ইসলামি বিধানের বৈজ্ঞানিক সত্যতা : পর্ব ছয়

মাছির ডানায় রোগ ও আরোগ্য

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক নির্দেশনা রয়েছে যা তৎকালীন সময়ে মানুষের কাছে রহস্যময় মনে হলেও বর্তমান বিজ্ঞান সেগুলোর যথার্থতা প্রমাণ করছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হলো খাবারের পাত্রে মাছি পড়লে তাকে ডুবিয়ে দেওয়া সংক্রান্ত হাদীসটি।

১. হাদীসের বর্ণনা ও প্রেক্ষাপট

হযরত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

قَالَ إِذَا وَقَعَ الذُّبَابُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْمِسْه“ كُلَّه“ ثُمَّ لِيَطْرَحْه“ فَإِنَّ فِي أَحَدِ جَنَاحَيْهِ شِفَاءً وَفِي الآخَرِ دَاءً.

“যখন তোমাদের কারও কোনো পানীয় পাত্রে মাছি পড়ে, তখন সে যেন তাকে তাতে ডুবিয়ে দেয় এবং তারপর তা তুলে ফেলে দেয়। কারণ তার এক ডানায় রোগ রয়েছে এবং অন্য ডানায় রয়েছে আরোগ্য (প্রতিষেধক)।” সহিহ বুখারি: ৩৩২০, ৫৭৮২

চৌদ্দশ বছর আগে যখন অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা অণুজীব বিজ্ঞান (Microbiology) সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণাই ছিল না, তখন নবী করীম (সা.)-এর এই ঘোষণা ছিল এক অভাবনীয় বার্তা।

২. আধুনিক বিজ্ঞানের পরীক্ষা ও প্রমাণ

বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মাছি নিয়ে গবেষণা করে রাসূল (সা.)-এর বাণীর সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন।

ডক্টর ওয়াজিহ বায়েশরীর গবেষণা:

কিং আব্দুল আজীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিশেষজ্ঞ মাছির বাজার থেকে মাছি সংগ্রহ করে জীবাণুমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা চালান। তিনি দেখেন যে, মাছি যখন পানিতে পড়ে, তখন পানি রোগজীবাণুতে আক্রান্ত হয়। কিন্তু যখনই মাছিকে ওই পানিতে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিস্ময়করভাবে পানির জীবাণুর ঘনত্ব কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে তা নির্মূল হয়। এটি প্রমাণ করে যে, মাছির শরীরেই এমন কিছু রয়েছে যা জীবাণুকে ধ্বংস করতে সক্ষম।

অ্যান্টিবায়োটিক এবং ব্যাকটেরিওফ্যাজ:

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাছির শরীরের উপরিভাগে বা বহিঃত্বকে প্রচুর পরিমাণে ‘ব্যাকটেরিওফ্যাজ’ (Bacteriophage) বা ভাইরাস নাশক উপাদান থাকে। এটি এমন এক প্রকার ভাইরাস যা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলে। মাছি যখন নোংরা স্থানে বসে, তখন তার ডানায় বিভিন্ন রোগজীবাণু আটকে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার অন্য ডানায় এমন এক ধরণের প্রতিষেধক বা এনজাইম দিয়েছেন, যা ওই জীবাণুগুলোকে অকেজো করে দেয়।

৩. মাছির প্রতিরক্ষা কৌশল

মাছি যখন কোনো তরল বা খাদ্যে বসে, তখন সে আত্মরক্ষার জন্য বা ভারসাম্য রক্ষার জন্য সাধারণত তার একটি ডানা উঁচিয়ে রাখে এবং অন্যটি ডুবিয়ে দেয়। দুর্ভাগ্যবশত, যে ডানায় বিষ বা রোগজীবাণু থাকে, সেটিই আগে খাবারে স্পর্শ করে। কিন্তু যখন মাছিটিকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেওয়া হয়, তখন অন্য ডানায় থাকা প্রতিষেধকগুলো (যেমন: প্রোটিন যৌগ ও এনজাইম) খাদ্যে মিশে যায় এবং জীবাণুগুলোকে নিউট্রালাইজ বা ধ্বংস করে দেয়।

৪. আন্তর্জাতিক গবেষণা ও স্বীকৃতি

•      জার্মান ও ব্রিটিশ গবেষণা: শাইখ মোস্তফা এবং শাইখ খালীল মোল্লা তাদের সংকলিত বইয়ে দেখিয়েছেন যে, জার্মানি ও ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা মাছি থেকে এমন সব অ্যান্টিবায়োটিক বের করেছেন যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অনেক নামী দামী ঔষধের চেয়েও কার্যকর।

•      কানাডিয়ান গবেষণা রিপোর্ট: রিয়াদে অনুষ্ঠিত চিকিৎসা সম্মেলনে কানাডার গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, মাছিতে এমন কিছু নির্দিষ্ট উপাদান রয়েছে যা ক্ষতিকর প্যাথোজেন বা জীবাণু ধ্বংসকারী হিসেবে কাজ করে।

•      অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকুয়ারি ইউনিভার্সিটি: এখানকার গবেষকরাও মাছির সারফেস বা উপরিভাগ থেকে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল প্রপার্টি খুঁজে পেয়েছেন।

৫. কেন মাছিকে ডুবিয়ে দিতে হবে?

সাধারণভাবে মাছি কোনো খাবারে পড়লে আমরা ঘৃণায় তা ফেলে দেই। কিন্তু যদি খাবারটি মূল্যবান হয় বা দুষ্প্রাপ্য হয়, তবে মাছি ফেলে দিয়ে খাবারটি নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। মাছিকে ডুবিয়ে দিলে তার ডানার প্রতিষেধক নির্গত হয়। ফলে খাবারের বিষক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায় এবং তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ হয়ে ওঠে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং একটি নিখুঁত স্বাস্থ্যবিধি।

৬. নবুওয়াতের অকাট্য প্রমাণ

তৎকালীন আরব সমাজে কোনো ল্যাবরেটরি বা উন্নত প্রযুক্তি ছিল না। একজন উম্মি বা নিরক্ষর নবীর পক্ষে মাছির ডানার অণুবীক্ষণিক জীবাণু এবং তার প্রতিষেধক সম্পর্কে জানা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না যদি না তা মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে ওহী হিসেবে আসত। এটি প্রমাণ করে যে, আল-কুরআন এবং সুন্নাহর প্রতিটি নির্দেশ মানবজাতির কল্যাণের জন্য এবং তা এক মহাশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।

মাছির ডানা নিয়ে এই বৈজ্ঞানিক সত্য রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতের অন্যতম বড় নিদর্শন। এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইসলামের বিধানগুলো সর্বদা বিজ্ঞানমনস্ক এবং মানবদেহের জন্য হিতকর। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা ইসলামের প্রতিটি বিধানের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও যৌক্তিকতা আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *