মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন
আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের জীবন কেবল দুনিয়ার কয়েকদিনের ক্ষণস্থায়ী সফরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর রয়েছে চিরস্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ এক পরবর্তী ধাপ, যা “পরকালীন জীবন” নামে পরিচিত। মৃত্যুর পর একজন মানুষের ভৌত অস্তিত্ব মাটির নিচে চলে গেলেও তার আত্মা প্রবেশ করে এক অন্তর্বর্তী জগতে, যাকে ‘বারযাখ’ বলা হয়। এটি আখেরাতের সূচনা পর্ব, যেখানে মানুষ কিয়ামতের আগপর্যন্ত অবস্থান করবে। অত:পর, ইসরাফিল (আ.) আল্লাহর আদেশে শিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। এর ফলে আকাশ-বাতাস, গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষ পুনরায় মৃত অবস্থায় কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে—যাকে বলা হয় ‘নশর’ বা পুনরুত্থান। তখন এক বিশাল ও ভয়াবহ দিন শুরু হবে, যার নাম ‘ইয়াওমুল কিয়ামাহ’ বা কিয়ামতের দিন। কুরআনে একে “৫০ হাজার বছরের সমান দীর্ঘ” দিন বলা হয়েছে।
বান্দাকে এ দিনে হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে। সেখানে শুরু হবে মহান হিসাব-নিকাশের পর্ব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা প্রত্যেককে তাঁর দুনিয়াবি কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন করবেন। কারো আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, আর কারো বাম হাতে। বিচার হবে পূর্ণ ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, যেখানে কণামাত্র অন্যায় করা হবে না। এমনকি কারো পায়ে ছোট কাঁটা ফুটানোর মতো সামান্য যন্ত্রণাও হিসাবের খাতায় লেখা থাকবে।
হিসাব-নিকাশের পরে মানুষের সামনে উপস্থিত হবে একটি সংকীর্ণ ও ভয়ানক সেতু যার নাম ‘পুল সিরাত’। এই সেতুটি জাহান্নামের উপর স্থাপিত থাকবে এবং সকলকে এটি অতিক্রম করতে হবে। কেউ এটি বিজলি গতিতে পার হবে, কেউ হাঁটতে হাঁটতে, আবার কেউ পিছলে পড়ে জাহান্নামে নিপতিত হবে। কেবল ঈমানদার, সৎকর্মশীল ও তাকওয়াবানরাই সফলতার সঙ্গে পার হতে পারবে।
সবশেষে প্রত্যেক মানুষকে তার চিরস্থায়ী আবাসস্থলে প্রেরণ করা হবে—জান্নাত অথবা জাহান্নাম। জান্নাত হবে পরম শান্তি ও পুরস্কারের স্থান, আর জাহান্নাম হবে শাস্তি ও নিদারুণ কষ্টের জায়গা। জান্নাত লাভ হবে আল্লাহর রহমত ও বান্দার ঈমান ও আমলের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে জাহান্নাম হবে সেইসব কাফির, মুনাফিক ও পাপাচারীদের গন্তব্য, যারা আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অমান্য করেছে।
সারকথা, পরকালীন জীবন একটি চরম বাস্তবতা, যা আমাদের বর্তমান জীবনের প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহিতার একটি চূড়ান্ত পরিণতি বহন করে। এই বিশ্বাস একজন মুসলিমকে দুনিয়াবি জীবনে সচেতন, আত্মনিয়ন্ত্রণকারী ও সৎকর্মপরায়ণ করে তোলে।
পাঠকদের নিকটি বারযক বা কবরের জীবনের পরবর্তি পরকালীন জীবনের ধাপগুলো ফুটিয়ে তুলতে ৬ ভাগে ভাগ করে উপস্থাপন করা চেষ্টা করব। বান্দাকে পরকালে নিচের ৬ টি ধাপের সম্মূখিত হবে তবে।
১. কিয়ামত দিবস ও শিংগা ফুত্কারের
২. হাশরের ময়দান
৩. হাশরের ময়দানের হিসেব নিকাশ
৪. পুল সিরাত পার হওয়া
৪. জান্নাত ও
৬. জাহান্নাম
শিংগা ফুত্কার
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নির্ধারিত এক সময় পৃথিবীর শেষ দিন নির্ধারণ করেছেন, যাকে বলা হয় কিয়ামত। যখন সেই সময় উপস্থিত হবে, তখন তিনি কিয়ামত সংঘটনের জন্য নিয়োজিত বিশেষ ফেরেশতা ইসরাফিল (আ.) কে শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার আদেশ দিবেন। একমাত্র আল্লাহই জানেন সেই মুহূর্ত কখন আসবে। ফেরেশতা শিঙ্গায় প্রথমবার ফুঁ দেবার সঙ্গে সঙ্গে আসমান ও যমীন কাঁপতে থাকবে। পাহাড়গুলো গুড়িয়ে বালুর পাহাড়ের মতো উড়ে যাবে, ভূমি উল্টে যাবে। আকাশ বিদীর্ণ হয়ে পড়বে, গ্রহ-নক্ষত্রের কক্ষপথ বিছিন্ন হয়ে তা খসে পড়বে। সূর্য ও চাঁদের আলো নিভে যাবে, সমুদ্র অগ্নিসদৃশ উত্তাল হয়ে উঠবে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দে প্রাণীকুল হতবিহবল হয়ে পড়বে। এই সময় দুনিয়াতে শুধু সেই সব মানুষই জীবিত থাকবে, যারা হবে সবচেয়ে মন্দ, পাপাচারী ও অবাধ্য। কিয়ামত তাদেরই ওপর সংঘটিত হবে। এই দৃশ্য হবে এতটাই ভয়াবহ যে, কেউ রক্ষা পাবে না যতক্ষণ না আল্লাহ চান। কুরআন ও হাদিসে অসংখ্যার কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে তুল ধরা হয়েছে। নিচে কুরআন এ সহিহ হাদিসের আলোকে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।
১. কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই সংরক্ষিত
কিয়ামত কখন হবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউই জানেন না—এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনে একাধিক আয়াত রয়েছে। এই আয়াতগুলোতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই সংরক্ষিত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي ۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ ۚ ثَقُلَتْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا تَأْتِيكُمْ إِلَّا بَغْتَةً ۗ
তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তা কখন ঘটবে? বলো, এর জ্ঞান কেবল আমার প্রতিপালকের কাছেই আছে। তিনিই তার নির্ধারিত সময়ে তা প্রকাশ করবেন। আসমান ও যমীনে তা এক কঠিন বিষয়। তোমাদের কাছে তা হঠাৎ করেই আসবে। সূরা আরাফ : ১৮৭
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
নিশ্চয় আল্লাহ, তাঁর কাছেই কিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনিই জানেন যা কিছু জরায়ুতে আছে। আর কোনো ব্যক্তি জানে না যে, সে আগামী কাল কী উপার্জন করবে। কোনো ব্যক্তি জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব বিষয়ে খবর রাখেন।” সূরা লুকমান : ৩৪
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَسْأَلُكَ النَّاسُ عَنِ السَّاعَةِ ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ اللَّهِ ۚ وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّ السَّاعَةَ تَكُونُ قَرِيبًا
“লোকেরা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, ‘তার জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছেই আছে।‘ তুমি কি জানো, সম্ভবত কিয়ামত অতি নিকটবর্তী।” সূরা আহযাব : ৬৩
ক. আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا . فِيمَ أَنتَ مِن ذِكْرَاهَا . إِلَىٰ رَبِّكَ مُنتَهَاهَا
তারা তোমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তা কখন ঘটবে? এর আলোচনায় তোমার কী বলার আছে? এর চূড়ান্ত জ্ঞান তোমার প্রতিপালকের কাছেই।” সূরা নাযিয়াত : ৪২-৪৪
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِلَيْهِ يُرَدُّ عِلْمُ السَّاعَةِ ۚ وَمَا تَخْرُجُ مِن ثَمَرَاتٍ مِّنْ أَكْمَامِهَا وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَىٰ وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ ۚ وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ أَيْنَ شُرَكَائِي قَالُوا آذَنَّاكَ مَا مِنَّا مِن شَهِيدٍ
কিয়ামতের জ্ঞান তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়। তাঁর অজ্ঞাতসারে আবরণ হতে ফলসমূহ বের হয় না, কোন নারী গর্ভধারণ করে না এবং সন্তান প্রসবও করে না এবং সেদিন যখন তিনি তাদেরকে আহবান করে বলবেন, ‘আমার শরীকরা কোথায়?’ তারা বলবে, ‘আমরা আপনাকে জানাচ্ছি যে, এ ব্যাপারে আমাদের থেকে কোন সাক্ষী নেই।’ সূরা ফুসসিলাত : ৪৭
ইস্রাফিল (আ.) সর্বক্ষন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন
আবূ সাঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কিভাবে নিশ্চিন্তে আরাম করতে পারি, অথচ শিঙ্গাওয়ালা (ফিরিশতা ইসরাফীল আঃ) মুখে শিঙ্গা নিয়ে অধীর আগ্রহে কান পেতে শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়ার নির্দেশ শোনার অপেক্ষায় আছেন, কখন ফুঁ দেয়ার নির্দেশ প্রদান করা হবে, আর অমনি তিনি ফুঁ দিবেন। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের নিকট অত্যন্ত ভীতিকর মনে হলো। তখন তিনি তাদেরকে বললেনঃ তোমরা বল যে, আমাদের জন্য আল্লাহ্ তা’আলাই যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধানকারী। আমরা আল্লাহ্ তা’আলার উপর ভরসা করলাম। সুনানে তিরমিজ : ২৪৩১, মিশকাত : ৫৫২৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ২০৭৯, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ : ২৯৫৮৭, মুসনাদে আহমাদ : ৩০১০, আবূ ইয়া’লা : ১০৮৪, সহীহ ইবনু হিব্বান : ৮২৩, ত্ববারানী : ৪৯৩২, তারহীব : ৪৫।
শিঙ্গাটি দেখতে একটি শিং এর মত
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শিঙ্গা একটি শিং এর ন্যায়, তাতে ফুঁ দেয়া হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪২, মিশকাত : ৫৫২৮, সুনানে তিরমিজি : ৩৪৭২, সহীহুল জামি : ৩৮৬৩, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ১০৮০।
২. শিংগা ফুত্কারের মাধ্যমে কিয়ামত শুরু হবে
ক. আল্লাহ হুকুমে কিয়ামতের দিন শিংগার ফুঁক দেওয়া হবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ ؕ ذٰلِکَ یَوْمُ الْوَعِیْدِ
আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে। এটাই হল প্রতিশ্রুত দিন। সুরা কাফ : ২০
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاِذَا نُفِخَ فِی الصُّوْرِ نَفْخَۃٌ وَّاحِدَۃٌ ۙ
অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে- একটি মাত্র ফুঁক। সুরা হাক্কাহ : ১৩
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَیَوْمَ یَقُوْلُ کُنْ فَیَکُوْنُ ۬ؕ قَوْلُہُ الْحَقُّ ؕ وَلَہُ الْمُلْکُ یَوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ ؕ عٰلِمُ الْغَیْبِ وَالشَّہَادَۃِ ؕ وَہُوَ الْحَکِیْمُ الْخَبِیْرُ
যেদিন তিনি বলবেন. ‘হাশর হও‘ সেদিন হাশর হয়ে যাবে। তাঁর কথা খুবই যথার্থ বাস্তবানুগ। যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন একমাত্র তাঁরই হবে বাদশাহী ও রাজত্ব। গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু তাঁর জ্ঞানায়ত্বে। তিনি হচ্ছেন প্রজ্ঞাময়, সর্ববিদিত। সুরা আনাম : ৭৩
খ. শিংগায় ফুঁক দেয়া হলে অপরাধীরা দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত হবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یَّوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ وَنَحْشُرُ الْمُجْرِمِیْنَ یَوْمَئِذٍ زُرْقًا ۚۖ
যেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, আর সেদিন আমি অপরাধীদেরকে দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব। সুরা ত্বহা : ১০২
গ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ হাশরের ময়দানে তরঙ্গমালার মত আছড়ে পড়বে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَتَرَکْنَا بَعْضَہُمْ یَوْمَئِذٍ یَّمُوْجُ فِیْ بَعْضٍ وَّنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَجَمَعْنٰہُمْ جَمْعًا ۙ
আর সেদিন আমি তাদেরকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেব যে, তারা একদল আরেক দলের উপর তরঙ্গমালার মত আছড়ে পড়বে এবং শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদের সকলকে একত্র করব। সুরা কাহফ : ৯৯
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَاِذَا ہُمْ مِّنَ الْاَجْدَاثِ اِلٰی رَبِّہِمْ یَنْسِلُوْنَ
আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা কবর থেকে তাদের রবের দিকে ছুটে আসবে। সুরা ইয়াসিন : ৫১
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یَّوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ فَتَاْتُوْنَ اَفْوَاجًا ۙ
সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। সুরা নাবাহ : ১৮
ঘ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ আত্ম কেন্দ্রিক হয়ে পড়বে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَاِذَا نُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَلَاۤ اَنْسَابَ بَیْنَہُمْ یَوْمَئِذٍ وَّلَا یَتَسَآءَلُوْنَ
অতঃপর যে দিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন থাকবেনা, এবং একে অপরের খোঁজ খবর নিবেনা। সুরা মুমিনুন : ১০১
ঙ. শিংগায় ফুঁক দিলে মানুষ ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَیَوْمَ یُنْفَخُ فِی الصُّوْرِ فَفَزِعَ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَمَنْ فِی الْاَرْضِ اِلَّا مَنْ شَآءَ اللّٰہُ ؕ وَکُلٌّ اَتَوْہُ دٰخِرِیْنَ
আর যেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে সেদিন আল্লাহ যাদেরকে চান তারা ব্যতীত আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সবাই ভীত-বিহবল হয়ে পড়বে এবং সবাই তাঁর নিকট আসবে বিনীত অবস্থায়। সুরা নামল : ৮৭
চ. শিংগায় প্রথম ফুৎকারে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে এবং দ্বিতীয় ফুত্কারে দাঁড়িয়ে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَنُفِخَ فِی الصُّوْرِ فَصَعِقَ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَمَنْ فِی الْاَرْضِ اِلَّا مَنْ شَآءَ اللّٰہُ ؕ ثُمَّ نُفِخَ فِیْہِ اُخْرٰی فَاِذَا ہُمْ قِیَامٌ یَّنْظُرُوْنَ
আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। ফলে আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া আসমানসমূহে যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তারপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। সুরা যুমান : ৬৮
ছ. শিঙ্গায় ফুৎকারের পর আকাশ পাতাল চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে :
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
فَإِذَا نُفِخَ فِى ٱلصُّورِ نَفْخَةٌ۬ وَٲحِدَةٌ۬ (١٣) وَحُمِلَتِ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً۬ وَٲحِدَةً۬ (١٤) فَيَوْمَٮِٕذٍ۬ وَقَعَتِ ٱلْوَاقِعَةُ (١٥) وَٱنشَقَّتِ ٱلسَّمَآءُ فَهِىَ يَوْمَٮِٕذٍ۬ وَاهِيَةٌ۬ (١٦) وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآٮِٕهَاۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَٮِٕذٍ۬ ثَمَـٰنِيَةٌ۬ (١٧)
তারপর যখন একবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা তোলা হবে এবং এক আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে, তখন সেই দিন সংঘটিত হবে সেই মহাদিবস। এবং আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে, কেননা সেদিন তা দুর্বল হয়ে পড়বে। এবং ফিরিশতাগণ থাকবে তার প্রান্তসীমায় এবং তোমার রবের আরশকে সে দিন আটজন ফিরিশতা বহন করবে তাদের ওপর। সুরা হাক্কাহ : ১৩-১৭
৩. দ্বিতীয় ফুৎকারের মাধ্যামে সকল মানুষ পূনরুত্থিত হবে
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দু’বার ফুঁৎকারের মাঝে ব্যবধান চল্লিশ। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, হে আবূ হুরাইরাহ! চল্লিশ দিন? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। তারপর তারা জিজ্ঞেস করল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমার জানা নেই। এরপর তাঁরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে কি চল্লিশ মাস। তিনি বললেন, আমার জানা নেই এবং বললেন, শিরদাঁড়ার হাড় বাদে মানুষের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দ্বারাই সৃষ্টি জগত আবার সৃষ্টি করা হবে। সহিহ বুখারি : ৪৮১৪, ৪৯৩৫, সহিহ মুসলিম : ৯৫৫, মিশকাত : ৫৫১, সহীহুল জামি : ৫৫৮৫, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব : ৩৫৭৪ আহমাদ : ৯৫৩৩
৪. মেরুদন্ডের হাড় থেকে পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হবে
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন–
قَالَ: كُلَّ ابْنِ آدَمَ تَأْكُلُ الْأَرْضُ، إِلَّا عَجْبَ الذَّنَبِ مِنْهُ خُلِقَ وَفِيهِ يُرَكَّبُ
প্রতিটি আদম সন্তানকে মাটি খেয়ে ফেলবে, শুধু মেরুদন্ডের নীচের হাড়টুকু বাকী থাকবে। এ থেকেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এ থেকেই তাকে পুনর্গঠন করা হবে। সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৪৩
আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কতিপয় হাদীস উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে একটি হাদীস হচ্ছে এই যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মানুষের শরীরে এমন একটি হাড় আছে, যা জমিন কখনো ভক্ষণ করবে না। কিয়ামতের দিন এর দ্বারাই পুনরায় মানুষ সৃষ্টি করা হবে। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! এ আবার কোন হাড্ডি? তিনি বললেন, এ হলো, মেরুদণ্ডের হাড্ডি। সহিহ মুসলিম : ২৯৫৫
৫. কিয়ামতের ফুৎকারের মাঝে ব্যবধান হবে চল্লিশ বছর বা দিন
ইয়াকুব ইবনু আসিম ইবনু উরওয়াহ ইবনু মাসউদ আস্ সাকাফী (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ’আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) কে আমি এ কথা বলতে শুনেছি যে, একদা জনৈক লোক তার কাছে এসে বললেন, এ কেমন হাদীস আপনি বর্ণনা করছেন যে, এতো এতো দিনের মধ্যে কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ কথা শুনে তিনি বললেন, “সুবহানাল্লাহ অথবা ’লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ’ অথবা অবিকল কোন শব্দ। তারপর তিনি বললেন, আমি তো শুধু এ কথাই বলেছিলাম যে, অচিরেই তোমরা এমন ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে যা ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দিবে। এ ঘটনা কায়িম হবেই হবে।
এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমার উম্মাতের মধ্যেই দাজ্জালের আবির্ভাব হবে এবং সে চল্লিশ পর্যন্ত অবস্থান করবে। আমি জানি না চল্লিশ দিন, না চল্লিশ মাস, না চল্লিশ বছর। এ সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মারইয়াম তনয় ঈসা (আঃ) কে প্রেরণ করবেন। তাঁর আকৃতি উরওয়াহ ইবনু মাসউদ এর অবিকল হবে। তিনি দাজ্জালকে সন্ধান করে তাকে ধ্বংস করে দিবেন। তারপর সাতটি বছর লোকেরা এমনভাবে অতিবাহিত করবে যে, দু’ ব্যক্তির মধ্যে কোন শত্রুতা থাকবে না। তখন আল্লাহ তা’আলা সিরিয়ার দিক হতে শীতল বাতাস প্রবাহিত করবেন। ফলে যার হৃদয়ে কল্যাণ বা ঈমান থাকবে, এ ধরনের কোন লোকই এ দুনিয়াতে আর বেঁচে থাকবে না। বরং এ ধরনের প্রত্যেকের জান আল্লাহ তা’আলা কবয করে নিবেন। এমনকি তোমাদের কোন লোক যদি পর্বতের গভীরে গিয়ে আত্মগোপন করে তবে সেখানেও বাতাস তার কাছে পৌছে তার জান কবয করে নিবে।
আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে, তখন খারাপ লোকগুলো পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকবে। দ্রুতগামী পাখী এবং জ্ঞানশূন্য হিংস্রপ্রাণীর ন্যায় তাদের স্বভাব হবে। তারা কল্যাণকে অকল্যাণ বলে জানবে না এবং অকল্যাণকে অকল্যাণ বলে মনে করবে না। এ সময় শয়তান এক আকৃতিতে তাদের কাছে এসে বলবে, তোমরা কি আহবানে সাড়া দিবে না? তারা বলবে, আপনি আমাদেরকে কোন বিষয়ের আদেশ করছেন? তখন সে তাদেরকে মূর্তি পূজার নির্দেশ দিবে। এমতাবস্থায়ও তাদের জীবনোপকরণে প্রশস্ততা থাকবে এবং তারা স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন-যাপন করবে। তখনই শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। যে এ আওয়াজ শুনবে সে তার ঘাড় একদিকে অবনমিত করবে এবং অন্যদিকে উত্তোলন করবে। এ আওয়াজ সর্বপ্রথম ঐ লোকই শুনতে পাবে, যে তার উটের জন্য হাওয সংস্করণের কাজে নিযুক্ত থাকবে।
আওয়াজ শুনামাত্রই সে অজ্ঞান হয়ে লুটে পড়বে। সাথে সাথে অন্যান্য লোকেরাও অজ্ঞান হয়ে যাবে। অতঃপর মহান আল্লাহ শুক্র ফোটার অথবা ছায়ার ন্যায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। বর্ণনাকারী নুমান (রহ.) সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এতে মানুষের শরীর পরিবর্ধিত হবে। আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। অকস্মাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। অতঃপর আহবান করা হবে যে, হে লোক সকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট আসো। অতঃপর (ফেরেশতাদের বলা হবে) তাদেরকে থামাও, কারণ তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে। তারপর আবারো বলা হবে, জাহান্নামী দল বের করো। জিজ্ঞেস করা হবে, কত জন? উত্তরে বলা হবে, প্রত্যেক হাজার থেকে নয়শ’ নিরানব্বই জন। অতঃপর তিনি বললেন, এ-ই তো ঐদিন, যেদিন কিশোরকে পরিণত করবে বৃদ্ধে এবং এ-ই চরম সঙ্কটাপন্ন অবস্থার দিন। সহিহ মুসলিম : ২৯৪০
কিয়ামত বিদস
কিয়ামত শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো দাঁড়িয়ে যাওয়া, পুনরুত্থান বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। ইসলামি পরিভাষায়কিয়ামত বলতে এমন এক মহাদিবসকে বোঝানো হয়, যেদিন পৃথিবীর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তাআলা সকল মৃত মানুষকে পুনরায় জীবিত করে বিচারের জন্য দাঁড় করাবেন। কিয়ামতের এই দিনটিই হলো আখেরাত বা পরকালের প্রথম ধাপ, যেখানে মানুষের দুনিয়ার জীবনের সকল কাজের চূড়ান্ত হিসাব নেওয়া হবে।
কিয়ামত দিবস হলো এক ভয়ংকর ও অবশ্যম্ভাবী ঘটনা, যা মানবজাতির ইতিহাসকে চূড়ান্ত পরিণতি দেবে। সেদিন পৃথিবী তার সমস্ত ভার নির্গত করবে এবং পাহাড়-পর্বত তুলাধুনার মতো উড়ে যাবে। মানুষ ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়বে, কারণ সেদিন কোনো আশ্রয় থাকবে না এবং প্রত্যেকে নিজের কর্মফল নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। সেদিন আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে পুনরায় জীবিত করে এক বিশাল ময়দানে সমবেত করবেন, যেখানে প্রতিটি ছোট-বড় কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হবে। এটি হলো চূড়ান্ত বিচার ও কর্মফল প্রাপ্তির দিন, যখন মানুষের পার্থিব জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন হবে এবং প্রত্যেকের ভাগ্য নির্ধারিত হবে জান্নাত অথবা জাহান্নামে।
কুরআনে বহু স্থানে কিয়ামত দিবসের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলা হলেও সুরা হাক্কাহ, সুরা তাকভীর, সুরা কিয়ামাহ, সুরা ইনফিতার, সুরা ইনশিকাক, সুরা যিলজাল, সুরা গাশিয়াহ এই সূরাগুলোতে কিয়ামতের ভয়াবহতা ও দৃশ্যমান বর্ণনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এসব সূরা পাঠ করলে একজন মানুষের হৃদয়ে ভয়, অনুশোচনা ও আত্মশুদ্ধির অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়। নিচে কুরআন হাদিসের আলোকে এ দিবস সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো:
১. মা নিজের শিশুকে ভুলে যাবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى ٱلنَّاسَ سُكَٰرَىٰ وَمَا هُم بِسُكَٰرَىٰ وَلَٰكِنَّ عَذَابَ ٱللَّهِ شَدِيد
অর্থ : যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নারী তার স্তন্যপানরত শিশুকে ভুলে যাবে, এবং প্রত্যেক গর্ভবতী নারী গর্ভপাত করবে, আর তুমি মানুষকে মনে করবে মাতাল, অথচ তারা মাতাল নয়, বরং আল্লাহর শাস্তিই অত্যন্ত কঠিন। সূরা হজ্জ : ২
২. মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَبْصِرُونَهُمْ ۚ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍۢ بِبَنِيهِ
অর্থ: তারা একে অপরকে দেখতে পাবে। সে দিন অপরাধী চায় যে, যদি সে ঐ দিনের শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে পারত, তাহলে সে নিজের সন্তানদের কোরবানি দিত। সূরা মায়ারিজ : ১১
৩. আপন জন থেকে মানুষ পালিয়ে বেড়াবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
يَوْمَ يَفِرُّ ٱلْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ (٣٤) وَأُمِّهِۦ وَأَبِيهِ (٣٥) وَصَٰحِبَتِهِۦ وَبَنِيهِ (٣٦) لِكُلِّ ٱمْرِئٖ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٖ شَأْنٌ يُغْنِيهِ (٣٧)
অর্থ: সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই থেকে, তার মা ও পিতা থেকে, তার স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই এমন এক অবস্থা থাকবে যা তাকে ব্যস্ত রাখবে। সূরা আবাসা : ৩৪–৩৭
৪. কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসিদের চেহারা কালো হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یَّوْمَ تَبْیَضُّ وُجُوْہٌ وَّتَسْوَدُّ وُجُوْہٌ ۚ فَاَمَّا الَّذِیْنَ اسْوَدَّتْ وُجُوْہُہُمْ ۟ اَکَفَرْتُمْ بَعْدَ اِیْمَانِکُمْ فَذُوْقُوا الْعَذَابَ بِمَا کُنْتُمْ تَکْفُرُوْنَ
সে দিন কতক চেহারা সাদা হবে এবং কতক চেহারা হবে কালো। আর যাদের চেহারা কালো হবে (তাদেরকে বলা হবে) ‘তোমরা কি ঈমান আনার পর কুফরী করেছিলে? সুতরাং তোমরা আযাব আস্বাদন। সুরা আল ইমরান : ১০৬
৫. কিয়ামতের দিন সবার আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
یَوْمَئِذٍ یَّتَّبِعُوْنَ الدَّاعِیَ لَا عِوَجَ لَہٗ ۚ وَخَشَعَتِ الْاَصْوَاتُ لِلرَّحْمٰنِ فَلَا تَسْمَعُ اِلَّا ہَمْسًا
সেদিন তারা আহবানকারীর (ফেরেশতার) অনুসরণ করবে। এর কোন এদিক সেদিক হবে না এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না। সুরা ত্বহা : ১০৮
৬. পাপীরা তাদের দুর্ভোগের জন্য হাত কামড়াবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَيَوْمَ يَعَضُّ ٱلظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيْهِ يَقُولُ يَٰلَيْتَنِي ٱتَّخَذْتُ مَعَ ٱلرَّسُولِ سَبِيلٗا . يَٰوَيْلَتَىٰ لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلٗا . لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ ٱلذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَآءَنِيۗ وَكَانَ ٱلشَّيْطَٰنُ لِلْإِنسَٰنِ خَذُولٗا
অর্থ : আর সেদিন যালিম নিজের হাত দু’টো কামড়িয়ে বলবে, ‘হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম’! হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম’। আমাকেতো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌঁছার পর; শাইতানতো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক। সূরা ফুরকান: ২৭–২৯
৭. সেদিন মুখগুলো হবে আতঙ্কিত
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وُجُوهٞ يَوْمَئِذٖ نَّاضِرَةٌ . إِلَىٰ رَبِّهَا نَاظِرَةٞ . وَوُجُوهٞ يَوْمَئِذِۭ بَاسِرَةٞ . تَظُنُّ أَن يُفْعَلَ بِهَا فَاقِرَةٞ
অর্থ: সেদিন কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে। আর কিছু মুখ হবে বিমর্ষ, তারা ধারণা করবে তাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসবে। সূরা কিয়ামাহ : ২২–২৫
৮. আল্লাহ সামনে সকলেই অবনত হয়ে থাকবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَعَنَتِ ٱلْوُجُوهُ لِلْحَيِّ ٱلْقَيُّومِۖ وَقَدْ خَابَ مَنْ حَمَلَ ظُلْمٗا ١١١ وَمَن يَعْمَلْ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَهُوَ مُؤْمِنٞ فَلَا يَخَافُ ظُلْمٗا وَلَا هَضْمٗا ١١٢
আর চিরঞ্জীব, চিরপ্রতিষ্ঠিত সত্তার সামনে সকলেই অবনত হবে। আর সে অবশ্যই ব্যর্থ হবে যে যুলুম বহন করবে। এবং যে মুমিন অবস্থায় ভালো কাজ করবে সে কোনো যুলুম বা ক্ষতির আশংকা করবে না”। সূরা ত্বাহা : ১১১-১১২
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
خَاشِعَۃً اَبْصَارُہُمْ تَرْہَقُہُمْ ذِلَّۃٌ ؕ ذٰلِکَ الْیَوْمُ الَّذِیْ کَانُوْا یُوْعَدُوْنَ
অবনত চোখে। লাঞ্ছনা তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে! এটিই সেদিন যার ওয়াদা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল। সুরা মায়ারিজ : ৪৪
৯. কিয়ামতর দিন সূর্য ও চন্দ্র গুটিয়ে নেয়া হবে
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
إِذَا ٱلشَّمْسُ كُوِّرَتْ (١) وَإِذَا ٱلنُّجُومُ ٱنكَدَرَتْ (٢) وَإِذَا ٱلْجِبَالُ سُيِّرَتْ (٣) وَإِذَا ٱلْعِشَارُ عُطِّلَتْ (٤) وَإِذَا ٱلْوُحُوشُ حُشِرَتْ (٥) وَإِذَا ٱلْبِحَارُ سُجِّرَتْ (٦)
যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, আর যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে এবং যখন পর্বতসমূহকে সঞ্চালিত করা হবে, আর যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলো পরিত্যক্ত হবে, এবং যখন বন্য পশুদের একত্রিত করা হবে, আর যখন সমুদ্রসমূহকে অগ্নিতে উত্তপ্ত করা হবে। সূরা তাকভীর : ১-৬
ইবনু উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি কিয়ামতের দৃশ্যটি এমনভাবে দেখতে পছন্দ করে যে, তা তার চোখের সামনে উপস্থিত সে যেন (إِذا الشَّمسُ كُوِّرَتْ) “যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে”। সূরাতাকভীর: ১ এবং (إِذا السَّماءُ انفطرَتْ)“যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে”। সূরা ইনফিত্বার : ১, ও (إِذا السَّماءُ انشقَّتْ) “যখন আকাশ ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে। সূরা ইনশিক্বাক : ১, এ সূরা কয়েকটি (মর্ম বুঝে) পাঠ করে। সুনানে তিরমিযী : ৩৩৩৩, মিশকাত : ৫৫৪৭, সিলসিলাতুস সহীহাহ ১০৮১, মুসনাদে আহমাদ ৪৮০৬, সহীহুল জামি ৬২৯৩, আল মুসতাদরাক‘ লিল হাকিম ৮৭১৯।
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্র দু’টিকেই গুটিয়ে নেয়া হবে। সহিহ বুখারি : ৩২০০, মিশকাত : ৫৫৩৬, সিলসিলাতুস্ সহীহাহ : ১২৪।
১০. কিয়ামদের দিন আকাশ পৃথিবী উলট পালট হয়ে যাবে
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–
فَإِذَا نُفِخَ فِي ٱلصُّورِ نَفْخَةٞ وَٰحِدَةٞ ١٣ وَحُمِلَتِ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةٗ وَٰحِدَةٗ ١٤ فَيَوْمَئِذٖ وَقَعَتِ ٱلْوَاقِعَةُ ١٥ وَٱنشَقَّتِ ٱلسَّمَآءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٖ وَاهِيَةٞ ١٦ وَٱلْمَلَكُ عَلَىٰٓ أَرْجَآئِهَاۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٖ ثَمَٰنِيَةٞ ١٧ يَوْمَئِذٖ تُعْرَضُونَ لَا تَخْفَىٰ مِنكُمْ خَافِيَةٞ
অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেওয়া হবে- একটি মাত্র ফুঁক। আর যমীন ও পর্বতমালাকে সরিয়ে নেওয়া হবে এবং মাত্র একটি আঘাতে এগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সে দিন মহাঘটনা সংঘটিত হবে। আর আসমান বিদীর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সেদিন তা হয়ে যাবে দুর্বল বিক্ষিপ্ত। ফিরিশতাগণ আসমানের বিভিন্ন প্রান্তে থাকবে। সেদিন তোমার রবের আরশকে আটজন ফিরিশতা তাদের উর্ধ্বে বহন করবে। সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো গোপনীয়তাই গোপন থাকবে না”। সূরা হাক্কাহ : ১৩-১৮
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–
إِذَا ٱلسَّمَآءُ ٱنفَطَرَتْ ١ وَإِذَا ٱلْكَوَاكِبُ ٱنتَثَرَتْ ٢ وَإِذَا ٱلْبِحَارُ فُجِّرَتْ ٣ وَإِذَا ٱلْقُبُورُ بُعْثِرَتْ ٤ عَلِمَتْ نَفْسٞ مَّا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ
যখন আসমান বিদীর্ণ হবে। আর যখন নক্ষত্রগুলো ঝরে পড়বে। আর যখন সমুদ্রগুলোকে একাকার করা হবে। আর যখন কবরগুলো উন্মোচিত হবে। তখন প্রত্যেকে জানতে পারবে, সে যা আগে পাঠিয়েছে এবং যা পিছনে রেখে গেছে”। সূরা ইনফিতার : ১-৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–
إِنَّمَا تُوعَدُونَ لَوَٰقِعٞ ٧ فَإِذَا ٱلنُّجُومُ طُمِسَتْ ٨ وَإِذَا ٱلسَّمَآءُ فُرِجَتْ ٩ وَإِذَا ٱلْجِبَالُ نُسِفَتْ ١٠ وَإِذَا ٱلرُّسُلُ أُقِّتَتْ ١١ لِأَيِّ يَوْمٍ أُجِّلَتْ ١٢ لِيَوْمِ ٱلْفَصْلِ ١٣ وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا يَوْمُ ٱلْفَصْلِ ١٤ وَيْلٞ يَوْمَئِذٖ لِّلْمُكَذِّبِينَ ١٥
তোমাদেরকে যা কিছুর ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তা অবশ্যই ঘটবে। যখন তারকারাজি আলোহীন হবে, আর আকাশ বিদীর্ণ হবে, আর যখন পাহাড়গুলি চূর্ণবিচূর্ণ হবে, আর যখন রাসূলদেরকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত করা হবে; কান দিনের জন্য এসব স্থগিত করা হয়েছিল? বিচার দিনের জন্য। আর কিসে তোমাকে জানাবে বিচার দিবস কি? মিথ্যারোপকারীদের জন্য সেদিনের দুর্ভোগ! সূর মুরসালাত: ৭-১৫
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–
وَيَسَْٔلُونَكَ عَنِ ٱلْجِبَالِ فَقُلْ يَنسِفُهَا رَبِّي نَسْفٗا ١٠٥ فَيَذَرُهَا قَاعٗا صَفْصَفٗا ١٠٦ لَّا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجٗا وَلَآ أَمْتٗا ١٠٧ يَوْمَئِذٖ يَتَّبِعُونَ ٱلدَّاعِيَ لَا عِوَجَ لَهُۥۖ وَخَشَعَتِ ٱلْأَصْوَاتُ لِلرَّحْمَٰنِ فَلَا تَسْمَعُ إِلَّا هَمْسٗا
“আর তারা তোমাকে পাহাড় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল, আমার রব এগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে বিক্ষিপ্ত করে দিবেন, তারপর তিনি তাকে মসৃণ সমতলভূমি করে দিবেন তাতে তুমি কোনো বক্রতা ও উচ্চতা দেখবে না। সদিন তারা আহ্বানকারীর (ফেরেশতার) অনুসরণ করবে। এর কোনো এদিক সেদিক হবে না এবং পরম করুণাময়ের সামনে সকল আওয়াজ নিচু হয়ে যাবে। তাই মৃদু আওয়াজ ছাড়া তুমি কিছুই শুনতে পাবে না”। সূরা ত্বাহা : ১০৫-১০৮
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–
﴿ يَوْمَ تَرْجُفُ ٱلْأَرْضُ وَٱلْجِبَالُ وَكَانَتِ ٱلْجِبَالُ كَثِيبٗا مَّهِيلًا ١٤
দিন যমীন ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পাহাড়গুলো চলমান বালুকারাশিতে পরিণত হবে”। [সূরা আল-মুযযাম্মমিল : ১৪
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন–
وَيَوْمَ نُسَيِّرُ ٱلْجِبَالَ وَتَرَى ٱلْأَرْضَ بَارِزَةٗ وَحَشَرْنَٰهُمْ فَلَمْ نُغَادِرْ مِنْهُمْ أَحَدٗا ٤٧ وَعُرِضُواْ عَلَىٰ رَبِّكَ صَفّٗا لَّقَدْ جِئْتُمُونَا كَمَا خَلَقْنَٰكُمْ أَوَّلَ مَرَّةِۢۚ بَلْ زَعَمْتُمْ أَلَّن نَّجْعَلَ لَكُم مَّوْعِدٗا ٤٨ وَوُضِعَ ٱلْكِتَٰبُ فَتَرَى ٱلْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَٰوَيْلَتَنَا مَالِ هَٰذَا لْكِتَٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةٗ وَلَا كَبِيرَةً إِلَّآ أَحْصَىٰهَاۚ وَوَجَدُواْ مَا عَمِلُواْ حَاضِرٗاۗ وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدٗا
আর যেদিন আমি পাহাড়কে চলমান করব এবং তুমি যমীনকে দেখতে পাবে দৃশ্যমান, আর আমি তাদেরকে একত্র করব। অতঃপর তাদের কাউকেই ছাড়ব না। আর তাদেরকে তোমার রবের সামনে উপস্থিত করা হবে কাতারবদ্ধ করে। (আল্লাহ তায়ালা বলবেন) তোমরা আমার কাছে এসেছ তেমনভাবে, যেমন আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম; বরং তোমরা তো ভেবেছিলে আমি তোমাদের জন্য কোনো প্রতিশ্রুত মুহূর্ত রাখি নি। আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, হায় ধ্বংস আমাদের! কী হলো এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে এবং তারা যা করেছে, তা হাজির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। সূরা কাহাফ : ৪৭-৪৯
১১. কিয়ামতের দিন আল্লাহ দুনিয়াকে তার মুষ্ঠিতে ধারণ করবেন
কিয়ামতের দিনে আল্লাহর মহত্ব, সর্বময় কর্তৃত্ব ও সৃষ্টিজগতের ক্ষুদ্রতা ফুটে উঠেছে। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর কব্জায় থাকবে, আর যারা দুনিয়াতে অহংকার করেছে, তাদের অপমান ও বিচার হবে চরমভাবে।
وَمَا قَدَرُوا اللّٰہَ حَقَّ قَدْرِہٖ ٭ۖ وَالْاَرْضُ جَمِیْعًا قَبْضَتُہٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَالسَّمٰوٰتُ مَطْوِیّٰتٌۢ بِیَمِیْنِہٖ ؕ سُبْحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشْرِکُوْنَ
আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তাঁর মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে। সুরা যুমার : ৬৭
আল্লাহ তায়ালা বলেন–
یَوْمَ نَطْوِی السَّمَآءَ کَطَیِّ السِّجِلِّ لِلْکُتُبِ ؕ کَمَا بَدَاْنَاۤ اَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِیْدُہٗ ؕ وَعْدًا عَلَیْنَا ؕ اِنَّا کُنَّا فٰعِلِیْنَ
সে দিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই। সুরা আম্বিয়া : ১০৪
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলা যমীনকে নিজ মুষ্ঠিতে নিবেন এবং আকাশমন্ডলীকে ভাঁজ করে তাঁর ডান হাতে নিবেন, তারপর বলবেন, আমিই মালিক, দুনিয়ার বাদশারা কোথায়? সহিহ বুখারি : ৪৮১২, ৬৫১৯, ৭৩৮২, ৭৪১৩, সহিহ মুসলিম : ২৭৮৭, মিশকাত : ৫৫২২, সুনানে ইবনু মাজাহ : ১৯৮, সহীহুল জামি : ৮০০৯, মুসনাদে বাযযার : ৬১০৫, মুসনাদে আহমাদ : ৮৮৫০, ৮৮৭২, আবূ ইয়ালা : ৫৫৫৮, দারিমী : ২৭৯৯, তবারানী : ১৩১৪৬
আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন জনৈক ইয়াহূদী পাদ্রি নবী (সা.) -এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা (তাওরাতে) পেয়েছি যে, আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন আকাশমণ্ডলীকে এক আঙ্গুলের উপর স্থাপন করবেন। জমিনকে এক আঙ্গুলের উপর, পর্বতমালা ও গাছসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর, পানি এবং কাদা-মাটিকে এক আঙ্গুলের উপর, আর অন্যান্য সমস্ত সৃষ্টিজগতকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন। অতঃপর এ সমস্ত কিছুকে নাড়া দিয়ে বলবেন, আমিই বাদশাহ, আমিই আল্লাহ! ইয়াহুদী পাদ্রির কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিস্ময়ে হয়ে হেসে ফেললেন, তিনি যেন তার কথার সত্যতা স্বীকার করলেন। অতঃপর তিনি (সা.) কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন- وَ مَا قَدَرُوا اللّٰهَ حَقَّ قَدْرِهٖ ٭ۖ وَ الْاَرْضُ جَمِیْعًا قَبْضَتُهٗ یَوْمَ الْقِیٰمَۃِ وَ السَّمٰوٰتُ مَطْوِیّٰتٌۢ بِیَمِیْنِهٖ ؕ سُبْحٰنَهٗ وَ تَعٰلٰی عَمَّا یُشْرِکُوْنَ
আল্লাহ তা’আলার যতটুকু সম্মান করা দরকার ছিল তারা ততটুকু সম্মান করেনি, অথচ কিয়ামতের দিন সম্পূর্ণ পৃথিবী তাঁর মুষ্টিতে থাকবে এবং আকাশমণ্ডলী ডান হাতে গুটানো থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাকে শরীক করে তিনি তার উর্ধ্বে”। সূরা আয যুমার : ৬৭
সহিহ বুখারি : ৪৮১১, ৭৪১৪, ৭৪৫১, ৭৫১৩, সহিহ মুসলিম : ২৭৮৬, সুনানে তিরমিযী : ৩২৩৮, আহমাদ : ৪০৮৭, আবূ ইয়ালা : ৫৩৮৭, তবারানী : ১০১৮১
আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলা আকাশমণ্ডলী পেচিয়ে নিবেন। তারপর তিনি আকাশমণ্ডলীকে ডান হস্তে ধরে বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় শক্তিশালী লোকেরা! কোথায় অহংকারীরা? এরপর তিনি বাম হস্তে গোটা পৃথিবী গুটিয়ে নিবেন এবং বলবেন, আমিই বাদশাহ। কোথায় অত্যাচারী লোকেরা, কোথায় বড়ত্ব প্রদর্শনকারীরা? সহিহ মুসলিম : ২৭৮৮, মিশকাত : ৫৫২৩, সুনানে আবূ দাউদ : ৪৭৩২, ইবনু মাজাহ : ১৯৮, সহীহুল জামি : ৮০০৯, আবূ ইয়া‘লা : ৫৫৫৮, তবারানী : ৩৭
১২. কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুস হয়ে প্রথম মুসা (আ.) দেখতে পাবে
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, দু’ ব্যক্তি একে অপরকে গালি দিয়েছিল। তাদের একজন ছিল মুসলিম, অন্যজন ইয়াহূদী। মুসলিম লোকটি বলল, তাঁর কসম, যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত প্রদান করেছেন। আর ইয়াহূদী লোকটি বলল, সে সত্তার কসম, যিনি মূসা (আঃ)-কে সমস্ত জগতের মধ্যে ফাযীলাত দান করেছেন। এ সময় মুসলিম ব্যক্তি নিজের হাত উঠিয়ে ইয়াহূদীর মুখে চড় মারল। এতে ইয়াহূদী ব্যক্তিটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গিয়ে তার এবং মুসলিম ব্যক্তিটির মধ্যে যা ঘটেছিল, তা তাঁকে অবহিত করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা আমাকে মূসা (আঃ)-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তাদের সাথে আমিও বেহুঁশ হয়ে পড়ব। তারপর সকলের আগে আমার হুঁশ আসবে, তখন (দেখতে পাব) মূসা (আঃ) আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তিনি বেহুঁশ হয়ে আমার আগে হুঁশে এসেছেন অথবা আল্লাহ তা‘আলা যাঁদেরকে বেহুঁশ হওয়া হতে রেহাই দিয়েছেন, তিনি তাঁদের মধ্যে ছিলেন। সহিহ বুখারি : ২৪১১, ৩৪০৮, ৩৪১৪, ৪৮১৩, ৬৫১৭, ৬৫১৮, ৭৪২৮, সহিহ মুসলিম : ২৩৭৩, আহমাদ : ৭৫৮৯