Category Archives: সুদ

সুদের বিধান :

লেখক :মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সুদের বিধান :

ইসলামি শরীয়তে সুদ বা রিবা (اَلرِّبَا) এর বিধান

সুদ বা রিবা (اَلرِّبَا) ইসলামী অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এবং এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সুদ একটি হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়। কুরআনে সুদ বা রিবা সম্পর্কে কয়েকটি স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُوۡنَ الرِّبٰوا لَا یَقُوۡمُوۡنَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُہُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا ؕ فَمَنۡ جَآءَہٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ فَانۡتَہٰی فَلَہٗ مَا سَلَفَ ؕ وَاَمۡرُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ

যারা সুদ ভক্ষণ করে তারা শাইতানের স্পর্শে মোহাভিভূত ব্যক্তির অনুরূপ কিয়ামাত দিবসে দন্ডায়মান হবে; এর কারণ এই যে, তারা বলে, ব্যবসা সুদের অনুরূপ বৈ তো নয়; অথচ আল্লাহ তা‘আলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন; অতঃপর যার নিকট তার রবের পক্ষ হতে উপদেশ সমাগত হয়, ফলে সে নিবৃত্ত হয়; সুতরাং যা অতীত হয়েছে তার কৃতকর্ম আল্লাহর উপর নির্ভর; এবং যারা পুনরায় সুদ গ্রহণ করবে তারাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানেই চিরকাল অবস্থান করবে। সুরা বাকারা : ২৭৫

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

یَمۡحَقُ اللّٰہُ الرِّبٰوا وَیُرۡبِی الصَّدَقٰتِ ؕ وَاللّٰہُ لَا یُحِبُّ کُلَّ کَفَّارٍ اَثِیۡمٍ

আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সদাকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোন অতি কুফরকারী পাপীকে ভালবাসেন না। সুরা বাকারা : ২৭৬

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَمَاۤ اٰتَیۡتُمۡ مِّنۡ رِّبًا لِّیَرۡبُوَا۠ فِیۡۤ اَمۡوَالِ النَّاسِ فَلَا یَرۡبُوۡا عِنۡدَ اللّٰہِ ۚ وَمَاۤ اٰتَیۡتُمۡ مِّنۡ زَکٰوۃٍ تُرِیۡدُوۡنَ وَجۡہَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُضۡعِفُوۡنَ

আর তোমরা যে সূদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ প্রাপ্ত। সূরা রূম : ৩৯

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ ‏.‏

রসূলুল্লাহ ﷺ লা’নাত করেছেন সুদখোরের উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও তার সাক্ষী দু’জনের উপর এবং বলেছেন এরা সবাই সমান। সহিহ মুসলিম : ১৫৯৮

কুরআন ও সহিহ হাদিসে সুদ বা রিবা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এটি নৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। কুরআন ও সুন্নাহ সুদ গ্রহণ ও প্রদানের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং এর পরিবর্তে একটি ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে। ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামি নির্দেশনা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

সুর হারমা হওয়ার হিকমত :

মুমিন মাত্রেই বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তাআলা এমন কিছুর নির্দেশ দেন না বা এমন কিছু থেকে বারণ করেন না যাতে কোনো না কোনো হিকমত বা নিগূঢ় রহস্য লুকায়িত থাকে নেই। আমরা যদি সে রহস্য জানতে পারি তাহলে তা আমাদের জন্য অতিরিক্ত অর্জন। যদি না জানি তবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। আমাদের কাম্য ও কর্তব্য হচ্ছে, আল্লাহ ও রাসূল ﷺ যা করতে বলেন তা সম্পাদন করা আর যা বারণ করেন তা থেকে বিরত থাকা। সুদ হারাম হওয়ার পেছনে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিকমত বা জ্ঞানগর্ভ উদ্দেশ্য রয়েছে। ইসলাম মানবসমাজের কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে। রিবা এই নীতিগুলোর পরিপন্থী বলে এটিকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। নিচে রিবা হারাম হওয়ার কিছু হিকমত তুলে ধরা হলো:

১. অর্থনৈতিক শোষণ রোধ

সুদের মাধ্যমে সম্পদশালী ব্যক্তি দরিদ্রদের বা আর্থিকভাবে দুর্বলদের ওপর শোষণ চালাতে পারে। ঋণগ্রহীতা ব্যক্তির প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে সুদদাতা অধিক মুনাফা অর্জন করেন, যা সমাজে আর্থিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। ইসলাম এই ধরনের শোষণমূলক প্রথাকে নিষিদ্ধ করেছে।

২. সম্পদ বণ্টনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা

সুদের মাধ্যমে সম্পদ কেবল ধনী ব্যক্তিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এটি ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও গরিব করে তোলে। ইসলামে এই বৈষম্য দূর করার জন্য সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাকাত এবং সাদাকার মাধ্যমে ধনী-গরিবের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে।

৩. পরিশ্রমের ভিত্তিতে আয়ের নীতিকে সমর্থন

ইসলামic অর্থনীতি পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং ন্যায্য ব্যবসার ভিত্তিতে আয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়। সুদ একটি প্যাসিভ উপার্জনের পদ্ধতি, যেখানে কোনো শ্রম বা ঝুঁকি গ্রহণ না করেই অর্থ উপার্জন করা হয়। এটি নৈতিকভাবে ইসলামিক অর্থনীতির মূলনীতির পরিপন্থী।

৪. সামাজিক সংহতি বজায় রাখা

সুদভিত্তিক লেনদেন সমাজে শ্রেণীসংঘাত সৃষ্টি করে। এটি ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে বৈরিতা এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। সুদমুক্ত অর্থনীতি এই ধরনের বিভাজন দূর করে সামাজিক সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে উৎসাহিত করে।

৫. আর্থিক সংকট ও অস্থিরতা রোধ

সুদভিত্তিক অর্থনীতি অনেক সময় অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। উচ্চ সুদের কারণে ঋণগ্রহীতারা ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়ে, যা দেউলিয়াত্ব, সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। ইসলামে সুদের পরিবর্তে অংশীদারিত্বমূলক বিনিয়োগ ব্যবস্থা (যেমন মুদারাবা বা মুশারাকা) চালু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা ঝুঁকি এবং লাভ-ক্ষতি উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।

৬. মানবিক দৃষ্টিকোণ রক্ষা

সুদ অর্থনীতিতে ঋণগ্রহীতার প্রয়োজন এবং দুর্বল অবস্থার সুযোগ নেওয়া হয়। এটি মানবিক সহমর্মিতার অভাবকে প্রকাশ করে। ইসলাম চায় মানুষ একজন আরেকজনের প্রতি সহানুভূতিশীল হোক এবং দান বা বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে একে অপরকে সাহায্য করুক।

৭. আল্লাহর আদেশের প্রতি আনুগত্য

সর্বোপরি, রিবা হারাম হওয়ার কারণ হলো, এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন। আল্লাহ কুরআনে রিবাকে হারাম এবং ব্যবসাকে হালাল বলে ঘোষণা করেছেন:

“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিনে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে সেই ব্যক্তি দন্ডায়মান হয়, যাকে শয়তান স্পর্শ করে উন্মাদ করে দিয়েছে। কারণ তারা বলে, ‘ব্যবসা তো সুদের মতোই।’ অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।”

(সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

রিবা হারাম হওয়ার মূল কারণ হলো, এটি সমাজে শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ইসলামের উদ্দেশ্য হলো একটি ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেকে পরিশ্রম এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে অর্থ উপার্জন করে এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখে।

হাদিসের আলোক সুদ :

সুদ হলো অতিরিক্ত অর্থ যা একটি ঋণের বিনিময়ে নির্দিষ্ট শর্তে ধারক বা ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে পরিশোধ করে। অন্যভাবে বলতে গেলে সুদ হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ধার নেওয়ার পর, ঋণগ্রহীতা তার ঋণ পরিশোধের সময় মূল পরিমাণ অর্থের সাথে অতিরিক্ত একটি পরিমাণ অর্থ (সুদ) প্রদান করে। এটি সাধারণত নির্দিষ্ট একটি সুদের হারে হিসাব করা হয়, যা ঋণ দেওয়ার সময়েই নির্ধারিত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সুদকে হারাম করা হয়েছে। ইসলামি শরিয়তে প্রধান তিন পন্থায় দেনদেন বা ক্রয় বিক্রয় করলে সুন হয়। যাথা : –

১. রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) বা উৎকর্ষের সুদ

২. রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ) সময়কালীন সুদ

৩. রিবা-ই-বাইয়ে ইনা (رِبَا بَيْعِ الْعِينَةِ) বা ছদ্ম বাণিজ্যের সুদ

প্রতিটির ক্ষেত্রে সুদের ধারণা ও প্রক্রিয়া ভিন্ন হলেও এগুলো হারাম বলে শরীয়তে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। নিচে প্রতিটি প্রকার বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :

১. রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) বা উৎকর্ষের সুদ

রিবা-ই-ফযল এমন সুদ যা একই ধরনের পণ্য বিনিময়ে অতিরিক্ত পরিমাণ গ্রহণ করার মাধ্যমে হয়। যখন একই ধরনের পণ্য (যেমন সোনা, রুপা, গম, খেজুর ইত্যাদি) বিনিময় করা হয় এবং এক পক্ষ অন্য পক্ষকে বেশি পরিমাণে গ্রহণ করে, তখন এটি রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) হিসেবে গণ্য হয়।

রিবা-ই-ফযল (رِبَا الْفَضْلِ) সম্পর্কিত কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করা হলো। এগুলোতে রিবা-ই-ফযল

+বা উৎকর্ষের সুদের নিষেধাজ্ঞা এবং তার বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, রিবা-ই-ফযল (বিনিময়জনিত সুদ) নির্দিষ্ট ছয় প্রকার বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই ছয়টি বস্তু হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এগুলো হলো-

সোনা (ذَهَبٌ), রূপা (فِضَّةٌ), গম (بُرٌّ), জব বা যব (شَعِيرٌ), খেজুর (تَمْرٌ) ও লবণ (مِلْحٌ)

(১) সোনা, রুপা, গম, খেজুর, জব ও লবন নগদ ছাড়া বিনিময় বিক্রি বৈধ নয়

উবাদাহ্ ইবনু সামিত (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ مِثْلاً بِمِثْلٍ سَوَاءً بِسَوَاءٍ يَدًا بِيَدٍ فَإِذَا اخْتَلَفَتْ هَذِهِ الأَصْنَافُ فَبِيعُوا كَيْفَ شِئْتُمْ إِذَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ ‏”‏ ‏.‏

স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর এবং লবণের বিনিময়ে লবণ সমান সমান পরিমাণ ও হাতে হাতে (নগদ) হবে। অবশ্য এ দ্রব্যগুলো যদি একটি অপরটির ব্যতিক্রম হয় তোমরা যেরূপ ইচ্ছা বিক্রি করতে পার যদি হাতে হাতে (নগদে) হয়। সহিহ মুসলিম : ১৫৮৭

আবূ সাঈদ (রাযিঃ) আপন অঙ্গুলি দ্বারা তার দু’চোখ ও দু’কানের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আমার চক্ষুদ্বয় দেখেছে ও কর্ণদ্বয় শুনেছে রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ تَبِيعُوا الذَّهَبَ بِالذَّهَبِ وَلاَ تَبِيعُوا الْوَرِقَ بِالْوَرِقِ إِلاَّ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَلاَ تُشِفُّوا بَعْضَهُ عَلَى بَعْضٍ وَلاَ تَبِيعُوا شَيْئًا غَائِبًا مِنْهُ بِنَاجِزٍ إِلاَّ يَدًا بِيَدٍ ‏

তোমরা স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ বিক্রি করো না এবং রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য বিক্রি করো না, সমান সমান পরিমাণ ব্যতীত। আর তোমরা সেটার এক অংশকে অন্য অংশ অপেক্ষা বেশী করো না এবং হাতে হাতে ব্যতীত নগদের বিনিময়ে বাকীতে বিক্রি করো না। সহিহ মুসলিম : ১৫৮৪

মালিক ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একশ দ্বীনারের বিনিময় সারফ এর জন্য লোক সন্ধান করছিলেন। তখন তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে ডাক দিলেন। আমরা বিনিময় দ্রব্যের পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করতে থাকলাম। অবশেষে তিনি আমার সঙ্গে সারফ করতে রাজী হলেন এবং আমার হতে স্বর্ণ নিয়ে তার হাতে নাড়া-চাড়া করতে করতে বললেন, আমার খাযাঞ্চী গাবা (নামক স্থান) হতে আসা পর্যন্ত (আমার জিনিস পেতে) দেরী করতে হবে। ঐ সময়ে উমার (রাঃ) আমাদের কথা-বার্তা শুনছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, আল্লাহর কসম! তার জিনিস গ্রহণ না করা পর্যন্ত তুমি তার হতে বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না। কারণ, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, নগদ নগদ না হলে স্বর্ণের বদলে স্বর্ণের বিক্রয় (সুদ) হবে। নগদ নগদ ছাড়া গমের বদলে গমের বিক্রয় সুদ হবে। নগদ নগদ ছাড়া যবের বদলে যবের বিক্রয় রিবা হবে। নগদ নগদ না হলে খেজুরের বদলে খেজুরের বিক্রয় সুদ হবে। সহিহ বুখারি : ২১৭৪

উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণের সাথে যদি উভয় পক্ষ থেকে নগদ আদান-প্রদান না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। গমের বিনিময়ে গমের সাথে, যদি উভয় পক্ষ থেকে (সমান) আদান-প্রদান না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। খেজুরের বিনিময় খেজুরের সাথে, যদি উভয় পক্ষ থেকে নগদ লেনদেন (সম-পরিমাণ) না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। যবের বিনিময়ে যবের সাথে, যদি উভয় পক্ষ থেকে নগদ লেনদেন (সম-পরিমাণ) না হয় তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৩৪৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২২৫৩

(২) নগদ ছাড়া খেজুরের পরিবর্তে খেজুর বিক্রয় করা সুদ ;

উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলে-

الْبُرُّ بِالْبُرِّ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ

হাতে হাতে (নগদ নগদ) ছাড়া গমের বদলে গম বিক্রি করা সুদ, নগদ নগদ ছাড়া যবের বদলে যব বিক্রয় সুদ, নগদ নগদ ব্যতীত খেজুরের বিনিময়ে খেজুর বিক্রয় সুদ। সহিহ বুখারি : ২১৭০

(৩) শুকনো আঙ্গুরের পরিবর্তে শুকনো আঙ্গুর এবং খাদ্য দ্রব্যের পরিবর্তে খাদ্য দ্রব্য ক্রয় বিক্রয়।

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত যে-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ الْمُزَابَنَةِ وَالْمُزَابَنَةُ بَيْعُ الثَّمَرِ بِالتَّمْرِ كَيْلاً وَبَيْعُ الزَّبِيبِ بِالْكَرْمِ كَيْلاً

আল্লাহর রাসূল ﷺ মুযাবানা নিষেধ করেছেন। তিনি (রা.) বলেন, মুযাবানা হলো তাজা খেজুর শুকনো খেজুরের বদলে ওজন করে বিক্রি করা এবং কিসমিস তাজা আঙ্গুরের বদলে ওজন করে বিক্রি করা। সহিহ বুখারি : ২১৭০, ২১৭২, ২১৭৫, ২২০৫, সহিহ মুসলিম : ১৫৪২

(৩) মুহাকালা, মুখাদারা, মুখাবারা ও মুযাবানার বিক্রি নিষেধ

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ نَهَى عَنْ الْمُزَابَنَةِ وَالْمُحَاقَلَةِ وَالْمُزَابَنَةُ اشْتِرَاءُ الثَّمَرِ بِالتَّمْرِ فِي رُءُوسِ النَّخْلِ

আল্লাহর রাসূল ﷺ মুযাবানা ও মুহাকালা বারণ করেছেন। মুযাবানার অর্থ- শুকনো খেজুরের বিনিময়ে গাছের মাথায় অবস্থিত তাজা খেজুর ক্রয় করা। সহিহ বুখারি : ২১৮৬, সহিহ মুসলিম : ১৫৪৬,

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-

 نَهَى رَسُولُ اللهِ  ﷺ عَنْ الْمُحَاقَلَةِ وَالْمُخَاضَرَةِ وَالْمُلاَمَسَةِ وَالْمُنَابَذَةِ وَالْمُزَابَنَةِ

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাকালা, মুখাদার, মুলামাসা, মুনাবাযা ও মুযাবানা নিষিদ্ধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ২২০৭

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাকালা, মুযাবানা, মুখাবারা এবং খেজুর লাল বা মেটে লাল অথবা খাদ্যোপযোগী হওয়ার পূর্বে খরিদ করতে নিষেধ করেছেন। মুহাকালা হল ক্ষেতের শস্য নির্ধারিত পরিমাণ খাদ্যের বিনিময়ে বিক্রি করা। মুযাবান হচ্ছে- গাছের খেজুর কয়েক ওসক খুরমার বিনিময়ে বিক্রি করা। মুখাবারা বলা হয়- এক তৃতীয়াংশ, এক চতূর্থাংশ বা এইরূপ নির্দিষ্ট কোন অংশকে। সহিহ মুসলিম : ৩৭৬৭ ইফা.

মুহাকালা অর্থ- ওজন বা মাপকৃত ফজলের বদলে শীষে থাকাবস্থায় ফসল বিক্রি করা।

মুখাদারা অর্থ- কাঁচা ফল শস্য বিক্রি করা।

মুযাবানা অর্থ- শুকনো খেজুরের বিনিময়ে গাছের মাথায় অবস্থিত তাজা খেজুর ক্রয় করা।

মুখাবারা অর্থ –  এক তৃতীয়াংশ, এক চতূর্থাংশ বা এইরূপ নির্দিষ্ট কোন অংশ।

দ্রব্যে বিনিময়ে বেশী নিলে সুদ হবে-

খেজুর, লবন ও গমের বিনিময়ে বাকিতে করলে সুদ হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

التَّمْرُ بِالتَّمْرِ وَالْحِنْطَةُ بِالْحِنْطَةِ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ مِثْلاً بِمِثْلٍ يَدًا بِيَدٍ فَمَنْ زَادَ أَوِ اسْتَزَادَ فَقَدْ أَرْبَى إِلاَّ مَا اخْتَلَفَتْ أَلْوَانُهُ ‏

খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব ও লবণের বিনিময়ে লবণ সম পরিমাণ ও হাতে হাতে হতে হবে। কেউ যদি বেশী দেয় বা বেশী নেয় তবে সুদ হবে। তবে যদি এর শ্রেণী পরিবর্তন হয়। (তবে কম-বেশী জায়িয হবে)। “যে পণ্য একই ধরনের, তা বিনিময় করতে হলে সমান পরিমাণে এবং হাতেহাতে হওয়া আবশ্যক। যদি তা সময়ক্ষেপণ করা হয়, তবে তা রিবা। সহিহ মুসলিম: ১৫৮৮, সুনানে নাসায়ি : ৪৫৫৪

আবূ সা’ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন বিলাল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ’বার্‌নী’ জাতীয় খুরমা নিয়ে আসলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই জাতীয় খুরমা কোথায় পেলে? বিলাল বললেন, আমার কাছে কিছু খারাপ খুরমা ছিল। আমি এগুলোর দু’ সা’ এ জাতীয় এক সা’ খুরমার বিনিময়ে বিক্রি করেছি। এটা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আহ! এটাই তো ’সুদী’ লেনদেন। এটাইতো প্রকৃত সুদ। এরূপ করবে না, বরং তুমি এ খারাপ খুরমা পরিমাণে বেশি দিয়ে ভালো খুরমা পরিমাণে কম কিনতে চাইলে পৃথকভাবে মুদ্রার বিনিময়ে খারাপ খুরমা বিক্রি করে তার মূল্য দিয়ে ভালো খুরমা ক্রয় করবে। সহিহ বুখারি : ২২১২, সহিহ মুসলিম ১৫৯৪, নাসায়ী ৪৫৫৭, মিশকাত : ২৮১৪ আহমাদ ১১৫৯৫।

উপরে বর্ণিত হাদিসগুলোতে رِبَا الْفَضْلِ (রিবা-ই-ফযল) বা উৎকর্ষের সুদ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলাম সুদকে সমাজের শোষণ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণ হিসেবে দেখে। তাই রিবা-ই-ফযল থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

২. রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ) সময়কালীন সুদ :

ঋণের নির্ধারিত সময় সীমা বৃদ্ধি করার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা গ্রহণের মাধ্যমে যে সুদ হয় তাকে রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ)। যখন কোনো পক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ দেয় এবং বিনিময়ে অতিরিক্ত মুনাফা বা সুবিধা আদায় করে তখন তাকে রিবা-ই-নাসিয়া  (رِبَا النَّسِيئَةِ)  বলা হয়। এটি সুদের সর্বাধিক প্রচলিত প্রকার। রিবা-ই-নাসিয়া কে সময়কালীন সুদও বলা হয়।

আমাদের সমাজে সুধ বলতে মুলত এই সুদকে বুঝান হয়। পুর্বের যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই সুদই মুলত ব্যাপক প্রচলিত। আমাদের বর্তমান বিশ্বে যতগুলো আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক, বীমা) আছে সবাই এই সুদের সাথে জড়িত। এই সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাধারণ অর্থ লগ্নী করে বা টাকা ঋন দিয়ে উক্ত অর্থ পরিশোধের সময় নির্ধারণ করে দেয় এবং পরিনামে ঋন গ্রীহিতার নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা। ইসলমি শরীয়তে এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করাকে রিবা-ই- নাসিয়া বলা হয়। ঋণের সময় সীমা বৃদ্ধির বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ আদা|য় ইসলামি  শরীয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রিবা-ই-নাসিয়া সম্পর্কিত কুরআন ও হাদিস থেকে উল্লেখ করা হলো-

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوا الرِّبٰۤوا اَضۡعَافًا مُّضٰعَفَۃً ۪  وَاتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ۚ

হে মুমিনগণ, তোমরা সুদ খাবে না বহুগুণ বৃদ্ধি করে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। সুরা আল ইমরান : ১৩০

উসামা ইবনে যায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

“مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا ثُمَّ اشْتَرَطَ عَلَيْهِ زِيَادَةً فَهُوَ الرِّبَا”

কোনো ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করতে দেরি করলে এবং সে শর্ত দেয় যে তাকে অতিরিক্ত কিছু দিতে হবে, তবে তা রিবা। মুস্তাদরাক আল-হাকিম : ২১৯২

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন-

“الرِّبَا رِبَاءَانِ، فَرِبًا لَا يَحِلُّ، وَرِبًا يُتَّقَى، فَأَمَّا الرِّبَا الَّذِي لَا يَحِلُّ فَالرِّبَا فِي النَّسِيئَةِ.”

সুদ দুই প্রকার। এর মধ্যে সময় বৃদ্ধির শর্তে যে বাড়তি নেওয়া হয়, সেটি সর্বাধিক নিষিদ্ধ। সুনানে দারকুতনি : ২৯৫৫

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) তাফসির উল্লেখ করেন-

إِنَّمَا كَانَ رِبَا الْجَاهِلِيَّةِ أَنْ يَكُونَ لِلرَّجُلِ عَلَى الرَّجُلِ الْحَقُّ إِلَى أَجَلٍ، فَإِذَا حَلَّ الْأَجَلُ قَالَ: أَتَقْضِي أَمْ تُرْبِي؟

“জাহেলি যুগে সুদের রূপ ছিল এই যে, কোনো ব্যক্তির কাছে অন্য ব্যক্তির নির্দিষ্ট একটি ঋণ থাকত নির্ধারিত সময় পর্যন্ত। যখন সেই সময় শেষ হতো, তখন ঋণদাতা বলত: ‘তুমি কি পরিশোধ করবে, নাকি সুদ (অতিরিক্ত) দেবে?

 মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ২০৬৭২, তাফসির ইবনে কাসির: সূরা আল-ইমরান, আয়াত ১৩০ এর তাফসিরে।

জাবির (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ ‏.‏

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লা’নাত করেছেন সুদখোরের উপর, সুদদাতার উপর, এর লেখকের উপর ও তার সাক্ষী দু’জনের উপর এবং বলেছেন এরা সবাই সমান। সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮, সুনান আত-তিরমিজি : ১২০৬, সুনান আবু দাউদ : ৩৩৩৩

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ رِبًا إِلاَّ هَاءَ وَهَاءَ ‏

নগদ আদান-প্রদান না হলে সোনার বিনিময়ে স্বর্ণমুদ্রা গ্রহণ সুদের অন্তর্ভুক্ত। গমের পরিবর্তে গম নগদ বিনিময় না হলে সূদ হবে। বার্লির সাথে বার্লির নগদ বিনিময় না হলে সুদ হবে। খেজুরের সাথে খেজুরের বিনিময় নগদ না হলে সুদ হবে।

ইবনু মাজাহ : ২২৫৩, ২২৫৯, ২২৬০, সহীহুল বুখারী ২১৩৪, ২১৭০, ২১৭৪, মুসলিম ১৫৮৬, তিরমিযী ১২৪৩, নাসায়ী ৪৫৫৮, আবূ দাউদ ৩৩৪৮, আহমাদ ১৬৩, ২৪০, ৩১৬, মুয়াত্তা মালেক ১৩২৮, ১৩৩৩, দারেমী ২৫৭৮, ইরওয়া ১৩৪৭, রাওদুন নাদীর ৭২৯।

৩. রিবা-ই-বাইয়ে ইনা (رِبَا بَيْعِ الْعِينَةِ) বা ছদ্মবাণিজ্যের সুদ

রিবা-ই-বাইয়ে ইনা এমন একটি সুদ যেখানে বাণিজ্যের আড়ালে শর্ত সাপেক্ষে একটি পণ্য বেশি দামে বিক্রি করা হয় এবং পরে কম দামে ফিরে কেনা হয়। যখন দুটি পক্ষ বাণিজ্যের ছদ্মবেশে সুদ আদান-প্রদান করে। একজন অন্যজনকে একটি পণ্য বিক্রি করে এবং পরে তা বেশি মূল্যে ক্রয় করে, তখন এটি রিবা-ই-বাইয়ে ইনা। প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ধারে অধিক মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনার একটি উদাহরণ-১

জাহিদ, তারিককের নিটক ১০,০০০ টাকায় একটি মোবাইল ফোন বিক্রি করল এই শর্ত যে তুমি আমাকের এক বছর পর এই ১০,০০০ টাকার পরিশেধ করবে। আর্থাত মোবাইলটি বাকিতে বিক্রি করল। কিন্তু পরে জাহিদ আর তারিকের নিকট হতে সেই একই মোবাইল ৮০০০ টাকায় ক্রয় করে নিল। জাহিদের মোবাইল জাহিদের নিকটই রইল। অপর পক্ষে তারিক ৮০০০ টাকা পেলে। এই ৮০০০ টাকা তারিক জাকিদকে এক বছর পর দিবে। কিন্তু তাকে ৮০০০ টাকা নয় তাকে ১০০০০ টাকা ফেরত দিতে হবে। তারিককে অতিরিক্ত ২০০০ টাকা সুদ দিতে হবে।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনার একটি উদাহরণ-২

এক ব্যক্তির অর্থের প্রয়োজন হল। ঋণ কোথাও না পেয়ে এক গাড়ির ডিলারের নিকট গেল। ডিলারের নিকট থেকে ধারে ৫০ হাজার টাকায় একটি গাড়ি কিনল। অতঃপর সেই গাড়িকেই ঐ ডিলারের নিকট নগদ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বিক্রি করল। যার ফলে ১০ হাজার টাকা ডিলারের পকেটে অনায়াসে এসে গেল।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনার একটি উদাহরণ-৩

জহির রায়হানের নিকটি একটি মেশিন বিক্রি করল ৫ লাখ টাকায়, যা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। মেশিনটি আবার জহিরের নিকট রায়হান তাৎক্ষণিকভাবে ৪ লাখ টাকায় নগদ বিক্রি করে দিল। যার ফলে বায়হান এখন ৪ লাখ টাকা নগদ পেল এবং ছয় মাস পর ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করবে। আসল উদ্দেশ্য ছিল ১ লাখ টাকা সুদ আদান-প্রদান।

দুই ব্যবসায়ীর মাঝে তৃতীয় ব্যক্তির মধ্যস্থতাঃ-

এ ব্যবসা এই রূপ যে, ঋণদাতা ও গ্রহীতা নির্দিষ্ট টাকার আদান প্রদানে নিজের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ হয়। কিন্তু সুদ থেকে বাচতে তারা চতুরতার আশ্রয় নেয়। অতঃপর উভয়ে বাজারে কোন দোকানদারের নিকট এসে চুক্তি পরিমাণ টাকার পণ্য ঋণ দাতা খরীদ করে নেয়। অতঃপর সে ঋণ গ্রহীতার নিকট উক্ত পণ্য ধারে বিক্রয় করে। পুনরায় ঋণ গ্রহীতা এ পণ্য ঘুরে দোকানদারকে কম দরে বিক্রয় করে। এইভাবে দোকানদার এই সূদী কারবারে মধ্যস্থতা করে। টাকা পরিশোধের সময় বেশী পায় ঋণ দাতা। মাঝখান থেকে মধ্যস্থতার নামে লাভ হয় দোকানদারেরও। আল্লামা ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন, ‘এ কারবার সূদী কারবারের পর্যায়ভুক্ত। ফতোয়া ইবনে তাইমিয়াহ ২৯/৪৪১, শায়খ ইবনে উসাইমীন বলেন, ‘এ কারবার নিঃসন্দেহে হারাম। আল- মুদায়ানাহ, পৃ-৮

উদারহণ-

জাহিদ রফিককে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দিবে বলে চুক্তিবদ্ধ হয়। সরাসরি টাকা না দিয়ে জাহিদ মটর সো রুমে গিয়ে ৫০ হাজার টাকায় একটি বাইক ক্রয় করে। এই বাইকটি জাহিদ রফিকের নিকট ধারে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে। বাইকের মালিক এখন রফিক। এবার রফিক উক্ত বাইকটি পুরনায সো রুমের মালিকের নিকট ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। এইভাবে দোকানদার এই সূদী কারবারে মধ্যস্থতা করে লাভবান হয়।

এই দুটি উদারহর দ্বারা মনে হয় রিবা-ই-বাইয়ে ইনা (رِبَا بَيْعِ الْعِينَةِ) বা ছদ্মবাণিজ্যের সম্পর্কে বুঝতে পেরেছেন। এই সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস উল্লেখ করছি।

মহান আল্লাহ বলেন-

 ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا

আল্লাহ ব্যসাকে (الۡبَیۡعَ) হালাল করেছেন এবং সুদকে (الرِّبَا) হারাম করেছেন। সূরা বাকারা : ২৭৫

মহান আল্লাহ ক্রয় বিক্রয় বা ব্যবসা হালাল করেছে। এই কারনে সরাসরি টাকা ঋন না দিয়ে, ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে প্রতারণার করে ছদ্ম বানিজ্যের আশ্রয় নেয়। কিন্তু মহান আল্লাহ সুক্ষদর্শী তিনি এই সকল বানিজ্যকে হারাম করেছন।

রিবা-ই-বাইয়ে ইনা সম্পর্কিত কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো-

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-

إِذَا تَبَايَعْتُمْ بِالْعِينَةِ، وَأَخَذْتُمْ أَذْنَابَ الْبَقَرِ، وَرَضِيتُمْ بِالزَّرْعِ، وَتَرَكْتُمُ الْجِهَادَ، سَلَّطَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ ذُلًّا لَا يَنْزِعُهُ حَتَّى تَرْجِعُوا إِلَى دِينِكُمْ

যখন তোমরা ঈনা (ছদ্মবাণিজ্য) পদ্ধতিতে ব্যবসা করবে, গরুর লেজ আঁকড়ে ধরবে, কৃষিকাজেই সন্তুষ্ট থাকবে এবং জিহাদ ছেড়ে দিবে তখন আল্লাহ তোমাদের উপর লাঞ্ছনা ও অপমান চাপিয়ে দিবেন। তোমরা তোমাদের দ্বীনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহ তোমাদেরকে এই অপমান থেকে মুক্তি দিবেন না। সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬২. সহিহাহ : ১১, সহিহ আল জামে : ৪২৩

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত:

لَا يَأْتِيَنَّ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ إِلَّا أَكَلُوا الرِّبَا، فَإِنْ لَمْ يَأْكُلُوهُ أَصَابَهُمْ مِنْ غُبَارِهِ

মানুষের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন তারা সকলেই সুদ গ্রহণ করবে। যদি তারা সরাসরি সুদ না খায়, তবে এর ধুলো-বালু তাদের স্পর্শ করবে। সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩১

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন-

“إِذَا بَاعَ الرَّجُلُ السِّلْعَةَ ثُمَّ اشْتَرَاهَا بِأَكْثَرَ مِنْ ثَمَنِهَا، فَهُوَ الرِّبَا.”

যদি একজন ব্যক্তি একটি পণ্য বিক্রি করে এবং পরে তা আগের দামের চেয়ে বেশি দামে পুনরায় ক্রয় করে, তাহলে এটি মূলত সুদ। সুনান দারকুতনি : ৩৩৪২

উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত-

إِنَّكُمْ تَسْتَحِلُّونَ الرِّبَا بِالْبَيْعِ

তোমরা বাণিজ্যের নামে সুদকে বৈধ করার চেষ্টা করবে। মুসনাদ আহমদ : ২৫৪০০

রিবা-ই-বাই’আল-ইনা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ এটি বাণিজ্যের আড়ালে সুদকে বৈধ করার একটি পদ্ধতি। এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে ইসলামের মূলনীতি হলো শোষণ মুক্ত এবং ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তাই মুসলমানদের এই ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা উচিত।

হারাম মাল বিক্রি করা হারাম : মদ, মৃতজন্তু, শূকর ও মূর্তি বিক্রি করা হারাম

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ حُرِّمَ عَلَيْهِمُ الشَّحْمُ فَبَاعُوهُ وَأَكَلُوا ثَمَنَهُ ‏”

আল্লাহ ইয়াহুদী জাতিকে ধ্বংস করুন। তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয়েছে, তারপর তারা তা বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করেছে। সহহি মুসলিম : ১৫৮৩

ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, “উমর (রাযিঃ) এর নিকট এ খবর এলো যে, সামুরা (রাযিঃ) মদ বিক্রি করেছেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ সামুরার ধ্বংস করুন। সে-কি জানে না যে, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ আল্লাহ ইয়াহুদী জাতির উপর অভিশাপ দিয়েছেন। তাদের উপর চর্বি হারাম করা হয়েছিল। এরপর তারা তা গলিয়ে বিক্রি করে। সহহি মুসলিম : ১৫৮২

এমন কিছু লেনদের আছে যা সুদমুক্ত ;

সোনার পরিবর্তে অন্য ধাতুর কমবেশীতে বিক্রি সুদ হবে না-

আবূ বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন-

لاَ تَبِيعُوا الذَّهَبَ بِالذَّهَبِ إِلاَّ سَوَاءً بِسَوَاءٍ وَالْفِضَّةَ بِالْفِضَّةِ إِلاَّ سَوَاءً بِسَوَاءٍ وَبِيعُوا الذَّهَبَ بِالْفِضَّةِ وَالْفِضَّةَ بِالذَّهَبِ كَيْفَ شِئْتُمْ

সমান সমান ছাড়া তোমরা সোনার বদলে সোনা বিক্রয় করবে না। অনুরূপ রূপার বদলে রূপা সমান সমান ছাড়া (বিক্রি করবে না)। রূপার বদলে সোনা এবং সোনার বদলে রূপা যেভাবে ইচ্ছে, কেনা বেচা করতে পার। সহিহ বুখারি ২১৭৫, সহিহ মুসলিম : ১৫৯০, আহমাদ ২০৪১৭

উবাদাহ্ ইবনু সামিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর এবং লবণের বিনিময়ে লবণ সমান সমান পরিমাণ ও হাতে হাতে (নগদ) হবে। অবশ্য এ দ্রব্যগুলো যদি একটি অপরটির ব্যতিক্রম হয় (অর্থাৎ- পণ্য এক জাতীয় না হয়) তোমরা যেরূপ ইচ্ছা বিক্রি করতে পার যদি হাতে হাতে (নগদে) হয়। সহিহ মুসলিম : ১৫৮৭

আরিয়া পদ্ধতির লেনদেন বা গাছের মাথার খেজুর অনুমানে ক্রয়-বিক্রয়

জায়িদ ইবনে সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

أَرْخَصَ لِصَاحِبِ الْعَرِيَّةِ أَنْ يَبِيعَهَا بِخَرْصِهَا

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাছের উপরিস্থিত খেজুর অনুমানে পরিমাণ নিরূপণ করে বিক্রয় করার অনুমতি দিয়েছেন। সহহি বুখারি : ২১৮৮, ২১৯৩, ২৩৮০, সহিহ মুসলিম ১৫৩৪, ১৫৩৯, সুনানে তিরমিজি :  ১৩০০, ১৩০২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৬৮, ২২৬৯, সুনানে নাসায়ী : ৪৫৩২, ৪৫৩৬, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৩৬২

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপযোগী হওয়ার আগে ফল বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। এর কিছুই দ্বীনার ও দিরহাম এর বিনিময় ব্যতীত বিক্রি করা যাবে না, তবে আরায়্যার হুকুম এর ব্যতিক্রম। সহহি বুখারি : ২১৮৯, সহিহ  মুসলিম : ১৫৩৬

যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাইয়ার ব্যাপারে অনুমতি দিয়েছেন যে, ওযনকৃত খেজুরের বিনিময়ে গাছের অনুমানকৃত খেজুর বিক্রি করা যেতে পারে। মূসা ইবনু ‘উকবা (রহ.) বলেন, আরাইয়া বলা হয়, বাগানে এসে কতগুলো নির্দিষ্ট গাছের খেজুর (শুকনা খেজুরের বদলে) ক্রয় করে নেয়া। সহিহ বুখারি : ২১৯২

আবিয়া পদ্ধতিতে ফলের উপযুক্ততা প্রকাশের পর বিক্রি করতে হবে :

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ بَيْعِ الثِّمَارِ حَتَّى يَبْدُوَ صَلاَحُهَا نَهَى الْبَائِعَ وَالْمُبْتَاعَ

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফলের উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার আগে তা বিক্রি করতে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে নিষেধ করেছেন। সহিহ বুখারি : ২১৯৪, সহহি মুসলিম : ১৫৩৪

আনাস ইবনু মালিক (রহ.) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুর ফল পোখতা হওয়ার আগে বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। আবূ আবদুল্লাহ (ইমাম বুখারী) বলেন, অর্থাৎ লালচে হওয়ার আগে। সহিহ বুখারি : ২১৯৫

জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফলের রং পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। রাবী বলেন, অর্থাৎ লালচে বর্ণের বা হলুদ বর্ণের না হওয়া পর্যন্ত এবং তা খাওয়ার যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত। সহিহ বুখারি : ২১৯৬

উপযুক্ততা প্রকাশের পূর্বে বিক্রয় করলে, যদি কোন কারণে নষ্ট হয়, তবে ক্ষতি মালিক উপর বর্তবে :

ইবনু শিহাব (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি যদি ফলের উপযুক্ততা প্রকাশের পূর্বে তা ক্রয় করে, পরে তাতে মড়ক দেখা দেয়, তবে যা নষ্ট হবে তা মালিকের উপর বর্তাবে। [যুহরী (রহ.)] বলেন, আমার নিকট সালিম ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রহ.) ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উপযোগিতা প্রকাশ হওয়ার পূর্বে তোমরা ফল ক্রয় করবে না এবং শুকনো খেজুরের বিনিময়ে তাজা খেজুর বিক্রি করবে না। সহিহ বুখারি : ২১৯৯

অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে

 ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আসলেন তখন সেখানকার লোকেরা এক, দুই অথবা তিন বছরের মেয়াদে খেজুর অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় করতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কেউ অগ্রিম খেজুর ক্রয়-বিক্রয় করলে তাকে তা নির্দিষ্ট পরিমাপে, নির্দিষ্ট ওজনে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে করতে হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬৩

চতুস্পদ জন্তু অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়

১/২২৮৫। আবূ রাফে (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির নিকট থেকে ধারে একটি উঠতি বয়সের উট কিনেন এবং বলেনঃ যাকাতের উট এলে তোমার ধার পরিশোধ করবো। অতঃপর যাকাতের উট এলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে আবূ রাফে! সেই লোকের উটটি পরিশোধ করো। অতএব আমি চার বছর বা ততোধিক বয়সের উট ছাড়া আর কোন উট পেলাম না। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি বলেনঃ ওটাই তাকে দাও। কেননা লোকেদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে উত্তমভাবে ঋণ পরিশোধ করে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৮৫, মুসলিম ১৬০০, তিরমিযী ১৩১৮, নাসায়ী ৪৬১৭, আবূ দাউদ ৩৩৪৬, আহমাদ ২৬৬৪০, মুয়াত্তা মালেক ১৩৮৪, দারেমী ২৫৬৫, বায়হাকী ফিস সুনান ৬/২১, ইরওয়া ১৩৭১।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অস্পষ্ট চুক্তি নিষিদ্ধ-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“مَنْ بَاعَ بَيْعَتَيْنِ فِي بَيْعَةٍ، فَلَهُ أَوْكَسُهُمَا، أَوِ الرِّبَا.”

যে ব্যক্তি একই দ্রব্য বিক্রয়ে দু’টি শর্ত বা নিয়ম রাখে, তাকে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে (সর্বনিম্ন মূল্য) গ্রহণ করতে হবে, নতুবা এটি হবে সুদ। সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৬১, সুনানে তিরমিজি : ১২৩৬

উদাহরণ:

একজন বিক্রেতা ক্রেতাকে বললেন, তুমি যদি নগদ টাকা দিয়ে এই পণ্য কিনো, তাহলে মূল্য হবে ১০০০ টাকা। তুমি যদি কিস্তিতে পরিশোধ করো, তাহলে মূল্য হবে ১২০০ টাকা। ক্রেতা হয়তো চুক্তি সম্পাদনের সময় এই দু’টির মধ্যে কোনো একটি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করেনি, বরং পরে সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে এটি “এক দ্রব্যের জন্য দু’টি মূল্য নির্ধারণ” হয়ে যায়, যা দ্ব্যর্থতা সৃষ্টি করে।  ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এই ধরনের অস্পষ্টতা নিষিদ্ধ। বিক্রেতা এবং ক্রেতার মধ্যে চুক্তি সুস্পষ্ট হতে হবে। যদি বিক্রেতা ক্রেতার কাছ থেকে চুক্তির সময় সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না নেয় এবং পরে বেশি মূল্য দাবি করে, এটি মূলত সুদের মতো হয়। কারণ ক্রেতা দ্ব্যর্থতার মধ্যে থেকে পরে বেশি পরিশোধ করতে বাধ্য হতে পারে, যা জুলুম ও রিবা (সুদ) হিসেবে বিবেচিত।

ইসলাম সুদ ও ব্যবসা

ইসলাম সুদ ও ব্যবসা

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সুদের ইতিহাস : কুরআন ও হাদিসের আলোকে

সুদ একটি প্রাচীন অর্থনৈতিক প্রথা, যা মানবসভ্যতার শুরু থেকেই বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত ছিল। ইসলাম এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং কুরআন ও হাদিসে সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। নিচে সুদের ইতিহাস ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হলো।

প্রাচীন যুগে সুদের প্রচলন

সুদ ব্যবস্থা পৃথিবীর আদিকাল থেকেই সমাজে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন সভ্যতায়, বিশেষ করে ব্যাবিলনীয়, মিশরীয়, গ্রিক এবং রোমান সাম্রাজ্যে সুদ প্রথা প্রচলিত ছিল। ধনী শ্রেণি দরিদ্রদের ঋণ দিয়ে তাদের কাছ থেকে চড়া সুদ আদায় করত, যা তাদের আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিত। প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা এবং প্রাচীন গ্রন্থে তথ্য পাওয়া যায়।

১. ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় সুদ

ব্যাবিলনীয়দের মধ্যে সুদপ্রথার অস্তিত্ব পাওয়া যায় “হাম্মুরাবির বিধান” (Hammurabi’s Code) এ, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ সালের কাছাকাছি সময়কার। এই বিধানে ঋণের সুদের হার নির্দিষ্ট করা হয়েছিল এবং সুদখোরদের জন্য কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। Hudson, Michael. The Lost Tradition of Biblical Debt Cancellations (1993).

২. মিশরীয় সভ্যতায় সুদ

প্রাচীন মিশরীয়রা কৃষি ও ব্যবসার জন্য ঋণ গ্রহণ করত, এবং এর বিপরীতে চড়া সুদ গুণতে হতো। মিশরীয় প্যাপিরাস লিপিতে সুদসহ ঋণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। Henry, John F. The Evolution of Economic Institutions (2004).

৩. গ্রিক সভ্যতায় সুদ

গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (Aristotle) সুদকে অন্যায় ও অপ্রাকৃতিক আয়ের উৎস হিসেবে বর্ণনা করেছেন। Finley, Moses. The Ancient Economy (1973).

৪. ইহুদি ধর্মে সুদের প্রচলন ছিল

ইহুদিরা সেই আদিকাল থেকেই ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল প্রিয় জাতি হিসেবে প্রসিদ্ধ। তারা তাদের কাছে প্রেরিত নবীদের (আ.) বিরুদ্ধে নানা কূটচাল চালত। তাদের সেসব কূটকৌশলের একটি ছিল সুদ খাওয়ার ব্যাপারে কৌশলের আশ্রয় নেয়া। অথচ তাদের নবী এ থেকে তাদের বারণ করেছেন এবং সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ ۚ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا

সুতরাং ইয়াহুদীদের জুলুমের কারণে আমি তাদের উপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে। আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। সুরা নিসা :১৬০-১৬১

হাফেজ ইবনে কাসির রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের সুদ খেতে নিষেধ করেন, তারপরও তারা সুদ খাওয়া থেকে বিরত থাকেনি। এজন্য তারা নানা কৌশল গ্রহণ করল। বিষয়টিকে সন্দেহের বাতাবরণে ঢেকে ফেলল আর মানুষের সম্পদ খেতে লাগল অবৈধ পন্থায়। তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড-১, পৃ-৫৮৪

ইহুদি তাদের কুট কৌশল দ্বারা সুদ খাওয়াকে জাযেয করে নেন। কুরআন বলে তাদের জন্য সুদ খাওয়া নিষেধ ছিল। আর তাদের বিকৃত ধর্মীয় গ্রন্থ বলে সুদ খাওয়া জায়য আছে। সুদের প্রচলন ছিল এবং এটি তাদের ধর্মীয় শাস্ত্র (বর্তমানে বিকৃত) “তৌরাত” (Torah) ও তালমুদ (Talmud) এ উল্লেখিত রয়েছে। ইহুদিদের মাঝে সুদের ব্যবস্থাকে দুইভাবে দেখা হতো—

১. নিজেদের (ইহুদিদের) মধ্যে সুদ হারাম ছিল।

২. অন্য জাতির (ইহুদি নয়) প্রতি সুদ গ্রহণ বৈধ ছিল।

১. তৌরাতে (Old Testament) সুদের বিধান

তৌরাতে সুদের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে একজন ইহুদি তার ভাইয়ের (অন্য ইহুদির) কাছ থেকে সুদ নিতে পারবে না, কিন্তু অইহুদিদের কাছ থেকে সুদ গ্রহণ বৈধ।

ক। সুদ হারাম করা হয়েছে ইহুদিদের মধ্যে:

“তোমার কোনো ভাই (ইহুদি) যদি দরিদ্র হয়ে যায়, তাকে সুদ বা লভ্যাংশ দিও না। তোমার ঈশ্বরের ভয় করো, যাতে তোমার ভাই তোমার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে। তোমার কাছে টাকা ধার নিলে তার ওপর সুদ নিও না, খাবারের জন্য লভ্যাংশ নিও না।  লেবীয় পুস্তক/Leviticus 25:35-37

খ। কিন্তু অইহুদিদের থেকে সুদ নেওয়া বৈধ:

“তুমি অইহুদি (গয়ের) থেকে সুদ নিতে পারবে, কিন্তু তোমার ভাইয়ের (ইহুদি) কাছ থেকে নিতে পারবে না, যাতে তোমার ঈশ্বর যে দেশ তোমাকে দিতে চলেছেন, তাতে তুমি সমৃদ্ধ হতে পারো।” ব্যবস্থা বিবরণী /Deuteronomy 23:19-20

২. তালমুদে সুদের অনুমোদন

তালমুদ হলো ইহুদিদের ব্যাখ্যামূলক ধর্মগ্রন্থ, যেখানে সুদের বিষয়ে নানা বিধান দেওয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ আছে যে, একজন ইহুদি তার সম্প্রদায়ের বাইরে (অইহুদি) সুদ নিতে পারবে, কারণ তারা ইহুদিদের মতো “নির্বাচিত জাতি” নয়।

 ক। সুদ নেওয়া অনুমোদিত:

“ঋণ দেওয়ার সময় যদি ঋণগ্রহীতা একজন অইহুদি হয়, তবে তাকে সুদ নেওয়া বৈধ, কিন্তু যদি সে একজন ইহুদি হয়, তবে তার কাছ থেকে সুদ নেওয়া হারাম। (Talmud, Bava Metzia 70b)

খ। সুদের মাধ্যমে অইহুদিদের দুর্বল করার কৌশল:

“ঈশ্বর বলেছেন: আমি তোমাদের অন্য জাতিগুলোর উপর শাসন দিতে চাই, তোমরা তাদের থেকে সুদ গ্রহণ করো, যাতে তারা তোমাদের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে। (Talmud, Baba Kamma 113a)

৩. ইহুদিদের বাস্তব জীবনে সুদের প্রভাব

ইতিহাসে দেখা যায়, ইউরোপসহ বহু দেশে ইহুদিরা সুদের ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে এবং সামাজিকভাবে বিরোধের সম্মুখীন হয়েছে।

(১) মধ্যযুগে ইহুদিদের সুদ ব্যবসা:

মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিস্টানদের জন্য সুদ নিষিদ্ধ থাকায়, ইহুদিরা ব্যাপকভাবে সুদখোর ব্যবসায়ী হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডে ১২৯০ সালে ও ফ্রান্সে ১৩০৬ সালে ইহুদিদের সুদের কারণে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ Werner Sombart তার বই “The Jews and Modern Capitalism” (1911)-এ উল্লেখ করেছেন কিভাবে ইহুদিরা ইউরোপে সুদের মাধ্যমে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।

(২) শেক্সপিয়রের নাটক “The Merchant of Venice”

উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত নাটক The Merchant of Venice-এ ইহুদি মহাজন শাইলক (Shylock) চড়া সুদে অর্থ ধার দিতেন, যা ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিদের সুদ ব্যবসার প্রতিফলন বলে মনে করা হয়।

ইহুদি ধর্মে সুদের বিষয়ে দ্বৈতনীতি ছিল। ইহুদিদের মধ্যে সুদ হারাম, কিন্তু অইহুদিদের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। ইতিহাসে দেখা যায়, এই নীতির কারণে ইহুদিরা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও বহু সমাজে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছিল। ইসলামে সুদের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যেখানে এটি সর্বজনীনভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে  সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯

৫। ইসলামের আগের আরবে সুদের প্রচলন:

ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব সমাজে সুদ (রিবা) ছিল একটি প্রচলিত ও গভীরভাবে প্রোথিত আর্থিক ব্যবস্থা। বাণিজ্যিক লেনদেন, ব্যক্তিগত ঋণ ও সম্পদের বৃদ্ধি লাভের অন্যতম উপায় ছিল সুদ। ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দরিদ্রদের ঋণ দিত এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে মূলধনের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করত। এভাবে অর্থনীতিতে এক শোষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে দরিদ্ররা ক্রমাগত ঋণের জালে আবদ্ধ থাকত এবং ধনীরা আরও ধনী হতো। কুরআন, সুদের এই প্রচলন এবং তার নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে সুস্পষ্ট আলোচনা পাওয়া যায়। সেই যুগের প্রচলিত সুদের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কুরআনে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং একে সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ . فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা কিছু বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা রয়েছে। সূরা বাকারা : ২৭৮-২৭৯

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে সুদ অব্যাহত রাখলে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ইসলামের পূর্বে আরবে সুদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তাই ইসলাম এটিকে নির্মূল করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

সুদ ও ব্যবসা

সুদ এবং ব্যবসা উভয়ই আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়া, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এ দুটির প্রকৃতি ও প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করে এবং সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সুদ হলো অতিরিক্ত মুনাফা যা কোনো বিনিময় বা ঝুঁকি ছাড়াই ঋণের ওপর আদায় করা হয়। এটি শোষণমূলক এবং সমাজে আর্থিক বৈষম্য ও অবিচার সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, ব্যবসা হলো পণ্য বা সেবার বিনিময়ে ন্যায্য লাভ অর্জনের বৈধ মাধ্যম। এটি ঝুঁকি ও পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে হয় এবং উভয় পক্ষের জন্য উপকারী।

কুরআন ও হাদিসে সুদকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন-

 ۘ وَاَحَلَّ اللّٰہُ الۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰوا

আল্লাহ ব্যবসাকে (الۡبَیۡعَ) হালাল করেছেন এবং সুদকে (الرِّبَا) হারাম করেছেন। সূরা বাকারা : ২৭৫

সুদ সমাজে ধনী এবং গরিবের মধ্যে বৈষম্য বাড়ায়, যা আর্থিক শোষণের কারণ হয়। অপরদিকে, ব্যবসা আর্থিক সুষমতা বজায় রাখে এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যবসায় সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং হালাল পণ্য ও সেবার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুদ এবং ব্যবসার এই মৌলিক পার্থক্য সমাজে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।

সুদ বা (اَلرِّبَا) রিবা :

সুদ বা (اَلرِّبَا) রিবা একটি আবরি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হল, লাভ, বৃদ্ধি, আধিক্য, স্ফীতি প্রভৃতি। رَبَا অর্থাৎ বেড়েছে বা বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা যা বিনিময় ছাড়াই ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ হলো এমন অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা যা কোনো ব্যক্তি ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে বিনিময় ছাড়াই গ্রহণ করে।

ব্যবসা বা (الۡبَیۡعَ) বাইয়া :

ব্যবসব (الۡبَیۡعَ) আল-বাইয়া শব্দটি আরবি, যার অর্থ হলো বিক্রয় বা ব্যবসা। এটি মূলত একটি আর্থিক লেনদেন, যেখানে একটি পক্ষ নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে কোনো পণ্য, সেবা, বা সম্পদ ক্রয়-বিক্রয় করে।

শরিয়তের ভাষায় الۡبَیۡعَ বলতে বোঝায়, দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কোনো পণ্য বা সম্পদ নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তর করা। কুরআনে বাণিজ্যকে (الۡبَیۡعَ) বৈধ এবং সুদকে (الرِّبَا) হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যবসা (الۡبَیۡعَ) বা আল-বাইয়া ইসলামে একটি বৈধ ও পবিত্র উপার্জনের মাধ্যম। এটি আল্লাহর নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হলে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনে।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ করে নিচে  সুদ ও ব্যবসার কিছু পার্থক্য দেওয়া হলো:

১. সংজ্ঞা ও প্রকৃতি :

সুদ : কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা মুনাফা যা বিনিময় ছাড়াই ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রহণ করা হয়। এটি শোষণ মূলক।

কুরআন: আল্লাহ বাণিজ্যকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। সূরা বাকারা : ২৭৫

ব্যবসা : এটি পণ্যের লেনদেন বা বিনিয়োগের মাধ্যমে ন্যায্য মুনাফা অর্জন। উভয় পক্ষ লাভ-ক্ষতিতে অংশীদার হয়।

২. দ্রব্য হস্তান্তর করা:

সুদ : কোন জিনিসের মূল্য নয় বরং কেবল ঋণ গ্রহীতাকে তার ঋণ পরিশোধে কিছু সময় ও অবকাশ দেওয়ার বিনিময় অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া হয় ।

ব্যবসা : কোন জিনিসকে নির্দিষ্ট মুল্যে নিষ্পত্তির মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে হস্তান্তর করা হয়। অতঃপর সেই দাম বা মূল্যের বিনিময়ে ক্রেতা সেই জিনিসটাকে বিক্রেতার নিকট থেকে গ্রহণ করে।

৩. বিনিময় ভিন্নতা

সুদ : এই কারবারে দুই পক্ষের মুনাফা বিনিময় সমানভাবে হয় না। সুদ গ্রহীতা তো এক নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ নিয়ে নেয়। ফলে সে নিশ্চিতরূপে উপকৃত হয়। কিন্তু সুদদাতার জন্য কেবল ঋণ পরিশোধে অবকাশ মিলে যাতে থেকে সে উপকৃত হয় কি না তা অনিশ্চিত।

ব্যবসা : ব্যবসায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েরই মুনাফা বিনিময় সমানভাবে হয়ে থাকে। ক্রেতা বিক্রেতার নিকট থেকে ক্রয় করে তার দ্বারা উপকৃত হয় ফলে বিক্রেতাও তার প্রদত্ত শ্রম, বুদ্ধি এবং সময়ের মূল্য গ্রহণ করে।

৪। বিনিময়ের ধরণ :

সুদ : সুদী কারবারে বিনিয়োগকারি তার বিনিয়োগের উপর ধারাবাহিকভাবে বারংবার মুনাফা বা সূদ গ্রহণ করতে থাকে এবং সময়ের গতি বাড়ার সাথে সাথে তার সুদের অঙ্কও বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এই কারবারে ঋণ গ্রহীতা টাকা নিয়ে খরচ করে ফেলে। অতঃপর সেই খরচ-করা টাকা যোগাড় করে বাড়তি সুদসহ ফেরৎ দিতে হয়।

ব্যবসা : ব্যবসার ক্ষেত্রে বিক্রেতা ক্রেতার নিকট থেকে যত পরিমাণেই লাভ গ্রহণ করুক না কেন, গ্রহণ করে সে মাত্র একবার। ব্যবসায় পণ্য-দ্রব্য ও তার মূল্য বিনিময় হওয়ার সাথে সাথেই আদান-প্রদানের ব্যাপার শেষ হয়ে যায়। এর পরে ক্রেতা স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করে এবং বিক্রেতাকে কোন জিনিস ফেরৎ দিতে হয় না।

৫. পরিশ্রমের ধরণ :

সুদ : সুদী কারবারে সুদখোর কেবলমাত্র তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাল দিয়ে বিনা মেহনত ও কষ্টে অপরের উপার্জনে অংশীদার হয়।

ব্যবসা : ব্যবসায় মানুষ নিজের মেহনত ও বুদ্ধি ব্যয় করে এবং তারই পারিশ্রমিক গ্রহণ করে।

৬. বৈধতা দিক দিয়ে

সুদ (রিবা): ইসলামে সুদ সম্পূর্ণ হারাম।

হাদিস: যে সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদ লেখে এবং এর সাক্ষ্য দেয়, তারা সবাই সমানভাবে গুনাহগার। সহিহ মুসলিম : ১৫৯৮

ব্যবসা: হালাল ও বৈধ পন্থায় ব্যবসা করা সুন্নত।

কুরআন: “তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করো আল্লাহর অনুমতিক্রমে। সূরা নিসা : ২৯

৭. ঝুঁকি ও দায়িত্ব

সুদ (রিবা): ঋণদাতা কোনো ঝুঁকি নেয় না এবং শুধুমাত্র মুনাফা পেতে চায়।

ব্যবসা: ব্যবসায় উভয় পক্ষই ঝুঁকি গ্রহণ করে। লাভ বা ক্ষতির দায় উভয়ের ওপর বর্তায়।

৭. উপার্জনের উৎস

সুদ (রিবা): উপার্জন অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য উৎস থেকে আসে। এটি সম্পদকে অনৈতিকভাবে বৃদ্ধি করে।

ব্যবসা: হালাল পণ্য ও সেবার মাধ্যমে উপার্জন করা হয়। এটি সমাজে ন্যায্যতা বজায় রাখে।

৮. অর্থনৈতিক প্রভাব

সুদ (রিবা): ধনী এবং গরিবের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে। এটি শোষণমূলক।

ব্যবসা: ব্যবসা আর্থিক সুষমতা বজায় রাখে এবং গরিবদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।

৯. নৈতিকতা

সুদ (রিবা): এটি সমাজে অন্যায় ও দুর্নীতি সৃষ্টি করে।

ব্যবসা: নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হলে ব্যবসা সৎ ও কল্যাণমুখী হয়।

১০. আখিরাতের ফলাফল

সুদ (রিবা): সুদ গ্রহণকারীদের জন্য কঠিন শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে।

হাদিস: “রাত্রির মেরাজে আমি দেখেছি, যেসব ব্যক্তি সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন তাদের পেট বিশাল আকারে দেখতে পাবে এবং তাতে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৭৩

ব্যবসা: হালাল ব্যবসা আখিরাতে সাওয়াব ও বরকতের কারণ।

১১. লাভের পদ্ধতি

সুদ (রিবা): মুনাফা নির্ধারিত এবং ঋণের ওপর নির্ভরশীল।

ব্যবসা: মুনাফা বিনিয়োগ ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে অর্জিত হয়।

১২. সামাজিক প্রভাব

সুদ (রিবা): এটি সমাজে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক শোষণ বৃদ্ধি করে।

ব্যবসা: ব্যবসা সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে।

৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি

সুদ (রিবা): সুদগ্রহীতা আল্লাহর ক্রোধের সম্মুখীন হয়।

কুরআন: “যদি তোমরা সুদ থেকে ফিরে না আসো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।” সূরা বাকারা : ২৭৯

ব্যবসা: হালাল ব্যবসার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়।