উম্মতের মতবিরোধের প্রধান দশটি কারণ : দ্বিতীয় পর্ব (৩-৬)

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।

১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি।

২. ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ।

৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন

. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

৭. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।

৮. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।

৯. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।

১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।

এখানে পরের চারটি (৩-৬)  কারণ আলোচিত হলো :

৩। আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ :

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  জীবন দশায় কোন আকিদা বা ফিকহি কোনো সমস্যা হলে তার নিকট উপস্থিত হলেই সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর তার অনুপস্থিতির কারণে সাহাবিগনের এই সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যায়। ফলে কোন কোন ফিকহি বিষয় সাহাবিগণের মাঝেও মতভেদ দেখা দেয়। তাদের মতভেদের কারণগুলো ছিল নিম্নরূপ-

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

(১) সকল সাহাবিগণ (রা.) সকল হাদিস জানতেন-

প্রথম উদাহরনণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

عَنْ عِكْرِمَةَ أَنَّ أَهْلَ الْمَدِينَةِ سَأَلُوا ابْنَ عَبَّاسٍ عَنْ امْرَأَةٍ طَافَتْ ثُمَّ حَاضَتْ قَالَ لَهُمْ تَنْفِرُ قَالُوا لاَ نَأْخُذُ بِقَوْلِكَ وَنَدَعُ قَوْلَ زَيْدٍ قَالَ إِذَا قَدِمْتُمْ الْمَدِينَةَ فَسَلُوا فَقَدِمُوا الْمَدِينَةَ فَسَأَلُوا فَكَانَ فِيمَنْ سَأَلُوا أُمُّ سُلَيْمٍ فَذَكَرَتْ حَدِيثَ صَفِيَّةَ رَوَاهُ خَالِدٌ وَقَتَادَةُ عَنْ عِكْرِمَةَ

ইকরিমা (রহ.) হতে বর্ণিত যে, তাওয়াফে যিয়ারাহর পর ঋতু এসেছে এমন মহিলা সম্পর্কে মদিনা্বাসী ইবনু ‘আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তাদের বললেন, সে রওয়ানা হয়ে যাবে। তারা বললেন, আমরা আপনার কথা গ্রহণ করব না এবং জায়েদের কথাও বর্জন করব না। তিনি বললেন, তোমরা মদিনায় ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নেবে। তাঁরা মদিনায় এসে জিজ্ঞেস করলেন যাঁদের কাছে তাঁরা জিজ্ঞেস করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উম্মে সুলাইম (রা.) ও ছিলেন। তিনি তাঁদের উম্মুল মুমিনিন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। সহিহ বুখারি : ১৭৫৮

তাঊস (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর সঙ্গে ছিলাম। জায়েদ ইবনু সাবিত (রাঃ) ইবনু আব্বাস (রাঃ) কে বললেন, আপনি কি এই ফাতওয়া দিয়েছেন যে, হায়যগ্রস্ত মহিলারা বিদায়ী তাওয়াফ না করেই প্রস্থান করতে পারবে? ইবনু আব্বাস (রাঃ) তাকে বললেন, যদি আপনি আশ্বস্ত না হতে পারেন, তবে অমুক আনসারী মহিলাকে জিজ্ঞাসা করুন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তাকে এরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন? তাঊস বলেন, যায়দ ইবনু সাবিত (রাঃ) হাসতে হাসতে ইবনু আব্বাস (রাঃ) এর নিকট ফিরে এসে বললেন, আমি মনে করি আপনি সত্য কথাই বলেছেন। সহিহ মুসলিম : ১৩২৮

       মদিনার অধিবাসীরা ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে জানতে চান, একজন মহিলা তাওয়াফে যিয়ারাহ সম্পন্ন করার পর ঋতুমতী হলে, তার করণীয় কি? তিনি তাদের বলেন, ঐ মহিলা (মক্কা থেকে)  রওয়ানা হয়ে যেতে পারবে। এই মতামতের বিপরীত মত জায়দ (রা.) থেকে এসেছিল বিধায় তারা ইবনে আব্বাস (রা.) এর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিধায় পড়ে যান এবং বলেন, আমরা যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) এর মতামতও বিবেচনায় রাখব। এরপর ঘটনাটি আরো স্পষ্ট করতে, তারা মদিনায় ফিরে উম্মে সুলাইম (রা.) এর কাছ থেকে উম্মুল মুমিনীন সাফিয়া (রা.) এর ঘটনাটি শুনে নিশ্চিত হন যে তাওয়াফে যিয়ারাহ শেষ করার পর ঋতুমতী হন, তাহলে তার মক্কা ত্যাগে বাধা নেই। কারণ, তাওয়াফ সম্পন্ন হয়েছে এবং হজের মূল শর্ত পূরণ হয়েছে। এখানে দেখা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কিরামদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলে, দলিল প্রমাণের আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হতো। সাহাবায়ে কিরাম ইজতিহাদ এবং দলিলের ভিত্তিতে ফতোয়া প্রদান করতেন। মতভেদ দেখা দিলে, তারা প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। তাউস (রহ.) এর বর্ণনায় ও এমনটি দেখা যায় যে, জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বিষয়টি অনুসন্ধান করে ইবনে আব্বাস (রা.) এর কাছে এসে হাসতে হাসতে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছিলেন।

নোট : সাহাবিদের (রা.) শিক্ষা হলো দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে যার মতামত অধিক সঠিক তার মতামত গ্রহণ করা। আমরা দলিল প্রমাণের চেয়ে আমাদের আকাবিরদের বেশী গুরুত্ব প্রদান করে থাকি। মনে রাখতে হবে কোন মুজতাহিদ সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞাত নন। যখন হাদিসের সঠিক দলিল প্রমাণ পাওয়া যাবে, তখন আর কারো মতমতা প্রদান করা অধিকার থাকে না।

দ্বিতীয় উদাহরণ-

আবদুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, ’উমার ইবনু খাত্তাব সিরিয়ার দিকে রওনা করেছিলেন। শেষে তিনি যখন সারগ এলাকায় গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে সৈন্য বাহিনীর প্রধানগণ তথা আবূ ’উবাইদাহ ইবনু জার্রাহ ও তাঁর সঙ্গীগণ সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাঁকে জানালেন যে, সিরিয়া এলাকায় প্লেগের বিস্তার ঘটেছে। ইবনু ’আব্বাস বলেন, তখন ’উমার বলল, আমার নিকট প্রবীণ মুহাজিরদের ডেকে আন। তখন তিনি তাঁদের ডেকে আনলেন। ’উমার তাঁদের সিরিয়ার প্লেগের বিস্তার ঘটার কথা জানিয়ে তাঁদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। তখন তাঁদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি হল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন; কাজেই তা থেকে প্রত্যাবর্তন করা আমরা পছন্দ করি না। আবার কেউ কেউ বললেন, বাকী লোক আপনার সঙ্গে রয়েছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিগণ। কাজেই আমরা সঠিক মনে করি না যে, আপনি তাদের এই প্লেগের মধ্যে ঠেলে দিবেন।

উমার (রা.) বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে চলে যাও। এরপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম। তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলে তাঁরাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাঁদের মতই মতপার্থক্য করলেন।

উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা উঠে যাও। এরপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশী আছেন, যাঁরা মক্কা জয়ের বছর হিজরত করেছিলেন, তাদের ডেকে আন। আমি তাদের ডেকে আনলাম, তখন তাঁরা পরস্পরে মতভেদ করলেন না। তাঁরা বললেন, আপনার লোকজনকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা এবং তাদের প্লেগের মধ্যে ঠেলে না দেয়াই আমরা ভাল মনে করি। তখন ’উমার লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমি ভোরে সাওয়ারীর পিঠে আরোহণ করব (ফিরার জন্য)। অতএব তোমরাও সকালে সওয়ারির পিঠে আরোহণ করবে।

আবূ ’উবাইদাহ (রাঃ) বললেন, আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তকদির থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন? ’উমার(রাঃ) বললেন, হে আবূ ’উবাইদাহ! যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলত! হাঁ, আমরা আল্লাহর, এক তকদির থেকে আল্লাহর আরেকটি তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি। তুমি বলত, তোমার কিছু উটকে যদি তুমি এমন কোন উপত্যকায় নিয়ে যাও যেখানে আছে দু’টি মাঠ। তন্মধ্যে একটি হল সবুজ শ্যামল, আর অন্যটি হল শুষ্ক ও ধূসর। এবার বল ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, যদি তুমি সবুজ মাঠে চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তাহলে তাও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ীই চরিয়েছ। বর্ণনাকারী বলেন, এমন সময় ’আবদুর রহমান ইবনু ’আওফ(রাঃ) আসলেন। তিনি এতক্ষণ যাবৎ তাঁর কোন প্রয়োজনের কারণে অনুপস্থিত ছিলেন।

তিনি বললেন, এ ব্যাপারে আমার নিকট একটি তথ্য আছে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমরা যখন কোন এলাকায় প্লেগের) বিস্তারের কথা শোন, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোন এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাক, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর ’উমার (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, তারপর প্রত্যাবর্তন করলেন। সহিহ বুখারি : ৫৭২৯, ৫৭৩০, ৬৯৭৩, সহিহ মুসলিম : ২২১৯

মন্তব্যঃ কিয়াস করা ও কিয়াস অনুযায়ী আমল করা, উভয়টাই শরীয়ত সম্মত হলেও মতভেদের সময় দলিল পাওয়া গেলে দলিলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক।

এই দুটি উদাহরণ প্রমাণ করে সকল সাহাবি (রা.) সকল ফিকহি বিষয়ের জ্ঞান সম্পর্কে সমানভাবে জ্ঞাত ছিলেন না। এটা কোন অপরাধ নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। তবে ইমল আসার পর আর ইজতিহাদ করে মতামত প্রদান করা জায়েয নাই। দলিল প্রমাণের পরও মুরুব্বি বা বড়দের দোহাই দিয়ে মতবিরোধ করা যাবে না।

(২) হাদিসটি মানসুক ছিল অথচ তা সাহাবি (রা.) এ জানা ছিল না-

প্রথম উদাহরণ, সহিহ বুখারির একটি হাদিস-

جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ يَقُولُ كُنَّا لاَ نَأْكُلُ مِنْ لُحُومِ بُدْنِنَا فَوْقَ ثَلاَثِ مِنًى فَرَخَّصَ لَنَا النَّبِيُّ فَقَالَ كُلُوا وَتَزَوَّدُوا فَأَكَلْنَا وَتَزَوَّدْنَا قُلْتُ لِعَطَاءٍ أَقَالَ حَتَّى جِئْنَا الْمَدِينَةَ قَالَ لاَ

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আমাদের কুরবানির গোশত মিনায় তিন দিনের বেশি খেতাম না। এরপর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অনুমতি দিলেন এবং বললেন, খাও এবং সঞ্চয় করে রাখ। তাই আমরা খেলাম এবং সঞ্চয়ও করলাম। রাবী বলেন, আমি আত্বা (রহ.) কে বললাম, জাবির (রাঃ) কি বলেছেন আমরা মদিনায় আসা পর্যন্ত? তিনি বললেন, না। সহিহ বুখারি : ১৭১৯, ২৯৮০, ৫৪২৪, ৫৫৬৭, সহিহ মুসলিম : ১৯৭২, সুনানে নাসায়ী ৪৪২৬, সহিহ ইবনু হিব্বান : ৫৯২৫, মিশকাত : ২৬৩৯

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে: “জমহূরের মতে, তিন দিনের পরে খাওয়া এবং পরবর্তীর জন্য জমা করে রাখা বৈধ। আর এ বিষয়ে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞাটি জাবির, বুরায়দাহ্, ইবনু মাসউদ, কাতাদা, নুমানসহ বহু সাহাবি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে মানসুখ হয়ে গেছে। এই মানসুখের বিষয়টি আলী এবং ইবনু উমার (রা.) এর বিষয়টি জানা ছিল না।

হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তার গ্রন্থ ফাতহুল বারী-তে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইমাম শাফি‘ঈ (রহঃ) বলেছেন, সম্ভবত আলী (রাঃ)-এর নিকট মানসূখের বিষয়টি পৌঁছেনি।

ইমাম আহমাদ (রহঃ) বলেন, এ বিষয়ে সহিহ সনদে বর্ণিত অনেক হাদীস রয়েছে। আর ‘আলী এবং ইবনু ‘উমার রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এর বিষয়টি হলো তাদের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাড়ের বিষয়টি পৌঁছেনি। তারা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিষেধ করতে শুনেছিলেন ফলে তারা যা শ্রবণ করেছেন তাই বর্ণনা করেছেন। লক্ষ করুন, একটি জরুরি দুই জন বিশিষ্ট সাহাবির গোচরি ভূক্তই হয় নাই।

(৩) হাদিস বর্ণনাকারীর প্রতি অনাস্থা প্রকাশ থেকে সাহাবিদের মতবিরোধ

উদাহরণ- 

আল্লাহ রব্বুল আলামি বলেন-

أَسۡكِنُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ سَكَنتُم مِّن وُجۡدِكُمۡ وَلَا تُضَآرُّوهُنَّ لِتُضَيِّقُواْ عَلَيۡہِنَّ‌ۚ وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّ‌ۚ

অর্থঃ তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর সেখানে তাদেরকেও বাস করতে দাও, তাদেরকে সঙ্কটে ফেলার জন্য কষ্ট দিয়ো না। আর তারা গর্ভবতী হলে তাদের সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তাদের জন্য তোমরা ব্যয় কর। সূরা তালাক : ৬

আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) এর শ্রেষ্ঠত্ব ও জ্ঞানের কথা বলার অবকাশ নেই। অথচ তাঁর মত বিজ্ঞ মানুষের একটি হাদিছটি অজানা ছিল বিধান তিনি এই আয়াতে ব্যাখ্যায় ভুল করে বসেন। তিনি মতামত প্রদান করেন যে, তালাকে বাইন বা একসাথে তিন তালাক প্রাপ্ত মহিলা স্বামীর পক্ষ থেকে খোরপোশ ও আবাসনের পাবে। সহিহ হাদিসে এসেছে-

عَنْ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ، أَنَّهُ طَلَّقَهَا زَوْجُهَا فِي عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ أَنْفَقَ عَلَيْهَا نَفَقَةَ دُونٍ فَلَمَّا رَأَتْ ذَلِكَ قَالَتْ وَاللَّهِ لأُعْلِمَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ لِي نَفَقَةٌ أَخَذْتُ الَّذِي يُصْلِحُنِي وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لِي نَفَقَةٌ لَمْ آخُذْ مِنْهُ شَيْئًا قَالَتْ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏ “‏ لاَ نَفَقَةَ لَكِ وَلاَ سُكْنَى

ফাতমিা বিনতু কায়স (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তার স্বামী তাকে তালাক (তালাক) দেন। এরপর তার স্বামী তার জন্য (ইদ্দাতকালীন সময়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য) সামান্য পরিমাণ খোরপোশ দিয়েছিলেন। তিনি তা দেখে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই এ বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোচরে আনব। যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য হয় তবে তা আমি এ পরিমাণ উসুল করব যাতে সুচারুভাবে আমার প্রয়োজন পূরণ হয়। আর যদি খোরপোশ আমার প্রাপ্য না-ই হয় তাহলে আমি তার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করব না। তিনি বলেন, এবার আমি বিষয়টি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটে উত্থাপন করলাম। তিনি আমাকে বললেন, তোমার জন্য কোন খোরপোশ নেই, বাসস্থানও নেই। সহিহ মুসলিম : ১৪৮০

এই হাদিস উল্লেখ করার পরও আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ফাতিমা বিনতু কায়স হয়ত (রা.) ভুলে গেছেন। এই সম্ভাবনার উপর ভিত্তি করে তাঁর হাদিস প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মহিলার কথার উপর ভিত্তি করে আমরা কি আমাদের প্রতিপালকের কথা পরিত্যাগ করব, অথচ আমরা জানি না যে, তার মনে আছে নাকি ভুলে গেছে? অর্থাৎ আমীরুল মুমিনিন উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু এই দলিলের প্রতি আস্থাশীল হতে পারেননি।

এরূপ ঘটনা শুধু উমর (রা.) নয়, অন্যান্য সাহাবিগণ এবং তাবেয়িন-এর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তাই তো দেখা যায় বিদ্বানগণের এক জন এক হাদিসকে সহিহ মনে করে দলিল দিচ্ছেন অপর জন যঈফ মনে করে তা পরিত্যাগ করছেন। ফলে উমর রাদিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু দৃষ্টিতে যেটি শক্তিশালী মনে হয়েছে সেটিকেই তিনি গ্রহণ করেছেন। এমনকি তাদের পরেও হাদিস সম্পর্কে মুহাদ্দিসগনের মাঝেও এমন মতভেদ দেখা যায়। সনদ বিচারে একজন সহিহ বলেছেন তো আরেক জন যঈফ বলেছেন। কাজেই এক্ষেত্রে আমরা মহান সহাবিগণ (রা.) এর অনুসরণ করব। যে মতটি অধিক সঠিক বা সত্যের কাছাকাছি সে মতটিই গ্রহণ করতে হবে।

(৪) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার মর্মার্থ বুঝতে ভুল করা

ইবনু উমার (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহযাব যুদ্ধ হতে ফিরে পথে আমাদেরকে বললেন, বনূ কুরাইযাহ এলাকায় পৌঁছার পূর্বে কেউ যেন ‘আসর সালাত আদায় না করে। কিন্তু অনেকের রাস্তাতেই আসরের সময় হয়ে গেল, তখন তাদের কেউ কেউ বললেন, আমরা সেখানে না পৌঁছে সালাত আদায় করব না। আবার কেউ কেউ বললেন, আমরা সালাত আদায় করে নেব, আমাদের নিষেধ করার এ উদ্দেশ্য ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল তাড়াতাড়ি যাওয়া।  নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এ কথা উল্লেখ করা হলে, তিনি তাঁদের কারোর ব্যাপারে কড়াকড়ি করেননি। সহিহ বুখারি : ৯৪৬, ৪১১৯

এই হাদিসের মূল কথা হলো- খন্দকের যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ঘরে ফিরে এলেন এবং যুদ্ধের সাজ সরঞ্জাম রাখলেন। তখন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এসে বললেন আমরা এখন অস্ত্র রাখিনি। অতএব আপনি চুক্তি ভঙ্গকারি বিশ্বাসঘাতক ইয়াহুদি সম্প্রদায় “বনি কুরায়জা’র উদ্দেশ্যে বের হন। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের একটি দলকে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা “বনি কুরায়জা’র মহল্লায় না পৌঁছে কেউ আসর পড়বেনা”। পথে আসরের ওয়াক্ত হলে একদল হাদিসের শাব্দিক নির্দেশ অনুযায়ী বললো, আমরা সেখানে পৌঁছার পূর্বে সালাত আদায় করবো না। অন্যদল বললো, তাঁর (সা) ইচ্ছা এটা নয় অর্থাৎ উক্ত আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাড়াতাড়ি ঐ গোত্রে পৌঁছা, নামাজ না পড়া নয়, অতএব পথে সালাত পড়ে নাও। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে উভয় দলের ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি দুটোকেই অনুমোদন করেন। সাহাবিগন নিজ কানে সরাসরি শুনে ও মর্ম বুঝতে ভুল করলেন। এক এক দল এক এক ধরনের বুঝলেন এবং আমল ও করলেন ভিন্ন ভিন্ন অথচ উভয় দলই সঠিক ছিল। এটাই মতভেদ মতবিরোধ নয়। আজ কাল আমরা যা করছি তা মতবিরোধ, মতভেদ নয়।

(৫) সাহাবিগন হাদিস জানতেন কিন্তু ঐ সময়ের জন্য ভুলে গেছেন।

আবদুর রহমান ইবনু আবযা (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ’উমার (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বলল, আমরা কোন (পানিবিহীন) জায়গায় এক-দুই মাস অবস্থান করে থাকি (সেখানে অপবিত্র হলে করণীয় কি?)। ’উমার (রাঃ) বললেন, আমি তো পানি না পাওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করব না। বর্ণনাকারী বলেন, তখন ’আম্মার (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আপনার কি ঐ ঘটনার কথা মনে নেই, যখন আমি ও আপনি উটের পালে ছিলাম। আমরা জুনুবি হয়ে গেলাম এবং আমি মাটিতে গড়াগড়ি দিলাম।

আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন তোমাদের জন্য শুধু এতটুকুই যথেষ্ট ছিল- এই বলে তিনি মাটিতে উভয় হাত মেরে হাতে ফুঁ দিলেন। তারপর হাত দিয়ে মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের অর্ধেক পর্যন্ত মুছলেন। ’উমার (রাঃ) বললেন, হে ’আম্মার! আল্লাহকে ভয় কর। তিনি বললেন, হে আমীরুল মু’মিনিন! আল্লাহর শপথ! আপনি চাইলে আমি আর কখনো তা বর্ণনা করব না। ’উমার (রা.) বললেন, আল্লাহর শপথ! আমার উদ্দেশ্য এরূপ নয়, বরং তুমি চাইলে অবশ্যই তোমার বক্তব্যের স্বাধীনতা তোমাকে দিব। সুনানে আবু দাউদ : ৩২২, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫৬৯, সুনানে নাসায়ি : ৩১৮

উপরের আলোচনায় দেখতে পারলাম সাহাবিদের (রা.) মাঝে বহু ফিকহি বিষয় মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা যখনই সহিহ সুন্নাহর খবর পেতেন নিজেদের মতভেদ ভুলে সহিহ সুন্নাহর অনুসরণ করেছেন। আর আমাদের অবস্থা হল তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের কেউ কোন সহিহ সুন্নাহর কথা বললে আমাদের আমল পরিবর্তন করে ফিরে আসা প্রায় অসম্বর। আমরা যে মত বা পথের অনুসন করি তা ত্যাগ করা এতই কঠিন যে, তার জন্য জীবন দান করাও সাহস। কাজেই মতভেদ দূর করার একমাত্র পদ্ধতি হল সাহাবিদের (রা.) পথ অনুসরণ করা। তাদের অনুসরণীয় নীতি থেকে দুরে সরে আসার ফলে আমাদের মাঝে মতবিরোধ দিন দিন প্রকট হচ্ছে যার ফলে নতুন নতুন দলের সৃষ্টি হচ্ছে।

৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা

তাওহীদ না বুঝার কারণে অধিকাংশ মুসলিম শিরকি কাজে জড়িত। সমাজে এমন অনেক শির্ক কাজ আছে যা আহরহ করছে। কোন আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিলেও বলবে আরে এটাতো শির্ক নয়। এর প্রধান কারণ তাওহিদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।

আমাদের সমাজে গাইরুল্লাহ নামে মান্নত করে, আল্লাহ ব্যতীত অলি আওলিয়াদের নিকট ফরিয়াদ করে, সাহায্য তলব করে, আশ্রয় প্রার্থনা করে, কবর-মাজারে সিজদা করে, মৃত ব্যক্তির ক্ষতি বা উপকার করতে পারে তাদের করবের জন্য ভ্রমণ করে তাদের নিকট ফরিয়াদ করে ইত্যাদি। এ সকল শির্ক কাজ সমাজে এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত যে কেউ যদি সঠিক তাওহীদের কথা বলে তবে তাকেই ভ্রান্ত মনে করা হয়। কারণ সমাজের এই লোকগুলো জম্ম থেকেই শিরকি কাজকে নেক আমল মনে করে পালন করে আসছে। যদি তারা জন্মের পর পরই তাওহীদের সঠিক জ্ঞান পেত তবে তাহলে এমন জঘন্য শিরকই কাজে লিপ্ত হত না। কাজেই আলোচনার এ পর্যায় তাওহীদ সম্পর্কে সামান্য একটু আলোচনা করা হল।

আল্লাহ রব্বুল আলামিনের একত্ববাদের পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের মূল কথা। ঈমান হচ্ছে একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে এই ঈমানের মূল ভিত্তি। আল্লাহকে মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদের জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। কিন্তু বান্দা যখন এই ফরজ জ্ঞান অর্জন না করে, তখন সে তওহীদ পরিপন্থি কাজ করে। তাওহীদ পরিপন্থি কাজ করলে তাওহীদবাদীদের সাথে মতবিরোধ হবে এটাই স্বাভাবিক।

তাওহীদ বা একত্ববাদ হচ্ছে বান্দা নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়, এককভাবে সকল বস্তুর মালিক, প্রতিপালক, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা,  তিনিই সকল ইবাদাতের একমাত্র যোগ্য, তিনি সর্বতোভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাওহীদের সার কথা এই যে, বান্দা সুনিশ্চিতভাবে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের রুবুবিয়্যাতে (প্রভুত্বে), উরুহিয়াতে (উপাস্যত্বে) এবং আসমা ওয়াসসিফাতে (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নামে) একক বলে স্বীকার করবে, কোন শরীক স্থাপন করবে না।

তাওহীদ এর শ্রেণীবিভাগ

উপরের আলোচনার আলোকে বলা যায় তাওহীদ তিন প্রকারে বিশ্বাসের সমষ্টি।

০১. তাওহীদুর রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালকে এককত্ত্ব

০২. তাওহীদুর উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক

০৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নাম

এখন এই তিনটি বিষয় সম্পর্কে জানব :

১. তাওহীদুর রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালক এককত্ত্বঃ

আল্লাহকে তার কর্ম সমূহে একক হিসাবে মেনে নেওয়া। যেমন: সৃষ্টব করা, রিজিক দেওয়া, জীবন-মৃত্যু দান করা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের পূর্বে কাফেরগণ এই ধরনের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

২. তাওহীদুর উলুহিয়্যাহ বা ইবাদতে একমাত্র মালিক :

ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একক নির্ধারণ করা। যেমন: সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত, মান্নত, জিহাদ, দাওয়াত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান সদকা, দোয়া, ভয়, আশা, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, জবেহ ইত্যাদি। যাবতীয় ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা কারণ এই উদ্দেশেই সকল নবি (আ:) প্রেরণ করা হইয়াছে এবং কিতাব নাজিল করা হইয়াছে।

৩. তাওহীদুর আসমা ওয়াস সিফাত বা নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুণবাচক নাম :

আল্লাহ তাঁর নাম ও গুণসমূহকে ঠিক ঐভাবে বিশ্বাস করা যেভাবে আল্লাহ নিজে এবং তার রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর কোন পরিবর্তন, অস্বীকৃতি, বিকৃতি, বিলুপ্তি, ধরন, ব্যাখ্যা, তুলনা, উপমা ও গঠন ছাড়াই সাব্যস্ত করা ও মেনে নেওয়া। চাই গুণগুলি আচরণগত হোক বা সত্তাগত হোক। [সুত্র: তাফসীরুল উসরিল আখীর মিনাল কুরআনিল কারীম]

এই হল তাওহীদের সামান্য ধারণা মাত্র। যদি কাহারও তাওহীদের জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা না থাকে সে অবশ্য শিরকই কাজে লিপ্ত হবে অথচ সে মনে করবে সে নেক আমলই করছে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

মক্কার মুশরিকগণ তাওহীদে রুববিয়্যাহ বিশ্বাসী হলেও কাফির-

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মক্কার মুশরিকরা আল্লাহ তায়ালার তাওহীদে রুববিয়্যাহ বা প্রতিপালক হিসাবে তার কোন অংশীদার নেই এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছিল। যার বহু প্রমাণ কুরআনুল করিমে মজুদ আছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُل لِّمَنِ ٱلۡأَرۡضُ وَمَن فِيهَآ إِن ڪُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٤) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (٨٥) قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَـٰوَٲتِ ٱلسَّبۡعِ وَرَبُّ ٱلۡعَرۡشِ ٱلۡعَظِيمِ (٨٦) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ (٨٧) قُلۡ مَنۢ بِيَدِهِۦ مَلَكُوتُ ڪُلِّ شَىۡءٍ۬ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيۡهِ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ (٨٨) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ‌ۚ قُلۡ فَأَنَّىٰ تُسۡحَرُونَ (٨٩)

অর্থঃ তাদেরকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা জানো তাহলে বলো এ পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা বাস করে তারা কার (অধীনে)? তারা নিশ্চয় বলবে, আল্লাহর৷ বলো, তাহলে তোমরা সচেতন হচ্ছো না কেন?

তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, সাত আসমান ও মহান আরশের অধিপতি কে? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ।  বলো, তাহলে তোমরা ভয় করো না কেন?  তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, বলো যদি তোমরা জেনে থাকো, কার কর্তৃত্ব চলছে প্রত্যেকটি জিনিসের ওপর? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দেন এবং তাঁর মোকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারে না? তারা নিশ্চয়ই বলবে, এ বিষয়টি তো আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত ৷ বলো,তাহলে তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথায় থেকে? সুরা মুমিনুন : ৮৪-৮৯

আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاء وَالأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ والأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيَّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللّهُ فَقُلْ أَفَلاَ تَتَّقُونَ

তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেউবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ!খন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না?  সুরা ইউনুস ১০:৩১

এই আয়াতগুলি দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে মক্কার মুশরিকগণ রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব) ক্ষেত্র মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত না। কিন্তু  উলুহিয়্যাত (ইবাদতে (ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাথে শির্ক করত।

আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না বুঝে যে ইবাদাত করছি। সালাত আদায় করছি, সাওম পালন করী, হজ্জ আদায় করছি, যাকাত আদায় করছি, মান্নত পুরা করছি, দ্বারে দ্বারে দাওয়াত দিচ্ছি, কুরআন তি্লওয়াত মুখে ফেনা তুলছি, জিকির করতে করতে বেহুঁশ হচ্ছি, মাজারে দান করছি, জুমা ঘরে ছিন্নি দিচ্ছি, মাজারে পশু মান্নত করছি, মাজারে পশু জবেহ করছি, সুপারিশ লাভের আশায় মাজারে বা পীরকে তাজিমি সিজদাহ দিচ্ছি, মিলাদ মাহফিল করছি, বিভিন্ন প্রকার খতমের আয়োজন করছি, মাজারে ওরস করছি এর কি হবে। আসলে আল্লাহর তাওহীদের সঠিক অর্থ না জানার জন্য আল্লাহর ইবাদাতের সাথে গাইরুল্লাহর ও ইবাদাত করছি। অর্থাৎ না বুঝে হলেও গাইরুল্লাহর ইবাদাত করছি যা ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-

وَمَا يُؤۡمِنُ أَڪۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ

অর্থঃ অধিকাংশ লোক আল্লাহর প্রতি ইমান আনা স্বত্বেও মুশরিক। (ইউসুফ-১২ : ১০৬)

যদি তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না পায় তবে সে শিরকই কাজে লিপ্ত হবে। আমাদের উপমাদেশের প্রায় সকল মুসলিমদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল এবং এখনও তাদের পাশাপাশি বাস করছি। জন্মের সাথে সাথে তাদের আচার আচরণ আমাদের সামাজিক জীবনে একটা বিরাট ভূমিকা রাখে। তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে আমরা তাদের পূজা পার্বন্যে অংশ গ্রহণ করি এমনকি তাদের এ সকল অনুষ্ঠান সুন্দর করে উদ্‌যাপন করা জন্য চাঁদা প্রদান করি।

অপর পক্ষে যারা তাওহীদের সঠিক জ্ঞান রাখে। তারা সমাজের এ সকল শির্ক কাজ থেকে শতভাগ দুরে থাকার চেষ্টা করে। অনেক সময় এই শির্ককারী অজ্ঞ মুসলিমকে শির্ক থেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তখন উভয় পক্ষের মাঝে তাওহীদের জ্ঞানগত অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। এই পার্থক্য থেকেই শুরু হয় শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে শুরু হয় বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি। কাজেই বলতে পারি সকল মুসলিম ভাইদের তাওহীদের জ্ঞান থাকলে ভুল বুঝাবুঝির মাধ্যমে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হত না। যদি জম্ম থেকেই সকলে তাওহীদের সঠিক দিক নির্দেশনা পেত তবে অন্তত এ কারণে তাদের মাঝে ফির্কাবাজী মনোভাব তৈরি হত না।

৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন

কোন মানুষই শতভাগ সঠিক হতে পারেনা, ঠিক তেমনি কোন দল বা সংগঠন ও শতভাগ সঠিক হতে পারেনা। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের নামে অনেক সঠিক অনুসারী মুসলিম আছে। তাদের কেউই শতভাগ সঠিক নয়। যদি কারও নিকট কোনো প্রকারের বিদআত পাওয়া যায়। সাথে সাথে কাফির, মুশরিক, ইয়াহুদিদের দালাল ইত্যাদি হাজারও বিশেষণ দেয়া হয়। আসলে তার এই বিদআতটি এত বেশী ছিল না যে তাকে কাফির বলা যাবে। কোনো  ভুল হলে সংশোধর করার অধিকার আছে কিন্তু কাফির বলার অধিকার নেই।

এমনি ভাবে আমরা যদি ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েলের প্রতি লক্ষ করি তাহলে দেখব একটি ব্যাপারে দ্বিমত থাকা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এমন অনেক ফিকহি মাসয়ালা মাসায়েল আছে যার দুটিমতই সঠিক। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে নিজের আমলকে সঠিক ভেবে অন্যদের ভ্রান্ত ভাবি। অনেক সময় নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করি। এ ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ মানুষ নয় অনেক ফির্তাবন্দী আলেমকেও সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করতে দেখা যায়।

সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া না পড়া নিয়ে, রউফুল ইয়াদাইন করা না করা নিয়ে, ফাতিহার শেষে আমিন বলা না বলা নিয়ে এমনকি হাত বাধা স্থান নিয়েও অনেক কে সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন করতে দেখি। এর ফলে মানুষে প্রতি মানুষের হিংসার সৃষ্টি হয় এবং বিভিন্ন দলে দলে ভাগ হয়। অথচ এই সব আমলে সাহাবি, তাবেয়ী এবং তাবে-তাবেয়ীদের মাঝে ভিন্নতা ছিল কিন্তু তাদের মাঝে এই ধরনের আমল নিয়ে দলাদলি ছিল না।

৬। নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।

সবচেয়ে বড় মূর্খতা হল নিজের মতামতকে শতভাগ নির্ভুল মনে করা। কাফির ও মুশরিকদের অন্যতম খারাপ দিক হল দ্বীনের মধ্যে বিভক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দলে ভাগ হওয়া। প্রত্যেক দলই তাদোর নিজেদের হক মনে করে এবং নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

مُنِيبِينَ إِلَيۡهِ وَٱتَّقُوهُ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَلَا تَكُونُواْ مِنَ ٱلۡمُشۡرِڪِينَ (٣١) مِنَ ٱلَّذِينَ فَرَّقُواْ دِينَهُمۡ وَڪَانُواْ شِيَعً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٣٢)

অর্থঃ আল্লাহ অভিমুখী হয়ে এবং তাকে ভয় করো, আর নামাজ কায়েম করো  এবং এমন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না, যারা নিজেদের আলাদা আলাদা দীন তৈরি করে নিয়েছে আর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল। (সূরা রূম : ৩১-৩২)।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরাও বলেন-

 فَتَقَطَّعُوٓاْ أَمۡرَهُم بَيۡنَہُمۡ زُبُرً۬ا‌ۖ كُلُّ حِزۡبِۭ بِمَا لَدَيۡہِمۡ فَرِحُونَ (٥٣) فَذَرۡهُمۡ فِى غَمۡرَتِهِمۡ حَتَّىٰ حِينٍ (٥٤)

অর্থঃ কিন্তু তাহারা নিজেদের দীনের মধ্যে বহুধা বিভক্ত করিয়াছে। প্রত্যেক দলই তাহাদের নিকট যাহা আছে তাহা লইয়া আনন্দিত। সুতরাং কিছু কালের জন্য উহাদিগকে স্বীয় বিভ্রান্তিতে থাকিতে দাও”। (সূরা মু’মিনূন : ৫৩-৫৪

নবি রাসুলদের জামানা থেকে উম্মত যতই দুরে সরতে থাকবে তাদের মধ্যে আন্দাজ ও অনুমানের পরিমাণ বেড়ে যাবে। সকলেই নিজ নিজ আন্দাজ ও অনুমান কে সঠিক মনে করবে। তাই আমরা দেখি যত নতুন ধর্ম আছে সকলেই তাদের আসল ধর্মীয় দর্শন বিকৃতি করে নতুন ধর্ম রচনা করেছে এবং নিজেদের মূল বা রুট হিসাবে দাবি করছেন। মহান আল্লাহর ভাষায় “প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উৎফুল্ল, (৩০:৩২)। মহান আল্লাহ যেখানে বলেছেন ফির্কা বা দলাদলির সৃষ্টির নিজ মতামতকে সঠিক জ্ঞান করা সেখান প্রশ্নতোলা মানেই হল জালেমদের অন্তর ভুক্ত হওয়া। এভাবে নিজ মতামত কে সঠিক জ্ঞান করার ফলে অন্যদের মতামত সঠিক হলেও তা প্রত্যাখান করা হচ্ছে এবং ভিন্ন মতামত ধারণ কারীদের মাঝে বিরোধের বিষ বপন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কোন ব্যক্তি যখন নিজের ইমান আমল সঠিক মনে করবে তখন অন্যদের আমলে প্রত্যাখান করবে। এভাবে সকলে যদি একে অপরের ইমান আমল প্রত্যাখান করি তবে সকলের মাঝে মহা বিরোধেন সৃষ্টি হবে। যদি সকলে একই উত্স থেকে ইমান আমলে প্রহন করি তাহলে আর মতবিরোধ থাকবে। নিজের মতামতকে কুনআন সুন্নাহর সামনে অত্মসমর্পণ করি। সকলেই যদি কুনআন সুন্নাহর সামনে অত্মসমর্পণ করি তা হলে সকলে একথা বদ্ধ থাকতে পারব। এর বিন্ন কোন পথ অবলম্বন করলে শত শত মতের মানুষ দ্বারা শত শত ফির্কাবন্ধী হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *