মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দান হবে এক মহাবিস্ময়কর ও ভয়ংকর স্থান। পৃথিবী তখন তার বর্তমান রূপ হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন এক সমতল ভূমি হয়ে যাবে, যেখানে কোনো পাহাড়, পর্বত বা অসমতা থাকবে না। সেদিন সকল মানুষ, প্রথম মানুষ থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত, সেই ময়দানে একত্রিত হবে। এটি হবে এমন এক সমাবেশ, যার কোনো তুলনা নেই।
সূর্য সেদিন মানুষের খুব কাছে চলে আসবে, ফলে প্রচণ্ড গরমে সবাই অস্থির হয়ে পড়বে। পাপের পরিমাণ অনুযায়ী মানুষের শরীর থেকে ঘাম ঝরতে থাকবে। কেউ কেউ হাঁটুর সমান ঘামে, আবার কেউ কেউ বুক পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মানুষ কেবলই নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। সেদিন কোনো আপনজন কাউকে সাহায্য করতে পারবে না।
অপেক্ষা করতে করতে মানুষের ধৈর্য যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন তারা নবীদের কাছে শাফায়াতের জন্য যাবে। অবশেষে শাফায়াতের দায়িত্ব দেওয়া হবে শেষ নবীকে, যিনি আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। এরপরই শুরু হবে চূড়ান্ত বিচার। এটি হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আদালত, যেখানে প্রতিটি কাজের নিখুঁত হিসাব নেওয়া হবে এবং কোনো জুলুম করা হবে না। সেই দিনটি হবে বিশ্বাসীদের জন্য সুসংবাদ এবং অবিশ্বাসীদের জন্য চরম হতাশার দিন।
১. কিয়ামতের দিনে হাশরের ময়দানের অবস্থা
ক. হাশরের ময়দানের হবে সমতল ও মসৃণ ভূমি মত
কুরআনে আরও বলা হয়েছে যে, বিচার দিবসে পৃথিবী একটি সমতল, মসৃণ ও ধূসর ময়দানে পরিণত হবে। এতে কোনো বক্রতা বা উঁচু-নিচু জায়গা থাকবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَیَذَرُہَا قَاعًا صَفْصَفًا ۙ لَّا تَرٰی فِیْہَا عِوَجًا وَّلَاۤ اَمْتًا ؕ
‘তারপর তিনি তাকে মসৃণ সমতলভূমি করে দিবেন’। ‘তাতে তুমি কোন বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না’। সূরা ত্বাহা : ১০৬-১০৭
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ
যেদিন এ যমীন ভিন্ন যমীনে রূপান্তরিত হবে এবং আসমানসমূহও। আর তারা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে হাযির হবে। সূরা ইবরাহিম : ৪৮
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَیَوْمَ نُسَیِّرُ الْجِبَالَ وَتَرَی الْاَرْضَ بَارِزَۃً ۙ وَّحَشَرْنٰہُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْہُمْ اَحَدًا ۚ
স্মরণ কর সেদিনের কথা যেদিন আমি পর্বতকে করব সঞ্চালিত এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে একটি শূন্য প্রান্তর; সেদিন মানুষকে আমি একত্রিত করব এবং তাদের কেহকেও অব্যাহতি দিব না। সূরা কাহফ : ৪৭
সাহল ইবন সাআদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
«يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَى أَرْضٍ بَيْضَاءَ عَفْرَاءَ، كَقُرْصَةِ النَّقِيِّ، لَيْسَ فِيهَا عَلَمٌ لِأَحَدٍ»
কিয়ামতের দিবসে মানুষকে সাদা পোড়ামাটি রংয়ের উদ্ভিদহীন একটি জমিনে একত্র করা হবে। যেখানে কারো জন্য কোনো আলামত থাকবে না”। সহিহ বুখারী : ৬৫২১, সহিহ মুসলিম : ২৭৯০, মিশকাত : ৫৫৩২, সহীহুল জামি : ৮০৪৪, আবূ ইয়া’লা : ৭৫৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩২০, শুআবূল ঈমান : ৩৫৭।
২. হাশরের ময়দানে সবাইকে একত্র করার দৃশ্য
ক. কিয়ামতের দিন মানুষকে তাড়িয়ে হাশরের ময়দানে হাজির করা হবে
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্রিত করা হবে তিন প্রকারে। একদল হবে আল্লাহর প্রতি আসক্ত ও দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত। দ্বিতীয় দল হবে দু’জন, তিনজন, চারজন বা দশজন এক উটের ওপর আরোহণকারী। আর অবশিষ্ট যারা থাকবে অগ্নি তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। যেখানে তারা থামবে আগুনও তাদের সঙ্গে সেখানে থামবে। তারা যেখানে রাত্রি কাটাবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে রাত্রি কাটাবে। তারা যেখানে সকাল করবে আগুনও সেখানে তাদের সঙ্গে সকাল করবে। যেখানে তাদের সন্ধ্যা হবে আগুন সেখানেও তাদের সাথে অবস্থান করবে। সহিহ বুখারি : ৬৫২২, সহিহ মুসলিম : ২৮৬১, মিশকাত : ৫৫৩৪, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ : ৩৪৩৯৮, সুননে নাসায়ী : ২২১২, তবারানী : ১২৯০
খ. কিয়ামতে দিন কিছু মানুষ মুখে ভর দিয়ে হাশরের ময়দানে হাজির হবে
কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা এসেছে, যা থেকে বোঝা যায়, জালেম ও কাফেরদের কী অবমাননাকরভাবে জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়া হবে। এটি তাদের শাস্তির এক রূপ, দুনিয়ার গর্ব ও অহংকারের জবাব, যে দিন তারা লাঞ্ছিত হবে মুখ থুবড়ে। তারা
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلَّذِیْنَ یُحْشَرُوْنَ عَلٰی وُجُوْہِہِمْ اِلٰی جَہَنَّمَ ۙ اُولٰٓئِکَ شَرٌّ مَّکَانًا وَّاَضَلُّ سَبِیْلًا
যাদেরকে মুখে ভর দিয়ে দিয়ে চলা অবস্থায় জাহান্নামের দিকে একত্র করা হবে, তাদেরই স্থান হবে অতি নিকৃষ্ট এবং তারাই পথভ্রষ্ট। সুরা ফুরকান : ৩৪
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর নবী! কিয়ামতের দিন কাফেরদের মুখে ভর করে চলা অবস্থায় একত্রিত করা হবে? তিনি বললেন, যিনি এ দুনিয়ায় তাকে দু’পায়ের উপর চালাতে পারছেন, তিনি কি কিয়ামতের দিন মুখে ভর করে তাকে চালাতে পারবেন না? ক্বাতাদাহ (রহ.) বলেন, নিশ্চয়ই, আমার রবের ইজ্জতের কসম! সহিহ বুখারি : ৪৭৬০, ৬৫২৩, সহিহ মুসলিম : ২৮০৬, মিশকাত : ৫৫৩৭, আহমাদ : ১৩৪১৬, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৫০৭, আবূ ইয়া’লা: ৩০৪৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩২৩,
বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে তার বাবা, অতঃপর তার দাদার সুত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ (কিয়ামত দিবসে) তোমাদের পায়ে হাটিয়ে, সাওয়ারী হিসাবে এবং কিছু সংখ্যককে মুখের উপর উপুড় করে টেনে হাযির করা হবে। সুনানে তিরমিজি : ২৪২৪ হাদিসের মান সহিহ
গ. কাফিরের অন্ধ হয়ে উপস্থিত হবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُۥ مَعِيشَةٗ ضَنكٗا وَنَحْشُرُهُۥ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ أَعْمَىٰ ١٢٤ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِيٓ أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرٗا ١٢٥ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ ءَايَٰتُنَا فَنَسِيتَهَاۖ وَكَذَٰلِكَ ٱلْيَوْمَ تُنسَىٰ ١٢٦
আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? তিনি বলবেন, এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো”। সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৬
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَنَحْشُرُهُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَٰمَةِ عَلَىٰ وُجُوهِهِمْ عُمْيٗا وَبُكْمٗا وَصُمّٗاۖ مَّأْوَىٰهُمْ جَهَنَّمُۖ كُلَّمَا خَبَتْ زِدْنَٰهُمْ سَعِيرٗ
“আর আমরা কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম, যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব। সূরা ইসরা : ৯৭
ঘ. হাশরের ময়দানে ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
كَلَّآۖ إِذَا دُكَّتِ ٱلْأَرْضُ دَكّٗا دَكّٗا ٢١ وَجَآءَ رَبُّكَ وَٱلْمَلَكُ صَفّٗا صَفّٗا ٢٢ وَجِاْيٓءَ يَوْمَئِذِۢ بِجَهَنَّمَۚ يَوْمَئِذٖ يَتَذَكَّرُ ٱلْإِنسَٰنُ وَأَنَّىٰ لَهُ ٱلذِّكْرَىٰ ٢٣ يَقُولُ يَٰلَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي ٢٤
কখনো নয়, যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে পরিপূর্ণভাবে। আর তোমার রব ও ফিরিশতাগণ উপস্থিত হবেন সারিবদ্ধভাবে। আর সেদিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু সেই স্মরণ তার কী উপকারে আসবে? সে বলবে, হায়! যদি আমি কিছু আগে পাঠাতাম আমার এ জীবনের জন্য! সূরা ফাজর : ২১-২৪
ঙ. হাশরের মাঠে সকলে নগ্ন পদে নগ্ন দেহে পায়ে হেঁটে ও খাতনা বিহীন অবস্থায় হাজির হবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ؕ کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ
যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। সুরা আম্বিয়া : ১০৪
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন-
إِنَّكُمْ مُلاَقُو اللهِ حُفَاةً عُرَاةً مُشَاةً غُرْلاً قَالَ سُفْيَانُ هَذَا مِمَّا نَعُدُّ أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ سَمِعَهُ مِنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم
নিশ্চয়ই তোমরা নগ্ন পদে নগ্ন দেহে পায়ে হেঁটে ও খাতনা বিহীন অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে। সুফ্ইয়ান বলেন, এ হাদীসকে ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) এর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে স্বয়ং শুনা হাদীসসমূহের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয়। সহিহ বুখারি : ৬৫২৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৬০, আহমাদ : ১৯১৩
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষকে হাশরের মাঠে উঠানো হবে নগ্ন পদ, নগ্ন দেহ ও খাতনাবিহীন অবস্থায়। ’আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তাহলে পুরুষ ও নারীগণ একে অপরের দিকে তাকাবে। তিনি বললেন: এরকম ইচ্ছে করার চেয়ে তখনকার অবস্থা হবে অতীব সংকটময়। সহিহ বুখারি : ৩৪৪৭, ৬৫২৭, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৯, সুনানে তিরমিযী : ২৪২৩, সুনানে নাসায়ী : ২০৮৩, সহীহুল জামি : ৫২৩৫, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৪৬৯, মুসনাদে বাযযার : ২০২৩, মুসনাদে আহমাদ : ২৪৩১০, আবূ ইয়া’লা : ২৫৭৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩১৬, শুআবূল ঈমান : ৩৫৯, , দারিমী : ২৮০০, ত্ববারানী : ১২১৪৩, হাকিম : ৮৭১৫।
চ. সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আ.) কে কাপড় পরানো হবে
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে হাশর ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-
کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ
যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। আম্বিয়াঃ ১০৪
আর কিয়ামতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পরানো হবে তিনি হবেন ইবরাহীম (আ.)। আর আমার অনুসারীদের মধ্য হতে কয়েকজনকে পাকড়াও করে বাম দিকে অর্থাৎ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার অনুসারী, এরা তো আমার অনুসারী। এ সময় আল্লাহ বললেন, যখন আপনি এদের নিকট হতে বিদায় নেন, তখন তারা পূর্ব ধর্মে ফিরে যায়। কাজেই তারা আপনার সাহাবী নয়। তখন আল্লাহর নেক বান্দা [ঈসা (আঃ)] যেমন বলেছিলেন, তেমন আমি বলব, হে আল্লাহ! আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের অবস্থার পর্যবেক্ষক। আপনি ক্ষমতাধর হিকমত ওয়ালা। সুরা মায়িদা : ১১৭। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৯, ৪৩৩৭, ৪৬২৫, ৪৬২৬, ৪৬৪০, ৬৫২৬, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৯, সুনানে তিরমিযী : ২৪২৩, সুনানে নাসায়ী : ২০৮১, মিশকাত : ৫৫৩৫, সহীহুল জামি : ৭৮৭০ সিলসিলাতুস সহীহাহ : ৩৪৬৯, মুসনাদে বাযযার : ২০২৩, মুসনাদে আহমাদ : ১৯৫০।
ছ. কিয়ামতের দিন সমস্ত জমিন একটি রুটি হয়ে যাবে
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন একটি রুটি হয়ে যাবে। আর আল্লাহ তা’আলা বেহেশতীদের মেহমানদারীর জন্য তাকে বেহেশতে তুলে নেবেন। যেমন তোমাদের মাঝে কেউ সফরের সময় তার রুটি হাতে তুলে নেয়। এমন সময় একজন ইহুদী এলো এবং বলল, হে আবূল কাসিম! দয়াময় আপনাকে বরকত প্রদান করুন। কিয়ামতের দিন বেহেশতিদের আতিথেয়তা সম্পর্কে আপনাকে কি জানাব না? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। লোকটি বলল, (সেই দিন) সমস্ত ভূ-মণ্ডল একটি রুটি হয়ে যাবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন (লোকটিও সেইরূপই বলল)। এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে তাকালেন এবং হাসলেন। এমনকি তার চোয়ালের দাঁতসমূহ প্রকাশ পেল। এরপর তিনি বললেনঃ তবে কি আমি তোমাদেরকে (সেই রুটির) তরকারী সম্পর্কে বলব না? তিনি বললেনঃ তাদের তরকারী হবে বালাম এবং নূন। সাহাবাগন বললেনঃ সে আবার কি? তিনি বললেনঃ ষাড় এবং মাছ। এদের কলিজার গুরদা থেকে সত্তর হাজার লোক খেতে পারবে। সহিহ বুখারি : ৬৫২০, সহিহ মুসলিম : ২৭৯২, মিশকাত : ৫৫৩৩ সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ১৪৩৮, সহীহুল জামি : ২৯৮৮।
জ. হাশরের ময়দানের মানুষ ঘামে হাবুডুবু খাবে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
«يَعْرَقُ النَّاسُ يَوْمَ القِيَامَةِ حَتَّى يَذْهَبَ عَرَقُهُمْ فِي الأَرْضِ سَبْعِينَ ذِرَاعًا، وَيُلْجِمُهُمْ حَتَّى يَبْلُغَ آذَانَهُمْ»
কিয়ামতের দিন মানুষ ঘর্মাক্ত হবে। এমনকি যমীনের সত্তর হাত ঘামে ডুবে যাবে। তাদের ঘামে তারা কান পর্যন্ত ডুবে যাবে”। সহিহ বুখারী : ৬৫৩২, সহিহ মুসলিম : ২৮৬৩, মিশকাত : ৫৫৩৯, মুসনাদে আহমাদ : ৯৪১৬, সহীহুল জামি : ১৬৭৯।
আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। আল্লাহ বলেন-
یَّوْمَ یَقُوْمُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ؕ
যেদিন মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের জন্য দাঁড়াবে। সূরা মুতাফ্ফিফীন : ৬ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তির কানের লতা পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯৩৮, ৬৫৩১, সহিহ মুসলিম : ২৮৬২, আহমাদ : ৬০৭২
মিকদাদ ইবন আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কিয়ামত দিবসে সূর্য মানুষের খুব নিকটবর্তী হবে। এমনকি এর দুরত্ব এক মাইল পরিমাণ হবে। এ সম্পর্কে সুলাইম ইবন আমের বলেন, আল্লাহর শপথ! মাইল বলতে এখানে কোনো মাইল তিনি বুঝিয়েছেন আমি তা জানি না। জমির দূরত্ব পরিমাপের মাইল বুঝিয়েছেন, না সুরমা দানির মাইল (শলাকা) বুঝিয়েছেন? মানুষ তার আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে থাকবে। কারো ঘাম হবে পায়ের গিরা বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে হাটু বরাবর। কারো ঘামের পরিমাণ হবে কোমর বরাবর। আবার কারো ঘামের পরিমাণ হবে তার মুখ বরাবর” সহিহ মুসলিম : ২৮৬৪।
ঝ. মুত্তাকীরা আল্লাহর মেহমানরূপে হাজির হবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا، وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَىٰ جَهَنَّمَ وِرْدًا
সেদিন আমরা মুত্তাকীদেরকে দয়াময় আল্লাহর কাছে সম্মানিত মেহমানরূপে একত্র করব। আর অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব।” (সূরা মারয়াম: ৮৫-৮৬)
ঞ. কেউ উজ্জ্বল আবার কেউ কালো মুখমণ্ডল নিয়ে হাজির হবে
ঈমানদার ও নেককারদের মুখ সেদিন হবে উজ্জ্বল ও হাস্যোজ্জ্বল, আর অবিশ্বাসীদের মুখ হবে মলিন ও কালো। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ مُّسْفِرَةٌ، ضَاحِكَةٌ مُّسْتَبْشِرَةٌ، وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ، تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ، أُوْلَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ
সেদিন কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল, হাস্যোজ্জ্বল, আনন্দিত। আর কিছু মুখ হবে ধুলোমলিন, সেগুলোকে আচ্ছন্ন করে থাকবে কালিমা। এরাই হলো কাফির ও পাপিষ্ঠরা।”সূরা আবাসা: ৩৮-৪২
ট. কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টিকুলের অতি কাছাকাছি করে দেয়া হবে।
মিকদাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টিকুলের অতি কাছাকাছি করে দেয়া হবে। এমনকি তা প্রায় এক মাইলের ব্যবধানে হয়ে যাবে। অতএব তখন তার তাপে মানব সম্প্রদায় আপন আপন ’আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। কারো ঘাম টাখনু পর্যন্ত হবে। কারো হাঁটু অবধি। কারো কোমর অবধি আর কারো জন্য এ ঘাম লাগাম পর্যন্ত হয়ে যাবে (অর্থাৎ তার মুখের ভিতরে লাগামের ন্যায় ঢুকে যাবে) এ কথাটি বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজের মুখের দিকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করলেন। সহিহ মুসলিম : ২৮৬৪, মিশকত : ৫৫৪০, সহীহুল জামি : ২৯৩৩, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব: ৩৫৮৭, শু’আবূল ঈমান : ২৫৮, তবারানী : ১৬৯৯০
রিয়াকারী ও সালাত ত্যাগ হাশরে আল্লাহ দেখে সিজদা দিতে পারবেনা
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یَوْمَ یُکْشَفُ عَنْ سَاقٍ وَّیُدْعَوْنَ اِلَی السُّجُوْدِ فَلَا یَسْتَطِیْعُوْنَ ۙ
সে দিন পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। সুরা কালাম : ৪২
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি, (কিয়ামতের দিন) যখন আমাদের প্রভু পায়ের নলা বা গোছা উন্মোচিত করবেন, তখন ঈমানদার নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই তাঁকে সিজদাহ্ করবে। আর বিরত থাকবে ঐ সকল লোক যারা দুনিয়াতে রিয়া (লোক দেখানো) ও শুনানোর জন্য সিজদাহ্ করত, তারা সিজদাহ করতে চাইবে কিন্তু তাদের পৃষ্ঠদেশ ও কোমর একটি কাষ্ঠফলকের মতো শক্ত হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯১৯, মিশকাত : ৫৫৪২, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ : ৫৮৩, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৭৭।
৩. মানুষ তাদের নির্বাচিত গাইরুল্লাহ প্রত্যাখ্যান করবে
দুনিয়াতে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত বা অনুসরণ করে, কিয়ামতের দিন সেই অনুসারী এবং তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিরা একে অপরের থেকে দায়মুক্ত হতে চাইবে। কিয়ামতের দিন যখন সবকিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে, তখন মানুষেরা তাদের ভুল বুঝতে পারবে এবং একে অপরকে দোষারোপ করতে শুরু করবে।
ক. ইবাদতের অংশীদাররা প্রত্যাখ্যান করবে:
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, দুনিয়াতে যাদেরকে আল্লাহর অংশীদার হিসেবে ইবাদত করা হয়েছে, কিয়ামতের দিন তারাই এই ইবাদতকারীদের থেকে নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعٗا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُواْ مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَآؤُكُمْۚ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْۖ وَقَالَ شُرَكَآؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ ٢٨
আর যেদিন আমরা তাদের সকলকে একত্র করব, অতঃপর যারা শির্ক করেছে, তাদেরকে বলব, থাম, তোমরা ও তোমাদের শরীকরা। অতঃপর আমি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাব। আর তাদের শরীকরা বলবে, তোমরা তো আমাদের ইবাদাত করতে না”। সূরা ইউনূস : ২৮
এই আয়াতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন শিরককারীরা তাদের উপাস্যদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাবে না, বরং তারাই তাদের অস্বীকার করবে।
খ. শয়তান তার অনুসারীদের প্রত্যাখ্যান করবে:
শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য সব সময় চেষ্টা করে। কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন ফলাফল প্রকাশ পাবে, তখন শয়তান নিজেই তার অনুসারীদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَقَالَ الشَّیْطٰنُ لَمَّا قُضِیَ الْاَمْرُ اِنَّ اللّٰہَ وَعَدَکُمْ وَعْدَ الْحَقِّ وَوَعَدْتُّکُمْ فَاَخْلَفْتُکُمْ ؕ وَمَا کَانَ لِیَ عَلَیْکُمْ مِّنْ سُلْطٰنٍ اِلَّاۤ اَنْ دَعَوْتُکُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِیْ ۚ فَلَا تَلُوْمُوْنِیْ وَلُوْمُوْۤا اَنْفُسَکُمْ ؕ مَاۤ اَنَا بِمُصْرِخِکُمْ وَمَاۤ اَنْتُمْ بِمُصْرِخِیَّ ؕ اِنِّیْ کَفَرْتُ بِمَاۤ اَشْرَکْتُمُوْنِ مِنْ قَبْلُ ؕ اِنَّ الظّٰلِمِیْنَ لَہُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ
আর যখন যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা হয়ে যাবে, তখন শয়তান বলবে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন সত্য ওয়াদা, তোমাদের উপর আমার কোন আধিপত্য ছিল না, তবে আমিও তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, এখন আমি তা ভঙ্গ করলাম। তোমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, আর তোমরা আমার দাওয়াতে সাড়া দিয়েছ। সুতরাং তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করো না, বরং নিজদেরকেই ভৎর্সনা কর। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই, আর তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। ইতঃপূর্বে তোমরা আমাকে যার সাথে শরীক করেছ, নিশ্চয় আমি তা অস্বীকার করছি। নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। সূরা ইবরাহিম : ২২
গ. নেতারা অনুসারীদের থেকে দায়মুক্ত হবে
ইসলামে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে কোনো নেতা বা গোষ্ঠীর মনগড়া নিয়ম অনুসরণ করে, কিয়ামতের দিন তারাও চরম হতাশার মধ্যে পড়বে। সেই নেতারা তাদের অনুসারীদের অস্বীকার করবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَٱتَّخَذُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ ءَالِهَةٗ لِّيَكُونُواْ لَهُمْ عِزّٗا ٨١ كَلَّاۚ سَيَكْفُرُونَ بِعِبَادَتِهِمْ وَيَكُونُونَ عَلَيْهِمْ ضِدًّا ٨
আর তারা আল্লাহ ছাড়া বহু ইলাহ গ্রহণ করেছে, যাতে ওরা তাদের সাহায্যকারী হতে পারে। কখনো নয়, এরা তাদের ইবাদাতের কথা অস্বীকার করবে এবং তাদের বিপক্ষ হয়ে যাবে। সূরা মারইয়াম : ৮১-৮২
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَقَالُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّاۤ اَطَعْنَا سَادَتَنَا وَکُبَرَآءَنَا فَاَضَلُّوْنَا السَّبِیْلَا رَبَّنَاۤ اٰتِہِمْ ضِعْفَیْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْہُمْ لَعْنًا کَبِیْرًا
তারা আরো বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নেতৃবর্গ ও বিশিষ্ট লোকদের আনুগত্য করেছিলাম, তখন তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল’। হে আমাদের রব, আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দিন এবং তাদেরকে বেশী করে লা‘নত করুন’। সূরা আহযাব: ৬৭-৬৮
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِذْ تَبَرَّأَ ٱلَّذِينَ ٱتُّبِعُواْ مِنَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ وَرَأَوُاْ ٱلْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ ٱلْأَسْبَابُ ١٦٦ وَقَالَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةٗ فَنَتَبَرَّأَ مِنْهُمْ كَمَا تَبَرَّءُواْ مِنَّاۗ كَذَٰلِكَ يُرِيهِمُ ٱللَّهُ أَعْمَٰلَهُمْ حَسَرَٰتٍ عَلَيْهِمْۖ وَمَا هُم بِخَٰرِجِينَ مِنَ ٱلنَّارِ ١٦٧
“যখন অনুসরনীয় ব্যক্তিরা অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং তারা আযাব দেখতে পাবে। আর তাদের সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যারা অনুসরণ করেছে, তারা বলবে, যদি আমাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ হত, তাহলে আমরা তাদের থেকে আলাদা হয়ে যেতাম, যেভাবে তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে। এভাবে আল্লাহ তাদেরকে তাদের আমলসমূহ দেখাবেন তাদের আক্ষেপের জন্য, আর তারা আগুন থেকে বের হতে পারবে না”। সূরা বাকারা : ১৬৬-১৬৭
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার নিজের আমলের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সেদিন দুনিয়ার সব সম্পর্ক, প্রভাব এবং আনুগত্য ভেঙে যাবে। যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ইবাদত বা অনুসরণ করেছে, তারা চরম হতাশ হবে। তাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি বা শক্তি, তা সে শয়তান হোক, কোনো নেতা হোক, বা কোনো মূর্তি হোক—কেউই তাদের পাশে দাঁড়াবে না, বরং সবাই নিজেদের দায়মুক্ত ঘোষণা করবে। এই কারণে ইসলামে শিরক থেকে দূরে থাকার ওপর এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৪. হাশরের মাঠে পরকাল অস্বীকারকারীদের ধ্বংশ
পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে শাস্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই শাস্তিগুলো কেবল পরকালের জন্যই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে কবরের জীবন থেকেও শুরু হয়। কুরআনের আলোকে পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য কিছু প্রধান শাস্তি নিচে তুলে ধরা হলো:
ক. অন্ধ ও হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় হাশর
হাশরের ময়দানে পরকাল অস্বীকারকারীদের অন্ধ অবস্থায় উঠানো হবে। তারা কোনো কিছু দেখতে পাবে না এবং তাদের মধ্যে থাকবে গভীর হতাশা ও অনুশোচনা।
وَمَنْ اَعْرَضَ عَنْ ذِکْرِیْ فَاِنَّ لَہٗ مَعِیْشَۃً ضَنْکًا وَّنَحْشُرُہٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ اَعْمٰی
‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সূরা ত্ব-হা : ১২৪
খ. আমলনামা বাম হাতে দেওয়া
কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির আমলনামা (জীবনের হিসাব) দেওয়া হবে। যারা পরকাল অস্বীকারকারী, তাদের আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে। এতে তারা অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হবে।
وَاَمَّا مَنْ اُوْتِیَ کِتٰبَہٗ بِشِمَالِہٖ ۬ۙ فَیَقُوْلُ یٰلَیْتَنِیْ لَمْ اُوْتَ کِتٰبِیَہْ ۚ
কিন্তু যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে সে বলবে, ‘হায়, আমাকে যদি আমার আমলনামা দেয়া না হত’! সূরা আল-হাক্কাহ : ২৫
গ. চেহারার মলিনতা এবং কালিমা
কেয়ামতের দিন পরকাল অস্বীকারকারীদের চেহারা কালো ও মলিন হয়ে যাবে, যা তাদের অপমান ও পাপের পরিচায়ক হবে।
وَیَوْمَ الْقِیٰمَۃِ تَرَی الَّذِیْنَ کَذَبُوْا عَلَی اللّٰہِ وُجُوْہُہُمْ مُّسْوَدَّۃٌ ؕ اَلَیْسَ فِیْ جَہَنَّمَ مَثْوًی لِّلْمُتَکَبِّرِیْنَ
আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারাগুলো কালো দেখতে পাবে। অহঙ্কারীদের বাসস্থান জাহান্নামের মধ্যে নয় কি? সূরা আয-যুমার: ৬০
ঘ. কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি
কুরআন স্পষ্টভাবে বলে যে, পরকাল অস্বীকারকারীদের জন্য এক কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এই শাস্তি থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না এবং এর তীব্রতা হবে কল্পনাতীত।
بَلْ کَذَّبُوْا بِالسَّاعَۃِ ۟ وَاَعْتَدْنَا لِمَنْ کَذَّبَ بِالسَّاعَۃِ سَعِیْرًا ۚ
বরং তারা কিয়ামতকে অস্বীকার করেছে আর কিয়ামতকে যে অস্বীকার করে তার জন্য আমি প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুন। সূরা ফুরকান : ১১
ঙ. যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রদান করা হবে
পরকাল অস্বীকারকারীদের প্রধান পরিণতি হলো জাহান্নামে চিরস্থায়ী অবস্থান। এই জাহান্নাম থেকে তাদের কোনোদিন মুক্তি দেওয়া হবে না এবং তাদের কষ্ট কখনো শেষ হবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَالَّذِیْنَ کَفَرُوْا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ وَلِقَآئِہٖۤ اُولٰٓئِکَ یَئِسُوْا مِنْ رَّحْمَتِیْ وَاُولٰٓئِکَ لَہُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ
আর যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ ও তাঁর সাক্ষাত অস্বীকার করে তারা আমার রহমত থেকে হতাশ হবে এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা আনকাবুত : ২৩
এই শাস্তিগুলো পরকাল অস্বীকারের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে এবং বিশ্বাসীদেরকে সঠিক পথে চলার জন্য উৎসাহিত করে। এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, পরকালকে অস্বীকার করা কেবল একটি চিন্তাভাবনা নয়, বরং এর জন্য কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।
চ. কিয়ামতের দিন কাফিরদের জন্য কোন ওযনই স্থাপন করব না
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন খুব মোটাতাজা একজন বড় লোক আসবে। কিন্তু আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা একটি মশার পাখার সমানও হবে না। অতঃপর তিনি এর প্রমাণস্বরূপ বললেন, তোমরা এই আয়াতটি পাঠ কর-
فَلَا نُقِیْمُ لَهُمْ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَزْنًا
“আমি কিয়ামতের দিন কাফিরদের (নেক ’আমলের) জন্য কোন ওযনই স্থাপন করব না। সূরা কাহফ : ১০৫। সহিহ বুখারি : ৪৭২৯, সহহি মুসলিম : ২৭৮৫), মিশকাত : ৫৫৪৩, সহীহুল জামি : ২৪০৭, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩২০১, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ৩৫৮১