হাশরের ময়দানের বিচার : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

হাশরের ময়দান হলো পরকালের এমন এক বিশাল স্থান, যেখানে মানবজাতির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকলকে একত্রিত করা হবে। এই স্থানটি এক মহাবিচারের মঞ্চ, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার পার্থিব জীবনের প্রতিটি কাজের হিসাব দেবে। সেদিন কোনো মানুষই এই বিচার থেকে রেহাই পাবে না—রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সবাই সেখানে উপস্থিত থাকবে।

পার্থিব জীবনকে যেভাবে কর্মের ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, হাশরের ময়দান হলো তার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের স্থান। সেদিন মানুষের সকল কর্ম—প্রকাশ্য কিংবা গোপন, ছোট কিংবা বড়—একেবারে নিখুঁতভাবে সামনে আনা হবে। কোনো কিছু গোপন থাকবে না, কোনো কিছু হারিয়ে যাবে না। এমনকি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তার কৃতকর্মের সাক্ষী দেবে। সেদিন সব মানুষের জন্য দু’টি পাল্লা স্থাপন করা হবে, যেখানে তাদের ভালো এবং মন্দ আমল ওজন করা হবে। যাদের ভালো কাজের পাল্লা ভারী হবে, তারা পাবে এক অনাবিল শান্তি ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি। আর যাদের মন্দ কাজের পাল্লা ভারী হবে, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন পরিণতি।

এই বিচারের দিনটি হবে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং কঠিন। মানুষ সেদিন যার যার নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। তবে যারা নিজেদের জীবনে সৎ কাজ করেছে, মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে এবং স্রষ্টার প্রতি অনুগত ছিল, তাদের জন্য সেদিন থাকবে এক বিশেষ প্রশান্তি ও নিরাপত্তা। তাদের আমলনামা তাদের হাতে দেওয়া হবে, যা দেখে তারা বুঝতে পারবে তাদের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে। এটি কেবল কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়, বরং এটি মানবজীবনের চূড়ান্ত গন্তব্যের এক অনিবার্য বাস্তবতার চিত্র।

১. হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত বিচার

কিয়ামতের দিন মানুষ পুনরুত্থিত হবে, সকল আমলের হিসাব নেওয়া হবে এবং চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হবে। এই বিচার এমন একটি কঠিন মুহূর্ত, যার ভয়াবহতা কুরআন ও হাদীসে গভীরভাবে বর্ণিত হয়েছে। মানুষ সেখানে নগ্ন, অচল, আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় অবস্থান করবে এবং এক এক করে সকলকে আল্লাহর আদালতে উপস্থিত করা হবে। সেই মহামহিম আদালতের বিচার দুইটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হবে-

ক. হক্কুল্লাহ সম্পর্কিত বিচার

খ. হক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত বিচার

ক. হক্কুল্লাহ সম্পর্কিত বিচার

হক্কুল্লাহ অর্থ হলো- আল্লাহর অধিকার বা বান্দার উপর আল্লাহর যে সমস্ত হক (অধিকার) রয়েছে। এটি ইসলামী বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক দিক, যা কিয়ামতের দিন বিচারকার্যের প্রথম ভাগে অন্তর্ভুক্ত হবে। একজন বান্দার জীবনের প্রধান দায়িত্ব হলো— আল্লাহর হক আদায় করা। আর আল্লাহর হক হচ্ছে— তিনি যেভাবে ইবাদত করতে বলেছেন, ঠিক সেইভাবে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা।

এককথায় হক্কুল্লাহ বলতে সেই সকল দায়িত্ব ও কর্তব্যকে বোঝায়, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার উপর ফরজ করেছেন, তাঁর প্রতি বান্দার আনুগত্য, ইবাদত, বিশ্বাস ও আচরণের ক্ষেত্রে।

তাওহিদ হলো সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক। আল্লাহ চান, বান্দা কেবল তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। আল্লাহ বলেন:

وَمَا خَلَقْتُ ٱلْجِنَّ وَٱلْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমারই ইবাদতের জন্য। সূরা যারিয়াত : ৫৬

আল্লাহর সবচেয়ে বড় হক সম্পর্কে সহিহ হাদিসে এসেছে-

মু‘আয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, উফাইর নামক একটি গাধার পিঠে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর পেছনে আরোহী ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে মু‘আয, তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর হক কী? এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহর হক হলো, বান্দা তাঁর ‘ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হলো, তাঁর ‘ইবাদাতে কাউকে শরীক না করলে আল্লাহ্ তাকে শাস্তি দিবেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি কি লোকদের এ সুসংবাদ দিব না? তিনি বললেন, তুমি তাদের সুসংবাদটি দিও না, তাহলে লোকেরা এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। সহিহ বুখারি : ২৮৫৬, ৫৯৬৭, ৬২৬৭, ৬৫০০, ৭৩৭৩, সহিহ মুসলিম : ৩০, আহমাদ : ২২০৫২

তাওহীদ ও শিরকের বিচার

কিয়ামতের দিনের বিচারপদ্ধতির ভিত্তি হলো তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদ। তাওহীদ ইসলামের মূল স্তম্ভ। যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করে ইবাদত করেছে, তাদের কোনো আমলই গৃহীত হবে না। অর্থাৎ তাওহিদের বিশ্বাসের কারনে মানুষ হিসেব প্রদানে জন্য উপযুক্ত হবে। যারা মুশরিক তাদের তাদের হিসেব থেকে বাদ দেওয়া হবে। শিরককারির গুনাহ ক্ষমা করা হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغْفِرُ اَنْ یُّشْرَکَ بِہٖ وَیَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِکَ لِمَنْ یَّشَآءُ ۚ وَمَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰہِ فَقَدِ افْتَرٰۤی اِثْمًا عَظِیْمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অন্য বর্ণনায় রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি-

مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ ‏”‏ ‏.‏ وَقُلْتُ أَنَا وَمَنْ مَاتَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏.

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শারীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আমি বলি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শারীক না করা অবস্থায় মারা যায় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯২

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আমি বলতে শুনেছি, বারাকাতময় আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার হতে (ক্ষমা পাওয়ার) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তোমার গুনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌছে যায়, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গুনাহ নিয়েও আমার নিকট আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাযির হব। সুনানে তিরমিজি : ৩৫৪০, সহিহাহ : ১২৭, ১২৮ হাদিসের মান হাসান

আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ যাকারিয়া বর্ণনা করেছেন, আমি উম্মু দারদাকে বলতে শুনেছি, আমি আবূ দারদা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ সব গুনাহই ক্ষমা করবেন; কিন্তু মুশরিক অবস্থায় কেউ মারা গেলে অথবা কোনো ঈমানদার ব্যক্তি অপর কোনো ঈমানদারকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করলে। সুনানে কখআবু দাউদ : ৪২৭০

যারা তাওহীদ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে বিচারের দ্বিতীয় ধাপে গমন সম্ভব। আর যারা শিরকে লিপ্ত ছিল, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন-

وَلَقَدْ اُوْحِیَ اِلَیْکَ وَاِلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِکَ ۚ لَئِنْ اَشْرَکْتَ لَیَحْبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوْنَنَّ مِنَ الْخٰسِرِیْنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہْدِیْ بِہٖ مَنْ یَّشَآءُ مِنْ عِبَادِہٖ ؕ وَلَوْ اَشْرَکُوْا لَحَبِطَ عَنْہُمْ مَّا کَانُوْا یَعْمَلُوْنَ

এ হচ্ছে আল্লাহর হিদায়াত, এ দ্বারা তিনি নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্‌ক করত, তবে তারা যা আমল করছিল তা অবশ্যই বরবাদ হয়ে যেত। সুরা আনাম : ৮৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَقَدِمْنَاۤ اِلٰی مَا عَمِلُوْا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنٰہُ ہَبَآءً مَّنْثُوْرًا

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

মুআবিয়া বিন হায়দা বিন মুআবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لاَ يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْ مُشْرِكٍ أَشْرَكَ بَعْدَ مَا أَسْلَمَ عَمَلاً حَتَّى يُفَارِقَ الْمُشْرِكِينَ إِلَى الْمُسْلِمِينَ ‏

কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর মুশরিক হয়ে শিরকে লিপ্ত হলে আল্লাহ তার কোন আমলই গ্রহণ করেন না, যাবত না সে মুশরিকদের থেকে পৃথক হয়ে মুসলমানের মধ্যে প্রত্যাবর্তন করে। সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৫৩৬, আহমাদ : ১৯৫৩৩, সহীহাহ : ৩৬৯

যারা শিরক করেছে, তারা কোনো প্রশ্নোত্তর ছাড়াই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

নেক বা বদ আমলের হিসাব

যারা তাওহিদের পরিক্ষায় পাশ করবে তাদের নেক আমল বা বদ আমলের হিসেবের মুখোমিখি করা হবে। কিন্তু যারা শিরকে লিপ্ত ছিল, কুফরি করেছিল, পরকার অস্বীকার করছিল তারা তাওহিদের পরীক্ষায় ফেল করে দ্বিতীয় পর্যায়ে (হিসেব নিকেশ) উত্তির্ণ হতে পারবেনা। অর্থাৎ তাওহীদের ভিত্তিতে যারা ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের দ্বিতীয় পর্যায়ে আল্লাহ হক সম্পর্কে বিচার করা হবে। এ পর্যায়ে প্রধান্য পারে ঈমান আনার পর আল্লাহ প্রদত্ত ইবাদত, আদেশ নিষেধ, হালাল হারামের সীমা সম্পর্কিত বিষয়। এক কথায় বলা যায়, ইসলামে সকল হুকুম আহকাম সম্পর্কিত বিষয় যা সরাসরি আল্লাহ হকের সাথে জড়িত। যেমন-

১. প্রতি দিন পাঁচবার সালাত আদায় করা ফরজ। সুরা বাকারা : ৪৩, ৮৩, ২৭৭, সুরা নিসা : ১০৩, সুরা মায়েদা : ৫৫, সুরা আনআম : ৭২, সুরা আরাফ : ১৭০, সুরা আনফাল : ৩, সুরা তাওবা : ১৮, ৭১, সুরা রাদ : ২২, সুরা ইব্রাহিম : ৩১, সুরা নুর : ৫৬ ইত্যাদি

২. রমাজান মাসে সিয়াম আদায় করা ফরজ। সূরা বাকারা : ১৮৩-১৮৫, সহিহ বুখারি : ০৮, ৪৫১৪, সহিহ মুসলিম : ১৬, মিশকাত : ১৯৬২, সুনানে নাসায়ি : ২১০৬, সহিহ আত্ তারগীব : ৯৯৯, সহিহ আল জামি : ৫৫

৩. সামর্থ্যবাদ উপর আল্লাহর জন্য হজ ফরজ করেছেন। সুরা ইমরান : ৯৭, সুরা হাজ :২৭, সহিহ বুখারি ৮, সহিহ মুসলিম ১৬,

৫. নিসাব পরিমান মালের উপর জাকাত ফরজ করেছেন।  সুরা বাকারা : ৪৩, সুরা বাইয়িনা : ৫, সহিহ বুখারি : ৫৭, ৫২৪, ১৪০১, ২১৫৭, ২৭১৪, ২৭১৫, ৭২০৪, সহিহ মুসলিম : ৫৬, আহমাদ : ৩২৮১

৬. অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করা না করা। সুরা নিসা : ২৯, সুরা বাকারা : ১৮৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৩৩

৭. প্রকাশ্য ও গোপন সকল অশ্লীলতার থেকে দুরে থাকা ফরজ। সূরা আনআম : ১৫১

৮. হারাম কাজ পরিহার করা, সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করা । সূরা হাশর : ৭

৯.  সূদ পরিহার করে চলা অ সুরা বাকারা : ২৭৫. ২৭৬, ২৭৮, সুরা ইমরান : ১৩০, সুনানে নাসাঈ : ৫১০২, ইরনে মাজাহ ২২৭৪, মিসকাত ২৮২৬, শুয়াবুল ঈমান ৫১৩৩

১০. হারাম মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত ভক্ষন না করা। সুরা মায়েদা : ৩, সুনানে আবু দাউদ : ৩৪৮৫

আল্লাহর শত শত আদেশ নিষেদ থেকে মাত্র ১০ টি উদাহরণ তুলে ধরলাম। এগুলো সম্পর্কে কিয়ামতে দিন জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ তালায়া এ সকল আমলের জন্য শাস্তির ঘোষণা করেছেন। যেমন-

১. সালাত আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে।

 সুরা মারিয়াম : ৫৯, সুরা রূম : ৩১, সহিহ মুসলিম : ৮২, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬৭৮, সুনানে নাসায়ী : ৪৬৪, সুনানে তিরমিযী ২৬২০, সুনানে ইবনু মাজাহ্ ১০৭৮, মিশকাত : ৫৬৯

২. জাকাত আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে।

সুরা তাওবা : ৩৪-৩৫, সহিহ বুখারি : ১৪০৩, ১৪৬০, ৪৫৬৫, ৬৬৩৮, ৪৬৫৯, ৬৯৫৭, সহিহ মুসলিম : ৯৯০, আহমাদ : ২১৪০৯

৩. সিয়াম আদায় না করার জন্য শাস্তি পেতে হবে। সহিহ বুখারি : ২৮৪০, সহিহ মুসলিম : ১১৫৩, তিরমিযী ১৬২৩, নাসায়ী : ২২৫১-২২৫৩, ইবনু মাজাহ : ১৭১৭

একটিভাবে প্রতিটি ফরজ, ওয়াজিব, হারাম, অন্যায় অসত্য কাজের শাস্তির ঘোষণা আছে। এ শাস্তি প্রদান আল্লাহ তায়ালা শতভাগ সক্ষম। কিন্তু বড় আশার কথা হলো তিনি ইচ্ছা করলে তার সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

আল্লাহ হক্কুল্লাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন :

হক্কুল্লাহ সম্পর্কে আল্লাহ ক্ষমাশীল। এটি একটি আশার কথা, যে হক্কুল্লাহ যদি কেউ লঙ্ঘন করে, তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি শিরক ব্যতিত সকল গুনাহ ক্ষমা করা হবে। আশা করা যায় বান্দা তার যে সকল হক (শিরক করা ব্যতিত) আদায় করতে পাবে নাই, তা ক্ষমা করা হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغْفِرُ اَنْ یُّشْرَکَ بِہٖ وَیَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذٰلِکَ لِمَنْ یَّشَآءُ ۚ وَمَنْ یُّشْرِکْ بِاللّٰہِ فَقَدِ افْتَرٰۤی اِثْمًا عَظِیْمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সূরা নিসা: ৪৮

খ. হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক

হক্কুল ইবাদ” (حَقُّ الْعِبَاد) একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো বান্দার হক বা মানুষের হক। অর্থাৎ, এক মানুষের প্রতি অন্য মানুষের যে অধিকার ও দায়িত্ব, যেমন – মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব, প্রতিবেশীর অধিকার, আমানতের হেফাজত, সম্মান রক্ষা করা, ইত্যাদি।

ইসলামের নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো “হক্কুল ইবাদ” বা বান্দার হক। এটি এমন এক নীতি যা একজন মুসলিমকে কেবল আল্লাহর ইবাদতকারী হিসেবেই নয়, বরং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।

হক্কুল ইবাদের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, সহানুভূতি এবং ন্যায়পরায়ণতা। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। এর মধ্যে রয়েছে অন্যের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও স্বাধীনতাকে সম্মান করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হয়। এটাই মহা সাফল্য।” এখানে সৎকর্মের মধ্যে হক্কুল ইবাদ একটি অপরিহার্য অংশ। হক্কুল ইবাদ একটি বিস্তৃত ধারণা এবং এর মধ্যে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত। কিছু প্রধান দিক নিচে তুলে ধরা হলো-

১. পিতা মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা লোকমান : ১৪, সুরা বনিইসরাইল : ২৩, সুরা আনাম : ১৫১, সুরা আহকাফ : ১৫, সুরা বাকারা : ২১৫

২. পুরুষ ও স্ত্রী একে অপরের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।মুসলিম ১৪৬৯, রিয়াদুস সালেহীন : ২৭৫, আহমাদ ৮১৬৩, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫১, সুনানে তিরমিযী ১১৬৩, ৩০৮৭, ইরওয়াহ ১৯৯৭-২০২০, রিয়াদুস সালেহীন : ২৭৬

৩. আত্মীয় স্বজনের সাথে সদাচরণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সুরা বাকারা : ৮৩, ১৭৭, ১৮০, সুরা মুহাম্মদ : ২২-২৩, সহিহ বুখারি : ৫৯৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৫৬, সুনানে তিরমিজি ১৯০৯, আবু দাউদ ১৬৯৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩২৫১, সুনানে তিরমিযি : ২৪৮৫, দারিমী ১৪৬০।

৪. প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার নির্দেশ দেওয়া হয়েছ।

সুরা নিসা : ৩৬, সহিহ বুখারি : ১২৪০, ২৫৬৬, ৬০৪৭, সহিহ মুসলিম : ১০৩০, ২১৬০, সুনানে তিরমিজি ২১৩০, ২৭৩৭, সুনানে নাসায়ি ১৯৩৮, সুনানে আবু দাউদ ৫০৩০, ইবনে মাজাহ ১৪৩৫, রিয়াদুস সালেহীন : ৩০৬,

৫. সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, তাদের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করা।

সুরা মায়েদা : ২, সুরা হুজুরাত : ১০, সুরা ফুসসিলাত : ৩৪, সহিহ বুখারি : ৬০১১, ৬০১৩, ৭৩৭৬, সহিহ মুসলিম ২৩১৯, ২৫৮৬, সুনানে তিরমিযী : ১৯২২, , রিয়াদুস সালেহীন : ২২৪,  আহমাদ ১৮৭০৭, ১৮৭২১, ১৮৭৫৬, ১৮৭৭৭

৬. শ্রমিকের শ্রমের মর্যাদা দেওয়া, তাদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের জুলুম না করা ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা। সূরা আল-মায়েদা : ১, সহিহ বুখারি : ২০৭২,  ২২২৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৪৪৩

৭. এতিম, মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। সূরা বাকারা : ১৭৭, সূরা আন-নিসা : ৩৬, সূরা আল-ইনসান : ৮, সূরা ফজর : ১৭-১৮, সহিহ বুখারি :  ৫০০২, সহিহ মুসলিম: ৯৯৬ ১০৫৮, সুনানে তিরমিজি: ১৯১৮

হক্কুল ইবাদ এর গুনাহ ক্ষমা করা হবে না

হক্কুল্লাহর ক্ষেত্রে, আল্লাহ চাইলে তার বান্দার কোনো গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন, শিরক (আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা) ছাড়া। তবে হক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক নষ্ট করার গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত যার হক নষ্ট করা হয়েছে, সে নিজে ক্ষমা না করে। এর মূল কারণ হলো, আল্লাহ অত্যন্ত ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবেন।

হক্কুল ইবাদ সংক্রান্ত গুনাহের মধ্যে রয়েছে অন্যের সম্পত্তি আত্মসাৎ করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, গালিগালাজ করা, কারও সম্মানহানি করা, ঋণ পরিশোধ না করা, ইত্যাদি। এ ধরনের গুনাহের বিচার এতটাই কঠোর হবে যে, হাদিসে বর্ণিত আছে, কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি সবচেয়ে নিঃস্ব হবে, যে দুনিয়াতে অনেক নেক আমল নিয়ে আসবে, কিন্তু একই সাথে মানুষের হক নষ্ট করেছে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ তোমরা কি বলতে পার, অভাবী লোক কে? তারা বললেন, আমাদের মাঝে যার দিরহাম (টাকা কড়ি) ও ধন-সম্পদ নেই সে তো অভাবী লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মাতের মধ্যে সে প্রকৃত অভাবী লোক, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম ও যাকাত নিয়ে আসবে; অথচ সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। এরপর সে ব্যক্তিকে তার নেক ’আমল থেকে দেয়া হবে, অমুককে নেক আমল থেকে দেয়া হবে। এরপর যদি পাওনাদারের হাক তার নেক ’আমল থেকে পূরণ করা না যায় সে ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার প্রতি নিক্ষেপ করা হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সহিহ মুসলিম : ২৫৮১

হাদিস অনুযায়ী, বিচার দিবসে যখন পাওনাদাররা তাদের পাওনা দাবি করবে, তখন তাদের পাওনাদারকে পরিশোধ করার জন্য সেই হক নষ্টকারী ব্যক্তির নেক আমলগুলো থেকে নিয়ে দেওয়া হবে। যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তখন পাওনাদারের গুনাহ তার কাঁধে চাপানো হবে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সুতরাং, বান্দার হক সম্পর্কিত গুনাহ থেকে বাঁচতে হলে জীবিত থাকতেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে এবং তার পাওনা পরিশোধ করে দিতে হবে। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করার পাশাপাশি যার হক নষ্ট করেছেন তা পরিশোধের পর তার জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। এটি বিচারকার্যের সবচেয়ে ভয়াবহ ও কঠিন পর্যায়। বান্দার সাথে বান্দার যে সম্পর্ক, অন্যায়-অবিচার, গীবত, ধোঁকা, হক্ব নষ্ট করা, অপমান এসবের বিচার এই পর্যায়ে হবে। এই বিষয়ে ক্ষমার সুযোগ নেই। আল্লাহ তাঁর নিজের হক মাফ করতে পারেন। কিন্তু বান্দার হক তখনই মাফ হবে, যদি হকদার নিজে তা ক্ষমা করে দেয়।

২. কিয়ামতের দিন প্রথম আদম আলাইহিস সালাম কে ডাকা হবে

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন-

«أَوَّلُ مَنْ يُدْعَى يَوْمَ القِيَامَةِ آدَمُ، فَتَرَاءَى ذُرِّيَّتُهُ، فَيُقَالُ: هَذَا أَبُوكُمْ آدَمُ، فَيَقُولُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ، فَيَقُولُ: أَخْرِجْ بَعْثَ جَهَنَّمَ مِنْ ذُرِّيَّتِكَ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ كَمْ أُخْرِجُ، فَيَقُولُ: أَخْرِجْ مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ ” فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِذَا أُخِذَ مِنَّا مِنْ كُلِّ مِائَةٍ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ، فَمَاذَا يَبْقَى مِنَّا؟ قَالَ: «إِنَّ أُمَّتِي فِي الأُمَمِ كَالشَّعَرَةِ البَيْضَاءِ فِي الثَّوْرِ الأَسْوَدِ»

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-কে ডাকা হবে। তিনি তাঁর সন্তানদেরকে দেখতে পাবেন। তখন তাদেরকে বলা হবে, ইনি তোমাদের পিতা আদম (আঃ)। তখন তারা বলবে لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ আমরা তোমার খিদমাতে হাযির! এরপর তাঁকে আল্লাহ্ বলবেন, তোমার জাহান্নামী বংশধরকে বের কর। তখন আদম (আঃ) বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! কী পরিমাণ বের করব? আল্লাহ্ বলবেনঃ প্রতি একশ’ তে নিরানব্বই জনকে বের কর। তখন সাহাবাগণ বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! প্রতি একশ’ থেকে যখন নিরানব্বই জনকে বের করা হবে তখন আর আমাদের কে বাকী থাকবে? তিনি ﷺ বললেন,  নিশ্চয়ই অন্যান্য সকল উম্মাতের তুলনায় আমার উম্মাত হল কাল ষাঁড়ের গায়ে একটি সাদা চুলের মত। সহিহ বুখারি : ৬৫২৯

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাযির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুতঃ আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হাজ্জঃ ২)। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে। অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। [আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) বলেন] আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। সহিহ বুখাই : ৩৩৪৮, ৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২২, মিশকাত : ৫৫৪১, সহীহুল জামি : ১৪১০২, হাকিম : ৮০।

৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর সুপারিশে হিসাব গ্রহণের শুরু হবে

কিয়ামতের পর জান্নাতকে ঈমানদারদের নিকটে নিয়ে আসা হবে। তারা তাতে প্রবেশ করার জন্য অস্থির হয়ে যাবে। অপরদিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিচার, হিসাব নিকাশে দেরী করবেন। তখন মানুষেরা নবী ও রাসূলদের কাছে যাবে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার জন্য। তখন প্রত্যেক নবীই বলবে, আমি আমার জন্য চিন্তিত তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাও।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী ﷺ-এর সঙ্গে এক খানার দা’ওয়াতে উপস্থিত ছিলাম। তাঁর সামনে (রান্না করা) ছাগলের বাহু আনা হল, এটা তাঁর নিকট পছন্দনীয় ছিল। তিনি সেখান হতে এক খন্ড খেলেন এবং বললেন, আমি কিয়ামতের দিন সমগ্র মানব জাতির সরদার হব। তোমরা কি জান? আল্লাহ কিভাবে (কিয়ামতের দিন) একই সমতলে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্র করবেন? যেন একজন দর্শক তাদের সবাইকে দেখতে পায় এবং একজন আহবানকারীর আহবান সবার নিকট পৌঁছায়। সূর্য তাদের অতি নিকটে এসে যাবে। তখন কোন কোন মানুষ বলবে, তোমরা কি লক্ষ্য করনি, তোমরা কী অবস্থায় আছ এবং কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ। তোমরা কি এমন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের জন্য তোমাদের রবের নিকট সুপারিশ করবেন? তখন কিছু লোক বলবে, তোমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) আছেন। তখন সকলে তাঁর নিকট যাবে এবং বলবে, হে আদম! আপনি সমস্ত মানব জাতির পিতা। আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার পক্ষ হতে রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকেছেন। তিনি ফেরেশতাদেরকে (আপনার সম্মানের) নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী সকলে আপনাকে সিজদাও করেছেন এবং তিনি আপনাকে জান্নাতে বসবাস করতে দিয়েছেন। আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? আপনি দেখেন না, আমরা কী অবস্থায় আছি এবং কী কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি। তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়েছেন এর পূর্বে এমন রাগান্বিত হননি আর পরেও এমন রাগান্বিত হবেন না। আর তিনি আমাকে বৃক্ষটি হতে নিষেধ করেছিলেন। তখন আমি ভুল করেছি। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা আমাকে ছাড়া অন্যের নিকট যাও। তোমরা নূহের নিকট চলে যাও। তখন তারা নূহ (আঃ)-এর নিকট আসবে এবং বলবে, হে নূহ! পৃথিবীবাসীদের নিকট আপনিই প্রথম রাসূল এবং আল্লাহ আপনার নাম রেখেছেন কৃতজ্ঞ বান্দা। আপনি কি লক্ষ্য করছেন না, আমরা কী ভয়াবহ অবস্থায় পড়ে আছি? আপনি দেখছেন না আমরা কতই না দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে আছি? আপনি কি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করবেন না? তখন তিনি বলবেন, আমার রব আজ এমন রাগান্বিত হয়ে আছেন, যা ইতোপূর্বে হন নাই এবং এমন রাগান্বিত পরেও হবেন না। এখন আমি নিজের চিন্তায়ই ব্যস্ত। তোমরা নবী [মুহাম্মাদ ﷺ]-এর নিকট চলে যাও। তখন তারা আমার নিকট আসবে আর আমি আরশের নীচে সিজদায় পড়ে যাব। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার মাথা উঠান এবং সুপারিশ করুন। আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে আর আপনি যা চান, আপনাকে তাই দেয়া হবে। মুহাম্মাদ ইবনু ‘উবাইদ (রহ.) বলেন, হাদীসের সকল অংশ মুখস্থ করতে পারিনি। সহিহ বুখারি : ৩৩৪০, ৩৩৬১, সহিহ মুসলিম : ১৯৪, আহমাদ : ৯২২৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে গোশ্ত আনা হল এবং তাঁকে সামনের রান পরিবেশন করা হল। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি তার থেকে কামড়ে খেলেন। এরপর বললেন, আমি হব কিয়ামতের দিন মানবকুলের নেতা। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? কিয়ামতের দিন আগের ও পরের সকল মানুষ এমন এক ময়দানে জমায়েত হবে, যেখানে একজন আহবানকারীর আহবান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই এক সঙ্গে দৃষ্টিগোচর করবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছ না? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদমের কাছে চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাঁকে বলবে, আপনি আবুল বাশার

আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে নিজ হস্ত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছেন এবং মালায়িকাহ্কে হুকুম দিলে তাঁরা আপনাকে সিজদা করেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কী অবস্থায় পৌঁছেছি। তখন আদম (আঃ) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত হয়েছেন যার আগেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হননি আর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি আমাকে একটি গাছের নিকট যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি, নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী, (আমি নিজেই সুপারিশ প্রার্থী) তোমরা অন্যের কাছে যাও, তোমরা নূহ (আঃ)-এর কাছে যাও। তখন সকলে নূহ্ (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে নূহ্ (আঃ)! নিশ্চয়ই আপনি পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রথম রাসূল।

আর আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আমার রব আজ এত ভীষণ রাগান্বিত যে, আগেও এমন রাগান্বিত হননি আর পরে কখনো এমন রাগান্বিত হবেন না। আমার একটি গ্রহণযোগ্য দু’আ ছিল, যা আমি আমার কওমের ব্যাপারে করে ফেলেছি, (এখন) নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও তোমরা ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে। তখন তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে ইব্রাহীম (আঃ)! আপনি আল্লাহর নবী এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আপনি আল্লাহর বন্ধু[3]। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি তাদের বলবেন, আমার রব আজ ভীষণ রাগান্বিত, যার আগেও কোন দিন এরূপ রাগান্বিত হননি, আর পরেও কোনদিন এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো তিনটি মিথ্যা বলে ফেলেছিলাম। রাবী আবূ হাইয়ান তাঁর বর্ণনায় এগুলোর উল্লেখ করেছেন- (এখন) নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও মূসার কাছে।

তারা মূসার কাছে এসে বলবে, হে মূসা (আঃ)! আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ্ আপনাকে রিসালাতের সম্মান দিয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে কথা বলে সমস্ত মানবকূলের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বললেন, আজ আমার রব ভীষণ রাগান্বিত আছেন, এরূপ রাগান্বিত আগেও হননি এবং পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। আর আমি তো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম, যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এখন নফ্সী, নফসী, নফসী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও ঈসা (আঃ)-এর কাছে।

তখন তারা ঈসা (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, হে ঈসা (আঃ)! আপনি আল্লাহররাসূল এবং কালিমাহ, যা তিনি মারইয়াম (আঃ)-এর উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি ’রূহ’। আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন ঈসা (আঃ) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগান্বিত যে, এর আগে এরূপ রাগান্বিত হননি এবং এর পরেও এরূপ রাগান্বিত হবেন না। তিনি নিজের কোন গুনাহর কথা বলবেন না। নফসী, নফসী, নফসী, তোমরা অন্য কারও কাছে যাও- যাও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে।

তারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ্ তা’আলা আপনার আগের, পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সিজদা দিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর নিয়ম আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে অন্য কারও জন্য খোলেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তোমার মাথা উঠাও। তুমি যা চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবূল করা হবে।

এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার উম্মাতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ব্যতীত অন্যদের সঙ্গে অন্য দরজায় ও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে। তারপর তিনি বলবেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার শপথ! জান্নাতের এক দরজার দুই পার্শ্বের মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা যেমন মক্কা ও হামীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বস্রার মাঝে দূরত্বের সমতুল্য। সহিহ বুখারি : ৪৭১২; সহিহ মুসলিম : ১৯৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *