মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১৫. স্বামীর অধিকারের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে
হুস্বাইন বিন মিহস্বানের এক ফুফু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কোন প্রয়োজনে এলে এবং তা পূরণ হয়ে গেলে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি স্বামী আছে? সে বলল, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, তার কাছে তোমার অবস্থান কী? সে বলল, ’যথাসাধ্য আমি তার সেবা করি।’ তিনি বললেন, ’’খেয়াল করো, তার কাছে তোমার অবস্থান কোথায়। যেহেতু সে তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। হাদিস সম্ভার : ২৬১৬, আহমাদ : ১৯০০৩, সুনানে নাসায়ি : ১৪৯৩
আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি যদি কোন ব্যক্তিকে অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে অবশ্যই স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে লাল পাহাড় থেকে কালো পাহাড়ে অথবা কালো পাহাড় থেকে লাল পাহাড়ে পাথর স্থানান্তরের নির্দেশ দিলে তা পালন করা তার জন্য অপরিহার্য হতো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫২, আহমাদ : ২৩৯৫০
’আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে মু’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত।
সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৫৩, সহিহাহ ; ১২০৩
আবূ সাঈদ (রাঃ) ও আবূ হুরাইরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, এক ব্যক্তি তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমার এই মেয়েটি বিয়ে করতে অস্বীকার করছে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ’’তুমি তোমার আববার কথা মেনে নাও। মেয়েটি বলল, আপনি বলুন, স্ত্রীর উপর তার স্বামীর হক কী? তিনি বললেন, স্বামীর এত বড় হক আছে যে, যদি তার নাকের দুই ছিদ্র থেকে রক্ত-পুঁজ বের হয় এবং স্ত্রী তা নিজের জিভ দ্বারা চেঁটে (পরিষ্কার করে), তবুও সে তার যথার্থ হক আদায় করতে পারবে না! যদি মানুষের জন্য মানুষকে সিজদা করা সঙ্গত হত, তাহলে আমি স্ত্রীকে আদেশ করতাম, সে যেন তার স্বামী কাছে এলে তাকে সিজদা করে। যেহেতু আল্লাহ স্বামীকে স্ত্রীর উপর এত বড় মর্যাদা দান করেছেন। মেয়েটি বলল, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য সহ প্রেরণ করেছেন! দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে আমি বিয়েই করব না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা ওদের অনুমতি ছাড়া ওদের বিবাহ দিয়ো না। হাদিস সম্ভার : ২৬১৩, নাসাঈ কুবরা : ৫৩৬৫, ইবনে আবী শাইবাহ : ১৭১২২, তারগীব : ১৯৩৪, বাইহাকী : ১৩২৬৩, হাকেম : ২৭৬৮, বাযযার : ৮৬৩৪ দারাকুতনী : ৩৫৭১
১৬. স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোন চাপ সৃষ্টি না করা
স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত কোন চাপ সৃষ্টি না করা”- এটি পরিবার জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। কুরআন ও সহিহ হাদিসে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, বোঝাপড়া এবং দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীর সামর্থ্যের বাইরে কোনো দাবি বা চাপ সৃষ্টি না করা।
ক. জীবিকা ও ব্যয়ভার স্বামীর দায়িত্ব, কিন্তু সামর্থ্য অনুযায়ী
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ ۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ ۚ
“যার সামর্থ্য আছে সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সংকুচিত করা হয়েছে, সে আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকেই ব্যয় করবে।” সুরা তালাক : ৭
এখানে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, জীবিকা ব্যয় করতে হবে সামর্থ্যের ভেতরে। তাই স্ত্রী যদি স্বামীর সামর্থ্যের বাইরে দাবি করে, তবে সেটি কুরআনের এই নীতির বিরোধী হবে।
খ. আল্লাহ কারো উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
“আল্লাহ কোনো প্রাণীকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব দেন না।” সুরা বাকারা : ২৮৬)
এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। তাই স্ত্রী যদি স্বামীকে সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করতে বাধ্য করেন, তবে এটি আল্লাহর নীতির বিরুদ্ধে যাবে।
গ. পারিবারিক খরচে মিতব্যয়িতা
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একটি দীনার তুমি আল্লাহর পথে ব্যয় করলে, একটি দীনার গোলাম আযাদ করার জন্য এবং একটি দীনার মিসকীনদেরকে দান করলে এবং আর একটি তোমার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করলে। এর মধ্যে (সাওয়াবের দিক থেকে) ঐ দীনারটিই উত্তম যা তুমি তোমার পরিবারের লোকদের জন্য ব্যয় করলে। সহিহ মুসলিম : ৯৯৫
অর্থাৎ স্বামীর উপার্জন থেকে পরিবারকে ব্যয় করা একটি উত্তম আমল। তবে এ ব্যয় হবে সামর্থ্যের মধ্যে, অতিরিক্ত চাপ নয়।
ঘ. দুনিয়ার সামগ্রীকে সহজভাবে নেওয়ার তাগিদ
সব সময় নিজেদের থেকে নিচে অবস্থানকারীদের দিকে তাকাতে হবে।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কারো নজর যদি এমন লোকের উপর পড়ে, যাকে মাল-ধন ও দৈহিক গঠনে অধিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে তবে সে যেন এমন লোকের দিকে নজর দেয়, যে তার চেয়ে নিম্ন স্তরে রয়েছে। সহহি বুখারি : ৬৪৯০, সহিহ মুসলিম: ২৯৬৩
স্ত্রী যদি সবসময় সমাজের ধনী মানুষদের সাথে তুলনা করে স্বামীর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন, তবে এটি নবিজির নির্দেশনার বিরোধী হবে।
স্বামী হলো পরিবারের দায়িত্বশীল, তবে আল্লাহ তাকে শুধুমাত্র তার সামর্থ্যের ভেতরে দায়িত্ব দিয়েছেন।
স্ত্রী যদি স্বামীর উপর সামর্থ্যের বাইরে দাবি চাপান, তবে এটি পারিবারিক অশান্তির কারণ হয় এবং ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, মিতব্যয়িতা, এবং ধৈর্য—স্ত্রীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। স্ত্রী স্বামীর অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে বরকত দান করবেন।
১৭. অনুমতি ছাড়া স্বামীর সম্পদ ব্যয় না করা
স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া ব্যয় করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। কুরআন ও হাদিস উভয়ই নির্দেশ করে যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আস্থার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। স্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, স্বামীর উপার্জন তার হাতে একটি আমানত, তাই অনুমতি ছাড়া ব্যয় করা যাবে না; বরং স্বামীর সম্মতির ভেতরে থাকলেই কেবল সওয়াব পাওয়া যাবে।
ক. আমানত রক্ষার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تُؤۡتُوا السُّفَہَآءَ اَمۡوَالَکُمُ الَّتِیۡ جَعَلَ اللّٰہُ لَکُمۡ قِیٰمًا وَّارۡزُقُوۡہُمۡ فِیۡہَا وَاکۡسُوۡہُمۡ وَقُوۡلُوۡا لَہُمۡ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا
আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ দিও না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জন্য করেছেন জীবিকার মাধ্যম এবং তোমরা তা থেকে তাদেরকে আহার দাও, তাদেরকে পরিধান করাও এবং তাদের সাথে উত্তম কথা বল। সুরা নিসা : ৫
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সম্পদ একটি আমানত। তাই স্বামীর সম্পদ স্ত্রী অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করতে পারে না, কারণ সেটি আমানতের খিলাফ হবে।
খ. অন্যের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ করা হারাম
আল্লাহ বলেন—
وَلَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ وَتُدۡلُوۡا بِہَاۤ اِلَی الۡحُکَّامِ لِتَاۡکُلُوۡا فَرِیۡقًا مِّنۡ اَمۡوَالِ النَّاسِ بِالۡاِثۡمِ وَاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ
আর তোমরা নিজদের মধ্যে তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং তা বিচারকদেরকে (ঘুষ হিসেবে) প্রদান করো না। যাতে মানুষের সম্পদের কোন অংশ পাপের মাধ্যমে জেনে বুঝে খেয়ে ফেলতে পার।
সুরা বাকারা : ১৮৮
স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে সেটি বাতিল ভোগ বা অন্যায় ভোগের অন্তর্ভুক্ত হবে।
গ. স্বামীর সম্পদে স্ত্রীর সীমাবদ্ধতা
আবূ উমামাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ মহান আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করেছেন। কাজেই উত্তরাধিকারীদের জন্য কোনো ওয়াসিয়াত নেই। স্বামীর বিনা অনুমতিতে কোনো স্ত্রী তার ঘরের কিছু খরচ করবে না। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! খাদ্যদ্রব্যও নয়? তিনি বললেনঃ এটা তো আমাদের সর্বোত্তম সম্পদ। অতঃপর তিনি বললেনঃ ধারকৃত বস্তু ফেরত দিতে হবে; দুগ্ধবতী পশুর দুধ পান শেষ হলে তা ফেরত দিতে হবে; ঋণ পরিশোধ করতে হবে এবং জামিনদার দায়বদ্ধ থাকবে। সুনানে আবু দাউদ : ২৩৯৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৩৯৮
এখানে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা এসেছে—স্ত্রী অনুমতি ছাড়া স্বামীর সম্পদ খরচ করতে পারবে না।
(খ) ন্যায্য ব্যয়ের অনুমতি
৫৩৬০. আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কোন মহিলা স্বামীর উপার্জন থেকে তার নির্দেশ ব্যতীত দান করে, তবে সে তার অর্ধেক সাওয়াব পাবে। সহিহ বুখারি : ২০৬৬, ৫৩৬০, সহিহ মুসলিম : ১০২৬, আহমাদ : ৮১৯৫
অর্থাৎ, প্রচলিত অনুমতি বা স্বামীর সাধারণ সম্মতির মধ্যে থাকলে স্ত্রী ব্যয় করতে পারে। যেমন—অতিথিকে সামান্য খাবার খাওয়ানো, দান করা ইত্যাদি। তবে বড় বা অপ্রচলিত খরচের জন্য অবশ্যই স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন।
ঘ. স্ত্রীও স্বামীর সম্পদের আমানতদার
আবদুল্লাহ্ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। একজন শাসক সে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের রক্ষক, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের রক্ষক, সে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন গোলাম তার মনিবের সম্পদের রক্ষক, সে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক এবং তোমরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ৫১৮৮, সহহি মুসলিম : ১৮২৯
এখানে স্ত্রীকে স্বামীর ঘর ও সম্পদের আমানতদার বলা হয়েছে। আমানতদারের দায়িত্ব হলো অনুমতি ছাড়া কোনো কিছু অপচয় না করা।
উপসংহার : স্বামীর সম্পদ স্ত্রীর জন্য আমানত, অতএব অনুমতি ছাড়া তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়। তবে সাধারণ প্রচলিত অনুমতি থাকলে (যেমন অতিথিকে খাওয়ানো, সামান্য জিনিস দান করা) স্ত্রী ব্যয় করতে পারে, এতে উভয়েরই সওয়াব হবে। কিন্তু বড় কোনো ব্যয়, বিক্রি, বা দান—এসবের জন্য অবশ্যই স্বামীর সুনির্দিষ্ট অনুমতি লাগবে। স্বামীর সম্পদে অনুমতি ছাড়া ব্যয় করা হলে তা হারাম এবং কিয়ামতের দিন এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে।
১৭. স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাড়ীর বাইরে না যাওয়া।
স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর বাড়ীর বাইরে যাওয়া প্রসঙ্গে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিধানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পরিবার ও দাম্পত্য জীবনের শৃঙ্খলা, স্ত্রীর নিরাপত্তা, এবং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী, স্ত্রীর জন্য বিশেষ কোনো শরয়ী প্রয়োজন বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘর থেকে বাইরে যাওয়া বৈধ নয়, বরং নিষিদ্ধ। এটি স্বামীর একটি অধিকার এবং স্ত্রীর জন্য এটি পালন করা ওয়াজিব।
১. স্বামীর আনুগত্য ও কর্তৃত্ব
কুরআন মাজীদে পুরুষদেরকে নারীদের কর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা পরিবারের কাঠামোতে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যের আবশ্যকতাকে তুলে ধরে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সূরা আন-নিসা : ৩৪
এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে পুণ্যশীলা স্ত্রীরা স্বামীর অনুগত হন। স্বামীর আনুগত্যের একটি অংশ হলো তার অনুমতি ছাড়া ঘর থেকে বাইরে না যাওয়া।
২. স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ
ইসলামী ফিকাহবিদরা এই মর্মে একমত যে, প্রয়োজনীয় কারণ ও স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর ঘর থেকে বের হওয়া উচিত নয়।
ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘উমার (রাযি.)-এর স্ত্রী (আতিকাহ্ বিনত যায়দ) ফজর ও ‘ইশার সালাতের জামা‘আতে মসজিদে হাযির হতেন। তাঁকে বলা হল, আপনি কেন (সালাতের জন্য) বের হন? অথচ আপনি জানেন যে, ‘উমার (রাযি.) তা অপছন্দ করেন এবং মর্যাদা হানিকর মনে করেন। তিনি জবাব দিলেন, তা হলে কিসে বাধা দিচ্ছে যে, ‘উমার (রাযি.) স্বয়ং আমাকে নিষেধ করছেন না? বলা হল, তাঁকে বাধা দেয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণীঃ আল্লাহর দাসীদের আল্লাহর মসজিদে যেতে বারণ করো না। সহিহ বুখারি : ৯০০, সহিহ মুসলিম : ৪৪২, আহমাদ : ৪৬৫৫
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
এখানে বোঝা যাচ্ছে, স্ত্রী বের হওয়ার জন্য প্রথমে অনুমতি চাইবে, তারপর স্বামী অনুমতি দিলে বের হতে পারবে।
বিখ্যাত ফিকাহবিদ ইবনু মুফলিহ আল-হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “একজন মহিলার জন্য তার স্বামীর ঘর থেকে তার অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ, প্রয়োজন বা শরঈ বাধ্যবাধকতা ছাড়া।” আল-আদাব আশ-শাঈয়াহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-৩৭৫
৩. আনুগত্যের ফল জান্নাত :
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মহিলা যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমাযানের সিয়াম পালন করে, গুপ্তাঙ্গের হিফাযাত করে, স্বামীর একান্ত অনুগত হয়। তার জন্য জান্নাতের যে কোনো দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশের সুযোগ থাকবে। থাকবে। মিশকাত : ৩২৫৪
এই হাদিস প্রমাণ করে যে স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৩. প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার অনুমতি
ইসলাম নারীকে সব সময় ঘরে আবদ্ধ থাকতে বলে না। জরুরী প্রয়োজনে যেমন— বাজার করা (যদি অন্য ব্যবস্থা না থাকে), অসুস্থতা বা আত্মীয়-স্বজনের অসুস্থতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্ত্রীকে পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও স্বামীর অনুমতি নিয়ে রাখা উত্তম বা কর্তব্য।
ক. প্রয়োজনে অনুমতি:
’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে উম্মুহাতুল মু’মিনীন সওদা বিনত জাম’আ (রাঃ) কোন কারণে বাইরে গেলেন। ’উমার (রাঃ) তাঁকে দেখে চিনে ফেললেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! হে সাওদা! তুমি নিজেকে আমাদের নিকট হতে লুকাতে পারনি। এতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে গেলেন এবং উক্ত ঘটনা তাঁর কাছে বললেন। তিনি তখন আমার ঘরে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন এবং তাঁর হাতে মাংসওয়ালা একখানা হাড় ছিল। এমন সময় তাঁর কাছে ওয়াহী অবতীর্ণ হল। ওয়াহী শেষ হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা প্রয়োজনে তোমাদেরকে বাইরে যাবার অনুমতি দিয়েছেন। সহহি বুখারি : ৫২৩৭
খ. সাধারণ অনুমতি:
যদি স্বামী অনুপস্থিত থাকেন এবং স্ত্রীর কাছে নিকটবর্তী কোনো জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: পাশের বাসা বা কাছের মার্কেটে) যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তবে স্ত্রীর উচিত হলো স্বামীর কাছ থেকে সাধারণ অনুমতি (general permission) নিয়ে রাখা, যাতে ছোটখাটো প্রয়োজনে বারবার অনুমতি চাইতে না হয়।
গ. দূরবর্তী সফর
স্ত্রীর জন্য মাহরাম পুরুষ (যার সাথে বিবাহ বৈধ নয়, যেমন: পিতা, ভাই, ছেলে ইত্যাদি) ছাড়া একা দূরবর্তী সফর (সাধারনত ৪৮ মাইল বা তার বেশি) করা নিষিদ্ধ। এই ক্ষেত্রেও স্বামীর অনুমতি আবশ্যক।
আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
لاَ يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا
আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য বৈধ নয় যে, সে এক দিন এক রাতের সফর করবে মাহরাম ছাড়া।” সহিহ বুখারি : ১০৮৮, সহিহ মুসলিম : ১৩৩৯
ঘ. মাহরাম ছাড়া সফর:
১০৮৬. ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন নারীই যেন মাহরামকে (২) সঙ্গে না নিয়ে তিন দিনের সফর না করে। সহিহ বুখারি : ১০৮৬, ১০৮৭, সহিহ মুসলিম : ১৩৩৮, আহমাদ : ৪৬১৫
উপসংহার : ইসলামী শরীয়তে পারিবারিক শান্তি, স্ত্রীর নিরাপত্তা, এবং স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার জন্য স্ত্রীর উপর এই কর্তব্য আরোপ করা হয়েছে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর বাড়ীর বাইরে না যাওয়া কেবল স্বামীর অধিকার নয়, বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত আনুগত্যের অংশ। যদি কোনো শরয়ী প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে পর্দা মেনে এবং স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে বাইরে যাওয়া যেতে পারে।
১৮. স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা না রাখা।
স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নফল (ঐচ্ছিক) রোযা রাখা সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা মূলত স্বামী-স্ত্রীর অধিকারের ভারসাম্য এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি হাদিসের আলোকে নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
১. স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল সিয়ামের বিধান
স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নফল রোযা রাখার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একাধিক সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, নফল ইবাদতের চেয়ে স্বামীর অধিকারের বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কোনো নারীর পক্ষে বৈধ নয় স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ব্যতীত সিয়াম রাখা (রোযা রাখা) এবং স্বামীর অনুমতি ব্যতীত কাউকে তার ঘরে প্রবেশাধিকার দেওয়া।” সহীহ বুখারী : ৫১৯২; সহীহ মুসলিম : ১০২৬; সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪৫৮
স্বামী বাড়িতে উপস্থিত থাকলে বা স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ থাকলে, তার সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়া স্ত্রী নফল রোযা রাখতে পারবেন না। কারণ, স্ত্রীর নফল রোযা স্বামীর দৈহিক অধিকার (যৌন সম্পর্ক) বা অন্যান্য পারিবারিক প্রয়োজনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। ইসলাম দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা ও স্বামীর অধিকারকে নফল ইবাদতের উপর স্থান দিয়েছে। এই বিধানটি কেবল নফল রোযার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফরয রোযা (যেমন: রমযানের রোযা, বা ছুটে যাওয়া ফরয রোযা) রাখার জন্য স্ত্রীর কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই, কারণ তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশ।
২. কখন স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন নেই?
উল্লিখিত হাদিস অনুযায়ী, কয়েকটি ক্ষেত্রে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন হয় না:
ক. স্বামী অনুপস্থিত থাকলে: যদি স্বামী দূরে থাকেন বা সফরে থাকেন, এবং স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে স্ত্রী নফল রোযা রাখতে পারেন।
খ. স্বামীর অনুমতি থাকলে: স্বামী যদি স্ত্রীকে নফল রোযা রাখার অনুমতি দেন, তবে স্ত্রী রোযা রাখতে পারবেন।
গ. ফরয রোযা: রমযানের রোযা বা কাযা (যা ফরয) রোযা রাখার জন্য অনুমতির প্রয়োজন নেই।
ঘ. রোযা ভঙ্গ করার অনুমতি: কোনো স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোযা শুরু করার পর যদি স্বামী তাকে রোযা ভাঙতে নির্দেশ দেন, তবে স্ত্রীর জন্য রোযাটি ভেঙে ফেলা এবং পরে কাযা করে নেওয়া উত্তম বা কর্তব্য।
উপসংহার : ইসলাম পরিবারকে একটি সুশৃঙ্খল একক হিসেবে দেখে, যেখানে স্বামীর অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশ অনুসারে, স্বামীর উপস্থিতিতে স্ত্রীর জন্য নফল রোযা রাখার আগে অবশ্যই স্বামীর অনুমতি নেওয়া কর্তব্য। এটি স্বামীর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার অংশ। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে নফল ইবাদতের চেয়ে ফরয কর্তব্য এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের গুরুত্ব অনেক বেশি।
১৯. স্বামীর শরীআত বিরোধী কাজের সময় নসিহত করা
স্বামীর কাছ থেকে শরীয়ত বিরোধী কোনো কাজ প্রকাশ পেলে স্ত্রীর দায়িত্ব হলো আদব ও শালীনতার সাথে তাকে তা বোঝানো এবং সংশোধনের চেষ্টা করা। এটি স্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য (নসীহত), যা দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা এবং উভয়কে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার জন্য অপরিহার্য। এ বিষয়টি কুরআন ও হাদিসের সাধারণ নসীহত (সৎ উপদেশ) এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের নীতির আলোকে বোঝা যায়।
১. পারস্পরিক সৎ উপদেশ প্রদান
ইসলামী শরীয়তে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অপরের প্রতি নসীহত বা উপদেশ প্রদানের জন্য দায়িত্বশীল। আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মুমিনকে সৎকাজে আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তা’আলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন:
وَالۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتُ بَعۡضُہُمۡ اَوۡلِیَآءُ بَعۡضٍ ۘ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَیَنۡہَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَیُطِیۡعُوۡنَ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ ؕ اُولٰٓئِکَ سَیَرۡحَمُہُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ
আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়িম করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সূরা তাওবা : ৭১
এই আয়াতে স্বামী-স্ত্রীও অন্তর্ভুক্ত। দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে, একে অপরের ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর পথে আহ্বান করা তাদের প্রথম দায়িত্ব।
খ. পরিবারকে রক্ষার নির্দেশ:
আল্লাহ তা’আলা মুমিনদেরকে নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন।
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا وَّقُوۡدُہَا النَّاسُ وَالۡحِجَارَۃُ
হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে রক্ষা কর অগুন হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। সূরা তাহরীম : ৬
স্বামীর ভুল দেখলে বা শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হতে দেখলে স্ত্রীকে অবশ্যই তাকে সতর্ক করতে হবে, নতুবা তিনি এই আয়াত অনুযায়ী নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন।
তামীম আদ দারী (রহঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সদুপদেশ দেয়াই দীন। আমরা আরয করলাম, কার জন্য উপদেশ? তিনি বললেনঃ আল্লাহ ও তার কিতাবের, তার রাসূলের, মুসলিম শাসক এবং মুসলিম জনগণের। সহিহ মুসলিম : ৫৫
স্ত্রী হিসেবে স্বামীকেও আল্লাহর পথে চলার জন্য উপদেশ দেওয়া এই নসীহতের অন্তর্ভুক্ত।
২. উপদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে আদব ও পদ্ধতি
উপদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে স্ত্রীকে অবশ্যই সর্বোচ্চ আদব ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে। কারণ উদ্দেশ্য স্বামীকে লজ্জিত করা বা সম্পর্ক নষ্ট করা নয়, বরং তাকে সংশোধিত করা।
ক. নম্র ও কোমল ভাষা ব্যবহার:
যখন হযরত মূসা (আ.) এবং হারূন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন আল্লাহ তাদেরকে কোমল ভাষায় কথা বলতে বলেন, যদিও ফেরাউন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অবাধ্য শাসক।
اِذْهَبَاۤ اِلٰی فِرْعَوْنَ اِنَّہٗ طَغٰی ﴿ۚۖ۴۳﴾ فَقُوْلَا لَہٗ قَوْلًا لَّیِّنًا لَّعَلَّہٗ یَتَذَكَرُ اَوْ یَخْشٰی ﴿۴۴﴾
তোমরা দু’জন ফির‘আউনের নিকট যাও, কেননা সে তো সীমালংঘন করেছে। তোমরা তার সাথে নরম কথা বলবে। হয়তোবা সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে। সূরা ত্বহা : ৪৩-৪৪
স্বামীর ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা উচিত। কঠোরতা বা রূঢ়তার পরিবর্তে নম্রতা ও ভালোবাসা দিয়ে কথা বললে তা বেশি কার্যকর হয়।
খ. গোপনে উপদেশ:
উপদেশ সর্বদা একান্তে ও গোপনে প্রদান করা উচিত। অন্য কারো সামনে স্বামীর ভুল তুলে ধরলে তিনি নিজেকে অপমানিত মনে করতে পারেন এবং উপদেশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। জনসমক্ষে ভুল ধরা মানুষের মর্যাদাহানি করে।
গ. উপযুক্ত সময় নির্বাচন:
স্ত্রীকে এমন সময় নির্বাচন করতে হবে যখন স্বামীর মেজাজ ভালো থাকে এবং তিনি মনোযোগ সহকারে কথা শুনতে প্রস্তুত থাকেন।
ঘ. যুক্তির চেয়ে আহ্বানকে প্রাধান্য দেওয়া:
স্ত্রী শুধু ভুলটি ধরিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হবেন না, বরং কুরআন ও হাদিসের আলোকে সেই কাজের ক্ষতি এবং সঠিক পথ সম্পর্কেও বুঝিয়ে বলবেন। মনে রাখতে হবে, তিনি স্বামীর আদালত নন, তিনি তার সহকর্মী ও সহায়তাকারী।
ঙ. সীমালঙ্ঘন না করা:
যদি স্বামী উপদেশ গ্রহণ না করেন, তবে স্ত্রী তাঁর সাথে দুর্ব্যবহার করতে পারবেন না বা স্বামীর অন্যান্য অধিকার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবেন না। স্ত্রী শুধু আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তার দায়িত্ব পালন করে যাবেন এবং স্বামীর হেদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকবেন। কারণ হেদায়াত দানের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
উপসংহার : স্বামীর কাছ থেকে শরীয়ত বিরোধী কাজ প্রকাশ পেলে স্ত্রীকে অবশ্যই আদব, বিনয়, নম্রতা ও ভালোবাসা দিয়ে তাকে বোঝাতে হবে। এটি শুধু স্বামীর অধিকার নয়, বরং তাদের পারিবারিক শান্তি ও আখিরাতের সফলতার জন্য স্ত্রীর একটি শরয়ী দায়িত্ব।
২০. কারো সাথে স্বামীর বদনাম বা সমালোচনা না করা।
ইসলাম ধর্মে দাম্পত্য জীবনকে শান্তি, ভালোবাসা এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা এবং উত্তম আচরণ এই বন্ধনকে মজবুত করে। স্বামীর অধিকারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার সম্মান রক্ষা করা এবং কারো সামনে তার বদনাম বা সমালোচনা না করা। এই বিষয়টি কুরআন ও হাদীসের আলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারো সামনে স্বামীর সমালোচনা বা বদনাম করাকে ইসলামে গীবত (পরনিন্দা)-এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হতে পারে, যা একটি কবীরা গুনাহ। তবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব আরও গভীর।
১. পারস্পরিক অধিকার ও মর্যাদা
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি বিশেষ অধিকার ও মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা পুরুষকে পরিবারের কর্তা বা তত্ত্বাবধায়ক (কাওয়াম) হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন, কারণ তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে (পরিবারকে সমর্থন করে)। এই মর্যাদা পারস্পরিক সম্মানের দাবি রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ وَّبِمَاۤ اَنۡفَقُوۡا مِنۡ اَمۡوَالِہِمۡ ؕ فَالصّٰلِحٰتُ قٰنِتٰتٌ حٰفِظٰتٌ لِّلۡغَیۡبِ بِمَا حَفِظَ اللّٰہُ ؕ
পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু তারা নিজদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর অন্তরালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেনে। সুনা নিসা : ৩৪
এখানে কর্তৃত্বশীল বলতে স্বৈরাচারী হওয়া নয়, বরং দায়িত্বশীল হওয়া এবং পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে বোঝানো হয়েছে। স্ত্রীর কর্তব্য হলো এই দায়িত্বের প্রতি সম্মান দেখানো।
২. সমালোচনা বা বদনামের ভয়াবহতা (গীবত)
অন্যের সামনে স্বামীর বদনাম বা সমালোচনা করা সাধারণভাবে গীবত বা পরনিন্দার শামিল, যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। গীবতকে ইসলামে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ وَّلَا تَجَسَّسُوۡا وَلَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡہِ مَیۡتًا فَکَرِہۡتُمُوۡہُ ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ تَوَّابٌ رَّحِیۡمٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবূলকারী, অসীম দয়ালু। সূরা হুজরাত : ১২
স্বামী যখন অনুপস্থিত, তখন তার দোষ বলে বেড়ানোও এক প্রকার গীবত এবং এটি স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
স্ত্রী স্বামীর সম্পদ রক্ষক: সৎ স্ত্রীরা স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেদের সতীত্ব ও স্বামীর সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করে। এর মধ্যে স্বামীর মান-সম্মানও অন্তর্ভুক্ত। কারো সামনে স্বামীর সমালোচনা করলে তা তার সম্মান ক্ষুণ্ণ করে।
৩. স্ত্রীর করণীয়
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক একটি পবিত্র আমানত। বাইরের কারো কাছে স্বামীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা, দোষ বা সংসারের ভেতরের বিষয় নিয়ে সমালোচনা বা বদনাম করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। এটি দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্রতার অংশ। স্বামী-স্ত্রীর উচিত তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গোপন রাখা। যদি স্বামীর কোনো ত্রুটি থাকে, তবে স্ত্রীর কর্তব্য হলো গোপনে, একান্তে ও নম্রভাবে তাকে উপদেশ দেওয়া এবং সংশোধনের চেষ্টা করা। প্রকাশ্যে বা অন্যের সামনে সমালোচনা করলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং স্বামীর মর্যাদাহানি হয়। অনেক সময় স্ত্রীর কর্তব্য হয় স্বামীর কোনো ত্রুটির কারণে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে স্বামীর সংশোধনের জন্য দু’আ করা।
ইসলামী নির্দেশনা হলো, স্ত্রী তার স্বামীর মান-সম্মান রক্ষা করবেন এবং তাকে ভালোবেসে তার প্রতি উত্তম ব্যবহার করবেন। কারণ স্বামীর সম্মান রক্ষা করা প্রকারান্তরে নিজের পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করার শামিল।
২১. স্বামীর আত্মীয় ও আপনজনদের সাথে ভালো ব্যবহার করা
ইসলামে স্বামীর আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে তার পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করাকে স্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও স্বামীর অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আচরণ পারিবারিক শান্তি ও স্বামীর প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিচায়ক। স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের সাথে খারাপ ব্যবহার না করা এবং বিশেষ করে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি সেবা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার গুরুত্ব ইসলামে একাধিক কারণে বিদ্যমান, যা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
১. পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও উত্তম চরিত্র
ইসলাম পারিবারিক বন্ধন রক্ষা এবং উত্তম নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। স্বামীর আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহার এই নীতিরই অংশ। কুরআন ও হাদীসে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিবাহ স্বামী-স্ত্রীর পরিবারগুলোর মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক স্থাপন করে। এই সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা বলেন-
ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِیۡ تَسَآءَلُوۡنَ بِہٖ وَالۡاَرۡحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلَیۡکُمۡ رَقِیۡبًا
হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। সূরা নিসা :১
স্বামীর আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে পিতা-মাতা, এই রক্তের সম্পর্কের অংশ। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার না করা পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে এবং স্বামীর মনকে কষ্ট দেয়।
২. স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও মন রক্ষা
স্বামীর আত্মীয়দের কষ্ট দিলে সরাসরি স্বামীর মন ভেঙে যায়। স্ত্রীর অন্যতম প্রধান কর্তব্য হলো স্বামীর মনকে খুশি রাখা এবং তার অধিকার পূরণ করা। স্ত্রীর জন্য স্বামীর প্রতি আনুগত্য এবং তাকে সন্তুষ্ট রাখা জান্নাত লাভের অন্যতম পথ। স্বামীর পিতা-মাতার প্রতি সম্মান দেখানো তার সন্তুষ্টির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয (রাঃ) সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সিজদা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হে ম’আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সিজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করতে। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! স্ত্রী তার স্বামীর প্রাপ্য অধিকার আদায় না করা পর্যন্ত তার প্রভুর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে না। স্ত্রী শিবিকার মধ্যে থাকা অবস্থায় স্বামী তার সাথে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে স্ত্রীর তা প্রত্যাখ্যান করা অনুচিত।
সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৩, আদাবুয যিফাফ : ১৭৮, সহিহাহ : ১২০৩
যদিও শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা সরাসরি শরীয়তের বাধ্যতামূলক বিধান নয়, তবে তাদের সেবা করা স্বামীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে গণ্য হয়, যার মাধ্যমে স্বামী অত্যন্ত খুশি হন। স্বামীর অধিকারের মধ্যে পড়ে সে যেন তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো কষ্ট না পায়।
স্বামীর পরিবারের প্রতি সহানুভূতি দেখানো মানেই স্বামীর প্রতি সহানুভূতি দেখানো। কারণ স্বামীর চোখে তার পিতা-মাতার স্থান সর্বোচ্চ। তাদের প্রতি খারাপ আচরণ করা মানে স্বামীর প্রতিই খারাপ আচরণ করা।
৩. শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি সেবার মর্যাদা (পিতা-মাতার সম্মান)
স্বামীর পিতা-মাতা স্ত্রীর কাছে শ্বশুর ও শাশুড়ি। ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার মর্যাদা আল্লাহর ইবাদতের পর সবচেয়ে বেশি। স্বামীর পিতা-মাতাকে নিজের পিতা-মাতার মতো সম্মান করা কর্তব্য। যদিও শ্বশুর-শাশুড়ি স্ত্রীর জন্য রক্ত সম্পর্কীয় পিতা-মাতা নন, কিন্তু তাদের মর্যাদা স্বামীর কারণে অনেক উচ্চে। তাদের সেবা করা নিজের পিতা-মাতার সেবা করার মতোই পুণ্যময়।
وَاعۡبُدُوا اللّٰہَ وَلَا تُشۡرِکُوۡا بِہٖ شَیۡئًا وَّبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا وَّبِذِی الۡقُرۡبٰی وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنِ وَالۡجَارِ ذِی الۡقُرۡبٰی وَالۡجَارِ الۡجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالۡجَنۡۢبِ وَابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ وَمَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ مَنۡ کَانَ مُخۡتَالًا فَخُوۡرَا ۙ
তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী। সূরা নিসা : ৩৬
স্ত্রীর উত্তম আচরণে স্বামী তার পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য পালনে সহায়তা পান, যা তাকে দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী করে এবং পরিবারে শান্তি বজায় রাখে।
শ্বশুরের সেবার পাত্র মনে করে যথাসম্ভব শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও খিদমত করা দাম্পত্য জীবনে বরকত নিয়ে আসে। এই সেবার মানসিকতা দাম্পত্য বন্ধনকে আরও দৃঢ় ও মাধুর্যময় করে তোলে। যখন কোনো স্ত্রী স্বামীর পরিবারকে আপন করে নেয়, তখন সে স্বামীর চোখে আরও বেশি শ্রদ্ধার পাত্রী হয়।