কুরআনে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণী: ৭-১৪
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
পবিত্র কুরআনুল কারীম কেবল একটি জীবনবিধান বা আধ্যাত্মিক গ্রন্থ নয়, বরং এটি সমকাল ও মহাকালের এক জীবন্ত অলৌকিকতা (Miracle)। এই আসমানী কিতাবের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সুনির্দিষ্ট এবং অকাট্য ‘ভবিষ্যদ্বাণী’। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে এমন এক সময়ে এই বাণীসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল, যখন মানবজাতি আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যব্যবস্থা সম্পর্কে ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ। কুরআন এমন অনেক ঘটনার আগাম সংবাদ দিয়েছিল, যা তৎকালীন সময়ে অসম্ভব বা অকল্পনীয় মনে হলেও পরবর্তীকালে ইতিহাসের পাতায় প্রতিটি অক্ষর অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কেবল তথ্য নয়, বরং এগুলো যে সরাসরি মহান স্রষ্টা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, এটি তার অন্যতম বড় প্রমাণ।
কুরআনের এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়: প্রথমত, সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিজয় বা পতন (যেমন: রোমানদের বিজয় বা মক্কা বিজয়); দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক রহস্য যা দীর্ঘকাল পর উন্মোচিত হয়েছে (যেমন: ফেরাউনের মৃতদেহ সংরক্ষণ বা অনাগত নতুন যানবাহনের ধারণা); এবং তৃতীয়ত, কিয়ামত ও পরকাল সংক্রান্ত মহাজাগতিক সংবাদ। উদাহরণস্বরূপ, যখন রোমানরা পারসিকদের কাছে পরাজিত হয়ে খাদের কিনারায় ছিল, তখন কুরআন তাদের বিজয়ের যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, তা ইতিহাসে হুবহু বাস্তবায়িত হয়েছে। তেমনিভাবে ফেরাউনের দেহ সংরক্ষিত হওয়ার বিষয়টি ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।
এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর উদ্দেশ্য কেবল মানুষের কৌতূহল মেটানো নয়, বরং মানুষের অন্তরে ঈমানকে দৃঢ় করা এবং এটি যে কোনো মানুষের রচনা নয়—সেই অকাট্য সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করা। আল্লাহ প্রদত্ত এই চ্যালেঞ্জগুলো যুগ যুগ ধরে নাস্তিক ও সংশয়বাদীদের জন্য এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে। নিম্নে বর্ণিত ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী কুরআনের সেই অলৌকিকত্বেরই একেকটি উজ্জ্বল স্তম্ভ, যা কিয়ামত অবধি মানবজাতিকে সত্যের পথে দিশা দেখাবে।
ভবিষ্যদ্বাণী-০৭ : কুরআনের মত করে কেউ কোন দিন একটি সুরাও রচনা করতে পারবে না
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ اِنْ کُنْتُمْ فِیْ رَیْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلٰی عَبْدِنَا فَاْتُوْا بِسُوْرَۃٍ مِّنْ مِّثْلِہٖ ۪ وَ ادْعُوْا شُهَدَآءَکُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ اِنْ کُنْتُمْ صٰدِقِیْنَ ﴿۲۳﴾ فَاِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَ لَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیْ وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَ الْحِجَارَۃُ ۚۖ اُعِدَّتْ لِلْکٰفِرِیْنَ ﴿۲۴﴾
আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাজিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সুরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অতএব যদি তোমরা তা না কর- আর কখনো তোমরা তা করবে না- তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য। সুরা বাকারা : ২৩-২৪
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَمۡ یَقُوۡلُوۡنَ افۡتَرٰىہُ ؕ قُلۡ فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّثۡلِہٖ وَادۡعُوۡا مَنِ اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে’? বল, ‘তবে তোমরা তার মত একটি সুরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। সুরা ইউনুস : ৩৮
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَمۡ یَقُوۡلُوۡنَ افۡتَرٰىہُ ؕ قُلۡ فَاۡتُوۡا بِعَشۡرِ سُوَرٍ مِّثۡلِہٖ مُفۡتَرَیٰتٍ وَّادۡعُوۡا مَنِ اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
নাকি তারা বলে, ‘সে এটা রটনা করেছে’? বল, ‘তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সুরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। সুরা হুদ : ১৩
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ لَّئِنِ اجۡتَمَعَتِ الۡاِنۡسُ وَالۡجِنُّ عَلٰۤی اَنۡ یَّاۡتُوۡا بِمِثۡلِ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنِ لَا یَاۡتُوۡنَ بِمِثۡلِہٖ وَلَوۡ کَانَ بَعۡضُہُمۡ لِبَعۡضٍ ظَہِیۡرًا
বলঃ যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন রচনা করার জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ কুরআন রচনা করতে পারবেনা। সুরা ইসরা : ৮৮
এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ তায়ালা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, যা কুরআনের অলৌকিকতা এবং ঐশী উৎস প্রমাণ করে। এই আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, যদি কারো কুরআনের ব্যাপারে সন্দেহ থাকে, তাহলে তারা যেন কুরআনের মতো একটি সুরা রচনা করে নিয়ে আসে। এখানে, আল্লাহ তায়ালা অবিশ্বাসীদেরকে বলছেন, যদি তোমাদের মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি অবতীর্ণ কুরআন সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে তোমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে এর ক্ষুদ্রতম সুরাগুলোর (যেমন, সুরা কাউসার) মতো অন্তত একটি সুরাও তৈরি করে দেখাও। এই কাজে তারা আল্লাহ ছাড়া তাদের সব সাক্ষী ও সাহায্যকারীদের ডাকতে পারে। এই চ্যালেঞ্জটি কেবল একজন ব্যক্তির জন্য নয়, বরং সব অবিশ্বাসীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতি আহ্বান।
চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত ফলাফল
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তায়ালা এই চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত ফলাফলও জানিয়ে দিয়েছেন। “অতএব যদি তোমরা তা না কর- আর কখনো তোমরা তা করবে না- তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফিরদের জন্য।”
এই অংশে আল্লাহ বলছেন, তোমরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না, এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি কুরআনের নাজিলের পর থেকে আজ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহু মানুষ চেষ্টা করেও কুরআনের মতো কোনো সাহিত্য রচনা করতে পারেনি, যা কুরআনের শৈল্পিকতা, ভাষা, এবং গভীরতার সাথে তুলনীয়। এই ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে কুরআন মানুষের রচিত কোনো গ্রন্থ নয়, বরং এটি আল্লাহর বাণী।
কুরআনের চ্যালেঞ্জ আজও কেন সত্য?
১. অতুলনীয় সাহিত্য ও ভাষা
কুরআন শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি আরবি ভাষার এক অনন্য সাহিত্যিক অলৌকিকতা। এর শব্দচয়ন, বাক্য গঠন এবং বর্ণনাশৈলী এতটাই উন্নত যে ১৪০০ বছর পরেও কোনো সাহিত্যিক এর মতো কিছু তৈরি করতে পারেনি। কুরআনের ভাষা অত্যন্ত বিশুদ্ধ এবং এর কোনো ত্রুটি নেই। তৎকালীন আরবের সেরা কবি ও সাহিত্যিকরা এর ভাষা শুনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে এটি মানুষের পক্ষে রচনা করা সম্ভব নয়। কুরআনের প্রতিটি আয়াত একটি বিশেষ ছন্দ ও সুর বহন করে, যা পাঠকের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। এর ভাষা একদিকে যেমন সরল, তেমনি গভীর অর্থবহ। এটি একই সাথে কাব্যিক, প্রাঞ্জল এবং প্রাঞ্জল নয় এমন বিষয়কেও সহজে উপস্থাপন করে। এই চ্যালেঞ্জটি আজও বিদ্যমান। আধুনিক ভাষাবিদ এবং গবেষকরাও কুরআনের ভাষাগত অলৌকিকতা নিয়ে গবেষণা করছেন এবং এর সৌন্দর্য ও গভীরতা দেখে বিস্মিত হচ্ছেন।
২. ভবিষ্যদ্বাণী ও বৈজ্ঞানিক তথ্য
কুরআনে এমন কিছু তথ্য ও ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যা তৎকালীন সময়ে মানুষের জ্ঞানের বাইরে ছিল। এগুলো প্রমাণ করে যে কুরআন মানুষের রচিত নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।
ক. ভ্রূণের বিকাশ : কুরআনে ভ্রূণের বিভিন্ন ধাপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। যেমন, ভ্রূণের ‘আলাকা’ (রক্তপিণ্ড) ও ‘মুদগা’ (মাংসপিণ্ড) ধাপের বর্ণনা, যা ১৪০০ বছর আগে জানা সম্ভব ছিল না।
খ. মহাকাশ বিজ্ঞান: কুরআনে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, পৃথিবী ও আকাশের সৃষ্টি, সূর্য ও চাঁদের কক্ষপথের মতো অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য আধুনিক বিজ্ঞান সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে।
ঘ. ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী: কুরআনের সুরা রুম-এ রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে পরাজিত রোমানরা আবার বিজয়ী হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীটি মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সত্য হয়েছিল।
৩. ঐশী নিরাপত্তা
কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিয়েছেন, যার কারণে এর মূলপাঠ ১৪০০ বছর ধরে অপরিবর্তিত আছে। কুরআন একই সাথে লিখিত এবং মুখস্থ করার মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। যুগে যুগে হাজার হাজার হাফিজ (কুরআন মুখস্থকারী) তৈরি হয়েছেন, যারা এর প্রতিটি শব্দ, এমনকি প্রতিটি অক্ষরের নির্ভুলতা নিশ্চিত করেছেন। আপনি পৃথিবীর যে কোনো স্থানে কুরআনের একটি কপি খুলে দেখতে পারেন, এর মূলপাঠ সব জায়গায় একই রকম পাবেন। এর কোনো সংস্করণ নেই, কারণ এর কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
৪. চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারীদের ফলাফল
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কিছু ব্যক্তি কুরআনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তার মতো কিছু লেখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাদের সবার ক্ষেত্রেই ফল হয়েছে ব্যর্থতা এবং উপহাস। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো মুসায়লিমা আল-কাজ্জাব।
মুসায়লিমা ছিল ইসলামের প্রথম যুগের একজন মিথ্যা নবি দাবিদার। সে নিজেকে নবুওয়তের অধিকারী বলে প্রচার করে এবং কুরআনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কিছু আয়াত রচনার চেষ্টা করে। তার রচিত আয়াতগুলো ছিল অত্যন্ত হাস্যকর ও সাহিত্যিক মানহীন। যেমন-
সে একটি সুরা রচনার চেষ্টা করেছিল যার নাম ছিল ‘সুরা আল-ফিল’ (হাতি)। তার রচিত সেই সুরার কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো:
يَا فِيلُ! مَا أَنْتَ وَمَا الَّذِي يُخْبِرُكَ مَا أَنْتَ؟ لَدَيْكَ ذَيْلٌ طَوِيلٌ وَخُرْطُومٌ طَوِيلٌ.
অর্থ : হে হাতি! তুমি কী এবং কী তোমাকে বলে দেবে তুমি কী? তোমার একটি লম্বা লেজ এবং একটি লম্বা শুঁড় আছে।”
এই ধরনের অর্থহীন এবং দুর্বল বাক্য ছিল তার প্রধান হাতিয়ার। কুরআনের সাহিত্যিক গভীরতা এবং শৈল্পিক মানের সঙ্গে এর কোনো তুলনা চলে না। এর কারণে মুসায়লিমা তার অনুসারীদের কাছেও উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠে।
আধুনিক যুগেও কিছু মানুষ কুরআনের মতো কিছু লেখার চেষ্টা করেছে, বিশেষ করে অনলাইনে। কিন্তু তাদের কোনো প্রচেষ্টাই সফল হয়নি। তাদের লেখাগুলো হয় ব্যাকরণগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ, না হয় অর্থহীন এবং কুরআনের অতুলনীয় সাহিত্য ও শৈল্পিক মানের ধারে কাছেও যেতে পারেনি। এই ব্যর্থতাগুলো প্রমাণ করে যে কুরআনের চ্যালেঞ্জ একটি চিরন্তন সত্য, যা কোনো মানবীয় শক্তি মোকাবিলা করতে পারে না।
কুরআন মানবজাতির জীবনে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, তা অন্য কোনো গ্রন্থ আনতে পারেনি। এটি শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান যা সমাজে শান্তি, ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছে। এই আয়াত দুটি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, কুরআনের অলৌকিকতা কেবল এর ভাষার সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন চ্যালেঞ্জ, যা প্রমাণ করে কুরআন সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে এবং এর মতো কিছু রচনা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
ভবিষ্যদ্বাণী-০৮ : অল্প কিছু দিনের মধ্যে মক্কা বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী
মহান আল্লাহ বলেন-
وَاِنۡ کَادُوۡا لَیَسۡتَفِزُّوۡنَکَ مِنَ الۡاَرۡضِ لِیُخۡرِجُوۡکَ مِنۡہَا وَاِذًا لَّا یَلۡبَثُوۡنَ خِلٰفَکَ اِلَّا قَلِیۡلًا
আর তাদের অবস্থা এমন ছিল যে, তারা তোমাকে জমিন থেকে উৎখাত করে দেবে, যাতে তোমাকে সেখান থেকে বের করে দিতে পারে এবং তখন তারা তোমার পরে স্বল্প সময়ই টিকে থাকতে পারবে। সুরা ইসরা : ৭৬
এই আয়াতে আল্লাহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা পরবর্তীতে মক্কায় বাস্তবায়িত হয়েছিল:
১. নবি ﷺ-কে মক্কা থেকে উৎখাত করার চেষ্টা:
মক্কার কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাথীদের ওপর চরম অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাসুল ﷺ-কে মক্কা থেকে বিতাড়িত করা। এই আয়াতটি সেই উদ্দেশ্যকেই নির্দেশ করে। যখন কুরাইশদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আল্লাহ রাসুল ﷺ-কে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দেন। এটি ছিল এক অর্থে কুরাইশদের সেই উৎখাত করার পরিকল্পনারই একটি সফল পরিণতি, যদিও আল্লাহর নির্দেশে তা সম্পন্ন হয়েছিল।
২. কুরাইশদের স্বল্প সময় টিকে থাকা
আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ বলেন, “আর তখন তারা তোমার পরে স্বল্প সময়ই টিকে থাকতে পারবে।” এই অংশটি সরাসরি কুরাইশদের ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে। রাসুল ﷺ মক্কা থেকে হিজরতের পর কুরাইশরা মক্কায় তাদের শাসন ও প্রভাব বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেনি। মাত্র আট বছর পর, ৮ম হিজরিতে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দে) মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়। রাসুল ﷺ-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মক্কায় প্রবেশ করে এবং কুরাইশদের রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের অবসান ঘটায়। মক্কার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে এবং মক্কা মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
সুতরাং, এই আয়াতে আল্লাহ যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়েছিল। এটি ছিল কুরআনের একটি সুস্পষ্ট মু’জিযা (অলৌকিকতা), যা প্রমাণ করে যে কুরআন আল্লাহর বাণী।
ভবিষ্যদ্বাণী-০৯ : মুসলিমদের ক্ষমতায়ন ও পৃথিবীতে খিলাফত প্রতিষ্ঠা
কুরআন মুসলিমদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতায়ন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আল্লাহ তায়া বলেন-
وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَیَسۡتَخۡلِفَنَّہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ کَمَا اسۡتَخۡلَفَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ۪
তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে এ মর্মে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি নিশ্চিতভাবে তাদেরকে জমিনের খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব) প্রদান করবেন, যেমন তিনি খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব) প্রদান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। সুরা নুর : ৫৫
এ আয়াত মহান আল্লাহ দুটি শর্তে বিনিয়ম খিলাফত প্রদানে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলেন। যদি কেউ ঈমান আনে এবং নেক আমল করে তবে তাকে খিলাফত প্রদান করা হবে। মহানবি ﷺ এবং তাঁর সাহাবিরা এ দুটি শর্ত সঠিকভাবে পালন করেছেন এবং আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। মহানবি ﷺ এবং তাঁর সাহাবিদের জীবনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল। এটি শুধু একটি প্রতিশ্রুতি ছিল না, বরং ইসলামের ইতিহাসে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। এই আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয়, তখন মুসলিমরা মক্কায় চরম দুর্বল ও নিপীড়িত অবস্থায় ছিল। এই ওয়াদা তাদের জন্য ছিল এক বিরাট ভবিষ্যদ্বাণীর মাধ্যমে সুসংবাদ।
১. প্রথম বাস্তবায়িত হয় রাসুলুল্লাহ ﷺ এর যুগে
মক্কার দীর্ঘ ১৩ বছরের চরম নির্যাতন ও নিপীড়নের পর যখন মুসলমানরা মদিনায় হিজরত করে, তখন আল্লাহ তায়ালার এই ওয়াদা বাস্তবায়িত হওয়া শুরু হয়। মদিনায় রাসুল ﷺ একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাষ্ট্রে মুসলমানরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ক্ষেত্রে ক্ষমতা লাভ করে। এটি ছিল তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে “জমিনের খিলাফত” (প্রতিনিধিত্ব) লাভের প্রথম ধাপ। মদিনা সনদের মাধ্যমে রাসুল ﷺ মদিনার সকল গোত্রের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে তিনি সমগ্র আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক নেতা হয়ে ওঠেন। ইসলামের ইতিহাসে এই সময়কাল ছিল মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক উত্থানের স্বর্ণযুগ। মক্কার জীবনে মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশের জন্য নিপীড়িত হতো। কিন্তু মদিনায় তারা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ করে এবং ইসলামি আইন অনুযায়ী জীবনযাপন করার সুযোগ পায়। এটি ছিল আল্লাহর ওয়াদার একটি বাস্তব প্রতিফলন।
এই আয়াতের ওয়াদা অনুযায়ী, মুসলমানরা একের পর এক সামরিক বিজয় লাভ করতে থাকে। বদর, খন্দক, খায়বার ও মক্কা বিজয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোতে মুসলিমরা বিজয়ী হয়। মক্কা বিজয় ছিল এই ওয়াদা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। যে মক্কা থেকে রাসুল ﷺ ও সাহাবিদের বিতাড়িত করা হয়েছিল, সেই মক্কাই তাদের হাতে বিজিত হয়।
২. দ্বিতীয় বাস্তবায়ন খোলাফায়ে রাশেদীন যুগে
১. আবু বকর সিদ্দীক (রা.) রাসুল ﷺ এর ইন্তেকালের পর যখন অনেক গোত্র বিদ্রোহ ও মুরতাদ হয়ে গেল, তখন আল্লাহ তাঁকে শক্তি দিলেন। রিদ্দাহ যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামকে পুনরায় সুসংহত করলেন। মুসলিম উম্মাহর প্রথম খলিফা হিসেবে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলো।
২. উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) খিলাফতে আয়াতটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত হয়। রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিশাল এলাকা মুসলিমদের দখলে আসে। ইরাক, শাম, মিশর, ফারস – সব ইসলামি শাসনের অধীনে চলে আসে। রাসুল ﷺ বলেছেন-
“আল্লাহ আমার জন্য পৃথিবীকে সংকুচিত করে দিলেন, আমি পূর্ব ও পশ্চিম দেখলাম। আমার উম্মতের রাজত্ব সে পর্যন্ত পৌঁছাবে।” সহিহ মুসলিম : ২৮৮৯
৩. উসমান ইবন আফফান (রা.) শাসনামলে ইসলাম উত্তর আফ্রিকা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান প্রভৃতি এলাকায় পৌঁছায়। সমুদ্রপথে ইসলামি নৌবাহিনী গড়ে ওঠে।
৪. আলি ইবন আবি তালিব (রা.) শাসনামলে অভ্যন্তরীণ ফিতনা ছিল, তবে খিলাফত অব্যাহত ছিল।
ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, এই আয়াত রাসুল ﷺ ও তাঁর সাহাবাদের সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে দুর্বল অবস্থা থেকে শক্তি দিলেন, নির্যাতিত অবস্থা থেকে নিরাপত্তা দিলেন, অজ্ঞাত অবস্থা থেকে নেতৃত্ব দিলেন। এটাই খিলাফতের ওয়াদা। তাফসীর ইবনে কাসীর, সুরা আন-নূর : ৫৫
ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, আয়াতটি মুসলিম উম্মাহর জন্য সাধারণ ওয়াদা। তবে প্রথম বাস্তবায়িত হয়েছিল রাসুল ﷺ ও সাহাবাদের যুগে। আজ পর্যন্ত ইসলাম যে সব অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সবই এর আওতায়।
ভবিষ্যদ্বাণী-১০ : আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামিল ধ্বংস হবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
تَبَّتْ یَدَاۤ اَبِیْ لَهَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾ مَاۤ اَغْنٰی عَنْهُ مَالُہٗ وَ مَا كَسَبَ ؕ﴿۲﴾سَیَصْلٰی نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ۚ﴿ۖ۳﴾وَّ امْرَاَتُہٗ ؕ حَمَّالَۃَ الْحَطَبِ ۚ﴿۴﴾ فِیْ جِیْدِهَا حَبْلٌ مِّنْ مَّسَدٍ ﴿۵﴾
ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত, এবং সে ধ্বংসই হোক। তার ধন-সম্পদ ও অর্জন কিছুই তার উপকারে আসেনি। সে শীঘ্রই প্রবেশ করবে জ্বলন্ত অগ্নিতে। আর তার স্ত্রী (ও থাকবে), যে কাঠ বহন করত। তার গলায় থাকবে খেজুরের রেশমের পাকানো দড়ি। সুরা আল-লাহাব : ৩
এই আয়াতে আবু লাহাবের ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে। বাস্তবেও সে তার জীবনের শেষ প্রান্তে অত্যন্ত লাঞ্ছিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছিল।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এই আয়াত নাজিল হলো: “আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন” এবং তাদের মধ্যে যারা একনিষ্ঠ, তাদেরকেও। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বের হলেন এবং সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন। এরপর তিনি উচ্চস্বরে ডাক দিলেন, “ইয়া সাবাহাহ! (সকাল বেলার বিপদ)।
লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, “কে এই ব্যক্তি?” তখন তারা তার কাছে একত্রিত হলো। তিনি বললেন, “তোমরা কি মনে করো, যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের পাদদেশ থেকে একদল অশ্বারোহী সৈন্য আসছে, তাহলে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে?” তারা বলল, “আমরা আপনার ওপর কখনো মিথ্যা অভিযোগ দেখিনি।”
তখন তিনি বললেন, “তাহলে আমি তোমাদেরকে এক কঠিন আযাবের সামনে সতর্ককারী হিসেবে এসেছি।”
আবু লাহাব বলল, “তোমার ধ্বংস হোক! এই জন্যই কি তুমি আমাদের একত্রিত করেছ?” এই কথা বলে সে উঠে চলে গেল। তখন নাজিল হলো, “আবু লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।” সহিহ বুখারি : ৪৯৭১
ইবনে ’আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু লাহাব লানাতুল্লাহি ’আলাইহি নবি ﷺ -কে লক্ষ্য করে বললো, সারা দিনের জন্য তোমার অনিষ্ট হোক! (তার এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে) নাজিল হয়Ñ (যার অর্থ) ’’আবু লাহাবের হাত দু’টো ধ্বংস হোক এবং সেও ধ্বংস হোক’’। সুরা লাহাব : ০১। সহিহ বুখারি : ১৩৯৪, ৩৫২৫, ৩৫২৬, ৪৭৭০, ৪৮০১, ৪৯৭১, ৪৯৭২, ৪৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ২০৮, আহমাদ :২৮০২)
এ সুরায় আল্লাহ তায়ালা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামিলের ধ্বংসের যে ভবিষ্যদ্বাণী করে ছিলে তা দ্রুত বাস্তবায়ন হয়ে পৃথিবীতে অনান্য নজির স্থাপন করেছে।
১. আবু লাহাবের পরিণতি :
আবু লাহাব তার কৃতকর্মের ফল এই দুনিয়াতেও পেয়েছিল। বদর যুদ্ধের মাত্র এক সপ্তাহ পর সে এক ধরনের প্লেগ রোগে (আল-আদাসাহ) আক্রান্ত হয়। তার দেহ এমন দুর্গন্ধযুক্ত ও বিকৃত হয়ে যায় যে, তার পরিবারের সদস্যরাও তার কাছে যেতে ভয় পেত। এমনকি মৃত্যুর পরেও তার লাশ তিন দিন ধরে পড়ে ছিল, কারণ কেউই তার কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিল না। অবশেষে তার পুত্ররা দূর থেকে লাঠি দিয়ে ঠেলে তাকে মাটিতে গর্ত করে সেখানে মাটি চাপা দিয়ে দেয়। (ইবনে কাসীর, তাফসীর; সীরাত ইবনে হিশাম)
২. উম্মে জামীলের পরিণতি :
কোরআনে তার পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, জাহান্নামে তার গলায় খেজুরের আঁশের তৈরি রশি থাকবে। এটি তার দুনিয়ার অপকর্মের সাথে একটি প্রতীকী মিল। দুনিয়াতে সে রাসুল ﷺ-কে কষ্ট দেওয়ার জন্য কাঁটাযুক্ত ডালপালা বহন করত, আর আখেরাতে তাকে জাহান্নামের আগুন বহন করতে হবে। তাদের দুজনের পরিণতিই ছিল অত্যন্ত শোচনীয়, যা থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যারা শত্রুতায় লিপ্ত হয়, তাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
সুরা আল-লাহাব প্রথম থেকেই ঘোষণা করে দিয়েছিল, আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর কোনো কিছুই তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। আল্লাহর এ ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
ভবিষ্যদ্বাণী-১১: মক্কার কাফিরদের জন্য একটি বিশেষ শাস্তি
কুরআনে মক্কার কাফিরদের জন্য এমন এক শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা পরবর্তীতে বদর যুদ্ধের পরাজয়ের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَکُفَّارُکُمْ خَیْرٌ مِّنْ اُولٰٓئِکُمْ اَمْ لَکُمْ بَرَآءَۃٌ فِی الزُّبُرِ ﴿ۚ۴۳﴾ اَمْ یَقُوْلُوْنَ نَحْنُ جَمِیْعٌ مُّنْتَصِرٌ ﴿۴۴﴾سَیُہْزَمُ الْجَمْعُ وَ یُوَلُّوْنَ الدُّبُرَ ﴿۴۵﴾
তোমাদের (মক্কার) কাফিররা কি তাদের চেয়ে ভাল? না কি তোমাদের জন্য মুক্তির কোন ঘোষণা রয়েছে (আসমানি) কিতাবসমূহের মধ্যে? নাকি তারা বলে, ‘আমরা সংঘবদ্ধ বিজয়ী দল’? সংঘবদ্ধ দলটি শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে। সুরা কামার : ৪৩-৪৫
ঐতিহাসিকদের মতে এ আয়াত দুটি বদর যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী করে নাজিল হয়েছিল। এই আয়াতে কাফিরদের অহংকার এবং তাদের পরাজয় সম্পর্কে বলা হয়েছে। হিজরতের পূর্বে মক্কার মুশরিকরা যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করছিলো, তখন তারা নিজেদেরকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও অজেয় মনে করতো। তাদের ধারণা ছিলো, তাদের বিশাল সম্পদ, সংখ্যাধিক্য ও সামরিক শক্তির কারণে কেউ তাদের পরাজিত করতে পারবে না। তারা নিজেদেরকে ‘সংঘবদ্ধ বিজয়ী দল’ বলে মনে করতো।
এই মানসিকতার জবাবে আল্লাহ তা’আলা এই আয়াতগুলো নাজিল করেন। এর মাধ্যমে মুশরিকদের এই দাম্ভিকতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় যে, এই ‘সংঘবদ্ধ দল’ অচিরেই পরাজিত হবে এবং পিঠ দেখিয়ে পালাবে।
এই ভবিষ্যদ্বাণীটি বদর যুদ্ধে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়। বদরের প্রান্তরে মুসলিমদের ছোট একটি দল মুশরিকদের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে। মুশরিকদের বড় বড় নেতারা এই যুদ্ধে নিহত হয় এবং বাকিরা ময়দান থেকে পালিয়ে যায়। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবিকে সাহায্য করবেন এবং মিথ্যা ও অন্যায়ের ওপর সত্যের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংখ্যায় কম হলেও যদি কোনো দল সত্যের পথে অবিচল থাকে, তবে আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন এবং শেষ পর্যন্ত সত্যেরই বিজয় হয়।
ভবিষ্যদ্বাণী-১২ : কিয়ামতের পূর্বে সকল ইয়াহূদী ও নাসারারা ঈমান আনবে কিন্তু ঈমান তখন কোন কাজে আসবে না।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَاِنۡ مِّنۡ اَہۡلِ الۡکِتٰبِ اِلَّا لَیُؤۡمِنَنَّ بِہٖ قَبۡلَ مَوۡتِہٖ ۚ وَیَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ یَکُوۡنُ عَلَیۡہِمۡ شَہِیۡدًا ۚ
কিতাবীদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে তার মৃত্যুর পূর্বে তার প্রতি ঈমান আনবে না এবং কিয়ামতের দিনে সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবে। সুনা নিসা : ১৫৯
এই আয়াতের তাফসিরে আলেমগণ বলেছেন, এখানে “তাঁর প্রতি” বলতে নবি ঈসা (আঃ) কে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহর হিকমতের অংশ হল, কিয়ামতের পূর্বে নবি ঈসা (আঃ) দুনিয়াতে অবতরণ করবেন। তখন তিনি খ্রিষ্টানদের মিথ্যা আকীদা ভেঙে দেবেন। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস ঈসা (আঃ) আল্লাহ পুত্র। তিনি এসে বলবেন, আমি আল্লাহর পুত্র নই, বরং আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। তিনি ইসলাম অনুযায়ী শরীয়ত কায়েম করবেন। সেই সময় জীবিত ইহুদি ও নাসারারা তাঁকে দেখে নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারবে যে, তাঁর আসল অবস্থান কী ছিল। ফলে প্রত্যেকে মৃত্যুর পূর্বে কোনো না কোনোভাবে তাঁর প্রতিটি ঈমান স্বীকার করবে।
কিন্তু এ ঈমান হবে আল্লাহ নিদর্শন প্রকারের আগে। কিয়ামতের চুড়ান্ত নিদর্শন প্রকাশের পর আর ঈমান কবুল করা হবে না। যেমন-
ফির‘আউন মৃত্যুর সময় ঈমান এনেছিল। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির ঈমান গ্রহণ করা আল্লাহর কাছে কবুল করা হয় নাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَ جٰوَزْنَا بِبَنِیْۤ اِسْرَآءِیْلَ الْبَحْرَ فَاَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَ جُنُوْدُہٗ بَغْیًا وَّ عَدْوًا ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَدْرَكَهُ الْغَرَقُ ۙ قَالَ اٰمَنْتُ اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا الَّذِیْۤ اٰمَنَتْ بِہٖ بَنُوْۤا اِسْرَآءِیْلَ وَ اَنَا مِنَ الْمُسْلِمِیْنَ ﴿۹۰﴾ آٰلْـٰٔنَ وَ قَدْ عَصَیْتَ قَبْلُ وَ کُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِیْنَ ﴿۹۱﴾
আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির‘আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’। এখন অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানি করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত’। সুরা ইউনুস : ৯০-৯১
অতএব, এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা (আঃ) এর পুনরাবির্ভাব অবধারিত। আর তিনি কিয়ামতের দিনও খ্রিষ্টান-ইহুদিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন যে, তারা তাঁর প্রকৃত শিক্ষা বিকৃত করেছিল। বিধায় তখনকার ঈমান তাদের মুক্তি দেবে না. বরং শুধুই দলীল হিসেবে কিয়ামতের দিন তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হবে।
ভবিষ্যদ্বাণী-১৩ : আল্লাহ তায়ালা এমন কিছু সৃষ্টি করবেন যা মানুষ জানে না
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَّالۡخَیۡلَ وَالۡبِغَالَ وَالۡحَمِیۡرَ لِتَرۡکَبُوۡہَا وَزِیۡنَۃً ؕ وَیَخۡلُقُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ
আর (তিনি সৃষ্টি করেছেন) ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা, তোমাদের আরোহণ ও শোভার জন্য এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন কিছু, যা তোমরা জান না। সুরা নহল : ৮
এই আয়াতটি কেবল অতীত বা বর্তমানের বাহন নিয়েই কথা বলে না, বরং ভবিষ্যৎ আবিষ্কারের এক সুস্পষ্ট পূর্বাভাস বহন করে। আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে তৎকালীন আরবের মানুষের পরিচিত স্থলপথের বাহন—ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার কথা উল্লেখ করেছেন, যা তাদের আরোহণের পাশাপাশি সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। কিন্তু এরপরই তিনি এমন একটি বাক্য যুক্ত করেছেন, যা সময়ের সীমা অতিক্রম করে যায় : “এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন কিছু, যা তোমরা জান না।”
এই বাক্যটি একটি অলৌকিক ইঙ্গিত। কুরআন নাজিলের সময় মানুষ উট, ঘোড়া বা নৌকার বাইরে কোনো দ্রুতগতির যানের কল্পনাও করতে পারত না। তখন মোটরগাড়ি, ট্রেন, উড়োজাহাজ, বা রকেটের ধারণা মানুষের চিন্তারও বাইরে ছিল। অথচ এই আয়াতটি সেই সব আধুনিক যানবাহনের দিকেই ইঙ্গিত করছে, যা পরবর্তীকালে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো মানবজাতির অগ্রগতির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি থেকে এটি পরিষ্কার যে, এই সকল আধুনিক আবিষ্কারও মূলত আল্লাহরই সৃষ্টি। কারণ, মানুষ নতুন কোনো মৌলিক পদার্থ তৈরি করতে পারে না। বরং তারা প্রকৃতির মধ্যেই থাকা আল্লাহর সৃষ্ট উপাদান যেমন লোহা, অ্যালুমিনিয়াম, তামা, বা তেল ব্যবহার করে। বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির এই উপাদানগুলোকে নতুন রূপ দিয়েছেন। যেমন, কয়লা বা তেল থেকে তারা বিদ্যুৎ বা জ্বালানি তৈরি করেছেন, যা এসব যানের মূল শক্তি। ঠিক যেভাবে একটি কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন তৈরির জন্য সিলিকন, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন ধাতু প্রয়োজন হয়, তেমনি আধুনিক সব যানবাহনেরও মূল উপাদানগুলো প্রকৃতি থেকেই আসে, যা স্বয়ং আল্লাহরই সৃষ্টি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আয়াতে ব্যবহৃত ক্রিয়াপদের পরিবর্তন। ঘোড়া, খচ্চর ও গাধার ক্ষেত্রে অতীতকালের ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে, যা নির্দেশ করে যে এই বাহনগুলো ইতিমধ্যেই বিদ্যমান ছিল। আর “এবং তিনি সৃষ্টি করেন এমন কিছু, যা তোমরা জান না” এই অংশে আল্লাহ ভবিষ্যৎকালের ক্রিয়া ব্যবহার করেছেন, যা ইঙ্গিত করে যে এমন আরও কিছু জিনিস ভবিষ্যতে তৈরি হবে, যা তখন মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই প্রমাণ করে যে কুরআন শুধুমাত্র তৎকালীন সময়ের জ্ঞান নয়, বরং অনাগত দিনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কথাও তুলে ধরে। এই আয়াতটি কুরআনের চিরন্তন সত্যতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ, যা ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে।
মনে রাখবেন : এই আয়াতটি কেবল অতীতের নয়, বরং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে, যা কুরআনের অলৌকিকতার এক বড় প্রমাণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সব জ্ঞান ও সৃষ্টির উৎস একমাত্র আল্লাহ।
ভবিষ্যদ্বাণী-১৪ : ইয়াজুজ ও মাজুজের আত্মপ্রকাশ করবে
কুরআনে যুল-কারণাইন নামক একজন বিশ্ব বিখ্যাত বাদশাহর নাম উল্লেখ আছে। তিনি পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তসহ সমগ্র পৃথিবী পরিভ্রমণ করেছিলেন। কুরআন মাজীদের সুরা কাহাফে তাঁর ভ্রমণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তাঁর ভ্রমণের কাহিনীর এক পর্যায়ে ইয়াজুজ-মা’জুযের বিবরণ এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ثُمَّ اَتْبَعَ سَبَبًا ﴿۹۲﴾ حَتّٰۤی اِذَا بَلَغَ بَیْنَ السَّدَّیْنِ وَجَدَ مِنْ دُوْنِهِمَا قَوْمًا ۙ لَّا یَكَادُوْنَ یَفْقَهُوْنَ قَوْلًا ﴿۹۳﴾ قَالُوْا یٰذَاالْقَرْنَیْنِ اِنَّ یَاْجُوْجَ وَ مَاْجُوْجَ مُفْسِدُوْنَ فِی الْاَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلٰۤی اَنْ تَجْعَلَ بَیْنَنَا وَ بَیْنَهُمْ سَدًّا ﴿۹۴﴾ قَالَ مَا مَكَنِّیْ فِیْهِ رَبِّیْ خَیْرٌ فَاَعِیْنُوْنِیْ بِقُوَّۃٍ اَجْعَلْ بَیْنَکُمْ وَ بَیْنَهُمْ رَدْمًا ﴿ۙ۹۵﴾ اٰتُوْنِیْ زُبَرَ الْحَدِیْدِ ؕ حَتّٰۤی اِذَا سَاوٰی بَیْنَ الصَّدَفَیْنِ قَالَ انْفُخُوْا ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَعَلَہٗ نَارًا ۙ قَالَ اٰتُوْنِیْۤ اُفْرِغْ عَلَیْهِ قِطْرًا ﴿ؕ۹۶﴾ فَمَا اسْطَاعُوْۤا اَنْ یَّظْهَرُوْهُ وَ مَا اسْتَطَاعُوْا لَہٗ نَقْبًا ﴿۹۷﴾ قَالَ هٰذَا رَحْمَۃٌ مِّنْ رَّبِّیْ ۚ فَاِذَا جَآءَ وَعْدُ رَبِّیْ جَعَلَہٗ دَكَآءَ ۚ وَ كَانَ وَعْدُ رَبِّیْ حَقًّا ﴿ؕ۹۸﴾ وَ تَرَکْنَا بَعْضَهُمْ یَوْمَئِذٍ یَّمُوْجُ فِیْ بَعْضٍ وَّ نُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَجَمَعْنٰهُمْ جَمْعًا ﴿ۙ۹۹﴾
অর্থ : তারপর সে (যুল-কারণাইন) একটি পথ অনুসরণ করল। অবশেষে, যখন সে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছল, তখন সে সেখানে এমন এক সম্প্রদায়কে পেল, যারা কোনো কথা বুঝতে সক্ষম ছিল না। তারা বলল, “হে যুল-কারণাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। অতএব, আমরা কি আপনাকে কোনো খরচ দেব, যাতে আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেন?” সে বলল, “আমার পালনকর্তা যে সামর্থ্য আমাকে দিয়েছেন, তা অনেক উত্তম। অতএব তোমরা আমাকে শারীরিক শক্তি দিয়ে সাহায্য করো, আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যস্থলে একটি মজবুত বাধা নির্মাণ করে দিব।” “তোমরা আমার নিকট লোহার পাত এনে দাও।” তারপর যখন সে দুই পর্বতের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা পূর্ণ করল, তখন বলল, “তোমরা জোরে ফু দাও।” এমনকি যখন সে তা (লোহা) আগুনের মতো লাল করে ফেলল, তখন বলল, “তোমরা আমার নিকট গলিত তামা আনো, আমি তা এর উপর ঢেলে দেই।” ফলে ইয়াজুজ ও মাজুজ তাতে আর আরোহন করতে পারল না এবং তা ভেদও করতে পারল না। সে বলল, “এটা আমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে এক অনুগ্রহ। অতঃপর যখন আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি আসবে, তখন তিনি এটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন। আর আমার পালনকর্তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য।” আর সেদিন আমি তাদেরকে একে অপরের মধ্যে ঢেউ তুলতে ছেড়ে দেব; এবং শিংয়ে ফুৎকার দেয়া হবে, ফলে আমি তাদের সবাইকে একত্রিত করব। সুরা কাহাফ : ৯২-৯৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
حَتّٰۤی اِذَا فُتِحَتْ یَاْجُوْجُ وَ مَاْجُوْجُ وَ هُمْ مِّنْ کُلِّ حَدَبٍ یَّنْسِلُوْنَ ﴿۹۶﴾ وَ اقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَاِذَا هِیَ شَاخِصَۃٌ اَبْصَارُ الَّذِیْنَ كَفَرُوْا ؕ یٰوَیْلَنَا قَدْ کُنَّا فِیْ غَفْلَۃٍ مِّنْ هٰذَا بَلْ کُنَّا ظٰلِمِیْنَ ﴿۹۷﴾
অবশেষে যখন ইয়া’জূজ ও মা’জূজকে মুক্তি দেয়া হবে, আর তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি হতে ছুটে আসবে। আর সত্য ওয়াদার সময় নিকটে আসলে হঠাৎ কাফিরদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। তারা বলবে, ‘হায়, আমাদের দুর্ভোগ! আমরা তো এ বিষয়ে উদাসীন ছিলাম বরং আমরা ছিলাম যালিম’। সুরা আম্বিয়া : ৯৬-৯৭
এই আয়াতগুলো কিয়ামতের পূর্বে ইয়াজুজ ও মাজুজের আবির্ভাব এবং তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের বর্ণনা দেয়। আল্লাহ তায়ালা জানাচ্ছেন যে, যখন ইয়াজুজ ও মাজুজের বাঁধ মুক্ত করা হবে, তারা দ্রুত পৃথিবীর বিভিন্ন উঁচু স্থান থেকে ছড়িয়ে পড়বে, যা বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। এ সময় কিয়ামতের সত্য প্রতিশ্রুতি (ওয়াদা) নিকটবর্তী হবে। কাফিররা এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাবে এবং তাদের চোখ স্থির হয়ে যাবে। তারা আফসোস করে বলবে, তারা এই দিন সম্পর্কে উদাসীন ছিল এবং নিজেদের যালিম হিসেবে স্বীকার করবে।
ইয়াজুজ ও মাজুজদের সম্পর্কে সহিহ হাদিসের কিছু বর্ণনা :
১. ইয়া’জূজ ও মাজূজের প্রাচীর দ্বারা আটকিয়ে রাখা হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেন, ইয়া’জূজ ও মা’জূজের প্রাচীরে আল্লাহ এ পরিমাণ ছিদ্র করে দিয়েছেন। এই বলে, তিনি তাঁর হাতে নব্বই সংখ্যার আকৃতির মত করে দেখালেন। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৭, ৭১৩৬, সহিহ মুসলিম : ২৮৮১, আহমাদ : ৮৫০৯
যায়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) হতে বর্ণিত। একবার নবি ﷺ ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় তাঁর নিকট আসলেন এবং বলতে লাগলেন, লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আরবের লোকেদের জন্য সেই অনিষ্টের কারণে ধ্বংস অনিবার্য যা নিকটবর্তী হয়েছে। আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর এ পরিমাণ খুলে গেছে। এ কথা বলার সময় তিনি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলিল অগ্রভাগকে তার সঙ্গের শাহাদাত আঙ্গুলির অগ্রভাগের সঙ্গে মিলিয়ে গোলাকার করে ছিদ্রের পরিমাণ দেখান। যায়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে পুণ্যবান লোকজন থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হাঁ যখন পাপকাজ অতি মাত্রায় বেড়ে যাবে। সহহিহি বুখারি : ৩৩৪৬, ৩৫৯৮, ৭০৫৯, ৭১৩৫, সহিহ মুসলিম : ২৮৮০, সুনানে তিরমিজি : ২১৮৭, আহমাদ ২৬৮৬৭, ২৬৮৭০, , ২৭৪৮৬,, সহিহাহ ৯৮৭।
২. ইয়াজূজ-মাজূজের আত্মপ্রকাশ
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, ইয়াজূজ-মাজূজকে ছেড়ে দেয়া হবে, অতঃপর তারা বের হবে, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
’’তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি থেকে ছুটে আসবে। সুরা আম্বিয়া : ৯৬ এবং তারা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। মুসলিমগণ তাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবে এবং অবশিষ্ট মুসলিমরা তাদের শহরে ও দূর্গে আশ্রয় নিবে। সেখানে তারা তাদের গবাদি পশুও সাথে করে নিয়ে যাবে। ইয়াজূজ ও মাজূজের অবস্থা এই হবে যে, তাদের লোকগুলো একটি নহরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে এবং তার পানি পান করে নিঃশেষ করে ফেলবে, এক ফোঁটা পানিও অবশিষ্ট থাকবে না। এরপর এদের দলের অবশিষ্টরা তাদের নুসরণ করবে।
তখন তাদের মধ্যে কেউ বলবে, এখানে হয়তো কখনো পানি ছিলো। পৃথিবীতে তারা আধিপত্য বিস্তার করবে। অতঃপর তাদের কেউ বলবে, আমরা তো পৃথিবীবাসীদের থেকে অবসর হয়েছি। এবার আমরা আসমানবাসীদের বিরুদ্ধে লড়বো। শেষে এদের কেউ আকাশের দিকে বর্শা নিক্ষেপ করবে। তা রক্তে রঞ্জিত হয়ে ফিরে আসবে। তখন তারা বলবে, আমরা আসমানবাসীদেরও হত্যা করেছি। তাদের এ অবস্থায় থাকতে আল্লাহ তায়ালা টিড্ডি বাহিনী পাঠাবেন এবং সেগুলো ঘাড়ে প্রবেশ করার ফলে এরা সকলে ধ্বংস হয়ে একে অপরের উপর পড়ে মরে থাকবে। মুসলিমগণ সকালবেলা উঠে তাদের বীভৎস চীৎকার শুনতে না পেয়ে বলবে, এমন কে আছে যে তার নিজের জীবনকে বিক্রয় করবে এবং ইয়াজূজ-মাজূজেরা কী করছে তা দেখে আসবে? তখন তাদের মধ্যকার এক ব্যক্তি ইয়াজূজ-মাজূজ কর্তৃক নিহত হওয়ার পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে বের হয়ে এসে এদেরকে মৃত অবস্থায় দেখতে পেয়ে মুসলিমদের ডেকে বলবে, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো, তোমাদের শত্রুরা ধ্বংস হয়েছে। লোকজন (তার ডাক শুনে) বের হয়ে আসবে এবং তাদের গবাদি পশু চারণভূমিতে ছেড়ে দিবে। সেগুলোর চারণভূমিতে ইয়াজূজ-মাজূজের মাংস ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। ওরা তাদের মাংস খেয়ে বেশ মোটাতাজা হবে, যেমন কখনো ঘাস-পাতা খেয়ে মোটা তাজা হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৭৯, আহমাদ : ১১৩২৩, সহিহাহ : ১৭৯৩।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় ইয়াজূজ-মাজূজ প্রতিদিন সুড়ঙ্গপথ খনন করতে থাকে। এমনকি যখন তারা সূর্যের আলোকরশ্মি দেখার মত অবস্থায় পৌঁছে যায় তখন তাদের নেতা বলে, তোমরা ফিরে চলো, আগামী কাল এসে আমরা খনন কাজ শেষ করবো। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা (রাতের মধ্যে) সেই প্রাচীরকে আগের চেয়ে মযবুত অবস্থায় ফিরিয়ে দেন। যখন তাদের আবির্ভাবের সময় হবে এবং আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মানবকুলের মধ্যে পাঠাতে চাইবেন, তখন তারা খনন কাজ করতে থাকবে। শেষে যখন তারা সূর্যরশ্মি দেখার মত অবস্থায় পৌঁছবে তখন তাদের নেতা বলবে, এবার ফিরে চলো, ইনশাআল্লাহ আগামী কাল অবশিষ্ট খনন কাজ সম্পন্ন করবো। তারা ইনশাআল্লাহ শব্দ ব্যবহার করবে। সেদিন তারা ফিরে যাবে এবং প্রাচীর তাদের রেখে যাওয়া ক্ষীণ অবস্থায় থেকে যাবে। এ অবস্থায় তারা খননকাজ শেষ করে লোকালয়ে বের হয়ে আসবে এবং সমুদ্রের পানি পান করে শেষ করবে। মানুষ তাদের ভয়ে পালিয়ে দুর্গের মধ্যে আশ্রয় নিবে। তারা আকাশপানে তাদের তীর নিক্ষেপ করবে। রক্তে রঞ্জিত হয়ে তা তাদের দিকে ফিরে আসবে। তখন তারা বলবে, আমরা পৃথিবীবাসীদের চরমভাবে পরাভূত করেছি এবং আসমানবাসীদের উপরও বিজয়ী হয়েছি। অতঃপর আল্লাহ তাদের ঘাড়ে এক ধরনের কীট সৃষ্টি করবেন। কীটগুলো তাদের হত্যা করবে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, সেই মহান সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ! ভূপৃষ্ঠের গবাদি পশুগুলো সেগুলোর মাংস খেয়ে মোটাতাজা হয়ে মাংসল হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৮০, সুনানে তিরমিজি : ৩১৫৩, সহিহাহ : ১৭৩৫৮ হাদিসের মান সহিহ
নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মুসলিমগণ অচিরেই ইয়াজূজ ও মাজূজের তীর-ধনুক, বর্শাফলক এবং ঢালসমূহ সাত বছর ধরে জ্বালানি কাঠরূপে ভস্মীভূত করবে। সহিহ মুসলিম : ২৯৩৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০৭৬, সুনানে তিরমিজি : ২২৪০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৩২১, সহিহাহ : ১৯৪০।
যায়নাব বিনতে জাহ্শ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-
একদা নবি ﷺতাঁর নিকটে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি বলছিলেন, (لَا إلَهَ إلَا اللَّهُ)। আরবদের জন্য ধ্বংস! একটি অকল্যাণ তাদের অতি নিকটবর্তী হয়ে গেছে। আজ ইয়াজুজ-মা’জুযের প্রাচীর এই পরিমাণ খুলে দেয়া হয়েছে। এ কথা বলে তিনি হাতের বৃদ্ধাঙ্গল ও তার পার্শ্বের আঙ্গুল দিয়ে বৃত্ত তৈরী করে দেখালেন। যায়নাব বিনতে জাহ্শ (রা.) বলেন- আমি রাসুল ﷺকে বললামঃ হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মাঝে সৎ লোক থাকতেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো? নবি ﷺবললেন, হ্যাঁ, যখন পাপাচার বেড়ে যাবে’’। সহিহ বুখারি : ৭০৫৯, সহিহ মুসলিম : ২৮৮০
৩. ঈসা (আঃ) ইয়াজুজ-মা’জুজদের ধ্বংসের পর পৃথিবীর সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে আসবে।
নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
অতঃপর (দাজ্জালকে হত্যার পর) ঈসা (আঃ) এমন সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আঃ) তাদের কাছে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তায়ালা ঈসা (আঃ) এর প্রতি এ মর্মে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটেয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজ কাওমকে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি “বুহাইরায়ে তাবরিয়া”র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?
তারা আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দিনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আজাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে জমিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যথায় তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ’ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবে।
এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে জমিন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় জমিনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে জমিন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নিচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বারাকাত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভি এক গোত্রীয় মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরি এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবজ করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সহিহ মুসলিম : ২৯৩৭, সুনানে আবু দাউদ : ৪৩২৪, সুনানে তিরমিজি : ২২৩৪, সুনানে ইবন মাজাহ : ৪০৭৫। সহিহ মুসলিম থেকে হাদিসটি প্রাসঙ্গিক অংশ বিশেষ।
৪. ঈসা (আঃ) ইয়াজুজ-মাজুজকে ধ্বংস করবেন
নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
অতঃপর (দাজ্জালকে হত্যার পর) ঈসা (আঃ) এমন সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। ঈসা (আঃ) তাদের কাছে গিয়ে তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহের ব্যাপারে খবর দিবেন। এমন সময় আল্লাহ তায়ালা ঈসা (আঃ) এর প্রতি এ মর্মে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যে, আমি আমার এমন বান্দাদের আবির্ভাব ঘটেয়েছি, যাদের সঙ্গে কারোই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। অতঃপর তুমি আমার মুমিন বান্দাদেরকে নিয়ে তুর পাহাড়ে চলে যাও। তখন আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুজ-মাজুজ কাওমকে পাঠাবেন। তারা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীর সব প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। তাদের প্রথম দলটি “বুহাইরায়ে তাবরিয়া”র (ভূমধ্যসাগর) উপকূলে এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। তারপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে কোন সময় পানি ছিল কি?
তারা আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সাথীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দিনারের মূল্যের চেয়েও অধিক মূল্যবান প্রতিপন্ন হবে। তখন আল্লাহর নবি ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তায়ালা ইয়া’জুজ-মা’জুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আজাব পাঠাবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর মতো তারাও সবাই মরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তারপর ঈসা (আঃ) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে জমিনে বেরিয়ে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যথায় তাদের পচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ’ঈসা (আঃ) এবং তার সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তায়ালা উটের ঘাড়ের মতো লম্বা এক ধরনের পাখি পাঠাবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছানুসারে কোন স্থানে নিয়ে ফেলবে।
এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোন গৃহই আর অবশিষ্ট থাকবে না। এতে জমিন বিধৌত হয়ে উদ্ভিদ শূন্য মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় জমিনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে জমিন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন করো এবং তোমার বারাকাত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নিচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বারাকাত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই একদল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভি গাভি মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরি এক দাদার সন্তানদের (একটি ছোট গোত্রের) জন্য। এ সময় আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বায়ু প্রেরণ করবেন। এ বায়ু সকল মুমিন লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলিমদের রূহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকী থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সহিহ মুসলিম : ২৯৩৭, সুনানে আবু দাউদ : ৪৩২৪, সুনানে তিরমিজি : ২২৩৪, সুনানে ইবন মাজাহ : ৪০৭৫। সহিহ মুসলিম থেকে হাদিসটি প্রাসঙ্গিক অংশ বিশেষ।
৫. ইয়াজুজ ও মাজুজদের গণনা ধরে মুসলিমদের জান্নাত প্রদান করা হবে।
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত। নবি ﷺ বলেন, মহান আল্লাহ ডাকবেন, হে আদম (আঃ)! তখন তিনি জবাব দিবেন, আমি হাজির, আমি সৌভাগ্যবান এবং সকল কল্যাণ আপনার হতেই। তখন আল্লাহ বলবেন, জাহান্নামীদেরকে বের করে দাও। আদম (আঃ) বলবেন, জাহান্নামী কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় ছোটরা বুড়ো হয়ে যাবে। প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। মানুষকে দেখবে নেশাগ্রস্তের মত যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন- (হজ : ২)। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে সেই একজন কে? তিনি বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা তোমাদের মধ্য হতে একজন আর এক হাজারের অবশিষ্ট ইয়াজুজ-মাজুজ হবে। অতঃপর তিনি বললেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম। আমি আশা করি, তোমরা সমস্ত জান্নাতবাসীর এক তৃতীয়াংশ হবে। [আবু সাঈদ (রা.) বলেন] আমরা এ সংবাদ শুনে আবার আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি আবার বললেন, আমি আশা করি তোমরা সমস্ত জান্নাতীদের অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে আমরা আবারও আল্লাহু আকবার বলে তাকবীর দিলাম। তিনি বললেন, তোমরা তো অন্যান্য মানুষের তুলনায় এমন, যেমন সাদা ষাঁড়ের দেহে কয়েকটি কালো পশম অথবা কালো ষাঁড়ের শরীরে কয়েকটি সাদা পশম। সহিহ বুখারি : ৩৩৪৮, ৪৭৪১, ৬৫৩০, ৭৪৮৩।
৬. ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে একটি ভুল ধারন
অনেকে ধারনা করে থাকে যে, তারা শুধু আদম (আঃ)-এর বংশধর এবং আদম (আঃ)-এর স্বপ্নদোষ থেকে সৃষ্ট। কুরআন ও সহিহ হাদিসের কোথাও আদম (আঃ)-এর স্বপ্নদোষ থেকে ইয়াজুজ-মাজুজের সৃষ্টির বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এ ধরনের বর্ণনাগুলো সাধারণত ইসরাঈলিয়াত বা লোককথার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা নির্ভরযোগ্য ইসলামি উৎস দ্বারা সমর্থিত নয়। তাই এ মতটি অধিকাংশ ইসলামি পণ্ডিত ও আলেমদের দ্বারা সমর্থিত নয়। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি করেন এবং মানবজাতির ধারাবাহিকতা আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-এর মাধ্যমেই চলে আসছে।