পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: তৃতীয় কিন্তি

পাশ্চাত্য বিনোদনের এপিঠ ওপিঠ: তৃতীয় কিন্তি

মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন

ইসলামি দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেদের অগ্রগামী, উদার ও প্রগতিশীল বলে দাবি করলেও বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রযুক্তির অগ্রগতি, মিডিয়ার শক্তি এবং বস্তুবাদী চিন্তার প্রভাবে পশ্চিমা সমাজ আজ অশ্লীলতা ও কুরুচির গভীর গহ্বরে নিমজ্জিত। বিনোদনের নামে সেখানে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অশ্লীল সংস্কৃতি—যার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে নৈতিকতা, হায়া ও আল্লাহভীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া। তাদের অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদনের আগ্রাসন শুধু নৈতিকতা নয়, বরং ইসলামী সমাজব্যবস্থার মূল কাঠামোকেই ধ্বংস করছে। ইসলাম যে সমাজে পবিত্রতা, হায়া, তাকওয়া ও পারিবারিক বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে একটি সুশৃঙ্খল জীবন গঠন করতে চায়, পাশ্চাত্যের বিনোদন সংস্কৃতি তা ভেঙে দিয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধরনের বিনোদন কেবল সময়ের অপচয় নয়; বরং তা মানুষের ঈমান, চরিত্র ও সমাজব্যবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিচে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে ইসলামী দৃষ্টিতে কিছু ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলো।

১. হায়া (লজ্জা) ধ্বংস হয়ে যাওয়া

ইসলামে লজ্জা বা হায়া ঈমানের অন্যতম শাখা। এটি মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং নৈতিকতার মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন হায়াকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের সিনেমা, নাটক, বিজ্ঞাপন, গান ও সামাজিক মাধ্যম এমনভাবে নোংরামিতে ভরপুর যে, মানুষ নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতাকে সংস্কৃতি হিসেবে গ্রহণ করছে।

২৪. আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাযি.) হতে বর্ণিত। একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আনসারীর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি তাঁর ভাইকে তখন (অধিক) লজ্জা ত্যাগের জন্য নাসীহাত করছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেনঃ ওকে ছেড়ে দাও। কারণ লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। সহিহ বুখারি : ২৪, ৬১১৮, সহিহ মুসলিম : ৩৬, আহমাদ : ৪৫৫৪

আবূ মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পূর্ববর্তী নবীদের (নবীদের) নাসীহাত থেকে মানুষ যা লাভ করেছে তার একটা হলো, যদি তুমি লজ্জাই না কর, তবে যা ইচ্ছে তাই কর।[সহিহ বুখারি : ৬১২০

অতএব, লজ্জা হারিয়ে গেলে মানুষ যে কোনো পাপে জড়িয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যে আজ পোশাক-আচরণে নির্লজ্জতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাপকে তারা আর পাপ মনে করে না—এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ নৈতিক পতন।

২. চোখ ও হৃদয়ের পবিত্রতা নষ্ট হওয়া

ইসলাম মানুষকে চোখ নামানোর নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, চোখ হলো হৃদয়ের দরজা। হারাম দৃশ্য দেখা হৃদয়ে কামনা-বাসনা জাগায় এবং জিনা-ব্যভিচারের পথ খুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা নূর, : ৩০

অশ্লীল সিনেমা, ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক মাধ্যমের দৃশ্য মানুষকে এই ঐশী নির্দেশনা ভুলিয়ে দিয়েছে। এর ফলে হৃদয়ে হারাম ভালোবাসা, কামনা ও বিকৃতি জন্ম নিচ্ছে। মানুষ বাস্তব ভালোবাসার পরিবর্তে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে, যা মানসিক বিকার ও হতাশা তৈরি করছে।

৩. জিনা ও ব্যভিচারের প্রসার

অশ্লীলতা কখনো একা থাকে না; এটি সবসময় জিনার দিকে নিয়ে যায়। এজন্য ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি, বরং তার কাছাকাছি যাওয়া থেকেও সতর্ক করেছে।

আল্লাহ বলেন—

وَلَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّہٗ کَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَسَآءَ سَبِیۡلًا

তোমরা অবৈধ যৌন সংযোগের নিকটবর্তী হয়োনা, ওটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ। সূরা ইসরা : ৩২

অশ্লীল বিনোদন, পর্নোগ্রাফি, আধুনিক ফ্যাশন ও অবাধ মেলামেশার সংস্কৃতি মানুষকে ধীরে ধীরে এই নিষিদ্ধ পথে টেনে নিচ্ছে। পাশ্চাত্যে বিবাহের হার কমে যাচ্ছে, আর অবৈধ সম্পর্ক ও সন্তান জন্মের হার ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে। ইসলাম যেসব বিষয় সমাজ থেকে দূর করতে চায়, পাশ্চাত্যের এই বিনোদন সংস্কৃতি সেগুলোকেই স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।

৪. আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া হারানো

যে সমাজে মানুষ ক্রমাগত অশ্লীলতার চর্চা করে, সে সমাজ থেকে আল্লাহভীতি ও তাকওয়া হারিয়ে যায়। পাপকে যখন মানুষ বিনোদন মনে করে, তখন তার হৃদয় কঠিন হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

کَلَّا بَلۡ ٜ رَانَ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ مَّا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ

বরং তারা যা অর্জন করে, তা তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দেয়। সূরা মুতাফ্ফিফীন : ১৪

অশ্লীল বিনোদন এই “মরিচা”-র মতো হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে মানুষ নামাজ, কুরআন ও ইবাদতের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। তাকওয়াবোধ হারিয়ে গেলে মানুষ পাপকে লজ্জাজনক নয় বরং উপভোগ্য মনে করে। এই অবস্থা সমাজের আধ্যাত্মিক মৃত্যু ডেকে আনে।

৫. সমাজে ফিতনা ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার

অশ্লীলতা শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকেও কলুষিত করে। এটি ফিতনা সৃষ্টি করে, যার প্রভাব নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ—সবার ওপর পড়ে। ইসলামের দৃষ্টিতে যারা অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয় বা তাতে অংশগ্রহণ করে, তারা আল্লাহর কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা নূর : ১৯

অশ্লীলতার প্রসার সমাজে ফিতনার দরজা খুলে দেয়—বিবাহ বিচ্ছেদ, পরকীয়া, যৌন অপরাধ, নারী নির্যাতন, পারিবারিক ভাঙন, এবং মানসিক অশান্তি তার ফল। পশ্চিমা সমাজ আজ এই ভয়াবহ পরিণতির শিকার, কারণ তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করেছে।

৬. পরিবার ব্যবস্থা ধ্বংস ও বিবাহ-বিচ্ছেদ বৃদ্ধি

ইসলাম পরিবারকে সমাজের মূল ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করেছে। পরিবারেই গড়ে ওঠে নৈতিকতা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। কিন্তু অশ্লীল বিনোদন সেই পরিবার ব্যবস্থাকেই নষ্ট করে দিচ্ছে।

অশ্লীল দৃশ্য, সিরিজ, সিনেমা ও সামাজিক মাধ্যম মানুষকে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক থেকে বিমুখ করছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হচ্ছে, পরকীয়া ও সন্দেহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পাশ্চাত্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ, একক মাতৃত্ব ও অবৈধ সন্তান জন্মের হার ভয়াবহভাবে বেড়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً 

তাঁর নিদর্শনসমূহের একটি হলো—তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন। সূরা আর-রূম : ২১

অশ্লীল সংস্কৃতি এই দয়া ও ভালোবাসাকে হত্যা করে দিয়েছে। বিনোদনের নামে ব্যভিচার ও অবিশ্বস্ততা পরিবার ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে, যা ইসলামী দৃষ্টিতে এক মহাপাপ।

৭. তরুণ প্রজন্মের নৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়

তরুণ প্রজন্ম হলো জাতির ভবিষ্যৎ। ইসলাম তাদেরকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও তাকওয়ার পথে আহ্বান করেছে। কিন্তু অশ্লীল বিনোদন তাদের মনোজগতে এমনভাবে প্রভাব ফেলছে যে, তারা জীবনকে উদ্দেশ্যহীন আনন্দের খেলায় পরিণত করছে।

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৬, সহীহাহ : ৯৪৬

অশ্লীল বিনোদন তরুণদের সেই যৌবনকে নষ্ট করছে। তারা পড়াশোনা, ইবাদত ও আত্মগঠনের পরিবর্তে পর্নোগ্রাফি, নোংরা গেম ও অবাধ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে মগ্ন হয়ে পড়ছে। এতে তাদের মন ও চরিত্র উভয়ই দুর্বল হচ্ছে।

৮. নারীকে পণ্যে পরিণত করা ও মর্যাদা হরণ

ইসলাম নারীর মর্যাদাকে অতি উচ্চ আসনে স্থাপন করেছে। তিনি মা, কন্যা, বোন, স্ত্রী—প্রত্যেক ভূমিকায় সম্মানের দাবিদার। কিন্তু পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন নারীকে কেবল ভোগ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তার সৌন্দর্য, দেহ ও রূপকে পণ্যের মতো বিক্রি করা হচ্ছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ اٰدَمَ وَحَمَلۡنٰہُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ وَرَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَفَضَّلۡنٰہُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا

আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিয্ক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমি তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি। সূরা ইসরা :৭০

এই সম্মান ইসলাম দিয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্যের অশ্লীলতা নারীর সেই মর্যাদা কেড়ে নিয়ে তাকে পণ্য ও প্রচারের উপকরণে পরিণত করেছে। এটি মানবাধিকারের নয়, বরং মানবতার লাঞ্ছনা।

৯. সমাজে ফিতনা ও পাপাচারের সংস্কৃতি বিস্তার

অশ্লীলতা কখনো সীমার মধ্যে থাকে না; এটি ক্রমে সমাজে ফিতনা ছড়িয়ে দেয়। যখন গান, নাচ, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন ও মিডিয়া অশ্লীলতার বাহক হয়, তখন পুরো সমাজে পাপাচারের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُحِبُّوۡنَ اَنۡ تَشِیۡعَ الۡفَاحِشَۃُ فِی الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ۙ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ

নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। সূরা নূর : ১৯

এ আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে—যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অশ্লীলতার প্রচার করে, সে আল্লাহর গজবের উপযুক্ত। আধুনিক বিনোদন মাধ্যমগুলো এই ফিতনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যা সমাজে আল্লাহর রহমতের বদলে গজব টেনে আনছে।

১০. আল্লাহর আজাব ও সমাজের ধ্বংস

যখন কোনো সমাজে অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তা’আলা সেই সমাজ থেকে তাঁর বরকত ও রহমত উঠিয়ে নেন। ইতিহাস সাক্ষী—যেসব জাতি অশ্লীলতা ও ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে, তারা ধ্বংস হয়ে গেছে।

আল্লাহ বলেন—

وَلُوۡطًا اِذۡ قَالَ لِقَوۡمِہٖۤ اَتَاۡتُوۡنَ الۡفَاحِشَۃَ مَا سَبَقَکُمۡ بِہَا مِنۡ اَحَدٍ مِّنَ الۡعٰلَمِیۡنَ

আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার কাওমকে বলেছিল, তোমরা এমন অশ্লীল ও কু-কর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেহই করেনি। সূরা আরাফ : ৮০

লূত (আ.)-এর সম্প্রদায় যৌন বিকৃতির কারণে ধ্বংস হয়েছিল। আজকের পশ্চিমা সমাজ একই পথে হাঁটছে—সমকামিতা, উলঙ্গ সংস্কৃতি ও বিকৃত যৌনাচারে নিমজ্জিত হয়ে আল্লাহর গজব আহ্বান করছে।

উপসংহার : ইসলামের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা কোনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নয়, বরং তা মানবতার জন্য বিষের মতো ক্ষতিকর। এটি ঈমান, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়। মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজেকে ও পরিবারকে এই পাপের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা এবং সমাজে পবিত্রতা, লজ্জা ও তাকওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَاللّٰہُ یُرِیۡدُ اَنۡ یَّتُوۡبَ عَلَیۡکُمۡ ۟ وَیُرِیۡدُ الَّذِیۡنَ یَتَّبِعُوۡنَ الشَّہَوٰتِ اَنۡ تَمِیۡلُوۡا مَیۡلًا عَظِیۡمًا

আল্লাহ তোমাদের তাওবা কবুল করতে চান, কিন্তু যারা কামনা-বাসনা অনুসরণ করে তারা চায় তোমরা সম্পূর্ণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে যাও।” সূরা নিসা : ২৭

অতএব, অশ্লীল বিনোদনের প্রতিরোধ কেবল সংস্কৃতিগত নয়; এটি ঈমান রক্ষার সংগ্রাম। যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টি, শ্রবণ ও অন্তরকে পবিত্র রাখবে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করবেন।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা মানুষকে পবিত্রতা, হায়া ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে। অশ্লীলতা ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদন সেই পথের পরিপূর্ণ বিপরীত। পাশ্চাত্য সমাজে এর ব্যাপকতা শুধু সামাজিক শৃঙ্খলা নয়, মানবতার মূল ভিত্তিকেই নষ্ট করছে।

মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের দৃষ্টি, শ্রবণ ও মনকে পবিত্র রাখা, অশ্লীলতার সব পথ থেকে দূরে থাকা এবং পরিবার-সমাজকে তা থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর। সূরা তাহরীম : ৬

অতএব, অশ্লীল বিনোদন থেকে দূরে থাকা শুধু ব্যক্তিগত পবিত্রতার অংশ নয়, বরং তা ঈমান রক্ষার অন্যতম মাধ্যম। পাশ্চাত্যের এই অন্ধ অনুকরণ থেকে দূরে থেকে ইসলামি নৈতিকতা ও হায়ার সংস্কৃতি পুনর্জাগরিত করা আজ সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *