মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
৮. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের গীবত বা পরনিন্দা করার ফলে
পরনিন্দা ও গীবত (অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা) একটি দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে এটি একটি মারাত্মক পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই ধরনের আচরণ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস, ঘৃণা এবং দূরত্ব তৈরি করে।
কেন পরনিন্দা ও গীবত দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে?
ক. বিশ্বাস ও সম্মান নষ্ট হওয়া :
যখন একজন সঙ্গী অন্য কারো কাছে তার জীবনসঙ্গীর দোষ-ত্রুটি বা দুর্বলতা নিয়ে কথা বলে, তখন তা তাদের মধ্যকার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সম্মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। স্বামী বা স্ত্রী যখন জানতে পারে যে তার গোপনীয় বিষয় অন্য কারো কাছে ফাঁস করা হয়েছে, তখন সে নিজেকে অসম্মানিত ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার মনে করে।
খ. পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি :
গীবত ও পরনিন্দা পারিবারিক অশান্তি ও কলহ বাড়িয়ে দেয়। যখন একজন তার সঙ্গীর পরিবারের সদস্যদের বা বন্ধুদের কাছে তার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলে, তখন সেই সম্পর্কগুলোও খারাপ হয়ে যায়। এতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও ঝগড়া বৃদ্ধি পায়।
গ. রাসূল ﷺ-এর আদর্শের পরিপন্থী :
আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) পরনিন্দা ও গীবত থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে বলেছেন। তিনি গীবতকে মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَّلَا تَجَسَّسُوۡا وَلَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡہِ مَیۡتًا فَکَرِہۡتُمُوۡہُ ؕ
আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। সুরা হুজরাত : ১২
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, গীবত একটি জঘন্য কাজ। একজন মুসলিম স্বামী-স্ত্রীকে তাদের সম্পর্ককে এই ধরনের পাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
ঘ. নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি :
গীবত করা ব্যক্তিকে নেতিবাচক চিন্তাভাবনা ও সমালোচনায় অভ্যস্ত করে তোলে। এতে তারা তাদের সঙ্গীর ভালো দিকগুলো দেখতে ব্যর্থ হয় এবং সবসময় তার দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়। এর ফলে তাদের সম্পর্ক থেকে ভালোবাসা ও ইতিবাচকতা দূর হয়ে যায়।
ঙ. দাম্পত্য ভাঙনের পথ তৈরি হয় :
গীবতের ফলে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ জমে যায়, ছোট সমস্যা বড় হয়ে বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যেতে পারে। হুযায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বললেনঃ আমি নবী ﷺ কে বলতে শুনেছি-
لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ
চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সহিহ বুখারি : ৬০৫৬, সুনানে তিরমিজি : ২০৩২
স্বামী-স্ত্রীর ত্রুটি প্রচার করে বেড়ানো আসলে চোগলখোরিরই এক রূপ, যা দাম্পত্য ভাঙনের অন্যতম কারণ।
প্রতিকারের উপায় :
পরনিন্দা ও গীবত একটি দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য বিষাক্ত উপাদানের মতো। এটি ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সম্মানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে ভাঙনের দিকে এগিয়ে যায়। তাই গিবতে ভয়াবহতা জেনে ও নিজেদের সুখের কথা ভেবে স্বামী স্ত্রী উভয়ের উচিত গিবত পরিহার করে চলে।
আবূ বারজা আসলামী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ’’হে সেই মানুষের দল; যারা মুখে ঈমান এনেছে এবং যাদের হৃদয়ে ঈমান স্থান পায়নি (তারা শোন)! তোমরা মুসলিমদের গীবত করো না এবং তাদের দোষ খুঁজে বেড়ায়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি তাদের দোষ খুঁজবে, আল্লাহ তার দোষ ধরবেন। আর আল্লাহ যার দোষ ধরবেন তাকে তার ঘরের ভিতরেও লাঞ্ছিত করবেন।’’ হাদিস সম্ভার : ২৯৭৩, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮৮২, সহীহুল জামে : ৭৯৮৪
আবূ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করবে, কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুন থেকে তার চেহারাকে রক্ষা করবেন। সুনান তিরমিযী : ১৯৩১, হাদিস সম্ভার : ২৯৭৬
৯. দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা ফাঁস করা
দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা প্রকাশ করা একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সবচেয়ে গুরুতর কারণগুলোর মধ্যে একটি। ইসলামে এই কাজকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ এটি সম্পর্কের পবিত্রতা, বিশ্বাস এবং সম্মান সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।
কেন গোপন কথা প্রকাশ করা দাম্পত্য জীবন নষ্ট করে?
ক. বিশ্বাসভঙ্গ ও আমানতের খেয়ানত :
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো বিশ্বাস ও আমানতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একে অপরের কাছে তারা নিজেদের সবচেয়ে গোপন ও ব্যক্তিগত কথাগুলো শেয়ার করে। যখন এই কথাগুলো অন্য কারো কাছে প্রকাশ করা হয়, তখন তা আমানতের খেয়ানত হয় এবং সম্পর্কের মূল ভিত্তি, অর্থাৎ বিশ্বাস, ভেঙে যায়। একবার বিশ্বাস ভেঙে গেলে তা আর সহজে ফিরে আসে না।
খ. ইসলামী নৈতিকতার লঙ্ঘন :
ইসলামে গোপনীয়তা রক্ষা করাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করা একটি জঘন্য পাপ।
বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ” .
কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭, আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।
গ. সম্মানহানি ও মানসিক যন্ত্রণা :
স্বামীর গোপন কথা ফাঁস হলে স্ত্রীর সম্মানহানি হয় এবং স্ত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এটি তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে। অপরদিকে, স্ত্রীর গোপন কথা ফাঁস হলে স্বামীও সমাজে অসম্মানিত হন। এর ফলে উভয়ই মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন।
ঘ. সম্পর্কের অবনতি ও দূরত্ব:
স্বামী-স্ত্রী যখন জানতে পারে যে, তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রকাশ করা হয়েছে, তখন তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তারা একে অপরের সাথে খোলামেলাভাবে কথা বলতে ভয় পায়, কারণ তারা মনে করে যে তাদের কথা আবারও প্রকাশ করা হতে পারে। এই দূরত্ব একসময় সম্পর্ককে ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়।
ঙ. পারিবারিক ও সামাজিক ফিতনা :
গোপন কথা প্রকাশ করা কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি তাদের পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যেও ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে। এর ফলে উভয় পরিবারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও ঘৃণা তৈরি হতে পারে, যা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।
প্রতিকারের উপায় :
দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা প্রকাশ করা হলো সম্পর্কের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এটি বিশ্বাস, সম্মান এবং ভালোবাসাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয় এবং একটি সুখী দাম্পত্য জীবনকে বিষাক্ত করে তোলে। তাই কোন অবস্থায়ই নিজেদের দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা প্রকাশ করা যাবে না। সব সয়ম রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কঠিন হুসিয়ারির কথা মনে করবে।
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ” .
কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭, আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।
১০. অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা
অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার একটি বড় কারণ। ইসলামে এই ধরনের মানসিকতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কারণ এটি কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির মতো মৌলিক গুণগুলোকে নষ্ট করে দেয়। অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা ক্ষতিকর দিকগুলো হলো-
ক. আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা:
আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন রিজিক ও নেয়ামত দান করেছেন। যখন একজন ব্যক্তি অন্যের সংসার বা জীবন দেখে নিজের সংসারের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়, তখন সে প্রকারান্তরে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে অস্বীকার করে। এই অকৃতজ্ঞতা পারিবারিক জীবন থেকে বরকত ও শান্তি দূর করে দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে-
وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ
আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সূরা ইবরাহীম, : ৭
খ. মানসিক চাপ ও হতাশা:
সামাজিক মাধ্যমে বা বাস্তবে অন্যের সুখী জীবনের দৃশ্য দেখে নিজের জীবনে তা না পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। তারা ভুলে যান যে, মানুষ সাধারণত তার জীবনের ভালো দিকগুলোই প্রকাশ করে, খারাপ দিকগুলো নয়। এই ধরনের তুলনা মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং সম্পর্কের মধ্যে হতাশা ও নেতিবাচকতা তৈরি করে।
গ. পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ও ঝগড়া:
যখন একজন স্ত্রী বা স্বামী অন্যের জীবনের সাথে নিজেদের জীবনকে তুলনা করে, তখন তারা তাদের সঙ্গীকে দোষারোপ করা শুরু করে। যেমন: “অমুকের স্বামী তো তার স্ত্রীকে অনেক কিছু কিনে দেয়, তুমি কেন পারো না?” অথবা “অমুকের স্ত্রী এত ভালো, তুমি কেন এমন নও?” এই ধরনের অভিযোগগুলো পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ঝগড়ার জন্ম দেয়, যা সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে।
ঘ. সম্পর্কের মৌলিকত্ব নষ্ট হওয়া:
প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কের নিজস্ব গতিপথ এবং সৌন্দর্য আছে। অন্যের সাথে নিজের সম্পর্ককে তুলনা করলে সম্পর্কের এই মৌলিকত্ব নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে, ভালোবাসার চেয়ে ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।
ঙ. সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব:
যখন বাবা-মা অন্যের সংসার দেখে নিজেদের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকেন, তখন তাদের এই নেতিবাচক মানসিকতা সন্তানদের ওপরও প্রভাব ফেলে। শিশুরা শেখে যে, তাদের পরিবার যথেষ্ট ভালো নয়, যা তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে এবং তাদেরকে অকৃতজ্ঞ হতে শেখায়।
প্রতিকারের উপায় :
অন্যের সংসার দেখে নিজের সংসারে অসন্তুষ্ট থাকা হলো একটি বিষাক্ত অভ্যাস, যা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা, মানসিক অশান্তি এবং পারিবারিক কলহের জন্ম দেয়। এর পরিবর্তে, স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত নিজেদের সম্পর্কের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং একে অপরের ভালো দিকগুলো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। সব সময় নিজের অবস্থান থেকে নিচে অবস্থান প্রতি লক্ষ করে কৃতজ্ঞ থাকা।
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ এমন ব্যক্তির দিকে তাকাবে, যাকে সম্পদ ও দৈহিক গঠনে তার উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তখন সে যেন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে এসব দিক থেকে তার চেয়ে নিম্নমানের। সহিহ বুখারি : ৬৪৯০, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৩
১১. শ্বশুর-শাশুড়ি বা আত্মীয়দের অন্যায় হস্তক্ষেপের ফলে
শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য আত্মীয়দের অন্যায় হস্তক্ষেপ একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ইসলামে দাম্পত্য জীবনকে একটি স্বাধীন ও পবিত্র সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়, যেখানে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের জীবন নিজেরাই পরিচালনা করবে। যখন এই সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের অন্যায় হস্তক্ষেপ হয়, তখন নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। অন্যায় হস্তক্ষেপ দাম্পত্য জীবন যে বিষয়গুলো নষ্ট হয় তা হলো-
ক. সীমানা লঙ্ঘন ও গোপনীয়তা নষ্ট:
দাম্পত্য জীবনের কিছু বিষয় অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও গোপনীয়। যখন স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে অন্য কেউ হস্তক্ষেপ করে, তখন সেই সম্পর্কের সীমানা ভেঙে যায়। এর ফলে সম্পর্কের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা বোধ নষ্ট হয়।
খ. বিশ্বাস ও ভালোবাসার অভাব:
বহিরাগত হস্তক্ষেপের কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস ও ভুল বোঝাবুঝি বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় একজন সঙ্গী তার বাবা-মা বা আত্মীয়দের পক্ষ নেয়, যা অপর সঙ্গীর মনে আঘাত দেয় এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এটি তাদের মধ্যকার ভালোবাসা ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গ. অতিরিক্ত মানসিক চাপ:
শ্বশুর-শাশুড়ির চাপ বা অন্য আত্মীয়দের অন্যায় আবদার স্বামী-স্ত্রীর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। তাদের নিজেদের সমস্যা সমাধানের সুযোগ কমে যায় এবং তারা অন্যের ইচ্ছার কাছে নিজেদেরকে অসহায় মনে করে। এর ফলে সংসারে অশান্তি ও কলহ বৃদ্ধি পায়।
ঘ. সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা:
দাম্পত্য জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেমন: সন্তানের ভবিষ্যৎ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। যখন এই সিদ্ধান্তগুলো বাইরের লোকের প্রভাবে প্রভাবিত হয়, তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা কমে যায়।
ঙ. কুরআন ও হাদিসের পরিপন্থী:
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, বিয়ের পর স্ত্রী তার স্বামীর ঘরে পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রাখে। একইভাবে, স্বামীরও উচিত তার স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করা এবং পরিবারের অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে তাকে রক্ষা করা।
আবদুল্লাহ [ইবনু ‘উমার (রাঃ)] হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪, ২৫৫৮, ২৭৫১, ৫১৮৮, ৫৬০০, ৭১৩৮
একজন স্বামীর দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীকে অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করে একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
প্রতিকারের উপায় :
শ্বশুর-শাশুড়ি বা আত্মীয়দের অন্যায় হস্তক্ষেপ একটি দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য বিষাক্ত। এটি স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, বিশ্বাস, ভালোবাসা এবং শান্তিকে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়। তাই এ অন্যায় ও অবেধ হস্তক্ষেপ পরিহার করতে হবে।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ হলো, সে যেসব কাজে তার কোনো দায়িত্ব নেই, সে সেসব থেকে বিরত থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২৩১৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৯৭৬
১২. হারাম উপার্জন করার ফলে
হারাম উপার্জনের ফলে দাম্পত্য জীবন নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়, বরং এর মারাত্মক প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। হারাম উপার্জনের দাম্পত্য জীবন উপর যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তা হলো-
ক. মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তি নষ্ট হওয়া
হারাম উপার্জনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মানসিক শান্তি ও আত্মিক প্রশান্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন-
اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ
যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। সূরা রাদ : ২৮
যখন কোনো পরিবারে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা হয়, তখন সেখানে আল্লাহর বরকত থাকে না। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই মানসিক চাপ ও অশান্তিতে ভোগে, কারণ তারা জানে যে তাদের উপার্জনে আল্লাহর কোনো রহমত নেই। এই অশান্তি দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
খ. দোয়া কবুল না হওয়া
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
“আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ তা’আলা তার প্রেরিত রসূলদের যে হুকুম দিয়েছেন মুমিনদেরকেও সে হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভাল কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত। সূরা আল মুমিনূন : ৫১
তিনি (আল্লাহ) আরো বলেছেন-
তোমরা যারা ঈমান এনেছো শোনা আমি তোমাদের যে সব পবিত্র জিনিস রিযক হিসেবে দিয়েছি তা খাও”। সূরা বাকারা : ১৭২
অতঃপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে সে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, “হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দু’আ তিনি কী করে কবুল করতে পারেন?” সহীহ মুসলিম : ১০১৫
যদি স্বামী-স্ত্রীর দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল না হয়, তাহলে তাদের দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলো সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তারা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে পারে না, কারণ তাদের উপার্জনই দোয়া কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
গ. পারিবারিক বরকত চলে যাওয়া
হারাম উপার্জন পরিবার থেকে আল্লাহর বরকতকে ছিনিয়ে নেয়। এমনকি যদি উপার্জন অনেক বেশি হয়, তবুও তাতে কোনো কল্যাণ থাকে না। এই উপার্জনে কেনাকাটা করা জিনিসপত্র, ঘর-বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি বা আনন্দ থাকে না। এর ফলে, সামান্য কিছু নিয়েও ঝগড়া, অশান্তি এবং অসন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়।
ঘ. চারিত্রিক অবক্ষয়
যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার চরিত্রে সততা ও আমানতদারি থাকে না। এই খারাপ স্বভাব তার দাম্পত্য জীবনেও প্রতিফলিত হয়। সে তার স্ত্রীর প্রতি বা স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি মিথ্যাচার, প্রতারণা এবং বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। এর ফলে সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়, যা সম্পর্ককে ভেঙে দেয়।
ঙ. সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব
হারাম উপার্জনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর। হারাম খাদ্য গ্রহণকারী সন্তানেরা স্বভাবগতভাবে অবাধ্য, বেয়াদব এবং খারাপ চরিত্রের অধিকারী হতে পারে। বাবা-মায়ের অনৈতিক উপার্জনের কারণে তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দেয়। এর ফলে দাম্পত্য জীবনের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রতিকারের উপায় :
হারাম উপার্জন শুধু একটি আর্থিক অন্যায় নয়, বরং এটি একটি আত্মিক ও নৈতিক বিপর্যয়, যা দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে ধ্বংস করে দেয়। তাই পাম্পত্য জীবন ও পরকাল জাহান্নাম থেকে বাচতে হারাম বর্জনের কোন বিকল্প নাই।
জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দেহের গোশত হারাম উপার্জনে গঠিত, তা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। হারাম ধন-সম্পদে গঠিত ও লালিত পালিত দেহের জন্য জাহান্নামই উপযোগী। মিশকাত : ২৭৭২, আহমাদ : ১৪৪১, শু‘আবুল ঈমান : ৮৯৭২, দারিমী : ২৭৭৯।
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাঃ)-এর একজন ক্রীতদাস ছিল। সে প্রতিদিন তার উপর ধার্য কর আদায় করত। আর আবূ বকর (রাঃ) তার দেওয়া কর হতে আহার করতেন। একদিন সে কিছু খাবার জিনিস এনে দিল। তা হতে তিনি আহার করলেন। তারপর গোলাম বলল, আপনি জানেন কি ওটা কিভাবে উপার্জিত করা হয়েছে যা আপনি খেয়েছেন? তিনি বললেন, বলত কিভাবে? গোলাম উত্তরে বলল, আমি জাহিলী যুগে এক ব্যক্তির ভবিষ্যৎ গণনা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভবিষ্যৎ গণনা করা আমার ভালভাবে জানা ছিল না। তথাপি প্রতারণা করে তা করেছিলাম। আমার সাথে তার দেখা হলে গণনার বিনিময়ে এ দব্যাদি সে আমাকে হাদীয়া দিল যা হতে আপনি আহার করলেন। আবূ বকর (রাঃ) এটা শুনামাত্র মুখের ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন এবং পেটের ভিতর যা কিছু ছিল সবই বমি করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৩৮৪২, মিশকাত : ২৭৮৬, সহীহ আত্ তারগীব : ১৭৩৮
১৩. অতিরিক্ত ক্রোধ ও রাগ নিয়ন্ত্রণ না করা
অতিরিক্ত ক্রোধ ও রাগ নিয়ন্ত্রণ না করা দাম্পত্য জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়। দাম্পত্য সম্পর্ক আসলে ভালোবাসা, ধৈর্য ও পারস্পরিক সহনশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন স্বামী-স্ত্রী কেউ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন কয়েকভাবে সংসার নষ্ট হতে থাকে—
ক. কটু কথা ও আঘাতমূলক আচরণ
রাগের সময় মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। তখন স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে কটু কথা বলে বসে বা এমন আঘাতমূলক বাক্য উচ্চারণ করে, যা পরে ক্ষমা চাইলেও মনে দাগ রেখে দেয়। এই কটু ভাষা ভালোবাসার বাঁধন ছিন্ন করে দেয়।
খ. ছোট বিষয়কে বড় করে তোলা
রাগ অনিয়ন্ত্রিত হলে ক্ষুদ্র বিষয়ও বড় হয়ে যায়। তুচ্ছ ভুল নিয়ে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়, যা ধীরে ধীরে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে।
গ. শারীরিক সহিংসতায় রূপ নেওয়া
অনেক সময় রাগ চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে শারীরিক সহিংসতা পর্যন্ত চলে যায়। এতে সংসার ভেঙে যাওয়া বা আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ঘ. বিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতা নষ্ট হওয়া
একজন সঙ্গীর রাগের কারণে অপরজন সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। এতে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিশ্বাস কমে যায় এবং নিরাপত্তার অনুভূতি হারিয়ে যায়।
ঙ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব
যদি স্বামী-স্ত্রী সবসময় রাগ ও ঝগড়ায় লিপ্ত থাকে, তবে সন্তানরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা ভীতু, আক্রমণাত্মক বা মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ে।
চ. ভালোবাসা ও দয়া হারিয়ে যাওয়া
দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা, দয়া ও ক্ষমাশীলতা। রাগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন এসব সুন্দর গুণ ধীরে ধীরে মরে যায় এবং সম্পর্ক শুধুই ঝগড়া-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
প্রতিকারের উপায় :
দাম্পত্য জীবনকে টিকিয়ে রাখতে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। ইসলামও আমাদেরকে রাগ দমন করতে বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছে। যখন স্বামি-স্ত্রী তাদের অতিরিক্ত ক্রোধ বা রাগ নিয়ন্ত্রণ করবে, তখন তারা দাম্পত্য জীবনের ভয়াবহ ক্ষতির থেকে রক্ষা পাবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ فِی السَّرَّآءِ وَالضَّرَّآءِ وَالۡکٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَالۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ وَاللّٰہُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ۚ
যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন। সুরা আর ইমরান : ১৩৪
আবূ হুরাইরাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। সহিহ বুখারি : ৬১১৪, সহিহ মুসলিম : ২৬০৯, আহমাদ : ৭২২৩
১৪. অতি ব্যয়বহুল জীবনযাপন ও অপচয়
অতি ব্যয়বহুল জীবনযাপন (luxury life) এবং অপচয় (israf) দাম্পত্য জীবন ধ্বংস করার অন্যতম কারণ। কারণ সংসারের প্রকৃত সুখ আসে না বাহুল্য প্রদর্শনী বা বিলাসিতায়; বরং আসে সরলতা, পরস্পরের ভালোবাসা, শান্তি ও সহযোগিতায়। অতি ব্যয়বহুলতা ও অপচয় দাম্পত্য জীবনে যেভাবে ক্ষতি আনে—
ক. আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়
অযথা বিলাসিতা ও অপচয় সংসারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। আয় কম হলে ঋণগ্রস্ত হতে হয়, আর আয় বেশি হলেও কখনো সন্তুষ্টি আসে না। ফলে সংসারে অশান্তি শুরু হয়।
খ. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ে
অতিরিক্ত খরচ করার প্রবণতা থাকলে একসময় অপর পক্ষ বিরক্ত হয়ে পড়ে। স্বামী যদি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল জীবনযাপন করতে চায় কিন্তু স্ত্রী বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয়, বা উল্টোটা হয়, তখন ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয়।
গ. আত্মীয়স্বজন ও সমাজের সাথে প্রতিযোগিতা
অতি ব্যয়বহুল জীবনযাপনের পেছনে অনেক সময় সামাজিক প্রতিযোগিতা কাজ করে—“কে কত বেশি দেখাতে পারে।” এ প্রতিযোগিতা দাম্পত্য সম্পর্কে অহংকার, হিংসা ও অসন্তোষ ঢুকিয়ে দেয়।
ঘ. সরলতা ও কৃতজ্ঞতা হারিয়ে যায়
যখন জীবনে অপচয় ও বিলাসিতা বাড়ে, তখন মানুষ সামান্যতে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। ফলে দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত সুখ, সরলতা, কৃতজ্ঞতা, তৃপ্তি ইত্যাদি সব হারিয়ে যায়।
ঙ. সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব
অতি বিলাসিতা দেখে সন্তানরা ছোট থেকেই অপচয়ের অভ্যাস রপ্ত করে। পরে তারা চাহিদাপূর্ণ, অসহিষ্ণু ও স্বার্থপর হয়ে ওঠে, যা পুরো পরিবারের জন্য ক্ষতিকর।
চ. আল্লাহর অসন্তুষ্টি
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” সূরা বানী ইসরাঈল : ২৭
অপচয় আল্লাহর নাফরমানির কাজ। যখন সংসারে অপচয় হয়, তখন তা বরকতহীন হয়ে যায়।
ছ. দাম্পত্য ভালোবাসা ও শান্তি নষ্ট হয়
যখন সংসারের বড় অংশ অর্থকেন্দ্রিক ঝগড়ায় জড়িয়ে যায়, তখন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাধুর্য ও পারস্পরিক ভালোবাসা কমে যায়। তখন ঘর শুধু অর্থের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, আশ্রয়ের স্থান আর থাকে না।
প্রতিকার উপায় :
দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতে হলে সাধারণ জীবনযাপন, পরিমিত ব্যয়, কৃতজ্ঞতা এবং অপচয় থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য। ইসলাম আমাদেরকে সব সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের আদেশ দিয়ে বলেন-
وَکَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُہَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَیَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَہِیۡدًا ؕ
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। সূরা বাকারাহ : ১৪৩
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَا تَجۡعَلۡ یَدَکَ مَغۡلُوۡلَۃً اِلٰی عُنُقِکَ وَلَا تَبۡسُطۡہَا کُلَّ الۡبَسۡطِ فَتَقۡعُدَ مَلُوۡمًا مَّحۡسُوۡرًا
তুমি বদ্ধমুষ্টি হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়োনা; তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হবে। সূরা বানী ইসরাঈল : ২৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ
হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৭
১৫. যৌন চাহিদা পূরণে অবহেলা করার ফলে
যৌন চাহিদা দাম্পত্য জীবনের অন্যতম স্বাভাবিক ও মৌলিক অধিকার। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, মানসিক প্রশান্তি এবং সংসারের স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই এই চাহিদা পূরণের উপর নির্ভর করে। যদি এ বিষয়ে অবহেলা করা হয়, তবে দাম্পত্য জীবন নানা দিক থেকে ভেঙে পড়তে শুরু করে। তা কয়েকভাবে বোঝা যায়—
ক. মানসিক অশান্তি ও হতাশা
যৌন চাহিদা পূরণ না হলে স্বামী বা স্ত্রী মানসিকভাবে হতাশ, রূঢ় বা বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। এতে সংসারে অশান্তি ও ঝগড়া বাড়তে থাকে।
খ. পারস্পরিক দূরত্ব বৃদ্ধি
যখন দাম্পত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ অবহেলিত হয়, তখন স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা কমে যায়। একে অপরের প্রতি আকর্ষণ ও মমতা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে পড়ে।
গ. অন্যায় ও গুনাহের দিকে ধাবিত হওয়া
যৌন চাহিদা বৈধ পথে পূরণ না হলে মানুষ অনেক সময় অবৈধ উপায়ে (ব্যভিচার, হস্তমৈথুন, পর্নোগ্রাফি ইত্যাদি) সেই অভাব পূরণ করতে যায়। এতে আল্লাহর গজব ও সংসার ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ঘ. বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভাঙন
যদি এক পক্ষ বারবার অবহেলা করে, অন্য পক্ষ মনে করে—“সে আমাকে ভালোবাসে না, আমায় গুরুত্ব দেয় না।” এই ধারণা বিশ্বাস ও ভালোবাসার ভাঙন ঘটায়।
ঙ. বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ
শারীরিক সম্পর্কের অভাব বা অবহেলা অনেক সময় সরাসরি বিবাহ বিচ্ছেদ বা দ্বিতীয় বিয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামী ফিকহেও স্বামী-স্ত্রীর যৌন অধিকার না দেওয়া “নুশূয” বা অবাধ্যতার অন্তর্ভুক্ত।
চ. সন্তান জন্ম ও পরিবার গঠনে বাধা
দাম্পত্য জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সন্তান জন্মদান ও পরিবার গঠন। যৌন সম্পর্কে অবহেলা করলে এ স্বাভাবিক উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
প্রতিকারের উপায় :
যৌন সম্পর্ক দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শারীরিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই দম্পতিদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। তাই এই বিষয়ে অবহেলা করলে তা ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয় এবং একসময় তা ভেঙে দিতে পারে। যত দ্রুত সম্ভম নিজেদের মধ্যকার ভুল বুঝাবুঝি দুর করে যৌন চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হতে হবে। তাই দাম্পত্য জীবন সুন্দর ও স্থায়ী রাখতে হলে স্বামী-স্ত্রীর জন্য যৌন চাহিদা পূরণ করা পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব এবং ইবাদতের অংশ।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায় আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে ফেরেশ্তাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। সহিহ বুখারি : ৩২৩৭, ৫১৯৩, ৫১৯৪, সহিহ মুসলিম ; ১৪৩৬, আহমাদ : ৯৬৭৭