সন্তান জন্মের আগে প্রস্তুতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

সন্তানের জন্ম কেবল একটি শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক যাত্রা। এই যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয় সন্তান ধারণের অনেক আগে থেকেই। একজন সুস্থ ও আদর্শ সন্তান পাওয়ার জন্য মা-বাবাকে তাদের জীবনধারার বিভিন্ন দিক নিয়ে সচেতন থাকতে হয়। এই প্রস্তুতি শুরু হয় সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে, যেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিবাহের সম্পর্ক এমনভাবে স্থাপিত হওয়া উচিত যা ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী পবিত্র ও বৈধ।

সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই শুরু হয় আরেকটি নতুন অধ্যায়। এ সময় গর্ভবতী মায়ের প্রতি পরিবারের সবার, বিশেষ করে স্বামীর, যত্নশীল হওয়া অপরিহার্য। মাকে কেবল শারীরিক নয়, বরং মানসিক সহায়তাও প্রদান করা উচিত। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের আচরণ ও জীবনযাপন সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই এ সময়ে মাকে অবশ্যই ইসলাম-বিরোধী কাজ, যেমন অশ্লীল বিনোদন বা মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সাথে, ইসলামী দিকনির্দেশনা মেনে চলা এবং কুরআনের শিক্ষা অনুশীলন করা গর্ভস্থ শিশুর জন্য কল্যাণকর। আধুনিক বিজ্ঞানও গর্ভকালীন সময়ে মায়ের সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকার ওপর জোর দেয়। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা একটি সুস্থ, সুন্দর ও নৈতিকভাবে উন্নত প্রজন্মের ভিত্তি স্থাপন করে। এ সম্পর্কে ধারাবাহিক আলোচনা করা হলো।

পাত্র ও পাত্রী নির্বাচন

ইসলামে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু দুটি মানুষের মধ্যে চুক্তি নয়, বরং একটি সুখী পরিবারের ভিত্তি। ইসলাম এই ক্ষেত্রে দ্বীনদারীকে (ধার্মিকতা) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এর পাশাপাশি সচ্চরিত্র, উত্তম আখলাক, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনা করা উচিত। রাসূল (সা.) বলেছেন, উত্তম সঙ্গী নির্বাচন একটি সফল জীবনের চাবিকাঠি। সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি পরিবারে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়, যা তাদের জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। তাই, এটি একটি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত যা ব্যক্তিগত পছন্দের চেয়েও সমাজের কল্যাণের সাথে জড়িত।

১. পাত্রী নির্বাচনের আগে দেখে নেওয়া ভালো

বিবাহের আগে পাত্র-পাত্রীকে একে অপরকে দেখে নেওয়া একটি বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক সত্য। যখন দুটি মানুষ একে অপরকে দেখে, তখন তাদের মধ্যে একটি মানসিক সংযোগ স্থাপন হয়, যা তাদের সম্পর্ককে মজবুত করে এবং এর মাধ্যমে দুজনের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মিল সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। তাই পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখে নিলে তাদের মধ্যে এই সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।

মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি এক মহিলার নিকট বিয়ের প্রস্তাব প্রেরণ করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তাকে দেখে নাও, তোমাদের মধ্যে এটা ভালবাসার সৃষ্টি করবে। সুনানে তিরমিযী : ১০৮৭,

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। মুগীরাহ ইবনু শু’বাহ (রাঃ) এক মহিলাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করলে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেন-

اذْهَبْ فَانْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا فَفَعَلَ فَتَزَوَّجَهَا فَذَكَرَ مِنْ مُوَافَقَتِهَا

তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কেননা তা তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সাহায়ক হবে। অতঃপর তিনি তাই করলেন এবং তাকে বিবাহ করলেন। পরে তাঁর নিকট তাদের দাম্পত্য সমপ্রীতির কথা উল্লেখ করা হয়।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৬৫, সুনানে নাসায়ী : ৩২৩৫, দারেমী : ২১৭২, মিশকাত : ৩১০৭, সহীহাহ : ৯৬।

২. একজন দ্বীনদার নারীকে বিবাহ করা

আবু হুরায়রাহ (রাঃ)] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

যখন তোমাদের নিকট কেউ বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়, তখন দীনদারী ও সচ্চরিত্রের মূল্যায়ন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ কর। যদি তোমার তা না কর, তাহলে দুনিয়াতে বড় রকমের ফিতনা-বিশৃঙ্খলা জন্ম দেবে। মিশকাত : ৩০৯০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৬৭, ইরওয়া ১৮৬৮

আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, গোটা দুনিয়াই হলো সম্পদ। আর দুনিয়ার মধ্যে পুণ্যবতী স্ত্রীলোকের চেয়ে অধিক উত্তম কোন সম্পদ নাই।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫৫

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ

চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়ঃ তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সহিহ বুখারি : ৫০৯০, সহিহ মুসলিম : ১৪৬৬, সুনানে নাসায়ী ৩২৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৭, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৫৮, মিশকাত : ৩০৭৪,  আহমাদ : ৯৫২১, ৯৫২৬,  ইরওয়া : ১৭৮৩, সহীহ আল জামি : ৩০০৩

৩. পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করতে হবে

’আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ করো এবং সমতা (কুফু) বিবচেনায় বিবাহ করো, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৬৮, সহীহাহ : ১০৬৭

৪. পাত্রী নির্বাচনে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী বিবেচনা করা

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

انْكِحُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ

তোমরা বিবাহ করো আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গৌরব করবো। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬৩

মা’কিল ইবনু ইয়াসার (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমাতে উপস্থিত হয়ে বললো, আমি এক সুন্দরী ও মর্যাদা সম্পন্ন নারীর সন্ধান পেয়েছি। কিন্তু সে বন্ধ্যা। আমি কি তাকে বিয়ে করবো? তিনি বললেন, না। অতঃপর লোকটি দ্বিতীয়বার এসেও তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে নিষেধ করলেন। লোকটি তৃতীয়বার তাঁর নিকট এলে তিনি তাকে বললেন, এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসবকারী। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো। সুনানে আবু দাউদ : ২০৫০

৫. কুমারীত্ব নারীকে বিবাহ করা উত্তম

আব্দুর রহমান ইবনু সালিম ইবনু ’উতবাহ্ ইবনু ’উওয়াইম ইবনু সা’ইদাহ্ আল আনসারী তাঁর পিতা, তিনি তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

عَلَيْكُمْ بِالْأَبْكَارِ فَإِنَّهُنَّ أَعْذَبُ أَفْوَاهًا وَأَنْتَقُ أَرْحَامًا وَأَرْضَى بِالْيَسِيرِ

তোমাদের কুমারী মেয়ে বিবাহ করা উচিত। কেননা তারা মিষ্টিমুখী, নির্মল জরায়ুধারী এবং অল্পতেই তুষ্ট হয়। সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৮৬১, মিশকাত : ৩০৯২, সহীহাহ : ৬২৩, সহীহ আল জামি : ৪০৫৩।

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক যুদ্ধে শরীক ছিলাম। (যুদ্ধ শেষে ফেরার সময়) যখন আমরা মদীনার নিকটবর্তী হলাম, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন সদ্যবিবাহিত। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বিবাহ করেছ! উত্তরে বললাম, জী হ্যাঁ। (পুনরায়) তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বিধবা। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, কুমারী বিবাহ করলে না কেন? তাহলে তুমিও তার সাথে আমোদ-প্রমোদ করতে এবং সেও তোমার সাথে মন খুলে আমোদ-প্রমোদ করত। জাবির(রাঃ) বলেন, অতঃপর আমরা যখন মদীনায় পৌঁছলাম, তখন আমরা নিজ ঘরে প্রবেশে উদ্যত হলাম। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ থাম! রাত (সন্ধ্যা) পর্যন্ত অপেক্ষা কর (এখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো না), আমরা রাতে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশ করব। কেননা স্ত্রী তার অবিন্যস্ত চুল আঁচড়ে (পরিপাটি হতে) নিতে পারে এবং স্বামী বিচ্ছিন্না (প্রবাসী স্বামীর) নারী ক্ষুর ব্যবহার করে অবসর হয় (অর্থাৎ- নাভির নীচের চুল পরিষ্কার করে নিতে পারে)। সহিহ বুখারী : ৫২৪৭, ২০৯৭, ২৩০৯, ২৯৬৭, ৪০৫২, ৫০৭৯, ৫০৮০, ৫২৪৫, ৫২৪৭, ৫৩৬৭, ৬৩৮৭ সহিহ মুসলিম : ৭১৫,  মিশকাত : ৩০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০০, দারিমী : ২২৬২, ইরওয়া : ১৭৮৫, সহীহ আল জামি : ৪২৩৩।

৬. সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা বিবেচনায় নিতে হবে

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

উট আরোহণকারিণীদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী কুরায়শ বংশের নারীগণ, তারা শৈশবকালে সন্তানের প্রতি অধিক স্নেহপরায়ণা হয় এবং স্বামীর ধন-সম্পদের উত্তম রক্ষনাবেক্ষণকারিণী হয়। সহিহ বুখারি : ৫০৮২, সহিহ মুসলিম : ২৫২৭, মিশকাত : ৩২০৪ সহীহাহ্ ১০৫২, সহীহ আল জামি‘ ৩৩২৯।

যাদের সাথে বিবাহ হারাম

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট সম্পর্কের মানুষের সাথে বিবাহ করা হারাম বা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এই সম্পর্কের ভিত্তি হল রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কগুলো আল্লাহ তায়ালা বলেন-

حُرِّمَتۡ عَلَیۡکُمۡ اُمَّہٰتُکُمۡ وَبَنٰتُکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ وَعَمّٰتُکُمۡ وَخٰلٰتُکُمۡ وَبَنٰتُ الۡاَخِ وَبَنٰتُ الۡاُخۡتِ وَاُمَّہٰتُکُمُ الّٰتِیۡۤ اَرۡضَعۡنَکُمۡ وَاَخَوٰتُکُمۡ مِّنَ الرَّضَاعَۃِ وَاُمَّہٰتُ نِسَآئِکُمۡ وَرَبَآئِبُکُمُ الّٰتِیۡ فِیۡ حُجُوۡرِکُمۡ مِّنۡ نِّسَآئِکُمُ الّٰتِیۡ دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ ۫  فَاِنۡ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا دَخَلۡتُمۡ بِہِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ ۫  وَحَلَآئِلُ اَبۡنَآئِکُمُ الَّذِیۡنَ مِنۡ اَصۡلَابِکُمۡ ۙ  وَاَنۡ تَجۡمَعُوۡا بَیۡنَ الۡاُخۡتَیۡنِ اِلَّا مَا قَدۡ سَلَفَ ؕ  اِنَّ اللّٰہَ کَانَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا ۙ

তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতাদেরকে, তোমাদের মেয়েদেরকে, তোমাদের বোনদেরকে, তোমাদের ফুফুদেরকে, তোমাদের খালাদেরকে, ভাতিজীদেরকে, ভাগ্নীদেরকে, তোমাদের সে সব মাতাকে যারা তোমাদেরকে দুধপান করিয়েছে, তোমাদের দুধবোনদেরকে, তোমাদের শ্বাশুড়ীদেরকে, তোমরা যেসব স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছ সেসব স্ত্রীর অপর স্বামী থেকে যেসব কন্যা তোমাদের কোলে রয়েছে তাদেরকে, আর যদি তোমরা তাদের সাথে মিলিত না হয়ে থাক তবে তোমাদের উপর কোন পাপ নেই এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে এবং দুই বোনকে একত্র করা (তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে)। তবে অতীতে যা হয়ে গেছে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা নিসা : ২৩

এই আয়াতে আল্লাহ তিন ধরনের ১৪ প্রকারে সম্পর্কের ভিত্তিতে বিবাহকে হারাম করেছেন। রক্তের সম্পর্ক, দুধের সম্পর্ক এবং বৈবাহিক সম্পর্ক।

বংশগত কারণে হারাম (৭ জন):

১.  মা (জননী)

২.  মেয়ে (নিজ ঔরসের কন্যা)

৩.  বোন (সহোদরা, বৈমাত্রেয় বা সৎ বোন)

৪.  ফুফু (পিতার বোন)

৫.  খালা (মাতার বোন)

৬.  ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজী)

৭.  বোনের মেয়ে (ভাগ্নী)

দুধের সম্পর্কের কারণে হারাম (২ জন):

৮.  দুধ-মা (যিনি দুধ পান করিয়েছেন)

৯.  দুধ-বোন (দুধ-মায়ের কন্যা)

বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে হারাম (৫ জন):

১০. শাশুড়ি (স্ত্রীর মা)

১১. স্ত্রীর অন্য স্বামীর ঔরসজাত কন্যা (যদি স্ত্রীর সাথে সহবাস হয়)

১২. ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী (পুত্রবধূ)

১৩. স্ত্রীর বোন (দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা হারাম)

১৪. বিবাহিত নারী (কোনো নারীর বিবাহ থাকা অবস্থায় তাকে বিবাহ করা হারাম, যা আয়াতের পরবর্তী অংশে বর্ণিত আছে)।

বিবাহের শরীয়ি পদ্ধতি

ইসলামে বিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু দুটি মানুষের বন্ধন নয়, বরং একটি ইবাদত। দুঃখজনকভাবে, আমরা আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রায়ই ইসলাম-বিরোধী কাজ করে থাকি। ইসলাম বিয়ের প্রথম ধাপ, অর্থাৎ কনে দেখার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি দ্বীনদারী (ধার্মিকতা)-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। কনে দেখার সময় শরীয়তের বিধি-বিধান মেনে পর্দা রক্ষা করা, মেয়ের ব্যাপারে ভালোভাবে খোঁজ নেওয়া এবং কোনো ধরনের অনৈসলামিক বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকা জরুরি। বিয়ের এই শুরুটা যদি সঠিক পথে হয়, তাহলে পুরো দাম্পত্য জীবনই আল্লাহর রহমতে ভরে ওঠে।

শরীয়তে বিবাহ বলতে কী বুঝায় :

শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবাহ একটি পবিত্র চুক্তি, যা নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে। এটি শুধু জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম নয়, বরং একটি ইবাদত ও সুন্নাহ, যার মাধ্যমে একটি নতুন পরিবার গঠিত হয়। ইসলামী শরিয়তে বিয়ের মূল কার্যক্রম পাঁচটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়, যা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ইজাব বা প্রস্তাব দেওয়া (প্রপোজাল)

‘ইজাব’ শব্দের অর্থ হলো প্রস্তাব দেওয়া। বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ের পক্ষ থেকে বিয়ের জন্য যে প্রস্তাব দেওয়া হয়, তাকে ইজাব বলে। সাধারণত, ছেলে পক্ষ মেয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু এর উল্টোটাও হতে পারে। এই প্রস্তাব হতে পারে সরাসরি, যেমন “আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই”, অথবা অভিভাবকের মাধ্যমে, যেমন “আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই।” এটি বিয়ের প্রথম পদক্ষেপ এবং একটি বৈধ চুক্তির শুরু।

জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, আর যদি তার পক্ষে এমন কোনো অঙ্গ দেখা সম্ভব হয় যা বিবাহের পক্ষে যথেষ্ট, তখন তা যেন দেখে নেয়। সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৮২, মিশকাত :৩১০৬, সহীহাহ্ : ৯৯, আহমাদ : ১৪৫৮৬, ইরওয়া : ১৭৯১, সহীহ আল জামি :  ৫০৬

ক. একজনের প্রস্তাবের ওপর অন্যজনের প্রস্তাব না দেয়া :

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রামবাসীর পক্ষে শহরবাসী কর্তৃক বিক্রয় করা হতে নিষেধ করেছেন এবং তোমরা প্রতারণামূলক দালালী করবে না। কোন ব্যক্তি যেন তার ভাইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উপর ক্রয়-বিক্রয় না করে। কেউ যেন তার ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়। কোন মহিলা যেন তার বোনের (সতীনের) তালাকের দাবী না করে, যাতে সে তার পাত্রে যা কিছু আছে, তা নিজেই নিয়ে নেয়। সহিহ বুখারি : ২১৪০, ৫১৪৪, সহিহ মুসলিম : ১৫১৫, আহমাদ : ৯৫২৩. সুনানে নাসায়ী : ৩২৪১

খ. ইদ্দতে থাকা নারীকে প্রস্তাব দেয়া :

বায়ান তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে ইদ্দত পালনকারী নারীকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া হারাম। ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়া বৈধ। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِہٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَکۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ ؕ  عَلِمَ اللّٰہُ اَنَّکُمۡ سَتَذۡکُرُوۡنَہُنَّ وَلٰکِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡہُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ  وَلَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّکَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡکِتٰبُ اَجَلَہٗ ؕ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُ ۚ  وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ 

আর এতে তোমাদের কোন পাপ নেই যে, তোমরা নারীদেরকে ইশারায় যে প্রস্তাব করবে কিংবা মনে গোপন করে রাখবে। আল্লাহ জেনেছেন যে, তোমরা অবশ্যই তাদেরকে স্মরণ করবে। কিন্তু বিধি মোতাবেক কোন কথা বলা ছাড়া গোপনে তাদেরকে (কোন) প্রতিশ্রুতি দিয়ো না। আর আল্লাহর নির্দেশ (ইদ্দত) তার সময় পূর্ণ করার পূর্বে বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা রয়েছে তা জানেন। সুতরাং তোমরা তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। সূরা বাকারা : ২৩৫।

তবে ‘রজঈ’ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে সুস্পষ্টভাবে তো দূরের কথা আকার-ইঙ্গিতে প্রস্তাব দেয়াও হারাম। তেমনি এ নারীর পক্ষে তালাকদাতা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রস্তাবে সাড়া দেয়াও হারাম। কেননা এখনো সে তার স্ত্রী হিসেবেই রয়েছে।

গ. উপযুক্ত পাত্রের প্রস্তাব প্রত্যাখান না করা :

আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلاَّ تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِى الأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ.

‘যদি এমন কেউ তোমাদের বিয়ের প্রস্তাব দেয় যার ধার্মিকতা ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট তবে তোমরা তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেবে। যদি তা না করো তবে পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজতা সৃষ্টি হবে। সুনানে তিরমিজি :  ১০৮৪, ইরওয়া : ১৮৬৮, সহীহাহ : ১০২২, মিশকাত : ২৫৭৯

২. কনের পক্ষ থেকে ওয়ালি বা অভিভাবকের সম্মতি

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে কনের জন্য একজন ওয়ালি বা অভিভাবক থাকা ফরজ বা আবশ্যক। ওয়ালি হলেন এমন ব্যক্তি যিনি কনের সম্মতিতে তার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ওয়ালি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না।

আবূ মূসা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়েই হতে পারে না। সুনানে আবু দাউদ : ২০৮৫

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮১, সুনানে তিরমিযী : ১১০১, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৫, আহমাদ : ১৯০২৪, ১৯২১১, ১৯২৪৭, দারেমী : ২১৮২, ২১৮৩, ইরওয়াহ : ১৮৩৯, মিশকাত : ১৩৩০,

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল। স্বামী তার সাথে সহবাস করলে তাতে সে মাহরের অধিকারী হবে। তাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে সে ক্ষেত্রে যার অভিভাবক নাই, শাসক তার অভিভাবক। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৭৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০২, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৮৩, আহমাদ : ২৩৮৫১, ২৪৭৯৮, দারেমী : ২১৮৪, ইরওয়াহ : ১৮৪০, মিশকাত : ১৩৩১

ক. কন্যার ওয়ালি বা অভিভাবকত্বের পরিচয়

ইসলামি ফিকহশাস্ত্র অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে কনের ওয়ালি হওয়ার অধিকার কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ধাপে ধাপে বন্টিত হয়। এই ক্রমটি সাধারণত আত্মীয়তার নৈকট্য ও মিরাসে (উত্তরাধিকার) প্রাপ্তির ক্রমের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।

(১) পিতা, (২) দাদা, (৩) ভাই, (৪) চাচা, (৫) অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়, (৬) ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসকঅ

যদি কনের কোনো ওয়ালি না থাকে, অথবা ওয়ালি থাকা সত্ত্বেও তিনি দূরে থাকেন, বা বিবাহে বাধা দেন কিন্তু শরিয়তসম্মত কোনো কারণ না দেখাতে পারেন, তাহলে ইসলামী আদালতের কাজী বা মুসলিম শাসক কনের ওয়ালি হবেন।

খ. অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা

কোন নারীর বিবাহের জন্য ওয়ালী বা অভিভাবক আবশ্যক। অভিভাবক উপযুক্ত হওয়ার জন্য ৬টি শর্ত আছে। যখা-

(১) আকল বা বিবেক সম্পন্ন হওয়া (পাগল হলে হবে না)

(২) প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া

(৩) স্বাধীন হওয়া

(৪) পুরুষ হওয়া (বিবাহের ক্ষেত্রে নারী নারীর অভিভাবক হতে পারবে না)

(৫) অভিভাবক ও যার অভিভাবক হচ্ছে উভয়ে একই দ্বীনের অনুসারী হওয়া। (কোন কাফির মুসলিম নারীর অভিভাবক হবে না

(৬) অভিভাবক হওয়ার উপযুক্ত হওয়া। (অর্থাৎ বিবাহের জন্য কুফূ বা তার কন্যার জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন বা সমকক্ষ পাত্র নির্বাচন করার জ্ঞান থাকা ও বিবাহের কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয় সমূহ অনুধাবন জ্ঞান থাকা)

৩. কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকবে

বিয়েকে বৈধতা ও স্বীকৃতি দিতে সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। ইসলামে কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। সাক্ষীরা বিয়ের চুক্তিটির সত্যতা নিশ্চিত করেন। এর মাধ্যমে বিয়ের বিষয়টি প্রকাশ্য হয় এবং সমাজে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ থাকে না।

ইসলামি আইন অনুযায়ী, বিবাহের জন্য কমপক্ষে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ও মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। যদি দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী পাওয়া না যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী থাকতে পারে।

ক. সাক্ষী অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে।

খ.  সাক্ষী অবশ্যই মুসলিম হতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ 

এবং তোমাদের মধ্য থেকে ন্যায়পরায়ণ দুইজনকে সাক্ষী বানাবে। আর আল্লাহর জন্য সঠিক সাক্ষ্য দেবে। সূরা তালাক : ২

যদিও এই আয়াতটি মূলত তালাকের ক্ষেত্রে এসেছে, তবে ফিকহবিদগণ এর সাধারণ বিধানের ভিত্তিতে বিবাহের ক্ষেত্রেও সাক্ষীর আবশ্যকতা প্রমাণ করেছেন।

ইমরান ইবন হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَي عَدْلٍ»

“অভিভাবক (ওলি) এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।” ইমাম বাইহাকি, সুনান আল-কুবরা : ১৪১৪৬, ইমাম দারাকুতনি : ৩৭৩৮

সুতরাং, ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বিবাহে সাক্ষী থাকা অপরিহার্য। এটি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং বিবাহের বৈধতা ও সামাজিক স্বীকৃতির জন্য একটি মৌলিক বিধান।

৪. আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মোহর নির্ধারণ করা

‘মোহর’ হলো এমন একটি অর্থ বা সম্পদ যা স্বামী তার স্ত্রীকে বিবাহের চুক্তির অংশ হিসেবে প্রদান করে। এটি স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার, যা তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। মোহরের পরিমাণ আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত, যাতে তা দিতে বরের কোনো কষ্ট না হয়। মোহর নির্ধারণের মাধ্যমে স্ত্রীকে সম্মানিত করা হয় এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

মহর পরিশোধ করা স্বামীর উপর একটি ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاٰتُوا النِّسَآءَ صَدُقٰتِہِنَّ نِحۡلَۃً ؕ فَاِنۡ طِبۡنَ لَکُمۡ عَنۡ شَیۡءٍ مِّنۡہُ نَفۡسًا فَکُلُوۡہُ ہَنِیۡٓــًٔا مَّرِیۡٓــًٔا

আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও। সূরা নিসা : ৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ فَمَا اسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِہٖ مِنۡہُنَّ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ فَرِیۡضَۃً ؕ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ فِیۡمَا تَرٰضَیۡتُمۡ بِہٖ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡفَرِیۡضَۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا

সুতরাং তাদের মধ্যে তোমরা যাদেরকে ভোগ করেছ তাদেরকে তাদের নির্ধারিত মোহর দিয়ে দাও। আর নির্ধারণের পর যে ব্যাপারে তোমরা পরস্পর সম্মত হবে তাতে তোমাদের উপর কোন অপরাধ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ২৪ 

আবূ সালামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ) -কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের মাহর কতো ছিলো? তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীদের মাহরের পরিমাণ ছিলো বার উকিয়া ও এক নাশ। তুমি কি জানো, নাশ কী? তাহলো অর্ধ উকিয়া। আর তাহলো পাঁচ শত দিরহামের সমান। সহিহ মুসলিম ১৪২৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৮৬,  সুনানে নাসায়ী : ৩৩৪৭, সুনানে আবূ দাউদ : ২১০৫, দারেমী : ২১৯৯, সহিহাহ : ১৮৩৩

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ (রাঃ) কোন এক মহিলাকে বিয়ে করলেন এবং তাকে মাহর হিসাবে খেজুর দানার পরিমাণ স্বর্ণ দিলেন। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুখে বিয়ের খুশির ছাপ দেখলেন তখন তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন; তখন সে বললঃ আমি এক নারীকে খেজুর আঁটি পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে বিয়ে করেছি। সহিহ বুখারি : ৫১৪৮, সহিহ মুসলিম ১৪২৭, সুনানে নাসায়ী ৩৩৭২, সুনানে তিরমিযী : ১০৯৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯০৭, আহমাদ : ১৩৩৭০, দারিমী : ২২৫০।

৫. কবুল বলে প্রস্তাব গ্রহণ করা

কবুল হলো অপর পক্ষ কর্তৃক সেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করা। ইজাবের পর সঙ্গে সঙ্গেই কবুল করা আবশ্যক। কবুল করার সময়ও ভাষা স্পষ্ট এবং শর্তহীন হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:

পাত্র বা পাত্রীর পক্ষ থেকে : “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি কবুল করলাম।”

যদি ইজাব এবং কবুলের মাঝে দীর্ঘ সময় ব্যবধান থাকে বা প্রস্তাবের মধ্যে কোনো শর্ত যুক্ত করা হয়, তাহলে বিবাহ চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হতে পারে। তাই এই দুটি বিষয় একই মজলিসে (একই স্থানে, একই বৈঠকে) সম্পন্ন করা জরুরি।

ইজাব ও কবুলের শর্ত

একটি সঠিক ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়:

ক. একই মজলিস : ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে (মজলিসে) সম্পন্ন হতে হবে। আল-ইনায়াহ শরহুল হিদায়াহ, তৃতীয় খণ্ড, পৃ.-২৮৭

খ. সাক্ষী : ইজাব ও কবুলের সময় কমপক্ষে দুইজন মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত থাকা আবশ্যক। অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী হলেও চলবে। এটি বিয়ের বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সূরা তালাক : ২

গ. স্পষ্ট ভাষা: প্রস্তাব ও গ্রহণ উভয়ই স্পষ্ট ভাষায় হতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-২৬৭

এই নিয়মগুলো মূলত সাহাবিদের আমল এবং পরবর্তী ফকিহদের ইজতিহাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। 

বিবাহ কন্যার সম্মতি নেওয়া জরুরি :

আবূ সালামাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) তাদের কাছে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! কেমন করে তার অনুমতি নেয়া হবে। তিনি বললেন, তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি। সহিহ বুখারি : ৫১৩৬, ৬৯৭০, সহহি  মুসলিম : ১৪১৯, আহমাদ : ৯৬১

খানসা বিনতে খিযাম আল আনসারিয়্যাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, যখন তিনি অকুমারী ছিলেন তখন তার পিতা তাকে বিয়ে দেন। এ বিয়ে তিনি অপছন্দ করলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিয়ে বাতিল করে দিলেন। সহিহ বুখারি : ৫১৩৮, ৫১৩৯, ৬৯৪৫, ৬৯৬৯

এই পাঁচটি ধাপ হলো একটি ইসলামী বিবাহের মূল ভিত্তি। এই নিয়মগুলো মেনে চললে বিবাহ একটি মজবুত ও বরকতময় বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

দাম্পত্য জীবনের সুন্নাহ সম্মত আমল

১. বাসর রাতে স্ত্রীর কপালের উপরের চুল দুআ পাঠ করা

আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন তোমাদের কেউ স্ত্রী, খাদেম অথবা আরোহণের পশু লাভ করে তখন সে যেন তার কপালে হাত রেখে বলে-

اللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِهَا وَخَيْرِ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جُبِلَتْ عَلَيْهِ

হে আল্লাহ্! আমি তোমার নিকট এর মধ্যে নিহিত কল্যাণ প্রার্থনা করি এবং যে কল্যাণ এর মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। আমি তোমার নিকট এর অনিষ্ট হতে এবং যে অনিষ্টসহ একে সৃষ্টি করা হয়েছে তা হতে আশরয় চাই’’। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯১৮, বাইহাকী, সুনান কুবরা : ১৪২১১

আমর ইবনু শুআইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিয়ে করে অথবা কোনো দাসী ক্রয় করে তখন সে যেন বলে-

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَمِنْ شَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ،

হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এর মধ্যকার কল্যাণ এবং এর মাধ্যমে কল্যাণ চাই এবং তার মধ্যে নিহিত অকল্যাণ ও তার মাধ্যমে অকল্যাণ থেকে আপনার নিকট আশ্রয় চাই।’’

আর যখন কোনো উট কিনবে তখন যেন সেটির কুঁজের উপরিভাগ ধরে অনুরূপ দু’আ করে। ইমাম আবূ দাঊদ (রহ.) বলেন, আবূ সাঈদের বর্ণনায় রয়েছেঃ অতঃপর তার কপালের চুল ধরে বলবে। স্ত্রী এবং দাসীর ব্যাপারেও বরকতের দু’আ করবে। সুনানে আবু দাউদ : ২১৬০

০২. স্বামী-স্ত্রী  উভয়ে একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করা :

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, স্ত্রী যখন স্বামীর কাছে যাবে, স্বামী তখন দাঁড়িয়ে যাবে। আর স্ত্রীও দাঁড়িয়ে যাবে তার পেছনে। অতপর তারা একসঙ্গে দুই রাকা‌‘‌ত সালাত আদায় করবে এবং বলবে-

اللَّهُمَّ بَارِكْ لِي فِي أَهْلِي، وَبَارِكْ لَهُمْ فِيَّ، اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي مِنْهُمْ وَارْزُقْهُمْ مِنِّي، اللَّهُمَّ اجْمَعَ بَيْنَنَا مَا جَمَعْتَ إِلَى خَيْرٍ، وَفَرِّقْ بَيْنَنَا إِذَا فَرَّقْتَ إِلَى خَيْرٍ.

‘হে আল্লাহ, আপনি আমার জন্য আমার পরিবারে বরকত দিন আর আমার ভেতরেও বরকত দিন পরিবারের জন্য। আয় আল্লাহ, আপনি তাদের থেকে আমাকে রিযক দিন আর আমার থেকে তাদেরও রিযক দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের যতদিন একত্রে রাখেন কল্যাণেই একত্র রাখুন আর আমাদের মাঝে যখন বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবেন তখন কল্যাণের পথেই বিচ্ছেদ ঘটাবেন। . তাবরানী, মুজামুল কাবীর : : ৮৯০০, মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ : ১৭৪৩৩

০৩. সহবাস করার ইচ্ছা করলে দুআ দুআ পাঠ করা

ইবনু ‘আব্বাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে যদি বলে-

بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏

“আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখো এবং আমাদের যে সন্তান দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।”

 অতঃপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের কিসমতে কোন সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। সহিহ বুখারি : ১৪১, ৩২৭১, ৩২৮৩, ৫১৬৫, ৬৩৮৮, ৭৩৯৬, সহিহ মুসলিম : ১৪৩৪, সুনানে তিরমিযী ১০৯২, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৬১, আহমাদ : ১৮৭০, ১৯১১, ২১৭৯, ২৫৫১, ২৫৯২, দারেমী : ২২১২, ইরওয়াহ : ২০১২

০৪. সহবাসের সময় পর্দা করা।

উতবা ইবনু আব্দ আস-সুলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর নিকট এসে যেন (নির্জনে মিলনে) পর্দা (গোপনীয়তা) রক্ষা করে এবং গর্দভের ন্যায় বিবস্ত্র না হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, ইরওয়া : ২০০৯

আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কখনও রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাইনি বা তা দেখিনি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯২১, আহমাদ ২৩৮২৩, ইরওয়া : ১৮১২, মিশকাত : ৩১২৩

০৫. নিষিদ্ধ সময় ও জায়গা থেকে বিরত থাকা :

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم

যে ব্যক্তি ঋতুবতী নারীর সাথে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে অথবা গণক ঠাকুরের নিকটে যায়।  সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করে। সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬৩৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওয়াহী নাযিল হয়- ’’তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। অতএব, তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা যেতে পার’’। সূরা বাকারা : ২২৩। তাই সামনের দিক হতে বা পিছন দিক হতে সহবাস কর; কিন্তু মলদ্বার ও ঋতুবতী হতে বিরত থাক। মিশকাত : ৩১৯১, সুনানে তিরমিযী : ২৯৮০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯২৫, আহমাদ : ২৭০৩, সহীহ আল জামি :  ১১৪১।

০৬. ঘুমানোর আগে অযূ বা গোসল করা :

স্ত্রী সহবাসের পর সুন্নত হলো অযূ বা গোসল করে তবেই ঘুমানো। অবশ্য গোসল করাই উত্তম।

আম্মার ইবনু ইয়াসির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

ثَلَاثَةٌ لَا تَقْرَبُهُمُ الْمَلَائِكَةُ: جِيفَةُ الْكَافِرِ، وَالْمُتَضَمِّخُ بِالْخَلُوقِ، وَالْجُنُبُ، إِلَّا أَنْ يَتَوَضَّأَ

তিন প্রকার ব্যক্তির নিকট ফিরিশতারা আসেন না। (১) কাফিরের লাশের নিকট (জানাযায়). (২) জাফরান রঙ ব্যবহারকারী এবং (৩) নাপাক ব্যক্তির নিকট, তবে সে উযু করলে ভিন্ন কথা। সুনানে আবু দাউদ : ৪১৮০

০৭. স্ত্রী ঋতুবতীর হলেও যা যা অনুমতি রয়েছে

স্বামীর জন্য ঋতুবতী স্ত্রীর সঙ্গে যোনি ব্যবহার ছাড়া অন্য সব আচরণের অনুমতি রয়েছে। স্ত্রী পবিত্র হবার পর গোসল করলে তার সঙ্গে সবকিছুই বৈধ।

আনাস (রা. থেকে বর্ণিত যে, ইয়াহুদীগণ তাদের মহিলাদের হায়িয হলে তার সাথে এক সঙ্গে খাবার খেত না এবং এক ঘরে বাস করত না। সাহাবায়ে কিরাম এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করলেন-

আর তারা তোমাকে হায়েয সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েযকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।  সূরা বাকারা : ২২২

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা (সে সময় তাদের সাথে) শুধু সহবাস ছাড়া অন্যান্য সব কাজ কর। এ খবর ইয়াহুদীদের কাছে পৌছলে তারা বলল, এ লোকটি সব কাজেই কেবল আমাদের বিরোধিতা করতে চায়।

অতঃপর উসায়দ ইবনু হুযায়র (রা.) ও আব্বাদ ইবনু বিশ্বর (রা.) এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইয়াহুদীরা এমন এমন বলছে। আমরা কি তাদের সাথে (হায়িয অবস্থায়) সহবাস করব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চেহারা মুবারক বিবর্ণ হয়ে গেল। এতে আমরা ধারণা করলাম যে, তিনি তাদের উপর ভীষণ রাগাম্বিত হয়েছেন। তারা (উভয়ে) বেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে দুধ হাদিয়া এলো। তিনি তাদেরকে ডেকে আনার জন্যে লোক পাঠালেন। (তারা এলে) তিনি তাদেরকে দুধ পান করালেন। তখন তারা বুঝল যে, তিনি তাদের উপর রাগ করেননি। সহিহ মুসলিম : ৩০২

০৮. কোন দিন স্ত্রী সান্বিধ্যের গোপন তথ্য প্রকাশ করা যাবে না

বিবাহিত ব্যক্তির আরেকটি কর্তব্য হলো স্ত্রী সংসর্গের গোপন তথ্য কারো কাছে প্রকাশ না করা।

আবূ সাঈদ আল খুদরী (রাযীঃ) থেকে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ‏”‏ ‏.‏

কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। সহিহ মুসলিম : ১৪৩৭,  আবূ দাঊদ ৪৮৭০, মিশকাত : ৩১৯০, আহমাদ ১১৬৫৫, য‘ঈফ আল জামি‘ ১৯৮৮।

০৯. বিশুদ্ধ নিয়তে স্ত্রীর সাথে মিলিত হবে

আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্ল-হ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্ল-হু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে। সহিহ মুসলিম : ১০০৬

গর্ভ অবস্থায় করণীয়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে গর্ভবতী স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার করার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল মানবিক সদাচরণ নয়, বরং এটি একটি ইবাদত এবং আদর্শ পরিবারের ভিত্তি। ইসলামি শরিয়ত এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

১. গর্ভবতী স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ করা

ইসলাম গর্ভবতী স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। এই সময়ে নারীর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। তাই স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তার কষ্টকে উপলব্ধি করা এবং যথাসম্ভব তার আরামের ব্যবস্থা করা।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ২৮৫

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ

“কোনো মুমিন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না। যদি তার কোনো গুণ তাকে অপছন্দ হয়, তবে অন্য কোনো গুণ অবশ্যই সে পছন্দ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৬৯

গর্ভাবস্থায় নারীর কষ্ট ও দুর্বলতা স্বামীকে আরও বেশি সহানুভূতিশীল হতে আহ্বান করে। নবী ﷺ স্ত্রীদের সাথে দয়া, স্নেহ ও সহযোগিতার আদর্শ স্থাপন করেছেন। তাই এ হাদিসগুলোই গর্ভবতী স্ত্রীর যত্ন ও সহানুভূতিশীল আচরণের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগানো যায়।

২. গর্ভবতী স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক সহায়তা করা

গর্ভকালীন সময়ে স্ত্রী দুর্বল ও অসুস্থ থাকতে পারেন। তাই স্বামীর উচিত:

ক. শারীরিক কাজে সাহায্য করা:

আসওয়াদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহে কী কাজ করতেন? তিনি বললেনঃ তিনি পারিবারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। যখন সালাতের সময় উপস্থিত হত, তখন উঠে সালাতে চলে যেতেন। সহিহ বুখারি : ৬৭৬, ৬০৩৯

খ. মানসিক সমর্থন দেওয়া :

গর্ভকালীন দুশ্চিন্তা বা অবসাদ থেকে স্ত্রীকে মুক্ত রাখতে তার পাশে থাকা, তাকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার ভালো লাগার বিষয়গুলো করা। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

গ. আহার ও স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা :

স্ত্রীর পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকা।

মুয়াবিযা বিন হাইদাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলো, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেনঃ সে আহার করলে তাকেও (একই মানের) আহার করাবে, সে পরিধান করলে তাকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে কখনও তার মুখমণ্ডল আঘাত করবে না, অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকী ত্যাগ করবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪২, ইরওয়াহ : ২০৩, মিশকাত : ৩২২৯, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫৮-১৮৬১

৩. গর্ভবর্তী মায়েকে পড়াশোনা করেত হবে

একজন শিশুর আগমন একটি নারীর জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। মাতৃত্বের মাধ্যমে নারী তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। তবে কেবল জন্ম দিলেই একজন নারী প্রকৃত মা হন না; সঠিকভাবে সন্তান প্রতিপালনের মধ্যেই মাতৃত্বের সার্থকতা নিহিত।

আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে গর্ভবতী মায়েরা কেবল নিজেদের খাওয়া-দাওয়া নিয়েই চিন্তিত থাকেন। কিন্তু গর্ভধারণ ও সন্তান প্রতিপালন একটি ব্যাপক বিষয়, যার জন্য সঠিক জ্ঞান ও প্রস্তুতির প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে, যেমন উত্তর আমেরিকায়, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিভিন্ন কোর্স এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সেখানে প্রেগন্যান্ট হওয়ার আগে থেকেই পড়াশোনা শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাজারে এই সংক্রান্ত বহু বই এবং ডিভিডি পাওয়া যায়। এছাড়াও, ইন্টারনেটে অসংখ্য ওয়েবসাইট রয়েছে যেখান থেকে ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যায়। এসব উৎস থেকে গর্ভধারণের আগে ও পরে করণীয়, শিশুর সঠিক পরিচর্যা এবং শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়। একজন সচেতন মা হওয়া এবং নিজের সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য।

একজন মুসলিম গর্ভবতী মায়ের দায়িত্ব অন্য মায়েদের চেয়ে কিছুটা বেশি। সাধারণ প্রস্তুতির পাশাপাশি তাকে সন্তানকে আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অতিরিক্ত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। সন্তানের অন্তরে দ্বীনের আলো প্রজ্জ্বলিত করতে প্রয়োজন ইসলামি শিশু সাহিত্য, আল কুরআনের তাফসির, রাসূল (সা.) ও সাহাবিদের জীবনী অধ্যয়ন করা। বর্তমানে ইন্টারনেটে এ সংক্রান্ত প্রচুর ভিডিও পাওয়া যায়, যা থেকে সহজেই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পর মায়েরা হাতে প্রচুর সময় পান। এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে তারা ইসলামের ওপর গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। এতে একদিকে যেমন সন্তানের সঠিক ইসলামিক পরিচর্যার পথ খুলে যায়, তেমনি মা নিজেও এক গভীর মানসিক শান্তি লাভ

৪. গর্ভবতী মায়ের যে কাজগুলো পরিহার করা উচিত

গর্ভকালীন সময় একজন মায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রভাব সরাসরি গর্ভের সন্তানের ওপর পড়ে। তাই এই সময়ে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা খুবই জরুরি। এই বিষয়ে ইসলাম ধর্ম ও বিজ্ঞান উভয়ই একমত। গর্ভবতী মায়ের যে কাজগুলো পরিহার করা উচিত, তা নিচে দেওয়া হলো:

ক. অশ্লীল ও অনৈসলামিক বিনোদন:

গর্ভবতী অবস্থায় অনেক মা অবসর সময় কাটানোর জন্য টিভি বা ইন্টারনেটে অশ্লীল নাচ, গান, সিরিয়াল, নাটক বা সিনেমা দেখে থাকেন। এটি শুধু সময়ের অপচয়ই নয়, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব গর্ভের সন্তানের ওপরও পড়ে। ইসলামে এ ধরনের কাজ হারাম। বিজ্ঞানও বলে, মা যা দেখেন বা শোনেন, তার প্রভাব সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশে পড়ে।

খ. অনিয়মিত সালাত ও ইবাদত:

আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতস্বরূপ সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে অনেকেই ইবাদত থেকে দূরে সরে যান। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় না করা, কুরআন তিলাওয়াত না করা, বা ইসলামিক বই না পড়া—এগুলো মা ও সন্তান উভয়ের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।

গ. গীবত ও খারাপ কথা:

গীবত বা পরনিন্দা করা, মিথ্যা বলা, বা অহংকার করা—এগুলো গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর। মায়ের মানসিক অবস্থা যত শান্ত ও পবিত্র থাকবে, সন্তানের ওপর তার প্রভাব ততটাই ইতিবাচক হবে।

ঘ. হারাম খাবার:

ইসলামে যে সকল খাবার হারাম করা হয়েছে, তা গর্ভবতী মায়ের জন্য অবশ্যই পরিহার করা উচিত। হালাল খাবার গ্রহণ করা মা ও সন্তানের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

একজন গর্ভবতী মা যখন নিয়মিত সালাত আদায় করেন, কুরআন তিলাওয়াত করেন, ইসলামিক লেকচার শোনেন এবং ভালো কাজ করেন, তখন তার গর্ভের সন্তানও এই ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করে। মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তান দান করেছেন একটি নেয়ামত হিসেবে। তাই তার দেওয়া এই নেয়ামতের জন্য সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এবং তার পছন্দ মতো কাজ করা উচিত।

মনে রাখবেন, সন্তানের সুস্থ জীবন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ আল্লাহর হাতে। তাই সর্বদা তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা উচিত। আপনার গর্ভের সন্তান সুস্থ হোক এবং দ্বীনের পথে বেড়ে উঠুক, এই কামনা করি।

৫. গর্ভকালীন শিশু বিকাশ ও ইসলামী দিকনির্দেশনা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে শিশুর বিকাশ

  • প্রথম মাসে: ভ্রূণের হৃদপিণ্ড গঠিত হতে শুরু করে।
  • দেড় মাসের মধ্যে: শিশুর হৃদপিণ্ড কাজ করা শুরু করে।
  • দুই মাস পর: হাত-পা ও অন্যান্য প্রধান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে গঠিত হয়।
  • তিন মাসের পর থেকে: শিশু ক্রমশ বড় হতে থাকে।
  • পাঁচ মাস বয়স থেকে: ভ্রূণ শুনতে সক্ষম হয়।
  • প্রথম গর্ভধারণে: প্রায় বিশ সপ্তাহ পর মা প্রথমবার সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করেন।
  • দ্বিতীয় বা তৃতীয় গর্ভধারণে: সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যেই শিশুর নড়াচড়া টের পাওয়া যায়।
  • গর্ভাবস্থায় শিশু নাভীর মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে খাদ্য গ্রহণ করে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। ফলে মায়ের খাদ্যাভ্যাস, মানসিক অবস্থা ও চরিত্র শিশুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয়

যায়দ ইবনু ওয়াহব (রহ.) হতে বর্ণিত। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, সত্যবাদী হিসেবে গৃহীত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা মাংসপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাঁকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাঁকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার ‘আমল, তার রিজক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়। কাজেই তোমাদের কোন ব্যক্তি ‘আমল করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার এবং জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত পার্থক্য থাকে। এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। তখন সে জাহান্নামবাসীর মত আমল করে। আর একজন ‘আমল করতে করতে এমন স্তরে পৌঁছে যে, তার এবং জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত তফাৎ থাকে, এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতবাসীর মত ‘আমল করে। সহিহ বুখারি : ৩২০৮, ৩৩৩২, ৬৫৯৪, ৭৪৫৪, সহিহ মুসলিম : ৩৬৪৩, আহমাদ : ৩৬২৪

ক. কুরআন তিলাওয়াত ও সুন্দর কথা শোনানো

যেহেতু তৃতীয় মাস থেকে ভ্রূণ ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে, তাই এ সময় থেকেই মায়ের উচিত ধীরে ধীরে সুন্দর করে কুরআন তিলাওয়াত করা।

পঞ্চম মাস থেকে শিশুর শ্রবণশক্তি সক্রিয় হয়। তাই মায়ের উচিত জোরে জোরে কুরআন-হাদিস পাঠ করা, নেক কথা শোনানো এবং শিশুর সাথে কোমলভাবে কথা বলা। এতে শিশুর হৃদয় ও চরিত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

খ. ইবাদতে নিয়মিত হওয়া

মায়ের মধ্যে যদি আগে থেকে নামাজে অনিয়ম থাকে, তবে এ সময় থেকেই তাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিয়মিত হয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিশুর চরিত্র গঠনে মায়ের চরিত্রের গভীর প্রভাব পড়ে। তাই মায়ের উচিত নিজের দোষ-ত্রুটি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং সৎকাজের অভ্যাস গড়ে তোলা।

গ. চরিত্র ও নৈতিকতা

মায়ের আচরণ, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ইবাদত—সবকিছু সন্তানের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। গর্ভকালীন সময়ে আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হওয়া, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে বিরত থাকা, সৎ-সঙ্গ ও উত্তম আচার-আচরণ বজায় রাখা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কল্যাণকর ভিত্তি তৈরি করে।

৬. সন্তানের জন্মের আগে মা-বাবার নৈতিক দায়িত্ব

সন্তান পৃথিবীতে আসার আগে মা-বাবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব রয়েছে, যা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করে। ইসলাম ধর্মানুসারে, এই দায়িত্বগুলো পালনের মাধ্যমে একটি পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। নিচে এই দায়িত্বগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

উত্তম ও সৎ উদ্দেশ্য: সন্তান গ্রহণের আগে মা-বাবা উভয়ের উচিত, সন্তানের লালন-পালন ও জীবন গঠনের জন্য সৎ ও উত্তম উদ্দেশ্য পোষণ করা। নিয়ত বা উদ্দেশ্য ভালো হলে আল্লাহ তাআলা তাদের কাজে বরকত দেন।

হালাল উপার্জন ও খাদ্য: সন্তানের জন্মের আগে মা-বাবার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হালাল উপার্জন করা এবং সেই উপার্জন দিয়ে কেনা হালাল খাবার গ্রহণ করা। হালাল উপার্জনের প্রভাব সন্তানের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ওপর পড়ে।

নিয়মিত সালাত ও ইবাদত: সন্তান ধারণের সময় মা-বাবা উভয়ের উচিত নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা। সম্ভব হলে মাঝেমধ্যে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় এবং সালাতের পর তাসবীহ পাঠ করা যেতে পারে। ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক এবং মনকে পবিত্র রাখে।

সৎ কাজ ও ভালো আচরণ: মা-বাবার উচিত নিজেদের ভালো কাজের সংখ্যা বাড়ানো। মানুষের সাথে আরও ভালো আচরণ করা, দরিদ্রদের মধ্যে দান-সদকা করা এবং অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। এসব কাজ সন্তানের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কুরআন অধ্যয়ন ও তিলাওয়াত: প্রতিদিন অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করা এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত শোনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আত্মিক শান্তি ও প্রশান্তি আসে, যা সন্তানের জন্যও কল্যাণকর। ইসলামের ওপর অন্যান্য বই অধ্যয়ন করলে ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।

অসুন্দর কাজ থেকে বিরত থাকা: গীবত, পরনিন্দা, কুৎসা রটনা, অহংকার এবং দাম্ভিকতাপূর্ণ কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। এছাড়াও, টিভি বা ইন্টারনেটে অশ্লীল নাচ, গান, সিরিয়াল, নাটক বা সিনেমা দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব নেতিবাচক কাজ পারিবারিক পরিবেশকে নষ্ট করে।

এই দায়িত্বগুলো পালনের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠার ভিত্তি স্থাপন করতে পারেন। এটি কেবল সন্তানের জন্য নয়, বরং মা-বাবার নিজেদের জীবনকেও আরও শান্তিময় ও বরকতময় করে তোলে।

৭. সন্তান জম্মের আগে দুআ করা

ইসলামে সন্তানকে আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত হিসেবে দেখা হয়। তাই সন্তান জন্মের আগে থেকেই তার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদীসে এর অনেক দৃষ্টান্ত ও নির্দেশনা পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় যে সন্তানের সুস্থ জীবন, সুন্দর চরিত্র এবং দ্বীনের পথে বেড়ে ওঠার জন্য দুআ অপরিহার্য।

কুরআনে অনেক নবী-রাসূলের দুআ উল্লেখ আছে, যেখানে তাঁরা আল্লাহর কাছে নেক সন্তান চেয়েছেন। যেমন, হযরত যাকারিয়া (আ.) বৃদ্ধ বয়সেও আল্লাহর কাছে সন্তান চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআর কথা কুরআনে এভাবে বলেছেন-

رَبِّ ہَبۡ لِیۡ مِنۡ لَّدُنۡکَ ذُرِّیَّۃً طَیِّبَۃً ۚ اِنَّکَ سَمِیۡعُ الدُّعَآءِ

সেখানে যাকারিয়্যা তার রবের কাছে প্রার্থনা করেছিল, সে বলল, ‘হে আমর রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী’। সূরা আল ইমরান : ৩৮

এই দুআর মাধ্যমে তিনি কেবল সন্তান নয়, বরং এমন সন্তান চেয়েছিলেন যে হবে পবিত্র ও নেককার। একইভাবে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন-

رَبِّ ہَبۡ لِیۡ مِنَ الصّٰلِحِیۡنَ

‘হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন’। সূরা সাফফাত : ১০০

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, সন্তানের জন্মের আগে থেকেই তার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা সুন্নাহ এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

যখন ইমরান স্ত্রী, মরিয়ম (আ.) এর মা দুআ করেছিলেন-

رَبِّ اِنِّیۡ نَذَرۡتُ لَکَ مَا فِیۡ بَطۡنِیۡ مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلۡ مِنِّیۡ ۚ اِنَّکَ اَنۡتَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ

হে আমার রাব্ব! নিশ্চয়ই আমার গর্ভে যা রয়েছে তা আমি মুক্ত করে আপনার উদ্দেশে উৎসর্গ করলাম, সুতরাং আপনি আমা হতে তা গ্রহণ করুন, নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। সুর আল ইমরান : ৩৫

সন্তান জন্মের আগে দুআ করা কেবল একটি প্রার্থনা নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ভরসার প্রতিফলন। এর মাধ্যমে মা-বাবা আল্লাহর কাছে একটি নেক, সুস্থ ও সৎ সন্তানের জন্য আবেদন করেন। এই দুআগুলো সন্তানের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তাকে দ্বীনের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। তাই সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করার পর থেকেই দুআ করা শুরু করা উচিত।

আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত গর্ভবতী মায়ের যত্ন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

গর্ভধারণ একজন নারীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায়। এ সময়ে শুধু মায়ের শরীরেই নয়, একটি নতুন প্রাণও তার ভেতরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই মা ও শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য গর্ভকালীন সময়ে সঠিক যত্ন নেওয়া অপরিহার্য। আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র (Medical Science) ও ডাক্তারি মতে গর্ভকালীন যত্নকে বলা হয় Antenatal Care (ANC) বা Prenatal Care। এর উদ্দেশ্য হলো—

  • গর্ভবতী মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা।
  • গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা।
  • যেকোনো জটিলতা দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিকার করা।
  • প্রসবকে নিরাপদ ও সহজতর করা।

১. নিয়মিত চিকিৎসা পরীক্ষা (Regular Check-ups)

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মা ও গর্ভস্থ শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বা জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

নিয়মিত চেক-আপের গুরুত্ব

গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসা পরীক্ষা (Antenatal Care) একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া। চিকিৎসকরা গর্ভাবস্থার বিভিন্ন ধাপে নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে এই পরীক্ষাগুলো করার পরামর্শ দেন:

প্রথম তিন মাসে (১ম ট্রাইমেস্টার): গর্ভাবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব অন্তত একবার চেকআপ করা উচিত। এই সময়ে চিকিৎসকরা সাধারণত প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাফি এবং ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দেন।

চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ মাস (২য় ট্রাইমেস্টার): এই সময়ে প্রতি মাসে একবার চেকআপ করানো প্রয়োজন। এই ভিজিটগুলোতে মায়ের রক্তচাপ, ওজন এবং ভ্রূণের হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ করা হয়।

সপ্তম থেকে নবম মাস (৩য় ট্রাইমেস্টার): এই সময় থেকে প্রসবের আগ পর্যন্ত চেকআপের সংখ্যা বাড়ানো হয়, যা সাধারণত প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর হয়।

৯ম মাসের শেষ দিকে: প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসায় প্রতি সপ্তাহে একবার চেকআপ করা হয়।

প্রতিটি ভিজিটে যা পরীক্ষা করা হয়

প্রতিটি ভিজিটে চিকিৎসক কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করেন যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি তুলে ধরে:

শারীরিক পরিমাপ : মা ও শিশুর সুস্থ ওজন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ওজন, উচ্চতা ও রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয়।

রক্ত পরীক্ষা : রক্তে হিমোগ্লোবিন, সুগার ও রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা হয়। হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা রক্তস্বল্পতা নির্ণয়ে সাহায্য করে, আর রক্তের গ্রুপ জানা থাকলে জরুরি প্রয়োজনে রক্ত সরবরাহ সহজ হয়।

আলট্রাসনোগ্রাফি : এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর বৃদ্ধি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়।

প্রস্রাব পরীক্ষা : প্রস্রাবে কোনো সংক্রমণ বা প্রোটিনের উপস্থিতি আছে কিনা, তা পরীক্ষা করা হয়, যা প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার মতো জটিলতা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

এই নিয়মিত পরীক্ষাগুলো মা ও শিশুর সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।

২. পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ (Balanced Nutrition)

গর্ভাবস্থায় সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ মা ও অনাগত শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পুষ্টি না পেলে মা ও শিশু উভয়ই বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই এই সময়ে কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করা অপরিহার্য।

গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান ও তার ভূমিকা

ফলিক অ্যাসিড: গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ফলিক অ্যাসিডের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড গঠনের সময় নিউরাল টিউব নামক জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাই গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত।

আয়রন (লোহা): গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই রক্তস্বল্পতা রোধ করতে পর্যাপ্ত আয়রন গ্রহণ করা জরুরি। আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন শাক-সবজি, লাল মাংস, ডাল ইত্যাদি খেলে মা ও শিশুর দেহে অক্সিজেনের সরবরাহ ঠিক থাকে।

ক্যালসিয়াম: শিশুর হাড় ও দাঁতের সুস্থ গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম অপরিহার্য। এটি শুধু শিশুরই নয়, মায়ের হাড়ের সুস্থতাও নিশ্চিত করে। দুধ, দই, পনির, বাদাম এবং সবুজ শাক-সবজি ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।

প্রোটিন: প্রোটিন হলো শরীরের গঠনের মূল উপাদান। শিশুর টিস্যু, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং পেশীর বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন প্রয়োজন। ডিম, মাংস, মাছ, ডাল এবং বাদাম প্রোটিনের চমৎকার উৎস।

ভিটামিন ও খনিজ: ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি এবং অন্যান্য খনিজ উপাদান যেমন জিঙ্ক ও আয়োডিন মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং শিশুর সামগ্রিক বিকাশে সাহায্য করে।

সুষম খাদ্যতালিকা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই পুষ্টি উপাদানগুলো গ্রহণ করলে গর্ভাবস্থা আরও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর হয়।

(খ) এড়িয়ে চলা উচিত

একজন গর্ভবতী নারীর জন্য কিছু খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এগুলো মা ও অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে এর কারণগুলো সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হলো:

কাঁচা বা আধসেদ্ধ মাংস, ডিম ও মাছ:

এই ধরনের খাবারগুলোতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, যেমন সালমোনেলা, ই. কোলাই এবং লিস্টেরিয়া থাকার সম্ভাবনা থাকে। এই জীবাণুগুলো মায়ের শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ ঘটাতে পারে, যা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বা শিশুর জন্মগত ত্রুটির কারণ হতে পারে। তাই সব খাবার ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া উচিত।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন (চা-কফি):

অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে গর্ভপাত, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং শিশুর হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত করা উচিত।

কার্বনেটেড সফটড্রিংক:

এই ধরনের পানীয়গুলোতে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম রং এবং উচ্চ মাত্রার ক্যাফেইন থাকে। এগুলো ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এবং অকাল প্রসবের কারণ হতে পারে। এসব পানীয়ের পরিবর্তে টাটকা ফলের রস বা পানি পান করা ভালো।

অতিরিক্ত তৈলাক্ত ও ফাস্টফুড:

ফাস্টফুডে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, লবণ এবং ক্যালোরি থাকে। এগুলো মায়ের অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এই খাবারগুলোর পরিবর্তে পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা উচিত।

৩. ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টস

ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টগুলো গর্ভবতী মায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো গর্ভস্থ শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করে এবং মায়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। নিচে এই ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টগুলো কেন অপরিহার্য তার ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

ফলিক অ্যাসিড :

ফলিক অ্যাসিড হলো এক ধরনের বি ভিটামিন, যা কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এই সময়ে ফলিক অ্যাসিড শিশুর মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের গঠনগত ত্রুটি, যা নিউরাল টিউব ডিফেক্টস নামে পরিচিত, তা প্রতিরোধে সাহায্য করে। তাই গর্ভধারণের আগে থেকে এবং গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস পর্যন্ত ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

আয়রন (লোহা)

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রক্তের পরিমাণ প্রায় ৫০% বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত রক্ত সরবরাহ করার জন্য পর্যাপ্ত আয়রনের প্রয়োজন হয়। আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে সাহায্য করে, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে। আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দিতে পারে, যার ফলে মা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং শিশুর ওজন কম হতে পারে। তাই রক্তস্বল্পতা রোধে আয়রন ট্যাবলেট অত্যন্ত জরুরি।

ক্যালসিয়াম

ক্যালসিয়াম শিশুর হাড়, দাঁত, হৃদপিণ্ড, পেশী এবং স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। যদি মায়ের পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ না হয়, তবে শিশুর প্রয়োজনে মায়ের শরীর থেকে ক্যালসিয়াম নেওয়া শুরু হয়, যা পরবর্তী জীবনে মায়ের হাড়ের দুর্বলতা বা অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা জরুরি।

মাল্টিভিটামিন

গর্ভকালীন মাল্টিভিটামিন সাপ্লিমেন্ট সাধারণত এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এতে ফলিক অ্যাসিড, আয়রন ও ক্যালসিয়াম ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও মিনারেল যেমন- ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, জিঙ্ক এবং আয়োডিন থাকে। অনেক সময় শুধুমাত্র খাবারের মাধ্যমে সব প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তাই মাল্টিভিটামিন গ্রহণ করলে শরীরের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয় এবং মা ও শিশু দু’জনের স্বাস্থ্যই সুরক্ষিত থাকে।

৪. শারীরিক ব্যায়াম

একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য শারীরিক ব্যায়াম শুধু শারীরিক সুস্থতা নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। তবে, গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম করার ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা জরুরি, যা এখানে ব্যাখ্যা করা হলো।

উপকারী ব্যায়ামের প্রকারভেদ

গর্ভাবস্থায় হালকা ও নিয়মিত ব্যায়ামই সবচেয়ে নিরাপদ। এর মধ্যে রয়েছে:

হাঁটা: প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটা গর্ভাবস্থার জন্য সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর ব্যায়াম। এটি রক্তসঞ্চালন বাড়াতে এবং শরীরকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।

প্রেগন্যান্সি যোগা: বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য তৈরি যোগা খুবই উপকারী। এটি শরীরকে শিথিল করে, মাংসপেশি শক্তিশালী করে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামের মাধ্যমে প্রসবের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করে।

শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম: এই ব্যায়ামগুলো মানসিক চাপ কমাতে এবং প্রসবের সময় ব্যথা ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করে।

ব্যায়ামের উপকারিতা

সঠিকভাবে ব্যায়াম করলে গর্ভবতী মা ও শিশু উভয়ই অনেক উপকৃত হয়:

রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি: নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত করে, যা মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: ব্যায়াম অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি রোধ করে, যা গর্ভাবস্থার অনেক জটিলতা, যেমন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়।

প্রসব সহজীকরণ: হালকা ব্যায়াম শরীরের পেশীগুলোকে শক্তিশালী করে এবং প্রসবের জন্য শরীরকে প্রস্তুত করে, ফলে প্রসব প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি: ব্যায়াম মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমিয়ে মনকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।

তবে, ভারী ব্যায়াম ও ওজন তোলা এড়িয়ে চলা উচিত। যেকোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৫. মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট

গর্ভাবস্থায় শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনও আসে। হরমোনের ওঠানামার কারণে অনেক নারী দুশ্চিন্তা, ভয় বা বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন। তাই এই সময়ে মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।

গর্ভকালীন সময়ে মানসিক চাপ কমাতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যায়:

পরিবার ও স্বামীর সহানুভূতি:

পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে স্বামীর সহযোগিতা মানসিক প্রশান্তি আনতে পারে। তাদের সহানুভূতি, ধৈর্য এবং ভালোবাসা একজন মাকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে।

ধ্যান ও প্রার্থনা:

মেডিটেশন, দোয়া এবং ইতিবাচক চিন্তা মনের অস্থিরতা দূর করতে সাহায্য করে। এই সময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তার কাছে প্রার্থনা করা মানসিক চাপ কমাতে পারে।

বিশেষজ্ঞের সাহায্য:

যদি দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতা বেশি হয় এবং তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে, তবে একজন সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া উচিত। পেশাদার সাহায্য নিলে এই সমস্যাগুলো থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

মনে রাখা উচিত, একজন সুস্থ মা-ই একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারেন। তাই গর্ভাবস্থায় নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

৬. বিশ্রাম ও ঘুম

গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ঘুম মা ও অনাগত শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। হরমোনের পরিবর্তন, শারীরিক অস্বস্তি এবং মানসিক চাপ ভালো ঘুমের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এই সময়ে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা উচিত।

বিশ্রাম ও ঘুমের গুরুত্ব

শারীরিক সুস্থতা: পর্যাপ্ত ঘুম মায়ের শরীরকে সতেজ ও সুস্থ রাখে। এটি ক্লান্তি দূর করে এবং গর্ভাবস্থার কারণে সৃষ্ট শারীরিক চাপ মোকাবিলায় সাহায্য করে।

শিশুর বৃদ্ধি: বিশ্রাম নিলে শিশুর দিকে রক্তপ্রবাহ বাড়ে, যা তার সঠিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

মানসিক প্রশান্তি: পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং হরমোনের ওঠানামার কারণে সৃষ্ট মেজাজের পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে রাখে।

সঠিক ঘুমের নিয়ম

সময়: একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘণ্টা রাতের ঘুম প্রয়োজন। দিনের বেলায় ক্লান্তি বোধ করলে ১ ঘণ্টার বিশ্রাম বা হালকা ঘুম নেওয়া যেতে পারে।

শোয়ার নিয়ম: গর্ভাবস্থায় বাঁ পাশে কাত হয়ে ঘুমানো শ্রেয়।  এটি গর্ভস্থ শিশুর দিকে রক্ত ও পুষ্টি সরবরাহ বাড়াতে সাহায্য করে। এর কারণ হলো, শরীরের ডান পাশে থাকা লিভারের ওপর চাপ কম পড়ে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।

চিৎ হয়ে শোয়া: বেশি সময় চিৎ হয়ে না শোয়া ভালো। গর্ভাবস্থার শেষ দিকে চিৎ হয়ে শুলে জরায়ুর ওজন পেছনের দিকে থাকা রক্তনালীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা মায়ের রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে এবং শিশুর রক্ত সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে।

সঠিক বিশ্রাম ও ঘুম একটি সুস্থ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান উপায়।

৭. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি (Hygiene)

গর্ভাবস্থায় মায়ের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুবই জরুরি। এটি শুধু মায়ের সুস্থতাই নিশ্চিত করে না, বরং অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যকেও সুরক্ষা দেয়।

ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব

সংক্রমণ রোধ: নিয়মিত গোসল এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জীবাণু ও সংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করে। গর্ভাবস্থায় মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল থাকে, তাই জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে এই ঝুঁকি কমে।

আরামদায়ক পোশাক: হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা উচিত, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখে এবং ত্বককে শ্বাস-প্রশ্বাসের সুযোগ দেয়। এটি অতিরিক্ত ঘাম এবং ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

দাঁতের যত্ন: গর্ভাবস্থায় দাঁত ও মাড়ির যত্ন নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাড়ির প্রদাহ বা সংক্রমণ হলে তা শিশুর কম ওজন বা অকাল জন্মের কারণ হতে পারে। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা, ফ্লস ব্যবহার করা এবং ডেন্টিস্টের সাথে পরামর্শ করা জরুরি।

ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা একটি সুস্থ গর্ভাবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৮. টিকা ও প্রতিরোধমূলক যত্ন

গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর সুস্থতার জন্য টিকা ও প্রতিরোধমূলক যত্ন অত্যন্ত জরুরি। এটি অনেক সংক্রামক রোগ থেকে মা ও শিশুকে সুরক্ষা দেয়।

টিকা ও প্রতিরোধমূলক যত্নের গুরুত্ব

টিটেনাস টিকা (TT): এটি গর্ভবতী মায়ের জন্য একটি আবশ্যকীয় টিকা। এই টিকা মা ও শিশুকে টিটেনাস (ধনুষ্টঙ্কার) নামক মারাত্মক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। টিটেনাস একটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ যা সাধারণত আঘাত বা ক্ষত থেকে শরীরে প্রবেশ করে এবং পেশী সংকোচন ও খিঁচুনির কারণ হয়। গর্ভাবস্থায় এই টিকা গ্রহণ করলে মা ও নবজাতক উভয়ই নিরাপদ থাকে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা বা কোভিড ভ্যাকসিন:

গর্ভাবস্থায় ফ্লু বা কোভিড-১৯ সংক্রমণ হলে তা গুরুতর রূপ নিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই টিকাগুলো নেওয়া উচিত। এই টিকাগুলো শুধু মাকে সুরক্ষা দেয় না, বরং জন্মগতভাবে শিশুকে এই রোগগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতেও সাহায্য করে।

এই টিকাগুলো গ্রহণ করে মা তার নিজের ও গর্ভস্থ সন্তানের স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারেন।

৯. ঝুঁকি ও সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় কিছু লক্ষণ দেখা দিলে তা মারাত্মক ঝুঁকির ইঙ্গিত হতে পারে। তাই এই ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা রক্তমিশ্রিত স্রাব:

এটি গর্ভপাত, একটোপিক প্রেগন্যান্সি (জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ) বা প্লাসেন্টা প্রিভিয়ার (গর্ভফুল জরায়ুমুখের কাছে চলে আসা) মতো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

তীব্র মাথাব্যথা ও দৃষ্টি ঝাপসা:

এটি উচ্চ রক্তচাপের কারণে সৃষ্ট প্রি-এক্লাম্পসিয়ার (Pre-eclampsia) লক্ষণ হতে পারে। প্রি-এক্লাম্পসিয়া গর্ভবতী মা ও অনাগত শিশুর জন্য খুবই বিপজ্জনক।

পেটের প্রচণ্ড ব্যথা:

তলপেটে তীব্র ব্যথা গর্ভপাত, অকাল প্রসব, বা প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশনের (গর্ভফুল জরায়ু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া) মতো জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।

শিশুর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া:

গর্ভাবস্থার শেষের দিকে যদি শিশু স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া না করে বা তার নড়াচড়ার পরিমাণ কমে যায়, তবে তা শিশুর সংকটাপন্ন অবস্থার লক্ষণ হতে পারে।

হাত-পা অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া:

গর্ভাবস্থায় হাত-পা সামান্য ফোলা স্বাভাবিক, কিন্তু যদি তা হঠাৎ করে অতিরিক্ত ফুলে যায় এবং এর সাথে মাথাব্যথা বা উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তবে এটি প্রি-এক্লাম্পসিয়ার লক্ষণ হতে পারে।

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

১০. প্রসবের প্রস্তুতি (Birth Preparedness)

গর্ভাবস্থার শেষ সময়ে প্রসবের জন্য আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এটি সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং প্রসব প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ও সহজ করতে সাহায্য করে।

প্রসবের প্রস্তুতির মূল দিকগুলো

প্রসবের স্থান নির্বাচন:

আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া উচিত যে প্রসব কোথায় হবে—হাসপাতালে, ক্লিনিকে, নাকি বাড়িতে। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে প্রসব করানো সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ সেখানে জরুরি চিকিৎসা সেবার সুবিধা থাকে।

জরুরি অবস্থার জন্য পরিকল্পনা:

প্রসবকালীন যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি যেমন- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা জটিলতার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখা উচিত। এর মধ্যে জরুরি যোগাযোগের নম্বর, যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে রক্তের ব্যবস্থা করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখা:

প্রসবের সময় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ব্যাগ গুছিয়ে রাখা উচিত। এই ব্যাগে মা ও শিশুর প্রয়োজনীয় কাপড়, স্যানিটারি প্যাড, প্রাথমিক ঔষধপত্র এবং জরুরি কাগজপত্র (যেমন- আল্ট্রাসাউন্ড রিপোর্ট, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ইত্যাদি) রাখা উচিত।

এই পূর্বপ্রস্তুতিগুলো একজন গর্ভবতী মাকে মানসিক চাপ থেকে মুক্ত রাখে এবং একটি নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করে।

১১. নবজাতকের যত্ন সম্পর্কিত প্রস্তুতি

নবজাতকের আগমন একজন মায়ের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি তার যত্নের জন্য প্রস্তুতিরও প্রয়োজন হয়। নবজাতকের যত্নের জন্য কিছু প্রস্তুতি আগে থেকে নিয়ে রাখলে নতুন বাবা-মায়ের জন্য কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়।

নবজাতকের যত্নের প্রস্তুতি

শিশুর প্রয়োজনীয় সামগ্রী: শিশুর জন্মের আগেই তার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন- পরিষ্কার কাপড়, ডায়াপার, তোয়ালে, কম্বল, শিশুর বিছানা এবং হালকা সাবান ও লোশন প্রস্তুত করে রাখা উচিত। এগুলো প্রসবের পর শিশুর প্রাথমিক যত্নের জন্য অপরিহার্য।

বুকের দুধ খাওয়ানো: জন্মের পরপরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে আগে থেকেই সচেতনতা তৈরি করা উচিত। বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মায়ের সাথে তার সম্পর্ককে আরও মজবুত করে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: শিশুর ব্যবহৃত সব জিনিসপত্র, বিশেষ করে কাপড় এবং বোতল (যদি প্রয়োজন হয়), ভালোভাবে পরিষ্কার করে রাখা জরুরি, কারণ নবজাতক সহজেই সংক্রমিত হতে পারে।

এই প্রস্তুতিগুলো নতুন বাবা-মাকে একটি নতুন জীবনকে স্বাগত জানাতে সাহায্য করে এবং শিশুর সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।

১২. সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তা

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় মায়ের সুস্থতা কেবল শারীরিক যত্নের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থনও এর একটি অপরিহার্য অংশ। পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সহযোগিতা মায়ের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তার গুরুত্ব হলো :

মানসিক চাপ কমানো:

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে একজন মা মানসিক চাপ, ভয় বা বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন। এ সময় পরিবারের সহযোগিতা, বিশেষ করে স্বামীর মানসিক সমর্থন, এই চাপ কমাতে সাহায্য করে।

গৃহস্থালির কাজে সাহায্য:

ভারী কাজ এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই পরিবারের উচিত তাকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখা এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য করা। এটি মায়ের শারীরিক ক্লান্তি কমায় এবং তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেয়।

ভালোবাসা, সম্মান ও মানসিক সমর্থন:

একজন গর্ভবতী মায়ের প্রয়োজন ভালোবাসা ও সম্মান। তাকে বুঝতে দেওয়া যে তিনি একা নন, এবং তার কষ্টকে পরিবার গুরুত্ব দিচ্ছে—এই অনুভূতি তার মনোবলকে অনেক শক্তিশালী করে। এটি মায়ের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে এবং তার মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করে।

সুতরাং, গর্ভকালীন সময়ে একজন মায়ের সুস্থতার জন্য শারীরিক যত্নের পাশাপাশি পরিবার ও স্বামীর ভালোবাসা, সম্মান এবং সমর্থন অত্যন্ত জরুরি।

সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের জন্য করণীয়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

একজন মুসলিমের প্রতিটি কাজই ইবাদত, যদি তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে অনেকেই উদাসীন এবং বিধর্মীদের রীতি অনুসরণ করে। অথচ, সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি এবং আমাদের সন্তানকে ইসলামের পথে গড়ে তুলতে পারি।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকেন করণীয় :

একটি শিশু পৃথিবীতে আসার পর তার প্রথম কয়েক মিনিটের যত্নের ওপর তার সুস্থ জীবন অনেকাংশে নির্ভর করে। চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক, যা তার জীবনকে সুরক্ষিত করে।

১. শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখা:

জন্মের পরপরই নবজাতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলো ভালোভাবে শ্বাস নেওয়া। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর মুখ ও নাকে এক ধরনের পিচ্ছিল পদার্থ (মিউকোনিয়াম) জমে থাকে। এই পদার্থ দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরি, যাতে শিশু সহজে শ্বাস নিতে পারে। এটি পরিষ্কার করার জন্য পরিষ্কার ও নরম কাপড় বা আঙুল ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুকে উল্টো করে ধরে ঝাঁকানো বা পিঠে জোরে থাপ্পড় দেওয়া উচিত নয়, কারণ এতে শিশুর ক্ষতি হতে পারে।

২. শরীর শুকনো ও উষ্ণ রাখা:

নবজাতকের শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই জন্মের পরপরই একটি পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও নরম কাপড় দিয়ে তার পুরো শরীর ভালোভাবে মুছে দিতে হবে। এই সময়ে শিশুকে গোসল করানো যাবে না, কারণ এতে তার শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে যাবে। শরীর মোছার পর শিশুকে নতুন ও শুকনো কাপড়ে মুড়ে মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে রাখা খুবই উপকারী। এতে শিশু উষ্ণ থাকে এবং মায়ের হৃদস্পন্দন অনুভব করে নিরাপদ বোধ করে, যা তার মানসিক বিকাশেও সহায়তা করে।

৩. অপরিচ্ছন্নতা দূর করা: নবজাতকের গোসল

নবজাতক শিশুকে জন্মের পরপরই গোসল করানো উচিত নয়। এর প্রধান কারণ হলো ‘ভারনিক্স কেসিওসা’ (vernix caseosa) নামক একটি সাদা, মোমের মতো পাতলা আবরণ, যা শিশুর ত্বককে ঢেকে রাখে। এই ভারনিক্স কেসিওসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু শিশুর ত্বককে শুষ্ক হওয়া থেকে রক্ষা করে না, বরং এটি একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করে। এতে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ফাঙ্গাল উপাদান থাকে, যা শিশুকে বিভিন্ন ধরনের জীবাণু সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এটি শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতেও সহায়তা করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নষ্ট করা উচিত নয়। তাই জন্মের ২৪ ঘণ্টা পর যখন শিশুর শরীর ও পরিবেশের সাথে কিছুটা মানিয়ে নেয়, তখন ধীরে ধীরে গোসল করানো যেতে পারে। এই সময় পর্যন্ত শুধুমাত্র শুকনো, পরিষ্কার কাপড় দিয়ে শিশুর শরীর আলতো করে মুছে দেওয়াই যথেষ্ট। এটি শিশুকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

৪. নবজাতকের নাভির যত্ন

নবজাতকের নাভির যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি সংক্রমণের একটি সম্ভাব্য প্রবেশপথ। জন্মের পর পরই যখন নাড়ি কাটা হয়, তখন নাভির অবশিষ্ট অংশটুকু সঠিকভাবে যত্ন না নিলে সেখানে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে, যা শিশুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। নাভির সঠিক যত্ন নেওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে দেওয়া হলো:

ক. শুষ্ক ও পরিষ্কার রাখা:

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নাভিকে সবসময় শুকনো ও পরিষ্কার রাখা। নাভিতে কোনো ধরনের ময়লা বা ভেজা ভাব যেন না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

খ. তেল বা পাউডার ব্যবহার না করা:

নাভির ওপর কোনো ধরনের তেল, পাউডার বা অ্যান্টিসেপটিক লোশন ব্যবহার করা উচিত নয়। এতে নাভি আরও ভেজা হতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গ. খোলা রাখা:

নাভিকে বাতাস লাগতে দেওয়া ভালো। ডায়াপার পরানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন ডায়াপার নাভির ওপর না আসে। প্রয়োজনে ডায়াপারের উপরের অংশটি ভাঁজ করে দিতে হবে।

ঘ. স্বাভাবিকভাবে পড়ে যেতে দেওয়া:

নাভি সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই শুকিয়ে ঝরে পড়ে যায়। এই প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত করার জন্য কোনো ধরনের জোর করা বা টানাটানি করা যাবে না।

ঙ. চিকিৎসকের পরামর্শ:

যদি নাভিতে কোনো অস্বাভাবিকতা, যেমন লালচে ভাব, ফোলা, পুঁজ বা দুর্গন্ধ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

এই সহজ নিয়মগুলো মেনে চললে নবজাতকের নাভি দ্রুত ও নিরাপদে শুকিয়ে যাবে, এবং সে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে।

৫. মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো

জন্মের পর সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারী কাজ হলো তাকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো। বিশেষ করে, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে দুধ পান করানো উচিত। এই সময়ের মধ্যে মায়ের বুক থেকে যে প্রথম দুধ বের হয়, তাকে কলোস্ট্রাম (Colostrum) বলা হয়।

কলোস্ট্রামের গুরুত্ব:

ক. প্রাকৃতিক টিকা: কলোস্ট্রামে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডি এবং পুষ্টি উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলো নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে এবং তাকে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। একে শিশুর প্রথম প্রাকৃতিক টিকাও বলা যায়।

খ. হজম সহজ: কলোস্ট্রাম হালকা ও সহজে হজমযোগ্য, যা নবজাতকের পরিপাকতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত। এটি শিশুর হজম প্রক্রিয়া শুরু করতে সাহায্য করে।

গ. গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি: এতে ভিটামিন, মিনারেল এবং প্রোটিনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে, যা শিশুর দ্রুত শারীরিক বিকাশে সহায়তা করে।

শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ালে মা ও শিশু উভয়ের মধ্যে এক গভীর মানসিক বন্ধন তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নবজাতককে জন্মের প্রথম ৬ মাস শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর সুপারিশ করে। এটি শিশুর সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।

৬. টিকা ও চিকিৎসা সেবা

সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে জন্মের পরপরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো শিশুকে সম্ভাব্য রোগ থেকে রক্ষা করা এবং তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। শিশুকে জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা দেওয়া হয়। যেমন- বিসিজি (BCG): এই টিকা যক্ষ্মা রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে। এরপর শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার রোগ প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন টিকা প্রদান করা হয়।

চিকিৎসা পরীক্ষা:

টিকা প্রদানের পাশাপাশি চিকিৎসক শিশুর সার্বিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান উচিত। যেমন-

ক. হিয়ারিং স্ক্রিনিং টেস্ট (Hearing Screening Test): শিশুর শ্রবণশক্তি স্বাভাবিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই পরীক্ষা করা হয়।

খ. জন্মকালীন ওজন ও উচ্চতা নির্ণয়: শিশুর সুস্থতার একটি প্রাথমিক সূচক হলো তার জন্মকালীন ওজন ও উচ্চতা। এ দুটি পরিমাপ করে চিকিৎসক শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পান।

গ. শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন : শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দনের হার স্বাভাবিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।

ঘ. ত্বকের রঙ ও রিফ্লেক্স : ত্বকের রঙ দেখে শিশুর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা অনুমান করা হয়। এছাড়াও, শিশুর জন্মগত রিফ্লেক্সগুলো (যেমন: গ্রাসপিং রিফ্লেক্স) পরীক্ষা করা হয়।

এই পরীক্ষাগুলো নিশ্চিত করে যে শিশু সুস্থ আছে এবং তার কোনো বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। এই পদক্ষেপগুলো শিশুর জীবনের প্রথম ধাপেই তার জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

৭. মায়ের কোলে রাখা ও ভালোবাসা দেওয়া

চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ব—উভয়ই একমত যে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর জন্য মায়ের কোলে থাকা এবং ভালোবাসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল শারীরিক উষ্ণতা এবং নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং শিশুর মানসিক ও আবেগিক বিকাশেও এর অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে।

ক. মায়ের গায়ের গন্ধ ও বুকের উষ্ণতা:

নবজাতক শিশু মায়ের গায়ের গন্ধে সবচেয়ে বেশি শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করে। এটি তার পরিচিত পরিবেশ এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অনুভূতি তৈরি করে, যা তার স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। মায়ের বুকের উষ্ণতা শিশুর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতেও সহায়তা করে। এই ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শকে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ (Kangaroo Mother Care) বলা হয়, যা অপরিণত শিশুদের জন্যও অত্যন্ত কার্যকর।

খ. মানসিক ও আবেগিক বন্ধন:

মা-বাবার ভালোবাসা, কোমল আচরণ, এবং স্পর্শ শিশুর মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যখন শিশু মা-বাবার কাছ থেকে ভালোবাসা ও মনোযোগ পায়, তখন তার মধ্যে বিশ্বাস এবং নিরাপত্তার অনুভূতি গড়ে ওঠে। এই প্রাথমিক বন্ধন শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে এবং তাকে আবেগিকভাবে স্থিতিশীল করে তোলে। নিয়মিত কোলে নেওয়া, আলতো করে আদর করা, এবং শান্ত কণ্ঠে কথা বলা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

সুতরাং, সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকে কেবল শারীরিক যত্ন দিলেই হবে না, বরং তাকে পর্যাপ্ত ভালোবাসা ও মানসিক সহায়তাও দিতে হবে। এটি শিশুর সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একটি অপরিহার্য ধাপ।

ইসলামি শরীয়তের আলোকেন করণীয় :

১. কন্যা সন্তানের জন্য মন খারাপ করা যাবে নাঃ

সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, তা নিয়ে যুগ যুগ ধরে সমাজে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করে। বেশিরভাগ পরিবারই পুত্রসন্তান কামনা করে, কিন্তু সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে, তা সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। জাহেলি যুগে কন্যা সন্তানকে অপমান মনে করে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। কিন্তু ইসলাম এই বর্বরতাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলামে ছেলে ও মেয়ে উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তাই এ ধরনের বৈষম্য দূর করে নবজাতক ছেলে হোক বা মেয়ে, তাকে সাদরে গ্রহণ করা উচিত।

এখন অবশ্য জাহেলি যুগের মত কবর দেয়া হয় না, তবে ইসলামি জ্ঞান যাদের কম তারা মন খারাপ করে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِٱلْأُنثَىٰ ظَلَّ وَجْهُهُۥ مُسْوَدًّا وَهُوَ كَظِيمٌ

আর যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত। (সুরা নহল ১৬:৫৮)

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ  یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕ  یَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّیَہَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّکُوۡرَ ۙ

আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তা’ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। (সুরা আশ শুরা ৪২:৪৯)

ত্র বা কন্যা সন্তান জন্মদান সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন, এতে স্বামী বা স্ত্রীর কোনো হাত নেই। তাই এ নিয়ে কাউকে দোষারোপ না করে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া উচিত। আল্লাহ হয়তো এর মধ্যে কল্যাণ রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বহু হাদিসে কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাই যদি কন্যা সন্তানের কারণে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি, তবে কন্যা সন্তানই আমাদের জন্য সর্বোত্তম।

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

مَنِ ابْتُلِيَ بِشَيْءٍ مِنَ الْبَنَاتِ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ

যে ব্যক্তি তার কন্যা সন্তানদের জন্য কোনরকম পরীক্ষার সম্মুখীন হয় এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরলে, তা তার জন্য জাহান্নাম ঢাল হবে।  সুনানে তিরমিজি : ১৯১৩

উকবা ইবনে ’আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি, কারো তিনটি কন্যা সন্তান থাকলে এবং সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করলে, যথাসাধ্য তাদের পানাহার করালে ও পোশাক-আশাক দিলে, তারা কিয়ামতের দিন তার জন্য জাহান্নাম থেকে অন্তরায় হবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৬৯, আহমাদ : ১৬৯৫০, সহীহাহ : ৩৯৪

এই সকল হাদিসের আলোকে বুঝা যায় সঠিকভাবে কন্যা সন্তান লালন পালন করে, দ্বীনের উপর রাখতে পারলে আখেরাত নাজাতের অসিলা হয়ে যাবে

২. সন্তান জম্মের জন্য মহান আল্লাহ শুকরিয়া আদায় করাঃ

এই পৃথিবীতে কত মানুষ আছে যারা শত চেষ্টা করেও সন্তানের পিতা মাতা হতে পারেন নাই। অথচ মহান আল্লাহ তার নিজ অনুগ্রহে আপনাকে একট সন্তান দান করেছেন।  তাই সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে আল্লাহর প্রসংশা করা, তার শুকরিয়া আদায় করা ও সন্তানের জন্য দো‘আ করা খুবই জরুরী। মহান আল্লাহ বলেন,

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ

আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সুরা ইবরাহিম ১৪:৭

বৃদ্ধ বয়সে মহান আল্লাহ যখন ইবরাহীম (আঃ) কে ইসমাঈল (আঃ)  ও ইসহাক (আঃ) দান করেন খনিত তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। তিনি যে ভাষায় মহান আল্লাহ শুকরিয়া করেছিলেন পবিত্র কুরআনে তা তুলে ধরা হয়েছ। ইবরাহীম (আঃ) দুআ ছিল। মহান আল্লাহ বলেন-

﴿ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِي وَهَبَ لِي عَلَى ٱلۡكِبَرِ إِسۡمَٰعِيلَ وَإِسۡحَٰقَۚ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ ٣٩ رَبِّ ٱجۡعَلۡنِي مُقِيمَ ٱلصَّلَوٰةِ وَمِن ذُرِّيَّتِيۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلۡ دُعَآءِ

সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বৃদ্ধ বয়সে আমাকে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দো‘আ শ্রবণকারী। হে আমার রব, আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও, হে আমাদের রব! আর আমার দোআ কবুল করুন। সূরা ইবরাহিম ১৪:৩৯-৪১

সন্তান-সন্ততি বান্দার প্রতি আল্লাহর উপহার। কারণ, সুসন্তান জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সন্তানকে মানবজীবনের সৌন্দর্য ও রূপ বলা হয়েছে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَلۡمَالُ وَالۡبَنُوۡنَ زِیۡنَۃُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَالۡبٰقِیٰتُ الصّٰلِحٰتُ خَیۡرٌ عِنۡدَ رَبِّکَ ثَوَابًا وَّخَیۡرٌ اَمَلًا

সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা। আর স্থায়ী সৎকাজ তোমার রবের নিকট প্রতিদানে উত্তম এবং প্রত্যাশাতেও উত্তম। সুরা কাহাব : ৪৬

৩. সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের জন্য প্রথম করণীয় কাজ কানে আজান প্রদানঃ

উবাইদুল্লাহ ইবনু আবূ রাফি (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন,

رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَذَّنَ فِي أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلَاةِ

ফাতিমাহ (রাঃ) যখন আলী (রাঃ)-এর পুত্র হাসান (রাঃ)-কে প্রসব করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তার কানে সালাতের আযান ন্যায় আযান দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ : ৫১০৫, সুনানে তিরমিজি ১৫১৪)

৪. ডান কানে আযান এবং বাম কানে ইকামত দেয়া সুন্নাহ সম্মত আমল নয়ঃ

এই সম্পর্কিত একটি জাল হাদিসটি হলোঃ

مَنْ وُلِدَ لَهُ وَلَدٌ فَأَذَّنَ في أُذُنِهِ الْيُمْنَى وَأَقَامَ في أُذُنِهِ الْيُسْرَى لَمْ تَضُرَّهُ أُمُّ الصِّبْيَانِ

যদি কারো সন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং সে তার ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেয় তবে উম্মুস সিবইয়ান’ (জিন) তার ক্ষতি করবে না।’’ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীসটিকে জাল বলেছেন। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৬৫২

যে ব্যাক্তির কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে, অতঃপর তার ডান কানে আজন এবং বাম কানে ইকামত দেয়া হবে, বাচ্চাঁদের মা (শয়তান) তার কোন অনিষ্ঠ করতে পারবে না। মুসনাদ আবূ ইয়ালা, চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৬০২। শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী (রহ.) বলেন জাল বলেছেন। সিলসিলা আহাদিস আস জঈফা, হাদিস নম্বর ৩২১

৫. তাহনীক করা

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় তাহনিক (تَحْنِيكِ) হলো, একজন প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তির দ্বারা খেজুর বা মিষ্টি জাতীয় কিছু চিবিয়ে নবজাতক শিশুর মুখে দেয়া। একটি নবজাতক শিশুর মুখের তালুতে মধু, মিষ্টি রস বা চাপা খেজুর দিয়ে মালিশ করার একটি ইসলামিক অনুষ্ঠানের নামকে তাহনিক বলা হয়।

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার একটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে আমি তাকে নিয়ে নবী ﷺ এর কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহীম। তারপর খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। সে ছিল আবূ মূসার বড় সন্তান। (সহিহ বুখারি ৫৪৬৭)

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। যে, নবী ﷺ একটি শিশুকে নিজের কোলে উঠিয়ে নিলেন। তারপর তাকে তাহনীক করালেন। শিশুটি তাঁর কোলে প্রসাব করে দিল। তখন তিনি পানি আনতে বললেন এবং তা (প্রস্রাবের জায়গায়) ঢেলে দিলেন। সহিহ বুখারী : ৬০০২, সহিহ মুসলিম : ৫৪৯

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উম্মু সুলাইম (রা.) যখন একটি সন্তান প্রসব করলেন তখন আমাকে জানালেন, হে আনাস! শিশুটিকে দেখ, যেন সে কিছু না খায়, যতক্ষণ না তুমি একে নবী ﷺ এর নিকট নিয়ে যাও, তিনি এর তাহনীক করবেন। আমি তাকে নিয়ে গেলাম। দেখলাম, তিনি একটি বাগানে আছেন, আর তাঁর পরনে হুরাইসিয়া নামের চাদর আছে। তিনি যে উটে করে মাক্কাহ বিজয়ের দিনে অভিযানে গিয়েছিলেন তার পিঠে ছিলেন। সহিহ বুখারী ৫৮২৪, সহিহ মুসলিম ২১১৯

আসমা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তখন তাঁর পেটে ছিলেন আবদুল্লাহ্ ইবনু যুবায়ের, তিনি বলেন, আমি এমন সময় হিজরত করি যখন আমি আসন্ন প্রসবা। আমি মদিনায় এসে কুবা’তে অবতরণ করি। এ কুবায়ই আমি পুত্র সন্তানটি প্রসব করি। এরপর আমি তাকে নিয়ে নবী ﷺ এর কাছে এসে তাঁর কোলে দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনালেন এবং তা চিবিয়ে তার মুখে থুথু দিলেন। কাজেই সর্বপ্রথম যে বস্তুটি আবদুল্লাহর পেটে গেল তা হল নবী ﷺ এর থুথু। নবী ﷺ সামান্য চিবানো খেজুর নবজাতকের মুখের ভিতরের তালুর অংশে লাগিয়ে দিলেন। এরপর তার জন্য দু’আ করলেন এবং বরকত চাইলেন। তিনি হলেন প্রথম নবজাতক সন্তান যিনি হিজরতের পর মুসলিম পরিবারে জন্মলাভ করেন। সহিহ বুখারি : ৩৯০৮

নোট : আমাদের সমাজে একটি ভুল প্রচলন যার জন্য সন্তানের ক্ষতির পাশাপাশি ইসলামের ও দুর্নাম হয়। অনেকে তাহনিক বলতে সম্পূর্ণ একটব খেজুর চাবিয়ে নবজাকতে মুখে প্রদান করা বুঝে থাকে থাকে। আপনিই বলুন যে বাচ্ছা এখনও তরল খেতে পারেনা সে কি করে শক্ত খাবার খাবে। তাহনিক করার উদ্দেশ্য হলো, খাবারের পথ খুলে দেয়া ও বরকত লাভ। এই জন্য খেজুর চিবান লালা বা রস তার মুখের তাতুলে আলতভাবে দিয়ে দেয়া। অনেক ডাক্তারও বিষয়টি না জানার কারনে তাহনিক করাকে নিরুত্সাহিত করে থাকে। ডাক্তার কেন? একজন সাধারণ লোকও নবজাতকের মুখে একটি আস্ত খেতুর দিতে সম্মত হবে না। অথচ সঠিক পদ্ধতিতে তাহনিক করা সুন্নাহর পাশাপাশি বিজ্ঞান সম্মত কাজ। তাহনীক মুখের পেশীর ব্যায়ামও করে এবং মুখের মধ্যে রক্ত ​​সঞ্চালনে সাহায্য করে। এটি শিশুকে মায়ের দুধ চুষতে ও খেতে সক্ষম হতে সাহায্য করতে পারে। এমন কি যে সকল নবজাতক শিশু হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তের গ্লুকোজ কম) নিয়ে জম্ম গ্রহন করে তাদের জন্য তাহনিক প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে বলে কৃতিত্ব দেওয়া হয়।

৬. সন্তার জন্মের সুসংবাদ সবাই জানিয়ে দেওয়া

সন্তান ভূমিষ্ঠের সুসংবাদ প্রিয়জনদের জানানো নবীদের সুন্নত। আবার সংবাদ জানার পর মা–বাবাকে মোবারকবাদ দেওয়া এবং খুশি প্রকাশ করাও সওয়াবের কাজ। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে,

یٰزَکَرِیَّاۤ اِنَّا نُبَشِّرُکَ بِغُلٰمِۣ اسۡمُہٗ یَحۡیٰی ۙ لَمۡ نَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ قَبۡلُ سَمِیًّا

‘হে যাকারিয়্যা, আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে কাউকে আমি এ নাম দেইনি’। সূরা মারইয়াম ১৯:৭

এই ভাবে সন্তান জম্মের আগে ইবরাহিম (আ.) কে সুসংবাদ প্রদান করা হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

فَاَوۡجَسَ مِنۡہُمۡ خِیۡفَۃً ؕ قَالُوۡا لَا تَخَفۡ ؕ وَبَشَّرُوۡہُ بِغُلٰمٍ عَلِیۡمٍ

এতে তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হল। তারা বলল, ‘ভয় পেয়োনা, তারা তাকে এক বিদ্বান পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল’। সুরা জারিয়াত ৫১:২৮

সন্তান মহান আল্লাহর দেওয়া সেরা নেয়ামত। বাবা মার জন্য দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। কারণ দুনিয়াতে চেষ্টা করলে অনেক কিছুই পাওয়া যায় কিন্তু চাইলে সন্তান পাওয়া সম্ভব নয়। উপরের দুটি আয়াতেও মহান আল্লাহ সন্তান প্রদানকে সুসংবাদ বলে ঘোষনা করা হয়ে। কাজেই সন্তান জম্মের সাথে সাথেই আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাইকে জানিয়ে দেওয়া উচিত।

এর অর্থ, মাতৃগর্ভে বাচ্চার গজানো চুল, তা মানুষ হোক অথবা জীব-জন্তু।

৭. সপ্তম দিনে আকিকার করা

সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সকল শিশুই তার আকীকার সাথে দায়বদ্ধ (বন্ধক) অবস্থায় থাকে। জনুগ্রহণ করার সপ্তম দিনে তার পক্ষে যবেহ করতে হবে, তার নাম রাখতে হবে এবং তার মাথা নেড়া করতে হবে। সুনানে তিরমিজি : ১৫২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১৬৫

২. আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (জন্মের) সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইনের আকীকা দিয়েছেন, তাঁদের নাম রেখেছেন এবং তাঁদের মাথা থেকে কষ্ট (চুল) দূর করেছেন। বাইহাকী : ১৯০৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৩১১

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান ও হুসাইনের (জন্মের) সপ্তম দিন রাসূলুল্লাহ ﷺ দু’টি ছাগল দিয়ে আকীকা দেন এবং তার মাথার কষ্ট দূর করার নির্দেশ দেন। আর তিনি বলেন, ‘তাঁর (আল্লাহর) নামে জবাই করো এবং বলো, বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, হে আল্লাহ, আপনার কাছে অমুকের জন্য এ আকীকা। বাইহাকী : ১৯৭৭২, মুসনাদ আবী ইয়ালা : ৪৫২১

 ৮. সপ্তম দিনে সম্বব না হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তম দিনে দিলেও যথেষ্ট হবেঃ

সস্তম দিন ছাড়া অন্য কোন দিন সম্পর্কে কোন সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। এই সম্পর্ক একটি দুর্বল হাদিসে উম্মে কুরজ এবং আবু কুরজের সূত্রে, বর্ণিত, তারা বলেন, আব্দুর রহমান বিন আবী বাকর বংশের জনৈকা মহিলা মানত করে যে, আব্দুর রহমানের স্ত্রী যদি বাচ্চা প্রসব করে, তাহলে আমরা উঁট যবাই করব। এ কথা শ্রবণ করে আয়েশা (রা.) বলেন, না। বরং সুন্নাত বা উত্তম হচ্ছে ছেলের পক্ষ হতে দু’টি ছাগল আর মেয়ের পক্ষ হতে একটি ছাগল আকিকা দেয়া। হাড় গোটা রেখে অঙ্গের জোড় ছাড়িয়ে আলাদা করবে। তার মাংস খাওরা হবে ও সাদকা করা যাবে। কিন্তু ঐ কর্ম গুলো হতে হবে সাত দিনে, সাত দিনে-না পারলে ১৪ দিনে, ১৪ দিনে না পারলে ২১ দিনে।  মুহাদ্দিস হাকিম নিশাপুরী (৪০৫ হিঃ), মুস্তাদরাক আল হাকিম

 ইমাম তিরমিযী (রহ.) ১৫২২ নম্বর হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এ হাদীস মোতাবিক অভিজ্ঞ আলিমগণ আমল করেছেন। তারা মনে করেন শিশু জন্মগ্রহণ করার সপ্তম দিনে তার পক্ষে আকীকা করাটা মুস্তাহাব, সপ্তম দিনে অক্ষম হলে চৌদ্দতম দিনে এবং সেই তারিখেও অক্ষম হলে একুশতম দিনে। তারা আরো বলেন, যে ধরনের বকরী কুরবানীর জন্য বৈধ সেই ধরনের বকরী আকীকার জন্যও বৈধ।

৯. সপ্তম দিনে নব জাতকের মাথা মুন্ডন করে হবে

সামুরা ইবন জুনদুব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ  ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক শিশু তার ’আকীকার বিনিময়ে (আল্লাহর নিকট) বন্ধকস্বরূপ থাকে। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ হতে কুরবানী করবে এবং তার মাথা মুন্ডন করে নাম রাখবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১৬৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২৮৩৮

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (জন্মের) সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইনের আকীকা দিয়েছেন, তাঁদের নাম রেখেছেন এবং তাঁদের মাথা থেকে কষ্ট (চুল) দূর করেছেন। (বাইহাকী : ১৯০৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৩১১)

আমর ইবনু শুআইব (রাহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখতে, মাথা মুণ্ডন করতে এবং আকীকা করতে আদেশ করেছেন। সুনানে তিরমিজি : ২৮৩২ ১৫২৮

১০. শিশু জন্মের সপ্তম দিনে চুল কেটে সমপরিমান রুপার মুদ্রা দান করা

আলী ইবনু আবী তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, একটি বকরী দ্বারা রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসানের আকীকা করেন এবং বলেনঃ হে ফাতিমা! তার মাথা নেড়া করে দাও এবং তার চুলের ওজনের অনুরূপ রূপা দান কর। তদানুযায়ী আমি তার চুল ওজন করলাম এবং তার ওজন এক দিরহাম বা তার কাছাকাছি হয়। সুনানে তিরমিজি : ১৫১৯

আবূ রাফি (রা.) হতে বর্ণিত, ফাতিমা (রা.) যখন হাসান (রা.) কে জন্ম দিলেন তখন নবী ﷺ কে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমার ছেলের মাথার চুল কি রক্ত দ্বারা মালিশ করে দিবো না? তিনি বললেন, না বরং তার চুল মুড়িয়ে ফেলো এবং উক্ত চুল ওজন করে সমপরিমাণ রৌপ্য মুদ্রা সাদাকা কর আহলুস সুফফাবাসীদের উপর। তুহফাতুল আহওয়াযী ৪র্থ খন্ড, হাদিস  : ১৫১৯

১১. সপ্তম দিনই সন্তানের নাম রাখা

সামুরা ইবন জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ  ﷺ বলেছেন, প্রত্যেক শিশু তার ’আকীকার বিনিময়ে (আল্লাহর নিকট) বন্ধকস্বরূপ থাকে। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ হতে কুরবানী করবে এবং তার মাথা মুন্ডন করে নাম রাখবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩১৬৫, সুনানে আবূ দাউদ : ২৮৩৮

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (জন্মের) সপ্তম দিনে রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইনের আকীকা দিয়েছেন, তাঁদের নাম রেখেছেন এবং তাঁদের মাথা থেকে কষ্ট (চুল) দূর করেছেন। বাইহাকী : ১৯০৫৫; সহীহ ইবন হিব্বান : ৫৩১১

আমর ইবনু শুআইব (রাহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখতে, মাথা মুণ্ডন করতে এবং আকীকা করতে আদেশ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি : ২৮৩২ ১৫২৮

ক. উত্তম নাম আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান, ইবরাহিম 

আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট তোমাদের নামসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম নাম আবদুল্লাহ এবং আবদুর রহমান। সুনানে তিরমিযী : ২৮৩৩, ইবনু মাজাহ : ৩৭২৮, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১০৪০

আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার একটি পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলে আমি তাকে নিয়ে নবী ﷺ এর কাছে গেলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহীম। তারপর খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিলেন এবং তার জন্য বরকতের দুআ করে আমার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। সে ছিল আবূ মূসার বড় সন্তান। সহিহ বুখারি : ৫৪৬৭,  ৬১৯৮

খ. আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত নামঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাআলার নিকট কিয়ামত দিবসে এ ব্যাক্তির নাম সব চাইতে ঘৃণিত, যে তার নাম ধারণ করেছে মালিকাল আমলাক বা রাজাধিরাজ। (সহিহ বুখারি ৬২০৫)

এমনই কিছু শব্দ যা উপাধি বা নাম হিসাবে আমাদের দেশে ব্যবহার করা হয়। যেমন- শাহ জাহান, শাহান শাহ, কাজিউল কুজাত, হাকিমুল হুক্কাম,  হাকিমুল হাকিম। একই অর্থবহন করে এমন বাংলা নামও আছে। যেনম- রাজাধিরাজ, মহারাজ, জগতের বাদশাহ, বিচারকদের বিচারক, শাসকদের শাসক ইত্যাদি। প্রকৃত পক্ষ মহান আল্লাহই হলেন, রাজাধিরাজ। কিয়ামের দিন মহান আল্লাহ নিজেকে রাজাধিরাজ ঘোষণা করবেন।

১২. পুরুষ ও মহিলা উভয়ের খতনা কার

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ইব্রাহীম (আঃ) আশি বছর বয়সের পর ’কাদূম’ নামক স্থানে নিজেই নিজের খাতনা করেন। সহিহ বুখারি : ৬২৯৮

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পাঁচ প্রকার কাজ ফিতরাতের (স্বভাব ধর্মের) অন্তর্গত। (১) নাভীর নীচের লোম কেটে ফেলা, (২) খৎনাহ্ করা, (৩) গোঁফ কাটা, (৪) বগলের চুল উপড়িয়ে ফেলা এবং (৫) নখ কাটা। সহিহ বুখারি : ৫৮৮৯, ৫৮৯১, সহিহ মুসলিম : ২৫৭, ইবনে মাজাহ : ২৯২, তিরমিযী : ২৭৫৬, নাসায়ী : ৫২২৫; আবূ দাঊদ : ৪১৯৮

উম্মু আতীয়া নামক জনৈকা আনসারী থেকে বর্ণিত যে, মদীনাতে একজন মহিলা মেয়েদের খাতনা করতো। তখন নবী ﷺ তাকে বলেন, তুমি মেয়েদের লিংগাংগ্র বেশী গভীর করে কাটবে না। কেননা, এটা মেয়েদের শরীরের এমন একটা অংশ, যা পুরুষদের কাছে খুবই প্রিয়। সুনানে আবু দাউদ : ৫১৮১ ইফা.

 সা’ঈদ ইবনু যুবায়র (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, নবী ﷺ এর ওফাতের সময় আপনি বয়সে কার মত ছিলেন? তিনি বললেনঃ আমি তখন খাতনাকৃত ছিলাম। সহিহ বুখারি : ৬৩০০

সাঈদ ইবনু যুবায়র আরও বলেন, তাদের নিয়ম ছিল যে, সাবালক না হওয়া পর্যন্ত তারা খাতনা করতেন না। সহিহ বুখারি : ৬২৯৯

স্কুলে গমনের আগ পর্যান্ত

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নবজাতক ও তার মায়ের জন্য আরাম দায়ক বাস্থানের ব্যবস্থা করা

ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে, স্ত্রীর ভরণ-পোষণ এবং তার জন্য আরামদায়ক বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ইসলামে স্ত্রীর ও সন্তানের ভরণ-পোষণ অভিভাবক স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক। এটি তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বরেন-

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ

তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না।  সূরা তালাক : ৬

 আল্লাহ তায়ালা বরেন-

لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ  وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰىہُ اللّٰہُ ؕ  لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰىہَا ؕ  سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا 

সামর্থ্যবান যেন নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করে আর যার রিজক সংকীর্ণ করা হয়েছে. সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। আল্লাহ কারো ওপর বোঝা চাপাতে চান না তিনি তাকে যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী। আল্লাহ কঠিন অবস্থার পর সহজতা দান করবেন। সূরা তালাক : ৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ؕ لَا تُکَلَّفُ نَفۡسٌ اِلَّا وُسۡعَہَا ۚ

আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সাধ্যের অতিরিক্ত কোন ব্যক্তিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় না।  সুরা আল-বাকারা : ২৩৩

মুয়াবিযা বিন হাইদাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলো, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেনঃ সে আহার করলে তাকেও (একই মানের) আহার করাবে, সে পরিধান করলে তাকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে কখনও তার মুখমণ্ডল আঘাত করবে না, অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকী ত্যাগ করবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪২, ইরওয়াহ : ২০৩, মিশকাত : ৩২২৯, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫৮-১৮৬১

কুরআনের আয়াত এবং হাদিস— উভয়ই এই বিষয়টি নিশ্চিত করে যে, স্বামী তার স্ত্রীর জন্য একটি আরামদায়ক ও নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করতে বাধ্য। এই দায়িত্ব বিশেষ করে তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন পরিবারে একটি নবজাতকের আগমন হয়। নবজাতক এবং তার মায়ের সুস্থতা ও শান্তির জন্য একটি উপযুক্ত বাসস্থান অপরিহার্য, এবং ইসলামে এই দায়িত্ব স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলাম নারী ও শিশুর অধিকার ও সুরক্ষার প্রতি গভীর গুরুত্বারোপ করেছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে শিশুর বয়স অনুযায়ী খাবারের তালিকা

চিকিৎসাবিজ্ঞান শিশুর বয়স অনুযায়ী খাবারের তালিকাটি তৈরি করেছেন। তারা অনেক পরিক্ষা নিরিক্ষা করে শিশুদের জন্য যে খাবারের তালিকা তৈরি করেছেন তা  মানদণ্ড অনুযায়ী খুবই সঠিক এবং বিজ্ঞানসম্মত। প্রতিটি ধাপের পেছনেই সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে, যা শিশুর সঠিক বৃদ্ধি, বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অপরিহার্য। নিচে প্রতিটি ধাপের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো:

১. ০-৬ মাস : শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ

মানবজীবনের সূচনালগ্নেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক পুষ্টি। নবজাতক শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য, শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপিত হয় জীবনের প্রথম কয়েক মাসে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেমন এ সময় শুধুমাত্র মায়ের দুধকে সর্বোত্তম খাদ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে, তেমনি ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও সহিহ হাদিসও মায়ের দুধের গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। এখানে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞান, কুরআন-হাদিস ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে নবজাতকের প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মায়ের দুধ পান করানোর প্রয়োজনীয়তা বিশদভাবে আলোচনা করব।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে

ক. মায়ের দুধ পূর্ণাঙ্গ খাদ্য

মায়ের দুধে রয়েছে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান—প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিবডি, হরমোন ও এনজাইম। এটি প্রকৃতির সর্বোত্তম ফর্মুলা, যা শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হয়। তাই জন্মের পর প্রথম ছয় মাসে শিশুর অন্য কোনো খাবারের দরকার হয় না।

খ. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

মায়ের দুধে ইমিউনোগ্লোবুলিন এ (IgA), ল্যাকটোফেরিন, লাইসোজাইম ও জীবন্ত সাদা রক্তকণিকা থাকে। এগুলো নবজাতককে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি, কানের ইনফেকশনসহ নানা সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এ কারণে স্তন্যপানকারী শিশুদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম।

গ. শারীরিক ও মানসিক বিকাশ

গবেষণায় প্রমাণিত যে, মায়ের দুধ খাওয়া শিশুরা মানসিকভাবে অধিক সচেতন, স্মৃতিশক্তি ভালো এবং স্কুলে তুলনামূলকভাবে ভালো ফলাফল করে। এতে উপস্থিত DHA (Docosahexaenoic acid) এবং ARA (Arachidonic acid) মস্তিষ্ক ও চোখের সঠিক বিকাশে ভূমিকা রাখে।

ঘ. মায়ের জন্য উপকারিতা

  • স্তন্যদান করলে মায়ের গর্ভাশয় দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
  • প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ কমে যায়।
  • দীর্ঘমেয়াদে স্তন ক্যান্সার ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
  • পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক জন্মবিরতির ভূমিকা রাখে।

ঙ. সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব

মায়ের দুধ সবসময় জীবাণুমুক্ত, নিরাপদ, সঠিক তাপমাত্রার এবং বিনামূল্যে পাওয়া যায়। এটি পরিবারের আর্থিক চাপ কমায় এবং কৃত্রিম দুধ বা বোতলজাত খাবারের জটিলতা থেকে রক্ষা করে।

কুরআনের আলোকে

ইসলামে শিশুর জন্য মায়ের দুধকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ক. পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করানো

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ؕ وَعَلَی الۡمَوۡلُوۡدِ لَہٗ رِزۡقُہُنَّ وَکِسۡوَتُہُنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ

আর মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ পান করাবে, (এটা) তার জন্য যে দুধ পান করাবার সময় পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মাদেরকে খাবার ও পোশাক প্রদান করা। সুরা বাকারা : ২২৩

এই আয়াত প্রমাণ করে, ইসলামে শিশুর জন্য স্তন্যপান সর্বাধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত খাদ্য।

খ. মায়ের পরিশ্রম ও সন্তানের কল্যাণ

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا ۖ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا ۖ وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا

আর আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস। সূরা আহকাফ : ১৫

এই আয়াতটি থেকে জানা যায় যে, মায়ের গর্ভে থাকার সর্বনিম্ন সময়কাল এবং দুধ পান করানোর সর্বোচ্চ সময়কাল হলো মোট ত্রিশ মাস। যদি কোনো সন্তান গর্ভে ছয় মাস থাকে, তাহলে তাকে চব্বিশ মাস (অর্থাৎ দুই বছর) দুধ পান করানো যেতে পারে। এই আয়াতটিও দুই বছর দুধ পান করানোর ধারণাকে সমর্থন করে।

গ. দুধ ছাড়ানোর সময়সীমা

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَوَصَّیۡنَا الۡاِنۡسَانَ بِوَالِدَیۡہِ ۚ حَمَلَتۡہُ اُمُّہٗ وَہۡنًا عَلٰی وَہۡنٍ وَّفِصٰلُہٗ فِیۡ عَامَیۡنِ

আমিতো মানুষকে তার মাতাপিতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। মা সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সূরা লুকমান : ১৪

আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে শিশুর স্বাভাবিক স্তন্যপানের সময়কাল হলো দুই বছর পর্যন্ত।

চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং কুরআন-হাদিসের এই আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, নবজাতকের জন্য প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানো একটি সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত এবং কল্যাণকর বিষয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান এর বৈজ্ঞানিক কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছে, আর ইসলাম ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব ও নির্দেশনা দিয়েছে। এই দুই ভিন্ন ধারা একই লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে, যা মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম পথ।

২. ৬ মাস – ১২ মাস : বুকের দুধের পাশাপাশি নরম খাবার

এই পর্যায়কে বলা হয় “কমপ্লিমেন্টারি ফিডিং” (Complementary Feeding) বা সম্পূরক খাবার দেওয়ার সময়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এই সময়ে বুকের দুধের পাশাপাশি নরম খাবার শুরু করার পরামর্শ দেন, কারণ:

ক. বাড়তি পুষ্টি চাহিদা :

ছয় মাস বয়সের পর শিশুর দ্রুত বৃদ্ধি হতে থাকে। শুধু বুকের দুধ আর তার পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে, এই সময়ে শিশুর আয়রন (Iron) এবং জিংক (Zinc)-এর মতো খনিজ পদার্থের চাহিদা বাড়ে, যা নরম খাবার থেকে আসে।

খ. হজমের সক্ষমতা :

ছয় মাস বয়সে শিশুর হজমতন্ত্র শক্ত খাবার গ্রহণের জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত হতে থাকে। এই সময়ে অল্প পরিমাণে নরম খাবার দেওয়া হলে তা হজমতন্ত্রকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করে তোলে।

গ. খাবার গ্রহণ শেখা:

এটি শিশুর জন্য নতুন স্বাদ ও গঠনযুক্ত খাবার পরিচয় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে নরম ভাত, ডাল, খিচুড়ি, সবজি এবং ফল দেওয়া হয় যাতে শিশু চিবানো এবং গিলতে শেখে।

ঘ. খাবারের সময়:

বুকের দুধের পাশাপাশি প্রতিদিন ২-৩ বার খাবার শুরু করা উচিত। যদি শিশু বুকের দুধ কম খায়, তাহলে খাবারের পরিমাণ ও সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে, যা আপনি ৫ বার বলে উল্লেখ করেছেন, যা সঠিক।

৩, ১২ মাস – ২ বছর : পুষ্টিকর পারিবারিক খাবার

এই সময়কে “ট্রানজিশনাল ফুডিং” (Transitional Feeding) বা পরিবর্তনশীল খাবার পর্যায় বলা হয়। এই সময়ে শিশু দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং তার শক্তি ও পুষ্টি চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।

ক. বিভিন্ন ধরনের খাবার:

এই বয়সে শিশু পরিবারের সঙ্গে একই ধরনের পুষ্টিকর খাবার খেতে পারে। ভাত-ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, শাক-সবজি এবং ফল থেকে সে প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান (প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন) পায়।

খ. স্ন্যাক্স (Snacks):

এই বয়সে শিশুরা অল্প অল্প করে বারে বারে খায়। তাই দিনে ৫ বার খাবার দেওয়া, যার মধ্যে মূল খাবারের পাশাপাশি হালকা ও পুষ্টিকর খাবার যেমন মুড়ি, বিস্কুট, ফল অন্তর্ভুক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের শক্তি সরবরাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

গ. বুকের দুধের ভূমিকা:

বুকের দুধ এ বয়সেও শিশুর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উৎস হিসেবে কাজ করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

৪. দুই বছর বা তার বেশি : পারিবারিক খাবারের সঙ্গে স্ন্যাকস

এই বয়সে শিশুর খাবার অভ্যাস অনেকটাই পূর্ণবয়স্কদের মতো হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, এই সময়ে শিশুর খাবার অভ্যাসকে স্বাস্থ্যকর দিকে পরিচালিত করা জরুরি।

নিয়মিত খাবার:

দিনে ৩ বার প্রধান খাবার এবং ২ বার হালকা ও পুষ্টিকর স্ন্যাক্স দেওয়া শিশুর জন্য একটি স্বাস্থ্যকর রুটিন তৈরি করে। এটি তার মেটাবলিজমকে সচল রাখে এবং পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করে।

শক্তি ও পুষ্টির ভারসাম্য:

প্রতিটি খাবারে শক্তিদায়ক উপাদান (তেল, কার্বোহাইড্রেট) এবং শরীরের গঠনকারী উপাদান (প্রোটিন, যেমন: মাছ, মাংস, ডিম) থাকা উচিত। এর সঙ্গে ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের জন্য সবজি যোগ করা প্রয়োজন।

শিশুর খাবারের পাশাপাশি কিভাবে শারীরিক যত্ন নিতে হবে

শিশুর খাবারের পাশাপাশি শারীরিক যত্ন নেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ খাবার শুধু পুষ্টি জোগায়, কিন্তু সঠিক শারীরিক যত্ন ছাড়া শিশুর বিকাশ সঠিকভাবে হয় না। এখানে আমি ধাপে ধাপে আলোচনা করছি—

শিশুর সঠিক শারীরিক যত্ন: চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে

১. প্রথম বছর (০-১২ মাস)

এই সময়ে শিশুর শারীরিক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ঘটে। তাই প্রথম ছয় মাস “এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং” শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হজম ব্যবস্থা এবং মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য জরুরি। মায়ের দুধের অ্যান্টিবডি বিভিন্ন রোগ থেকে শিশুকে রক্ষা করে। তাই মায়ের দুধ খাওয়ানোর শারীরিত যত্ন নিতে হবে। শিশুর ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল। নিয়মিত গোসল করানো, পরিষ্কার কাপড় ও ডায়াপার পরিবর্তন করা ত্বকের সংক্রমণ, ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

মা মাঝে মাঝে আলিঙ্গন করবে। কেননা, মায়ের স্পর্শ, আলিঙ্গন ও স্নেহ “অক্সিটোকিন” নামক হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে, যা স্নায়ু সংযোগ স্থাপন করে। এটি শিশুর মানসিক নিরাপত্তা, আত্মবিশ্বাস এবং আবেগময় বিকাশের জন্য অপরিহার্য।

টিকা : জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী টিকা দেওয়া “হার্ড ইমিউনিটি” তৈরি করে। এটি শিশুর শরীরকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ, যেমন—হাম, রুবেলা, পোলিও এবং যক্ষ্মা থেকে সুরক্ষা দেয়।

২. প্রথম দুই বছর (০-২৪ মাস)

এই সময়ে শিশু দ্রুত তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে এবং শারীরিক দক্ষতা বাড়ায়। তাই খাবারের পাশাপাশি দাঁত উঠার প্রতি খেয়াল রাখেত হবে। দাঁত ওঠার সময় নরম কাপড় দিয়ে দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার করা “দাঁতের ক্ষয়” প্রতিরোধে সাহায্য করে। এটি সঠিক দাঁতের বিকাশের জন্য জরুরি।

এ বয়সে শিশুকে হাঁটতে শেখানো, খেলাধুলা ও রোদে বের করা তার পেশী ও হাড়ের বিকাশে সাহায্য করে। সূর্যের আলো থেকে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করে, যা হাড়ের গঠনে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে।

এই বয়সে শিশুরা “কৌতূহল” দ্বারা চালিত হয়। তাই বাড়ির পরিবেশ শিশুর জন্য নিরাপদ রাখা দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য জরুরি। ধারালো বস্তু, ছোট খেলনা বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র থেকে দূরে রাখা হলে শিশু আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে।

৩. বয়স ২-৫ বছর শিশুর যত্ব :

এই পর্যায়টি শিশুর জন্য শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে তার সুষম খাবার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অতিরিক্ত শারীরিক যত্ব নিতে হবে। তাকে কোন অবস্থায়ই

“জাঙ্ক ফুড” খেতে দেওয়া যাবে না। কেননা, এ খাবারে থাকা অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি স্থূলতা এবং দাঁতের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

সে ঘরে মধ্যে দৌড়া দৌড়ি করে, খাটে লাফালাফি করে, ঘরে একটু্‌ও স্থীর থাকতে চায়না। একটি তার এ বয়সের শারীরি ব্যায়াম যা তার পেশী ও হাড়কে শক্তিশালী করার পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়াতে সাহায্য করে, যা সুস্থ ওজন বজায় রাখে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, এই বয়সের শিশুদের জন্য ১০-১২ ঘণ্টা ঘুম অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের সঠিক কার্যকারিতা, শেখার ক্ষমতা এবং স্মৃতির বিকাশে সহায়তা করে।

গল্প বলা, খেলাধুলা ও সামাজিক আচরণ শেখানো মস্তিষ্কের সিনাপটিক সংযোগ বাড়ায়, যা শিশুর বুদ্ধিমত্তা, ভাষা এবং সামাজিক দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে।

প্রথম পনের মাসে শিশুর টিনা প্রদান

শিশুদের টিকা দান আজকের যুগে একটি আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় দিকেই নানা রকম আলোচনা পাওয়া যায়। নিচে বাংলাদেশের আলোকে ধ্যান-ধারণা সংক্ষেপে তুলে ধরলাম—

১. ইসলামের আলোকে টিকা দান

ইসলাম মূলত জীবন রক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধকে উৎসাহিত করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡکُمۡ اِلَی التَّہۡلُکَۃِ ۚۖۛ وَاَحۡسِنُوۡا ۚۛ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ

এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর সুকর্ম কর। নিশ্চয় আল্লাহ সুকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন। সুরা বাকারা : ১৯৫

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ এমন কোন রোগ পাঠাননি যার আরোগ্যের ব্যবস্থা দেননি। সহিহ বুখারি : ৫৬৭৮

জাবির (রাযিঃ) এর সানাদে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন- প্রতিটি ব্যাধির প্রতিকার রয়েছে। অতএব রোগে যথাযথ ঔষধ প্রয়োগ করা হলে আল্লাহর ইচ্ছায় আরোগ্য লাভ হয়। সহিহ মুসলিম : ২২০৪

উসামা ইবনু শারীক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মফস্বলের লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আমরা কি (রোগীর) চিকিৎসা করব না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর বান্দাহগণ! তোমরা চিকিৎসা কর। আল্লাহ তা’আলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার ঔষধ বা নিরাময়ের ব্যবস্থা রাখেননি (রোগও দিয়েছেন রোগ সারাবার ব্যবস্থাও করেছেন)। কিন্তু একটি রোগের কোন নিরাময় নেই। সাহাবীগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল সে রোগটি কি? তিনি বললেনঃ বার্ধক্য। সুনানে তিরমিজি : ২০৩৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৪৩৬, সুনান আবু দাউদ : ৩৮৫৫

২. বাংলাদেশের সরকারি নীতি

বাংলাদেশ সরকার টিকা সম্প্রসারণ কর্মসুচি বা Expanded Program on Immunization (EPI) এর মাধ্যমে শিশুদের টিকা দান করে থাকে।

শিশুরা জন্ম থেকে শুরু করে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন রোগ (যেমন: যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি, হাম, পোলিও ইত্যাদি) থেকে সুরক্ষার জন্য বিনামূল্যে টিকা পায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ঘোষণা করেছে যে শিশুর টিকা ইসলাম বিরোধী নয়। বরং এটি শিশুর জীবন রক্ষায় সহায়ক।

 ৩. সামাজিক ও ধর্মীয় ধারণা

বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরণের ধ্যানধারণা দেখা যায়—

ক. ইতিবাচক ধারণা :

অধিকাংশ মানুষ টিকাকে শিশুদের রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করে এবং সরকারী উদ্যোগে টিকা গ্রহণ করে।

খ. সন্দেহপ্রবণ ধারা :

কিছু মানুষ মনে করে টিকায় ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে, বা এটি ষড়যন্ত্রমূলক। তবে ধর্মীয় আলেমরা বহুবার বলেছেন, যাচাইকৃত টিকা গ্রহণে ইসলামে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

গ. ধর্মীয় ভুল ধারণা :

কিছু গোষ্ঠী মনে করেছিল টিকা শরীয়তবিরোধী বা বন্ধ্যাত্ব ঘটায়। কিন্তু আলেম, মুফতি ও চিকিৎসকদের যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে এ ভুল ধারণা অনেকাংশে দূর হয়েছে। নিচে একটি চার্টে এ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

শিশুদের নিয়মিত টিকাদান সময়সূচি :

টিকা দেয়ার সঠিক সময়  রোগের নাম  টিকার নাম  টিকার ডোজ  ডোজের সংখ্যা  ভোজের মধ্যে নূনতম বিরতিটিকাদানের স্থান  টিকার প্রয়োগ পথ  
জম্মের পর থেকেযক্ষ্মা  বিসিজি  ০.০৫ এম এলবাহুর উপরের অংশেচামড়ার মধ্যে  
৬ সপ্তাহ ১০ সপ্তাহ ১৪ সপ্তাহ  ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বিপেন্টাভ্যালেন্ট টিকা (ডিপিটি, হেপাটাইটিস-বি, হিব)  ০.৫ এম এল  ৪ সপ্তাহবাম উরুর মধ্যভাগের বহিরাংশে  মাংসপেশী  
৬ সপ্তাহ ১০ সপ্তাহ ১৪ সপ্তাহনিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া  পিসিভি টিকা  ০.৫ এম এল  ৪ সপ্তাহবাম উরুর মধ্যভাগের বহিরাংশেমাংসপেশী  
৬ সপ্তাহ ১০ সপ্তাহ ১৪ সপ্তাহপোলিওমাইলাইটিস  বিউপিভি  ২ ফোঁটা৪ সপ্তাহমুখেমুখে
৬ সপ্তাহ ১৪ সপ্তাহআইপিভি (ফ্রাকশনাল)  ০.১ এম এল  ৮ সপ্তাহবাহুর উপরের অংশেচামড়ার মধ্যে
9 gvm I 15 gvm eqm c~Y© n‡jহোম ও রুবেলাএমআর টিকা  ০.৫ এম এল  ডাম উরুর মধ্যভাগের বহিরাংশেচামড়ার মধ্যে  

সৌজন্যে: বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন

চার ও পাঁচ এ দুই বছর ঘরে শিক্ষা গ্রহন করবে

প্রথম ৫ বছর শিশুর মানসিক নিরাপত্তার সময়। এ সময়ে মায়ের ভালোবাসা, পরিবারিক উষ্ণতা, খেলা, গল্প, গান ও কুরআন শুনে শিশুর মস্তিষ্ক গড়ে ওঠে।স্কুলের আনুষ্ঠানিক চাপ আগে শুরু হলে শিশুর মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাস কমতে পারে। তাই প্রথম চার ও পাঁচ এ দুই বছর ঘরে মায়ের কাছে শিক্ষা গ্রহন করবে। কারন-

ক. প্রাথমিক বছরগুলোতে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ

আপনি ঠিকই বলেছেন, শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৮০% বিকাশ ঘটে জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে। এই সময়টা শিশুর মানসিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই সময়ে শিশুর মানসিক চাপ দেওয়া উচিত নয়, বরং তাকে ভালোবাসা, খেলাধুলা, গল্প, এবং গান-এর মাধ্যমে শেখার সুযোগ দেওয়া উচিত। মায়ের সান্নিধ্য এবং পারিবারিক উষ্ণতা শিশুর মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আপনি বলেছেন যে, এই সময়ে কুরআন শোনালে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ভালো হয়, যা অনেক মুসলিম পরিবারে প্রচলিত একটি ধারণা।

খ. ঘরে পড়াশোনা ও স্কুলের চাপ

৪-৫ বছর বয়সে শিশুকে স্কুলে ভর্তি করলে তার উপর চাপ পড়ে, যার কারণে তার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। এই বয়সে শিশুরা যদি বাড়িতে মা-বাবার কাছে মৌলিক বিষয়গুলো যেমন – অক্ষর জ্ঞান, সংখ্যা জ্ঞান, এবং ভাষা শেখে, তাহলে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তাদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। কারণ, তখন তারা নতুন পরিবেশে নিজেকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও মানিয়ে নিতে পারবে।

গ. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের পরামর্শ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির উপযুক্ত বয়স হলো ৫+ বছর। এই তথ্যটি খুবই প্রাসঙ্গিক। তাদের মতে, ৫-৬ বছর বয়সে শিশুরা সামাজিক মেলামেশা, নিয়ম মেনে চলা এবং দলগত কাজ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। তাই এই বয়সের আগে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু না করাই ভালো। তবে প্রি-স্কুল এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন, যেখানে খেলাধুলা ও সামাজিক মেলামেশার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়।

ঘ. নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা

আপনার মতে, ঘরে বসে বাবা-মা শিশুকে যে শিক্ষা দিতে পারেন, তা স্কুলে তুলনামূলকভাবে কম শেখানো হয়। যেমন, দোয়া, কালিমা, শালীনতা, সত্য বলা, মিথ্যা থেকে দূরে থাকা ইত্যাদি। এই ধরনের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাগুলো শিশুর চরিত্র গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। ঘরে পারিবারিক পরিবেশে এই শিক্ষাগুলো শেখানো হলে শিশুরা সহজেই তা গ্রহণ করতে পারে। এই বিষয়গুলো তাদের জীবনে নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

চার ও পাঁচ এ দুই বছর প্রি-স্কুল দিতে পারেন

প্রি-স্কুল হলো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এটি ফরমাল শিক্ষার প্রথম ধাপ এবং শিশুদের সামাজিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রি-স্কুলের মূল উদ্দেশ্য-

ক. সামাজিকীকরণ:

প্রি-স্কুল শিশুদের সমবয়সীদের সাথে মেলামেশার সুযোগ করে দেয়, যা তাদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া, সহযোগিতা করা এবং অন্যদের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর মতো সামাজিক দক্ষতা তৈরি করে।

খ. মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ:

এই বয়সে শিশুদের কৌতূহল এবং শেখার আগ্রহ থাকে অনেক বেশি। প্রি-স্কুলে বিভিন্ন খেলাধুলা, ছবি আঁকা, ছড়া ও গান শেখার মাধ্যমে তাদের মনোযোগ বৃদ্ধি, স্মৃতিশক্তি এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ে।

গ. আবেগীয় বিকাশ:

শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শিশুরা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখে।

ঘ. শারীরিক বিকাশ:

 প্রি-স্কুলে দৌড়ানো, লাফানো এবং অন্যান্য খেলাধুলা শিশুদের মোটোর স্কিল (যেমন: দৌড়ানো) ও ফাইন মোটোর স্কিল (যেমন: পেন্সিল ধরা) বিকাশে সহায়তা করে।

ঙ. প্রি-স্কুল ও ডে-কেয়ারের পার্থক্য

অনেক সময় প্রি-স্কুলকে ডে-কেয়ার বা চাইল্ড কেয়ারের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। যদিও উভয় প্রতিষ্ঠানেই শিশুদের যত্ন নেওয়া হয়, তবে তাদের মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন।

ডে-কেয়ার: এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুদের তত্ত্বাবধান করা। এটি সাধারণত কাজের সময়কাল জুড়ে চলে এবং এখানে শিশুদের ঘুমের রুটিন, খাবার ও খেলাধুলার দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়।

প্রি-স্কুল : এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিশুদের শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা। এখানে শেখা-কেন্দ্রিক কার্যক্রম যেমন—বর্ণমালা, সংখ্যা এবং সাধারণ জ্ঞানের ওপর জোর দেওয়া হয়। সাধারণত এটি সীমিত সময়ের জন্য (২-৪ ঘণ্টা) পরিচালিত হয়।

সব মিলিয়ে, প্রি-স্কুল শিশুদের শুধু অক্ষর জ্ঞানই দেয় না, বরং তাদের জন্য একটি সুস্থ, সামাজিক এবং আনন্দময় পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এটি শিশুদের স্কুল জীবনের ভিত গড়ে তোলে।

প্রি-স্কুল ও বাংলাদেশ প্রক্ষপঠ

বাংলাদেশে অনেক প্রি-স্কুল আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে প্রি-স্কুলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়, যাতে তারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

চ. বাংলাদেশে প্রি-স্কুলের ধরন

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রি-স্কুল রয়েছে, যা তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং পরিচালনা ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়।

কিন্ডারগার্টেন (Kindergarten) : এটি সবচেয়ে প্রচলিত ধরন। কিন্ডারগার্টেনগুলো সাধারণত স্কুল ভবনের একটি অংশ বা একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়। এখানে অক্ষর জ্ঞান, সংখ্যা, ছড়া, গান এবং ছবি আঁকার মতো কার্যকলাপের উপর জোর দেওয়া হয়। অনেক কিন্ডারগার্টেন বাংলা এবং ইংরেজি উভয় মাধ্যমেই শিক্ষা প্রদান করে।

মন্টেসরি (Montessori) : মন্টেসরি পদ্ধতি একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাদান দর্শন অনুসরণ করে। এই ধরনের প্রি-স্কুলে শিশুরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী শিখতে পারে এবং স্ব-নির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করা হয়। এখানে শিক্ষকের ভূমিকা হলো শিশুদের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা নিজেদের গতিতে শিখতে পারে। বাংলাদেশে মন্টেসরি পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

প্লে-গ্রুপ (Play Group) : কিছু প্রি-স্কুল শুধু খেলার মাধ্যমে শিক্ষাদান করে। এই প্লে-গ্রুপগুলোতে শিশুদের সামাজিকীকরণ এবং সৃজনশীলতা বিকাশের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে একাডেমিক চাপ কম থাকে এবং শিশুরা খেলার ছলে শিখতে পারে।

বাংলাদেশের প্রি-স্কুলগুলোর বৈশিষ্ট্য ;

বাংলাদেশের প্রি-স্কুলগুলো খেলার মাধ্যমে শেখা, হাতে-কলমে শেখা এবং গল্প বলার পদ্ধতি অনুসরণ করে। এর উদ্দেশ্য হলো শিশুদের কৌতূহল বাড়ানো এবং তাদের শিখতে উৎসাহিত করা। প্রি-স্কুলের শিক্ষকরা সাধারণত শিশু মনোবিজ্ঞান এবং শিশু বিকাশের উপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। তারা শিশুদের আবেগীয়, সামাজিক এবং জ্ঞানীয় চাহিদা পূরণে সহায়তা করেন। ক্লাসরুমগুলো রঙিন এবং শিশুদের উপযোগী করে সাজানো হয়। এখানে খেলনা, বই, ছবি আঁকার সামগ্রী এবং অন্যান্য শিক্ষামূলক উপকরণ থাকে। প্রি-স্কুলের পঠনকাল সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয়, সাধারণত ২-৩ ঘণ্টার জন্য। এটি শিশুদের মনোযোগের সময়সীমা এবং তাদের দৈনন্দিন রুটিনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশে প্রি-স্কুলগুলো ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হচ্ছে। কারণ, বাবা-মা এখন শিশুর প্রাথমিক বিকাশের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন।

++ বছর হলে বাচ্চাকে স্কুল/মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিন

++ বছর বয়সে শিশুকে স্কুল/মাদ্রাসায় ভর্তি করার সিদ্ধান্তটি বাস্তবসম্মত এবং এর কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। যেমন-

১. ৫++ বছর বয়সে শিশুকে স্কুল বা মাদ্রাসায় ভর্তি করার পেছনে মূল কারণগুলো হলো:

ক. মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতি:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ-এর মতে, ৫+ বছর বয়স হলো শিশুর সামাজিক মেলামেশা, নিয়ম মেনে চলা এবং দলগত কাজ করার জন্য উপযুক্ত সময়। এই বয়সে শিশু নতুন বন্ধু তৈরি করতে, শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে মানিয়ে নিতে এবং স্কুলের নিয়মকানুন বুঝতে প্রস্তুত থাকে।

খ. শিক্ষার প্রতি আগ্রহ:

 আপনি যেমন বলেছেন, প্রথম ৪-৫ বছর ঘরে অক্ষর জ্ঞান, সংখ্যা জ্ঞান, ও ভাষা শেখানো হলে শিশু স্কুলে গিয়ে পড়াশোনার প্রতি বেশি আগ্রহ বোধ করে। কারণ, সে তখন নতুন কিছু শিখতে প্রস্তুত থাকে এবং অজানা বিষয়গুলো তার কাছে ভীতিকর মনে হয় না।

গ. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি:

ছোটবেলা থেকে স্কুলের আনুষ্ঠানিক চাপ না থাকার কারণে শিশুর মধ্যে শেখার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে। সঠিক বয়সে স্কুলে ভর্তি হলে সে সহজেই তার নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারে, যা তার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে।

ঘ. এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে শিশু তার সমবয়সীদের সাথে মেলামেশার সুযোগ পাবে, যা তার সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি করবে। ঘরে শেখা মৌলিক জ্ঞানগুলো স্কুলের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে শিশু নতুন পাঠ্যক্রম সহজেই গ্রহণ করতে পারবে এবং পড়াশোনায় ভালো ফল করবে। প্রথম বছরগুলোতে বাবা-মায়ের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা ও গল্পে অংশ নেওয়ার কারণে তাদের মধ্যে বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। এই সম্পর্ক শিশুর মানসিক বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু প্রতিপালনের কিছু কৌশল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর জন্য ছড়া বা গান না গেয়ে বরং দুআ ও কুরআন পাঠ করানো উচিত।

সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় অনেক মা-বাবা বিভিন্ন ধরনের ছড়া বা গান ব্যবহার করেন, যেমন: ‘আয় আয় চাঁদ মামা’, ‘আয় আয় টিয়ে’, ‘হাট্টিমাটিম টিম’ ইত্যাদি। এই ছড়াগুলোর হয়তো কোনো গভীর অর্থ নেই, কিন্তু শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য এগুলো যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ইসলামে শিশুদের ভালো গুণ ও আদর্শ দিয়ে লালন-পালন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে, শিশুকে ঘুম পাড়ানোর সময় যদি কোনো অর্থহীন ছড়া না গেয়ে বরং ইসলামিক দুআ, কোরআনের ছোট ছোট সূরা, বা আল্লাহর প্রশংসা করে কোনো গান শোনানো হয়, তাহলে সেটি শিশুর জন্য খুবই উপকারী হতে পারে।

ক. শিশুর কানে ভালো কথা প্রবেশ করানো: ছোটবেলা থেকেই যদি শিশু কোরআনের আয়াত বা আল্লাহর প্রশংসামূলক কথা শোনে, তাহলে তার মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব কথা তার অবচেতন মনে গেঁথে যাবে, যা ভবিষ্যতে তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে।

খ. স্মৃতিশক্তি ও মানসিক বিকাশে সহায়তা: নিয়মিত দুআ ও সূরা শুনতে শুনতে একসময় তার সেগুলো মুখস্থ হয়ে যাবে। এটি তার স্মরণশক্তি বাড়াতে সাহায্য করবে।

গ. আল্লাহর রহমত লাভ: বিশ্বাস করা হয় যে, ঘুম পাড়ানোর সময় এই ধরনের ইসলামিক পাঠ করলে শিশুর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। এতে শিশু শান্ত ও নিরাপদে ঘুমায়।

সুতরাং, মা-বাবারা চাইলে প্রথাগত ছড়া বা গানের পরিবর্তে নতুন এই পদ্ধতিটি অবলম্বন করতে পারেন। এতে শিশু ঘুমের সময় প্রশান্তি পাবে এবং তার মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশও ঘটবে।

২. রূপকথার বদলে কুরআন ও হাদিসের গল্প

শিশুদের গল্প শোনানো তাদের মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তারা কল্পনা করতে শেখে এবং নৈতিক শিক্ষা লাভ করে। আমাদের সমাজে প্রচলিত দাদি-নানিদের বলা রূপকথার গল্পগুলো, যেমন – রাজা-রানি, রাজপুত্র-রাজকন্যা বা রাক্ষসের গল্প, শিশুদের মনকে কল্পনার জগতে নিয়ে যায়। তবে এই গল্পগুলোর বেশিরভাগই কাল্পনিক এবং বাস্তব জীবনের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

রূপকথার বদলে যদি শিশুদের কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত নবী-রাসুল, সাহাবি, বা অন্যান্য সত্য ঘটনার গল্প শোনানো হয়, তাহলে তারা একই সাথে বিনোদন ও শিক্ষা লাভ করবে। এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:

বাস্তবতার শিক্ষা: কোরআন ও হাদিসের গল্পগুলো বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এসব গল্পের মাধ্যমে শিশুরা শিখতে পারে যে জীবনে সফলতা, ব্যর্থতা, এবং চ্যালেঞ্জ থাকে। তারা বুঝতে পারে যে ভালো কাজ করলে কী ফল হয় এবং খারাপ কাজ করলে কী পরিণতি হতে পারে।

আদর্শ চরিত্রের সাথে পরিচয়: এসব গল্পে আল্লাহ্‌র নবী, রাসুল, এবং সাহাবিদের মতো মহান চরিত্রদের সাথে শিশুদের পরিচয় ঘটে। তাদের সততা, সাহসিকতা, ধৈর্য, এবং ত্যাগের গল্প শুনে শিশুরা অনুপ্রাণিত হয় এবং তাদের মতো হওয়ার চেষ্টা করে।

ধর্মীয় জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি: ছোটবেলা থেকেই যদি শিশুরা কোরআন ও হাদিসের গল্প শোনে, তাহলে তাদের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞান ও মূল্যবোধের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি হয়। এটি তাদের ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং ভবিষ্যতে তাদের ধর্মীয় শিক্ষায় সাহায্য করে।

নৈতিকতার বিকাশ: এসব গল্পে সত্য, মিথ্যা, ন্যায়, অন্যায়, ভালো, মন্দ – এগুলোর স্পষ্ট ধারণা থাকে। এটি শিশুদের সঠিক-ভুল চিনতে সাহায্য করে এবং তাদের নৈতিক চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।

সুতরাং, শিশুদের গল্প শোনানোর সময় রূপকথার পরিবর্তে কোরআন ও হাদিসের সত্য গল্প শোনানোর অভ্যাস করা যেতে পারে। এতে করে শিশুরা বিনোদন পাওয়ার পাশাপাশি বাস্তব জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষা লাভ করবে।

৩. শিশুদের জন্য সঠিক বই নির্বাচন

শিশুদের মন ও মস্তিষ্কের বিকাশে বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে কোন ধরনের বই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেদিকে অভিভাবকদের বিশেষভাবে নজর রাখা উচিত। ভূত-প্রেত বা কাল্পনিক অশরীরী শক্তির গল্প নিয়ে লেখা বইগুলো শিশুদের মনে ভীতির সৃষ্টি করতে পারে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।

প্রাসঙ্গিক। শিশুদের জন্য এমন বই কেনা উচিত, যা তাদের জ্ঞান ও নৈতিকতার ভিত্তি মজবুত করতে সাহায্য করবে। বাজারে এখন অনেক ভালো মানের বই পাওয়া যায়, যেমন-

ইসলামিক শিক্ষামূলক বই: শিশুদের উপযোগী করে লেখা নবী-রাসুল এবং সাহাবিদের জীবনী, কোরআন ও হাদিসভিত্তিক গল্পের বই। এসব বই থেকে তারা মহৎ চরিত্রগুলোর আদর্শ সম্পর্কে জানতে পারবে এবং নৈতিক শিক্ষা লাভ করবে।

সাধারণ জ্ঞানের বই: বিজ্ঞান, ইতিহাস, পরিবেশ, বা অন্যান্য বিষয়ের ওপর লেখা সহজবোধ্য বই শিশুদের কৌতূহল বাড়াতে সাহায্য করবে।

এছাড়াও, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান বই পড়ুক, তাহলে আপনাকেও তাদের সামনে বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। এতে তারা বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হবে এবং এটিকে একটি ভালো অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করবে।

৩. শিশুদের খেলাধুলা ও সুস্থ বিকাশ

শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা-বাবার উচিত তাদের সাথে খেলা করা এবং বয়স অনুযায়ী খেলনা কিনে দেওয়া। খেলার সামগ্রী কেনার সময় প্যাকেটে উল্লেখিত বয়সসীমা দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে শিশুর আগ্রহ বজায় থাকে এবং খেলনাটি তার বিকাশে সঠিক ভূমিকা পালন করে।

এছাড়াও, শিশুদের শুধু কোলে-পিঠে না রেখে তাদের মাটি, বালি বা কাদার মতো প্রাকৃতিক জিনিসের সাথে খেলতে দেওয়া উচিত। এতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং তারা প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে নতুন কিছু শিখতে পারে। খেলার মাধ্যমে তারা শুধু আনন্দই পায় না, বরং তাদের সৃজনশীলতা ও জানার আগ্রহও বৃদ্ধি পায়।

৪. শিশুর সুস্থ বিকাশে মোবাইল ও টিভি থেকে দূরে রাখুন

অনেক মা-বাবা নিজেদের কাজের সুবিধার জন্য বা শিশুর কান্না থামাতে তার হাতে মোবাইল বা টিভির রিমোট তুলে দেন। তারা হয়তো সাময়িক স্বস্তি পান, কিন্তু অজান্তেই শিশুর বড় ক্ষতি করে ফেলেন।

শিশুরা যখন মোবাইল বা টিভিতে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এই ডিভাইসগুলো তাদের বাস্তব দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা কমিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, শিশু একা একা থাকতে শেখে এবং আশেপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশতে পারে না। তাই, শিশুকে সাময়িকভাবে ব্যস্ত রাখার জন্য মোবাইল বা টিভির ওপর নির্ভর না করে তার সাথে খেলার চেষ্টা করুন। তাকে বাইরে নিয়ে যান, নতুন কিছু দেখান বা বই পড়ে শোনান। এতে শিশু আপনার সাথে সুন্দর সময় কাটাবে এবং সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে।

৫. শিশুকে খাওয়ানোর সময় মোবাইল ও টিভি বন্ধ রাখুন

অনেক মা-বাবা শিশুকে খাওয়ানোর জন্য মোবাইল বা টিভি ছেড়ে দেন, যাতে শিশু সেদিকে তাকিয়ে থাকে আর সহজে খাবার খায়। যদিও এই পদ্ধতিটি সাময়িক কাজে দেয়, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খুবই ক্ষতিকর।

খাওয়ার সময় মোবাইল বা টিভিতে মনোযোগ দিলে শিশুরা খাবারের স্বাদ, গন্ধ বা গঠন বুঝতে পারে না। ফলে খাবারের পুষ্টিগুণ তাদের শরীরে সঠিকভাবে কাজ করে না। এই অভ্যাস শিশুদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করে। তাই, শিশুকে খাওয়ানোর সময় সব ধরনের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখুন। খাবারের সময়টাকে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করুন, যেখানে আপনি আপনার সন্তানের সাথে কথা বলতে পারেন এবং তাকে খাওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে পারেন।

৬. শিশুর প্রশ্নের জবাব দেওয়া: ধৈর্য ও আন্তরিকতা

শিশুরা যখন কথা বলতে শেখে, তখন তাদের মনে হাজারো প্রশ্ন উঁকি দেয়। তাদের কৌতূহল মেটাতে তারা একই প্রশ্ন বারবার করতে পারে, বা এমন প্রশ্ন করতে পারে যা আপনার কাছে সহজ বা কঠিন মনে হতে পারে। এই সময়ে বিরক্ত না হয়ে তাদের প্রতিটি প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

শিশুদের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া বা দায়সারা জবাব দেওয়া উচিত নয়। এতে তারা নিজেদের অবহেলিত মনে করতে পারে। যদি কোনো প্রশ্নের সঠিক উত্তর আপনার জানা না থাকে, তবে সততার সঙ্গে বলুন, “আমি জেনে তোমাকে পরে জানাব।” এবং অবশ্যই সেই কথা রাখুন। এভাবে আপনি শিশুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ দেখালে তাদের মধ্যে জানার আগ্রহ আরও বাড়বে, এবং তারা আপনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে শিখবে। তাদের কৌতূহলকে সম্মান করলে তারা শেখার ব্যাপারে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবে।

৭. শিশুকে আল্লাহর সাথে পরিচয়:

শিশুদের বয়স যখন একটু বাড়ে এবং তারা বুঝতে শুরু করে, তখন তাদের মহান আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত। সহজ ভাষায় তাদের বোঝানো যেতে পারে যে আল্লাহ আমাদেরকে এবং এই পুরো পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন।

তাদেরকে বোঝান যে আল্লাহ আমাদের ভালো কাজ দেখলে খুশি হন। যখন আমরা ভালো ব্যবহার করি, সত্য কথা বলি, বা অন্যকে সাহায্য করি, তখন আল্লাহ আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন এবং আমাদের প্রার্থনা শোনেন। একই সাথে, তাদের এই বিষয়টিও বোঝানো প্রয়োজন যে খারাপ কাজ করলে বা মিথ্যা বললে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। এমনকি লুকিয়ে কোনো খারাপ কাজ করলেও আল্লাহ তা দেখেন। এভাবে শিশুদের মনে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা তৈরি হবে। এটি তাদের মধ্যে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার একটি মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

৮. শিশুদের কুরআনের সাথে পরিচয়:

অনেক মুসলিম পরিবারে কুরআনকে শ্রদ্ধার নামে দূরে সরিয়ে রাখা হয়—একে স্পর্শ করা যাবে না, শুধু কাপড়ে মুড়িয়ে উঁচু তাকে রাখতে হবে, এমন ধারণা প্রচলিত আছে। এই ধরনের ভুল ধারণা শিশুদের মনে কুরআন সম্পর্কে এক ধরনের ভয় তৈরি করে।

শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকেই কায়দা বা আমপারা পড়ার পাশাপাশি সরাসরি কুরআনের মূল আরবি কপিটি হাতে ধরতে এবং দেখতে দেওয়া উচিত। এর ফলে তাদের মনে কুরআনের প্রতি কোনো অযৌক্তিক ভয় বা দূরত্ব তৈরি হবে না। বরং, তারা একে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার চোখে দেখবে। এটি তাদের পবিত্র কিতাবের সাথে একটি সরাসরি এবং ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

৯. শিশুদের সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা

শিশুরা ছোট হলেও তাদের সামনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। এমনটা ভাবা ঠিক নয় যে তারা কিছুই বুঝবে না। বরং, তাদের কৌতূহল মেটাতে এবং নতুন কিছু শেখানোর জন্য এটি একটি চমৎকার সুযোগ।

শিশুদের উপযোগী বিজ্ঞানের অনেক বই বাজারে পাওয়া যায়, যা তাদের জন্য সহজবোধ্য। এই বিষয়গুলো যখন আল্লাহর সৃষ্টির সাথে মিলিয়ে আলোচনা করা হয়, তখন তা আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। যেমন: আকাশের বিশালতা, বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্র, বা প্রকৃতির নিয়মাবলি নিয়ে কথা বলার সময় কুরআন ও হাদীসের উদাহরণ তুলে ধরা যায়। এভাবে শিশুরা শুধু বিজ্ঞানই শিখবে না, বরং আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে তাদের মনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তৈরি হবে।

১০. শিশুদের গ্রামের সাথে পরিচয় করানো

শহুরে জীবনে বেড়ে ওঠা শিশুদের অনেকেই গ্রামের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। মা-বাবার উচিত তাদের মাঝেমধ্যে গ্রামে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানকার জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

শিশুদের কৃষক, রাখাল, গবাদি পশু, ফসলের ক্ষেত ও খামার ইত্যাদি দেখানো উচিত। এতে তারা প্রকৃতির কাছাকাছি আসতে পারে এবং জীবনের মৌলিক দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারে। একইভাবে, যখন গ্রামের কোনো আত্মীয় বা মানুষজন বেড়াতে আসে, তখন তাদের প্রতি ভালো আচরণ করা জরুরি। এর মাধ্যমে শিশুরা সম্মান এবং শিষ্টাচার শিখবে এবং মানুষের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক হবে। এটি তাদের মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে সহায়তা করবে।

১১. শিশুদের ভাগ করে নিতে শেখানো

শিশুদের মধ্যে কোনো কিছু ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু, বিশেষ করে যারা একা থাকে, তারা অন্যদের সাথে জিনিসপত্র ভাগ করতে চায় না। এটি মূলত মা-বাবার প্রশিক্ষণের অভাব থেকে হয়।

মা-বাবা যদি শুরু থেকেই সচেতন থাকেন এবং শিশুকে ভাগাভাগি করার গুরুত্ব শেখান, তাহলে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব। যখন কোনো শিশু অন্য শিশুর সাথে খেলনা বা খাবার ভাগ করে নেয়, তখন তাকে উৎসাহিত করা উচিত। এর মাধ্যমে শিশু অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখে এবং তার সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে।

১২. ভাইবোনদের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখানো

যেসব পরিবারের একাধিক সন্তান আছে, সেখানে বড়দের ছোটদের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখানো খুবই জরুরি। শিশুরা নিজের থেকে সব কিছু শেখে না, তাই বাবা-মায়ের উচিত তাদের এই বিষয়ে সাহায্য করা।

বড় ভাই বা বোন কীভাবে ছোটদের দেখাশোনা করবে, তাদের খেয়াল রাখবে এবং বিভিন্ন কাজে সাহায্য করবে, তা শেখানো উচিত। এটি শুধু তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধই তৈরি করে না, বরং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও নির্ভরশীলতাও বাড়ায়। পাহাড়ি এলাকার উপজাতিদের মধ্যে এই অভ্যাসটি খুব সাধারণ—যেখানে বড়রা ছোটদের পিঠে নিয়ে সংসারের কাজ করে। এমন দৃষ্টান্ত থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি এবং শিশুদের মধ্যে এই মানবিক গুণটি গড়ে তুলতে পারি।

১৩. ছোট শিশুদের একা বাসায় রাখা নিরাপদ নয়

ছোট শিশুদের একা বাসায় রেখে বাইরে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও অনেক মা-বাবার কাজের প্রয়োজনে এমনটা করতে হয়, কিন্তু শিশুর সুরক্ষার কথা ভেবে এটি থেকে বিরত থাকা উচিত।

আমেরিকা এবং কানাডার মতো উন্নত দেশগুলোতে আইন রয়েছে যে, ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের একা বাসায় রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। এর প্রধান কারণ হলো, শিশুরা অবুঝ এবং খেলার ছলে যেকোনো ধরনের বিপজ্জনক কাজ করে ফেলতে পারে। যেমন: ধারালো জিনিস দিয়ে খেলা, বারান্দার রেলিংয়ে ওঠা, বা ম্যাচ নিয়ে খেলা করা। সাধারণত বড়দের উপস্থিতিতে তারা এই ধরনের কাজ করে না, কিন্তু একা থাকলে নিজেদের স্বাধীন মনে করে এবং কৌতূহলবশত দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।

তাই, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে, তাদের একা বাসায় রাখা থেকে বিরত থাকা জরুরি। যদি একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে তাদের সাথে রেখে যাওয়া উচিত।

১৪. শিশুদের গায়ে হাত তোলা ঠিক নয়

শিশুদের গায়ে হাত তোলা বা শারীরিক শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমাদের সমাজে একসময় শিশুদের মারধর করাকে সংশোধনের একটি উপায় হিসেবে মনে করা হতো, কিন্তু আধুনিক শিশু মনোবিজ্ঞান এবং ইসলাম—কোনোটাই এই ধরনের অমানবিক আচরণকে সমর্থন করে না।

শিশুকে আঘাত করা তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে তাদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়। ইসলামেও কারও মুখে আঘাত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তাই, শারীরিক শাস্তি না দিয়ে ভালোবাসা, ধৈর্য এবং যুক্তির মাধ্যমে শিশুকে সঠিক পথে পরিচালনা করাই সবচেয়ে উত্তম পন্থা। এতে শিশু সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে।

১৫. দশ বছর বয়স থেকে শিশুদের জন্য আলাদা বিছানা

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, শিশুরা ১০ বছর বয়স হলে তাদের বিছানা বাবা-মায়ের থেকে আলাদা করে দেওয়া উচিত। আমাদের সমাজে সাধারণত শিশুরা বাবা-মায়ের সাথে এক বিছানায় ঘুমায়, তবে এটি একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সহিহ হাদিসে এসেছে-

আমর ইবনু শু’আইব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন-

“‏ مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে সালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স দশ বছর হয়ে যাবে তখন (সালাত আদায় না করলে) এজন্য তাদেরকে মারবে এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দিবে।[ সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৫, আহমাদ : ৬৬৮৯

এই বয়সে তাদের মধ্যে নিজস্ব ব্যক্তিত্ব এবং গোপনীয়তার বোধ তৈরি হতে শুরু করে। আলাদা বিছানা তাদের মধ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে এবং একই সাথে পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও শালীনতা রক্ষা করতে সহায়তা করে। এই নিয়মটি মেনে চলা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৬. সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব করা ঠিক নয়

মা-বাবাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্তানদের মধ্যে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব না করা। যে পরিবারের একাধিক সন্তান আছে, সেখানে অনেক সময় দেখা যায় যে, মা-বাবা কোনো একটি সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দেন বা বেশি ভালোবাসেন। এর ফলে অন্য সন্তানরা মনে কষ্ট পায় এবং এর নেতিবাচক প্রভাব তাদের মানসিক বিকাশে পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও সন্তানদের প্রতি সমান আচরণ করা বাধ্যতামূলক।

আমির (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নুমান ইবনু বাশীর (রাঃ)-কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি যে, আমার পিতা আমাকে কিছু দান করেছিলেন। তখন (আমার মাতা) আমরা বিনতে রাওয়াহা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে সাক্ষী রাখা ব্যতীত সম্মত নই। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট আসলেন এবং বললেন, আমরা বিনতে রাওয়াহার গর্ভজাত আমার পুত্রকে কিছু দান করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে সাক্ষী রাখার জন্য সে আমাকে বলেছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সব ছেলেকেই কি এ রকম করেছ? তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং আপন সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা কর। নুমান (রাঃ) বলেন, অতঃপর তিনি ফিরে গেলেন এবং তার দান ফিরিয়ে নিলেন।

সহিহ বুখারি : ২৫৮৭

সন্তানদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব তাদের পড়ালেখায় মনোযোগ নষ্ট করতে পারে এবং মা-বাবার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কমিয়ে দেয়। তাই সব সন্তানের সাথে সমান ও ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত, যেন তারা নিজেদেরকে সুরক্ষিত ও মূল্যবান মনে করে।

১৭. শিশুদের পুতুল খেলা: একটি সহজ দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুদের পুতুল খেলার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় ভোগেন। তবে এটি পরিষ্কার যে, শিশুরা একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত পুতুল দিয়ে খেলতে পারে।

৬১৩০. ’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনেই আমি পুতুল বানিয়ে খেলতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে তারা দৌড়ে পালাত। তখন তিনি তাদের ডেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সঙ্গে খেলত। সহিহ বুখারি : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম : ২৪৪০, আহমাদ : ২৬০২০

বাজারে যে প্লাস্টিক, কাপড় বা মাটির পুতুল পাওয়া যায়, সেগুলো সাধারণত পূজা করার জন্য তৈরি করা হয় না। তাই শিশুদের জন্য এগুলো দিয়ে খেলাধুলা করা বৈধ। তবে তাদের ছোটবেলা থেকেই ধীরে ধীরে বোঝানো উচিত যে, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খেলা কমিয়ে আনা প্রয়োজন।

শিশুদের মধ্যে দান করার অভ্যাস তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা। এটি একটি কার্যকরী পদ্ধতি হতে পারে যে, প্রতি বছর তাদের খেলনাগুলো দিয়ে দরিদ্র শিশু বা হাসপাতালের শিশুদেরকে উপহার দেওয়া। এর মাধ্যমে শিশুরা কেবল পুতুল খেলার প্রতি তাদের আসক্তি কমাতে শেখে না, বরং তাদের মধ্যে অন্যের জন্য কিছু করার মানসিকতাও তৈরি হয়। এই অভ্যাস তাদের মধ্যে সহানুভূতি, উদারতা এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্ম দেয়। এভাবে খেলার মাধ্যমে এবং একই সাথে নৈতিক শিক্ষাও দেওয়া সম্ভব।

শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ২৫টি টিপস :

১. ঘুমানোর অভ্যাস: শিশুরা যখন ঘুমায়, বাবা-মায়ের উচিত তাদের সাথে কিছুটা সময় ঘুমানো। এতে তাদের ঘুমের সময়কাল বাড়ে এবং তারা শান্তিতে ঘুমায়।

২. খাবারের নিয়ম: শিশুদের কখনোই শুয়ে শুয়ে খেতে দেবেন না। এর ফলে খাবার শ্বাসনালীতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৩. শান্ত পরিবেশ: শিশুদের সামনে উঁচু গলায় কথা বলা, ঝগড়া বা তর্ক করা থেকে বিরত থাকুন। এতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ে।

৪. স্ক্রিন টাইম: দুই বছর বয়সের আগে শিশুদের টিভি বা যেকোনো স্ক্রিন থেকে দূরে রাখুন। দুই বছর পর থেকে দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা তাদের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখতে দিতে পারেন।

৫. সৃজনশীলতা: শিশুদের সামনে এমন গান বা কার্টুন চালাতে পারেন যেখানে ভালো কিছু শেখার আছে। তিন বছর বয়স থেকে এ ধরনের শিক্ষামূলক কনটেন্ট দেখতে দিলে তাদের সৃজনশীলতা বাড়বে।

৬. শারীরিক সুরক্ষা: শিশুদের কখনোই ঝাঁকাবেন না বা ছুঁড়ে মারবেন না। এর ফলে তাদের মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগতে পারে।

৭. ইতিবাচক ব্যবহার: শিশুদের কড়া বা অপমানজনক কোনো নামে ডাকবেন না। সব সময় ইতিবাচক এবং উৎসাহমূলক কথা বলুন।

৮. খেলার গুরুত্ব: শিশুদের খেলাধুলা করতে দিন। এতে তারা নিজেদের থেকে কিছু করতে শেখে এবং বিভিন্ন কাজে তাদের আগ্রহ বাড়ে।

৯. দায়িত্ববোধ: শিশুদের তাদের খেলা শেষে খেলনা গুছিয়ে রাখতে শেখান। এতে ছোট থেকেই তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।

১০. মারামারি ও সহিংসতা: শিশুদের এমন কোনো কার্টুন বা খেলা দেখতে দেবেন না যেখানে মারামারি বা সহিংসতা আছে। এর ফলে তাদের মধ্যে হিংসা বা আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হতে পারে।

১১. শারীরিক কার্যকলাপ: প্রতিদিন অন্তত ২০ মিনিট শিশুদের সাথে কিছু হালকা ব্যায়াম করুন। এতে তাদের শরীর ও মন দুটোই সতেজ থাকে।

১২. একা থাকার অভ্যাস: শিশুদের কিছু সময় একা থাকতে দিন। এতে তাদের নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তবে খেয়াল রাখুন, একা থাকা মানে বাবা-মায়ের দৃষ্টির আড়ালে নয়।

১৩. সম্পর্ক তৈরি: শিশুদের অন্যদের সাথে মিশতে বা খেলতে উৎসাহিত করুন। এতে তারা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে এবং মিলেমিশে থাকতে শিখবে।

১৪. স্বাধীনতা: শিশুদের নিজেদের জিনিসপত্র বা পোশাক পছন্দ করতে দিন। তাদের পছন্দকে সম্মান করুন।

১৫. পরিবারের সাথে খাবার: পরিবারের সবাই একসঙ্গে এক টেবিলে খেতে বসুন। এটি শিশুদের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করে তোলে।

১৬. শিক্ষার গুরুত্ব: শিশুদের প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ মিনিট কিছু একটা পড়তে দিন। এতে তাদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হবে।

১৭. সুস্থ খাবার: শিশুদের সার ও কেমিক্যালমুক্ত শাকসবজি এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। এতে তাদের শরীর সুস্থ থাকে।

১৮. পুরস্কার ও সম্মান: শিশুরা বাবা এবং মা দুজনের কাছ থেকেই যেন উপহার পায়। এতে তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়।

১৯. মাটির কাছাকাছি: শিশুদের কাদা, মাটি বা ধুলো নিয়ে খেলতে দিন। এতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং তারা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে শেখে।

২০. খেলার মাধ্যমে শেখা: শিশুদের এমন খেলায় হারতে দিন যাতে তারা শিখতে পারে যে কীভাবে পরাজয়কে সামলে নিতে হয় এবং কীভাবে ভালো খেলতে হয়।

২১. শাস্তির বিকল্প: শিশুদের মারধর বা শারীরিক শাস্তি দেবেন না। এর পরিবর্তে তাদেরকে বুঝিয়ে বলুন যে খারাপ কাজের পরিণতি কী হতে পারে।

২২. স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া: শিশুরা যখন কাঁদে, তখন তাদের জোর করে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। তাদের নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে দিন।

২৩. সৃজনশীল খেলা: ছেলে বা মেয়ে নির্বিশেষে শিশুদের বাবার জুতো-শার্ট বা মায়ের শাড়ি-বড় পোশাক পরতে বাধা দেবেন না। এতে তাদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি বাড়ে।

২৪. নতুন কাজের সুযোগ: শিশুদের নতুন নতুন কাজ করতে দিন এবং এতে তাদের উৎসাহ দিন, বাধা দেবেন না।

২৫. পটি ট্রেনিং: ছেলে শিশুদের তিন বছর বয়সে এবং মেয়ে শিশুদের দুই বছর বয়সে পটি ট্রেনিং দেওয়া ভালো। এটি তাদের স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে।

সন্তান প্রতিপালনে কিছু অসংগতি

১. শিশুর লালন-পালনে মুরুব্বীদের অবদান ও সীমাবদ্ধতা

আমাদের সমাজে শিশুদের লালন-পালনে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভূমিকা অপরিসীম। অনেক ক্ষেত্রে তারাই প্রথম হাতে ধরে শিশুকে বড় করে তোলেন। তাদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও অবদান অনস্বীকার্য। তবে বর্তমান যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে শিশু পরিচর্যা এবং শিক্ষায় অনেক নতুন তথ্য ও পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে। তাই দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভালোবাসার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও দেখা যেতে পারে। এই বিষয়গুলো সুন্দর ও শ্রদ্ধার সাথে মোকাবিলা করা মা-বাবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আধুনিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও প্রচলিত কুসংস্কার

শিশুদের পরিচর্যার ক্ষেত্রে দাদা-দাদী ও নানা-নানীর অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কিন্তু অনেক সময় তাদের এই অভিজ্ঞতা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ধর্মীয় অনুমতির সাথে সংগতিপূর্ণ হয় না। এর ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। যেমন-

ক. চিকিৎসা বিষয়ক ভুল ধারণা:

শিশুদের রোগ-শোকে অনেক সময় বয়স্করা এমন কিছু ঘরোয়া বা অপ্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিশুদের জন্য যে টিকাগুলো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, তার গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের অনেকেরই সঠিক ধারণা নেই। তারা মনে করেন, এটি অপ্রয়োজনীয় বা এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায় না, ফলে তারা হাম, পোলিও, ধনুষ্টংকারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

খ. মায়ের দুধে বাতাস লাগা

গ্রামাঞ্চলে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, যদি কোনো নবজাতকের পাতলা পায়খানা হয়, তাহলে এর কারণ হলো মায়ের দুধে ‘বাতাস লেগেছে’। এই বিশ্বাস থেকে মুরুব্বীরা নবজাতককে মায়ের দুধ পান করানো থেকে বিরত রাখেন। এটি খুবই বিপজ্জনক একটি প্রথা, যার কারণে নবজাতকের জীবন বিপন্ন হতে পারে।

নবজাতকের পাতলা পায়খানা হলে তার শরীর থেকে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। এমন অবস্থায় মায়ের দুধই হলো তার জন্য সবচেয়ে ভালো তরল খাবার যা তাকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু এই কুসংস্কারের ফলে যখন তাকে দুধ থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন তার শরীরে তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দেয়, যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

নবজাতকের জন্য মায়ের দুধই একমাত্র আদর্শ খাবার, যা তার সঠিক বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য। দুধ বন্ধ করে দিলে শিশুটি মারাত্মক পুষ্টিহীনতায় ভোগে। নবজাতককে দুধ পান করানো বন্ধ করলে মায়ের স্তনে দুধ জমে থাকে, যা ব্যথা ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময় জোর করে এই দুধ ফেলে দেওয়া হয়, যা অপ্রয়োজনীয় এবং কষ্টকর।

নবজাতকের পাতলা পায়খানার পেছনে মূলত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোনো জীবাণু সংক্রমণ দায়ী। এটি মায়ের দুধের কারণে হয় না। মায়ের দুধ নবজাতককে এই ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। তাই পাতলা পায়খানা হলে দুধ বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যদি কোনো নবজাতকের পাতলা পায়খানা হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে জরুরি।

গ. ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে ভুল সংশোধন

দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভুল পরিচর্যা বা ভুল ইসলামী শিক্ষা দিলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, তারা ভালোবাসা থেকেই এসব করেন। তাই তাদের মনে কষ্ট না দিয়ে বুঝিয়ে বলার কৌশল অবলম্বন করতে হবে।

যখন কোনো ভুল দেখা যাবে, তখন সরাসরি তাদের ভুল না বলে বিনয়ের সাথে বলতে হবে, “মা/বাবা, এখন বিজ্ঞানীরা এটা করতে নিষেধ করে” অথবা “হুজুররা বলেছেন যে এটা ইসলামে অনুমোদিত নয়।”

যদি সম্ভব হয়, তাহলে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের তথ্য বা ইসলামী জ্ঞানের উৎস থেকে প্রমাণ দেখাতে পারেন। যেমন- কোনো নির্ভরযোগ্য ডাক্তারের ভিডিও, ইসলামিক স্কলারের লেকচার বা বইয়ের অংশবিশেষ।

সঠিক ইসলামী শিক্ষা : শিশুদের প্রাথমিক ইসলামী শিক্ষা যেমন- কালেমা, ছোট সূরা ইত্যাদি শেখানোর ক্ষেত্রেও মুরুব্বীদের ভুল হতে পারে। এক্ষেত্রে মা-বাবা হিসেবে আপনাদের নিজেদেরই সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। কারণ, আপনার যদি সঠিক জ্ঞান না থাকে, তাহলে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা বোঝা সম্ভব হবে না।

ঘ. দাদা-দাদী ও নানা-নানীর জন্য সঠিক জ্ঞানের ব্যবস্থা করা

শিশুর লালন-পালন ও প্রাথমিক শিক্ষায় দাদা-দাদী ও নানা-নানীর ভূমিকা অপরিসীম। তাই মা-বাবার পাশাপাশি তাদেরও আধুনিক ও সঠিক ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা জরুরি।

তাদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ডকুমেন্টারি বা ভিডিও লেকচার দেখতে ও শুনতে দিতে পারেন। যদি তারা বই পড়তে ভালোবাসেন, তবে এ সংক্রান্ত ভালো বই কিনে দিতে পারেন। তাদের সঙ্গে খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে পারেন। তাদের অভিজ্ঞতাকে সম্মান জানিয়ে নতুন জ্ঞান সম্পর্কে তাদের উৎসাহিত করতে পারেন।

২. নবজাতের রোগমুক্তির জন্য তাবিজ প্রদান

শিশুদের রোগমুক্তি বা সুস্থতার জন্য তাবিজ ব্যবহার করা একটি প্রচলিত কুসংস্কার, যা আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলাম উভয় দিক থেকেই ভুল। এটি মূলত শিশুদের রোগবালাই বা ‘অশুভ দৃষ্টি’ থেকে রক্ষা করার একটি ভ্রান্ত ধারণা।

ক. চিকিৎসা বিজ্ঞান :

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, প্রতিটি রোগের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে। এই কারণ হতে পারে জীবাণু (যেমন- ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া), পুষ্টির অভাব, জেনেটিক সমস্যা বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন সঠিক ঔষধ, চিকিৎসা পদ্ধতি, অথবা কোনো বিশেষ থেরাপি। তাবিজের মধ্যে এমন কোনো উপাদান নেই যা এই জীবাণু বা শারীরিক সমস্যাকে দূর করতে পারে। যখন কোনো শিশুর অসুস্থতার জন্য তাবিজের ওপর নির্ভর করা হয়, তখন তাকে সঠিক এবং কার্যকর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এর ফলে শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং কখনো কখনো তা জীবনের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, যদি কোনো শিশুর নিউমোনিয়া হয় এবং তার বাবা-মা তাকে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে তাবিজ পরিয়ে দেন, তাহলে জীবাণু ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়বে এবং শিশুটির মৃত্যুও হতে পারে। তাবিজ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতা তৈরি হয়। তারা মনে করে তাবিজই সব সমস্যার সমাধান, যার ফলে তারা আধুনিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা হারায়। মোট কথা, তাবিজ ব্যবহার করলে শিশুদের প্রকৃত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়, যার ফলে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে।

খ. তাবির ব্যবহার ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছোট শির্ক :

ঈসা ইবনু আবদুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলা (রহ.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনু উকাইম আবূ মা’বাদ আল-জুহানীর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দেখতে গেলাম। তিনি বিষাক্ত ফোঁড়ায় আক্রান্ত ছিলেন। আমি বললাম, কিছু  ঝুলিয়ে রাখছেন না কেন? তিনি বললেন, মৃত্যু তো এর চেয়েও নিকটে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكِلَ إِلَيْهِ

যে লোক কোনোকিছু ঝুলিয়ে রাখে তাকে তার উপরই সোপর্দ করা হয়। সুনানে তিরমিজি : ২০৭২ মান সহিহ

আবূ বাশীর আল-আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলেন। (রাবী) ‘আবদুল্লাহ্ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সংবাদ বহনকারীকে পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না ঝুলে, আর ঝুললে তা যেন কেটে ফেলা হয়। সহিহ বুখারি : ৩০০৫, সহিহ মুসলিম : ২১১৫, আহমাদ : ২১৯৪৬

নোট : জাহেলি যুগে কুসংস্কারের কারণে উটের গলায় মালা লটকানো হতো যাতে উট বদ নজর থেকে রক্ষা পায়। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ভ্রান্ত ধারণা ও রসম উৎখাতের ব্যবস্থা করেন।

আব্দুল্লাহ (রা.) এর স্ত্রী যাইনাব (রা.) আব্দুল্লাহ (রা.) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি-

إِنَّ الرُّقَى، وَالتَّمَائِمَ، وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ قَالَتْ

যাদু, তাবিজ ও অবৈধ, প্রেম ঘটানোর মন্ত্র শির্ক-এর অন্তর্ভুক্ত। সুনানে আবু দাউদ : ৩৮৮৩ আংশিক

টিকা : এখানে যে ঝাড়ফুঁক করাকে শিরক বলা হয়েছে, তা দ্বারা শিরকি কালামের মাধ্যমে ঝাড় ফুঁক উদ্দেশ্য। তবে ঝাড়ফুঁক যদি আল্লাহর কালাম, আল্লাহর সিফাত বা সহিহ হাদিসে বর্ণিত কোন বাক্যের মাধ্যমে হয়, তাতে কোন অসুবিধা নেই। কারণ সহিহ হাদিস দ্বারা ঝাড়ফুঁক করাকে শরিয়ত সম্মত বলা হয়েছে।

উকবা বিন আমের রা. হতে একটি ‘‘মারফু’’ হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায় আল্লাহ যেন তার আশা পূরণ না করেন। যে ব্যক্তি কড়ি, শঙ্খ বা শামুক ঝুলায় তাকে যেন আল্লাহ রক্ষা না করেন।’’ অপর একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলালো সে শিরক করলো। সিলসিলায়ে সহিহ : ৮০৯, মুসনাদে আহমাদ : ৪/১৫৬, কিতাবুত তাওহীদ, সপ্তম অধ্যায়, মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহাব রহ.

যদি কেউ এ ধারনা রাখেন যে ভালো মন্দ করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর তারপরও তাবিজ ব্যবহার করে তবে সে ছোট শির্কে লিপ্ত হলো। সে কারণে সে মুললিম থাকবে, কিন্তু যদি কেউ বিশ্বাস করে তাবিজের নিজেস্ব ক্ষমতা আছ, তবে সে শিরকে আকবারে লিপ্ত হলো। এ কারনে সে ইসলাম ও মুসলিম থেকে বাহির হয়ে যাবে। শিরক হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা বা আল্লাহর ক্ষমতার সাথে অন্য কিছুর ক্ষমতাকে যুক্ত করা। ইসলাম বিশ্বাস করে, রোগ-শোক নিরাময় এবং সুরক্ষা একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন। কোনো তাবিজ বা অলৌকিক বস্তু এই ক্ষমতা রাখে না। তাই তাবিজ ব্যবহার ছোট শিরক।

শিশুদের সুস্থ রাখার জন্য সঠিক উপায় হলো:

কোনো শিশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা। ইসলামে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়াগুলো পাঠ করার কথা বলা হয়েছে।

৩. নবজাতকের জন্য ‘আতুর ঘর’ ও ইসলামের নির্দেশনা

“আতুর ঘর” বলতে সাধারণত সেই কক্ষকে বোঝানো হয়, যেখানে একজন নবজাতকের জন্ম হয় এবং তার প্রাথমিক পরিচর্যা করা হয়। গ্রামাঞ্চলে এই ঘরকে প্রায়শই একটি বিশেষ পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করা হয় এবং প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে সেখানে সহজে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। কিছু মানুষ মনে করে যে বাইরের লোক ঘরে প্রবেশ করলে শিশুর ক্ষতি হবে।

ইসলামে এই ধরনের কোনো কুসংস্কার বা ধারণার স্থান নেই। বরং ইসলাম নবজাতক ও তার মায়ের জন্য আরামদায়ক, পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়।

ক. আতুর ঘরের ইসলামী বিধান :

ইসলামে ‘আতুর ঘর’ বলে কোনো বিশেষ প্রথা নেই। সন্তান যে ঘরেই জন্ম নিক না কেন, সেই ঘরটি যেন পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ হয়, এটাই ইসলামের মূল নির্দেশনা। সন্তানের জন্মগ্রহণের পর মা এবং শিশু উভয়ের জন্যই উত্তম ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

ইসলামে পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হয়েছে। নবজাতকের জন্য এমন একটি পরিবেশ দরকার, যা ধুলো-ময়লা ও জীবাণুমুক্ত। প্রথাগত ‘আতুর ঘর’-এর ধারণা অনেক সময় অপরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহিত করে, যা নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও এটি সমর্থন করে যে, নবজাতকের জন্য একটি জীবাণুমুক্ত এবং খোলামেলা পরিবেশ প্রয়োজন।

খ. কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলাম:

ইসলাম কুসংস্কার ও শিরক-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। বাইরের লোক ঘরে প্রবেশ করলে শিশুর ক্ষতি হবে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী। শিশুর ভালো-মন্দ আল্লাহর হাতে। এ ধরনের বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহর ওপর ভরসা থেকে বিচ্যুত করে এবং শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইসলামে যেকোনো বিপদ বা ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে, কোনো কুসংস্কার বা অযৌক্তিক রীতিনীতি নয়।

৪. কপালে কালো টিপ দিয়ে থাখে

কপালে কালো টিপ দেওয়া, যা অনেক সময় শিশুদেরকে কুনজর থেকে রক্ষা করার জন্য করা হয়, তা একটি প্রচলিত কুসংস্কার। ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই এবং এটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

ইসলামে শিরক হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা। এর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ওপর ভরসা করা বা সেটিকে আল্লাহর ক্ষমতার অংশীদার মনে করা।

হিফাজতের মালিক আল্লাহ :

ইসলামে বিশ্বাস করা হয় যে, সকল প্রকার অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার একমাত্র ক্ষমতা আল্লাহরই রয়েছে। কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পেতে বা কোনো কল্যাণ লাভের জন্য একমাত্র আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চাইতে হবে।

কালো টিপকে যদি কুনজর থেকে রক্ষার মাধ্যম মনে করা হয়, তবে এটি আল্লাহর ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস না করে একটি বস্তুর ওপর ভরসা করার শামিল। এই ধরনের বিশ্বাস ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি শিরকের কাছাকাছি চলে যায়।

নবজাতককে যেকোনো অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য নবীজির (সা.) শেখানো দোয়া পাঠ করা উচিত, যেমন: “আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ”। এই দোয়াটি পাঠ করে শিশুদের ওপর ফুঁ দিলে আল্লাহই তাদের হেফাজত করবেন।

এই পরিস্থিতিতে মা-বাবার দায়িত্ব হলো সুন্দর ও সাবলীলভাবে মুরুব্বীদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া। তাদের ভালোবাসা ও অবদানকে সম্মান জানিয়ে বোঝাতে হবে যে, সময়ের সাথে অনেক কিছু বদলে গেছে এবং বর্তমানে আরও ভালো ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে।

৫. শিশুরা ফিরিশতা মনে করা :

শিশুদের নিষ্পাপ হওয়ার কারণে অনেক সময় আমরা বলে থাকি ‘শিশুরা ফিরিশতার মতো’। এই ধরনের কথা আবেগের বশবর্তী হয়ে বলা হলেও, এর পেছনে কিছু ভুল ধারণা থাকতে পারে। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে, শিশু হলো মানুষ, ফিরিশতা নয়। আল্লাহ তায়ালা মানুষ এবং ফিরিশতাকে আলাদা আলাদা সৃষ্টি হিসেবে তৈরি করেছেন। মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে। মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ উভয় ধরনের প্রবণতাই থাকে। ফিরিশতারা সৃষ্টি হয়েছেন নূর (আলো) থেকে। তাদের মধ্যে কোনো পাপ করার বা আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কোনো প্রবণতা নেই। তারা শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালন করে। যদিও শিশুরা নিষ্পাপ, কারণ তারা এখনো এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয়নি যা তাদের পাপী করে তোলে, তবুও তারা মানুষেরই অংশ, ফিরিশতা নয়। তাই ফিরিশতাদের সাথে মানুষের তুলনা করা বা শিশুকে ফিরিশতা বলা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়।

সন্তানের স্কুল জীবন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

১. সন্তানের স্কুল জীবন শুরু আগে শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে সাধারন জ্ঞান

শিক্ষা কি?

শিক্ষা হল একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা এবং অভ্যাস অর্জন করে। এটি শুধুমাত্র বই পড়ে বা স্কুলে গিয়ে শেখা বিষয় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাই শিক্ষার অংশ।

শিক্ষার মূল উপাদান:

জ্ঞান (Knowledge): এটি তথ্য ও তত্ত্বগত ধারণা যা মানুষ শেখে। যেমন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত ইত্যাদি।

দক্ষতা (Skills): এটি কোনো কাজ করার ক্ষমতা। যেমন, কথা বলা, লেখা, হিসাব করা, বা কোনো যন্ত্র চালানো।

মূল্যবোধ (Values): এটি মানুষের ভালো-মন্দ, সঠিক-বেঠিক বোঝার ক্ষমতা। যেমন, সততা, সম্মান, দয়া এবং দায়িত্ববোধ।

নৈতিকতা (Morality): এটি সমাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনে ভালো আচরণের নিয়ম। যেমন, সত্য বলা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা।

অভ্যাস (Habits): এটি বারবার করা কাজের মাধ্যমে তৈরি হওয়া আচরণ। যেমন, সময় মতো ঘুম থেকে ওঠা বা পড়াশোনা করা।

শিক্ষার অর্জনের ধরন :

আমাদের সমাজে সাধারণত তিন ধরনের শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। এই ধরনগুলো হলো:

১. আনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Formal Education)

এটি সবচেয়ে পরিচিত এবং সুসংগঠিত শিক্ষা ব্যবস্থা। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নির্দিষ্ট নিয়মনীতি, পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়। এই শিক্ষায় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে এবং শেষে সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

উদাহরণ: প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া করা।

২. অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Informal Education)

এই ধরনের শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নিয়ম বা পাঠ্যক্রমের ওপর নির্ভর করে না। এটি জীবনের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত হয়। পরিবার, সমাজ, বন্ধু-বান্ধব, এবং গণমাধ্যম থেকে আমরা যা কিছু শিখি, তা সবই এই শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া যা সচেতন বা অবচেতনভাবে চলতে থাকে।

উদাহরণ: বাবা-মায়ের কাছ থেকে নৈতিক শিক্ষা লাভ, বন্ধুদের সাথে খেলার সময় সামাজিক নিয়ম শেখা, বা কোনো ঘটনা থেকে জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

৩. উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা (Non-Formal Education)

উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হয়। এই ধরনের শিক্ষা সাধারণত নমনীয় হয় এবং এটি আনুষ্ঠানিক ডিগ্রির পরিবর্তে কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেয়।

উদাহরণ: কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কম্পিউটার কোর্স, ভাষা শেখার কোর্স, বা কৃষি বিষয়ক কর্মশালায় অংশ নেওয়া।

বর্তমান সমাজে শিক্ষা অর্জনের ধারা

বর্তমানে আমাদের সমাজে কিছু প্রতিষ্ঠান পার্থিব জীবনে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দেয়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান আমাদের আত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করে যা আমাদের ইহকাল ও পরকালের জন্য প্রস্তুত করে। এ হিসেবে বর্তমান সমাজে শিক্ষা অর্জনের ধারা দুটি।  যথা-

১. জাগতিক শিক্ষা

২. ইসলামী বা ধর্মীয় শিক্ষা

১. জাগতিক শিক্ষা: পৃথিবীতে সুন্দর জীবন যাপন

জাগতিক শিক্ষা হলো সেই জ্ঞান ও দক্ষতা যা মানুষকে পার্থিব জীবনে সফল হতে সাহায্য করে। এর মূল লক্ষ্য হলো বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করা এবং পেশাগত ক্ষেত্রে উন্নতি করা। এ ধারার শিক্ষার মুল উদ্দেশ্য দুটি। যথা-

ক. সম্পদ অর্জন :

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রকৌশল বা অন্যান্য আধুনিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে একজন ব্যক্তি একটি সফল কর্মজীবন গড়তে পারেন। এই দক্ষতা তাকে ভালো চাকরি পেতে বা ব্যবসা শুরু করতে সাহায্য করে, যার মাধ্যমে তিনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন এবং সম্পদ অর্জন করেন।

খ. সুন্দর জীবন যাপন :

আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য মানুষকে একটি আরামদায়ক ও সুন্দর জীবন যাপনের সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আরও উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে পারেন। যেমন, ভালো বাড়িতে থাকা, সুচিকিৎসা পাওয়া, এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখা। এই শিক্ষা মানব সভ্যতাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

২. ইসলামী বা ধর্মীয় শিক্ষা : ইহকাল ও পরকালে সুখী জীবন যাপন

ইসলামী বা ধর্মীয় শিক্ষা জাগতিক সাফল্যের চেয়ে মানুষের আত্মিক এবং নৈতিক বিকাশের ওপর বেশি জোর দেয়। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে একটি সঠিক জীবনবোধ এবং নৈতিক ভিত্তি প্রদান করা। এ ধারার শিক্ষার মুল উদ্দেশ্যও দুটি। যথা-

ক. ইহকালে সুখ :

ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। এটি শেখায় কীভাবে ন্যায়পরায়ণ, ধৈর্যশীল এবং দয়াবান হতে হয়। যখন একজন ব্যক্তি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে, তখন সে মানসিক শান্তি ও সন্তুষ্টি লাভ করে। এই শিক্ষা তাকে লোভ, হিংসা এবং অন্যায় থেকে দূরে রাখে, যা ইহকালেই একটি শান্তিপূর্ণ ও সুখী জীবন নিশ্চিত করে।

খ. পরকালে সুখ :

ধর্মীয় শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি মানুষকে পরকালের জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। ইসলামে বিশ্বাস করা হয়, এই পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর মানুষকে তার কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে জানতে পারে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে পরকালের জীবনে সফল হওয়ার চেষ্টা করে।

সারকথা : জাগতিক শিক্ষা আমাদের শারীরিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করে, আর ধর্মীয় শিক্ষা আমাদের আত্মিক ও নৈতিক চাহিদা পূরণ করে। এই দুটি শিক্ষাকে একসঙ্গে গ্রহণ করলে একজন ব্যক্তি ইহকাল ও পরকাল—উভয় জীবনেই ভারসাম্যপূর্ণ ও সুখী হতে পারে।

জাগতিক শিক্ষা ও  ইসলামী শিক্ষার পার্থক্য

জাগতিক শিক্ষা ও  ইসলামী শিক্ষার পার্থক্য নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো :

 ইসলামী শিক্ষাজাগতিক শিক্ষা
মূল উদ্দেশ্যআল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পুণ্যবান চরিত্র গঠন।পার্থিব জীবনে পেশাগত ও অর্থনৈতিক সাফল্য লাভ।
জ্ঞানের উৎসকুরআন, হাদিস এবং অন্যান্য ঐশী জ্ঞানের পাশাপাশি জাগতিক জ্ঞান।মানবীয় গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং যুক্তি। এখানে ঐশী জ্ঞানের প্রভাব থাকে না।
নৈতিক ভিত্তিপ্রতিটি বিষয়ে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা কুরআন-হাদিস দ্বারা নির্ধারিত।নৈতিকতা প্রায়শই আলাদা বিষয় হিসেবে শেখানো হয়, যা সমাজ বা আইন দ্বারা নির্ধারিত।
লক্ষ্যএকজন শিক্ষার্থীকে ধর্মীয় ও জাগতিক উভয় জ্ঞান দিয়ে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।একজন দক্ষ ও কর্মজীবনের জন্য যোগ্য নাগরিক তৈরি করা, যে সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

এই দুটি ধারার মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও, আধুনিক যুগে অনেকেই এই দুই শিক্ষাকে একত্রিত করে জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেন। জাগতিক শিক্ষা আমাদের পার্থিব জীবনে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দেয়, আর ইসলামী বা ধর্মীয় শিক্ষা আমাদের আত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি মজবুত করে এবং ইহকাল ও পরকালের জন্য প্রস্তুত করে। এই দুটি ধারার সমন্বয় একজন মানুষকে পরিপূর্ণ করে তোলে।

ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

ইসলামী শিক্ষা বলতে শুধু ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা বোঝায় না, বরং জীবনকে ইসলামের নীতি অনুযায়ী পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করাকে বোঝায়। এটি মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জীবনেই সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে। ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বহুবিধ, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়কেই প্রভাবিত করে।

১. সঠিক পথনির্দেশ এবং চরিত্র গঠন

ইসলামী শিক্ষা মানুষের জীবনে সঠিক পথ দেখায়। এটি মানুষকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং নৈতিক মূল্যবোধ অর্জনে সাহায্য করে। কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান মানুষকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে এবং সৎ পথে চলতে শেখায়। এর মাধ্যমে দয়া, সততা, ধৈর্য, এবং বিনয়ের মতো গুণাবলী বিকশিত হয়, যা একজন মানুষের চরিত্রকে উন্নত করে।

২. নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ সৃষ্টি

ইসলামী শিক্ষা মানুষকে তার সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। এটি শেখায় যে, একজন মুসলিম হিসেবে সমাজের প্রতি তার কিছু কর্তব্য আছে। যেমন: গরিব ও অসহায়দের সাহায্য করা, প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখা, এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই শিক্ষা মানুষকে শুধু নিজের ভালো নয়, বরং অন্যদের কল্যাণের জন্যও কাজ করতে উৎসাহিত করে, যা একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে সহায়তা করে।

৩. দুনিয়া ও আখিরাতের প্রস্তুতি

ইসলামী শিক্ষা শুধু দুনিয়ার জীবন নিয়েই ব্যস্ত থাকে না, বরং পরকালের জীবনের জন্যও মানুষকে প্রস্তুত করে। এটি শেখায় যে, এই দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর মানুষকে তার কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এই ধারণা মানুষকে পাপ কাজ থেকে দূরে রাখে এবং নেক আমলের দিকে ধাবিত করে। ফলে মানুষ দুনিয়ার জীবনকে অর্থপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারে এবং একইসাথে আখিরাতের জীবনের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করতে পারে।

৪. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে সমন্বয়

ইসলামী শিক্ষা জ্ঞান অর্জনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়, যা ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি জাগতিক জ্ঞানকেও অন্তর্ভুক্ত করে। ইসলামে বলা হয়েছে, জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য ফরজ। তাই ইসলামী শিক্ষা মানুষকে বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা এবং অন্যান্য জাগতিক বিষয়ে পারদর্শী হতে উৎসাহিত করে। এই সমন্বিত শিক্ষা মানুষকে শুধুমাত্র ধর্মীয় পণ্ডিতই নয়, বরং একজন দক্ষ পেশাদার হিসেবেও গড়ে তোলে, যে সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা

দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল দেশ বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে শিক্ষা এক অপরিহার্য মাধ্যম। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে, তা সেই দেশের শিক্ষানীতি ও কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। তবে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একমুখী নয়, বরং এটি বহু ধারা ও ঐতিহ্যের এক জটিল মিশ্রণ।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৈচিত্র্য ও জটিলতা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেবল কয়েকটি স্কুল বা কলেজ নিয়ে গঠিত নয়, বরং এটি দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এর মূল কারণ হলো এখানে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত। এই ভিন্নমুখী শিক্ষা ধারাগুলো দেশের মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা তৈরি করে, যা একদিকে যেমন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমনই কিছু জটিলতা ও সমস্যারও জন্ম দেয়।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তার জাতীয় চরিত্র, অর্থনীতি এবং সামাজিক অগ্রগতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এই ব্যবস্থাটি তার বহু বৈচিত্র্য এবং বহুমাত্রিকতার কারণেই অনন্য। এই শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্তমান কাঠামো এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা, যেমন সাধারণ শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা শিক্ষা (আলিয়া ও কওমী) এবং কারিগরি শিক্ষা, প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা শিক্ষাক্রম ও উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হয়। এই ভিন্নতা সমাজে বিভেদ তৈরি করছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। এ দেশের শিক্ষার কাঠামোকে বুঝতে হলে তিনটি প্রধান সময়কালকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়—ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল, পাকিস্তানি শাসনকাল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ পরবর্তী সময়। প্রতিটি সময়েই শিক্ষা ব্যবস্থা ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব বহন করেছে, যা আজকের বহুমুখী শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেছে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল

ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর তারা শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলে ইংরেজি ভাষাভিত্তিক শিক্ষানীতি চালু করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের সহায়ক এক শ্রেণির মানুষ তৈরি করা। এই নীতির ফলে ইসলামি শিক্ষা ও প্রথাগত মাদ্রাসা শিক্ষা অবহেলিত হতে থাকে। মুসলিম সমাজ বুঝতে পারে যে, এই শিক্ষানীতির মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে মুসলিম আলেমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামি শিক্ষার সংরক্ষণ ও প্রসারের জন্য ১৮৬৬ সালে ভারতের সাহারানপুর জেলার দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। দেওবন্দ মাদ্রাসা ছিল সম্পূর্ণ দ্বীনি শিক্ষাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও ইসলামি জ্ঞানকে কেন্দ্র করে পাঠদান করা হতো। এটি মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষার এক শক্তিশালী দুর্গে পরিণত হয়।

একই সময়ে, আরেকদল মুসলিম নেতা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থেকেই মুসলিমদের উন্নতির পথ খুঁজতে শুরু করেন। স্যার সৈয়দ আহমদ খান ছিলেন এই ধারার একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ ছাড়া মুসলিমদের পক্ষে সমাজের মূলধারায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। মুসলিমদেরকে আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্ক করার লক্ষ্যে ১৮৭৫ সালে তিনি উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে মুহম্মদ অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯২০ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়-এ রূপান্তরিত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি মুসলিমদের জন্য একটি আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যেখানে পশ্চিমা বিজ্ঞান ও সাহিত্য শিক্ষার পাশাপাশি ইসলাম শিক্ষা দেওয়া হত। এটি মুসলিম সমাজের মধ্যে একটি নতুন মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত শ্রেণি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই দুটি ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—দেওবন্দ ও আলিগড়—তখনকার মুসলিম সমাজের দুটি ভিন্ন চিন্তাধারাকে প্রতিনিধিত্ব করত। একটি ঐতিহ্য ও ধর্মের ওপর জোর দেয়, আর অন্যটি আধুনিকতা ও জাগতিক উন্নতির ওপর। এই দুই ধারার প্রভাব আজও এই অঞ্চলের মুসলিম সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় লক্ষণীয়।

পাকিস্তানি আমলের শিক্ষা ব্যবস্থা

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অংশে পরিণত হলে, শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়। ব্রিটিশ আমলের বিভাজিত শিক্ষাধারা, অর্থাৎ সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য এ সময়ে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাব্যবস্থা একটি সমন্বিত রূপ পায়নি। ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা সাধারণ শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষার ধারা দুটি নিজেদের মতো করে চলতে থাকে। সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ঘটালেও, সাধারণ শিক্ষার মান উন্নয়নে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।  এই সময়ে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সরকারি স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও, কওমি মাদ্রাসাগুলো স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব পাঠ্যক্রম ও অর্থায়নে পরিচালিত হতো। এই ভিন্নমুখী ধারাগুলো মূলত ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণে আলাদা ছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা :

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ সরকার একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৪ সালে কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়, যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা ও বুনিয়াদি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈচিত্র্যের কারণে সেই সুপারিশ পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে বিভিন্ন শিক্ষা ধারার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই চলতে থাকে। যার ফলে আজ আমরা বাংলাদেশে বহুমুখি শিক্ষা ব্যবস্থার দেখতে পাচ্ছি। যেমন-

১. সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা

২. ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা

৩. কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা

৪. বিশেষ শিক্ষা

৫. কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা

৬. আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা

সাধারন সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্ক আমাদের সকলেরই কমবেশী জ্ঞান আছে। কিন্তু কওমী ও আলীয়া মাদ্রাসা সম্পর্কে শুধু ঐ সংশ্লিষ্ট লোকদেরই জ্ঞান আছে। আমারা যেহেতু নিজের সন্তানে ইহকাল ও পরকারের কৃতকার্য চাই তাই আমাদের এ দুটি মাদ্রসা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক। এ কারনে আমি এ দুটি মাদ্রাসা সম্পর্কে আপনাদের বিস্তারিত সঠিক ধারনা প্রদান কবর এবং অন্য শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে শুধু ধারণা দিব মাত্র।

১. সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা:

এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে প্রচলিত এবং প্রধান ধারা। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়। এই ধারাটি একটি নির্দিষ্ট জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে, যা শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান দেয়। পাবলিক পরীক্ষা যেমন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (PEC), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (JSC), মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (SSC) এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (HSC) এই ধারার মূল ভিত্তি। এরপর শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে।

নোট : এখনে ধর্মীয় শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নাই। নাম মাত্র একটি ধর্মীয় বই পড়ান হয়। উপরে যে জাগতিক শিক্ষার কথা বলেছি তার প্রকৃত উদাহলন হলো- এ সাধারন শিক্ষা ব্যবস্থা।

২. ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা:

এই ধারাটি সাধারণত শহরাঞ্চলে বেশি প্রচলিত। এখানে ব্রিটিশ কারিকুলাম, যেমন অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল কারিকুলাম বা কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। এই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধানত ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো হয় এবং শিক্ষার্থীরা O-level এবং A-level পরীক্ষায় অংশ নেয়। এই শিক্ষা ধারাটি মূলত উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে জনপ্রিয়, কারণ এর খরচ সাধারণ শিক্ষার চেয়ে অনেক বেশি।

নোট : এখানে ও ধর্মীয় শিক্ষার বালাই নাই। শুধুই জাগতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়।

৩. কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা:

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধুমাত্র একটি শিক্ষা ধারা নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির মূল ভিত্তি। এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক এবং পেশাগত দক্ষতা দিয়ে গড়ে তোলা, যাতে তারা সরাসরি কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। এই ধারায় বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেমন:

প্রকৌশল: সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, কম্পিউটার, টেক্সটাইল, আর্কিটেকচার।

কৃষি ও মৎস্য: কৃষি প্রযুক্তি, পশুপালন, মৎস্য চাষ।

স্বাস্থ্য: নার্সিং, ফার্মেসি, মেডিকেল টেকনোলজি।

কম্পিউটার: সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, হার্ডওয়্যার, নেটওয়ার্কিং।

অন্যান্য: হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ড্রেস মেকিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ড্রাইভিং।

এই শিক্ষাব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে রয়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (BTEB)। এটি দেশের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন কোর্স ও পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করে এবং পরীক্ষা পরিচালনা করে।

নোট : এখানে ও ধর্মীয় শিক্ষার বালাই নাই। শুধুই জাগতিক শিক্ষা প্রদান করা হয়।

৪. বিশেষ শিক্ষা: অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের ভিত্তি

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা। এই শিক্ষাধারাটি শুধুমাত্র একটি পাঠ্যক্রম নয়, বরং এটি একটি মানবিক ও সংবেদনশীল প্রক্রিয়া। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শারীরিক, মানসিক, শ্রবণ বা দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা বিবেচনা করে এখানে বিশেষ শিক্ষাদান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে-

বিশেষায়িত শিক্ষকের ব্যবহার:

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক প্রয়োজন হয়। তারা প্রতিটি শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাদান পদ্ধতি তৈরি করেন।

সহায়ক প্রযুক্তি:

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতি, শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ (ইশারা ভাষা) এবং অন্যান্য সহায়ক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

বিশেষ পাঠ্যক্রম:

সাধারণ পাঠ্যক্রমের বাইরে, শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ পাঠ্যক্রম তৈরি করা হয়, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এ খাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এখনো এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার এবং মান উন্নয়ন অপরিহার্য।

কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা:

এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এবং স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর মধ্যে একটি। ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার মডেল অনুসরণ করে এই মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ধারাটি মূলত শুধু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন প্রকারে জাগতিক শিক্ষ প্রদান করে না। কওমী মাদ্রাসা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। কেননা একজন মুসলিম হিসেবে্ আমাদের প্রত্যেকের সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া ফরজ। আর সে ফরজ কাজেটি করে থাকে আমাদের এ মদ্রাসাগুলো। কাজেই তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানাও জরুরি। আপনার সন্তান কোথায় কি পড়ছে, তা জানা আপনার জন্য খুবই জরুরি। কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যসূচির সার সংক্ষেপ হল:

১. প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যান্ত পড়ান হয়:

 আল কুরআন (কুরআন সুন্দর করে পড়তে শেখান হয়), ফিকাহ (বেহেশতী জিওর বা অন্য কোন ফিকাহ), উর্দূ (উর্দূ কায়দা ও উর্দূ পহেলী, উর্দূ দুসরী. ফার্সী (ফার্সী ব্যাকরণ ও ফার্সী পহেলী) পড়ান হয়।

২. ষষ্ঠ (মিজান) থেকে দশম (শরহেজামী) জামাতে পর্যান্ত পড়ান হয়:

আল কুরআন (কুআনের অর্থ, শানে নুযুল ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, আরবী ব্যাকরণ এবং সম্বলিত কিতাব), ফিকাহ (মালাবুদ্দা মিনহু, মুখতাসারুল কুদুরী, নুরুল আনোয়ার, শরহুল বিকায়াহ, হেদায়া ইত্যাদি), উর্দূ (উর্দূ কি তেসরী ও উর্দূ সাহিত্য), ফার্সী (হেকায়াতে লতীফ, মসনবী রুমি এবং গুলিস্তসহ)। বর্তমানে অনেক মাদ্রাসা ফার্সী কিতাব পড়ান বাদ দিয়েছে।

৩. একাদশ শ্রেণী  থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (মাস্টার্ম)

আল-কুরআন বিভিন্ন তাফসির (তাফসীরে জালালাইন, আল ফাউযুল কাবীর),  বিভিন্ন ফিকাহ (নুরুল আনোয়ার, শরহুল বিকায়াহ, হেদায়া), হাদিস (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ শরীফ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, ত্বহাবী, মুয়াত্তা ইমাম মালেক, মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ, শামায়েলে তিরমিযী, রিয়াজুস সালেহীন, মেশকাত, আকিদা (আকিদাতুত তাহাবী, শরহুল আকাইদ),

ইদানিং কিছু কিছু মাদ্রাসায় প্রাথমিক পর্যায় বাংলা ও ইংরেজি পড়ানোর চেষ্টা করছে। ষষ্ঠ (মিজান) থেকে আবার বাংলা ও ইংরেজি পড়ান সিলেভাসে রাখেনি।

সিলেভাসগুলি পর্যালোচনা করে অনেকগুলি প্রশ্ন জম্ম নিয়ছে যার কোন সদ উত্তর খুজে পাইনি।

১. মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্বেও, বাংলা বাদ দিয়ে উর্দূ এবং ফার্সী ব্যাকারণ, কবিতা, সাহিত্য সম্বলিত কিতাব পড়ানোর যুক্তিকতা কতটুকু?

৩। যদি উর্দূ এবং ফার্সী ভাষা শিক্ষা করি, তবে আধুনিক কালের আন্তর্জাতীক ভাষা ইংরেজী শিখতে বাধা কোথায়?

৩। উর্দূ এবং ফার্সী ব্যাকারণ, কবিতা, সাহিত্য সম্বলিত কিতাব না পড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্য প‌্রযুক্তি, ভূগোল, ইতিহাস, সমকালিন অর্থনীতি ইত্যাদি পড়ালে সমস্যা কোথায়?

৪. ইসলামের আকিদার জ্ঞানই মূল জ্ঞান। আকিদাতুত তাহাবী’ পড়ান হয় বার/তের বছর পর স্নাতক ডিগ্রি ক্লাসে। প্রতিটি ক্লাসে আকিদার পাঠ্যসূচি নাই কেন? ‘

৫. দাওরায়ে হাদিস জামায়াতের মেয়াদ এক বছর অথচ হাদিস গ্রন্থ ১০ টি যার প্রতিটি আবার কয়েক খন্ডে রচিত। কি করে এতগুলো কিতাব সুন্দর করে এক বছরে পড়ান সম্ভব?

৬. হাদিস থেকেই ফিকাহ তৈরি হয়, হাদিস সম্পর্কে যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারি তারাই কেবল ফিকাহ রচনা করতে পানের। তাহলে প্রথম বার বছরে শুধু ফিকাহ কেন? প্রথম বার বছর ক্লাস অনুসারে হাদিস পড়ানে সমস্যা কি?

একটি প্রশ্নের উত্তর:

প্রশ্ন : আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ ২০১৮ সালে গঠিত হয়। তারা দাওরায়ে হাদিস পড়ানো হয় এমন মাদ্রাসাগুলোকে তাদের অধীনে নিয়ে আসে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর অধীনে প্রায় ২৩,০০০ কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১,২০০ মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিস পড়ানো হয়। এই মাদ্রাসাগুলো ছয়টি স্বতন্ত্র কওমি শিক্ষাবোর্ডের সঙ্গে যুক্ত। যদি প্রতিটি মাদ্রাসা থেকে গড়ে বিশ জন আলেম বাহির হয় তবে ২৪ হাজারের ও বেশী আলেম প্রতি বছর বের হচ্ছে। এরা দেশের জন্য কি অবদান রাখবে?

উত্তর : মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমের কারনে তাদের কোন সরাকারি সার্টিফিকেট নাই। যার ফরে তারা কোন সরকারি চাকুরী পায় না। তারা বড় জোর মাদ্রাসার মুহাদ্দিস, মসজিদের ইমাম অথরা মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করবে। প্রতি বছর ২৪ হাজার দাওরায়ে হাদিস পাশ আলেমের সবাই কিন্তু মুহাদ্দিস, ইমাম অথরা মুয়াজ্জিন হতে পারে না। অর্থাৎ তাদের বিশাল একটি অংশ বেকার থেকে যায়। এ কারণে বাংলার মুসলিমদের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। অপর পক্ষে তাদের শুন্যন্থান দখল করছে সেকুলাল, নাস্তিক, মুশরিকরা। বাংলাদেশে ৮% হিন্দু হলেও সরকারি চাকুরির তারা ২২% স্থান দখল করে আছে। অপর পক্ষে ভারতে ২১% মুসলিম থাকা সত্বেও সরকারি চাকুরির তারা ২% স্থান দখল করে আছে। কি সুন্দর আমাদের মাদ্রাসার পাঠ্য ক্রম!!

ক্ষতির উদারহণ : ০১

একজন পীরের মুরিদ বা একজন প্রচলিত তাবলীগের সাথি যাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান খুবই কম। কিন্তু তারা ইসলামে সাথে জড়িত থাকার কারনে অফিসের সততার সাথে কাজ করে, কোন ফাঁকি না দেয়, ঘুস না খায়। তাদের স্থানে যদি একজন আলেম চাকুরী জীবি হত, তাহলে সম্পুর্ণ অফিসটি সংশোধর হয়ে যেত। আলেম নিজে হয়ত ভালো আমল করতে পারবেন, কিন্তু বাংলার মুসলিমরা তার বিশাল থেদমত থেকে বঞ্চিত।

ক্ষতির উদারহণ : ০২

আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময় একটি প্রশিক্ষণ ক্লাসে মাওলানা আব্দুল জব্বার নামের একজন মুজাহিদকে, যিনি ছিলেন দেওবন্দের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, বারবার ভূগোলের দ্রাঘিমা রেখা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি তা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না। এই দৃশ্য দেখে সৌদি প্রশিক্ষক অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি না দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্র? তোমাদের ওখানে কী পড়ানো হয়?” লজ্জায় মাওলানা আব্দুল জব্বার শুধু মাথা নিচু করে রইলেন। এই ঘটনা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক জ্ঞানের অভাবের এক করুণ চিত্র।

যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে, যখন তিনি কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তখন তার উপলব্ধি ছিল আরও মর্মস্পর্শী। হতাশার সুরে তিনি বলেছিলেন, “আমি কর্মহীন ধর্ম শিখেছি, আর সাধারণ স্কুল-কলেজে ধর্মহীন কর্ম শেখানো হচ্ছে।” এই কথাটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুটি প্রধান ধারার মধ্যে বিদ্যমান গভীর শূন্যতাকে তুলে ধরে।

একদিকে কওমি মাদ্রাসাগুলো শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু তাদের পার্থিব জ্ঞান এবং আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানো হয় না। অন্যদিকে, সাধারণ স্কুল-কলেজগুলো শিক্ষার্থীদেরকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করলেও, সেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর তেমন জোর দেওয়া হয় না।

এই দুটি ধারার মধ্যে একটি গভীর বিভাজন রয়েছে, যা সমাজে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। যদি এই দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে একটি ভারসাম্য ও সমন্বয় সাধন করা না যায়, তাহলে এই বিভাজন সমাজে থেকেই যাবে। এর ফলে একদল মানুষ ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শী হলেও কর্মজীবনে পিছিয়ে পড়বে, আর অন্য দল কর্মজীবনে সফল হলেও নৈতিক ও ধর্মীয় দিক থেকে দুর্বল থাকবে।

নোটি : আমি কওমী মাদ্রাসা বিদ্বেষী নই। আমার হৃদয়ে আছে কওমী মাদ্রাস। আজ আমরা উপমহাদেশে যতটুকু দ্বীন পাচ্ছি তার শতভাগ দাবিদার ও অবহেলিত কওমী মাদ্রাসা। উপরে দেখেছেন ব্রিটিশ শিক্ষানীতির বিরোধীতা করে উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র বাদিদার কওমী মাদ্রাসা। উপমহাদেশে শিয়া ও মাজার পুজারীদের বিপরীতে যারা দাড়িয়েছে তারাই কওমী মাদ্রসা। সমাজে আলেম নামে যাদের চিনি তাদের শতকার ৯০ ভাগ আলেমও কওমী মাদ্রাসা থেকে এসেছে। কিন্তু তাদের কোন কোন অনুসারী সুফিবাদকে প্রধান্য দিতে গিয়ে কিছুটা সঠিক ইসলাম থেকে দুর চলে গেছেন।

আমি উপরের সমালোচনা মুলক প্রশ্ন করার কারন হলো- যাতে আমার প্রিয় মাদ্রাসাগুলো প্রশ্নে উত্তর খুজে জাতীর খেদমতে অগ্রনী ভুমিকা রাখে। কওমী মাদ্রাসা প্রতি বিদ্বেষ থাকলে, সংশোধনের কথা না বলে শুধুই সমালোচনা করতাম।

উপরে কওমী মাদ্রাসার যে সমস্যার কথা বললাম, তা এখন কওমী আলেমদের নজরে আছে। তাদের একটি অংশ বিভিন্নভাবে তাদের এ পাঠ্যক্রম পরিবর্ত করে মূলধারায় আসার চেষ্টা করেছে। আরেকটি অংশ মূল ধারা থেকে বাহির হয়ে আসার বিরোধীত করছে।

আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা

আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা: ধর্ম ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়

আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা একটি বিশেষ ধারার ধর্মীয় শিক্ষা, যা বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোয় এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই ব্যবস্থাটি সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষ করে তোলা। এই মডেলটি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য কিছু প্রতিষ্ঠানের অনুপ্রেরণায় গড়ে উঠেছে।

১. প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও দর্শন

আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রধান লক্ষ্য ছিল এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করবে না, বরং আধুনিক বিজ্ঞান, সাহিত্য, গণিত এবং অন্যান্য জাগতিক বিষয়েও পারদর্শী হবে। এর ফলে, তারা একদিকে যেমন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অর্জন করতে পারবে, তেমনই আধুনিক সমাজের বিভিন্ন পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। প্রতিষ্ঠাতাদের এই দূরদর্শী চিন্তাধারার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিমদেরকে ধর্মীয় এবং জাগতিক উভয় ক্ষেত্রেই যোগ্য করে তোলা, যাতে তারা ইহকাল ও পরকালে সফলতা লাভ করতে পারে।

২. পাঠ্যক্রম ও শিক্ষাপদ্ধতি

আলিয়া মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামো অনুসরণ করে। এখানে ধর্মীয় ও সাধারণ উভয় ধরনের বিষয় পড়ানো হয়। এর মূল পাঠ্যসূচির মধ্যে রয়েছে:

ধর্মীয় বিষয়: কোরআন, হাদিস, ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র), আরবি ও ফারসি ভাষা এবং ইসলামের ইতিহাস। এসব বিষয় শিক্ষার্থীদের ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও ধর্মীয় অনুশীলন সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়।

সাধারণ বিষয়: বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং আইসিটি। সাধারণ শিক্ষার এই বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য প্রস্তুত করে।

এই শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মতোই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে এবং তাদের অর্জিত ডিগ্রিগুলো সমমানের সরকারি স্বীকৃতি পায়। উদাহরণস্বরূপ, আলিয়া মাদ্রাসার দাখিল ডিগ্রি সাধারণ শিক্ষার এসএসসি (মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট) এর সমতুল্য এবং আলিম ডিগ্রি এইচএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট) এর সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে, আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দেশের যেকোনো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে পারে।

৩. সুযোগ ও সম্ভাবনা

আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মীয় এবং জাগতিক শিক্ষার মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করে। এই ধারার শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে আলেম হতে পারে, আবার একই সাথে তারা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক বা অন্য কোনো পেশায় নিজেদের কর্মজীবন গড়তে পারে। এটি একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা, যা শিক্ষার্থীদের সামনে বহুমুখী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। আমাদের এমন শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের প্রয়োজন ছিল, যা ইহকাল ও পরকারের জন্য কল্যাণ কর।

আপনি আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছেন, তা খুবই বাস্তবসম্মত এবং গুরুত্বপূর্ণ। আপনার দেওয়া তথ্যগুলো এবং আমার পূর্বের জ্ঞানকে একত্রিত করে আলিয়া মাদ্রাসার সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে ১০০০ শব্দের একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।

আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমান অবস্থা :

আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা একসময় ধর্মীয় ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হতো। এটি এমন একটি শিক্ষাধারা, যা মুসলিম শিক্ষার্থীদের একদিকে যেমন ধর্মীয় জ্ঞান দিত, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে দক্ষ করে তুলত। কিন্তু বর্তমানে এই ব্যবস্থাটি প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি করতে পারেনি। এর মূল কারণ হলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও, এই মাদ্রাসাগুলো সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন পায় না। এর পাশাপাশি, মাদ্রাসার সংখ্যা কম হওয়ায় এবং চাকরির বাজারে বৈষম্যের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পথে আসতে আগ্রহী হয় না। এর ফলে, মানসম্মত শিক্ষক ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে শিক্ষার মানও আশানুরূপ হয় না। এই সীমাবদ্ধতাগুলোর কারণে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো তাদের মহৎ উদ্দেশ্য সত্ত্বেও বর্তমানে এক দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

১. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি

আলিয়া মাদ্রাসাগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলোর পক্ষ থেকে আশানুরূপ সমর্থন পায়নি। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করে এমন সেক্যুলার সরকারগুলো প্রায়শই মাদ্রাসা শিক্ষাকে তাদের মূল এজেন্ডা থেকে দূরে রেখেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত রাজনৈতিক ও আদর্শগত। মাদ্রাসা শিক্ষাকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়, এবং তাই এর উন্নয়নে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয় না।

অর্থনৈতিক বরাদ্দ: সাধারণ শিক্ষা খাতের তুলনায় আলিয়া মাদ্রাসার জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রায়শই কম থাকে। নতুন ভবন নির্মাণ, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার এবং গ্রন্থাগার তৈরিতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় মাদ্রাসার অবকাঠামো দুর্বল থেকে যায়।

নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় আলিয়া মাদ্রাসার বিশেষ প্রয়োজনগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। ফলে, এই ধারার শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের কারণে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম এবং সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, যা শিক্ষার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

২. প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতা এবং বৈষম্য

প্রতিটি থানায় মাত্র ২-৩টি আলিয়া মাদ্রাসা আছে, কিন্তু স্কুল ও কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা শত শত, তা খুবই বাস্তবসম্মত। এই সংখ্যাগত বৈষম্য আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার দুর্বলতার আরেকটি প্রধান কারণ।

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ও শহরে অসংখ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে। একই সাথে, কওমি মাদ্রাসাগুলোও স্থানীয় উদ্যোগে এবং জনসাধারণের অনুদানে ব্যাপক সংখ্যায় গড়ে উঠেছে। কিন্তু আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা খুবই সীমিত, যা শিক্ষার্থীদের জন্য এই শিক্ষাধারায় প্রবেশ কঠিন করে তোলে।

৩. প্রতিযোগিতার অভাব:

যেহেতু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, তাই আলিয়া মাদ্রাসার মধ্যে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা গড়ে ওঠে না। যদি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি থাকত, তাহলে প্রতিটি মাদ্রাসা নিজেদের মান উন্নত করতে চেষ্টা করত, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করত।

সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় অনেক আগ্রহী শিক্ষার্থী এই ধারায় ভর্তি হতে পারে না, ফলে তারা অন্য শিক্ষাধারায় চলে যায়। এই অসম বন্টনের কারণে আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা কখনো একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি।

৪. কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং মেধাবীদের অনীহা

সরকারের পক্ষ থেকে চাকরির ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেশি সুযোগ দেওয়া হয়, যা মেধাবী ছাত্রদের আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ।

চাকরির বাজারে বৈষম্য: যদিও আলিয়া মাদ্রাসার ডিগ্রিগুলো সাধারণ শিক্ষার ডিগ্রির সমতুল্য হিসেবে স্বীকৃত, কিন্তু বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রায়শই আলিয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তারা মাদ্রাসা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও আধুনিক জ্ঞানের ওপর আস্থা রাখতে পারেন না।

৫. ইসলাম বিদ্বেষ:

সেকুলার সরকারের “ইসলাম বিদ্বেষ” দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ মাদ্রসাগুলোর উপর পড়েছে। বিশেষ করে কিছু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের প্রতি এক ধরনের বিদ্বেষমূলক মনোভাব দেখা যায়, যা তাদের চাকরির সুযোগকে সীমিত করে দেয়।

যেহেতু আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে কর্মজীবনে সফল হওয়ার পথ সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কঠিন, তাই অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শুরুতেই এই পথ বেছে নিতে চায় না। তারা এমন শিক্ষাধারা বেছে নেয় যেখানে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এর ফলে, আলিয়া মাদ্রাসাগুলো প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়, যা তাদের শিক্ষার মানকে আরও দুর্বল করে তোলে।

৬. মানসম্মত শিক্ষকের অভাব ও নিম্নমানের পরিবেশ

সরকারের সঠিক নজরদারির অভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতা মানসম্মত শিক্ষক তৈরিতে বাধা দিচ্ছে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুসারে, হাতেগোনা যে কয়েকজন মানসম্মত শিক্ষক আছেন, তারাও উপযুক্ত ছাত্র ও পরিবেশের অভাবে সঠিকভাবে শিক্ষাদান করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

প্রশিক্ষণের অভাব: আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য উন্নত ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা প্রায়শই অপ্রতুল। নতুন শিক্ষাপদ্ধতি, প্রযুক্তি এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে তাদের পরিচিতি কম থাকে।

কম বেতন ও সুযোগ-সুবিধা: মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রায়শই সাধারণ স্কুলের শিক্ষকদের তুলনায় কম হয়। এর ফলে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষকরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন না।

শিক্ষাদানের পরিবেশ: আলিয়া মাদ্রাসার অনেক প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব বা গ্রন্থাগার নেই। এমন দুর্বল পরিবেশে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া খুবই কঠিন। শিক্ষকের যোগ্যতা থাকলেও তিনি যথাযথ পরিবেশের অভাবে তার জ্ঞান ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন না।

৭. সামগ্রিক দুর্বলতার চক্র

এই প্রতিটি সীমাবদ্ধতা একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত হতে পারে না, যার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় না। মেধাবী শিক্ষার্থীর অভাবে মানসম্মত শিক্ষকরা আগ্রহ হারান। আবার, মানসম্মত শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার মান আরও কমে যায়, যা কর্মক্ষেত্রে আলিয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি নেতিবাচক ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে। এই চক্রের কারণে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো কখনো আশানুরূপ অগ্রগতি লাভ করতে পারেনি।

একটি মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উচিত ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থাটিকে যথাযথভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা, যাতে এটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু তা না হওয়ায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে যেমন আন্তরিক পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি সমাজেও আলিয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে।

বিভিন্ন ধারার শিক্ষার প্রভাব

আমাদের এই ভিন্নমুখী শিক্ষাব্যবস্থাগুলো সমাজে কিছু বিভেদ তৈরি করে। শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তাধারা নিয়ে বেড়ে ওঠে। একজন সাধারণ ধারার শিক্ষার্থী, একজন ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী এবং একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায়শই সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে পার্থক্য দেখা যায়। এটি সমাজের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।

একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের ধারণাটি একটি জটিল বিষয়। এর সুবিধা হলো, এটি একটি দেশের সব নাগরিকের মধ্যে একটি সাধারণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যা ভেদাভেদ কমাতে সাহায্য করবে। তবে এর অসুবিধা হলো, এটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কওমী মাদ্রাসাগুলো তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চায়, যা একটি একক শিক্ষাব্যবস্থায় কঠিন হতে পারে।

সন্তানের স্কুল নির্বাচন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সন্তানের জন্য সঠিক স্কুল বা মাদ্রাসা নির্বাচন করা সত্যিই একটি “মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন”। কারণ এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার বহুমুখিতা এতটাই প্রকট যে, একজন মুসলিম অভিভাবকের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি একটু খোলসা করলে পরিষ্কার হবে—

প্রথমত, সাধারণ স্কুল বা কলেজ ভিত্তিক শিক্ষা (যা মূলত সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ এবং ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে চলে) সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার চরম অভাব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু-কিশোররা আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা, গণিতসহ নানা ধরনের দক্ষতা অর্জন করলেও তাদের হৃদয়ে ইসলামী চেতনা গড়ে ওঠার মতো পরিবেশ থাকে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ধর্মহীন জীবনদর্শন, ভোগবাদী মানসিকতা ও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মাঝে গড়ে ওঠে। ফলে একজন মুসলিম অভিভাবক দ্বিধায় পড়ে যান—সন্তানকে জাগতিক বিদ্যায় দক্ষ করা যাবে ঠিকই, কিন্তু আখিরাতের জন্য প্রস্তুত করা যাবে তো?

দ্বিতীয়ত, কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা। এখানে শিশুরা কোরআন-হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও ইসলামী জ্ঞান নিয়ে বেড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ঈমানি শক্তি, তাকওয়া, দ্বীনী শৃঙ্খলা ও আখিরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, কর্মমুখী শিক্ষা বা আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান এখানে অনুপস্থিত। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুমুখী কর্মক্ষেত্রে সরাসরি নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারে না।

তৃতীয়ত, আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা। এখানে দ্বীনী জ্ঞান ও দুনিয়াবি বিদ্যার একটি মিশ্রণ রয়েছে। পাঠ্যক্রমে কোরআন-হাদিস, ফিকহ, ইসলামী ইতিহাসের পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে। কিন্তু বাস্তবতার কারণে শিক্ষার মান ঠিকভাবে রক্ষা করা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে অভিভাবকের মনোভাব দ্বিধাগ্রস্ত থেকে যায়—এখানে ইসলামি চেতনা আছে, আবার দুনিয়াবি জ্ঞানও আছে, কিন্তু মানের ঘাটতি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে দেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন অভিভাবক কী করবেন?

যদি সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি সাফল্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে আখিরাতের দিকটি উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আবার যদি শুধু দ্বীনি শিক্ষায় মনোনিবেশ করা হয়, তবে কর্মজীবনে সন্তান সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। আর আলিয়া মাদ্রাসায় দিলে মাঝামাঝি একটি সমাধান পাওয়া গেলেও শিক্ষার মান অভিভাবকদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। অতএব, একজন মুসলিম অভিভাবকের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, সে কি সন্তানের জন্য দ্বীনি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি আধুনিক কর্মমুখী শিক্ষাকে? বাস্তবে প্রয়োজন হলো একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে দ্বীনি শিক্ষা ও আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষার সমন্বয় থাকবে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ হতে পারে— অভিভাবকরা বিকল্প কোনো পথ খোঁজার চেষ্টা করবেন। যেমন—সাধারণ স্কুলে পড়ার পাশাপাশি বাসায় বা বিকল্প প্রতিষ্ঠানে ইসলামী শিক্ষার আয়োজন করা; অথবা কওমী মাদ্রাসায় পড়ানোর সাথে সাথে আধুনিক বিজ্ঞান, কম্পিউটার, ইংরেজি ইত্যাদি বিষয়ে আলাদা কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা। যা বলা সহজ কিন্তু করা খুবই কঠিন। তবে এর মাঝে সামান্য খুসির খবর আছে। বর্তমানে কিছু ইসলামি স্কুল ও মডেল মাদ্রাসা এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে, তবে সংখ্যা খুবই সীমিত। তাই সচেতন অভিভাবকদের জন্য সর্বোত্তম পথ হলো, যেকোনো প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করানোর পাশাপাশি ঘরে ইসলামি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা, কুরআন-হাদিসের জ্ঞান দান করা এবং নৈতিক চরিত্র গঠনে মনোযোগী হওয়া।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সঠিক শিক্ষা নির্বাচন শুধু স্কুলের ব্যাপার নয়, বরং অভিভাবকের সচেতনতার বিষয়। তিনি যেভাবেই সন্তানকে ভর্তি করুন না কেন, অতিরিক্ত যত্ন, দিকনির্দেশনা ও পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব তার নিজের উপরেই বর্তাবে। তাই এই জটিল বাস্তবতায় সরাসরি কোনো একপাক্ষিক সমাধান নেই। বরং ইসলামী চেতনা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বিত সমাধান খুঁজে বের করাই হবে সর্বোত্তম পথ।

পড়াশুনার পাশাপাশি ইসলামি অনুশাসন শিক্ষা : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আধুনিক সমাজে একজন মুসলিম সন্তানের জন্য শুধু সাধারণ শিক্ষায় পারদর্শী হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তার অন্তরে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও দ্বীনের চেতনা সঞ্চার হওয়া অপরিহার্য। কারণ স্কুলের শিক্ষার মাধ্যমে সে হয়তো দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করবে, কিন্তু দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে তার অন্তর আল্লাহর প্রতি ঈমান, রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা, আর আখিরাতের প্রস্তুতি সম্পর্কে সচেতন হবে। তাই অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানকে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক অনুশাসন শেখানো।

শিশু বয়সে অর্জিত শিক্ষা দীর্ঘজীবন পর্যন্ত মনে গেঁথে থাকে। তাই এই বয়সেই যদি তাকে সঠিক আকিদা, সালাত, শিষ্টাচার ও পর্দার ধারণা শেখানো যায়, তবে সে বড় হয়ে একজন আদর্শ মুসলিম এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। আজকের শিশুই আগামী দিনের পরিবারপ্রধান, সমাজের নেতা কিংবা রাষ্ট্রের কর্ণধার। যদি তার ভেতরে দ্বীনের মৌলিক ভিত্তি মজবুত হয়, তবে দুনিয়ার শিক্ষা তাকে পথভ্রষ্ট না করে বরং দ্বীনকে সঠিকভাবে ধারণ করার শক্তি দেবে।

একজন স্কুলগামী মুসলিম বালকের জন্য দ্বীনের যে বিষয়গুলো অপরিহার্য জ্ঞান হিসেবে শিখতে হবে, তা আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করছি।  

এর মধ্যে প্রথমেই আসছে— আকিদার মৌলিক বিষয়, যাতে সে আল্লাহর একত্ব, নবুওয়াত, আখিরাত ও ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে। দ্বিতীয়ত— সালাতের সাধারণ নিয়ম, কারণ সালাত দ্বীনের স্তম্ভ এবং প্রতিদিনকার অপরিহার্য ইবাদত। তৃতীয়ত— পর্দার প্রাথমিক ধারণা, যাতে সে ছোটবেলা থেকেই শালীনতা ও দৃষ্টি সংযমে অভ্যস্ত হয়।

এর পাশাপাশি আরও কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে, যা প্রত্যেক মুসলিম শিশুর জানা জরুরি। যেমন:

১. আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন

২. পবিত্রতার মৌলিক জ্ঞান অর্জন

৩. কুরআন শিক্ষা করা

৪. সালাতের সাধারণ নিয়ম শিক্ষা করা

৫. পর্দার প্রাথমিক ধারণা নেওয়া

৬. সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা (অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধু ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব)

৭. দু’আ ও যিকিরের মৌলিক দিকগুলো শেখা

৮. হালাল-হারামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা

১. আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন

শিশুদের আকিদার মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ আকিদা দ্বীনের মূলভিত্তি। ছোটবেলা থেকেই যদি শিশু বুঝতে পারে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, সবকিছুর মালিক, আর নবী ﷺ হচ্ছেন সর্বশেষ রাসূল, তবে তার ঈমান দৃঢ় হবে। আখিরাত, ফেরেশতা, বারজাখ ও কিয়ামতের বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা থাকলে সে জীবনের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে বুঝতে পারবে। আকিদার জ্ঞান শিশুকে কুসংস্কার, ভ্রান্ত বিশ্বাস ও গোমরাহি থেকে রক্ষা করে। এতে তার হৃদয়ে তাকওয়া জন্মায় এবং আমলগুলো সঠিক পথে পরিচালিত হয়। তাই দুনিয়াবি শিক্ষার পাশাপাশি আকিদার মৌলিক শিক্ষা দেওয়া প্রতিটি অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব। নিচে আকিদার কিছু মৌলিক বিষয় প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-

১. তোমার রব (رَبٌّ) কে?

আমার ও সমগ্র বিশ্বের রব আল্লাহ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-

ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِينَ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বের রব। সুরা ফাতিহা : ১

২: রব (رَبٌّ)  অর্থ কি?

“রব” (رَبّ) শব্দটি আরবি। এর মূল অর্থ হলো—

সৃষ্টি করা, পরিপূর্ণ করা, পরিপালন করা, পরিচর্যা করা ও লালন পালন করা। যিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, মালিক, নিয়ন্ত্রক, পরিচর্যাকারী ও হিদায়াত দানকারী।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ

বলুন, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে রব বানাবো? অথচ তিনিই সব কিছুর রব।” সুরা আনআম : ১৬৪

৩: আল্লাহ (اللّٰه) অর্থ কি?

আল্লাহ (اللّٰه) শব্দটি ইসলামের সবচেয়ে মহিমান্বিত নাম। আল্লাহ মানে হল— যাবতীয় ইবাদত, আনুগত্য ও উপাসনার যোগ্য একমাত্র সত্য সত্তা। কুরআনের ভাষায়-

وَإِلَـٰهُكُمْ إِلَـٰهٌۭ وَٰحِدٌۭ ۖ لَّآ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلرَّحْمَـٰنُ ٱلرَّحِيمُ

তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু।” সুরা বাকারা : ১৬৩

৪: আল্লাহ কোথায় আছন?

আমার প্রভু আল্লাহ উর্ধ্বে, আরশের উপরে আছেন। মহান আল্লাহ নিজের সম্পর্কে বলেন,

اَلرَّحۡمٰنُ عَلَی الۡعَرۡشِ اسۡتَوٰی

পরম করুণাময় আরশের ওপর সমুন্নত। সুরা ত্বহা : ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-

الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ

যিনি আসমান জমিন ও এতদুভয়ের অন্তবর্র্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। সুরা ফুরকান : ৫৯

কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা আরশে সমুন্নত। তিনি স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন, বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান। এমনকি গভির সমুদ্রের ক্ষুত্র প্রানি, জমিনের গভিরের ছোট পোকা তার দৃষ্টি ও জ্ঞানের বাহিরে নয়।

৫. আল্লাহর আকার আছে কি?

আল্লাহ রব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা জায়েয নাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

لَیۡسَ کَمِثۡلِہٖ شَیۡءٌ ۚ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। সুরা শুয়ারা : ১১

এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, সৃষ্টি জগতের কোন সৃষ্টির সদৃশ তিনি নন। কাজেই আল্লাহ তায়ালার আকার আছে বললে যে আকৃতিতে কল্পনা করবেন তাই ভুল। যেহেতু, কুরআন ও সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাঁর নিজস্ব সত্তার হাত, পা, মুখ, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ শক্তি, তাঁর সন্তুষ্টি ও ক্রোধ-ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা তা বিশ্বাস করি কিন্তু তার ধরন জানিনা। মুমিনগণ কিয়ামাতের দিন তাকে দেখতে পাবে। তাই নিরাকার বলাটা তো একেবারেই অযৌক্তিক।  সুরা কিয়ামা : ২২-২৩

কুরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনাতে দেখা যায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর চেহারা, হাত, পা, চক্ষু, যাত বা সত্তা, সুরাত আছে। এই ধারনা থেকে অনেক মনে করেন আল্লাহর আকার আছে। মানুষ তার কল্পনা শক্তি দ্বারা জাগতিক বিশ্বের বাহিরে কোন আকার কল্পনা করতে পারে না। তাই তারা আল্লাহকে যে কোন সৃষ্টির আকারে সাব্যস্থ করে কল্পনা করে যা মূলত কুফরি।

৬. আল্লাহ আমদেরকে কেন সৃষ্টি করেছেন?

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ

আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। সুরা জারিয়াত : ৫৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন-

৭. আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় পাপ কোন্‌টি?

উত্তর : আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় পাপ হলে- শিরক। অর্থাত তার প্রভুত্তে, ইবাদতে ও গুনে কাউকে তার সমকক্ষ দাড় করার।

৮. ইবাদত অর্থ কি?

যে সকল কাজের কারণে আল্লাহ আমাদের ভালোবাসে বা সন্ত্বষ্ট হন তাই ইবাদত। যেমন- সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত, দান সদগা, জিকির, পর্দা করা, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করা, উপকার করা ইত্যাদি।

৯. আমরা কার ইবাদত করব?

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন-

وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡ‍ٔٗاۖ

আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। সুরা নিসা : ৩৬

১০. বান্দার প্রথম ফরজ কাজ কোনটি?

বান্দার প্রথম ফরজ কাজ হলো- আল্লাহ, তার ফিরিশতা, তার নাজিল করা কিতাব, তার রাসুল, শেষ দিবস ও তাকদিরের ভালো-মন্দের ওপর ঈমান আনা।

১১ তোমান দ্বীন কি?

আমার দ্বীন হচ্ছে, ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥

“যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা তার পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুরা আল ইমরান : ৮৫

১২. সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি কে?

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি হলো- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

১৩. ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন হক বা সত্য ধর্ম আছে কি?

না, ইসলাম ছাড়া অন্য কোন সত্য দ্বীন নাই। ইসলাম আল্লাহ মতোনিত একমাত্র পরিপূর্ণ দ্বীন। মহান আল্লাহ বলেন,

ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নে’মতসমূহ সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পছন্দ করলাম। সুরা মায়েদাহ : ৩

১৪. ঈমানের পুরস্কার কি?

ঈমানের পুরস্কার জান্নাত। মহান আল্লাহ বলেন-

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ

অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সুরা বাকারা : ২৫

১৫. কাফিরের আলম ওজন করা হবে না

আল্লাহ তায়ালা-

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ رَبِّہِمۡ وَلِقَآئِہٖ فَحَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ فَلَا نُقِیۡمُ لَہُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَزۡنًا

তারাই সেসব লোক, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতকে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন ওজনের ব্যবস্থা রাখব না’। সুরা কাহাব : ১০৫

১৬. ইহসান কাকে বলে?

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইহসান হলো-

«أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ

এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে সক্ষম না হও, তাহলে মনে করবে, তিনি তোমাকে দেখছেন। সহিহ মুসলিম : ৮

১৭. নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব কিছুর পরিচালক কে?

আল্লাহ তায়ালাই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব বস্তুর পরিচালক।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ اِلَیۡہِ فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ

তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর। সুরা সিজদা : ৫

১৮. নবি, রাসূল, অলি-আওলিয়ারা কি গায়েবের খবর জানেন?

মহান আল্লাহ বলেন-

﴿وَلَوۡ كُنتُ أَعۡلَمُ ٱلۡغَيۡبَ لَٱسۡتَكۡثَرۡتُ مِنَ ٱلۡخَيۡرِ وَمَا مَسَّنِيَ ٱلسُّوٓءُۚ

“আর আমি যদি গায়বের কথা জানতাম, তাহলে বহু কল্যাণ অর্জন করে নিতে পারতাম এবং কোনো অকল্যাণ আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। সুরা আরআফ : ১৮৮

আমাদের প্রিয় রাসুল ﷺ যেখানে গায়েব জানেন সেখানে অন্য নবি, রাসূল, অলি-আওলিয়ারাদের বিষয়টি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

১৯. আল্লাহর অলি হতে কি কি গুন থাকা প্রয়োজন?

অলি আওলিয়া সম্পর্কে আমাদের সমাজে ভ্রান্ত ধারনা প্রচলিত আছে যে যিনি আল্লাহ অলি ব বন্ধু হবে তিনি অলৌকিক ক্ষমতার দেখান বা তার মাধ্যমে শত শথ অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পায়। তদের ও ধারনা মিথ্যা ও কুফরির সামিল। কেননা অলৌকিক ক্ষমতার মালিক শুধি আল্লাহ। মহান আল্লাহর মতে দুটি গুনা কোন মানুষের মাঝে থাকলে তিনিই আল্লাহ অলি বা বন্ধু। আল্লাহ তায়ারা বলেন-

اَلَاۤ اِنَّ اَوْلِیَآءَ اللّٰهِ لَا خَوْفٌ عَلَیْهِمْ وَ لَا  هُمْ  یَحْزَنُوْنَ ﴿ۚۖ۶۲﴾   الَّذِیْنَ  اٰمَنُوْا  وَ كَانُوْا  یَتَّقُوْنَ ﴿ؕ۶۳﴾

জেনে রাখ, আল্লাহর বন্ধুদের (অলিয়াদের) কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারা হলো, যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। সুরা ইউনুস : : ৬২-৬৩

২০. পৃথিবীতে কি আল্লাহকে দেখা সম্ভব?

না, পৃথিবীতে বসে আল্লাহকে দেখা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

لَا تُدۡرِکُہُ الۡاَبۡصَارُ ۫ وَہُوَ یُدۡرِکُ الۡاَبۡصَارَ ۚ وَہُوَ اللَّطِیۡفُ الۡخَبِیۡرُ

কোন মানব-দৃষ্টি তাঁকে দেখতে পারেনা, অথচ তিনি সকল কিছুই দেখতে পান এবং তিনি অতীব সূক্ষ্মদর্শী এবং সর্ব বিষয়ে ওয়াকিফহাল। সুরা আনআম : ১০৩

২১. মুমিনগণ পরকালে কি আল্লাহকে দেখতে পারবে?

হ্যাঁ, মুমিনগণ জান্নাতে তাঁদের প্রতিপালককে দেখতে পাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

وَ  لٰكِنْ  كَذَّبَ وَ تَوَلّٰی ﴿ۙ۳۲﴾  ثُمَّ  ذَهَبَ  اِلٰۤی  اَهْلِہٖ یَتَمَطّٰی ﴿ؕ۳۳﴾

সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের পালনকর্তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। সুর কিয়ামাহ : ২২-২৩

২২. ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ কতটি?

ঈমানের রুকন বা স্তম্ভ ছয়টি। যথা-

কুরআনুল কারীমের আয়াত ও সহিহ হাদিস পর্যালোচনা করে আলিমগণ হাদিসে জিবরাঈলে বর্ণিত ছয়টি বিষয় কে ঈমানের মূল ভিত্তি উল্লেখ করেছেন। যথা-

(১) আল্লাহর প্রতি ঈমান,

(২) ফেরেশতাগণের প্রতি ঈমান,  

(৩) আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান,  

(৪) রাসূলগণের প্রতি ঈমান,

(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান এবং

(৬) তাকদীর বা পূর্বনিয়তির প্রতি ঈমান।

২৩. তাওহীদ কয় প্রকার ও কি কি?

তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ তিন প্রকার। যথা

১. ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ :  এর অর্থ হচ্ছে, আমাদেরকে এমর্মে অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, একমাত্র আল্লাহই এককভাবে ইবাদত পাওয়ার যোগ্য, এতে তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ

“তাদেরকে কেবলমাত্র এই নির্দেশ করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি বিশ্বাসের সহিত এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে। সুরা বাইয়েনাহ : ৫

২. রুবুবিয়াত তথা প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ:  অর্থাৎ আমাদেরকে এই অকাট্য বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, একমাত্র আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রিযিক্বদাতা এবং পরিচালক; এক্ষেত্রে তার কোনো অংশীদার নেই এবং নেই কোনো সহযোগীও। মহান আল্লাহ বলেন,

هَلۡ مِنۡ خَٰلِقٍ غَيۡرُ ٱللَّهِ يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۖ فَأَنَّىٰ تُؤۡفَكُونَ

আল্লাহ ব্যতীত এমন কোন স্রষ্টা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযিক্ব দান করে? তিনি ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই। অতএব, তোমরা কিভাবে (তাঁর তাওহীদ থেকে) ফিরে যাচ্ছ?” সুরা ফাতির : ৩

৩. আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ এবং গুণাবলীর ক্ষেত্রে একত্ববাদ : অর্থাৎ এই বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ এবং পরিপূর্ণ গুণাবলী রয়েছে, যেগুলি কুরআনুল কারীম ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন-

وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ

আর আল্লাহর রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। অতএব, সেগুলির মাধ্যমেই তাঁকে ডাকো সুরা  আরাফ : ১৮০ এই নামসমূহ এবং গুণাবলীতে কোনোরূপ পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যাবে না এবং এগুলির কল্পিত কোনো আকৃতি যেমন স্থির করা যাবে না, তেমনি কোনো সৃষ্টির সাথে সেগুলির কোনোরূপ সাদৃশ্য বিধানও করা চলবে না। আমাদেরকে আরো বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহর মত আর কেউ নেই। আল্লাহ বলেন,

لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞۖ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ

কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা এবং সর্বদ্রষ্টা” (শূরা ১১)।

২৪. শির্ক কত প্রকার ও কি কি?

শির্ক দুই প্রকার। যথা-

১. বড় শিরক।

২. ছোট শিরক।

১. শিরকে আকবার বা বড় শিরক

বান্দা যখন একমাত্র আল্লাহর অধিকার বা হককে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে নিবেদন করবে তখন শিরকে আকবর হবে। অর্থাৎ তার রুবুবিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার উলুহিয়াতের কোনো অংশ, অথবা তার নাম ও গুণাবলির কোনো অংশকে তিনি ব্যতীত কাউকে নিবেদন করবে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا فَاُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ 

আর যারা কুফরী করে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তাদের জন্যেই রয়েছে অপমানজনক আযাব। সুরা হজ : ৫৭

২. শিরকে আসগার বা ছোট শিরক

আল্লাহ তা’আলার উদ্দেশ্যে বাস্তবায়ন কৃত আমল মানুষকে দেখানোর জন্য করাতে যে শিরক হয় তাকে ছোট শিরক বা রিয়া বলা হয়।  শিরকে আসগার। শিরকে আসগার মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না। তবে এটি আমলকে নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَمَنۡ کَانَ یَرۡجُوۡا لِقَآءَ رَبِّهٖ فَلۡیَعۡمَلۡ عَمَلًا صَالِحًا وَّ لَا یُشۡرِکۡ بِعِبَادَۃِ رَبِّهٖۤ اَحَدًا

সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে। সূরা আল কাহফ : ১১০

২৫. কুফরী কত প্রকার ও কি কি?

কুফরী দুই প্রকার। যথা-

১. বড় কুফরী :

২. ছোট কুফরী :

১. বড় কুফরী : যে কুফরি মানুষকে দ্বীন থেকে বের করে দেয়। যেমন-

আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে গালি দেওয়া বা অস্বীকার করা। ইসলামের রুকনসমূহ বা আল্লাহ কর্তৃক ফজরকৃত বিধানকে অস্বীকার করলে বড় কুফরি হবে। মহান আল্লাহ বলেন-

وَ لَئِنْ سَاَلْتَهُمْ لَیَقُوْلُنَّ اِنَّمَا کُنَّا نَخُوْضُ وَ نَلْعَبُ ؕ قُلْ اَ بِاللّٰهِ وَ اٰیٰتِہٖ وَ رَسُوْلِہٖ  کُنْتُمْ  تَسْتَہْزِءُوْنَ ﴿۶۵﴾ لَا تَعْتَذِرُوْا قَدْ كَفَرْتُمْ  بَعْدَ  اِیْمَانِکُمْ ؕ اِنْ نَّعْفُ عَنْ طَآئِفَۃٍ مِّنْکُمْ نُعَذِّبْ طَآئِفَۃًۢ  بِاَنَّهُمْ  كَانُوْا  مُجْرِمِیْنَ ﴿۶۶﴾

আর যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর, অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বল, ‘আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের সাথে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে’? তোমরা ওযর পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরী করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আযাব দেব। কারণ, তারা হচ্ছে অপরাধী। সুরা তাওবা : ৬৫-৬৬

২. ছোট কুফরী : আল্লাহর নেয়ামত অস্বীকার করা অথবা কোনো মুসলিম ব্যক্তির সাথে অন্যায়ভাবে কলহ-বিবাদ ও মারামারি করা বা হত্যা করা।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ

 মুসলিমকে গালি দেয়া ফাসিকী এবং তাকে হত্যা করা কুফুরী। সহিহ বুখারি : ৬০৪৪

২৬. আখেরাতে সুপারিশ প্রাপ্তির শর্ত কি?

আখেরাতে সুপারিশ প্রাপ্তির দুটি শর্ত। যথা-

১. ঈমারদান :

২. আল্লাহ অনুমতি :

১. ঈমারদান : সুপারিশ প্রাপ্তির প্রাথমিক যোগ্যতা হলো তাকে ইমানদার হতে হবে। দুনিয়াতে যারা প্রকাশ্য শিরক ও কুফরীর গুনাহে লিপ্ত ছিল এবং এর উপর মৃত্যুবরণ করেছেন, কিয়ামত দিবসে তারা সুপরিশ থেকে বঞ্চিত হবেন। তাদের জন্য কোন প্রকারের সুপারিসের অনুমতি প্রদান করা হবে না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَـٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَـٰلِدِينَ فِيہَآ

আহলে কিতাবের মধ্যে যারা কাফের এবং মুশরিক, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ী ভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। সূরা বায়্যিনাহ : ৬

এ থেকে বুঝা গেল, কাফির এবং মুশরিকদের জন্য কোন সুপারিশকারী নাই।

২. আল্লাহর অনুমতি : আখিরাতের সেই ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না। তিনি যাকে ইচ্ছা সুপারিশের অনুমতি দেবেন। ইহা সম্পূর্ণরূপে তার ইচ্ছাধীন। শ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর এবং কোন নিকটতম ফেরেশতাও এই পৃথিবী ও আকাশের মালিকের দরবারে বিনা অনুমতিতে একটি শব্দও উচ্চারণ করার সাহস রাখে না।আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُل لِّلَّهِ ٱلشَّفَـٰعَةُ جَمِيعً۬ا‌ۖ لَّهُ ۥ مُلۡكُ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَٱلۡأَرۡضِ‌ۖ ثُمَّ إِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ (٤٤) 

বলো, সুপারিশ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক তিনিই৷ তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে৷ সূরা যুমার : ৪৪

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন-

مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ مَن ذَا ٱلَّذِى يَشۡفَعُ عِندَهُ ۥۤ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦ‌ۚ

অর্থ: পৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তার৷  কে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? সূরা বাক্বারা : ২৫৫

২৭. কারা আল্লাহ অনুমতি প্রদান সাপেক্ষে সুপারিশ করতে পারবে

ঈমান ও আল্লাহর অনুমতি প্রদানে পর আল্লাহ কিছু বান্দা অন্য বান্দাদের সুপারিশ করতে পারবে।  সহিহ হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, বিশ্বনবি মুহাম্মদ ﷺ প্রথম  সুপারিশের অনুমতি পাবেন। 

আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَأَوَّلُ مَنْ يَنْشَقُّ عَنْهُ الْقَبْرُ وَأَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ

আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি। সহিহ মুসলিম : ২২৭৮, সুনানে আবু দাউদ : ৪৬৭০

রসূলুল্লাহ এর পর অন্যান্য নবী রাসুলগণ, শহিদগণ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ, কুরআন ও সিয়াম মুমিনদের জন্য সুপারিশের অনুমতি পাবেন 

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরাহ অর্থাৎ সুরাহ আল বাকারাহ এবং সুরাহ্ আল ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরা বাকারাহ পাঠ কর। এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বারাকাতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না। সহিহ মুসলিম : ৮০৪

নিমরান ইবনু উতবাহ আয-যামারী (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা কতক ইয়াতীম উম্মুদ দারদা (রা.) এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। কেননা আমি আবূ দারদা (রাঃ) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন শহিদ তার পরিবারের সত্তরজনের জন্য সুপারিশ করবে এবং তার সুপারিশ কবুল করা হবে। আবু দাউদ : ২৫২২

২৮. ইবাদত কবূল হওয়ার শর্ত কয়টি ও কি কি?

ইবাদত কবূল হওয়ার শর্ত দু’টি। যথা-

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা

২. সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি করতে হবে

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করা : ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া। মহান আল্লাহ বলেন,

وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ

তাদেরকে কেবলমাত্র এই নির্দেশ করা হয়েছে যে, তারা খাঁটি বিশ্বাসের সাথে এবং একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে” (বাইয়্যেনাহ ৫)।

২. সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি করতে হবে : রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রদর্শিত পদ্ধতিত বা সুন্নাহ সম্মতভাবে করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন-

مَنۡ یُّطِعِ الرَّسُوۡلَ فَقَدۡ اَطَاعَ اللّٰہَ ۚ  وَمَنۡ تَوَلّٰی فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ عَلَیۡہِمۡ حَفِیۡظًا ؕ

যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি। সুনা নিসা : ৮০

রাসূল ﷺ প্রতি খুতবায় বলতেন-

«فَإِنَّ خَيْرَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ، وَخَيْرَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ»

অর্থ: “নিশ্চয় সর্বোত্তম কথা আল্লাহর কিতাব এবং সর্বোত্তম পথনির্দেশ মুহাম্মদ ﷺ-এর পথনির্দেশ। আর নিকৃষ্টতম কাজ হলো দ্বীনে নতুন উদ্ভাবন, আর প্রতিটি নতুন উদ্ভাবনই বিদআত। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে দাউদ : ৪৬০৭, সুনানে আন-নাসায়ি : ১৫৭৮, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫

২৯গণক বা জ্যোতিষীগণ কি অদৃশ্যের খবর রাখেন?

না, গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন না। অদৃশ্যে জ্ঞানের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা।  আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

*عَٰلِمُ ٱلْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِۦٓ أَحَدًا *

তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। সুরা জিন : ২৬

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

قُلۡ لَّا یَعۡلَمُ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ الۡغَیۡبَ اِلَّا اللّٰہُ ؕ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ اَیَّانَ یُبۡعَثُوۡنَ

বল, ‘আল্লাহ ছাড়া আসমানসমূহে ও যমীনে যারা আছে তারা গায়েব জানে না। আর কখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তা তারা অনুভব করতে পারে না’। সুরা নামল : ৬৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

فَلَمَّا قَضَیۡنَا عَلَیۡہِ الۡمَوۡتَ مَا دَلَّہُمۡ عَلٰی مَوۡتِہٖۤ اِلَّا دَآبَّۃُ الۡاَرۡضِ تَاۡکُلُ مِنۡسَاَتَہٗ ۚ  فَلَمَّا خَرَّ تَبَیَّنَتِ الۡجِنُّ اَنۡ لَّوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ الۡغَیۡبَ مَا لَبِثُوۡا فِی الۡعَذَابِ الۡمُہِیۡنِ ؕ

তারপর যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করলাম তখন মাটির পোকা জিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করল, যা তার লাঠি খাচ্ছিল। অতঃপর যখন সে পড়ে গেল তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি গায়েব জানত তাহলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক আযাবে থাকত না। সুরা সাবা : ১৪

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো অথবা স্ত্রীর মলদ্বারে সঙ্গম করলো অথবা গণকের নিকট গেলো এবং সে যা বললো তা বিশ্বাস করলো, সে অবশ্যই মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর নাযিলকৃত জিনিসের বিরুদ্ধাচরণ করলো। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৩৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৫, সুনানে আবূ দাঊদ ৩৯০৪,

কুরআন সুন্নাহর আলোকে বলা যায়- আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কারো কাছে গায়ের প্রকাশ করেন না, কোন নবী রাসূলও গায়েব জানে না, এমনকি কোন জিনও গায়েব জানে না। তাহলে গণক বা জ্যোতিষী অদৃশ্যের খবর রাখেন এমন বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের নিকট অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া নিসন্দেহে শির্ক পর্যায়ের কবিরা গুনাহ।

৩০. ঈসা আলাইহিস সালাম কি মৃত্যুবরণ করেছেন?

না, ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেন নাই। তাকে উপরে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন-

وَّ قَوْلِهِمْ اِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِیْحَ عِیْسَی ابْنَ مَرْیَمَ رَسُوْلَ اللّٰهِ ۚ وَ مَا قَتَلُوْهُ وَ مَا صَلَبُوْهُ وَ لٰكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ ؕ وَ  اِنَّ الَّذِیْنَ اخْتَلَفُوْا فِیْهِ لَفِیْ شَکٍّ مِّنْهُ ؕ مَا لَهُمْ بِہٖ مِنْ عِلْمٍ  اِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ ۚ وَ مَا قَتَلُوْهُ  یَقِیْنًۢا ﴿۱۵۷﴾ۙ  بَلْ رَّفَعَهُ اللّٰهُ اِلَیْهِ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ عَزِیْزًا حَكِیْمًا ﴿۱۵۸﴾

এবং তাদের এ কথার কারণে যে, ‘আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম পুত্র ঈসা মাসীহকে হত্যা করেছি’। অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং তাকে শূলেও চড়ায়নি। বরং তাদেরকে ধাঁধায় ফেলা হয়েছিল। আর নিশ্চয় যারা তাতে মতবিরোধ করেছিল, অবশ্যই তারা তার ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে ছিল। ধারণার অনুসরণ ছাড়া এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই। আর এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করেনি। বরং আল্লাহ তাঁর কাছে তাকে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। সুরা নিসা : ১৫৭-১৫৮

মহান আল্লাহ আরওভ বলেন-

اِذۡ قَالَ اللّٰہُ یٰعِیۡسٰۤی اِنِّیۡ مُتَوَفِّیۡکَ وَرَافِعُکَ اِلَیَّ وَمُطَہِّرُکَ مِنَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا

স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ঈসা, নিশ্চয় আমি তোমাকে পরিগ্রহণ করব, তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নেব এবং কাফিরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করব। সুরা আল ইমরান : ৩৩

এ আয়াতগুলোই প্রমাণ করে যে ঈসা আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেন নাই; বরং আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন।

৩১. খিযির কি এখনো জীবিত?

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে প্রেরিত হওয়ার আগেই খিযির মারা গেছেন। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٖ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَٰلِدُونَ

আপনার পূর্বে কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে? সুরা আম্বিয়া : ৩৪

পড়াশুনার পাশাপাশি ইসলামি অনুশাসন শিক্ষা : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পবিত্রতার মৌলিক জ্ঞান অর্জন

তাহারাত (الطَّهَارَةُ) :

তাহারাত আরবি শব্দ, যার অর্থ হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা ও অপবিত্রতা থেকে মুক্তি। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য তাহারাত অপরিহার্য।  অজু, গোসল এবং তায়াম্মুম এ তিনটির মাধ্যমে তাহারাত বা পবিত্রতা অর্জিত হয়। তাহারাত অর্জনের তিনটি পদ্ধতি:

১. অজু ও অজুর ফজিলত :

ইসলামী পরিভাষায় অজু বলতে বুঝায়, “নির্ধারিত একটি পদ্ধতি অনুযায়ী নিয়তসহ বিশেষ অঙ্গসমূহ ধৌত করার মাধ্যমে শরীয়ত সম্মত উপায় পবিত্রতা অর্জন করাকে অজু বলে।

উসমান ইবনে আফফান (রা.) বলেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“‏ مَنْ تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ خَرَجَتْ خَطَايَاهُ مِنْ جَسَدِهِ حَتَّى تَخْرُجَ مِنْ تَحْتِ أَظْفَارِهِ

অর্থ : যে ব্যক্তি অজু করল এবং উত্তমভাবে অজু করল, তার গুনাহসমূহ তার দেহ থেকে বের হয়ে যায়, এমনকি তা তার নখের নিচ থেকে বের হয়ে যায়। সহিহ মুসলিম : ২৪৫, মিশকাত : ২৮৪

অজু বিধান :

পরিবেশ পরিস্থিতির কারনে অজু কখন ফরজ, কখনও ওয়াজিব আবার কথনও মুস্তাহাব। মহান আল্লাহ বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فاغْسِلُواْ وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُواْ بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَينِ

অর্থঃ হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতে দন্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত কর। সুরা মায়েদা : ৬

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাক-পবিত্রতা ছাড়া সালাত এবং হারাম ধন-সম্পদের দান-খয়রাত কবূল হয় না। সহিহ মুসলিম : ২২৪, মিশকাত : ৩০১, সুনানে তিরমিজি : ০১

যে অবস্থায় অজু করা ফরজ হয় :

১। সালাত আদায়ের জন্য অজু করা ফরজ। সহিহ বুখারী ১৩৫, সহিহ মুসলিম ২২৪, ২২৫, মিশকাত : ৩০১, সুনানে তিরমিজি : ০১

২. জানাযার সালাত আদায়ের জন্য অজু করা ফরজ। সুনান আল কুবরা, বাইহাকি : ২১২, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১১৫৮৭

৩. তিলাওয়াতের সিজদা আদায়ের জন্য অজু করা ফরজ। ইবনে মাজাহ ২৭২, সহিহ মুসলিম ২২৪, তিরমিযী ১, আহমাদ ৪৬৮৬

অজু ওয়াজিব হওয়ার কারনসমূহ :

১. বাইতুল্লাহ তাওয়াফের জন্য অজু করা ওয়াজিব। সুরা বাকারা ১২, সহিহ বুখারি ৩০৫

২. কুরআন স্পর্শ করার জন্য অজু করা ওয়াজিব। মিসকাত ৪৬৫, মালিক ৪৬৮, দারাকুত্বনী, সহীহুল জামি ৭৭৮০, আল মুয়াত্তা ৫৩৪

যে সকল কারণে অজু করা সুন্নাত বা মুস্তাহাব :

১। গোসলের পূর্বে অজু করা সুন্নাত। সহিহ বুখারি ২৪৯, ২৫৭, ২৫৯, ২৬০, ২৬৬, সহিহ মুসলিম ৩১৮

২। ঘুমানা পূর্বে অযু করা সুন্নাত। সহিহ বুখারি : ২৪৭

৩। জানাবাত বা গোসল ফরজ অবস্থায় ঘুমানোর আগে অজু করা। সহিহ বুখারি : ২৮৬

৪। সালাত আদায়ের জন্য মসজিদে রওয়ানা হওয়া আগে অজু করা। সুনানে ইবনে মাজাহ :২৮০৫।

৫। অজু থাকা অবস্থায় ঘন ঘন অজু নবায়ন করা। সহিহ বুখারি : ১৩৬

৬। একাধিক বার স্ত্রীসহবাসের পর নতুন অজু করা সুন্নাহ। সহিহ মুসলিম : ৩০৮; আবু দাউদ : ২১৮

৭। প্রত্যেক সালাতের জন্য নতুন অজু (যদি পূর্বের অজু ভঙ্গ না হয়)। সুনানে আবু দাউদ : ৩০৫, মিশাকাত : ৪২৫, দারেমী : ৭২০

৯। গুনাহের পর তাওবা ও অজু করা। তাবরানি, মুজামুল আওসাত : ৬২৩৫

১০। রাগের সময় অজু। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৮৪

১১। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর অজু করা। সহিহ বুখারি : ১৬২

অজুর ফরজ আমলসমূহ :

অজুর ফরজ চারটি। যথা-

১। সমস্ত মুখমণ্ডল ধৌত করা।

২। দুই হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করা।

৩। মাথা মাসেহ করা।

৪। দুই পা টাকনুসহ ধৌত করা।

ইহা ছাড়াও নিম্মের কাজগুলিকে কিছু আলেম ওয়াজিব বলে উল্লেখ করেছেন।

১. অঙ্গগুলো ধৌত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ের বিরতি না দেয়া।

২.  অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা। এ মত প্রকাশ করেছেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)।

৩. অজুর অঙ্গগুলোর মাঝে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। ধারাবাহিকতা হলো- প্রথম মুখণ্ডল ধৌতকরা অতপর হাত ধোয়া, মাথা মাসেহ করা সর্বশেষে পা ধোয়া। তবে অধিকাংশ আলিমের মতে অজুর এ ধারাবাহিক কাজগুলি ওয়াজিব নয় বরং সুন্নত।

অজুর সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি :

ধারাবাহিক কাজগুলো সুন্দর করে উপস্থাপন করা হলো :-

(১) প্রথমেই অজুর নিয়ত করা। বুখারি : ১, মিশকাত : ১

(২) বিশমিল্লাহ বলে অজু শুরু করা। সুনানে তিরমিজি : ২৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৯৮, সহীহুল জামি : ৭৫১৪, মিশকাত : ৪০২, সুনানে আবু দাউদ : ১০১

(৩) জোড়া অঙ্গগুলির ডান অঙ্গকে আগে ধোয়া। মিশকাত : ৪০১, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪১৪১, সহীহুল জামি : ৭৮৭, আহমাদ : ৮৬৫২।

(৪) উভয় হাত কবজি র্পযন্ত ধৌত করা। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৭৩, সুনানে তিরমিযী ৪৮, সুনানে নাসায়ী ৯৬, মিশকাত : ৪১০

(৫) কপালের গোড়া থেকে দুই কানের লতী হয়ে থুৎনীর নীচ পর্যন্ত পুরা মুখমণ্ডল ধৌত করা। সহিহ বুখারি : ২৯১৮

(৬) অজুতে প্রতি অঙ্গ তিন বার ধৌত করা। সহিহ বুখারি : ১৫৯, ১৬০, ১৬৪, ১৯৩৪, ৬৪৩৩, সহিহ মুসলিম ২২৬, সুনানে আবূ দাঊদ ১৪৫, মিশকাত : ৪০৮, ৪০৯ সুনানে তিরমিযী ৩১,

(৭) তিন বার কুলি করা ও নাকে পানি দিবে। সহিহ বুখারি : ১৮৫, সুনানে আবূ দাঊদ ১১৯, সুনানে তিরমিযী ২৮, মিশকাত : ৪১২  

(৮) তিন বারের কম বেশী হলেও সমস্যা নাই। সহিহ বুখারি : ১৫৭, ১৫৮, মিশাকাত : ৩৯৫, ৩৯৬

(৯) তিনের অধিকবার বাড়াবাড়ি। মিশকাত : ৪১৭, সুনানে নাসায়ী : ১৪০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪২২, সহীহাহ : ২৯৭০

(১০) অজুতে গড়গড়া করে কুলি করা (সিয়াম অবস্থায় নয়)। সুনানে নাসায়ী : ৮৪

(১১) অজুর সময় নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা। সুহিহ বখারি : ১৬১, ১৬২, সহিহ মুসলিম ২৩৭

(১২) দাড়ি থাকলে খলিাল করা। সুনানে আবু দাউদ : ১৪৫, সুনানে তিরমিজি : ৩১, ইবনে মাজাহ ৪৩০।

(১৩) আঙুলসমূহ খিলাল করা। সুনানে আবূ দাঊদ ১৪২, সুনানে তিরমিযী ৭৮৮, সুনানে নাসায়ী ১১৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৪৮, মিশকাত : ৪০৫

(১৪) মাথার সামনরে থেকে সম্পূর্ণ মাথা মাসাহ করা। সহহি মুসলমি : ২৩৫।

(১৫) উভয় কানরে ভতেরে ও বাইরে মাসহে করা।  সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৩৯, মিশকাত : ৪১৩, সুনানে নাসায়ী : ১০২, আবূ দাউদ ১৩৭, ইবনু মাজাহ ৪৩৯।

(১৬) বাঁ হাত দিয়ে প্রথমে ডান হাত ধোয়া এবং বাঁ হাত দিয়ে প্রথমে ডান পা ধোয়া। আবূ দাঊদ ৪১৪১, মিশকাতুল ৪০১, সহিহ বুখারী ৪২৬, সহিহ মুসলিম ২৬৮, মিশকাতুল ৪০০।

(১৭) অঙ্গগুলো ধোয়ার সময় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। সুরা মায়েদা : ৬।

(১৬) আংটি থাকলে পানি পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।  সহিহ বুখারি ১৬৫, সহিহ মুসলিম ২৪২।

(১৭) অজুর শেষে অবশিষ্ট পানি পান করা।  তিরমিযী ৪৮, নাসায়ী ৯৬,মিশকাতুল মাসাবিহ: ৪১০।

(১৮) অজুর শেষ করার পর দোয়া। সহিহ মুসলিম ২৩৪, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৭০

নোট : পাগড়ীবিহীন অবস্থায় মাথার কিছু অংশ বা এক চতুর্থাংশ মাথা মাসাহ করার কোন দলীল নেই। বরং কেবল পূর্ণ মাথা অথবা মাথার সামনের কিছু অংশ সহ পাগড়ীর উপর মাসাহ অথবা কেবল পাগড়ীর উপর মাসাহ প্রমাণিত। মুহাম্মাদ আসাদুল্লহ আল গালিব, ছালাতুর রাসুল (ছা.), পৃ.-৫৯

অজুর শেষ করার পর দুআ পাঠ করা :

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে কোন মুসলিম ব্যাক্তি উত্তমরূপে অজু করার পর বলে (কালিমা শাহাদাত)-

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

“আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তাঁর কোন শারীক নাই, তিনি একক এবং আমি আরো সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল”।

তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হবে। সে যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা তাতে প্রবেশ করবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৭০, সুনানে নাসায়ী : ১৪৮, আহমাদ : ১৬৯৪২

অজু ভঙ্গের কারণঃ

১। পায়খানা বা প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে কিছু বের হওয়া (হোক তা গ্যাস, পেশাব বা পায়খানা)। সহিহ বুখারি: ১৩৫, সহিহ মুসলিম: ২২৫

২। গ্যাস বা বায়ু নির্গত হওয়া। সহিহ বুখারি: ১৩৭, সহিহ মুসলিম: ৩৬২, তিরমিযী ১১৬৫ ও আবূ দাঊদ ২০৫, মিশকাত : ৩০৬

৩। মচি বা কামরস বের হলেই অজু নষ্ট হবে।সুনানে তিরমিযী ১১৪, মিসকাত ৩১১, সহিহ বুখারী ১৩২, ১৭৮, ১৬৯, সহিহ মুসলিম ৩০৩

৪। দেহের প্রত্যেক প্রবহমান রক্তব বা পুঁজের কারণেই অজু ভঙ্গ হয়। মিসকাত ৩৩৩, দারাকুত্বনী ১/১৫৭

নোট : এই হাদসিটি মান যঈফ তাই অনেক মুহাদ্দিস বলেছেন, পুঁজ অথবা রক্ত যদি দেহ থেকে বাহির হয় তবে অজু নষ্ট হবে না।

৫।  ঘুমিয়ে যাওয়া (যদি তা গভীর হয় বা বসার ভঙ্গি থেকে সরে যায়)। সুনান আবু দাউদ: ২০৩, মিসকাত ৩১৬, সহীহুল জামি : ৭১১৭।

গভীর ঘুমের উপর কিয়াস করে মুহাদ্দিসগন বলেছেন, বেহুশ বা জ্ঞানশূন্য হলে অজু নষ্ট হয়।

নোট : তবে বসে বসে ঘুমালে অজু নষ্ট হবে না। আবূ দাঊদ ২০০, তিরমিযী ৭৮, সহিহ মুসলিম ৩৭৬

৬। উটের মাংস খেলে অজি নষ্ট হয়ে যাবে। সহিহ মুসলিম ৩৬০, সুনানে আবু দাউদ: ১৮৪, সুনানে তিরমিযী: ৮১ মিশকাত ৩০৫

৭। লজ্জাস্থান (লিঙ্গ) স্পর্শ করলে অজু ভঙ্গ হবে (নগ্ন হাতে)। সুনান ইবনে মাজাহ: ৩৯৫, সুনানে তিরমিযী ৮২, সুনানে নাসায়ী ১৬৩-৬৪, সুনানে আবূ দাঊদ ১৮১, মিশকাত : ৩১৯, আহমাদ : ২৬৭৪৯, ২৭৭৪৬,  মুওয়াত্ত্বা মালিক : ৯১, দারিমী : ৭২৪-২৫।

নোটঃ তবে হাদিসে এসেছেঃ- ত্বলক্ব ইবনু আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, অজু করার পর কেউ যদি তার পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করে তাহলে এর হুকুম কী? তিনি ﷺ বললেন, সেটা তো মানুষের শরীরেরই একটা অংশবিশেষ। সুনানে আবূ দাঊদ : ১৮২, তিরমিযী : ৮৫, নাসায়ী ১৬৫, মিসকাত ৩২০, ইমাম মুহয়্যিইউস সুন্নাহ (রহ.) বলেছেন, এ হাদীসটি মানসূখ (রহিত), কেননা আবূ হুরায়রা (রা.) ত্বলক্ব এর মদীনাহ আগমনের পর ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

৮। হানাফি মাজহাব মতে, নামাজে অট্টহাসি দিলে অজু ভেঙে যায়।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে মারফু হাদিস-

“أَيُّكُمْ ضَحِكَ فِي الصَّلَاةِ فَلْيُعِدِ الْوُضُوءَ وَالصَّلَاةَ”

তোমাদের কেউ নামাজে হেসে ফেললে, সে যেন পুনরায় অজু ও নামাজ করে। দারাকুতনী: ১/১২৪,  মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক: ৩৯০৭, মুসান্নাফ ইবন আবু শাইবা: ২/২৮৩

এ হাদিসটি ইমাম বুখারি, ইমাম আহমাদ, ইবনু হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ একে মুনকার বলেছেন বিধায়

মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের ফকিহগণ অজু না ভাঙ্গার পক্ষে মত দিয়েছেন।

যে সকল কারনে অজু নষ্ট হবে না :

(১) খাবার খাইলে অজু নষ্ট হবে না। সহিহ বুখারী ২০৭, সহিহ মুসলিম ৩৫৪, ৩৫৭, মিশকাত : ৩২৬, ৩২৯

(২) স্ত্রীকে চুমু দিলে অথবা তার স্বীয় হাত দিয়ে স্পর্শ করলে অজু নষ্ট হবে না। মিশকাত : ৩২৩, ৩৩০,  আবু দাউদ : ১৭৮, ১৭৯ মুয়াত্ত্বা মালিক : ৯৭

(৩) সন্দেহের কারনে অজু নষ্ট হবে না। সহিহ মুসলিম ৩৬২, মিসকাত ৩০৬, তিরমিযী ১১৬৫ ও আবূ দাঊদ ২০৫,

নোট : বায়ু বের হলে অজু নষ্ট হবে এতে কোন সন্দেহ নাই কিন্তু যদি সন্দেহ থাকে যে তার বায়ু বের হয়েছে কিনা তবে তাকে শব্দ বা গন্ধ পেতে হবে। সন্দেহে বসিভূত হয়ে অজুর দরকার নাই।

গোসল

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গোসল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম। এটি কিছু নির্দিষ্ট অবস্থায় ফরজ এবং কিছু অবস্থায় মুস্তাহাব বা সুন্নত হয়।

গোসল (اَلْغُسْلُ) মূলত তিন প্রকারে বিভক্ত :

১. ফরজ গোসল।

২. সুন্নত গোসল।

৩. মুস্তাহাব গোসল।

গোসল ফরজ হওয়ার কারণসমূহঃ

(১) যে কোন কারনে পুরুষ-মহিলার বীর্য বের হলে গোসল ফরহ হয়।  সুনানে নাসায়ী : ১৯৩, সুনানে আবূ দাউদ : ২০৬, সুনানে ইবনে মাজাহ :৬০৭

(২) স্বামী স্ত্রী সহবাস করলে গোসল ফরজ হয়। । সহিহ মুসলিম : ৩৪৮, মিসকাত : ৪৩০

(৩) পুরুষ-মহিলার স্বপ্নদোষ হলে গোসল ফরজ হয়। সহিহ বুখারী : ১৩০, ২৮২, ৩৩২৮, ৬০৯১, ৬১২১, সহিহ মুসলিম ৩১৩, মিমকাত : ৪৩৩।

(৪) পুরুষ-মহিলা হস্তমৈথুন করলে বা যে কোন উপায় যৌন তৃপ্তিভোগ করলে।

সুরা মায়েদা : ৬, সূরা মায়ারিজ ২৯, সুরা মুমিনূন : ৫-৭, সুনানে তিরমিযী ১১৪, মিসকাত ৩১১, সহিহ বুখারী ১৩২, ১৭৮, ১৬৯, সহিহ মুসলিম ৩০৩

(৫) হায়িজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হলে গোসল ফরজ হয় : সহিহ বুখারি ৩২০, সুনানে ইবনে মাজাহ ৬২০, সুনানে নাসায়ী ৩৪৯, ৩৫৮, সুনানে আবূ দাঊদ ২৮০, ২৮৬, ৩০৪)

(৬). নিফাস বা সন্তান প্রসব পরবর্তী ইদ্দতকালীন সময় শেষ হলে গোসল ফরজ। সহিহ মুসলিম : ১২১০, সুনানে আবূ দাউদ : ১৯০৫, সুনানে নাসায়ী : ৪২৯, সুনানে সুনানে ইবনে মাজাহ : ৬৪৮, ৬৪৯, সুনানে তিরমিজি : ১৩৯

(৭) যৌনাঙ্গে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করালেই গোসল ফরজ। সহিহ মুসলিম ৩৪৯, ৩৫০, সুনানে তিরমিযী : ১০৮, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৬০৮, মিশকাত : ৪৪২ভ।

(৮) শুধু কামরস/মযি (مَذْيٌ)  বের হলে গোসল ফরজ হয় না। সহিহ সহিহ বুখারী: ২৬৯, ২৯৩, সহিহ মুসলিম : ৩৪৬

**  বীর্য (মনী) ও কামরস (মযি) এর মাঝে মৌলিক পার্থক্য

গোসল সুন্নাহসমূহ হলো-

(১) জুমআর ছালাতের পূর্বে গোসল করা।

সহিহ বুখারি : ৮৭৭, সহিহ মুসলিম ৮৪৪, মিশকাত : ৫৩৭, ৫৪৪, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৫৩

(২) মৃত ব্যাক্তির গোসল দানকারীর জন্য গোসল করা।

মিসকাত : ৫৪১, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩১৬১, সুনানে তিরমিযী : ৯৯৩, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৪৬৩, আহমাদ : ৯৮৬২।

(৩) ইসলাম গ্রহণের সময় গোসল করা।

মিসকাত : ৫৪৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৩৫, সুনানে তিরমিযী : ৬০৫, সুনানে নাসায়ী : ১৮৮।

(৪) হজ্জ বা ওমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধার পূর্বে গোসল করা।

 সহিহ মুসলিম : ১২১০, সুনানে তিরমিজ ৮৩০, সুনানে নাসায়ী ২১৫, সুনানে ইবনু মাজাহ ২৯১৩, ৩০৭৪

(৫) আরাফার দিন গোসল করা।

 সিলসিলাতুল আহাদিস সহিহাহ : ৩৫৩, সুনানুল কুবরা বাইহাকি : ৫৯১৯,

(৬) দুই ঈদের দিন সকালে গোসল করা। মুয়াত্তা মালিক : ৪১৫

(৭) সপ্তাহে অন্তত একবার গোসল করা।

 সহিহ বুখারি : ৮৯৮, ৮৯৭, সহিহ মুসলিম ৮৪৯, মিশকাত : ৫৩৯

(৮) সিঙ্গা লাগালে গোসল করা।

সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৪৮, মিসকাত ৫৪২ হাদিসের মান জঈফ

(৯) মক্কাহয় প্রবেশের পূর্বে গোসল করা। সহিহ মুসলিম ২৯১৫ ইফা.

(১০) একবার স্ত্রী সহবাসের পর পুনরায় সহবাস করতে চাইলেঃ সুনানে আবু দাউদ ২১৯, ৫৯০

১.৫.০। গোসলের ফরজসমূহঃ

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গোসলের ফরজ ) কাজ হলো তিনটি। যথা-

(১) পূর্ণ শরীরে পানি প্রবাহিত করা। সহিহ বুখারী : ২৭৪

(২) গড়গড়া করে কুলি করা সহিহ বুখারি ২৫৭, ২৬৫

(৩) নাকে পানি দেওয়া সহিহ বুখারী: ২৭৬, মিসকাত ৪৪৩, আবূ দাঊদ ২৪৮, তিরমিযী ১০৬, ইবনু মাজাহ ৫৯৭

গোসলের সুন্নতসমূহ হলোঃ

(১) গোসলের আগে মিসওয়াক করা। সহিহ মুসলিম: ১৮৪৫, সুনানে নাসায়ী : ১৩৭৫, ইবনে মাজাহ : ২৮৭, সুনানে তিরমিযী : ২২

(২)  গোসলের আগে অজু করা। সহিহ বুখারি : ২৪৮, ২৬২, ২৭২, সহিহ মুসলিম : ৩১৬, আহমদ : ২৫৭০৪।

(৩) দুই হাতের কজ্বি ধৌত করা।  সহিহ বুখারি : ২৭৬, ২৬২, সহিহ মুসলিম : ৩১৭

(৪) শরীরের কোন নাপাকি থাকলে প্রথমে ধুয়ে ফেলা। সহিহ বুখারি : ২৪৯, ২৫৭, ২৫৯, ২৬০, ২৬৬, ২৭৪, ২৭৬, ২৮১

(৫) গুপ্তস্থান ধৌত করে নাপাকি পরিষ্কার করা। সহিহ বুখারী : ২৬০

(৬) মাথা ও শরীর তিনবার ধৌত করা। সহিহ বুখারী: ২৫৪, ২৫৫, ২৭৭, সহিহ মুসলিম ৩২৭, ৩২৯, সুনানে নাসায়ী : ৪২৬,

(৭) সবশেষে পা ধোয়া এবং ডান দিক থেকে শুরু করা।

সুনানে তিরমিযী : ১০৭, সুনানে আবু দাউদ : ২৫০, সুনানে নাসাঈ:  ২৫২, সুনানে ইবনে মাজাহ: ৫৭৯)

তায়াম্মুম (اَلتَّيَمُّمُ):

তায়াম্মুম (اَلتَّيَمُّمُ) একটি আরবি শব্দ। তায়াম্মুম শব্দের অর্থ সংকল্প। ইসলামের বিধান অনুসারে, তায়াম্মুম হল অজু বা গোসলের বিকল্প স্বরূপ বালি, মাটি বা ধূলা দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের একটি

তায়াম্মুম করা জায়েয হওয়ার কারন সমূহ :

(১) আশেপাশে কোথাও পানি না পাওয়া গেলে তায়াম্মুম জায়েয। সুরা মায়েদা : ৬, সহিহ বুখারি : ৩৪৮; সহিহ মুসলিম : ৬৮২ মিসকাত : ৫৩০, সুনানে আবূ দাঊদ : ৩৩২, সুনানে তিরমিযী : ১২৪

(২) অভিজ্ঞতা ডাক্তার যদি বলেন যে পানি ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য মরাত্বক ক্ষতিকর। মিসকাত : ৫৩২, আবূ দাঊদ : ৩৩৬, ইবন মাজাহ: ৫৭২

(৩) প্রচন্ড ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা হলে তায়াম্মুম করা যাবে। সুনানে আবু দাউদ ৩৩৪, আহমাদ ৪/২০৩, ২০৪), বায়হাক্বী ‘সুনানুল কুবরা’১/২৫৫, হাকিম ১/১৭৭)

তায়াম্মুমের ফরজ আমল। তায়াম্মুমের ফরজ দুইটি হলো :

১. নিয়ত

২. মুখমণ্ডল ও উভয় হাত মাসেহ করা

১. নিয়ত : মনে মনে সংকল্প করবে যে, আমি অজু বা গোসলের বিকল্প হিসেবে পবিত্রতা অর্জনের জন্য আল্লাহর খুশি উদ্দেশ্য তায়াম্মুম করছি। সহিহ বুখারি : ১, সহিহ মুসলিম : ১৯০৭

২. মুখমণ্ডল ও উভয় হাত মাসেহ করা

পবিত্র মাটি বা ধূলিতে হাত রেখে তা দিয়ে প্রথমে মুখ ও পরে দুই হাত মাসেহ করা (হানাফি মতে কব্জি পর্যন্ত, অন্য মাযহাব মতে কনুই পর্যন্ত)। সূরা মায়িদা : ৬, সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৬

নোট :  হানাফি ও মালিকি : মুখ ও হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসেহ করা ফরজ। বদায়েউস সানায়ে ১/৪৭ (হানাফি), আশ-শারহুল কাবীর ১/১৭৬ (মালেকি)

শাফিয়ী ও হাম্বলি: মুখ ও কনুই পর্যন্ত মাসেহ ফরজ। আল-মাজমূ‘ ২/২২৪ (শাফেয়ি), আল-মুগনী ১/১৬৬ (হাম্বলী)

তায়াম্মুম ভঙ্গ বা নষ্ট হওয়ার কারন :

যে সকল কারণে অজু ভঙ্গ হয়, ঠিক সে কারণে তায়াম্মুমও ভঙ্গ হয়ে যায়। এ ছাড়া যে অসুবিধার কারণে তায়াম্মুম করা হয়েছিল, সেই অসুবিধা দূর হয়ে গেলেই তায়াম্মুম নষ্ট হয়ে যায়। যেমন পানি না পাওয়ার কারণে তায়াম্মুম করলে পানি পাওয়ার সাথে সাথে তায়াম্মুম শেষ হয়ে যায়। অসুখের কারণে করলে, অসুখ দূর হয়ে যাওয়ার পর পরই আর তায়াম্মুম থাকে না। স্বালাতে মুবাশশির পবিত্রতা, আবদুল হামীদ ফাইযী, ফিকহুস সুন্নাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ.-৬৩ উর্দু

কুরআন শিক্ষা করা

স্কুল জীবনে মুসলিম বালকের কুরআন শিক্ষা করা ও নিয়মিত তিলাওয়াতের করা খুবি জরুরি আমল। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে দুনিয়ায় সঠিকভাবে জীবন যাপনের জন্য কুরআনুল কারীম নাযিল করেছেন। কুরআন শুধুমাত্র ধর্মীয় বই নয়, বরং এটি মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। একজন মুসলিমের জীবনকে সফল করতে হলে শৈশব থেকেই কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। বিশেষত স্কুল জীবনে একজন মুসলিম বালকের জন্য কুরআন শিক্ষা করা এবং নিয়মিত তিলাওয়াত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই সময়েই শিশুর মানসিক ও চারিত্রিক গঠন হয়।

কুরআন শিক্ষা করা ফরজ

একজন প্রকৃত মুসলিমের জন্য প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা ফরজ বা অবশ্যকরণীয় ইবাদত। এই সালাতে কুরআনের নির্দিষ্ট কিছু অংশ তিলাওয়াত করতে হয়। এই অংশটুকু সঠিকভাবে তিলাওয়াত করা ফরজে আইন, অর্থাৎ প্রত্যেকের জন্য এটি শেখা বাধ্যতামূলক। তাছাড়া পুরো কুরআন বুঝে পড়া এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাও প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ।

কুরআনকে শুধু তিলাওয়াত করলেই হবে না, বরং এর সঠিক মাখরাজ (উচ্চারণস্থান) অনুযায়ী বিশুদ্ধভাবে পাঠ করাও ফরয। শৈশবে যদি কুরআন তিলাওয়াতের এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে না শেখা হয়, তাহলে পরবর্তীতে তা শুদ্ধ করা কঠিন হয়ে যায়। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বিশুদ্ধ উচ্চারণে কুরআন শেখানো জরুরি। বিশুদ্ধ কুরআন তিরওয়াত সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَرَتِّلِ الۡقُرۡاٰنَ تَرۡتِیۡلًا ؕ

আর কুরআন যথাযথভাবে তিলাওয়াত করো। সূরা মুজাম্মিল : ৪

উসমান ইবনু আফফান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ أَفْضَلَكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ

তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম তারা, যারা নিজেরা কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়। সহিহ বুখাই : ৫০২৮

এই আয়াত ও হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, কুরআন শিক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। একজন মুসলিম বালকের জন্য কুরআন শেখা শুধু নামাযে তিলাওয়াত করার জন্য নয়, বরং পুরো জীবনকে কুরআনের আলোকে গড়ে তোলার জন্য।

শৈশবে শিক্ষা নেওয়ার গুরুত্ব

শৈশব হলো মানুষের চরিত্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় অর্জিত জ্ঞান পাথরের ওপর খোদাই করা অক্ষরের মতোই স্থায়ী হয়, যেমনটি আরবি প্রবাদে বলা হয়েছে-

العِلْمُ فِي الصِّغَرِ كَالنَّقْشِ فِي الحَجَرِ

“শৈশবে অর্জিত জ্ঞান হচ্ছে পাথরে খোদাই করার মতো স্থায়ী।”

তাই স্কুল জীবনের শুরু থেকেই শিশুদের কোরআনের হরফ, হরকত, মাখরাজ এবং তাজবীদসহ বিশুদ্ধভাবে কুরআন শেখানো উচিত। এতে করে তারা সারাজীবন সঠিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারবে এবং এর মাধ্যমে তাদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি মজবুত হবে।

নিয়মিত তিলাওয়াতের প্রয়োজনীয়তা

আমাদের মাতৃভাষা আরবি না হওয়ায় নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত না করলে তা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কুরআন তিলাওয়াত একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল, যা প্রতিদিন করলে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। শৈশব থেকে এই অভ্যাস গড়ে তুললে তা সারা জীবন বজায় রাখা সহজ হয়।

আবূ উমামাহ আল বাহিলী (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি-

“اقْرَؤُوا الْقُرْآنَ، فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ

তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো, কেননা কুরআন কিয়ামতের দিন তার তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে।” সহিহ মুসলিম :৮০৪

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, যে মুসলিম বালক নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে, সে আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আখিরাতে যখন মানুষ চরম বিপদের মুখোমুখি হবে, তখন কুরআন তার পক্ষে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। এটি কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ নয়, বরং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার একটি নিশ্চিত মাধ্যম।

কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত

 কুরআন তিলাওয়াত ঈমান বৃদ্ধি করেঃ

কুরআন তিলাওয়াত করা বান্দার জন্য এমন উপকারী। এবং কুরআন তিলাওয়াত করলে ঈমান বৃদ্ধি পায়। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتۡ قُلُوبُهُمۡ وَإِذَا تُلِيَتۡ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُهُۥ زَادَتۡهُمۡ إِيمَٰنٗا وَعَلَىٰ رَبِّهِمۡ يَتَوَكَّلُونَ ٢ 

অর্থ: ‘মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে’। সুরা  আনফাল : ২

মুমিনের অত্যতম গুন কুরআন তিলওয়াত করা

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلاَوَتِهِ أُوْلَـئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ وَمن يَكْفُرْ بِهِ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

অর্থঃ আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। সুরা বাকারা : ১২১

মহান আল্লাহ আরো বলেন-

لَيْسُواْ سَوَاء مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ أُمَّةٌ قَآئِمَةٌ يَتْلُونَ آيَاتِ اللّهِ آنَاء اللَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ

অর্থঃ তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। সুরা ইমরান : ১১৩

কুরআন তিলওয়াতে প্রতি হরফের জন্য সওয়াব প্রদান করা হয় :

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“‏ مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ

আল্লাহ তা’আলার কিতাবের একটি হরফ যে ব্যক্তি পাঠ করবে তার জন্য এর সাওয়াব আছে। আর সাওয়াব হয় তার দশ গুণ হিসেবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ, বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ। সুনানে তিরমিজি : ২৯১০, মিশকাত : ২১৩৭

কুরআন তিলাওয়াত হলো সর্বোত্তম যিকির, যা শিশুর হৃদয়ে শান্তি আনে।

১. নৈতিক চরিত্র গঠন: কুরআনের শিক্ষার মাধ্যমে বালকের মনে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল চরিত্র গড়ে ওঠে।

২. পাপ থেকে দূরে রাখা: রাসূল ﷺ বলেন, কুরআন মানুষকে জান্নাতের দিকে ডাকে এবং মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে।

৩. স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি: গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করলে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মনোযোগের ক্ষমতা বাড়ে, যা স্কুলের পড়াশোনাতেও সহায়ক হয়।

অভিভাবক ও শিক্ষকের ভূমিকা

স্কুল জীবনে একজন বালকের কুরআন শিক্ষা নিশ্চিত করতে অভিভাবকের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি স্কুলগুলোতে দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যেন শিশুরা ধর্মীয় ও দুনিয়াবি শিক্ষায় সমানভাবে অগ্রসর হতে পারে।

কুরআন শিক্ষা ও নিয়মিত তিলাওয়াত একজন মুসলিম বালকের জন্য জীবনের অপরিহার্য অংশ। এর মাধ্যমে তার হৃদয় পরিশুদ্ধ হবে, চরিত্র হবে আদর্শবান এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সে মনোযোগী হবে। শৈশবেই কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা গেলে ভবিষ্যতে সে একজন আদর্শ মুসলিম, সুনাগরিক এবং দুনিয়া-আখিরাতে সফল মানুষ হতে পারবে।

সালাতের সাধারণ নিয়ম শিক্ষা করা

দুই রাকাত সালাতের ধারাবাহিক নিয়ম :

সরাসরি একটি সহিহ হাদিস থেকে :

মুহাম্মাদ ইবনু ‘আমর ইবনু ‘আত্বা (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর একদল সাহাবীর সঙ্গে বসা ছিলেন। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সালাত সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। তখন আবূ হুমাইদ সা‘ঈদী (রাযি.) বলেন, আমিই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সালাত সম্পর্কে অধিক স্মরণ রেখেছি। আমি তাঁকে দেখেছি (সালাত শুরু করার সময়) (১) তিনি তাকবীর বলে দু’ হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। (২) আর যখন রুকূ‘ করতেন তখন দু’ হাত দিয়ে হাঁটু শক্ত করে ধরতেন এবং পিঠ সমান করে রাখতেন। (৩) অতঃপর রুকূ‘ হতে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন যাতে মেরুদন্ডের হাড়গুলো স্ব-স্ব স্থানে ফিরে আসতো। (৪) অতঃপর যখন সিজদা্ করতেন তখন দু’ হাত সম্পূর্ণভাবে মাটির উপর বিছিয়ে দিতেন না, আবার গুটিয়েও রাখতেন না। এবং তাঁর উভয় পায়ের আঙ্গুলির মাথা কিবলামুখী করে দিতেন। (৫) যখন দু’রাকআতের পর বসতেন তখন বাম পা-এর উপর বসতেন আর ডান পা খাড়া করে দিতেন এবং যখন শেষ রাক‘আতে বসতেন তখন বাঁ পা এগিয়ে দিয়ে ডান পা খাড়া করে নিতম্বের উপর বসতেন। সহিহ বুখারি : ৮২৮, মিশকাত : ৭৯২, সুনানে তিরমিজি : ৩০৪, সুনানে আবু দাউদ : ৭৩০

উপরের সহিহ হাদিস মোটামুটি দুই রাকাত সালাতের অধিকাংশ চলে এসেছে। তারপরও একটু খোলাসা করে দুই রাকাত সালাতের ধারাবাহিক আমলগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

১. শরীয়ত সম্মত পবিত্র পোশাক পরিধান করে, শরীর পবিত্র (গোসল ও অজু) করে কিবলামুখী হয়ে পবিত্র মুসাল্লাহ উপর দাড়িয়ে যাই। তাকবিরে তাহরিমা বা আল্লাহু আকবার বলে হাতকে কান/কাধ পর্যন্ত তুলে বুকের উপর ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখি।

২. সানা পাঠ করি। একটি সানা হলে-

*سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ تَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ *

উচ্চারনঃ সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গায়রুকা।

অর্থাঃ হে আল্লাহ! তোমারই পবিত্রতা বর্ণনা করি এবং তোমারই শুকর আদায় করি, তোমার নাম বড়ই বারাকাতপূর্ণ, তোমার মর্যাদা সর্বোচ্চ, তুমি ছাড়া আর কেউ মাবূদ নেই।

৩. আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতো-নির র‌জীম। বিসমিল্লা-হির রাহমা-নির রাহীম। বলে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِِ

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ ﴿۱﴾ اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۲﴾  الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ ۙ﴿۳﴾ مٰلِكِ یَوْمِ الدِّیْنِ ؕ﴿۴﴾ اِیَّاكَ نَعْبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسْتَعِیْنُ ؕ﴿۵﴾  اِهْدِ نَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِیْمَ ۙ﴿۶﴾  صِرَاطَ الَّذِیْنَ اَنْعَمْتَ عَلَیْهِمْ ۬ۙغَیْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَیْهِمْ وَ لَا الضَّآلِّیْنَ ﴿۷﴾

অর্থ : পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব। দয়াময়, পরম দয়ালু, পরম করুণাময়, অতি দয়ালু। বিচার দিবসের মালিক। আপনারই আমরা ইবাদাত করি এবং আপনারই নিকট আমরা সাহায্য চাই। আমাদেরকে সরল পথ দেখান। পথের হিদায়াত দিন। তাদের পথ, যাদের উপর আপনি অনুগ্রহ করেছেন। যাদেরকে নিয়ামত দিয়েছেন।যাদের উপর (আপনার) ক্রোধ আপতিত হয়নি এবং যারা পথভ্রষ্টও নয়।

৪. সুরা ফাতিহার পর কুরআন থেকে অন্য একটি সুরা/আয়াত (ছোট আয়াত হলে কমপক্ষে তিনটি) তিলাওয়াত করা।  

৫. আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে গমন করা এবং রুকুর তাসবিহ পাঠ করা।

রুকুর এতটি তাসবিহ হলো : সুবহানা রব্বিয়াল আযীম’ (سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ)

৬. সামি আল্লাহু লিমান হামিদা’ বলে ধীর স্থীরভাবে রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাড়াতে হবে এবং সামান্য অপেক্ষা করা।

৭. আল্লাহু আকবার বলে রুকু থেকে সিজদাতে চলে যেতে হবে। সাত অঙ্গের সাথে সিজদা করতে হবে এবং সিজদার তাসবিহ পাঠ করতে হবে। সিজদার একটি সহজ তাসবিহ হল : “সুবহানা রব্বিয়াল আলা (سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى)। আল্লাহু আকবার কবে সিজদা থেকে উঠে সোজা হয়ে বসে সামান্য অপেক্ষা করে দ্বিতীয় সিজদা প্রদান করা।

৮. দ্বিতীয় সিজদা শেষ করে আল্লাহু আকবার বলে দাড়িয়ে যেতে হবে এবং পূর্বেন ন্যায় সুরা ফাতিহা ও কিরায়াত পাঠের পর রুকু সিজদা করতে হবে।

৯. অতঃপর তাশাতহুদের জন্য বসে। তাশাহুদ, দুরুদ ও দুআ পাঠ করা।

তাশাহুদটি হলো :

اَلتَّحِيَّاتُ لِلّٰهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلَامُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبىُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُه السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلٰى عِبَادِ اللهِ الصَّالِحِيْنَ اَشْهَدُ اَنْ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه وَرَسُوْلُه-

অর্থ : ’সমস্ত মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ইবাদত আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার উপর প্রতি সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। সালাম আমাদের প্রতি এবং আল্লাহর নেক বান্দাগণের প্রতি।’’ তোমরা যখন তা বলবে তখন আসমান বা আসমান ও যমীনের মধ্যে আল্লাহর প্রত্যেক বান্দার নিকট তা পৌঁছে যাবে। (এরপর বলবে) ’’আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন মাবূদ নাই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।’’

একটি বহুল পরিচিত দুরূদ হলো :

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের পরিবারবর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও মুহাম্মদের পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম ও ইব্রাহিমের পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত।

দুআ মাসুরাটি হলো :

«اَللّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِيْ ظُلْمًا كَثِيرًا وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِيْ مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِيْ إِنَّك أَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ».

অর্থা :হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আমার নাফসের উপর অনেক যুলুম করেছি। তুমি ছাড়া গুনাহ মাফ করার কেউ নেই। অতএব আমাকে তোমার পক্ষ থেকে মাফ করে দাও। আমার উপর রহম কর। তুমিই ক্ষমাকারী ও রহমতকারী।

১০. তাশাহুদ, দুরূদ ও দুআ পাঠের পর ডানে বামে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করা।

সালাতের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ১০ টি ছোট সুরা বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদসহ নিচে দেওয়া হলো :

১. সুরা আল ফিল

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

اَلَمْ  تَرَ كَیْفَ فَعَلَ رَبُّكَ  بِاَصْحٰبِ الْفِیْلِ ؕ﴿۱﴾اَلَمْ  یَجْعَلْ  كَیْدَهُمْ فِیْ  تَضْلِیْلٍ ۙ﴿۲﴾ وَّ  اَرْسَلَ عَلَیْهِمْ  طَیْرًا  اَبَابِیْلَ ۙ﴿۳﴾ تَرْمِیْهِمْ  بِحِجَارَۃٍ  مِّنْ سِجِّیْلٍ ۪ۙ﴿۴﴾ فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَّاْکُوْلٍ ﴿۵﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)-

অনুবাদ : (১) আপনি কি শোনেন নি, আপনার প্রভু হস্তীওয়ালাদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছিলেন? (২) তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? (৩) তিনি তাদের উপরে প্রেরণ করেছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি (৪) যারা তাদের উপরে নিক্ষেপ করেছিল মেটেল পাথরের কংকর (৫) অতঃপর তিনি তাদের করে দেন ভক্ষিত তৃণসদৃশ।

(২) সুরা কুরাইশ

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

لِاِیْلٰفِ قُرَیْشٍ ۙ﴿۱﴾اٖلٰفِهِمْ  رِحْلَۃَ  الشِّتَآءِ  وَ الصَّیْفِ ۚ﴿۲﴾ فَلْیَعْبُدُوْا  رَبَّ هٰذَا الْبَیْتِ ۙ﴿۳﴾ الَّذِیْۤ  اَطْعَمَهُمْ  مِّنْ جُوْعٍ ۬ۙ وَّ اٰمَنَهُمْ مِّنْ خَوْفٍ ﴿۴﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) কুরায়েশদের আসক্তির কারণে (২) আসক্তির কারণে তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের (৩) অতএব তারা যেন ইবাদত করে এই গৃহের মালিকের (৪) যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় অন্ন দান করেছেন এবং ভীতি হ’তে নিরাপদ করেছেন।

(৩) সুরা আল মাউন

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

اَرَءَیْتَ  الَّذِیْ یُكَذِّبُ بِالدِّیْنِ ؕ﴿۱﴾ فَذٰلِكَ الَّذِیْ یَدُعُّ  الْیَتِیْمَ ۙ﴿۲﴾ وَ لَا یَحُضُّ عَلٰی طَعَامِ الْمِسْكِیْنِ ؕ﴿۳﴾ فَوَیْلٌ  لِّلْمُصَلِّیْنَ ۙ﴿۴﴾الَّذِیْنَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُوْنَ ۙ﴿۵﴾ الَّذِیْنَ هُمْ  یُرَآءُوْنَ ۙ﴿۶﴾وَ یَمْنَعُوْنَ الْمَاعُوْنَ ﴿۷﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে বিচার দিবসকে মিথ্যা বলে? (২) সে হ’ল ঐ ব্যক্তি, যে ইয়াতীমকে গলা ধাক্কা দেয় (৩) এবং মিসকীনকে খাদ্য দানে উৎসাহিত করে না (৪) অতঃপর দুর্ভোগ ঐ সব মুছল্লীর জন্য (৫) যারা তাদের সালাত থেকে উদাসীন (৬) যারা লোকদেরকে দেখায় (৭) এবং নিত্য ব্যবহার্য বস্ত্ত দানে বিরত থাকে।

(৪) সুরা আল কাউসার

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

اِنَّاۤ  اَعْطَیْنٰكَ  الْكَوْثَرَ ؕ﴿۱﴾ فَصَلِّ  لِرَبِّكَ وَ انْحَرْ ؕ﴿۲﴾ اِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْاَبْتَرُ ﴿۳﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে ‘কাওছার’ দান করেছি (২) অতএব আপনার প্রভুর উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন ও কুরবানী করুন (৩) নিশ্চয়ই আপনার শত্রুই নির্বংশ।

(৫) সুরা আল কাফিরূন

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

قُلْ یٰۤاَیُّهَا الْکٰفِرُوْنَ ۙ﴿۱﴾ لَاۤ  اَعْبُدُ مَا تَعْبُدُوْنَ ۙ﴿۲﴾وَ لَاۤ  اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَاۤ  اَعْبُدُ ۚ﴿۳﴾ وَ لَاۤ  اَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدْتُّمْ ۙ﴿۴﴾ وَ لَاۤ  اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَاۤ  اَعْبُدُ ؕ﴿۵﴾ لَکُمْ  دِیْنُکُمْ  وَلِیَ  دِیْنِ ﴿۶﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) আপনি বলুন! হে কাফেরবৃন্দ! (২) আমি ইবাদত করি না তোমরা যাদের ইবাদত কর (৩) এবং তোমরা ইবাদতকারী নও আমি যার ইবাদত করি (৪) আমি ইবাদতকারী নই তোমরা যার ইবাদত কর (৫) এবং তোমরা ইবাদতকারী নও আমি যার ইবাদত করি (৬) তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন এবং আমার জন্য আমার দ্বীন।

(৬) সুরা আন নাসর

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

اِذَا  جَآءَ  نَصْرُ اللّٰهِ  وَ  الْفَتْحُ ۙ﴿۱﴾ وَ  رَاَیْتَ النَّاسَ یَدْخُلُوْنَ فِیْ  دِیْنِ اللّٰهِ  اَفْوَاجًا ۙ﴿۲﴾ فَسَبِّحْ  بِحَمْدِ رَبِّكَ وَ اسْتَغْفِرْهُ  ؕؔ اِنَّہٗ كَانَ  تَوَّابًا ﴿۳﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) যখন এসে গেছে আল্লাহর সাহায্য ও (মক্কা) বিজয় (২) এবং আপনি মানুষকে দেখছেন দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে (ইসলামে) প্রবেশ করছে (৩) তখন আপনি আপনার পালনকর্তার প্রশংসা সহ পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি অধিক তওবা কবুলকারী।

(৭) সুরা আল মাজাদ/লাহাব

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

تَبَّتْ یَدَاۤ  اَبِیْ  لَهَبٍ وَّ  تَبَّ ؕ﴿۱﴾ مَاۤ  اَغْنٰی عَنْهُ  مَالُہٗ  وَ  مَا كَسَبَ ؕ﴿۲﴾سَیَصْلٰی نَارًا ذَاتَ  لَهَبٍ ۚ﴿ۖ۳﴾وَّ  امْرَاَتُہٗ ؕ حَمَّالَۃَ  الْحَطَبِ ۚ﴿۴﴾ فِیْ  جِیْدِهَا حَبْلٌ مِّنْ مَّسَدٍ ﴿۵﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হৌক এবং ধ্বংস হৌক সে নিজে (২) তার কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা কিছু সে উপার্জন করেছে (৩) সত্বর সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে (৪) এবং তার স্ত্রীও; যে ইন্ধন বহনকারিণী (৫) তার গলদেশে খর্জুর পত্রের পাকানো রশি।

(৮) সুরা আল ইখলাস

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

قُلْ هُوَ  اللّٰهُ  اَحَدٌ  ۚ﴿۱﴾اَللّٰهُ  الصَّمَدُ ۚ﴿۲﴾ لَمْ  یَلِدْ ۬ۙ  وَ  لَمْ  یُوْلَدْ ۙ﴿۳﴾وَ  لَمْ  یَکُنْ  لَّہٗ   کُفُوًا  اَحَدٌ ﴿۴﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) বলুন, তিনি আল্লাহ এক (২) আল্লাহ মুখাপেক্ষীহীন (৩) তিনি (কাউকে) জন্ম দেননি এবং তিনি (কারও) জন্মিত নন (৪) এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।

(৯) সুরা আল ফালাক

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

قُلْ اَعُوْذُ  بِرَبِّ الْفَلَقِ ۙ﴿۱﴾ مِنْ  شَرِّ مَا خَلَقَ ۙ﴿۲﴾ وَ مِنْ  شَرِّ غَاسِقٍ  اِذَا وَقَبَ ۙ﴿۳﴾ وَ مِنْ  شَرِّ النَّفّٰثٰتِ فِی الْعُقَدِ ۙ﴿۴﴾ وَ مِنْ  شَرِّ حَاسِدٍ  اِذَا حَسَدَ ﴿۵﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) বলুন! আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের প্রতিপালকের (২) যাবতীয় অনিষ্ট হ’তে, যা তিনি সৃষ্টি করেছেন (৩) এবং অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট হ’তে, যখন তা আচছন্ন হয় (৪) গ্রন্থিতে ফুঁকদান কারিণীদের অনিষ্ট হ’তে (৫) এবং হিংসুকের অনিষ্ট হ’তে যখন সে হিংসা করে।

(১০) সুরা আন নাস

بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِ

قُلْ  اَعُوْذُ  بِرَبِّ النَّاسِ ۙ﴿۱﴾ مَلِكِ النَّاسِ ۙ﴿۲﴾ اِلٰهِ  النَّاسِ ۙ﴿۳﴾ مِنْ  شَرِّ الْوَسْوَاسِ ۬ۙ  الْخَنَّاسِ ۪ۙ﴿۴﴾ الَّذِیْ یُوَسْوِسُ فِیْ صُدُوْرِ النَّاسِ ۙ﴿۵﴾ مِنَ الْجِنَّۃِ وَ النَّاسِ ﴿۶﴾

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)

অনুবাদ : (১) বলুন! আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার (২) মানুষের অধিপতির (৩) মানুষের উপাস্যের (৪) গোপন কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হ’তে (৫) যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তর সমূহে (৬) জিনের মধ্য হ’তে ও মানুষের মধ্য হতে।

পড়াশুনার পাশাপাশি ইসলামি অনুশাসন শিক্ষা :তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পর্দার প্রাথমিক ধারণা নেওয়া

ইসলাম হলো পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। একজন মুসলিমের প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে শরিয়তের নির্দেশনা। পর্দা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা, যা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। বিশেষত স্কুল জীবনের শুরু থেকেই ছেলে-মেয়েদের পর্দার প্রাথমিক ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কেননা এই বয়সেই তাদের নৈতিকতা ও চরিত্র গঠিত হয়। কুরআন ও হাদিসে পর্দার গুরুত্ব বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে, যা ছোটদের মন-মানসে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া অভিভাবক ও শিক্ষকের দায়িত্ব। পর্দা ফরজ বিধান অবহেরা করা যাবে না। নারীর পর্দা ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান। সুন্দর সমাজ গড়ার চমৎকার ব্যবস্থাপনা। পর্দার বিধানের বাস্তবায়ন হলে মানুষ বহুবিধ সুফল পাবে। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে বলেন-

وَ اِذَا سَاَلۡتُمُوۡہُنَّ مَتَاعًا فَسۡـَٔلُوۡہُنَّ مِنۡ وَّرَآءِ  حِجَابٍ ؕ ذٰلِکُمۡ  اَطۡہَرُ  لِقُلُوۡبِکُمۡ  وَ قُلُوۡبِہِنّ

 তোমরা তাদের (নারীদের) নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটা তোমাদের এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। সুরা আহজাব : ৫৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ  زِیۡنَتَہُنَّ  اِلَّا مَا ظَہَرَ  مِنۡہَا وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ

 হে নবি! আপনি ঈমানদার নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তাদের গ্রীবা ও গলদেশ চাদর দ্বারা ঢেকে রাখে। সুর নূর : ৩১

আল্লাহ তাআলা বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযম করে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।” সুরা নুর : ৩০

এই আয়াতদ্বয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, দৃষ্টি সংযম ও শালীন পোশাক হলো পর্দার প্রথম ধাপ।

মহান আল্লাহ বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ  قُلۡ  لِّاَزۡوَاجِکَ  وَ  بَنٰتِکَ وَ نِسَآءِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ یُدۡنِیۡنَ عَلَیۡہِنَّ مِنۡ جَلَابِیۡبِہِنَّ ؕ ذٰلِکَ اَدۡنٰۤی اَنۡ یُّعۡرَفۡنَ فَلَا  یُؤۡذَیۡنَ

 হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলে দিন যে, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। সুরা আহজাব : ৫৯

উম্মু সালামা (রা.) বলেন, উক্ত আয়াত অবতীর্ণ হলে (মদিনার) আনসারদের মহিলারা যখন বের হল, তখন তাদের মাথায় (কালো) চাদর (বা মোটা ওড়না) দেখে মনে হচ্ছিল যেন ওদের মাথায় কালো কাকের ঝাঁক বসে আছে। সুনানে আবু দাউদ : ৪১০১

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি ধর্মেরই একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। আর ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো ’লজ্জাশীলতা’। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৮১

অতএব, একজন মুসলিম ছেলে বা মেয়ে যদি স্কুল জীবন থেকেই পর্দার গুরুত্ব বুঝতে শেখে, তবে তার চরিত্রে লজ্জাশীলতা ও নৈতিকতা দৃঢ়ভাবে গড়ে উঠবে।

কেন শৈশবেই পর্দার শিক্ষা জরুরি?

১. চরিত্র গঠন:

শৈশবে শেখা শিক্ষা সারাজীবন মনে থাকে। যদি ছোটবেলা থেকেই বালক-বালিকা শালীন পোশাক ও পর্দার অভ্যাস করে, তবে তা সহজে ত্যাগ করা যায় না।

২. নৈতিক অবক্ষয় থেকে সুরক্ষা:

আজকের সমাজে অশ্লীলতা, ফ্যাশন ও অবাধ মেলামেশা ছড়িয়ে পড়েছে। পর্দার প্রাথমিক শিক্ষা এ সব থেকে শিশুদের দূরে রাখে।

৩. ইমানি পরিবেশ সৃষ্টি:

রিবার ও স্কুলে যদি পর্দার পরিবেশ থাকে, তবে শিশুরা ইসলামী মূল্যবোধকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।

৪. ভবিষ্যতের প্রস্তুতি:

 বড় হয়ে যখন ছেলে-মেয়েরা বালেগ হবে, তখন পর্দা তাদের উপর ফরজ হয়ে যাবে। শৈশবেই এই অভ্যাস করলে বড় হলে তা সহজ হয়ে যাবে।

বালক ও বালিকার জন্য প্রাথমিক পর্দার শিক্ষা

বালক: ছোট থেকেই তাকে শালীন পোশাক পরার অভ্যাস গড়ে দিতে হবে। আঁটসাঁট ও অশোভন পোশাক বর্জন করতে হবে। মেয়েদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা থেকে বিরত থাকতে শেখাতে হবে।

বালিকা: স্কুল জীবন থেকেই তাকে ঢিলেঢালা ও পর্দাসম্মত পোশাক পরতে শেখাতে হবে। বালেগ হওয়ার আগেই মাথা ঢাকার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

উভয়ের জন্য: দৃষ্টি সংযম, অশালীনতা থেকে দূরে থাকা, সামাজিক যোগাযোগে ভদ্রতা ও লজ্জাশীলতা বজায় রাখা।

অভিভাবক ও শিক্ষকের ভূমিকা

অভিভাবকরা ঘরে ইসলামী পরিবেশ সৃষ্টি করবেন, যাতে সন্তানরা শালীন পোশাক ও আচরণে অভ্যস্ত হয়। শিক্ষকরা স্কুলে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ইসলামী আদর্শ তুলে ধরবেন, বিশেষত কুরআন ও হাদিসের আলোকে পর্দার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করবেন।

শিশুরা যেন পর্দাকে শাস্তি মনে না করে বরং মর্যাদার প্রতীক মনে করে, সে দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

স্কুল জীবন থেকেই মুসলিম বালক-বালিকাদের পর্দার প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কুরআন ও হাদিসে নির্দেশিত দৃষ্টি সংযম, শালীন পোশাক এবং লজ্জাশীলতা তাদের নৈতিক উন্নয়ন, ইমানের দৃঢ়তা এবং ভবিষ্যতের সঠিক জীবনধারার ভিত্তি স্থাপন করে। তাই অভিভাবক ও শিক্ষকের উচিত ছোটদের কোমল হৃদয়ে ইসলামী পর্দার শিক্ষা সুন্দরভাবে পৌঁছে দেওয়া। এভাবে তারা বড় হয়ে হবে আদর্শ মুসলিম, যারা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করবে।

সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা

একজন মুসলিম সন্তানের জীবনের ভিত্তি তৈরি হয় তার স্কুল জীবনে। এই সময়েই সে সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা গ্রহণ করে, যা তার চরিত্র গঠনের মূল স্তম্ভ। কুরআন ও হাদিসে অভিভাবকের প্রতি আনুগত্য, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা, বন্ধুদের সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আবার রাসূল ﷺ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যার আখলাক উত্তম।” তাই স্কুল জীবনের শুরু থেকেই একজন মুসলিম সন্তান যদি অভিভাবকের সাথে ভদ্র ব্যবহার, শিক্ষকের প্রতি সম্মান, বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা শিখে নেয়, তবে সে একজন আদর্শ মানুষ ও মুসলিম নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

ক. অভিভাবকের সাথে আচরণ :

ইসলাম মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আদব-আখলাকের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। স্কুল জীবনে একজন মুসলিম সন্তান যখন সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা গ্রহণ করবে, তখন সর্বাগ্রে তাকে শেখানো উচিত—কীভাবে অভিভাবকের সাথে আচরণ করতে হয়। কারণ পিতা-মাতা সন্তানের জন্য আল্লাহর দেওয়া অমূল্য নিয়ামত।

কুরআনের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ

“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁর ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে উত্তম আচরণ করো।” সূরা ইসরা: ২৩

আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন-

وَاخۡفِضۡ لَہُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحۡمَۃِ وَقُلۡ رَّبِّ ارۡحَمۡہُمَا کَمَا رَبَّیٰنِیۡ صَغِیۡرًا ؕ

আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, ‘হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন’। সূরা ইসরা : ২৪

১৮৯৯। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বাবার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহ তা’আলার সস্তুষ্টি এবং বাবার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহ তা’আলার অসন্তুষ্টি রয়েছে। সুনানে তিরমিজি : ১৮৯৯, সহীহাহ : ৫১৫

অভিভাবকের সাথে সন্তানের কর্তব্য :

১. অভিভাবকের সাথে ভদ্র ও কোমল ভাষায় কথা বলা।

২. তাদের সামনে উচ্চস্বরে কথা না বলা।

৩. তাদের জন্য দোয়া করা ও সর্বদা সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা।

৪. তাদের কষ্ট না দিয়ে যত্ন ও সেবা করা।

৫. তাদের সম্মান করা এবং তাদের প্রতি বিনয়ী হওয়া।

৬. তাদের অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ না করা বা দূরে কোথাও না যাওয়া।

৭. তাদের বৈধ আদেশ মেনে চলা এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

৮. আর্থিক সামর্থ্য থাকলে তাদের আর্থিক সাহায্য করা বা ভরণপোষণ দেওয়া।

৯. তাদের সাথে হাসিমুখে কথা বলা ও তাদের খোঁজ-খবর রাখা।

১০. তাদের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের প্রতিও সম্মান দেখানো এবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।

উপসংহার : স্কুল জীবন থেকেই যদি সন্তান কুরআন-হাদিসের আলোকে অভিভাবকের সাথে আদব ও উত্তম আচরণ শিখে নেয়, তবে সে পরিণত বয়সে একজন আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠবে। অভিভাবকের সন্তুষ্টিই সন্তানের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি।

খ. শিক্ষকের সাথে আচরণ

ইসলামে জ্ঞান অর্জন ও আলিমদের সম্মান প্রদর্শনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মুসলিম সন্তান যখন স্কুল জীবনে সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা গ্রহণ করবে, তখন তার জন্য শিক্ষকের সাথে ভদ্র ও সম্মানজনক আচরণ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ শিক্ষক হচ্ছেন জ্ঞান ও চরিত্র গঠনের মাধ্যম, আর তাদের সম্মান করা মানে জ্ঞানকে সম্মান করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ ۙ وَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ دَرَجٰتٍ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত। সূরা মুজাদিলা : ১১

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জ্ঞানীরা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাই তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা শিক্ষার্থীর ঈমানেরই অংশ।

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আমাদের বড়দেরকে সম্মান করে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৪৩

শিক্ষকের সাথে কর্তব্য :

১. শিক্ষকের সাথে সর্বদা বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল থাকা।

২. ক্লাসে মনোযোগী হওয়া এবং অশোভন আচরণ না করা।

৩. শিক্ষকের পরিশ্রম ও নির্দেশের কদর করা।

৪. তাদের জন্য দোয়া করা এবং বাইরে তাদের সম্মান বজায় রাখা।

৫. ক্লাসে প্রশ্ন করার সময় অনুমতি নেওয়া এবং নম্রভাবে প্রশ্ন করা।

৬. শিক্ষকের কথা মনোযোগ সহকারে শোনা এবং তাদের কথা মাঝে না কাটা।

৭. কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও তা মার্জিত ও শালীন ভাষায় প্রকাশ করা।

৮. শিক্ষকের দেওয়া কাজ ও অ্যাসাইনমেন্টগুলো সময়মতো এবং যত্ন সহকারে সম্পন্ন করা।

৯. রাস্তায় দেখা হলে প্রথমে সালাম দেওয়া বা সম্মান প্রদর্শন করা।

১০. অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে ক্লাসে উপস্থিত থাকতে না পারলে শিক্ষকের কাছ থেকে বিনয়ের সাথে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

উপসংহার: শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন শুধু সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি ইসলামের নির্দেশ। স্কুল জীবনে যদি একজন মুসলিম সন্তান শিক্ষকের প্রতি ভদ্রতা ও কৃতজ্ঞতা শিখে নেয়, তবে সে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে এবং পরিণত বয়সে আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠবে।

গ. বন্ধুদের সাথে আচরণ

বন্ধুত্ব মানুষের জীবনে একটি বিশেষ সম্পর্ক। স্কুল জীবনে বন্ধুদের সাথে মিলেমিশে থাকা, একে অপরকে সাহায্য করা এবং ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা একজন মুসলিম সন্তানের আখলাকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুরআন ও হাদিসে সৎ বন্ধুত্ব এবং ভালো আচরণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ

“নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই, কাজেই তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক করে দাও।” সূরা হুজুরাত : ১০

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى

“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো।” সূরা মায়িদা: ২

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা ও নেক কাজে সহায়তার ভিত্তিতে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির (দ্বীন ধর্মের) অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। সুনান আবু দাউদ : ৪৮৩৩

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ

“তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা চায়, তার ভাইয়ের জন্যও তা না চায়।” সহহি বুখারী : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, আহমাদ : ১২৮০১, ১৩৮৭৫

বন্ধুর সাথে কর্তব্য :

১. বন্ধুর সাথে সর্বদা ভদ্রতা ও আন্তরিকতা দেখানো।

২. তাদের কষ্ট না দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য করা।

৩. খারাপ কাজে প্ররোচিত না করা, বরং নেক কাজে উদ্বুদ্ধ করা।

৪. হিংসা, বিদ্বেষ ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা।

৫. বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার সম্মান ও সম্পদ রক্ষা করা।

৬. বন্ধুর দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা এবং জনসমক্ষে তাকে লজ্জা না দেওয়া।

৭. বন্ধুর সুখে ও দুঃখে তার পাশে থাকা এবং সান্ত্বনা দেওয়া।

৮. বন্ধুর কোনো ভুল দেখলে গোপনে ও নম্রতার সাথে তাকে শুধরে দেওয়া।

৯. বন্ধুর সাথে কথা ও ওয়াদা রক্ষা করা এবং বিশ্বাস ভঙ্গ না করা।

১০. বন্ধুর জন্য দোয়া করা এবং তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলতে উৎসাহিত করা।

উপসংহার : বন্ধুত্ব হলো ইসলামী ভ্রাতৃত্বের প্রতিফলন। স্কুল জীবনে যদি একজন মুসলিম সন্তান বন্ধুদের সাথে সৎ, ভালোবাসাপূর্ণ এবং ইসলামী আদব অনুসারে আচরণ করে, তবে সে শুধু ভালো বন্ধু নয়, বরং একজন আদর্শ মুসলিম চরিত্রের অধিকারী হয়ে উঠবে।

ঘ. স্কুল জীবনে সমাজের প্রতি দায়িত্ব

ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, বরং সামাজিক জীবনেরও পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। একজন মুসলিম সন্তান যখন স্কুল জীবনে সাধারণ আচরণ ও আখলাকের শিক্ষা গ্রহণ করবে, তখন তাকে সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখানো জরুরি। কারণ সমাজই মানুষের বসবাসের পরিবেশ তৈরি করে এবং তার উন্নতি বা অবনতি অনেকাংশে সদস্যদের আচার-আচরণের উপর নির্ভর করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” সূরা মায়িদা: ২

এছাড়া আল্লাহ আরও বলেন:

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ

“তোমরা সর্বোত্তম উম্মাহ, যারা মানুষের জন্য প্রকাশিত হয়েছে—তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখো।” সূরা আল ইমরান : ১১০

আবূ মূসা (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন মু’মিন আরেকজন মু‘মিনের জন্যে ইমারতস্বরূপ, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে থাকে। এ ব’লে তিনি তার হাতের আঙুলগুলো একটার মধ্যে আরেকটা প্রবেশ করালেন। সহিহ বুখারি : ৪৮১, ২৪৪৬, ৬০২৬, সহিহ মুসলিম : ২৫৮৫, আহমাদ : ১৯৬৪৪

সমাজে প্রতি সন্তানের দায়িত্ব

১. সমাজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।

২. ছোট-বড় সবার সাথে ভদ্র আচরণ করা।

৩. গরিব-দুঃখীদের সাহায্যে এগিয়ে আসা।

৪. মিথ্যা, অন্যায় ও অশালীনতা থেকে দূরে থেকে অন্যদেরও তা থেকে বিরত করা।

৫. মিলেমিশে থাকা এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখা।

৬. জনসাধারণের সম্পদ রক্ষা করা এবং রাস্তা-ঘাট, পার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো স্থানগুলোর ক্ষতি না করা।

৭. প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা।

৮. আইন-কানুন মেনে চলা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।

৯. বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ রক্ষায় অংশগ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ পরিবেশ পায়।

১০. অন্যের ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং সমাজে সহাবস্থানের উদাহরণ সৃষ্টি করা।

উপসংহার : স্কুল জীবনে থেকেই যদি একজন মুসলিম সন্তান সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখে, তবে সে বড় হয়ে একজন আদর্শ নাগরিক ও মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠবে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে সমাজের কল্যাণে কাজ করাই একজন মুসলিমের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

 সন্তানের দু’আ ও যিকির শিক্ষা

একজন মুসলিমের জীবনে দু’আ ও যিকিরের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ দু’আ হলো বান্দার সাথে আল্লাহর সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম, আর যিকির হলো হৃদয়কে প্রশান্ত রাখার সর্বোত্তম উপায়। স্কুল জীবনে থেকেই যদি একজন মুসলিম সন্তান মাসনুন দু’আ ও যিকির শিখে নেয়, তবে তার অন্তর আল্লাহর স্মরণে ভরপুর থাকবে এবং প্রতিটি কাজ ইসলামের আলোকে পরিচালিত হবে।

দু’আ ও যিকিরের গুরুত্ব

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَقَالَ رَبُّکُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَکُمۡ ؕ  اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِیۡ سَیَدۡخُلُوۡنَ جَہَنَّمَ دٰخِرِیۡنَ 

আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহঙ্কার বশতঃ আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ সূরা গাফির: ৬০

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। সূরা রা’দ: ২৮

২/৩৮২৮। নোমান ইবনে বশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দোয়াই হলো ইবাদত। অতঃপর তিলাওয়াত করেন—

وَقَالَ رَبُّکُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَکُمۡ

 ’এবং তোমার প্রভু বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো’’ সুরা গাফির : ৬০। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৮২৮, সুনানে তিরমিযী : ২৯৬৯, ৩২৪৭, ৩৩৭২, সুনানে  আবূ দাউদ : ১৪৭৯, ১৭৮৮৮, ১৭৯১৯, ১৭৯৬৪, মিশকাত : ২৩৩০

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ

যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে স্মরণ করে এবং যে স্মরণ করে না—তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃত মানুষের মতো।” সহীহ বুখারী : ৬৪০৭, সহিহ মুসলিম : ৭৭৯

এ থেকে প্রমাণিত হয়, একজন মুসলিম সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই মাসনুন দু’আ ও যিকির শিখতে হবে, যেন তার জীবনের প্রতিটি ধাপে আল্লাহর স্মরণ থাকে।

উদারহরন হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় উল্লেখ করছি যখন মাসনুন দু’আ করা উচিত।

১. ফজর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সকালবেলার যিকির।

২. আসর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সন্ধ্যার যিকির।

৩. সালাত শেষ করার পর।

৪. ঘুমানোর আগে।

৫. ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর।

৬. সেহরি ও ইফতারের সময়।

৭. রুকু, সিজদা ও তাশাহহুদের মধ্যে।

৮. কষ্ট, দুশ্চিন্তা বা বিপদে পড়লে।

৯. ভ্রমণ বা সফরে বের হওয়ার সময়।

১০. বৃষ্টির সময় বা আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে।

উদারহরন হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান উল্লেখ করছি যেখানে মাসনুন দু’আ ও যিকির করা উচিত।

১. মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়।

২. ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়।

৩. টয়লেটে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময়।

৪. যানবাহনে ওঠার সময়।

৫. কবর জিয়ারতের সময়।

৬. বাজারে প্রবেশের সময়।

৭. নতুন পোশাক পরার সময়।

৮. খাওয়া শুরু ও শেষ করার সময়।

৯. আয়নায় তাকানোর সময়।

১০. অসুস্থ কারও খোঁজ নিতে গেলে।

নোট : বইয়ের কলরব বৃদ্ধি পাবে বিধায় দুআসহ উল্লেখ করা হলো না। এ সম্পর্কে আপনারা “হিসনুল মুসলিম” দুআর বইটি সংগ্রহ করে পড়তে পারেন।

উপসংহার : দু’আ ও যিকির একজন মুসলিম সন্তানের জীবনে শক্তি ও প্রশান্তির উৎস। এগুলো তাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে, অন্তরে ঈমান দৃঢ় করে এবং জীবনের প্রতিটি কাজে আল্লাহর সাহায্য লাভের সুযোগ এনে দেয়। স্কুল জীবনে থেকেই মাসনুন দু’আ শেখানো উচিত, বিশেষত সময় ও স্থানের সাথে সম্পর্কিত দু’আসমূহ। এতে সন্তান শৈশব থেকেই আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং তার জীবন হবে বরকতময়।

হালাল-হারামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা

স্কুল জীবনে একজন মুসলিম সন্তানের জন্য হালাল-হারামের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জ্ঞান তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং নৈতিকভাবে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বয়সে মূলত যেসব বিষয় শেখা উচিত, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. হালাল-হারামের মূল ধারণা

প্রথমত, শিশুদের সহজভাবে হালাল ও হারামের মূল ধারণা বোঝাতে হবে। হালাল হলো সেই কাজ বা জিনিস যা আল্লাহ অনুমোদিত করেছেন, আর হারাম হলো যা তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল পথ অনুসরণ করা এবং হারাম থেকে দূরে থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অবশ্যপালনীয়।

নুমান ইবনু বশীর (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, ‘হালাল স্পষ্ট এবং হারামও স্পষ্ট। আর এ দু’য়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দেহজনক বিষয়- যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সেই সন্দেহজনক বিষয়সমূহ হতে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়সমূহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তার উদাহরণ সে রাখালের ন্যায়, যে তার পশু বাদশাহ্ সংরক্ষিত চারণভূমির আশেপাশে চরায়, অচিরেই সেগুলোর সেখানে ঢুকে পড়ার আশংকা রয়েছে। জেনে রাখ যে, প্রত্যেক বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে। আরো জেনে রাখ যে, আল্লাহর যমীনে তাঁর সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর নিষিদ্ধ কাজসমূহ। জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি মাংসের টুকরো আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সে মাংসের টুকরোটি হল অন্তর। সহহি বুখারি : ৫২, ২০৫১, সহিহ মুসলিম : ১৫৯৯, আহমাদ : ১৮৩৯৬, ১৮৪০২

শিশুদের বোঝানো উচিত—যা স্পষ্ট হালাল, তা গ্রহণ করা উচিত; যা স্পষ্ট হারাম, তা অবশ্যই বর্জন করতে হবে।

২. খাদ্য ও পানীয়

খাদ্যের বিষয়ে হালাল-হারামের জ্ঞান খুবই জরুরি। শিশুদের শেখানো উচিত যে, সকল প্রকার শূকরের মাংস, মৃত প্রাণীর মাংস, এবং এমন প্রাণী যা আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়নি, তা খাওয়া হারাম। পাশাপাশি মাদকদ্রব্য ও নেশাজাতীয় জিনিসও হারাম।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। সূরা মায়িদাহ: ৯০

এই শিক্ষা শিশুদেরকে সুস্থ ও পবিত্র জীবনযাপনে উৎসাহিত করে।

৩. পোশাক ও সাজসজ্জা

পোশাকের ক্ষেত্রে শিশুদের শেখাতে হবে—মুসলিম ছেলেদের জন্য রেশমের পোশাক ও সোনার অলংকার পরা হারাম। মেয়েদের জন্য শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখা অপরিহার্য, যা ইসলামে পর্দার প্রাথমিক ধারণা দেয়।

আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহিলারা হচ্ছে আওরাত (আবরণীয় বস্তু)। সে বাইরে বের হলে শাইতান তার দিকে চোখ তুলে তাকায়। সুনানে তিরমিজি : ১১৭৩, মিশকাত : ৩১০৯, ইরওয়া : ২৭৩

৪. নৈতিকতা ও আচরণ

হালাল-হারামের ধারণা শুধু খাদ্য ও পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের আচরণেও প্রযোজ্য। মিথ্যা বলা, চুরি, প্রতারণা, গিবত (পরচর্চা) করা এবং অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করা হারাম।

আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের চিহ্ন তিনটিঃ ১. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে; ২. যখন অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করে এবং ৩. আমানত রাখা হলে খিয়ানাত করে। সহিহ বুখারি : ৩৩ ২৬৮২, ২৭৪৯, ৬০৯৫, সহিহ মুসলিম : ৫৯, আহমাদ : ৯১৬২

’আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাকে জিবরীল (আঃ) সর্বদা প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত করতে থাকেন। এমনকি, আমার ধারণা হয়, শীঘ্রই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিস করে দিবেন। সহিহ বুখারি : ৬০১৪, সহিহ মুসলিম : ২৬২৪, আহমাদ : ২৪৩১৪

শিশুদের শেখানো উচিত—সৎ থাকা, আমানত রক্ষা করা এবং প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা আল্লাহর কাছে প্রিয়।

৫. উপার্জন

যদিও স্কুল বয়সে শিশুরা উপার্জন করে না, তবুও তাদের মধ্যে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব বোঝানো উচিত। ঘুষ, সুদ, প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জন হারাম।

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَنۡ تَکُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡکُمۡ ۟ وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا

হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা নিজেরা নিজদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু। সুরা নিসা : ২৯

আল্লাহ বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوا الرِّبٰۤوا اَضۡعَافًا مُّضٰعَفَۃً ۪  وَاتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ۚ

হে মুমিনগণ, তোমরা সুদ খাবে না বহুগুণ বৃদ্ধি করে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। সুনা আল ইমরান : ১৩০

৬. বন্ধু নির্বাচন

শিশুদের হালাল-হারামের জ্ঞান তাদের বন্ধু নির্বাচনে সাহায্য করে। ভালো বন্ধু ভালো পথে চালিত করে।

৪৮৩৩। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির (দ্বীন ধর্মের) অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে। সুনান আবু দাউদ : ৪৮৩৩, সুনান তিরমিজি : ২৩৭৮, আহমদ : ৮৩৯৮

উপসংহার : হালাল-হারামের প্রাথমিক জ্ঞান স্কুল জীবনে শিশুদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি মজবুত করতে সাহায্য করে। এটি তাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা তৈরি করে, যা জীবনের প্রতিটি ধাপে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক।