ইসলামি বিধানের বৈজ্ঞানিক সত্যতা: পর্ব তিন

অতিরিক্ত আহারের নিষেধাজ্ঞা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

অতিরিক্ত আহার করা কেবল ইসলামের দৃষ্টিতেই অপছন্দনীয় নয়, বরং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি শরীরের জন্য এক নীরব ঘাতক। দেড় হাজার বছর আগে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিমিত আহারের যে বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা প্রদান করেছেন, আজকের পুষ্টিবিজ্ঞানীরা তাকেই দীর্ঘায়ু ও সুস্থতার চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন।

শরীর পরিচালনার জন্য জ্বালানি হিসেবে খাদ্যের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইসলাম সুস্বাদু ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু সীমানালঙ্ঘন বা অতিরিক্ত ভোজনকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।

১. পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা

আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আরাফ :৩১

মিকদাম ইবনে মাদীকারিব (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোন পাত্র ভর্তি করে না। (যতটুকু খাদ্য গ্রহণ করলে পেট ভরে পাত্র থেকে ততটুকু খাদ্য উঠানো কোন ব্যক্তির জন্য দূষণীয় নয়)। যতটুকু আহার করলে মেরুদন্ড সোজা রাখা সম্ভব, ততটুকু খাদ্যই কোন ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট। এরপরও যদি কোন ব্যক্তির উপর তার নফস (প্রবৃত্তি) জয়যুক্ত হয়, তবে সে তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৩৪৮, সুনানে তিরমিযী : ২৩৮০, ইরওয়া : ২৩৮০, সহীহাহ : ২২৬৫

অর্থাৎ অতিরিক্ত ভোজন মানুষের চরিত্র ও শরীর—উভয়কেই কলুষিত করে।

২. আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত আহারের কুফল

খাদ্য বিশেষজ্ঞরা একমত যে, মানুষের অধিকাংশ রোগ ব্যাধি (প্রায় ৮০%) তার খাদ্যাভ্যাসের সাথে জড়িত। অতিরিক্ত আহার শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে অতিরিক্ত চাপে ফেলে দেয়।

ক) ডায়াবেটিস ও অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি:

অতিরিক্ত আহারের ফলে রক্তের গ্লুকোজ লেভেল বেড়ে যায়। একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়কে অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণ করতে হয়। নিয়মিত অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে অগ্ন্যাশয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ইনসুলিন উৎপাদন কমিয়ে দেয়, যার চূড়ান্ত ফল হলো ডায়াবেটিস।

খ) উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ:

অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে শরীরে মেদ জমা হয় এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে রক্তবাহী শিরা ও ধমনীগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়ে (Atherosclerosis)। শিরা সংকীর্ণ হওয়ার কারণে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়, যা উচ্চ রক্তচাপের প্রধান কারণ। যখন হৃদপিণ্ডের করোনারি ধমনীগুলো সংকুচিত হয়, তখন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

গ) প্যারালাইসিস ও মস্তিষ্কের ব্যাধি:

শিরা সংকীর্ণ হওয়ার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হলে মানুষ প্যারালাইসিস বা অর্ধাঙ্গ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম শিরা ছিঁড়ে গিয়ে স্ট্রোক হওয়ার পেছনেও অতিরিক্ত ভোজন এবং এর ফলে সৃষ্ট উচ্চ রক্তচাপ দায়ী।

ঘ) অকাল বার্ধক্য ও স্থূলতা:

বেশি খেলে শরীরের কোষগুলো দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাকে বয়সের তুলনায় বৃদ্ধ দেখায়। এছাড়া স্থূলতার কারণে হাঁটু ও কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা (Joint Pain) এবং অস্থি মজ্জার জটিলতা তৈরি হয়।

৩. প্রফেসর রিচার্ড বার্ডের গবেষণা

বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী প্রফেসর রিচার্ড বার্ড তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, অতিভোজ কেবল পেটের সমস্যা নয়, বরং এটি সারা শরীরের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। তাঁর মতে, অতিরিক্ত আহারের ফলে মস্তিস্ক, চক্ষু, জিহ্বা, গলা, বক্ষ, ফুসফুস, যকৃত ও পিত্তথলির মারাত্মক রোগ হতে পারে। এমনকি দুশ্চিন্তা ও মনস্তাত্ত্বিক রোগের সাথেও খাদ্যাভ্যাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

৪. শহর বনাম গ্রাম: একটি তুলনামূলক চিত্র

সাধারণত শহরবাসীদের মধ্যে অতিভোজ ও বিলাসিতার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ফলে শহর অঞ্চলে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার ও হৃদরোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। অপরদিকে গ্রামবাংলার মানুষ যারা স্বাভাবিক ও স্বল্প আহারে অভ্যস্ত এবং কায়িক শ্রম করে, তারা দীর্ঘকাল সুস্থ ও সবল থাকে। তাদের শরীরে কোলেস্টেরলের আধিক্য থাকে না এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো পরিমিত কাজের মাধ্যমে সচল থাকে।

৫. ইসলামের ফর্মুলা: “ক্ষুধা না লাগলে না খাওয়া”

মুসলিম জাতির একটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ক্ষুধা না লাগলে খায় না এবং যখন খায় তখন পেট পূর্ণ করে খায় না। এটি কেবল একটি অভ্যাস নয়, এটি একটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা (Preventive Medicine)। নবীজি (সা.) বলেছেন, মুমিন এক আঁতে খায় আর কাফির সাত আঁতে খায়। এর অর্থ হলো মুমিন তার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিমিত আহারে তুষ্ট থাকে।

৬. পরিমিত আহারের মানসিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা

বেশি খেলে মানুষের মধ্যে অলসতা ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা তৈরি হয়, যা ইবাদত ও কাজে বিঘ্ন ঘটায়। কম আহারে মানুষের মেধা ও চিন্তাশক্তি তীক্ষ্ণ হয়। রাসূল (সা.)-এর বাতলে দেওয়া ‘পেটের তিন ভাগের এক ভাগ’ নিয়মটি অনুসরণ করলে পাকস্থলী সহজে খাদ্য হজম করতে পারে এবং মানুষ গ্যাস্ট্রিক ও আলসার থেকে মুক্তি পায়।

বর্তমান স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের স্লোগান হলো— “কম আহার করুন, বেশি দিন বাঁচুন।” অথচ এই সত্যটি ইসলাম দেড় হাজার বছর আগেই আমাদের দিয়ে রেখেছে। অতিরিক্ত আহার কেবল শরীরের ওজন বাড়ায় না, বরং এটি মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয় এবং নানাবিধ যন্ত্রণাদায়ক রোগের জন্ম দেয়। সুস্থ থাকতে হলে এবং দীর্ঘজীবন লাভ করতে হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া পানাহারের সুশৃঙ্খল পদ্ধতি অনুসরণ করার কোনো বিকল্প নেই। নবীজি (সা.)-এর প্রতিটি নির্দেশনা যে মানবজাতির জন্য পরম কল্যাণকর, তা আধুনিক বিজ্ঞান আজ নতমস্তকে স্বীকার করে নিচ্ছে।

ইসলামি বিধানের বৈজ্ঞানিক সত্যতা : পর্ব চার

হারাম খাদ্যের অপকারিতা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা (Complete Code of Life)। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার বেঁচে থাকার জন্য অসংখ্য নিয়ামতরাজি পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তবে মানুষের কল্যাণ ও অকল্যাণের কথা বিবেচনা করে তিনি কিছু বস্তুকে ‘হালাল’ (বৈধ) এবং কিছু বস্তুকে ‘হারাম’ (অবৈধ) ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। মানুষের শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য হালাল খাদ্য গ্রহণ অপরিহার্য। আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে আজ এটি প্রমাণিত যে, ১৪৫০ বছর আগে কুরআন যেসব খাদ্য নিষিদ্ধ করেছে, তা প্রকৃতপক্ষে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই প্রবন্ধে আমরা হারাম খাদ্যের অপকারিতা সম্পর্কে ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. কুরআনের আলোকে হারাম খাদ্যের নিষেধাজ্ঞা

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُلُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا رَزَقۡنٰکُمۡ وَاشۡکُرُوۡا لِلّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ اِیَّاہُ تَعۡبُدُوۡنَ

হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযক দিয়েছি তা থেকে এবং আল্লাহর জন্য শোকর কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদাত কর। সুরা বাকারা : ১৭২

এই আয়াতে ‘তাইয়িবাত’ (পবিত্র ও উত্তম) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ কেবল হালালই করেননি, বরং তা পবিত্র ও স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূল হতে হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَیۡکُمُ الۡمَیۡتَۃُ وَالدَّمُ وَلَحۡمُ الۡخِنۡزِیۡرِ وَمَاۤ اُہِلَّ لِغَیۡرِ اللّٰہِ بِہٖ وَالۡمُنۡخَنِقَۃُ وَالۡمَوۡقُوۡذَۃُ وَالۡمُتَرَدِّیَۃُ وَالنَّطِیۡحَۃُ وَمَاۤ اَکَلَ السَّبُعُ اِلَّا مَا ذَکَّیۡتُمۡ ۟ وَمَا ذُبِحَ عَلَی النُّصُبِ وَاَنۡ تَسۡتَقۡسِمُوۡا بِالۡاَزۡلَامِ ؕ ذٰلِکُمۡ فِسۡقٌ 

তোমাদের জন্য মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অপরের নামে উৎসর্গীকৃত পশু, কন্ঠরোধে মারা পশু, আঘাত লেগে মরে যাওয়া পশু, পতনের ফলে মৃত পশু, শৃংগাঘাতে মৃত পশু এবং হিংস্র জন্তুতে খাওয়া পশু হারাম করা হয়েছে; তবে যা তোমরা যবাহ দ্বারা পবিত্র করেছ তা হালাল। আর যে সমস্ত পশুকে পূজার বেদীর উপর বলি দেয়া হয়েছে তা এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করাও তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে। এসব কাজ পাপ। সুরা মায়েদা : ৩

এই আয়াতে হারাম খাদ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হয়েছে। মহান স্রষ্টা মানুষের অন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র এবং মেটাবলিজম সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তাই তিনি এমন সব খাদ্য নিষিদ্ধ করেছেন যা মানুষের জীবকোষের (Cell) জন্য বিষতূল্য।

২. বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হারাম খাদ্যের অপকারিতা

আল্লাহ তায়ালা যেসকল খাদ্য হারাম করেছেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণা করে দেখেছে যে, সেগুলোর প্রতিটিই মানবদেহের জন্য ধ্বংসাত্মক। নিচে এগুলোর বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

ক. মৃত পশুর গোশত (Carrion/Maytah)

ইসলামী শরীয়তে স্বাভাবিকভাবে মৃত বা জবেহ ছাড়া মারা যাওয়া পশুর মাংস হারাম।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

অটোলিসিস ও পচন: কোনো প্রাণী মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরে ‘অটোলিসিস’ বা কোষের ভাঙন শুরু হয়। শরীরের এনজাইমগুলো নিজস্ব কোষগুলোকে হজম করতে শুরু করে, ফলে মাংস দ্রুত পচতে থাকে।

ব্যাকটেরিয়ার আধার: মৃত প্রাণীর রক্ত শরীরে জমে থাকে। রক্ত হলো ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে উর্বর মাধ্যম (Culture Medium)। মৃত্যুর পর পরই ই-কোলাই (E. coli), সালমোনেলা (Salmonella) এবং অ্যানথ্রাক্স (Anthrax)-এর মতো মারাত্মক জীবাণু দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।

বিষ ক্রিয়া: মৃত্যুর কারণ যদি কোনো বিষাক্ত সাপের কামড় বা রাসায়নিক বিষক্রিয়া হয়, তবে সেই বিষ মাংসের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে পড়ে। এই মাংস রান্না করলেও অনেক সময় বিষ নষ্ট হয় না, যা ভক্ষণকারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

খ. প্রবাহিত রক্ত (Flowing Blood/Dam)

কুরআনে ‘দামান মাসফুহা’ বা প্রবাহিত রক্ত পান বা ভক্ষণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

টক্সিনের ভাণ্ডার:

রক্ত শরীরের আবর্জনা বা বর্জ্য পদার্থ বহন করে কিডনি ও ফুসফুসে নিয়ে যায় পরিষ্কার করার জন্য। পশুর মৃত্যুর সময় তার শরীরে ইউরিক অ্যাসিড, ইউরিয়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বর্জ্য পদার্থ রক্তে বিদ্যমান থাকে। রক্ত খেলে এই টক্সিনগুলো সরাসরি মানুষের দেহে প্রবেশ করে।

লৌহ ও অতিরিক্ত প্রোটিন জটিলতা:

যদিও রক্তে প্রোটিন ও আয়রন আছে, কিন্তু তা মানুষের পরিপাকতন্ত্রের জন্য হজম করা অত্যন্ত কঠিন। এটি কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং কিডনি ফেইলিউরের ঝুঁকি বাড়ায়।

জীবাণুর বাসা:

রক্ত হলো প্যাথোজেন বা রোগজীবাণুর বাহক। পশুর শরীরে থাকা যেকোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া রক্তেই অবস্থান করে।

গ. শুকরের মাংস (Pork/Khinzir)

বর্তমান বিশ্বে হারাম খাদ্যগুলোর মধ্যে শুকরের মাংস নিয়ে সবচেয়ে বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে এবং এর ভয়াবহ দিকগুলো উন্মোচিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এটিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি:

চর্বির আধিক্য: শুকরের মাংসে চর্বির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। এই চর্বি রক্তনালীতে জমে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (Atherosclerosis), উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পরজীবী বা কৃমির আক্রমণ:

ট্রিচিনোসিস (Trichinosis): আপনি যথার্থই উল্লেখ করেছেন, Trichinella spiralis নামক গোলকৃমি শুকরের মাংসে থাকে। এর লার্ভা মানুষের পেশিতে (Muscles) ঢুকে সিস্ট তৈরি করে। এটি হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক এবং চোখের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। সাধারণ রান্নার তাপে এই জীবাণু মরে না।

টিনিয়া সোলিয়াম (Taenia solium): এটি একটি ফিতা কৃমি। শুকরের মাংসের মাধ্যমে এটি মানুষের অন্ত্রে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে Neurocysticercosis নামক রোগ সৃষ্টি করে, যা মৃগী রোগ (Epilepsy) এবং মস্তিষ্কের বিকৃতির অন্যতম কারণ।

গ্রোথ হরমোন ও টক্সিন: শুকর পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা ভক্ষক প্রাণী। এটি নিজের মলমূত্র পর্যন্ত খায়। শুকরের পরিপাকতন্ত্র খুব দ্রুত কাজ করে (মাত্র ৪ ঘণ্টায় হজম হয়), ফলে বিষাক্ত পদার্থগুলো শরীর থেকে বের হওয়ার সুযোগ পায় না এবং চর্বি বা মাংসে জমা হয়। একে বলা হয় ‘Sutoxin’। এটি মানুষের শরীরে অ্যালার্জি ও প্রদাহ সৃষ্টি করে।

ভাইরাস বাহক: নিপাহ ভাইরাস, সোয়াইন ফ্লু (H1N1) এবং ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ মূলত শুকরের মাধ্যমেই মহামারী আকারে ছড়ায়।

ঘ. হিংস্র প্রাণী ও শিকারি পাখি

নবী করীম (সা.) দাঁত দিয়ে শিকার করা পশু (যেমন: বাঘ, সিংহ, কুকুর, বিড়াল) এবং নখ দিয়ে শিকার করা পাখি (যেমন: ঈগল, চিল, বাজপাখি) খেতে নিষেধ করেছেন।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

খাদ্য শৃঙ্খল ও টক্সিন: ইকোলজির ভাষায় একে ‘Bio-accumulation’ বলা হয়। তৃণভোজী প্রাণীদের তুলনায় মাংসাশী প্রাণীদের দেহে ভারী ধাতু এবং বিষাক্ত পদার্থের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে। কারণ তারা অন্য প্রাণীদের খেয়ে বেঁচে থাকে।

আচরণগত প্রভাব: বিজ্ঞানের মতে, খাদ্যের প্রভাব প্রাণীর আচরণের ওপর পড়ে। হিংস্র প্রাণীর মাংস ভক্ষণে মানুষের স্বভাবেও হিংস্রতা, নির্দয়তা এবং পাশবিক প্রবৃত্তি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ঙ. মদ ও মাদকদ্রব্য (Intoxicants)

যদিও আপনার মূল তালিকায় এটি ছিল না, তবুও হারাম খাদ্যের আলোচনায় মাদক অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা মদকে ‘শয়তানের কাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

লিভার সিরোসিস: অ্যালকোহল লিভারের কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সার হয়।

মস্তিষ্ক বিকৃতি: মাদক স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়, স্মৃতিশক্তি লোপ পায় এবং মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে।

সামাজিক অবক্ষয়: মাদকের কারণে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, যা অপরাধ প্রবণতা, পারিবারিক কলহ এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

৩. জবেহ পদ্ধতি: ইসলামী বিধান বনাম আধুনিক পদ্ধতি

ইসলামে পশুকে ‘জবেহ’ (Zabiha) করার পদ্ধতিটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। এর বিপরীতে শ্বাসরোধ, বৈদ্যুতিক শক বা আঘাত করে হত্যা করা পশুর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

ক. ইসলামী জবেহ (হালাল পদ্ধতি):

ইসলামী পদ্ধতিতে গলার চারটি প্রধান রগ (শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং দুটি জুগুলার ভেইন ও ক্যারোটিড ধমনী) ধারালো অস্ত্র দিয়ে দ্রুত কেটে ফেলা হয়। কিন্তু স্পাইনাল কর্ড (মেরুদণ্ডের স্নায়ু) অক্ষত রাখা হয়।

সুবিধা: মেরুদণ্ডের স্নায়ু অক্ষত থাকায় মস্তিষ্ক হৃৎপিণ্ডকে নির্দেশ দিতে থাকে রক্ত পাম্প করার জন্য। ফলে পশুর শরীরের অধিকাংশ রক্ত দ্রুত বের হয়ে যায়। রক্ত বের হয়ে যাওয়ার ফলে মাংস দীর্ঘসময় ভালো থাকে এবং রোগজীবাণুমুক্ত থাকে। পশুর খিঁচুনি মূলত রক্ত বের করে দেওয়ার প্রতিক্রিয়া, এটি ব্যথার কারণে নয়। কারণ মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ২-৩ সেকেন্ডের মধ্যে পশু অজ্ঞান হয়ে যায় এবং ব্যথা অনুভব করে না।

খ. শ্বাসরোধ বা আঘাতজনিত মৃত্যু (হারাম পদ্ধতি):

শ্বাসরোধ (Strangulation): শ্বাসরোধ করে মারলে শরীরে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যায় এবং রক্ত মাংসের ভেতর আটকে যায়। এই দূষিত রক্তযুক্ত মাংস খেলে মানুষের শরীরে টক্সিন জমা হয়।

ইলেকট্রিক শক বা যান্ত্রিক আঘাত (Stunning): পাশ্চাত্যে পশুকে জবেহ করার আগে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় বা মাথায় গুলি করা হয় (Captive Bolt Pistol)।

অপকারিতা: ১৯৫৫ এবং ১৯৫৮ সালের বিভিন্ন গবেষণায় (যেমন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রিটিশ আইন সংশোধন কমিটি) দেখা গেছে, ইলেকট্রিক শকের ফলে পশুর শরীরে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। রক্ত পুরোপুরি বের হতে পারে না। মাংসের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায় এবং পচন দ্রুত ধরে। এছাড়াও, ইলেকট্রিক শকের কারণে অনেক সময় পশুটি জবেহ করার আগেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যায়, যা ইসলামী দৃষ্টিতে মৃত (হারাম) এবং বৈজ্ঞানিকভাবে অস্বাস্থ্যকর।

৪. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গিত পশু

কুরআনে ‘গাইরুল্লাহর’ নামে জবেহ করা পশু হারাম করা হয়েছে। এখানে মূলত বিশ্বাস বা ঈমানের বিষয়টি জড়িত, তবে এর একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।

শিরক বা অংশীদারিত্ব: তাওহীদ বা একত্ববাদ ইসলামের মূল। খাবারের সাথেও স্রষ্টার কৃতজ্ঞতা জড়িত। যখন আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারো নামে পশু উৎসর্গ করা হয়, তখন মানুষ তার প্রকৃত রিজিকদাতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে।

মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব: আল্লাহর নাম নিয়ে জবেহ করার সময় মানুষের মনে এই বোধ জাগ্রত থাকে যে, “আমি নিছক হত্যার জন্য হত্যা করছি না, বরং খাদ্যের প্রয়োজনে মহান স্রষ্টার অনুমতি নিয়ে একটি প্রাণ সংহার করছি।” এটি মানুষের মনে পশুর প্রতি মমতা ও স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা বজায় রাখে। কিন্তু মূর্তিপূজা বা বলির নামে যখন পশু হত্যা করা হয়, তখন সেখানে নিষ্ঠুরতা এবং কুসংস্কার প্রধান হয়ে ওঠে।

৫. হারাম খাদ্যের আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক প্রভাব

হারাম খাদ্যের কুফল কেবল শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের মন, চরিত্র এবং ইবাদতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।

ক. ইবাদত কবুল না হওয়া:

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা’আলা পবিত্র, তিনি পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ তা’আলা তার প্রেরিত রসূলদের যে হুকুম দিয়েছেন মুমিনদেরকেও সে হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র ও হালাল জিনিস আহার কর এবং ভাল কাজ কর। আমি তোমাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে জ্ঞাত।সূরা মু’মিনূন : ৫১

তিনি (আল্লাহ) আরো বলেছেন, “তোমরা যারা ঈমান এনেছো শোনা আমি তোমাদের যে সব পবিত্র জিনিস রিযক হিসেবে দিয়েছি তা খাও”। সূরা কারা : ১৭২)। অতঃপর তিনি এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত দীর্ঘ সফর করে। ফলে সে ধুলি ধূসরিত রুক্ষ কেশধারী হয়ে পড়ে। অতঃপর সে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, “হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দু’আ তিনি কী করে কবুল করতে পারেন?” সহিহ মুসলিম : ১০১৫

খ. অন্তরের কঠোরতা:

হারাম খাদ্য মানুষের অন্তরকে মৃত করে দেয়। আধ্যাত্মিক নূর বা জ্যোতি নিভে যায়। সালাফে সালেহীনগণ বলতেন, হারাম ভক্ষণকারীর অন্তরে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ থাকে না এবং পাপ কাজের প্রতি ঝোঁক বৃদ্ধি পায়। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, হারাম খাদ্যের প্রভাবে মানুষের শরীরে যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তা তাকে পাপ কাজের দিকে ধাবিত করে।

গ. চারিত্রিক অধঃপতন:

খাদ্য মানুষের স্বভাব-চরিত্র গঠন করে। বিজ্ঞান ও দর্শন একমত যে, “You are what you eat.” হিংস্র প্রাণী, শুকর বা অপবিত্র খাদ্য গ্রহণ করলে মানুষের মধ্যেও লোভ, লালসা, নির্লজ্জতা এবং নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি পায়। হালাল ও পবিত্র খাবার মানুষের চিন্তাধারাকে স্বচ্ছ রাখে এবং মনকে প্রশান্ত করে।

৬. অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

হারাম খাদ্যের প্রসার একটি সমাজের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বৃদ্ধি: হারাম খাদ্যের কারণে হৃদরোগ, ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস এবং বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি বৃদ্ধি পায়। এতে রাষ্ট্র ও ব্যক্তির বিপুল অর্থ চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়।

কর্মক্ষমতা হ্রাস: অসুস্থ ও দুর্বল জাতি দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে না। মদ্যপান ও নেশাজাতীয় দ্রব্য যুবসমাজকে ধ্বংস করে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য হুমকি।

মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের ওপর কোনো বিধান চাপিয়ে দেননি তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য; বরং প্রতিটি নির্দেশনার পেছনে রয়েছে মানুষেরই কল্যাণ। কুরআন মাজিদে ঘোষিত হারাম খাদ্যগুলো বর্জনের নির্দেশ কেবল ধর্মীয় অনুশাসনই নয়, বরং এটি সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ জীবনযাপনের পূর্বশর্ত।

আজকের আধুনিক বিজ্ঞান দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছে যে, কুরআনের প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার পেছনে অকাট্য বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে। মৃত পশু, রক্ত, শুকরের মাংস বা জবেহ ছাড়া হত্যা করা পশুর মাংস—সবই মানুষের জন্য বিষতুল্য। এগুলো মানুষকে শারীরিক ব্যাধি, মানসিক অশান্তি এবং আধ্যাত্মিক দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

পক্ষান্তরে, হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণ করলে শরীর সুস্থ থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মন থাকে প্রফুল্ল। একজন মুমিন হিসেবে আমাদের উচিত বিনাপ্রশ্নে আল্লাহর বিধান মেনে চলা। কারণ, স্রষ্টাই সবচেয়ে ভালো জানেন তার সৃষ্টির জন্য কোনটি কল্যাণকর আর কোনটি অকল্যাণকর। তাই আসুন, আমরা হারাম খাদ্য বর্জন করি এবং হালাল ও পবিত্র রিজিক গ্রহণের মাধ্যমে দুনিয়ার সুস্থতা ও আখিরাতের মুক্তি নিশ্চিত করি। আল্লাহ আমাদের সকলকে হালাল রুজি উপার্জনের এবং ভক্ষণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

ইসলামি বিধানের বৈজ্ঞানিক সত্যতা: পর্ব পাঁচ

সহবাস ও ইদ্দত সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস নিষেধ কেন?

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে মানুষের জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় বিষয়ের নিখুঁত সমাধান রয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই সকল বিধান নাজিল করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা হায়েয বা মাসিক ঋতুস্রাবকে ‘আযা’ (অসুস্থতা বা কষ্টদায়ক অবস্থা) হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এই অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর দৈহিক মিলন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে যেমন রয়েছে আধ্যাত্মিক তাৎপর্য, তেমনি রয়েছে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর ও অকাট্য যুক্তি।

১. কুরআনের ঘোষণা ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡمَحِیۡضِ ؕ قُلۡ ہُوَ اَذًی ۙ فَاعۡتَزِلُوا النِّسَآءَ فِی الۡمَحِیۡضِ ۙ وَلَا تَقۡرَبُوۡہُنَّ حَتّٰی یَطۡہُرۡنَ ۚ فَاِذَا تَطَہَّرۡنَ فَاۡتُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ اَمَرَکُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ التَّوَّابِیۡنَ وَیُحِبُّ الۡمُتَطَہِّرِیۡنَ

আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে। সূরা বাকারা : ২২২

এই নিষেধাজ্ঞার একটি বড় কারণ হলো তাকওয়া বা আল্লাহর স্মরণ। দাম্পত্য জীবনের চরম মুহূর্তগুলোতেও বান্দা যেন তার সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে না যায়, সে জন্য আল্লাহ কিছু ‘রেড সিগন্যাল’ বা সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেভাবে রমজান মাসে দিনের বেলা হালাল খাবার ও স্ত্রী সহবাস হারাম করা হয়েছে, কিংবা হজ্জের ইহরাম অবস্থায় কিছু নির্দিষ্ট কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ঠিক তেমনি হায়েয অবস্থায় সহবাস নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে মুমিনের ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়। এটি বান্দাকে মনে করিয়ে দেয় যে, তার প্রতিটি কাজ আল্লাহর হুকুমের অনুসারী হতে হবে।

২. চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হায়েয ও নারীর শারীরিক অবস্থা

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি হওয়ার আগে অনেকেই মনে করতেন মাসিক চলাকালীন নারীর দেহ স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু বর্তমানের প্যাথলজিক্যাল ও ফিজিওলজিক্যাল গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। এই সময়ে একজন নারীর দেহে ব্যাপক হরমোনজনিত এবং শারীরিক পরিবর্তন ঘটে, যা তাকে সাময়িকভাবে দুর্বল ও সংবেদনশীল করে তোলে।

শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনসমূহ:

তাপমাত্রা ও রক্তচাপ: ডা. যোয়ান গ্রাহামের মতে, ঋতুস্রাবের সময় নারীর দেহের তাপ সংরক্ষণ ক্ষমতা কমে যায় এবং নাড়ীর গতি কিছুটা ক্ষীণ হয়ে পড়ে। এতে রক্তচাপ কমে গিয়ে শরীরে ক্লান্তি ভর করে।

মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা: এই সময়ে নারীদের স্মরণশক্তি সাময়িকভাবে হ্রাস পেতে পারে এবং কোনো বিষয়ে একাগ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। স্নায়ুমণ্ডলী অবসন্ন হয়ে পড়ার কারণে তারা খিটখিটে মেজাজ বা বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন।

পাচনতন্ত্রের সমস্যা: ডা. এমিল নুডিক উল্লেখ করেছেন যে, এই সময়ে অনেক নারীর হজমশক্তি কমে যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য বা বমির ভাব দেখা দেয় এবং কারো কারো কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে যায়।

৩. সহবাসের ফলে সম্ভাব্য রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

হায়েয অবস্থায় সহবাস নিষিদ্ধ হওয়ার সবচেয়ে জোরালো কারণ হলো সংক্রমণ বা ইনফেকশনের উচ্চ ঝুঁকি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একে অত্যন্ত অনিরাপদ বলে ঘোষণা করেছেন।

ক) জরায়ুর উন্মুক্ত অবস্থা:

স্বাভাবিক অবস্থায় জরায়ুর মুখ (Cervix) সংকুচিত থাকে। কিন্তু হায়েযের সময় রক্ত নির্গমনের সুবিধার্থে জরায়ুর মুখ কিছুটা খুলে যায়। এই সময়ে সহবাস করলে পুরুষের লিঙ্গ থেকে বা বাহ্যিক পরিবেশ থেকে রোগজীবাণু খুব সহজেই জরায়ুর অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে।

খ) ক্ষতবিক্ষত ঝিল্লি (Endometrium):

মাসিক হওয়ার অর্থ হলো জরায়ুর ভেতরের আবরণ বা এন্ডোমেট্রিয়াম ঝরে পড়া। এটি একটি ক্ষতের মতো কাজ করে। ডা. মোহাম্মদ গোল্লাম মুয়াযযাম তার কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই অবস্থায় সহবাস করলে সেই ক্ষতস্থানে সরাসরি সংক্রমণ হতে পারে, যা থেকে নিম্নোক্ত জটিল রোগ সৃষ্টি হতে পারে:

•      Endometritis: জরায়ুর অভ্যন্তরীণ ঝিল্লির প্রদাহ।

•      Salpingitis: জরায়ুর নালীর মারাত্মক প্রদাহ।

•      Pelvic Cellulitis: তলপেটের কোষকলায় সংক্রমণ ও ব্যথা।

•      Peritonitis: উদর গহ্বরের পর্দার প্রদাহ।

গ) পুরুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি:

কেবল নারীর নয়, পুরুষের জন্যও এটি সমান ক্ষতিকর। হায়েযের রক্তে নানারকম ব্যাকটেরিয়া ও দূষিত উপাদান থাকে। এই অবস্থায় মিলনের ফলে পুরুষের মূত্রনালীর প্রদাহ (Urethritis) বা যৌনবাহিত রোগ (STI) হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। যদি স্ত্রীর আগে থেকেই কোনো সংক্রমণ থাকে, তবে তা দ্রুত স্বামীর দেহে সংক্রমিত হয়।

৪. মনস্তাত্ত্বিক ও নান্দনিক দিক

যৌন মিলন হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একটি অত্যন্ত পবিত্র ও আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। কিন্তু ঋতুস্রাব চলাকালীন শরীর থেকে দূষিত রক্ত ও টিস্যু নির্গত হয়, যা দেখতে অস্বস্তিকর এবং দুর্গন্ধযুক্ত হতে পারে। এই অবস্থায় মিলন করাটা কেবল অস্বাস্থ্যকর নয়, বরং এটি রুচিহীনতা ও মানসিক বিকৃতির পরিচয় দেয়। ডা. গ্রাহাম স্পষ্ট করেছেন যে, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং এটি বিশুদ্ধ স্বাস্থ্যবিজ্ঞানসম্মত এবং মানবিক মর্যাদার অনুকূলে।

৫. ইসলামের ভারসাম্যতা: সহবাস হারাম, সান্নিধ্য নয়

ইসলাম একটি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। ইহুদি ধর্মে ঋতুবতী নারীকে অস্পৃশ্য মনে করা হতো এবং তাকে আলাদা ঘরে রাখা হতো। কিন্তু ইসলাম এই চরমপন্থার বিরোধিতা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) হায়েয অবস্থায় স্ত্রীর সাথে একই বিছানায় শয়ন করতেন, একসাথে খাবার খেতেন এবং স্ত্রীর সান্নিধ্য নিতেন। কেবল ‘সহবাস’ বা জোনাঙ্গ ব্যবহার হারাম করা হয়েছে যেন নারী ও পুরুষ উভয়ের স্বাস্থ্য রক্ষা পায়। এটি নারীর প্রতি অবজ্ঞা নয়, বরং তার অসুস্থতার সময়ে তাকে বিশ্রাম দেওয়া এবং তার শরীরকে সুরক্ষা দেওয়ার এক ঐশ্বরিক ব্যবস্থা।

পরিশেষে বলা যায়, হায়েয অবস্থায় স্ত্রী সহবাস নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে মহান আল্লাহর যে হিকমত রয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞান আজ মাথা পেতে গ্রহণ করছে। ১৪০০ বছর আগে যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা প্যাথলজি ল্যাব ছিল না, তখন পবিত্র কুরআন একে ‘অসুস্থতা’ বলে ঘোষণা করে মানুষকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামি শরিয়তের প্রতিটি বিধান মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক কল্যাণের জন্যই প্রণীত হয়েছে।

২. তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যার প্রতিটি নির্দেশের পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী হিকমত বা প্রজ্ঞা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-

وَالۡمُطَلَّقٰتُ یَتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ ثَلٰثَۃَ قُرُوۡٓءٍ ؕ  وَلَا یَحِلُّ لَہُنَّ اَنۡ یَّکۡتُمۡنَ مَا خَلَقَ اللّٰہُ فِیۡۤ اَرۡحَامِہِنَّ اِنۡ کُنَّ یُؤۡمِنَّ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ  وَبُعُوۡلَتُہُنَّ اَحَقُّ بِرَدِّہِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ اِنۡ اَرَادُوۡۤا اِصۡلَاحًا ؕ  وَلَہُنَّ مِثۡلُ الَّذِیۡ عَلَیۡہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۪  وَلِلرِّجَالِ عَلَیۡہِنَّ دَرَجَۃٌ ؕ  وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ 

আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা তিন কুরূ* পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকবে এবং তাদের জন্য হালাল হবে না যে, আল্লাহ তাদের গর্ভে যা সৃষ্টি করেছেন, তা তারা গোপন করবে, যদি তারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে। আর এর মধ্যে তাদের স্বামীরা তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে অধিক হকদার, যদি তারা সংশোধন চায়। আর নারীদের রয়েছে বিধি মোতাবেক অধিকার। যেমন আছে তাদের উপর (পুরুষদের) অধিকার। আর পুরুষদের রয়েছে তাদের উপর মর্যাদা এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।সূরা বাকারা : ২২৮

এই নির্দিষ্ট সময়কালকে ইসলামি পরিভাষায় ‘ইদ্দত’ বলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিধান মনে হলেও, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের আলোকে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

১. পিতৃত্বের নিশ্চয়তা ও জরায়ু পরিশুদ্ধকরণ

ইদ্দত পালনের প্রধানতম উদ্দেশ্য হলো গর্ভাশয় বা জরায়ু পূর্ববর্তী স্বামীর সন্তান থেকে মুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করা। যদি একজন নারী তালাকের পরপরই অন্য কাউকে বিয়ে করেন এবং সন্তান প্রসব করেন, তবে সেই সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে জটিল সামাজিক ও আইনি সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে: বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ হলো মাসিক বা হায়েয বন্ধ হওয়া। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গর্ভবতী হওয়ার পরও প্রথম বা দ্বিতীয় মাসে সামান্য রক্তস্রাব হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ইমপ্লান্টেশন ব্লিডিং’ বা অন্য কোনো শারীরিক কারণে সৃষ্ট রক্তপাত বলা হয় যা হায়েযের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু গর্ভাবস্থায় একটানা তিন মাস নিয়মিত হায়েয হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসম্ভব। তাই তিন হায়েয অতিবাহিত হওয়া মানেই হলো জরায়ু সম্পূর্ণ খালি হওয়ার অকাট্য প্রমাণ।

২. ডিএনএ (DNA) এবং ইমিউনোলজিক্যাল মেমোরি

আধুনিক গবেষণায় আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রত্যেক পুরুষের বীর্যের একটি নিজস্ব ‘ডিএনএ সিগনেচার’ বা প্রোটিন কোড থাকে। যখন কোনো নারী দীর্ঘ সময় একজন পুরুষের সাথে অতিবাহিত করেন, তখন তার শরীরে সেই পুরুষের একটি নির্দিষ্ট ইমিউনোলজিক্যাল মেমোরি তৈরি হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, একজন নারীর শরীর থেকে আগের স্বামীর এই ‘বায়োলজিক্যাল ছাপ’ বা স্মৃতি সম্পূর্ণ মুছে যেতে প্রায় তিন মাস বা তিনটি ঋতুচক্রের সময় প্রয়োজন হয়। যদি এই সময়ের আগেই নারী অন্য পুরুষের সংস্পর্শে আসেন, তবে শারীরিক ও জিনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা এমনকি জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। তিন মাস পর নারী দেহ শারীরিকভাবে নতুন করে অন্য কাউকে গ্রহণ করার জন্য উপযুক্ত হয়।

৩. মানসিক প্রশান্তি ও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ

তালাক কেবল একটি আইনি বিচ্ছেদ নয়, এটি একটি চরম মানসিক বিপর্যয়। ইদ্দতের এই সময়টি নারীকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল হতে সাহায্য করে। হুট করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য এই তিন মাস একটি ‘কুলিং পিরিয়ড’ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ‘তালাকে রাজয়ী’ বা প্রত্যাহারযোগ্য তালাকের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী যদি তাদের ভুল বুঝতে পারে, তবে এই সময়ের মধ্যে তারা পুনরায় সংসার গড়ার সুযোগ পায়।

৪. তুলনামূলক আইন ও সামাজিক নিরাপত্তা

আপনার উল্লিখিত ফ্রান্সের আইন বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সিভিল আইনেও তালাক বা বৈধব্যের পর নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার বিধান রয়েছে (যেমন ৩১০ দিন)। ইসলাম দেড় হাজার বছর আগেই এই বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক বিষয়টি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন কোনো মানুষের তৈরি গ্রন্থ নয়, বরং এটি সর্বজ্ঞাতা মহান আল্লাহর বাণী।

পরিশেষে বলা যায়, তালাকপ্রাপ্তা নারীর তিন হায়েয পর্যন্ত অপেক্ষা করা কেবল অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং এটি স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং নৈতিকতার এক অনন্য সমন্বয়। এটি একদিকে যেমন সন্তানের বংশপরিচয় রক্ষা করে, অন্যদিকে নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আধুনিক বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে, কুরআনের এই বিধানগুলোর যৌক্তিকতা ততই উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিচ্ছে।

ইসলামি বিধানের বৈজ্ঞানিক সত্যতা : পর্ব ছয়

মাছির ডানায় রোগ ও আরোগ্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক নির্দেশনা রয়েছে যা তৎকালীন সময়ে মানুষের কাছে রহস্যময় মনে হলেও বর্তমান বিজ্ঞান সেগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হলো খাবারের পাত্রে মাছি পড়লে তাকে ডুবিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত হাদীসটি।

১. হাদীসের বর্ণনা ও প্রেক্ষাপট

হযরত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَالَ إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْمِسْه“ كُلَّه“ ثُمَّ لِيَطْرَحْه“ فَإِنَّ فِي أَحَدِ جَنَاحَيْهِ شِفَاءً وَفِي الآخَرِ دَاءً.

“যখন তোমাদের কারও কোনো পানীয় পাত্রে মাছি পড়ে, তখন সে যেন তাকে তাতে ডুবিয়ে দেয় এবং তারপর তা তুলে ফেলে দেয়। কারণ তার এক ডানায় রোগ রয়েছে এবং অন্য ডানায় রয়েছে আরোগ্য (প্রতিষেধক)।” সহিহ বুখারি: ৩৩২০, ৫৭৮২

চৌদ্দশ বছর আগে যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা অণুজীব বিজ্ঞান (Microbiology) সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না, তখন নবী করীম (সা.)-এর এই ঘোষণা ছিল এক অভাবনীয় বার্তা।

২. আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষা ও প্রমাণ

বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মাছি নিয়ে গবেষণা করে রাসূল (সা.)-এর বাণীর সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন।

ডক্টর ওয়াজিহ বায়েশরীর গবেষণা:

কিং আব্দুল আজীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষজ্ঞ মাছির বাজার থেকে মাছি সংগ্রহ করে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা চালান। তিনি দেখেন যে, মাছি যখন পানিতে পড়ে, তখন পানি রোগজীবাণুতে আক্রান্ত হয়। কিন্তু যখনই মাছিকে ওই পানিতে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিস্ময়করভাবে পানির জীবাণুর ঘনত্ব কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা নির্মূল হয়। এটি প্রমাণ করে যে, মাছির শরীরেই এমন কিছু রয়েছে যা জীবাণুকে ধ্বংস করতে সক্ষম।

অ্যান্টিবায়োটিক এবং ব্যাকটেরিওফ্যাজ:

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাছির শরীরের উপরিভাগে বা বহিঃত্বকে প্রচুর পরিমাণে ‘ব্যাকটেরিওফ্যাজ’ (Bacteriophage) বা ভাইরাস নাশক উপাদান থাকে। এটি এমন এক প্রকার ভাইরাস যা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলে। মাছি যখন নোংরা স্থানে বসে, তখন তার ডানায় বিভিন্ন রোগজীবাণু আটকে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার অন্য ডানায় এমন এক ধরণের প্রতিষেধক বা এনজাইম দিয়েছেন, যা ওই জীবাণুগুলোকে অকেজো করে দেয়।

৩. মাছির প্রতিরক্ষা কৌশল

মাছি যখন কোনো তরল বা খাদ্যে বসে, তখন সে আত্মরক্ষার জন্য বা ভারসাম্য রক্ষার জন্য সাধারণত তার একটি ডানা উঁচিয়ে রাখে এবং অন্যটি ডুবিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, যে ডানায় বিষ বা রোগজীবাণু থাকে, সেটিই আগে খাবারে স্পর্শ করে। কিন্তু যখন মাছিটিকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেওয়া হয়, তখন অন্য ডানায় থাকা প্রতিষেধকগুলো (যেমন: প্রোটিন যৌগ ও এনজাইম) খাদ্যে মিশে যায় এবং জীবাণুগুলোকে নিউট্রালাইজ বা ধ্বংস করে দেয়।

৪. আন্তর্জাতিক গবেষণা ও স্বীকৃতি

•      জার্মান ও ব্রিটিশ গবেষণা: শাইখ মোস্তফা এবং শাইখ খালীল মোল্লা তাদের সংকলিত বইয়ে দেখিয়েছেন যে, জার্মানি ও ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা মাছি থেকে এমন সব অ্যান্টিবায়োটিক বের করেছেন যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অনেক নামী দামী ঔষধের চেয়েও কার্যকর।

•      কানাডিয়ান গবেষণা রিপোর্ট: রিয়াদে অনুষ্ঠিত চিকিৎসা সম্মেলনে কানাডার গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, মাছিতে এমন কিছু নির্দিষ্ট উপাদান রয়েছে যা ক্ষতিকর প্যাথোজেন বা জীবাণু ধ্বংসকারী হিসেবে কাজ করে।

•      অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকুয়ারি ইউনিভার্সিটি: এখানকার গবেষকরাও মাছির সারফেস বা উপরিভাগ থেকে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল প্রপার্টি খুঁজে পেয়েছেন।

৫. কেন মাছিকে ডুবিয়ে দিতে হবে?

সাধারণভাবে মাছি কোনো খাবারে পড়লে আমরা ঘৃণায় তা ফেলে দেই। কিন্তু যদি খাবারটি মূল্যবান হয় বা দুষ্প্রাপ্য হয়, তবে মাছি ফেলে দিয়ে খাবারটি নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। মাছিকে ডুবিয়ে দিলে তার ডানার প্রতিষেধক নির্গত হয়। ফলে খাবারের বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায় এবং তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ হয়ে ওঠে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং একটি নিখুঁত স্বাস্থ্যবিধি।

৬. নবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ

তৎকালীন আরব সমাজে কোনো ল্যাবরেটরি বা উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। একজন উম্মি বা নিরক্ষর নবীর পক্ষে মাছির ডানার অণুবীক্ষণিক জীবাণু এবং তার প্রতিষেধক সম্পর্কে জানা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না যদি না তা মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে ওহী হিসেবে আসত। এটি প্রমাণ করে যে, আল-কুরআন এবং সুন্নাহর প্রতিটি নির্দেশ মানবজাতির কল্যাণের জন্য এবং তা এক মহাশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

মাছির ডানা নিয়ে এই বৈজ্ঞানিক সত্য রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতের অন্যতম বড় নিদর্শন। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলামের বিধানগুলো সর্বদা বিজ্ঞানমনস্ক এবং মানবদেহের জন্য হিতকর। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা ইসলামের প্রতিটি বিধানের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও যৌক্তিকতা আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।

ইসলামি বিধানের বৈজ্ঞানিক সত্যতা : পর্ব সাত

গরম পাত্রে ফুঁ দেওয়া নিষেধ কেন?

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

খাবার বা পানীয় পাত্রে ফুঁ দেওয়া ইসলামি শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই নিষেধাজ্ঞা দেড় হাজার বছর আগে দেওয়া হলেও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এর পেছনে থাকা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো উন্মোচন করেছে। নিচে আপনার দেওয়া তথ্যের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

ইসলাম কেবল ইবাদতের নিয়ম শেখায় না, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সুস্থ থাকার নিখুঁত দিকনির্দেশনা প্রদান করে। খাবার ও পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো পাত্রে ফুঁ না দেওয়া।

১. হাদিসের নির্দেশনা

হযরত আবু কাতাদা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“যখন তোমাদের কেউ পান করবে, তখন সে যেন পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস না ছাড়ে।” (সহিহ বুখারি: ১৫৩

অন্য একটি হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার বা পানীয়তে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩৭২২

২. কার্বন ডাই অক্সাইড ও রাসায়নিক বিক্রিয়া

মানুষ যখন প্রশ্বাস ছাড়ে, তখন ফুসফুস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO২) নির্গত হয়। বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, যখন আমরা পানির ওপর ফুঁ দেই, তখন এই কার্বন ডাই অক্সাইড পানির সাথে মিশে ‘কার্বনিক অ্যাসিড’ তৈরি করতে পারে। যদিও এটি খুব সামান্য পরিমাণে হয়, কিন্তু নিয়মিত এই অভ্যাস শরীরের অম্ল-ক্ষারের (pH) ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হজমের সমস্যা বা মেটাবলিক জটিলতা তৈরি করতে সক্ষম।

৩. জীবাণুর বিস্তার ও যক্ষ্মা রোগের ঝুঁকি

মানুষের মুখে এবং লালায় অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীব বাস করে। ফুঁ দেওয়ার সময় এই জীবাণুগুলো খাবারের সাথে মিশে যায়। বিশেষ করে সংক্রামক ব্যাধি যেমন—যক্ষ্মা (TB), ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সাধারণ সর্দি-কাশির জীবাণু ফুঁয়ের মাধ্যমে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।

আপনার উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, সুদানের চিকিৎসকদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, সেখানকার মানুষের মধ্যে যক্ষ্মা রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল অতিরিক্ত গরম পানীয় ফুঁ দিয়ে পান করা। যক্ষ্মার জীবাণুগুলো নির্দিষ্ট মাত্রার গরমে বংশবৃদ্ধি করে। যখন কেউ গরম পানীয়তে ফুঁ দেয়, তখন তার মুখ থেকে নির্গত জীবাণুগুলো সেই অনুকূল পরিবেশ পেয়ে দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সুস্থ মানুষকে আক্রান্ত করে।

৪. গরম খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব

খাবার অতিরিক্ত গরম অবস্থায় খেলে মুখগহ্বর, জিহ্বা এবং খাদ্যনালীর নরম কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুঁ দিয়ে খাবার ঠান্ডা করার চেষ্টার চেয়ে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষা করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “গরম খাবারে বরকত নেই।” তাই খাবার কিছুটা ঠান্ডা করে খাওয়া সুন্নত এবং স্বাস্থ্যসম্মত।

৫. সামাজিক ও চারিত্রিক পরিশীলতা

ইসলাম একটি মার্জিত ধর্ম। অন্যের সামনে খাবারের পাত্রে ফুঁ দেওয়া বা শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়া অশোভন ও বিরক্তির কারণ। এটি এক প্রকারের অভদ্রতাও বটে। যখন কোনো পাত্র থেকে একাধিক ব্যক্তি পানি পান করে বা খাবার খায়, তখন একজনের দেওয়া ফুঁ অন্যজনের জন্য অস্বাস্থ্যকর ও ঘৃণ্য হতে পারে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে ধৈর্য ধারণ করতে—অর্থাৎ খাবারটি নিজে থেকেই খাওয়ার উপযোগী তাপমাত্রায় আসার জন্য অপেক্ষা করা।

৬. ওহীর জ্ঞান ও রাসূল (সা.)-এর প্রজ্ঞা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে এই নিষেধাজ্ঞা দেননি। তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত দূত। তাঁর প্রতিটি বাণী ওহীর ওপর ভিত্তি করে প্রদান করা হয়েছে। আজকের বিজ্ঞান যে যক্ষ্মা বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কথা বলছে, তা রাসূল (সা.) চৌদ্দশ বছর আগেই উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে যে, ইসলামের প্রতিটি বিধান মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য নিবেদিত।

খাবারে ফুঁ দেওয়া থেকে বিরত থাকা কেবল একটি সুন্নত নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যবিধি (Preventive Medicine)। যক্ষ্মা, পাকস্থলীর আলসার এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে বাঁচতে রাসূল (সা.)-এর এই ক্ষুদ্র আমলটি পালন করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য জরুরি। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কারগুলো মূলত ইসলামের সত্যতাকেই বারবার বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করছে।

ইসলামি বিধানের বৈজ্ঞানিক সত্যতা : পর্ব আট

কুকুরের লালাযুক্ত পাত্র পরিষ্কারে মাটি ব্যবহার

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কুকুরের লালাযুক্ত পাত্র পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে মাটির ব্যবহার এবং কুকুরের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা বর্তমান বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রের এক অনন্য বিস্ময়। দেড় হাজার বছর আগে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে স্বাস্থ্যবিধি আমাদের শিখিয়েছেন, আধুনিক অণুজীব বিজ্ঞান (Microbiology) আজ তার অকাট্য প্রমাণ দিচ্ছে।

ইসলামি শরীয়াহ অনুসারে কুকুর একটি অপবিত্র প্রাণী (নাজিস)। এর লালা বা উচ্ছিষ্ট যদি কোনো পাত্রে লাগে, তবে তা কেবল পানি দিয়ে ধুলে পবিত্র হয় না। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।

১. হাদিসের অমিয় বাণী

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

“যদি তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দেয়, তবে সে যেন উক্ত পাত্রটি সাতবার ধৌত করে এবং তার মধ্যে একবার মাটি দিয়ে (ঘষে) পরিষ্কার করে।” সহিহ মুসলিম, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৬

অন্য বর্ণনায় এসেছে, প্রথমবার মাটি দিয়ে ঘষার কথা বলা হয়েছে। এই হাদিসটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি একটি নিগূঢ় বৈজ্ঞানিক সত্য বহন করে।

২. লন্ডনের গবেষকের বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা

আপনার বর্ণিত লন্ডনের সেই গবেষকের ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আধুনিক ডিটারজেন্ট এবং সাবান ব্যবহার করে কুকুরের লালাযুক্ত পাত্র পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি দেখতে পান যে, বারংবার সাবান দিয়ে ধোয়ার পরেও পাত্রের গায়ে অতি ক্ষুদ্র জীবাণু লেগে আছে। সাবানের রাসায়নিক উপাদান সেই নির্দিষ্ট প্যাথোজেনগুলোকে ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়।

পরবর্তীতে যখন তিনি নবীজি (সা.)-এর বাতলে দেওয়া পদ্ধতি অনুযায়ী পাত্রটিতে মাটি দিয়ে ঘর্ষণ করেন এবং এরপর পানি দিয়ে ধৌত করেন, তখন দেখা যায় পাত্রটি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত হয়েছে। এই সত্যটি তাকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি ইসলামের সত্যতা স্বীকার করে সপরিবারে মুসলিম হন।

৩. মাটির কেন প্রয়োজন? (বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ)

মাটির মাঝে এমন কিছু রাসায়নিক ও ভৌত গুণাগুণ রয়েছে যা বর্তমানের অনেক উন্নত অ্যান্টিসেপটিকের চেয়েও কার্যকর।

অ্যান্টিবায়োটিক উপাদান:

মাটিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক। বিজ্ঞানীরা মাটি থেকে স্ট্রেপটোমাইসিনের মতো অনেক জীবনরক্ষাকারী ঔষধ তৈরি করেছেন। কুকুরের লালায় থাকা বিশেষ ধরণের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার ক্ষমতা মাটির এই উপাদানগুলোর রয়েছে।

অ্যাডসরপশন (Adsorption):

 মাটির কণাগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং এদের পৃষ্ঠটান বেশি। কুকুরের লালা অত্যন্ত আঠালো এবং পিচ্ছিল হয়, যা কেবল পানি বা সাধারণ সাবানে পুরোপুরি দূর হয় না। মাটির সূক্ষ্ম কণাগুলো এই আঠালো জীবাণুগুলোকে নিজের গায়ে আটকে ফেলে (Absorb) এবং ঘর্ষণের ফলে পাত্রের গা থেকে সমূলে উপড়ে ফেলে।

কুকুরের বিষাক্ত অণুজীব:

কুকুরের লালায় ‘ক্যাপনোসাইটোফাগা’ (Capnocytophaga) সহ এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া থাকে যা মানুষের রক্তে মিশলে ভয়াবহ ইনফেকশন এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে। মাটির অম্লতা বা ক্ষারীয় গুণাগুণ এই নির্দিষ্ট জীবাণুগুলোকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম।

৪. কুকুরের সংস্পর্শ ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি

জার্মান গবেষক ও চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে আপনি যে ভয়াবহ রোগের কথা উল্লেখ করেছেন, তা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘হাইড্যাটিড সিস্ট’ (Hydatid Cyst) বা ‘ইচিনোকোকোসিস’ (Echinococcosis) নামে পরিচিত।

ফিতাকৃমির আক্রমণ:

কুকুরের অন্ত্রে এক ধরণের ক্ষুদ্র ফিতাকৃমি (Echinococcus granulosus) বাস করে। কুকুরের মলের সাথে এই কৃমির ডিম নির্গত হয় এবং তা কুকুরের লোমে ও জিহ্বায় লেগে থাকে। মানুষ যখন কুকুরকে আদর করে, চুমু খায় বা কুকুর মানুষের হাত-পা চাটে, তখন এই অদৃশ্য ডিমগুলো মানুষের দেহে প্রবেশ করে।

অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি:

এই জীবাণুগুলো মানুষের রক্তস্রোতে মিশে কলিজা (Liver), ফুসফুস, কিডনি এমনকি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। সেখানে এগুলো সিস্ট বা টিউমারের মতো তৈরি করে। অনেক সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও শুরুতে একে ক্যান্সার ভেবে ভুল করেন। এর চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল এবং কখনো কখনো এটি প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।

৫. পাশ্চাত্য সভ্যতা ও অন্ধ অনুকরণ

বর্তমানে পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে কুকুর পালন একটি আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অনেকেই কুকুরকে বিছানায় শোয়ায়, একই পাত্রে খাবার খায় এবং পরম মমতায় চুমু খায়। কিন্তু তারা এর পেছনে থাকা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে অসচেতন। জার্মান চিকিৎসক নুল্লর এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুকুর পালনের কারণে অনেক দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এই জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অথচ ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, “তোমরা কুকুরকে বাড়িতে প্রবেশ করাবে না।” (সহিহ বুখারি)।

৬. ওহীর জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন একজন ‘উম্মী’ বা নিরক্ষর নবী। তাঁর কোনো গবেষণাগার ছিল না, ছিল না কোনো আধুনিক অণুবীক্ষণ যন্ত্র। কিন্তু তিনি যেভাবে মাটি ব্যবহারের নিখুঁত বিধান দিয়েছেন এবং কুকুরের বিপদমুক্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন, তা কোনো মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত হতে পারে না। এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহীর জ্ঞান। পবিত্র কুরআনের সূরা নজমের আয়াতটি এর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ-

وَ مَا یَنْطِقُ عَنِ  الْهَوٰی  ؕ﴿۳﴾اِنْ  هُوَ   اِلَّا  وَحْیٌ   یُّوْحٰی  ۙ﴿۴﴾

“রাসূল নিজের ইচ্ছামত কিছুই বলেন না, যা বলেন তা ওহী ভিন্ন আর কিছু নয়।” সূরা নজম: ৩-৪

কুকুরের লালাযুক্ত পাত্র সাতবার ধোয়া এবং একবার মাটি দিয়ে ঘষা—এই বিধানটি প্রমাণ করে যে ইসলাম একটি বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম। এটি কেবল আত্মিক পবিত্রতা নয়, বরং মানুষের দৈহিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আধুনিক বিজ্ঞান যত বেশি অগ্রসর হচ্ছে, ইসলামের প্রতিটি বিধানের যৌক্তিকতা ও শ্রেষ্ঠত্ব তত বেশি উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিচ্ছে। যারা সুস্থ বিবেকসম্পন্ন, তারা এই বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো দেখে ইসলামের সত্যতা অনুধাবন করতে বাধ্য হয়।

কুরআনে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী: পর্ব এক

কুরআনে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী: ১-৬

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআনুল কারীম কেবল একটি জীবনবিধান বা আধ্যাত্মিক গ্রন্থ নয়, বরং এটি সমকাল ও মহাকালের এক জীবন্ত অলৌকিকতা (Miracle)। এই আসমানী কিতাবের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সুনির্দিষ্ট এবং অকাট্য ‘ভবিষ্যদ্বাণী’। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে এমন এক সময়ে এই বাণীসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন মানবজাতি আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যব্যবস্থা সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কুরআন এমন অনেক ঘটনার আগাম সংবাদ দিয়েছিল, যা তৎকালীন সময়ে অসম্ভব বা অকল্পনীয় মনে হলেও পরবর্তীকালে ইতিহাসের পাতায় প্রতিটি অক্ষর অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কেবল তথ্য নয়, বরং এগুলো যে সরাসরি মহান স্রষ্টা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, এটি তার অন্যতম বড় প্রমাণ।

কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়: প্রথমত, সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিজয় বা পতন (যেমন: রোমানদের বিজয় বা মক্কা বিজয়); দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক রহস্য যা দীর্ঘকাল পর উন্মোচিত হয়েছে (যেমন: ফেরাউনের মৃতদেহ সংরক্ষণ বা অনাগত নতুন যানবাহনের ধারণা); এবং তৃতীয়ত, কিয়ামত ও পরকাল সংক্রান্ত মহাজাগতিক সংবাদ। উদাহরণস্বরূপ, যখন রোমানরা পারসিকদের কাছে পরাজিত হয়ে খাদের কিনারায় ছিল, তখন কুরআন তাদের বিজয়ের যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, তা ইতিহাসে হুবহু বাস্তবায়িত হয়েছে। তেমনিভাবে ফেরাউনের দেহ সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর উদ্দেশ্য কেবল মানুষের কৌতূহল মেটানো নয়, বরং মানুষের অন্তরে ঈমানকে দৃঢ় করা এবং এটি যে কোনো মানুষের রচনা নয়—সেই অকাট্য সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করা। আল্লাহ প্রদত্ত এই চ্যালেঞ্জগুলো যুগ যুগ ধরে নাস্তিক ও সংশয়বাদীদের জন্য এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। নিম্নে বর্ণিত ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী কুরআনের সেই অলৌকিকত্বেরই একেকটি উজ্জ্বল স্তম্ভ, যা কিয়ামত অবধি মানবজাতিকে সত্যের পথে দিশা দেখাবে।

ভবিষ্যদ্বাণী-০১ : ফেরাউনের মৃত দেহকে সংরক্ষণ করে রাখা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَجٰوَزۡنَا بِبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ الۡبَحۡرَ فَاَتۡبَعَہُمۡ فِرۡعَوۡنُ وَجُنُوۡدُہٗ بَغۡیًا وَّعَدۡوًا ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَدۡرَکَہُ الۡغَرَقُ ۙ قَالَ اٰمَنۡتُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا الَّذِیۡۤ اٰمَنَتۡ بِہٖ بَنُوۡۤا اِسۡرَآءِیۡلَ وَاَنَا مِنَ الۡمُسۡلِمِیۡنَ آٰلۡـٰٔنَ وَقَدۡ عَصَیۡتَ قَبۡلُ وَکُنۡتَ مِنَ الۡمُفۡسِدِیۡنَ فَالۡیَوۡمَ نُنَجِّیۡکَ بِبَدَنِکَ لِتَکُوۡنَ لِمَنۡ خَلۡفَکَ اٰیَۃً ؕ  وَاِنَّ کَثِیۡرًا مِّنَ النَّاسِ عَنۡ اٰیٰتِنَا لَغٰفِلُوۡنَ 

আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। যদিও ফিরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’। এখন অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানি করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত’। সুতরাং আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শনও হয়ে থাক। আর নিশ্চয় অনেক মানুষ আমার নিদর্শনসমূহের ব্যাপারে গাফেল’। সুরা ইউনুস  : ৯১-৯১

প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ফেরাউনের সদ্য ঘোষিত ঈমানকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল্লাহ ফেরাউনকে বলছেন, “এতদিন তুমি অবাধ্যতা করেছ এবং পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। এখন এই সময়ে তোমার তাওবা বা ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়।”

এরপর আল্লাহ ফেরাউনের দেহ সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। আল্লাহ বলেন, “আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য একটি নিদর্শন হয়ে থাকতে পারো।” এই ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ফেরাউন নিজেকে দেবতা বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করত। তার এই দম্ভের বিপরীতে আল্লাহ তার লাশকে সবার জন্য একটি নিদর্শন বানিয়ে রেখেছেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে কোনো অহংকারী ও সীমালঙ্ঘনকারীই আল্লাহর ক্ষমতা থেকে বাঁচতে পারে না।

এই আয়াতে বর্ণিত “দেহটি রক্ষা করব” – এই কথাটির ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন যে, এর মাধ্যমে আল্লাহ ফেরাউনের মৃতদেহকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মৃতদেহ পচে যায় এবং মাটির সাথে মিশে যায়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর কুদরতে ফেরাউনের লাশকে এমনভাবে রক্ষা করেছেন, যা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।

মিশরের বিভিন্ন স্থানে যে মমিগুলো পাওয়া গেছে, তার মধ্যে একটি হলো রাজা দ্বিতীয় রামসেসের মমি। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকগণ মনে করেন, এই রামসেস দ্বিতীয়ই ছিলেন সেই ফিরাউন, যার শাসনামলে মূসা (আঃ) এবং বনী ইসরাইলিরা বসবাস করতেন। এই ফেরাউনের রাজপ্রাসাদেই শিশু হজরত মূসা (আঃ) লালিতপালিত হন। সে সময়কার জ্যোতিষ গণকদের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, বনি ইসরাইলিদের মধ্য থেকে একজন ছেলে জন্মাবে, যে ফেরাউনের সিংহাসন পতনের কারণ হবে। এ কারণে ফেরাউন এক নির্মম শিশু হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তখন হজরত মূসা (আঃ)-এর মা আল্লাহর আদেশে তাঁকে একটি কাঠের বাক্সে করে নদীতে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহর কুদরতে ওই বাক্সটি এসে ফেরাউনের প্রাসাদের কাছে পৌঁছায় এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া শিশুটিকে দত্তক নেন।

পরবর্তীকালে নবুওয়তপ্রাপ্ত হজরত মূসা (আ.) ফেরাউনের অন্যায় ও আল্লাহর অবাধ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। ফেরাউন রেগে গিয়ে তাঁকে হত্যা করতে চায়। তখন মূসা (আ.) মিশর ত্যাগ করে মাদায়েনে গিয়ে হজরত শুয়াইব (আ.)-এর আশ্রয়ে বসবাস করেন। উল্লেখযোগ্য যে, ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ছিলেন একজন পরহেযগার, পূণ্যবতী নারী।

আবূ মূসা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল ﷺ বলেছেন, পুরুষের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতা অর্জন করেছেন। কিন্তু মহিলাদের মধ্যে ফির‘আউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ইমরানের কন্যা মারইয়াম ব্যতীত আর কেউ পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়নি। তবে আয়িশার মর্যাদা সব মহিলার উপর এমন, যেমন সারীদের (মাংসের সুরুয়ায় ভিজা রুটির) মর্যাদা সকল প্রকার খাদ্যের উপর। সহিহ বুখারি : ৩৪১১, ৩৪৩৩, ৩৭৬৯, ৫৪১৮, সহিহ মুসলিম : ২৪৩১, সুনানে তিরমিযী : ১৮৩৪, সুনানে নাসায়ী : ৩৯৪৭, আহমাদ : ১৯০২৯, ১৯১৬৯

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, “নারীদের মধ্যে চারজন শ্রেষ্ঠ: মাদার মেরি (মারইয়াম), ফাতিমা, খাদিজা এবং ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৩০)

১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিজ্ঞানীরা ফেরাউনের একটি মমি আবিষ্কার করেন, যা বর্তমানে রাজা দ্বিতীয় রামসেসের মমিটি মিশরের কায়রোতে অবস্থিত ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ ইজিপশিয়ান সিভিলাইজেশন (National Museum of Egyptian Civilization বা NMEC)-এ সংরক্ষিত আছে। এটি একটি কাঁচের বাক্সে বিশেষভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা তা দেখতে পারেন।

ফ্রান্সের খ্যাতিমান চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষক ড. মরিস বুকাইলী ১৯৭৫ সালে এই মমিটি প্রত্যক্ষভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ পান। তিনি মমিটির শরীরের রেডিওগ্রাফিক ও ফরেনসিক স্টাডি পরিচালনা করেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, মমিটির হাড়ে ফাটল, ছেঁড়াভাব ও পানি ঢোকার লক্ষণ রয়েছে যা স্পষ্টভাবে ডুবে মৃত্যু বা পানিতে পতনের ইঙ্গিত বহন করে। ড. বুকাইলী তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই “The Bible, The Qur’an and Science”-এ লেখেন-

“According to the Quranic description, the body of Pharaoh would be preserved — I only came to realize the full meaning of this when the examinations confirmed that the cause of Pharaoh’s death was drowning and that his body showed signs of a sudden shock and rapid preservation.”

অর্থ : কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী ফেরাউনের দেহ সংরক্ষিত থাকবে—এই কথাটি আমি তখনই বুঝতে পারি যখন পরীক্ষায় নিশ্চিত হই যে, ফেরাউনের মৃত্যু ডুবে যাওয়ার সময়কার শক ও দেহের দ্রুত সংরক্ষণের প্রমাণ বহন করে। সূত্র: Maurice Bucaille, The Bible, the Qur’an and Science, 1976

প্রকৃতপক্ষে, সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকলেও আল্লাহর কুদরতে ফেরাউনের দেহ পানি থেকে উদ্ধার হয়ে মমী হিসেবে সংরক্ষিত হয়। কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এটি নিছক কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়। বরং ঈমানদারদের জন্য এক জীবন্ত নিদর্শন এবং আল্লাহর বাণীর সত্যতার শক্ত প্রমাণ।

আধুনিক যুগে এসে বিজ্ঞানীরা যখন মিশরের পিরামিড ও অন্যান্য স্থান থেকে প্রাচীন মমির সন্ধান পান, তখন ফেরাউনের মৃতদেহ সংরক্ষণের এই ঘটনাটি সূরা ইউনুসের এই আয়াতের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে সামনে আসে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানতে পারেন যে, তৎকালীন ফেরাউনদের মৃতদেহ মমি করে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এই আবিষ্কার কোরআনের এই আয়াতকে আরো শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে, যা ১৪০০ বছর আগে থেকে এই ভবিষ্যতবাণী করে এসেছে।

কুরআনে ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ফেরাউনের দেহকে সংরক্ষণ করা হয়েছিল যাতে তা মানুষের জন্য একটি নিদর্শন হয়ে থাকে। আধুনিক যুগে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার এই ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণ করে।

ভবিষ্যদ্বাণী-০২ : কুরআন চিরদিন সংরক্ষিত থাকবে

মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا الذِّکۡرَ وَاِنَّا لَہٗ لَحٰفِظُوۡنَ

নিশ্চয় আমি কুরআন নাজিল করেছি, আর আমিই তার হেফাযতকারী।

আল্লাহ নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, কুরআন কোনো মানুষের রচনা নয় বরং তিনি নিজেই একে নাজিল করেছেন। এটি ওহির মাধ্যমে জিবরাইল (আঃ) নবি ﷺ-এর উপর নাজিল করেছেন। আল্লাহ স্বয়ং কুরআন রক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছেন। তাই এটি পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবসমূহের মতো পরিবর্তিত হয়নি এবং কখনো হবে না। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ (তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর) মানুষের হাতে পরিবর্তিত হয়েছিল, কিন্তু কুরআনের ক্ষেত্রে আল্লাহ নিজেই পাহারাদার। কুরআন মূলত আল্লাহর নিকট লাওহে মাহফূজে সংরক্ষিত।

কুরআন সংরক্ষণের জন্য তিনটি পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একে অপরের পরিপূরক। নিচে এ সম্পর্কে  বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

১. হিফজ বা মুখস্থকরার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা

হিফজ পদ্ধতিটি হলো কুরআনকে স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা। এটি কুরআনের সংরক্ষণে সবচেয়ে অনন্য এবং শক্তিশালী পদ্ধতি।  ইসলামে, যে ব্যক্তি পুরো কুরআন মুখস্থ করেন, তাকে হাফিয বলা হয়। এই প্রক্রিয়াটি কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগ থেকেই এই পদ্ধতি চলে আসছে। জিবরাইল (আঃ) যখন রাসুল ﷺ-এর কাছে ওহি নিয়ে আসতেন, তখন রাসুল ﷺ তা মুখস্থ করতেন এবং সাহাবিগণকে তা শেখাতেন। সাহাবিগণও তা মুখস্থ করতেন এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে শেখাতেন। এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে কুরআন সংরক্ষিত হয়ে আসছে। এই পদ্ধতি কুরআনের সঠিকতা নিশ্চিত করে, কারণ যদি লিখিত প্রতিলিপিতে কোনো ভুল বা পরিবর্তন আসে, তবে হাজার হাজার হাফিজের স্মৃতিতে থাকা কুরআনের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা সম্ভব। এটি এমন এক জীবন্ত প্রমাণ যা অন্য কোনো আসমানি কিতাবের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

২. লিখিত প্রতিলিপির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা

 হিফজের পাশাপাশি, প্রথম থেকেই কুরআন লিখিত আকারেও সংরক্ষিত হয়েছে। রাসুল ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই ওহি লেখক সাহাবিগণ যেমন যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) প্রমুখ চামড়া, পাথর, খেজুরের ডাল ও পাতাসহ বিভিন্ন বস্তুতে কুরআনের আয়াত লিখে রাখতেন। এটি ছিল স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভরশীলতার পাশাপাশি একটি বাড়তি সতর্কতা।

পরবর্তীতে, প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সময় ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফিয শহীদ হওয়ার পর, তিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-কে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি লিখিত আয়াতগুলো সংগ্রহ করে একটি মুসহাফ (কুরআনের সংকলিত রূপ) তৈরি করেন। এরপর তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে যখন বিভিন্ন অঞ্চলে ক্বিরাআতের ভিন্নতা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়, তখন তিনি এই মুসহাফের একাধিক অনুলিপি তৈরি করে প্রধান প্রধান মুসলিম শহরে পাঠিয়ে দেন। এই অনুলিপিটি মুসহাফে উসমানী নামে পরিচিত, যা আজও কুরআনের প্রামাণ্য মানদণ্ড হিসেবে বিবেচ্য।

৩. নিয়মিত তিলাওয়াতের মাধ্যমে সংরক্ষন করা

কুরআন শুধু মুখস্থ বা লিখিত রূপেই সংরক্ষিত হয়নি, বরং এর আবৃত্তি বা তিলাওয়াতের নিয়মও সঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। ক্বিরাআত হলো কুরআন পাঠের নিয়মকানুন, যার মাধ্যমে প্রতিটি অক্ষরের উচ্চারণ, স্বরধ্বনি এবং শব্দের সঠিক রূপ নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে জানা যায় কখন কোন শব্দ কীভাবে উচ্চারণ করতে হবে, কোন স্থানে থামতে হবে এবং কোথায় মিলিয়ে পড়তে হবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ যেভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, সাহাবিগণ ঠিক সেভাবেই তা শিখেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা তাঁদের ছাত্রদেরকে তা শেখান। এই শিক্ষা প্রক্রিয়াটি এক শৃঙ্খলিত ধারাবাহিকতা বা সিলসিলা হিসেবে চলে আসছে, যেখানে একজন শিক্ষক তাঁর পূর্ববর্তী শিক্ষকের কাছ থেকে এবং তিনি তাঁর পূর্ববর্তী শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন, যা রাসুল ﷺ পর্যন্ত পৌঁছায়। এর ফলে হাজার বছর পরেও কুরআনের তিলাওয়াত তার মূল রূপেই সংরক্ষিত আছে, এবং এর কোনো ধরনের বিকৃতি বা পরিবর্তন ঘটেনি। এটি কুরআনের শব্দ ও ধ্বনিগত বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করে।

প্রথম যুগের হাতে লেখা কুরআনের কয়েকটি কপি এখনো ইস্তাম্বুলে এবং তাসখন্দের যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এগুলোর সাথে বর্তমান যুগের কুরআনের কোন পার্থক্য নেই। ফ্রান্সের বিখ্যাত মনীষী ডা. মরিস বুকাইলি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান’-এ প্রথম যুগের হাতে লেখা কুরআনের কপিগুলোর সাথে বর্তমান যুগের কুরআনের কোনো পার্থক্য নেই বলে উল্লেখ করেছেন। বুকাইলি তাঁর বইয়ে বলেন যে, কুরআনের পাঠের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইসলামের প্রথম দিককার লিখিত কপিগুলো, যা আজও সংরক্ষিত আছে (যেমন ইস্তাম্বুল বা তাসখন্দের কপি), সেগুলোর সঙ্গে বর্তমানের মুদ্রিত কুরআনের কোনো পার্থক্য নেই। বুকাইলি এই পর্যবেক্ষণকে কুরআনের ঐশী উৎসের একটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন, কারণ এটি প্রমাণ করে যে কুরআন কোনো মানবিয় সম্পাদনা বা পরিবর্তনের শিকার হয়নি। এটা কুরআনের এক অলৌকিক মুজেজা বলা যায়।

ভবিষ্যদ্বাণী-০৩ : ইহুদীরা চিরকার লাঞ্চিত ও অপমানিত অবস্থায় জীবন যাপন করবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ضُرِبَتْ عَلَیْهِمُ الذِّلَّۃُ  اَیْنَ مَا ثُقِفُوْۤا اِلَّا بِحَبْلٍ مِّنَ اللّٰهِ وَ حَبْلٍ مِّنَ النَّاسِ وَ بَآءُوْ بِغَضَبٍ مِّنَ اللّٰهِ وَ ضُرِبَتْ عَلَیْهِمُ الْمَسْكَنَۃُ ؕ ذٰلِكَ بِاَنَّهُمْ كَانُوْا یَکْفُرُوْنَ بِاٰیٰتِ اللّٰهِ وَ یَقْتُلُوْنَ الْاَنْۢبِیَآءَ بِغَیْرِ حَقٍّ ؕ ذٰلِكَ بِمَا عَصَوْا وَّ كَانُوْا یَعْتَدُوْنَ ﴿۱۱۲﴾

তাদের উপর (ইহুদিদের উপর) যেখানে ধরা পড়েছে সেখানেই লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে আল্লাহর (রশি) প্রতিশ্রুতি বা মানুষের (রশি) প্রতিশ্রুতির (চুক্তির) আশ্রয়ে ব্যতীত নয়। তারা আল্লাহর গজব নিয়ে ফিরে এসেছে। তাদের উপর দারিদ্র্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করত এবং নবিদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। আবার এজন্য যে, তারা অবাধ্যতা করত এবং সীমালঙ্ঘন করত।”

সুরা আল-ইমরানের এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইহুদিদের ওপর তিনটি শাস্তির ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন- লাঞ্ছনা, আল্লাহর গজব ও দারিদ্র্য। তাদের নবিদের অস্বীকার ও হত্যার মতো সীমালঙ্ঘনের কারণে এই লাঞ্ছনা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তারা সর্বত্র অসম্মানিত ও পরাজিত হয়েছে। তারা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয়ে নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে দেউলিয়া হয়েছে, এবং তাদের জীবনে শান্তি ও বরকত নেই।এগুলোর ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো-

১. তাদের উপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে

কুরআনে বলা হয়েছে যে, ইহুদিরা যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই তাদের উপর অপমান ও হীনতা চাপিয়ে দেওয়া হবে। ইতিহাসে এর বাস্তব প্রমাণ রয়েছে। তারা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীন শাসনব্যবস্থা বজায় রাখতে পারেনি। বারবার তারা অন্য জাতির অধীনস্থ হয়েছে, যেমন: ব্যাবিলনীয়, পারস্য, রোমান, এমনকি ইসলামি খেলাফতের সময়েও তাদের অবস্থান ছিল অধীনস্ত জাতি হিসেবে।

রোমানদের হাতে জেরুজালেম ধ্বংস হওয়ার পর থেকে ইহুদিরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। তারা প্রায় প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে থেকেছে এবং বারবার বৈষম্য, নির্যাতন ও নির্বাসনের শিকার হয়েছে।

কুরআন বলছে, তাদের এই লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি সম্ভব কেবল আল্লাহর রশি—অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে অথবা মানুষের রশি—অর্থাৎ মুসলিমদের চুক্তি ও আশ্রয়ের অধীনে থেকে। অন্যথায় এই অপমান তাদের চিরস্থায়ী নিয়তি।

আল্লাহর রশি (حبل من الله) :

আল্লাহর রশি দ্বারা এখানে মূলত ইসলাম ধর্ম বা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকে বোঝানো হয়েছে। কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও ‘আল্লাহর রশি’ বলতে ইসলামকে বোঝানো হয়েছে, যেমন সুরা আল-ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা সকলে আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, লাঞ্ছনা থেকে বাঁচার একমাত্র স্থায়ী উপায় হলো আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করা এবং তাঁর আনুগত্য করা। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে, তখন আল্লাহ তাদের সম্মান ও সুরক্ষা দান করেন। ইহুদিদের জন্য তাদের লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির একটি পথ ছিল ইসলাম গ্রহণ করা, কারণ ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন।

মানুষের রশি (حبل من الناس) :

‘মানুষের রশি’ দ্বারা বোঝানো হয়েছে অন্যান্য মানবগোষ্ঠীর সাথে চুক্তি, মিত্রতা বা সুরক্ষা। এটি মূলত সেই চুক্তি বা নিরাপত্তাকে বোঝায় যা কোনো শক্তিশালী জাতি বা সরকার ইহুদিদের প্রদান করে। এটি আল্লাহর সরাসরি রহমত নয়, বরং অন্য জাতির সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের টিকে থাকার পেছনে এই ‘মানুষের রশি’র ব্যাখ্যা খুবই প্রাসঙ্গিক। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে, এটি মূলত নিজস্ব সামরিক শক্তি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। এই রাষ্ট্রগুলোই ইসরায়েলের সুরক্ষার প্রধান উৎস। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইসরায়েল শক্তিশালী মিত্রদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। এই সমর্থন না থাকলে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হতো। এভাবে, কুরআন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইহুদিরা তাদের লাঞ্ছনা থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা পেতে পারে যদি তারা কোনো পরাশক্তির সঙ্গে চুক্তি করে বা তাদের আশ্রয় লাভ করে। তবে এই সুরক্ষা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা স্থায়ী সম্মান নয়, বরং এটি অন্যদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা।

২. তারা আল্লাহর গজব নিয়ে ফিরে আসবে

ইহুদিদের দ্বিতীয় শাস্তি হলো আল্লাহর গজব। গজব মানে শুধু দুনিয়ার বিপর্যয় নয়, বরং আখিরাতের কঠিন শাস্তিও এর অন্তর্ভুক্ত। তারা আল্লাহর অসন্তোষ ও অভিশাপের অধিকারী হয়েছে কারণ তারা ধারাবাহিকভাবে নবিদের অবাধ্যতা করেছে। তারা তাওরাতের বিধান বিকৃত করেছে, আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করেছে এবং অন্যায়ভাবে নবিদের হত্যা করেছে। ইয়াহইয়া (আঃ) ও যাকারিয়া (আঃ)-কে তারা হত্যা করেছে, আর ঈসা (আঃ)-কে হত্যা করার চেষ্টাও করেছে। তারা মুহাম্মদ ﷺ -কেউ অস্বীকার করেছে, যদিও তাদের কিতাবে তাঁর আগমনের সুসংবাদ ছিল। ফলে আল্লাহর গজব তাদের উপর স্থায়ীভাবে নেমে এসেছে। দুনিয়াতে তারা বারবার ধ্বংস, নির্বাসন, গণহত্যা ও অপমানের মুখোমুখি হয়েছে, আর আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ আজাব, এটা হলো দুনিয়ার লাঞ্ছনা পর দ্বিতীয় শাস্তি।

৩. তাদের উপর দারিদ্র্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে

এখানে দারিদ্র্য শব্দটি কেবল আর্থিক দারিদ্র্যকে বোঝায় না। বরং এটি মূলত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দেউলিয়াত্বকে নির্দেশ করে। ইহুদিরা ব্যবসা-বাণিজ্যে দক্ষ হওয়ায় অনেক সময় তারা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল, কিন্তু তাদের অন্তরে শান্তি ও প্রশান্তি নেই। তারা লোভ, স্বার্থপরতা ও অনৈতিকতার কারণে নৈতিকভাবে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। তাদের জীবনযাত্রা বাহ্যিকভাবে ধনবান হলেও তারা সম্মানহীন, ভীত-সন্ত্রস্ত ও নিরাপত্তাহীন। কুরআন এ দারিদ্র্যকে তাদের সীমালঙ্ঘন, অবাধ্যতা এবং নবি হত্যার ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা প্রকৃত দারিদ্র্যের শিকার হয়েছে।

এই আয়াত ইহুদিদের ইতিহাস ও পরিণতির এক চিরন্তন দলিল। তারা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার, নবি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ এবং অবাধ্যতার কারণে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই অপমান, গজব ও দারিদ্র্যের শাস্তি ভোগ করছে। এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী কুরআন ও ইসলামের সত্যতা প্রমানে ভুমিকা রাখে। ১৪০০ বছর আগের লেখা কথা ফল যখন বর্তমানের সাথে থাকে, তখন তার সত্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা বাতুলতা মাত্র।

ভবিষ্যদ্বাণী-০৪ : রাসুল এর খ্যাতি ও মর্যাদা দুনিয়াতে সমুন্নত রাখা হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَرَفَعۡنَا لَکَ ذِکۡرَکَ ؕ

আর আমি তোমার (মর্যাদার) জন্য তোমার স্মরণকে সমুন্নত করেছি। সুরা ইনশিরাহ : ৪

এখানে সুরা ইনশিরাহের এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসুল ﷺ-এর খ্যাতি সমুন্নত করার কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ রাসূলের ﷺ নাম, সম্মান ও মর্যাদাকে পৃথিবীর বুকে স্থায়ী ও সুউচ্চ করেছেন। নিচে এমন কয়েকটি পদ্ধতি তুলে ধরা হলো, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা রাসুল ﷺ-এর খ্যাতি বৃদ্ধি করেছেন:

১. শাহাদাতাইন বা কালেমা মাধ্যমে

কালেমা শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ রাসুল ﷺ-এর নামকে তাঁর নিজের নামের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে, যেখানেই কোনো মুসলমান কালেমা পাঠ করে, সেখানে “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) বলার পরেই “ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ (এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ তাঁর রাসুল) বলে। এভাবে প্রতিদিন লক্ষ কোটি কণ্ঠে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়।

২. সালাতের আজানের মাধ্যমে

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের জন্য আজানে মুয়াজ্জিনরা আল্লাহর নামের পর রাসুল ﷺ-এর নাম উচ্চারণ করেন। আযান ২৪ ঘণ্টাই পৃথিবীর কোনো না কোনো স্থানে হচ্ছে, যা রাসুল ﷺ-এর নামের উচ্চতা এবং মর্যাদাকে অবিরামভাবে প্রচার করছে।

৩. সালাত মাধ্যমে

মুসলিমরা তাদের দৈনিক সালাতের শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতুতে আল্লাহর প্রশংসা করার পর রাসুল ﷺ-এর উপর দরূদ পাঠ করে। এই দরূদ পাঠের মাধ্যমে প্রতিবার মুসলিমরা রাসুল ﷺ-এর প্রতি সম্মান জানায়, যা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

৪. কুরআনে তাঁর নাম

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে রাসুল ﷺ-কে সম্মানের সাথে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করেছেন। যেমন- সুরা আহযাবের ৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাসুল ﷺ-কে “সিরাজুম মুনীরা” (প্রদীপ্ত প্রদীপ) বলে আখ্যায়িত করেছেন।

৫. ইসলামি আইন ও শরীয়ত

ইসলামি শরীয়ত ও আইন-কানুনসমূহ রাসুল ﷺ-এর মাধ্যমে মানবজাতির কাছে পৌঁছেছে। তাঁর সুন্নাহ ও হাদিসসমূহ যুগ যুগ ধরে মুসলিমদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে, যা তাঁর শিক্ষাকে অমর করে রেখেছে।

৬. তাঁর শাফায়াত (সুপারিশ)

কিয়ামত দিবসে যখন সমস্ত মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত থাকবে, তখন শুধু রাসুল ﷺ-এরই অধিকার থাকবে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার। এই মহান মর্যাদা তাঁর নামের সম্মানকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করবে।

৭. ইসলামের প্রসার

রাসুল ﷺ-এর মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ মুসলিম। এই বিশাল মুসলিম উম্মাহের প্রতিটি সদস্য রাসুল ﷺ-কে তাদের নেতা ও আদর্শ হিসেবে মেনে চলে।

৮. তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ব্যর্থতা

ইতিহাসে অসংখ্যবার রাসুল ﷺ-এর সম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। বরং তাঁর বিরুদ্ধে যত অপপ্রচার চালানো হয়েছে, ততই তাঁর ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ সম্পর্কে জানার আগ্রহ বেড়েছে এবং অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে।

৯. তাঁর জীবন্ত সুন্নাহ

রাসুল ﷺ-এর প্রতিটি কাজ, কথা ও অনুমোদন (সুন্নাহ) আজও মুসলিম উম্মাহের জীবনযাত্রার অংশ। তার সুন্নাহ জীবিত থাকার কারণে তার স্মৃতি এবং আদর্শ কখনো বিলুপ্ত হবে না।

১০. বিজ্ঞান ও ইতিহাসে তাঁর প্রশংসা

আধুনিক যুগে অনেক অমুসলিম বিজ্ঞানী, ঐতিহাসিক এবং চিন্তাবিদও রাসুল ﷺ-এর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং সফলতাকে অকপটে স্বীকার করেছেন। তারা তাঁকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করেছেন।

১১. আহলে বাইয়াত মধ্যমে :

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আহলে বাইত (ঘরের লোক বা পরিবার) বলতে সেইসব সম্মানিত ব্যক্তিদের বোঝানো হয়, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন এবং রাসুলের ﷺ হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।  ফাতিমা (রা.), আলি (রা.),  হাসান (রা.):  হুসাইন (রা.), রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র স্ত্রীগণও অন্তর্ভুক্ত।

আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সম্মানে মুসলিম দুরুদ পাঠ করি এবং এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সম্মান সমুন্নত করা হয়।

ভবিষ্যদ্বাণী-০৫ : রোমানরা পারস্যের উপর বিজয় হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

غُلِبَتِ  الرُّوْمُ ۙ﴿۲﴾  فِیْۤ  اَدْنَی الْاَرْضِ وَ هُمْ مِّنْۢ  بَعْدِ غَلَبِهِمْ سَیَغْلِبُوْنَ ۙ﴿۳﴾  فِیْ بِضْعِ سِنِیْنَ ۬ؕ لِلّٰهِ الْاَمْرُ  مِنْ قَبْلُ وَ مِنْۢ  بَعْدُ ؕ وَ  یَوْمَئِذٍ  یَّفْرَحُ  الْمُؤْمِنُوْنَ ۙ﴿۴﴾  بِنَصْرِ اللّٰهِ ؕ یَنْصُرُ مَنْ یَّشَآءُ ؕ وَ هُوَ الْعَزِیْزُ  الرَّحِیْمُ ۙ﴿۵﴾

রোমানরা পরাজিত হয়েছে। নিকটবর্তী অঞ্চলে, আর তারা তাদের এ পরাজয়ের পর অচিরেই বিজয়ী হবে, কয়েক বছরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের সব ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে, আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। সুরা রূম : ২-৫

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্যের পরাজয় এবং তাদের ভবিষ্যৎ বিজয় সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি কুরআনের এক মহা মু’জিযা বা অলৌকিকতা হিসেবে বিবেচিত।

১. পারস্যের কাছে রোমানরা পরাজিত হয়।

রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (যারা ছিল খ্রিষ্টান) পারস্যের সাফাভিদ সাম্রাজ্যের (যারা ছিল অগ্নি উপাসক) কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। পারস্যরা বাইজেন্টাইনদের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের সন্নিকট পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। বাইজেন্টাইনরা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তাদের সাম্রাজ্য পতনোন্মুখ বলে মনে হচ্ছিল। এই পরাজয়ের খবর মুসলিমদের জন্য দুঃখজনক ছিল, কারণ তারা বাইজেন্টাইনদেরকে আহলে কিতাব (আকাশি কিতাবের অনুসারী) হিসেবে পারস্যের মুশরিকদের চেয়ে নিজেদের বেশি ঘনিষ্ঠ মনে করত। অন্যদিকে, মক্কার মুশরিকরা পারস্যদের বিজয়কে উদ্যাপন করছিল, কারণ তারা মুসলিমদের মতোই একত্ববাদী বাইজেন্টাইনদের পরাজয়কে তাদের নিজেদের বিজয় বলে মনে করত।

২. আল্লহ ঘোষণা করলেন অচিরেই রোমানরা বিজয়ই হবে

রোমানদের পরাজয়ে মুসলিমদের পরাজয়ের মত ছিল। কেনান রোমানরা কিতাবি ছিল। তাই আল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করে বলে দিলেন, রোমানরা তাদের পরাজয়ের পর আবার বিজয় লাভ করবে। এই ঘটনাটি মক্কা থেকে খুব বেশি দূরে নয়, বাইজেন্টাইন-পারস্য সীমান্তের নিকটেই ঘটবে। এখানে আরবি শব্দ “বিদ্’ঈ সিনীন” ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হলো “কয়েক বছরের মধ্যে”। আরবিতে “বিদ্’ঈ” শব্দটি সাধারণত ৩ থেকে ৯ বছরের সময়কালকে বোঝায়। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি যখন করা হয়েছিল, তখন এটি ছিল প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। কারণ বাইজেন্টাইনরা সামরিক এবং অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তাদের পক্ষে পারস্যের মতো একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা ছিল কল্পনাতীত।

কিন্তু এই ভবিষ্যদ্বাণীটি বাস্তবায়িত হলে মুসলিমরা আনন্দিত হবে। তাদের আনন্দিত হওয়ার কারণ হলো দুটি: প্রথমত, বাইজেন্টাইনদের বিজয় লাভ (যারা ছিল আহলে কিতাব); দ্বিতীয়ত, আল্লাহর এই অলৌকিক ভবিষ্যদ্বাণীটি বাস্তবে প্রমাণিত হবে। এই আয়াতটি যখন নাজিল হয়েছিল, তখন মুসলিমরা মক্কায় চরম দুর্বল অবস্থায় ছিল। এই ভবিষ্যদ্বাণী ছিল তাদের জন্য এক বড় সান্ত্বনা ও অনুপ্রেরণা।

ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন

এই আয়াতগুলো নাজিল হওয়ার মাত্র কয়েক বছর পরেই রাসুল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়। ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে বদরের যুদ্ধের সময় বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস একটি চূড়ান্ত যুদ্ধে পারস্যের সম্রাট দ্বিতীয় খসরুকে পরাজিত করেন। এই বিজয়টি ছিল ৬২৪-৬২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, যা কুরআনে উল্লিখিত ‘কয়েক বছর’ (৩ থেকে ৯ বছর) সময়সীমার মধ্যে পড়ে। এই বিজয়ের খবর যখন মুসলিমদের কাছে পৌঁছায়, তখন তারা বদরের যুদ্ধের বিজয়ের সাথে সাথে এই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়নে দ্বিগুণ আনন্দিত হয়।

এই ঘটনাটি কুরআনের অলৌকিকতার এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এমন একটি অসম্ভব ভবিষ্যদ্বাণী এমন নিখুঁতভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

ভবিষ্যদ্বাণী-০৬ : পরবর্তীদের জন্য ইবরাহীম (আঃ) এর সুখ্যাতি (কীর্তি) থাকবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ  السَّعْیَ قَالَ یٰبُنَیَّ  اِنِّیْۤ اَرٰی فِی الْمَنَامِ اَنِّیْۤ  اَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرٰی ؕ قَالَ یٰۤاَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۫ سَتَجِدُنِیْۤ  اِنْ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ الصّٰبِرِیْنَ ﴿۱۰۲﴾  فَلَمَّاۤ   اَسْلَمَا وَ  تَلَّہٗ   لِلْجَبِیْنِ ﴿۱۰۳﴾ۚ وَ  نَادَیْنٰهُ  اَنْ  یّٰۤاِبْرٰهِیْمُ ﴿۱۰۴﴾ۙقَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْیَا ۚ اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِی الْمُحْسِنِیْنَ ﴿۱۰۵﴾اِنَّ هٰذَا لَهُوَ  الْبَلٰٓـؤُا الْمُبِیْنُ ﴿۱۰۶﴾ وَ فَدَیْنٰهُ  بِذِبْحٍ عَظِیْمٍ ﴿۱۰۷﴾ وَ تَرَکْنَا عَلَیْهِ فِی الْاٰخِرِیْنَ ﴿۱۰۸﴾ۖ

“অতঃপর যখন সে তার (ইসমাইলের) সাথে চলাফেরার বয়সে পৌঁছাল, ইবরাহীম বলল, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। সুতরাং ভেবে দেখ, তোমার কী অভিমত?’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।অতঃপর যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং সে (পুত্র) তাকে (পিতার নির্দেশে) উপুড় করে শুইয়ে দিল। “তখন আমি তাকে ডাকলাম, ‘হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করি। নিশ্চয় এটি ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম এবং আর তার জন্য আমি পরবর্তীদের মধ্যে সুখ্যাতি (কীর্তি)  রেখে দিয়েছি। সুরা সাফফাত : ১০২-১০৮

আল্লাহ ইবরাহীম (আঃ) এর নাম, স্মৃতি, ও কুরবানির সুন্নাহ পরবর্তী যুগসমূহে চলমান রেখেছেন। আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম হজ, কুরবানি ও সালাতের মাধ্যমে তাকে স্বরণ করে। এমনকি হজ কুরবানির মাধ্যমে তার কীর্তি বা স্মৃতি বহন করে।

১. হজের মাধ্যমে ইব্রাহিম (আঃ)-এর কীর্তি বা স্মৃতি স্মরণ

হজের মাধ্যমে ইব্রাহিম (আঃ)-এর কীর্তি বা স্মৃতি বিভিন্ন উপায়ে জীবিত রাখা হয়। হজের প্রতিটি ধাপ ইব্রাহিম (আঃ), তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আঃ) এবং তাঁদের পুত্র ইসমাইল (আঃ)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন-

ক. সাফা ও মারওয়া সাঈ

সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার দৌড়ানো ইব্রাহিম (আঃ)-এর স্ত্রী হাজেরা (আঃ)-এর সেই অবিচল প্রচেষ্টার স্মৃতিচারণ, যখন তিনি শিশু ইসমাইলের জন্য পানির খোঁজে ব্যাকুলভাবে ছোটাছুটি করেছিলেন। হাজেরা (আঃ)-এর এই অবিরাম দৌড়ানো আল্লাহর উপর তাঁর গভীর ভরসা ও ধৈর্যকে তুলে ধরে। হজ ও উমরা পালনকারীরা এই সাঈ সম্পাদনের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পুনরাভিনয় করে।

খ. মিনা, আরাফাহ এবং মুযদালিফা

মিনা: এখানে হাজীরা অবস্থান করেন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। এটি ইব্রাহিম (আঃ)-এর তাঁবু স্থাপনের স্মৃতিকে ধারণ করে।

গ. আরাফাহ:

আরাফাতের ময়দানে সমবেত হওয়া হলো হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই স্থানে ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। হাজীরা এখানে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত কামনা করেন, যা হজের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু।

ঘ. মুযদালিফা:

এই স্থানে হাজীরা রাতে অবস্থান করেন এবং শয়তানকে পাথর মারার জন্য কঙ্কর সংগ্রহ করেন, যা ইব্রাহিম (আঃ)-এর শয়তানের প্ররোচনা প্রত্যাখ্যান করার প্রতীক।

ঙ. জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ (রমি)

কঙ্কর নিক্ষেপের এই প্রথাটি ইব্রাহিম (আঃ)-এর সেই ঘটনার স্মৃতি বহন করে, যখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজ পুত্র ইসমাইলকে কুরবানি দিতে যাচ্ছিলেন। পথে শয়তান তাকে প্ররোচনা দিয়েছিল এবং তিনি শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হাজীরা এই রমি সম্পাদনের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং শয়তানের বিরুদ্ধে তাদের দঢ় সংকল্প প্রকাশ করেন।

চ. কুরবানি

হজের একটি অপরিহার্য অংশ হলো কুরবানি করা, যা ইব্রাহিম (আঃ)-এর সেই চরম আত্মত্যাগের স্মরণে করা হয়, যখন তিনি তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর নির্দেশে কুরবানি দিতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। এই কুরবানি আল্লাহর প্রতি চূড়ান্ত আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রতীক। হাজীরা কুরবানির মাধ্যমে ইব্রাহিম (আঃ)-এর সেই মহান ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

ছ. কাবাঘর তাওয়াফ

ইসলামের পবিত্রতম স্থান কাবাঘর, যা ইব্রাহিম (আঃ) এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আঃ) পুনর্র্নিমাণ করেছিলেন। হাজীরা কাবাঘরের চারপাশে সাতবার প্রদক্ষিণ (তাওয়াফ) করার মাধ্যমে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একত্ববাদের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করেন। এই তাওয়াফ সেই স্মৃতিকে ধারণ করে যখন ইব্রাহিম (আঃ) কাবাঘরের চারপাশে তাওয়াফ করেছিলেন।

জ. হজের তালবিয়াহ :

হজ্বের সময় হাজীরা যে তালবিয়াহ পাঠ করেন, তাতে ইব্রাহিম (আঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ প্রকাশ পায়।

২. ঈদুল আজহার কুরবানি

ঈদুল আজহার কুরবানি ইব্রাহিম (আঃ)-এর সেই চূড়ান্ত আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় স্মারক।  প্রতি বছর ১০ই যিলহজ তারিখে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করেন। এই কুরবানি কেবল একটি পশু জবাই নয়, বরং আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য, ত্যাগ এবং ভালোবাসার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর নির্দেশ পালনে যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে আমরা প্রস্তুত। এটি ইব্রাহিম (আঃ)-এর আত্মত্যাগকে সজীব রাখে এবং মুসলিমদের মধ্যে ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করে।

৩. তাকবিরে তাশরীক:

 ঈদুল আজহার দিনগুলোতে এবং এর পরের দিনগুলোতে তাকবিরে তাশরীক পাঠ করা হয়, যা ইব্রাহিম (আঃ)-এর সেই মহান ঘটনার স্মৃতিচারণ করে।

৪. সালাতে দোয়া:

প্রতিদিনের নামাজে আমরা যে দরুদ ইব্রাহিম পাঠ করি, সেখানে আমরা ইব্রাহিম (আঃ) ও তাঁর বংশধরের ওপর শান্তি বর্ষণের জন্য দোয়া করি। এটি মুসলিম উম্মাহর সাথে ইব্রাহিম (আঃ)-এর আধ্যাত্মিক সংযোগকে আরও দৃঢ় করে।

৫. শরীয়তের অংশ  হিসেবে

কুরবানি শুধু একটি ঐতিহাসিক প্রথা বা স্মৃতিচারণ নয় বরং এটি ইসলামের একটি স্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সুরা আল-কওসারের আয়াতে আল্লাহ রাসুল ﷺ-কে আদেশ করেছেন, “অতএব আপনি আপনার রবের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।” এটি প্রমাণ করে যে কুরবানি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি শরয়ী বিধান, যা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে। এটি ইব্রাহিম (আঃ)-এর ত্যাগের একটি চিরন্তন প্রতীক এবং মুসলিমদের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম

কুরআনে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী: পর্ব দুই  

কুরআনে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী: ৭-১৪

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্র কুরআনুল কারীম কেবল একটি জীবনবিধান বা আধ্যাত্মিক গ্রন্থ নয়, বরং এটি সমকাল ও মহাকালের এক জীবন্ত অলৌকিকতা (Miracle)। এই আসমানী কিতাবের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সুনির্দিষ্ট এবং অকাট্য ‘ভবিষ্যদ্বাণী’। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে এমন এক সময়ে এই বাণীসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন মানবজাতি আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যব্যবস্থা সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কুরআন এমন অনেক ঘটনার আগাম সংবাদ দিয়েছিল, যা তৎকালীন সময়ে অসম্ভব বা অকল্পনীয় মনে হলেও পরবর্তীকালে ইতিহাসের পাতায় প্রতিটি অক্ষর অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কেবল তথ্য নয়, বরং এগুলো যে সরাসরি মহান স্রষ্টা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, এটি তার অন্যতম বড় প্রমাণ।

কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়: প্রথমত, সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিজয় বা পতন (যেমন: রোমানদের বিজয় বা মক্কা বিজয়); দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক রহস্য যা দীর্ঘকাল পর উন্মোচিত হয়েছে (যেমন: ফেরাউনের মৃতদেহ সংরক্ষণ বা অনাগত নতুন যানবাহনের ধারণা); এবং তৃতীয়ত, কিয়ামত ও পরকাল সংক্রান্ত মহাজাগতিক সংবাদ। উদাহরণস্বরূপ, যখন রোমানরা পারসিকদের কাছে পরাজিত হয়ে খাদের কিনারায় ছিল, তখন কুরআন তাদের বিজয়ের যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, তা ইতিহাসে হুবহু বাস্তবায়িত হয়েছে। তেমনিভাবে ফেরাউনের দেহ সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর উদ্দেশ্য কেবল মানুষের কৌতূহল মেটানো নয়, বরং মানুষের অন্তরে ঈমানকে দৃঢ় করা এবং এটি যে কোনো মানুষের রচনা নয়—সেই অকাট্য সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করা। আল্লাহ প্রদত্ত এই চ্যালেঞ্জগুলো যুগ যুগ ধরে নাস্তিক ও সংশয়বাদীদের জন্য এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। নিম্নে বর্ণিত ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী কুরআনের সেই অলৌকিকত্বেরই একেকটি উজ্জ্বল স্তম্ভ, যা কিয়ামত অবধি মানবজাতিকে সত্যের পথে দিশা দেখাবে।

ভবিষ্যদ্বাণী-০৭ : কুরআনের মত করে কেউ কোন দিন একটি সুরাও রচনা করতে পারবে না

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اِنْ کُنْتُمْ فِیْ رَیْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلٰی عَبْدِنَا فَاْتُوْا بِسُوْرَۃٍ مِّنْ مِّثْلِہٖ ۪ وَ ادْعُوْا شُهَدَآءَکُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ  اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ ﴿۲۳﴾  فَاِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَ لَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَ الْحِجَارَۃُ  ۚۖ اُعِدَّتْ لِلْکٰفِرِیْنَ ﴿۲۴﴾

 আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাজিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সুরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অতএব যদি তোমরা তা না কর- আর কখনো তোমরা তা করবে না- তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য। সুরা বাকারা : ২৩-২৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَمۡ یَقُوۡلُوۡنَ افۡتَرٰىہُ ؕ قُلۡ فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّثۡلِہٖ وَادۡعُوۡا مَنِ اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ

নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে’? বল, ‘তবে তোমরা তার মত একটি সুরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। সুরা ইউনুস : ৩৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَمۡ یَقُوۡلُوۡنَ افۡتَرٰىہُ ؕ قُلۡ فَاۡتُوۡا بِعَشۡرِ سُوَرٍ مِّثۡلِہٖ مُفۡتَرَیٰتٍ وَّادۡعُوۡا مَنِ اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ

নাকি তারা বলে, ‘সে এটা রটনা করেছে’? বল, ‘তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সুরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। সুরা হুদ : ১৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ لَّئِنِ اجۡتَمَعَتِ الۡاِنۡسُ وَالۡجِنُّ عَلٰۤی اَنۡ یَّاۡتُوۡا بِمِثۡلِ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنِ لَا یَاۡتُوۡنَ بِمِثۡلِہٖ وَلَوۡ کَانَ بَعۡضُہُمۡ لِبَعۡضٍ ظَہِیۡرًا

বলঃ যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন রচনা করার জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ কুরআন রচনা করতে পারবেনা। সুরা ইসরা : ৮৮

এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, যা কুরআনের অলৌকিকতা এবং ঐশী উৎস প্রমাণ করে। এই আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, যদি কারো কুরআনের ব্যাপারে সন্দেহ থাকে, তাহলে তারা যেন কুরআনের মতো একটি সুরা রচনা করে নিয়ে আসে। এখানে, আল্লাহ তায়ালা অবিশ্বাসীদেরকে বলছেন, যদি তোমাদের মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি অবতীর্ণ কুরআন সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে তোমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে এর ক্ষুদ্রতম সুরাগুলোর (যেমন, সুরা কাউসার) মতো অন্তত একটি সুরাও তৈরি করে দেখাও। এই কাজে তারা আল্লাহ ছাড়া তাদের সব সাক্ষী ও সাহায্যকারীদের ডাকতে পারে। এই চ্যালেঞ্জটি কেবল একজন ব্যক্তির জন্য নয়, বরং সব অবিশ্বাসীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতি আহ্বান।

চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত ফলাফল

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তায়ালা এই চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত ফলাফলও জানিয়ে দিয়েছেন। “অতএব যদি তোমরা তা না কর- আর কখনো তোমরা তা করবে না- তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য।”

এই অংশে আল্লাহ বলছেন, তোমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না, এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি কুরআনের নাজিলের পর থেকে আজ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহু মানুষ চেষ্টা করেও কুরআনের মতো কোনো সাহিত্য রচনা করতে পারেনি, যা কুরআনের শৈল্পিকতা, ভাষা, এবং গভীরতার সাথে তুলনীয়। এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে কুরআন মানুষের রচিত কোনো গ্রন্থ নয়, বরং এটি আল্লাহর বাণী।

কুরআনের চ্যালেঞ্জ আজও কেন সত্য?

১. অতুলনীয় সাহিত্য ও ভাষা

কুরআন শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি আরবি ভাষার এক অনন্য সাহিত্যিক অলৌকিকতা। এর শব্দচয়ন, বাক্য গঠন এবং বর্ণনাশৈলী এতটাই উন্নত যে ১৪০০ বছর পরেও কোনো সাহিত্যিক এর মতো কিছু তৈরি করতে পারেনি।  কুরআনের ভাষা অত্যন্ত বিশুদ্ধ এবং এর কোনো ত্রুটি নেই। তৎকালীন আরবের সেরা কবি ও সাহিত্যিকরা এর ভাষা শুনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে এটি মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। কুরআনের প্রতিটি আয়াত একটি বিশেষ ছন্দ ও সুর বহন করে, যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। এর ভাষা একদিকে যেমন সরল, তেমনি গভীর অর্থবহ। এটি একই সাথে কাব্যিক, প্রাঞ্জল এবং প্রাঞ্জল নয় এমন বিষয়কেও সহজে উপস্থাপন করে। এই চ্যালেঞ্জটি আজও বিদ্যমান। আধুনিক ভাষাবিদ এবং গবেষকরাও কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতা নিয়ে গবেষণা করছেন এবং এর সৌন্দর্য ও গভীরতা দেখে বিস্মিত হচ্ছেন।

২. ভবিষ্যদ্বাণী ও বৈজ্ঞানিক তথ্য

কুরআনে এমন কিছু তথ্য ও ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যা তৎকালীন সময়ে মানুষের জ্ঞানের বাইরে ছিল। এগুলো প্রমাণ করে যে কুরআন মানুষের রচিত নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

ক. ভ্রূণের বিকাশ : কুরআনে ভ্রূণের বিভিন্ন ধাপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। যেমন, ভ্রূণের ‘আলাকা’ (রক্তপিণ্ড) ও ‘মুদগা’ (মাংসপিণ্ড) ধাপের বর্ণনা, যা ১৪০০ বছর আগে জানা সম্ভব ছিল না।

খ. মহাকাশ বিজ্ঞান: কুরআনে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি, সূর্য ও চাঁদের কক্ষপথের মতো অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য আধুনিক বিজ্ঞান সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে।

ঘ. ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী: কুরআনের সুরা রুম-এ রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে পরাজিত রোমানরা আবার বিজয়ী হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সত্য হয়েছিল।

৩. ঐশী নিরাপত্তা

কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিয়েছেন, যার কারণে এর মূলপাঠ ১৪০০ বছর ধরে অপরিবর্তিত আছে। কুরআন একই সাথে লিখিত এবং মুখস্থ করার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। যুগে যুগে হাজার হাজার হাফিজ (কুরআন মুখস্থকারী) তৈরি হয়েছেন, যারা এর প্রতিটি শব্দ, এমনকি প্রতিটি অক্ষরের নির্ভুলতা নিশ্চিত করেছেন। আপনি পৃথিবীর যে কোনো স্থানে কুরআনের একটি কপি খুলে দেখতে পারেন, এর মূলপাঠ সব জায়গায় একই রকম পাবেন। এর কোনো সংস্করণ নেই, কারণ এর কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।

৪. চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারীদের ফলাফল

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কিছু ব্যক্তি কুরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তার মতো কিছু লেখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের সবার ক্ষেত্রেই ফল হয়েছে ব্যর্থতা এবং উপহাস। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো মুসায়লিমা আল-কাজ্জাব।

মুসায়লিমা ছিল ইসলামের প্রথম যুগের একজন মিথ্যা নবি দাবিদার। সে নিজেকে নবুওয়তের অধিকারী বলে প্রচার করে এবং কুরআনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কিছু আয়াত রচনার চেষ্টা করে। তার রচিত আয়াতগুলো ছিল অত্যন্ত হাস্যকর ও সাহিত্যিক মানহীন। যেমন-

সে একটি সুরা রচনার চেষ্টা করেছিল যার নাম ছিল ‘সুরা আল-ফিল’ (হাতি)। তার রচিত সেই সুরার কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো:

يَا فِيلُ! مَا أَنْتَ وَمَا الَّذِي يُخْبِرُكَ مَا أَنْتَ؟ لَدَيْكَ ذَيْلٌ طَوِيلٌ وَخُرْطُومٌ طَوِيلٌ.

অর্থ : হে হাতি! তুমি কী এবং কী তোমাকে বলে দেবে তুমি কী? তোমার একটি লম্বা লেজ এবং একটি লম্বা শুঁড় আছে।”

এই ধরনের অর্থহীন এবং দুর্বল বাক্য ছিল তার প্রধান হাতিয়ার। কুরআনের সাহিত্যিক গভীরতা এবং শৈল্পিক মানের সঙ্গে এর কোনো তুলনা চলে না। এর কারণে মুসায়লিমা তার অনুসারীদের কাছেও উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠে।

আধুনিক যুগেও কিছু মানুষ কুরআনের মতো কিছু লেখার চেষ্টা করেছে, বিশেষ করে অনলাইনে। কিন্তু তাদের কোনো প্রচেষ্টাই সফল হয়নি। তাদের লেখাগুলো হয় ব্যাকরণগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ, না হয় অর্থহীন এবং কুরআনের অতুলনীয় সাহিত্য ও শৈল্পিক মানের ধারে কাছেও যেতে পারেনি। এই ব্যর্থতাগুলো প্রমাণ করে যে কুরআনের চ্যালেঞ্জ একটি চিরন্তন সত্য, যা কোনো মানবীয় শক্তি মোকাবিলা করতে পারে না।

কুরআন মানবজাতির জীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, তা অন্য কোনো গ্রন্থ আনতে পারেনি। এটি শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান যা সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছে। এই আয়াত দুটি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, কুরআনের অলৌকিকতা কেবল এর ভাষার সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন চ্যালেঞ্জ, যা প্রমাণ করে কুরআন সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এর মতো কিছু রচনা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

ভবিষ্যদ্বাণী-০৮ :  অল্প কিছু দিনের মধ্যে মক্কা বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী

মহান আল্লাহ বলেন-

وَاِنۡ کَادُوۡا لَیَسۡتَفِزُّوۡنَکَ مِنَ الۡاَرۡضِ لِیُخۡرِجُوۡکَ مِنۡہَا وَاِذًا لَّا یَلۡبَثُوۡنَ خِلٰفَکَ اِلَّا قَلِیۡلًا

আর তাদের অবস্থা এমন ছিল যে, তারা তোমাকে জমিন থেকে উৎখাত করে দেবে, যাতে তোমাকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারে এবং তখন তারা তোমার পরে স্বল্প সময়ই টিকে থাকতে পারবে। সুরা ইসরা : ৭৬

এই আয়াতে আল্লাহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা পরবর্তীতে মক্কায় বাস্তবায়িত হয়েছিল:

১. নবি ﷺ-কে মক্কা থেকে উৎখাত করার চেষ্টা:

মক্কার কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাথীদের ওপর চরম অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাসুল ﷺ-কে মক্কা থেকে বিতাড়িত করা। এই আয়াতটি সেই উদ্দেশ্যকেই নির্দেশ করে। যখন কুরাইশদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আল্লাহ রাসুল ﷺ-কে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এটি ছিল এক অর্থে কুরাইশদের সেই উৎখাত করার পরিকল্পনারই একটি সফল পরিণতি, যদিও আল্লাহর নির্দেশে তা সম্পন্ন হয়েছিল।

২. কুরাইশদের স্বল্প সময় টিকে থাকা

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ বলেন, “আর তখন তারা তোমার পরে স্বল্প সময়ই টিকে থাকতে পারবে।” এই অংশটি সরাসরি কুরাইশদের ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে। রাসুল ﷺ মক্কা থেকে হিজরতের পর কুরাইশরা মক্কায় তাদের শাসন ও প্রভাব বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেনি। মাত্র আট বছর পর, ৮ম হিজরিতে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দে) মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়। রাসুল ﷺ-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মক্কায় প্রবেশ করে এবং কুরাইশদের রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের অবসান ঘটায়। মক্কার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে এবং মক্কা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

সুতরাং, এই আয়াতে আল্লাহ যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছিল। এটি ছিল কুরআনের একটি সুস্পষ্ট মু’জিযা (অলৌকিকতা), যা প্রমাণ করে যে কুরআন আল্লাহর বাণী।

ভবিষ্যদ্বাণী-০৯ : মুসলিমদের ক্ষমতায়ন ও পৃথিবীতে খিলাফত প্রতিষ্ঠা

কুরআন মুসলিমদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতায়ন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আল্লাহ তায়া বলেন-

وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَیَسۡتَخۡلِفَنَّہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ کَمَا اسۡتَخۡلَفَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ۪

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে জমিনের খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব) প্রদান করবেন, যেমন তিনি খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব) প্রদান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। সুরা নুর : ৫৫

এ আয়াত মহান আল্লাহ দুটি শর্তে বিনিয়ম খিলাফত প্রদানে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন। যদি কেউ  ঈমান আনে এবং নেক আমল করে তবে তাকে খিলাফত প্রদান করা হবে। মহানবি ﷺ এবং তাঁর সাহাবিরা এ দুটি শর্ত সঠিকভাবে পালন করেছেন এবং আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন।  মহানবি ﷺ এবং তাঁর সাহাবিদের জীবনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল। এটি শুধু একটি প্রতিশ্রুতি ছিল না, বরং ইসলামের ইতিহাসে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন মুসলিমরা মক্কায় চরম দুর্বল ও নিপীড়িত অবস্থায় ছিল। এই ওয়াদা তাদের জন্য ছিল এক বিরাট ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে সুসংবাদ।

১. প্রথম বাস্তবায়িত হয় রাসুলুল্লাহ ﷺ এর যুগে

মক্কার দীর্ঘ ১৩ বছরের চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের পর যখন মুসলমানরা মদিনায় হিজরত করে, তখন আল্লাহ তায়ালার এই ওয়াদা বাস্তবায়িত হওয়া শুরু হয়। মদিনায় রাসুল ﷺ একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাষ্ট্রে মুসলমানরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ক্ষেত্রে ক্ষমতা লাভ করে। এটি ছিল তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে “জমিনের খিলাফত” (প্রতিনিধিত্ব) লাভের প্রথম ধাপ। মদিনা সনদের মাধ্যমে রাসুল ﷺ মদিনার সকল গোত্রের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে তিনি সমগ্র আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা হয়ে ওঠেন। ইসলামের ইতিহাসে এই সময়কাল ছিল মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক উত্থানের স্বর্ণযুগ। মক্কার জীবনে মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশের জন্য নিপীড়িত হতো। কিন্তু মদিনায় তারা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ করে এবং ইসলামি আইন অনুযায়ী জীবনযাপন করার সুযোগ পায়। এটি ছিল আল্লাহর ওয়াদার একটি বাস্তব প্রতিফলন।

এই আয়াতের ওয়াদা অনুযায়ী, মুসলমানরা একের পর এক সামরিক বিজয় লাভ করতে থাকে। বদর, খন্দক, খায়বার ও মক্কা বিজয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোতে মুসলিমরা বিজয়ী হয়। মক্কা বিজয় ছিল এই ওয়াদা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। যে মক্কা থেকে রাসুল ﷺ ও সাহাবিদের বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেই মক্কাই তাদের হাতে বিজিত হয়।

২. দ্বিতীয় বাস্তবায়ন খোলাফায়ে রাশেদীন যুগে

১. আবু বকর সিদ্দীক (রা.) রাসুল ﷺ এর ইন্তেকালের পর যখন অনেক গোত্র বিদ্রোহ ও মুরতাদ হয়ে গেল, তখন আল্লাহ তাঁকে শক্তি দিলেন। রিদ্দাহ যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামকে পুনরায় সুসংহত করলেন। মুসলিম উম্মাহর প্রথম খলিফা হিসেবে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলো।

২. উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) খিলাফতে আয়াতটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হয়। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল এলাকা মুসলিমদের দখলে আসে। ইরাক, শাম, মিশর, ফারস – সব ইসলামি শাসনের অধীনে চলে আসে। রাসুল ﷺ বলেছেন-

“আল্লাহ আমার জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত করে দিলেন, আমি পূর্ব ও পশ্চিম দেখলাম। আমার উম্মতের রাজত্ব সে পর্যন্ত পৌঁছাবে।” সহিহ মুসলিম : ২৮৮৯

৩. উসমান ইবন আফফান (রা.)  শাসনামলে ইসলাম উত্তর আফ্রিকা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান প্রভৃতি এলাকায় পৌঁছায়। সমুদ্রপথে ইসলামি নৌবাহিনী গড়ে ওঠে।

৪. আলি ইবন আবি তালিব (রা.) শাসনামলে অভ্যন্তরীণ ফিতনা ছিল, তবে খিলাফত অব্যাহত ছিল।

ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, এই আয়াত রাসুল ﷺ ও তাঁর সাহাবাদের সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে দুর্বল অবস্থা থেকে শক্তি দিলেন, নির্যাতিত অবস্থা থেকে নিরাপত্তা দিলেন, অজ্ঞাত অবস্থা থেকে নেতৃত্ব দিলেন। এটাই খিলাফতের ওয়াদা। তাফসীর ইবনে কাসীর, সুরা আন-নূর : ৫৫

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, আয়াতটি মুসলিম উম্মাহর জন্য সাধারণ ওয়াদা। তবে প্রথম বাস্তবায়িত হয়েছিল রাসুল ﷺ ও সাহাবাদের যুগে। আজ পর্যন্ত ইসলাম যে সব অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সবই এর আওতায়।

ভবিষ্যদ্বাণী-১০ : আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামিল ধ্বংস হবে

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

تَبَّتْ یَدَاۤ  اَبِیْ  لَهَبٍ وَّ  تَبَّ ؕ﴿۱﴾ مَاۤ  اَغْنٰی عَنْهُ  مَالُہٗ  وَ  مَا كَسَبَ ؕ﴿۲﴾سَیَصْلٰی نَارًا ذَاتَ  لَهَبٍ ۚ﴿ۖ۳﴾وَّ  امْرَاَتُہٗ ؕ حَمَّالَۃَ  الْحَطَبِ ۚ﴿۴﴾ فِیْ  جِیْدِهَا حَبْلٌ مِّنْ مَّسَدٍ ﴿۵﴾

ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত, এবং সে ধ্বংসই হোক। তার ধন-সম্পদ ও অর্জন কিছুই তার উপকারে আসেনি। সে শীঘ্রই প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। আর তার স্ত্রী (ও থাকবে), যে কাঠ বহন করত। তার গলায় থাকবে খেজুরের রেশমের পাকানো দড়ি। সুরা আল-লাহাব : ৩

এই আয়াতে আবু লাহাবের ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে। বাস্তবেও সে তার জীবনের শেষ প্রান্তে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিল।

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এই আয়াত নাজিল হলো: “আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন” এবং তাদের মধ্যে যারা একনিষ্ঠ, তাদেরকেও। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বের হলেন এবং সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন। এরপর তিনি উচ্চস্বরে ডাক দিলেন, “ইয়া সাবাহাহ! (সকাল বেলার বিপদ)।

লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, “কে এই ব্যক্তি?” তখন তারা তার কাছে একত্রিত হলো। তিনি বললেন, “তোমরা কি মনে করো, যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে একদল অশ্বারোহী সৈন্য আসছে, তাহলে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে?” তারা বলল, “আমরা আপনার ওপর কখনো মিথ্যা অভিযোগ দেখিনি।”

তখন তিনি বললেন, “তাহলে আমি তোমাদেরকে এক কঠিন আযাবের সামনে সতর্ককারী হিসেবে এসেছি।”

আবু লাহাব বলল, “তোমার ধ্বংস হোক! এই জন্যই কি তুমি আমাদের একত্রিত করেছ?” এই কথা বলে সে উঠে চলে গেল। তখন নাজিল হলো, “আবু লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।” সহিহ বুখারি : ৪৯৭১

ইবনে ’আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু লাহাব লানাতুল্লাহি ’আলাইহি নবি ﷺ -কে লক্ষ্য করে বললো, সারা দিনের জন্য তোমার অনিষ্ট হোক! (তার এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে) নাজিল হয়Ñ (যার অর্থ) ’’আবু লাহাবের হাত দু’টো ধ্বংস হোক এবং সেও ধ্বংস হোক’’। সুরা লাহাব : ০১। সহিহ বুখারি : ১৩৯৪, ৩৫২৫, ৩৫২৬, ৪৭৭০, ৪৮০১, ৪৯৭১, ৪৯৭২, ৪৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ২০৮, আহমাদ :২৮০২)

এ সুরায় আল্লাহ তায়ালা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামিলের ধ্বংসের যে ভবিষ্যদ্বাণী করে ছিলে তা দ্রুত বাস্তবায়ন হয়ে পৃথিবীতে অনান্য নজির স্থাপন করেছে।

১. আবু লাহাবের পরিণতি :

আবু লাহাব তার কৃতকর্মের ফল এই দুনিয়াতেও পেয়েছিল। বদর যুদ্ধের মাত্র এক সপ্তাহ পর সে এক ধরনের প্লেগ রোগে (আল-আদাসাহ) আক্রান্ত হয়। তার দেহ এমন দুর্গন্ধযুক্ত ও বিকৃত হয়ে যায় যে, তার পরিবারের সদস্যরাও তার কাছে যেতে ভয় পেত। এমনকি মৃত্যুর পরেও তার লাশ তিন দিন ধরে পড়ে ছিল, কারণ কেউই তার কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিল না। অবশেষে তার পুত্ররা দূর থেকে লাঠি দিয়ে ঠেলে তাকে মাটিতে গর্ত করে সেখানে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। (ইবনে কাসীর, তাফসীর; সীরাত ইবনে হিশাম)

২. উম্মে জামীলের পরিণতি :

কোরআনে তার পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, জাহান্নামে তার গলায় খেজুরের আঁশের তৈরি রশি থাকবে। এটি তার দুনিয়ার অপকর্মের সাথে একটি প্রতীকী মিল। দুনিয়াতে সে রাসুল ﷺ-কে কষ্ট দেওয়ার জন্য কাঁটাযুক্ত ডালপালা বহন করত, আর আখেরাতে তাকে জাহান্নামের আগুন বহন করতে হবে। তাদের দুজনের পরিণতিই ছিল অত্যন্ত শোচনীয়, যা থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যারা শত্রুতায় লিপ্ত হয়, তাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

সুরা আল-লাহাব প্রথম থেকেই ঘোষণা করে দিয়েছিল, আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর কোনো কিছুই তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহর এ  ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

ভবিষ্যদ্বাণী-১১: মক্কার কাফিরদের জন্য একটি বিশেষ শাস্তি

কুরআনে মক্কার কাফিরদের জন্য এমন এক শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা পরবর্তীতে বদর যুদ্ধের পরাজয়ের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَکُفَّارُکُمْ خَیْرٌ مِّنْ اُولٰٓئِکُمْ اَمْ لَکُمْ  بَرَآءَۃٌ  فِی الزُّبُرِ ﴿ۚ۴۳﴾ اَمْ  یَقُوْلُوْنَ نَحْنُ جَمِیْعٌ مُّنْتَصِرٌ ﴿۴۴﴾سَیُہْزَمُ الْجَمْعُ وَ  یُوَلُّوْنَ الدُّبُرَ ﴿۴۵﴾

তোমাদের (মক্কার) কাফিররা কি তাদের চেয়ে ভাল? না কি তোমাদের জন্য মুক্তির কোন ঘোষণা রয়েছে (আসমানি) কিতাবসমূহের মধ্যে? নাকি তারা বলে, ‘আমরা সংঘবদ্ধ বিজয়ী দল’? সংঘবদ্ধ দলটি শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে। সুরা কামার : ৪৩-৪৫

ঐতিহাসিকদের মতে এ আয়াত দুটি বদর যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করে নাজিল হয়েছিল। এই আয়াতে কাফিরদের অহংকার এবং তাদের পরাজয় সম্পর্কে বলা হয়েছে। হিজরতের পূর্বে মক্কার মুশরিকরা যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করছিলো, তখন তারা নিজেদেরকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও অজেয় মনে করতো। তাদের ধারণা ছিলো, তাদের বিশাল সম্পদ, সংখ্যাধিক্য ও সামরিক শক্তির কারণে কেউ তাদের পরাজিত করতে পারবে না। তারা নিজেদেরকে ‘সংঘবদ্ধ বিজয়ী দল’ বলে মনে করতো।

এই মানসিকতার জবাবে আল্লাহ তা’আলা এই আয়াতগুলো নাজিল করেন। এর মাধ্যমে মুশরিকদের এই দাম্ভিকতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যে, এই ‘সংঘবদ্ধ দল’ অচিরেই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে।

এই ভবিষ্যদ্বাণীটি বদর যুদ্ধে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়। বদরের প্রান্তরে মুসলিমদের ছোট একটি দল মুশরিকদের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে। মুশরিকদের বড় বড় নেতারা এই যুদ্ধে নিহত হয় এবং বাকিরা ময়দান থেকে পালিয়ে যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবিকে সাহায্য করবেন এবং মিথ্যা ও অন্যায়ের ওপর সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংখ্যায় কম হলেও যদি কোনো দল সত্যের পথে অবিচল থাকে, তবে আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন এবং শেষ পর্যন্ত সত্যেরই বিজয় হয়।

ভবিষ্যদ্বাণী-১২ :  কিয়ামতের পূর্বে সকল ইয়াহূদী ও নাসারারা ঈমান আনবে কিন্তু ঈমান তখন কোন কাজে আসবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنۡ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ اِلَّا لَیُؤۡمِنَنَّ بِہٖ قَبۡلَ مَوۡتِہٖ ۚ  وَیَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یَکُوۡنُ عَلَیۡہِمۡ شَہِیۡدًا ۚ

কিতাবীদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তার মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতি ঈমান আনবে না এবং কিয়ামতের দিনে সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। সুনা নিসা : ১৫৯

এই আয়াতের তাফসিরে আলেমগণ বলেছেন, এখানে “তাঁর প্রতি” বলতে নবি ঈসা (আঃ) কে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহর হিকমতের অংশ হল, কিয়ামতের পূর্বে নবি ঈসা (আঃ) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তখন তিনি খ্রিষ্টানদের মিথ্যা আকীদা ভেঙে দেবেন। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস ঈসা  (আঃ) আল্লাহ পুত্র। তিনি এসে বলবেন, আমি আল্লাহর পুত্র নই, বরং আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। তিনি ইসলাম অনুযায়ী শরীয়ত কায়েম করবেন। সেই সময় জীবিত ইহুদি ও নাসারারা তাঁকে দেখে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, তাঁর আসল অবস্থান কী ছিল। ফলে প্রত্যেকে মৃত্যুর পূর্বে কোনো না কোনোভাবে তাঁর প্রতিটি ঈমান স্বীকার করবে।

কিন্তু এ ঈমান হবে আল্লাহ নিদর্শন প্রকারের আগে। কিয়ামতের চুড়ান্ত নিদর্শন প্রকাশের পর আর ঈমান কবুল করা হবে না। যেমন-

ফির‘আউন মৃত্যুর সময় ঈমান এনেছিল। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির ঈমান গ্রহণ করা আল্লাহর কাছে কবুল করা হয় নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ جٰوَزْنَا بِبَنِیْۤ  اِسْرَآءِیْلَ الْبَحْرَ فَاَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَ جُنُوْدُہٗ  بَغْیًا وَّ عَدْوًا ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ  اَدْرَكَهُ الْغَرَقُ ۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّہٗ  لَاۤ اِلٰهَ  اِلَّا الَّذِیْۤ اٰمَنَتْ بِہٖ بَنُوْۤا اِسْرَآءِیْلَ وَ اَنَا مِنَ الْمُسْلِمِیْنَ ﴿۹۰﴾ آٰلْـٰٔنَ وَ قَدْ عَصَیْتَ قَبْلُ وَ کُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِیْنَ ﴿۹۱﴾

আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির‘আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’। এখন অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানি করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত’। সুরা ইউনুস : ৯০-৯১

অতএব, এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা (আঃ) এর পুনরাবির্ভাব অবধারিত। আর তিনি কিয়ামতের দিনও খ্রিষ্টান-ইহুদিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন যে, তারা তাঁর প্রকৃত শিক্ষা বিকৃত করেছিল। বিধায় তখনকার ঈমান তাদের মুক্তি দেবে না. বরং শুধুই দলীল হিসেবে কিয়ামতের দিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হবে।

ভবিষ্যদ্বাণী-১৩ : আল্লাহ তায়ালা এমন কিছু সৃষ্টি করবেন যা মানুষ জানে না

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّالۡخَیۡلَ وَالۡبِغَالَ وَالۡحَمِیۡرَ لِتَرۡکَبُوۡہَا وَزِیۡنَۃً ؕ وَیَخۡلُقُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ

আর (তিনি সৃষ্টি করেছেন) ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা, তোমাদের আরোহণ ও শোভার জন্য এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন কিছু, যা তোমরা জান না। সুরা নহল : ৮

এই আয়াতটি কেবল অতীত বা বর্তমানের বাহন নিয়েই কথা বলে না, বরং ভবিষ্যৎ আবিষ্কারের এক সুস্পষ্ট পূর্বাভাস বহন করে। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে তৎকালীন আরবের মানুষের পরিচিত স্থলপথের বাহন—ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার কথা উল্লেখ করেছেন, যা তাদের আরোহণের পাশাপাশি সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। কিন্তু এরপরই তিনি এমন একটি বাক্য যুক্ত করেছেন, যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে যায় : “এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন কিছু, যা তোমরা জান না।”

এই বাক্যটি একটি অলৌকিক ইঙ্গিত। কুরআন নাজিলের সময় মানুষ উট, ঘোড়া বা নৌকার বাইরে কোনো দ্রুতগতির যানের কল্পনাও করতে পারত না। তখন মোটরগাড়ি, ট্রেন, উড়োজাহাজ, বা রকেটের ধারণা মানুষের চিন্তারও বাইরে ছিল। অথচ এই আয়াতটি সেই সব আধুনিক যানবাহনের দিকেই ইঙ্গিত করছে, যা পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো মানবজাতির অগ্রগতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি থেকে এটি পরিষ্কার যে, এই সকল আধুনিক আবিষ্কারও মূলত আল্লাহরই সৃষ্টি। কারণ, মানুষ নতুন কোনো মৌলিক পদার্থ তৈরি করতে পারে না। বরং তারা প্রকৃতির মধ্যেই থাকা আল্লাহর সৃষ্ট উপাদান যেমন লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, বা তেল ব্যবহার করে। বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির এই উপাদানগুলোকে নতুন রূপ দিয়েছেন। যেমন, কয়লা বা তেল থেকে তারা বিদ্যুৎ বা জ্বালানি তৈরি করেছেন, যা এসব যানের মূল শক্তি। ঠিক যেভাবে একটি কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন তৈরির জন্য সিলিকন, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধাতু প্রয়োজন হয়, তেমনি আধুনিক সব যানবাহনেরও মূল উপাদানগুলো প্রকৃতি থেকেই আসে, যা স্বয়ং আল্লাহরই সৃষ্টি।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আয়াতে ব্যবহৃত ক্রিয়াপদের পরিবর্তন। ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার ক্ষেত্রে অতীতকালের ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে এই বাহনগুলো ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। আর “এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন কিছু, যা তোমরা জান না” এই অংশে আল্লাহ ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়া ব্যবহার করেছেন, যা ইঙ্গিত করে যে এমন আরও কিছু জিনিস ভবিষ্যতে তৈরি হবে, যা তখন মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই প্রমাণ করে যে কুরআন শুধুমাত্র তৎকালীন সময়ের জ্ঞান নয়, বরং অনাগত দিনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কথাও তুলে ধরে। এই আয়াতটি কুরআনের চিরন্তন সত্যতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ, যা ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে।

মনে রাখবেন : এই আয়াতটি কেবল অতীতের নয়, বরং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে, যা কুরআনের অলৌকিকতার এক বড় প্রমাণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সব জ্ঞান ও সৃষ্টির উৎস একমাত্র আল্লাহ।

 ভবিষ্যদ্বাণী-১৪ : ইয়াজুজ ও মাজুজের আত্মপ্রকাশ করবে

কুরআনে যুল-কারণাইন নামক একজন বিশ্ব বিখ্যাত বাদশাহর নাম উল্লেখ আছে। তিনি পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তসহ সমগ্র পৃথিবী পরিভ্রমণ করেছিলেন। কুরআন মাজীদের সুরা কাহাফে তাঁর ভ্রমণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তাঁর ভ্রমণের কাহিনীর এক পর্যায়ে ইয়াজুজ-মা’জুযের বিবরণ এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ثُمَّ  اَتْبَعَ  سَبَبًا ﴿۹۲﴾ حَتّٰۤی  اِذَا بَلَغَ  بَیْنَ السَّدَّیْنِ وَجَدَ مِنْ دُوْنِهِمَا قَوْمًا ۙ لَّا یَكَادُوْنَ یَفْقَهُوْنَ قَوْلًا ﴿۹۳﴾ قَالُوْا یٰذَاالْقَرْنَیْنِ  اِنَّ یَاْجُوْجَ وَ مَاْجُوْجَ مُفْسِدُوْنَ فِی الْاَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلٰۤی اَنْ  تَجْعَلَ بَیْنَنَا وَ  بَیْنَهُمْ  سَدًّا ﴿۹۴﴾  قَالَ مَا مَكَنِّیْ فِیْهِ رَبِّیْ خَیْرٌ فَاَعِیْنُوْنِیْ بِقُوَّۃٍ  اَجْعَلْ بَیْنَکُمْ وَ بَیْنَهُمْ  رَدْمًا ﴿ۙ۹۵﴾   اٰتُوْنِیْ زُبَرَ الْحَدِیْدِ ؕ حَتّٰۤی  اِذَا سَاوٰی بَیْنَ الصَّدَفَیْنِ قَالَ انْفُخُوْا ؕ حَتّٰۤی  اِذَا جَعَلَہٗ  نَارًا ۙ قَالَ اٰتُوْنِیْۤ  اُفْرِغْ عَلَیْهِ قِطْرًا ﴿ؕ۹۶﴾   فَمَا اسْطَاعُوْۤا اَنْ یَّظْهَرُوْهُ  وَ مَا اسْتَطَاعُوْا  لَہٗ  نَقْبًا ﴿۹۷﴾   قَالَ هٰذَا رَحْمَۃٌ مِّنْ رَّبِّیْ ۚ فَاِذَا جَآءَ وَعْدُ رَبِّیْ جَعَلَہٗ  دَكَآءَ ۚ وَ كَانَ وَعْدُ رَبِّیْ  حَقًّا  ﴿ؕ۹۸﴾  وَ تَرَکْنَا بَعْضَهُمْ یَوْمَئِذٍ یَّمُوْجُ فِیْ بَعْضٍ وَّ نُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَجَمَعْنٰهُمْ جَمْعًا ﴿ۙ۹۹﴾

অর্থ : তারপর সে (যুল-কারণাইন) একটি পথ অনুসরণ করল। অবশেষে, যখন সে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছল, তখন সে সেখানে এমন এক সম্প্রদায়কে পেল, যারা কোনো কথা বুঝতে সক্ষম ছিল না। তারা বলল, “হে যুল-কারণাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। অতএব, আমরা কি আপনাকে কোনো খরচ দেব, যাতে আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেন?” সে বলল, “আমার পালনকর্তা যে সামর্থ্য আমাকে দিয়েছেন, তা অনেক উত্তম। অতএব তোমরা আমাকে শারীরিক শক্তি দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যস্থলে একটি মজবুত বাধা নির্মাণ করে দিব।” “তোমরা আমার নিকট লোহার পাত এনে দাও।” তারপর যখন সে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা পূর্ণ করল, তখন বলল, “তোমরা জোরে ফু দাও।” এমনকি যখন সে তা (লোহা) আগুনের মতো লাল করে ফেলল, তখন বলল, “তোমরা আমার নিকট গলিত তামা আনো, আমি তা এর উপর ঢেলে দেই।” ফলে ইয়াজুজ ও মাজুজ তাতে আর আরোহন করতে পারল না এবং তা ভেদও করতে পারল না। সে বলল, “এটা আমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে এক অনুগ্রহ। অতঃপর যখন আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি আসবে, তখন তিনি এটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন। আর আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য।” আর সেদিন আমি তাদেরকে একে অপরের মধ্যে ঢেউ তুলতে ছেড়ে দেব; এবং শিংয়ে ফুৎকার দেয়া হবে, ফলে আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করব। সুরা কাহাফ : ৯২-৯৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حَتّٰۤی  اِذَا  فُتِحَتْ یَاْجُوْجُ وَ مَاْجُوْجُ وَ هُمْ  مِّنْ  کُلِّ  حَدَبٍ  یَّنْسِلُوْنَ ﴿۹۶﴾  وَ اقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَاِذَا هِیَ شَاخِصَۃٌ  اَبْصَارُ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا ؕ یٰوَیْلَنَا قَدْ کُنَّا فِیْ غَفْلَۃٍ  مِّنْ  هٰذَا بَلْ کُنَّا ظٰلِمِیْنَ ﴿۹۷﴾

অবশেষে যখন ইয়া’জূজ ও মা’জূজকে মুক্তি দেয়া হবে, আর তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি হতে ছুটে আসবে। আর সত্য ওয়াদার সময় নিকটে আসলে হঠাৎ কাফিরদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। তারা বলবে, ‘হায়, আমাদের দুর্ভোগ! আমরা তো এ বিষয়ে উদাসীন ছিলাম বরং আমরা ছিলাম যালিম’। সুরা আম্বিয়া : ৯৬-৯৭

এই আয়াতগুলো কিয়ামতের পূর্বে ইয়াজুজ ও মাজুজের আবির্ভাব এবং তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের বর্ণনা দেয়। আল্লাহ তায়ালা জানাচ্ছেন যে, যখন ইয়াজুজ ও মাজুজের বাঁধ মুক্ত করা হবে, তারা দ্রুত পৃথিবীর বিভিন্ন উঁচু স্থান থেকে ছড়িয়ে পড়বে, যা বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। এ সময় কিয়ামতের সত্য প্রতিশ্রুতি (ওয়াদা) নিকটবর্তী হবে। কাফিররা এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাবে এবং তাদের চোখ স্থির হয়ে যাবে। তারা আফসোস করে বলবে, তারা এই দিন সম্পর্কে উদাসীন ছিল এবং নিজেদের যালিম হিসেবে স্বীকার করবে।

ইয়াজুজ ও মাজুজদের সম্পর্কে সহিহ হাদিসের কিছু বর্ণনা :

১. ইয়া’জূজ ও মাজূজের প্রাচীর দ্বারা আটকিয়ে রাখা হয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেন, ইয়া’জূজ ও মা’জূজের প্রাচীরে আল্লাহ এ পরিমাণ ছিদ্র করে দিয়েছেন। এই বলে, তিনি তাঁর হাতে নব্বই সংখ্যার আকৃতির মত করে দেখালেন। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৭, ৭১৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৮৮১, আহমাদ : ৮৫০৯

যায়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) হতে বর্ণিত। একবার নবি ﷺ ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় তাঁর নিকট আসলেন এবং বলতে লাগলেন, লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আরবের লোকেদের জন্য সেই অনিষ্টের কারণে ধ্বংস অনিবার্য যা নিকটবর্তী হয়েছে। আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর এ পরিমাণ খুলে গেছে। এ কথা বলার সময় তিনি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলিল অগ্রভাগকে তার সঙ্গের শাহাদাত আঙ্গুলির অগ্রভাগের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাকার করে ছিদ্রের পরিমাণ দেখান। যায়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে পুণ্যবান লোকজন থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হাঁ যখন পাপকাজ অতি মাত্রায় বেড়ে যাবে। সহহিহি বুখারি : ৩৩৪৬, ৩৫৯৮, ৭০৫৯, ৭১৩৫, সহিহ মুসলিম : ২৮৮০, সুনানে তিরমিজি : ২১৮৭, আহমাদ ২৬৮৬৭, ২৬৮৭০, , ২৭৪৮৬,,  সহিহাহ ৯৮৭।

২. ইয়াজূজ-মাজূজের আত্মপ্রকাশ

আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, ইয়াজূজ-মাজূজকে ছেড়ে দেয়া হবে, অতঃপর তারা বের হবে, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

’’তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি থেকে ছুটে আসবে। সুরা আম্বিয়া : ৯৬ এবং তারা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। মুসলিমগণ তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে এবং অবশিষ্ট মুসলিমরা তাদের শহরে ও দূর্গে আশ্রয় নিবে। সেখানে তারা তাদের গবাদি পশুও সাথে করে নিয়ে যাবে। ইয়াজূজ ও মাজূজের অবস্থা এই হবে যে, তাদের লোকগুলো একটি নহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে এবং তার পানি পান করে নিঃশেষ করে ফেলবে, এক ফোঁটা পানিও অবশিষ্ট থাকবে না। এরপর এদের দলের অবশিষ্টরা তাদের নুসরণ করবে।

তখন তাদের মধ্যে কেউ বলবে, এখানে হয়তো কখনো পানি ছিলো। পৃথিবীতে তারা আধিপত্য বিস্তার করবে। অতঃপর তাদের কেউ বলবে, আমরা তো পৃথিবীবাসীদের থেকে অবসর হয়েছি। এবার আমরা আসমানবাসীদের বিরুদ্ধে লড়বো। শেষে এদের কেউ আকাশের দিকে বর্শা নিক্ষেপ করবে। তা রক্তে রঞ্জিত হয়ে ফিরে আসবে। তখন তারা বলবে, আমরা আসমানবাসীদেরও হত্যা করেছি। তাদের এ অবস্থায় থাকতে আল্লাহ তায়ালা টিড্ডি বাহিনী পাঠাবেন এবং সেগুলো ঘাড়ে প্রবেশ করার ফলে এরা সকলে ধ্বংস হয়ে একে অপরের উপর পড়ে মরে থাকবে। মুসলিমগণ সকালবেলা উঠে তাদের বীভৎস চীৎকার শুনতে না পেয়ে বলবে, এমন কে আছে যে তার নিজের জীবনকে বিক্রয় করবে এবং ইয়াজূজ-মাজূজেরা কী করছে তা দেখে আসবে? তখন তাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি ইয়াজূজ-মাজূজ কর্তৃক নিহত হওয়ার পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে বের হয়ে এসে এদেরকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে মুসলিমদের ডেকে বলবে, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো, তোমাদের শত্রুরা ধ্বংস হয়েছে। লোকজন (তার ডাক শুনে) বের হয়ে আসবে এবং তাদের গবাদি পশু চারণভূমিতে ছেড়ে দিবে। সেগুলোর চারণভূমিতে ইয়াজূজ-মাজূজের মাংস ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। ওরা তাদের মাংস খেয়ে বেশ মোটাতাজা হবে, যেমন কখনো ঘাস-পাতা খেয়ে মোটা তাজা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৭৯, আহমাদ : ১১৩২৩, সহিহাহ : ১৭৯৩।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় ইয়াজূজ-মাজূজ প্রতিদিন সুড়ঙ্গপথ খনন করতে থাকে। এমনকি যখন তারা সূর্যের আলোকরশ্মি দেখার মত অবস্থায় পৌঁছে যায় তখন তাদের নেতা বলে, তোমরা ফিরে চলো, আগামী কাল এসে আমরা খনন কাজ শেষ করবো। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা (রাতের মধ্যে) সেই প্রাচীরকে আগের চেয়ে মযবুত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। যখন তাদের আবির্ভাবের সময় হবে এবং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মানবকুলের মধ্যে পাঠাতে চাইবেন, তখন তারা খনন কাজ করতে থাকবে। শেষে যখন তারা সূর্যরশ্মি দেখার মত অবস্থায় পৌঁছবে তখন তাদের নেতা বলবে, এবার ফিরে চলো, ইনশাআল্লাহ আগামী কাল অবশিষ্ট খনন কাজ সম্পন্ন করবো। তারা ইনশাআল্লাহ শব্দ ব্যবহার করবে। সেদিন তারা ফিরে যাবে এবং প্রাচীর তাদের রেখে যাওয়া ক্ষীণ অবস্থায় থেকে যাবে। এ অবস্থায় তারা খননকাজ শেষ করে লোকালয়ে বের হয়ে আসবে এবং সমুদ্রের পানি পান করে শেষ করবে। মানুষ তাদের ভয়ে পালিয়ে দুর্গের মধ্যে আশ্রয় নিবে। তারা আকাশপানে তাদের তীর নিক্ষেপ করবে। রক্তে রঞ্জিত হয়ে তা তাদের দিকে ফিরে আসবে। তখন তারা বলবে, আমরা পৃথিবীবাসীদের চরমভাবে পরাভূত করেছি এবং আসমানবাসীদের উপরও বিজয়ী হয়েছি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ঘাড়ে এক ধরনের কীট সৃষ্টি করবেন। কীটগুলো তাদের হত্যা করবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, সেই মহান সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! ভূপৃষ্ঠের গবাদি পশুগুলো সেগুলোর মাংস খেয়ে মোটাতাজা হয়ে মাংসল হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৮০, সুনানে তিরমিজি : ৩১৫৩, সহিহাহ : ১৭৩৫৮ হাদিসের মান সহিহ

নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুসলিমগণ অচিরেই ইয়াজূজ ও মাজূজের তীর-ধনুক, বর্শাফলক এবং ঢালসমূহ সাত বছর ধরে জ্বালানি কাঠরূপে ভস্মীভূত করবে। সহিহ মুসলিম : ২৯৩৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৭৬, সুনানে তিরমিজি : ২২৪০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৩২১, সহিহাহ : ১৯৪০।

যায়নাব বিনতে জাহ্শ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

একদা নবি ﷺতাঁর নিকটে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি বলছিলেন, (لَا إلَهَ إلَا اللَّهُ)। আরবদের জন্য ধ্বংস! একটি অকল্যাণ তাদের অতি নিকটবর্তী হয়ে গেছে। আজ ইয়াজুজ-মা’জুযের প্রাচীর এই পরিমাণ খুলে দেয়া হয়েছে। এ কথা বলে তিনি হাতের বৃদ্ধাঙ্গল ও তার পার্শ্বের আঙ্গুল দিয়ে বৃত্ত তৈরী করে দেখালেন। যায়নাব বিনতে জাহ্শ (রা.) বলেন- আমি রাসুল ﷺকে বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মাঝে সৎ লোক থাকতেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো? নবি ﷺবললেন, হ্যাঁ, যখন পাপাচার বেড়ে যাবে’’। সহিহ বুখারি : ৭০৫৯, সহিহ মুসলিম : ২৮৮০

৩. ঈসা (আঃ) ইয়াজুজ-মা’জুজদের ধ্বংসের পর পৃথিবীর সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসবে।

নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

অতঃপর (দাজ্জালকে হত্যার পর) ঈসা (আঃ) এমন সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আঃ) তাদের কাছে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তায়ালা ঈসা (আঃ) এর প্রতি এ মর্মে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটেয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজ কাওমকে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি “বুহাইরায়ে তাবরিয়া”র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?

তারা আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দিনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আজাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে জমিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যথায় তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ’ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবে।

এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে জমিন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় জমিনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে জমিন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নিচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বারাকাত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভি এক গোত্রীয় মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরি এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবজ করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সহিহ মুসলিম : ২৯৩৭, সুনানে আবু দাউদ : ৪৩২৪, সুনানে তিরমিজি : ২২৩৪, সুনানে ইবন মাজাহ : ৪০৭৫। সহিহ মুসলিম থেকে হাদিসটি প্রাসঙ্গিক অংশ বিশেষ।

৪. ঈসা (আঃ) ইয়াজুজ-মাজুজকে ধ্বংস করবেন

নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

অতঃপর (দাজ্জালকে হত্যার পর) ঈসা (আঃ) এমন সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আঃ) তাদের কাছে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তায়ালা ঈসা (আঃ) এর প্রতি এ মর্মে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটেয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজ কাওমকে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি “বুহাইরায়ে তাবরিয়া”র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?

তারা আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দিনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আজাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে জমিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যথায় তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ’ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবে।

এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে জমিন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় জমিনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে জমিন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নিচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বারাকাত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভি গাভি মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরি এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সহিহ মুসলিম : ২৯৩৭, সুনানে আবু দাউদ : ৪৩২৪, সুনানে তিরমিজি : ২২৩৪, সুনানে ইবন মাজাহ : ৪০৭৫। সহিহ মুসলিম থেকে হাদিসটি প্রাসঙ্গিক অংশ বিশেষ।

৫. ইয়াজুজ ও মাজুজদের গণনা ধরে মুসলিমদের জান্নাত প্রদান করা হবে।

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাজির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হজ : ২)। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে। অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। [আবু সাঈদ  (রা.) বলেন] আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৮, ৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩।

৬. ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে একটি ভুল ধারন

অনেকে ধারনা করে থাকে যে, তারা শুধু আদম (আঃ)-এর বংশধর এবং আদম (আঃ)-এর স্বপ্নদোষ থেকে সৃষ্ট। কুরআন ও সহিহ হাদিসের কোথাও আদম (আঃ)-এর স্বপ্নদোষ থেকে ইয়াজুজ-মাজুজের সৃষ্টির বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এ ধরনের বর্ণনাগুলো সাধারণত ইসরাঈলিয়াত বা লোককথার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা নির্ভরযোগ্য ইসলামি উৎস দ্বারা সমর্থিত নয়। তাই এ মতটি অধিকাংশ ইসলামি পণ্ডিত ও আলেমদের দ্বারা সমর্থিত নয়। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করেন এবং মানবজাতির ধারাবাহিকতা আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর মাধ্যমেই চলে আসছে।

কুরআনের গাণিতিক মুজিযা

কুরআনের গাণিতিক মুজিযা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আল-কুরআন আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত সর্বশেষ ও চূড়ান্ত ওহিভিত্তিক গ্রন্থ, যা কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়েত, নূর ও রহমত। কুরআনের মুজিযা বহুমাত্রিক—এর ভাষাগত অলংকার, অর্থগত গভীরতা, বিধানগত ভারসাম্য, ভবিষ্যদ্বাণীর যথার্থতা এবং সর্বোপরি এর অলৌকিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা। এই বহুমাত্রিক মুজিযারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গাণিতিক মুজিযা।

গাণিতিক মুজিযা বলতে কুরআনের আয়াত, শব্দ, অক্ষর, সংখ্যা ও গঠনগত বিন্যাসে এমন নিখুঁত সংখ্যাগত সামঞ্জস্যকে বোঝানো হয়, যা মানুষের পক্ষে দীর্ঘ ২৩ বছরে, বিচ্ছিন্ন প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ একটি গ্রন্থে পরিকল্পিতভাবে রচনা করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষত আধুনিক যুগে পরিসংখ্যান, গণিত ও কম্পিউটার বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই দিকটি আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অধ্যায়ে কুরআনের গাণিতিক সামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করা হবে, অন্যদিকে সহজ ভাষায় এর তাৎপর্য তুলে ধরা হবে, যাতে সাধারণ পাঠক ও গবেষক—উভয়েই উপকৃত হতে পারেন।

মুজিযার সংজ্ঞা ও কুরআনের অলৌকিকতা

ইসলামি পরিভাষায় মুজিযা হলো এমন অতিপ্রাকৃত নিদর্শন, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী–রাসূলদের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ প্রকাশ করেন এবং যা মানুষের সাধ্যাতীত। কুরআন নিজেই রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী মুজিযা। আল্লাহ তায়ালা বলন-

اَوَلَمۡ یَکۡفِہِمۡ اَنَّاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ یُتۡلٰی عَلَیۡہِمۡ ؕ  اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَرَحۡمَۃً وَّذِکۡرٰی لِقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ 

এটা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের নিকট তিলাওয়াত করা হয়? নিশ্চয় এর মধ্যে রহমত ও উপদেশ রয়েছে সেই কওমের জন্য, যারা ঈমান আনে।

১. কুরআনের অলৌকিকতার ধরন :

কুরআনের অলৌকিকতা মূলত কয়েকটি স্তরে প্রকাশিত:

  • ভাষাগত ও সাহিত্যিক মুজিযা
  • অর্থগত ও বিষয়গত মুজিযা
  • আইনগত ও সামাজিক ভারসাম্য
  • বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত
  • ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যদ্বাণীমূলক নিদর্শন
  • গাণিতিক ও সংখ্যাগত মুজিযা

গাণিতিক মুজিযা বলতে কুরআনের শব্দসংখ্যা, অক্ষরসংখ্যা, আয়াতসংখ্যা, সূরাসংখ্যা, পুনরাবৃত্ত শব্দ ও বিপরীতার্থক শব্দের মধ্যে বিদ্যমান সংখ্যাগত সামঞ্জস্যকে বোঝায়। গাণিতিক মুজিযা কুরআনের অন্যান্য মুজিযাকে প্রতিস্থাপন করে না বরং তা সেগুলোর সত্যতাকে সমর্থনকারী একটি সহায়ক প্রমাণ।

কুরআনের ১৯ সংখ্যার বিশেষ অলৌকিত্ব :

কুরআনের গাণিতিক অলৌকিকত্বের আলোচনা শুরু হয় ১৯ সংখ্যাটি দিয়ে। এই দাবি অনুসারে, কুরআনের সুরা, আয়াত, শব্দ এবং অক্ষরের সংখ্যা প্রায়শই ১৯-এর গুণিতক হয়। আল্লাহ বলেন-

عَلَیۡہَا تِسۡعَۃَ عَشَرَ ؕ

উহার তত্ত্বাবধানে রয়েছে উনিশ জন প্রহরী। সূরা আল-মুদ্দাসসির : ৩০

 নীচে এ সম্পর্কে কিছু জনপ্রিয় উদাহরণ দেওয়া হলো, যা মুসলিমগণ প্রায়শই উল্লেখ করেন।এগুলো সহজে যাচাই করা যায়:

  •  বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম-এর অক্ষর সংখ্যা: ঠিক ১৯টি।
  • কুরআনের মোট সুরা ১১৪ = ১৯ X ৬।
  •  বিসমিল্লাহ কুরআনে মোট ১১৪ বার উল্লেখিত (সুরা তাওবা ব্যতীত ১১৩ সুরায় একবার করে,  এবং সুরা নমল-এ দুবার) = ১৯ X ৬।
  •  কুরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াত (সুরা আলাক ৯৬ :১-৫) : ১৯টি শব্দ (কিছু গণনায়)।
  •  আল্লাহ শব্দটি কুরআনে ২৬৯৮ বার = ১৯ X ১৪২।
  •  রাহমান ৫৭ বার = ১৯ X ৩; “রাহিম” ১১৪ বার = ১৯ X ৬।
  • মুকাত্তাত (অসংযুক্ত অক্ষর) সংক্রান্ত উদাহরণ
  • কুরআনের ২৯টি সুরা অসংযুক্ত অক্ষর (যেমন আলিফ-লাম-মিম) দিয়ে শুরু। এগুলোর সংখ্যা প্রায়শই ১৯-এর গুণিতক:
  •  সুরা কাফ (৫০)-এ “কাফ” অক্ষর: ৫৭ বার = ১৯ X ৩।
  • সুরা নুন (৬৮)-এ “নুন” অক্ষর: ১৩৩ বার = ১৯ X ৭।
  • সুরা সাদ (৭, ১৯, ৩৮)-এ সাদ অক্ষর মোট: ১৫২ বার = ১৯ X ৮।
  •  সুরা ইয়াসিনে “ইয়া” এবং “সিন” সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন গণনায় ১৯-এর গুণিতক।
  • অন্যান্য জটিল উদাহরণ
  • কুরআনের মোট আয়াত (সাধারণত ৬৩৪৬) : ১৯ X ৩৩৪ (কিছু গণনায়; তবে আয়াত সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে)।
  • সুরা ৯৬-এর অক্ষর সংখ্যা : ৩০৪ = ১৯ X ১৬ (কিছু গণনায়)।

নোট : অনেক মুসলিম পণ্ডিত বলেন, কুরআনের প্রকৃত মুজিযা তার ভাষা, বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত এবং নৈতিক নির্দেশনায়, সংখ্যাতত্ত্বে নয়। কুরআন নিজেই সংখ্যাগত মুজিযার দাবি করে না।

কুরআনের ৭ সংখ্যার গাণিতিক অলৌকিকত্ব

কুরআনের গাণিতিক অলৌকিকত্বের আলোচনায় ১৯-এর পর সবচেয়ে জনপ্রিয় সংখ্যা হলো ৭। এই সংখ্যাটি সৃষ্টির সাথে গভীরভাবে যুক্ত যেমন ৭ আসমান (আকাশ), পৃথিবী সৃষ্টি ৬ দিনে এবং ৭ম দিনে আরশে অধিষ্ঠিত হওয়া, জাহান্নামের ৭ দরজা ইত্যাদি। মুসলিম গবেষকরা (যেমন আব্দুল দায়েম আল-কাহিল) দাবি করেন যে কুরআনে ৭-এর গুণিতক বা প্যাটার্ন অসংখ্য, যা ডিভাইন ডিজাইনের প্রমাণ। নিচে কিছু জনপ্রিয় উদাহরণ দেওয়া হলো, যা সহজে যাচাইযোগ্য। জনপ্রিয় উদাহরণসমূহ

সাত আসমান: কুরআনে “সাত আসমান” (সাবআ সামাওয়াত) বাক্যাংশটি ঠিক ৭ বার উল্লেখিত।

জাহান্নাম: “জাহান্নাম” শব্দটি কুরআনে ৭৭ বার (৭ X ১১) উল্লেখিত। জাহান্নামের ৭ দরজার সাথে মিল।

সুরা ফাতিহা: কুরআনের প্রথম সুরা, যাকে “সাবআল মাথানি” (সাতটি পুনরাবৃত্ত আয়াত) বলা হয়—ঠিক ৭ আয়াত। এতে “আল্লাহ” নামের অক্ষর তিনটি মোট ৪৯ টি (৭ X ৭)।

আখিরাত: “আখিরাত” (পরকাল) শব্দটি ৭০ বার (৭ X ১০) উল্লেখিত।

সৃষ্টি সম্পর্কিত: “সাত আসমানের সৃষ্টি” সংক্রান্ত বর্ণনা ৭ বার।

এছাড়া আরও দাবি: কুরআনের কিছু সুরায় শব্দ বা অক্ষরের সংখ্যা ৭-এর গুণিতক, যেমন কিছু গবেষকের মতে মক্কী-মাদানী সুরার বিভাজন বা অন্যান্য প্যাটার্ন।

চিত্র : উপরের ডায়াগ্রামে ৭ সংখ্যার গাণিতিক অলৌকিকত দেখান হয়েছে।

সমালোচনা : যদিও এই উদাহরণগুলো বিশ্বাসীদের কাছে চমকপ্রদ কিন্তু গণনা ক্ষেত্রে সিলেকটিভ অর্থাৎ শুধু যেগুলো মিলে যায় সেগুলো নেওয়া হয়েছে, অন্যগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনে “সাত পৃথিবী” (৬৫:১২) উল্লেখ আছে, কিন্তু “সাত পৃথিবী” বাক্যাংশ ৭ বার নয়। আবার গণনা পতি ভিন্ন হলে ফলাফল বদলে যায়

এই দাবিগুলো বিশ্বাসীদের জন্য ঈমান বাড়ানোর উপাদান, কিন্তু স্কেপটিকদের কাছে ডেটা সিলেকশনের উদাহরণ। যাচাই করতে নিজে কুরআনের টেক্সট কাউন্ট করা যায়।

কুরআনে বিপরীত শব্দের ভারসাম্য :

কুরআনের আরেকটি আশ্চর্যজনক গাণিতিক মুজিযা হলো বিপরীতার্থক শব্দগুলোর সমান সংখ্যায় উল্লেখ। এটি কুরআনের ভারসাম্য এবং ন্যায়বিচারের থিমকে প্রতিফলিত করে।

কুরআন প্রমাণ করে যে, ইহা কেবল এলোমেলো কিছু বাণীর সংকলন নয়, বরং এর প্রতিটি শব্দ এক মহাজাগতিক গণিতের সূত্রে গাঁথা যা কুরআনের বিষয়গত ভারসাম্যকে তুলে ধরে।  নিচে এ সম্পর্কিত কিছু উদাহরন তুলে ধরা হলো-

ক্রমশব্দ (আরবি ও বাংলা)সংখ্যাবিপরীত বা সম্পর্কিত শব্দসংখ্যা
الدُّنْيَا (আদ-দুনইয়া)১১৫الْآخِرَةُ (আল-আখিরাত)১১৫
الْحَيَاةُ (আল-হায়াত)১৪৫الْمَوْتُ (আল-মাউত)১৪৫
الْمَلَائِكَةُ (আল-মালাইকা)৮৮الشَّيَاطِينُ (আশ-শায়াতিন)৮৮
الرَّجُلُ (আর-রাজুল/পুরুষ)২৪الْمَرْأَةُ (আল-মারআ/নারী)২৪
الْإِيمَانُ (আল-ইমান)২৫الْكُفْرُ (আল-কুফর)২৫
النَّفْعُ (আন-নাফ‘/কল্যাণ)৫০الضَّرُّ (আদ-দারর/অকল্যাণ)৫০
الْأَجْرُ (আল-আজর/পুরস্কার)১০৮الْعِقَابُ (আল-ইকাব/শাস্তি)১০৮
الصَّالِحَاتُ(আস-সালিহাত/নেক কাজ)১৬৭السَّيِّئَاتُ (আস-সাইয়িআত/পাপ)১৬৭
الزَّكَاةُ (আয-যাকাত)৩২الْبَرَكَةُ (আল-বারাকাহ/বরকত)৩২
১০إِبْلِيسُ (ইবলিস)১১الْاِسْتِعَاذَةُ (আল-ইস্তিআজাহ/আশ্রয়)১১
১১الشِّدَّةُ (আশ-শিদ্দাহ/কষ্ট)১১৪الصَّبْرُ (আস-সাবর/ধৈর্য)১১৪
১২الْمَحَبَّةُ (আল-মাহাব্বাহ/ভালোবাসা)৮৩الطَّاعَةُ (আত-তাআহ/আনুগত্য)৮৩
১৩الْحَرُّ (আল-হারর/গরম)الْبَرْدُ (আল-বারদ/ঠান্ডা)
১৪الْإِنْسَانُ (আল-ইনসান/মানুষ)৬৫الرَّسُولُ (আর-রাসুল)৬৫
১৫الْجَهَنَّمُ (জাহান্নাম)৭৭الْجَنَّةُ (জান্নাহ)৭৭

কেন এই ভারসাম্য অলৌকিক?

সমন্বয়: কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে। কোনো মানুষের পক্ষে ২৩ বছর ধরে মুখে বলা বাণীর মধ্যে এই পরিমাণ শব্দের হিসাব রাখা অসম্ভব, বিশেষ করে যখন সেই যুগে কোনো ক্যালকুলেটর বা ডেটাবেস ছিল না।

সুরক্ষা: এই গাণিতিক ভারসাম্য প্রমাণ করে যে, কুরআনের ভেতর থেকে একটি শব্দও সরিয়ে ফেলা বা যোগ করা সম্ভব নয়। কারণ একটি শব্দ পরিবর্তন করলেই এই বিশাল গাণিতিক চেইনটি ভেঙে পড়বে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সময়ের একক

কুরআন যখন নাযিল হয়, তখন মানুষের কাছে সৌরবর্ষ বা চন্দ্রবর্ষের নিখুঁত গাণিতিক হিসাব ছিল না। অথচ কুরআনের শব্দসংখ্যা আধুনিক ক্যালেন্ডারের সাথে হুবহু মিলে যায়।

  • দিন (উধু): ‘ইয়াওম’ (একবচন) শব্দটি কুরআনে ঠিক ৩৬৫ বার এসেছে। আমরা জানি পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে ৩৬৫ দিন সময় নেয়।
  • মাস : ‘শাহর’ শব্দটি এসেছে ১২ বার। এক বছরে মাসের সংখ্যাও ১২টি।
  • চাঁদ ও সূর্য: ‘চাঁদ’ (কামার) এবং ‘সূর্য’ (শামস) শব্দ দুটির ব্যবহার এবং তাদের কক্ষপথের বর্ণনা এমন এক অনুপাতে দেওয়া হয়েছে যা তাদের আপেক্ষিক গতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জলভাগ ও স্থলভাগের অনুপাত

আধুনিক উপগ্রহ প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা জানি যে পৃথিবীর উপরিভাগের প্রায় ৭১.১১% পানি এবং ২৮.৮৯% স্থলভাগ।

কুরআনে এই অনুপাতটি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে আগেভাগেই বলে দেওয়া হয়েছে:

  • বাহর (সমুদ্র/পানি) শব্দটি এসেছে: ৩২ বার।
  • বার (স্থলভাগ) শব্দটি এসেছে: ১৩ বার।
  • মোট ব্যবহার: ৩২ + ১৩ = ৪৫ বার।

এখন যদি আমরা গাণিতিক শতাংশ বের করি:

জলভাগ = (৩২÷৪৫)X১০০=৭১.১১%

স্থলভাগ = (১৩÷৪৫)X১০০=২৮.৮৯%

১৪০০ বছর আগের কোনো মানুষের পক্ষে পৃথিবীর জল ও স্থলের এই নিখুঁত অনুপাত বের করা অসম্ভব ছিল।

৫. গোল্ডেন রেশিও (Φ = ১.৬১৮) এবং পবিত্র মক্কা

গোল্ডেন রেশিও বা 1.618 হলো প্রকৃতির এমন এক অনুপাত যা গ্যালাক্সির গঠন থেকে শুরু করে মানুষের ডিএনএ সবকিছুর সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি। কুরআনে এর প্রয়োগ বিস্ময়কর:

  • মক্কার অবস্থান: উত্তর মেরু থেকে মক্কার দূরত্ব এবং দক্ষিণ মেরু থেকে মক্কার দূরত্বের অনুপাত করলে ১.৬১৮ পাওয়া যায়। এটি প্রমাণ করে যে মক্কা পৃথিবীর ‘গোল্ডেন রেশিও পয়েন্ট’-এ অবস্থিত।
  • কুরআনের আয়াত (৩:৯৬):  সূরা আল-ইমরানের ৯৬ নম্বর আয়াতে মক্কার (বক্কাহ) কথা বলা হয়েছে। পুরো আয়াতের মোট ৪৭টি অক্ষরের মধ্যে ‘মক্কা’ শব্দটি যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান পর্যন্ত অক্ষরের সংখ্যা ২৯। এখন ২৯ কে ৪৭ দিয়ে ভাগ করলে (৪৭ ÷ ২৯) ফলাফল আসে ১.৬১৮, যা গোল্ডেন রেশিও।

জীববিজ্ঞানের মুজিজা : মৌমাছি ও পিঁপড়া

৬. জীববিজ্ঞানের মুজিজা: মৌমাছি ও পিঁপড়া

সূরা আন-নাহল (মৌমাছি) – সূরা নং ১৬:

ক্রোমোজোম সংখ্যা: পুরুষ মৌমাছির (Drone) ক্রোমোজোম সংখ্যা ১৬টি। আর স্ত্রী মৌমাছির (Queen/Worker) ক্রোমোজোম সংখ্যা ৩২টি (১৬ জোড়া)। বিস্ময়করভাবে মৌমাছির নামে থাকা সূরার নম্বরও ১৬।

শব্দ সংখ্যা: সূরা আন-নাহল এর ৬৮ নম্বর আয়াতে মৌমাছিকে ঘর বানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতে ব্যবহৃত শব্দগুলোর অক্ষর সংখ্যা এবং সূরার বিন্যাস ১৬-এর গুণিতক হিসেবে কাজ করে।

সূরা আন-নামল (পিঁপড়া) – সূরা নং ২৭:

পিঁপড়ার যোগাযোগ: আধুনিক বিজ্ঞান বলছে পিঁপড়ারা রাসায়নিক সংকেতের (Pheromones) মাধ্যমে অত্যন্ত জটিল যোগাযোগ রক্ষা করে। সূরা আন-নামল-এ (২৭:১৮) একটি নারী পিঁপড়ার কথা বলা হয়েছে যে অন্য পিঁপড়াদের সাবধান করছে। আরবিতে এখানে স্ত্রীবাচক শব্দ ‘নাহলাতুন’ (نملة) ব্যবহৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে পিঁপড়া সমাজে নারী পিঁপড়াই মূলত শ্রমিক ও প্রহরীর কাজ করে—যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র কিছুদিন আগে আবিষ্কার করেছে।

৭. সূরার সিমেট্রি (Symmetry) ও শব্দের বিন্যাস

সূরা আল-মুলক (৬৭) :

এই সূরায় মোট ৩০টি আয়াত আছে। একে দুই ভাগে ভাগ করলে (১-১৫ এবং ১৬-৩০ আয়াত) দেখা যায়, প্রথম অর্ধে আল্লাহ মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও তার অসীম ক্ষমতার বর্ণনা দিয়েছেন। আর দ্বিতীয় অর্ধে অবাধ্যদের পরিণতি ও রিযিকের বর্ণনা দিয়েছেন। গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এই দুই অর্ধাংশের শব্দ বিন্যাস ও ভাবের মধ্যে এক অভাবনীয় ভারসাম্য বা Mirror Symmetry বিদ্যমান।

সূরা আল-বাকারা (২৮৬ আয়াত):

কুরআনের দীর্ঘতম এই সূরার ঠিক মাঝখানের আয়াত হলো ১৪৩ নম্বর আয়াত (২৮৬÷২০=১৪৩)। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই ১৪৩ নম্বর আয়াতেই আল্লাহ বলছেন:

“আর এভাবেই আমি তোমাদের এক মধ্যপন্থী জাতি (উম্মাতান ওয়াসাতান) হিসেবে সৃষ্টি করেছি।”

অর্থাৎ ‘মধ্যপন্থী’ শব্দটি ঠিক সূরার মাঝখানেই অবস্থান করছে।

৮. রসায়ন ও লোহার মুজিজা (Iron Miracle)

আপনি আগে সূরা আল-হাদীদ (৫৭) সম্পর্কে বলেছিলেন। এর গাণিতিক গভীরতা আরও বেশি:

  • পারমাণবিক ভর: লোহার ৫টি আইসোটোপের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ৫৬ এবং ৫৭। সূরার নম্বর ৫৭।
  • পারমাণবিক সংখ্যা: লোহার পারমাণবিক সংখ্যা ২৬। সূরা আল-হাদীদ-এর ‘বিসমিল্লাহ’ সহ আয়াতের হিসাব করলে এবং ‘আল-হাদীদ’ শব্দের গাণিতিক মান (আবিদ মান) বের করলে দেখা যায় সেটিও ২৬।

কুরআনের গাণিতিক মুজিযা প্রমাণ করে যে এই গ্রন্থ মানব রচনার ফল নয়, বরং তা সর্বজ্ঞ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত। শব্দ, সংখ্যা, সময় ও কাঠামোর এই নিখুঁত সামঞ্জস্য কুরআনের ভাষাগত ও অর্থগত মুজিযাকে আরও সুদৃঢ় করে। তবে একজন মুমিনের জন্য কুরআনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—এটি হেদায়েতের কিতাব। গাণিতিক মুজিযা সেই হেদায়েতের পথে চিন্তাশীল মানুষকে আহ্বান জানানোর এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক মাধ্যম মাত্র। এই গাণিতিক নিখুঁততা প্রমাণ করে যে, কুরআন কেবল পড়ার কিতাব নয়, এটি এক গাণিতিক বিস্ময়।

কুরআনে ঐতিহাসিক দুটি ঘটনা

কুরআনে ঐতিহাসিক শহর পেত্রা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পেত্রা, জর্ডানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন শহর, বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচিত। লালচে বালুকাময় পাহাড়ে খোদাই করা অসাধারণ স্থাপত্য, যেমন আল-খাজনেহ (The Treasury) এবং আদ-দেয়র (The Monastery), এটিকে ‘রোজ সিটি’ (Rose City) নামে খ্যাত করেছে। পেত্রার ইতিহাস প্রায় ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে শুরু হয়, যখন এখানে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে, কিন্তু এর প্রধান উন্নয়ন ঘটে নাবাতীয় সভ্যতার হাতে দ্বিতীয় শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এই শহরটি মশলা বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, যা দক্ষিণ আরব থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যাওয়ার পথে অবস্থিত। কিন্তু পেত্রার সাথে পবিত্র কুরআনের যোগসূত্র কী? কুরআনে সরাসরি ‘পেত্রা’ নাম উল্লেখ না থাকলেও, অনেক গবেষক এবং ঐতিহাসিক মনে করেন যে এটি সামুদ জাতির বাসস্থান ‘আল-হিজর’ (যা সৌদি আরবের মাদাইন সালেহ নামে পরিচিত) এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ لَقَدْ كَذَّبَ اَصْحٰبُ الْحِجْرِ  الْمُرْسَلِیْنَ ﴿ۙ۸۰﴾ وَ اٰتَیْنٰهُمْ اٰیٰتِنَا فَكَانُوْا عَنْهَا مُعْرِضِیْنَ ﴿ۙ۸۱﴾ وَ كَانُوْا یَنْحِتُوْنَ مِنَ الْجِبَالِ بُیُوْتًا اٰمِنِیْنَ ﴿۸۲﴾ فَاَخَذَتْهُمُ  الصَّیْحَۃُ  مُصْبِحِیْنَ ﴿ۙ۸۳﴾ فَمَاۤ  اَغْنٰی عَنْهُمْ مَّا كَانُوْا یَکْسِبُوْنَ ﴿ؕ۸۴﴾

আর অবশ্যই ‘হিজর’-এর অধিবাসীরা (সামুদ জাতি) রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল। আমি তাদের কাছে আমার নিদর্শনসমূহ পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তারা পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণ করত অত্যন্ত নিরাপদ মনে করে। অতঃপর এক প্রভাতে এক প্রচণ্ড মহানাদ তাদের পাকড়াও করল। সুতরাং তাদের উপার্জিত ধন-সম্পদ ও কৌশল তাদের কোনো কাজে আসলো না। সূরা আল-হিজর : ৮০-৮৪

চিত্র : পেত্রা, জর্ডানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত প্রাচীন এই শহরটি বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচিত। লালচে বালুকাময় পাহাড়ে খোদাই করা অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী, যেমন আল-খাজনেহ (The Treasury) এবং আদ-দেয়র (The Monastery), এটিকে রোজ সিটি‘ (Rose City) নামে খ্যাতি দিয়েছে।

পেত্রার ঐতিহাসিক পটভূমি

পেত্রার ইতিহাস একটি দীর্ঘ যাত্রা। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান অনুসারে, এখানে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে নিওলিথিক যুগে, প্রায় ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যখন কৃষি-ভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠে। পরবর্তীকালে, ব্রোঞ্জ যুগে (৩০০০-১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এটি ইজিপ্শিয়ান নথিতে ‘পেল’, ‘সেলা’ বা ‘সেয়ার’ নামে উল্লেখিত হয়। আয়রন যুগে (১২০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এখানে এডোমাইটরা বাস করত, যারা পাহাড়ী জলাধার ব্যবহার করে ওয়াইন, জলপাই তেল এবং কাঠের বাণিজ্য করত। কিন্তু পেত্রার সত্যিকারের উজ্জ্বলতা আসে নাবাতীয়দের হাতে। নাবাতীয়রা, আরব মরুভূমির যাযাবর জাতি, চতুর্থ শতাব্দী খ্রিস্টপূর্বাব্দে এখানে বসতি স্থাপন করে এবং দ্বিতীয় শতাব্দীতে এটিকে তাদের রাজধানী বানায়। নাবাতীয় ভাষায় এর নাম ছিল ‘রাকমু’ বা ‘রাকেমো’।

পেত্রার নব্যতীয় (Nabataean) সভ্যতা :

নাবাতীয়রা ছিলেন অসাধারণ প্রকৌশলী। তারা পাহাড়ে জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা, চ্যানেল এবং ড্যাম তৈরি করে মরুভূমিতে কৃষি চালিয়ে যায়। পেত্রা ধীরে ধীরে একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে দক্ষিণ আরবের ধূপ, মশলা এবং অন্যান্য পণ্য ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হত।

প্রথম শতাব্দী খ্রিস্টাব্দে এর জনসংখ্যা ২০,০০০-এ পৌঁছে। আল-খাজনেহ, যা সম্ভবত রাজা আরেটাস চতুর্থের সমাধি, ৩৭ মিটার উঁচু এবং হেলেনিস্টিক স্থাপত্যের প্রভাব দেখায়, কলাম, পেডিমেন্ট এবং দেবতাদের মূর্তি যেমন ক্যাস্টর, পোলাক্স, আইসিস-টাইকি। আদ-দেয়র, ৪৫ মিটার উঁচু, নাবাতীয় উপাদান যুক্ত।

অন্যান্য স্থাপনায় রয়েছে থিয়েটার (৮,৫০০ আসন), কলোনেডেড স্ট্রিট, নিম্ফিয়াম এবং রয়্যাল টম্বস। ১০৬ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা এটি দখল করে ‘আরাবিয়া পেট্রিয়া’ নাম দেয়, কিন্তু ৩৬৩ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্প এবং সমুদ্রপথের উত্থানে এর পতন ঘটে। বাইজানটাইন যুগে খ্রিস্টান গির্জা তৈরি হয়, কিন্তু ইসলামী যুগের শুরুতে এটি পরিত্যক্ত হয়। ১৮১২ সালে সুইস অভিযাত্রী জোহান লুডভিগ বুর্কহার্ড এটি পুনরাবিষ্কার করেন।

চিত্র : মাদা’য়েন সালেহ (Mada’in Saleh বা Hegra) সৌদি আরবের আল-উলা অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রাচীন নাবাতীয় ধ্বংসাবশেষ।

পেত্রার বিস্ময়কর পানি ব্যবস্থাপনা (Ancient Engineering)

আধুনিক ইতিহাস অনুযায়ী, পেত্রা ছিল নব্যতীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী। এরা ছিল অত্যন্ত দক্ষ ব্যবসায়ী এবং প্রকৌশলী। বিশেষ করে মরুভূমিতে পানি সংগ্রহের জন্য তারা যে জটিল বাঁধ ও নালা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তা আজও বিজ্ঞানীদের অবাক করে। কুরআনে বর্ণিত সামুদ জাতির পরবর্তী বংশধর বা একই সংস্কৃতির উত্তরসূরী হিসেবে নব্যতীয়দের বিবেচনা করা হয়। মরুভূমির চরম বৈরী পরিবেশে পেত্রাকে একটি সমৃদ্ধ শহরে পরিণত করার পেছনে কাজ করেছিল নব্যতীয়দের (Nabateans) অবিশ্বাস্য প্রকৌশল জ্ঞান। এটি আজ থেকে ২০০০ বছর আগে নির্মিত আধুনিক হাইড্রোলিক সিস্টেমের এক অনন্য উদাহরণ।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ: পেত্রাতে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ছিল নগণ্য। নব্যতীয়রা আশেপাশের পাহাড়ের ওপর পানি সংগ্রহের এলাকা (Catchment areas) তৈরি করেছিল। প্রতিটি বৃষ্টির ফোঁটা যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য তারা পাহাড়ের গায়ে নালা (Channels) খোদাই করে পানিকে শহরের ভেতরের চৌবাচ্চায় (Cisterns) নিয়ে আসত। পেত্রাতে প্রায় শতাধিক মাটির নিচের চৌবাচ্চা আবিষ্কৃত হয়েছে যা কয়েক লাখ ঘনমিটার পানি ধরে রাখতে পারত।

বাঁধ ও টানেল নির্মাণ: হঠাৎ আসা বন্যার পানি থেকে শহরকে রক্ষা করার জন্য তারা বিশাল বাঁধ (Dams) নির্মাণ করেছিল। একটি বিশেষ টানেলের মাধ্যমে বন্যার পানিকে শহরের মূল কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হতো।

উন্নত পাইপলাইন সিস্টেম: তারা পোড়ামাটির (Clay) পাইপ ব্যবহার করে প্রায় ৫-৭ কিমি দূরবর্তী প্রাকৃতিক ঝরনা (যেমন: আইন মূসা) থেকে পানি শহরে নিয়ে আসত। এই পাইপগুলো এমনভাবে ঢালু করে বসানো হয়েছিল যাতে পানির চাপ (Water Pressure) সঠিক থাকে এবং কোনো পলি না জমে। তাদের এই পাইপলাইনের নকশা বর্তমান যুগের প্রকৌশলীদেরও বিস্মিত করে।

পলি অপসারণ ও বিশুদ্ধকরণ: পানির সাথে আসা বালি বা কাদা দূর করার জন্য তারা ক্রমান্বয়ে নিচু চৌবাচ্চা বা ‘সেটলিং বেসিন’ ব্যবহার করত, যা পানিকে প্রাকৃতিকভাবে বিশুদ্ধ করত।

চিত্র : পেত্রার বিস্ময়কর পানি ব্যবস্থাপনা (প্রাচীন প্রকৌশল)

কুরআনে সামুদ জাতি এবং আল-হিজর

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হিজর বা সামুদ জাতির স্থাপত্যশৈলী এবং তাদের সেই অলৌকিক ইতিহাস সত্যিই বিস্ময়কর। পেত্রার উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং সামুদ জাতির উষ্ট্রীর কাহিনী বিস্তারিত পাওয়া যায়।  সামুদ জাতির কথা একাধিক সূরায় উল্লেখ করেছে, যা প্রাচীন আরবের একটি জাতি যারা পাহাড়ে ঘর খোদাই করে বাস করত এবং অহংকারের কারণে ধ্বংস হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

৭৩. আর সামূদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের জন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালক হতে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে। এটা আল্লাহর উষ্ট্রী তোমাদের জন্য একটি নিদর্শন। এটাকে ‘আল্লাহর জমিতে চরে খেতে দাও এবং এর সাথে কোন দুর্ব্যবহার করনা, নচেৎ মর্মান্তিক শাস্তি তোমাদের উপর পতিত হবে।

 ‘স্মরণ কর, ‘আদ জাতির পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করেছ। সুতরাং তোমরা ‘আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়াও না। তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক প্রধানেরা সে সম্প্রদায়ের ঈমানদার যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত তাদেরকে বলল, ‘তোমরা কি জান যে, সালেহ ‘আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত?’ তারা বলল, ‘তার প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে বিশ্বাসী। তখন অহংকারীরা বললো তোমারা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অবিশ্বাস করি। অতঃপরতারা সেই উষ্ট্রিটিকে মেরে ফেললো এবং (গর্ব ও দাম্ভিকতার সাথে) তাদের প্রতিপালকের নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে চলতে লাগলো এবং বললো হে সালেহ! তুমি সত্য রাসূল হয়ে থাকলে আমাদেরকে যে শাস্তিÍর ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন কর। সুতরাং তাদেরকে একটি প্রলয়ংকারী ভূমিকম্প এসে গ্রাস করে নিলো, ফলে তার নিজেদের গৃহের মধ্যেই (মৃত্যু অবস্থায় ) উপুড় (অধোমুখী) হয়ে পড়ে গেল। অতঃপর তিনি (সালেহ আ:) একথা বলে তাদের জনপদ হতে বের হয়ে গেলেন হে আমার সম্প্রদায়! আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি, আর আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছি, কিন্তু তোমরা তো উপদেশ দাতাদেরকে পছন্দ কর না। সূরা আল-আরাফ : ৭৩-৭৯

এ সম্পর্কে আরও দেখুন : আল-হুদ : ৬১-৬৯, আল-হিজর : ৮০-৮৪, আশ-শুয়ারা : ১৪১-১৫৮, আন-নামল : ৪৫-৫৩, আল-কামার : ২৩-৩১, আল-ফাজর : ৬-১৩ এবং আশ-শামস : ১১-১৫।

সামুদ ছিলেন আদ জাতির বংশধর, যাদের নবী সালিহ (আ.) পাঠানো হয়। কুরআন বলে-

وَاِلٰی ثَمُوۡدَ اَخَاہُمۡ صٰلِحًا ۘ قَالَ یٰقَوۡمِ اعۡبُدُوا اللّٰہَ مَا لَکُمۡ مِّنۡ اِلٰہٍ غَیۡرُہٗ ؕ ہُوَ اَنۡشَاَکُمۡ مِّنَ الۡاَرۡضِ وَاسۡتَعۡمَرَکُمۡ فِیۡہَا فَاسۡتَغۡفِرُوۡہُ ثُمَّ تُوۡبُوۡۤا اِلَیۡہِ ؕ اِنَّ رَبِّیۡ قَرِیۡبٌ مُّجِیۡبٌ

আর সামূদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম)তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল,‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আবাদের* ব্যবস্থা করেছেন । সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয়ই আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী’। সুরা হুদ : ৬১

তারা অহংকারী ছিল, পাহাড়ে নিরাপদ ঘর বানিয়ে মনে করত কেউ তাদের ধ্বংস করতে পারবে না। আল্লাহ একটি উটনীকে চিহ্ন হিসেবে পাঠান, কিন্তু তারা তাকে হত্যা করে। ফলে ভূমিকম্প এবং বজ্রপাতে তারা ধ্বংস হয়। আল-হিজর’ সূরায় বলা হয়েছে-

আর আল-হিজরের অধিবাসীরা রাসূলগণকে মিথ্যা বলেছিল। আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনসমূহ দিয়েছিলাম কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। আর তারা পাহাড়সমূহে নিরাপদে ঘরসমূহ খোদাই করত। সুরা হিজর : : ৮০-৮২

এই ‘আসহাবুল হিজর’ হলো সামুদ, যারা পাহাড় খোদাই করে ঘর বানাত। কুরআন এটিকে একটি সতর্কবাণী হিসেবে উপস্থাপন করে, যাতে মানুষ অহংকার থেকে বিরত থাকে। সামুদের সময়কাল নোয়া (আ.) এবং হুদ (আ.) এর পর, ইবরাহিম (আ.) এবং মুসা (আ.) এর আগে বলে কুরআন নির্দেশ করে।

চিত্র : ম্যাপে পেত্রা  নগরী।

চিত্র : পেত্রার স্যাটেলাইট ভিউ।

সামুদ জাতির উষ্ট্রীর অলৌকিক কাহিনী

পবিত্র কুরআনে সামুদ জাতির কাছে প্রেরিত হযরত সালেহ (আ.)-এর সেই উষ্ট্রীর ঘটনাটি এক মহান নিদর্শন ও পরীক্ষা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

অলৌকিক আবির্ভাব: সামুদ জাতি ছিল অত্যন্ত অহঙ্কারী। তারা সালেহ (আ.)-এর কাছে দাবি করল, যদি তিনি একটি নির্দিষ্ট বিশাল পাথর থেকে একটি গর্ভবতী ও জীবন্ত উষ্ট্রী বের করে দেখাতে পারেন, তবেই তারা ঈমান আনবে। সালেহ (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন এবং মানুষের চোখের সামনে সেই আস্ত পাথর ফেটে একটি অতিকায় উষ্ট্রী বের হয়ে এল।

পানির বণ্টন ও অলৌকিকতা: এই উষ্ট্রীটি ছিল সাধারণ উটের চেয়ে অনেক বড়। আল্লাহ পরীক্ষা হিসেবে নির্দেশ দিলেন যে, শহরের কূয়োর পানি একদিন উষ্ট্রী পান করবে এবং পরের দিন মানুষ ও তাদের গবাদি পশুরা পান করবে। উষ্ট্রীটি যেদিন পানি পান করত, সেদিন সে এতো পরিমাণ দুধ দিত যে পুরো শহরের মানুষের চাহিদা পূরণ হয়ে যেত।

অবাধ্যতা ও ষড়যন্ত্র: সামুদ জাতির নেতারা উষ্ট্রীর এই জনপ্রিয়তা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল, উষ্ট্রীটি বেঁচে থাকলে মানুষ সালেহ (আ.)-এর প্রতি আরও বেশি ঝুঁকে পড়বে। তাই তারা কুদার ইবনে সালিফ নামক এক পাপিষ্ঠ লোকের মাধ্যমে উষ্ট্রীটিকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা (হামস্ট্রিং) করল।

চূড়ান্ত শাস্তি: উষ্ট্রীটিকে হত্যার পর সালেহ (আ.) তাদের সতর্ক করলেন যে আর মাত্র তিন দিন তারা সময় পাবে। তিন দিন পর এক প্রচণ্ড বিকট শব্দ (মহানাদ) এবং ভূমিকম্পে পুরো সামুদ জাতি ধ্বংস হয়ে যায়। শুধু সালেহ (আ.) এবং তাঁর অল্প কয়েকজন অনুসারী রক্ষা পান।

প্রত্নতাত্ত্বিক এবং গবেষণামূলক যোগসূত্র

প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে, পেত্রা নাবাতীয় সভ্যতার (৪র্থ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১ম খ্রিস্টাব্দ) সাথে যুক্ত, যা সামুদের থেকে অনেক পরবর্তী। সামুদকে দ্বিতীয় সহস্রাব্দ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাখা হয়। কিন্তু সৌদি আরবের আল-হিজর (মাদাইন সালেহ বা হেগরা) কুরআনের আল-হিজরের সাথে সরাসরি যুক্ত। এখানে ১১০টিরও বেশি নাবাতীয় সমাধি আছে, যা পেত্রার মতোই পাহাড়ে খোদাই করা। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, এটি নাবাতীয় রাজধানী পেত্রার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ছিল। কুরআনের সামুদ এখানকার বাসিন্দা বলে মুসলিম ঐতিহ্য মনে করে, যদিও নাবাতীয়রা পরবর্তী। পেত্রা সামুদের অংশ, যা নাবাতীয় নামে পরিচিত। তারা আদের বংশধর এবং উত্তর আরবে চলে আসে। কুরআনের বর্ণনা, পাহাড়ে ঘর, ভূমিকম্পে ধ্বংস – পেত্রার ৩৬৩ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পের সাথে মিলে যায়।

হাদিসে নবী মুহাম্মদ (সা.) আল-হিজর দিয়ে যাওয়ার সময় সতর্ক করেন। ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ যখন আল-হিজর (সামুদ জাতির জনপদ) অতিক্রম করলেন, তখন তিনি বললেন, তোমরা এই শাস্তিপ্রাপ্ত জাতির (ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের) কাছে প্রবেশ করবে না, যদি না তোমরা কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ করো। আর যদি কাঁদতে না পারো, তবে সেখানে প্রবেশ করো না, পাছে তোমাদের ওপরও এমন শাস্তি নেমে আসে, যেমনটি তাদের ওপর নেমে এসেছিল। সহিহ বুখারি : ৩৩৮০, ৩৩৮১, ৪৪১৯, ৪৪২০, ৪৭০২; সহিহ মুসলিম : ২৯৮।

বর্তমান অবস্থা

১৮১২ সালে জোহান লুডভিগ বুর্খাট নামক একজন সুইস পর্যটক পেত্রাকে আধুনিক বিশ্বের কাছে পরিচিত করান। ১৯৮৫ সালে এটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়। ২০০৭ সালে একে বিশ্বের ‘সপ্তাশ্চর্যের’ একটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

পেত্রা একটি প্রাচীন বিস্ময়, যা ঐতিহাসিকভাবে নাবাতীয় সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে এবং কুরআনিকভাবে সামুদের স্মৃতি জাগায়। যদিও সরাসরি যোগসূত্র নেই, এর স্থাপত্য কুরআনের বর্ণনাকে জীবন্ত করে।

হাইরোগ্লিফ বা চিত্রলিপি ও মিসরের ফারাও রাজা

পবিত্র কুরআনের ফেরাউন ও তার বাহিনীর ধ্বংসের পরের অবস্থা বর্ণনা করে। প্রাচীন মিসরের হায়ারোগ্লিফ বা চিত্রলিপির যে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন, তা আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। হায়ারোগ্লিফ এবং ফেরাউন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে আলোচিত হলো। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَمَا بَکَتۡ عَلَیۡہِمُ السَّمَآءُ وَالۡاَرۡضُ وَمَا کَانُوۡا مُنۡظَرِیۡنَ 

আকাশ এবং পৃথিবীর কেহই তাদের জন্য অশ্রুপাত করেনি এবং তাদেরকে অবকাশও দেয়া হয়নি। সুরা দুখান : ২৯।

এই আয়াতে বলা হয়েছে, ফেরাউন ও তার অনুসারীদের মৃত্যুর পর “আকাশ ও পৃথিবী তাদের জন্য কাঁদেনি”। তারা এতটাই জালিম ও অবাধ্য ছিল যে তাদের ধ্বংসে সৃষ্টিজগতের কেউ শোক প্রকাশ করেনি, বরং তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সময় বা সুযোগও বাড়ানো হয়নি।

ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেন, “মুমিন বান্দা মারা গেলে তার আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায় বলে আসমান কাঁদে, আর তার সিজদার স্থান বিচ্ছিন্ন হওয়ায় জমিন কাঁদে। কিন্তু কাফিরদের জন্য আকাশ-জমিন কাঁদে না।” তাফসির ইবন কাসির

প্রাচীন মিসরীয় বিশ্বাস: হায়ারোগ্লিফ লিপি থেকে জানা যায়, মিসরীয়রা বিশ্বাস করত যে ফারাওরা ছিল দেবতার অংশ (যেমন সূর্যের দেবতা ‘রা’ এর সন্তান)। তারা মনে করত, কোনো ফারাও মারা গেলে মহাবিশ্বের প্রকৃতি, আকাশ এবং পৃথিবী শোক পালন করে।

কুরআনের চ্যালেঞ্জ: আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাদের সেই মিথ্যা দম্ভ ও বিশ্বাসকে নাকচ করে দিয়েছেন। আল্লাহ জানিয়েছেন যে, তারা নিজেদের এত প্রভাবশালী মনে করলেও আসলে সৃষ্টিজগতের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই।

 চিত্র : প্রাচীন মিসরীয়রা এই লিপি ব্যবহার করে ফারাওদের গৌরবগাথা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস লিপিবদ্ধ করতেন।

২. হাইরোগ্লিফ বা চিত্রলিপি

হায়ারোগ্লিফ (Hieroglyphs) বা চিত্রলিপি হলো প্রাচীন মিসরীয়দের ব্যবহৃত একটি বিশেষ লিখন পদ্ধতি, যেখানে বর্ণমালার পরিবর্তে বিভিন্ন ছবি বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা হতো।

সহজভাবে বলতে গেলে, এটি একটি “ছবি দিয়ে লেখা” ভাষা। হায়ারোগ্লিফ শব্দটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ‘পবিত্র খোদাইকৃত লিপি’। এই পদ্ধতিতে মানুষ, পশু-পাখি, গাছপালা এবং বিভিন্ন বস্তুর ছবি ব্যবহার করা হতো। প্রতিটি ছবির আলাদা আলাদা অর্থ ছিল। একটি চোখের ছবি দিয়ে দেখা বোঝানো হতো। একটি পাখির ছবি দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো ধ্বনি বা উড়ন্ত কিছু বোঝানো হতো।

প্রাচীন মিসরীয়রা মনে করত এই লিপিটি দেবতাদের পক্ষ থেকে উপহার। তাই তারা এটি মূলত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ব্যবহার করত।  পিরামিড ও মন্দিরের দেয়ালে  ফারাওদের গৌরবগাথা বা ধর্মীয় মন্ত্র লিখত। জকীয় সমাধিতে মৃত ব্যক্তির পরকাল বিষয়ক নির্দেশনা খোদাই করত।

ফেরাউনের যুগের সমাপ্তির পর হায়ারোগ্লিফ লিপি পড়ার জ্ঞান পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। হাজার বছর মানুষ জানত না পিরামিডের গায়ে কী লেখা আছে। ১৭৯৯ সালে রসেটা স্টোন (Rosetta Stone) আবিষ্কারের পর ১৮২২ সালে জঁ-ফ্রাঁসোয়া শাঁপোলিওঁ প্রথম এই লিপি পড়ার পদ্ধতি বের করেন। বিভিন্ন পিরামিড ও মন্দিরের দেয়ালে হায়ারোগ্লিফ লিপিতে ফারাওদের দেবতুল্য করার বর্ণনা লেখা থাকত। কুরআনের এই আয়াতটি ঠিক সেই প্রাচীন লিপিতে থাকা অহংকারকে লক্ষ্য করেই নাযিল হয়েছে।

চিত্র : ফারাওরা নিজেদের দেবতুল্য হিসেবে উপস্থাপন করতেন, যা হাইরোগ্লিফ লিপিতে বর্ণিত।

৩. ফারাওদের দম্ভ ও পরিণতি

প্রাচীন হায়ারোগ্লিফ লিপি বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিকরা দেখেছেন যে, ফারাওরা নিজেদের “আকাশ ও পৃথিবীর অধিপতি” হিসেবে দাবি করত। তারা পাথরের গায়ে নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করত যেন তারা অমর। কুরআন এই লিপিগুলো উন্মোচনের হাজার বছর আগেই ঘোষণা করেছে যে, তাদের এই আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের শেষে কোনো সহানুভূতি ছিল না।

প্রাচীন মিসরের শিলালিপি বা হায়ারোগ্লিফ আমাদের সামনে ফারাওদের যে জাঁকজমকপূর্ণ ইতিহাসের চিত্র তুলে ধরে, কুরআন এই একটি আয়াতের মাধ্যমে সেই পুরো আভিজাত্যকে অর্থহীন প্রমাণ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের ক্ষমতা যতই আকাশচুম্বী হোক না কেন, আল্লাহর অবাধ্য হলে তা ধুলোয় মিশে যায়।