ইসলামের দৃষ্টিতে মতবিরোধের কুফল

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামের দৃষ্টিতে মতবিরোধের কুফল

পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ছয়শত কোটি মানুষ বাস করে। তাঁদের মধ্যে জাতিগত, ধর্মগত, বর্ণগত, গোত্রগত, ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, সীমানাগত, বিভক্তি লক্ষ করা যায়। মুসলিমদের মধ্যে জাতিগত, ধর্মগত, বর্ণগত, গোত্রগত, ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, সীমানাগত, বিভক্তি না থাকলেও আজ তারাও শত শত দলে বিভক্ত হয়ে আছে। এ বিভক্তির কারণে সঠিক ইসলামকে টিকিয়ে রাখাই দুষ্কর হয়ে দাড়িয়েছে। নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে নিজেরাই নানা প্রকার দু:খ-কষ্ট, বালা-মুসিবতে মধ্যে কালাতিপাত করছে। এমনি ভয়াবহ যুদ্ধের মত ফেতনায় জর্জরিত। যার প্রকৃত উদাহরণ হল ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলিমগণ শিয়া, খারিজী, মুতাজিলা, জাহমী, কাদারী, জাবরিয়াসহ অনেক ফিরকায় বিভক্ত হয়ে যায়। আজও তারা বিভিন্ন নামে বিভক্ত। এক বাংলাদেশেই হাজারের অধিক ফির্কা বা দলেন সন্ধান পাওয়া যাবে। পৃথিবীতে বর্তমানে যে দেড়শত কোটি মুসলিম বাস করে। আধুনিক কালের ফির্কা সমূহের পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আজ মুসলিম বিশ্ব দুটি ধারায় বিভক্ত। তাদের একটি হল শিয়া আর অপরটি হল সুন্নি। উভয়ই ধারাই ইসলামের মূল ধারা হিসেবে দাবি করে থাকে। অথচ শিয়াদের সাথে ইসলামের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তাদের আকিদা বিশ্বাস ইসলাম থেকে যোজন বিয়োজন দুরে। ইসলামের শুরু থেকে অদ্যাবধি মক্কা মদিনায় ইসলামের মূলধারা বিদ্যমান আছে। সুদূর পারস্যে (বর্তমান ইরান) ইসলামের নামে কি হচ্ছে, কি আকিদা পোষণ করছে, কি ইবাদত তৈরি করছে, কি অনুষ্ঠান পালন করছে? তা জানলে আপনার ঘৃণাই প্রকাশ পাবে। তাদের আকিদা বিশ্বাস জানলে আপনি কখন তাদের মুসলিম ভাবতে পারবেন না।  অন্যান্য ধর্মমতের মত তাদের মতকে শীয়া মতবাদ বলা হয় যা ইসলাম থেকে বহু দুরে। তবে সমস্যা হয় তাদের শীয়া মতবাদের সকল কাজগুলি ইসলাম বলে চালিয়ে দেয়, তখন তো ইসলামে আত্ম মর্যাদার জন্য অবশ্যই হানিকর। শিয়ারা যে বাতিল ফির্কা তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু আমরা যারা সুন্নি দাবি করি তারাও আজ শত শত দলে বিভক্ত। সবাই আজ নিজেদের “”আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআহ” (أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআহ” এর অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করছি। কিন্তু কে সত্যিকারের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআহ” এর দলভুক্ত? সুন্নিদের সকল ফির্কার অনুসারীগণ নিজেদের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআহ” এর সঠিক অনুসারী দাবি কারে থাকে তার কারণ একটি হাদিসে এসেছে।

মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে দণ্ডায়মান হলেন, অতঃপর বললেন-

أَلَا إِنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ افْتَرَقُوا عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَإِنَّ هَذِهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ وَهِيَ الْجَمَاعَةُ.

জেনে রেখো! তোমাদের পূর্ব যুগের আহলে কিতাবগণ বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এই উম্মত অচিরেই তেহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। তন্মধ্যে বাহাত্তর দলই জাহান্নামে যাবে, আর একটি মাত্র দল যাবে জান্নাতে, সে দলটি হল জামআত।  সহিহ তারগিব ওয়াত তাহরিব : ৫১ হাদিসের মান সহিহ, সহিহাহ : ৪০৪-৪১৪

আরেকটি হাদিসে এসেছে-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ‏ “‏ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي مَا أَتَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ حَتَّى إِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ أَتَى أُمَّهُ عَلاَنِيَةً لَكَانَ فِي أُمَّتِي مَنْ يَصْنَعُ ذَلِكَ وَإِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلاَّ مِلَّةً وَاحِدَةً قَالُوا وَمَنْ هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ مُفَسَّرٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ لاَ نَعْرِفُهُ مِثْلَ هَذَا إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ ‏.‏

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উম্মতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামি হবে। সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেন, আমি ও আমার সাহাবিগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১, মিশকাত : ১৭১, সহীহাহ : ১৩৪৮

প্রথম হাদিসে একমাত্র দলের নাম উল্লেখ করে জামআত বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয় হাদিসের ভাষ্য মতে রাসূলুল্লাহ ﷺ  বলেন, একমাত্র আমি এবং আমার সাহাবিদের মতের অনুসারী দল। তাই এই উম্মতের সুন্নি মুসলিমগণ সে জামআত এর নাম দিয়েছেন- ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত”। অর্থাৎ যে যত বেশী রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তার সাহাবিদের (রা.) অনুসরণ করবে সে তত বেশী “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর অনুসারী হবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন, যে যত বেশী বিদআত চালু করছে এবং সাহাবিদের (রা,) আমলের বিরোধিতা করছে, সে তত বেশী “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর অনুসারী দাবি করছে। আবার কেউ তো দলের নাম রেখেছেন “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত”। আসলে “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” কোন দলেন নাম নয়, এটা হল এক দল মুসলিমদের উপাধি যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একনিষ্ঠ অনুসীরি এবং তাদের অনুসরণের মানদণ্ড হল সাহাবিগণ। যারা সত্যিকার অর্থেই “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত”। বর্তমানে তারাও বহু নামে বিভক্ত। বর্তমানে বিশ্বের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর বিভক্তির খতিয়ান বেশ লম্বা। শুধু ভারত উপমহাদেশের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” দাবিদার মুসলিমগণ বহু ফির্কায় বিভক্ত। উপমহাদেশের শিয়া ও তাদের শাখাসমূহ ব্যতীত, যারা “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” দাবিদার তারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ফির্কায় বিভক্ত। কোন কোন গবেষক এই ফির্কার সংখ্যা লক্ষাধিক বলেছেন।

এই সকল ফির্কার উৎপত্তি, আকিদা, আলম এবং তাদের অনুসারী সম্পর্ক জানতে পারলে, আপনি অনায়াসে বুঝে যাবেন “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআত” এর সাথে তাদের কার কত টুকু সম্পর্ক আছে।

অপর পক্ষে মাজহাব অনুসারে হানাফি মাজহাব, শাফিঈ মাজহাব, মালেকি  হাবহাব এবং  হাম্বলি  মাজহাব নামে চারটি ভাগে বিভক্ত। আবার তরিকার নামের আজ আমরা বিভক্ত। অনুসন্ধানে জানা যায় এই মাযহাবের বিভাজন সম্পর্কে মাযহাবের ইমামগণ কিছুই জানেন না। তরিকার ব্যাপারটি প্রায় একই ধরনের। অধিকাংশ তরিকা প্রতিষ্ঠাতা হয়েছে তাদের মৃত্যুর পর। প্রাথমিক যুগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন দশায়  ইসলাম ধর্মের মাঝে কোনো বিভক্তি ছিল না। ইসলাম বিস্তারের সাথে সাথে (আরব বাদে) বিভিন্ন স্থানের মানুষ ইসলামকে বিভিন্নভাবে বুঝতে থাকে এবং বিভিন্ন আকিদা প্রষোণ করতে থাকে। আকিদার ভিন্নতার দরুন তাদের আমল আখলাকে ও ভিন্নতার ছাপ লক্ষ করা যায়। আস্তে আস্তে মুসলিমদের মাঝে মত পার্থক্যও প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। এমনিভাবে ইসলাম ভেঙ্গে হাজার হাজার ধর্মের উদ্ভব ঘটে। রাত দিন শত শত তরিকার কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাফালা হলেও তাদের মাঝে ছয়টি সুফিবাদি তারিকা বেশ প্রসিদ্ধ।

প্রসিদ্ধ এই তরিকাগুলো হল-

ক.  কাদেরিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা আবদুল কাদির জিলানি ৫৬১ হি.)

খ.  চিশতিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি ৬৩৩ হি.)

গ. মাইজভান্ডারিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ১৯০৬ খৃ.)

ঘ. নকশবন্দিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী ৭৯১ হি.)

ঙ. মুজাদ্দিদিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠিত নকশবন্দী মুজাদ্দিদ-ই-আলফে সানি ১০০৭ হি.) এবং

চ. সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকা (প্রতিষ্ঠাতা শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ৬৮১ হি.)।

এমনি ভাবে তরিকার নামেও শত শত ফির্কার উদ্ভব ঘটেছে। এক এক জন ব্যক্তির আন্দাস এবং অনুমানের উপর ভর করে সৃষ্টি হয়েছে এই সকল তরিকা। এদের আমল ও আকিদা ইসলাম থেকে বহু দুরে। 

ইসলামে কি এই ধরনের ফির্কা সৃষ্টির অনুমতি আছে?

ইসলামে ধর্মের মাঝে এমনিভাবে তরিকার নামে, মাযহাবের নামে, ব্যক্তির নামে, গোষ্ঠীর নামে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামে ধর্মের মাঝে এই ধরনের ফির্কা সৃষ্টির ন্যূনতম স্থান বা অনুমতি নেই। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায় ইসলামে বিভক্তি, ফির্কাবাজি বা দলাদলি করা সম্পূর্ণ হারাম। তার পরও ফির্কাবাজি বা দলাদলি চলছে। হাজার হাজার নজর কাড়া, মন ভুলান নামে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ফির্কা। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ লোকগুলি ফির্কার যাতা কলে পড়ে বিদআতি এবং শির্ক মিশ্রিত আমল করে ইমান হারাচ্ছে। অথচ ইসলামে ফির্কাবাজি বা দলাদলির কোনো সুযোগ নেই। আমাদের নবি মুহাম্মাদ ﷺ এর মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের যে সত্য দ্বীনে দান করেছে তার মাঝে ঐক্য বিনষ্ট করতে তিনি (আল্লাহ) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। নবি মুহাম্মাদ ﷺ বিভিন্ন হাদিসেও ঐক্য বিনষ্ট করতে নিষেধ করা হয়েছে। হাদিসের গ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করলে বিভক্তির খারাপ দিকগুলি ফুটে উঠার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনেক ভবিষ্যৎ বাণী পাওয়া যাবে, যেখানে তিনি উম্মতের মাঝে ব্যাপক মতবিরোধের কথা উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ মতবিরোধ হবে বলে উল্লেখ করেছেন মাত্র, তিনি মতবিরোধ করতে বলেননি। তিনি শুধু উম্মতকে সতর্ক করা জন্য বলেছেন যে, আমার পরবর্তী কালে তোমাদের মাঝে মতবিরোধ হবে কিন্তু যারা এই বিরোধ থেকে মুক্ত থাকবে তারাই সফলকাম। এই মতবিরোধ থেকে বেচে সফলকাম হতে হলে কি কাজ করে হবে তারও বিস্তারিত বিবরণ তিনি বলেছেন। এমনই একটি উপদেশ মুলক হাদিস উল্লেখ করছি।

ইরবাজ ইবনু সারিয়া (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নসিহত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু বর্ষণ করলো। তাকে বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন। তিনি ﷺ বলেন-

عَلَيْكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا وَسَتَرَوْنَ مِنْ بَعْدِي اخْتِلاَفًا شَدِيدًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَالأُمُورَ الْمُحْدَثَاتِ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ

তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, হাফসি গোলাম আমির হলেও তার কথা শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্মক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২, সুনান তিরমিজি : ২৬৭৬, সুনানে আবূ দাঊদ ৪৬০৭, আহমাদ : ১৬৬৯২, দারিমী : ৯৫

এই হাদিসে উম্মতের দলাদলি বা ফির্কাবাজী করার ইঙ্গিত পাই। তিনি বিভিন্ন দলে ভাগ হবে বলেছেন কিন্তু ভাগ হতে বলেন নি। উম্মতের অনৈক্য সৃষ্টি করে ফির্কা তৈরি করার সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আলোকে আলোচন করব। কুরআন ও হাদিসে ফির্কা সৃষ্টির অপকার এবং শাস্তি সম্পর্কে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। আবার যারা ফির্কা সৃষ্টি না করে মিলেমিশে থাকবে, তাদের জন্য মহান আল্লাহ ইহকাল ও পরকালের পুরস্কারের কথা উল্লেখ আছে। মহান আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক বাণী জানতে পারলে খুব সহজেই ফির্কাবাজি বা দলাদলির কুফল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারব। কুরআন সুন্নাহ আলোকে ফির্তবাজির কুফলগুলো উল্লেখ করা হল।

ফির্কাবাজি বা দলাদলির ফলে কুফল-

১। মতবিরোধ করে দ্বীনে বিভক্তির সৃষ্টিকারীদের হত্যার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে

এই সম্পর্কে প্রথমেই সুনানে নাসায়ি এ বর্ণিন একটি হাদিস লক্ষ করুন-

أَخْبَرَنِي أَحْمَدُ بْنُ يَحْيَى الصُّوفِيُّ قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ قَالَ: حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ مَرْدَانِبَةَ، عَنْ زِيَادِ بْنِ عِلَاقَةَ، عَنْ عَرْفَجَةَ بْنِ شُرَيْحٍ الْأَشْجَعِيِّ قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمِنْبَرِ يَخْطُبُ النَّاسَ، فَقَالَ: «إِنَّهُ سَيَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ، فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ، أَوْ يُرِيدُ يُفَرِّقُ أَمْرَ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَائِنًا مَنْ كَانَ فَاقْتُلُوهُ، فَإِنَّ يَدَ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ يَرْكُضُ»

আরফাজা ইবন শুরায়াহ আশজাই (রা.) হতে বর্ণিত, আমি নবি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে মিম্বরের উপর লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে দেখেছি। তিনি বলছিলেন, আমার পরে অনেক ফিতনা দেখা দেবে, এসময় তোমরা যাকে দেখবে মুসলমানদের দল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, অথবা উম্মতে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইছে; সে যে-ই হোক না কেন, তাকে হত্যা করবে। কেননা আল্লাহ্ তা’আলার রহমতের হাত মুসলমানদের দলের উপর থাকবে। আর যে ব্যক্তি জামা’আত থেকে পৃথক হয়ে যায়, শয়তান তার সাথি হয় এবং তাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেয়। সুনানে নাসায়ি : ৪০২০, সহিহুল জামে : ৩৬২১

আরফাযা ইবন রায়হ্ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّهَا سَتَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَرَفَعَ يَدَيْهِ فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ يُرِيدُ تَفْرِيقَ أَمْرِ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُمْ جَمِيعٌ فَاقْتُلُوهُ كَائِنًا مَنْ كَانَ مِنْ النَّاسِ

আমার পরে নিশ্চয়ই অনেক ফিতনা-ফাসাদ হবে। এরপর তিনি তাঁর হাত উঠিয়ে বললেন, তখন তোমরা যাকে দেখবে, উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ইচ্ছা করছে, অথচ তারা একতাবদ্ধ; তখন তোমরা তাকে হত্যা করবে, সে যে-ই হোক না কেন। সুনানে নাসায়ি : ৪০২১, সহিহুল জামে : ৩৬২২

মহান আল্লাহ বলে,

إِنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُواْ أَوْ يُصَلَّبُواْ أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْاْ مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অর্থ : যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। সুরা মায়েদ : ৩৩

সুরা মায়েদার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সুনানে নাসায়ির ৪০২৩ নম্বর হাদিসের বলা হয়-

أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ قُدَامَةَ قَالَ: حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ زَيْدِ بْنِ عَطَاءِ بْنِ السَّائِبِ، عَنْ زِيَادِ بْنِ عِلَاقَةَ، عَنْ أُسَامَةَ بْنِ شَرِيكٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَيُّمَا رَجُلٍ خَرَجَ يُفَرِّقُ بَيْنَ أُمَّتِي، فَاضْرِبُوا عُنُقَهُ»

উসামা ইবন শরীক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার উম্মতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির তৎপরতা চালাবে, তার গর্দান উড়িয়ে দাও। সুনানে নাসায়ি : ৪৬২৩

২। মতবিরোধ করে ফির্কা সৃষ্টিকারীদের থেকে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দায় মুক্তি :

নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনের উদ্দেশ্যই হল মানুষ জাতির হিদায়দের পথ প্রদর্শন করা। কিন্তু মানুষ জাতি যখন মুশরিকদের স্বভাব ধারণ করে ইসলামি দ্বীনের মাঝে  ফাটল ধরিয়ে টুকরা টুকরা করবে তখন মহান আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দ্বীনে বিভক্তি সৃষ্টিকারীদের থেকে দূরে রাখবেন। অর্থাৎ যারা দ্বীনে অনৈক্য সৃষ্টি করবে মহান আল্লাহ তাদের দায়িত্ব থেকে তার নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মুক্ত ঘোষণা করছেন।

 আল্লাহ সুবহানাহু বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অর্থঃ যারা নিজেদের দিনকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে নিঃসন্দেহে তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই৷  তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ন্যস্ত রয়েছে৷ তারা কি করেছে, সে কথা তিনিই তাদেরকে জানাবেন৷  সূরা আন‘আম : ১৫৯

এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ফার্রাকু (فَرَّقُوا) শব্দটির ব্যবহার করেছেন যার অনুবাদ করা হয়েছে, ধর্মের নামে বিভক্ত করা। দ্বীনকে বিভক্ত করলে তার দায় থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বাধীন হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে ভীষণ বিপদের সময় মহান আল্লাহর অনুমতি ক্রমে তার প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষদের সাফায়েত করে জান্নাত প্রদানের জন্য মহান আল্লাহর নিকট অনুরোধ করবেন। মহান আল্লাহরও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুপারিশে হাজার হাজার পাপী মানুষকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবেন। কিন্তু যারা দ্বীন মাঝে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করবে তাদের দায়িত্ব বা সুপারিশ থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দায় মুক্ত থাকবেন। মহান আল্লাহর এহেন সতর্কবার্তা সত্ত্বেও মুসলমানগণ আজ ধর্মের নামে, নেতার নামে, দলেন নামে, পীরের নামে, মাযহাবের নামে, তরিকার নামে, কুরআনের নামে হাদিসের নামে বিভক্ত হচ্ছে।

৩।  দ্বীনে নিয়ে বিরোধে লিপ্ত হলে কঠিন শাস্তির ঘোষণা :

মহান আল্লাহ দ্বীনের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করছেন এবং তিনি এর জন্য শাস্তির ও ঘোষণা করছেন। ইসলাম ধর্মের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি করা হারাম ও কবিরা গুনাহর কাজ।  মহান আল্লাহ বলেন-

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

এবং তাদের মতো হয়োনা যাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে ও পরস্পর মতভেদে লিপ্ত রয়েছে; তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। সূরা আল-ইমরান : ১০৫

এই আয়াতে মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী নবিদের উম্মাতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, তারা সঠিক দ্বীন পেয়েছিল কিন্তু তারা সঠিক দীনের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি করছিল। তাদের নিকট মহান আল্লাহর নিকট থেকে সত্য, সঠিক, সরল ও সুস্পষ্ট  ধর্ম এসেছিল তারা তা থেকে শিক্ষাও লাভ করেছিল। কিন্তু কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর দীনের মূল বিষয়গুলো পরিত্যাগ করে দীনের সাথে সম্পর্কবিহীন গৌণ ও অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি বিষয়াবলির ভিত্তিতে নিজেদেরকে একটি আলাদা ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলতে শুরু করে দিয়েছিল। তারপর অবান্তর ও আজেবাজে কথা নিয়ে এমনভাবে কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে, আল্লাহ তাদের ওপর যে দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন তার কথাই তারা ভুলে গিয়েছিল এবং বিশ্বাস ও নৈতিকতার যে-সব মূলনীতির ওপর আসলে মানুষের সাফল্য ও কল্যাণের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, তার প্রতি কোন আগ্রহই তাদের ছিল না। এই সকল লোকদেরকে মহান আল্লাহর আজাব ভোগ করতে হবে।

৪। মতবিরোধ করা একটি পার্থিব আজাব

সে সকল মানুষ সত্য দ্বীন থেকে বিমুখ, তারাই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যাবে আর নিজেদের মাঝে মারামারি, খুনাখুনি ও ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হবে। আমরা জানি ভূমিকম্প, বন্যা, জলোচ্ছাস, সুনামি, ঝরঝঞ্চা, মহামারি ইত্যাদি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠান ইহকালের আজাব। একটি মাত্র ঝট্‌কা তোমাদের সমগ্র জনপদকে ধূলিস্মাত করে দেবার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মহান আল্লাহ আনিত দ্বীনকে অস্বীকার করলে ইহকালে মহান আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে একদল দিয়ে অন্য দলকে শাস্তি দিবেন। তার শান্তি এমন যে, মানুষ বিভিন্ন নিজেদের মধ্যে এমন শত্রুতা জন্ম দিবে যার ফলে বছরের পর বছর ধরে রক্তপাত, বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব হবে না। যখন দেখবে দেশে দেশে, গোত্রে গোত্রে, জাতিতে জাতিতে, মুসলিম মুসলিমে, ভাই ভাইয়ে বিবাদে লিপ্ত তখন বুঝবে এটা মহান আল্লাহ কর্তৃক পাঠান আজাব। মহান আল্লাহ বলেন,

قُلْ هُوَ الْقَادِرُ عَلَى أَن يَبْعَثَ عَلَيْكُمْ عَذَابًا مِّن فَوْقِكُمْ أَوْ مِن تَحْتِ أَرْجُلِكُمْ أَوْ يَلْبِسَكُمْ شِيَعاً وَيُذِيقَ بَعْضَكُم بَأْسَ بَعْضٍ انظُرْ كَيْفَ نُصَرِّفُ الآيَاتِ لَعَلَّهُمْ يَفْقَهُونَ

অর্থঃ বলুন, তিনিই শক্তিমান যিনি তোমাদের উপর কোন শাস্তি উপর দিক থেকে অথবা তোমাদের পদতল থেকে প্রেরণ করবেন অথবা তোমাদেরকে দলে-উপদলে বিভক্ত করে সবাইকে মুখোমুখি করে দিবেন এবং এককে অন্যের উপর আক্রমণের স্বাদ আস্বাদন করাবেন। দেখ, আমি কেমন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিদর্শনাবলি বর্ণনা করি যাতে তারা বুঝে নেয়। সুরা আনয়াম : ৬৫ 

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, ইসলামের মাঝে আজ যে আমরা দলাদলি দেখতে পাচ্ছি তা আমাদের প্রতি মহান আল্লাহ পক্ষ থেকে পাঠান আজাব মাত্র। এই আজাব থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হল কুরআন সুন্নাহর আলোকে তাওহীদের ভিত্তিতে সকলকে এক হয়ে যাওয়া।

এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস-

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ فَقَالَ الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ

নুমান বিন বাশীর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় বলেছেন, জামায়াত (ঐক্য) হল রহমত এবং বিচ্ছিন্নতা (মতবিরোধ) হল আজাব। হাদিস সম্ভার : ১৮৪৪, সহিহুল জামে : ৩১০৯, কিতাবুস সুন্নাহ, শায়বানী : ৮৯৫

৫। মুশরিকদের স্বভাব অর্জন করা

কুরআনুল মাজিদে মহান আল্লাহ মুশরিকদের অনেক শিরকই কাজের পাশাপাশি ধর্মের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে ধর্মকে টুকরা টুকরা করার মত স্বভাবটিও উল্লেখ করেছেন। ধর্মের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করা নিঃসন্দেহে একটি মন্দ কাজ। মতবিরোধ বা বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্ম টুকরা টুকরা হয়ে যায়। মহান আল্লাহর দ্বীনকে টুকরা টুকরা মুশরিকি স্বভাব হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিন ইরশাদ করেন-

وَلَا تَكُونُواْ مِنَ ٱلۡمُشۡرِڪِينَ.  مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَڪَانُواْ شِيَعً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ

অর্থঃ তোমরা ঐ মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা দ্বীনকে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে এবং যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দল তাদের কাছে যা ছিল তাই নিয়েই খুশি। সূরা রুম : ৩১-৩২

এই আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা মুশরিকগণ তাদের দ্বীনে বিভক্তি সুষ্টি করছ। মুশরিকদের বিভক্তির কারণ হল, তাদের নিকট সঠিক তাওহীদের জ্ঞান ছিল না। দুনিয়ায় যতগুলো ধর্ম পাওয়া যায়, তার সবগুলোরই উৎপত্তি হয়েছে আসল বা ঐশী দ্বীনের বিকৃতি সাধনের মাধ্যমে। এ বিকৃতি আসার কারণ হল, বিভিন্ন ব্যক্তি প্রাকৃতিক সত্যের ওপর নিজেদের নতুন নতুন কথা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের জন্য এক একটি আলাদা ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে। মুশরিকদের মত আজ মুসলিমগণও ধর্মের মাঝে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি করছে এবং তারা তাদের ভ্রান্ত মতবাদ নিয়েই সন্তুষ্টও বটে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ আরও বলেন,

 وَإِنَّ هَـٰذِهِۦۤ أُمَّتُكُمۡ أُمَّةً۬ وَٲحِدَةً۬ وَأَنَا۟ رَبُّڪُمۡ فَٱتَّقُونِ (٥٢) فَتَقَطَّعُوٓاْ أَمۡرَهُم بَيۡنَہُمۡ زُبُرً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٥٣) فَذَرۡهُمۡ فِى غَمۡرَتِهِمۡ حَتَّىٰ حِينٍ (٥٤)

অর্থঃ তোমাদের এই দীন তো একই দীন। আর আমি তোমাদের রব, অতএব তোমরা আমাকে ভয় কর। তারপর লোকেরা তাদের মাঝে তাদের দ্বীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে। প্রত্যেক দলই তাদের কাছে যা আছে তা নিয়ে উৎফুল্ল। সুতরাং কিছুকালের জন্য তাদেরকে স্বীয় বিভ্রান্তিতে থাকতে দাও। সুরা মুমিনুন : ৫২-৫৪

সকল যুগে সমগ্র মানব জাতি একই দল ও একই মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের কার্যকলাপ তাদের মধ্য বিভেদের সৃষ্টি করছে। তারা আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে চলত এবং নিজেদের মাঝে ফির্কার সৃষ্টি করে ফির্কা বন্দী জিবন যাপন করতে। পূর্বে দুনিয়ায় যত নবি রাসূল এসেছিল তারা সবাই একই দীন ও জীবন বিধান নিয়ে এসেছেন। তাদের সকলের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তারা সকলে কেবলমাত্র এক ও একক আল্লাহ দিতে মানুষকে আহ্বান করতেন। সকল নবি একই ধর্ম নিয়ে এসেছে তাদের সকলের ধর্ম ছিল ইসলাম। অথচ মুশরিকগণ তাদের কার্যকলাপ বা স্বভাব দ্বারা দ্বীনে বিভক্তি সৃষ্টি করে ছিল। এই মর্ম মহান আল্লাহ বলেন-

*وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ كُلٌّ إِلَيْنَا رَاجِعُونَ* إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ

অর্থঃ তারা সকলেই তোমাদের ধর্মের। একই ধর্মে তো বিশ্বাসী সবাই এবং আমিই তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমার বন্দেগি কর। এবং মানুষ তাদের কার্যকলাপ দ্বারা পারস্পরিক বিষয়ে ভেদ সৃষ্টি করেছে। প্রত্যেকেই আমার কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।  সুরা আম্বিয়া : ৯২-৯৩

৬। পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ ও হিংসা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছ

আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ، فَإِنَّ الظَّنَّ أَكْذَبُ الْحَدِيثِ، وَلاَ تَحَسَّسُوا، وَلاَ تَجَسَّسُوا، وَلاَ تَنَاجَشُوا، وَلاَ تَحَاسَدُوا، وَلاَ تَبَاغَضُوا، وَلاَ تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا ‏”‏‏.‏

তোমরা অনুমান থেকে বেঁচে চলো। কারণ অনুমান বড় মিথ্যা ব্যাপার। আর কারো দোষ খুঁজে বেড়িও না, গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পরকে ধোঁকা দিও না, আর পরস্পরকে হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না এবং পরস্পরের বিরুদ্ধাচরণ করো না। বরং সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬৬

আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ تَبَاغَضُوا، وَلاَ تَحَاسَدُوا، وَلاَ تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا، وَلاَ يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ ‏

তোমরা পরস্পর বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের বিরুদ্ধাচরণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। কোনো মুসলিমের জন্য তিন দিনের অধিক তার ভাইকে ত্যাগ করে থাকা বৈধ নয়। সহিহ বুখারি : ৬০৬৫, ৬০৭৬,সহিহ মুসলিম  : ২৫৫৯

ফির্কাবাজি বা দলাদলি পরিত্যাগ করার সুফল

১। ফির্কাবাজি পরিত্যাগ করলে সকলের মাঝে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দিবেন।

২। দ্বীনের মাঝে দলাদলি সৃষ্টি না করা সকল নবীর সুন্নত।

১। মতবিরোধ পরিত্যাগ করলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে আল্লাহ সকলের মাঝে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দিবেন-

মতবিরোধ পরিত্যাগ করলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে মহান আল্লাহ পরস্পরের মাঝে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দেন। ইসলামের আগমেনর পূর্বে আরববাসীরা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা, কথায় কথায় ঝগড়া বিবাদ এবং রাতদিন মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহের লেগেই থাকত। কোন কোন মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ তো বছরের পর বছর ধনে চলত। এমন কি মৃত্যুর সময় সন্তানকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অসিয়ত করে যেত। আওস ও খাযরাজ দু’টি গোত্রে বছরের পর বছর যুদ্ধ করেছিল। তারা ছিল পরস্পরের রক্ত পিপাসু। তাদের এই যুদ্ধ-বিগ্রহ তাদের কে ধ্বংসের কবলে নিক্ষিপ্ত করছিল। তাদের এই মর্মান্তিক অবস্থা এক মাত্র কারণ ছিল অনৈক্য বা নিজের মাঝে মতবিরোধ। এই চরম অবস্থা থেকে তাদের উদ্ধার করে ছিল ইসলাম। তাদের মধ্যে থেকে যারাই ইসলাম গ্রহণ করেছিল, মহান আল্লাহ তাদের সকলের আন্তরে মিল মহব্বত ঢেলে দিয়েছিল। যার ফলে তারা একে অপরের ভাই বা বন্ধু হয়ে যায়। ইসলামের বদৌলতে তারা পরস্পরের মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মহান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেন, যদি আদম সন্তান তার রজ্জুকে দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধভাবে তার দ্বীন ধারণ করে তবে তিনি তাদের মধ্যে শত্রুতার পরিবর্তে মিল মহব্বত সৃষ্টি করে দিবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا

অর্থঃ “তোমরা আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর ঐক্যবদ্ধভাবে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তে ছিলে, আল্লাহ্ তা থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করেছেন। সুরা আল-ইমরান : ১০৩

ইসলাম কে  আল্লাহর একটি রজ্জু সাথে তুলনা করেছেন। মহান আল্লাহ তাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ প্রদান করছেন। আল্লাহর রজ্জু বলতে তাঁর দ্বীনকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহর দ্বীনকে রজ্জুর সাথে তুলনা করার কারণ হয়েছে। ইসলামি দ্বীনের প্রতি ইমান আনার সাথে সাথে তাদের মাঝে একটি ঈমানি শক্তির সৃষ্টি হয়।

এই সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْجَمَاعَةَ وَيَكْرَهُ الْفُرْقَةَ.” عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ

আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, নবি করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ঐক্যকে পছন্দ করেন এবং বিভেদকে অপছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ : ২১৭২১

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমর (রা.) আমাদের সামনে খুতবাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন, হে উপস্থিত জনতা! যেভাবে আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়াতেন, সেভাবে তোমাদের মাঝে আমিও দাঁড়িয়েছি। তারপর তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আমার সাহাবিদের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (তাদের যমানা শ্রেষ্ঠ যমানা), তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর মিথ্যাচারের বিস্তার ঘটবে। এমনকি কাউকে শপথ করতে না বলা হলেও সে শপথ করবে, আর সাক্ষ্য প্রদান করতে না বলা হলেও সাক্ষ্য প্রদান করবে।

সাবধান! কোন পুরুষ কোনো মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি :২১৬৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ২৩৬৩

২। দ্বীনের মাঝে দলাদলি সৃষ্টি না করা সকল নবীর সুন্নত-

পৃথিবীতে যত নবি রসূলই আগমন করেছেন তাঁরা সবাই একই দ্বীন নিয়ে এসেছেন। তাদেরকে দ্বীন কায়েম করা পাশাপাশি দ্বীনে বিভেদ বা দালালি সৃষ্টি না করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

অর্থঃ তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে আর যা আমি ওহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করো না।” (সূরা শুরা ৪১:১৩)।

এই আয়াতে মহান আল্লাহ তার শ্রেষ্ঠ পাঁচ জন নবি আলাইহিস সালামের কথা উল্লেখ করে বলেছেন যে, আমি তাদের সকলকে এক ও অভিন্ন দ্বীন দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছি। শুধু তাই নয় পৃথিবীতে যত নবী-রসূলই আগমন করেছেন তাঁরা সবাই একই দ্বীন নিয়ে এসেছেন। নমুনা হিসেবে এমন পাঁচজন মহান নবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যাঁদের মাধ্যমে দুনিয়ার মানুষ সুবিখ্যাত আসমানি শরীয়তসমূহ লাভ করেছে। এই আয়াতে আলোকে বুঝা যায় মহান আল্লাহ তাদের দুটি নির্দেশ প্রদান করেছেন। এক. দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা। দুই. দ্বীনে মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে পরস্পর ভিন্ন না হয়। সকল নবিদের কাজই ছিল মহান আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন কায়েম করা। আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, দ্বীনে বিভেদের সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে।

দ্বীনে বিভেদ পরিহার করা সকল নবিদের সুন্নত। সকল নবীকে মহান আল্লাহ এ বিষয়টি পরিহার করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। পূর্ববর্তী উম্মাতগুলোর মতভেদ ও বিভক্তি প্রসঙ্গে কুরআন কারিমে বারবারই বলা হয়েছে যে, জ্ঞানের আগমনের পরেও তারা বাড়াবাড়ি করে বিভক্ত হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

وَمَا تَفَرَّقُوا إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ

অর্থ: তাদের নিকট ইলম আগমনের পরে পারস্পরিক বাড়াবাড়ি করেই শুধু তারা দলাদলি করেছে।” সূরা শূরা : ১৪

উম্মতের মতবিরোধের প্রধান দশটি কারণ : প্রথম পর্ব (১-২)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

উম্মতের মতবিরোধ এই উম্মতের একটা রড় ক্ষতির কারণ। আলোচনার শুরুতেই খুঁজে বের করার চেষ্টা থাকবে মতবিরোধের মূল কারণসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করা। একজন ডাক্তার প্রথমত রোগীর রোগ নির্ণয় করে, তার পরই তার রোগের জন্য সঠিক ঔষধ প্রদান করেন। কাজেই এই গ্রন্থের প্রধান লক্ষ হল মতবিরোধ সৃষ্টির কারণ জেনে তার প্রতিকার করার প্রয়োজনীয় উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা। মতবিরোধের কারণ, প্রতিকার সম্পর্কে নিরপেক্ষ জ্ঞান অর্জন করতে পারলে বা এই সম্পর্কে আসল সত্য চোখের সমানে প্রকাশিত হলে সরল ও সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া সহজ হবে।

সাধারণত মতভেদ থেকে শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন ফির্কা বা দলের, যারা মূল ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করে। আর এই বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া কে বলা হয় ইফতিরাক। কিন্তু আকিদা হোক বা ফিকহি মাসলা মাসায়েল হোক উভয় ক্ষেত্রে ইফতিরাক বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া ইসলামি শরিয়তে একটি হারাম কাজ। যেহেতু, ইখতিলাফ বা মতভেদ হল ইফতিরাক বা বিভক্তির অন্যতম কারণ। তাই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ইখতিলাফ বা মতভেদ একটি মানবীয় প্রকৃতি। কখনোই দুজন মানুষ  শতভাগ একমত প্রকাশ করতে পারেন না। এই জন্যই ইসলামে পরামর্শের বিধান রাখা হইয়াছে। ইখতিলাফ বা মতভেদ করা জায়েয। কিন্তু ইফতিরাক বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া সকল অবস্থায়ই হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

অর্থাৎ : আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।  (সূরা আল ইমরান ৩: ১০৩)।

সমাজে আমরা প্রায়ই সর্বত্রই মতভেদ দেখতে পাই। সকল মতভেদ খারাপ নয়। মতভেদ যখন শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি বা দলাদলি সৃষ্টি করে না তখন তা খারাপ নয়। সাহাবিগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মার ইমাম ও আলিমদের মধ্যে ‘মতভেদ’ বা ইখতিলাফ ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা বা ইফতিরাক ছিল না। ইখতিলাফকারী আলিম নিন্দিত নন, বরং তিনি ইখলাস ও ইজতিহাদের ভিত্তিতে প্রশংসিত ও পুরস্কার-প্রাপ্ত। মুজতাহিদ ভুল করলে একটি পুরস্কার ও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে দুটি পুরস্কার লাভ করেন।

মতভেদ যখন শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি বা দলাদলি সৃষ্টি করে তখন তা চূড়ান্তভাবে নিন্দনীয়। এরও কারণ আছে মানুষ যখন নিজের মতামত কে নির্ভুল জ্ঞান করে আর অন্যদের ভ্রান্ত ভাবে তখনই শুরু হয় বিরোধ। বিরোধ থেকে শুরু হয় বিভক্তি বা দলাদলি। তাই যে মতভেদ বিভক্তি বা দলাদলির সৃষ্টি করে তা পরিহার করা সকলের কর্তব্য। এ লক্ষ্যে আমাদের কুরআন সুন্নাহ মাফিক জীবক পরিচালিত করতে হবে। আর এটাই হল, আল্লাহ ও তাঁর রসূল সা.) এর শেখান মূলনীতি।

নিজেদের কুসংস্কার, কল্পনা, বিলাসিতা, আন্দাজ-অনুমান ও নিজেদের দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার ছাঁচে ফেলে তার আকীদা বিশ্বাসে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছে। কখনও কখনও কাঁট ছাঁট করে দ্বীন ধর্ম পুরোপুরি বিকৃত করে দিয়েছে। অনেক নতুন বিষয় উদ্ভাবন করে তার সাথে জুড়ে দিয়েছে মনগড়া যতসব আমল ও বিশ্বাস। ছোটখাটো বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ করার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেছে। গুরুত্বপূর্ণকে গুরুত্বহীন ও গুরুত্বহীনকে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে দিয়েছে।

যুগে যুগে বহু নবী-রসূল আল্লহর মনোনীত দ্বীন দীন প্রচার করেছেন। তাদের দেখান পথ অনুসরণ করে আমাদের পূর্ববর্তী মহান মনীষী ও বুযর্গগণ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত রেখে জীবনপাত করে গেছেন। পরবর্তীতে তাদের অনুসারিগণ তাদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যধিক বাড়াবাড়ি করেছেন। আবার কারো কারো প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং তাদের বিরোধিতা করেছে। এভাবে অসংখ্য ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে চলেছে। এভাবের বিরোধের মাধ্যমে সৃষ্টি প্রত্যেকটি ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব মানব সমাজকে কলহ, বিবাদ ও পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত করেছে। এভাবে মানব সমাজ দ্বন্দ্বমুখর দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে চলেছে।

আমরা যদি মতবিরোধ করে নিজের সুবিধামতো দ্বীন পালন করি তা হলে, সত্যিকারের ধার্মিক লোকদের থেকে আলাদা হয়ে যাব। ধর্মের আকিদা আমল হবে কুরআন সুন্নাহর আলোকে। এখানে মনগড়া বিষয় নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া কোনো সুযোগ নাই। তারপরও সমাজের এক শ্রেণির সুসীল বুদ্ধিজীবী যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করে, তারা ধর্মকে নিজেদের জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখে। তাদের উপর ধর্মের কোনো প্রভাব নাই। এই রকম বিভিন্ন মতের মানুষ ধর্মের নামে নিজেদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলে এবং প্রত্যেক গোষ্ঠী নিজস্ব চিন্তাধারাকে অভ্রান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করে, ফলে ধর্মের মূল ঐক্য বিনষ্ট হয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে সমাজে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে। উম্মার মতবিরোধ থেকেই মূলত বিভিন্ন ফির্কা বা দলের সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি

২। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ

৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন।

৬. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

৭. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।

৮. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।

৯. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।

১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

এখানে পরের দুটি কারণ আলোচিত হলো :

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি-

আকিদা বা বিশ্বাসের উপরই ভর করে মুসলিমগণ আজ ফির্কাবাজি বা দলাদলিতে লিপ্ত। আকিদার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সংশয়ের স্থান নাই অথচ মুসলিমগণ আজ আকিদাকে সংশয়পূর্ণ করে বিভিন্ন ফির্কা তৈরি করেছে। মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে তার আকিদা বা বিশ্বাসের জম্ম নেয়। মানুষের জ্ঞানের উৎস হল, প্রাকৃতিক, চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, লোকাচার, বিজ্ঞান ভিত্তিক পড়াশুনা, দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি। আধুনিক কালের সকল মানুষের আকিদা বা বিশ্বাস যুক্তি ও বিজ্ঞান কেন্দ্রিক।

যৌক্তিক কোনো কাজ সহজে যে কেউ মেনে নেন। আর বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত কোন জ্ঞানতো সাথে সাথে মেনে নেয়। কিন্তু ইসলামি আকিদার মূল হল অদৃশ্যে বিশ্বাস এখানে জাগতিক কোন বিষয় থাকলে যুক্তি ও বিজ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা করা যেত কিন্তু অদৃশ্যে বিশ্বাস করতে হলে অদৃশ্য থেকে প্রাপ্ত অহির উপর নির্ভর করতে হবে। অহী ভিন্ন যে কোনো উৎস থেকে আকিদা গ্রহণ করলে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ যে কোনোটাই হতে পারে। ইসলামি আকিদা বিশ্বাস সব সময় আল্লাহকে কেন্দ্র অদৃশ্যের উপর নির্ভর করে থাকে। তাই ইসলামি আকিদার মূল উৎস হল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক।

অদৃশ্যের একটি ব্যাপার হল কবরের আজাব। কবরে আজাব হবে এটাই সত্য। কিন্তু কাউকে যুক্তি দিয়ে কি কবরের আজাব বুঝাতে বা দেখাতে পাওয়ার। কিংবা বিজ্ঞানের আবিষ্কার ক্যামেরা দ্বারা কি এই আজাব দেখাতে পারব। না, পাওয়ার না। এটা একটি গাইবের বিষয়, কুরআন সুন্নাহর দলিলের ভিত্তিতে বিশ্বাস করতে হবে। কোনো যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণের কোনো অবকাশ নাই।

অপর পক্ষে আমলের ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। এখানে কুরআন হাদিসের বাহিরে ইজমা কিয়াজের দরকার হয়। নতুন কোনো সমস্যা আসলে কিয়াস করে মাসায়েল দিতে হয়। যেমন- মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট, শেয়ার বাজার ইত্যাদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না।তাই কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে কিয়াস করে সমাধান দিতে হয়। কাজেই একটি কথা মনে রাখতে হবে-

لفَرْقُ الأَسَاسِيُّ بَيْنَ العَقِيدَةِ وَالفِقْهِ هُوَ أَنَّ الفِقْهَ قَدْ يَحْتَاجُ إِلَى اسْتِشْهَادٍ أَوْ قِيَاسٍ أَوْ حُجَّةٍ أَوْ دَلِيلٍ عَقْلِيٍّ، لَكِنَّ العَقِيدَةَ لَا تَحْتَاجُ إِلَى اسْتِشْهَادٍ أَوْ قِيَاسٍ أَوْ حُجَّةٍ أَوْ دَلِيلٍ عَقْلِيٍّ.

আকিদা ও ফিকহের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো, ফিকহের ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু আকিদার ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন নেই”।

এক কথায় বলে গেলে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট কোন রেফারেন্স ছাড়া আকিদা গ্রহণীয় নয়। যদি কেউ যুক্তি দিয়ে আকিদা বুঝাতে আসে তাকে সালাম জানাতে হবে। 

কুনআন সুন্নাহকে উৎস হিসেবে না নিলে আকিদার ভিন্নতা তো থাকবেই। আর বিভক্তির মূল কারণ হল আকীদা বা বিশ্বাসগত ইখতিলাফ বা মতভেদ। আকিদার মতভেদ কখনও মতভেদ হয়ে থাকেনি সব সময় মতবিরোধে রূপ নিয়েছে। কুরআন হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, এমন ফিকহি মাসলা মাসায়েলের ক্ষেতে ইখতিলাফ বা মতভেদ করা জায়েয হলেও, আকিদার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার মতভেদ জায়েয নেই। কারণ আকিদার ছয়টি বিষয় (আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস, ফিরিশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস, রাসূলগনের প্রতি বিশ্বাস শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস, তকদিরের  ভালো মন্দেন প্রতি বিশ্বাস) যার সবগুলিই গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত এবং গায়েব জানার জন্য অহির প্রয়োজন। যতি কেউ তার আকিদাকে অহি ভিত্তিক না করে, যুক্তি ভিত্তিক করে, তাহলে তার বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

আকিদার মতভেদ মুসলিমদের মাঝে এত প্রকট আকার ধারণ করছে যে, তাদের আকিদার মতভেদ আলোচনা করলে আলাদা গ্রন্থ রচনা হবে। আমি শুধু উপমহাদেশের প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরছি যার মতবিরোধের কারণেই আজ উপমহাদেশে শত শত ফির্কার সৃষ্টি। 

এই গ্রন্থে বেশ কিছু ভ্রান্ত আকিদা বর্ণনা করার সাথে সাথে কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক সঠিক আকিদা তুলে ধরেছি। আকিদার মতভেদই যে ফির্কা সৃষ্টির অন্যতম কারণ সে কথাটা বুঝানোর জন্য অত্র গ্রন্থে বিস্তরিত না হলেও সংক্ষেপে কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আকিদার সম্পর্কে আলোচনার আগে একটা কথাকে মনে খোদাই করে লিখে রাখেন, “আকিদা গাইবের প্রতি বিশ্বাস, এই বিশ্বাস হবে অহী নির্ভর, কোন প্রকার যুক্তিতর্কের অবতারণা করা যাবেনা”।

আমি আমার ওয়েব সাইডে সঠিক আকিদা সম্পর্কি কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত রেফারেন্সসহ উল্লেখ করেছি। যার লিংক হলো :

১.

২.

৩.

এখানে কিছু সঠিক আকিদার শিরোনাম তুলে ধরা হলো। এগুলোর উপর মতভেদের কারনেই মতোরিধের সৃষ্টি হয়। এফলে শত শত ফির্কার জন্ম হয়।

১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা হয়।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার ধারণা থেকে উর্ধে।

২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

 কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান।

৩।  রাসুলুল্লাহ আমাদের মত মানব ছিলেন না

ভ্রান্ত আকিদব হলো : রাসুলুল্লাহ আমাদের মত মানব ছিলেন না

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন কিন্তু তিনি মহান আল্লাহ মনোনিত রাসুল ছিলেন, তার উপর ওহি নাজিল হত।

৪। রাসুলুল্লাহ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তায়ালা মানুকে যে উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কেও সেই একই উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।

৫।  আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

প্রতিটি সৃষ্টি জীবের মতই আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু বরণ করতে হবে।

৬। নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।

৭। গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।

৮। রাসুলুল্লাহ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

 আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির নয়।

৯। দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখার দাবি করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর বান্দা দুনিয়াতে বসে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পারে।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব।

১০। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কিয়ামতের দিন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ  করতে পারবে না।

১১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।

১২। কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো– কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা শিরক।

১৩। দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে একক মালিক মহান আল্লাহ, এ জন্য তার কোন সাহায্যকারী প্রয়োজন নাই।

১৪। গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক।

১৫। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পাওে না।

১৬। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখতে পারে না।

১৭। আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে না।

১৮। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পাওে না।

১৯। কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহ তায়ালাই এতমাত্র উত্তম ফয়সালাকারী।

২০। আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

আল্লাহই একমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতার উত্তম উৎস।

২১। আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

 আল্লাহ তায়ালাই শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের একক মালিক।

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার চলার নিয়ম- নীতি, পদ্ধতি, নির্দেশনা ও বিধান প্রণয়নের অধিকার সবই একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর জন্যই সংরক্ষিত। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে অন্য কারো সামান্য অধিকার নেই।

২২।  অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।

২৩। অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।

২৪। হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’  বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা তার সৃষ্টির মাঝে হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’ করে বলে বিশ্বাস করা

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।

২৫। অহেদাতুল অজুদ বা সর্বেশ্বরবাদ আকিদায় বিশ্বাস করা

ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা ও সৃষ্টির অজুদ বা অস্তিত¦ একই বলে বিশ্বাস করা।

এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—

স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।

নোট : এ স্পষ্ট আকিদা বিশ্বাসগুলোই অনেক বিদআতি বিকৃতি করে তাদের পীর, মাশায়েখ, শাইখ, মুরব্বিদের ক্ষমতা বা হক হিসেবে বিশ্বাস করে। যার ফলে বিশুদ্ধ বিশ্বাসিদের সাথে মতরিরোধ হয়ে নতুন ফির্কার জম্ম হয়।

২। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ

ইসলামি শরিয়তের মূল উৎস হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নাজিলকৃত সুমহান কুরআনের মহান বাণী, যার নাজিল শুরু হয়েছিল মক্কার হেরা গুহা থেকে আর শেষ হয়েছে মদিনায়। এই দীর্ঘ তেইশ বছরব্যাপী নাজিল হয় স্বয়ং সম্পূর্ণ ইসলামি জীবন বিধান। কিন্তু মক্কি জীবনে পবিত্র কুরআনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নাজিল হলেও তার খুব সামান্য অংশই ছিল বিধি বিধান সম্বলিত এবং প্রায় সবটুকুই ছিল দ্বীনের মৌলিক বিষয় যেমন, আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, পরকাল, জান্নান, জাহান্নাম এবং পূর্ববর্তী জাতির ও তাদের প্রতি প্রেরিত নবি রাসুলদের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ। এই সময়কালে ইসলাম ধর্মের সঠিক বিশ্বাস, চলমান ধর্মেগুলির অসারতা প্রচার, মানুষের মাঝে সৎগুনাবলীর বিকাশ এবং সামাজিক কু-প্রথাগুলোর নিন্দা প্রচারই ছিল নাজিলকৃত কুরআনের মূল কথা। আহকাম সম্পর্কিত প্রায় সমস্ত আয়াতই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় হিজরত করার পর থেকে নাজিল হতে থাকে এবং মাদানী জীবনের দশ বছর ব্যাপী তা চলতে থাকে। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি তত্ত্বাবধানে সাহাবায়ে কেরাম দ্বীন বুঝেছেন এবং সেই অনুযায়ী পালন করছেন।

নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সময়ে একদিকে যেমন মানুষকে তাওহীদ, রেসালত ও আখেরাতে কথা বলে দাওয়াত দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম হাতে কলমে আমল শিক্ষা দিয়েছেন। তাই তো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ও আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামের প্রচার  এবং আমল দুটি কাজে যুগপথ ভাবেই চলতে থাকে। প্রচারের জন্য সরাসরি দাওয়াত দিতেন, আর মাঝে মাঝে পত্রের মাধ্যমে দুরে দাওয়াত পাঠাতেণ। অর্থাৎ প্রচারের যতটুকু সুযোগ সুবিধা ছিল পুরটাই কাজে লাগাতেন, যদিও আধুনিক কালের মত এত প্রাচর মাধ্যমও ছিল না। আমলে ক্ষেত্রে নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি অনুসরণই একমাত্র মাধ্যম। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলতেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখ সেভাবে সালাত আদায় কর। সাহাবিরা যেমন নতুন কোনো মানুষকে অজু শেখানোর সময় তাদের সামনে বসে অজু করতেন এবং বলতেন, এই ছিল নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অজু। ইসলামের প্রতিটি বিধানই প্রাথমিকভাবে এর ধারক বাহকদের মাধ্যমে ব্যবহারিক তথা প্রায়োগিকভাবেই বিস্তৃত ও প্রচলিত হতে থাকে। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহ যে হিকমা দান করেছে তার মাধ্যমে ইসলামি বিধান চলতে থাকল।  মহান আল্লাহ বলেন,

لَقَدۡ مَنَّ اللّٰہُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ بَعَثَ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡ اَنۡفُسِہِمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَیُزَکِّیۡہِمۡ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ ۚ وَاِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ

অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল। সুরা আল ইমরান : ১৬৪

মহান আল্লাহ তায়ালাই বলছেন ইসলামের যাবতীয় বিধান তার তরফ থেকেই আসে। এখানে মানব রচিত কোনো বিধান চলবে না। তিনি কুরআন নাজিলের পাশাপাশি আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ও দান করেছেন হিকমা বা জ্ঞান। অর্থাৎ আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহ এক ধরনের জ্ঞান দান করছেন, যার দ্বারা তিনি ও শরিয়তের বিধি বিধান মানব জাতির সামনে তুল ধরেছেন। যাকে আমরা তার হাদিস হিসাবে জানি।

হাদিসও এক ধরনের অহি যা মহান অল্লাহর তরফ থেকে আসে। মহান আল্লাহর বাণী তিনি বলেন,

وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَيۡنَا بَعۡضَ ٱلۡأَقَاوِيلِ .-لَأَخَذۡنَا مِنۡهُ بِٱلۡيَمِينِ . ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡهُ ٱلۡوَتِينَ .فَمَا مِنكُم مِّنۡ أَحَدٍ عَنۡهُ حَـٰجِزِينَ

অর্থঃ যদি এ নবি নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিতো, তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম, এবং ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম৷  তোমাদের কেউই (আমাকে) এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতো না৷ সুরা হাক্কাহ : ৪৪-৪৭

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিপূর্ণ আমনতদারী ও বিশ্বাসিকতার সাথে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করছেন, এবং আমাদের নিকট অবিকৃতভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। তার বিকল্প ভাবার বা করার সামান্যতম অবকাশ তার ছিল না। এই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী এখানে পরীক্ষার জন্য অল্প কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান। এই অবস্থানকালে কি ভাবে চললে  এবং  কি আমল করলে কৃতকার্য হওয়া যাবে, তারই একটি দিক নির্দেশনা হল কুরআন ও হাদিস।  তাইতো কুরআন ও হাদিসে যেমন ইবাদতের নিয়ম শিক্ষা দিয়েছেন তেমনি দিয়েছেন পার্থিব আইন কানুনের বিধি বিধান।

মহান আল্লাহ বাণী ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঠিক দিক নির্দেশনা থাকার কারণে সাহাবিদের মাঝে কোন মতভেদ ছিল না। যদি কোনো বিষয় মতভেদ দেখা যেত সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা নিয়ে নিতেন। কিন্তু পরবর্তী কালে মুজতাহিদ আলেমগন ফিকহি অনেক বিষয় মতভেদ করেন। মুজতাহিদ ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত কুরআন-হাদিসের গবেষণা লব্ধ ব্যাখ্যা প্রদানে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কখন উভয়ের ইজতিহাদ পরস্পর বিরোধী কিন্তু উভয়ই সঠিক। আবার কখন একজন অপরজন থেকে কুরআন সুন্নার অধিক নিকটবর্তী। যে মতভেদ সাহাবিদের জামানা থেকে শুরু হয়েছিল তা তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ী, আম্মিয়ায়ে মুজতাহিদ হয়ে আজও বিদ্যমান আছে। ফিকহি বিষয়ে ইখতিলাফ খারাপ নয় তা জায়েয। এই ইখতিলাফ বা মতভেদের জন্য মতবিরোধ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম কাজ। মুজতাহীদগনের ইজতিহাদি মতভেদ জায়েয কারণ তারা ভুল ইজতিহাদ করলেও সওয়াবের অধিকারী। আমাদের পূর্ববর্তী মুজতাহিদ আলেম, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) মৃত্যু ১৫০ হিজরী, ইমাম মালেক (রহ .) মৃত্যু ১৭৯ হিজরী, ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) মৃত্যু  ২০৪ হিজরী এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) মৃত্যু ২৪১ হিজরি তাদের সকলেম মাঝে ইজতিহাদগত মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালবাসতের, দোয়া করতেন। তাদের মাঝে কোন কোন মতভেদ এমনও ছিল যে পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা যায় তারা উভয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এই ফিকহি মতভেদই ইসলামের প্রস্থতা।  শুরু এ চার ইমাম নয়। আরও অনেক প্রসিদ্ধ ইমাম ছিল। যেমন- ইমাম সুফিয়ান ছাওরীর নামে “ছাওরী’ মাজহাব, লাইছ ইবন সা’দ এর নামে “ লাইছী” মাযহাব এবং ইমাম আওযাই এর নাম “আওযাই” মাযহাব  প্রবর্তিত হয়। এই সকল মুজতাহিদ আলেম তৎকালীন সময়ে প্রখ্যাত ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। তারা ইমামদের মত এত বেশী খ্যাতি লাভ করতে পারে নাই। এই সকল মুজতাহিদ আলেমগণও মতভেদ করছেন। তাদের এ মতভেদ থেকে মুসলিমদের মাঝে আস্তে আস্তে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় যা তারা কখনও পছন্দ করতেন না। আর মতবিরোধের ফল এই মাযহাব। পূর্বের আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামের উত্স হিসাবে এক প্রাথমিক যুগে শুধু কুরআন এবং হাদিসকে বুঝায়।

বাতিল ফির্কা (শীয়া, কাদিয়ানি, ব্রেলভী) বাদে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট বিষয় কারও কোন মতভেদ নেই। ফিকহি মাসায়েলে অনেক মতভেদ লক্ষ করা যায়। কুরআন-সুন্নাহ’র পরোক্ষ, অস্পষ্ট ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ জটিল কিছু বিষয়ে মুজতাহিদ আলেমগন নিজস্ব ইজতিহাদ মোতাবেক কিছু বায় প্রদান করছে যাতে তাদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ করা যায়। যার ইজতিহাদ কুরআন সুন্নাহ অধিক নিকটবর্তী তার ইজতিহাদ অধিক গ্রহণীয়। আবার তাদের ইজতিহাদ ভুলও হতে পারে। তাদের এমন ভুল হাদিস না জানার কারণে (তার নিকট পৌঁছায়নি) হতে পারে। সহিহ হাদিস জানতে অথচ তিনি হাদিস বিরোধী ইজতিহাদ করেছেন এমনটা কষ্টিম কালেও তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। যখন কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ হাদিসের বিরোধী হবে, যখন ইজতিহাদ পরিত্যাগ করে হাদিসের অনুসরণ করা ফরজ। পরবর্তী কালে সময়ের সাথে ইসলামকে তাল মিলিয়ে নিতে এবং নতুন নতুন সমস্যা সমাধানে জন্য ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের উত্স পরিগনিত হয়। এভাবে সাহাবী, তাবেয়ী, এবং  তাবে তাবেয়ী যুগ থেকেই কুরআন সুন্নাহ আলোকে ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের দলিল হিসাবে গণ্য করা হয়। মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ করার কারণ হল-

(১) কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষার কারণে মতবিরোধ

(২) পরস্পর বিরোধী হাদিস কারণে মতবিরোধ

(৩) মুহাদ্দিসগণের সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে-

(৪) নতুন নতুন সমস্যার জন্য কিয়াস করার ফলে মতবিরোধ

(৫) জাল ও যঈফ হাদিসের কারণে মত বিরোধ

(১) কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষার কারণে মতবিরোধ

কুরআনের এমন আয়াত আছে যার ব্যাখ্যা হাদিস ছাড়া সম্ভব নয়। কুরআনে স্পষ্ট করেনি কিন্তু হাদিসে ব্যাখ্যায় স্পষ্ট। আবার এমন আয়াত বা হাদিস আছে যার একাধিক অর্থ গ্রহণ করা যায়। তাই কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা প্রদান বা ফিকাহ রচনার সময় মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে।

যেমন- আলী বিন আবু তালেব (রা.) এবং আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রা.)-এর মতে, কোন গর্ভবতীর স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে চার মাস দশ দিন অথবা বাচ্চা প্রসবের দিন। এই দুই সময়ের মধ্যে দীর্ঘতম সময় পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করবে। অতএব যদি সে চার মাস দশ দিনের আগে বাচ্চা প্রসব করে, তাহলে তাঁদের নিকট তার ইদ্দত পালনের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। [অর্থাৎ বাচ্চা প্রসব সত্ত্বেও তাকে ইদ্দত পালন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা এক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন দীর্ঘতম সময়]। আর যদি বাচ্চা প্রসবের আগে চার মাস দশ দিন শেষ হয়ে যায়, তাহলে বাচ্চা প্রসব করা পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করতে থাকবে। (যেহেতু এক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসবের সময় হচ্ছে দীর্ঘতম সময়) কেননা আল্লাহপাক এরশাদ করেন,

وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّ

 অর্থঃ আর তারা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য খরচ করো৷ সূরা তালাক : ৬

অন্যত্র তিনি বলেন,

وَٱلَّذِينَ يُتَوَفَّوۡنَ مِنكُمۡ وَيَذَرُونَ أَزۡوَٲجً۬ا يَتَرَبَّصۡنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرۡبَعَةَ أَشۡہُرٍ۬ وَعَشۡرً۬ا‌ۖ

 অর্থঃ তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যায়, তাদের পরে যদি তাদের স্ত্রীরা জীবিত থাকে, তাহলে তাদের চার মাস দশ দিন নিজেদেরকে (বিবাহ থেকে) বিরত রাখতে হবে ৷ (বাকারা ২:২৩৪)।

উক্ত আয়াতদ্বয়ের মধ্যে ‘আম-খাছ ওয়াজ্‌হী’ এর সম্পর্ক। আর এমন সম্পর্কযুক্ত দুই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতি হল এমনভাবে হুকুম গ্রহণ করতে হবে, যাতে উভয় আয়াত বা হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। তবে তা করতে গেলে আলী ও ইবনু আববাস (রা.)-এর পদ্ধতি মেনে নেওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। কিন্তু সুন্নাত এসবের ঊর্ধ্বে। এই সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হাদিসে এসেছে-

عَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ سُبَيْعَةَ الأَسْلَمِيَّةَ نُفِسَتْ بَعْدَ وَفَاةِ زَوْجِهَا بِلَيَالٍ فَجَاءَتْ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَاسْتَأْذَنَتْه“ أَنْ تَنْكِحَ فَأَذِنَ لَهَا فَنَكَحَتْ.

৫৩২০. মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, সুবায়আ আসলামীয়া তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে। সহিহ বুখারি : ৫৩২০, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৪

সূরা তালাকের উক্ত আয়াতের অনুসরণ করব। আর এই আয়াতে আল্লাহর সাধারণ ঘোষণা হচ্ছে, ‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। এ কথা নিশ্চিতভাবে যে, যদি এই হাদিস আলী ও ইবনু আববাস (রা.) পর্যন্ত পৌঁছত, তাহ’লে তাঁরা নিশ্চয় তা মেনে নিতেন এবং নিজেদের মত ব্যক্ত করতেন না। এমন অস্পষ্ট বিষয়ে কোন প্রকার মতামত প্রদান করা থেকে বিরত থাকতেন।

(২) পরস্পর বিরোধী হাদিস কারণে মতবিরোধ

 দুটি হাদিসই সহিহ অথচ দুটির হুকুম সম্পূর্ণ আলাদা। সুনান আবু দাউদ এমনই দুটি হাদিস পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। যার একটি হাদিস বলা হয়েছে, যদি কেউ নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে  তাকে অজু করতে হবে। অপর হাদিসে বলা হয়েছে, পুরুষাঙ্গ তো একটি গোশতের টুকরা তাই স্পর্শ করলে অজু  করতে হবে না।

প্রথম হাদিস :

উরওয়া (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মারওয়ান ইবনুল হাকামের নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- কি কারণে অজু করার প্রয়োজন হয়? জবাবে মারওয়ান বলেন, পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে তখন উরওয়া জিজ্ঞেস করেন, আপনি তা কীরূপে জানলেন? মারওয়ান বলেন, বুসরা বিনতে সাফওয়ান (রা) আমাকে জানিয়েছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-

‏ مَنْ مَسَّ ذَكَرَهُ فَلْيَتَوَضَّأْ ‏‏

যে ব্যক্তি নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে  তাকে অজু করতে হবে। সুনান আবু দাউদ : ১৮১

দ্বিতীয় হাদিস :

ক্বায়িস ইবনু তালক থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قَدِمْنَا عَلَى نَبِيِّ اللهِ صلي الله عليه وسلم فَجَاءَ رَجُلٌ كَأَنَّهُ بَدَوِيٌّ فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللهِ مَا تَرَى فِي مَسِّ الرَّجُلِ ذَكَرَهُ بَعْدَ مَا يَتَوَضَّأُ فَقَالَ ‏”‏ هَلْ هُوَ إِلَّا مُضْغَةٌ مِنْهُ ‏”‏ ‏.‏ أَوْ قَالَ – ‏”‏ بَضْعَةٌ مِنْهُ ‏

আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন সম্ভাব্য এক বেদুইন ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রসূল! কোন ব্যক্তি অজু করার পর নিজ পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওটা তো তার শরীরের মাংসের একটি টুকরা বা অংশ মাত্র। সুনান আবু দাউদ : ১৮১

হানাফি মাযহাবের আলেমদের মতে যদি কেউ নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে  তাকে অজু করতে হবে না। অপর পক্ষে হাম্বলি মাযহাব, সালাফি ও আহলে হাদিস আলেমদের মতে পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে অজু করতে হবে। দুটি মতই সঠিক। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা জ্ঞান স্বল্পতার কারেন এই ধরনের প্রশস্ত মাসয়ালা নিয়া উম্মতের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে।

(৩) মুহাদ্দিসগণের সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে-

আমাদের সমাজে প্রচলিত চার মাযহাবের ইমাম তো দূরের কথা তাদের পরবর্তী যুগ বা হাদিস সংকলনের যুগেও যারা হাদিস সংকলনের জন্য জীবন মরণ চেষ্টা করেছেন তাদের কেউই সকল হাদিস সংকলন করতে পাবে নাই। ২০০ হিজরি থেকে ৪০০ হিজরির মাঝেই প্রধান প্রধান হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়। এই সময় ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলীম, ইমাম তিরমিজি, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম ইবনে মাজাহ, ইমাম নাসাঈ এর মত জগৎ বিখ্যাত হাদিসের মুহাদ্দিস তৈরি হয়েছে। তারা সকলে হাদীস সংগ্রহ, সংকলন ও বাছাই-ছাঁটাইর পর সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হাদিসের সমন্বয়ে উন্নত ধরনের গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ করছেন। এই বিরাট ও দুরূহ কাজের জন্য যে প্রতিভা ও দক্ষতা অপরিহার্য ছিল, আল্লাহর অনুগ্রহে তাহাতে ভূষিত হইয়াছে।  তারা ছয়খানি সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেছেন। এই ছয়টি গ্রন্থ ছাড়াও আরও বহু হাদিসের গ্রন্থ সংকলন হয়েছে। যেমনি সহিহ ইবনে খোযায়মা, সহিহ ইবনে হাব্বান, মোস্তাদরেক ইবনে হাকিম, মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালেক, মুওয়াত্তায়ে ইমাম মুহম্মদ, কিতাবুল আছার, মসনদে শাফেয়ী,  মসনদে আবূ ইয়ালী,  মসনদে আব্দুর রাজ্জাক, মোছান্নেফে আবূ বকর ইবনে আবী শায়বা, সুনানে দারে কুতনী,  সুনানে দারেমী, সুনানে বায়হাক্বী, মারেফাতু সুনানে বায়হাক্বী, মুজামুল কবীর তিবরানী, মুজামুস সগীর-তিবরানী,  মসনদে বাজ্জাজ,ক. মিশকাতুল মাসাবীহ, আত-তাগরীব ওয়াত তারহীব,আল-মুহাল্লা, রিয়াদুস-সালেহীন, মাসাবীহুস সুন্নাহ ইত্যাদি। এই হাদিসের গ্রন্থগুলির নাম উল্লেখ করার প্রধান কারণ হল- এই হাদিসের গ্রন্থ সংকলন কারি কোন মুহাদ্দিস এ দাবি করেননি যে, আমি সকল সহিহ হাদিস অথবা সকল জঈফ হাদিস পেয়েছি বা লিপিবদ্ধ করেছি। প্রমাণ করার চেয়ে দাবি করা অনেক সহজ হলেও কোন মুহাদ্দিস এমন দাবিও করেনি। তাহলে এ কথা দিবালোকের মত পরিষ্কার যে কোন মুজতাহিদ বা মুহাদ্দিস এককভাবে সকল হাদিস আয়ত্ত করে সংকলন করতে পারেনি। কিন্তু ৪০০ পর যখন সকল হাদিস সংকলনের কাজ শেষ হয়ে যায়, তখন থেকে মুহাদ্দিসগন কম পরিশ্রমে অনায়াসে বহু হাদিসের কিতাব পেয়ে যেতেন। আধুনিক কালে এক কাজ আরও অধিক সহতর হয়েছে।

কাজেই ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে থেকে এককভাবে কেহ সকল হাদিস পেয়েছেন এ কথা বলা ঠিক হবেনা। চার ইমামদের মাঝ সবচেয়ে বেশী হাদিস সংকলন করেছেন ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল, তিনিও সকল হাদিস সংকলন করতে পারেনি। কোন মুজতাহিদ আলেম হাদিস না জানার কারণে যদি ইজতিহদ করে রায় দিতে পাবের। তখন তার রায় সঠিক বা ভুল দুটিই হতে পারে। কিন্তু সঠিক দলিল জানার পর ভুল ইজতিহাদ থেকে ফিরে আসা ওয়াজিব। কিন্তু বিপত্তি বাধে অনুসারীদের মাঝে। তাদের ভুল আমলের পরিবর্তে সঠিক দলিল প্রদান করলে তারা শুধু এই যুক্তিতে সঠিক দলিল ত্যাগ করে যে, আমাদের মুজতাহিদ কি কম বুঝেছে?

তাদের একটুকু জানা দরকার ছিলে যে, আমাদের অনুসারী মুজতাহিদ আলেম সকল হাদিস না পেতে পারে, হয়ত তিনি এই মাসায়ালাটি ইজতিহাদ করে প্রদান করছেন। এখন যখন সহিহ হাদিসের আলোকে মাসয়ালাটি জানতে পারলাম, তাই আমল পরিবর্তন করে সঠিক দিকে ফিরে আসি। এভাবে সঠকি আমল থেকে দুরে থাকার কারণে উম্মতের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়। আর মতভেদ থেকে সৃষ্টি হয় মতবিরোধ। এইভাবে বিভক্তির কারণে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়।

(৪) নতুন নতুন সমস্যার জন্য কিয়াস করার ফলে মতবিরোধ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন দশায় সাহাবিদের মাঝে মতভেদ হলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে সমাধান নিলে কোন  মতভেদ থাকত না। একক উত্স এবং একক বর্ণনাকারী থাকায় কোন প্রকার মতভেদ অবশিষ্ট থাকত না, তাই কোন ইজমা এবং কিয়াসের দরকার ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর শরীয়তের এমন অনেক সমস্যা দেখা দিল যার দিক নির্দেশনা সরাসরি কুরআন হাদিসে নেই। আবার সাহাবিদের ইজমা বা আমল দ্বারাও তার সমাধান করা যায় না। ঠিক এমন সময় মুজতাহিদ আলেমগন কুরআন সুন্নাহর আলোকে উক্ত সমস্যার সমাধান প্রদান করে। একই বিষয়ে বিভিন্ন মুজতাহিদের ভিন্ন ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। তাই মুজতাহিদ আলেমদের কিয়াস ইসলামের নামে নতুন কোনো বিধান রচনা না করলেও একটা মতভেদ সৃষ্ট করে। তাই ফিকহি মাসয়ালা সামায়েলে মতভেদ জায়েয করা হয়েছে। মুজতাহিদ আলেমদের জীবনীতে দেখতে পাই তারের মাঝে শত শত ফিকহি মতভেদ থাকলেও একে অপরকে ভালোবাসতেন তার জন্য দুয়া করতেন। 

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের আধুনিক জীবনের সাথে একাকার হয়ে জড়িয়ে আছে টেলিভিশন নামক যন্ত্রটা। শুরুর দিকে টেলিভিশন জায়েয/নাজায়েয নিয়ে বহু আলোচনা  হয়েছে। ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে তরজমানুল কুরআন নামক পত্রিকায় মাওলানা মওদূদী (রহ 🙂 কতগুলি শর্ত সাপেক্ষে সিনেমা দেখা জায়েয বলে ফতোয়া প্রদান করেন। তার এই ফতোয়া প্রকাশের সাথে সাথে ভারত উপমহাদেশের প্রায় সকল আলেম এক যোগে প্রতিবাদ করে। অনেকে আগ বাড়িয়ে তাকে কাফির ফতোয়াও প্রাদান করে।  কিন্তু মজার ব্যাপার হল মাওলানা মওদূদী (রহঃ) শর্তগুলি দিয়া এখন প্রায় সকল আলেমই টিভি নয় সিনেমা দেখাও জায়েয বলছেন।

এর কারন হল টেলিভিশন নামক যন্ত্রটা আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জামানায় ছিলনা। তিনি এ সম্পর্ক স্পষ্ট কোর বক্তব্য রেখে যাননি। তাই এ সম্পর্ক মুজতাহিদ আলেমগন অশ্লীলতা, নারী, পর্দা, জিনা, নেষা, সময় অপচয়, শিক্ষা, উপকার, অপকার, সমাজিক অবক্ষয়, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং দ্বীন দুনীয়ার সামগ্রিক উপকারিতা ইত্যাদি বিবেচনা করে কুরআন হাদিসের আলোকে রায় প্রাদান করেছেন। সকলের চিন্তা চেতনা ও ইলমি গবেষণা সমান নয়, তার তাদের মাঝে কিয়াসের ভিন্নতা দেখা যায়।

একজন আধুনিক মুসলিম কখন ইন্টারনেট, মোবাইল এবং কম্পিউটার ছাড়া চলতে পারেনা। অনেক আলেমতো ইন্টারনেটকেই দ্বীন প্রচার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছে। কিন্তু  ইন্টারনেট অশ্লীলতার কথা বিবেচনা করে অনেক আলেম ইহা ব্যবহার হারাম বলেছেন। কোন কোন আলেম আবার শর্ত সাপেক্ষে ইন্টারনেরট ব্যবহার করতে বলেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যারা ইন্টারনেট এর অশ্লীলতা থেকে বাঁচতে চেয়েও যারা বাঁচতে পারেনা তাদের এই মাধ্যমে দ্বীন শেখা জায়েজ নয়। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, গুগল ইত্যাদি ব্যবহার করে দ্বীন প্রচার করা সম্পর্কেও আলেমদের মাঝে মতভেদ আছে। এমনিভাবে, শেয়ার বাজার, ব্যাংকিং ও জীবনবিমা সম্পর্কে আলেমদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়।

সরাসরি কুরআন হাদিস পেলে আমরা এই ইজতিহাদগত মতভেদ থেকে বাঁচতে পারতাম। কিন্তু তাতো আর সম্ভব নয়। কাজেই যতদিন মুজতাহীদগন কিয়াস করবেন তত দিন মতভেদ থাকবে। আমাদের দায়িত্ব হল। কিয়াসগত ইজতিহাদ যারটা কুরআন সুন্নাহর অধিক কাছাকাছি মনে হবে তার অনুসরণ করা। আর অন্য ব্যাপারে খারাপ ধারণা না রাখা। কারণ হয়ত সেই কুরআন সুন্নাহর অধিক নিতটবর্তী। কিন্তু যখনই আমরা নিজের অনুসারী আলেমদের কিয়াস শতভাগ সঠিক মনে করব আর অন্য আলেমদের ভ্রান্ত জানব তখনতো মতবিরোধ হবেই। তাই বর্তমান আধুনিক যুগে অধিকাংশ সাধারণ মুসলিম যাদের ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান নেই তারা এই কিয়াস কৃত মাসয়ালা নিয়ে বিরোধে জড়ায় আর এক শ্রেণির আলেম তাদের পালে হাওয়া দেয়। এর ফলে মুসলিম উম্মার মাঝে যে বিভাজনের সৃষ্টি হয় তার দায়ভার সাধারণ মুসলিমদের সাথে ঐ সকল আলেমদেরও নিতে হবে। এটা নিশ্চয় অন্যায়।

(৫) অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের কারণে মতবিরোধ-

হাদিসের মান বর্ণার ক্ষেতে সহিহ, জঈফ, হাসান ও জাল কথাগুলি ব্যবহার করছি। তাই বিষয়টি ভালোভাবে বুঝার জন্য সহিহ হাদিস, হাসান হাদিস, জাল হাদিস ও যঈফ হাদিস সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা দরকার।  তা হলেই সহজে বুঝতে পারব কেন অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের উপর আমল করার ফলে বিদআতের সৃষ্টি হয়। তাই খুবই সংক্ষেপে এই সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা হল।

সহিহ হাদিস :

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে হাদিসের মধ্যে ৫টি শর্ত বিদ্যমান তাকে সহিহ হাদীস বলা হয়-

১. আদালত : হাদিসের সকল রাবী পরিপূর্ণ সৎ ও বিশ্বস্ত বলে প্রমাণিত।

২. যাবত : সকল রাবীর “নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা’ পূর্ণরূপে বিদ্যমান বলে প্রমাণিত।

৩. ইত্তিসালঃ সনদের প্রত্যেক রাবী তাঁর ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত।

৪. শুযুয মুক্তি বা শায না হওয়া : হাদিসটি অন্যান্য প্রামাণ্য বর্ণনার বিপরীত নয় বলে প্রমাণিত।

৫. মিল্লাত মুক্তি : হাদিসটির মধ্যে সূক্ষ্ণ কোন সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি নেই বলে প্রমাণিত।

প্রথম তিনটি শর্ত সনদ কেন্দ্রিক ও শেষের দুটি শর্ত মূলত অর্থ কেন্দ্রিক। তবে সাধারণ পাঠকের জন্য আমরা বলতে পারি যে, প্রদত্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদির বিষয়ে যতটুকু নিশ্চয়তা অনুভব করলে একজন বিচারক মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন, বর্ণিত হাদিসটি সত্যিই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন বলে অনুরূপভাবে নিশ্চিত হতে পারলে মুহাদ্দিসগণ তাকে ‘‘সহিহ” বা বিশুদ্ধ হাদীস বলে গণ্য করেন।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ এর লেখা, “হাদিসের নামে জালিয়াতী” বইয়ের প্রথম পর্ব, পৃষ্ঠা নম্বর-১৩৩)

হাসান হাদিস :

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাসান হাদিসের মধ্যেও সহিহ হাদিসের সকল শর্তের বিদ্যমানতা অপরিহার্য। তবে দ্বিতীয় শর্তের (যাবত) ক্ষেত্রে যদি সামান্য দুর্বলতা দেখা যায় তবে হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলা হয়। রাবীর নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা বা ‘যাবত’ কিছুটা দুর্বল বলে বুঝা যায়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। এরূপ রাবীর বর্ণিত হাদীস ‘হাসান’ বলে গণ্য। হবে হাদিসের সনদের রাবীগণ ব্যক্তিগতভাবে সৎ, প্রত্যেকে হাদীসটি ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত।

জঈফ হাদিস :

জঈফ অর্থ দুর্বল। যে হাদিসের মধ্যে সহিহ হাদিসের শর্তাবলি থেকে এক বা একাধিক শর্তের ঘাটতি রয়েছে সেটিকে জঈফ হাদীস বলা হয়। সনদ বা বর্ণনা সূত্রের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণতা, দ্বীনদারী, তাকওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, অথবা এটা প্রামাণিত হওয়া যে, বর্ণনকারী হাদীস যথার্থভাবে সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তার স্মৃতি বিভ্রাটের কারণে হোক বা তার কাছে সংরক্ষিত হাদিসের কিতাবগুলো কোন কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে হোক। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়। তাই হাদীস শাস্ত্রের বিদগ্ধ মুহাদ্দিসগণ সার্বিক দিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কোনও হাদীস সহিহ না কি জঈফ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।

জঈফ হাদীস কি আমল যোগ্য?

জঈফ হাদীস সাধারণভাবে আমল যোগ্য নয়। তবে তিনটি ক্ষেত্রে মুহাদ্দিস কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে জঈফ হাদিসের উপর আমল করার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন।  জঈফ হাদীস আমল করার শর্তগুলি হলো

১. জঈফ হাদিসটি খুবই জঈফ না হয়। 

২. ইসলামি শরীয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।

৩. আকিদা সম্পর্কিত হবে না।

৪. হালাল-হারাম সংক্রান্ত হবে না।

৫. নেক আমলটি সহিহ হাদিসের আলোকে হওয়া।

জঈফ হাদীস আমলের ক্ষেত্র হলো

১. জঈফ হাদিসটি নেক আমলের ফজিলত ক্ষেত্রে,

২. কুরআনের ‘তাফসীর’ বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ও

৩. ইতিহাস বা ঐতিহাসিক বর্ণনার ক্ষেত্রে।

শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহসহ বহু সালাফি আলিম জঈফ হাদিসের উপর আমল না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অপরপক্ষে একদল মুহাদ্দিস পূর্বোক্ত শর্তাবলি সাপেক্ষে শুধু ফজিলতের ক্ষেত্রে জঈফ হাদিসের উপর আমল করার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, জঈফ হাদিসকে রাসূলুল্লাহ (সা্ঃ) এর কথা বলে বিশ্বাস করা যাবে না। জঈফ হাদিসের উপর আমল করার ক্ষেত্রে একথা মনে করা যাবে না যে, রাসূলুল্লাহ (সা্ঃ) সত্যিই একথা বলেছেন। তাই আমার মতে জঈফ হাদিসে উপর আমল না ভালো, কেননা সহিহ হাদির উপরই আমল করে শেষ করতে পারি না।

যখন সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও কেউ অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে আমল করে তখন দুই দলের মাঝে মাসায়েল গত বিশার পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে দুই দলের মতভেদ থেকে মতবিরোধের জম্ম নেয়। এই মতবিরোধই নতুন ফির্কার জম্ম দেয়।

একটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথা হলো-

বিশিষ্ট তাবিয়ী ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ আল বাকির (১১৫ হি.) থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বরাতে বর্ণনা করেছে-

مَن صَلَّى فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِن شَعْبَانَ مِائَةَ رَكْعَةٍ، وَقَرَأَ فِيهَا أَلْفَ مَرَّةٍ سُورَةَ الإِخْلَاصِ، بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْهِ قَبْلَ مَوْتِهِ مِائَةَ مَلَكٍ: ثَلاَثُونَ يُبَشِّرُونَهُ بِالْجَنَّةِ، وَثَلاَثُونَ يُنَجُّونَهُ مِنَ النَّارِ، وَثَلاَثُونَ يُصَحِّحُونَ خَطَايَاهُ، وَعَشَرَةٌ يَكْتُبُونَ أَسْمَاءَ أَعْدَائِهِ.”

যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে একশত রাকআত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বেই মহান আল্লাহ তার কাছে একশত জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন। ত্রিশজন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবে, ত্রিশ জন তার ভুল সংশোধন করবে এবং ত্রিশজন তার শত্রুদের নাম লিপিবদ্ধ করবে।

হাদিসটি জাল বলেছেন  ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫১; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৯; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১১৩-১১৪; এ হাদীসও বানোয়াট। সনদের কিছু রাবী অজ্ঞাত পরিচয় এবং কিছু রাবী মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত, হাদিসের নামে জালিয়াতী, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৩৯।

এই রকম অসংখ্য জাল হাদিস উপর ভিত্তি করে সমাজে অনেক আমল প্রচলিত আছে। যেমন- আমাদের সমাজে প্রচলিত মিরাজের রজণী নাম দিয়ে ২৭ শে রজব ইবাদতে মধ্যে রাত কাটান, পরের দিন সিয়াম পালন করা, শাবান মাসের ১৫ তারিখ দিনের বেলা রোজা রাখা, রাতে নির্দিষ্ট সালাত আদায় করা, মহররম মাসের ইরাদাত, আখেরি চাহার সোম্বা, ঈদের রাতের ইবাদাত ইত্যাদি। এই সকল আমল দুর্বল ও জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যারা এই সকল বিদআতি আমলের বিরোধিতা করবে তাদের সাথে ঐ বিদআতিদের সংঘর্ষ অনিবার্য।

উম্মতের মতবিরোধের প্রধান দশটি কারণ : দ্বিতীয় পর্ব (৩-৬)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি।

২. ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ।

৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন

. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

৭. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।

৮. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।

৯. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।

১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

এখানে পরের চারটি (৩-৬)  কারণ আলোচিত হলো :

৩। আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ :

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  জীবন দশায় কোন আকিদা বা ফিকহি কোনো সমস্যা হলে তার নিকট উপস্থিত হলেই সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর তার অনুপস্থিতির কারণে সাহাবিগনের এই সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যায়। ফলে কোন কোন ফিকহি বিষয় সাহাবিগণের মাঝেও মতভেদ দেখা দেয়। তাদের মতভেদের কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ-

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

প্রথম উদাহরনণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

عَنْ عِكْرِمَةَ أَنَّ أَهْلَ الْمَدِينَةِ سَأَلُوا ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ امْرَأَةٍ طَافَتْ ثُمَّ حَاضَتْ قَالَ لَهُمْ تَنْفِرُ قَالُوا لاَ نَأْخُذُ بِقَوْلِكَ وَنَدَعُ قَوْلَ زَيْدٍ قَالَ إِذَا قَدِمْتُمْ الْمَدِينَةَ فَسَلُوا فَقَدِمُوا الْمَدِينَةَ فَسَأَلُوا فَكَانَ فِيمَنْ سَأَلُوا أُمُّ سُلَيْمٍ فَذَكَرَتْ حَدِيثَ صَفِيَّةَ رَوَاهُ خَالِدٌ وَقَتَادَةُ عَنْ عِكْرِمَةَ

ইকরিমা (রহ.) হতে বর্ণিত যে, তাওয়াফে যিয়ারাহর পর ঋতু এসেছে এমন মহিলা সম্পর্কে মদিনা্বাসী ইবনু ‘আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তাদের বললেন, সে রওয়ানা হয়ে যাবে। তারা বললেন, আমরা আপনার কথা গ্রহণ করব না এবং জায়েদের কথাও বর্জন করব না। তিনি বললেন, তোমরা মদিনায় ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবে। তাঁরা মদিনায় এসে জিজ্ঞেস করলেন যাঁদের কাছে তাঁরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে সুলাইম (রা.) ও ছিলেন। তিনি তাঁদের উম্মুল মুমিনিন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সহিহ বুখারি : ১৭৫৮

তাঊস (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর সঙ্গে ছিলাম। জায়েদ ইবনু সাবিত (রাঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বললেন, আপনি কি এই ফাতওয়া দিয়েছেন যে, হায়যগ্রস্ত মহিলারা বিদায়ী তাওয়াফ না করেই প্রস্থান করতে পারবে? ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাকে বললেন, যদি আপনি আশ্বস্ত না হতে পারেন, তবে অমুক আনসারী মহিলাকে জিজ্ঞাসা করুন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন? তাঊস বলেন, যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হাসতে হাসতে ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি মনে করি আপনি সত্য কথাই বলেছেন। সহিহ মুসলিম : ১৩২৮

       মদিনার অধিবাসীরা ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে জানতে চান, একজন মহিলা তাওয়াফে যিয়ারাহ সম্পন্ন করার পর ঋতুমতী হলে, তার করণীয় কি? তিনি তাদের বলেন, ঐ মহিলা (মক্কা থেকে)  রওয়ানা হয়ে যেতে পারবে। এই মতামতের বিপরীত মত জায়দ (রা.) থেকে এসেছিল বিধায় তারা ইবনে আব্বাস (রা.) এর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিধায় পড়ে যান এবং বলেন, আমরা যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর মতামতও বিবেচনায় রাখব। এরপর ঘটনাটি আরো স্পষ্ট করতে, তারা মদিনায় ফিরে উম্মে সুলাইম (রা.) এর কাছ থেকে উম্মুল মুমিনীন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি শুনে নিশ্চিত হন যে তাওয়াফে যিয়ারাহ শেষ করার পর ঋতুমতী হন, তাহলে তার মক্কা ত্যাগে বাধা নেই। কারণ, তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে এবং হজের মূল শর্ত পূরণ হয়েছে। এখানে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কিরামদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলে, দলিল প্রমাণের আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হতো। সাহাবায়ে কিরাম ইজতিহাদ এবং দলিলের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদান করতেন। মতভেদ দেখা দিলে, তারা প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাউস (রহ.) এর বর্ণনায় ও এমনটি দেখা যায় যে, জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বিষয়টি অনুসন্ধান করে ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে এসে হাসতে হাসতে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছিলেন।

নোট : সাহাবিদের (রা.) শিক্ষা হলো দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে যার মতামত অধিক সঠিক তার মতামত গ্রহণ করা। আমরা দলিল প্রমাণের চেয়ে আমাদের আকাবিরদের বেশী গুরুত্ব প্রদান করে থাকি। মনে রাখতে হবে কোন মুজতাহিদ সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞাত নন। যখন হাদিসের সঠিক দলিল প্রমাণ পাওয়া যাবে, তখন আর কারো মতমতা প্রদান করা অধিকার থাকে না।

দ্বিতীয় উদাহরণ-

আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ’উমার ইবনু খাত্তাব সিরিয়ার দিকে রওনা করেছিলেন। শেষে তিনি যখন সারগ এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সৈন্য বাহিনীর প্রধানগণ তথা আবূ ’উবাইদাহ ইবনু জার্রাহ ও তাঁর সঙ্গীগণ সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানালেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের বিস্তার ঘটেছে। ইবনু ’আব্বাস বলেন, তখন ’উমার বলল, আমার নিকট প্রবীণ মুহাজিরদের ডেকে আন। তখন তিনি তাঁদের ডেকে আনলেন। ’উমার তাঁদের সিরিয়ার প্লেগের বিস্তার ঘটার কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন; কাজেই তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেন, বাকী লোক আপনার সঙ্গে রয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিগণ। কাজেই আমরা সঠিক মনে করি না যে, আপনি তাদের এই প্লেগের মধ্যে ঠেলে দিবেন।

উমার (রা.) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে চলে যাও। এরপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম। তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলে তাঁরাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতই মতপার্থক্য করলেন।

উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা উঠে যাও। এরপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশী আছেন, যাঁরা মক্কা জয়ের বছর হিজরত করেছিলেন, তাদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম, তখন তাঁরা পরস্পরে মতভেদ করলেন না। তাঁরা বললেন, আপনার লোকজনকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা এবং তাদের প্লেগের মধ্যে ঠেলে না দেয়াই আমরা ভাল মনে করি। তখন ’উমার লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সাওয়ারীর পিঠে আরোহণ করব (ফিরার জন্য)। অতএব তোমরাও সকালে সওয়ারির পিঠে আরোহণ করবে।

আবূ ’উবাইদাহ (রাঃ) বললেন, আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদির থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন? ’উমার(রাঃ) বললেন, হে আবূ ’উবাইদাহ! যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলত! হাঁ, আমরা আল্লাহর, এক তকদির থেকে আল্লাহর আরেকটি তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত, তোমার কিছু উটকে যদি তুমি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও যেখানে আছে দু’টি মাঠ। তন্মধ্যে একটি হল সবুজ শ্যামল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তাহলে তাও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ(রাঃ) আসলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোন প্রয়োজনের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।

তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা যখন কোন এলাকায় প্লেগের) বিস্তারের কথা শোন, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাক, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ’উমার (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করলেন। সহিহ বুখারি : ৫৭২৯, ৫৭৩০, ৬৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২১৯

মন্তব্যঃ কিয়াস করা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করা, উভয়টাই শরীয়ত সম্মত হলেও মতভেদের সময় দলিল পাওয়া গেলে দলিলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক।

এই দুটি উদাহরণ প্রমাণ করে সকল সাহাবি (রা.) সকল ফিকহি বিষয়ের জ্ঞান সম্পর্কে সমানভাবে জ্ঞাত ছিলেন না। এটা কোন অপরাধ নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। তবে ইমল আসার পর আর ইজতিহাদ করে মতামত প্রদান করা জায়েয নাই। দলিল প্রমাণের পরও মুরুব্বি বা বড়দের দোহাই দিয়ে মতবিরোধ করা যাবে না।

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

প্রথম উদাহরণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ يَقُولُ كُنَّا لاَ نَأْكُلُ مِنْ لُحُومِ بُدْنِنَا فَوْقَ ثَلاَثِ مِنًى فَرَخَّصَ لَنَا النَّبِيُّ فَقَالَ كُلُوا وَتَزَوَّدُوا فَأَكَلْنَا وَتَزَوَّدْنَا قُلْتُ لِعَطَاءٍ أَقَالَ حَتَّى جِئْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لاَ

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আমাদের কুরবানির গোশত মিনায় তিন দিনের বেশি খেতাম না। এরপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অনুমতি দিলেন এবং বললেন, খাও এবং সঞ্চয় করে রাখ। তাই আমরা খেলাম এবং সঞ্চয়ও করলাম। রাবী বলেন, আমি আত্বা (রহ.) কে বললাম, জাবির (রাঃ) কি বলেছেন আমরা মদিনায় আসা পর্যন্ত? তিনি বললেন, না। সহিহ বুখারি : ১৭১৯, ২৯৮০, ৫৪২৪, ৫৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৯৭২, সুনানে নাসায়ী ৪৪২৬, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৫৯২৫, মিশকাত : ২৬৩৯

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে: “জমহূরের মতে, তিন দিনের পরে খাওয়া এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখা বৈধ। আর এ বিষয়ে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞাটি জাবির, বুরায়দাহ্, ইবনু মাসউদ, কাতাদা, নুমানসহ বহু সাহাবি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে মানসুখ হয়ে গেছে। এই মানসুখের বিষয়টি আলী এবং ইবনু উমার (রা.) এর বিষয়টি জানা ছিল না।

হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তার গ্রন্থ ফাতহুল বারী-তে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, সম্ভবত আলী (রাঃ)-এর নিকট মানসূখের বিষয়টি পৌঁছেনি।

ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে সহিহ সনদে বর্ণিত অনেক হাদীস রয়েছে। আর ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এর বিষয়টি হলো তাদের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাড়ের বিষয়টি পৌঁছেনি। তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিষেধ করতে শুনেছিলেন ফলে তারা যা শ্রবণ করেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। লক্ষ করুন, একটি জরুরি দুই জন বিশিষ্ট সাহাবির গোচরি ভূক্তই হয় নাই।

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

উদাহরণ- 

আল্লাহ রব্বুল আলামি বলেন-

أَسۡكِنُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ سَكَنتُم مِّن وُجۡدِكُمۡ وَلَا تُضَآرُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُواْ عَلَيۡہِنَّ‌ۚ وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّ‌ۚ

অর্থঃ তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। সূরা তালাক : ৬

আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও জ্ঞানের কথা বলার অবকাশ নেই। অথচ তাঁর মত বিজ্ঞ মানুষের একটি হাদিছটি অজানা ছিল বিধান তিনি এই আয়াতে ব্যাখ্যায় ভুল করে বসেন। তিনি মতামত প্রদান করেন যে, তালাকে বাইন বা একসাথে তিন তালাক প্রাপ্ত মহিলা স্বামীর পক্ষ থেকে খোরপোশ ও আবাসনের পাবে। সহিহ হাদিসে এসেছে-

عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ، أَنَّهُ طَلَّقَهَا زَوْجُهَا فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ أَنْفَقَ عَلَيْهَا نَفَقَةَ دُونٍ فَلَمَّا رَأَتْ ذَلِكَ قَالَتْ وَاللَّهِ لأُعْلِمَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ لِي نَفَقَةٌ أَخَذْتُ الَّذِي يُصْلِحُنِي وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لِي نَفَقَةٌ لَمْ آخُذْ مِنْهُ شَيْئًا قَالَتْ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏ “‏ لاَ نَفَقَةَ لَكِ وَلاَ سُكْنَى

ফাতমিা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তার স্বামী তাকে তালাক (তালাক) দেন। এরপর তার স্বামী তার জন্য (ইদ্দাতকালীন সময়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য) সামান্য পরিমাণ খোরপোশ দিয়েছিলেন। তিনি তা দেখে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই এ বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোচরে আনব। যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য হয় তবে তা আমি এ পরিমাণ উসুল করব যাতে সুচারুভাবে আমার প্রয়োজন পূরণ হয়। আর যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য না-ই হয় তাহলে আমি তার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করব না। তিনি বলেন, এবার আমি বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উত্থাপন করলাম। তিনি আমাকে বললেন, তোমার জন্য কোন খোরপোশ নেই, বাসস্থানও নেই। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০

এই হাদিস উল্লেখ করার পরও আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ফাতিমা বিনতু কায়স হয়ত (রা.) ভুলে গেছেন। এই সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তাঁর হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মহিলার কথার উপর ভিত্তি করে আমরা কি আমাদের প্রতিপালকের কথা পরিত্যাগ করব, অথচ আমরা জানি না যে, তার মনে আছে নাকি ভুলে গেছে? অর্থাৎ আমীরুল মুমিনিন উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এই দলিলের প্রতি আস্থাশীল হতে পারেননি।

এরূপ ঘটনা শুধু উমর (রা.) নয়, অন্যান্য সাহাবিগণ এবং তাবেয়িন-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তাই তো দেখা যায় বিদ্বানগণের এক জন এক হাদিসকে সহিহ মনে করে দলিল দিচ্ছেন অপর জন যঈফ মনে করে তা পরিত্যাগ করছেন। ফলে উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু দৃষ্টিতে যেটি শক্তিশালী মনে হয়েছে সেটিকেই তিনি গ্রহণ করেছেন। এমনকি তাদের পরেও হাদিস সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মাঝেও এমন মতভেদ দেখা যায়। সনদ বিচারে একজন সহিহ বলেছেন তো আরেক জন যঈফ বলেছেন। কাজেই এক্ষেত্রে আমরা মহান সহাবিগণ (রা.) এর অনুসরণ করব। যে মতটি অধিক সঠিক বা সত্যের কাছাকাছি সে মতটিই গ্রহণ করতে হবে।

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধ হতে ফিরে পথে আমাদেরকে বললেন, বনূ কুরাইযাহ এলাকায় পৌঁছার পূর্বে কেউ যেন ‘আসর সালাত আদায় না করে। কিন্তু অনেকের রাস্তাতেই আসরের সময় হয়ে গেল, তখন তাদের কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে না পৌঁছে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা সালাত আদায় করে নেব, আমাদের নিষেধ করার এ উদ্দেশ্য ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল তাড়াতাড়ি যাওয়া।  নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এ কথা উল্লেখ করা হলে, তিনি তাঁদের কারোর ব্যাপারে কড়াকড়ি করেননি। সহিহ বুখারি : ৯৪৬, ৪১১৯

এই হাদিসের মূল কথা হলো- খন্দকের যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরে এলেন এবং যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম রাখলেন। তখন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন আমরা এখন অস্ত্র রাখিনি। অতএব আপনি চুক্তি ভঙ্গকারি বিশ্বাসঘাতক ইয়াহুদি সম্প্রদায় “বনি কুরায়জা’র উদ্দেশ্যে বের হন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের একটি দলকে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা “বনি কুরায়জা’র মহল্লায় না পৌঁছে কেউ আসর পড়বেনা”। পথে আসরের ওয়াক্ত হলে একদল হাদিসের শাব্দিক নির্দেশ অনুযায়ী বললো, আমরা সেখানে পৌঁছার পূর্বে সালাত আদায় করবো না। অন্যদল বললো, তাঁর (সা) ইচ্ছা এটা নয় অর্থাৎ উক্ত আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাড়াতাড়ি ঐ গোত্রে পৌঁছা, নামাজ না পড়া নয়, অতএব পথে সালাত পড়ে নাও। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে উভয় দলের ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি দুটোকেই অনুমোদন করেন। সাহাবিগন নিজ কানে সরাসরি শুনে ও মর্ম বুঝতে ভুল করলেন। এক এক দল এক এক ধরনের বুঝলেন এবং আমল ও করলেন ভিন্ন ভিন্ন অথচ উভয় দলই সঠিক ছিল। এটাই মতভেদ মতবিরোধ নয়। আজ কাল আমরা যা করছি তা মতবিরোধ, মতভেদ নয়।

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

আবদুর রহমান ইবনু আবযা (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’উমার (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, আমরা কোন (পানিবিহীন) জায়গায় এক-দুই মাস অবস্থান করে থাকি (সেখানে অপবিত্র হলে করণীয় কি?)। ’উমার (রাঃ) বললেন, আমি তো পানি না পাওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করব না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ’আম্মার (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আপনার কি ঐ ঘটনার কথা মনে নেই, যখন আমি ও আপনি উটের পালে ছিলাম। আমরা জুনুবি হয়ে গেলাম এবং আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিলাম।

আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন তোমাদের জন্য শুধু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল- এই বলে তিনি মাটিতে উভয় হাত মেরে হাতে ফুঁ দিলেন। তারপর হাত দিয়ে মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের অর্ধেক পর্যন্ত মুছলেন। ’উমার (রাঃ) বললেন, হে ’আম্মার! আল্লাহকে ভয় কর। তিনি বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আল্লাহর শপথ! আপনি চাইলে আমি আর কখনো তা বর্ণনা করব না। ’উমার (রা.) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার উদ্দেশ্য এরূপ নয়, বরং তুমি চাইলে অবশ্যই তোমার বক্তব্যের স্বাধীনতা তোমাকে দিব। সুনানে আবু দাউদ : ৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৬৯, সুনানে নাসায়ি : ৩১৮

উপরের আলোচনায় দেখতে পারলাম সাহাবিদের (রা.) মাঝে বহু ফিকহি বিষয় মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা যখনই সহিহ সুন্নাহর খবর পেতেন নিজেদের মতভেদ ভুলে সহিহ সুন্নাহর অনুসরণ করেছেন। আর আমাদের অবস্থা হল তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের কেউ কোন সহিহ সুন্নাহর কথা বললে আমাদের আমল পরিবর্তন করে ফিরে আসা প্রায় অসম্বর। আমরা যে মত বা পথের অনুসন করি তা ত্যাগ করা এতই কঠিন যে, তার জন্য জীবন দান করাও সাহস। কাজেই মতভেদ দূর করার একমাত্র পদ্ধতি হল সাহাবিদের (রা.) পথ অনুসরণ করা। তাদের অনুসরণীয় নীতি থেকে দুরে সরে আসার ফলে আমাদের মাঝে মতবিরোধ দিন দিন প্রকট হচ্ছে যার ফলে নতুন নতুন দলের সৃষ্টি হচ্ছে।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা

তাওহীদ না বুঝার কারণে অধিকাংশ মুসলিম শিরকি কাজে জড়িত। সমাজে এমন অনেক শির্ক কাজ আছে যা আহরহ করছে। কোন আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিলেও বলবে আরে এটাতো শির্ক নয়। এর প্রধান কারণ তাওহিদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।

আমাদের সমাজে গাইরুল্লাহ নামে মান্নত করে, আল্লাহ ব্যতীত অলি আওলিয়াদের নিকট ফরিয়াদ করে, সাহায্য তলব করে, আশ্রয় প্রার্থনা করে, কবর-মাজারে সিজদা করে, মৃত ব্যক্তির ক্ষতি বা উপকার করতে পারে তাদের করবের জন্য ভ্রমণ করে তাদের নিকট ফরিয়াদ করে ইত্যাদি। এ সকল শির্ক কাজ সমাজে এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে কেউ যদি সঠিক তাওহীদের কথা বলে তবে তাকেই ভ্রান্ত মনে করা হয়। কারণ সমাজের এই লোকগুলো জম্ম থেকেই শিরকি কাজকে নেক আমল মনে করে পালন করে আসছে। যদি তারা জন্মের পর পরই তাওহীদের সঠিক জ্ঞান পেত তবে তাহলে এমন জঘন্য শিরকই কাজে লিপ্ত হত না। কাজেই আলোচনার এ পর্যায় তাওহীদ সম্পর্কে সামান্য একটু আলোচনা করা হল।

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কিন্তু বান্দা যখন এই ফরজ জ্ঞান অর্জন না করে, তখন সে তওহীদ পরিপন্থি কাজ করে। তাওহীদ পরিপন্থি কাজ করলে তাওহীদবাদীদের সাথে মতবিরোধ হবে এটাই স্বাভাবিক।

তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে বান্দা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়, এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা,  তিনিই সকল ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য, তিনি সর্বতোভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাওহীদের সার কথা এই যে, বান্দা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের রুবুবিয়্যাতে (প্রভুত্বে), উরুহিয়াতে (উপাস্যত্বে) এবং আসমা ওয়াসসিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নামে) একক বলে স্বীকার করবে, কোন শরীক স্থাপন করবে না।

তাওহীদ এর শ্রেণীবিভাগ

উপরের আলোচনার আলোকে বলা যায় তাওহীদ তিন প্রকারে বিশ্বাসের সমষ্টি।

০১. তাওহীদুর রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

০২. তাওহীদুর উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

০৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নাম

এখন এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে জানব :

১. তাওহীদুর রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালক এককত্ত্বঃ

আল্লাহকে তার কর্ম সমূহে একক হিসাবে মেনে নেওয়া। যেমন: সৃষ্টব করা, রিজিক দেওয়া, জীবন-মৃত্যু দান করা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে কাফেরগণ এই ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

২. তাওহীদুর উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক :

ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন: সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান সদকা, দোয়া, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা কারণ এই উদ্দেশেই সকল নবি (আ:) প্রেরণ করা হইয়াছে এবং কিতাব নাজিল করা হইয়াছে।

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নাম :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুণগুলি আচরণগত হোক বা সত্তাগত হোক। [সুত্র: তাফসীরুল উসরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম]

এই হল তাওহীদের সামান্য ধারণা মাত্র। যদি কাহারও তাওহীদের জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা না থাকে সে অবশ্য শিরকই কাজে লিপ্ত হবে অথচ সে মনে করবে সে নেক আমলই করছে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

মক্কার মুশরিকগণ তাওহীদে রুববিয়্যাহ বিশ্বাসী হলেও কাফির-

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কার মুশরিকরা আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালক হিসাবে তার কোন অংশীদার নেই এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছিল। যার বহু প্রমাণ কুরআনুল করিমে মজুদ আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُل لِّمَنِ ٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهَآ إِن ڪُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٤) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (٨٥) قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ ٱلسَّبۡعِ وَرَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡعَظِيمِ (٨٦) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ (٨٧) قُلۡ مَنۢ بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ ڪُلِّ شَىۡءٍ۬ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيۡهِ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٨) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ فَأَنَّىٰ تُسۡحَرُونَ (٨٩)

অর্থঃ তাদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা জানো তাহলে বলো এ পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা বাস করে তারা কার (অধীনে)? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহর৷ বলো, তাহলে তোমরা সচেতন হচ্ছো না কেন?

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, সাত আসমান ও মহান আরশের অধিপতি কে? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ।  বলো, তাহলে তোমরা ভয় করো না কেন?  তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, বলো যদি তোমরা জেনে থাকো, কার কর্তৃত্ব চলছে প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তাঁর মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয়ই বলবে, এ বিষয়টি তো আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত ৷ বলো,তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথায় থেকে? সুরা মুমিনুন : ৮৪-৮৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ والأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيَّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللّهُ فَقُلْ أَفَلاَ تَتَّقُونَ

তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেউবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ!খন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?  সুরা ইউনুস ১০:৩১

এই আয়াতগুলি দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত না। কিন্তু  উলুহিয়্যাত (ইবাদতে (ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত।

আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না বুঝে যে ইবাদাত করছি। সালাত আদায় করছি, সাওম পালন করী, হজ্জ আদায় করছি, যাকাত আদায় করছি, মান্নত পুরা করছি, দ্বারে দ্বারে দাওয়াত দিচ্ছি, কুরআন তি্লওয়াত মুখে ফেনা তুলছি, জিকির করতে করতে বেহুঁশ হচ্ছি, মাজারে দান করছি, জুমা ঘরে ছিন্নি দিচ্ছি, মাজারে পশু মান্নত করছি, মাজারে পশু জবেহ করছি, সুপারিশ লাভের আশায় মাজারে বা পীরকে তাজিমি সিজদাহ দিচ্ছি, মিলাদ মাহফিল করছি, বিভিন্ন প্রকার খতমের আয়োজন করছি, মাজারে ওরস করছি এর কি হবে। আসলে আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না জানার জন্য আল্লাহর ইবাদাতের সাথে গাইরুল্লাহর ও ইবাদাত করছি। অর্থাৎ না বুঝে হলেও গাইরুল্লাহর ইবাদাত করছি যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَمَا يُؤۡمِنُ أَڪۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ

অর্থঃ অধিকাংশ লোক আল্লাহর প্রতি ইমান আনা স্বত্বেও মুশরিক। (ইউসুফ-১২ : ১০৬)

যদি তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না পায় তবে সে শিরকই কাজে লিপ্ত হবে। আমাদের উপমাদেশের প্রায় সকল মুসলিমদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল এবং এখনও তাদের পাশাপাশি বাস করছি। জন্মের সাথে সাথে তাদের আচার আচরণ আমাদের সামাজিক জীবনে একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে আমরা তাদের পূজা পার্বন্যে অংশ গ্রহণ করি এমনকি তাদের এ সকল অনুষ্ঠান সুন্দর করে উদ্‌যাপন করা জন্য চাঁদা প্রদান করি।

অপর পক্ষে যারা তাওহীদের সঠিক জ্ঞান রাখে। তারা সমাজের এ সকল শির্ক কাজ থেকে শতভাগ দুরে থাকার চেষ্টা করে। অনেক সময় এই শির্ককারী অজ্ঞ মুসলিমকে শির্ক থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তখন উভয় পক্ষের মাঝে তাওহীদের জ্ঞানগত অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য থেকেই শুরু হয় শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি। কাজেই বলতে পারি সকল মুসলিম ভাইদের তাওহীদের জ্ঞান থাকলে ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হত না। যদি জম্ম থেকেই সকলে তাওহীদের সঠিক দিক নির্দেশনা পেত তবে অন্তত এ কারণে তাদের মাঝে ফির্কাবাজী মনোভাব তৈরি হত না।

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন

কোন মানুষই শতভাগ সঠিক হতে পারেনা, ঠিক তেমনি কোন দল বা সংগঠন ও শতভাগ সঠিক হতে পারেনা। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের নামে অনেক সঠিক অনুসারী মুসলিম আছে। তাদের কেউই শতভাগ সঠিক নয়। যদি কারও নিকট কোনো প্রকারের বিদআত পাওয়া যায়। সাথে সাথে কাফির, মুশরিক, ইয়াহুদিদের দালাল ইত্যাদি হাজারও বিশেষণ দেয়া হয়। আসলে তার এই বিদআতটি এত বেশী ছিল না যে তাকে কাফির বলা যাবে। কোনো  ভুল হলে সংশোধর করার অধিকার আছে কিন্তু কাফির বলার অধিকার নেই।

এমনি ভাবে আমরা যদি ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েলের প্রতি লক্ষ করি তাহলে দেখব একটি ব্যাপারে দ্বিমত থাকা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এমন অনেক ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েল আছে যার দুটিমতই সঠিক। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে নিজের আমলকে সঠিক ভেবে অন্যদের ভ্রান্ত ভাবি। অনেক সময় নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করি। এ ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ মানুষ নয় অনেক ফির্তাবন্দী আলেমকেও সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করতে দেখা যায়।

সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া না পড়া নিয়ে, রউফুল ইয়াদাইন করা না করা নিয়ে, ফাতিহার শেষে আমিন বলা না বলা নিয়ে এমনকি হাত বাধা স্থান নিয়েও অনেক কে সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করতে দেখি। এর ফলে মানুষে প্রতি মানুষের হিংসার সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন দলে দলে ভাগ হয়। অথচ এই সব আমলে সাহাবি, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীদের মাঝে ভিন্নতা ছিল কিন্তু তাদের মাঝে এই ধরনের আমল নিয়ে দলাদলি ছিল না।

৬। নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

সবচেয়ে বড় মূর্খতা হল নিজের মতামতকে শতভাগ নির্ভুল মনে করা। কাফির ও মুশরিকদের অন্যতম খারাপ দিক হল দ্বীনের মধ্যে বিভক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দলে ভাগ হওয়া। প্রত্যেক দলই তাদোর নিজেদের হক মনে করে এবং নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

مُنِيبِينَ إِلَيۡهِ وَٱتَّقُوهُ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَلَا تَكُونُواْ مِنَ ٱلۡمُشۡرِڪِينَ (٣١) مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَڪَانُواْ شِيَعً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٣٢)

অর্থঃ আল্লাহ অভিমুখী হয়ে এবং তাকে ভয় করো, আর নামাজ কায়েম করো  এবং এমন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না, যারা নিজেদের আলাদা আলাদা দীন তৈরি করে নিয়েছে আর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল। (সূরা রূম : ৩১-৩২)।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরাও বলেন-

 فَتَقَطَّعُوٓاْ أَمۡرَهُم بَيۡنَہُمۡ زُبُرً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٥٣) فَذَرۡهُمۡ فِى غَمۡرَتِهِمۡ حَتَّىٰ حِينٍ (٥٤)

অর্থঃ কিন্তু তাহারা নিজেদের দীনের মধ্যে বহুধা বিভক্ত করিয়াছে। প্রত্যেক দলই তাহাদের নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আনন্দিত। সুতরাং কিছু কালের জন্য উহাদিগকে স্বীয় বিভ্রান্তিতে থাকিতে দাও”। (সূরা মু’মিনূন : ৫৩-৫৪

নবি রাসুলদের জামানা থেকে উম্মত যতই দুরে সরতে থাকবে তাদের মধ্যে আন্দাজ ও অনুমানের পরিমাণ বেড়ে যাবে। সকলেই নিজ নিজ আন্দাজ ও অনুমান কে সঠিক মনে করবে। তাই আমরা দেখি যত নতুন ধর্ম আছে সকলেই তাদের আসল ধর্মীয় দর্শন বিকৃতি করে নতুন ধর্ম রচনা করেছে এবং নিজেদের মূল বা রুট হিসাবে দাবি করছেন। মহান আল্লাহর ভাষায় “প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল, (৩০:৩২)। মহান আল্লাহ যেখানে বলেছেন ফির্কা বা দলাদলির সৃষ্টির নিজ মতামতকে সঠিক জ্ঞান করা সেখান প্রশ্নতোলা মানেই হল জালেমদের অন্তর ভুক্ত হওয়া। এভাবে নিজ মতামত কে সঠিক জ্ঞান করার ফলে অন্যদের মতামত সঠিক হলেও তা প্রত্যাখান করা হচ্ছে এবং ভিন্ন মতামত ধারণ কারীদের মাঝে বিরোধের বিষ বপন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কোন ব্যক্তি যখন নিজের ইমান আমল সঠিক মনে করবে তখন অন্যদের আমলে প্রত্যাখান করবে। এভাবে সকলে যদি একে অপরের ইমান আমল প্রত্যাখান করি তবে সকলের মাঝে মহা বিরোধেন সৃষ্টি হবে। যদি সকলে একই উত্স থেকে ইমান আমলে প্রহন করি তাহলে আর মতবিরোধ থাকবে। নিজের মতামতকে কুনআন সুন্নাহর সামনে অত্মসমর্পণ করি। সকলেই যদি কুনআন সুন্নাহর সামনে অত্মসমর্পণ করি তা হলে সকলে একথা বদ্ধ থাকতে পারব। এর বিন্ন কোন পথ অবলম্বন করলে শত শত মতের মানুষ দ্বারা শত শত ফির্কাবন্ধী হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

উম্মতের মতবিরোধের প্রধান দশটি কারণ : তৃতীয় পর্ব (৭-১০)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি।

২. ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ।

৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন।

৬. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।

. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।

. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।

১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

এখানে শেষের ৪ টি কারণ আলোচিত হলো :

৭। ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি

যুগে যুগে বহু মনীষী ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। তাদের ত্যাগ ও খেদমত ইসলাম আজ এমন পর্যায় উপনীত হয়েছে। আবার এর বিপরীতে অনেক কাজ্জার আছে যারা ইসলামের নাম নিয়ে ব্যাপক শির্ক এ বিদআতের প্রসার ঘটিয়েছেন। এই উভয় শ্রেণির লোকের মৃত্যুর পর তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নানান ফির্কা। যে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ফির্কা বা তরিকার সৃষ্টি হয় তাকে নিয়ে তার ভক্তরা তৈরি করে নানান আজগোবি গল্প কাহিনী এবং তার নামে চালিয়ে দেয় হাজার হাজার মিথ্যা কেরামতি। যাদের ইসলাম, শির্ক এবং বিদআত সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই সেই সকল সরল মনা মানুষগুলি এই বানান আজগুবি গল্প শুনে তার খাটি ভক্ত হয়ে যায়।

যাদের কেন্দ্র করে ফির্কা বা তরিকা বা মাযহাব সৃষ্টি হয় তারা অনেক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে কিছুই জানেনা। এমনকি তাদের মৃত্যুর শত শত বছর পরে তাদের নামে ফির্কা বা তরিকা বা মাযহাব সুষ্টি হয়েছে। আবার এমন অনেক মিথ্যাবাদী লোকও আছে যারা তাদের নিজের জীবন দশায় অনেক বাতিল ফির্কা সৃষ্ট করে গেছেন। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

ইসলামের শুরুর দিকে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে শীয়া ফির্কা, ওয়াছিল ইবনে আতা (মৃত ১৩১ হি.) মুতাজিলা  ফির্কা এবং সীসওয়াহ কাদেরীয়া ফির্কার প্রতিষ্ঠা করেন। এই সকল কাজ্জাবদের প্রায় একক প্রচেষ্ঠায় এই ফির্কাগুলি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। (ইসলামি আকিদাও ভ্রান্ত মতবাদ)

মহান চার মুজতাহিদ আলেমের নামে মাযহাব সৃষ্টি :

মহামতি চার ইমামের নামে মূর্তি সৃষ্টি করা হয়েছে অথচ তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানেনা। তাদের নামে মাযহাব সৃষ্ট করা হয়েছে তাদের মৃত্যুর পর। একটু আলোচনা করলেই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর সাহাবিদের মাঝে ফিকহি বিষয় মতভেদ ছিল কিন্তু উম্মতের ঐক্য নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করেনি। মহান চার খলিফায়ে মুসলমানদের ওফাতের পর ইসলাম ও মুসলিমদের উপর যেমন জুলুম চলছিল, ঠিক তেমনিভাবে কুরআন হাদিস এর চর্চাও চলছিল। সম্মানিত চার ইমাম নিজ নিজ সময়ে স্ব স্ব এলাকায় বড় আলিম হিসেবে খ্যাত ছিলেন। ফলে লোকজন তাঁদেরকে জরুরি মাসআলা-মাসাইল জিজ্ঞাসা করতো। তাঁরাও ফয়সালা দিতেন। ইমামগণের ইস্তেকালের পর তাঁদের ভক্তরা তাঁদের মতামত ও নীতি প্রচার প্রসার করেন। এমনকি গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে থাকেন। এক ইমামের ভক্তরা অন্য ইমামের ভক্তদের সাথে তর্ক-বাহাস করতে থাকেন। এভাবে বিভিন্ন দলে এবং এলাকা কেন্দ্রীক ইমাম ও মুহাদ্দিসদের অনুসরণ শুরু হয়।

কুফা শহর কে কেন্দ্র করে ইমাম আবু হানিফার অনুসরণ চলতে থাকে। মদিনা শহরকে কে কেন্দ্র করে ইমাম মালিক এর অনুসরণ চলতে থাকে। বাগদাদকে কেন্দ্র করে ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল এর অনুসরণ চলতে থাকে। মিশর কে কেন্দ্র করে ইমাম শাফেঈ এর অনুসরণ চলতে থাকে। এভাবে ইমাম সুফিয়ান ছাওরীর, ইমাম লাইছ ইবন সা’দ, ইমাম মুবারক, ইমাম আওযাইসহ প্রায় ১১/১২ জন মুজতাহিদ আলেমের নামে ১১/১২ টি মাযহাবের সৃষ্টি হয়। কিন্তু মজার ব্যাপর হল, এই সকল ইমামদের কেউই মাযহার সৃষ্টি করে নাই এমন কি সৃষ্টি করতেও বলেন নাই। তারা সকলে একনিষ্টভাবে কুরআন ও হাদিসের অনুসারি ছিলেন এবং সমসাময়িক জটিল ব্যপারে ইজতিহাদ করতেন। তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লষণের কারনে সমসাময়িক আলেম ও সাধারণ লোকদের মাঝে তাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, যার প্রভাব পরবর্তী প্রজম্মের পর প্রজম্মের চলেত থাকে। মুসলিমগণ নবুয়ত থেকে যত দূরে যেতে থাকে, তাদের নিকট থেকে কুরআন হাদিস এর চর্চাও কমতে থাকে। আস্তে আস্তে তারা  কুরআন হাদিস বিমুখ হতে থাকে এবং আলেমদের ব্যাখ্যা নির্ভর হয়ে পড়ে। ফলে কুরআন হাদিসের ব্যবহারিক পতন ঘটতে শুরু করে। এরই পটভূমিতে মুসলিমদের মাঝে ফির্কাবন্দী হয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন মুজতাহিদ আলেমকে একমাত্র অনুসরণীয় ভাবতে থাকে। যার যার অনুসারী ইমামের নামে মাযহাব এর সৃষ্ট করে তারই অনুসরণ করতে থাকে। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে শাসকবর্গও এতে জড়িত হয়ে পড়েন। এভাবে কালক্রমে ধীর ধীর প্রচলিত চার মাযহাবের রূপ ধারণ করেছে। ৩১৭ হিজরি আগ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে হানাফী, শাফেয়ী ইত্যাদি বলতেন না বরং স্ব স্ব অনুসরণীয় আলেমদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা করতেন। পরবর্তীতে প্রত্যেকেই নিজের জন্য পৃথক পৃথক দলীয় নাম নির্ধারিত করে নিতেন এবং নিজ অনুসরণীয় আলেমদের নির্দেশ খুঁজে বের না করা পর্যন্ত কোরআন ও হাদিসের ব্যবস্থা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাতেন। সুতরাং মতভেদ দৃঢ়তর হল, মাযহাবের সূত্রপাত হল।

মাযহাবের মহাব্যাধি মুসলমানগণের জাতীয় জীবনে প্রবেশ করায় ইসলামের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন। ৩১৭ হিজরিতে একটি আয়াতের অন্তর্ভুক্ত মাকামে মাহমুদের ব্যাখ্যা নিয়ে বাগদাদে হাম্বলী ও অপর তিন মাযহাবের অনুসারীগণের মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়, এই সংগ্রামে সৈন্য বাহিনী ও জনসাধারণও যোগ দেয় এবং শত সহস্র লোক হতাহত হয়। ৩২৩ হিজরিতে হাম্বলী ও শাফেয়ীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে ৭ বছর পর্যন্ত চলে।

উপমহাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলিম, ভারতবর্ষের বিখ্যাত হাদীস শাস্ত্রবিদ ও হানাফীদের শিক্ষাগুরু যাকে হানাফীরা ভারতবর্ষের ‘ইমাম বুখারী’ বলে থাকেন সেই শাহ আলিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহেলভী (রহ) বলেছেন। তোমরা জেনে রাখ যে ৪০০ হিজরির আগে লোকেরা কোন একটি বিশেষ মাযহাবের উপর জমে ছিল না।  (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ পৃষ্ঠা নম্বর ১২৫)।

ইসলামি আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ (কওমি মাদ্রাসার নিসাবভুক্ত) গ্রন্থের ৪৪৯ পৃষ্ঠায় মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দিন লিখেন হিজরি চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত চার মাযহার ছাড়া অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা হত। কিন্তু অন্যান্য মুজাহিদের মাযহাবগুলো এরূপে সংরক্ষিত হয়নি, যার ফলে সেগুলো অনেক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সংকলিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকবে নি। ফলে চতুর্থ শতাব্দীর পর চার মাযহাব ব্যতীত অন্য কোন মাযহাব অবশিষ্ট থাকেনি। আল্লাহর রহমতে এই মাযহাব চতুষ্টয়ে তাকলীদে শাখসি সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ ৪০০ হিজরির আগে নিজেকে হানাফী, শাফেয়ী বা মালেকী বলে পরিচয় দিতো না। আর চারশো হিজরির অনেক আগে ইমামরা ইন্তেকাল করেন।

আমাদের সমাজে চারটি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের জীবনে আলোচনা করে দেখতে পাই, তারা ইসলামের এক এক জন নক্ষত্র তুল্য ইমাম ও মুজতাহিদ ছিল। প্রতিষ্ঠিত চার ইমামের সময় কাল ছিল নিম্মরুপঃ

আবু হানীফা (রহঃ) জম্ম ৮০ হিজরী এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরী

ইমাম মালেক (রহঃ) জম্ম  ৯৩ হিজরী এবং মৃত্যু ১৭৯ হিজরী

ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) জম্ম  ১৫০ হিজরী এবং মৃত্যু  ২০৪ হিজরী

আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) জম্ম  ১৬৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৪১ হিজরী

অপর পক্ষে বিশিষ্ট হানাফী বিদ্বান শাহ ওলিউল্লাহ দেহেলভী (রহ) এর কথা যদি মেনে নেওয়া হয় যে, ৪০০ হিজরির আগে কোনো মাযহাব ছিল না, এবং ৪০০ হিজরির পরে মানুষেরা মাযহাব সৃষ্টি করেছে। তার মানে এটা দাঁড়ায় যে আবু হানীফার ইন্তেকালের ২৫০ বছর পর হানাফী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম মালেকের ইন্তেকালের ২২১ বছর পর মালেকী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে। ইমাম শাফেরীর ইন্তেকালের ১৯৬ বছর পরে শাফেয়ী মাযহাব এবং ইমাম আহমাদের ইন্তেকালের  ১৫৯ বছর পর হাম্বলী মাযহাব সৃষ্টি হয়েছে।  তাহলে আমরা কি করে বলি যে, চার ইমামের যে কোন একজনকেই মানতে হবে। সর্ব বিষয়ে এক মাযহাবের মাসআলা মতেই চলতে হবে। অন্য কোর ইমামের অনুসরণ করা যাবেনা। মহান ইমাম যাদের নামে আমরা মাযহাব রচনা করেছি, তারাও এই নাম গুলো দেয়নি। মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত চারটি মাযহাব, দল বা ফির্কাহ ইসলামের কোনো নিয়ম বা বিধান মেনে তৈরি করা হয়নি। কারণ ইসলাম ধর্মে কোনো দলবাজি বা ফির্কাবন্দী নেই। মুসলমানদের বিভক্ত হওয়া থেকে এবং ধর্মে নানা মতের সৃষ্টি করা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করা হয়েছে, (সূরা আনাম ৬:১৫৯)। এই মাযহাবগুলো রসুল (সাঃ) এবং সাহাবাদের (রা) সময় সৃষ্টি হয়নি। এমনকি ইমামগণের সময়ও হয়নি।

৮০৯ হিজরিতে কাবার ইব্রাহিমী মুসাল্লাতে দাঁড়াই ইমামতি নিয়ে ১০/১১টি মাজহাবি দলের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ বাঁধে। তাহাতে বহু মুসলমান হতাহত হয়। জাহল বাদশা ফারহা ইবনে বয়কুফ সংঘর্ষ মিটাবার উদ্দেশ্যে বিবাদরত দলগুলির মধ্যে হতে চারটি দলকে কাবার চার পার্শ্বে খাড়া করিয়া দিলেন। অন্যান্য দল এই চার মাযহাবের মধ্যে মিশিয়া গেল। ফলে কাবাঘরের চার কোণে চার মাযহাবের চারখানা ভিন্ন ভিন্ন মুসাল্লাহ তৈরি হইল। প্রতি ওয়াক্তে চার মাজহাবের চার ইমাম চার মুসাল্লায় দাঁড়িয়ে পর্যায়ক্রমে নামাজ আদায় করিতে থাকেন। এই নিয়ম প্রায় ৫০০ বছর পর্যন্ত চালু থাকে।  তখন থেকে এক আল্লাহর দ্বীন এবং মুসলিম জাতির প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র চার ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ল। অর্থাৎ সত্য ধর্মকে চারটি মাযহাবে বিভক্ত করে নবীর দ্বীনে বিপর্যয় ঘটান হল।

যার ফলে চার মাযহাবের অনুসারীগণ চার ইমামের পেছনে ভিন্ন-ভিন্নভাবে জামাতে নামাজ আদায় করেছেন। হানাফী মাযহাবের অনুসারীগণ হানাফী অনুসারীগণ হানাফী মাযহাবের ইমামের পেছনে, মালেকী মাযহাবের অনুসারীগণ মালেকী মাযহাবের ইমামের পেছনে, এভাবে অপর দুটি মাযহাবের অনুসারীগণও তাঁদের স্ব-স্ব মাযহাবের ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করতেন। এই ঘটনার সাড়ে পাঁচশত বৎসর পর সৌদী আরবের বাদশাহ আব্দুল আযীয আল সউদের রাজত্বকালে ১৩৪৩ হিজরিতে বাদশা সাউদ ইবনে আবদুল আযীয তাঁর সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ প্রবেশ করেন। তিনি তখন তিনি হারাম শরিফে সকল মুসল্লিকে একই ইমামের পেছনে একই সাথে জামায়াতে নামাজ আদায়ের নির্দেশ জারি করেন। কাবার হেরেম হতে এ জঘন্য বিদ’আত রহিত করেন। কাবার হেরেম থেকে মূল উৎপাটিত হলেও পৃথিবীর প্রায় সব মুসলিম প্রধান দেশে এই মাযহাবগত বিভক্তি এখনও প্রকটভাবে বিদ্যমান।

ইমরান ইবনু হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

خَيْرُ أُمَّتِي قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ‏”‏‏.‏ قَالَ عِمْرَانُ فَلاَ أَدْرِي أَذَكَرَ بَعْدَ قَرْنِهِ قَرْنَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا ‏”‏ ثُمَّ إِنَّ بَعْدَكُمْ قَوْمًا يَشْهَدُونَ وَلاَ يُسْتَشْهَدُونَ، وَيَخُونُونَ وَلاَ يُؤْتَمَنُونَ، وَيَنْذُرُونَ وَلاَ يَفُونَ، وَيَظْهَرُ فِيهِمُ السِّمَنُ ‏

আমার উম্মাতের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। অতঃপর তৎপরবর্তী যুগ। ‘ইমরান (রাঃ) বলেন, তিনি তাঁর যুগের পর দু’যুগ অথবা তিন যুগ বলেছেন তা আমার স্মরণ নেই। অতঃপর এমন লোকের আগমন ঘটবে যারা সাক্ষ্য প্রদানে আগ্রহী হবে অথচ তাদের নিকট সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। বিশ্বাস ভঙ্গের কারণে তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করবে না। তারা মানত করবে কিন্তু তা পূরণ করবে না। তারা হবে চর্বিওয়ালা মোটাসোটা। সহিহ বুখারী : ৩৬৫০, ৬৪২৮

এই তিনটি যুগ যেহেতু শ্রেষ্ঠ এবং তাদের মাঝেও মতভেদ ছিল কিন্তু তারা মাযহাব সৃষ্টি করেননি। তাদের পরে অনেক মুহাদ্দিস বহু সহিহ হাদিস সংকলন করেছেন, কিন্তু তাদের নামে মাযহাব তৈরি করতে বলেনি। অথচ চার নাম মহান মুজতাহিদ আলেম ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে তাদেরই নামে মাযহাব সৃষ্টি করা হল।

৮। সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা:

আমরা হয়ত অনেক সময় অনুমান করে বলে থাকি কালের আবর্তে মানুষেরা আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে নিজ নিজ ধর্মে সৃষ্টি করেছে। মহান আল্লাহ কিন্তু কুরআনে সঠিক কথা বলে দিয়েছেন যে, পরিপূর্ণ তাওহীদের আলোকেই মানুষ ধর্ম সূচনা করে  আদম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে। কারণ মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম তাকে সৃষ্টি করেছিলেন তাকে প্রকৃত সত্যের জ্ঞান দান করেছিলেন এবং তাকে সঠিক তাওহীদের জ্ঞান দিয়েছিলেন। তারপর থেকে দীর্ঘকাল পর্যন্ত বনী আদম সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তখন তারা একটি উম্মাত ও একই দলভুক্ত ছিল। কালের আবর্তে তারা তাওহীদ ভুলে যায়  এবং আন্দাজ ও অনুমানের ভিত্তিতে তারা নতুন নতুন পথ ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে থাকে। তাদের আবার সঠিক তাওহীদের জ্ঞান দান করে ইহকাল ও পরকালের অনিষ্টকারিতা থেকে মুক্তিদানের লক্ষ্যে মহান আল্লাহ নবি পাঠাতে শুধু করেন। মানুষের সামনে তাদের হারানো সত্যপথ সুষ্পষ্ট করে তুলে ধরে তাদেরকে পুনরায় একই উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হতভাগ্য আদম সন্তান সত্য ও সঠিক বুঝান পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে সত্য কে অস্বীকার করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবি পাঠানোর উদ্দেশ্য হল, তাওহীদের সত্য প্রকাশ করা। কিন্তু মহন আল্লাহর আয়াত বলছে সত্য প্রকাশ করার পরও তারা শুধু জেদ এবং বিদ্বেষের বসিভুত হয়ে মতভেদ করে থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللّهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلاَّ الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن بَعْدِ مَا جَاءتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللّهُ الَّذِينَ آمَنُواْ لِمَا اخْتَلَفُواْ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللّهُ يَهْدِي مَن يَشَاء إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ*

অর্থঃ সকল মানুষ একই জাতি সত্তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা পয়গম্বর পাঠালেন সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকরী হিসাবে। আর তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করলেন সত্য কিতাব, যাতে মানুষের মাঝে বিতর্কমূলক বিষয়ে মীমাংসা করতে পারেন। বস্তুত কিতাবের ব্যাপারে অন্য কেউ মতভেদ করেনি; কিন্তু পরিষ্কার নির্দেশ এসে যাবার পর নিজেদের পারস্পরিক জেদবশত, তারাই করেছে, যারা কিতাব প্রাপ্ত হয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ ঈমানদারদেরকে হেদায়েত করেছেন সেই সত্য বিষয়ে, যে ব্যাপারে তারা মতভেদ লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা, সরল পথ বাতলে দেন। সুরা বাকারা : ২১৩

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরও বলেন

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوْتُواْ الْكِتَابَ إِلاَّ مِن بَعْدِ مَا جَاءهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ*

অর্থঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম। এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশত। সুরা আল ইমরান ৩:১৯

৯। সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে

ভারত উপমহাদেশে পীরের আস্তানা বা খানকা মাধ্যমে শির্ক প্রচারের পাশাপাশি ইসলামও প্রচার লাভ করে। কিন্তু এই সকল আস্তানা বা এলাকা অনেক হিন্দু মুসলিম বানালেও খাটি মুসলিম বানাতে পারে নাই। বরং বানিয়োছে মুশরিক মুসলিম। এই সকল আস্তানা বা খানকা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন কোন না কোন সুফি তরিকার লোক। তাই এদের আমলের শিরকের পাশাপাশি আকিদার শির্ক ও পরিরক্ষিত হয়। আমাদের উপমহাদেশের সুফিগণ প্রচুর শির্ক আকিদা প্রষোণ করে। এ আলোচনার শুরু যে দশটি ভ্রান্ত আকিদা আলোচনা করা হয়েছে তার সবগুলিই সুফিদের মাঝে বিরাজমান। এই ভ্রান্ত আকিদাগুলি তারা আস্তানা বা খানকা আশ্রয় করেই প্রচার করে। তাই তো অনেক জ্ঞানী মনে করেন, ইসলাম মন্দিরে বা গির্জায় যত টুকু অসম্মান হয়েছে তার চেয়ে বেশী অসম্মান হয়েছে এই আস্তানা বা খানকা। এর সত্যতা ও পাওয়া যায় এখানকার আচার আচরণ লক্ষ করলে। এই সকল আস্তানা বা খানকায় পীরের মৃত্যু বার্ষিকী কে কেন্দ্র করে দুটি ঊরশ করা। কোন কোন পীরের আস্তানায় পুরুষ ও মহিলা সহাবস্থান করে নাচ, গান, জুয়া ও মদের আসর বসায়। তারা  পীরের মৃত্যুর পর তার কবর পাকা করা সেখানে গম্বুজ তৈরি করে থাকে। পীরের কবরের নিকট ঊরশ উপলক্ষ্যে সিরনি, মিষ্ট, গরু, ছাগল, সবজি ইত্যাদি মান্নত করে। এমনকি সেখানে নিয়মিত শির্ক মিশ্রিত মারেফাতি গানের আয়োজন করা হয়। এই সকল মাজারের খানকায় প্রায়ই বড় বড় আওয়াজে হু হু হু হু শব্দে আল্লাহকে ডাকে এবং তাদের পীরের ধ্যান করে।  কোনো পীরের কবরকে সিজদার স্থান বানিয়েছে। তাদের বিদআতি কাজ কর্মের উপর ভিত্তি করে তারা তাদের মধ্যেও বিভক্তি সৃষ্টি করেছেন।

সত্যিকারের মুসলিম যখনই এই সকল শির্ক ও বিদআতি কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে তখনই উম্মতের মাঝে বিভক্তির বিষ বপন হয়। সুফিদের উত্থানের ফলে শিরক ও বিদআতি আমলেরও উত্থান ঘটে। সুফিদের বিভিন্ন তরিকা আছে। এক এক তরিকার লেবাস বা পোশাক এক এক ধরনের। তাঁর আমলের মাঝেও পার্থক্য দেখা যায়। তাদের এই ভিন্নতার জন্য তাদের মাঝেও শত শত তরিকা বা ফির্কা বিদ্যমান। তাদের মাঝের এই ফির্কাবাজিও ইসলামকে টুকরা টুকরা করে ছেড়েছে। অনেক মুসলিম তাদের এ সকল শির্ক ও বিদআতি আমল ইলমের সাহায্য প্রত্যাখান করে। ফলে বিদআতিদের সাথে সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন লোকদের বিবাধ বাধে। এভাবে সুফিগন প্রকৃত আলেমদের নিকট থেকে দুরা সরে যায় আর সুফিবাদী ফির্কার উৎপত্তি হয়। মূলত বিদআতের ভিন্নতার কারণে তাদের তরিকাও ভিন্ন। নিম্ন তাদের কিছু তরিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

(১) বিভিন্ন সুফিদের নামে তরিকা সৃষ্টি

বিদআতি আমলের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীতে আজ হাজার হাজার তরিকা বিদ্যমান। এই তরিকার নামে ইসলাম ধর্মকে টুকরা টিকরা করে ছেড়েছে। এক এক তরিকার আমল এক এক প্রকারের তাদের আকিদাগত মতবিরোধের সাথে আকিদাগত ভ্রান্তি আছে। ইলমুল কালামের ক্ষেত্রে আশরারি ও মাতুরিদি মতবাদ নামে ফির্কা সৃষ্টি হয়েছে, ইলমে ফিকহের ক্ষেত্রে হানাফি, মালেকি, শাফেঈ ও হাম্বলি মাজহাব নামে ফির্কা সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক এলমে তাসাউফের ক্ষেত্রেও সুফিদের ভিন্ন ভিন্ন রীতি পদ্ধতি রয়েছে এটাকেই বলা হয় তরিকা। এলমে ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন প্রসিদ্ধ চার মাজহাবের ইমামদের নামানুসারেই মাজহাবের নামকরণ করা হয়েছে, তেমনি এলমে তাসাউফের তরিকাগুলোকেও বিশেষ সুফিসাধকদের নাম দ্বারা নামকরণ করা হয়েছে।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচরণ স্থান মক্কা মনীনায় কোন যুগেই সুফিদের প্রভাব ছিল না এবং আজও নেই। সুফিদের নামে সুফিবাদ বর্তমান সমাজে চালু আছে তাদের উৎপত্তি ও উৎকর্ষ লাভ করে পারস্যে (ইরান)। সেখানকার প্রখ্যাত সুফি দরবেশ, কবি-সাহিত্যিক এবং দার্শনিকগণ নানা শাস্ত্র, কাব্য ও ব্যাখ্যা-পুস্তক রচনা করে এই দর্শনকে সাধারণের নিকট জনপ্রিয় করে তোলেন। কালক্রমে বিখ্যাত সুফিদের অবলম্বন করে নানা তরিকা গড়ে ওঠে। স্থান ও কাল অনুযায়ী অসংখ্য সুফী তরিকা আত্ম প্রকাশ করার কারণে এর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। চরমোনাই পীর সৈয়দ মোঃ ফজলুল করীম সাহেব ভেদে মারেফত বা ইয়াদে খোদা কিতাবে ১২৬ তরিকা থাকার কথা বলেছেন। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য সুফী তরিকা আত্মপ্রকাশ করেছে। তার মধ্যে নিম্নের কয়েকটি তরিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায়ই সুফী তরিকার পীর ও মুরীদদের মুখে এ সমস্ত তরিকার নাম উচ্চারণ করতে শুনা যায়। এ সমস্ত তরিকা হচ্ছে-

ক। কাদেরিয়া তরিকা, খ. চিশতিয়া তরিকা,  গ। মাইজভান্ডারিয়া তরিকা, গ। মুজাদ্দিদিয়া তরিকা, ঙ।  নকশবন্দিয়া তরিকা  এবং চ। সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া তরিকা।

এই সকল তরিকা যাদের নামের তাদের সাথে সম্পৃক্ত, তারা তারা এই তরিকা প্রতিষ্ঠিত করতে কতটুকু দায়ী ছিলেন তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা কঠিন। তবে অধিকাংশ সুফিগণই তরিকা সৃষ্টির জন্য যে সকল উপদান দরকার তা সরবরাহ করে গিয়েছেন। শুধু বড় পীর ক্ষেত আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ কোন তরিকা সৃষ্টি করেনি বলে জানা যায়। তার মৃত্যুর পর তার ভক্তরাই তার নামে কাদেরীয়া তরিকা প্রতিষ্ঠাতা করেছেন।

ক। কাদেরিয়া তরিকা : 

আব্দুল কাদের জিলানী হলেন ইসলাম ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ইসলামের অন্যতম প্রচারক হিসেবে সুবিদিত। হজরত আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ ‘বড়পীর’ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তিনি ০১ রমজান ৪৭১ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদ নগরের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন।  হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউসসানী আব্দুল কাদের জিলানী রাহিমাহুল্লাহ পরলোক গমন করেন। বিদাআতি মুসলিমগণ প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার মৃত্যু দিবস পালন করে যার নাম দিয়েছে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহাম। তার নামে সবচেয়ে বেশি শির্ক মিশ্রিত কল্প কাহিনী সমাজে প্রচলিত আছে। তার নামেই কাদেরিয়া বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

খ। চিশতিয়া তরিকাঃ

মইনুদ্দিন চিশতী হলেন চিশতীয় ধারার ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক। তিনি গরিবে ‘নেওয়াজ’ নামেও পরিচিত। ১১৩৮ ইংরেজিতে (৫৩৭ হিজরী) মধ্য এশিয়ায় খোরাসানের অন্তর্গত সিস্তান রাজ্যের সানজার নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি বোখারা থেকে নিশাপুরে আসেন। সেখানে চিস্তিয়া তরিকার অপর প্রসিদ্ধ ছুফি সাধক খাজা উসমান হারুনীর নিকট মুরীদ হন। তার সেবায় ২০ বছর একাগ্রভাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরে উসমান হারুনী তাকে খেলাফত বা ছুফি প্রতিনিধিত্ব প্রদান করেন। মঈনুদ্দীন চিশতী ৬৩৩ হিজরির ৫ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ৬ রজব সূর্যোদয়ের সময় ইন্তেকাল করেন। ভারতের আজমীরে তাকে দাফন করা হয় এবং এ আজমিরে হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি এর মাজার অবস্থিত। মোগল সম্রাট আকবর তার মাজার শরিফ বেষ্টনী করে একটি সুরম্য সমাধিসৌধ নির্মাণ করে দেন। ৯৭৮ হিজরিতে বাদশাহ আকবর খাজা সাহেবের মাজার সংলগ্ন স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি সাদা ও লাল মর্মর পাথরে নির্মিত। প্রতিবছর ১লা রজব হতে ৬ রজব পর্যন্ত আজমিরে তার সমাধিস্থলে উরস অনুষ্ঠিত হয়। আজমীর শরীফ কালক্রমে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলে এখানে আসেন দর্শক হিসেবে। কিছু অজ্ঞ পীর পন্থী মুসলীম এখানে আসে তাদের মনের আশা পূরণ করতে। তারা মনে করে আজমীর হল শ্রেষ্ঠ রুহানী রাজধানী এবং  ফয়েজ বরকত হাসিলের মারকাজ অথচ এসব কারণে তারা ইসলাম ও মুসলিম থেকে খারিজ হয়ে যায়। ভারতবর্ষে শিরক ও পৌত্তলিক জাহিলিয়াতের অন্ধকারের সাথে তারা মিলেমিশে শির্ক কাজ করে ইসলামের নামে। তারা মুসলিম দাবি করে কিন্তু ইসলামের নামে বিদআতও করে থাকে।  মইনুদ্দিন চিশতী নামে চিশতিয়া তরিকা সমাজে প্রচলিত আছে এবং তরিকা প্রতিষ্ঠা করার পিছনে তার সরাসরি ভূমিকা লক্ষণীয়।

গ। মাইজভান্ডারিয়া তরিকা :

মাইজভান্ডারি দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা শাহসূফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর। কথিত আছে, তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ হামিদ উদ্দীন গৌড়ি ১৫৭৫ সালে ইসলাম প্রচার মানুষে চট্টগ্রামে আগমন করেন। এবং পটিয়া থানার কাঞ্চননগরে বসতি স্থাপন করেন। তার এক পুত্র সন্তান সৈয়দ আবদুল কাদের ফটিকছড়ি থানার আজিম নগরে ইমামতির দায়িত্ব নিয়ে বসতি স্থাপন করেন। তার প্রপৌত্র মওলানা সৈয়দ মতি উল্লাহর পবিত্র ঔরসে শাহসুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার মাইজভান্ডার শরীফ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ৭৯ বছর বয়সে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। প্রতি বছর ৮, ৯ ও ১০ মাঘ তার ওফাত দিবস উপলক্ষ্যে ৩ দিনব্যাপী ওরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশবিদেশের লক্ষ-লক্ষ মাইজভান্ডারিয়া তরিকার ভক্তের সমাগম ঘটে। এই ভণ্ড কাজ্জাব নিজেই মাইজভান্ডারিয়া তরিকা তরিকা প্রতিষ্ঠা করে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের ঈমান নষ্ট করে চলছে।

ঘ। মুজাদ্দিদিয়া তরিকা :

মুজাদ্দিদে আলফে সানির পুর নাম ছিল, শাইখ আহমেদ আল ফারুকি সিরহিন্দি। তাকে অনেক একজন ইসলামি পণ্ডিত হিসাবেও চিনে। তিনি ফিকহের ক্ষেত্র হানাফি মাযহার অনুসরণ করতেন এবং তরিকার ক্ষেত্র নকশবন্দি সুফি তরিকার অনুসারী করতেন। তাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি বলা হয় যার অর্থ “দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক”। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরোধীতার জন্য তিনি অধিক পরিচিত। মুজাদ্দিদে আলফে সানি ১৫৬১ সাল মোতাবেক ৯৭১ হিজরির জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৬২৪ সালে মারা যান। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। ভারতের সিরহিন্দে তার মাজার অবস্থিত। তিনি নকশবন্দি তরিকার অনুসারী হলেও পরে তার নামেই মুজাদ্দিদিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ঙ। নকশবন্দিয়া তরিকা :

শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী (রঃ) বোখারার সন্নিকটে কাসরে আরেফান নামক স্থানে ৭১৮ হিজরি সনের মহররম মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল হজরত জালানুদ্দীন।

শেখ বাহাউদ্দিন মোহাম্মদ নকশবন্দী ৭৯১ হিজরিতে ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তার মাজার  কাসবে আরেফানে অবস্থিত। তাকেই নকশবন্দী তরিকার প্রতিষ্ঠানা মনে করা হয়।

চ। সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া তরিকা :

সাধক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ১১৪৫ সালে তার জন্ম হয়। তার জম্ম নিয়ে অনেক ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পাওয়া যায়। তিনি মোসেলের নিকটবর্তী ইরবিলে হিজরি ৬০৮ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং হিজরি ৬৮১ সালে ৫৩ বছর বয়সে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন। কারো কারো মতে, তার জীবনকাল ঈসায়ী ১২১১ হতে ১২৮২ সাল পর্যন্ত। বাংলা ভাষায় সুফীতত্ত্বের ওপর প্রচুর বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এবং তরিকতের আলোচনায় সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকার বর্ণনাও স্থান পেয়েছে। কথিত আছে এই বিখ্যাত সাধক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী ১২৩৪ সালে তার মৃত্যু হয় তবে এর সত্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তার নামেই সুহ্‌রাওয়ার্দিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করা হয়।

যে সকল তরিকাসমূহ উল্লেখ করা হল এ ধরনের কিছু ইসলামে নেই, অথবা এর কাছাকাছিও কিছু নেই। এই ধরনের তরিকা সৃষ্টি করা ইসলাম পরিপন্থি কাজ। কাল কিয়ামতের দিনে অবশ্যই মহান আল্লাহ নিকট জবার দিহি করতে হবে। কুরআন হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী এক দল বাদে সকলেই ভ্রান্ত দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। হাদীস যেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন, “ইহুদিরা একাত্তর ফিরকাহ’য় বিভক্ত হয়েছে এবং খ্রিস্টানেরা হয়েছে বাহাত্তর ফিরকায়। আমার উম্মাহ বিভক্ত হবে তিহাত্তর ফিরকা হবে। আর এদের প্রত্যেকটি হবে জাহান্নামি একটি ব্যতীত। জানতে চাওয়া হল, “তারা কারা, হে আল্লাহর রাসূল?” এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমার উম্মাহর একটি দল সত্যের অনুসরণ করতে থাকবে এবং বিজয়ী হবে, এবং তাদের যারা অভিশাপ দেয় কিংবা বিরোধিতা করে তারা সেই দলটির কোন ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর ফরমান নাজিল হয়। মনে রাখতে হবে ‘সত্য’ আছে কুরআন এবং সহিহ হাদীস অনুসরণের মধ্যে। এটাই আল্লাহর পথ, এবং সরল পথ। মহান আল্লাহ বলেন,

وَكَذَٲلِكَ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ رُوحً۬ا مِّنۡ أَمۡرِنَا‌ۚ مَا كُنتَ تَدۡرِى مَا ٱلۡكِتَـٰبُ وَلَا ٱلۡإِيمَـٰنُ وَلَـٰكِن جَعَلۡنَـٰهُ نُورً۬ا نَّہۡدِى بِهِۦ مَن نَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِنَا‌ۚ وَإِنَّكَ لَتَہۡدِىٓ إِلَىٰ صِرَٲطٍ۬ مُّسۡتَقِيمٍ۬ (٥٢) صِرَٲطِ ٱللَّهِ ٱلَّذِى لَهُ ۥ مَا فِى ٱلسَّمَـٰوَٲتِ وَمَا فِى ٱلۡأَرۡضِ‌ۗ أَلَآ إِلَى ٱللَّهِ تَصِيرُ ٱلۡأُمُورُ (٥٣)

অর্থঃ এভাবেই আমি আপনার প্রতি ওহি প্রেরণ করেছি, কুরআন আমার নির্দেশ। আপনিতো আদৌ জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি। কিন্তু সেই কুরআনকে আমি একটি আলো বানিয়ে দিয়েছি যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা পথ দেখিয়ে থাকি৷ নিশ্চয়ই আপনি এর সাহায্যে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করে থাকেন। সেই আল্লাহর পথ যিনি, যা কিছু আছে আসমানে ও যা কিছু আছে জমিনে তার মালিক। জেনে রাখ, যাবতীয় বিষয় সেই আল্লাহর সমীপে প্রত্যাবর্তন করে। (সুরা আশ-শুরা ৪২:৫১-৫৩)।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগ থেকে ইসলাম যতই দুরে যাচ্ছে কুরআন ও সহিহ হাদিসের পরিবর্তে ততই সুফিবাদের ধ্যানধারণা এবং বিজাতীয়দের আমল আখলাক মুসলিমদের মাঝে প্রসার লাভ করে। বিজাতির নোংরা রীতি-নীতির জালে আটকা পড়ে ইসলাম তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। আর হাজার হাজার শিরকি আকিদা ও বিদআতী রীতি-নীতির ইসলামে ঢুকে পড়েছে। সমাজের অজ্ঞ লোকেরা এর বিষাক্ত থাবায় ঈমান হারাচ্ছে। এভাবে মানুষ সরল পথ ছেড়ে বাঁকা পথ ধরছে।  একক তরিকা বাদ দিয়া হাজারও তরিকা তালাশ করছে।

১০। মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়

মাজার কেন্দ্রিক আমল কে কেন্দ্র করেও ইসলাম আজ হাজার হাজার ফির্কাবন্দী। ইসলামে মাজার বা করব কেন্দ্রিক কোনো আমলের স্থান নেই। তাই যখনই কোন মুসলিম মাজারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে এবং ইহাকে ইসলামি শরীয়তের আমল বলে দাবি করে তখন মূল ধারার কুরআন সুন্নাহ আলেমদের সাথে মতবিরোধ বাধে। অধিকাংশ মাজার পন্থীদের আকিদা ভ্রান্ত তাই তাদের নিজেদের মাঝেও বিভিন্ন ফির্কায় বিভক্ত। তারা মনে করে তাদের কল্পিত অলি,  আওলিয়া, পীর কবরে আমাদের মতই জীবিত আছেন।  তারা মানুষের ভালো মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন। তারা মরার পরও বিপদে আপদে সাহায্য করতে পারে এমনকি মরার পর তাদের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। তাই তারা তাদের পীর বা অলি আওলিয়াদের আহ্বান করে এবং তাদের কবরের নিকট গিয়ে কোন কিছু বিপদে থেকে উদ্ধার কামনা করে। তোদের পীরদের মাঝে আবার যারা গাউস, কুতুব, আবদাল, নকিব ইত্যাদি উপাধি পেয়েছেন তারা আরও বেশি হাজত পুরা করতে পারে। এই জন্য তারা তাদের অলি-আওলিয়া ও তরিকার মাশায়েখদের কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ, তাতে বাতি জ্বালানো, কবর ও মাজার জিয়ারত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে থাকে। সেখানে তারা তাদের আহ্বান করে জরুরত পুরা করার জন্য দোয়া করে। অথচ দোয়া বা ফরিয়াদ শুধু আল্লাহর জন্যই খাস।

এভাবে তারা কবর কে মাজার (দর্শনীয় স্থান) এ পরিণত করে। আর হাজার হাজার ভক্ত তাদের ফরিয়াদ নিয়ে মাজারে শায়িত ব্যক্তির নিকট ফরিয়াদ জানাতে আসে। হিন্দুরা যেমন সিজদা দ্বারা তাদের  দেবীকে খুসি করে ঠিক তেমনি অনেকে মাজার ভক্ত মুসলীম মাজারে সিজদা করে তার দ্বারা শায়িত ব্যক্তিকে খুশি করে তার সুপারিশের মাধ্যমে আল্লাহ সন্তুষ্টি কামনা করে যা তাদের হিন্দু বা  মুশরিক বানিয়ে দিয়েছে। যে মুসলীম এদের মুশরিক ভাবতে পারবে না, সে তাদেরই সমর্থক হবে। এভাবে মাজার কেন্দ্রিক তারা উরশ এর আয়োজন করে, মাজার কে কাবার মত তাওয়াফ করে। মাজার কেন্দ্রিক কিছু আমল আছে যা সরাসরি কুরআন হাদিসর বিপরীত। এখান থেকেই সত্যপন্থি মুসলিমদের সাথে তাদের বিরোধ বা বিভক্তির সূত্রপাত হয়।

ক। প্রথম উদাহরণ :

আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

قَاتَلَ اللَّهُ الْيَهُودَ اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ

আল্লাহ তা’য়ালা ইয়াহূদীদের ধ্বংস করুন। তারা তাদের নবিদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৪৩৭

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, উম্মে হাবীবা ও উম্মে সালমা (রা.) হাবশায় তাঁদের দেখা একটি গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তাঁরা উভয়ে বিষয়টি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেন-

إِنَّ أُولَئِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا، وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، فَأُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ‏

তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামতের দিন তারাই আল্লাহর কাছে সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টি বলে গণ্য হবে। সহিহ বুখারি  : ৪২৭

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে মসজিদকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরি করতে নিষেধ করেছেন। সেখানে বিদআতিগণ মসজিদকে কেন্দ্র করে মাজার তৈরি করে সত্যিকারের মুসলিমদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হয়ে আতঙ্ক তৈরি করছে।

খ। দ্বিতীয় উদরাহরণ-

আবূ হুরাইরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ قُبُورًا، وَلَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيدًا، وَصَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ تَبْلُغُنِي حَيْثُ كُنْتُمْ

তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত করো না এবং আমার কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত করো না। তোমরা আমার উপর দোয়া পাঠ করো। তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হবে। সুনানে আবু দাউদ : ২০৪২

এই হাদিসে কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত নিষধ করা হয়েছে, তারপরও পীরভক্ত মানুষ এই কাজ করে নেকীর আশায় করে থাকে। তারা ইসলাম বিরোধী কাজ করে মহান আল্লাহ স্বন্তষ্টির আশায় মাজারে উরস করে থাকে।

গ। তৃতীয় উদরাহরণ-

ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم زَائِرَاتِ الْقُبُورِ وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারতকারিণী মহিলাদের উপর লা’নত করেছেন। আর যারা কবরের উপর মসজিদ বানায় এবং বাতি জ্বালায়, তাদের উপরও তিনি অভিসম্পাত করেছেন। সুনানে আবু দাউদ : ৩২৩৬ হাদিসের মান জঈফ

আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَائِرَاتِ الْقُبُورِ وَالْمُتَّخِذِينَ عَلَيْهَا الْمَسَاجِدَ وَالسُّرُجَ. رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ وَالنَّسَائِيّ

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন ঐ সকল স্ত্রী লোককে যারা (ঘন ঘন) কবর জিয়ারত করতে যায় এবং ঐ সব লোককেও অভিশাপ দিয়েছেন যারা কবরের উপর মাসজিদ নির্মাণ করে বা তাতে বাতি জ্বালায়। মিশকাত : ৭৪০, সুনানে তিরমিজি : ৩২০, সুনানে নাসায়ী : ২০৪৩ হাদিসের মান জঈফ

উক্ত হাদিসে সুষ্পষ্ট বলা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরে বাতি প্রজ্জ্বলনকারীর উপর আল্লাহ তায়ালার অভিশম্পাত বর্ষিত হয়। অথচ মাজার ভক্ত লোকের এই কাজর করে সত্যপন্থি মুসলিমদের সাথে বিরোধে লিপ্ত হবে। নতুন বিদআতি ফির্কার জম্ম দিচ্ছে।

মাজার কেন্দ্রিক এই শির্ক ও বিদআতি আমলের সাথে ইসলামে কোনো সম্পর্ক নেই। যারাই এই ধরনের বিদআতি আমলের সাথে জড়িত তাদের সাথে সঠিক পথের অনুসারীদের সংঘর্ষ অনিবার্য। এ সকল বিদআতী আমলের কারণে কবর পূজারি এবং মাজার ব্যবসাই নামে নতুন একটি ফির্কার সৃষ্টি হয়,  যারা নিজেরা বিভ্রান্ত এবং সাথে সাথে অন্যদের বিভ্রান্ত করে তাদের ফির্কা ভারি করে।

মতবিরোধ প্রতিরোধে বারটি করণীয় আমল : প্রথম পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুসলিম উম্মার মাঝে বিভিন্ন দল সৃষ্টির ফলে আজ আমাদের এমন করুন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের দিকে দৃষ্টি দেই আর আমাদের দেশের দিকে দৃষ্ট দেই, সকল স্থানেই আমাদেরকে মাঝে বিভেদ আর বিশৃঙ্খলা বেড়া জাল দ্বারা আটকে রেখেছে। এই বইটিতে উম্মতের মতবিরোধের কুফল ও কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। এই পর্যায় মতবিরোধ দূর করার জন্য আমাদের করণীয় কাজসমূহ উল্লেখ করব, (ইনশাআল্লাহ)। মতবিরোধ দুর কারণে আমাদের করণীয় প্রথম ও প্রধান কাজ হল- যে সকল কারণে বিভক্ত সৃষ্ট হয়েছে তা পরিহার করা। বিভক্তির কারণ হিসেবে প্রথমে উল্লেখ করেছিলাম উম্মতের মাঝে আকীদার ব্যাপারে ব্যাপক মতভেদ আছে এবং সে সম্পর্কে আলোচনাও করেছি। প্রথমে আমাদের সালাফদের গৃহীত শির্ক বর্জিত, সহিহ ও সঠিক আকিদা অনুসারী হতে হবে। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে ব্যাপক মতভেদ থাকলেও তারা সাহাবিগণের পদ্ধতি অনুসরণ করে মতভেদের ব্যাপারে ব্যাপক প্রশস্ততা দেখিয়েছেন। তারা কোনো স্পষ্ট বিষয়ে মতভেদ করেনি। কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষা, পরস্পর বিরোধী হাদিস, হাদিস না জানার জন্য মতভেদ করতেন কিন্তু যখনই কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট দলিল পেতেন নিজের মতামত ছেড়ে দিতেন। মুজতাহিদ আলেমদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল- তারা তাদের কোন ইজতিহাদকে শতভাগ সঠিক মতে করতেন না, তাই তারা হাদিস পেলে ইজতিহাদ ছেড়ে হাদিসের অনুসরণ করতে বলতেন। অপর পক্ষে তারা অন্য মুজতাহিদ আলেমের রায়কেও সম্মান দেখাতেন। এই কারণে মুজতাহিদ আমাদের মাঝে ব্যাপক মতভেদ হলেও তাদের মাঝে মতবিরোধ বা দলালদি হয়নি। কাজেই আমাদেরও ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েলে প্রশস্ততা দেখাতে হবে। উম্মতে মাঝে তাওহিদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা ব্যাপক। তারা যেন তাওহীদের সঠিক অর্থ বুঝে সঠিক বিশ্বাস নিয়ে চলতে পারে তার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে তাওহীদের সঠিক শিক্ষা প্রদান করতে হবে। ইমাম জুমার খুতবায়, বক্তাগণ তাদের বিভিন্ন বক্তৃতায়, লেখকগণ তাদের লেখায় তাওহীদের সঠিক মর্মবাণী তুলে ধরতে হবে। উপমহাদেশে সুফিদের পরিচালিত কর্মকাণ্ড যতটুকু শির্ক বা বিদআত আছে তা সম্মানের সাথে যুক্তি সংগতভাবে তুলে ধরতে হবে, তা না হলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। কারণ সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করলে কেউ আপনার সঠিক কথায় মূল্যায়ন করবে না। এ কথা বলেও তৃপ্তির ঢেকুল গেলা যাবেনা যে, আমার নিজের মতামত শতভাগই নির্ভর। আমাদের দেশে মাজার ভক্তের সংখ্যা একেবারে কম নয়। মাজার ভক্তের অধিকাংশই অশিক্ষিত। তাই তাদের মাজার কেন্দ্রিক আমল সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে। এক কথায় বিভক্তির কারণ থেকে করণীয় আলোচনা করা হল। ইহার পাশাপাশি মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে আমাদের নিম্নের কাজেগুলি করত হবে তবেই মতবিরোধ বা দলাদলি থেকে মুক্তি পাব। মতবিরোধ থেকে মুক্তি জন্য আমাদের করণীয় হল-

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

০৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

এখানে প্রথম চারটি আলোচিত হলো :

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

ঐক্য বজায় রাখা ফরজ। ঐক্য মুসলিম জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আল্লাহ তায়ালা ও  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমানের অনিবার্য দাবি হচ্ছে- ঐক্যবদ্ধ জীবনযাপন।    তাওহিদের পরে মুমিনদেরকে যে ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি তাগিদ দেওয়া হয়েছে তা হলো- ঐক্য। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا ۚ وَكُنْتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا ۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ

“তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা আল্লাহর সেই অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে মিল সৃষ্টি করেছিলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। সুরা আলে ইমরান : ১০৩

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

অর্থ : তিনি তোমাদের জন্য সেই ধর্ম নির্ধারণ করেছেন যা নূহকে আদেশ দিয়েছিলেন, যা আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি, এবং যা ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে আদেশ দিয়েছিলাম। ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে বিভক্ত হয়ো না। সূরা শুরা : ১৩

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোশ মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।সুরা হুজুরাত : ১০

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। তা না হলে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের শক্তি ক্ষীণ হয়ে যাবে। ধৈর্য ধারণ করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। সুরা আনফাল : ৪৬

মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখা সকল উম্মতের উপর ফরজ। ফির্কাবাজী করে বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হওয়া হারাম কাজ। মহান আল্লাহ এই নির্দেশ মেনে সকল উম্মত কে ঐক্য বজায় রেখে চলতে হবে। আমাদের মাঝে যে সকল মতভেদ বিদ্যমান আছে, তা ভুলে একই কাতারে এসে দাঁড়ান এখন সময়ের দাবি। কোন দল বা নেতার কথা কান না দিয়ে মহান আল্লাহ নির্দেশ পালনার্থে সবাইকে ঐক্য বদ্ধ হতে হবে। রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবিদের অনুসৃত পথই হল আসল ও হেদায়েতের পথ তাদের পথে চললে ঐক্য থাকা খুবই সহজ হবে। তারাই মহান আল্লাহর এই নির্দেশ বেশী বুঝেছেন এবং বেশী অনুসরণ করেছেন। ঐক্যবদ্ধ থাকতে যে কোনো প্রকারের স্বার্থ কুরবানি করতে প্রস্তত থাকতে হবে। কুরআন সুন্নাহর সামনে নিজে সমর্পণ করে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এই একটি মাত্র নিয়তই সমাজের মতবিরোধ কমাতে অনেকাংশে ভূমিকা রাখতে পারে। যার ফলে মুসলিমরা আল্লাহ আদেশ মেন ঐক্যবদ্ধ থাকবে।

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে-

জামাত শব্দটি আরবি “جَمَاعَة” (জামাআহ) থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দল, গোষ্ঠী বা সংঘ। ইসলামের পরিভাষায়, জামাত বলতে সেই গোষ্ঠী বা দলকে বোঝানো হয় যারা কুরআন ও সুন্নাহকে তাদের জীবন ও কাজের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে এবং ইসলামের মূল আদর্শের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে।

অপর পক্ষে ফিরকা শব্দটি আরবি “فِرْقَة” (ফিরকাহ) থেকে এসেছে, যার অর্থ বিভক্তি বা গোষ্ঠী। ইসলামের পরিভাষায়, ফিরকা বলতে সেই দল বা গোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যারা ইসলামের মূল শিক্ষাগুলো থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মতবাদ, চিন্তাধারা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যায়। এ ধরনের বিভক্তি সাধারণত কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশনার পরিপন্থি এবং মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে জামাত এবং ফিরকা দুটো ভিন্ন বিষয়। জামাত সাধারণত ইসলামের মূল আদর্শে ঐক্যবদ্ধ একটি গোষ্ঠীকে বোঝায়, যা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ফিরকা বলতে বিভক্ত গোষ্ঠী বা মতবাদের দলকে বোঝায়, যারা কোনো বিশেষ মতবাদ বা দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে আলাদা হয়ে যায়। এদের মধ্যে ১০টি মূল পার্থক্য নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. ঐক্য বনাম বিভাজন

জামাত: ইসলামের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে ঐক্য বজায় রাখে।

ফিরকা: ভিন্ন মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিভাজন সৃষ্টি করে।

২. আদর্শের ভিত্তি

জামাত: কুরআন ও সহিহ হাদিসকে তাদের মূল আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।

ফিরকা: তাদের নিজস্ব মতবাদ, ইজতিহাদ, বা দার্শনিক চিন্তাধারার উপর নির্ভর করে।

৩. ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি

জামাত: ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ ও প্রচার করার চেষ্টা করে।

ফিরকা: কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা মতবাদে অধিক জোর দেয়।

৪. আন্তর্জাতিকতা বনাম আঞ্চলিকতা

জামাত: জাতি, বর্ণ, ও অঞ্চলভেদে সকল মুসলিমকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে চায়।

ফিরকা: নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

৫. ধর্মীয় নেতৃত্ব

জামাত: নেতৃত্ব নির্বাচনে ইসলামি নীতিমালা মেনে চলে।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ প্রচারে কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

৬. বিধানের প্রয়োগ

জামাত: ইসলামের শারী‘আহর পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ চায়।

ফিরকা: শারী‘আহর নির্দিষ্ট অংশের উপর জোর দেয়।

৭. সাম্প্রদায়িকতা

জামাত: সামগ্রিক মুসলিম উম্মাহর কল্যাণকে প্রাধান্য দেয়।

ফিরকা: নিজেদের গোষ্ঠী বা মতবাদকে প্রাধান্য দেয়।

৮. মতভেদের প্রতি মনোভাব

জামাত: মতভেদের ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সমাধান খোঁজে।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ সঠিক প্রমাণে জেদ ধরে।

৯. প্রভাব ও প্রসার

জামাত: ইসলামের প্রকৃত বার্তা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে চায়।

ফিরকা: নিজেদের মতবাদ বা চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

১০. ইসলামের সাথে সামঞ্জস্যতা

জামাত: ইসলামের মৌলিক নীতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ফিরকা: ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে কখনো কখনো অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অর্থঃ নিশ্চয় যারা তাদের দীনকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোন ব্যাপারে তোমার দায়িত্ব নেই। তাদের বিষয়টি তো আল্লাহর নিকট। অতঃপর তারা যা করত, তিনি তাদেরকে সে বিষয়ে অবগত করবেন।৷  সূরা আনআম : ১৫৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আরও বলেন-

وَلَا تَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ تَفَرَّقُوۡا وَاخۡتَلَفُوۡا مِنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَہُمُ الۡبَیِّنٰتُ ؕ  وَاُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ۙ

আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর। আর তাদের জন্যই রয়েছে কঠোর আযাব। সুরা আল ইমরান : ১০৫

ফির্কা সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকার বিপদ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি-

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

‏ “‏ يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ

জামাআতের উপর আল্লাহ্ তায়ালার হাত (রহমত) থাকে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৬, মিশকাত : ১৭৩

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّ اللَّهَ لَا يَجْمَعُ أُمَّتِي أَوْ قَالَ: أُمَّةَ مُحَمَّدٍ عَلَى ضَلَالَةٍ وَيَدُ اللَّهِ عَلَى الْجَمَاعَةِ وَمَنْ شَذَّ شَذَّ فِي النَّار

আল্লাহ তা’আলা আমার গোটা উম্মাতকে; অপর বর্ণনাতে তিনি বলেছেন, উম্মাতে মুহাম্মাদিকে কখনও পথভ্রষ্টতার উপর একত্রিত করবেন না। আল্লাহ তা’আলার হাত (রহমত ও সাহায্য) জামা’আতের উপর রয়েছে। যে ব্যক্তি জামা’আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সে বিচ্ছিন্ন হয়ে (অবশেষে) জাহান্নামে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৭, মিশকাত : ১৭৩

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, জাবিয়া’ (সিরিয়ার অন্তর্গত) নামক জায়গায় উমর (রাঃ) আমাদের সামনে খুতবাহ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন, হে উপস্থিত জনতা! যেভাবে আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ ﷺ দাঁড়াতেন, সেভাবে তোমাদের মাঝে আমিও দাঁড়িয়েছি। তারপর তিনি (রাসূলুল্লাহ ﷺ) বলেন, আমার সাহাবিদের ব্যাপারে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (তাদের যমানা শ্রেষ্ঠ), তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর তাদের পরবর্তীদের যমানা, তারপর মিথ্যাচারের বিস্তার ঘটবে। এমনকি কাউকে শপথ করতে না বলা হলেও সে শপথ করবে, আর সাক্ষ্য প্রদান করতে না বলা হলেও সাক্ষ্য প্রদান করবে।

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫, সুনানে ইবনে মাজাহ : ২৩৬৩

এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, ইসলামে জামাত তথা ঐক্যবদ্ধ থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ব্যক্তিকে শয়তান সহজে ধ্বংস করতে পারে। মুসলিম উম্মাহকে বিভেদ এড়িয়ে ঐক্যের পথ অনুসরণ করতে হবে।

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

মুসলিম উম্মার মাঝে ঐক্য ঠিক রাখতে হলে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ করতে হবে। এই উম্মায় নিজেদের মাঝে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে বিভিন্ন দলে দলে বিভক্ত না হয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে তার কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ করতে হবে।

আল্লাহ রব্বূল আলামিন বলেন-

فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا

অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সূরা নিসা : ৫৯

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অর্থঃ অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। সূরা নিসা : ৬৫

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا

অর্থঃ আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট তায় পতিত হয়। সুরা আহযাব : ৩৬

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِن شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ

“তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করো, তার সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। সুরা শুরা : ১০

আল্লাহ রব্বূল আলামিন আরও বলেন-

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

রাসূল তোমাদের যা দান করেন, তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।”

সুরা হাশর : ৭

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হয়েছে যে, মতবিরোধ দেখা দিলে মুসলমানদের উচিত কুরআন ও রাসুলের সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া। কারণ কুরআন ও সুন্নাহ ইসলামের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং এর মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সঠিক পথনির্দেশ নিশ্চিত হয়। এই সম্পর্কিত কয়েকটি হাদিসের প্রতি লক্ষ করুন।

আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

تَرَكْتُ فيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُما كِتابَ الله وسُنَّتي وَلَنْ يَتَفَرَّقا حَتَّى يَرِدا عَلَيَّ الحَوْضَ

আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা অবলম্বন করলে তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। ’হওয’ (কাওসারে) আমার নিকট অবতরণ না করা পর্যন্ত তা বিচ্ছিন্ন হবে না। হাদিস সম্ভার : ১৫০০, হাকেম : ৩১৯

মুয়াত্তা মালিকের এক হাদিসে এসেছে-

وَحَدَّثَنِي عَنْ مَالِك أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ

মালিক (রহঃ) বলেন, তাহার নিকট রেওয়ায়ত পৌঁছিয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, আমি তোমাদের নিকট দুইটি বস্তু ছাড়িয়া যাইতেছি। তোমরা যতক্ষণ উহাকে ধরিয়া থাকিবে পথভ্রষ্ট হইবে না। উহা হইল আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নত। মুয়াত্তা মালিক : ১৬৬১,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّتِي”

আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যদি এগুলো আঁকড়ে ধরো, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না: আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ। মুসনাদ আহমদ: ৮৮৪৫,  সুনান দারিমি

উপরোক্ত হাদিসগুলোতে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলিমদের জীবনের সব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসা উচিত। এটি মতভেদ সমাধানের প্রধান পন্থা এবং ইসলামি ঐক্য বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি।

মতবিরোধ বা দলাদলির অন্যতম কারণ হল কুরআন সুন্নাহ থেকে দুরে থাকা। তাই কোনো বিষয় মতবিরোধ দেখা দিলে কুরআন সুন্নাহ থেকে সমাধান নিব। যদি সকলে সত্যিকারের কুরআন সুন্নাহর অনুসারী হত তবে মুসলিমদের মাঝে এত মতভেদ আর মতবিরোধ হতো না। ফিকহি মাসায়েল নিয়ে মতভেদ দেখা দিলেও তারা ঐক্য বদ্ধ থাকত। স্পষ্ট কুরআন সুন্নাহর বিপরীত কথা বলার মত সাহস কোন সত্যিকারের মুসলিম কোনো কালে করেনি আজও করবেনা। কাজেই মতভেদ পূর্ণ বিষয়গুলি কুরআন সুন্নাহ উপর ছেড়ে দিলে মুসলীম উম্মাহ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের হারান জৌলুস ফিরে পেত।

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

কুনআন সুন্নাহ মানদণ্ডে পরীক্ষতি আমিরের আনুগত্য ফরজ। কুনআন সুন্নাহ অনুসারী নতা বা আমিরকে আনুগত্য না করে, নতুন আমিরে তৈরি করে ইসলামকে টুকরা টুকরা করে দলে উপদলে ভাগ করা ইসলামি শরীয়ত হারাম।  কুরআন সুন্নার বহু স্থানে আমিরের আনুগত্য বা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ أَطِيعُواْ اللّهَ وَأَطِيعُواْ الرَّسُولَ وَأُوْلِي الأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً

অর্থ : হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের (আমির, বিচারক, শাসক)। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

مَنْ كَرِهَ مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ لَيْسَ أَحَدٌ مِنَ النَّاسِ خَرَجَ مِنَ السُّلْطَانِ شِبْرًا فَمَاتَ عَلَيْهِ إِلاَّ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً

যে ব্যক্তি তার আমীরের কোন কার্যকলাপ অপছন্দ করে, তার উচিত ধৈর্যধারণ করা। কেননা যে কোন ব্যক্তিই শাসকের থেকে (আনুগত্য থেকে) বেরিয়ে গিয়ে বিঘত পরিমাণ সরে যাবে এবং তারপর এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৪৯

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

وَبِهَذَا الْإِسْنَادِ مَنْ أَطَاعَنِيْ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِيْ فَقَدْ عَصَى اللهَ وَمَنْ يُطِعْ الأَمِيْرَ فَقَدْ أَطَاعَنِيْ وَمَنْ يَعْصِ الأَمِيْرَ فَقَدْ عَصَانِيْ وَإِنَّمَا الْإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ فَإِنْ أَمَرَ بِتَقْوَى اللهِ وَعَدَلَ فَإِنَّ لَهُ بِذَلِكَ أَجْرًا وَإِنْ قَالَ بِغَيْرِهِ فَإِنَّ عَلَيْهِ مِنْهُ

যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমার নাফরমানি করল, সে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলারই নাফরমানি করল। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল, সে ব্যক্তি আমারই আনুগত্য করল আর যে ব্যক্তি আমীরের নাফরমানি করল সে ব্যক্তি আমারই নাফরমানি করল। ইমাম তো ঢাল স্বরূপ। তাঁর নেতৃত্বে যুদ্ধ এবং তাঁরই মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জন করা হয়। অতঃপর যদি সে আল্লাহর তাকওয়ার নির্দেশ দেয় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে, তবে তার জন্য এর পুরস্কার রয়েছে আর যদি সে এর বিপরীত করে তবে এর মন্দ পরিণাম তার উপরই বর্তাবে। সহিহ বুখারি : ২৯৫৭, ৭১৩৭, সহিহ মুসলিম : ১৮৩৫, মিশকাত : ৩৬৬১, সহিহ আল জামি : ৬০৪৪

নাফি (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রা.) আবদুল্লাহ ইবনু মুতী (রা.) এর নিকট এলেন তখন হাররা (হৃদয় বিদারক) এর ঘটনা ঘটেছে এবং যুগটা ছিল ইয়াযীদ ইবনু মুয়াবিয়ার যুগ। তখন তিনি (ইবনু মুতী’) বললেন, আবূ আবদুর রহমানের জন্য বিছানা পেতে দাও। তখন তিনি বললেন, আমি তোমার কাছে বসতে আসিনি, এসেছি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যে হাদীস শুনেছি তা তোমাকে শুনাতে। আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি (আমীরের) আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে তার কোন দলিল থাকবে না। আর যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলো আর তার ঘাড়ে আনুগত্যের কোন চুক্তি নেই তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে। সহিহ মুসলিম : ১৮৫১

উপরের কুরআন ও হাদিসের আলোকে দেখতে পেলাম মতবিরোধ থেকে মুক্ত থাকতে হলে আমিরের আনুগত্য করতে হবে। আমিরের আনুগত্য মেনে চললে সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে শান্তির পথে আগানো সম্ভব। ইসলাম নেতৃত্ব মানার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম আমিরের অনুসরণ বা আনুগত্যের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছে। কিন্তু একটি কথা সব সময় লক্ষ রাখতে হবে আমিরের আনুগত্য শর্ত সাপেক্ষ। তাকে অনুসরণের মাপকাঠিও কুরআন সুন্নায় বিস্তারিত বলেছেন। কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমার মধ্যে অবস্থানকারী নেতার আনুগত্য প্রকাশ অপরিহার্য ঘোষণা করেছে। সে সকল আমির আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে তাদের কোন আনুগত্য নাই। যে আয়াতে মহান আল্লাহ আমিরের আনুগত্য করার কথা বলেছেন, সে আয়াতেই সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً

অর্থঃ অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ কর, যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। সুরা নিসা : ৫৯

এ আয়াতে উলুল আমর বা আমিরের আনুগত্য শর্ত হলো তাদের মাঝে কোন বিষয় মতবিরোধ হলে কুরআন সুন্নাহর আলোকে সমাধা করতে হবে। কোনো অবস্থায়ই তারা কুরআ সুন্নাহর বাহিরে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক হারামকৃত বিষয়কে হালাল বা হালালকৃত বস্তুকে হারাম করার ক্ষেত্রে  আনুগত্য করা যাবে না। কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তাদের আনুগত্য করল তারা মূলত আল্লাহ তাআলার সমকক্ষ দাড় করার মত হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ

অর্থ: তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছেন৷ এবং এভাবে মারয়াম পুত্র মসীহকেও৷ অথচ তাদের মাবুদ ছাড়া আর কারোর বন্দেগি কারার হুকুম দেয়া হয়নি, এমন এক মাবুদ যিনি ছাড়া ইবাদত লাভের যোগ্যতা সম্পন্ন আর কেউ নেই৷ তারা যে-সব মুশরিক কথা বলে তা থেকে তিনি পাক পবিত্র৷ সুরা তওবা : ৩১

বোঝা গেল, শরিয়তের গ্রহণযোগ্য কোন প্রমাণ ছাড়াই আমিরের হালাল বা হারাম সিদ্ধান্তকে অন্ধভাবে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত। উপরের আয়াত সম্পর্কে একটি হাদিস-

আদী ইবনু হাতিম (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে এলাম। তিনি বললেন, হে ’আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাকে সূরা তওবার  নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

অনুবাদ) “তারা আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত তাদের পণ্ডিতগণকে ও সংসারবিরাগীগণকে তাদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। সূরা তওবা-৩১

তারপর তিনি বললেন, তারা অবশ্য তাদের পূজা করত না। তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলত তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলত তখন নিজেদের জন্য উহাকে হারাম বলে মেনে নিত। সুনানে তিরমিজ : ৩০৯৫

তাফসিরে ইবনে কাসির লিখেন-

আদী ইবনে হাতেম নবি (সা) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিল খ্রিষ্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি নবি (সা) কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন হচ্ছে, কুরআনের এ আয়াতটিতে (সুরা তওবা- ৯:৩১) আমাদের বিরুদ্ধে উলামা ও দরবেশদেরকে খোদা বানিয়ে নেবার যে দোষারোপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কি৷ জবাবে তিনি বলেন, তারা যেগুলোকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়৷ জবাবে আদী বলেন, হ্যাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্য এমনটি করতাম। রসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ব্যাস, এটিই তো হচ্ছে তোমাদের প্রভু বানিয়ে নেয়া। সুরা তাওবার ৩১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, ইবনে কাসির

আমিরের আনুগত্য শুধু মাত্র হকের উপর-

আলী (ইবনু আবূ তালিব) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং আনসারদের এক ব্যক্তিকে তার সেনাপতি নিযুক্ত করে তিনি তাদেরকে তাঁর (সেনাপতির) আনুগত্য করার নির্দেশ দেন। (কোন কারণে) আমির রাগান্বিত হয়ে যান। তিনি বললেন, নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদেরকে আমার আনুগত্য করতে নির্দেশ দেননি? তাঁরা বললেন, অবশ্যই। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা কিছু কাঠ সংগ্রহ করে আনো। তাঁরা কাঠ সংগ্রহ করলেন। তিনি বললেন, এগুলোতে আগুন লাগিয়ে দাও। তাঁরা ওতে আগুন লাগালেন। তখন তিনি বললেন, এবার তোমরা সকলে এ আগুনে প্রবেশ কর। তারা আগুনে প্রবেশ করতে সংকল্প করে ফেললেন। কিন্তু তাদের কয়েকজন অন্যদের বাধা দিয়ে বলতে লাগলেন, আগুন থেকেই তো আমরা পালিয়ে গিয়ে নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এভাবে ইতস্তত করতে করতে আগুন নিভে গেল এবং তার ক্রোধও ঠান্ডা হল। এরপর এ সংবাদ নবি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, যদি তারা আগুনে ঝাঁপ দিত তা হলে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত আর এ আগুন থেকে বের হতে পারত না। আনুগত্য (করতে হবে) কেবল সৎ কাজের। সহিহ বুখারি ৪৩৪০, ৭১৪৫, ৭২৫৭

পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই-

পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি নেতা বা কারো আনুগত্য করতে পারবে না। যাদের আনুগত্য করা ইসলামে জরুরি পাপের কাজে তাদেরও আনুগত্য করতে কেউ বাধ্য নয়। যেমনভাবে মহান আল্লাহ বলেন,

وَتَعَاوَنُواْ عَلَى الْبرِّ وَالتَّقْوَى وَلاَ تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

অর্থ : সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। সুরা মায়েদা : ২ 

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ حَقٌّ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِالْمَعْصِيَةِ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ

পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না। সহিহ বুখারি : ২৯৫৫, ৭১৪৪)

আলী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوف

নাফরমানির ক্ষেত্রে আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু সৎকর্মের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সহিহ মুসলিম : ১৮৪০, আবূ দাঊদ : ২৬২৫, নাসায়ী : ৪২০৫, মিশকাত : ৩৬৬৫, আহমাদ : ৭২৪।

এই আলোচনা দ্বারা দুটি বিষয় বোঝ যায়-

(১) কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক শরীয়ত সম্মত আমিরের আদেশ মান্য করা ফরজ। এ সকল বিষয় মতবিরোধ করা হারাম। এ মতবিরোধ থেকেই নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

(২) অপর পক্ষে শর্থহীভাবে আমিরের অনুসরণ করে, তার সীমা লঙ্ঘনকে সহায়তা করে দলে দলে বিভক্ত হচ্ছি। আমিরের ভ্রান্ত নীতির ফলে সত্যপন্থীরা তার থেকে দূরে চলে যায় এবং নতুন করে ফির্কার সৃষ্ট হয়।

৪। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কঠিন সতর্ক বাণী শুনে মতবিরোধ বা ফির্কা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকা-

মহান আল্লাহ নিষেধ করার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মতবিরোধ করে ফির্কা সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছেন। ঐক্যবদ্দভাবে মুসলিম জামাতকে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ

অর্থ: যারা নিজেদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে নিঃসন্দেহে তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই৷  তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ন্যস্ত রয়েছে৷ তারা কি করেছে, সে কথা তিনিই তাদেরকে জানাবেন৷  সূরা আন‘আম : ১৫৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

এবং তাদের মতো হয়ো না যাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে ও পরস্পর মতভেদে লিপ্ত রয়েছে; তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। সূরা আল-ইমরান : ১০৫

আরফাযা ইবন রায়হ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّهَا سَتَكُونُ بَعْدِي هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَهَنَاتٌ وَرَفَعَ يَدَيْهِ فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ يُرِيدُ تَفْرِيقَ أَمْرِ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُمْ جَمِيعٌ فَاقْتُلُوهُ كَائِنًا مَنْ كَانَ مِنْ النَّاسِ

আমার পরে নিশ্চয়ই অনেক ফিতনা-ফাসাদ হবে। এরপর তিনি তাঁর হাত উঠিয়ে বললেন, তখন তোমরা যাকে দেখবে, উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ইচ্ছা করছে, অথচ তারা একতাবদ্ধ; তখন তোমরা তাকে হত্যা করবে, সে যে-ই হোক না কেন। সুনানে নাসায়ি : ৪০২১, সহিহুল জামে : ৩৬২২

এই সম্পর্কে একটি সহিহ হাদিস-

عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ أَنّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَطَبَ فَقَالَ الْجَمَاعَةُ رَحْمَةٌ وَالْفُرْقَةُ عَذَابٌ

নুমান বিন বাশীর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় বলেছেন, জামআত (ঐক্য) হল রহমত এবং বিচ্ছিন্নতা (মতবিরোধ) হল আজাব। হাদিস সম্ভার : ১৮৪৪, সহিহুল জামে : ৩১০৯, কিতাবুস সুন্নাহ, শায়বানী : ৮৯৫

এই সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْجَمَاعَةَ وَيَكْرَهُ الْفُرْقَةَ.” عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ

আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ঐক্যকে পছন্দ করেন এবং বিভেদকে অপছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ : ২১৭২১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে এই উম্মতকে একত্র করে এই ছাতার নিজে রেখে নেতৃত্ব নিয়েছেন এর মাত্র তার অনুসরণের মাধ্যমেই এই উম্মত আবার একই ছাতার নিচে আনা সম্ভব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসের মর্মবাণী উপলব্ধি করে দলাদলি বাদ দিতে হবে এবং তার প্রচারিত তাওহীদের ভিত্তিতে সকল উম্মত কে মুসলিম পরিচয়ে হতে হবে।

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে-

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

০৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

মতবিরোধ প্রতিরোধে বারটি করণীয় আমল : দ্বিতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মতবিরোধ থেকে মুক্তি জন্য আমাদের করণীয় হল-

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

এখানে মাঝের চারটি আলোচিত হলো :

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

উম্মতের মতবিরোধের অন্যতম কারণ হিসেবে জাল ও জঈফ হাদিসের উপর আমল করাকে চিহ্নিত করেছি। ঐ আলোচনায় সহিহ, হাসান, জঈফ ও জাল হাদিস সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণ দেওয়া হয়েছে এবং এ কথা বলার বোঝাতে চেষ্টা করেছি যে জাল ও জঈফ হাদিসের উপর আমল করার ফলে যারা সহিহ হাদিসের উপর সঠিক আমল করবে তাদের সাথে একটা বিরোধের সৃষ্টি হবে। এই আলোচনায় আমরা দেখব কিভাবে জাল ও জঈফ হাদিস পরিহার করে সহিহ হাদিসের উপর আমল করে মতবিরোধকে  প্রতিহত করতে পারি।

এই উম্মতের সকলে যদি জাল ও জঈফ হাদিস পরিহার করে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহকে অনুসরণ করে তবে নিজের মাঝে বিরোধ অনেকাংশে কমে যাবে। আমরা জানি- “ফিকহি মাসায়েল প্রদানের ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর পাশাপাশি ইজমা ও কিয়াসের প্রয়োজন। কিন্তু আকিদার বিষয় কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর বাহিরে কোন ইজমা ও কিয়াসের প্রয়োজন নাই।“

এই জন্য মাজহাবের ইমামদের মাঝে হাজার হাজার ফিকহি মতভেদ থাকলেও আকিদার কিছু সূক্ষ্ম বিষয় বাদে সকল আকিদা একই। আকিদার ক্ষেত্র উম্মার সকলে কুরআন ও সহিহ অনুসরণ করলে মতবিরোধের সিংহভাগই করে যাবে। মতবিরোধ কবার ফলে সকলে ফিকহি মাসায়েলেও প্রস্থতা দেখাবে। এমনি সুন্নাহ ও মুস্তাহাবে মতভেদ থাকলেও মতবিরোধ দেখা দিবে না।

মতবিরোধের পিছনে যেহেতু জাল ও জঈফ হদিসের বিরাট ভূমিকা তাই আমাদের প্রথম কাজ হলো এই 

জাল ও জঈফ হদিস চিহ্নিত করা। নিম্ন লিখিত উপায় জাল ও জঈফ হাদিস চিহৃত করতে পারি।

ক। জাল ও জঈফ সম্পর্কিত বই অধ্যয়ন করে

খ। যে সকল বইয়ে জাল ও জঈফ হাদিসে ভরপুর তা পরিহার করা

গ। দ্বীন নেওয়া ক্ষেত্রে সঠিক আলেম নির্বাচন করা।

ক। জাল ও জঈফ সম্পর্কিত বই অধ্যয়ন করে-

জাল ও জঈফ সম্পর্কিত বই অধ্যয়ন করে জাল এ জঈফ হাদিস চিহ্নিত করতে পারলে সহজেই সহজে এর খপ্পর থেকে বাঁচা সম্ভব। বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য এই সম্পর্কিত কিছু বই হলো-

১. বিশ্ব বিখ্যাত “সিলসিলাহ যায়ীফাহ” যা “যঈফ ও জাল হাদিস” নামে প্রকাশিত হয়। লেখক : শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ

২. হাদিসের নামে জালিয়াতী, ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ। 

৩. এসব হাদিস নয় (দুই খন্ড), লেখক : মাওলানা মুতীউর রহমান ও মাওলানা আব্দুল মালেক।

৪. প্রচলিত ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন, ড.খ.ম. আব্দুর রাজ্জাক। 

৫. ইসলাম আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন।

৬. প্রচলিত জাল হাদীস”, আল্লামা হাফেয জুনায়েদ বাবুনগরী রাহিমাহুল্লাহ।

৭. মাউযূ হাদিস বা প্রচলিত জাল হাদিস”, প্রফেসর ড. মুফতি মুহাম্মদ মানজুরুর রহমান।

৮. জাল হাদীস, আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা, মাওলানা ডক্টর শাহ্‌ মুহাম্মাদ আবদুর রাহীম এবং

৯. বহুল প্রচলিত ১০০ জাল হাদিস, ড. মোহাম্মদ ইমাম হোসাইন।

খ। যে সকল বইয়ে জাল ও জঈফ হাদিসে ভরপুর তা পরিহার করা

ইসলামি জ্ঞানচর্চায় নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত হাদিসের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে কিছু বই ও সংকলনে জাল (মিথ্যা) ও জঈফ (দুর্বল) হাদিস স্থান পেয়েছে। এ ধরনের বইগুলো পড়ার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। নিম্নে এমন কিছু বইয়ের উদাহরণ দেওয়া হলো, যেগুলোতে জাল ও জঈফ হাদিস রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেছেন

১. ফাযায়েলে আমল (মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী)

এই বইটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নসিহত রয়েছে, তবে কিছু হাদিসের সূত্র দুর্বল বা জাল বলে পরিচিত।

এটি মূলত তাবলিগ জামাতের একটি প্রচলিত বই। পড়ার সময় নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা জরুরি।

২. ইহইয়াউল উলুম (ইমাম গাজ্জালী)

ইমাম গাজ্জালী (রহ.)-এর রচিত এই বিখ্যাত বইটি ইসলামের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে অমূল্য। তবে এতে কিছু জঈফ ও জাল হাদিসের উপস্থিতি রয়েছে বলে হাদিস বিশেষজ্ঞগণ জানিয়েছেন।

৩. আল-মাওয়াইয ওয়াল-মাজালিস (ইবনে আল-জাওযী)

এই বইটিতে ইসলামের নসিহতমূলক বক্তব্য সংকলিত আছে। তবে কিছু হাদিস জাল বা জঈফ হিসেবে প্রমাণিত।

৪. কাসাসুল আম্বিয়া (ইবনে কাসির বা অন্য লেখকদের)

নবিদের কাহিনী সংকলিত এ ধরনের বইতে প্রায়ই জাল ও ভিত্তিহীন বর্ণনা পাওয়া যায়।

৫. নাশরুত ত্বিব (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)

আধ্যাত্মিকতা নিয়ে লেখা কিছু বইয়ে এমন বহু হাদিস পাওয়া যায়, যেগুলোর সূত্র প্রমাণিত নয় বা জাল।

সতর্কতা

৬. মাকসুদুল মোমিনীন (শাহ মাখদুম রূপোশ তবে বিভিন্ন লেখকের নামে পাওয়া যায়)

এই বইটিতে কিছু দোয়া ও আমলের উল্লেখ রয়েছে, তবে সেগুলোর উৎস হিসেবে জাল বা ভিত্তিহীন হাদিস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

৭. নেয়ামুল কুরআন (হজরত মাওলানা শামসুল হক)

এই বইটি আমল ও দোয়া সংক্রান্ত, তবে এতে অনেক জঈফ বা ভিত্তিহীন হাদিস স্থান পেয়েছে।

৮. আমলে নাজাত (আলহাজ হাফেজ ছৈয়দ মনির উদ্দিন)

এটি একটি জনপ্রিয় বই, তবে এতে কিছু দোয়া ও আমল জঈফ হাদিস থেকে প্রাপ্ত বলে বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেছেন।

৯ . ফাযায়েল দুরুদ (মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী)

দুরুদ ও তার ফজিলত নিয়ে লেখা হলেও এতে জঈফ ও জাল হাদিস স্থান পেয়েছে।

১০. রুহুল বাইয়ান (ইসমাইল হাক্কি)

এটি একটি তাফসির গ্রন্থ। তবে এতে কিছু মনগড়া কাহিনী ও জাল হাদিস রয়েছে।

১১. নূরুল ইযাহার (মাওলানা আবদুল্লাহ)

এটি ফিকহ ও আমল সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ। তবে কিছু দুর্বল বা ভিত্তিহীন হাদিসের উপস্থিতি রয়েছে।

কাজেই পড়ার সময় নির্ভরযোগ্য আলেমদের বা গবেষকদের থেকে হাদিসের সত্যতা যাচাই করা। নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ পড়া: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান ইবনে মাজাহ, তিরমিজি ইত্যাদি মূল উৎস থেকে হাদিস জানা। নির্ভরযোগ্য প্রকাশনা থেকে প্রাপ্ত ও আলেমদের দ্বারা অনুমোদিত বইগুলো পড়া।

গ। দ্বীন নেওয়া ক্ষেত্রে সঠিক আলেম নির্বাচন করা।

দ্বীনের বিষয়ে সঠিক আলেম নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্বীনের সঠিক বুঝ ও আমল নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানীর উপর। সঠিক আলেম নির্বাচন করার জন্য নিম্নোক্ত কিছু বিষয় বিবেচনা করতে পারেন:

১. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ইসলামি জ্ঞানের গভীরতা

আলেমটি কোথা থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং তার শিক্ষা কোন মাদ্রাসা, জামিয়া বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন হয়েছে তা জেনে নিন। প্রখ্যাত ও গ্রহণযোগ্য ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেমন- দারুল উলুম দেওবন্দ, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে পড়াশোনা করা আলেমদের সাধারণত নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।

২. কুরআন ও সহিহ হাদিসে গভীর জ্ঞান

আলেমটি কুরআন এবং সহিহ হাদিসের সাথে কতটা সুস্পষ্ট এবং সঠিকভাবে সংযুক্ত তা বিবেচনা করুন।

দেখুন তিনি সহিহ সূত্র থেকে জ্ঞান প্রদান করছেন কিনা এবং দুর্বল বা জাল হাদিস এড়িয়ে চলেন কিনা।

৩. ফিকহ ও মাজহাব অনুসরণে ভারসাম্যপূর্ণতা

আলেমটি কোন মাজহাব বা ফিকহি মতের অনুসারী তা জেনে নিন। যদি তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতামতকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেন বা অন্যান্য মাজহাবের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেন, তবে সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

৪. আখলাক ও ব্যক্তিগত চরিত্র

আলেমটির ব্যক্তিগত জীবন কেমন? তিনি বিনয়ী, পরিশুদ্ধ এবং ভালো চরিত্রের অধিকারী কিনা তা দেখুন।

সচ্চরিত্র ও আখলাক আলেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলির একটি।

৫. গুরুত্বপূর্ণ ইলমি ও আকিদাগত বিষয়ের প্রতি মনোযোগ

সঠিক আকীদা (বিশ্বাস) এবং তাওহীদের বিষয়ে আলেমটি কতটা পরিষ্কার তা যাচাই করুন।

তিনি শিরক, বিদআত এবং ভুল আকীদা থেকে মুক্ত কিনা তা নিশ্চিত করুন।

৬. মৌলিকত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা

আলেমটি দ্বীনের বিষয়গুলো সহজভাবে ও প্রাসঙ্গিক ভাষায় উপস্থাপন করেন কিনা। দেখুন তিনি সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ইসলামের শিক্ষাকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম কিনা।

৭. প্রশংসাপত্র ও সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা

স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে আলেমটির গ্রহণযোগ্যতা কেমন? অন্যান্য অভিজ্ঞ আলেম বা ইলমি প্রতিষ্ঠান কি তাকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে?

৮. সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত

আলেমটি কি রাজনৈতিক দল বা এমন কোনো গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত, যা দ্বীনের খাঁটি মর্মবাণী থেকে তাকে বিচ্যুত করেছে?  তিনি জ্ঞান ও আমলের ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রভাবের অধীন নয়।

কোনো আলেমকে অনুসরণ করার আগে তার বক্তৃতা, বই বা বক্তব্য বিশ্লেষণ করুন। যারা অভিজ্ঞ এবং দ্বীনের জ্ঞানে প্রজ্ঞাবান, তাদের কাছ থেকে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের নাম জানতে চান। একজন আলেমের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে মতামত সংগ্রহ করুন। যে আলেম বিদআত, জাল হাদিস, বা ভুল আকীদা প্রচার করেন, তাদের থেকে দূরে থাকুন। তারা কখনো দ্বীনের প্রকৃত মর্মার্থ বুঝতে বা বুঝাতে সক্ষম হবেন না। সঠিক আলেমের কাছে দ্বীন শেখার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান-

মতবিরোধ বা দলাদলির অন্যতম কারণ হল “মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ”। তারা মতভেদ করতেন সত্য কিন্তু আমাদের মত মতবিরোধ করতেন না। আর তাদের এ মতভেদ থেকে মুসলিমদের মাঝে আস্তে আস্তে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় যা তারা কখনও পছন্দ করতেন না। আর মতবিরোধের ফল এই মাযহাব। ইসলামি শরীয়তের উত্স হিসেবে প্রাথমিক যুগে শুধু কুরআন এবং হাদিসকে বুঝায়। বাতিল ফির্কা (শীয়া, কাদিয়ানি, ব্রেলভী) বাদে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট বিষয় কারও কোন মতভেদ নেই। ফিকহি মাসায়েলে অনেক মতভেদ লক্ষ করা যায়। কুরআন-সুন্নাহ’র পরোক্ষ, অস্পষ্ট ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ জটিল কিছু বিষয়ে মুজতাহিদ আলেমগন নিজস্ব ইজতিহাদ মোতাবেক কিছু বায় প্রদান করছে যাতে তাদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ করা যায়। যার ইজতিহাদ কুরআন সুন্নাহ অধিক নিকটবর্তী তার ইজতিহাদ অধিক গ্রহণীয়। আবার তাদের ইজতিহাদ ভুলও হতে পারে। তাদের এমন ভুল হাদিস না জানার কারণে (তার নিকট পৌঁছায়নি) হতে পারে। সহিহ হাদিস জানতে অথচ তিনি হাদিস বিরোধী ইজতিহাদ করেছেন এমনটা কষ্ট কালেও তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। যখন কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ হাদিসের বিরোধী হবে, যখন ইজতিহাদ পরিত্যাগ করে হাদিসের অনুসরণ করা ফরজ। পরবর্তীকালে সময়ের সাথে ইসলামকে তাল মিলিয়ে নিতে এবং নতুন নতুন সমস্যা সমাধানে জন্য ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের উত্স পরিগনিত হয়। এভাবে সাহাবী, তাবেয়ী, এবং  তাবে তাবেয়ী যুগ থেকেই কুরআন সুন্নাহ আলোকে  ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের দলিল হিসাবে গণ্য করা হয়।

মুজতাহিদ ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত কুরআন-হাদিসের গবেষণা লব্ধ ব্যাখ্যা প্রদানে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কখন উভয়ের ইজতিহাদ পরস্পর বিরোধী কিন্তু উভয়ই সঠিক। আবার কখন একজন অপরজন থেকে কুরআন সুন্নার অধিক নিকটবর্তী। যে মতভেদ সাহাবিদের জামানা থেকে শুরু হয়েছিল তা তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ী, মুজতাহিদ হয়ে আজও বিদ্যমান আছে। ফিকহি বিষয়ে ইখতিলাফ খারাপ নয় তা জায়েয। এই ফিকহি  মতভেদ বা ইখতিলাফ থেকেই মতবিরোধ বা ইফতিরাক সৃষ্টি হয়েছে আর ইফতিরাক থেকে বিভিন্ন দল বা গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে। এই ইখতিলাফ বা মতভেদের জন্য মতবিরোধ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম কাজ। মুজতাহীদগনের ইজতিহাদি মতভেদ জায়েয কারণ তারা ভুল ইজতিহাদ করলও সওয়াবের অধিকার। আমাদের পূর্ববর্তী মুজতাহিদ আলেম যেমন- ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) মৃত্যু ১৫০ হিজরি, ইমাম মালেক (রহঃ) মৃত্যু ১৭৯ হিজরি, ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) মৃত্যু  ২০৪ হিজরি এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) মৃত্যু ২৪১ হিজরি তাদের সকলের মাঝে ইজতিহাদগত মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতেন, দোয়া করতেন। তাদের মাঝে কোন কোন মতভেদ এমনও ছিল যে পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা যায় তারা উভয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এই ফিকহি মতভেদই ইসলামের প্রস্থতা। মতভেদ বা ইখতিলাফ যেহেতু জায়েয এবং মতবিরোধ বা ইফতিরাক যেহেতু হারাম কাজেই বিষয়টে সম্পর্কে একটু আলোকপাত করতে চাই।

ইখতিলাফ এবং ইফতিরাক :

ইখতিলাফ এবং ইফতিরাক ইসলামি চিন্তায় দুটি ভিন্ন ধারণা। এগুলোকে বুঝতে হলে তাদের মূল অর্থ এবং প্রভাব পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন। নিচে তাদের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো-

ইখতিলাফ (اختلاف):

ইখতিলাফ (اختلاف) আরবি শব্দ যার অর্থ মতভেদ বা ভিন্নমত। এটি কোনো বিষয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা অভিমত পোষণ করা। ইখতিলাফ স্বাভাবিক এবং ইসলামে অনুমোদিত, যদি তা সঠিক জ্ঞানের ভিত্তিতে এবং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে হয়। মতভেদ মানবীয় প্রকৃতি। আমরা সমাজের বা রাষ্ট্রের সকল স্তরে মতভেদ দেখি এমনকি সাহাবিদের মাঝে ও ছিল। সাহাবিগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মার ইমাম ও আলিমদের মধ্যে ‘মতভেদ’ বা ইখতিলাফ ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা বা ইফতিরাক ছিল না। ইসলামের জন্য উপকারী হতে পারে: ইখতিলাফ ইসলামি চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শরীয়াহর সমাধান প্রদান করে। ইখতিলাফ থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব।

কোনো ব্যাপারে দুজন মানুষ কখনোই শতভাগ একমত হতে পারেন না। স্বামী-স্ত্রী বা পিতা-পুত্র থেকে শুরু করে পরিবার বা সমাজ সর্বত্রই মতভেদ বিদ্যমান। এই মতভেদ কখন নিন্দনীয় নয় যতক্ষণ না মতবিরোধে বা শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি, বিচ্ছিন্নতা, দলাদলি সৃষ্টি না করে।

উদাহরণ-

ইসলামি ফিকহে চার মাজহাবের (হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি, হাম্বলি) মধ্যে কিছু বিষয়ে মতভেদ থাকা।

নামাজের কিছু আমলে ভিন্নতা (যেমন রুকু থেকে ওঠার পর হাত বাঁধা বা না বাঁধা)।

আল্লাহ বলেন- Al-Quran 5:48

وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَجَعَلَکُمۡ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّلٰکِنۡ لِّیَبۡلُوَکُمۡ فِیۡ مَاۤ اٰتٰىکُمۡ فَاسۡتَبِقُوا الۡخَیۡرٰتِ ؕ  اِلَی اللّٰہِ مَرۡجِعُکُمۡ جَمِیۡعًا فَیُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ فِیۡہِ تَخۡتَلِفُوۡنَ ۙ

এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে। সুরা আল-মায়েদা : ৪৮

ইফতিরাক (افتراق):

ইফতিরাক (افتراق) একটি আরবি শব্দ যার অর্থ বিভক্তি বা দলাদলি। ইফতিরাক (افتراق) শব্দটি তার্ফারুক বা ফারক শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ হল পার্থক্য, পৃথক, বিভক্ত বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা করা। মতভেদ চূড়ান্ত পর্যায় মতবিরোধ সৃষ্টি করে। তাই ইফতিরাক সব সময় বিভক্তি বা দলাদলি মাধ্যমে পারস্পরিক শত্রুতা সৃষ্টি করে। ইফতিরাক হলো এমন মতভেদ যা মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করে এবং গোষ্ঠীবদ্ধ সংঘাত সৃষ্টি করে। কুরআন ও হাদিসে বারবার বিভক্তি, ফির্কাবাজি বা দলাদলি থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

অর্থঃ তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসার পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে, এদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।” সূরা আল-ইমরান : ১০৫

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ৭১ বা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছে। আমার উম্মাহ ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, যার মধ্যে একমাত্র দল জান্নাতে যাবে। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১

ইখতিলাফ এবং ইফতিরাক এর মাঝে পার্থক্য :

বিষয়  ইখতিলাফ (মতভেদ)ইফতিরাক (মতবিরোধ)
অর্থমতভেদ করা।মতবিরোধ করা
হুকুমবৈধ ও শালীন মতভেদঅশালীন ও ধ্বংসাত্মক বিভক্তি
প্রভাবউম্মাহর ঐক্য রক্ষা করেউম্মাহকে দুর্বল ও বিভক্ত করে
কারণজ্ঞান, ব্যাখ্যার ভিন্নতাঅহংকার, গোঁড়ামি, বিদআত
বৈধতা বৈধ, যদি তা সীমার মধ্যে থাকেহারাম, ইসলাম বিরোধী
ধরণএকটি স্বাভাবিক এবং গঠনমূলকক্ষতিকর, একতা ও শক্তিকে ধ্বংস করে।
ফলাফলজ্ঞানের প্রসার, আখলাকের উন্নতিদলাদলি, শত্রুতা, সমাজের অবক্ষয়
চুড়ান্ত ফলাফলদলাদলি সৃষ্টি করে না।দলাদলি মাধ্যমে ফিতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে।

উপরের আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, মতভেদ জায়েয আর মতবিরোধ হারাম। আমাদের মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতভেদ ছিল কিন্তু মতবিরোধ ছিল না। মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতভেদ হলে তারা মতবিরোধ না করে একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালোবাসতের, দোয়া করতেন।

আমাদের শিক্ষা : আমরা যদি ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের উদার ও প্রশস্ততা দেখাতে পারি তা হলে আমাদের মতবিরোধ কমে আসবে। আমরা একে অন্য কাছে আসতে পারব এবং আমাদের মাঝের দলাদলি কমে যাবে।

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

আকিদা বা বিশ্বাসের উপরই মানুষের আমল প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ভ্রান্ত আকিদা গ্রহণের ফলে তারা মূল ধারার সঠিক আকিদা ধারণকারীদের সাথে মতবিরোধ করে ফির্কাবাজীতে লিপ্ত হয়। মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে তার আকিদা বা বিশ্বাসের জম্ম নেয়। মানুষের জ্ঞানের উৎস হল, প্রাকৃতিক, চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, লোকাচার, বিজ্ঞান ভিত্তিক পড়াশুনা, দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি। আধুনিক কালের সকল মানুষের আকিদা বা বিশ্বাস যুক্তি ও বিজ্ঞান কেন্দ্রিক।

যৌক্তিক কোনো কাজ সহজে যে কেউ মেনে নেন। আর বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত কোন জ্ঞানতো সাথে সাথে মেনে নেয়। কিন্তু ইসলামি আকিদার মূল হল অদৃশ্যে বিশ্বাস এখানে জাগতিক কোন বিষয় থাকলে যুক্তি ও বিজ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা করা যেত কিন্তু অদৃশ্যে বিশ্বাস করতে হলে অদৃশ্য থেকে প্রাপ্ত অহির উপর নির্ভর করতে হবে। অহী ভিন্ন যে কোনো উৎস থেকে আকিদা গ্রহণ করলে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ যে কোনোটাই হতে পারে। ইসলামি আকিদা বিশ্বাস সব সময় আল্লাহকে কেন্দ্র অদৃশ্যের উপর নির্ভর করে থাকে। তাই ইসলামি আকিদার মূল উৎস বা ভিত্তি হল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক।

মহান আল্লাহ বলেন-

 ذَٲلِكَ ٱلۡڪِتَـٰبُ لَا رَيۡبَ‌ۛ فِيهِ‌ۛ هُدً۬ى لِّلۡمُتَّقِينَ (٢) ٱلَّذِينَ يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡغَيۡبِ وَيُقِيمُونَ ٱلصَّلَوٰةَ وَمِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ يُنفِقُونَ (٣)

অর্থঃ এটি আল্লাহর কিতাব, এর মধ্যে কোন সন্দেহ নেই ৷ এটি হিদায়াত সেই মুত্তাকিদের জন্য। যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, নামাজ কায়েম করে। এবং যে রিযিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।

সুরা বাকারা আয়াত : ২-৩

মহান আল্লাহ এখানে অদৃশ্য বা না দেখা বস্তুর উপর ইমান বা বিশ্বাস আনার শর্ত আরোপ করছেন। অদৃশ্য জ্ঞান এমন না সাধারণত কোন মানুষ তার প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দ্বারা অর্জন করতে পারে না।

আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলি, ফেরেশতা, অহী, জান্নাত, জাহান্নাম, পরকাল, হাশরের মাঠ কবরের আজার, কবরের সয়াল জওয়াব ইত্যাদি কার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বুঝানো সম্ভব নয়। অদৃশ্যের একটি ব্যাপার হল কবরের আজাব। কবরে আজাব হবে এটাই সত্য। কিন্তু কাউকে যুক্তি দিয়ে কি কবরের আজাব বুঝাতে বা দেখাতে পাওয়ার। কিংবা বিজ্ঞানের আবিষ্কার ক্যামেরা দ্বারা কি এই আজাব দেখাতে পারব।

অপর পক্ষে আমলের ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। এখানে কুরআন হাদিসের বাহিরে ইজমা কিয়াজের দরকার হয়। নতুন কোনো সমস্যা আসলে কিয়াস করে মাসায়েল দিতে হয়।

মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট, শেয়ার বাজার ইত্যাদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না। তাই কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে কিয়াস করে সমাধান দিতে হয়। কাজেই একটি কথা মনে রাখতে হবে, “আকিদা ও ফিকহের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো, ফিকহের ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু আকিদার ক্ষেত্রে  ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন নেই”।

এক কথায় বলে গেল কুরআন হাদিসের স্পষ্ট কোন রেফারেন্স ছাড়া আকিদা গ্রহণীয় নয়। যদি কেউ যুক্তি দিয়ে আকিদা বুঝাতে আসে তাকে সালাম জানাতে হবে। পৃথিবীতে শতকরা এক ভাগ ও পাওয়া যাবেনা যে এক মাত্র স্রষ্টা আল্লাহকে মানে না। কাজেই আল্লাহর একত্ত্বাবাদ বা তাওহীদের জ্ঞান মানুষকে সহিহ আকিদা অর্জনে সাহায্য করবে। তাই ভ্রান্ত আকিদাগুলির সংশোধনের জন্য একমাত্র অহির জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে হবে। যখনই কুরআন ও সহিহ হাদিসের কোন জ্ঞান জানতে পারবে তখন মুমিনের গুণাবলি হবে আল্লাহর বিধান শুনলাম এবং মেনে নিলাম।  মহান আল্লাহ বলেন,

وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَا‌ۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ (٢٨٥)

অর্থঃ আমরা নির্দেশ শুনেছি ও অনুগত হয়েছি ৷ হে প্রভু! আমরা তোমার কাছে গোনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করছি। আমাদের তোমারই দিকে ফিরে যেতে হবে। সুরা বাকারা : ২৮৫

আকিদার বিষয় আলোচনার ক্ষেত্রে কুরআনো সহিহ হাদিসের বর্ণনা পেলে বলতে হবে শুনলাম এবং মেনে নিলাম। কারণ সকল মুস্তাহিদ আলেমগন এ ব্যাপারে একমত যে আকিদার ক্ষেত্রে কখনও ইসতিহাদ, কিয়াস যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন নাই। আকিদার উৎস যেহেতু কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ তাই কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত কোন আকিদাকে শুনার সাথে সাথে মেনে নিতে হবে। অপর পক্ষে আল্লাহ্‌ রব্বুল আলামীন তার নাজিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে যদি কেউ তার প্রাকৃতিক, চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, লোকাচার, বিজ্ঞান ভিত্তিক পড়াশুনা, দর্শন, শ্রবণ, বুজুর্গের উক্তি, পীরের বাণী ইত্যাদি থেকে আকিদা প্রহন করে হবে তাদের এই ভ্রান্ত আকিদায় নানার বৈপরিত্ত দেখা যাবে। যার ফলে তাদের মাঝে অনেক বাতিল ও ভ্রান্ত ফির্কার উৎপত্তি হবে। এমন কি মানুষ যদি আধুনিক কালের যুক্তি ও বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে তার বিশ্বাসের মূল ভিত্ত হিসাবে গ্রহণ করে তবে সে বাতিল ফির্কার জম্ম দিবে। তার তা জ্ঞান ও যুক্তি ভীত্তিক আকিদা বা বিশ্বাস অদুশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পাবরেনা।

কাজেই আকিদার মূল উত্স কুরআন সুন্নাহ থেকে সকলে প্রমাণভিত্তিক আকিদা গ্রহণ করলে আকিদার মতভেদ থেকে মুক্তি পার। আকিদার মতভেদ থেকে মুক্ত হতে পারলে আকিদার মাধ্যমে মুসলিমদের মাছে যে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে মুক্তি পাব। ইনশাআল্লাহ।

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করাঃ

মহানবী মুহম্মাদ ﷺ প্রদর্শিত সুন্নাহের বিরোধী আমলই হল বিদআত। মুহম্মাদ ﷺ প্রদর্শিত পথের বাহিরে আমল করা থেকে বিরত থাকতে তিনি নিজেই নির্দেশ প্রদান করেছেন। এ সকল আমলকে তিনি বিদআত বলে উল্লেখ করেছেন। বিদআদ সম্পর্ক ধারণা থাকলে খুব সহজে বুঝতে পারব এই বিদআত কিভাবে সমাজের মাঝে ফির্কাবাজীর সৃষ্টি করছে আর বিদআত পরিহার করলে কিভাবে উম্মত ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য।

(১) বিদআত পরিচিতি-

বিদআত অর্থ নতুন সৃষ্টি। শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত বলা হয় দ্বীনের মধ্যে কোন নতুন আমলের পদ্ধতি সৃষ্টি করে, তাকে ইবাদত মনে করে অতিরিক্ত সওয়াবের আশায় আমল করা।

অর্থাৎ দ্বীনের মাঝে এমন কোন আমলের প্রচলন করা যা রাসূল (সাঃ) সাহাবী ও তাবেঈদের যুগে অর্থাৎ আদর্শ যুগে ছিল না এবং কুরআন ও হাদিসের কোন দলিলও তা সমর্থন করে না।

সুন্নাহ সম্মত সকল আমলের ক্ষেত্রে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর মধ্যে অবশ্যই কোন না কোন দলিল আছে। কিন্তু নব আবিষ্কৃত বিদআত এর কোন প্রকার দলিল কুরআন সুন্নাহতে নেই। ইবাদের পদ্ধতি নয় কিন্তু ইবাদতের উপকরণ বা জাগতিক কাজের উপকরণ যদিও নতুন আবিষ্কার তাকে বিদআত বলা হবে না। যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করা।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন-

ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।  সূরা আল মায়িদা : ৩

যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ দ্বীন তাই এটিই মহান আল্লাহ পছন্দনীয় এবং এর বাহিরে কেউ দ্বীন অনুসন্ধান করলে তাও তিনি গ্রহণ করবেন না। তিনি কুরআনে ঘোষণা করেন,

مَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ

যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অনুসন্ধান করে, তা কখনোই তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না’’।  সূরা আলে-ইমরান : ৮৫

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি ২৬৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত-

إِنَّ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللهِ وَأَحْسَنَ الْهَدْيِ هَدْيُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم وَشَرَّ الأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا وَ (إِنَّ مَا تُوعَدُونَ لاَتٍ وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ)

সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ ﷺ-এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ওয়াদা দেওয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না, সুরা আনাম-১৩৪। সহিহ বুখারি : ৭২৭৭,

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন ভাষণ দিতেন তখন তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে যেতো, কণ্ঠস্বর জোরালো হতো, তাঁর ক্রোধ বৃদ্ধি পেতো, যেন তিনি কোনো সেনাবাহিনীকে সতর্ক করছেন। তিনি বলতেন, তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় আক্রান্ত হতে পারো (অথবা তোমাদের সকাল-সন্ধ্যা কল্যাণময় হোক)। তিনি আরো বলতেন, আমার প্রেরণ ও কিয়ামত  এ দুটি আঙ্গুলের অবস্থানের মত পরস্পর নিকটবর্তী। তিনি তাঁর তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে দেখান। অতঃপর তিনি বলেন, সবচেয়ে উত্তম নির্দেশ হল আল্লাহ্‌র কিতাব এবং সর্বোত্তম পথ হল মুহাম্মাদ ﷺ প্রদর্শিত পথ। দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট কাজ। প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যক্তি ধন-সম্পদ রেখে (মারা) গেলে তা তার পরিবারবর্গের এবং কোনো ব্যক্তি দেনা অথবা অসহায় সন্তান রেখে (মারা) গেলে তার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব আমার এবং তার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্বভারও আমার জিম্মায়। সহিহ মুসলিম : ৮৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪৫, সুনানে নাসায়ি : ১৫৭৮, ১৯৬২, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৯৫৪, আহমাদ : ১৩৭৪৪, ১৩৯২৪, ১৪০২২, ১৪২১৯, ১৪৫৬৬; সুনানে দারিমী : ২০৬

(২) বিদআত বিভক্তির অন্যতম মূল কারণ ইসলামে নতুন সংযোজন-

মহান আল্লাহ বলেন-

وَلا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ

তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আসার পরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং মতভেদ করেছে, এদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি। সূরা আল ইমরান : ১০৫

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলামি শরীরও পরিপূর্ণ। কাজেই আমল আকিদার ক্ষেত্রে আর সংযোজন করার কোনো প্রয়োজন নেই। একটি একটা ভরা কলসিতে যদি পানি ঢালা হয় তবে যতটুকু পানি কলসি থেকে পড়ে যাবে ঠিক ততটুকু পানিই কলসিতে ঢুকবে। অনুরূপভাবে ইসলামি শরীয়তের যেখানেই বিদআত ঢুকবে সেখান থেকেই কুরআন বিদায় নিবে।

ইসলামে নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে বিদআত মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করে। যারা সঠিক পদ্ধতিতে ইসলাম মানার চেষ্টা করে তারা বিদআতকে ঘৃণা করে। ফলে ইসলামের মাঝে বিভক্তির সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক যুগ থেকেই বিদআতকে গ্রহণ ও বর্জনের প্রশ্নে মুসলিম উম্মাহ শিয়া ও সুন্নি এবং পরবর্তী কালে আরো শত দলে বিভক্ত হয়ে গেল। কত প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, রক্তপাত হল। যদি সকলে কুরআন সুন্নাহর অনুসরণ করত এবং বিদআত পরিহার করত তবে বিশ্বের সকল মুসলিম এক হতে পারত। এমন কি প্রায়ই বিদআতি বিদআতি নিজেদের আমল নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়। কাজেই এক কথায় বলা যায় বিদআত মুসলমানদের বিভক্তির দিকে আহ্বান করে।

(৩) বিদআত সহিহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করার ফলে বিভক্তি সৃষ্টি করে-

হাসসান ইবনু আতিয়্যাহ্) (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مَا ابْتَدَعَ قَوْمٌ بِدْعَةً فِي دِينِهِمْ إِلَّا نَزَعَ اللَّهُ مِنْ سُنَّتِهِمْ مِثْلَهَا ثُمَّ لَا يُعِيدُهَا إِلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة.

কোনো জাতি যখন দীনের মধ্যে কোনো বিদআত সৃষ্টি করে, তখনই আল্লাহ তা’আলা তাদের থেকে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। কিয়ামত (কিয়ামত) পর্যন্ত এ সুন্নাত আর তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।

মিশকাত : ১৮৮, সুনানে দারেমী : ৯৮

ইসলামি শরীয়ত পরিপূর্ণ। কখন, কোথায়, কিভাবে আমল করতে হবে তার পরিপূর্ণ বর্ণনা ইসলামি শরীয়তে সুনিপুণভাবে ধারণ করা আছে। কাজেই যদি কেউ নতুন কোন আমল করে তবে অবশ্যই সে এক বা একাধিক সুন্নাত পরিত্যাগ করে। উলামায়ে কিরাম বলেছেন, যখন কোনো দল সমাজে একটা বিদআতের প্রচলন করে, তখন সমাজ থেকে কম করে হলেও একটি সুন্নাত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কাজেই যারাই সুন্নাহ সম্মত আমল করবে তাদের সাথে বিদআত পন্থীদের সংঘর্ষ অনিবার্য। সমাজে বিদআতি ও সহিহ সুন্নাহ অনুসারীদের মাঝে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করছে। এই জন্য বিদআতিগণ পৃথক হয়ে তাদের আলাদা নাম ও পরিচয় নির্ধারণ করে নিয়েছে। যদি সবাই সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করত তবে সমাজে এই বিশৃঙ্খলা এ বিভক্তি দেখা যেত  না।

(৪) বিদআতিদের সাথে বিভক্তির অন্যতম কয়েকটি কারণ :

বিদআতিদের সাথে বিভক্তির মূল কারণগুলো ধর্মীয়, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। নিচে এই বিভক্তির অন্যতম কয়েকটি কারণ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. বিদআত কর্মে বাধা প্রদানে মতবিরোধের সৃষ্টি-

বিদআত কিভাবে মতবিরোধ সৃষ্টি করেছেন তার একটি উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর মানুষ উরুশ উদ্‌যাপন করে। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে একটু জ্ঞান যারা রাখেন তারা জানেন এই কাজটি সম্পূর্ণ বিদআত। যা কুরআন সুন্নাহতে নেই এমন কি আমাদের পূর্বসূরি সালাফদের মাঝেও ছিল না কিন্তু কিছু পথভ্রষ্ট পীরের অনুসারী মুরিদ এই বিদআতি কাজটি ইবাদাত বলে চালাচ্ছে। যখনই আপনি এই বিদাতের বিরোধিতা করবেন সাথে সাথে দেখবেন উরশ পন্থী লোকজন আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। এই বিদআত দ্বারা মুসলিমদের মাঝে দুটি ভাগ হল। ঠিক এভাবেই প্রচলিত বিদআত দ্বারা মুসলিম জাতী আজ হাজার হাজার ফির্কাবন্ধী।

আস্তে আস্তে জিকির করা সুন্নাহ। এক দল জোরে জিকির করে। আপনি যদি বলেন, ভাই, জোরে জোরে জিকির করা বিদআতি কাজ। দেখবেন আপনার সাথে মতবিরোধ করছে। কোনো দলিলের ধার ধারবে না। এখান সমাজে জম্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী পালক করেছে। ঈদে মিলাদুন নবি” নাম দিয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী  পালন করেছ। যারা তাদের কথা না শুনে, কুরআন সুন্নাহ মত চলার চেষ্টা করে, তাদের সাথে এই বিদআতিদের সাথে সংঘর্ষ অনিবার্য।

২. ধর্মীয় অপব্যাখ্যা

বিদআত প্রচারকারীরা প্রায়শই ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে নিজেদের মত অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে, যা কুরআন ও হাদিসের মূল শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা নতুন নতুন প্রথা ও বিশ্বাসকে ধর্মের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। যার ফলে, যারা বিদআত মানে না, তাদের সঙ্গে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়।

৩. কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে পার্থক্য

কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি বিদআতিদের দৃষ্টিভঙ্গি মূলধারার মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়। বিদআতিরা নিজেদের প্রচলিত প্রথাকে সুন্নাহর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয়। এতে সুন্নাহ অনুসারী ও বিদআতিদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়।

৪. ধর্মীয় গোঁড়ামি ও উগ্রতা

বিদআতিরা প্রায়শই নিজেদের মতবাদকে একমাত্র সঠিক বলে দাবি করে। তাদের যতই কুরআন সুন্নাহ থেকে দলিল প্রদান কর হোকনা কেন তারা নিজেরদের মতমতই প্রাধান্য দেয় এবং অন্যদের ভুল হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাদের উপর দোষারোপ করে। তাদের এই মনোভাব সমাজে বিভাজন ও শত্রুতা বৃদ্ধি করে।

৫. বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য

বিদআতিরা প্রায়শই এমন বিশ্বাস ও আচার পালন করে, যা ইসলামের মূলধারার বাইরে। তারা ইসলামের মূল ধারার বাহিরে নতুন নতুন আমলের মাধ্যামে ধর্মীয় আচার পালন। যার ফলে মূল ধারায় আমলকারীর সাথে তাদের এগুলো নিয়ে বিতর্ক ও মতানৈক্য তৈরি হয়।

৬. তারা সামাজিক ও ধর্মীয় সংঘর্ষ সৃষ্টি করে।

বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করে। আস্ত আস্তে সমাজে বিদআতকরিদের সাথে সাধারণ মুসলিমদের বিভক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে।

৭. বিদআতিদের সঙ্গে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব

বিদআতিরা প্রায়শই নতুন নেতৃত্ব তৈরি করে এবং তাদেরকে সঠিক ধর্মীয় নেতা হিসেবে তুলে ধরে।

আমাদের করণীয় কি?

১. কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি গুরুত্ব:

সঠিক ইসলামি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে বিদআত থেকে দূরে থাকা। সবাই যদি সঠিকভাবে কুরআন সুন্নাহর অনুসরণ করে তবে বিদআতে কোন স্থান থাকবে। সবার আকিদা বিশ্বাস ও আমল এক হলে বিভক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সমাজে সবার মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। কাজেই কুরআন ও সুন্নাহকে গুরুত্ব দিয়ে জ্ঞান অর্জন করেত  হবে।

২. বিদআতেদের সাথে আলোচনা করা কিন্তু বিতর্কের পরিহার:

শান্তিপূর্ণ উপায়ে ধর্মীয় সমস্যার সমাধান করা। তাদের সাথে আলোচন করে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান হিকমতের সাথে প্রদান করা যাকে তারা এই ভয়াবহ ফিতনা থেকে বেচে যায় এবং সমাজেও বিভক্তি লোপ পায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে বির্তক কোনো সমাধান আনতে পারে না। বিতর্ক শুধু দূরত্বই বৃদ্ধি করে দিতে পারে।

৩. ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষা প্রচার:

গবেষণায় দেখা যায় বিদআতে মূল কারণ ইসলামি শিক্ষার অভাব। জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে জাহেল ও ভণ্ড পীর, অলি আওলিয়াদের ভ্রান্ত কথা পরে সাধারণ মানুষ বহু বিদআতে লিপ্ত। সমাজে সঠিক ইসলামি শিক্ষা বিস্তার করতে পারলে সহজে বিদআত দুর হবে। বিদআতের সাথে সাথে বিভক্তিও লোপ পাবে, সমাজে মুসলিমদের মাঝে ঐক্যের সৃষ্ট হবে।

মতবিরোধ প্রতিরোধে বারটি করণীয় আমল : তৃতীয় পর্ব

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মতবিরোধ থেকে মুক্তি জন্য আমাদের করণীয় হল-

১। মহান আল্লাহ নির্দেশ মেনে ঐক্য বজায় রাখতে হবে

২। মতবিরোধের মাধ্যমে ফির্কার সৃষ্টি না করে জামাত বন্ধ থাকতে হবে

৩। মতবিরোধ নিরসনে আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের হাদিসের দিকে প্রত্যর্পণ কর

৪। মতবিরোধ নিরসনে আমিরের আনুগত্য করতে হবে-

৫। জাল ও যঈফ বর্ণনাগুলো পরিহার করাঃ

৬। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মত প্রশস্ততা দেখান

৭। আকিদার ক্ষেত্র কুরআন সুন্নাহর সঠিক দলিলের অনুসরণ করা

৮। বিদআত পরিহার করে সুন্নাহর অনুসরণ করা

৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

এখানে শেষের চারটি আলোচিত হলো :

৯। কোন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা

আমাদের পূর্বসূরী বহু আলেম হকের উপর থেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইসলামে খেদমত করেছেন। তাদের ইমান, আমল ও ইলমের জন্য আজও আমরা তাদের স্মরণ করি। তাদের মাঝে যে বেশী ইলম অর্জন করেছে এবং যে বেশী মহানবী মুহম্মাদ ﷺ এর অনুসরণ করেছে সেই আমাদের নিকট বেশী প্রিয়। তাদের প্রতি আমাদের ভালবাসা ও অনুসরণের মাপকাঠি হল তাদের কুরআন সুন্নার অনুসরণ। এই মাপকাঠিতে তারা আমাদের অনুসরণীয় ব্যক্তি কিন্তু তাদের কেউ আমাদের একমাত্র অনুসরণীয় নয়। আমাদের একমাত্র অনুসরণ ব্যক্তি হল রাসূলুল্লাহ ﷺ। তিনিই একমাত্র অনুকরনী এবং অনুসরণীয়। ইবাদাত কোন পদ্ধতিতে একমাত্র অনুকরনী মাপকাঠি হল আমাদের নবি মুহাম্মাদ ﷺ। শুধু ইবাদত নয় দুনিয়াবী বিধি বিধানেও তিনি অনুকরনীয়। মুসলীম মানে আত্মসমর্থণকারী। অর্থাৎ আমরা আল্লাহ ও তার রসূল ﷺ এর ফায়সালার সামনে আত্মসমর্থণকারী। আল্লাহর রসূল ﷺ এর ফায়সালার সামনে মুমিনের আর কোনো স্বাধীনতা থাকে না। মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিন ‌ইরশাদ করেন

 وَمَا كَانَ لِمُؤۡمِنٖ وَلَا مُؤۡمِنَةٍ إِذَا قَضَى ٱللَّهُ وَرَسُولُهُۥٓ أَمۡرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ ٱلۡخِيَرَةُ مِنۡ أَمۡرِهِمۡۗ وَمَن يَعۡصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلٗا مُّبِينٗا

অর্থঃ যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিয়ে দেন তখন কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই ব্যাপারে নিজে ফায়সালা করার কোনো অধিকার নেই৷ আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের নাফরমানি করে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হয়৷ সূরা আহযাব : ৩৬

ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে একক কোন মানুষের তাকলীদ করতে হলে শুধু নবি মুহাম্মাদ ﷺ এর তাকলীদ করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে কেহই ভুলেন ঊর্ধ্বে নয়। মুহাম্মাদ ﷺ বলেন, তোমরা প্রত্যেকেই ভুল কর। ইসলামি ইবাদত ও বিধি বিধানে মুহাম্মাদ ﷺ ছাড়া কেহই শতভাগ সঠিক নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে, কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই সম্পূর্ণ নির্ভুল। তবে ইসলামে রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষভাবে সুরক্ষিত (মাসুম) করা হয়েছে, যার ফলে তিনি নবুয়তের বিষয়ে ভুলের ঊর্ধ্বে।

১. আল্লাহ তাআলা ভুলের ঊর্ধ্বে :

আল্লাহ তাআলা বলেন:

قَالَ عِلۡمُہَا عِنۡدَ رَبِّیۡ فِیۡ کِتٰبٍ ۚ  لَا یَضِلُّ رَبِّیۡ وَلَا یَنۡسَی ۫

মূসা বলল, ‘এর জ্ঞান আমার রবের নিকট কিতাবে আছে। আমার রব বিভ্রান্ত হন না এবং ভুলেও যান না’। সুরা ত্বহা : ৫২

২. রাসুলুল্লাহ -এর মাসুম হওয়া-

রাসুলুল্লাহ ﷺ নবুয়ত এবং ধর্মীয় বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরক্ষিত। তিনি কোনো ভুল নির্দেশ দেননি বা কুরআন ও সুন্নাহর ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি ঘটাননি।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ  إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡىٌ۬ يُوحَىٰ

“তিনি (রাসুল) তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী কথা বলেন না। এটি কেবল একটি ওহি যা তাঁর কাছে নাজিল করা হয়। সূরা নাজম : ৩-৪

৩. সাহাবা, আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে ভুলের সম্ভাবনা-

সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এবং বড় বড় আলেমরাও ভুল করতে পারেন। তাদের ভুলের কারণে তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে যান না, তবে তাদের বক্তব্য বা মতামত যাচাই করা উচিত কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে। এই সম্পর্কে ইমাম মালিক (রহ.)-এর এই উক্তিটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ এবং ইসলামি জ্ঞানচর্চায় বহুল ব্যবহৃত। এটি মূলত ইবনে আবদুল বার (রহ.) এর বই “জামি’ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি”-তে উল্লিখিত হয়েছে। উক্তিটির আরবি ভাষ্য হলো-

“ما من أحدٍ إلا ويؤخذُ من قولِهِ ويترك، إلا النبي ﷺ.”

“কোনো ব্যক্তির কথা গ্রহণও করা হয় এবং বর্জনও করা হয়, কেবল নবি ﷺ ছাড়া।”

এটি ইমাম মালিক (রহ.)-এর ইসলামি আইনের মূলনীতির প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর গুরুত্ব সর্বোচ্চ।

৪. রাসুলুল্লাহ ছাড়া কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নন-

যে কেউ ভুল করতে পারে, তবে ইসলাম তার ভুল স্বীকার করার এবং সংশোধনের ওপর জোর দেয়। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ

“প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর সর্বোত্তম ভুলকারী হলো তারা যারা তওবা করে। সুনানে তিরমিজি : ২৪৯৯

৫. কাউকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা বিপজ্জনক

কাউকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে, কারণ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে নিখুঁত মনে করা হয়। যদি কাউকে ভুলের ঊর্ধ্বে হয় তবে সমাজে বিভ্রান্তি ও অন্ধ অনুসরণ সৃষ্টি হয়। মানুষ তখন মিথ্যা ও সত্যের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা হয়।  একক কোনো ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা যাবে না। এতে হক সত্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি এমনটি হয় তবে একে কেন্দ্র করে সমাজে নতুন নতুন ফির্কার সৃষ্ট হবে। ফির্কা সৃষ্টি পাশাপাশি আরও একটা মহা বিপদ আছে। যদি কেউ কোনো ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করে, তাহলে সে তার সকল আদেশ নিষধ মানার মাধ্যমে মহান আল্লাহর সমক্ষ করা হবে। এবং এর মাধ্যমে সে শিরকি কাজে লিপ্ত হবে, যা তাকে ইসলাম ও মুসলিম থেকে খারিজ করে দিবে। যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন-

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

অর্থ: তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের উলামা ও দরবেশদেরকে নিজেদের খোদায় পরিণত করেছেন৷ সুরা তওবা  : ৩১

ইসলামের খেদমত করেছেন এমন  অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি আছে। যারা যুগে যুগে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অবদান রেখেছেন। তারা আমাদের নিকট অনুসরণীয় কিন্তু একমাত্র অনুসরণীয় নয়। এমন কিছু আলেমদের নাম উল্লেখ করব যারা যুগে যুগে মুসলিম ও ইসলাম ধর্মকে প্রচার ও প্রসার করছে। তারা স্বমহিমায় ভাক্মর কিন্তু তাদের নামে কোন ফির্কার সৃষ্ট করেনি। তাদের অধিকাংশের নাম কোন ফির্কাও নেই। কিছু অতি উৎসাহী ভক্ত তাদের মৃত্যুর বহু পরে তাদের কারো কারো নামে ফির্কার জম্ম দিয়েছে। আবার অনেক পথভ্রষ্ট আলেন নিজেও ফির্কার জম্ম দেন।

আমাদের দায়িত্ব হল-

১. আমরা তাদের অনুসরণ করব, তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিব কিন্তু তাদের নামের কোন ফির্কার জন্ম দিব না। তাহলে উম্মত কখনো বিভক্ত হবে না।

২. কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকা। তাদের কোন কথা কাজ কুরআন সুন্নাহর বিপরীত পেলে, তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করা।

৩. তাদেরকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা যাবে না। তাদের প্রতিটি বক্তব্য বা মতামত সম্ভব হলে, যাচাই করে গ্রহণ করা।

৪. আমাদের অন্যতম দায়িত্ব হলো- কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সত্য-মিথ্যার যাচাই করা এবং যে কোনো ভুল সংশোধনের জন্য প্রয়াস চালানো।

উপরের কাজগুলো সঠিকভাবে করতে পারলে সমাজে বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্যের সৃষ্ট হবে। মানুষ ইসলামি শরীয়ার অনুশাসনে ফিরে আসবে।

১০। মাযহাবের নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেয়া-

যে সকল মহান মুহাদ্দিস আলেমদের নামে আমাদের সমাজে চারটি মাযহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের জীবনে আলোচনা করে দেখতে পাই, তারা ইসলামের এক এক জন নক্ষত্র তুল্য ইমাম ও মুজতাহিদ ছিল। তারা নিজেরা নিজের নামে কোন মাযহার প্রতিষ্ঠা করে যান নি। তারা যে সময় জম্ম গ্রহণ করেন তখন ছিল ইসলামের স্বর্ণ যুগ। প্রতিষ্ঠিত চার ইমামের সময় কাল ছিল নিম্মরুপঃ

আবু হানীফা (রহঃ) জম্ম ৮০ হিজরী এবং মৃত্যু ১৫০ হিজরী

ইমাম মালেক (রহঃ) জম্ম  ৯৩ হিজরী এবং মৃত্যু ১৭৯ হিজরী

ইমাম শাফিয়ী  (রহঃ) জম্ম  ১৫০ হিজরী এবং মৃত্যু  ২০৪ হিজরী

আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) জম্ম  ১৬৪ হিজরী এবং মৃত্যু ২৪১ হিজরী

ইমামদের জীবনী গবেষণা করে দেখা যায় একমাত্র আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) ব্যতীত বাকি তিন তাবে-তাবেয়ী ছিলেন। তাদের তিনজনের মৃত্যু তাবে তাবেয়ীদের যুগ অর্থাৎ ২২০ হিরজীর পূর্বে। ইসলামি চিন্তাবিদগণ মনে করেন তাবে-তাবেয়ী হওয়ার যোগ্যতা ১৭৪ হিজরিতে শেষ হয়ে যায়। যদিও এই মহান চার মুজতাহীন আলেমের নাম চারটি মাযহাব সমাজে প্রচলিত কিন্তু ইতিহাস বলে মাযহার সৃষ্টিতে তাদের কোন ভূমিকা নেই। হয়ত তারা তাদের জীবনে এক মুহূর্তের জন্য এমন কল্পনা করেনি যে, তাদের নামে এই পৃথিবীতে মাযহাব সৃষ্টি করা হবে। মাযহার সৃষ্ট করা তো দূরের কথা মাযহাব কি তাও তারা জানতেন না। মাযহাবের নামে পরিচয় দেওয়া, যেমন “আমি হানাফি,” “আমি শাফেয়ি,” বা “আমি মালিকি,” যদি তা ইসলামের ঐক্যের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে আত্মগৌরব, বিদ্বেষ বা বিভাজনের কারণ হয়ে ওঠে, তবে এর কিছু কুফল দেখা যায়। নিচে এই কুফলগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি

মাযহাবের নামে পরিচিতি অনেক সময় মুসলিমদের মধ্যে বিভাজনের জন্ম দেয়। একে অপরকে ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ মনে করার মানসিকতা গড়ে ওঠে। ইসলাম একমাত্র পরিচয় হওয়ার পরিবর্তে মাযহাবকে বড় করে দেখা হয়। ফলে উম্মার মাঝে বিভক্তির সৃষ্ট হয় ও ঐক্য নষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

أَلاَ لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ عَلَيْكُمْ بِالْجَمَاعَةِ وَإِيَّاكُمْ وَالْفُرْقَةَ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ مَعَ الْوَاحِدِ وَهُوَ مِنَ الاِثْنَيْنِ أَبْعَدُ مَنْ أَرَادَ بُحْبُوحَةَ الْجَنَّةِ فَلْيَلْزَمِ الْجَمَاعَةَ مَنْ سَرَّتْهُ حَسَنَتُهُ وَسَاءَتْهُ سَيِّئَتُهُ فَذَلِكَ الْمُؤْمِنُ

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থা করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫

২. উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট

ইসলাম সকল মুসলমানকে একত্রে “উম্মাহ” হিসেবে পরিচিত করে। মাযহাবের নামে দলবাজি উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করে এবং শত্রুরা এই বিভাজন কাজে লাগায়।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ

তোমরা সবাই আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। সুরা আলে ইমরান : ১০৩

এই সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْجَمَاعَةَ وَيَكْرَهُ الْفُرْقَةَ.” عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ رضي الله عنه، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ

আবু দারদা (রা.) হতে বর্ণিত, নবি করিম (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ ঐক্যকে পছন্দ করেন এবং বিভেদকে অপছন্দ করেন। মুসনাদ আহমদ : ২১৭২১

৩. কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দূরে থাকা

মাযহাবের প্রতি অন্ধ আনুগত্য কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত নির্দেশনা অনুসরণ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে। প্রায়শই লোকেরা মাযহাবের মতবাদকে চূড়ান্ত মনে করে, যা ইসলামের শাশ্বত মূলনীতির বিপরীত।

৪. আত্মগৌরব ও বিদ্বেষ সৃষ্টি

“আমার মাযহাব সঠিক, তোমার মাযহাব ভুল” এই ধরনের মানসিকতা গড়ে ওঠে। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ এবং অহংকার প্রদর্শন দেখা যায়।

৫. জ্ঞানচর্চায় সংকীর্ণতা

মাযহাবের নামে পরিচিতি অনেক সময় একজন ব্যক্তির জ্ঞানচর্চাকে সীমাবদ্ধ করে। অন্যান্য মাযহাবের বিশ্লেষণ বা যুক্তি গ্রহণ করার মানসিকতা কমে যায়।

৬. ইসলামের সরলতার ক্ষতি

ইসলাম একটি সহজ-সরল ধর্ম, যা মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে। মাযহাবকে কেন্দ্র করে কঠোরতা বা অহেতুক বিতর্ক সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পারে।

আমাদের করণীয়-

মাযহাবের আলেমদের অনুসরণ করা দোষের কিছু নাই। কেননা এই সকল ইমামগণ কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি অগ্রাধিকার দিয়ে কঠিন কঠিন সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। কুরআন সুন্নাহতে আছে, আর তারা এর বিপরীত কথা বলেছেন তা চিন্তাতীত ভাবনা। তারপরও তারা ভুলের ঊর্ধ্বে নন এবং তারা সকল বিষয়ের সকল হাদিসও জানতেন না বিধায় তাদের কোনো গবেষণা কুরআন সুন্নাহর বিপরীত হতেও পাবে। এই সকল ক্ষেত্রে তাদের তাদের প্রতি সম্মান রেখে কুরআন সুন্নাহ অনুসরণ করা জরুরি। এই সবের প্রতি খেয়াল রেখে, ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রতি দৃঢ় থাকা এবং মাযহাবকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাই করা। মাযহাবের প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি: মাযহাবের ফিকহগত দিকগুলো অধ্যয়ন করা, তবে তা মুসলিম ঐক্যের ক্ষতি না করে। মাযহাবের পার্থক্য ভুলে মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য বজায় রাখা। সকল মাযহাবের ফিকহ অধ্যয়ন করা এবং মতভেদ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক এড়ানো। সর্বোপরি মাযহাবের নামে পরিচয় দেওয়া যদি ইসলামের সার্বজনীন ঐক্যের ক্ষতি করে, তবে তা ইসলামের মৌলিক উদ্দেশ্যের বিপরীত। একজন মুসলমানের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত “আমি মুসলিম” এবং কুরআন ও সুন্নাহর প্রতি অবিচল থাকা। তাহলেই আমরা মতবিরোধ থেকে বেঁচে থাকতে পারব। আল্লাহু আলাম।।

১১। তরিকার নামে আলাদা আলাদা পরিচয় না দেওয়া

সুফিবাদ বা বৈরাগ্যবাদ যাকে মহান আল্লাহ আল কুরআনে “রুহবানিয়াত” বলে উল্লেখ করছেন। মহান আল্লাহ কুরআনে এরশাদ করেন,

 ثُمَّ قَفَّيۡنَا عَلَىٰٓ ءَاثَـٰرِهِم بِرُسُلِنَا وَقَفَّيۡنَا بِعِيسَى ٱبۡنِ مَرۡيَمَ وَءَاتَيۡنَـٰهُ ٱلۡإِنجِيلَ وَجَعَلۡنَا فِى قُلُوبِ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُوهُ رَأۡفَةً۬ وَرَحۡمَةً۬ وَرَهۡبَانِيَّةً ٱبۡتَدَعُوهَا مَا كَتَبۡنَـٰهَا عَلَيۡهِمۡ إِلَّا ٱبۡتِغَآءَ رِضۡوَٲنِ ٱللَّهِ فَمَا رَعَوۡهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا‌ۖ فَـَٔاتَيۡنَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ مِنۡہُمۡ أَجۡرَهُمۡ‌ۖ وَكَثِيرٌ۬ مِّنۡہُمۡ فَـٰسِقُونَ

অর্থঃ তাদের পর আমি একের পর এক আমার রসূলগণকে পাঠিয়েছি৷ তাদের সবার শেষে মারয়ামের পুত্র ঈসাকে পাঠিয়েছি, তাকে ইনজীল দিয়েছি এবং তার অনুসারীদের মনে দয়া ও করুণার সৃষ্টি করেছি৷ আর বৈরাগ্যবাদ তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করে নিয়েছে৷ আমি ওটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেইনি৷ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তারা নিজেরাই এ বিদয়াত বানিয়ে নিয়েছে৷  তারপর সেটি যেভাবে মেনে চলা দরকার, সেভাবে মেনেও চলেনি ৷ তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিল, তাদের প্রতিদান আমি দিয়েছি৷ তবে তাদের অধিকাংশই পাপী৷ সুরা হাদিদ : ২৭

উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ রুহবানিয়াত’ বা বৈরাগ্যবাদ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন খ্রিষ্টানগণ (ঈসা আলাইহিস সালাম এর অনুসারী) নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় উদ্ভাবন করে নিয়েছে রুহবানিয়াত’ বা বৈরাগ্যবাদ। কারো জুলুম নির্যাতনের ভয়ে, দুনিয়ার ফিতনার ভয়ে, নিজের প্রবৃত্তির দুর্বলতার ভয়ে বা অন্য কোন ভয়ের কারণে দুনিয়াত্যাগী হয়ে যাওয়া এবং দুনিয়ার জীবন থেকে পালিয়ে বন-জংগলে বা পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া কিংবা নির্জন নিভৃতে কোন স্থানে বসে থাকা হল রুহবানিয়াত’ বা বৈরাগ্যবাদ। তাই বলা যায় ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের আগেই এ পৃথিবীতে সুফিবাদ ছিল। আর আস্তে আস্তে ইসলামের ভিতর ঢুকে পড়েছে। এই মতবাদ প্রথমে পারস্য এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় সভ্যতার অনিবার্য প্রভাব পড়েছিল। এই দুই অঞ্চলের সুফিবাদে বিভিন্ন আকিদা আমল ইসলামের নামে সফিবাদে ঢুকে পরে। যার ফলে সুফিরা ইসলামি বিশ্বাস থেকে বহু দুরে সরে যায়। তাই সুফিবাদের বিরুদ্ধে অনেক মুজতাহিদ আলেম ওলেমাগন সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলে। আলেম ওলামাদের এ সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে আরবের অধিকাংশ দেশে সুফিবাদ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও সিরিয়া ও ইরানে (পারস্যে) প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। আর উপমহাদেশে রাজনৈতিক কারণে সুফিদের প্রাধান্য বেশী থেকে যায় যা আজও বিদ্যমান। তাই বলা যায় আমাদের দেশে সুফিবাদের অগ্রগতি ও বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়নি। তবে সুফিবাদ নিয়ে বির্তকও কম নেই। এসব সত্ত্বেও বাংলার জনসমাজে প্রায় হাজার বছর ধরে মতবাদটি দারুণ জনপ্রিয় ও গ্রহণীয়। গ্রামে গজ্ঞে আজও এ  মতবাদে বিশ্বাসীদের মিথ্যা এবং ইসলাম বিরোধী কল্পকাহিনির মাধ্যমে সাধারণ অজ্ঞ লোকদের বিমোহিদ করে ধোঁকা দিচ্ছে। আজও বাঙালি মুসলমানদের মনের গভীরে সুফি-দরবেশদের চিন্তাধারার প্রভাব বিস্তার করে আছে।ইতিহাস গবেষণা করে জানা যায় এই সুফিবাদী দর্শন তিনটি উত্স থেকে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করে।

১। দক্ষিণ এশীয় হিন্দু, বৌদ্ধ এবং শিখদের থেকে

২। খ্রিষ্টানদের নিকট থেকে

৩। মধ্যপ্রাচ্য থেকে

 সহজেই অনুমেয় সুফিদের সাথে ইসলামের সাথে মিলের চেয়ে অমিলই বেশী। যেখানে ইসলামের একটি মৌলিক বিধান অমান্য করলে কাফির হতে হয় সেখানে সুফিদের আকিদ ও আমলের বিস্তার পার্থক্য। এই কারণে অনেক মুহাক্কিদ আলেম সুফিদের কাফির বলার সাথে সাথে বলেছেন এটা ইসলামের নামে শিয়াদের মত আরেকটি মতবাদ। শিয়াগন বাদি করে থাকে তারা সঠিক ও সুন্নি থেকে আলাদা অপর পক্ষে সুফিগণ তো সুন্নি বাদি করেই বসে আছে। মূল ধারার ইসলামের সাথে এদের বিরোধ আর বিভক্তি চরম। কেননা, এদের আকিদা আমল কোনটিই ইসলামের মৌলীক শিক্ষার সাথে সামযস্যশীল নয়। কিছু সুফি গোষ্ঠী এবং ব্যক্তির মধ্যে এমন কিছু ভ্রান্ত আকিদা ও কর্মপ্রণালী দেখা যায়, যা কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। নিচে কিছু ভ্রান্ত আকিদা উল্লেখ করা হলো-

১. আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে সম্পূর্ণ একত্বের ধারণা (ওহদাতুল ওজুদ)

২. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নূরের সৃষ্টি, তিনি আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্ট, যা মানবীয় সৃষ্টির বিপরীত।

৩. পীর বা মুরশিদের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য

৪. মাজার পূজা ও ওসিলা হিসেবে মৃতদের আহ্বান করে

৫. জাহেরি (বাহ্যিক) ইবাদতকে তুচ্ছজ্ঞান করে

৬. আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক দাবি করে।

৭. নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে ইবাদত করা

৮. আধ্যাত্মিক শক্তির দাবি করে

৯. তাওয়াক্কুলের নামে কর্মবিমুখ থাকে

১০. মিথ্যা ধ্যান-গমনের মাধ্যম থাকা।

এ রকম শত শত ভ্রান্ত মিথ্যা মনগড়া আকিদা বিশ্বাস ও আমলের উপর সুফিবাদ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সাথে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরোধ ও বিভক্তি একটি সাধারণ ব্যাপার। সুফিদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো- তাদের প্রায় শতভাগই অজ্ঞ শরিয়াত সম্পর্কে কোন জ্ঞানই নাই। তারা শুনা কথার অনুসরণ করে থাকে। যদি সুফিদের এই সকল ভ্রান্ত আকিদা কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা যায়, তবে আশা করা যায় ফিরে আসবে। মুসলমানদের উচিত এ ধরনের ভুল ধারণা ধরিয়ে দিয়ে প্রকৃত ইসলামের ছায়াতলে ফিরিয়া আনা। যদি তাদের কুরআন ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর পথে আনা সম্ভব হয় তবে সুফিদের সাথে ইসলামের বিভক্তি কমে যাবে।

রসুলুল্লাহ ﷺ যুগ থেকে ইসলাম যতই দুরে যাচ্ছে ইসলামে কুরআন ও সহিহ হাদিসের পরিবর্তে সুফিবাদের ধ্যানধারণা এবং বিজাতীয়দের আমল আখলাক মুসলিমদের মাঝে প্রসার লাভ করে। বিজাতির নোংরা রীতি-নীতির জালে আটকা পড়ে ইসলাম তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেছে। আর হাজার হাজার শিরকি আকিদা ও বিদআতী রীতি-নীতির ইসলামে ঢুকে পড়েছে। সমাজের অজ্ঞ লোকেরা এর বিষাক্ত থাবায় ঈমান হারাচ্ছে। এভাবে মানুষ সরল পথ ছেড়ে বাঁকা পথ ধরছে। একক তরিকা বাদ দিয়া হাজারও তরিকা তালাশ করছে। যার মূলে ইসলামে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে। ইসলাম ধর্মে ঐক্য ঠিক রাখতে হলে এই সকল তরিকা পরিত্যাগ করে ইসলামের সহজ ও সরল পথ অনুসরণ করতে হবে।।

১২। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেয়া-

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হল সর্বক্ষেত্রে নিজের নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য দেয়া। মানুষের মাঝে মতভেদ হওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয় হলে, যখন মতভেদের বিষয়ে নিজের মতামতকে প্রাধান্য প্রদান করা হয় তখনই মতবিরোধ হয়। যার ফলে দ্বীনে মাঝে ফির্কা সৃষ্টি হয়ে দ্বীন টুকরা হয়ে যায়। পৃথিবীতে মুশরিকগণ আল্লাহর দ্বীনকে টুকরা টুকরা করেছিল বলে কুরআনে উল্লেখ আছে।  আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ ..مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ

অর্থঃ তোমরা ঐ মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা দ্বীনকে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে এবং যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দল তাদের কাছে যা ছিল তাই নিয়েই খুশি। সূরা রূম : ৩১-৩২।

এখান একটি কঠিন কথা বলা হয়েছে যে দ্বীন বিভক্ত করে তারা অখুশি ছিল না বরং তারা নিজেদের দল নিজেই সন্তুষ্ট ছিল। এটা একটা মুশরিক নীতি যে নিজের দল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে অর্থাৎ নিজ দলকেই প্রাধান্য দিবে। সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেওয়া অন্যতম কারণ কুরআন সুন্নাহর দলিলেকে প্রাধান্য প্রদান না করে নিজের প্রবৃ‌ত্তিকে প্রাধান্য প্রদান করে। দলিল প্রদানের উপর নিজের প্রবৃত্তিকে প্রাধান্য প্রদানকে কুরআন বলা হয়েছে নিজের প্রবৃত্তিকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে। এই সম্পর্ক আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

اَفَرَءَیۡتَ مَنِ اتَّخَذَ اِلٰـہَہٗ ہَوٰىہُ وَاَضَلَّہُ اللّٰہُ عَلٰی عِلۡمٍ وَّخَتَمَ عَلٰی سَمۡعِہٖ وَقَلۡبِہٖ وَجَعَلَ عَلٰی بَصَرِہٖ غِشٰوَۃً ؕ فَمَنۡ یَّہۡدِیۡہِ مِنۡۢ بَعۡدِ اللّٰہِ ؕ اَفَلَا تَذَکَّرُوۡنَ

তবে তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে আপন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তিনি তার কান ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তার চোখের উপর স্থাপন করেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পর কে তাকে হিদায়াত করবে? তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? সুরা জাসিয়া : ২৩

ইসলামের সৌন্দর্য হলো সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতের উপর ইসলামের বিধিবিধান (ঈমান, হালাল, হারাম, ফরজ হুকুম) কে প্রাধান্য প্রদান করা। শুধু তাই নয়, নিজের উপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সকল মুমিন মুসলিম ভাইকেও প্রাধান্য দিতে হবে। নিজের হাদিসগুলো লক্ষ করুন-

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ

তোমাদের কেউ প্রকৃত মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ يُؤْمِنُ عَبْدٌ حَتَّى يُؤْمِنَ بِأَرْبَعٍ بِاللَّهِ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ وَبِالْبَعْثِ بَعْدَ الْمَوْتِ وَالْقَدَرِ

 কোন বান্দাহ চারটি বিষয়ের উপর ঈমান না আনা পর্যন্ত মুমিন হবে না। একমাত্র আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনবে, যাঁর কোন শারীক নেই, নিশ্চয় আমি আল্লাহ্‌র রাসূল, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান এবং তাকদির ভালোমন্দে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৮১, সুনানে তিরমিযজি : ২১৪৫, মিশকাত : ১০৪

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ.

তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষের অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই। সহিহ বুখারি : ১৫, সহিহ মুসলিম : ৪৪

যখন সর্বক্ষেত্রে নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না নিয়ে কুরআন, সুন্নাহ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মুমিন ও অন্যকে দলকে প্রাধান্য দিব তখন মতভেদ, মতভেদই থেকে যাবে। মতভেদ, কখনই মতবিরোধে রূপ নিবে না। কাজেই মতবিরোধ দূর করার অন্যতম হাতিয়ার হলো- নিজের দল ও মতকে প্রাধান্য না দেওয়া।

যে সকল দিবস পালন করা বিদআত-০৭ ::  আশুরা সম্পর্কি জাল বর্ণনাসমূহ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় জালিয়াতগন এ সম্পর্কেও বহু জাল হাদিস রচনা করেছে। আশুরা সম্পর্কে কয়েকটি জাল হাদিস তুল ধরছি।

জাল হাদীস-০১ : মুহাররম বা আশুরার সিয়ামের ফজিলত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে এই সম্পর্কে জাল হাদিসগুলি হলোঃ

১. যে ব্যক্তি আশুরার দিন রোজা রাখে, তা তার চল্লিশ বছরের গোনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়।

২. মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।

৩. আশুরার তারিখে রোজা আদায়কারীর আমলনামার সাত আসমান-জমিনের অধিবাসীদের সওয়াব লিখে দেওয়া হয়।

৪. হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি মহররমের মাসে রোযা রাখিবে, আল্লাহ তা‘আলা তাহাকে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ৩০ দিন রোযা রাখার সমান ছওয়াব দিবেন।

৫. মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে।

৬. আরও হাদীছে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার দিন একটি রোযা রাখিবে সে দশ হাজার ফেরেশতার, দশ হাজার শহীদের ও দশ হাজার হাজীর ছওয়াব পাইবে। 

৭. আরও হাদীছে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে স্নেহ-পরবশ হইয়া কোন এতীমের মাথায় হাত ঘুরাইবে, আল্লাহতাআলা ঐ এতীমের মাথার প্রত্যেক চুলের পরিবর্তে তাহাকে বেহেশতের এক একটি ‘দরজা’ প্রদান করিবেন। আর যে ব্যক্তি উক্ত তারিখের সন্ধ্যায় রোযাদারকে খানা খাওয়াইবে বা ইফতার করাইবে, সে ব্যক্তি সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকে খানা খাওয়াইবার ও ইফতার করাইবার ন্যায় ছওয়াব পাইবে।

৮. নবি (সা.) বলিলেন, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখিবে, সে ৬০ বৎসর রোযা সালাত করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে। যে ব্যক্তি ঐ তারিখে বিমার পোরছী করিবে, সে সমস্ত আওলাদে আদমের বিমার-পোরছী করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে।… তাহার পরিবারের ফারাগতি অবস্থা হইবে। ৪০ বৎসরের গুনাহর কাফ্ফারা হইয়া যাইবে।

৯. হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করিয়াছেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের প্রথম ১০ দিন রোজা রাখিবে, সে ব্যক্তি যেন ১০ হাজার বৎসর যাবত দিনের বেলা রোজা রাখিল এবং রাত্রিবেলা ইবাদতে জাগরিত থাকিল। … মহররম মাসে ইবাদতকারী ব্যক্তি যেন ক্বদরের রাত্রির ইবাদতের ফযীলত লাভ করিল।… তোমরা আল্লাহ তা‘আলার পছন্দনীয় মাস মহররমের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিও। যেই ব্যক্তি মহররম মাসের সম্মান করিবে, আল্লাহ তাআলা তাহাকে জান্নাতের মধ্যে সম্মানিত করিবেন এবং জাহান্নামের আযাব হইতে বাঁচাইয়া রাখিবেন… মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা আদম (আ.) ও অন্যান্য নবিদের উপর ফরজ ছিল। এই দিবসে ২০০০ নবি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এবং ২০০০ নবির দোয়া কবুল করা হইয়াছে।

এই জাল কথাগুলি পাবেনঃ

১. মাওলানা গোলাম রহমান, মকছুদোল মো’মেনীন, পৃষ্ঠা-৪৩০-৪৩১। 

২. মুফতী হাবীব ছামদানী, বার চান্দের ফযীলত, পৃষ্ঠা-১৩,

৩. অধ্যাপিকা কামরুন নেসা দুলাল, পৃষ্ঠা-২৯৮-৩০০।

হাদীস জাল বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৩

২. শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিঃ), মিজানুল ইতিদাল, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-৪৫১-৪৫২।

৩. ইমাম হাসান আস-সাগানী (৬৫০ হিঃ), আল-মাউদুআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৬৮-৫৭২।

৪. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৪৬-৫৪৮।

৫. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯ ।

৬. ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৯-১৩০।

৭. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহুশ শরীআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯-১৫১

৮. আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৫।

৯. মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬।

১০. হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৯।

১১. এসব হাদিস নয়, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১৯।

জাল হাদীস-০২ : আশুরার সম্পর্কে মিথ্যা ঘটনাবলি।

আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে এই জাল কাথাগুলি বলা হয়ঃ

দশই মহাররম বা আশুরার দিন আল্লাহ আসমান ও যমিন, পাহাড়, পর্বত, নদনদী, কলম, লাওহে মাহফূয, আরশ, কুরসী, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিরিশতাগণ, আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, ইদরীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, নূহ (আ.) কে নৌকা থেকে বের করেন,  দাউদ (আ.) তাওবা কবুল করেছেন, সুলাইমান (আ.) কে রাজত্ব প্রদান করেছেন, আইঊব (আ.)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন, তাওরাত নাযিল করেন, ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, তিনি খলীল উপাধি লাভ করেন, ইবরাহীম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান, ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানী করা হয়েছিল, ইউনূস (আ.) মাছের পেট থেকে বাহির হয়, ইউসূফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করেন, এ দিনে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান, ইয়াকূব (আ.) ইউসূফের (আ.) সাথে সম্মিলিত হন, মুহাম্মাদ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছেন।

আদম (আ.) এর তাওবা কবুল, নূহ (আ.) এর নৌকা জূদী পর্বতের উপর থামা ও ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবী-তাবিয়ী থেকে বর্ণিত।

কথাগুলিকে জাল হাদিস বলেছেনঃ

১. ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৭

২. শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিঃ), মিজানুল ইতিদাল, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৯০।

৩. মুহাম্মাদ ইবনুস সাইয়িদ দরবেশ হূত (১২৭৬ হি), ‘আসনাল মাতালিব, পৃষ্ঠা-২৭৭-২৭৮।

৪. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৬৯।

৫. ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯ ।

৬. ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২।

৭. আল-আজলূনী (১১৬২ হি.), কাশফুল খাফা, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৭।

৮. আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৭।

৯. মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬।

১০. ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯।

ইবনুল কাইয়িম, আল-মানার, পৃষ্ঠা-৫২।

১১. হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫১০।

১২. এসব হাদিস নয়, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১২০।

এই সম্পর্কে সহিহ হাদিস হলোঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা আশূরার দিন সওম রাখে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে  ডুবিয়েছেন। মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। (মিশকাত-২০৬৭, বুখারী ১৮৭৮ ইফাঃ সহিহ মুসলিম ১১৩০)

এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরআউন ও তার কওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এই বর্ণনাটি সত্য হলেও বাকি সব জাল।

জাল হাদীস-০৩ : আশূরার দিনে সুরমা ব্যবহার।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথাটি হলোঃ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

مَنِ اكْتَحَلَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ بِالإِثْمِدِ، لَمْ تَرْمُدْ عَيْنُهُ أَبَداً

যে ব্যক্তি আশূরার দিনে চোখে ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে কখনোই তার চোখ উঠবে না।

হাদিসটি জাল বলেছনঃ

* ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১৬।

* আব্দুর রহমান আল-সাখাভী (৯০২ হিঃ), আল-মাকাসীদুল হাসানাহ, পৃষ্ঠা-৪০১।

* ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-২১১।

* মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরার পৃষ্ঠা-২২২, মাসনূ, পৃষ্ঠা- ১৪১।

* ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৫৭।

* ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-১৩১-১৩২।

* আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১০০-১০২।

* হাদিসের নামে জালিয়াতী বইয়ের অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫০৮।

ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করার ফলে চোখের উপকার হয় এই মর্মে সহহি হাদীস বিদ্যমানঃ

১. আবদুল্লাহ বিন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা অবশ্যই ইসমিদ সুরমা ব্যবহার করবে। কেননা তা চোখের ময়লা দূর করে, দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতায় লোম গজায়। (ইবনে মাজাহ ৩৪৯৫)

২. ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো এবং তা দিয়ে তোমাদের মৃতদের কাফন পরাও। কেননা তা তোমাদের উত্তম পোশাক। আর তোমাদের জন্য উত্তম সুরমা হলো ‘ইসমিদ’ সুরমা, কারণ তা দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের পাতার চুল গজায়।  (আবু দাউদ ৩৮৭৮, ৪১৬১)

৩. জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা শোয়ার সময় অবশ্যই ‘ইসমিদ’ সুরমা ব্যবহার করবে। কারণ, তা চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে এবং এর ফলে অধিক ভ্রূ জন্মায়। (শামায়েলে তিরমিজি ৪১, ইবনে মাজাহ ৩৪৯৬)

৪. ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি ﷺ বলেছেন, তোমরা ইসমিদ সুরমা লাগাও। এটা চোখের জ্যোতি বাড়ায় এবং চোখের পাতার লোম গজায়। তিনি মনে করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটি সুরমাদানি ছিল। তা হতে তিনি প্রতি রাতে তিনবার ডান চোখে এবং তিনবার বাঁ চোখে সুরমা লাগাতেন। (তিরমিজি ১৭৫৭)

জাল হাদীস-০৪ : দশই মুহাররম আশুরার দিন কিয়মত হবে।

এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে প্রচলিত জাল হাদিসটি হলোঃ

১. রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশই মুহাররম ব আশুরার দিন কিয়মত হবে।

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

১. আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী (রহ.) মন্তব্য করেন এটা নিঃসন্দেহে মাওযূ বা বানোয়াট।

২. শায়খ আলবানী জাল বলেছেন। কিতাবুল মওযূয়াত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-২০২।

৩. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল লায়ালিল মাসনূআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৯।

৪. মুহাম্মদ ইব্‌ন আলী আল-কিনানী, তানযীহুশ শরীআতিল মারফুআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৪৯।

৫. মাউযূ হাদীস বা প্রচলিত জাল হাদীস, হাদীস নং-১০৬।

বিভিন্ন প্রকারের দিবস কেন্দ্রিক কার্যক্রম

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

দেশ বিদেশে বিভিন্ন দিবস খুব ঘটা করে উদ্‌যাপন করা হয়। জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবেও বিভিন্ন দিবস উদ্‌যাপন করা হয়। ইসলামি শরীয়তেও বিভিন্ন দিবস বা মাসকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ইবাদাত করা হয়।  রমজান এবং জিলহজ্জ মাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ ইবাদাত করা হয়। লাইলাতুল কদর, আরাফাতের দিন, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার দিন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একটু লক্ষ করলেই দেখা যায় অনেক মুসলিম কম বেশী ইসলামি শরিয়তের বাহিরের দিবসগুলো খুব গুরুত্ব দিয়া উদ্‌যাপন করে থাকে। ইসলামি শরীয়তে নেই, এমন দিবস উদ্‌যাপন করা ইসলাম কতটুকু সমর্থন করে?

কুরআন সুন্নাহর বাহিরে কোনো দিবস উদ্‌যাপন ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ বিধান প্রযোজ্য। কোন কোন দিবস উদ্‌যাপন করা হারাম, আবার কোনটি জায়েয। দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে দিবসটির সামগ্রিক কার্যকলাপের উপর নির্ভর করবে। এই হিসাবে দিবসটি পালনের কারণে শির্ক, কুফরি, বিদআত, হারাম এবং জায়েয হতে পারে। শুধু দুনিয়ায় সাথে সংশ্লিষ্ট এমন নতুন দিবস উদ্‌যাপন করা হয় হারাম, না হয় জায়েয। কিন্তু যখন দিবসটি ইবাদত মনে করে উদ্‌যাপন করা হবে তখন তা বিদআতি কাজ হিসেবে পরিগনিত হবে।  দিবস উদ্‌যাপন করা শরিয়ত সম্মত কি না, তা নির্ধারণের জন্য কিছু শর্ত আছে। ঐ শর্তের বাহিরে গেলেই উদ্‌যাপন করা করা হয় হারাম, না হয় বিদআত হবে। কাজেই দিবস উদ্‌যাপন করার আগে এই শর্ত সম্পর্কে জেনে নেই। সাধারণত দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত শর্তগুলি খেয়াল রাখতে হবে।

১। কুরআন সুন্নাহে নাই, এমন দিবস উদ্‌যাপন করাকে ইবাদাত মনে করা যাবে না।

২। দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে কুফরি আকিদা ধারণ করা করা যাবে না।

৩। দিবস উদ্‌যাপন করার সময় ইসলাম বহির্ভূত হারাম কাজ লিপ্ত হওয়া যাবে না।

৪। দিবস উদ্‌যাপন করার ক্ষেত্রে অর্থের অপচয় করা যাবে না।

৫। বিধর্মীদের অনুসরণে কোনো দিবস উদ্‌যাপন করা যাবে না।

৬। ইবাদত প্রমাণের জন্য জাল জইফ হাদিসের আশ্রয় নেয়া যাবে না।

৭। যে দিবস ইসলামের প্রাথমিক যুগে উদ্‌যাপন করা হয় নাই।

উপরের শর্তগুলির আলোকেই দিবস উদ্‌যাপন করা জায়েয হতে পারে। বিষয়টি একটু খুলে বলা যাক।

১। দিবস উদ্‌যাপন করাকে দ্বীন মনে করা :

কুরআন সুন্নাহে নাই, এমন দিবসকে ইবাদাত মনে করে উদ্‌যাপন করা একটি বিদআত। আমাদের সমাজে বহু দিবসকে দ্বীন মনে করে উদ্‌যাপন করা হয় যার কোন ভিত্তি ইসলামে নেই। ইসলামের নামে এমন দিবস উদ্ভাবন করে উদ্‌যাপন করাই বিদআত যা মুমিন মুসলিমকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।

আয়িশাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيْهِ فَهُوَ رَدٌّ

কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি ২৬৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রা.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আমাদের নাসীহাত করেন, যাতে অন্তরসমূহ ভীত হল এবং চোখগুলো অশ্রু প্রবাহিত হলো। বলা হল, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি তো বিদায় গ্রহণকারীর উপদেশ দিলেন। অতএব আমাদের নিকট থেকে একটি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন। তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ ভিতি অবলম্বন করো, শ্রবণ করো ও আনুগত্য করো, যদিও সে কাফরী গোলাম হয়। আমার পরে অচিরেই তোমরা মারাত্নক মতভেদ লক্ষ্য করবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়াত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদ্বীনের সুন্নাত অবশ্যই অবলম্বন করবে, তা দাঁত দিয়ে শক্তভাবে কামড়ে ধরবে। অবশ্যই তোমরা বিদআত কাজ পরিহার করবে। কারণ প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২, সুনানে তিরমিজি : ২৬৭৬, সুনানে আবূ দাঊদ : ৪৬০৭, আহমাদ : ১৬৬৯২, দারিমী : ৯৫।

দ্বীন নাই অথচ দ্বীন মনে করে বহু আমল আবিষ্কার করেছে জান্নাত পাগল মুমিন। নবি ﷺ এর জন্মদিবস উদ্‌যাপন করা হয় “ঈদে মিলাদুন্নবি” নাম ধারণ  করে। নবি ﷺ এর মিরাজকে কেন্দ্র করে “শবে মিরাজ” বা “লাইলাতুল মিরাজ” উদ্‌যাপন করা হয়। বিভিন্ন অলি আউলিয়াদের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাদের মাজারে উরশ উদ্‌যাপন করা হয়। সাধারণ মুসলীম নর-নারীদের মৃত্যু বার্ষিকী এবং চল্লিশার নামে দিন ক্ষণ ঠিক করে পালিত হয় মৃত্যু বার্ষিকী এবং চল্লিশা উদ্‌যাপন করা হয়। এমনিভাবে আশুরা এবং শাবানের ১৫ তারিখের রজনীও মুসলিম সমাজে ইবাদাত মনে করে উদ্‌যাপন করা হয়। এই সকল দিবস উদ্‌যাপন করার কোন ভিত্তি ইসলামি শরীয়তে নাই কিন্তু বিদআতিগণ ইহাকে দ্বীন মনে করে নেকীর আশায় উদ্‌যাপন করে। মন রাখতে হবে, কুরআন সুন্নাহে নাই, এমন দিবস উদ্‌যাপন করাকে ইবাদাত মনে করা যাবে না।

২। দিবসের উৎযাপনের সাথে কুফরী আকিদা রাখাঃ

এমন অনেক দিবস আছে যেগুলির সাথে ইসলামী শরীয়তের কোন প্রকার সংশ্লিষ্টতা নাই এবং কেউ ইবাদাত মনে করেও এই সকল দিবস উদ্‌যাপন করে না। কিন্তু ঐ দিবসটি উদযাপনের সাথে সাথে কুফরী আকিদা প্রষোণ করে থাকে। আমাদের দেশে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন করা হয়। অনেক এই কুফরী আকিদা রাখে যে বছরের প্রথম দিন যেমন যাবে, সারা বছর ঠিক তেমন যাবে। তাই তারা বছরের প্রথম দিন ভাল ভাল পোশাক করে, ভালো ভালো খাবার খায়। প্রতি বছর নববর্ষের একটি করে কুফরী আকিদা নিয়ে উৎযাপিত হয়। এই সম্পর্কে বলা হয়- এ বছর  মা দূর্গা হাতিতে চড়ে এসেছেন, তাই এবার ফসল ভাল হবে।

আমাদের সমাজে আশুরার সিয়াম উদ্‌যাপন করে অনেক সুন্নাহ সম্মত আমল করার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু লোক অজ্ঞতা বসত মনে করে থাক। আশুরার সম্পর্কে মিথ্যা ঘটনাবলি। দশই মহাররম বা আশুরার দিন আল্লাহ আসমান ও যমিন, পাহাড়, পর্বত, নদনদী, কলম, লাওহে মাহফূয, আরশ, কুরসী, জান্নাত, জাহান্নাম, ফিরিশতাগণ, আদম (আ.) কে সৃষ্টি করেছেন। এই দিনে তিনি আদম (আ.) কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, ইদরীসকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, নূহ (আ.) কে নৌকা থেকে বের করেন,  দাউদ (আ.) তাওবা কবুল করেছেন, সুলাইমান (আ.) কে রাজত্ব প্রদান করেছেন, আইঊব (আ.)-এর বিপদ-মসিবত দূর করেন, তাওরাত নাযিল করেন, ইবরাহীম (আ.) জন্মগ্রহণ করেন, তিনি খলীল উপাধি লাভ করেন, ইবরাহীম (আ.) নমরূদের অগ্নিকুন্ডু থেকে রক্ষা পান, ইসমাঈল (আ.) কে কুরবানী করা হয়েছিল, ইউনূস (আ.) মাছের পেট থেকে বাহির হয়, ইউসূফকে (আ.) জেলখানা থেকে বের করেন, এ দিনে ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টি শক্তি ফিরে পান, ইয়াকূব (আ.) ইউসূফের (আ.) সাথে সম্মিলিত হন, মুহাম্মাদ ﷺ জন্মগ্রহণ করেছেন।

এই সম্পর্কে সহিহ হাদিস হলোঃ

১. ইবনু ‘আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা আশূরার দিন সওম রাখে। রাসূল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আঃ) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে  ডুবিয়েছেন। মূসা (আঃ) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সওম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। (মিশকাত-২০৬৭, বুখারী ১৮৭৮ ইফাঃ সহিহ মুসলিম ১১৩০)

নোটঃ – এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফিরআউন ও তার কওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন এই বর্ণনাটি সত্য । আদম (আ.) এর তাওবা কবুল, নূহ (আ.) এর নৌকা জূদী পর্বতের উপর থামা ও ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো কোনো সাহাবী-তাবিয়ীদের কথা।  বাকিই সব বর্ণনা জাল বলেছেন-

ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হিঃ), আল-মাউদআত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১১২-১১৭, শামছুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিঃ), মিজানুল ইতিদাল, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৯০, ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), লিসানুল মিজান, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৬৯,  ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৮-১০৯,  আল-আজলূনী (১১৬২ হি.), কাশফুল খাফা, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-৫৫৭, আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৭, মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হিঃ), আল আসরারুল মারফুআহ, পৃষ্ঠা-৯৪-৯৬।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দশই মুহাররম ব আশুরার দিন কিয়মত হবে। এই হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

আল্লামা আবুল ফরজ ইবনুল জাওযী (রহ.) মন্তব্য করেন এটা নিঃসন্দেহে মাওযূ বা বানোয়াট, জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল লায়ালিল মাসনূআহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১০৯। শায়খ আলবানী জাল বলেছেন। কিতাবুল মওযূয়াত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-২০২।

৩। দিবসের উৎযাপনের সময় ইসলাম বহির্ভুত হারাম কাজে লিপ্ত হয়ঃ

এমন অনেক দিবস আছে যার সাথে ইসলামে ইবাদাতে কোন সম্পর্ক নাই। দিবসটি উদ্‌যাপন করাকে ইবাদাত মনে করে না। ইহার দ্বারা কোন খারাপ আকিদাও প্রষোণ করে না। কিন্তু এই দিবস উৎযাপনের সাথে সাথে বহু হারাম কাজ লিপ্ত হতে হয়। অর্থাৎ দিবসটির সাথে হারাম হালালের সম্পর্ক আছে। আন্তরজাতীক নারী দিবস উদ্‌যাপন করার জন্য হাজার হাজার মহিলা পর্দাকে উপেক্ষা করে ঘরের বাহিরে আসে। নারীর পর্দার ফরজকে উপেক্ষা করে ইহাতে অংশ গ্রহন হারাম। অথচ মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। সুরা আহযাব : ৫৯

‘আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস’ এর কথাই ধরুন, নারীর নৃত্য মানে কি সবার জানা। কোন দেশের বা অঞ্চলের সংস্কৃতি হলেও ইসলামি শরীয়তে ইহা যে হারাম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠিক তেমনভাবে “বিশ্বভালবাসা দিবস” উদ্‌যাপন করা মানে নারী অবাধ মেলামেসাকে সমর্থন প্রদান করা। এই দিবস উদ্‌যাপন করা করার অর্থ হবে নিজেকে হারাম কাজে সম্পৃক্ত করা। আপনাকে কোন আলেম হতে হবে না, একটু চোখ কান খোলা রাখলেই ইসলামি শরীয়ত বিরোধী দিবস যা হারাম কাজের জম্মদেয় তা অনায়াসে চিনতে পারবেন। আমলের যেমন নির্দষ্ট নিয়ম কারন আছে ঠিক তেমনি প্রতিটি কাজের মাঝে ইসলামি শরীয়তের নির্দিষ্ট বীধি বিধান আছে। এই বীধি বিধানের বাহিরে কোন কাজ করলে কাজটি হারাম হয়। কাজেই কোন দিবস উদ্‌যাপন করতে গিয়ে যদি ইসলামি শরীয়তের এই বীধি বিধানকে উপেক্ষা করে হারামে লিপ্ত হতে হয়, তবে দিবসটি উদ্‌যাপন করা যে হারাম হবে।

৪। দিবস উদযাপনে শুধু অর্থের অপচয় করা

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُواْ إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় উদ্‌যাপনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। ( সুরা বনী-ইসরাঈল : ২৭

এমন অনেক দিবস আছে যার কোন উপকারীতা নাই শুধু্ই অর্থের অপচয়। যেমনঃ জম্ম দিন, জাতীয় শিক্ষক দিবস, সুন্দরবন দিবস, কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী, মহান শিক্ষা দিবস, কন্যা শিশু দিবস, জাতীয় যুব দিবস, এই রকম বহু দিবস আছে যার কারনে সমাজের কোন উপকার হয় না, দিবসটি উৎযাপনে শুধু অর্থের অপচয় হয়। এই সকল দিবস পালনে ইসলামের সাথে সম্পর্ক না থাকলেও অপচয় করার জন্য হারামে পরিনত্ হয়।

ইংরেজী নববর্ষে শুধু আতশবাজীর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার আগুন-পটকা ফোটানোর মাধ্যমে খরচ করে থাকে। এই অপচয় এখন আর ধনী দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পৃথিবীর বহু দেশ এখন এই অপচয়ের সাথে যু্ক্ত।  আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশর মানুষও নানা অপকর্মের আর অপচয়ের মাধ্যমে দিনটি উদ্‌যাপন করে।

৫। বিধর্মীদের অনুসকরণে দিবস উদ্‌যাপন করাঃ

মহান আল্লাহ বলেন,

*وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ وَدَعْ أَذَاهُمْ وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا*

আপনি কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের উৎপীড়ন উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর উপর ভরসা করুন। আল্লাহ কার্যনিবার্হীরূপে যথেষ্ট। সুরা আহযাব ৩৩:৪৮

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَلَن تَرْضَىٰ عَنكَ ٱلْيَهُودُ وَلَا ٱلنَّصَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْۗ قُلْ إِنَّ هُدَى ٱللَّهِ هُوَ ٱلْهُدَىٰۗ وَلَئِنِ ٱتَّبَعْتَ أَهْوَآءَهُم بَعْدَ ٱلَّذِى جَآءَكَ مِنَ ٱلْعِلْمِۙ مَا لَكَ مِنَ ٱللَّهِ مِن وَلِىٍّ وَلَا نَصِيرٍ

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহর হিদায়াতই হিদায়াত’ আর যদি তুমি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর তোমার কাছে যে জ্ঞান এসেছে তার পর, তাহলে আল্লাহর বিপরীতে তোমার কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না। সুরা বাকারা : ১২০

ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

আমর ইবনু শু‘আইব রহ. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا لاَ تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ وَلاَ بِالنَّصَارَى فَإِنَّ تَسْلِيمَ الْيَهُودِ الإِشَارَةُ بِالأَصَابِعِ وَتَسْلِيمَ النَّصَارَى الإِشَارَةُ بِالأَكُفِّ ‏

বিজাতির অনুকরণকারী ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী-নাসারাদের অনুকরণ করো না। কেননা ইয়াহূদীগণ আঙ্গুলের ইশারায় এবং নাসারাগণ হাতের ইশারায় সালাম দেয়। সুনানে তিরমিজ : ২৬৯৫

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ ﷺ আমার পরনে কমলা বা কুসম্ব রংয়ের দু’খানা কাপড় দেখতে পেলেন, তখন তিনি ﷺ বললেন, মূলতঃ এটা কাফিরদের পোশাক। কাজেই তা পরো না। অপর এক রিওয়ায়াতে আছে, আমি বললাম, আমি কি তাকে ধৌত করে ফেলব? তিনি বললেন, বরং এ দু’টিকে পুড়িয়ে ফেলো।  মিশকাত : ৪৩২৭,  সিলসিলাতুস সহিহাহ : ২৩৯৫

কুরআন ও সহিহ হাদিসসমূহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠলো যে কাফির মুশরিক, ইহুদী, নাছারা, বৌদ্ধ, হিন্দুসহ কোন অমুসলিমদের অনুসরণ করা জায়িয নেই। কিন্তু এমন অনেক দিবস আছে যে দিবসগুলি উদ্‌যাপন করে থাকি অমুসলিমদের অনুসরণের মাধ্যমে। যে দিবস কখনও মুসলিমদের দ্বার সৃষ্ট হয় নাই। যার প্রতিটি ছত্রই আবিস্কার করছে অমুসলিম জাতী। প্রতি বছর জানুয়ারীর প্রথম দিন ইংরেজী নববর্ষ হিসাবে পশ্চিমা জাতী খুব ঘটা করে উদ্‌যাপন করে থাকে। তাদের দেখা দেখি অনেক মুসলমানে সন্তানেরাও আজ ঘটা করে ইংরেজী নববর্ষ উদ্‌যাপন করা করে থাকে।

অনুরূপভাবে খৃষ্টানগণ প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর ঈসা আলাইহিস সালামের জম্ম দিন ধরে বড় দিন হিসবে উদ্‌যাপন করে। হিন্দুরা শ্রী শ্রী কৃষ্ণের জন্ম দিন হিসাব করে জম্মাষ্টি উদ্‌যাপন করে। এদের দেখা দেখি আজ বিদআতি মুসলিমগন নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জম্ম দিবস হিসাব করে “ঈদে মীলাদুন্নবী” উদ্‌যাপন করে।

৬। ইবাদত প্রমানের জন্য জাল জইফ হাদিসের আশ্রয় নেয়া যাবে না

দিবস পালনের জন্য জাল হাদিস দ্বারা মিথ্যা নেকির বর্ণনা করে থাকে। এর যুগে দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয় নাই। সাহবী রা. ও জানতেন না। তাবেয়ি ও তাবে তাবেয়িগণ ও আমল করেন  নাই। এমন দিবস সম্পর্ক কিছু জাল  ও বানোয়াট বর্ণনা করে দিবসটি পালনের বৈধতা প্রদান করার চেষ্টা করা হয়। লাইলা তুল মিরাজের কথা বলতে পারি। এই সম্পর্কে কোন হাদিসতো দুরের কতা সঠিক তারিখটিও জানা যায় নে কত তারিখে মিরাজ হয়েছিল। অথচ আমদের পূর্বসুরিদের আমল প্রমানিত হলে আর যা হোক তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকতো না। অথচ লাইলাতুল মিরাজ সম্পর্কে একটি জাল হাদিস দেখুন-

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

بُعِثْتُ نَبِيًّا فِيْ السَّابِعِ وَالْعِشْرِيْنَ مِنْ رَجَبٍ فَمَنْ صَامَ ذَلِكَ الْيَوْمَ كَانَ كَفَّارَةَ سِتِّيْنَ شَهْراً

রজব মাসের ২৭ তারিখে আমি নবুয়ত পেয়েছি। কাজেই যে ব্যক্তি এই দিনে সিয়াম উদ্‌যাপন করবে তার ৬০ মাসের গোনাহের কাফফারা হবে।

হাদীসটি জাল বলেছেনঃ

 ইবনে আররাক (৯৩২ হি.), তানযীহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১৬১,  ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২ হিঃ), তাবয়ীনুল আজাব, পৃষ্ঠা-৬৪, ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), আল-ইলালুল মুতানাহিয়া, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৬, ইবনে কাসির (৭৭৪ হিঃ), আলবিদায়া ওয়ান-নিহায়া, সপ্তম খন্ড, পৃষ্ঠা-৬৮০-৬৮১ ও একাদশ খন্ড, পৃষ্ঠা-৭৪, ইমাম আল-বায়হাকী (৪৫৮ হিঃ), শু‘আবুল ঈমান, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠ-৩৭৩, হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা নম্বর-৫৩২, এসব হাদিস, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৫-১২৬।

ঠিত তেমনি ভাবে ঈদে মিলাদুন্ননবী সম্পর্কে কোন অনেক জাল বর্ননা আছে যার  দ্বারা বিদআতিগণ  তার ফজিলত বর্ণনা করে দিবসটি পালনের চেষ্টা করে তাকে। কাজেই কোন দিবস পারনের জন্য সহিহ বর্ণনা না পেলে কোন অবস্থায়ই দিবসটি ইসলাম মনের করে উদ্‌যাপন করা যাবে না এবং এ লক্ষে কোন প্রকার জাল জইফ হাদিসের আশ্রয় নেয়া যাবে না।

৭। যে দিবস ইসলামের প্রথমিক যুগে উদ্‌যাপন করা হয় নাই

আবূ নাজীহ আল-ইরবাদ ইবনু সারিয়াহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনালেন যে, তাতে অন্তর ভীত হল এবং চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে গেল। সুতরাং আমরা বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! এ যেন বিদায়ী ভাষণ মনে হচ্ছে। তাই আপনি আমাদেরকে অন্তিম উপদেশ দিন।’ তিনি বললেন, ’’আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতি এবং (রাষ্ট্রনেতার) কথা শোনার ও তার আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি; যদিও তোমাদের উপর কোন নিগ্রো (আফ্রিকার কৃষ্ণকায় অধিবাসী) রাষ্ট্রনেতা হয়। (স্মরণ রাখ) তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদ্বীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবূত করে ধরে থাকবে। আর তোমরা দ্বীনে নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদ’আত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদ’আতই ভ্রষ্টতা। সুনানে আবূ দাউদ : ৪৬০৭, সুনানে দারেমী : ৯৫, রিযাদুস সালেহিন : ১৫৭

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, বনী ইসরাঈল যে অবস্থায় পতিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে আমার উম্মাতও সেই অবস্থার সম্মুখীন হবে, যেমন একজোড়া জুতার একটি আরেকটির মতো হয়ে থাকে। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ যদি প্রকাশ্যে তার মায়ের সাথে ব্যভিচার করে থাকে, তবে আমার উন্মাতের মধ্যেও কেউ তাই করবে। আর বনী ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উন্মাত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া তাদের সবাই জাহান্নামী হবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে দল কোনটি? তিনি বললেনঃ আমি ও আমার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত। সুনানে তিরমিজি : ২৬৪১, সহীহাহ : ১৩৪৮

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর পর ১০ হিজরী থেকে ২২০ হিজরী সাল পর্যান্ত সাহাবি, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের যুগ ছিল। ২২০ হিজরি সময় কাল পর্যান্ত যে সকল তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগন তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম দ্বারা হাদিস মুখম্ত করেছেন, সংরক্ষণ করেছেন এবং উম্মতে ফিকহি সমাধান প্রদান করছেন তাদের মধ্য মাযহাবে ইমাম চার জনের ভূমিকা অত্যান্ত উজ্জ্বল। তারা হাদিস মুখন্ত, সংকল, সংরক্ষন, প্রচার এবং ফিকহি ব্যাখ্যা বিশ্লেষন অন্যতম ভুমিকা রাখেন। এই সময়টাকে ইসলামের প্রথমিক যুগ বলা। এই সময় দ্বীনের মাঝে কোন বিকৃতি ঘটে নাই বিধায় এই সময় কোন আমলকে সুন্নাহ সম্মত হিসাবে ধরা হয়। কাজেই কোন আমল এর পর আবিস্কৃত হলে তা বাতিল বিদআত।  রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মৃত্যুর প্রায় চারশত বছর পরি মিলাদ নামক বিদআত চালু হলেয়ে। আমাদের পূর্ববর্তী সালাফদের মাছে এই মিলাদের কোন নমুনা খুজে পাওয়া যায় না।

বিভিন্ন দিবসের নাম

উপরে আলোচিত সাতটি শর্তে মেনে কোন দিবস উদ্‌যাপন করা হারাম হবে না, বরং জায়েয। জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস, জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস, নিরাপদ সড়ক দিবস,  বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস, মাদক বিরোধী দিবস ইত্যাদি। এই সকল দিবসে যদি অপচয় রোধ করে বা কোন প্রকার শরীয়ত বিরোধী কাজ না করে যদি জন সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষে কাজ করা হয় তবে শুধু জায়েয হবে না বরং বড় সওয়াবের কাজ হবে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতীকভাবে এত দিবস উদ্‌যাপন করা হয় যে হিসাব রাখা খুবই কঠিন। এই বিশাল তালিকা সম্পর্কে আলোচনা করাও সম্ভব নয়। এ সকল দিবস সম্পর্কে জ্ঞান রাখাও জরুরী নয়। তারপরও একটা সাধারণ ধারনা প্রদানের জন্য পাঠকদের নিকট এই দিবসগুলোর একটি তালিকা উল্লেখ করছি। যার ফলে পাঠকবৃন্দ এ সম্পর্কে কিছু ধারনা নিতে পারে। আমাদের আলোচনার বিষয় হলো বিভিন্ন দিবস তাই এই দিবসগুলির মাঝে যেগুলো আমাদের শরীয়ত বিরোধী কাজ করাতে উৎসাহ দেন তা থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটা আলোচন করব ইনশাল্লাহ।   

দিবসগুলোর তালিকা তিনটিভাগে উল্লেখ করছি, প্রথমভাগে বাংলাদেশের দিবসগুলো, দ্বিতীয় ভাগে বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক দিবসগুলো এবং শেষের দিকে আন্তর্জাতিক দিবস যা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত সেগুলো উল্লেখ করব। আমাদের দেশে অধিকাংশই দিবসগুলো প্রায় নিয়মিত পালিত হয়। কিন্তু কিছু কিছু দিবস, বিভিন্ন রাজনৈতিক কারনে পালিত হয়, আবার কখনও রাজনৈতিক কারনে পালিত হয় না। আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক দিবসগুলোর জন্য সরকারি ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার প্রেক্ষিতে তা পালিত হয়। দিবস পালনের ব্যাপ্তিও অর্থ প্রাপ্তীর উপর নির্ভর করে থাকে। অর্থ বেশী পেলে জাকযমক বেশী হয়, আবার অর্থ কম পেলে জাকযমক কম হয়।

বাংলাদেশের দিবস :

এই দিবসগুলো শ্রেফ বাংলাদেশেই পালিত হয়। অবশ্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসি বাঙালিরাও এই দিবসগুলো সীমিতাকারে উদ্‌যাপন করে থাকেন।

তারিখদিবসের নামতারিখদিবসের নাম
১০ জানুয়ারিবঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ২৩ জুনপলাশী দিবস 
১৯ জানুয়ারিজাতীয় শিক্ষক দিবস ১ জুলাইঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস 
২০ জানুয়ারিশহীদ আসাদ দিবস ৩ জুলাইজন্ম নিবন্ধন দিবস :
২৪ জানুয়ারিগণঅভ্যুত্থান দিবস ১৫ আগষ্টশোক দিবস 
২৫ জানুয়ারিকম্পিউটারে বাংলা প্রচলন দিবস ২৭ আগস্টদিঘলিয়ার দেয়াড়া গণহত্যা দিবস 
৫ ফেব্রুয়ারিবাংলাদেশের জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস১৭ সেপ্টেম্বরমহান শিক্ষা দিবস :
১১ ফেব্রুয়ারিসড়ক হত্যা দিবস১৮ সেপ্টেম্বরকৃষ্ণপুর গণহত্যা দিবস 
১৪ ফেব্রুয়ারিসুন্দরবন দিবস ২৩ সেপ্টেম্বরপ্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবস
২১ ফেব্রুয়ারিশহীদ দিবস২৯ সেপ্টেম্বরমাহমুদপুর গণহত্যা দিবস 
২৮ ফেব্রুয়ারিজাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস৩০ সেপ্টেম্বরকন্যা শিশু দিবস
১ মার্চজাতীয় ভোটার দিবস  ২ অক্টোবরপথশিশু দিবস বা সুবিধাবঞ্চিত শিশু দিবস  
২ মার্চজাতীয় পতাকা দিবস ৫ অক্টোবরশিক্ষক দিবস 
৬ মার্চজাতীয় পাট দিবস২২ অক্টোবরনিরাপদ সড়ক দিবস 
৮ মার্চজাতীয় নারী দিবস১ নভেম্বরজাতীয় যুব দিবস
১৭ মার্চশিশু দিবসপ্রথম শনিবারজাতীয় সমবায় দিবস 
২৩ মার্চপতাকা উত্তোলন দিবস*৩ নভেম্বরজেলহত্যা দিবস
২৬ মার্চস্বাধীনতা দিবস  ৪ নভেম্বরসংবিধান দিবস
৩১ মার্চজাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস৭ নভেম্বরজাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস*
২ এপ্রিলজাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস ১০ নভেম্বরনূর হোসেন দিবস বা স্বৈরাচার বিরোধী দিবস 
১৪ এপ্রিলপহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ ২১ নভেম্বরসশস্ত্রবাহিনী দিবস 
১৭ এপ্রিলমুজিবনগর দিবস৩০ নভেম্ববরজাতীয় আয়কর দিবস
২৮ এপ্রিলজাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা দিবস
১ মেমহান মে দিবস : ৬ ডিসেম্বরস্বৈরাচার পতন দিবস
১৬ মেফারাক্কা লংমার্চ দিবস বা ফারাক্কা দিবস ৮ ডিসেম্বরজাতীয় যুব দিবস 
২৩ মেজাতীয় নৌ নিরাপত্তা দিবস৯ ডিসেম্বররোকেয়া দিবস
২৫ মেকবি কাজী নজরুল ইসলামের  জন্মবার্ষিকী  ১২ ডিসেম্বরডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস
২৮ মেনিরাপদ মাতৃত্ব দিবস  ১৪ ডিসেম্বরশহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
৭ জুনছয় দফা দিবস১৬ ডিসেম্বরবিজয় দিবস
১৩ জুননারী উত্ত্যক্তকরণ প্রতিরোধ দিবস বা ইভ টীজিং প্রতিরোধ দিবস ১৯ ডিসেম্বরবাংলা ব্লগ দিবস

বিশ্ব বা আন্তর্জাতিক দিবসঃ

বিশ্বের প্রায় সকল দেশে একই দিনে একই সাথে এই দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয়। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এই দিবসগুলি পালনের রীতি চালু আছে।  বিশ্ব দিবসাকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

তারিখদিবসের নামতারিখদিবসের নাম
জানুয়ারির শেষ রবিবারবিশ্ব কুষ্ঠ দিবস৩১ মেবিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস
২ জানুয়ারিবিশ্ব জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ দিবসতৃতীয় রবিবার।বিশ্ব বাবা দিবস
২৬ জানুয়ারিআন্তর্জাতিক কাস্টম্‌স দিবস৫ জুনবিশ্ব পরিবেশ দিবস
২ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব জলাভূমি দিবস৮ জুনবিশ্ব ব্রেইন টিউমার দিবস
১২ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব ডারউইন দিবস,১২ জুনবিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস
১৪ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব ভালোবাসা দিবস১৪ জুনবিশ্ব রক্তদাতা দিবস
১৫ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস১৭ জুনবিশ্ব মরুময়তা দিবস 
২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস২১ জুনবিশ্ব সঙ্গীত দিবস
২২ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব স্কাউট দিবস২ জুলাইবিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিকতা দিবস
২৪ ফেব্রুয়ারি: আল কুদ্‌স দিবস২৯ জুলাইবিশ্ব বাঘ দিবস
দ্বিতীয় সোমবারকমনওয়েলথ দিবসপ্রথম রবিবারবিশ্ব বন্ধু দিবস
৩ মার্চবিশ্ব বই দিবস১ আগস্টবিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস
৮ মার্চবিশ্ব নারী দিবস৬ আগস্টহিরোশিমা দিবস
১০ মার্চবিশ্ব কিডনি দিবস৯ আগস্টনাগাসাকি দিবস
১৪ মার্চআন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস ৮ই সেপ্টেম্বরবিশ্ব ফিজিওথেরাপি দিবস
১৪ মার্চবিশ্ব পাই দিবস১৮ সেপ্টেম্বরবিশ্ব নৌ দিবস
১৫ মার্চপঙ্গু দিবস২২ সেপ্টেম্বরবিশ্ব কারামুক্ত দিবস
 ১৫ মার্চবিশ্ব ক্রেতা অধিকার দিবস২৪ সেপ্টেম্বরমীনা দিবস
২০ মার্চবিশ্ব শিশুনাট্য দিবস২৬ সেপ্টেম্বরবিশ্ব হার্ট দিবস
২১ মার্চবিশ্ব বন দিবস২৭ সেপ্টেম্বরবিশ্ব পর্যটন দিবস
২১ মার্চবিশ্ব বর্ণবৈষম্য দিবস২৮ সেপ্টেম্বরবিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস
২২ মার্চবিশ্ব পানি দিবস৩০ সেপ্টেম্বরবিশ্ব কন্যা শিশু দিবস
২৩ মার্চবিশ্ব আবহাওয়া দিবস১ অক্টোবরআন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস
২৪ মার্চবিশ্ব যক্ষ্মা দিবস১ অক্টোবরবিশ্ব নিরামিষ দিবস
২৬ মার্চআর্থ আওয়ার৪ অক্টোবরবিশ্ব প্রাণী দিবস
২৭ মার্চবিশ্ব নাট্য দিবস৫ অক্টোবরবিশ্ব শিক্ষক দিবস
২ এপ্রিলবিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস৯ অক্টোবরবিশ্ব ডাক দিবস
২ এপ্রিলবিশ্ব শিশু বই দিবস১০ অক্টোবরবিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস
৪ এপ্রিলবিশ্ব মাইন বিরোধী দিবস১৪ অক্টোবরবিশ্ব মান দিবস
৭ এপ্রিলবিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস১৪ অক্টোবরবিশ্ব দৃষ্টি দিবস
১৬ এপ্রিলবিশ্ব কণ্ঠ দিবস১৫ অক্টোবরবিশ্ব সাদাছড়ি দিবস
১৭ এপ্রিলবিশ্ব হিমোফেলিয়া দিবস১৬ অক্টোবরবিশ্ব খাদ্য দিবস
২২ এপ্রিলবিশ্ব ধরিত্রী দিবস২৪ অক্টোবরবিশ্ব তথ্য উন্নতকরণ দিবস
২৩ এপ্রিলবিশ্ব পুস্তক দিবস৩১ অক্টোবরবিশ্ব মিতব্যয়িতা দিবস
২৪ এপ্রিলবিশ্ব ভেটেরিনারি দিবসঅক্টোবরের প্রথম সপ্তাহআন্তর্জাতিক পোস্টকার্ড সপ্তাহ
২৫ এপ্রিলবিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবসঅক্টোবরের প্রথম সোমবারবিশ্ব স্থাপত্য দিবস
২৬ এপ্রিলবিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসঅক্টোবরের প্রথম শুক্রবারবিশ্ব হাসি দিবস
২৬ এপ্রিলআন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস১৪ নভেম্বরবিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস
২৭ এপ্রিলবিশ্ব নকশা দিবস১২ নভেম্বরবিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস
২৮ এপ্রিলবিশ্ব পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা দিবস২০ নভেম্বরআফ্রিকার শিল্পায়ন দিবস
৩ মেবিশ্ব সাংবাদিকতা দিবস২৯ নভেম্বরফিলিস্তিন সংহতি দিবস
৮ মেবিশ্ব রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট দিবস১ ডিসেম্বরবিশ্ব এইড্‌স দিবস
১৭ মেবিশ্ব টেলিযোগাযোগ দিবস১১ ডিসেম্বরবিশ্ব পর্বত দিবস
১৮ মে:আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস২৫ ডিসেম্বরবড় দিন বা যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন

আন্তর্জাতিক দিবস যা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতঃ

 সাধারণত জাতিসংঘ কর্তৃক চালু করা ও উদযাপিত দিবসগুলোই “আন্তর্জাতিক দিবস” হিসেবে উদযাপিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ, জাতিসংঘের অন্যতম সদস্য হিসেবে এই দিবসগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্‌যাপন করে থাকে।

তারিখদিবসের নামতারিখদিবসের নাম
২৫ জানুয়ারিআন্তর্জাতিক শুল্ক দিবস:১ অক্টোবরবিশ্ব শিশু দিবস
৪ ফেব্রুয়ারিবিশ্ব ক্যান্সার দিবস:১ অক্টোবরআন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস
২১ ফেব্রুয়ারিআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস৫ অক্টোবরবিশ্ব শিক্ষক দিবস
২২ মার্চবিশ্ব পানি দিবসঅক্টোবর প্রথম সোমবারবিশ্ব আবাসন দিবস বা বিশ্ব বসতি দিবস
২৯ এপ্রিলআন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসঅক্টোবর দ্বিতীয় বুধবারআন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসকরণ দিবস
১ মেমে দিবস১৫ অক্টোবরআন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস
১৫ মেআন্তর্জাতিক পরিবার দিবস১৭ অক্টোবরআন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস
২৯ মেশান্তিরক্ষী দিবস২৪ অক্টোবরজাতিসংঘ দিবস
২০ জুনবিশ্ব শরণার্থী দিবস৩ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
২৬ জুনআন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস :৫ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাসেবক দিবস
জুন প্রথম শনিবারআন্তর্জাতিক সমবায় দিবস৭ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল দিবস
১১ জুলাইবিশ্ব জনসংখ্যা দিবস :৯ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক দূর্নীতিবিরোধী দিবস
৯ আগস্টআন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস :১০ ডিসেম্বরমানবাধিকার দিবস
৮ সেপ্টেম্বরবিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবস ১৮ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস
১৬ সেপ্টেম্বরআন্তর্জাতিক ওজনস্তর রক্ষা দিবস ২৯ ডিসেম্বরআন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস
২১ সেপ্টেম্বরবিশ্ব শান্তি দিবস  

উৎসঃ এই লেখাটির https://bn.wikipedia.org/wiki/ থেকে নেয়া।

বিভিন্ন দিবসের হুকুমঃ

দিবস উদ্‌যাপন সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারনা পেয়েছি। দিবস উদ্‌যাপন করা কখনও ইবাদত আবার কখনও হারাম। ইসলামি শরীয়তে আমাদের সকল কাজই ইবাতদের মধ্য গন্য। আর কাজটি তখনই ইবাদতের মধ্য গন্য হবে যখন কাজেটি আল্লাহ হুকুম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দেখানো পথে সম্পাদন করব। যদি আল্লাহর আদেশ অমান্য করে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দেখান পথে করি তার হলে আর ইবাদত হবে না। অনুরূপভাবে আল্লাহ হুকুম আছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দেখান পন্থায় আমল করলাম না তবেও ইবাদত হবেনা।  উদরাহরণ সরূপ বলা যায। গরু বা ভেড়ার মাংশ খাওয়া জায়েয অর্থাত আল্লাহ হুকুম আছে। কিন্তু যদি আল্লাহ নাম না নিয়ে সুন্নাহ বহির্ভূতভাবে জবেহ করি তবে ঐ মাংশ খাওয়া জায়েয নয়। আবার শুকরের মাংশ খাওয়া হারাম অর্থাত আল্লাহর হুকুম নাই। যদি কেউ সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতিতে জবেহ করি তবে তাও খাওয়া জায়েয নয়। ইসলামি শরীয়তে ইবাদত হতে হলে আমাদের এই দুটি শর্ত মেনে আমল করতে হবে। দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রেও আমাদের দেখতে হবে আল্লাহ হুকুম আছে কিনা? রাসূলুল্লাহ ﷺ এর তরিকা আছে কিনা? এর বাহিকে যে কোন দিবস উদ্‌যাপন করা কখনও হারাম, কখনও বিদআত আবার কখনও জায়েয। কাজেই আমরা দিবস আলোচনার ক্ষেত্র চারটি ভাবে বিভক্ত করে আলোচনা করব।

১। যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত

২। যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা বিদআত

৩। যে সকর দিবস উদ্‌যাপন করা হারাম।

৩। যে সকর দিবস উদ্‌যাপন করা জায়েয।

যে সকল দিবস উদ্‌যাপন করা ইবাদত-০১ ::  লাইলতুল কদর

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মহান আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মান্য করাই ইবাদত। তিনি আমাদের ইবাদতের জন্য কিছু সময় ও কিছু তিন খাস করে দিয়েছেন। ঐ সময় বা দিনে তার ইবাদতে অধিক নেকী হাসিল কা যায়। তিনি লাইলাতুল কদর দিয়েছেন, তিনি রামাজান মাস দিয়েছেন, তিনি আরাফার দিন দিয়েছেন, দুটি ঈদের দিন  দিয়েছেন যাতে করে বান্দা তার সন্ত্বষ্টি অর্জন করতে পারে। আল্লাহ প্রদত্ত সময় ও দিনের বাহিরে নিজে সময় বা দিন নির্ধারণ করে নেওয়া গুনাহের কাজ। তিনি আমাদের দিন দিয়েছেন আর দিনের ইবাদতের পদ্ধতিও বলেদিয়েছেন। রামাজানের দিনে পারাহার করতে নিষেধ করেছেন। ইফতারিতে খাওয়াতে পুরস্কার ঘোষনা করেছেন। ঈদের দিনে সিয়াম পালন হারাম করেছেন। অর্থাত আল্লাহ প্রদত্ত সময় বা দিনে তার প্রদত্ত বিধান মোতাবেক আমল করাই আবশ্যক। কিন্তু ইহার বাহিরে মনগড়া দিবস পালন করা বিদআত বা হারাম হবে পারে। এ পর্যায়ে এ পরিচ্ছেদে ঐ সকল দিবস নিয়ে আলোচনা করব যা আল্লাহ প্রদত্ত এবং তার কথামত উদযাপন করতে পারলে তাকে সন্ত্বষ্ট করতে পারব। মনে রাখতে হবে শুধু আল্লাহ প্রদত্ত দিবস হলেই হবে না, ঐ দিবসে তার প্রদত্ত সীমাও অতিক্রম করা যাবেনা। ঈদের দিন আল্লাহ প্রদত্ত সীমার মধ্য থেকে ঈদ পালন করলে তিনি খুসি হবে এবং পরিনামে তার বান্দাকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু যদি ঈদের দিন তার প্রদত্ত সীমা অতিক্রম করে নাজ, গাল, অশ্লীল কাজ, মদ, জুয়া, নারী ইত্যাদির উপভোদের মাধ্যমে উদযাপন করে তবে কি তিনি খুসি হবেন? নিশ্চয় তিনি খুসি হবে না। কাজেই আল্লাহ প্রদত্ত বিধান তার প্রদত্ত সীমার মাঝে তার নির্দেশিত পন্থায় পালন করাই ইবাদত হবে।

লাইলতুল কদর

১। দিবসটির নামকরণ-

লাইলাতুল কদর-এর নামকরণ নিয়ে উলামাগণের মাঝে দুটি মত প্রদিদ্ধ। আরবি শব্দ একটি হল (لیل) ‘লাইলাতুন’ অর্থ যার অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী আর অপরটি হল (القدر‎‎) ‘কদর’ যার অর্থ হল সম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান। এ হিসাবে লাইলাতুল কদর এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। এ রাতের বিরাট মাহাত্ম্য ও অপরিসীম মর্যাদার কারণে এ রাতকে ‘লায়লাতুল কদর’ তথা মহিমান্বিত রাত বলা হয়। গবেষক আবু বকর ওররাক (রহঃ) বলেন, এ রাতকে ‘লায়লাতুল কদর’ বলার কারণ হচ্ছে, এ রাতের পূর্বে আমল না করার কারণে যাদের কোনো সম্মান মর্যাদা, মূল্যায়ন ছিল না তারাও তাওবা-ইস্তেগফার ও ইবাদতের মাধ্যমে এ রাতে সম্মানিত ও মহিমান্বিত হয়ে যান। (তাফসির মারিফুল কোরআন)

আরবি ভাষায় এ ছাড়া কদর অন্য আর একটি অর্থ হলোঃ ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা। ভাগ্য অর্থে লাইলাতুল কদর এর অর্থ হবে ভাগ্য রজনী। সংক্ষেপে বলতে গেলে লাইলাতুল কদর এর অর্থ হলোঃ ভাগ্য রজনী। এই অর্থে এ রাতে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত বিধিলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাগণের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের বয়স, মৃত্যু, রিজিক, বৃষ্টি ইত্যাদির ফরমান নির্দিষ্ট ফেরেশতাগণকে লিখে দেওয়া হয়। এমনকি এ বছর কে হজ্জ করবে তাও লিখে দেওয়া হয়। হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর বক্তব্য মতে, চার ফেরেশতাকে এসব কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তারা হলেন— ইসরাফিল, মিকাইল, আজরাইল ও জিবরাইল (আঃ)। (তাফসিরে কুরতুরি)

একটি ভুল সংশোধনঃ অনেক মুসলিককে বলতে শুনা যায়, সাবান মাসের পনের তারিখ হল ভাগ্য রজনী। তাদের কথার কোন দলীল নেই। কিন্ত লাইলাতুল কদর বা মহিমান্বিত রাতটি যে ভাগ্য রজনী এ সম্পর্ক কুরআনের ষ্পষ্ট দলীল বিদ্যামান। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-

 إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةٍ۬ مُّبَـٰرَكَةٍ‌ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ (٣) فِيہَا يُفۡرَقُ كُلُّ أَمۡرٍ حَكِيمٍ (٤)

নিশ্চয় আমি এটি নাযিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। সুরা দুখান : ৩-৪

এই আয়াতের আলোকে দেখা যায়, কুরআন যে বরকত ও কল্যাণময় রাতে নাযিল হয়েছে এবং সেই রাত্রেই ভাগ্য নির্ধারণ হয়। এক কথায় বলা যায়, যে রাতে কুরআন নাজিল হয়েছিল, সে রাতেই ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। আর কুরআন নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ

রমজান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। সুরা বাকারা : ১৮৫

উপরের আয়াতের ঘোষনা হলো- রমজান মাসেই কুরআন নাজিল হয়। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমানিত লাইলাতুল কদর বা ভাগ্য রজনী রমজানের শেষ দশকেই তাকে। ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, মুজাহিদ, কাতাদা, হাসান বাসারী, সাঈদ ইবনে জুবাইর, ইবনে যায়েদ, আবু সালেক, দাহ্‌হাক এবং আরো অনেক মুফাসসির এ ব্যাপারে একমত যে, এটা রমযানের সেই রাত যাকে “লাইলাতুল কদর” বলা হয়েছে। কারণ, কুরআন মজীদ নিজেই সুস্পষ্ট করে তা বলছে। ইবনের কাসীর বলেনঃ এক শা’বান থেকে অন্য শা’বান পর্যন্ত ভাগ্যের ফায়সালা হওয়া সম্পর্কে উসমান ইবনে মুহাম্মাদ বর্ণিত যে হাদীস ইমাম যুহরী উদ্ধৃত করেছেন তা একটি ‘মুরসাল’’ হাদীস। কুরআনের সুস্পষ্ট উক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের হাদীস পেশ করা যায় না। কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী বলেন, শা’বানের পনের তারিখের রাত সম্পর্কে কোন হাদীসই নির্ভরযোগ্য নয়, না তার ফযীলত সম্পর্কে, না ঐ রাতে ভাগ্যের ফয়সালা হওয়া সম্পর্কে। তাই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা উচিত। (আহকামুল কুরআন, তাফহীমূল কুরআন)

তাই বলা যায় এই মহিমান্বিত রাত্রিতে মুসলিমদের সম্মান বৃদ্ধি করা হয় এবং মানবজাতির ভাগ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তাই মুসলমানদের কাছে এই রাত অত্যন্ত পুণ্যময় ও মহাসম্মানিত হিসেবে পরিগণিত। কুরানের ঘোষণা অনুসারে, আল্লাহ এই রাত্রিকে অনন্য সকল রাত্রির উপর মর্যাদা দিয়েছেন। মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাজিল হওয়ার কারণে অন্যসব মাস ও দিনের চেয়ে রমজান মাসের ফজিলত বেশী। আর রমজানের রাতগুলোর মধ্যে কোরআন নাজিলের রাত, লাইলাতুল কদর সবচেয়ে তাত্পর্যমণ্ডিত একটি রাত। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন,

إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ (١) وَمَآ أَدۡرَٮٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ (٢) لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أَلۡفِ شَہۡرٍ۬ (٣)

অর্থঃ আমি একে নাজিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জান কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সূরা কদর : ১-৩

এই একটি মাত্র রজনীর উপাসনা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর মাহে রমজানে এই মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর মুসলিমদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে বলে তারা বিশ্বাস করে। এই রজনী অনুসন্ধানের জন্য তারা রমজানের শেষ দশকে মসজিদে মসজিদে ইতিকাফ করে।

২। লাইলাতুল কদর এর সময় নির্ধারণ

লাইলাতুল কদর এর নির্দিষ্ট কোন রাত কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমানিত নয়। নির্দিষ্ট না করার মাধ্যমে কল্যান নিহীত আছে বলে মহান আল্লাহ নির্দিষ্ট করেন নি। আবার রাতটি জন্য সারা বছর বা পুর রমজান মাসও নির্দিষ্ট করেন নি। হাদিসসমূহের ভাষ্য মতে বুঝা যায়, রমজানের শেষ দশকেই লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট আছে। মাত্র এই দশটি দিন অনুসন্ধান করলেই নিশ্চিতভাবে এই ফজিলতপূর্ন কল্যায়কর রজণী পাওয়া যাবে। এই রমজানের শেষ দশকে মাঝে আবার কোন কোন দিনকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। নিম্ম এমনই কিছু হাদিস তুলে ধরলাম।

ক। লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ সাত দিনেঃ

ইবনু উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী ﷺ এর কতিপয় সাহাবীকে স্বপ্নযোগে রমযানের শেষের সাত রাতে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ، فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيَهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِي السَّبْعِ الأَوَاخِرِ ‏

আমাকেও তোমাদের স্বপ্নের অনুরূপ দেখানো হয়েছে। শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব যে ব্যাক্তি এর সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে। সহিহ বুখারী : ২০১৫, মুয়াত্তা মালিক : ১১৪৪, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৩৬৭৫, সহিহ আল জামি : ৮৬৭)।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী ﷺ এর কতিপয় সাহাবীকে স্বপ্নে দেখান হল যে, শেষ সাত দিনের মধ্যে কদরের রাত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, আমি মনে করি যে, শেষের সাতদিন সম্পর্কে তোমাদের সকলের স্বপ্ন পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব যে ব্যাক্তি তা অন্বেষণ করবে, সে যেন রমযানের শেষ সাতদিনের রাতগুলোতে তা অন্বেষণ করে। সহিহ মুসলিম : ১১৬৫

খ। লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশকে

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُجَاوِرُ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ، وَيَقُولُ ‏ “‏ تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‏

রাসূলুল্লাহ ﷺ রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ কর। সহিহ বুখারী : ২০২০

উকবাহ ইবনু হুরায়স (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু উমর (রাযিঃ) কে বলতে শুনেছি, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ তোমরা (রমাযানের) শেষ দশ দিনে কদরের রাত অনুসন্ধান কর। তোমাদের কেউ যদি দুর্বল অথবা অপারগ হয়ে পড়ে, তবে সে যেন শেষের সাত রাতে অলসতা না করে। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৫

গ। । লাইলাতুল কদর রমজানের ২১ তারিখেঃ

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ রমযান মাসের প্রথম দশকে ইতিকাফ করলেন। এরপর তিনি মাঝের দশকেও একটি তাঁবুর মধ্যে ইতিকাফ করলেন এবং তাবুর দরজায় একটি চাটাই ঝূলান ছিল। রাবী বলেন, তিনি নিজ হাতে চাটাই ধরে তা তাঁবুর কোণে রাখলেন এরপর নিজের মাথা বাইরে এনে লোকদের সাথে কথা বললেন এবং তারাও তাঁর নিকট এগিয়ে এল। তিনি বললেন, এই রাতের অনুসন্ধানকল্পে আমি (রমযানের) প্রথম দশকে ইতিকাফ করলাম। অতঃপর মাঝের দশকে ইতিকাফ করলাম। এরপর আমার নিকট একজন আগন্তুক (ফিরিশতা) এসে আমাকে বলল, লায়লাতুল কদর শেষ দশকে নিহিত আছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যাক্তি ইতিকাফ করতে চায়, সে যেন ইতিকাফ করে।

লোকেরা তাঁর সঙ্গে (শেষ দশকে) ইতিকাফ করল। রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বললেন, স্বপ্নে আমাকে তা কোন এক বেজোড় রাতে দেখনো হয়েছে এবং আমি যেন সেই রাতে কাদা ও পানির মধ্যে ফজরের সিজদা করছি। (রাবী বলেন) তিনি ২১তম রাতের ভোরে উপনীত হয়ে ফজরের সালাতে দাঁড়ালেন এবং আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হল। ফলে ছাদ থেকে মসজিদে পানি বর্ষিত হল এবং আমি কাদা ও পানি দেখতে পেলাম। তিনি ফজরের সালাত শেষে যখন বের হয়ে এলেন তখন তাঁর কপাল ও নাকের ডগা সিক্ত ও কর্দমাক্ত ছিল। আর তা ছিল রমযানের শেষ দশকের প্রথম (বা ২১তম) রাত। সহিহ বুখারি  : ২০১৮, সহিহ মুসলিম : ২৬৪২ ইফা

ঘ। লাইলাতুল কদর রমজানের ২৩ তারিখেঃ

আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, আমাকে কদরের রাত দেখান হয়েছিল। অতঃপর তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে ঐ রাতের ভোর সম্পর্কে স্বপ্নে আরও দেখান হয়েছে যে, আমি পানি ও কাদার মধ্যে সিজদা করছি। রাবী বলেন, অতএব ২৩তম রাতে বৃষ্টি হল এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের সাথে (ফজরের) সালাত আদায় করে যখন ফিরলেন, তখন আমরা তাঁর কপাল ও নাকের ডগায় কাদা ও পানির চিহ্ন দেখতে পেলাম। রাবী বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু উনায়স (রাঃ) বলতেন, তা ছিল ২৩তম। সহিহ মুসলিম : ২৬৪৬ ইফাঃ

ঙ। লাইলাতুল কদর রমজানের ২৭ তারিখেঃ

যির ইবনু হুবায়শ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) কে বললাম, আপনার ভাই আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) বলেন, যে ব্যক্তি গোটা বছর রাত জাগরণ করে- সে কদরের রাতের সন্ধান পাবে। তিনি (উবাই) বললেন, আল্লাহ তাকে রহম করুন, এর দ্বারা তিনি এ কথা বুঝাতে চাচ্ছেন যে, লোকেরা যেন কেবল একটি রাতের উপর ভরসা করে বসে না থাকে। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, তা রমযান মাসে শেষের দশ দিনের মধ্যে এবং ২৭তম রজনী। অতঃপর তিনি দৃঢ় শপথ করে বললেন, তা ২৭তম রজনী। আমি (যির) বললাম, হে আবূল মুনযির! আপনি কিসের ভিত্তিতে তা বলছেন? তিনি বললেন, বিভিন্ন আলামাত ও নিদর্শনের ভিত্তিতে- যে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে অবহিত করেছেন। যেমন, সেদিন সূর্য উদয় হবে কিন্তু তাতে আলোকরশ্মি থাকবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬৬৭

চ। লাইলাতুল কদর রমজানের বিজোড় তারিখেঃ

সালিম (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (পিতা) বলেন, এক ব্যক্তি (রমাযানের) ২৭ তম রাতে লায়লাতুল কদর দেখতে পেল। নবী ﷺ বললেন-

‏ أَرَى رُؤْيَاكُمْ فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ فَاطْلُبُوهَا فِي الْوِتْرِ مِنْهَا

আমাকেও তোমাদের মতো স্বপ্ন দেখানো হয়েছে যে, তা রমাযানের শেষ দশকে নিহিত আছে। অতএব এর বেজোড় রাতগুলোতে তা অনুসন্ধান কর। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৩

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী ﷺ বলেছেনঃ তোমরা তা (লাইলাতুল কদর) রমযানের শেষ দশকে তালাশ কর। লাইলাতুল কদর (শেষ দিক হতে গনণায়) নবম, সপ্তম বা পঞ্চম রাত অবশিষ্ট থাকে। (সহিহ বুখারী হাদিস : ২০২১

উপরের হাদিসগুলোর আলোক বুঝা যায় লাইলাতুল কদর নির্ধারিত নয়। তবে এ কথা ষ্পষ্ট জোর দিয়ে বলা যায় যে, রমজানের শেষ দশকেই লাইলাতুল কদর নির্ধারিত। একদল মুজতাহীদ আলেম জোর দিয়ে বলেছেন, নিশ্চয়ই লাইলাতুল কদর রমাজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে হতে পারে। তরে নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে প্রতি বছর একই তারিখেই হবে। কোন বছর তা ২১তম রাতে হতে পারে, আবার কখনো ২৫শে কখনো ২৭শে এবং কখনো ২৯শে রাতে হতে পারে।

৩। লাইলাতুল কদর গোপন করার হিকমাতঃ

উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার নাবী ﷺ আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের (নির্দিষ্ট তারিখের) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলমান ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিবার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবতঃ এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যান নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম, সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর। সহিহ বুখারী ২০২৩

লাইলাতুল কদরের রাতকে গোপন করার হিকমাত প্রসঙ্গে ‘উলামাগণ বলেন, এটি গোপন রাখা হয়েছে এ কারণে যে, যাতে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধানের জন্য সকলে প্রচেষ্টা করা যায়। এর বিপরীতে যদি তা নির্দিষ্ট করে দেয়া হত তাহলে মানুষ শুধু ওই নির্ধারিত রাতটির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত। (আল্লাহ ভালো জানেন)

৪। লাইলাতুল কদর ফজিলতঃ

সূরা কদরের শানে নুজুল সম্পর্কে ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আলী ইবনে উরওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বনি ইসরাইলের চারজন আবেদ সম্পর্কে বলছিলেন, তারা আশি বছর ধরে অনবরত আল্লাহর ইবাদত করছিল। এর মধ্যে মুহূর্ত সময়ের জন্যও ইবাদত থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হননি। বিখ্যাত এ চারজন আবেদ হলো আল্লাহর নবী জাকারিয়া আলাইহিস সালাম, আইউব আলাইহিস সালাম, হাজকিল ইবনে আজূজ আলাইহিস সালাম, এবং ইউশা ইবনে নূহ আলাইহিস সালাম। এমনটি শুনে সাহাবিরা (রা.) রীতিমতো অবাক হলেন। এ সময় জিবরাইল আলাইহিস সালাম, এসে বললেন, ‘হে মোহাম্মদ (সাঃ)! আপনার উম্মতরা এ কথা শুনে অবাক হচ্ছে? তাদের জন্য আল্লাহতায়ালা এর চেয়ে উত্তম কিছু রেখেছেন। এরপর সূরা কদর পাঠ করা হয়। তাফসিরে ইবনে কাসরি, খন্ড-১৮, পৃ-২২৩।

সুরা ক্বদরে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ

إِنَّآ أَنزَلۡنَـٰهُ فِى لَيۡلَةِ ٱلۡقَدۡرِ (١) وَمَآ أَدۡرَٮٰكَ مَا لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ (٢) لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٌ۬ مِّنۡ أَلۡفِ شَہۡرٍ۬ (٣) تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَـٰٓٮِٕكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيہَا بِإِذۡنِ رَبِّہِم مِّن كُلِّ أَمۡرٍ۬ (٤) سَلَـٰمٌ هِىَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ (٥)

আমি একে নাযিল করেছি শবে-কদরে। শবে-কদর সমন্ধে আপনি কি জানেন? শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের উদ্‌যাপনকর্তার নির্দেশক্রমে। এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। সুরা ক্বদর : ১-৫

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী ﷺ বলেছেন-

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ تَابَعَهُ

যে ব্যক্তি রমাযানে ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় সওম উদ্‌যাপন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। সহিহ বুখারি : ২০১৪

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ্‌ (ﷺ) বলেছেন যে, তোমাদের নিকট রমযান উপস্থিত হয়েছে, যা একটি বরকতময় মাস। তোমাদের উপরে আল্লাহ তা’আলা অত্র মাসের সওম ফরয করেছেন। এ মাসের আগমনে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়, আর আল্লাহর অবাধ্য শয়তানদের গলায় লোহার বেড়ী পরানো হয়। এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল সে প্রকৃত বঞ্চিত রয়ে গেল। সুনানে নাসায়ী : ২১০৬

আনাস বিন মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রমজান মাস শুরু হলে রসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেনঃ তোমাদের নিকট এ মাস সমুপস্থিত। এতে রয়েছে এমন এক রাত, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। এ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত হলো সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। কেবল বঞ্চিত ব্যক্তিরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়। সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৪৪, মিশকাত -১৯৬৪, সহিহ আত তারগীব : ১৪২৯, সহিহ আল জামি : ৩৮৮২

৫। লাইলাতুল কদরের আমলঃ

লাইলাতুল কদর এই উম্মতের জন্য বড় নেয়ামত। মহান আল্লাহর অশেষ নেয়ামত মধ্যে এটি একটি বড় নেয়ামত। এই নেয়ামতের হক হল, আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মোতাবেগ তার ইবাদাত তার সন্ত্বষ্টি অর্জন করা। আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই এই রাতের সন্দানে রমজানের শেষ দশকে ইবাদতের জন্য কোমর বেধে আমল করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাযানে শেষ দশকে যত বেশি পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না।

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ‏.

যখন রমযানের শেষ দশক আসত তখন নবী ﷺ তাঁর লুঙ্গি কষে নিতেন (বেশী বেশী ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত্রে জেগে থাকতেন ও পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।

সহিহ বুখারি : ২০২৪, সহিহ মুসলিম : ১১৭৪, সহিহ আল জামি : ৪৭১৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ১৩৭৬, সুনানে নাসায়ী : ১৬৩৯, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৬৮

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখান পথ ধরে আমরাও রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের নিমিত্তে প্রতি রাতে নিম্মের ইবাদতগুলোর মাধ্যমে রাত কাটাতে পারি, যাতে লাইলাতুল কদর কোনভাবেই মিস না হয়। ইবাতদগুলি হল-

ক। শেষ দশকে ইতিকাফ করা

নবী ﷺ সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ

নাবী ﷺ রমযানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন। তার ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তার সহধর্মিণীগণও তিকাফ করতেন। সহিহ বুখারি ২০২৬, সহিহ মুসলিম ১১৭২, সুনানে তিরমিয়ী : ৭৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ২৪৬২,

লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে রাসুলুল্লাহ ﷺ মসজিদে ইতকাফ করছেন। কাজেই সময় ও সুযোগ হলে আমাদের প্রথম কাজই হবে রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে মসজিদে ইতিকাফ করা।

খ। তারাবিহ সালাত আদায় করাঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ  ﷺ কে রমযান সম্পর্কে বলতে শুনেছি-

مَنْ قَامَهُ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏

যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় কিয়ামে রমযান অর্থাৎ তারাবীহর সালাত আদায় করবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহিহ বুখারি :

কাজেই লাইলাতুল কদর এর প্রধান আমল হল তারাবিহ সালাত আদায় করা। কোন অবস্থায় এই সালাত যেন বাদ না পড়ে। ইফতারি করার পর পর সামান্য বিশ্রাম নিয়েই এই সালাত আদায়ের উদ্দেশ্য মসজিদে গমন করতে হবে।

গ। তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করাঃ

তারাবীহ সালাতের রাকাতের সংখ্যা নিয়ে যেমন মতভেদ আছে ঠিক তেমনি তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ সালাত নিয়েও মহভেদ আছে। কেউ বলে দুটি সালাত একই আবার কেউ বরে দুটি সালাত ভিন্ন। মহান আল্লাহ নফলের (তাহাজ্জুদ) কোন সীমা নির্ধারণ করে নাই। ঠিক তেমনি তারাবীহ এর সীমা নির্ধারণ করে দিলে বা ফরজ করে দিলে উম্মত আদায় করতে পারত না। রাসুলুল্লাহ ﷺ আশঙ্কা করে ছিল যে, উম্মতের মাঝে এই সালাতের সীমা নির্ধারণ দিলে কষ্ট হবে। কাজেই উম্মার ঐক্যের স্বার্থ যে সমাজে বিশ রাকাত চালু আছে সেখানে বিশ পড়ে, আর সে সমাজে আট রাকাত চালু আছে সেখানে আট পড়ে একটু বিশ্রম নিয়ে তাহাজ্জুদ সালাত দাড়াই যেন আমার কদর রাত আমল বিহীন অতিবাহিত না হয়। 

ঘ। নফল সালাত আদায় করাঃ

সময় সুযোগ হলে মাগরিবের পর কিছু নফল সালাত আদয় করা যায়। কারন সূর্য অন্ত যাওয়ার সাথে সাথেই কদরের রাত্রি শুরু হয়। এই রাতের প্রতিটি মুহুর্তই খুব দামি। কাজেই এই রাতে হয় বিশ্রাসের জন্য ঘুমে থাকবে, না হয় ইবাদতের মাধ্যে থাকবে।

ঙ। কুরআন বুঝে তিলওয়াত করাঃ

আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ ٱلَّذِينَ يَتۡلُونَ كِتَـٰبَ ٱللَّهِ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنفَقُواْ مِمَّا رَزَقۡنَـٰهُمۡ سِرًّ۬ا وَعَلَانِيَةً۬ يَرۡجُونَ تِجَـٰرَةً۬ لَّن تَبُورَ (٢٩) لِيُوَفِّيَهُمۡ أُجُورَهُمۡ وَيَزِيدَهُم مِّن فَضۡلِهِۚۦۤ إِنَّهُ ۥ غَفُورٌ۬ شَڪُورٌ۬ (٣٠)

অর্থঃ যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান। সুরা ফাতির : ২৯-৩০

লাইলাতুল কদরের রাতে প্রতিটি মুহুর্তে ইবাদাতের মাধ্যমে অতিবাহিত করাই হল আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। যতগুলো নফল ইবাদাত আছে তার মধ্য কুরআন তিলওয়াত হল সর্বত্তোম। মহান আল্লাহ নিজে কুরআনে বলছেন, আল্লাহর কিতাব পাঠকারী কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং নিজ অনুগ্রহে তিনি কুরআন পাঠকারীকে অধিক দান করবেন। কাজেই এই রাত্রে যেন কুরআন হাত ছাড়া না হয়।

চ। তাজবিহ তাহলীল পড়া

একাধারে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা কার পক্ষ সম্বব নয়। তাই প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নিতে হয়। এই বিশ্রামের মুহূর্তে অন্তর ও ঠোট মহান আল্লাহর স্মরনে কাটাতে হবে। এই তজবিহ তাহলীলের শব্দ ও বাক্য সমূহকে যিকর বলে, যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করা হয়। যেমন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল-হামদুল্লিল্লাহ” “সুবহানাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” “আস্তাগ ফিরুল্লাহ”, “লা হাওলা ওয়ালা কুউআতা ইল্লাবিল্লাহ”। ইত্যাদি।

ছ। ইতিকাফ করা সম্ভব না হলেও মসজিদে রাত কাটানঃ

রমজানে মসজিদে ইতিকাফ করা খুবই ফজিলতের কাজ। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে অনেকে এই ফজিলত পূর্ণ ইবাদাত করতে পারে না। যারা শেষ দশকে ইতকাফ করতে পারে না, তারা ইচ্ছা করলে  এই রাতের সন্ধানে মসজিদে রাত কাটাতে পারে। দিনে বেলায় আয় রোজগারের জন্য সময় ব্যয় করে অথবা চাকুরীজীবিগন অফিসের কাজ শেষ করে, বিকালে ইফতারী নিয়ে মসজিদে গিয়ে অবস্থান করা। ফজরের পর সূর্য উঠার পর ইশরাক আদায় করে ঘরে ফিরে আসা। এভাবে শেষ দশকে আমল করলে লাইলাতুল কদর মিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা কারন এই মহিমান্বিত সময় রাতেই হয়ে থাকে। তাই শিরোনামের সাথে তাল মিলিয়ে বলা যায়, ইতিকাফ করা সম্ভব না হলেও মসজিদে রাত কাটান।

জ।  ফজর ও ঈশার সালাতের জামাত যেন মিস না হয়ঃ

সারা জীবনের নফল সালাত এক ওয়াক্ত ফরজের সমান হতে পারে না। কাজেই এই রাতের নফলের প্রস্তিতে যেন কোন অবস্তায় আমার ফজর ও ঈশার সালাতের জামাত যেন মিস না হয়।

ঝ। সাধ্যমত আল্লাহর রাস্তায় কিছু দান-সাদকা করাঃ

এই রাতের সব প্রকারের আমলই করা যায়। যে কোন আমলই এই রাতে উত্তম। দান সদকা করা যেহেতু অন্যতম একটা নেক আমল, তাই এই রাতে গুনাহ মাপের নিয়তে কিছু দান সদকা করা যায়। নিজের পক্ষ থেকে মৃত মাতা পিতার পক্ষ থেকেও দান করা যায়।  যেমনঃ  মহান আল্লাহ বলেন,

وَأَنفِقُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَلاَ تُلْقُواْ بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ وَأَحْسِنُوَاْ إِنَّ اللّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ

আর ব্যয় কর আল্লাহর পথে, তবে নিজের জীবনকে ধ্বংসের সম্মুখীন করো না। আর মানুষের প্রতি অনুগ্রহ কর। আল্লাহ অনুগ্রহকারীদেরকে ভালবাসেন। সুরা বাকারা : ১৯৫

ঞ। পরিবার ও প্রতিবেশীদের এ রাত সম্পর্কে সচেতন করাঃ

এই তারটি যেহেতু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ তাই এই সৌভাগ্যবান রাতে যেমন নিজে সৌভাগ্য অর্জণ করতে হতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে অন্যদেরও এ সম্পর্কে সচেতন করে সৌভাগ্য লাভের চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَاراً وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ

অর্থঃ হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও স্বীয় পরিবারবর্গকে আগুন (জাহান্নাম) হ’তে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।  (তাহরীম ৬৬:৬)।

কাজেই গুনাহ মাপের রজনীতে নিজের পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের এ রাত সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, যাতে তারাও গুনাহ মাপ করে নিতে পার।

ট। এই সকল আমলের মাঝে মাঝে দুয়া করাঃ

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহ আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যদি জানতে পারি যে, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তাহলে তখন কোন দুয়াটি পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি বল-

 اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى

হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অতঃএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। সুনানে তিরমিজি : ৩৫১৩, সুনানে ইবনু মাজাহ ৩৮৫০, হাকিম : ১৯৪২, সহীহাহ : ৩৩৩৭, সহিহ আল জামি : ৩৩৯১

এছাড়া বান্দা পছন্দ মত দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর যাবতীয় দুআ করবে। সে গুলো প্রমাণিত আরবী ভাষায় দুয়া হোক কিংবা নিজ ভাষায় হোক। এ ক্ষেত্রে ইবাদতকারী একটি সুন্দর সহীহ দুআ সংকলিত দুয়ার বইয়ের সাহায্য নিতে পারে। সালাফে সালেহীনদের অনেকে এই রাতে অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে দুয়া করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ এতে বান্দার মুক্ষাপেক্ষীতা, প্রয়োজনীয়তা ও বিনম্রতা প্রকাশ পায়, যা আল্লাহ পছন্দ করেন।