শিরকে আসগর ও রিয়া

শিরকে আসগর ও রিয়া

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শিরকে আসগর

শিরকে আসগর এর অর্থ হলো ছোট শিরক। ছোট শিরক বলতে এমন শিরকি কথা, কাজ ও ইবাদতকে বুঝানো হয় যা বললে বা করলে ইসলামি শরিয়ত কোন মুসলিমকে ইসলাম থেকে বহিস্কার না। কিন্তু তার ঐ কর্মটি কবিরা গুনাহ থেকে নিকৃষ্ট হতে পারে এবং তাকে কাফির না বলে ফাসিক বা পাপিষ্ঠ বলা হয়।

ছোট শিরক শ্রেণী বিভাগ

অনেক গবেষক আলেম ছোট শিরক সহজ করে বুঝাতে শ্রণী বিভাগ করে আলোচনা করেছেন। তারা ছোট শিরক প্রকাশ্য ছোট শিরক, গোপনীয় ছোট শিরক, নিয়তে ছোট শিরক, আমলে ছোট শিরক ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগ করে আলোচনা করছেন। সাধারণ মানুষ বিভীন্ন কারনে, বিভিন্নভাবে ছোট শিরক করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের মুল ভিত্তি হলে বিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসকে কথা ও কাজ দ্বারা প্রতিফলিত করে থাকে। বিশ্বাসের চুড়ান্ত পর্যায় হলো আল্লাহ প্রদত্ত কিছু নিয়ম সম্বলিত ইবাদত।  এই বিশ্বাস, কথা, কর্ম ও ইবাদতের উপর ভিত্তি করে সাধারনত চারটি পদ্দতিতে ছোট শিরক সম্পাদিত হয়। যেহেতু চারটি পদ্ধতিতে ছোট শিরক হয় তাই চারটি ভাগে বিভক্ত করে ছেট শিরা আলোচনা কবর। চার প্রকারের ছোট শিরক হলো-

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

(১) বিশ্বাসের দ্বারা ছোট শিরক

আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও যদি কেউ কোনো বস্তু সম্পর্কে বিশ্বাস করল যে, তা উপকার হাসিল ও অনিষ্ট দূরীকরণের উপায়, অথচ আল্লাহ ইহাকে উপকার হাসিল ও অনিষ্ট দূরীকরণের উপায় সাবস্ত করেনি। আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও যদি শয়তানের হাত আছে তবে ছোট শিরক হবে। যেমন-

আবুল মালীহ (রহঃ) হতে এক ব্যক্তির সুত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জন্তুযানে নবী ﷺ এর পিছনে বসা ছিলাম। হঠাৎ তাঁর সাওয়ারী হোঁচট খেলে আমি বললাম, শয়তান ধ্বংস হয়েছে। তিনি বললেন, একথা বলো না যে, শয়তান ধ্বংস হয়েছে। কেননা তুমি একথা বললে সে অহংকারে ঘরের মতো বড় আকৃতির হয়ে যাবে এবং সে বলবে, আমার ক্ষমতায় হয়েছে। অতএব বলো, (بِسْمِ اللَّهِ) আল্লাহর নামে। যখন তুমি ’আল্লাহর নামে’ বলবে তখন শয়তান হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে মাছির মত হয়ে যাবে। আবু দাউদ : ৪৯৮২

তবে পরিপূর্ণ বিশ্বাস না করে, আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির জন্য আমল করে থাকলে তার পরিণতি শিরকে আকবর। সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٍ۬ فَجَعَلۡنَـٰهُ هَبَآءً۬ مَّنثُورًا 

আর তারা যে কাজ করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব। সুরা ফুরকান : ২৩

অন্তরে সঠিক বিশ্বাস থাকার পরও যদি ব্যক্তি বা বস্তুর দ্বারা উপকার বা অপকারের উপায় সাবস্ত করে তাদের খুশির জন্য আমল ছোট শিকর। তবে মনে রাখতে হবে আপনার অন্তরের খবর আল্লাহ জানানে।

আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ ‏

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক চাল-চলন ও বিত্ত-বৈভবের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না বরং তিনি দৃষ্টি দিয়ে থাকেন তোমাদের অন্তর ও আমলের প্রতি। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৪

(২) কথার দ্বারা ছোট শিরক

আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকার পরও কেউ এমন কথা বলে যা আল্লাহর সাথে অংশিদার সাব্যস্থ করে, তবে সে কথার দ্বারা ছোট শিরক করল, যদিও গাইরুল্লাহকে সম্মান করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সমকক্ষ উদ্দেশ্য না হয়। আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস রেখে কেউ বলল, আল্লাহর সাথে ইল্লাহও লাগে, যা আল্লাহ চেয়েছেন এবং আপনি চেয়েছেন, পীরের অসিলায় ভাল আছি, বিপদে আপনি না থাকলে যে কি হত, ভাগ্যিস চাকুরিটা ছিল অথবা কেউ গায়রুল্লাহর নামে কসম করল। যেমন-

হুযাইফাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী ﷺ বলেছেন-

لَا تَقُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ، وَشَاءَ فُلَانٌ، وَلَكِنْ قُولُوا مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ شَاءَ فُلَانٌ

তোমরা বলো না যে, আল্লাহ যা চান এবং অমুক লোক যা চায়। সুতরাং তোমরা বলো, আল্লাহ যা চান, অতঃপর অমুক যা চায়। সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৮০, সহিহাহ : ১৩৯

কেউ যদি এভাবে বলা যে-

যদি আল্লাহ এবং আপনি না থাকতেন! তাহলে আমার বিপদ হত। আমার তো শুধু আল্লাহ এবং আপনি ছাড়া আর কেউ নেই কিংবা আমি আল্লাহ এবং আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি, ইত্যাদি। তাহলে কথার দ্বারা ছোট শিরক।

(৩) কর্মের দ্বারা ছোট শিরক

যদি কেউ একই সাথে আল্লাহর এবং মানুষের সন্তস্টি অর্জনের জন্য কর্ম সম্পাদন করে যে কর্ম মহান আল্লাহ নির্ধারন করেনি তাহলে কর্মের দ্বারা ছোট শিরক হবে। কর্মের ছোট শিরক দ্বারা মানুষ গুনাহগার হবে, কর্মের কোন প্রতিদান পাবেনা এবং আমল প্রত্যাখ্যাত হবে। যেমন-

মসজিদের দরজাসমূহ চুমু খাওয়া, কবর স্পর্শ করা, কবরের গিলাপ ধরে দোয়া করা। কবর, মসজিদ বা আলীদের স্মৃতি বিজরিত স্থানের মাটির বরকতের নেশায় বা রোগ মুক্তি কামনায় করা বা গায়ে মাখা। রোগ মুক্তি আশায় তাবিজ লটকালো, অথবা আংটি কিংবা তাগা পরিধান করল, ইত্যাদি কর্মসমূহ ছোট শিরক। যেমন-

নবী ﷺ বলেন,  (مَنْ تَعَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ)   যে ব্যক্তি তাবীজ লটকালো সে শিরক করল। সিলসিলায়ে সহিহাহ : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ, চতুর্খ খণ্ড, হাদিস : ১৫৬

(৪) ইবাদতের ছোট শিরক বা রিয়া

মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহকে রাজি খুশি কারর জন্য ইবাদত করলে মানুষের ইহকালীন জীবন যেমন সুন্দর হয়, পরকালীন জীবনও তেমনি মঙ্গলময় হবে। ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সন্ত্বষ্ট করা। কিন্তু যখন সে ইবাদত মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে না হয়ে গাইরুল্লাহ বা লোক দেখানোর জন্য সুন্দর করা হয় তখন তাকে রিয়া বলা হয়। এক কথায়, লোক দেখানো আমল কে রিয়া বলা হয়।

রিয়া (رِئَآءَ) অর্থ প্রদর্শন করা বা প্রদর্শনেচ্ছা। আল্লাহর জন্য করণীয় ইবাদত পালনের মধ্যে মানুষের দর্শন, প্রশংসা বা বাহবা পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করাকে রিয়া বলে। কোন নেক ইবাদাত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র গায়রুল্লাহকে দেখানোর উদ্দেশ্যে বা মানুষের প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে করা হয় অথচ তার ইবাদতটি দেখে মানুষে যেন আল্লাহর ইবাদাত বলেই মনে করে। যদিও সে ইবাদতে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক বা সমান করা উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তথাপি এ জাতীয় ইবাদাত হলো ছোট শিরক বা রিয়া। এ ধরনের ‘ইবাদাত আল্লাহ্‌র নিকট আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কোন সত্যিকারের কোন মুমিন বান্দা এরূপ রিয়া করতে পারে না।  এই রিয়া বা ছোট শিকর থেকেই বড় শিরকে পরিনত হয়। অর্থাৎ বান্দা যদি তার ইবাদাতে গায়রুল্লাহকে আল্লাহর প্রাপ্য ও অধিকারে শামিল বা অংশীদার করা উদ্দেশ্য হয়, কিংবা মুল কাজটাই যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়, তাহলে তা শিরকে আকবার (বড় শিরক) বলে গণ্য হবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

  فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّہٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّلَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّہٖۤ اَحَدًا 

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সুরা কাহাফ : ১১০

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। আর তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। সুরা নিসা : ১৪২

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

রিয়াকারিগর সৎকাজ আন্তরিক সংকল্প সহকারে আল্লাহর জন্য করে না। বরং যা কিছু করে অন্যদের দেখাবার জন্য করে। এভাবে তারা নিজেদের প্রশংসা শুনাতে চায়। তারা চায়, লোকেরা তাদের সৎ লোক মনে করুক, তাদের সৎকাজের সুনাম করুক। এর মাধ্যমে তারা কোন না কোনভাবে দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধার করবে। অর্থাৎ তারা লোক দেখানো কাজ করে। সাধারনত মুনফিকদের শ্রেণীর মুসলিমগন মানুষের সামনে লজ্জায় পড়ে নেক আমল করে, মানুষ জন না থাকলে আমল ত্যাগ করে। এই সকল কারনে লোক দেখান আমল কবিরা গুনাহের অন্তরভূক্ত।

মাহমূদ ইবনু লাবীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ: الرِّيَاءُ

তোমাদের ব্যাপারে আমার সর্বাপেক্ষা ভয়ের বস্তু যা আমি ভয় পাচ্ছি তা হচ্ছে ছোট শির্ক বা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত)। বুলুগুল মারাম : ১৪৮৪, আহমাদ : ২৩১১৯, ২৭৭৪২

আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের সংবাদ দিব না, যে বিষয়টি আমার কাছে মাসীহ দাজ্জালের চাইতেও ভয়ঙ্কর? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তা হচ্ছে গোপন শিরক। একজন মানুষ দাঁড়িয়ে শুধু এ জন্যই তার সালাতকে খুব সুন্দরভাবে আদায় করে যে, কোন মানুষ তার সালাত দেখছে। সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২০৪

রিয়া (ছোট শিরক) বা লোক দেখানো ইবাদত বুঝাতে নিচের একটি হাদিসই যথেষ্ট। বিয়া কি? এর পরিমান কি? সবই পাবের তিরমিজির নিম্মের হাদিসটিতে।

শুফাই আল-আসবাহী (রহ.) হতে বর্ণিত আছে, কোন একদিন তিনি মদীনায় পৌছে দেখতে পেলেন যে, একজন লোককে ঘিরে জনতার ভিড় লেগে আছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ইনি কে? উপস্থিত লোকেরা তাকে বলল, ইনি আবূ হুরাইরা (রা.) (শুফাই বলেন), আমি কাছে গিয়ে তার সামনে বসলাম। তখন লোকদের তিনি হাদীস শুনাচ্ছিলেন। তারপর তিনি যখন নীরব ও একাকী হলেন, আমি তাকে বললাম, আমি সত্যিকারভাবে আপনার নিকট এই আবেদন করছি যে, আপনি আমাকে এমন একটি হাদীস শুনাবেন, যা আপনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট শুনেছেন, ভালোভাবে বুঝেছেন এবং জেনেছেন।

আবূ হুরাইরা (রা.) বললেন, আমি তাই করব, আমি এমন একটি হাদীস তোমার কাছে বর্ণনা করব যা সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন এবং আমি তা বুঝেছি ও জেনেছি। আবূ হুরাইরা (রা.) একথা বলার পর কেমন যেন তন্ময়গ্রস্ত হয়ে পড়েন। অল্প সময় এভাবে থাকলেন। তারপর তন্ময়ভাব চলে গেলে তিনি বললেন, আমি এমন একটি হাদীস তোমার কাছে বর্ণনা করব যা রাসূলুল্লাহ ﷺ এই ঘরের মধ্যে আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তখন আমি ও তিনি ব্যতীত আমাদের সাথে আর কেউ ছিল না। আবূ হুরাইরা (রা.) পুনরায় আরো গভীরভাবে তন্ময়গ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি চেতনা ফিরে পেয়ে মুখমণ্ডল মুছলেন, তারপর বললেন, আমি তোমার নিকট অবশ্যই এরূপ হাদীস বর্ণনা করব যা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তখন এই ঘরে তিনি ও আমি ব্যতীত আমাদের সাথে আর কেউ ছিল না। আবূ হুরাইরা আবার বেহুশ হয়ে গেলেন; তিনি পুনরায় হুশে ফিরে এসে তার মুখমণ্ডল মুছলেন এবং বললেন, আমি তা করব। আমি অবশ্যই তোমার নিকট এরূপ হাদীস বর্ণনা করব যাহা তিনি আমাকে বর্ণনা করেছেন।

আমি তখন তার সাথে এই ঘরে ছিলাম। আমি আর তিনি ব্যতীত তখন আর কেউ ছিলনা। আবূ হুরাইরা (রা.) পুনরায় আরো গভীরভাবে তন্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন এবং বেহুশ হয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি অনেকক্ষণ তাকে ঠেস দিয়ে রাখলাম। তারপর হুশ ফিরে এলে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের মাঝে ফায়সালা করার জন্য কিয়ামত দিবসে তাদের সামনে হাযির হবেন। সকল উন্মাতই তখন নতজানু অবস্থায় থাকবে।

তারপর হিসাব-নিকাশের জন্য সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিদের ডাকা হবে তারা হলো কুরআনের হাফিয, আল্লাহ্ তা’আলার পথের শহীদ এবং প্রচুর ধনৈশ্বর্যের মালিক।

সেই কারী (কুরআন পাঠক)-কে আল্লাহ তা’আলা প্রশ্ন করবেন, আমি আমার রাসূলের নিকট যা প্রেরণ করেছি তা কি তোমাকে শিখাইনি? সে বলবে, হে রব! হ্যাঁ, শিখিয়েছেন। তিনি বলবেন, তুমি যা শিখেছ সে অনুযায়ী কোন কোন আমল করেছ? সে বলবে, আমি রাত-দিন তা তিলাওয়াত করেছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, ফেরেশতারাও বলবে, তুমি মিথ্যা বলেছ। আল্লাহ তা’আলা তাকে আরো বলবেন, বরং তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে যে, তোমাকে বড় কারী (হাফিয) ডাকা হোক। আর তা তো ডাকা হয়েছে।

তারপর সম্পদওয়ালা ব্যক্তিকে হাযির করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে বলবেন, আমি কি তোমাকে সম্পদশালী বানাইনি? এমনকি তুমি কারো মুখাপেক্ষী ছিলেনা? সে বলবে, হে রব! হ্যাঁ, তা বানিয়েছেন। তিনি বলবেন, আমার দেয়া সম্পদ হতে তুমি কোন কোন (সৎ) আমল করেছ? সে বলবে, আমি এর দ্বারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রেখেছি এবং দান-খাইরাত করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, ফেরেশতারাও বলবে, তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা’আলা আরো বলবেন, তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে যে, মানুষের নিকট তোমার দানশীল-দানবীর নামের প্রসার হোক, আর এরূপ তো হয়েছেই।

তারপর যে লোক আল্লাহ্ তা’আলার রাস্তায় শাহাদাৎ বরণ করেছে তাকে হাযির করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তাকে প্রশ্ন করবেন, তুমি কিভাবে নিহত হয়েছ? সে বলবে, আমি তো আপনার পথে জিহাদ করতে আদিষ্ট ছিলাম। কাজেই আমি জিহাদ করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করেছি। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ, আর ফেরেশতারাও তাকে বলবে তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ তা’আলা আরো বলবেন, তুমি ইচ্ছাপোষণ করেছিলে লোকমুখে একথা প্রচার হোক যে, অমুক ব্যক্তি খুব সাহসী বীর। আর তাতো বলাই হয়েছে।

তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার হাটুতে হাত মেরে বললেন, হে আবূ হুরাইরা কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্ তা’আলার সৃষ্টির মধ্য হতে এ তিনজন দ্বারাই প্রথমে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে।

ওয়ালীদ অর্থাৎ আবূ উসমান আল-মাদাইনী বলেন, উকবা ইবনু আমাকে বলেছেন যে, উক্ত শুফাই (শাফী) এ হাদীসটি মুয়াবিয়া (রা.)-এর নিকট গিয়ে বর্ণনা করেন। আবূ উসমান আরো বলেন, আলা ইবনু আবূ হাকীম আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, সে (শাফী) ছিল মুয়াবিয়া (রা.) এর তলোয়ার বাহক।

সে বলেছে যে, জনৈক ব্যক্তি মুয়াবিয়া (রা.) এর নিকট এসে উক্ত হাদীসটি আবূ হুরাইরা (রা.) এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তখন মুয়াবিয়া (রা.) বলেন, যদি তাদের সাথে এমনটি করা হয় তাহলে অন্যসব লোকের কি অবস্থা হবে? তারপর মুআবিয়া (রা.) খুব বেশি কান্না করলেন। এমনকি আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি কাঁদতে কাঁদতে মারা যাবেন। আমরা বলাবলি করতে লাগলাম, এই লোকটিই আমাদের এখানে অনিষ্ট নিয়ে এসেছে (অর্থাৎ সে এই হাদীসটি বর্ণনা না করলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না)। ইতিমধ্যে মুয়াবিয়া (রা.) হুশ ফিরে পেলেন এবং তার চেহারা মুছলেন, তারপর বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূল ﷺ সত্যই বলেছেন। (এই বলে তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন)

যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবন ও তার জৌলুস কামনা করে, আমি সেখানে তাদেরকে তাদের আমলের ফল পুরোপুরি দিয়ে দেই এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। এরাই তারা, আখিরাতে যাদের জন্য আগুন ছাড়া আর কিছুই নেই এবং তারা সেখানে যা করে তা বরবাদ হয়ে যাবে আর তারা যা করত, তা সম্পূর্ণ বাতিল, সুরা হুদ: ১৫-১৬। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮২, তালিক আলা ইবনে খুজাইমাহ : ২৪৮২, সহিহ তারীকুর রাগিব, প্রথম খণ্ড, পৃ-২৯-৩০, হাদসের মান সহিহ

২। শিরকে আকবার (বড় শিরক) ও শিরকে আসগার (ছোট শিরক) এর মধ্যে পার্থক্য

(১) শিরকে আকবার নিঃসন্দেহে কবিরা গুনাহ কিন্তু শিরকে আসগর কবিরা বা সগিরা গুনাহ হতে পারে।

শিরকে আকবার সবচেয়ে বড় অন্যায় ও অপরাধ বা কবিরা গুনাহ। মহান আল্লাহ বলেন-

وَاِذۡ قَالَ لُقۡمٰنُ لِابۡنِہٖ وَہُوَ یَعِظُہٗ یٰبُنَیَّ لَا تُشۡرِکۡ بِاللّٰہِ ؕؔ اِنَّ الشِّرۡکَ لَظُلۡمٌ عَظِیۡمٌ

আর স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে শিরক করো না; নিশ্চয় শিরক হল বড় জুলুম। সুরা লুকমান :১৩

আবূ বকরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ قَالَ ‏”‏ الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ

আমি কি তোমাদের নিকৃষ্ট কাবীরাহ গুনাহের বর্ণনা দিব না? সকলে বললেনঃ হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! তখন তিনি বললেন, তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা-পিতার অবাধ্যতা। সহিহ বুখারি : ৬২৭৩

(২) শিরকে আকবর তাওবা ছাড়া ক্ষমা করা হবে না কিন্তু শিরকে আসগর তাওবা ছাড়াও ক্ষমা করা হতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

অপর পক্ষে শিরকে আসগর যখন সগিরা গুনাহ হবে তখন আল্লাহ তাওবা ছাড়াই ক্ষমা করেত পারেন। মহান আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ یَجۡتَنِبُوۡنَ کَبٰٓئِرَ الۡاِثۡمِ وَالۡفَوَاحِشَ اِلَّا اللَّمَمَ ؕ  اِنَّ رَبَّکَ وَاسِعُ الۡمَغۡفِرَۃِ ؕ 

যারা ছোট খাট দোষ-ত্রুটি ছাড়া বড় বড় পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে, নিশ্চয় তোমার রব ক্ষমার ব্যাপারে উদার। সুরা নাজম : ৩২

(৩) শিরকে আকবর সকল আমলকে ধ্বংস করে দেয় কিন্ত শিরকে আসগর শুধু আমল সংশ্লিষ্ট নেকী নষ্ট করে দেয়

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

وَلَقَدۡ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ لَئِنۡ اَشۡرَکۡتَ لَیَحۡبَطَنَّ عَمَلُکَ وَلَتَکُوۡنَنَّ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা যুমার : ৬৫

কিন্তু শিরকে আসগর শুধু আমল সংশ্লিষ্ট নেকী নষ্ট করে দেয়। যদি কেউ লোক দেখানোর জন্য দান  করে, সিয়াম আদায় করে বা হজ আদায় করে তখন তার দান, সিয়াম বা হজ সংশ্লিষ্টি সকল নেকী বাদ হয়ে যাবে।

(৪) শিরকে আকবরের কারনে জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে কিন্তু শিরকে আসগরের কারনে জাহান্নামী স্থায়ী হবে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ

‘আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সুরা বাইয়েনা : ৬

পক্ষান্তরে শিরকে আসগরের কারনে জাহান্নামী স্থায়ী হবে না। নির্দিষ্ট শান্তি ভোগের পর তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

إِن تَجْتَنِبُواْ كَبَآئِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلاً كَرِيمًا

যেগুলো সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে যদি তোমরা সে সব বড় গোনাহ গুলো থেকে বেঁচে থাকতে পার। তবে আমি তোমাদের ক্রটি-বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেব এবং সম্মান জনক স্থানে তোমাদের প্রবেশ করার। সুরা নিসা :৩১

শিরকে আসগর সর্বেচ্চ কবিরা গুনাহ হয়। আর কবিরা গুনাহকারী ইমানের কারনে আল্লাহ ক্ষমার আশা রাখে কাজেই সে জাহান্নামে স্থায়ী হবে না।  

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন-

‏ أَتَانِي جِبْرِيلُ – عَلَيْهِ السَّلاَمُ – فَبَشَّرَنِي أَنَّهُ مَنْ مَاتَ مِنْ أُمَّتِكَ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏”‏ ‏.‏ قُلْتُ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏.‏ قَالَ ‏”‏ وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ ‏

জিবরীল (আঃ) আমার নিকট এসে সুসংবাদ দিলেন যে, আপনার উম্মাতের যে কেউ শিরক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি (আবূ যার) বললাম, যদিও সে ব্যভিচার করে এবং যদিও সে চুরি করে। তিনি বললেন, যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে। সহিহ মুসলিম: ১৭৩

(৫) শিরকে আকবর ইসলাম থেকে বের করে দিলেও আসগর বের করে দেয় না।

শিরকে আকবরে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গন্ডী থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয়। এর বিপরীতে শিরকে আসগরের কারনে ইসলাম থেকে বহিস্কৃত হয় না। মহান আল্লাহ বলেন-

وَیَقُوۡلُوۡنَ اٰمَنَّا بِاللّٰہِ وَبِالرَّسُوۡلِ وَاَطَعۡنَا ثُمَّ یَتَوَلّٰی فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ ذٰلِکَ ؕ وَمَاۤ اُولٰٓئِکَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ

তারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমরা আনুগত্য করেছি’, তারপর তাদের একটি দল এর পরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তারা মুমিন নয়। সুরা নুর : ৪৭

পক্ষান্তরে শিরকে আসগার মুসলমানকে ইসলাম থেকে বহিস্কার করে দেয় না। অর্থাৎ শিরকে আসগার করার কারণে কোন মুসলিম, কাফির-মুশরিকে পরিণত হয় না।

(৬) শিরকে আকরকরে লিপ্ত ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ এর সাফায়েত থেকে বঞ্চিত থাকবে

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন

لِكُلِّ نَبِيٍّ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ فَتَعَجَّلَ كُلُّ نَبِيٍّ دَعْوَتَهُ وَإِنِّي اخْتَبَأْتُ دَعْوَتِي شَفَاعَةً لأُمَّتِي فَهِيَ نَائِلَةٌ مَنْ مَاتَ مِنْهُمْ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

প্রত্যেক নবীর জন্য একটি করে দোয়া আছে যা কবুল করা হয়। আর প্রত্যেক নবী তাঁর দু’আর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছেন আর আমি আমার দু’আ আমার উম্মাতের শাফাআতের জন্য জমা রেখেছি। অতএব আমার উম্মাতের মধ্যে যারা আল্লাহর সাথে শিরক না করে মারা যাবে তারা আমার শাফাআত প্রাপ্ত হবে।সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩০৭

শিরকে আকরকরে লিপ্ত ব্যক্তি কাফির আর কাফিরের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সুপারিশ থাকবে না। পক্ষান্তরে শিরকে আসগন ব্যক্তি ফাসিক তার জন্য এর সুপারিশ তাকবে। ইনশাল্লাহ

(৭) মুসলিম প্রকাশ্যে শিরকে আকবরের ঘোষনা দিলে তার জাল মালের নিরাপত্তা নাই।

যে মুসলিম প্রকাশ্যে শিরকে আকবরের ঘোষনা দিবে, তাকে তাওবা করে নতুন করে ইসলাম গ্রহণ না করেলে শারীয়াতের দৃষ্টিতে তার জান ও মালের কোন নিরাপত্তা নেই। শারীয়াতের দৃষ্টিতে সে মৃত্যুদন্ডের যোগ্য এবং তার সম্পদ বাজেয়াপ্তযোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا انۡسَلَخَ الۡاَشۡہُرُ الۡحُرُمُ فَاقۡتُلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَیۡثُ وَجَدۡتُّمُوۡہُمۡ وَخُذُوۡہُمۡ وَاحۡصُرُوۡہُمۡ وَاقۡعُدُوۡا لَہُمۡ کُلَّ مَرۡصَدٍ ۚ فَاِنۡ تَابُوۡا وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَخَلُّوۡا سَبِیۡلَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে পাকড়াও কর, তাদেরকে অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে বসে থাক। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা তাওবা : ০৫

পক্ষান্তরে শিরকে আসগারকারী যদিও ফাসিক, তথাপি মুমিন হওয়ার কারণে শারী‘য়াতের দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্রের কাছে তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা রয়েছে। সে মৃত্যুদন্ড যোগ্য নয় এবং তার সম্পদও বাজেয়াপ্তযোগ্য নয়।

৩। ছোট শিরকের পরিনামঃ

কুরআন ও বিভিন্ন হাদিসে রিয়াকে শিরকে আসগর বা ছোট শিরক এবং শিরকে খাফি বা লুকায়িত শিরক বলা হয়েছে। শিরকে আসগর বা ছোট শিরক বলতে এমন কাজ ও কথাকে বুঝানো হয়, যা তাতে লিপ্ত ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেবে না বটে, তবে তা মাঝে মাঝে সগিরা গুনাহের গন্ডি ছাড়িয়ে কবিরা গুনাহ অপেক্ষাও জঘন্য মনে হবে। সবচেয়ে ভয়ানা হলো- এই গুনাহ থেকে সামান্য কারনে শিরকে আকবর হয়ে যেতে পারে।

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

يَا عَائِشَةُ إِيَّاكِ وَمُحَقَّرَاتِ الأَعْمَالِ فَإِنَّ لَهَا مِنَ اللَّهِ طَالِبًا ‏‏

 হে আয়েশা! ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কারণ সেগুলোর জন্যও আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২৪৩, আহমাদ : ২৩৮৯৪, সুনানে দারেমী : ২৭২৬, সহীহাহ ৫১৩।

আনাস (রা.) থেকে বলেন, তোমরা এমন সব কাজ করে থাক, যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও চিকন। কিন্তু নবি ﷺ এর সময়ে আমরা এগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম। সহিহ বুখারি : ৬৪৯২

আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, লোক দেখানোর জন্য আমল করে আল্লাহ তার এই রিয়াকে প্রকাশ করে দেন। যে ব্যক্তি যশ লাভের জন্য আমল করে আল্লাহ তাআলা মানুষের সামনে তা প্রকাশ করে দেন।  ইবনু মাজাহ : ৪২০৬

(১) ছোট শিরক বান্দার আমল বাতিল করে দেয়ঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

মাহমুদ ইবনে লাবিদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشِّرْكُ الأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ الرِّيَاءُ يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً

আমি তোমাদের উপর যা ভয় করি তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে শির্কে আসগর (ছোট শির্ক)। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! শির্কে আসগর কি? তিনি বললেন, রিয়া আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাদেরকে (রিয়াকারীদের) বলবেন, যখন মানুষকে তাদের আমলের বিনিময় দেয়া হবে, তোমরা তাদের কাছে যাও যাদেরকে তোমরা দুনিয়াতে দেখাতে। দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কিনা? সহিহ হাদিসে কুদসি : ০৭ হাদিস বিডি, মুসনাদে আহমদ, পঞ্চম খণ্ড, হাদিস নম্বর- ৪২৮-৪২৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ : ১০২, হাদিসের মান সহিহ

আবু উমামা বাহিলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত-

جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: أَرَأَيْتَ رَجُلًا غَزَا يَلْتَمِسُ الْأَجْرَ وَالذِّكْرَ، مَالَهُ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى

اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا شَيْءَ لَهُ» فَأَعَادَهَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ، يَقُولُ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا شَيْءَ لَهُ» ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبَلُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا كَانَ لَهُ خَالِصًا، وَابْتُغِيَ بِهِ وَجْهُهُ»

এক ব্যক্তি রাসুলূল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে বললেনঃ ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে আপনি কি বলেন, যে ব্যক্তি সওয়াব এবং সুনামের জন্য জিহাদ করে, তার জন্য কি রয়েছে? রাসুলূল্লাহ ﷺ বললেনঃ তার জন্য কিছুই নেই। সে ব্যক্তি তা তিনবার পুনরাবৃত্তি করলেন। রাসুলূল্লাহ ﷺ তাকে (একটি কথাই) বললেন, তার জন্য কিছুই নেই। তারপর তিনি ﷺ বললেন, আল্লাহ্‌ তা‘আলা তাঁর জন্য কৃত খাঁটি আমল ব্যতীত, যা দ্বারা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ছাড়া আর কিছুই উদ্দেশ্য না হয়, আর কিছুই কবুল করেন না। সুনানে আন-নাসায়ী: ৩১৪০, সুনানে বাইহাকি: ৪৩৪৮

(২) ছোট শিরক শয়তানের সাথিঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَہُمۡ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَلَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ وَمَنۡ یَّکُنِ الشَّیۡطٰنُ لَہٗ قَرِیۡنًا فَسَآءَ قَرِیۡنًا

আর যারা নিজ ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং ঈমান আনে না আল্লাহর প্রতি এবং না শেষ দিনের প্রতি। আর শয়তান যার সঙ্গী হয়, সঙ্গী হিসেবে কতইনা নিকৃষ্ট সে! সুরা নিসা : ৩৮

(৩) ছোট শিরককারীর আমলের জন্য তাকে আপমান করা হবেঃ

সালামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জুনদুবকে বলতে শুনেছি নবী ﷺ বলেন। তিনি ছাড়া আমি অন্য কাউকে ’নবী ﷺ বলেন’ এমন বলতে শুনিনি। আমি তাঁর নিকট গেলাম এবং তাঁকে বলতে শুনলাম। নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهِ وَمَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللهُ بِهِ

যে ব্যাক্তি লোক শোনানো ইবাদত করে আল্লাহ তা’আলা এর বিনিময়ে লোক শোনানো দিবেন। আর যে ব্যাক্তি লোক-দেখানো ইবাদত করবে আল্লাহ এর বিনিময়ে “লোক দেখানো দিবেন। সহিহ বুখারি : ৬৪৯৯, ৭১৫২, সহিহ মুসলিম :  ২৯৮৬

আবূ সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ يُرَائِي يُرَائِي اللَّهُ بِهِ وَمَنْ يُسَمِّعْ يُسَمِّعِ اللَّهُ بِهِ

যে লোক মানুষকে দেখানোর উদ্দেশ্যে আমল করবে, আল্লাহ তায়ালাও তাকে তাই দেখাবেন এবং সুনাম-সুখ্যাতির অন্বেষণের উদ্দেশ্যে যে লোক আমল করবে, আল্লাহ তায়ালাও তার আমল প্রচার করে দেবেন। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮১, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৬

(৪) ছোট শিরক দাজ্জালের ফিতনা থেকেও ভয়ানকঃ

আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন—

خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم، وَنَحْنُ نَتَذَاكَرُ الْـمَسِيْحَ الدَّجَّالَ، فَقَالَ: أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِيْ مِنَ الْـمَسِيْحِ الدَّجَّالِ؟ قُلْنَا: بَلَى، قَالَ: الشِّـرْكُ الْـخَفِيُّ؛ أَنْ يَقُوْمَ الرَّجُلُ يُصَلِّيْ، فَيُزَيِّنُ صَلاَتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ الرَّجُلِ

রাসুল ﷺ আমাদের নিকট আসলেন যখন আমরা দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন বস্তু সম্পর্কে সংবাদ দেবো, যা তোমাদের জন্য দাজ্জালের চেয়েও অধিক ভয়ঙ্কর। আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি বললেন, গোপন শিরক (রিয়া)। যেমন, কোনো ব্যক্তি নামাজ পড়ছিলো, অতঃপর কেউ তাকে দেখছে বলে সে নামাজকে খুব সুন্দর করে পড়তে শুরু করলো”। সুনানে ইবনু মাজাহ: ৪২০৪, আহমাদ : ১০৮৫৯, মিশকাত : ৫৩৩৩ 

(৫) ছোট শিরক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুঃচিস্তাঃ

শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَتَخَوَّفُ عَلَى أُمَّتِي الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ أَمَا إِنِّي لَسْتُ أَقُولُ يَعْبُدُونَ شَمْسًا وَلاَ قَمَرًا وَلاَ وَثَنًا وَلَكِنْ أَعْمَالاً لِغَيْرِ اللَّهِ وَشَهْوَةً خَفِيَّةً

আমি আমার উম্মাতের জন্য যেসব বিষয়ের ভয় করি তার মধ্যে অধিক আশংকাজনক হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা। অবশ্য আমি এ কথা বলছি না যে, তারা সূর্য, চন্দ্র বা প্রতিমার পূজা করবে, বরং আল্লাহ ব্যতীত অপরের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা এবং গোপন পাপাচার। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২০৫, মসনদে আহমাদ : ১৬৬৭১, ১৬৬৯০

৪। ছোট শিরক সম্পর্কে যে দুটি বিষয় জানা দরকারঃ

(১) গোপন আমল প্রকাশ পেলেও রিয়া হবে নাঃ

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ ‏ “‏ تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ

রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমীপে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কি মতামত, যে সৎ আমল করে এবং মানুষেরা তার গুণ বর্ণনা করে? তিনি বললেন, এটা তো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য আগাম সুসংবাদ। সহিহ মুসলিম : ২৬৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২২৫, আহমাদ : ২০৮৭২, ২০৯৬৬

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ يَعْمَلُ الْعَمَلَ فَيُسِرُّهُ فَإِذَا اطُّلِعَ عَلَيْهِ أَعْجَبَهُ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَهُ أَجْرَانِ أَجْرُ السِّرِّ وَأَجْرُ الْعَلاَنِيَةِ ‏”

এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন লোক খুবই গোপনে কোন আমল করে কিন্তু অন্যরা তা জেনে ফেললে তাতেও তার আনন্দ লাগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব, একটি গোপনে আমল করার জন্য এবং অপরটি প্রকাশ হয়ে পড়ার জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮৪, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ৪২২৬ মান জঈফ।

আবদুল্লাহ্ ইবন ’আমর (রা.) মহানবী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিহাদ ও যুদ্ধ সম্বন্ধে বলুন, এর কোনটি আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য? তিনি বলেন, হে আবদু্ল্লাহ ইবন ’আমর! যদি তুমি ধৈর্যের সাথে আল্লাহ নিকট হতে পুণ্য লাভের আশায় যুদ্ধ কর তবে আল্লাহ্ তোমাকে গর্বিত ও লোক দেখানোরূপে চিহিৃত করবেন। হে আবদুল্লাহ্ ইবন ’আমর! তুমি যে অবস্থায় যুদ্ধ কর বা মারা যাও তোমাকে সে অবস্থায় তোমার নিয়্যাত অনুযায়ী আল্লাহ্ উত্থিত করবেন। সুনানে আবু দাউদ : ২৫১১

(২) সমালোচনার ভয়ে নেক আমল ছেড়ে দেওয়া যাবে নাঃ

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَـٰٓأَيُّہَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مَن يَرۡتَدَّ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَسَوۡفَ يَأۡتِى ٱللَّهُ بِقَوۡمٍ۬ يُحِبُّہُمۡ وَيُحِبُّونَهُ ۥۤ أَذِلَّةٍ عَلَى ٱلۡمُؤۡمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى ٱلۡكَـٰفِرِينَ يُجَـٰهِدُونَ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآٮِٕمٍ۬‌ۚ ذَٲلِكَ فَضۡلُ ٱللَّهِ يُؤۡتِيهِ مَن يَشَآءُ‌ۚ وَٱللَّهُ وَٲسِعٌ عَلِيمٌ (٥٤)

হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি স্বীয় ধর্ম হতে বিচ্যুত হবে, আল্লাহ সত্ত্বরই এমন এক সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসবেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসবে, তারা মুসলিমদের প্রতি মেহেরবান থাকবে, কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে, তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে আর তারা কোন নিন্দুকের নিন্দার পরওয়া করবেনা। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, তা তিনি যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন; বস্তুতঃ আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী। সুরা মায়েদা : ৫৪

আবূ মাস’ঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন সাদকার আয়াত অবতীর্ণ হল তখন আমরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বোঝা বহন করতাম। এক ব্যাক্তি এসে প্রচুর মাল সাদকা করলো। তারা (মুনাফিকরা) বলতে লাগল, এ ব্যাক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করেছে, আর এক ব্যাক্তি এসে সা’ পরিমাণ দান করলে তারা বললো, আল্লাহ তো এ ব্যাক্তির এক সা’ থেকে অমুখাপেক্ষী। এ প্রসংগে অবতীর্ণ হয়, (আল্লাহ বলেন)-

اَلَّذِیۡنَ یَلۡمِزُوۡنَ الۡمُطَّوِّعِیۡنَ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ فِی الصَّدَقٰتِ وَالَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ اِلَّا جُہۡدَہُمۡ فَیَسۡخَرُوۡنَ مِنۡہُمۡ ؕ سَخِرَ اللّٰہُ مِنۡہُمۡ ۫ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ

যারা দোষারোপ করে সদাকার ব্যাপারে মুমিনদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাদানকারীদেরকে এবং তাদেরকে যারা তাদের পরিশ্রম ছাড়া কিছুই পায় না। অতঃপর তারা তাদেরকে নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহও তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব, তাওবা-৭৯। সহিহ বুখারি : ১৪১৫

উবাদাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমরা রসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতে বাইআত হলাম এ মর্মে যে, আমরা শুনবো ও মানবো, সংকটের সময় ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়, খুশীর অবস্থায় ও অপছন্দের অবস্থায় এবং আমাদের উপর অন্যদেরকে প্রাধান্য দিলেও। আর এ মর্মে যে, আমরা যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব বরণ করে নিতে কোনরূপ কোন্দল করবো না। আর এ মর্মে যে, আমরা যেখানেই থাকবো হক কথা বলব। আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবো না। সহিহ মুসলিম : ১৭০৯

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন এবং তাঁর ভাষণে বলেন, সাবধান! মানুষের ভয় যেন কোন ব্যক্তিকে সজ্ঞানে সত্য কথা বলতে বিরত না রাখে। রাবী বলেন আবূ সাঈদ (রা.) কেঁদে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ! আমরা বহু কিছু লক্ষ্য করেছি কিন্তু বলতে ভয় পাচ্ছি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০০৭, সুনানে তিরমিযী : ২১৯১, সহীহাহ : ১৬৮

মুমিনের অন্যতাম বৈশিষ্ট হলো, মহান আল্লাহর আনুগত্য ও হুকুম পালনের ক্ষেত্রে কোন কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় বা পরোয়া করবে না। আমাদের সমাজে অনেক মুসলিম আছে যারা আল্লাহর হুকুম মত জীবন চালাত চায় কিন্তু নিন্দুকের নিন্দা ও তিরস্কারের মোকাবেলা করার মত ক্ষমতা নেই বলে তারা আমল ছেড়ে দেয়। অনেক যুবক আছে তারা দাড়ি রাখতে চায় কিন্তু নিন্দুকের নিন্দার ভয়ে দাড়ি রাখছে না।

৫। শিরকে আসগার বা ছোট শিরক চেনায় উপায়ঃ

(১) যে সব শিরককে কুরআন ও সুন্নায় ছোট শিরক বলা হয়েছে, যতক্ষণ না সেগুলো বড় শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে সেগুলো শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে।

(২) আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কাজ যদি বান্দা কোন মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছায় করে তবে সেই আমল শিরকে আসগার বা ছোট শিরক  বলে বিবেচিত হবে।

(৩) আল্লাহর রুবুবিয়াতের সমপরিমাণ মর্যাদা না হওয়া পর্যান্ত শিরকে আসগার বা ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে। (সমপরিমাণ মর্যাদা দিলে বড় শিরক হবে)।

(৪) আমলটি শুরু হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু পরে তাতে রিয়া প্রবেশ করেছে। আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে প্রতিহত করতে থাকে, তবে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু সে যদি রিয়া চালিয়ে যায় এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তার আমলটি ছোট শিরক বলে বিবেচিত হবে।

৬। ছোট শিরক সময়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকে

মুমিন বান্দা মহান আল্লাহ সন্ত্বষ্টির জন্য আমল করবে এটাই সাভাবিক। কিন্তু তার আমল করা সময় তার কুপ্রবৃত্তি বার বার দুয়িয়ার লোভ দেখিয়ে গাইরুল্লাহর জন্য ইবাদত করতে উদভূদ্ধ করে থাকে। সে যখনই আমল করার নিয়ত করে, তখনই তাকে ধোকা দেয়। আবার কখনো শুরুতে ধোকা দিতে ব্যর্থ হলে আমলের মাঝে বা শেষেও ধোকা দিতে চেষ্টা করে। এ সকল বিষয় বিবেচনা করে বলা যায় ছোট শিরক সাধারনত তিনটি সময়ের সাথে সম্পৃক্ত থেকে সম্পাদিত হয়।

(১) আমল শুরু করার পূর্বে ছোট শিরক

(২) আমল শুরু করার মাঝে ছোট শিরক

(৩) আমল শেষ করার পর ছোট শিরক

(১) আমল শুরু করার পূর্বে ছোট শিরক

কোন আমল শুরু করার পূর্বে মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার কোন ইচ্ছাই তার নেই, তবে সে মুনাফিক। কারন সকলে জানবে, সে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন করছে অথচ সে গাইরুল্লারকে সন্তষ্টি করছে। নবী ﷺ এর জামানায় মুমিনেরা বিপুল উৎসাহ আগ্রহ নিয়ে মসজিদে আসতো, জামায়াতের সময়ের পূর্বেই মসজিদে পৌঁছে যেতো এবং নামায শেষ হবার পরও মসজিদে বসে থাকতো। কোন ব্যক্তি নিয়মিত নামায না পড়ে মুসলমানদের দলের অন্তরভুক্ত হতে পারতো। তাই বড় বড় কট্টর মুনাফিকদেরও সে যুগে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে হাযিরা দিতে হতো। অপর পক্ষে মুনাফিকেরা অনিচ্ছায় স্বত্বেও নেহাত দায়ে ঠেকে লোক দেখাতে মসজিদে আসত। এই মুনাফিকরা আল্লাহর এবং তার রসুলের (সা:) সাথে ধোঁকাবাজি করছে এবং নিছক লোক দেখাবার জন্য সালাত আদায় করছে। আমল  শুরু পূর্বেই লোক দেখাবার পাক্কা নিয়ত। মহান আল্লাহ তায়ালান বলেন:

 إِنَّ ٱلۡمُنَـٰفِقِينَ يُخَـٰدِعُونَ ٱللَّهَ وَهُوَ خَـٰدِعُهُمۡ وَإِذَا قَامُوٓاْ إِلَى ٱلصَّلَوٰةِ قَامُواْ كُسَالَىٰ يُرَآءُونَ ٱلنَّاسَ وَلَا يَذۡكُرُونَ ٱللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً۬ (١٤٢)

এই মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করছে৷ অথচ আল্লাহই তাদেরকে ধোঁকার মধ্যে ফেলে রেখে দিয়েছেন৷ তারা যখন নামাযের জন্য ওঠে, আড়মোড়া ভাংতে ভাংতে শৈথিল্য সহকারে নিছক লোক দেখাবার জন্য ওঠে এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে৷ সুরা নিসা : ১৪২

(২) আমল শুরু করার মাঝে ছোট শিরক

ইবাদাত করাকালীন বা চলাকালীন মধ্যবর্তী সময়ে অন্য কেউ তা দেখে ফেললে বা অবহিত হয়ে গেলে তাতে আনন্দিত ও উল্লাসিত হয়ে লোক দেখানোর জন্য ইবাদাতকে আরো সুন্দর করার চেষ্টা করলে আমল মাঝে রিয়া প্রবেশ করে। আমল শুরুর প্রাথমিক নিয়ত ভাল ছিল কিন্তু আমলের মাঝেই লোক দেখানোর (রিয়া) ইচ্ছা পোষন করে। আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে প্রতিহত করতে থাকে, তবে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু সে যদি রিয়া চালিয়ে যায় এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তার আমলটি বাতিল হয়ে যাবে। কারন সে পরবর্তীতে তার আমল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করতে শুরু করেছে।

আবূ যার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرَأَيْتَ الرَّجُلَ يَعْمَلُ الْعَمَلَ مِنَ الْخَيْرِ وَيَحْمَدُهُ النَّاسُ عَلَيْهِ قَالَ ‏ “‏ تِلْكَ عَاجِلُ بُشْرَى الْمُؤْمِنِ

রসূলুল্লাহ ﷺ এর সমীপে আবেদন করা হলো, ঐ লোক সম্পর্কে আপনার কি মতামত, যে সৎ আমল করে এবং মানুষেরা তার গুণ বর্ণনা করে? তিনি বললেন, এটা তো ঈমানদার ব্যক্তির জন্য আগাম সুসংবাদ। সহিহ মুসলিম : ২৬৪২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২২৫, আহমাদ : ২০৮৭২, ২০৯৬৬

এখানে তিনটি সুরত আছে:

খ। আমল শুরু মাঝে রিয়া আসলে আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করলে আমল বাতিল হবে না।

কোন ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানীর জন্য গরু ক্রয় করল। এমতাবস্থায় গরুর প্রতি নজর দিয়ে সে ভাবল খুব রড় গরু লোকে ভাল বলবে আবার মাংশও বেশী পাব অর্থাৎ তার অন্তরে রিয়ার উদ্রেক হলো। সাথে সাথে সে তার অন্তর থেকে এই কুমন্ত্রণা ও কুমনোভাব দূর করার যথাসাধ্য চেষ্টা করল। এবং এক মাত্র আল্লাহর সন্ত্বষ্টির জন্য কুরবানী  সম্পন্ন করল, তাহলে এই রিয়া তার ‘আমালে কোন প্রভাব ফেলবে না এবং আল্লাহ চাহেতো তার এই  কুরবানী বাতিল হবে না।

খ। আমল শুরু মাঝে রিয়া আসলে আমলকারী যদি উক্ত রিয়াকে প্রত্যাখ্যান না করলে আমল বাতিল হবে।

যদি সে ব্যক্তি তার অন্তরের এই কুমন্ত্রণা দূর করার এবং ‘আমালকে রিয়ামুক্ত করার চেষ্টা না করে, বরং রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য অন্তরে পোষণ করেই আমাল সম্পন্ন করে থাকে, তাহলে তার এই ‘আমাল সম্পূর্ণ বাতিল ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। নিছুক লোক দেখাবার জন্য সে যেসব কাজ করে সেগুলো সুস্পষ্টভাবে একথাই প্রকাশ করে যে, সৃষ্টিকেই সে আল্লাহ মনে করে এবং তার কাছ থেকেই নিজের কাজের প্রতিদান চায়। আল্লাহর কাছ থেকে সে প্রতিদানের আশা করে না। একদিন সমস্ত কাজের হিসেব-নিকেশ করা হবে এবং প্রতিদান দেয়া হবে, একথাও সে বিশ্বাস করে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُبۡطِلُوۡا صَدَقٰتِکُمۡ بِالۡمَنِّ وَالۡاَذٰی ۙ کَالَّذِیۡ یُنۡفِقُ مَالَہٗ رِئَآءَ النَّاسِ وَلَا یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ فَمَثَلُہٗ کَمَثَلِ صَفۡوَانٍ عَلَیۡہِ تُرَابٌ فَاَصَابَہٗ وَابِلٌ فَتَرَکَہٗ صَلۡدًا ؕ لَا یَقۡدِرُوۡنَ عَلٰی شَیۡءٍ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়াত দেন না। সুরা বাকারা : ২৬৪

আল্লাহ এই উপমায় প্রবল বর্ষণ বলতে বান্দা নিয়ত আর মাটির দ্বারা তার দান খয়রাতকে বুঝানো হয়েছে। প্রবল বর্ষণের ফলে সমস্ত মাটি ধুয়ে গেলো অর্থাৎ লোক দেখাবার জন্য সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে গেল। 

গ। উভয় অংশের আলাদা আলাদা নেকি/গুনাহ থাকবে।

আমলটি শুরু হয়েছে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির উদ্দেশে কিন্তু পরে তাতে রিয়া প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় ‘আমালটির  যদি এমন হয় যে, তার এক অংশ অপর অংশের উপর নির্ভরশীল নয় বরং তার প্রতিটি অংশ পৃথক পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ, তাহলে সেই আমাল সে অংশটুকু রিয়া মিশ্রিত হবে, শুধুমাত্র সে অংশটুকু বাত্বিল হয়ে যাবে, তবে তার সম্পূর্ণ ‘আমাল বাত্বিল হবে না। যেমন-

কোন ব্যক্তি একমাত্র মহান আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কিছু  টাকা মসজিদে দান করার নিয়তে বাড়ি থেকে মসজিদে জুমার সালাতে হাজির হল। মসজিদে এসে কিছু টাকা দানও করল, ইতোমধ্যে ইমাম সাহেবের খুতবা শুনে অনেক মুসল্লী দান করা শুরু করলো। অনেক মুসল্লীকে ইমাম সাহেব বাহবা দিচ্ছে এবং তার প্রশংসা করছে। তখন সে আরো বেশি বাহবা ও প্রশংসা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে বা লোক দেখানোর জন্য আবার দান করল। এমতাবস্থায় তার দানকৃত প্রথম টাকা আল্লাহ্‌র নিকট গৃহীত হবে এবং পরবর্তীতে দানকৃত টাকা রিয়ার কারনে আল্লাহ্‌র নিকট বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত বলে গণ্য হবে।

(৩) আমল শেষ করার পর ছোট শিরক

শিরকে আসগার বা ছোট শিরকের সাধারনত ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়্যাতের দ্বারা  সঙ্গটিত হয়। আমল শেষ করার পর ইচ্ছা, সংকল্প বা নিয়্যাত করার আর কোন বাধ্যবাধকতা থাকে না। তাই আমল শেষ করার পর রিয়া অনুভুত হওয়া শয়তানের ওয়াসওয়াসা মাত্র এতে আমলকারীর আমলেন উপর কোন প্রভাব পরবেনা। আল্লাহ্‌র জন্যে পূর্ণ নিষ্ঠা ও ইখলাসের সাথে কোন আমাল আরম্ভ ও সম্পন্ন করার পর অন্তরে রিয়ার উদ্ভব হওয়া আর না হওয়া সমান কথা। যেমন-

অনেক সময় লোকজনের মুখে নিজের আমাল সম্পর্কে প্রশংসা শুনে নীরবে আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ হয়। যদিও এটা রিয়া কিন্তু এ জাতীয় রিয়া, সম্পাদিত সেই আমালের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা এবং এর দ্বারা আমল বাতিল বা বিনষ্ট হবে না। কেননা তা আমল সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকাশ পেয়েছে। এ সম্পর্কে একটি হাদিস হলো-

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ الرَّجُلُ يَعْمَلُ الْعَمَلَ فَيُسِرُّهُ فَإِذَا اطُّلِعَ عَلَيْهِ أَعْجَبَهُ ذَلِكَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَهُ أَجْرَانِ أَجْرُ السِّرِّ وَأَجْرُ الْعَلاَنِيَةِ ‏”

এক ব্যক্তি বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোন লোক খুবই গোপনে কোন আমল করে কিন্তু অন্যরা তা জেনে ফেললে তাতেও তার আনন্দ লাগে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব, একটি গোপনে আমল করার জন্য এবং অপরটি প্রকাশ হয়ে পড়ার জন্য। সুনানে তিরমিজি : ২৩৮৪, সুনানে  ইবনু মাজাহ : ৪২২৬ মান জঈফ।

প্রশংসা শুনে আত্মতৃপ্তি ও গর্ববোধ করা করা ঠিক নয় বরং ইহার পরিবর্তে মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ কারন তিনিই তো আমাকে আমল করার সুযোগ দিয়েছেন।

আল কুরআনের পথ:

আল কুরআনের পথ: আলোর সন্ধানে একটি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক যাত্রা

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম

(পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি)

যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তির দিশারি, আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর।

ভূমিকা: হৃদয়ের স্পন্দন ও একটি স্বপ্নের শুরু

“আল কুরআনের পথ”—এটি কেবল একটি ওয়েবসাইটের নাম নয়, বরং এটি একটি আদর্শ, একটি জীবনদর্শন এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফেরার এক নিরন্তর প্রচেষ্টার নাম। তথ্যপ্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে যখন পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়, তখন সত্যের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি মিথ্যার গোলকধাঁধায় পথ হারানোও খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞানকে আধুনিক মানুষের ভাষায়, সহজবোধ্য আঙ্গিকে এবং যুক্তিনির্ভর উপস্থাপনায় তুলে ধরতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

আমরা বিশ্বাস করি, মানবজীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে আল-কুরআনের পরশপাথরে। সেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এবং তা সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।

________________________________________

আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Our Mission & Vision)

১. দ্বীন প্রচার ও তাত্ত্বিক আলোচনা: আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো ইসলামের মৌলিক আকিদা, ইবাদত, আখলাক এবং সমকালীন জীবনব্যবস্থার সাথে ইসলামের সামঞ্জস্য নিয়ে গঠনমূলক লেখালেখি করা। ইন্টারনেটের এই বিশাল প্রান্তরে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। “আল কুরআনের পথ” চেষ্টা করবে নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সলফে সালেহীনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিশুদ্ধ দ্বীনি জ্ঞান প্রচার করতে।

২. জ্ঞান ও লেখনীর সেতুবন্ধন: একজন লেখক হিসেবে আমার বিশ্বাস—কালি আর কলম হলো মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। আমার লিখিত বইগুলোর মাধ্যমে আমি পাঠকদের অন্তরে ইমানের নূর জ্বালিয়ে দিতে চাই। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আপনি সরাসরি আমার প্রকাশিত এবং অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, প্রবন্ধ এবং গবেষণামূলক কাজগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারবেন।

৩. সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ: আমাদের সমাজে যখন অপসংস্কৃতি আর অনৈতিকতার জোয়ার বইছে, তখন সুস্থ বিনোদন এবং নৈতিক শিক্ষা সম্বলিত বই ও কনটেন্ট মানুষের হাতে তুলে দেওয়া সময়ের দাবি। আমরা চাই প্রতিটি পরিবারে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠুক, বিশেষ করে সেই বই যা মানুষকে তার রবের কথা মনে করিয়ে দেয়।

লেখকের কথা: কলমের শক্তি ও দায়বদ্ধতা

আমি দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামি সাহিত্য, ইতিহাস এবং সমসাময়িক বিষয়ের ওপর কাজ করার চেষ্টা করছি। লেখালেখি আমার কাছে কেবল একটি পেশা নয়, বরং এটি আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের একটি মাধ্যম। আমার বইগুলোতে আমি চেষ্টা করেছি—

•      কুরআন ও সুন্নাহর গভীর তত্ত্বকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করতে।

•      যুগজিজ্ঞাসার আলোকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে।

•      পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের নৈতিক অবক্ষয় রোধে ইসলামের বিধানগুলো তুলে ধরতে।

এই ওয়েবসাইটের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকবে আমার বইগুলোর পরিচিতি। আপনি চাইলেই এখান থেকে সরাসরি আপনার পছন্দের বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রতিটি বইয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শ্রম এবং গবেষণার ছাপ। আশা করি, এই বইগুলো আপনার জীবনকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে।

সেবা ও পণ্য: হালাল রিযিক ও স্বচ্ছতা

ইসলাম আমাদের কেবল ইবাদতের শিক্ষা দেয় না, বরং হালাল উপায়ে জীবিকা নির্বাহের নির্দেশও দেয়। “আল কুরআনের পথ” ওয়েবসাইটটি যেমন একটি দাওয়াতি প্ল্যাটফর্ম, তেমনি এটি একটি আস্থার বিপণি কেন্দ্রও হতে পারে।

বই বিক্রয় কেন্দ্র: এখানে আমার নিজের লেখা বইগুলো আপনি সরাসরি কিনতে পারবেন। আমরা চেষ্টা করব খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে পাঠকদের হাতে বই পৌঁছে দিতে।

লোকাল প্রডাক্ট ও উদ্যোগ: ভবিষ্যতে আমরা স্থানীয় ও বিশুদ্ধ কিছু পণ্য (যেমন: ভালো মানের মধু, কালোজিরা তেল বা ইসলামিক লাইফস্টাইল পণ্য) আমাদের এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছি। আমাদের উদ্দেশ্য হলো—ক্রেতা যেন ঘরে বসে নিশ্চিন্তে বিষমুক্ত এবং মানসম্মত পণ্য পেতে পারেন। ব্যবসার ক্ষেত্রেও আমরা “আল কুরআনের পথ” বা ইসলামের ইনসাফপূর্ণ নীতি অনুসরণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

কেন “আল কুরআনের পথ” অন্য সবার চেয়ে আলাদা?

আপনারা হয়তো ভাবছেন, ইন্টারনেটে তো অনেক ওয়েবসাইট আছে, তাহলে আমাদের বিশেষত্ব কী? আমাদের মূল শক্তি হলো আস্থা ও নির্ভরতা।

•      নির্ভরযোগ্য তথ্য: আমরা প্রতিটি তথ্য কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহী কিতাবের আলোকে যাচাই করে প্রচার করি।

•      ব্যক্তিগত সংযোগ: এখানে আপনি সরাসরি লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। আপনার কোনো জিজ্ঞাসা বা পরামর্শ থাকলে আমরা তা সাদরে গ্রহণ করি।

•      সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থা: যেহেতু আমরা জানি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিকাশ বা নগদে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাই আমাদের ওয়েবসাইটে আপনি খুব সহজেই পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারবেন।

আগামীর পথচলা: আপনার অংশগ্রহণ কাম্য

একটি মহৎ উদ্দেশ্য সফল করতে হলে একা চলা সম্ভব নয়। আপনাদের দোয়া, সমর্থন এবং অংশগ্রহণ আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাবে।

•      পাঠক হিসেবে: আমাদের লেখাগুলো পড়ুন, গঠনমূলক সমালোচনা করুন এবং ভালো লাগলে অন্যের সাথে শেয়ার করে দ্বীন প্রচারে শরিক হোন।

•      ক্রেতা হিসেবে: আমাদের বই বা পণ্য ক্রয় করে একটি সুস্থ ধারার উদ্যোগকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করুন।

•      শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে: আমাদের জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের এই মেহনতকে কবুল করেন এবং রিয়া বা লোকদেখানো আমল থেকে আমাদের অন্তরকে পবিত্র রাখেন।

উপসংহার

পরিশেষে, “আল কুরআনের পথ” ওয়েবসাইটটি আপনার আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি মাধ্যম হয়ে উঠুক—এটাই আমার প্রার্থনা। আমরা কোনো দল বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ প্রচারণায় বিশ্বাসী নই, বরং উম্মাহর ঐক্য এবং সার্বজনীন ইসলামের সৌন্দর্যে বিশ্বাসী।

আসুন, আমরা সবাই মিলে কুরআনের আলোয় নিজেদের জীবনকে রাঙিয়ে তুলি। সত্যের এই মিছিলে আপনিও হোন আমাদের সফরসঙ্গী।

আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।

বিনীত, ইসরাফিল হোসাইন প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক,

আল কুরআনের পথ www.mdisrafilhossain.com

You may be interested in…

আল কুরআনের পথ:

Your cart is currently empty!

Browse store


New in store