টি দেয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। পথ হতে পাথর, কাটা ও হাড় সরানো তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। তোমার বালতি দিয়ে পানি তুলে তোমার ভাইয়ের বালতিতে ঢেলে দেয়া তোমার জন্য সাদকাস্বরূপ। সুনানে তিরমিজি : ১৯৫৬, সহীহাহ : ৫৭২

১২. ইবাদত পালনে পারস্পরিক সহযোগিতা

আল্লাহ তায়াল বলেন-

لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّہُنَّ ؕ

তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ। সুরা বাকারা : ১৮৭

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু পার্থিব নয়, আধ্যাত্মিকও। একে অপরের ইবাদতে সহযোগিতা করা, যেমন সালাতের জন্য ডাকা বা রোজা রাখতে উৎসাহিত করা, সম্পর্ককে আল্লাহর কাছে প্রিয় করে তোলে।

আবূ সাঈদ ও আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজ স্ত্রীকেও ঘুম থেকে জাগ্রত করে উভয়ে দু রাকআত (নফল) সালাত পড়ে, তাদের উভয়কে আল্লাহ্‌র পর্যাপ্ত যিকরকারী পুরুষ ও পর্যাপ্ত যিকিরকারী স্ত্রীলোকদের তালিকাভুক্ত করা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৩৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩০৯, ১৪৫১, মিশকাত : ১২৩৮

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“আল্লাহ সেই পুরুষের ওপর রহম করুন যে রাতের বেলা উঠে সালাত আদায় করে এবং তার স্ত্রীকে জাগায়, আর যদি সে অস্বীকার করে, তবে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। এবং আল্লাহ সেই নারীর ওপর রহম করুন যে রাতের বেলা উঠে সালাত আদায় করে এবং তার স্বামীকে জাগায়, আর যদি সে অস্বীকার করে, তবে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়।” সুনানে আবু দাউদ : ১৩০৮

১৩. স্বামীর অপছন্দনীয় কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া

স্বামী যাকে অপছন্দ করে, সেই ব্যক্তিকে তার ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া একজন স্ত্রীর জন্য জরুরি। এতে দাম্পত্য জীবনে ফিতনা সৃষ্টি হয় না।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো বিবাহিতা নারীর নিকটে স্বামী অথবা মাহরাম ছাড়া কেউ যেন রাত্রি যাপন না করে। সহিহ মুসলিম : ২১৭১, সহীহাহ্ : ৩০৮৬, মিশকাত : ৩১০১

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন স্বামী উপস্থিত থাকবে, তখন স্বামীর অনুমতি ব্যতীত মহিলার জন্য সওম পালন বৈধ নয় এবং স্বামীর অনুমতি ব্যতীত অন্য কাউকে তার গৃহে প্রবেশ করতে দেবে না। যদি কোন স্ত্রী স্বামীর নির্দেশ ব্যতীত তার সম্পদ থেকে খরচ করে, তাহলে স্বামী তার অর্ধেক সওয়াব পাবে। সহিহ বুখারি : ২০৬৬, ৫১৯৫, মুসলিম ২৪১৭,

আমর বিন আহওয়াস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বিদায়ী হজ্জের ভাষণে) বলেছেন, তোমাদের স্ত্রীর উপর তোমাদের অধিকার এই যে, (তোমাদের অবর্তমানে) তোমরা যাকে অপছন্দ ও ঘৃণা কর, তাকে তোমাদের শয্যা দলন করতে যেন সুযোগ না দেয় এবং যাকে অপছন্দ কর তাকে তোমাদের গৃহে (প্রবেশের জন্য) যেন অনুমতি না দেয়। সুনানে তিরমিজি : ১১৬৩, ৩০৮৭, হাদসি সম্ভার হাদিসের মান সহিহ

১৪. স্বামীকে কোন প্রকার কষ্ট দিবে না

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায় আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে ফেরেশ্তাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। শুবা, আবূ হামযাহ, ইবনু দাউদ ও আবূ মু‘আবিয়াহ (রহ.) আ‘মাশ (রহ.) হতে হাদীস বর্ণনায় আবূ আওয়ানাহ (রহ.)-এর অনুসরণ করেছেন। সহিহ বুখারি : ৩২৩৭, ৫১৯৩, ৫১৯৪, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৬, আহমাদ : ৯৬৭৭

মুআয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কোন স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দেয়, তখন জান্নাতে তার আয়তালোচনা হুর স্ত্রীগণ বলতে থাকেঃ ওহে! আল্লাহ্ তোমার সর্বনাশ করুন। তুমি তাকে কষ্ট দিও না। সে তো তোমার নিকট অল্প দিনের মেহমান। অচিরেই সে তোমাকে ত্যাগ করে আমাদের নিকট চলে আসবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২০১৪, সুাননে তিরমিজি : ১১৭৪, সহীহা : ১৭৩

স্বামীর অধিকারসমূহ : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৫. স্বামীর অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে

হুস্বাইন বিন মিহস্বানের এক ফুফু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কোন প্রয়োজনে এলে এবং তা পূরণ হয়ে গেলে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি স্বামী আছে? সে বলল, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, তার কাছে তোমার অবস্থান কী? সে বলল, ’যথাসাধ্য আমি তার সেবা করি।’ তিনি বললেন, ’’খেয়াল করো, তার কাছে তোমার অবস্থান কোথায়। যেহেতু সে তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। হাদিস সম্ভার : ২৬১৬, আহমাদ : ১৯০০৩, সুনানে নাসায়ি : ১৪৯৩

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি যদি কোন ব্যক্তিকে অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে লাল পাহাড় থেকে কালো পাহাড়ে অথবা কালো পাহাড় থেকে লাল পাহাড়ে পাথর স্থানান্তরের নির্দেশ দিলে তা পালন করা তার জন্য অপরিহার্য হতো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫২, আহমাদ : ২৩৯৫০

’আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত।

সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৫৩, সহিহাহ ; ১২০৩

আবূ সাঈদ (রাঃ) ও আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, এক ব্যক্তি তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার এই মেয়েটি বিয়ে করতে অস্বীকার করছে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ’’তুমি তোমার আববার কথা মেনে নাও। মেয়েটি বলল, আপনি বলুন, স্ত্রীর উপর তার স্বামীর হক কী? তিনি বললেন, স্বামীর এত বড় হক আছে যে, যদি তার নাকের দুই ছিদ্র থেকে রক্ত-পুঁজ বের হয় এবং স্ত্রী তা নিজের জিভ দ্বারা চেঁটে (পরিষ্কার করে), তবুও সে তার যথার্থ হক আদায় করতে পারবে না! যদি মানুষের জন্য মানুষকে সিজদা করা সঙ্গত হত, তাহলে আমি স্ত্রীকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামী কাছে এলে তাকে সিজদা করে। যেহেতু আল্লাহ স্বামীকে স্ত্রীর উপর এত বড় মর্যাদা দান করেছেন। মেয়েটি বলল, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য সহ প্রেরণ করেছেন! দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে আমি বিয়েই করব না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা ওদের অনুমতি ছাড়া ওদের বিবাহ দিয়ো না। হাদিস সম্ভার : ২৬১৩, নাসাঈ কুবরা : ৫৩৬৫, ইবনে আবী শাইবাহ : ১৭১২২, তারগীব : ১৯৩৪, বাইহাকী : ১৩২৬৩, হাকেম : ২৭৬৮, বাযযার : ৮৬৩৪ দারাকুতনী : ৩৫৭১

১৬. স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোন চাপ সৃষ্টি না করা

স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোন চাপ সৃষ্টি না করা”- এটি পরিবার জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। কুরআন ও সহিহ হাদিসে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, বোঝাপড়া এবং দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীর সামর্থ্যের বাইরে কোনো দাবি বা চাপ সৃষ্টি না করা।

ক. জীবিকা ও ব্যয়ভার স্বামীর দায়িত্ব, কিন্তু সামর্থ্য অনুযায়ী

আল্লাহ তাআলা বলেন—

لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ ۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ ۚ

“যার সামর্থ্য আছে সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সংকুচিত করা হয়েছে, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে।” সুরা তালাক : ৭

এখানে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, জীবিকা ব্যয় করতে হবে সামর্থ্যের ভেতরে। তাই স্ত্রী যদি স্বামীর সামর্থ্যের বাইরে দাবি করে, তবে সেটি কুরআনের এই নীতির বিরোধী হবে।

খ. আল্লাহ কারো উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না

আল্লাহ তাআলা বলেন—

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

“আল্লাহ কোনো প্রাণীকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব দেন না।” সুরা বাকারা : ২৮৬)

এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। তাই স্ত্রী যদি স্বামীকে সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করতে বাধ্য করেন, তবে এটি আল্লাহর নীতির বিরুদ্ধে যাবে।

গ. পারিবারিক খরচে মিতব্যয়িতা

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একটি দীনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করলে, একটি দীনার গোলাম আযাদ করার জন্য এবং একটি দীনার মিসকীনদেরকে দান করলে এবং আর একটি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করলে। এর মধ্যে (সাওয়াবের দিক থেকে) ঐ দীনারটিই উত্তম যা তুমি তোমার পরিবারের লোকদের জন্য ব্যয় করলে। সহিহ মুসলিম : ৯৯৫

অর্থাৎ স্বামীর উপার্জন থেকে পরিবারকে ব্যয় করা একটি উত্তম আমল। তবে এ ব্যয় হবে সামর্থ্যের মধ্যে, অতিরিক্ত চাপ নয়।

ঘ. দুনিয়ার সামগ্রীকে সহজভাবে নেওয়ার তাগিদ

সব সময় নিজেদের থেকে নিচে অবস্থানকারীদের দিকে তাকাতে হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কারো নজর যদি এমন লোকের উপর পড়ে, যাকে মাল-ধন ও দৈহিক গঠনে অধিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে তবে সে যেন এমন লোকের দিকে নজর দেয়, যে তার চেয়ে নিম্ন স্তরে রয়েছে। সহহি বুখারি : ৬৪৯০, সহিহ মুসলিম: ২৯৬৩

স্ত্রী যদি সবসময় সমাজের ধনী মানুষদের সাথে তুলনা করে স্বামীর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন, তবে এটি নবিজির নির্দেশনার বিরোধী হবে।

স্বামী হলো পরিবারের দায়িত্বশীল, তবে আল্লাহ তাকে শুধুমাত্র তার সামর্থ্যের ভেতরে দায়িত্ব দিয়েছেন।

স্ত্রী যদি স্বামীর উপর সামর্থ্যের বাইরে দাবি চাপান, তবে এটি পারিবারিক অশান্তির কারণ হয় এবং ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, মিতব্যয়িতা, এবং ধৈর্য—স্ত্রীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। স্ত্রী স্বামীর অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে বরকত দান করবেন।

১৭. অনুমতি ছাড়া স্বামীর সম্পদ ব্যয় না করা

স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া ব্যয় করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। কুরআন ও হাদিস উভয়ই নির্দেশ করে যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আস্থার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। স্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, স্বামীর উপার্জন তার হাতে একটি আমানত, তাই অনুমতি ছাড়া ব্যয় করা যাবে না; বরং স্বামীর সম্মতির ভেতরে থাকলেই কেবল সওয়াব পাওয়া যাবে।

ক. আমানত রক্ষার নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَا تُؤۡتُوا السُّفَہَآءَ اَمۡوَالَکُمُ الَّتِیۡ جَعَلَ اللّٰہُ لَکُمۡ قِیٰمًا وَّارۡزُقُوۡہُمۡ فِیۡہَا وَاکۡسُوۡہُمۡ وَقُوۡلُوۡا لَہُمۡ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا

আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ দিও না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য করেছেন জীবিকার মাধ্যম এবং তোমরা তা থেকে তাদেরকে আহার দাও, তাদেরকে পরিধান করাও এবং তাদের সাথে উত্তম কথা বল। সুরা নিসা : ৫

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সম্পদ একটি আমানত। তাই স্বামীর সম্পদ স্ত্রী অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করতে পারে না, কারণ সেটি আমানতের খিলাফ হবে।

খ. অন্যের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ করা হারাম

আল্লাহ বলেন—

وَلَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَتُدۡلُوۡا بِہَاۤ اِلَی الۡحُکَّامِ لِتَاۡکُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ وَاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ 

আর তোমরা নিজদের মধ্যে তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং তা বিচারকদেরকে (ঘুষ হিসেবে) প্রদান করো না। যাতে মানুষের সম্পদের কোন অংশ পাপের মাধ্যমে জেনে বুঝে খেয়ে ফেলতে পার।

সুরা বাকারা : ১৮৮

স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে সেটি বাতিল ভোগ বা অন্যায় ভোগের অন্তর্ভুক্ত হবে।

গ. স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর সীমাবদ্ধতা

আবূ উমামাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ মহান আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করেছেন। কাজেই উত্তরাধিকারীদের জন্য কোনো ওয়াসিয়াত নেই। স্বামীর বিনা অনুমতিতে কোনো স্ত্রী তার ঘরের কিছু খরচ করবে না। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! খাদ্যদ্রব্যও নয়? তিনি বললেনঃ এটা তো আমাদের সর্বোত্তম সম্পদ। অতঃপর তিনি বললেনঃ ধারকৃত বস্তু ফেরত দিতে হবে; দুগ্ধবতী পশুর দুধ পান শেষ হলে তা ফেরত দিতে হবে; ঋণ পরিশোধ করতে হবে এবং জামিনদার দায়বদ্ধ থাকবে। সুনানে আবু দাউদ : ২৩৯৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৩৯৮

এখানে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা এসেছে—স্ত্রী অনুমতি ছাড়া স্বামীর সম্পদ খরচ করতে পারবে না।

(খ) ন্যায্য ব্যয়ের অনুমতি

৫৩৬০. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কোন মহিলা স্বামীর উপার্জন থেকে তার নির্দেশ ব্যতীত দান করে, তবে সে তার অর্ধেক সাওয়াব পাবে। সহিহ বুখারি : ২০৬৬, ৫৩৬০, সহিহ মুসলিম : ১০২৬, আহমাদ : ৮১৯৫

অর্থাৎ, প্রচলিত অনুমতি বা স্বামীর সাধারণ সম্মতির মধ্যে থাকলে স্ত্রী ব্যয় করতে পারে। যেমন—অতিথিকে সামান্য খাবার খাওয়ানো, দান করা ইত্যাদি। তবে বড় বা অপ্রচলিত খরচের জন্য অবশ্যই স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন।

ঘ.  স্ত্রীও স্বামীর সম্পদের আমানতদার

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। একজন শাসক সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের রক্ষক, সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন গোলাম তার মনিবের সম্পদের রক্ষক, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ৫১৮৮, সহহি মুসলিম : ১৮২৯

এখানে স্ত্রীকে স্বামীর ঘর ও সম্পদের আমানতদার বলা হয়েছে। আমানতদারের দায়িত্ব হলো অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু অপচয় না করা।

উপসংহার : স্বামীর সম্পদ স্ত্রীর জন্য আমানত, অতএব অনুমতি ছাড়া তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়। তবে সাধারণ প্রচলিত অনুমতি থাকলে (যেমন অতিথিকে খাওয়ানো, সামান্য জিনিস দান করা) স্ত্রী ব্যয় করতে পারে, এতে উভয়েরই সওয়াব হবে। কিন্তু বড় কোনো ব্যয়, বিক্রি, বা দান—এসবের জন্য অবশ্যই স্বামীর সুনির্দিষ্ট অনুমতি লাগবে। স্বামীর সম্পদে অনুমতি ছাড়া ব্যয় করা হলে তা হারাম এবং কিয়ামতের দিন এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে।

১৭. স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ীর বাইরে না যাওয়া।

স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর বাড়ীর বাইরে যাওয়া প্রসঙ্গে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিধানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পরিবার ও দাম্পত্য জীবনের শৃঙ্খলা, স্ত্রীর নিরাপত্তা, এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, স্ত্রীর জন্য বিশেষ কোনো শরয়ী প্রয়োজন বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বাইরে যাওয়া বৈধ নয়, বরং নিষিদ্ধ। এটি স্বামীর একটি অধিকার এবং স্ত্রীর জন্য এটি পালন করা ওয়াজিব।

১. স্বামীর আনুগত্য ও কর্তৃত্ব

কুরআন মাজীদে পুরুষদেরকে নারীদের কর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা পরিবারের কাঠামোতে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যের আবশ্যকতাকে তুলে ধরে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে।  সূরা আন-নিসা : ৩৪

এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে পুণ্যশীলা স্ত্রীরা স্বামীর অনুগত হন। স্বামীর আনুগত্যের একটি অংশ হলো তার অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বাইরে না যাওয়া।

২. স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ

ইসলামী ফিকাহবিদরা এই মর্মে একমত যে, প্রয়োজনীয় কারণ ও স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়।

ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাযি.)-এর স্ত্রী (আতিকাহ্ বিনত যায়দ) ফজর ও ‘ইশার সালাতের জামা‘আতে মসজিদে হাযির হতেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কেন (সালাতের জন্য) বের হন? অথচ আপনি জানেন যে, ‘উমার (রাযি.) তা অপছন্দ করেন এবং মর্যাদা হানিকর মনে করেন। তিনি জবাব দিলেন, তা হলে কিসে বাধা দিচ্ছে যে, ‘উমার (রাযি.) স্বয়ং আমাকে নিষেধ করছেন না? বলা হল, তাঁকে বাধা দেয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণীঃ আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর মসজিদে যেতে বারণ করো না। সহিহ বুখারি : ৯০০, সহিহ মুসলিম : ৪৪২, আহমাদ : ৪৬৫৫

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

এখানে বোঝা যাচ্ছে, স্ত্রী বের হওয়ার জন্য প্রথমে অনুমতি চাইবে, তারপর স্বামী অনুমতি দিলে বের হতে পারবে।

বিখ্যাত ফিকাহবিদ ইবনু মুফলিহ আল-হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “একজন মহিলার জন্য তার স্বামীর ঘর থেকে তার অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ, প্রয়োজন বা শরঈ বাধ্যবাধকতা ছাড়া।” আল-আদাব আশ-শাঈয়াহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৭৫

৩. আনুগত্যের ফল জান্নাত :

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মহিলা যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমাযানের সিয়াম পালন করে, গুপ্তাঙ্গের হিফাযাত করে, স্বামীর একান্ত অনুগত হয়। তার জন্য জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশের সুযোগ থাকবে। থাকবে। মিশকাত : ৩২৫৪

এই হাদিস প্রমাণ করে যে স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

৩. প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার অনুমতি

ইসলাম নারীকে সব সময় ঘরে আবদ্ধ থাকতে বলে না। জরুরী প্রয়োজনে যেমন— বাজার করা (যদি অন্য ব্যবস্থা না থাকে), অসুস্থতা বা আত্মীয়-স্বজনের অসুস্থতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্ত্রীকে পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও স্বামীর অনুমতি নিয়ে রাখা উত্তম বা কর্তব্য।

ক. প্রয়োজনে অনুমতি:

’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে উম্মুহাতুল মু’মিনীন সওদা বিনত জাম’আ (রাঃ) কোন কারণে বাইরে গেলেন। ’উমার (রাঃ) তাঁকে দেখে চিনে ফেললেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! হে সাওদা! তুমি নিজেকে আমাদের নিকট হতে লুকাতে পারনি। এতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে গেলেন এবং উক্ত ঘটনা তাঁর কাছে বললেন। তিনি তখন আমার ঘরে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন এবং তাঁর হাতে মাংসওয়ালা একখানা হাড় ছিল। এমন সময় তাঁর কাছে ওয়াহী অবতীর্ণ হল। ওয়াহী শেষ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা প্রয়োজনে তোমাদেরকে বাইরে যাবার অনুমতি দিয়েছেন। সহহি বুখারি : ৫২৩৭

খ. সাধারণ অনুমতি:

যদি স্বামী অনুপস্থিত থাকেন এবং স্ত্রীর কাছে নিকটবর্তী কোনো জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: পাশের বাসা বা কাছের মার্কেটে) যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তবে স্ত্রীর উচিত হলো স্বামীর কাছ থেকে সাধারণ অনুমতি (general permission) নিয়ে রাখা, যাতে ছোটখাটো প্রয়োজনে বারবার অনুমতি চাইতে না হয়।

গ. দূরবর্তী সফর

স্ত্রীর জন্য মাহরাম পুরুষ (যার সাথে বিবাহ বৈধ নয়, যেমন: পিতা, ভাই, ছেলে ইত্যাদি) ছাড়া একা দূরবর্তী সফর (সাধারনত ৪৮ মাইল বা তার বেশি) করা নিষিদ্ধ। এই ক্ষেত্রেও স্বামীর অনুমতি আবশ্যক।

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا

আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য বৈধ নয় যে, সে এক দিন এক রাতের সফর করবে মাহরাম ছাড়া।” সহিহ বুখারি : ১০৮৮, সহিহ মুসলিম : ১৩৩৯

ঘ. মাহরাম ছাড়া সফর:

১০৮৬. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন নারীই যেন মাহরামকে (২) সঙ্গে না নিয়ে তিন দিনের সফর না করে। সহিহ বুখারি : ১০৮৬, ১০৮৭, সহিহ মুসলিম : ১৩৩৮, আহমাদ : ৪৬১৫

 উপসংহার : ইসলামী শরীয়তে পারিবারিক শান্তি, স্ত্রীর নিরাপত্তা, এবং স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার জন্য স্ত্রীর উপর এই কর্তব্য আরোপ করা হয়েছে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর বাড়ীর বাইরে না যাওয়া কেবল স্বামীর অধিকার নয়, বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত আনুগত্যের অংশ। যদি কোনো শরয়ী প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে পর্দা মেনে এবং স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে বাইরে যাওয়া যেতে পারে।

১৮. স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা না রাখা।

স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নফল (ঐচ্ছিক) রোযা রাখা সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা মূলত স্বামী-স্ত্রীর অধিকারের ভারসাম্য এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি হাদিসের আলোকে নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

১. স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল সিয়ামের বিধান

স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নফল রোযা রাখার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একাধিক সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, নফল ইবাদতের চেয়ে স্বামীর অধিকারের বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো নারীর পক্ষে বৈধ নয় স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ব্যতীত সিয়াম রাখা (রোযা রাখা) এবং স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কাউকে তার ঘরে প্রবেশাধিকার দেওয়া।” সহীহ বুখারী : ৫১৯২; সহীহ মুসলিম : ১০২৬; সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪৫৮

স্বামী বাড়িতে উপস্থিত থাকলে বা স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ থাকলে, তার সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নফল রোযা রাখতে পারবেন না। কারণ, স্ত্রীর নফল রোযা স্বামীর দৈহিক অধিকার (যৌন সম্পর্ক) বা অন্যান্য পারিবারিক প্রয়োজনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ইসলাম দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা ও স্বামীর অধিকারকে নফল ইবাদতের উপর স্থান দিয়েছে। এই বিধানটি কেবল নফল রোযার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফরয রোযা (যেমন: রমযানের রোযা, বা ছুটে যাওয়া ফরয রোযা) রাখার জন্য স্ত্রীর কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই, কারণ তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশ।

২. কখন স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন নেই?

উল্লিখিত হাদিস অনুযায়ী, কয়েকটি ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন হয় না:

ক. স্বামী অনুপস্থিত থাকলে: যদি স্বামী দূরে থাকেন বা সফরে থাকেন, এবং স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে স্ত্রী নফল রোযা রাখতে পারেন।

খ. স্বামীর অনুমতি থাকলে: স্বামী যদি স্ত্রীকে নফল রোযা রাখার অনুমতি দেন, তবে স্ত্রী রোযা রাখতে পারবেন।

গ. ফরয রোযা: রমযানের রোযা বা কাযা (যা ফরয) রোযা রাখার জন্য অনুমতির প্রয়োজন নেই।

ঘ. রোযা ভঙ্গ করার অনুমতি: কোনো স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা শুরু করার পর যদি স্বামী তাকে রোযা ভাঙতে নির্দেশ দেন, তবে স্ত্রীর জন্য রোযাটি ভেঙে ফেলা এবং পরে কাযা করে নেওয়া উত্তম বা কর্তব্য।

উপসংহার : ইসলাম পরিবারকে একটি সুশৃঙ্খল একক হিসেবে দেখে, যেখানে স্বামীর অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশ অনুসারে, স্বামীর উপস্থিতিতে স্ত্রীর জন্য নফল রোযা রাখার আগে অবশ্যই স্বামীর অনুমতি নেওয়া কর্তব্য। এটি স্বামীর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার অংশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে নফল ইবাদতের চেয়ে ফরয কর্তব্য এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব অনেক বেশি।

১৯. স্বামীর শরীআত বিরোধী কাজের সময় নসিহত করা

স্বামীর কাছ থেকে শরীয়ত বিরোধী কোনো কাজ প্রকাশ পেলে স্ত্রীর দায়িত্ব হলো আদব ও শালীনতার সাথে তাকে তা বোঝানো এবং সংশোধনের চেষ্টা করা। এটি স্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য (নসীহত), যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা এবং উভয়কে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এ বিষয়টি কুরআন ও হাদিসের সাধারণ নসীহত (সৎ উপদেশ) এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের নীতির আলোকে বোঝা যায়।

১. পারস্পরিক সৎ উপদেশ প্রদান

ইসলামী শরীয়তে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অপরের প্রতি নসীহত বা উপদেশ প্রদানের জন্য দায়িত্বশীল। আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মুমিনকে সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন:

وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیۡعُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُہُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ

আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা তাওবা : ৭১

এই আয়াতে স্বামী-স্ত্রীও অন্তর্ভুক্ত। দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে, একে অপরের ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর পথে আহ্বান করা তাদের প্রথম দায়িত্ব।

খ. পরিবারকে রক্ষার নির্দেশ:

আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا وَّقُوۡدُہَا النَّاسُ وَالۡحِجَارَۃُ

হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে রক্ষা কর অগুন হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। সূরা তাহরীম : ৬

স্বামীর ভুল দেখলে বা শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হতে দেখলে স্ত্রীকে অবশ্যই তাকে সতর্ক করতে হবে, নতুবা তিনি এই আয়াত অনুযায়ী নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন।

তামীম আদ দারী (রহঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সদুপদেশ দেয়াই দীন। আমরা আরয করলাম, কার জন্য উপদেশ? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তার কিতাবের, তার রাসূলের, মুসলিম শাসক এবং মুসলিম জনগণের। সহিহ মুসলিম : ৫৫

স্ত্রী হিসেবে স্বামীকেও আল্লাহর পথে চলার জন্য উপদেশ দেওয়া এই নসীহতের অন্তর্ভুক্ত।

২. উপদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে আদব ও পদ্ধতি

উপদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে অবশ্যই সর্বোচ্চ আদব ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে। কারণ উদ্দেশ্য স্বামীকে লজ্জিত করা বা সম্পর্ক নষ্ট করা নয়, বরং তাকে সংশোধিত করা।

ক. নম্র ও কোমল ভাষা ব্যবহার:

যখন হযরত মূসা (আ.) এবং হারূন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন আল্লাহ তাদেরকে কোমল ভাষায় কথা বলতে বলেন, যদিও ফেরাউন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অবাধ্য শাসক।

اِذْهَبَاۤ  اِلٰی  فِرْعَوْنَ  اِنَّہٗ  طَغٰی  ﴿ۚۖ۴۳﴾  فَقُوْلَا لَہٗ  قَوْلًا لَّیِّنًا لَّعَلَّہٗ  یَتَذَكَرُ اَوْ یَخْشٰی ﴿۴۴﴾

তোমরা দু’জন ফির‘আউনের নিকট যাও, কেননা সে তো সীমালংঘন করেছে। তোমরা তার সাথে নরম কথা বলবে। হয়তোবা সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে। সূরা ত্বহা : ৪৩-৪৪

স্বামীর ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত। কঠোরতা বা রূঢ়তার পরিবর্তে নম্রতা ও ভালোবাসা দিয়ে কথা বললে তা বেশি কার্যকর হয়।

খ. গোপনে উপদেশ:

উপদেশ সর্বদা একান্তে ও গোপনে প্রদান করা উচিত। অন্য কারো সামনে স্বামীর ভুল তুলে ধরলে তিনি নিজেকে অপমানিত মনে করতে পারেন এবং উপদেশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। জনসমক্ষে ভুল ধরা মানুষের মর্যাদাহানি করে।

গ. উপযুক্ত সময় নির্বাচন:

স্ত্রীকে এমন সময় নির্বাচন করতে হবে যখন স্বামীর মেজাজ ভালো থাকে এবং তিনি মনোযোগ সহকারে কথা শুনতে প্রস্তুত থাকেন।

ঘ. যুক্তির চেয়ে আহ্বানকে প্রাধান্য দেওয়া:

স্ত্রী শুধু ভুলটি ধরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হবেন না, বরং কুরআন ও হাদিসের আলোকে সেই কাজের ক্ষতি এবং সঠিক পথ সম্পর্কেও বুঝিয়ে বলবেন। মনে রাখতে হবে, তিনি স্বামীর আদালত নন, তিনি তার সহকর্মী ও সহায়তাকারী।

ঙ. সীমালঙ্ঘন না করা:

যদি স্বামী উপদেশ গ্রহণ না করেন, তবে স্ত্রী তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করতে পারবেন না বা স্বামীর অন্যান্য অধিকার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবেন না। স্ত্রী শুধু আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তার দায়িত্ব পালন করে যাবেন এবং স্বামীর হেদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকবেন। কারণ হেদায়াত দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

উপসংহার : স্বামীর কাছ থেকে শরীয়ত বিরোধী কাজ প্রকাশ পেলে স্ত্রীকে অবশ্যই আদব, বিনয়, নম্রতা ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে বোঝাতে হবে। এটি শুধু স্বামীর অধিকার নয়, বরং তাদের পারিবারিক শান্তি ও আখিরাতের সফলতার জন্য স্ত্রীর একটি শরয়ী দায়িত্ব।

২০. কারো সাথে স্বামীর বদনাম বা সমালোচনা না করা।

ইসলাম ধর্মে দাম্পত্য জীবনকে শান্তি, ভালোবাসা এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা এবং উত্তম আচরণ এই বন্ধনকে মজবুত করে। স্বামীর অধিকারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার সম্মান রক্ষা করা এবং কারো সামনে তার বদনাম বা সমালোচনা না করা। এই বিষয়টি কুরআন ও হাদীসের আলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারো সামনে স্বামীর সমালোচনা বা বদনাম করাকে ইসলামে গীবত (পরনিন্দা)-এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হতে পারে, যা একটি কবীরা গুনাহ। তবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও গভীর।

১. পারস্পরিক অধিকার ও মর্যাদা

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি বিশেষ অধিকার ও মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পুরুষকে পরিবারের কর্তা বা তত্ত্বাবধায়ক (কাওয়াম) হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন, কারণ তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে (পরিবারকে সমর্থন করে)। এই মর্যাদা পারস্পরিক সম্মানের দাবি রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪

এখানে কর্তৃত্বশীল বলতে স্বৈরাচারী হওয়া নয়, বরং দায়িত্বশীল হওয়া এবং পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে বোঝানো হয়েছে। স্ত্রীর কর্তব্য হলো এই দায়িত্বের প্রতি সম্মান দেখানো।

২. সমালোচনা বা বদনামের ভয়াবহতা (গীবত)

অন্যের সামনে স্বামীর বদনাম বা সমালোচনা করা সাধারণভাবে গীবত বা পরনিন্দার শামিল, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। গীবতকে ইসলামে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ وَّلَا تَجَسَّسُوۡا وَلَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡہِ مَیۡتًا فَکَرِہۡتُمُوۡہُ ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ تَوَّابٌ رَّحِیۡمٌ

হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবূলকারী, অসীম দয়ালু। সূরা হুজরাত : ১২

স্বামী যখন অনুপস্থিত, তখন তার দোষ বলে বেড়ানোও এক প্রকার গীবত এবং এটি স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

স্ত্রী স্বামীর সম্পদ রক্ষক: সৎ স্ত্রীরা স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেদের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করে। এর মধ্যে স্বামীর মান-সম্মানও অন্তর্ভুক্ত। কারো সামনে স্বামীর সমালোচনা করলে তা তার সম্মান ক্ষুণ্ণ করে।

৩. স্ত্রীর করণীয়

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটি পবিত্র আমানত। বাইরের কারো কাছে স্বামীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা, দোষ বা সংসারের ভেতরের বিষয় নিয়ে সমালোচনা বা বদনাম করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। এটি দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্রতার অংশ। স্বামী-স্ত্রীর উচিত তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গোপন রাখা। যদি স্বামীর কোনো ত্রুটি থাকে, তবে স্ত্রীর কর্তব্য হলো গোপনে, একান্তে ও নম্রভাবে তাকে উপদেশ দেওয়া এবং সংশোধনের চেষ্টা করা। প্রকাশ্যে বা অন্যের সামনে সমালোচনা করলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং স্বামীর মর্যাদাহানি হয়। অনেক সময় স্ত্রীর কর্তব্য হয় স্বামীর কোনো ত্রুটির কারণে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে স্বামীর সংশোধনের জন্য দু’আ করা।

ইসলামী নির্দেশনা হলো, স্ত্রী তার স্বামীর মান-সম্মান রক্ষা করবেন এবং তাকে ভালোবেসে তার প্রতি উত্তম ব্যবহার করবেন। কারণ স্বামীর সম্মান রক্ষা করা প্রকারান্তরে নিজের পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করার শামিল।

২১. স্বামীর আত্মীয় ও আপনজনদের সাথে ভালো ব্যবহার করা

ইসলামে স্বামীর আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে তার পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করাকে স্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও স্বামীর অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আচরণ পারিবারিক শান্তি ও স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিচায়ক। স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের সাথে খারাপ ব্যবহার না করা এবং বিশেষ করে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি সেবা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার গুরুত্ব ইসলামে একাধিক কারণে বিদ্যমান, যা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

১. পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও উত্তম চরিত্র

ইসলাম পারিবারিক বন্ধন রক্ষা এবং উত্তম নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার এই নীতিরই অংশ। কুরআন ও হাদীসে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিবাহ স্বামী-স্ত্রীর পরিবারগুলোর মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক স্থাপন করে। এই সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন-

 ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِیۡ تَسَآءَلُوۡنَ بِہٖ وَالۡاَرۡحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلَیۡکُمۡ رَقِیۡبًا

হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। সূরা নিসা :১

স্বামীর আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে পিতা-মাতা, এই রক্তের সম্পর্কের অংশ। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার না করা পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে এবং স্বামীর মনকে কষ্ট দেয়।

২. স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও মন রক্ষা

স্বামীর আত্মীয়দের কষ্ট দিলে সরাসরি স্বামীর মন ভেঙে যায়। স্ত্রীর অন্যতম প্রধান কর্তব্য হলো স্বামীর মনকে খুশি রাখা এবং তার অধিকার পূরণ করা। স্ত্রীর জন্য স্বামীর প্রতি আনুগত্য এবং তাকে সন্তুষ্ট রাখা জান্নাত লাভের অন্যতম পথ। স্বামীর পিতা-মাতার প্রতি সম্মান দেখানো তার সন্তুষ্টির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে ম’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত।

সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৩,  আদাবুয যিফাফ : ১৭৮, সহিহাহ : ১২০৩

যদিও শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা সরাসরি শরীয়তের বাধ্যতামূলক বিধান নয়, তবে তাদের সেবা করা স্বামীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে গণ্য হয়, যার মাধ্যমে স্বামী অত্যন্ত খুশি হন। স্বামীর অধিকারের মধ্যে পড়ে সে যেন তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো কষ্ট না পায়।

স্বামীর পরিবারের প্রতি সহানুভূতি দেখানো মানেই স্বামীর প্রতি সহানুভূতি দেখানো। কারণ স্বামীর চোখে তার পিতা-মাতার স্থান সর্বোচ্চ। তাদের প্রতি খারাপ আচরণ করা মানে স্বামীর প্রতিই খারাপ আচরণ করা।

৩. শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি সেবার মর্যাদা (পিতা-মাতার সম্মান)

স্বামীর পিতা-মাতা স্ত্রীর কাছে শ্বশুর ও শাশুড়ি। ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার মর্যাদা আল্লাহর ইবাদতের পর সবচেয়ে বেশি। স্বামীর পিতা-মাতাকে নিজের পিতা-মাতার মতো সম্মান করা কর্তব্য। যদিও শ্বশুর-শাশুড়ি স্ত্রীর জন্য রক্ত সম্পর্কীয় পিতা-মাতা নন, কিন্তু তাদের মর্যাদা স্বামীর কারণে অনেক উচ্চে। তাদের সেবা করা নিজের পিতা-মাতার সেবা করার মতোই পুণ্যময়।

وَاعۡبُدُوا اللّٰہَ وَلَا تُشۡرِکُوۡا بِہٖ شَیۡئًا وَّبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا وَّبِذِی الۡقُرۡبٰی وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَالۡجَارِ ذِی الۡقُرۡبٰی وَالۡجَارِ الۡجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالۡجَنۡۢبِ وَابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ  وَمَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ مَنۡ کَانَ مُخۡتَالًا فَخُوۡرَا ۙ

তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী। সূরা নিসা : ৩৬

স্ত্রীর উত্তম আচরণে স্বামী তার পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালনে সহায়তা পান, যা তাকে দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী করে এবং পরিবারে শান্তি বজায় রাখে।

শ্বশুরের সেবার পাত্র মনে করে যথাসম্ভব শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও খিদমত করা দাম্পত্য জীবনে বরকত নিয়ে আসে। এই সেবার মানসিকতা দাম্পত্য বন্ধনকে আরও দৃঢ় ও মাধুর্যময় করে তোলে। যখন কোনো স্ত্রী স্বামীর পরিবারকে আপন করে নেয়, তখন সে স্বামীর চোখে আরও বেশি শ্রদ্ধার পাত্রী হয়।

দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

দাম্পত্য জীবন হলো মানব সম্পর্কের সবচেয়ে পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্ধন। এটি কেবল দুজন মানুষের মিলন নয়, বরং দুটি পরিবারের বন্ধন এবং একটি নতুন প্রজন্মের ভিত্তি। তবে, নানা কারণে এই পবিত্র সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে বা এর সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কারণগুলো মূলত ঈমান ও নৈতিকতার দুর্বলতা, যা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ধৈর্য ও ভালোবাসাকে ক্ষুণ্ণ করে।

কুরআন ও হাদিসে সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যখন স্বামী-স্ত্রী আল্লাহর দেওয়া এই বিধানগুলো থেকে দূরে সরে যায়, তখন তাদের জীবনে অশান্তি নেমে আসে। এর মধ্যে রয়েছে অহংকার, অবিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব, এবং ছোটখাটো বিষয়ে ধৈর্যহীনতা। এই কারণগুলো একটি পরিবারকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাই, দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর ও মজবুত রাখতে হলে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর সমাধান করা অপরিহার্য। প্রতিটি মুসলিম দম্পতির উচিত তাদের জীবনকে আল্লাহর দেখানো পথে পরিচালিত করা, যাতে সম্পর্কটি শুধু দুনিয়াতে নয়, আখেরাতেও কল্যাণ বয়ে আনে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার প্রধান কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরছি—

১. ঈমানের দুর্বলতা ও আল্লাহর ওপর ভরসার অভাব হলে  

যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বা যেকোনো একজনের ঈমান দুর্বল হয়, তখন তারা ধৈর্য, ক্ষমা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মতো গুণগুলো হারিয়ে ফেলে। আল্লাহর ওপর ভরসা না থাকলে সামান্য সমস্যাতেই তারা হতাশ হয়ে পড়ে এবং সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে ধৈর্য ধারণ করার এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, জীবনের সব সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জের সমাধান আল্লাহর হাতেই নিহিত। তিনি ইরশাদ করেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَالصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। সূরা বাকারা : ১৫৩

এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন যে, যখন আমরা কোনো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, তখন ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। দাম্পত্য জীবনে যখন কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তখন ঈমানদার দম্পতি ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর কাছে সমাধান চান। কিন্তু ঈমান দুর্বল হলে ধৈর্য থাকে না, ফলে সামান্য সমস্যাতেই তারা হতাশ হয়ে পড়ে এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।

وَ  مَنْ یَّتَّقِ اللّٰهَ  یَجْعَلْ لَّہٗ  مَخْرَجًا ۙ﴿۲﴾  وَّ یَرْزُقْهُ  مِنْ حَیْثُ لَا یَحْتَسِبُ ؕ وَ مَنْ  یَّتَوَكَلْ عَلَی اللّٰهِ  فَهُوَ حَسْبُہٗ ؕ… .﴿۳﴾

আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (উত্তরণের) পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাক, ৬৫:২-৩)

এই আয়াতটি বিশেষভাবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে নাযিল হয়েছে। এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, যারা তাকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে), তিনি তাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেন। দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে যারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তাদের জন্য অকল্পনীয় উপায়ে সমাধানের পথ খুলে দেন।

হাদিসেও ঈমানের দুর্বলতার কারণে দাম্পত্য জীবনের সমস্যা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সুহায়ব (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দুঃখ-মুসীবাতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর। সহীহ মুসলিম : ২৯৯৯

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, একজন প্রকৃত মুমিন তার দাম্পত্য জীবনের সুখ বা দুঃখ—উভয় পরিস্থিতিতেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে এবং ধৈর্য ধারণ করে। ঈমান দুর্বল হলে এই গুণটি হারিয়ে যায়, তখন দুঃখ-কষ্টে সে দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং সম্পর্কের ইতি টানার কথা ভাবে। এছাড়াও, আরও একটি হাদিসে বলা হয়েছে:

২৩৯৮। মুসআব ইবনু সা’দ (রহঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি (সাদ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। মানুষের মাঝে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়? তিনি বললেনঃ নবীদের বিপদের পরীক্ষা, তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা। মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। তুলনামূলকভাবে যে লোক বেশি ধাৰ্মিক তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি কেউ তার দ্বীনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে সে মোতাবিক পরীক্ষা করা হয়। অতএব, বান্দার উপর বিপদাপদ লেগেই থাকে, অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে, সে যমীনে চলাফেরা করে অথচ তার কোন গুনাহই থাকে না। সুনানে তিরমিজি : ২৩৯৮,সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০২৩

এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, জীবনে পরীক্ষা আসবেই। আর দাম্পত্য জীবনও এর ব্যতিক্রম নয়।

প্রতকারের উপায় : ঈমানদার ব্যক্তিরা এসব পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, যা তাদের সম্পর্ককে আরও মজবুত করে। কিন্তু যারা ঈমানের দুর্বলতায় ভোগে, তারা এসব পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়। আল্লাহ তায়ালার উপর যথাযত ঈমানের ও তার ওপর সকল কাজের ভরসাই দাম্পত্য জীবনে সুখ আনতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ وَعَلَی اللّٰہِ فَلۡیَتَوَکَّلِ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ

আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই; সুতরাং মু’মিনরা যেন আল্লাহ উপরই নির্ভর করে। সুরা তাগাবুন : ১৩

২. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহ সৃষ্টি হলে

অকারণে সন্দেহ একটি সুখী সংসার ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ। এটি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে বিশ্বাস, সম্মান এবং ভালোবাসার মূল ভিত্তিগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ইসলামে এই ধরনের সন্দেহ পোষণ করাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অহেতুক সন্দেহ একটি বড় ধরনের পাপ এবং এটি সমাজের মধ্যে ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ

হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ।

সূরা হুজুরাত : ১২

এই আয়াতে আল্লাহ সরাসরি অনুমান বা সন্দেহ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। দাম্পত্য জীবনে এই সন্দেহ যখন প্রবেশ করে, তখন তা স্বামী-স্ত্রীকে পরস্পরের প্রতি খারাপ ধারণা করতে বাধ্য করে, যা সম্পর্কের ভিত্তি নষ্ট করে দেয়।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। একে অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজিও না, একে অন্যের ব্যাপারে মন্দ কথায় কান দিও না এবং একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না; বরং ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখরি : ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩

এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, অহেতুক সন্দেহ একটি মিথ্যাচার, যা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে নয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যখন এই মিথ্যা প্রবেশ করে, তখন তা সত্যকে আড়াল করে দেয় এবং উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়।

সন্দেহ কীভাবে সংসার ভাঙে?

ক.  বিশ্বাস নষ্ট হয় : দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যখন একজন সঙ্গী অন্যজনকে অকারণে সন্দেহ করে, তখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা আবার ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।

খ.  মানসিক যন্ত্রণা : সন্দেহপ্রবণ সঙ্গী অপরজনকে প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসাবাদ করে, নজরদারি করে এবং তার স্বাধীনতা খর্ব করে। এটি যার ওপর সন্দেহ করা হচ্ছে, তার জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণা ও হতাশার কারণ হয়।

গ.  অসহযোগিতা ও দূরত্ব : সন্দেহ সম্পর্কের মধ্যে একটি দেয়াল তৈরি করে। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মন খুলে কথা বলতে পারে না, ফলে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।

ঘ.  অশান্তি ও ঝগড়া : সন্দেহ থেকে প্রতিনিয়ত ঝগড়া, বিবাদ এবং অশান্তি সৃষ্টি হয়। এর ফলে পারিবারিক শান্তি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

প্রতিকারের উপায় : ইসলাম দাম্পত্য জীবনে আস্থা ও নিরাপত্তার উপর জোর দিয়েছে। যখন স্বামী-স্ত্রী আল্লাহর বিধান মেনে চলে এবং একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান বজায় রাখে, তখন তাদের সম্পর্ক শক্তিশালী ও স্থায়ী হয়। অকারণে সন্দেহকে তাই পারিবারিক জীবনের জন্য একটি বিষাক্ত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত অবিশ্বাস ও সন্দেহ পরিহার করে, বিশ্বাস, সম্মান এবং ভালোবাসার মাধ্যমে পাম্পত্য জীবন গড় তোলা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ

হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ।

সূরা হুজুরাত : ১২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। একে অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজিও না, একে অন্যের ব্যাপারে মন্দ কথায় কান দিও না এবং একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না; বরং ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখরি : ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩

৩. স্বামীর সাথে স্ত্রীর অবাধ্য আচরণের ফলে  

স্ত্রীর অবাধ্যতা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি পারিবারিক শৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য। যখন স্ত্রী স্বামীর বৈধ ও শরিয়তসম্মত আদেশ-নিষেধ অমান্য করে, তখন সম্পর্কটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়।

অবাধ্যতা যেভাবে দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে

ক. পারিবারিক শৃঙ্খলার অভাব:

ইসলামে পরিবারকে একটি সুশৃঙ্খল একক হিসেবে দেখা হয়, যার নেতৃত্ব দেন স্বামী। স্ত্রীর অবাধ্যতা এই শৃঙ্খলা নষ্ট করে দেয়। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বা কোনো কাজ করতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায় এবং স্ত্রী স্বামীর সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সংসারে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি হয়।

খ. বিশ্বাস ও সম্মানের অভাব:

অবাধ্যতা মূলত স্বামীর প্রতি অসম্মানেরই বহিঃপ্রকাশ। একজন স্বামী যখন দেখতে পান যে তার স্ত্রী তার কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না বা তার বৈধ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করছেন, তখন তিনি নিজেকে অসম্মানিত ও মূল্যহীন মনে করতে পারেন। এর ফলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা কমে যায়।

গ. মানসিক চাপ ও হতাশা:

অবাধ্য স্ত্রী একজন স্বামীর জন্য মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। তিনি হতাশ হয়ে পড়েন কারণ তিনি তার পরিবারকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন না। এই হতাশা তাদের দুজনের মধ্যে আরও দূরত্ব তৈরি করে।

ঘ. কুরআন ও হাদিসের লঙ্ঘন:

ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর আনুগত্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ

পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪

আল্লাহ পুরুষদের নারীদের থেকে শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি প্রদান করেছেন। এটি আল্লাহর একটি প্রাকৃতিক বিধান, যা উভয় লিঙ্গের জন্যই উপকারী। এই শ্রেষ্ঠত্ব কোনো একতরফা ক্ষমতা নয়, বরং এটি একটি দায়িত্ব, যা পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু যখন কোন নারী আল্লাহ প্রদত্ত পুরুষে এ দায়িত্ব অস্বীকার করে তার অনুগত্য ত্যাগ করে তাহলে তার দাম্পত্য জীবনের সুখ চলে যাবে।

ঙ. সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব:

অবাধ্য স্ত্রী যখন সন্তানদের সামনে স্বামীর অবাধ্যতা করে, তখন শিশুরা তাদের মায়ের এই আচরণ দেখে শেখে যে বাবাদের অসম্মান করা যায়। এটি তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

প্রতিকারের উপায় :

স্ত্রীর অবাধ্যতা কেবল তাদের দুজনের সম্পর্কই নষ্ট করে না, বরং পুরো পরিবারের শৃঙ্খলা ও শান্তিকে ভেঙে দেয়। কোন প্রশ্ন ছাড়া ন্যায় সংগত সকল প্রকারের কাজে স্ত্রীকে স্বামীর অনুগত্য করতে হবে। স্বামী শরীয়ত বিরোধী কোন হুকুম প্রদান না করলে, স্ত্রী মান্য করতে বাধ্য। প্রতিকারে প্রদান উপাদান হলো স্বামীর অনুগত্য। 

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যদি কাউকে অন্য কোন লোকের প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে তার স্বামীর প্রতি সিজদা করার নির্দেশ দিতাম। সুনানে তিরমিজি : ১১৫৯

৪. স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে কৃতজ্ঞাবোধ না থাকার কারনে

স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা না থাকা দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার একটি অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে এটি একটি গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত। এর কারণ হলো:

ক. ভালোবাসা ও সম্মানের অভাব :

কৃতজ্ঞতা হলো ভালোবাসার একটি প্রকাশ। যখন একজন স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন না, তখন স্বামী নিজেকে মূল্যহীন ও অসম্মানিত মনে করতে পারেন। এর ফলে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে এবং ভালোবাসা কমে যায়।

খ. হাদিসের সতর্কতা :

ইবনু আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জাহান্নাম দেখানো হয়। (আমি দেখি), তার অধিবাসীদের বেশির ভাগই নারীজাতি; (কারণ) তারা কুফরী করে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘তারা কি আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে?’ তিনি বললেন, ‘তারা স্বামীর অবাধ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞ হয়।’ তুমি যদি দীর্ঘদিন তাদের কারো প্রতি ইহসান করতে থাক, অতঃপর সে তোমার সামান্য অবহেলা দেখতে পেলেই বলে ফেলে, ‘আমি কক্ষনো তোমার নিকট হতে ভালো ব্যবহার পাইনি।’ সহিহ বুখারি : ২৯, ৪৩১,৭৪৮,১০৫২,৩২০২,৫১৯৭, সহিহ মুসলিম : ৮৮৪, আহমাদ : ৩০৬৪

এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতা জাহান্নামে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে। এটি শুধু একটি মানসিক অবস্থা নয়, বরং এটি একটি গুরুতর পাপ।

গ. পারিবারিক শান্তি নষ্ট হওয়া :

কৃতজ্ঞতা না থাকলে স্ত্রী তার স্বামীর ভালো কাজগুলোকে তুচ্ছ মনে করতে পারে। এতে স্বামী হতাশ হয়ে পড়ে এবং সাংসারিক দায়িত্ব পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে সংসারে অশান্তি ও কলহ বৃদ্ধি পায়।

ঘ. নেতিবাচকতা ও অভিযোগ :

অকৃতজ্ঞ স্ত্রী সবসময় স্বামীর খারাপ দিকগুলো নিয়ে অভিযোগ করে। এই ধরনের নেতিবাচক মনোভাব সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করে এবং উভয়কে মানসিকভাবে পীড়িত করে।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি সুখী ও সফল দাম্পত্য জীবনের জন্য অপরিহার্য। এটি শুধু সম্পর্ককে মজবুত করে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন করে।

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা সেই মহিলার প্রতি চেয়েও দেখবেন না, যে তার স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না। অথচ সে তার মুখাপেক্ষিণী। হা্দিস সম্ভার : ২৬০৬সুনানে নাসায়ি কুবরা : ৯১৩৫, ত্বাবারানী, বাযযার : ২৩৪৯, হাকেম : ২৭৭১, বাইহাকী : ১৪৪৯৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ২৮৯

৫. স্ত্রীর ওপর স্বামীর অন্যায় ও নির্যাতনের ফলে

স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর প্রতি অন্যায় ও নির্যাতন একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে গুরুতর কারণগুলোর মধ্যে একটি। এটি শুধু সম্পর্কের বিশ্বাস ও ভালোবাসা নষ্ট করে না, বরং এটি ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলামে এই ধরনের আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নির্যাতন কেন সম্পর্ক নষ্ট করে?

ক. কুরআনের নির্দেশনা লঙ্ঘন:

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন-

فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا

আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯

এই আয়াতে আল্লাহ পুরুষদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের স্ত্রীর সাথে সুন্দর ও ভদ্র আচরণ করে। নির্যাতন এই নির্দেশের সরাসরি লঙ্ঘন।

খ. রাসূল ﷺ-এর আদর্শের পরিপন্থী:

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের প্রতি সর্বদা অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহপরায়ণ ছিলেন। তিনি কখনোই তাদের ওপর কঠোরতা বা নির্যাতন করেননি।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ ২৮৫।

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, একজন ভালো মুসলিম পুরুষ তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোচ্চ দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন করবে। নির্যাতন এই আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।

গ. বিশ্বাস ও ভালোবাসার অভাব : একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা। যখন স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি শারীরিক, মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতন চালায়, তখন সেই বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে যায়। স্ত্রী তার স্বামীকে আর নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করে না, বরং ভয় ও আতঙ্কের উৎস হিসেবে দেখে।

ঘ. মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি : নির্যাতন শুধু শারীরিক আঘাতই নয়, এটি স্ত্রীর মানসিক স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি করে। এটি হতাশা, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব সৃষ্টি করে। একটি পরিবারে শান্তি ও সুখ তখনই আসতে পারে যখন উভয় সঙ্গী মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে। নির্যাতন সেই সুস্থতাকে নষ্ট করে দেয়।

ঙ. পারিবারিক অবক্ষয় : একটি নির্যাতিত পরিবারে সন্তানরা নেতিবাচক পরিবেশের শিকার হয়। তারা সহিংসতা ও অসম্মান দেখে বড় হয়, যা তাদের মানসিক বিকাশে বাধা দেয় এবং ভবিষ্যতে তারাও একই ধরনের আচরণ করতে শিখতে পারে।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর প্রতি অন্যায় ও নির্যাতন কেবল একটি ব্যক্তিগত ভুল নয়, বরং এটি একটি গুরুতর পাপ এবং একটি সুস্থ পরিবার গঠনের পথে একটি বড় বাধা। এটি সম্পর্কের ভিত্তি, অর্থাৎ ভালোবাসা ও বিশ্বাসকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয় এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়।

আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিলেন, অতঃপর মহিলাদের উল্লেখ করে তাদের ব্যাপারে লোকজনকে উপদেশ দিলেন। তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ কেন তার স্ত্রীকে দাসীর মত বেত্রাঘাত করে? অথচ দিনের শেষেই সে আবার তার শয্যাসঙ্গী হয়! সহিহ বুখারি : ৫২০৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৩, সুনানে তিরমিযী : ৩৩৪৩, আহমাদ : ১৫৭৮৮, দারেমী : ২২২০, ইরওয়াহ : ২০৩১

৫. স্বামী বা স্ত্রীর অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা ফলে

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা দাম্পত্য জীবন ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এটি কুরআন-হাদিসে নিন্দিত হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা দাম্পত্য জীবনে কি কি প্রভাব পড়ে তান নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-

ক. পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব তৈরি হয়

যখন স্বামী বা স্ত্রী নিজেদের মতামতকেই সঠিক ধরে নেয় এবং মানতে জিদ ধরে, তখন পারস্পরিক আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ

আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। সুরা রুম : ২০

অতিরিক্ত জিদ থাকলে এই ভালোবাসা ও রহমত ভেঙে যায়।

খ. ছোট সমস্যা বড় সংঘাতে রূপ নেয়

দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো মতভেদ স্বাভাবিক, কিন্তু জিদ-হঠকারিতা এগুলোকে বড় ঝগড়ায় পরিণত করে।

’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর কাছে সর্বাধিক ঘৃণ্য ঐ ব্যক্তি, যে সব সময় ঝগড়ায় লিপ্ত থাকে। সহহি বুখঅই : ২৪৫৭, ৭১৮৮, সহিহ মুসলিম : ৩৬৬৮

গ. ক্ষমা ও দয়া হারিয়ে যায়

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হলো দয়া, ক্ষমা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা। কিন্তু জিদী স্বভাব থাকলে কেউই ছাড় দিতে চায় না।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮

কিন্তু জিদ মানুষকে ক্ষমা করতে বাধা দেয়। ফলে সম্পর্ক শীতল হয়ে যায়।

ঘ. শান্তি ও সুখ হারিয়ে যায়

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। সুরা রূম : ২১

কিন্তু জিদী মনোভাব থাকলে সম্পর্ক টানটান হয়ে থাকে, শান্তি চলে যায়। অনেক সময় এ ধরনের হঠকারিতা তালাক পর্যন্ত গড়ায়।

ঙ. শয়তানের সুযোগ সৃষ্টি হয়

জাবির (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ইবলীস পানির উপর তার আরশ স্থাপন করতঃ তার বাহিনী প্রেরণ করে। তন্মধ্যে তার সর্বাধিক নৈকট্য অর্জনকারী সে-ই যে সবচেয়ে বেশী ফিতনাহ সৃষ্টিকারী। তাদের একজন এসে বলে, আমি অমুক অমুক কাজ করেছি। সে বলে, তুমি কিছুই করনি। অতঃপর অন্যজন এসে বলে, অমুকের সাথে আমি সকল প্রকার ধোকার আচরণই করেছি। এমনকি তার থেকে তার স্ত্রীকে আলাদা করে দিয়েছি। তারপর শাইতান (শয়তান) তাকে তার নিকটবর্তী করে নেয় এবং বলে হ্যাঁ, তুমি খুব ভাল। রাবী আ’মাশ বলেন, আমার মনে হয় তিনি বলেছেনঃ অতঃপর শাইতান (শয়তান) তার সাথে আলিঙ্গন করে।সহিহ মুসলিম : ২৮১৩

প্রতিকারের উপায় :

অতিরিক্ত জিদ ও হঠকারিতা দাম্পত্য জীবনের বোঝাপড়া নষ্ট করে। স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা ও দয়া কমিয়ে দেয়। ছোট সমস্যাকে বড় করে তোলা হয়। যে সুযোগ নিয়ে শয়তান দাম্পত্য জীবন ধ্বংস করে দেয়। জেদ থেকেই মানুষের ক্রোদ্ধ বা রাগের সৃষ্টি হয়ে। তাই রাগ পরিহার করার চেষ্টা করি।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, তুমি রাগ করবে না। লোকটি কয়েকবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করল। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও প্রত্যেক বারই বললেন, তুমি রাগ করো না। সহিহ বুখারী : ৬১১৬, মিশকাত : ৫১০৪, সুনানে তিরমিযী : ২০২০, সহীহ আত্ তারগীব : ২৭৪৫,  আহমাদ : ২০৩৫৭, আবূ ইয়া‘লা : ৬৮৩৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৬৮৯, শু‘আবুল ঈমান : ৮২৭৭,

৭. স্বামী সামর্থ অনুসারে আর্থিক দায়িত্ব পালন না করার ফলে

ইসলামে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক। এটি স্বামীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বরেন-

لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ  وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰىہُ اللّٰہُ ؕ  لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىہَا ؕ  سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا 

সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিজক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন। সূরা তালাক : ৭

মুয়াবিযা বিন হাইদাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলো, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেনঃ সে আহার করলে তাকেও (একই মানের) আহার করাবে, সে পরিধান করলে তাকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে কখনও তার মুখমণ্ডল আঘাত করবে না, অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকী ত্যাগ করবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪২, ইরওয়াহ : ২০৩, মিশকাত : ৩২২৯, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫৮-১৮৬১।

আবূ মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাবী বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে? তিনি বললেন, (হাঁ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ সওয়াবের আশায় কোন মুসলিম যখন তার পরিবার-পরিজনের প্রতি ব্যয় করে, তা তার সাদাকা হিসাবে গণ্য হয়। সহিহ বুখারি : ৫৩৫১, সহিহ মুসলিম : ১০০২, আহমাদ : ১৭০৮১

প্রতিকারের উপায় :

উপরের কুরআন ও হাদিস প্রমান কর- স্বামীর প্রধান দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা) নিশ্চিত করা, তা সে স্ত্রী যতই ধনী হোক না কেন। স্ত্রীর উপার্জন থাকুক বা না থাকুক, এই দায়িত্ব স্বামীর কাঁধে। অন্যদিকে, স্ত্রী তার উপার্জিত অর্থ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ বা মোহরানার সম্পূর্ণ মালিক। এই সম্পদ থেকে তিনি কাকে দেবেন বা কীভাবে খরচ করবেন, তা নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার আছে। স্বামী যদি তার সামর্থ অনুসারে স্ত্রীকে ভরণ পোষণ প্রদান করে, তবে দাম্পত্য জীবনে শান্তি এসে যাবে।

দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৮. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের গীবত বা পরনিন্দা করার ফলে

পরনিন্দা ও গীবত (অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা) একটি দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে এটি একটি মারাত্মক পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই ধরনের আচরণ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস, ঘৃণা এবং দূরত্ব তৈরি করে।

কেন পরনিন্দা ও গীবত দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে?

ক. বিশ্বাস ও সম্মান নষ্ট হওয়া :

যখন একজন সঙ্গী অন্য কারো কাছে তার জীবনসঙ্গীর দোষ-ত্রুটি বা দুর্বলতা নিয়ে কথা বলে, তখন তা তাদের মধ্যকার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সম্মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। স্বামী বা স্ত্রী যখন জানতে পারে যে তার গোপনীয় বিষয় অন্য কারো কাছে ফাঁস করা হয়েছে, তখন সে নিজেকে অসম্মানিত ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার মনে করে।

খ. পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি :

গীবত ও পরনিন্দা পারিবারিক অশান্তি ও কলহ বাড়িয়ে দেয়। যখন একজন তার সঙ্গীর পরিবারের সদস্যদের বা বন্ধুদের কাছে তার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলে, তখন সেই সম্পর্কগুলোও খারাপ হয়ে যায়। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও ঝগড়া বৃদ্ধি পায়।

গ. রাসূল -এর আদর্শের পরিপন্থী :

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) পরনিন্দা ও গীবত থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে বলেছেন। তিনি গীবতকে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَّلَا تَجَسَّسُوۡا وَلَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡہِ مَیۡتًا فَکَرِہۡتُمُوۡہُ ؕ

আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। সুরা হুজরাত : ১২

এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, গীবত একটি জঘন্য কাজ। একজন মুসলিম স্বামী-স্ত্রীকে তাদের সম্পর্ককে এই ধরনের পাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

ঘ. নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি :

গীবত করা ব্যক্তিকে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা ও সমালোচনায় অভ্যস্ত করে তোলে। এতে তারা তাদের সঙ্গীর ভালো দিকগুলো দেখতে ব্যর্থ হয় এবং সবসময় তার দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়। এর ফলে তাদের সম্পর্ক থেকে ভালোবাসা ও ইতিবাচকতা দূর হয়ে যায়।

ঙ. দাম্পত্য ভাঙনের পথ তৈরি হয় :

গীবতের ফলে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ জমে যায়, ছোট সমস্যা বড় হয়ে বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যেতে পারে। হুযায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেনঃ আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি-

لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ ‏‏

চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সহিহ বুখারি : ৬০৫৬, সুনানে তিরমিজি : ২০৩২

স্বামী-স্ত্রীর ত্রুটি প্রচার করে বেড়ানো আসলে চোগলখোরিরই এক রূপ, যা দাম্পত্য ভাঙনের অন্যতম কারণ।

প্রতিকারের উপায় :

পরনিন্দা ও গীবত একটি দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য বিষাক্ত উপাদানের মতো। এটি ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সম্মানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে ভাঙনের দিকে এগিয়ে যায়। তাই গিবতে ভয়াবহতা জেনে ও নিজেদের সুখের কথা ভেবে স্বামী স্ত্রী উভয়ের উচিত গিবত পরিহার করে চলে।

আবূ বারজা আসলামী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ’’হে সেই মানুষের দল; যারা মুখে ঈমান এনেছে এবং যাদের হৃদয়ে ঈমান স্থান পায়নি (তারা শোন)! তোমরা মুসলিমদের গীবত করো না এবং তাদের দোষ খুঁজে বেড়ায়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি তাদের দোষ খুঁজবে, আল্লাহ তার দোষ ধরবেন। আর আল্লাহ যার দোষ ধরবেন তাকে তার ঘরের ভিতরেও লাঞ্ছিত করবেন।’’ হাদিস সম্ভার : ২৯৭৩, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮৮২, সহীহুল জামে : ৭৯৮৪

আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করবে, কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুন থেকে তার চেহারাকে রক্ষা করবেন। সুনান তিরমিযী : ১৯৩১, হাদিস সম্ভার : ২৯৭৬

৯. দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা ফাঁস করা  

দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা প্রকাশ করা একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে গুরুতর কারণগুলোর মধ্যে একটি। ইসলামে এই কাজকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এটি সম্পর্কের পবিত্রতা, বিশ্বাস এবং সম্মান সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।

কেন গোপন কথা প্রকাশ করা দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে?

ক. বিশ্বাসভঙ্গ ও আমানতের খেয়ানত :

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো বিশ্বাস ও আমানতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একে অপরের কাছে তারা নিজেদের সবচেয়ে গোপন ও ব্যক্তিগত কথাগুলো শেয়ার করে। যখন এই কথাগুলো অন্য কারো কাছে প্রকাশ করা হয়, তখন তা আমানতের খেয়ানত হয় এবং সম্পর্কের মূল ভিত্তি, অর্থাৎ বিশ্বাস, ভেঙে যায়। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা আর সহজে ফিরে আসে না।

খ. ইসলামী নৈতিকতার লঙ্ঘন :

ইসলামে গোপনীয়তা রক্ষা করাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করা একটি জঘন্য পাপ।

বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

গ. সম্মানহানি ও মানসিক যন্ত্রণা :

স্বামীর গোপন কথা ফাঁস হলে স্ত্রীর সম্মানহানি হয় এবং স্ত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এটি তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে। অপরদিকে, স্ত্রীর গোপন কথা ফাঁস হলে স্বামীও সমাজে অসম্মানিত হন। এর ফলে উভয়ই মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন।

ঘ. সম্পর্কের অবনতি ও দূরত্ব:

স্বামী-স্ত্রী যখন জানতে পারে যে, তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রকাশ করা হয়েছে, তখন তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তারা একে অপরের সাথে খোলামেলাভাবে কথা বলতে ভয় পায়, কারণ তারা মনে করে যে তাদের কথা আবারও প্রকাশ করা হতে পারে। এই দূরত্ব একসময় সম্পর্ককে ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়।

ঙ. পারিবারিক ও সামাজিক ফিতনা :

গোপন কথা প্রকাশ করা কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি তাদের পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যেও ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে। এর ফলে উভয় পরিবারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও ঘৃণা তৈরি হতে পারে, যা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা প্রকাশ করা হলো সম্পর্কের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এটি বিশ্বাস, সম্মান এবং ভালোবাসাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয় এবং একটি সুখী দাম্পত্য জীবনকে বিষাক্ত করে তোলে। তাই কোন অবস্থায়ই নিজেদের দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা প্রকাশ করা যাবে না। সব সয়ম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কঠিন হুসিয়ারির কথা মনে করবে।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

১০. অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা

অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার একটি বড় কারণ। ইসলামে এই ধরনের মানসিকতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কারণ এটি কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির মতো মৌলিক গুণগুলোকে নষ্ট করে দেয়। অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা ক্ষতিকর দিকগুলো হলো-

ক. আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা:

আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন রিজিক ও নেয়ামত দান করেছেন। যখন একজন ব্যক্তি অন্যের সংসার বা জীবন দেখে নিজের সংসারের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়, তখন সে প্রকারান্তরে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে অস্বীকার করে। এই অকৃতজ্ঞতা পারিবারিক জীবন থেকে বরকত ও শান্তি দূর করে দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে-

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ

আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সূরা ইবরাহীম, : ৭

খ. মানসিক চাপ ও হতাশা:

সামাজিক মাধ্যমে বা বাস্তবে অন্যের সুখী জীবনের দৃশ্য দেখে নিজের জীবনে তা না পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। তারা ভুলে যান যে, মানুষ সাধারণত তার জীবনের ভালো দিকগুলোই প্রকাশ করে, খারাপ দিকগুলো নয়। এই ধরনের তুলনা মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং সম্পর্কের মধ্যে হতাশা ও নেতিবাচকতা তৈরি করে।

গ. পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ও ঝগড়া:

যখন একজন স্ত্রী বা স্বামী অন্যের জীবনের সাথে নিজেদের জীবনকে তুলনা করে, তখন তারা তাদের সঙ্গীকে দোষারোপ করা শুরু করে। যেমন: “অমুকের স্বামী তো তার স্ত্রীকে অনেক কিছু কিনে দেয়, তুমি কেন পারো না?” অথবা “অমুকের স্ত্রী এত ভালো, তুমি কেন এমন নও?” এই ধরনের অভিযোগগুলো পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ঝগড়ার জন্ম দেয়, যা সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে।

ঘ. সম্পর্কের মৌলিকত্ব নষ্ট হওয়া:

প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কের নিজস্ব গতিপথ এবং সৌন্দর্য আছে। অন্যের সাথে নিজের সম্পর্ককে তুলনা করলে সম্পর্কের এই মৌলিকত্ব নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে, ভালোবাসার চেয়ে ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

ঙ. সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব:

যখন বাবা-মা অন্যের সংসার দেখে নিজেদের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকেন, তখন তাদের এই নেতিবাচক মানসিকতা সন্তানদের ওপরও প্রভাব ফেলে। শিশুরা শেখে যে, তাদের পরিবার যথেষ্ট ভালো নয়, যা তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে এবং তাদেরকে অকৃতজ্ঞ হতে শেখায়।

প্রতিকারের উপায় :

অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা হলো একটি বিষাক্ত অভ্যাস, যা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা, মানসিক অশান্তি এবং পারিবারিক কলহের জন্ম দেয়। এর পরিবর্তে, স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত নিজেদের সম্পর্কের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং একে অপরের ভালো দিকগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। সব সময় নিজের অবস্থান থেকে নিচে অবস্থান প্রতি লক্ষ করে কৃতজ্ঞ থাকা।

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ এমন ব্যক্তির দিকে তাকাবে, যাকে সম্পদ ও দৈহিক গঠনে তার উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তখন সে যেন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে এসব দিক থেকে তার চেয়ে নিম্নমানের। সহিহ বুখারি : ৬৪৯০, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৩

১১. শ্বশুর-শাশুড়ি বা আত্মীয়দের অন্যায় হস্তক্ষেপের ফলে

শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য আত্মীয়দের অন্যায় হস্তক্ষেপ একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে দাম্পত্য জীবনকে একটি স্বাধীন ও পবিত্র সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের জীবন নিজেরাই পরিচালনা করবে। যখন এই সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের অন্যায় হস্তক্ষেপ হয়, তখন নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। অন্যায় হস্তক্ষেপ দাম্পত্য জীবন যে বিষয়গুলো নষ্ট হয় তা হলো-

ক. সীমানা লঙ্ঘন ও গোপনীয়তা নষ্ট:

দাম্পত্য জীবনের কিছু বিষয় অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও গোপনীয়। যখন স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করে, তখন সেই সম্পর্কের সীমানা ভেঙে যায়। এর ফলে সম্পর্কের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা বোধ নষ্ট হয়।

খ. বিশ্বাস ও ভালোবাসার অভাব:

বহিরাগত হস্তক্ষেপের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় একজন সঙ্গী তার বাবা-মা বা আত্মীয়দের পক্ষ নেয়, যা অপর সঙ্গীর মনে আঘাত দেয় এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এটি তাদের মধ্যকার ভালোবাসা ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

গ. অতিরিক্ত মানসিক চাপ:

শ্বশুর-শাশুড়ির চাপ বা অন্য আত্মীয়দের অন্যায় আবদার স্বামী-স্ত্রীর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। তাদের নিজেদের সমস্যা সমাধানের সুযোগ কমে যায় এবং তারা অন্যের ইচ্ছার কাছে নিজেদেরকে অসহায় মনে করে। এর ফলে সংসারে অশান্তি ও কলহ বৃদ্ধি পায়।

ঘ. সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা:

দাম্পত্য জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেমন: সন্তানের ভবিষ্যৎ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। যখন এই সিদ্ধান্তগুলো বাইরের লোকের প্রভাবে প্রভাবিত হয়, তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা কমে যায়।

ঙ. কুরআন ও হাদিসের পরিপন্থী:

ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, বিয়ের পর স্ত্রী তার স্বামীর ঘরে পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে। একইভাবে, স্বামীরও উচিত তার স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করা এবং পরিবারের অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে তাকে রক্ষা করা।

আবদুল্লাহ [ইবনু ‘উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮

একজন স্বামীর দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

প্রতিকারের উপায় :

শ্বশুর-শাশুড়ি বা আত্মীয়দের অন্যায় হস্তক্ষেপ একটি দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য বিষাক্ত। এটি স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং শান্তিকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়। তাই এ অন্যায় ও অবেধ হস্তক্ষেপ পরিহার করতে হবে।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ হলো, সে যেসব কাজে তার কোনো দায়িত্ব নেই, সে সেসব থেকে বিরত থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২৩১৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৬

১২. হারাম উপার্জন করার ফলে

হারাম উপার্জনের ফলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়, বরং এর মারাত্মক প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। হারাম উপার্জনের দাম্পত্য জীবন উপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তা হলো-

ক. মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি নষ্ট হওয়া

হারাম উপার্জনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মানসিক শান্তি ও আত্মিক প্রশান্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। সূরা রাদ : ২৮

যখন কোনো পরিবারে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা হয়, তখন সেখানে আল্লাহর বরকত থাকে না। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই মানসিক চাপ ও অশান্তিতে ভোগে, কারণ তারা জানে যে তাদের উপার্জনে আল্লাহর কোনো রহমত নেই। এই অশান্তি দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

খ. দোয়া কবুল না হওয়া

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ তা’আলা তার প্রেরিত রসূলদের যে হুকুম দিয়েছেন মুমিনদেরকেও সে হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-

হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভাল কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত। সূরা আল মুমিনূন : ৫১

তিনি (আল্লাহ) আরো বলেছেন-

তোমরা যারা ঈমান এনেছো শোনা আমি তোমাদের যে সব পবিত্র জিনিস রিযক হিসেবে দিয়েছি তা খাও”। সূরা বাকারা : ১৭২

অতঃপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে সে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, “হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দু’আ তিনি কী করে কবুল করতে পারেন?” সহীহ মুসলিম : ১০১৫

যদি স্বামী-স্ত্রীর দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল না হয়, তাহলে তাদের দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলো সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তারা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারে না, কারণ তাদের উপার্জনই দোয়া কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

গ. পারিবারিক বরকত চলে যাওয়া

হারাম উপার্জন পরিবার থেকে আল্লাহর বরকতকে ছিনিয়ে নেয়। এমনকি যদি উপার্জন অনেক বেশি হয়, তবুও তাতে কোনো কল্যাণ থাকে না। এই উপার্জনে কেনাকাটা করা জিনিসপত্র, ঘর-বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি বা আনন্দ থাকে না। এর ফলে, সামান্য কিছু নিয়েও ঝগড়া, অশান্তি এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়।

ঘ. চারিত্রিক অবক্ষয়

যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার চরিত্রে সততা ও আমানতদারি থাকে না। এই খারাপ স্বভাব তার দাম্পত্য জীবনেও প্রতিফলিত হয়। সে তার স্ত্রীর প্রতি বা স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি মিথ্যাচার, প্রতারণা এবং বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়, যা সম্পর্ককে ভেঙে দেয়।

ঙ. সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব

হারাম উপার্জনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর। হারাম খাদ্য গ্রহণকারী সন্তানেরা স্বভাবগতভাবে অবাধ্য, বেয়াদব এবং খারাপ চরিত্রের অধিকারী হতে পারে। বাবা-মায়ের অনৈতিক উপার্জনের কারণে তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দেয়। এর ফলে দাম্পত্য জীবনের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রতিকারের উপায় :

হারাম উপার্জন শুধু একটি আর্থিক অন্যায় নয়, বরং এটি একটি আত্মিক ও নৈতিক বিপর্যয়, যা দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ধ্বংস করে দেয়। তাই পাম্পত্য জীবন ও পরকাল জাহান্নাম থেকে বাচতে হারাম বর্জনের কোন বিকল্প নাই।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দেহের গোশত হারাম উপার্জনে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম ধন-সম্পদে গঠিত ও লালিত পালিত দেহের জন্য জাহান্নামই উপযোগী। মিশকাত : ২৭৭২, আহমাদ : ১৪৪১, শু‘আবুল ঈমান : ৮৯৭২, দারিমী : ২৭৭৯।

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ)-এর একজন ক্রীতদাস ছিল। সে প্রতিদিন তার উপর ধার্য কর আদায় করত। আর আবূ বকর (রাঃ) তার দেওয়া কর হতে আহার করতেন। একদিন সে কিছু খাবার জিনিস এনে দিল। তা হতে তিনি আহার করলেন। তারপর গোলাম বলল, আপনি জানেন কি ওটা কিভাবে উপার্জিত করা হয়েছে যা আপনি খেয়েছেন? তিনি বললেন, বলত কিভাবে? গোলাম উত্তরে বলল, আমি জাহিলী যুগে এক ব্যক্তির ভবিষ্যৎ গণনা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভবিষ্যৎ গণনা করা আমার ভালভাবে জানা ছিল না। তথাপি প্রতারণা করে তা করেছিলাম। আমার সাথে তার দেখা হলে গণনার বিনিময়ে এ দব্যাদি সে আমাকে হাদীয়া দিল যা হতে আপনি আহার করলেন। আবূ বকর (রাঃ) এটা শুনামাত্র মুখের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং পেটের ভিতর যা কিছু ছিল সবই বমি করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৩৮৪২, মিশকাত : ২৭৮৬, সহীহ আত্ তারগীব : ১৭৩৮

১৩. অতিরিক্ত ক্রোধ ও রাগ নিয়ন্ত্রণ না করা

অতিরিক্ত ক্রোধ ও রাগ নিয়ন্ত্রণ না করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়। দাম্পত্য সম্পর্ক আসলে ভালোবাসা, ধৈর্য ও পারস্পরিক সহনশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন স্বামী-স্ত্রী কেউ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন কয়েকভাবে সংসার নষ্ট হতে থাকে—

ক. কটু কথা ও আঘাতমূলক আচরণ

রাগের সময় মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। তখন স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে কটু কথা বলে বসে বা এমন আঘাতমূলক বাক্য উচ্চারণ করে, যা পরে ক্ষমা চাইলেও মনে দাগ রেখে দেয়। এই কটু ভাষা ভালোবাসার বাঁধন ছিন্ন করে দেয়।

খ. ছোট বিষয়কে বড় করে তোলা

রাগ অনিয়ন্ত্রিত হলে ক্ষুদ্র বিষয়ও বড় হয়ে যায়। তুচ্ছ ভুল নিয়ে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়, যা ধীরে ধীরে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে।

গ. শারীরিক সহিংসতায় রূপ নেওয়া

অনেক সময় রাগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে শারীরিক সহিংসতা পর্যন্ত চলে যায়। এতে সংসার ভেঙে যাওয়া বা আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ঘ. বিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতা নষ্ট হওয়া

একজন সঙ্গীর রাগের কারণে অপরজন সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাস কমে যায় এবং নিরাপত্তার অনুভূতি হারিয়ে যায়।

ঙ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব

যদি স্বামী-স্ত্রী সবসময় রাগ ও ঝগড়ায় লিপ্ত থাকে, তবে সন্তানরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা ভীতু, আক্রমণাত্মক বা মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ে।

চ. ভালোবাসা ও দয়া হারিয়ে যাওয়া

দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা, দয়া ও ক্ষমাশীলতা। রাগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন এসব সুন্দর গুণ ধীরে ধীরে মরে যায় এবং সম্পর্ক শুধুই ঝগড়া-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনকে টিকিয়ে রাখতে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। ইসলামও আমাদেরকে রাগ দমন করতে বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছে। যখন স্বামি-স্ত্রী তাদের অতিরিক্ত ক্রোধ বা রাগ নিয়ন্ত্রণ করবে, তখন তারা দাম্পত্য জীবনের ভয়াবহ ক্ষতির থেকে রক্ষা পাবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ فِی السَّرَّآءِ وَالضَّرَّآءِ وَالۡکٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَالۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ  وَاللّٰہُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ۚ

যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন। সুরা আর ইমরান : ১৩৪

আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সহিহ বুখারি : ৬১১৪, সহিহ মুসলিম : ২৬০৯, আহমাদ : ৭২২৩

১৪. অতি ব্যয়বহুল জীবনযাপন ও অপচয়

অতি ব্যয়বহুল জীবনযাপন (luxury life) এবং অপচয় (israf) দাম্পত্য জীবন ধ্বংস করার অন্যতম কারণ। কারণ সংসারের প্রকৃত সুখ আসে না বাহুল্য প্রদর্শনী বা বিলাসিতায়; বরং আসে সরলতা, পরস্পরের ভালোবাসা, শান্তি ও সহযোগিতায়। অতি ব্যয়বহুলতা ও অপচয় দাম্পত্য জীবনে যেভাবে ক্ষতি আনে—

ক. আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়

অযথা বিলাসিতা ও অপচয় সংসারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। আয় কম হলে ঋণগ্রস্ত হতে হয়, আর আয় বেশি হলেও কখনো সন্তুষ্টি আসে না। ফলে সংসারে অশান্তি শুরু হয়।

খ. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ে

অতিরিক্ত খরচ করার প্রবণতা থাকলে একসময় অপর পক্ষ বিরক্ত হয়ে পড়ে। স্বামী যদি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল জীবনযাপন করতে চায় কিন্তু স্ত্রী বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়, বা উল্টোটা হয়, তখন ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয়।

গ. আত্মীয়স্বজন ও সমাজের সাথে প্রতিযোগিতা

অতি ব্যয়বহুল জীবনযাপনের পেছনে অনেক সময় সামাজিক প্রতিযোগিতা কাজ করে—“কে কত বেশি দেখাতে পারে।” এ প্রতিযোগিতা দাম্পত্য সম্পর্কে অহংকার, হিংসা ও অসন্তোষ ঢুকিয়ে দেয়।

ঘ. সরলতা ও কৃতজ্ঞতা হারিয়ে যায়

যখন জীবনে অপচয় ও বিলাসিতা বাড়ে, তখন মানুষ সামান্যতে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। ফলে দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত সুখ, সরলতা, কৃতজ্ঞতা, তৃপ্তি ইত্যাদি সব হারিয়ে যায়।

ঙ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব

অতি বিলাসিতা দেখে সন্তানরা ছোট থেকেই অপচয়ের অভ্যাস রপ্ত করে। পরে তারা চাহিদাপূর্ণ, অসহিষ্ণু ও স্বার্থপর হয়ে ওঠে, যা পুরো পরিবারের জন্য ক্ষতিকর।

চ. আল্লাহর অসন্তুষ্টি

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” সূরা বানী ইসরাঈল : ২৭

অপচয় আল্লাহর নাফরমানির কাজ। যখন সংসারে অপচয় হয়, তখন তা বরকতহীন হয়ে যায়।

ছ. দাম্পত্য ভালোবাসা ও শান্তি নষ্ট হয়

যখন সংসারের বড় অংশ অর্থকেন্দ্রিক ঝগড়ায় জড়িয়ে যায়, তখন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাধুর্য ও পারস্পরিক ভালোবাসা কমে যায়। তখন ঘর শুধু অর্থের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, আশ্রয়ের স্থান আর থাকে না।

প্রতিকার উপায় :

দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতে হলে সাধারণ জীবনযাপন, পরিমিত ব্যয়, কৃতজ্ঞতা এবং অপচয় থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। ইসলাম আমাদেরকে সব সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের আদেশ দিয়ে বলেন-

وَکَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَہِیۡدًا ؕ

আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। সূরা বাকারাহ : ১৪৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَجۡعَلۡ یَدَکَ مَغۡلُوۡلَۃً اِلٰی عُنُقِکَ وَلَا تَبۡسُطۡہَا کُلَّ الۡبَسۡطِ فَتَقۡعُدَ مَلُوۡمًا مَّحۡسُوۡرًا

তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়োনা; তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হবে। সূরা বানী ইসরাঈল : ২৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৭

১৫. যৌন চাহিদা পূরণে অবহেলা করার ফলে

যৌন চাহিদা দাম্পত্য জীবনের অন্যতম স্বাভাবিক ও মৌলিক অধিকার। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, মানসিক প্রশান্তি এবং সংসারের স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই এই চাহিদা পূরণের উপর নির্ভর করে। যদি এ বিষয়ে অবহেলা করা হয়, তবে দাম্পত্য জীবন নানা দিক থেকে ভেঙে পড়তে শুরু করে। তা কয়েকভাবে বোঝা যায়—

ক. মানসিক অশান্তি ও হতাশা

যৌন চাহিদা পূরণ না হলে স্বামী বা স্ত্রী মানসিকভাবে হতাশ, রূঢ় বা বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। এতে সংসারে অশান্তি ও ঝগড়া বাড়তে থাকে।

খ. পারস্পরিক দূরত্ব বৃদ্ধি

যখন দাম্পত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ অবহেলিত হয়, তখন স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা কমে যায়। একে অপরের প্রতি আকর্ষণ ও মমতা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

গ. অন্যায় ও গুনাহের দিকে ধাবিত হওয়া

যৌন চাহিদা বৈধ পথে পূরণ না হলে মানুষ অনেক সময় অবৈধ উপায়ে (ব্যভিচার, হস্তমৈথুন, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদি) সেই অভাব পূরণ করতে যায়। এতে আল্লাহর গজব ও সংসার ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ঘ. বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভাঙন

যদি এক পক্ষ বারবার অবহেলা করে, অন্য পক্ষ মনে করে—“সে আমাকে ভালোবাসে না, আমায় গুরুত্ব দেয় না।” এই ধারণা বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভাঙন ঘটায়।

ঙ. বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ

শারীরিক সম্পর্কের অভাব বা অবহেলা অনেক সময় সরাসরি বিবাহ বিচ্ছেদ বা দ্বিতীয় বিয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামী ফিকহেও স্বামী-স্ত্রীর যৌন অধিকার না দেওয়া “নুশূয” বা অবাধ্যতার অন্তর্ভুক্ত।

চ. সন্তান জন্ম ও পরিবার গঠনে বাধা

দাম্পত্য জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সন্তান জন্মদান ও পরিবার গঠন। যৌন সম্পর্কে অবহেলা করলে এ স্বাভাবিক উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।

প্রতিকারের উপায় :  

যৌন সম্পর্ক দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শারীরিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই দম্পতিদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। তাই এই বিষয়ে অবহেলা করলে তা ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয় এবং একসময় তা ভেঙে দিতে পারে। যত দ্রুত সম্ভম নিজেদের মধ্যকার ভুল বুঝাবুঝি দুর করে যৌন চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হতে হবে। তাই দাম্পত্য জীবন সুন্দর ও স্থায়ী রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রীর জন্য যৌন চাহিদা পূরণ করা পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব এবং ইবাদতের অংশ।

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায় আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে ফেরেশ্তাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। সহিহ বুখারি : ৩২৩৭, ৫১৯৩, ৫১৯৪, সহিহ মুসলিম ; ১৪৩৬, আহমাদ : ৯৬৭৭

দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার কারন : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১৬. স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে অপমান করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ দাম্পত্য শুধু দু’জন মানুষের সম্পর্ক নয়; বরং দুটি পরিবার ও বংশের সংযোগও বটে। যখন স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের পরিবারকে ছোট করে দেখে বা অপমান করে, তখন এর প্রভাব সরাসরি সংসারের ভেতরে পড়ে।

ক. ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়ে যায়

স্বামী বা স্ত্রী তার নিজের পরিবারকে নিজের মর্যাদার অংশ মনে করে। যখন কেউ তার পরিবারকে অপমান করে, তখন সে মনে করে, আসলে আমাকেই হেয় করা হলো। এতে ভালোবাসা ও সম্মান নষ্ট হয়।

খ. স্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়

পরিবারকে অপমান করার কথা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। এতে অন্তরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ জন্ম নেয়, যা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

গ. পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ে

একে অপরের পরিবারকে খাটো করলে স্বামী-স্ত্রীর পাশাপাশি দুই পরিবারের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এতে দাম্পত্য জীবনে চাপ আরও বেড়ে যায়।

ঘ. ছোট বিষয়কে বড় করে তোলে

যখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের পরিবার নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে, তখন ক্ষুদ্র সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করে। এতে সমাধান না হয়ে নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়।

ঙ. সন্তানদের মানসিক ক্ষতি

সন্তানরা যদি দেখে বাবা-মা সবসময় একে অপরের পরিবারকে অপমান করছে, তবে তাদের ভেতরে দ্বন্দ্বপূর্ণ ও নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। তারা সম্মান ও সৌজন্য শেখার পরিবর্তে ঝগড়া-মুখী হয়ে ওঠে।

চ. বিচ্ছেদের ঝুঁকি বাড়ে

একে অপরের পরিবারকে অপমান করা অনেক সময় এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করে যে, তা বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিকারের উপায় :

স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের পরিবারকে সম্মান জানানো অত্যন্ত জরুরি। পরিবারকে অপমান করা আসলে ভালোবাসার মানুষটিকে অপমান করারই সমান। তাই দাম্পত্য জীবনে শান্তি ও সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত। ইসলামে অন্যের পরিবারকে গালি বা অপমান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আবদুল্লাহ ইবনু ’আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো নিজের পিতা-মাতাকে লা’নত করা। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপন পিতা-মাতাকে কোন লোক কীভাবে লা’নত করতে পারে? তিনি বললেনঃ সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তখন সে তার মাকে গালি দেয়। সহিহ বুখারি : ৫৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ৯০, আহমাদ : ৬৫৪০

১৭. ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলা ও উপেক্ষা না করা

দাম্পত্য জীবন ভালোবাসা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। যদি স্বামী-স্ত্রী ছোটখাটো ভুলকে বড় করে তোলে এবং তা উপেক্ষা করতে না পারে, তবে সংসার অশান্ত হয়ে যায়। এর ক্ষতিকর দিকগুলো হলো—

ক. প্রতিনিয়ত ঝগড়া সৃষ্টি হয়

প্রতিটি ত্রুটি নিয়ে আলোচনা বা অভিযোগ করলে সংসারে শান্তি হারিয়ে যায়। তুচ্ছ বিষয় নিয়েই বারবার ঝগড়া হতে থাকে।

খ. ভালোবাসা ও মমতা কমে যায়

যখন এক পক্ষের ভুল অন্য পক্ষ বারবার বড় করে তোলে, তখন তার মনে অপমান ও অভিমান জমে যায়। এতে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়।

গ. আস্থার সম্পর্ক ভেঙে যায়

সবসময় সমালোচনা শুনতে শুনতে মানুষ মনে করে, “সে আমাকে বুঝতে বা মানতে চায় না।” এতে পারস্পরিক আস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।

ঘ. নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়

ছোটখাটো ভুল বড় করে দেখার অভ্যাস একসময় স্বামী বা স্ত্রীকে অপরজনের শুধু খারাপ দিকগুলোই দেখতে বাধ্য করে। তখন আর কোনো ভালো দিক চোখে পড়ে না।

ঙ. সন্তানদের উপর খারাপ প্রভাব

যদি বাবা-মা সবসময় ছোটখাটো বিষয়ে ঝগড়া করে, সন্তানরা তা দেখে নেতিবাচক চরিত্র গড়ে তোলে এবং মানসিকভাবে অস্থির হয়ে যায়।

চ. সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি

অবিরাম খুঁটিনাটি ভুল নিয়ে সমালোচনা দাম্পত্য জীবনে এক পর্যায়ে ক্লান্তি এনে দেয়। তখন বিচ্ছেদ বা দূরত্ব তৈরি হওয়া খুব সহজ হয়ে যায়।

ছ. তিক্ততা এবং রাগ বৃদ্ধি

ক্ষমা করার অভ্যাস না থাকলে এবং ছোট ভুলের জন্য অভিযোগ করতে থাকলে দুজনের মনেই তিক্ততা এবং রাগ জমা হয়। এই চাপা রাগ একসময় বড় ঝগড়া বা বিস্ফোরণের রূপ নেয়। সম্পর্কের মধ্যে জমে থাকা এই তিক্ততা বিষের মতো কাজ করে এবং ধীরে ধীরে সম্পর্ককে শেষ করে দেয়।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনে ছোটখাটো ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। একে অপরকে ক্ষমা করে দিলে এবং ছোটখাটো বিষয়গুলো সহজে মেনে নিলে সম্পর্ক অনেক বেশি মজবুত হয়। মনে রাখবেন, ভালোবাসার সম্পর্ক নিখুঁত হয় না, এটি ভুলগুলোকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়েই সুন্দর হয়ে ওঠে। ইসলাম আমাদেরকে ক্ষমাশীল হতে এবং ছোটখাটো ভুল এড়িয়ে চলতে শিখিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

خُذِ الۡعَفۡوَ وَاۡمُرۡ بِالۡعُرۡفِ وَاَعۡرِضۡ عَنِ الۡجٰہِلِیۡنَ

তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক। সুরা আরাফ : ১৯৯

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “একজন মুমিন পুরুষ যেন মুমিন স্ত্রীকে ঘৃণা না করে। কারণ, যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে তার অন্য কোনো স্বভাবের প্রতি সে সন্তুষ্ট হবে।” সহীহ মুসলিম : ১৪৬৯

১৮. পরকিয়া বা নিজ স্বামী-স্ত্রীর থেকে অন্য কাউকে প্রধান্য দেওয়া

পরকীয়া বা স্বামী/স্ত্রীর বদলে অন্য কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। কারণ দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস, আনুগত্য ও একনিষ্ঠতা। যখন এই ভিত্তি নষ্ট হয়, তখন সংসার ভেঙে পড়তে শুরু করে। নিচে কয়েকটি দিক তুলে ধরছি—

ক. বিশ্বাসের চূড়ান্ত লঙ্ঘন

দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো বিশ্বাস এবং পারস্পরিক আনুগত্য। যখন একজন সঙ্গী পরকীয়া করে বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেয়, তখন এই বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কের মূল স্তম্ভকে আঘাত করে এবং এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি ফাটল তৈরি হয় যা সহজে মেরামত করা যায় না। যে ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হন, তিনি আর কখনোই তার সঙ্গীকে বিশ্বাস করতে পারেন না, যা সম্পর্ককে অকার্যকর করে তোলে।

খ. ভালোবাসার মৃত্যু

পরকীয়ার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও মমতা দ্রুত নষ্ট হয়। যিনি অবহেলিত হন, তার মনে প্রবল কষ্ট, ক্ষোভ ও ঘৃণা জন্ম নেয়।

গ. পারিবারিক ভাঙন

পরকীয়া সংসার ভাঙনের অন্যতম প্রধান কারণ। এতে শুধু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়, বরং দুই পরিবার ও সন্তানের জীবনও নষ্ট হয়ে যায়।

ঘ. সন্তানদের উপর ভয়াবহ প্রভাব

যখন সন্তানরা দেখে বাবা-মার একজন অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে, তখন তাদের মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং অনেক সময় বেপথু হয়ে পড়ে।

ঙ. পারিবারিক ও সামাজিক সম্মানহানি

পরকীয়া শুধু দম্পতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পরিবার এবং সমাজে তাদের সম্মানও নষ্ট করে। যখন এই ধরনের সম্পর্ক প্রকাশ পায়, তখন তা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অবিশ্বাস এবং ঘৃণা তৈরি করে। এর ফলে সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৬. আল্লাহর গজব ও আখিরাতের শাস্তি

পরকীয়া (ব্যভিচার) কুরআন-হাদিসে মহাপাপ হিসেবে বর্ণিত।

আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ। সূরা ইসরা :  ৩২

২৪৭৫. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, ৫৫৭৮, ৬৭৭২, ৬৮১০, সহিহ মুসলিম : ৫৭

প্রতিকারের উপায় :

পরকীয়া বা অন্য কাউকে প্রাধান্য দেওয়া একটি সম্পর্ককে কেবল ভেঙে দেয় না, বরং এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। এটি ভালোবাসার সম্পর্ককে ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং ব্যথার সম্পর্কে পরিণত করে। তাই দাম্পত্য জীবন রক্ষা করতে হলে পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, আনুগত্য করা এবং পরকীয়া বা অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক অভ্যাস থেকে বাঁচা অপরিহার্য। সাথে সাথে দুনিয়া ও আখেরাতের শাস্তির কথা মনে করলে পরকিয়া করা অসম্ভব হবে।

আবদুল্লাহ (ইবনু মাস’ঊদ) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২, সহিহ মুসলিম : ৮৬০

১৯. ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করার ফলে

ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হয়। কারণ দাম্পত্যের প্রকৃত ভিত্তি হলো আল্লাহর ভয়, তাকওয়া, এবং দ্বীনের অনুসরণ। যখন স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্বকে উপেক্ষা করে, তখন সংসার থেকে বরকত সরে যায় এবং নানা বিপদ ঘনিয়ে আসে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে দাম্পত্য জীবনের ক্ষতি তা হলো-

ক. আল্লাহর ভয় না থাকায় সম্পর্ক দুর্বল হয়

যদি স্বামী-স্ত্রী আল্লাহকে ভয় না করে, তবে তারা সহজেই একে অপরের প্রতি জুলুম, প্রতারণা বা অবহেলা করতে পারে। ফলে দাম্পত্যের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

খ. নামাজ-সিয়াম অবহেলা করলে বরকত চলে যায়

নামাজ, সিয়াম, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত অবহেলা করলে সংসার থেকে বরকত সরে যায়। ফলে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও শান্তি থাকে না।

গ. হালাল-হারামের সীমা অমান্য করা

ধর্মীয় অবহেলার কারণে কেউ হারাম উপার্জনে লিপ্ত হয়, কেউ পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে, কেউ অপচয় ও বিলাসিতায় মত্ত হয়। এসব সরাসরি সংসার ধ্বংস করে।

ঘ. সন্তানদের ঈমান নষ্ট হয়

স্বামী-স্ত্রীর দ্বীনহীনতা সন্তানদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভবিষ্যত প্রজন্ম নষ্ট হয় এবং পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।

ঙ. পারস্পরিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা

ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর দায়িত্ব, আর স্ত্রীকে স্বামীর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে। ধর্মীয় অবহেলার কারণে এগুলো অমান্য হয়, যা সংসার ভাঙনের পথ তৈরি করে।

চ. বিবেক ও নৈতিকতার অবক্ষয়

ধর্ম ছাড়া দাম্পত্য জীবন শুধুই জাগতিক স্বার্থে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে নৈতিকতা হারায়, সম্মান ও ভালোবাসা ক্ষয়ে যায়।

ছ. আখিরাতের ক্ষতি

সংসারে সুখ পেলেও যদি স্বামী-স্ত্রী ধর্মীয় দায়িত্ব পালন না করে, তবে আখিরাতে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا

যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, আমি তার জন্য সংকীর্ণ জীবন নির্ধারণ করব।” সুরা  ত্বাহা : ১২৪

প্রতিকারের উপায় :

দ্বীনহীন স্বামী বা স্ত্রী সংসারে শান্তি আনতে পারে না। তাই দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর, স্থায়ী ও বরকতময় করতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দ্বীনের প্রতি যত্নবান হওয়া, একে অপরকে ইবাদতে সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর ভয় হৃদয়ে জাগ্রত রাখা অপরিহার্য। প্রথমত দ্বীনদার ছেলে/মেয়ে বিবাহ করা।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সিহহ মুসলিম : ১৪৬৬, আহমাদ : ৯৫২৬

পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর মাধ্যমে একটি পরিবার আদর্শ মুসলিম পরিবার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং সদস্যরা একে অপরের জন্য সহায়ক হতে পারে। নিচে কিছু সহজ ও কার্যকরী উপায় দেওয়া হলো, যার মাধ্যমে পরিবারের মধ্যে দ্বীন চর্চা করা সম্ভব। তাই নিয়মিত ইবাদতের পরিবেশ তৈরি করা। যেমন- জামাতে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দুআ, দান সদগা ইত্যাদি। নিয়মিত ঘরে দ্বীনি আলোচনার ব্যবস্থা করা। পরিবারের সবাইকে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করা। পরিবারের নারীদের মাহরাম রক্ষা করে চলাফেরা করা এবং পর্দার বিষয় কোন ছাড় না দেওয়া। এভাবের পরিবারে দ্বীন চলে আসলে আপনি অবশ্যি দাম্পত্য জীবনে সুখি হবেন।

২০. অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা

অশ্লীল কথা ও গালাগালি করা দাম্পত্য জীবনে একটি ধ্বংসাত্মক আচরণ, যা সম্পর্ককে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। এই ধরনের আচরণ দাম্পত্য জীবনে যে ক্ষতি করে তা হলো-

ক. পারস্পরিক সম্মান নষ্ট হওয়া

একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান। যখন একজন সঙ্গী অন্যজনকে গালি দেয় বা অশ্লীল কথা বলে, তখন সেই সম্মানবোধ সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়। এই আচরণ এমন একটি বার্তা দেয় যে, আপনি আপনার সঙ্গীকে সম্মান করেন না বা তার অনুভূতি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর ফলে সঙ্গী নিজেকে অপমানিত এবং মূল্যহীন মনে করে, যা সম্পর্কের মূল ভিত্তি ভেঙে দেয়।

খ. মানসিক আঘাত ও নিরাপত্তাহীনতা

অশ্লীল কথা এবং গালাগালি শারীরিক আঘাতের মতো দৃশ্যমান না হলেও এটি মানসিক আঘাত তৈরি করে। এই ধরনের আচরণ একজন ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং তাকে নিরাপত্তাহীন করে তোলে। যে ব্যক্তি এই ধরনের আচরণের শিকার হন, তিনি সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকেন যে কখন আবার তাকে অপমান করা হবে। এতে করে সম্পর্কের মধ্যে কোনো শান্তি থাকে না।

গ. ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃণা বৃদ্ধি

ভালোবাসা এবং গালাগালি একসঙ্গে চলতে পারে না। যখন একজন মানুষ তার ভালোবাসার মানুষকে ক্রমাগত অসম্মান করে, তখন ভালোবাসার অনুভূতি ধীরে ধীরে ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। যে ব্যক্তি গালমন্দ করে, তার প্রতি অন্যজনের মনে ঘৃণা ও ক্ষোভ জমা হয়, যা একসময় সম্পর্কের ইতি টেনে দেয়।

ঘ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব

যদি দম্পতির সন্তান থাকে, তবে তাদের বাবা-মায়ের অশ্লীল কথা এবং গালাগালি তাদের মানসিক বিকাশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুরা এই ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে এবং নিজের জীবনেও এটি প্রয়োগ করতে শেখে। এর ফলে তাদের মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।

ঙ. ঘনিষ্ঠতা ও আস্থা ভেঙে যায়

যখন স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে খারাপ ভাষায় সম্বোধন করে, তখন তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা নষ্ট হয়, আস্থা হারিয়ে যায়।

প্রতিকারের উপায় :

অশ্লীল কথা এবং গালাগালি একটি সম্পর্কের উষ্ণতা, সম্মান এবং ভালোবাসা কেড়ে নেয়। এটি সম্পর্ককে একটি বিষাক্ত এবং অসহনীয় জায়গায় পরিণত করে, যেখানে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য এই ধরনের আচরণ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتُوا الزَّکٰوۃَ ؕ ثُمَّ تَوَلَّیۡتُمۡ اِلَّا قَلِیۡلًا مِّنۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ

আর মানুষকে উত্তম কথা বল, সালাত কায়েম কর এবং যাকাত প্রদান কর। অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক ছাড়া তোমরা সকলে উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে নিলে। সূরা বাকারা : ৮৩

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মু’মিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিসম্পাতকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না। সুনানে তিরমিজ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ৩২০

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে জ্বালাতন না করে। যে লোক আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা চুপ থাকে। সহিহ বুখারি : ৬০১৮, ৫১৮৫, সহিহ মুসলিম : ৪৭, আহমাদ : ৭৬৩০

তাই দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত অশ্লীলতা ও গালাগালি থেকে বিরত থাকা, সবসময় কোমল ও ভালোবাসাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা।

২১. স্ত্রী পক্ষের আত্মীয়দের বেশী গুরুত্ব দেওয়া

দাম্পত্য জীবন হলো দুজন মানুষের এক হওয়া এবং তাদের দুটি পরিবারকে একটি পরিবার হিসেবে গ্রহণ করা। যখন একজন স্ত্রী তার নিজের পরিবারের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেন এবং স্বামীর পরিবারের প্রতি অবহেলা করেন, তখন স্বামীর মনে এই ধারণা জন্ম নেয় যে তার পরিবারকে সম্মান করা হচ্ছে না। এই অসম্মান থেকে পারস্পরিক আস্থার অভাব সৃষ্টি হয়। স্বামী ভাবতে শুরু করেন যে, তার স্ত্রী তার এবং তার পরিবারের প্রতি আন্তরিক নন, যা সম্পর্কের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়। ইহার ফলে দাম্পত্য জীবনে যে সকল সমস্যা সৃষ্টি করে তা আলোচনা করা হলো-

ক. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি

স্ত্রীর অতিরিক্ত আত্মীয়প্রিয়তা স্বামীর পিতামাতা বা পরিবারের প্রতি অমনোযোগ বা অসম্মান হিসেবে ধরা দিতে পারে। এটি স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে অসন্তুষ্টি এবং দূরত্ব বৃদ্ধি করে।

খ. অর্থ ও দায়িত্বের অসামঞ্জস্য

যদি পরিবারিক অর্থনৈতিক বা দৈনন্দিন দায়িত্ব (যেমন রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবা) প্রধানত নারীর হাতে থাকে, আত্মীয়দের বেশি সাহায্য ও সহযোগিতা দেওয়া স্বামী-স্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি করতে পারে। স্বামীকে তার অধিকার ও দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হতে পারে।

গ. ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব

স্ত্রী যখন আত্মীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন এবং তাদের কথার বেশি গুরুত্ব দেন, তখন স্বামীর প্রতি তাঁর প্রাধান্য বা নেতৃত্বের ধারণা হ্রাস পেতে পারে। এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব বা কলহের কারণ হতে পারে।

ঘ. সংঘাত ও কলহের উদ্ভব

যদি স্বামী এই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন, তবে স্ত্রী-স্বামী মধ্যে তর্ক বা কলহ জন্মায়। আবার যদি স্বামী চুপচাপ থাকে, তাহলে ভিতরে ভিতরে ক্ষোভ জমে যায়। এই ধরনের ক্ষোভ দীর্ঘমেয়াদি হলে সম্পর্কের মানসিক দিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঙ. সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা

দাম্পত্য জীবনে সবকিছুতে সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ—সময়, অর্থ, আবেগ, দায়িত্ব। আত্মীয়দের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা ও সম্পর্কের সৌহার্দ্য কমে যায়।

প্রতিকারের উপায় :

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর উভয়েরই উচিত একে অপরের পরিবারকে সমান চোখে দেখা এবং উভয় পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। এই ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই সকল পক্ষের আত্মীয়দের সদ্ব্যবহার ও ভালোবাসা দিতে হবে। স্বামী স্ত্রী উভয় পক্ষের আত্মীয়দের সাথে ভালো আচরন করা কুরআন সুন্নাহ নির্দেশ।

আল্লাহ তায়ারা বলেন-

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ

“তোমরা কি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে দুনিয়ায় ফিতনা সৃষ্টি করবে না?” সূরা মুহাম্মদ : ২২

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

‏ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَأَنْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ ‏

যে লোক তার জীবিকা প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৫

যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সহিহ বুখারি : ৫৯৮৪, মুসলিম ২৫৫৬, তিরমিযী ১৯০৯, আবূ দাউদ ১৬৯৬, আহমাদ ১৬২৯১, ১৬৩২২, ১৬৩৩১

২২. একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে

দাম্পত্য জীবনে একে অপরকে ছোট করা এবং অসম্মান করা সম্পর্কের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে কীভাবে একটি সুস্থ সম্পর্ক ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে। , তা নিচে আলোচনা করা হলো। একে অপরকে ছোট করা ও সম্মানহানি করার মাধ্যামে দাম্পত্য জীবন যে ক্ষতি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো-

ক. বিশ্বাসের অভাব ও দূরত্ব তৈরি হওয়া

যখন একজন সঙ্গী বারবার অন্যজনকে ছোট করে কথা বলেন বা অপমান করেন, তখন তাদের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়। যার ফলে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি, দুর্বলতা বা মনের কথা একে অপরের সাথে ভাগ করে নিতে পারেন না। এতে দুজনের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে।

খ. আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া

বারবার অপমানিত হলে একজন মানুষের আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। এর ফলে তিনি নিজেকে অযোগ্য বা মূল্যহীন ভাবতে শুরু করেন। এই ধরনের মানসিক চাপ সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

গ. রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম

অপমানিত হতে হতে মনের মধ্যে রাগ, ঘৃণা ও হতাশার জন্ম হয়। এই নেতিবাচক অনুভূতিগুলো সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। একপর্যায়ে এই চাপা রাগ বা হতাশা বড় ধরনের ঝগড়া বা বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে।

ঘ. একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা হারানো

সুস্থ দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা। যখন একজন আরেকজনকে ছোট করে, তখন সেই শ্রদ্ধা ভেঙে যায়। শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে না।

ঙ. মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি

নিয়মিত অপমান ও অসম্মান একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। এর ফলে তিনি বিষণ্ণতা, উদ্বেগ এবং অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগতে পারেন।

চ. শিশু ও পরিবারিক পরিবেশে প্রভাব:

অবমাননার পরিবেশে বড় হওয়া সন্তান মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়। তারা পরিবারকে ঘরের নিরাপদ স্থান মনে করতে পারে না, যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে।

প্রতিকারে উপায় :

একে অপরকে ছোট করা বা অসম্মান করা হলো একটি সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায়। একটি সুস্থ ও সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলার জন্য একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান এবং শ্রদ্ধা থাকা অপরিহার্য। তাই এক অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। অপরের আত্ম মর্যাদারে প্রতি দৃষ্টি রেখে কথা বলেত হবে। কাউকে কোন প্রকারের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা চলবেনা। তাহলেউ দাম্পত্য জীবনে সুখ আসবে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, (ক্রয় করার ভান করে) মূল্য বৃদ্ধি করে ধোঁকা দিও না। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না। একে অপরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন (অবজ্ঞা প্রকাশ) করবে না। তোমাদের একজনের সাওদা করা শেষ না হলে ঐ বস্তুর সাওদা বা কেনা-বেচার প্রস্তাব করবে না। হে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ! তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, অসম্মান করবে না, তুচ্ছ ভাববে না। ‘ধর্ম ভীরুতা এখানে’-এটা বলার সময় তিনি স্বীয় বক্ষস্থলের প্রতি তিনবার ইঙ্গিত করেছিলেন। কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করাটা মন্দ ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট (অর্থাৎ এরূপ তুচ্ছ জ্ঞান প্রদর্শন দ্বারা পাপ কার্য হওয়া সুনিশ্চিত।) এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে খুন করা, তাঁর মাল গ্রাস করা ও সম্মানে আঘাত দেয়া হারাম।  সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩, ২৫৬৪, সুনানে তিরমিযী : ১১৩৪, ১৯৮৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৯, ৪৪৯৬, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৪৩৮, ৩৪৪৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৭, ২১৭২,২১৭৪, আহমাদ : ৭৬৭০, ৭৮১৫, মালেক ১৩৯১, ১৬৮৪ ।