মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
১০. দুনিয়াতে যারা আল্লাহর সাক্ষাতে বিশ্বাস করত না, পরকালে তাদের ভূলে যাওয়া হবে
হাদীসে এসেছে: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি কিয়ামত দিবসে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “আচ্ছা দুপুর বেলা যখন মেঘ না থাকে তখন সূর্যকে দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন, না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করলেন: পূর্ণিমার রাতে যখন আকাশে মেঘ না থাকে তখন চাঁদ দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন: না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! তোমাদের প্রতিপালককে দেখার জন্য সেদিন তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হবে না। যেমন সূর্য ও চন্দ্র দেখার জন্য তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হয় না। আল্লাহ এক বান্দার সাথে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাইনি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাইনি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর দ্বিতীয় এ ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাই নি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাই নি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর তৃতীয় এক ব্যক্তিকে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে অপর দুজনের মত করেই প্রশ্ন করবেন। সে বলবে, আমি আপনার প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। আপনার কিতাব, আপনার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। সালাত পড়েছি, রোযা রেখেছি, দান-সদকা করেছি। সাধ্যমত আপনার প্রশংসা করেছি। তার উত্তর শুনে আল্লাহ বলবেন, তাই নাকি? তাহলে এখনই তোমার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী উপস্থিত করি। তারপর (তোমার উত্তর সম্পর্কে) তুমি ভেবে দেখবে। বলা হবে, কে আছে তার সম্পর্কে স্বাক্ষ্য দিবে? এরপর তার মুখ সীল করে দেওয়া হবে। তার রান, তার মাংস, তার হাড্ডিকে বলা হবে, তোমরা কথা বলো। এরা তাদের জানা মতে তথ্য দিতে শুরু করবে। এভাবে আল্লাহ নিজে স্বাক্ষ্য দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। আসলে এ ব্যক্তিটি ছিল দুনিয়ার জীবনে মুনাফিক। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন”। সহিহ মুসলিম : ২৯৬৮।
১১. কিয়ামতের দিন যার হিসাব নেওয়া হবে সে জাহান্নামে যাবে
ইবনু আবূ মুলাইকাহ (রাযি.) বলেন, নবী ﷺ এর স্ত্রী আয়িশা (রাদি.) কোন কথা শুনে না বুঝলে বার বার প্রশ্ন করতেন। একদা নবী ﷺ বললেন, ‘‘কিয়ামতের দিন যার কাছ থেকে হিসেব নেয়া হবে তাকে শাস্তি দেয়া হবে।’’ ‘আয়িশা (রাদি.) বলেন-
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ্ তা‘আলা কি ইরশাদ করেননি, فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا তার হিসাব-নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। সূরা ইনশিক্বাক : ৮। তখন তিনি বললেন, তা কেবল হিসেব প্রকাশ করা। কিন্তু যার হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে নেয়া হবে সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। সহহি বুখারি : ১০৩
এ হাদিসটিই অন্য স্থানে একটু পরির্তনে এসেছে-
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন যে ব্যক্তিরই হিসাব নেয়া হবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, তখন আমি বললাম, আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য কুরবান করুন। আল্লাহ্ কি বলেননি,
فَأَمَّا مَنْ أُوْتِيَ كِتٰبَه” بِيَمِيْنِهٰلا – فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَّسِيْرًا
’’যার ’আমলনামা তার ডান হস্তে দেয়া হবে, তার হিসাব নিকাশ সহজেই নেয়া হবে। সূরা ইনশিক্বাক : ৮
এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ আয়াতে আমলনামা কীভাবে দেয়া হবে সে ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুবা যার খুঁটিনাটি হিসাব নেয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। সহিহ বুখারি : ৪৯৩৯, ৬৫৩৬, ৬৫৩৭, সহিহ মুসলিম: ২৮৭৬, মিশকাত : ৫৫৪৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৬৯, সহীহুল জামি : ৬২২০, আবূ ইয়া’লা : ৪৪৫৩, আহমাদ : ২৪২৫৫
আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে এসে বললেন, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ যেদিন সম্পর্কে বলেছেন, সেদিন সকল মানুষ উভয় জাহানের প্রভুর সম্মুখে দণ্ডায়মান হবে। আমাকে বলুন! কোন লোকের সেই কিয়ামতের দিন আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়ানোর সাধ্য হবে। তখন তিনি (সা.) বললেন, সেদিন ঈমানদারের জন্য খুবই হালকা করা হবে। এমনকি ঐ দিন তার জন্য একটি ফরয সালাত (আদায়ের সময়ের) ন্যায় হবে। মিশকাত : ৫৫৬৩
১২. সেদিন আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে কোনো দোভাষী থাকবে না
আদী ইবন হাতেম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«مَا مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا سَيُكَلِّمُهُ رَبُّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ تُرْجُمَانٌ، فَيَنْظُرُ أَيْمَنَ مِنْهُ فَلاَ يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ مِنْ عَمَلِهِ، وَيَنْظُرُ أَشْأَمَ مِنْهُ فَلاَ يَرَى إِلَّا مَا قَدَّمَ، وَيَنْظُرُ بَيْنَ يَدَيْهِ فَلاَ يَرَى إِلَّا النَّارَ تِلْقَاءَ وَجْهِهِ، فَاتَّقُوا النَّارَ وَلَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ “
তোমাদের মধ্যে প্রতিটি ব্যক্তি সেদিন আল্লাহ তায়ালার সাথে সরাসরি কথা বলবে। কোনো দোভাষী বা মধ্যস্থ থাকবে না। মানুষ তখন তার ডান দিকে তাকাবে দেখতে পাবে শুধু তাদের প্রেরিত কর্ম। আর বাম দিকে তাকাবে দেখবে শুধু নিজ কৃত কর্ম। সামনের দিকে তাকাবে দেখবে শুধু জাহান্নামের আগুন। কাজেই তোমরা আগুন থেকে সাবধান হও নিজেদের বাঁচাও যদি একটি খেজুরের টুকরা দান করার বিনিময়েও হয়”। সহিহ বুখারি : ৭৫১২,
এ হাদিসটিই অন্য স্থানে বিস্তারিত বিবরণসহ এসেছে-
আদী ইবনু হাতিম (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে ছিলাম, এমন সময় দু’জন সাহাবী আসলেন, তাদের একজন দারিদ্রের অভিযোগ করছিলেন আর অপরজন রাহাজানির অভিযোগ করছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ রাহাজানির অবস্থা এই যে, কিছু দিন পর এমন সময় আসবে যখন কাফিলা মক্কা পর্যন্ত বিনা পাহারায় পৌঁছে যাবে। আর দারিদ্রের অবস্থা এই যে, তোমাদের কেউ সাদাকা নিয়ে ঘোরাফিরা করবে, কিন্তু তা গ্রহণ করার মত কাউকে পাবে না। এমন সময় না আসা পর্যন্ত ক্বিয়ামাত (কিয়ামত) কায়িম হবে না। অতঃপর (বিচার দিবসে) আল্লাহর নিকট তোমাদের কেউ এমনভাবে খাড়া হবে যে, তার ও আল্লাহর মাঝে কোন আড়াল থাকবে না বা কোন ব্যাখ্যাকারী দোভাষীও থাকবে না। অতঃপর তিনি বলবেনঃ আমি কি তোমাকে সম্পদ দান করিনি? সে অবশ্যই বলবে, হ্যাঁ। এরপর তিনি বলবেন, আমি কি তোমার নিকট রাসূল প্রেরণ করিনি? সে অবশ্যই বলবে হাঁ, তখন সে ব্যক্তি ডান দিকে তাকিয়ে শুধু আগুন দেখতে পাবে, তেমনি ভাবে বাম দিকে তাকিয়েও আগুন দেখতে পাবে। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত এক টুকরা খেজুর (সাদাকা) দিয়ে হলেও যেন আগুন হতে আত্মরক্ষা করে। যদি কেউ তা না পায় তবে যেন উত্তম কথা দিয়ে হলেও। সহিহ বুখারি : ১৪১৩ ১৪১৭, ৩৫৯৫, ৬০২৩, ৬৫৩৯, ৬৫৪০, ৬৫৬৩, ৭৪৪৩, সহিহ মুসলিম : ১০১৬, মিশকাত : ৫৫৫০, সুনানেতিরমিযী : ২৪১৫, সুননে ইবনু মাজাহ : ১৮৫, আহমাদ : ১৮২৭২, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৭৩, বায়হাকী : ১০৪২৫।
১৩. নিজের পাপাচার গোপনকারীকে পরকালে ক্ষমা করে দেয়া হবে
কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা একজন মু’মিন বান্দাকে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও সম্মানের সঙ্গে নিজের কাছে ডেকে নেবেন। এরপর তার কৃত পাপগুলো একটি একটি করে তাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। মু’মিন ব্যক্তি যখন তার পাপগুলো স্বীকার করবে, তখন সে ভয় পাবে যে তার কোনো ক্ষমা নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা তার গোপনীয় গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিবেন। অন্যদিকে, কাফির ও মুনাফিকদেরকে সবার সামনে আনা হবে যারা পরকাল কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
সাফওয়ান ইবনু মুহরিব আল-মাযিনী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ইবনু ‘উমার (রাঃ)-এর সাথে তাঁর হাত ধরে চলছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর মু’মিন বান্দার একান্তে কথাবার্তা সম্পর্কে আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কী বলতে শুনেছেন? তখন তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা‘আলা মু’মিন ব্যক্তিকে নিজের কাছে নিয়ে আসবেন এবং তার উপর স্বীয় আবরণ দ্বারা তাকে ঢেকে নিবেন। তারপর বলবেন, অমুক পাপের কথা কি তুমি জান? তখন সে বলবে, হ্যাঁ, হে আমার প্রতিপালক! এভাবে তিনি তার কাছ হতে তার পাপগুলো স্বীকার করিয়ে নিবেন। আর সে মনে করবে যে, তার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, আমি পৃথিবীতে তোমার পাপ গোপন করে রেখেছিলাম। আর আজ আমি তা মাফ করে দিব’’। তারপর তার নেকের আমলনামা তাকে দেয়া হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে সাক্ষীরা বলবে, এরাই তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিল। সাবধান, যালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। সহিহ বুখারি : ২৪৪১, ৪৬৮৫, ৬০৭০, ৭৫১৪, সহিহ মুসলিম : ২৭৬৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৩, আহমাদ : ৫৪৩৬, সহীহুল জামি : ১৮৯৪, আবূ ইয়া’লা : ৫৭৫১, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৫৫
১৪. হাশরের ময়দানে সবার আমলনামা দেখান হবে
হাশরের দিন সকল মানুষের আমলনামা প্রকাশ করা হবে এবং প্রত্যেককে তার নিজ নিজ আমলনামা দেওয়া হবে। এই বিষয়টি কুরআন ও হাদিসের একাধিক স্থানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ইসলামের একটি মৌলিক বিশ্বাস।
আল্লাহ তায়ালা বলন-
اِقْرَاْ کِتٰبَکَ ؕ کَفٰی بِنَفْسِکَ الْیَوْمَ عَلَیْکَ حَسِیْبًا ؕ
পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশকারী হিসেবে যথেষ্ট। সুরা ইসরা : ১৪
আল্লাহ তায়ালা বলন-
وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا ۚ وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا ۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا
আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, ‘হায় ধ্বংস আমাদের! কী হল এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে’ এবং তারা যা করেছে, তা হাযির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। সূরা কাহফ : ৪৯
আল্লাহ তায়ালা বলন-
فَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ بِيَمِينِهِۦ .فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابً۬ا يَسِيرً۬ا . وَيَنقَلِبُ إِلَىٰٓ أَهْلِهِۦ مَسْرُورً۬ا وَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ وَرَآءَ ظَهْرِهِۦ . فَسَوْفَ يَدْعُواْ ثُبُورً۬ا
অতঃপর যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে। অত্যন্ত সহজভাবেই তার হিসাব-নিকাশ করা হবে। আর সে তার পরিবার-পরিজনের কাছে আনন্দিত হয়ে ফিরে যাবে। আর যাকে তার আমলনামা পিঠের পেছনে দেয়া হবে। অতঃপর সে ধ্বংস আহবান করতে থাকবে। সূরা ইনশিকাক : ৭-১১
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন সকল মানুষের আমলনামা সামনে আনা হবে। মুমিনদেরকে তাদের ডান হাতে আমলনামা দেওয়া হবে, আর কাফির ও পাপীদেরকে তাদের বাম হাতে অথবা পিঠের পেছন দিক থেকে দেওয়া হবে।
সহিহ বুখারীর একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাআলা মুমিন ব্যক্তির আমলনামা নিয়ে তার সঙ্গে একান্তে কথা বলবেন এবং তার পাপগুলো স্মরণ করিয়ে দেবেন। যখন মুমিন ব্যক্তি পাপের কথা স্বীকার করবে, আল্লাহ তখন বলবেন, “আমি দুনিয়াতে তোমার পাপ গোপন করে রেখেছিলাম, আর আজ আমি তা ক্ষমা করে দিলাম।” এরপর তাকে তার নেকের আমলনামা দেওয়া হবে। সহিহ বুখারি : ২৪৪১, ৪৬৮৫, ৬০৭০, ৭৫১৪
ইমাম আহমদের মুসনাদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কেয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের আমলনামা তাদের সামনে পেশ করা হবে, এবং তাদেরকে বলা হবে, ‘পড়ো তোমার আমলনামা, আজ তোমার নিজের হিসাব নেওয়ার জন্য তুমিই যথেষ্ট’। মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬৬৫৩
কুরআন ও হাদিসের প্রমাণগুলো থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে, হাশরের ময়দানে প্রত্যেক মানুষকে তার জীবনের সব আমল বা কাজের হিসাব দিতে হবে। প্রতিটি ভালো-মন্দ কাজ আমলনামায় লিপিবদ্ধ থাকবে এবং তা সবার সামনে প্রকাশ করা হবে।
১৫. মানুষের আমল নামা ওজর করা হবে
কিয়ামতের দিন মানুষের আমলনামা ওজন করা হবে, এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদা বা বিশ্বাস।
কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে এই আমল ওজন করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এই ওজন করার জন্য একটি পাল্লা থাকবে, যাকে মিজান বলা হয়।
আল্লাহ তায়ালা বলন-
وَالْوَزْنُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ ۚ فَمَن ثَقُلَتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ . وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُم بِمَا كَانُوا بِآيَاتِنَا يَظْلِمُونَ
আর সেদিন পরিমাপ হবে যথাযথ। সুতরাং যাদের পাল্লা ভারি হবে তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই হবে সেই সব লোক, যারা নিজদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি (অস্বীকার করার মাধ্যমে) যুলম করত। সূরা আরাফ : ৮-৯
আল্লাহ তায়ালা বলন-
فَاَمَّا مَنْ ثَقُلَتْ مَوَازِیْنُہٗ ۙ فَہُوَ فِیْ عِیْشَۃٍ رَّاضِیَۃٍ ؕ وَاَمَّا مَنْ خَفَّتْ مَوَازِیْنُہٗ ۙ فَاُمُّہٗ ہَاوِیَۃٌ ؕ وَمَاۤ اَدْرٰىکَ مَا ہِیَہْ ؕ نَارٌ حَامِیَۃٌ
অতঃপর যার পাল্লা ভারী হবে, সে থাকবে সন্তোষজনক জীবনে। আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার আবাস হবে হাবিয়া।আর তোমাকে কিসে জানাবে হাবিয়া কী? প্রজ্জ্বলিত অগ্নি। সূরা আল-কারিয়াহ: ৬-১১
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আমল ওজন করার পর যাদের নেকির পাল্লা ভারী হবে, তারা সফলকাম হবে এবং যাদের পাপের পাল্লা ভারী হবে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
كَلِمَتَانِ خَفِيفَتَانِ عَلٰى اللِّسَانِ ثَقِيلَتَانِ فِي الْمِيزَانِ حَبِيبَتَانِ إِلٰى الرَّحْمٰنِسُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه
দু’টি বাক্য এমন যা মুখে উচ্চারণ করা অতি সহজ, পাল্লায় অতি ভারী, আর আল্লাহর নিকট অতি প্রিয়। তা হলোঃ সুবহানাল্লাহিল আযীম, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহ।স হিহ বুখারি : ৬৪০৬, ৬৬৮২, ৭৫৬৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৯৪, আহমাদ : ৭১৭০
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন কেবল বড় আমলই নয়, বরং ছোট ছোট আমলও ওজন করা হবে এবং আল্লাহর কাছে প্রিয় এমন কিছু বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমেও নেকির পাল্লা ভারী করা সম্ভব।
আবূদ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে মুমিনের দাড়িপাল্লায় সচ্চরিত্র ও সদাচারের চেয়ে বেশি ওজনের আর কোন জিনিস হবে না। কেননা, আল্লাহ তা’আলা অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন। সুনানে তিরমিজি : ২০০২, সহীহাহ : ৮৭৬, আহমাদ : ২৭৫৪১
এই হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট যে, কিয়ামতের দিন মানুষের আমল, এমনকি তাদের চরিত্রও ওজন করা হবে। তাই প্রতিটি মুসলিমের জন্য ভালো কাজ করা এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া অপরিহার্য।
১৬. তাদের আমলনামা কর্ম অনুসারে ডান বা বাম হাতে দেওয়া হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآٮِٕهَاۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَٮِٕذٍ۬ ثَمَـٰنِيَةٌ۬ (١٧) يَوْمَٮِٕذٍ۬ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَىٰ مِنكُمْ خَافِيَةٌ۬ (١٨) فَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ بِيَمِينِهِۦ فَيَقُولُ هَآؤُمُ ٱقْرَءُواْ كِتَـٰبِيَهْ (١٩) إِنِّى ظَنَنتُ أَنِّى مُلَـٰقٍ حِسَابِيَهْ (٢٠) فَهُوَ فِى عِيشَةٍ۬ رَّاضِيَةٍ۬ (٢١) فِى جَنَّةٍ عَالِيَةٍ۬ (٢٢) قُطُوفُهَا دَانِيَةٌ۬ (٢٣) كُلُواْ وَٱشْرَبُواْ هَنِيٓـَٔۢا بِمَآ أَسْلَفْتُمْ فِى ٱلْأَيَّامِ ٱلْخَالِيَةِ (٢٤) وَأَمَّا مَنْ أُوتِىَ كِتَـٰبَهُ ۥ بِشِمَالِهِۦ فَيَقُولُ يَـٰلَيْتَنِى لَمْ أُوتَ كِتَـٰبِيَهْ (٢٥) وَلَمْ أَدْرِ مَا حِسَابِيَهْ (٢٦) يَـٰلَيْتَہَا كَانَتِ ٱلْقَاضِيَةَ (٢٧) مَآ أَغْنَىٰ عَنِّى مَالِيَهْۜ (٢٨) هَلَكَ عَنِّى سُلْطَـٰنِيَهْ (٢٩) خُذُوهُ فَغُلُّوهُ (٣٠) ثُمَّ ٱلْجَحِيمَ صَلُّوهُ (٣١) ثُمَّ فِى سِلْسِلَةٍ۬ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعً۬ا فَٱسْلُكُوهُ (٣٢)
সেই দিন তোমরা হিসাবের জন্য উপস্থিত হবে, তোমাদের কোনো গোপন বিষয় লুকানো থাকবে না। যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘আসো, আমার আমলনামা পড়ো!’ ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, আমি আমার হিসাবের মুখোমুখি হব।’ সে সুখের জীবনে থাকবে, এক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতে, যার ফলমূল থাকবে হাতের নাগালে। তোমরা আহার করো ও পান করো আনন্দের সঙ্গে, তোমাদের পূর্ববর্তী কাজের বিনিময়ে।’ আর যার আমলনামা তার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, ‘হায়! যদি আমার আমলনামা আমাকে না দেওয়া হতো! এবং আমি না জানতাম আমার হিসাব কী!’ হায়! যদি সেটাই চূড়ান্ত মৃত্যু হতো! আমার ধন-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসেনি। আমার ক্ষমতাও আমার থেকে চলে গেছে।’ ‘তোমরা তাকে ধরে নাও এবং শৃঙ্খলে আবদ্ধ করো।’ তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। অতঃপর তাকে সত্তর হাত দীর্ঘ এক শৃঙ্খলে প্রবেশ করাও। সুরা হাক্কাহ : ১৮-৩২
১৭. কিয়ামতে দিন রিয়া বা লোক দেখানো আমলের বিচার হবে
মহান আল্লাহ বলেন-
اِنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ یُخٰدِعُوْنَ اللّٰہَ وَہُوَ خَادِعُہُمْ ۚ وَاِذَا قَامُوْۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوْا کُسَالٰی ۙ یُرَآءُوْنَ النَّاسَ وَلَا یَذْکُرُوْنَ اللّٰہَ اِلَّا قَلِیْلًا ۫ۙ
নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। সুরা নিসা : ১৪২
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
فَمَنْ کَانَ یَرْجُوْا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلْیَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشْرِکْ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا
সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহাফ : ১১০
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقٰتِکُمْ بِالْمَنِّ وَالْاَذٰی ۙ کَالَّذِیْ یُنْفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤْمِنُ بِاللّٰہِ وَالْیَوْمِ الْاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَیْہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلْدًا ؕ لَا یَقْدِرُوْنَ عَلٰی شَیْءٍ مِّمَّا کَسَبُوْا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہْدِی الْقَوْمَ الْکٰفِرِیْنَ
হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪
সুলাইমান ইবনু ইয়াসার (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা লোকজন যখন আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) এর নিকট থেকে বিদায় নিচ্ছিল, তখন সিরিয়াবাসী নাতিল (রহঃ) বললেন, হে শায়খ! আপনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে শুনেছেন এমন একখানা হাদীস আমাদেরকে শুনান। তিনি বলেন, হ্যাঁ! (শুনাবো)। আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে এমন একজন যে শহীদ হয়েছিল। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং আল্লাহ তার নিয়ামাতরাশির কথা তাকে বলবেন এবং সে তার সবটাই চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে।) তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এর বিনিময়ে কী আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি তোমারই পথে যুদ্ধ করেছি এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি বরং এ জন্যেই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে, তুমি বীর। তা বলা হয়েছে, এরপর নির্দেশ দেয়া হবে। সে মতে তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে যে জ্ঞান অর্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করেছে। তখন তাকে হাযির করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তার প্রদত্ত নি’আমাতের কথা তাকে বলবেন এবং সে তা চিনতে পারবে (এবং যথারীতি তার স্বীকারোক্তিও করবে) তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এত বড় নি’আমাত পেয়ে বিনিময়ে তুমি কী করলে? জবাবে সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছো। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে এজন্যে যাতে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলে। কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে এ জন্যে যাতে লোকে বলে, তুমি একজন কারী। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে, সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে যাকে আল্লাহ তা’আলা সচ্ছলতা এবং সর্ববিধ বিত্ত-বৈভব দান করেছেন। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে প্রদত্ত নিআমাতসমূহের কথা তাকে বলবেন। সে তা চিনতে পারবে (এবং স্বীকারোক্তিও করবে)। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এসব নি’আমাতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছো? জবাবে সে বলবে, সম্পদ ব্যয়ের এমন কোন খাত নেই যাতে সম্পদ ব্যয় করা তুমি পছন্দ কর, আমি সে খাতে তোমার সন্তুষ্টির জন্যে ব্যয় করেছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছে। তুমি বরং এ জন্যে তা করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে ’দানবীর’ বলে অভিহিত করে। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে। সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সহিহ মুসলিম : ১৯০৫।
মাহমূদ ইবনু লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ: الرِّيَاءُ
তোমাদের ব্যাপারে আমার সর্বাপেক্ষা ভয়ের বস্তু যা আমি ভয় পাচ্ছি তা হচ্ছে ছোট শির্ক বা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত)। বুলুগুল মারাম : ১৪৮৪, আহমাদ : ২৩১১৯, ২৭৭৪২
১৮. অসহায়কে সাহায্য না করলে জবাবদিহি করত হবে
অসহায়কে সাহায্য না করা এবং তাদের প্রতি উদাসীন থাকা সম্পর্কে ইসলামে কঠোর সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। কুরআনে অসহায় ও অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করার ব্যাপারে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যারা তাদের হক আদায় করে না, তাদের জন্য শাস্তির কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
اَرَءَیْتَ الَّذِیْ یُکَذِّبُ بِالدِّیْنِ ؕ فَذٰلِکَ الَّذِیْ یَدُعُّ الْیَتِیْمَ ۙ وَلَا یَحُضُّ عَلٰی طَعَامِ الْمِسْکِیْنِ ؕ
তুমি কি তাকে দেখেছ, যে হিসাব-প্রতিদানকে অস্বীকার করে? সে-ই ইয়াতীমকে কঠোরভাবে তাড়িয়ে দেয়,
আর মিসকীনকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না। সূরা মাউন : ১-৩
এই সূরায় আল্লাহ তাআলা তাদের কথা বলেছেন যারা দ্বীনকে অস্বীকার করে। এর একটি লক্ষণ হলো তারা অসহায়দের প্রতি উদাসীন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
کَلَّا بَلْ لَّا تُکْرِمُوْنَ الْیَتِیْمَ ۙ وَلَا تَحٰٓضُّوْنَ عَلٰی طَعَامِ الْمِسْکِیْنِ ۙ
কখনো নয়, বরং তোমরা ইয়াতীমদের দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন কর না। আর তোমরা মিসকীনদের খাদ্যদানে পরষ্পরকে উৎসাহিত কর না। সূরা ফাজর : ১৭-১৮
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ
তোমাদেরকে কিসে সাকার (জাহান্নাম) নামক স্থানে নিয়ে গেল? তারা বলবে, আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না এবং আমরা মিসকিনদের খাদ্য দিতাম না। আর আমরা অনর্থক আলোচনাকারীদের সাথে আলোচনায় মগ্ন থাকতাম।
আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিনে বলবেন, হে আদম সন্তান আমি অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমার সেবা-শুশ্রুষা করনি। সে বলবে, হে পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমার সেবা শুশ্রুষা করব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, আর তুমি তার সেবা করনি, তুমি কি জানতে না যে, তুমি তার সেবা-শুশ্রুষা করলে আমাকে তার কাছেই পেতে। হে আদম সন্তান আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে খেতে দাওনি। সে (বান্দা) বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে আহার করাতে পারি? তুমি তো সারা জাহানের প্রতিপালক।
তিনি (আল্লাহ) বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে আহার চেয়েছিল? তুমি তাকে খেতে দাওনি। তুমি কি জানতে না যে, যদি তুমি তাকে আহার করাতে তাহলে তা অবশ্যই আমার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান আমি তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে পানি পান করাওনি। সে (বান্দা) বলবে, হে আমার পরওয়ারদিগার! আমি কী করে তোমাকে পান করাব, অথচ তুমি সারা জাহানের প্রতিপালক। তিনি (আল্লাহ) বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানীয় চেয়েছিল, তুমি তাকে পান করাওনি। যদি তুমি তাকে পান করাতে, তবে তা আমার কাছে পেয়ে যেতে। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৯
এ বিচারের সময় ভালোফল পেতে নিচের হাদিসটির্ উপর আমল করা জরুরি।
আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক কোন ঈমানদারের দুনিয়া থেকে কোন মুসীবাত দূর করে দিবে, আল্লাহ তা’আলা বিচার দিবসে তার থেকে মুসীবাত সরিয়ে দিবেন। যে লোক কোন দুঃস্থ লোকের অভাব দূর করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দুরবস্থা দূর করবেন। যে লোক কোন মুসলিমের দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রাখবেন। বান্দা যতক্ষণ তার ভাই এর সহযোগিতায় আত্মনিয়োগ করে আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতা করতে থাকেন। যে লোক জ্ঞানার্জনের জন্য রাস্তায় বের হয়, আল্লাহ এর বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোন একটি গৃহে একত্রিত হয়ে আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং একে অপরের সাথে মিলে (কুরআন) অধ্যয়নে লিপ্ত থাকে তখন তাদের উপর শান্তিধারা অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং ফেরেশতাগণ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তা’আলা তার নিকটবর্তীদের (ফেরেশতাগণের) মধ্যে তাদের কথা আলোচনা করেন। আর যে লোককে আমলে পিছনে সরিয়ে দিবে তার বংশ (মর্যাদা) তাকে অগ্রসর করে দিবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৪৮, সুনানে তিরমিজি : ১৪২৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪
১৯. তাওহিদে সাক্ষ্য প্রদানে জন্য ক্ষমা করা হবে
তাওহীদ বা আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদে অবিচল বিশ্বাস দীন ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যার তাওহীদী আকীদা-বিশ্বাসে সমস্যা আছে তার কোনো নেক আমল কাজে আসবে না। দুনিয়া পরিমাণ সম্পদ ছদকা বা আল্লাহর পথে নিজের প্রাণ ও সম্পদ সবকিছু কুরবানী দিলেও নয়। অপরপক্ষে যারা তাওহীদী-আকীদা বিশ্বাস নির্ভেজাল হবে ও এর ওপর অবিচল থাকবে তার অন্য কোনো নেক আমল না থাকলেও তাওহীদের কারণে সে একদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। কিয়ামত পরবর্তী বিচারেও তাওহীদের মূল্যায়ন করা হবে গুরুত্বের সাথে।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত দিবসে আমার উম্মতের একজনকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে আলাদা করে এনে উপস্থিত করবেন। তিনি তার সামনে নিরানব্বইটি আমলনামার খাতা খুলে ধরবেন। প্রতিটি খাতা দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তারপর তিনি প্রশ্ন করবেন, তুমি কি এগুলো হতে কোন একটি (গুনাহ) অস্বীকার করতে পার? আমার লেখক ফেরেশতারা কি তোমার উপর যুলুম করেছে? সে বলবে, না, হে প্ৰভু!
তিনি আবার প্রশ্ন করবেনঃ তোমার কোন অভিযোগ আছে কি? সে বলবে, না, হে আমার প্রভু! তিনি বলবেনঃ আমার নিকট তোমার একটি সাওয়াব আছে। আজ তোমার উপর এতটুকু যুলুমও করা হবে না। তখন ছোট একটি কাগজের টুকরা বের করা হবে। তাতে লিখা থাকবে-
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
অর্থ : আমি সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত আর কোন প্রভু নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল”।
তিনি তাকে বলবেনঃ দাড়িপাল্লার সামনে যাও। সে বলবে, হে প্ৰভু! এতগুলো খাতার বিপরীতে এই সামান্য কাগজটুকুর কি আর ওজন হবে? তিনি বলবেনঃ তোমার উপর কোন রকম যুলুম করা হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর খাতাগুলো এক পাল্লায় রাখা হবে এবং উক্ত টুকরাটি আরেক পাল্লায় রাখা হবে। ওজনে খাতাগুলোর পাল্লা হালকা হবে এবং কাগজের টুকরার পাল্লা ভারী হবে। আর আল্লাহ তা’আলার নামের বিপরীতে কোন কিছুই ভারী হতে পারে না। সুনানে তিরমিজি : ২৬৩৯, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০০, সহিহাহ : ১৩৫, সহীহুল জামি : ১৭৭৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ২২৫, শুআবূল ঈমান : ২৮৩, তবারানী : ১৪৯০
২০. কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেউ অগ্রসর হতে পারবে না
ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لاَ تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاَهُ وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ ”
কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে। সুনানে তিরিমিজি : ২৪১৬, সহিহাহ : ৯৪৬
২১. মুসলিমদের মুক্তিপণ হিসেবে ইহুদী বা নাসারকে প্রদান করা হবে
আবু মূসা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
إِذَا كَانَ يَوْمُ الْقِيَامَةِ دَفَعَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى كُلِّ مُسْلِمٍ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا فَيَقُولُ هَذَا فَكَاكُكَ مِنَ النَّارِ
কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মুসলিমের নিকট একজন খ্রীস্টান বা ইয়াহুদী দিয়ে বলবেন, এ হচ্ছে তোমার জন্যে জাহান্নামের অগ্নি হতে মুক্তিপণ। সহীহ মুসলিম : ২৭৬৭, মিশকাত : ৫৫৫২ শুআবূল ঈমান : ৩৭৮, আল মুজামুল আওসাত : ৯৭৪।
২২. হাশরের ময়দানে মানুষের অঙ্গ প্রতঙ্গ তার বিরুদ্ধে সাক্ষি দিবে
اَلْیَوْمَ نَخْتِمُ عَلٰۤی اَفْوَاہِہِمْ وَتُکَلِّمُنَاۤ اَیْدِیْہِمْ وَتَشْہَدُ اَرْجُلُہُمْ بِمَا کَانُوْا یَکْسِبُوْنَ
আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব এবং তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে ও তাদের পা সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে যা তারা অর্জন করত।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর কাছে ছিলাম, হঠাৎ তিনি হাসলেন। অতঃপর প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জান আমি কেন হাসছি? আমরা বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি (সা.) বললেন, কিয়ামতের দিন বান্দা যে তার প্রভুর সাথে কথা বলবে, সে কথাটি স্মরণ করে হাসছি। বান্দা বলবে, হে প্রভু! তুমি কি আমাকে অবিচার থেকে নিরাপত্তা দান করনি? আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হ্যাঁ। তখন বান্দা বলবে, আজ আমি আমার সম্পর্কে আপনজন ছাড়া আমার বিরুদ্ধে অন্য কারো সাক্ষ্য গ্রহণ করব না। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি আজ নিজেই তোমার সাক্ষী হিসেবে এবং কিরামান কাতিবীনের সাক্ষ্যই তোমার জন্য যথেষ্ট। অতঃপর তার মুখের উপর আল্লাহ তা’আলা মোহর লাগিয়ে দিবেন এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে বলা হবে, তোমরা (কে কখন কি কি কাজ করেছ) বল? তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ তাদের কৃতকর্মসমূহ প্রকাশ করে দেবে। এরপর তার মুখকে স্বাভাবিক অবস্থায় খুলে দেয়া হবে। তখন সে স্বীয় অঙ্গসমূহকে লক্ষ্য করে আক্ষেপের সাথে বলবে, হে হতভাগা অঙ্গসমূহ! তোরা দূর হ! তোদের ধ্বংস হোক। তোদের জন্যই তো আমি আমার প্রভুর সাথে তর্ক করছিলাম। সহীহ: মুসলিম : ২৯৬৯, মিশকাত : ৫৫৫৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৫৮, সহীহুল জামি : ৮১৩৪, আবু ইয়া’লা : ৩৯৭৭, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৭৩৫৮, শুআবূল ঈমান : ২৬৫।
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছন, ………মোটকথা সে সাধ্য পরিমাণ নিজের নেক কার্যসমূহের একটি তালিকা আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আচ্ছা! তুমি তো তোমার কথা বললে, এখন এখানেই দাঁড়াও, এক্ষুণি তোমার সাক্ষী উপস্থিত করছি। এ কথা শুনে বান্দা মনে মনে চিন্তা করবে, কে আছে এমন যে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে? অতঃপর তার মুখে মোহর লাগিয়ে দেয়া হবে এবং তার উরুকে বলা হবে, তুমি বল, তখন তার উরু, হাড় মাংস প্রভৃতি এক একটি করে বলে ফেলবে, তারা যা যা করেছিল। তার মুখে মোহর লাগিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে এজন্য সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে যেন সে বান্দা কোন ওযর-আপত্তি পেশ করতে না পারে। মূলত যে বান্দার কথা আলোচনা করা হয়েছে, সে হলো মুনাফিক এবং এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা তার প্রতি অত্যন্ত রাগান্বিত হবেন। অংশিক সহীহ বুখারী : ৭৪৩৭, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৭৯১৪, আবূ ইয়া’লা : ৬৬৮৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪৬৪২. হাকিম : ৮৭৩৬।
২৩. সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন
আবূ উমামাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আমার প্রভু আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার উম্মতের মধ্য থেকে সত্তর হাজার লোককে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং তাদের ওপর ’আযাবও হবে না। আবার উক্ত প্রত্যেক হাজারের সাথে সত্তর হাজার এবং আমার প্রভুর তিন অঞ্জলি ভর্তি লোকও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
মিশকত : ৫৫৫৬, সুনানে তিরমিযী : ২৪৬৭, সুনানে ইবনু মাজাহ :ধ ৪২৮৬, সহীহুল জামি : ৭০৬২ : আহমাদ : ২২৩৫৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১৯০৯, ত্ববারানী : ৪৪২৭
২৪. আল্লাহ ক্ষমার আচ্ছাসে বান্দা তার কবিরা গুনাহ প্রকাশ করে দিবেন
আবূ যার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: আমি এমন এক লোক সম্পর্কে অবহিত আছি, যে জান্নাতীদের মধ্যে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তি এবং সর্বশেষ জাহান্নামী, যে তা থেকে বের হয়ে আসবে। কিয়ামতের দিন তাকে আল্লাহ তা’আলার সামনে উপস্থিত করা হবে। তখন মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাদের)-কে বলা হবে, তার ছোট ছোট গুনাহসমূহ তার সামনে উপস্থিত কর এবং বড় বড় গুনাহগুলো সরিয়ে রাখ। তখন তার ছোট ছোট গুনাহগুলোই তার সামনে উপস্থিত করা হবে। তখন তাকে প্রশ্ন করা হবে, আচ্ছা বল তো অমুক অমুক দিন অমুক অমুক কাজটি তুমি করেছিলে? সে বলবে, হ্যা করেছি। মূলত তা সে অস্বীকার করতে পারবে না। তবে বড় বড় গুনাহসমূহ উপস্থিত করা সম্পর্কে সে অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত থাকবে। তখন তাকে বলা হবে, যাও! তোমার প্রতিটি গুনাহের স্থলে তোমাকে এক একটি পুণ্য দেয়া হলো। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভু! আমি তো এমন কিছু (বড় বড়) গুনাহও করেছিলাম, যেগুলাকে আমি এখানে দেখতে পাচ্ছি না। বর্ণনাকারী আবূ যার (রাঃ) বলেন, এ সময় আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) – কে এমনভাবে হাসতে দেখেছি যে, তাঁর মাড়ির দাঁত পর্যন্ত প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সহীহ মুসলিম : ১৯০, মিশকাত : ৫৫৮৭, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ৩০৫২, আস্ সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী : ২১২৯১।