মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
উম্মতের মতবিরোধ এই উম্মতের একটা রড় ক্ষতির কারণ। আলোচনার শুরুতেই খুঁজে বের করার চেষ্টা থাকবে মতবিরোধের মূল কারণসমূহ সম্পর্কে আলোকপাত করা। একজন ডাক্তার প্রথমত রোগীর রোগ নির্ণয় করে, তার পরই তার রোগের জন্য সঠিক ঔষধ প্রদান করেন। কাজেই এই গ্রন্থের প্রধান লক্ষ হল মতবিরোধ সৃষ্টির কারণ জেনে তার প্রতিকার করার প্রয়োজনীয় উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা। মতবিরোধের কারণ, প্রতিকার সম্পর্কে নিরপেক্ষ জ্ঞান অর্জন করতে পারলে বা এই সম্পর্কে আসল সত্য চোখের সমানে প্রকাশিত হলে সরল ও সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া সহজ হবে।
সাধারণত মতভেদ থেকে শুরু হয় মতবিরোধ আর মতবিরোধ থেকে সৃষ্টি হয় নতুন নতুন ফির্কা বা দলের, যারা মূল ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করে। আর এই বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া কে বলা হয় ইফতিরাক। কিন্তু আকিদা হোক বা ফিকহি মাসলা মাসায়েল হোক উভয় ক্ষেত্রে ইফতিরাক বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া ইসলামি শরিয়তে একটি হারাম কাজ। যেহেতু, ইখতিলাফ বা মতভেদ হল ইফতিরাক বা বিভক্তির অন্যতম কারণ। তাই উভয়ের মধ্যে পার্থক্য জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ইখতিলাফ বা মতভেদ একটি মানবীয় প্রকৃতি। কখনোই দুজন মানুষ শতভাগ একমত প্রকাশ করতে পারেন না। এই জন্যই ইসলামে পরামর্শের বিধান রাখা হইয়াছে। ইখতিলাফ বা মতভেদ করা জায়েয। কিন্তু ইফতিরাক বা বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দলে দলে বিভক্ত হওয়া সকল অবস্থায়ই হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
অর্থাৎ : আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না। (সূরা আল ইমরান ৩: ১০৩)।
সমাজে আমরা প্রায়ই সর্বত্রই মতভেদ দেখতে পাই। সকল মতভেদ খারাপ নয়। মতভেদ যখন শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি বা দলাদলি সৃষ্টি করে না তখন তা খারাপ নয়। সাহাবিগণের যুগ থেকে মুসলিম উম্মার ইমাম ও আলিমদের মধ্যে ‘মতভেদ’ বা ইখতিলাফ ছিল, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা বা ইফতিরাক ছিল না। ইখতিলাফকারী আলিম নিন্দিত নন, বরং তিনি ইখলাস ও ইজতিহাদের ভিত্তিতে প্রশংসিত ও পুরস্কার-প্রাপ্ত। মুজতাহিদ ভুল করলে একটি পুরস্কার ও সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে দুটি পুরস্কার লাভ করেন।
মতভেদ যখন শত্রুতা, বিদ্বেষ, বিভক্তি বা দলাদলি সৃষ্টি করে তখন তা চূড়ান্তভাবে নিন্দনীয়। এরও কারণ আছে মানুষ যখন নিজের মতামত কে নির্ভুল জ্ঞান করে আর অন্যদের ভ্রান্ত ভাবে তখনই শুরু হয় বিরোধ। বিরোধ থেকে শুরু হয় বিভক্তি বা দলাদলি। তাই যে মতভেদ বিভক্তি বা দলাদলির সৃষ্টি করে তা পরিহার করা সকলের কর্তব্য। এ লক্ষ্যে আমাদের কুরআন সুন্নাহ মাফিক জীবক পরিচালিত করতে হবে। আর এটাই হল, আল্লাহ ও তাঁর রসূল সা.) এর শেখান মূলনীতি।
নিজেদের কুসংস্কার, কল্পনা, বিলাসিতা, আন্দাজ-অনুমান ও নিজেদের দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার ছাঁচে ফেলে তার আকীদা বিশ্বাসে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেছে। কখনও কখনও কাঁট ছাঁট করে দ্বীন ধর্ম পুরোপুরি বিকৃত করে দিয়েছে। অনেক নতুন বিষয় উদ্ভাবন করে তার সাথে জুড়ে দিয়েছে মনগড়া যতসব আমল ও বিশ্বাস। ছোটখাটো বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ করার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করেছে। গুরুত্বপূর্ণকে গুরুত্বহীন ও গুরুত্বহীনকে গুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে দিয়েছে।
যুগে যুগে বহু নবী-রসূল আল্লহর মনোনীত দ্বীন দীন প্রচার করেছেন। তাদের দেখান পথ অনুসরণ করে আমাদের পূর্ববর্তী মহান মনীষী ও বুযর্গগণ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত রেখে জীবনপাত করে গেছেন। পরবর্তীতে তাদের অনুসারিগণ তাদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যধিক বাড়াবাড়ি করেছেন। আবার কারো কারো প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটিয়েছে এবং তাদের বিরোধিতা করেছে। এভাবে অসংখ্য ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে চলেছে। এভাবের বিরোধের মাধ্যমে সৃষ্টি প্রত্যেকটি ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব মানব সমাজকে কলহ, বিবাদ ও পারস্পরিক সংঘর্ষে লিপ্ত করেছে। এভাবে মানব সমাজ দ্বন্দ্বমুখর দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে চলেছে।
আমরা যদি মতবিরোধ করে নিজের সুবিধামতো দ্বীন পালন করি তা হলে, সত্যিকারের ধার্মিক লোকদের থেকে আলাদা হয়ে যাব। ধর্মের আকিদা আমল হবে কুরআন সুন্নাহর আলোকে। এখানে মনগড়া বিষয় নিয়ে মতবিরোধে লিপ্ত হওয়া কোনো সুযোগ নাই। তারপরও সমাজের এক শ্রেণির সুসীল বুদ্ধিজীবী যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে দাবি করে, তারা ধর্মকে নিজেদের জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখে। তাদের উপর ধর্মের কোনো প্রভাব নাই। এই রকম বিভিন্ন মতের মানুষ ধর্মের নামে নিজেদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে ফেলে এবং প্রত্যেক গোষ্ঠী নিজস্ব চিন্তাধারাকে অভ্রান্ত সত্য বলে বিশ্বাস করে, ফলে ধর্মের মূল ঐক্য বিনষ্ট হয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে সমাজে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়েছে। উম্মার মতবিরোধ থেকেই মূলত বিভিন্ন ফির্কা বা দলের সৃষ্টি হয়েছে। নিম্নে মতবিরোধের কারণ সমূহ উল্লেখ করছি।
১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি।
২। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ।
৩. আকীদা ও ফিকহি মতভেদে সাহাবিগণের পদ্ধতি পরিত্যাগ।
৪. জম্ম থেকে তাওহীদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা।
৫. মুসলিমদের সমালোচনায় ইসলামি আদব লঙ্ঘন।
৬. নিজের মতামতকে নির্ভুল মনে করা।
৭. ব্যক্তি কেন্দ্রিক অতিভক্তি।
৮. সত্য প্রকাশের পরও শুধু জেদ ও বিদ্বেষের কারণে মতভেদ করা।
৯. সুফিবাদের উত্থানের সাথে বিদআতে কারণে মতবিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে।
১০. মাজার কেন্দ্রিক আমল আবিষ্কারের ফলে উম্মতে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়।
এখানে পরের দুটি কারণ আলোচিত হলো :
১. আকীদার ক্ষেত্রে মতবিরোধ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি-
আকিদা বা বিশ্বাসের উপরই ভর করে মুসলিমগণ আজ ফির্কাবাজি বা দলাদলিতে লিপ্ত। আকিদার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সংশয়ের স্থান নাই অথচ মুসলিমগণ আজ আকিদাকে সংশয়পূর্ণ করে বিভিন্ন ফির্কা তৈরি করেছে। মানুষ যে জ্ঞান অর্জন করে তা থেকে তার আকিদা বা বিশ্বাসের জম্ম নেয়। মানুষের জ্ঞানের উৎস হল, প্রাকৃতিক, চারপাশের পরিবেশ, সমাজ, লোকাচার, বিজ্ঞান ভিত্তিক পড়াশুনা, দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি। আধুনিক কালের সকল মানুষের আকিদা বা বিশ্বাস যুক্তি ও বিজ্ঞান কেন্দ্রিক।
যৌক্তিক কোনো কাজ সহজে যে কেউ মেনে নেন। আর বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত কোন জ্ঞানতো সাথে সাথে মেনে নেয়। কিন্তু ইসলামি আকিদার মূল হল অদৃশ্যে বিশ্বাস এখানে জাগতিক কোন বিষয় থাকলে যুক্তি ও বিজ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা করা যেত কিন্তু অদৃশ্যে বিশ্বাস করতে হলে অদৃশ্য থেকে প্রাপ্ত অহির উপর নির্ভর করতে হবে। অহী ভিন্ন যে কোনো উৎস থেকে আকিদা গ্রহণ করলে শুদ্ধ ও অশুদ্ধ যে কোনোটাই হতে পারে। ইসলামি আকিদা বিশ্বাস সব সময় আল্লাহকে কেন্দ্র অদৃশ্যের উপর নির্ভর করে থাকে। তাই ইসলামি আকিদার মূল উৎস হল কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক।
অদৃশ্যের একটি ব্যাপার হল কবরের আজাব। কবরে আজাব হবে এটাই সত্য। কিন্তু কাউকে যুক্তি দিয়ে কি কবরের আজাব বুঝাতে বা দেখাতে পাওয়ার। কিংবা বিজ্ঞানের আবিষ্কার ক্যামেরা দ্বারা কি এই আজাব দেখাতে পারব। না, পাওয়ার না। এটা একটি গাইবের বিষয়, কুরআন সুন্নাহর দলিলের ভিত্তিতে বিশ্বাস করতে হবে। কোনো যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণের কোনো অবকাশ নাই।
অপর পক্ষে আমলের ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়। এখানে কুরআন হাদিসের বাহিরে ইজমা কিয়াজের দরকার হয়। নতুন কোনো সমস্যা আসলে কিয়াস করে মাসায়েল দিতে হয়। যেমন- মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট, শেয়ার বাজার ইত্যাদি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না।তাই কুরআন সুন্নাহর ভিত্তিতে কিয়াস করে সমাধান দিতে হয়। কাজেই একটি কথা মনে রাখতে হবে-
لفَرْقُ الأَسَاسِيُّ بَيْنَ العَقِيدَةِ وَالفِقْهِ هُوَ أَنَّ الفِقْهَ قَدْ يَحْتَاجُ إِلَى اسْتِشْهَادٍ أَوْ قِيَاسٍ أَوْ حُجَّةٍ أَوْ دَلِيلٍ عَقْلِيٍّ، لَكِنَّ العَقِيدَةَ لَا تَحْتَاجُ إِلَى اسْتِشْهَادٍ أَوْ قِيَاسٍ أَوْ حُجَّةٍ أَوْ دَلِيلٍ عَقْلِيٍّ.
আকিদা ও ফিকহের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো, ফিকহের ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু আকিদার ক্ষেত্রে ইসতিহাদ, কিয়াস, যুক্তি বা আকলি দলিলের প্রয়োজন নেই”।
এক কথায় বলে গেলে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট কোন রেফারেন্স ছাড়া আকিদা গ্রহণীয় নয়। যদি কেউ যুক্তি দিয়ে আকিদা বুঝাতে আসে তাকে সালাম জানাতে হবে।
কুনআন সুন্নাহকে উৎস হিসেবে না নিলে আকিদার ভিন্নতা তো থাকবেই। আর বিভক্তির মূল কারণ হল আকীদা বা বিশ্বাসগত ইখতিলাফ বা মতভেদ। আকিদার মতভেদ কখনও মতভেদ হয়ে থাকেনি সব সময় মতবিরোধে রূপ নিয়েছে। কুরআন হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, এমন ফিকহি মাসলা মাসায়েলের ক্ষেতে ইখতিলাফ বা মতভেদ করা জায়েয হলেও, আকিদার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার মতভেদ জায়েয নেই। কারণ আকিদার ছয়টি বিষয় (আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস, ফিরিশতাগণের প্রতি বিশ্বাস, কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস, রাসূলগনের প্রতি বিশ্বাস শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস, তকদিরের ভালো মন্দেন প্রতি বিশ্বাস) যার সবগুলিই গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত এবং গায়েব জানার জন্য অহির প্রয়োজন। যতি কেউ তার আকিদাকে অহি ভিত্তিক না করে, যুক্তি ভিত্তিক করে, তাহলে তার বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
আকিদার মতভেদ মুসলিমদের মাঝে এত প্রকট আকার ধারণ করছে যে, তাদের আকিদার মতভেদ আলোচনা করলে আলাদা গ্রন্থ রচনা হবে। আমি শুধু উপমহাদেশের প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরছি যার মতবিরোধের কারণেই আজ উপমহাদেশে শত শত ফির্কার সৃষ্টি।
এই গ্রন্থে বেশ কিছু ভ্রান্ত আকিদা বর্ণনা করার সাথে সাথে কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক সঠিক আকিদা তুলে ধরেছি। আকিদার মতভেদই যে ফির্কা সৃষ্টির অন্যতম কারণ সে কথাটা বুঝানোর জন্য অত্র গ্রন্থে বিস্তরিত না হলেও সংক্ষেপে কিছু ভ্রান্ত আকিদা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আকিদার সম্পর্কে আলোচনার আগে একটা কথাকে মনে খোদাই করে লিখে রাখেন, “আকিদা গাইবের প্রতি বিশ্বাস, এই বিশ্বাস হবে অহী নির্ভর, কোন প্রকার যুক্তিতর্কের অবতারণা করা যাবেনা”।
আমি আমার ওয়েব সাইডে সঠিক আকিদা সম্পর্কি কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিস্তারিত রেফারেন্সসহ উল্লেখ করেছি। যার লিংক হলো :
১.
২.
৩.
এখানে কিছু সঠিক আকিদার শিরোনাম তুলে ধরা হলো। এগুলোর উপর মতভেদের কারনেই মতোরিধের সৃষ্টি হয়। এফলে শত শত ফির্কার জন্ম হয়।
১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার সাব্যস্ত করা হয়।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর আকার বা নিরাকার ধারণা থেকে উর্ধে।
২। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র সবকিছুতে স্বভাবগত ভাবে বিরাজমান।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় আল্লাহ তায়ালা স্বভাবগত ভাবে সব জায়গায় বিরাজমান নন। বরং তার ক্ষমতা, রাজত্ব, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, দৃষ্টি ইত্যাদি সর্বত্র ও সব কিছুতে বিরাজমান।
৩। রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন না।
ভ্রান্ত আকিদব হলো : রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন না।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মত মানব ছিলেন কিন্তু তিনি মহান আল্লাহ মনোনিত রাসুল ছিলেন, তার উপর ওহি নাজিল হত।
৪। রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নিজস্ব নূর থেকে সৃষ্টি।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ তায়ালা মানুকে যে উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ কেও সেই একই উপাদান দ্বারা সৃষ্টি করেছেন।
৫। আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু নাই।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
প্রতিটি সৃষ্টি জীবের মতই আল্লাহর নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগণের মৃত্যু বরণ করতে হবে।
৬। নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: নবি, রাসুল, অলি, আওলিয়াগর অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।
৭। গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গণক বা জ্যোতিষীগণ অদৃশ্যের খবর রাখেন।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না।
৮। রাসুলুল্লাহ ﷺ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: রাসুলুল্লাহ ﷺ সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই সর্বত্র সর্বদা হাজির নাজির নয়।
৯। দুনিয়াতে স্বচক্ষে আল্লাহ কে দেখার দাবি করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহর বান্দা দুনিয়াতে বসে স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখতে পারে।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
দুনিয়াতে স্বচক্ষে জাগ্রত অবস্থায় আল্লাহকে দেখা অসম্ভব।
১০। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কিয়ামতের দিন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সুপারিশের মালিক মনে করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কিয়ামতের দিন ভয়াবহ বিপদের মুহূর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর অনুমতি ব্যতীত কেউ সুপারিশ করতে পারবে না।
১১। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া অন্য কাউকে হিদায়েত প্রদানের মালিক মনে করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া কেহই হিদায়েত প্রদানের মালিক নয়।
১২। কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো– কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে ভালবাসা প্রদান করা শিরক।
১৩। দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: দুনিয়া পরিচালনের ক্ষেত্র আল্লাহর সাহায্যকারী আছে বিশ্বাস করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
দুনিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে একক মালিক মহান আল্লাহ, এ জন্য তার কোন সাহায্যকারী প্রয়োজন নাই।
১৪। গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
গাইরুল্লাহর নিকট একচ্ছত্র আনুগত্য করার শিরক।
১৫। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পারে।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়াও কেউ কাউকে ধনী বা দরিদ্র বানাতে পাওে না।
১৬। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখেন।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তরের খবর রাখতে পারে না।
১৭। আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ্ তাআলা ছাড়াও অন্য কেউ কারোর অন্তর পরিবর্তন ঘটাতে পারে না।
১৮। আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: এ কথা বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পারে।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ তাআলা ছাড়াও কেউ কাউকে সন্তান-সন্ততি দিতে পাওে না।
১৯। কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: কাউকে আল্লাহ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী মানা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ তায়ালাই এতমাত্র উত্তম ফয়সালাকারী।
২০। আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে রাষ্ট্র ক্ষমতার উৎস মনে করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহই একমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতার উত্তম উৎস।
২১। আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: আল্লাহ ছাড়া কাউকে শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের অধিকারী মনে করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
আল্লাহ তায়ালাই শরিয়াতের বিধান প্রণয়নের একক মালিক।
রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার চলার নিয়ম- নীতি, পদ্ধতি, নির্দেশনা ও বিধান প্রণয়নের অধিকার সবই একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনর জন্যই সংরক্ষিত। ইসলামের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে অন্য কারো সামান্য অধিকার নেই।
২২। অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অধিকাংশে মতামতই সত্যের মাপকাঠি বিশ্বাস করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।
২৩। অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: অল্পসংখ্যক মানুষ কখনোও সত্যের মাপকাঠি নয় বলে বিশ্বাস করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
কুরআন সুন্নাহই হলো একমাত্র সত্যের মাপকাঠি।
২৪। হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’ বিশ্বাস করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা তার সৃষ্টির মাঝে হুলুলিয়্যায় বা ‘অনুপ্রবেশবাদ’ করে বলে বিশ্বাস করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।
২৫। অহেদাতুল অজুদ বা সর্বেশ্বরবাদ আকিদায় বিশ্বাস করা।
ভ্রান্ত আকিদব হলো :: স্রষ্টা ও সৃষ্টির অজুদ বা অস্তিত¦ একই বলে বিশ্বাস করা।
এই সম্পর্কে সহিহ আকিদা হলো—
স্রষ্টার সাথে তার সৃষ্টির কোনো তুলনা করা শিরকি কাজ, যা বান্দার ঈমান ভঙ্গেও কারণ।
নোট : এ স্পষ্ট আকিদা বিশ্বাসগুলোই অনেক বিদআতি বিকৃতি করে তাদের পীর, মাশায়েখ, শাইখ, মুরব্বিদের ক্ষমতা বা হক হিসেবে বিশ্বাস করে। যার ফলে বিশুদ্ধ বিশ্বাসিদের সাথে মতরিরোধ হয়ে নতুন ফির্কার জম্ম হয়।
২। ফিকহি ক্ষেত্রে মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ
ইসলামি শরিয়তের মূল উৎস হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নাজিলকৃত সুমহান কুরআনের মহান বাণী, যার নাজিল শুরু হয়েছিল মক্কার হেরা গুহা থেকে আর শেষ হয়েছে মদিনায়। এই দীর্ঘ তেইশ বছরব্যাপী নাজিল হয় স্বয়ং সম্পূর্ণ ইসলামি জীবন বিধান। কিন্তু মক্কি জীবনে পবিত্র কুরআনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নাজিল হলেও তার খুব সামান্য অংশই ছিল বিধি বিধান সম্বলিত এবং প্রায় সবটুকুই ছিল দ্বীনের মৌলিক বিষয় যেমন, আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, পরকাল, জান্নান, জাহান্নাম এবং পূর্ববর্তী জাতির ও তাদের প্রতি প্রেরিত নবি রাসুলদের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ। এই সময়কালে ইসলাম ধর্মের সঠিক বিশ্বাস, চলমান ধর্মেগুলির অসারতা প্রচার, মানুষের মাঝে সৎগুনাবলীর বিকাশ এবং সামাজিক কু-প্রথাগুলোর নিন্দা প্রচারই ছিল নাজিলকৃত কুরআনের মূল কথা। আহকাম সম্পর্কিত প্রায় সমস্ত আয়াতই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মদিনায় হিজরত করার পর থেকে নাজিল হতে থাকে এবং মাদানী জীবনের দশ বছর ব্যাপী তা চলতে থাকে। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি তত্ত্বাবধানে সাহাবায়ে কেরাম দ্বীন বুঝেছেন এবং সেই অনুযায়ী পালন করছেন।
নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সময়ে একদিকে যেমন মানুষকে তাওহীদ, রেসালত ও আখেরাতে কথা বলে দাওয়াত দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম হাতে কলমে আমল শিক্ষা দিয়েছেন। তাই তো বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ও আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামের প্রচার এবং আমল দুটি কাজে যুগপথ ভাবেই চলতে থাকে। প্রচারের জন্য সরাসরি দাওয়াত দিতেন, আর মাঝে মাঝে পত্রের মাধ্যমে দুরে দাওয়াত পাঠাতেণ। অর্থাৎ প্রচারের যতটুকু সুযোগ সুবিধা ছিল পুরটাই কাজে লাগাতেন, যদিও আধুনিক কালের মত এত প্রাচর মাধ্যমও ছিল না। আমলে ক্ষেত্রে নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সরাসরি অনুসরণই একমাত্র মাধ্যম। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন বলতেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখ সেভাবে সালাত আদায় কর। সাহাবিরা যেমন নতুন কোনো মানুষকে অজু শেখানোর সময় তাদের সামনে বসে অজু করতেন এবং বলতেন, এই ছিল নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অজু। ইসলামের প্রতিটি বিধানই প্রাথমিকভাবে এর ধারক বাহকদের মাধ্যমে ব্যবহারিক তথা প্রায়োগিকভাবেই বিস্তৃত ও প্রচলিত হতে থাকে। নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহ যে হিকমা দান করেছে তার মাধ্যমে ইসলামি বিধান চলতে থাকল। মহান আল্লাহ বলেন,
لَقَدۡ مَنَّ اللّٰہُ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اِذۡ بَعَثَ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡ اَنۡفُسِہِمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِہٖ وَیُزَکِّیۡہِمۡ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ ۚ وَاِنۡ کَانُوۡا مِنۡ قَبۡلُ لَفِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ
অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকে তাদের প্রতি একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে আর তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। যদিও তারা ইতঃপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে ছিল। সুরা আল ইমরান : ১৬৪
মহান আল্লাহ তায়ালাই বলছেন ইসলামের যাবতীয় বিধান তার তরফ থেকেই আসে। এখানে মানব রচিত কোনো বিধান চলবে না। তিনি কুরআন নাজিলের পাশাপাশি আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ও দান করেছেন হিকমা বা জ্ঞান। অর্থাৎ আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আল্লাহ এক ধরনের জ্ঞান দান করছেন, যার দ্বারা তিনি ও শরিয়তের বিধি বিধান মানব জাতির সামনে তুল ধরেছেন। যাকে আমরা তার হাদিস হিসাবে জানি।
হাদিসও এক ধরনের অহি যা মহান অল্লাহর তরফ থেকে আসে। মহান আল্লাহর বাণী তিনি বলেন,
وَلَوۡ تَقَوَّلَ عَلَيۡنَا بَعۡضَ ٱلۡأَقَاوِيلِ .-لَأَخَذۡنَا مِنۡهُ بِٱلۡيَمِينِ . ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡهُ ٱلۡوَتِينَ .فَمَا مِنكُم مِّنۡ أَحَدٍ عَنۡهُ حَـٰجِزِينَ
অর্থঃ যদি এ নবি নিজে কোন কথা বানিয়ে আমার কথা বলে চালিয়ে দিতো, তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম, এবং ঘাড়ের রগ কেটে দিতাম৷ তোমাদের কেউই (আমাকে) এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতো না৷ সুরা হাক্কাহ : ৪৪-৪৭
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিপূর্ণ আমনতদারী ও বিশ্বাসিকতার সাথে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করছেন, এবং আমাদের নিকট অবিকৃতভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। তার বিকল্প ভাবার বা করার সামান্যতম অবকাশ তার ছিল না। এই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী এখানে পরীক্ষার জন্য অল্প কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান। এই অবস্থানকালে কি ভাবে চললে এবং কি আমল করলে কৃতকার্য হওয়া যাবে, তারই একটি দিক নির্দেশনা হল কুরআন ও হাদিস। তাইতো কুরআন ও হাদিসে যেমন ইবাদতের নিয়ম শিক্ষা দিয়েছেন তেমনি দিয়েছেন পার্থিব আইন কানুনের বিধি বিধান।
মহান আল্লাহ বাণী ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঠিক দিক নির্দেশনা থাকার কারণে সাহাবিদের মাঝে কোন মতভেদ ছিল না। যদি কোনো বিষয় মতভেদ দেখা যেত সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা নিয়ে নিতেন। কিন্তু পরবর্তী কালে মুজতাহিদ আলেমগন ফিকহি অনেক বিষয় মতভেদ করেন। মুজতাহিদ ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত কুরআন-হাদিসের গবেষণা লব্ধ ব্যাখ্যা প্রদানে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কখন উভয়ের ইজতিহাদ পরস্পর বিরোধী কিন্তু উভয়ই সঠিক। আবার কখন একজন অপরজন থেকে কুরআন সুন্নার অধিক নিকটবর্তী। যে মতভেদ সাহাবিদের জামানা থেকে শুরু হয়েছিল তা তাবেয়ি, তাবে তাবেয়ী, আম্মিয়ায়ে মুজতাহিদ হয়ে আজও বিদ্যমান আছে। ফিকহি বিষয়ে ইখতিলাফ খারাপ নয় তা জায়েয। এই ইখতিলাফ বা মতভেদের জন্য মতবিরোধ সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ হারাম কাজ। মুজতাহীদগনের ইজতিহাদি মতভেদ জায়েয কারণ তারা ভুল ইজতিহাদ করলেও সওয়াবের অধিকারী। আমাদের পূর্ববর্তী মুজতাহিদ আলেম, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) মৃত্যু ১৫০ হিজরী, ইমাম মালেক (রহ .) মৃত্যু ১৭৯ হিজরী, ইমাম শাফিয়ী (রহঃ) মৃত্যু ২০৪ হিজরী এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল (রহঃ) মৃত্যু ২৪১ হিজরি তাদের সকলেম মাঝে ইজতিহাদগত মতভেদ ছিল। কিন্তু তারা একে অপরকে শ্রদ্ধা করতেন, ভালবাসতের, দোয়া করতেন। তাদের মাঝে কোন কোন মতভেদ এমনও ছিল যে পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা যায় তারা উভয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। এই ফিকহি মতভেদই ইসলামের প্রস্থতা। শুরু এ চার ইমাম নয়। আরও অনেক প্রসিদ্ধ ইমাম ছিল। যেমন- ইমাম সুফিয়ান ছাওরীর নামে “ছাওরী’ মাজহাব, লাইছ ইবন সা’দ এর নামে “ লাইছী” মাযহাব এবং ইমাম আওযাই এর নাম “আওযাই” মাযহাব প্রবর্তিত হয়। এই সকল মুজতাহিদ আলেম তৎকালীন সময়ে প্রখ্যাত ইমাম ও মুজতাহিদ ছিলেন। তারা ইমামদের মত এত বেশী খ্যাতি লাভ করতে পারে নাই। এই সকল মুজতাহিদ আলেমগণও মতভেদ করছেন। তাদের এ মতভেদ থেকে মুসলিমদের মাঝে আস্তে আস্তে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় যা তারা কখনও পছন্দ করতেন না। আর মতবিরোধের ফল এই মাযহাব। পূর্বের আলোচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামের উত্স হিসাবে এক প্রাথমিক যুগে শুধু কুরআন এবং হাদিসকে বুঝায়।
বাতিল ফির্কা (শীয়া, কাদিয়ানি, ব্রেলভী) বাদে কুরআন হাদিসের স্পষ্ট বিষয় কারও কোন মতভেদ নেই। ফিকহি মাসায়েলে অনেক মতভেদ লক্ষ করা যায়। কুরআন-সুন্নাহ’র পরোক্ষ, অস্পষ্ট ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ জটিল কিছু বিষয়ে মুজতাহিদ আলেমগন নিজস্ব ইজতিহাদ মোতাবেক কিছু বায় প্রদান করছে যাতে তাদের মধ্যে মতভেদ লক্ষ করা যায়। যার ইজতিহাদ কুরআন সুন্নাহ অধিক নিকটবর্তী তার ইজতিহাদ অধিক গ্রহণীয়। আবার তাদের ইজতিহাদ ভুলও হতে পারে। তাদের এমন ভুল হাদিস না জানার কারণে (তার নিকট পৌঁছায়নি) হতে পারে। সহিহ হাদিস জানতে অথচ তিনি হাদিস বিরোধী ইজতিহাদ করেছেন এমনটা কষ্টিম কালেও তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। যখন কোন মুজতাহিদের ইজতিহাদ হাদিসের বিরোধী হবে, যখন ইজতিহাদ পরিত্যাগ করে হাদিসের অনুসরণ করা ফরজ। পরবর্তী কালে সময়ের সাথে ইসলামকে তাল মিলিয়ে নিতে এবং নতুন নতুন সমস্যা সমাধানে জন্য ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের উত্স পরিগনিত হয়। এভাবে সাহাবী, তাবেয়ী, এবং তাবে তাবেয়ী যুগ থেকেই কুরআন সুন্নাহ আলোকে ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের দলিল হিসাবে গণ্য করা হয়। মুজতাহিদ আলেমদের মতভেদ করার কারণ হল-
(১) কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষার কারণে মতবিরোধ
(২) পরস্পর বিরোধী হাদিস কারণে মতবিরোধ
(৩) মুহাদ্দিসগণের সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে-
(৪) নতুন নতুন সমস্যার জন্য কিয়াস করার ফলে মতবিরোধ
(৫) জাল ও যঈফ হাদিসের কারণে মত বিরোধ
(১) কুরআন ও হাদিসের অস্পষ্ট ভাষার কারণে মতবিরোধ
কুরআনের এমন আয়াত আছে যার ব্যাখ্যা হাদিস ছাড়া সম্ভব নয়। কুরআনে স্পষ্ট করেনি কিন্তু হাদিসে ব্যাখ্যায় স্পষ্ট। আবার এমন আয়াত বা হাদিস আছে যার একাধিক অর্থ গ্রহণ করা যায়। তাই কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা প্রদান বা ফিকাহ রচনার সময় মুজতাহিদ আলেমদের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে।
যেমন- আলী বিন আবু তালেব (রা.) এবং আব্দুল্লাহ বিন আববাস (রা.)-এর মতে, কোন গর্ভবতীর স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে চার মাস দশ দিন অথবা বাচ্চা প্রসবের দিন। এই দুই সময়ের মধ্যে দীর্ঘতম সময় পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করবে। অতএব যদি সে চার মাস দশ দিনের আগে বাচ্চা প্রসব করে, তাহলে তাঁদের নিকট তার ইদ্দত পালনের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। [অর্থাৎ বাচ্চা প্রসব সত্ত্বেও তাকে ইদ্দত পালন অব্যাহত রাখতে হবে। কেননা এক্ষেত্রে চার মাস দশ দিন দীর্ঘতম সময়]। আর যদি বাচ্চা প্রসবের আগে চার মাস দশ দিন শেষ হয়ে যায়, তাহলে বাচ্চা প্রসব করা পর্যন্ত সে ইদ্দত পালন করতে থাকবে। (যেহেতু এক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসবের সময় হচ্ছে দীর্ঘতম সময়) কেননা আল্লাহপাক এরশাদ করেন,
وَإِن كُنَّ أُوْلَـٰتِ حَمۡلٍ۬ فَأَنفِقُواْ عَلَيۡہِنَّ حَتَّىٰ يَضَعۡنَ حَمۡلَهُنَّ
অর্থঃ আর তারা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য খরচ করো৷ সূরা তালাক : ৬
অন্যত্র তিনি বলেন,
وَٱلَّذِينَ يُتَوَفَّوۡنَ مِنكُمۡ وَيَذَرُونَ أَزۡوَٲجً۬ا يَتَرَبَّصۡنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرۡبَعَةَ أَشۡہُرٍ۬ وَعَشۡرً۬اۖ
অর্থঃ তোমাদের মধ্য থেকে যারা মারা যায়, তাদের পরে যদি তাদের স্ত্রীরা জীবিত থাকে, তাহলে তাদের চার মাস দশ দিন নিজেদেরকে (বিবাহ থেকে) বিরত রাখতে হবে ৷ (বাকারা ২:২৩৪)।
উক্ত আয়াতদ্বয়ের মধ্যে ‘আম-খাছ ওয়াজ্হী’ এর সম্পর্ক। আর এমন সম্পর্কযুক্ত দুই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের পদ্ধতি হল এমনভাবে হুকুম গ্রহণ করতে হবে, যাতে উভয় আয়াত বা হাদিসের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। তবে তা করতে গেলে আলী ও ইবনু আববাস (রা.)-এর পদ্ধতি মেনে নেওয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। কিন্তু সুন্নাত এসবের ঊর্ধ্বে। এই সম্পর্কে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হাদিসে এসেছে-
عَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ سُبَيْعَةَ الأَسْلَمِيَّةَ نُفِسَتْ بَعْدَ وَفَاةِ زَوْجِهَا بِلَيَالٍ فَجَاءَتْ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَاسْتَأْذَنَتْه“ أَنْ تَنْكِحَ فَأَذِنَ لَهَا فَنَكَحَتْ.
৫৩২০. মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, সুবায়আ আসলামীয়া তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে। সহিহ বুখারি : ৫৩২০, সহিহ মুসলিম : ১৪৮৪
সূরা তালাকের উক্ত আয়াতের অনুসরণ করব। আর এই আয়াতে আল্লাহর সাধারণ ঘোষণা হচ্ছে, ‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত। এ কথা নিশ্চিতভাবে যে, যদি এই হাদিস আলী ও ইবনু আববাস (রা.) পর্যন্ত পৌঁছত, তাহ’লে তাঁরা নিশ্চয় তা মেনে নিতেন এবং নিজেদের মত ব্যক্ত করতেন না। এমন অস্পষ্ট বিষয়ে কোন প্রকার মতামত প্রদান করা থেকে বিরত থাকতেন।
(২) পরস্পর বিরোধী হাদিস কারণে মতবিরোধ
দুটি হাদিসই সহিহ অথচ দুটির হুকুম সম্পূর্ণ আলাদা। সুনান আবু দাউদ এমনই দুটি হাদিস পাশাপাশি স্থান পেয়েছে। যার একটি হাদিস বলা হয়েছে, যদি কেউ নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে তাকে অজু করতে হবে। অপর হাদিসে বলা হয়েছে, পুরুষাঙ্গ তো একটি গোশতের টুকরা তাই স্পর্শ করলে অজু করতে হবে না।
প্রথম হাদিস :
উরওয়া (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি মারওয়ান ইবনুল হাকামের নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- কি কারণে অজু করার প্রয়োজন হয়? জবাবে মারওয়ান বলেন, পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে তখন উরওয়া জিজ্ঞেস করেন, আপনি তা কীরূপে জানলেন? মারওয়ান বলেন, বুসরা বিনতে সাফওয়ান (রা) আমাকে জানিয়েছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
مَنْ مَسَّ ذَكَرَهُ فَلْيَتَوَضَّأْ
যে ব্যক্তি নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে তাকে অজু করতে হবে। সুনান আবু দাউদ : ১৮১
দ্বিতীয় হাদিস :
ক্বায়িস ইবনু তালক থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-
قَدِمْنَا عَلَى نَبِيِّ اللهِ صلي الله عليه وسلم فَجَاءَ رَجُلٌ كَأَنَّهُ بَدَوِيٌّ فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللهِ مَا تَرَى فِي مَسِّ الرَّجُلِ ذَكَرَهُ بَعْدَ مَا يَتَوَضَّأُ فَقَالَ ” هَلْ هُوَ إِلَّا مُضْغَةٌ مِنْهُ ” . أَوْ قَالَ – ” بَضْعَةٌ مِنْهُ
আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন সম্ভাব্য এক বেদুইন ব্যক্তি এসে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রসূল! কোন ব্যক্তি অজু করার পর নিজ পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওটা তো তার শরীরের মাংসের একটি টুকরা বা অংশ মাত্র। সুনান আবু দাউদ : ১৮১
হানাফি মাযহাবের আলেমদের মতে যদি কেউ নিজের পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করবে তাকে অজু করতে হবে না। অপর পক্ষে হাম্বলি মাযহাব, সালাফি ও আহলে হাদিস আলেমদের মতে পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করলে অজু করতে হবে। দুটি মতই সঠিক। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা জ্ঞান স্বল্পতার কারেন এই ধরনের প্রশস্ত মাসয়ালা নিয়া উম্মতের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে।
(৩) মুহাদ্দিসগণের সকল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে-
আমাদের সমাজে প্রচলিত চার মাযহাবের ইমাম তো দূরের কথা তাদের পরবর্তী যুগ বা হাদিস সংকলনের যুগেও যারা হাদিস সংকলনের জন্য জীবন মরণ চেষ্টা করেছেন তাদের কেউই সকল হাদিস সংকলন করতে পাবে নাই। ২০০ হিজরি থেকে ৪০০ হিজরির মাঝেই প্রধান প্রধান হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়। এই সময় ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলীম, ইমাম তিরমিজি, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম ইবনে মাজাহ, ইমাম নাসাঈ এর মত জগৎ বিখ্যাত হাদিসের মুহাদ্দিস তৈরি হয়েছে। তারা সকলে হাদীস সংগ্রহ, সংকলন ও বাছাই-ছাঁটাইর পর সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হাদিসের সমন্বয়ে উন্নত ধরনের গ্রন্থ প্রণয়নের কাজ করছেন। এই বিরাট ও দুরূহ কাজের জন্য যে প্রতিভা ও দক্ষতা অপরিহার্য ছিল, আল্লাহর অনুগ্রহে তাহাতে ভূষিত হইয়াছে। তারা ছয়খানি সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেছেন। এই ছয়টি গ্রন্থ ছাড়াও আরও বহু হাদিসের গ্রন্থ সংকলন হয়েছে। যেমনি সহিহ ইবনে খোযায়মা, সহিহ ইবনে হাব্বান, মোস্তাদরেক ইবনে হাকিম, মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালেক, মুওয়াত্তায়ে ইমাম মুহম্মদ, কিতাবুল আছার, মসনদে শাফেয়ী, মসনদে আবূ ইয়ালী, মসনদে আব্দুর রাজ্জাক, মোছান্নেফে আবূ বকর ইবনে আবী শায়বা, সুনানে দারে কুতনী, সুনানে দারেমী, সুনানে বায়হাক্বী, মারেফাতু সুনানে বায়হাক্বী, মুজামুল কবীর তিবরানী, মুজামুস সগীর-তিবরানী, মসনদে বাজ্জাজ,ক. মিশকাতুল মাসাবীহ, আত-তাগরীব ওয়াত তারহীব,আল-মুহাল্লা, রিয়াদুস-সালেহীন, মাসাবীহুস সুন্নাহ ইত্যাদি। এই হাদিসের গ্রন্থগুলির নাম উল্লেখ করার প্রধান কারণ হল- এই হাদিসের গ্রন্থ সংকলন কারি কোন মুহাদ্দিস এ দাবি করেননি যে, আমি সকল সহিহ হাদিস অথবা সকল জঈফ হাদিস পেয়েছি বা লিপিবদ্ধ করেছি। প্রমাণ করার চেয়ে দাবি করা অনেক সহজ হলেও কোন মুহাদ্দিস এমন দাবিও করেনি। তাহলে এ কথা দিবালোকের মত পরিষ্কার যে কোন মুজতাহিদ বা মুহাদ্দিস এককভাবে সকল হাদিস আয়ত্ত করে সংকলন করতে পারেনি। কিন্তু ৪০০ পর যখন সকল হাদিস সংকলনের কাজ শেষ হয়ে যায়, তখন থেকে মুহাদ্দিসগন কম পরিশ্রমে অনায়াসে বহু হাদিসের কিতাব পেয়ে যেতেন। আধুনিক কালে এক কাজ আরও অধিক সহতর হয়েছে।
কাজেই ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে থেকে এককভাবে কেহ সকল হাদিস পেয়েছেন এ কথা বলা ঠিক হবেনা। চার ইমামদের মাঝ সবচেয়ে বেশী হাদিস সংকলন করেছেন ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল, তিনিও সকল হাদিস সংকলন করতে পারেনি। কোন মুজতাহিদ আলেম হাদিস না জানার কারণে যদি ইজতিহদ করে রায় দিতে পাবের। তখন তার রায় সঠিক বা ভুল দুটিই হতে পারে। কিন্তু সঠিক দলিল জানার পর ভুল ইজতিহাদ থেকে ফিরে আসা ওয়াজিব। কিন্তু বিপত্তি বাধে অনুসারীদের মাঝে। তাদের ভুল আমলের পরিবর্তে সঠিক দলিল প্রদান করলে তারা শুধু এই যুক্তিতে সঠিক দলিল ত্যাগ করে যে, আমাদের মুজতাহিদ কি কম বুঝেছে?
তাদের একটুকু জানা দরকার ছিলে যে, আমাদের অনুসারী মুজতাহিদ আলেম সকল হাদিস না পেতে পারে, হয়ত তিনি এই মাসায়ালাটি ইজতিহাদ করে প্রদান করছেন। এখন যখন সহিহ হাদিসের আলোকে মাসয়ালাটি জানতে পারলাম, তাই আমল পরিবর্তন করে সঠিক দিকে ফিরে আসি। এভাবে সঠকি আমল থেকে দুরে থাকার কারণে উম্মতের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়। আর মতভেদ থেকে সৃষ্টি হয় মতবিরোধ। এইভাবে বিভক্তির কারণে বিভিন্ন ফির্কার সৃষ্টি হয়।
(৪) নতুন নতুন সমস্যার জন্য কিয়াস করার ফলে মতবিরোধ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন দশায় সাহাবিদের মাঝে মতভেদ হলেও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে সমাধান নিলে কোন মতভেদ থাকত না। একক উত্স এবং একক বর্ণনাকারী থাকায় কোন প্রকার মতভেদ অবশিষ্ট থাকত না, তাই কোন ইজমা এবং কিয়াসের দরকার ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পর শরীয়তের এমন অনেক সমস্যা দেখা দিল যার দিক নির্দেশনা সরাসরি কুরআন হাদিসে নেই। আবার সাহাবিদের ইজমা বা আমল দ্বারাও তার সমাধান করা যায় না। ঠিক এমন সময় মুজতাহিদ আলেমগন কুরআন সুন্নাহর আলোকে উক্ত সমস্যার সমাধান প্রদান করে। একই বিষয়ে বিভিন্ন মুজতাহিদের ভিন্ন ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। তাই মুজতাহিদ আলেমদের কিয়াস ইসলামের নামে নতুন কোনো বিধান রচনা না করলেও একটা মতভেদ সৃষ্ট করে। তাই ফিকহি মাসয়ালা সামায়েলে মতভেদ জায়েয করা হয়েছে। মুজতাহিদ আলেমদের জীবনীতে দেখতে পাই তারের মাঝে শত শত ফিকহি মতভেদ থাকলেও একে অপরকে ভালোবাসতেন তার জন্য দুয়া করতেন।
একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের আধুনিক জীবনের সাথে একাকার হয়ে জড়িয়ে আছে টেলিভিশন নামক যন্ত্রটা। শুরুর দিকে টেলিভিশন জায়েয/নাজায়েয নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে তরজমানুল কুরআন নামক পত্রিকায় মাওলানা মওদূদী (রহ 🙂 কতগুলি শর্ত সাপেক্ষে সিনেমা দেখা জায়েয বলে ফতোয়া প্রদান করেন। তার এই ফতোয়া প্রকাশের সাথে সাথে ভারত উপমহাদেশের প্রায় সকল আলেম এক যোগে প্রতিবাদ করে। অনেকে আগ বাড়িয়ে তাকে কাফির ফতোয়াও প্রাদান করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল মাওলানা মওদূদী (রহঃ) শর্তগুলি দিয়া এখন প্রায় সকল আলেমই টিভি নয় সিনেমা দেখাও জায়েয বলছেন।
এর কারন হল টেলিভিশন নামক যন্ত্রটা আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জামানায় ছিলনা। তিনি এ সম্পর্ক স্পষ্ট কোর বক্তব্য রেখে যাননি। তাই এ সম্পর্ক মুজতাহিদ আলেমগন অশ্লীলতা, নারী, পর্দা, জিনা, নেষা, সময় অপচয়, শিক্ষা, উপকার, অপকার, সমাজিক অবক্ষয়, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং দ্বীন দুনীয়ার সামগ্রিক উপকারিতা ইত্যাদি বিবেচনা করে কুরআন হাদিসের আলোকে রায় প্রাদান করেছেন। সকলের চিন্তা চেতনা ও ইলমি গবেষণা সমান নয়, তার তাদের মাঝে কিয়াসের ভিন্নতা দেখা যায়।
একজন আধুনিক মুসলিম কখন ইন্টারনেট, মোবাইল এবং কম্পিউটার ছাড়া চলতে পারেনা। অনেক আলেমতো ইন্টারনেটকেই দ্বীন প্রচার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করছে। কিন্তু ইন্টারনেট অশ্লীলতার কথা বিবেচনা করে অনেক আলেম ইহা ব্যবহার হারাম বলেছেন। কোন কোন আলেম আবার শর্ত সাপেক্ষে ইন্টারনেরট ব্যবহার করতে বলেছেন। তারা জোর দিয়ে বলেছেন যারা ইন্টারনেট এর অশ্লীলতা থেকে বাঁচতে চেয়েও যারা বাঁচতে পারেনা তাদের এই মাধ্যমে দ্বীন শেখা জায়েজ নয়। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার, গুগল ইত্যাদি ব্যবহার করে দ্বীন প্রচার করা সম্পর্কেও আলেমদের মাঝে মতভেদ আছে। এমনিভাবে, শেয়ার বাজার, ব্যাংকিং ও জীবনবিমা সম্পর্কে আলেমদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মত পাওয়া যায়।
সরাসরি কুরআন হাদিস পেলে আমরা এই ইজতিহাদগত মতভেদ থেকে বাঁচতে পারতাম। কিন্তু তাতো আর সম্ভব নয়। কাজেই যতদিন মুজতাহীদগন কিয়াস করবেন তত দিন মতভেদ থাকবে। আমাদের দায়িত্ব হল। কিয়াসগত ইজতিহাদ যারটা কুরআন সুন্নাহর অধিক কাছাকাছি মনে হবে তার অনুসরণ করা। আর অন্য ব্যাপারে খারাপ ধারণা না রাখা। কারণ হয়ত সেই কুরআন সুন্নাহর অধিক নিতটবর্তী। কিন্তু যখনই আমরা নিজের অনুসারী আলেমদের কিয়াস শতভাগ সঠিক মনে করব আর অন্য আলেমদের ভ্রান্ত জানব তখনতো মতবিরোধ হবেই। তাই বর্তমান আধুনিক যুগে অধিকাংশ সাধারণ মুসলিম যাদের ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান নেই তারা এই কিয়াস কৃত মাসয়ালা নিয়ে বিরোধে জড়ায় আর এক শ্রেণির আলেম তাদের পালে হাওয়া দেয়। এর ফলে মুসলিম উম্মার মাঝে যে বিভাজনের সৃষ্টি হয় তার দায়ভার সাধারণ মুসলিমদের সাথে ঐ সকল আলেমদেরও নিতে হবে। এটা নিশ্চয় অন্যায়।
(৫) অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের কারণে মতবিরোধ-
হাদিসের মান বর্ণার ক্ষেতে সহিহ, জঈফ, হাসান ও জাল কথাগুলি ব্যবহার করছি। তাই বিষয়টি ভালোভাবে বুঝার জন্য সহিহ হাদিস, হাসান হাদিস, জাল হাদিস ও যঈফ হাদিস সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা দরকার। তা হলেই সহজে বুঝতে পারব কেন অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের উপর আমল করার ফলে বিদআতের সৃষ্টি হয়। তাই খুবই সংক্ষেপে এই সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা হল।
সহিহ হাদিস :
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় যে হাদিসের মধ্যে ৫টি শর্ত বিদ্যমান তাকে সহিহ হাদীস বলা হয়-
১. আদালত : হাদিসের সকল রাবী পরিপূর্ণ সৎ ও বিশ্বস্ত বলে প্রমাণিত।
২. যাবত : সকল রাবীর “নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা’ পূর্ণরূপে বিদ্যমান বলে প্রমাণিত।
৩. ইত্তিসালঃ সনদের প্রত্যেক রাবী তাঁর ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত।
৪. শুযুয মুক্তি বা শায না হওয়া : হাদিসটি অন্যান্য প্রামাণ্য বর্ণনার বিপরীত নয় বলে প্রমাণিত।
৫. মিল্লাত মুক্তি : হাদিসটির মধ্যে সূক্ষ্ণ কোন সনদগত বা অর্থগত ত্রুটি নেই বলে প্রমাণিত।
প্রথম তিনটি শর্ত সনদ কেন্দ্রিক ও শেষের দুটি শর্ত মূলত অর্থ কেন্দ্রিক। তবে সাধারণ পাঠকের জন্য আমরা বলতে পারি যে, প্রদত্ত সাক্ষ্য-প্রমাণাদির বিষয়ে যতটুকু নিশ্চয়তা অনুভব করলে একজন বিচারক মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন, বর্ণিত হাদিসটি সত্যিই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন বলে অনুরূপভাবে নিশ্চিত হতে পারলে মুহাদ্দিসগণ তাকে ‘‘সহিহ” বা বিশুদ্ধ হাদীস বলে গণ্য করেন।
ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ এর লেখা, “হাদিসের নামে জালিয়াতী” বইয়ের প্রথম পর্ব, পৃষ্ঠা নম্বর-১৩৩)
হাসান হাদিস :
মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় হাসান হাদিসের মধ্যেও সহিহ হাদিসের সকল শর্তের বিদ্যমানতা অপরিহার্য। তবে দ্বিতীয় শর্তের (যাবত) ক্ষেত্রে যদি সামান্য দুর্বলতা দেখা যায় তবে হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলা হয়। রাবীর নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা বা ‘যাবত’ কিছুটা দুর্বল বলে বুঝা যায়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। এরূপ রাবীর বর্ণিত হাদীস ‘হাসান’ বলে গণ্য। হবে হাদিসের সনদের রাবীগণ ব্যক্তিগতভাবে সৎ, প্রত্যেকে হাদীসটি ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে স্বকর্ণে শুনেছেন বলে প্রমাণিত।
জঈফ হাদিস :
জঈফ অর্থ দুর্বল। যে হাদিসের মধ্যে সহিহ হাদিসের শর্তাবলি থেকে এক বা একাধিক শর্তের ঘাটতি রয়েছে সেটিকে জঈফ হাদীস বলা হয়। সনদ বা বর্ণনা সূত্রের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণতা, দ্বীনদারী, তাকওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, অথবা এটা প্রামাণিত হওয়া যে, বর্ণনকারী হাদীস যথার্থভাবে সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তার স্মৃতি বিভ্রাটের কারণে হোক বা তার কাছে সংরক্ষিত হাদিসের কিতাবগুলো কোন কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে হোক। এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়। তাই হাদীস শাস্ত্রের বিদগ্ধ মুহাদ্দিসগণ সার্বিক দিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কোনও হাদীস সহিহ না কি জঈফ সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।
জঈফ হাদীস কি আমল যোগ্য?
জঈফ হাদীস সাধারণভাবে আমল যোগ্য নয়। তবে তিনটি ক্ষেত্রে মুহাদ্দিস কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে জঈফ হাদিসের উপর আমল করার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন। জঈফ হাদীস আমল করার শর্তগুলি হলো
১. জঈফ হাদিসটি খুবই জঈফ না হয়।
২. ইসলামি শরীয়তের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
৩. আকিদা সম্পর্কিত হবে না।
৪. হালাল-হারাম সংক্রান্ত হবে না।
৫. নেক আমলটি সহিহ হাদিসের আলোকে হওয়া।
জঈফ হাদীস আমলের ক্ষেত্র হলো
১. জঈফ হাদিসটি নেক আমলের ফজিলত ক্ষেত্রে,
২. কুরআনের ‘তাফসীর’ বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ও
৩. ইতিহাস বা ঐতিহাসিক বর্ণনার ক্ষেত্রে।
শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহসহ বহু সালাফি আলিম জঈফ হাদিসের উপর আমল না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। অপরপক্ষে একদল মুহাদ্দিস পূর্বোক্ত শর্তাবলি সাপেক্ষে শুধু ফজিলতের ক্ষেত্রে জঈফ হাদিসের উপর আমল করার বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, জঈফ হাদিসকে রাসূলুল্লাহ (সা্ঃ) এর কথা বলে বিশ্বাস করা যাবে না। জঈফ হাদিসের উপর আমল করার ক্ষেত্রে একথা মনে করা যাবে না যে, রাসূলুল্লাহ (সা্ঃ) সত্যিই একথা বলেছেন। তাই আমার মতে জঈফ হাদিসে উপর আমল না ভালো, কেননা সহিহ হাদির উপরই আমল করে শেষ করতে পারি না।
যখন সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও কেউ অত্যধিক দুর্বল, মিথ্যা ও জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে আমল করে তখন দুই দলের মাঝে মাসায়েল গত বিশার পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে দুই দলের মতভেদ থেকে মতবিরোধের জম্ম নেয়। এই মতবিরোধই নতুন ফির্কার জম্ম দেয়।
একটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে জাল কথা হলো-
বিশিষ্ট তাবিয়ী ইমাম আবু জাফর মুহাম্মাদ আল বাকির (১১৫ হি.) থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বরাতে বর্ণনা করেছে-
مَن صَلَّى فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِن شَعْبَانَ مِائَةَ رَكْعَةٍ، وَقَرَأَ فِيهَا أَلْفَ مَرَّةٍ سُورَةَ الإِخْلَاصِ، بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْهِ قَبْلَ مَوْتِهِ مِائَةَ مَلَكٍ: ثَلاَثُونَ يُبَشِّرُونَهُ بِالْجَنَّةِ، وَثَلاَثُونَ يُنَجُّونَهُ مِنَ النَّارِ، وَثَلاَثُونَ يُصَحِّحُونَ خَطَايَاهُ، وَعَشَرَةٌ يَكْتُبُونَ أَسْمَاءَ أَعْدَائِهِ.”
যে ব্যক্তি মধ্য শাবানের রাতে একশত রাকআত সালাতে এক হাজার বার সুরা ইখলাস পাঠ করবে তার মৃত্যুর পূর্বেই মহান আল্লাহ তার কাছে একশত জন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন। ত্রিশজন তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিবে, ত্রিশজন তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিবে, ত্রিশ জন তার ভুল সংশোধন করবে এবং ত্রিশজন তার শত্রুদের নাম লিপিবদ্ধ করবে।
হাদিসটি জাল বলেছেন ইবনুল জাওযী (৫৯৭ হি), , আল-মাওদু‘আত, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫১; ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতী (৯১১ হি.), আল-লাআলী, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৯; আব্দুল হাই লাখনবি (১৩০৪ হি.), আল আসার, পৃষ্ঠা-১১৩-১১৪; এ হাদীসও বানোয়াট। সনদের কিছু রাবী অজ্ঞাত পরিচয় এবং কিছু রাবী মিথ্যাবাদী হিসাবে সুপরিচিত, হাদিসের নামে জালিয়াতী, অষ্টম পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৩৯।
এই রকম অসংখ্য জাল হাদিস উপর ভিত্তি করে সমাজে অনেক আমল প্রচলিত আছে। যেমন- আমাদের সমাজে প্রচলিত মিরাজের রজণী নাম দিয়ে ২৭ শে রজব ইবাদতে মধ্যে রাত কাটান, পরের দিন সিয়াম পালন করা, শাবান মাসের ১৫ তারিখ দিনের বেলা রোজা রাখা, রাতে নির্দিষ্ট সালাত আদায় করা, মহররম মাসের ইরাদাত, আখেরি চাহার সোম্বা, ঈদের রাতের ইবাদাত ইত্যাদি। এই সকল আমল দুর্বল ও জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যারা এই সকল বিদআতি আমলের বিরোধিতা করবে তাদের সাথে ঐ বিদআতিদের সংঘর্ষ অনিবার্য।