মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
পাশ্চাত্যে অশ্লীল বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব
আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা নিজেদেরকে সভ্যতা, অগ্রগতি ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই তথাকথিত স্বাধীনতা আজ তাদের নৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশেষত, বিনোদনের নামে অশ্লীলতা, নগ্নতা, বিকৃত রুচি ও যৌন উদ্দীপনামূলক সংস্কৃতি পশ্চিমা সমাজকে অন্তঃসারশূন্য করে তুলেছে। ইসলামে বিনোদন নিষিদ্ধ নয়, বরং সীমার মধ্যে তা উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু যখন তা আল্লাহর সীমা অতিক্রম করে অশ্লীলতা ও পাপাচারে রূপ নেয়, তখন তা ধ্বংসাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلۡ اِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّیَ الۡفَوَاحِشَ مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَمَا بَطَنَ وَالۡاِثۡمَ وَالۡبَغۡیَ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَاَنۡ تُشۡرِکُوۡا بِاللّٰہِ مَا لَمۡ یُنَزِّلۡ بِہٖ سُلۡطٰنًا وَّاَنۡ تَقُوۡلُوۡا عَلَی اللّٰہِ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ
বল ,‘আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ, যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে তোমাদের শরীক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উাপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না’। সূরা আরাফ : ৩৩
এ আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, অশ্লীলতার প্রকাশ্য প্রচার সমাজের জন্য বিষের মতো। পাশ্চাত্যে আজ সেই বিষই সংস্কৃতির রূপ নিয়েছে। নিচে তার কিছু বড় নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করা হলো।
১. পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া
২. অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া
৩. চরম স্বার্থপরতা বৃদ্ধি
৪. অশ্লীল ইন্ডাস্ট্রির সৃষ্টি ও বিস্তার
৫. উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন
৬. মানসিক বিকার ও হতাশা বৃদ্ধি:
৭. নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠা:
৮. যৌন অপরাধের হার বৃদ্ধি:
৯. কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা হ্রাস
১০. সমকামিতা ও বিকৃত যৌনাচার বৃদ্ধি:
১১. তরুণ প্রজন্মের চরিত্র ধ্বংস:
১২. আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও জীবনের অর্থ হারানো:
১৩. মানসিক স্বাস্থ্য এবং সম্পর্কের অবনতি
১৪. নারী ও শিশুদের বস্তুকরণে উৎসাহ
১৫. শিশু ও তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা
১৬. নৈতিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ অবক্ষয়
১. পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া
অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদন মানুষকে একক ও বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। যখন ব্যক্তিগত বিনোদন, বিশেষত পর্নোগ্রাফি বা চরম কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট, পারিবারিক সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, তখন পরিবারের সদস্যদের মধ্যেকার যোগাযোগ ও সহমর্মিতা হ্রাস পায়। এই ধরনের বিনোদন প্রায়শই অবাস্তব যৌন প্রত্যাশা তৈরি করে, যা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও দূরত্ব সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির চরম প্রাধান্যতা পারিবারিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধকে ম্লান করে দেয়। ফলস্বরূপ, পরিবারে ভাঙন, বিবাহবিচ্ছেদ এবং সন্তানদের মধ্যে সুরক্ষার অভাব ও মানসিক আঘাত বৃদ্ধি পায়। পাশ্চাত্য সমাজে যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সর্বোচ্চ মূল্য পায়, সেখানে এই ধরনের বিনোদন আরও দ্রুত পারিবারিক কাঠামোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হলো দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন সমাজ তৈরি হওয়া। ফলে বিবাহ ভেঙে যায়, সন্তানরা পিতামাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, এবং সমাজে একাকিত্ব ও হতাশা বৃদ্ধি পায়। ইসলামে পরিবার সমাজের ভিত্তি। আল্লাহ বলেন,
وَمِنۡ اٰیٰتِہٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَکُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِکُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡکُنُوۡۤا اِلَیۡہَا وَجَعَلَ بَیۡنَکُمۡ مَّوَدَّۃً وَّرَحۡمَۃً ؕ
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। সূরা রূম : ২১
এই ভালোবাসা ও দয়ার বন্ধনকে অশ্লীল সংস্কৃতি ছিন্ন করছে, ফলে পাশ্চাত্য সমাজে পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
২. অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া
নোংরা বিনোদনের নিরন্তর প্রবাহ মানুষের মধ্যে নৈতিক সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়িয়ে তোলে। এই ধরনের কনটেন্ট প্রায়শই সহিংসতা, প্রতারণা এবং অবৈধ সম্পর্ককে গ্ল্যামারাইজ করে বা সেগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দেয়। যখন কেউ নিয়মিতভাবে এই কনটেন্টগুলো দেখতে থাকে, তখন আচরণের স্বাভাবিককরণ ঘটে, যেখানে পূর্বে যা অনৈতিক বলে বিবেচিত হতো, তা ক্রমশ গ্রহণযোগ্য বা পরীক্ষামূলক বলে মনে হতে শুরু করে। এটি বিশেষত তরুণদের মধ্যে দেখা যায়, যারা বিনোদনের মাধ্যমে শেখা আক্রমণাত্মক বা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে উৎসাহিত হয়। ফলে, অনৈতিক কার্যকলাপ মানুষকে ধীরে ধীরে পাপাচারের দিকে ঠেলে দেয়। চাহিদা জাগায়, তারপর সেই চাহিদা মেটাতে মানুষ বাস্তব জীবনে ব্যভিচার, ধর্ষণ, পরকীয়া ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ে।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা বানী আদমের জন্য যিনার একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা হলো দেখা, জিহবার যিনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে। সহিহ বুখারি, ৬২৪৩, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৭, আহমাদ :
অশ্লীল বিনোদন এই “চোখের ব্যভিচার”কে সাধারণ ব্যাপারে পরিণত করেছে। পরিণতিতে নৈতিকতা বিলুপ্ত।
৩. চরম স্বার্থপরতা বৃদ্ধি
অশ্লীল বিনোদন প্রায়শই তাৎক্ষণিক আত্মতৃপ্তি এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রাধান্যকে প্রচার করে। এই ধরনের কনটেন্টের মূল ভিত্তি হলো অন্যের অনুভূতি বা পরিণতির তোয়াক্কা না করে নিজের কামনা চরিতার্থ করা। এটি ক্রমাগত মানুষকে শেখায় যে, নিজের ভোগ বা আনন্দই জীবনের প্রধান লক্ষ্য, এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্য মানুষের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা যেতে পারে। এর ফলে সমাজে সমবেদনা, পরার্থপরতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব দেখা দেয়। যখন ব্যক্তি তার চারপাশের মানুষের প্রতি উদাসীন হয়ে কেবল নিজের চাহিদা পূরণে মগ্ন থাকে, তখন চরম স্বার্থপরতা সমাজের প্রতিটি স্তরে বিষ ছড়ায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি অনৈক্যপূর্ণ ও অমানবিক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বিলীন হয়ে যায়। ফলে, প্রত্যেকে নিজের সুখের জন্য অন্যকে ব্যবহার করতে চায়। ইসলামে এ প্রবণতা নিন্দনীয়। আল্লাহ তায়াল বলেন-
ۘ وَتَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَالتَّقۡوٰی ۪ وَلَا تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡاِثۡمِ وَالۡعُدۡوَانِ ۪ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ
সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ আযাব প্রদানে কঠোর। সূরা মায়িদাহ : ২
অশ্লীল বিনোদন মানুষকে এই সহযোগিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক নিঃসঙ্গ, আত্মকেন্দ্রিক জীবনে ঠেলে দেয়।
৪. অশ্লীল ইন্ডাস্ট্রির সৃষ্টি ও বিস্তার
অশ্লীল এবং কুরুচিপূর্ণ বিনোদনের চাহিদাকে কেন্দ্র করে বিশাল একটি শিল্প গড়ে উঠেছে, যা আর্থিক লাভের জন্য মানুষের নৈতিক দুর্বলতা ও আসক্তিকে পুঁজি করে। পর্নোগ্রাফি, অতিরিক্ত যৌনতাযুক্ত গেম বা মিডিয়া কনটেন্ট উৎপাদনকারী এই ইন্ডাস্ট্রিগুলো বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে। এই শিল্পের বিস্তার কেবল কনটেন্ট তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ট্র্যাফিকিং, শোষণ এবং দুর্বল শ্রেণির মানুষকে ব্যবহার করার মতো অন্ধকার দিকগুলোকেও উৎসাহিত করে। অর্থের এই চক্র মানুষকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে আরও বেশি কুরুচিপূর্ণ ও সীমা অতিক্রমকারী কনটেন্ট তৈরি করতে প্ররোচিত করে। এই শিল্প সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে ক্রমাগত ক্ষয় করে এবং মানুষের উপভোগের বস্তুকরণকে স্বাভাবিক করে তোলে, যা এক অসুস্থ সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এটি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। ইসলাম নারীকে সম্মানিত করেছে, কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রি তাকে অপমানিত করেছে। অথচ ইসলাম মনে করে, দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ সতী নারী।
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) এর সূত্রে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দুনিয়া উপভোগের উপকরণ (ভোগ্যপণ্য) এবং দুনিয়ার উত্তম উপভোগ্য উপকরণ পুণ্যবতী নারী। সহিহ মুসলিম : ১৪৬৭
৫. উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন
যখন জীবনধারণের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায় শুধুমাত্র বিনোদন বা ভোগ, তখন মানুষের মধ্যে জীবনের গভীর অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা হ্রাস পায়। অশ্লীল বিনোদন প্রায়শই মানুষকে একটি অবাস্তব জগতে আটকে রাখে, যেখানে তারা তাৎক্ষণিক আনন্দ খুঁজে পায় এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে শেখে। এই ধরনের জীবনযাপন মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ, কঠোর পরিশ্রম বা আত্ম-উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করতে বাধা দেয়। ফলস্বরূপ, ব্যক্তিরা একটি উদ্দেশ্যহীন, লক্ষ্যহীন ও আলস্যপূর্ণ জীবনযাপন শুরু করে। এটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যেখানে তারা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো (যেমন শিক্ষা, ক্যারিয়ার গঠন, সম্পর্ক স্থাপন) উপেক্ষা করে বিনোদনে মগ্ন থাকে। এই অলস ও অর্থহীন জীবনযাপন সমাজে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতার অভাব ঘটায়।
যে সমাজে আনন্দই সর্বোচ্চ লক্ষ্য, সেখানে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং আল্লাহভীতিহীন, উদ্দেশ্যহীন ও আখিরাত-বিমুখ করে তোলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰکُمۡ عَبَثًا وَّاَنَّکُمۡ اِلَیۡنَا لَا تُرۡجَعُوۡنَ
তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে কেবল অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে না’? সূরা মু’মিনুন : ১১৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
وَمَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَالۡاِنۡسَ اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ
আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। সুরা জারিয়া : ৫৬
৬. মানসিক বিকার ও হতাশা বৃদ্ধি
অতিরিক্ত নোংরা বিনোদনের আসক্তি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক পুরস্কার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে দেয়। পর্নোগ্রাফি বা চরম কনটেন্টের মাধ্যমে মস্তিষ্কে ডোপামিনের অতিরিক্ত প্রবাহ বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক আনন্দগুলোকে ম্লান করে দেয়। এই আসক্তি যখন পূরণ হয় না, তখন উদ্বেগ, হতাশা, নিদ্রাহীনতা এবং বিষণ্নতা বৃদ্ধি পায়। যারা এই আসক্তিতে ভোগে, তারা প্রায়শই নিজেদের জীবন ও সম্পর্ক নিয়ে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে, যা পূরণ না হওয়ায় তারা আরও হতাশ হয়ে পড়ে। এছাড়াও, এই কনটেন্টগুলো দেখার পর প্রায়শই অপরাধবোধ, লজ্জা এবং আত্ম-ঘৃণা জন্ম নেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে সমাজে মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং সুস্থ মানসিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। অশ্লীল কনটেন্টে আসক্ত ব্যক্তি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, এটি ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, সামাজিক ভয় ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায়। ইসলাম আত্মসম্মান, সংযম ও ধৈর্যের শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ یٰعِبَادِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوۡا رَبَّکُمۡ ؕ لِلَّذِیۡنَ اَحۡسَنُوۡا فِیۡ ہٰذِہِ الدُّنۡیَا حَسَنَۃٌ ؕ وَاَرۡضُ اللّٰہِ وَاسِعَۃٌ ؕ اِنَّمَا یُوَفَّی الصّٰبِرُوۡنَ اَجۡرَہُمۡ بِغَیۡرِ حِسَابٍ
বল, ‘হে আমার মুমিন বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় ভাল কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই। সূরা যুমার : ১০
৭. নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠা
নোংরা বিনোদন, বিশেষত পর্নোগ্রাফি, প্রায়শই নারীকে শুধুমাত্র যৌন বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে। এই ধরনের কনটেন্টে নারীর আবেগ, মর্যাদা এবং ব্যক্তিত্বকে উপেক্ষা করা হয়, এবং তাকে কেবল পুরুষের যৌন পরিতৃপ্তির মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়। এই চিত্রণ সমাজে নারীর প্রতি একটি অবমাননাকর ও বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। পুরুষেরা নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সমবেদনা দেখাতে ব্যর্থ হয়, এবং তাদের মূল্য কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বা যৌন প্রাপ্যতা দ্বারা পরিমাপ করা হয়। এর ফলে কর্মক্ষেত্র, পাবলিক প্লেস এবং এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও নারীর প্রতি হয়রানি ও বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। এটি নারীর সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে এবং সমাজে যৌন শোষণের পথ প্রশস্ত করে, যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এর ফলে পুরুষদের মনে নারীর প্রতি সম্মান হারিয়ে যায়, নারী হয় শিকার।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِہِمۡ وَیَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَہُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَزۡکٰی لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ
মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। সূরা নূর : ৩০
৮. যৌন অপরাধের হার বৃদ্ধি
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, কুরুচিপূর্ণ ও সহিংস যৌন বিনোদনের নিয়মিত ব্যবহার মানুষের মধ্যে আক্রমণাত্মক যৌন আচরণ বা যৌন উত্তেজনা জাগানো সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। এ কারনে প্রায়শই জোরপূর্বক যৌনতাকে আকর্ষণীয় বা উত্তেজিত হিসেবে উপস্থাপন করে। যখন বিনোদনের মাধ্যমে এই ধরণের আচরণ বারবার দেখা যায়, তখন কিছু দুর্বল মানসিকতার ব্যক্তি কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যেকার পার্থক্য হারিয়ে ফেলে এবং বাস্তব জীবনে যৌন অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়। যদিও পর্নোগ্রাফি বা নোংরা বিনোদন সরাসরি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং অন্যান্য যৌন এই অপরাধগুলোর হার বাড়তে থাকে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলেন, হে মুহাজিরগণ! তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। যখন কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকেদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪০১৯ ,সহীহাহ : ১০৬, হাদিসটির প্রয়োজনীয় অংশ।
৯. কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা হ্রাস
অশ্লীল বিনোদনে আসক্তি মানুষের মনোযোগ, সময় এবং মানসিক শক্তিকে গ্রাস করে। যারা নিয়মিতভাবে এই অশ্লীলতায় ডুবে থাকে, তাদের পক্ষে কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মঘণ্টার মধ্যে গোপনভাবে এই কনটেন্ট দেখার প্রবণতাও সময় নষ্ট করে এবং কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া, আসক্তির কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও নিদ্রাহীনতা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই দুর্বল করে তোলে। এর ফলে কাজে ভুল, দায়িত্ব পালনে অনীহা এবং সৃজনশীলতার অভাব দেখা দেয়। একটি সমাজে যখন কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশ এই আসক্তির শিকার হয়, তখন সামগ্রিকভাবে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামত দিবসে পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগপর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে; তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে মুতাবিক কি কি আমল করেছে। সুনানে তিরমিজি : ২৪১৬, সহীহাহ : ৯৪৬
১০. সমকামিতা ও বিকৃত যৌনাচার বৃদ্ধি
যদিও সমকামিতা একটি জটিল সামাজিক-জৈবিক বিষয়, তবুও নোংরা বিনোদনের বিস্তার প্রায়শই প্রকৃতির বিরুদ্ধ যৌনাচার ও বিকৃত আকাঙ্ক্ষাকে উন্মোচিত করে এবং সেগুলোকে “নতুন বা সাহসী” জীবনধারা হিসেবে তুলে ধরে। অশ্লীল মিডিয়া প্রায়শই অস্বাভাবিক এবং প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর বাইরে থাকা যৌন আচরণকে প্রচার করে, যা দর্শকদের মধ্যে এই ধরনের কার্যকলাপের প্রতি কৌতূহল ও স্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। এর ফলে, সমাজের একটি অংশে সমকামিতা, উভকামিতা এবং অন্যান্য বিকৃত যৌন আচরণের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিবর্তনগুলো কেবল ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রভাবিত করে না, বরং পরিবার ও সমাজের ঐতিহ্যবাহী নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে, যা সমাজে অস্থিরতা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। অশ্লীল বিনোদনের মাধ্যমে বিকৃত যৌন আচরণ প্রচারিত হচ্ছে। সমকামিতা, ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতি ও পশুর সঙ্গে যৌনাচার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ বলেন-
وَ لُوْطًا اِذْ قَالَ لِقَوْمِہٖۤ اَتَاْتُوْنَ الْفَاحِشَۃَ مَا سَبَقَکُمْ بِهَا مِنْ اَحَدٍ مِّنَ الْعٰلَمِیْنَ ﴿۸۰﴾ اِنَّکُمْ لَتَاْتُوْنَ الرِّجَالَ شَہْوَۃً مِّنْ دُوْنِ النِّسَآءِ ؕ بَلْ اَنْتُمْ قَوْمٌ مُّسْرِفُوْنَ ﴿۸۱﴾
আর আমি লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার কাওমকে বলেছিল, তোমরা এমন অশ্লীল ও কু-কর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে আর কেহই করেনি। তোমরা তো নারীদের ছাড়া পুরুষদের সাথে কামনা পূর্ণ করছ, বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী কওম’। সূরা আরআফ : ৮০-৮১
১১. তরুণ প্রজন্মের চরিত্র ধ্বংস
তরুণ প্রজন্ম অশ্লীল ও নোংরা বিনোদনের প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। তাদের অসম্পূর্ণ মানসিক বিকাশ ও কৌতূহল তাদের এই ধরনের কনটেন্টের দিকে আকর্ষণ করে। শৈশবেই এই ধরনের কনটেন্টের সংস্পর্শে আসার ফলে তাদের যৌনতা, সম্পর্ক এবং নৈতিকতা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা তৈরি হয়। এটি তাদের মধ্যে তাড়াতাড়ি যৌন কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, এবং শ্রদ্ধার অভাব সৃষ্টি করে। এই বিনোদনগুলো প্রায়শই তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির ধারণা দেয়, যা তাদের ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম এবং দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্ব বুঝতে বাধা দেয়। ফলস্বরূপ, তরুণ প্রজন্মের চারিত্রিক দৃঢ়তা, নৈতিক ভিত্তি এবং দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সমাজের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। যুবক-যুবতীরা আজ সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। অশ্লীল বিনোদন তাদের ইমান, লজ্জা ও নৈতিকতা নষ্ট করছে।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ঈমানের একটি শাখা। সহিহ বুখারি : ৯, সহিহ মুসলিম : ৩৫, আহমাদ : ৯৩৭২
১২. আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও জীবনের অর্থ হারানো
অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদনে অত্যধিক মগ্নতা মানুষকে আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক জীবনের প্রশ্নগুলো থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই বিনোদনগুলো মূলত শারীরিক কামনা, ভোগ এবং ক্ষণিকের আনন্দের উপর জোর দেয়। যখন মানুষ শুধুমাত্র শারীরিক স্তরের আনন্দকেই জীবনের মূল লক্ষ্য মনে করে, তখন তারা মহৎ উদ্দেশ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ, বা গভীর মানবিক সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছিন্নতা মানুষের মধ্যে এক ধরনের আধ্যাত্মিক শূন্যতা সৃষ্টি করে। এর ফলে মানুষ জীবনের আসল অর্থ ও উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়, যা মানসিক অসন্তুষ্টি এবং হতাশার জন্ম দেয়। এই শূন্যতা পূরণের জন্য তারা আরও বেশি করে বিনোদনের দিকে ঝুঁকতে থাকে, যা এক বিষাক্ত চক্র তৈরি করে। অশ্লীল বিনোদনে নিমগ্ন মানুষ এই প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত। ফলে আত্মার চাহিদা অপূর্ণ থাকে। তারা মানসিক শান্তি হারায়, যদিও বাহ্যিকভাবে সব আছে। আল্লাহ বলেন-
اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَتَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ؕ
‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। সূরা রাদ : ২৮
১৩. মানসিক স্বাস্থ্য এবং সম্পর্কের অবনতি
অশ্লীল বিনোদনের আসক্তি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর দ্বিমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একদিকে, আসক্তি উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্ম-সম্মান হ্রাস করে মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, এটি স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে অবিশ্বাস, প্রতারণার সন্দেহ এবং মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে। পর্নোগ্রাফির মতো কনটেন্ট বাস্তব জীবনের যৌনতাকে অবাস্তব ও কৃত্রিম প্রত্যাশার সাথে তুলনা করে, যা দম্পতিদের মধ্যে যৌন অসন্তুষ্টি তৈরি করে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগের অভাব, সহানুভূতি হ্রাস এবং একাকীত্ব দেখা দেয়, যা বিবাহবিচ্ছেদ বা সম্পর্কচ্ছেদের দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে সমাজে সুস্থ ও স্থিতিশীল সম্পর্কের সংখ্যা হ্রাস পায় এবং পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন_
ؕ ہُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّہُنَّ ؕ
তারা তোমাদের জন্য বস্ত্র, আর তোমরা তাদের জন্য বস্ত্র। সূরা বাকারা : ১৮৭
১৪. নারী ও শিশুদের বস্তুকরণে উৎসাহ
নোংরা বিনোদন ক্রমাগত নারী ও শিশুদেরকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং যৌন বা ভোগের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে। এটি তাদের মানবাধিকার ও মর্যাদা লঙ্ঘন করে। পর্নোগ্রাফিতে প্রায়শই নারী ও শিশুদের শরীরের অংশগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রদর্শন করা হয়, যা তাদের বস্তুকরণের ধারণাটিকে শক্তিশালী করে। এই ধরনের বস্তুকরণ সমাজে নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন শোষণ ও হয়রানিকে বাড়িয়ে তোলে। যখন নারী ও শিশুদের মানুষ হিসেবে সম্মান না করে কেবল ভোগের সামগ্রী হিসেবে দেখা হয়, তখন সমাজে নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটে। এটি তাদের স্বাভাবিক বিকাশ এবং সমাজে নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দুটি মেয়ে সন্তানকে সাবালক হওয়া পর্যন্ত প্রতিপালন করে, কিয়ামতের দিনে সে ও আমি এমন পাশাপাশি অবস্থায় থাকব, এ বলে তিনি তার হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিয়ে দিলেন। সহিহ
মুসলিম : ২৬৩১
১৫. শিশু ও তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা
অশ্লীল বিনোদন অল্প বয়সে শিশু ও তরুণদের কাছে পৌঁছানোর ফলে তাদের স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তারা জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে (যেমন, বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, যৌনতা) ভুল এবং বিকৃত ধারণা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এই ধরনের কনটেন্ট তাদের মধ্যে অসময়ে যৌন কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, যা তাদের শৈশবের নির্দোষতা নষ্ট করে দেয়। এছাড়াও, এটি তাদের আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে বাধা দেয়, কারণ তারা স্ক্রিনের মাধ্যমে পাওয়া কৃত্রিম উত্তেজনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, তারা বাস্তব জীবনে সুস্থ সম্পর্ক তৈরি করতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে।
৩৫৮. শু’আইব (রহ.) হতে বর্ণিত যে, ইবনু শিহাব (রহ.) বলেছেন, নবজাত শিশু মারা গেলে তাদের প্রত্যেকের জানাযার সালাত আদায় করা হবে। যদিও সে কোন ভ্রষ্টা মায়ের সন্তানও হয়। এ কারণে যে, সে সন্তানটি ইসলামী ফিত্রাহর (তাওহীদ) এর উপর জন্মলাভ করেছে। তার পিতামাতা ইসলামের দাবীদার হোক বা বিশেষভাবে তার পিতা। যদিও তার মা ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের অনুসারী হয়। নবজাত শিশু সরবে কেঁদে থাকলে তার জানাযার সালাত আদায় করা হবে। আর যে শিশু না কাঁদবে, তার জানাযার সালাত আদায় করা হবে না। কেননা, সে অপূর্ণাঙ্গ সন্তান। কারণ, আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হাদীস বর্ণনা করতেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ প্রতিটি নবজাতকই জন্ম লাভ করে ফিতরাতের (তাওহীদের) উপর। অতঃপর তার মা-বাপ তাকে ইয়াহূদী বা খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজারী রূপে গড়ে তোলে। যেমন, চতুষ্পদ পশু নিখুঁত বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাদের মধ্যে কোন কান কাটা দেখতে পাও? (বরং মানুষরাই তার নাক কান কেটে দিয়ে বা ছিদ্র করে তাকে বিকৃত করে থাকে। অনুরূপ ইসলামের ফিতরাহ্তে ভূমিষ্ট সন্তানকে মা-বাপ তাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবন ধারায় প্রবাহিত করে ভ্রান্ত ধর্মী বানিয়ে ফেলে) পরে আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) তিলাওয়াত করলেন-
فَاَقِمۡ وَجۡہَکَ لِلدِّیۡنِ حَنِیۡفًا ؕ فِطۡرَتَ اللّٰہِ الَّتِیۡ فَطَرَ النَّاسَ عَلَیۡہَا ؕ لَا تَبۡدِیۡلَ لِخَلۡقِ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ الدِّیۡنُ الۡقَیِّمُ ٭ۙ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ٭ۙ
অতএব তুমি একনিষ্ঠ হয়ে দীনের জন্য নিজকে প্রতিষ্ঠিত রাখ। আল্লাহর প্রকৃতি*, যে প্রকৃতির উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। সুরা রুম : ৩০। সহিহ বুখারি : ১৩৫৮, ১৩৫৯, ১৩৮৫, ৪৭৭৫, ৬৫৯৯, সহিহ মুসলিম : ২৬৫৮, আহমাদ : ৮১৮৫
১৬. নৈতিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ অবক্ষয়
অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিনোদনের ব্যাপক বিস্তার সমাজের সামগ্রিক নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই বিনোদনগুলো দায়িত্ব, সম্মান, পবিত্রতা এবং সংযমের মতো ঐতিহ্যবাহী নৈতিক মূল্যবোধগুলোকে তুচ্ছ করে, বা সেগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতাকে হ্রাস করে। যখন সমাজে নীতি-নৈতিকতার সীমারেখা ক্রমাগত মুছে যেতে থাকে, তখন মানুষ কেবল তাদের ব্যক্তিগত কামনা ও স্বার্থসিদ্ধির উপর মনোযোগ দেয়। এই অবক্ষয় একটি সমাজকে বিশৃঙ্খলা, অনৈতিকতা এবং সামাজিক অস্থিরতার দিকে নিয়ে যায়। এর ফলে, সমাজের সদস্যরা তাদের পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান হারায়, এবং সামাজিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে পড়ে। এই নৈতিক শূন্যতা পাশ্চাত্য সমাজের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং মানবিকতার জন্য সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতি নিয়ে আসে। সবশেষে, পাশ্চাত্যের অশ্লীল বিনোদন নৈতিকতার সব সীমা ভেঙে দিয়েছে। সেখানে ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম, লজ্জা-নির্লজ্জতার পার্থক্য মুছে গেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قَدْ اَفْلَحَ مَنْ زَکّٰىهَا ۪ۙ﴿۹﴾ وَ قَدْ خَابَ مَنْ دَسّٰىهَا ﴿ؕ۱۰﴾
“অবশ্যই সফল হলো সে, যে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে; এবং ব্যর্থ হলো সে, যে তা কলুষিত করেছে।”
সূরা শামস : ৯-১০
উপসংহার : অশ্লীল বিনোদন কোনো ব্যক্তিগত রুচির বিষয় নয়; এটি গোটা মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকি। পাশ্চাত্যের সমাজ আজ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। ইসলামী সমাজ যদি সতর্ক না হয়, তবে আমাদেরকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইসলাম যে সমাজ চায়, তা বিনোদনবিমুখ নয়, বরং তা আল্লাহভীতিপূর্ণ, মার্যাদাশীল, সুশৃঙ্খল ও পরিশুদ্ধ আনন্দের সমাজ। আল্লাহ তায়াতা এ সব অশ্লীলতা মুক্ত জীবন যাপনে নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিন ইরশাদ করেন-
وَقُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَیَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَلَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَلۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ ۪ وَلَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا لِبُعُوۡلَتِہِنَّ اَوۡ اٰبَآئِہِنَّ اَوۡ اٰبَآءِ بُعُوۡلَتِہِنَّ اَوۡ اَبۡنَآئِہِنَّ اَوۡ اَبۡنَآءِ بُعُوۡلَتِہِنَّ اَوۡ اِخۡوَانِہِنَّ اَوۡ بَنِیۡۤ اِخۡوَانِہِنَّ اَوۡ بَنِیۡۤ اَخَوٰتِہِنَّ اَوۡ نِسَآئِہِنَّ اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُنَّ اَوِ التّٰبِعِیۡنَ غَیۡرِ اُولِی الۡاِرۡبَۃِ مِنَ الرِّجَالِ اَوِ الطِّفۡلِ الَّذِیۡنَ لَمۡ یَظۡہَرُوۡا عَلٰی عَوۡرٰتِ النِّسَآءِ ۪ وَلَا یَضۡرِبۡنَ بِاَرۡجُلِہِنَّ لِیُعۡلَمَ مَا یُخۡفِیۡنَ مِنۡ زِیۡنَتِہِنَّ ؕ وَتُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ جَمِیۡعًا اَیُّہَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ
আর মুমিন নারীদেরকে বল, যেন তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। সূরা নূর : ৩১