গর্ভ অবস্থায় করণীয়

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামে গর্ভবতী স্ত্রীর সাথে উত্তম ব্যবহার করার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল মানবিক সদাচরণ নয়, বরং এটি একটি ইবাদত এবং আদর্শ পরিবারের ভিত্তি। ইসলামি শরিয়ত এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

১. গর্ভবতী স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ করা

ইসলাম গর্ভবতী স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করে। এই সময়ে নারীর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। তাই স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, তার কষ্টকে উপলব্ধি করা এবং যথাসম্ভব তার আরামের ব্যবস্থা করা।

ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সহীহাহ : ২৮৫

আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ

“কোনো মুমিন ব্যক্তি তার স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না। যদি তার কোনো গুণ তাকে অপছন্দ হয়, তবে অন্য কোনো গুণ অবশ্যই সে পছন্দ করবে। সহিহ মুসলিম : ১৪৬৯

গর্ভাবস্থায় নারীর কষ্ট ও দুর্বলতা স্বামীকে আরও বেশি সহানুভূতিশীল হতে আহ্বান করে। নবী ﷺ স্ত্রীদের সাথে দয়া, স্নেহ ও সহযোগিতার আদর্শ স্থাপন করেছেন। তাই এ হাদিসগুলোই গর্ভবতী স্ত্রীর যত্ন ও সহানুভূতিশীল আচরণের সরাসরি প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগানো যায়।

২. গর্ভবতী স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক সহায়তা করা

গর্ভকালীন সময়ে স্ত্রী দুর্বল ও অসুস্থ থাকতে পারেন। তাই স্বামীর উচিত:

ক. শারীরিক কাজে সাহায্য করা:

আসওয়াদ (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’আয়িশাহ (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলামঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গৃহে কী কাজ করতেন? তিনি বললেনঃ তিনি পারিবারিক কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। যখন সালাতের সময় উপস্থিত হত, তখন উঠে সালাতে চলে যেতেন। সহিহ বুখারি : ৬৭৬, ৬০৩৯

খ. মানসিক সমর্থন দেওয়া :

গর্ভকালীন দুশ্চিন্তা বা অবসাদ থেকে স্ত্রীকে মুক্ত রাখতে তার পাশে থাকা, তাকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার ভালো লাগার বিষয়গুলো করা। ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭, সুনানে তিরমিজি : ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

গ. আহার ও স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা :

স্ত্রীর পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকা।

মুয়াবিযা বিন হাইদাহ (রহ.) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলো, স্বামীর উপর স্ত্রীর কী অধিকার রয়েছে? তিনি বলেনঃ সে আহার করলে তাকেও (একই মানের) আহার করাবে, সে পরিধান করলে তাকেও একই মানের পোশাক পরিধান করাবে কখনও তার মুখমণ্ডল আঘাত করবে না, অশ্লীল গালমন্দ করবে না এবং নিজ বাড়ি ছাড়া অন্যত্র তাকে একাকী ত্যাগ করবে না। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮৫০, সুনানে আবূ দাউদ : ২১৪২, ইরওয়াহ : ২০৩, মিশকাত : ৩২২৯, সহীহ আবী দাউদ ১৮৫৮-১৮৬১

৩. গর্ভবর্তী মায়েকে পড়াশোনা করেত হবে

একজন শিশুর আগমন একটি নারীর জীবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। মাতৃত্বের মাধ্যমে নারী তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। তবে কেবল জন্ম দিলেই একজন নারী প্রকৃত মা হন না; সঠিকভাবে সন্তান প্রতিপালনের মধ্যেই মাতৃত্বের সার্থকতা নিহিত।

আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে গর্ভবতী মায়েরা কেবল নিজেদের খাওয়া-দাওয়া নিয়েই চিন্তিত থাকেন। কিন্তু গর্ভধারণ ও সন্তান প্রতিপালন একটি ব্যাপক বিষয়, যার জন্য সঠিক জ্ঞান ও প্রস্তুতির প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে, যেমন উত্তর আমেরিকায়, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য বিভিন্ন কোর্স এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সেখানে প্রেগন্যান্ট হওয়ার আগে থেকেই পড়াশোনা শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাজারে এই সংক্রান্ত বহু বই এবং ডিভিডি পাওয়া যায়। এছাড়াও, ইন্টারনেটে অসংখ্য ওয়েবসাইট রয়েছে যেখান থেকে ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা যায়। এসব উৎস থেকে গর্ভধারণের আগে ও পরে করণীয়, শিশুর সঠিক পরিচর্যা এবং শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়। একজন সচেতন মা হওয়া এবং নিজের সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য।

একজন মুসলিম গর্ভবতী মায়ের দায়িত্ব অন্য মায়েদের চেয়ে কিছুটা বেশি। সাধারণ প্রস্তুতির পাশাপাশি তাকে সন্তানকে আদর্শ মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অতিরিক্ত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। সন্তানের অন্তরে দ্বীনের আলো প্রজ্জ্বলিত করতে প্রয়োজন ইসলামি শিশু সাহিত্য, আল কুরআনের তাফসির, রাসূল (সা.) ও সাহাবিদের জীবনী অধ্যয়ন করা। বর্তমানে ইন্টারনেটে এ সংক্রান্ত প্রচুর ভিডিও পাওয়া যায়, যা থেকে সহজেই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পর মায়েরা হাতে প্রচুর সময় পান। এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে তারা ইসলামের ওপর গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। এতে একদিকে যেমন সন্তানের সঠিক ইসলামিক পরিচর্যার পথ খুলে যায়, তেমনি মা নিজেও এক গভীর মানসিক শান্তি লাভ

৪. গর্ভবতী মায়ের যে কাজগুলো পরিহার করা উচিত

গর্ভকালীন সময় একজন মায়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার প্রভাব সরাসরি গর্ভের সন্তানের ওপর পড়ে। তাই এই সময়ে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা খুবই জরুরি। এই বিষয়ে ইসলাম ধর্ম ও বিজ্ঞান উভয়ই একমত। গর্ভবতী মায়ের যে কাজগুলো পরিহার করা উচিত, তা নিচে দেওয়া হলো:

ক. অশ্লীল ও অনৈসলামিক বিনোদন:

গর্ভবতী অবস্থায় অনেক মা অবসর সময় কাটানোর জন্য টিভি বা ইন্টারনেটে অশ্লীল নাচ, গান, সিরিয়াল, নাটক বা সিনেমা দেখে থাকেন। এটি শুধু সময়ের অপচয়ই নয়, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব গর্ভের সন্তানের ওপরও পড়ে। ইসলামে এ ধরনের কাজ হারাম। বিজ্ঞানও বলে, মা যা দেখেন বা শোনেন, তার প্রভাব সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশে পড়ে।

খ. অনিয়মিত সালাত ও ইবাদত:

আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতস্বরূপ সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে অনেকেই ইবাদত থেকে দূরে সরে যান। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় না করা, কুরআন তিলাওয়াত না করা, বা ইসলামিক বই না পড়া—এগুলো মা ও সন্তান উভয়ের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করে।

গ. গীবত ও খারাপ কথা:

গীবত বা পরনিন্দা করা, মিথ্যা বলা, বা অহংকার করা—এগুলো গর্ভবতী মায়ের জন্য ক্ষতিকর। মায়ের মানসিক অবস্থা যত শান্ত ও পবিত্র থাকবে, সন্তানের ওপর তার প্রভাব ততটাই ইতিবাচক হবে।

ঘ. হারাম খাবার:

ইসলামে যে সকল খাবার হারাম করা হয়েছে, তা গর্ভবতী মায়ের জন্য অবশ্যই পরিহার করা উচিত। হালাল খাবার গ্রহণ করা মা ও সন্তানের সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

একজন গর্ভবতী মা যখন নিয়মিত সালাত আদায় করেন, কুরআন তিলাওয়াত করেন, ইসলামিক লেকচার শোনেন এবং ভালো কাজ করেন, তখন তার গর্ভের সন্তানও এই ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করে। মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তান দান করেছেন একটি নেয়ামত হিসেবে। তাই তার দেওয়া এই নেয়ামতের জন্য সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এবং তার পছন্দ মতো কাজ করা উচিত।

মনে রাখবেন, সন্তানের সুস্থ জীবন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ আল্লাহর হাতে। তাই সর্বদা তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলা উচিত। আপনার গর্ভের সন্তান সুস্থ হোক এবং দ্বীনের পথে বেড়ে উঠুক, এই কামনা করি।

৫. গর্ভকালীন শিশু বিকাশ ও ইসলামী দিকনির্দেশনা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে শিশুর বিকাশ

  • প্রথম মাসে: ভ্রূণের হৃদপিণ্ড গঠিত হতে শুরু করে।
  • দেড় মাসের মধ্যে: শিশুর হৃদপিণ্ড কাজ করা শুরু করে।
  • দুই মাস পর: হাত-পা ও অন্যান্য প্রধান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে গঠিত হয়।
  • তিন মাসের পর থেকে: শিশু ক্রমশ বড় হতে থাকে।
  • পাঁচ মাস বয়স থেকে: ভ্রূণ শুনতে সক্ষম হয়।
  • প্রথম গর্ভধারণে: প্রায় বিশ সপ্তাহ পর মা প্রথমবার সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করেন।
  • দ্বিতীয় বা তৃতীয় গর্ভধারণে: সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ সপ্তাহের মধ্যেই শিশুর নড়াচড়া টের পাওয়া যায়।
  • গর্ভাবস্থায় শিশু নাভীর মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে খাদ্য গ্রহণ করে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। ফলে মায়ের খাদ্যাভ্যাস, মানসিক অবস্থা ও চরিত্র শিশুর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয়

যায়দ ইবনু ওয়াহব (রহ.) হতে বর্ণিত। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, সত্যবাদী হিসেবে গৃহীত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা মাংসপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাঁকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাঁকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার ‘আমল, তার রিজক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়। কাজেই তোমাদের কোন ব্যক্তি ‘আমল করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তার এবং জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত পার্থক্য থাকে। এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। তখন সে জাহান্নামবাসীর মত আমল করে। আর একজন ‘আমল করতে করতে এমন স্তরে পৌঁছে যে, তার এবং জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত তফাৎ থাকে, এমন সময় তার ‘আমলনামা তার উপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতবাসীর মত ‘আমল করে। সহিহ বুখারি : ৩২০৮, ৩৩৩২, ৬৫৯৪, ৭৪৫৪, সহিহ মুসলিম : ৩৬৪৩, আহমাদ : ৩৬২৪

ক. কুরআন তিলাওয়াত ও সুন্দর কথা শোনানো

যেহেতু তৃতীয় মাস থেকে ভ্রূণ ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে, তাই এ সময় থেকেই মায়ের উচিত ধীরে ধীরে সুন্দর করে কুরআন তিলাওয়াত করা।

পঞ্চম মাস থেকে শিশুর শ্রবণশক্তি সক্রিয় হয়। তাই মায়ের উচিত জোরে জোরে কুরআন-হাদিস পাঠ করা, নেক কথা শোনানো এবং শিশুর সাথে কোমলভাবে কথা বলা। এতে শিশুর হৃদয় ও চরিত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

খ. ইবাদতে নিয়মিত হওয়া

মায়ের মধ্যে যদি আগে থেকে নামাজে অনিয়ম থাকে, তবে এ সময় থেকেই তাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে নিয়মিত হয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিশুর চরিত্র গঠনে মায়ের চরিত্রের গভীর প্রভাব পড়ে। তাই মায়ের উচিত নিজের দোষ-ত্রুটি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং সৎকাজের অভ্যাস গড়ে তোলা।

গ. চরিত্র ও নৈতিকতা

মায়ের আচরণ, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ইবাদত—সবকিছু সন্তানের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। গর্ভকালীন সময়ে আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হওয়া, হারাম ও সন্দেহজনক বিষয় থেকে বিরত থাকা, সৎ-সঙ্গ ও উত্তম আচার-আচরণ বজায় রাখা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কল্যাণকর ভিত্তি তৈরি করে।

৬. সন্তানের জন্মের আগে মা-বাবার নৈতিক দায়িত্ব

সন্তান পৃথিবীতে আসার আগে মা-বাবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব রয়েছে, যা সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করে। ইসলাম ধর্মানুসারে, এই দায়িত্বগুলো পালনের মাধ্যমে একটি পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। নিচে এই দায়িত্বগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

উত্তম ও সৎ উদ্দেশ্য: সন্তান গ্রহণের আগে মা-বাবা উভয়ের উচিত, সন্তানের লালন-পালন ও জীবন গঠনের জন্য সৎ ও উত্তম উদ্দেশ্য পোষণ করা। নিয়ত বা উদ্দেশ্য ভালো হলে আল্লাহ তাআলা তাদের কাজে বরকত দেন।

হালাল উপার্জন ও খাদ্য: সন্তানের জন্মের আগে মা-বাবার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হালাল উপার্জন করা এবং সেই উপার্জন দিয়ে কেনা হালাল খাবার গ্রহণ করা। হালাল উপার্জনের প্রভাব সন্তানের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের ওপর পড়ে।

নিয়মিত সালাত ও ইবাদত: সন্তান ধারণের সময় মা-বাবা উভয়ের উচিত নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা। সম্ভব হলে মাঝেমধ্যে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় এবং সালাতের পর তাসবীহ পাঠ করা যেতে পারে। ইবাদত আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক এবং মনকে পবিত্র রাখে।

সৎ কাজ ও ভালো আচরণ: মা-বাবার উচিত নিজেদের ভালো কাজের সংখ্যা বাড়ানো। মানুষের সাথে আরও ভালো আচরণ করা, দরিদ্রদের মধ্যে দান-সদকা করা এবং অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। এসব কাজ সন্তানের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কুরআন অধ্যয়ন ও তিলাওয়াত: প্রতিদিন অর্থসহ কুরআন তিলাওয়াত করা এবং নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত শোনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আত্মিক শান্তি ও প্রশান্তি আসে, যা সন্তানের জন্যও কল্যাণকর। ইসলামের ওপর অন্যান্য বই অধ্যয়ন করলে ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধি পায়।

অসুন্দর কাজ থেকে বিরত থাকা: গীবত, পরনিন্দা, কুৎসা রটনা, অহংকার এবং দাম্ভিকতাপূর্ণ কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। এছাড়াও, টিভি বা ইন্টারনেটে অশ্লীল নাচ, গান, সিরিয়াল, নাটক বা সিনেমা দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব নেতিবাচক কাজ পারিবারিক পরিবেশকে নষ্ট করে।

এই দায়িত্বগুলো পালনের মাধ্যমে মা-বাবা সন্তানের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠার ভিত্তি স্থাপন করতে পারেন। এটি কেবল সন্তানের জন্য নয়, বরং মা-বাবার নিজেদের জীবনকেও আরও শান্তিময় ও বরকতময় করে তোলে।

৭. সন্তান জম্মের আগে দুআ করা

ইসলামে সন্তানকে আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত হিসেবে দেখা হয়। তাই সন্তান জন্মের আগে থেকেই তার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদীসে এর অনেক দৃষ্টান্ত ও নির্দেশনা পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় যে সন্তানের সুস্থ জীবন, সুন্দর চরিত্র এবং দ্বীনের পথে বেড়ে ওঠার জন্য দুআ অপরিহার্য।

কুরআনে অনেক নবী-রাসূলের দুআ উল্লেখ আছে, যেখানে তাঁরা আল্লাহর কাছে নেক সন্তান চেয়েছেন। যেমন, হযরত যাকারিয়া (আ.) বৃদ্ধ বয়সেও আল্লাহর কাছে সন্তান চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআর কথা কুরআনে এভাবে বলেছেন-

رَبِّ ہَبۡ لِیۡ مِنۡ لَّدُنۡکَ ذُرِّیَّۃً طَیِّبَۃً ۚ اِنَّکَ سَمِیۡعُ الدُّعَآءِ

সেখানে যাকারিয়্যা তার রবের কাছে প্রার্থনা করেছিল, সে বলল, ‘হে আমর রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী’। সূরা আল ইমরান : ৩৮

এই দুআর মাধ্যমে তিনি কেবল সন্তান নয়, বরং এমন সন্তান চেয়েছিলেন যে হবে পবিত্র ও নেককার। একইভাবে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন-

رَبِّ ہَبۡ لِیۡ مِنَ الصّٰلِحِیۡنَ

‘হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন’। সূরা সাফফাত : ১০০

এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, সন্তানের জন্মের আগে থেকেই তার জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা সুন্নাহ এবং অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

যখন ইমরান স্ত্রী, মরিয়ম (আ.) এর মা দুআ করেছিলেন-

رَبِّ اِنِّیۡ نَذَرۡتُ لَکَ مَا فِیۡ بَطۡنِیۡ مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلۡ مِنِّیۡ ۚ اِنَّکَ اَنۡتَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ

হে আমার রাব্ব! নিশ্চয়ই আমার গর্ভে যা রয়েছে তা আমি মুক্ত করে আপনার উদ্দেশে উৎসর্গ করলাম, সুতরাং আপনি আমা হতে তা গ্রহণ করুন, নিশ্চয়ই আপনি শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। সুর আল ইমরান : ৩৫

সন্তান জন্মের আগে দুআ করা কেবল একটি প্রার্থনা নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ভরসার প্রতিফলন। এর মাধ্যমে মা-বাবা আল্লাহর কাছে একটি নেক, সুস্থ ও সৎ সন্তানের জন্য আবেদন করেন। এই দুআগুলো সন্তানের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তাকে দ্বীনের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। তাই সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করার পর থেকেই দুআ করা শুরু করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *