মাদক ও যৌনতা
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
মাদকের অপকারিতা সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নিচে নির্ভরযোগ্য কুরআনের আয়াত ও হাদিসের রেফারেন্স সংক্ষেপে ও সাজানোভাবে তুলে ধরা হলো—
১. মাদক শয়তানের কাজ সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয়
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব শয়তানের নাপাক কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”সূরা মায়িদাহ: ৯০
‘খামর’ শব্দের মধ্যে সব ধরনের নেশাদ্রব্য (মাদক) অন্তর্ভুক্ত।
২. মাদক মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে দূরে রাখে
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ
“শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বিরত রাখতে।” সূরা মায়িদাহ: ৯১
৩️. নিজের ধ্বংস নিজ হাতে ডেকে আনা নিষিদ্ধ
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“তোমরা নিজেদের হাতেই নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” সূরা বাকারা: ১৯৫
মাদক মানুষের দেহ, মন, পরিবার ও সমাজ—সবকিছুকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
হাদিসের আলোকে মাদকের ভয়াবহতা
১️. সব নেশাদ্রব্যই হারাম
ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, নিশ্চয়ই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যা কিছু নেশাগ্রস্ত করে তা-ই মদ। আর যা নেশা উদ্রেক করে তা-ই নিষিদ্ধ। সহিহ মুসলিম : ২০০৩
অল্প হলেও হারাম
১৮৬৫। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে দ্রব্যের বেশি পরিমাণ (পান করলে) নেশার সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও (পান করা) হারাম। সুনানে তিরমিজি : ১৮৬৫, সুনানে ইবনো মাজাহ : ৩৩৯৩, সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৮১
মাদক সকল অশ্লীলতার মূল
১/৩৩৭১। আবূ দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার বন্ধু (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে উপদেশ দিয়েছেনঃ শরাব পান করো না, কারণ তা সমস্ত পাপাচারের প্রসূতি। সুনানে ইবনো মাজাহ : ৩৩৭১
মাদকাসক্তের ইমানি পরিণতি ভয়াবহ
আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ব্যভিচারী ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত থাকাবস্থায় মু’মিন থাকে না, চুরি করার সময় চোরও ঈমানদার তখনও সে মুমিন থাকে না। সহিহ বুখারি : ২৪৭৫, সহিহ মুসলিম : ৫৭
- সংক্ষেপে মাদকের ক্ষতি (ইসলামের দৃষ্টিতে)
- বিবেক ও বুদ্ধি নষ্ট করে
- সালাত ও ইবাদত থেকে দূরে রাখে
- পরিবার ধ্বংস করে
- সমাজে অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা বাড়ায়
- আত্মধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে
কুরআন ও আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের আলোকে মাদকের ক্ষতি
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাদকাসক্তি কেবল একটি ‘বাজে অভ্যাস’ নয়, বরং এটি একটি ‘ক্রনিক ব্রেইন ডিজিজ’ বা দীর্ঘস্থায়ী মস্তিষ্কের রোগ। শরীর ও মনের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক এবং সুদূরপ্রসারী। নিচে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে মাদকের ক্ষতিকর চিত্র এবং এর ভয়াবহতা আলোচনা করা হলো।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে মাদকের ভয়াবহ চিত্র
আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মাদক গ্রহণের ফলে মানুষের শরীরে এবং মস্তিষ্কে রাসায়নিক ও গাঠনিক পরিবর্তন ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে অপরিবর্তনীয় হতে পারে।
১. মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রভাব (Neurological Impact)
মাদকের প্রাথমিক ও প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলো মানুষের মস্তিষ্ক।
রিওয়ার্ড সিস্টেম হাইজ্যাক: মাদক মস্তিষ্কের ‘লিম্বিক সিস্টেম’ বা রিওয়ার্ড সার্কিটকে কৃত্রিমভাবে উদ্দীপ্ত করে। এটি স্বাভাবিকের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি ডোপামিন (Dopamine) নিঃসরণ ঘটায়, যা সাময়িক আনন্দের সৃষ্টি করে। কিন্তু বারবার গ্রহণের ফলে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে ডোপামিন তৈরি বন্ধ করে দেয়। ফলে মাদক ছাড়া মানুষ আর কোনো কিছুতেই আনন্দ পায় না।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা: মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ বা ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (Prefrontal Cortex), যা বিচার-বিবেচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ করে, মাদকের প্রভাবে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
স্মৃতিশক্তি লোপ: হিপ্পোক্যাম্পাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং শেখার ক্ষমতা নষ্ট হয়।
২. শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি (Organ Damage)
মাদক শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে ধীরে ধীরে বিকল করে দেয়।
হৃদরোগ ও রক্তচাপ: কোকেন বা ইয়াবার মতো উদ্দীপক মাদক হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। অন্যদিকে হেরোইনের মতো মাদক শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর করে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
লিভার ও কিডনি: অ্যালকোহল ও অন্যান্য রাসায়নিক মাদক লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis) এবং লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ। এটি কিডনির ফিল্টারিং ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়, ফলে রেনাল ফেইলিউর দেখা দিতে পারে।
ফুসফুসের ক্ষতি: যারা ধূমপান বা গাঁজার মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে, তাদের ফুসফুসে সংক্রমণ, ব্রঙ্কাইটিস এবং ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।
৩. মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় (Psychological Impact)
চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে, মাদকাসক্তি এবং মানসিক রোগ একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia), বাইপোলার ডিসঅর্ডার এবং তীব্র ডিপ্রেশন তৈরি হয়।
অনেকের মধ্যে ‘প্যারানয়িড ডিলুশন’ বা অহেতুক সন্দেহের রোগ দেখা দেয়। হ্যালুসিনেশন বা অলীক কিছু দেখার প্রবণতা থেকে অনেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে।
৪. সংক্রামক ব্যাধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে, তাদের মধ্যে এইচআইভি (HIV) এবং হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ানোর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এছাড়া মাদক শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে সাধারণ অসুখও তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
ইসলামি ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমন্বয়
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ইসলাম—উভয়েই একবাক্যে ঘোষণা করে যে, মাদক মানবজীবনের জন্য মারাত্মক ধ্বংসাত্মক। চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছে, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির শরীরকে ধ্বংস করে না; বরং তার মস্তিষ্ক, বিবেক, পরিবার ও সমাজব্যবস্থাকে পর্যায়ক্রমে বিপর্যস্ত করে তোলে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়।
ইসলাম এই বাস্তবতাকে আরও আগেই চিহ্নিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্যনির্ণায়ক তীর শয়তানের অপবিত্র কাজ; সুতরাং তা থেকে দূরে থাকো।” সূরা মায়িদা : ৯০
ইসলামে মাদককে বলা হয়েছে ‘উম্মুল খাবায়িস’ বা সমস্ত মন্দের জননী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মদ ও জুয়াকে ‘শয়তানের কাজ’ হিসেবে অভিহিত করে তা বর্জন করার নির্দেশ দিয়েছেন। আধুনিক বিজ্ঞান ঠিক এই জায়গাটিতেই ইসলামের সাথে একমত পোষণ করে। ইসলামের মূল লক্ষ্য হলো হিফযুন নাফস (প্রাণ রক্ষা), হিফযুল আকল (বুদ্ধি সংরক্ষণ) ও হিফযুল মাল (সম্পদ সংরক্ষণ)—যা মাদক সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। সুতরাং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেখানে পরীক্ষাগারে প্রমাণ দিচ্ছে, ইসলাম সেখানে নৈতিক ও আত্মিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই মাদকমুক্ত ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠন সম্ভব।
চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মাদক মানুষের ‘আকল’ বা বিবেক-বুদ্ধি এবং বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতা (Prefrontal Cortex-এর কার্যকারিতা) ধ্বংস করে দেয়। যখন একজন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, তখন সে যেকোনো অপরাধ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যা বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে নেশা হয়, তা অল্প পরিমাণে গ্রহণ করাও হারাম।” বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘টলারেন্স’ (Tolerance)—অর্থাৎ অল্প দিয়ে শুরু করলেই মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং বড় ক্ষতির দিকে ধাবিত হয়।
সর্বোপরি, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।” চিকিৎসা বিজ্ঞান দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছে যে, মাদক গ্রহণ মানেই হলো নিজেকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। সুতরাং, আধুনিক বিজ্ঞান মাদকের যে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির প্রমাণ পেশ করেছে, তা ইসলামের চিরন্তন নিষেধাজ্ঞারই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। সুস্থ দেহ ও সুস্থ মন—উভয়ই আল্লাহর আমানত, আর মাদক এই আমানতের খেয়ানতকারী।
কুরআন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে অবৈধ যৌনতা ও সমকামিতা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নৈতিকতা ও শ্লীলতা সবসময়ই সমাজের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মানুষকে এমন এক সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনের পথ দেখায়, যা কেবল পরকালীন মুক্তিই নয় বরং ইহকালীন শান্তি ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর নির্দেশনার মূলে রয়েছে মানুষের কল্যাণ। আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান যখন এইডসের মতো মরণব্যাধির কারণ অনুসন্ধান করছে, তখন দেখা যাচ্ছে ইসলামের চৌদ্দশত বছর পুরনো বিধানগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের সমর্থন পাচ্ছে। এই প্রবন্ধে কুরআন-হাদিসের আলোকে অবৈধ যৌনতা ও সমকামিতার পরিণতি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণালব্ধ ফলাফলের মধ্যকার সামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করা হবে।
অবৈধ যৌনতা ও সমকামিতা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি :
পবিত্র কুরআনে সমকামিতার কঠোর নিন্দা করা হয়েছে, বিশেষত নবী লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ لُوْطًا اِذْ قَالَ لِقَوْمِہٖۤ اَتَاْتُوْنَ الْفَاحِشَۃَ مَا سَبَقَکُمْ بِهَا مِنْ اَحَدٍ مِّنَ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۸۰﴾اِنَّکُمْ لَتَاْتُوْنَ الرِّجَالَ شَہْوَۃً مِّنْ دُوْنِ النِّسَآءِ ؕ بَلْ اَنْتُمْ قَوْمٌ مُّسْرِفُوْنَ ﴿۸۱﴾
আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার কাওমকে বলেছিলঃ তোমরা এমন অশ্লীল ও কু-কর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেহই করেনি। তোমরা তো নারীদের ছাড়া পুরুষদের সাথে কামনা পূর্ণ করছ, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী কওম’। সূরা আরাফ : ৮০-৮১
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
اَتَاْتُوْنَ الذُّکْرَانَ مِنَ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۱۶۵﴾ۙ وَ تَذَرُوْنَ مَا خَلَقَ لَکُمْ رَبُّکُمْ مِّنْ اَزْوَاجِکُمْ ؕ بَلْ اَنْتُمْ قَوْمٌ عٰدُوْنَ ﴿۱۶۶﴾
তোমরা কি সারা বিশ্বের মধ্যে পুরুষদের সাথে সঙ্গম কর? আর তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা সৃষ্টি করেছেন (স্ত্রীগণ) তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। সূরা শুআরা : ১৬৫-১৬৬
কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহর আইন লঙ্ঘনের পরিণতি ভয়াবহ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ظَہَرَ الۡفَسَادُ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ بِمَا کَسَبَتۡ اَیۡدِی النَّاسِ لِیُذِیۡقَہُمۡ بَعۡضَ الَّذِیۡ عَمِلُوۡا لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ
মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। সূরা আর-রুম : ৪১
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লুত সম্প্রদায়ের কর্ম করতে তোমরা যাকে পাবে তাকে কতল কর এবং যার সাথে ঐ কর্ম করা হয়েছে তাকেও। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৫৬১, সুনানে তিরমিজী : ১৪৫৬
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি আমার উম্মাতের ব্যাপারে লূত জাতির অনুরূপ অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার সর্বাধিক আশঙ্কা করি। সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৫৬৩, সুনানে তিরমিজী : ১৪৫৭
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সমকামিতা ও এইডস
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মানুষের প্রাকৃতিক শারীরিক গঠনের বিপরীতে গিয়ে যৌন আচরণ করা নানাবিধ মরণব্যাধির মূল কারণ।
১. এইডস (AIDS): একবিংশ শতাব্দীর মহামারী
Acquired Immune Deficiency Syndrome বা AIDS হলো এমন এক অবস্থা যেখানে মানুষের দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এর মূল কারণ HIV (Human Immunodeficiency Virus)।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮১ সালে যখন প্রথম এই রোগ শনাক্ত হয়, তখন আক্রান্তদের একটি বিশাল অংশ ছিল সমকামী পুরুষ। এটি HIV দ্বারা সংক্রমিত হয়, যা মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে।
প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্যানুসারে ১৯৮৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৪,৭৩৯ জন এইডস রোগীর মধ্যে ১০,৬৫৩ জনই ছিলেন পুরুষ সমকামী। আমেরিকায় প্রথম শনাক্ত এইডস রোগী ছিল সমকামী সম্প্রদায়ভুক্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৯৯৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২ কোটি ৫০ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ HIV আক্রান্ত ছিল। ২০০০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩০-৪০ মিলিয়নে পৌঁছানোর আশঙ্কা ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি মানুষ HIV আক্রান্ত, যার মধ্যে ৬ লক্ষাধিক মানুষ এইডস সম্পর্কিত রোগে মৃত্যুবরণ করেছে। ডাঃ রবার্ট রেডিফিল্ডের মতে, “AIDS is a sexually transmitted disease” অর্থাৎ এটি মূলত যৌন অনাচার থেকে সৃষ্ট। বর্তমান বিশ্বের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনিরাপদ ও বিকৃত যৌন মিলনই এই ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম (প্রায় ৭০-৭৫%)। বর্তমানে সাব-সাহারান আফ্রিকায় সর্বোচ্চ সংক্রমণ হার লক্ষ্য করা যায়।
সংক্রমণের প্রধান মাধ্যম
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুযায়ী:
অবাধ যৌনাচার*: ৭০-৮০% সংক্রমণ যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে
সমকামী সম্পর্ক : বিশেষত পুরুষ-পুরুষ যৌন সম্পর্কে সংক্রমণের উচ্চহার
দূষিত রক্ত ও সূচির ব্যবহারঅ
মা থেকে শিশুতে সংক্রমণঅ
২. শারীরিক ও মানসিক ধ্বংসলীলা
এইডস আক্রান্ত রোগী কেবল শারীরিকভাবেই শেষ হয় না, বরং মানসিকভাবেও মৃত্যুর আগে হাজারবার মারা যায়। ১৯৮৭ সালে এইডস আক্রান্ত জিম শ্যালী মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, “আমার শরীরে একটা ভাইরাস আছে, সেটা আমার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খেয়ে ফেলছে। আমি ওর অস্তিত্ব টের পাই।” এটি মূলত আল্লাহ তা‘আলার সেই বাণীর প্রতিফলন-
فَاَصَابَہُمۡ سَیِّاٰتُ مَا کَسَبُوۡا ؕ وَالَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا مِنۡ ہٰۤؤُلَآءِ سَیُصِیۡبُہُمۡ سَیِّاٰتُ مَا کَسَبُوۡا ۙ وَمَا ہُمۡ بِمُعۡجِزِیۡنَ
সুতরাং তাদের কৃতকর্মের মন্দ ফল তাদের উপর আপতিত হয়েছিল। এদের মধ্যেও যারা যুলম করে তাদের উপরেও তাদের অর্জনের সব মন্দফল শীঘ্রই আপতিত হবে। আর তারা অক্ষম করতে পারবে না। সূরা যুমার : ৫১
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত
চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ উন্নতির শিখরে পৌঁছেও বিজ্ঞানীরা আজ স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, কেবল ঔষধ বা টিকা দিয়ে এইডস নির্মূল করা সম্ভব নয়। একমাত্র নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনই পারে মানবজাতিকে রক্ষা করতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO): তাদের প্রকাশিত পুস্তিকায় (The role of Religion and Ethics in the prevention and control of AIDS) বলা হয়েছে: “এইডস প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় ধর্মীয় শিক্ষাদান এবং নির্মল আচরণ প্রবর্তনের চেয়ে আর কোন কিছুই অধিক সহায়ক হতে পারে না।”
ডাঃ মুহাম্মদ মনসুর আলী: তার মতে, এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র বৈবাহিক জীবন যাপন করাই একমাত্র পথ।
কবির উদ্দীন আহমদ: তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, ইসলাম সম্মত জীবন যাপন ব্যতীত এই ধ্বংসাত্মক সংক্রমণ ঠেকাবার আর কোন উপায় নেই।
ইসলামী বিধান ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে সামঞ্জস্য
নৈতিক জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব
ইসলাম যৌনাচারকে বিবাহবন্ধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে, যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে এইডস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আল্লাহ বলেন-
اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَلَمۡ یَلۡبِسُوۡۤا اِیۡمَانَہُمۡ بِظُلۡمٍ اُولٰٓئِکَ لَہُمُ الۡاَمۡنُ وَہُمۡ مُّہۡتَدُوۡنَ
প্রকৃত পক্ষে তারাই শান্তি ও নিরাপত্তার অধিকারী এবং তারাই সঠিক পথে পরিচালিত, যারা নিজেদের ঈমানকে যুলমের সাথে (শির্কের সাথে) মিশ্রিত করেনি। সূরা আনআম, ৬:৮২
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের স্বীকারোক্তি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯০-এর দশকে ঘোষণা করেছিল: “এইডস প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় ধর্মীয় শিক্ষাদান এবং যথাযথ নির্মল আচরণ প্রবর্তনের চেয়ে আর কোনো কিছুই অধিক সহায়ক হতে পারে না, যার প্রতি সকল ঐশ্বরিক ধর্মে সমর্থন প্রদান ও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।”
সামাজিক প্রভাব ও নৈতিক অবক্ষয়
পাশ্চাত্য সমাজের বর্তমান চিত্র
- আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক দেশে সমকামিতাকে বৈধতা প্রদান করা হয়েছে।
- যৌনশিক্ষার নামে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অবাধ যৌনাচার encouraged হচ্ছে।
- পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বহুগামিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফলাফল :
ডাঃ মুহাম্মাদ মনসুর আলীর মতে, এইডস এমনই এক সময়ে সমগ্র বিশ্বে চরম আতঙ্ক এবং নিরতিশয় হতাশা সৃষ্টি করেছে যখন চিকিৎসা বিজ্ঞান উন্নতির অত্যুঙ্গ শিখরে অবস্থান করছে। এই মরণব্যাধির উৎপত্তি এবং বিস্তারের কারণ হিসাবে দেখা গেছে চরম অশ্লীলতা, যৌন বিকৃতি ও কুরুচিপূর্ণ সমকাম ও বহুগামীতার মত পশুসুলভ যৌন আচরণের উপস্থিতি।”
ইসলামী সমাধান: একটি সামগ্রিক পদ্ধতি :
১. নৈতিক শিক্ষা ও চরিত্র গঠন :
ইসলামী শিক্ষা মানুষকে আত্মসংযমী করে তোলে। রাসূল (সা.) বলেছেন: “তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার প্রবৃত্তি আমার আনিত বিধানের অনুসরণ করবে।
২. বৈধ যৌনতা প্রতিষ্ঠা
বিবাহকে সহজ করা এবং সামাজিক মর্যাদা দেওয়া ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। আল্লাহ বলেন: “তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নর-নারীদের বিবাহ দাও। সূরা আন-নূর, ২৪:৩২
৩. শাস্তির বিধান
ইসলামে ব্যভিচার ও সমকামিতার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে সমাজকে রক্ষার জন্য।
৪. সামাজিক নিয়ন্ত্রণ
পর্দা প্রথা, নর-নারীর অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি সামাজিক সংক্রমণ রোধ করে।
ইসলামী বিধান কেন বিজ্ঞানসম্মত
চিকিৎসা বিজ্ঞান আজও এইডসের স্থায়ী প্রতিষেধক বা চিকিৎসা আবিষ্কার করতে পারেনি। একমাত্র কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ। আর এখানেই ইসলামী বিধানের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণিত হয়। ইসলাম শুধু নিষেধই করে না, বরং বিকল্পও দেয়। যেমন-
- যৌন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ।
- বৈধ যৌনতার মাধ্যমে তৃপ্তির ব্যবস্থা।
- সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা।
- পারলৌকিক জীবনের চেতনা।