Category Archives: বিনোদন

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: তৃতীয় কিন্তি

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: তৃতীয় কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামি দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেদের অগ্রগামী, উদার ও প্রগতিশীল বলে দাবি করলেও বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রযুক্তির অগ্রগতি, মিডিয়ার শক্তি এবং বস্তুবাদী চিন্তার প্রভাবে পশ্চিমা সমাজ আজ অশ্লীলতা ও কুরুচির গভীর গহ্বরে নিমজ্জিত। বিনোদনের নামে সেখানে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অশ্লীল সংস্কৃতি—যার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে নৈতিকতা, হায়া ও আল্লাহভীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তাদের অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদনের আগ্রাসন শুধু নৈতিকতা নয়, বরং ইসলামী সমাজব্যবস্থার মূল কাঠামোকেই ধ্বংস করছে। ইসলাম যে সমাজে পবিত্রতা, হায়া, তাকওয়া ও পারিবারিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে একটি সুশৃঙ্খল জীবন গঠন করতে চায়, পাশ্চাত্যের বিনোদন সংস্কৃতি তা ভেঙে দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধরনের বিনোদন কেবল সময়ের অপচয় নয়; বরং তা মানুষের ঈমান, চরিত্র ও সমাজব্যবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিচে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে ইসলামী দৃষ্টিতে কিছু ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলো।

১. হায়া (লজ্জা) ধ্বংস হয়ে যাওয়া

ইসলামে লজ্জা বা হায়া ঈমানের অন্যতম শাখা। এটি মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং নৈতিকতার মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন হায়াকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপন, গান ও সামাজিক মাধ্যম এমনভাবে নোংরামিতে ভরপুর যে, মানুষ নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতাকে সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করছে।

২৪. আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি তাঁর ভাইকে তখন (অধিক) লজ্জা ত্যাগের জন্য নাসীহাত করছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ ওকে ছেড়ে দাও। কারণ লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। সহিহ বুখারি : ২৪, ৬১১৮, সহিহ মুসলিম : ৩৬, আহমাদ : ৪৫৫৪

আবূ মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পূর্ববর্তী নবীদের (নবীদের) নাসীহাত থেকে মানুষ যা লাভ করেছে তার একটা হলো, যদি তুমি লজ্জাই না কর, তবে যা ইচ্ছে তাই কর।[সহিহ বুখারি : ৬১২০

অতএব, লজ্জা হারিয়ে গেলে মানুষ যে কোনো পাপে জড়িয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যে আজ পোশাক-আচরণে নির্লজ্জতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাপকে তারা আর পাপ মনে করে না—এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ নৈতিক পতন।

২. চোখ ও হৃদয়ের পবিত্রতা নষ্ট হওয়া

ইসলাম মানুষকে চোখ নামানোর নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, চোখ হলো হৃদয়ের দরজা। হারাম দৃশ্য দেখা হৃদয়ে কামনা-বাসনা জাগায় এবং জিনা-ব্যভিচারের পথ খুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা নূর, : ৩০

অশ্লীল সিনেমা, ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক মাধ্যমের দৃশ্য মানুষকে এই ঐশী নির্দেশনা ভুলিয়ে দিয়েছে। এর ফলে হৃদয়ে হারাম ভালোবাসা, কামনা ও বিকৃতি জন্ম নিচ্ছে। মানুষ বাস্তব ভালোবাসার পরিবর্তে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে, যা মানসিক বিকার ও হতাশা তৈরি করছে।

৩. জিনা ও ব্যভিচারের প্রসার

অশ্লীলতা কখনো একা থাকে না; এটি সবসময় জিনার দিকে নিয়ে যায়। এজন্য ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি, বরং তার কাছাকাছি যাওয়া থেকেও সতর্ক করেছে।

আল্লাহ বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

তোমরা অবৈধ যৌন সংযোগের নিকটবর্তী হয়োনা, ওটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। সূরা ইসরা : ৩২

অশ্লীল বিনোদন, পর্নোগ্রাফি, আধুনিক ফ্যাশন ও অবাধ মেলামেশার সংস্কৃতি মানুষকে ধীরে ধীরে এই নিষিদ্ধ পথে টেনে নিচ্ছে। পাশ্চাত্যে বিবাহের হার কমে যাচ্ছে, আর অবৈধ সম্পর্ক ও সন্তান জন্মের হার ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে। ইসলাম যেসব বিষয় সমাজ থেকে দূর করতে চায়, পাশ্চাত্যের এই বিনোদন সংস্কৃতি সেগুলোকেই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।

৪. আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া হারানো

যে সমাজে মানুষ ক্রমাগত অশ্লীলতার চর্চা করে, সে সমাজ থেকে আল্লাহভীতি ও তাকওয়া হারিয়ে যায়। পাপকে যখন মানুষ বিনোদন মনে করে, তখন তার হৃদয় কঠিন হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

کَلَّا بَلۡ ٜ رَانَ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ مَّا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ

বরং তারা যা অর্জন করে, তা তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দেয়। সূরা মুতাফ্ফিফীন : ১৪

অশ্লীল বিনোদন এই “মরিচা”-র মতো হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে মানুষ নামাজ, কুরআন ও ইবাদতের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। তাকওয়াবোধ হারিয়ে গেলে মানুষ পাপকে লজ্জাজনক নয় বরং উপভোগ্য মনে করে। এই অবস্থা সমাজের আধ্যাত্মিক মৃত্যু ডেকে আনে।

৫. সমাজে ফিতনা ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার

অশ্লীলতা শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকেও কলুষিত করে। এটি ফিতনা সৃষ্টি করে, যার প্রভাব নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ—সবার ওপর পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে যারা অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয় বা তাতে অংশগ্রহণ করে, তারা আল্লাহর কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা নূর : ১৯

অশ্লীলতার প্রসার সমাজে ফিতনার দরজা খুলে দেয়—বিবাহ বিচ্ছেদ, পরকীয়া, যৌন অপরাধ, নারী নির্যাতন, পারিবারিক ভাঙন, এবং মানসিক অশান্তি তার ফল। পশ্চিমা সমাজ আজ এই ভয়াবহ পরিণতির শিকার, কারণ তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করেছে।

৬. পরিবার ব্যবস্থা ধ্বংস ও বিবাহ-বিচ্ছেদ বৃদ্ধি

ইসলাম পরিবারকে সমাজের মূল ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করেছে। পরিবারেই গড়ে ওঠে নৈতিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। কিন্তু অশ্লীল বিনোদন সেই পরিবার ব্যবস্থাকেই নষ্ট করে দিচ্ছে।

অশ্লীল দৃশ্য, সিরিজ, সিনেমা ও সামাজিক মাধ্যম মানুষকে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে বিমুখ করছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হচ্ছে, পরকীয়া ও সন্দেহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পাশ্চাত্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ, একক মাতৃত্ব ও অবৈধ সন্তান জন্মের হার ভয়াবহভাবে বেড়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً 

তাঁর নিদর্শনসমূহের একটি হলো—তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। সূরা আর-রূম : ২১

অশ্লীল সংস্কৃতি এই দয়া ও ভালোবাসাকে হত্যা করে দিয়েছে। বিনোদনের নামে ব্যভিচার ও অবিশ্বস্ততা পরিবার ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে, যা ইসলামী দৃষ্টিতে এক মহাপাপ।

৭. তরুণ প্রজন্মের নৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়

তরুণ প্রজন্ম হলো জাতির ভবিষ্যৎ। ইসলাম তাদেরকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও তাকওয়ার পথে আহ্বান করেছে। কিন্তু অশ্লীল বিনোদন তাদের মনোজগতে এমনভাবে প্রভাব ফেলছে যে, তারা জীবনকে উদ্দেশ্যহীন আনন্দের খেলায় পরিণত করছে।

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৬, সহীহাহ : ৯৪৬

অশ্লীল বিনোদন তরুণদের সেই যৌবনকে নষ্ট করছে। তারা পড়াশোনা, ইবাদত ও আত্মগঠনের পরিবর্তে পর্নোগ্রাফি, নোংরা গেম ও অবাধ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে মগ্ন হয়ে পড়ছে। এতে তাদের মন ও চরিত্র উভয়ই দুর্বল হচ্ছে।

৮. নারীকে পণ্যে পরিণত করা ও মর্যাদা হরণ

ইসলাম নারীর মর্যাদাকে অতি উচ্চ আসনে স্থাপন করেছে। তিনি মা, কন্যা, বোন, স্ত্রী—প্রত্যেক ভূমিকায় সম্মানের দাবিদার। কিন্তু পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন নারীকে কেবল ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তার সৌন্দর্য, দেহ ও রূপকে পণ্যের মতো বিক্রি করা হচ্ছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَحَمَلۡنٰہُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ وَرَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَفَضَّلۡنٰہُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا

আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিয্ক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি। সূরা ইসরা :৭০

এই সম্মান ইসলাম দিয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্যের অশ্লীলতা নারীর সেই মর্যাদা কেড়ে নিয়ে তাকে পণ্য ও প্রচারের উপকরণে পরিণত করেছে। এটি মানবাধিকারের নয়, বরং মানবতার লাঞ্ছনা।

৯. সমাজে ফিতনা ও পাপাচারের সংস্কৃতি বিস্তার

অশ্লীলতা কখনো সীমার মধ্যে থাকে না; এটি ক্রমে সমাজে ফিতনা ছড়িয়ে দেয়। যখন গান, নাচ, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন ও মিডিয়া অশ্লীলতার বাহক হয়, তখন পুরো সমাজে পাপাচারের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা নূর : ১৯

এ আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অশ্লীলতার প্রচার করে, সে আল্লাহর গজবের উপযুক্ত। আধুনিক বিনোদন মাধ্যমগুলো এই ফিতনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যা সমাজে আল্লাহর রহমতের বদলে গজব টেনে আনছে।

১০. আল্লাহর আজাব ও সমাজের ধ্বংস

যখন কোনো সমাজে অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তা’আলা সেই সমাজ থেকে তাঁর বরকত ও রহমত উঠিয়ে নেন। ইতিহাস সাক্ষী—যেসব জাতি অশ্লীলতা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে, তারা ধ্বংস হয়ে গেছে।

আল্লাহ বলেন—

وَلُوۡطًا اِذۡ قَالَ لِقَوۡمِہٖۤ اَتَاۡتُوۡنَ الۡفَاحِشَۃَ مَا سَبَقَکُمۡ بِہَا مِنۡ اَحَدٍ مِّنَ الۡعٰلَمِیۡنَ

আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার কাওমকে বলেছিল, তোমরা এমন অশ্লীল ও কু-কর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেহই করেনি। সূরা আরাফ : ৮০

লূত (আ.)-এর সম্প্রদায় যৌন বিকৃতির কারণে ধ্বংস হয়েছিল। আজকের পশ্চিমা সমাজ একই পথে হাঁটছে—সমকামিতা, উলঙ্গ সংস্কৃতি ও বিকৃত যৌনাচারে নিমজ্জিত হয়ে আল্লাহর গজব আহ্বান করছে।

উপসংহার : ইসলামের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা কোনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নয়, বরং তা মানবতার জন্য বিষের মতো ক্ষতিকর। এটি ঈমান, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়। মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজেকে ও পরিবারকে এই পাপের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা এবং সমাজে পবিত্রতা, লজ্জা ও তাকওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَاللّٰہُ یُرِیۡدُ اَنۡ یَّتُوۡبَ عَلَیۡکُمۡ ۟ وَیُرِیۡدُ الَّذِیۡنَ یَتَّبِعُوۡنَ الشَّہَوٰتِ اَنۡ تَمِیۡلُوۡا مَیۡلًا عَظِیۡمًا

আল্লাহ তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান, কিন্তু যারা কামনা-বাসনা অনুসরণ করে তারা চায় তোমরা সম্পূর্ণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে যাও।” সূরা নিসা : ২৭

অতএব, অশ্লীল বিনোদনের প্রতিরোধ কেবল সংস্কৃতিগত নয়; এটি ঈমান রক্ষার সংগ্রাম। যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টি, শ্রবণ ও অন্তরকে পবিত্র রাখবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করবেন।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা মানুষকে পবিত্রতা, হায়া ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে। অশ্লীলতা ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদন সেই পথের পরিপূর্ণ বিপরীত। পাশ্চাত্য সমাজে এর ব্যাপকতা শুধু সামাজিক শৃঙ্খলা নয়, মানবতার মূল ভিত্তিকেই নষ্ট করছে।

মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের দৃষ্টি, শ্রবণ ও মনকে পবিত্র রাখা, অশ্লীলতার সব পথ থেকে দূরে থাকা এবং পরিবার-সমাজকে তা থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর। সূরা তাহরীম : ৬

অতএব, অশ্লীল বিনোদন থেকে দূরে থাকা শুধু ব্যক্তিগত পবিত্রতার অংশ নয়, বরং তা ঈমান রক্ষার অন্যতম মাধ্যম। পাশ্চাত্যের এই অন্ধ অনুকরণ থেকে দূরে থেকে ইসলামি নৈতিকতা ও হায়ার সংস্কৃতি পুনর্জাগরিত করা আজ সময়ের দাবি।

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: চতুর্থ কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ

মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ

বিশ্বের সামনে পাশ্চাত্যের অধিকমাত্রায় অশ্লীল, কুরুচি ও নোংরা বিনোদন বর্তমান। এ কুফল তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তাদের ও অশ্লীল বিনোদন আজ মুসলিম সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে। এটি আজকের দুনিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা। কারণ পশ্চিমা সংস্কৃতি ও তথাকথিত বিনোদনের ছোঁয়ায় মুসলিম সমাজের চিন্তা, রুচি, পোশাক, ভাষা এমনকি নৈতিক মানদণ্ড পর্যন্ত বদলে যাচ্ছে। অথচ ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের রুচি, সংস্কৃতি ও বিনোদনকেও শালীনতা ও তাকওয়ার সীমায় রাখে। কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজে পাশ্চাত্যের অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ বিনোদন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। টেলিভিশন, সিনেমা, ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়া সব জায়গাতেই নৈতিকতার সীমা ভাঙা দৃশ্য ও আচরণ প্রবলভাবে প্রভাব ফেলছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কেবল একটি সামাজিক বিপর্যয় নয়; বরং এক আত্মিক ও নৈতিক সংকট। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা নূর : ১৯

এই আয়াত মুসলিম সমাজে অশ্লীলতার প্রচারকারীদের জন্য ভয়াবহ সতর্কবাণী। নিচে মুসলিম জনপদে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ কিছু কারণ বিশ্লেষণ করেছি—

১. মানুষ অনুসকরণ প্রিয়

২. মানুষ সভাবত কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে

৩. অশ্লীলতার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার

৪. সহজ লভ্যতা

৫. আধুনিক ডিজিটার মাধ্যম

৬. আধুনিক সোস্যাল মিয়ায়া (ইউটিউব, ফেসবুক, ইমো, হটস অ্যাপ, ভাইবার ইত্যাতি)

৭. মানুষের আর্থিক অবস্থান উন্নতি

৮. প্রযুক্তিনির্ভরতা ও একাকীত্ব বৃদ্ধি

৯. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিশ্বায়ন

১০. দেশীয় সুস্থ বিনোদনের অপ্রতুলতা

১১. পশ্চিমা জীবনযাত্রার প্রতি আকর্ষণ ও মোহ

১২. চলচ্চিত্র, সংগীত ও ফ্যাশন ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাব

১৩. গণমাধ্যমে ধর্মবিমুখ বিনোদনের আধিপত্য

১৪. নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা

১৪. পরিবার ও সমাজের দুর্বল নজরদারি

১৬. ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব

১৭. ইসলামী বিকল্প বিনোদনের ঘাটতি

১. মানুষ অনুকরণ প্রিয়

মানুষ স্বভাবগতভাবেই অনুকরণপ্রিয় প্রাণী। এই সহজাত প্রবণতা একটি সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে বিনোদনের উপাদান ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। পশ্চিমা বিনোদন, বিশেষত চলচ্চিত্র, সংগীত এবং ফ্যাশন, গ্ল্যামার ও চাকচিক্যের মোড়কে আবৃত হয়ে মুসলিম সমাজের তরুণ প্রজন্মকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। তারা পশ্চিমাদের জীবনধারা, পোশাক-আশাক, কথা বলার ধরণ এবং বিনোদন সংস্কৃতিকে আধুনিকতা ও সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখে। ফলে, সমালোচনামূলক দৃষ্টি ছাড়াই তারা এই বিনোদনের উপকরণগুলো অন্ধভাবে গ্রহণ করতে থাকে, যেখানে অশ্লীলতা বা কুরুচি লুকিয়ে থাকে। এই অনুকরণের মাধ্যমে পশ্চিমা বিনোদনের অনৈতিক উপাদানগুলো মুসলিম সমাজে সহজে অনুপ্রবেশ করে এবং নিজস্ব মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

মানুষের স্বভাবই হলো অনুকরণ করা। যাকে সে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তার আচরণ, পোশাক, কথা—সব অনুকরণ করতে চায়। পাশ্চাত্য সভ্যতাকে “উন্নত” ভেবে মুসলমানরা তাদের জীবনধারা অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ

যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে।

সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১

অর্থাৎ, যার সংস্কৃতি অনুসরণ করবে, আখিরাতে তার সঙ্গেই উঠতে হবে। তাই অশ্লীল বিনোদনের অনুসরণ আসলে এক প্রকার নৈতিক আত্মহত্যা।

২. মানুষ স্বভাবত কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে

ইসলাম মানুষের মধ্যে দুই ধরনের প্রবৃত্তি বা আকর্ষণকে স্বীকার করে: একটি হলো কল্যাণমুখী ‘ফিতরাত’ (স্বাভাবিক প্রকৃতি) এবং অপরটি হলো ‘নফস’ বা কুপ্রবৃত্তি, যা মানুষকে খারাপ কাজের দিকে প্ররোচিত করে। পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন সরাসরি মানুষের এই কুপ্রবৃত্তিকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়, যা যৌনতা, ভোগ এবং তাৎক্ষণিক আনন্দের দিকে ধাবিত করে। এই ধরনের বিনোদন মানুষকে সহজলভ্যভাবে অনৈতিকতার স্বাদ পেতে উৎসাহিত করে এবং ধর্মীয় বা নৈতিক বিধিনিষেধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যখন কোনো সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন মানুষ স্বভাবতই সহজলভ্য ও প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্টকারী বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কুপ্রবৃত্তির এই তীব্র আকর্ষণকে পুঁজি করেই অশ্লীল বিনোদনের প্রসার ঘটছে। আল্লাহ মানুষকে “নফস” বা প্রবৃত্তিসহ সৃষ্টি করেছেন। এই নফস যদি সংযমহীন হয়, তবে মানুষ অশ্লীলতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পশ্চিমা বিনোদন এই প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়।

আল্লাহ বলেন-

وَمَاۤ اُبَرِّیٴُ نَفۡسِیۡ ۚ اِنَّ النَّفۡسَ لَاَمَّارَۃٌۢ بِالسُّوۡٓءِ اِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّیۡ ؕ اِنَّ رَبِّیۡ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

‘আর আমি আমার নাফ্সকে পবিত্র মনে করি না, নিশ্চয় নাফ্স মন্দ কজের নির্দেশ দিয়ে থাকে, আমার রব যাকে দয়া করেন সে ছাড়া। নিশ্চয় আমার রব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। সূরা ইউসুফ : ৫৩)

ইসলাম এই নফসকে প্রশিক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে—সিয়াম, নামাজ ও তাকওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু পাশ্চাত্যের বিনোদন নফসকে আরো উগ্র করে তোলে।

৩. অশ্লীলতার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার

বর্তমানে পশ্চিমা বিনোদন শুধুমাত্র স্থানীয়ভাবে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক প্রচারণার মাধ্যমে তা বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে যাচ্ছে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো অশ্লীলতা ও কুরুচিপূর্ণ বিষয়বস্তু প্রতিনিয়ত প্রচার করে চলেছে। এই প্রচারণার পেছনে কাজ করে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং অনেক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্য। কোনো বিষয়বস্তু যখন প্রতিনিয়ত ও ব্যাপক পরিসরে প্রচার হতে থাকে, তখন সমাজের মানুষের কাছে তা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে শুরু করে, এমনকি তা নৈতিকভাবে ভুল হলেও। অশ্লীলতার এই ব্যাপক প্রচার মুসলিম সমাজে লজ্জাবোধ ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে, যা পশ্চিমা বিনোদনের অনুকরণের পথ সুগম করছে। বর্তমানে চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, গান—সব জায়গায় অশ্লীলতার প্রতিযোগিতা চলছে। এটি যেন এক শিল্পে পরিণত হয়েছে। ইসলামের ভাষায় এটি “ফাহিশাহর প্রচার”, যা সমাজে গুনাহের সাহস জোগায়।

আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলেনঃ হে মুহাজিরগণ! তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকেদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। সুনানে ইবন মাজাহ : ৪০১৯ হাদিসের প্রয়োজনীয় অংশ।

৪. বিনোদন সামগ্রীর সহজ লভ্যতা

প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অশ্লীল বিনোদন সামগ্রী এখন অত্যন্ত সহজলভ্য। একসময় এই ধরনের বিনোদন পেতে মানুষকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো, কিন্তু এখন একটি স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই মুহূর্তের মধ্যে যে কেউ যেকোনো ধরনের অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ বিনোদনে প্রবেশ করতে পারছে। এই সহজলভ্যতা বিশেষত তরুণদের জন্য ক্ষতিকর, কারণ তাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট নৈতিক বা ধর্মীয় জ্ঞান থাকে না। কোনো বাধা বা বিধিনিষেধ না থাকায়, তারা দ্রুতই এই ধরনের বিনোদনে আসক্ত হয়ে পড়ে। সহজলভ্যতার এই দিকটি পরিবার ও সমাজের নজরদারিকে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে, ফলে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন মুসলিম সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। আগে অশ্লীল বস্তু পাওয়া ছিল কঠিন, এখন মাত্র এক ক্লিকেই সবকিছু হাতে চলে আসে। এ সহজলভ্যতা মুসলমানদের গোপন পাপাচারে ডুবিয়েছে। ইসলামে পাপের সুযোগ সৃষ্টি করাও নিষিদ্ধ; তাই প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা থেকে বাঁচতে আত্মসংযম জরুরি।

৫. আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম

আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমগুলো, যেমন ইন্টারনেট, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট, পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। এই মাধ্যমগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো ব্যবহারকারীকে ব্যক্তিগতভাবে এবং গোপনীয়তার সাথে কন্টেন্ট উপভোগ করার সুযোগ দেয়। ফলে সামাজিক লজ্জা বা ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তিগত স্পেসে মানুষ সহজেই অনৈতিক বিনোদনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই মাধ্যমগুলোতে কন্টেন্টের পরিমাণ অসীম এবং এর উপর কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হয় না। ফলে, পশ্চিমা সংস্কৃতির নোংরা দিকগুলো ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে এমনভাবে পরিবেশিত হয় যে, তা মুসলিম সমাজের মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে নীরবে ক্ষয় করে দেয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, ভিডিও গেম, সব জায়গায় এখন নগ্নতা ও অনৈতিক বার্তা। এগুলো তরুণ প্রজন্মের মনকে ধ্বংস করছে।

আল্লাহ বলেন-

وَلَا تَقۡفُ مَا لَیۡسَ لَکَ بِہٖ عِلۡمٌ ؕ اِنَّ السَّمۡعَ وَالۡبَصَرَ وَالۡفُؤَادَ کُلُّ اُولٰٓئِکَ کَانَ عَنۡہُ مَسۡـُٔوۡلًا

আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। সূরা ইসরা : ৩৬

৬. আধুনিক সোস্যাল মিডিয়া

ইউটিউব, ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার-এর মতো আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো পশ্চিমা বিনোদনের অশ্লীল উপাদান ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এই মাধ্যমগুলোতে ব্যক্তিগত কন্টেন্ট শেয়ার করা, লাইভ স্ট্রিমিং এবং বিনোদনমূলক ভিডিওর সহজলভ্যতার কারণে অশ্লীলতা দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রতিযোগিতায় ব্যবহারকারীরা নিজেরাই কুরুচিপূর্ণ বা উত্তেজক কন্টেন্ট তৈরি করে, যা ভাইরাল হয়ে মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম সমাজের বৃহৎ অংশে পৌঁছে যায়। তাছাড়া, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম প্রায়শই ব্যবহারকারীর আগ্রহের উপর ভিত্তি করে এমন কন্টেন্ট সুপারিশ করে, যা ধীরে ধীরে মানুষকে অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

সলিমের পিতা আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তার ভাইকে লজ্জার ব্যাপারে উপদেশ দিচ্ছিলেন শুনতে পেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। সহিহ মুসলিম : ৩৬

যখন লজ্জা হারিয়ে যায়, তখন পাপকে পাপ মনে হয় না, যেমন আজ দেখা যাচ্ছে।

৭. মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি

মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতির সাথে সাথে অবসর সময় কাটানোর উপায়ে পরিবর্তন আসে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা মানুষকে বিনোদনের জন্য নতুন নতুন প্রযুক্তি বা মাধ্যমের দিকে আকৃষ্ট করে। যখন মানুষের হাতে অর্থ ও সময় থাকে, তখন তারা প্রায়শই পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত বিনোদনের উপকরণ, যেমন দামী স্মার্টফোন, হাই-স্পিড ইন্টারনেট বা প্রিমিয়াম স্ট্রিমিং সাবস্ক্রিপশন কিনতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন সহজে পাওয়া যায়। তাছাড়া, আর্থিক উন্নতি মানুষকে পশ্চিমা লাইফস্টাইল, ফ্যাশন এবং জাঁকজমকের প্রতি ঝুঁকতে উৎসাহিত করে, যা ঐ সংস্কৃতির বিনোদনের অংশ হিসেবে অশ্লীলতাকেও গ্রহণ করতে প্রেরণা যোগায়। অর্থনৈতিক উন্নতি মানুষকে ভোগবিলাসে প্রবণ করেছে। অতিরিক্ত আয় বিনোদনে ব্যয় হয়, যার মধ্যে থাকে হারাম উপাদান। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ خُذُوۡا زِیۡنَتَکُمۡ عِنۡدَ کُلِّ مَسۡجِدٍ وَّکُلُوۡا وَاشۡرَبُوۡا وَلَا تُسۡرِفُوۡا ۚ  اِنَّہٗ لَا یُحِبُّ الۡمُسۡرِفِیۡنَ 

হে বনী আদম, তোমরা প্রতি সালাতে তোমাদের বেশ-ভূষা গ্রহণ কর এবং খাও, পান কর ও অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সূরা আ’রাফ : ৩১

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তখনই কল্যাণকর, যখন তা আল্লাহভীতির সঙ্গে যুক্ত হয়।

৮. প্রযুক্তিনির্ভরতা ও একাকীত্ব বৃদ্ধি

আধুনিক জীবনে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে একাকীত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিথিল হওয়ায় মানুষ বিনোদনের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যক্তিগত মাধ্যমের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যখন একজন মানুষ একাকীত্বে ভোগে, তখন সে সান্ত্বনা বা সময় কাটানোর জন্য সহজলভ্য বিনোদনের দিকে দ্রুত ঝুঁকে পড়ে। পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন, যা মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে সহজে অ্যাক্সেসযোগ্য, এই একাকীত্বকে পূরণ করার একটি সহজ পথ বলে মনে হতে পারে। প্রযুক্তির পর্দার আড়ালে একাকীত্বে ডুবে থাকা মানুষটি সহজে নৈতিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে অনৈতিক বিনোদনের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে। মানুষ এখন বাস্তব সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্ক্রিনে বন্দি। একাকীত্ব থেকে মুক্তি খোঁজে অশ্লীল কনটেন্টে।

আমর ইবনু শুয়াইব তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ একজন আরোহী (সফরকারী) এক শায়ত্বন, দু’জন আরোহী দুই শায়ত্বন, কিন্তু তিনজন হলো একটি পরিপূর্ণ জামা’আত। সুনানে আবূ দাঊদ : ২৬০৭, সুনানে তিরমিজি : ১৬৭৪, সুনানে নাসায়ী : ৮৮৪৯, মিশকাত : ৩৯১০

৯. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বিশ্বায়ন

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বলতে বোঝায় একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি যখন দুর্বল সংস্কৃতির উপর তার মূল্যবোধ ও জীবনধারা চাপিয়ে দেয়। বিশ্বায়নের যুগে পশ্চিমা সংস্কৃতি তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির জোরে মুসলিম জনপদে বিনোদনের মাধ্যমে আগ্রাসন চালাচ্ছে। চলচ্চিত্র, সংগীত, টেলিভিশন শো ইত্যাদির মাধ্যমে তারা পশ্চিমা জীবনধারাকে স্বাভাবিক ও আধুনিক হিসেবে উপস্থাপন করে। এই আগ্রাসনের ফলে মুসলিম সমাজে নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি হয় এবং মানুষ পশ্চিমা আদর্শকে অনুসরণ করতে শুরু করে। পশ্চিমা বিনোদনের সাথে আসা অশ্লীলতা ও কুরুচিকে তারা আধুনিকতার প্রতীক মনে করে গ্রহণ করে, যা সমাজের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পশ্চিমা মিডিয়া বিশ্বায়নের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিচ্ছে। মুসলমানরা অজান্তে তা গ্রহণ করছে,গান, পোশাক, ভাষা, বিনোদন সবই পশ্চিমমুখী। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সূরা আল ইমরান : ৮৫

১০. দেশীয় সুস্থ বিনোদনের অপ্রতুলতা

মুসলিম সমাজে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুস্থ বিনোদনের পর্যাপ্ত বিকল্পের অভাব রয়েছে। ইসলাম যদিও বৈধ বিনোদনকে উৎসাহিত করে, কিন্তু অনেক মুসলিম দেশে সুস্থ চলচ্চিত্র, নাটক, গান বা খেলাধুলার প্ল্যাটফর্মগুলো পশ্চিমা বিনোদনের মতো আকর্ষণীয় বা মানসম্পন্ন হয় না। ফলে, তরুণ প্রজন্ম দ্রুত পশ্চিমা চকচকে ও বৈচিত্র্যময় বিনোদনের দিকে আকৃষ্ট হয়, যেখানে বিনোদনের মোড়কে অশ্লীলতা ও নোংরামি পরিবেশন করা হয়। সুস্থ বিনোদনের অভাবের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদন দ্রুত তার স্থান দখল করে নেয়, কারণ মানুষ স্বভাবতই বিনোদন চায় এবং বিকল্প না পেলে সহজলভ্য দিকে ঝুঁকে পড়ে। যখন হালাল বিকল্প থাকে না, মানুষ হারামের দিকে ঝোঁকে। ইসলামী শিক্ষা, নৈতিক নাটক, ইসলামী সংগীত, এসব কমে যাওয়ায় মানুষ অশ্লীল বিনোদনে আসক্ত হচ্ছে।

১১. পশ্চিমা জীবনযাত্রার প্রতি আকর্ষণ ও মোহ

পশ্চিমা জীবনযাত্রা, যা ভোগবাদিতা, অবাধ স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ দ্বারা প্রভাবিত, তা মুসলিম সমাজের অনেক তরুণকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। গণমাধ্যম এবং বিনোদন শিল্পে এই জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত গ্ল্যামারাস এবং সফল হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই জীবনধারার প্রতি মোহ সৃষ্টি হলে মানুষ পশ্চিমা বিনোদনকে সেই লাইফ স্টাইলের অংশ মনে করে গ্রহণ করে। তারা মনে করে, এই ধরনের বিনোদন উপভোগ করা আধুনিক ও প্রগতিশীল হওয়ার পরিচায়ক। এই মোহের কারণে তারা পশ্চিমা বিনোদনের সাথে আসা অশ্লীলতা ও নৈতিক স্খলনকে উপেক্ষা করে, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পশ্চিমাদের সাজপোশাক, ভাষা, পার্টি, সব মুসলমানদের চোখে “উন্নত জীবন” মনে হয়। অথচ তারা নিজেরাই নৈতিক দেউলিয়া।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَلَا تَمُدَّنَّ عَیۡنَیۡکَ اِلٰی مَا مَتَّعۡنَا بِہٖۤ اَزۡوَاجًا مِّنۡہُمۡ زَہۡرَۃَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۬ۙ لِنَفۡتِنَہُمۡ فِیۡہِ ؕ وَرِزۡقُ رَبِّکَ خَیۡرٌ وَّاَبۡقٰی

আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সে সবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণীকে দুনিয়ার জীবনের জাঁক-জমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি। যাতে আমি সে বিষয়ে তাদেরকে পরীক্ষা করে নিতে পারি। আর তোমার রবের প্রদত্ত রিয্ক সর্বোৎকৃষ্ট ও অধিকতর স্থায়ী। সূরা ত্বাহা : ১৩১

মুসলমানদের উচিত আল্লাহর বিধানকেই আদর্শ মানা, পশ্চিমাকে নয়।

১২. চলচ্চিত্র, সংগীত, ফ্যাশন ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাব

চলচ্চিত্র, সংগীত ও ফ্যাশন শিল্প হলো পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের প্রধান বাহক। এই শিল্পগুলো সাধারণত ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়, যেখানে বস্তুগত সুখ, সৌন্দর্য এবং যৌনতাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়। চলচ্চিত্রে খোলামেলা দৃশ্য, সংগীতে উত্তেজক লিরিকস এবং ফ্যাশনে স্বল্পবসনা মডেলদের উপস্থিতি মুসলিম সমাজে যৌনতার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় এবং শালীনতাকে ম্লান করে দেয়। এই বিনোদনগুলো মানুষের মনে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে এবং তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির নেশা সৃষ্টি করে। ভোগবাদী সংস্কৃতির এই শক্তিশালী প্রভাবের কারণে মানুষ ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিবর্তে বস্তুবাদী বিনোদনের দিকে ধাবিত হয়। মিডিয়া এখন “তারকা সংস্কৃতি” তৈরি করেছে, যারা ইসলামবিমুখ বার্তা ছড়ায়। ফ্যাশনের নামে নগ্নতা ছড়াচ্ছে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

এই ভবিষ্যদ্বাণী আজ বাস্তব হয়ে গেছে।

১৩. গণমাধ্যমে ধর্মবিমুখ বিনোদনের আধিপত্য

মুসলিম সমাজে প্রচারিত গণমাধ্যম, বিশেষত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে তৈরি হওয়া বিনোদনের আধিপত্য দেখা যায়। অনেক সময় এই বিনোদন সামগ্রীগুলো পশ্চিমা বিনোদনের সরাসরি অনুকরণ বা রূপান্তর হয়। ধর্মবিমুখ বা ধর্মনিরপেক্ষ বিনোদনের এই আধিপত্য সমাজে ধীরে ধীরে ধর্মীয় সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়। যখন কোনো বিনোদনে নৈতিক বা ধর্মীয় বার্তা থাকে না, তখন মানুষ অনৈতিক বিষয়বস্তুকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শুরু করে। সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং ধর্মবিমুখ কন্টেন্টের ব্যাপক প্রচারের ফলে মানুষ পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। মিডিয়া ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, অশ্লীল নাটক ও গান প্রচার করে। মুসলমানরা প্রতিদিন গুনাহ দেখেই সময় কাটায়। অথচ মুমিনদের গুন ইহার সম্পূর্ণ উল্টা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ ۙ

তারা নিরর্থক কথাবার্তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সূরা মুমিনুন : ৩

ইসলামী সমাজের উচিত এমন গণমাধ্যম গড়া, যা ঈমান ও জ্ঞানের চর্চা বাড়ায়।

১৪. নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা

অনেক মুসলিম তরুণ নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির প্রতি উদাসীন বা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। তারা মনে করে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি সেকেলে ও অনাকর্ষণীয়। এর বিপরীতে, পশ্চিমা সংস্কৃতিকে তারা অত্যাধুনিক, গ্ল্যামারাস এবং অনুসরণযোগ্য মনে করে। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি এই উদাসীনতা এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি অতি-আকর্ষণ, তাদেরকে পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের দিকে ঠেলে দেয়। যখন কেউ তার শেকড়কে ভুলে যায়, তখন অন্য যেকোনো সংস্কৃতি বা বিনোদন ব্যবস্থা তার উপর সহজে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই উদাসীনতা পশ্চিমা বিনোদনের অশালীন উপাদানগুলো গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে না। মুসলমানরা তাদের ঐতিহ্য, সাহিত্য ও ইসলামি সৌন্দর্যবোধ ভুলে যাচ্ছে। ফলে তারা পশ্চিমা সংস্কৃতির ভোক্তা হয়ে পড়েছে।

১৫. পরিবার ও সমাজের দুর্বল নজরদারি

পরিবার এবং সমাজ হলো নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রথম পাঠশালা। কিন্তু আধুনিক জীবনে বাবা-মা ও অভিভাবকরা কর্মব্যস্ততা এবং অন্যান্য কারণে সন্তানদের উপর পর্যাপ্ত নজরদারি করতে পারেন না। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমের সহজলভ্যতার যুগে, শিশুরা ব্যক্তিগতভাবে ইন্টারনেটে কী দেখছে বা কী ধরনের বিনোদনে অভ্যস্ত হচ্ছে, তা ট্র্যাক করা কঠিন। সমাজের নজরদারি শিথিল হওয়ায় এবং ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেওয়ায়, তরুণ প্রজন্ম পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ বিনোদন মুসলিম সমাজে অবাধে প্রবেশ করছে। পিতা-মাতা সন্তানদের স্ক্রিনের জগতে ছেড়ে দিচ্ছেন, সমাজও দায়িত্ব নিচ্ছে না। ফলে তরুণরা অশ্লীলতার কবলে পড়ছে।

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম (শাসক) একজন দায়িত্বশীল। কাজেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে সে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল। কাজেই সে তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে, আর খাদিম তার মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। [‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ)] বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এদের সম্পর্কে (নিশ্চিতভাবেই) শুনেছি। তবে আমার ধারণা; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, আর সন্তান তার পিতার সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। মোটকথা তোমাদের প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।  সহিহ বুখারি : ২৫৫৮

১৬. ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব

পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মুসলিমদের মধ্যে সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব। ইসলামে হালাল (বৈধ) এবং হারাম (অবৈধ) বিনোদনের স্পষ্ট সীমারেখা রয়েছে এবং সুস্থ বিনোদনের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন মানুষের ধর্মীয় জ্ঞান দুর্বল হয়, তখন তারা নৈতিকতা ও অনৈতিকতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না বা প্রবৃত্তির তাড়নায় হারামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা অশ্লীল বিনোদনের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন থাকে না। ধর্মীয় শিক্ষার অভাবের ফলে, এই ধরনের বিনোদনের প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং পশ্চিমা নোংরা বিনোদন সহজেই সমাজে অনুপ্রবেশ করে। যে সমাজে কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা নেই, সে সমাজে হারাম-হালালের বোধও থাকে না। ফলে অশ্লীলতাকে বিনোদন মনে করা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

  وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا ۙ

যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন। সূরা তালাক : ২

১৭. ইসলামী বিকল্প বিনোদনের ঘাটতি

যদিও ইসলাম সুস্থ ও নৈতিক বিনোদনকে উৎসাহিত করে, কিন্তু আধুনিক চাহিদা মেটানোর মতো আকর্ষণীয়, উচ্চমানের এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ ইসলামী বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম বা কন্টেন্টের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তার কারনও আছ ইসরাম পরকালে বিশ্বাস শিক্ষা দেয়। অশ্লীল বিনোদনে লাগাম লাগায়। তাই ইসলামি  কন্টেন্টগুলো অনেক সময় তরুণদের কাছে আধুনিক বা আকর্ষণীয় বলে মনে হয় না। ফলে, বিনোদনের সহজাত চাহিদা পূরণের জন্য মানুষ সহজলভ্য পশ্চিমা বিনোদনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেখানে প্রচুর পরিমাণে কুরুচিপূর্ণ উপাদান থাকলেও তার পরিবেশনা হয় আকর্ষণীয়। ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে তৈরি বিকল্প বিনোদনের অভাব পশ্চিমা অশ্লীল বিনোদনের জন্য মুসলিম সমাজে প্রবেশের একটি বিশাল সুযোগ তৈরি করে।

উপসংহার : মুসলিম সমাজে পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদনের অনুপ্রবেশ এক ভয়াবহ নৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সংকট। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন তিনটি বিষয়—

ইসলামী জ্ঞানের প্রসার,

পরিবার ও সমাজের দৃঢ় নজরদারি,

ইসলামী বিকল্প সংস্কৃতি ও বিনোদন মাধ্যমের বিকাশ।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

 ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِہِمۡ ؕ

আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের পরিবর্তন করে। সূরা রাদ : ১১

সুতরাং, মুসলিম সমাজকে আত্মপরিশুদ্ধি ও ইসলামী চেতনায় ফিরতে হবে; তবেই পাশ্চাত্যের অশ্লীল সংস্কৃতির এই আগ্রাসন প্রতিহত করা সম্ভব হবে।

ইসলাম ও পশ্চিমাদের বিনোদনের পার্থক্য?

বিনোদনের ইসলামিক ধারণা হলো এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক আকাঙ্ক্ষা যা আল্লাহর সীমার মধ্যে পূরণ করা যেতে পারে, তবে এটি একজন মুসলিমের জন্য একমাত্র লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নয়। এখানে আমরা বিনোদন সম্পর্কে আমাদের ধারণা এবং পশ্চিমের ধারণার মধ্যে কয়েকটি পার্থক্য লক্ষ্য করি।

প্রথমত, মুসলিমদের জন্য, বিনোদন নিজের মধ্যে কোনো লক্ষ্য নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে উপভোগ করার জন্য একটি আশীর্বাদ।

দ্বিতীয়ত, ইসলামে বিনোদনের সীমা রয়েছে যা আল্লাহ ﷺ নির্ধারণ করেছেন, যা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।এই কারণগুলি একজন অনুশীলনকারী মুসলিম এবং একজন গড়পড়তা পশ্চিমা ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

উভয়েই নিজেদের বিনোদন দেয়, তবুও মুসলিম আল্লাহকে মান্য করার জন্য অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করে, আর পশ্চিমা ব্যক্তি আল্লাহকে ভুলে গিয়ে এবং অনুমোদিত বিনোদনের সীমা অতিক্রম করে আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনে।

এই পার্থক্য ব্যাপক, কারণ এটি অস্তিত্বের উদ্দেশ্যকেই জড়িত করে। অনুমতিযোগ্য বিনোদনের সাধারণ প্রমাণ আমি এখন নিজেকে বিনোদন দেওয়া এবং অনুমোদিত সমস্ত কিছু উপভোগ করার অনুমতিযোগ্যতার জন্য কিছু সাধারণ প্রমাণ উপস্থাপন করব। এটি বিশেষভাবে তাদের উপকারের জন্য যারা তাদের অজ্ঞতার কারণে প্রায় সব ধরনের বিনোদনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার চরম সীমায় চলে যান, যা তাদের এবং অন্যদের জন্য ইসলামকে কঠিন করে তোলে।

নিষিদ্ধ বিনোদনের সরূপ

নিষিদ্ধ বিনোদনের স্বরূপ

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

বিনোদন মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, যখন তা আল্লাহ্‌র নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে তখন তা আর নির্মল থাকে না; বরং তা ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বইটির এই অধ্যায়ে এমন কিছু বিনোদনের আলোচনা করা হয়েছে যা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ, কিন্তু আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাবে যা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

আধুনিক যুগের ঝলমলে বিনোদন ব্যবস্থা একদিকে যেমন মনকে সাময়িক তৃপ্তি দেয়, অন্যদিকে তা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অধঃপতনকে ত্বরান্বিত করে। যেমন- অবৈধ প্রেম, অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া, বেপর্দা পোশাক, বিপরীত লিঙ্গের সাথে অবাধ মেলামেশা, অশালীন নাচ-গান, ডেটিং, যৌন উত্তেজক বই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত কার্যকলাপ একজন ব্যক্তিকে পাপের পথে ঠেলে দেয়। এসব কার্যকলাপ আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ মনে হলেও, এগুলি ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে, লজ্জা ও শালীনতাবোধ নষ্ট করে দেয় এবং সর্বশেষে তাকে জিনা-ব্যভিচারের মতো মহাপাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম সমাজের একাংশও নিজস্ব সংস্কৃতির নামে এমন কিছু কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে যা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী। এ অধ্যয় বিতর্কিত প্রথা ও উৎসবগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে, যা ধর্মের নামে বা ঐতিহ্য হিসেবে পালিত হয় কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক ভিত্তি নেই। ঈদে মীলাদুন্নবী, শবে বরাত, আশুরার দিন আনন্দ-উৎসব, মিলাদ মাহফিল, ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহাম, পীরের মাজারে উরস, এমনকি নববর্ষের মতো উৎসবগুলিতে গান-বাজনা, বেপর্দা মেলামেশা ও বাড়াবাড়ির মাধ্যমে অনৈসলামিক বিনোদনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বিবাহ, আকিকা, এমনকি মৃত্যু পরবর্তী কুলখানি ও চল্লিশার মতো পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানও আজকাল অনৈতিক গান-নাচ ও বেপর্দার বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ছে, যা মুসলিম সমাজের সরলতা ও পবিত্রতাকে নষ্ট করছে।

অন্যদিকে, বিশ্বায়নের এই যুগে পশ্চিমা ও অমুসলিম সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের প্রবণতা মুসলিম যুবসমাজকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই ভয়াবহ অনুকরণ প্রিয়তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পোশাক, স্টাইল, সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ, সিনেমা, নাটক ও খেলাধুলায় অমুসলিমদের অন্ধ অনুসরণ, এবং পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদনে গা ভাসিয়ে দেওয়া—এগুলি প্রমাণ করে যে মুসলিমরা নিজেদের স্বকীয়তা ও গৌরব ভুলে গিয়ে অন্যদের অনুকরণে মত্ত হচ্ছে। এই অনুকরণ শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের উপর আঘাত হানে।

সবশেষে, “আধুনিক ডিজিটাল ডিভাইজ” এর প্রভাবে বিনোদনের জগত যে নতুন মোড় নিয়েছে, তা সংক্ষিপ্তভাবে হলেও আলোচনার দাবি রাখে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বিনোদনকে হাতের মুঠোয় এনে দিলেও, এর অপব্যবহার সমাজের নৈতিক কাঠামোকে চরমভাবে দুর্বল করছে। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলিম সমাজকে সেইসব নিষিদ্ধ বিনোদনের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা এবং তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও নির্দেশনার আলোকে পবিত্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা।

যে বিনোদন জিনা, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা দিকে ধাবিত করে

১. অবৈধ প্রেম ও ভালোবাসা

২. অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া দেখা

৩. বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরা বা দেখা

৪. বিপরীত লিঙ্গের সাথে একান্তে মেলামেশা

৫. অশালীন বা উত্তেজক নাচ-গান ও সঙ্গীত শোনা

৬. অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া

৭. যৌন উত্তেজক বই, পত্রিকা ও উপন্যাস পাঠ করা

৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত পোস্ট ও ভিডিও দেখা

৯. যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা ও টিকটক ভিডিও দেখা বা তৈরি করা

১০. বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং ও অনলাইন বন্ধুত্ব

অবৈধ প্রেম ও ভালোবাসা

প্রেম আল্লাহ প্রদত্ত একটি স্বাভাবিক অনুভূতি। মানুষ পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়, মমতা জন্মে এটা প্রকৃতিগত। কিন্তু যখন এই অনুভূতি শরীয়তের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে, তখন সেটাই হয় অবৈধ প্রেম বা হারাম ভালোবাসা। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন সম্পর্ক, যা বিবাহবন্ধনের বাইরে ঘটে এবং পুরুষ-নারীর মাঝে গোপন ঘনিষ্ঠতা বা যোগাযোগ সৃষ্টি করে, তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

অবৈধ প্রেমের বাস্তব চিত্র

বর্তমান সমাজে “ভালোবাসা দিবস”, “বয়ফ্রেন্ড–গার্লফ্রেন্ড” সংস্কৃতি, “চ্যাটিং”, “ডেটিং” ইত্যাদি নাম দিয়ে এমন এক অশ্লীল প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে যা সরাসরি জিনা ও ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে পরিমিত লজ্জাবোধ ও পরিশুদ্ধতা দিয়েছেন, এসব সংস্কৃতি তা ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কথাবার্তা, মেসেজ, বা চোখের দৃষ্টি থেকে শুরু হয়ে এক সময় তা দেহগত পাপের দিকে গড়ায়। ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ প্রেম হারাম। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

এ আয়াত শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি, বরং এর কাছেও না যেতে সতর্ক করেছে  অর্থাৎ, এমন সব উপাদান ও আচরণ থেকে দূরে থাকা যা ব্যভিচারের দিকে ধাবিত করে। অবৈধ প্রেম, গোপন সাক্ষাৎ, ফোন বা সামাজিক মাধ্যমে অন্তরঙ্গ বার্তা, এগুলোই সেই “কাছাকাছি যাওয়ার” রূপ।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখরির : ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ : ৮২২২

অতএব, প্রেমের নামে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, চ্যাটিং, দেখা করা, অনুভূতি ভাগাভাগি করা, এগুলোও “জিনার ভূমিকা” পালন করে। শয়তান কখনও সরাসরি জিনায় প্ররোচিত করে না। সে শুরু করে “সহানুভূতি”, “বন্ধুত্ব”, “আন্তরিকতা” দিয়ে। ধীরে ধীরে সে হৃদয়ে হারাম ভালোবাসার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এক সময় মানুষ নিজের নফসের দাসে পরিণত হয়।

উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পুরুষের জন্য স্ত্রীজাতি অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর কোন ফিতনা আমি রেখে গেলাম না। সহিহ বুখারি : ৫০৯৬, সহিহ মুসলিম : ২৭৪০

এই কারণেই ইসলামে প্রেমের সম্পর্ক কেবল বৈধ হয় বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহই ভালোবাসাকে পরিশুদ্ধ ও ইবাদতে রূপ দেয়। অপর পক্ষে অবৈধ প্রেম শুধু দীন নয়, দুনিয়াও ধ্বংস করে। এটি মানসিক অস্থিরতা, হৃদয়ভঙ্গ, অবিশ্বাস, পারিবারিক অশান্তি ও লজ্জাহীনতা সৃষ্টি করে। সমাজে ব্যভিচার, অবৈধ সন্তান, তালাকের হার বৃদ্ধি সবকিছুর মূলে এই হারাম সম্পর্ক। ইসলাম প্রেমকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং শরয়ী পথে পরিচালিত করেছে। বৈধ উপায়ে বিবাহের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করা উত্তম ও বরকতময়। অবৈধ প্রেম থেকে বিরত থাকা ইমানের নিদর্শন। যে যুবক-যুবতী আল্লাহর ভয় ও লজ্জাবোধে নিজের দৃষ্টি ও হৃদয় সংযত রাখে, তার জন্য জান্নাতের সুখবর রয়েছে।

২. অশ্লীল সিনেমা ও মিডিয়া দেখা

বর্তমান সময়ে বিনোদনের নামে অশ্লীলতা সবচেয়ে ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে সিনেমা, নাটক, সিরিজ, ইউটিউব ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। এগুলো বাহ্যত “বিনোদন” মনে হলেও বাস্তবে এগুলোর অনেকাংশ মুসলিম সমাজে নগ্নতা, জিনা, ব্যভিচার, মাদক, হত্যা, নাস্তিকতা ও ধর্মবিমুখতার প্রচারক হিসেবে কাজ করছে। টিভি সিরিজ, প্রেমভিত্তিক সিনেমা, ওয়েব সিরিজ—এগুলো যুবসমাজের হৃদয়ে জাহেলিয়াতের আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ وَاَنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না। সূরা নূর: ১৯

এই আয়াত অশ্লীলতা প্রচারকারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছে। আজকের সিনেমা ও মিডিয়া আসলে এই অশ্লীলতাই সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে—চোখ, কান ও হৃদয়ের মাধ্যমে। দর্শকও সেই পাপের অংশীদার হয়, কারণ সে তা দেখা ও উপভোগের মাধ্যমে মন্দ কাজকে সমর্থন করছে। আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

“তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো। তবে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ শাস্তি প্রদানে কঠোর।” সূরা মায়েদা : ২

আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোক সঠিক পথের দিকে ডাকে তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। আর যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না। সহিহ বুখারি : ২৬৭৪

অতএব, যারা অশ্লীল ভিডিও নির্মাণ করে বা সেগুলো দেখা-শোনায় অংশ নেয়, উভয়ই পাপে জড়িত।

চোখের হিফাজত ও নফসের প্রশান্তি

চোখ হলো হৃদয়ের দরজা। অশ্লীল দৃশ্য দেখলে হৃদয় কলুষিত হয়, নামাজে মনোযোগ হারিয়ে যায়, কুরআন পাঠে তৃপ্তি থাকে না, এমনকি আল্লাহর ভয়ও হারিয়ে যায়।

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখরির : ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ : ৮২২২

এ কারণেই ইসলামে “অশ্লীল দৃশ্য দেখা” সরাসরি জিনার পথে নিয়ে যায়।

অশ্লীল সিনেমা মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরিয়ে কল্পনার দুনিয়ায় বন্দী করে রাখে। এতে পরিবারে অবিশ্বাস, বৈবাহিক অসন্তোষ, মানসিক অবসাদ, এমনকি পর্নোগ্রাফির আসক্তি সৃষ্টি হয়। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মুসলিম যুবক-যুবতী এই অশ্লীল মিডিয়ার কারণে নামাজ, লজ্জা ও ইমান হারাচ্ছে। মুমিনের উচিত নিজের চোখ ও কানের পাহারাদার হওয়া।

উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো নারীকে দেখে, অতঃপর আল্লাহকে ভয় করে (পুনরায় না দেখার জন্য) দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ্ তাকে এমন ইমান দান করেন, যার মিষ্টতা সে তার হৃদয়ে অনুভব করে।” সহিহুল জামে : ৫০৯০, তাবারানী : ৭৮১৯, মুসনাদ আহমাদ : ২৩০২৪,

অতএব, বিনোদনের নামে হারাম দেখার পরিবর্তে মুসলিমদের উচিত হালাল বিকল্প গ্রহণ করা—ইসলামী প্রামাণ্যচিত্র, শিক্ষামূলক কন্টেন্ট, কুরআন–সিরাহ বিষয়ক নাটক ইত্যাদি। এতে মনও প্রশান্ত হয়, ঈমানও বাড়ে।  ইসলামে দৃষ্টি সংযত রাখতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা নূর : ৩০

অশ্লীল মিডিয়া সরাসরি এই নির্দেশনার লঙ্ঘন ঘটায়। দীর্ঘসময় ধরে এই ধরনের দৃশ্য দেখতে থাকলে মানুষের মন পাপের প্রতি সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তার কাছে বেপর্দা, অবৈধ সম্পর্ক বা অশালীন আচরণ স্বাভাবিক মনে হতে থাকে, যা তাকে বাস্তব জীবনে সেই কাজগুলো করতে উৎসাহিত করে। মিডিয়াতে দেখানো অবৈধ সম্পর্ককে ‘রোমান্টিক’ বা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে উপস্থাপন করার কারণে দর্শক বাস্তবেও এমন সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা ব্যভিচারের পথকে সুগম করে।

বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান করা

আল্লাহ তাআলা মানুষকে বস্ত্র দান করেছেন লজ্জাস্থান ঢাকার ও সৌন্দর্য রক্ষার জন্য, প্রদর্শনের নয়। আজকের বিশ্বে পোশাক হয়ে উঠেছে ফ্যাশনের প্রতিযোগিতা ও দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যম। পুরুষ ও নারীরা উত্তেজক, আঁটসাঁট, আধা-উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ পোশাক পরে নিজেদেরকে “আধুনিকতা”র নামে প্রদর্শন করছে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এমন পোশাক শুধু গুনাহ নয়, বরং সমাজে অশ্লীলতার প্রসারের অন্যতম মাধ্যম।

বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান করা বা তা প্রদর্শন করা উভয়ই ইসলামে নিষিদ্ধ এবং অশ্লীলতা ও যিনার দিকে ধাবিত করার শক্তিশালী কারণ। পর্দা হলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য তাদের সম্মান, পবিত্রতা এবং সমাজের শান্তি রক্ষার একটি ব্যবস্থা। নারীদের জন্য উত্তেজক ও আকর্ষণীয় পোশাক পরা, সৌন্দর্য প্রদর্শন করা বা অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে বের হওয়া সরাসরি আল্লাহর নির্দেশনার লঙ্ঘন কর। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

وَقَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সূরা আহযাব : ৩৩

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ ۚ

হে আদম সন্তানগণ! আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক দান করেছি যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢেকে রাখে ও শোভা বৃদ্ধি করে আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। সূরা আরাফ: ২৬

নারীদের জন্য পর্দার নির্দেশ

কুরআনে নারীদেরকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—

وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا… وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ

“তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া; এবং তারা যেন তাদের ওড়না বুকের উপর ফেলে রাখে। সূরা নূর: ৩১

এছাড়া আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ

“হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলুন যেন তারা নিজেদের চাদর দ্বারা নিজেদের আবৃত করে নেয়। এতে তারা চেনা যাবে এবং কষ্ট পাবে না।” সূরা আহযাব: ৫৯

অতএব, উত্তেজক বা অর্ধনগ্ন পোশাক ইসলামী বিধানের পরিপন্থী। পর্দাহীন পোশাক পুরুষদের মধ্যে কামনা জাগায় এবং নারীর মর্যাদা নষ্ট করে।

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু প্রকার লোক জাহান্নামী হবে। আমি তাদেরকে দেখিনি। এক প্রকার ঐ সব লোক যাদের কাছে গরুর লেজের ন্যায় ছড়ি থাকবে। তারা এর দ্বারা লোকেদের পিটাবে। দ্বিতীয় প্রকার ঐ শ্রেণীর মহিলা, যারা কাপড় পরিহিতা কিন্তু উলঙ্গ প্রায়, মানুষকে আকৃষ্টকারিণী ও স্বয়ং বিচ্যুত। যাদের মাথার খোপা বুখতী উটের পিঠের উঁচু কুজোর ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধি অনেক দূর থেকে পাওয়া যায়। সহিহ মুসলিম : ২১২৮

এই হাদিসে স্পষ্ট বোঝা যায়, বেপর্দা ও আকর্ষণীয় পোশাক শুধু গুনাহ নয়; বরং এটি এমন এক অপরাধ যা জান্নাত থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব

অনেকে মনে করে পর্দা শুধু নারীদের বিষয়। কিন্তু ইসলাম পুরুষকেও দৃষ্টি ও পোশাকের শালীনতার নির্দেশ দিয়েছে।

জারহাদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন আর তখন তার উরু খোলা অবস্থায় ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ তোমার উরু ঢেকে রাখ, কেননা এটাও আভরণীয় অঙ্গ। “পুরুষ যেন উরুর নিচের অংশ প্রকাশ না করে।

সুনানে তিরমিজি : ২৭৯৮

এছাড়া পুরুষদেরও হারাম নারীদের দিকে দৃষ্টি নামানোর নির্দেশ দিয়েছেন—

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ

“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। সূরা নূর: ৩০

বেপর্দা পোশাক সমাজে অশ্লীলতার দরজা খুলে দেয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বাড়ায়, পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করে, এমনকি ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের হার বাড়ায়। এ কারণেই ইসলাম লজ্জাশীলতাকে ঈমানের অঙ্গ ঘোষণা করেছে। অতএব, পরিশুদ্ধ সমাজের জন্য প্রত্যেক মুমিনের উচিত লজ্জা ও পর্দাকে জীবনের অলংকার হিসেবে ধারণ করা এবং বেপর্দা ও উত্তেজক পোশাক পরিধান না করা।

৪. বিপরীত লিঙ্গের সাথে একান্তে মেলামেশা

বিপরীত লিঙ্গের সাথে নির্জনে বা একান্তে মেলামেশা করাকে ইসলামী পরিভাষায় খালওয়াত বলা হয় এবং এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম। এটি যিনা ও অশ্লীলতার দিকে ধাবিত হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর ধাপগুলির মধ্যে একটি। একান্ত সাক্ষাৎ করাকে জিনার প্রবেশদ্বার বলা হয়ে থাকে। মানুষের নফস দুর্বল, আর শয়তান তার সুযোগসন্ধানী শত্রু। যখন কোনো নারী ও পুরুষ একান্তে থাকে, তখন তাদের মাঝে তৃতীয় হিসেবে শয়তান উপস্থিত হয় এবং ধীরে ধীরে তাদের হৃদয়ে পাপের আকর্ষণ জাগিয়ে তোলে। তাই ইসলাম একান্ত মেলামেশা (খলওয়াহ) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে নবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে (এবং পাপাচারে প্ররোচনা দেয়)। তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শাইতান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)। যার সৎ আমল তাকে আনন্দিত করে এবং বদ্‌ আমল কষ্ট দেয় সেই হলো প্রকৃত ঈমানদার। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫

নির্জন পরিবেশে যখন কেউ শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে, তখন তার পক্ষে নৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। একান্তে মেলামেশা শারীরিক প্রলোভন সৃষ্টির সবচেয়ে শক্তিশালী পরিস্থিতি তৈরি করে। কথা বলা, স্পর্শ করা, বা আবেগ বিনিময়— ইত্যাদি সহজেই যিনার পথে নিয়ে যায়। এমনকি যদি আপাতদৃষ্টিতে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য না-ও থাকে, তবুও শয়তান ধীরে ধীরে তাদের মনে কুচিন্তা ও কামনার বীজ বপন করে। তাই ইসলাম সকল ধরনের সন্দেহ ও পাপের পথকে গোড়াতেই বন্ধ করে দিতে চেয়েছে। নির্জনতা দূর করার মাধ্যমে ব্যভিচারের মূল কারণটিই দূর করা হয় এবং সমাজকে অনৈতিকতা থেকে রক্ষা করা হয়। নবী ﷺ জানতেন, যতই পবিত্র উদ্দেশ্য থাকুক না কেন, একান্ত পরিবেশে নফসের প্রবৃত্তি জেগে উঠতে পারে, যা পাপের দিকে ধাবিত করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

এই আয়াতে আল্লাহ শুধুমাত্র জিনা নিষিদ্ধ করেননি, বরং বলেছেন “কাছেও যেও না”। একান্ত সাক্ষাৎ, ফোনে আলাদা কথা বলা, বন্ধুত্বের নামে চ্যাটিং করা, এগুলোই “জিনার কাছাকাছি যাওয়া”-এর আধুনিক রূপ। আধুনিক প্রেক্ষাপটে নারী পুরুষ অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এক সাথে কাজ করে।

তারা বিভিন্ন কারনে একসাথে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। যেনম-

• অফিসে গোপন মিটিং,

• বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকল্প কাজের নামে একান্ত সময়,

• কফিশপে বন্ধুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎ,

• কিংবা অনলাইনে প্রাইভেট ভিডিও কল ও মেসেজ বিনিময়।

এসবই “খলওয়াহ”-এর অন্তর্ভুক্ত, যদিও তা ভার্চুয়াল মাধ্যমেই ঘটে। ইসলামিক ফিকহে এরূপ অবস্থাকে বলা হয় অনলাইন একান্ততা, যা একইভাবে নিষিদ্ধ।

এভাবে একান্তে অনলাইনে বার বার কথা বলার কারনে তাদের অন্তরে হারাম আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। আস্তে  আস্তে লজ্জা ও আল্লাহভীতি দূরে সরে যায়। ফলে তাদের বিবাহিত জীবনে অবিশ্বাস ও দাম্পত্য কলহ জন্মায়। অসংখ্য যুবক–যুবতী “বন্ধুত্ব” থেকে শুরু করে “জিনা” পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে কেবল একান্ত মেলামেশার কারণে। ইসলাম পুরুষ–নারীর মধ্যে সম্পূর্ণ দেয়াল টানেনি, বরং শরয়ী শিষ্টাচারের সীমানা নির্ধারণ করেছে। প্রয়োজনে নারী–পুরুষ কথা বলতে পারে, কিন্তু শালীনতা ও প্রয়োজনীয়তার সীমার মধ্যে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ

হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। সূরা আল-আহযাব: ৩২

৫. অশালীন বা উত্তেজক নাচ-গান ও সঙ্গীত শোনা

যে সমস্ত গান, নাচ বা সঙ্গীতে অশ্লীল, যৌন উত্তেজক বা অবৈধ প্রেম ও কামনা-বাসনার প্রচার থাকে, তা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম। এটি মানুষের মনকে সরাসরি অশ্লীলতার দিকে নিয়ে যায়।

ইসলাম সঙ্গীতকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেনি, তবে যে গান বা সঙ্গীত যৌন আকাঙ্ক্ষা জাগায়, হারামের দিকে প্ররোচিত করে, বা নারীদের বেপর্দা ও অশালীন চিত্র প্রদর্শন করে, তা নিষিদ্ধ। এ ধরনের গান শ্রবণের যিনা ঘটায় এবং মানুষের মনে কামভাব জাগিয়ে তোলে। গানের কথা বা সুর যখন অবৈধ সম্পর্ক, মদ্যপান বা বেপরোয়া জীবনযাপনকে উৎসাহিত করে, তখন শ্রোতা সেই পাপের প্রতি মানসিক আকর্ষণ অনুভব করে। বিশেষ করে নাচ ও উদ্দীপক সঙ্গীত, যা নারী-পুরুষের মিশ্র জমায়েতে পরিবেশন করা হয়, তা সরাসরি বেপর্দা ও শারীরিক অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করে। অবৈধ গানের কারনে আল্লাহ দুনিয়াতেই শান্তি প্রদান করবেন।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

এ হাদিস ইঙ্গিত করে যে এই দুটি বিষয় একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। অশ্লীল গান ও নাচ মানুষের লজ্জা ও তাক্বওয়া (আল্লাহভীতি) কমিয়ে দেয়, ফলে পাপের কাজ করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

৬. অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া

অবাধে ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশগ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম এবং যিনার দিকে ধাবিত হওয়ার একটি মারাত্মক পথ। ডেটিং বা নৈশপার্টি হলো এমন সামাজিক মিলনক্ষেত্র যেখানে নারী-পুরুষের মধ্যে শরীয়ত-বহির্ভূত অবাধ মেলামেশা ঘটে। সাধারণত এসব পরিবেশে বেপর্দা, নেশা (যেমন মদ) এবং উত্তেজক নাচ-গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার থাকে। এই তিনটি উপাদানই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং এগুলো মানুষকে নৈতিকতা ও আল্লাহর ভয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অবাধ মেলামেশার কারণে পুরুষ ও নারীর মধ্যে দৈহিক আকর্ষণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে নৈশপার্টির মতো অন্ধকার ও উদ্দাম পরিবেশে, যেখানে মানুষ নিজেদেরকে ধর্মীয় ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত মনে করে, সেখানে যিনা বা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। ডেটিং সম্পর্কগুলো শুরু হয় সাধারণ আলাপচারিতা দিয়ে, কিন্তু এটি অনিবার্যভাবে শারীরিক সান্নিধ্যের দিকে এগোয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। সূরা ইসরা : ৩২

তাই ডেটিং বা নৈশপার্টিতে অংশ নেওয়া  ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি মুসলিম সমাজে অশ্লীলতা ও যৌন নৈরাজ্য বিস্তারে সরাসরি ভূমিকা রাখে।

ইবনু উমার (রাঃ) হতে নবি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাবধান! কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে সেখানে অবশ্যই তৃতীয়জন হিসাবে শাইতান অবস্থান করে। সুনানে তিরমিজি : ২১৬৫ আংশিক হাদিস।

৭. যৌন উত্তেজক বই, পত্রিকা ও উপন্যাস পাঠ করা

যৌন উত্তেজক (পর্নোগ্রাফিক) বই, পত্রিকা বা উপন্যাস পাঠ করা মানসিক ও চিন্তার যিনা ঘটায় এবং ব্যক্তিকে অশ্লীলতার প্রতি আসক্ত করে তোলে। যদিও এটি সরাসরি শারীরিক যিনা নয়, কিন্তু এই ধরনের সাহিত্য পাঠ মানুষের চিন্তা ও কল্পনার জগৎকে কলুষিত করে। আল্লাহ্ তাআলা মানুষকে দৃষ্টি ও চিন্তাকে সংযত রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। যখন কেউ এই ধরনের বই পড়ে, তখন তার মনে অবৈধ ও বিকৃত যৌন কামনা তৈরি হয়, যা তাকে বাস্তবে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্ররোচিত করে। এটি মনের মধ্যে এমন এক আসক্তি সৃষ্টি করে যে ব্যক্তি আর স্বাভাবিক ও বৈধ সম্পর্কে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। এই ধরনের পাঠ তার লজ্জা ও আল্লাহভীতিকে (তাকওয়া) দুর্বল করে দেয়। যে মন সর্বদা অবৈধ কামনায় নিমজ্জিত থাকে, সে ধীরে ধীরে শারীরিক ব্যভিচারের দিকে অগ্রসর হয়। এছাড়া, এই মাধ্যমগুলো অবৈধ সম্পর্ক বা বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ককে গৌরবময় বা স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে, যা পাঠকের নৈতিক মানদণ্ডকে নষ্ট করে দেয় এবং তাকে যিনার দিকে ধাবিত করে।

এ কারণে যৌন উত্তেজক বই, উপন্যাস বা পত্রিকা, রোমান্টিক গল্পের বই যেখানে নেক্কারজনক আচরণ বা প্রেমের নামে অশ্লীলতা প্রচার করা হয়, যা পড়ার মাধ্যমে মানুষ মনের মধ্যে কামনার আগুন জ্বালায় তা পড়া হারাম। এটি সরাসরি জিনার পথকে উন্মুক্ত করে।

আবু হুরাইরাহ্ (রাযিঃ) এর সানাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, আদম সন্তানের উপর ব্যভিচারের যে অংশ লিখিত রয়েছে তা অবশ্যই সে, প্রাপ্ত হবে। নিঃসন্দেহে দু’চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো, দু’কানের ব্যভিচার হলো শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো কথোপকথন করা, হাতের ব্যভিচার হলো শক্ত করে ধরা, পায়ের ব্যভিচার হলো হেঁটে যাওয়া, হৃদয়ের ব্যভিচার হচ্ছে কামনা-বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান তা সত্যায়িত করে বা মিথ্যা সাব্যস্ত করে। সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭

৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুপযুক্ত পোস্ট ও ভিডিও দেখা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (যেমন: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিইব) অনুপযুক্ত বা অশ্লীল পোস্ট এবং ভিডিও দেখা হলো চোখ ও কানের যিনা, যা আধুনিক যুগে অশ্লীলতা বিস্তারের অন্যতম প্রধান কারণ।

এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রায়শই বেপর্দা নারীর ছবি, উত্তেজক নাচ বা অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ বিষয়বস্তু প্রদর্শিত হয়। এইগুলো দেখা সরাসরি দৃষ্টি সংযত রাখার ইসলামী নীতির লঙ্ঘন। অনুপযুক্ত ভিডিও বা ছবি দেখার মাধ্যমে মানুষ মানসিক উত্তেজনা অনুভব করে এবং ধীরে ধীরে পাপের প্রতি তার লজ্জা (হায়া) চলে যায়। বারবার এই ধরনের দৃশ্য দেখতে থাকলে, তার কাছে অবৈধ বা অশ্লীল কাজগুলো স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। এটি তাকে বাস্তবেও এমন আচরণ করতে বা এমন পরিবেশে যেতে উৎসাহিত করে, যেখানে সে এই দৃশ্যের অনুরূপ অভিজ্ঞতা পেতে পারে। এগুলো অনৈতিক ব্যবহার করলে সরাসরি জিনা ও ব্যভিচারের দিকে পরিচালিত করে। যুবক-যুবতী ছবি, ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ ও কামনা বৃদ্ধি করে।

বুরাইদাহ (রাযিঃ) হতে মারফু’ হিসেবে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে ’আলী! বারবার (অননুমোদিত জিনিসের প্রতি) তাকাবে না। তোমার প্রথম দৃষ্টি জায়িয (ও ক্ষমাযোগ্য) হলেও পরের দৃষ্টি (ক্ষমাযোগ্য) নয়। সুনান তিরমিজি : ২৭৭৭, সুনানে আবু দাউদ ২১৪৯

অশ্লীল ভিডিও বা পোস্ট দেখা মানে চোখের জিনার অংশীদার হওয়া। কুরআনও সতর্ক করেছেন—

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ

মুমিন পুরুষদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে। সূরা নূর : ৩০

তাই এই পোস্টগুলোর লাইক ও শেয়ারের মাধ্যমে ব্যক্তি অশ্লীলতার প্রচারে অংশ নেয়, যা কোরআনের নির্দেশনার বিপরীত। আল্লাহ্ তাআলা এমন লোকদের জন্য কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যারা মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিতে চায়। সুতরাং, এই অনুপযুক্ত কনটেন্টগুলো দেখা হলো ব্যভিচারের পথে শয়তানের প্রথম ফাঁদ।

৯. যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা ও টিকটক ভিডিও দেখা বা তৈরি করা

যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কৌতুক, নাটিকা বা টিকটক ভিডিও তৈরি করা বা উপভোগ করা হলো যিনার পথে কথার ব্যবহার এবং অশ্লীলতাকে জনপ্রিয় করার মাধ্যম।

এ ধরনের কৌতুক বা ভিডিওতে সরাসরি অশ্লীলতা না থাকলেও, সেগুলোতে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা, অঙ্গভঙ্গি ও বিষয়বস্তু ব্যবহার করা হয় যা মানুষের মনে যৌন চিন্তা জাগিয়ে তোলে। ইসলামে কথা ও রসিকতায় শালীনতা বজায় রাখা আবশ্যক। এই ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টগুলো একদিকে যেমন কথার যিনা ঘটায়, তেমনি অন্যদিকে তা সমাজে লজ্জাহীনতাকে সাধারণ বিষয়ে পরিণত করে। বিশেষ করে টিকটক বা নাটিকার মতো মাধ্যমগুলোতে নারী ও পুরুষের বেপর্দাভাবে অভিনয় করা, অপ্রয়োজনীয় শারীরিক নৈকট্য দেখানো এবং উত্তেজক ভঙ্গিমা প্রদর্শন করার মাধ্যমে দর্শক অবাধে মেলামেশা ও অশ্লীলতার প্রতি উৎসাহিত হয়। যখন সমাজের মানুষ অশ্লীল ইঙ্গিতের প্রতি হাসে ও উপভোগ করে, তখন তাদের হৃদয়ে পাপের প্রতি ঘৃণা কমে যায় এবং তারা ধীরে ধীরে গুরুতর অশ্লীল কাজের দিকে ধাবিত হয়। এই কনটেন্টগুলো ক্ষতিকর মানসিক আসক্তি তৈরি করে, যা বাস্তবে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ও পবিত্র বিবাহিত জীবন গঠনের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

১০. বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং ও অনলাইন বন্ধুত্ব

বিপরীত লিঙ্গের সাথে অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং, মেসেজিং বা অনলাইন বন্ধুত্ব হলো কথার যিনা এবং এটি অবৈধ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

অনলাইনে চ্যাট বা মেসেজিংয়ের মাধ্যমে শুরু হওয়া সম্পর্কগুলো খুব দ্রুত গভীর ও আবেগপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ সেখানে সরাসরি সাক্ষাতের সামাজিক বাধা থাকে না। প্রথমদিকে এটি হয়তো সাধারণ কথা দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় ধীরে ধীরে তা অশোভন, আবেগপূর্ণ এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলাপে পরিণত হয়। ইসলাম নারীদেরকে প্রয়োজন ছাড়া কোমল কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-

یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِہٖ مَرَضٌ وَّقُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۚ

হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। সূরা আহযাব :৩২

অনলাইনে চ্যাটিংয়ে এই নিষেধাজ্ঞা আরও গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়। এই ধরনের সম্পর্ক হৃদয়ের যিনা ঘটায় এবং চ্যাটিংকারীরা বাস্তবে দেখা-সাক্ষাৎ (খালওয়াত) এবং অবশেষে ব্যভিচারের দিকে ধাবিত হয়। অনলাইন বন্ধুত্ব অবৈধ প্রেমের ক্ষেত্র তৈরি করে, যা একজন মুসলিমকে তার বৈধ সঙ্গীর প্রতি আগ্রহ কমাতে এবং ধর্মীয় নৈতিকতা হারাতে সাহায্য করে। অপ্রয়োজনীয় চ্যাটিং মানুষের সময়ের অপচয় এবং চিন্তাকে কুলষিত করার মাধ্যমে সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করে।

মুসলিমদের অনৈতিক বিনোদন : প্রথম কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ঈদে মীলাদুন্নবী বা নবী -এর জম্ম উৎসব

আমাদের সমাজের বিশার একটা জনগোষ্ঠী রাসূলুল্লাহ এর জম্ম দিন কে সব ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ হিসবে পালন করে। যার নাম রেখেছে ঈদে মীলাদুন্নবী। বিদআতীদের নিকট সবচেয়ে বড় ঈদ এবং বড় উৎসবের দিন হলো এই দিন। তারা মহা ধুমধামে বিশাল শোভা যাত্রা এবং বিভিন্ন ভক্তিপূর্ণ গান ও আনন্দ-ফূর্তির মাধ্যমে আয়োজন করে থাকে। আর রাসূল রাসূলুল্লাহ এর নামে মিথ্যা কাহিনী বর্ণনার জন্য এই দিন তারা তথাকথিত সীরাত মাহফিলের আয়োজন করে। আজকাল তারা ঈদে মীলাদুন্নবী বা রাসূলুল্লাহ এর জ্ম্ম উৎসব পালন কে ফরজ বলেও উল্লেখ করছে।

ঈদে মীলাদুন্নবী কি?

ঈদে মিলাদুন্নবী (مَوْلِدُ النَبِيِّ): হল আরবি তিনটি শব্দের সম্মিলিত রূপ। ঈদ, মিলাদ ও নবী এই তিনটি শব্দ নিয়ে এটি গঠিত। আভিধানিক অর্থে ঈদ অর্থ খুশি, মিলাদ অর্থ জন্ম, নবী অর্থ বার্তাবাহক। পারিভাষিক অর্থে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুনিয়াতে আবির্ভাবের আনন্দকে ঈদে মিলাদুন্নবী বলা হয়। কাজেই ‘‘মীলাদুন্নবী’’ বলতে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জন্মদিনকে বিশেষ পদ্ধতিতে উদযাপন করাকেই বোঝান হয়। জন্মদিনকে উদযাপন বা পালন বা জন্ম উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করাই মীলাদুন্নবী হিসেবে মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে পরিচিত।

২. রাসূলুল্লাহ এর জন্মের সঠিক তারিখ কেউ জাননা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ সম্পর্কে অনেকগুলো অভিমত পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মের বছর ও বার নিয়ে তেমন কোন মতভেদ না থাকলেওে, জম্মের তারিখ ও মাস নির্দিষ্ট করা নিয়ে অধিকাংশ মুহাদ্দিস ইতিহাসবিদ, তাফসির কারক, মুফাস্সির, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ করেছেন। এ মতানৈক্যের যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

* কারো জানা ছিল না যে, এ (রাসূলুল্লাহ ﷺ) নবজাতক ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? অন্য নবজাতকের জন্মকে যেভাবে নেয়া হত তার জন্মকেও সেভাবে নেয়া হয়েছে। এ জন্য পরিবারের কারো পক্ষে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্ম তারিখ নির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করে রাখা হয়নি।

* রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জম্মের পূর্বেই তাহার পিতা মারা জান। মাতা ও ছয় বছর পর মারা যান। কাজেই জম্ম তারিখ মনে রাখার মত আপন আর কেই ছিল না।

* একশত বছর আগের কথা ভাবুন! কত জন মানুষ সঠিকভাবে জম্ম তারিখ জানে? এবার একটু ১৪০০ বছর আগে কথা কল্পনায় নিয়ে আসুন, দেখবেন জম্ম তারিখ মনে রাখা বা লিখে রাখা কতটা অসম্ভব ছিল।

* সবচেয়ে সঠিক ও নির্ভর যোগ্য উৎস হল, কুরআন ও হাদিস। অথচ সেখানে জম্মের দিন সোমবার দিন ছাড়া আর কিছু সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয় নি।

৩. এই দিনে খুসিতে যে সব বিনোদন করা হয়

ক. এ দিনে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রায় আয়োজন করা হয়। এবং বিভিন্ন ধরনের প্লেকার্ড, পোষ্টার, ফেস্টুন দিয়ে শোভাযাত্রায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। যা মুলত অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। এটা অনেকটা শিয়াদের তাজিয়া মিশিলের অনুকরনে করা হয়ে থাকে।

খ. এ উপলক্ষে মিলাদ মাহফিলেন আয়োজন করে থাকে যার কোন শরিয়তের ভিত্তি নেই। এবং উক্ত অনুষ্ঠানে এমন কিছু কবিতা আবৃতি করা হয়, যাতে রাসূল ﷺ এর ব্যাপারে এমন বাড়াবাড়ি রয়েছে, যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দু’আ করা এবং আশ্রয় প্রার্থনা করা পর্যন্ত নিয়ে যায়।

গ. তৃতিয় ঈদ মনে করে খাওয়া দওয়ার আয়োজন করে থাকে, যা মুসলেমদের অন্য দুই ঈদের সম পর্যায় নিয়ে যায়। এবং আয়োজোকদের কাছ থেকে এও শুনতে পাোওয়া যায়, ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ।

ঘ. কোন কোন সূফীদের দেখা যায় দলবদ্ধভাবে গান-বাজনা করে, ঢোল বাজায় এবং তাদের বানানো বিদআতী নিয়মে বিভিন্ন জিকির-আজকার করে। কখনও কখনও নারী-পুরুষ একত্রিত হয়ে এসমস্ত কাজে অংশ নিয়ে থাকে। যার কারণে অনেক সময় অশালীন কাজকর্ম সংঘটিত হওয়ার সংবাদও শুনা যায়।

ঙ,   ইদানিং দেখা যাচ্ছে শোভাযাত্রায় শেষে এ উপলক্ষে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে থাকে।

চ. অনেকে আবার জলসার আয়োজন করে থাকে, যেখানে তাদের করা পদ্ধতিতে অনুষ্ঠাণ সাজান হয়ে থাকে।

৪. ইসলামে ঈদ হল দুটি যথা: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা তৃতীয় কোন ঈদ নেই।

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী মাদীনায় আগমন করার পর তাদের দু’টি দিন ছিল। এ দিন দু’টিতে তারা খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ করত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কি? তারা বলল ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়্যাতের সময় এ দিন দু’টিতে আমরা খেলাধুলা করতাম। রসূলুল্লাহ বললেন, এ দু’দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের জন্য আরো উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। এর একটি হলো ঈদুল আযহার দিন ও অপরটি ঈদুল ফিতরের দিন। সুনানে আবূ দাঊদ ১১৩৪, মিশকাত : ১৪৩৯,  আহমাদ : ১৩৬২২, মুসতাদরাক লিল হাকিম : ১০৯১

ইসলামে ঈদ শুধু দু’ টি এ বিষয়টি শুধু সহিহ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত নয়, তা রবং ইজমায়ে উম্মত দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত। যদি কেউ ইসলামে তৃতীয় আরেকটি ঈদের প্রচলন করে তবে তা কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং তা দ্বীনের মধ্যে একটা বেদআত ও বিকৃতি বলেই গণ্য হবে। ১২ই রবিউল আউয়ালে ঈদে-মীলাদ উদযাপন করা শরীয়ত বিরোধী কাজ। এ ধরণের কাজ হতে যেমন নিজেদের বাঁচাতে হবে তেমনি অন্যকে বিরত রাখার চেষ্টা করতে হবে।

২. শবে বরাতের বিনোদন

শবে বরাত নামটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। এই দিন সরকরি ছুটির দিন বলে সকল নাগরিকই জানে এটি একটি ইসলমি দিবস। আমরাও দেখে থাকি এই রাতে প্রতিটি মসজিদে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে রাতটি অতিবাহিত করে। আবার কিছু লোককে দেখা যায় তারা এ রাতের বিশেষ ইবাদতকে বিদআত হবে। আলোচনা সমালোচায় এক পর্যায় শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর এই আমলকে মুরুব্বিদের দোহাই ও সমাজে প্রচলিত বলে দাবি করে থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলোঃ শবে বরাত বা মধ্য শাবানের রজনীর আমল, বিশেষ নামায পড়া, সিয়াম রাখা, মিলাদ পড়া, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা, আলোক সজ্জা করা ইত্যাদি ইসলামি শরীআতে একটা নব আবিস্কার বিষয়। এই ধরনের কোন আমল বা অনুষ্ঠান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে কিংবা সাহাবাগণের যুগে ছিল না। পরবর্তীতে আব্বাসীয় খেলাফতের একজন শিয়া মতাদর্শী মন্ত্রী মুহাম্মাদ বিন আলী বিন খলফ এ দিনকে বিশেষ ঈদ বা অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করা, মিষ্টি মিঠায় বিলি করা শুরু করেন এবং ৪৪৮ হিজরীতে এক ব্যক্তি বায়তুল মুকাদ্দস মসজিদে বিশেষ নামাযের আয়োজন করেন। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া

প্রতি বছর হিজরি সালের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে মুসলিম উম্মাহ কিছু বিদআতী এই রাতকে সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পালন করে বহু মনগড়া আমল করে থাকে।

১. শবে বরাত রাতে বিতআতি আমল

এই রাতের আমল সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহে কোন দিক নির্দেশনা নাই। তারপরও কিছু মানুষ এই রাতে নফল নিয়তে কিছু সালাত আদায় করে থাকে। এই রাতের বিদআতের নামে যে আমল করে সে সম্পরকএ নিচে আলোচনা করা হলো :

ক. রাতে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়

বিদআতিগণ রাতে ইবাদত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে সালাত আদায়ের পদ্ধতি আবিস্কার করেছে।

খ. দিনে সিয়াম পালন

উপমহাদেশে শবে বরাত উপলক্ষে মধ্য শাবানের রাতে সালাত আদায় ও দিনে সিয়াম পালন করাকে ইসলামি বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এখনও এই আমলটি গুরুত্বসহকারে করা হয়। বিশেষ করে দেওবন্দী অনুসরাণী ও সুন্নী নাম ধারি বিদআতিগণ এই আলম চালু রেখেছেন। অবশ্য দুই একজন ব্যতিক্রমও আছে।

গ. এই রাতে ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকির করাঃ

এই রাতের নির্দিষ্ট সালাত ছেড়ে দিলেও এশা সালাতের পর ইসলামি বিষয় আলোচনা ও জিকিরের মাহফিল কায়েম করে থাকেন। অনেক মসজিদে আলোচনা করার পর আবার নির্দিষ্ট সংখ্যক (দশ বার রাকাত) সালাত আদায় করার সময় প্রদান করেন। এরপর লম্বা একটি সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। কোন কোন মসজিদে আরার আলোচনা শেষ করে ব্যক্তিগত আমল জিকির, সালাত, তিলওয়াত করার সময় প্রদান করে। ফজর সালাতের পর সম্মিলিত মুনাজানের মাধ্যমে শেষ করেন। ইসলামি আলোচনা, সালাত, তিলওয়াত, জিকির এবং সম্মিলিত মুনাজান কোনটিই বিদআত নয়। কিন্তু শুধু এই রাতটিক খাস মনে করে সময়ে সাথে নির্দষ্ট করার জন্য বিদআত পরিনত হবে।

ঘ. এই রাতে সম্মিলিতভাবে কবর জিয়ারত করা

অনেক এই রাতে কবর জিয়ারতকে জরুরী মনে করে থাকে। অনেক সময় পূর্নিমার এ রাতে কবরস্থানে শত শত লোক দেখা যায়।

১. শবে বরাত রাতে অনৈতিক বিনোধন

ক.  হালুয়া-রুটি খাওয়াঃ

শবে বরাত উপলক্ষ্যে আমাদের সমাজে হালুয়া রুটি তৈরি বেশ প্রচলন আছে। এই বিদআতি কর্মকান্ডের জন্য দায়ী জাল হাদিস।  এই কথাগুলিকে জাল হাদিস বলতেও ঘৃনা হয়। অথচ যুগ যুগ ধরে অন্ধ ও অজ্ঞ মুসলীমদের মাঝে হাদিস হিসাবে প্রচলিত। এমনই একটি জাল হাদিস হলো-

আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, শবে বরাতে হালুয়া-রুটি বানালে আরশের নিচে ছায়া পাবে। হাদিসের নামে জালিয়াতী, অস্টম  পরিচ্ছেদ, পৃষ্ঠা-৫৪৯, হাদিসের নামে ভিতিহীন কথা, হাদিস নম্বর : ৫১২

মুহাক্কিক আলেমদের মনে ঐ নির্দষ্ট দিনে জাল হাদিসের উপর ভিত্তি করে, মিথ্যা নেকীর উদ্দেশ্য হালুয়া রুটি বানান সম্পূর্ণ বিদআতি কাজ।

খ. এই রাতে বিশেষ মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা 

শবে বরাতের রাতে মসজিদে এশার সালাত পর মিলাদ একটি রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। আর ৩০/৩৫ বছর ঢাকা আছি অনেক মসজিদে সালাত আদায় করা সৌভাগ্য হয়েছে। মাজার পুজারী বিদআতী ইমাম নয়, ঢাকার অনেক নামিদামি মসজিদের ইমামকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে শবে বরাতের মিলাদে জিলাপি কেনার জন্য চাঁদা আদায় করতে দেখেছি। এই রাতকে সামনে রেখে ঘরে ঘরে গিয়ে মিলাদের জিলপি কেনার টাকা তোলা হয়। বলূত তো এটা কার সুন্নাহ?

রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তার সাহাবীগন কি এইভাবে মিলাদের আয়োজন করেছেন। আমাদের চার মাযহাবের কোন ইমান কি এমন আমল করতে বলেছে। শবে বরাত উপলক্ষ্যে মসজিদ ছাড়াও বিদআতিদের খানকাহ ও দরগায়সমূহে বিশাল আয়োজনে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মিলাদ শেষে চলে মিষ্টি খওয়ার ধুম। চলতে থাকে বিদআতী পন্থায় গরম জিকিরের মজলিশ। এ সব কাজ দ্বীনের মধ্যে বিদআত ছাড়া কিছু নয়।

গ.  মসজিদে সম্মিলিতভাবে খাওয়ার আয়োজন করাঃ

চাকুরির সুবাধে চট্রগ্রামের বিভিন্ন মসজিদে বিভিন্ন কর্মকান্ড দেখান সৌভাগ্য হয়েছে। এ সব মসজিদে, এ রাতে বিদআতীগণ মিলাদ উপলক্ষে রান্না করা খাবার (পায়েশ, ভাত-গোশতের তরকারী, হালূয়া-রুটি) জমা করে। এশার সালাতের পর সম্মিলিতভাবে মিলাদের আয়োজন করে এবং মীলাদ শেষে সকলে মিলে ঐ জমা করা খাদ্য খায়। মনে হবে, কোন একটি অনুষ্ঠানের খাওয়া দাওয়া চলছে। এই কাজকে তারা ইসলামি কাজ মনে করে নেকীর জন্য করছে অথচ এর কোন দলীল প্রমান কুরআন সুন্নাহতে নেই। এই ভাবে খেতে অসুবিধা নেই কিন্তু নির্দষ্ট দিনে নেকী আশায় আমল করলে তা রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমানিত হতে হবে নতুবা বিদআত হবে।

ঘ. এই রাতে আলোক সজ্জা করা এবং আতশবাজী করা :

আমাদের সমাজে সাধারণ বিহাহের আয়োজনে, আনন্দ উত্সবে বা কোন খুসির কারনে আলোক সজ্জা করা হয়। আতশবাজী ফুটান হয়। এই দুটি কাজই সময় ও অর্থের অপব্যয় করে থাকে। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে এ দুটি কাজই হারাম। মহান আল্লাহ বলেন-

اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّہٖ کَفُوۡرًا

নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ। সুরা ইসরা : ২৭

ইবাদাত মনে করে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি ও আলোকসজ্জা করা বিদআত। সুতারং এই কাজটি হারাম হওয়া পাশাপাশি বিদআতও বটে। তাই এ রাত উপলক্ষ্যে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা যাবে না। এ কাজ শরীয়তসম্মত নয়। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলোক সজ্জা হচ্ছে গ্রীক ধর্মের একটি প্রথা। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে হিন্দু ধর্মের প্রথা হিসেবে রূপ লাভ করে যা শেষ পর্যন্ত দেয়ালীপূজা নামে মশহুর হয়। আলোক সজ্জা সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে মুসলমানগণের মধ্যে প্রবেশ করে। যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃতপক্ষে আতশবাজিও হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে লক্ষ লক্ষ টাকা শুধু অপচয় করা হয় না বরং এগুলো অগ্নি পুজকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

৩. আশুরার দিন আনন্দ–উৎসব করা

ইসলামি শরীয়তের কিছু পর্ব বা দিবস আছে, যা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কতৃর্ক নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই সকল দিনে সুন্নাহ মোতাবেগ আমল করলে বহু নেকি পাওয়া যায়। এমনি একটা দিবসের নাম আশুরা। হিজরী সনের প্রথম মাস মহররমের দশ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। অনারবদের অধিকাংশের নিকট আশুরা মানে মহররমের দশ তারিখ। মহররম মাসের দশ তারিখকে নির্দিষ্ট করে বলা হয় ‘আশুরায়ে মহররম’। কিছু বিশেষ কারণে এ দিনটি আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়, তাই তিনি এ দিনে রোজা পালন ও নফল ইবাদত করায় সওয়াব প্রদান করে থাকেন বহুগুণে।

১. আশুরার সিয়ামের পটভূমি সম্পর্কিত হাদিস-

আবূ মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আশূরার দিনকে ইয়াহুদীগণ ঈদ মনে করত। নাবী ﷺ বললেন, তোমরাও এ দিনে সিয়াম পালন কর। সহিহ বুখারি  : ২০০৫

ইবনু ‘আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা ‘আশূরার দিন সিয়াম রাখে। রসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা  (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ২০০৪, সহহি মুসলিম : ১১৩০, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ ৩১১২

২. আশুরার দিনের সিয়ামের ফজিলতঃ

হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, রমযানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সওম হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের সওম এবং ফারয (ফরয) সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত। সহিহ মুসলিম : ১১৬৩, সুনানে আবূ দাঊদ : ২৪২৯, সুনানে তিরমিযী : ৪৩৮, সুনানে নাসায়ী : ১৬১৩, মিশকাত : ২০৩৯

আবূ কাতাদাহ আল-আনসারী (রা.) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ () ‘আরাফাহর দিনে সওম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-এর দ্বারা বিগত ও আগত এক বছরের গুনাহ মোচন হয়। আশুরাহর দিনের সিয়াম  পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন-বিগত এক বছরের পাপ মোচন হয়। সোমবারের দিনে সওম পালন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হয়ে বললেন, এটা সেদিন যেদিন আমি জন্মেছি এবং নুবুওয়াত লাভ করেছি আর আমার উপর (কুরআন) অবতীর্ণ হয়েছে।” সহিহ মুসলিম : ১১৬২, সুনানে তিরমিযী : ৬৭৬, সুনানে  নাসায়ী : ২৩৮২, সুনানে আবু দাউদ : ২৪২৫, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৭১৩, আহমাদ : ২২০২৪

আব্দুল্লাহ ইবনু ’আব্বাস (রাযি.) বলেন, নবী যখন নিজে আশূরার দিন সওম রাখলেন এবং আমাদেরকেও এ সওম পালনের নির্দেশ দেন, তখন লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদী ও খৃস্টানরা এ দিনটিকে সম্মান করে। রাসূলুল্লাহ বললেনঃ আগামী বছর এলে আমরা নবম দিন সওম পালন করবো। কিন্তু আগামী বছর না আসতেই রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন।  আবূ দাউদ : ২৪৪৫, আহমাদ : ২১০৭, ২৬৩৯, সুনানে দারেমী : ১৭৫৯

৩. বিদআত ফির্কার উদযাপন

উপরে সহিহ হাদিসগোলোর মধ্যমে আশুরার পটভূমি সিয়ামের ফজিলত সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু সিয়াম পালনের বাহিরে দুটি ফির্কা এ দিবসে ভিন্ন ভিন্ন শরীয়ত বিরোধা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ বাতিল ফির্কা হলো-

ক. ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা  

খ. শিয়া ফির্কার

৪. ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা উদযাপন :

আমাদের উপমহাদেরশ যারা পীর, মুরিদী ও মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসি, সাধারনত তারাই ব্রেলভী বা রেজভী ফির্কা লোক। মূলত মাজার কেন্দ্রিক আমলে বিশ্বাসিগণই হল উপমহাদেশে বিদআতি আমলের পাওয়ার হাউজ। অথচ তারা তাদের নিজেদের নাম রেখেছে সুন্নি মুসলিম। এ সকল সুন্নি নামধারি বিদআতি মুসলিম জনসাধারণের দিকে তাকালে আপনি দেখবেন যে, তারা এ আশুরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের কাজ-কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এবং এ কাজগুলো তারা আশুরার আমল মনে করেই করে থাকে। যেমন-

*আশুরার রাত্রি জাগরণ করে ইবাদাত করে

* বিভিন্ন প্রকার উন্নত খাবারের ব্যবস্থা করে

* ওয়াজ মাহফিল ও আলোচনা সভা করে

* মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে

* কেউ কেউ পশু জবেহ

* কেউ কেউ শীয়দের অনুকরণে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের স্মরনে প্রতিকৃতি বানায়

* অনেকে শোক প্রকাশের জন্য শীয়াদের মত তাযিয়া মিছিল বের করে

কষ্টের ব্যাপার হল, এগুলো বিভ্রান্ত শিয়া ও রাফেজীদের কাজ হলেও দুঃখজনক ভাবে এই বিদআতগুলি আজ সুন্নী নামের কিছু মুসলিম ভাইদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে।

৫. শিয়া ফির্কার কর্মকান্ড

শীয়া সম্প্রদায়ের লোকদের এই দিনটি খুবই পবিত্র মনে করে। তাদের বিশ্বাস আশুরার দিনে তাদের প্রান প্রিয় ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহ আনহু (শীয়াগন তাদের ইমাম (আ.) কে বলে) এই দিনে কারবালাতে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তারা এ সম্পর্কে এমন সব উদ্ভট আকিদা রাখেন যার সমর্থনে কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোন প্রমাণ নেই।

৬. কারবালার ঘটনার সাথে আশুরার সম্পর্ক কি?

কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরনের সাথে আশুরার কোন সম্পর্ক নেই। আমরা হাদিসের আলোকে যে আশুরার করা বলেছি উহা রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের আগের ঘটনা। তিনি নিজে আশুরার ফজিলত ও গুরুত্ব সাহাবিদের সামনে তুলে ধরেছেন। মুছা আলাইহিস সালামে বিজয়ের শুকরিয়া স্বরুপ সিয়াম পালন করেছে। যেমন হাদিসে এসেছে,

ইবনু আব্বাস  হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনায় গমন করার পর দেখলেন ইয়াহূদীরা ‘আশূরার দিন সিয়াম রাখে। রসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এ দিনটার বৈশিষ্ট্য কি যে, তোমরা সিয়াম রাখো? তারা বলল, এটা একটি গুরুত্ববহ দিন। এ দিনে আল্লাহ তা‘আলা মূসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে মুক্তি দিয়েছেন। আর ফিরাউন ও তার জাতিকে (সমুদ্রে) ডুবিয়েছেন। মূসা  (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এ দিন সিয়াম রেখেছেন। অতএব তাঁর অনুসরণে আমরাও রাখি। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ বললেনঃ দীনের দিক দিয়ে আমরা মূসার বেশী নিকটে আর তার তরফ থেকে শুকরিয়া আদায়ের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে আমরা বেশী হকদার। বস্তুত ‘আশূরার দিন রসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও সিয়াম রেখেছেন অন্যদেরকেও রাখার হুকুম দিয়েছেন। সহিহ বুখারী : ২০০৪, সহিহ মুসলিম : ১১৩০, ইবনু মাজাহ : ১৭৩৪, মিশকাত : ২০৬৭, আহমাদ : ৩১১২

অপর পক্ষ, শিয়ারা যে আশুরা কথা গুরুত্ব দিয়ে বলে থাকে তা এক নয়। রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তেকালের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিজরী ৬১ সালে কারবালার ময়দানে জান্নাতী যুবকদের নেতা, রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রিয় নাতী সাইয়েদুনা হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা একটা হৃদয় বিদারক ঘটনা। ঘটনাক্রমে এ মর্মান্তিক ইতিহাস এ আশুরার দিনে সংঘঠিত হয়েছিল। এটি ছিল উম্মতের ওপর নেমে আসা সবচে বড় বিপদগুলোর একটি।

উপরের আলোচনার মাধ্যমে আশা করি আশুরা সম্পর্কে একটা ষ্পষ্ট ধারনা হয়েছে যে হাদিসে বর্ণিত আশুরা আর শিয়াদের উদযাপিত আশুর মাঝে কোন প্রকারের সম্পর্ক না্‌ই

৭. এ বিবস উপলক্ষে শিয়াদের বিদআত

ক. আশুরার দিনে মাতম করাঃ

উপরের আলোচনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বর্তমানে আশুরার দিনে হুসাইন (রা.) এর নামে যে অনুষ্ঠান, মাতম, বুক ও গাল থাপড়ানো, উচ্চ স্বরে ক্রন্দন এবং বিলাপ করে থাকে তার কোনো ভিত্তি নেই।

খ. শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করাঃ

হাদিসের আলোকো সুন্নাহ সম্মত সিয়াম পালনের কথা বলা হয়েছে। আমরা দেখেছি আশুরার সিয়াম একটি সুন্নাহ সম্মত ইবাদাত। কিন্তু শীয়া ও সুফি তরিকার অনুসরিগণ হুসাইন (রা.) শোক পালনের উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে এবং এর পাশাপাশি তারা শাহাদতে হুসাইনের শোক পালনের উদ্দেশ্যে ছিয়াম পালন করে থাকে, যা সম্পূর্ণরূপে সহিহ হাদিস বিরোধী এবং স্পষ্ট বিদ‘আত।

গ. ১০ই মুহাররমকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করাঃ

 শীয়াদের একটি দল হুসাইন (রা.) এর শাহাদতের শোক স্বরূপ শোক দিবস পালন করে। পক্ষান্তরে একটি গোষ্ঠী রাফেযীদের বিরোধিতা করার লক্ষ্যে এ দিনটিকে আনন্দ উৎসবে পরিণত করে।

ঘ. তাযিয়া মিছিল বাহির করাঃ

তাযিয়া অর্থ বিপদে সান্ত্বনা দেওয়া। যেটা বর্তমানে শাহাদাতে হোসাইনের শোক মিছিলে রূপ নিয়েছে। অথচ ইসলামে কারো মৃত্যুতে তিন দিনের অধিক শোক পালন করা নিষেধ। অথচ শিয়ারা প্রতি বছর শাতাদা বার্ষিকতে ও তাযিয়া মিলিল বের কর। মিডিয়ার কারনে তাযিয়া মিসিলের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটেছে বিধায এখন সকলে মনে করে, আশুরা তাযিয়া মিসিল।

ঙ. ১০ই মুহাররমে চোখে সুরমা লাগানোঃ

অনেকেই আশুরার দিন বা ১০ই মুহাররমে বিশেষ ফযীলতের আশায় চোখে সুরমা লাগিয়ে থাকে; যা সুস্পষ্ট বিদ‘আত।

চ. তাবেঈ ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়াঃ

ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে ‘মালঊন’ বা অভিশপ্ত বলে গালি দেওয়া আদৌ ঠিক নয়। বরং সকল মুসলমানের ন্যায় তার মাগফেরাতের জন্য দো‘আ করা উচিত। কেননা মানুষ হিসাবে তার কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার জন্য তিনি দায়ী নন। এজন্য মূলতঃ দায়ী বিশ্বাসঘাতক কূফাবাসী ও নিষ্ঠুর গভর্ণর ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ। কেননা ইয়াযীদ কেবল হুসাইন (রা.)-এর আনুগত্য চেয়েছিলেন, তাঁর খুন চাননি। হুসাইন (রা.) সে আনুগত্য দিতেও প্রস্ত্তত ছিলেন। ইয়াযীদ স্বীয় পিতার অছিয়ত অনুযায়ী হুসাইনকে সর্বদা সম্মান করেছেন এবং তখনও করতেন। হুসাইন (রা.)-এর ছিন্ন মস্তক ইয়াযীদের সামনে রাখা হলে তিনি কেঁদে বলে ওঠেন, ‘ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের উপর আল্লাহ লা‘নত করুন। আল্লাহর কসম! যদি হুসাইনের সাথে ওর রক্তের সম্পর্ক থাকত, তাহলে সে কিছুতেই তাঁকে হত্যা করত না। তিনি আরো বলেন, হুসাইনের খুন ছাড়াও আমি ইরাকীদেরকে আমার আনুগত্যে রাযী করাতে পারতাম। (ইবনু তায়মিয়া, মুখতাছার মিনহাজুস সুন্নাহ, ১/৩৫০; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৮/১৭৩; আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয়, পৃঃ ৭-১০।

৪. মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা

আমাদের সমাজে ‘মিলাদ মাহফিল’ একটি ব্যাপক প্রচলিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান, মসজিদের ইমাম সাহেব সালাত শেষে প্রায়ই ঘোষণা করে থাকেন, দোয়া বাদ মিলাদ আছে। সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল যে, যেহেতু এটি মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা এর নেতৃত্ব দেন, তাই এটি নিছন্দেহে একটি বৈধ ইবাদত বা কল্যাণের মাধ্যম। এই কারণে, অনেকেই প্রশ্ন তোলেন যে, এত প্রচলিত একটি প্রথাকে ‘বিদআত’ বলা কি সঠিক?

 মিলাদ বিদআত কেন?

১. মিলাদ রাসুল ﷺ, সাহাবী, তাবেই, তাবে-তাবেইন দের যুগ পর্যন্ত ছিলইনা।

২. মিলাদ একটা ইবাদত মনে করা হয় যার পক্ষে রাসুল ﷺ থেকে কোন নির্দেশনা নেই।

৩. মিলাদ আমল হিসাবে আদায় করা হয় এবং এর পদ্ধতিও আবিস্কার করা হয়েছে। প্রত্যেক আদায়কারী এর মাধ্যমে সওয়াব আশা করে থাকে। কাজেই এটা বিদআত।

৪. রাসুল ﷺ তাঁর জন্মের শুকরিয়া হিসেবে সোমবার ব্যক্তিগত সিয়াম পালন করতেন। রাসুল ﷺ সোমবার সিয়াম পালন করতেন সেটা তাঁর নিজের কৃতজ্ঞতা বোধ আল্লাহর প্রতি। আজকে যারা মিলাদুন নবীর কথা বলে তারা কিন্তু প্রতি সপ্তাহে সোমবারের কথা কিছুই বলে না। ভন্ডামি করে এই সোমবারের উদাহরণ পেশ করে বাত্সরিক মিলাদ করে থাকে। 

৫. মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয় বিন্ন উপলক্ষে, যেমন- নতুন ঘর তৈরি বা গৃহে প্রবেশ,  দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন, বিয়ে বা মৃত্যুবার্ষিকী, চল্লিশা, ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে। ইসলামে এই ধরনের পার্থিব বা ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য বিশেষ কোনো সম্মিলিত ইবাদত অনুষ্ঠানের নিয়ম নেই। নো সুনির্দিষ্ট উপলক্ষ বা দিনে ইবাদতকে আবদ্ধ করে ফেলা বিতআত।

৬. সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই অনুষ্ঠানটিকে একটি স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে গণ্য করা। অথচ ইবাদত হতে হলে তার পদ্ধতি, সময় ও কারণ অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

নোট : গত কয়েক দশক আগেও হয়তো এই বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে বোঝানো কঠিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে ইসলামিক জ্ঞান সহজলভ্য হওয়ায়, আলিম সমাজ এবং সচেতন মুসলিমরা বুঝতে পারছেন যে সমাজে প্রচলিত এই মিলাদ মাহফিলের পদ্ধতিটি একটি বিদআত, যা পরিহার করা ইসলামের সঠিক পথে থাকার জন্য অপরিহার্য। এটি কোনো ব্যক্তির সম্মান বা ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্ন নয়, বরং ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করার বিষয়।

এ বিদআতটি কেন বিনোদনে মাঝে উপস্থাপন করলাম?

মিলাদ মাহফিলের আয়োজন একটি ধর্মীয় প্রথা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও, এটিকে বিনোদনের প্রসঙ্গে নিয়ে আসার মূল কারণ এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং মিষ্টি বিতরণের সামাজিক দিক। ইবাদত এবং বিনোদন, এই দুটি বিষয়ের মধ্যেকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে লুপ্ত হয়ে যায়।

ইসলামে ফরজ বা নফল ইবাদত, যেমন সালাত বা রোজা পালনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে মিষ্টি বিতরণ বা ভোজের আয়োজন করা হয় না। ইবাদত পালনের উদ্দেশ্য সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা, যেখানে বিনোদন হলো মনস্তাত্ত্বিক আনন্দ বা উল্লাস। সমাজে মিষ্টি বিতরণের প্রচলন মূলত পার্থিব আনন্দ সংবাদ—যেমন: কোনো পরীক্ষায় সফলতা, নতুন চাকরি লাভ, বা পারিবারিক শুভ বিবাহের মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যখন মিলাদ মাহফিলের মতো একটি অনুষ্ঠান শেষে ব্যাপক হারে মিষ্টি বিতরণ করা হয়, তখন এই পুরো অনুষ্ঠানটি একটি খুশির উপলক্ষ বা সামাজিক উৎসবের মেজাজ লাভ করে।

এই অনুষ্ঠানের মূল ধার্মিকতার চেয়ে শিশুদের এবং অনেক সাধারণ মানুষের কাছে এর প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে এই মিষ্টি। পাড়া-মহল্লার শিশু-কিশোরেরা এই মাহফিলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, কারণ তারা জানে যে শেষে লাইন ধরে মজা করে মিষ্টি বা তাবারুক নিতে পারবে। তাদের কাছে এটি এক ধরনের ‘প্রাইজ মানি’ বা ‘ঈদ বোনাস’-এর মতো। তাই, তাদের কাছে মিলাদ মাহফিলের আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় গুরুত্বের চেয়ে মিষ্টি সংগ্রহ এবং সেই উপলক্ষ্যে একত্রিত হওয়ার সামাজিক আনন্দ বা উল্লাস অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এভাবেই, বিদআতের মাধ্যমে সৃষ্ট এই অনুষ্ঠানটি ধর্মীয় মোড়কের আড়ালে সমাজে একটি সামাজিক বিনোদনমূলক রেওয়াজ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই কারণে, আপনি এটিকে অনৈতিক বা বিদআতি বিনোদনের তালিকায় উপস্থাপন করেছেন, কারণ এর কার্যকারণ এবং ফলাফল একে নিছক ইবাদতের চেয়ে ‘বিনোদন’ বা ‘উৎসব’ হিসেবেই বেশি প্রতিষ্ঠিত করেছে।

৫. ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম

রড় পীর খ্যাত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হিজরী ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানী ৯১ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তার কিছু অনুসারি প্রতি বছর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার ওফাতের দিন পালন করে থাকেন। তার মৃত্যু বার্ষিকী ফাতিহা–ই-ইয়াজদাহাম হিসেবে পরিচিত। ফাতিহা ও ইয়াজদাহম দুটি ফার্সি শব্দ। ফাতিহা অর্থ দোয়া, আর ইয়াজদাহম অর্থ এগারো। ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলতে এগারো-এর ফাতিহা বা দোয়াকে বুঝায়। এক কথায় রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখের ইছালে সওয়াবের মাহফিলকে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ বলে। ফার্সি ভাষার প্রভাবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান, বৃহৎ রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, ইরাক প্রভৃতি স্থানে ‘ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহম’ অর্থাৎ এগারো-এর ফাতিহা নামে উদ্যাপিত হয়। এই দিনটি উৎযাপন করা যে বিদআতে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারন ইসলামে কোন জন্ম মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হারাম কাজ। 

আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) হলেন  ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ত্ব। তিনি ইসলামের অন্যতম প্রচারক হিসাবে সুবিদিত। আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) কে ‘বড়পীর’ হিসাবে মুসলিম বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তিনি ০১ রমজান ৪৭১ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদ নগরের অন্তর্গত জিলান শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। জিলানের অধিবাসি হিসাবে তিনি জিলানী নামে নামে পরিচিতি লাভ করে। তাকে সম্মান প্রদানের জন্য আবু মোহাম্মাদ মুহিউদ্দিন নামে উপাধি প্রদান করা হয়। তার পিতার নাম আবু সালেহ মুছা জঙ্গী এবং মাতার নাম উম্মুল খায়ের ফাতেমা। জীবনি লেখকদের মতে তার মাতা হাসান ইবনে আলী (রা.) এর বংশধর।

ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহাম উপলক্ষে বিদআতি কার্যক্রম

১. বিশেষ ধর্মীয় সভার আয়োজন

দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতে বিশেষ মাহফিল বা ওরশ-এর আয়োজন করা হয়। এই মাহফিলে আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়, তবে এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে দিনটিকে একটি উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশেষত মাজারে (তাঁর কবরের কাছে) অনুসারীরা ভিড় করে। অনেকে কবরের চারপাশ তাওয়াফ করে, কবরে সিজদা করে বা কবরে ফুলের চাদর দেয়—যা স্পষ্টতই শিরক-এর অন্তর্ভুক্ত।

২. বিশেষ খাদ্য ও পানীয় বিতরণ

এই দিনে ব্যাপকভাবে শিরনি (মিষ্টান্ন), তাবারুক (খাবার) তৈরি করা ও বিতরণ করা হয়। এই বিশেষ খাবারকে কেন্দ্র করে একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় যে, এই দিনে এই কাজটি করতেই হবে। এটি ঈদ বা অন্য কোনো সুন্নাহসম্মত দিনে খাবার বিতরণের মতো স্বাভাবিক দান নয়, বরং একটি বিদআতি প্রথার অংশ। অনেক অঞ্চলে ফাতিহা-ই-ইয়াজদাহামের সাথে নির্দিষ্ট কিছু খাবার বা রেসিপি জড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিবসের জন্য নির্ধারিত নয়।

৩. আলোকসজ্জা ও অলংকরণ

ওরশ বা মাহফিলের স্থান, মাজার এবং কখনো কখনো ঘরবাড়িও আলোকসজ্জা করা হয়। এই ধরনের আলোকসজ্জা উৎসবের আমেজ তৈরি করে, যা শুধুমাত্র ইসলামে অনুমোদিত দুটি ঈদ বা সুন্নাহসম্মত উপলক্ষে (যেমন: বিবাহ) করা যেতে পারে। পীর বা বুজুর্গের সম্মানার্থে বিভিন্ন ধরনের রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন, এবং ঝালর দিয়ে স্থানটিকে সাজানো হয়, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংশ নয়।

৪. সাওয়াবের ভুল ধারণা

‘ইছালে সওয়াব’ (সওয়াব পৌঁছানো) করার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করা হয়। যদিও এককভাবে কারো জন্য দোয়া করা বৈধ, কিন্তু এই দিনটিতে বাধ্যতামূলকভাবে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সওয়াব পৌঁছানোর প্রথা প্রতিষ্ঠা করা বিদআত। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ সওয়াব অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু পুস্তক বা প্রবন্ধ পাঠ করা হয়, যা রাসূল (ﷺ) বা সাহাবীদের (রা.) যুগে প্রচলিত ছিল না।

উপসংহার : আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন মহান বুজুর্গ ও আলিম ছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন করা বা কোনো বিশেষ ধর্মীয় উৎসব পালন করা ইসলামে অনুমোদিত নয়। যেহেতু ইসলামে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হারাম (যেহেতু এর কোনো ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহতে নেই), তাই এর সাথে যুক্ত হওয়া সকল আনুষ্ঠানিকতাই বিদআত বা শিরক-এর পর্যায়ে পড়ে। মুসলিমদের উচিত, কোনো ব্যক্তি বা দিবসের প্রতি সম্মান জানাতে গিয়ে শরীয়ত বিরোধী কা

৬. পীরের মাজারে উরশ উৎযাপন

১. উরশ কোন ভাষার শব্দ?

উরশ (ﻋُﺮﺱ) একটি আরবি শব্দ।  উরশ শব্দের আভিধানিক অর্থ বিবাহ বা বিবাহ অনুষ্ঠান, বাসর রাত বা বর ও কনের প্রথম মিলন, ওয়ালীমা বা প্রীতিভোজ। এককভাবে উরুশ (ﻋَﺮُﻭﺱ) শব্দ দ্বারা বর ও কনে উভয়কেই বোঝানো হয়।

২. উরশ শব্দের প্রচলিত পরিভাষা

সাধারণ মুসলিম সমাজে এবং বিশেষ করে সুফিবাদের অনুসারীদের মধ্যে ‘উরশ’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত করে। সুফি সাধকগণ তাদের পীর বা বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী বা ওফাত দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বার্ষিক অনুষ্ঠান বা মাহফিলকে পারিভাষিক অর্থে ‘উরশ’ বলা হয়।

উরশের মূল আভিধানিক অর্থ (বিবাহ বা মিলন) থেকে ধারণা নেওয়া হয়েছে। সুফি মতবাদে বিশ্বাস করা হয় যে, একজন নেককার বুজুর্গ ব্যক্তির মৃত্যু তাঁর প্রিয়তমের (আল্লাহর) সাথে মহামিলন বা মিলন রাত্রি। তাই তাঁদের মৃত্যুদিবসকে ‘ইয়াওমুল উরস’ (মিলনের দিন) বা সংক্ষেপে ‘উরশ’ নামে অভিহিত করা হয়।

৩. উরশ উপলক্ষ ভক্তগন যে সকর কাজ করে থাকে

১. মাজারে তাওয়াকরে, কোন কোন ক্ষেত্র সিজদা করে

২. নারী পুরুষ একত্র মিলিত হয়ে হু হু হু জিকির করে

৩. মাজারের মানত কালেকশন করে

৪. মানতকৃত গরু, মহিষ, ছাগর জবেন কবে।

৫. ভক্তদের জন্য খাবার বিতরণ করে

৬. রাতে গাজা বা নেষার আশর বসে।

৭. মাযারকে ঘিরে বাতি প্রজ্বলন করে ও চাদর চড়ায়।

৮. কবর পাকা করে, কবরের উপর গম্বুজ নির্মান করে।

৪. এ কাজগুলো জঘন্য পাপাচার কেন?

পীরের মাজারে ‘উরশ’ উদযাপনকে কেন্দ্র করে ভক্তরা যে কার্যকলাপগুলো করে, তার সাথে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার ন্যূনতম সম্পর্কও পরিলক্ষিত হয় না; বরং এই কার্যকলাপগুলো ইসলামের নীতির (তাওহীদ) সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং ঘোর বিদআত (ধর্মীয় নব-উদ্ভাবন) ও শিরক-এর শামিল। উরশের নামে ভক্তদের কার্যকলাপের প্রতিটি ধাপই শরীয়তের সীমালঙ্ঘন করে।

মাজারে তাওয়াফ করা এবং কিছু ক্ষেত্রে সিজদা করা স্পষ্টত শিরক, যা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট ইবাদতকে সৃষ্টির প্রতি নিবেদন করে। এই ধরনের কাজ ইসলাম থেকে ব্যক্তিকে বের করে দেয়। একইভাবে, কবর পাকা করা এবং সেগুলোর উপর গম্বুজ বা স্থাপত্য নির্মাণ করা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ; এর উদ্দেশ্য হলো কবরের প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শন করে এটিকে পূজা বা উৎসবের কেন্দ্রে পরিণত করা। উরশ উপলক্ষে মানত (নযর) কালেকশন করা এবং সেই মানতকৃত পশু যবেহ করাও শিরক, কারণ মানত একটি ইবাদত যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে করা হারাম। এছাড়া, মাজার প্রাঙ্গণে নারী-পুরুষের একত্র মিলিত হয়ে ‘হু হু হু’ ধ্বনিতে জিকির করা, যা কথিত আধ্যাত্মিকতার নামে ব্যভিচার ও ফিতনার পথ উন্মুক্ত করে এবং ইসলামের পর্দার বিধান লঙ্ঘন করে। রাতের আঁধারে গাজা বা নেশার আসর বসানো গুরুতর নৈতিক অপরাধ ও হারাম কাজ, যা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে চরম পাপাচারকে প্রশ্রয় দেয়। সর্বশেষে, মাযারকে ঘিরে বাতি প্রজ্বলন ও চাদর চড়ানোর প্রথাটি হলো কুসংস্কার ও অপচয়, যা অগ্নি উপাসকদের রীতির অনুকরণ এবং মুসলিমদের ধন-সম্পদ নষ্ট করার নামান্তর। সামগ্রিকভাবে, উরশ উদযাপনের এই আটটি কাজই ইসলামের মৌলিক আকিদা ও নৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়।

পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ

আধুনিক মিডিয়ার প্রচারের কারনে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই দিন উপলক্ষে বাঙ্গালীরা নতুন জামাকাপড় পড়ে রাস্তায় বাহির হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হলেও নিম্মের অনুষ্ঠানগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন-

১. ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণঃ

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়।

২. নববর্ষ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের সকালে একটি শোভাযাত্রা বের করে। এই শোভাযাত্রাটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়।

৩. নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীদের হালখাতাঃ

বছরের প্রথম দিন বা নববর্ষে বাংলার ব্যবসায়ীগণ তাদের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে এদিন হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এই হালখাতার দিন খদ্দেরগণও চেষ্টা করে কিছু বাকি টাকা পরিশোধের। উপলক্ষে  ব্যবসায়ীরা তাদের খদ্দেরদের মিস্টিমুখ করান।

৪. হিন্দুদের বা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুজাঃ

পহেলা বৈশাখের সকালে সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু ধর্মের দোকানী ও ব্যবসায়ীরা পুজা দান করেন। হিন্দুদের দাবী  করে থাকে যে লক্ষী হলো, বিত্তের দেবী। তাই তারা পহেলা বৈশাখের নববর্ষে  লক্ষ্মীর পূজা করে থাকেন। তারা এই দিন লক্ষীর নিকট দাবি করে যে, তাদের সারা বছর যেন ব্যবসা ভাল যায়।

নববর্ষ উপলক্ষে গ্রাম অঞ্চলে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা

গ্রাম অঞ্চলের লোকেরা খোলা মাঠে বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন থাকে। নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন করে থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তির। এমন কোন জেলা নাই যেখানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মেলার আয়োজন করা হয়না।

ববর্ষের সাথে ইসলামের বিরোধ কোথায়?

১. সব অনষ্ঠানই সরাসরি সনাতন ধর্মের আদলে করাঃ

আধুনিক নববর্ষের প্রধান আকর্ষন হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণিল শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় বাঘ, হাতি, কুমির পেঁচাসহ বহু জীবজন্তুর মূর্তি বা প্রতিকৃতি প্রদর্ষণ করা হয়।  এই শোভাযাত্রার প্রচলন কারীগণ দাবি করে থাকে, এই জীবজন্তুর মূর্তি মাধ্যমে মানুষের মঙ্গল কামনা করা হয়। এই জন্য তারা এর নাম দিয়েছেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমাদের প্রতিবেশী হিন্দুভাইদেরও দেখি নিজেদের মঙ্গল কামন করে তারা গাছ, পাথর, সাপ, সিংহ, মহিষ, ময়ুর, গাভী, নদীর পুঁজা করে থাকে।

২. ইসলাম বিরোধী আকিদা ধারণ করে

নববর্ষ উপলক্ষে প্রচার কর হয় যে, নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক, নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি। এই ধরনের কোন তত্ত্ব কথায় সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। এই কথা বিশ্বাস করলে ইসলাম বিরোধী আকিদা হিসাবে চিহৃত হবে।

ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস আমাদের সকল প্রকার শুভ অশুভের মালিক এক মাত্র মহান আল্লাহ। কিন্তু নববর্ষে

প্রচার করে থাকে এ বছর মা দূর্গা গজে বা হাতিতে চড়ে এসছেন তাই এ বছর ফসল ভাল হবে। তাছাড়া    নববর্ষকে আহবান করা হয় এই বলে যে, “এসো হে বৈশাখ”। এই ধরনের কোন আপেক্ষিত বন্তুকে আহবান করা নিষেধ।৷ কারন এর দ্বারা মাখলুকের নিকট কল্যাণ কামনা করা হয়৷ অথচ কল্যানের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’লা।

مَّا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللّهِ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ

আপনার যে কল্যাণ হয়, তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আর আপনার যে অকল্যাণ হয়, সেটা হয় আপনার নিজের কারণে। সুরা নিসা : ৭৯

 ৩. গান বাজনা মাধ্যমে নববর্ষ উদযাপন করা

নববর্ষে ঢাক ঢোল পিটিয়ে, নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রায় অংশ গ্রহন করা হয়। প্রথম কর্মসুচি হলো, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানায়। শত শত নারী পুরুষ এই অনুষ্ঠানে যোগদান করে। এখান থেকে একাধারে দুপুর পর্যান্ত নানা ধরনের গান গাওয়া হয়। অথচ ইসলামি শরীয়তে এই ধরনের গান বাজনা হারাম করা হয়েছে।

৪. নবর্ষের মাধ্যামে বিজাতির অনুসরণ করা হয়

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন,এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪

এই হাদিসের ব্যাখ্যায় অধিকাংশ হাদিস বিশারত লিখেছেন, মদীনাবাসী যে দুটি দিবস উদযাপন করত তা ছিল তাদের নববর্ষ। হাদিসের আলোকে বুঝা যায়, নববর্ষের বিকল্প হিসাবে আল্লাহ আমাদের দুটি উত্তম দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অথচ আমরা আল্লাহ প্রদত্ত দিবস বাদ দিয়ে মনগড়া দিবস পালন করছি। ইদানিং পহেলা বৈশাখ উদযাপনকে দুই ঈদের বিকল্প হিসাবে দাঁড় করানো হয়।

৫. নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশাঃ

শয়তানের হাতিয়ার হল নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। এই কাজটি সে আনজান দিয়ে থাকে নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশার মাধ্যমে। নববর্ষ মানে আনন্দ। এই আনন্দ হলো, সর্বস্থরের নারী পুরুষ একত্র হয়ে নগ্নতা, অশ্লিলত, বেহায়া পনার মাধ্যমে নিজকে প্রদর্শণ করান। নারী, পুরুষের অবাধ মেলামেশা আমাদের সমাজে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, মনে করা হয় এই বেপর্দা, বেহায়াপনা,  অশ্লীলতা, আমাদের দেশীয় আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অংশ। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অনেক ভাল দিক আছে। সামাজিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্য, জনকল্যাণ, মানবপ্রেম ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখের বিষয হলো, এসব বাদ দিয়ে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির নামে যুবক যুবতীদেরকে অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার সুযোগ করে দিয়ে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাচ্ছি। আমরা এক বারের জন্যও চিন্তা করি না যে এই নববর্ষ উপলক্ষ্যে এক বারের জন্যও যদি আমাদের কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা অশ্লীলতায় মাঝে নিপতিত হয়, তবে তাদের আর বের করা সম্ভব হবে না। তারা ক্রমান্বয়ে আরো বেশি পাপ ও অপরাধের মধ্যে নিপতিত হতে থাকবে।

মনে রাখবেন ব্যভিচার করা হয় শুধু বিশেষ অংগের দ্বারা। বাস্তবতা হলো, ব্যভিচার হতে পারে বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা। আমাদের ইসলামি শরীয়তে এ সম্পর্কে সুষ্পষ্ট বিধান রয়েছে। পাপাচারের প্রথার উৎস হলো, নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা। এই জন্য বিষয়টি খুবই ইসালাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَقَرْنَ فِى بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ ٱلْجَٰهِلِيَّةِ ٱلْأُولَىٰۖ وَ

আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। সুরা আহজাব : ৩৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِىُّ قُل لِّأَزْوَٰجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَآءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَٰبِيبِهِنَّۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا

হে নাবী! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মু’মিনা নারীদেরকে বলঃ তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবেনা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আহজাব : ৫৯

৬. সময় ও অর্থ অপচয়কারীঃ

নববর্ষ উপলক্ষে যে কোন সময় ওঅর্থ অপচয় করা সঠিক কাজ হবে না।  এই দিবস উদযাপনের জন্য প্রধানত চারটি স্থান সময় ওঅর্থ অপচয় করে থাকে।

ক. খাবারের পেছনে

খ. পোশাকের পেছনে

গ. বিভিন্ন অনিষ্ঠান আয়োজনের পেছনে

ঘ. শোভাযাত্রার আয়োজনের পেছনে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

يَٰبَنِىٓ ءَادَمَ خُذُوا۟ زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا۟ وَٱشْرَبُوا۟ وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

হে আদাম সন্তান! প্রত্যেক সলাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ কর, আর খাও, পান কর কিন্তু অপচয় করো না, অবশ্যই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। সুরা আরাফ : ৩১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১

৭. মুখোস এবং উল্কি আঁকা একটি ইসলামি বিরোধী সংস্কৃতিঃ

নববর্ষ উপলক্ষে হাজার হাজার যুবগ যুবতী তাদের গালে, কপালে, হাতে উল্কি আঁকাছে। তারা এ সব খুবই মজা করে আকঁছে। কিন্তু এই কাজ যে ইসলামি বিরোধী তারা হয়তো তা জানে না। মানুষের শরীরে উল্কি আঁকা হাদিসে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। নিম্মে এ সম্পর্কে কয়েকটি সহিহ হাদিস বর্ণনা করা হল-

আওন ইবনু আবূ জুহাইফাহ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি-

إِنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنْ ثَمَنِ الدَّمِ، وَثَمَنِ الْكَلْبِ، وَآكِلِ الرِّبَا وَمُوكِلِهِ، وَالْوَاشِمَةِ وَالْمُسْتَوْشِمَةِ‏.‏

নবী রক্তের মূল্য ও কুকুরের মূল্য নিতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি সুদ গ্রহীতা, সুদ দাতা, উল্কি অঙ্কনকারী উল্কি গ্রহণকারী নারীদের উপর লানত করেছেন। সহিহ বুখারি : ৫৯৪৫

 মুসলিমদের অনৈতিক বিনোদন : দ্বিতীয় কিস্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

শেষ রমজানের দিন রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা

শেষ রমজানের দিন মানুষ ঈদের আহব শুনতে পায়। ঈদের জন্য তাদর যেন আর দেরী সইছে না। তাই ঈদের চাঁদ দেখার সাথে সাতের রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা শুরু করে দেয়। ইহা কোন অবস্থায় মুসলিমদের সংস্কৃতি নয়। রমজানের শেষ রাতে আতশবাজি, গান-বাজনা বা রাতভর আড্ডা আয়োজন করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু হারামই নয়, এটি পবিত্র মাসের মাহাত্ম্য এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। এই ধরনের কাজ কুরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট নির্দেশের লঙ্ঘন।

১. আতশবাজি ও অপচয়

রমজানের শেষ রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লাইলাতুল কদর ও ইতিকাফের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। এই সময়ে আতশবাজি ফোটানো বা এ ধরনের অপচয়মূলক কাজ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

 وَلَا تُسْرِفُوٓا۟ۚ إِنَّهُۥ لَا يُحِبُّ ٱلْمُسْرِفِينَ

অপচয় করো না, নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। সুরা আনাম : ১৪১

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

إِنَّ ٱلْمُبَذِّرِينَ كَانُوٓا۟ إِخْوَٰنَ ٱلشَّيَٰطِينِۖ وَكَانَ ٱلشَّيْطَٰنُ لِرَبِّهِۦ كَفُورًا

অপব্যয়কারীরা শয়তানদের ভাই। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।  সুরা বনীইরাঈল : ২৭

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-

وَٱلَّذِينَ إِذَآ أَنفَقُوا۟ لَمْ يُسْرِفُوا۟ وَلَمْ يَقْتُرُوا۟ وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا

আর যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, আর কৃপণতাও করে না। এ দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা গ্রহণ করে। সুরা ফুরকান ২৫:৬৭

আতশবাজি বাজি ফোটানো সম্পদের অপচয় এবং একই সাথে পরিবেশ দূষণ ও জনগণের কষ্টের কারণ। তাছাড়া আতশবাজির বিকট শব্দ মুসল্লিদের ইবাদত এবং সাধারণ মানুষের ঘুম ও শান্তি নষ্ট করে, যা ইসলামে অন্যের ক্ষতি করাকে হারাম ঘোষণা করেছে।

২. গান-বাজনা ও অনর্থক কাজ

রমজানের শেষ রাতগুলোতে গান-বাজনা বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন করা শরীয়তে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

৩. রাতভর আড্ডা ও ইবাদত থেকে গাফেলতি

রমজানের শেষ রাতে বিনোদনের নামে এসব হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহকে অবজ্ঞা করা এবং বরকতময় রাতকে নষ্ট করার শামিল।

সাঈদ ইবন আওস আল-আনসারী তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী ﷺ বলেছেন, “যখন ঈদুল ফিতরের দিন হয়, তখন ফেরেশতাগণ রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে, ‘হে মুসলিমগণ! তোমরা তোমাদের পরম দয়ালু প্রতিপালকের দিকে যাও, যিনি প্রচুর পুরস্কার দান করেন এবং মহাপাপ ক্ষমা করেন।’ যখন তারা ঈদগাহে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার ফেরেশতারা! আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি আমার বান্দাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তারা রোযা রেখেছে, সালাত কায়েম করেছে, তাই আজ তোমরা ফিরে যাও, তোমাদের সব পাপ ক্ষমা করা হলো, এবং তাদের পাপগুলোকে সওয়াবে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সাহীহাহ : ১৮৮১, শুয়াবুল ঈমান : ৩৬৪৮,

তাই এ রাতে প্রতিটি মুসলিমের চিন্তা করা উচিত আমি কি মহান আল্লাহ ক্ষমার তালিকায় আছি।

৯. বিবাহ বা আকিকায় গান-নাচ ও বেপর্দা অনুষ্ঠান করা

বিবাহ বা আকিকার অনুষ্ঠানে গান, নাচ, ড্যান্স পার্টি এবং বেপর্দা আয়োজন করা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। এই ধরনের কার্যকলাপ ইসলামের মৌলিক নৈতিকতা, শালীনতা এবং শরীয়তের বিধানের সরাসরি লঙ্ঘন। কুরআন ও হাদিস মুসলিমদেরকে এসব অননুমোদিত বিনোদন থেকে দূরে থাকতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে।

১. অশ্লীল গান, নাচ ও ড্যান্স পার্টির বিধান

গান-বাজনা, বিশেষ করে অশ্লীল কথা ও বাদ্যযন্ত্রের সাথে নাচ ও ড্যান্স পার্টির আয়োজন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

২. বেপর্দা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা

এই ধরনের অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা এবং অঙ্গভঙ্গি সহকারে নাচ-গানের আয়োজন ইসলামের কঠোর পর্দার বিধানের পরিপন্থী। এ সম্পর্কেও পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।  

অতএব, মুসলিমদের উচিত বিবাহ ও আকিকার মতো পবিত্র ও বরকতময় অনুষ্ঠানগুলো কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে শালীনভাবে পালন করা এবং সকল প্রকার হারাম কার্যকলাপ, যেমন গান, নাচ ও বেপর্দা থেকে দূরে থাকা।

১১. মৃত্যু পরবর্তী কুলখানি, চল্লিশা ও বছর পূর্তির উত্জাপন করা

মৃত্যুর পর শোকাহত পরিবার কর্তৃক মৃত ব্যক্তির জন্য কুলখানি, চল্লিশা, বা বছর পূর্তির মতো বিশেষ উপলক্ষে সম্মিলিত ভোজ ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম। এই প্রথাগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজে গভীরভাবে প্রচলিত হলেও, কুরআন ও সহীহ হাদিসে এর কোনো ভিত্তি নেই। বরং এগুলো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বিদআত (ধর্মীয় নব-উদ্ভাবন) এবং ক্ষেত্রবিশেষে জাহেলিয়াতের রীতির অন্তর্ভুক্ত।

১. এ কাজ বিদআত ও সীমালঙ্ঘন:

কুলখানি, চল্লিশা ও বছর পূর্তির মূল সমস্যা হলো, এটিকে সওয়াবের কাজ বা মৃত ব্যক্তির মুক্তির উপায় মনে করা। অথচ ইবাদত বা সওয়াবের কাজ হতে হলে তার নির্দিষ্ট পদ্ধতি, সময় ও কারণ অবশ্যই আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।

রাসূল (ﷺ), সাহাবায়ে কিরাম (রা.) বা তাবেঈনদের যুগে মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট দিনে (তৃতীয় দিন, চল্লিশতম দিন বা বছর পূর্তিতে) সম্মিলিতভাবে কোরআন খতম বা ভোজের আয়োজন করে সওয়াব পৌঁছানোর কোনো প্রমাণ নেই। এটি একটি আবিষ্কৃত রীতি, যা স্পষ্টত বিদআতের শামিল।

আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত।

সহিহ বুখারি : ২৬৯৭, সহিহ মুসলিম : ১৭১৮, আহমাদ : ২৬০৯২

ইসলামে মৃত্যুতে শোক প্রকাশের সর্বোচ্চ সীমা হলো তিন দিন। এর বেশি আনুষ্ঠানিক শোক পালন করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। চল্লিশা বা বছর পূর্তির আয়োজন এই শোকের সীমা লঙ্ঘন করে এবং দুঃখকে দীর্ঘায়িত করে।

২. সম্মিলিত ভোজের আয়োজন সুন্নাহ বিরোধী কাজ

মৃতের পরিবার কর্তৃক ভোজের আয়োজন করা শরীয়তে বৈধ নয়, বরং এটি জাহেলী যুগের প্রথা হিসেবে চিহ্নিত। এই উপলক্ষে ব্যাপক লোক সমাগম করে খাবারের আয়োজন করা মূলত মৃতের পরিবারকে অতিরিক্ত আর্থিক ও মানসিক চাপে ফেলে দেয়। রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ হলো, প্রতিবেশীরা বা আত্মীয়-স্বজনরা শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার রান্না করে পাঠাবে, যেন তারা খাবারের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে শোক পালন ও ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারে। এ কাজ সরাসরি হাদিসের বিরোধিতা।

জারীর ইবনু ’আবদুল্লাহ্ আল-বাজালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মৃতের বাড়িতে ভীড় জমানো ও খাদ্য প্রস্তুত করা বিলাপের অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম। সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬১২

 এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মৃত ব্যক্তির জন্য ভোজের আয়োজন করা সাহাবাদের কাছে নিন্দনীয় ছিল।

উপসংহারে : কুলখানি, চল্লিশা বা বছর পূর্তির মতো অনুষ্ঠানগুলো মৃত ব্যক্তিকে কোনো উপকার করে না, বরং জীবিতদের উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ইবাদতের নামে বিদআতে লিপ্ত করে। মুসলিমদের কর্তব্য হলো, এসব হারাম প্রথা সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপন করা।

অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত অনুকরণে বিনোদন

১. অমুসলিমদের অনুসরণে দিবস ও বছর পালন

২. অমুসলিম সংস্কৃতির পোশাক ও স্টাইল অনুকরণ

৩. সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ

৪. সিনেমা, নাটক ও বিনোদন মাধ্যমের অনুকরণ

৫. খেলাধুলায় অমুসলিম অনুকরণ

৬. পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদন

৭. অবিশ্বাসীদের উৎসব উদযাপন

ইসলামী বিনোদনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, এটি অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত বিশেষ চিহ্নের অনুকরণ (তাশাব্বুহ) করবে না। এই অনুকরণ বলতে এমন কোনো পোশাক, আচার-আচরণ, উৎসব বা প্রতীক ব্যবহার করা বোঝায় যা বিশেষভাবে কোনো অমুসলিম ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।

উদাহরণস্বরূপ, অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবের সাথে সম্পর্কিত কোনো বিশেষ ধরনের খেলা বা অনুষ্ঠান আয়োজন করা বা তাদের ধর্মীয় পোশাক পরিধান করা ইসলামী বিনোদনে বৈধ নয়। একজন মুসলিমের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র পরিচয় এবং জীবনধারা রয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক নীতি ও মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিনোদনের মাধ্যমে সেই স্বতন্ত্রতাকে বিসর্জন দেওয়া বা অন্য সংস্কৃতিতে বিলীন হওয়ার প্রবণতা তৈরি করা উচিত নয়। তবে, সাধারণ মানবীয় সংস্কৃতি বা যা সকল জাতির মধ্যে প্রচলিত এবং যা শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেই ধরনের সুস্থ বিনোদন গ্রহণে কোনো বাধা নেই। এই নীতিটি মুসলিমদের তাদের আত্ম-পরিচয় ও ধর্মীয় সীমানার প্রতি সচেতন থাকতে সাহায্য করে।

মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র পথ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন_

وَلَنۡ تَرۡضٰی عَنۡکَ الۡیَہُوۡدُ وَلَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَہُمۡ 

আর ইয়াহূদী ও নাসারারা কখনো তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের মিল্লাতের অনুসরণ কর। সূরা বাকারা : ১২০

এই আয়াত মুসলিমদের সতর্ক করছে যেন তারা অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিক ধারা অনুসরণ না করে। তাদের সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাদের আচার-আচরণ বা উৎসব অনুকরণ করা ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ।

মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡہُ ۚ وَہُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ

আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সূরা আল ইমরান : ৮৫

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ইসলামের বিকল্প কোনো জীবনধারা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিনোদন বা সংস্কৃতিতেও মুসলিমকে ইসলাম-সম্মত নীতি বজায় রাখতে হবে।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে- দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে।

ইবনু ’উমার (রাঃ) যখন হাজ্জ বা ’উমরাহ করতেন, তখন তিনি তাঁর দাড়ি মুষ্টি করে ধরতেন এবং মুষ্টির বাইরে যতটুকু বেশি থাকত, তা কেটে ফেলতেন। সহিহ মুসলিম : ৫৮৯২, ৫৮৯৩, সহিহ মুসলিম : ২৫৯, আহমাদ : ৪৬৫৪

রাসূল ﷺ দাড়ি রাখার এবং গোঁফ ছাঁটার নির্দেশ দিয়েছিলেন এই বলে, “মুশরিকদের বিপরীত হও।”

অর্থাৎ, ইসলাম মুসলিমদের জন্য একটি আলাদা, স্বতন্ত্র চেহারা ও সংস্কৃতি বজায় রাখতে চায়।

অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণ থেকে বারণ :

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাহবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’ দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’ দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪, সুনানে নাসায়ি : ১৫৫৫

রাসূল ﷺ নিজে অমুসলিমদের উৎসব বা বিনোদনকে বাতিল করে মুসলিমদের জন্য ইসলামসম্মত বিকল্প নির্ধারণ করেছেন। তাই বিনোদনের ক্ষেত্রেও মুসলিমের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে।

অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত যে অনুকরণ করছে, তার কিছু উদারহন তুলে ধরছি। যেমন-

আজকের যুগে মুসলিম সমাজের বহু অংশ বিনোদনের নামে অমুসলিমদের ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত বিশেষ চিহ্ন ও রীতির অনুকরণ করছে— যা ইসলামী পরিচয়ের জন্য গুরুতর হুমকি। নিচে কিছু বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা হলো, যাতে এই তাশাব্বুহ (অমুসলিম অনুকরণ) স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

১. অমুসলিমদের অনুসরণে দিবস ও বছর পালন

প্রথমেই বলি, অমুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক “বিশেষ দিন” বা “বছর” অনুকরণে মুসলিম সমাজের বিনোদনমূলক প্রবণতা বর্তমানে ব্যাপক। ইসলাম মুসলিমদের নিজস্ব উৎসব ও পরিচয় নির্ধারণ করেছে। তাদের প্রদান উত্সব হলো, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও জুমার দিন। এর বাইরে অন্য কোনো “ধর্মীয় আনন্দ দিবস” ইসলাম স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম সমাজে অমুসলিমদের বিশেষ দিন ও বছর উদযাপন ক্রমে বিনোদনের অংশ হয়ে উঠছে। নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো-

ক. ক্রিসমাস ডে (২৫ ডিসেম্বর)

ক্রিসমাস ডে বা বড়দিন হলো খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। তারা এই দিনটিকে নবী ঈসা (আ.)-এর জন্মদিন হিসেবে পালন করেন। তবে খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসের মূল নীতি অনুসারে, এটি “ঈশ্বরের পুত্র” (গডের পুত্র) ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, যা ইসলামের মূল বিশ্বাস অর্থাৎ তাওহীদ (একত্ববাদ) এর সম্পূর্ণ বিরোধী।

দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা এবং প্রতিষ্ঠানেও এই উৎসবের বিভিন্ন অংশ বিনোদন হিসেবে ঢুকে পড়েছে। অনেকে ক্রিসমাস ট্রি সাজান, শিশুরা সান্তা ক্লজের পোশাক পরে, এবং উপহার বিনিময়ের (গিফট এক্সচেঞ্জ) আয়োজন করেন। অফিস, স্কুল বা বিভিন্ন সামাজিক আড্ডায় “ক্রিসমাস পার্টি”র আয়োজন করা হয়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই ধরনের কাজকে “তাশাব্বুহ বিল-কুফফার” (অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন) হিসেবে দেখা হয়। তাদের একটি অংশের মতে, একটি ভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় উৎসবকে এভাবে পালন বা অনুকরণ করা মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়।

ইবনু উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪০৩১, আহমাদ : ৫১০৪

খ. ভ্যালেন্টাইন ডে (১৪ ফেব্রুয়ারি)

ভ্যালেন্টাইন ডে বা তথাকথিত “প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা দিবস” মূলত খ্রিস্টান পুরোহিত “সেন্ট ভ্যালেন্টাইন”-এর নামে উদযাপিত একটি পৌত্তলিক ঐতিহ্যের অংশ। এই দিনটি আজ মুসলিম সমাজে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিনোদনের এক জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই উপলক্ষে নানা ধরনের আয়োজন দেখা যায়, যেমন- “লাল গোলাপ দিবস,” “লাভ কনসার্ট” এবং “কাপল নাইট”।

এটি কেবল অমুসলিমদের উৎসবের অনুকরণই নয়, বরং এর মাধ্যমে সমাজে অশ্লীলতা, অবৈধ সম্পর্ক এবং নৈতিক বিশৃঙ্খলা বা ফিতনার জন্ম হচ্ছে বলে কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়। এই উৎসব তরুণ-তরুণীদেরকে ইসলামী বিবাহের পবিত্র বন্ধনের বাইরে গিয়ে অবাধ সম্পর্কের দিকে উৎসাহিত করে, যা ইসলামী নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য চরম ক্ষতিকর।

গ. হ্যালোইন উৎসব (৩১ অক্টোবর)

হ্যালোইন উৎসবের মূল শিকড় হলো কেল্টিক পৌত্তলিকদের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য, যেখানে মৃত আত্মাদের ভয় দেখানো বা তাদের তাড়ানোর জন্য এই উৎসব পালন করা হতো। পরে এটি খ্রিস্টান সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আজকাল মুসলিম সমাজেও এই উৎসব বিনোদনের নামে ঢুকে পড়েছে। মুখোশ পরে “হরর পার্টি” আয়োজন করা হচ্ছে। শিশুরা “ট্রিক অর ট্রিট” খেলায় অংশ নিচ্ছে এবং অনেক স্কুল বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে হ্যালোইন সাজসজ্জা প্রতিযোগিতা বা ইভেন্ট দেখা যায়।

একটি পৌত্তলিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঐতিহ্যকে বিনোদনের নামে অনুসরণ করা মুসলিমদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য অমর্যাদাকর। এই ধরনের “ভৌতিক” সাজসজ্জা এবং আচার-আচরণ গ্রহণ করাকে “তাশাব্বুহ” বা অমুসলিমদের অনুকরণ হিসেবে দেখা হয়, যা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে বেমানান। এটি শিরক ও কুফরী বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত উৎসব; তাই মুসলিমদের জন্য এতে অংশ নেওয়া বা অনুকরণ করা হারাম।

ঘ. নিউ ইয়ার পার্টি (৩১ ডিসেম্বর রাত)

৩১শে ডিসেম্বর রাতে যে “নিউ ইয়ার পার্টি” উদযাপন করা হয়, তা গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনোদনমূলক উৎসব। এটি এখন মুসলিমদের মধ্যেও সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদনের একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই রাতে ব্যাপক আতশবাজি, আলোকসজ্জা, ডান্স পার্টি, কাউন্টডাউন অনুষ্ঠান, মদ্যপান ও গান-বাজনার আসর ইত্যাদি আয়োজন করা হয়।

ইসলামী পন্ডিতদের মতে এটিকে অমুসলিমদের উৎসব হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন যে এই উপলক্ষে বিশেষ বিনোদনে অংশ নেওয়া তাদের সংস্কৃতির অনুকরণ। এছাড়া, এই রাতের আয়োজনগুলিতে প্রায়শই মদ্যপান, অশ্লীল নাচ-গান এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা দেখা যায়, যা ইসলামী নৈতিকতা ও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে। এই ধরনের “আনন্দের দিন” উদযাপন করাকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে সরে যাওয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

قُلۡ یٰۤاَہۡلَ الۡکِتٰبِ لَا تَغۡلُوۡا فِیۡ دِیۡنِکُمۡ غَیۡرَ الۡحَقِّ وَلَا تَتَّبِعُوۡۤا اَہۡوَآءَ قَوۡمٍ قَدۡ ضَلُّوۡا مِنۡ قَبۡلُ وَاَضَلُّوۡا کَثِیۡرًا وَّضَلُّوۡا عَنۡ سَوَآءِ السَّبِیۡلِ 

বল, ‘হে কিতাবীরা, সত্য ছাড়া তোমরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না এবং এমন কওমের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে, আর অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সোজা পথ বিচ্যুত হয়েছে। সূরা মায়িদা : ৭৭

ঙ. মাদার্স-ডে, ফাদার্স-ডে ,উইমেনস-ডে ইত্যাদি

এসব দিন পশ্চিমা সমাজে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে বা মানবিক মূল্যবোধ প্রচারের নামে চালু হয়েছে। আজ মুসলিম সমাজেও তা বিনোদন ও সামাজিক প্রচারণার অংশ হয়ে গেছে।

ইসলামে পিতা-মাতা বা নারীকে সম্মান করা কোনো একদিনের দায়িত্ব নয়, বরং আজীবন ইবাদতস্বরূপ দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا

আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। সূরা ইসরা : ২৩

অতএব, একদিনের নামে বাকি সময় অবহেলা করা ইসলামী চেতনার পরিপন্থী।

চ. বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ, হোলি ইত্যাদি

অনেক মুসলিম সমাজে বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ (নববর্ষ) এবং হোলির মতো অনুষ্ঠানগুলো, যা মূলত হিন্দু ধর্মীয় বা সংস্কৃতিগত ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, সেগুলোকে “সংস্কৃতি” বা “বিনোদন” হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মুসলিম সমাজের কিছু মানুষ রঙ খেলা, বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান ও নাচসহ এই উৎসবগুলিতে অংশ নেয়। এই দিনগুলোতে কিছু মুসলিম নারী রঙিন, হালকা বা অশালীন পোশাক পরেন এবং নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ মেলামেশা বা নাচ-গানে অংশ নেন।

ইসলামী আলেমদের মতে এই ধরনের উৎসব উদযাপনকে ধর্মীয় সীমালঙ্ঘন এবং অমুসলিমদের কাছে “সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণ” হিসেবে দেখেন। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু ইসলামে কেবল দুটি ঈদ উৎসব হিসেবে নির্ধারিত, তাই অন্য ধর্মের উৎসব পালন করা মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় স্বকীয়তা ও মূল্যবোধকে দুর্বল করে দেয়। এই উৎসবগুলোর কিছু অনুষঙ্গ (যেমন—রঙ খেলা বা অবাধ মেলামেশা) ইসলামী শালীনতা ও নৈতিকতার নীতি লঙ্ঘন করে বলেও মনে করা হয়।

ছ. “আন্তর্জাতিক দিবস” বা “বিশ্ব দিবস” কেন্দ্রিক বিনোদন সংস্কৃতি

আধুনিক যুগে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবস, যেমন— “ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক ডে,” “ওয়ার্ল্ড ড্যান্স ডে,” “ফ্যাশন উইক,” বা “এন্টারটেইনমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ডে” মুসলিম সমাজে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এই দিবসগুলো মূলত অমুসলিম বা পশ্চিমা বিনোদন সংস্কৃতির অংশ। এই দিবসগুলো সাধারণত মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভোগবাদকে উৎসাহ দেওয়া। শরীরী সৌন্দর্য, প্রদর্শনী ও ফ্যাশনের প্রতিযোগিতা তৈরি করা। ব্যক্তিগত খ্যাতি (সেলিব্রিটি কালচার) অর্জনে উৎসাহিত করা।

ইসলামী শরীয়ত মনে করেন, এই ধরনের বিনোদন ও সংস্কৃতির মূল বিষয়বস্তু (যেমন—অতিরিক্ত প্রদর্শনী, খ্যাতি বা অর্থকে প্রাধান্য দেওয়া) ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই দিবসগুলোর মাধ্যমে মুসলিম সমাজে অশালীনতা ও আত্ম-প্রচারের প্রবণতা বাড়ে বলে মনে করা হয়।

জ. জন্মদিনের মোমবাতি নিভানো এবং “হ্যাপি বার্থডে” উদযাপন:

জন্মদিনের কেক কেটে মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নিভানো এবং “হ্যাপি বার্থডে টু ইউ” গান গেয়ে উদযাপন করা। যদিও এটি আধুনিক সময়ে প্রায় বৈশ্বিক প্রথায় পরিণত হয়েছে, ইসলামী পন্ডিতদের মতে, এই প্রথাটিকে অমুসলিম (প্রধানত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আগত) রীতিনীতি হিসেবে দেখেন। এইসব উৎসব “বিনোদন বা আনন্দের দিন” হিসেবে পালন করা হচ্ছে। যদিও এসব উৎসবের শিকড় স্পষ্টভাবে ধর্মীয়—খ্রিস্টান, হিন্দু বা পৌত্তলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত।

ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, এই প্রথাটি মূলত অমুসলিম (প্রধানত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে আগত) রীতিনীতি হিসেবে বিবেচিত। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু ইসলামে এই ধরনের কোনো উৎসব বা উদযাপন নেই, তাই এটি অমুসলিমদের বিনোদন ও আনন্দের দিনের অনুকরণ। কিছু ব্যাখ্যাকার মনে করেন, মোমবাতি নিভিয়ে উদযাপনের এই ঐতিহ্যটি প্রাচীন পৌত্তলিক বিশ্বাস থেকে এসেছে। তাই, এই ধরনের “বিনোদন বা আনন্দের দিন” পালন করাকে মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় স্বকীয়তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরিহার করা উচিত।

২. অমুসলিম সংস্কৃতির পোশাক ও স্টাইল অনুকরণ

বর্তমানে মুসলিম যুবক-যুবতীদের মধ্যে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, নাটক, ফ্যাশন শো এবং সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিওতে অমুসলিম বা প্রধানত পশ্চিমা পোশাক ও জীবনযাত্রার স্টাইল অনুকরণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি কেবল পোশাক নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জীবনধারার প্রকাশ।

নারীদের মধ্যে ওয়েস্টার্ন পোশাকের প্রতি আকর্ষণ দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমা ধাঁচের স্কিন-টাইট (শরীরের সাথে এঁটে থাকা) পোশাক পরিধান করা হচ্ছে, যা ইসলামী শালীনতার নীতির (আয়াতে বর্ণিত পর্দার মূলনীতি) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমনকি হিজাব পরিধান করেও এমনভাবে ফ্যাশন করা হচ্ছে, যা হিজাবের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ শালীনতা রক্ষা করা, থেকে সরে এসে তা নিজেই একটি অশালীন ফ্যাশনের মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে।

এই ধরনের পোশাক ও স্টাইল অনুকরণের সমালোচকরা মনে করেন, এগুলি মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতীক, যা ভোগবাদ, শরীর প্রদর্শনী এবং ক্ষণস্থায়ী ফ্যাশনের প্রতি আসক্তি বাড়ায়।

ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মুসলিমদের নিজস্ব একটি স্বকীয়তা ও শালীনতার পোশাকবিধি রয়েছে, যা এ ধরনের অমুসলিম সাংস্কৃতিক প্রতীকের অনুকরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয়।

ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে- দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে। সহিহ বুখারি : ৫৮৯২

৩. সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য অনুকরণ

মুসলিম সমাজের বিনোদন জগতে বর্তমানে পশ্চিমা ধাঁচের সংগীত ও নৃত্যের প্রভাব ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিনোদনের নামে নানা ধরনের আয়োজন হচ্ছে, যেমন—র‍্যাপ, পপ, এবং রক মিউজিক কনসার্ট, ডান্স পার্টি, ডিজে নাইট এবং মিউজিক্যাল রিয়্যালিটি শো।

এইসব মাধ্যম সরাসরি পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত এবং মুসলিম সমাজে বিনোদনের একটি প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে। সমালোচকরা মনে করেন, এই ধরনের বিনোদন কেবল অমুসলিম সংস্কৃতির অনুকরণই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা ইসলামী নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর।

অতএব, এই ধরনের পাশ্চাত্য-অনুপ্রাণিত সংগীত ও নৃত্য সংস্কৃতিকে অনেকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেন না, বরং এটিকে মুসলিম সমাজে নৈতিক অবক্ষয় এবং ধর্মীয় সীমালঙ্ঘনের একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ধরনের সংস্কৃতি অনুকরণের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের নিজস্ব বিনোদনমূলক ঐতিহ্যগুলো (যেমন—সাংস্কৃতিক গজল বা হামদ-নাত) ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّشۡتَرِیۡ لَہۡوَ الۡحَدِیۡثِ لِیُضِلَّ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ بِغَیۡرِ عِلۡمٍ وَّیَتَّخِذَہَا ہُزُوًا ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مُّہِیۡنٌ

আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব। সুরা লোকমান : ৬

৪. সিনেমা, নাটক ও বিনোদন মাধ্যমের অনুকরণ

পাশ্চাত্য বিনোদন মাধ্যমের জনপ্রিয় ধাঁচ বা ফরম্যাট অনুকরণ করে মুসলিম দেশগুলোতেও এখন বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, রোমান্টিক নাটক ও সিনেমা, নানা ধরনের “রিয়্যালিটি শো”, “বিউটি পেজেন্ট” (সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা), এবং বিভিন্ন “টক শো”।

এই অনুষ্ঠানগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:

নাটক, সিনেমা ও টক শোতে পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা এবং হাস্যরস সৃষ্টি করা হয়, যা ইসলামী সামাজিক রীতিনীতি ও শালীনতার শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাগুলো মূলত শারীরিক সৌন্দর্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ তাব্বারুজ (অতিরিক্ত প্রদর্শন) এবং নারীদের কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবে উপস্থাপনের ধারণাকে উৎসাহিত করে।

এই অনুষ্ঠানগুলোর নির্মাণশৈলী এবং বিষয়বস্তু অমুসলিম সংস্কৃতি থেকে সরাসরি ধার করা, এবং এগুলি ইসলামী বিনোদনের মূলনীতি যেমন—শিক্ষা, নৈতিকতা ও শালীনতা—থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে।

আবদুর রহমান ইবনু গানাম আশ’আরী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নিকট আবূ আমির কিংবা আবূ মালিক আশ’আরী বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কসম! তিনি আমার কাছে মিথ্যে কথা বলেননি। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। তেমনি এমন অনেক দল হবে, যারা পাহাড়ের ধারে বসবাস করবে, বিকাল বেলায় যখন তারা পশুপাল নিয়ে ফিরবে তখন তাদের নিকট কোন অভাব নিয়ে ফকীর আসলে তারা বলবে, আগামী দিন সকালে তুমি আমাদের নিকট এসো। এদিকে রাতের অন্ধকারেই আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেবেন। পর্বতটি ধ্বসিয়ে দেবেন, আর বাকী লোকদেরকে তিনি কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বানর ও শূকর বানিয়ে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ৫৫৯০

৫. খেলাধুলায় অমুসলিম অনুকরণ

খেলাধুলা যদিও সাধারণভাবে বিনোদনের একটি সুস্থ মাধ্যম, তবে এই ক্ষেত্রেও কিছু অমুসলিম সাংস্কৃতিক প্রতীক বা রীতির অনুকরণ মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

কিছু মুসলিম খেলোয়াড় বা সমর্থক অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীক, যেমন—ক্রস চিহ্ন বা লোগোতে অ-ইসলামী ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে। এমনকি কিছু ক্রীড়া সামগ্রী বা পোশাকের নকশাও বিতর্কিত প্রতীক বহন করে।  অনেক সময় অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে মিলিয়ে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট বা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। যেমন—ক্রিসমাস কাপ বা ভ্যালেন্টাইন ক্রিকেট ম্যাচ। এই ধরনের প্রতিযোগিতা একটি অমুসলিম উৎসবকে বিশেষ সম্মান বা গুরুত্ব দেয়, যা মুসলিমদের উৎসবের স্বকীয়তা নষ্ট করে।

এই ধরনের অনুকরণ খেলার মতো একটি সুস্থ বিনোদনকেও ইসলামী সীমার বাইরে ঠেলে দেয়। এটি মুসলিম যুবকদের মধ্যে অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি স্বাভাবিকতা তৈরি করে এবং ধর্মীয় সংবেদনশীলতা হ্রাস করে, যা চূড়ান্তভাবে তাদের “তাশাব্বুহ বিল-কুফফার” (অমুসলিমদের সাদৃশ্য অবলম্বন)-এর দিকে ধাবিত করে।

৬. পশ্চিমা উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদন

বর্তমানে মুসলিম সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত বেশ কিছু উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক আয়োজন ব্যাপকতা লাভ করেছে। এই আয়োজনগুলো মূলত ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং পশ্চিমা উৎসবের অনুকরণকে উৎসাহিত করে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে বিশেষ সেল, হ্যালোইন মেকআপ প্রতিযোগিতা বা পার্টি, নিউ ইয়ার পার্টি এবং ক্রিসমাস উপলক্ষে সান্তা ক্লজ গিফট এক্সচেঞ্জ।

এই ধরনের প্রতিটি উৎসবই অমুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। যেমন—সান্তা ক্লজ খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস উৎসবের প্রতীক, হ্যালোইন ইউরোপীয় পৌত্তলিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত, এবং ভ্যালেন্টাইন ডে খ্রিস্টান ধর্মীয় কাহিনি ও পশ্চিমা প্রেমের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। এই দিনগুলো উদযাপন করা ইসলামী শরিয়তের ব্যাখ্যায় ‘তাশাব্বুহ’ (সাদৃশ্য অবলম্বন)-এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এই উৎসবগুলোর প্রচার মুসলিমদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে দুর্বল করে। মুসলিম সমাজে ইসলামী মূল্যবোধ অনুযায়ী নির্ধারিত ঈদ ছাড়া অন্য কোনো উৎসবকে এভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয় বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই আয়োজনগুলো মূলত তরুণ সমাজকে পশ্চিমা ভোগবাদী জীবনের দিকে আকৃষ্ট করে, যা ধর্মীয় নৈতিকতার বিপরীত।

৭. অবিশ্বাসীদের উৎসব উদযাপন

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে উদযাপন, ইবাদত এবং আনন্দের জন্য দুটি পবিত্র দিন দিয়েছেন। এইগুলি হলো ঈদুল আজহা এবং ঈদুল ফিতর।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদ্বীনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা দুইটি দিন (নায়মূক ও মেহেরজান) খেলাধূলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, এই দুইটি দিন কিসের? তারা বলেন, জাহেলী যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে অন্য দুইটি উত্তম দিন দান করেছেন এবং তা হল: কোরবানীর ঈদ এবং রোযার ঈদ। সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪, সুনানে নাসয়ি : ১১৫৫

এটি স্পষ্ট যে নবী তাদেরকে তাদের খেলাধুলা এবং উদযাপন চালিয়ে যেতে অনুমতি দেননি কারণ এটি মদীনার পৌত্তলিক আরবদের একটি প্রথা ছিল। পরিবর্তে, তিনি তাদের বললেন: “আল্লাহ সেগুলি প্রতিস্থাপন করেছেন,” যার অর্থ হলো তোমাদেরকে যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে তা ছেড়ে দিতে হবে এবং যা প্রতিস্থাপন করেছে তা গ্রহণ করতে হবে।

নবী তাঁর সাহাবীদের সেই দিনগুলিতে উদযাপন ও খেলাধুলা করতে অনুমতি দেননি কারণ এটি অন্য একটি ধর্মের অংশ ছিল। এই বিধানটি ধর্মীয় পটভূমিযুক্ত সমস্ত ছুটির উদযাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার মধ্যে ক্রিসমাস, দিওয়ালি, ইস্টার এবং হ্যালোইন অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের কোনো ছুটির উদযাপনে যোগ দেওয়া অনুমোদিত নয়, এমনকি যদি এটি তার ধর্মীয় তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে থাকে। কারণ এর শিকড় শিরকের মধ্যে নিহিত, এবং মুসলিম হিসেবে আমরা শিরককে মহিমান্বিত করতে পারি না। এ সম্পর্কে পূর্ব বর্ণনা করা হয়েছে বিধান আলোচনা সমাপ্ত কররাম।

অপর পক্ষে মুশরিক বা হিন্দুদের পূজাতে অংশগ্রহণ করাও হারাম। অধিকাংশ ইসলামী পণ্ডিত (আলেম ও ফকীহ) এই ব্যাপারে একমত। এর কয়েকটি প্রধান কারণ হলো:

ইসলামে আল্লাহ্‌র সাথে কাউকে শরিক করা বা অন্য কারো ইবাদত করাকে শিরক বলা হয়, যা সবচেয়ে বড় পাপ এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ (যদি তওবা না করা হয়)। পূজাতে অংশ নেওয়াকে পরোক্ষভাবে সেই শিরকের প্রতি সমর্থন জানানো বা তাতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করা বলে গণ্য করা হয়।

পূজার মতো বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাকে বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনের শামিল মনে করা হয়। খলিফা উমর (রা.) মুশরিকদের উৎসবের দিন তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন।

ইসলাম অমুসলিমদের সাথে মানবিক সম্পর্ক, ন্যায়সঙ্গত আচরণ ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে উৎসাহিত করে। তাদের ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে (যেমন: বিয়ে, মেজবান বা বিপদে সাহায্য) অংশগ্রহণ করা বা সাধারণ সৌজন্যমূলক ব্যবহার করা যেতে পারে, যদি সেখানে কোনো হারাম কাজ বা ধর্মীয় প্রতীক বহনকারী আচার না থাকে। একজন মুসলমানের জন্য অন্য কোনো ধর্মের উপাসনা ও ধর্মীয় আচারে অংশগ্রহণ করা ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী জায়েয নয়।

বিনোদনে আধুনিক প্রযুক্তি

বিনোদনে আধুনিক প্রযুক্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

আধুনিক যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আজকের মানুষ কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা এমনকি বিনোদনেও প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল। কম্পিউটার, মোবাইল, ট্যাব, টেলিভিশন, স্মার্টওয়াচ প্রভৃতি ডিভাইস একদিকে আমাদের কাজকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করেছে; অন্যদিকে এগুলো আমাদের বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষত মোবাইল ও কম্পিউটারের মাধ্যমে মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ভিডিও গেম, গান-বাজনা, সিনেমা দেখা ইত্যাদি নানা উপায়ে সময় কাটাচ্ছে। তবে এ ডিভাইসগুলোর ব্যবহার সব সময় শরীয়তসম্মত হয় না। যেমন—অশ্লীল কনটেন্ট দেখা, হারাম সম্পর্ক গড়া, সময়ের অপচয় করা বা নামাজ ও ইবাদত থেকে গাফিল হওয়া ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে এসব ডিভাইস গুনাহের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। আবার, যদি এগুলো ব্যবহৃত হয় ইসলাম প্রচার, জ্ঞান অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য বা পারিবারিক যোগাযোগের মতো হালাল উদ্দেশ্যে, তাহলে তা নেকীর কাজ হিসেবেও গণ্য হতে পারে।

আমি এ পর্যায় কিন্তু ডিজিটাল ডিভাইসের সম্পর্কে প্রাথমিক ধারন ও তাদের ব্যবহার সম্পর্কে ধারনা দিব। ইহার মাধ্যমেই আপনি বুঝে যাবেন এ সক ডিভাইজ ব্যবহার কতটা শরিয়ত সম্মত আর কতটা শরীয়ত সম্মত  নয়।  সর্বশেষে এ সকল ডিভাইসের ব্যবহার পর্যালোচনা করে ঠিক করব ডিভাইসগুলো কি শর্তে ব্যবহারে করলে শরীয়ত সম্মত হবে।

টেলিভিশন কি?

টেলিভিশন (Television) হলো একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা শব্দ এবং চলমান ছবিকে একই সাথে সম্প্রচার ও প্রদর্শন করে। এটি একটি গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করে যা ক্যাবল, স্যাটেলাইট, বা ওভার-দ্য-এয়ার সম্প্রচারের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থানে থাকা দর্শকদের কাছে তথ্য, শিক্ষা এবং বিনোদন পৌঁছে দেয়। আধুনিক টেলিভিশনগুলো স্মার্ট সংযোগ সমর্থন করে, যার মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযুক্ত করে বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কনটেন্টও দেখা যায়।

টেলিভিশনের ব্যবহার:

১. সংবাদ ও তথ্য পরিবেশন করা।

২. শিক্ষামূলক চ্যানেল, ডকুমেন্টারি, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান এবং ভাষা শিক্ষার অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে জ্ঞান বৃদ্ধি করা।

৩. বিভিন্ন প্রকার নাটক, সিনেমা, সিরিজ, রিয়েলিটি শো এবং কমিক অনুষ্ঠান প্রচার করা।

৪. বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, লোকনৃত্য, লোকসংগীত এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলি প্রদর্শন করা।

৫. আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সকল প্রকার খেলাধুলার সরাসরি সম্প্রচার দেখা।

৬. স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার, এবং সামাজিক সমস্যা সম্পর্কিত সচেতনতামূলক প্রচার করে।

৭. পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা।

৮. রাজনৈতিক টক-শো এবং বিতর্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতামত প্রদান করা।

৯. ইসলামিক ওয়াজ-নসিহত, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী প্রশ্নোত্তর ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সম্প্রচার।

১০. শিশুদের জন্য কার্টুন, শিক্ষামূলক গেম শো এবং নৈতিকতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা।

১১. জাতীয় দিবস, সাংস্কৃতিক উৎসব, সরকারি অনুষ্ঠান এবং কনসার্টের মতো সরাসরি ইভেন্টগুলি সম্প্রচার

২. ইন্টারনেট

ইন্টারনেট (Internet) হলো বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত কোটি কোটি কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল ব্যবস্থা। এটি “Interconnected Network” বা আন্তঃসংযুক্ত জালিকাব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত রূপ। ইন্টারনেট প্রোটোকল (IP) নামক একটি নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ব্যবহার করে এই নেটওয়ার্কগুলো একে অপরের সাথে তথ্য বা ডেটা আদান-প্রদান করে। সহজ কথায়, এটি হলো একটি আন্তর্জাতিক তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ডিভাইসকে যুক্ত করে তথ্য, জ্ঞান ও বিনোদন বিনিময়ের সুযোগ করে দেয়। ইন্টারনেটকে প্রায়শই “বিশ্বগ্রামের মেরুদণ্ড” বা “নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক” বলা হয়।

ইন্টারনেটের ব্যবহার

ইন্টারনেট মানবজীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে। এর প্রধান ব্যবহারগুলো হলো:

১. যোগাযোগ

ই-মেইল, মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন ভিডিও কলিং) এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন।

২. শিক্ষা ও গবেষণা (Education & Research) :

অনলাইন কোর্স (ভার্চুয়াল ক্লাস, ই-বুক এবং বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে জ্ঞান অর্জন ও গবেষণা করা।

৩. তথ্য ও সংবাদ সংগ্রহ :

দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক সংবাদ ও তথ্য মুহূর্তের মধ্যে জানা এবং যেকোনো বিষয়ে অনুসন্ধান করা।

৪. ব্যবসা-বাণিজ্য

অনলাইন শপিং, কেনা-বেচা, এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা।

৫. ব্যাংকিং ও অর্থ লেনদেন

অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, নগদ), এবং ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান করা।

৬. বিনোদন

: ভিডিও স্ট্রিমিং (ইউটিউব নেটফ্লিস), মিউজিক স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিং, এবং পডকাস্ট শোনার মাধ্যমে অবসর সময় কাটানো।

৭. দাওয়াহ ও ধর্ম প্রচার

: ইসলামি ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুকের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর দাওয়াত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া এবং ধর্মীয় জ্ঞান বিতরণ করা।

৮. সরকারি পরিষেবা

জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট আবেদন, ট্যাক্স পরিশোধ, পরীক্ষার ফলাফল জানা এবং অন্যান্য সরকারি পরিষেবা গ্রহণ করা।

৯. কর্মসংস্থান ও ফ্রিল্যান্সিং:

অনলাইনে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্লায়েন্টদের জন্য দূর থেকে কাজ করা।

১০. সামাজিক নেটওয়ার্কিং:

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মে নতুন বন্ধু তৈরি, সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা ও মতামত প্রকাশ করা।

১১. দূরবর্তী কর্মক্ষেত্র

অফিসের কাজ বাড়ি বা অন্য যেকোনো স্থান থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সম্পাদন করা।

২. স্বাস্থ্যসেবা

 ভিডিও কলের মাধ্যমে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ বা অনলাইন স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করা।

৩. স্মার্টফোন কি?

স্মার্টফোন হলো একটি অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন, যা মূলত একটি পকেট-সাইজড কম্পিউটারের মতো কাজ করে। এটি সাধারণ মোবাইল ফোনের কল করা ও বার্তা পাঠানোর ক্ষমতার পাশাপাশি আরও অনেক উন্নত সুবিধা প্রদান করে।

স্মার্টফোনের সাধারণত স্পর্শ-ভিত্তিক স্ক্রিন ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। এতে অ্যান্ড্রয়েড বা আইওএস-এর মতো অপারেটিং সিস্টেম থাকে, যা অ্যাপ্লিকেশান (অ্যাপস) চালানোর সুবিধা দেয়। ওয়াই-ফাই ও মোবাইল ডেটার মাধ্যমে দ্রুত ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করা যায়। এটি ক্যামেরা, জিপিএস, মিডিয়া প্লেয়ার, ও গেম খেলার মতো বহুবিধ কাজ করতে পারে।

স্মার্টফোন ব্যবহার

স্মার্টফোন আধুনিক জীবনে একটি উপকারী যন্ত্র হিসেবে নিম্নলিখিত কাজগুলোতে ব্যবহৃত হয়:

১. যোগাযোগ:

দ্রুত কল করা, টেক্সট মেসেজ, এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা।

২. ইন্টারনেট ব্রাউজিং:

প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজা এবং বিশ্বের খবরাখবর জানা।

৩. জ্ঞানার্জন :

শিক্ষা ও গবেষণার কাজে বিভিন্ন তথ্য, আর্টিকেল এবং ই-বুক পড়া।

৪. ইসলামিক ইবাদত:

কোরআন তিলাওয়াত করা, তাফসির পড়া এবং হাদিসের গ্রন্থাবলী দেখা। * নামাযের সময় কিবলা (কিবলা ফাইন্ডার) নিশ্চিত হওয়া। * আযানের সময়সূচি এবং সালাতের সঠিক সময় জানা।

৫. ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি :

অনলাইন ব্যাংকিং, স্টক ট্রেডিং, এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করা।

৬. সামাজিক যোগাযোগ:

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা।

৭. নেভিগেশন ও দিকনির্দেশনা:

জিপিএস (GPS) ব্যবহার করে অচেনা জায়গায় রাস্তা খুঁজে বের করা।

৮. ছবি ও ভিডিও:

উচ্চ-মানের ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ড করা এবং সেগুলোর এডিটিং করা।

৯. বিনোদন:

 গান, ভিডিও, সিনেমা দেখা এবং বিভিন্ন ধরনের গেম খেলা।

১০. স্বাস্থ্য ও ফিটনেস ট্র্যাকিং:

 স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত তথ্য যেমন হার্ট রেট, হাঁটার সংখ্যা (স্টেপ কাউন্ট) ট্র্যাক করা।

১১. দপ্তর ও পেশাগত কাজ:

ইমেইল আদান-প্রদান, ডকুমেন্ট তৈরি, মিটিং করা, এবং ফাইল ব্যবস্থাপনার কাজ করা।

১২. সতর্কতা/রিমাউন্ডার:

অ্যালার্ম, ক্যালেন্ডার এবং রিমাইন্ডার সেট করে দৈনন্দিন কাজগুলো সময়মতো মনে রাখা।

৪. কম্পিউটার কি?

কম্পিউটার (Computer) হলো একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র বা ডিভাইস যা তথ্য (Data) গ্রহণ করতে, সেই তথ্যকে নির্দেশিত উপায়ে প্রক্রিয়াকরণ (Process) করতে, তথ্য সংরক্ষণ (Store) করতে এবং প্রয়োজন অনুসারে তা ফলাফল হিসেবে প্রদর্শন করতে সক্ষম। ‘Compute’ (কম্পিউট) শব্দটি থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ হলো গণনা করা বা হিসাব করা।

আধুনিক কম্পিউটারকে কেবল গণনাকারী যন্ত্র বলা চলে না। এটি একটি বহুমুখী যন্ত্র, যা গাণিতিক এবং যৌক্তিক উভয় ধরনের জটিল কাজ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করতে পারে। এটি হার্ডওয়্যার (যন্ত্রাংশ) এবং সফটওয়্যার (প্রোগ্রাম) এর সমন্বয়ে গঠিত।

কম্পিউটারের ব্যবহার

কম্পিউটার বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এর প্রধান ব্যবহারগুলো নিম্নরূপ:

১. শিক্ষা ও গবেষণা:

 অনলাইন লার্নিং: ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম এবং ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে অংশগ্রহণ। * গবেষণা: জটিল ডেটা বিশ্লেষণ, তথ্য সংগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক মডেলিং।

২. যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং:

ই-মেইল ও চ্যাটিং: ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান। * ভিডিও কনফারেন্সিং: দূরবর্তী স্থানে থাকা মানুষের সাথে সভা বা আলোচনা করা।

৩. ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প:

ডেটা ম্যানেজমেন্ট: হিসাবরক্ষণ, ডেটাবেস তৈরি, ইনভেন্টরি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মচারী ব্যবস্থাপনা। * ই-কমার্স: অনলাইনে পণ্য বা পরিষেবা কেনা-বেচা করা।

৪. স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা:

রোগ নির্ণয়: এক্স-রে, সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই (MRI) যন্ত্রে ডেটা বিশ্লেষণ করা। * রোগীর ডেটা সংরক্ষণ: হাসপাতালের রেকর্ড এবং রোগীর ইতিহাস ব্যবস্থাপনা।

৫. প্রশাসন ও সরকার (ই-গভর্ন্যান্স):

সরকারি কাজ: বিভিন্ন সরকারি ডেটা সংরক্ষণ, ডিজিটাল পরিষেবা প্রদান (যেমন: পাসপোর্ট, জন্ম নিবন্ধন)।  জাতীয় নিরাপত্তা: প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ।

৬. বিনোদন ও মিডিয়া :

 ভিডিও উৎপাদন: চলচ্চিত্র, অ্যানিমেশন এবং ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তৈরি করা। * গেমিং: ভিডিও গেম খেলা এবং তৈরি করা।

৭. অর্থ ও ব্যাংকিং :

স্বয়ংক্রিয় লেনদেন, এটিএম (ATM) পরিচালনা এবং অনলাইন ফান্ড ট্রান্সফার করা। * আর্থিক বিশ্লেষণ: স্টক মার্কেট পর্যবেক্ষণ ও বিনিয়োগের পূর্বাভাস দেওয়া।

৮. প্রকাশনা ও ডকুমেন্টেশন:

ডকুমেন্ট তৈরি: চিঠি, রিপোর্ট, বই, এবং প্রবন্ধ লেখা ও সম্পাদনা করা (Word Processing)। * গ্রাফিক ডিজাইন: বিজ্ঞাপন, লোগো এবং বিভিন্ন নকশা তৈরি করা।

৯. প্রকৌশল ও ডিজাইন:

 ক্যাড (CAD) সফটওয়্যার: ভবন, গাড়ি এবং যন্ত্রপাতির নকশা তৈরি ও পরীক্ষা করা। * রোবটিক্স: রোবট নিয়ন্ত্রণ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াগুলো পরিচালনা করা।

১০. সময় ব্যবস্থাপনা ও গৃহস্থালি কাজ:

ব্যক্তিগত সময়সূচী তৈরি করা, বিল পরিশোধ করা এবং পরিবারের বাজেট তৈরি করা।

১১. আবহাওয়া পূর্বাভাস:

জটিল গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে আবহাওয়ার ডেটা বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস প্রদান করা।

১২. শিল্প উৎপাদন (Manufacturing):

উৎপাদন প্রক্রিয়ার যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ (CNC মেশিন) এবং মান নিয়ন্ত্রণ (Quality Control) করা।

৫. গেমিং কনসোল

গেমিং কনসোল বা ভিডিও গেম কনসোল হলো এক ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা বিশেষায়িত কম্পিউটার যা প্রধানত ভিডিও গেম খেলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি সাধারণত একটি টেলিভিশন বা মনিটরের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং গেম খেলার জন্য বিশেষ কন্ট্রোলার বা গেমপ্যাড ব্যবহার করা হয়।

এটি কম্পিউটারের মতোই গেম চালানোর জন্য প্রসেসর (CPU), গ্রাফিক্স প্রসেসর (GPU), মেমরি এবং স্টোরেজ নিয়ে গঠিত, তবে এর হার্ডওয়্যার ও অপারেটিং সিস্টেম বিশেষভাবে শুধু গেমিংয়ের দিকে মনোনিবেশ করে তৈরি করা হয়।

উদাহরণ: সনি প্লেস্টেশন (PlayStation), মাইক্রোসফট এক্সবক্স (Xbox), নিনটেন্ডো সুইচ (Nintendo Switch) ইত্যাদি।

গেমিং কনসোল ব্যবহার

গেমিং কনসোলের মূল কাজ গেম খেলা হলেও, আধুনিক কনসোলগুলোতে আরও অনেক বহুমুখী সুবিধা রয়েছে:

১. ভিডিও গেম খেলা (মূল ব্যবহার):

কনসোলের মূল ব্যবহার হলো উচ্চ-মানের, গ্রাফিক্স সমৃদ্ধ ভিডিও গেম খেলা। এতে বিভিন্ন ঘরানার গেম উপভোগ করা যায়।

২. বিনোদন কেন্দ্র (Media Center):

কনসোলগুলো ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে নেটফ্লিক্স, ইউটিউব, অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও-এর মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম থেকে সিনেমা, টিভি শো এবং ভিডিও দেখার সুবিধা দেয়।

৩. ব্লু-রে এবং ডিভিডি প্লেয়ার:

আধুনিক কনসোলগুলোতে ব্লু-রে ডিস্ক এবং ডিভিডি প্লেয়ারের সুবিধা থাকে, যার মাধ্যমে উচ্চ রেজোলিউশনের সিনেমা দেখা যায়।

৪. অনলাইন যোগাযোগ ও সামাজিকতা:

কনসোলের মাধ্যমে অন্য খেলোয়াড়দের সাথে অনলাইন গেমিং-এ যুক্ত হওয়া, ভয়েস চ্যাটিং করা এবং গেমিং কমিউনিটিতে সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।

৫. অন্যান্য অ্যাপস ব্যবহার:

কিছু কনসোলে বিশেষায়িত অ্যাপস ব্যবহার করে সঙ্গীত শোনা বা ব্রাউজিং করাও সম্ভব।

৭. ডিজিটাল ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরা

ডিজিটাল ক্যামেরা: এটি এমন একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যা ফিল্মের পরিবর্তে একটি ইলেকট্রনিক ইমেজ সেন্সর (যেমন: CCD বা CMOS) ব্যবহার করে ছবি তোলে। এটি তোলা ছবিগুলোকে ডিজিটাল ডেটা হিসেবে মেমরি কার্ডে সংরক্ষণ করে, যা দ্রুত কম্পিউটারে দেখা, সম্পাদনা বা প্রিন্ট করা যায়। ডিজিটাল ক্যামেরা স্থির ছবি তোলার জন্য বিশেষভাবে তৈরি হলেও বেশিরভাগ আধুনিক ক্যামেরায় ভিডিও ধারণের ক্ষমতা থাকে।

ভিডিও ক্যামেরা (বা ক্যামকর্ডার): এটি একটি বিশেষায়িত ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা মূলতঃ চলমান ছবি বা ভিডিও সিকোয়েন্স রেকর্ড করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ডিজিটাল ক্যামেরার মতো এটিও ডিজিটাল ডেটা হিসেবে ভিডিও সংরক্ষণ করে এবং সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ভিডিও রেকর্ডিংয়ের জন্য এতে ভালো স্ট্যাবিলাইজেশন এবং জুম সুবিধা থাকে।

ডিজিটাল ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরার ব্যবহার

ডিজিটাল ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরার বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে, যার প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো:

১. স্মৃতি সংরক্ষণ ও ব্যক্তিগত ব্যবহার: * ফটোগ্রাফি: পারিবারিক অনুষ্ঠান, ভ্রমণ বা দৈনন্দিন জীবনের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো স্থির ছবি হিসেবে ধরে রাখা। * ভিডিও রেকর্ডিং: ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ইভেন্টগুলোর ভিডিও ডকুমেন্টেশন তৈরি করা।

২. পেশাগত মিডিয়া ও সাংবাদিকতা: * সংবাদ কভারেজ: সংবাদ সংগ্রহ ও সরাসরি সম্প্রচারের জন্য ভিডিও ধারণ করা। *লচ্চিত্র ও টিভি প্রোডাকশন: চলচ্চিত্র, সিরিয়াল, ডকুমেন্টারি এবং বিজ্ঞাপন তৈরি করা।

৩. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ: টিউটোরিয়াল তৈরি: অনলাইন শিক্ষামূলক ভিডিও, লেকচার বা ব্যবহারিক কাজের পদ্ধতি ভিডিও করে শেখানো। * প্রশিক্ষণ সামগ্রী: কর্পোরেট বা পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য ভিজ্যুয়াল সামগ্রী প্রস্তুত করা।

৪. নিরাপত্তা ও নজরদারি: সিসিটিভি ও নজরদারি: নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধমূলক কার্যকলাপ রেকর্ড করতে ব্যবহার করা। * ট্র্যাফিক মনিটরিং: রাস্তায় ট্র্যাফিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা।

৫. ব্যবসা ও ই-কমার্স: পণ্য প্রদর্শন: ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য পণ্যের উচ্চ-মানের ছবি এবং ভিডিও তৈরি করা। * ভার্চুয়াল ট্যুর: রিয়েল এস্টেট ব্যবসার জন্য সম্পত্তি বা স্থানের ভিডিও ট্যুর তৈরি করা।

৬. বিজ্ঞান ও গবেষণা: মাইক্রোস্কোপিক ফটোগ্রাফি: অণুজীব বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সূক্ষ্ম ছবি ও ভিডিও ধারণ করা। দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ: বন্যপ্রাণী, মহাকাশ বা দূরবর্তী স্থানে পর্যবেক্ষণ করা।

৭. সোশ্যাল মিডিয়া ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন: ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামের জন্য ব্লগ, শর্ট ফিল্ম বা অন্যান্য সৃজনশীল কন্টেন্ট তৈরি করা।

স্মার্ট ওয়াচ

স্মার্ট ওয়াচ হলো একটি ডিজিটাল কব্জিঘড়ি, যা প্রথাগত ঘড়ির সময় দেখানোর পাশাপাশি একটি কম্পিউটারের এবং স্মার্টফোনের অনেক ফাংশন সম্পাদন করতে পারে। এটি সাধারণত একটি টাচস্ক্রিন ইন্টারফেস, বিভিন্ন সেন্সর এবং ওয়্যারলেস কানেক্টিভিটি (যেমন ব্লুটুথ ও Wi-Fi) দিয়ে সজ্জিত থাকে। এটি একটি স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করে এবং স্বাস্থ্য ট্র্যাকিং, নোটিফিকেশন প্রদর্শন এবং অ্যাপস চালানোর মতো কাজগুলো করে থাকে।

স্মার্ট ওয়াচের ব্যবহার

স্বাস্থ্য ও ফিটনেস ট্র্যাকিং:

এটি ব্যবহারকারীর হৃদস্পন্দন (Heart Rate), রক্তের অক্সিজেন স্তর (SpO2), ঘুমের মান (Sleep Quality) এবং দৈনিক হাঁটা বা দৌড়ানোর পরিমাণ ট্র্যাক করে।

নোটিফিকেশন ও যোগাযোগ:

ফোন পকেট থেকে না বের করেই কল, টেক্সট মেসেজ, ইমেইল এবং সোশ্যাল মিডিয়া নোটিফিকেশন সরাসরি কব্জিতে দেখা যায়।

সময় ব্যবস্থাপনা ও অ্যালার্ম:

এটি অ্যালার্ম, টাইমার এবং রিমাইন্ডার সেট করার মাধ্যমে দৈনিক কাজগুলো সংগঠিত রাখতে সাহায্য করে।

নেভিগেশন ও অবস্থান (GPS):

জিপিএস সুবিধার মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেখা যায় এবং ভ্রমণ বা দৌড়ানোর সময় দূরত্ব ও গতি ট্র্যাক করা যায়।

পেমেন্ট ও ওয়্যারলেস লেনদেন:

কিছু স্মার্ট ওয়াচ NFC (Near Field Communication) ব্যবহার করে কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট (যেমন Google Pay বা Apple Pay) করতে দেয়।

মিউজিক কন্ট্রোল: এটি ফোন থেকে মিউজিক প্লে করা, পজ করা বা ভলিউম বাড়ানো-কমানোর জন্য রিমোট কন্ট্রোল হিসেবে কাজ করে।

ই-বুক রিডার কি?

ই-বুক রিডার (E-Book Reader) হলো একটি বহনযোগ্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা বিশেষভাবে ডিজিটাল বই বা ই-বুক (E-Book) পড়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের চেয়ে আলাদা কারণ এটি সাধারণত ই-ইঙ্ক (E-Ink) প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ই-ইঙ্ক ডিসপ্লে দেখতে অনেকটা সাধারণ কাগজের মতো এবং সরাসরি সূর্যের আলোতে পড়লেও চোখের ওপর চাপ ফেলে না। এটি কম শক্তি খরচ করে এবং ব্যাটারি দীর্ঘ সময় ধরে চলে।

উদাহরণ: অ্যামাজন কিন্ডল (Amazon Kindle), কোবো (Kobo), নুুক (Nook) ইত্যাদি।

ই-বুক রিডারের ব্যবহার

সহজে বই পড়া ও বহন:

এটিতে হাজার হাজার বই একসাথে সংরক্ষণ করা যায় এবং খুব সহজে বহন করা যায়।

চোখের আরাম:

ই-ইঙ্ক প্রযুক্তির কারণে এটি থেকে কোনো ব্লু লাইট নির্গত হয় না, ফলে দীর্ঘ সময় পড়লেও চোখে কম চাপ পড়ে।

পঠনযোগ্যতা :

এটি ব্যবহারকারীকে ফন্টের আকার, ফন্ট স্টাইল এবং লাইনের ব্যবধান কাস্টমাইজ করার সুবিধা দেয়, যা বয়স্ক বা দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা রয়েছে এমন পাঠকের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

ডিকশনারি ও নোট নেওয়া:

এতে বিল্ট-ইন ডিকশনারি থাকে, যা কোনো শব্দের ওপর ট্যাপ করলেই তার অর্থ দেখিয়ে দেয়। এছাড়া সরাসরি বইয়ের পাতায় নোট নেওয়ার বা অংশবিশেষ হাইলাইট করার সুবিধা থাকে।

দ্রুত অ্যাক্সেস:

ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে যেকোনো নতুন বই ডাউনলোড বা কেনা যায়।

কম আলোতে পড়া: বেশিরভাগ আধুনিক ই-বুক রিডারে সামঞ্জস্যযোগ্য ফ্রন্ট লাইট থাকে, যা রাতের অন্ধকারেও আরামদায়কভাবে পড়ার সুযোগ দেয়।

স্মার্ট স্পিকার কি?

স্মার্ট স্পিকার হলো একটি ওয়্যারলেস (তারবিহীন) হাই-টেক স্পিকার, যাতে একটি ভার্চুয়াল সহকারী যেমন অ্যামাজন অ্যালেক্সা, গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা অ্যাপল সিরি ইনবিল্ট থাকে। এটি ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে কাজ করে এবং ব্যবহারকারীর ভয়েস কমান্ড অনুসরণ করে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করতে পারে। এটি কেবল গান বাজানো নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের একটি “স্মার্ট হোম হাব” বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

স্মার্ট স্পিকারের ব্যবহার

ভয়েস কমান্ডে তথ্য ও উত্তর প্রদান: আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ট্র্যাফিকের খবর, সাধারণ প্রশ্ন বা গণনার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে দেওয়া।

স্মার্ট হোম নিয়ন্ত্রণ: ভয়েসের মাধ্যমে ঘরের অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইস (যেমন: লাইট, ফ্যান, এসি, থার্মোস্ট্যাট) চালু বা বন্ধ করা।

মিউজিক ও অডিও কন্টেন্ট প্লেব্যাক: ইন্টারনেট বা স্ট্রিমিং সার্ভিস থেকে গান, পডকাস্ট, কুরআন তিলাওয়াত, বা রেডিও চালানো এবং নিয়ন্ত্রণ করা।

সময় ব্যবস্থাপনা ও রিমাইন্ডার: অ্যালার্ম সেট করা, টাইমার দেওয়া, এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রিমাইন্ডার সেট করা।

যোগাযোগ: কিছু স্পিকারের মাধ্যমে ভয়েস কল করা বা মেসেজ পাঠানো যায়।

সংবাদ ও আপডেট: সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম বা খেলার স্কোর ভয়েস নোটিফিকেশনের মাধ্যমে শোনা।

ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষতিসমূহ

উপরে যে সকল ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার করার সময় ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সামনে অনেক খারাপ দিন উম্মচিত হবে। টিভি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা, গেমিং কনসোল, স্মার্টওয়াচ, ই-বুক, স্মার্ট স্পিকার ইত্যাদি ডিভাইসগুলোর ব্যবহার গবেষনা করে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক খারাপ দিক উম্মচিত হয়েছে। নিচে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এ সব ডিভাইস খারাপ দিনগুলো তুল ধার হলো।

১. সময়ের অপচয়

সোশ্যাল মিডিয়া, গেম, ভিডিও, চ্যাট ইত্যাদিতে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করে ইবাদত, শিক্ষা ও দুনিয়াবী দায়িত্ব অবহেলা করা।

২. চোখের গুনাহ

অশ্লীল ছবি, ভিডিও, বা গায়রে মাহরামদের দেখা— যা নবী ﷺ চোখের যিনা বলেছেন।

৩. অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়:

ইন্টারনেট ও ভিডিওর মাধ্যমে হারাম, নগ্ন বা অশোভন বিষয়বস্তু প্রচার করা।

৪. ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট:

নোটিফিকেশন, কল, বা মিউজিকের কারণে নামায ও কুরআন তিলাওয়াতের খুশু-খুযু নষ্ট হওয়া।

৫. মিথ্যা ও গুজব ছড়ানো:

যাচাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা ও ফিতনা সৃষ্টি করা।

৬. অর্থের অপচয় (إسراف):

বিলাসী ডিভাইস, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপস ও সাবস্ক্রিপশনে সম্পদ নষ্ট করা।

৭. গোপনীয়তার লঙ্ঘন (انتهاك الخصوصية):

ছবি, ভিডিও বা রেকর্ডের মাধ্যমে কারও ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ বা অপব্যবহার করা।

৮. অহংকার ও প্রদর্শনবাদিতা (الرياء):

ছবি-ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে নিজের ইবাদত, সম্পদ বা সৌন্দর্য প্রদর্শন করা।

৯. সহিংসতা ও মানসিক বিকৃতি:

গেম বা ভিডিওর মাধ্যমে সহিংসতা, হত্যা ও নিষ্ঠুরতা শেখা, যা ইসলামের শান্তি-নীতির বিপরীত।

১০. জুয়া ও বাজির প্রবণতা (القمار):

কিছু অনলাইন গেম বা প্ল্যাটফর্মে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা, যা স্পষ্ট হারাম।

১১. পবিত্র বিষয়াবলীর অবমাননা:

কুরআন তিলাওয়াত বা আযানকে রিংটোন বানিয়ে অপবিত্র স্থানে বাজানো।

১২. পর্দা ও লজ্জাশীলতার লঙ্ঘন (الحياء):

নারীদের ছবি-ভিডিও প্রকাশ করা বা গায়রে মাহরামদের দেখা, যা পর্দাহীনতার কারণ হয়।

১৩. শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি:

ডিভাইস আসক্তির ফলে ঘুমের অভাব, চোখের ক্ষতি ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া।

১৪. অন্যের হক নষ্ট করা:

কপিরাইট ভাঙা, অনুমতি ছাড়া কনটেন্ট ব্যবহার করা, বা মানুষকে কষ্ট দেওয়া।

১৫. ইখলাস ও তাকওয়ার অবক্ষয়:

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা মানুষকে দুনিয়ামুখী ও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে ফেলে।

উপসংহার : প্রযুক্তি স্বয়ং হারাম নয়; বরং এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে তা হালাল না হারাম হবে। একজন মু’মিনের কর্তব্য হলো—ডিভাইসগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখে কেবল কল্যাণকর, শরীয়তসম্মত ও ইখলাসপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা। অন্যথায়, এই আধুনিক উপকরণগুলো নেকীর পরিবর্তে গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার জায়েয হওয়ার শর্ত

উপরে যে সকল ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার উল্লেখ করেছি। উহার খারাপ দিনগুলো তুল ধার হয়ে। কাজের এ সব ডিভাইস (টিভি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ক্যামেরা, গেমিং কনসোল, স্মার্টওয়াচ, ই-বুক, স্মার্ট স্পিকার ইত্যাদি) ব্যবহার করা জায়েয নয়। তবে ইসলামি কিছু নীতিমালা অনুসরণের মাধ্যমে জায়েয করা যেতে পারে। নিচে এ সম্পর্কিত নীতিমালা তুলে ধরা হলো :

১. নিয়ত (উদ্দেশ্য) সত্য ও কল্যাণকর হতে হবে :

ডিভাইসটি দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, হালাল জীবিকার কাজ, পরিবারের কল্যাণ বা জরুরি যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হলে তা জায়েয।

২. হারাম কনটেন্ট থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা :

অশ্লীলতা, নগ্নতা, শিরকপ্রবণতা, জুয়া-প্রচেষ্টা, নাস্তিকতা ইত্যাদি দেখা/শেয়ার/প্রচার করা যাবে না।

৩. ইবাদত ও ফরজ কর্তব্যে বিঘ্ন না ঘটানো :

নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদতের সময় ডিভাইস বন্ধ/সাইলেন্ট রাখা বা DND মোড ব্যবহার করতে হবে।

৪. সময় নিয়ন্ত্রণ ও অপচয় রোধ :

অনাবশ্যক সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং বা বিনোদনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় থেকে বিরত থাকতে হবে; সময়পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।

৫. গোপনীয়তা এবং কারো হক রক্ষা :

অন্যের অনুমতি ছাড়া ছবি/ভিডিও তোলা বা প্রকাশ করা, ব্যক্তিগত কথোপকথন রেকর্ড বা ছড়ানো বাদ দিতে হবে।

৬. মিথ্যা, গীবত ও ফিতনা-প্রচারণা করা যাবে না :

যাচাই না করে সংবাদ, বিদ্বেষপূর্ণ কনটেন্ট বা অপবাদ ছড়ানো নিষেধ।

৭. পবিত্র শব্দাবলীর মর্যাদা বজায় রাখা — কোরআন, আজান বা জিকিরকে রিংটোন/বেকগ্রাউন্ড হিসেবে অপমানজনক জায়গায় ব্যবহার করলে বারণ; সম্মানজনক ব্যবহারের শর্তে অনুমোদন।

৮. পর্দা, লজ্জাশীলতা ও শিষ্টাচার রক্ষা :

অপরিপক্ব/বিরুদ্ধ লিঙ্গের প্রতি উন্মুক্ত দৃষ্টি, অশোভন পোশাক বা বিরূপ আচরণ উৎসাহিত করা যাবে না।

৯. অর্থিক অপচয় পরিহার করা :

অপ্রয়োজনীয় বিলাসী ডিভাইস বা অবৈধ সাবস্ক্রিপশনে অর্থ অপচয় করা শামিল হতে পারে; প্রয়োজনমাফিক ব্যবহার জরুরি।

১০. কপিরাইট ও অন্যের শ্রমের সম্মান :

অননুমোদিত কপিরাইট লঙ্ঘন (চোরাই কন্টেন্ট ডাউনলোড/শেয়ার) করা যাবে না।

১১. হারাম সেবাসমূহ (জুয়া, বাজি ইত্যাদি) থেকে বিরত থাকা :

 অনলাইন গেম বা প্ল্যাটফর্মে জুয়ারূপী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ হারাম।

১২. ডিভাইসের সেটিংসে সুরক্ষা ও নৈতিক ফিল্টার ব্যবহার :

কনটেন্ট ফিল্টার, প্রাইভেসি সেটিংস, প্যারেন্টাল কনট্রোল ইত্যাদি চালু রাখার মাধ্যমে ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রতিহত করা।

১৩. স্বাস্থ্য ও শারীরিক ক্ষতি এড়ানো :

দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে থাকা, ঘুমের বিঘ্ন বা অতিরিক্ত রেডিয়েশনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করা।

১৪. ইখলাস ও তাকওয়া রক্ষা :

ব্যবহার যেন রিয়া (দেখানোর জন্য ইবাদত) বা দুনিয়ামুখিতা না বাড়ায়; সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য থাকা উচিত।

১৫. পরিবার ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা :

ডিভাইস ব্যবহার পরিবারের সম্পর্ক ও সামাজিক দায়িত্বকে ক্ষুণ্ন করবো না; পরিবারকে সময় দেওয়া ও সম্মিলিত, নির্মল বিনোদনের বিকল্প রাখা।

উপসংহার: উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে চললে যে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হিসেবে গণ্য হবে — কারণ মূল বিচার হচ্ছে নিয়ত, বিষয়বস্তু, সময় ও প্রভাব। চাইলে আমি এই ১৫টি শর্ত থেকে প্রতিটির জন্য আলাদা-বিশেষ প্রয়োজনীয় নিয়ম বা উদাহরণ (টিভি, মোবাইল, গেমিং কনসোল ইত্যাদির জন্য) সংক্ষেপে লিখে দিতে পারি। তুমি কোনটি আগে চাও — টিভি নাকি স্মার্টফোন?

বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

বিনোদনে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবসর

লেখক : মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

মানুষ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব। তাকে আল্লাহ এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, জন্মলগ্ন থেকেই তার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়। কেউ ছাত্র হিসেবে লেখাপড়ার দায়িত্ব পালন করে, কেউ শিক্ষক হিসেবে জ্ঞান বিতরণের কাজে নিয়োজিত থাকে, কেউ কৃষক হয়ে ফসল ফলায়, কেউ ব্যবসায়ী হয়ে বাণিজ্য পরিচালনা করে, আবার কেউ সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে অফিসে দায়িত্ব পালন করে। এমনকি একজন গৃহিণীও ঘরের সমস্ত কাজকর্ম, সন্তান পালন, খাবার তৈরি ও সংসারের ভার সামলে নিজের দায়িত্ব পালন করে থাকে। অর্থাৎ পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে একেবারে কর্মহীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন-

لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡ کَبَدٍ ؕ

অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি ক্লেশের মধ্যে। সূরা বালাদ : ৪

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ পরিশ্রম ও কর্মের মাধ্যমেই জীবন পরিচালনা করে। তবে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তার শরীর ও মন দুটোই বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে। তাই সারাদিনের কর্মযজ্ঞের পর মানুষ কিছু সময় বিশ্রাম নেয়, যাকে আমরা বলি অবসর সময়

মুমিনের অবসর

জীবন হলো কর্ম ও বিশ্রামের সমন্বয়। আধুনিক কর্মনীতি অনুযায়ী একজন মানুষ সাধারণত দিনে আট ঘণ্টা কাজ করে। বাকিটা সময় ঘুম, খাওয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন এবং সামান্য কিছু সময় অবসর হিসেবে থাকে। এই অবসর সময়েই মানুষ বিনোদন খোঁজে—কখনও বই পড়ে, কখনও পরিবারের সাথে সময় কাটায়, কখনও ভ্রমণে যায়, আবার কেউ কেউ সঙ্গীত, খেলাধুলা, সিনেমা দেখা, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সময় ব্যয় করে। সাধারণভাবে অবসর বলতে বোঝায় কাজের বাইরে ফাঁকা সময় যে সময় মানুষ বিশ্রাম নেয় বা বিনোদন করে। কিন্তু একজন মুমিন বান্দার জীবনে “অবসর” বলতে একেবারে কর্মহীন বা উদ্দেশ্যহীন সময় বোঝানো যায় না। কারণ, একজন মুমিন জানে, তার প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে হিসাবযোগ্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ

“অতএব, যখন তুমি এক কাজ শেষ করো, তখন অন্য কাজে মনোনিবেশ করো। আর তোমার রবের প্রতিই আকাঙ্ক্ষা রাখো। সূরা ইনশিরাহ :৭-৮

অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবন কখনোই শূন্য বা উদ্দেশ্যহীন হয় না। সে এক ইবাদত শেষ করলে অন্য ইবাদতে প্রবেশ করে, এক দায়িত্ব শেষ করলে অন্য দায়িত্বে মনোনিবেশ করে।

সাধারণ অর্থে অবসর বলতে মানুষ সাধারণত সেই সময়কে বোঝে, যখন সে কোনো ধরনের কাজ বা দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকে না, অর্থাৎ কর্মহীনতা ও দায়িত্বমুক্তির একটি অবকাশ। কিন্তু এই অর্থে যদি অবসরের ধারণা গ্রহণ করা হয়, তবে একজন মুসলিমের জীবনধারায় ‘অবসর’ নামক কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব থাকা কার্যত অসম্ভব, যার প্রতি সে যত্নবান হতে পারে বা যাকে সে শুধু কর্মহীনতায় অতিবাহিত করতে পারে। কারণ, একজন নিষ্ঠাবান মুসলিমের জীবনকর্মের একটি মুহূর্তও দায়িত্ব বা লক্ষ্যহীনভাবে অতিক্রান্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না। তার জীবনের প্রতিটি ক্ষণই কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পালনে নিবেদিত। একজন মুসলিমকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেত হয়। সালাতের বাহিরে তাকে প্রতি নিয়ত জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করতে হয়। তাছাড়া তার পরিবারের হক, আত্মীয় স্বজনদের হক, প্রতিবেশীর হক, সামাজিক দায়বদ্ধতার হক ইত্যাদি আদায় করতে হয়। আর যদি দৈবক্রমে এই ধরনের কোন দায়িত্বই সম্পাদনের প্রয়োজন না হয়, তবুও একজন মুসলিমের জীবনে সুন্নাত বা নফল (ঐচ্ছিক ইবাদত) কাজের কোনো সীমারেখা নেই, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক। একজন মুসলিম যদি শরিয়তে বর্ণিত সমস্ত সুন্নাত তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত করতে চায়, তবে সেই সুন্নাত ও নফল আমলের আধিক্য এত বেশি যে, তার এই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করাই জীবনব্যাপী এক বিশাল কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়।

অতএব, এই ব্যাপক কর্মপরিধি ও ইবাদতের অবিচ্ছিন্ন ধারার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, একজন মুসলিমের জীবনে প্রকৃত অর্থে ‘অবসর সময়’ কোথায়? ইসলামী জীবনদর্শনে ‘অবসর’ শব্দটির অর্থকে তাই ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়। মুসলিমের জীবনে অবসর মানে দায়িত্বমুক্তির সময় নয়, বরং এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বে স্থানান্তরের মুহূর্ত। এটি একটি ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে রূপান্তরের সময়। যখন সে দৈহিক কোনো কাজ থেকে মুক্তি পায়, তখন সে মানসিক, আত্মিক অথবা জ্ঞানগত ইবাদতে মনোনিবেশ করে।

বিনোদনের ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

উপরের আলোচনাতে এ কতা ষ্পষ্ট যে মুমিনের জীবন কোন অবসর নাই। অবসর নাই মানেই তার কোন বিনোদন নাই। ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি বিনোদনের পরিধি ও সঙ্গা আলাদা। কঠোর পরিশ্রমের পর বিশ্রাম নেওয়াও আল্লাহর হক আদায় ও পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে ইবাদতে পরিণত হতে পারে। এমনকি, হালাল উপায়ে বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তাও অর্থহীন থাকে না।

অর্থাত মুমিনে বিনোদন ও ইবাদত। যখন মুমিন হবে তখনই ভিন্ন আঙ্গিতে ভিন্ন পন্থায় কুরআন সুন্নাহর অনুসরের ইবাদতে লিপ্ত হবে। আল্লাহ বলেন-

فَاِذَا فَرَغۡتَ فَانۡصَبۡ ۙ

অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। সুরা ইনশারাহ : ৭

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুমিনের জীবনদর্শনের গভীর দিকটি উন্মোচিত হয়। এই আয়াতটি কঠোরভাবে উপদেশ দেয় যে, মুমিন ব্যক্তি এক কাজ শেষ করার পর যেন কোনো প্রকার আলস্যে গা ভাসিয়ে না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে।

দুনিয়াবি কাজ থেকে অবসর পেলে যেন আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ, জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা শেষ হলে তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত, বা যিকিরে মনোনিবেশ করা। মুমিনের কাছে কঠোর পরিশ্রমের পর যে বিশ্রাম (হালাল বিনোদন, ঘুম, পরিবারের সাথে সময় কাটানো) আসে, তা পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে করা হলে তা-ও এক প্রকারের ইবাদতে পরিণত হয়। কারণ, শরীর ও মনকে চাঙ্গা না রাখলে সঠিকভাবে ইবাদত করা সম্ভব নয়। রাসূল (সাঃ)-এর জীবনযাপন এর উজ্জ্বল প্রমাণ, যেখানে তিনি বিশ্রাম ও হালাল বিনোদনের মাধ্যমে ইবাদতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতেন। সুতরাং, মুমিনের জীবনে “অবসর” বলতে অর্থহীনভাবে বা উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় নষ্ট করা বোঝায় না, বরং এর অর্থ এক প্রকারের ‘ট্রানজিশনাল পিরিয়ড’ বা এক ইবাদত থেকে অন্য ইবাদতে যাওয়ার বিরতি। এই বিরতির সময় হালাল বিনোদন বা বিশ্রামও যদি সওয়াবের নিয়তে করা হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে অর্থহীন থাকে না, বরং ইবাদতেরই ভিন্ন এক আঙ্গিক হয়ে দাঁড়ায়। মুমিনের জীবন তাই বিনোদনের নামে প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে, কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী ভিন্ন পন্থায় ইবাদতে লিপ্ত থাকে।

ইসলামী জীবনবোধের মূল কথা হলো, একজন মুসলিম তো সর্বদা মনেপ্রাণে এই প্রত্যাশা লালন করবে এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে যে, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে নিবেদিত হয়। এই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন-

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

আর আমি জিন ও মানবকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। কুরআন ৫১: ৫৬

এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যই হলো ইবাদত। আর ইবাদত শুধু আনুষ্ঠানিক সালাত, সিয়াম বা হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি বৈধ কাজ, যদি আল্লাহর নির্দেশিত পথে এবং তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে তা ইবাদতে গণ্য হয়।

মুমিনের অবসর সময়ও তার ঈমানের আলোয় পরিচালিত হয়। সে অবসরে এমন কাজ করে, যা হয় ইবাদতের অংশ, নয়তো ইবাদতের সহায়ক। ইবাদাহ মানে হলো—

আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করা। একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। এ উদ্দেশ্যে সাধনে এবং প্রতিটি কাজ কুরআন সুন্নাহ সীমারেখার মধ্যে রাখতে আমরা নিচে তিনটি নিয়ম মেনে চলব। যথা-

* আমরা পৃথিবীতে আল্লাহর দাস হিসেবে তার সন্তুষ্টির কাজ করব।  

* তিনি যা হালাল করেছেন, তা করব।

* তিনি যা হারাম করেছেন, তা থেকে দূরে থাকব।

এই দাসত্ব বা আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করার নামই হলো ইসলাম। আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সারাদিন কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতে (সালাত, সিয়াম) মগ্ন থাকার প্রয়োজন নেই। বরং, যখন আমরা আল্লাহর দেওয়া শরীয়তের (সীমা বা বিধান) মধ্যে থেকে, আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন পার্থিব কাজগুলো করি, তখন সেই কাজগুলোও ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন-

১. পরিবারকে খাওয়ানোর জন্য চাকরি বা ব্যবসা করা ইবাদত:

হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জন করা এবং এর মাধ্যমে পরিবার-পরিজনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানো ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যখন একজন মুমিন এই কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং রাসূল ﷺ-এর নির্দেশিত পথে সততার সাথে ব্যবসা বা চাকরি করে, তখন তার এই কঠোর পরিশ্রম একটি মহৎ ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে। এটি শুধু পার্থিব কাজ থাকে না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত দায়িত্ব পালন হিসেবে গণ্য হয়।

কাব ইবনু উজরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ﷺ- এর নিকট দিয়ে এক ব্যক্তি গমন করলো। রাসূলুল্লাহ ﷺএর সাহাবাগণ তার কর্মস্পৃহা ও শক্তি দেখে বললেন, “”হে আল্লাহর রাসূল! যদি এই কর্মতৎপরতা আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদে) হতো! তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন-

যদি সে তার ছোট সন্তানদের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে বার্ধক্যে উপনীত বাবা-মায়ের জন্য চেষ্টা করতে বের হয়, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। যদি সে নিজেকে (হারাম থেকে) পবিত্র রাখার জন্য চেষ্টা করে, তবে সে আল্লাহর পথে আছে। আর যদি সে লোক-দেখানো ও অহংকার করার জন্য বের হয়, তবে সে শয়তানের পথে আছে। আল-মুজামুল কাবীর, তাবারানী : ৭১৬৬. সহীহ ইবনে হিব্বান : ৪৩৬৪

২. পরিশ্রমের পর শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য ঘুমানো ইবাদত:

 আল্লাহ আমাদের শরীরকে একটি আমানত হিসেবে দিয়েছেন। দিনের কাজের শেষে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম দিয়ে শরীরকে সতেজ রাখা এই আমানতের হক আদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ঘুমানোর আগে যদি আল্লাহর নাম নেওয়া হয় এবং এই নিয়ত করা হয় যে, এর মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে পরের দিন আরও মনোযোগের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালন করা হবে, তবে এই ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়। সুস্থতা ইবাদতের পূর্বশর্ত।

আবূ জুহাইফাহ (রাঃ)-এর পিতা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালমান ও আবূ দারদা (রাঃ)-এর মধ্যে ভ্রাতৃ বন্ধন স্থাপন করেন। এরপর একদিন সালমান আবূ দারদা-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। তখন তিনি উম্মু দারদা (রাঃ)-কে নিম্নমানের পোশাকে দেখতে পেলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার কী হয়েছে? তিনি বললেনঃ তোমার ভাই আবূ দারদার দুনিয়াতে কিছুর দরকার নেই। ইতোমধ্যে আবূ দারদা এলেন। অতঃপর তার জন্য খাবার তৈরি করে তাঁকে বললেন, আপনি খেয়ে নিন, আমি তো সিয়াম পালন করছি।’ তিনি বললেনঃ আপনি যতক্ষণ না খাবেন ততক্ষণ আমিও খাব না। তখন তিনিও খেলেন। তারপর যখন রাত হলো, তখন আবূ দারদা সালাতে দাঁড়ালেন। তখন সালমান তাঁকে বললেনঃ আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। তিনি শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে আবার উঠে দাঁড়ালে, তিনি বললেনঃ (আরও) ঘুমান। অবশেষে যখন রাত শেষ হয়ে এল, তখন সালমান বললেনঃ এখন উঠুন এবং তারা উভয়েই সালাত আদায় করলেন। তারপর সালমান বললেনঃ তোমার উপর তোমার রবের হক আছে, (তেমনি) তোমার উপর তোমার হক আছে এবং তোমার স্ত্রীরও তোমার উপর হক আছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক হকদারের দাবী আদায় করবে। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে, তাঁর কাছে তার কথা উল্লেখ করলেনঃ তিনি বললেন, সালমান ঠিকই বলেছে। সহিহ বুখারি : ৬১৩৯

৩. আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে হালাল খাদ্য গ্রহণ করে শুকরিয়া আদায় করা ইবাদত:

হালাল খাবার গ্রহণ করা এবং প্রতিটি লোকমার জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। খাবার গ্রহণের আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা এবং শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শোকর আদায় করা—এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ইবাদতের অংশ। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে স্বীকার করে এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে, যা তার রুহানিয়াতকে আরও শক্তিশালী করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ کُلُوۡا مِمَّا فِی الۡاَرۡضِ حَلٰلًا طَیِّبًا ۫ۖ وَّلَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّہٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

হে মানুষ, যমীনে যা রয়েছে, তা থেকে হালাল পবিত্র বস্তু আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট শত্রু। সুরা বাকারা : ১৬৮

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ

আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন’। সুরা ইবরাহিত : ৭

৪. মানুষের সেবা করা ও উপকার করা:

মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও দয়া প্রদর্শন করা এবং তাদের বিপদাপদে সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। শারীরিক, আর্থিক বা মানসিক যে কোনো উপায়ে একজন মুমিনের কষ্ট দূর করা বা তার প্রয়োজন মেটানো একটি উচ্চ মর্যাদার ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

 ؕ وَمَنۡ اَحۡیَاہَا فَکَاَنَّمَاۤ اَحۡیَا النَّاسَ جَمِیۡعًا ؕ

وَلَقَدۡ جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُنَا بِالۡبَیِّنٰتِ ۫ ثُمَّ اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنۡہُمۡ بَعۡدَ ذٰلِکَ فِی الۡاَرۡضِ لَمُسۡرِفُوۡ

আর যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে রক্ষা করল, তাহলে সে যেন সমস্ত মানুষকে রক্ষা করল। সুরা মায়িদা : ৩২

আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর জুলুম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে,আল্লাহ তার অভাব পূরণ করবেন।যে কেউ তার মুসলিম ভাইয়ের বিপদ দুর করবে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলিমের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন। সহিহ বুখারি : ২৪৪২, ৬৯৫১

৫. জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষাদান:

দ্বীনী জ্ঞান (কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান) এবং উপকারী দুনিয়াবি জ্ঞান (যা মানুষের কল্যাণে আসে) অর্জন করা উভয়ই মুমিনের জন্য আবশ্যক। জ্ঞান অর্জন যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয় এবং তা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ইবাদত। এই জ্ঞান অন্যকে শিক্ষাদান করা বা সৎকাজে উৎসাহিত করাও সাদকায়ে জারিয়া বা চলমান সওয়াব হিসেবে পরিগণিত হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

ہَلۡ یَسۡتَوِی الَّذِیۡنَ یَعۡلَمُوۡنَ وَالَّذِیۡنَ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ؕ  اِنَّمَا یَتَذَکَّرُ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ 

‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে। সূরা যুমার : ৯

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

«وَمَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الجَنَّةِ

যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।সহিহ মুসলিম : ২৬৯৯

৬. পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন:

পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের প্রতি দয়া ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) সর্বোচ্চ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এসব দায়িত্বকে আল্লাহর আদেশ মনে করে পালন করলে প্রতিটি আচরণ ইবাদতের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়। সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিবেশীর হক আদায় করা এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাও ইবাদত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارً

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন হতে বাঁচাও। সুরা তাহরিম : ৬

‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। সহিহ বুখারি : ২৫৫৪

৭. সময়মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষা

শরীয়তের নির্দেশিত পথে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যেমন – অজু করা, গোসল করা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আবূ মালিক আল আশ’আরী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পবিত্রতা হল ঈমানের অর্ধেক অংশ। আলহামদু লিল্লাহ’ মিযানের পরিমাপকে পরিপূর্ণ করে দিবে এবং “সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লা-হ” আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দিবে। সালাত’ হচ্ছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি। সাদাকা হচ্ছে দলীল। ধৈর্য হচ্ছে জ্যোতির্ময়। আর “আল কুরআন’ হবে তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে প্রমাণ স্বরূপ। বস্তুতঃ সকল মানুষই প্রত্যেক ভোরে নিজেকে আমলের বিনিময়ে বিক্রি করে। তার আমল দ্বারা সে নিজেকে (আল্লাহর আযাব থেকে) মুক্ত করে অথবা সে তার নিজের ধ্বংস সাধন করে। সহিহ মুসলিম : ২২৩

পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ, এই বিশ্বাসে সুস্থ থাকার জন্য প্রচেষ্টা করাও ইবাদত, কারণ সুস্থ শরীর ইবাদত পালনে এবং দ্বীনের খেদমতে আরও বেশি সক্ষমতা যোগায়। অসুস্থতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা আল্লাহর আমানতের প্রতি যত্নশীল হওয়ারই নামান্তর।

হালাল উপায়ে বিনোদনও ইবাদত

আল্লাহর দেওয়া সীমারেখার মধ্যে থেকে মনকে সতেজ করার জন্য এবং ইবাদতের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার জন্য বৈধ বিনোদন করা ইবাদত হতে পারে। যেমন: পরিবারকে সময় দেওয়া, বৈধ খেলাধুলা করা বা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা। যদি এর মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া দেহকে সতেজ রেখে পরবর্তী ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের নিয়ত থাকে, তবে এই সতেজতা অর্জনের প্রক্রিয়াটিও ইবাদতে পরিণত হয়।

আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আমার ঘরের দরজায় দেখলাম। তখন হাবশার লোকেরা মসজিদে (বর্শা দ্বারা) খেলা করছিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে আড়াল করে রাখছিলেন। আমি ওদের খেলা অবলোকন করছিলাম। সহিহ বুখারি : ৪৫৪, ৪৫৫, ৯৫০, ৯৮৮, ২৯০৬, ৩৫২৯, ৩৯৩১, ৫১৯০, ৫২৩৬

মুসলিমের জীবন হলো এক নিরবচ্ছিন্ন ইবাদতের ধারা, এক দায়িত্ব থেকে অন্য দায়িত্বের সেতু। এখানে আলস্য বা উদ্দেশ্যহীন কর্মহীনতার কোনো স্থান নেই। সময়কে অর্থহীন করার অর্থ হলো সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া। আর এই বিচ্যুতিই মানুষকে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগত অকর্মণ্যতার দিকে ঠেলে দেয়, যা বর্তমান সময়ের কর্মবিমুখতার প্রধান কারণ। একজন প্রকৃত মুসলিম তার জীবনের প্রতিটি ‘অবসর’ সময়কেও আল্লাহর ইবাদত ও দ্বীনের খেদমতে ব্যয় করে, ফলে তার জীবনে ‘অবসর’ কেবল সময়ের সার্থক ব্যবহারেরই নামান্তর। এভাবে, ইসলামী জীবনব্যবস্থা একজন মুসলিমকে প্রতিটি মুহূর্তে কর্মোদ্দীপক ও উদ্দেশ্যমুখী রাখে, তাকে অর্থহীনতার হাত থেকে রক্ষা করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষণকে আল্লাহর পথে কাজে লাগানোর প্রেরণা যোগায়। এটাই মুসলিম জীবনে অবসর সময়ের প্রকৃত তাৎপর্য।

তবে এর মানে এই নয় যে মুমিন কখনো অবসর বা বিশ্রাম নেয় না। বরং ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। তাই কাজের পর কিছু সময় বিশ্রাম নেওয়া, মনকে সতেজ রাখা, শরীরকে শক্তিশালী করা, এসবই মুমিনের জীবনের অংশ। তবে এই “অবসর” সময়ও সে আল্লাহর সীমার মধ্যে কাটায়, তাই তার অবসর কখনোই অর্থহীন নয়। মুমিন যখন তার অবসর কুনআন ও সুন্নাহ সীমরেখার মাধ্যমে ব্যয় করে তবে নিশ্চিত রূপে ইবাদত হবে। মুমিনের প্রতিটি মুহুর্ত দাবি। তাই মুমিনের অবসর, বিনোদন, উপভোগ, আমদ-প্রমদ সব কিছুই  আল্লাহ সীমারেখার মধ্য হওয়া জরুরি। কেননা তার প্রতি মুহুর্ত হিসেব প্রদানে জন্য লেখা হচ্ছে। বলা যায়, মুমিনের জীবন উপভোগ, চিত্তবিনোদন বা বৈচিত্র্যের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ

আর আমি আকাশ ও পৃথিবী এবং যা তাদের মধ্যে আছে তা খেল-তামাশার ছলে সৃষ্টি করিনি। কুরআন : ১৬

মুমিন ও কাফিরের অবসরের সময়ের পার্থক্য

একজন মুমিন ব্যক্তি তার সময়কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যবহার করে। তার জীবনের প্রতিটি কাজের উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ফলে তার অবসর সময়ও খুব সীমিত হয়ে যায়। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে চায় সেই সময়কে ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইসলামি জ্ঞান অর্জন, পরিবারের হক আদায় বা সমাজসেবার মাধ্যমে কাজে লাগাতে।

অন্যদিকে একজন অবিশ্বাসী বা বিধর্মী তার অবসর সময়কে শুধুমাত্র দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসে ব্যয় করে। সে সিনেমা, গান, নাচ, ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কারণ তার কাছে জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস।

১. মুমিন ও কাফিরের অবসর সময়ের ব্যবহারের পার্থক্য

ইসলামী জীবনদর্শনে একজন মুমিন (বিশ্বাসী) এবং একজন কাফিরের (অবিশ্বাসী/বিধর্মী) জীবনবোধ, উদ্দেশ্য এবং সময় ব্যবহারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। অবসর সময়ের ব্যবহার এই পার্থক্যকে বিশেষভাবে প্রতিফলিত করে। মুমিনের জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের সফলতাকে কেন্দ্র করে, যেখানে কাফিরের জীবনের লক্ষ্য সাধারণত হয় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবি ভোগ-বিলাস।

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
মূল ভিত্তিশরীয়তের সীমারেখা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা।ভোগবাদিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। নৈতিক বা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই।
উদ্দেশ্য-১মুমিনের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালীন জীবনের (আখিরাত) জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।কাফিরের কাছে জীবন হলো একবারই পাওয়া, তাই জীবনের লক্ষ্য হলো শুধুই ভোগ-বিলাস এবং দুনিয়াবি আনন্দ-উল্লাসকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।
উদ্দেশ্য-২দেহ ও মনের সতেজতা, ইবাদতের জন্য শক্তি সঞ্চয়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা।তাৎক্ষণিক আনন্দ ও আত্ম-সন্তুষ্টি। প্রায়শই মানসিক ও শারীরিক ক্ষতির দিকে ধাবিত করে।
সময়ের ধারণামুমিন সময়কে আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে পুণ্যময় কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তার কাছে অবসর সময়ও ইবাদতের একটি অংশ।কাফির বা অবিশ্বাসীর কাছে সময় কেবলই ক্লান্তি বা কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যম। এই সময়ে তারা কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহিতা অনুভব করে না।
সাধারণ রূপপরিবার নিয়ে হালাল স্থানে ভ্রমণ, শরীর চর্চা/খেলাধুলা (হালাল নিয়মে), হালাল আড্ডা, ইসলামী জ্ঞান অর্জন (বই পড়া), প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, জিকির-তিলাওয়াত ও চিন্তন-মনন।সঙ্গীত (হারাম উপাদানযুক্ত), মদ্যপান, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদকের ব্যবহার, কুরুচিপূর্ণ প্রদর্শনী।
ফলাফলমানসিক শান্তি লাভ, ইমান বৃদ্ধি এবং আখিরাতের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা।পাপের পথে ধাবিত হওয়া, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মানসিক অস্থিরতা ও আসক্তি।

২. অবসর সময়ের ব্যবহার ও কার্যকলাপ

মুমিন ব্যক্তি তার অবসর সময়কে এমন কাজে নিয়োজিত করে যা তার আত্মার খোরাক জোগায় এবং পরকালে উপকারে আসে। কর্মঘণ্টার পর অবসর সময় পেলেও সে সেই সময়কে ফলপ্রসূ ও ভারসাম্যপূর্ণ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।

মুমিনের অবসর কার্যকলাপ (হালাল বিনোদন ও ফলপ্রসূ কাজ)কাফিরের অবসর কার্যকলাপ (হারাম ও ভোগবাদী বিনোদন)
আধ্যাত্মিক উন্নয়ন: কুরআন তিলাওয়াত, আল্লাহর জিকির, নফল ইবাদত বা ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা।ভোগবাদী আনন্দ: সিনেমা, গান, নাচ, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো বা অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত হওয়া।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক হক আদায়: পরিবারের হক আদায় করা, স্ত্রী-সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের সাথে ফলপ্রসূ খেলাধুলা করা। এটিও মুমিনের জন্য ইবাদত।অবাধ্যতা ও পাপ: মদ, জুয়া, অশ্লীলতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বা নৈতিকতাহীন কাজে সময় নষ্ট করা।
সৃজনশীলতা ও সমাজসেবা: ইসলামি সাহিত্য চর্চা, সমাজসেবা, অভাবীকে সাহায্য করা, জনকল্যাণমূলক কাজে সময় দেওয়া, বা হালাল শখ পূরণ করা।সময় ও সম্পদের অপচয়: অর্থহীন বা ক্ষতিকর গেমিং, চরম বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং সম্পদ ও মূল্যবান সময়ের চূড়ান্ত অপচয় করা।
শারীরিক সুস্থতা: হালাল উপায়ে শরীরচর্চা করা, যা তাকে ইবাদতের জন্য শক্তিশালী করে তোলে।স্বাস্থ্যের ক্ষতি: এমন কাজ করা যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর, যেমন নেশা বা অতিরিক্ত অনিরাপদ অভ্যাস।

৩. ইসলামি বিধিবিধানের পার্থক্য

ক্ষেত্রমুসলিমের বিনোদন (হালালের পথে)কাফিরের বিনোদন (হারামের পথে)
 বিধিবিধানমুমিন শরীয়তের সীমান থেকে অবসর কাটায় বিধান সে হারাম বিষয় থেকে দূরে থাকতে বলে।কাফিরের হারাম হালাল বিধানের বাধ্যবাধকরা নাই। তাই সে অশ্লীলভাবে অবসর কাটায়।  
বিনোদনের পদ্ধতিপরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে হালাল আড্ডা, শরীর চর্চা বা খেলাধুলা, ইসলামী বই পড়া জিকির, তিলাওয়াত ও চিন্তা-মননে নিজেকে প্রশান্ত করা, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো ইত্যাদিমাদকদ্রব্য ও নেশা সেবন, জুয়া ও বাজি ধরা, অশ্লীল চলচ্চিত্র ও পর্ণোগ্রাফি দেখা, কুরুচিপূর্ণ বা হারাম গান ও বাদ্যযন্ত্র শোনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প বা হাসি-ঠাট্টা, অশালীন পোশাক পরিধান ও প্রদর্শনী, সময় নষ্ট করা হয় এমন অনর্থক খেলাধুলা, জাদুটোনা ও ভাগ্য গণনা: ভাগ্য গণনাকারী ইত্যাদি।
ফলাফলঅবসর শেষে মুমিনের মনে আসে মানসিক শান্তি ও আত্মতৃপ্তি, কারণ সে জানে যে এই সময়টি সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করেছে। তার অবসর জীবন তাকে কর্ম ও ইবাদতের জন্য আরও বেশি সতেজ ও প্রস্তুত করে তোলে।  কাফিরের অবসর সময় তাকে হয়তো ক্ষণিকের উত্তেজনা বা শারীরিক আনন্দ দেয়, কিন্তু এর ফলস্বরূপ প্রায়শই তার মনে শূন্যতা, একঘেয়েমি, মানসিক অশান্তি এবং পাপের গ্লানি থেকে যায়।

মুমিনের অবসর হলো আল্লাহর পথে চলার জন্য একটি ‘বিশ্রাম ও রিচার্জ’ প্রক্রিয়া, যেখানে মুমিনের প্রতিটি হালাল কাজও নেকিতে পরিণত হয়। আর কাফিরের অবসর হলো শুধুমাত্র দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লোভ ও জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম, যা তাকে পরকালীন জীবনের সফলতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। মুমিন তার সময়কে ‘ইনভেস্ট’ করে, আর কাফির তার সময়কে ‘খরচ’ করে।

ইবাদত ও বিনোদনে ভারসাম্য রক্ষা

ইসলামী জীবনদর্শনে মানুষের সামগ্রিক কল্যাণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে ফেরেশতাদের মতো কেবল একমুখী ইবাদত বা নিরবচ্ছিন্ন উপাসনার জন্য সৃষ্টি করেননি। বরং তিনি আমাদের শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের চাহিদা দিয়েই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই চাহিদাসমূহের মধ্যে আছে বিশ্রাম, আত্মতৃপ্তি এবং চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন। মানুষের এই সহজাত প্রবৃত্তি উপেক্ষা করে যদি আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত-বন্দেগি ও গম্ভীর কাজে ডুবে থাকি, তবে এর ফলস্বরূপ আমাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তির দ্রুত ক্ষয় ঘটবে। একঘেয়েমি চলে আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদী ইবাদত চালিয়ে যেতে কষ্টকর করে তুলবে। এর ফলে একসময় মানসিক হতাশা, অসুস্থতা বা ইবাদতে অনীহা দেখা দিতে পারে।

ইসলাম মানুষের প্রকৃতির এই দিকটিকে পুরোপুরি স্বীকার করে। এ কারণেই প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ স্বয়ং নিরবচ্ছিন্নভাবে কেবল ইবাদত করতে নিষেধ করেছেন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর জীবনাচারই মুমিনদের জন্য উত্তম আদর্শ। এই ভারসাম্য রক্ষার নীতির সমর্থনে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস হলো-

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদা তিন ব্যক্তি নাবী ﷺ এর ‘ইবাদাতের অবস্থা জানার জন্য তাঁর স্ত্রীগণের নিকট এলে। নাবী ﷺ এর ইবাদাতের খবর শুনে তারা যেন তাঁর ইবাদাতকে কম মনে করলেন এবং পরস্পর আলাপ করলেন: নাবী ﷺ এর সঙ্গে আমাদের তুলনা কোথায়, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আগের-পরের (গোটা জীবনের) সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতঃপর তাদের একজন বললেন, আমি কিন্তু সারা রাত সলাত আদায় করবো। দ্বিতীয়জন বললেন, আমি দিনে সিয়াম পালন করবো, আর কখনো তা ত্যাগ করব না। তৃতীয়জন বললেন, আমি নারী থেকে দূরে থাকব, কখনো বিয়ে করবো না। তাদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার সময় নবী ﷺ এসে পড়লেন এবং বললেন, তোমরা কী ধরনের কথাবর্তা বলছিলে? আল্লাহ্‌র কসম! আমি আল্লাহ্‌কে তোমাদের চেয়ে বেশী ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশী পরহেয করি। কিন্তু এরপরও আমি কোন দিন সিয়াম পালন করি আবার কোন দিন সিয়াম পালন করা ছেড়ে দেই। রাতে সলাত আদায় করি আবার ঘুমিয়েও থাকে। আমি বিয়েও করি। সুতরাং এটাই আমার সুন্নাত (পথ), যে ব্যক্তি আমার পথ থেকে বিমূখ হবে সে আমার (উম্মাতের) মধ্যে গণ হবে না। সহিহ বুখারী : ৫০৬৩, সহিহ মুসলিম ১৪০১

এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামে কঠোরতা বা সন্ন্যাসবাদের কোনো স্থান নেই। রাসূল ﷺ নিজে আল্লাহর সর্বাধিক ভয়কারী হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি তাঁর উম্মতকেও জীবনের বিভিন্ন দিকের দাবি পূরণ করতে উৎসাহিত করেছেন—একদিকে যেমন আল্লাহর হক (ইবাদত), অন্যদিকে তেমনি নিজের হক (বিশ্রাম, ঘুম) এবং পরিবারের হক (বিয়ে ও সামাজিক জীবন) আদায় করতে শিখিয়েছেন। অতিরিক্ত কঠোরতার মাধ্যমে ভারসাম্য নষ্ট করার প্রবণতাকে তিনি তাঁর পথ থেকে বিমুখতা হিসেবে গণ্য করেছেন।

তাই, একজন বুদ্ধিমান মুমিন তাঁর জীবনে এই ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি জানেন যে, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি নিয়ে ইবাদত করলে তাতে মনোযোগ আসে না এবং ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য (আল্লাহর সাথে নৈকট্য স্থাপন) ব্যাহত হয়। তাই তিনি আল্লাহর অনুমোদিত উপায়ে মাঝে মাঝে বিরতি নেন ও বিনোদন করেন। এই বিরতি বা বিনোদনকে ইসলামী পরিভাষায় ‘মুরাওয়াহাতুন নাফস’ (আত্মার প্রশান্তি) বলা যেতে পারে। হালাল বিনোদন মুমিনের শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যম, যা তাকে সতেজ করে পুনরায় দ্বীনী ও দুনিয়াবী দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে।

এই বিনোদনের অর্থ এই নয় যে তা ইবাদতের সময়কে বা দায়িত্বকে নষ্ট করবে, বরং তা এমন হওয়া চাই যা শরীয়তের সীমারেখা মেনে চলে এবং মুমিনকে আরও উদ্যমের সাথে আল্লাহমুখী করে তোলে। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, খেলাধুলা, বৈধ ভ্রমণ, বা কোনো সুস্থ বিনোদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ—এ সবই ক্লান্তি দূর করে মনকে সতেজ করার মাধ্যম। যখন একজন মুমিন এই বিশ্রাম ও বিনোদনের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরবর্তীতে আরও উদ্যমের সাথে ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের নিয়ত করে, তখন এই বিরতিও নেক আমল হিসেবে গণ্য হতে পারে। এভাবে, ইবাদত ও বিনোদনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একজন মুমিন একটি সুস্থ, সফল এবং সন্তোষজনক জীবন অতিবাহিত করতে পারে, যা ইহকাল ও পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই কল্যাণ বয়ে আনে।