Category Archives: রাসূলুল্লাহ ﷺ

মসজিদে নব্বীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মসজিদে নব্বীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র মদিনা মুসলিম উম্মাহর কাছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ শহর। মুসলিম হৃদয়ে এই নগরীর প্রতি রয়েছে অপরিসীম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মর্যাদা। কেননা এখানেই শুয়ে আছেন প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পবিত্র এই ভূমিতেই ইসলামের উত্থান হয়েছিল এবং এখান থেকেই সারা পৃথিবীতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় সাহাবী আবু বকর (রাঃ) কে নিয়ে মাতৃভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। উমর (রাঃ) এর খিলাফতকালে সে স্মৃতির উপর ভিত্তি করে ইসলামি বর্ষপঞ্জি প্রতিষ্ঠিত হয় যা হিজরী সাল নামে পরিচিতি লাভ করে। ঐতিহাসিকভাবে মদিনা একটু গুরুত্বপূর্ণ নগরী কারণ রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পরে মদিনায় বসবাস করেছেন। রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শেষ ১০ বছর এই নগরীতেই কাটিয়েছেন। মূলত আল্লাহ এই নগরীকে ইসলামের জন্য কবুল করেছিলেন বিধায় এই নগরীটি মুনলিমদের নিকট অত্যন্ত শ্রদ্ধার।  

মদিনা সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চলের একটি শহর এবং মদিনা প্রদেশের রাজধানী। এটি ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্র শহর, যেখানে মুসলমানদের শেষ নবী মুহাম্মাদের কবর নানান ঐতিহাসিক কারণে মদিনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রাচীনতম ও ঐতিহাসিক তিনটি মসজিদ যেমন মসজিদে নববী, কুবা মসজিদ (যেটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মসজিদ) এবং মসজিদ আল কিবলাতাইন (যে মসজিদে মুসলমানদের কিবলা পরিবর্তন হয়েছিল) অবস্থিত।

ইসলামের ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থে মদিনার অনেক নাম পাওয়া যায়, যা তার সম্মান ও মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। মদিনা কে সরকারী ভাবে (المدينة المنورة) আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারাহ‎‎ বলা হয়। তবে পৃথিবীর সকলের নিকট মদিনা হিসেবে পরিচিত। অনারবগন আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারাহ‎‎ কে মদিনা হিসাবেই উল্লেখ করে থাকে। আল্লামা সামহুদি মদিনার ৯৪ টি নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ‘মদিনা’ নামটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে মদিনা শব্দটি কমপক্ষে ১৩ বার এসেছে, যার মধ্যে সরাসরি চারটি স্থানে মদিনা নগরীর কথা বলা হয়েছে। যেমনঃ সুরা তাওবা ৯:১০১ ও ৯:১২০, সুরা আহজাব ৩৩:৬০ এবং সুরা মুনাফিকুন ৬৩:৮। ইহা ছাড়া বাকি সকল স্থানে মদিনা শব্দের অর্ত শহর বা নগর হিসাবের ব্যবহৃত হয়েছে। তবে অসংখ্যা হাদিসে মদিনা শহরের নামটি বার বার ব্যবহার হয়েছে। মদিনার আরেকটি প্রসিদ্ধ নাম ‘তাইবাহ”।

যাইদ ইবনু সাবিত (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ “তোমাদের কি হল যে, মুনাফিক্বদের প্রসঙ্গে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে…..”। (সূরা নিসা:৮৮) আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উহূদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবীদের (মুসলিম বাহিনীর) মধ্য হতে কিছু সংখ্যক লোক (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) ফিরে আসে। তাদের প্রসঙ্গে সাহাবীগণ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যান। এক দলের বক্তব্য ছিল, তাদেরকে হত্যা কর। অন্য দলের মত ছিল, তাদেরকে হত্যার প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) : “তোমাদের কি হল যে, মুনাফিক্বদের ব্যাপারে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে….। (সুরা নিসা ৪:৮৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মাদীনা হল তাইবাহ-পবিত্র নগরী। তা ময়লা আবর্জনা (অপবিত্রতা মুনাফিক্বী) এমনভাবে দূর করে দেয় যেভাবে আগুন লোহার ময়লা দূর করে দেয়। (সহিহ বুখারি ৪৫৮৯, তিরমিজি ৩০২৮)

মদিনার উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি নাম হলো আদ-দার, আল-হাবিবা, দারুল হিজরা, দারুল ফাতহ ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আসার আগে এ নগরীর নাম ছিল ইয়াসরিব। নুহ আলাইহিস সালাম এর এক ছেলের নাম ছিল ইয়াসরিব। তাঁর বংশধরদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তিনি মদিনায় এসে বসবাস করেন। তাঁর নামানুসারে এ শহরের নাম ইয়াসরিব রাখা হয়। ইয়াসরিব অর্থ অভিযুক্ত করা বা ধমক দেওয়া। মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হিজরতের পর এ নগরীর নাম রাখা হয় মদিনা। আগেই উল্লেখ করেছি, মদিনা শব্দের অর্থ শহর। নবীজি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইয়াসরিবে আগমনে স্থানীয় সব ধর্মবিশ্বাসের এবং সব গোত্রের সব অধিবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁকে শান্তির দূত ও অভিভাবক হিসেবে সানন্দে মেনে নেয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমনে আনন্দে উদ্বেলিত জনতা নিজ শহরের নাম বদলে ফেলে রাখলেন মাদিনাতুন নবী, অর্থাৎ নবীর শহর। তখন থেকেই ইয়াসরিব হয়ে যায় মদিনা।

হিজরত করে মদিনা পৌছানোর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথম কাজ হল মসজিদে নাবাবীর নির্মাণ। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসের শেষ অংশে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, ‘উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবায়রের সাথে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাত হয়। তিনি মুসলমানদের একটি বণিক কাফেলার সাথে সিরিয়া হতে ফিরছিলেন। তখন যুবায়র (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকর (রাঃ)-কে সাদা রঙ্গের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদিনায় মুসলিমগণ শুনলেন যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা হতে মদিনার পথে রওয়ানা হয়েছেন। তাই তাঁরা প্রতিদিন সকালে মদিনার হার্রা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতেন থাকেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তারা ঘরে ফিরে আসতেন। একদিন তারা পূর্বাপেক্ষা বেশি সময় প্রতীক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। এমন সময় এক ইয়াহূদী একটি টিলায় আরোহণ করে এদিক ওদিক কি যেন দেখছিল। তখন সে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীসঙ্গীদেরকে সাদা পোশাক পরা অবস্থায় মরীচিকাময় মরুভূমির উপর দিয়ে আগমন করতে দেখতে পেল। ইয়াহূদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে চীৎকার করে বলে উঠল, হে আরব সম্প্রদায়! এইতো সে ভাগ্যবান ব্যক্তি- যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছ। মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে মদিনার হাররার উপকন্ঠে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বনু ‘আমর ইবনু ‘আউফ গোত্রে অবতরণ করলেন। এদিনটি ছিল রবি‘উল আউয়াল মাসের সোমবার। আবূ বাকর (রাঃ) দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। আনসারদের মধ্য হতে যাঁরা এ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেননি তাঁরা আবূ বাকর (রাঃ)-কে সালাম করতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রের উত্তাপ নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর পড়তে লাগল এবং আবূ বাকর (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তাঁর চাদর দিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপর ছায়া করে দিলেন তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু ‘আমার ইবনু ‘আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশি সময় কাটালেন এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে সালাত আদায় করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উঁনীতে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন। লোকেরাও তাঁর সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদিনায় মসজিদে নাবাবীর স্থানে পৌঁছে উটনীটি বসে পড়ল। সে সময় ঐ স্থানে কতিপয় মুসলিম সালাত আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইবনু যুরারাহ এর আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহায়েল নামক দু’জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে উটনীটি যখন এ স্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ্, এ স্থানটিই হবে আবাসস্থল। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বালক দু’টিকে ডেকে পাঠালেন এবং মাসজিদ তৈরির জন্য তাদের কাছে জায়গাটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনামূল্যে দিচ্ছি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ হতে বিনামূল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের হতে খরীদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মাসজিদ তৈরি করলেন। রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসজিদ নির্মাণকালে সহাবা কেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন এবং ইট বহনের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেনঃ

এ বোঝা খায়বারের বোঝা বহন নয়।          

ইয়া রব, এর ভোঝা অত্যন্ত পুণ্যময় ও অতি পবিত্র।

তিনি আরো বলছিলেন, হে আল্লাহ্! পরকালের প্রতিদানই প্রকৃত প্রতিদান।              

সুতরাং আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।

এক মুসলিম কবির কবিতা আবৃত্তি করেন, যার নাম আমাকে বলা হয়নি। ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এছাড়া অপর কোন পূর্ণ কবিতা পাঠ করছেন বলে, কোন কথা আমার কাছে পৌঁছেনি। (সহিহ বুখারি ৩৯০৫)

সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায় যে, মদিনা মসজিদের নির্মাণের জন্য নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সোহাইল নামক দু’জন বালকের নিকট হতে জমি ক্রয় করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দশ দীনার মূল্যে স্থানটি খরীদ করলেন। আবুবকর (রাঃ) মূল্য পরিশোধ করলেন। অতঃপর তার আশপাশের কবরগুলি এবং বাড়ী-ঘরের ভগ্নস্তূপসহ স্থানটি সমতল করলেন। গারক্বাদের খেজুর গাছগুলি উঠিয়ে সেগুলিকে ক্বিবলার দিকে সারিবদ্ধভাবে পুঁতে দেওয়া হয়। ঐ সময় ক্বিবলা ছিল বায়তুল মুক্বাদ্দাস, যা ছিল মদীনা হতে উত্তর দিকে। তিনটি দরজার দু’বাহুর স্তম্ভগুলি পাথরের, মধ্যের খাম্বাগুলি খেজুর বৃক্ষের, দেওয়াল কাঁচা ইটের, ছাদ খেজুর ডালপাতার এবং বালু ও ছোট কাঁকর বিছানো মেঝে-এই নিয়ে তৈরী হল মসজিদে নববী, যা তখন ছিল ৭০×৬০×৭ হাত আয়তন বিশিষ্ট। পরবর্তীতে মদিনা মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন প্রতিটি কোণ হতে তীর নিক্ষেপ করে যে পরিমাণ জায়গা পাওয়া গেল তা হলো একটি ক্ষেত্র। বর্গের প্রতিটি বাহুর পরিমাণ হয় ১০০ হাত বা ৫৬ গজ। অর্থাত্ মদিনা মসজিদের আয়তন হল ১০০X১০০ হাত বা ৫৬X৫৬ গজ। ইবনে সাদ ও দিয়ার বকরী বলেন, মসজিদের ভিটি ও দেয়ালের নিম্নভাগ ৩ হাত পর্যন্ত প্রস্তর নির্মিত ছিল। প্রথম পর্যায়ে মদিনা মসজিদ রৌদ্র শুষ্ক ইট দ্বারা নির্মিত হয়। এই রৌদ্র শুষ্ক ইট বাকী আল-খাবখাবা উপত্যকা হতে আনিত কাদা দ্বারা তৈরি হয়েছিল। তখন মদিনা মসজিদের দেয়াল ছিল ৭ হাত উঁচু। ছাদকে শক্তিশালী ও মজবুত রাখার জন্য মদিনা মসজিদের ৩৬টি খেজুর গাছকে স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। মসজিদের ছাদ নির্মিত হয়েছিল খেজুর পাতা দিয়ে। ছাদকে সুন্দর করার জন্য, রৌদ্র ও বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য খেজুর পাতার ওপর কাঁদামাটির আস্তরণ দেয়া হয়েছিল। ১৬ বা ১৭ মাস পরে ক্বিবলা পরিবর্তিত হলে উত্তর দেওয়ালের বদলে দক্ষিণ দেওয়ালের দিকে ক্বিবলা ঘুরে যায়। কেননা মক্কা হল মদীনা থেকে দক্ষিণ দিকে। এ সময় উত্তর দেওয়ালের বাইরে একটা খেজুর পাতার ছাপড়া দেওয়া হয়। আরবীতে বারান্দা বা চাতালকে ‘ছুফফাহ’ বলা হয়। উক্ত ছুফফাহ’তে নিঃস্ব ও নিরাশ্রয় মুসলমানদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া হত। পরবর্তীতে তাদের কোন ব্যবস্থা হয়ে গেলে তারা চলে যেতেন। বারান্দায় বা চাতালে সাময়িক আশ্রয় গ্রহণকারীগণ ইতিহাসে ‘আছহাবে ছুফফাহ’ (أصحاب الصفة) নামে খ্যাতি লাভ করেছেন।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওফাতের পর আবু বক্কর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর সময় এই মসজদি আর সংস্কার হয়নি। পরবর্তিতে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এবং ওসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর যুগে মসজিদের সম্প্রসারণ ঘটে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওফাতের পর হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নব্বীর সম্প্রসারণ করেন। তিনি মসজিদটি উত্তর দিকে ৩০ হাত, দক্ষিণ দিকে ১০ হাত, পশ্চিম দিকে ২০ হাত সম্প্রসারণ করেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর সময় মসজিদের পরিমাণ দাঁড়ায় উত্তর-দক্ষিণে ১৪০ হাত, পূর্ব-পশ্চিমে ১২০ হাত। হযরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর সময় ৬৪৬-৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে খেজুরপাতার পরিবর্তে ছাদে সেগুণ কাঠ ব্যবহার করা হয়। ছাদের আকার দাঁড়ায় ১৬০X১৩০ হাত। এ সময় সম্প্রসারিত হয়ে মসজিদের আকার দাঁড়ায় উত্তর দক্ষিণে ১৬০ হাত এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫০ হাত।

উমর ইবনে আবদুল আজীজ ৮৭ হিজরীতে তিনি মদীনার শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েছিলেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল মসজিদে নববী পুনঃনির্মাণ ও ইহার সৌন্দর্য বৃদ্ধি। এ বিরাট কীর্তি তিনি মদীনায় শুভাগমন করার এক বছর পর অর্থাৎ ৮৮ হিজরীর সফর মাসে শুরু করেন এবং ৮৯ হিজরীতে শেষ করেন। তবে অনেকের মতে ইহা শেষ হয়েছিল ৯১ হিজরীতে।। ঐতিহাসিকগণ খলিফা ওয়ালীদকে মসজিদের নির্মাতা বলে উল্লেখ করেছেন, তা যথার্থই করেছেন। খলিফা ওয়ালীগ এ হিসেবেই এর নির্মাতা যেহেতু, তিনি এ মহান কর্মকাণ্ডের জন্য বিপুল সাজ-সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য গাড়ী বোঝাই করে ওমর ইবনে আবদুল আজীজের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।

পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন মুসলিম শাসকের আমলে মসজিদের উন্নয়ন ও সম্প্রসারন ঘটে। খলিফা আল ওয়ালিদের সময় মদিনা মসজিদটি আধুনিক ইমারতে পরিণত হয়। ওয়ালিদ ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে মসজিদে নববীকে সাজিয়ে তোলেন। তাঁর সময় মসজিদে নববীর পরিমাপ দাঁড়ায় ২০০X২০০ হাত। ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সর্ব প্রথম মদিনা মসজিদের চারকোণে ৪টি মিনার নির্মাণ করেন আল ওয়ালিদ। তখন প্রতিটি মিনারের উচ্চতা ছিল ৫০ হাত এবং প্রস্থে ছিল ৮ হাত।

খলিফা মাহদী ৭৭৫-৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন ৩০০ X ৩০০ হাত। আর মামলুক সুলতান কয়েত-বে মসজিদে নববীতে গম্বুজ প্রতিষ্ঠিত করেন। এতে গম্বুজ করা হয় ১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দে। গম্বুজ সবুজ রং-এর আস্তরণ দিয়েছিলেন ওসমানী সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে।

বিশালকার মসজিদে নববীর সমস্ত রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব সৌদি রাজ পরিবারের। তাই বর্তমান আধুনিকায়নে মসজিদ-এ নববীর রূপদান করেন সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজ ইবনে সউদ। তিনি এর পরিকল্পনা করেন  ১৯৪৮ খ্রীস্টাব্দে।  সৌদি সরকার যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন মসজিদের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। ১৯৫১ ইং সালে বাদশাহ আব্দুল আযীয মসজিদের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম দিকের আশেপাশের ঘর-বাড়ি খরিদ করে ভেঙে ফেলেন। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১২৮ মিটার ও প্রস্থ ৯১ মিটার করা হয় এবং আয়তন ৬২৪৬ বর্গ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১৬৩২৬ বর্গমিটার করা হয়। মসজিদের মেঝেতে ঠান্ডা মার্বেল পাথর লাগানো হয়। মসজিদের চার কোনায় ৭২ মিটার উচুঁ চারটি মিনার তৈরি করা হয়। এ সম্প্রসারণে ৫ কোটি রিয়াল খরচ হয় ও কাজ শেষ হয় ১৯৫৫ সালে।

বাদশাহ ফয়সাল এর আমলে ক্রমবর্ধমান হাজীদের জায়গার সংকুলান করার জন্য পশ্চিম দিকের জায়গা বৃদ্ধি করা হয় যার আয়তন ছিল ৩৫০০০ বর্গমিটার।

সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে বাদশাহ ফাহাদ ইবন আব্দুল আযীয কর্তৃক মসজিদের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন ও বিস্তার সাধিত হয়। পূর্ববর্তী মসজিদের আয়তনের তুলনায় নয় গুণ আয়তন বৃদ্ধি করা হয়। মসজিদকে এত সুন্দর করা হয় যা মুসলিমদের অন্তর জয় করে। মসজিদের ছাদ এমনভাবে বানানো হয়েছে যে প্রয়োজনে দ্বিতল বানানো সম্ভব হবে। মূল গ্রাউণ্ড ফ্লোরের আয়তন ৮২০০০ বর্গমিটার হয়। মসজিদের চারপাশে ২৩৫০০০ বর্গমিটার খোলা চত্বরে সাদা শীতল মার্বেল পাথর বসানো হয়। এর ফলে মসজিদের ভিতরে ২৬৮০০০ মুসল্লি এবং মসজিদের বাইরের চত্বরে ৪৩০০০০ মুসল্লির সালাত আদায়ের জায়গা হয়। সম্পূর্ণ মসজিদে এসি, আন্ডারগ্রাউন্ডে ওয়াশরুম ও কার পার্কিং এর ব্যবস্থা করা হয়। মসজিদের কাজ শুরু হয় ১৯৮৫ সালে আর শেষ হয় ১৯৯৪ সালে।

মন্তব্যঃ হজ্জ পরিসমাপ্তির পর প্রত্যকে হাজ্জিকে মদীনা যেতে হবে এমন কোন বাধ্য বাধকতা ইসলামি শরীয়তে নাই। হজ্জের সাথে মদীনা শরীফ যিয়ারত করাও অপরিহার্য নয়। মদীনার যিয়ারত করা একটি স্বতন্ত্র সুন্নত। অধিকাংশ হাজ্জি মক্কা মনীদার বাহির থেকে হজ্জ আদায়ের জন্য আসেন। তাদের জন্য এই সময় মদীনা সফর করা একটি সুযোগ আসে। আলাদা আলাদাভাবে দুজায়গা সফরের লক্ষ্যে দুবার আসা খুবই কষ্টকর। কষ্ট হলেও অনেকের আবার আর্থিকভাবেও সমর্থবান নয়। বিধায় হজ্জের সফরের কারনে এক সঙ্গেই তারা দুজায়গায় সফর করেন। তাই বিষয়টি অন্যভাবে বিবেচনা না করে, হজ্জ পরিসমাপ্তির পর মদীনা জিয়ারত করা যেতে পারে। তাহলে এতটুকু ষ্পষ্ট যে, হজ্জের সফর হোক আর অন্য সময়ে হোক মদীনা যিয়ারত করা যেতেই পাবে।

কোন নিয়তে মদীনা যাবেন?

এই সম্পর্কে দুটি প্রশিদ্ধ মত পাওয়া যায়। এক দল বলেছেন, মদীনা সফর মানে মসজিদে নব্বী সফরের নিয়ত করতে হবে। আরেক দল বলেছেন না, কবর বা রওজা মোবারক যিয়ারতের নিয়তে সফর করতে হবে। যারা কবর বা রওজা মোবারক যিয়ারতের নিয়তে মদীনা যাবার পক্ষে তারা শুধু ব্রেলভী বা রিজভী নয়, তারা আমাদের দেওবন্দী আলেমও। এই মাসায়েলে তারা দুটি দলই এতটাই অগ্রগন্য যে এ সম্পর্কে দলিল দ্বারা প্রমান করার দরকার নাই। তাদের আলেমদের জিজ্ঞাসা করলেই এর পক্ষে মতমত প্রদান করে। তারপরও পাঠদের বুঝাতে দুটি রেফারেন্স দিলাম।

দেওবন্দীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারত ওয়াজিব বা এর কাছাকাছি মনে করে।

ক। ‘আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ’ এ বর্ণিত মক্কা-মদিনার আলমগন প্রশ্ন করে ছিল। (১ম প্রশ্ন) “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা সম্পর্কে আপনাদের মত কি?

উত্তরে তারা লিখেঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে জিয়ারত আমরা ও আমাদের পূবর্সূরীহনের মতে আল্লাহর অধিক নৈকট্য লাভ, অতিশয় পূণ্য লাভ উন্নত স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মাধ্যম। বরং উম্মতের জন্য তা ওয়াজিব না হলেও তার কাছা কাছি বিষয়।

রওদ্বায়ে পাক জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা ও এ উদ্দেশ্যে ব্যয় করা সৌভাগ্যের বিষয়। কেউ যদি রওজা পাক যিয়ারতের নিয়তের সাথে সাথে মসজিদে নব্বীও তত্সংশ্লষ্ট মুবারক জাযগা সমুহের নিয়ত কর তাতে কোন আপত্তি নেই। (‘আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ’ খলিল আহম্মদ সাহরনাপুলী, ভারত, পৃষ্ঠা নম্বর ২৪)।

খ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারতে যাওয়ার ব্যপারে দেওবন্দ আলেদের অরস্থান একেবারে স্পষ্ট। “ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” বইটিতে একটা অধ্যায়ের নাম দিয়েছেন “রওযায়ে আতহার যিয়ারতে যাওয়ার নিয়ত প্রসঙ্গে”  লেখক এখানে সালাফি আলেম ইবনে তাইমিয়া (র) এর আনিত অভিযোগ খন্ডন করার নিমিত্তে তার (ইবনে তাইমিয়া) উল্লেখিত হাদিসের (তিনটি স্থান ব্যতিত নেকির উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না) ব্যাখ্যা ও  কয়েক জন বিসিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদের মতামত তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারত জন্য সফর করা নেকির কাজ। (“ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন, পৃষ্ঠা – ৪৬৭)।

পক্ষান্তরে সালাফিরা কবর জিয়ারত কে সুন্নাত মনে করে কিন্তু কবর জিয়ারত উদ্দেশ্যে সফর করা কে নাজায়িয মনে করে থাকে।

শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন, যদি হাজীসাহেব হজ্জের আগে অথবা পরে মসজিদে নববি যিয়ারত করতে চান তাহলে তিনি মসজিদে নববি যিয়ারত করার নিয়ত করবেন, কবর নয়। কারণ নেকি হাছিল করার জন্য কোন কবরকে উদ্দেশ্য করে সফর করা জায়েয নয়। বরং সফর করা যায় তিনটি মসজিদের উদ্দেশ্যে। সেগুলো হচ্ছে- মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি ও মসজিদে আকসা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে তিনি বলেন, “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন কিছুকে উদ্দেশ্য করে সফর করা যাবে না, মসজিদে হারাম, আমার মসজিদ ও মসজিদে আকসা। (সহিহ বুখারি ১১৮৯ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৭)

সালাফি আলেমদের মতে, মসজিদে নববী যিয়ারত করা সুন্নত ওয়াজিব নয়। হজ্জের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এটি হজ্জকে পূর্ণ করবে এমন কিছু নয়। মসজিদে নববীর যিয়ারতকে হজ্জের সাথে সম্পৃক্ত করে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে এর সবগুলো মাওজু (বানোয়াট) ও মিথ্যা। যে ব্যক্তি তাঁর মদিনার সফরের মাধ্যমে মসজিদে নববী যিয়ারত ও মসজিদে নববীতে নামায পড়ার উদ্দেশ্য করবে তার উদ্দেশ্য পূণ্যময়, তাঁর আমল সওয়াবসম্ভাব্য। আর যে ব্যক্তির সফরের উদ্দেশ্য কবর যিয়ারত ও কবর-ওয়ালাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা ছাড়া অন্য কিছু নয় তার উদ্দেশ্য হারাম, তার কর্ম মন্দ।

দলিলঃ

১. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন গন্তব্যে সফর করা যাবে না। মসজিদে হারাম, আমার এই মসজিদ ও মসজিদে আকসা।”(সহিহ বুখারী ১১৮৯ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৭, আবু দাইদ ২০৩৩)

২. জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “সফর করার সবচেয়ে উত্তম গন্তব্য হচ্ছে- আমার এ মসজিদ ও বাইতুল আতিক (কাবা)”। (মুসনাদে আহমাদ ৩/৩৫০, আলবানী তাঁর ‘আল-সিলসিলাতুস সহিহা’ গ্রন্থে ১৬৪৮) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)

মন্তব্যঃ ইমামগণ এবং অধিকাংশ শরীয়ত বিশেষজ্ঞ একমত পোষণ করেছেন যে, সফরকারির সফরের উদ্দেশ্য যদি শুধু নবীর কবর যিয়ারত হয়, তাঁর মসজিদে সালাত আদায় করা না হয় তবে তা  শরীয়ত সম্মত নয়। (ইবন তাইমিয়া, আল-ফাতাওয়াল কুবরা : ৫/১৪৯)

ইবন তাইমিয়া রহ. আরো বলেন, ‘জেনে রাখো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত বহু ইবাদত থেকে মর্যাদাপূর্ণ, অনেক নফল কর্ম থেকে উত্তম। কিন্তু সফরকারীর জন্য শ্রেয় হচ্ছে, সে মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়ত করবে। অতপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত করবে এবং তাঁর ওপর সালাত ও সালাম পেশ করবে। (আল-ফুরকান বাইনা আউলিয়াইর রহমান ওয়া আউলিয়ায়িশ শয়তান : ১/৩০৭)

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘জাহেলী যুগের মানুষেরা তাদের ধারণামত মর্যাদাপূর্ণ স্থানসমূহকে উদ্দেশ্য করে তা যিয়ারত করত এবং তার মাধ্যমে (তাদের ধারণামত) বরকত লাভ করত। এতে রয়েছে সত্যচ্যুতি, বিকৃতি ও ফাসাদ যা কারো অজানা নয়। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ফাসাদ চিরতরে বন্ধ করে দেন, যাতে শা‘আয়ের (আল্লাহর নিদর্শন এবং তাঁর ইবাদতের স্থানসমূহ) নয় এমন বিষয়গুলো শা‘আয়ের-এর অন্তর্ভুক্ত না হয় এবং যাতে এটা গায়রুল্লাহর ইবাদতের মাধ্যম না হয়। আমার মতে সঠিক কথা হচ্ছে, কবর ও আল্লাহর যে কোন ওলীর ইবাদতের স্থান, তূর পাহাড় ইত্যাদি সবকিছু উপরোক্ত হাদীসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাহ : ১/৪০৮)

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘হ্যাঁ, সফকারির জন্য মুস্তাহাব হচ্ছে, মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়তে সফর করা। আর এটা নৈকট্য লাভের অন্যতম বড় উপায়। অতপর সে যখন মদীনা পৌঁছবে, তার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর কবর যিয়ারত করাও মুস্তাহাব। কেননা তখন সে মদীনা নগরীতে অবস্থানকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর তখন নগরীতে অবস্থিত কবরগুলো যিয়ারত করা অবস্থানকারীর ক্ষেত্রে মুস্তাহাব। (ফায়যুল বারী : ৪/৪৩।

সুতরাং মসজিদে নববী যিয়ারতের নিয়তে মদীনা যিয়ারত করতে হবে। কবর যিয়ারতের নিয়তে মদীনা যিয়ারত হলে, তা সহীহ হবে না। মনে রাখবেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর কেন্দ্রিক সকল উৎসব জোরালোভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর আমার কবরকে তোমরা উৎসবের উপলক্ষ্য বানিও না। (আবূ দাউদ : ১৭৪৬)

অর্থাৎ আমার কবর-কেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করো না।’ এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করাও শামিল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  প্রথম কিস্তি

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  প্রথম কিস্তি

মুহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

কবর যিয়ারতের নিয়তে ত্রুটি

দুটি কারনে মদীনা গমন করা হয়। প্রথমটি হল ফজিলত পূর্ণ মসজীদে নবী দর্শণ ও সেখানে ইবাদাত করা। দ্বিতীয় হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর জিয়ারত করা। কিন্তু এই দুটি কোনটি নিয়ত করে সফর শুরু করতে হবে? এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে মতভেদ লক্ষ করা যায়। উপমহাদেশের দেওবন্দ অনুসারী অধিকাংশ আলেমদের মতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর বা রওজার নিয়তে সফর করতে হবে। এর বিরোধীতা করে সালাফী আলেমদের ঐক্যমত হল, না বরকত ও সোয়াবের আশা করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের উদ্দেশ্য করে সফর করা যাবে না। 

এ সম্পর্কে শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমীন (রহঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারতের নিয়তে সফর করার হুকুম কী?

উত্তরে তিনি বলেনঃ যে কোনো কবর যিয়ারতের নিয়তে সফর করা জায়েয নয়। কারন হাদিসে এসেছে, আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, মাসজিদুল হারাম, মাসজিদুর রাসূল এবং মাসজিদুল আকসা (বায়তুল মাক্দিস) তিনটি মাসজিদ ব্যতীত অন্য কোন মসজিদে (সালাতের) উদ্দেশে হাওদা বাঁধা যাবে না (অর্থাৎ সফর করা যাবে না)। (সহিহ বুখারী ১১৮৯ তাওহীদ প্রকাশনী)

এই হাদিসের উদ্দেশ্য হলো ইবাদাতের নিয়তে পৃথিবীর কোনো স্থানের দিকে সফর করা যাবে না। কারণ, এ তিনটি মসজিদের দিকেই ইবাদাতের নিয়তে সফর করা জায়েয। অন্য কোনো মসজিদের দিকে ভ্রমণ করা জায়েয নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাঁর মসজিদে ইবাদাতের নিয়তে সফর করতে হবে। মসজিদে পৌঁছে গেলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। তা শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য। মহিলাদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করা জায়েয নেই।

মন্তব্যঃ সহিহ বুখারির হাদিসে জানা যায় কবর যিয়ারতের মাধ্যমে বরকত লাভ ও নেকী লাভের আশায় সফর করতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। অপর পক্ষে আমরা জানি কবর যিয়ারত এইটি মুস্তাহাব আমল। এই হাদিস দুটির সমন্নয় কর আলেমগন মতামত প্রদান করছেন যে, কবর যিয়ারত সুন্নাহ সম্মত মুস্তাহাব আমল হলেও, এর জন্য সফর করা জায়েয নয়। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারত করার জন্য সফর করা যাবে না। কিন্তু যদি মসজিদে নবীকে উদ্দেশ্য করে সফল করি, তা হলে আমারা আর উক্ত হাদিসের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ব না। যেহেতু যদি মসজিদে নবীতে সালাতে অধিক ফজিলত বর্ণীত হয়েছে। যেমনঃ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মাসজিদুল হারাম ব্যতীত, অন্যান্য মসজিদে পড়া সালাতের তুলনায় আমার এ মসজিদে পড়া সালাত হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ। (ইবনে মাজাহ ১৪০৪)

তাই অধিক নেকীর আশায় আমরা মসজিদে নবীতে নিয়তে সফর কবর। যেহেতু আমাদের প্রান প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মসজিদের পাশেই আছেন। তাই এই একই সফলে তার কবর যিয়ারত করব। এই সময় করর যিয়ারত করা সুন্নাহ সম্মত আলম। 

কবর যিয়ারত হজ্জের সাথে সম্পৃক্ত না করা

আমাদের দেশ থেকে যারাই হজ্জ করতে যায়। তাদের জন্য মদীনা সফরের একটি ব্যবস্থা থাকে। সাধারণ হজ্জের কার্যাবলী শেষ করতে আট থেকে দশ দিন সময় লাগে। কিন্তু যাতায়াতগত বিভিন্ন সমস্যার কারনে হাজ্জিদের প্রায় ৪০-৪৫ দিন সৌদি আরবে অবস্থান করতে হয়। এই কারনে হাজ্জিদের মক্কা ও মদীনার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখান হয়। যা নিন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। এই ধারা বাহিকতায় প্রায় দশ দিন সকল হাজিদের মদীনা থাকার একটি ব্যবস্থা করা হয়। যার ফলে অনেক অজ্ঞ হাজীসাহেব বিশ্বাস করেন যে, মসজিদে নববী যিয়ারত করা হজ্জের একটি অংশ। তারা ভাবেন, মসজিদে নববী যিয়ারত না করলে হজ্জ আদায় হবে না। বরং কোন কোন জাহেল মানুষ যিয়ারতকে হজ্জের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন।

হজ্জ ও যিয়ারত দুটি পৃথক আমল। হজ্জ ইসলামের অন্যতম একটি রুকন। ইসলামি শরীয়তের ভিত্তিগুলোর অন্যতম একটি ভিত্তি হল হজ্জ। যার উপর হজ্জ করার ফরজ হয়েছে তিনি তা আদায় না করলে কবিরা গুনাহ হবে। মহান আল্লাহ নিকট এই জন্য তাকে জবাবদীহি করতে হবে। কিন্তু যিয়ারত করা একটি সুন্নাহ সম্মত মু্স্তাহাব আমল যার জন্য নিয়ত করে সফর করাও সঠিক কাজ নয়। যে আমলটি না করলে তাকে মহান আল্লাহ নিকট এই কোন জবাবদীহি করতে হবে না। ইচ্ছা করে পরিত্যাগ করলেও গুনাহ হবে না। কাজেই বলা যায়, হজ্জ ও মসজিদে নববী যিয়ারতের মাঝে কোন সম্পর্ক নেই। যিয়ারত ছাড়াই হজ্জ পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং হজ্জ ছাড়াও যিয়ারত পূর্ণ হয়ে যায়। আমাদের দেশের অনেকেরই সৌদি আবর গিয়ে যিয়ারতের সমর্থ নাই এবং বারবার সফর করা তাদের জন্য কষ্টকর। তাই আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ সময় ও সুযোগ থাকার কারনে হজ্জের সফরে যিয়ারত করে থাকে। এই কাজটি ভাল কিন্তু যিয়ারত কে হজ্জের সাথে সম্পৃক্ত করা ইসলামী শরীয়ত বিরোধী কাজ। ভেবে দেখেছেন কি! ফরজ নয় এমন একটি আমল কে ফরজের সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করা কতটা গুরুতর অন্যায়।

কিন্তু কেন আমরা হজ্জের সাথে যিয়ারত সম্পুক্ত করি?

উপমহাদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারি অধিকাংশ আলেম মনে করে থাকেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর যিয়ারত করা ওয়াজিব না হলেও ওয়াজিব কাছাকাছি একটি বিষয়। “আল মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ” নামক কিতাবে দেওবন্দ ঘরানার প্রখ্যাত আলেম মাওলান খলিল আহম্মদ সাহারানপুরী এক প্রশ্নের জবাবে লিখেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা শরীফ যিয়ারত আমরা ও আমাদের পূর্বসূরীগনের মতে আল্লাহ অধিক নৈকট্য লাভ, অতিশয় পূণ্য লাভ ও উন্নত স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মাধ্যম। বরং উম্মতের জন্য তা ওয়াজিব না হলেও তার কাছাকাছি একটি বিষয়। রওযা পাক যিয়ারতের উদেশ্যে যাত্রা ও এই উদ্যশ্যে ব্যয় করা সৌভাগ্যের বিষয়। কেউ কেউ রওজা পাক যিয়ারতের নিয়তের সাথে মসজিদে নবী ও তত্সংশ্লিষ্ট মুবারক জায়গা সমূহের নিয়ত করে তাতেও কোন আপত্তি নেই। (দেওবন্দী আহলে সুন্নাতের আকিদা,খলীল আহমদ সাহারনাপুরী, প্রকাশক আল হাবীব ফাউন্ডেশন)

ফাজায়েলে হজ্জ নামক গ্রন্থে শাইখুল হাদিস মোহাম্মাদ জাকারিয়া ছাহারানপুরী লিখেছেন, যেই ব্যক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও হুজুর (ছঃ) এর মাজার মোবারক আসিল না, সে নিজের নফসের উপর বড় জুলুম করিল। চার মাযহাবের ওলামায়ে কেরাম এই বিষয় এক মত যে, হুজুর (ছঃ) এর কবর যিয়ারতের এরাদা করা মুস্তহাব। কেহ কেহ ওয়াজিব ও লিখিয়াছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারত মু্স্তাহাব হওয়া সত্ত্বেও এত বাড়াবাড়ির কারন হল কিছু মিথ্যা, জাল ও যঈফ হাদিস। যারা করব যিয়ারতকে ওয়াজিবের কাছাকাছি উল্লেখ করেছেন তারা ঐ সকল মিথ্যা, জাল ও যঈফ হাদিসের আলোকেই বলেছন। হয়ত তাদের যুগে হাদিস সহিহ যঈফ নিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যার ফলে তারা হাদিসের মান উল্লেখ না করেই ফতোয়া দিয়েছে। (আল্লাহু আলাম)

আমার কথার প্রমান হিসাবে ফাজায়েলে হজ্জ যে সকল জাল হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে তার কয়েকটি তুলে ধরলাম।

১। হুজুর (ছঃ) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমার যিয়ারত করিল তাহার জন্য আমার সুপারিশ ওয়াজিব হইয়া গেল। (দারে কুতনী), ফাজায়েলে হজ্জ, প্রকাশনায় তাবলীগী কুতুর খানাপৃষ্ঠা নম্বর ১০৩)

২। হুজুর (ছঃ) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আমার যিয়ারত জন্য আসিল, ইহাতে তাহার অন্য কোন নিয়ত ছিলনা। তাহার জন্য সুপারিশ করা আমার উপর জরুরী হইয়া গেল। (ফাজায়েলে হজ্জ, প্রকাশনায় তাবলীগী কুতুর খানাপৃষ্ঠা নম্বর ১০৩)

হজ্জরত উমর (রাঃ) হইতে বর্নিত আছে, হুজুর আকরাম (ছঃ) এরশাদ করেন, আমার মৃত্যুর পর যে আমার যিয়ারত করিল, সে যেন জীবদ্দশায় আমার সহিত যিয়ারত করিল। (ফাজায়েলে হজ্জ পৃষ্ঠা নম্বর ১০৪)

মন্তব্যঃ এই হাদিসটির মান জাল। হাদিসটি শাইখ নাসির উদ্দিন আলবাণী তারার লিখিত, “যঈফ ও জাল হাদিস গ্রন্থের ৪৭ নম্বরে উল্লেখ করছেন।

হুজুর সাঃ এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হজ্জ করিল, অথচ আমরা জেয়ারত করিল না। সে আমার উপর জুলুম করিল। (ফাজায়েলে হজ্জ পৃষ্ঠা নম্বর ১০৫)

মন্তব্যঃ যদি এই হাদিসটি সাব্যস্ত হত তাহলে তাঁর কবর যিয়ারত করা সব ওয়াজিবগুলোর মধ্যে সর্বাধিক তাগিদপূর্ণ ওয়াজিব হত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে মিথ্যা হাদিস এবং দ্বীনের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক।

হুজুর (ছঃ) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মদীনা মোনাওয়ারায় আসিয়া ছওয়াবের নিয়তে আমরা যিয়ারত করিল, সে আমার প্রতিবেশী হইবে এবং কিয়ামতে দিন আমি তাহার জন্য সুপারিশ করিব। (ফাজায়েলে হজ্জ, পৃষ্ঠা নম্বর ১০৬)

মন্তব্যঃ এমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারত সম্পর্কিত বহু জাল, মিথ্যা ও যঈফ হাদিস জালিয়াতগন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামে বানিয়ে বানিয়ে প্রচার করছেন। আল্লাহ এমন মিথ্যাবাদীদের লাঞ্চিত করুক। এই সকল ভিত্তিহীন বানোয়াট হাদিসের উপর ভিত্তি করে বা বিশ্বাস করে অজ্ঞ মুসলিম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারত করে থাকেন। যা মুলত একটি মিথ্যা বিশ্বাস। আমাদের এমন মিথ্যা বিশ্বাস বা ভুল আকিদা থেকে দুরে থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারত করতে হবে।

কবরে তাওয়াফ করা এবং এর বিভিন্ন অংশ ষ্পর্শ করা চুমো খাওয়া

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি ভালবাসা আমাদের ইমানের অংশ। তার ভালবাসার জন্য বাড়াবাড়ি করে আমরা অনেক সময় বিদআত ও শির্ক কাজ করে থাকি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারত করার সময় কোন কোন কবরের চারদিকে তাওয়াফ করেন। কাবা ঘর ছাড়া অন্য কিছুর চারদিকে তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ বিদাত। অথচ অজ্ঞতার কারনে অনেক হাজি সাথের এই বিদআত লিপ্ত।

অনেক সময় দেখা যায় কেউ কেউ হুজরার গ্রিল ও দেয়ালগুলো স্পর্শ করেন। এমনকি কেউ কেউ তাদের ঠোঁট দিয়ে চুমো খান, দেয়ালের উপর নিজেদের গাল রাখেন। এমনকি কবরের গ্রিন ধরে কান্নাকাটি করে থাকেন। এই কাজগুলো শরীয়তের দৃষ্টিতে গর্হিত বিদাত। এই ধরনের বিদআতী কর্মকান্ডের কারনে মুমিন বান্দা আল্লাহর নিকটে আশার পরিবর্তে আল্লাহ্‌র থেকে আরও দূরে সরে যায়। কিছু কিছু যিয়ারতকারী মসজিদে নববীর মেহরাব, মিম্বর ও মসজিদের দেয়ালকে স্পর্শ করে। এগুলোও বিদআত।

কবরের সামনে নামাযের সুরতে দাঁড়ানো

যেভাবে মহান আল্লাহ ইবাদাত বন্দেগী করা হয়, সেভাবে সৃষ্টির জন্য কোন আমল করা জায়েয নয়। এই ধরুন যে ভাবে ডানহাত বামহাতের উপর রেখে বুকের উপরে কিংবা নীচে রেখে আমরা সালাততে দাড়াই ঠিক সেইভাবে কবরের সামনে দাঁড়ানো একটি হারাম কাজ। যেহেতু সালাতে দাঁড়ানোর এ পদ্ধতিটি ইবাদত যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন। তাই এই পদ্ধতি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা নাজায়েয।

সালাত আমরা যেখাবে মহান আল্লাহ সামনে মাথা নত করে তার খাটি বান্দা হিসাবে নিজে প্রমান করা চেষ্টা করি, ঠিক সেভাবে সৃষ্টির সামনে মাথা নত করা একটি শির্ক কাজ। তাই কবরের কাছে ঝুঁকে পড়া, সিজদা করা কিংবা এমন কিছু করা যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য করা জায়েয নয়। 

 আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “কোন মানুষের জন্য মানুষকে সিজদা করা সঙ্গত নয়। (মুসনাদে আহমাদ (৩/১৫৮), আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

কায়স ইবন সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হিরা শহরে আগমন করে সেখানকার লোকদেরকে মারযুবানকে সিজদা করতে দেখি। আমি (মনে মনে) বলি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই তো সিজদার অধিকতর হকদার। তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বলি, আমি হিরাতে গমন করে সেখানকার লোকদেরকে মারযুবানকে সিজদা করতে দেখেছি। আর হে আল্লাহ্‌র রাসুল! আপনিতো এর অধিক হকদার যে, আমরা আপনাকে সিজদা করি? তিনি বলেন, তুমি বল, যদি (আমার ইন্তেকালের পর) তুমি আমার কবরের পাশ দিয়ে গমন কর, তবে কি তুমি সেখানে সিজদা করবে? তিনি বলেন, আমি বললাম, না। তিনি বলেন, তোমরা সেরূপ করবে না। আর যদি আমি কাউকে সিজদা করতে বলতাম, তবে আমি স্ত্রীলোকদেরকে তাদের স্বামীদেরকে সিজদা করতে বলতাম। আর তা এইজন্য যে, আল্লাহ্ তা‘আলা তাদেরকে (স্বামীকে) তাদের (স্ত্রীদের) উপর হক প্রদান করেছেন। (সহিহ, তবে কবর সম্পর্কিত ব্যাকটি বাদে। সুনানে আবু দাউদ ২১৩৭ ইফাঃ)

কবরের নিকট এসে দোয়া করা

আমাদের একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার নিকটই দোয়া করতে হবে। তার কাছে চাইতে হবে। তিনিই সবাইকে সব ধরনের দুশ্চিন্তা ও পেরেশানিমুক্ত করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো। (সুরা মুমিন-৬০)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দোয়াই ইবাদত।  (তিরমিজি, হাদিস নং ৩৩৭২ ইফাঃ) 

দোয়া একটি স্বতন্ত্র ইবাদত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দোয়া আমাদের জন্য সবসময় উপকারী। দোয়া কোথায় কখন দোয়া করলে সহজে মহান আল্লাহ দোয়া কবুল করবেন তার কিছু উদাহরণ হাদিসে পাওয়া যায়। ইহা ছাড়া যে কোন সময় যে কোন স্থানে দোয়া করা যাবে।

কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় হল, কেউ কেউ এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, কবরের নিকটে দোয়া করলে কবুল হয়। এটি বিদআতীদের ধারনা মাত্র কারন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন হাদিসে এর প্রমান পাওয়া যায় না। আমাদের অনুসরণীয় সলফে সালেহীন সাহাবা (বাঃ), তাবেয়ী বা তাবে-তাবেয়ী কারো আমল দ্বারা প্রমানিত নয় যে তারা কবরের কাছে গিয়ে মহান আল্লাহ নিকট ফরিয়াদ করেছেন। তাই এই কাজ যদি কেউ ইসলামী শরীয়ত মনে করে করে থাকে তবে তা হারাম হবে। এই আমলটি করতে থাকলে এক সময় শির্কে পতিত হওয়ার আশংকা থাকে। তাই আমলটিকে শির্কে পতিত হওয়ার বাহন বলা যেতে পারে। যদি কবরের কাছে দোয়া করা কিংবা নবীজির কবরের কাছে দোয়া করা উত্তম হত, সঠিক হত কিংবা আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় হত তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সেটা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে যেতেন। কেননা যা কিছু উম্মতকে জান্নাতের নৈকট্য হাছিল করিয়ে দিবে এমন কোন কিছু বর্ণনা করা থেকে তিনি বাদ দেননি। যখন তিনি এক্ষেত্রে উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেননি এর থেকে জানা গেল যে, এটি শরিয়তসিদ্ধ নয়। হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ।

মন্তব্যঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের নিকটি দোয়া করার কোন দলিল নাই। যদি কেউ মনে করে তার দোয়া রসূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুনছেন আর আল্লাহ নিকট সুপারিশ করছেন। তবে তিনি শির্কে পতিত হবেন, কারন বারযাকী হায়াতে জীবত, আমাদের মত দুনিয়ার হায়াতে জীবত নয়। তাকে আল্লাহ যা শুনার তৌফিক দেন, তিনি শুধু তাই শুনে থাকেন। অপর পক্ষে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর জন্য দোয়া করতে হলে, তার কবরের নিকট থাকতে তাড়াতাড়ি কবুল হবে, এমনটি ভাবাও সঠিক নয়। আর তার নিকট দুরুদ ও সালাম পৌছানোর জন্যতো মহান আল্লাহ ফিরিস্থা নিযুক্ত করে রেখেছেন।  যেমন হাদিসে এসেছেঃ

আব্দুল্লাহ রা: হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে পৃথিবীতে বিচরণকারী কিছু ফেরেশতা নিয়োগ করা হয়েছে, যারা (পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে) আমার উম্মতের প্রেরিত সালাম আমার নিকট পৌঁছে দেয়। (সুনানে নাসায়ী ১২৮২)

আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যখনই যে কেউ আমাকে সালাম করে তখনই আল্লাহ আমার রূহকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেন, যেন আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি। (মিসকাতুল মাসাবিহ ৯২৫ ও আবূ দাউদ, আস-সুনান ২/২১৮)।

কাজেই উপরে বর্ণিত সুন্নাহ সম্মতভাবে এর কবর যিয়ারত করি। 

কবরে সালাম পৌছাতে বলা

যারা মদিনা যিয়ারতে আসতে পারেনি তারা কোন কোন যিয়ারতকারীর মাধ্যমে রাসূলের কাছে সালাম প্রেরণ করে থাকেন এবং যিয়ারতকারীগণ এ সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরে পৌছে দেন। এটি বিদাতী কর্ম ও নব উদ্ভাবিত কর্ম। যে সকল বিদআতী মনে করে থাকেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরে আমাদের মত দুনায়াবী জীবনের মত জীবন যাপন করছেন। তার কবরের নিকট গিয়ে সালাম দিলে তিনি নিজ কানে শুনেন ও উত্তর দেন। তারা এই বিদআতী কাজটি করে থাকেন। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশের পীর দাবিদার যারা তারাই এই ভুল বিশ্বাসের স্বীকার। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গিয়েছেন, তিনি তার কবরে বারযাকী হায়াতে জীবিত আছেন। কাজেই তার কবরে কোন মানুষের মাধ্যমে সালাম পাঠাতে হবে না, সালাম ও দুরুদ পাঠোন জন্য মহান আল্লাহ তার ফিরিস্তা নিযুক্ত করে রেখেছেন। যেমনঃ

আব্দুল্লাহ রা: হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে পৃথিবীতে বিচরণকারী কিছু ফেরেশতা নিয়োগ করা হয়েছে, যারা (পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে) আমার উম্মতের প্রেরিত সালাম আমার নিকট পৌঁছে দেয়। (সুনানে নাসায়ী ১২৮২)

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কেউ আমার ওপর সালাম পাঠ করলে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার কাছে আমার রূহ ফেরত দেন যাতে আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি। (আবূ দাঊদ ২০৪১, মিসকাতুল মাসবিহ ৯২৫)

মন্তব্যঃ মহান আল্লাহ ও তার রাসূলু সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথা মত সালাম না পৌছে বিদআতী পন্থায় সালাম পৌছানোর চেষ্টা কত টুকু ফলদায়ক। তাই এই সালাম পাঠানোর মত বিদআতি কর্ম ত্যাগ করতে হবে।  

প্রত্যেক ফরয নামাযের পর যিয়ারত করা

অনেক মুসলিম আছে যারা হয়ত তার জীবনে একবারই মদীনা যাওয়ার সুযোগ পাবে। তাও আবার দশ বার দিনের মত। আর যারা হজ্জের সুবাদে মদীনা যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে তারাও প্রায় দশ বার দিনের মত সময় পায়। এই অল্প সময় অনেক বেশী আমল করার চেষ্টা করে থাকে। তাই তারা বারবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর  কবর যিয়ারত করা। যেমনঃ প্রত্যেক ফরয নামাযের পর যিয়ারত করা কিংবা প্রতিদিন নির্দিষ্ট নামাযের শেষে যিয়ারত করা। এই কাজটি বিদআত। তাই প্রতিদিন প্রতি ফরজ সালাতের পর বারবার যিয়ারত না করে।  এই অল্প সময়ে হাতেগুনে কয়েক বার জিয়ারত করা যেতে পারে। 

কবরের দিকে মুখ করে কাবার দিকে পিছন রেখে দোয়া করা

আমাদের দেশের অনেক মাজার পন্থী আছে যারা তাদের পীরের কবর যিয়ারতের পর কবরকে সামনে রাখার জন্য উল্টা পায়ে হেটে মাজার থেকে বাহির হয়। অর্থৎ কবরকে সামনে রেখে পিছনে ছলে আসে। কবরের দিকে পিছন দেয়াকে তারা কবরবাসীল সাথে বেয়াবদী হবে মনে করে থাকেন। ঠিক তেমনী ভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের কাছে গিয়ে তারা এই কাজটিই করে থাকে। যা একটি বিদআতী কাজ।

সাধারন জনগন নয় কিছু হক্কানী আলেম দবিবাদ তারা একটি বিদআতি কাজ করে। দোয়া করা সময় তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর সামনে রাখে আর মহার আল্লাহ ঘর কাবা কে পিছনে রাখে। আগেই জানতে পেরেছি, কবরকে সামনে রেখে দোয়া করা সঠিক আমল নয়। তাই যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর সামনে রেখে দোয়া করার চেষ্টা করে সৌদি পুলিস তাকে কবরের সামনে থেকে তাড়িয়ে দেন। তাড়া খেয়ে কবরের সামনে থেকে চলে এসে তারা একটু দুরে দাড়িয়ে ঠিক কবরের দিকে মুখ করে কাবাকে পিছনে ফেলে দোয়া করা। এই কাজটি করা ঠিক নয়। দোয়া যদি করতে হয় তবে প্রথমত কবর থেকে একটু দুরে গিয়ে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা উচিত।

এমনিভাবে মসজিদের যে কোন স্থান থেকে দোয়া করার সময় কবরের অভিমুখি হওয়া কিংবা যখনি মসজিদে প্রবেশ করবে তখনি কবরের দিকে মুখ করা কিংবা যখনি নামায শেষ করবে তখনি কবরের দিকে মুখ করা। এই সকল কাজ বিদআতের পর্যায় ভুক্ত। কারন এ্রর কোন দলিল ইসলামি শরীয়তে নাই। অনেকে আছেন যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর সামনে সালাম দেয়ার সময় দুইহাত দুইপাশে রেখে মাথা ও থুতনি নোয়ানো। তাও ইসলামি শরীয়তে বিদাত বা ভুল আমল। আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহকে ভয় করুন। সকল বিদাত থেকে সাবধান হোন। কুপ্রবৃত্তি ও অন্ধ অনুকরণ পরিহার করুন। দলিলঃ-প্রমাণের ভিত্তিতে আমল করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যে ব্যক্তি তার রব প্রেরিত সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত, সে কি তার ন্যায় যার কাছে নিজের মন্দ কাজগুলো শোভন করে দেয়া হয়েছে এবং যারা নিজ খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেছে? (সূরা মুহাম্মদ  আয়াত: ১৪]

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি তিনি যেন আমাদেরকে রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী অন্যদেরকে পথ দেখাবার তাওফিক দেন।

 নিজের মনে আশা পূরনের জন্য কবর যিয়ারত করা

আমাদের উপমহাদেশ থেকে অনেক হাজিগণ শুধু অজ্ঞতার কারনে নিজের মনে আশা পূরনের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবর যিয়ারত করতে যান। তাদের ধারন রাসূল তাদের ফরিয়াদ শুনে তাদের মনের আশা পূরণ করে থাকেন। তাই তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকটি বিপদমুক্তির জন্য সাহায্য প্রার্থনা করেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের অসুস্থ লোককে সুস্থ করে দিন। হে আল্লাহর রাসূল, আমার ঋণ পরিশোধ করে দিন। হে আল্লাহর রাসূল, আমি আজ আপনার মেহমান আমরা প্রয়োজন পূরন করে দিন, আমার পাথেয় নাই আমরা পাথেয়র ব্যবস্থা করে দিন ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সকল ফরিয়াদগুলো মহান আল্লাহ ব্যতিত কারো নিকট করা শির্কি কাজ কারন, তিনি ব্যতিত কেউ প্রয়োজন পূরন করার ক্ষমতা রাখে না। এই সকল বাক্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ফরিয়াদ করা বা প্রার্থনা করা একটি শির্কি কাজ। যা একজন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বাহির করে দেয়। মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

﴿ وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَۖ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ ١٠٦ ﴾ 

অর্থঃ আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কোন সত্তাকে ডেকো না, যে তোমার না কোন উপকার করতে না ক্ষতি করতে পারে৷ যদি তুমি এমনিটি করো তাহলে জালেমদের দলভুক্ত হবে৷ (সুরা ইউনুস ১০৬)

অন্যত্র আয়াতে বলা হয়েছে:

﴿وَٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ مَا يَمۡلِكُونَ مِن قِطۡمِيرٍ ١٣ ﴾

অর্থঃ আল্লাহকে বাদ দিয়ে যারা অন্যের কাছে চায়, তারা তো খেজুরের বিচির উপরের পাতলা আবরণেরও মালিক নয়। (ফাতির ১৩-১৪)

অন্যত্র আয়াতে বলা হয়েছেঃ

 وَمَنۡ أَضَلُّ مِمَّن يَدۡعُواْ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَن لَّا يَسۡتَجِيبُ لَهُ ۥۤ إِلَىٰ يَوۡمِ ٱلۡقِيَـٰمَةِ وَهُمۡ عَن دُعَآٮِٕهِمۡ غَـٰفِلُونَ (٥) وَإِذَا حُشِرَ ٱلنَّاسُ كَانُواْ لَهُمۡ أَعۡدَآءً۬ وَكَانُواْ بِعِبَادَتِہِمۡ كَـٰفِرِينَ (٦)

অর্থ: সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশী পথভ্রষ্ট কে যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব সত্তাকে ডাকে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে সক্ষম নয়৷ এমনকি আহবানকারী যে তাকে আহবান করছে সে বিষয়েও সে অজ্ঞ৷ যখন সমস্ত মানুষকে সমবেত করা হবে তখন তারা নিজেদের আহবানকারীর দুশমন হয়ে যাবে এবং ইবাদতকারীদের অস্বীকার করবে৷ (সুরা আহকাফ ৪৭: ৫-৬)

সুতরাং সবকিছু দেওয়ার একচ্ছত্র মালিকই হচ্ছেন মহান আল্লাহ। তাকে বাদ দিয়ে অন্যের কাছে চাওয়া মূলত অহেতুক তার নির্ধারিত অধিকারে অন্যকে অংশীদার বানান। এমনকি কোনো নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ও চাওয়া শির্ক। বর্ণিত হয়েছে,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে একজন মুনাফিক মুমিনদেরকে কষ্ট দিত। কেউ কেউ বললেন, চলুন আমরা রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাছে এই মুনাফিক হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই ধরণের  মুক্তি আমার থেকে চাওয়া উচিত নয়, বরং তা আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। (সহিহ বুখারি)

ঠিক তেমনিভাবে, দোয়ার জন্য কোন সৃষ্টিজীবকে মাধ্যম করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেনঃ

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ‌ۖ أُجِيبُ دَعۡوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ‌ۖ فَلۡيَسۡتَجِيبُواْ لِى وَلۡيُؤۡمِنُواْ بِى لَعَلَّهُمۡ يَرۡشُدُونَ (١٨٦)

অর্থঃ আর হে নবী! আমার বান্দা যদি তোমার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই আছি ৷ যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই, কাজেই তাদের আমার আহবানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা উচিত একথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে ৷ (বাকারা ২:১৮৬)

আল্লাহ্‌ তাআলা আমাদের এতো কাছে অবস্থান করর যে, কোন প্রকার মাধ্যমে ও সুপারিশ ছাড়াই  নিজেই সরাসরি সবসময় আমাদের আবেদন নিবেদন শুনেন। কাজেই আমাদের উচিৎ মুর্খতার বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলা। আল্লাহ্‌ তাআলার আহবানে সাড়া দিয়ে তার দিকে ফিরে যেতে হবে এবং তারই বন্দেগী ও আনুগত্য করতে হবে। সরাসরি সবসময় তারই নিকট চাইব কেননা কোনো কিছু চাওয়ার নিয়ম তো আল্লাহ্‌ তাআলাই ভাল জানেন। যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছে:

﴿ وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ  ٦٠ ﴾ 

অর্থঃ এবং তোমাদের রব বলেছেন আমার কাছে চাও, আমিই দিব। (সুরা মুমিন আয়াত ৬০)

সুতরাং বান্দা তার রবের কাছেই চাইবে। অন্য কারো অছিলায় চাওয়া মুলত আল্লাহর একচ্ছত্র অধিকার কে খর্ব করে। তেমনি অন্যকেও এ কাজে জড়িয়ে ফেলা হয়, সে জন্য এটি শির্কেই নামান্তর।

মন্বব্যঃ আমাদের উচিত আমাদের আশা, আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা, ফরিয়াদ, প্রার্থনা, ফরিদায়সহ সকল বিষয় মহান স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করা। কারন এক মাত্র মহান আল্লাহই পারেন আমাদের ঐ সকল প্রয়োজন পুরনের নিশ্চয়াতা দিতে। তাই আমাদের কর্তব্য হলোঃ আমাদের রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রেখে যাওয়া দ্বীনের একান্ত অনুসরণ করে মহান আল্লাহ সন্ত্বষ্টি অর্জন করা।

মদীনায় প্রবেশের পূর্বে গোসল করা

হজ্জের নিয়তে মক্কার প্রবেশের আগে গোসল করা একটি মুস্তাহাব আমল। সহিহ  হাদিসের দ্বারা প্রমানিত যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার প্রবেশের আগে গোসল করছেন। সময় সুযোগ না থাকলে মক্কা প্রবেশের আগেই গোসল করা জরুরী নয়। কিন্তু কোন হাদিসেই মদিনা প্রবেশের আগে গোসল করার কথা উল্লেখ নাই। মক্কার প্রবেশের উপর কিয়াস করে মদিয়া প্রবেশের গোসর করলে বিদআত হবে। কেননা, সময় সুযোগ থাকা সত্বেও আমাদের সালাফগন এই ধরনের আমর করেন নাই।

মক্কা প্রবেশের আগের গোসলের দলিলঃ

নাফি (রহঃ) থেকে বর্ণিত। ইবনু উমর (রাঃ) যু-তুওয়ায় ভোর পর্যন্ত রাত যাপন না করে মক্কায় উপনীত হতেন না। তিনি (সেখানে) গোসল করতেন, তারপর দিনের বেলায় মক্কায় প্রবেশ করতেন এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাই করতেন বলে তিনি বলেছেন। (সহিহ মুসলিম ২৯১৫ ইফাঃ)

মদিনা প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া পড়া

মদীনায় প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয় নাই। দোয়া এমন একটি ইবাদাত যা সময় ও স্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। যে কোন স্থান এবং যে কোন  সময় দোয়া করা যায়। এমনটি হাটতে হাটতে, শুয়ে বসেও দোয়া করা যায়। সহিহ হাদিসের কিছু স্থান ও কিছু সময় কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া কবুলের জন্য খাস বলে উল্লেখ করেছেন। যেমনঃ স্থান হিসাবে সাফা মারওয়ার পাহার, আরাফাতের ময়দান, মিনা, মুজদালিফা ইত্যাদি। আবার সময হিসাবে রাতের শেষভাগে, শুক্রবারের বিষেশ সময়, লাইলাতুল কদরে, আরাফার দিন ইত্যাদি। হাদিসে বর্ণিত স্থান ও সময়ের বাহিরে কোন স্থান ও সময় নির্দিষ্ট করা বিদআত। অনুরুপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্থানে যে দোয়া করতে বলেছেন, তার বাহিরে কোন দোয়া বানিয়ে নির্দিষ্ট করে বিশেষ নেকীর আশায় দোয়া করাও বিদআত। এই হিসাবে আপনি মদিনা প্রবেশের আগে দোয়া করতে পারেন আবার নাও পারেন, আপনার ইচ্ছা। তবে যখনই মদিনা প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্ত করে পাঠ করা জরুরী মনে করবেন তখনই বিদাআত হবে। কাজেই মদিনা প্রবেশের সময় দোয়া করা বিদআত নয়। আপনার নিয়ত ও পদ্ধতির কারনে বিদআত হবে। কাজেই কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত যে কোন দোয়া পড়তে পড়তে মদিনা প্রবেশ করেত কোন বাধা নাই।

মসজদি প্রবেশ করে সালাতের আগেই কবর যিয়ারত করা

পৃথিবীর যে কোন মসজিদে প্রবেশ করেই দুই রাকাত সালাত আদায় করা জরুরী। জুমার খুতবার সময় কোন প্রকার নফল আমল করাও নিষেধ, কিন্তু তখনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায় না করে মসজিদে বসতে নিষেধ করেছেন। কাজেই সালাত আদায় না করে সমজিদে বসতে অনেক ফকিহ নিষেধ করেছেন।

দলিলঃ

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুমা’আর দিন মিম্বারে উপবিষ্ট থাকা অবস্থায় সুলায়ক আল গাত্বাফানী মাসজিদে এসে (তাহিয়্যাতুল মাসজিদ) সলাত আদায় করার আগেই বসে পড়ল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বলেন, তুমি কি দু’ রাক‘আত সলাত আদায় করেছো? সে বলল, না। তিনি বলেন, তুমি উঠে দু’ রাক‘আত সলাত আদায় কর। (সহিহ মুসলিম ১৯০৮)

মসজিদে নব্বীতে প্রবেশ করেই প্রথম তাহিয়্যাতুল মাসজিদের জন্য কমপক্ষে দুই রাকাত সলাত আদায় বসবেন। কিন্তু অনেকে আবেগ দেখিয়ে, মসজিদে নব্বীতে প্রবেশ করে কোন সালাত আদায়ের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারত করতে চলে যায়।

এইভাবে সালাত আদায়ে পূর্বেই কবর যিয়ারত করা সুন্নাহ বিরোধী কাজ হবে। তাই সকলের উচিত হবে। ধীর স্থীরভাবে মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমে সালাত আদায় করতে হবে। তারপর ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের করব যিয়ারত করা।

কবরকে সামনে রেখে সালাতের মত দাড়ান

সালাত আদায়ের কিছু নিয়ম পদ্ধতি আছে। তারমধ্যে অন্যতম হলো, তাকবিরে তাহরিমা বলে হাত বাঁধা। আমরা সালাতে হাত বেধে মহান আল্লাহ সমানে দাড়িয়ে যাই। হাত বাধার অন্যতাম শর্ত হলো, ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা। কিন্তু অনেক মুসলিম ভাই কবর যিয়ারতে সময়, কবর কে সামানে রেখে,  একেবারে হুবহু সালাতের মত দাড়িয়ে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখে। যা মুলত একটি সুন্নাহ বিরোধী কাজ। সালাতের মত না করে যে কোন পদ্ধতি অনুসরন করে দোয়া কালাম পড়া যায়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  দ্বিতীয় কিস্তি

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  দ্বিতীয় কিস্তি

মুহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াসিলা দিয়ে দুয়া করা

দোয়া করার ক্ষেত্রে ওয়াসিলা গ্রহন করা কখনও জায়েয আবার কখনও নাজায়েয। সহিহ হাদিসে দোয়ার জন্য ওয়াসিলা গ্রহনের নজির আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াসিলা দিয়ে দুয়া করা যাবে কি না, এ সম্পর্কে কিছু মতভেদ আছে তবে সঠিক কথা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াসিলা দিয়ে দুয়া করা যাবে না।

বিষয়টি একটু ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কেননা আমাদের ওয়াসিলা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারনে ভুল করে থাকি। আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসীলা দিয়ে দুয়া করা যাবে কি না?

ওয়াসিলা একটি আরবি শব্দ যার আবিধানিক অর্থ হলো, উপায়, উপকরণ, ব্যবস্থা ও মাধ্যম যার দ্বারা কাংখিত লক্ষে পৌছা যায়। ওয়াসিলা শব্দটি নৈকট্য, সান্নিধ্য, ঘনিষ্টতা, সম্মান পজিশন ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তবে আমাদের সমাজে প্রচলিত ওয়াসিলা বলতে বুঝান হয়, এমন মাধ্যম বা পন্থা বা পথ বা ব্যক্তি যার মাধ্যমে কাংখিত লক্ষে পৌছা যায়। কুরআন দুটি স্থানে মহান আল্লাহ ওয়াসিলা শব্দটি ব্যবহার করছেন। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُواْ اللّهَ وَابْتَغُواْ إِلَيهِ الْوَسِيلَةَ وَجَاهِدُواْ فِي سَبِيلِهِ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

অর্থঃ হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য অন্বেষন কর এবং তাঁর পথে জেহাদ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সুরা মায়েদা ৫:৩৫)

 মহান আল্লাহ বলেন,

أُولَـئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا

অর্থঃ যাদেরকে তারা আহবান করে, তারা নিজেরাই তো তাদের পালনকর্তার নৈকট্য লাভের জন্য পথ তালাশ করে যে, তাদের মধ্যে কে নৈকট্যশীল। তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয় আপনার পালনকর্তার শাস্তি ভয়াবহ। (সুরা বনী-ইসরাঈল ১৭:৫৭)

মন্তব্যঃ এই দুটি আয়াত দ্বারা ওয়াসিলা শব্দটি নৈকট্য, সান্নিধ্য, ঘনিষ্টতা, সম্মান পজিশন ইত্যাদি অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে এখানে মাধ্যম হিসাবে নেয়া যায় না।

আমাদের সমাজে ওয়াসিলার প্রচলিত অর্থ হলো মাধ্যম ধরা। পার্থিক কোন কাজ সম্মত হওয়া জন্য যেমন একজন কে ওয়াসিলা বা মাধ্যম ধরে কাজটি করে নেয়া হয়। এই অর্থে দোয়ার জন্য আল্লাহ বা বন্দার মাধ্যে মাধ্যম ঠিক করা শির্ক কাজ। মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ

অর্থঃ তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। (সুরা মু’মিন ৪০:৬০)

আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে মাধ্যম সাবস্থ্য না করে যদি নেক আলম, ঈমান বা আল্লাহ নাম ও তার গুনাবলীকে দোয়া কবুলের ওয়াসিলা হিসাবে গ্রহন কর  হয় তবে তা জায়েয হবে।

ক। আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ঈমান আনার ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করা

খ। নেক আমলের ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করা

গ। আল্লাহ নাম ও তার গুনাবলী ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করা

ঘ। নিজের অসহায় অবস্থার ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করা

ঙ। জীবিত লোকদের নিকট দোয়া চাওয়া

ক। আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ঈমান আনার ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করাঃ

আমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সর্বশেষ রাসূল ও নবী হিসাবে ঈমান এনেছি এর অসীলা দীয়া দোয়া করা যাবে। মহান আল্লাহ তাআলা ঈমানের উসীলা দিয়ে দোয়া করার নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন,

﴿إِنَّ فِي خَلۡقِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَٱخۡتِلَٰفِ ٱلَّيۡلِ وَٱلنَّهَارِ لَأٓيَٰتٖ لِّأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ ١٩٠ ٱلَّذِينَ يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ قِيَٰمٗا وَقُعُودٗا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمۡ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلۡقِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ رَبَّنَا مَا خَلَقۡتَ هَٰذَا بَٰطِلٗا سُبۡحَٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ ٱلنَّارِ ١٩١ رَبَّنَآ إِنَّكَ مَن تُدۡخِلِ ٱلنَّارَ فَقَدۡ أَخۡزَيۡتَهُۥۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ ١٩٢ رَّبَّنَآ إِنَّنَا سَمِعۡنَا مُنَادِيٗا يُنَادِي لِلۡإِيمَٰنِ أَنۡ ءَامِنُواْ بِرَبِّكُمۡ فَ‍َٔامَنَّاۚ رَبَّنَا فَٱغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرۡ عَنَّا سَيِّ‍َٔاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ ٱلۡأَبۡرَارِ ١٩٣﴾

অর্থঃ “নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্যে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা-গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে (তারা বলে) হে আমাদের প্রতিপালক! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করোনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদেরকে তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। হে আমাদের রব! নিশ্চয় তুমি যাকে জাহান্নমে নিক্ষেপ করলে তাকে অপমানিত করলে, আর যালেমদের জন্যে তো কোনো সাহায্যকারী নেই। হে আমাদের রব! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের প্রতি আহ্বান করতে যে, তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আন, তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! অতঃপর আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা কর এবং আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি দূর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে।” (সুরা ইমরান ৩:১৯০-১৯৩)

খ। নেক আমলের ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করাঃ

দোয়ার ক্ষেত্রে ওয়াসিলা কে দোয়া কবুলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। সাধারণত কিছু আমল করার পরই দোয়া করে থাকি। দোয়ার পূর্বে আমল না করলেও অন্তত কিছু সময় দুরুদ ও কুরআন তিলওয়াত করে থাকি। অতপর দোয়া শুরু করার পর আমরা এই সকল নেক আমলের ওয়াসিলা দিয়ে দোয়া করি। এইভাবে নেক আমলের ওয়াসিলা দ্বারা দোয়া করা সুন্নাহ সম্মত আমল।

গ। আল্লাহ নাম ও তার গুনাবলী ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করাঃ

নেক আমলের পাশাপাশি আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর ওয়াসিলা দিয়ে দোয়া করা যাবে। আবূ বাকর সিদ্দীক (রাযি.) হতে বর্ণিত। একদা তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট আরয করলেন, আমাকে সালাতে পাঠ করার জন্য একটি দু‘আ শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, এ দু‘আটি বলবে-

 اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّك أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

‘‘হে আল্লাহ্! আমি নিজের উপর অধিক জুলুম করেছি। আপনি ছাড়া সে অপরাধ ক্ষমা করার আর কেউ নেই। আপনার পক্ষ হতে আমাকে তা ক্ষমা করে দিন এবং আমার উপর রহমত বর্ষণ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।’’ (সহিহ বুখারী ৭৯৫ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ এখানে আল্লাহর দু’টি নাম, ‘গাফূর’ এবং ‘রাহীম’ এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত কামনা করা হয়েছে। এমনিভাবে আল্লাহর নামের পাশাপাশি তার গুণাবলীর মাধ্যমে উসীলা গ্রহণ করা যাবে।

ঘ। নিজের অসহায় অবস্থার ওয়াসিলা দিয়া দোয়া করাঃ

নিজের অবস্থা আল্লাহর কাছে তুলে ধরে তার ওয়াসিলা দিয়ে দোয়া করা যায়। অর্থাৎ দোয়াকারী যে অবস্থায় রয়েছে, তা আল্লাহর কাছে তুলে ধরবে। যেমন, মূসা আলাইহিস সালাম বলেছিলেন,

﴿رَبِّ إِنِّي لِمَآ أَنزَلۡتَ إِلَيَّ مِنۡ خَيۡرٖ فَقِيرٞ﴾

অর্থঃ হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী। (সূরা কাসাস ২৪)

যাকারিয়া আলাইহিস সালাম নিজের দুর্বলতাকে তুলে ধরে উসীলা দিয়েছেন। আল্লাহ তার কথা উল্লেখ করে  বলেন,

﴿قَالَ رَبِّ إِنِّي وَهَنَ ٱلۡعَظۡمُ مِنِّي وَٱشۡتَعَلَ ٱلرَّأۡسُ شَيۡبٗا وَلَمۡ أَكُنۢ بِدُعَآئِكَ رَبِّ شَقِيّٗا ٤﴾

অর্থঃ তিনি বললেন, হে আমার রব! আমার অস্থি বয়স-ভারাবনত হয়েছে, বার্ধক্যে মস্তক সুশুভ্র হয়েছে, হে আমার রব আপনাকে ডেকে আমি কখনো বিফল মনোরথ হইনি।” (সূরা মারইয়াম ৪)

ঙ। জীবিত লোকদের নিকট দোয়া চাওয়াঃ

জীবিত সৎকর্মশীলদের ওয়াসিলার দ্বারা দোয়া করা যাবে। সাহাবীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দোয়া চাইতেন।

দলিলঃ

১. আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহ্‌র রসূল! পশুগুলো মারা যাচ্ছে, এবং রাস্তাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আপনি আল্লাহ্‌র নিকট দু‘আ করুন। তখন আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু‘আ করলেন। ফলে সে জুমু‘আ হতে পরবর্তী জুমু‘আ পর্যন্ত তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকল। অতঃপর এক ব্যক্তি আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহ্‌র রসূল! ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়েছে, রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং পশুগুলোও মরে যাচ্ছে। আল্লাহ্‌র রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেনঃ হে আল্লাহ্! পাহাড়ের চূড়ায়, টিলায়, উপত্যকায় এবং বনভূমিতে বৃষ্টি বর্ষণকরুন। অতঃপর মদীনার আকাশ হতে মেঘ সরে গেল, যেমন কাপড় ছিঁড়ে ফাঁক হয়ে যায়। (সহিহ বুখারি  ১০১৭)

২. ইমরান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মাতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, তারা কারা, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম? তিনি বললেনঃ যারা ক্ষতস্থানে লোহা পুড়ে লাগায় না এবং (জাহিলী যুগের ন্যায়) ঝাড়ফুঁক বা মন্ত্রের দ্বারা চিকিৎসা কামনা করে না বরং তারা আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করে। এ সময় ‘উক্কাশাহ্‌ (রাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর আর এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর নাবী! আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, তিনি আমাকেও যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। উত্তরে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘উক্কাশাহ্ তোমার আগেই সে দলভুক্ত হয়ে গেছে। (সহিহ মুসলিম  ৪১২)

মন্তব্যঃ এই সকল সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায় কোন বিষয়ে ভালো নেকাআর মুসলিমের নিকটি দোয়া চাওয়া যায়। এই জীবিত লোকদের নিকট দোয়া চাওয়া ও কবুলের আশা করা যায়। কাজেউ জীবিত লোকদের ওয়াসিলা গ্রহন করা যায়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াসিলা কেন অবৈধঃ

উপরের আলোচনায় দেখলাম শরীয়ত সম্মত ওয়াসিলা জায়েয। কিন্তু ইহার বাহিরে ও নাজায়েয ওয়াসিলা  আছে। যেমনঃ মৃত ব্যক্তির কাছে দোয়া চাওয়ার মাধ্যমে উসীলা গ্রহণ করা। মানুষ মৃত্যু বরণের সাথে সাথে তার আমর বন্ধ হয়ে যায়। সে আর জীবিত লোক কোন উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখেনা না। জীবিতেদের জন্য তাদের কোন সুপারিস গ্রহন করা হয় না। তারা বারজাকি জীবনের সাথে পার্থিব জীবন সম্পর্কহীন হয়ে যায়। সুতারং মৃত ব্যক্তির নিকট চাওয়া বা তার সাহায্য কামন করা শির্ক কাজ। তার সুপারিশে দোয়া কবুলের আশা করাও শির্ক কাজ।

যদি আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরের নিকট গিয়ে তার উপর দুরুদ পড়ি, তাকে সালাম দেই, তাই জন্য মহান আল্লাহর নিকট দোয়া চাই। এই সবই শরীয়ত সম্মত আমল। কিন্তু যদি তার কবরের নিকট গিয়ে তার সাহায্য চাই, তার ওয়াসিলা দ্বারা দোয়া কবুলের জন্য সুপারিশ চাই তবে জায়েয হবে না। কেননা, সাহাবিগন তার জীবন দসায় তার নিকট দোয়া চাইলেও তার মৃত্যুর পর তার কবরের পাশে বসে অন্য সাহাবিদের দ্বারা দোয়া করালেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  ওয়াসিলা দ্বারা দোয়া করেন নাই।

দলিলঃ

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) অনাবৃষ্টির সময় ‘আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওয়াসীলাহ দিয়ে বৃষ্টির জন্য দু’আ করতেন এবং বলতেন, হে আল্লাহ! (আগে) আমরা আমাদের নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওয়াসীলাহ দিয়ে দু’আ করতাম এবং আপনি বৃষ্টি দান করতেন। এখন আমরা আমাদের নাবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাচার ওয়াসীলাহ দিয়ে দু’আ করছি , আপনি আমাদে্রকে বৃষ্টি দান করুন। এর ফলে বৃষ্টি বর্ষিত হত। এর ফলে বৃষ্টি বর্ষণ হতো। (সহিহ বুখারি  ১০১০ , ২৭১০)

মন্তব্যঃ কাজেই মৃত্যু ব্যক্তির ওয়াসিলা দ্বারা দোয়া করা বিবেক এবং শরী‘আত সম্মত নয়।  কেননা মানুষ যখন মারা যায়, তার আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষে কারও জন্য দোয়া করা সম্ভব নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষেও মারা যাওয়ার পর কারও জন্য দোয়া করা সম্ভব নয়। তাই সাহাবীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তাঁর কাছে এসে দোয়া চান নি। অনুরূপভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানের উসীলা দেওয়াও জায়েয নেই। কারণ, আল্লাহর কাছে তাঁর সম্মান থাকা দোয়া জন্য কোনো উপকারে আসবে না। দোয়াকারীর জন্য এমন বিষয়ের উসীলা দেওয়া উচিৎ, যা তার কাজে আসবে। সুতরাং এভাবে বলা উচিৎ যে, হে আল্লাহ! আপনার প্রতি এবং আপনার রাসূলের প্রতি আমার ঈমান আনয়নের বিনিময়ে আমাকে ক্ষমা করুন। এ জাতীয় অন্যান্য শরী‘আত সম্মত বিষয়ের উসীলা দেওয়া বৈধ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সুপারিশ চাওয়া

আমাদের সব কিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই সৃষ্টির নিকট কোন কিছু চাওয়া হলো শির্ক কাজ। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রদান করবেন। এর মান এই নয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকে ইচ্ছা তাকে সুপারিশ করতে পারবেন। মনে রাখতে হবে সুপারিশ কাকে করতে হবে, কে করবে, তা নির্ধারণের একমাত্র মালিক আল্লাহ। মহান আল্লাহ তায়ালাই হল শাফাআতের একমাত্র মালিক। তিনিই একচ্ছন্ন শাফাআতের অধিকারি। তিনি ছাড়া কঠিন হাসরের ময়দানে কেউ শাফাআত করতে পারবেন না। সর্বপ্রকার শাফাআতের চাবিকাঠি একমাত্র তাঁরই হাতে। কোন কারো সুপারিশ গ্রহণ করানোর ক্ষমতা তো দূরের কথা নিজে নিজেই আল্লাহর দরবারে সুপারিশকারী হিসেবে যাবে সে শক্তিও করো নেই।  আল্লাহ তাআলা বলেন,

قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬ا‌ۖ لَّهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ (٤٤) 

অর্থঃ বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইখতিয়ারাধীন৷  আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ ( সূরা যুমার ৩৯:৪৪)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ وَمَا بَيۡنَهُمَا فِى سِتَّةِ أَيَّامٍ۬ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ‌ۖ مَا لَكُم مِّن دُونِهِۦ مِن وَلِىٍّ۬ وَلَا شَفِيعٍ‌ۚ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ (٤)

অর্থঃ আল্লাহই আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এদের মাঝখানে যা কিছু আছে সব সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে এবং এরপর আরশে সমাসীন হয়েছেন ৷ তিনি ছাড়া তোমাদের কোন সাহায্যকারী নেই এবং নেই তার সামনে সুপারিশকারী, তারপরও কি তোমরা সচেতন হবে না। (সূরা সাজদাহ ৩২:৪)।

আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মূহূর্ত মহান আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কেউ শাফাআত করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। আবার ইচ্ছা করলে না ও দিতে পারেন। ইহা সম্পূর্ণ রূপে তার ইখাতিয়ার ভূক্ত। এক শ্রেণীর মুশরীকেরা চিন্তা করে থাকেন যে, আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিবর্গ, নবীগন রাসুলগন, ফেরেশস্তাগর বা অন্যান্য সত্তা আল্লাহর নিকট শাফাআত করে তাদের জান্নাত দিবেন বা আল্লাহর নিকট তাদের বিরাট প্রতিপত্তি আছে। তাই তারা আল্লাহর কাছ থেকে তারা যে কোন কার্যোদ্ধার করতে সক্ষম। তারা যে কথার ওপর অটল থাকে, তা তারা আদায় করেই ছাড়ে। এভাবেই শাফাআতের লোভে শির্কি কাজে জড়িয়ে পরে। অথচ শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না। তবে মনে রাখতে হবে শাফায়াতে দুটি শর্থ আছে।

১। মহান আল্লাহ তাআলার অনুমতি

২। ঈমানদার হতে হবে (তার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা)

 

ক। শাফাআতের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার অনুমতি প্রয়োজনঃ

মহান তাআলা বলেছেন,

مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ

অর্থঃ পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷  কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? (সূরা বাক্বারা ২:২৫৫)।

মহান তাআলা বলেছেন,

إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِى خَلَقَ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِى سِتَّةِ أَيَّامٍ۬ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِ‌ۖ يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ‌ۖ مَا مِن شَفِيعٍ إِلَّا مِنۢ بَعۡدِ إِذۡنِهِۦ‌ۚ ذَٲلِڪُمُ ٱللَّهُ رَبُّڪُمۡ فَٱعۡبُدُوهُ‌ۚ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (٣)

অর্থঃ কোন শাফায়াতকারী (সুপারিশকারী ) এমন নেই, যে তার অনুমতি ছাড়া শাফায়াত করতে পারে৷ এ আল্লাহই হচ্ছেন তোমাদের রব৷ কাজেই তোমরা তারই ইবাদত করো৷ এরপরও কি তোমাদের চৈতন্য হবে না। (ইউনুস ১০:১০৩)।

এতে স্পষ্ট যে, সুপারিশকারীকে অবশ্যই সুপারিশের অনুমতি প্রাপ্ত হতে হবে। অর্থাৎ বিনা অনুমতিতে সুপারিশ করার কেউ নেই। সুপারিশ স্বেচ্ছামূলক নয়, বরং তা হবে অনুমতি ক্রমে।

আখিরাতে কেউ যখন শাফাআত করার সাহস করতে পারবে না। তখন আমাদের প্রিয় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই প্রথম শাফাআতের অনুমতি পাবেন বলে আশা করা যায়। অতপর, আমাদের নবীজির সাথে অন্যান্যরা শাফায়েত করবেন। যেমনঃ নবীগণ, ফেরেশতাগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, নেককার বান্দাগণ সকলেই শাফাআত করবেন, অবশ্য আল্লাহর অনুমতিক্রমে।

খ। ঈমানদার হতে হবেঃ

নবীগণ, ফেরেশতাগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, নেককার বান্দাগণ সকলেই শাফাআত করবেন কিন্তু তাদের শাফাআত প্রাপ্তির প্রধান উপকরন হল ঈমান ও কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক নেক আমল যা করলে তিনি সন্তুষ্টি থাকবেন। যদি মনে করে থাকি আত্মিয়তার সম্পর্ক তবে মারাত্ত্বক ভুল করবেন। মনে রাখবেন শাফায়াত প্রাপ্তির জন্য শর্থ হল ঈমান। আল্লাহর নিকট অপ্রিয় (মুসরিক) এমন কারো জন্য কোন সুপারিশ চলবে না। কোরআনে বর্ণিত আছে, মহা প্লাবনের সময় আল্লাহর প্রেরিত নবী নূহ আলাইহিস সালাম তার ছেলে কেনানকে আযাব হতে রক্ষা করার ব্যাপারে সুপারিশ করে ছিলেন আল্লাহ তা গ্রহণ করেননি। পিতা আজরের জন্যে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ক্ষমা করে দেয়ার সুপারিশ গ্রহণ করেননি। এমনকি মুনাফিকদের ব্যাপারে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলার বলেছেন।

 ٱسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ أَوۡ لَا تَسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ إِن تَسۡتَغۡفِرۡ لَهُمۡ سَبۡعِينَ مَرَّةً۬ فَلَن يَغۡفِرَ ٱللَّهُ لَهُمۡ‌ۚ ذَٲلِكَ بِأَنَّہُمۡ ڪَفَرُواْ بِٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ‌ۗ وَٱللَّهُ لَا يَہۡدِى ٱلۡقَوۡمَ ٱلۡفَـٰسِقِينَ (٨٠)

অর্থঃ হে নবী! তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না কর। যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর তথাপিও আল্লাহ তাদেরকে কখনো ক্ষমা করবেন না। (সূরা তাওবা ৯:৮০)।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيہِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يَشۡفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ٱرۡتَضَىٰ وَهُم مِّنۡ خَشۡيَتِهِۦ مُشۡفِقُونَ (٢٨)

অর্থঃ যাকিছু তাদের সামনে আছে এবং যাকিছু আছে তাদের অগোচরে সবই তিনি জানেন৷ যাদের পক্ষে সুপারিশ শুনতে আল্লাহ সম্মত, তাদের পক্ষে ছাড়া আর কারো সুপারিশ তারা করে না। এবং তারা তার ভয়ে ভীত৷ (সূরা আম্বিয়া ২১:২৮)।

এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় আদরের কন্যা কলিজার টুকরা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিজের আমল সম্পর্কে সতর্ক  করছেন।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ মর্মে আয়াত অবতীর্ণ হলো (অর্থ) “তোমার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও”। (সূরা শু’আরা ২৬:২১৪)। তখন রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে কুরায়শগণ! আল্লাহর (‘আযাব) থেকে তোমরা নিজেদের কিনে নাও (বাঁচাও)। আল্লাহর (‘আযাব) থেকে তোমাদের রক্ষা করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। ওহে ‘আবদুল মুত্তালিব-এর বংশধর! তোমাদের আমি রক্ষা করতে পারব না। হে ‘আব্বাস ইবনু ‘আবদুল মুত্তালিব! তোমাকেও আমি রক্ষা কতে পারব না। হে সাফিয়্যাহ্‌ রসূলুল্লাহ্‌র ফুপু আমি আল্লাহর (‘আযাব) থেকে তোমার কোন উপকার করতে পারব না। হে রসূলুল্লাহ্‌র কন্যা ফাতিমাহ্‌! তোমার যা ইচ্ছা চাও। আল্লাহর (‘আযাব) থেকে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারবো না। (সহিহ মুসলিম ৩৯২)

এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিজ মেয়েকে মুহাম্মদের মেয়ে বলে সম্বোধন করাটা সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর  কাছে কারো গ্রহণ যোগ্যতা তার পিতৃ বা বংশ পরিচয়ের নিক্তিতে হবে না, হবে নিজ নিজ ঈমান, আমলের মূল্য  ও মানের ভিত্তিতে।

এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সুপারিশ তারাই পাবেন যারা আল্লাহর প্রিয়জন হবেন। বস্তুতপক্ষে যখন সমস্ত শাফাআত একমাত্র আল্লাহরই জন্য সংরক্ষিত এবং তা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষ। আর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অন্য কেউ আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কারো জন্য শাফাআত করতে সক্ষম হবেন না। আল্লাহর অনুমতি একমাত্র একনিষ্ঠ তাওহীদবাদীদের জন্যই নির্দিষ্ট।

আখিরাতে মহান আল্লাহর অনুমতিক্রমে যারা শাফাআত করবেন তারা হচ্ছেন, নবীগণ, ফিরিশতাগন, শহীদগণ, আলেম ওলামাগণ, হাফেজে কোরআন, নাবালগ সন্তান, সাওম এবং কুরআন। তাদের শাফাআত কোরআন-হাদীসের অকাট্য প্রমাণাদি দ্বারা প্রমানিত। তাদের মধ্যে শাফাআতকারীদের সর্দার হলেন বিশ্বনবী

মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ।

দলিলঃ

১. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমি আদম সন্তানের নেতা এবং আমাকেই সর্বপ্রথম কবর হতে উঠানো হবে এবং আমিই সর্বপ্রথম সুপারিশকারীহবো এবং সর্বপ্রথম আমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (আবু দাউদ ৪৬৭০ সহিহ মুসলিম ৫৮৩৪)

২. আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, জান্নাতে লোকদের প্রবেশ সম্পর্কে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারীএবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ঈমান এনেছে যা অন্য কোন নাবীর বেলায় হবে না। নাবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যাঁর প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ঈমান এনেছে। সহিহ মুসলিম ৩৭৩)

৩. আবূ উমামা বাহেলী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “তোমরা কুরআন পড়ো, কারণ তা কিয়ামতের দিন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আগমন করবে।” (সহিহ মুসলিম ৮০৪)

৪. নিমরান ইবনু ‘উতবাহ আয-যামারী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রাঃ) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহন করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ শহীদ তার পরিবারের সত্তর জনেরজন্য শাফা’আত করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। (আবু দাউদ ২৫২২)

৫. আতা ইব্‌ন ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ) এবং আবূ সাঈদ (রা)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তাঁদের একজন শাফাআতের হাদীস বর্ণনা করলেন, আর অন্যজন ছিলেন নিশ্চুপ। তিনি বলেন, তারপর ফেরেশতা এসে সুপারিশ করবেন এবং রাসূলগণ সুপারিশ করবেন, তারপর তিনি পুলসিরাতের উল্লেখ করে বললেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যাদের অনুমতি দেয়া হবে তাঁদের মধ্যে আমি-ই হবো প্রথম। তারপর যখন আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির বিচারকার্য থেকে অবসর গ্রহণ করবেন এবং দোযখ থেকে যাকে বের করতে ইচ্ছা করবেন তাকে বের করবেন। আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতা ও রাসূলগণকে আদেশ করবেন সুপারিশ করার জন্য। তখন তাঁরা তাদের চিহ্ন দ্বারা চিনে নিবেন যে, আদম সন্তানের সিজদার স্থান ব্যতীত আর সব কিছুই আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছে। তারপর তাদের উপর ‘আবে হায়াত’ ঢেলে দেয়া হবে। তখন তারা নবজীবন লাভ করবে যেরুপ স্রোতের ধারে বীজ গজিয়ে ওঠে। (সুনানে নাসাঈ ১১৪০)

৬. রাসুল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,  তিন শ্রেণীর লোক কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবেন, নবী-রাসূরগণ, আলেম-ওলামা ও শহীদগণ (ইবনু মাজাহ, বাইহাকী ও বাজ্জার)

খ। ঈমানদার হতে হবেঃ

কিয়ামত দিবসে অনুষ্ঠিত শাফাআত থেকে বঞ্চিত হবে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরীর গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এরই উপর মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ

অর্থঃ আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং যারা মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম(সূরা বায়্যিনাহ : ৬)

মহান আল্লাহ বলেন,

 أَفَمَنۡ حَقَّ عَلَيۡهِ كَلِمَةُ ٱلۡعَذَابِ أَفَأَنتَ تُنقِذُ مَن فِى ٱلنَّارِ (١٩)

অর্থঃ হে নবী, সে ব্যক্তিকে কে বাঁচাতে পারে যার উপর আযাবের ফয়সালা হয়ে গেছ, তুমি কি তাকে বাঁচাতে পার যে জাহান্নামে রয়েছে? (সূরা যুমার ৩৯:১৯)

এতে বুঝা গেল, এ সব জাহান্নামীদের জন্য কোন শাফাআতকারী নেই। নেই কোন রক্ষাকারী। তাদের ব্যাপারে কোন শাফাআত গ্রহণও করা হবে না। কারণ, তারা ঈমানশূন্য। অনেক পীরকে বলতে শুনা যায়, আখেরাতে তারা তাদের মুরিদকে ফেলে জান্নাতে যাবে না। কেমন হাস্যকর, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং নিজের কলিজার টুকরার জিম্মাদারী নিতে পারলেন না। অথচ পীর সাহেব মুরিদদের জিম্মাদারী নিচ্ছেন। তবে মনে রাখতে হবে অলীদের শাফায়াত সত্য কিন্তু নিশ্চত নয় বা ইচ্ছাধিন। কারন ইহাতে আল্লাহকে বাধ্য করা হয় যা চুড়ান্তভাবে অন্যায়। আর যদি কেউ গাইরুল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে শাফাআতের দু’আ বা প্রার্থনা করে তবে দাও শির্ক হবে। কারণ, দু’আ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুয়ই ইবাদত’। (তিরমিযী)। আর ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। ইবাদতে তাঁর আর কোন শরীক নেই। আর শির্ক হচ্ছে, গাইরুল্লাহকে ইবাদতে অংশীদার করার নাম।

মন্তব্যঃ এই জন্য শাফায়েতের জন্য মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করতে হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে শাফায়াত করারা অনুমতি দিবেন। তাই শাফায়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইলে শির্ক হবে চাইতে হবে মহান আল্লাহ নিকট। তবে এইভাবে বলা যায়, হে আল্লাহ আমি কুরআন সুন্নাহর আলোকে জানতে পেরেছি তোমার প্রিয় বান্দা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতে দিন তোমার অনুমতি ক্রমে বহু মুসলিমকে সুপারিশ করে জাহান্নাম থেকে জান্নাতে নিয় যাবে তুমি তাদের মধ্য আমাকেও সামিল করে দিও। আর যদি বলি হে রাসূলুল্লাহ! কিমায়তের কঠিন ময়দানে আপনি আমাকে শাফায়েক করবেন। তাহলে শির্ক কাজ হয়ে যাবে। কেননা আপনি আল্লাহ পরিবর্তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুপারিশ চাইলেন। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবস্থা জানেনঃ

মদিনা কবর যিয়ারত গিয়ে কবরের সামনে দাড়িয়ে যদি ভাবেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবস্থা জানেন, আমাদের দেখছেন এবং আমাদের ফরিয়াদ শুনে মহান আল্লাহ নিকট সুপারিশও করছেন তবে সুস্পষ্ট শির্কি কাজ হবে। কেননা সকল স্থানে হাজির নাজির ও গাইবি বিষয় একমাত্র আল্লাহ জন্য প্রজোয্য। কোন সৃষ্টিকে মহান আল্লাহ তার এই সকল ক্ষমতা দান  করেন না। অনেক অজ্ঞ মুসলিম বিশ্বাস করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে হুবহু দুনিয়ার মতই জীবিত যাপন করছেন এবং তিনি মারাই যাননি। তাদের এ সকল বক্তব্য সাধারন মুসলিমদের মধ্যে মহাবিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। অথচ আল্লাহ্‌ ঘোষণা করেছেন যে, মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর উর্দ্ধে নন। আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেনঃ

 إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ (٣٠) 

অর্থঃ নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে, এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। (জুমার  ৩৯:৩০)।

প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমাদের নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মত একজন মানুষ ছিলেন। নিম্নের আয়াতট দুটি তার দলিল। সুরা আনকাবুদের ৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেন:

كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٥٧)

অর্থঃ প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। সবশেষে তোমাদের আমার নিকট ফিরিয়ে আনা হবে। (আনকাবুদ ২৯:৫৭)।

আর সূরা কাহাফে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, আমাদের নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মত একজন মানুষ ছিলেন।

এরশাদ হচ্ছঃ

 قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلاً۬ صَـٰلِحً۬ا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦۤ أَحَدَۢا (١١٠)

অর্থঃ (হে রাসুল) আপনি বলে দিন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহী করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে’। (সূরা আল্ কাহাব- ১৮:১১০)

মৃত লোক কোন অস্থায়ই জীবিত লোকদের খবর নিতে পারবে না। নবী মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু মারা গিয়েছেন তাই তিনি আর আমাদের কোন প্রকারের খবর নিতে পারবেন না। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে যা এসেছে এখানে তা বর্ণনা করছি।

إِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاء

অর্থঃ আপনি আহবান শোনাতে পারবেন না মৃতদেরকে এবং বধিরকেও নয়।(সুরা নাম’ল ২৭:৮০ এবং সুরা রুপ ৩০:৫২)

وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاء وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَن يَشَاء وَمَا أَنتَ بِمُسْمِعٍ مَّن فِي الْقُبُورِ

অর্থঃ আরও সমান নয় জীবিত ও মৃত। আল্লাহ শ্রবণ করান যাকে ইচ্ছা। আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নন। (সুরা ফাতির ৩৫:২২)]

মন্তব্যঃ এই সকল আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, মৃতদেরকে শোনানোর দায়িত্ব মানুষের নয়, এটা আল্লাহ্‌র কাজ। তাই সর্বাবস্থায় মৃতরা শুনতে পাবে এটার সপক্ষে কোন দলীল নেই। তবে আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় মাঝে মধ্যে তারা যে শুনতে পায় তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি এক হাদীসে, বদরের যুদ্ধের পরে কাফেরদের লাশ যখন একটি গর্তে রেখে দেয়া হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের লাশদের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে ডেকে ডেকে বললেনঃ তোমরা কি তোমাদের মা‘বুদদের কৃত ওয়াদাকে বাস্তব পেয়েছ? আমরা তো আমাদের মা‘বুদের ওয়াদা বাস্তব পেয়েছি। সাহাবীগণ বললেনঃ রাসূল! আপনি এমন লোকদের সাথে কি কথা বলছেন যারা মরে পচে গেছে? তিনি বললেনঃ ‘আল্লাহ্‌র শপথ! তোমরা আমার কথা তাদের থেকে বেশী শুনতে পাচ্ছ না’। (সহিহ বুখারী ৩৭৫৭)

মহান আল্লাহ যদি কোন খবর তাকে জানান তবে ভিন্ন কথা। তাছাড়া সহিহ হাদিস দ্বারা জানা যায় আমাদের দুরুদ ও সালাম তার নিকট ফিরিস্থা দ্বারা পৌছান হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত একদল ফেরেশতা রয়েছেন যারা দুনিয়াতে ঘুরে বেড়ান এবং আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান ৯১৪, ইমাম হাকেম হাদীসটিকে সহিহ বলেছেন, মুসতাদরাকে হাকেম ৩৫৭৬, ২/৪২১ ও হাফেজ ইবনুল কায়্যিম রাহ., জালাউল আফহাম পৃ.২৪)। 

মন্তব্যঃ কবর যেহেতু আখেরাতের ব্যাপার। আর আখেরাতের ব্যাপারে যতটুকু কুরআন ও হাদীসে যা এসেছে তার বাইরে কোন কিছু বলা কোন ক্রমেই ঠিক নয়। কোন সহিহ বা জাল সনদে উল্লেখ নাই যে তার সাহাবিদের সাথে মরার পরও কথা বলেছেন বা কোন সাহাবি বলেছেন যে আমাদের কর্মকান্ড দেখছেন। তাই দলিল বিহীন এই সকল ধারনা থেকে আমাদের বেচে থাকতে হবে।

কবর যিয়ারতে সময় সুরা নিসার ৬৪ নম্বর আয়াত তিলওয়াত করাঃ

সুরা নিসায় আয়াতটি হলোঃ

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلاَّ لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذ ظَّلَمُواْ أَنفُسَهُمْ جَآؤُوكَ فَاسْتَغْفَرُواْ اللّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُواْ اللّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا

অর্থঃ বস্তুতঃ আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রসূলও যদি তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দিতেন। অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত। (সুরা নিসা ৪:৬৪)

মন্তব্যঃ এই আয়াতের শেষের দিকে বলা হয়েছে,  “তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রসূলও যদি তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দিতেন। অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত”।

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে ইবনে কাসিরে যা বলা হয়েছে তার সার সংক্ষেপ হলো, ক্ষমাপ্রার্থনার জন্য কারো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসা এবং তার জন্য তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনা করার কথা তাঁর পার্থিব জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। তাঁর তিরোধানের পর এই শ্রেণীর ক্ষমাপ্রার্থনা বা তাঁর অসীলায় দু’আ করা আর সম্ভব নয়।

তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা তো আল্লাহর কাছেই করতে হয় এবং কেবল তাঁর কাছে করাই জরুরী ও যথেষ্ট। কিন্তু এখানে বলা হল যে, হে নবী! তারা তোমার কাছে এসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তুমিও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। এটা এই জন্য যে, তারা বিবাদের ফায়সালা গ্রহণের জন্য অন্যের শরণাপন্ন হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসম্মান করেছিল। এটা দূর করার জন্য তাঁর কাছে আসার তাকীদ করা হয়।

অনেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবিত ও মৃত্যুর মধ্য পার্থক্য করে না। যা মুলত একটি কুফরি আকিদা। তারাই আয়াতের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বারা ক্ষমা প্রর্থনা করে থাকে। যা মুলত একটি শির্ক আকিদা। আর যদি এমনি এমনি জরুরী মনে না করে শুধু এই আয়াতটি এই স্থানে পাঠের জন্য খাস করে নেন তবে কম পক্ষে বিদআত হবে। কেননা, এমন আমল আমাদের সালাফদের মাঝে পাওয়া যায় না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  তৃতীয় কিস্তি

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  তৃতীয় কিস্তি

মুহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

উহুদের শহীদদের কবরের গিয়ে কিছু চাওয়া

ইসলাম প্রচার শুরু করার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজ কুরাইশ বংশীয়দের কাছ থেকে প্রতিবাদের সম্মুখীন হন। নির্যাতনের ফলে একপর্যায়ে মুসলিমরা মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করে। এরপর ৬২৪ সালে মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে মুসলিমদের কাছে কুরাইশরা পরাজিত হয়। বদরের যুদ্ধে মক্কার কয়েকজন প্রধান গোত্রপ্রধান নিহত হন। ক্ষয়ক্ষতির কারণে নেতৃস্থানীয়রা প্রতিশোধ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং আরেকটি যুদ্ধের জন্য পুনরায় প্রস্তুতি শুরু করে। ইকরিমা ইবনে আবি জাহল, সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব ও আবদুল্লাহ ইবনে রাবিয়াহ যুদ্ধ করার জন্য অগ্রগামী ছিলেন। এরই ফলোশ্রুতিতে তৃতীয় হিজরির শাওয়াল মাসের ৩ তারিখ (২৩ মার্চ ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) শনিবার উহুদ পর্বতের সংলগ্ন স্থানে মদিনার মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এই মুসলিমদের নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর কুরাইশদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। তিনি তখন কাফির ছিলেন। দ্বন্দ্বযুদ্ধের পর দুই বাহিনীর মধ্যে মূল লড়াই শুরু হয়। মুসলিমরা মক্কার সৈনিকদের সারি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হওয়ায় মক্কার বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে।

খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মক্কার অশ্বারোহীরা তিনবার মুসলিম বাহিনীর বাম পার্শ্বে আক্রমণ চালাতে চেষ্টা করে কিন্তু জাবালে রুমাতের উপর মোতায়েন করা তীরন্দাজদের আক্রমণের কারণে তারা বেশি অগ্রসর হতে পারেনি। যুদ্ধের কৌশল হিসাবে এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবালে রুমাতে একদল সাহাবীদের অবস্থান করতে বলেন। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলিমরা সুবিধাজনক অবস্থান লাভ করে এবং বিজয়ের নিকটে পৌছে যায়। এসময় মুসলিম তীরন্দাজদের একটি বড় অংশ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ ভুল বুঝে জাবালে রুমাত ত্যাগ করে। তারা মনে করেছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ ছিল শুধু যুদ্ধ চলা কালিন সময় পর্যান্ত। তাই তারা যুদ্ধ শেষ মনে করে এক পর্যায় স্থানটি ত্যাগ করে মুল বাহিনীর সাথে যোগ দান করে। ফলে বাম পার্শ্বের প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে খালিদের নেতৃত্বাধীন মক্কার অশ্বারোহীরা সুযোগ কাজে লাগায়। নির্দেশ মেনে অবস্থান ত্যাগ না করা অবশিষ্ট তীরন্দাজদের উপর তারা আক্রমণ চালালেও সংখ্যাস্বল্পতার কারণে খালিদের অশ্বারোহিদের প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে মক্কার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর পার্শ্বভাগ ও পেছনের ভাগে আক্রমণ করতে সক্ষম হয়। কটি ক্ষুদ্র অংশ দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং মদিনার দিকে অগ্রসর হয়।

অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতিতে মুসলমানরা দিগ্বিদিক ছুটতে লাগলেন। এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় অনেক মুসলিম মারা যায়। মক্কার বাহিনীর আক্রমণে মুসআব ইবনে উমায়ের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও নবীজির চাচা হজরত হামজা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হন। মুসআব ইবনে ওমায়ের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু -এর দেহ অবয়ব নবীজির সঙ্গে সাদৃশ্য ছিল। তাই গুজব ছড়ায় যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিহত। কিন্তু পরে দেখা যায়, এটা নিছকই গুজব। মক্কার বাহিনীর আক্রমণের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হন এবং তার একটি দাঁত ভেঙে যায়।

তীব্র সম্মুখযুদ্ধের পর অধিকাংশ মুসলিম উহুদ পর্বতের ঢালে জমায়েত হতে সক্ষম হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্বতের উপরের দিকে আশ্রয় নেন। মক্কার সেনারা পর্বতের দিকে অগ্রসর হয় কিন্তু উমর ইবনুল খাত্তাব ও মুসলিমদের একটি দলের প্রতিরোধের কারণে বেশি এগোতে সক্ষম হয়নি। ফলে লড়াই থেমে যায়।

হিন্দ ও তার সঙ্গীরা এসময় মুসলিমদের লাশ টুকরো করে, লাশের কান, নাক কেটে পায়ের গয়নার মত পরিধান করে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হিন্দার ইথিওপীয় দাস ওয়াহশি ইবনে হারবে রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু (তিনি তখন মুসলিম হন নাই) বর্শার আঘাতে নিহত হয়েছিলেন। হামজা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে হত্যা করতে পারলে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়া হবে এমন প্রতিশ্রুতি পাওয়ার কারণে ওয়াহশি হামজাকে হত্যা করেছিলেন। হিন্দ নিহত হামজার কলিজা বের করে চিবিয়েছিলেন।

শুধু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ ভুল বুঝার কারণে নিশ্চিত জয়ী হওয়া যুদ্ধে অনেক মুসলিম শহীদ হন। মুসলিমরা পর্বতে আশ্রয় নেয়ার পর আবু সুফিয়ানের সাথে উমরের কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। কথোপকথনের সময় আবু সুফিয়ান এই দিনকে বদরের প্রতিশোধ বলে উল্লেখ করেন। প্রতি উত্তরে উমর বলেন যে মুসলিমদের নিহতরা জান্নাতে এবং কাফির নিহতরা জাহান্নামে আছে। এরপর মক্কার বাহিনী মক্কাভিমুখী যাত্রা করে। এই যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবি শাহাদত বরণ করেন। তাঁদের সবাইকে উহুদ প্রান্তরে দাফন করা হয়।

মন্তব্যঃ উপরে উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা হলো। যাতে বিষয়টি সম্পর্কে একটু ইলম থাকে। সঠিক ইলমের অভাবে অনেক শির্ক ও বিদআত কাজে লিপ্ত হয়। উপরের ঘটানাটি ইসলাম ও মুসলিদে জন্য বিরাট তাতপর্যপূর্ণ কেননা এই যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলিমদের শক্তি মত্তা পরীক্ষিত হয়ছে। আবার ভুলে জন্যও বিশাল মাসুল গুনতে হয়েছে। এই স্থানটির সাথে তাই ইসলামের ইতিহাসের সম্পর্ক। এখান থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। কিন্তু উহুদ স্থানে সাথে আমলের কোন সম্পর্ক নাই। অনেক বরকত লাভের আশায় বা নেকী হাসিলের আশায় উদুদের প্রান্তে শহীদের কবর যিয়ারতের জন্য আসেন। তারা উহুদের  শহীদদের কবরের কাছে গিয়ে তাদের নিকট মঙ্গল কামনা করে দোয়া করে। দোয়া করার সময় তাদের কবরের দিকে ফিরে থাকে। এখানে কোন প্রকার সওয়াব লাভের আশায় সফর করা যাবে না। তবে হ্যা, জানার জন্য বা জ্ঞান অর্জনে জন্য সফর করা যাবে। কেননা, এই স্থানটি মুসলিমদের একটি ঐহিহাসিক স্থান যার সাথে আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের সৃস্মি জড়িত আছে। উহুদ যুদ্ধে যেসব শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সুরা আল-ইমরানের ১২১ নম্বর আয়াত থেকে শুরু করে ১৬০ নম্বর আয়াতের মধ্যে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে মুসলমানদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা নির্দেশ ভুল বুঝে অমান্য করা, মতভেদ করা এবং ছত্রভঙ্গ হওয়ার মন্দ পরিণাম সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া, যাতে তারা ভবিষ্যতে সতর্ক হয়ে যায় এবং যেসব বিষয় তাদের পরাজয়ের কারণ হতে পারে, তা থেকে বিরত থাকে।

আমরা এই শিক্ষা গ্রহন না করে তাদের কবর যিয়ারত কেন্দ্রিক বিদআতে লিক্ষ হচ্ছি। কাজেই উহুদের শহীদের কবর স্থানে যাওয়ার আগে আমাদের নিয়ত পরিশুদ্ধ করি। এবং কবর যিয়ারত সম্পর্কিত সকল বিদআতি কাজ পরিহার করে চলি।  

কবরের কাছে বসে কুরআন পাঠ বা যিকর করা

কুরআন প্রতিটি মুসলিমের জীবন বিধান। এই কুরআন তাকে নিয়মি তিলওয়াত করতে হবে এবং এর মর্ম বুঝে তদনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে। কুরআন শিক্ষা ও তেলাওয়াতের ফযিলত কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত। যেমনঃ আল্লাহ তাআলা বলেন,

 إِنَّ ٱلَّذِينَ يَتۡلُونَ كِتَـٰبَ ٱللَّهِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ سِرًّ۬ا وَعَلَانِيَةً۬ يَرۡجُونَ تِجَـٰرَةً۬ لَّن تَبُورَ * لِيُوَفِّيَهُمۡ أُجُورَهُمۡ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۚۦۤ إِنَّهُ ۥ غَفُورٌ۬ شَڪُورٌ۬ *

অর্থঃ যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। সুরা ফাতির ৩৫:২৯-৩০)।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) কর্তক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, পবিত্র কুরআন পাঠক, হাফেয ও তার উপর আমলকারীকে (কিয়ামতের দিন) বলা হবে, ‘তুমি কুরআন কারীম পড়তে থাকো ও চড়তে থাকো। আর ঠিক সেইভাবে স্পষ্ট ও ধীরে ধীরে পড়তে থাকো, যেভাবে দুনিয়াতে পড়তে। কেননা, (জান্নাতের ভিতর) তোমার স্থান ঠিক সেখানে হবে, যেখানে তোমার শেষ আয়াতটি খতম হবে।” ( আবূ দাউদ ১৮৬৮, তিরমীযি ২৯১৪ হাসান)

মন্তব্যঃ এমনিভাবে বহু আয়াত ও সহিহ হাদিসে কুরআন তিলয়াতে ফজিলত বর্ণিত আছে। কুরআন তিলয়াতে স্থান ও সময় সাথে দলিলের আলোকে সংশ্লিষ্ট করে আমল করলে বিদআত হবে না। কিন্তু দলিল বিহীনভাবে স্থান ও সময় সাথে সংশ্লিষ্ট করে কুরআন তিলয়াতে করলে বিদআত হবে। আপনি মসজিদে নব্বীর যে কোন স্থান বসে কুরআন তিলয়াতে কোন সমস্যা নাই কিন্তু যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের কাছে বসে কুরআন তিলয়াত করেন আর ভাবেন তিনি দেখছেন বা এখানে বসে পড়লে সওয়াব বেশী হবে। তবে মারাত্বক ভুল করলেন। সঠিক আমলটি বিদআতের বেড়াজালে আটকালেন।

দূর থেকে কবরকে উদ্দেশ্য করে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি ভালবাসা সকল মুসলিমের জন্য একটা ফরজ কাজ। আপনি মুসলিম হবেন তো তার প্রতি ভালাবাসা থাকতে ই হবে। তাকে ভালোবাসা ছাড়া কেউ প্রকৃত মুসলিম হবে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

অর্থঃ বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। (সুরা ইমরান ৩:৩১)

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সেই আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষন না আমি তার নিকট তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক ভালবাসার পাত্র হই। (সহিহ বুখারি ১৪)

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষন না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই। (সহিহ বুখারি ১৫)

মন্তব্যঃ কিন্তু এই ভালবাসা থাকবে অন্তরে আর ভালবাসা প্রকাশ পারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুসরণের মাধ্যমে। যদি তার অনুসরণ, তার দেখান পদ্ধতিতে না হয়, তবে প্রকৃত ভালবাসা না হয়ে বিদআতে পরিনত হবে। কাজেই দূর থেকে কবরকে উদ্দেশ্য করে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করা যাবে না। যদি তার প্রতি এমনিই আবেগ আসে তবে বিদআত হবে না। কিন্তু ইচ্ছা করে তার কবর কে উদ্দেশ্য করে কান্নাকাটি বিদআতি কাজ। 

সালাতের পর পর আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ বলা

মদিনা অবস্থান কালে প্রতি ওয়াক্ত সালাতের পর পর আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ বলা একটি বিদআত কাজ। প্রথমে আসি ইয়া রাসূলাল্লাহ বলা যায় কি না?

ইয়া রাসূলাল্লাহ বা ইয়া মুহাম্মদ বলা যাবে তবে শর্ত সাপেক্ষে। সাধারন সরাসরি সাক্ষাতের সময় ইয়া বা  হে বা ওহে বলে সম্ভোধন করে থাকি। কিন্তু অনুপস্থিত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও ইয়া বা ওহে শব্দটি ব্যবহার করা যাবে তবে শর্ত হলো, যাকে সম্বোধন করা হচ্ছে তার কাছে কোন কিছু তলব না করে শুধু তার চিত্র মানসপটে আনা। যেমন- ইয়া মুহাম্মদ বলে চুপ করে যাওয়া কিংবা ‘ইয়া মুহাম্মদ, সাল্লাল্লাহু আলাইকা’ বলা এটি শির্ক নয়। কেননা এর মধ্যে গাইরুল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা নেই।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, “‘ইয়া মুহাম্মদ’, ‘ইয়া নবী’ বা ইয়া রাসূলাল্লাহ এগুলো এবং এ জাতীয় অন্য কথাগুলো ‌সম্বোধনসূচক। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- সম্বোধিত ব্যক্তিকে অন্তরে স্মরণ করা এবং অন্তরে উপস্থিত ব্যক্তিকে সম্বোধন করা। যেমনটি নামাযী ব্যক্তি বলে থাকেন, “আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ” (হে নবী, আপনার প্রতি শান্তি, আল্লাহ্‌র রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এ ধরণের সম্বোধন করে থাকে। নিজের মনে যাকে কল্পনা করছে তাকে সম্বোধন করে থাকে যদিও বহির্জগতে সে তার সম্বোধন শুনে না।” (ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম লি মুখালাফাতি আসহাবিল জাহিম ২/৩১৯)।

কিন্তু যদি সম্বোধনটির মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন এভাবে বলা, হে মুহাম্মদ, আমার জন্য অমুক অমুক কাজ করে দিন। কিংবা এর মধ্যে পরোক্ষ প্রার্থনা অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন- যে ব্যক্তি বড় কোন পাথর কিংবা ভারী কোন কিছু বহনকালে বলে, ‘ইয়া মুহাম্মদ’ তবে ধরে নেয়া হয় সে কষ্ট লাঘবের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছে। এই কাজটি আল্লাহ্‌র সাথে শির্ক। কেননা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মৃতব্যক্তি বা অনুপস্থিত ব্যক্তিকে ডাকা কুরআন-সুন্নাহ্‌ এর দলিল ও ইজমার প্রমাণের ভিত্তিতে শির্ক। অর্থাৎ অনুপস্থিত মৃত ব্যাক্তিকে সাহায্য সহিযোগীতার জন্য আহবান করা সর্বাস্থায় শির্ক কাজ। আবার সে সকল কাজ সরাসরি আল্লাহ নিয়ন্ত্রন করেন সে সকল বিষয় মানুষকে আহবান করাও শির্ক কাজ। যেনমঃ ভাগ্য পরিবর্তনে জন্য, ছেলে  সন্তানের জন্য মানুষে মানুষের কাছে প্রার্থনা করা। কাজেই আমাদের সকল প্রকারের সাহায্য সহিযোগীতার জন্য একমাত্র আল্লাহ কে আহবান করতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَأَنَّ ٱلۡمَسَـٰجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدۡعُواْ مَعَ ٱللَّهِ أَحَدً۬ا (١٨) 

অর্থঃ আর মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য৷ তাই তোমরা আল্লাহর সাথে আর কাউকে আহ্বান করিও না। (সূরা জিন ৭২:১৮)

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

 لَهُ ۥ دَعۡوَةُ ٱلۡحَقِّ‌ۖ وَٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ لَا يَسۡتَجِيبُونَ لَهُم بِشَىۡءٍ إِلَّا كَبَـٰسِطِ كَفَّيۡهِ إِلَى ٱلۡمَآءِ لِيَبۡلُغَ فَاهُ وَمَا هُوَ بِبَـٰلِغِهِۦ‌ۚ وَمَا دُعَآءُ ٱلۡكَـٰفِرِينَ إِلَّا فِى ضَلَـٰلٍ۬ (١٤)

অর্থঃ একমাত্র তাঁকেই আহ্বান করা সঠিক৷  আর অন্যান্য সত্তাসমূহ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদেরকে লোকেরা ডাকে, তারা তাদের প্রার্থনায় কোন সাড়া দিতে পারে না৷ তাদেরকে ডাকা তো ঠিক এমনি ধরনের যেমন কোন ব্যক্তি পানির দিকে হাত বাড়িয়ে তার কাছে আবেদন জানায়, তুমি আমার মুখে পৌঁছে যাও, অথচ পানি তার মুখে পৌঁছতে সক্ষম নয়৷ ঠিক এমনিভাবে কাফেরদের দোয়াও একটি লক্ষভ্রষ্ট তীর ছাড়া আর কিছু নয়৷ (সুরা রাদ১৩:১৪)

কাজেই বিপদে ডাকতে হবে একমাত্র আল্লাহকে কেননা তিনি ছাড়া কেউ বিপদ দুর করতে পারবে না। আর যাদের বিপদ উদ্ধারকারী মনে করছে ডাকছে, তারা নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

قُلِ ٱدۡعُواْ ٱلَّذِينَ زَعَمۡتُم مِّن دُونِهِۦ فَلَا يَمۡلِكُونَ كَشۡفَ ٱلضُّرِّ عَنكُمۡ وَلَا تَحۡوِيلاً (٥٦)

অর্থঃ এদেরকে বলো, ডাক দিয়ে দেখো তোমাদের সেই মাবুদদেরকে, যাদেরকে তোমরা আল্লাহ ছাড়া (নিজেদের কার্যোদ্ধারকারী মনে করে) তারা তোমাদের কোনো কষ্ট দূর করতে পারবে না এবং তা পরিবর্তন করতেও পারবে না৷ (সুরা বনী ঈসরাইল ১৭:৫৬)

আল্লাহ তা’আলা বলেন:

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ يَبۡتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ ٱلۡوَسِيلَةَ أَيُّہُمۡ أَقۡرَبُ وَيَرۡجُونَ رَحۡمَتَهُ ۥ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۥۤ‌ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحۡذُورً۬ا (٥٧)

অর্থঃ এরা যাদেরকে ডাকে তারা তো নিজেরাই নিজেদের রবের নৈকট্যলাভের উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে যে, কে তাঁর নিকটতর হয়ে যাবে এবং এরা তাঁর রহমতের প্রত্যাশী এবং তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত। আসলে তোমার রবের শাস্তি ভয় করার মতো৷ (সুরা বনী ইসরাঈল ১৭:৫৭)

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, “যে ব্যক্তি ফেরেশতাদেরকে কিংবা নবীদেরকে মাধ্যম বানিয়ে তাদেরকে ডাকে, তাদের উপর নির্ভর করে, কল্যাণ আনয়ন ও অকল্যাণ দূর করার জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা করে। যেমন- গুনাহ মাফ, অন্তরের হেদায়েত প্রাপ্তি, বিপদাপদ দূর হওয়া, অভাব দূর হওয়ার জন্য তাদের কাছে প্রার্থনা করে মুসলিম উম্মাহ্‌র ইজমা অনুযায়ী সে কাফের। (মাজমুউল ফাতাওয়া ১/১২৪)

*“‘ইয়া মুহাম্মদ’, ‘ইয়া নবী’ বা ইয়া রাসূলাল্লাহ বলা যাবে, যতক্ষন না সরাসরি বা পরোক্ষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট কোন কিছু প্রার্থনা করা হয় অথবা তাকে সাহায্যের জন্য আহবান করা না হয়। কেননা কোন বিষয় গাইরুল্লাহ নিকট সাহায্য বা আহবান করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। ইহা ছাড়া মনে মনে হাজির করার জন্য,  ভালোবেসে দুরুদ, সালাম ও দোয়া করা জন্য “‘ইয়া মুহাম্মদ’, ‘ইয়া নবী’ বা ইয়া রাসূলাল্লাহ বলা যাবে। তবে এ ধরণের ডাক দেয়া কিংবা বেশি বেশি এটি বলা থেকে বিরত থাকা বেশী যুক্তি যুক্ত। কারণ এই কথা বলার কারণে অনেক মানুষ আপনার প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা হতে পারে যে, আপনি গায়রুল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করছেন। আবার এমনও হতে পারে যে, আপনি এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন এবং কোন কাজ করাকালে ও সহযোগীর দরকার হলে আপনি এই ডাক দিয়ে বসবেন। বরং আপনার উচিত ‘ইয়া আল্লাহ্‌’, ‘ইয়া হাইয়্যু’, ‘ইয়া কায়্যুম’, ‘ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম’ বলায় নিজের জিহ্বাকে অভ্যস্ত করে তোলা। কোন বান্দা বা দাসের জন্য তার মনিবের কাছে প্রার্থনা করা, তার কাছে মিনতি করা ও সর্বাবস্থায় তাকে ডাকার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আর কিছু নেই।

মন্তব্যঃ তা হলে বুঝতে পারলাম শর্ত সাপেক্ষে ইয়া রাসূলাল্লাহ যাবে। কিন্ত আমি কেন, মদিনা অবস্থান কালে প্রতি ওয়াক্ত সালাতের পর পর আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ বলা একটি বিদআত কাজ বলেছিলাম। কেননা, এই ধরনের আমল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী বা আমাদের পূর্বরতী মুজতাহীদ আলেমদেন নিকট থেকে প্রমানিত হয়। তবে আপনি এই আমলের পরিবর্তে বার বার দুরুদ ও সালাম পেশ করতে পারেন। যে সকল সম্পর্ক কোন প্রকারের  সন্দেহ বা সংশয় নাই।

ফরজ সালাত প্রথম কাতার বাদ দিয়ে রওযাতে সালাত পড়া উত্তম মনে করা

রওযাতুন মিন রিয়াদিল জান্নাত স্থানটি সহিহ হাদিসে জান্নাতের অংশ বলা হয়েছে।

১. আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝখানের অংশটুকু রওযাতুন মিন রিয়াদিল জান্নাত (জান্নাতের উদ্যানসমুহের একটি উদ্যান)। (সহিহ বুখারী ১৮৮৮, ৬৫৮৮)

২. আবদুল্লাহ ইবন্‌ যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, আমার ঘর এবং আমার মিম্বরের মধ্যস্থিত স্থান বেহেশতের বাগানসমূহের একটি বাগান। (সুনানে নাসাঈ ৬৯৫)

ফরজ সালাত প্রথম কাতার আদায় করা সম্পর্কে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এই সকল হাদিসের উপর ইলম থাকলে কেউই সুযোগ থাকা সত্বেও সালাতে প্রথম কাতার বাদ দিয়ে অন্য স্থানে সালাত আদায় করতে চাইবে না।

১. বারা’ বিন আযেব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ প্রথম কাতারের (নামাযীদের) উপর রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতাগণ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। মুআয্‌যিনকে তার আযানের আওয়াযের উচ্চতা অনুযায়ী ক্ষমা করা হয়। তার আযান শ্রবণকারী প্রত্যেক সরস বা নীরস বস্তু তার কথার সত্যায়ন করে থাকে। তার সাথে যারা নামায পড়ে তাদের সকলের নেকীর সমপরিমাণ তার নেকী লাভ হয়।” (সুনানে নাসাঈ ৬৪৬)

২.  আবদুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ প্রথম কাতারের লোকদের উপর রহমত নাযিল করেন। (ইবনে মাজাহ ৯৯৯)

মন্তব্যঃ উপরের সহিহ হাদিস দ্বারা ফরজ সালাতের প্রথম কাতারগুলোতে সালাত আদায় করার ফজিলত প্রমানিত। অপর পক্ষে রওযাতুন মিন রিয়াদিল জান্নাত বা রওযার স্থানটি সহিহ হাদিসে জান্নাতের অংশ বলা হয়েছে। এখানে সালাত আদায়ের কোন বিষেশ ফজিলত বর্ণিত হয় নাই। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মসজিদের এ অংশকে অন্যান্য অংশ থেকে পৃথক গুণে গুণান্বিত করা দ্বারা এ অংশের আলাদা ফযীলত ও বিশেষ শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করছে। কিন্তু তাই বলে, এই স্থান কে ফরজ সালাত প্রথম কাতারের চেয়ে উত্তম মনে করা যাবে না। যদি সময় সুযোগ হয় এবং কাউকে কষ্ট না দিয়ে সেখানে নফল নামায আদায় করা, আল্লাহর জিকির করা, কুরআন পাঠ করার ভালো।

মসজিদে নব্বী ও কুবাছাড়া অন্য মসজিদে সওয়াবের উদ্দেশ্যে গমন করা

মদিনা যাওয়ার সুযোগ সবার হয় না। তাই যারাই মদিনা যায় তারা ইহার ঐতিহাসিক স্থানসমূহ দেখতে চায়। ঐতিহাসিক স্থানসমূহ ঘুরে ঘুরে দেখা, আর সওয়াবের উদ্দেশ্যে সফর করা এক নয়। মসজিদে নব্বী ও মসজিদে কুবার সালাত আদায়ে ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত তাই সালাত আদায় তথা সওয়াবের উদ্দেশ্যে এই দুটি মসজিদে সফর করা শরীয়ত সম্মত কাজ। কিন্তু ইহার বাহিরে মদিনার  ঐতিহাসিক স্থানসমূহ যেমনঃ উহুদের ময়দায়, উহুদের সাহাবিদের কবরস্থান, জীনের পাথার, বদর প্রান্ত, খন্দকের প্রান্ত, খন্দকের সমজিদ, কিবলাতাইন মসজিদ ইত্যাদি। এই সকল স্থানে যাওয়া কোন প্রকারের অসুবিধা নাই। তবে যাওয়া উদ্দেশ্যে হবে জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা গ্রহণ। তাই সকল স্থানে সওয়াবের উদ্দেশ্যে গমন করা যাবে না্

দলিলঃ

১. আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তিন মসজিদ ছাড়া অন্য কোন গন্তব্যে সফর করা যাবে না। মসজিদে হারাম, আমার এই মসজিদ ও মসজিদে আকসা।”(সহিহ বুখারী ১১৮৯ ও সহিহ মুসলিম ১৩৯৭, আবু দাইদ ২০৩৩)

২.  সাহল বিন হুনাইফ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি (স্বগৃহ হতে ওযূ করে) বের হয়ে এই মসজিদে (কুবায়) উপস্থিত হয়ে নামায আদায় করে, সে ব্যক্তির একটি উমরাহ আদায় করা সমান সওয়াব লাভ হয়। (হাদিস সম্ভার ১১৯৭, ইবনে মাজাহ ১৪১২)

৩. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহণ করে কিংবা পায়ে হেঁটে কুবা মসজিদে আসতেন। ইবনু নুমায়র (রহ.) নাফি‘ (রহ.) হতে অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করতেন। (সহিহ বুখারি ১১৯৪, সহিহ মুসলিম ৩২৬০ ইফাঃ)

প্রতিদিন বাকী কবরস্থান যিয়ারত করা

বাকী কবরস্থানকে আমাদের উপমহাদেশের মুসলীমগন জান্নাতুল বাকি বলে থাকে। এই কবর স্থানকে আরবীতে বলা হয়, বাকিউল গারকাদ, মাকবারাতুল বাকি। এটি মসজিদে নব্বীল দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত। পূর্বে এখানে কবরের উপর স্থাপনা ছিল। ওসমানী খেলাফত ও তার পূর্বে এসব কবরকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের কুসংস্কার প্রথা চালু হওয়ায় সৌদি আরব সরকার কবরগুলোতে ছোট চিহ্ন রেখে স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেয়। ইমাম মালিক (রহ.)-এর কথামতে জান্নাতুল বাকিতে অন্তত দশ হাজার সাহাবার কবর রয়েছে।

বর্তামান বাকী কবরস্থান

এই কবরস্থানটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনেক আত্মীয় ও সাহাবিকে দাফন করা হয়েছে। তিনি এই কবরস্থানে বেশ কয়েকবার এসেছেন। বাকী কবরস্থান পেছনে একসময় একটি ইহুদি কবরস্থান ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদিনা আসার সময় বাকী কবরস্থান সবুজ বৃক্ষ আচ্ছাদিত ছিল।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত,আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়িতে তাঁর পালাতে রাতের শেষভাগে বাকী‘ (নামক মদীনার কবরস্থান) যেতেন এবং বলতেন, ‘আস্সালামু আলাইকুম দা-রা ক্বাওমিম মু’মিনীন অআতাকুম মা তূ‘আদূন, গাদাম মুআজ্জালূন। অইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লাহিক্বুন। আল্লাহুম্মাগফির লিআহলি বাকী‘ইল গারক্বাদ।’

অর্থাৎ হে মুসলমান কবরবাসীগণ! তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের নিকট তা চলে এসেছে যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হচ্ছিল, আগামী কাল (কিয়ামত) পর্যন্ত (বিস্তারিত পুরস্কার ও শাস্তি) বিলম্বিত করা হয়েছে। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব। হে আল্লাহ! তুমি বাক্বী‘উল গারক্বাদবাসীদেরকে ক্ষমা কর। (মুসলিম ৯৭৪, নাসায়ী ২০৩৭, ২০৩৯, ইবনু মাজাহ ১৫৪৬, আহমাদ ২৩৯০৪)

মসজিদে নববী নির্মাণের সময় তিনি মসজিদের স্থানটি দুজন এতিম শিশুর কাছ থেকে কিনে নেন। তার এক সাহাবি আসাদ বিন জারারার মৃত্যুর পর মুহাম্মদ কবরস্থানের জায়গা নির্ধারণ করেন। আসাদ বিন জারার রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু ছিলেন এখানে দাফন হওয়া প্রথম আনসার ব্যক্তি। উসমান বিন মাজুন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এখানে দাফন হওয়া প্রথম মুহাজির ব্যক্তি। তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর মৃত্যুর পর তাকে এখানে দাফন করা হয়। তখন তার কবরটি পার্শ্ববর্তী ইহুদি কবরস্থানের মধ্যে পড়ে। খলিফা প্রথম মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তার সম্মানে এই স্থানকে জান্নাতুল বাকির অংশ করে নেন। উমাইয়া খিলাফতের সময় তার কবরের উপর প্রথম গম্বুজ নির্মিত হয়। অন্যান্য সময়েও এখানকার বিভিন্ন কবরের উপর গম্বুজ ও স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। এই করবগুলি কেন্দ্র করে নানান প্রকারের বিদআত প্রচলিত ছিল তাই ১৯২৬ সালে আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের শাসনামলে বাকী কবরস্থানের মাজারগুলো ধ্বংস করা হয়। একই বছর মক্কার মুয়াল্লা কবরস্থানের মাজারগুলোও ধ্বংস করা হয়। মুয়াল্লায় কবরস্থানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথম স্ত্রী খাদিজাসহ আরো অন্যান্য আত্মীয়ের কবর রয়েছে। এসময় বহির্বিশ্বের কিছু বিদআতি মাজার পুজারী সম্প্রদায় প্রতিবাদ জানালেও তার প্রতি কোন কর্ণপাত করেন নাই।

প্রতিবছর হজ্জের সময় মদিনায় অবস্থানরত কোনো হজ্জ পালনকারীর মৃত্যু হলে বাকী কবরস্থানে দাফন করা হয়। এছাড়াও মদীনার বাসিন্দারাও মারা গেলে এখানে দাফনের সুযোগ পায়। তবে সাহাবাদের ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ হিসেবে এ কবরস্থানের শুরুর অংশে যাদের সমাহিত করা হয়েছে তাদের স্থানে এখন আর নতুন করে কাউকে কবরস্থ করা হয় না। সৌদি সরকারের তত্ত্ববধানে বাকী কবরস্থানে যিয়ারতের জন্য ফজর ও আসরের নামাজের পর খুলে দেয়া হয়। এসময় মুসলিম পুরুষরা জিয়ারতের জন্য ভেতরে যেতে পারে। এই সুযোগে কিছু হাজ্জি প্রতিদিন বাকী কবরস্থান যিয়ারত করার জন্য যায়। এটা ঠিক নয়। বাকী কবরস্থানে গিয়ে কবর যিয়ারত সুন্নাহ সম্মত আমল হলেও প্রতিদিন যাওয়া ঠিক হবে না।

বরকত হাসিলের জন্য মদীনার মাটি বয়ে নিয়ে বেড়ানো

কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত হাসিল করা কখন জায়েয আবার কখন নাজায়েয। ইসলামি শরিয়তে যে সকল কোন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করার কথা বলা হয়েছে শুধু সে গুল থেকেই বরকত হাসিল করা যাবে। ইসলামি শরিয়তে নেই এমন ব্যক্তি বা বস্তুর মাধ্যমে তাবার্রুক বা বরকত  হাসিল করা অনেক সময় হরাম আবার অনেক সময় শির্ক। বিষয়টি সম্পর্কে পরিস্কার ধারনার জন্য উভয়টি সম্পর্কে জানা দরকার।

ক। জায়েয তাবার্রুক বা বরকতঃ  

হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মক্কার মুশরিকদের প্রতিনিধি ছিলেন উরউয়া ইবনে মাসউদ। তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে রাসূল স. এর সাহাবীদের সম্পর্কে মক্কার মুশরিকদেরকে বলেন,  হে কুরাইশ সম্প্রদায়, আল্লাহর শপথ, আমি বহু রাজা-বাদশার নিকট প্রতিনিধি হয়ে গমন করেছি। আমি কায়সার, কিসরা, ও নাজ্জাশীর নিকট প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছি। আল্লাহর শপথ, মুহাম্মাদ স. এর সাহাবীরা তাকে যে পরিমাণ সম্মান করে, কোন রাজা-বাদশাকে এধরনের সম্মান করতে দেখিনি। আল্লাহর শপথ, তিনি যদি কফ ফেলেন, তাহলে সেটা তার কোন সাহাবীর হাতে পড়ে। আর সেই সাহাবী সেটি তার মুখে ও শরীরে মেখে নেয়। তিনি কোন আদেশ করলে সেটি পালনে তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তিনি ওজু করলে তার ওজু পানি নেয়ার জন্য এত বেশি প্রতিযোগিতা করে যেন তারা যুদ্ধ করছে। রাসূল স. এর সামনে তারা অত্যন্ত নিচু স্বরে কথা বলে। তাঁর সম্মানে তারা চোখ তুলে তার দিকে তাকায় না। (সহিহ বুখারী শরীফ : ২৭৩৪)।

  হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  এর মাথার চুল হলক করতে দেখেছি। সাহাবায়ে কেরাম রাসূল স. এর চার পাশে চক্কর দিতেন। রাসূল স. এর মাথা থেকে কোন চুল পড়লে যেন কোন সাহাবীর হাতে পড়ে। ( সহিহ মুসলিম : ২৩২৫)।

 এছাড়া হাসিসের মাধ্যমে জানা যায় সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিহিত পোশাক ও ঘাম থেকে বরকত হাসিল করতেন।

আল্লাহর জিকির কারি বা নেককারদের সাথে বসলে বরকত হাসিল হয়। (সহিহ বুখারি ৬৪০৮, সহিহ মুসলীম ২৬৮৯)

অনেক সহিহ হাদিস প্রমান করে, মসজিদে হারাম, মসজিদে নবী, মসজিদে আকসা, এই তিনটি মসজিদের বরকতময়। ইহা ছাড়া পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ অন্য সকল স্থান থেকে উত্তম।

খাদ্য হিসাবে যাইতুনের তৈল, (সুরা নুর-৩৫, তিরমিজি-১৮৫১২) দুধ, (ইবনে মাজাহ-৩৩৮৫) মধু (সুরা নাহল৬৯, বুখারি-৫৬৮৪ মুসলিম-২২১৭) ও যমযমের পানি, (মুসলিম-২৪৭৩) বরকতময়।

সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন দসায় সাহারাগন (রা:) সময় এবং দুযোগ থাকা স্বত্বেও যে সকল স্থান, সময় এবং ব্যক্তি থেকে বরকত নেনন নাই সে সকল স্থান, সময় এবং ব্যক্তি থেকে বরকত নেয়া যাবে না।

যেমনঃ

ব্যক্তি হিসাবেঃ হাদিসসমুহ দ্বারা প্রমানিত যে, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের থুথু, ক্বফ, ঘাম, পোশাক ইত্যাদি দ্বারা বরকত হাসিল করতেন। এখন যদি কেউ ভাবেন তাহলে তো আমাদের পীর, বুজুর্গ, আকাবিরদের থুথু, ক্বফ, ঘাম, পোশাক ইত্যাদি দ্বারা বরকত হাসিল করা যাবে কারণ তারা নবীদের ওয়ারিস। তা হলে মহা ভুল করবেন কারণ এটা শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য খাস ছিল। তা না হলে আমাদের পীরের পীর, বুজুর্গদের বুজুর্গ, অলীদির অলী, হযরত আবু বক্কর (রা:) ,হযরত ওমর (রা:), হযরত আলী (রা:), হযরত ওসমানসহ (রা:) কোন সাহাবির থুথু, ক্বফ, ঘাম, পোশাক থেকে কেউ বরকত লাভ করছেন বলে জানা যায় না। তাছাড়া আমরা যাকে তার বাহিজ্জিক আমল আখলাক দেখে আল্লাহর অলী মনে করছি। মহান আল্লাহর কাছে সে অলী না ও হতে পারে। 

অপর পক্ষে সকলের জন্য খাদ্য হিসাবে যাইতুনের তৈল, দুধ, মধু ও যমযমের পানি, আজও বরকতময়। মসজিদে হারাম, মসজিদে নবী, মসজিদে আকসা, এমনকি পৃথিবীর সকল মসজিদসমুহ আজও বরকত হাসিলের কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহর জিকির কারি বা নেককারদের সোহবত বরকতময় তা আর বরার অপেক্ষা রাখে না।

স্থান হিসাবঃ হেরাগুহা, জাবারে শুর, জাবালে রহমত, মোহদায়ো ওহুদের কবর জিয়ারত করে বরকত হাসিল করা যা কোন সাহাবি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন দসায় বা ওফাতের পর করেনি। বরকত হাসিলের জন্য ক্বাবা ঘরের গিলাফ, যে কোন মসজিদ বা মাজারের দেয়াল, মাটি, জানালা, দরজা ইত্যাদি চুমু খাওয়া হারাম ও শির্ক।  যেহেতু বরকত গ্রহন ইবাদাত (নেকির কাজ) তাই এই সকল কাজ শির্কের মধ্যে গন্য হবে। তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বস্তু দ্বারা বরকত হাসিল কে মুর্তি পুজার সাথে তুলানা করছেন।

আবু ওয়াকিদ আল লাইছী (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, “আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে হুনাইনের উদ্দেশ্যে রওযানা হলকম। আমরা সবে মাত্র ইসলাম গ্রহন করছি। একস্থানে পৌত্তুলিকদের একটি কুলগাছ ছিল যার চারপাশে তারা বসতো এবং তাদের সমরাস্ত্র ঝুলিয়ে রাখতো। গাছটিকে তারা যাত আনওয়াত বলতো। আমরা একদিন একটি কুলগাছের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল মুশরিকদের যেমন ‘যাতু আনওয়াত’ আছে আমাদের জন্যও অনুরূপ ‘যাতু আনওয়াত’ (অর্থাৎ একটি গাছ) নির্ধারণ করে দিন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আল্লাহু আকবার, তোমাদের এ দাবীটি পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতি ছাড়া আর কিছু্‌ই নয় যার হাতে আমার জীবন তার কসম করে বলছি, তোমরা এমন কথাই বলেছো যা বনী ইসরাইল মূসা আলাইহিস সালাম কে বলেছিল, হে মূসা, মুশরিকদের যেমন মা’বুদ আছে আমাদের জন্য তেমন মা’বুদ বানিয়ে দাও। মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, তোমরা মূর্খের মতো কথা বার্তা বলছ। আরাফ ৭:১৩৮)। তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের রীতি নীতিই অবলম্বন করছো। (তিরমিজি হাদিসটি সহিহ বলেছেন)। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

َّقَدۡ رَضِىَ ٱللَّهُ عَنِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ إِذۡ يُبَايِعُونَكَ تَحۡتَ ٱلشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِى قُلُوبِہِمۡ فَأَنزَلَ ٱلسَّكِينَةَ عَلَيۡہِمۡ وَأَثَـٰبَهُمۡ فَتۡحً۬ا قَرِيبً۬ا (١٨) 

অর্থঃ আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে তোমরা কাছে বাইয়াত করছিলো৷  তিনি তাদের মনের অবস্থা জানতেন৷ তাই তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করেছেন, পুরস্কার স্বরূপ তাদেরকে আশু বিজয় দান করেছেন৷  (সুরা ফাতহা ৪৮:১৮)

যে গাছর নীচে এ বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সে গাছির কোন আলাদা মর্জাদা সহাবাগন দেন নাই।  বুখারী, মুসলিমে এসেছে, ইবনে সা’দে হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েবের। তিনি বলেন, আমার পিতা বাইয়াতে রিদওয়ান শরীক ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছেন পরের বছর আমরা যখন উমরাতুল কাযার জন্য গিয়েছিলাম তখন গাছটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনুসন্ধান করেও তার কোন হদিস করতে পারিনি। হযরত উমর (রা) তাঁর খিলাফত কালে যখন হুদাইবিয়া অতিক্রম করেন তখন জিজ্ঞেস করেন, যে গাছটি নিজে বাইয়াত হয়েছিলো তা কোথায়৷ কেউ বলে, অমুক গাছটি এবং কেউ বলেন অমুকটি। তখন হযরত উমর (রা:) বলেন, এ কষ্ট বাদ দাও, এর কোন প্রয়োজন নেই।

সময় হিসাবঃ সাহাবিগন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর কখন তার জম্ম বা মৃতু বার্ষিকি পালন করেনি। ঈদে মিলাদন্নবী নাম করন করেনি। তেমনি ভাবে মিরাজের রাত্রি, অহুদ দিবস, বদর দিবস, হিজরত দিবস পালন করে নি। সময় এবং সুযোগ তাদের ছিল। তারা আমাদের চেয়ে দিন ভাল বুঝতেন। সুতারং সাহাবিগন যা করেনি তাতে কোন বরকত হতে পারে না বরং তা বিদাআতি কাজ হবে।

মন্তব্যঃ মদিনা নগরীর ফজিলত, মদিনার মসজিদে নব্বীর আলাদা ফিজিলত থাকলেও উপরের আলোচনা এ কথা ষ্পষ্ট যে মদিনার মাটির বিষেশ কোন বরকত নাই। কোন সাহাবি (রাঃ) বা আমাদের সালাফগন মদিনার মাটিতে আলাদা মর্জাদা প্রদান করেছেন বলে কোন প্রমান নাই। তাই বরকত হাসিলের জন্য মদিনার মদীনার মাটি বয়ে নিয়ে বেড়ানো বিদআত কাজ হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের মাটি মর্জদা নিয়ে বাড়াবাড়ি

অনেক বিদআতি আলেম বিশ্বাস করে থাকেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের মাটি কাবা, আরশ কুরছি ও লওহে মাহফুজ থেকে শ্রেষ্টতাদের এই ধরনে বিশ্বাসের কোন দলিল কুরআন ও সহিহ সুন্নায় পাওয়া যায় না।

আলমুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদএ বর্ণিত, মক্কামদিনার আলমগনের প্রথম প্রশ্নের উত্তরের শেষ দিকে বলা হয়েছে, “রাওদ্বা পাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বশরীরে অবস্থায় করছেন। মুবারক দেহ স্পর্শী এ রওদ্বাখানি কেন বস্তত, কাবা শরীফ এমনকি আল্লাহর আরশ ও কুরশী থেকে ও উত্তমএ সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরাম এর বিশদ আলোচনা করেছেন। 

শইখুল হাদিস হযরত জাকারিয়া শাহারানপুরী (রহ), ফাজায়েল হজ্জ্বে লিখেন “” যেই জায়গা হুজুরে পাক () এর শরীর মোবারকের সহিত মিলিত আছে, উহা আল্লাহরপাকের আরশ হইতেও শ্রেষ্ট, কাবা হইতেও শ্রেষ্ট, কুরছি হইতেও শ্রেষ্ট, এমনকি আশমান জমিনের মধ্যে অরস্থিত যে কোন স্থান হইতেও শ্রেষ্ট,।। (ফাজায়েল হজ্জ্ব, পৃষ্ঠা নম্বর ১১৯, একমাত্র পরিবেশক তাবলীগী কুতুর খানা, প্রকাশ কাল অক্টোবর ২০০৫)

মন্তব্যঃ আকিদার ক্ষেত্র কোন অনুমান বা কল্পনার দ্বারা প্রমানিত হবে না। আকিদা বা বিশ্বাসের বিষয়টি সরাসরি কুরআন অথরা সহহি হাদিসে উল্লেখ থাকবে হবে। আর যদি আমাদের বুঝে না আছে তবে চুপ থাকতে হবে।

ছোট ছিদ্র পথে বরকত লাভের আশায় হাত ঢুকানো

মসজিদে নব্বীতে প্রবেশের অনেকগুলো গেট বা দরজা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারতে জন্য পশ্চিম পাশে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। এই গেট বা দরজাকে ‘বাবুস সালাম’ বলা হয়। বাবুস সালাম দিয়ে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারতের পর পূর্ব দিকের গেট দিয়ে বাহির হতে হয়। এই পূর্ব পাশের গেটকে ‘বাবুল বাকি’ বলা হয়। বাবুস সালাম বা পশ্চিম পাশের গেট দিয়ে ঢুকে সামান্য অগ্রসর হলে হাতের ডানে ইমাম সাহেবের মিম্বার। এখানে দাড়িয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের ইমামি করতেন। এই মিম্বার থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর স্থান কে রিয়াযুল জান্নাহ বা বেহেস্তের বাগান বলা হয়। এর পর কিছু দুর অর্থাৎ রিয়াযুল জান্নাহ অতিক্রম করলেই হাতে বামে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর। এই স্থানটি একটি ওয়াল দ্বারা আটকানো কোন অস্থায়ই কবর সরাসরি দেখতে পাওয়া যাবে না। তবে কবরকে বুঝাতে ওয়ালে পাশে ছোট ছোট তিনটি ছিদ্র আছে।

প্রথম যে ছিদ্রটি চোখে পড়বে ইহা অন্য দুটি ছিদ্র অপেক্ষা একটু বড়। এই ছিদ্র বরাবর আছে আমাদের সাবার প্রিয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর। এর পরের ছোট দুটি ছিদ্র প্রথমটি বরাবর আছে আবু বক্কর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবর ও দ্বিতীয়টি বরাবর আছে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কবর।  অনেক অজ্ঞ লোক বরকত লাভের আশায় এই সকল ছোট ছিদ্র পথে হাত ঢুকিয় দেয়। বরকত লাভে আশায় এমন কাজ করা শির্ক। কেননা, মহান আল্লাহ ছাড়া কেউই বরকত প্রদানের মালিক নয়। তবে কোন কারন ছাড়া না বুঝে এমনতে হাত ঢুকালে কোন গুনাহ হবে না। তবে এমন কাজ না করাই ভাল। পৃথিবীর শ্রেষ্ট মানবের কবরের সামনে আজোবাজে কাজ না করে, বিনীতভাবে মহান আল্লাহ কাছে দোয়া ও জিকিরের মাধ্যমে সময় কাটান উত্তম। আল্লাহু আলাম।।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  চতুর্থ কিস্তি

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কবর যিয়ারতের ত্রুটিসমূহ :  চতুর্থ কিস্তি

মুহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত জীবিত মনে করে কিছু চাওয়াঃ

অনেক অজ্ঞ মুসলিম মনে কর থাকে, রাসুলুল্লাহ এর ওফাত পরবর্তী জীবন আমাদের দুনিয়ার জীবনের মত। আমাদের সমাজে বলেন, নবীগণ কবরে জীবিত বা মৃত দুটি বিশ্বাসই প্রচলিত। আবার কারো বিশ্বাস তিনি কবরে হুবহু দুনিয়ার মতই জীবিত যাপন করছেন। অনেকেরতো আবার বিশ্বাস করেন, তিনি মারাই যাননি। তবে মারা গেছেন এমন বিশ্বাস ও আছে। কাজেই বিষয়টি নিয়ে সাধারন মুসলিমদের মধ্যে মহাবিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এই আকিদার কারনে অনেক মুসলিম রাসুলুল্লাহ এর এর কবর জিয়ারত করতে গিয়ে এমন বিষয় চেয়ে বসেন যা মুলত আল্লাহ নিকট চাওয়া যায় ফলে তারা শির্কে আকবর করে বসেন। এই জন্য বিষয়টি একটি পরিস্কার করছি। মানুষ মাত্রই মরণশীল এমন কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহম্মদ ও এর উর্দ্ধে নন। আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেনঃ

 إِنَّكَ مَيِّتٌ۬ وَإِنَّہُم مَّيِّتُونَ (٣٠) 

অর্থ: নিশ্চয়ই তুমিও মারা যাবে, এবং নিশ্চয়ই তারাও মারা যাবে। (জুমার  ৩৯:৩০)।

২.     প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আমাদের নবী মুহম্মদ আমাদের মত একজন মানুষ ছিলেন। নিম্নের আয়াতট দুটি তার দলিলঃ। সুরা আনকাবুদের ৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেন:

كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٥٧)

অর্থ: প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। সবশেষে তোমাদের আমার নিকট ফিরিয়ে আনা হবে। (আনকাবুদ ২৯:৫৭)।

আর সূরা কাহাফে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, আমাদের নবী মুহম্মদ আমাদের মত একজন মানুষ ছিলেন। এরশাদ হচ্ছ:

 قُلۡ إِنَّمَآ أَنَا۟ بَشَرٌ۬ مِّثۡلُكُمۡ يُوحَىٰٓ إِلَىَّ أَنَّمَآ إِلَـٰهُكُمۡ إِلَـٰهٌ۬ وَٲحِدٌ۬‌ۖ فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلاً۬ صَـٰلِحً۬ا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦۤ أَحَدَۢا (١١٠)

অর্থঃ (হে রাসুল) আপনি বলে দিন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহী করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে’। [সূরা আল্ কাহাব- ১৮:১১০]

৩.     জম্মিলে মৃত্যু আছে, একথটি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য সে মানব শিশু হোক বা অন্য কিছু। যে দিন সে পৃথিবীতে জন্ম লাভ করে, তার পরের দিন থেকেই শুরু হয় তার মৃত্যুর দিকে পথযাত্রা। প্রতিটি জীবন মানেই মৃত্যু। নবী রসুলেরাও এর ব্যতিক্রম নয়। এর উর্দ্ধে নয় কোন অলী আওলিয়া বা কোন পূণ্যাত্মা মানুষ। পাপী ও পূণ্যাত্মা সকলেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে। পুর্বের কোন নবী বা রাসুল ও এর উর্দ্ধে ছিলন না। কাফেররা মুহম্মদ কে বিদ্রূপ করতো যে তিনি যদি সত্য নবী হন তবে মৃত্যু তাঁকে স্পর্শ করবে না। এরই প্রেক্ষিতে উক্ত আয়াত নাজেল হয়। আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা এরশাদ করেন:

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ۬ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَ‌ۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَـٰلِدُونَ (٣٤) كُلُّ نَفۡسٍ۬ ذَآٮِٕقَةُ ٱلۡمَوۡتِ‌ۗ وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةً۬‌ۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ (٣٥) 

অর্থ: (পৃথিবীতে) তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান করা হয় নাই। সুতারাং তোমার মৃত্যু হলে ওরা কি চিরদিন বেঁচে থাকবে ? প্রতিটি আত্মাকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি। আমারই নিকট তোমরা ফিরে আসবে, (আম্বিয়া ২১:৩৪-৩৫)।

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, যে সময় রাসূলুল্লাহ ﷺইনতিকাল করলেন, তখন উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, “কতকগুলো মুনাফিক বলে বেড়াচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺমারা গেছেন। আল্লাহর কসম, তিনি মারা যাননি। তিনি কেবল মূসা আলাইহিস সালামের মত সাময়িকভাবে আল্লাহর কাছে গিয়েছেন। মূসা (আ) চল্লিশ দিনের জন্য আল্লাহর কাছে গিয়েছিলেন। তখন প্রচার করা হয়েছিল যে, তিনি মারা গেছেন। অথচ তার পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম, মূসার (আ) মত রাসূলুল্লাহ ﷺআবার ফিরে আসবেন। এখন যারা বলছে যে তিনি মারা গেছেন, তাদের হাত পা কেটে দেয়া হবে।” আবু বাক্কর (রা:) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালেরর খবর জানতে পেরে ছুটে এলেন। উমার (রা) তখনও ঐ কথা বলে চলেছেন। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি আয়িশার (রা) ঘরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে চলে গেলেন। তখন তাঁকে ইয়ামনী কাপড় দিয়ে ঘরের এক কোণে ঢেকে রাখা হয়েছিল। এগিয়ে গিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের কাপড় সরিয়ে চুমু খেলেন। অতঃপর বললেন, “আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছিলেন তা আপনি আস্বাদন করেছেন। এরপর আপনার কাছে আর কখনো মৃত্যু আসবে না।” অতঃপর মুখ ঢেকে দিলেন। তারপর বাহিরে বেরিয়ে দেখেন উমার (রা) সেই একই কথা বলে চলেছেন। তিনি বললেন, “উমার। তুমি ক্ষান্ত হও। চুপ কর।” উমার (রা) কছিুতেই থামতে রাজী হচ্ছিলেন না। এ অবস্থা দেখে আবু বাক্কর (রা:) জনগণকে লক্ষ্য করে কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর কথা শুনে জনতা উমারকে (রা) রেখে তাঁর দিকে এগিয়ে এল। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন,

“হে জনমন্ডলী, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের পূজা করতো সে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত করতো সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর।” তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-

 وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ۬ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُ‌ۚ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوۡ قُتِلَ ٱنقَلَبۡتُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَـٰبِكُمۡ‌ۚ وَمَن يَنقَلِبۡ عَلَىٰ عَقِبَيۡهِ فَلَن يَضُرَّ ٱللَّهَ شَيۡـًٔ۬ا‌ۗ وَسَيَجۡزِى ٱللَّهُ ٱلشَّـٰڪِرِينَ (١٤٤) 

 অর্থ: মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বৈ আর কিছুই নন। তার পূর্বে বহু রাসূলস অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথোচিত পুরস্কার দেবেন।” (আলে ইমরান-৩:১৪৪)।

এরপর মানুষের মধ্যে এমন ভাবান্তর ঘটলো যে, মনে হচ্ছিল তারা যেন আবু বাক্করের মুখে শোনার আগে এ আয়াত কখনো শোনেইনি। তার আয়াতটি আবু বাকরের কাছ থেকে মুখস্থ করে নিল এবং অনবরত তা আবৃত্তি করতে লাগলো। আবু হুরাইরা বলেন,, উমার (রা) বলেছেন, “আবু বাক্করের মুখে এ আয়াত শোনার পর আমি হতবাক ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে গেলাম। পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। আমি তখনই অনুভব করলাম যে,, রাসূলুল্লাহ ﷺসত্যিই ইনতিকাল করেছেন। সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রকাশনীঃ বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার

রাসুলুল্লাহ এর মারা গেছেন কিনা এ সম্পর্কে আর কিছু কি বলার আছে। রেফারেন্সগলি তুলে ধরলাম, এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের। এবার দেখা যাক রাসুলুল্লাহ এর ওফাত পরবর্তী জীবন কেমন।

যারা বলেন রাসুলুল্লাহ এর মারা তারা দলিলঃ হিসাবে কুরআনের সুরা বাকারা ও সুরা আল- ইমরান দুটি আয়াত পেম করেন।  আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেনঃ

وَلَا تَقُولُواْ لِمَن يُقۡتَلُ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمۡوَٲتُۢ‌ۚ بَلۡ أَحۡيَآءٌ۬ وَلَـٰكِن لَّا تَشۡعُرُونَ (١٥٤) 

অর্থ: আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না৷ এই ধরনের লোকেরা আসলে জীবিত৷ কিন্তু  (তাদের জীবন সম্পর্কে) তোমারা কোন উপলব্ধি করতে পার না, (বাকারা ২:১৫৪)।

আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেনঃ

وَلَا تَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمۡوَٲتَۢا‌ۚ بَلۡ أَحۡيَآءٌ عِندَ رَبِّهِمۡ يُرۡزَقُونَ (١٦٩) 

অর্থ: “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের কখনই মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত, এবং তাদের রবের নিকট হতে তারা রিযিকপ্রাপ্ত। [আল- ইমরান ৩: ১৬৯]

কুরআনের আয়াতদুটিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, শহীদগণ মৃত নন, তারা জীবিত ও রিযিক পাচ্ছেন। আমরা জানি, বারযাখে সমস্ত মানুষেরই এক ধরনের জীবন আছে। আপনি যদি মুসলিম হন তবে অবশ্যই কবরের ছওয়াল জওয়াব বিশ্বাস করেন, কবরের আযাব/শান্তি বিশ্বাস করেন। আর এসব কোন প্রানহীন মানুষর পক্ষে ঘটা সম্ভব নয়। কাজেই এটাও জীবন কিন্তু এই জীবন সাধারণ দুনিয়ার জীবনের মত নয়। এই জীবনটাকে বলা হয় “হায়াতুন বারযাখিয়া’। শহীদের এই বারযাখি জীবন সাধারণ লোকদের বারযাখি জীবনের চেয়ে ভিন্নতর কারন কুরআনে শহীদের সেই জীবন যেভাবে জীবিত ও রিজিক প্রাপ্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারন লোকের জীবনের কথা তেমনিভাবে উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু এর অর্থ যদি আমরা এভাবে করি যে, শহীদগন দুনিয়ার জীবনের মত চলাফেরা করেন খাওয়া দাওয়া করেন, তবে নিতান্তই ভুল হবে। তাদের জীবন সম্পর্কে ব্যাখ্যা বিশ্লষন করা খুবই নির্বুদ্ধিতার কাজ। কারন আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে (۬ وَلَـٰكِن لَّا تَشۡعُرُونَ) ‘তোমারা কোন উপলব্ধি করতে পার না’। এরপরও উপলব্ধি করার চেষ্টা করা বা ব্যাখ্যা বিশ্লষন করে সাধারন দুনিয়ার জীবনের মত মনে করা কত টুকু যুক্তি সংগত হবে। শহীদদের ওফাত পরবর্তী জীবন সাধারণের জীবনের চেয়ে ভিন্নতর কুরআনে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নবীদের কথা তেমনিভাবে উল্লেখ করা হয়নি। যেহেতু আল্লাহর কাছে নবীদের মর্যাদা শহীদের চেয়েও অনেক বেশি। কাজেই ওফাত পরবর্তী জীবন শহীদের জীবনের চেয়ে নবীদের জীবন ভিন্নতর হওয়ার কথা অধিকাংশ আলেম উল্লেখ করেছেন। তাহলে বুঝতে পাররাম সাধারন মুসলিম, শহীদ ও নবীদের ওফাত পরবর্তী জীবনের (বারযাখি জীবনের) মধ্যে পার্থক্য আছে। ওফাত পরবর্তী জীবন বা বারযাখি জীবন সম্পর্কে হাদিসে সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকায় জন্য কারো কোন মতভেদ নাই।

যেহেতু সাধারন মুসলিম, শহীদ ও নবীদের বারযাখি জীবনের মধ্যে পার্থক্য আছে। আর পার্থক্য না জানার জন্যই মুলত আমরা এ সম্পর্কে মহা বিভ্রান্তে পতিত হই। এই পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে কুরআন হাদিসের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বারযাখি জীবনের কথা একটি গায়েবি বিষয় কাজেই অহী ছাড়া কথা বলা যাবে না। অহীর ব্যাখ্যা রাসুলুল্লাহ যেভাবে করছেন, সাহাবিগন রাজি: যেভাবে বুঝছেন, সলফে সালেহীন যেভাবে পালন করছেন তার ব্যতিক্রম গ্রহনীয় নয়। মৃত্যু পরবর্তী জীবন বা বারযাখি জীবন তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়ঃ

১.  সাধারন মুসলিম বা অমুসলিমদের বারযাখি জীবন

২.  শহীদের বারযাখি জীবন

৩.  নবীদের বারযাখি জীবন

সকলের কাছে এ ব্যাপারটি স্পষ্ট যে মৃত্যুর পর সকলেনই বারযাখি জীবন ভোগ করতে হয়। সাধারন মুমিন, মুনফিক, কাফির ও ইয়াহুদীদের  বারযাখি জীবনে জীবিত থাবকে। মুমিনকে জান্নাত দেখান হবে, সামান্য অন্যায়ে আযাব দেওয়া হবে। মুনফিক ও কাফির আযাবে যন্ত্রনায় চিত্কার করবে।  ইয়াহুদী, খৃষ্টান ও কাফির সকলকেই আযাব ভোক করতে হবে। যার অর্থ হল এদের সললেরই বারযাখি জীবন আছে। যদি কেউ বলে, এরা সকলে আযাবে যন্ত্রনায় চিত্কার করছে, কাজেই দুনিয়ার জীবনের সাথে তাদের জীবনের সাদৃশ্য আছে। যেমনটি শহীদদের ব্যাপারে অনেকে বলে থাকেন:  আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালা বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের কখনই মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত, এবং তাদের রবের নিকট হতে তারা রিযিকপ্রাপ্ত, (আল- ইমরান ৩: ১৬৯)। আল্লাহ্‌ সুবাহানাহুয়াতালার স্পষ্ট ঘোষনা শহীদগন জীবিত ও রিজিক প্রাপ্ত। এ থেকেও বুঝা যায় দুনিয়ার জীবনের সাথে  শহীদদের বিশেষ জীবনের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। কারন দুনিয়ার জীবনে খাবার খেতে হয়। আর ও একটু বাড়িয়ে বলা যায়, নবীদের মর্যাদা শহীদের চেয়েও অনেক বেশি তাই দুনিয়ার জীবনের সাথে নবীদের জীবনের অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। তাই তারা মরে নাই, তারা জীবিত, খাবার খায়, তারা হাজির নাজির ইত্যাদি ইত্যাদি। কাজেই তাদের বারযাখি জীবন ও সাধারণের জীবনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এভাবে যুক্তির দ্বারা মানুষকে ঘাস খাওয়ান যায় কিন্তু যুক্তির দ্বারা তৈরি আকিদা গ্রহনীয় নয়। যেমন: কেউ বলল মানুষ ঘাস খায়। আপনি বললেন কিভাবে? সে বলল, গরু ঘাস খায়। আর মানুষ গরু খায়। আপনি বললেন, না মানুষ মাংশ খায়। সে যুক্তি দিল মাংশতো ঘাস খাওয়ার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে। আপনি বললেন ও বুঝেছি, এভাবেই মানুষ ঘাস খায়। 

 বলেছিলাম যে, শহীদগন জীবিত ও রিজিক প্রাপ্ত। তাই  তাদের সাথে দুনিয়ার জীবনে সাদৃশ্য রয়েছে। সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য দেখানোর প্রয়োজন নেই। হাদিসে রাসুলুল্লাহ ওফাত পরবর্তী জীবন সম্পর্কে যা বলছেন তা মোনে নেওয়াই মুমিদের কাজ।   

 সহীহ মুসলিম বর্নিত, হযরত আনাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন:- ‘আমি মিরাজের রাতে (বাইতুল মাকদিসের পাশে) লাল বালুর ঢিবির কাছে মূসা আ.-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছি। তখন তিনি তাঁর কবরে দাড়িয়ে নামায আদায় করছিলেন”।

এই হাদিসটি বর্ননা করে বলে, যেহেতু মুসা (আ:) কবরে দাড়িয়ে নামায আদায় করছিলেন, সুতারং তিনি জীবিত।  অথচ সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারি, নাসাঈ শরীফসহ অনেক গ্রন্থে পাওয়া যায় মিরাজের রাতে ষষ্ঠ আসমানের হযরত মুসা (আঃ)-এর সাক্ষাৎ পান। তিনি রাসূলুল্লাহ কে মারহাবা দেন ও কল্যাণের জন্য দুআ করলেন। ফিরে আসার সময় মুসা (আঃ)-এর পরামর্শে আল্লাহর নিকট থেকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত কমিয়ে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরজ করে নিয়ে আসেন। তাই বলে কি তিনি ষষ্ঠ আসমানের থাকেন? আমাদের আকিদা হবে, মুসা (আ:) কবরে দাড়িয়ে নামায আদায় করেন আবার  আল্লাহর ইচ্ছায় ষষ্ঠ আসমানে ও থাকেন। বারযাখী হায়াত সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন।

এ হিসাবেতো মুমিন, মুনফিক, কাফির ও ইয়াহুদী এমনকি পরনিন্দাককারী, পেশাবের ব্যাপারে অসতর্কতা অবলম্বনকারি সকলেই জীবিত। এমনি ভাবে আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করে সাধারন মানুষকে মহাবিভ্রান্তিতর ফেলে দেয়। কাজেই কোন আকিদার প্রশ্ন আসলে, আপনি যুক্তি না খুজে দলিলঃ খুজবেন।

রাসুলুল্লাহ এর ওফাত পরবর্তী জীবন বা বারযাখি জীবন ও সাধারণের জীবনের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি নেই তার জন্য কোন ব্যাখ্যা প্রয়োজন নেই। দরকার শুধুই কুরআন হাদিসের মতামত। নবীগণের বিষয়ে কুরআন কারীমে কিছু না বলা হলেও সহীহ হাদীসে তাঁদের মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে এখন শুধু সহিহ হাদিসগুলি উল্লেখ করব। দেখবেন একজন বুদ্ধিমান জ্ঞানি মানুষ হিসাবে আপনি নিজেই বলতে পারবেন আসল ব্যাপারটি কি?

০১. আনাস ইবনু মালিক (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ বলেন, ‘‘নবীগণ তাঁদের কবরের মধ্যে জীবিত, তাঁরা সালাত আদায় করেন।’’ (সিলসিলাতুস সহীহা, হাদীস ৬২১)

২. রাসুলুল্লাহ এর ইন্তিকাল পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ বলেন, ‘‘যখনই যে কেউ আমাকে সালাম করে তখনই আল্লাহ আমার রূহকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেন, যেন আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি।’’ (আবূ দাউদ ২০৪১)

৩. আউস (রা) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর একটি হল জুমার দিন। এ দিনেই আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ দিনেই শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে, আর এ দিনেই সকল প্রাণী মৃত্যুবরণ করবে। সুতরাং এ দিনে তোমরা আমার উপর বেশি করে ছালাত ও সালাম পাঠাও। তোমাদের ছালাত আমার কাছে পেশ করা হবে। সাহাবাগণ বললেন, আমাদের ছালাত আপনার কাছে কীভাবে পেশ করা হবে, তখন যে আপনি (মাটির সাথে মিশে) ক্ষয়প্রাপ্ত (নিঃশেষিত) হয়ে যাবেন? নবী বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মাটির জন্য নবীগণের দেহ খাওয়াকে হারাম করে দিয়েছেন’। (আলবানী, আস সহীহা  ১৫৩০; সুনানে আবু দাউদ ১০৪৭, মুসনাদে আহমাদ ১৬১৬২)

৪. রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেন। “আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত একদল ফেরেশতা রয়েছেন যারা দুনিয়াতে ঘুরে বেড়ান এবং আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছে দেন। (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৯১৪)

উপরের সহিহ হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ কে মৃত্যু পরবর্তী জীবন দান করা হয়েছে। এ জীবন হল, তার বারযাখী জীবন। যা সম্পর্কে মনগড়া ইচ্ছামতন বানিয়ে বানিয়ে বলা সম্পুর্ন হারাম।  রাসূলুল্লাহ এর এই বারযাখী জীবনটা তার বিশেষ সম্মান ও মর্জাদার বহন করে। যেহেতু এটি গায়েবী জগতের খবর তই এ বিষয়ে হাদীসে যতটুকু বলা হয়েছে ততটুকুই বলতে হবে, এর বেশী বাড়ান বা কমান যাবে না। হাদীসের আলোকে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ এ অলৌকিক বারযাখী জীবন অনেক ঘটনা ঘটছে যা সাধারন মুমিন থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। রাসূলুল্লাহ এর এই অলৌকিক বারযাখী জীবনের বৈশিষ্ট হল;

১. তার এই জীবনে সালাত আদায়ের সুযোগ রয়েছে।

২. কেউ সালাম দিলে আল্লাহ তাঁর রূহ মুবারাককে ফিরিয়ে দেন সালামের জবাব দেয়ার জন্য।

৩.  নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মাটির জন্য তার দেহ খাওয়াকে হারাম করে দিয়েছেন।

মন্তব্যঃ হায়াতুন্নাবী বলতে অনেকে বুঝে থাকে রাসূলুল্লাহ ওফাত পরবর্তী জীবন জাগতিক জীবনের মতই। এ ধারণাটি ভুল এবং তা কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবীগণের রীতির পরিপন্থী। রাসূলুল্লাহ মৃত্যু পরবর্তী পরের ঘটনাগুলো হাদীসগ্রন্থগুলোতে পাঠ করলেই আমরা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, সাহাবীগণ তাকে কখনোই জাগতিক জীবনের অধিকারী বলে মনে করেন নি। তাই তার ওফাতের পর একজন সাধারন মুমিনের মৃত্যর পর তার সাথে যে রকম করার আদেশ তিনি দিয়ে ছিলেন তার তার সাথেও ঠিক তেমনি আচরন করা হইয়াছে। যেমন গোসল করান, দাফন করা।

 রাসূলুল্লাহ জীবদ্দশায় তার পরামর্শ, দোয়া ও অনুমতি ছাড়া কোন সাহাবি কিছু করছেন বলে প্রমান পাওয়া যায় না। কিন্তু তার ওফাতের পরে কখনো কোনো সাহাবী তার কবরে দোয়া, পরামর্শ বা অনুমতি গ্রহণের জন্য আসেন নাই।

ইতিহাস গ্রন্থ পড়লে দেখা যায় তার ওফাতের পরে খলীফা নির্বাচনের বিষয়সহ সাহাবীগণ বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছেন। নিজেদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির জন্য যুদ্ধবিগ্রহ করেছেন। আবু বকর (রা)-এর খিলাফত গ্রহণের পরই অনেকে জাকাত দিতে অস্বীকার করে,  প্রায় আধা ডজন ভন্ড নবী দাবি করে বসে এবং আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ শুরু হয়। উম্মুল মুমিনীন আয়েশার (রা) সাথে আমীরুল মুমিনীন আলীর (রা) কঠিন যুদ্ধ হয়েছে, আমীর মুয়াবিয়ার (রা) সাথেও তার যুদ্ধ হয়েছে। হাজার হজার সাহাবি শহীদ হয়েছেন। তার কলিজার টুকরা ফাতিমর (রাদি:) পুত্র হোসাইন (রাদি:) কারবালায় নির্মমভাবে শহীদ হন। এই ভয়াবহ বিপদের সময় কোনো খলিফা (রা) বা  সাহাবী (রা) তার কবরে কাছে দোয়া বা পরামর্শের জন্য গিয়েছেন বলে জানা যায়না। আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্যও কবর শরীফে সমবেত হয়ে কোনো অনুষ্ঠান করেন নি। এমনকি কারো কাছে রাসূলুল্লাহ রূহানীভাবেও প্রকাশিত হয়ে কিছু বলেন নাই এবং কাউকে সপ্নের মধ্যে ও নির্দেশ দেন নাই। জালিয়াতগন হযরত ওমরের (রা) পক্ষে বিপক্ষে, হযরত আলীর (রা) পক্ষে বিপক্ষে হাদিস বানিয়েছেন। কিন্তু ওফাতের পরে রাসূলুল্লাহ কবর থেকে বা রূহানীভাবেও প্রকাশিত হয়েছে অথবা সাহাবীগণের মাজলিসে এসে কোন পরামর্শ দিয়েছেন বলে হাদিস জাল করতে সাহস পাননি। সুতারং রাসূলুল্লাহ ওফাত পরবর্তী জীবন জাগতিক জীবনের মত মনে করা চরম বোকামি ছাড়া কিছু না।

এই ভ্রান্ত আকিদার ফলঃ

এই ভ্রান্ত আকিদা নিয়ে আমাদের উপমহাদেশ থেকে যারাই হজ্জের সফরে যান। তারা নিজে সালাম দেয়ার পাশাপাশি অন্যদের সালামও পৌছান। যার প্রমান আমাদের সালাফদের মাঝে ছিল না। অনেকে রাসুলুল্লাহ কে জীবিত মনে করে দুনিয়ার হাজত পুরা করার জন্য দোয়া করে থাকে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেও তার নিজের হাজত সব সময় মহান আল্লাহর নিকট পেশ করতেন। তারা এই বিশ্বাস রাখে রাসুলুল্লাহ এখন সরাসরি তাদের দেখছেন এবং তাদের ফরিয়াদ শুনছেন। এহেন বিশ্বাস নিয়ে রাসুলুল্লাহ এর কবর জিয়ারত করতে গেলে সওয়াবতো অনেক দুরের কথা, মুসরীক হয়েই ফিরে আসার সম্ভাবনা  থাকে।   

রাসুলুল্লাহ ﷺজম্ম এবং নাম

রাসুলুল্লাহ জম্ম এবং নাম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল কুরআনের বাণী :

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন-

وَاِذۡ قَالَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ مُّصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیَّ مِنَ التَّوۡرٰىۃِ وَمُبَشِّرًۢا بِرَسُوۡلٍ یَّاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِی اسۡمُہٗۤ اَحۡمَدُ ؕ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ قَالُوۡا ہٰذَا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ

অনুবাদ : আর যখন মারইয়াম পুত্র ঈসা বলেছিল, ‘হে বনী ইসরাঈল, নিশ্চয় আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল। আমার পূর্ববর্তী তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম আহমদ’। অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল, ‘এটাতো স্পষ্ট যাদু’। সুরা সফ : ০৬

হাদিস নম্বর-০১ :: রাসুলুল্লাহ ﷺ সোমবার জম্ম গ্রহণ করেন।

وَحَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا مَهْدِيُّ بْنُ مَيْمُونٍ، عَنْ غَيْلاَنَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَعْبَدٍ الزِّمَّانِيِّ، عَنْ أَبِي قَتَادَةَ الأَنْصَارِيِّ، ر  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَأَنَّرَسُولَ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ الاِثْنَيْنِ فَقَالَ ‏ “‏ فِيهِ وُلِدْتُ وَفِيهِ أُنْزِلَ عَلَىَّ ‏”‏ ‏

অনুবাদ : আবূ কতাদাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে সোমবারের সওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ঐদিন আমি জন্মলাভ করেছি এবং ঐদিন আমার উপর (কুরআন) নাযিল হয়েছে।

সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৬, মিশকাত : ২০৪৫, আহমাদ : ২২৫৫০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ৮৪৩৪, শুআবূল ঈমান : ১৩২৩। হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর -০২ :: রাসুলুল্লাহ এর জম্ম গ্রহণের বছর

حَدَّثَنَا أَحْمَدُ ابْنُ أَبِيْ رَجَاءٍ حَدَّثَنَا النَّضْرُ عَنْ هِشَامٍ عَنْ عِكْرِمَةَ عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ أُنْزِلَ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَهُوَ ابْنُ أَرْبَعِيْنَ فَمَكَثَ بِمَكَّةَ ثَلَاثَ عَشْرَةَ سَنَةً ثُمَّ أُمِرَ بِالْهِجْرَةِ فَهَاجَرَ إِلَى الْمَدِيْنَةِ فَمَكَثَ بِهَا عَشْرَ سِنِيْنَ ثُمَّ تُوُفِّيَ صلى الله عليه

অনুবাদ : ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উপর যখন (ওহি) নজিল করা হয় তখন তাঁর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। অতঃপর তিনি মক্কা্য় তের বছর অবস্থান করেন। অতঃপর তাঁকে হিজরত করার আদেশ দেয়া হয়। তিনি হিজরত করে মদিনা্য় চলে গেলেন এবং সেখানে দশ বছর অবস্থান করলেন, তারপর তাঁর মৃত্যু হয় ﷺ। সহিহ বখারি : ৩৮৫১, ৩৯০২, ৩৯০৩, ৪৪৬৫, ৪৯৭৯

নোট : সহিহ হাদিস নিশ্চিত করে যে রাসুলুল্লাহ ﷺ ৪০ বছর বয়সে নবুওয়ত লাভ করেন।  ঐতিহাসিকভাবে, নবুওয়ত লাভের সময় ৬১০ খ্রিস্টাব্দ বলে নির্ধারিত হয়েছে। যদি রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বয়স তখন ৪০ বছর ধরা হয়, তবে হিসাব অনুযায়ী জন্ম সাল দাঁড়ায়—৬১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪০ বছর বাদ দিলে ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ হয়।  অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ ﷺ সম্ভবত ৫৭০ বা ৫৭১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছেন।

সঠিক সন নির্ধারিত না হলেও তিনি আমরে ফিল বা হাতির বছর জম্ম গ্রহণ করেন-

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম ‘হাতির বছর’ (عام الفيل) সংঘটিত হয়েছে। এ তথ্য সরাসরি সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না, তবে এটি বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক ও সিরাহ গ্রন্থগুলোতে উল্লেখিত আছে। অনেক প্রাচীন ইসলামি ঐতিহাসিক, তাবেয়ি এবং মুহাদ্দিসগণ একমত হয়েছেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেন।

বিশিষ্ট ইসলামি জীবনীকার ইবন ইসহাক (মৃত্যু: ১৫১ হিজরি) তাঁর সিরাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَعَامَ الْفِيلِ، وَذَلِكَ مَا اتَّفَقَ عَلَيْهِ أَهْلُ السِّيَرِ وَالْمَغَازِي.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন, এবং এটি সিরাহ ও মাগাজি (জিহাদ সম্পর্কিত ইতিহাস) বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত মত। সিরাতু ইবন হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৭৫-১৭৬

ইবন কাসির (মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি)  তার লিখিত ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’ গ্রন্থে বলেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفِي عَامِ الْفِيلِ وَهَذَا هُوَ الْمَشْهُورُ عِندَ الْجُمْهُورِ.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন, এবং এটি সাধারণ মুসলিম ঐতিহাসিকদের প্রসিদ্ধ মতামত। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৬০

ইবন সা’দ (মৃত্যু: ২৩০ হিজরি)  তার ‘আত-তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থে বলেন-

“وُلِدَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفِي عَامِ الْفِيلِ بِمَكَّةَ.”

অর্থ: রাসূলুল্লাহ ﷺ মক্কায় হাতির বছরে জন্মগ্রহণ করেছেন।

আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবন সাদ, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১০০

রাসূলুল্লাহ এর জন্ম গ্রহণের তারিখ :

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুনির্দিষ্ট জন্ম তারিখ সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিকগনের কাছে তারিখ সম্পর্কে ২০ এর অধিক মতামত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ ১২ রবিউল আউয়াল বেশি প্রসিদ্ধ হলেও সমকালীন সিরাত প্রণেত শফিউর রহমান মোবারকপুরি ৯ রবিউল আউয়াল তারিখটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

হাদিস নম্বর-০৩ :: রাসুলুল্লাহ অনেকগুলো নাম ছিল।

حَدَّثَنِيْ إِبْرَاهِيْمُ بْنُ الْمُنْذِرِ قَالَ حَدَّثَنِيْ مَعْنٌ عَنْ مَالِكٍ عَنْ ابْنِ شِهَابٍ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَلِيْ خَمْسَةُ أَسْمَاءٍ أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِيْ يَمْحُوْ اللهُ بِي الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِيْ يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِيْ وَأَنَا الْعَاقِبُ>

অনুবাদ : জুবায়র ইবনু মুত‘ঈম (রা.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন-

আমার পাঁচটি (প্রসিদ্ধ) নাম রয়েছে, আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, আমি আল-মাহী আমার দ্বারা আল্লাহ কুফর ও শির্ককে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন। আমি আল-হাশির আমার চারপাশে মানব জাতিকে একত্রিত করা হবে। আমি আল-আক্বিব (সর্বশেষে আগমনকারী)।

সহিহ বুখারি : ৩৫৩২, সহিহ মুসলিম : ২৩৫৪। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৪ :: রাসুলুল্লাহ এর সুন্দর নামসমূহঅ

أَبُو الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ قَالَ أَخْبَرَنِيْ مُحَمَّدُ بْنُ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيْهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَيَقُوْلُ إِنَّ لِيْ أَسْمَاءً أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِيْ يَمْحُو اللهُ بِيَ الْكُفْرَ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِيْ يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى قَدَمِيْ وَأَنَا الْعَاقِبُ.

যুবায়র ইবনু মুত’ইম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, আমার অনেকগুলো নাম আছে। আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ এবং আমি মাহী। আমার দ্বারা আল্লাহ্ তা’আলা সমস্ত কুফরী দূর করবেন। আমি হাশির, আমার পেছনে সমস্ত মানুষকে একত্রিত করা হবে এবং আমি ’আকিব, সকলের শেষে আগমনকারী।

সহিহ বুখারি : ৪৮৯৬; সহিহ মুসলিম : ৬২৫২: মুসনাদে আহমাদ : ১৬৫৮০; মুসনাদে বাযযার : ৩৪১৩; তাবারানী : ১৫০৪; ইবনে হিব্বান : ৬৩১৩। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৫ :: রাসুলুল্লাহ ইবরাহিম (আ.) এর দুআ, ঈসা (আঃ) এর সুসংবাদ, এবং তার মায়ের দেখা স্বপ্ন।

وَعَن العِرْباض بن ساريةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: إِنِّي عِنْدَ اللَّهِ مَكْتُوبٌ: خَاتَمُ النَّبِيِّينَ وَإِنَّ آدَمَ لِمُنْجَدِلٌ فِي طِينَتِهِ وَسَأُخْبِرُكُمْ بِأَوَّلِ أَمْرِي دَعْوَةُ إِبْرَاهِيمَ وَبِشَارَةُ عِيسَى وَرُؤْيَا أُمِّي الَّتِي رَأَتْ حِينَ وَضَعَتْنِي وَقَدْ خَرَجَ لَهَا نُورٌ أَضَاءَ لَهَا مِنْهُ قُصُورُ الشَّامِ

অনুবাদ : ইরবাজ ইবনু সারিয়াহ (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলার কাছে আমি তখনো ’খাতামুন্‌ নাবিয়্যিন’ হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিলাম যখন আদম আলায়হিস সালাম ছিলেন মাটির খামিরায়। আমি তোমাদেরকে আরো বলছি যে, আমার নুবুওয়াতের প্রথম প্রকাশ হলো ইবরাহীম আলায়হিস সালাম -এর দু’আ এবং ঈসা আলায়হিস সালাম -এর ভবিষ্যদ্বাণী আর আমার মায়ের সরাসরি স্বপ্ন, যা তিনি আমাকে প্রসবকালে দেখেছিলেন যে, তাঁর সামনে একটি আলো উদ্ভাসিত হয়েছে, যার আলোতে তিনি সিরিয়ার রাজ প্রাসাদ পর্যন্ত দেখতে পান।

মিশকাত : ৫৭৫৯, মুসনাদ আহমাদ : ১৭১৯১, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩৭৩, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ৯৭১৮, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬৪০৪, সুানানে দারিমী : ১৩, তবারানী : ১৫০৩৪। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি মিশকাত থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৬ :: রাসুলুল্লাহ এর জম্মের সময় সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الزُّبَيْرِ، عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “رَأَتْ أُمِّي حِينَ وَضَعَتْنِي نُورًا خَرَجَ مِنْهَا أَضَاءَتْ لَهُ قُصُورُ الشَّامِ.”​

অনুবাদ : উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

“আমার মা যখন আমাকে জন্ম দিলেন, তখন তিনি এক নূর দেখতে পেলেন, যা সিরিয়ার রাজপ্রাসাদগুলোকে আলোকিত করেছিল।” মুসনাদ আহমাদ : ১৭৫৫০; সহিহ লিগাইরিহি

হাদিস নম্বর-০৭ :: রাসূলুল্লাহ মক্কায় জম্ম গ্রহন করেন ও মদিনায হিজরত করেন।

 ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত-

তিনি কা’ব আল আহবারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: তুমি তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গুণাবলী কেমন পেয়েছ? কাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা তাওরাতে পেয়েছি যে, মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল্লাহ ﷺ মক্কায় জন্ম গ্রহণ করবেন, ত্ববাহ বা মদীনায় হিজরত করবেন, আর তাঁর রাজ্য শাম পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। আর অশ্লীলতার সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক থাকবে না, তিনি হাটে-বাজারে শোরগোলকারীও হবেন না, তিনি মন্দ আচরণের প্রতিদানে মন্দ আচরণ করবেন না, বরং তিনি ক্ষমা ও মার্জনা করবেন। আর তাঁর উম্মত মহান আল্লাহ’র অধিক হামদ বর্ণনাকারী, তারা সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহ’র প্রশংসা করবে, তারা অঙ্গসমূহ (ধুয়ে) ওযু করবে এবং প্রত্যেক উঁচু ভূমিতে (আরোহণ কালে) তাকবীর উচ্চারণ করবে। তারা ’ইযার’ বা তহবন্দ (এর নিম্নাংশ) পরিধান করবে তাদের (পায়ের গোছার) মাঝ বরাবর। তারা যেভাবে যুদ্ধে সারিবদ্ধ হবে, তারা তাদের সালাতেও তদ্রূপ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মসজিদসমূহে তাদের (তিলাওয়াত ও যিকিরের) আওয়াজ হবে মৌমাছির গুণগুণ আওয়াজের মত। আর তাদের আহ্বানকারীর আহ্বান (মুয়াযযিনের আযান) দূর আকাশে শোনা যাবে।

সুনানে আদ দারিমী : ০৮, ইবনু হিব্বান (রহ.) এ হাদীসের বর্ণনাকারী সম্পর্কে তার ‘আস সিক্বাত’ গ্রন্থে ইবনু আব্বাস থেকে তার যে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন তা সঠিক হলে এর সনদ সহিহ।

রাসূলুল্লাহ ﷺপিতামাতা ও বংশ পরিচিতি

রাসূলুল্লাহ  পিতামাতা ও বংশ পরিচিতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাদিস নম্বর-০১ :: রাসূলুল্লাহ  কুরাইশ গোত্রে জম্ম গ্রহণ করেন।

 حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مِهْرَانَ الرَّازِيُّ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَهْمٍ، جَمِيعًا عَنِ الْوَلِيدِ، – قَالَ ابْنُ مِهْرَانَ حَدَّثَنَا الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، – حَدَّثَنَا الأَوْزَاعِيُّ، عَنْ أَبِي عَمَّارٍ، شَدَّادٍ أَنَّهُ سَمِعَ وَاثِلَةَ بْنَ الأَسْقَعِ، يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ ‏ “‏ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ وَاصْطَفَى قُرَيْشًا مِنْ كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ ‏”‏ 

অনুবাদ : আবু আম্মার শাদ্দাদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা.) কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি-

আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল (আঃ) এর সন্তানদের মধ্য থেকে কিনানা গোত্রকে নির্বাচন করেছেন, কিনানা গোত্র থেকে কুরাইশ গোত্রকে নির্বাচন করেছেন, কুরাইশ গোত্র থেকে বনি হাশিমকে নির্বাচন করেছেন এবং বনি হাশিম থেকে আমাকে নির্বাচন করেছেন।

সহিহ মুসলিম : ২২৭৬, সহিহ বুখারি : ৩৩৫৭, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৬২৪২, আবূ ইয়ালা : ৭৪৮৫, সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৩০২। । হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০২ :: রাসূলুল্লাহ  কুরাইশ গোত্রে জম্ম গ্রহণ করেন।

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللهِ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ حَدَّثَنَا عَمْرٌو حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيهِ كُنْتُ أَطْلُبُ بَعِيرًا لِي ح وحَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ عَمْرٍو سَمِعَ مُحَمَّدَ بْنَ جُبَيْرٍ عَنْ أَبِيهِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ قَالَ أَضْلَلْتُ بَعِيرًا لِي فَذَهَبْتُ أَطْلُبُهُ يَوْمَ عَرَفَةَ فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَاقِفًا بِعَرَفَةَ فَقُلْتُ هَذَا وَاللهِ مِنْ الْحُمْسِ فَمَا شَأْنُهُ هَا هُنَا

অনুবাদ : জুবাইর ইবনু মুতয়িম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আমার একটি উট হারিয়ে ‘আরাফার দিনে তা তালাশ করতে লাগলাম। তখন আমি রসুলুল্লাহ ﷺকে ‘আরাফায় উকূফ করতে দেখলাম এবং বললাম, আল্লাহর কসম! তিনি তো কুরায়শ বংশীয়। এখানে তিনি কী করছেন?

সহিহ বুখারি : ১৬৬৪, সহিহ মুসলিম : ১২২০

হাদিস নম্বর-০৩ :: কুরাইশগন নিজের হুমস বা কঠোর ধার্মিক বলে পরিচয় দিত

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الأَعْلَى الصَّنْعَانِيُّ الْبَصْرِيُّ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الطُّفَاوِيُّ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَتْ قُرَيْشٌ وَمَنْ كَانَ عَلَى دِينِهَا وَهُمُ الْحُمْسُ يَقِفُونَ بِالْمُزْدَلِفَةِ يَقُولُونَ نَحْنُ قَطِينُ اللَّهِ ‏.‏ وَكَانَ مَنْ سِوَاهُمْ يَقِفُونَ بِعَرَفَةَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى ‏:‏ ‏(‏ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ

অনুবাদ : আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, কুরাইশ এবং তাদের ধর্মের যারা অনুসারী ছিল তাদেরকে হুমস বলা হত। তারা মুযদালফায় অবস্থান করত এবং বলত, আমরা আল্লাহর ঘরের অধিবাসী। তারা ব্যতীত অন্য লোকেরা আরাফাতে অবস্থান করত। আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ে আয়াত অবতীর্ণ করেন-

ثُمَّ اَفِیۡضُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَفَاضَ النَّاسُ وَاسۡتَغۡفِرُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অতঃপর তোমরা প্রত্যাবর্তন কর, যেখান থেকে মানুষেরা প্রত্যাবর্তন করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা বাকারা-১৯৯।

সুনানে তিরমিজি : ৮৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩০১৮, ইবনে হিসাম খন্ড-১,পৃ-৫৭। হাদিসের মান সহিহ। হাদিসটি সুনানে তিরমিজি থেকে সংকলন করা হয়েছে। হুমস শব্দের অর্থ কঠোর ধার্মিক। কুরায়েশরা মূর্তিপূজা করত। সেই সাথে নিজেদেরকে ইবরাহীম (আঃ)-এর একান্ত অনুসারীর পাশাপাশি নিজেদের হুমস বলে দাবি করত।

হাদিস নম্বর-০৪ : রাসূলুল্লাহ তার জন্য নির্ধারিত যুগে আগমন করেন।

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيْدٍ حَدَّثَنَا يَعْقُوْبُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَنْ عَمْرٍو عَنْ سَعِيْدٍ الْمَقْبُرِيِّ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ بُعِثْتُ مِنْ خَيْرِ قُرُونِ بَنِيْ آدَمَ قَرْنًا فَقَرْنًا حَتَّى كُنْتُ مِنْ الْقَرْنِ الَّذِيْ كُنْتُ فِيْهِ

অনুবাদ : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

“আমি বনি আদমের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ থেকে যুগে প্রেরিত হয়েছি (بُعِثْتُ)। এক যুগ থেকে আরেক যুগ অতিবাহিত হয়ে আমি সেই যুগেই এসেছি যে যুগ আমার জন্য নির্দিষ্ট ছিল।

সহিহ বুখারি : ৩৫৫৭, মিশকাত : ৫৭৩৯, মুসনাদে আহমাদ : ৮৮৪৪, শুআবুল ঈমান : ১৩৯২, আবু সিলসিলাতুস সহিহাহ : ৮০৯। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ এর পিতামাতার বর্ননা :

সহিহ হাদিসের মধ্যে এমন কোনো নির্দিষ্ট হাদিস পাওয়া কঠিন, যেখানে উভয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ তথ্য সিরাহ ও ইতিহাসের গ্রন্থে পাওয়া যায়। সিরাহ ও ইতিহাস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে রাসূল ﷺ-এর জন্মের আগেই তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন এবং ছয় বছর বয়সে মারা যান।

ইবন ইসহাক (মৃত্যু: ১৫১ হিজরি) তার সিরাতু রাসূলিল্লাহ গ্রন্থে বলেন-

عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ مَاتَ فِي مَدِينَةِ يَثْرِبَ وَهُوَ فِي طَرِيقِهِ إِلَى سُورِيَا، وَذَلِكَ قَبْلَ وِلَادَةِ رَسُولِ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَوَقَدْ أُصِيبَ بِالْمَرَضِ هُنَاكَ

অনুবাদ : আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের আগে সিরিয়া যাওয়ার পথে ইয়াসরিব (মদিনা) শহরে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান।

ইবন ইসহাক, সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৫৬, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৬০

ইবন কাসির (মৃত্যু: ৭৭৪ হিজরি)  “আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেন-

أَمِينَةُ أَخَذَتِ النَّبِيَّ ﷺ إِلَى الْمَدِينَةِ لِزِيَارَةِ أَقَارِبِهِ مِنْ جَانِبِ أَخْوَالِهِ، ثُمَّ فِي طَرِيقِ رُجُوعِهَا إِلَى مَكَّةَ تُوُفِّيَتْ فِي مَكَانٍ يُسَمَّى ٱلْأَبْوَاءَ، وَكَانَ عُمْرُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ سِتَّ سِنِينَ۔

অনুবাদ : আমিনা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নিয়ে মদিনায় গিয়েছিলেন তাঁর নানা আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। পরে মক্কায় ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বয়স ছিল ছয় বছর।

আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইবন কাসির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬০, সিরাতু ইবন ইসহাক, ইবন হিশাম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৭, তাবাকাত আল-কুবরা, ইবন সা’দ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৯

হাদিস নম্বর-০৫ : রাসূলুল্লাহ এর পিতার পরকালীন অবস্থান

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ سَلَمَةَ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلاً، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيْنَ أَبِي قَالَ ‏”‏ فِي النَّارِ ‏”‏ ‏.‏ فَلَمَّا قَفَّى دَعَاهُ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ ‏”

অনুবাদ : আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা কোথায় আছেন (জান্নাতে না জাহান্নামে)? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, জাহান্নামে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি যখন চলে যেতে লাগল, তিনি ডাকলেন এবং বললেন, আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।

সহিহ মুসলিম : ২০৩, এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, রাসূল ﷺ এর পিতা আবদুল্লাহ ইসলাম গ্রহণের আগেই মৃত্যুবরণ করেন।

হাদিস নম্বর-০৬ :: রসূলুল্লাহ এর পিতামাতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ ছিল।

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبَّادٍ، – وَاللَّفْظُ لِيَحْيَى – قَالاَ حَدَّثَنَا مَرْوَانُ، بْنُ مُعَاوِيَةَ عَنْ يَزِيدَ، – يَعْنِي ابْنَ كَيْسَانَ – عَنْ أَبِي حَازِمٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ‏ “‏ اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لأُمِّي فَلَمْ يَأْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُهُ أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي ‏”‏

অনুবাদ : আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন- আমি আমার প্রভুর নিকট আমার মায়ের জন্য ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করার অনুমতি চাইলে আমার প্রভু আমাকে অনুমতি দান করেননি। আর তার কবর যিয়ারাত করার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। সহিহ মুসলিম : ৯৭৬. মসনাদে আহমাদ : ৯৩৯৫ ইরওয়াহ : ৭৭২। হাদিসটি সহিহ মুসলিম থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-০৭ :: রসূলুল্লাহ -এর মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ ছিল।

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدٍ حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ كَيْسَانَ عَنْ أَبِي حَازِمٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ زَارَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَقَبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يَأْذَنْ لِي وَاسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي فَزُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُكُمْ الْمَ

অনুবাদ : আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সাথের লোকেদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন, আমি আমার রবের নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের নিকট তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৫৭২, সুনানে নাসায়ি : ২০৩৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৩২৩৪। হাদিসটি সুনানে ইবনে মাজাহ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

নোট : রাসূল ﷺ এর পিতা আবদুল্লাহ রাসূল ﷺ-এর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন। তিনি ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পাননি এবং ইসলামের আকিদা অনুযায়ী, কুফর অবস্থায় মৃত্যু হলে জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। রাসূল ﷺ এর জন্য তাঁর মা-বাবার জন্য দোয়া করা নিষিদ্ধ ছিল। এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়, তাই ইসলামি বিশ্বাসের আলোকে একে গ্রহণ করা জরুরি। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রেরিত হওয়ার পূর্বে লোকেরা যে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল

হাদিস নম্বর-০৮ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার বাসি বিভিন্ন দেবদেবীর পুজা করত।

الْحُمَيْدِيُّ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ عَنْ ابْنِ أَبِيْ نَجِيْحٍ عَنْ مُجَاهِدٍ عَنْ أَبِيْ مَعْمَرٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَمَكَّةَ وَحَوْلَ الْبَيْتِ سِتُّوْنَ وَثَلَاثُ مِائَةِ نُصُبٍ فَجَعَلَ يَطْعُنُهَا بِعُوْدٍ فِيْ يَدِهِ وَيَقُوْلُ (جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا) جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ.

অনুবাদ : আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত-

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা্য় (মক্কা বিজয়ের দিন) প্রবেশ করলেন, তখন কা’বা ঘরের চারপাশে তিনশ ষাটটি মূর্তি ছিল। তখন তিনি তাঁর হাতের ছড়ি দিয়ে এগুলোকে ঠোকা দিতে লাগলেন এবং বলতে থাকলেন-

وَقُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَزَہَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ کَانَ زَہُوۡقًا

আর বল, ‘হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল’। (সূরা ইসরাঈল-৮১)।

সহিহ বুখারি : ৪৭২০, সহহি বুখারির এই হাদিস প্রমান করে এর জম্মের প্রাককালে মক্বাম মানুষ মূর্তি পূজক বা মুশরিক ছিল।

হাদিস নম্বর-০৯ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার মানত করত।

حَدَّثَنَا أَبُوْ الْيَمَانِ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ قَالَ سَمِعْتُ سَعِيْدَ بْنَ الْمُسَيَّبِ قَالَ الْبَحِيْرَةُ الَّتِيْ يُمْنَعُ دَرُّهَا لِلطَّوَاغِيْتِ وَلَا يَحْلُبُهَا أَحَدٌ مِنْ النَّاسِ وَالسَّائِبَةُ الَّتِيْ كَانُوْا يُسَيِّبُوْنَهَا ِلآلِهَتِهِمْ فَلَا يُحْمَلُ عَلَيْهَا شَيْءٌ قَالَ وَقَالَ أَبُوْ هُرَيْرَةَ قَالَ النَّبِيُّ  صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَرَأَيْتُ عَمْرَو بْنَ عَامِرِ بْنِ لُحَيٍّ الْخُزَاعِيَّ يَجُرُّ قُصْبَهُ فِي النَّارِ وَكَانَ أَوَّلَ مَنْ سَيَّبَ السَّوَائِبَ

অনুবাদ : যুহরী (রহ.) বলেন। আমি সা‘ঈদ ইবনু মুসাইয়্যাব (রহ.)-কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, বাহীরাহ বলে দেবতার নামে উৎসর্গ করা উটনী যার দুধ আটকিয়ে রাখা হত এবং কোন লোক তার দুধ দোহন করত না। সা-য়িবাহ বলে ঐ পশুকে যাকে তারা ছেড়ে দিত দেবতার নামে। তাকে বোঝা বহন ইত্যাদি কোন কাজ কর্মে ব্যবহার করা হয় না। রাবী বলেন, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) বলেছেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমি আমর ইবনু ‘আমির খুয‘আহকে তার বহির্গত নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেলা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সায়্যিবাহ উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে।

সহিহ বুখারি : ৩৫২১, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৬, আহমাদ ৭৭১৪। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

হাদিস নম্বর-১০ : রাসূলুল্লাহ জম্মের সময় মক্কার লোকেরা অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।

অয়াদ্বীন (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা ছিলাম জাহিলী যুগের লোক এবং আমরা মূর্তিপূজক ছিলাম। আর আমরা আমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করতাম। আমার একটি কন্যা ছিল। আমি যখনই তাকে ডাকতাম, তখনই সে আনন্দের সাথে আমার ডাকে সাড়া দিত। একদিন আমি তাকে ডাকলে সে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে আমার পিছনে পিছনে চলতে লাগল। আমি চলতে লাগলাম যতক্ষণ না বাড়ির অদূরে একটি কূপের নিকট পৌঁছলাম। অতঃপর আমি তার হাত ধরে তাকে কূপে নিক্ষেপ করলাম। আমার বিশ্বাস, সবশেষে সে বলছিল: হে আব্বা! হে আব্বা। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ কাঁদতে লাগলেন, এমনকি তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে বসা এক ব্যক্তি সেই লোকটিকে বলল, তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺকে দুঃখ দিয়েছো। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ঐ ব্যক্তিকে বললেন: ’থাম! কেননা, যা তাকে কষ্ট দিয়েছে, সে তো সে বিষয়েই জিজ্ঞেস করছে। অতঃপর তিনি সেই লোকটিকে বললেন: ’তোমার কথাগুলো আমাকে আবার শোনাও। ফলে সে লোকটি আবার (উল্লিখিত কাহিনীটি) বলতে লাগল। এ কাহিনী শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ (আবারও) কাঁদতে লাগলেন, এমনকি তাঁর দু’চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়ে তাঁর দাড়ির উপর পড়তে লাগল। অবশেষে তিনি তাকে বললেন, ’নিশ্চয়ই আল্লাহ জাহিলী যুগে কৃত (মন্দ) আমলসমূহ থেকে তাদেরকে অব্যহতি দিয়েছেন (অর্থাৎ সেসব পাপের জন্য তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে না)। অতএব তুমি নতুন করে আমল করা শুরু করো। সুনানে আদ দারিমী : ০২, হাদিসটি ইমাম দারিমী এককভাবে বর্ণনা করেছেন। সনদের রাবীগণ সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য। তবে এটি মুরসাল হাদিস।

হাদিস নম্বর-১১ : সুলুল্লাহ  এর পূর্ব পুরুষ ইসমাইল (আ.) এর বিস্তারিত বর্ণনা।

সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহ.) হতে বর্ণিত। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, নারী জাতি সর্বপ্রথম কোমরবন্দ বানানো শিখেছে ইসমাঈল (আঃ)-এর মায়ের নিকট থেকে। হাযেরা (আঃ) কোমরবন্দ লাগাতেন সারাহ (আঃ) থেকে নিজের মর্যাদা গোপন রাখার জন্য। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) হাযেরা (আঃ) এবং তাঁর শিশু ছেলে ইসমাঈল (আঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন এ অবস্থায় যে, হাযেরা (আঃ) শিশুকে দুধ পান করাতেন। অবশেষে যেখানে কা’বার ঘর অবস্থিত, ইবরাহীম (আঃ) তাঁদের উভয়কে সেখানে নিয়ে এসে মসজিদের উঁচু অংশে যমযম কূপের উপরে অবস্থিত একটি বিরাট গাছের নীচে তাদেরকে রাখলেন। তখন মক্কা্য় না ছিল কোন মানুষ, না ছিল কোনরূপ পানির ব্যবস্থা। পরে তিনি তাদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন। আর এছাড়া তিনি তাদের নিকট রেখে গেলেন একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে কিছু পরিমাণ পানি। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) ফিরে চললেন। তখন ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পিছু পিছু আসলেন এবং বলতে লাগলেন, হে ইবরাহীম! আপনি কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী আর না আছে কোন ব্যবস্থা। তিনি এ কথা তাকে বারবার বললেন। কিন্তু ইবরাহীম (আঃ) তাঁর দিকে তাকালেন না। তখন হাযেরা (আঃ) তাঁকে বললেন, এর আদেশ কি আপনাকে আল্লাহ দিয়েছেন? তিনি বললেন, হাঁ। হাযেরা (আঃ) বললেন, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। অতঃপর তিনি ফিরে আসলেন। আর ইবরাহীম (আঃ)-ও সামনে চললেন। চলতে চলতে যখন তিনি গিরিপথের বাঁকে পৌঁছলেন, যেখানে স্ত্রী ও সন্তান তাঁকে আর দেখতে পাচ্ছে না, তখন তিনি কা’বা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন। অতঃপর তিনি দু’হাত তুলে এ দু’আ করলেন, আর বললেন, ’’হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার পরিবারের কতককে আপনার সম্মানিত ঘরের নিকট এক অনুর্বর উপত্যকায় …… যাতে আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে- (ইবরাহীম ৩৭)। আর ইসমাঈলের মা ইসমাঈলকে স্বীয় স্তন্যের দুধ পান করাতেন এবং নিজে ঐ মশক থেকে পানি পান করতেন। অবশেষে মশকে যা পানি ছিল তা ফুরিয়ে গেল। তিনি নিজে তৃষ্ণার্ত হলেন এবং তাঁর শিশু পুত্রটিও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। তিনি শিশুটির দিকে দেখতে লাগলেন। তৃষ্ণায় তার বুক ধড়ফড় করছে অথবা রাবী বলেন, সে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। শিশু পুত্রের এ করুণ অবস্থার প্রতি তাকানো অসহনীয় হয়ে পড়ায় তিনি সরে গেলেন আর তাঁর অবস্থানের নিকটবর্তী পর্বত ’সাফা’-কে একমাত্র তাঁর নিকটতম পর্বত হিসাবে পেলেন। অতঃপর তিনি তার উপর উঠে দাঁড়ালেন এবং ময়দানের দিকে তাকালেন। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন, কোথায়ও কাউকে দেখা যায় কিনা? কিন্তু তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। তখন ’সাফা’ পর্বত থেকে নেমে পড়লেন। এমন কি যখন তিনি নিচু ময়দান পর্যন্ত পৌঁছলেন, তখন তিনি তাঁর কামিজের এক প্রান্ত তুলে ধরে একজন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের মত ছুটে চললেন। অবশেষে ময়দান অতিক্রম করে ’মারওয়া’ পাহাড়ের নিকট এসে তার উপর উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর এদিকে সেদিকে তাকালেন, কাউকে দেখতে পান কিনা? কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এমনিভাবে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করলেন।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এজন্যই মানুষ এ পর্বতদ্বয়ের মধ্যে সায়ী করে থাকে। অতঃপর তিনি যখন মারওয়া পাহাড়ে উঠলেন, তখন একটি শব্দ শুনতে পেলেন এবং তিনি নিজেকেই নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা কর। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি তো তোমার শব্দ শুনিয়েছ। যদি তোমার নিকট কোন সাহায্যকারী থাকে। হঠাৎ যেখানে যমযম কূপ অবস্থিত সেখানে তিনি একজন ফেরেশতা দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালি দ্বারা আঘাত করলেন অথবা তিনি বলেছেন, আপন ডানা দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে পানি বের হতে লাগল। তখন হাযেরা (আঃ)-এর চারপাশে নিজ হাতে বাঁধ দিয়ে এক হাউজের মত করে দিলেন এবং হাতের কোষভরে তাঁর মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। তখনো পানি উপচে উঠছিল। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। যদি তিনি বাঁধ না দিয়ে যমযমকে এভাবে ছেড়ে দিতেন কিংবা বলেছেন, যদি কোষে ভরে পানি মশকে জমা না করতেন, তাহলে যমযম একটি কূপ না হয়ে একটি প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হতো। রাবী বলেন, অতঃপর হাযেরা (আঃ) পানি পান করলেন, আর শিশু পুত্রকেও দুধ পান করালেন, তখন ফেরেশতা তাঁকে বললেন, আপনি ধ্বংসের কোন আশঙ্কা করবেন না। কেননা এখানেই আল্লাহর ঘর রয়েছে। এ শিশুটি এবং তাঁর পিতা দু’জনে মিলে এখানে ঘর নির্মাণ করবে এবং আল্লাহ তাঁর আপনজনকে কখনও ধ্বংস করেন না। ঐ সময় আল্লাহর ঘরের স্থানটি যমীন থেকে টিলার মত উঁচু ছিল। বন্যা আসার ফলে তার ডানে বামে ভেঙ্গে যাচ্ছিল। অতঃপর হাযেরা (আঃ) এভাবেই দিন যাপন করছিলেন। অবশেষে জুরহুম গোত্রের একদল লোক তাদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল। অথবা রাবী বলেন, জুরহুম পরিবারের কিছু লোক কাদা নামক উঁচু ভূমির পথ ধরে এদিকে আসছিল। তারা মক্কা্য় নীচু ভূমিতে অবতরণ করল এবং তারা দেখতে পেল একঝাঁক পাখি চক্রাকারে উড়ছে। তখন তারা বলল, নিশ্চয় এ পাখিগুলো পানির উপর উড়ছে। আমরা এ ময়দানের পথ হয়ে বহুবার অতিক্রম করেছি। কিন্তু এখানে কোন পানি ছিল না। তখন তারা একজন কি দু’জন লোক সেখানে পাঠালো। তারা সেখানে গিয়েই পানি দেখতে পেল। তারা সেখান থেকে ফিরে এসে সকলকে পানির সংবাদ দিল। সংবাদ শুনে সবাই সেদিকে অগ্রসর হল। রাবী বলেন, ইসমাঈল (আঃ)-এর মা পানির নিকট ছিলেন। তারা তাঁকে বলল, আমরা আপনার নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতে চাই। আপনি আমাদেরকে অনুমতি দিবেন কি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। তবে, এ পানির উপর তোমাদের কোন অধিকার থাকবে না। তারা হ্যাঁ, বলে তাদের মত প্রকাশ করল।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) বলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, এ ঘটনা ইসমাঈলের মাকে একটি সুযোগ এনে দিল। আর তিনিও মানুষের সাহচর্য চেয়েছিলেন। অতঃপর তারা সেখানে বসতি স্থাপন করল এবং তাদের পরিবার-পরিজনের নিকটও সংবাদ পাঠাল। তারপর তারাও এসে তাদেরও সাথে বসবাস করতে লাগল। পরিশেষে সেখানে তাদেরও কয়েকটি পরিবারের বসতি স্থাপিত হল। আর ইসমাঈলও যৌবনে উপনীত হলেন এবং তাদের থেকে আরবী ভাষা শিখলেন। যৌবনে পৌঁছে তিনি তাদের নিকট অধিক আকর্ষণীয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি পূর্ণ যৌবন লাভ করলেন, তখন তারা তাঁর সঙ্গে তাদেরই একটি মেয়েকে বিবাহ দিল। এরই মধ্যে ইসমাঈলের মা হাযেরা (আঃ) ইন্তিকাল করেন। ইসমাঈলের বিবাহের পর ইবরাহীম (আঃ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনের অবস্থা দেখার জন্য এখানে আসলেন। কিন্তু তিনি ইসমাঈলকে পেলেন না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে তাঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী বলল, তিনি আমাদের জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। অতঃপর তিনি পুত্রবধূকে তাদের জীবন যাত্রা এবং অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমরা অতি দূরবস্থায়, অতি টানাটানি ও খুব কষ্টে আছি। সে ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট তাদের দুর্দশার অভিযোগ করল। তিনি বললেন, তোমার স্বামী বাড়ী আসলে, তাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে নেয়। অতঃপর যখন ইসমাঈল বাড়ী আসলেন, তখন তিনি যেন কিছুটা আভাস পেলেন। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের নিকট কেউ কি এসেছিল? স্ত্রী বলল, হাঁ। এমন এমন আকৃতির একজন বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং আমাকে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ দিলাম। তিনি আমাকে আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তাঁকে জানালাম, আমরা খুব কষ্ট ও অভাবে আছি। ইসমাঈল (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি তোমাকে কোন নাসীহাত করেছেন? স্ত্রী বলল, হাঁ। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন আপনাকে তাঁর সালাম পৌঁছাই এবং তিনি আরো বলেছেন, আপনি যেন আপনার ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলিয়ে ফেলেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনি আমার পিতা। এ কথা দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে পৃথক করে দেই। অতএব তুমি তোমার আপন জনদের নিকট চলে যাও। এ কথা বলে, ইসমাঈল (আঃ) তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ঐ লোকদের থেকে অন্য একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে দূরে রইলেন, আল্লাহ যতদিন চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার এদের দেখতে আসলেন। কিন্তু এবারও তিনি ইসমাঈল (আঃ)-এর দেখা পেলেন না। তিনি পুত্রবধূর নিকট উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে ইসমাঈল (আঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, তিনি আমাদের খাবারের খোঁজে বেরিয়ে গেছেন। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেমন আছ? তিনি তাদের জীবন যাপন ও অবস্থা জানতে চাইলেন। তখন সে বলল, আমরা ভাল এবং স্বচ্ছল অবস্থায় আছি। আর সে আল্লাহর প্রশংসাও করল। ইবরাহীম (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের প্রধান খাদ্য কী? সে বলল, গোশ্ত। তিনি আবার জানতে চাইলেন, তোমাদের পানীয় কী? সে বলল, পানি। ইবরাহীম (আঃ) দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! তাদের গোশ্ত ও পানিতে বরকত দিন। রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, ঐ সময় তাদের সেখানে খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো না। যদি হতো তাহলে ইবরাহীম (আঃ) সে বিষয়েও তাদের জন্য দু’আ করতেন। বর্ণনাকারী বলেন, মক্কা ছাড়া অন্য কোথাও কেউ শুধু গোশ্ত ও পানি দ্বারা জীবন ধারণ করতে পারে না। কেননা, শুধু গোশ্ত ও পানি জীবন যাপনের অনুকূল হতে পারে না।

ইবরাহীম (আঃ) বললেন, যখন তোমার স্বামী ফিরে আসবে, তখন তাঁকে সালাম বলবে, আর তাঁকে আমার পক্ষ থেকে হুকুম করবে যে, সে যেন তার ঘরের দরজার চৌকাঠ ঠিক রাখে। অতঃপর ইসমাঈল (আঃ) যখন ফিরে আসলেন, তখন তিনি বললেন, তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি? সে বলল, হাঁ। একজন সুন্দর চেহারার বৃদ্ধ লোক এসেছিলেন এবং সে তাঁর প্রশংসা করল, তিনি আমাকে আপনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি তাঁকে আপনার সংবাদ জানিয়েছি। অতঃপর তিনি আমার নিকট আমাদের জীবন যাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে জানিয়েছি যে, আমরা ভাল আছি। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, তিনি কি তোমাকে আর কোন কিছুর জন্য আদেশ করেছেন? সে বলল, হাঁ। তিনি আপনার প্রতি সালাম জানিয়ে আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি যেন আপনার ঘরের চৌকাঠ ঠিক রাখেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ইনিই আমার পিতা। আর তুমি হলে আমার ঘরের দরজার চৌকাঠ। এ কথার দ্বারা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখি। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) এদের থেকে দূরে রইলেন, যদ্দিন আল্লাহ চাইলেন। অতঃপর তিনি আবার আসলেন। (দেখতে পেলেন) যমযম কূপের নিকটস্থ একটি বিরাট বৃক্ষের নীচে বসে ইসমাঈল (আঃ) তাঁর একটি তীর মেরামত করছেন। যখন তিনি তাঁর পিতাকে দেখতে পেলেন, তিনি দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন। অতঃপর একজন বাপ-বেটার সঙ্গে, একজন বেটা-বাপের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে যেমন করে থাকে তাঁরা উভয়ে তাই করলেন। অতঃপর ইবরাহীম (আঃ) বললেন, হে ইসমাঈল! আল্লাহ আমাকে একটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আপনার রব! আপনাকে যা আদেশ করেছেন, তা করুন। ইবরাহীম (&আ) বললেন, তুমি আমার সাহায্য করবে কি? ইসমাঈল (আঃ) বললেন, আমি আপনার সাহায্য করব। ইবরাহীম (আঃ) বললেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই বলে তিনি উঁচু টিলাটির দিকে ইশারা করলেন যে, এর চারপাশে ঘেরাও দিয়ে। তখনি তাঁরা উভয়ে কা’বা ঘরের দেয়াল তুলতে লেগে গেলেন। ইসমাঈল (আঃ) পাথর আনতেন, আর ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করতেন। পরিশেষে যখন দেয়াল উঁচু হয়ে গেল, তখন ইসমাঈল (আঃ) (মাকামে ইবরাহীম নামে খ্যাত) পাথরটি আনলেন এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্য তা যথাস্থানে রাখলেন। ইবরাহীম (আঃ) তার উপর দাঁড়িয়ে নির্মাণ কাজ করতে লাগলেন। আর ইসমাঈল (আঃ) তাঁকে পাথর যোগান দিতে থাকেন। তখন তারা উভয়ে এ দু’আ করতে থাকলেন, হে আমাদে রব! আমাদের থেকে কবূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। তাঁরা উভয়ে আবার কা’বা ঘর তৈরী করতে থাকেন এবং কা’বা ঘরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে এ দু’আ করতে থাকেন। ’’হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবূল করে নিন। নিশ্চয়ই আপনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। আল-বাকারা-১২৭। সহিহ বুখারি : ৩৩৬৪,  ২৩৬৮। হাদিসটি সহিহ বুখারি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

রসুলুল্লাহ ﷺ এর বংশধারা মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব (শায়বাহ) বিন হাশিম (‘আমর) বিন আবদে মানাফ (মুগীরাহ) বিন কুসাই (যায়দ) বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কাব লুওয়াই বিন গালিব বিন ফিহর (তাঁর উপাধি ছিল কুরাইশ এবং এ সূত্রেই কুরাইশ বংশের উদ্ভব) বিন মালিক বিন নাযর (ক্বায়স) বিন কিনানাহ বিন খুযায়মাহ বিন মুদরিকাহ (আমির) বিন ইলিয়াস বিন মুযার বিন নিযার বিন মা’আদ্দ বিন আদনান বিন উদাদ বিন হামায়সা’ বিন সালামান বিন ‘আওস বিন বুয বিন ক্বামওয়াল বিন উবাই বিন ‘আউওয়াম বিন নাশিদ বিন হিযা বিন বালদাস বিন ইয়াদলাফ বিন ত্বাবিখ বিন যাহিম বিন নাহিশ বিন মাখী বিন ‘আইয বিন আ’বক্বার বিন উবাইদ বিন আদ-দু’আ বিন হামদান বিন সুনবর বিন ইয়াসরিবী বিন ইয়াহযুন বিন ইয়ালহান বিন আর’আওয়া বিন ‘আইয বিন দীশান বিন ‘আইসার বিন আফনাদ বিন আইহাম বিন মুক্বসির বিন নাহিস বিন যারিহ বিন সুমাই বিন মুযী বিন ‘আওযাহ বিন ‘ইরাম বিন ক্বাইদার বিন ইসামাঈল বিন ইবরাহীম (আঃ)। ইবনু হিশাম, খন্ড-১, পৃ-১-২; আর-রাহীকুল মাখতূম, ছফিউর রহমান মুবারকপুরী (রহ.) (মৃ ২০০৬খৃ:),