Category Archives: বিনোদন

বিনোদন বা তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ)  

বিনোদন বা তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ)  

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিনোদন শব্দেটি আরবিতে আত-তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ)  বলা হয়। আরবিতে বেশিরভাগ শব্দ তিনটি মূল অক্ষরের সমন্বয়ে গঠিত রুট বা ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত হয়। ‘الـتَّـرْفِـيـهْ’ শব্দটির ক্রিয়ামূল হলো-

 (ر – ف – ه) যার সাধারণত অর্থ হলো- স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম, সুখ, এবং জীবনকে সহজ ও হালকা করা ইত্যাদি।  ক্রিয়া: ‘رَفَّهَ’ (রাফ্ফাহা) যার অর্থ আরাম দেওয়া, শান্ত করা বা বিনোদন দেওয়া। মাসদার (ক্রিয়াবিশেষ্য)  ‘تَرْفِيه’ (তারফিহ) যার অর্থ বিনোদন, আরাম দেওয়া বা স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করার কাজ বা প্রক্রিয়া। সুতরাং, ‘الـتَّـرْفِـيـهْ’ এর উৎপত্তিগত অর্থ হলো- স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম বা প্রশান্তি প্রদানের কাজ বা প্রক্রিয়া, যা আধুনিক বাংলায় বিনোদন, আমোদ-প্রমোদ, চিত্তবিনোদন ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।

আত-তারফিহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ)  বা বিনোদন শব্দটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াতে ব্যবহৃত হয়নি। তবে, এর মূল ধাতু বা রুট (ر-ف-ه) থেকে উদ্ভূত অন্যান্য রূপগুলি, যা সাধারণত বিলাসিতা, ভোগ-বিলাস, আরাম এবং সীমালঙ্ঘন অর্থে ব্যবহৃত হয়, কুরআনে বহুবার এসেছে। যেমন-

আল্লাহ বলেন-

وَاِذَاۤ اَرَدۡنَاۤ اَنۡ نُّہۡلِکَ قَرۡیَۃً اَمَرۡنَا مُتۡرَفِیۡہَا فَفَسَقُوۡا فِیۡہَا فَحَقَّ عَلَیۡہَا الۡقَوۡلُ فَدَمَّرۡنٰہَا تَدۡمِیۡرًا

আর যখন আমি কোন জনপদ ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন ‘মুতরাফিন’ (বিলাসী বা সীমালঙ্ঘনকারী) দেরকে আদেশ করি। অতঃপর তারা তাতে সীমালঙ্ঘন করে। তখন তাদের উপর নির্দেশটি সাব্যস্ত হয়ে যায় এবং আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি। সুরা ইসরা : ১৬

এখানে এই শব্দটি সেই সব লোকদের বোঝায় যারা বিলাসিতায় অভ্যস্ত এবং পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে মগ্ন থাকার কারণে অবাধ্য হয়ে যায় এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে। আধুনিক ‘বিনোদন’ অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে এটি বরং অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস ও আরামপ্রিয়তার নেতিবাচক দিকটি প্রকাশ করে।

বিনোদন বলতে কি বুঝায়?

বিনোদন শব্দের মূল অর্থ হলো মনকে ভুলিয়ে রাখা বা চিত্তের তুষ্টিসাধন। ইংরেজি পরিভাষা ‘Entertainment’-এর মূল ধারণা হলো মনোযোগকে ধরে রাখা বা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেওয়া। আর আরবিতে একে আত-তারফীহ (اَلـتَّـرْفِـيـهْ) বলা হয়, যার মূল অর্থ আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্য প্রদান করা।

বিনোদন হলো এমন একটি কার্যকলাপ, অনুষ্ঠান বা অভিজ্ঞতা যা কোনো দর্শক বা অংশগ্রহণকারীকে আনন্দ, তৃপ্তি, আগ্রহ এবং মনোরঞ্জন দেয়। এটি সাধারণত দৈনন্দিন জীবনের রুটিন, কাজ বা দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে মনকে সতেজ করে এবং অবকাশ সময়ে উপভোগের সুযোগ করে দেয়।

সহজভাবে, বিনোদন হলো সেই সব কাজ যা মানুষকে আনন্দ দেয় এবং মনকে প্রফুল্ল রাখে। এটি গল্প বলা, সঙ্গীত, নাটক, নৃত্য, খেলাধুলা, সিনেমা, বই পড়া, বা অন্য যেকোনো ধরনের প্রদর্শনী বা কার্যকলাপ হতে পারে।

বিনোদনের বৈশিষ্ট্য

বিনোদনের অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। নিচে প্রধান প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো :

১. মনোযোগ আকর্ষণ ও আগ্রহ সৃষ্টি

একটি সফল বিনোদনমূলক কার্যকলাপের প্রধান উদ্দেশ্য হলো দর্শক বা শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখা এবং তাদের মধ্যে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করা। কারণ বিনোদন মূলত আগ্রহের উপর নির্ভরশীল। একটি ভালো চলচ্চিত্র বা নাটক এমনভাবে গল্প বলে যে দর্শক শেষ পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। একইভাবে, কোনো রোমাঞ্চকর খেলাধুলা বা কুইজ প্রতিযোগিতা মানুষের কৌতূহলকে উদ্দীপিত করে এবং তাদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত রাখে। যখন বিনোদনের উপাদানটি নতুনত্ব, অপ্রত্যাশিততা বা মানসিক চ্যালেঞ্জের সংমিশ্রণ ঘটায়, তখন তা মানুষের মনকে সহজেই আকর্ষণ করে। আগ্রহ ধরে রাখতে না পারলে, বিনোদনটি দ্রুত একঘেয়েমিতে পরিণত হয়, যেমন দীর্ঘ ও পুনরাবৃত্তিমূলক বক্তৃতায় মানুষ সহজে আগ্রহ হারায়।

২. আনন্দ ও তৃপ্তি প্রদান

বিনোদনের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এটি অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক ও মানসিক আনন্দ এবং তৃপ্তি দেয়। বিনোদন মনস্তাত্ত্বিক স্তরে কাজ করে, যা মানুষকে দৈনন্দিন চাপ থেকে দূরে সরিয়ে সুখের অনুভূতি দেয়। যখন আমরা একটি কমেডি শো দেখি, তখন হাসি আমাদের মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন (সুখের হরমোন) নিঃসরণ করে। আবার, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো বা একটি সুন্দর গান শোনা মনকে এক ধরনের শান্তি ও প্রফুল্লতা এনে দেয়। এই আনন্দ বা তৃপ্তিই মানুষকে বারবার বিনোদনের দিকে আকর্ষণ করে। এটি কেবল হাসি বা মজার মাধ্যমে নাও আসতে পারে; একটি গভীর বা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও উত্তেজনা বা বিস্ময়ের মাধ্যমে মানসিক তৃপ্তি দিতে পারে।

৩. দুশ্চিন্তা এবং একঘেয়েমি থেকে মুক্তি

বিনোদন মানুষের মনকে দৈনন্দিন জীবনের চাপ, দুশ্চিন্তা এবং একঘেয়েমি থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে। এই বৈশিষ্ট্যটি মানুষকে বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা থেকে ক্ষণিকের জন্য দূরে থাকতে সাহায্য করে। একটি ভালো বই পড়া বা একটি ভিডিও গেম খেলা মানুষকে অন্য একটি জগতে নিয়ে যায়, যেখানে তারা তাদের ব্যক্তিগত সমস্যাগুলি ভুলে থাকতে পারে। এটি এক ধরনের মানসিক বিরতি বা মুক্তি দেয়, যা স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল হতে সাহায্য করে। এই বিচ্যুতি মানসিক চাপ কমানোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যেমন, দিনের শেষে একটি প্রিয় সিরিয়াল দেখা বা গান শোনা মানসিক ক্লান্তি দূর করে এবং মনকে পুনরায় সতেজ করে তোলে।

৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা

অনেক বিনোদনমূলক কার্যকলাপ কেবল ব্যক্তিগত আনন্দ দেয় না, বরং মানুষকে একত্রিত করে এবং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। উৎসব, অনুষ্ঠান ( ঈদ) বা সম্মিলিত খেলাধুলার মতো বিনোদনমূলক অভিজ্ঞতাগুলো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি তৈরি করে। এগুলি সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে প্রতিফলিত করে ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে। যৌথভাবে কোনো একটি খেলার দলের জয় উদযাপন করা বা কোন পার্টিতে অংশ নেওয়া মানুষকে সামাজিকভাবে সংযুক্ত করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে।

৫. শিক্ষামূলক বা অন্তর্দৃষ্টির সম্ভাবনা

যদিও বিনোদনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো আনন্দ দেওয়া, তবুও অনেক সময় এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে এবং দর্শকদের মধ্যে শিক্ষা বা অন্তর্দৃষ্টি জাগাতে পারে। এই ধরনের বিনোদনকে প্রায়শই ‘এডুটেইনমেন্ট’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিক ডকুমেন্টারিগুলো আমাদের অতীত সম্পর্কে জ্ঞান দেয়, আবার কিছু ব্যঙ্গাত্মক বা সামাজিক সিনেমা সমাজের সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে। ভালো সাহিত্য, হামদ, নাথ বা ইসলামি নাটকগুলো মানুষের চিন্তাভাবনার জগতকে প্রসারিত করে এ ./6[;lvcবং নৈতিক বা দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবায়। এইভাবে, বিনোদন কেবল সময়ের অপচয় না হয়ে মানসিক বৃদ্ধি এবং জ্ঞানের উৎসে পরিণত হতে পারে।

৬. অবসর সময়ের ব্যবহার

বিনোদন সাধারণত অবসর সময়ে ঘটে। যখন মানুষ তার পেশাগত কাজ, ঘরোয়া দায়িত্ব বা দৈনন্দিন রুটিন থেকে মুক্ত থাকে, তখন তারা বিনোদনমূলক কার্যকলাপে অংশ নেয়। এটি মূলত ক্লান্তি দূর করে মনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মজীবী মানুষ সপ্তাহান্তে পার্কে হাঁটা বা পরিবারের সাথে পিকনিকে যাওয়ার মাধ্যমে তার অবসরের সদ্ব্যবহার করেন। এই সময়টি বাধ্যতামূলক কাজ নয়, বরং ঐচ্ছিক আনন্দদায়ক কার্যকলাপের জন্য নির্ধারিত। অবসর সময়ের সার্থক ব্যবহার মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে এবং পরবর্তী কাজের জন্য শক্তি ও উদ্যম যোগায়।

৭. বৈচিত্র্যময় রূপ

বিনোদনের কোনো একক বা নির্দিষ্ট রূপ নেই; এটি মানুষের রুচি ও প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে বহু ধরনের হতে পারে। এই বৈচিত্র্যকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:

ক. নিষ্ক্রিয় বিনোদন

যে কার্যকলাপে ব্যক্তি কেবল দর্শক বা শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকে এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে না, তাকে নিষ্ক্রিয় বিনোদন বলে। এই ধরনের বিনোদনে ব্যক্তি কেবল তথ্য বা অভিজ্ঞতা গ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। শারীরিক বা মানসিক দিক থেকে সক্রিয় প্রচেষ্টা খুব কম থাকে, অর্থাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বা শারীরিক কসরত করতে হয় না। এর মাধ্যমে কম শক্তি ব্যয় করে দ্রুত মানসিক স্বস্তি লাভ করা যায়। এটি অনেকটা ‘স্ট্রেস বাটন অফ’ করার মতো কাজ করে, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে পরিবেশকের হাতে ছেড়ে দেয় এবং সহজে মানসিক মুক্তি লাভ করে।

উদাহরণ : চলচ্চিত্র বা টিভি দেখা, গান শোনা, নাটক উপভোগ করা, খেলাধুলার ম্যাচ দেখা বা সার্কাস দেখা।

খ. সক্রিয় বিনোদন

যে কার্যকলাপে ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং এর জন্য শারীরিক বা মানসিক দক্ষতা ও শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হয়, তাকে সক্রিয় বিনোদন বলে। এই কার্যকলাপে ব্যক্তি শারীরিক বা মানসিক শক্তি ব্যয় করে এবং প্রায়শই কোনো দক্ষতা বা চ্যালেঞ্জের সাথে যুক্ত থাকে। এটি নিষ্ক্রিয় বিনোদনের চেয়ে বেশি পরিকল্পনা এবং প্রচেষ্টা দাবি করে। এটি মানসিক স্বস্তির পাশাপাশি ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সুস্থতা আনতেও সাহায্য করে। এটি শারীরিক বা মানসিক উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, যা মন ও শরীরকে একই সাথে সতেজ করে তোলে।

উদাহরণ: বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা (ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার), ভিডিও গেম খেলা, শখের কাজ (যেমন বাগান করা, ছবি আঁকা), অথবা পর্যটন ও ভ্রমণ।

গ. সামাজিক বিনোদন

যে বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অন্যান্য মানুষের সাথে মিথস্ক্রিয়া জড়িত থাকে এবং তাদের উপস্থিতি বিনোদনের মূল উপাদান হয়, তাকে সামাজিক বিনোদন বলে। এই ধরনের বিনোদন মানুষের সামাজিক প্রাণী হওয়ার চাহিদাকে পূরণ করে। এখানে আনন্দ কেবল কার্যকলাপটির মধ্যে নিহিত নয়, বরং একসাথে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্যে নিহিত। এটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি ও মজবুত করতে সাহায্য করে। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া একাকীত্ব দূর করে, আপনজনের সাথে সংযোগের অনুভূতি বাড়ায় এবং আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক মজবুত করার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করে।

উদাহরণ: বন্ধু বা পরিবারের সাথে আড্ডা দেওয়া, সামাজিক অনুষ্ঠানে (যেমন, বিয়ে, উৎসব) অংশগ্রহণ, দলগত খেলাধুলা, বা একসাথে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখা।

বিনোদনের উপকারিতা

সুস্থ আনন্দ বা বৈধ আমোদ-প্রমোদ (বিনোদন) মানুষের শরীর, মন ও আত্মার জন্য অপরিহার্য। এটি কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বরং জীবনের ভারসাম্য রক্ষা, মানসিক চাপ কমানো, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপায়। নিয়মিত ও পরিমিত বিনোদন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি দূর করে, মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে এবং সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক মানসিকতা বিকাশে সহায়তা করে। নিচে বিনোদনের উপকারিতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো-

১. মানসিক প্রশান্তি আনে:

নিয়মিত কাজের চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা এবং জীবনের নানা ধরনের দুশ্চিন্তা থেকে মনকে ক্ষণিকের জন্য স্বস্তি দিতে বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি একটি বিরতির মতো কাজ করে, যা মনকে শিথিল করতে সাহায্য করে এবং চাপ সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। এর ফলে মানসিক ভারসাম্য বজায় থাকে। যখন মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়, তখন হতাশা, উদ্বেগ বা অন্যান্য মানসিক রোগের ঝুঁকিও বহুলাংশে হ্রাস পায় এবং ব্যক্তি মানসিক স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে পারে।

২. শরীর ও মস্তিষ্ককে সতেজ করে:

দৈনন্দিন ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করার জন্য সুস্থ বিনোদন অত্যন্ত কার্যকর। শরীর ও মন যখন একটানা কাজ করতে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ক্লান্তি আসে এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়। একটি আনন্দদায়ক বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শরীরের জড়তা কাটে এবং মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর হয়। এটি একটি ‘রিফ্রেশ’ বোতামের মতো কাজ করে, যা ব্যক্তিকে নতুন উদ্যম ও উৎসাহ নিয়ে পুনরায় কাজে ফেরার শক্তি ও প্রেরণা জোগায়।

৩. সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করে:

পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সাথে আনন্দময় বিনোদনে অংশ নেওয়া সামাজিক সম্পর্ককে মজবুত করার একটি চমৎকার উপায়। একসাথে হাসি, খেলা বা ভ্রমণ – এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলো মানুষকে আরও কাছাকাছি আনে এবং তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বন্ধন তৈরি করে। সম্মিলিত বিনোদনের মাধ্যমে একে অপরের প্রতি পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং গভীর বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। এই সামাজিক মিথস্ক্রিয়া একাকীত্ব দূর করে এবং জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৪. সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি বাড়ায়:

বিনোদন মনকে দৈনন্দিন সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে এবং কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত হতে সাহায্য করে। যখন মন চাপমুক্ত ও প্রফুল্ল থাকে, তখন এটি স্বাভাবিকভাবেই নতুন ধারণা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সৃজনশীল সমাধান নিয়ে আসতে পারে। শিল্পকলা, সংগীত, সাহিত্য বা চ্যালেঞ্জিং গেমের মতো বিনোদনমূলক কাজগুলো মস্তিষ্কের সেই অংশগুলিকে উদ্দীপিত করে যা সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের জন্য দায়ী। ফলস্বরূপ, ব্যক্তি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করতে শেখে এবং কাজে আরও বেশি সৃষ্টিশীল হয়।

৫. আধ্যাত্মিক ভারসাম্য বজায় রাখে:

ইসলাম অনুমোদিত বা যেকোনো ধর্মীয় সীমারেখার মধ্যে থাকা সুস্থ বিনোদন, যেমন হালাল খেলাধুলা, প্রকৃতির মাঝে ভ্রমণ, অথবা মননশীল শিল্প উপভোগ করা, আত্মাকে প্রশান্ত রাখতে সহায়ক। এই ধরনের পরিচ্ছন্ন আনন্দ মনকে অহেতুক দুশ্চিন্তা ও নেতিবাচকতা থেকে দূরে রাখে। এটি ব্যক্তির জীবনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে এবং তাকে জীবনের মূল্যবোধ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও সচেতন করে তোলে, যা জীবনের সামগ্রিক আধ্যাত্মিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৬. কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে:

পরিশ্রমের মাঝে একটি পরিকল্পিত ও ফলপ্রসূ বিরতি বা বিনোদন একজন ব্যক্তির কর্মক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে। একটানা কাজ করার ফলে মনোযোগ কমে যায় এবং ভুল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু যখন শরীর ও মন প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও বিনোদন পায়, তখন ক্লান্তি দূর হয় এবং মনোযোগের স্তর পুনরায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরে আসে। ফলে কাজের প্রতি একাগ্রতা বাড়ে এবং দক্ষতাও বহু গুণে বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিকভাবে উন্নত ফলাফল নিশ্চিত করে।

৭. চিন্তা ও দুশ্চিন্তা কমায়:

উপযুক্ত বিনোদন মানসিক চাপ (স্ট্রেস), হতাশা ও উদ্বেগের মতো নেতিবাচক অনুভূতিগুলো কমাতে অত্যন্ত সহায়ক। যখন ব্যক্তি তার পছন্দের বিনোদনমূলক কার্যক্রমে মগ্ন থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক এন্ডোরফিন (সুখের হরমোন) নিঃসরণ করে, যা মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। এই প্রক্রিয়াটি নেতিবাচক চিন্তাগুলিকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং মানসিকতাকে ইতিবাচক রাখে। নিয়মিত বিনোদন দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং জীবনকে চাপমুক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

৮. পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করে:

পরিবারের সকল সদস্যের একসাথে হালাল বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া পারিবারিক বন্ধনকে আরও গভীর ও মজবুত করে। সিনেমা দেখা, বোর্ড গেম খেলা, পিকনিকে যাওয়া বা একসাথে রান্না করার মতো বিনোদনমূলক অভিজ্ঞতাগুলো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিকতা এবং বোঝাপড়া তৈরি করতে সাহায্য করে। এই সম্মিলিত আনন্দময় স্মৃতিগুলো পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি আরও মজবুত করে এবং সকলের মধ্যে মানসিক নৈকট্য বৃদ্ধি করে।

৯. শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা দেয়:

অনেক বিনোদনমূলক মাধ্যম কেবল আনন্দই দেয় না, বরং মূল্যবান জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাও অর্জনে সহায়তা করে। ভ্রমণ, তথ্যভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখা, সাহিত্য পাঠ, জাদুঘর বা ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের মতো কার্যকলাপগুলো জ্ঞানকে প্রসারিত করে। এমনকি ইতিহাসভিত্তিক বা শিক্ষামূলক গেমও নতুন দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে। এই ধরনের বিনোদন মানুষকে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ জোগায় এবং শিক্ষণ প্রক্রিয়াটিকে আরও আনন্দময় করে তোলে।

১০. সুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলে:

খেলাধুলা বা দলীয় বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক গুণাবলী অর্জন করে। দলগত খেলাধুলা সহযোগিতা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্বদানের ক্ষমতা এবং ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতার মানসিকতা শেখায়। পরাজয়কে মেনে নেওয়া এবং জয়কে বিনয়ের সাথে উদযাপন করার মতো গুণাবলী এই বিনোদনের মাধ্যমেই শেখা যায়, যা সমাজে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

১১. মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়:

বিভিন্ন মানসিক খেলা যেমন পাজল, সুডোকু, বা কৌশলগত গেম, এবং সেইসাথে গল্প বা কবিতা পাঠ মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকে সক্রিয় রাখে। এসব বিনোদনমূলক কাজ মস্তিষ্কের সংযোগগুলিকে শক্তিশালী করে, যার ফলে মনোযোগের স্থিতিকাল বাড়ে এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা উন্নত হয়। ভ্রমণ এবং নতুন পরিবেশ দেখা স্মৃতিশক্তিকে উদ্দীপিত করে। সুস্থ বিনোদন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে জ্ঞানীয় অবনতির ঝুঁকি কমায়।

১২. জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে:

একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাত্রার জন্য কাজ বা ইবাদতের পাশাপাশি কিছু সময় বিনোদন অপরিহার্য। অতিরিক্ত কাজ বা যেকোনো একটি বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিলে জীবন একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে এবং মানসিক ক্লান্তি আসতে পারে। বিনোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্রেক’ হিসেবে কাজ করে, যা কর্মজীবন, ব্যক্তিগত জীবন এবং আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই ভারসাম্য ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ, সুখী ও উৎপাদনশীল থাকতে সাহায্য করে।

১৩. শারীরিক স্বাস্থ্য উন্নত করে:

খেলাধুলা, হাঁটা, সাঁতার কাটা বা ভ্রমণের মতো সক্রিয় বিনোদনমূলক কার্যকলাপগুলো দেহের জন্য ব্যায়ামের মতো কাজ করে। এই ধরনের বিনোদন শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সচল রাখে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ স্থূলতা, হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। আনন্দদায়ক বিনোদনমূলক উপায়ে শরীরকে সুস্থ রাখা কঠিন কাজ বলে মনে হয় না।

১৪. সন্তানদের চরিত্র গঠনে সহায়ক:

বাচ্চাদের জন্য শিক্ষণীয় এবং আনন্দময় বিনোদন তাদের নৈতিকতা, সামাজিক দক্ষতা ও সৃজনশীলতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নৈতিক শিক্ষামূলক গল্প, দলবদ্ধ খেলা বা গঠনমূলক খেলনা তাদের মধ্যে সহযোগিতা, ভাগ করে নেওয়া, ধৈর্য এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশ করে। এই ধরনের বিনোদন তাদের শৈশবেই ইতিবাচক মূল্যবোধ ও নিয়মানুবর্তিতা শেখায়, যা ভবিষ্যতে তাদের চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়।

১৫. মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে:

সৃজনশীল বিনোদন যেমন নাটক, সাহিত্য, বা কাহিনি ভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলো মানুষের আবেগ ও অনুভূতিকে উদ্দীপিত করে। এসবের মাধ্যমে মানুষ সহমর্মিতা, দয়া, সততা, এবং ন্যায়বিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক মূল্যবোধগুলো শিখতে পারে। একটি চরিত্র বা ঘটনার সাথে নিজেকে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে, মানুষ অন্যের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে শেখে এবং সমাজে একজন দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল সদস্য হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

১৬. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে:

খেলাধুলা, সংগীত বা যেকোনো সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সফলতা বা সক্রিয় অংশগ্রহণ একজন ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তোলে। ছোট ছোট সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে এবং অন্যদের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার ফলে আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি পায়। নতুন কিছু শেখা বা একটি চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করা ভীতিভাব ও জড়তা কাটাতে সাহায্য করে। এই আত্মবিশ্বাস জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

১৭. একঘেয়েমি দূর করে:

নিয়মিত জীবনযাত্রার পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো থেকে সৃষ্ট ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করার জন্য বিনোদন একটি কার্যকর হাতিয়ার। এটি রুটিন থেকে একটি পরিকল্পিত প্রস্থান যা মনকে নতুনত্ব ও উত্তেজনা এনে দেয়। বিনোদনের মাধ্যমে মানসিক উদ্দীপনা পুনরায় জাগ্রত হয় এবং জীবন আরও আনন্দময় ও অর্থপূর্ণ মনে হয়। এটি মানসিক অবসাদ এড়াতেও সহায়তা করে।

১৮. সময় ব্যবস্থাপনা শেখায়:

একটি সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে বিনোদনের জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিনোদনকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে মানুষ কাজ, বিশ্রাম ও আনন্দের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য রক্ষা করতে শেখে। এই অনুশীলন ব্যক্তিকে তার সময়কে দক্ষতার সাথে অগ্রাধিকার দিতে এবং অপচয় রোধ করতে শেখায়, যা সামগ্রিক সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়িয়ে তোলে।

১৯. সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখে:

বৈধ উৎসব, খেলাধুলা বা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানগুলো বিভিন্ন পটভূমির মানুষকে একত্রিত করে। এই সম্মিলিত অভিজ্ঞতাগুলো সমাজে ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে। মানুষ একে অপরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে, যা সামাজিক বিভেদ কমিয়ে মিলন ও একতার অনুভূতি তৈরি করতে সাহায্য করে।

২০. ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে:

বিনোদন মনকে প্রফুল্ল ও হালকা রাখে, যা হতাশা, ক্রোধ বা নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে। এটি জীবনের প্রতি একটি আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। নিয়মিত বিনোদন মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়, যাতে ব্যক্তি জীবনের কঠিন পরিস্থিতিগুলো আরও সহজে মোকাবেলা করতে পারে। একটি ইতিবাচক মানসিকতা সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়ক।

বিনোদনের প্রকারভেদ

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান যা মানুষের জীবনে কাজ, ইবাদত এবং বিশ্রামের মাঝে সামঞ্জস্য বিধানের কথা বলে। বিনোদন মানুষের একটি সহজাত চাহিদা হলেও, ইসলাম এটিকে শরীয়তের নির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে রেখেছে, যা বিনোদনকে বৈধ (হালাল) বা অবৈধ (হারাম) নির্ধারণ করে। বিধানের ভিত্তিতে ইসলামে বিনোদনকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. হারাম বিনোদন,

২. হালাল বিনোদন এবং

৩. হারাম-হালালের সংমিশ্রণে বিনোদন।

১. হারাম বিনোদন বা নিষিদ্ধ বিনোদন

যে বিনোদনমূলক কার্যকলাপ ইসলামের মৌলিক নীতিমালা, বিশ্বাস বা নৈতিকতার সরাসরি পরিপন্থী এবং যা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট দলীল দ্বারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা হলো হারাম বিনোদন। এই ধরনের বিনোদন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং পাপে লিপ্ত করে।

প্রধান বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণ:

ক বিশ্বাস বিরোধী উপাদান

যে বিনোদনমূলক কাজের মাধ্যমে শিরক (আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা), কুফরী (অবিশ্বাস) বা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো বিষয়কে প্রচার, উৎসাহিত বা উদযাপন করা হয়, তা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

উদাহরণস্বরূপ, এমন কোনো অনুষ্ঠান বা চলচ্চিত্র দেখা যেখানে সরাসরি মূর্তিপূজা, জাদুবিদ্যা, ভবিষ্যৎ গণনা (যা কেবল আল্লাহর জ্ঞান) বা ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি উপহাস করা হয়। এই ধরনের বিনোদন একজন মুসলিমের ঈমান (বিশ্বাস) ও তাওহীদ (একত্ববাদ)-এর ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই বিনোদনগুলো মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং অন্য শক্তির প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে।

খ. নৈতিকতা ও পাপের উৎসাহ

যে বিনোদন অশ্লীলতা, ব্যভিচার, মদ্যপান, জুয়া, মিথ্যাচার বা হিংসাত্মক কার্যকলাপকে সরাসরি উৎসাহিত করে, প্রদর্শন করে বা স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরে, তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যেমন: পর্নোগ্রাফিক বা অত্যন্ত অশ্লীল দৃশ্যযুক্ত চলচ্চিত্র, গান বা অনুষ্ঠান; জুয়ার আড্ডা বা অনলাইন জুয়ায় অংশগ্রহণ; এমন বিনোদনমূলক খেলা বা অনুষ্ঠান যেখানে বিনা কারণে চরম সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতাকে বীরত্ব হিসেবে দেখানো হয়। এই কার্যকলাপগুলো সামাজিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত নৈতিকতাকে ধ্বংস করে, যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী এবং সমাজে ফিতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি করে।

গ. দায়িত্ব থেকে গাফিলতি

যে বিনোদন মানুষের মনকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে সে ফরয ইবাদত, যেমন সালাত (নামায) ও সিয়াম (রোজা), অথবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও জাগতিক দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে গাফেল হয়ে যায়, তা হারাম বিনোদন হিসেবে গণ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো খেলাধুলা, সিনেমা বা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে ওয়াক্তের নামায ছেড়ে দেওয়া বা নামাযের সময় পার করে দেওয়া। বিনোদন যদি ব্যক্তির পরিবার, চাকরি বা অন্যান্য সামাজিক দায়িত্ব পালনে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটায় এবং তাকে নিষ্ক্রিয় করে তোলে, তবে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইসলামের উদ্দেশ্য হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা।

ঘ. সম্পদ ও সময়ের চরম অপচয়

যে বিনোদন চূড়ান্তভাবে মূল্যহীন (‘লাহ্ওয়াল হাদিস’) এবং যার পেছনে সম্পদ ও মূল্যবান সময় নষ্ট হয়, বিশেষ করে যদি তা মারাত্মক আসক্তিতে রূপ নেয়, তবে তা নিন্দনীয় বা হারাম। যদিও সামান্য অবকাশ বৈধ, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন কার্যকলাপে মগ্ন থাকা যা কোনো জ্ঞান, স্বাস্থ্য বা নৈতিক উপকার দেয় না, বরং সম্পদ ও জীবনের মূল্যবান সময়কে নিঃশেষ করে দেয়, তা ইসলামে অনুমোদিত নয়। যেমন: উদ্দেশ্যবিহীনভাবে অর্থ খরচ করে জুয়াসদৃশ গেমিং-এ আসক্ত হওয়া বা দীর্ঘ সময় ধরে এমন সামগ্রী দেখা যা চূড়ান্তভাবে কোনো কল্যাণ বহন করে না। সময় আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত, যার অপচয় হারাম।

২. হালাল বিনোদন বা বৈধ বিনোদন

যে বিনোদন কুরআন ও সুন্নাহর নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা মানুষকে মানসিক ও শারীরিক স্বস্তি দেয় এবং কোনো প্রকার হারাম কাজে লিপ্ত করে না, তা হলো হালাল বিনোদন। এই ধরনের বিনোদন জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং আত্মাকে সতেজ করতে সহায়ক।

প্রধান নীতিমালা:

ক. শরীয়তের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ

হালাল বা বৈধ বিনোদনকে অবশ্যই ইসলামের মৌলিক বিধান, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ, কোনো বিনোদন যেন ইসলামী জীবনপদ্ধতির কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতিকে লঙ্ঘন না করে বা এর প্রতি অবজ্ঞা না দেখায়। উদাহরণস্বরূপ, কুরআন পাঠ, প্রকৃতি দেখা, জ্ঞানমূলক আলোচনা বা শিশুদের সাথে খেলাধুলা করা এই নীতির অধীনে পড়ে। এই ধরনের বিনোদন মন ও আত্মাকে সতেজ করে এবং একই সাথে আল্লাহর দেওয়া নির্দেশিত পথে জীবন যাপনে সাহায্য করে। বিনোদনের উদ্দেশ্য হবে মানসিক শান্তি অর্জন, কোনো পাপের দ্বার উন্মোচন করা নয়।

খ. হারাম উপাদানের বর্জন

বৈধ বিনোদনের প্রধান শর্ত হলো এতে মদ, জুয়া, মিথ্যাচার, অশ্লীলতা এবং নারী-পুরুষের অবাধ ও অনৈসলামিক মেলামেশার মতো কোনো হারাম উপাদান বা কার্যকলাপের উপস্থিতি থাকবে না। যদি কোনো খেলা বা অনুষ্ঠানে এই ধরনের উপাদান যুক্ত হয়, তবে তা সাথে সাথে অবৈধ বা নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ, গান শোনা বৈধ, কিন্তু যদি সেই গানে অশ্লীল কথা, মদ্যপানের বা জুয়ার প্রচার থাকে, তবে তা হারাম হয়ে যায়। পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা হালাল বিনোদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

গ. শরীয়ত পালন কোন অবহেলা নয়

হালাল বিনোদন কখনই ব্যক্তিকে তার ফরয ইবাদত (যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও সিয়াম) এবং অন্যান্য পারিবারিক বা সামাজিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দেবে না। বিনোদন অবশ্যই সময়ের এমন একটি অংশ হবে যা দায়িত্ব পালনে সহায়ক, বাধা সৃষ্টিকারী নয়। উদাহরণস্বরূপ, বৈধ খেলাধুলা করা ভালো, কিন্তু খেলার কারণে যদি নামাযের ওয়াক্ত চলে যায় বা বাবা-মা’র খেদমত করার সময় নষ্ট হয়, তবে সেই বিনোদন আর হালাল থাকে না। ইসলামে আল্লাহ্‌র অধিকার ও মানুষের অধিকার (হুকুকুল ইবাদ) উভয়ই রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘ. শারীরিক নিরাপত্তা থাকবে

ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সংরক্ষণের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই এমন কোনো বিনোদন বৈধ নয় যা শরীরের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর বা জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিনোদন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করবে, ক্ষতি করবে না। যদিও সাহসিকতা প্রদর্শন প্রশংসনীয়, তবে কোনো খেলাধুলা বা কার্যকলাপ যদি নিশ্চিত আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়, তবে তা শরীয়তে অনুমোদিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছাড়া চরম বিপজ্জনক খেলাধুলায় অংশ নেওয়া হালাল বিনোদনের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

ঙ, অপচয় থেকে মুক্ত হবে

হালাল বিনোদন অবশ্যই সম্পদ বা মূল্যবান সময়ের চরম অপচয়ে পরিণত হবে না। ইসলামে মিতব্যয়িতা এবং সম্পদের সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই যে বিনোদনের পেছনে অযথা প্রচুর অর্থ খরচ হয় বা যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মূল্যবান সময় নষ্ট করে দেয়, তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) অথবা হারাম হওয়ার ঝুঁকি রাখে। হালাল বিনোদন হবে কার্যকর এবং পরিমিত। উদাহরণস্বরূপ, অল্প সময়ের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ইনডোর গেম খেলা বৈধ, কিন্তু দিনে দশ ঘণ্টা ব্যয় করে কোনো মূল্যহীন ভিডিও গেমে আসক্ত হওয়া অপচয় হিসেবে গণ্য হবে।

৩. হারাম-হালালের সংমিশ্রণে বিনোদন

এই প্রকারের বিনোদন এমন কার্যকলাপকে বোঝায়, যা মূলত হালাল (বৈধ) হলেও তাতে কোনো হারাম উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটে, অথবা বৈধ হলেও তা এমনভাবে করা হয় যে তা হারামের কাছাকাছি চলে যায়। ইসলামী পরিভাষায় এটিকে উলামাগণ ‘মাকরূহ তাহরীমি’ বা ‘মাকরূহ তানযিহি’ (না-পছন্দনীয়) হিসেবেও আখ্যায়িত করতে পারেন, যা পরিস্থিতিভেদে হারামও হতে পারে।

ক. বৈধ কাজে অবৈধ অনুপ্রবেশ

বৈধ বিনোদনে অবৈধ কাজের অনুপ্রবেশ করলে বিনোদনটি হারাম হয়ে যায়। অর্থাত হালাল কার্যকলাপের মধ্যে হারাম উপাদানের প্রবেশ ঘটা।

উদাহরণস্বরূপ, ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা করা শারীরিকভাবে বৈধ ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন। কিন্তু যদি এই খেলার ফলাফল নিয়ে জুয়া খেলা হয় বা খেলোয়াড়রা জয়ের জন্য বারবার মিথ্যা কথা বলে (যেমন রেফারির কাছে মিথ্যা অভিযোগ করা), তবে সেই বিনোদনটি অবৈধ বা হারাম উপাদানের কারণে নিষিদ্ধে পরিণত হয়। অর্থাৎ, কাজটি নিজে বৈধ হলেও, তার পার্শ্ববর্তী আচরণ বা উদ্দেশ্য তাকে হারাম করে দেয়।

খ. বিনোদনের সময় সতর প্রকাশ পাওয়া :

খেলাধুলা বা অন্য কোনো বৈধ বিনোদনের সময় যদি এমন পোশাক পরিধান করা হয় যা সতর (ইসলামে আবৃত করা আবশ্যকীয় শরীরের অংশ) প্রকাশ করে, তবে সেই বিনোদনটি হারাম হয়ে যায়।  ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শালীন পোশাক পরিধান করা ফরজ।

উদাহরণস্বরূপ, সাঁতার বা কিছু খেলাধুলার জন্য সংক্ষিপ্ত পোশাক পরিধান করতে হলেও, তা যদি ইসলামী শালীনতার সীমারেখা অতিক্রম করে এবং সতর উন্মোচন করে, তবে সেই বিনোদন অবৈধ হবে। এই নীতি মূলত নৈতিকতা ও শালীনতা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেয়।

গ. আসক্তি ও দায়িত্বে ব্যাঘাত

যে বিনোদন মূলত বৈধ (যেমন ভিডিও গেম, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার বা খেলাধুলা), তাতে যখন ব্যক্তি এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে যে তা তার ফরয ইবাদত (নামায, রোজা) বা পারিবারিক ও সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটায়, তখন তা অপছন্দনীয় হিসেবে গণ্য হয়। এই ক্ষেত্রে কাজটি নিজে হারাম নয়, কিন্তু এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং ক্ষতিকর ফলাফল এটিকে নিষিদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। সারাদিন গেম খেলে সময় নষ্ট করা বা রাতের পর রাত জেগে বিনোদন করার কারণে পরিবারকে সময় না দিতে পারা—এই বিনোদনের উদাহরণ।

ঘ. বিনোদনে অসৎ আচরণ

বৈধ বিনোদনের সময় মিথ্যা বলা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা বা অন্যকে মানসিকভাবে আঘাত দেওয়া বা অপমান করা কঠোরভাবে নিন্দনীয়। খেলাধুলা বা আড্ডার সময় মজা করার অজুহাতে যদি অন্যকে অপমান করা হয়, বা মিথ্যা বলে আনন্দ নেওয়া হয়, তবে এই আচরণ হারাম। যদিও খেলা বা আড্ডা হালাল, কিন্তু এই ধরনের অসৎ ও ক্ষতিকর আচরণ একে পাপের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। ইসলামে ঠাট্টার ক্ষেত্রেও সত্যতা ও সম্মান বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ কারো অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া একটি গুরুতর অন্যায়।

উপসংহার : ইসলামে বিনোদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, বরং এটিকে জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে তা অবশ্যই শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থাকতে হবে। মুসলিম ব্যক্তিকে বিনোদনের ক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহর আদেশ-নিষেধের প্রতি সজাগ থাকতে হবে। যেকোনো বিনোদনের বৈধতা যাচাইয়ের মূল মাপকাঠি হলো—তা কি আমাকে আল্লাহর পথে অগ্রসর করছে, নাকি গাফেল করে দিচ্ছে?

 বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

 বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মানুষ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব। তাকে আল্লাহ এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, জন্মলগ্ন থেকেই তার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়। কেউ ছাত্র হিসেবে লেখাপড়ার দায়িত্ব পালন করে, কেউ শিক্ষক হিসেবে জ্ঞান বিতরণের কাজে নিয়োজিত থাকে, কেউ কৃষক হয়ে ফসল ফলায়, কেউ ব্যবসায়ী হয়ে বাণিজ্য পরিচালনা করে, আবার কেউ সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে অফিসে দায়িত্ব পালন করে। এমনকি একজন গৃহিণীও ঘরের সমস্ত কাজকর্ম, সন্তান পালন, খাবার তৈরি ও সংসারের ভার সামলে নিজের দায়িত্ব পালন করে থাকে। অর্থাৎ পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে একেবারে কর্মহীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন-

لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡ کَبَدٍ ؕ

অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি ক্লেশের মধ্যে। সূরা বালাদ : ৪

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ পরিশ্রম ও কর্মের মাধ্যমেই জীবন পরিচালনা করে। তবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার শরীর ও মন দুটোই বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে। তাই সারাদিনের কর্মযজ্ঞের পর মানুষ কিছু সময় বিশ্রাম নেয়, যাকে আমরা বলি অবসর সময়

মুমিনের অবসর

জীবন হলো কর্ম ও বিশ্রামের সমন্বয়। আধুনিক কর্মনীতি অনুযায়ী একজন মানুষ সাধারণত দিনে আট ঘণ্টা কাজ করে। বাকিটা সময় ঘুম, খাওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং সামান্য কিছু সময় অবসর হিসেবে থাকে। এই অবসর সময়েই মানুষ বিনোদন খোঁজে—কখনও বই পড়ে, কখনও পরিবারের সাথে সময় কাটায়, কখনও ভ্রমণে যায়, আবার কেউ কেউ সঙ্গীত, খেলাধুলা, সিনেমা দেখা, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সময় ব্যয় করে। সাধারণভাবে অবসর বলতে বোঝায় কাজের বাইরে ফাঁকা সময় যে সময় মানুষ বিশ্রাম নেয় বা বিনোদন করে। কিন্তু একজন মুমিন বান্দার জীবনে “অবসর” বলতে একেবারে কর্মহীন বা উদ্দেশ্যহীন সময় বোঝানো যায় না। কারণ, একজন মুমিন জানে, তার প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে হিসাবযোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ

“অতএব, যখন তুমি এক কাজ শেষ করো, তখন অন্য কাজে মনোনিবেশ করো। আর তোমার রবের প্রতিই আকাঙ্ক্ষা রাখো। সূরা ইনশিরাহ :৭-৮

অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবন কখনোই শূন্য বা উদ্দেশ্যহীন হয় না। সে এক ইবাদত শেষ করলে অন্য ইবাদতে প্রবেশ করে, এক দায়িত্ব শেষ করলে অন্য দায়িত্বে মনোনিবেশ করে।

সাধারণ অর্থে অবসর বলতে মানুষ সাধারণত সেই সময়কে বোঝে, যখন সে কোনো ধরনের কাজ বা দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকে না, অর্থাৎ কর্মহীনতা ও দায়িত্বমুক্তির একটি অবকাশ। কিন্তু এই অর্থে যদি অবসরের ধারণা গ্রহণ করা হয়, তবে একজন মুসলিমের জীবনধারায় ‘অবসর’ নামক কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব থাকা কার্যত অসম্ভব, যার প্রতি সে যত্নবান হতে পারে বা যাকে সে শুধু কর্মহীনতায় অতিবাহিত করতে পারে। কারণ, একজন নিষ্ঠাবান মুসলিমের জীবনকর্মের একটি মুহূর্তও দায়িত্ব বা লক্ষ্যহীনভাবে অতিক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না। তার জীবনের প্রতিটি ক্ষণই কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালনে নিবেদিত। একজন মুসলিমকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেত হয়। সালাতের বাহিরে তাকে প্রতি নিয়ত জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করতে হয়। তাছাড়া তার পরিবারের হক, আত্মীয় স্বজনদের হক, প্রতিবেশীর হক, সামাজিক দায়বদ্ধতার হক ইত্যাদি আদায় করতে হয়। আর যদি দৈবক্রমে এই ধরনের কোন দায়িত্বই সম্পাদনের প্রয়োজন না হয়, তবুও একজন মুসলিমের জীবনে সুন্নাত বা নফল (ঐচ্ছিক ইবাদত) কাজের কোনো সীমারেখা নেই, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক। একজন মুসলিম যদি শরিয়তে বর্ণিত সমস্ত সুন্নাত তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত করতে চায়, তবে সেই সুন্নাত ও নফল আমলের আধিক্য এত বেশি যে, তার এই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করাই জীবনব্যাপী এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়।

অতএব, এই ব্যাপক কর্মপরিধি ও ইবাদতের অবিচ্ছিন্ন ধারার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, একজন মুসলিমের জীবনে প্রকৃত অর্থে ‘অবসর সময়’ কোথায়? ইসলামী জীবনদর্শনে ‘অবসর’ শব্দটির অর্থকে তাই ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়। মুসলিমের জীবনে অবসর মানে দায়িত্বমুক্তির সময় নয়, বরং এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বে স্থানান্তরের মুহূর্ত। এটি একটি ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে রূপান্তরের সময়। যখন সে দৈহিক কোনো কাজ থেকে মুক্তি পায়, তখন সে মানসিক, আত্মিক অথবা জ্ঞানগত ইবাদতে মনোনিবেশ করে।

বিনোদনের ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

উপরের আলোচনাতে এ কতা ষ্পষ্ট যে মুমিনের জীবন কোন অবসর নাই। অবসর নাই মানেই তার কোন বিনোদন নাই। ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি বিনোদনের পরিধি ও সঙ্গা আলাদা। কঠোর পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নেওয়াও আল্লাহর হক আদায় ও পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে ইবাদতে পরিণত হতে পারে। এমনকি, হালাল উপায়ে বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তাও অর্থহীন থাকে না।

অর্থাত মুমিনে বিনোদন ও ইবাদত। যখন মুমিন হবে তখনই ভিন্ন আঙ্গিতে ভিন্ন পন্থায় কুরআন সুন্নাহর অনুসরের ইবাদতে লিপ্ত হবে। আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا فَرَغۡتَ فَانۡصَبۡ ۙ

অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। সুরা ইনশারাহ : ৭

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুমিনের জীবনদর্শনের গভীর দিকটি উন্মোচিত হয়। এই আয়াতটি কঠোরভাবে উপদেশ দেয় যে, মুমিন ব্যক্তি এক কাজ শেষ করার পর যেন কোনো প্রকার আলস্যে গা ভাসিয়ে না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।

দুনিয়াবি কাজ থেকে অবসর পেলে যেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা শেষ হলে তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত, বা যিকিরে মনোনিবেশ করা। মুমিনের কাছে কঠোর পরিশ্রমের পর যে বিশ্রাম (হালাল বিনোদন, ঘুম, পরিবারের সাথে সময় কাটানো) আসে, তা পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে করা হলে তা-ও এক প্রকারের ইবাদতে পরিণত হয়। কারণ, শরীর ও মনকে চাঙ্গা না রাখলে সঠিকভাবে ইবাদত করা সম্ভব নয়। রাসূল (সাঃ)-এর জীবনযাপন এর উজ্জ্বল প্রমাণ, যেখানে তিনি বিশ্রাম ও হালাল বিনোদনের মাধ্যমে ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন। সুতরাং, মুমিনের জীবনে “অবসর” বলতে অর্থহীনভাবে বা উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় নষ্ট করা বোঝায় না, বরং এর অর্থ এক প্রকারের ‘ট্রানজিশনাল পিরিয়ড’ বা এক ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে যাওয়ার বিরতি। এই বিরতির সময় হালাল বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে অর্থহীন থাকে না, বরং ইবাদতেরই ভিন্ন এক আঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়। মুমিনের জীবন তাই বিনোদনের নামে প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ভিন্ন পন্থায় ইবাদতে লিপ্ত থাকে।

ইসলামী জীবনবোধের মূল কথা হলো, একজন মুসলিম তো সর্বদা মনেপ্রাণে এই প্রত্যাশা লালন করবে এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে যে, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে নিবেদিত হয়। এই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আর আমি জিন ও মানবকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। কুরআন ৫১: ৫৬

এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো ইবাদত। আর ইবাদত শুধু আনুষ্ঠানিক সালাত, সিয়াম বা হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি বৈধ কাজ, যদি আল্লাহর নির্দেশিত পথে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদতে গণ্য হয়।

মুমিনের অবসর সময়ও তার ঈমানের আলোয় পরিচালিত হয়। সে অবসরে এমন কাজ করে, যা হয় ইবাদতের অংশ, নয়তো ইবাদতের সহায়ক। ইবাদাহ মানে হলো—

আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। এ উদ্দেশ্যে সাধনে এবং প্রতিটি কাজ কুরআন সুন্নাহ সীমারেখার মধ্যে রাখতে আমরা নিচে তিনটি নিয়ম মেনে চলব। যথা-

* আমরা পৃথিবীতে আল্লাহর দাস হিসেবে তার সন্তুষ্টির কাজ করব।  

* তিনি যা হালাল করেছেন, তা করব।

* তিনি যা হারাম করেছেন, তা থেকে দূরে থাকব।

এই দাসত্ব বা আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার নামই হলো ইসলাম। আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সারাদিন কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতে (সালাত, সিয়াম) মগ্ন থাকার প্রয়োজন নেই। বরং, যখন আমরা আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের (সীমা বা বিধান) মধ্যে থেকে, আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন পার্থিব কাজগুলো করি, তখন সেই কাজগুলোও ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন-

১. পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য চাকরি বা ব্যবসা করা ইবাদত:

হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করা এবং এর মাধ্যমে পরিবার-পরিজনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যখন একজন মুমিন এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং রাসূল ﷺ-এর নির্দেশিত পথে সততার সাথে ব্যবসা বা চাকরি করে, তখন তার এই কঠোর পরিশ্রম একটি মহৎ ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে। এটি শুধু পার্থিব কাজ থাকে না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন হিসেবে গণ্য হয়।

কাব ইবনু উজরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ- এর নিকট দিয়ে এক ব্যক্তি গমন করলো। রাসূলুল্লাহ ﷺএর সাহাবাগণ তার কর্মস্পৃহা ও শক্তি দেখে বললেন, “”হে আল্লাহর রাসূল! যদি এই কর্মতৎপরতা আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদে) হতো! তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মায়ের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। যদি সে নিজেকে (হারাম থেকে) পবিত্র রাখার জন্য চেষ্টা করে, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে লোক-দেখানো ও অহংকার করার জন্য বের হয়, তবে সে শয়তানের পথে আছে। আল-মুজামুল কাবীর, তাবারানী : ৭১৬৬. সহীহ ইবনে হিব্বান : ৪৩৬৪

২. পরিশ্রমের পর শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য ঘুমানো ইবাদত:

 আল্লাহ আমাদের শরীরকে একটি আমানত হিসেবে দিয়েছেন। দিনের কাজের শেষে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম দিয়ে শরীরকে সতেজ রাখা এই আমানতের হক আদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ঘুমানোর আগে যদি আল্লাহর নাম নেওয়া হয় এবং এই নিয়ত করা হয় যে, এর মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে পরের দিন আরও মনোযোগের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালন করা হবে, তবে এই ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়। সুস্থতা ইবাদতের পূর্বশর্ত।

আবূ জুহাইফাহ (রাঃ)-এর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ও আবূ দারদা (রাঃ)-এর মধ্যে ভ্রাতৃ বন্ধন স্থাপন করেন। এরপর একদিন সালমান আবূ দারদা-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তখন তিনি উম্মু দারদা (রাঃ)-কে নিম্নমানের পোশাকে দেখতে পেলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেনঃ তোমার ভাই আবূ দারদার দুনিয়াতে কিছুর দরকার নেই। ইতোমধ্যে আবূ দারদা এলেন। অতঃপর তার জন্য খাবার তৈরি করে তাঁকে বললেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি তো সিয়াম পালন করছি।’ তিনি বললেনঃ আপনি যতক্ষণ না খাবেন ততক্ষণ আমিও খাব না। তখন তিনিও খেলেন। তারপর যখন রাত হলো, তখন আবূ দারদা সালাতে দাঁড়ালেন। তখন সালমান তাঁকে বললেনঃ আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবার উঠে দাঁড়ালে, তিনি বললেনঃ (আরও) ঘুমান। অবশেষে যখন রাত শেষ হয়ে এল, তখন সালমান বললেনঃ এখন উঠুন এবং তারা উভয়েই সালাত আদায় করলেন। তারপর সালমান বললেনঃ তোমার উপর তোমার রবের হক আছে, (তেমনি) তোমার উপর তোমার হক আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার উপর হক আছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক হকদারের দাবী আদায় করবে। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে, তাঁর কাছে তার কথা উল্লেখ করলেনঃ তিনি বললেন, সালমান ঠিকই বলেছে। সহিহ বুখারি : ৬১৩৯

৩. আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে হালাল খাদ্য গ্রহণ করে শুকরিয়া আদায় করা ইবাদত:

হালাল খাবার গ্রহণ করা এবং প্রতিটি লোকমার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। খাবার গ্রহণের আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা এবং শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শোকর আদায় করা—এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ইবাদতের অংশ। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে স্বীকার করে এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে, যা তার রুহানিয়াতকে আরও শক্তিশালী করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

হে মানুষ, যমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু। সুরা বাকারা : ১৬৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ

আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সুরা ইবরাহিত : ৭

৪. মানুষের সেবা করা ও উপকার করা:

মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও দয়া প্রদর্শন করা এবং তাদের বিপদাপদে সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। শারীরিক, আর্থিক বা মানসিক যে কোনো উপায়ে একজন মুমিনের কষ্ট দূর করা বা তার প্রয়োজন মেটানো একটি উচ্চ মর্যাদার ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ وَمَنۡ اَحۡیَاہَا فَکَاَنَّمَاۤ اَحۡیَا النَّاسَ جَمِیۡعًا ؕ

وَلَقَدۡ جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُنَا بِالۡبَیِّنٰتِ ۫ ثُمَّ اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنۡہُمۡ بَعۡدَ ذٰلِکَ فِی الۡاَرۡضِ لَمُسۡرِفُوۡ

আর যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে রক্ষা করল, তাহলে সে যেন সমস্ত মানুষকে রক্ষা করল। সুরা মায়িদা : ৩২

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে,আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন।যে কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দুর করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ২৪৪২, ৬৯৫১

৫. জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষাদান:

দ্বীনী জ্ঞান (কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান) এবং উপকারী দুনিয়াবি জ্ঞান (যা মানুষের কল্যাণে আসে) অর্জন করা উভয়ই মুমিনের জন্য আবশ্যক। জ্ঞান অর্জন যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয় এবং তা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ইবাদত। এই জ্ঞান অন্যকে শিক্ষাদান করা বা সৎকাজে উৎসাহিত করাও সাদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াব হিসেবে পরিগণিত হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ  اِنَّمَا یَتَذَکَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ 

‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা যুমার : ৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الجَنَّةِ

যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯

৬. পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন:

পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) সর্বোচ্চ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এসব দায়িত্বকে আল্লাহর আদেশ মনে করে পালন করলে প্রতিটি আচরণ ইবাদতের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়। সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিবেশীর হক আদায় করা এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও ইবাদত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارً

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও। সুরা তাহরিম : ৬

‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪

৭. সময়মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষা

শরীয়তের নির্দেশিত পথে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যেমন – অজু করা, গোসল করা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবূ মালিক আল আশ’আরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পবিত্রতা হল ঈমানের অর্ধেক অংশ। আলহামদু লিল্লাহ’ মিযানের পরিমাপকে পরিপূর্ণ করে দিবে এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লা-হ” আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দিবে। সালাত’ হচ্ছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি। সাদাকা হচ্ছে দলীল। ধৈর্য হচ্ছে জ্যোতির্ময়। আর “আল কুরআন’ হবে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ। বস্তুতঃ সকল মানুষই প্রত্যেক ভোরে নিজেকে আমলের বিনিময়ে বিক্রি করে। তার আমল দ্বারা সে নিজেকে (আল্লাহর আযাব থেকে) মুক্ত করে অথবা সে তার নিজের ধ্বংস সাধন করে। সহিহ মুসলিম : ২২৩

পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, এই বিশ্বাসে সুস্থ থাকার জন্য প্রচেষ্টা করাও ইবাদত, কারণ সুস্থ শরীর ইবাদত পালনে এবং দ্বীনের খেদমতে আরও বেশি সক্ষমতা যোগায়। অসুস্থতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা আল্লাহর আমানতের প্রতি যত্নশীল হওয়ারই নামান্তর।

হালাল উপায়ে বিনোদনও ইবাদত

আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার মধ্যে থেকে মনকে সতেজ করার জন্য এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার জন্য বৈধ বিনোদন করা ইবাদত হতে পারে। যেমন: পরিবারকে সময় দেওয়া, বৈধ খেলাধুলা করা বা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা। যদি এর মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া দেহকে সতেজ রেখে পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়ত থাকে, তবে এই সতেজতা অর্জনের প্রক্রিয়াটিও ইবাদতে পরিণত হয়।

আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

মুসলিমের জীবন হলো এক নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের ধারা, এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বের সেতু। এখানে আলস্য বা উদ্দেশ্যহীন কর্মহীনতার কোনো স্থান নেই। সময়কে অর্থহীন করার অর্থ হলো সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া। আর এই বিচ্যুতিই মানুষকে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগত অকর্মণ্যতার দিকে ঠেলে দেয়, যা বর্তমান সময়ের কর্মবিমুখতার প্রধান কারণ। একজন প্রকৃত মুসলিম তার জীবনের প্রতিটি ‘অবসর’ সময়কেও আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের খেদমতে ব্যয় করে, ফলে তার জীবনে ‘অবসর’ কেবল সময়ের সার্থক ব্যবহারেরই নামান্তর। এভাবে, ইসলামী জীবনব্যবস্থা একজন মুসলিমকে প্রতিটি মুহূর্তে কর্মোদ্দীপক ও উদ্দেশ্যমুখী রাখে, তাকে অর্থহীনতার হাত থেকে রক্ষা করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে আল্লাহর পথে কাজে লাগানোর প্রেরণা যোগায়। এটাই মুসলিম জীবনে অবসর সময়ের প্রকৃত তাৎপর্য।

তবে এর মানে এই নয় যে মুমিন কখনো অবসর বা বিশ্রাম নেয় না। বরং ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই কাজের পর কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া, মনকে সতেজ রাখা, শরীরকে শক্তিশালী করা, এসবই মুমিনের জীবনের অংশ। তবে এই “অবসর” সময়ও সে আল্লাহর সীমার মধ্যে কাটায়, তাই তার অবসর কখনোই অর্থহীন নয়। মুমিন যখন তার অবসর কুনআন ও সুন্নাহ সীমরেখার মাধ্যমে ব্যয় করে তবে নিশ্চিত রূপে ইবাদত হবে। মুমিনের প্রতিটি মুহুর্ত দাবি। তাই মুমিনের অবসর, বিনোদন, উপভোগ, আমদ-প্রমদ সব কিছুই  আল্লাহ সীমারেখার মধ্য হওয়া জরুরি। কেননা তার প্রতি মুহুর্ত হিসেব প্রদানে জন্য লেখা হচ্ছে। বলা যায়, মুমিনের জীবন উপভোগ, চিত্তবিনোদন বা বৈচিত্র্যের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ

আর আমি আকাশ ও পৃথিবী এবং যা তাদের মধ্যে আছে তা খেল-তামাশার ছলে সৃষ্টি করিনি। কুরআন : ১৬

মুমিন ও কাফিরের অবসরের সময়ের পার্থক্য

একজন মুমিন ব্যক্তি তার সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করে। তার জীবনের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ফলে তার অবসর সময়ও খুব সীমিত হয়ে যায়। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে চায় সেই সময়কে ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইসলামি জ্ঞান অর্জন, পরিবারের হক আদায় বা সমাজসেবার মাধ্যমে কাজে লাগাতে।

অন্যদিকে একজন অবিশ্বাসী বা বিধর্মী তার অবসর সময়কে শুধুমাত্র দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসে ব্যয় করে। সে সিনেমা, গান, নাচ, ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কারণ তার কাছে জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস।

১. মুমিন ও কাফিরের অবসর সময়ের ব্যবহারের পার্থক্য

ইসলামী জীবনদর্শনে একজন মুমিন (বিশ্বাসী) এবং একজন কাফিরের (অবিশ্বাসী/বিধর্মী) জীবনবোধ, উদ্দেশ্য এবং সময় ব্যবহারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। অবসর সময়ের ব্যবহার এই পার্থক্যকে বিশেষভাবে প্রতিফলিত করে। মুমিনের জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সফলতাকে কেন্দ্র করে, যেখানে কাফিরের জীবনের লক্ষ্য সাধারণত হয় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস।

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
মূল ভিত্তিশরীয়তের সীমারেখা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা।ভোগবাদিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। নৈতিক বা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই।
উদ্দেশ্য-১মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালীন জীবনের (আখিরাত) জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।কাফিরের কাছে জীবন হলো একবারই পাওয়া, তাই জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস এবং দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।
উদ্দেশ্য-২দেহ ও মনের সতেজতা, ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা।তাৎক্ষণিক আনন্দ ও আত্ম-সন্তুষ্টি। প্রায়শই মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির দিকে ধাবিত করে।
সময়ের ধারণামুমিন সময়কে আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে পুণ্যময় কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তার কাছে অবসর সময়ও ইবাদতের একটি অংশ।কাফির বা অবিশ্বাসীর কাছে সময় কেবলই ক্লান্তি বা কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যম। এই সময়ে তারা কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা অনুভব করে না।
সাধারণ রূপপরিবার নিয়ে হালাল স্থানে ভ্রমণ, শরীর চর্চা/খেলাধুলা (হালাল নিয়মে), হালাল আড্ডা, ইসলামী জ্ঞান অর্জন (বই পড়া), প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, জিকির-তিলাওয়াত ও চিন্তন-মনন।সঙ্গীত (হারাম উপাদানযুক্ত), মদ্যপান, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদকের ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ প্রদর্শনী।
ফলাফলমানসিক শান্তি লাভ, ইমান বৃদ্ধি এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা।পাপের পথে ধাবিত হওয়া, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মানসিক অস্থিরতা ও আসক্তি।

২. অবসর সময়ের ব্যবহার ও কার্যকলাপ

মুমিন ব্যক্তি তার অবসর সময়কে এমন কাজে নিয়োজিত করে যা তার আত্মার খোরাক জোগায় এবং পরকালে উপকারে আসে। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে সেই সময়কে ফলপ্রসূ ও ভারসাম্যপূর্ণ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।

মুমিনের অবসর কার্যকলাপ (হালাল বিনোদন ও ফলপ্রসূ কাজ)কাফিরের অবসর কার্যকলাপ (হারাম ও ভোগবাদী বিনোদন)
আধ্যাত্মিক উন্নয়ন: কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, নফল ইবাদত বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা।ভোগবাদী আনন্দ: সিনেমা, গান, নাচ, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হওয়া।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক হক আদায়: পরিবারের হক আদায় করা, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের সাথে ফলপ্রসূ খেলাধুলা করা। এটিও মুমিনের জন্য ইবাদত।অবাধ্যতা ও পাপ: মদ, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা নৈতিকতাহীন কাজে সময় নষ্ট করা।
সৃজনশীলতা ও সমাজসেবা: ইসলামি সাহিত্য চর্চা, সমাজসেবা, অভাবীকে সাহায্য করা, জনকল্যাণমূলক কাজে সময় দেওয়া, বা হালাল শখ পূরণ করা।সময় ও সম্পদের অপচয়: অর্থহীন বা ক্ষতিকর গেমিং, চরম বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং সম্পদ ও মূল্যবান সময়ের চূড়ান্ত অপচয় করা।
শারীরিক সুস্থতা: হালাল উপায়ে শরীরচর্চা করা, যা তাকে ইবাদতের জন্য শক্তিশালী করে তোলে।স্বাস্থ্যের ক্ষতি: এমন কাজ করা যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর, যেমন নেশা বা অতিরিক্ত অনিরাপদ অভ্যাস।

৩. ইসলামি বিধিবিধানের পার্থক্য

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
 বিধিবিধানমুমিন শরীয়তের সীমান থেকে অবসর কাটায় বিধান সে হারাম বিষয় থেকে দূরে থাকতে বলে।কাফিরের হারাম হালাল বিধানের বাধ্যবাধকরা নাই। তাই সে অশ্লীলভাবে অবসর কাটায়।  
বিনোদনের পদ্ধতিপরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে হালাল আড্ডা, শরীর চর্চা বা খেলাধুলা, ইসলামী বই পড়া জিকির, তিলাওয়াত ও চিন্তা-মননে নিজেকে প্রশান্ত করা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো ইত্যাদিমাদকদ্রব্য ও নেশা সেবন, জুয়া ও বাজি ধরা, অশ্লীল চলচ্চিত্র ও পর্ণোগ্রাফি দেখা, কুরুচিপূর্ণ বা হারাম গান ও বাদ্যযন্ত্র শোনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প বা হাসি-ঠাট্টা, অশালীন পোশাক পরিধান ও প্রদর্শনী, সময় নষ্ট করা হয় এমন অনর্থক খেলাধুলা, জাদুটোনা ও ভাগ্য গণনা: ভাগ্য গণনাকারী ইত্যাদি।
ফলাফলঅবসর শেষে মুমিনের মনে আসে মানসিক শান্তি ও আত্মতৃপ্তি, কারণ সে জানে যে এই সময়টি সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করেছে। তার অবসর জীবন তাকে কর্ম ও ইবাদতের জন্য আরও বেশি সতেজ ও প্রস্তুত করে তোলে।  কাফিরের অবসর সময় তাকে হয়তো ক্ষণিকের উত্তেজনা বা শারীরিক আনন্দ দেয়, কিন্তু এর ফলস্বরূপ প্রায়শই তার মনে শূন্যতা, একঘেয়েমি, মানসিক অশান্তি এবং পাপের গ্লানি থেকে যায়।

মুমিনের অবসর হলো আল্লাহর পথে চলার জন্য একটি ‘বিশ্রাম ও রিচার্জ’ প্রক্রিয়া, যেখানে মুমিনের প্রতিটি হালাল কাজও নেকিতে পরিণত হয়। আর কাফিরের অবসর হলো শুধুমাত্র দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লোভ ও জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম, যা তাকে পরকালীন জীবনের সফলতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মুমিন তার সময়কে ‘ইনভেস্ট’ করে, আর কাফির তার সময়কে ‘খরচ’ করে।

ইবাদত ও বিনোদনে ভারসাম্য রক্ষা

ইসলামী জীবনদর্শনে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে ফেরেশতাদের মতো কেবল একমুখী ইবাদত বা নিরবচ্ছিন্ন উপাসনার জন্য সৃষ্টি করেননি। বরং তিনি আমাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের চাহিদা দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই চাহিদাসমূহের মধ্যে আছে বিশ্রাম, আত্মতৃপ্তি এবং চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন। মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তি উপেক্ষা করে যদি আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত-বন্দেগি ও গম্ভীর কাজে ডুবে থাকি, তবে এর ফলস্বরূপ আমাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির দ্রুত ক্ষয় ঘটবে। একঘেয়েমি চলে আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদী ইবাদত চালিয়ে যেতে কষ্টকর করে তুলবে। এর ফলে একসময় মানসিক হতাশা, অসুস্থতা বা ইবাদতে অনীহা দেখা দিতে পারে।

ইসলাম মানুষের প্রকৃতির এই দিকটিকে পুরোপুরি স্বীকার করে। এ কারণেই প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ স্বয়ং নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত করতে নিষেধ করেছেন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর জীবনাচারই মুমিনদের জন্য উত্তম আদর্শ। এই ভারসাম্য রক্ষার নীতির সমর্থনে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস হলো-

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা তিন ব্যক্তি নাবী ﷺ এর ‘ইবাদাতের অবস্থা জানার জন্য তাঁর স্ত্রীগণের নিকট এলে। নাবী ﷺ এর ইবাদাতের খবর শুনে তারা যেন তাঁর ইবাদাতকে কম মনে করলেন এবং পরস্পর আলাপ করলেন: নাবী ﷺ এর সঙ্গে আমাদের তুলনা কোথায়, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আগের-পরের (গোটা জীবনের) সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতঃপর তাদের একজন বললেন, আমি কিন্তু সারা রাত সলাত আদায় করবো। দ্বিতীয়জন বললেন, আমি দিনে সিয়াম পালন করবো, আর কখনো তা ত্যাগ করব না। তৃতীয়জন বললেন, আমি নারী থেকে দূরে থাকব, কখনো বিয়ে করবো না। তাদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার সময় নবী ﷺ এসে পড়লেন এবং বললেন, তোমরা কী ধরনের কথাবর্তা বলছিলে? আল্লাহ্‌র কসম! আমি আল্লাহ্‌কে তোমাদের চেয়ে বেশী ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশী পরহেয করি। কিন্তু এরপরও আমি কোন দিন সিয়াম পালন করি আবার কোন দিন সিয়াম পালন করা ছেড়ে দেই। রাতে সলাত আদায় করি আবার ঘুমিয়েও থাকে। আমি বিয়েও করি। সুতরাং এটাই আমার সুন্নাত (পথ), যে ব্যক্তি আমার পথ থেকে বিমূখ হবে সে আমার (উম্মাতের) মধ্যে গণ হবে না। সহিহ বুখারী : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম ১৪০১

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে কঠোরতা বা সন্ন্যাসবাদের কোনো স্থান নেই। রাসূল ﷺ নিজে আল্লাহর সর্বাধিক ভয়কারী হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি তাঁর উম্মতকেও জীবনের বিভিন্ন দিকের দাবি পূরণ করতে উৎসাহিত করেছেন—একদিকে যেমন আল্লাহর হক (ইবাদত), অন্যদিকে তেমনি নিজের হক (বিশ্রাম, ঘুম) এবং পরিবারের হক (বিয়ে ও সামাজিক জীবন) আদায় করতে শিখিয়েছেন। অতিরিক্ত কঠোরতার মাধ্যমে ভারসাম্য নষ্ট করার প্রবণতাকে তিনি তাঁর পথ থেকে বিমুখতা হিসেবে গণ্য করেছেন।

তাই, একজন বুদ্ধিমান মুমিন তাঁর জীবনে এই ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি জানেন যে, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি নিয়ে ইবাদত করলে তাতে মনোযোগ আসে না এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য (আল্লাহর সাথে নৈকট্য স্থাপন) ব্যাহত হয়। তাই তিনি আল্লাহর অনুমোদিত উপায়ে মাঝে মাঝে বিরতি নেন ও বিনোদন করেন। এই বিরতি বা বিনোদনকে ইসলামী পরিভাষায় ‘মুরাওয়াহাতুন নাফস’ (আত্মার প্রশান্তি) বলা যেতে পারে। হালাল বিনোদন মুমিনের শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যম, যা তাকে সতেজ করে পুনরায় দ্বীনী ও দুনিয়াবী দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।

এই বিনোদনের অর্থ এই নয় যে তা ইবাদতের সময়কে বা দায়িত্বকে নষ্ট করবে, বরং তা এমন হওয়া চাই যা শরীয়তের সীমারেখা মেনে চলে এবং মুমিনকে আরও উদ্যমের সাথে আল্লাহমুখী করে তোলে। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা, বৈধ ভ্রমণ, বা কোনো সুস্থ বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ—এ সবই ক্লান্তি দূর করে মনকে সতেজ করার মাধ্যম। যখন একজন মুমিন এই বিশ্রাম ও বিনোদনের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরবর্তীতে আরও উদ্যমের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের নিয়ত করে, তখন এই বিরতিও নেক আমল হিসেবে গণ্য হতে পারে। এভাবে, ইবাদত ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একজন মুমিন একটি সুস্থ, সফল এবং সন্তোষজনক জীবন অতিবাহিত করতে পারে, যা ইহকাল ও পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে।

ইসলামে বিনোদনের মূলনীতি : প্রথম কিস্তি

ইসলামে বিনোদনের মূলনীতি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিনোদন মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে বিনোদন কোনোভাবেই জীবনের মূল লক্ষ্য নয়। এটি কেবল মন ও দেহের ক্লান্তি দূর করে পুনরায় কল্যাণকর কাজে উৎসাহ জোগানোর একটি মাধ্যম মাত্র। একজন মুসলিমের কাছে বিনোদনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর অনুমোদিত সীমার মধ্যে থেকে শরীর ও মনের ভারসাম্য রক্ষা করা। কেবল চিত্তবিনোদনের জন্য সময় অপচয় করা নয়। কেননা, ইসলামে প্রতিটি কাজই তখনই মূল্যবান, যখন তা দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো উপকার বয়ে আনে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পন্ন হয়।

সুতরাং মুসলমানদের উচিত বিনোদনের ক্ষেত্রে এমন সীমারেখা নির্ধারণ করা, যা শরিয়তের আলোকে বৈধ ও উপকারী, যেন কেউ অনিচ্ছায় বা প্রবৃত্তির টানে হারাম ও গর্হিত পর্যায়ে না পৌঁছে যায়। ইসলামী দৃষ্টিতে বিনোদনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এর উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও ফলাফলের ওপর। যে বিনোদন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে, পাপাচার, অশ্লীলতা, অপচয়, শিরক বা অন্যায় কাজে লিপ্ত করে, তবে তা কখনো বৈধ হতে পারে না। বরং যে বিনোদন শরীর-মনকে বিশ্রাম দেয়, সমাজে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে, নৈতিক উন্নতি সাধন করে এবং মানুষকে সৎ পথে দৃঢ় রাখে, তা ইসলামের আলোকে প্রশংসনীয়। তাই একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, নিজের বিনোদন যেন সর্বদা হালাল সীমার মধ্যে থাকে এবং তা তাঁর ঈমান, চরিত্র ও কর্মে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, এই নীতিই ইসলামী বিনোদনের মূল দর্শন।

কুরআন সুন্নাহ আলোকে বিনোদন হালাল হওয়ার জন্য অনেক নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে। সেখান থেকে প্রধান প্রধান কিছু নীতিমালা পাঠদের সামনে তুল ধরা হলো। এগুলোর প্রতি লক্ষ রেখে বিনোদন করলে আশা করি শরীয়ত বিরোধী হবে না। ইনশাআল্লাহ।

১. বিনোদনের মাঝে শিরক থাকবে না

২. গাইরুল্লাহর সাথে সম্পৃক্ততা তৈরি করবে না

৩ বিদআত থাকবে না।

৪. হারাম কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে

৫. নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা থাকবে না

৬. অশ্লীলতা, নগ্নতা ও নৈতিক অবক্ষয় থাকবে না

৭. বিনোদন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করবে না

৮. প্রয়োজন পরিমাণ বিনোদনের প্রতি লক্ষ রাখা

৯. সময়ের অপচয় ও দায়িত্ব অবহেলার কারণ হবে না

১০. বিনোদমূলক সম্পদ অপচয়ের মাধ্যম হবে না

১১. অন্যের অধিকার লঙ্ঘন বা ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না

১২. পরনিন্দা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও গিবত থেকে মুক্ত থাকতে হবে

১৩. অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করবে না

১৪. বিনোদনে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যাবে না

১৫. শরীরের বা মনের কোনো ক্ষতি করবে না:

১৬. বিনোদনে কোন প্রকারের জাদুর উপস্থিত থাকবে না

১৭. অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত বিশেষ চিহ্নের অনুকরণ হবে না:

১৮. বিনোদনে দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি সৃষ্টি করা যাবে না

১৯. বিনোদন যেন মুসলিমকে কাফিররাষ্ট্রে যেতে বাধ্য না করে

বিনোদনের মাঝে শিরক থাকবে না

ইসলামে বিনোদনের প্রধান ও মৌলিক শর্ত হলো এর মধ্যে কোনো প্রকার শিরকের উপাদান থাকা চলবে না। শিরক হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ও ক্ষমার অযোগ্য পাপ। কোনো খেলাধুলা, গান, সিনেমা, অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো বিনোদনের মাধ্যমে যদি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো পূজা, ইবাদত, ক্ষমতা বা ঐশ্বরিক গুণাবলীকে মহিমান্বিত করা হয়, তবে তা সম্পূর্ণভাবে হারাম।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَکَ بِہٖ وَیَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِکَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ۚ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَقَدِ افۡتَرٰۤی اِثۡمًا عَظِیۡمًا

নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। সুরা নিসা : ৪৮

আবদুল্লাহ (ইবনু মাস’ঊদ) (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, কোন্ গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করান। অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি বললাম, এতো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন্ গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা। সহিহ বুখারি : ৪৪৭৭, ৪৭৬১, ৬০০১, ৬৮১১, ৬৮৬১, ৭৫২০, ৭৫৩২, সহিহ মুসলিম : ৮৬০

জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকেও শারীক না করে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার সম্মুখে উপস্থিত হবে এমন অবস্থায় যে, সে আল্লাহর সাথে শারীক স্থির করে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সহিহ মুসলিম : ৯৩

যে সকল বিনোদনে শিরক হয় তা বুঝার জন্য কয়েকটি উদারহর পেশ করছি ।

১. মুশরিকদের পূজায় অংশগ্রহণ

বিনোদনের নামে বা সামাজিকতার খাতিরেও মুশরিকদের (যারা আল্লাহর সাথে অন্য সত্তাকে শরিক করে) ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা পূজায় অংশগ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। একজন মুসলিমের জন্য পূজার স্থানে উপস্থিত থাকা, এমনকি উপাসনায় সরাসরি অংশ না নিলেও, তা পরোক্ষভাবে সেই শিরকি কাজের প্রতি সমর্থন বা সম্মতি জ্ঞাপনের শামিল হতে পারে। বিনোদন বা কৌতূহলের বশেও এ ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা ইসলামী বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা ও স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে। একজন মুসলিমকে অবশ্যই তার বিশ্বাস ও পরিচয় রক্ষা করতে হবে এবং শিরকের সকল প্রকার কার্যকলাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

২. যে অনুষ্ঠানে গাইরুল্লাহর নামে পশু যবেহ করা হয় তাতে অংশগ্রহণ

পশু যবেহ (কুরবানি বা জবেহ) একটি ইবাদত, যা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁরই নামে সম্পন্ন হতে পারে। যদি কোনো বিনোদনমূলক উৎসব, মেলা বা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় যেখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো দেব-দেবী, পীর, মাজার বা সত্তার নামে পশু যবেহ করা হয় (গাইরুল্লাহর নামে যবেহ), তবে সেই মাংস খাওয়া যেমন হারাম, তেমনি সেই অনুষ্ঠানে বিনোদনের উদ্দেশ্যে অংশ নেওয়াও হারাম। এই ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা মূলত একটি শিরকি রীতির প্রতি সমর্থন জানানো এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো শ্রেষ্ঠত্ব বা ক্ষমতা স্বীকার করার শামিল। মুসলিমের জন্য তার খাদ্যের উৎস এবং ধর্মীয় আচারের পবিত্রতা বজায় রাখা অত্যাবশ্যক।

৩. যে গান বা কবিতায় শিরক থাকে তা গাওয়া বা শোনা

গান, কবিতা, নাটক বা অন্য যেকোনো বিনোদনমূলক শিল্পকর্মে যদি শিরকপূর্ণ ভাষা, ধারণা বা বিষয়বস্তু থাকে, তবে তা উপভোগ করা বা প্রচার করা ইসলামে বৈধ নয়। শিরকপূর্ণ কথা বলতে বোঝায়: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়া, অন্য সত্তাকে সৃষ্টিকর্তা বা ভাগ্যনিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করা, বা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার গুণগান করা। এই ধরনের গান বা কবিতা শোনা বা গাওয়া মানুষের আকিদা বা বিশ্বাসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ধীরে ধীরে তাদের মনকে শিরকের দিকে ধাবিত করতে পারে। একজন মুসলিমের বিনোদনমূলক উপাদান অবশ্যই তাওহীদ-ভিত্তিক এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে, যাতে মনের শান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ব্যাহত না হয়।

৪. জ্যোতিষশাস্ত্রভিত্তিক খেলা বা ভাগ্যগণনা বিনোদন:

এমন কোনো খেলাধুলা, বাজি বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান যেখানে রাশিচক্র, ভাগ্যগণনা বা ভবিষ্যৎ বলার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইসলামে বিশ্বাস করা হয় যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ভবিষ্যতের জ্ঞান রাখে না এবং ভাগ্যগণনাকারীদের ওপর আস্থা রাখা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, কোনো খেলা বা প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য রাশিফল দেখে দিনক্ষণ নির্ধারণ করা বা জ্যোতিষীর পরামর্শ মেনে চলা।

৫. আদর্শিক শিরকযুক্ত কাল্পনিক বা পৌরাণিক কাহিনীর প্রতি আসক্তি:

এমন ভিডিও গেম, চলচ্চিত্র বা কমিকস দেখা ও তাতে মগ্ন হওয়া, যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কাল্পনিক সত্তা বা দেবতাকে অসীম ক্ষমতার অধিকারী বা স্রষ্টার আসনে বসানো হয় এবং বিনোদনের মাধ্যমে সেই শক্তির প্রতি পরোক্ষভাবে ভক্তি বা প্রশংসা তৈরি হয়। বিনোদনের ছলে এই ধরনের পৌরাণিক বা ফ্যান্টাসি জগতের “দেবতা”দেরকে মহিমান্বিত করা মানসিক ও আদর্শিক শিরকের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

৬. মাজার বা পীর-কেন্দ্রিক বিনোদনমূলক মেলা বা উৎসব:

এমন কোনো লোকজ মেলা বা উৎসব যা কোনো পীর, মাজার বা সমাধিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় এবং যেখানে আল্লাহর কাছে না চেয়ে ওই পীর বা মৃত ব্যক্তির কাছে মান্নত করা, চাওয়া বা তার নামে উৎসর্গ করার মতো কার্যকলাপ বিনোদনের অংশ হিসেবে পরিবেশিত হয়। এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নেওয়া বা উপভোগ করা শিরকি কার্যক্রমে সমর্থন ও অংশগ্রহণ হিসাবে গণ্য হতে পারে।

৭. শরিয়তবিরোধী প্রতীকের মাধ্যমে শিরকি বিশ্বাস প্রকাশ:

খেলাধুলা বা বিনোদনের সময় এমন কোনো পোশাক, টটু (Tattoo) বা প্রতীক ব্যবহার করা যা কোনো বিশেষ শিরকি মতবাদ বা দেব-দেবীকে প্রকাশ করে বা তাদের প্রতি আনুগত্য বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অমুসলিম ধর্মীয় দেবতার প্রতীক ব্যবহার করা বা কোনো শিরকি আচারের বিশেষ পোশাক পরিধান করে সেটিকে বিনোদনমূলকভাবে প্রদর্শন করা।

৮. শিরকি স্লোগান বা গান গেয়ে আনন্দ প্রকাশ: কোনো খেলা বা দলীয় বিনোদনের সময় এমন স্লোগান বা বিজয়সূচক গান গাওয়া, যেখানে আল্লাহর নামের পরিবর্তে কোনো মানুষ, প্রতীক বা কাল্পনিক সত্তার কাছে সাহায্য চাওয়া হয়, বা তাদেরকে এমন গুণে গুণান্বিত করা হয় যা কেবল আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য। যেমন—‘অমুকই আমাদের রক্ষাকর্তা’, বা ‘অমুক না থাকলে আমরা জয় পেতাম না’ বলে তাঁকে অতিমাত্রায় ক্ষমতাবান হিসেবে উপস্থাপন করা।

একজন মুসলিমের জন্য বিনোদন হতে হবে তাওহীদ বা একত্ববাদের নীতির সাথে সংগতিপূর্ণ। বিনোদনের সামগ্রিক পরিবেশ, উদ্দেশ্য এবং ফলাফল অবশ্যই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও একত্বকে সমুন্নত রাখবে। এর অর্থ হলো, বিনোদনের উপাদান নির্বাচনে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যাতে সামান্যতম শিরকি ধারণা বা প্রথাও সমাজে বা মনের গভীরে স্থান না পায়।  এই নীতিটি কেবল বিনোদন নয়, বরং মুসলিম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য। তাই একজন বিশ্বাসী সর্বদা নিশ্চিত করবে যে তার বিনোদনমূলক কার্যক্রমে আল্লাহর একত্বের প্রতি তার বিশ্বাস বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ না হয়। এই সতর্কতাই ইসলামী বিনোদনের ভিত্তি।

বিনোদন গাইরুল্লাহর সাথে সম্পৃক্ততা তৈরি করবে না

ইসলামী বিনোদন এমন কোনো কার্যকলাপের সাথে সম্পৃক্ততা তৈরি করবে না, যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো বা কিছুর প্রতি আনুগত্য বা নির্ভরতা প্রকাশ করে। ‘গাইরুল্লাহ’ বলতে আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুকেই বোঝানো হয়। এই নীতিটি শিরক না থাকার নীতিরই একটি সম্প্রসারিত রূপ। বিনোদনের মাধ্যমে যদি এমন কোনো গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা আদর্শের প্রতি মানসিক বা আবেগী ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় যা ইসলামের মৌলিক আকিদা ও মূল্যবোধের পরিপন্থী, তবে সেই বিনোদন বর্জন করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلْ یٰۤاَیُّهَا الْکٰفِرُوْنَ ۙ﴿۱﴾لَاۤ  اَعْبُدُ مَا تَعْبُدُوْنَ ۙ﴿۲﴾ وَ لَاۤ  اَنْتُمْ عٰبِدُوْنَ مَاۤ  اَعْبُدُ ۚ﴿۳﴾

বলুন, ‘হে কাফেরগণ! তোমরা যার ‘ইবাদাত কর আমি তার ‘ইবাদাত করি না’। এবং আমি যার ‘ইবাদাত করি তোমরা তার ‘ইবাদাতকারী নও’। সূরা কাফিরুন :১–৩

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মহান আল্লাহ বলেন, আমি শারীকদের শির্ক হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদি কোন লোক কোন কাজ করে এবং এতে আমি ছাড়া অপর কাউকে শারীক করে, তবে আমি তাকে ও তার শিরকী কাজকে প্রত্যাখ্যান করি। সহিহ মুসলিম : ২৯৮৫

বিনোদনের মাধ্যমে গাইরুল্লাহর সাথে সম্পৃক্ততা তৈরি করে এমন কয়েকটির উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. নির্দিষ্ট কাল্ট বা গোষ্ঠীর প্রতীকী পোশাক পরিধান:

এমন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বা খেলাধুলা করা, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা এমন কোনো আন্তর্জাতিক কাল্ট বা অমুসলিম গোষ্ঠীর পোশাক বা প্রতীক (যেমন: কোনো ধর্মবিরোধী গোপন সংগঠনের চিহ্ন বা পোশাক) পরিধান করে, যারা স্পষ্টতই ইসলামী আদর্শের বিপরীত মতাদর্শ প্রচার করে। এই পোশাক পরিধানের মাধ্যমে বিনোদনের ছলে তাদের প্রতি আনুগত্য বা সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।

২. আদর্শিক গাইরুল্লাহর প্রতি অতিভক্তি প্রকাশ:

এমন চলচ্চিত্র, নাটক বা সংগীতানুষ্ঠান তৈরি বা উপভোগ করা, যেখানে কোনো বিশেষ অ-ইসলামী রাজনৈতিক নেতা, দল বা মতাদর্শকে এমনভাবে মহিমান্বিত করা হয় যেন তারা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে এবং তাদের আদেশ-নিষেধ আল্লাহর আদেশের সমতুল্য। বিনোদনের মাধ্যমে এই ধরনের ব্যক্তিত্বের প্রতি অন্ধভক্তি ও গাইরুল্লাহর আনুগত্য সৃষ্টি হতে পারে।

৩. অতিমানবীয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস রেখে খেলা:

ভিডিও গেম বা ফ্যান্টাসি গেম খেলা, যেখানে খেলার জয়ের জন্য বা কোনো বিশেষ ক্ষমতা অর্জনের জন্য এমন অতিমানবীয় সত্তার শক্তি, মন্ত্র বা টোটকার ওপর নির্ভর করা হয় যা ইসলামি বিশ্বাসে কুফুরি বা শিরকের আওতায় পড়ে। বিনোদনের মাধ্যমে সেই কাল্পনিক শক্তির প্রতি মনের অজান্তে বিশ্বাস তৈরি হওয়া।

৪. সেক্যুলার বা ভোগবাদী জীবনধারাকে আদর্শ হিসেবে দেখানো:

এমন বিনোদনমূলক মিডিয়া বা কন্টেন্ট উপভোগ করা যা লাগামহীন সেক্যুলার জীবনধারা, অবৈধ প্রেম, সীমাহীন বস্তুবাদিতা এবং চরম ভোগবাদকে জীবনের চূড়ান্ত সফলতা বা আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই বিনোদন মুসলিমকে তার সরল ইসলামী জীবনধারা থেকে সরিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে দুনিয়ামুখী গাইরুল্লাহর আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে।

৫. গাইরুল্লাহর নামে শপথ বা অঙ্গীকারভিত্তিক বিনোদন:

দলীয় খেলা বা বিনোদনমূলক আড্ডায় এমন কোনো শপথ বা অঙ্গীকার করা, যেখানে আল্লাহর নামের পরিবর্তে কোনো মানুষ, দেশ, আদর্শ বা অন্য কিছুর নামে অঙ্গীকার করা হয় বা “তাদের মাথায় হাত রেখে” কসম খাওয়া হয়। যদিও এটি খেলার অংশ হতে পারে, কিন্তু বিনোদনের ছলে গাইরুল্লাহর নামে শপথ করা ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং শিরকের কাছাকাছি।

এমন কোনো সাংস্কৃতিক বা শৈল্পিক প্রকাশ যা ইসলামবিরোধী মতাদর্শ বা জীবনধারাকে মহিমান্বিত করে বা সেগুলোর প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে, তা বৈধ হতে পারে না। একজন মুসলিমের হৃদয় ও আনুগত্য কেবল আল্লাহর জন্যই নিবেদিত থাকবে। বিনোদনকে সেই আনুগত্যকে দুর্বল করার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং, বিনোদন এমন হওয়া উচিত যা আল্লাহর আনুগত্যকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করে। এই নীতির মাধ্যমে মুসলিমদের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক বিশুদ্ধতা বজায় থাকে। তারা যেন বিনোদনের ছলে অন্য কোনো ধর্মীয় বা সেক্যুলার মতবাদের ফাঁদে না পড়ে, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে একজন মুসলিম তার আত্মপরিচয় ও বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করতে সক্ষম হয়।

বিনোদনে বিদআত থাকবে না

বিনোদনের ক্ষেত্রে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো এর মধ্যে কোনো প্রকার বিদআত বা ধর্মে নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ের উপস্থিতি থাকবে না। বিদআত হলো দ্বীনের নামে এমন কোনো কাজ বা পদ্ধতি প্রচলন করা যার সপক্ষে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে কোনো ভিত্তি নেই। বিনোদন যদি ধর্মীয় উৎসব বা ইবাদতের অংশ বলে ভুলভাবে বিবেচিত হয় এবং সেই বিনোদনে এমন সব রীতিনীতি যুক্ত করা হয় যা শরিয়ত দ্বারা অনুমোদিত নয়, তবে তা স্পষ্টতই বর্জনীয়।

বিনোদনে বিদআত থাকবে না। আল্লাহ তায়ারা বলেন-

وَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰہِ کَذِبًا اَوۡ کَذَّبَ بِاٰیٰتِہٖ ؕ اِنَّہٗ لَا یُفۡلِحُ الظّٰلِمُوۡنَ

আর তার চেয়ে বড় যালিম আর কে যে আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে? নিশ্চয়ই যালিমরা সফলকাম হয় না। সূরা আনআম : ২১

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী বলেছেন-

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ

‘কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত। সহিহ বুখারি : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসুদ (রা.) হতে বর্ণিত। নবী বলেছেন, সর্বোত্তম কালাম হল আল্লাহর কিতাব, আর সর্বোত্তম পথ নির্দেশনা হল মুহাম্মাদ -এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হল নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। ’’তোমাদের কাছে যার ওয়াদা দেয়া হচ্ছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না’’- সূরা আনআম : ১৩৪। সহিহ বুখারি : ৭২৭৭

বিদআতি উৎসব বা আনন্দ-আয়োজনের উদাহরণ :

নিচি কয়েকটি বিদআত উৎসব বা আনন্দ-আয়োজনের উদারহন দিলাম এগুলো অবশ্য বিনোদনের নিয়তে করে না, এগুলো বিদআতিরা ইবাদতের নিয়তে করে। যেহেতু উৎসব বা আনন্দ-তাই এগুলো বিনোদনের উদাহরণ সরূপ তুল ধরলাম। নিচে এই অনুষ্ঠানগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো যে কেন এগুলোকে বিদআতি অনুষ্ঠান বলা হয় এবং এর সাথে বিনোদনের সম্পর্ক কী:

১. ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবী (ﷺ) এর জন্ম উৎসব

ঈদে মীলাদুন্নবী হলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে আয়োজিত একটি উৎসব। এই দিনে সাধারণত আনন্দ মিছিল, ধর্মীয় সভা, মিলাদ মাহফিল, এবং বিভিন্ন ধরনের খানাপিনার আয়োজন করা হয়।

যে কারণে বিদআত বলা হয় : ইসলামের সহীহ বা বিশুদ্ধ সূত্র অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (ﷺ), সাহাবায়ে কিরাম (রা.) বা তাবেঈনদের সময়কালে তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক উৎসব বা দিবস উদযাপন করার প্রমাণ নেই। এটি পরবর্তীকালে দীনের অংশ হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছে। এই উদযাপনের সাথে যুক্ত আনন্দ-আয়োজনের প্রকৃতি অনেক সময়ই ইসলামী উৎসবের সীমানা অতিক্রম করে।

২. লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত উপলক্ষে বিভিন্ন আনন্দ আয়োজন

লাইলাতুল বরাত বলতে শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বোঝানো হয়। এই রাতে অনেকে হালুয়া-রুটি বিতরণ, মসজিদে বা বাড়িতে বিশেষ ধরনের জামাতবদ্ধ ইবাদত, কবর জিয়ারত এবং আলোকসজ্জার মতো আনন্দমূলক বা উৎসবের মতো আয়োজন করে থাকে।

যে কারণে বিদআত বলা হয় : যদিও শাবান মাসের গুরুত্ব সম্পর্কিত কিছু দুর্বল হাদিস রয়েছে, তবে এই রাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো উৎসব বা সম্মিলিত আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। সম্মিলিত ইবাদত, হালুয়া-রুটি বিতরণ এবং আলোকসজ্জার মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করাকে দীনের অংশ হিসেবে গণ্য করা বিদআত।

৩. শবে মিরাজ বা লাইলাতুল মিরাজ উদযাপন করা

শবে মিরাজ বা লাইলাতুল মিরাজ হলো সেই রাত, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঊর্ধ্বাকাশে ভ্রমণ করেছিলেন। রজব মাসের ২৭ তারিখে এই ঘটনাকে স্মরণ করে অনেক মুসলিম বিভিন্ন ধর্মীয় আলোচনা, ওয়াজ মাহফিল এবং ইবাদতের নামে বিশেষ আনন্দ-উৎসবের মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

যে কারণে বিদআত বলা হয় : রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মিরাজের ঘটনাটি সত্য হলেও, এই দিন বা রাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপন করা বা এই উপলক্ষে বিশেষ ইবাদতের বিধান শরিয়তে নেই। সাহাবায়ে কিরাম (রা.) বা প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা কখনোই এই দিবসটিকে উৎসবের মতো পালন করেননি। এটিকে উদযাপন করা এবং এর সাথে বিশেষ আনন্দ-আয়োজনের সম্পর্ক স্থাপন করা বিদআত হিসেবে বিবেচিত।

৪. আশুরা দিবস উদযাপন করা

আশুরা হলো মুহাররম মাসের দশম দিন। ইসলামে এই দিনে নফল রোজা রাখার বিধান রয়েছে। তবে অনেকে এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বিশেষ শোক মিছিল, মাতম, তা’জিয়া (প্রতীকী সমাধির মডেল) তৈরি, এবং বিভিন্ন লোকনৃত্য বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, বিশেষ করে কারবালার ঘটনার স্মরণে।

যে কারণে বিদআত বলা হয়: আশুরার দিনটি ইবাদতের দিন (রোজা রাখা সুন্নাত), উৎসব বা শোক প্রকাশের দিন নয়। এই দিনে শোকের নামে বাড়াবাড়ি করা, মাতম করা, বা বিশেষ আনন্দ-বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান করা –যা ইসলামের শিক্ষাবিরোধী এবং যা পূর্ববর্তী মুসলিমদের মধ্যে ছিল না, তা বিদআত। এর সাথে যুক্ত বিনোদন বা শোক-মিছিলগুলো বিদআতি কার্যক্রমের অংশ।

৫. বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল আয়োজন করা

মিলাদ মাহফিল হলো বিশেষ কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক দিবস (যেমন: কারো মৃত্যুবার্ষিকী, নতুন ঘর উদ্বোধন, বা অন্য কোনো বিশেষ উপলক্ষ) উপলক্ষে সম্মিলিতভাবে রাসূল (ﷺ)-এর প্রশংসা বা জন্ম সম্পর্কিত বর্ণনা পাঠ করা এবং শেষে সম্মিলিত মুনাজাত ও খানাপিনার আয়োজন করা।

যে কারণে বিদআত বলা হয়: মিলাদ মাহফিলের সম্মিলিত ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং এই উপলক্ষে আয়োজিত আচার-অনুষ্ঠানগুলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা সাহাবায়ে কিরামের (রা.) যুগে প্রচলিত ছিল না। রাসূল (ﷺ)-এর ওপর দরূদ পাঠ করা একটি উত্তম ইবাদত, কিন্তু এটিকে কোনো নির্দিষ্ট দিনে বা বিশেষ উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকতার সাথে সম্মিলিত ইবাদত বা বিনোদনের মতো করে পালন করাকে অনেক আলেম বিদআত বলে গণ্য করেন।

৬. মৃত্যুবার্ষিকী পালন

কারো মৃত্যুর দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর নির্দিষ্ট তারিখে কুলখানি, চল্লিশা, মিলাদ মাহফিল, বিশেষ দোয়া-দরুদ বা খানাপিনার আয়োজন করা। এই দিনে বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা বা কুরআন খতমের মতো অনুষ্ঠান করা হয়।

যে কারণে বিদআত বলা হয় : ইসলামে মৃত ব্যক্তির জন্য যেকোনো সময় দোয়া করা বৈধ, কিন্তু মৃত্যুর দিনটিকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা পালন করার কোনো বিধান কুরআন বা সহীহ সুন্নাহতে নেই।

৭. জন্মদিন পালন

নিজের, সন্তানের বা অন্য কারো জন্ম তারিখ উপলক্ষে মোমবাতি জ্বালানো, কেক কাটা, দাওয়াত দেওয়া, গান-বাজনা করা এবং উপহার বিনিময় করার মাধ্যমে আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা।

যে কারণে বিদআত বলা হয় : ইসলামে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা ছাড়া অন্য কোনো দিনকে উৎসব বা আনন্দের দিন হিসেবে পালনের অনুমতি নেই। জন্মদিন পালনের প্রথাটি মূলত অমুসলিম সংস্কৃতি থেকে আগত। এই উদযাপনকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উৎসাহিত করার কোনো প্রমাণ রাসূল (ﷺ) বা সাহাবায়ে কিরামের (রা.) জীবনীতে পাওয়া যায় না। এটি সময়ের অপচয়, অতিরিক্ত খরচ এবং অন্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের কারণ হওয়ায় এটিকে বিদআত হিসেবে গণ্য করা হয়।

৮. বিবাহবার্ষিকী পালন

বিবাহ বন্ধনের দিনটিকে স্মরণ করে প্রতি বছর স্বামী-স্ত্রী বা পরিবার-পরিজন মিলে বিশেষ ভোজের আয়োজন করা, উপহার আদান-প্রদান করা, বিশেষ পোশাকে সজ্জিত হওয়া এবং আনন্দ প্রকাশ করা।

যে কারণে বিদআত বলা হয় : জন্মদিনের মতোই, বিবাহবার্ষিকী পালনও ইসলামী শরিয়তের উৎসবের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। বিয়ে একটি সুন্নাহসম্মত চুক্তি এবং এর বরকত কামনা করা হয়, কিন্তু প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে উৎসবের নামে বাধ্যতামূলক বা আনুষ্ঠানিক কোনো আয়োজন করা ইসলামে অপ্রচলিত। এই ধরনের অনুষ্ঠান করা অমুসলিম সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত এবং এটি বিবাহকে স্মরণ করার জন্য দীনের অংশ হিসেবে একটি নতুন রীতি তৈরি করার শামিল, যা বিদআত। দাম্পত্য জীবনের সফলতা ও ভালোবাসার জন্য যেকোনো দিন দোয়া করা বা হালাল উপায়ে আনন্দ করা বৈধ, কিন্তু এটিকে বার্ষিক উৎসবের রূপ দেওয়া বৈধ নয়।

৯. খেলাধুলা যেখানে হালাল হারাম মিশ্রন ঘটে তা কুরআন তিলওয়াত দ্বারা শুরু করা

হালাল হারামি মিশ্রন ঘটে তা এমন কাজের শুরুতে কুরআন তিলাওয়াত দ্বারা শুরু করা বৈধ নয়, বরং এটি একটি গর্হিত কাজ। যে কোনো খেলাধুলা বা বিনোদনমূলক কার্যক্রমে যদি সুস্পষ্টভাবে হারাম বা শরিয়তবিরোধী কার্যকলাপের মিশ্রণ থাকে (জুয়া, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অশ্লীলতা, বা ফরজ ইবাদত বর্জন), তবে সেই কাজ বা অনুষ্ঠান শুরু করার আগে কুরআন তিলাওয়াত করা একটি মারাত্মক ভুল কাজ।

যে কারণে এটি অগ্রহণযোগ্য:

১. পবিত্রতা ও অপবিত্রতার মিশ্রণ: কুরআন তিলাওয়াত হলো এক মহৎ ইবাদত এবং আল্লাহর কালাম। এর উদ্দেশ্য হলো বরকত ও হেদায়েত লাভ করা। অন্যদিকে, হারাম কাজ হলো স্পষ্ট পাপ। হারাম কাজকে কুরআন তিলাওয়াত দ্বারা শুরু করা মূলত পবিত্রতার সাথে অপবিত্রতার মিশ্রণ ঘটানো। এটি কুরআনকে অসম্মান করার শামিল, কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহর কালামকে একটি হারাম কাজের সূচনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে কোনো হারাম কাজ বৈধ হয়ে যায় না। বরং এটি এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করে যে, “যেহেতু কুরআন পড়া হয়েছে, তাই এই হারাম কাজটিতে হয়তো আল্লাহর অনুমোদন আছে।” এই কাজটি পাপকে ধর্মীয় মোড়ক দিয়ে বৈধতা দেওয়ার একটি অপচেষ্টা মাত্র, যা মানুষকে দ্বীন সম্পর্কে বিভ্রান্ত করে।

হারাম কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে

ইসলামী বিনোদনের একটি আবশ্যিক শর্ত হলো, এটি কোনোভাবেই শরিয়ত কর্তৃক সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ কোনো কাজের সাথে যুক্ত থাকবে না।

হারাম কাজের কুফল সম্পর্কে আল্লাহ তায়াল বলন-

وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَوۡلَادَکُمۡ مِّنۡ اِمۡلَاقٍ ؕ نَحۡنُ نَرۡزُقُکُمۡ وَاِیَّاہُمۡ ۚ وَلَا تَقۡرَبُوا الۡفَوَاحِشَ مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَمَا بَطَنَ ۚ وَلَا تَقۡتُلُوا النَّفۡسَ الَّتِیۡ حَرَّمَ اللّٰہُ اِلَّا بِالۡحَقِّ ؕ ذٰلِکُمۡ وَصّٰکُمۡ بِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ

আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না- তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে। আর বৈধ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ যা হারাম করেছেন। এগুলো আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার। সূরা আন‘আম : ১৫১

আবার আল্লাহ বলেন—

وَمَنۡ یَّعۡصِ اللّٰہَ وَرَسُوۡلَہٗ وَیَتَعَدَّ حُدُوۡدَہٗ یُدۡخِلۡہُ نَارًا خَالِدًا فِیۡہَا ۪  وَلَہٗ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ 

আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক আযাব। সূরা নিসা : ১৪

আল-হারিস আল-আশআরী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

إِذَا ظَهَرَتِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ عَمِلُوا بِهَا، لَمْ يَبْقَ لَهُمْ مِنَ اللَّهِ إِلَّا الْمَوْتُ

যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা (হারাম কাজ) প্রকাশ পায় এবং তারা তা করতে থাকে, তখন আল্লাহ তাদের উপর মৃত্যুকে (ধ্বংস ও শাস্তিকে) অবধারিত করে দেন। মুসনাদ আহমদ: ২৫২৪১, সহিহুল জামে ৭৯৫৭ আলবানী হাদিসটি সহিহ বলেছেন।

যে সকল বিনোদনের সাথে হামার কাজ সম্পৃক্ত থাকে এমন কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো-

১. পরনিন্দা বা গীবতভিত্তিক আড্ডা ও হাসিতামাশা

বিনোদনমূলক আড্ডা বা গল্পের ছলে অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দোষ চর্চা করা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া বা গীবত করা। আড্ডা দেওয়া বা গল্প করা হালাল হলেও, তার সঙ্গে অন্যের সম্মানহানির মতো হারাম কাজ যুক্ত হওয়ায় পুরো বিনোদনটিই পাপের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

২. শরীরের ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে খেলাধুলা (যেমন: অতিমাত্রার মারামারি খেলা)

বিনোদনের নামে এমন খেলাধুলা করা যা নিজের শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে (যেমন: অতিরিক্ত সহিংস বা জীবন বিপন্নকারী স্টান্ট বা খেলা)। ইসলামে নিজের ক্ষতি করা (আত্ম-ক্ষতি) হারাম, তাই যে বিনোদনে এই হারাম কাজটি অনিবার্য, তা বৈধ নয়।

৩. মাদক বা নেশাজাতীয় পানীয়সহ পিকনিক বা পার্টি

প্রকৃতি উপভোগ করা বা সামাজিক পিকনিক করা হালাল, কিন্তু সেই আয়োজনে মাদকদ্রব্য, অ্যালকোহল বা নেশাজাতীয় পানীয়ের ব্যবস্থা করা, যা গ্রহণ করা স্পষ্ট হারাম। এখানে বিনোদনের সাথে হারাম বস্তু সেবনের কাজটি সরাসরি যুক্ত।

৪. গান-বাজনার আসরে অবৈধ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার

গজল, হামদ বা নাতে রাসূলের মতো ইসলামিক গান শোনা বা গাওয়া হালাল হতে পারে (যদি তার কথা অশ্লীল না হয়)। কিন্তু যদি সেই গানে শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ বাদ্যযন্ত্র (যেমন: গিটার, ড্রামস, বা বেশিরভাগ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র) ব্যবহার করা হয়, তবে তা হারাম কাজের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পুরো বিনোদনটি অবৈধ হয়ে যায়।

৫. অন্যের সম্পদ বা অধিকার লঙ্ঘন করে শিকার বা ভ্রমণ

আনন্দ বা বিনোদনের জন্য শিকার করা বা ভ্রমণ করা হালাল। কিন্তু যদি এই বিনোদনের মাধ্যমে অন্যের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা (Trespassing), শিকার নিষিদ্ধ প্রাণীর শিকার করা বা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়, তবে তা হারাম।

৫. হারাম বস্তু ব্যবহার করে খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতা

কোনো খেলার উপকরণ হিসেবে বা বিজয়ী পুরষ্কার হিসেবে মাদকদ্রব্য, অ্যালকোহল, বা হারাম সম্পদ ব্যবহার করা। যেমন: মাদক সেবনের প্রতিযোগিতা বা পুরস্কার হিসেবে মদের বোতল দেওয়া। এখানে প্রতিযোগিতা বা খেলাধুলা (যদি শারীরিক ক্ষতির কারণ না হয়) হালাল হলেও, হারাম বস্তুর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা এটিকে হারাম করে তোলে।

৬. জুয়া বা বাজিভিত্তিক খেলাধুলা

খেলাধুলার মতো বৈধ বিনোদনকে অবৈধ বা হারাম উপায়ে (জুয়া বা বাজি ধরে) উপভোগ করা। এখানে খেলা দেখা বা খেলায় অংশ নেওয়াটা বাহ্যত হালাল হলেও, তার সঙ্গে জুয়া খেলার মতো স্পষ্ট হারাম কাজ যুক্ত হওয়ায় পুরো বিনোদনটিই হারাম হয়ে যায়।

৭. অশ্লীল মিউজিক কনসার্ট বা নাইট ক্লাবে যাওয়া

এখানে মূল বিনোদন হলো গান শোনা, নাচ দেখা বা সামাজিকীকরণ। কিন্তু এই পরিবেশগুলোতে সাধারণত অবাধ নারী-পুরুষের মেলামেশা, মাদকদ্রব্য ও অ্যালকোহলের ব্যবহার, এবং অশ্লীল পোশাক ও নৃত্য থাকে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে কঠোরভাবে হারাম। এই বিনোদন উপভোগের জন্য হারাম কাজগুলোও করা লাগে বা দেখা লাগে।

৮. অশ্লীল বা নগ্নতাযুক্ত চলচ্চিত্র বা সিরিজ দেখা

চলচ্চিত্র দেখা বা নাটক উপভোগ করা এক প্রকার বিনোদন। কিন্তু যদি সেই চলচ্চিত্র বা সিরিজের মূল উপাদানে নগ্নতা, যৌনতা, বা অশ্লীল দৃশ্যের মতো হারাম উপাদান থাকে, তবে সেই বিনোদনটিই হারাম। এই ক্ষেত্রে, বিনোদন পাওয়ার জন্য হারাম দৃশ্যগুলো দেখতে হয়।

৯. নারী-পুরুষের মিশ্রণে অনৈসলামিক ফ্যাশন শো বা ডিস্কো পার্টি

এটিও এক প্রকার বিনোদন, যেখানে পোশাক ও ফ্যাশন প্রদর্শন বা নাচ-গান মুখ্য। কিন্তু এখানে পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে নারী-পুরুষের অবাধ ও ঘনিষ্ঠ মেলামেশা (ইখতিলাত) ঘটে এবং উত্তেজক নাচ-গান ও শালীনতা বিবর্জিত পোশাক প্রদর্শন করা হয়। এই মেলামেশা এবং অশ্লীলতা বিনোদনের একটি আবশ্যিক অংশ হওয়ায় পুরো বিনোদনটি হারাম।

১০. হারাম বস্তু ব্যবহার করে খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতা

কোনো খেলার উপকরণ হিসেবে বা বিজয়ী পুরষ্কার হিসেবে মাদকদ্রব্য, অ্যালকোহল, বা হারাম সম্পদ ব্যবহার করা। যেমন: মাদক সেবনের প্রতিযোগিতা বা পুরস্কার হিসেবে মদের বোতল দেওয়া। এখানে প্রতিযোগিতা বা খেলাধুলা (যদি শারীরিক ক্ষতির কারণ না হয়) হালাল হলেও, হারাম বস্তুর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা এটিকে হারাম করে তোলে।

নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা থাকবে না

ইসলামী নীতিমালায় নারী-পুরুষের মেলামেশার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে, যা বিনোদনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। বিনোদনমূলক পরিবেশে নারী-পুরুষের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা বা ইখতিলাত সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়কে শালীনতা বজায় রাখতে এবং ফিতনা বা চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দেয়। তাই, খেলাধুলা, সামাজিক অনুষ্ঠান, ভ্রমণ বা অন্য যেকোনো বিনোদনে এমন পরিবেশ তৈরি করা যাবে না যেখানে গায়রে মাহরাম (যাদের সাথে শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহ বন্ধন বৈধ) নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয় বা চারিত্রিক দুর্বলতা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়। বিনোদনের স্থান ও সময় এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যাতে নারীরা তাদের শালীনতা ও নিরাপত্তা বজায় রেখে উপভোগ করতে পারে এবং পুরুষরাও তাদের দৃষ্টি ও আচরণে সংযত থাকতে পারে। যদি কোনো পারিবারিক বা দলীয় বিনোদনে নারী-পুরুষের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়, তবে তাদের মধ্যে অবশ্যই শরিয়তের পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা পরিহার করতে হবে। এই নীতিটি মুসলিম সমাজে নৈতিক পবিত্রতা ও পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে এবং ফিতনার সকল পথ রুদ্ধ করে।

পর্দা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা, যা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশায় লংঘিত হয়। বিশেষত যখন কোন বিনোদন বা খেলাধুলার অনুষ্ঠানে একত্র অংশ গ্রহন করে। কুরআন ও হাদিসে পর্দার গুরুত্ব বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে, যা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হারাম করে দিয়েছে। কেনান পর্দা ফরজ বিধান অবহেরা করা যাবে না। এ বিধান সুন্দর সমাজ গড়ার চমৎকার ব্যবস্থাপনা। বিধান যে বিনোদনে রক্ষা করা সম্ভব নয়, সে বিনোদন করা জায়েয নাই। এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে বলেন-

وَ اِذَا سَاَلۡتُمُوۡہُنَّ مَتَاعًا فَسۡـَٔلُوۡہُنَّ مِنۡ وَّرَآءِ  حِجَابٍ ؕ ذٰلِکُمۡ  اَطۡہَرُ  لِقُلُوۡبِکُمۡ  وَ قُلُوۡبِہِنّ

 তোমরা তাদের (নারীদের) নিকট কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটা তোমাদের এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। সুরা আহজাব : ৫৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ  زِیۡنَتَہُنَّ  اِلَّا مَا ظَہَرَ  مِنۡہَا وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ

 হে নবি! আপনি ঈমানদার নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান থাকে তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তাদের গ্রীবা ও গলদেশ চাদর দ্বারা ঢেকে রাখে। সুর নূর : ৩১

আল্লাহ তাআলা বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযম করে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কাজ সম্পর্কে অবগত।” সুরা নুর : ৩০

এই আয়াতদ্বয়ের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, দৃষ্টি সংযম ও শালীন পোশাক হলো পর্দার প্রথম ধাপ।

মহান আল্লাহ বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ  قُلۡ  لِّاَزۡوَاجِکَ  وَ  بَنٰتِکَ وَ نِسَآءِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ یُدۡنِیۡنَ عَلَیۡہِنَّ مِنۡ جَلَابِیۡبِہِنَّ ؕ ذٰلِکَ اَدۡنٰۤی اَنۡ یُّعۡرَفۡنَ فَلَا  یُؤۡذَیۡنَ

 হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বলে দিন যে, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। সুরা আহজাব : ৫৯

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি ধর্মেরই একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। আর ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো ’লজ্জাশীলতা’। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৮১

অতএব, যে বিনোদনে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার কারনে পর্দা বিঘ্নিত হয়, সে বিনোদন হারাম।

যেসব বিনোদনগুলোতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার কারণে পর্দার বিধান বিঘ্নিত হয় তার কিছু উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো-

১. অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মের আড্ডা

বিনোদনের উদ্দেশ্যে যখন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেমন বিভিন্ন চ্যাট রুম, ডেটিং অ্যাপ, বা গেমিং ফোরামে গায়রে মাহরাম (বিবাহ বৈধ এমন) নারী-পুরুষ ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা অডিও-ভিডিও কলে আড্ডা দেয়। যদিও এটি শারীরিক মেলামেশা নয়, কিন্তু আবেগিক ও মৌখিক অবাধ মেলামেশা ফিতনা ও পর্দার মূলনীতি (যা দৃষ্টি ও কথার শালীনতা রক্ষা করে) লঙ্ঘন করে।

২. কর্পোরেট পার্টি বা ডিনার যেখানে মিশ্র ড্যান্সিং হয়

কর্মক্ষেত্র বা সামাজিকতার নাম করে আয়োজিত পার্টি বা ডিনারে যখন নারী-পুরুষের একটি মিশ্র দল একসাথে হয় এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে নাচে। এ ধরনের বিনোদনে সাধারণত অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, শারীরিক স্পর্শ ও উন্মুক্ততা থাকে, যা পর্দার বিধানের পরিপন্থী।

৩. ভাড়া করা নির্জন কটেজ বা ভিলায় মিশ্র গ্রুপের ছুটি কাটানো

বিনোদনের উদ্দেশ্যে যখন একাধিক অবিবাহিত বা গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষ একসাথে কোনো নির্জন কটেজ বা ভিলা ভাড়া করে রাত্রিযাপন বা একাধিক দিন ছুটি কাটায়। এই ধরনের পরিবেশে পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে এবং তা ফিতনা সৃষ্টির একটি বড় মাধ্যম।

৪. মিশ্র পরিবেশে ছবি তোলা বা ফটোশুট

বিনোদনমূলক উদ্দেশ্যে যখন গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষ একসাথে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় বা ঘনিষ্ঠ হয়ে ছবি তোলে বা ফটোশুট করে। এই ধরনের কার্যকলাপে প্রায়শই অশালীন পোশাক এবং অপ্রয়োজনীয় শারীরিক নৈকট্য প্রদর্শন করা হয়, যা পর্দার নীতিকে সরাসরি লঙ্ঘন করে।

৫. অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত কোচিং বা টিউটরিং ক্লাস যেখানে আড্ডা মুখ্য

পড়াশোনার বাইরে যখন কোচিং সেন্টার বা টিউটরিং-এর ক্লাসগুলোতে পড়াশোনার চেয়ে আড্ডা, গল্প বা অপ্রয়োজনীয় হাসিতামাশা প্রাধান্য পায় এবং নারী-পুরুষ একে অপরের সাথে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মিশে যায়। যদিও উদ্দেশ্য শিক্ষা, কিন্তু পরিবেশটি বিনোদনে রূপান্তরিত হওয়ায় পর্দার লঙ্ঘন ঘটে।

৬. মিশ্র পরিবেশে উন্মুক্ত সুইমিং বা ওয়াটার পার্ক

সুইমিং পুল বা ওয়াটার পার্কে যখন নারী-পুরুষ একসাথে সাঁতার কাটে এবং খেলাধুলা করে, তখন পর্দার বিধান (যা পোশাকের শালীনতা ও গায়রে মাহরামের সাথে দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেয়) সম্পূর্ণরূপে লঙ্ঘিত হয়। এখানে বিনোদন উপভোগ করতে গিয়ে পর্দার অপরিহার্যতা নষ্ট হয়।

৭. নাইট ক্লাব বা ডিস্কো পার্টির নাচ-গান

এই ধরনের পার্টিতে নারী-পুরুষের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বা শালীনতা বজায় রাখা হয় না। উচ্চ শব্দে গান ও উদ্দাম নাচের পরিবেশে তারা অবাধে মেলামেশা করে এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও তৈরি হয়, যা ইসলামী পর্দার নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

৮. মিশ্র পরিবেশে আয়োজিত মিউজিক কনসার্ট

এমন কনসার্ট যেখানে হাজার হাজার নারী-পুরুষ একসাথে দাঁড়িয়ে বা বসে গান উপভোগ করে। ভিড়ের কারণে নারী-পুরুষের মধ্যে অবাঞ্ছিত শারীরিক স্পর্শ হয় এবং উচ্চ স্বরে গান-বাজনার মাধ্যমে ফিতনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এখানে অবাধ মেলামেশা বিনোদনের মূল শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

৯. মিশ্র পরিবেশে ভ্রমণ বা পিকনিকে দলগত খেলাধুলা

ভ্রমণ বা পিকনিকে যখন নারী-পুরুষের একটি মিশ্র দল একসাথে হয় এবং শারীরিক স্পর্শযুক্ত বা অশালীন পোশাক পরিধান করে দলগত খেলাধুলা করে, তখন পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয়। এখানে বিনোদন বা খেলার ছলে শালীনতা ও দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

১০. অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকে এমন সিনেমা বা থিয়েটার হল     

সিনেমা বা থিয়েটার হলের ভেতরে যখন নারী-পুরুষ কোনো ধরনের পর্দা বা দূরত্ব বজায় না রেখে পাশাপাশি বা কাছাকাছি বসে দীর্ঘ সময় কাটায় এবং একইসাথে বিনোদনমূলক দৃশ্য উপভোগ করে। অন্ধকার বা আধা-অন্ধকার পরিবেশ অনৈসলামিক মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠতার সুযোগ তৈরি করে, যা পর্দার উদ্দেশ্যের বিপরীত।

অশ্লীলতা, নগ্নতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের উপদান থাকবে না

ইসলামী বিনোদনের একটি মূল শর্ত হলো, এটি সকল প্রকার অশ্লীলতা, নগ্নতা এবং নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টিকারী উপাদান থেকে মুক্ত থাকবে। অশ্লীলতা বলতে এমন সকল কাজ, কথা, ছবি বা দৃশ্যকে বোঝায় যা শালীনতার সীমা অতিক্রম করে এবং সমাজে কামুকতা বা অনৈতিকতার বিস্তার ঘটায়। পোশাকের শালীনতা বজায় রাখা, অশ্লীল ভাষা পরিহার করা এবং চারিত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো দৃশ্য বা পরিবেশ তৈরি না করা বিনোদনের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الۡفَوَاحِشَ مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَمَا بَطَنَ وَالۡاِثۡمَ وَالۡبَغۡیَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَاَنۡ تُشۡرِکُوۡا بِاللّٰہِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِہٖ سُلۡطٰنًا وَّاَنۡ تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ

বল,‘আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ- যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উাপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না’। সুরা আরআফ : ৩৩

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সুরা নুর : ১৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সুরা ইসরা : ৩২

অশ্লীলতা, নগ্নতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের উপাদান বা সহায়ক এমন কিছু বিনোদনের উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যক্তিগত নগ্নতা বা অশালীন ছবি/ভিডিও পোস্ট করা

বিনোদনের জন্য বা লাইক পাওয়ার উদ্দেশ্যে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে শরিয়তবিরোধী পোশাক পরা বা অর্ধনগ্ন ছবি/ভিডিও পোস্ট করা। এটি নগ্নতা প্রচার করে, শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে এবং যুব সমাজের মধ্যে অশ্লীলতাকে জনপ্রিয় করে তোলে।

২. থিয়েটার বা মঞ্চ নাটকে অশালীন

এমন মঞ্চ নাটক বা থিয়েটার যেখানে খোলামেলা দৃশ্য, বিতর্কিত যৌন কার্যকলাপের ইঙ্গিত বা সমাজের প্রতিষ্ঠিত নৈতিক মূল্যবোধের বিরোধী বার্তা দেওয়া হয়। এটি বিনোদনের ছলে দর্শকদের মনে অনৈকিতার বীজ বপন করে।

৩. বিকৃত বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ নৃত্য পরিবেশনা

এমন নৃত্য পরিবেশনা (যেমন: কিছু আধুনিক সঙ্গীতানুষ্ঠানে) যেখানে উত্তেজক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি বা অশালীন পোশাক ব্যবহার করা হয়। এটি দর্শকদের মধ্যে কামোত্তেজনা বৃদ্ধি করে এবং নৈতিক বিচ্যুতির জন্ম দেয়।

৪. প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি হওয়া কমিক বা কার্টুন

কিছু কমিক বই বা কার্টুন সিরিজ রয়েছে যা বয়স্কদের জন্য তৈরি এবং সেগুলোতে নগ্নতা, অশালীন সংলাপ বা যৌন সহিংসতার মতো বিষয়গুলো হালকাভাবে উপস্থাপন করা হয়। বিনোদনের মাধ্যমে এটি বিকৃত মানসিকতা তৈরি করতে পারে।

৫. ভার্চুয়াল ডেটিং গেম বা সিমুলেশন

যে ভিডিও গেম বা সিমুলেশনগুলোতে মূল উদ্দেশ্য হলো ভার্চুয়াল সঙ্গী খোঁজা, অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করা বা ভার্চুয়াল যৌন কার্যকলাপের অনুকরণ করা। এটি বাস্তব জীবনে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে এবং নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল করে।

৬. পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট ও প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র

এই ধরনের মিডিয়া সরাসরি নগ্নতা ও যৌনতার স্পষ্ট প্রদর্শন করে। এর প্রধান উদ্দেশ্যই হলো কামুকতা জাগানো, যা নৈতিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে।

৭. অশ্লীল ভাষা ও দ্ব্যর্থবোধক কৌতুক সম্বলিত স্ট্যান্ড-আপ কমেডি

এমন কমেডি শো যেখানে অশালীন ভাষা, নোংরা রসিকতা এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ দ্ব্যর্থবোধক কৌতুক ব্যবহার করা হয়। এটি বিনোদনের নামে মানুষের মনে লজ্জা ও শালীনতার বোধকে দুর্বল করে এবং সমাজে কুরুচির বিস্তার ঘটায়।

৮. অশ্লীল মিউজিক ভিডিও ও গানের লিরিক্স

যে সকল মিউজিক ভিডিওতে অশালীন পোশাক, নগ্ন অঙ্গভঙ্গি বা উত্তেজক নৃত্য দেখানো হয়, অথবা যে গানের কথায় যৌনতা বা অবৈধ সম্পর্ককে মহিমান্বিত করা হয়। এটি দর্শকদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয় এবং কামোত্তেজকতার জন্ম দেয়।

৯. ফ্যাশন শো যেখানে স্বল্প বা উস্কানিমূলক পোশাক প্রদর্শন করা হয়

ফ্যাশন বা মডেলিং ইভেন্ট, যেখানে মডেলরা জনসমক্ষে অত্যন্ত স্বল্প, স্বচ্ছ বা উত্তেজক পোশাক পরিধান করে। এটি সমাজে নগ্নতাকে স্বাভাবিকীকরণে সাহায্য করে এবং দৃষ্টির পবিত্রতা নষ্ট করে।

১০. ভিডিও গেম যেখানে যৌনতা বা বিকৃত সম্পর্ককে স্বাভাবিক করা হয়

কিছু ভিডিও গেম আছে যেখানে যৌন কার্যকলাপ, অবৈধ সম্পর্ক বা নৈতিকভাবে বিকৃত আচরণকে খেলার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বিনোদনের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো শিশুদের ও তরুণদের মনে অনৈতিকতাকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে।

ইসলামে বিনোদনের মূলনীতি : দ্বিতীয় কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিনোদন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করবে না

বিনোদন মানব জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অংশ হলেও, এটি কখনোই একজন মুসলিমকে তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য, আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে বিচ্যুত বা গাফেল করবে না। বিনোদনের সময় এমন হওয়া উচিত নয় যে এর কারণে ফরজ ইবাদত, যেমন নামাজ, সময়মতো আদায় করা সম্ভব হয় না, বা আল্লাহর প্রতি মনোযোগ কমে যায়। একজন মুসলিমকে সর্বদা সচেতন থাকতে হবে যে বিনোদন যেন মূল দায়িত্ব ও কর্তব্যকে ভুলিয়ে না দেয়।

যদি কোনো খেলা বা অনুষ্ঠানে মত্ত থাকার কারণে ওয়াক্তের নামাজ ছুটে যায়, তবে সেই বিনোদন স্পষ্টতই হারাম হয়ে যায়। সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং ইবাদতের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা একজন মুসলিমের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিনোদন বরং এমনভাবে গ্রহণ করা উচিত যাতে মন ও শরীর বিশ্রাম নিয়ে পুনরায় আল্লাহর ইবাদত এবং দুনিয়ার কল্যাণকর কাজে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারে। এই নীতিটি বিনোদনকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রাখে, এটিকে জীবনের মূল লক্ষ্য না বানিয়ে একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা মুসলিমদেরকে তাদের আধ্যাত্মিক যাত্রায় স্থির থাকতে সাহায্য করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُلۡہِکُمۡ اَمۡوَالُکُمۡ وَلَاۤ اَوۡلَادُکُمۡ عَنۡ ذِکۡرِ اللّٰہِ ۚ وَمَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ

হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। সুনা মুনাফিকুন : ৯

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاصۡبِرۡ نَفۡسَکَ مَعَ الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ رَبَّہُمۡ بِالۡغَدٰوۃِ وَالۡعَشِیِّ یُرِیۡدُوۡنَ وَجۡہَہٗ وَلَا تَعۡدُ عَیۡنٰکَ عَنۡہُمۡ ۚ تُرِیۡدُ زِیۡنَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَلَا تُطِعۡ مَنۡ اَغۡفَلۡنَا قَلۡبَہٗ عَنۡ ذِکۡرِنَا وَاتَّبَعَ ہَوٰىہُ وَکَانَ اَمۡرُہٗ فُرُطًا

আর তুমি নিজকে ধৈর্যশীল রাখ তাদের সাথে, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশে, এবং দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তোমার দু’চোখ যেন তাদের থেকে ঘুরে না যায়। আর ওই ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমি আমার যিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে এবং যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে। সূরা কাহফ : ২৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اُتۡلُ مَاۤ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ مِنَ الۡکِتٰبِ وَاَقِمِ الصَّلٰوۃَ ؕ اِنَّ الصَّلٰوۃَ تَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَالۡمُنۡکَرِ ؕ وَلَذِکۡرُ اللّٰہِ اَکۡبَرُ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ مَا تَصۡنَعُوۡنَ

তোমার প্রতি যে কিতাব ওহী করা হয়েছে, তা থেকে তিলাওয়াত কর এবং সালাত কায়েম কর। নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন যা তোমরা কর। সূরা আনবুত : ৪৫

উপরে উল্লেখিত তিনটি কুরআনের আয়াত গভীর তাৎপর্য বহন করে, যা আমাদের জীবনের বিনোদন এবং পার্থিব আসক্তিকে আল্লাহর স্মরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার গুরুত্ব শিক্ষা দেয়। এই আয়াতগুলোর মূল বার্তা হলো, একজন বিশ্বাসীর জীবনে কোনো প্রকার সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, বা দুনিয়ার আকর্ষণীয় জীবনশৈলী যেন তাকে আল্লাহ তাআলার স্মরণ (যিকির) ও ইবাদত থেকে উদাসীন না করে। যদি কোনো কার্যকলাপ, তা বিনোদনই হোক না কেন, মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ করে দেয় এবং তাকে প্রবৃত্তির অনুসারী করে তোলে, তবে তা চরম ক্ষতির কারণ হবে।

এই আয়াতগুলোর মুল বিষয় হলো— বিনোদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষিদ্ধ নয়, তবে এর গুণগত মান ও প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। যেকোনো বিনোদন যদি আল্লাহর স্মরণে সহায়ক হয়, শরীর ও মনকে ইবাদতের জন্য চাঙা করে তোলে, এবং শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু যদি তা ব্যক্তিকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে, সালাত ও ইবাদতে অমনোযোগী করে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং পরকালের লক্ষ্য ভুলিয়ে দেয়, তবে সেই বিনোদন অবশ্যই হারাম ও মারাত্মক ক্ষতির কারণ। একজন মুমিনের জীবনে বিনোদনের উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে শক্তি অর্জন, আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হওয়া নয়।

আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে তার প্রতিপালকের যিকর করে, আর যে যিকর করে না, তাদের উপমা হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তি। সহিহ বুখারি : ৬৪০৭, সহিহ মুসলিম : ৭৭৯

বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, তার দাদা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছিঃ সেই লোক ধ্বংস হোক যে মানুষদের হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে। সে নিপাত যাক, সে নিপাত যাক। সুনানে তিরমিজি : ২৩১৫, মিশকাত : ৪৮৩৮, সহিহুল জামে : ৭৭৭৩

নিচে বিনোদন কিভাবে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে তার কিছু বাস্তব উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. অতিরিক্ত মোবাইল গেমিং বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার:

একজন ব্যক্তি ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইল গেম খেলায় বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্রোল করায় এতটাই মগ্ন থাকেন যে, আযানের ধ্বনি শোনা সত্ত্বেও তিনি তা উপেক্ষা করেন অথবা নামাজের নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে তা আদায় করেন। এমনকি গভীর রাতে খেলার কারণে ফজরের নামাজও কাজা হয়ে যায়। ফলে আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক স্থিরতা ও সময় থাকে না।

২. সময়ক্ষেপণকারী টেলিভিশন সিরিজ/চলচ্চিত্র দেখা:

কেউ কেউ একটি ওয়েব সিরিজ বা টেলিভিশন প্রোগ্রামের নতুন পর্ব দেখার জন্য রাত জাগেন, যার ফলে রাতের শেষ ভাগে তাহাজ্জুদ তো দূরের কথা, সময়মতো ঘুমাতে না পারার কারণে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয় এবং ফজরের নামাজ ছুটে যায়। অনেক সময় এসব কনটেন্টে অশ্লীলতাও থাকে। এটি কেবল শারীরিক ক্লান্তিই আনে না, বরং এতে থাকা অনৈসলামিক উপাদানগুলো অজান্তেই নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় এবং আল্লাহর অপছন্দনীয় বিষয়ে মনকে ব্যস্ত রাখে।

৩. গান-বাজনার আসক্তি যা ইবাদতের মনযোগ নষ্ট করে:

একজন ব্যক্তি উচ্চস্বরে এমন গান শোনেন বা নিজে গান নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে, তিনি কুরআন তিলাওয়াতের জন্য বা আল্লাহর যিকিরের জন্য কোনো ধরনের মানসিক আগ্রহ পান না। নামাজের সময়ও তার মনে গানের সুর বা কথাগুলো ঘুরপাক খেতে থাকে। এটি অন্তরকে নরম করার পরিবর্তে পার্থিব মোহ ও আকাঙ্ক্ষার দিকে ঠেলে দেয়, যা আল্লাহর স্মরণের সাথে সাংঘর্ষিক।

৪. অতিরিক্ত অপচয়মূলক বিনোদন ও ঘোরাফেরা:

 সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র ‘স্ট্যাটাস’ বা দুনিয়াবি আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যে প্রতি সপ্তাহে ব্যয়বহুল পার্টি বা ট্যুরে যাওয়া, যেখানে সময় ও অর্থের বড় অংশ অপচয় হয় এবং নৈতিক মূল্যবোধের তোয়াক্কা করা হয় না। এর ফলে সাদাকা বা গরিবের হক আদায়ে অনীহা সৃষ্টি হয়।

এটি মানুষকে দুনিয়ার চাকচিক্য ও ভোগের প্রতি অন্ধ করে তোলে। অর্থের অপচয় একদিকে যেমন আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞতা, তেমনি অন্যদিকে এর কারণে পরকালের ভাবনা থেকে মন দূরে সরে যায়। এই জীবনধারা মানুষকে বিনয়ী হওয়ার বদলে অহংকারী করে তোলে।

৫. অবৈধ বা শরিয়তবিরোধী খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতা:

জুয়া বা বাজি-নির্ভর খেলাধুলা অথবা এমন কোনো প্রতিযোগিতা যেখানে অশ্লীলতা বা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয়, তাতে অংশগ্রহণ করা বা তা দেখতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা। গাফেল করার প্রক্রিয়া: এসব বিনোদন সরাসরি হারাম কাজের সাথে জড়িত। হারাম কাজে লিপ্ত থাকা সরাসরি আল্লাহর অবাধ্যতা এবং তা অন্তর থেকে ঈমানের নূর ও আল্লাহর ভয় দূর করে দেয়, যা যিকির ও ইবাদতের জন্য অপরিহার্য।

৬. দৈনন্দিন জীবনের ইবাদতকে গুরুত্ব না দিয়ে খেলাধুলার প্রতি অন্ধ অনুরাগ:

ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মতো জনপ্রিয় ইভেন্টগুলো দেখার জন্য একজন ব্যক্তি এমনভাবে সময় নির্ধারণ করেন যে জুমার নামাজ বা আসরের নামাজের জামাত তার কাছে গৌণ হয়ে যায়। তিনি খেলার একটি মুহূর্তও মিস করতে চান না, কিন্তু নামাজের ক্ষেত্রে সামান্য অলসতা দেখান।

এই ধরনের অন্ধ অনুরাগ বা ফ্যানাটিকজম পার্থিব বিষয়কে ইবাদতের উপর অগ্রাধিকার দিতে শেখায়। খেলাধুলার ফল নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা বা উত্তেজনা আল্লাহর উপর নির্ভরতা এবং তাকওয়া (আল্লাহভীতি) থেকে মনকে সরিয়ে দেয়।

৭. অতিরিক্ত আড্ডা ও গাল-গল্পে সময় নষ্ট করা:

একদল বন্ধু বা সহকর্মী রাতের খাবারের পর অপ্রয়োজনীয়, উদ্দেশ্যহীন এবং কখনো কখনো পরনিন্দা বা অন্যের দোষচর্চামূলক আড্ডায় এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন যে, এশার নামাজ বা কিয়ামুল লাইলের জন্য কোনো উৎসাহ বা সুযোগই অবশিষ্ট থাকে না।

অর্থহীন কথাবার্তা অন্তরকে কঠিন করে তোলে এবং মিথ্যা, গীবত (পরনিন্দা) ও অপপ্রচারের মতো পাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই অপচয়কৃত সময় কুরআন তিলাওয়াত, যিকির বা দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের মতো ফলপ্রসূ কাজ থেকে ব্যক্তিকে বঞ্চিত করে।

৮. শখের কাজে অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া

কোনো ব্যক্তি দামি ক্যামেরা বা অন্যান্য সরঞ্জাম কিনে শুধু শখের বশে ছবি তোলা বা ভিডিওগ্রাফিতে এত বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করেন যে, তার যাকাত দেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা দিতে গড়িমসি করেন অথবা নিজের মৌলিক ইবাদতের সময়কেও এই শখের জন্য উৎসর্গ করেন।

শখ যখন জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, তখন তা পার্থিব আসক্তিতে রূপ নেয়। এর ফলে ব্যক্তি তার সম্পদ ও সময়ের সঠিক ব্যবহার নিয়ে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কথা ভুলে যায়। বিনোদন যখন উদ্দেশ্যহীন অপচয়ের কারণ হয়, তখন তা আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

৯. ঘুম ও বিশ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের সময় বিনোদনে

একজন ছাত্র বা চাকরিজীবী রাতে সিনেমা দেখা বা অনলাইনে চ্যাট করার জন্য তার বিশ্রামের সময় কাটান। ফলে তিনি সকালে ক্লান্ত থাকেন, যার কারণে কর্মক্ষেত্রে বা পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারেন না এবং দিনের ফরজ ইবাদতগুলোও মনোযোগের সাথে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন।

অতিরিক্ত বিনোদন ব্যক্তির স্বাস্থ্য এবং দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে। আল্লাহ প্রদত্ত আমানত (শারীরিক স্বাস্থ্য এবং দায়িত্ব) অবহেলা করা এক প্রকার গাফেলতি। শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি ইবাদতে খুশু-খুযু (একাগ্রতা) আনয়নে বাধা দেয়, ফলে ইবাদত নিছক অভ্যাসে পরিণত হয়, আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে চলে যাওয়া সহজ হয়।

প্রয়োজন পরিমাণ বিনোদনের প্রতি লক্ষ রাখা

ইসলামে বিনোদনের ক্ষেত্রে ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করা জরুরি। বিনোদনকে জীবনের মূল লক্ষ্য না বানিয়ে, এটি কেবল মন ও দেহের ক্লান্তি দূর করার জন্য প্রয়োজনমতো গ্রহণ করা উচিত। এই নীতি অনুযায়ী, বিনোদনে যেন অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বা সময়-শক্তির অপচয় না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজন পরিমাণ বিনোদন বলতে বোঝায়-

যখন মন বা শরীর সত্যিই ক্লান্ত হয় এবং নতুন উদ্যম নিয়ে কাজ শুরু করার জন্য বিশ্রামের দরকার হয়, ঠিক সেই পরিমাণ সময় বিনোদন করা। সারাদিন বা রাতের বড় একটি অংশ কেবল চিত্তবিনোদনে ব্যয় করা, যা জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যেমন পড়াশোনা, কাজ, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং ইবাদত থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়, তা কাম্য নয়। একজন মুসলিমের সময় অত্যন্ত মূল্যবান, এবং প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। তাই, সময়ের এই মূল্যবান সম্পদকে কেবল অপ্রয়োজনীয় বিনোদনে নষ্ট করা উচিত নয়। বরং, বিনোদন এমনভাবে সীমিত রাখতে হবে যাতে এটি পুনরায় উদ্যম ফিরিয়ে আনার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, কিন্তু অভ্যাসে পরিণত হয়ে জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি না হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ ۙ

আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ। সূরা মুমিনূন :৩

 প্রকৃত মুমিন কখনো অপ্রয়োজনীয় বিনোদন বা সময় নষ্টকারী কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে না; বরং জীবনের প্রতিটি কাজ উদ্দেশ্যপূর্ণ হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَنۡفَقُوۡا لَمۡ یُسۡرِفُوۡا وَلَمۡ یَقۡتُرُوۡا وَکَانَ بَیۡنَ ذٰلِکَ قَوَامًا

আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। সূরা ফুরকান : ৬৭

এখানে ব্যয়ের সংযমের কথা বলা হলেও, ইসলামী ব্যাখ্যাকারগণ বলেছেন—এই নীতি সমস্ত কাজে প্রযোজ্য, যেমন বিনোদন, বিশ্রাম, আহার ও অন্যান্য পার্থিব ভোগেও।

সময়ের অপচয় ও দায়িত্ব অবহেলার কারণ হবে না

ইসলামী বিনোদন অবশ্যই সময়ের অপচয় এবং ব্যক্তিগত বা সামাজিক দায়িত্ব অবহেলার কারণ হবে না। সময় ইসলামের দৃষ্টিতে একটি মূল্যবান আমানত। একজন মুসলিমকে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং পেশাগত সকল দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হয়। বিনোদনের নামে যদি কেউ তার পেশাগত কাজ ফেলে রাখে, পরিবারের সদস্যদের হক আদায় না করে, বা সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে সেই বিনোদন অবৈধ ও নিন্দনীয়।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও গেম খেলা বা অনর্থক আড্ডায় মত্ত থাকা, যার ফলে পড়াশোনা বা উপার্জনের সময় নষ্ট হয়, তা সময়ের অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। বিনোদনের সময় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যেন তা কাজের সময়ের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। একজন মুসলিম সর্বদা মনে রাখবে যে, আল্লাহ তাকে এই দুনিয়ায় একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে পাঠিয়েছেন এবং প্রতিটি কাজের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এই নীতিটি বিনোদনকে একটি সীমারেখার মধ্যে রাখে, যাতে তা দায়িত্বশীলতা ও উৎপাদনশীলতার পথে বাধা না হয়ে, বরং কর্ম উদ্দীপনা বাড়ানোর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَاِذَا  فَرَغْتَ فَانْصَبْ ۙ﴿۷﴾ وَ اِلٰی  رَبِّكَ فَارْغَبْ ﴿۸﴾অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ট হও। সূরা ইনশিরাহ : ৭–৮

আয়াতটি নির্দেশ করে, এক কাজ শেষ হলে অলসতা বা অনর্থক বিনোদনে না ডুবে, বরং নতুন কল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগ করা উচিত।

আবূ বারযা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন বান্দার পদদ্বয় (কিয়ামত দিবসে) এতটুকুও সরবে না, তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে? কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কি কি কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৭

প্রত্যেক ব্যক্তি তার সময় কীভাবে ব্যয় করেছে, তার জবাব দিতে হবে। তাই বিনোদনের নামে দায়িত্ব অবহেলা করা কিয়ামতের দিনে জবাবদিহির কারণ হবে।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন দু’টি নিয়ামত আছে, যে দু’টোতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। তা হচ্ছে, সুস্থতা আর অবসর। সহিহ বুখারি : ৬৪১২

অবসর বা বিনোদনের সময়টাও যেন অপচয় না হয়, বরং কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা উচিত। সময় আল্লাহর এক মূল্যবান আমানত। অযথা বিনোদন বা অপচয় সেই আমানতের প্রতি গাফেলতা। ইসলামে ভারসাম্য নীতি, ইবাদত, কাজ, পরিবার ও বিশ্রাম—সবকিছুই প্রাপ্য সীমায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত বিনোদন বা অতিরিক্ত ত্যাগ উভয়ই অগ্রহণযোগ্য।

বিনোদন সম্পদ অপচয়ের মাধ্যম হবে না

ইসলামে সকল প্রকার সম্পদের অপচয় (ইসরাফ) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিনোদনের ক্ষেত্রেও এই নীতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনোদনমূলক কার্যক্রমে যেন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, খাদ্যদ্রব্যের অপচয় বা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদের অপব্যবহার না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যয়বহুল খেলাধুলা, অপ্রয়োজনীয়ভাবে দামি সরঞ্জাম কেনা বা বিলাসিতার জন্য বিনোদনের আয়োজন করা, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে, তা অপচয়ের আওতায় পড়তে পারে। একজন মুসলিমকে সর্বদা মিতব্যয়ী ও দূরদর্শী হতে হবে। বিনোদনের জন্য অর্থ ব্যয় করার আগে চিন্তা করতে হবে যে এই অর্থ কি আরও গুরুত্বপূর্ণ বা কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা যেত কিনা। বিশেষ করে, যখন সমাজে দরিদ্র ও অভাবী মানুষ রয়েছে, তখন কেবল চিত্তবিনোদনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী। এই নীতিটি মুসলিমদেরকে সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া আমানতের প্রতি সচেতন করে তোলে এবং সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতা মনে করিয়ে দেয়। সুস্থ বিনোদন কম খরচে বা বিনা খরচেও হতে পারে, যদি তা শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ اٰتِ ذَاالْقُرْبٰی حَقَّہٗ  وَ الْمِسْكِیْنَ وَ ابْنَ  السَّبِیْلِ  وَ لَا  تُبَذِّرْ  تَبْذِیْرًا ﴿۲۶﴾ اِنَّ الْمُبَذِّرِیْنَ كَانُوْۤا اِخْوَانَ الشَّیٰطِیْنِ ؕ وَ كَانَ الشَّیْطٰنُ لِرَبِّہٖ كَفُوْرًا ﴿۲۷﴾

আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও। আর কোনভাবেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ। সূরা ইসরা : ২৬-

শাবী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, মুগীরা ইবনু শু‘বাহ (রহ.) এর কাতিব (একান্ত সচিব) বলেছেন, মু‘আবিয়া (রাঃ)

মুগীরা ইবনু শু‘বাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তোমাদের তিনটি কাজ অপছন্দ করেন- অনর্থক কথাবার্তা, সম্পদ নষ্ট করা এবং অত্যধিক সওয়াল করা। সহিহ বুখারি : ১৪৭৭

আবূ বারযা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন বান্দার পদদ্বয় (কিয়ামত দিবসে) এতটুকুও সরবে না, তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে? কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কি কি কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৭

এই হাদিসের আলোকে বলা যায়, বিনোদন ততক্ষণই বৈধ যতক্ষণ তা সম্পদের অপচয় বা অপব্যবহার না ঘটায়। মুমিনের বিনোদন হবে সংযত, হালাল পথে উপার্জিত অর্থ দ্বারা সীমাবদ্ধ, এবং তা যেন এমন বিলাসবহুল না হয় যা ব্যক্তিকে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ করে তোলে। কিয়ামতের দিন অপচয়ের জন্য জবাবদিহিতার ভয় সর্বদা বিনোদনে ব্যয় করার সময় ব্যক্তিকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করবে। বিনোদন হবে ইবাদতের জন্য শক্তি অর্জনের মাধ্যম, সম্পদের অপচয়ের মাধ্যম নয়।

বিনোদন সম্পদ অপচয়ের মাধ্যম হতে পারে এমন কিছু বাস্তব উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত অবকাশযাপন (ভ্যাকেশন):

প্রতি বছর একাধিকবার বা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক ট্রিপে যাওয়া, যেখানে উচ্চ মূল্যের হোটেল, ফার্স্ট ক্লাস ভ্রমণ এবং ব্যয়বহুল কার্যকলাপের জন্য বিশাল বাজেট ব্যয় করা হয়, অথচ এই অর্থ মৌলিক প্রয়োজন বা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা যেত।

২. প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়বহুল শখের সরঞ্জাম কেনা ও ব্যবহার:

শখের বশে দামি গাড়ি, মোটরসাইকেল বা প্রযুক্তির নতুন মডেল (যেমন: নতুন আইফোন, গেমিং কনসোল) কেনার পর কিছুদিনের মধ্যেই তা পরিবর্তন করা বা উন্নত সংস্করণের জন্য আবার ব্যয় করা। কিংবা শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য অতিরিক্ত দামি ব্র্যান্ডের পোশাক বা জুয়েলারি কেনা।

৩. সীমাহীন বিলাসবহুল ব্যক্তিগত পার্টি বা ইভেন্ট আয়োজন:

শুধুমাত্র লোক দেখানো বা সামাজিক প্রতিপত্তি প্রকাশের জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করে জমকালো জন্মদিনের পার্টি, বিবাহ-পূর্ব অনুষ্ঠান বা ব্যক্তিগত সমাবেশ আয়োজন করা, যেখানে খাদ্যের অপচয় হয় এবং অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জায় বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। বিপুল পরিমাণ অর্থ তাৎক্ষণিক ও ক্ষণস্থায়ী আনন্দের জন্য খরচ করা হয়, যার ফলে সম্পদের প্রকৃত মূল্য ও গুরুত্ব ভুলে যাওয়া হয়।

৪. নিয়মিত অপ্রয়োজনীয় রেস্তোরাঁয় ব্যয়বহুল খাদ্যে অপচয়:

প্রায় প্রতিদিনই বাইরে উচ্চমূল্যের রেস্তোরাঁয় খাওয়া, যেখানে পরিবেশিত খাবারের মান বা পরিমাণ বাসার রান্নার চেয়ে খুব বেশি ভালো না হলেও শুধুমাত্র বিলাসিতা বা বিনোদনের অংশ হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয় এবং প্রায়শই প্লেটে খাবার নষ্ট করা হয়।

৫. অনর্থক উপহার কেনা এবং দেওয়া (বিশেষত শিশুদের জন্য):

শিশুর খেলনা বা বিনোদনের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করা, যেখানে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট জিনিস রয়েছে। বিশেষ দিবসগুলোতে শুধুমাত্র সামাজিক চাপ বা লোক দেখানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় দামি উপহার কেনা।

৬. দামি টিকিট কেটে বড় ইভেন্ট বা কনসার্টে অংশগ্রহণ:

জনপ্রিয় গায়ক বা দলের কনসার্ট, খেলার ফাইনাল ম্যাচ বা অন্যান্য বিনোদনমূলক শো-এর জন্য অত্যন্ত চড়া মূল্যের টিকিট কিনে অংশগ্রহণ করা, যেখানে টিকিটের মূল্য এক দিনের আয়ের সমতুল্য বা তারও বেশি।

৭. অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত বা গ্যাজেট-ভিত্তিক বিনোদন ব্যবস্থা:

বাড়িতে বিশাল আকারের হোম থিয়েটার সিস্টেম, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) হেডসেট বা অন্যান্য উন্নত গেমিং সেটআপ তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা, যার ব্যবহার খুবই সীমিত এবং যা দ্রুত পুরনো হয়ে যায়।

৮. রূপচর্চা বা প্রসাধনীতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়:

বিনোদনের অংশ হিসেবে (যেমন: নিজেকে আকর্ষণীয় দেখানো) ত্বকের বা চুলের এমন চিকিৎসা বা প্রসাধনীতে নিয়মিত বিপুল অর্থ ব্যয় করা যা স্বাস্থ্য বা প্রয়োজনের জন্য অপরিহার্য নয়, বরং কেবল ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের জন্য করা হয়।

৯. অতিরিক্ত জুয়া বা বাজি-নির্ভর খেলা:

ক্যাসিনোতে বা অনলাইনে জুয়া খেলা, ঘোড়দৌড় বা অন্যান্য ক্রীড়া ইভেন্টে বড় অঙ্কের বাজি ধরা। এই বিনোদনটি সম্পদ লাভের মিথ্যা আশায় অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলে। জুয়া ইসলামে সুস্পষ্টভাবে হারাম এবং এর ফলে এক ব্যক্তি তার সমস্ত সঞ্চয় বা সম্পদ এক নিমেষেই হারাতে পারে। এটি অর্থের সবচেয়ে মারাত্মক অপচয়, যা ব্যক্তিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

১০. সময় ও অর্থের অপচয়কারী অনলাইন গেমিংয়ে বিনিয়োগ:

ভিডিও গেমসে ‘ইন-গেম পারচেজ’ (In-game purchases), ‘লুট বক্স’ (Loot Box) বা কসমেটিক আইটেম কেনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা, যা গেমে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা না দিলেও শুধু দৃশ্যমান সৌন্দর্য বা দ্রুত অগ্রগতি এনে দেয়। এটি একটি আসক্তি তৈরি করে এবং এই বিনোদনে বিনিয়োগ করা সম্পদ কোনো স্থায়ী কল্যাণ বা প্রয়োজন মেটায় না, যা সরাসরি অর্থের অপচয়।

অন্যের অধিকার লঙ্ঘন বা ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না

ইসলামী বিনোদন কখনোই অন্যের কোনো প্রকার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করবে না। এই অধিকার বলতে ব্যক্তিগত, আর্থিক, সামাজিক বা শারীরিক—সকল প্রকার অধিকারকে বোঝানো হয়। যদি কোনো বিনোদনমূলক কার্যকলাপের কারণে অন্যের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাহত হয়, বা তাদের সময় নষ্ট হয়, তবে সেই বিনোদন অবৈধ হবে। অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো একজন মুসলিমের মৌলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সে কখনোই অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করবে না বা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে না। বিনোদনের মাধ্যমে উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করা, যা প্রতিবেশীর বিশ্রামে বা ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায়, তা সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়। একইভাবে, এমন কোনো খেলা বা অনুষ্ঠান আয়োজন করা যাবে না যা অন্যের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করে বা তাদের চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টি করে। একজন মুসলিমকে সর্বদা তার প্রতিবেশীর অধিকার, রাস্তার হক এবং অন্যান্য মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে। বিনোদন যদি এমন হয় যে তা অন্যের ধর্মীয় কর্তব্যে (যেমন নামাজ বা কুরআন তেলাওয়াত) মনোনিবেশে বাধা দেয়, তবে সেই বিনোদন বৈধ হতে পারে না। এই নীতিটি সমাজে শান্তি, সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিনোদন হবে ব্যক্তিগত আনন্দ লাভের উৎস, কিন্তু তা কখনোই অন্যের ক্ষতি বা কষ্টের কারণ হবে না। এটি ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা বিনোদনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَبۡغِ الۡفَسَادَ فِی الۡاَرۡضِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ الۡمُفۡسِدِیۡنَ

আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’। সুরা কাসাস : ৭৭

কোনো কাজ এমনকি বিনোদনমূলক হলেও—যদি মানুষের কষ্ট, বিশৃঙ্খলা বা সম্পদের ক্ষতি ডেকে আনে, তবে তা “ফাসাদ” বা অনর্থের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম এমন সব কার্যকলাপ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ بِغَیۡرِ مَا اکۡتَسَبُوۡا فَقَدِ احۡتَمَلُوۡا بُہۡتَانًا وَّاِثۡمًا مُّبِیۡنًا 

আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে তাদের কৃত কোন অন্যায় ছাড়াই কষ্ট দেয়, নিশ্চয় তারা বহন করবে অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপ। সুরা আহযাব : ৫৮

বিনোদনের নামে উচ্চ শব্দে গান, মাইক বা আতশবাজির ব্যবহার যদি অন্যের শান্তি ও ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায়, তবে তা মুমিনদের কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহর নিকট মহা গুনাহ।

আবূ শুরায়হ্ (রাঃ) থেকে বণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলছিলেনঃ আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মু’মিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল! কে সে লোক? তিনি বললেনঃ যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না। সহিহ বুখারি : ৬০১৬,সহিহ মুসলিম : ৪৬, আহমাদ : ৮৮৬৪

প্রতিবেশীর শান্তি ও বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটানো, উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, বা রাস্তা আটকে অনুষ্ঠান করা—সবই এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত।

আবূ সাঈদ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে ই’তিকাফ কালে সাহাবীদেরকে উচ্চস্বরে ক্বিরাআত পড়তে শুনে পর্দা সরিয়ে বললেনঃ জেনে রাখো! তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় রব্বের সাথে চুপিসারে আলাপে রত আছো। কাজেই তোমরা পরস্পরকে কষ্ট দিও না এবং পরস্পরের সামনে ক্বিরাআতে বা সালাতে আওয়ায উঁচু করো না। সুনানে আবু দাউদ : ১৩৩২

যখন এমনকি ইবাদত (কুরআন তেলাওয়াত) করাও উচ্চস্বরে করা নিষেধ, যাতে অন্যের মনোযোগে ব্যাঘাত না ঘটে, তখন বিনোদনের নামে উচ্চ শব্দে অন্যের ইবাদতে বাধা দেওয়া আরও বড় গুনাহ।

অন্যের অধিকার লঙ্ঘন বা ইবাদতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এমন কয়েকটি বিনোদনের উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. অতিরিক্ত উচ্চস্বরে গান বা বাদ্য বাজানো:

আবাসিক এলাকায় বা উপাসনালয়ের কাছাকাছি খুব জোরে গান বা বাদ্যযন্ত্র বাজালে তা আশেপাশের মানুষের ঘুমের, আরামের বা শান্তভাবে ইবাদত করার অধিকারে ব্যাঘাত ঘটায়।

২. প্রকাশ্যে অশালীন বা অশ্লীল নৃত্য/অভিনয়:

এমন বিনোদন যা জনসম্মুখে শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং এতে আশেপাশের মানুষের অস্বস্তি বা বিব্রতবোধ হয় বা যা ধর্মীয় অনুভূতির পরিপন্থী।

৩. আপত্তিকর বা ব্যঙ্গাত্মক বিষয়বস্তু নিয়ে নাটক/কৌতুক:

এমন বিনোদনমূলক পরিবেশনা যা কোনো ধর্ম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে ব্যঙ্গ করে বা অপমান করে, যা নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত দেয় এবং ইবাদতের পরিবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।

৪. অনেক রাত পর্যন্ত জোরে আওয়াজ করা খেলাধুলা বা উৎসব:

যদি কোনো খেলাধুলা বা উৎসব মধ্যরাত বা ইবাদতের নির্দিষ্ট সময়ের আশেপাশে হয় এবং এর উচ্চ আওয়াজ বা ভিড়ের কারণে অন্য মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বা ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটে।

৫. অন্যের ব্যক্তিগত বা সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে বিনোদনমূলক ব্যবহার:

কারো অনুমতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত জীবনের সংবেদনশীল তথ্য বা ছবি ব্যবহার করে কৌতুক বা অন্যান্য বিনোদন তৈরি করা, যা ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করে।

৬. অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ আতশবাজি/পটকা ফাটানো:

জনবহুল এলাকা বা উপাসনালয়ের কাছে বিনোদনের উদ্দেশ্যে উচ্চ শব্দে ও ঝুঁকি তৈরি করে এমন আতশবাজি বা পটকা ফাটানো, যা মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিতে থাকার অধিকারে ব্যাঘাত ঘটায় এবং ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায়।

৭. বেআইনিভাবে জমায়েত বা পথ অবরোধ করে অনুষ্ঠান:

বিনোদনমূলক কোনো অনুষ্ঠান বা জমায়েত করার ফলে সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ (রাস্তা বা ফুটপাত) সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যা তাদের চলাচলের অধিকার লঙ্ঘন করে।

৮. ইবাদতের স্থানে বা তার খুব কাছাকাছি বিনোদনমূলক ইভেন্ট (বিশেষত উচ্চশব্দের):

উপাসনালয়ের ঠিক পাশে বা তার প্রাঙ্গণের খুব কাছে কনসার্ট, মেলার মতো উচ্চ আওয়াজ ও জনসমাগমের বিনোদনমূলক ইভেন্টের আয়োজন করা, যার ফলে ইবাদতকারীদের মনোযোগ নষ্ট হয়।

৯. অন্যের সম্পত্তির ওপর অনধিকার প্রবেশ করে বিনোদন:

বিনোদনের (ফটোগ্রাফি, ট্রেজার হান্ট, বা খেলার) অজুহাতে কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে, বাড়ির ছাদে, উঠানে বা জমিতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করা, যা সম্পত্তির অধিকার লঙ্ঘন করে।

বিনোদন পরনিন্দা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও গিবত থেকে মুক্ত থাকতে হবে

ইসলামী বিনোদনের ক্ষেত্রে ভাষা ও আচরণের পবিত্রতা অপরিহার্য। বিনোদনের সময় হাসি-ঠাট্টা, কৌতুক বা গল্পগুজবের মাধ্যমে যেন পরনিন্দা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ বা মিথ্যা অপবাদের মতো মারাত্মক পাপ কাজ সংঘটিত না হয়, সেদিকে কঠোরভাবে সতর্ক থাকতে হবে। গীবত, যা কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষের আলোচনা করা যা সে শুনলে অপছন্দ করে, তা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়।

কোনো ব্যক্তিকে অপমান করার উদ্দেশ্যে বা তাকে ছোট করার জন্য ঠাট্টা-বিদ্রূপ করাও নিষিদ্ধ। বিনোদনের উদ্দেশ্য হলো মানসিক শান্তি ও প্রফুল্লতা অর্জন করা, কিন্তু অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করে বা তাদের সম্মানহানি করে সেই আনন্দ অর্জন করা বৈধ নয়। বরং, একজন মুসলিমের বিনোদনমূলক আলোচনা হবে গঠনমূলক, ইতিবাচক এবং শালীন। এই নীতিটি মুসলিমদেরকে তাদের জিহ্বা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব শেখায় এবং তাদের সামাজিক সম্পর্ককে কলুষিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। সুস্থ বিনোদন কেবল শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেয় না, বরং আত্মার পরিশুদ্ধিতেও সহায়তা করে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَیۡلٌ لِّکُلِّ ہُمَزَۃٍ لُّمَزَۃِۣ ۙ

দুর্ভোগ প্রত্যেকের যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গীবতকারী। সুরা হুমাজাহ : ০১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَّلَا تَجَسَّسُوۡا وَلَا یَغۡتَبۡ بَّعۡضُکُمۡ بَعۡضًا ؕ اَیُحِبُّ اَحَدُکُمۡ اَنۡ یَّاۡکُلَ لَحۡمَ اَخِیۡہِ مَیۡتًا فَکَرِہۡتُمُوۡہُ ؕ

আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। সুরা হুজরাত : ১২

আবূ হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা কি জান গীবাত কাকে বলে? উপস্থিত সাহাবীগণ বলেন,, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল ﷺ অধিক জানেন। তিনি বললেন, তোমার ভাই যে কথা তার প্রসঙ্গে বলা অপছন্দ মনে করে তার অসাক্ষাতে তা বলার নাম গীবাত। কেউ বললো, আপনি কি মনে করেন আমি যা বলছি তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্য থাকে তাহলে তুমি তার গীবাত করলে, আর যদি তার মধ্যে তা না থাকে তুমি তার উপর মিথ্যা অপবাদ দিলে। সহিহ মুসলিম : ২৫৮৯, সুনানে তিরমিযী : ১৯৩৪, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৮৭৪, আহমাদ : ৭১০৬

আল্লাহ বাব্বুল আলামীন বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَومٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاء مِّن نِّسَاء عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الاِسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম। সুরা হুজুরাত : ১১

আবূ হুরায়রাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা বিপদাপদে কষ্ট-ক্লিষ্ট ও দুর্ভাগ্যের আক্রমণ, ভাগ্যের অনিষ্টতা এবং বিপদগ্রস্তে শত্রুর উপহাস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। সহিহ বুখারি : ৬৬১৬, সহিহ মুসলিম : ২৭০৭, সহিহ আল-জামি : ২৯৬৮, সহিহাহ : ১৫৪১

বিনোদন গিবত বা পরনিন্দা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও গিবত করা হয় এমন কয়েকটি বিনোদনের উদাহরন  নিচে দেওয়া হলো-

১. বন্ধুমহলের আড্ডা

কাজ বা পড়ালেখার ফাঁকে বন্ধুদের সঙ্গে বসে অন্য কোনো বন্ধু বা সহকর্মী (যারা সেই মুহূর্তে উপস্থিত নেই) তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, সম্পর্ক বা ভুল নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, কানাকানি বা আলোচনা করা। এটিই হয়তো গিবতের সবচেয়ে সাধারণ ও প্রচলিত রূপ।

২. পারিবারিক জমায়েত বা অনুষ্ঠান :

বিয়ে বা অন্য কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয়ের (যিনি সেখানে নেই) আর্থিক অবস্থা, ছেলে-মেয়েরা কী করছে, কে মোটা হয়ে গেছে বা কার পোশাক কেমন—তা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে টিপ্পনি কাটা বা হাসাহাসি করা।

৩. চায়ের দোকান বা কফি শপের আলোচনা :

অফিস থেকে ফেরার পথে বা অবসরে চায়ের দোকানে বসে পাড়ার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আচার-আচরণ, কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা বা কোনো প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে সমালোচনা করা এবং তাতে রসদ খুঁজে পাওয়া।

৪. কাজের জায়গার বিরতি বা অফিস গসিপ :

মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে বা কফি পানের সময় সহকর্মীরা মিলে বসের (Boss), অন্য বিভাগের সহকর্মীর বা কোনো জুনিয়রের কাজ, কাজের দক্ষতা বা ব্যক্তিগত কোনো ভুল নিয়ে মজা করা বা পরনিন্দা করা।

৫. স্কুল-কলেজের ক্যান্টিন বা ক্লাসরুমের পিছনের বেঞ্চ :

শিক্ষার্থীরা তাদের কোনো শিক্ষক, অন্য কোনো সহপাঠী বা স্কুলের কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারীর হাঁটার ধরন, কথা বলার ভঙ্গি বা কোনো ব্যর্থতা নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বিনোদন খুঁজে নেয়।

৬. মেঝে বা বারান্দার আলোচনা :

বিকেলে বারান্দায় বা ছাদে বসে প্রতিবেশীরা মিলে অন্য পরিবারের সদস্যদের গতিবিধি, ঘরে নতুন কিছু আসা, বা তাদের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করে সময় কাটানো, যেখানে সাধারণত পরনিন্দা বা গিবত মুখ্য হয়ে ওঠে।

৭. অনলাইন ফোরাম এবং কমেন্ট সেকশন :

কোনো খবর, ভিডিও বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের কমেন্ট সেকশনে গিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মতামত, চেহারা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা বা বিদ্রূপাত্মক মিম (Meme) ব্যবহার করে অন্য ব্যবহারকারীদের বিনোদন দেওয়া বা নিজে বিনোদন নেওয়া।

৮. ভার্চুয়াল মিটিংয়ে আড়ালে আলোচনা :

অনলাইনে জুম বা গুগল মিটে কোনো মিটিং চলাকালীন, যেখানে সবাই উপস্থিত, সেখানে ব্যক্তিগত চ্যাট উইন্ডো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কোনো বক্তা বা অংশগ্রহণকারীর কথা বলার ধরন, ব্যাকগ্রাউন্ড, বা পোশাক নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ বা গিবত করা।

৯. পাবলিক ট্রান্সপোর্টে বাসে/ট্রেনে পর্যবেক্ষণ :

বাসে বা ট্রেনে যাতায়াতের সময় আশেপাশে বসা বা দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত যাত্রীদের অদ্ভুত আচরণ, কথা বলার ধরণ, বা অগোছালো পোশাক নিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে আলোচনা করা বা হাসাহাসি করা।

১০. খেলাধুলার ম্যাচের বিশ্লেষণ এবং ট্রোলিং :

কোনো ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচের পরে পরাজিত দলের বা কোনো বিশেষ খেলোয়াড়ের খারাপ পারফরম্যান্স, ভুল সিদ্ধান্ত বা চেহারা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্যক্তিগত আড্ডায় ব্যঙ্গাত্মক আলোচনা, ট্রোলিং বা গিবত ছড়ানো।

১১. মিথ্যা বা রং চড়ানো গল্প বলা :

কোনো আড্ডায় উপস্থিত না থাকা কোনো তৃতীয় ব্যক্তির জীবনের একটি সামান্য ঘটনাকে রং চড়িয়ে, হাস্যকর করে তুলে বা ভুলভাবে উপস্থাপন করে অন্যদের হাসানো বা মনোযোগn আকর্ষণ করা। এর ফলে আড্ডায় গিবত ও পরনিন্দা প্রাধান্য পায়।02 mik

ইসলামে বিনোদনের মূলনীতি : তৃতীয় কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করবে না

বিনোদনের মাধ্যমে সমাজের মধ্যে বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা বা বৈরিতা সৃষ্টি করা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। অনেক প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলা বা বিনোদনে জেতার জন্য বা প্রতিপক্ষকে হারাতে গিয়ে এমন মনোভাব তৈরি হতে পারে যা সুস্থ সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। ইসলামী বিনোদন অবশ্যই সুস্থ প্রতিযোগিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের জন্ম দেবে, যা সমাজে সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। যদি কোনো খেলা বা বিনোদন এমন হয় যা দুই দলের মধ্যে বা দুই ব্যক্তির মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া, বিদ্বেষ বা প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি করে, তবে সেই বিনোদন পরিহার করতে হবে। একজন মুসলিমের হৃদয়ে তার ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা ও কল্যাণ কামনা থাকবে। বিনোদনকে এমনভাবে ডিজাইন ও পরিচালনা করতে হবে যাতে অংশগ্রহণকারীরা বিজয় ও পরাজয় উভয়কেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখে এবং খেলা শেষে পারস্পরিক সম্মান ও বন্ধুত্ব বজায় থাকে। এই নীতিটি সমাজের সংহতি ও মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের বন্ধনকে মজবুত করতে সাহায্য করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ فَاَصۡلِحُوۡا بَیۡنَ اَخَوَیۡکُمۡ وَاتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ 

নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। সূরা হুজুরাত : ১০

 মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতা নয়, ভ্রাতৃত্ববোধ থাকা উচিত। বিনোদন এমন হওয়া উচিত যা এই ভ্রাতৃত্বকে শক্তিশালী করে, বিভক্ত নয়।

হিংসা ও বিদ্বেষে ভরা হৃদয় জান্নাতে প্রবেশে বাধা হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَنَزَعۡنَا مَا فِیۡ صُدُوۡرِہِمۡ مِّنۡ غِلٍّ اِخۡوَانًا عَلٰی سُرُرٍ مُّتَقٰبِلِیۡنَ

আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ বের করে ফেলব, তারা সেখানে ভাই ভাই হয়ে আসনে মুখোমুখি বসবে। সূরা হিজর : ৪৭

 জান্নাতবাসীদের হৃদয়ে কোনো হিংসা বা বিদ্বেষ থাকবে না। ইসলামী বিনোদন এমন হতে হবে, যা মানুষের হৃদয়কে কলুষমুক্ত রাখে।

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা নেক আমলসমূহ খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন জ্বালানী কাঠ খেয়ে ফেলে। দান-খায়রাত গুনাহসমূহ বিলীন করে দেয়, যেমন পানি আগুনকে বিলীন করে (নিভিয়ে) দেয়। সালাত মুমিনের নূর (আলো) এবং সিয়াম জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষার ঢাল। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪২১০, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯০৩

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কেউ প্রকৃত মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ১৩, সহিহ মুসলিম : ৪৫, আহমাদ : ১২৮০১, ১৩৮৭৫

বিনোদন জগতের এমন কিছু ক্ষেত্র আছে যা মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. সামাজিক মাধ্যম

সামাজিক মাধ্যমকে যদিও মূলত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, এটি মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঈর্ষা সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে।

ক. সামাজিক তুলনা ও ঈর্ষা

মানুষ যখন দেখে যে তার বন্ধু বা পরিচিতজন ছুটি কাটানোর, দামি জিনিস কেনার বা সফলতার ছবি ও ভিডিও পোস্ট করছে, তখন তাদের মনে ঈর্ষা তৈরি হয়। এতে নিজের জীবনকে তাদের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ বা ব্যর্থ মনে হতে পারে, যা বিদ্বেষের জন্ম দেয়।

খ. সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঈর্ষা

কোনো সঙ্গী যখন তার ভালোবাসার মানুষটির সামাজিক মাধ্যমে অন্য কারোর সাথে ঘনিষ্ঠতা বা যোগাযোগ দেখে, তখন তাদের মধ্যে রোমান্টিক ঈর্ষা তৈরি হতে পারে, যা সম্পর্কের মধ্যে শত্রুতা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

গ. অনলাইন ট্রোলিং ও রাগ

সামাজিক মাধ্যমে নাম গোপন রেখে বা অন্যভাবে অনেকে খারাপ মন্তব্য, অপমানজনক কথা বা উস্কানিমূলক পোস্ট করে। এর ফলে মানুষের মধ্যে দ্রুত রাগ ছড়িয়ে পড়ে এবং তা বিদ্বেষমূলক আক্রমণ বা শত্রুতা সৃষ্টি করে।

২. প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক খেলাধুলা

আমরা বনাম তারা” মানসিকতা

খেলাধুলায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার (যেমন—দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থক) কারণে মানুষের মধ্যে “আমরা বনাম তারা” নামক একটি মানসিকতা তৈরি হয়। এর ফলে অন্য দলের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা তৈরি হয়।

খ. খেলোয়াড় বা গেমিং সংস্থার প্রতিদ্বন্দ্বিতা

ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় যখন খেলোয়াড়রা একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিযোগিতা করে, তখন হারলে বা কেউ ভালো খেললে হিংসা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় দুটি ক্লাব বা সংস্থা বা কোম্পানির মাঝে তাদের ভক্তদের মধ্যেও তীব্র শত্রুতা দেখা যায়।

৩. রিয়ালিটি শো বা টক-শোতে

ক. পরিকল্পিত সংঘাত ও ষড়যন্ত্র

এই শো-গুলিতে প্রায়শই প্রতিযোগীরা একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বা ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে। দর্শকরা এই সংঘাত দেখে তাদের পছন্দের প্রতিযোগীর প্রতি সমর্থন এবং অন্যদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করে।

খ. বিজয় ও জনপ্রিয়তা নিয়ে ঈর্ষা

যখন কোনো একজন প্রতিযোগী অত্যন্ত দ্রুত খ্যাতি, জনপ্রিয়তা বা পুরস্কার পেয়ে যায়, তখন অন্য প্রতিযোগীরা বা দর্শকরা তাদের প্রতি হিংসা বা ঈর্ষান্বিত হতে পারে।

শরীরের বা মনের কোনো ক্ষতি করবে না

ইসলামী বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো এটি অংশগ্রহণকারীর শরীর বা মনের কোনো প্রকার ক্ষতি করবে না। ইসলামে নিজের ক্ষতি করা (আত্ম-ক্ষতি) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিনোদনের নামে যদি এমন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ খেলা বা কার্যকলাপ করা হয়, যা গুরুতর শারীরিক আঘাত বা স্থায়ী অক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা বৈধ হতে পারে না। একইভাবে, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও বিনোদন ক্ষতিকারক হওয়া উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ, অত্যধিক চাপ সৃষ্টিকারী বা আসক্তি তৈরি করা বিনোদনমূলক কার্যকলাপ, যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং মানসিক অসুস্থতার দিকে নিয়ে যায়, তা বর্জনীয়। বিনোদন এমন হওয়া উচিত যা শরীর ও মনকে সতেজ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মানসিক শান্তি প্রদান করে। সুস্থ খেলাধুলা যেমন সাঁতার, দৌড়ানো বা উপকারী ভ্রমণ শরীরকে সুস্থ রাখে। তাই, একজন মুসলিম সর্বদা এমন বিনোদন বেছে নেবে যা তার সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণে ইতিবাচক অবদান রাখে।

আল্লাহ তায়াল বলেন-

وَاَنۡفِقُوۡا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَلَا تُلۡقُوۡا بِاَیۡدِیۡکُمۡ اِلَی التَّہۡلُکَۃِ

আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর এবং নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। সূরা বাকারা : ১৯৫

আত্ম-ক্ষতি বা নিজের শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এমন কোনো বিনোদন যা শরীরকে ক্লান্ত করে, বিপজ্জনক স্টান্টে বাধ্য করে বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, তা এই আয়াতের পরিপন্থী।

আল্লাহ তায়াল বলেন-

وَلَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا

তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। সূরা নিসা : ২৯

যে কোনো কাজ, খেলা বা বিনোদন যা নিজের জীবনের ক্ষতি বা ঝুঁকি সৃষ্টি করে, তা ইসলামীভাবে নিষিদ্ধ। ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন যেমন আত্মহত্যাসদৃশ স্টান্ট, প্রাণঘাতী খেলাধুলা বা মানসিক ক্ষতিকর আসক্তি ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহাও যাবে না। সুনানে ইবন মাজাহ : ২৩৪১, আহমাদ : ২৮৬২

শরীর, মন, সম্পদ বা সমাজের কোনো অংশে ক্ষতি সৃষ্টি করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিপজ্জনক বিনোদন বা মানসিক ক্ষতির কারণ বিনোদন এ নীতির পরিপন্থী।

আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ হে ‘আবদুল্লাহ! আমি এ সংবাদ পেয়েছি যে, তুমি প্রতিদিন সওম পালন কর এবং সারা রাত সালাত আদায় করে থাক। আমি বললাম, ঠিক (শুনেছেন) হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেনঃ এরূপ করবে না (বরং মাঝে মাঝে) সওম পালন কর আবার ছেড়েও দাও। (রাতে) সালাত আদায় কর আবার ঘুমাও। কেননা তোমার উপর তোমার শরীরের হাক্ব রয়েছে, তোমার চোখের হাক্ব রয়েছে, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হাক্ব আছে, তোমার মেহমানের হাক্ব আছে। তোমার জন্য যথেষ্ট যে, তুমি প্রত্যেক মাসে তিন দিন সওম পালন কর। কেননা নেক ‘আমলের বদলে তোমার জন্য রয়েছে দশগুণ নেকী। এভাবে সারা বছরের সওম হয়ে যায়। আমি (বললাম) আমি এর চেয়েও কঠোর ‘আমল করতে সক্ষম। তখন আমাকে আরও কঠিন ‘আমলের অনুমতি দেয়া হল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আরো বেশি শক্তি রাখি। তিনি বললেনঃ তবে আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ)-এর সওম পালন কর, এর হতে বেশি করতে যেয়ো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর নবী দাঊদ (আঃ)-এর সওম কেমন? তিনি বললেনঃ অর্ধেক বছর। রাবী বলেন, ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বৃদ্ধ বয়সে বলতেন, আহা! আমি যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত রুখসত (সহজতর বিধান) কবূল করে নিতাম! সহিহ বুখারি : ১৯৭৫, সহিহ  মুসলিম : ১১৫৯, আহমাদ : ৬৭৭৩

বিনোদনের শারীরিক খেলাধুলা ক্ষতির কিছু উদাহরণ

শারীরিক খেলাধুলা সাধারণত শরীরের জন্য খুবই উপকারী। তবে, কিছু খেলাধুলা অতিরিক্ত, ভুল পদ্ধতিতে, বা অসতর্কভাবে খেললে তা শরীর ও মনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া এবং কিছু বিপজ্জনক খেলা ক্ষতির কারণ হতে পারে। যেমন-

১. ফুটবল, কাবাডি, রাগবি

ক্ষতির ধরণ: এই খেলায় খেলোয়াড়দের মধ্যে উচ্চ শারীরিক সংঘাত ঘটে, যার ফলে ঘন ঘন কনকাশন বা মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া হাড় ভাঙা, লিগামেন্ট ছেঁড়া এবং দীর্ঘমেয়াদী নিউরোলজিক্যাল সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

২. বক্সিং বা মুষ্টিযুদ্ধ

বক্সিং বা মুষ্টিযুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো প্রতিপক্ষকে আঘাত করা। ঘন ঘন মাথায় আঘাতের কারণে ব্রেন ড্যামেজ, দীর্ঘমেয়াদী নিউরোলজিক্যাল রোগ (যেমন- ক্রনিক ট্রমাটিক এনসেফালোপ্যাথি), দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৩. মার্শাল আর্টস

 মার্শাল আর্টস এর কারনে অনেক সময় চরম শারীরিক আঘাত, জয়েন্ট এবং হাড়ের গুরুতর আঘাত, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের আঘাত এবং কনকাশন এর উচ্চ ঝুঁকি থাকে।

৪. জিমন্যাস্টিকস

জিমন্যাস্টিকস প্রশিক্ষনের জন্য অল্প বয়স থেকে কঠোর প্রশিক্ষণ এবং শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপের কারণে ঘন ঘন অতিরিক্ত ব্যবহারের আঘাতের ফলে স্ট্রেস ফ্র্যাকচার, জয়েন্টের দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা বিশেষ করে হাঁটু, গোড়ালি, মেরুদণ্ড এবং বৃদ্ধির (সমস্যা দেখা যায়। এছাড়া মানসিক চাপ ও খাওয়ার সমস্যা হতে পারে।

৫. ম্যারাথন বা এন্ডুরেন্স রেস

ম্যারাথন রেস এর কারনে অনেক সময় শরীরের উপর চরম চাপের কারণে ক্লান্তিজনিত ফ্র্যাকচার, কিডনির ক্ষতি, ডিহাইড্রেশন এবং হৃৎপিণ্ডের উপর অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ মানসিক অবসাদ ঘটাতে পারে।

৬. ঘোড়দৌড়/অশ্বারোহণ

ঘোড়দৌড়ের সময় ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়া বা ঘোড়ার দ্বারা চাপা পড়ার কারণে গুরুতর আঘাত, মাথায় আঘাত, মেরুদণ্ড এবং পেলভিসের ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে, যা স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

৭. ভারোত্তোলন

ভারোত্তোলন সময় ভুল কৌশল বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে পেশীর মোচ, টেন্ডন ছিঁড়ে যাওয়া, এবং পিঠের নিচের অংশে গুরুতর আঘাত লাগার ঝুঁকি থাকে। এর অতিরিক্ত চাপ হৃদপিণ্ডের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।

৮. দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক খেলা

দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক খেলার কারণে পায়ের গাঁটে (বিশেষত হাঁটু এবং গোড়ালি) লিগামেন্ট ইনজুরি, টেন্ডন সমস্যা এবং ঘন ঘন কনকাশন (হেড করার কারণে) এর ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত চাপের কারণে মানসিক অবসাদও আসতে পারে।

৯. অতিরিক্ত শারীরিক প্রশিক্ষণ বা ‘ওভার-ট্রেনিং’ :

অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের কারণে শারীরিক অবসাদ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, দীর্ঘমেয়াদী ক্লান্তি এবং খেলার প্রতি মানসিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

বিনোদনের মানসিক ক্ষতির কিছু উদাহরণ

বিনোদনের অনেক ধরনই আছে, তবে কিছু বিনোদন বা গেম অতিরিক্ত বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে মানসিক ক্ষতি হতে পারে। যেমন-

১. অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার

অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার ফলে অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করার প্রবণতা থেকে হীনমন্যতা, উদ্বেগ ও হতাশা বৃদ্ধি, সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া। ঘুমের সমস্যা, শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়া। বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়া, মনোযোগের ক্ষমতা হ্রাস।

২. টেলিভিশন বা সিনেমা অতিরিক্ত সময় কাটানো

টেলিভিশন বা সিনেমা অতিরিক্ত সময় কাটানো ফলে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, চোখের সমস্যা। অলসতা, বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা, প্রোডাক্টিভিটি কমে যাওয়া।

৩. ‘ডেটিং’ বা ‘চ্যাটিং’ অ্যাপে অতিরিক্ত ও যাচাইবিহীন সময় কাটানো

‘ডেটিং’ বা ‘চ্যাটিং’ অ্যাপে অতিরিক্ত ও যাচাইবিহীন সময় কাটানো কারণে মানসিক প্রতারণা, ‘ক্যাফিশিং’ এর শিকার হওয়া, একাকীত্ব বৃদ্ধি, হতাশা। অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়া, এবং কখনও কখনও বাস্তব জীবনে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

৪. অতিরিক্ত ভিডিও গেম বা অনলাইন গেমিং

অতিরিক্ত গেমিং এর কারনে গেমিং আসক্তি, উদ্বেগ, হতাশা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মনোযোগের অভাব।

৫. জুয়া বা বাজির খেলা

জুয়া বা বাজির খেলা কারনে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হয়। সম্পদ হারিয়ে অনেক ঋণের বোঝার বহন করে।

বিনোদনে কোনো প্রকার জাদুর উপস্থিতি থাকবে না

ইসলামী বিনোদনে সকল প্রকার জাদু বা কুসংস্কারের উপস্থিতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। জাদু একটি গুরুতর পাপ এবং এটি শিরকের দিকেও নিয়ে যেতে পারে। বিনোদনমূলক কার্যক্রমে যদি এমন কোনো উপাদান থাকে যেখানে জাদু বা তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা প্রদর্শন করা হয় বা সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকে উৎসাহিত করা হয়, তবে তা সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে। এর মধ্যে এমন খেলা বা প্রদর্শনীও অন্তর্ভুক্ত যা অলৌকিক ক্ষমতার ভান করে বা সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। যদিও কিছু আপাতদৃষ্টিতে ‘জাদু’ কেবল হাতের কৌশল বা বিভ্রম হতে পারে, তবুও তা যদি মানুষকে ভুল ধারণা দেয় বা কুসংস্কারকে উৎসাহিত করে, তবে তা পরিহার করা উচিত। একজন মুসলিমের বিশ্বাস কেবল আল্লাহর ক্ষমতার ওপর থাকবে। এই নীতিটি নিশ্চিত করে যে মুসলিমরা বিনোদনের মাধ্যমে কোনো প্রকার মিথ্যা, প্রতারণা বা শিরকের ফাঁদে না পড়ে এবং তাদের আকিদাকে সকল প্রকার কুসংস্কার থেকে মুক্ত রাখে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

আর তারা অনুসরণ করেছে, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। আর সুলাইমান কুফরী করেনি; বরং শয়তানরা কুফরী করেছে। তারা মানুষকে যাদু শেখাত এবং (তারা অনুসরণ করেছে) যা নাযিল করা হয়েছিল বাবেলের দুই ফেরেশতা হারূত ও মারূতের উপর। আর তারা কাউকে শেখাত না যে পর্যন্ত না বলত যে, ‘আমরা তো পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা কুফরী করো না। এরপরও তারা এদের কাছ থেকে শিখত, যার মাধ্যমে তারা পুরুষ ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত। অথচ তারা তার মাধ্যমে কারো কোন ক্ষতি করতে পারত না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। আর তারা শিখত যা তাদের ক্ষতি করত, তাদের উপকার করত না এবং তারা অবশ্যই জানত যে, যে ব্যক্তি তা ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোন অংশ থাকবে না। আর তা নিশ্চিতরূপে কতই-না মন্দ, যার বিনিময়ে তারা নিজদেরকে বিক্রয় করেছে। যদি তারা জানত। সুরা বাকারা : ১০

যাদু হলো শয়তানি কুফরি কাজ, যা সুলাইমান (আ.) করেননি। হারূত ও মারূতকে পরীক্ষা হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু মানুষ স্বেচ্ছায় জেনে-বুঝে যাদু শিখেছে। এই যাদু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে। তবে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো ক্ষতিই হতে পারে না। এই কুফরি কাজের ফলে যাদু চর্চাকারী আখিরাতে তার সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে, যা তার নিজেদের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এ থেকে বুঝা যায় যাদু শয়তানি কাজ। কাজেউ বিনোদনে যাদুর থাকা হারাম।

জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাদুকরের শার্’ঈ শাস্তি হলো তাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করা। মিশকাত : ৩৫৫১, সুনানে তিরমিযী : ১৪৬০

আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বস্তু থেকে বেঁচে থাক। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, জাদু, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে কাউকে হত্যা করা, যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, জিহাদের ময়দান থেকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করা সাধ্বী বিশ্বাসী সরলমনা রমনাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করা। সহিহ বুখারি : ২৭৬৬, ২৭৬৭, ৫৭৬৪, ৬৮৫৭, মুসলিম ৮৯, নাসায়ী ৩৬৭১, আবূ দাউদ ২৮৭৪

আমর ইবন আলী (রহঃ) … আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি গিরা দিয়ে তাতে ফুঁক দেয়, সে যাদু করলো, আর যে যাদু করলো, সে মুশরিক হলো। আর যে ব্যক্তি গলায় কিছু ঝুলায়, তাকে সেই জিনিসের উপর ন্যস্ত করা হয়। সুনানে নাসায়ি : ৪০৮০

বিনোদনে জাদুর ব্যবহার :

বিনোদন বা মনোরঞ্জনের ক্ষেত্রে “যাদু” বলতে সাধারণত বোঝায় হাতের কৌশল বিভ্রম বা ভ্রম সৃষ্টি, মানসিক কৌশল এবং বড় ধরনের চমকপ্রদ প্রদর্শনী, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এই ধরনের যাদু কোনো অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা নয় বরং সুকৌশলী অভিনয়, পদার্থবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব এবং দ্রুত হাত চালানোর দক্ষতা।

বিনোদনমূলক জাদুর ব্যবহারের কয়েকটি উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. স্টেজ ম্যাজিক

কোনো মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করা, মানুষকে উধাও করে দেওয়া বা আবার ফিরিয়ে আনা, কোনো গাড়ি বা প্রাণীকে মঞ্চে এনে বা উধাও করে দেওয়া, বা শূন্যে ভাসিয়ে দেওয়া। বড় শো, থিয়েটার বা লাস ভেগাসের মতো জায়গায় বড় আকারে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।

২. ক্লোজ-আপ ম্যাজিক বা মাইক্রো ম্যাজিক :

তাস বা কার্ডের কৌশল, মুদ্রা উধাও করা বা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে আসা, অথবা ছোট কোনো বস্তুকে চোখের পলকে পরিবর্তন করে দেওয়া। ছোট গ্রুপে বা ব্যক্তিগতভাবে দর্শকদের কাছাকাছি এসে, কখনও কখনও তাদের হাতেই কৌশলগুলো দেখানো হয়। এটি ইন্টারেক্টিভ বিনোদনের জন্য খুব জনপ্রিয়।

৩. মেন্টালিজম বা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল

দর্শকের মন থেকে কোনো সংখ্যা বা চিন্তা অনুমান করা, ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা আগে থেকে বলে দেওয়া, অথবা মানসিক প্রভাব খাটিয়ে দর্শকের কোনো কাজকে প্রভাবিত করা। এটি মনস্তত্ত্ব, ভুল দিকনির্দেশনা এবং সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দর্শকদের মনে হয় যে যেন যাদুকর সত্যিই তাদের মন পড়তে পারেন।

৪. এস্কেপ আর্ট বা মুক্তি পাওয়ার কৌশল

হাতকড়া, শিকল বা জলপূর্ণ ট্যাঙ্কে আবদ্ধ হয়ে সেখান থেকে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় নিজেকে মুক্ত করা। এটি দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ তৈরি করে এবং যাদুকরের সাহস ও দক্ষতার প্রমাণ দেয়।

৫. চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শো-তে

বিভিন্ন টেলিভিশন শো-তে বা জাদুকরের বিশেষ শো জাদুকররা তাদের নতুন এবং চমকপ্রদ কৌশল প্রদর্শন করে। জাদুকরের জীবন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বা অলৌকিক ঘটনা দেখানোর মাধ্যমে দর্শকদের বিনোদন দেওয়া।

৬. স্ট্রিট ম্যাজিক

রাস্তায় পথচারীদের সামনে হঠাৎ করে ছোটখাটো কিন্তু চমকপ্রদ যাদু দেখানো, যেমন কোনো বস্তু হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া বা অবিশ্বাস্য উপায়ে তাস বের করে আনা। সাধারণ মানুষকে তাৎক্ষণিক আনন্দ দিতে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া ধারণ করতে এই ধরণের জাদু ব্যবহৃত হয়।

বিনোদনমূলক কৌশল বনাম কুফরি জাদু এবং শিরকের ঝুঁকি

আমি উপরে জাদুর উদাহরন প্রদান করলাম তা সত্যি কারের জাদু নয় এগুলো মানুষ আনন্দ প্রদানে জন্য কৌলম করে দেখান হয়। মানব সমাজে বহুকাল ধরে বিনোদনমূলক জাদু বা ম্যাজিক প্রচলিত আছে, যা মূলত দ্রুত হাতের কৌশল, চাক্ষুষ বিভ্রম এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের সমন্বয়ে দর্শকদের আনন্দ ও বিস্ময় প্রদান করে। এই কৌশলগুলি নিছক পারফরম্যান্স আর্ট এবং এর সঙ্গে কোনো অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক ক্ষমতার যোগ নেই।

আধুনিক বিশ্বে জাদুকররা দক্ষতার সাথে এই কৌশলগুলি প্রদর্শন করেন, যা মোটেও কুফরি বা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তবে সমস্যাটি দেখা দেয় তখন, যখন সাধারণ দর্শক বা অনুরাগীরা এই প্রদর্শিত কৌশলগুলিকে অতিমানবীয় বা ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে ভুল করে এবং জাদুকরকে সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতার অংশীদার মনে করে। এমন ধারণা পোষণ করা সরাসরি ইসলামের সবচেয়ে বড় আল্লাহর সাথে অংশীদার (শিরক) সাব্যস্ত হবে। অন্যদিকে, ইসলামি ধর্মগ্রন্থ কোরআন ও সহীহ হাদিসে যে জাদুর কথা বলা হয়েছে, যেমন—মূসা (আ.)-এর সঙ্গে জাদুকরদের মুকাবিলা বা নবীজীকে (সা.) যাদু করার ঘটনা, তা কোনো কৌশল বা চোখের ভ্রম ছিল না; বরং তা ছিল বাস্তবে ক্ষতিকারক প্রভাব সৃষ্টিকারী এক নিন্দনীয় কাজ। ইসলামী শরীয়তে এই ধরনের জাদু, যা শয়তানের সাহায্য বা কুফরির মাধ্যমে করা হয়, তা নিঃসন্দেহে স্পষ্ট কুফরি ও মারাত্মক পাপ হিসেবে গণ্য।

সুতরাং, আমাদের মনে রাখা উচিত, বিনোদনের জাদু শুধুমাত্র কৌশল, একে অলৌকিক ভাবা শিরক; আর কোরআন-হাদিসের জাদু সত্যই ক্ষতিকারক ও কুফরি কাজ। উভয় ক্ষেত্রেই মুমিনদের সচেতন থাকা আবশ্যক।

 বিনোদনে দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি সৃষ্টি করা যাবে না

ইসলামী বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ হলো এটি যেন মুসলিমকে দুনিয়া-কেন্দ্রিক বা ভোগবাদী জীবনধারার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত করে না তোলে। বিনোদনের মূল উদ্দেশ্য হলো মনকে সাময়িক সতেজতা দেওয়া, যাতে ইবাদত ও পরকালের প্রস্তুতিতে নতুন উদ্যম লাভ করা যায়। কিন্তু যদি কোনো বিনোদন—যেমন বিলাস-বহুল জীবনযাপন দেখানো সিনেমা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের প্রতি উৎসাহী খেলাধুলা, বা ভোগবাদকে মহিমান্বিত করা অনুষ্ঠান—মানুষের মনে এমন মানসিকতা তৈরি করে যে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আরাম-আয়েশই জীবনের প্রধান লক্ষ্য, তবে তা ইসলামে বৈধ হতে পারে না। এই নীতিটি মানুষের মধ্যে ‘যূহদ’ (পৃথিবীর প্রতি অনাসক্তি) এবং ‘আখেরাত-মুখিতা’ (পরকাল-কেন্দ্রিকতা)-এর চেতনা বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিনোদনে অতিরিক্ত মত্ততা ব্যক্তিকে দুনিয়ার মোহে ফেলে দেয়, যা আল্লাহর স্মরণ এবং সৎ কাজ থেকে গাফেল করে। তাই একজন মুসলিমের উচিত এমন বিনোদন বেছে নেওয়া যা তাকে বস্তুবাদী আসক্তি থেকে দূরে রাখে এবং তার অন্তরকে পরকালের চিন্তায় স্থির রাখে। বিনোদন হবে ক্ষণিকের বিশ্রাম, চিরস্থায়ী ঠিকানা বা লক্ষ্য নয়। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ইসলামী বিনোদনের মূল দর্শন।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

 ؕ وَمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ

আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী। সুরা আল ইমরান : ১৮৫

অর্থাৎ দুনিয়ার আনন্দ, খেলা, ভোগ—সবই ক্ষণস্থায়ী। যদি এগুলো মানুষকে পরকাল থেকে গাফেল করে তোলে, তবে তা প্রতারণামূলক ভোগে পরিণত হয়।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

 ؕ وَمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ

আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। সুরা হাদিন : ২০

এই আয়াত স্পষ্টভাবে দেখায়, মানুষ যখন বিনোদন বা ভোগবাদে আসক্ত হয়, তখন তা তাকে আখিরাত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَلَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَرِزۡقُ رَبِّکَ خَیۡرٌ وَّاَبۡقٰی

আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী। সুরা ত্বহা : ১৩১

সাহল ইবনে সাদ আস-সাইদী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলে দিন যা আমি করলে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন এবং লোকেরাও আমাকে ভালোবাসবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তুমি দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি অবলন্বন করো। তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। মানুষের নিকট যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হয়ে যাও, তাহলে তারাও তোমাকে ভালোবাসবে। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১০২, সহীহাহ ৯৪৪

বর্তমান বিনোদন মানেই দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি

বিনোদন এবং দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি সৃষ্টি এই ধারণাটি বর্তমানে চুড়ান্ত পর্যায় আছ। কয়েক দশক আগে আজকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলেও তখনও বিনোদন বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিচালিত হতো। বর্তমান বিনোদন মানুষের মধ্যে পার্থিব জিনিসের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করছে। নিচে এ সম্পর্কে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. সিনেমা এবং সিরিজের থিম ও মার্কেটিং

সিনেমা, টিভি শো ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল লক্ষ্য হলো বিশাল অঙ্কের মুনাফা অর্জন। তাই তাদের চিত্রনাট্য এবং মার্কেটিং কৌশল এমনভাবে তৈরি হয়, যা দর্শকদের ভোগবাদ, রোমান্স, এবং প্রতিশোধের মতো দুনিয়া-কেন্দ্রিক আবেগগুলিতে আকৃষ্ট করে। সিনেমা বা সিরিজে নায়ক-নায়িকার জীবনে ক্ষমতা, প্রেম, সম্পদ এবং চরম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অর্জনকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়। দর্শকরা অবচেতনভাবে সেই জীবনধারাকেই আদর্শ বলে মনে করে এবং বাস্তব জীবনেও একই ধরনের ভোগ এবং আকাঙ্ক্ষার পিছনে ছুটতে শুরু করে।

২. রেডিও এবং টেলিভিশন বিজ্ঞাপন

টেলিভিশন ও রেডিওর প্রসার ঘটলে তা বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ এনে দেয়। বিজ্ঞাপনগুলো “আদর্শ পরিবার” এবং “সফল জীবন”-এর এমন ছবি তৈরি করত, যেখানে নতুন গাড়ি, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক গ্যাজেট থাকা আবশ্যিক ছিল।

এই বিনোদনমূলক মাধ্যমগুলি একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেছিল যে, সত্যিকারের সুখ বা সামাজিক সম্মান পেতে হলে এই পণ্যগুলো কিনতেই হবে। এর ফলে মানুষের মধ্যে ক্রমাগত নতুন ভোগ্যপণ্য কেনার তাগিদ এবং সামাজিক মান-মর্যাদ বাড়ানোর জন্য বস্তুর প্রতি আসক্তি জন্মাত।

৩. গানের তারকাদের সংস্কৃতি

এই মিউজিক আইডলরা কেবল গান গেয়েই নয়, বরং তাদের প্রকাশিত রেকর্ড, বিশেষ পোশাকের লাইন, এবং ফ্যান ক্লাবগুলোর মাধ্যমে বিশাল বাণিজ্য তৈরি করত। ভক্তরা তাদের প্রিয় তারকার স্টাইল, চুল এবং জীবনযাত্রা অন্ধভাবে অনুকরণ করত। এটি কেবল গানের প্রতি অনুরাগ ছিল না, বরং তারকার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, জনপ্রিয়তা এবং জাগতিক সাফল্যকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি করত।

৪. থিম পার্ক এবং অবকাশযাপন সংস্কৃতি

থিম পার্কগুলো ছিল পরিবার-কেন্দ্রিক বিনোদনের একটি নতুন এবং অত্যন্ত বাণিজ্যিক রূপ। টিকিট, খাদ্য, পানীয় এবং স্যুভেনিয়ার বিক্রি ছিল এর প্রধান ব্যবসায়িক মডেল।

এই সংস্কৃতি মাধ্যমে মানুষক বুঝান হয়, সত্যিকারের পারিবারিক আনন্দ এবং সুখ পেতে হলে অর্থ খরচ করে বিশেষ স্থানে (যেমন—থিম পার্কে বা দামী অবকাশ যাপনে) যেতে হবে। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে অর্থ ব্যয় করে বিনোদন কেনার এবং পারিবারিক স্মৃতিকে কেবল ভ্রমণের ওপর নির্ভরশীল করার দুনিয়া-কেন্দ্রিক আসক্তি জন্মাত।

৫. সেলেব্রিটি এবং ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতি

বিনোদন জগতের তারকারা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সাররা হলেন একেকটি বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনদাতা। তাদের জনপ্রিয়তা মূলত পণ্যের প্রচার এবং লক্ষ লক্ষ টাকার চুক্তির উপর নির্ভরশীল। তাদের জীবনধারা ও স্টাইল কোটি কোটি টাকা আয়ের উৎস।

৬. মিউজিক এবং ড্যান্স পার্টির বাণিজ্যিকীকরণ

বড় বড় মিউজিক কনসার্ট, ডান্স পার্টি এবং ডিজে নাইট হলো টিকিট বিক্রয়, পৃষ্ঠপোষকতা ও পানীয় বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের বিশাল প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিল্পীর পারিশ্রমিক এবং ইভেন্টের লাভই মুখ্য।

এই ইভেন্টগুলিতে মূলত উচ্চস্বরে সঙ্গীত, উদ্দাম নৃত্য, এবং ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। এই ধরনের আসক্তি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী নৈতিকতা বা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের পরিবর্তে শুধুমাত্র শারীরিক আনন্দ ও ক্ষণিকের উদ্দীপনা খোঁজার দিকে ঠেলে দেয়।

৭. গেমিং এবং ই-স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি

গেমিং ইন্ডাস্ট্রি এখন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। গেম বিক্রি, ইন-গেম পারচেজ (যেমন- স্কিন, অস্ত্র, বুস্টার) এবং ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্টের পুরস্কারের অর্থ এটিকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক করে তুলেছে।

গেমিং আসক্তি একটি সুপরিচিত সমস্যা। এখানে ভার্চুয়াল জগতের কৃতিত্ব, র‍্যাঙ্কিং, এবং পুরস্কারের প্রতি তীব্র মনোযোগ দেওয়া হয়। খেলোয়াড়রা বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য উপেক্ষা করে গেমে সময় ও অর্থ ব্যয় করে। এটি ভার্চুয়াল জগতের সাফল্যের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করে, যা তাদের জাগতিক লক্ষ্যগুলো ছাড়া অন্য কোনো বৃহত্তর উদ্দেশ্যের প্রতি মনোযোগ দিতে বাধা দেয়।

৮. ফ্যাশন উইক এবং বিউটি পেজেন্ট (সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা)

ফ্যাশন শো ও সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলি হলো বস্ত্র, কসমেটিকস এবং বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলির প্রচারের মূল মাধ্যম। এই ইভেন্টগুলো কর্পোরেট বিজ্ঞাপন ও পণ্যের প্রচারে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এই ইভেন্টগুলোর মাধ্যমে শারীরিক সৌন্দর্য এবং বাহ্যিক প্রদর্শনকে চরম মূল্য দেওয়া হয়। এটি সমাজের মধ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়া অভাববোধ সৃষ্টি করে। এর ফলে মানুষের মধ্যে শরীর-কেন্দ্রিক অহংকার এবং বস্তুবাদী সৌন্দর্যের পিছনে অবিরাম ছোটার আসক্তি জন্মায়, যা অভ্যন্তরীণ বা আধ্যাত্মিক বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

উপসংহার : এই উদাহরণগুলো স্পষ্ট করে যে, আজকের বিনোদন মাধ্যমগুলো মূলত অর্থ ও ব্যবসার স্বার্থে পরিচালিত। বিনোদনের মূল লক্ষ্য আর নিছক মানসিক আরাম বা স্বাস্থ্যকর অবসর নয়, বরং দর্শকদের মধ্যে ভোগ, প্রদর্শনী, এবং খ্যাতি অর্জনের দুনিয়া-কেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করা, যাতে তারা পণ্যের ভোক্তা হিসেবে টিকে থাকে।

বিনোদন যেন মুসলিমকে কাফিররাষ্ট্রে যেতে বাধ্য না করে

ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে, বিনোদনের জন্য কোনো মুসলিমকে এমন খেলাধুলা বা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া উচিত নয়, যা তাকে বিধর্মী (কাফির) রাষ্ট্রে যেতে বাধ্য করে। এর মূল কারণ হলো, কাফির রাষ্ট্রে ভ্রমণের ফলে একজন মুসলিমের জন্য বহু ফিতনা এবং অনিষ্টতায় জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে।

এই ধরনের সফরে যে বিপদগুলো তৈরি হতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হলো:

১. অতিরিক্ত মেলামেশা:

কাফিরদের জীবনধারা ও সংস্কৃতির সাথে মাত্রাতিরিক্ত মেলামেশা এবং তাদের প্রভাবাধীন থাকা।

২. হারাম কাজে জড়িয়ে পড়া:

এমন অনেক প্রকার হারাম কাজের মাঝ দিয়ে অতিক্রম করা, যা মুসলিম রাষ্ট্রে সাধারণত সুরক্ষিত থাকে। ৩. আক্বিদার ওপর কুপ্রভাব:

এই পরিবেশ একজন মুসলিমের অন্তরে চরমভাবে খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং তার ঈমান ও আক্বিদা-বিশ্বাসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে, ফিকাহ বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কিরাম শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজন বা ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে সীমিত পরিসরে কাফির রাষ্ট্রে ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছেন। এই অনুমতির ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং প্রয়োজনের দ্বারা নির্ধারিত:

১. চিকিৎসার প্রয়োজন: এমন দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা, যা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে, একজন মুসলিমের জীবন রক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজনের তাগিদে এই সফর অনুমোদিত। তবে শর্ত হলো, বিশেষজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার বা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে, সেই রোগের অত্যাধুনিক ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি অন্য কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে সত্যিই অপ্রাপ্য।

২. অপরিহার্য ব্যবসা:

মুসলিম রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় এমন ব্যবসার খাতিরে সফর, যা অন্য কোথাও সম্ভব নয়। এই অনুমতি কেবল সেই সকল ব্যবসায়ী বা প্রতিনিধিদের জন্য, যাদের পণ্য বা সেবা মুসলিম সমাজের জন্য অপরিহার্য এবং তা আমদানি বা সরবরাহের জন্য কাফির রাষ্ট্রে যাওয়া অনিবার্য। এক্ষেত্রে সফরকারীকে কেবল ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, বিলাসীতা বা অনর্থক বিনোদনে সময় ব্যয় করা চলবে না, এবং নৈতিক ও দ্বীনি বিষয়ে আপসহীন থাকতে হবে।

৩. অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন:

এমন জ্ঞান বা দক্ষতার জন্য শিক্ষা সফর, যা মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য কিন্তু মুসলিম রাষ্ট্রে যার ব্যবস্থা নেই। এই জ্ঞান অবশ্যই এমন হতে হবে যা মুসলিম উম্মাহর উন্নতি, প্রতিরক্ষা বা অগ্রগতির জন্য অত্যাবশ্যক, যেমন— উচ্চতর চিকিৎসা বিজ্ঞান, সামরিক প্রযুক্তি বা বিশেষ প্রকৌশল। তবে শর্ত হলো, শিক্ষার্থীকে অবশ্যই দ্বীনি জ্ঞান ও আক্বিদায় সুদৃঢ় হতে হবে, যাতে সে সেখানকার ফিতনায় প্রভাবিত না হয়।

৪. দাওয়াত ও ইসলাম প্রচার:

আল্লাহর দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেওয়া এবং ইসলামের প্রচার-প্রসারের মহৎ উদ্দেশ্যে সফর। এই কাজ সকল মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অনুমতি কেবল সেই দাঈদের (প্রচারক) জন্য যারা ইসলামের জ্ঞান, চরিত্র এবং দাওয়াতের পদ্ধতিতে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ। দাঈকে অবশ্যই সকল ফিতনা থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখতে হবে এবং তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন ইসলামের আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তার লক্ষ্য হবে অমুসলিমদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা এবং মুসলিমদের ঈমানকে মজবুত করা, নিছক ভ্রমণ বা অন্য কোনো পার্থিব লাভ নয়।

হাদিসের আলোকে বিনোদনের আরও কয়েকটি নীতিমালা

১. আল্লাহর নাফরমানী হয় না এমন ক্রীড়া-কৌতুক করার অবকাশ প্রদান

আয়িশ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবূ বকর (রা.) আমার নিকট আসলেন। এ সময় আমার কাছে আনসার সম্প্রদায়ের দু’টি মেয়ে গান গাচ্ছিল। আনসারগণ বু’আস যুদ্ধের সময় এ গানটি গেয়েছিল। আয়িশাহ (রাযিঃ) বলেন, তারা অবশ্য (পেশাগত) গায়িকা ছিল না। আবূ বকর (রাযিঃ) বললেন, একি? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবূ বকর প্রত্যেক জাতির জন্য উৎসবের ব্যবস্থা আছে। আর এটা হচ্ছে আমাদের উৎসবের দিন। সহিহ মুসলিম : ৮৯২

ইসলামে সুস্থ, পরিচ্ছন্ন এবং অশ্লীলতামুক্ত বিনোদন সম্পূর্ণ অনুমোদিত। এটি ইসলামের উদারতা ও মানবিক প্রকৃতির পরিচায়ক। যে ক্রীড়া-কৌতুক আল্লাহর কোনো আদেশ বা নিষেধ লঙ্ঘন করে না, তা করতে ইসলামে সুস্পষ্ট অবকাশ দেওয়া হয়েছে। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) উৎসবের দিনে (ঈদের দিনে) সাহাবীর আপত্তি সত্ত্বেও মেয়েদের গাওয়া নির্দোষ দেশাত্মবোধক গানকে অনুমোদন দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি এই নীতি প্রতিষ্ঠা করেন যে, আনন্দ প্রকাশের জন্য এমন মাধ্যম গ্রহণ করা যেতে পারে, যা পাপমুক্ত এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর নয়।

এই নীতিমালা আধুনিক জীবনে খুবই প্রাসঙ্গিক। জীবনের ক্লান্তি দূর করে মনকে সতেজ করার জন্য বিনোদন অপরিহার্য। শর্ত হলো, সেই বিনোদন অবশ্যই সীমার মধ্যে থাকতে হবে। এতে যেন কোনোভাবে অশ্লীলতা, মিথ্যাচার, অন্যের অধিকার হরণ বা সময়ের অপচয় না হয়। পরিচ্ছন্ন বিনোদন মানসিক প্রশান্তি দেয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং ইবাদতের জন্য নতুন উদ্যম সৃষ্টি করে। মোটকথা, ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারাকে সমর্থন করে, যেখানে কঠোরতা ও বিনোদন উভয়েরই স্থান রয়েছে।

২. বিনোদনে ভয় দেখান যাবে না

আব্দুর রাহমান ইবনু আবূ লাইলাহ (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, একদা তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সফরে ছিলেন। তাদের এক ব্যক্তি ঘুমিয়ে পড়লে তাদের মধ্যকার কেউ গিয়ে (মজার ছলে) তার সঙ্গের রশি নিয়ে আসলো। তাতে সে ভয় পেয়ে গেলো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কোনো মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমকে ভয় দেখানো বৈধ নয়। সুনানে আবু দাউদ : ৫০০৪

এই হাদীসটি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, রসিকতা বা কৌতুকের ছলেও অন্য কোনো মুসলিমকে ভয় দেখানো বা আতঙ্কিত করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে অবৈধ (হারাম)। সামান্য একটি রশি বা জিনিস লুকিয়ে ফেলায় যদি কোনো ব্যক্তি সাময়িকভাবেও ভয় পায় বা অস্থির হয়ে ওঠে, তবে নবী (ﷺ) তা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাহাবীর উদ্দেশ্য ছিল নিছক মজা করা, কিন্তু এর ফলাফল ছিল অপরজনের ভয় পাওয়া। ইসলাম বিনোদনের ক্ষেত্রে শুধু উদ্দেশ্যকেই নয়, বরং তার প্রভাব ও ফলাফলকেও গুরুত্ব দেয়। যে কৌতুক অন্যের মনে সামান্য হলেও কষ্ট, আতঙ্ক বা উদ্বেগ সৃষ্টি করে, তা বৈধ বিনোদন হতে পারে না।

এই হাদীসটি শিক্ষা দেয় যে, বিনোদন হতে হবে নির্মল এবং নিরাপদ। এমন কোনো কাজ বা কৌতুক, যা দ্বারা মুসলিম ভাইয়ের মনে এক মুহূর্তের জন্যেও ভয় বা আঘাত আসে, তা ইসলামে জায়েয নয়। এটি মুসলিম সমাজের পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান রক্ষার একটি মৌলিক বিধান।

৩. বিনোদনে মজার ছলে মিথ্যা বলা যাবে না

আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا ‏.‏ قَالَ ‏ “‏ إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا ‏”‏

(সাহাবিগণ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ﷺ আপনি তো আমাদের সাথে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেন আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি।  সুনানে তিরমিজি : ১৯৯০, সিলসিলা সহিহাহ : ১৭২৬, মুখতাসার শামাইল ; ২০২।  হাদিসটি সুনানে তিরমিজি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, তার দাদা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি. সেই লোক ধ্বংস হোক যে মানুষদের হাসানোর উদ্দেশ্যে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে। সে নিপাত যাক, সে নিপাত যাক। সুনানে তিরমিজি : ২৩১৫

রাসূল ﷺ কৌতুক বা রসিকতা করাকে সরাসরি অস্বীকার করেননি, বরং তিনি এর একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই সীমা হলো- কৌতুক বা রসিকতার সময়ও মিথ্যা বলা যাবে না। এর অর্থ হলো, নির্মল হাসি-ঠাট্টা বৈধ, কিন্তু মিথ্যা বা বানানো গল্প দ্বারা মানুষকে হাসানো বা মজা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

নবী (ﷺ) ছিলেন সর্বকালের সেরা সত্যবাদী (আস-সাদিক)। তাঁর জীবনধারা থেকে এটি জানা যায় যে, তিনি তাঁর সাহাবীদের সাথে মজা করতেন, কিন্তু তাঁর কৌতুক সব সময়ই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

এই হাদীসদুটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বিনোদন হতে হবে নিষ্কলুষ ও সত্যভিত্তিক। রসিকতা করার সময়ও একজন মুসলিমকে অবশ্যই সত্যের পথ আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে, কারণ মিথ্যা কৌতুকের ছলেই হোক বা গুরুতর ব্যাপারেই হোক, ইসলামে একটি মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ কাজ। একজন মুসলিম তার স্বভাবজাত সত্যবাদিতাকে কোনো অবস্থাতেই বিসর্জন দিতে পারে না।

মুমিনের বিনোদন : প্রথম কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইবাদত ও জীবনের ভারসাম্য ইসলামী জীবনদর্শনে বিনোদন বা মানসিক শান্তি লাভের বিষয়টিকে কখনওই উপেক্ষিত করা হয়নি, বরং এটিকে ইবাদত এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। মুমিনদের জীবন কেবল কঠোর ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈধ ও অর্থবহ বিনোদনের মাধ্যমে তারা মনকে সতেজ করে এবং ইবাদতে নতুন শক্তি সঞ্চার করে। বিনোদনের ইসলামী ধারণা হলো, যা ব্যক্তিকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়, বরং সেই আনুগত্যে আরও উৎসাহী করে তোলে। কুরআন ও হাদীস স্পষ্টভাবে দেখায় যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ এবং তাঁর সাহাবীগণ (রাঃ) এমনভাবে জীবন যাপন করতেন, যেখানে দ্বীন ও দুনিয়ার কাজের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য ছিল। হাসি-ঠাট্টা, খেলাধুলা, প্রকৃতির চিন্তা-ভাবনা এবং দাম্পত্য জীবনের আনন্দ সবকিছুই এই বিনোদনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বিষয়ে ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে, প্রতিটি কাজ, এমনকি বিনোদনও, যদি সঠিক নিয়তে করা হয়, তবে তা ইবাদতে পরিণত হতে পারে। একজন মুমিন যখন বিনোদনের মাধ্যমে তার শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেয়, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে পরবর্তী ইবাদতগুলো আরও মনোযোগ ও শক্তি দিয়ে পালন করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, বিনোদন শুধুমাত্র সময় কাটানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি জীবনের ক্লান্তি দূর করে এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমরা পরবর্তী অংশে কুরআন ও হাদীসের আলোকে মুমিনের জীবনের বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো (যেমন- আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, শরীরচর্চা, বই পড়া, নাশিদ, ভ্রমণ, বাচ্চাদের সাথে খেলা এবং দাম্পত্য জীবনের আনন্দ) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। এসব বিষয়ের মধ্য দিয়ে আমরা দেখব কিভাবে মুমিনের প্রতিটি বৈধ আনন্দও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পথ হতে পারে।

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা বিনোদনের মাঝে ইবাদত

পরিবারের সাথে সময় কাটানো:

শারীরিক খেলাধুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন।

বিনোদন হিসেবে বই পড়া

নাশিদ বা ইসলামিক গান

মাঝে মাঝে পরিবারের সবাই নিয়ে বাইরে যাওয়া

বাচ্চাদের সাথে খেলা

বৈবাহিক সম্পর্কে মাধ্যমে বিনোদন

জীবন্ত প্রাণীর প্রতিনিধিত্বকারী পুতুল ও খেলনা

নবী ﷺ–এর জীবনের হাস্যরস, আনন্দ ও বিনোদন

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পারিবারিক জীবনে বিনোদন

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা বিনোদনের মাঝে ইবাদত

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’আলা তাঁর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনাকে ইবাদতের এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এটি কেবল জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্যই নয়, বরং এটি মানসিক প্রশান্তি ও ঈমান বৃদ্ধির অন্যতম সেরা উপায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اِنَّ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ وَ اخْتِلَافِ الَّیْلِ وَ النَّهَارِ لَاٰیٰتٍ  لِّاُولِی الْاَلْبَابِ ﴿۱۹۰﴾ۚۙ الَّذِیْنَ یَذْکُرُوْنَ اللّٰهَ  قِیٰمًا وَّ قُعُوْدًا وَّ عَلٰی جُنُوْبِهِمْ وَ یَتَفَكَرُوْنَ فِیْ خَلْقِ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ۚ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا ۚ سُبْحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ﴿۱۹۱﴾

নিশ্চয়ই আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে। (বলে) ‘হে আমাদের রব, তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র মহান। সুতরাং তুমি আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা কর’। সূরা আল ইমরান : ১৯০-১৯১

এই সৃষ্টিগুলো নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়। একজন সাধারণ মানুষ এগুলোকে কেবল বিনোদনের বস্তু হিসেবে দেখতে পারে, কিন্তু একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যখন প্রকৃতির মাঝে (যেমন পার্কে বা সমুদ্র সৈকতে) হাঁটেন, তিনি এর পেছনের কারিগরকে খোঁজার চেষ্টা করেন। তিনি এই বিশাল সৃষ্টিজগতের শৃঙ্খলা দেখে বুঝতে পারেন, এর পেছনে একজন মহান স্রষ্টা অবশ্যই আছেন।

এ আয়াতে আল্লাহ সেই জ্ঞানীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তারা কীভাবে প্রকৃতির এই বিনোদনকে ইবাদতে পরিণত করেন?

মানুষ আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন থাকেন না। তারা যখন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন (দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়ে—অর্থাৎ সর্বাবস্থায়), তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকে। তারা শুধু দেখেন না, বরং গভীরভাবে চিন্তা করেন। তারা যখন একটি প্রাণী সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করেন বা প্রকৃতির উপর ডকুমেন্টারি দেখেন, তখন তারা ভাবেন—কীভাবে আল্লাহ এই প্রাণীকে সৃষ্টি করলেন? কীভাবে এই গ্রহ-নক্ষত্র একটি নির্দিষ্ট নিয়মে চলছে?

এই গভীর চিন্তা-ভাবনা তাদেরকে একটি চূড়ান্ত উপলব্ধিতে পৌঁছে দেয়। তারা চিৎকার করে বলে ওঠেন-

رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هٰذَا بَاطِلًا ۚ

“হে আমাদের রব, আপনি এটি উদ্দেশ্যহীনভাবেসৃষ্টি করেননি।”

অর্থাৎ, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। যখন একজন মুমিন এই সত্যটি উপলব্ধি করেন, তখন আল্লাহর প্রতি তার ভালোবাসা ও সম্মান বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তিনি বুঝতে পারেন যে, এই জীবন অর্থহীন নয়। এই উপলব্ধির ফলে তার অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয় এবং তিনি শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করে আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তি কামনা করেন।

সুতরাং, এই আয়াত দুটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা বা প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো নিছক বিনোদন নয়, এটি একটি গভীর ইবাদত যা ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং মানুষকে তার রবের নিকটবর্তী করে।

পরিবারের সাথে সময় কাটানো:

দুনিয়া ও আখিরাতে এর চেয়ে বড় কোনো পুরস্কার ও আনন্দের উৎস নেই, যা নিজের পরিবারের সাথে হাসি-খুশি ও মজার সময় কাটানোর মধ্যে পাওয়া যায়। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ছিলেন একজন আদর্শ পারিবারিক মানুষ এবং এ বিষয়ে তাঁর উৎসাহ অনেক হাদিসেই পাওয়া যায়। নবী (ﷺ) কেবল একজন আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন না, বরং একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও পিতাও ছিলেন। তিনি তাঁর পরিবারের সাথে খেলাধুলা ও কৌতুক করতেন। শিশুরা তাঁকে গল্প বলত এবং তিনি তাদের সাথে খেলে ও হেসে তাদের আনন্দ দিতেন। পরিবারের সদস্যদের সাথে গুণগত সময় কাটানো এবং একসাথে মজা করা পরিবারকে দৃঢ় ও ঘনিষ্ঠ রাখার মূল চাবিকাঠি। এর মাধ্যমে একে অপরের প্রতি গভীর আস্থা ও ভালোবাসা তৈরি হয়, যা পরিবারে শান্তি নিয়ে আসে। প্রকৃত মুসলিমরা তাদের ঘরের ভেতরেই শান্তি ও আনন্দ খুঁজে পান; বাইরের বিনোদনের জন্য পরিবার থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়ার দরকার হয় না।

দুর্ভাগ্যবশত, আধুনিক যুগে এই পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে গেছে। এখন একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যরা কার্যত বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেন। এমনকি তারা একসাথে খাবারও ভাগ করে নেন না। যদি আমরা আমাদের পারিবারিক ঐক্য ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে নবী (ﷺ)-এর দেখানো পথে ‘পারিবারিক সময়’ কাটানোর এই ধারণাটিকে আবার জোরেশোরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পরিবারের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং আনন্দের মাধ্যমে বন্ধন তৈরি করাই হলো একটি সুখী ও শান্তিময় মুসলিম সমাজের ভিত্তি। নিচে এ সম্পর্কিত কিছু হাদিস উল্লেখ করা হলো :

ক. পরিবারের সাথে আনন্দ করা ;

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন-

كُلُّ شَيْءٍ لَيْسَ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَهُوَ لَهْوٌ وَلَعِبٌ إِلَّا أَرْبَعَةً: مِلاَعَبَتُهُ الرَّجُلَ امْرَأَتَهُ، وَتَأْدِيبُهُ فَرَسَهُ، وَمَشْيُهُ بَيْنَ الْغَرَضَيْنِ، وَتَعْلِيمُهُ السِّبَاحَةَ

আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া প্রত্যেকটি জিনিসই নিরর্থক বা খেল-তামাশা, তবে চারটি কাজ ব্যতীত,  পুরুষের তার স্ত্রীর সাথে আনন্দ করা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তীর নিক্ষেপ করা, এবং তাকে সাঁতার শিক্ষা দেওয়া।  সুনানে নাসায়ী : ৩৫৭৬, মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩২৫, তাবারানী : ১৮৯৯৬

খ. পরিবারের জন্য খরচ করা :

আবূ মাসঊদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ

মানুষ স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য পুণ্যের আশায় যখন ব্যয় করে তখন সেটা তার জন্য সাদাকা হয়ে যায়। সহিহ বুখারি : ৫৫, ৪০০৬, ৫৩৫১, সহিহ মুসলিম : ১০০২

সাদ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فَمِ امْرَأَتِكَ

তুমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশে যা-ই ব্যয় কর না কেন, তোমাকে তার প্রতিদান নিশ্চিতরূপে প্রদান করা হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও, তারও।’ সহিহ বুখারি : ৫৬, ১২৯৫, ২৭৪২, ২৭৪৪, ৩৯৩৬, ৪৪০৯, ৫৩৫৪, ৫৬৫৯, ৫৬৬৮, ৬৩৭৩, ৬৭৩৩, সহিহ মুসলিম : ১৬২৮, আহমাদ : ১৫৪৬।

গ. পরিবারের সাথে আমোদ-প্রমোদ করা

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮, আহমাদ : ২৫৬৭৭

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে এক যুদ্ধে ছিলাম। যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে যখন আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম, আমি আমার ধীর গতি উটকে দ্রুত হাঁকালাম। একটু পরেই এক আরোহী আমার পিছনে এসে মিলিত হলেন এবং তাঁর লাঠি দ্বারা আমার উটটিকে খোঁচা দিলেন। এতে আমার উটটি সর্বোৎকৃষ্ট উটেরমত চলতে লাগল যেমনভাবে উৎকৃষ্ট উটকে তোমরা চলতে দেখ। মুখ ফিরিয়ে দেখলাম যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি সদ্য বিয়ে করেছি।

তিনি বললেন, বিয়ে করেছ? বললাম, জি-হ্যাঁ। তিনি বললেন, কুমারী না পূর্ব-বিবাহিতা? আমি বললাম, বরং পূর্ব-বিবাহিতা। তিনি বললেন, কুমারী করলে না কেন? তুমি তার সঙ্গে আমোদ-প্রমোদ করতে আর সেও তোমার সঙ্গে আমোদ-প্রমোদ করত। রাবী বলেন, এরপর আমরা মদিনায় পৌঁছে নিজ নিজ গৃহে) প্রবেশ করতে উদ্যত হলাম, তখন তিনি বললেন, অপেক্ষা কর, সকলে রাতে অর্থাৎ সন্ধ্যায় প্রবেশ করবে, যাতে এলোকেশী নারী চিরুনি করে নিতে পারে এবং অনুপস্থিত স্বামীর স্ত্রী ক্ষুর ব্যবহার করে নিতে পারে। সহিহ বুখারি : ২০৯৭, ২৩০৯, ২৯৬৭, ৪০৫২, ৫০৭৯, ৫০৮০, ৫২৪৫, ৫২৪৭, ৫৩৬৭, ৬৩৮৭ সহিহ মুসলিম : ৭১৫,  মিশকাত : ৩০৮৮, সুনানে আবূ দাঊদ : ২০৪৮, সুনানে নাসায়ী : ৩২১৯, সুনানে তিরমিযী : ১১০০, দারিমী : ২২৬২, ইরওয়া : ১৭৮৫, সহীহ আল জামি : ৪২৩৩।

এই ঘটনাটি প্রকাশ করে যে, নবী ﷺ–এর পারিবারিক জীবন ছিল প্রেম, হাসি ও বন্ধুত্বে ভরপুর।

শারীরিক খেলাধুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন।

শারীরিক খেলাধুলা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত প্রস্তাবিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন। নবী মুহাম্মাদ ﷺ নিজেও দৌড়, ঘোড়দৌড়, কুস্তি, সাঁতার এবং তীরন্দাজিতে অংশ নিতে উৎসাহিত করতেন। শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখা এবং আত্মরক্ষা ও ধর্ম রক্ষায় প্রস্তুত থাকার জন্য খেলাধুলা জরুরি। ইসলাম স্বাস্থ্য রক্ষায় জোর দিলেও এটি করতে হবে সংযমের সাথে। অলসতা ও অতিরিক্ত খাওয়া নিষিদ্ধ হলেও, খেলাধুলায় আগ্রহী নয় এমন কাউকে জোর করা উচিত নয়। আল্লাহ মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন আগ্রহ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, কেউ খেলাধুলা ভালোবাসে, কেউ বা পড়ালেখা, দুটোই গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ না মানুষ তার দেহের যত্ন নেয়।

মুসলিম পিতামাতাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি সন্তানের আগ্রহ ভিন্ন। তাদের ইচ্ছাকে সম্মান করা এবং সে অনুযায়ী সঠিক পথে পরিচালিত করা জরুরি। আগ্রহ নেই এমন কিছুতে জোর করলে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য ও পিতামাতার সাথে তাদের সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে। তাই পারিবারিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ রাখতে এবং সন্তানের সুস্থ বিকাশে তাদের আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ইসলাম মানুষের দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় জীবনের কল্যাণ নিশ্চিত করে। শারীরিক সুস্থতা ও শক্তিমত্তা এই কল্যাণের একটি অপরিহার্য অংশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি এই বিষয়ে মুসলিমদের উৎসাহিত করে।

আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ শক্তিধর ঈমানদার দুর্বল ঈমানদারের তুলনায় আল্লাহর নিকট উত্তম ও অতীব পছন্দনীয়। তবে প্রত্যেকের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে, যাতে তোমার উপকার রয়েছে তা অর্জনে তুমি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা কর। তুমি অক্ষম হয়ে যেও না। এমন বলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তবে এমন হত না। বরং এ কথা বলে যে, আল্লাহ তা’আলা যা নির্দিষ্ট করেছেন এবং যা চেয়েছেন তাই করেছেন। কেননাلَوْ (যদি) শব্দটি শাইতানের (শয়তানের) কর্মের দুয়ার খুলে দেয়। সহিহ মুসলিম : ২৬৬৪

এই হাদিসটি স্পষ্ট করে যে, মুমিনের শক্তি কেবল ঈমানী বা জ্ঞানগত নয়, বরং শারীরিক শক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে কাম্য।শারীরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তাশরীরের শক্তিমত্তা, সুস্থতা এবং নিরাপত্তা বান্দাকে আল্লাহর ইবাদত পালনে সাহায্য করে। নামায, রোযা, হজ্জ, জিহাদ—এই সকল ইবাদত পালনের জন্য শারীরিক সক্ষমতা একান্ত জরুরি। দুর্বল বা অসুস্থ শরীর অনেক নেকীর কাজ থেকে পিছিয়ে দিতে পারে। শারীরিক শক্তি মজলুমকে সাহায্য করতে, শত্রুর মোকাবিলা করতে এবং পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা যখন তালূতকে রাজা নিযুক্ত করেছিলেন, তখন তাঁর গুণাবলীর মধ্যে জ্ঞান ও শারীরিক শক্তি উভয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন-

আর তাদেরকে তাদের নবী বলল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য তালূতকে রাজারূপে পাঠিয়েছেন। তারা বলল, ‘আমাদের উপর কীভাবে তার রাজত্ব হবে, অথচ আমরা তার চেয়ে রাজত্বের অধিক হকদার? আর তাকে সম্পদের প্রাচুর্যও দেয়া হয়নি’। সে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাকে তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে ও দেহে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ যাকে চান, তাকে তাঁর রাজত্ব দেন। সূরা বাকারা : ২৪৭

কারণ, রাজত্বের পূর্ণতা ও সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রজ্ঞা ও তা বাস্তবায়নের দৈহিক শক্তি দুটোই আবশ্যক।

১. শরীয়তসম্মত শরীরচর্চার

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আধুনিককালের মতো প্রচলিত কোনো ‘শরীরচর্চা’ বা ব্যায়ামাগারে অংশ নেননি, তবে তিনি এবং সাহাবীগণ শারীরিক শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কিছু কাজকে উৎসাহিত ও অনুমোদন করেছেন। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের শরীরচর্চার ধরনরা ভিন্ন ছিল। তারা যে সকল কাজের মাধ্যমে শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করতেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: 

ক. কুস্তিতে খেলায় অংশ গ্রহন করা :

আবূ জা’ফার ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু রুকানাহ (রহঃ) থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত। এই রুকানাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মল্লযুদ্ধে ভূপাতিত করেন। রুকানাহ (রাঃ) বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ আমাদের ও মুশরিকদের মাঝে পার্থক্য হলো, টুপির উপর পাগড়ি পরিধান করা। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৭৮

খ. দৌড় প্রতিযোগিতা করা :

আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোন ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সী ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও পাতলা ছিলাম, তখনো মোটা তাজা হইনি। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনের দিকে অগ্রসর হল, তখন তিনি আমাকে বললেন: “এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, অত:পর আমি তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম ও আমি তার উপর বিজয় লাভ করলাম। তিনি সে দিন আমাকে কিছুই বললেন না। যখন আমি শারীরিক দিক দিয়ে মোটা হলাম ও ভারী হলাম, ও তাঁর সাথে কোন এক সফরে বের হলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা যখন সামনে অগ্রসর হল: তখন তিনি আমাকে বললেন: এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, এবারের প্রতিযোগিতায় তিনি আমার আগে চলে গিয়ে হাসতে হাসতে বললেন: আজকের জয় সেই দিনের প্রতিশোধ”। মুসনাদ আহমাদ : ২৬২৭৭, সুনানে নাসায়ি : ৮৯৩৮. ইমাম বায়হাকি : ৮৬২৫

এ হাদিসের আলোক বুঝায় ইসলমি শরীয়তের সীমারেখার মাঝে থেকে শারীরিক খেলাধুলা মাধ্যমে  বিনোদন। করা যায় বিষয়টি এক অনু্চ্ছদে বুঝিয়ে বল।

গ. তীরন্দাজি বা তীর নিক্ষেপ :

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاَعِدُّوۡا لَہُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّمِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡہِبُوۡنَ بِہٖ عَدُوَّ اللّٰہِ وَعَدُوَّکُمۡ وَاٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِہِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَہُمۡ ۚ اَللّٰہُ یَعۡلَمُہُمۡ ؕ وَمَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ یُوَفَّ اِلَیۡکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ

আর তাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত কর, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও, যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আর তোমরা যা আল্লাহর রাস্তায় খরচ কর, তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণ দেয়া হবে, আর তোমাদেরকে যুলম করা হবে না। সুরা আনফাল : ৬০

সালামাহ ইবনু আকওয়া‘ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসলাম গোত্রের একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তারা তীরন্দাজীর প্রতিযোগিতা করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে বনী ইসমাঈল! তোমরা তীরন্দাজী করে দাও। কেননা তোমাদের পূর্বপুরুষ তীরন্দাজ ছিলেন। সুতরাং তোমরাও তীরন্দাজী করে যাও আর আমি অমুক গোত্রের লোকদের সঙ্গে আছি। রাবী বলেন, তাদের এক পক্ষ হাত চালনা হতে বিরত হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমাদের কী হল, তোমরা যে তীরন্দাজী করছ না? তখন তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিভাবে তীর ছুঁড়তে পারি, অথচ আপনি তো তাদের সঙ্গে রয়েছেন। তখন তিনি বললেন, তোমরা তীর ছুঁড়তে থাক, আমি তোমাদের সবার সঙ্গেই আছি। সহিহ বুখারি : ৩৩৭৩, সহিহ বুখারি : ২৮৯৯, ৩৩৭৩, ৩৫০৭

উকবা ইবনু আমির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‏ مَنْ عَلِمَ الرَّمْىَ ثُمَّ تَرَكَهُ فَلَيْسَ مِنَّا أَوْ قَدْ عَصَى

 ব্যক্তি তীর পরিচালনা শিখলো তারপর তার চর্চা ছেড়ে দিল সে আমাদের কেউ না অথবা তিনি বলেছেন, সে পাপ করলো। সহিহ মুসলিম : ১৯১৯

ঘ. সাঁতার কাঁটা :

যদিও নবী (সা.)র নিজের সাঁতার কাটার কোনো কর্ম বর্ণিত নেই, তবে তিনি সাঁতার শেখাকে খেল-তামাশার বাইরে এক উপকারী কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া প্রত্যেকটি জিনিসই নিরর্থক বা খেল-তামাশা, তবে চারটি কাজ ব্যতীত,  পুরুষের তার স্ত্রীর সাথে আনন্দ করা, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তীর নিক্ষেপ করা, এবং তাকে সাঁতার শিক্ষা দেওয়া।  সুনানে নাসায়ী : ৩৫৭৬, মুসনাদে আহমাদ : ১৭৩২৫, তাবারানী : ১৮৯৯৬

ঙ, ঘোড়ায় পড়া ও ঘোড়দৌড় :

আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের জন্যে তৈরি ঘোড়াকে ‘হাফ্য়া’ (নামক স্থান) হতে ‘সানিয়াতুল ওয়াদা’ পর্যন্ত দৌড় প্রতিযোগিতা করিয়েছিলেন। আর যে ঘোড়া যুদ্ধের জন্যে তৈরি নয়, সে ঘোড়াকে ‘সানিয়া’ হতে যুরাইক গোত্রের মাসজিদ পর্যন্ত দৌঁড় প্রতিযোগিতা করিয়েছিলেন। আর এই প্রতিযোগিতায় ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) অগ্রগামী ছিলেন। সহিহ বুখারি : ৪২০, ২৮৬৮, ২৮৬৯, ২৮৭০, ৭৩৩৬, সহহি মুসলিম : ১৮৭০, আহমাদ ৪৪৮৭

উপরোক্ত হাদিসসমূহের আলোকে ইসলামি শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে শারীরিক খেলাধুলার মাধ্যমে বিনোদন গ্রহণের বৈধতা।  আল্লাহর জিকির ব্যতীত অন্য সবকিছুই খেল-তামাশা হিসেবে গণ্য হলেও, নবী ﷺ চারটি কাজকে এর ব্যতিক্রম বলেছেন, যার মধ্যে তিনটি কাজই শারীরিক দক্ষতা ও শক্তির সাথে সম্পর্কিত, ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তীর নিক্ষেপ করা, এবং সাঁতার শিক্ষা দেওয়া। এই হাদিস ইঙ্গিত দেয় যে, যে খেলাধুলা বা কাজ শক্তি সঞ্চয়, প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রস্তুতি, বা জীবনের অপরিহার্য দক্ষতা অর্জনে সহায়ক, তা কেবল নিরর্থক নয়, বরং প্রশংসনীয়। এটি প্রমাণ করে ইসলাম শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখার গুরুত্ব দেয়। বিনোদন হিসেবে শারীরিক প্রতিযোগিতা বা খেলাধুলা ইসলামিক জীবনযাত্রার অংশ হতে পারে, যতক্ষণ না তা শরিয়তের মৌলিক সীমা (যেমন: জুয়া, অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট, ফরজ ইবাদত থেকে গাফেল হওয়া বা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা) লঙ্ঘন করে। এক কথায় বলা যায়, ইসলামি শরিয়ত শারীরিক সুস্থতা, দক্ষতা বৃদ্ধি, এবং স্বাস্থ্যকর বিনোদনের জন্য সহায়ক খেলাধুলাকে উৎসাহিত করে।

২. শরীরচর্চা করার ক্ষেত্রে কিছু বিধান :

ইসলাম শরীরচর্চা, দৌড়, সাঁতার, কুস্তি, তীরন্দাজি, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি খেলাকে উৎসাহ দিয়েছে, কিন্তু তা যেন ইবাদতের মনোভাব ও শরীয়তসম্মত সীমার মধ্যে থাকেভ। নিচে এ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের আলোকে আলোচনা করে হলো :

ক. শরীরচর্চা নেকীর নিয়ত করতে হবে:

শরীরচর্চার উদ্দেশ্য যেন হয় ইবাদতের শক্তি অর্জন করার নিয়তে হয়। এ শরীরচর্চা কারনে আমি সুস্থ থেকে ইবাদতে বেশি মনোযোগী হতে পারব। ইসলাম কাজের নিয়তের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।

অতএব, মুসলিম যখন শরীরচর্চা করে, ইবাদতের শক্তি অর্জন করা (যেমন সালাত, সিয়াম, জিহাদ, হজ, দাওয়াহ ইত্যাদি)। নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব পালন করার মতো সক্ষম হওয়া। মজলুম ও দুর্বলকে সাহায্য করার মতো শক্তি অর্জন করা।

আল্লাহ বলেন:

وَاَعِدُّوۡا لَہُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّمِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡہِبُوۡنَ بِہٖ عَدُوَّ اللّٰہِ وَعَدُوَّکُمۡ وَاٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِہِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَہُمۡ ۚ اَللّٰہُ یَعۡلَمُہُمۡ ؕ

আর তাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত কর, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও, যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন।  সূরা আনফাল : ৬০

শরীরচর্চা ইবাদতের উদ্দেশ্যে করলে তা নিজেই নেকী হয়ে যায়।

খ . শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু না ঘটানো

শরীরচর্চা বৈধ, তবে তা হারাম উপাদানমুক্ত হতে হবে। নিচে কিছু এ সম্পর্কিত কিছু বিধান উল্লেখ করা হলো-

* মুখে চপেটাঘাত করা বা মারধর করা যাবে না। সহিহ মুসলিম : ২৬১২

* শরীয়ত সম্মত পোশাক পরিধান করেতে হবে। সূরা মু’মিনূন : ৫-৬, সুনানে আবু দাউদ : ৪০১৭

* জুয়া বা বাজি ধরে কোন খেলাধুলায় অংশগ্রনহণ করা যাবে না। সূরা মায়িদা : ৯০

* অশালীন আচরণ বা নত হওয়া (সিজদার মতো) হওয়া যাবে না। সহিহ মুসলিম : ৫৩৮৬

গ. কর্তব্য থেকে বিরত না থাকা

খেলাধুলা বা ব্যায়াম যেন আল্লাহর আনুগত্য ও দায়িত্ব থেকে বিক্ষিপ্ত না করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

رِجَالٌ ۙ  لَّا تُلۡہِیۡہِمۡ تِجَارَۃٌ وَّلَا بَیۡعٌ عَنۡ ذِکۡرِ اللّٰہِ وَاِقَامِ الصَّلٰوۃِ وَاِیۡتَآءِ الزَّکٰوۃِ ۪ۙ  یَخَافُوۡنَ یَوۡمًا تَتَقَلَّبُ فِیۡہِ الۡقُلُوۡبُ وَالۡاَبۡصَارُ ٭ۙ

সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর যিক্র, সালাত কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। সূরা নূর : ৩৭

ঘ. সময় বা অর্থ কোনটিই অপচয় করা যাবে না

ইসলাম অপচয় কঠোরভাবে নিষেধ করেছে এমন কি যদি বৈধ কাজেও হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ কর, আর খাও এবং পান কর। তবে অপব্যয় ও অমিতাচার করবেনা, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালবাসেননা। সূরা আরাফ : ৩১

ইসলাম খেলাধুলাকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং আল্লাহর পথে শক্তিশালী হওয়ার উপায় হিসেবে প্রশংসা করেছে। কিন্তু এর সাথে যদি গুনাহ, অপচয়, অহংকার বা দায়িত্বহীনতা জড়িয়ে পড়ে, তবে সেটি আর বিনোদন নয়, বরং গাফিলতির পথ হয়ে যায়। তাই খেলাধুলায় বিপুল অর্থ ব্যয়, বিলাসবহুল জিম, দেহ প্রদর্শনী, বা অপ্রয়োজনীয় সাজসজ্জা—এসব ইসলাম অনুমোদন করে না। বরং পরিমিত ব্যয় ও উদ্দেশ্যমূলক শরীরচর্চাই প্রশংসনীয়।

৩. পেশাদার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা”-

পেশাদার ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বলতে সেই ধরনের খেলাধুলাকে বোঝায় যেখানে অংশগ্রহণকারীরা (খেলোয়াড় বা দল) খেলাকে কেবল বিনোদন বা শখের মাধ্যম হিসেবে না দেখে, বরং এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা বা জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে এবং এর মাধ্যমে পারিশ্রমিক ও আর্থিক সুবিধা লাভ করে। আধুনিক বিশ্বে, এটি একটি বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য, স্পন্সরশিপ, মিডিয়া স্বত্ব এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য দর্শকের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়। এই প্রতিযোগিতাগুলি সাধারণত সর্বোচ্চ স্তরের শারীরিক দক্ষতা, কৌশল এবং পারফরম্যান্সের মানদণ্ড তুলে ধরে। যদিও খেলাধুলা হিসেবে এটি শারীরিক সুস্থতা ও বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে, তবে পেশাদার স্তরে পৌঁছানোর পর এর সাথে যে বাণিজ্যিকীকরণ, বিপুল পরিমাণ সময় ব্যয় এবং সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক দিক যুক্ত হয়, তা অনেক সময় ইসলামিক জীবনদর্শনের মূলনীতি ও নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, যে কারণে বহু আলেম এর অতি আসক্তি বা মনোযোগ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেন। নিচে এ সম্পর্কি তিনটি কার উল্লেখ করা হলো :

ক. সময় নষ্ট:

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে যে কোনো পেশাদার খেলার ভক্তরা তারা দেখতে পারে এমন প্রতিটি ম্যাচ দেখে তাদের জীবনের অনেক ঘন্টা নষ্ট করে। এটি আল্লাহ তায়ালা এবং অন্য লোকেদের প্রতি তাদের কর্তব্যে অবহেলা করে। এই ধরনের লোকেরা প্রায়শই একটি ইসলামিক অনুষ্ঠানের চেয়ে একটি ম্যাচ দেখতে পছন্দ করে, যা একজন মুমিনের মনোভাব নয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَ الْعَصْرِ ۙ﴿۱﴾ اِنَّ  الْاِنْسَانَ لَفِیْ خُسْرٍ ۙ﴿۲﴾ اِلَّا  الَّذِیْنَ  اٰمَنُوْا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ وَ تَوَاصَوْا بِالْحَقِّ ۬ۙ  وَ تَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ﴿۳﴾

সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে, তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে।”

সূরা আসর : ১–৩

আল্লাহ তাআলা সময়ের কসম খেয়েছেন কারণ সময়ই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যে ব্যক্তি সময় নষ্ট করে অকারণে, সে প্রকৃত অর্থে ক্ষতির মধ্যে আছে। অতএব ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু খেলা দেখা, তাতে কোনো উপকার বা দীনী কল্যাণ না থাকলে। এটি “লাহও” (অর্থহীন ব্যস্ততা)-এর অন্তর্ভুক্ত।

আবূ বারযা আল-আসলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন বান্দার পদদ্বয় (কিয়ামত দিবসে) এতটুকুও সরবে না, তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে? কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কি কি কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৭

অর্থাৎ সময় নষ্ট করা শুধু দুনিয়ার ক্ষতি নয়, বরং আখিরাতেও জবাবদিহির কারণ।

খ. জ্ঞানের অপচয়:

ক্রীড়া ভক্তরা তাদের প্রিয় দলগুলির অনেক খেলোয়াড়ের নাম এবং জীবন কাহিনী জানতে আগ্রহী হয়, তবুও এই অকেজো তথ্য নিয়ে তাদের ব্যস্ততার কারণে—যা তাদের এই জগতেও উপকার করবে না, পরকালের কথা তো বাদই দিন, এই ধরনের লোকেরা ইসলামিক জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। এটি সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং হারাম।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

“বলুন, যারা জানে ও যারা জানে না, তারা কি সমান?”

সূরা আজ-যুমার (৩৯:৯)

ইসলাম সেই জ্ঞানকে সম্মান দিয়েছে যা মানুষকে আল্লাহর পরিচয়, নিজের দায়িত্ব ও পরকাল সম্পর্কে সচেতন করে। কিন্তু যে জ্ঞান কেবল অপকারজনক বা অর্থহীন বিনোদনের বিষয়। যেমন- খেলোয়াড়দের নাম, পরিসংখ্যান বা ক্লাবের খবর  তা কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না।

যায়দ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তোমাদের নিকট তেমনই বলব যেমনটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেন-

হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পানাহ চাই অপারগতা, অলসতা, ভীরুতা, বখিলতা, বার্ধক্যতা এবং কবরের শাস্তি থেকে। হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে পরহেযগারিতা দান করুন এবং একে সংশোধন করে দিন। আপনি একমাত্র সর্বোত্তম সংশোধনকারী এবং আপনিই একমাত্র তার মালিক ও আশ্রয়স্থল। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পানাহ চাই এমন ইলম হতে যা কোন উপকারে আসবে না ও এমন অন্তঃকরণ থেকে যা আল্লাহর ভয়ে ভীত হয় না; এমন আত্মা থেকে যা কক্ষনও তৃপ্ত হয় না। আর এমন দু’আ থেকে যা কবুল হয় না। সহিহ মুসলিম : ২৭২২

অতএব, ক্রীড়া জগতের নিছক তথ্য মুখস্থ করা বা তাতে মগ্ন থাকা, এটি সেই “অকল্যাণকর জ্ঞান”-এর অন্তর্ভুক্ত, যেটি নবী ﷺ নিজে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।

গ. নায়ক পূজা

পেশাদার খেলার কিছু ভক্ত তাদের প্রিয় খেলোয়াড়দের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করতে শুরু করে এবং তারা তাদের নকল করার এবং শ্রদ্ধার চেষ্টা করে। এটি নায়ক পূজার দিকে পরিচালিত করে, যার মধ্যে ইসলামের নায়কদের এবং এমনকি নবী ﷺ-এর চেয়েও ক্রীড়া খেলোয়াড়ের (সাধারণত অবিশ্বাসীদের) প্রতি বেশি শ্রদ্ধা পোষণ করা হয় এবং এই কারণে অনেক পাপ সংঘটিত হয়। এই ধরনের লোকেরা নবী ﷺ-কে অনুকরণ করার চেয়ে তাদের প্রিয় ক্রীড়া খেলোয়াড়দের অনুকরণ করতে বেশি পছন্দ করবে, যা চরম অসম্মান এবং কুফরের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অথচ ভালোবাসা ও অনুসরণের একমাত্র দাবিদান আমদের প্রিয় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।

যখন কেউ কোনো খেলোয়াড় বা সেলিব্রিটিকে এমন ভালোবাসে, যে তার জীবনযাপন, স্টাইল, কথা, এমনকি চিন্তাও অনুকরণ করতে থাকে, তখন সেটি শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম কাজ হবে।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

অর্থাৎ মুসলিম যদি অবিশ্বাসী বা নাস্তিক খেলোয়াড়দের স্টাইল, পোশাক, কথাবার্তা বা আচরণ অনুকরণ করে, তাহলে সে তাদের পথেই চলেছে, যা ঈমানের জন্য ভয়াবহ হুমকি।

বিনোদন হিসেবে বই পড়া

বই পড়া মানব জীবনের এক মহৎ অভ্যাস। এটি শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং মননশীল বিনোদনেরও এক উত্তম রূপ। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন বিনোদনই প্রশংসনীয়, যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ না করে বরং জ্ঞান, চিন্তা ও আত্মসমালোচনার দিকে আহ্বান জানায়। যে কোনো কিছু যা মুসলিমদের উপকার করে এবং তাদের আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে আসে, অথবা বিজ্ঞানের কোনো দিক থেকে তাদের উপকার করে, তা ইসলামে প্রস্তাবিত, যতক্ষণ এটি নিষিদ্ধ বিষয়বস্তু থেকে মুক্ত থাকে। কুরআন এমন গল্পে পূর্ণ যাতে অনেক শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের অবহিত করেছেন-

لَقَدۡ کَانَ فِیۡ قَصَصِہِمۡ عِبۡرَۃٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ ؕ  مَا کَانَ حَدِیۡثًا یُّفۡتَرٰی وَلٰکِنۡ تَصۡدِیۡقَ الَّذِیۡ بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَتَفۡصِیۡلَ کُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ 

তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোন বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হিদায়াত ও রহমত ঐ কওমের জন্য যারা ঈমান আনে। সুনা ইউসুফ : ১১১

এই আয়াত থেকে, আমরা বুঝতে পারি যে ইসলামের গল্পগুলি কেবল ঐতিহাসিক মূল্যের জন্য শেখা উচিত নয়, বরং তাদের শিক্ষার জন্য বিশ্লেষণ করা উচিত। আমরা এই আয়াত থেকে আরও অনুমান করতে পারি যে যে কোনো গল্প যা থেকে একজন ব্যক্তি উপকার পেতে পারে।

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফারয। অপাত্রে জ্ঞান দানকারী শুকরের গলায় মণিমুক্তা ও সোনার হার পরানো ব্যাক্তির সমতুল্য।  সুনানে ইবনু মাজাহ : ২২৪, মিশকাত : ২১৮

সুতরাং, যে বই পড়া মানুষকে জ্ঞান, চরিত্র, নৈতিকতা, ইতিহাস, সভ্যতা, বিজ্ঞান, সমাজ ও আত্মোন্নয়নের পথে চালিত করে, তা ইসলামে প্রশংসনীয়। এটি এমন এক বিনোদন, যা মনকে বিশ্রাম দেয়, চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।

অবশ্য ইসলামে “বিনোদন” বলতে শুধু হাসি-আনন্দ নয়, বরং ক্লান্ত মনকে সতেজ করে পুনরায় কল্যাণের পথে ফিরিয়ে নেওয়াই উদ্দেশ্য। বই পড়া ঠিক তেমনই এক প্রশান্তিকর বিনোদন। একজন মুসলিম যখন কুরআনের তাফসির, নবীর জীবনী, সাহাবিদের ঘটনা, বা নৈতিক গল্প পড়ে—তখন তার হৃদয় প্রশান্ত হয়, ঈমান বৃদ্ধি পায়, এবং মন কল্যাণের দিকে ধাবিত হয়।

কুরআনের কাহিনী পাঠ করা ও শিক্ষা গ্রহণ করা :

আমরা যে জ্ঞান (কুরআনের) অর্জন করি, তার মহত্ত্ব আমাদের সাধারণ ভাবনার চেয়েও বহু গুণে বেশি। এর প্রধান কারণ হলো, এই জ্ঞান কোনো সাধারণ গ্রন্থ থেকে আসেনি, বরং এটি এমন একটি অলৌকিক মু’জিযা যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে আরব জাতির কাছে প্রেরণ করেছেন।

কুরআনের জ্ঞান অর্জন করা মানে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিধান জানা নয়, বরং আল্লাহর সেই চিরন্তন মু’জিযা ও অলংকারপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা, যা মানবজাতির সেরা সাহিত্যিকদেরও হতভম্ব করে দিয়েছে। এই জ্ঞানের মহত্ত্ব সীমাহীন, কারণ এর উৎস এবং এর সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব উভয়ই মানুষের কল্পনার ঊর্ধ্বে। এটি আমাদের চিন্তা ও মননশীলতার সর্বোচ্চ বিকাশের পথ দেখায়। কুরআন মাজিদ তার অলৌকিক সাহিত্যমান, শব্দচয়ন এবং অর্থ সঞ্চালনের মাধ্যমে আরবের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের অক্ষম প্রমাণ করেছে। এই গ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নবী-রাসূলদের কাহিনি। কুরআনি এই গল্পগুলো কখনোই কেবল বিনোদন বা সময় কাটানোর জন্য নয়; বরং এর প্রধান লক্ষ্য হলো সত্যের পথে দাওয়াত দেওয়া এবং মুমিনদের দীক্ষাদান করা। এই কাহিনিগুলো শুধু ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নয়, বরং এগুলি হলো উপদেশ, অনুপ্রেরণা এবং ঈমানকে মজবুত করার এক শক্তিশালী উৎস। নবী-রাসূলদের কাহিনি বার বার উল্লেখ করার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মূলত মানবজাতিকে কতগুলো মৌলিক শিক্ষা প্রদান করে। 

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

لَقَدۡ کَانَ فِیۡ قَصَصِہِمۡ عِبۡرَۃٌ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ ؕ  مَا کَانَ حَدِیۡثًا یُّفۡتَرٰی وَلٰکِنۡ تَصۡدِیۡقَ الَّذِیۡ بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَتَفۡصِیۡلَ کُلِّ شَیۡءٍ وَّہُدًی وَّرَحۡمَۃً لِّقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ 

তাদের এ কাহিনীগুলোতে অবশ্যই বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, এটা কোন বানানো গল্প নয়, বরং তাদের পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ। আর হিদায়াত ও রহমত ঐ কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।

নোট : কুরআনের গল্পগুলো নিছক অতীত ইতিহাস নয়, বরং গভীর উপদেশ সমৃদ্ধ। এই কাহিনিগুলো আমাদেরকে অতীত উম্মতদের সফলতা ও ব্যর্থতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে শেখায়। যারা বুদ্ধিমান তারা কেবল গল্প শুনেই ক্ষান্ত হয় না, বরং তা থেকে জীবনের জন্য কার্যকর শিক্ষা গ্রহণ করে। নবিদের জীবন থেকে আমরা জানতে পারি, কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরতে হয়, কীভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হয় এবং কীভাবে সমাজের কুসংস্কার ও শিরকের বিরুদ্ধে একাকী সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। এই শিক্ষাই মুমিনদের চলার পথের পাথেয়।

কুরআনের এ কাহিনীগুলো মুমিনের অন্তরের বিশ্বাসকে আরও মজবুত করে। কুরআনে কারিমের এ মর্মে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَکُلًّا نَّقُصُّ عَلَیۡکَ مِنۡ اَنۡۢبَآءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِہٖ فُؤَادَکَ ۚ وَجَآءَکَ فِیۡ ہٰذِہِ الۡحَقُّ وَمَوۡعِظَۃٌ وَّذِکۡرٰی لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ

আর রাসূলদের এসকল সংবাদ আমি তোমার কাছে বর্ণনা করছি যার দ্বারা আমি তোমার মনকে স্থির করি আর এতে তোমার কাছে এসেছে সত্য এবং মুমিনদের জন্য উপদেশ ও স্মরণ। সূরা হূদ : ১২০

নোট : নবি মুহাম্মাদ (ﷺ) যখন দাওয়াতের কঠিন সময়ে ছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা পূর্ববর্তী নবিদের কষ্টের কাহিনি তাঁকে শুনিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নবিজির (ﷺ) অন্তরকে মজবুত করা তিনি যখন জানতেন যে, নূহ (আঃ) প্রায় হাজার বছর দাওয়াত দিয়েও সামান্য মানুষ পেয়েছেন, বা ইবরাহীম (আঃ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, তখন তাঁর নিজের দুঃখ-কষ্ট সহনীয় মনে হতো। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, নবিদের কাহিনি ঈমানদারদের মানসিক শক্তি ও ধৈর্য বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

এ কাহিনীগুলো তুলে ধরার অন্যতম লক্ষ হলো বান্দার মনে চিন্তার উদ্রেক ঘটায়। যে চিন্তার মাধ্যমে সে ইহকাল ও পরকালে সফল্য অর্জন করবে। তাই আল্লাহ নবিদের কাহিনীগুলো বার বার তুলে ধরার কারন সম্পর্কে বলেন-

ۚ فَاقۡصُصِ الۡقَصَصَ لَعَلَّہُمۡ یَتَفَکَّرُوۡنَ

তুমি কাহিনী বর্ণনা করে শোনাতে থাক, হয়তো তারা এটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে। সূরা আরাফ : ১৭৬

নোট: এই আয়াতটি স্পষ্ট করে যে, নবিদের কাহিনি বর্ণনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পাঠকের মধ্যে গভীর চিন্তার উদ্রেক করা। চিন্তা (তাফাক্কুর) হলো ইবাদতের অন্যতম উচ্চ স্তর। মুমিনরা যেন কাহিনির মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমতা, তাঁর দয়া, তাঁর শাস্তি এবং তাঁর সৃষ্টির রহস্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। এই চিন্তা মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী করে তোলে এবং তাকে সঠিক পথে চলতে উৎসাহিত করে।

কাহিনী থেকে শিক্ষা নেওয়ার অন্যতম করান হলে, এ কাহিনীতের যার সাথে তার কর্মের কারনে যে আজাব-গজর বা শান্তির ফয়সালা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বন্দার কর্মের কারনে ঠিক তেমন ফয়সালা করা হবে। এ কারনে আল্লাহ বলেছেন, নবিদের কাহিনিতে কোনো মিথ্যা বা বানোয়াটের লেশ নেই। তিনি ইরশাদ করেন-

اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ  لَیَجۡمَعَنَّکُمۡ اِلٰی یَوۡمِ الۡقِیٰمَۃِ لَا رَیۡبَ فِیۡہِ ؕ  وَمَنۡ اَصۡدَقُ مِنَ اللّٰہِ حَدِیۡثًا 

আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। অবশ্যই তিনি তোমাদেরকে একত্র করবেন কিয়ামতের দিনে। এতে কোন সন্দেহ নেই। আর কথায় আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কে? সূরা নিসা : ৮৭

নোট: কুরআনে বর্ণিত প্রতিটি কাহিনি নিঃসন্দেহে সত্য। এই কাহিনিগুলো মানুষের তৈরি কিংবদন্তি বা উপকথা নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কর্তৃক বর্ণিত সত্য ঘটনা। অন্যান্য গ্রন্থের বা মানুষের গল্পের মাঝে ভুল বা মিথ্যা মিশ্রিত থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহর বাণীতে কোনো ভুল বা মিথ্যা নেই। এই সত্যতা কুরআনের কাহিনিগুলোকে ঐতিহাসিক গুরুত্বের ঊর্ধ্বে এক ঐশী নির্ভরযোগ্যতা দেয়, যা মুমিনদের মনে এর শিক্ষা ও উপদেশের প্রতি গভীর বিশ্বাস জন্মায়।

অতএব, ইসলামি দৃষ্টিতে বই পড়া এমন এক প্রশংসনীয় বিনোদন, যা জ্ঞান বৃদ্ধি করে, আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং চিন্তাকে নির্মল করে। এটি সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার, যা ইবাদতের প্রস্তুতি হিসেবেও গণ্য হতে পারে, যদি উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জ্ঞানের প্রসার।

পাঠযোগ্য ও বর্জনীয় গ্রন্থ সম্পর্কে ধারণা :

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা এবং এটি তার অনুসারীদের কেবল ইবাদত-বন্দেগীতে সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞান অর্জন ও সুস্থ বিনোদনেও উৎসাহিত করে। বই পড়া এই দু’টিরই অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে একজন মুসলিমকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, বিনোদন বা জ্ঞানার্জন যাই হোক না কেন, তা যেন আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার মধ্যে থাকে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, উপকারী বই হলো সেই জ্ঞানভাণ্ডার যা পাঠককে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়, তার নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে সহায়তা করে, ইতিহাস ও বিজ্ঞান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেয়, অথবা জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। নবী-সাহাবীদের জীবনী, সিরাত গ্রন্থ, নৈতিকতা বিষয়ক বই এবং সমাজ ও ফিকহ সম্পর্কিত রচনাগুলো এই শ্রেণিতে সর্বাগ্রে স্থান পায়।

এর বিপরীতে, এমন সব ক্ষতিকর বই সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয় যা সরাসরি ঈমান বা নৈতিকতার ওপর আঘাত হানে। এর মধ্যে রয়েছে কুফরি, নাস্তিকতাবাদী ও ইসলাম-বিদ্বেষী রচনা; যৌন উত্তেজক ও অশ্লীল সাহিত্য; ভিত্তিহীন পৌরাণিক গল্প বা শিরক মিশ্রিত উপন্যাস। একইভাবে, বিদ’আতি বা ভ্রান্ত ফিরকার প্রচারমূলক এবং জ্যোতিষশাস্ত্র ও ভাগ্য গণনার বইগুলোও পরিত্যাজ্য। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, ক্ষতিকরকে এড়িয়ে কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তার জীবনকে উন্নত করা। নিচে বুঝার জন্য বইয়ের একটি তালিকা করে দিলাম।

বিনোদন হিসেবে উপকারি বই-

১. জীবনী এবং সিরাত গ্রন্থ

২. ভ্রমন কাহিনী সম্পর্কিত বই

৩. বিজ্ঞান ও আবিস্কার সম্পর্কিত বই

৪. সত্যকাহিনী নির্ভর বই

৫. নবী ও সাহাবিদের জীবনীভিত্তিক বই

৬. নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনমূলক বই

৭. পরিবার ও সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক ফিকহ

৮. ইতিহাস ও সভ্যতা বিষয়ক বই

৯. ইসলামি চিন্তাধারা ও দাওয়াতমূলক বই

১০. ভৌগলিক জ্ঞান সম্পর্কি বই

১১. কবিতা, সাহিত্য ও প্রজ্ঞামূলক রচনা (ইসলামসম্মত)

বিনোদন হিসেবে অপকারি বই-

১. কুফরি ও নাস্তিকতাবাদী বই,

২. বিদ‘আতিদের লিখিত বই,

৩. জাদু ও ভাগ্যবিশ্বাসমূলক বই,

৪. দুনিয়ামুখী ও ভোগবাদী বই,

৫. বিবাহপূর্ব প্রেম সম্পর্কিত উপন্যাস

৬. যৌন উত্তেযোগ বা অশ্লীল বই

৭. ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী

৮. পূনানিক গ্রন্থের বস্তপড়া গল্প

৯. পাশ্চাত্যের শিরক মিশ্রিত উপন্যাস

১০. ইসলাম-বিদ্বেষী ও ধর্মদ্রোহী (Atheistic) রচনা    

১১. ভ্রান্ত ও বাতিল ফিরকার প্রচারমূলক বই

১২. জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্য গণনা ও কুসংস্কার ভিত্তিক বই

১৩. অতিরিক্ত হিংসা, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ প্রচারকারী বই

মুমিনের বিনোদন : দ্বিতীয় কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

নাশিদ বা ইসলামিক গান

বর্তমানে সাধারণ গান বা সঙ্গীত এতটাই জনপ্রিয় যে, মুসলমানদের জন্য এর একটি ইসলামি বিকল্প থাকা অত্যন্ত জরুরি। গান মানুষের মনের ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলার ক্ষমতা আছে। তাই আমাদের উচিত এমন নাশিদ বা গান শোনা, যা আমাদের একজন ভালো মুসলিম হতে উৎসাহ জোগায় এবং ইসলামি শিক্ষা ও নৈতিকতা ছড়িয়ে দেয়। অশ্লীল বা খারাপ বার্তা প্রচার করে এমন আধুনিক গান শোনা থেকে আমাদের বিরত থাকা দরকার।

আলহামদুলিল্লাহ, এখন নাশিদ শিল্প অনেক উন্নতি লাভ করেছে। তবে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, অনেক গায়ক তাদের নাশিদে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করছেন। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে গান শোনা হারাম। তাই আমাদের পরামর্শ হলো:

১. বাদ্যযন্ত্র ছাড়া তৈরি নাশিদ বা গজল শোনাকে অগ্রাধিকার দিন।

২. যে নাশিদগুলি নিশ্চিতভাবে অনুমোদিত এবং ইসলামের সীমার মধ্যে থাকে, সেগুলিতেই মনোযোগ দিন। ৩. শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ভালো নাশিদ শোনার অভ্যাস করানো উচিত। এর ফলে তারা শৈশব থেকেই ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং সঠিকভাবে আমলকারী মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত হবে।

সুস্থ ও নিরাপদ বিনোদনের জন্য ইসলামি গান বা নাশিদ একটি চমৎকার মাধ্যম, তবে এটি অবশ্যই শরিয়তের নিয়ম মেনে বাদ্যযন্ত্র মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

১. গান গাওয়ার সময় দফ বা একপাশ খোলা ঢোল ব্যবহারের অনুমতির

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন তখন আমার নিকট দু’টি মেয়ে বু‘আস যুদ্ধ সংক্রান্ত গান গাইছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং চেহারা অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখলেন। এ সময় আবূ বকর (রা.) এসে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানী বাদ্যযন্ত্র (দফ) বাজান হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট! তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, তাদের ছেড়ে দাও। অতঃপর তিনি যখন অন্য দিকে ফিরলেন তখন আমি তাদের ইঙ্গিত করলাম আর তারা বেরিয়ে গেল। সহিহ বুখারি : ৯৪৯, ৯৫২, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, সহিহ মুসলিম : ৮৯২

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। আবূ বকর (রা.) তাঁর নিকট এলেন। এ সময় মিনার দিবসগুলোর (জিলহজ মাসের ১১, ১২, এবং ১৩ তম দিন) এক দিবসে তাঁর নিকট দু’টি মেয়ে দফ বাজাচ্ছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর আবৃত অবস্থায় ছিলেন। তখন আবূ বকর (রাযি.) মেয়ে দু’টিকে ধমক দিলেন। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখমণ্ডল হতে কাপড় সরিয়ে নিয়ে বললেন, হে আবূ বকর! ওদের বাধা দিও না। কেননা, এসব ‘ঈদের দিন। আর সে দিনগুলো ছিল মিনার দিন। সহিহ বুখারি : ৯৮৭

রুবায়ই বিনতু মু‘আওয়িয (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আমার বাসর রাতের পরদিন সকালে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন এবং তুমি (খালিদ ইবনু যাকওয়ান) যেমন আমার কাছে বসে আছ ঠিক সেভাবে আমার পাশে আমার বিছানায় এসে বসলেন। তখন কয়েকজন ছোট বালিকা দুফ বাজিয়ে বদরে নিহত শহীদ পিতাদের প্রশংসা গীতি আবৃত্তি করছিল। শেষে একটি বালিকা বলে উঠল, আমাদের মাঝে এমন একজন নবী আছেন, যিনি জানেন, আগামীকল্য কী হবে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন কথা বলবে না, বরং আগে যা বলেছিলে তাই বল। সহিহ বুখারি : ৪০০১, ৫১৪৭

নোট : একমুখ খোলা অপর প্রান্তে চামড়া লাগানো তবলাকে দফ বলা হয়, বিবাহ ও ‘ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশের জন্য তা বাজিয়ে নাবালিকা মেয়েদের আপত্তিকর কথা বিবর্জিত গীত গাওয়া নিঃসন্দেহে বৈধ।

২. সফরের সময় গান গাওয়া

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সফরে ছিলেন। তাঁর আনজাশা নামে এক গোলাম ছিল। সে হুদী গান গেয়ে উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে বললেনঃ হে আনজাশা! তুমি ধীরে উট হাঁকাও, যেহেতু তুমি কাঁচপাত্র তুল্যদের (আরোহী) উট হাঁকিয়ে যাচ্ছ। আবূ কিলাবাহ বর্ণনা করেন, কাঁচপাত্র সদৃশ শব্দ দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীলোকদেরকে বুঝিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২২১০, ৬২১১

সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে খায়বারের পথে রওয়ানা হলাম। তখন তাদের এক ব্যক্তি বলল, হে আমির! তোমরা আমাদেরকে উট চালনার কিছু গান শোনাও। সে তাদেরকে তা গেয়ে শোনাল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চালকটি কে? তারা বলল, আমির। তিনি বললেন আল্লাহ্ তাকে রহম করুন। সহিহ বুখারি : ৬৮৯১ আংশিক

সফরে উট চালনার জন্য সাহাবীগন রাঃ নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে গান গেয়েছেন। কাজেই হাদিসে বর্ণিত পরিবেশ ও পরিস্থিতি হলে গান গাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্র আমাদের দেশের কর্মজীবি বা মাঝি মাল্লাগণ বাদ্যযন্ত্র, শির্কি  ও অশ্লীল কথা বিহীন যে গান গায় তার সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

ইসলামে গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিধান

সুফি নামধারী অনেক মুসলিম গান ও বাদ্যযন্ত্রকে ইসলামি শরীয়তের অংশ মনে করে থাকে। তারা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে গান গায়। তারা জিকির করার সময়ও বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে। এমনকি তারা গানের জন্য আসর বসায়। অনেক মুরিদ গানকে ইসলামি শরীয়তের অংশ মনে করে গানের জলসা বা মাহফিল দেয়ার  মানত করে। অথচ ইসলাম এগুলোকে সুস্পষ্টভাবে হারাম বলে ঘোষণা করেছে।

১. বাদ্যযন্ত্রসহ গান হারাম :

আল্লাহ তায়ারা বলেন-

اَفَمِنْ هٰذَا  الْحَدِیْثِ  تَعْجَبُوْنَ ﴿ۙ۵۹﴾ وَ تَضْحَکُوْنَ  وَ لَا  تَبْکُوْنَ ﴿ۙ۶۰﴾ وَ اَنْتُمْ  سٰمِدُوْنَ ﴿۶۱﴾

তাহলে কি এসব কথা শুনেই তোমরা বিস্ময় প্রকাশ করছো? হাসছো কিন্তু কাঁদছো না? অথচ তোমরা সঙ্গীত বা গান-বাজনা করছো? সূরা নাজম : ৫৯-৬১

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ٭ۖ وَّیَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ

আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা (গান) খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব। সুরা লোকমান : ৬

আবূ উমামা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গায়িকা বিক্রয় কর না, ক্রয়ও কর না এবং তাদেরকে গানের প্রশিক্ষণও দিও না। এদের ব্যবসায়ের মধ্যে কোনরকম কল্যাণ নেই এবং এদের বিনিময় মূল্য হারাম। এই আয়াত এ ধরণের লোকদের বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে-

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ ٭ۖ وَّیَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ

মানুষের মধ্যে কিছু এমন ধরণের লোকও আছে, যে মন ভুলানো কথা ক্রয় করে আনে, যেন আল্লাহ তা’আলার পথ হতে লোকদেরকে তাদের অজান্তেই বিভ্রান্ত করতে পারে এবং আল্লাহ্ তা’আলার পথকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। এই ধরণের লোকদের জন্য আছে কঠিন ও অপমানজনক শাস্তি। সূরা লোকমান : ৬।  সুনানে তিরমিজি : ১২৮২, সহিহাহ : ২৯২২

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَاسۡتَفۡزِزۡ مَنِ اسۡتَطَعۡتَ مِنۡہُمۡ بِصَوۡتِکَ وَاَجۡلِبۡ عَلَیۡہِمۡ بِخَیۡلِکَ وَرَجِلِکَ وَشَارِکۡہُمۡ فِی الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَوۡلَادِ وَعِدۡہُمۡ ؕ وَمَا یَعِدُہُمُ الشَّیۡطٰنُ اِلَّا غُرُوۡرًا

তোমার কণ্ঠ (গান) দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো প্ররোচিত কর, তাদের উপর ঝাপিয়ে পড় তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে এবং তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে অংশীদার হও এবং তাদেরকে ওয়াদা দাও’। আর শয়তান প্রতারণা ছাড়া তাদেরকে কোন ওয়াদাই দেয় না। সুরা ইসরা : ৬৪

মুআবিয়া (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতম করা, মূর্তি বা ছবি, হিংস্র জন্তুর চামড়া, নগ্নতা ও পর্দাহীনতা, গান, শোনা ও রেশমকে (পুরুষের) নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। হাদিস সম্ভার : ২৩০৬, আহমাদ : ১৬৯৩৫, ত্বাবারানী : ১৬২৪০-১৬২৪১, সহীহুল জামে : ৬৯১৪

২. গানে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হারাম :

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘অবশ্যই আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য মদ, জুয়া, ঢোল-তবলা এবং বীণা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে হারাম করেছেন।’’ হাদিস সম্ভার ২৩১০, আহমাদ : ৬৫৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ১৭০৮

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

৩. গায়িকা দ্বারা ব্যবসা করা হারাম :

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুর বিক্রির মূল্য ও গান গায়িকাদের উপার্জন গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। মিশকাত : ২৭৭৯, শারহুস সুন্নাহ : ২৯৩৮, সহীহাহ : ৩২৭৫। আলবানী (রহ.) হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।

৪. শিরকি কথামালা দ্বারা গান গাওয়া যাবে না :

মুআওব্বিয কন্যা রুবাই (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি সকালে আমার ঘরে এলেন। আমার কাছে তুমি (খালিদ ইবনু যাকওয়ান) যেভাবে বসে আছ, তিনি আমার বিছানায় ঠিক সেভাবে বসলেন। আমাদের বালিকারা এমন সময়ে দফ বাজিয়ে বদরের যুদ্ধের শহীদ হওয়া আমার বাপ-দাদার শোকগাথা গাইছিলো। তাদের কোন একজন গাইতে গাইতে বলল, “আমাদের মাঝে একজন নবী আছেন। আগামী কাল কি হবে তা তিনি জানেন।” তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে বললেনঃ “এরূপ বলা হতে বিরত থাক, বরং তাই বল এতক্ষণ যা বলতেছিলে। সুনানে তিরমিযী ১০৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯২২

৫. গানের শান্তি দুনিয়াতে

বর্তমানে গান ও বাদ্যযন্ত্রের বিশাল বাজার তৈরী হয়েছে যাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, এর সকল উপার্জন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিস অনুযায়ী সম্পূর্ণভাবে হারাম।

আবূ মালেক আল-আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার উম্মাতের কতক লোক মদের ভিন্নতর নামকরণ করে তা পান করবে। (তাদের পাপসক্ত অবস্থায়) তাদের সামনে বাদ্যবাজনা চলবে এবং গায়িকা নারীরা গীত পরিবেশন করবে। আল্লাহ তা’আলা এদেরকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন। সুনানে  ইবনে মাজাহ : ৪০২০, সুনানে আবূ দাউদ : ৩৬৮৮, আহমাদ : ২২৩৯৩, মিশকাত : ৪২৯২, সহীহাহ : ১৩৮-১৩৯

৬. কুরআন হাদিসের আলোকে গান বাজনা সম্পর্কে সিদ্ধান্তসমূহ :

* বেহুদা কথা, অবান্তর কথা, বাজে কথা, অর্থহীন কথা ইত্যাদি দ্বারা কোন প্রকান গান গাওয়া যাবে না। সুরা লোকমান : ৬

* বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে কোন প্রকার গান গাওয়া বা কবিতা আবৃতি করা যাবে না। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

* বাদ্যযন্ত্র না থাকলেও যে গানের মদ ও জুয়ার আসর বসবে, সে আসবে গান গাওয়া হারাম। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

*যে গানের আসরে নারীরা পর্দাহীনভাবে থাকে এবং নগ্নতা প্রকাশ করে সে সকল গানের আসরে যাওয়া ও আয়োজনে সাহায্য করা জায়েয নেই।  আহমাদ : ১৬৯৩৫, ত্বাবারানী : ১৬২৪০-১৬২৪১, সহীহুল জামে : ৬৯১৪

* যারা বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে গান গায় তাদের গানের আয়োজন করা বা তাদের মাধ্যমে ব্যবসা করা হারাম। সুনানে তিরমিযী : ১২৮২, সহীহাহ : ২৯২২

*-দফ বাজিয়ে গানের মাধ্যমে যুদ্ধ অভিজান ও যোদ্ধাদের বিরত্বগাথা বর্ণনা করা যায়। সহিহ বুখারি : ৪০০১, ৫১৪৭

* ঈদের দিনে ছোট মেয়েদের গান গেয়ে ও দফ বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে পারে। সহিহ বুখারি : ৯৮৭

* যে সকল বালিকা পেশাদার গায়িকা নয় তারা দফ বাজিয়ে গান করতে পাবে। সহিহ বুখারি : ৯৫০, মুসলিম : ৮৯২

* বিবাহের অনুষ্ঠানে দফ বাজিয়ে গান করা যাবে। সহিহ বুখারী : ৪০০১

* শির্কি কথামালা দ্বারা গান গাওয়া যাবেনা। সুনানে তিরমিযী ১০৯০, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৯২২

* কর্মজীবি বা মাঝি মাল্লাগণ বাদ্যযন্ত্র, শির্কি  ও অশ্লীল কথা বিহীন গান গাইতে পারে। সহিহ বুখারী : ৬৮৯১

* আমাদের সমাজে প্রচলীত নবী তত্ত্ব, মুর্শীদি, জারী, কাওয়ালী, পল্লীগীতি, ভাওয়ালী, ভক্তিমূলক এ সকল গান ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গাওয়া বা শোনা হারাম ও কবীরা গোনাহের অন্তর্ভূক্ত কারন ইহা গাওয়া সময় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে।

* বাজনা বা বাদ্যযন্ত্র ব্যতীত আল্লাহ তায়ালার গুনাবলী বিষয়ে হামদ, না’ত, কাসীদা, গজল ইত্যাদি পাঠ করা ও শোনা জায়েয রয়েছে। কিন্তু  ইহাতে শির্ক ও বেহুদা কথামালা থাকলে গাওয়া বা শোনা হারাম ও কবীরা গোনাহ।

*আমাদের সমাজে প্রচলীত হামদ, না’ত, কাসীদা, গজল ইত্যাদি প্রচুর শির্কি কথামালায় ঠাসা। কাজেই যাচাই বাচাই করে গাইতে ও শুনতে হবে। বিশেষ করে নাতে রাসূলের (সাঃ) গাওয়া সময় প্রায়ই সীমা লঙ্গন হয়ে তাকে।

* গানের আসরে যদি উদ্দাম ও উশৃংখলার গান-বাজনা, অশ্লীস কথা, অশ্লীস নাচ, নগ্ন নর্তকী, ফাহেসা গায়িকা, নির্লজ্জ পুরুষ, বেপর্তা নারী, প্রফেশনাল নারী গায়িকা, প্রেম বিরহের বিবরণ সম্বলিত গানের কথা, নারী পুরূষের অবাধ মেলামেসার সুযোগ, বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, মদ, জুয়া ই্ত্যাদির তবে তা হারার ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

* আমাদের দেশে প্রচলিত আধুনিক গান বা সিনেমাতে ব্যবহৃত গান শুনা, গাওয় বা দেখা হামার। কানর ইহাতে বিবাহের পূর্বে হারাম প্রেমকে উত্সাহ প্রদান করে।

৭. সেন্টার, দোকান, ব্যায়ামাগার, খেলাধুলার স্থানে বাদ্যযন্ত্র থাকলে তার বিধান

ইসলামি শরীয়তে, অধিকাংশ আলেম ও ফকীহর মতে, প্রচলিত বাদ্যযন্ত্র (যেমন: তবলা, হারমোনিয়াম, গিটার, বাঁশি ইত্যাদি) এবং গান-বাজনা যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে, তা হারাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, যে, এক সময় তাঁর উম্মতের মধ্যে কিছু লোক আসবে যারা ব্যভিচার, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে। এতে বাদ্যযন্ত্রের হারাম হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। হাদিস সম্ভার ২৩১০, আহমাদ : ৬৫৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ : ১৭০৮

যে সকল স্থানে (সেন্টার, দোকান, খেলার মাঠ ইত্যাদি) প্রকাশ্যে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়, গান-বাজনা চলে, সেই স্থানগুলি একটি হারাম কাজের পরিবেশ তৈরি করে।  ইসলামে শুধু হারাম কাজ করা থেকেই নয়, বরং হারাম কাজের পরিবেশে নিজে উপস্থিত থাকা, তার অংশ হওয়া বা তাকে সমর্থন করা থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমন পরিবেশে কাজ করা বা কেনাকাটা করার দ্বারা ঐ হারাম কাজকে পরোক্ষভাবে সমর্থন বা প্রশ্রয় দেওয়া হতে পারে বলে গণ্য করা হয়। বিশেষত, যদি সেই ব্যবসা বা কাজের উপার্জন বাদ্যযন্ত্র ও গান-বাজনার কারণে আরও আকর্ষণীয় হয় বা লোক সমাগম বৃদ্ধি পায়।

যদি কোনো দোকান বা সেন্টারে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়, তবে সেখানে ক্রয়-বিক্রয় বা কর্ম সম্পাদন করা জায়েয নয় কারণ হলো-

* সেখানে অবস্থান করলে মানুষ আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হতে পারে।  

* হারাম কাজের প্রতি ঘৃণা জন্ম নেওয়ার পরিবর্তে সহনশীলতা আসতে পারে।

* এরূপ কাজে জড়িত হওয়া বা সেই পরিবেশকে অর্থ দিয়ে সমৃদ্ধ করা (যেমন কেনাকাটার মাধ্যমে) পরোক্ষভাবে সেই হারাম কাজকে উৎসাহিত করা বোঝায়।

যেহেতু ইসলামে বাদ্যযন্ত্র এবং এর অনর্থক ব্যবহারকে হারাম বা কঠোরভাবে অপছন্দনীয় মনে করা হয়, তাই যে কোনো স্থানে (বাজার, কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র) এর প্রকাশ্য উপস্থিতি থাকলে, সেই স্থানকে পরিহার করাই একজন মুমিনের জন্য উত্তম ও নিরাপদ। তবে যদি কাজ বা কেনাকাটার প্রয়োজন খুব তীব্র হয় এবং অন্য কোনো উপায় না থাকে, তখন দ্রুত কাজটি সম্পন্ন করে সেই পরিবেশ থেকে সরে আসা উচিত।

মাঝে মাঝে পরিবারের সবাই নিয়ে বাইরে যাওয়া

ইসলাম নারীর মর্যাদা ও ইজ্জত রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইসলাম নারীদের জন্য কিছু বিশেষ বিধান দিয়েছে, যার মূলনীতি হলো—বিশেষ প্রয়োজন বা আবশ্যকীয় কারণ ছাড়া নারীরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।

সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৩

এর অর্থ এই নয় যে, নারীরা সম্পূর্ণরূপে গৃহবন্দী থাকবে। বরং ইসলাম নারীকে সম্মানজনক ও নিরাপদ উপায়ে প্রয়োজনীয় কাজ ও বৈধ বিনোদনের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

 ইবনে উমর (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, “যদি তোমাদের কারো কাছে তার স্ত্রী মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চায় তাহলে তাকে বাধা দিও না। সহিহ বুখারি: ৮২৭, সহিহ মুসলিম : ৪৪২

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, “আমার খালার তালাক হয়ে গেলে তিনি তাঁর খেজুর গাছের ফল সংগ্রহ করতে বের হলেন। তখন এক ব্যক্তি তাঁকে বাহিরে আসার জন্য ধমক দিল। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বিষয়টি জানালেন। নবী ﷺ বললেন, ‘অবশ্যই তুমি তোমার খেজুর পাড়বে; হতে পারে তুমি তা থেকে সদকা করবে বা কোনো ভালো কাজে ব্যবহার করবে।’”

সহিহ মুসলিম : ১৪৮৩

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে খাওয়াও শরীয়তসম্মতভাবে অনুমোদিত একটি বৈধ বিনোদন এবং প্রয়োজনীয় কাজ হতে পারে। এই বিনোদন একঘেয়েমি কাটাতে, পরিবারের বন্ধন সুদৃঢ় করতে এবং মানসিক প্রফুল্লতা অর্জনে সহায়ক। এটি কেবল ঘরের মধ্যে বন্দীদশা থেকে মুক্তি নয়, বরং ইসলাম অনুমোদিত একটি প্রয়োজনও বটে, যা নারীর স্বাস্থ্য ও প্রফুল্লতা নিশ্চিত করে।

তবে, এই বৈধ প্রয়োজন মেটাতে বাইরে যাওয়ার সময় ইসলাম নির্ধারিত সকল নিয়ম-নীতি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে প্রধান হলো:

১. পূর্ণ পর্দা রক্ষা : নারীদেরকে অবশ্যই পরিপূর্ণভাবে পর্দার সাথে ঘর থেকে বের হতে হবে। চেহারা ও সতর আবৃত করা অপরিহার্য।

২. সাজসজ্জা ও সুগন্ধি পরিহার: গায়রে-মাহরাম পুরুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে এমন কোনো সাজসজ্জা বা সুগন্ধি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

আব্দুল্লাহর স্ত্রী যয়নব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন: “তোমাদের কেউ যদি মসজিদে আসতে চায় তাহলে সে যেন সুগন্ধি না মাখে। সহিহ মুসলিম : ৪৪৩

৩. নিরাপদ স্থান নির্বাচন: এমন রেস্টুরেন্ট বা স্থান নির্বাচন করতে হবে যেখানে বেগানা পুরুষদের সাথে অপ্রয়োজনীয় সংমিশ্রণ বা ভিড় এড়িয়ে চলা সম্ভব হয় এবং নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে।

৪. বেশি বেশি বের হওয়া পরিহার: কোনো প্রয়োজন বা বৈধ বিনোদন ছাড়া কেবল অযথা বেশি বেশি বাইরে যাওয়া উচিত নয়, যেমনটা প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে। বাইরে যাওয়া কেবল প্রয়োজন বা অনুমোদিত বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।

৫. মাহরামের উপস্থিতি: দূরত্বের ক্ষেত্রে অবশ্যই মাহরাম (নিকটাত্মীয় পুরুষ, যার সাথে বিবাহ হারাম) সাথে থাকতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়েও রাস্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কোন পুরুষ যেন অপর মহিলার সঙ্গে নিভৃতে অবস্থান না করে, কোন স্ত্রীলোক যেন কোন মাহরাম সঙ্গী ছাড়া সফর না করে। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! অমুক যুদ্ধের জন্য আমার নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু আমার স্ত্রী হাজ্জযাত্রী। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তবে যাও তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হাজ্জ কর। সহিহ বুখারি : ৩০০৬, সহিহ মুসলিম : ১৩৪০

৬. গাইরে মাহরামের সাথে যাওয়া হারাম :

ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার।  সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫

সুতরাং, ইসলাম নারীকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করে না, বরং নিরাপদ ও সম্মানজনক উপায়ে বৈধ কাজ ও বিনোদনের অনুমতি দেয়। যখন পরিবারের সকলে মিলে বাইরে খেতে যাওয়া হয়, যদি তা শরীয়তের নিয়ম-কানুন মেনে হয় এবং হারাম কোনো কিছু থেকে মুক্ত থাকে, তবে এতে কোনো অসুবিধা নেই। এটি পরিবারের প্রতি খেয়াল রাখার এবং বৈধভাবে জীবন উপভোগ করার একটি সুন্দর মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের সকলকে পুত-পবিত্রতা, আত্মসংরক্ষণ এবং উত্তম দ্বীনদারি অর্জনের তৌফিক দিন।

বাচ্চাদের সাথে খেলা

শিশুরা হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক অমূল্য নিয়ামত, যারা মানবজীবনে নির্মল আনন্দ ও প্রশান্তি বয়ে আনে। তাদের নিষ্পাপ হাসি, কৌতুহলপূর্ণ চোখ আর মিষ্টি আচরণ প্রতিটি ঘরকে আলো ঝলমলে করে তোলে। ইসলামে এই শিশুদের প্রতি কোমলতা, ভালোবাসা ও তাদের সাথে সময় কাটানোর গুরুত্ব অপরিসীম। বস্তুত, শিশুদের সাথে সময় কাটানো, তাদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়া—এগুলো নিছক বিনোদন নয়, বরং তা একটি মহৎ ইবাদত এবং মানসিক শান্তি লাভের উপায়। এই প্রসঙ্গে, যারা শিশুদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে বা তাদের সহ্য করতে পারে না, তাদের আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। বিশেষ করে মসজিদসমূহে যদি কোনো শিশু আঘাতপ্রাপ্ত হয় বা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়, তবে তা ঐ শিশুদের মনে মসজিদ ও ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে, যা মোটেও কাম্য নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনচরিত থেকে আমরা দেখতে পাই, তিনি শিশুদের সাথে কেমন চমৎকারভাবে মিশেছেন এবং তাদের প্রতি সীমাহীন দয়া দেখিয়েছেন।হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাতে ইমামতি করছিলেন, তখন তাঁর প্রিয় নাতি হাসান বা হুসাইন (রা.) তাঁর পিঠে চড়ে বসতেন। তিনি তাড়াহুড়া করে তাদের নামিয়ে না দিয়ে সিজদা দীর্ঘ করতেন।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখা বা তাদের সাথে খেলাধূলা করা ইবাদতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়েও অনুমোদিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু খেলাই করেননি, বরং শিশুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে উৎসাহিত করেছেন।

শিশুদের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা করা এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা ইসলামের একটি সুন্দর শিক্ষা। এটি একদিকে যেমন তাদের অধিকার, তেমনি এটি আমাদের হৃদয়ের জন্য শান্তি ও সওয়াবের মাধ্যম। শিশুদের প্রতি দয়াশীল হওয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আদর্শ এবং প্রতিটি মুসলিমের জীবনে এটি প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। এ সম্পর্কে নিচের হাদিসগুলো প্রতিধান যোগ্য।

আবু বকরাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের ইমামতি করছিলেন, এসময় হাসান বা হুসাইন (রাঃ) তাঁর পিঠে উঠে বসত। তখন তিনি সিজদা দীর্ঘ করতেন। সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনি সিজদা অনেক দীর্ঘ করেছেন।’ তিনি বললেন, ‘আমার ছেলে আমার পিঠে চড়ে বসেছিল, আমি চাইলাম না তাড়াহুড়া করে তাকে নামিয়ে দিই।’” সুনানে নাসায়ী, হাদীস ; ১১৪১. ,আহমদ : ১৭৩২১

আবু কাতাদা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “আমি দেখেছি নবী ﷺ সালাতে ইমামতি করছিলেন এবং তিনি তাঁর নাতনি উমামাহ বিনতে আবুল আস (রাঃ)-কে কোলে নিয়েছিলেন। তিনি যখন সিজদায় যেতেন, তখন তাঁকে নামিয়ে রাখতেন; আর দাঁড়ালে তাঁকে আবার কোলে তুলে নিতেন।” সহিহ মুসলিম : ১১০৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হাসান ইবনু ’আলীকে চুম্বন করেন। সে সময় তাঁর নিকট আকরা’ ইবনু হাবিস তামীমী উপবিষ্ট ছিলেন। আকরা’ ইবনু হাবিস বললেনঃ আমার দশটি পুত্র আছে, আমি তাদের কাউকেই কোন দিন চুম্বন দেইনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পানে তাকালেন, অতঃপর বললেনঃ যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। সহিহ বুখারি : ৫৯৯৭, সহিহ মুসলিম : ২৩১৮, আহমাদ : ৭২৯৩

বৈবাহিক সম্পর্কে মাধ্যমে বিনোদন

মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান ও স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ। এই আকর্ষণ মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, যা আল্লাহ তাআলা নিজেই মানবজাতির মধ্যে স্থাপন করেছেন।

আল্লাহ বলেন—

زُیِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّہَوٰتِ مِنَ النِّسَآءِ وَالۡبَنِیۡنَ وَالۡقَنَاطِیۡرِ الۡمُقَنۡطَرَۃِ مِنَ الذَّہَبِ وَالۡفِضَّۃِ وَالۡخَیۡلِ الۡمُسَوَّمَۃِ وَالۡاَنۡعَامِ وَالۡحَرۡثِ ؕ

মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চি‎‎হ্নত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। সূরা আল ইমরান: ১৪

ইসলাম এই প্রাকৃতিক চাহিদাকে অস্বীকার করেনি, বরং শরীয়তসিদ্ধ ও সম্মানজনক পথ নির্ধারণ করেছে—আর তা হলো বিবাহ। ইসলাম যৌন সম্পর্ককে কেবল আনন্দের মাধ্যম নয়, বরং একটি ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করেছে, যা মানবসমাজে পবিত্রতা, ভালোবাসা ও স্থিতিশীলতা এনে দেয়।

১. বিবাহ আনন্দ ও ভালোবাসার পবিত্র বন্ধন

০৬৬. ’আবদুল্লাহ্ ইবনু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমরা কতক যুবক ছিলাম; আর আমাদের কোন কিছু ছিল না। এই হালতে আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে যুব সম্প্রদায় [1]! তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে তার দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করে এবং যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সে যেন সওম পালন করে। কেননা, সওম তার যৌনতাকে দমন করবে। সহিহ বুখারি : ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম : ১৪০০

বিবাহ কেবল দায়িত্ব নয়, এটি মানসিক প্রশান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা, এবং বিনোদনেরও উৎস।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً

“তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো—তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের মাধ্যমে প্রশান্তি পাও; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” সূরা আর-রূম : ২১

২. বৈবাহিক জীবন প্রশান্তি দেয়

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে। সুরা রূম : ২১

৩. বৈধ আমোদ-স্ফূর্তি ও ক্রীড়া-কৌতুক

জাবির ইবনু আবদুল্লা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ (রা.) মৃত্যু বরণ করলেন এবং নয়টি কন্যা রেখে গেলেন। পরে আমি (জাবির) এক বিধবা মহিলাকে বিয়ে করলাম। তখন রসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, হে জাবির! তুমি বিয়ে করেছো? আমি বললামঃ হ্যাঁ। তিনি (ﷺ) বললেন, তা কুমারী না বিধবা? আমি বললাম, বরং বিধবা হে আল্লাহর রসূল! তিনি (ﷺ) বললেন, তবে তা কোন তরুণী (কুমারী) কেন নয় যে, তুমি তার সঙ্গে আমোদ-স্ফূর্তি করবে, সেও তোমার সাথে ক্রীড়া-কৌতুক করবে কিংবা তিনি (ﷺ) বলেছিলেন, তুমি তার সঙ্গে হাস্য-রস করতে, সেও তোমার সঙ্গে হাস্য-রস করত। জাবির (রাযিঃ) বলেন, আমি তাকে বললাম, (আমার পিতা) আবদুল্লাহ নয়টি (কিংবা সাতটি) মেয়ে রেখে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং আমি তাদের মাঝে তাদের মতো একজনকে নিয়ে আসা অপছন্দ করলাম। তাই আমি এমন একটি মহিলাকে নিয়ে আসা পছন্দ করলাম যে তাদের দেখাশুনা করবে এবং তাদের শুধরে দিবে ও গড়ে তুলবে। তিনি (ﷺ) বললেন, তবে আল্লাহ তোমাকে বারাকাত দান করুন। তিনি আমাকে (এ ধরনের) কোন উত্তম কথা বললেন। আবূ রবী (রহঃ) এর রিওয়ায়াতে রয়েছে- “তুমি তার সঙ্গে আমোদ-স্ফূর্তি করবে ও তার সঙ্গে হাস্যরস করবে, সেও তোমার সঙ্গে হাস্য রস করবে। সহিহ মুসলিম : ৭১৫, ১৪৬৬

৪. বৈবাহিক আনন্দও ইবাদত

আবূ যার (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কিছু সংখ্যক সাহাবী তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সাওয়াব নিয়ে নিচ্ছে। কেননা আমরা যেভাবে সালাত আদায় করি তারাও সেভাবে আদায় করে। আমরা যেভাবে সিয়াম (পালন করি তারাও সেভাবে সিয়াম পালন করে। কিন্তু তারা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ দান করে সাওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা কি তোমাদেরকে এমন অনেক কিছু দান করেননি যা সাদাকা করে তোমরা সাওয়াব পেতে পার? আর তা হলো প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহা-নাল্লহ) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাকবীর (আল্লহু আকবার) একটি সাদাকা, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ) বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্লহ’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেক ভাল কাজের আদেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ করতে দেখলে নিষেধ করা ও বাধা দেয়া একটি সাদাকা্। এমনকি তোমাদের শরীরের অংশে সাদাকা রয়েছে। অর্থাৎ আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও একটি সাদাকা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ তার কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করবে বৈধ পথে আর এতেও কি তার সাওয়াব হবে? তিনি বললেন, তোমরা বল দেখি, যদি তোমাদের কেউ হারাম পথে নিজের চাহিদা মেটাত বা যিনা করত তাহলে কি তার গুনাহ হত না? অনুরূপভাবে যখন সে হালাল বা বৈধ পথে কামাচার করবে তাতে তার সাওয়াব হবে। সহিহ মুসলিম :  ১০০৬

অতএব, বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে বিনোদন, প্রেম, ও শারীরিক আনন্দও একপ্রকার ইবাদত, যদি তা আল্লাহর সীমারেখার মধ্যে হয়।

বৈবাহিক জীবনে আনন্দের প্রভাব

বৈবাহিক সম্পর্কের সুখ-শান্তি একজন মুসলিমের মানসিক প্রশান্তির প্রধান উৎস।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়া উপভোগের উপকরণ এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী।  সহিহ মুসলিম : ১৪৬৭

একজন সুখী স্বামী বা স্ত্রী সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে; তারা সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে, সমাজে দয়া ও ভারসাম্য ছড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, দাম্পত্য জীবনে অসন্তোষ অনেক সময় মানসিক চাপ, অশান্তি ও পাপাচারের দিকে ধাবিত করে।

উপসংহার : ইসলাম বিবাহের মাধ্যমে মানবীয় আকাঙ্ক্ষাকে পবিত্রতা দিয়েছে। বিবাহিত জীবনে আনন্দ, রোমান্স ও বিনোদন কেবল অনুমোদিতই নয়, বরং উৎসাহিত করা হয়েছে। বিবাহকে ভালোবাসা ও বিনোদনের কেন্দ্র বানানো, পারস্পরিক সম্মান ও আদব বজায় রাখা, নবী ﷺ এর আদর্শ অনুযায়ী হাসিখুশি, আনন্দময়, ঈমানদার দাম্পত্য জীবন গঠন করা।

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

“خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي”

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম আচরণ করে। আমি তোমাদের মধ্যে পরিবারের জন্য সর্বোত্তম। সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫, সহীহাহ : ২৮৫

জীবন্ত প্রাণীর প্রতিনিধিত্বকারী পুতুল ও খেলনা

সলামী শরীয়তে জীবন্ত প্রাণীর আকৃতি তৈরি করা বা চিত্রাঙ্কনের ওপর সাধারণভাবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর মূল কারণ হলো আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ থেকে বিরত থাকা এবং এর মাধ্যমে শিরকের পথ বন্ধ করা। কিন্তু এই সাধারণ বিধির ক্ষেত্রে শিশুদের খেলনা পুতুল ব্যতিক্রম কিনা, এই বিষয়ে ইসলামী ফিকহ ও হাদীস বিশারদদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে। মুজতাহিদ আলেমগণ এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও সাহাবীদের আমল সম্পর্কিত একাধিক সহীহ হাদীসের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। একটি হাদীস যেখানে ছবিযুক্ত বালিশ ব্যবহারের কঠোরতা নির্দেশ করে, সেখানে অন্য হাদীসগুলো নবী (সা.)-এর ঘরে শিশুদের খেলার পুতুলের উপস্থিতিকে অনুমোদন করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমগণ এই ব্যতিক্রমকে শিশুদের মানসিক বিকাশ এবং প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিশেষ ছাড় হিসেবে দেখেন। পরবর্তী অংশে, এই সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলোর আলোকে পুতুল ও খেলনা ব্যবহারের বৈধতা এবং এর ওপর বিভিন্ন ইসলামী স্কলারের ফতোয়া বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।

প্রথসে সহিহ হাদিসগুলো লক্ষ করি। তাহলো ফতওয়াটি বুঝতে সহজ হবে। হাদসিগুল হলো :

উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, তিনি একটি ছবিওয়ালা বালিশ ক্রয় করেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখতে পেয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন, ভিতরে প্রবেশ করলেন না। আমি তাঁর চেহারায় অসন্তুষ্টি ভাব দেখতে পেলাম। তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে তওবা করছি। আমি কী অপরাধ করেছি? তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ বালিশের কী ব্যাপার? ‘আয়িশাহ (রাযি.) বলেন, আমি বললাম, আমি এটি আপনার জন্য ক্রয় করেছি, যাতে আপনি টেক লাগিয়ে বসতে পারেন। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই ছবি তৈরীকারীদের কিয়ামতের দিন শাস্তি দেয়া হবে। তাদের বলা হবে, তোমরা যা তৈরী করেছিলে, তা জীবিত কর। তিনি আরো বলেন, যে ঘরে এ সব ছবি থাকে, সে ঘরে (রহমতের) ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না। সহিহ বুখারি : ২১০৫, ৩২২৪, ৫১৮১, ৫৯৫৭, ৫৯৬১, ৭৫৫৭, সহহি মুসলিম : ২১০৭, আহমাদ : ২৬১৪৯

আবূ ত্বলহা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

لاَ تَدْخُلُ الْمَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ تَصَاوِيرُ ‏

যে ঘরে কুকুর বা জীবজন্তুর ছবি (তাসাবীর) থাকে, ফেরেশতারা সেখানে প্রবেশ করেন না। সহিহ বুখারি : ৫৯৪৯, সহিহ মুসলিম : ২১০৬

আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

تَأْتِينِي صَوَاحِبِي فَكُنَّ يَنْقَمِعْنَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَتْ فَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُسَرِّبُهُنَّ إِلَىَّ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনেই আমি পুতুল বানিয়ে খেলতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলে তারা দৌড়ে পালাত। তখন তিনি তাদের ডেকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন এবং তারা আমার সঙ্গে খেলত। সহিহ বুখারি : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম : ২৪৪০ আহমাদ : ২৬০২০

আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন। “আল্লাহর রাসূল ﷺ তাবুক বা খায়বার অভিযান থেকে ফিরে এলেন (বর্ণনাকারী নিশ্চিত নন কোনটি)। আমার একটি ঘরে একটি পর্দা ছিল। বাতাস এসে পর্দাটি একপাশে সরিয়ে দেয়, এবং সেখানে আমার কিছু পুতুল দেখা যায়।

নবী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন: ‘হে আয়েশা! এগুলো কী?’

আমি বললাম: ‘আমার পুতুল।’

তিনি একটি পুতুল ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে বললেন: ‘আমি এটার মাঝখানে কী দেখছি?’

আমি বললাম: ‘এটি একটি ঘোড়া।’

তিনি বললেন: ‘এর উপর কী আছে?’

আমি বললাম: ‘দুটি ডানা।’

তিনি বললেন: ‘ডানাযুক্ত ঘোড়া?’

আমি বললাম: ‘আপনি কি শোনেননি যে সুলাইমান (আঃ)-এরও ডানাযুক্ত ঘোড়া ছিল?’

তিনি তখন এমনভাবে হেসে উঠলেন যে আমি তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেলাম।” সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৩২

আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তার সাত বছর বয়সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিবাহ করেন। তাকে নয় বছর* বয়সে তার ঘরে বধুবেশে নেয়া হয় এবং তার সঙ্গে তার খেলার পুতুলগুলোও ছিল। তাঁর আঠারো বছর বয়সে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তিকাল করেন। সহিহ মুসলিম : ১৪২২

রুবায়্যি বিনতু মুআব্বিয (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আশূরার সকালে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের সকল পল্লীতে এ নির্দেশ দিলেনঃ যে ব্যক্তি সওম পালন করেনি সে যেন দিনের বাকি অংশ না খেয়ে থাকে, আর যার সওম অবস্থায় সকাল হয়েছে, সে যেন সওম পূর্ণ করে। তিনি (রুবায়্যি‘) (রাযি.) বলেন, পরবর্তীতে আমরা ঐ দিন সওম পালন করতাম এবং আমাদের শিশুদের সওম পালন করাতাম। আমরা তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁদলে তাকে ঐ খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতাম। আর এভাবেই ইফতারের সময় হয়ে যেত। সহিহ বুখারি : ১৯৬০, সহিহ মুসলিম : ১১৩৬

হাদিসগুলোর আলোকে একটি ফতওয়া :

জীবন্ত প্রাণীর প্রতিনিধিত্বকারী পুতুল ও খেলনা সম্পর্কে ইসলামী ফিকহের অবস্থান মূলত উপরের সহীহ হাদীসগুলোর ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল, যার ফলে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমের ফতোয়া শিশুদের খেলনার ক্ষেত্রে শিথিলতা বা অনুমোদনের পক্ষে।

১. জমহূর ফুকাহা (অধিকাংশ আলেম) এর ফতোয়া: বৈধতা

ইমাম আন-নাবাবী, ইমাম ইবন হাজার আসকালানী, ইমাম ইবনে কুদামা এবং সমসাময়িক আলেমদের মধ্যে শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন ও ড. ইউসুফ আল-কারযাভী সহ অনেকেই মনে করেন যে শিশুদের খেলার পুতুল ও খেলনা জায়েয এবং এটি জীবন্ত প্রাণীর ভাস্কর্য বা ছবি তৈরির সাধারণ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত।

তাঁদের দলীল ও যুক্তি:

আয়েশা (রাঃ)-এর হাদীস: সহীহ বুখারী এবং মুসলিমের হাদীস। সহিহ বুখারী : ৬১৩০, সহিহ মুসলিম: ২৪৪০

প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপস্থিতিতেই আয়েশা (রাঃ) পুতুল নিয়ে খেলতেন এবং তিনি তা অনুমোদন করেছিলেন। এমনকি তাবুক বা খাইবারের অভিযানের পর ডানাযুক্ত ঘোড়ার পুতুল দেখেও তিনি হেসেছিলেন, কিন্তু তা নিষেধ করেননি। সুনানে আবূ দাউদ: ৪৯৩২

সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম এটিকে শিশুদের জন্য, বিশেষত মেয়েদের, বিশেষ ছাড় হিসেবে গণ্য করেন। এর উদ্দেশ্য হলো খেলার মাধ্যমে তাদের মধ্যে মাতৃস্নেহ এবং সন্তান প্রতিপালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া। তাঁদের মতে, মূর্তি বা ছবি নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো সেগুলোকে সম্মান দেখানো বা উপাসনার মাধ্যমে শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু খেলনা পুতুলকে সাধারণত সম্মান করা হয় না বা উপাসনার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় না; এগুলি খেলার সামগ্রী মাত্র।

২. কঠোর ফতোয়া : সাধারণভাবে হারাম

কিছু আলেম, প্রধানত নিষেধাজ্ঞার সাধারণ হাদীসগুলোর ওপর জোর দিয়ে, সব ধরনের প্রাণীর আকৃতিযুক্ত পুতুলকে সাধারণভাবে হারাম বা কমপক্ষে পরিহারযোগ্য (উত্তম) বলে মনে করেন।

তাঁদের দলীল ও যুক্তি:

তাঁরা ছবিযুক্ত বালিশ সম্পর্কিত হাদীসকে সাধারণ বিধান হিসেবে দেখেন যে, যে ঘরে ছবি বা প্রাণীর আকৃতি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।

শাইখ ইবনে বায (রহ.) সহ কেউ কেউ মনে করেন যে, এটি বিতর্কের বিষয় হওয়ায় এবং নিষেধাজ্ঞার সাধারণ হাদীসগুলো কঠোর হওয়ায় সন্দেহ থেকে বাঁচার জন্য (যেমন রাসূল ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে পতিত হল, সে হারামে পতিত হল”) এসব খেলনা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

শাইখ ইবনে উসাইমীনের দৃষ্টিভঙ্গি

সমসাময়িক প্রখ্যাত আলেম শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.) শিশুদের খেলনার বৈধতা প্রদান করেছেন, তবে তিনি উপদেশ দিয়েছেন যে, সম্ভব হলে খেলনাগুলোর বৈশিষ্ট্য সরল রাখা বা অসম্পূর্ণ রাখা ভালো, যাতে তা বাস্তবের সাথে অপ্রয়োজনীয় সাদৃশ্য এড়িয়ে যায়। এই মতটিই জমহূর ফুকাহাদের মতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ফাইনাল ফতওয়া : শিশুদের খেলাধুলার জন্য ব্যবহৃত জীবন্ত প্রাণীর পুতুল ও খেলনা শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ বলে গণ্য হয়, তবে তা যেন প্রদর্শনী বা সম্মানের বস্তু হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।

নবি ﷺ–এর জীবনের হাস্যরস, আনন্দ ও বিনোদন

নবি –এর জীবনের হাস্যরস, আনন্দ ও বিনোদন

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। এতে মানুষের আত্মা, মন, শরীর ও সমাজ—সবকিছুর সমন্বিত বিকাশের পথনির্দেশ রয়েছে। এই ধর্ম কেবল ইবাদত বা আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং জীবনের আনন্দ ও স্বাভাবিক বিনোদনকেও স্বীকৃতি দিয়েছে, যদি তা হয় আল্লাহর অনুমোদিত সীমার মধ্যে।

মানুষ প্রকৃতিগতভাবে হাসে, খেলে, বিশ্রাম নেয় এবং আনন্দ পায়। ইসলামের উদ্দেশ্য এ প্রাকৃতিক চাহিদাকে দমন করা নয়, বরং সুষমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। আর এ বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হচ্ছেন মুহাম্মাদ ﷺ। তাঁর জীবন ছিল এক অনুপম ভারসাম্যের দৃষ্টান্ত—ইবাদতে গভীর, কিন্তু জীবনে প্রফুল্ল; রসিকতায় কোমল, কিন্তু কথায় কখনো মিথ্যা নয়। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব, কেমন ছিলেন নবী ﷺ–এর হাস্যরস, আনন্দ, পারিবারিক বিনোদন, সাহাবিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সামাজিক মেলামেশা, এবং এসবের মাধ্যমে তিনি উম্মতের জন্য কী শিক্ষা রেখে গেছেন।

১. নবী –এর রসিকতা ও হাস্যরসের ধরন

নবী ﷺ মানুষ ছিলেন, ফেরেশতা নন। তাই তাঁর জীবনে হাসি, খুশি, মজা, কৌতুক সবই ছিল; তবে তা হতো সত্য, শালীনতা ও উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণের মধ্যে।

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّكَ تُدَاعِبُنَا ‏.‏ قَالَ ‏ “‏ إِنِّي لاَ أَقُولُ إِلاَّ حَقًّا

(সাহাবীগণ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনি তো আমাদের সাথে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেনঃ আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি। সুনানে তিরমিজি :১৯৯০, সহীহাহ : ১৭২৬

এই হাদীসের মাধ্যমে নবী ﷺ–এর রসিকতার নীতি স্পষ্ট হয়—হাস্যরস থাকতে পারে, তবে মিথ্যা নয়। তিনি কখনো কারো অনুভূতিতে আঘাত করতেন না, কখনো অশালীন ভাষা ব্যবহার করতেন না। তাঁর হাসি ছিল শান্ত, তাঁর মজা ছিল স্নেহপূর্ণ।

আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনু জাযয়ি (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বেশী মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি : ৩৬৪১, মিশকাত : ৫৮২৯

২. নবী ﷺ–এর হাসি : আনন্দ, দাওয়াত ও দয়া

নবী ﷺ–এর হাসি ছিল এক ধরণের দাওয়াত। তা ছিল তাঁর সৌজন্য ও দয়ার প্রকাশ।

জারীর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন-

مُنْذُ أَسْلَمْتُ وَلَا رَآنِيْ إِلَّا تَبَسَّمَ فِيْ وَجْهِي

আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন থেকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর নিকট প্রবেশ করতে বাধা দেননি এবং যখনই তিনি আমার চেহারার দিকে তাকাতেন তখন তিনি মুচকি হাসতেন। সহিহ বুখারি : ৩০৩৫, ৩৮২২, ৬০৯০, সহিহ মুসলিম : ২৪৭৫

আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনু জাযয়ি (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চেয়ে বেশী মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি : ৩৬৪১, মিশকাত : ৫৮২৯, মুসনাদে আহমাদ : ১৭৭৫০, শুআবূল ঈমান : ৮০৪৭,

এই আচরণ আমাদের শেখায়, মুমিনের হাসি উচিত শালীন ও হৃদয় প্রশান্তকারী, যা মন ভালো করে, কিন্তু বেহায়াপনা সৃষ্টি করে না।

৩. নবী ﷺ–এর কোমল রসিকতা

মুবারক ইবন ফাদালাহ (রহ.) বর্ণনা করেছেন। তিনি হাসান (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন-

: أَتَتْ عَجُوزٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَتْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، ادْعُ اللَّهَ أَنْ يُدْخِلَنِي الْجَنَّةَ ، فَقَالَ : ” يَا أُمَّ فُلانٍ ، إِنَّ الْجَنَّةَ لا تَدْخُلُهَا عَجُوزٌ ” ، قَالَ : فَوَلَّتْ تَبْكِي , فَقَالَ : ” أَخْبِرُوهَا أَنَّهَا لا تَدْخُلُهَا وَهِيَ عَجُوزٌ إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى , يَقُولُ : إِنَّا أَنْشَأْنَاهُنَّ إِنْشَاءً

অর্থ : একজন বৃদ্ধা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।

তিনি (ﷺ) বললেন, “হে অমুকের মা! জান্নাতে কোনো বৃদ্ধা প্রবেশ করবে না।

(বর্ণনাকারী বলেন) তখন সে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “তাকে খবর দাও যে, সে বৃদ্ধ অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বলেন-

‘আমি তাদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি, তাদেরকে করেছি কুমারী, স্বামীদের প্রতি প্রেমময়ী ও সমবয়সী। সূরা ওয়াকিয়া : ৩৫-৩৭।  সহিহ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৯, সিলসিলা সহিহাহ : ২৯৮৭; শারহুস সুন্নাহ : ৩৬০৬। হাদিসটি সহিহ শামায়েলে তিরমিজি থেকে সংকলন করা হয়েছে।

৪. নবী ﷺ–এর পারিবারিক বিনোদন

আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত। আবূ বকর (রা.) আইয়্যামে তাশরীকের দিনে আয়িশাহ (রাযিঃ) এর নিকট গিয়ে দেখেন যে, তার কাছে দুটি বালিকা গান করছে এবং দফ বাজাচ্ছে। আর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাদর দিয়ে মাথা ঢাকা অবস্থায় ছিলেন। আবূ বকর (রাযিঃ) এটা দেখে বালিকাদ্বয়কে খুব শাসলেন বা ধমক দিলেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চেহারা থেকে কাপড় সরিয়ে বলেন, হে আবূ বকর! এদেরকে ছেড়ে দাও। এ দিনগুলো হ’ল ঈদের দিন। আয়িশাহ (রাযিঃ) আরও বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে তার চাদর দ্বারা ঢেকে দিচ্ছেন, যখন আমি আবিসিনিয়ার যুবকদের (কৃষ্ণাঙ্গ) খেলার দৃশ্য অবলোকন করছিলাম। তখন আমি সবেমাত্র বালিকা। অতএব তোমরা অল্পবয়স্কা বালিকাদের সখের মূল্যায়ন কর। অল্পবয়স্ক বালিকারা অনেকক্ষণ আমোদ-ফুর্তিতে মেতে থাকে। সহিহ মুসলিম : ৮৯২, আহমাদ : ২৬৩৮৮

এটি ইসলামে শালীন বিনোদনের দৃষ্টান্ত। নবী ﷺ স্ত্রীকে বিনোদনের সুযোগ দিয়েছেন, তবে পরিমিতি বজায় রেখেছেন।

৫. সাহাবিদের সাথে নবী ﷺ–এর রসিকতা

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সওয়ারী চাইল। তখন তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন-

إِنَّا حَامِلُوكَ عَلَى وَلَدِ نَاقَةٍ قَالَ: وَمَا أَصْنَعُ بِوَلَدِ النَّاقَةِ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَهَلْ تَلِدُ الْإِبِلَ إِلَّا النُّوقُ

আমরা তো তোমাকে উটনীর বাচ্চার উপর সওয়ার করাব।’ তিনি বললেন, আমি উটনীর বাচ্চা দিয়ে কী করব?’ অতঃপর নবী (ﷺ) বললেন, ‘উটকে কি উটনী ছাড়া অন্য কেউ জন্ম দেয়? মিশকাত : ৪৮৮৬, সুনানে তিরমিযী : ১৯৯১, সুনানে আবু দাঊদ : ৪৯৯৮, সহীহুল জামি : ৭১২৮,

এটি ছিল বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা, যা হাস্যরসের সাথে চিন্তারও খোরাক দেয়।

৬. শিশুদের সঙ্গে রসিকতা

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে অধিক সদাচারী ছিলেন। আমার এক ভাই ছিল; ’তাকে আবূ ’উমায়র’ বলে ডাকা হতো। আমার ধারণা যে, সে তখন মায়ের দুধ খেতো না। যখনই সে তাঁর নিকট আসতো, তিনি বলতেন, হে আবূ উমায়র! কী করছে তোমার নুগায়র? সে নুগায়র পাখিটা নিয়ে খেলতো। আর প্রায়ই যখন সালাতের সময় হতো, আর তিনি আমাদের ঘরে থাকতেন, তখন তাঁর নীচে যে বিছানা থাকতো, একটু পানি ছিটিয়ে ঝেড়ে দেয়ার জন্য আমাদের আদেশ করতেন। তারপর তিনি সালাতের জন্য দাঁড়াতেন এবং আমরাও তাঁর পেছনে দাঁড়াতাম। আর তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করতেন। সহিহ মুসলিম : ৬২০৩, সহিহ মুসলিম : ২১৫০

আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের কাছে আসতেন, এবং আমার এক ছোট ভাই ছিলেন, যার উপনাম ছিল আবু উমায়র। তার একটি ছোট পাখি ছিল, যার সাথে সে খেলা করত। একদিন সেই পাখিটি মারা গেল। রাসুলুল্লাহ ﷺ একদিন তার কাছে এলেন এবং তাকে বিষণ্ন দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: “এর কী হয়েছে? লোকেরা বলল: “তার পাখিটি মারা গেছে। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন, “হে আবু উমায়র! তোমার নুগাইর (ছোট পাখি) কী করল? সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৬৯

৭. নবী ﷺ–এর সাহাবিদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক

আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই আমাকে বলতেন-

“‏ يَا ذَا الأُذُنَيْنِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو أُسَامَةَ يَعْنِي يُمَازِحُهُ ‏

হে দুই কানের অধিকারী। আবূ উসামাহ বলেন, অর্থাৎ তার সাথে তিনি (এ কথা বলে) রসিকতা করতেন। সুনানে তিরমিযী : ৩৮২৮

এ রসিকতায় ছিল না বিদ্রূপ, বরং ভালোবাসা।

৮. নবী ﷺ–এর হাস্যরস সাহাবিদের মন প্রশান্ত রাখত

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আপনি তো আমাদের সাথে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেনঃ আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি (এমনকি কৌতুকেও)। সুনানে তিরমিজি : ১৯৯০, সহীহাহ : ১৭২৬

৯. নবী ﷺ–এর হাস্যরস সামাজিক জীবনে

বদুল্লাহ ইবনুল হারিস ইবনু জাযয়ি (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে বেশী মুচকি হাসি দিতে আমি আর কাউকে দেখিনি। সুনানে তিরমিজি : ৩৬৪১, মিশকাত : ৫৮২৯

তাঁর হাসি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলত—ভীতি নয়, বরং প্রেমের পরিবেশ তৈরি করত।

 ১০. নবী ﷺ কখনো হাসি-ঠাট্টাকে জীবনের কেন্দ্র বানান নাই

আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন কে আছে যে আমার নিকট হতে এ কথাগুলো গ্রহণ করবে এবং সে মুতাবিক নিজেও আমল করবে অথবা এমন কাউকে শিক্ষা দিবে যে অনুরূপ আমল করবে? আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। আমি আছি। অতঃপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং গুনে গুনে এ পাঁচটি কথা বললেন-

তুমি হারাম সমুহ হতে বিরত থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় আবিদ বলে গণ্য হবে; তোমার ভাগ্যে আল্লাহ তা’আলা যা নির্ধারিত করে রেখেছেন তাতে খুশি থাকলে লোকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা স্বনির্ভর বলে গণ্য হবে; প্রতিবেশীর সাথে ভদ্র আচরণ করলে প্রকৃত মুমিন হতে পারবে; যা নিজের জন্য পছন্দ কর তা-ই অন্যের জন্যও পছন্দ করতে পারলে প্রকৃত মুসলিম হতে পারবে এবং অধিক হাসা থেকে বিরত থাক। কেননা অতিরিক্ত হাস্য-কৌতুক হৃদয়কে মৃতবৎ করে দেয়। সুনানে তিরমিজি : ২৩০৫, সহিহাহ : ৯৩০

১১. নবী ﷺ–এর দয়া ও ভালোবাসা

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দশটি বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি কক্ষনো আমার প্রতি উহ্ শব্দটি করেননি। এ কথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না? সহিহ বুখারি : ৬০৩৮, সহিহ মুসলিম : ২৩০৯, আহমাদ : ১৩০২০

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। যাহির (ইবনে হিযাম আশজায়ী বদরী) নামে এক বেদুঈন প্রায়ই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হাদিয়া দিত। যখন সে চলে যেতে উদ্যত হতো তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, যাহির আমাদের পল্লিবন্ধু, আমরা তার শহুরে বন্ধু। সে কদাকার হলেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভালোবাসতেন। একবার সে বেচাকেনা করছিল আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অলক্ষ্যে পেছন দিক থেকে ধরে ফেললেন। তারপর সে বলল, কে? আমাকে ছেড়ে দাও! দৃষ্টিপাত করতেই সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখে তাঁর পিঠ আরো নৰী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বুকের সাথে মিলালো। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ গোলামটিকে কে ক্রয় করবে? যাহির বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে বিক্রি করে কেবল অচল মুদ্ৰাই পাবেন। এরপর তিনি বললেন, কিন্তু তুমি আল্লাহর নিকট অচল নও। অথবা তিনি বলেছেন, আল্লাহর নিকট তোমার উচ্চমর্যাদা রয়েছে।

সহিহ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৮, মুসনাদে আহমদ : ১২৬৬৯ সহীহ ইবনে হিব্বান : ৫৭৯০ বায়হাকী, : ২০৯৬১; শারহুস সুন্নাহ : ৩৬০৪; মুসনাদুল বাযযার : ৬৯২২।

রাসূলুল্লাহ -এর পারিবারিক জীবনে বিনোদন

১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীদের প্রসংশা করতেন

খাদীজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রশংসা করা অব্যাহত রাখেন এবং তাঁকে সব সময় স্মরণ করতেন। একবার আয়েশা (রা.) খাদীজা (রা.) সম্পর্কে কিছু বললে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাকে তার চেয়ে উত্তম কোনো স্ত্রী দেননি। সে আমার ওপর ঈমান এনেছে যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করেছে; সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা বলেছে; সে আমাকে তার ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে যখন মানুষ আমাকে বঞ্চিত করেছে; এবং আল্লাহ আমাকে তার মাধ্যমেই সন্তান দিয়েছেন, যখন অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে দেননি। মুসনাদে আহমাদ : ২৪৮৬৪, আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক : 6857

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর মর্যাদা নারীদের উপর এমন যেমন সারীদের মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর। সহিহ বুখারি : ৩৭৭০, ৪৫১৯, ৫৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৪৪৬, আহমাদ : ১৩৭৮৭

২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আবসর সময় কাটাতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ’আসরের সালাত শেষ করতেন, তখন স্বীয় স্ত্রীদের মধ্য থেকে যে কোন একজনের নিকট গমন করতেন। একদিন তিনি স্ত্রী হাফসাহ (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং সাধারণতঃ যে সময় কাটান তার চেয়ে বেশি সময় কাটালেন। সহিহ বুখারি : ৫২১৬

৩.. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে চুমু দিয়ে ঘরের বাহির বের হতেন

আয়িশাহ্ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোন এক স্ত্রীকে চুমো দিলেন, অতঃপর সালাত আদায়ের জন্য বের হলেন, কিন্তু অযু করলেন না। ’উরওয়াহ বলেনঃ আমি ’আয়িশাহ্ (রাঃ)-কে বললাম, ’সেই স্ত্রী আপনি নন কি? ফলে তিনি হেসে দিলেন। সুনানে আবু দাউদ : ১৭৯, সুনানে তিরমিজি : ৮৬, সুনানে ইবনে মাজাহ : ৫০২

৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর চুল আচড়ে দিতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ আমি হায়েয অবস্থায় আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাথা আঁচড়ে দিতাম। সহিহ বুখারি : ২৯৫, সহিহ মুসলিম : ৩০২

নবী সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে থাকাবস্থায় আমার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন আর আমি তা আঁচড়িয়ে দিতাম এবং তিনি যখন ই‘তিকাফে থাকতেন তখন (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করতেন না। সহিহ বুখারি : ২০২৯, ২০৩৩, ২০৩৪, ২০৪১, ২০৪৫

৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করতেন

আসওয়াদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন। আর সালাতের সময় হলে সালাতের জন্য চলে যেতেন। সহিহ বুখারি  :৬৭৬, ৫৩৬৩, ৬০৩৯

উরওয়াহ বলেন, আয়েশা (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি ঘরে কাজ করতেন?’ তিনি বললেন, ’রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ ছিলেন; স্বহস্তে কাপড় পরিষ্কার করতেন, দুধ দোহাতেন এবং নিজের খেদমত নিজেই করতেন। অন্যনা্য পুরুষরা যেমন নিজেদের বাড়ীতে কাজ করে, অনুরূপ তিনিও তাঁর কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং জুতো সিলাই করতেন। হাদিস সম্ভার : ২৫৯০, আদাবুল মুফরাদ : ২১৫, সহীহুল জামে : ৯০৬৮

আয়েশা (রা.) বলেন: নবী ﷺ তাঁর জুতা মেরামত করতেন, কাপড় সেলাই করতেন এবং ঘরে কাজ করতেন, যেমন তোমাদের কেউ ঘরে কাজ করে।” মুসনাদ আহমাদ : ২৪৯০৩

৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে কুরাআন তিলওয়াত করতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম।

 করেছেন এ সম্পর্কিত ০২ টি হাদিস দিন। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১, সুনানে নাসায়ি : ২৭১, মুসনাদ আহমাদ : ২৪৩৮৪

৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে একই পাত্রে গোসল করতেন

‘আয়িশাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই পাত্র (কাদাহ) হতে (পানি নিয়ে) গোসল করতাম। সেই পাত্রকে ফারাক বলা হতো। সহিহ বুখারি : ২৫০, ২৬১, ২৬৩, ২৭৩, ২৯৯, ৫৯৫৬, ৭৩৩৯, সহিহ মুসলিম : ৩১৯, আহমাদ : ২৫৮৯৪

৮. স্ত্রী যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করেছে, সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করা

আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ঋতুবতী অবস্থায় পানি পান করতাম এবং পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবশিষ্টটুকু প্রদান করলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতাম তিনিও পাত্রের সে স্থানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। আবার আমি ঋতুবতী অবস্থায় হাড় খেয়ে তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দিলে আমি যেখানে মুখ লাগিয়েছিলাম তিনি সেখানে মুখ লাগিয়ে খেতেন। তবে যুহায়র কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে “পান করার” উল্লেখ নেই।  সহিহ মুসলিম : ৩০০

৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর স্ত্রীর সাথে মজার ছলে কথা বলতেন

আয়েশা (রাঃ) যখন ছোট ছিলেন, তখন কাপড়ের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তার মধ্যে ০২ টি ঘোড়া ছিল, যার দু’টি ডানা ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখে বললেন, ’এটা কী?’ আয়েশা বললেন, ’ঘোড়া।’ তিনি বললেন,

فَرَسٌ لَهُ جَنَاحَانِ قَالَتْ أَمَا سَمِعْتَ أَنَّ لِسُلَيْمَانَ خَيْلاً لَهَا أَجْنِحَةٌ قَالَتْ فَضَحِكَ حَتّٰـى رَأَيْتُ نَوَاجِذَهُ

ঘোড়ার আবার দু’টি ডানা?’ আয়েশা বললেন, ’আপনি কি শুনেননি, সুলাইমান (নবী)র ডানা-ওয়ালা ঘোড়া ছিল?’ এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং সে হাসিতে তাঁর চোয়ালের দাঁত দেখা গেল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৭, মিশকাত  : ৩২৬৫, সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৩২, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৫৮৬৪, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১০. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে হালকা ঠাট্টা-মশকরা করেতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা সাওদা বিনতে যামআ’ আমার সাথে দেখা করতে আমার বাসায় এলো। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ও আমার মাঝখানে বসে গেলেন। তাঁর ০২ টি পা আমার কোলে, আর ০২ টি পা সাওদার কোলে ছিল। আমি তার (সাওদার) জন্য ’খাযীরা’ (গোশ্ত ছোট ছোট করে কেটে তাতে আটা মিশিয়ে রান্না করা খাবার) তৈরী করলাম। অতঃপর তাকে খেতে বললে সে খেতে অস্বীকার করল। আমি বললাম, ’তুমি অবশ্যই খাবে, নচেৎ আমি তোমার মুখে তা লেপে দেব।’ সে অস্বীকার করলে আমি প্লেট থেকে সামান্য পরিমাণ নিয়ে তার মুখে লেপে দিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোল থেকে স্বীয় পা সরিয়ে নিলেন, যাতে সে আমার কাছ থেকে বদলা নিতে পারে। অতঃপর আমি প্লেট থেকে আরো কিছু নিয়ে আমার মুখে লেপে নিলাম। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে লাগলেন। ইত্যবসরে উমার (রাঃ) উপস্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, ’হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার! হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার!’ তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা উঠে তোমাদের মুখ ধুয়ে নাও, আমার মনে হয় উমার প্রবেশ না করে ছাড়বে না। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৮, নাসাঈ কুবরা : ৮৯১৭, সহীহাহ : ৩১৩১, হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সফর করতেন

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সফরের মনস্থ করলে স্ত্রীগণের মধ্যে কুরআর ব্যবস্থা করতেন। যার নাম আসত তিনি তাঁকে নিয়েই সফরে বের হতেন। এছাড়া প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একদিন এক রাত নির্দিষ্ট করে দিতেন। তবে সাওদা বিনতে যাম‘আহ (রাঃ) নিজের দিন ও রাত নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-কে দান করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। সহিহ বুখারি : ২৫৯৩, ২৬৩৭, ২৬৬১, ২৬৮৮, ২৮৭৯, ৪০২৫, ৪১৪১, ৪৬৯০, ৪৭৪৯, ৪৭৫০, ৪৭৫৭, ৫২১২, ৬৬৬২, ৬৬৭৯, ৭৩৬৯, ৭৩৭০,৭৫০০, ৭৫৪৫

১২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সাথে আনন্দ উপভোগ করতেন

উরওয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, একদিন হাবশীরা তাদের বর্শা নিয়ে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে পর্দা করে তার পেছনে দাঁড় করিয়ে ছিলেন এবং আমি সেই খেলা দেখছিলাম। যতক্ষণ আমার ভাল লাগছিল ততক্ষণ আমি দেখছিলাম। এরপর আমি স্বেচ্ছায় সে স্থান ত্যাগ করলাম। সুতরাং তোমরা অনুমান করতে পার কোন্ বয়সের মেয়েরা আমোদ-প্রমোদ পছন্দ করে। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা

আমর ইবনু ’আস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যাতুস্ সালাসিল যুদ্ধের সেনাপতি করে পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের মধ্যে কে আপনার নিকট সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, ’আয়িশাহ্। আমি বললাম, পুরুষদের মধ্যে কে? তিনি বললেন, তাঁর পিতা (আবূ বকর)। আমি জিজ্ঞেস করলাম, অতঃপর কোন লোকটি? তিনি বললেন, ’উমার ইবনু খাত্তাব অতঃপর আরো কয়েকজনের নাম করলেন। সহিহ বুখারি : ৩৬৬২, ৪৩৫৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৮৪, আহমাদ : ১৭৮৫৭

১৩. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে ঘুমাতেন

আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কোলে হেলান দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। আর তখন আমি হায়েযের অবস্থায় ছিলাম। সহিহ বুখারি : ২৯৭, সহিহ মুসলিম : ৩০১

১৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে খেলা করেছেন

’আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি এক সফরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তাঁর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে তাঁর আগে চলে গেলাম। অতঃপর আমি মোটা হয়ে যাওয়ার পর তাঁর সাথে আবারো দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম, এবার তিনি আমাকে পিছে ফেলে দিলেন বিজয়ী হলেন। তিনি বলেনঃ এ বিজয় সেই বিজয়ের বদলা। সুনানে আবু দাউদ : ২৫৭৮,

১৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর অবর্তমানে তার বান্ধবিদের উপহার পাঠান

আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদীজাহ (রাঃ)-এর প্রতি করেছি। কেননা, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর কথা বারবার আলোচনা করতে শুনেছি, অথচ আমাকে বিবাহ করার আগেই তিনি ইন্তিকাল করেছিলেন। খাদীজাহ (রাঃ)-কে জান্নাতে মণি-মুক্তা খচিত একটি প্রাসাদের খোশ খবর দেয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আদেশ করেন। কোন দিন বকরী যবহ হলে খাদীজাহ (রাঃ)-এর বান্ধবীদের নিকট তাদের প্রত্যেকের দরকার মত গোশ্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিতেন। সহিহ বুখারি : ৩৯১৬, ৩৮১৭, ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

১৬. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর পছন্দের গুরুত্ব দিতেন

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা হাবশীরা বর্শা-বল্লম নিয়ে মসজিদে খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ’’হে হুমাইরা! তুমি কি ওদের খেলা দেখতে চাও?’’ আমি বললাম, ’হ্যাঁ।’ তখন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার থুত্নিকে তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম এবং আমার চেহারাকে তাঁর গালের সাথে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। (বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর) তিনি বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ তাই তিনি আমার জন্য আবারও দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর আবার বললেন, ’’যথেষ্ট হয়েছে, চল এবারে।’’ আমি বললাম, ’হে আল্লাহর রাসূল! তাড়াতাড়ি করবেন না।’ আমার যে তাদের খেলা দেখার খুব শখ ছিল তা নয়, বরং আমি কেবল তাঁর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে এ কথাটা জানিয়ে দিতে চাইছিলাম যে, আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কতটা মর্যাদা ছিল এবং তাঁর কাছে আমার কতটা কদর ছিল। হাদিস সম্ভার : ২৫৮৪, নাসায়ি কুবরা : ৮৯৫১, মুসলিম : ২১০০-২১০৫ হাদিসটি হাদিস সম্ভার থেকে সংকলন করা হয়েছে।

১৭. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর জন্য উপহার কিনে দিতেন

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বাজারে গিয়েছিলেন এবং দুটি জুতা কিনলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো সাওদা (রাঃ)-কে দিলেন।” মুসনাদে আহমাদ : ২৬৬৯৩

১৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অন্য কোন সহধর্মিণীর প্রতি এতটুকু অভিমান করিনি, যতটুকু খাদীজা (রা)-এর প্রতি করেছি। অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা অধিক সময় আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরী যবেহ করে মাংসের পরিমান বিবেচনায় হাড়-মাংসকে ছোট ছোট টুকরা করে হলেও খাদিজা (রাঃ) এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোন সময় অভিমানের সুরে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতাম, (আপনার অবস্থা দৃষ্টে) মনে হয়, খাদীজা (রাঃ) ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন নারী নেই। প্রতি উত্তরে তিনি বলতেন, হ্যাঁ। তিনি এমন ছিলেন, তার গর্ভে আমার সন্তান জন্মেছিল।

সহিহ বুখারি : ৩৮১৮, ৫২২৯, ৬০০৪, ৭৪৮৪, সহিহ মুসলিম : ২৪৩৫, আহমাদ : ২৫৭১৬

নোট : মৃত্যুর পরও খাদীজা (রা)-এর প্রতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত ছিল।

১৯. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর কষ্টের সময় সান্তনা দিতেন

আয়িশা (রাঃ) বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো জানাযা পড়ে বাকী’ (গোরস্থান) থেকে আমার নিকট এলেন। তখন আমার মাথায় ছিল যন্ত্রণা। আমি বলছিলাম, হায় আমার মাথা গেল! তিনি বললেন, বরং আমার মাথাও গেল! (হে আয়েশা!) তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যাও এবং আমি তোমাকে গোসল দিই, কাফনাই, অতঃপর তোমার উপর জানাযা পড়ে তোমাকে দাফন করি, তাহলে এতে তোমার নোকসান আছে কি? ইবনে মাজাহ : ১৪৬৫, ইবনে হিব্বান : ৬৫৮৬, দারাকুত্বনী : ১৯২, বাইহাক্বী : ৬৯০৪, ইরওয়াহ : ৭০০

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: প্রথম কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ

বর্তমান বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বিনোদনের দ্রুত বিকাশ। বিশেষ করে পাশ্চাত্য সমাজ এই বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- আধুনিকতা ও প্রগতির নামে পাশ্চাত্যে যে বিনোদন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা অনেকাংশে নৈতিক অবক্ষয়, লজ্জাহীনতা ও অশ্লীলতার উর্বর ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, ফ্যাশন, ক্রীড়া, সোশ্যাল মিডিয়া— প্রতিটি অঙ্গনেই আজ অশালীনতার প্রকাশ এতটাই সাধারণ যে, তা তাদের সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতিকে বলা যেতে পারে “পাশ্চাত্যে অশ্লীল ও নোংরা বিনোদন”  যেখানে শিল্প, সংস্কৃতি ও আনন্দের নামে মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী নৈতিক বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে।

এই অশ্লীল বিনোদন কেবল একটি সামাজিক প্রবণতা নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক সন্ত্রাস— যা মানবমনের চিন্তাভাবনা, পরিবারব্যবস্থা ও সমাজ কাঠামোকে ভেতর থেকে ধ্বংস করছে। গবেষণায় দেখা যায়, পাশ্চাত্যের এই বিনোদন-সংস্কৃতি তরুণ প্রজন্মকে দ্রুত যৌনাসক্ততা, পারিবারিক ভাঙন, মানসিক বিকার, অপরাধ প্রবণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নগ্নতা, পরকীয়া, সমকামিতা, লিঙ্গবিভ্রান্তি ইত্যাদিকে আজ “স্বাধীনতা” ও “শিল্প” নামে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। ফলে, পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব কেবল নৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়েও গভীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারা আরো ভয়াবহ। ইসলাম মানবজাতিকে বিনোদনের বিরোধিতা করেনি; বরং শালীন, সীমার মধ্যে থাকা বিনোদনকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু যখন বিনোদন মানুষকে পাপ, অশ্লীলতা, আল্লাহর অবাধ্যতা ও সমাজের নৈতিক কাঠামো ধ্বংসের দিকে টেনে নেয়, তখন তা স্পষ্ট হারাম ও ধ্বংসাত্মক হয়ে যায়। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে “ইসলামি দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব” বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মানুষের অন্তরের পবিত্রতা নষ্ট করে, লজ্জা ও হায়ার মূল্যবোধ ধ্বংস করে এবং ফিতনার দরজা খুলে দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার চক্ষু সংযত রাখে, আল্লাহ তার হৃদয়ে ঈমানের মিষ্টতা দান করেন।” কিন্তু পাশ্চাত্যের বিনোদন মানুষের চোখ, কান ও মনকে এমন বিষে ভরিয়ে দিচ্ছে, যা ঈমান ও তাকওয়ার সর্বনাশ ডেকে আনছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই অশ্লীল সংস্কৃতি আজ মুসলিম সমাজে দ্রুত অনুপ্রবেশ করছে। স্যাটেলাইট টিভি, ইন্টারনেট, চলচ্চিত্র, ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যম— সবখানেই পাশ্চাত্যের বিনোদনের আধিপত্য। মুসলিম তরুণ-তরুণীরা অজান্তেই সেই সংস্কৃতির অনুসারী হয়ে পড়ছে। পোশাক-আশাক, কথাবার্তা, চিন্তা-চেতনা, এমনকি দাম্পত্য সম্পর্কেও তাদের মাঝে পাশ্চাত্যের প্রভাব স্পষ্ট। এভাবে “মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ” কেবল সাংস্কৃতিক নয়, এটি একটি ধর্মীয় সংকটেও রূপ নিচ্ছে। এই প্রভাব মুসলিম উম্মাহর চেতনা, নৈতিকতা ও ঐতিহ্যের শিকড় উপড়ে ফেলছে— ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক নৈতিক শূন্যতা, যেখানে পাপ ও পুণ্যের পার্থক্য পর্যন্ত মুছে যাচ্ছে।

এই অধ্যায়ে আমরা চারটি শিরোনামের আলোকে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন সংস্কৃতির উৎস, বিকাশ, নেতিবাচক প্রভাব, ইসলামি বিশ্লেষণ এবং মুসলিম সমাজে এর অনুপ্রবেশের বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করা হবে। লক্ষ্য হলো— এই বিপজ্জনক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নৈতিক পুনর্জাগরণের দিকনির্দেশনা প্রদান করা।

১. পাশ্চাত্যে অশ্লীল ও নোংরা বিনোদন

২. পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

৩. ইসলামি দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

৪. মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ

পঞ্চম অধ্যায়

পাশ্চাত্যে অশ্লীল ও নোংরা বিনোদন

আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বিনোদনের যে ধারাটি প্রভাবশালী, তার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লাগামহীন অশ্লীলতা, কুরুচি ও নোংরামি। এই ধরনের বিনোদন কেবল নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ নয়, বরং এটি মানবজাতির আধ্যাত্মিক এবং মানসিক শান্তির পরিপন্থী। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধরনের প্রবণতা জীবনের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতির ফল এবং এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু আদর্শিক ও সামাজিক কারণ, যা কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

কুরআন মাজীদ মুমিনদেরকে জীবনধারণের ক্ষেত্রে সংযম, শালীনতা এবং তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, দুনিয়ার জীবন কেবল ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসের স্থান এবং পরকালীন সফলতা অর্জনের ক্ষেত্র। কিন্তু পশ্চিমা সমাজে যখন ভোগবাদী দর্শন, বস্তুবাদিতা এবং প্রবৃত্তির অবাধ অনুসরণ প্রধান হয়ে ওঠে, তখন বিনোদনের ধরনও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়।

পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের এই আধিক্যের মূলে রয়েছে একটি সুসংগঠিত আদর্শিক পটভূমি। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পরকালের ধারণাকে অস্বীকার করা, দুনিয়ার জীবনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে নৈতিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধকে দুর্বল করে দেওয়া। এই বিষয়গুলো সম্মিলিতভাবে এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে অবাধ যৌনাচার এবং অশ্লীলতাকে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তিকে কেবল বাণিজ্যিক লাভের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পরিবার ও নৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে মানুষ মুক্তির পথ খুঁজছে এই ক্ষণস্থায়ী, অর্থহীন বিনোদনের মধ্যে। পরবর্তী অংশে কুরআন ও হাদীসের আলোর এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে কিভাবে ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলেই সমাজে অশ্লীলতার এই ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে।

পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন কারণ :

১. ভোগবাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতি

২. নফসের (প্রবৃত্তির) অনুসরণ

৩. পার্থিব জীবন পরকালের উপর প্রধান্য দেয়া

৪. পুনরুত্থানকে অস্বীকারের করা

৫. কুফরির কারনে দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করা হয়েছে

৬. ভোগ-বিলাস পরীক্ষার উপকরণ করা হয়েছে

৭. উন্নত জীবনধারা, আর্থিক অগ্রগতি কারণে

৮ পার্থিক জিন ক্ষনস্থায়ী যা ভাবনাতেই নাই

৯. পার্থিক জীবন উভোগ্য সামগ্রী মাত্র যা ভাবনাতেই নাই

১০. ধর্মীয় ও নৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা:

১১. ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে অবাধ যৌনাচারকে স্বাভাবিকীকরণ :

১২. গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ:

১৩. পরিবারের ভূমিকা দুর্বল হওয়া

১৪. যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদ দ্বারা আবেগ ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি অবিশ্বাস:

১৫. সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে পলায়ন

পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন কারণ :

পাশ্চাত্য সমাজে আজ নোংরা, অসংযত ও অনৈতিক বিনোদনের যে ভয়াবহ প্রসার দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ তাদের বিশ্বাস ব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত। এই সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পরকাল, জবাবদিহিতা, জান্নাত-জাহান্নাম বা সওয়াব-গুনাহের ধারণাকে কার্যত গুরুত্বহীন মনে করে। তাদের চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুধুমাত্র দুনিয়ার ভোগবিলাস, ক্ষণস্থায়ী আনন্দ, ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি। এই চরম বস্তুবাদী (Materialistic) মনোভাবই সমাজকে এমন এক পথে চালিত করেছে, যেখানে নৈতিকতার মানদণ্ড প্রায় বিলুপ্ত, এবং লজ্জা-শরম, হায়া, ও আত্মসংযমের মতো গুণাবলিকে উল্টো ‘ব্যক্তিস্বাধীনতার বাধা’ বলে মনে করা হয়। যখন কোনো সমাজ চিরস্থায়ী পরকালের চেয়ে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসকে বেশি মূল্যবান মনে করে এবং পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় থেকে মুক্ত হয়ে যায়, তখন তারা নৈতিক সীমালঙ্ঘনের দিকে ধাবিত হয় এবং শয়তানের প্ররোচনায় নোংরা বিনোদনের মতো নিম্নগামী ও অশ্লীল পথ অবলম্বন করে। এই ভোগবাদী মানসিকতা এবং পরকালবিমুখতাই পাশ্চাত্য সমাজে অনৈতিকতার প্রসারের প্রধান ভিত্তি তৈরি করেছে। নিচে পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন কিছু কারণ উল্লেখ করা হলো :

১. ভোগবাদী অর্থনীতি ও সংস্কৃতি

পাশ্চাত্য সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর যে অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ওপর স্থাপিত, তা গভীরভাবে পরকালের বিশ্বাসের পরিপন্থী। এই সমাজব্যবস্থা মূলত ভোগবাদ এবং বস্তুবাদকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, জীবনের প্রধান লক্ষ্য দাঁড়ায় তাৎক্ষণিক সুখ অর্জন এবং সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোগ করা। এই সংস্কৃতি মানুষকে শেখায় যে, ‘তুমি যা দেখতে পাও এবং স্পর্শ করতে পারো, তাই তোমার একমাত্র বাস্তবতা’, আর এর বাইরের কোনো অদৃশ্য নৈতিক বা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের গুরুত্ব নেই। এই প্রেক্ষাপটে, নোংরা বিনোদন বা অশ্লীলতা পরিণত হয় ভোগবাদী সমাজের এক সহজলভ্য, দ্রুত ফলদায়ক এবং অত্যন্ত উচ্চ-মুনাফাকারী উপাদানে। যেহেতু এই বিনোদন তাৎক্ষণিক শারীরিক ও মানসিক কামনাকে সন্তুষ্ট করে, তাই এটি অর্থনীতির জন্য বিশাল বাজার তৈরি করে। পরকালে কোনো জবাবদিহিতার ভয় না থাকায়, মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে নৈতিকতার কোনো বাঁধন বা সীমা মানা হয় না। ফলস্বরূপ, এই অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি সমাজে অনৈতিকতার স্রোতকে আরও বেগবান করে, যেখানে নৈতিকতার চেয়ে অর্থ ও ভোগই প্রধান মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি বস্তুত পরকালীন জীবনের দাবির সরাসরি উল্টো চিত্র।

সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ্ তা’আলার নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানো হত তাহলে তিনি কোন কাফিরকে এখানকার পানির এক ঢোকও পান করাতেন না। সুনানে তিরমিজি : ২৩২০, সহীহাহ : ৯৪০

২. নফসের বা প্রবৃত্তির অনুসরণ

যখন কোনো সমাজে পরকালের প্রতিদান ও জবাবদিহিতার ভয় সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়, তখন মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো তার নফসের (প্রবৃত্তির) বা অনিয়ন্ত্রিত কামনা-বাসনার দাসত্ব করা।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

زُیِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّہَوٰتِ مِنَ النِّسَآءِ وَالۡبَنِیۡنَ وَالۡقَنَاطِیۡرِ الۡمُقَنۡطَرَۃِ مِنَ الذَّہَبِ وَالۡفِضَّۃِ وَالۡخَیۡلِ الۡمُسَوَّمَۃِ وَالۡاَنۡعَامِ وَالۡحَرۡثِ ؕ ذٰلِکَ مَتَاعُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَاللّٰہُ عِنۡدَہٗ حُسۡنُ الۡمَاٰبِ

মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালবাসা- নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রূপা, চি‎‎হ্নত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল। সুরা আল ইমরান : ১৪

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰدَاوٗدُ اِنَّا جَعَلۡنٰکَ خَلِیۡفَۃً فِی الۡاَرۡضِ فَاحۡکُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ بِالۡحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الۡہَوٰی فَیُضِلَّکَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ  اِنَّ الَّذِیۡنَ یَضِلُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ لَہُمۡ عَذَابٌ شَدِیۡدٌۢ بِمَا نَسُوۡا یَوۡمَ الۡحِسَابِ 

হে দাউদ! নিশ্চয় আমি তোমাকে যমীনে খলীফা বানিয়েছি, অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার কর আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। নিশ্চয় যারা আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের জন্য কঠিন আযাব রয়েছে। কারণ তারা হিসাব দিবসকে ভুলে গিয়েছিল। সুরা সাদ : ৩৮

ইসলামি পরিভাষায় নফস হলো মানুষের ভেতরের সেই শক্তি, যা তাকে মন্দ কাজের দিকে প্ররোচিত করে এবং নৈতিক সংযম থেকে দূরে রাখে। পাশ্চাত্য সমাজের মতো যেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক সীমারেখা দুর্বল, সেখানে মানুষ সহজেই তার প্রবৃত্তির তাড়নায় পরিচালিত হয়। নোংরা বিনোদন হলো এই নফসের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার এক অত্যন্ত সহজ, তাৎক্ষণিক ও সহজলভ্য মাধ্যম। সমাজের পক্ষ থেকে কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক তোয়াক্কা না থাকায়, এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে আত্মসংযমকে নেতিবাচকভাবে সংজ্ঞায়িত করায়, এই প্রবৃত্তি অনুসরণ করাই যেন স্বাভাবিকতা লাভ করে। মানুষ তখন কেবল তাদের শারীরিক ও জৈবিক চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা মূলত মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়। এই অবাধ্য নফসের নিরঙ্কুশ অনুসরণ সমাজে অশ্লীলতা ও অনৈতিক বিনোদনের মাত্রাকে ক্রমশ চরম শিখরে নিয়ে যেতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এটি স্পষ্ট করে যে, পরকালের ভয় না থাকলে মানুষ নৈতিকতার লাগাম ছেড়ে দিয়ে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

৩. পার্থিব জীবন পরকালের উপর প্রধান্য দেয়া

পাশ্চাত্য ঈমানহীন সমাজে পার্থিব জীবন পরকালের উপর প্রধান্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। যার পরকালের কথা বলে তাদের মাঝে ইসলাম ফবিয়া বা ইসলাম ভীতি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছ। তার মনের করে পরকালের ভীতি তাদের ভাড়া ভাতে পানি দিবে। তারা তাদের প্রতিটি কাজে কর্মে দুনিয়াকে প্রধান্য দেয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এ মনোভাবের কারণ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন-

ذٰلِکَ بِاَنَّہُمُ اسۡتَحَبُّوا الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا عَلَی الۡاٰخِرَۃِ ۙ وَاَنَّ اللّٰہَ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡکٰفِرِیۡنَ

এটা এ জন্য যে, তারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের উপর প্রাধান্য দেয় এবং এ জন্য যে, আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেননা। সূরা নাহল : ১০৭

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষের নৈতিক অধঃপতনের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা এবং আখিরাতের প্রতি উদাসীনতা। যখন কোনো জাতি পরকালের জবাবদিহিতা ভুলে যায়, তখন তারা সবকিছুতেই শুধু তাৎক্ষণিক আনন্দ খোঁজে। নৈতিকতা, সংযম, বা পাপ-পুণ্যের ধারণা তখন তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

অথচ দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন—

بَلْ  تُؤْثِرُوْنَ الْحَیٰوۃَ  الدُّنْیَا ﴿۫ۖ۱۶﴾ وَ الْاٰخِرَۃُ  خَیْرٌ  وَّ اَبْقٰی ﴿ؕ۱۷﴾

“তোমরা এ দুনিয়ার জীবন চাও, অথচ পরকাল উত্তম ও স্থায়ী। সূরা আলা : ১৬-১৭

অর্থাৎ দুনিয়ার সুখ-ভোগ অল্প কিছুদিনের জন্য, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী এবং প্রকৃত সুখের স্থান।

দুনিয়ার আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, যেমন শিশুর খেলা; কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরন্তন বাস্তবতা।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—

وَمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ

আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী। সূরা আল ইমরান : ১৮৫

মানুষ দুনিয়ার চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়, কিন্তু তা ধোঁকা। ফলস্বরূপ, পাশ্চাত্যে আজ “বিনোদন” মানেই যৌন উন্মুক্ততা, নগ্নতা, অশ্লীলতা, মাদক, জুয়া, বা বিকৃত সংস্কৃতির প্রকাশ। তারা এটাকে “শিল্প” বা “স্বাধীনতা” বলে আখ্যা দেয়। অথচ এর আড়ালে আছে পরকাল-অস্বীকার, আত্মসংযমহীনতা, ও হৃদয়ের অন্ধতা।

অতএব, কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, পাশ্চাত্যের অধিকমাত্রায় নোংরা বিনোদনের দিকে ধাবিত হওয়ার মূল কারণ হলো—আখিরাতের বিশ্বাস হারানো ও দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া। যার পরিণাম হলো নৈতিক শূন্যতা, আত্মিক সংকট, ও মানবিক মূল্যবোধের ধ্বংস।

৪. পুনরুত্থানকে অস্বীকারের করা

পাশ্চাত্য সমাজের একটি বিশাল অংশের মধ্যে পুনরুত্থান (আখিরাত) অস্বীকারের মানসিকতা থাকায় অশ্লীল বিনোদনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরকাল বা চূড়ান্ত জবাবদিহিতার ভয় না থাকায়, তাদের কাছে নৈতিকতার বাঁধন আলগা হয়ে যায়। ফলে, জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতে সর্বোচ্চ ভোগ ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি অর্জন করা। অশ্লীল বিনোদন হলো এই তাৎক্ষণিক ভোগবাদ চরিতার্থ করার সহজ মাধ্যম।

পাশ্চাত্য সমাজের এ মৌলিক বিশ্বাস কুরআনের ঘোষনার সাথে মিলে যায় আল্লাহ বলেন-

اِنۡ ہِیَ اِلَّا حَیَاتُنَا الدُّنۡیَا نَمُوۡتُ وَنَحۡیَا وَمَا نَحۡنُ بِمَبۡعُوۡثِیۡنَ ۪ۙ

একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি বাঁচি এখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হবনা। সুনা মুমিনুন : ৩৭

পুনরুত্থান অস্বীকারের ফলে, জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোগ ও ইন্দ্রিয়তৃপ্তি অর্জন করা। অশ্লীল বিনোদন এই তাৎক্ষণিক ভোগবাদকে সহজে চরিতার্থ করার মাধ্যম হিসেবে সমাজের কেন্দ্রে চলে আসে। তাদের বিশাল অংশের মনোভাবে এই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। তাদের কাছে দৃশ্যমান দুনিয়াই একমাত্র সত্য, আর শ্রুতিনির্ভর পরকালকে তারা অসম্ভব মনে করে। এই মানুষগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের মতো বিষয়কে গৌণ মনে করে এবং দুনিয়ার জীবনেই যথাসম্ভব পরিপূর্ণ প্রাপ্তির লালসা করে। পরকালের কোনো জবাবদিহিতার ভয় না থাকায়, তারা নৈতিক সীমা লঙ্ঘন করতে দ্বিধা করে না। তারা নিকটবর্তী চন্দ্রের মোহ দেখে দূরবর্তী বিশাল নক্ষত্রকে ভুলে বসেছে—অর্থাৎ তাৎক্ষণিক ভোগবিলাস তাদের কাছে চিরস্থায়ী কল্যাণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরকালবিমুখতার পরিণতি হিসেবে, তাদের সামনে আল্লাহ পার্থিব জীবনকে আরও বেশি মোহনীয় করে উপস্থাপন করেছেন।

৫. কুফরির কারনে দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করা হয়েছে

যারা পরকালে অবিশ্বাস করে বা কুফরিকে তাদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদের জন্য পার্থিব জীবনকে বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বা ‘সুশোভিত’  করে তোলেন। অর্থাত তাদের মধ্যে দুনিয়াকে ভোগ করা তীব্র আকর্ষণ সৃষ্টি করা হয়। প্রযুক্তি, সম্পদ, বিলাসিতা এবং তাৎক্ষণিক আনন্দ লাভের সুযোগগুলো তাদের কাছে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এই মোহের কারণেই তারা নোংরা ও অনৈতিক বিনোদনের মতো নিম্নগামী ভোগে ডুবে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

زُیِّنَ لِلَّذِیۡنَ کَفَرُوا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا وَیَسۡخَرُوۡنَ مِنَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۘ

যারা কুফরী করেছে, দুনিয়ার জীবনকে তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আর তারা মুমিনদের নিয়ে উপহাস করে। সূরা বাকারা : ২১২

যখন দুনিয়ার জীবন তাদের কাছে এতোটাই মোহনীয় ও একমাত্র সত্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন তারা মুমিনদের জীবনযাত্রাকে (সংযম, ধৈর্য, এবং ত্যাগে) উপহাস করে। তাদের দৃষ্টিতে, মুমিনরা যেন এক ‘অবাস্তব’ পরকালের জন্য ‘বাস্তব’ জীবনের ভোগ-সুখ ত্যাগ করছে। এই উপহাসের মানসিকতা প্রমাণ করে যে, তাদের অন্তরে পরকালের প্রতি বিশ্বাসের বিন্দুমাত্র স্থান নেই, যা তাদের অসংযত ও অনৈতিক জীবনধারাকে ন্যায্যতা দেয়।

৬. ভোগ-বিলাস পরীক্ষার উপকরণ করা হয়েছে

পাশ্চাত্য সমাজের ভোগ-বিলাসের জীবন হলো একটি ক্ষণস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মোহে অন্ধ হয়ে তারা নোংরা বিনোদন ও অনৈতিকতার দিকে ঝুঁকেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

وَلَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَرِزۡقُ رَبِّکَ خَیۡرٌ وَّاَبۡقٰی

আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী। সূরা ত্বহা : ১৩১

পাশ্চাত্য সমাজে যে বিপুল সম্পদ, প্রযুক্তি, এবং “পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের উপকরণ (যেমন- বিলাসবহুল জীবনধারা, দ্রুত পরিবর্তনশীল ফ্যাশন, এবং নোংরা বিনোদনের সহজলভ্যতা) দেখা যায়, তা মূলত তাদের স্থায়ী সফলতা বা পুরস্কার নয়। বরং এটি তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি কঠিন পরীক্ষা। এই উপকরণগুলো দেওয়া হয়েছে এটা দেখার জন্য যে, তারা এই ক্ষণস্থায়ী জৌলুসে মত্ত হয়ে সঠিক পথ (ঈমান ও নৈতিকতা) থেকে বিচ্যুত হয় কি না।

পাশ্চাত্য সমাজ পুনরুত্থান ও পরকালকে অস্বীকার করে এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। তারা এই “পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যকে চূড়ান্ত গন্তব্য মনে করে অশ্লীলতা ও অনৈতিক ভোগে ডুবে গেছে।

আল্লাহ তাআলা এই ভোগ-বিলাসের প্রতি দৃষ্টি না দিতে বলে মুমিনদের সতর্ক করেছেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, কাফিরদের এই জীবনধারা ঈর্ষার যোগ্য নয়, বরং এটি একটি ফাঁদ (পরীক্ষা)। এর বিপরীতে, মুমিনদের জন্য “আপনার পালনকর্তার দেওয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী রিজিক হলো পরকালীন সুখ, জান্নাত, এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি।

৭. উন্নত জীবনধারা ও আর্থিক অগ্রগতি কারণে

পাশ্চাত্য সমাজের মানুষ তাদের উন্নত জীবনধারা, আর্থিক অগ্রগতি, ও জাগতিক প্রতিপত্তি (ধন-সম্পদ, প্রযুক্তি, ক্ষমতা) দেখে প্রায়শই মনে করে যে, তারা সঠিক পথেই আছে এবং এটি তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। তারা ধরে নেয়, এই প্রাচুর্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কৃতিত্বের পুরস্কার।

আল্লাহ তাআলা তাদের সুখ-সম্ভোগ, রিজিক, সম্পদ ও সন্তান দান করেছেন, এগুলো তাদের পরিশুদ্ধতা ও আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাদের ভালোবাসার কারণে? না, বাস্তবতা এমন নয়। বরং তারা পৃথিবীতে যে ভালো কাজগুলো করে, দুনিয়াতেই এগুলো তার নগদ প্রতিদান। আর কিয়ামতের দিন তারা এমনভাবে পুনরুত্থিত হবে, তাদের আমলনামায় কোনো নেকআমল অবশিষ্ট থাকবে না, থাকবে শুধু বদআমলের ফিরিস্তি আর নোংরা কালিনা। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-

اَیَحْسَبُوْنَ اَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِہٖ مِنْ مَّالٍ وَّ بَنِیْنَ ﴿ۙ۵۵﴾ نُسَارِعُ  لَهُمْ فِی الْخَیْرٰتِ ؕ بَلْ لَّا یَشْعُرُوْنَ ﴿۵۶﴾

তারা কি মনে করে যে, তাদের জাগতিক প্রতিপত্তির কারণে আমি তাঁদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে যাচ্ছি, যাতে করে তাদের দ্রুত মঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? বরং তারা বোঝে না। সুরা মুমিনুন : ৫৫-৫৬

দুনিয়ার জীবন আল্লাহর পরীক্ষা ক্ষেত্র, স্থায়ী আবাস নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

مَنْ كَانَ یُرِیْدُ الْحَیٰوۃَ  الدُّنْیَا وَ زِیْنَتَهَا نُوَفِّ اِلَیْهِمْ اَعْمَالَهُمْ فِیْهَا وَ هُمْ  فِیْهَا  لَا  یُبْخَسُوْنَ ﴿۱۵﴾ اُولٰٓئِكَ الَّذِیْنَ لَیْسَ لَهُمْ فِی الْاٰخِرَۃِ  اِلَّا النَّارُ ۫ۖ وَ  حَبِطَ مَا صَنَعُوْا  فِیْهَا وَ  بٰطِلٌ  مَّا  كَانُوْا  یَعْمَلُوْنَ ﴿۱۶﴾

যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবন ও তার জৌলুস কামনা করে, আমি সেখানে তাদেরকে তাদের আমলের ফল পুরোপুরি দিয়ে দেই এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না। এরা এমন লোক যে, তাদের জন্য আখিরাতে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই; আর তারা যা কিছু করছে তাও বিফল হবে। সূরা হুদ : ১৫-১৬

কাফের বা অবিশ্বাসীরা মনে করে যে, তাদের ধন-সম্পদ (মাল) ও সন্তান-সন্ততির প্রাচুর্য তাদের সৌভাগ্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ। তারা ভুলবশত মনে করে যে, আল্লাহ তাদের দ্রুত কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। পাশ্চাত্য সমাজের ভোগবাদী সফলতা এই বিভ্রান্তিকে আরও দৃঢ় করে।

আল্লাহ তাআলা তাদের এই জাগতিক প্রতিপত্তি দিচ্ছেন পরীক্ষা হিসেবে এবং এটি তাদের অজ্ঞতা প্রমাণ করে। এই প্রাচুর্য তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ ধীরে ধীরে এই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় দায়িত্ব থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেয়। তারা এই মিথ্যা মায়ায় ডুবে গিয়ে মনে করে যে, পরকালের কোনো প্রয়োজন নেই।  জাগতিক মোহে তারা এতোটাই অন্ধ হয়ে যায় যে, তারা বুঝতে পারে না যে, এই জীবন কেবল পরীক্ষা মাত্র এবং এই প্রতিপত্তি তাদের অনৈতিকতা ও সীমালঙ্ঘনের জন্য চূড়ান্ত শাস্তি অনিবার্য করে তুলছে।

৮. পার্থিক জীবন উভোগ্য সামগ্রীর কারনে

পার্থিব জীবন ভোগ্য সামগ্রী মাত্র”—এ বক্তব্যটি কুরআনের ভাষায় গভীর অর্থ বহন করে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে বুঝাতে চেয়েছেন, দুনিয়ার জীবনের সব সাজসজ্জা, আনন্দ ও ভোগবিলাস মূল লক্ষ্য নয়; বরং এটি এক পরীক্ষা, এক অস্থায়ী ভোগ্য সামগ্রী, যার পরেই আসবে চিরস্থায়ী জীবন আখিরাত।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَا ہٰذِہِ الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا لَہۡوٌ وَّلَعِبٌ ؕ وَاِنَّ الدَّارَ الۡاٰخِرَۃَ لَہِیَ الۡحَیَوَانُ ۘ لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ

আর এ দুনিয়ার জীবন খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং নিশ্চয় আখিরাতের নিবাসই হলো প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত। সূরা আনকাবূত : ৬৪

অর্থাৎ দুনিয়া হলো এক প্রকার অস্থায়ী বিনোদন, যা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। প্রকৃত জীবন হলো আখিরাতের, যেখানে সুখ-দুঃখ, পুরস্কার বা শাস্তি স্থায়ী।

 আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন—

اِعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا لَعِبٌ وَّلَہۡوٌ وَّزِیۡنَۃٌ وَّتَفَاخُرٌۢ بَیۡنَکُمۡ وَتَکَاثُرٌ فِی الۡاَمۡوَالِ وَالۡاَوۡلَادِ ؕ

তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। সূরা হাদীদ : ২০

এ আয়াতগুলো দুনিয়ার জীবনকে উদ্ভিদের মতো উপমা দেওয়া হয়েছে—অল্প সময়ের জন্য সবুজ, তারপর ধীরে ধীরে মলিন ও শেষ।

০৯. ধর্মীয় ও নৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা :

ঐতিহাসিকভাবে চার্চের ক্ষমতা হ্রাস এবং আধুনিক সেক্যুলারিজমের উত্থানের ফলে সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কমে গেছে। ফলে, নৈতিকতা ও সংযমের শিক্ষা দেওয়ার এবং অশ্লীলতা প্রতিরোধের কোনো শক্তিশালী সামাজিক বা আধ্যাত্মিক বাঁধন অবশিষ্ট নেই। ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে চরম পর্যায়ে নেওয়ার ফলে ধর্মীয় অনুশাসনকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যা গণমাধ্যম ও বিনোদনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَنۡ اَعۡرَضَ عَنۡ ذِکۡرِیۡ فَاِنَّ لَہٗ مَعِیۡشَۃً ضَنۡکًا وَّنَحۡشُرُہٗ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ اَعۡمٰی

যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামাত দিবসে উত্থিত করব অন্ধ অবস্থায়। সূরা ত্বাহা : ১২৪

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে গেলে মানুষের অন্তর সংকীর্ণ হয়, নৈতিকতা লুপ্ত হয়, আর সংযমের জায়গায় প্রবৃত্তি প্রাধান্য পায়।

৪৩৩৮। কাইস (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু বাকর (রাঃ) আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করার পর বললেন, হে জনসমাজ! তোমরা তো এ আয়াত পাঠ করে থাকো, কিন্তু একে যথাস্থানে প্রয়োগ করো না। আল্লাহর বাণী-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا عَلَیۡکُمۡ اَنۡفُسَکُمۡ ۚ لَا یَضُرُّکُمۡ مَّنۡ ضَلَّ اِذَا اہۡتَدَیۡتُمۡ 

হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর তোমাদের নিজদের দায়িত্ব। যদি তোমরা সঠিক পথে থাক তাহলে যে পথভ্রষ্ট হয়েছে সে তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। সূরা মায়িদা : ১০৫

তিনি খালিদ থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মানুষ যখন কোনো যালেমকে যুলম করতে দেখে তার দু’ হাত চেপে ধরে না অবিলম্বে আল্লাহ তাদের সবাইকে শাস্তি দিবেন। আমর (রহঃ) হুসাইন থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে জাতির মধ্যে পাপকাজ হতে থাকে, এগুলো বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধ করছে না, অচিরেই আল্লাহ তাদের সবাইকে চরম শাস্তি দিবেন। সুনানে আবু দাউদ ; ৪৩৩৮

১০. ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে অবাধ যৌনাচারকে স্বাভাবিকীকরণ :

 বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া ‘যৌন বিপ্লব’ এবং ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’র চরম ব্যাখ্যার কারণে যেকোনো ধরনের অসংযত ও অনৈতিক যৌনাচারকে স্বাভাবিক, এমনকি প্রগতিশীল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই দর্শন লজ্জা, শরম ও আত্মসংযমকে পশ্চাৎপদতা বা ‘ব্যক্তিস্বাধীনতার বাধা’ হিসেবে চিত্রিত করে, যা নোংরা বিনোদনের প্রসারকে বৈধতা দেয়।  অথচ আল্লাহ বলেন-

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে যৌনাচারকে বৈধ করা কুরআনের এই স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার সরাসরি বিরোধী। আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু সেই স্বাধীনতা শারঈ সীমারেখার মধ্যে।

আবূ মাস‘ঊদ ‘উকবাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আম্বিয়া-এ-কিরামের উক্তিসমূহ যা মানব জাতি লাভ করেছে, তার মধ্যে একটি হল, ‘‘যদি তোমার লজ্জা না থাকে তাহলে তুমি যা ইচ্ছে তাই কর।’’ সহিহ বুখারি : ৩৪৮৩, ৩৪৮৪, ৬১২০

অর্থাৎ লজ্জাহীনতা ও ‘ব্যক্তিস্বাধীনতার’ অপব্যবহার মানুষকে অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

১১. গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ:

পশ্চিমা অর্থনীতিতে, নোংরা ও অশ্লীল বিনোদন ইত্যাদি হলো এক বিশাল লাভজনক শিল্প। ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং মোবাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে এই শিল্প মুনাফা লাভের জন্য ক্রমাগত আরও বেশি উত্তেজক, কুরুচিপূর্ণ এবং সহজলভ্য সামগ্রী তৈরি করে। এখানে লাভই একমাত্র চালিকাশক্তি, নৈতিকতা নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یُرِیۡدُوۡنَ لِیُطۡفِـُٔوۡا نُوۡرَ اللّٰہِ بِاَفۡوَاہِہِمۡ وَاللّٰہُ مُتِمُّ نُوۡرِہٖ وَلَوۡ کَرِہَ الۡکٰفِرُوۡنَ

তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতাদানকারী। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। সূরা সফ : ৮

অর্থাৎ, পুঁজিবাদী গণমাধ্যম আল্লাহর নূর (নৈতিকতা, হায়া, ঈমান) নিভিয়ে দিতে চায় লাভের জন্য। কিন্তু আল্লাহর দ্বীন কখনো নিভবে না।

১২. পরিবারের ভূমিকা দুর্বল হওয়া

 ঐতিহ্যবাহী পরিবার কাঠামোর ভাঙন এবং বিবাহ ও সন্তানের প্রতি অনাগ্রহ বাড়ার কারণে সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেছে। পরিবার যেখানে শিশুদের সংযম, লজ্জা ও সম্পর্কের পবিত্রতার শিক্ষা দিত, সেই ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় শিশুরা খুব কম বয়স থেকেই অশ্লীল বিনোদনের শিকার হচ্ছে এবং একেই স্বাভাবিক মনে করছে। অথচ আল্লাহ বলেন-

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ قُوا۟ أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارٗا

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো। সূরা তাহরীম : ৬

পরিবারের দায়িত্ব হলো সন্তানদের ঈমান, লজ্জা, সংযম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া। যখন পরিবার ব্যর্থ হয়, তখন সমাজ নৈতিক ভিত্তি হারায়।

আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম (শাসক) একজন দায়িত্বশীল। কাজেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে, আর খাদিম তার মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। [‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)] বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এদের সম্পর্কে (নিশ্চিতভাবেই) শুনেছি। তবে আমার ধারণা; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, আর সন্তান তার পিতার সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। মোটকথা তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৮, সহিহ মুসলিম : ১৮২৯

১৩. যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদ দ্বারা আবেগ ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি অবিশ্বাস:

পাশ্চাত্য দর্শন বহুলাংশে চরম যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানবাদকে গ্রহণ করেছে। এর ফলস্বরূপ, আবেগ, আধ্যাত্মিকতা, এবং নৈতিক জ্ঞানকে (যা ধর্ম থেকে আসে) অযুক্তিসঙ্গত বা অন্ধ বিশ্বাস হিসেবে বাতিল করে দেওয়া হয়। যার ফলে তারা মনে করে ধর্ম বা পরকার বলতে কিছুই নাঈ। ধর্মীয় বিশ্বাস বাদ দিয়ে যখন মানবজীবনের নৈতিকতা শুধু যুক্তি বা সামাজিক চুক্তির ওপর নির্ভর করে, তখন প্রবৃত্তি অনুসরণ করাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়, যা অশ্লীল বিনোদনের জন্ম দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَفَلَمۡ یَسِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَتَکُوۡنَ لَہُمۡ قُلُوۡبٌ یَّعۡقِلُوۡنَ بِہَاۤ اَوۡ اٰذَانٌ یَّسۡمَعُوۡنَ بِہَا ۚ فَاِنَّہَا لَا تَعۡمَی الۡاَبۡصَارُ وَلٰکِنۡ تَعۡمَی الۡقُلُوۡبُ الَّتِیۡ فِی الصُّدُوۡرِ

তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি? তাহলে তাদের হত এমন হৃদয় যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারত এবং এমন কান যা দ্বারা তারা শুনতে পারত। চোখ অন্ধ হয় না, বরং বুকের ভেতর যে হৃদয় আছে, সেটিই অন্ধ হয়। সূরা হাজ্জ : ৪৬

যারা শুধু যুক্তি ও ইন্দ্রিয় দিয়ে বিচার করে, তাদের অন্তর অন্ধ হয়ে যায়—তারা নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধি করতে পারে না।

১৪. সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে পলায়ন

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, পরকালবিমুখ এবং বস্তুবাদী সমাজে এক ধরনের ‘অস্তিত্বের শূন্যতা’ ও মানসিক অস্থিরতা বিরাজ করে। এই শূন্যতা এবং জীবনের অর্থহীনতার ভয় থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তাৎক্ষণিক, তীব্র আনন্দদায়ক কিন্তু অর্থহীন বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার মধ্যে অশ্লীলতা অন্যতম। সামাজিক অস্থিরতা ও বিষণ্ণতা থেকে পলায়ন জন্য অর্থহীন বিনোদনের দিকে না ঝুঁকে আল্লাহর স্মররই মুক্তি দিতে পারে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। সূরা রাদ : ২৮

যখন সমাজ আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন হৃদয়ে শূন্যতা, উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা ভর করে; মানুষ তা পূরণ করতে অশ্লীলতা, মদ্যপান ও বিনোদনে ডুবে যায়।

১৫. পার্থিক আইনে অশ্লীলতা বৈধনা প্রদান

পাশ্চাত্য সমাজে আইন ও নৈতিকতার মধ্যে তীব্র বিভাজন বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয় আইনে ‘পাপ’ বা ‘নৈতিক অপরাধ’ বলে কিছু নেই। ব্যক্তিগত আচরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কেবল তখনই হস্তক্ষেপ করে যখন তা অন্যের ক্ষতি করে। ফলে, অধিকাংশ অশ্লীল বিনোদন (পর্নোগ্রাফির উৎপাদন ও বিতরণ, যা স্বেচ্ছায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ঘটে) আইনের সুরক্ষা পায়, কারণ এটিকে ‘অভিব্যক্তির স্বাধীনতা’ এবং ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখা হয়।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰکُمۡ عَبَثًا وَّاَنَّکُمۡ اِلَیۡنَا لَا تُرۡجَعُوۡنَ

তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে কেবল অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে না’? সূরা মুমিনুন : ১১৫

আল খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ গৰ্হিত কাজ হতে দেখলে সে যেন স্বহস্তে (শক্তি প্রয়োগে) পরিবর্তন করে দেয়, যদি তার সে ক্ষমতা না থাকে, তবে মুখ (বাক্য) দ্বারা এর পরিবর্তন করবে। আর যদি সে সাধ্যও না থাকে, তখন অন্তর দ্বারা করবে, তবে এটা ঈমানের দুর্বলতম পরিচায়ক। সহিহ মুসলিম : ৪৯

আইন যদি অশ্লীলতাকে বৈধতা দেয়, মুসলিমকে অন্তত হৃদয়ে ঘৃণা করতে হবে এবং সমাজে বিকল্প নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে হবে।

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ : দ্বিতীয় কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেদেরকে সভ্যতা, অগ্রগতি ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই তথাকথিত স্বাধীনতা আজ তাদের নৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশেষত, বিনোদনের নামে অশ্লীলতা, নগ্নতা, বিকৃত রুচি ও যৌন উদ্দীপনামূলক সংস্কৃতি পশ্চিমা সমাজকে অন্তঃসারশূন্য করে তুলেছে। ইসলামে বিনোদন নিষিদ্ধ নয়, বরং সীমার মধ্যে তা উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু যখন তা আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে অশ্লীলতা ও পাপাচারে রূপ নেয়, তখন তা ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-

قُلۡ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الۡفَوَاحِشَ مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَمَا بَطَنَ وَالۡاِثۡمَ وَالۡبَغۡیَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَاَنۡ تُشۡرِکُوۡا بِاللّٰہِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِہٖ سُلۡطٰنًا وَّاَنۡ تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ

বল ,‘আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ, যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উাপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না’। সূরা আরাফ : ৩৩

এ আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, অশ্লীলতার প্রকাশ্য প্রচার সমাজের জন্য বিষের মতো। পাশ্চাত্যে আজ সেই বিষই সংস্কৃতির রূপ নিয়েছে। নিচে তার কিছু বড় নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলো।

১. পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া

২. অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া

৩. চরম স্বার্থপরতা বৃদ্ধি

৪. অশ্লীল ইন্ডাস্ট্রির সৃষ্টি ও বিস্তার

৫. উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন

৬. মানসিক বিকার ও হতাশা বৃদ্ধি:

৭. নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠা:

৮. যৌন অপরাধের হার বৃদ্ধি:

৯. কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা হ্রাস

১০. সমকামিতা ও বিকৃত যৌনাচার বৃদ্ধি:

১১. তরুণ প্রজন্মের চরিত্র ধ্বংস:

১২. আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও জীবনের অর্থ হারানো:

১৩. মানসিক স্বাস্থ্য এবং সম্পর্কের অবনতি

১৪. নারী ও শিশুদের বস্তুকরণে উৎসাহ

১৫. শিশু ও তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা

১৬. নৈতিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ অবক্ষয়

১. পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া

অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদন মানুষকে একক ও বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। যখন ব্যক্তিগত বিনোদন, বিশেষত পর্নোগ্রাফি বা চরম কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট, পারিবারিক সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তখন পরিবারের সদস্যদের মধ্যেকার যোগাযোগ ও সহমর্মিতা হ্রাস পায়। এই ধরনের বিনোদন প্রায়শই অবাস্তব যৌন প্রত্যাশা তৈরি করে, যা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও দূরত্ব সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির চরম প্রাধান্যতা পারিবারিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধকে ম্লান করে দেয়। ফলস্বরূপ, পরিবারে ভাঙন, বিবাহবিচ্ছেদ এবং সন্তানদের মধ্যে সুরক্ষার অভাব ও মানসিক আঘাত বৃদ্ধি পায়। পাশ্চাত্য সমাজে যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সর্বোচ্চ মূল্য পায়, সেখানে এই ধরনের বিনোদন আরও দ্রুত পারিবারিক কাঠামোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হলো দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন সমাজ তৈরি হওয়া। ফলে বিবাহ ভেঙে যায়, সন্তানরা পিতামাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, এবং সমাজে একাকিত্ব ও হতাশা বৃদ্ধি পায়। ইসলামে পরিবার সমাজের ভিত্তি। আল্লাহ বলেন,

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। সূরা রূম : ২১

এই ভালোবাসা ও দয়ার বন্ধনকে অশ্লীল সংস্কৃতি ছিন্ন করছে, ফলে পাশ্চাত্য সমাজে পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।

২. অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া

নোংরা বিনোদনের নিরন্তর প্রবাহ মানুষের মধ্যে নৈতিক সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। এই ধরনের কনটেন্ট প্রায়শই সহিংসতা, প্রতারণা এবং অবৈধ সম্পর্ককে গ্ল্যামারাইজ করে বা সেগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দেয়। যখন কেউ নিয়মিতভাবে এই কনটেন্টগুলো দেখতে থাকে, তখন আচরণের স্বাভাবিককরণ ঘটে, যেখানে পূর্বে যা অনৈতিক বলে বিবেচিত হতো, তা ক্রমশ গ্রহণযোগ্য বা পরীক্ষামূলক বলে মনে হতে শুরু করে। এটি বিশেষত তরুণদের মধ্যে দেখা যায়, যারা বিনোদনের মাধ্যমে শেখা আক্রমণাত্মক বা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে উৎসাহিত হয়। ফলে, অনৈতিক কার্যকলাপ মানুষকে ধীরে ধীরে পাপাচারের দিকে ঠেলে দেয়। চাহিদা জাগায়, তারপর সেই চাহিদা মেটাতে মানুষ বাস্তব জীবনে ব্যভিচার, ধর্ষণ, পরকীয়া ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ে।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখারি, ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ :

অশ্লীল বিনোদন এই “চোখের ব্যভিচার”কে সাধারণ ব্যাপারে পরিণত করেছে। পরিণতিতে নৈতিকতা বিলুপ্ত।

৩. চরম স্বার্থপরতা বৃদ্ধি

অশ্লীল বিনোদন প্রায়শই তাৎক্ষণিক আত্মতৃপ্তি এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রাধান্যকে প্রচার করে। এই ধরনের কনটেন্টের মূল ভিত্তি হলো অন্যের অনুভূতি বা পরিণতির তোয়াক্কা না করে নিজের কামনা চরিতার্থ করা। এটি ক্রমাগত মানুষকে শেখায় যে, নিজের ভোগ বা আনন্দই জীবনের প্রধান লক্ষ্য, এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্য মানুষের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা যেতে পারে। এর ফলে সমাজে সমবেদনা, পরার্থপরতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব দেখা দেয়। যখন ব্যক্তি তার চারপাশের মানুষের প্রতি উদাসীন হয়ে কেবল নিজের চাহিদা পূরণে মগ্ন থাকে, তখন চরম স্বার্থপরতা সমাজের প্রতিটি স্তরে বিষ ছড়ায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি অনৈক্যপূর্ণ ও অমানবিক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বিলীন হয়ে যায়। ফলে, প্রত্যেকে নিজের সুখের জন্য অন্যকে ব্যবহার করতে চায়। ইসলামে এ প্রবণতা নিন্দনীয়। আল্লাহ তায়াল বলেন-

ۘ وَتَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَالتَّقۡوٰی ۪ وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ

সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর। সূরা মায়িদাহ : ২

অশ্লীল বিনোদন মানুষকে এই সহযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক নিঃসঙ্গ, আত্মকেন্দ্রিক জীবনে ঠেলে দেয়।

৪. অশ্লীল ইন্ডাস্ট্রির সৃষ্টি ও বিস্তার

অশ্লীল এবং কুরুচিপূর্ণ বিনোদনের চাহিদাকে কেন্দ্র করে বিশাল একটি শিল্প গড়ে উঠেছে, যা আর্থিক লাভের জন্য মানুষের নৈতিক দুর্বলতা ও আসক্তিকে পুঁজি করে। পর্নোগ্রাফি, অতিরিক্ত যৌনতাযুক্ত গেম বা মিডিয়া কনটেন্ট উৎপাদনকারী এই ইন্ডাস্ট্রিগুলো বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে। এই শিল্পের বিস্তার কেবল কনটেন্ট তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ট্র্যাফিকিং, শোষণ এবং দুর্বল শ্রেণির মানুষকে ব্যবহার করার মতো অন্ধকার দিকগুলোকেও উৎসাহিত করে। অর্থের এই চক্র মানুষকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে আরও বেশি কুরুচিপূর্ণ ও সীমা অতিক্রমকারী কনটেন্ট তৈরি করতে প্ররোচিত করে। এই শিল্প সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ক্রমাগত ক্ষয় করে এবং মানুষের উপভোগের বস্তুকরণকে স্বাভাবিক করে তোলে, যা এক অসুস্থ সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এটি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছে, কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রি তাকে অপমানিত করেছে। অথচ ইসলাম মনে করে, দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ সতী নারী।

আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়া উপভোগের উপকরণ (ভোগ্যপণ্য) এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী। সহিহ মুসলিম : ১৪৬৭

৫. উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন

যখন জীবনধারণের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায় শুধুমাত্র বিনোদন বা ভোগ, তখন মানুষের মধ্যে জীবনের গভীর অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা হ্রাস পায়। অশ্লীল বিনোদন প্রায়শই মানুষকে একটি অবাস্তব জগতে আটকে রাখে, যেখানে তারা তাৎক্ষণিক আনন্দ খুঁজে পায় এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে শেখে। এই ধরনের জীবনযাপন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ, কঠোর পরিশ্রম বা আত্ম-উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করতে বাধা দেয়। ফলস্বরূপ, ব্যক্তিরা একটি উদ্দেশ্যহীন, লক্ষ্যহীন ও আলস্যপূর্ণ জীবনযাপন শুরু করে। এটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যেখানে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো (যেমন শিক্ষা, ক্যারিয়ার গঠন, সম্পর্ক স্থাপন) উপেক্ষা করে বিনোদনে মগ্ন থাকে। এই অলস ও অর্থহীন জীবনযাপন সমাজে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতার অভাব ঘটায়।

যে সমাজে আনন্দই সর্বোচ্চ লক্ষ্য, সেখানে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং আল্লাহভীতিহীন, উদ্দেশ্যহীন ও আখিরাত-বিমুখ করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰکُمۡ عَبَثًا وَّاَنَّکُمۡ اِلَیۡنَا لَا تُرۡجَعُوۡنَ

তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে কেবল অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে না’? সূরা মু’মিনুন : ১১৫

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-

وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ

আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। সুরা জারিয়া : ৫৬

৬. মানসিক বিকার ও হতাশা বৃদ্ধি

অতিরিক্ত নোংরা বিনোদনের আসক্তি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পুরস্কার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে দেয়। পর্নোগ্রাফি বা চরম কনটেন্টের মাধ্যমে মস্তিষ্কে ডোপামিনের অতিরিক্ত প্রবাহ বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক আনন্দগুলোকে ম্লান করে দেয়। এই আসক্তি যখন পূরণ হয় না, তখন উদ্বেগ, হতাশা, নিদ্রাহীনতা এবং বিষণ্নতা বৃদ্ধি পায়। যারা এই আসক্তিতে ভোগে, তারা প্রায়শই নিজেদের জীবন ও সম্পর্ক নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে, যা পূরণ না হওয়ায় তারা আরও হতাশ হয়ে পড়ে। এছাড়াও, এই কনটেন্টগুলো দেখার পর প্রায়শই অপরাধবোধ, লজ্জা এবং আত্ম-ঘৃণা জন্ম নেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে সমাজে মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ মানসিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। অশ্লীল কনটেন্টে আসক্ত ব্যক্তি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা  যায়, এটি ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, সামাজিক ভয় ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায়। ইসলাম আত্মসম্মান, সংযম ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ یٰعِبَادِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوۡا رَبَّکُمۡ ؕ لِلَّذِیۡنَ اَحۡسَنُوۡا فِیۡ ہٰذِہِ الدُّنۡیَا حَسَنَۃٌ ؕ وَاَرۡضُ اللّٰہِ وَاسِعَۃٌ ؕ اِنَّمَا یُوَفَّی الصّٰبِرُوۡنَ اَجۡرَہُمۡ بِغَیۡرِ حِسَابٍ

বল, ‘হে আমার মুমিন বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় ভাল কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই। সূরা যুমার : ১০

৭. নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠা

নোংরা বিনোদন, বিশেষত পর্নোগ্রাফি, প্রায়শই নারীকে শুধুমাত্র যৌন বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে। এই ধরনের কনটেন্টে নারীর আবেগ, মর্যাদা এবং ব্যক্তিত্বকে উপেক্ষা করা হয়, এবং তাকে কেবল পুরুষের যৌন পরিতৃপ্তির মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়। এই চিত্রণ সমাজে নারীর প্রতি একটি অবমাননাকর ও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। পুরুষেরা নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমবেদনা দেখাতে ব্যর্থ হয়, এবং তাদের মূল্য কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা যৌন প্রাপ্যতা দ্বারা পরিমাপ করা হয়। এর ফলে কর্মক্ষেত্র, পাবলিক প্লেস এবং এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও নারীর প্রতি হয়রানি ও বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। এটি নারীর সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং সমাজে যৌন শোষণের পথ প্রশস্ত করে, যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

এর ফলে পুরুষদের মনে নারীর প্রতি সম্মান হারিয়ে যায়, নারী হয় শিকার।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা নূর : ৩০

৮. যৌন অপরাধের হার বৃদ্ধি

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, কুরুচিপূর্ণ ও সহিংস যৌন বিনোদনের নিয়মিত ব্যবহার মানুষের মধ্যে আক্রমণাত্মক যৌন আচরণ বা যৌন উত্তেজনা জাগানো সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। এ কারনে প্রায়শই জোরপূর্বক যৌনতাকে আকর্ষণীয় বা উত্তেজিত হিসেবে উপস্থাপন করে। যখন বিনোদনের মাধ্যমে এই ধরণের আচরণ বারবার দেখা যায়, তখন কিছু দুর্বল মানসিকতার ব্যক্তি কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যেকার পার্থক্য হারিয়ে ফেলে এবং বাস্তব জীবনে যৌন অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়। যদিও পর্নোগ্রাফি বা নোংরা বিনোদন সরাসরি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন এই অপরাধগুলোর হার বাড়তে থাকে।

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলেন, হে মুহাজিরগণ! তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকেদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০১৯ ,সহীহাহ : ১০৬, হাদিসটির প্রয়োজনীয় অংশ।

৯. কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা হ্রাস

অশ্লীল বিনোদনে আসক্তি মানুষের মনোযোগ, সময় এবং মানসিক শক্তিকে গ্রাস করে। যারা নিয়মিতভাবে এই অশ্লীলতায় ডুবে থাকে, তাদের পক্ষে কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মঘণ্টার মধ্যে গোপনভাবে এই কনটেন্ট দেখার প্রবণতাও সময় নষ্ট করে এবং কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া, আসক্তির কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও নিদ্রাহীনতা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই দুর্বল করে তোলে। এর ফলে কাজে ভুল, দায়িত্ব পালনে অনীহা এবং সৃজনশীলতার অভাব দেখা দেয়। একটি সমাজে যখন কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশ এই আসক্তির শিকার হয়, তখন সামগ্রিকভাবে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,  কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৬, সহীহাহ : ৯৪৬

১০. সমকামিতা ও বিকৃত যৌনাচার বৃদ্ধি

যদিও সমকামিতা একটি জটিল সামাজিক-জৈবিক বিষয়, তবুও নোংরা বিনোদনের বিস্তার প্রায়শই প্রকৃতির বিরুদ্ধ যৌনাচার ও বিকৃত আকাঙ্ক্ষাকে উন্মোচিত করে এবং সেগুলোকে “নতুন বা সাহসী” জীবনধারা হিসেবে তুলে ধরে। অশ্লীল মিডিয়া প্রায়শই অস্বাভাবিক এবং প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর বাইরে থাকা যৌন আচরণকে প্রচার করে, যা দর্শকদের মধ্যে এই ধরনের কার্যকলাপের প্রতি কৌতূহল ও স্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। এর ফলে, সমাজের একটি অংশে সমকামিতা, উভকামিতা এবং অন্যান্য বিকৃত যৌন আচরণের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো কেবল ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রভাবিত করে না, বরং পরিবার ও সমাজের ঐতিহ্যবাহী নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে, যা সমাজে অস্থিরতা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।  অশ্লীল বিনোদনের মাধ্যমে বিকৃত যৌন আচরণ প্রচারিত হচ্ছে। সমকামিতা, ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতি ও পশুর সঙ্গে যৌনাচার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ বলেন-

وَ لُوْطًا اِذْ قَالَ لِقَوْمِہٖۤ اَتَاْتُوْنَ الْفَاحِشَۃَ مَا سَبَقَکُمْ بِهَا مِنْ اَحَدٍ مِّنَ  الْعٰلَمِیْنَ ﴿۸۰﴾  اِنَّکُمْ لَتَاْتُوْنَ الرِّجَالَ شَہْوَۃً مِّنْ دُوْنِ النِّسَآءِ ؕ بَلْ  اَنْتُمْ  قَوْمٌ  مُّسْرِفُوْنَ ﴿۸۱﴾

আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার কাওমকে বলেছিল, তোমরা এমন অশ্লীল ও কু-কর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেহই করেনি। তোমরা তো নারীদের ছাড়া পুরুষদের সাথে কামনা পূর্ণ করছ, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী কওম’। সূরা আরআফ : ৮০-৮১

১১. তরুণ প্রজন্মের চরিত্র ধ্বংস

তরুণ প্রজন্ম অশ্লীল ও নোংরা বিনোদনের প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। তাদের অসম্পূর্ণ মানসিক বিকাশ ও কৌতূহল তাদের এই ধরনের কনটেন্টের দিকে আকর্ষণ করে। শৈশবেই এই ধরনের কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ফলে তাদের যৌনতা, সম্পর্ক এবং নৈতিকতা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা তৈরি হয়। এটি তাদের মধ্যে তাড়াতাড়ি যৌন কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, এবং শ্রদ্ধার অভাব সৃষ্টি করে। এই বিনোদনগুলো প্রায়শই তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির ধারণা দেয়, যা তাদের ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্ব বুঝতে বাধা দেয়। ফলস্বরূপ, তরুণ প্রজন্মের চারিত্রিক দৃঢ়তা, নৈতিক ভিত্তি এবং দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সমাজের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। যুবক-যুবতীরা আজ সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। অশ্লীল বিনোদন তাদের ইমান, লজ্জা ও নৈতিকতা নষ্ট করছে।

 আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি শাখা। সহিহ বুখারি : ৯, সহিহ মুসলিম : ৩৫, আহমাদ : ৯৩৭২

১২. আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও জীবনের অর্থ হারানো

অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদনে অত্যধিক মগ্নতা মানুষকে আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক জীবনের প্রশ্নগুলো থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই বিনোদনগুলো মূলত শারীরিক কামনা, ভোগ এবং ক্ষণিকের আনন্দের উপর জোর দেয়। যখন মানুষ শুধুমাত্র শারীরিক স্তরের আনন্দকেই জীবনের মূল লক্ষ্য মনে করে, তখন তারা মহৎ উদ্দেশ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ, বা গভীর মানবিক সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিক শূন্যতা সৃষ্টি করে। এর ফলে মানুষ জীবনের আসল অর্থ ও উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়, যা মানসিক অসন্তুষ্টি এবং হতাশার জন্ম দেয়। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা আরও বেশি করে বিনোদনের দিকে ঝুঁকতে থাকে, যা এক বিষাক্ত চক্র তৈরি করে। অশ্লীল বিনোদনে নিমগ্ন মানুষ এই প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত। ফলে আত্মার চাহিদা অপূর্ণ থাকে। তারা মানসিক শান্তি হারায়, যদিও বাহ্যিকভাবে সব আছে। আল্লাহ বলেন-

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ  اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ

‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। সূরা রাদ : ২৮

১৩. মানসিক স্বাস্থ্য এবং সম্পর্কের অবনতি

অশ্লীল বিনোদনের আসক্তি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর দ্বিমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একদিকে, আসক্তি উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্ম-সম্মান হ্রাস করে মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, এটি স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে অবিশ্বাস, প্রতারণার সন্দেহ এবং মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে। পর্নোগ্রাফির মতো কনটেন্ট বাস্তব জীবনের যৌনতাকে অবাস্তব ও কৃত্রিম প্রত্যাশার সাথে তুলনা করে, যা দম্পতিদের মধ্যে যৌন অসন্তুষ্টি তৈরি করে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগের অভাব, সহানুভূতি হ্রাস এবং একাকীত্ব দেখা দেয়, যা বিবাহবিচ্ছেদ বা সম্পর্কচ্ছেদের দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে সমাজে সুস্থ ও স্থিতিশীল সম্পর্কের সংখ্যা হ্রাস পায় এবং পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন_

 ؕ ہُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّہُنَّ ؕ

তারা তোমাদের জন্য বস্ত্র, আর তোমরা তাদের জন্য বস্ত্র। সূরা বাকারা : ১৮৭

১৪. নারী ও শিশুদের বস্তুকরণে উৎসাহ

নোংরা বিনোদন ক্রমাগত নারী ও শিশুদেরকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং যৌন বা ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে। এটি তাদের মানবাধিকার ও মর্যাদা লঙ্ঘন করে। পর্নোগ্রাফিতে প্রায়শই নারী ও শিশুদের শরীরের অংশগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রদর্শন করা হয়, যা তাদের বস্তুকরণের ধারণাটিকে শক্তিশালী করে। এই ধরনের বস্তুকরণ সমাজে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন শোষণ ও হয়রানিকে বাড়িয়ে তোলে। যখন নারী ও শিশুদের মানুষ হিসেবে সম্মান না করে কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবে দেখা হয়, তখন সমাজে নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটে। এটি তাদের স্বাভাবিক বিকাশ এবং সমাজে নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুটি মেয়ে সন্তানকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিনে সে ও আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকব, এ বলে তিনি তার হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে দিলেন। সহিহ

মুসলিম : ২৬৩১

১৫. শিশু ও তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা

অশ্লীল বিনোদন অল্প বয়সে শিশু ও তরুণদের কাছে পৌঁছানোর ফলে তাদের স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তারা জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে (যেমন, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, যৌনতা) ভুল এবং বিকৃত ধারণা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এই ধরনের কনটেন্ট তাদের মধ্যে অসময়ে যৌন কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, যা তাদের শৈশবের নির্দোষতা নষ্ট করে দেয়। এছাড়াও, এটি তাদের আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে বাধা দেয়, কারণ তারা স্ক্রিনের মাধ্যমে পাওয়া কৃত্রিম উত্তেজনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, তারা বাস্তব জীবনে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে।

৩৫৮. শু’আইব (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু শিহাব (রহ.) বলেছেন, নবজাত শিশু মারা গেলে তাদের প্রত্যেকের জানাযার সালাত আদায় করা হবে। যদিও সে কোন ভ্রষ্টা মায়ের সন্তানও হয়। এ কারণে যে, সে সন্তানটি ইসলামী ফিত্রাহর (তাওহীদ) এর উপর জন্মলাভ করেছে। তার পিতামাতা ইসলামের দাবীদার হোক বা বিশেষভাবে তার পিতা। যদিও তার মা ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের অনুসারী হয়। নবজাত শিশু সরবে কেঁদে থাকলে তার জানাযার সালাত আদায় করা হবে। আর যে শিশু না কাঁদবে, তার জানাযার সালাত আদায় করা হবে না। কেননা, সে অপূর্ণাঙ্গ সন্তান। কারণ, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ প্রতিটি নবজাতকই জন্ম লাভ করে ফিতরাতের (তাওহীদের) উপর। অতঃপর তার মা-বাপ তাকে ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারী রূপে গড়ে তোলে। যেমন, চতুষ্পদ পশু নিখুঁত বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাদের মধ্যে কোন কান কাটা দেখতে পাও? (বরং মানুষরাই তার নাক কান কেটে দিয়ে বা ছিদ্র করে তাকে বিকৃত করে থাকে। অনুরূপ ইসলামের ফিতরাহ্তে ভূমিষ্ট সন্তানকে মা-বাপ তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবন ধারায় প্রবাহিত করে ভ্রান্ত ধর্মী বানিয়ে ফেলে) পরে আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) তিলাওয়াত করলেন-

فَاَقِمۡ وَجۡہَکَ لِلدِّیۡنِ حَنِیۡفًا ؕ  فِطۡرَتَ اللّٰہِ الَّتِیۡ فَطَرَ النَّاسَ عَلَیۡہَا ؕ  لَا تَبۡدِیۡلَ لِخَلۡقِ اللّٰہِ ؕ  ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ٭ۙ  وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٭ۙ

অতএব তুমি একনিষ্ঠ হয়ে দীনের জন্য নিজকে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর প্রকৃতি*, যে প্রকৃতির উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। সুরা রুম : ৩০। সহিহ বুখারি : ১৩৫৮, ১৩৫৯, ১৩৮৫, ৪৭৭৫, ৬৫৯৯, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৮, আহমাদ : ৮১৮৫

১৬. নৈতিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ অবক্ষয়

অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদনের ব্যাপক বিস্তার সমাজের সামগ্রিক নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই বিনোদনগুলো দায়িত্ব, সম্মান, পবিত্রতা এবং সংযমের মতো ঐতিহ্যবাহী নৈতিক মূল্যবোধগুলোকে তুচ্ছ করে, বা সেগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতাকে হ্রাস করে। যখন সমাজে নীতি-নৈতিকতার সীমারেখা ক্রমাগত মুছে যেতে থাকে, তখন মানুষ কেবল তাদের ব্যক্তিগত কামনা ও স্বার্থসিদ্ধির উপর মনোযোগ দেয়। এই অবক্ষয় একটি সমাজকে বিশৃঙ্খলা, অনৈতিকতা এবং সামাজিক অস্থিরতার দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে, সমাজের সদস্যরা তাদের পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান হারায়, এবং সামাজিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে পড়ে। এই নৈতিক শূন্যতা পাশ্চাত্য সমাজের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং মানবিকতার জন্য সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি নিয়ে আসে। সবশেষে, পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন নৈতিকতার সব সীমা ভেঙে দিয়েছে। সেখানে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম, লজ্জা-নির্লজ্জতার পার্থক্য মুছে গেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-

قَدْ  اَفْلَحَ  مَنْ  زَکّٰىهَا ۪ۙ﴿۹﴾ وَ  قَدْ خَابَ مَنْ  دَسّٰىهَا ﴿ؕ۱۰﴾

“অবশ্যই সফল হলো সে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে; এবং ব্যর্থ হলো সে, যে তা কলুষিত করেছে।”

সূরা শামস : ৯-১০

উপসংহার : অশ্লীল বিনোদন কোনো ব্যক্তিগত রুচির বিষয় নয়; এটি গোটা মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকি। পাশ্চাত্যের সমাজ আজ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ইসলামী সমাজ যদি সতর্ক না হয়, তবে আমাদেরকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইসলাম যে সমাজ চায়, তা বিনোদনবিমুখ নয়, বরং তা আল্লাহভীতিপূর্ণ, মার্যাদাশীল, সুশৃঙ্খল ও পরিশুদ্ধ আনন্দের সমাজ। আল্লাহ তায়াতা এ সব অশ্লীলতা মুক্ত জীবন যাপনে  নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিন ইরশাদ করেন-

وَقُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَیَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَلَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَلۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ ۪ وَلَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا لِبُعُوۡلَتِہِنَّ اَوۡ اٰبَآئِہِنَّ اَوۡ اٰبَآءِ بُعُوۡلَتِہِنَّ اَوۡ اَبۡنَآئِہِنَّ اَوۡ اَبۡنَآءِ بُعُوۡلَتِہِنَّ اَوۡ اِخۡوَانِہِنَّ اَوۡ بَنِیۡۤ اِخۡوَانِہِنَّ اَوۡ بَنِیۡۤ اَخَوٰتِہِنَّ اَوۡ نِسَآئِہِنَّ اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُنَّ اَوِ التّٰبِعِیۡنَ غَیۡرِ اُولِی الۡاِرۡبَۃِ مِنَ الرِّجَالِ اَوِ الطِّفۡلِ الَّذِیۡنَ لَمۡ یَظۡہَرُوۡا عَلٰی عَوۡرٰتِ النِّسَآءِ ۪ وَلَا یَضۡرِبۡنَ بِاَرۡجُلِہِنَّ لِیُعۡلَمَ مَا یُخۡفِیۡنَ مِنۡ زِیۡنَتِہِنَّ ؕ وَتُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ جَمِیۡعًا اَیُّہَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। সূরা নূর : ৩১