মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১. স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বা উত্তমভাবে জীবন-যাপন করা
কুরআনের দলিল:
وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা আন-নিসা : ১৯
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫
ক. স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা
স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন করতে হলে, স্বামীকে তার সাথে দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হবে।
নুমান ইবনু বাশীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
পারস্পরিক দয়া, ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রদর্শনে তুমি মু’মিনদের একটি দেহের মত দেখবে। যখন শরীরের একটি অঙ্গ রোগে আক্রান্ত হয়, তখন শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রাত জাগে এবং জ্বরে অংশ নেয়। সহহি বুখারি : ৬০১১, সহহি মুসলিম : ২৫৮৬, আহমাদ : ১৮৪০১
খ. স্ত্রীর প্রতি অজথা রাগ পরিত্যাগ করা
সাহল ইবনু মু’আয (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার নিজের রাগকে সংযত করে রাখে এমন অবস্থায় যে, সে নিজের রাগ দ্বারা নিজের মনোবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে পারে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে সৃষ্টিকুলের সম্মুখে ডাকবেন এবং যে হূরকে সে পছন্দ করে, তাকে সে হূরকেই বেছে নেয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হবে। মিশকাত : ৫০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ ৪৭৭৭, সুনানে তিরমিযী : ২০২১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪১৮৬, আহমাদ : ১৫৬৩৭, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা : ১৪৯৭, শু‘আবুল ঈমান : ৮৩০৩
অনেক সময় সামান্য রাগের কারনে স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবাসে না, সম্মান করে না, তার জীবনকে বিষিয়ে তোলে। রাগের কারনে সে শুধু একটি সম্পর্ককেই নষ্ট করে না, বরং একটি পরিবারের শান্তি ও ভবিষ্যতকেও ধ্বংস করে দেয়। শুধু এ কারণে একজন পুরুষ অন্যায়েই নারীর শরীর রক্তাক্ত করে দেয়। সমাজে এমন বহু বিপন্ন নারী রয়েছে, যারা তাদের স্বামীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। দাম্পত্য জীবন সুন্দর ও সুফলদায়ক করতে হলে রাগ দমন করে স্ত্রীর সাথে সদ্ভাবে বা উত্তমভাবে জীবন-যাপন করতে হবে। স্বামীর নিকট প্রতিটি নারীর প্রাপ্য হলো সম্মান, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা। স্ত্রী তার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত আমানত। এই আমানতের সঠিক পরিচর্যা করতে পারাটাই একজন প্রকৃত পুরুষের কর্তব্য।
গ. স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ’আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা’ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা’ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেন, যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, সহিহ মুসলিম : ২৩১৮, আহমাদ : ৭২৯৩
২. স্বামী স্ত্রীর খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করা
ইসলামে স্ত্রীর ভরণ-পোষণ স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক। এটি স্বামীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বরেন-
لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰىہُ اللّٰہُ ؕ لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىہَا ؕ سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا
সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিজক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন। সূরা তালাক : ৭
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ لَا تُکَلَّفُ نَفۡسٌ اِلَّا وُسۡعَہَا ۚ
আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না। সুরা আল-বাকারা : ২৩৩
মুয়াবিযা বিন হাইদাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলো, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেনঃ সে আহার করলে তাকেও (একই মানের) আহার করাবে, সে পরিধান করলে তাকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে কখনও তার মুখমণ্ডল আঘাত করবে না, অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকী ত্যাগ করবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪২, ইরওয়াহ : ২০৩, মিশকাত : ৩২২৯, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫৮-১৮৬১।
বাহয ইবনু হাকীম তার পিতা থেকে তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি বলি, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের স্ত্রীদের কোন্ স্থানে সঙ্গম করবো, আর কোন্ স্থান বর্জন করবো? তিনি বললেনঃ তুমি যেভাবে ইচ্ছে করো তোমার ফসল উৎপাদন স্থানে (সম্মুখের লজ্জাস্থানে) সঙ্গম করো। আর তুমি যখন খাবে তাকেও খাওয়াবে এবং তুমি পরিধার করলে তাকেও পরিধান করাবে। তাকে গালমন্দ করবে না এবং মারবে না। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, শু’বাহ বর্ণনা করেছেন, যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে। আর যখন তুমি পরিধান করবে তখন তাকেও পরাবে। সুনানে আবু দাউদ : ২১৪৩
আমর ইবনুল আহ্ওয়াস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বিদায় হাজ্জে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সাথে উপস্থিত ছিলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করেন এবং ওয়াজ-নসীহত করেন। এরপর তিনি বলেনঃ তোমরা নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহারের উপদেশ শুনে নাও। কেননা তারা তোমাদের নিকট আবদ্ধ আছে। এর অধিক তাদের উপর তোমাদের কর্তৃত্ব নাই যে, তারা যদি প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়, সত্যিই যদি তারা তাই করে, তবে তোমরা তাদেরকে পৃথক বিছানায় রাখবে এবং আহত হয় না এরূপ হালকা মারধর করবে। অতঃপর তারা তোমাদের অনুগত হয়ে গেলে তাদের উপর আর বাড়াবাড়ি করো না। স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের উপরও তাদের অধিকার আছে। তোমাদের স্ত্রীদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের শয্যা তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদের দ্বারা মাড়াবে না এবং তোমাদের অপছন্দনীয় লোকেদেরকে তোমাদের ঘরে প্রবেশানুমতি দিবে না। সাবধান! তোমাদের উপর তাদের অধিকার এই যে, তাদের ভরণপোষণ, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সজ্জার ব্যাপারে তোমরা তাদের প্রতি শোভনীয় আচরণ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে তিরমিযী : ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ : ১৯৯৭-২০২০
আবূ মাস’ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাবী বলেন, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ এটা কি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে? তিনি বললেন, (হাঁ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ সওয়াবের আশায় কোন মুসলিম যখন তার পরিবার-পরিজনের প্রতি ব্যয় করে, তা তার সাদাকা হিসাবে গণ্য হয়। সহিহ বুখারি : ৫৩৫১, সহিহ মুসলিম : ১০০২, আহমাদ : ১৭০৮১
৩. স্ত্রীর জন্য উত্তম বাসস্থানের ব্যবস্থা
ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর জন্য একটি পৃথক ও স্বাধীন আবাসনের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে স্ত্রী তার ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে পারে। যদি স্ত্রী শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে থাকতে না চায়, তবে তাকে আলাদা করে রাখা স্বামীর কর্তব্য। শরীয়ত অনুযায়ী, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা স্ত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়, যদিও সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেবা করলে তা অনেক সওয়াবের কাজ। তাদের সেবা করার মূল দায়িত্ব স্বামীর, সে নিজে করবে অথবা লোক দিয়ে করাবে।
অনেক পরিবারে স্বামীকে জোর করে তার স্ত্রীকে মাতা-পিতার অধীনে রাখা হয়, যা স্ত্রীর প্রতি জুলুম। শাশুড়িদের উচিত তাদের পুত্র ও পুত্রবধূকে স্বাধীনভাবে থাকতে দেওয়া এবং তাদের স্বেচ্ছাকৃত সেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। পুত্রবধূকে কাজের বোঝা না চাপিয়ে তাদের নিজেদের পুত্রবধূ জীবনের কথা মনে করা উচিত, যেখানে তারাও একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবন বাস্তাবায়নে স্ত্রীর জন্য একটি উত্তম বাসস্থানের ব্যবস্থা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, স্ত্রীর জন্য একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত বাসস্থান নিশ্চিত করাও স্বামীর দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বরেন-
اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ
তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। সূরা তালাক : ৬
এই আয়াতের প্রধান বার্তা হলো, স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে বাসস্থান সরবরাহ করা আবশ্যক। এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, স্বামী যেখানে ও যেভাবে বসবাস করে, স্ত্রীকে ঠিক সেভাবেই থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এর মানে হলো, স্বামী যেমন একটি নিরাপদ, শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশে থাকে, স্ত্রীরও তেমন পরিবেশে থাকার অধিকার রয়েছে।
আয়াতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া বা তার জীবনকে সংকটে ফেলার জন্য বাসস্থানকে কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে, স্ত্রীকে এমন কোনো অস্বস্তিকর বা অনুপযোগী পরিবেশে রাখা যাবে না যা তার জন্য কষ্টকর হয়। যেমন, অতিরিক্ত ছোট, নোংরা বা অনিরাপদ স্থানে তাকে থাকতে বাধ্য করা যাবে না, কারণ এর উদ্দেশ্য হলো তাকে কষ্ট দেওয়া।
৪. স্ত্রীকে নিয়মিত সদুপদের দেওয়া
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَذَکِّرۡ اِنۡ نَّفَعَتِ الذِّکۡرٰی ؕ
অতঃপর উপদেশ দাও যদি উপদেশ ফলপ্রসু হয়। সুরা আলা : ৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَّلٰکِنۡ ذِکۡرٰی لَعَلَّہُمۡ یَتَّقُوۡنَ
কিন্তু (তাদের কর্তব্য হচ্ছে) উপদেশ দেয়া, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে। সুরা আনাম : ৬৯
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। কারণ তাদেরকে পাঁজরের বাঁকা হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, পাঁজরের হাড়ের মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা (হাড়) হলো উপরেরটি। অতঃপর তুমি যদি ঐ হাড়কে সোজা করতে চেষ্টা কর, তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি রেখে দাও, তবে সর্বদা বাঁকাই থাকবে। সুতরাং (আমার নাসীহাত) তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। সহিহ বুখারী ৫১৮৬, মুসলিম ১৪৬৮, মিশকাত : ৩২৩৮, ইরওয়া ১৯৯৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৯২৭
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদেরকে সম্বোধন যে উপদেশ প্রদান করেছেন-
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৯৮৮, ৩০৪৮, ৪৭৯০, সহিহ মুসলিম : ৯৮২, আহমাদ : ৭২৯৯
৫. স্ত্রীর গোপনীয়তার তথ্য ফাঁস না করা
বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ” .
কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭, আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।
স্ত্রীর গোপনীয়তার তথ্য ফাঁস করা একটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও অনৈতিক কাজ। ইসলামে এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই কাজটি শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো বিশ্বাস ও নির্ভরতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। একজন স্ত্রী তার স্বামীকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে, তার কাছে নিজের জীবনের সব গোপন কথা ও দুর্বলতা প্রকাশ করে। যখন স্বামী সেই গোপনীয়তা ফাঁস করে, তখন তা সেই বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে। এটি শুধু বিশ্বাসভঙ্গ নয়, বরং সম্পর্কের পবিত্রতাও নষ্ট করে। স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করাকে একটি বড় পাপ হিসেবে দেখা হয়। স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করলে তার সম্মান ও মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। এটি সমাজে তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে এবং তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। একজন স্ত্রীর জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কিছু হতে পারে না।
আবূ বকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ লজ্জাশীলতা ঈমানের অংগ। আর ঈমানের অবস্থান হলো জান্নাতে। আর অশ্লীলতা হলো অত্যাচার (জুলুম), আর অত্যাচার থাকবে জাহান্নামে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৮৪, সহীহাহ : ৪৯৫
৬. স্ত্রীর জন্য দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা করা
ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক। স্ত্রী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম, যা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। স্বামী তার স্ত্রীকে এই জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করবে। এ শিক্ষা শুধু তার জন্যই উপকারি নয়, বরং পরিবারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। স্ত্রীর শরীয়তের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তার সন্তানদেরকে শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে সন্তান লালন-পালন করতে পারবেন। এমনকি তিনি কুরআন সুন্নাহ অনুসারে নিজ সন্তাদের প্রথমিক শিক্ষা দিতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ ہَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ اِنَّمَا یَتَذَکَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ
বল, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে। সুরা যুমার : ৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ ہَلۡ یَسۡتَوِی الۡاَعۡمٰی وَالۡبَصِیۡرُ ۬ۙ اَمۡ ہَلۡ تَسۡتَوِی الظُّلُمٰتُ وَالنُّوۡرُ ۬ۚ
বল, ‘অন্ধ ও দৃষ্টিমান ব্যক্তি কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে? সুরা রাদ : ১৬
ইসলাম ধর্মে পুরুষদের জন্য শিক্ষা-দীক্ষাকে যেরূপ জরুরী মনে করা হয়েছে, মহিলাদের জন্যও তেমনি আবশ্যক মনে করা হয়েছে। পুরুষরা যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট তা‘লীম গ্রহণ করতেন, তেমনি করতেন নারীরাও। শুধু সম্ভ্রান্ত মহিলাদেরকেই নয়, বরং দাসীদেরকেও শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আবূ বুরদাহ, তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তিন ধরনের লোকের জন্য দুটি পুণ্য রয়েছেঃ (১) আহলে কিতাব- যে ব্যক্তি তার নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপরও ঈমান এনেছে। (২) যে ক্রীতদাস আল্লাহর হাক আদায় করে এবং তার মালিকের হাকও (আদায় করে)। (৩) যার বাঁদী ছিল, যার সাথে সে মিলিত হত। তারপর তাকে সে সুন্দরভাবে আদব-কায়দা শিক্ষা দিয়েছে এবং ভালভাবে দ্বীনি ইল্ম শিক্ষা দিয়েছে, অতঃপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে; তার জন্য দু’টি পুণ্য রয়েছে। অতঃপর বর্ণনাকারী ‘আমির (রহ.) (তাঁর ছাত্রকে) বলেন, তোমাকে কোন কিছুর বিনিময় ব্যতীতই হাদীসটি শিক্ষা দিলাম, অথচ পূর্বে এর চেয়ে ছোট হাদীসের জন্যও লোকেরা (দূর-দূরান্ত থেকে) সওয়ার হয়ে মদিনা্য় আসত। সহিহ বুখারি : ২৯, ২৫৪৪, ২৫৪৭, ২৫৫১, ৩০১১, ৩৪৪৬, ৫০৮৩, সহিহ মুসলিম : ১৫৪, আহমাদ : ১৯৭৩২
ইসলাম যেভাবে পুরুষের উপর শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জন ফরয করে দিয়েছে, ঠিক তেমনি এটা ফরয করে দিয়েছে নারীদের উপর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলিমদের তাঁর উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেছেন। এ ঘোষণায় তিনি পুরুষ বা মহিলা কাউকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেননি।
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য। সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪
৭. মোহরানা আদায় সঠিকভাবে আদায় করা
মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا
আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪
মাইমূন আল-কুরদী, তার পিতার সূত্রে বলেন। আমি নবী ﷺ-কে একবার, দুইবার, তিনবার নয়—বরং দশবার পর্যন্ত বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো নারীকে সামান্য বা অধিক মোহরের বিনিময়ে বিবাহ করে, অথচ তার মনে থাকে না যে সে তার হক আদায় করবে—তাহলে সে নারীকে প্রতারণা করল। যদি সে মারা যায় অথচ তার হক (মোহর) আদায় না করে, তবে সে আল্লাহর সাথে কিয়ামতের দিন সাক্ষাৎ করবে ব্যভিচারী (যানী) হিসেবে।’ মুসনাদে আহমাদ : ১১০৬২, আল-মুজামুল আওসাত : ৬০৮৭, আল-মুজামুস সাগীর : ৯৫৩
উমার ইবনুল খত্ত্বাব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রীদের মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা যদি উক্ত মোহর নির্ধারণ দুনিয়াতে সম্মান এবং আল্লাহর নিকট তাকওয়ার বিষয় হতো, তবে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই তোমাদের চেয়ে তা নির্ধারণে অধিক অগ্রগামী হতেন। কিন্তু ১২ উকিয়্যার বেশি পরিমাণ মোহর নির্ধারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো সহধর্মিণীকে বিয়ে করেছেন কিংবা কোনো মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। মিশকাত : ৩২০৪, সুনানে তিরমিযী : ১১১৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৩৫১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১০৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৮৭, দারিমী : ২২৪৬, আহমাদ : ৩৪০, ইরওয়া : ১৯২৭।
৮. স্ত্রীর সম্পদের প্রতি লোভ না করা
স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ বা উপার্জন থাকলে তার উপর স্বামীর কোনো অধিকার নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَا تَتَمَنَّوۡا مَا فَضَّلَ اللّٰہُ بِہٖ بَعۡضَکُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ لِلرِّجَالِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا اکۡتَسَبُوۡا ؕ وَلِلنِّسَآءِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا اکۡتَسَبۡنَ ؕ وَسۡئَلُوا اللّٰہَ مِنۡ فَضۡلِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا
আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না সে সবের, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের এক জনকে অন্য জনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরুষদের জন্য রয়েছে অংশ, তারা যা উপার্জন করে তা থেকে এবং নারীদের জন্য রয়েছে অংশ, যা তারা উপার্জন করে তা থেকে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও। নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত। সুরা নিসা : ৩২
এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের নিজ নিজ উপার্জনের মালিক। নারীর উপার্জিত অর্থ তার একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি এবং এর উপর অন্য কারো কোনো অধিকার নেই, এমনকি তার স্বামীরও নয়।
হাদিসের আলোকে এই নীতি আরও পরিষ্কার হয়। একজন মুসলিম নারী তার নিজস্ব সম্পদ থেকে খরচ করার বা কাউকে দান করার পূর্ণ স্বাধীনতা রাখেন। ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে স্ত্রী তার স্বামীকে বা অন্য কাউকে নিজের সম্পদ থেকে দান করেছেন।
আবদুল্লাহর স্ত্রী যায়নাব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, হে নারী সমাজ! তোমরা (দান) সাদাকা কর যদিও তা তোমাদের গহনাপত্রের মাধ্যমে হয়। যায়নাব (রাযিঃ) বলেন, এ কথা শুনে আমি গিয়ে আমার স্বামী আবদুল্লাহকে বললাম, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সাদাকা করতে বলেছেন। আর তুমি তো গরীব অভাবী মানুষ, তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, তোমাকে দান করলে তা দান হিসেবে গণ্য হবে কিনা? তা না হলে অপর কাউকে দান করব। রাবী বলেন, আমার স্বামী আবদুল্লাহ আমাকে বললেন, বরং তুমিই যাও। অতঃপর আমিই গেলাম এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরজায় আনসার সম্প্রদায়ের অপর এক মহিলাকে একই উদ্দেশে দাঁড়ানো দেখলাম। কারণ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও প্রভাবশালী লোক। অতঃপর বিলাল (রাযিঃ) বের হয়ে আসলে আমরা তাকে বললাম, আপনি গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলুন, দু’জন মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা আপনার কাছে জানতে চাচ্ছে- যদি তারা তাদের নিজ স্বামীকে দান করে এবং তাদের ঘরেই প্রতিপালিত ইয়াতীমকেই দান করে তাহলে কি তা আদায় হবে? আর অনুরোধ হলো আমাদের পরিচয় তাকে জানাবেন না। রাবী বলেন, অতঃপর বিলাল (রাযিঃ) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, মহিলাদ্বয় কে কে? তিনি বললেন, জনৈক আনসার গোত্রের এবং অপরজন যায়নাব? তিনি বললেন, ’আবদুল্লাহর স্ত্রী যায়নাব। অতঃপর তাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা উভয়েই তাদের দানের জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব পাবে। এক- নিকটাত্মীয়দের সাথে সদ্ব্যবহারের জন্য। দুই- সাদাকা করার জন্য। সহিহ বুখারি : ১৪৬৬, সহিহ মুসলিম : ১০০০, আহমাদ : ১৬০৮৩
এ হাদিসে আমরা দেখতে পাচ্ছি- স্ত্রী তার নিজ স্বামীকে দান করছে। যদি নারীদের সম্পত্তির নিজেস্ব মালাকানা না থাকত তবে স্বামীকে দান করার প্রশ্নই উঠত না।
ইসলামী শরিয়তে স্বামী এবং স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায়িত্ব সম্পূর্ণ আলাদা।
স্বামীর দায়িত্ব : স্বামীর প্রধান দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণ (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা) নিশ্চিত করা, তা সে স্ত্রী যতই ধনী হোক না কেন। স্ত্রীর উপার্জন থাকুক বা না থাকুক, এই দায়িত্ব স্বামীর কাঁধে।
স্ত্রীর অধিকার : অন্যদিকে, স্ত্রী তার উপার্জিত অর্থ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ বা মোহরানার সম্পূর্ণ মালিক। এই সম্পদ থেকে তিনি কাকে দেবেন বা কীভাবে খরচ করবেন, তা নির্ধারণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা তার আছে।
ইসলামে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। স্ত্রীর উপার্জনে স্বামীর কোনো অধিকার নেই। তবে, যদি স্ত্রী স্বেচ্ছায় এবং সন্তুষ্টচিত্তে তার স্বামীকে কোনো আর্থিক সহযোগিতা করতে চান, তাহলে তা জায়েজ এবং এর জন্য তিনি সওয়াবও পাবেন।
৯. স্ত্রীর ত্রুটি বিচ্ছুতি রাগ সংবরণ করে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা
দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হতেই পারে। ক্ষমা ও সহনশীলতার মানসিকতা সম্পর্ককে মজবুত করে। ক্ষমা করা বা ক্ষমার মানসিকতা রাখা ইসলামের একটি মহান গুণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ فِی السَّرَّآءِ وَالضَّرَّآءِ وَالۡکٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَالۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ وَاللّٰہُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ۚ
যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং রাগ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন। সূরা আল ইমরান : ১৩৪
সাহল ইবনু মু’আয (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার নিজের রাগকে সংযত করে রাখে এমন অবস্থায় যে, সে নিজের রাগ দ্বারা নিজের মনোবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে পারে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা তাকে সৃষ্টিকুলের সম্মুখে ডাকবেন এবং যে হূরকে সে পছন্দ করে, তাকে সে হূরকেই বেছে নেয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হবে। মিশকাত : ৫০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ ৪৭৭৭, সুনানে তিরমিযী : ২০২১, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪১৮৬, আহমাদ : ১৫৬৩৭, মুসনাদে আবূ ইয়া‘লা : ১৪৯৭, শু‘আবুল ঈমান : ৮৩০৩
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَجَزٰٓؤُا سَیِّئَۃٍ سَیِّئَۃٌ مِّثۡلُہَا ۚ فَمَنۡ عَفَا وَاَصۡلَحَ فَاَجۡرُہٗ عَلَی اللّٰہِ ؕ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الظّٰلِمِیۡنَ
মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ দ্বারা এবং যে ক্ষমা করে ও আপোষ-নিস্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। আল্লাহ যালিমদের পছন্দ করেন না। সূরা শূরা : ৪০
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
۪ۖ وَلۡیَعۡفُوۡا وَلۡیَصۡفَحُوۡا ؕ اَلَا تُحِبُّوۡنَ اَنۡ یَّغۡفِرَ اللّٰہُ لَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা নূর : ২২
আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাদাকা করাতে সম্পদের হ্রাস হয় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আর কেউ আল্লাহর সম্ভষ্টি লাভে বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৮
১০. স্ত্রীল নারী প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রাখা
নারীদের প্রকৃতি, তাদের মানসিকতা ও শারীরিক অবস্থার প্রতি স্বামীর যত্নশীল হওয়া উচিত।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নারীদেরকে উত্তম নাসীহাত প্রদান করবে। কেননা নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে উপরের হাড়টি বেশী বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থাকবে। কাজেই নারীদেরকে নাসীহাত করতে থাক। সহিহ বুখারি : ৩৩৩১, ৫১৮৪, ৫১৮৬
এই হাদিসের মূলভাব হলো, নারীদের প্রকৃতি কিছুটা সংবেদনশীল, কোমল এবং পুরুষ থেকে ভিন্ন। এই ভিন্নতাকে সম্মান করা এবং তাদের সাথে সেভাবেই আচরণ করা উচিত। নারী ও পুরুষের শারীরিক ও মানসিক প্রকৃতি ভিন্ন, এবং এই ভিন্নতা একটি বাস্তবতা। এটিকে স্বীকার করে নিতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে একে অপরের ছোটখাটো ভুলত্রুটি এবং ভিন্নতাকে ধৈর্যের সাথে মেনে নেওয়া জরুরি। নারীদের প্রতি কঠোর না হয়ে বরং দয়া ও ভালোবাসার সাথে আচরণ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ নারীর কোমল ও সংবেদনশীল প্রকৃতি ভালোবাসা ও কোমলতা চায়।
জারীর ইবনে আবদুল্লাহ আল-বাজালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নম্র স্বভাব বঞ্চিত, সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। সহিহ মুসলিম : ২৫৯২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৮৭, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮০৯, আহমাদ : ২৭৮২৯, ১৮৭৬৭
নারিদের এ বাঁকা স্বভাব সোজা করা যাবে না। তাই কোন কারনে তাদের প্রতি বাগ হলে, তাদের গায়ে হাত তোলা ঠিক নয়।
আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম’আহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্রহার করো না। কেননা, দিনের শেষে তার সঙ্গে তো মিলিত হবে। সহিহ বুখারি : ৫২০৪
ইয়াস ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ যুবাব (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর দাসীদেরকে মারবে না। অতঃপর উমার (রাযি.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, মহিলারা তাদের স্বামীদের অবাধ্য হচ্ছে। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে মৃদু আঘাত করার অনুমতি দিলেন। অতঃপর অনেক মহিলা এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে স্বামীদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করলো। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মুহাম্মাদের পরিবারে কাছে অনেক মহিলা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে। সুতরাং যারা স্ত্রীদেরকে প্রহার করে তারা তোমাদের মধ্যে উত্তম নয়। সুনানে আবু দাউদ : ২১৪৬৯