হাশরের ময়দা : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

৫. ইবরাহীম আ. এর পিতাকে ক্ষমা করা হবে না

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: কিয়ামতের দিন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তার পিতা আযর-এর সাক্ষাৎ পাবেন। তখন আযর-এর চেহারা হবে কালো ধুলাবালি মিশ্রিত। তখন ইবরাহীম আলায়হিস সালাম তাকে বলবেন, আমি কি আপনাকে (দুনিয়াতে) বলেছিলাম না যে, আপনি আমার কথা অমান্য করবেন না? তখন তার পিতা তাকে বলবেন, আজ আমি তোমার অবাধ্যতা করব না। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম বলবেন, হে প্রতিপালক! আপনি আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, হাশরের দিন আমাকে অপমানিত করবেন না। অথচ আজ আমার পিতা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত, অতএব এর চেয়ে অধিক লাঞ্ছনা ও অপমান আর কি হতে পারে? তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, আমি কাফিরদের জন্য জান্নাত অবৈধ করে রেখেছি। অতঃপর ইবরাহীম আলায়হিস সালাম-কে বলা হবে, তুমি তোমার পায়ের তলার দিকে দেখ। তিনি সে দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই হঠাৎ দেখবেন যে, তার সামনে কাদা গোবরে লণ্ডভণ্ড শিয়াল আকৃতি একটি নিকৃষ্ট পশু দাঁড়িয়ে আছে। তখনি তাকে চার পা ধরে জাহান্নামে ফেলে দেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ৩৩৫০, মিশকাত : ৫৫৩৮, সহীহুল জামি : ৮১৫৮, আল মুসতাদরাক লিল হাকিম : ২৯৩৬।

৬. কিয়ামতের দিন কিছু মানুষকে আরশের ছায়ায় স্থান দেওয়া হবে

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«إِنَّ اللهَ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: «أَيْنَ الْمُتَحَابُّونَ بِجَلَالِي، الْيَوْمَ أُظِلُّهُمْ فِي ظِلِّي يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلِّي»

আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, যারা আমারই জন্য পরস্পরকে ভালোবেসেছে তারা আজ কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়ায় ছায়া দান করবো। আজ এমন দিন আমার ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া নেই”। সহিহ মুসলিম : ২৫৬৬।

আবু ইয়াসার কা‘আব ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا أَوْ وَضَعَ عَنْهُ، أَظَلَّهُ اللهُ فِي ظِلِّهِ»

“যে কোনো ঋণগ্রস্ত বা অভাবী ব্যক্তিকে সুযোগ দিবে অথবা তাকে ঋণ আদায় থেকে অব্যাহতি দিবে আল্লাহ তায়ালা তাকে নিজ ছায়ায় আশ্রয় দিবেন”। সহিহ মুসলিম : ২৩০২

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

কিয়ামত দিবসে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ‘আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দিবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোনো ছায়া থাকবে না- ন্যায়পরায়ন বাদশাহ, এমন যুবক যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর ইবাদতে, ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় সর্বদা সংশি­ষ্ট থাকে মসজিদের সাথে, এমন দু ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে তারই জন্য, এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সুন্দরী নেতৃস্থানীয়া এক রমণী আহ্বান করল অশ্লীল কর্মের প্রতি, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করে সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি, এমন ব্যক্তি, যে এরূপ গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত ডান হাতের দান সম্পর্কে অবগত হয় না। আর এমন ব্যক্তি, নির্জনে যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দু-চোখ বেয়ে বয়ে যায় অশ্রুধারা” সহিহ বুখারি ৬৬০, সহিহ  মুসলিম : ১০৩১।

৭. কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠি মুমিনগণ আল্লাহকে দেখতে পাবে

আবূ রযীন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আমরা কি কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখতে পাবো এবং তাঁর সৃষ্টির মাঝে এর নিদর্শন কী? তিনি বলেনঃ হে আবূ রযীন! তোমাদের প্রত্যেকে কি চাঁদকে পৃথকভাবে দেখতে পায় না? তিনি বলেন, আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেনঃ আল্লাহ অতীব মহান এবং এটাই হল তাঁর সৃষ্টির মাঝে (তাঁর) নিদর্শন। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৮০, মিশকাত : ৫৬৫৮, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩১, ইবনু মাজাহ : ১৮০, মুসনাদে আহমাদ : ১৬২৩১, ত্ববারানী : ১৫৭৯৬।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি কিয়ামত দিবসে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “আচ্ছা দুপুর বেলা যখন মেঘ না থাকে তখন সূর্যকে দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন, না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রশ্ন করলেন: পূর্ণিমার রাতে যখন আকাশে মেঘ না থাকে তখন চাঁদ দেখার জন্য কি তোমাদের ভীর করতে হয়? সাহাবায়ে কেরাম উত্তরে বললেন: না। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ! তোমাদের প্রতিপালককে দেখার জন্য সেদিন তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হবে না। যেমন সূর্য ও চন্দ্র দেখার জন্য তোমাদের কোনো কষ্ট করতে হয় না। আল্লাহ এক বান্দার সাথে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাইনি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাইনি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর দ্বিতীয় এ ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ বলবেন: হে ব্যক্তি আমি কি তোমাকে সম্মানিত করি নি? আমি কি তোমাকে নেতা বানাই নি? আমি কি তোমাকে বিবাহ করাই নি। আমি কি তোমার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করি নি? সে ব্যক্তি উত্তর দিবে অবশ্যই আপনি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি আমার সাথে সাক্ষাতের বিশ্বাস রাখতে? সে বলবে, না। আল্লাহ তখন বলবেন: আজ আমি তোমাকে ভুলে গেলাম যেমন তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছিলে। এরপর তৃতীয় এক ব্যক্তিকে সাক্ষাত দিবেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে অপর দুজনের মত করেই প্রশ্ন করবেন। সে বলবে, আমি আপনার প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। আপনার কিতাব, আপনার রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। সালাত পড়েছি, রোযা রেখেছি, দান-সদকা করেছি। সাধ্যমত আপনার প্রশংসা করেছি। তার উত্তর শুনে আল্লাহ বলবেন, তাই নাকি? তাহলে এখনই তোমার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী উপস্থিত করি। তারপর (তোমার উত্তর সম্পর্কে) তুমি ভেবে দেখবে। বলা হবে, কে আছে তার সম্পর্কে স্বাক্ষ্য দিবে? এরপর তার মুখ সীল করে দেওয়া হবে। তার রান, তার মাংস, তার হাড্ডিকে বলা হবে, তোমরা কথা বলো। এরা তাদের জানা মতে তথ্য দিতে শুরু করবে। এভাবে আল্লাহ নিজে স্বাক্ষ্য দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত থাকবেন। আসলে এ ব্যক্তিটি ছিল দুনিয়ার জীবনে মুনাফিক। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা তার প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন”। সহীহ বুখারী : ৭৪৩৭, সহিহ মুসলিম : ২৯৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৭৯১৪, আবূ ইয়া’লা : ৬৬৮৯, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৪৬৪২. হাকিম : ৮৭৩৬।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) বলেন যে, কয়েকজন সাহাবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত দিবসে আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের মাঝে কষ্ট হয়? সাহাবাগণ বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের পরস্পরের কষ্টবোধ হয়? তারা বললেন, না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তদ্রুপ তোমরা তাকেও দেখবে। কিয়ামত দিবসে আল্লাহ সকল মানুষকে জমায়েত করে বলবেন, পৃথিবীতে তোমাদের যে যার ইবাদাত করেছিলে আজ তাকেই অনুসরণ কর।

তখন যারা সূর্যের উপাসনা করতো, তারা সূর্যের সাথে থাকবে। যারা চন্দ্রের উপাসনা করতো, তারা চন্দ্রের সাথে থাকবে। আর যারা আল্লাহদ্রোহীদের (তাগুতের) উপাসনা করতো, তারা আল্লাহদ্রোহীদের সাথে জমায়েত হয়ে যাবে। কেবল এ উম্মত অবশিষ্ট থাকবে। তন্মধ্যে মুনাফিকরাও থাকবে। তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট এমন আকৃতিতে উপস্থিত হবেন যা তারা চিনে না। তারপর (আল্লাহ তা’আলা) বলবেন, আমি তোমাদের প্রতিপালক (সুতরাং তোমরা আমার পিছনে চল)। তারা বলবে, নাউযুবিল্লাহ। আমাদের প্রভু না আসা পর্যন্ত আমরা এখানেই দাড়িয়ে থাকবো। আর তিনি যখন আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারবো।

এরপর আল্লাহ তা’আলা তাদের নিকট তাদের পরিচিত আকৃতিতে আসবেন, বলবেনঃ আমি তোমাদের প্রভু। তারা বলবে, হ্যাঁ, আপনি আমাদের প্রতু। এ বলে তারা তাকে অনুসরণ করবে। এমন সময়ে জাহান্নামের উপর দিয়ে সিরাত (সাকো) বসানো হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন আর আমি ও আমার উম্মতই হব প্রথম এ পথ অতিক্রমকারী। সেদিন রাসূলগণ ব্যতীত অন্য কেউ মুখ খোলারও সাহস করবে না। আর রাসূলগণও কেবল এ দু’আ করবেন। হে আল্লাহ! নিরাপত্তা দাও, নিরাপত্তা দাও। আর জাহান্নামে থাকবে সা’দান বৃক্ষের কাটার মত অনেক কাটাযুক্ত লৌহদণ্ড। তোমরা সাদান বৃক্ষটি দেখেছ কি? সাহাবাগণ বললেন, হ্যাঁ দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তা সাদান বৃক্ষের কাটার মতই, তবে সেটা যে কত বিরাট তা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। পাপ কাজের জন্য কাটার আংটাগুলো ছোবল দিতে থাকবে। তাদের কেউ কেউ মু’মিন (যারা সাময়িক জাহান্নামী) তারা রক্ষা পাবে, আর কেউ তো শাস্তি ভোগ করে নাযাত পাবে।

এরপর আল্লাহ বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা হতে অবসর হলে স্বীয় রহমতে কিছু সংখ্যক জাহান্নামীদের (জাহান্নাম হতে) বের করতে দেয়ার ইচ্ছা করবেন তখন ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন যারা কালিমায় বিশ্বাসী ও শিরক করেনি যাদের উপর আল্লাহ তা’আলা রহম করতে চাইবেন যে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে নিয়ে আসো। আর যাদের উপর আল্লাহ তা’আলা দয়া করতে চেয়েছেন তারা ঐ সকল লোক যারা ’লা- ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ বলত। অতঃপর ফেরেশতাগণ তাদের সনাক্ত করবেন। তারা সিজদা চিহ্নের সাহায্যে তাদের চিনবেন। কারণ, অগ্নি মানুষের দেহের সবকিছু জ্বালিয়ে ফেললেও সাজদার স্থান অক্ষত থাকবে। আল্লাহ তা’আলা সাজদার চিহ্ন নষ্ট করা হারাম (নিষিদ্ধ) করে দিয়েছেন। মোটকথা, ফেরেশতাগণ এদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে এমন অবস্থায় যে, তাদের দেহ আগুনে দগ্ধ। তাদের উপর ’মাউল-হায়াত’ (সঞ্জীবনী পানি) ঢেলে দেয়া হবে। তখন তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে যেমনভাবে শস্য অঙ্কুর পানিসিক্ত উর্বর জমিতে সতেজ হয়ে উঠে।

তারপর আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের বিচার সমাপ্ত করবেন। শেষে এক ব্যক্তি থেকে যাবে। তার মুখমণ্ডল হবে জাহান্নামের দিকে। এই হবে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী। সে বলবে, হে আমার প্রভু! (অনুগ্রহ করে) আমার মুখটি জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দিন। কারণ জাহান্নামের দুর্গন্ধ আমাকে অসহনীয় কষ্ট দিচ্ছে; এর লেলিহান অগ্নিশিখা আমাকে দগ্ধ করে দিচ্ছে। আল্লাহ যতদিন চান ততদিন পর্যন্ত সে তার নিকট দু’আ করতে থাকবে। পরে আল্লাহ বলবেন, তোমার এ দু’আ কবুল করলে তুমি কি আরো কিছু কামনা করবে? সে বিভিন্ন ধরনের ওয়াদা ও অঙ্গীকার করে বলবে যে, জাহান্নামের দিক থেকে ফিরিয়ে দিবেন।

তার চেহারা যখন জান্নাতের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, আর সে জান্নাত দেখবে, তখন আল্লাহ যতদিন চান সে নীরব থাকবে। পরে আবার বলবে, হে আমার প্রতিপালক! কেবল জান্নাতের দরজা পর্যন্ত আমাকে পৌছে দিন। আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি না অঙ্গীকার দিয়েছিলে যে, আমি তোমাকে যা দিয়েছি তা ছাড়া আর কিছু চাইবে না। হে আদম সন্তান! তুমি হতভাগা ও তুমি সাংঘাতিক ওয়াদাভঙ্গকারী। তখন সে বলবে, হে আমার রব! এই বলে আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকবে। আল্লাহ বলবেন, তুমি যা চাও তা যদি দিয়ে দেই তবে আর কিছু চাইবে না তো? সে বলবে, আপনার ইজ্জতের কসম! আর কিছু চাইব না। এভাবে সে তার অক্ষমতা (আল্লাহর কাছে) পেশ করতে থাকবে যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা হয়।

তারপর তাকে জান্নাতের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়া হবে। এবার যখন সে জান্নাতের দরজায় দাঁড়াবে, তখন জান্নাত তার সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সে জান্নাতের সমৃদ্ধি ও সুখ দেখতে থাকবে। সেখানে আল্লাহ যতক্ষণ চান সে ততক্ষণ চুপ করে থাকবে। পরে বলবে, হে আমার রব! আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, তুমি না সকল ধরনের ওয়াদা ও অঙ্গীকার করে বলেছিলে, আমি যা দান করেছি এর চাইতে বেশি আর কিছু চাইবে না? হে হতভাগা আদম সন্তান! তুমি তো ভীষণ ওয়াদাভঙ্গকারী। সে বলবে, হে আমার রব। আমি যেন আপনার সৃষ্টির সবচেয়ে দুর্ভাগা না হই। সে বার বার দু’আ করতে থাকবে। পরিশেষে তার অবস্থা দেখে আল্লাহ তা’আলা হেসে ফেলবেন। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। (জান্নাতে প্রবেশের পর) আল্লাহ তাকে বলবেন, (যা চাওয়ার) চাও। তখন সে তার সকল কামনা চেয়ে শেষ করবে। এরপর আল্লাহ নিজেই স্মরণ করায়ে বলবেন, অমুক অমুকটা চাও। এভাবে তার কামনা শেষ হয়ে গেলে আল্লাহ বলবেন, তোমাকে এ সব এবং এর সমপরিমাণ আরো দেয়া হল। সহিহ মুসলিম : ১৮২

৮. ফিরিশতাগণ মুশরিকদের থেকে দায়মুক্তির ঘোষণা দিবে

আরবের মুশরিকরা ফিরিশতাদেরকে আল্লাহ তায়ালার কন্যা বলে জ্ঞান করতো। তাই তারা ফিরিশতাদের পূজা করতো। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাআলা ফিরিশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন যে, অবিশ্বাসীরা কি তাদের পূজা করত? ফিরিশতারা সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিজেদের পবিত্র ঘোষণা করবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعٗا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَٰٓئِكَةِ أَهَٰٓؤُلَآءِ إِيَّاكُمْ كَانُواْ يَعْبُدُونَ ٤٠ قَالُواْ سُبْحَٰنَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِمۖ بَلْ كَانُواْ يَعْبُدُونَ ٱلْجِنَّۖ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ ٤١

আর স্মরণ কর, যেদিন তিনি তাদের সকলকে সমবেত করবেন তারপর ফেরেশতাদেরকে বলবেন, ‘এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?’ তারা (ফেরেশতারা) বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, আপনিই আমাদের অভিভাবক, তারা নয়। বরং তারা জিনদের পূজা করত। এদের অধিকাংশই তাদের প্রতি ঈমান রাখত’। সূরা সাবা : ৪০-৪১

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সকল প্রকার শিরক বা আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্বের মিথ্যাকে প্রকাশ করে দেবেন। যারা ফিরিশতা, নবী-রাসূল বা জিনদের পূজা করত, তাদের উপাসনার এই দাবি সেদিন বাতিল প্রমাণিত হবে। তারা কেউ কারো কোন উপকার করেত পারবে না।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

فَٱلْيَوْمَ لَا يَمْلِكُ بَعْضُكُمْ لِبَعْضٖ نَّفْعٗا وَلَا ضَرّٗا وَنَقُولُ لِلَّذِينَ ظَلَمُواْ ذُوقُواْ عَذَابَ ٱلنَّارِ ٱلَّتِي كُنتُم بِهَا تُكَذِّبُونَ

ফলে আজ তোমাদের একে অপরের কোনো উপকার কিংবা অপকার করার ক্ষমতা কেউ রাখবে না। আর আমি যালিমদের উদ্দেশ্যে বলব, তোমরা আগুনের আযাব আস্বাদন কর যা তোমরা অস্বীকার করতে”। সূরা সাবা : ৪২

৯. মুশরিকদের মূর্তিগুলো পুজারীদের সাহায্য করতে অক্ষমতা প্রকাশ করবে

দুনিয়াতে যারা মূর্তি বা অন্য কোনো বস্তুর পূজা করেছে, কিয়ামতের দিন সেই পূজিত বস্তুগুলো তাদের পূজারীদের কোনো রকম সাহায্য করতে পারবে না। বরং তারা হয় পূজারীদের বিপক্ষে সাক্ষী দেবে অথবা তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে। কুরআনে বেশ কয়েকটি আয়াতে এই সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِذَا حُشِرَ النَّاسُ کَانُوْا لَہُمْ اَعْدَآءً وَّکَانُوْا بِعِبَادَتِہِمْ کٰفِرِیْنَ

আর যখন মানুষকে একত্র করা হবে, তখন এ উপাস্যগুলো তাদের (পূজারীদের) শত্রু হবে এবং তারা তাদের ইবাদাত অস্বীকার করবে। সূরা আহকাফ: ৬

এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন পূজিত উপাস্যগুলো তাদের পূজারীদের ইবাদত অস্বীকার করবে। অর্থাৎ, তারা বলবে যে, “আমরা তোমাদের ইবাদত সম্পর্কে অবগত নই এবং আমাদের ইবাদত করার জন্য আমরা তোমাদেরকে নির্দেশও দেইনি।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَيَوْمَ نَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ نَقُولُ لِلَّذِينَ أَشْرَكُوا مَكَانَكُمْ أَنتُمْ وَشُرَكَاؤُكُمْ ۚ فَزَيَّلْنَا بَيْنَهُمْ ۖ وَقَالَ شُرَكَاؤُهُم مَّا كُنتُمْ إِيَّانَا تَعْبُدُونَ

আর যেদিন আমি তাদের সকলকে একত্রিত করব, তারপর যারা শির্ক করেছিল, তাদের বলব, তোমরা এবং তোমাদের অংশীদাররা নিজ নিজ স্থানে থাকো। অতঃপর আমি তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেব এবং তাদের অংশীদাররা বলবে, ‘তোমরা তো আমাদের ইবাদত করতে না’। সূরা ইউনুস: ২৮

এই আয়াতটিতে আরও পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, পূজিত উপাস্যগুলো কেবল অসহায়ত্বই প্রকাশ করবে না, বরং তাদের পূজারীদের ইবাদত অস্বীকার করে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

أَتَدْعُونَ مَن لَّا يَسْمَعُ دُعَاءَكُمْ وَلَا يَضُرُّكُمْ وَلَا يَنفَعُكُمْ

তোমরা কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছুকে ডাকো, যা তোমাদের কোনো ডাকে সাড়া দিতে পারে না, তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না এবং তোমাদের কোনো উপকারও করতে পারে না?” সূরা আরাফ: ১৯২

এই আয়াতে আল্লাহ তা’আলা মূর্তিপূজার ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করেছেন। এই মূর্তিগুলো এতটাই ক্ষমতাহীন যে, তারা তাদের পূজারীদের প্রার্থনা শুনতে বা কোনো সাহায্য করতে পারে না।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, ‘যে যার পূজা করত, সে তার অনুসরণ করুক।’ তখন যারা সূর্যের পূজা করত, তারা সূর্যের সঙ্গে, যারা চন্দ্রের পূজা করত, তারা চন্দ্রের সঙ্গে এবং যারা প্রতিমার পূজা করত, তারা তাদের প্রতিমার সঙ্গে চলে যাবে। সহিহ বুখারী, হাদিস: ৭৪৩৯, সহিহ মুসলিম : ৪৫১

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কিয়ামতের দিন এই উপাস্যগুলো তাদের পূজারীদের কোনো উপকারে আসবে না, বরং তাদের সঙ্গে জাহান্নামের দিকে চলে যাবে।

সুতরাং, কুরআন ও হাদিসের আলোকে এটি সুস্পষ্ট যে, দুনিয়াতে যারা মূর্তি বা অন্য কোনো বস্তুর পূজা করেছে, কিয়ামতের দিন সেই মূর্তিগুলো তাদের কোনো কাজে আসবে না। বরং তারা তাদের পূজারীদের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দেবে এবং তাদের অসহায়ত্বের চরম প্রমাণ হবে।

১০. কিয়ামতের দিনে ঈসা (আ.) খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (Trinity) এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন

খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ (Trinity) হলো একটি ধর্মীয় বিশ্বাস যা বলে যে ঈশ্বর এক, কিন্তু তিনি তিনটি সত্তায় বিদ্যমান- পিতা (God the Father), পুত্র (God the Son বা যিশু খ্রিস্ট) এবং পবিত্র আত্মা (Holy Spirit)। এই তিনটি সত্তা সমানভাবে ঐশ্বরিক এবং তারা তিনজন মিলে এক ঈশ্বর।

এই বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রিত্বের প্রতিটি সত্তা সম্পূর্ণ ঈশ্বর। যেমন-

পিতা: তিনি হলেন স্রষ্টা, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

পুত্র: তিনি হলেন যিশু খ্রিস্ট, যিনি মানব রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে এসেছেন, মানুষকে পাপ থেকে মুক্ত করার জন্য।

পবিত্র আত্মা: তিনি হলেন ঈশ্বরের সেই শক্তি বা প্রভাব, যা বিশ্বাসীদের হৃদয়ে কাজ করে এবং তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করে।

ত্রিত্ববাদকে বোঝার জন্য প্রায়শই একটি উপমা ব্যবহার করা হয়, যেমন একটি ডিমের তিনটি অংশ (শেল, সাদা অংশ, কুসুম) বা পানির তিনটি রূপ (তরল, বরফ, বাষ্প)। যদিও এই উপমাগুলো ত্রিত্বের ধারণাটি সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না, তবে এটি বোঝাতে সাহায্য করে যে কীভাবে একজন ঈশ্বর তিনটি ভিন্ন সত্তায় প্রকাশিত হতে পারেন।

ত্রিত্ববাদ হলো খ্রিস্টধর্মের অন্যতম মৌলিক একটি মতবাদ। এটি প্রধানত ক্যাথলিক, অর্থোডক্স এবং প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের বেশিরভাগ শাখা দ্বারা গৃহীত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে ত্রিত্ববাদ (Trinity) হারাম ও শিরক কারণ এটি ইসলামের মূল ভিত্তি তাওহীদ-এর পরিপন্থী। তাওহীদ মানে হলো আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং তিনি কোনো কিছু বা কারো ওপর নির্ভরশীল নন। আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা অপরিহার্য। ত্রিত্ববাদের ধারণা, যেখানে ঈশ্বরকে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা এই তিনটি সত্তায় বিভক্ত করা হয়, তা এই মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসিদের সাথে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَإِذْ قَالَ ٱللَّهُ يَٰعِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ ءَأَنتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ ٱتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَٰهَيْنِ مِن دُونِ ٱللَّهِۖ قَالَ سُبْحَٰنَكَ مَا يَكُونُ لِيٓ أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّۚ إِن كُنتُ قُلْتُهُۥ فَقَدْ عَلِمْتَهُۥۚ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَآ أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّٰمُ ٱلْغُيُوبِ ١١٦ مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَآ أَمَرْتَنِي بِهِۦٓ أَنِ ٱعْبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْۚ وَكُنتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدٗا مَّا دُمْتُ فِيهِمْۖ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنتَ أَنتَ ٱلرَّقِيبَ عَلَيْهِمْۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٖ شَهِيدٌ

আর আল্লাহ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়ামের পুত্র ঈসা, তুমি কি মানুষদেরকে বলেছিলে যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাতাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর?’ সে বলবে, ‘আপনি পবিত্র মহান, যার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার জন্য সম্ভব নয়। যদি আমি তা বলতাম তাহলে অবশ্যই আপনি তা জানতেন। আমার অন্তরে যা আছে তা আপনি জানেন, আর আপনার অন্তরে যা আছে তা আমি জানি না; নিশ্চয় আপনি গায়েবী বিষয়সমূহে সর্বজ্ঞাত’। আমি তাদেরকে কেবল তাই বলেছি, যা আপনি আমাকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আললাহর ইবাদাত কর। আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনি ছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণকারী। আর আপনি সব কিছুর উপর সাক্ষী। সূরা মায়েদা : ১১৬-১১৭

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَہْلَ الْکِتٰبِ لَا تَغْلُوْا فِیْ دِیْنِکُمْ وَلَا تَقُوْلُوْا عَلَی اللّٰہِ اِلَّا الْحَقَّ ؕ  اِنَّمَا الْمَسِیْحُ عِیْسَی ابْنُ مَرْیَمَ رَسُوْلُ اللّٰہِ وَکَلِمَتُہٗ ۚ  اَلْقٰہَاۤ اِلٰی مَرْیَمَ وَرُوْحٌ مِّنْہُ ۫  فَاٰمِنُوْا بِاللّٰہِ وَرُسُلِہٖ ۚ۟  وَلَا تَقُوْلُوْا ثَلٰثَۃٌ ؕ  اِنْتَہُوْا خَیْرًا لَّکُمْ ؕ  اِنَّمَا اللّٰہُ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ ؕ  سُبْحٰنَہٗۤ اَنْ یَّکُوْنَ لَہٗ وَلَدٌ ۘ  لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الْاَرْضِ ؕ  وَکَفٰی بِاللّٰہِ وَکِیْلًا 

হে কিতাবীগণ, তোমরা তোমাদের দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলো না। মারইয়ামের পুত্র মাসীহ ঈসা কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল ও তাঁর কালিমা, যা তিনি প্রেরণ করেছিলেন মারইয়ামের প্রতি এবং তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন এবং বলো না, ‘তিন’। তোমরা বিরত হও, তা তোমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহই কেবল এক ইলাহ, তিনি পবিত্র মহান এ থেকে যে, তাঁর কোন সন্তান হবে। আসমানসূহে যা রয়েছে এবং যা রয়েছে যমীনে, তা আল্লাহরই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। সুরা নিসা : ১৭১

এই দুটি আয়াতের মূল সারকথা হলো, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক বা সন্তান নেই। নবী ঈসা (আ.) একজন সম্মানিত রাসূল ছিলেন, কোনোভাবেই আল্লাহর পুত্র বা ইলাহ নন। ত্রিত্ববাদ এবং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করার এই ধারণা ইসলামের তাওহীদের মূলনীতির পরিপন্থী। কিয়ামতের দিনেও নবী ঈসা (আ.) নিজে এই সত্যের সাক্ষী হবেন।

১১. হাশরের মাঠের অন্যতম আকর্ষন ‘হাউজে কাউসার

ক. কিয়ামতের দিন বিদআতিদের হাউজে কাউসারের পানি পান করতে দেওয়া হবে না

আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি হাউজে কাউসারে থাকব আর দেখব তোমাদের কে কে আসছে। কিন্তু কিছু মানুষকে আমার অনুমতি ব্যতীত নিয়ে যাওয়া হবে। তখন আমি বলব, হে রব! এরা আমার অনুসারী, আমার উম্মতের অংশ। আমাকে বলা হবে, আপনি কি জানেন, আপনার পরে এরা কি কাজ করেছে? আল্লাহর শপথ! তারা পিছনে ফিরে যাবে”। সহিহ বুখারী : ৬৫৯৩,  সহিহ মুসলিম : ২৭।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হাউজে কাউসারে আমার উম্মত সমবেত হবে। আমি অনেক মানুষকে এমনভাবে তাড়িয়ে দেব যেমন একজনের উট অন্য জনের উটের পাল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আমাদের তখন চিনবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যা, তোমাদের এমন কিছু আলামত আছে যা অন্যদের নেই। তোমরা আমার কাছে উপস্থিত হবে আর তোমাদের অজুর স্থানগুলো চকমক করতে থাকবে। তোমাদের একটি দলকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হবে, তারা হাউজের কাছে পৌছতে পারবে না। সে সময় আমি বলব, হে আমার প্রভূ এরা আমার অনুসারী। তখন এক ফিরিশতা উত্তর দিবে, আপনি কি জানেন আপনার পরে তারা কি প্রচলন করেছে? সহিহ মুসলিম : ২৪৭

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ তার উপর অচৈতন্য ভাব চেপে বসল। অতঃপর তিনি মুচকি হেসে মাথা তুললেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাসির কারণ কি? তিনি বললেনঃ এ মাত্র আমার উপর একটি সূরাহ অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি পাঠ করলেন-

بِسْمِ ٱللهِ ٱلرَّحْمَـٰنِ ٱلرَّحِيمِ

إِنَّآ أَعْطَيْنَـٰكَ ٱلْكَوْثَرَ (١) فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنْحَرْ (٢) إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ ٱلْأَبْتَرُ (٣)

পরম করুনাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ নামে শুরু করছি।  নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় কর এবং কুরবানী দাও। তোমার কুৎসা রটনাকারীরাই মূলত শিকড়কাটা, নির্মূল।

অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জান কাওসার কি? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা একটা ঝর্ণা। আমার মহান প্রতিপালক আমাকে তা দেয়ার জন্য ওয়া’দা করেছেন। এর মধ্যে অশেষ কল্যাণ রয়েছে, আমার উম্মতের লোকেরা কিয়ামতের দিন এ হাওযের পানি পান করতে আসবে। এ হাওযে রয়েছে তারকার মত অসংখ্য পানপাত্র।

এক ব্যক্তিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। আমি তখন বলব, প্রভু! সে আমার উম্মতেরই লোক। আমাকে তখন বলা হবে, তুমি জান না, তোমার মৃত্যুর পর এরা কী অভিনব কাজ (বিদ’আত) করেছে। ইবনু হুজরের বর্ণনায় আরো আছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে আমাদের কাছে এসেছেন এবং আল্লাহ বলবেন, এ ব্যক্তি আপনার পরে বিদ’আত চালু করেছে। সহিহ মুসলিম : ৪০০

১২. হাশররের ময়দানে হাউজে কাউসারের পাশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথে নেককারের সাক্ষাত হবে

ইবন যায়েদ ইবন আসেম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আমার পরে তোমরা অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে শাসকদের অগ্রাধিকার দেখতে পাবে। তোমরা তখন ধৈর্য ধারণ করবে হাউজে কাউসারে আমার কাছে সাক্ষাত লাভ পর্যন্ত”। সহিহ বুখারী : ৪৩৩০,  সহিহ মুসলিম : ১৮৪৫।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সা.) -এর নিকটে আবেদন করলাম, কিয়ামতের দিন আপনি অনুগ্রহপূর্বক আমার জন্য বিশেষভাবে শাফা’আত করবেন। তিনি (সা.) বললেন, আচ্ছা আমি তা করব। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে কোথায় অনুসন্ধান করব? তিনি (সা.) বললেন, সর্বপ্রথম তুমি আমাকে পুলসিরাতের উপর অনুসন্ধান করবে। বললাম, যদি আমি আপনাকে পুলসিরাতের সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে মীযানের কাছে খোঁজ করে বললাম, যদি আমি আপনাকে মীযানের কাছেও সাক্ষাৎ না পাই? তিনি (সা.) বললেন, তখন তুমি আমাকে হাওযে কাওসারের কাছে অনুসন্ধান করব। স্মরণ রাখ, আমি এ তিন জায়গা থেকে অনুপস্থিত থাকব না। সুনানে তিরমিযী : ২৪৩৩, মিশকাত : ৫৫৯৫, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ্ : ২৬৩০।

১২. হাশরে কেউ একবার এ পানি পান করবে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না

সাহল ইবনু সাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের কাছে পৌছব। যে ব্যক্তি আমার কাছে পৌছবে, সে তার পানি পান করবে। আর যে একবার পান করবে, সে আর কখনো পিপাসার্ত হবে না। আমার কাছে এমন কিছু লোক আসবে যাদেরকে আমি চিনতে পারব এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। অতঃপর আমার ও তাদের মাঝে আড়াল করে দেয়া হবে। তখন আমি বলব, তারা তো আমার উম্মত। তখন আমাকে বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে তারা যে কি সকল নতুন নতুন মত পথ তৈরি করেছে। তা শুনে আমি বলব, যারা আমার অবর্তমানে আমার দীনকে পরিবর্তন করেছে, তারা দূর হোক (অর্থাৎ এ ধরনের লোক আমার শাফা’আত ও আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। সহীহ বুখারী : ৬৫৮৩, সহিহ মুসলিম : ২২৯৬, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৩৯৪৪, মিশকাত : ৫৫৭১,  সহীহুল জামি : ২৪৬৮, মুসনাদে আহমাদ : ৩৮১২, আবূ ইয়া’লা : ৭৪৭৮, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৯৮৫, শু’আবূল ঈমান : ৩৬০, তবারানী : ১৬৭৩

১৩. হাউজে কাউসার পরিচিত :

ক. হাউজে কাউসারের পানি হবে দুধের চেয়েও সাদা

আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার হাউজের প্রশস্ততা হবে এক মাসের সমান দূরত্ব। তার পানি দুধের চেয়েও সাদা, সুঘ্রান মেশকের চেয়ে উত্তম। আর তার পাত্রগুলো আকাশের নক্ষত্রের মতো। যে তা থেকে পান করবে কখনো পিপাসিত হবে না”। সহিহ বুখারী : ৬৫৭৯, সহিহ মুসলিম : ২২৯২

খ. পানি মিশকের মতো সুগন্ধময়।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (মি’রাজের রাত্রে) জান্নাত ভ্রমণকালে অকস্মাৎ আমি একটি নহরের কাছে উপস্থিত হলাম, যার উভয় পার্শ্বে শূন্যগর্ভ মুক্তার গুম্বুজ সাজানো রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল! এটা কী? তিনি বললেন, এটাই সেই কাওসার যা আপনার প্রভু আপনাকে দান করেছেন। তার পানি মিশকের মতো সুগন্ধময়। মিশকাত : ৫৫৬৬, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৬৪৭৪, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৭২০, আবূ ইয়ালা : ২৮৭৬

গ. পানপাত্রের (গ্লাসের) সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো অগণিত

সাওবান (রাঃ) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: আমার হাওয ’আদান থেকে বালকা’র ’উম্মানের মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাণ হবে। তার পানি দুগ্ধ অপেক্ষা সাদা ও মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং তার পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের মতো অগণিত। যে তা থেকে এক ঢোক পান করবে, সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। উক্ত হাওযের কাছে সর্বপ্রথম ঐ সকল গরীব মুহাজিরীনগণ আসবে, যাদের মাথার চুল অগোছালো, পরনের কাপড়-চোপড় ময়লা, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলাগণকে যাদের সাথে বিবাহ দেয়া হয় না এবং তাদের জন্য (গৃহের) দরজা খোলা হয় না। মিশকাত : ৫৫৯২, সুনানে তিরমিযী : ২৪৪৪, সুনানে ইবনু মাজাহ : ৪৩০৩, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ১০৮২, আহমাদ : ২২৪২১, সহীহুল জামি : ২০৬০, শুআবূল ঈমান : ১০৪৮৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *