মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১১. স্ত্রীর সাথে নিয়মিত রাত্রিযাপন
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু শারীরিক প্রয়োজন নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক বন্ধনের জন্যও অপরিহার্য। স্বামী তার স্ত্রীর মানসিক ও শারীরিক চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকবেন।
আল্লাত তায়ালা বলেন-
وَعَاشِرُوۡہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۚ فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯
এই আয়াতে ‘ভালোভাবে জীবনযাপন’ বলতে সকল প্রকার পারস্পরিক অধিকার আদায়কে বোঝানো হয়েছে, যার মধ্যে রাত্রিযাপনও অন্তর্ভুক্ত।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যার দু’জন স্ত্রী আছে, আর সে তাদের একজনের চেয়ে অপরজনের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে, সে কিয়ামতের দিন তার (দেহের) এক পার্শ্ব পতিত অবস্থায় উপস্থিত হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৯, সুনানে তিরমিযী : ১১৪১, সুনানে নাসায়ী : ৩৯৪২, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৩৩, আহমাদ : ৮৩৬৩, ৯৭৪০, দারেমী : ২২০৬, ইরওয়াহ : ২০১৭, মিশকাত : ৩২৩৬, সহীহাহ : ২০৭৭
আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এলেন। এরপর তিনি ‘‘তোমার উপর মেহমানের হাক্ব আছে, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হাক্ব আছে। সহিহ বুখারি : ১৯৭৪
আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ হে ‘আবদুল্লাহ! আমি জানতে পেরেছি, তুমি দিনে সওম রাখো ও রাত জেগে সলাত আদায় করো। আমি বললাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল! তিনি ﷺ বললেন, না, (এরূপ) করো না। সওম রাখবে, আবার ছেড়ে দেবে। সলাত আদায় করবে, আবার ঘুমাবে। অবশ্য অবশ্যই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার চোখের ওপর হক আছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক আছে। তোমার মেহমানদেরও তোমার ওপর হক আছে। যে সব সময় সওম রাখে সে যেন সওমই রাখল না। অবশ্য প্রতি মাসে তিনটি সওম সবসময়ে সওম রাখার সমান। অতএব প্রতি মাসে সওম রাখো। এভাবে প্রতি মাসে কুরআন পড়বে। আমি নিবেদন করলাম, আমি তো এর চেয়ে বেশী করার সামর্থ্য রাখি। তিনি ﷺ বললেন, তাহলে উত্তম দাঊদ (আ.) এর সওম রাখো। একদিন রাখবে, আর একদিন ছেড়ে দেবে। আর সাত রাতে একবার কুরআন খতম করবে। এতে আর মাত্রা বাড়াবে না। সহিহ বুখারী ১৯৭৫, ১৯৭৬, ৫০৫৪, সহিহ মুসলিম ১১৫৯, মিশকাত-২০৫৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ৩২০, সহীহ আত্ তারগীব ২৫৮৭, সহীহ আল জামি‘ ৭৯৪২
আবূ জুহায়ফাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান (রাঃ) ও আবুদ দারদা (রাঃ)-এর মাঝে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন করে দেন। (একদা) সালমান (রাঃ) আবূদ দারদা (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে উম্মুদ দারদা (রাযি.)-কে মলিন কাপড় পরিহিত দেখতে পান। তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে উম্মুদ দারদা (রাযি.) বললেন, আপনার ভাই আবুদ দারদার পার্থিব কোন কিছুরই প্রতি মোহ নেই। কিছুক্ষণ পরে আবূদ দারদা (রাঃ) এলেন। অতঃপর তিনি সালমান (রাঃ)-এর জন্য খাদ্য প্রস্তুত করান এবং বলেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি সাওম পালন করছি। সালমান (রাঃ) বললেন, আপনি না খেলে আমি খাবো না। এরপর আবূদ দারদা (রাঃ) সালমান (রাঃ)-এর সঙ্গে খেলেন। রাত হলে আবূদ দারদা (রাঃ) (সালাত আদায়ে) দাঁড়াতে গেলেন। সালমান (রাঃ) বললেন, এখন ঘুমিয়ে পড়েন। আবূদ দারদা (রাঃ) ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবূদ দারদা (রাঃ) আবার সালাতে দাঁড়াতে উদ্যত হলেন, সালমান (রাঃ) বললেন, ঘুমিয়ে পড়েন। যখন রাতের শেষ ভাগ হলো, সালমান (রাঃ) আবূদ দারদা (রাঃ)-কে বললেন, এখন উঠুন। এরপর তাঁরা দু’জনে সালাত আদায় করলেন। পরে সালমান (রাঃ) তাঁকে বললেন, আপনার প্রতিপালকের হাক্ব আপনার উপর আছে। আপনার নিজেরও হাক্ব আপনার উপর রয়েছে। আবার আপনার পরিবারেরও হাক্ব রয়েছে। প্রত্যেক হাক্বদারকে তার হাক্ব প্রদান করুন। এরপর আবূদ দারদা (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট হাজির হয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সালমান ঠিকই বলেছে। সহিহ বুখারি : ১৯৬৮, ৬১৩৯
১২. স্ত্রীর চারিত্রিক বিষয়ে সন্দেহ পোষণ না করা
দাম্পত্য জীবনে আস্থা ও বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অযথা সন্দেহ করা সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। একজন বিশ্বাসী স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি সর্বদা ভালো ধারণা রাখবেন। কেননা, ইসলাম শুধু স্ত্রীর নয়, বরং সমাজের অন্যের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এটি পরিবারে বা সমাজে অবিশ্বাস, বিভেদ ও শত্রুতা তৈরি করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ।
সূরা হুজুরাত : ১২
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তোমরা কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। একে অপরের দোষ-ত্রুটি খুঁজিও না, একে অন্যের ব্যাপারে মন্দ কথায় কান দিও না এবং একে অপরের প্রতি শত্রুতা পোষণ করো না; বরং ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখরি : ৫১৪৩, ৬০৬৪, ৬০৬৬, ৬৭২৪, সহিহ মুসলিম : ২৫৬৩
আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারের উপর উঠলেন এবং উচ্চস্বরে ডেকে বললেনঃ ’’হে মুসলিমগণ! যারা মুখে ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং অন্তরে ইসলামের প্রভাব রাখোনি, তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লজ্জা দিয়ো না এবং তাদের দোষ অন্বেষণ করো না। কেননা যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ অন্বেষণ করে, আল্লাহ তা’আলা তার দোষ অন্বেষণ করেন। আল্লাহ তা’আলা যার দোষ খুঁজবেন, তাকে অপমান করবেন, যদি সে নিজের ঘরের মধ্যেও থাকে। মিশকাত : ৫০৪৪, সুনান তিরমিযী : ২০৩২, সহীহ আত্ তারগীব : ২৩৩৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৭৬৩, আহমাদ : ১৯৭৭৬, শু‘আবুল ঈমান : ৬৭০৪
সত্যি সত্যি যদি কোন স্ত্রীর অন্যায় ধরা পড়ে তবে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। যদি সংশোধন না হয় তবে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান তালাক দেওয়া যাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সন্ধেহের কারনে কোন অপবাদ প্রদান হারাম।
১৩. একাধিক বিবাহ করলে স্ত্রীদের মাঝে সমতা বজায় রাখা
ইসলামে একাধিক বিবাহের অনুমতি থাকলেও, প্রতিটি স্ত্রীর প্রতি সমান আচরণ করা বাধ্যতামূলক। এই সমতা শুধু আর্থিক ভরণ-পোষণেই নয়, বরং রাত্রিযাপন ও ভালোবাসার ক্ষেত্রেও।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَانۡکِحُوۡا مَا طَابَ لَکُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ مَثۡنٰی وَثُلٰثَ وَرُبٰعَ ۚ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تَعۡدِلُوۡا فَوَاحِدَۃً اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ
তাহলে তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দু’টি, তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি অথবা তোমাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে। সুরা নিসা : ৩
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কোনো পুরুষের দু’জন সহধর্মিণী থাকে আর সে তাদের মধ্যে যদি ন্যায়বিচার না করে, তবে সে কিয়ামতের দিন একপাশ ভঙ্গ (অঙ্গহীন) অবস্থায় উঠবে। মিশকাত : ৩২৩৬, সুনানে তিরমিযী : ১১৪১, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৬৯, সুনানে নাসায়ী : ৩৯৪২, আহমাদ : ৭৯৩৬, সহীহ আল জামি : ৭৬১, সহিহ আত তারগীব : ১৯৪৯
আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরের ইচ্ছা পোষণ করলে তাঁর স্ত্রীদের মাঝে কুর‘আ নিক্ষেপ করতেন। যার নাম বের হত তাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি সফরে বের হতেন। আর তিনি স্ত্রীদের প্রত্যেকের জন্যই দিন রাত বণ্টন করতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম‘আহ (রাঃ) তাঁর অংশের দিন রাত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে দান করে দিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তা করেছিলেন। সহিহ বুখারি : ২৬৮৮, সহিহ মুসলিম : ২৭৭০, মিশকাত : ৩২৩২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২১৩৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৭০, আহমাদ : ২৪৮৫৯, দারিমী : ২২৫৪।
১৪. স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার বা উত্তম আচরণ করা
আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলে আমি তাঁকে অতিক্রম করে যাই। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৯, সুনানে আবূ দাউদ : ২৫৭৮, আহমাদ : ২৩৫৯৮, ২৪৪৬০, ২৫৭২০, ২৫৭৪৫. ২৫৮৬৬, ইরওয়াহ : ১৫০২, সহীহাহ : ১৩১
আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে পুতুল নিয়ে খেলা করতাম। তিনি আমার বান্ধবীদেরকে আমার সাথে খেলা করার জন্য আমার নিকট পাঠিয়ে দিতেন। সহিহ বুখারী : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম : ২৪৪০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮২, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯৬১, আহমাদ : ২৩৭৭৭, ২৪৮০৬, ২৫৪৩০, ২৫৪৩৭
‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬, সহিহ মুসলিম : ৮৯২, সুনানে নাসয়ী : ১৫৯৫, আহমাদ : ১৬১০১, ইরওয়া : ১৮০৫।
ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ ২৮৫।
আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে উত্তম লোক তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৮, সহিহাহ : ২৮৫, আদাবুয যিফাফ : ১৬২।
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন মুমিন পুরুষ কোন মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ-ঘৃণা পোষণ করবে না; (কেননা) তার কোন চরিত্র অভ্যাসকে অপছন্দ করলে তার অন্য কোন (চরিত্র-অভ্যাস) টি সে পছন্দ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৬৯, মিশকাত : ৩২৪০, আহমাদ : ৮৩৬৩, সহীহ আত্ তারগীব : ১৯২৮, সহীহ আল জামি : ৭৭৪১।
১৫. স্ত্রীর সম্মানের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল হওয়া
একজন মুসলিম স্বামীর উচিত তার স্ত্রীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা। অন্যদের সামনে স্ত্রীর ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরা বা তাকে অপমান করা একজন দায়িত্বশীল স্বামীর কাজ নয়।
মুগীরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনু ’উবাদাহ (রাঃ) বলেছেন, যদি আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কোন পরপুরুষকে দেখি তবে আমি তাকে তরবারীর ধারালো দিক দিয়ে আঘাত করব। তার এ উক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছল। তখন তিনি বললেন, তোমরা কি সা’দ এর আত্মমর্যাদাবোধে আশ্চর্য হচ্ছ? আমি ওর থেকে অধিক আত্মসম্মানী। আর আল্লাহ্ আমার থেকেও অধিক আত্মসম্মানের অধিকারী। সহিহ বুখারি : ৬৮৪৬, ৭৪১৬
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষ বড় আমনাত খিয়ানাতকারী যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭
১৬. ইবাদতে স্ত্রীকে উত্সাহ প্রদান করা
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে দয়া করুন, যে রাতে উঠে নিজেও সালাত আদায় করে এবং তার স্ত্রীকেও জাগায় এবং সেও সালাত আদায় করে। সে উঠতে না চাইলে তার মুখমণ্ডল পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ এমন নারীর প্রতিও অনুগ্রহ করুন, যে রাতে উঠে নিজে সালাত আদায় করে এবং তার স্বামীকেও জাগায়। সে উঠতে না চাইলে তার মুখন্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়। সুনানে আবু দাউদ : ১৩০৮, ১৪৫০, সুনানে নাসায়ী : ১৬০৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৩৩৬, আহমাদ : ৭৪০৪
১৭. স্ত্রীদের প্রহার করা অন্যায় কাজ
আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বহস্তে কোন দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোন নারীকেও না, খাদিমকেও না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত। আর যে তার অনিষ্ট করেছে তার থেকে প্রতিশোধও নেননি। তবে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি তার প্রতিশোধ নিয়েছেন। সহিহ মুসলিম : ২৩২৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৪, সুনানে আবূ দাউদ ৪৭৮৫, ৪৭৮৬, আহমাদ : ২৩৫১৪, ২৪৩০৯, ২৪৪৬৪, ২৫৪২৫, ২৭৬৫৮, মুয়াত্তা মালেক : ১৬৭১, দারেমী : ২২১৮, গয়াতুল মারাম : ২৫২, মুখতাসার শামাইল : ২৯৯
আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম’আ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিলেন, অতঃপর মহিলাদের উল্লেখ করে তাদের ব্যাপারে লোকজনকে উপদেশ দিলেন। তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ কেন তার স্ত্রীকে দাসীর মত বেত্রাঘাত করে? অথচ দিনের শেষেই সে আবার তার শয্যাসঙ্গী হয়! সহিহ বুখারি : ৫২০৪, সহিহ মুসলিম : ২৮৫৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৩, সুনানে তিরমিযী : ৩৩৪৩, আহমাদ : ১৫৭৮৮, দারেমী : ২২২০, ইরওয়াহ : ২০৩১
ইয়াস ইবনু ’আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ যুবাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর দাসীদের প্রহার করো না। অতঃপর ’উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! নারীরা তো তাদের স্বামীদের অবাধ্যাচরণ করছে। তিনি তাদেরকে মারার অনুমতি দিলেন এবং তারা প্রহৃত হলো। পরে অনেক নারী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাড়িতে সমবেত হলো। সকাল বেলা তিনি বলেনঃ ’’আজ রাতে মুহাম্মাদের পরিবারে সত্তরজন মহিলা এসে তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। তোমরা মারপিটকারীদেরকে তোমাদের মধ্যে উত্তম হিসাবে পাবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৮৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪৬, দারেমী : ২২১৯, গায়াতুল মারাম : ২৫১
১৮. স্ত্রীর মান-অভিমানের প্রতি লক্ষ রাখা
নারীদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো মান-অভিমান করা। ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে একটি পবিত্র সম্পর্ক হিসেবে দেখে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সহানুভূতিশীল এবং ধৈর্যশীল হবেন। এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একে অপরের মানসিক প্রকৃতিকে বোঝা এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করা। নারীদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো মান-অভিমান করা, যা অনেক সময় তাদের সংবেদনশীল প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত হয়। একজন বিচক্ষণ ও আদর্শ মুসলিম স্বামী এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখবেন এবং ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে তার স্ত্রীর মান ভাঙানোর চেষ্টা করবেন।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই মান-অভিমান কোনো দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য, যা সম্পর্কের গভীরতা ও ভালোবাসার পরিচায়ক। নবী কারীম (ﷺ)-এর জীবনীতে আমরা এর সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। স্বয়ং তাঁর স্ত্রীদেরও মান-অভিমান করার ঘটনা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, এই প্রবণতা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, বরং এটি মানব প্রকৃতির একটি অংশ। নারীদের মান অভিমানের প্রধান কারণ-
ক. নারীদের সোজা করা কঠিন
উপরন্তু নারীদের বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। কেননা, তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরার হাড় থেকে এবং সবচেয়ে বাঁকা হচ্ছে পাঁজরার ওপরের হাড়। যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে ভেঙ্গে যাবে। আর যদি তা যেভাবে আছে সেভাবে রেখে দাও তাহলে বাঁকাই থাকবে। অতএব, তোমাদেরকে ওসীয়ত করা হলো নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার জন্য। সহিহ বুখারি : ৫১৮৬
খ.নারীদের জ্ঞান-বুদ্ধি কম
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ একবার ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের সালাত আদায়ের জন্য আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদগাহের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি মহিলাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেনঃ হে মহিলা সমাজ! তোমার সদাক্বাহ করতে থাক। কারণ আমি দেখেছি জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে তোমরাই অধিক। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেনঃ কী কারণে, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ তোমরা অধিক পরিমানে অভিশাপ দিয়ে থাক আর স্বামীর অকৃতজ্ঞ হও। বুদ্ধি ও দ্বীনের ব্যাপারে ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও একজন সদাসতর্ক ব্যক্তির বুদ্ধি হরণে তোমাদের চেয়ে পারদর্শী আমি আর কাউকে দেখিনি। তারা বললেনঃ আমাদের দ্বীন ও বুদ্ধির ত্রুটি কোথায়, হে আল্লাহ্র রাসূল? তিনি বললেনঃ একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেক নয়? তারা উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের বুদ্ধির ত্রুটি। আর হায়েয অবস্থায় তারা কি সালাত ও সিয়াম হতে বিরত থাকে না? তারা বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের ত্রুটি। সহিহ বুখারি : ৩০৪, ১৪৬২, ১৯৫১, ২৬৫৮, সহিহ মুসলিম : ৭৯, ৮০ আহমাদ : ৫৪৪৩
গ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর স্ত্রীদের মান-অভিমানের
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একজন স্ত্রীর কাছে ছিলেন। ঐ সময় উম্মুহাতুল মু’মিনীনের আর একজন একটি পাত্রে কিছু খাদ্য পাঠালেন। যে স্ত্রীর ঘরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবস্থান করছিলেন সে স্ত্রী খাদিমের হাতে আঘাত করলেন। ফলে খাদ্যের পাত্রটি পড়ে ভেঙ্গে গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রের ভাঙ্গা টুকরোগুলো কুড়িয়ে একত্রিত করলেন, তারপর খাদ্যগুলো কুড়িয়ে তাতে রাখলেন এবং বললেন, তোমাদের আম্মাজীর আত্মর্যাদাবোধে আঘাত লেগেছে। তারপর তিনি খাদিমকে অপেক্ষা করতে বললেন এবং যে স্ত্রীর কাছে ছিলেন তাঁর নিকট হতে একটি পাত্র নিয়ে যার পাত্র ভেঙ্গেছিল, তার কাছে পাঠালেন এবং ভাঙ্গা পাত্রটি যে ভেঙ্গেছিল তার ঘরেই রাখলেন। সহিহ বুখারি : ২৪৮১, ৫২২৫,
১৯. স্ত্রী অভদ্র, বদমেজাজী হলেও ভালো ব্যবহার করা
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯
স্ত্রী অভদ্র ও বদমেযাজী হলেও ইসলাম স্বামীকে ধৈর্য ধারণ করতে বলেছে এবং প্রতিদান হিসেবে পরকালে স্বামীর জন্য মহাপুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। স্ত্রীর ভালো দিকগুলো নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করতে বলেছে। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে বলেছে। কারণ অভদ্র হওয়া সত্ত্বেও সে তো স্বামীর খিদমত, রান্না-বান্না, সংসার পরিচালনা ও সন্তানাদি লালন-পালনসহ প্রতিনিয়ত অসংখ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছে। অতএব কদাচিৎ তার পক্ষ থেকে কিছুটা কষ্ট পেলে তা সয়ে যাওয়াই স্বামীর কর্তব্য। এক্ষেত্রে লোকমান হাকীমের একটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন-
” لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ
কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) ঘৃণা না করে। যদি সে তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ করে, তবে তার অন্য একটি স্বভাবের প্রতি সে সন্তুষ্ট থাকবে। সহীহ মুসলিমের : ১৪৬৯
এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো একজন যদি অন্যজনের কোনো স্বভাব অপছন্দ করে, তবে সেই একটি দুর্বলতার কারণে তাকে পুরোপুরি ঘৃণা করা উচিত নয়। বরং, তার মধ্যে যে ভালো গুণগুলো রয়েছে, সেগুলো স্মরণ করে ভালোবাসা ও ধৈর্য বজায় রাখা দরকার। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুস্থ দাম্পত্য জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
২০. স্ত্রী অপছন্দনীয় হলেও ভালো ব্যবহার করা
ইসলামে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক উপহার। কোনো কারণে স্ত্রীকে অপছন্দ হলেও তাকে ত্যাগ করা বা তার প্রতি দুর্ব্যবহার করা উচিত নয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاِنۡ کَرِہۡتُمُوۡہُنَّ فَعَسٰۤی اَنۡ تَکۡرَہُوۡا شَیۡئًا وَّیَجۡعَلَ اللّٰہُ فِیۡہِ خَیۡرًا کَثِیۡرًا
আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। সুরা নিসা : ১৯
এই আয়াতটি স্বীকার করে যে, দাম্পত্য জীবনে স্বামী তার স্ত্রীর কোনো আচরণ, স্বভাব বা বাহ্যিক দিক অপছন্দ করতে পারে। এটি মানব প্রকৃতির একটি অংশ। তবে, আল্লাহ এখানে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, এই অপছন্দের কারণে যেন কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, যেমন তালাক। বরং, ধৈর্য ধারণ করা এবং পরিস্থিতিকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করা উচিত।
আয়াতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো,”…আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন।” এর অর্থ হলো, আমরা যা অপছন্দ করি, তার মধ্যে আল্লাহ এমন কল্যাণ লুকিয়ে রাখতে পারেন, যা আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে আমরা বুঝতে পারি না। এই কল্যাণ বিভিন্নভাবে আসতে পারে:
ক. সন্তান-সন্ততি : হয়তো সেই স্ত্রীর গর্ভে এমন সন্তান জন্ম নেবে, যে ভবিষ্যতে মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক বড় কল্যাণ বয়ে আনবে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একজন সাধারণ মায়ের গর্ভে মহান আলেম, নেতা বা শহীদ জন্মগ্রহণ করেছেন।
খ. আত্মিক উন্নতি : স্ত্রীর কোনো অপছন্দনীয় স্বভাব বা ত্রুটি একজন স্বামীকে ধৈর্য, সহনশীলতা এবং ক্ষমা করার মতো মহৎ গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করতে পারে। এটি তার ঈমান এবং চারিত্রিক উন্নতিতে সহায়ক হয়।
গ. অদৃশ্য কল্যাণ : আল্লাহর পক্ষ থেকে সেই সম্পর্কে এমন বারাকাহ বা কল্যাণ আসতে পারে, যা দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় ক্ষেত্রেই লাভজনক হবে।
এই আয়াতটি মুসলিম পুরুষদেরকে তাদের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করতে শেখায়। এটি শেখায় যে, কোনো মানুষকে তার এক বা একাধিক খারাপ গুণের কারণে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া উচিত নয়। বরং, তার ভালো গুণগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং সামগ্রিকভাবে তাকে বিচার করা প্রয়োজন।
২১. স্ত্রী নিঃসন্তান সন্তান হলে ভালো ব্যবহার করা
সন্তান আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে একটি উপহার। নিঃসন্তান হওয়া বা শুধু কন্যা সন্তান হওয়া কোনোভাবেই স্ত্রীর দোষ নয়। এই নিয়ে স্ত্রীকে দোষারোপ করা বা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। আল্লাহ তা’আলা বলেন-
لِلّٰهِ مُلْکُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ؕ یَخْلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنْ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّ یَهَبُ لِمَنْ یَّشَآءُ الذُّکُوْرَ ﴿ۙ۴۹﴾ اَوْ یُزَوِّجُهُمْ ذُکْرَانًا وَّ اِنَاثًا ۚ وَ یَجْعَلُ مَنْ یَّشَآءُ عَقِیْمًا ؕ اِنَّہٗ عَلِیْمٌ قَدِیْرٌ ﴿۵۰﴾
আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। সূরা শুরা : ৪৯-৫০
আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, সন্তান দান করার ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই। এরপরেও সমাজে সন্তান না হওয়ার জন্য নারীকে দোষারোপ করা হয়, যা ইসলামের শিক্ষা ও আল্লাহর কালামের সম্পূর্ণ বিরোধী।
ক. আল্লাহর ইচ্ছাকে অস্বীকার করা
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নিঃসন্তান হওয়ার কারণ হিসেবে নিজেকেই উল্লেখ করেছেন। তিনি সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান; তাঁর প্রতিটি ফয়সালার পেছনে রয়েছে গভীর প্রজ্ঞা। যখন কোনো পুরুষ বা তার পরিবার সন্তান না হওয়ার জন্য স্ত্রীকে দোষারোপ করে, তখন প্রকারান্তরে তারা আল্লাহর এই সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করে। এটি ঈমানের দুর্বলতারই একটি লক্ষণ। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, আল্লাহর প্রতিটি বিধানের ওপর সন্তুষ্ট থাকা, তা তার মনমতো হোক বা না হোক।
খ. জাহেলি যুগের কুসংস্কার
সন্তান না হওয়ার জন্য নারীকে দায়ী করা মূলত ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগের কুসংস্কার। সে সময় সমাজে নারীদেরকে হেয় করা হতো এবং তাদের কোনো সম্মান ছিল না। ইসলাম এসে এই সব জাহেলি প্রথার মূলোচ্ছেদ করে দিয়েছে। ইসলাম নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে যে, সন্তান আল্লাহর দান। তাই এই ধরনের কুসংস্কার আঁকড়ে ধরা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।
ইসলামে স্বামীর একটি প্রধান দায়িত্ব হলো তার স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল ও যত্নশীল হওয়া। স্ত্রীর নিঃসন্তান হওয়া কোনোভাবেই তার দোষ নয়। এই পরিস্থিতিতে তাকে মানসিক সাপোর্ট দেওয়া এবং তার পাশে থাকা স্বামীর নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। স্ত্রীকে দোষারোপ করা বা তার সাথে দুর্ব্যবহার করা তার মানসিক কষ্ট বাড়িয়ে দেয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। বরং এই ধরনের পরিস্থিতিতে উভয়কেই ধৈর্যের সাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
ইসলাম শিক্ষা দেয় যে, জীবনের প্রতিটি বিষয় তাকদীর দ্বারা নির্ধারিত হয়। সন্তান হওয়া বা না হওয়াও তাকদীরের অংশ। একজন মুমিন হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো আল্লাহর এই সিদ্ধান্তে ধৈর্য ধারণ করা এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখা। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “মুমিনের প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর।” যদি আল্লাহ কাউকে নিঃসন্তান রাখেন, তবে এর মধ্যেও হয়তো কোনো কল্যাণ রয়েছে, যা আমরা বুঝতে পারি না।
২৫. স্ত্রী কন্যা সন্তান প্রসবিনী হলে ভালো ব্যবহার করা
সন্তান জন্ম গ্রহণের পূর্বমুহূর্ত অনাগত সন্তানের মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচিসহ পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন থাকে সন্তানটি কি ছেলে হবে, না মেয়ে হবে। শুধু বর্তমান যুগে নয়, যুগ যুগ ধরে সমাজের প্রতিটি পরিবারই চেয়েছে তাদের যেন একটি ছেলে সন্তায় হয়। পুরো পরিবার পুত্র সন্তান জন্য দুআ করে। সবার দুয়া কবুল করলে কি হত, একবার ভেবে দেখেছেন! সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিরতে সমতা বিধানের জন্যই হয়ত সবার চওয়া পূরণ করেন না। সন্তান ছেলে হবে, না মেয়ে হবে, এর উপর পিতা মাতার কোন হাত নাই। এটা সম্পূর্ণ মহান আল্লাহ হাতে। জাহেলি যুগে কন্যা সন্তানের জম্মকে নিজেদের অপমান মনে করা হত, তাই তারা কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে জীবন্ত কবর দিয়ে দিত।
সাদ ইবনু হাফস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন, মা-বাপের নাফরমানি করা, প্রাপকের প্রাপ্য আটক রাখা, যে জিনিস গ্রহণ করা তোমাদের জন্য ঠিক নয় তা তলব করা এবং কন্যা সন্তানকে জীবিত ক্ববর দেয়া। আর তিনি তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন গল্প-গুজব করা, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা ও সম্পদ অপচয় করা। সহিহ বুখারী : ৫৯৭৫
এখন অবশ্য জাহেলি যুগের মত কবর দেয়া হয় না, তবে ইসলামি জ্ঞান যাদের কম তারা মন খারাপ করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُۥ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ
আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। সুরা নহল : ৫৮
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ یَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّیَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّکُوۡرَ ۙ
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তা’ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। সুরা শুরা : ৪৯
পুত্র বা কন্যা সন্তান জম্ম দানের ব্যাপারে স্বামী বা স্ত্রীর কোন হাত নাই। মহান আল্লাহ তার এই সৃষ্টির পরিকল্পনাতে কাউকে শরীক করেন না। কাজেই কাউকে দোষ না দিয়ে মহান আল্লাহ পরীক্ষার উপদান মনে করতে হবে। আর ভাবতে হবে মহান আল্লাহ হয়ত ইহার মধ্যে কল্যান রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু হাদিসে কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের পুরস্কার ঘোষনা করেছেন। পৃথিবীতে কেউ স্থায়ীভাবে থাকতে আসে নাই। মহান আল্লাহকে সন্ত্বষ্ট রেখে পৃথিবী থেকে চলে যেতে পারলেই কৃতকার্য হওয়া যাবে। সেই কাঙ্থিত কৃতকারর্য যদি কন্যা সম্তানের কারনে হয়, তবে কন্যা সস্তানই ভালো। নিম্মের হাদিসগুলো লক্ষ করি।
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার কন্যা সন্তানদের জন্য কোনরকম পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরলে, তা তার জন্য জাহান্নাম ঢাল হবে। সুনানে তিরমিজি : ১৯১৩
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে লোক দুটি মেয়ে সন্তানকে লালন-পালন করবে, আমি এবং সে এভাবে একসাথে পাশাপাশি জান্নাতে যাব। এই বলে তিনি নিজের হাতের দুটি আঙ্গুল একত্র করে ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন। সহিহ মুসলিম : ২৬৩১, সুনানে তিরমিজি : ১৯১৪
উকবা ইবনে ’আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কারো তিনটি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করলে, যথাসাধ্য তাদের পানাহার করালে ও পোশাক-আশাক দিলে, তারা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে অন্তরায় হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৬৯, আহমাদ : ১৬৯৫০, সহীহাহ : ৩৯৪)
এই সকল হাদিসের আলোকে বুঝা যায় সঠিকভাবে কন্যা সন্তান লালন পালন করে, দ্বীনের উপর রাখতে পারলে আখেরাত নাজাতের অসিলা হয়ে যাবে।
মেয়ে সন্তান জন্মের জন্য নারীর ভূমিকা বেশি না পুরুষের? – এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে জেনেটিক্স, এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর দিয়েছে।
আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে মেয়ে সন্তান জম্মগ্রহণে কার ভুমিকা বেশি
আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি শিশু ছেলে হবে না মেয়ে হবে, তা সম্পূর্ণভাবে পুরুষের ক্রোমোজোমের ওপর নির্ভরশীল। নারীর এই বিষয়ে কোনো ভূমিকা নেই। কারণ-
মানুষের ক্রোমোজোম : প্রতিটি মানুষের শরীরে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে, যা ২৩ জোড়ায় বিভক্ত। এর মধ্যে ২২ জোড়া ক্রোমোজোম ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই একই রকম। ২৩তম জোড়া হলো সেক্স ক্রোমোজোম, যা নির্ধারণ করে একটি শিশু ছেলে হবে না মেয়ে হবে।
নারীর ক্রোমোজোম : নারীর সেক্স ক্রোমোজোম হলো দুটি X ক্রোমোজোম (XX)। ডিম্বাণু (ovum) উৎপাদনের সময় নারী কেবল একটি X ক্রোমোজোমই দিতে পারে।
পুরুষের ক্রোমোজোম : পুরুষের সেক্স ক্রোমোজোম হলো একটি X এবং একটি Y ক্রোমোজোম (XY)। শুক্রাণু (sperm) উৎপাদনের সময় পুরুষ দুটি ভিন্ন ধরনের শুক্রাণু তৈরি করে—একটি যাতে X ক্রোমোজোম থাকে এবং অন্যটি যাতে Y ক্রোমোজোম থাকে।
কীভাবে লিঙ্গ নির্ধারিত হয়?
যখন নিষেক (fertilization) ঘটে, তখন নারীর ডিম্বাণুর (যা কেবল X ক্রোমোজোম বহন করে) সাথে পুরুষের যেকোনো একটি শুক্রাণু মিলিত হয়।
যদি X ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণু ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়, তাহলে শিশুটি হবে XX, অর্থাৎ মেয়ে সন্তান।
যদি Y ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণু ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়, তাহলে শিশুটি হবে XY, অর্থাৎ ছেলে সন্তান।
সুতরাং, বিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি শিশু ছেলে না মেয়ে হবে তা নির্ভর করে পুরুষ কোন ধরনের শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করছে তার উপর। নারীর ডিম্বাণুতে সব সময় একই ধরনের (X) ক্রোমোজোম থাকে বলে তার কোনো ভূমিকা থাকে না।
অতীতে, যখন মানুষ এই বৈজ্ঞানিক সত্য জানত না, তখন কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নারীকে দোষারোপ করা হতো। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান সেই ধারণা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণ করেছে।