পুলসিরাত ও আরাফ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পুলসিরাত:

পুলসিরাত এর শাব্দিক অর্থ হলো পথ বা সেতু। ইসলামী পরিভাষায়, এটি হলো এমন একটি সেতু যা কিয়ামতের দিন জাহান্নামের ওপর স্থাপন করা হবে। মু’মিনগণ এই সেতু পার হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন, আর পাপীরা সেখান থেকে জাহান্নামে পতিত হবে। পুলসিরাত সম্পর্কে সরাসরি কোনো আয়াতে নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে, যা দিয়ে পুলসিরাতের ধারণাকে ব্যাখ্যা করা যায়। ইসলামি পণ্ডিতগণ ও মুফাসসিরগণ এই আয়াতগুলোকে পুল সিরাতের বর্ণনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। যেমন-

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِنْ مِّنْکُمْ اِلَّا وَارِدُہَا ۚ  کَانَ عَلٰی رَبِّکَ حَتْمًا مَّقْضِیًّا ۚ

এবং তোমাদের প্রত্যেকেই ওটা অতিক্রম করবে; ওটা তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত। সূরা মারইয়াম : ৭১

এই আয়াতে ‘ওয়ারিদুহা’ (অতিক্রমশ করবে) শব্দটি নিয়ে মুফাসসিরদের দুটি মত আছে:

১. এর অর্থ হলো সবাই জাহান্নামের পাশ দিয়ে অতিক্রমশ করবে।

২. এর অর্থ হলো সবাই পুল সিরাতের উপর দিয়ে অতিক্রমশ করবে, যা জাহান্নামের উপর স্থাপন করা হবে।

এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই অধিকাংশ পণ্ডিত গ্রহণ করেছেন। কারণ, এই আয়াতে বলা হয়েছে, সবাইকেই জাহান্নামের উপর দিয়ে যেতে হবে, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদেরকে (সৎকর্মশীলদের) রক্ষা করবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ثُمَّ نُنَجِّی الَّذِیْنَ اتَّقَوْا وَّنَذَرُ الظّٰلِمِیْنَ فِیْہَا جِثِیًّا

পরে আমি মুত্তাকীদেরকে উদ্ধার করব এবং যালিমদের সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব। সূরা মারইয়াম: ৭২

এই আয়াতে বলা হয়েছে, যারা পরহেজগার, আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন। এই রক্ষা করার বিষয়টি পুল সিরাতের সাথে সম্পর্কিত। যারা পুল সিরাত পার হতে পারবে, তারা হবে মুত্তাকি এবং যারা তা পারবে না, তারা জাহান্নামে পড়ে যাবে।

আয়িশা (রাদি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। আল্লাহ বলেন-

یَوْمَ تُبَدَّلُ الْاَرْضُ غَیْرَ الْاَرْضِ وَالسَّمٰوٰتُ وَبَرَزُوْا لِلّٰہِ الْوَاحِدِ الْقَہَّارِ

যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হবে এবং আকাশমন্ডলীও এবং মানুষ উপস্থিত হবে আললাহর সামনে, যিনি এক, পরাক্রমশালী। সূরাহ ইবরাহীম ১৪: ৪৮।

সে দিন সকল মানুষ কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, ’পুলসিরাতের উপর। সহিহ মুসলিম : ২৭৯১, মিশকাত : ৫৫২৫, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৩৩১।

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

فَجُعِلَ عَلَى الصِّرَاطِ كَلاَلِيبُ، وَشَوْكٌ مِثْلَ شَوْكِ السَّعْدَانِ، ثُمَّ يَمُرُّ الْمُؤْمِنُونَ عَلَى الصِّرَاطِ، فَمِنْهُمْ مَنْ يَمُرُّ بِسُرْعَةٍ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُخْتَطَفُ، فَيَقَعُ فِي النَّارِ، فَيُقَالُ لَهُ: مَا تَعْبُدُ؟ فَيَقُولُ: كُنْتُ أَعْبُدُ اللَّهَ

এরপর পুলসিরাতের উপর কাঁটা ও হুক স্থাপন করা হবে, যা সাদানের কাঁটার মতো হবে। এরপর মুমিনগণ পুলসিরাতের উপর দিয়ে পার হবে। তাদের মধ্যে কেউ দ্রুত পার হবে, আবার কাউকে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে। সহিহ বুখারী : ৭৪৩৯ -এর একটি অংশ। সম্পূর্ণ হাদিসটি পর দেওয়া আছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত।  রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

‏”‏يُضْرَبُ الصِّرَاطُ بَيْنَ ظَهْرَانَىْ جَهَنَّمَ، فَأَكُونُ أَنَا وَأُمَّتِي أَوَّلَ مَنْ يُجِيزُهَا‏”‏‏.‏

জাহান্নামের মাঝখানে পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। তখন আমি এবং আমার উম্মত সর্বপ্রথম তা পার হব। সহিহ বুখারী : ৭৪৩৭-এর একটি অংশ। সম্পূর্ণ হাদিসটি পর দেওয়া আছে।

আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

“‏يُعْطَى كُلُّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ نُورُهُ، فَيُسْطِعُ كُلُّ مُؤْمِنٍ وَمُؤْمِنَةٍ نُورُهُ فَيَسِيرُونَ عَلَى الصِّرَاطِ‏”‏‏.‏

“প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে তার নূর (আলো) দেওয়া হবে। সেই আলো তাদের সামনে থাকবে এবং তারা পুলসিরাতের উপর দিয়ে চলতে থাকবে। মুস্তাদরাকে হাকিম : ৪৬২৯

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

“مَنْ كَانَتْ لَهُ حَاجَةٌ إِلَى ذِي سُلْطَانٍ فِي تَفْرِيجِ كُرْبَةٍ أَوْ قَضَاءِ حَاجَةٍ لِأَخِيهِ الْمُسْلِمِ، فَقَامَ لَهَا، فَاللَّهُ جَلَّ وَعَلَا يُجِيزُهُ عَلَى الصِّرَاطِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حِينَ تَزِلُّ الْأَقْدَامُ”

যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ সাধন অথবা কষ্ট দূর করার জন্য কোনো শাসকের কাছে যাওয়ার মাধ্যম হবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন যখন (পুলসিরাতে) মানুষের পা পিছলে যাবে, তখন তাকে পুলসিরাত পার করাবেন। সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৩১

হুযায়ফাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) এ থেকে শাফা’আতের হাদীস বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি (সা.) বলেছেন-

আমানত ও আত্মীয়তাকে পাঠানো হবে, তখন উভয়টি পুলসিরাতের ডানে ও বামে উভয় পার্শ্বে দাঁড়াবে। সহিহ মুসলিম : ১৯৫, মিশকাত : ৫৫৭৬, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৬৪২।

১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন পুলসিরাতের কাছে থাকবেন।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিবেদন করলাম যে, তিনি যেন কিয়ামত দিবসে আমার জন্য সুপারিশ করেন। তিনি বললেন, ঠিক আছে আমি সুপারিশ করব। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমি আপনাকে কোথায় খোঁজ করব? তিনি বললেন, তুমি সর্বপ্রথম আমাকে পুলসিরাতের সামনে খোঁজ করবে। আমি বললাম, পুলসিরাতে যদি আপনাকে না পাই? তিনি বললেন, তাহলে মীযানের ঐখানে খুঁজবে। আমি আবার বললাম, মীযানের ঐখানেও যদি আপনাকে না পাই? তিনি বললেন, তাহলে হাওযে কাওসারের সামনে খুঁজবে। আমি এ তিনটি জায়গার যে কোন একটিতে অবশ্যই উপস্থিত থাকব। সুনানে তিরমিজি : ২৪৩৩, মিশকাত : ৫৫৯৫

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত-

(কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে)…….রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’আর নিমিত্ত দাঁড়াবেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করা হবে। আমানাত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, পুল-সিরাতের ডানে-বামে এসে দাঁড়াবে। আর তোমাদের প্রথম দলটি এ সিরাতে, বিদ্যুৎ গতিতে পার হয়ে যাবে। সাহাবা বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক। আমাকে বলে দিন “বিদ্যুৎ গতির ন্যায়” কথাটির অর্থ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আকাশের বিদ্যুৎ চমক কি কখনো দেখনি? চোখের পলকে এখান থেকে সেখানে চলে যায় আবার ফিরে আসে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বায়ুর বেগে, পাখির গতিতে, তারপর লম্বা দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে তা অতিক্রম করবে। আর তোমাদের নবী সে অবস্থায় পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দু’আ করতে থাকবে, আল্লাহ এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন, এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন।

এরূপে মানুষের আমল মানুষকে চলতে অক্ষম করে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা এ সিরাত অতিক্রম করতে থাকবে। শেষে এক ব্যক্তিকে দেখা যাবে সে নিতম্বের উপর ভর করে পথ অতিক্রম করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, সিরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। এরা আল্লাহর নির্দেশত্রুমে চিহ্নিত পাপীদেরকে পাকড়াও করবে। তন্মধ্যে কাউকে তো ক্ষত-বিক্ষত করেই ছেড়ে দিবে; অতঃপর সে নাজাত পাবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, শপথ সে সত্তার যার হাতে আবূ হুরাইরাহর প্রাণ! জেনে রেখ, জাহান্নামের গভীরতা সত্তর খারীফ (অর্থাৎ- সত্তর হাজার বছরের পথের ন্যায়। আংশিক সহিহ মুসলিম : ১৯৫

২. জাহান্নামের উপর দুর্গম পিচ্ছিল পুল স্থান করা হবে

আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের রবের দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেনঃ মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেনঃ সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না। এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ’ইবাদত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রুশপূজারী ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রুশের কাছে। মূর্তিপূজারীরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়র (আঃ)-এর ’ইবাদত করতাম।

তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ’ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসীহের ’ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ’ইবাদতকারীগণ। তাদের নেক্কার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন্ জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল।

আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ’ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এরপর মহাক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রবব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবীগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে।

এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সিজদা্য় পড়ে যাবে। বাকি থাকবে তারা, যারা লোক-দেখানো এবং লোক-শোনানো সিজদা্ করেছিল। তবে তারা সিজদার মনোভাব নিয়ে সিজদা্ করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের মেরুদন্ড একটি তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে। এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবীগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেনঃ দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো।

তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। এ কবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে। এখন তোমরা হকের বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক কঠোর নও, যতটুকু সেদিন ঈমানদারগণ আল্লাহর সম্মুখে হয়ে থাকবে, যা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যখন ঈমানদারগণ এ দৃশ্যটি দেখবে যে, তাদের ভাইদেরকে রেখে একমাত্র তারাই মুক্তি পেয়েছে, তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের সেসব ভাই কোথায়, যারা আমাদের সঙ্গে সালাত আদায় করত, সওম পালন কত, নেক কাজ করত? তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে এক দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আল্লাহ্ তাদের মুখমণ্ডল জাহান্নামের ওপর হারাম করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ দু’পা ও দু’পায়ের নলার বেশি পর্যন্ত জাহান্নামের মধ্যে থাকবে।

তারা যাদেরকে চিনতে পারে, তাদেরকে বের করবে। তারপর এরা আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ আবার তাদেরকে বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অর্ধ দ্বীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা গিয়ে তাদেরকেই বের করে নিয়ে আসবে, যাদেরকে তারা চিনতে পারবে। তারপর আবার ফিরে আসবে। আল্লাহ্ তাদেরকে আবার বলবেন, তোমরা যাও, যাদের অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। তারা যাদেরকে চিনতে পারবে তাদেরকে বের করে নিয়ে আসবে। বর্ণনাকারী আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না কর, তাহলে আল্লাহর এ বাণীটি পড়ঃ ’’আল্লাহ অণু পরিমাণও যুল্ম করেন না, আর কোন পুণ্য কাজ হলে তাকে তিনি দ্বিগুণ করেন’’- (সূরাহ আন্-নিসা ৪/৪০)। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ফেরেশ্তা ও মু’মিনগণ সুপারিশ করবে। তখন মহা পরাক্রান্ত আল্লাহ্ বলবেন, এখন শুধু আমার শাফাআতই বাকী রয়েছে।

তিনি জাহান্নাম থেকে একমুষ্টি ভরে এমন কতগুলো কওমকে বের করবেন, যারা জ্বলে পুড়ে দগ্ধ হয়ে গিয়েছে। তারপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখে অবস্থিত ’হায়াত’ নামের নহরে ঢালা হবে। তারা সে নহরের দু’পার্শ্বে এমনভাবে উদগত হবে, যেমন পাথর এবং গাছের কিনারে বয়ে আনা আবর্জনায় বীজ থেকে তৃণ উদগত হয়। দেখতে পাও তার মধ্যে সূর্যের আলোর অংশের গাছগুলো সাধারণত সবুজ হয়, ছায়ার অংশেরগুলো সাদা হয়। তারা সেখান থেকে মুক্তার দানার মত বের হবে। তাদের গর্দানে মোহর লাগানো হবে। জান্নাতে তারা যখন প্রবেশ করবে, তখন অন্যান্য জান্নাতবাসীরা বলবেন, এরা হলেন রাহমান কর্তৃক আযাদকৃত যাদেরকে আল্লাহ্ কোন নেক ’আমল কিংবা কল্যাণকর কাজ ব্যতীতই জান্নাতে দাখিল করেছেন। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ তোমরা যা দেখেছ, সবই তো তোমাদের, এর সঙ্গে আরো সমপরিমাণ তোমাদেরকে দেয়া হলো। সহিহ বুখারি : ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ১৮৩, আহমাদ : ১১১২৭

৩. রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম পুল অতিক্রম করবেন

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার কয়েকজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? উত্তরে তিনি বললেনঃ সূর্যের নিচে যখন কোন মেঘ না থাকে তখন তা দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়? তারা বলল, না, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ পূর্ণিমার চাঁদ যদি মেঘের আড়ালে না থাকে তবে তা দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়? তারা বলল, না হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ তোমরা অবশ্যই কিয়ামতের দিন আল্লাহকে ঐরূপ দেখতে পাবে। আল্লাহ্ মানুষকে একত্রিত করে বলবেন, (দুনিয়াতে) তোমরা যে যে জিনিসের ’ইবাদাত করেছিলে সে তার সঙ্গে চলে যাও।

অতএব সূর্যের পূজারী সূর্যের সঙ্গে, চন্দ্রের পূজারী চন্দ্রের সঙ্গে এবং মূর্তি পূজারী মূর্তির সঙ্গে চলে যাবে। অবশিষ্ট থাকবে এ উম্মাতের লোকেরা, যাদের মাঝে মুনাফিক সম্প্রদায়ের লোকও থাকবে। তারা আল্লাহকে যে আকৃতিতে জানত, তার আলাদা আকৃতিতে আল্লাহ্ তাদের কাছে হাযির হবেন এবং বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক। তখন তারা বলবে, আমরা তোমার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। আমাদের প্রতিপালক না আসা পর্যন্ত আমরা এ স্থানেই থেকে যাব। আমাদের প্রতিপালক যখন আমাদের কাছে আসবেন, আমরা তাকে চিনে নেব। এরপর যে আকৃতিতে তারা আল্লাহকে জানত সে আকৃতিতে তিনি তাদের কাছে হাযির হবেন এবং বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক। তখন তারা বলবে (হাঁ) আপনি আমাদের প্রতিপালক। তখন তারা আল্লাহর অনুসরণ করবে। অতঃপর জাহান্নামের পুল স্থাপন করা হবে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, সর্বপ্রথম আমি সেই পুল অতিক্রম করব। আর সেই দিন সমস্ত রাসূলের দু’আ হবে اللهُمَّ سَلِّمْ سَلِّمْ অর্থাৎ হে আল্লাহ্! রক্ষা কর, রক্ষা কর। সেই পুলের মাঝে সা’দান নামক (এক রকম কাঁটাওয়ালা) গাছের কাঁটার মত কাঁটা থাকবে। তোমরা কি সা’দানের কাঁটা দেখেছ? তারা বলল, হ্যাঁ, ইয়া রাসূরাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ কাঁটাগুলি সা’দানের কাঁটার মতই হবে, তবে তা যে কত বড় হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানে না। সে কাঁটাগুলি মানুষকে তাদের ’আমল অনুসারে ছিনিয়ে নেবে। তাদের মাঝে কতক লোক এমন হবে যে তাদের ’আমলের কারণে ধ্বংস হয়ে যাবে। আর কতক লোক এমন হবে যে তাদের ’আমল হবে সরিষার মত নগণ্য। তবুও তারা নাজাত পাবে। এমন কি আল্লাহ্ বান্দাদের বিচার সমাপ্ত করবেন এবং لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ এর সাক্ষ্যদাতাদের থেকে যাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করার ইচ্ছা করবেন আল্লাহ্ তাদেরকে বের করার জন্য ফেরেশতাদেরকে আদেশ করবেন। সিজদার চিহ্ন দেখে ফেরেশতারা তাদেরকে চিনতে পারবে।

আর আল্লাহ্ বানী আদমের ঐ সিজদার স্থানগুলোকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। কাজেই ফেরেশ্তারা তাদেরকে এমন অবস্থায় বের করবে যে, তখন তাদের দেহ থাকবে কয়লার মত। তারপর তাদের দেহে পানি ঢেলে দেয়া হবে। যাকে বলা হয় ’মাউল হায়াত’ জীবন-বারি। সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসা আবর্জনায় যেমন গাছ জন্মায়, পরে এগুলো যেমন সজীব হয় তারাও সেরকম সজীব হয়ে যাবে। এ সময় জাহান্নামের দিকে মুখ করে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকবে আর বলবে, হে প্রভু! জাহান্নামের লু হাওয়া আমাকে ঝলসে দিয়েছে, এর তেজ আমাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সুতরাং তুমি আমার চেহারাটা জাহান্নামের দিক থেকে ঘুরিয়ে দাও। এভাবে সে আল্লাহকে ডাকতে থাকবে। তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ আমি যদি তোমাকে এটা দিয়ে দেই তবে তুমি আর অন্যটি চাইবে? লোকটি বলবে, না। আল্লাহ্, তোমার ইয্যতের কসম! আর অন্যটি চাইব না। তখন তার চেহারাটা জাহান্নামের দিক থেকে ঘুরিয়ে দেয়া হবে। এরপর সে বলবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে জান্নাতের দরজার কাছে পৌঁছে দাও। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বলনি যে, তুমি আমার কাছে আর অন্য কিছু চাইবে না? আফসোস তোমার জন্য আদম সন্তান! তুমি বড়ই বিশ্বাসঘাতক! সে এরূপই প্রার্থনা করতে থাকবে।

তখন আল্লাহ বলবেনঃ সম্ভবত আমি যদি তোমাকে এটা দিয়ে দেই তবে তুমি অন্য আরেকটি আমার কাছে চাইবে। লোকটি বলবে, না, তোমার ইয্যাতের কসম! অন্যটি আর চাইব না। তখন সে আল্লাহর সাথে ওয়াদা করবে যে, সে আর কিছুই চাইবে না। তখন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতের দরজার নিকটে নিয়ে দিবেন। সে যখন জান্নাতের ভিতরের নিয়ামতগুলো দেখতে পাবে, তখন আল্লাহ্ যতক্ষণ চাইবেন ততক্ষণ সে চুপ থাকবে। এরপরই সে বলতে থাকবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। তখন আল্লাহ্ বলবেন, তুমি কি বল নাই যে তুমি আর কিছু চাইবে না? আফসোস তোমার জন্য হে আদম সন্তান! তুমি কতইনা বিশ্বাসঘাতক।

লোকটি বলবে, হে প্রতিপালক! তুমি আমাকে তোমার সৃষ্ট জীবের মাঝে সবচেয়ে হতভাগ্য কর না। এভাবে সে চাইতেই থাকবে। শেষে আল্লাহ্ হেসে দিবেন। আর আল্লাহ্ যখন হেসে দিবেন, তখন তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে দেবেন। এরপর সে যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন তাকে বলা হবে, তোমার যা ইচ্ছে হয় আমার কাছে চাও। সে চাইবে, এমনকি তার সব চাহিদা ফুরিয়ে যাবে। তখন আল্লাহ্ বলবেনঃ এগুলো তোমার এবং আরো এতটা তোমার। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, ঐ লোকটি হচ্ছে সবশেষে জান্নাতে প্রবেশকারী। রাবী বলেন যে, এ সময় আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৮০৬, ৬৫৭৩, ৭৩৩৭, সহিহ মুসলিম : ১৮২, আহমাদ  : ৭৭২১

৪. পুলসিরাতের উপর কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা থাকবে

জাবির ইবনু আবদুল্লাহকে কুরআনে উল্লেখিত الْوُرُودِ অর্থাৎ (পুলসিরাতের উপর দিয়ে) অতিক্রম করতে হবে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, কিয়ামতের দিন আমরা এরূপে আসব। তিনি মাথা উচু করে দেখালেন। এরপর একে একে প্রত্যেক জাতিকে তাদের নিজ নিজ দেব-দেবী ও উপাস্যের নামসহ ডাকা হবে। তারপর আল্লাহ আমাদের (মু’মিনদের) নিকট এসে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কার অপেক্ষায় রয়েছ? মুমিনগণ বলবে, আমাদের প্রতিপালকের অপেক্ষায় আছি। তিনি বলবেন, আমিই তে তোমাদের প্রতিপালক। তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে না দেখব (আমরা তা মানছি না)। এরপর আল্লাহ তখন এমনভাবে উদ্ভাসিত হবেন যে, তিনি হাসছেন। অনন্তর তিনি তাদের নিয়ে চলবেন এবং মুমিনগণ তার অনুসরণ করবে। মুনাফিক কি মুমিন প্রত্যেক মানুষকেই নূর প্রদান করা হবে। তারপর তারা এর অনুসরণ করবে।

জাহান্নামের পুলের উপর থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে সেগুলো পাকড়াও করবে। মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। আর মুমিনগণ নাযাত পাবেন। প্রথম দল হবে সত্তর হাজার লোকের, তাদের কোন হিসাবই নেয়া হবে না। তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমা রাতের চাদের ন্যায় উজ্জ্বল। তারপর আরেক দল আসবে তাদের মুখমণ্ডল হবে আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের ন্যায় দীপ্ত। এভাবে পর্যায়ক্রমে সকলে পার হয়ে যাবে। তারপর শাফাআতের অনুমতি প্রদান করা হবে। ফলে সকলেই শাফা’আত করবে। এমনকি যে ব্যক্তি “লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ” স্বীকার করেছে এবং যার অন্তরে সামান্য যব পরিমাণ ঈমান অবশিষ্ট আছে তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আনা হবে। পরে এদেরকে জান্নাতের আঙিনায় জমায়েত করা হবে, আর জান্নাতীগণ তাদের গায়ে পানি সিঞ্চন করবেন, ফলে তারা এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে যেমনভাবে কোন উদ্ভিদ স্রোতবাহিত পানির ধারে সতেজ হয়ে উঠে। আগুনে পোড়া দাগসমূহ মুছে যাবে। এরপর তারা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা জানাবে। আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করবেন। তাদের প্রত্যেককে পৃথিবীর ন্যায় এবং তৎসহ আরো দশগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। সহিহ মুসলিম : ১৯১

৫. মুমিনগন তাদের আমল অনুসারে পুলসিরাত পার হবে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা’আলা সকল মানুষকে একত্রিত করবেন। মু’মিনগণ দাঁড়িয়ে থাকবে। জান্নাত তাদের নিকটবর্তী করা হবে। অবশেষে সবাই আদমের নিকট এসে বলবে, আমাদের জন্য জান্নাত খুলে দেয়ার প্রার্থনা করুন। আদম (আঃ) বলবেন, তোমাদের পিতা আদমের পদস্খলনের কারণেই তো তোমাদেরকে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হয়েছিল। সুতরাং আমি এর যোগ্য নই। আমার পুত্র ইবরাহীমের নিকট যাও। তিনি আল্লাহর বন্ধু। এরপর সবাই ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, না, আমিও এর যোগ্য নই, আমি আল্লাহর বন্ধু ছিলাম বটে, তবে তা ছিল দূরে দূরে থেকে। তোমরা মূসার নিকট যাও। কারণ তিনি আল্লাহর সাথে সরাসরি বাক্যালাপ করেছেন। সবাই মূসার নিকট আসবে। তিনি বলবেনঃ আমিও এর যোগ্য নই বরং তোমরা ঈসার নিকট যাও। তিনি আল্লাহর কালিমাহ ও রূহ। (সবাই তার নিকট আসলে) তিনি বলবেনঃ আমি তার উপযুক্ত নই। তখন সকলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসবে।

তিনি দু’আর নিমিত্ত দাঁড়াবেন এবং তাকে অনুমতি প্রদান করা হবে। আমানাত ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, পুল-সিরাতের ডানে-বামে এসে দাঁড়াবে। আর তোমাদের প্রথম দলটি এ সিরাতে, বিদ্যুৎ গতিতে পার হয়ে যাবে। সাহাবা বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক। আমাকে বলে দিন “বিদ্যুৎ গতির ন্যায়” কথাটির অর্থ কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আকাশের বিদ্যুৎ চমক কি কখনো দেখনি? চোখের পলকে এখান থেকে সেখানে চলে যায় আবার ফিরে আসে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর পরবর্তী দলগুলো যথাক্রমে বায়ুর বেগে, পাখির গতিতে, তারপর লম্বা দৌড়ের গতিতে পার হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই তার আমল হিসেবে তা অতিক্রম করবে। আর তোমাদের নবী সে অবস্থায় পুলসিরাতের উপর দাঁড়িয়ে এ দু’আ করতে থাকবে, আল্লাহ এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন, এদেরকে নিরাপদে পৌছিয়ে দিন।

এরূপে মানুষের আমল মানুষকে চলতে অক্ষম করে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা এ সিরাত অতিক্রম করতে থাকবে। শেষে এক ব্যক্তিকে দেখা যাবে সে নিতম্বের উপর ভর করে পথ অতিক্রম করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, সিরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। এরা আল্লাহর নির্দেশত্রুমে চিহ্নিত পাপীদেরকে পাকড়াও করবে। তন্মধ্যে কাউকে তো ক্ষত-বিক্ষত করেই ছেড়ে দিবে; অতঃপর সে নাজাত পাবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে। আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন, শপথ সে সত্তার যার হাতে আবূ হুরাইরাহর প্রাণ! জেনে রেখ, জাহান্নামের গভীরতা সত্তর খারীফ (অর্থাৎ- সত্তর হাজার বছরের পথের ন্যায়। সহিহ মুসলিম : ১৯৫

৬. জাহান্নাম ও জান্নাতের মধ্যে একটি সেতু থাকবে।

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِذَا خَلَصَ الْمُؤْمِنُونَ مِنْ النَّارِ حُبِسُوا بِقَنْطَرَةٍ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ فَيَتَقَاصُّونَ مَظَالِمَ كَانَتْ بَيْنَهُمْ فِي الدُّنْيَا حَتَّى إِذَا نُقُّوا وَهُذِّبُوا أُذِنَ لَهُمْ بِدُخُولِ الْجَنَّةِ فَوَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لأحَدُهُمْ بِمَسْكَنِهِ فِي الْجَنَّةِ أَدَلُّ بِمَنْزِلِهِ كَانَ فِي الدُّنْيَا وَقَالَ يُونُسُ بْنُ مُحَمَّدٍ حَدَّثَنَا شَيْبَانُ عَنْ قَتَادَةَ حَدَّثَنَا أَبُو الْمُتَوَكِّلِ

যখন মু’মিনগণ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে, তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি সেতুতে (ক্বানত্বরাহ) আটকে রাখা হবে। সেখানে দুনিয়াতে তাদের পরস্পরের মধ্যে যে সব জুলুম ও অন্যায় ছিল, তার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা সম্পূর্ণ পরিশুদ্ধ ও পবিত্র হবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! তাদের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তি তার দুনিয়ার বাসস্থানের চেয়ে জান্নাতের বাসস্থানকে অধিক সহজে চিনবে। সহিহ বুখারি : ২৪৪০, ৬৫৩৫

আল আরাফ :

আরাফ (الأعراف) হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে অবস্থিত একটি উঁচু স্থান বা প্রাচীর। এর নামেই কুরআনের একটি সূরার নামকরণ করা হয়েছে, সূরা আল-আরাফ। যারা এখানে অবস্থান করবে, তাদের বলা হয় ‘আহলুল আ’রাফ’ (আরাফবাসী)। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আ’রাফের ৪৬ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াতে আরাফের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতগুলো থেকে আরাফ সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হলো

১. আরাফের অবস্থান :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَبَیْنَہُمَا حِجَابٌ ۚ وَعَلَی الْاَعْرَافِ رِجَالٌ یَّعْرِفُوْنَ کُلًّۢا بِسِیْمٰہُمْ ۚ وَنَادَوْا اَصْحٰبَ الْجَنَّۃِ اَنْ سَلٰمٌ عَلَیْکُمْ ۟ لَمْ یَدْخُلُوْہَا وَہُمْ یَطْمَعُوْنَ

আর তাদের মধ্যে থাকবে পর্দা এবং আরাফের উপর থাকবে কিছু লোক, যারা প্রত্যেককে তাদের চি‎‎হ্ন দ্বারা চিনবে। আর তারা জান্নাতের অধিবাসীদেরকে ডাকবে যে,‘তোমাদের উপর সালাম’। তারা (এখনো) তাতে প্রবেশ করেনি তবে তারা আশা করবে। সূরা আরাফ : ৪৬

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আরাফ হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে একটি উঁচু স্থান, যা থেকে উভয় স্থানই দেখা যাবে।

২. আরাফবাসীদের অবস্থা

আরাফবাসীরা জান্নাত ও জাহান্নাম উভয় দিকেই তাকিয়ে থাকবে। তারা জান্নাতবাসীদের দিকে তাকিয়ে শান্তি ও স্বস্তির অনুভূতি প্রকাশ করবে এবং জাহান্নামবাসীদের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাইবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَادٰۤی اَصْحٰبُ الْاَعْرَافِ رِجَالًا یَّعْرِفُوْنَہُمْ بِسِیْمٰہُمْ قَالُوْا مَاۤ اَغْنٰی عَنْکُمْ جَمْعُکُمْ وَمَا کُنْتُمْ تَسْتَکْبِرُوْنَ

আর আ‘রাফের অধিবাসীরা এমন লোকদেরকে ডাকবে, যাদেরকে তারা চিনবে তাদের চি‎‎হ্নর মাধ্যমে, তারা বলবে, ‘তোমাদের দল এবং যে বড়াই তোমরা করতে তা তোমাদের উপকারে আসেনি’। সূরা আরাফ : ৪৮

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায় যে, আরাফবাসীরা সেইসব লোকদের চিনতে পারবে যারা দুনিয়াতে অহংকার করত।

আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ঈমানদারদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি একটি পুলের উপর আটক রাখা হবে এবং দুনিয়াতে পরস্পর পরস্পরে যা অন্যায়-অবিচার হয়েছিল তার প্রতিশোধ নেয়া হবে। সবশেষে যখন তারা পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে, তখন তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমি মুহাম্মাদের প্রাণ! মু’মিনদের প্রত্যেকে পৃথিবীতে তার নিজ বাড়িকে যেমনিভাবে চিনত, তার তুলনায় সে জান্নাতে তার স্থান ভালোরূপে চিনতে পারবে। সহীহঃ বুখারী ৬৫৩৫, মিশকাত : ৫৫৮৯, মুসনাদে আহমাদ : ১১১১৩,

৩. আরাফবাসী কারা হবেন?

ইসলামী পণ্ডিত ও মুফাসসিরগণের মতে, আরাফবাসীরা হবেন এমন কিছু মানুষ, যাদের নেকি ও বদির পাল্লা সমান সমান হবে। অর্থাৎ, তাদের ভালো কাজ ও মন্দ কাজের পরিমাণ এতটাই সমান হবে যে, তাদের সরাসরি জান্নাতে বা জাহান্নামে পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এই ব্যক্তিদের আমলনামা ওজন করার পর দেখা যাবে যে, তাদের নেকি ও বদির পাল্লা সমান হয়ে গেছে। ফলে তারা সরাসরি জান্নাতে যাওয়ার যোগ্যতাও অর্জন করতে পারবে না, আবার জাহান্নামেও যাবে না। আরাফবাসীরা দীর্ঘদিন সেই স্থানে অবস্থান করবে এবং আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় থাকবে। অবশেষে আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে।

আরাফ সম্পর্কে সরাসরি হাদিসের সংখ্যা কম, তবে কিছু হাদিস ও সাহাবিদের ব্যাখ্যায় এর ধারণা পাওয়া যায়। এই হাদিসগুলো মূলত সূরা আল-আ’রাফের আয়াতের ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে।

ইবনে মাসউদ (রা.)-কে আরাফবাসী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “তারা এমন কিছু লোক যাদের নেকি ও বদির পাল্লা সমান হয়ে গেছে। তাদের নেকিগুলো তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেনি, আবার তাদের বদিগুলো তাদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাতে পারেনি। তাই তারা আল্লাহর রহমতের অপেক্ষায় আরাফে অবস্থান করবে।”  তাফসীরে ইবনে কাসীর-এ এই বর্ণনাটি উল্লেখ করা হয়েছে, যা সাহাবিদের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে। এটি সরাসরি মারফু হাদিস নয়, বরং মুফাসসিরদের তাফসীরের অংশ।

আরাফবাসীদের পরিচয় সম্পর্কে হাদীসে এসেছে: হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-

আরাফবাসী হলো এমন এক দল, যাদের সৎকর্ম এত পরিমাণ যে তা তাদের জাহান্নামে যেতে দেয় না আবার পাপাচার এত পরিমাণ যে তা জান্নাতে প্রবেশ করতে দেয় না। (অর্থাৎ পাপ ও পুণ্য সমানে সমান) যখন তাদের মুখ জাহান্নামবাসীদের দিকে ফেরানো হবে তখন তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে যালিম কওমের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। তারা এমনি অবস্থায় থাকবে। তখন তোমার প্রতিপালক বলবেন, যাও, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো। তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম”। মুস্তাদরাকে হাকিম : ৩২৪৭, ৪৪২৯।

সহিহ ইবনে খুযাইমা : ২৪৬৩

কিয়ামতের দিনে যখন মুমিনরা তাদের ঈমান ও আমলের কারণে নূর বা আলো পাবে, তখন মুনাফিক পুরুষ ও নারীরাও তাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু মুনাফিকদের কোনো আলো থাকবে না। মুমিনদের নূর দেখে তারা তাদের কাছে মিনতি করবে, যেন মুমিনরা একটু থামে এবং তাদের নূর থেকে কিছু আলো নিতে দেয়। কিন্তু মুমিনদেরকে বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং নূরের সন্ধান কর।’ এর অর্থ হলো, দুনিয়াতে তারা ঈমানের আলো গ্রহণ করেনি, তাই সেদিনও তারা তা পাবে না। তাদের বলা হবে, তারা যেন দুনিয়াতে ফিরে গিয়ে নূরের সন্ধান করে, যা তাদের জন্য অসম্ভব। এটি হবে তাদের প্রতি এক ধরনের উপহাস এবং হতাশার চূড়ান্ত প্রকাশ। এর পর তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর স্থাপন করা হবে। এই প্রাচীরের বৈশিষ্ট্য হলো:

১. অভ্যন্তরীণ অংশে এই দিকে থাকবে রহমত। এই অংশটি মুমিনদের দিকে থাকবে, যেখানে জান্নাতের শান্তি, আনন্দ ও আল্লাহর দয়া থাকবে।

২. বাহ্যিক অংশে থাকবে আযাব। এটি মুনাফিকদের দিকে থাকবে, যেখানে জাহান্নামের যন্ত্রণা ও কষ্ট থাকবে।

এই প্রাচীরটি মুমিন ও মুনাফিকদের চিরতরে আলাদা করে দেবে। মুনাফিকরা আর কখনো মুমিনদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না এবং তারা আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের সুখ থেকেও বঞ্চিত হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-

یَوْمَ یَقُوْلُ الْمُنٰفِقُوْنَ وَالْمُنٰفِقٰتُ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِکُمْ ۚ  قِیْلَ ارْجِعُوْا وَرَآءَکُمْ فَالْتَمِسُوْا نُوْرًا ؕ  فَضُرِبَ بَیْنَہُمْ بِسُوْرٍ لَّہٗ بَابٌ ؕ  بَاطِنُہٗ فِیْہِ الرَّحْمَۃُ وَظَاہِرُہٗ مِنْ قِبَلِہِ الْعَذَابُ ؕ

সেদিন মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারীগণ ঈমানদারদের বলবে, ‘তোমরা আমাদের জন্য অপেক্ষা কর, তোমাদের নূর থেকে আমরা একটু নিয়ে নেই’, বলা হবে, ‘তোমরা তোমাদের পিছনে ফিরে যাও এবং নূরের সন্ধান কর,’ তারপর তাদের মাঝখানে একটি প্রাচীর স্থাপন করে দেয়া হবে, যাতে একটি দরজা থাকবে। তার ভিতরভাগে থাকবে রহমত এবং তার বহির্ভাগে থাকবে আযাব। সূরা হাদীদ : ১৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *