Category Archives: ইলম বা জ্ঞান

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: প্রথম কিস্তি

সালাতের কসর করা

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সালাতের কসর করাঃ

কসর একটি আরবি শব্দ যার অর্থ হলো কম করা, কমানো। কোন মুসলিম যখন সফরে থাকে তখন তিনি চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত আদায় করে। সালাত কমিয়ে আদায় করাকেই সালাতে কসর বলা হয়। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, যে ব্যক্তি ভ্রমণ বা সফর করে তাকে সফররত অবস্থায় মুসাফির বলে। আবার যখন নিজ বাড়ী বা বাসভবনে চলে আসে তখন শরিয়তের পরিভাষায় তাকে বলে মুকিম। মুকিম অর্থ হল, নিজ বাসস্থানে অবস্থানকারী। অর্থাৎ শুধু মুসাফির ব্যক্তিই সালাতের কসর আদায় করবে। মুকিম কখনও সালাতের কসর আদায় করবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

 وَإِذَا ضَرَبۡتُمۡ فِى ٱلۡأَرۡضِ فَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٌ أَن تَقۡصُرُواْ مِنَ ٱلصَّلَوٰةِ إِنۡ خِفۡتُمۡ أَن يَفۡتِنَكُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ‌ۚ إِنَّ ٱلۡكَـٰفِرِينَ كَانُواْ لَكُمۡ عَدُوًّ۬ا مُّبِينً۬ا (١٠١) 

অর্থঃ আর যখন তোমরা সফরে বের হও তখন নামায সংক্ষেপ করে নিলে কোন ক্ষতি নেই৷ (বিশেষ করে) যখন তোমাদের আশংকা হয় যে, কাফেররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে৷ কারণ তারা প্রকাশ্য তোমাদের শত্রুতা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে৷  (সুরা নিসা ৪:১০১)।

উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা সফরত অবস্থায় সালাত কসর করতে বলেছেন। আয়াতটি সরল অনুবাদ দেখলে মনে হয় কসর কেবল যুদ্ধাবস্থার  আদায় করেত হবে শান্তির অবস্থায় নয়। এই সরল অনুবাদ করে ‘যাহেরী’ ও ‘খারেজী’ ফিকাহর অনুসারীরা বলে থাকে কসর কেবল যুদ্ধাবস্থার জন্য আর শান্তির অবস্থায় যে সফর করা হয় তাতে কসর করা কুরআন বিরোধী। কিন্তু নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াতের মাধ্যমে হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, হযরত উমর (রা) এই একই সন্দেহটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে সামনে পেশ করলে তিনি এর জবাবে বলেন আল্লাহ পক্ষ থেকে সাদাকা বলেছে। হাদিসটি হলঃ

ইয়ালা ইবনু উমায়্যা (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে বললাম, (আল্লাহ তা’আলা বলেছেন) “যদি তোমরা ভয় পাও যে, কাফিররা তোমাদেরকে কষ্ট দেবে, তরে সালাত সংক্ষেপ করে পড়াতে কোন দোষ নেই” কিন্তু এখন তো লোকেরা নিরাপদ। উমর (রাঃ) বললেন, বিষয়টি আমাকেও বিস্মিত করেছে, যা তোমাকে বিস্মিত করেছিল। তারপর আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম ও এর জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি একটি সাদাকা। তোমরা তাঁর সাদাকাটি গ্রহণ কর। (সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৪৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

ইয়া‘লা ইবনু উমাইয়্যাহ্ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘উমারের কাছে নিবেদন করলাম, আল্লাহ তা‘আলার বাণী হলো, ‘‘তোমরা সলাত কম আদায় করো, অর্থাৎ ক্বসর করো, যদি অমুসলিমরা তোমাদেরকে বিপদে ফেলবে বলে আশংকা করো’’- (সূরাহ্ আন্ নিসা ৪: ১০১)। এখন তো লোকেরা নিরাপদ। তাহলে ক্বসরের সালাত আদায়ের প্রয়োজনটা কি? ‘উমার (রাঃ) বললেন, তুমি এ ব্যাপারে যেমন বিস্মিত হচ্ছো, আমিও এরূপ আশ্চর্য হয়েছিলাম। তাই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ব্যাপারটি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সলাতে কসর করাটা আল্লাহর একটা সাদাকা বা দান, যা তিনি তোমাদেরকে দান করেছেন। অতএব তোমরা তাঁর এ দান গ্রহণ করো। (মিসকাত ১৩৩৫ থেকে নেয়া, আরও আছে সহীহ মুসলিম ৬৮৬, আবূ দাঊদ ১১৯৯, আত্ তিরমিযী ৩০৩৪, নাসায়ী ১৪৩৩, ইবনু মাজাহ্ ১০৬৫, আহমাদ ১৭৪, দারিমী ১৫৪৬, ইবনু খুযায়মাহ্ ৯৪৫, ইবনু হিব্বান ২৭৩৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৩৭৯, শারহুস্ সুন্নাহ্ ১০২৪)।

হারিসা ইবনু ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপদ অবস্থায় আমাদেরকে নিয়ে মিনায় দু’ রাকা’আত সালাত আদায় করেন। (সহীহ বুখারী – ১০২২ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মহানবী (সাঃ) প্রত্যেক সফরেই কসর করে নামায পড়েছেন এবং কোন নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত দ্বারা এ কথা প্রমাণিত নেই যে, তিনি কোন সফরে নামায পূর্ণ করে পড়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন, ‘আমি নবী (সাঃ), আবূ বাক্‌র, উমার ও উসমান (রাঃ)-এর সাথে সফরে থেকেছি। কিন্তু কখনো দেখি নি যে, তাঁরা ২ রাকআতের বেশী নামায পড়েছেন।’ ( মিশকাত ১৩৩৮, বুখারী ১১০২, মুসলিম ৬৮৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৫০৭, আবূ দাঊদ ১২২৩)

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মদিনা থেকে মক্কার দিকে রওনা দিলাম। সেই সফরে তিনি মদিনায় ফিরে আসা পর্যন্ত দু’ রাক’আত দু’ রাক’আত করে সালাত আদায় করেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি মক্কায় কতদিন ছিলেন? তিনি বললেন দশ দিন।(সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৫৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ এই সকল সফর ছিল স্বাভাবিক, কোন যুদ্ধের জন্য সফর ছিল না। তাই সাধারনত যে কোন মুসাফিরই সালাতের কসর করতে পারবে যদি সে সফরের শর্থের মাঝে থাকে।

সফরের দুরত্ব কতটুকু?

আল্লাহ্‌ তা’আলা নির্দিষ্টভাবে সফরের কোন দুরত্ব নির্ধারণ করেননি। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেও সফরের দুরত্ব নির্ধারণের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা পাওয়া যায় না। কুরআন সুন্নাহে নির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা না পাওয়ার কারনে মুজতাহীদ আলেমদের মাঝে এ সম্পর্কে বিশাল মতভেদ আছে। উলামাগণের মাঝে অনেক মত পার্থক্য রয়েছে। ইবনুল মুনযির ও অন্যান্যদের বর্ণনায় প্রায় ২০টি মত রয়েছে।

তবে আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় যুহরের সালাত চার রাক্‘আত আদায় করেছেন। তবে যুল হুলায়ফায় ‘আসরের সলাত দু’ রাক্‘আত আদায় করেছেন। (মিসকাত ১৩৩৩, সহীহ  বুখারী ১৫৪৭, মুসলিম ৬৯০, নাসায়ী ৪৭৭, আহমাদ ১২৯৩৪, ইবনু হিব্বান ২৭৪৭, ইরওয়া ৫৭০, আবূ দাঊদ ১২০২।

এই হাদিসের আলোকে ইমাম নাবাবী (রহঃ) বলেন, ক্বসরের সর্বনিম্ন সীমা হলো ৩ মাইল। তিনি দলিল পেশ করেছেন এই সহিহ হাদিস থেকে। হাফিয আসক্বালানী (রহঃ) বলেনঃ এ বিষয়ে এটাই অধিক বিশুদ্ধ হাদীস।

আর যারা এ মতের বিরোধী তারা বলেন যে, আলোচ্য হাদীস দ্বারা ক্বসর শুরু উদ্দেশ্য, সফরের শেষ গন্তব্য নয়। অর্থাৎ যখন সে দীর্ঘ সফরের ইচ্ছা করবে এবং তিন মাইল দূরত্বে পৌঁছার পর থেকে সে কসর করবে। যেমন হাদিসের অর্থের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় চার রাকআত সলাত আদায় করলেন এবং যুল হুলায়ফায় দু’ রাকআত সলাত আদায় করলেন। অর্থাৎ সফর শুরু করে তিন মাইল অথবা তিন ফারসাখ পরিমাণ দূরত্বে গেলেই সালাত কসর করতে হবে।

সহিহ মুসলিমে এসেছেঃ আবূ বাকর ইবনু আবূ শায়বা ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … ইয়াহিয়া ইবনু ইযায়ীদ আল হুনাঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) এর নিকট সালাত কসর করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরের উদ্দেশ্যে তিন মাইল অথবা (রাবী শুবার সন্দেহ) তিনি তিন ফারসাখ পথ অতিক্রম করতেন, তখন দু’রাকআত পড়তেন।(সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

সহিহ মুসলিমে আরও এসেছেঃ যুহায়র ইবনু নুফায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুরাহবিল ইবনুল সিম্‌ত (রহঃ) এর সঙ্গে একটি গ্রামের দিকে রওনা দিলাম, যা সতের বা আঠার মাইলের মাথায় অবস্থিত। তারপর তিনি দু’ রাক’আত সালাত পড়লেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি উমর (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি যুল হুলায়ফায় দু’ রাক’আত পড়েছেন। এ বিষয়ে তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যেরূপ করতে দেখেছি, সেরূপই করছি। (সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৭ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

ইমাম শাফি‘ঈ রাহিমাহুল্লাহ, ইমাম মালিকরাহিমাহুল্লাহ, ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যান্য ফিকহবিদের মত, পূর্ণ একদিন সফরের দূরত্বের কমে সলাত ক্বসর করা যাবে না। আর তা হলো চার বারদ, আর চার বারদ হলো ১৬ ফারসাখ অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা ৮০ কিলোমিটার। কারণ এক বারদ হলো চার ফারসাখ, আর এক ফারসাখ সমান তিন মাইল। (মিসকাতের সফর অধ্যায়)

কোন কোন মুজতাহীদ ৮০ কিলোমিটার এর মত নির্ধিষ্ট পরিমাণ দুরত্ব উল্লেখ না করে বলেছেনঃ সমাজে প্রচলিত রীতিনীতিতে বা দেশীয় প্রথায় যাকে সফর বলা হয় তাতেই নামায কসর করবে। যদিও তা ৮০ কিলোমিটার না হয়। আর মানুষ যদি তাকে সফর না বলে, তবে তা সফর নয়, যদিও তা ১০০ কিলোমিটার হয়। এটাই শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ এর মত। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)।

মন্তব্যঃ প্রচলিত রীতিনীতিতে মতভেদ দেখা দিলে ইমামদের যে কোন একটি মত গ্রহণ করলেও কোন অসুবিধা নেই। কেননা ইমামগণ সবাই মুজতাহিদ বা গবেষক। এক্ষেত্রে কোন দোষ হবে না ইনশাআল্লাহ্‌। কিন্তু বর্তমানে মানুষের প্রচলিত রীতিনীতি যেহেতু সুনির্দিষ্ট তাই ইহা গ্রহণ করাই অধিক সঠিক। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)।

সফরে কত দিন পর্যান্ত কসর সালাত আদায় করা যাবে?

মুসাফির যখন সফরের গন্তব্যে পৌঁছে যাবে, তখন কতদিন অবস্থান করলে সে সালাত কসর করবে এ ব্যাপারে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। সাহাবিদের যুগ থেকেই এ ব্যাপারে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়। যার ফরে আমরা হাদিসের মধ্যও দিনের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য দেখতে পাই। তাই যখন কোন মুজতাহীদ হাদিসের আলোকে বায় প্রদান করেন, তখন তিনি যেটা অধিক সঠিক মনে করছেন তার উপর রায় প্রদান করেন। অন্য মুজতাহীদ হয়ত অন্য হাদিসকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই সাহিবী নয় মুজতাহীদ আলেমদের মাঝেও দিনের সংখ্যা নিয়ে মতদেভ আছে। প্রথমে এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস লক্ষ করিঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার সফরে উনিশ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং সালাত কসর করেন। কাজেই (কোথাও) আমরা উনিশ দিনের সফরে থাকলে কসর করি এবং এর চাইতে বেশী হলে পুরোপুরি সালাত আদায় করি। (সহীহ বুখারী  ১০১৯ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

২. আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ভ্রমণে গিয়ে ঊনিশ দিন অবস্থান করেন। এ সময় তিনি দু’ রাক্‘আত করে ফরয সালাত আদায় করেন। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমরাও মক্কা মাদীনার মধ্যে কোথাও গেলে সেখানে ঊনিশ দিন অবস্থান করলে, আমরা দু’ রাক্‘আত করে সলাত আদায় করতাম। এর চেয়ে বেশী দিন অবস্থান করলে চার রাক্‘আত করে সলাত ক্বায়িম করতাম। (মিসকাত ১৩৩৭ হাদিসের মান সহিহ। আত্ তিরমিযী ৫৪৯, ইবনু মাজাহ্ ১০৭৫)

৩. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মক্কা থেকে মদিনায় গমণ করি, আমরা মদিনা ফিরে আসা পর্যন্ত তিনি দু’রাকা’আত, দু’রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। (রাবী বলেন) আমি (আনাস (রাঃ) কে বললাম, আপনারা মক্কায় কত দিন ছিলেন তিনি বললেন, আমরা সেখানে দশ দিন ছিলাম (সহীহ বুখারী ১০২০ এবং সহিহ মুসলিম ১৪৫৯, ইসলামি ফাউন্ডেশনের প্রকাশনায়)

এক বছরের হাদিস, ছয় মাসের হাদিস

উপরের হাদিসগুলিতে ১৯ দিন, ১০দিন, ছয়মাস ও একবছর দেখতে পাই। আসলে সবগুরি হাদিসই সঠিক। উম্মাতের মাঝে এ সম্পর্কি ভুল বুঝাবুঝি দুর করার জন্য এক এক মুজতাহীদ আলেম এক একটি মতামত প্রদান করেছেন। তাদের মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ চারটি মতামত বা রায় তুলে ধরছি।

প্রথম মতামতঃ শাফি‘ঈ ও মালিকী রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত হলো, যখন চার দিনের অতিরিক্ত অবস্থান করবে তখন সলাত পূর্ণ করবে।

দ্বিতীয় মতামতঃ আবূ হানীফাহ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত হলো, যখন ১৫ দিনের বেশী অবস্থান করবে, তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

তৃতীয় মতামতঃ ইমাম আহমাদ ও দাঊদ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত অনুযায়ী যখন চার দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

চতুর্থ মতামতঃ ইসহাক্ব ইবনু রাহওয়াইয়াহ্ রাহিমাহুল্লাহ এর মতামত অনুযায়ী যখন ১৯ দিনের অধিক অবস্থান করবে তখন পূর্ণ সলাত আদায় করবে।

ইমাম শাফি‘ঈ ও মালিক রাহিমাহুল্লাহ এর মতে সলাত কসরের সীমা হলো গন্তব্যে প্রবেশ এবং গন্তব্য থেকে বের হওয়ার দিন ব্যতীত তিন দিন। ইমাম আবূ হানীফাহ্ (রহঃ)-এর নিকট ১৪ দিন, ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর নিকট ৪ দিন, ইসহাক (রহঃ)-এর নিকট ১৯ দিন। মির্‘আত প্রণেতা বলেনঃ আমার নিকট অগ্রগণ্য বা প্রাধান্য মত হলো ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর মত। (মিসাতের সফর অধ্যায়ের টিকা থেকে নেয়া হয়েছে)।

মন্তব্যঃ উপরের মতামত গুলি সবই হাদিসের আলোকে প্রদান করা হয়েছে। কোন মুজতাহীদ আলেমই হাদিসের বাহিরে কিয়াস করেনি। প্রচলিত রীতিনীতিতে মতভেদ দেখা দিলে ইমামদের যে কোন একটি মত গ্রহণ করলেও কোন অসুবিধা নেই। কাজেই এটা ঠিক, ওটা ভুল এমন বলে বলে উম্মতের মাঝে ঐক্য নষ্ট করা হারাম।

সফরের সময় সুন্নাত ও নফল পড়ার বিধানঃ

ঈসা ইবনু হাফস ইবনু আসিম ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর পিতা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কার রাস্তায় আমি ইবনু উমরের সহচর হলাম। তিনি আমাদের যুহরের সালাত দু’ রাক’আত পড়ালেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হলেন, আমরাও তাঁর সঙ্গে অগ্রসর হলাম। তারপর তিনি তাঁর মনযিলে এসে বসলেন এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে বসলাম। এরপর যে স্থানে তিনি সালাত আদায় করেছিলেন, সে স্থানের প্রতি দৃষ্টি পড়লে তিনি দেখলেন, কিছু লোক দাঁড়ানো। তিনি বললেন, তারা সেখানে কি করছে? আমি বললাম, তারা নফল সালাত আদায় করছে তিনি বললেন, আমি যদি নফল আদায় করতাম তাহলে আমি আমার সালাত (ফরয) কেই পূর্ণ করতাম।

হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে সফরে থেকেছি। কিন্তু ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গেও থেকেছি, তিনিও তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আমি উমর (রা) এর সঙ্গেও ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত পড়েননি। আমি উসমান (রাঃ) এরও সঙ্গে ছিলাম। তিনিও ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত দু’ রাক’আতের অতিরিক্ত আদায় করেননি। আর আল্লাহ তাআ’লা বলেছেন, “নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। (সহিহ মুসলিম হাদিস ১৪৫২ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

হাফস ইবনু ‘আসিম (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার মক্কা-মাদীনার পথে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমারের সাথে থাকার আমার সৌভাগ্য ঘটেছে। (যুহরের সলাতের সময় হলে) তিনি আমাদেরকে দু’ রাক্‘আত সলাত (জামা‘আতে) আদায় করালেন। এখান থেকে তাঁবুতে ফিরে গিয়ে তিনি দেখলেন, লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, লোকেরা এটা কি করছে? আমি বললাম, তারা নফল সলাত আদায় করছে। তিনি বললেন, আমাকে যদি নফল সলাতই আদায় করতে হয়, তাহলে ফরয সলাতই তো পরিপূর্ণভাবে আদায় করা বেশী ভাল ছিল। কিন্তু যখন সহজ্জ করার জন্য ফরয সালাত কসর আদায়ের হুকুম হয়েছে, তখন তো নফল সলাত ছেড়ে দেয়াই উত্তম। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকার সৌভাগ্যও পেয়েছি। তিনি সফরের অবস্থায় দু’ রাক্‘আতের বেশী (ফরয) সলাত আদায় করতেন না। আবূ বাকর, ‘উমার, ‘উসমান (রাঃ)-এর সাথে চলারও সুযোগ আমার হয়েছে। তারাও এভাবে দু’ রাক্‘আতের বেশী আদায় করতেন না। (মিসকাত ১৩৩৮, সহীহ বুখারী ১১০২, সহিহ মুসলিম ৬৮৯, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৫৫০৭, আবূ দাঊদ ১২২৩।

অবশ্য সাধারণ নফল, তাহাজ্জুদ, চাশত, তাহিয়্যাতুল মাসজিদ প্রভৃতি নামায সফরে পড়া চলে। যেমনঃ ফরয নামাযের আগে-পরেও নফলের নিয়তে নামায পড়া দূষণীয় নয়।

মক্কা বিজয়ের দিন উম্মেহানীর ঘরে তিনি চাশতের নামায পড়েছেন। উম্মে হানী (রাঃ) ব্যতিত অন্য কেউ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাতুয যুহা (পূর্বাহ্ন এর সালাত) আদায় করতে দেখেছেন বলে আমাদের জানাননি।

উম্মে হানী (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর ঘরে গোসল করার পর আট রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। আমি তাঁকে এর চাইতে সংক্ষিপ্ত কোন সালাত আদায় করতে দেখিনি, তবে তিনি রুকূ’ ও সিজদা পূর্ণভাবে আদায় করেছিলেন। লায়স (রহঃ) আমির ইবনু রাবীআ’ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাতের বেলা বাহনের পিঠে বাহনের গতিমুখী হয়ে নফল সালাত আদায় করতে দেখেছেন। (সহিহ বুখারী ১০৪০ ইফাঃ)।

 এ ছাড়া তিনি সফরে উটের পিঠে নফল ও বিতের নামায পড়তেন। 

আমীর ইবনু রাবী’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি, তিনি সাওয়ারীর উপর উপবিষ্ট অবস্থায় মাথা দিয়ে ইশারা করে সে দিকেই সালাত আদায় করতেন যে দিকে সাওয়ারী ফিরত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরয সালাতে এরূপ করতেন না। সালিম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ (রাঃ) সফরকালে রাতের বেলায় সাওয়ারীর উপর থাকা অবস্থায় সালাত আদায় করতেন, কোন্ দিকে তাঁর মুখ রয়েছে সে দিকে লক্ষ্য করতেন না এবং ইবনু উমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ারীর উপর নফল সালাত আদায় করেছেন, সাওয়ারী যে দিকে মুখ ফিরিয়েছে সেদিকেই এবং তার বিত্‌র ও আদায় করেছেন। কিন্তু সাওয়রীর উপর ফরয সালাত আদায় করতেন না। (সহিহ বুখারী ১০৩৫ ইফাঃ)।

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওয়ার থাকাবস্থায় কিবলা ছাড়া অন্য দিকে মুখ করে নফল সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করেছেন।(সহিহ বুখারী ১০৩২ ইফাঃ)।

মন্তব্যঃ অনেক আলেম বলে থাকের সফর অবস্থায় নফল সুন্নাহ সালাত ছেড়ে দিবে শুধে ফজরের দুই রাকআত সুন্নাহ ব্যাতিত। সফর অবস্থায় যদি কোথাও হোটেলে বা বাড়িতে অবস্থান করে তার কোন প্রকার সফরের ক্লান্তি না তাকে তবে সে নফল সুন্নাহ সালাত আদায় করতে পারে।

সফর শুরুর পর কত দুর পর মুসাফিরের হুকুম হয়ঃ

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মদিনায় যুহরের সালাত চার রাকা’আত আদায় করেছি এবং যুল-হুলাইফায় আসরের সালাত দু’রাকা’আত আদায় করেছি। (সহীহ বুখারী ১০২৮ ও সহিহ মুসলিম ১৪৫৫ ইসলামি ফাউন্ডেশন সহিহ আবু দাউদ ১০৮৫, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৫৪৬)

যুহায়র ইবনু হারব (রহঃ) ও মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার রহঃ যুহায়র ইবনু নুফায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি শুরাহবিল ইবনুল সিম্‌ত (রহঃ) এর সঙ্গে একটি গ্রামের দিকে রওনা দিলাম, যা সতের বা আঠার মাইলের মাথায় অবস্থিত। তারপর তিনি দু’ রাক’আত সালাত পড়লেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি উমর (রাঃ) কে দেখেছি, তিনি যুল হুলায়ফায় দু’ রাক’আত পড়েছেন। এ বিষয়ে তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যেরূপ করতে দেখেছি, সেরূপই করছি। (সহিহ মুসলিম ১৪৫৭ ইফাঃ)।

ইয়াহিয়া ইবনু ইযায়ীদ আল হুনাঈ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) এর নিকট সালাত কসর করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরের উদ্দেশ্যে তিন মাইল অথবা (রাবী শুবার সন্দেহ) তিনি তিন ফারসাখ পথ অতিক্রম করতেন, তখন দু’রাকআত পড়তেন। (সহিহ মুসলিম হাদিস নম্বর ১৪৫৬ ইসলামি ফাউন্ডেশন)।

মন্তব্যঃ সফল শুরু করার পর নিজ এলাকা ত্যাগ করার সাথে সাথেই সফরকারির উপর মুসাফিরের হুকুম কার্যকর হবে। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়  নিজ এলাকা ত্যাগ প্রায় তিন মাইল বা ছয় কিলোমিটারের মত দুরে গেলেই সালাত কসর করতে পারবে।

মিনায় সালাত কসর করাঃ

ক। হজ্জের সময় প্রথম দফায় মিনায় সালাত কসর করাঃ

প্রথম দফায় ইহরাম বাঁধার পর হাজিগণ মিনার দিকে রওয়ানা হয়ে যাওয়াই হলো সুন্নাত তরিকা। সূর্য ঢলার পূর্বে হোক আর পরে হোক ৮ জিলহজ্জ মিনায় পৌছাইতে চেষ্টা করা। মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা অর্থাৎ ৮ জিলহজ্জ ‘জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা এবং ৯ জিলহজ্জ সকালের ফজর নামাজসহ এ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা মোস্তাহাব। মিনায় থাকাকালীন সময়ে মক্কার অবস্থানকারী বা বহিরাগত সকলকে প্রত্যেক নামাজ সুন্নাত মোতাবেক পড়ার নিয়ম হলো, প্রত্যেক ওয়াক্ত (জোহর, আসর ও ইশা) নামাজ উহার নির্দিষ্ট সময়ে কসর পড়া। মাগরিব ও ফজর নামাজ ব্যতিত, কেননা এ দুই নামাজে কসর নেই।

দলিলঃ

১. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় যুহর ও ফজরের নামায (অর্থাৎ যুহর হতে পরবর্তী ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্তের নামায) আদায় করলেন। তারপর ভোরেই আরাফাতের দিকে যাত্রা শুরু করেন। (সুনানে তিরমিজি ৮৮০, হাদিসের মান সহিহ)

২. ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমাদের নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিনায় যুহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামায আদায় করলেন, তারপর ভোরে যাত্রা শুরু করেন আরাফাতের দিকে। (সুনানে তিরমিজি ৮৭৯ হাদিসের মান সহিহ)

খ। দ্বিতীয় দফায় মিনায় সালাত কসর করার যৌক্তিকতাঃ

দ্বিতীয় দফায় ১০ জিলহজ্জ সকালের ফজর সালাত আদায় করে মুজদালিফা থেকে আবার মিনায় আসা হয়। এ সময় একটাকা ৪/৫ দিন মিনায় অবস্থান করা ওয়াজিব। এই সময়ও সালাতের কসর আদায় করেত হবে। তবে অনেকে পূর্ণ সালাতও আদায় করে থাকে। তাদেরও দলিল আছে। দুটি দলিল পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে মিনার সকল সালাত কসরই হবে বলে মনে হবে। সে যা হোক আপনি অধিক যৌক্তিক ও হাদিস সম্মত কসরই আদায় করবেন তবে যদি কেউ কোন দলিলের আলোকে এখানে সালাত কসর না করে তবে তাকে ভতসনা করা যাবে না। তার সাথে বিবাদে জড়ান যাবে না।

দলিলঃ

১. আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিনায় দু’রাক’আত সালাত আদায় করেছেন এবং আবূ বকর, ‘উমর (রাঃ) -ও। আর ‘উসমান (রাঃ) তাঁর খিলাফতের প্রথম ভাগেও দু’রাক’আত আদায় করেছেন। (সহিহ বুখারি ১৬৫৫)

২. হারিসা ইব্‌নু ওয়াহব খুযা’য় (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিয়ে মিনাতে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছেন। এ সময় আমরা আগের তুলনায় সংখ্যায় বেশি ছিলাম এবং অতি নিরাপদে ছিলাম। (সহিহ বুখারি ১৬৫৬)

৩. হারিসা ইবনু ওয়াহব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় থাকা অবস্থায় আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সর্বাধিক সংখ্যক লোকসহ মিনায় (চার রাক’আত ফরযের স্থলে) দুই রাক’আত নামায আদায় করেছি। (তিরমিজ ৮৮২, আবূ দাউদ ১৭১৪)

৪. হারিছা ইব্‌ন ওয়াহ্‌ব খুযায়ী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে মিনায় দু’রাকআত সালাত আদায় করলাম অথচ মানুষ তখন অধিক নিরাপদ ছিল। (নাসাঈ ১৪৪৫)

গ। মিনায় মতভেদ করে পুর্ণ সালাত আদায়ঃ

১. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর (রাঃ)-এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর (রাঃ)-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে [অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ)-এর সময় থেকে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে] হায়! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতেই আমর ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারী ১৫৫৪ ইফাঃ)

২. আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি (মিনায়) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করেছি। আবূ বকর এর সাথে দু’ রাক’আত এবং ‘উমর-এর সাথেও দু’ রাক’আত আদায় করেছি। এরপর তোমাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে (অর্থাৎ ‘উসমান (রাঃ) -এর সময় হতে চার রাক’আত সালাত আদায় করা শুরু হয়েছে) আহা! যদি চার রাক’আতের পরিবর্তে মকবূল দু’ রাক’আতই আমার ভাগ্যে জুটত! (সহিহ বুখারি ১৬৫৭)

৩. উসমান (রাঃ) এই চার রাকআত পুরো আদায় করার বিরোধীতা করে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ)। সহিহ বুখারীতে এসেছেঃ

ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) আমাদেরকে নিয়ে মিনায় চার রাকা’আত সালাত আদায় করেছেন। তারপর এ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) কে বলা হল, তিনি প্রথমে ‘ইন্না লিল্লাহ্’ পড়লেন। এবপর বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে মিনায় দু’ রাকা’আত পড়েছি, আবূ বকর (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি এবং উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে মিনায় দু’রাকা’আত পড়েছি। কতই না ভাল হতো যদি চার রাকা’আতের পরিবর্তে দু’রাকা’আত মাকবূল সালাত হতো। (সহীহ বুখারী ১০২৩ ইসলামি ফাউন্ডেশন)

মন্তব্যঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কাবাসী ও অন্যান্য স্থানের অধিবাসীদের নিয়ে মিনা, আরাফা ও মুযদালিফায় কসর নামাজ পড়েছিলেন। মক্কাবাসীদের সম্পূর্ণ নামাজ পড়তে নির্দেশ দেন নাই। চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয নামাযগুলো দু’রাকআত করে পড়তে হবে। সে নামাযগুলো হলো যুহর, আসর ও এশা। হজ্জের সময় মিনা, আরাফা ও মুয্দালিফায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার ভিতরের ও বাইরের সকল লোককে নিয়ে এ সালাতগুলো কসর করে পড়েছিলেন, এটা সুন্নাত। এ ক্ষেত্রে তিনি মুকীম বা মুসাফিরের মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি। অর্থাৎ মক্কার লোকদেরকেও চার রাকআত করে পড়তে বলেননি। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ও ফাতাওয়া ইবনে বায)

তবে মনে রাখতে হবে যে, ফজর ও মাগরিবের ফরয নামায অর্থাৎ দুই এবং তিন রাকআত বিশিষ্ট নামায কখনো কসর হয় না। মিনাতে প্রত্যেক সালাত ওয়াক্ত মত আদায় করবেন, জমা করবেন না। অর্থাৎ যুহর-আসর একত্রে এবং মাগরিব-এশা একত্রে পড়বেন না। এমনকি মুসাফির হলেও না। (প্রশ্নোত্তরে হজ্জ ও উমরা, অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম)

কাজেই সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত মিনায় সালাত চার নয় দুই বাকআতই আদায় করা উত্তম। কিন্তু কেউ পূর্ণ সালাত আদায় করলে তাদের গবেষণার উপর ছেড়ে দিতে হবে। তাদের সামনে সহিহ হাদিসগুলি তুলে ধরে বুঝাতে হবে। এ নিয়ে ফতোয়াবাজী করে উম্মতের ঐক্য নষ্ট করা যাবেনা। কারন আমাদের অনুকরনী তৃতীয় খলীফা ওসমান (রাঃ) শেষের দিকে পূর্ণ সালাত আদায় করেছেন বলে প্রমানিত যদিও আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) তার বিরোধীতা করেছেন।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: দ্বিতীয় কিস্তি

সালাত জমা করার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সালাত জমা করাঃ

সালাত জমা করার অর্থ হল দুই ওয়াক্তের সালাত কে একত্রে আদায় করা। অর্থাৎ যুহর ও আসরের এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করা। মুসল্লী আসরের সালাত এগিয়ে এনে যোহরের সময়ে প্রথম যোহর তারপর আসর আদায় করবে। অথবা যোহরকে এমনভাবে দেরী করা যে যোহরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে, তারপর আসরের ওয়াক্ত আসলে প্রথমে যোহর আদায় করে তারপর আসরের সালাত আদায় করা। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার ক্ষেত্রেও যোহর ও আসরের মত আদায় করা। অর্থাৎ মাগরিবের সময়ে ইশাকে এগিয়ে এনে প্রথমে মাগরিব তারপর ইশার সালাত আদায় করবে। অথবা মাগরিবকে এমনভাবে পিছিয়ে দিবে যে মাগরিবের সময় শেষ হয়ে যাবে, তারপর ইশার ওয়াক্ত হলে সেখানে প্রথমে মাগরিব আদায় করে তারপর ইশার সালাত আদায় করে নিবে।

আরাফা ও মুজদালিফায় সালাত জমা করাঃ

হাজিরা আরাফাতের ময়দানের জোহর ও আসরের একত্রে আদায় করে। আবার মুজদালীফায় মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করে। তবে ফজরের সাথে কোন সালাত একত্র জমা করা যাবে না, ঠিক তেমনি মাগরিবের সাথে আসরের সালাত ও জমা করা যাবে না।

ইব্‌নু উমর (রাঃ) ইমামের সাথে সালাত আদায় করতে না পারলে উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন।

যে বছর হাজ্জাজ ইব্‌নু ইউসুফ ইব্‌নু যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সে বছর তিনি ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আরাফার দিনে উকূফের সময় আমরা কিরূপে কাজ করব? সালিম (রহঃ) বললেন, আপনি যদি সুন্নাতের অনুসরণ করতে চান তাহলে ‘আরাফার দিনে দুপুরে সালাত আদায় করবেন। ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) বলেন, সালিম ঠিক বলেছে। সুন্নাত মুতাবিক সাহাবীগণ যুহর ও ‘আসর এক সাথেই আদায় করতেন। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি সালিমকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কি এরূপ করেছেন? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে তোমরা কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত ব্যতীত অন্য কারো অনুসরণ করবে? (সহিহ বুখারি ১৬৬২

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দ্রুত সফর করতেন, তখন মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন। ইবরাহীম ইবনু তাহমান (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সফরে দ্রুত চলার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুহর ও আসরের সালাত একত্রে আদায় করতেন আর মাগরিব ইশা একত্রে আদায় করতেন। আর হুসাইন (রহঃ)

আনাস ইবনু মলিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরকালে মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করতেন এবং আলী ইবনু মুবারকও হারব (রহঃ) আনাস (রাঃ) থেকে হাদীস বর্ণনায় হুসাইন (রহঃ) এর অনুসরণ করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একত্রে আদায় করেছেন। (সহীহ বুখারী ১০৪২ ইফাঃ)।

আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি যখন সফরে তাঁকে দ্রুত পথ অতিক্রম করতে হত, তখন মাগরিবের সালাত এত বিলম্বিত করতেন যে মাগরিব ও ইশা একত্রে আদায় করতেন। সালিম (রহঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) ও দ্রুত সফরকালে অনুরূপ করতেন। তখন ইকামতের পর মাগরিব তিন রাকা’আত আদায় করতেন এবং সালাম ফিরাতেন। তারপর অল্প সময় অপেক্ষা করেই ইশা-এর ইকামাত দিয়ে তা দু’রাকা’আত আদায় করে সালাম ফিরাতেন। এ দু’য়ের মাঝে কোন নফল সালাত আদায় করতেন না এবং ইশার পরেও না। অবশেষে মধ্যরাতে (তাহাজ্জুদের জন্য) উঠতেন। (সহীহ বুখারী ১০৪৩ ইফাঃ)

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে এ দু’সালাত একত্রে আদায় করতেন অর্থাৎ মাগরিব ও ইশা। (সহিহ বুখারী  ১০৪৪ ইফাঃ)।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য ঢলে পড়ার আগে সফর শুরু করলে আসরের ওয়াক্ত পর্যন্ত, যুহর বিলম্বিত করতেন এবং উভয় সালাত একত্রে আদায় করতেন। আর (সফর শুরু করার আগেই) সূর্য ঢলে গেলে যুহর আদায় করে নিতেন। এরপর (সফরের উদ্দেশ্যে) আরোহণ করতেন। (সহীহ বুখারী  ১০৪৫ ও ১০৪৬ ইফাঃ)।

যুদ্ধের সময় দুই সালাত একত্রে আদায়ঃ

সাঈদ ইবনু যুবায়র (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধে সফরকালে যুহর ও আসর এবং মাগরিব ইশা একত্রে আদায় করেন। সাঈদ বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁকে তা করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করেছিল? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য তার উম্মাতকে কষ্টে না ফেলা। (সহিহ মুসলিম ১৫০৩ ইফাঃ)

মু’আয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের সময় যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশার সালাত একত্রে আদায় করেন। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তার এইরূপ করার কারণ কি? তিনি বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর উম্মাতকে কষ্ট না দেওয়া। (সহিহ মুসলিম ১৫০৫ ইফাঃ)

উপরের হাদিস দ্বারা বুঝা যায় বিভিন্ন কারনে সালাত জমা করা যায়। তবে সালাত জমা করা অন্যতম কারন হিসাবে সফরকে ধরা হলেও একমাত্র কারন নয়। মুসফির যে কারনে সালাত কসর করে ঠিক সেই কারনে সালাত জমা করা বৈধ। হাদিসের আলোকে দেখতে পাই যে কোন সংকটের কারনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত জমা করেছেন। যেমনঃ তিনি যুদ্ধের সময় দুই সালাত একত্রে আদায় করছেন। বৃষ্টির কারণে যদি মসজিদে যেতে কষ্ট হয়, তবে দু’নামাযকে একত্রিত করা যাবে। ঠিক তেমনি ভাবে, শীতকালে যদি কঠিন ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হয় এবং সে কারণে মসজিদে যাওয়া কষ্টকর হয় তবে দু’নামাযকে একত্রিত করবে। নিজের মূল্যবান সম্পদের ক্ষতি বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে তবে দু’নামাযকে একত্রিত করবে। এছাড়া এ ধরণের আরো কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখিন হলে দু’নামাযকে একত্রিত করবে।

এমন কি মুকিম অবস্থায়ও যে কেউ চাইলে সালাত জমা করতে পারে। যেমনঃ

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর অথবা ভয়-ভীতি ছাড়াই মদিনায় যুহর ও আসরের সালাত একত্রে আদায় করেছেন। আবূ যুবায়র (রহঃ) বলেন, আমি সাঈদকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন এইরুপ করলেন? তিনি বললেন, তুমি যেমন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছ, আমিও তেমনি ইবনু আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তখন তিনি বললেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উদ্দেশ্য ছিল, তার উম্মাতেরকাউকে কষ্ট না দেওয়া। (সহিহ মুসলিম ১৫০২ ইফাঃ)

মন্তব্যঃ মুকিম অবস্থায় সংকট ছাড়া কেউ সালাত জমা করার ব্যাপারে মতামত দেননি। শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মানুষ যখনই দু’নামাযকে একত্রিত না করলে সমস্যা বা সংকটের সম্মুখিন হবে তখনই একত্রিত করণ তার জন্য বৈধ হয়ে যাবে। আর সমস্যা না হলে একত্রিত করবে না। কিন্তু যেহেতু সফর মানেই সমস্যা ও সংকট তাই মুসাফিরের জন্য দু’নামাযকে একত্রিত করা জায়েয। চাই তার সফর চলমান হোক বা কোন স্থানে অবস্থান করুক। তবে সফর চলমান থাকলে একত্রিত করা উত্তম। আর সফরে গিয়ে কোন গৃহে বা হোটেলে অবস্থান করলে একত্রিত না করাই উত্তম। কিন্তু মুসাফির যদি এমন শহরে অবস্থান করে যেখানে নামায জামাআতের সাথে অনুষ্ঠিত হয়, তখন জামাআতের সাথে নামায আদায় করা ওয়াজিব। ঐ সময় নামায কসরও করবে না একত্রিতও করবে না। কিন্তু জামাআত ছুটে গেলে কসর করবে একত্রিত করবে না। অবশ্য একত্রিত করা জরূরী হয়ে পড়লে করতে পারে। (ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম)

আলেমগণ দু’সালাত একত্রে আদায় বা জমা করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। এমই কিছু ইজতিহাদ ধর্মী কথা উল্লেখ করছিঃ

১. অধিকাংশ আলেম যেমন মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলীগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, সফরের কারণে যোহর এবং আসর অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার সালাতকে একত্রে আদায় করা জায়েয। (আশ-শারহুল কাবীর, ১/৩৬৮; মুগনিল মুহতাজ, ১/৫২৯, কাশশাফুল কিনা‘, ২/৫)

২. হানাফী আলেমগণ বলেন, আরাফা ও মুযদালিফা ব্যতীত দু’ ফরয সালাতকে একত্র করে আদায় করা যাবে না। তবে আকৃতিগতভাবে একত্রিত করা যাবে, আর তা হচ্ছে যোহরকে তার শেষ সময় পর্যন্ত দেরী করে আদায় করা তারপর আসরকে তার প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা। (আদ-দুররুল মুখতার ওয়া হাশিয়া ইবন আবেদীন, ১/৩৮১]

৩. শাফে‘ঈ ও হাম্বলীদের নিকট যদি দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে এসে প্রথম ওয়াক্তে দু’সালাতকে একত্রে পড়ে তবে সেখানে দ্বিতীয় সালাতকে আদায় করার নিয়্যত প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই থাকতে হবে। অবশ্য যদি প্রথম সালাতকে দেরী করে দ্বিতীয় সালাতের সময়ে নিয়ে যায় তখন প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে একত্রিত করার নিয়্যত লাগবে না। সে হিসেবে যদি প্রথম সালাত আদায় করার সময় দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আদায় করার নিয়্যত না করে তবে তার জমা বা একত্রিত করে আদায় করা শুদ্ধ হবে না। [রাওদাতুত তালেবীন, ১/৩৯৬; কাশশাফুল কিনা‘ ২/৮]

৪. মালেকী মাযহাবের আলেমগণের মতে, প্রথম সালাত আদায় করার সময়ে দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে জমা করার নিয়্যত করা ওয়াজিব কিন্তু শর্ত নয়। (আর তা দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আসা বা প্রথম সালাতকে দেরীতে আদায় করা উভয় ক্ষেত্রেই সমান) সুতরাং যদি কেউ প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে জমা নিয়্যত করা ছেড়ে দিল, তবে তাতে সালাত বাতিল হবে না। [হাশিয়াতুল আদাওয়ী (১/৩৩৫)]

৫. আর এক বর্ণনায় ইমাম আহমাদ, ইমাম মুযানী এবং ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাত তার সাথে একত্রিত করার নিয়্যতের বাধ্য-বাধকতা নেই। [আল-মুহাযযাব, (১/১৯৭); আল-ইনসাফ:২/৩৪১]

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান: তৃতীয় কিস্তি

কাপড়ের তৈরী মোজার উপর মাসেহ করার বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

কাপড়ের তৈরী মোজার উপর মাসেহ করার বিধান কি?

মোজার উপর মাসেহ করা সম্পর্রে কারো কোন দ্বিমত নেই। এ সম্পর্কে অসংখ্যা সহিহ হাদিস বিদ্যমান। প্রায় সত্তর জনের সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহু মোজা মাসাহ সংক্রান্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। কসর সালাত ও তাইয়ামুমের মত মোজার উপর মাসেহ করার বিধান মহার আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদির উপর জন্য বিশেষ এহসান।

আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া সুবিধাদি গ্রহণ করা। যেমনিভাবে তিনি অপছন্দ করেন তাঁর শানে কোনো পাপ সংঘটন করা”।(ইবন খুযাইমাহ ৯৫০, ২০২৭)।

আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ ও ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া সুবিধাদি গ্রহণ করা। যেমনিভাবে তিনি পছন্দ করেন তাঁর দেওয়া ফরযগুলো পালন করা”। ( ইবন হিব্বান ৩৫৬৮)।

ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম কারন ঈদের দিন আল্লাহ আনন্দ করার হুকুম দিয়েছেন। তাই শরীয়তের বিধান জেনে  যখন যা সহজ্জ তার জন্য তাই করা উত্তম। অতএব, যে ব্যক্তি মোজা পরিধান করাবস্থায় রয়েছে এবং তার মোজায় মোজা মাসাহ’র শর্তগুলোও পাওয়া যাচ্ছে তার জন্য উচিত মোজা না খুলে মোজার উপর মাসাহ করা। কারণ, তাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের অনুসরণ ও অনুকরণ করা হবে।

এই সহজ্জ বিধান কে  সুন্নাহ সম্মতভাবে আদায় করতে গিয়ে একটি বিতর্ক চলছে তা হল মোজার ধরণ নিয়ে মুজা কি চামড়ার হবে, নাকি কাপড়ের হলেও চলবে।

চমাড়ার মোজার উপর মাসাহ করা নিয়ে কোন মতভেদ বা ইকতিলাব নেই। এ ব্যাপার সকল উম্মত একমত বা ইজমা হয়েছে। কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করা নিয়ে কোর মতভেদ বা ইকতিলাব আছে। তাই বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের আলেমদের মতামত তুলে ধরব যাতে সহজে সঠিক মত গ্রহন করা সহজ্জ হয়।

যারা কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে নাঃ

উপমহাদেশের প্রায় সকল হানফী মাযহাবের অনুসারী আলেমগন চমাড়ার মোজার উপর মাসাহ করা শরীয়ত সম্মত বললেও কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে না। তাদের প্রায় সকল আলেমের ঐক্যমত হল :

“আমাদের দেশের প্রচলিত কাপড়ের মোজার উপর মাসেহ করা কিছুতেই জায়েজ নয়”

যেমন কওমী মাদ্রাদার আলের যারা হানাফি মাযহারভুক্ত তাদের কতৃর্ক প্রকাশিত মাসিক আল কাউসার পত্রিকার ১৮০৩ নম্বর প্রশ্ন ছিলঃ

প্রশ্নঃ এক খতীব সাহেবকে জুমআর বয়ানে বলতে শুনেছি যে, মোজার উপর মাসেহ বৈধ হওয়ার জন্য তা চামড়ার হওয়া জরুরি নয়। বরং আমাদের দেশে প্রচলিত সব ধরনের মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয। চাই তা সুতার হোক বা পশমের হোক বা অন্য কোনো কিছুর হোক। জানতে চাই, তার এ কথা কতটুকু সঠিক? (মুহাম্মাদ মাহমুদ হাসান, ধানমণ্ডি, ঢাকা থেকে)

উত্তরঃ

খতীব সাহেবের ঐ কথা ঠিক নয়। চামড়ার মোজার উপর মাসেহ জায়েয আছে। কিন্তু চামড়া ছাড়া সুতা বা পশমের তৈরি যেসব মোজা সচরাচর পাওয়া যায় এর উপর মাসেহ সহীহ নয়। তবে সুতা বা পশমের মোজায় নিম্নোক্ত শর্তগুলো পাওয়া গেলে তার উপর মাসেহ জায়েয হবে। শর্তগুলো হচ্ছে :
ক) মোজা এমন মোটা ও পুরু হওয়া যে, জুতা ছাড়া শুধু মোজা পায়ে দিয়ে তিন মাইল পর্যন্ত হাঁটা যায়। এতে মোজা ফেটে যায় না এবং নষ্টও হয় না।

খ) পায়ের সাথে কোনো জিনিস দ্বারা বাঁধা ছাড়াই তা লেগে থাকে এবং তা পরিধান করে হাঁটা যায়। 
গ) মোজা এমন মোটা যে, তা পানি চোষে না এবং তা ভেদ করে পানি পা পর্যন্ত পৌঁছায় না।
ঘ) তা পরিধান করার পর মোজার উপর থেকে ভিতরের অংশ দেখা যায় না। সচরাচর ব্যবহৃত সুতা বা পশমের মোজায় যেহেতু এসব শর্ত পাওয়া যায় না তাই এর উপর মাসেহ জায়েয হবে না।

হানফী মাযহারের আরেক জন আলেম মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী যিনি তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা এর পরিচালক। তিনি ও উক্ত শর্ত ৪ টি ঊল্লেখ করেন অতপর বলেন, সুতরাং পরিস্কার হয়ে গেল যে, আমাদের দেশের প্রচলিত কাপড়ের পাতলা মোজার উপর মাসাহ করা কিছুতেই জায়েজ নয়।

হানফী মাযহারের আরেক বিশ্ব বিখ্যাত আলেম মুফতি ত্বকি উসমানি। তিনি করাচি থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘আল বালাগ’ এর জমাদিউল উলা ১৩৯৭ হি. সংখ্যায় ‘প্রচলিত মোজার উপর মসেহ’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন।  যেখানে তিনিকাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে নাজায়েয বলেছেন। এবং যারা এর মাসাহ করার পক্ষে তাদের সমালোচনা করেছেন। বিশেষত জামায়াত ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা জনাব মাওলানা মওদুদী রাহিমাহুল্লার সমালোচনা করেন যিনি কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয বলেছেন।

মন্তব্যঃ আর কোন রেফারেন্স দেয়ার দরকার নেই কারন উপমহাদেশের হানফী মাযহাবের অনুসারী আলেমগন কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে না।  এ কথা বলে তাকে অভিযোগ করলে তিনি স্বীকার করেন ও এর সমর্থনে যুক্তি পেশ করেন।

যারা কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করেঃ

বর্তমানে সৌদি আরবের সকল আলেম যাদের আমরা সালাফি বলে চিনি। আমাদের দেশে যারা আহলে হাদিস নামে পরিচিত তারা সকলে কাপড়ের মোজার উপর মাসাহ করাকে জায়েয মনে করে থাকে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম এবং ইবনে হাজ্ম এই মতেরই অনুসারী। এরা সকলে “যে কোনো মোজার উপর মসেহ জায়েয বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তাদের দলিলঃ হল এই হাদিস যা ইমাম তিরমিজী উল্লখ করেছেন। হাদিসটি হলঃ

 *وَعَنْهُ قَالَ تَوَضَّاَ النَّبِىِّ ﷺ وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ وَالنَّعْلَيْنِ. رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالتِّرْمِذِيُّ وأَبُوْ دَاوٗدَ وَابْنُ مَاجَةَ*

অনুবাদঃ মুগীরা ইবনু শু‘বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অজু করলেন এবং জুতার সাথে ‘জাওরাব’ ও পা’ দু’টোর উপরের দিকও মাসাহ করলেন। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ ও ইবনু মাজাহ্, ছাহীহ: আবূ দাঊদ ১৫৯, তিরমিযী ইঃ ফাঃ ৯৯, ইবনু মাজাহ্ ৫৫৯, ইরওয়া ১০১, মিশকাতুল মাসাবীহ/মিশকাত: ৫২৩; ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী বলেনঃ এই হাদিসটি হাসান ও সহীহ। একাধিক আলিমের অভিমত এই। হাদিসের মানঃ ছাহীহ)


হাদীছটির ব্যাখ্যা: جَوْرَبَيْنِ ‘জাওরাবায়ন’ শব্দটি جَوْرَبْ ‘জাওরাব’-এর দ্বিবচন। এর অর্থ কাপড়ের মোজা। বর্ণিত হাদীসে প্রমাণ হয় যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাওরাবায়ন বা পায়ের ঢাকনীর উপর মাসাহ করেছেন। সেটা চাই পশমী হোক বা চুলের হোক। আর চামড়ার হোক বা পস্নাস্টিকের হোক। মোটা হোক বা পাতলা হোক সেটার উপর মাসাহ করা জায়িয আছে। জাওরাবায়ন জুতার ন্যায় যা জমিন হতে পাকে রক্ষা করে। সেটার উপর মাসাহ করা উত্তম। ইমাম ইবনু হাযম সেটা মোটা হওয়ার জন্য শর্ত করেছেন। অনেক সাহাবায়ি কিরাম এর ওপর ‘আমাল করেছেন। হাদীছটিকে ইমাম তিরমিযী  রহঃ ছহীহ বলেছেন।

প্রশ্নঃ এক ভাই জানতে চেয়েছেন ওজুর সময় মুজার ওপর পা মাসেহ করা জায়েজ কিনা? আমরা জানি আমাদের রাসূল (সা:) চামড়ার মুজার ওপর মাসাহ করতেনএখন প্রশ্ন হল নরমাল সব মুজার ওপর মাসেহ করা যাবে কি না? রেফারেন্স সহ জানালে উপকৃত হব।

উত্তরঃ মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয় চাই তা চামড়ার তৈরি হোক বা সুতার তৈরী হোক। সাহাবীগণ অনেকেই কাপড়ের তৈরী মোজা পরিধান করতেন আর তার উপর মাসেহ করতেন।

উল্লেখ্য যে, আরবীতে চামড়ার তৈরী মোজাকে ‘খুফ’ আর সুতার তৈরী মোজাকে ‘জাওরাব’ বলা হয়। উভয় প্রকার মুজার উপর মাসেহ করা বৈধ।

চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করা সর্ব সম্মতক্রমে বৈধ। তবে সুতার তেরী মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ কি না- এ বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও সঠিক মত হল, জায়েয।

*বিস্তারিত*
সাধারণভাবে সকল ধরণের জাওরাব (সুতার তৈরী মুজা) এর উপর মাসাহ বৈধ, এমনকি যদি তা খুব পাতলা হয় তবুও: এটাই ইবনু হাযম ও ইবনু তাইমিয়ার স্পষ্ট মাযহাব। আর এ মতকেই ইবনু উছাইমীন ও আল্লামা শানক্বীতী পছন্দ করেছেন।

[আল-মুহালস্না (২/৮৬), আল-মাসায়িলুল মারদিনিয়্যাহ (৫৮ পৃ.), মাজমূ’ আল-ফাতাওয়া (২১/১৮৪), আল-মুমতি’ (১/১৯০), আযওয়াউল বায়ান (২/১৮, ১৯), এখানে এ বিষয়ে মূল্যবান আলোচনা রয়েছে।] 
*এটাই অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।*

এখানে জাওরাবের উপর মাসাহ বৈধ মর্মে বর্ণিত শেষ দু‘টি অভিমতের প্রবক্তাগণ নিম্নোক্ত দলিল গুলোকে দলিল হিসাবে দাড় করান। যথাঃ

عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى الْجَوْرَبَيْنِ، وَالنَّعْلَيْنِ

(১) মুগীরা বিন শোবা (রাঃ) বর্ণিত হাদীস: ‘নিশ্চয় রাসূল (ﷺ) একবার ওযূ করলেন এবং জাওরাব ও দু জুতার উপর মাসাহ করলেন। (এ হাদীসকে আলবানী সহীহ বলেছেন, আবূ দাউদ (১৫৯), তিরমিযী (৯৯), আহমাদ (৪/২৫২), এ ব্যাপারে বিস্তারিত ‘আল-ইরওয়া (১০১)-দ্রষ্টব্য।)

عَنِ الأزرق بن قيس قال رأيت أنس بن مالك أحدث فغسل وجهه ويديه ومسح برأسه ، ومسح على جوربين من صوف فقلت : أتمسح عليهما ؟ فقال : إنهما خفان ولكنهما من صوف

(২) আয়রাক্ব ইবনে কায়েস (রাঃ) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনে মালিককে লক্ষ্য করেছি, তিনি বায়ু নিঃসরণ হলে তাঁর চেহারা ও দুহাত ধৌত করতেন এবং পশমের তৈরি জাওরাবের উপর মাসাহ করতেন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি জাওরাবের উপর মাসাহ করলেন? তিনি বললেন, এ দু’টি মোজা যা পশমের তৈরি। [এ হাদীসকে আহমাদ শাকির সহীহ বলেছেন; আলকূনী (১/১৮১) দাওলাবী প্রণীত।]

এখানে আনাস (রাঃ) খাফ বা মোজা চামড়ার তৈরি হওয়ার ব্যাপারে আম (ব্যাপক), সে কথা স্পষ্ট করেছেন। উল্লেখ্য যে, তিনি আরবী ভাষাবিদদের অন্যতম একজন সাহাবী ছিলেন।

(৩) জাওরাবের উপর মাসাহ করার হাদীস ১১ জন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। যাদের মধ্যে উমার তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বিন উমর, আলী, ইবনে মাসউদ আনাস প্রমুখ সাহাবী অন্যতম। তাদের সমসাময়িক কোন সাহাবী তাদের বিরোধিতা করেন নি। বরং, সকলে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। পরবর্তীতে জমহুর উলামা পাতলা জাওরাবের উপর মাসাহ করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তা দ্বারা ফরযের স্থান আচ্ছাদিত হয় না। অথচ এটা মাসাহ বৈধ হওয়ার জন্য শর্ত নয় যা ইতিপূর্বে আলোচনা হয়েছে।

বর্তমানে চামড়ার তেরী মোজার তুলনায় সুতার তৈরী মোজার প্রচলন বেশি। সেহেতু মোজার উপর মাসেহ করার জন্য চামড়ার তেরী হওয়ার শর্তারোপ করা ইসলাম প্রদত্ব প্রশস্ত বিধানকে সংকুচিত করে দেয়ার শামিল। (আল্লাহু আলাম)। (উত্তর দিয়েছেন শাইখ আব্দূল্লাহ হাদি)

শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহঃ) প্রশ্ন করা হয়েছিল, পাতলা বা ছেঁড়া মোজাতে মাসেহ করার বিধান কি?

বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, ছেঁড়া মোজা এবং বাইরে থেকে চামড়া দেখা যায় এমন পাতলা মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয। যে অঙ্গের উপর মাসেহ হবে তাকে পরিপূর্ণরূপে ঢেকে রাখতে হবে এটা উদ্দেশ্য নয়। কেননা পা তো আর সতর নয়। মাসেহ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে ওযুকারী ব্যক্তির উপর সহজ্জতা ও হাল্কা করা। অর্থাৎ- আমরা প্রত্যেক ওযুর সময় মোজা পরিধানকারীকে মোজা খুলে পা ধৌত করতে বাধ্য করব না। বরং বলব, এর উপর মাসেহ করাই আপনার জন্য যথেষ্ট। আর এই সহজ্জতার উদ্দেশ্যেই মোজার উপর মাসেহ শরীয়ত সম্মত করা হয়েছে। অতএব কোন পার্থক্য নেই চাই মোজা ছেঁড়া হোক বা ভাল হোক, পাতলা হোক বা মোটা হোক। (গ্রন্থের নামঃ ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, বিভাগের নামঃ পবিত্রতা, ক্রমিন নং ১৪৫)।

সাইয়্যেদ আবুল আ‘লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ

সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহ হানাফি আলেম হয়েও মতামত দিয়েছেন, সব ধরনের মোজার উপর মসেহ করা চলে, তাই তা সুতি হোক কিংবা পশমি হোক রামপুর (ভারত) থেকে প্রকাশিত মাসিক যিন্দেগীর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করা হলে তিনি আবার সুন্দর করে তার উত্তর প্রদান করেন যা রাসায়েল ও মাসায়েল ৬ষ্ঠ খন্ড “মোজার উপর মসেহ করার বিধান” শিরনামে উল্লখ করা হয়েছে নিম্ম তা হুবহু তুলে ধরা হলঃ

প্রশ্নঃ রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খণ্ডে এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করা চলে, তাই তা সুতি হোক কিংবা পশমি হোক রামপুর (ভারত) থেকে প্রকাশিত মাসিক যিন্দেগীর ১৯৬৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, সুতি হোক, পশমি হোক, পাতলা মোজার উপর মসেহ করা চলবেনা। কেননা পবিত্র কুরআন ও উৎকৃষ্ট মানের সহীহ হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত বিধিকে দুর্বল হাদিসের ভিত্তিতে শিথিল করা যায়না। হযরত মুগীরা ইবনে শুবার যে হাদিসটি বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে এবং যা অত্যন্ত সহীহ হাদিস, তাতে একমাত্র চামড়ার মোজার উপরে মসেহ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁর অপর যে হাদিসটিতে জাওরাইন (সুতি ও পশমি মোজা) শব্দটি সংযোজিত হয়েছে, হাদিস শাস্ত্রের ইমামগণ তাকে দুর্বল বলে রায় দিয়েছেন। 

বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে এরূপ যুক্তিও উত্থাপন করা হয়েছে যে, ‘জওরাব’ ও চামড়ার তৈরি হয়ে থাকে বিধায় ‘জওরাব’ ও এক ধরনের খুফ্‌ (চামড়ার মোজা) সুতরাং হয় চামড়ার মোজার উপরই মসেহ জায়েয মেনে নিতে হবে, নচেত জাওরাব যদি চামড়ার না হয়, তবে তাকে এমন শর্ত আরোপ করতে হবে যাতে তা খুফ্‌ তথা চামড়ার মোজার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। অন্যথায় চামড়ার মোজা ছাড়া আর কোনো মোজার উপর মসেহ করা জায়েয হবে না।


যিন্দেগীর উক্ত সংখ্যায় যে বিতর্ক, প্রশ্ন ও আপত্তি তোলা হয়েছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তরজমানুল কুরআনে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা আসা জরুরী হয়ে পড়েছে। যে কোনো মোজার উপর যে মসেহ করা চলে, সে সম্পর্কে প্রাচীন ইমামদের কোনো উক্তি থাকলে সেটাও তুলে দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

জবাবঃ  চামড়ার মোজার উপর মসেহ জায়েয হওয়ার ব্যাপারে সুন্নি ইমামরা প্রায় সকলেই একমত। তবে জাওরাব তথা চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপর মসেহ করার জন্য ফেকাহবিদগণ কিছু শর্ত আরোপ করেছেন। যেমন তা মোটা হওয়া চাই, গাঢ় ও পুরু হওয়া চাই, পানি নিরোধক হওয়া চাই এবং তাতে জুতার সমপরিমাণ চামড়াযুক্ত থাকা চাই। তবে প্রাচীন ফেকাহবিদদের কেউ কেউ আবার সকল ধরনের মোজার উপর মসেহ করাকে জায়েয মনে করেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়েম এবং ইবনে হাজ্‌ম এই মতেরই প্রবক্তা। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ফতোয়া গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে সুতি হোক, পশমি হোক, চামড়াযুক্ত হোক বা না হোক- যে কোনো মোজার উপর মসেহ জায়েয বলে একটি ফতোয়া লিপিবদ্ধ রয়েছে। রসূল সা. চামড়ার তৈরি নয় এমন মোজার উপরও মসেহ করতেন এই মর্মে যেসব হাদিস বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে, সে সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বলেনঃ

এই হাদিসগুলোর বক্তব্য হাদিসবেত্তাদের মানদণ্ডে সহীহ প্রমাণিত না হলেও স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধির দৃষ্টিতে এই বক্তব্য সঠিক। মাসাহের প্রয়োজন উভয় ক্ষেত্রেই সমান। উভয় ক্ষেত্রেই মাসাহের প্রয়োজন ও যৌক্তিকতা একই রকম। কাজেই এ দুটোর মধ্যে বৈষম্য করা সমমানের জিনিসকে অসম বলারই নামান্তর এবং সুবিচারের পরিপন্থী।

অনুরূপভাবে, চামড়া বেশি টেকসই হয়ে থাকে এবং তাতে পানি ঢোকে না এ যুক্তিও তাঁর মতে গুরুত্ববহ নয়। তিনি বরঞ্চ মনে করেন, সুতি বা পশমি মোজায় পানি শোষণ ও ভেতরে পানি প্রবেশ করা পবিত্রতার প্রয়োজনে অধিকতর অগ্রগণ্য এবং কর্তব্য। এসব মোজার পাতলা বা ঢিলে হওয়া অথবা বাঁধার প্রয়োজন না হওয়ায় তাঁর মতে অসুবিধার কিছু নেই।

আবু দাউদ শরিফের ব্যাখ্যা সম্বলিত গ্রন্থে মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের পর্যালোচনা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে কাইয়েমও এই অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। এসব হাদিসের সনদ যে নির্ভরযোগ্য নয়, সে কথা তিনি স্বীকার করেছেন। তবে তার বিভিন্ন জবাবও দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন, সুতি ও পশমি মোজায় মসেহ বৈধ হওয়ার ব্যাপারটা শুধুমাত্র রসূল স.-এর প্রত্যক্ষ বক্তব্য বা আচরণ সম্বলিত হাদিসের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ১৩ জন সাহাবির কার্যধারা থেকেও তা সমর্থিত। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল র. এই হাদিসগুলোকে দুর্বল আখ্যায়িত করা সত্বেও সুতি ও পশমি কাপড়ের মোজার উপর মসেহকে বৈধ বলে রায় দিয়ে সুবিচার ও ইনসাফের পরিচয় দিয়েছেন। সাহাবাদের কার্যধারা ও সুস্পষ্ট যৌক্তিকতার আলোকেই তিনি এরূপ রায় দিয়েছেন। আসলে ‘জাওরাবাইন’ তথা সুতি ও পশমি মোজা এবং ‘খুফ্‌ফাইন’ তথা চামড়ার মোজার এমন কোনো কার্যকর পার্থক্য নেই, যা শরিয়তের বিধানে পার্থক্য সুচিত করতে পারে। ইবনে কায়েম অনেক দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এতে তিনি সুতি ও পশমি মোজার উপর মাসাহের শর্তাবলীর সমালোচনা করেছেন এবং এ জাতীয় মোজার উপর মাসাহের বৈধতা সম্বলিত হাদিসগুলোতে সনদ ও যুক্তির বিচারে যে খুঁত ধরা হয়েছে, তা খণ্ডন করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি পরিহাসচ্ছলে একটা তীর্যক মন্তব্যও ছুড়ে দিয়েছেন যে, কোনো কোনো ফেকাহ শাস্ত্রবিদদের কাছে চামড়ার মোজার সাথে সুতি ও পশমির মোজাকেও মসেহযোগ্য ধরা গ্রহণযোগ্য হয়নি। অথচ এ ধরনের কোনো সংযোজন যখন তাদের ফেকাহ শাস্ত্রীয় মতামতের পক্ষে যায়, তখন সেটাকে তারা নি:সংকোচে গ্রহণ করেন।

“ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের দাবি এই যে, আপনি নিজের পণ্য যে পাল্লা দিয়ে মাপেন, আপনার বিরুদ্ধবাদীর পণ্যও সেই পাল্লা দিয়েই মাপবেন। নেয়া ও দোয়ার পাল্লা আলাদা রাখবেন না।”

ইবনে হাজমও তদীয় গ্রন্থ মুহাল্লাতে বিশদ আলোচনা করে ও সকল হাদিস উদ্ধৃত করে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, পায়ে  চামড়া, সুমি, পশমি, বা অন্য কোনো কাপড়ের তৈরি যাই পরা হোক না কেন, তাতে মসেহ চলবে। এতো সব ইতিবাচক মতামত ও বক্তব্য বর্তমান থাকা অবস্থায় কেউ যদি পূর্ববর্ণিত ফকীহদের উল্লেখিত শর্তাবলী সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ ও সর্বপ্রকারের মোজার উপর মসেহ করাকে বৈধ মনে করে, তবে তার বক্তব্য সহজে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এরপর আরো কয়েকটি কথা বলা সমীচীন মনে করছি। প্রথম কথা হলো, সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ জায়েয এই মর্মে মুগীরা ইবনে শুবা রা. বর্ণিত হাদিসটি ইমাম তিরমিযী সহীহ ও উত্তম বলেছেন। এই হাদিসটিকে একই সাহাবি বর্ণিত চামড়ার মোজায় মসেহ সংক্রান্ত হাদিসের বিপরীত বলে অগ্রাহ্য করা যায়না। এতোটুকু বৈপরিত্য মেনে নেয়া যেতো যদি মাসাহের ঘটনা এক আধবার ঘটতো। ওযু করা ও পবিত্রতা অর্জন করা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। তাই উভয় ধরনের মোজায় মসেহ করার প্রয়োজনীয়তা স্বভাবতই একাধিকবার দেখা দেয়ার কথা। তাছাড়া হযরত মুগীরা দীর্ঘদিন যাবত রসূল সা.-এর সাথে থেকেছেন। তাই তার এই দু’ধরণের বর্ণনায় রসূল সা.-এর বিভিন্ন সময়কার কার্যধারার প্রতিফলন ঘটেছে ধরে নিতে অসুবিধে কোথায়? সুতি ও পশমি মোজার উপর মসেহ সম্পর্কে রসূল সা. -এর আরো বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো বিশেষ ধরনের মোজা নয় বরং যে কোনো ধরনের মোজার উপরই মসেহ জায়েয। তাই মসেহকে শুধুমাত্র চামড়ার মোজার সাথে নির্দিষ্ট করা এবং সুতি বা পশমির মোজা হলে তাকেও চামড়ার মোজা সদৃশ্য ঘন ও পুরু ইত্যাদি হওয়ার শর্তযুক্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই।

কথাটা আরো একটু সহজ্জবোধ্য করার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। সোনা ও রূপার যাকাতের সর্বনিম্ন পরিমাণ আলাদা আলাদা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তন্মোধ্যে রূপার নিসাব সম্বলিত হাদিস সবচেয়ে বিশুদ্ধ। কিন্তু সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিস সনদের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। ছয়টি সহীহ হাদিস গ্রন্থের মধ্যে কেবলমাত্র আবু দাউদ শরিফে সোনার নিসাব ২০ দিনার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই হাদিসের বর্ণনাকারীর বিশ্বস্ততা বিতর্কিত। তা সত্ত্বেও দুনিয়ার অধিকাংশ মুসলমান সোনা ও রূপার আলাদা আলাদা নিসাবই মেনে চলে। নিসাব সংক্রান্ত এই হাদিসকে গ্রহণ করলে নিসাবের চেয়ে কম পরিমাণে যাকাত থেকে অব্যাহতি মেলে, ঠিক যেমন মাসাহের হাদিস গ্রহণ করলে মসেহ করে পা ধোয়ার হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায়। নিসাবের প্রশ্নটা যাকাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত সম্পাদনের সাথে জড়িত। এখন সোনার নিসাব সংক্রান্ত হাদিসটি যদি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তাহলে কুরআনের কঠোর সতর্কবাণী অনুযায়ী যাকাত না দিয়ে স্বর্ণের একটা তারও রাখা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। আর যদি (একই কারণে অর্থাৎ হাদিসটি দুর্বল হলে অগ্রাহ্য করার কারণে) সোনাকে রূপার সমপর্যায়ের ধাতু ধরে নিয়ে সোনার নিসাব ও রূপার নিসাবের সমান মনে করা হয়, (যেমন সুতি ও পশমি মোজাকে চামড়ার মোজার সমপর্যায়ের ধরা হয়) তাহলে একতোলা সোনার উপরও যাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক হবে। কিন্তু চামড়ার মোজা ও কাপড়ের মোজার উপর মসেহ করার অনুমতিকে যদি পৃথক পৃথক অনুমতি মেনে নেয়া হয় এবং একটির সাথে অন্যটিকে জড়িয়ে ফেলা না হয়, তাহলে মোজা মোটা বা পাতলা যাই হোক, বিধি অপরিবর্তিতই থাকবে। কোনো জিনিসের পুরু বা পাতলা হওয়াটা আপিক্ষিক গুণ বা অবস্থা মাত্র, মূল জিনিসের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মোটা বা পাতলা যাই হোক চামড়া চামড়াই এবং পশম পশমই। আজকাল যে ধরনের পাতলা ও কোমল চামড়ার পায়তাবা পরে কেউ কেউ মসেহ করে থাকেন, সে মসেহ জায়েয হলে সুতি পশমি ও নাইলনের মোজায় মসেহ করা নাজায়েয কেন হবে?
আরবিতে খুফ্‌ ও (জাওরাব) বলতে যে মোজা বুঝায়, সেই উভয় মোজাই চামড়ার হয়ে থাকে- এ কথা ঠিক নয়। প্রচলিত আরবিতে খুফ্‌ বলতে চামড়ার মোজা এবং জাওরাব বলতে চামড়া ছাড়া অন্যান্য মোজা বুঝায়। তবে লিসানুল আরব, কামুস ও তাজুল আরুসে এই দুটো শব্দের আভিধানিক অর্থ বলা হয়েছে ‘পায়ের পোশাক।’ চামড়ার তৈরি না অন্য কিছুর তৈরি, এই দু’টি শব্দের আসল আভিধানিকদের কাছে কোনো ধরাবাধা ব্যাপার নয়। তাজুল আরুস এবং লিসানুল আরবে এ কথাও বলা হয়েছে যে, জাওরাব আসলে ফার্সী শব্দ ‘গোরব’-এর আরবি রূপ। আর ফার্সী আভিধানে গোরব অর্থ হলো পশম বা সুতার মোজা। আরবি ভাষায় খুফ্‌ শব্দ দ্বারা জাওরাব এবং জাওরাব দ্বারা খুফ্‌ বুঝানোও বিচিত্র নয়। ইমাম দুলাবী স্বীয় গ্রন্থ ‘আসমা ও কুনাতে’ হযরত আনাস সম্পর্কে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যে, তিনি স্বীয় পশমি মোজায় মসেহ করে বললেন “এ দুটো হচ্ছে পশমের তৈরি খুফ্‌”।’

এ থেকে বুঝা গেলো যে, পশমি মোজাকে হযরত আনাস একশ্রেণীর খুফই বলেছেন। তিনি এ কথা বলেননি যে, এটা খুফ তো নয়, তবে অত্যাধিক মোটা ও পুরু বলে এটা খুফেরই পর্যায়ভুক্ত এবং এ কারণেই তার উপর মসেহ বৈধ। [তরজমানুল কুরআন, ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮]

মন্তব্যঃ উপমাদেশের হানাফি আলেমগন যে মতামত দিয়েছেন, যেমনঃ মোজামোটা ও পুরু হওয়া, মোজা পায়ে দিয়ে ৩/৪ মাইল পর্যন্ত হাঁটা যাবে, পায়ের সাথে লেগে থাকা, পানি চোষে না বা ভেদ করে পানি ঠোকে না ইত্যাদি। সঠিক কথা বলতে, এই ধরনের কোন শর্ত মোজার উপর মাসাহ করার জন্য আরোপ করা হয়নি। তবে হ্যা, সালাফদের অনেক মোজা মোটা হওয়ার কথা বলেছেন।

তিরমিজিতে মুগীরা ইবনু শু‘বা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় সুফইয়ান ছাওরী, ইবনু মুবারাক, শাফিঈ, আহমদ ও ইসহাক (রহঃ) ও এই অভিমত পোষণ করেন, তারা বলেনঃ কাপড়ের মোযা যদি মোটা হয় তাহলে পায়ে চপ্পল না থাকলেও তাতে মাসেহ করা যাবে। (ইসলামি ফাউন্ডেশন, তিরমিজী হাদিস ৯৯ এর ব্যাখ্যা)।

যেহেতু মুজার উপর হাদিসে কোন শর্ত আরোপ করেনি তাহলে আমরা কেন করব। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করছেন তার অনুসরণই একমাত্র শ্রেষ্ঠ মানদন্ড। বর্তমান সময়ে লোকেরা কাপড়ের তৈরী মোজাই পরিধান করে থাকে। সুতরাং হাদীছে যেহেতু বিনা পার্থক্যে মোজার উপর মাসেহ করা বৈধ রাখা হয়েছে, তাই সকল প্রকার মোজার উপর মাসেহ করাই বৈধ। তা চামড়ার তৈরী হোক বা সুতার তৈরী হোক। পরিভাষায় যাকে মোজা বলা হয় তার উপরই মাসেহ করা বৈধ। ইসলাম মানুষের উপর সহজ্জ করতে উৎসাহ দিয়েছে এবং কঠোরতা করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং দলিল বিহীন কোন কঠিন মাসআলা মানুষের চাপিয়ে দেয়া ঠিক নয়।

তার পরও একটা কথা থাকে। মাসায়েলের ক্ষেত্রে এ উম্মতের প্রশস্ততা আছে। একই বিষয় একাধিক মতামত থাকতে পারে। যার মতামত কুরআন সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী তাই সবার অনুসরণ করা উচিত। তবে অন্যমতকেও সম্মানের চোখে দেখা উচিত, কারন ইসলামি শরীয়তের মৌলিক বিষয়ে বাতিল ফির্কা ছাড়া কার মাঝে বিভেধ নেই। (সব বিষয় আল্লাহই ভাল জানেন)। আমিন।।।

সফরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান : চতুর্থ কিস্তি

সফরের সময় সিয়ামের বিধান

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সফরের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ইসলাম সফর বা ভ্রমণকারীর জন্য ইসলামী বিধানে কিছুটা রুখসত বা ছাড় দিয়েছে। সালাত মহান আল্লাহ এমন এক আদেশ যাকে কোন অবস্থায়ই পরিত্যাগ করা যাবে না, তাই সে সফরে থাকুক আর বাড়িতে থাকুন। কিন্তু মহান আল্লাহ সফরের সময় সালাতের ব্যাপারে আমাদের প্রতি কিছুটা সহনশীলতা প্রদর্শণ করেছেন। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়া সত্বেও সফর বা ভ্রমণকরীর জন্য চার রাকআত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে বা কমিয়ে দুই রাকআত করেছেন। শুধু সালাত নয় সফরে আরও কয়েকটি হুকুমের ব্যাপারে মহান আল্লাহ কিছুটা ছাড় বা রুখসত প্রদান করেছেন। সফরে থাকা কালিন সময়ে সফরকারিকে মুসাফির বলা হয়। মুসাফির ব্যক্তি সব সময় চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি রুখসত হলঃ

১। সালাতকে কসর করে আদায়

২। সালাতকে জমা করা।

৩। সফরে তিন দিন ও তিন রাত্রি পর্যন্ত মোজার উপর মাসেহ করা

৪। সফর অবস্থায় রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করা

সফরের সময় সিয়ামের বিধান

সিয়াম পালন করতে মহান আল্লাহ নির্দেশ প্রদান করছেন এবং কোন শরীয়ত সম্মত ওজর ছাড়া পরিত্যাগ করা যাবেনা। সিয়াম ত্যাগ করা হারাম এবং অস্বীকার কারি কাফির। রমজান মাস ব্যাপিয়া সিয়াম পালন করা ফরজ। কিন্তু মহান আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম এই ফরজ হিসাব মুসাফিরের জন্য কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। যে আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম ফরজ করেছেন সেই আয়াতেই তিনি মুসাফিরের জন্য সিয়াম পালনে ছাড় দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম পালন ও মুসাফিরের অবকাশ প্রদান করে সুরা বাকারায় এরশাদ করেন,

*شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ

অর্থঃ রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। (সুরা বাকারা ২:১৮৫)।

সালাতের ব্যাপারে দেখেছি সফরের সময় মুসাফির সালাতের কসর করছে। সিয়ামের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম ভাঙ্গার অবকাশ প্রদাণ করছেন কিন্তু মুসাফির যখন মুকিম হবে তখন তার উপর ঐ সিয়ামের কাযা করা ওয়াজির হয়ে যায়। যেমনঃ মহান আল্লাহ বলেন,

أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَى سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَ وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَن تَصُومُواْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থঃ গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণ কর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার। (সুরা বাকারা ২:১৮৪)।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা অসুস্থ ব্যক্তি, সফরে থাকা ব্যক্তি বা মুসাফির, হায়েজ-নেফাস আক্রান্ত নারী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী, এবং দুর্ঘটনায় পতিত বা বিপদগ্রস্ত লোককে উদ্ধারকাজে নিয়োজিক ব্যক্তি উপর সিয়াম পালন করা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন।

এই সকল ব্যক্তির যে সকল ওজরের কারনে সিয়াম পালন সাময়িক স্থগিত ছিল, তাদের সে সকল ওজর দুরিভূত হলে ঐ ভাঙ্গা বা বাদপড়া সিয়ামগুলি গননা করে পুনরায় আদায় করতে হবে। অর্থাৎ যখন অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হবে, সফরে থাকা ব্যক্তি সফর শেষ কবরে অর্থাৎ মুসাফির ব্যক্তি মুকিম হবে, নারীগণ হায়েজ-নেফাস এর সময় অতিক্রান্ত করবে, গর্ভবতী নারী সস্তান প্রষব করবে এবং স্তন্যদানকারী নারীর সন্তান স্তন্য পানের সময় অতিক্রান্ত করবে তখন সে তার ভাঙ্গা সিয়ামগুলি আদায় করা ওয়াজিব।

মহান আল্লাহ কুরআনে স্পষ্ট ঘোষনার পর এ সম্পর্কে আর কোন সংশয় থাকার কথা নয়। তাই এ সম্পর্কিত বিধী বিধাণ জানার জন্য কিছু সহিহ হাদিস উল্লেখ করব।

সফরের সময় সিয়াম না থাকার নির্দেষঃ

ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (মক্কা বিজয়ের বছর) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনাহ্ হতে মক্কার দিকে রওনা হলেন। (এ সফরে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সওম রেখেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন (মক্কা হতে দু’ মঞ্জীল দূরে) ‘উসফান’-এ (নামক ঐতিহাসিক স্থানে) পৌঁছলেন তখন পানি চেয়ে আনালেন। এরপর তা হাতে ধরে অনেক উঁচুতে উঠালেন। যাতে লোকেরা পানি দেখতে পায়। এরপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সিয়াম ভাঙলেন। এভাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় পৌঁছলেন। এ সফর হয়েছিল রমাযান (রমজান) মাসে। ইবনু ‘আব্বাস বলতেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে সিয়াম রেখেছেন, আবার ভেঙেছেন। অতএব যার খুশী সওম রাখবে (যদি কষ্ট না হয়)। আর যার ইচ্ছা রাখবে না। (সহিহ বুখারী ১৮২০, সহিহ মুসলিম ১১১৩, মিসকাত ২০২৩, আবূ দাঊদ ২৪০৪, নাসায়ী ২৩১৪, আহমাদ ২৬৫২, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৬০, ইবনু হিব্বান ৩৫৬৬।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাসে (মাদীনাহ্ হতে) মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। তিনি (মক্কা মাদীনার মধ্যবর্তী স্থান ‘উসফানের কাছে) ‘‘কুরা-‘আল গমীম’’ পৌঁছা পর্যন্ত সওম রাখলেন। অন্যান্য লোকেরাও সওমে ছিলেন। (এখানে পৌঁছার পর) তিনি পেয়ালায় করে পানি চেয়ে আনলেন। পেয়ালাটিকে (হাতে উঠিয়ে এতো) উঁচুতে তুলে ধরলেন যে, মানুষেরা এর দিকে তাকাল। তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পানি পান করলেন। এরপর কিছু লোক আরয করল যে, (এখনো) কিছু লোক সওম রেখেছে (অর্থাৎ- রসূলের অনুসরণে সওম ভাঙেনি)। (এ কথা শুনে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এসব লোক পাক্কা গুনাহগার, এসব লোক পাক্কা গুনাহগার। (সহিহ মুসলিম ১১১৪, মিসকাত ২০২৭, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২০১৯, সহীহ ইবনু হিববান ৩৫৪৯, সহীহ আত্ তারগীব ১০৫৩।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা (একবার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। আমাদের কেউ সায়িম ছিলেন। আবার কেউ সওম রাখেননি। আমরা এক মঞ্জীলে পৌঁছলাম। এ সময় খুব রোদ ছিল। (রোদের প্রখরতায়) সায়িম ব্যক্তিগণ (মাটিতে) ঘুরে পড়ল। যারা  সিয়ামরত ছিল না, ঠিক রইল। তারা তাঁবু বানাল, উটকে পানি পান করাল। (এ দৃশ্য দেখে) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সিয়াম না থাকা লোকজন আজ সাওয়াবের ময়দান জিতে নিলো। (সহিহ বুখারী ২৮৯০, সহিহ মুসলিম ১১১৯, মিসকাত ২০২২, নাসায়ী ২২৮৩, ইবনু আবী শায়বাহ্ ৮৯৬১, ইবনু খুযায়মাহ্ ২০৩৩, সহীহ আত্ তারগীব ১০৬১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৫, ইবনু হিববান ৩৫৫৯, সহীহ আল জামি‘ ৩৪৩৬।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার এক সফরে ছিলেন। এক স্থানে তিনি কিছু লোকের সমাগম ও এক ব্যক্তিকে দেখলেন। (রোদের তাপ থেকে রক্ষা করার জন্য) ওই লোকটির ওপর ছায়া দিয়ে রাখা হয়েছে। (এ দৃশ্য দেখে) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ওখানে কী হয়েছে? লোকেরা বলল, এ ব্যক্তি সায়িম (দুর্বলতার কারণে পড়ে গেছে)। এ কথা শুনে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সফর অবস্থায় সিয়াম রাখা নেক কাজ নয়। (সহিহ বুখারী ১৯৪৬, সহিহ মুসলিম ১১১৫, মিসকাত ২০২১, দারিমী ১৭৫০, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৪)।

সফরের সময় সিয়াম রাখা ইচ্ছধীনঃ

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রী আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, হামযা ইবনু ‘আমর আসলামী (রাঃ) অধিক সিয়াম পালনে অভ্যস্থ ছিলেন। তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, আমি সফরেও কি সিয়াম পালন করতে পারি? তিনি বললেনঃ ইচ্ছা করলে তুমি সিয়াম পালন করতে পার, আবার ইচ্ছা করলে নাও করতে পার। (সহিহ বুখারী ১৮১৯, সহিহ মুসলিম ১১২১, তিরমিযী ৭১১, নাসায়ী ২৩০৬, ইবনু মাজাহ ১৬৬২, মিসকাত ২০১৯, আহমাদ ২৫৬০৭, ইবনু খুযায়মাহ্ ২০২৮, মু‘জামুল কাবীর লিত্ব ত্ববারানী ২৯৬৪, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৬)।

হামযাহ্ ইবনু ‘আমর আল আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসূল! সফর অবস্থায় আমি সওম পালনে সমর্থ। (না রাখলে) আমার কী কোন গুনাহ হবে? তিনি বললেন, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ ‘আযযা ওয়াজাল্লা তোমাকে অবকাশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ অবকাশ গ্রহণ করবে, সে উত্তম কাজ করবে। আর যে ব্যক্তি সওম রাখা পছন্দ করবে (সে রাখবে), তার কোন গুনাহ হবে না। (মিসকাত ২০২৯, হাদিসের মান সহিহ; সহিহ মুসলিম ১১২১, নাসায়ী ২৩০৩, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ্ ২০২৬, দারাকুত্বনী ২৩০১, সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৮১৫৮, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩৫৬৭, ইরওয়া ৯২৬, সহীহাহ্ ১৯২)।

আবূ সা‘ঈদ আল্ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (একবার) আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে যুদ্ধে রওনা হলাম। সে সময় রমাযান (রমজান) মাসের ষোল তারিখ অতিবাহিত হয়েছিল। (এ সময়) আমাদের কেউ সওম রেখেছে, আবার কেউ রাখেনি। সায়িমগণ সওমে না থাকা লোকদেরকে খারাপ জানেনি আবার সওমে না থাকা লোকজনও সায়িমগণকে খারাপ মনে করেনি।  (মিসকাত ২০২০ হাদিসের মান সহিহ, সহিহ মুসলিম ১১১৬, আহমাদ ১১৭০৫, সহীহ আত্ তারগীব ১০৬২)।